নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০২ ::  তাওহিদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা থাকবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। বান্দা তার নাম, সিফাত এবং কর্মাবলীর ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করা। ভাল মন্দ, লাভ লোকসান সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত ও সঙ্ঘটিতব্য সকল ঘটনা অনুঘটনা এক মাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং তাঁর ইশারাতেই হয়ে থাকে। এখানে অন্য কোন মাধ্যম ও কার্যকারণের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। প্রত্যেক মানুষ সকল বিষয়কে উপরোক্ত বিশ্বাসের আলোকে বিচার করবে। এটিই হচ্ছে মূলত তাওহীদের সার কথা। আর প্রভূত্ব, ইবাদাত, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের অস্তিত্বকে প্রমাণ করা হল তাওহীদ। সুতরাং এক মাত্র তারই ইবাদাত করবে। যে ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবে না। আর যে ব্যক্তি তাওহীদের শিক্ষা ও তাৎপর্য বাস্তবায়ন করলো সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাকে কোনোই শাস্তি পেতে হবে না। শিরক ও বিদআত হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মারঅস্ত্র। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার তাওহীদ বা একত্ববাদের  কথা মহা গ্রন্থ আল কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে তুলে ধরছেন। আল্লাহর মারোফাত বা পরিচয়ের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ কয়েকটি আয়াতগুলো দেওয়া হলো-

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ:  বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُ‌ۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬‌ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ‌ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَ‌ۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ‌ۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَا‌ۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيمُ (٢٥٥)

 অর্থ:  “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত (এ আয়াতটি কে আয়াতুল কুরসী বলা হয়)।

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ‌ۖ عَـٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَـٰدَةِ‌ۖ هُوَ ٱلرَّحۡمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ (٢٢)

 هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَـٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَڪَبِّرُ‌ۚ سُبۡحَـٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِڪُونَ (٢٣)

هُوَ ٱللَّهُ ٱلۡخَـٰلِقُ ٱلۡبَارِئُ ٱلۡمُصَوِّرُ‌ۖ لَهُ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ‌ۚ يُسَبِّحُ لَهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (٢٤)

অর্থ:  তিনিই আল্লাহ্‌, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই। যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব জানেন। তিনি মহান এবং পরম করুণাময়।  তিনিই আল্লাহ্‌, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনিই সার্বভৌম, পবিত্র, শান্তি উৎস, ঈমানের বিধায়ক, নিরাপত্তার রক্ষক, পরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, সর্বশ্রেষ্ঠ। মহিমা আল্লাহ্‌র। তারা আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে যে শরীক আরোপ করে তিনি তার উর্দ্ধে। তিনিই আল্লাহ্‌ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, আকৃতির রূপকার, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা হাশর : ২২-২৪

তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা,  তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমন্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়াতে (প্রভুত্বে), উলুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না। নিম্মে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের সমষ্টিই হল তাওহীদ।

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম

বুঝার জন্য বিষয় তিনটিকে আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করা হল:

(১) তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব:

আল্লাহকে তার কর্ম সমুহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক, রিজিক দাতা, জীবন- মৃত্যু দাতা এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষি নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান। সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগন এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ لَكُم مَّا فِى ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعً۬ا ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ فَسَوَّٮٰهُنَّ سَبۡعَ سَمَـٰوَٲتٍ۬‌ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ۬ (٢٩)

অর্থ : তিনিই পৃথিবীর সকল বস্তু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। উপরন্তু তার পরিকল্পনা আকাশকেও অন্তর্ভূক্ত করে, তিনি সপ্ত আসমান তৈরির কাজকে সুষম করেন। সকল বিষয় সম্বন্ধে তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। সুরা বাকারা  : ২৯

আল্লাহ তায়ালা একক সৃষ্টিকর্তা হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল:

আল আনাম : ১৭৩-১০১;  আর রাদ : ১৬; আল আম্বিয়া : ৩৩; মুমিনুন : ১২-১৪; আন নুর : ৪৫; আল ফুরকান : ২; লোকমান :১০; আর রহমান : ১৪-১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلِ ٱللَّهُمَّ مَـٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِى ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُ‌ۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ‌ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ۬ (٢٦)

অর্থ :  বল, “হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্‌ ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান কর, এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছে কর ক্ষমতা কেড়ে নাও। যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত কর, এবং যাকে ইচ্ছা তুমি অসম্মানিত কর। সকল কল্যাণ তোমার হাতেই। নিশ্চয়ই তুমি সবার উপরে সর্বশক্তিমান। সুরা ইমরান : ২৬

আল্লাহ তায়ালা একমাত্র মালিক হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল: আন আন নিসা- ৫৩; আল মায়িদা- ১৭৬; আন নাহল-৭৩; বনী ইসরাইল-১১১; সাবা-২২;  ফাতির-১৩; জুমার-৪৩; যোখরুফ-৮৬; আল ফাতহ- ১১-১৪। মুমিনুন ২৩: ৮৮-৮৯)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ ٱلۡقَصَصُ ٱلۡحَقُّ‌ۚ وَمَا مِنۡ إِلَـٰهٍ إِلَّا ٱللَّهُ‌ۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (٦٢)

অর্থ:   নিসন্দেহ এটা নির্ভুল সত্য বৃত্তান্ত ৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ আর আল্লাহর সত্তা প্রবল পরাক্রান্ত এবং তার জ্ঞান ও কর্মকৌশল সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় সক্রিয়। সুরা আল ইমরান : ৬২

নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা:  সূরা আল বাকারা-১৬৩ & ২৫৫; আন নিসা-১৭১; আল মায়িদা-৭৩; আল আনআম-৪৬; আল আ’রাফ-৬৫; ইব্রাহিম-৫২; আন নাহল-২২ &৫১; বনী ইসরাইল-২২; আল ক্বাহফ-১১০;  আল আম্বিয়া ১০৮; আল হাজ্জ-৩৪; আল মোমেনুন-৯১; আন নামল-৬০; আল কাছাছ-৭১; সাদ-৬৫; মীম সিজদাহ-৬ যোখরুখ৮৪; আত তূর-৪৩।

০২. তাওহীদে উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা-

ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে তাওহীদুল উলুহিয়াহ বলা হয়। বান্দার যাবতীয় ইবাদাত  সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলোয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদির এক মাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তষ্টির জন্য করা। সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিরংকুশ করা।

এই তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবী রাসুল প্রেরন করছেন। তারা এসে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সূরা আম্বিয়া : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সূরা নাহল- : ৩৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

অর্থ: ‘আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরা মুমিনুন : ১৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা বনী ইসরাইল : ৫৭

মজার বিষয় হলো- মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়াহতে বিশ্বাসী হলেও কাফির-

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়াহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٤) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٨٥) قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ (٨٦) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ (٨٧) قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٨) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ (٨٩)

অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ।  বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন?  তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?  সুরা ইউনুস ১০:৩১

এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু  ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।

আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে উরশ করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا يُؤۡمِنُ أَڪۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ

অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। সুরা ইউসুফ : ১০৬

এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত না। কিন্তু  ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে।

সুরা ফিলের সানে নুযুল থেকে পাই, বাদশা আবরাহা যখন কাবা ধ্বংস করার জন্য আসে তখন তার অগ্রবাহিনী তিহামার অধিবাসী ও কুরাইশদের উট , ছাগল , ভেড়া ইত্যাদি বহু পালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবেরও দু’ শো উট ছিল। এরপর সে মক্কাবাসীদের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠায়। তার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের কাছে এই মর্মে বাণী পাঠায় : আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি শুধুমাত্র এই ঘরটি ( কাবা ) ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে । যদি তোমরা যুদ্ধ না করো তাহলে তোমাদের প্রাণ ও ধন – সম্পত্তির কোন ক্ষতি আমি করবো না। তাছাড়া তার এক দুতকেও মক্কাবাসীদের কাছে পাঠায়। মক্কাবাসীরা যদি তার সাথে কথা বলতে চায় তাহলে তাদের সরদারকে তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। আবদুল মুত্তালিব তখন ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার। দূত তাঁর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি বলেন , আবরাহার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। দূত বলে , আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন এবং দূতের সাথে আবরাহার কাছে যান। তিনি এতই সুশ্রী , আকর্ষণীয় ও প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে , আবরাহা তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে সিংহাসন থেকে নেমে এসে নিজে তাঁর কাছে বসে পড়ে। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে , আপনি কি চান ? তিনি বলেন , আমার যে উটগুলো ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলো আমাকে ফেরত দেয়া হোক। আবরাহা বলল , আপনাকে দেখে তো আমি বড়ই প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন , অথচ এই যে ঘরটা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না , আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন , আমি তো কেবল আমার উটের মালিক এবং সেগুলোর জন্য আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি । আর এই ঘর। এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা জবাব দেয় , তিনি একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বলেন , এ ব্যাপারে আপনি জানেন ও তিনি জানেন । একথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে পড়েন । আবরাহা তাঁকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দেয়।  আবরাহার সেনাদলের কাছ থেকে ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে বলেন , নিজেদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর চলে যাও , এভাবে তারা ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তারপর তিনি ও কুরাইশদের কয়েকজন সরদার হারম শরীফে হাযির হয়ে যান। তারা কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতে থাকেন যে , তিনি যেন তাঁর ঘর ও তাঁর কাদেমদের হেফাজত করেন। সে সময় কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। কিন্তু এই সংকটকালে তারা সবাই এই মূর্তিগুলোর কথা ভুলে যায়। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য হাত ওঠায় । ইতিহাসের বইগুলোতে তাদের প্রার্থনা বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিবের নিম্নোক্ত কবিতাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন  

 “ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো। আগামীকাল তাদের ক্রুশ ও তাদের কৌশল যেন তোমার কৌশলের ওপর বিজয় লাভ না করে । যদি তুমি ছেড়ে দিতে চাও তাদেরকে ও আমাদের কিবলাহকে তাহলে তাই করো যা তুমি চাও।  সুহাইলী ‘ রওযুল উনুফ’ গ্রন্থে এ প্রসংগে নিম্নোক্ত কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন : ক্রুশের পরিজন ও তার পূজারীদের মোকাবিলায় আজ নিজের পরিজনদেরকে সাহায্য করো। ”

আবদুল মুত্তালিব দোয়া করতে করতে যে , কবিতাটি পড়েছিলেন ইবনে জারীর সেটিও উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছে :

“হে আমার রব ! তাদের মোকাবিলায়
তুমি ছাড়া কারো প্রতি আমার আশা নেই,
হে আমার রব ! তাদের হাত থেকে
তোমার হারমের হেফাজত করো ।
এই ঘরের শত্রু তোমার শত্রু ,
তোমার জনপদ ধবংস করা থেকে
তাদের বিরত রাখো। ”

এ দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীরাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে দিন আবরাহা মক্কায় প্রবশে করার জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় ঝাঁকে ঝাকে পাখিরা ঠোঁটে ও পাঞ্জার পাথর কণা নিয়ে উড়ে আসে । তারা এ সেনাদলের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকে। যার ওপর পাথর কণা পড়তো তার দেহ সংগে সংগে গলে যেতে থাকতো। (তাফসীরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআনের সুরা ফিলের তাফসির।

ঘটনা বলার উদ্যেষ্য হল মক্কার মুসরিকদের রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি ইমান কত পাকা ছিল শুধু একথাটা বুঝানোর জন্য। আবদুল মুত্তালিবের বক্তব্য দেখুন “আর এই ঘর, এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হিফাজত করবেন।“ “ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো।“ আল্লার রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) প্রতি বিশ্বাস কত মজবুত ছিল।

যদি কোন ব্যক্তি রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্রে এ কথা শত ভাগ বিশ্বাস ও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলা এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সকল কিছুর তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন কিন্তু তিনি ইবদতের ক্ষেত্রে আংশিক বা পূর্ন ভাবে অংশিদারত্ব স্থাপন করেন তবে সে মুশরিক।

কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অর্থাত আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। মক্কার মুশরিকরা এ কথা ভালো করেই জানত। তাই তারা এই কলেমা স্বীকার করেনি। কিন্তু বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম কালিমায়ে তাইয়্যবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর সঠিক অর্থ না জেনে, কালিমাকে স্বীকার করে এবং সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে। মক্কার মুশরিকগণ আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে স্বীকার করে হজ করত, বাইতুল্লাহ তাওয়াব করত কিন্তু যখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) দাওয়াত দেওয়া হল তারা বুঝতে পারল। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। তারা আল্লাহ স্বীকার করার পরও লাত, মানাত, উজ্জসহ বহু মুর্তির পুজা করত, আল্লাহ সাথে শিরক করত। কিন্তু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) তাদের ঐ সকর মুর্তির ইবাদত অস্বীকার করে বিধায় তারা এই কলেমা গ্রহণ করে নাই।

তৎকালিন মুশরিক আবু জাহেল, ওতবা, সায়বা, আবু লাহাব, রাবিয়া, উবাইয়া বিন খলফসহ সকলে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এই কলেমাকে অস্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করেছিল। আর আমরা এই কলেমা স্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করছি।

বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমানদের অবস্থা জাহিলিয়াতের যুগের মুসলিমদের অবস্থার তুলনায় অনেক খারাপ। বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম এ কালিমার বিশুদ্ধ অর্থ সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখে না। পক্ষান্তরে তৎকালীন যুগের আরবরা কালিমার অর্থ কি তা জানত ও বুঝত, কিন্তু তারা তাতে বিশ্বাস করত না। আনেক দাওয়াত দান কারিকে দেখবেন কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ করে আল্লাহ ছাড়া কোন প্রতিপালক নেই। অর্থাৎ আমার হায়াতের মালিক, মৌয়তের মালিক, রিজিকের মালিক, সব কিছুর মালিক এক মাত্র আল্লাহ। কিছু থেকে কিছু হয়না সব কিছু আল্লাহ থেকে হয়। তারা কেন অধিকাংশ মুসলিমই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর এই অর্থ ও ব্যাখ্যাই করে, তারা প্রকৃত পক্ষে এ কথার সত্যিকার অর্থ কি, তা জানে না। ভুলটা কোথায় একবার দেখুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ হবে: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্যিকার) উপাস্য নাই’। আর আমরা অর্থ করছি: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব (প্রতিপালক) নাই’।  তা হলে কথা দাড়াল আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ সম্পূর্ণ উল্টা ও বিপরীত জানি। আমরা ইলাহ এর অর্থ করছি রব (প্রতিপালক) কিন্তু ইলাহ এর অর্থ উপাস্য (ইবাদতের মালিক)। মক্কার কুফরেরা  বিশ্বাস করত যে, এ জগতের একজন স্রষ্টা আছে, যার কোন শরিক নাই, কিন্তু তারা আল্লাহর সাথে ইবাদাতে অসংখ্যা শরিক সাব্যস্ত করত কেননা তাদের শরিকগণ মহান আল্লাহর নিকট তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে। আল্লাহকে স্বীকার করার পর তার নিকট সুপারিশ পেতে গাইরুল্লাহ ইবাদত করার করা শিরকেরই নামান্ত। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের এ বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে গাইরুল্লাহর ইবাদাত বলে আখ্যায়িত । তারা বিশ্বাস করত রব এক কিন্তু তারা এ ও বিশ্বাস করত যে উপাস্য অসংখ্য।

মক্কার মুশরিকগন ইবাদাতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত এই আশায় যে তাদের উপাস্যরা তাদের কে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে অর্থাৎ সুপারিশ করবে৷  যখনই জিজ্ঞাসা করা হত তোমরা কেন এক বাদ দিয়ে অসংখ্য উপাস্যের ইবাদাত করছ। তারা জবাব দিত, এই সকল উপাস্যই আমাদের আল্লাহ নিকটবর্তি করে দিবে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

اَلَا لِلّٰہِ الدِّیۡنُ الۡخَالِصُ ؕ وَالَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ ۘ مَا نَعۡبُدُہُمۡ اِلَّا لِیُقَرِّبُوۡنَاۤ اِلَی اللّٰہِ زُلۡفٰی ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَحۡکُمُ بَیۡنَہُمۡ فِیۡ مَا ہُمۡ فِیۡہِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ۬ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِیۡ مَنۡ ہُوَ کٰذِبٌ کَفَّارٌ

জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। সুরা জুমার : : ০৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

(١٧) وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَـٰٓؤُلَآءِ شُفَعَـٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ‌ۚ قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَلَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ (١٨)

অর্থ: এ লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করছে তারা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না৷ আর তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী ৷ হে মুহাম্মাদ ! ওদেরকে বলে দাও, “তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের খবর দিচ্ছো যার অস্তিত্বের কথা তিনি আকাশেও জানেন না এবং যমিনেও না!”  তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পাক -পবিত্র এবং তার উর্ধে৷  সুরা ইউনুস : ১৮

লক্ষ করুন, আরবের মুশরীকেরা আল্লাহর তাওহীদের সঠিত অর্থ বুঝেছির কিন্তু স্বীকার না করে হজ্জের মওসুমে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধত, তালবিয়া পড়ত, কাবা ঘরের প্রভুর ইবাদাত করত, কাবা ঘর তাওয়াব করত, হাজিদের পানি পান করাত, আল্লাহ কাছ চাইত (সুরা ফিলের শানে নুযুল), সাফা মারওয়া সাই করত, দান সদকা করত। এসবগুলি রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পরিচয় বহন করে। আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পর ও কি তাহাদের ঠিকানা জাহন্নাম? জী, হ্যা। কারন তারা প্রভুর ইবাদাতে শরীক বা অংশীদার স্থাপন করছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের একটি মাত্র উপায় আ তা হল মানুষকে এ কালিমার দাওয়াত দিতে হবে এবং এ কালিমার মর্মার্থ সঠিক ভাবে তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দিন। আমিন।

(৩) তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম:

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতির হল :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুনগুলি আচরনগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম

তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর নামসমূহ (আসমা) এবং গুণাবলির (সিফাত) প্রতি একত্ববাদের ভিত্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিকভাবে গ্রহণ করা, কোনো পরিবর্তন, বিকৃতি, অস্বীকার বা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা না করা।

তাওহীদে আসমা (নামসমুহ):

আসমা বা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ, যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো আল্লাহর সত্তার বিশেষ দিক নির্দেশ করে। এগুলো আল্লাহর সত্তাকে নির্দেশ করে এবং কুরআন ও হাদিসে উল্লেখিত নামগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَا‌ۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦ‌ۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (١٨٠)

সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহ্‌র অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

إِنَّ لِلهِ تِسْعَةً وَتِسْعِيْنَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ

আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মনে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, ৬৪১০, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৫০৮

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে নিরাপত্তা চায়, তাকে নিরাপত্তা দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে ভিক্ষা চায়, তাকে দাও। যে ব্যক্তি তোমাদেরকে দাওয়াত করে তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তোমরা তার উত্তম প্রতিদান দাও। প্রতিদান দেয়ার মতো কিছু না পেলে তার জন্য দু’আ করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমরা অনুধাবন করতে পারো যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো।

সুনানে আবূ দাঊদ : ১৬৭২, ৫১০৯, সুনানে নাসায়ী : ২৫৬৭, আহমাদ : ৫৩৪২

ইহা ছাড়া অসংখ্যা সহিহ হাদিসে আল্লাহর নামে নিয়ে সকল কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে। অজুর শুরুতে, খাওয়ার শুরুতে, জবেহ করার শুরুতে, শিকার করার শুধুতে আল্লাহ নাম নিতে বলা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সবসময় (بِاللَّهِ) বিসমিল্লাহ ব্যবহার করা হয়।

আসমা বা আল্লাহ নাম সম্পর্কে আমাদের আকিদা হবে-

১. আল্লাহর নামের অর্থে বিকৃতি না করা (تَحْرِيف)

আল্লাহর নামগুলোর প্রকৃত অর্থ পরিবর্তন করা বা বিকৃত করা সম্পূর্ণ হারাম।

উদাহরণ: “আর-রহমান” (পরম দয়ালু) নামকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।

২. আল্লাহর নামকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা না করা (تَشْبِيه)

আল্লাহর নাম বা গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।

“لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ”

অর্থ: “তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”

(সূরা আশ-শুরা: ১১)

৩. আল্লাহর নাম অস্বীকার না করা (تَعْطِيل)

আল্লাহর নাম সম্পূর্ণ অস্বীকার করা বা তা মানতে অস্বীকৃতি জানানো নিষিদ্ধ।

৪. আল্লাহর নামের প্রকৃত অর্থে সন্দেহ না করা (تَكْيِيف)

আল্লাহর নাম বা গুণাবলির বাস্তব রূপ বা কেমন তা জানতে চেষ্টা করা উচিত নয়। আমরা কেবল কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট অর্থে তা গ্রহণ করব। যেমন- আল্লাহ “শোনেন” (সামীউন), কিন্তু তাঁর শ্রবণ সৃষ্টির মতো নয়।

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমা-উল-হুসনা):

নাম (আরবি)বাংলা উচ্চারণবাংলা অর্থ
اللَّهُআল্লাহএকমাত্র উপাস্য
الرَّحْمَٰنُআর-রহমানপরম দয়ালু
الرَّحِيمُআর-রহিমপরম করুণাময়
الْمَلِكُআল-মালিকসর্বশক্তিমান শাসক
الْقُدُّوسُআল-কুদ্দুসএকেবারে পবিত্র
السَّلَامُআস-সালামশান্তি দানকারী
الْمُؤْمِنُআল-মু’মিননিরাপত্তা দানকারী
الْعَزِيزُআল-আজিজপরাক্রমশালী
الْغَفَّارُআল-গফফারঅতিশয় ক্ষমাশীল
الْوَدُودُআল-ওয়াদুদঅগাধ ভালোবাসার অধিকারী
الرَّزَّاقُআর-রায্জাকরিজিক দানকারী
الْعَلِيمُআল-আলীমসর্বজ্ঞ
السَّمِيعُআস-সামীসর্বশ্রোতা
الْبَصِيرُআল-বাসীরসর্বদ্রষ্টা
الْحَكِيمُআল-হাকীমপ্রজ্ঞাময়
التَّوَّابُআত-তাওয়াবঅনুতপ্তদের ক্ষমাকারী
الشَّكُورُআশ-শাকুরকৃতজ্ঞতা গ্রহণকারী
الْكَرِيمُআল-করিমমহা উদার
الرَّؤُوفُআর-রউফঅত্যন্ত দয়ালু
الْجَبَّارُআল-জাব্বারমহা ক্ষমতাবান
الْخَالِقُআল-খালিকস্রষ্টা
الْبَارِئُআল-বারিসৃষ্টির আদর্শ রূপদানকারী
الْمُصَوِّرُআল-মুসাওয়াররূপকার

তাওহীদে সিফাত (গুণাবলি):

তাওহীদে সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর গুণাবলির প্রতি সঠিক বিশ্বাস স্থাপন করা, যা কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত। আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা না করা এবং তা বিকৃত বা অস্বীকার না করা। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে, যা আল্লাহ নিজে কুরআনে বলেছেন বা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহর সিফাতের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে উদাহরণ তুলে ধরা হলো :

১. আল্লাহ সর্বশ্রোতা (সামি‘)

কুরআনের দলিল:

“إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ”

অর্থ: “নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। সূরা আশ-শোআরা : ২২

২. আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা (বাসীর)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا”

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। সূরা আন-নিসা : ৫৮

৩. আল্লাহ ক্ষমাশীল (গাফুর)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا”

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। সূরা আন-নিসা: ৪৩

৪. আল্লাহ দয়ালু (রহিম)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ”

অর্থ: “আর তোমার রব ক্ষমাশীল, দয়ালু। সূরা কাহফ : ৫৮

৫. আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা (খালিক)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ”

অর্থ: “আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর ওপর অভিভাবক। সূরা যুমার : ৬২

৬. আল্লাহ রিজিক দানকারী (রায্জাক)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ”

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিক দাতা, শক্তিশালী, সুদৃঢ়। সূরা যারিয়াত : ৫৮

৭. আল্লাহ সবকিছু জানেন (আলিম)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ”

অর্থ: “আর তাঁর কাছেই রয়েছে অদৃশ্যের চাবি, যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না। সূরা আনআম : ৫৯

সিফাত সম্পর্কিত হাদিস-

১. আল্লাহর করুণা ও দয়া-

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَمَّا قَضَى اللهُ الْخَلْقَ كَتَبَ فِيْ كِتَابِهِ فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ إِنَّ رَحْمَتِيْ غَلَبَتْ غَضَبِي

আল্লাহ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহ্ফুজে লিখেন, যা আরশের উপর তাঁর নিকট আছে। নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রবল। সহিহ বুখারি : ৩১৯৪, ৭৪০৪, ৭৪১২, ৭৪৫৩, ৭৫৫৩, ৭৫৫৪, সহিহ মুসলিম : ২৭৫১, আহমাদ ৯৬০৩

৫. আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ তাহকীক সানী (হাঃ ২৩৩৬)

সিফাত সম্পর্ক আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো-

১. তাতিল (অস্বীকার না করা):

আল্লাহর কোনো গুণ অস্বীকার করা যাবে না।

২. তাহরিফ (বিকৃতি না করা):

আল্লাহর গুণাবলির অর্থ বিকৃত করা নিষিদ্ধ।

৩. তাকইফ (কিভাবে তা হয়, তা নির্ধারণ না করা):

আমরা জানি না আল্লাহর গুণাবলি কীভাবে কাজ করে।

যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্‌যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।

অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *