মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
৬। নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ
আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম, ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না। আমি তো শুধু একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা ইমানদারদের জন্য। সুরা আরাফ : ১৮৮
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِى خَزَآٮِٕنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّى مَلَكٌۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ (٥٠)
অর্থ: বল, “আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না। আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী। তার সৃষ্টিজগতের কাউকে তিনি এই বিষয়ে ভাগ প্রদান করেন নাই। এই সম্পর্কিত কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করা হল-
সুরা মায়েদা : ১১৬, ১০৯, সুরা আনাম : ৫৯ ৭৩, সুরা তওবা : ১০, ৯৫,৭৮,৪৩, সুরা নাহল- : ৭৭, সুরা ত্বহা : ১১০, সুরা জুরাক : ৮৫, সুরা তাহরিম : ১, সুরা জিন : ২৫, সুরা সাবা : ৩, সুরা আরাফ : ১৮, সুরা আহজাব : ৬৩, সুরা আনাম : ৫৯. সুরা নামল : ৬৫, সুরা হুজুরাত : ১৮, সুরা ফাতির : ৩৮, সুরা লুকমান : ৩৪, সুরা রাদ ; ৮,৯, সুরা হুদ : ১২৩, সুরা বাকারা : ১৩৩, সুরা কাহব : ২৬।
এই সকল আয়াতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসুলুল্লাহ ﷺ কে পরিস্কারভাবে ঘোষণা দিতে বললেন যে, তুমি বল আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখি না। আমাদের রাসুলুল্লাহ ﷺ যেখানে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না, সেখানে সাধারণ একজন অলি, আওলিয়া বা পিরের পক্ষে কীভাবে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখবেন। অদৃশ্যের জ্ঞান রাখা আল্লাহ একক গুণের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহর এই আদেশ কাউকে দেওয়া হয়নি, এমন কি আমাদের প্রাণ প্রিয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুর মুহাম্মদ ﷺ কেও না। অন্যান্য নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগরতো অনেক দূরের কথা। কাজেই কুরআনের বিরোধী আকিদা প্রষোণ করা নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا
তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ
বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ
তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋতুমতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,
কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবি রাসুলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিঃসন্দেহে শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৮। রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ذٰلِکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہِ اِلَیۡکَ ۚ وَمَا کُنۡتَ لَدَیۡہِمۡ اِذۡ اَجۡمَعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ وَہُمۡ یَمۡکُرُوۡنَ
এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি ওহি দ্বারা অবহিত করছি, ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল তখন তুমি তাদের সাথে ছিলেনা। সুরা ইউসুফ : ১০২
ইউসুফ আ. এর ভাইদের ষড়যন্ত্র রাসুলুল্লাহ ﷺ জানতেন না কেননা তিনি সেখানে ছিলেন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
تِلۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہَاۤ اِلَیۡکَ ۚ مَا کُنۡتَ تَعۡلَمُہَاۤ اَنۡتَ وَلَا قَوۡمُکَ مِنۡ قَبۡلِ ہٰذَا ؕۛ فَاصۡبِرۡؕۛ اِنَّ الۡعَاقِبَۃَ لِلۡمُتَّقِیۡنَ
এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহির মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য। সুরা হুদ : ৪৯
মুহাম্মদ ﷺ কে গায়েবের বিষয় ওহির মাধ্যমে জানতে হত। তিনি সর্বত্র সবদ্রা হাজির নাজির থাকলে ওহির জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَمِمَّنۡ حَوۡلَکُمۡ مِّنَ الۡاَعۡرَابِ مُنٰفِقُوۡنَ ؕۛ وَمِنۡ اَہۡلِ الۡمَدِیۡنَۃِ ۟ۛؔ مَرَدُوۡا عَلَی النِّفَاقِ ۟ لَا تَعۡلَمُہُمۡ ؕ نَحۡنُ نَعۡلَمُہُمۡ ؕ سَنُعَذِّبُہُمۡ مَّرَّتَیۡنِ ثُمَّ یُرَدُّوۡنَ اِلٰی عَذَابٍ عَظِیۡمٍ ۚ
আর তোমাদের আশপাশের মরূবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদ্বীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আজাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আজাবের দিকে। সুরা তওবা : ১০১
মুহাম্মদ ﷺ এর চার পাশে অনেক মুনাফিক লোক ছিল। তিনি তাদের চিনতেন না। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন কে কে মুনাফিক ছিল। যদি তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকতেন তবে মুনাফিকের কার্যকলাপ দেখতে পেতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক তাকে আর অবহিত করার প্রয়োজন ছিন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি দ্বারা সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির। কুরআনের আয়াতগুলো প্রমাণ করে মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ এই গুণটি দান করেন নাই। বরং তিনি তার প্রয়োজন মাফিক অহি করে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর এই গুণের সাথে অন্য কোন নবি, রাসুল, ওলি, আওলিয়াকে যুক্ত করলে বড় শির্কে পতিত হবে যা কবিরা গুনাহ থেকেও ভয়াবহ।
৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।
দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। আল্লাহকে কোন দৃষ্টিশক্তি আয়ত্ত করতে পারবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
لَّا تُدۡرِكُهُ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَهُوَ يُدۡرِكُ ٱلۡأَبۡصَٰرَۖ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ
দৃষ্টিশক্তি তাঁকে দেখতে অক্ষম কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ত করে নেন৷ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ। সুরা আনআম : ১০৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-
وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَـٰتِنَا وَكَلَّمَهُ ۥ رَبُّهُ ۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِىٓ أَنظُرۡ إِلَيۡكَۚ قَالَ لَن تَرَٮٰنِى وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَڪَانَهُ ۥ فَسَو
ۡفَ تَرَٮٰنِىۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ ۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُ ۥ دَڪًّ۬ا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقً۬اۚ فَلَمَّآ أَفَاقَ قَالَ سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَيۡكَ وَأَنَا۟ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ
অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকুল আবেদন জানালো, হে প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো৷ তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পারো না৷ হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও। সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে অবশ্য তুমি আমাকে দেখতে পাবে৷ কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো৷ সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললো, পাক-পবিত্র তোমার সত্তা৷ আমি তোমার কাছে তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন৷ সুরা আরাফ : ১৪৩
সুস্পষ্ট আয়াতের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, পৃথিবীতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে একটি সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয় নি, যাতে তিনি বলেছেন ‘আমি জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে বা মিরাজে চর্ম চক্ষে আল্লাহকে দেখেছি। নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়া, পীর, বুজুর্গ, আধ্যাত্মিক গুরু যে কেউই দাবি করতে পারে যে, সে দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখেছেন। দাবি করা আর বাস্তবতা ভিন্ন কথা। আল্লাহ তায়ালা কে নবি মুসা আ. দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু পারেন নাই। তার পরও যদি কেউ দাবি করে বা বিশ্বাস করে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ দেখা সম্ভব তবে তার শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে।
১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬اۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ
বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আসমান ও যমীনের বাদশাহি মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সুরা যুমার : ৪৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ
তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। সুরা সাজদাহ : ৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ
অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷ কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সুরা বাক্বারা : ২৫৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَاَنۡذِرۡہُمۡ یَوۡمَ الۡاٰزِفَۃِ اِذِ الۡقُلُوۡبُ لَدَی الۡحَنَاجِرِ کٰظِمِیۡنَ ۬ؕ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ حَمِیۡمٍ وَّلَا شَفِیۡعٍ یُّطَاعُ ؕ
আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮
আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূণর্রূপে তার ইচ্ছাধীন। এক শ্রেণীর মুশরিকগণ চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবিগণ, রাসুলগণ, ফেরেতাগণ বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করতে পারবেন। সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুমতি।
দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরির গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোনো প্রকারের সুপারিশের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ
আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাযয়্যিনাহ : ৬
এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই। আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ করা হবে। সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম সুপারিশের অনুমতি পাবেন।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ
আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের নেতা হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০
আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩
রসুলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবি রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন
আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সুরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়স্তÍ পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সুরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সুরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪
নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২