মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত কুরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে তাদের আকিদা (বিশ্বাস) এবং আমল প্রতিষ্ঠা করে। তাদের আকিদা নিম্নোক্ত মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা তাওহিদ (একত্ববাদ) বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং একমাত্র উপাস্য। আল্লাহর কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তাঁর গুণাবলি (সিফাত) তাঁর সত্তার সাথে সংগতিপূর্ণ। রিসালাত সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস আল্লাহর রাসূলগণ তাঁর নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরিত। সকল রাসুলগণই হক ও সত্যের উপর থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশেষ নবি এবং তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবে না (খাতামুন নাবিয়্যিন)। তারা আখিরাত তথা মৃত্যুর পরে জীবনের, কিয়ামতের দিন, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর এবং বিচার দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। তাদের বিশ্বাস কিয়ামতের দিন আমল ও বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ হবে। তাদের বিশ্বাস কুরআন আল্লাহর কালাম এবং এটি বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা এবং জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা। তারা সাহাবাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কনে ও তাদের অনুসরণ করা। তাদের মধ্যকার বিভেদ নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনা না করা। তাদের শুধু প্রশংসা করে, সমালোচনা এড়িয়ে চলে। তারা তাকদির বা আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণের প্রতি বিশ্বাস। ভালো ও মন্দ সবই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত এবং তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে। ইবাদতে ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করে এবং ধর্মে কোনো নতুন সংযোজন বা পরিবর্তনকে বিদআত (নবপ্রবর্তিত কর্ম) হিসেবে পরিহার করা। এই জামাত উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং অযথা বিভেদ সৃষ্টি না করা থেকে বিরত থাকাকে ফরজ মনে করে।
এই হলো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদার মূল ভিত্তি। কিন্তু কালের আবর্তনের ফলে তাদের মাঝেও অনেক ভ্রান্ত আকিদা প্রবেশ করেছেন। যার ফলে মূল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারিগণ দূরে সরে গিয়েছেন। ভ্রান্ত আকিদা ধারণকারী নতুন ফির্কা সৃষ্টি করে নতুন নামকরণ করলেও তারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারী দাব করে থাকে।
মজার বিষয় হলো, তাদের এই ভ্রান্ত আকিদা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এর থেকে আলাদা হলেও তারা নিজের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় ধারণ করে আছে। এই জামাতের সহিহ আদিকা সম্পর্কে বহু কিতাব রচিত হয়েছে। আকিদা জানতে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সে সকল কিতাব পাঠ করতে পারেন। আমি এখানে যারা ভ্রান্ত আকিদা ধারণ করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় দেয় তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যাতে এই ভ্রান্ত আকিদা দেখলেই বুঝতে পারবেন এরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
যদি কেউ নিম্নের ভ্রান্ত আকিদাগুলি ধারণ করে, প্রচার করে ও বিশ্বাস করে তবে বুঝবেন তারা এই সঠিক, সত্যপন্থি, মুক্তি প্রাপ্ত দল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা একটি ভ্রান্ত ধারণার অনুসারী। যদিও তারা দাবি করে আমরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী কিন্তু ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাস করার কারণ তারা বাতিল ফির্কা। নিম্নে সতর্ক করার জন্য বাতিল ফির্কার কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুল ধরছি। যাতে সহজে বুঝতে পারেন, এই সব বাতিল ফির্কা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নাম ব্যবহার করে তাদের ভ্রান্ত আকিদা প্রচার ও প্রসার করেছে। নিম্নে তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা হরা হলো-
১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖ ٭ۖ وَالۡاَرۡضُ جَمِیۡعًا قَبۡضَتُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطۡوِیّٰتٌۢ بِیَمِیۡنِہٖ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ
তারা আল্লাহর যথাযথ সম্মান করেন না। কিয়ামাত দিবসে সমস্ত পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুষ্টিতে এবং আকাশমণ্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। সুরা জুমার : ৬৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ
তিনি বললেন, হে ইবলিস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন? সুরা সোয়াদ : ৭৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬
সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বলেন-
يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ
সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহ্বান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েই স্বীয় রবের নিকট অভিযোগ করল। জান্নাত বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ব্যাপারটি কী যে তাতে শুধু নিঃস্ব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই প্রবেশ করবে। এদিকে জাহান্নামও অভিযোগ করল অর্থাৎ আপনি শুধু অহংকারীদেরকেই আমাকে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহ্ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আমার রহমত। জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার আজাব। আমি যাকে চাইব, তোমাকে দিয়ে শাস্তি পৌঁছাব। তোমাদের উভয়কেই পূর্ণ করা হবে। তবে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো উপর জুলুম করবেন না। তিনি জাহান্নামের জন্য নিজ ইচ্ছানুযায়ী নতুন সৃষ্টি করবেন। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নাম বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? জাহান্নামে আরো নিক্ষেপ করা হবে, তখনো বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? এভাবে তিনবার বলবে। অবশেষে আল্লাহ তাঁর পা জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তখন জাহান্নামের একটি অংশ অন্য অংশকে এ উত্তর করবে- আর নয়, আর নয়, আর নয়। সহিহ বুখারি : ৭৪৪৯
কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারণা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোনো সৃষ্টির আকারে সৃষ্টি করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোনো কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের গ্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সবদ্র্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নয়। কাজেই আল্লাহ তায়ালার কাছে আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩
এ সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উক্তিটি যথার্থ। তিনি বলেন-
আল্লাহর ইয়াদ (হাত) আছে, ওয়াজহ (মুখমন্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলো উল্লেখ করেছেন। কুরআনে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন- মুখমন্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তাঁর বিশেষণ, কোনো ‘স্বরূপ’ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর বিশেষণ বাতিল করা। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারিয়া ও মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ, কোনো স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ, আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনো ‘কাইফ’ বা ‘কীভাবে’ প্রশ্ন করা ছাড়াই।
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, আল ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃ-২২৫
কাজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর কোন নির্দিষ্ট আকার দেয়া বা তাকে নিরাকার সাব্যস্ত করা, দু’টিই কবিরা গুনাহ অন্তর্ভুক্ত।
২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারেফাত বা পরিচয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধি আর কল্পনা দ্বারা মানব সত্তার অবস্থানের মত অবস্থান কল্পনা করা যাবে না। তিনি কোথায় সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন আমাদের জন্য ওয়াজিব। এই সম্পর্কে কিছু বলার আগে কুরআনের কিছু আয়াত দেখেনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। সুরা ত্বহা : ৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا
যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর। সুরা ফুরকান : ৫৯
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন এ সম্পর্কিত আয়াত: সুরা সাজদা : ৪, সুরা ইউনুস : ৩, সুরা রাদ : ২, সুরা আরাফ : ৫৪, সুরা মুলক : ১৭, সুর হাদিদ : ৪।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِۖ مَا يَڪُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَـٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُہُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٲلِكَ وَلَآ أَڪۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ (٧)
আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে অবগত, সে ব্যাপারে তুমি কি সচেতন নও? যখনই তিন ব্যক্তির মধ্যে কোন গোপন কানাঘুষা হয়, তখন সেখানে আল্লাহ অবশ্যই চতুর্থজন হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ যখনই পাঁচজনের মধ্যে গোপন সলাপরামর্শ হয় তখন সেখানে ষষ্ঠ জন হিসেবে আল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন৷ গোপন সলাপরামর্শকারীরা সংখ্যায় এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক, এবং তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন৷ তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা কি কি করেছে৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ৷ সুরা মুজাদালা : ৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-
وَلِلَّهِ ٱلۡمَشۡرِقُ وَٱلۡمَغۡرِبُۚ فَأَيۡنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجۡهُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ۬ (١١٥)
পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ১১৫
ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি আমাদের সাথে আছি, সবরকারীদের সাথে আছি, মুত্তাকিদের সাথে আছি, মুমিনদের সাথে আছি।
প্রথম দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন। পরের দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সাথে আছেন। তাহলে এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা কী?
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি বলেন-
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
তিনি নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। সুরা হাদীদ : ৪
ভাল করে লক্ষ করুন হাদীদের এই আয়াতের প্রথমে আল্লাহ তায়ালা বললেন, তিনি আরশের উপর সমুন্নত আছেন এবং এই আয়াতই তিনি বললেন, আমাদের সাথে আছেন। তাহলে আল্লাহ কি আত্মভোলা (নাউজুবিল্লাহ)। এ আয়াতের তাফসির আয়াতেরই শেষাংশ আর তা হল, আল্লাহ সব কিছু দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টির সাথে আছেন। অর্থাৎ তিনি সপ্ত আসমানের উপর অবস্থিত আরশের উপর থেকেই সব কিছু দেখছেন, সব কিছু শুনছেন, সকল বিষয়ে জ্ঞাত আছেন।
সাথে থাকার অর্থ, গায়ে গায়ে লেগে থাকা নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মূসা ও হারূন আ. কে ফেরাউনের নিকট যেতে বললেন, তারা ফেরাউনের অত্যাচারের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন। আল্লাহ তাদের সম্বোধন করে বললেন, ‘‘তোমরা ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। শুনছি এবং দেখছি। সুরা ত্বহা : ৪৬ এখানে সাথে থাকার অর্থ এটা নয় যে, মূসা আ. এর সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউনের দরবারে গিয়েছিলেন। বরং সাথে থাকার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করছেন এই বলে যে, ‘‘শুনছি এবং দেখছি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশে আছেন বলেই, কুরআন পৃথিবীতে নাজিল করা হয়েছে এবং মিরাজে রাসূল ﷺ কে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করান। তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজ মান হলে জিবরাইল আ. এর মাধ্যমে কুরআন নাজিল করার প্রয়োজন ছিন না। মিরাজেও ঊর্ধ্বাকাশের গমনেন প্রয়োজন ছিল না। অতএব আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ হলো জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে, আর স্ব-সত্তায় তিনি আরশের উপর রয়েছেন।
তা হলে প্রশ্ন হল ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান’ কথাটা কি সঠিক?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান” বাক্যটির অর্থ যদি হয় ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” তা হলে কথাটি সরাসরি বাতিল। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতা দ্বারা সর্বত্র বিরাজমান তাহলে সঠিক হবে। আমরা শত শত কিলোমিটার দুর থেকে লাইভ টেলিকাস্ট দেখি আর ভাবি এত আমার চোখের সামনেই ঘটছে। কারণ আমার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ঐ ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত।
সুরা বাকারার ১১৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরবীদ হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনু কাসীর রহ. বলেন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে কোন জায়গা শূন্য নেই, এর ভাবার্থ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ইলম’ বা অবগতি হয় তাহলে অর্থ সঠিক হবে, যে কোন স্থানেই আল্লাহ পাকের ইলম হতে শূন্য নেই। আর যদি এর ভাবার্থ হয় ‘আল্লাহ তা আল্লাহ সত্তা’ তবে এটা সঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে, তার সৃষ্টি জীবের মধ্য হতে কোন জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন তা থেকে তার পবিত্র সত্তা বহু ঊর্ধ্বে। তাফসিরে ইবনে কাসির প্রথম খণ্ড পৃ-৩৭২
আবু মুতি আল হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ আল বালাখি রহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেউ যদি বলে, আমি জানি না আল্লাহ্ কোথায় পৃথিবীতে না আসমানে,তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন সে কাফির। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। (সুরা ত্বহা ২০:৫)। আবু মুতি বলেছেন, অতঃপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করে ছিলাম যে কেউ যদি বলে, আল্লাহ উপরে অধিষ্ঠিত কিন্তু আমি জানিনা আরশ কোথায় অবস্থিত, আকাশে না পৃথিবীতে। তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন, সে ব্যক্তি কাফির কেননা সে এ কথা অস্বীকার করে যে, ‘পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। আল ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃষ্ঠা -২৬১; ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ.
কুরআন, সহিহ হাদিস ও সালাফদের উক্ত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। কিন্তু তিনি স্বভাবগত ভাবে, সাত আসমানের উপর আরশে আযীমে সমুন্নত। আর এটাই হল বিশুদ্ধ আকীদা। আল্লাহ সম্পর্কে এর বিকল্প চিন্তা করা শিরকের মত কবিরা গুনাহ।
৩। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন না।
ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন না।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا
বলুন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহি করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে। সুরা আল কাহাব : ১১০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তায়ালা আরাও বলেন-
قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬ فَٱسۡتَقِيمُوٓاْ إِلَيۡهِ وَٱسۡتَغۡفِرُوهُۗ وَوَيۡلٌ۬ لِّلۡمُشۡرِكِينَ
(হে নবি) বলুন, আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস। সুরা হা-মিম-সিজদা : ৬
কুরআনের আয়াতগুলিতে স্পষ্ট ঘোষণা রাসুল ﷺ আমাদের মতই একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ ﷺ কে নবি ও রাসুল বানিয়ে সর্বোউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা আসনে বসিয়েছেন। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ মহা মানব না বলে, অতি মানব বা মানুষ ছিলেন বলা কবিরা গুনাহে অন্তর্ভুক্ত।
৪। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ¦ারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই জানেন মানুষ কে তিনি কোন উপাদানে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
وَمِنۡ ءَايَـٰتِهِۦۤ أَنۡ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ۬ ثُمَّ إِذَآ أَنتُم بَشَرٌ۬ تَنتَشِرُونَ
তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ। সুরা রুম : ২০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَـٰنَ مِن سُلَـٰلَةٍ۬ مِّن طِينٍ۬
আমি মানুষকে তৈরি করেছি মাটির উপাদান থেকে। সুরা মুমিনুন : ১২
মানুষ মাটির তৈরি এ সম্পর্কিত আরও আয়াত: সুরা আল ইমরান : ৫৯, সুরা আনাম : ২, সুরা আরাফ : ১২, সুরা সাফফাত : ১১, সুরা সোয়াদ : ৭১, ৭৫, ৭৬।
আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সৃষ্টি করছেন নুর দিয়ে, জিনদের সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা থেকে (সুরা আর রহমান : ১৫)। আর মানুষকে সৃষ্টি করছেন মাটির উপাদান থেকে। প্রত্যেক সৃষ্টির উপাদান আলাদা, তাই সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য ও আলাদা। মানুষ হিসেবে তাদের কিছু মানবিয় বৈশিষ্ট্য ও আছে। যেমন- খাবার গ্রহণ করা, পিপাসার জন্য পানি পান করা, বিবাহ করা, সন্তানের জন্মে দেওয়া, বাজারে গমন করা, দুনিয়াবি বিভিন্ন কাজে অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। এই মানবিয় বৈশিষ্ট্যগুলি ও তাদের মধ্যে ছিল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নুরের তৈরি এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আবী হানীফা, মুআত্তা মালিক, মুসনাদ আহমাদ, মিশকাত প্রভৃতি গ্রন্থ কোন হাদিস নাই। চার ইমামসহ ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরের মধ্যে কেউ কোন হাদিস গ্রন্থ নুর সম্পর্কে কোন হাদিন লিপিবদ্ধ করে নাই। হাদিস সংকলনের ৫০০ বছরের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা লিখবেন অথচ পূর্বের কোন কিতাবের রেফারেন্স দিবেন না, তা কি করে হয়? মনে রাখবেন হাদিস সংকলনের ৫০০ বছর পর কেউ কোন কথা লিখলে বা বললে তাকে অবশ্যই কিতাবের রেফারেন্স দিতে হবে। তা না হলে সে যে কথাটি লিখল বা বলল তা অবশ্যই তার নিজস্ব মতামত বা জাল কথা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহর নূরে তৈরি হয়েছে এ কথাটা খুবই বিপদ জনক, ইসলামে থাকা না থাকার প্রশ্ন। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নূর। যদি এ অর্থে বলা হয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর, তাহলে তা কুরআন বিরোধী, কারণ কুরআনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি আল্লাহর সত্তা নূর। তাহলে রাসুল ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর হওয়ার তো কোন প্রশ্ন আসে না।
যদি কেউ বলে রাসুল ﷺ কে আল্লাহর স্বভাবগত নূর থেকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহলে তো বলা হল রাসুল ﷺ স্বয়ং আল্লাহর সত্তা। তাহলে তার সুস্পষ্ট মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহই রাসূল এবং রাসূলই আল্লাহ। আর এটা যে প্রকাশ্য কুফর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যদি বলা হয়, রাসূল আল্লাহর জাতি নূর মানে হুবহু আল্লাহর সত্তা নন, বরং তাঁর সত্তার অংশ বিশেষ, তাহলে এর পরিষ্কার মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহর সত্তায় রাসূল অংশীদার। অথচ এটা যে প্রকাশ্য শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৫। আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَـٰبِكُمۡۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡـًٔ۬اۗ وَسَيَجۡزِى ٱللَّهُ ٱلشَّـٰڪِرِينَ
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছুই নয়। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথাযথ পুরস্কার দেবেন। আলে ইমরান : ১৪৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ
নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা জুমার : ৩০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥)
আর তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷ আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷ সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫
আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর মারা গেছেন কিনা এ সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?
সুতরাং যদি বিশ্বাস করি কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয়েছে তবে তা হবে কুরআন বিরোধী শিরকি বিশ্বাস। মৃত্যুর পরে এবং পুনূরূত্থানের পূবের্র জীবনকে বলা হয় ‘বারযাখি জীবন’। ‘বারযাখি হায়াত’’ সময়টাকে আমরা সকলে কবরে অবস্থানের সময়কে বুঝিয়ে থাকি। এই জীবনের কবি, শহিদ, মুসলিম, অমুসলিম সকলে জীবিত। কেননা, কবর আজাব সত্য। অপর পক্ষে নবি ও শহিদের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা আছে। কিন্তু তাদের হায়াতকে ‘বারযাখী হায়াত’ না বলে, পৃথিবীর মত স্বাভাবিক জীবন আছে মনে করা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। কাজেই ‘বারযাখি হায়াত’ এর রেফারেন্স দিয়ে যদি বলা হয়, আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়াগর মৃত্যু নাই। তাহলে নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে।