রাসূলুল্লাহ ﷺপিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

রাসূলুল্লাহ  পিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

 حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مِهْرَانَ الرَّازِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَهْمٍ، جَمِيعًا عَنِ الْوَلِيدِ، – قَالَ ابْنُ مِهْرَانَ حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، – حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ، عَنْ أَبِي عَمَّارٍ، شَدَّادٍ أَنَّهُ سَمِعَ وَاثِلَةَ بْنَ الأَسْقَعِ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ ‏ “‏ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ ‏”‏ 

অনুবাদ : আবু আম্মার শাদ্দাদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.) কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশ গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কুরাইশ গোত্র থেকে বনি হাশিমকে নির্বাচন করেছেন এবং বনি হাশিম থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন।

সহিহ মুসলিম : ২২৭৬, সহিহ বুখারি : ৩৩৫৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬২৪২, আবূ ইয়ালা : ৭৪৮৫, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩০২। । হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০২ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ حَدَّثَنَا عَمْرٌو حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيهِ كُنْتُ أَطْلُبُ بَعِيرًا لِي ح وحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عَمْرٍو سَمِعَ مُحَمَّدَ بْنَ جُبَيْرٍ عَنْ أَبِيهِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ أَضْلَلْتُ بَعِيرًا لِي فَذَهَبْتُ أَطْلُبُهُ يَوْمَ عَرَفَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَاقِفًا بِعَرَفَةَ فَقُلْتُ هَذَا وَاللهِ مِنْ الْحُمْسِ فَمَا شَأْنُهُ هَا هُنَا

অনুবাদ : জুবাইর ইবনু মুতয়িম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার একটি উট হারিয়ে ‘আরাফার দিনে তা তালাশ করতে লাগলাম। তখন আমি রসুলুল্লাহ ﷺকে ‘আরাফায় উকূফ করতে দেখলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো কুরায়শ বংশীয়। এখানে তিনি কী করছেন?

সহিহ বুখারি : ১৬৬৪, সহিহ মুসলিম : ১২২০

হাদিস নম্বর-০৩ :: কুরাইশগন নিজের হুমস বা কঠোর ধার্মিক বলে পরিচয় দিত

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى الصَّنْعَانِيُّ الْبَصْرِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الطُّفَاوِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَتْ قُرَيْشٌ وَمَنْ كَانَ عَلَى دِينِهَا وَهُمُ الْحُمْسُ يَقِفُونَ بِالْمُزْدَلِفَةِ يَقُولُونَ نَحْنُ قَطِينُ اللَّهِ ‏.‏ وَكَانَ مَنْ سِوَاهُمْ يَقِفُونَ بِعَرَفَةَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏:‏ ‏(‏ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ

অনুবাদ : আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কুরাইশ এবং তাদের ধর্মের যারা অনুসারী ছিল তাদেরকে হুমস বলা হত। তারা মুযদালফায় অবস্থান করত এবং বলত, আমরা আল্লাহর ঘরের অধিবাসী। তারা ব্যতীত অন্য লোকেরা আরাফাতে অবস্থান করত। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ করেন-

ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَاسۡتَغۡفِرُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তন কর, যেখান থেকে মানুষেরা প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাকারা-১৯৯।

সুনানে তিরমিজি : ৮৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩০১৮, ইবনে হিসাম খন্ড-১,পৃ-৫৭। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি সুনানে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে। হুমস শব্দের অর্থ কঠোর ধার্মিক। কুরায়েশরা মূর্তিপূজা করত। সেই সাথে নিজেদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর একান্ত অনুসারীর পাশাপাশি নিজেদের হুমস বলে দাবি করত।

হাদিস নম্বর-০৪ : রাসূলুল্লাহ তার জন্য নির্ধারিত যুগে আগমন করেন।

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيْدٍ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ عَمْرٍو عَنْ سَعِيْدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِيْ آدَمَ قَرْنًا فَقَرْنًا حَتَّى كُنْتُ مِنْ الْقَرْنِ الَّذِيْ كُنْتُ فِيْهِ

অনুবাদ : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

“আমি বনি আদমের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ থেকে যুগে প্রেরিত হয়েছি (بُعِثْتُ)। এক যুগ থেকে আরেক যুগ অতিবাহিত হয়ে আমি সেই যুগেই এসেছি যে যুগ আমার জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৫৫৭, মিশকাত : ৫৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৪৪, শুআবুল ঈমান : ১৩৯২, আবু সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৮০৯। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ এর পিতামাতার বর্ননা :

সহিহ হাদিসের মধ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট হাদিস পাওয়া কঠিন, যেখানে উভয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ তথ্য সিরাহ ও ইতিহাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। সিরাহ ও ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন এবং ছয় বছর বয়সে মারা যান।

ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তার সিরাতু রাসূলিল্লাহ গ্রন্থে বলেন-

عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ مَاتَ فِي مَدِينَةِ يَثْرِبَ وَهُوَ فِي طَرِيقِهِ إِلَى سُورِيَا، وَذَلِكَ قَبْلَ وِلَادَةِ رَسُولِ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَقَدْ أُصِيبَ بِالْمَرَضِ هُنَاكَ

অনুবাদ : আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের আগে সিরিয়া যাওয়ার পথে ইয়াসরিব (মদিনা) শহরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।

ইবন ইসহাক, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৫৬, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  “আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

أَمِينَةُ أَخَذَتِ النَّبِيَّ ﷺ إِلَى الْمَدِينَةِ لِزِيَارَةِ أَقَارِبِهِ مِنْ جَانِبِ أَخْوَالِهِ، ثُمَّ فِي طَرِيقِ رُجُوعِهَا إِلَى مَكَّةَ تُوُفِّيَتْ فِي مَكَانٍ يُسَمَّى ٱلْأَبْوَاءَ، وَكَانَ عُمْرُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ سِتَّ سِنِينَ۔

অনুবাদ : আমিনা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে মদিনায় গিয়েছিলেন তাঁর নানা আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। পরে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স ছিল ছয় বছর।

আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবন কাসির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬০, সিরাতু ইবন ইসহাক, ইবন হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৭, তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন সা’দ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৯

হাদিস নম্বর-০৫ : রাসূলুল্লাহ এর পিতার পরকালীন অবস্থান

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي قَالَ ‏”‏ فِي النَّارِ ‏”‏ ‏.‏ فَلَمَّا قَفَّى دَعَاهُ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ ‏”

অনুবাদ : আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন চলে যেতে লাগল, তিনি ডাকলেন এবং বললেন, আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।

সহিহ মুসলিম : ২০৩, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণের আগেই মৃত্যুবরণ করেন।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রসূলুল্লাহ এর পিতামাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبَّادٍ، – وَاللَّفْظُ لِيَحْيَى – قَالاَ حَدَّثَنَا مَرْوَانُ، بْنُ مُعَاوِيَةَ عَنْ يَزِيدَ، – يَعْنِي ابْنَ كَيْسَانَ – عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ‏ “‏ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لأُمِّي فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي ‏”‏

অনুবাদ : আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- আমি আমার প্রভুর নিকট আমার মায়ের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করার অনুমতি চাইলে আমার প্রভু আমাকে অনুমতি দান করেননি। আর তার কবর যিয়ারাত করার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। সহিহ মুসলিম : ৯৭৬. মসনাদে আহমাদ : ৯৩৯৫ ইরওয়াহ : ৭৭২। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৭ :: রসূলুল্লাহ -এর মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ كَيْسَانَ عَنْ أَبِي حَازِمٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ زَارَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَقَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمْ الْمَ

অনুবাদ : আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন, আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৫৭২, সুনানে নাসায়ি : ২০৩৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৩৪। হাদিসটি সুনানে ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

নোট : রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পাননি এবং ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, কুফর অবস্থায় মৃত্যু হলে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। রাসূল ﷺ এর জন্য তাঁর মা-বাবার জন্য দোয়া করা নিষিদ্ধ ছিল। এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়, তাই ইসলামি বিশ্বাসের আলোকে একে গ্রহণ করা জরুরি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রেরিত হওয়ার পূর্বে লোকেরা যে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল

হাদিস নম্বর-০৮ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার বাসি বিভিন্ন দেবদেবীর পুজা করত।

الْحُمَيْدِيُّ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ ابْنِ أَبِيْ نَجِيْحٍ عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ أَبِيْ مَعْمَرٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَمَكَّةَ وَحَوْلَ الْبَيْتِ سِتُّوْنَ وَثَلَاثُ مِائَةِ نُصُبٍ فَجَعَلَ يَطْعُنُهَا بِعُوْدٍ فِيْ يَدِهِ وَيَقُوْلُ (جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا) جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ.

অনুবাদ : আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত-

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা্য় (মক্কা বিজয়ের দিন) প্রবেশ করলেন, তখন কা’বা ঘরের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে এগুলোকে ঠোকা দিতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন-

وَقُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَزَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا

আর বল, ‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’। (সূরা ইসরাঈল-৮১)।

সহিহ বুখারি : ৪৭২০, সহহি বুখারির এই হাদিস প্রমান করে এর জম্মের প্রাককালে মক্বাম মানুষ মূর্তি পূজক বা মুশরিক ছিল।

হাদিস নম্বর-০৯ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার মানত করত।

حَدَّثَنَا أَبُوْ الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ سَمِعْتُ سَعِيْدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ قَالَ الْبَحِيْرَةُ الَّتِيْ يُمْنَعُ دَرُّهَا لِلطَّوَاغِيْتِ وَلَا يَحْلُبُهَا أَحَدٌ مِنْ النَّاسِ وَالسَّائِبَةُ الَّتِيْ كَانُوْا يُسَيِّبُوْنَهَا ِلآلِهَتِهِمْ فَلَا يُحْمَلُ عَلَيْهَا شَيْءٌ قَالَ وَقَالَ أَبُوْ هُرَيْرَةَ قَالَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَرَأَيْتُ عَمْرَو بْنَ عَامِرِ بْنِ لُحَيٍّ الْخُزَاعِيَّ يَجُرُّ قُصْبَهُ فِي النَّارِ وَكَانَ أَوَّلَ مَنْ سَيَّبَ السَّوَائِبَ

অনুবাদ : যুহরী (রহ.) বলেন। আমি সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহ.)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, বাহীরাহ বলে দেবতার নামে উৎসর্গ করা উটনী যার দুধ আটকিয়ে রাখা হত এবং কোন লোক তার দুধ দোহন করত না। সা-য়িবাহ বলে ঐ পশুকে যাকে তারা ছেড়ে দিত দেবতার নামে। তাকে বোঝা বহন ইত্যাদি কোন কাজ কর্মে ব্যবহার করা হয় না। রাবী বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) বলেছেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমি আমর ইবনু ‘আমির খুয‘আহকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সায়্যিবাহ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে।

সহিহ বুখারি : ৩৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৬, আহমাদ ৭৭১৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-১০ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার লোকেরা অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।

অয়াদ্বীন (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা ছিলাম জাহিলী যুগের লোক এবং আমরা মূর্তিপূজক ছিলাম। আর আমরা আমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করতাম। আমার একটি কন্যা ছিল। আমি যখনই তাকে ডাকতাম, তখনই সে আনন্দের সাথে আমার ডাকে সাড়া দিত। একদিন আমি তাকে ডাকলে সে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমার পিছনে পিছনে চলতে লাগল। আমি চলতে লাগলাম যতক্ষণ না বাড়ির অদূরে একটি কূপের নিকট পৌঁছলাম। অতঃপর আমি তার হাত ধরে তাকে কূপে নিক্ষেপ করলাম। আমার বিশ্বাস, সবশেষে সে বলছিল: হে আব্বা! হে আব্বা। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে বসা এক ব্যক্তি সেই লোকটিকে বলল, তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺকে দুঃখ দিয়েছো। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ ব্যক্তিকে বললেন: ’থাম! কেননা, যা তাকে কষ্ট দিয়েছে, সে তো সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করছে। অতঃপর তিনি সেই লোকটিকে বললেন: ’তোমার কথাগুলো আমাকে আবার শোনাও। ফলে সে লোকটি আবার (উল্লিখিত কাহিনীটি) বলতে লাগল। এ কাহিনী শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ (আবারও) কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে তাঁর দাড়ির উপর পড়তে লাগল। অবশেষে তিনি তাকে বললেন, ’নিশ্চয়ই আল্লাহ জাহিলী যুগে কৃত (মন্দ) আমলসমূহ থেকে তাদেরকে অব্যহতি দিয়েছেন (অর্থাৎ সেসব পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না)। অতএব তুমি নতুন করে আমল করা শুরু করো। সুনানে আদ দারিমী : ০২, হাদিসটি ইমাম দারিমী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। সনদের রাবীগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। তবে এটি মুরসাল হাদিস।

হাদিস নম্বর-১১ : সুলুল্লাহ  এর পূর্ব পুরুষ ইসমাইল (আ.) এর বিস্তারিত বর্ণনা।

সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহ.) হতে বর্ণিত। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট থেকে। হাযেরা (আঃ) কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ (আঃ) থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) হাযেরা (আঃ) এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাযেরা (আঃ) শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা’বার ঘর অবস্থিত, ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কা্য় না ছিল কোন মানুষ, না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এছাড়া তিনি তাদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পিছু পিছু আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে কোন ব্যবস্থা। তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) তাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাযেরা (আঃ) তাঁকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হাঁ। হাযেরা (আঃ) বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ)-ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি কা’বা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি দু’হাত তুলে এ দু’আ করলেন, আর বললেন, ’’হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের কতককে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনুর্বর উপত্যকায় …… যাতে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- (ইবরাহীম ৩৭)। আর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তাঁর শিশু পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা রাবী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ’সাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি তার উপর উঠে দাঁড়ালেন এবং ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথায়ও কাউকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন ’সাফা’ পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমন কি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মত ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ’মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এজন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সায়ী করে থাকে। অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। যদি তোমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকে। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন অথবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ)-এর চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে এক হাউজের মত করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপচে উঠছিল। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলেছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো। রাবী বলেন, অতঃপর হাযেরা (আঃ) পানি পান করলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাঁকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তাঁর পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। অতঃপর হাযেরা (আঃ) এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কা্য় নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদেরও সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈলও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের নিকট অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা (আঃ) ইন্তিকাল করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধূকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়। অতঃপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন নাসীহাত করেছেন? স্ত্রী বলল, হাঁ। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপন জনদের নিকট চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল (আঃ) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অন্য একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ যতদিন চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর দেখা পেলেন না। তিনি পুত্রবধূর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কী? সে বলল, গোশ্ত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কী? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আঃ) দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদের গোশ্ত ও পানিতে বরকত দিন। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো না। যদি হতো তাহলে ইবরাহীম (আঃ) সে বিষয়েও তাদের জন্য দু’আ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশ্ত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা, শুধু গোশ্ত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হতে পারে না।

ইবরাহীম (আঃ) বললেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাঁকে সালাম বলবে, আর তাঁকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে যে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? সে বলল, হাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন কিছুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বলল, হাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ। এ কথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, যদ্দিন আল্লাহ চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার আসলেন। (দেখতে পেলেন) যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে বসে ইসমাঈল (আঃ) তাঁর একটি তীর মেরামত করছেন। যখন তিনি তাঁর পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর একজন বাপ-বেটার সঙ্গে, একজন বেটা-বাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইবরাহীম (&আ) বললেন, তুমি আমার সাহায্য করবে কি? ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আমি আপনার সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তাঁরা উভয়ে কা’বা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাকামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে এ দু’আ করতে থাকলেন, হে আমাদে রব! আমাদের থেকে কবূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। তাঁরা উভয়ে আবার কা’বা ঘর তৈরী করতে থাকেন এবং কা’বা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দু’আ করতে থাকেন। ’’হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবূল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। আল-বাকারা-১২৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৬৪,  ২৩৬৮। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রসুলুল্লাহ ﷺ এর বংশধারা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (শায়বাহ) বিন হাশিম (‘আমর) বিন আবদে মানাফ (মুগীরাহ) বিন কুসাই (যায়দ) বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ এবং এ সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালিক বিন নাযর (ক্বায়স) বিন কিনানাহ বিন খুযায়মাহ বিন মুদরিকাহ (আমির) বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মা’আদ্দ বিন আদনান বিন উদাদ বিন হামায়সা’ বিন সালামান বিন ‘আওস বিন বুয বিন ক্বামওয়াল বিন উবাই বিন ‘আউওয়াম বিন নাশিদ বিন হিযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন ত্বাবিখ বিন যাহিম বিন নাহিশ বিন মাখী বিন ‘আইয বিন আ’বক্বার বিন উবাইদ বিন আদ-দু’আ বিন হামদান বিন সুনবর বিন ইয়াসরিবী বিন ইয়াহযুন বিন ইয়ালহান বিন আর’আওয়া বিন ‘আইয বিন দীশান বিন ‘আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুক্বসির বিন নাহিস বিন যারিহ বিন সুমাই বিন মুযী বিন ‘আওযাহ বিন ‘ইরাম বিন ক্বাইদার বিন ইসামাঈল বিন ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু হিশাম, খন্ড-১, পৃ-১-২; আর-রাহীকুল মাখতূম, ছফিউর রহমান মুবারকপুরী (রহ.) (মৃ ২০০৬খৃ:),

বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মানুষ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। তাকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, জন্মলগ্ন থেকেই তার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। কেউ ছাত্র হিসেবে লেখাপড়ার দায়িত্ব পালন করে, কেউ শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকে, কেউ কৃষক হয়ে ফসল ফলায়, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করে, আবার কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে অফিসে দায়িত্ব পালন করে। এমনকি একজন গৃহিণীও ঘরের সমস্ত কাজকর্ম, সন্তান পালন, খাবার তৈরি ও সংসারের ভার সামলে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকে। অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে একেবারে কর্মহীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন-

لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ ؕ

অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি ক্লেশের মধ্যে। সূরা বালাদ : ৪

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ পরিশ্রম ও কর্মের মাধ্যমেই জীবন পরিচালনা করে। তবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার শরীর ও মন দুটোই বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে। তাই সারাদিনের কর্মযজ্ঞের পর মানুষ কিছু সময় বিশ্রাম নেয়, যাকে আমরা বলি অবসর সময়

মুমিনের অবসর

জীবন হলো কর্ম ও বিশ্রামের সমন্বয়। আধুনিক কর্মনীতি অনুযায়ী একজন মানুষ সাধারণত দিনে আট ঘণ্টা কাজ করে। বাকিটা সময় ঘুম, খাওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং সামান্য কিছু সময় অবসর হিসেবে থাকে। এই অবসর সময়েই মানুষ বিনোদন খোঁজে—কখনও বই পড়ে, কখনও পরিবারের সাথে সময় কাটায়, কখনও ভ্রমণে যায়, আবার কেউ কেউ সঙ্গীত, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সময় ব্যয় করে। সাধারণভাবে অবসর বলতে বোঝায় কাজের বাইরে ফাঁকা সময় যে সময় মানুষ বিশ্রাম নেয় বা বিনোদন করে। কিন্তু একজন মুমিন বান্দার জীবনে “অবসর” বলতে একেবারে কর্মহীন বা উদ্দেশ্যহীন সময় বোঝানো যায় না। কারণ, একজন মুমিন জানে, তার প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ

“অতএব, যখন তুমি এক কাজ শেষ করো, তখন অন্য কাজে মনোনিবেশ করো। আর তোমার রবের প্রতিই আকাঙ্ক্ষা রাখো। সূরা ইনশিরাহ :৭-৮

অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন কখনোই শূন্য বা উদ্দেশ্যহীন হয় না। সে এক ইবাদত শেষ করলে অন্য ইবাদতে প্রবেশ করে, এক দায়িত্ব শেষ করলে অন্য দায়িত্বে মনোনিবেশ করে।

সাধারণ অর্থে অবসর বলতে মানুষ সাধারণত সেই সময়কে বোঝে, যখন সে কোনো ধরনের কাজ বা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকে না, অর্থাৎ কর্মহীনতা ও দায়িত্বমুক্তির একটি অবকাশ। কিন্তু এই অর্থে যদি অবসরের ধারণা গ্রহণ করা হয়, তবে একজন মুসলিমের জীবনধারায় ‘অবসর’ নামক কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব থাকা কার্যত অসম্ভব, যার প্রতি সে যত্নবান হতে পারে বা যাকে সে শুধু কর্মহীনতায় অতিবাহিত করতে পারে। কারণ, একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমের জীবনকর্মের একটি মুহূর্তও দায়িত্ব বা লক্ষ্যহীনভাবে অতিক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনে নিবেদিত। একজন মুসলিমকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেত হয়। সালাতের বাহিরে তাকে প্রতি নিয়ত জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতে হয়। তাছাড়া তার পরিবারের হক, আত্মীয় স্বজনদের হক, প্রতিবেশীর হক, সামাজিক দায়বদ্ধতার হক ইত্যাদি আদায় করতে হয়। আর যদি দৈবক্রমে এই ধরনের কোন দায়িত্বই সম্পাদনের প্রয়োজন না হয়, তবুও একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাত বা নফল (ঐচ্ছিক ইবাদত) কাজের কোনো সীমারেখা নেই, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক। একজন মুসলিম যদি শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে চায়, তবে সেই সুন্নাত ও নফল আমলের আধিক্য এত বেশি যে, তার এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করাই জীবনব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়।

অতএব, এই ব্যাপক কর্মপরিধি ও ইবাদতের অবিচ্ছিন্ন ধারার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, একজন মুসলিমের জীবনে প্রকৃত অর্থে ‘অবসর সময়’ কোথায়? ইসলামী জীবনদর্শনে ‘অবসর’ শব্দটির অর্থকে তাই ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। মুসলিমের জীবনে অবসর মানে দায়িত্বমুক্তির সময় নয়, বরং এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তরের মুহূর্ত। এটি একটি ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে রূপান্তরের সময়। যখন সে দৈহিক কোনো কাজ থেকে মুক্তি পায়, তখন সে মানসিক, আত্মিক অথবা জ্ঞানগত ইবাদতে মনোনিবেশ করে।

বিনোদনের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

উপরের আলোচনাতে এ কতা ষ্পষ্ট যে মুমিনের জীবন কোন অবসর নাই। অবসর নাই মানেই তার কোন বিনোদন নাই। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি বিনোদনের পরিধি ও সঙ্গা আলাদা। কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নেওয়াও আল্লাহর হক আদায় ও পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে ইবাদতে পরিণত হতে পারে। এমনকি, হালাল উপায়ে বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তাও অর্থহীন থাকে না।

অর্থাত মুমিনে বিনোদন ও ইবাদত। যখন মুমিন হবে তখনই ভিন্ন আঙ্গিতে ভিন্ন পন্থায় কুরআন সুন্নাহর অনুসরের ইবাদতে লিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ ۙ

অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। সুরা ইনশারাহ : ৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনের জীবনদর্শনের গভীর দিকটি উন্মোচিত হয়। এই আয়াতটি কঠোরভাবে উপদেশ দেয় যে, মুমিন ব্যক্তি এক কাজ শেষ করার পর যেন কোনো প্রকার আলস্যে গা ভাসিয়ে না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর পেলে যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা শেষ হলে তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত, বা যিকিরে মনোনিবেশ করা। মুমিনের কাছে কঠোর পরিশ্রমের পর যে বিশ্রাম (হালাল বিনোদন, ঘুম, পরিবারের সাথে সময় কাটানো) আসে, তা পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে করা হলে তা-ও এক প্রকারের ইবাদতে পরিণত হয়। কারণ, শরীর ও মনকে চাঙ্গা না রাখলে সঠিকভাবে ইবাদত করা সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ)-এর জীবনযাপন এর উজ্জ্বল প্রমাণ, যেখানে তিনি বিশ্রাম ও হালাল বিনোদনের মাধ্যমে ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। সুতরাং, মুমিনের জীবনে “অবসর” বলতে অর্থহীনভাবে বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় নষ্ট করা বোঝায় না, বরং এর অর্থ এক প্রকারের ‘ট্রানজিশনাল পিরিয়ড’ বা এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে যাওয়ার বিরতি। এই বিরতির সময় হালাল বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অর্থহীন থাকে না, বরং ইবাদতেরই ভিন্ন এক আঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। মুমিনের জীবন তাই বিনোদনের নামে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন পন্থায় ইবাদতে লিপ্ত থাকে।

ইসলামী জীবনবোধের মূল কথা হলো, একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে নিবেদিত হয়। এই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আর আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। কুরআন ৫১: ৫৬

এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো ইবাদত। আর ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিক সালাত, সিয়াম বা হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ, যদি আল্লাহর নির্দেশিত পথে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদতে গণ্য হয়।

মুমিনের অবসর সময়ও তার ঈমানের আলোয় পরিচালিত হয়। সে অবসরে এমন কাজ করে, যা হয় ইবাদতের অংশ, নয়তো ইবাদতের সহায়ক। ইবাদাহ মানে হলো—

আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। এ উদ্দেশ্যে সাধনে এবং প্রতিটি কাজ কুরআন সুন্নাহ সীমারেখার মধ্যে রাখতে আমরা নিচে তিনটি নিয়ম মেনে চলব। যথা-

* আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর দাস হিসেবে তার সন্তুষ্টির কাজ করব।  

* তিনি যা হালাল করেছেন, তা করব।

* তিনি যা হারাম করেছেন, তা থেকে দূরে থাকব।

এই দাসত্ব বা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার নামই হলো ইসলাম। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সারাদিন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতে (সালাত, সিয়াম) মগ্ন থাকার প্রয়োজন নেই। বরং, যখন আমরা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের (সীমা বা বিধান) মধ্যে থেকে, আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন পার্থিব কাজগুলো করি, তখন সেই কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন-

১. পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য চাকরি বা ব্যবসা করা ইবাদত:

হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করা এবং এর মাধ্যমে পরিবার-পরিজনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যখন একজন মুমিন এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রাসূল ﷺ-এর নির্দেশিত পথে সততার সাথে ব্যবসা বা চাকরি করে, তখন তার এই কঠোর পরিশ্রম একটি মহৎ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। এটি শুধু পার্থিব কাজ থাকে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য হয়।

কাব ইবনু উজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ- এর নিকট দিয়ে এক ব্যক্তি গমন করলো। রাসূলুল্লাহ ﷺএর সাহাবাগণ তার কর্মস্পৃহা ও শক্তি দেখে বললেন, “”হে আল্লাহর রাসূল! যদি এই কর্মতৎপরতা আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) হতো! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মায়ের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। যদি সে নিজেকে (হারাম থেকে) পবিত্র রাখার জন্য চেষ্টা করে, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে লোক-দেখানো ও অহংকার করার জন্য বের হয়, তবে সে শয়তানের পথে আছে। আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী : ৭১৬৬. সহীহ ইবনে হিব্বান : ৪৩৬৪

২. পরিশ্রমের পর শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ঘুমানো ইবাদত:

 আল্লাহ আমাদের শরীরকে একটি আমানত হিসেবে দিয়েছেন। দিনের কাজের শেষে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম দিয়ে শরীরকে সতেজ রাখা এই আমানতের হক আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ঘুমানোর আগে যদি আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং এই নিয়ত করা হয় যে, এর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে পরের দিন আরও মনোযোগের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালন করা হবে, তবে এই ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়। সুস্থতা ইবাদতের পূর্বশর্ত।

আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ও আবূ দারদা (রাঃ)-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপন করেন। এরপর একদিন সালমান আবূ দারদা-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তখন তিনি উম্মু দারদা (রাঃ)-কে নিম্নমানের পোশাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেনঃ তোমার ভাই আবূ দারদার দুনিয়াতে কিছুর দরকার নেই। ইতোমধ্যে আবূ দারদা এলেন। অতঃপর তার জন্য খাবার তৈরি করে তাঁকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি তো সিয়াম পালন করছি।’ তিনি বললেনঃ আপনি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও খেলেন। তারপর যখন রাত হলো, তখন আবূ দারদা সালাতে দাঁড়ালেন। তখন সালমান তাঁকে বললেনঃ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে দাঁড়ালে, তিনি বললেনঃ (আরও) ঘুমান। অবশেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন সালমান বললেনঃ এখন উঠুন এবং তারা উভয়েই সালাত আদায় করলেন। তারপর সালমান বললেনঃ তোমার উপর তোমার রবের হক আছে, (তেমনি) তোমার উপর তোমার হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের দাবী আদায় করবে। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে, তাঁর কাছে তার কথা উল্লেখ করলেনঃ তিনি বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে। সহিহ বুখারি : ৬১৩৯

৩. আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে হালাল খাদ্য গ্রহণ করে শুকরিয়া আদায় করা ইবাদত:

হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং প্রতিটি লোকমার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। খাবার গ্রহণের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শোকর আদায় করা—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ইবাদতের অংশ। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করে এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা তার রুহানিয়াতকে আরও শক্তিশালী করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু। সুরা বাকারা : ১৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিত : ৭

৪. মানুষের সেবা করা ও উপকার করা:

মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের বিপদাপদে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যে কোনো উপায়ে একজন মুমিনের কষ্ট দূর করা বা তার প্রয়োজন মেটানো একটি উচ্চ মর্যাদার ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ وَمَنۡ اَحۡیَاہَا فَکَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ

وَلَقَدۡ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا بِالۡبَیِّنٰتِ ۫ ثُمَّ اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ بَعۡدَ ذٰلِکَ فِی الۡاَرۡضِ لَمُسۡرِفُوۡ

আর যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল। সুরা মায়িদা : ৩২

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে,আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন।যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ২৪৪২, ৬৯৫১

৫. জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান:

দ্বীনী জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান) এবং উপকারী দুনিয়াবি জ্ঞান (যা মানুষের কল্যাণে আসে) অর্জন করা উভয়ই মুমিনের জন্য আবশ্যক। জ্ঞান অর্জন যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয় এবং তা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ইবাদত। এই জ্ঞান অন্যকে শিক্ষাদান করা বা সৎকাজে উৎসাহিত করাও সাদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব হিসেবে পরিগণিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ  اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ 

‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা যুমার : ৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الجَنَّةِ

যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৬. পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন:

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) সর্বোচ্চ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এসব দায়িত্বকে আল্লাহর আদেশ মনে করে পালন করলে প্রতিটি আচরণ ইবাদতের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارً

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও। সুরা তাহরিম : ৬

‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪

৭. সময়মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষা

শরীয়তের নির্দেশিত পথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যেমন – অজু করা, গোসল করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবূ মালিক আল আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক অংশ। আলহামদু লিল্লাহ’ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লা-হ” আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবে। সালাত’ হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। সাদাকা হচ্ছে দলীল। ধৈর্য হচ্ছে জ্যোতির্ময়। আর “আল কুরআন’ হবে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ। বস্তুতঃ সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আযাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে। সহিহ মুসলিম : ২২৩

পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এই বিশ্বাসে সুস্থ থাকার জন্য প্রচেষ্টা করাও ইবাদত, কারণ সুস্থ শরীর ইবাদত পালনে এবং দ্বীনের খেদমতে আরও বেশি সক্ষমতা যোগায়। অসুস্থতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা আল্লাহর আমানতের প্রতি যত্নশীল হওয়ারই নামান্তর।

হালাল উপায়ে বিনোদনও ইবাদত

আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থেকে মনকে সতেজ করার জন্য এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার জন্য বৈধ বিনোদন করা ইবাদত হতে পারে। যেমন: পরিবারকে সময় দেওয়া, বৈধ খেলাধুলা করা বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা। যদি এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া দেহকে সতেজ রেখে পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়ত থাকে, তবে এই সতেজতা অর্জনের প্রক্রিয়াটিও ইবাদতে পরিণত হয়।

আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

মুসলিমের জীবন হলো এক নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের ধারা, এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বের সেতু। এখানে আলস্য বা উদ্দেশ্যহীন কর্মহীনতার কোনো স্থান নেই। সময়কে অর্থহীন করার অর্থ হলো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া। আর এই বিচ্যুতিই মানুষকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতার দিকে ঠেলে দেয়, যা বর্তমান সময়ের কর্মবিমুখতার প্রধান কারণ। একজন প্রকৃত মুসলিম তার জীবনের প্রতিটি ‘অবসর’ সময়কেও আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে ব্যয় করে, ফলে তার জীবনে ‘অবসর’ কেবল সময়ের সার্থক ব্যবহারেরই নামান্তর। এভাবে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা একজন মুসলিমকে প্রতিটি মুহূর্তে কর্মোদ্দীপক ও উদ্দেশ্যমুখী রাখে, তাকে অর্থহীনতার হাত থেকে রক্ষা করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর পথে কাজে লাগানোর প্রেরণা যোগায়। এটাই মুসলিম জীবনে অবসর সময়ের প্রকৃত তাৎপর্য।

তবে এর মানে এই নয় যে মুমিন কখনো অবসর বা বিশ্রাম নেয় না। বরং ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই কাজের পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া, মনকে সতেজ রাখা, শরীরকে শক্তিশালী করা, এসবই মুমিনের জীবনের অংশ। তবে এই “অবসর” সময়ও সে আল্লাহর সীমার মধ্যে কাটায়, তাই তার অবসর কখনোই অর্থহীন নয়। মুমিন যখন তার অবসর কুনআন ও সুন্নাহ সীমরেখার মাধ্যমে ব্যয় করে তবে নিশ্চিত রূপে ইবাদত হবে। মুমিনের প্রতিটি মুহুর্ত দাবি। তাই মুমিনের অবসর, বিনোদন, উপভোগ, আমদ-প্রমদ সব কিছুই  আল্লাহ সীমারেখার মধ্য হওয়া জরুরি। কেননা তার প্রতি মুহুর্ত হিসেব প্রদানে জন্য লেখা হচ্ছে। বলা যায়, মুমিনের জীবন উপভোগ, চিত্তবিনোদন বা বৈচিত্র্যের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ

আর আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং যা তাদের মধ্যে আছে তা খেল-তামাশার ছলে সৃষ্টি করিনি। কুরআন : ১৬

মুমিন ও কাফিরের অবসরের সময়ের পার্থক্য

একজন মুমিন ব্যক্তি তার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করে। তার জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ফলে তার অবসর সময়ও খুব সীমিত হয়ে যায়। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে চায় সেই সময়কে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, পরিবারের হক আদায় বা সমাজসেবার মাধ্যমে কাজে লাগাতে।

অন্যদিকে একজন অবিশ্বাসী বা বিধর্মী তার অবসর সময়কে শুধুমাত্র দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসে ব্যয় করে। সে সিনেমা, গান, নাচ, ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কারণ তার কাছে জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস।

১. মুমিন ও কাফিরের অবসর সময়ের ব্যবহারের পার্থক্য

ইসলামী জীবনদর্শনে একজন মুমিন (বিশ্বাসী) এবং একজন কাফিরের (অবিশ্বাসী/বিধর্মী) জীবনবোধ, উদ্দেশ্য এবং সময় ব্যবহারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অবসর সময়ের ব্যবহার এই পার্থক্যকে বিশেষভাবে প্রতিফলিত করে। মুমিনের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতাকে কেন্দ্র করে, যেখানে কাফিরের জীবনের লক্ষ্য সাধারণত হয় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস।

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
মূল ভিত্তিশরীয়তের সীমারেখা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা।ভোগবাদিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। নৈতিক বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
উদ্দেশ্য-১মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালীন জীবনের (আখিরাত) জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।কাফিরের কাছে জীবন হলো একবারই পাওয়া, তাই জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস এবং দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।
উদ্দেশ্য-২দেহ ও মনের সতেজতা, ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা।তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আত্ম-সন্তুষ্টি। প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে।
সময়ের ধারণামুমিন সময়কে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পুণ্যময় কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তার কাছে অবসর সময়ও ইবাদতের একটি অংশ।কাফির বা অবিশ্বাসীর কাছে সময় কেবলই ক্লান্তি বা কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম। এই সময়ে তারা কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা অনুভব করে না।
সাধারণ রূপপরিবার নিয়ে হালাল স্থানে ভ্রমণ, শরীর চর্চা/খেলাধুলা (হালাল নিয়মে), হালাল আড্ডা, ইসলামী জ্ঞান অর্জন (বই পড়া), প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, জিকির-তিলাওয়াত ও চিন্তন-মনন।সঙ্গীত (হারাম উপাদানযুক্ত), মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকের ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শনী।
ফলাফলমানসিক শান্তি লাভ, ইমান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা।পাপের পথে ধাবিত হওয়া, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মানসিক অস্থিরতা ও আসক্তি।

২. অবসর সময়ের ব্যবহার ও কার্যকলাপ

মুমিন ব্যক্তি তার অবসর সময়কে এমন কাজে নিয়োজিত করে যা তার আত্মার খোরাক জোগায় এবং পরকালে উপকারে আসে। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে সেই সময়কে ফলপ্রসূ ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

মুমিনের অবসর কার্যকলাপ (হালাল বিনোদন ও ফলপ্রসূ কাজ)কাফিরের অবসর কার্যকলাপ (হারাম ও ভোগবাদী বিনোদন)
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন: কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, নফল ইবাদত বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা।ভোগবাদী আনন্দ: সিনেমা, গান, নাচ, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হওয়া।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক হক আদায়: পরিবারের হক আদায় করা, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের সাথে ফলপ্রসূ খেলাধুলা করা। এটিও মুমিনের জন্য ইবাদত।অবাধ্যতা ও পাপ: মদ, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা নৈতিকতাহীন কাজে সময় নষ্ট করা।
সৃজনশীলতা ও সমাজসেবা: ইসলামি সাহিত্য চর্চা, সমাজসেবা, অভাবীকে সাহায্য করা, জনকল্যাণমূলক কাজে সময় দেওয়া, বা হালাল শখ পূরণ করা।সময় ও সম্পদের অপচয়: অর্থহীন বা ক্ষতিকর গেমিং, চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সম্পদ ও মূল্যবান সময়ের চূড়ান্ত অপচয় করা।
শারীরিক সুস্থতা: হালাল উপায়ে শরীরচর্চা করা, যা তাকে ইবাদতের জন্য শক্তিশালী করে তোলে।স্বাস্থ্যের ক্ষতি: এমন কাজ করা যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যেমন নেশা বা অতিরিক্ত অনিরাপদ অভ্যাস।

৩. ইসলামি বিধিবিধানের পার্থক্য

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
 বিধিবিধানমুমিন শরীয়তের সীমান থেকে অবসর কাটায় বিধান সে হারাম বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলে।কাফিরের হারাম হালাল বিধানের বাধ্যবাধকরা নাই। তাই সে অশ্লীলভাবে অবসর কাটায়।  
বিনোদনের পদ্ধতিপরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে হালাল আড্ডা, শরীর চর্চা বা খেলাধুলা, ইসলামী বই পড়া জিকির, তিলাওয়াত ও চিন্তা-মননে নিজেকে প্রশান্ত করা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো ইত্যাদিমাদকদ্রব্য ও নেশা সেবন, জুয়া ও বাজি ধরা, অশ্লীল চলচ্চিত্র ও পর্ণোগ্রাফি দেখা, কুরুচিপূর্ণ বা হারাম গান ও বাদ্যযন্ত্র শোনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বা হাসি-ঠাট্টা, অশালীন পোশাক পরিধান ও প্রদর্শনী, সময় নষ্ট করা হয় এমন অনর্থক খেলাধুলা, জাদুটোনা ও ভাগ্য গণনা: ভাগ্য গণনাকারী ইত্যাদি।
ফলাফলঅবসর শেষে মুমিনের মনে আসে মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি, কারণ সে জানে যে এই সময়টি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছে। তার অবসর জীবন তাকে কর্ম ও ইবাদতের জন্য আরও বেশি সতেজ ও প্রস্তুত করে তোলে।  কাফিরের অবসর সময় তাকে হয়তো ক্ষণিকের উত্তেজনা বা শারীরিক আনন্দ দেয়, কিন্তু এর ফলস্বরূপ প্রায়শই তার মনে শূন্যতা, একঘেয়েমি, মানসিক অশান্তি এবং পাপের গ্লানি থেকে যায়।

মুমিনের অবসর হলো আল্লাহর পথে চলার জন্য একটি ‘বিশ্রাম ও রিচার্জ’ প্রক্রিয়া, যেখানে মুমিনের প্রতিটি হালাল কাজও নেকিতে পরিণত হয়। আর কাফিরের অবসর হলো শুধুমাত্র দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম, যা তাকে পরকালীন জীবনের সফলতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মুমিন তার সময়কে ‘ইনভেস্ট’ করে, আর কাফির তার সময়কে ‘খরচ’ করে।

ইবাদত ও বিনোদনে ভারসাম্য রক্ষা

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে ফেরেশতাদের মতো কেবল একমুখী ইবাদত বা নিরবচ্ছিন্ন উপাসনার জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের চাহিদা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই চাহিদাসমূহের মধ্যে আছে বিশ্রাম, আত্মতৃপ্তি এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন। মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তি উপেক্ষা করে যদি আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত-বন্দেগি ও গম্ভীর কাজে ডুবে থাকি, তবে এর ফলস্বরূপ আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির দ্রুত ক্ষয় ঘটবে। একঘেয়েমি চলে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদী ইবাদত চালিয়ে যেতে কষ্টকর করে তুলবে। এর ফলে একসময় মানসিক হতাশা, অসুস্থতা বা ইবাদতে অনীহা দেখা দিতে পারে।

ইসলাম মানুষের প্রকৃতির এই দিকটিকে পুরোপুরি স্বীকার করে। এ কারণেই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ স্বয়ং নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর জীবনাচারই মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ। এই ভারসাম্য রক্ষার নীতির সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো-

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা তিন ব্যক্তি নাবী ﷺ এর ‘ইবাদাতের অবস্থা জানার জন্য তাঁর স্ত্রীগণের নিকট এলে। নাবী ﷺ এর ইবাদাতের খবর শুনে তারা যেন তাঁর ইবাদাতকে কম মনে করলেন এবং পরস্পর আলাপ করলেন: নাবী ﷺ এর সঙ্গে আমাদের তুলনা কোথায়, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আগের-পরের (গোটা জীবনের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বললেন, আমি কিন্তু সারা রাত সলাত আদায় করবো। দ্বিতীয়জন বললেন, আমি দিনে সিয়াম পালন করবো, আর কখনো তা ত্যাগ করব না। তৃতীয়জন বললেন, আমি নারী থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করবো না। তাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার সময় নবী ﷺ এসে পড়লেন এবং বললেন, তোমরা কী ধরনের কথাবর্তা বলছিলে? আল্লাহ্‌র কসম! আমি আল্লাহ্‌কে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশী পরহেয করি। কিন্তু এরপরও আমি কোন দিন সিয়াম পালন করি আবার কোন দিন সিয়াম পালন করা ছেড়ে দেই। রাতে সলাত আদায় করি আবার ঘুমিয়েও থাকে। আমি বিয়েও করি। সুতরাং এটাই আমার সুন্নাত (পথ), যে ব্যক্তি আমার পথ থেকে বিমূখ হবে সে আমার (উম্মাতের) মধ্যে গণ হবে না। সহিহ বুখারী : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম ১৪০১

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে কঠোরতা বা সন্ন্যাসবাদের কোনো স্থান নেই। রাসূল ﷺ নিজে আল্লাহর সর্বাধিক ভয়কারী হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি তাঁর উম্মতকেও জীবনের বিভিন্ন দিকের দাবি পূরণ করতে উৎসাহিত করেছেন—একদিকে যেমন আল্লাহর হক (ইবাদত), অন্যদিকে তেমনি নিজের হক (বিশ্রাম, ঘুম) এবং পরিবারের হক (বিয়ে ও সামাজিক জীবন) আদায় করতে শিখিয়েছেন। অতিরিক্ত কঠোরতার মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট করার প্রবণতাকে তিনি তাঁর পথ থেকে বিমুখতা হিসেবে গণ্য করেছেন।

তাই, একজন বুদ্ধিমান মুমিন তাঁর জীবনে এই ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি জানেন যে, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে ইবাদত করলে তাতে মনোযোগ আসে না এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর সাথে নৈকট্য স্থাপন) ব্যাহত হয়। তাই তিনি আল্লাহর অনুমোদিত উপায়ে মাঝে মাঝে বিরতি নেন ও বিনোদন করেন। এই বিরতি বা বিনোদনকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মুরাওয়াহাতুন নাফস’ (আত্মার প্রশান্তি) বলা যেতে পারে। হালাল বিনোদন মুমিনের শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম, যা তাকে সতেজ করে পুনরায় দ্বীনী ও দুনিয়াবী দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।

এই বিনোদনের অর্থ এই নয় যে তা ইবাদতের সময়কে বা দায়িত্বকে নষ্ট করবে, বরং তা এমন হওয়া চাই যা শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলে এবং মুমিনকে আরও উদ্যমের সাথে আল্লাহমুখী করে তোলে। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা, বৈধ ভ্রমণ, বা কোনো সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এ সবই ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার মাধ্যম। যখন একজন মুমিন এই বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরবর্তীতে আরও উদ্যমের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের নিয়ত করে, তখন এই বিরতিও নেক আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে। এভাবে, ইবাদত ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একজন মুমিন একটি সুস্থ, সফল এবং সন্তোষজনক জীবন অতিবাহিত করতে পারে, যা ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।

বিনোদন বা আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ) 

বিনোদন বা আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন শব্দেটি আরবিতে আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  বলা হয়। আরবিতে বেশিরভাগ শব্দ তিনটি মূল অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত রুট বা ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত হয়। ‘الـتَّـرْفِـيـهْ’ শব্দটির ক্রিয়ামূল হলো-

 (ر – ف – ه) যার সাধারণত অর্থ হলো- স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম, সুখ, এবং জীবনকে সহজ ও হালকা করা ইত্যাদি।  ক্রিয়া: ‘رَفَّهَ’ (রাফ্ফাহা) যার অর্থ আরাম দেওয়া, শান্ত করা বা বিনোদন দেওয়া। মাসদার (ক্রিয়াবিশেষ্য)  ‘تَرْفِيه’ (তারফিহ) যার অর্থ বিনোদন, আরাম দেওয়া বা স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করার কাজ বা প্রক্রিয়া। সুতরাং, ‘الـتَّـرْفِـيـهْ’ এর উৎপত্তিগত অর্থ হলো- স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম বা প্রশান্তি প্রদানের কাজ বা প্রক্রিয়া, যা আধুনিক বাংলায় বিনোদন, আমোদ-প্রমোদ, চিত্তবিনোদন ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  বা বিনোদন শব্দটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াতে ব্যবহৃত হয়নি। তবে, এর মূল ধাতু বা রুট (ر-ف-ه) থেকে উদ্ভূত অন্যান্য রূপগুলি, যা সাধারণত বিলাসিতা, ভোগ-বিলাস, আরাম এবং সীমালঙ্ঘন অর্থে ব্যবহৃত হয়, কুরআনে বহুবার এসেছে। যেমন-

আল্লাহ বলেন-

وَاِذَاۤ اَرَدۡنَاۤ اَنۡ نُّہۡلِکَ قَرۡیَۃً اَمَرۡنَا مُتۡرَفِیۡہَا فَفَسَقُوۡا فِیۡہَا فَحَقَّ عَلَیۡہَا الۡقَوۡلُ فَدَمَّرۡنٰہَا تَدۡمِیۡرًا

আর যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ‘মুতরাফিন’ (বিলাসী বা সীমালঙ্ঘনকারী) দেরকে আদেশ করি। অতঃপর তারা তাতে সীমালঙ্ঘন করে। তখন তাদের উপর নির্দেশটি সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। সুরা ইসরা : ১৬

এখানে এই শব্দটি সেই সব লোকদের বোঝায় যারা বিলাসিতায় অভ্যস্ত এবং পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে মগ্ন থাকার কারণে অবাধ্য হয়ে যায় এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। আধুনিক ‘বিনোদন’ অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে এটি বরং অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়তার নেতিবাচক দিকটি প্রকাশ করে।

বিনোদন বলতে কি বুঝায়?

বিনোদন শব্দের মূল অর্থ হলো মনকে ভুলিয়ে রাখা বা চিত্তের তুষ্টিসাধন। ইংরেজি পরিভাষা ‘Entertainment’-এর মূল ধারণা হলো মনোযোগকে ধরে রাখা বা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। আর আরবিতে একে আত-তারফীহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ) বলা হয়, যার মূল অর্থ আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করা।

বিনোদন হলো এমন একটি কার্যকলাপ, অনুষ্ঠান বা অভিজ্ঞতা যা কোনো দর্শক বা অংশগ্রহণকারীকে আনন্দ, তৃপ্তি, আগ্রহ এবং মনোরঞ্জন দেয়। এটি সাধারণত দৈনন্দিন জীবনের রুটিন, কাজ বা দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে মনকে সতেজ করে এবং অবকাশ সময়ে উপভোগের সুযোগ করে দেয়।

সহজভাবে, বিনোদন হলো সেই সব কাজ যা মানুষকে আনন্দ দেয় এবং মনকে প্রফুল্ল রাখে। এটি গল্প বলা, সঙ্গীত, নাটক, নৃত্য, খেলাধুলা, সিনেমা, বই পড়া, বা অন্য যেকোনো ধরনের প্রদর্শনী বা কার্যকলাপ হতে পারে।

বিনোদনের বৈশিষ্ট্য

বিনোদনের অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। নিচে প্রধান প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো :

১. মনোযোগ আকর্ষণ ও আগ্রহ সৃষ্টি

একটি সফল বিনোদনমূলক কার্যকলাপের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দর্শক বা শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখা এবং তাদের মধ্যে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা। কারণ বিনোদন মূলত আগ্রহের উপর নির্ভরশীল। একটি ভালো চলচ্চিত্র বা নাটক এমনভাবে গল্প বলে যে দর্শক শেষ পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। একইভাবে, কোনো রোমাঞ্চকর খেলাধুলা বা কুইজ প্রতিযোগিতা মানুষের কৌতূহলকে উদ্দীপিত করে এবং তাদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখে। যখন বিনোদনের উপাদানটি নতুনত্ব, অপ্রত্যাশিততা বা মানসিক চ্যালেঞ্জের সংমিশ্রণ ঘটায়, তখন তা মানুষের মনকে সহজেই আকর্ষণ করে। আগ্রহ ধরে রাখতে না পারলে, বিনোদনটি দ্রুত একঘেয়েমিতে পরিণত হয়, যেমন দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিমূলক বক্তৃতায় মানুষ সহজে আগ্রহ হারায়।

২. আনন্দ ও তৃপ্তি প্রদান

বিনোদনের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক ও মানসিক আনন্দ এবং তৃপ্তি দেয়। বিনোদন মনস্তাত্ত্বিক স্তরে কাজ করে, যা মানুষকে দৈনন্দিন চাপ থেকে দূরে সরিয়ে সুখের অনুভূতি দেয়। যখন আমরা একটি কমেডি শো দেখি, তখন হাসি আমাদের মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন (সুখের হরমোন) নিঃসরণ করে। আবার, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো বা একটি সুন্দর গান শোনা মনকে এক ধরনের শান্তি ও প্রফুল্লতা এনে দেয়। এই আনন্দ বা তৃপ্তিই মানুষকে বারবার বিনোদনের দিকে আকর্ষণ করে। এটি কেবল হাসি বা মজার মাধ্যমে নাও আসতে পারে; একটি গভীর বা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও উত্তেজনা বা বিস্ময়ের মাধ্যমে মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে।

৩. দুশ্চিন্তা এবং একঘেয়েমি থেকে মুক্তি

বিনোদন মানুষের মনকে দৈনন্দিন জীবনের চাপ, দুশ্চিন্তা এবং একঘেয়েমি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। এই বৈশিষ্ট্যটি মানুষকে বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে থাকতে সাহায্য করে। একটি ভালো বই পড়া বা একটি ভিডিও গেম খেলা মানুষকে অন্য একটি জগতে নিয়ে যায়, যেখানে তারা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি ভুলে থাকতে পারে। এটি এক ধরনের মানসিক বিরতি বা মুক্তি দেয়, যা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল হতে সাহায্য করে। এই বিচ্যুতি মানসিক চাপ কমানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেমন, দিনের শেষে একটি প্রিয় সিরিয়াল দেখা বা গান শোনা মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং মনকে পুনরায় সতেজ করে তোলে।

৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা

অনেক বিনোদনমূলক কার্যকলাপ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দ দেয় না, বরং মানুষকে একত্রিত করে এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। উৎসব, অনুষ্ঠান ( ঈদ) বা সম্মিলিত খেলাধুলার মতো বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতাগুলো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি তৈরি করে। এগুলি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে। যৌথভাবে কোনো একটি খেলার দলের জয় উদযাপন করা বা কোন পার্টিতে অংশ নেওয়া মানুষকে সামাজিকভাবে সংযুক্ত করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।

৫. শিক্ষামূলক বা অন্তর্দৃষ্টির সম্ভাবনা

যদিও বিনোদনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আনন্দ দেওয়া, তবুও অনেক সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এবং দর্শকদের মধ্যে শিক্ষা বা অন্তর্দৃষ্টি জাগাতে পারে। এই ধরনের বিনোদনকে প্রায়শই ‘এডুটেইনমেন্ট’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারিগুলো আমাদের অতীত সম্পর্কে জ্ঞান দেয়, আবার কিছু ব্যঙ্গাত্মক বা সামাজিক সিনেমা সমাজের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। ভালো সাহিত্য, হামদ, নাথ বা ইসলামি নাটকগুলো মানুষের চিন্তাভাবনার জগতকে প্রসারিত করে এ ./6[;lvcবং নৈতিক বা দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবায়। এইভাবে, বিনোদন কেবল সময়ের অপচয় না হয়ে মানসিক বৃদ্ধি এবং জ্ঞানের উৎসে পরিণত হতে পারে।

৬. অবসর সময়ের ব্যবহার

বিনোদন সাধারণত অবসর সময়ে ঘটে। যখন মানুষ তার পেশাগত কাজ, ঘরোয়া দায়িত্ব বা দৈনন্দিন রুটিন থেকে মুক্ত থাকে, তখন তারা বিনোদনমূলক কার্যকলাপে অংশ নেয়। এটি মূলত ক্লান্তি দূর করে মনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মজীবী মানুষ সপ্তাহান্তে পার্কে হাঁটা বা পরিবারের সাথে পিকনিকে যাওয়ার মাধ্যমে তার অবসরের সদ্ব্যবহার করেন। এই সময়টি বাধ্যতামূলক কাজ নয়, বরং ঐচ্ছিক আনন্দদায়ক কার্যকলাপের জন্য নির্ধারিত। অবসর সময়ের সার্থক ব্যবহার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে এবং পরবর্তী কাজের জন্য শক্তি ও উদ্যম যোগায়।

৭. বৈচিত্র্যময় রূপ

বিনোদনের কোনো একক বা নির্দিষ্ট রূপ নেই; এটি মানুষের রুচি ও প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে বহু ধরনের হতে পারে। এই বৈচিত্র্যকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

ক. নিষ্ক্রিয় বিনোদন

যে কার্যকলাপে ব্যক্তি কেবল দর্শক বা শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকে এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে না, তাকে নিষ্ক্রিয় বিনোদন বলে। এই ধরনের বিনোদনে ব্যক্তি কেবল তথ্য বা অভিজ্ঞতা গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। শারীরিক বা মানসিক দিক থেকে সক্রিয় প্রচেষ্টা খুব কম থাকে, অর্থাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা শারীরিক কসরত করতে হয় না। এর মাধ্যমে কম শক্তি ব্যয় করে দ্রুত মানসিক স্বস্তি লাভ করা যায়। এটি অনেকটা ‘স্ট্রেস বাটন অফ’ করার মতো কাজ করে, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে পরিবেশকের হাতে ছেড়ে দেয় এবং সহজে মানসিক মুক্তি লাভ করে।

উদাহরণ : চলচ্চিত্র বা টিভি দেখা, গান শোনা, নাটক উপভোগ করা, খেলাধুলার ম্যাচ দেখা বা সার্কাস দেখা।

খ. সক্রিয় বিনোদন

যে কার্যকলাপে ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং এর জন্য শারীরিক বা মানসিক দক্ষতা ও শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তাকে সক্রিয় বিনোদন বলে। এই কার্যকলাপে ব্যক্তি শারীরিক বা মানসিক শক্তি ব্যয় করে এবং প্রায়শই কোনো দক্ষতা বা চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত থাকে। এটি নিষ্ক্রিয় বিনোদনের চেয়ে বেশি পরিকল্পনা এবং প্রচেষ্টা দাবি করে। এটি মানসিক স্বস্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুস্থতা আনতেও সাহায্য করে। এটি শারীরিক বা মানসিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা মন ও শরীরকে একই সাথে সতেজ করে তোলে।

উদাহরণ: বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা (ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার), ভিডিও গেম খেলা, শখের কাজ (যেমন বাগান করা, ছবি আঁকা), অথবা পর্যটন ও ভ্রমণ।

গ. সামাজিক বিনোদন

যে বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অন্যান্য মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া জড়িত থাকে এবং তাদের উপস্থিতি বিনোদনের মূল উপাদান হয়, তাকে সামাজিক বিনোদন বলে। এই ধরনের বিনোদন মানুষের সামাজিক প্রাণী হওয়ার চাহিদাকে পূরণ করে। এখানে আনন্দ কেবল কার্যকলাপটির মধ্যে নিহিত নয়, বরং একসাথে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্যে নিহিত। এটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি ও মজবুত করতে সাহায্য করে। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একাকীত্ব দূর করে, আপনজনের সাথে সংযোগের অনুভূতি বাড়ায় এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।

উদাহরণ: বন্ধু বা পরিবারের সাথে আড্ডা দেওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে (যেমন, বিয়ে, উৎসব) অংশগ্রহণ, দলগত খেলাধুলা, বা একসাথে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা।

বিনোদনের উপকারিতা

সুস্থ আনন্দ বা বৈধ আমোদ-প্রমোদ (বিনোদন) মানুষের শরীর, মন ও আত্মার জন্য অপরিহার্য। এটি কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং জীবনের ভারসাম্য রক্ষা, মানসিক চাপ কমানো, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়। নিয়মিত ও পরিমিত বিনোদন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি দূর করে, মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে এবং সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক মানসিকতা বিকাশে সহায়তা করে। নিচে বিনোদনের উপকারিতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো-

১. মানসিক প্রশান্তি আনে:

নিয়মিত কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা এবং জীবনের নানা ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে মনকে ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি দিতে বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি বিরতির মতো কাজ করে, যা মনকে শিথিল করতে সাহায্য করে এবং চাপ সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। এর ফলে মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে। যখন মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়, তখন হতাশা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক রোগের ঝুঁকিও বহুলাংশে হ্রাস পায় এবং ব্যক্তি মানসিক স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারে।

২. শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ করে:

দৈনন্দিন ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য সুস্থ বিনোদন অত্যন্ত কার্যকর। শরীর ও মন যখন একটানা কাজ করতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি আসে এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়। একটি আনন্দদায়ক বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শরীরের জড়তা কাটে এবং মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর হয়। এটি একটি ‘রিফ্রেশ’ বোতামের মতো কাজ করে, যা ব্যক্তিকে নতুন উদ্যম ও উৎসাহ নিয়ে পুনরায় কাজে ফেরার শক্তি ও প্রেরণা জোগায়।

৩. সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করে:

পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সাথে আনন্দময় বিনোদনে অংশ নেওয়া সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করার একটি চমৎকার উপায়। একসাথে হাসি, খেলা বা ভ্রমণ – এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলো মানুষকে আরও কাছাকাছি আনে এবং তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বন্ধন তৈরি করে। সম্মিলিত বিনোদনের মাধ্যমে একে অপরের প্রতি পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং গভীর বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একাকীত্ব দূর করে এবং জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়:

বিনোদন মনকে দৈনন্দিন সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এবং কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত হতে সাহায্য করে। যখন মন চাপমুক্ত ও প্রফুল্ল থাকে, তখন এটি স্বাভাবিকভাবেই নতুন ধারণা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সৃজনশীল সমাধান নিয়ে আসতে পারে। শিল্পকলা, সংগীত, সাহিত্য বা চ্যালেঞ্জিং গেমের মতো বিনোদনমূলক কাজগুলো মস্তিষ্কের সেই অংশগুলিকে উদ্দীপিত করে যা সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের জন্য দায়ী। ফলস্বরূপ, ব্যক্তি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে শেখে এবং কাজে আরও বেশি সৃষ্টিশীল হয়।

৫. আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখে:

ইসলাম অনুমোদিত বা যেকোনো ধর্মীয় সীমারেখার মধ্যে থাকা সুস্থ বিনোদন, যেমন হালাল খেলাধুলা, প্রকৃতির মাঝে ভ্রমণ, অথবা মননশীল শিল্প উপভোগ করা, আত্মাকে প্রশান্ত রাখতে সহায়ক। এই ধরনের পরিচ্ছন্ন আনন্দ মনকে অহেতুক দুশ্চিন্তা ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখে। এটি ব্যক্তির জীবনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে এবং তাকে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলে, যা জীবনের সামগ্রিক আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৬. কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে:

পরিশ্রমের মাঝে একটি পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ বিরতি বা বিনোদন একজন ব্যক্তির কর্মক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে। একটানা কাজ করার ফলে মনোযোগ কমে যায় এবং ভুল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু যখন শরীর ও মন প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও বিনোদন পায়, তখন ক্লান্তি দূর হয় এবং মনোযোগের স্তর পুনরায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরে আসে। ফলে কাজের প্রতি একাগ্রতা বাড়ে এবং দক্ষতাও বহু গুণে বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিকভাবে উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করে।

৭. চিন্তা ও দুশ্চিন্তা কমায়:

উপযুক্ত বিনোদন মানসিক চাপ (স্ট্রেস), হতাশা ও উদ্বেগের মতো নেতিবাচক অনুভূতিগুলো কমাতে অত্যন্ত সহায়ক। যখন ব্যক্তি তার পছন্দের বিনোদনমূলক কার্যক্রমে মগ্ন থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক এন্ডোরফিন (সুখের হরমোন) নিঃসরণ করে, যা মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। এই প্রক্রিয়াটি নেতিবাচক চিন্তাগুলিকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং মানসিকতাকে ইতিবাচক রাখে। নিয়মিত বিনোদন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং জীবনকে চাপমুক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

৮. পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করে:

পরিবারের সকল সদস্যের একসাথে হালাল বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া পারিবারিক বন্ধনকে আরও গভীর ও মজবুত করে। সিনেমা দেখা, বোর্ড গেম খেলা, পিকনিকে যাওয়া বা একসাথে রান্না করার মতো বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতাগুলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা এবং বোঝাপড়া তৈরি করতে সাহায্য করে। এই সম্মিলিত আনন্দময় স্মৃতিগুলো পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও মজবুত করে এবং সকলের মধ্যে মানসিক নৈকট্য বৃদ্ধি করে।

৯. শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা দেয়:

অনেক বিনোদনমূলক মাধ্যম কেবল আনন্দই দেয় না, বরং মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও অর্জনে সহায়তা করে। ভ্রমণ, তথ্যভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখা, সাহিত্য পাঠ, জাদুঘর বা ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের মতো কার্যকলাপগুলো জ্ঞানকে প্রসারিত করে। এমনকি ইতিহাসভিত্তিক বা শিক্ষামূলক গেমও নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ জোগায় এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়াটিকে আরও আনন্দময় করে তোলে।

১০. সুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলে:

খেলাধুলা বা দলীয় বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক গুণাবলী অর্জন করে। দলগত খেলাধুলা সহযোগিতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার মানসিকতা শেখায়। পরাজয়কে মেনে নেওয়া এবং জয়কে বিনয়ের সাথে উদযাপন করার মতো গুণাবলী এই বিনোদনের মাধ্যমেই শেখা যায়, যা সমাজে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

১১. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়:

বিভিন্ন মানসিক খেলা যেমন পাজল, সুডোকু, বা কৌশলগত গেম, এবং সেইসাথে গল্প বা কবিতা পাঠ মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে সক্রিয় রাখে। এসব বিনোদনমূলক কাজ মস্তিষ্কের সংযোগগুলিকে শক্তিশালী করে, যার ফলে মনোযোগের স্থিতিকাল বাড়ে এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা উন্নত হয়। ভ্রমণ এবং নতুন পরিবেশ দেখা স্মৃতিশক্তিকে উদ্দীপিত করে। সুস্থ বিনোদন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে জ্ঞানীয় অবনতির ঝুঁকি কমায়।

১২. জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে:

একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাত্রার জন্য কাজ বা ইবাদতের পাশাপাশি কিছু সময় বিনোদন অপরিহার্য। অতিরিক্ত কাজ বা যেকোনো একটি বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিলে জীবন একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে এবং মানসিক ক্লান্তি আসতে পারে। বিনোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্রেক’ হিসেবে কাজ করে, যা কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই ভারসাম্য ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ, সুখী ও উৎপাদনশীল থাকতে সাহায্য করে।

১৩. শারীরিক স্বাস্থ্য উন্নত করে:

খেলাধুলা, হাঁটা, সাঁতার কাটা বা ভ্রমণের মতো সক্রিয় বিনোদনমূলক কার্যকলাপগুলো দেহের জন্য ব্যায়ামের মতো কাজ করে। এই ধরনের বিনোদন শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল রাখে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ স্থূলতা, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আনন্দদায়ক বিনোদনমূলক উপায়ে শরীরকে সুস্থ রাখা কঠিন কাজ বলে মনে হয় না।

১৪. সন্তানদের চরিত্র গঠনে সহায়ক:

বাচ্চাদের জন্য শিক্ষণীয় এবং আনন্দময় বিনোদন তাদের নৈতিকতা, সামাজিক দক্ষতা ও সৃজনশীলতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নৈতিক শিক্ষামূলক গল্প, দলবদ্ধ খেলা বা গঠনমূলক খেলনা তাদের মধ্যে সহযোগিতা, ভাগ করে নেওয়া, ধৈর্য এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশ করে। এই ধরনের বিনোদন তাদের শৈশবেই ইতিবাচক মূল্যবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা শেখায়, যা ভবিষ্যতে তাদের চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।

১৫. মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে:

সৃজনশীল বিনোদন যেমন নাটক, সাহিত্য, বা কাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে উদ্দীপিত করে। এসবের মাধ্যমে মানুষ সহমর্মিতা, দয়া, সততা, এবং ন্যায়বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক মূল্যবোধগুলো শিখতে পারে। একটি চরিত্র বা ঘটনার সাথে নিজেকে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে, মানুষ অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে শেখে এবং সমাজে একজন দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

১৬. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে:

খেলাধুলা, সংগীত বা যেকোনো সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সফলতা বা সক্রিয় অংশগ্রহণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে। ছোট ছোট সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে এবং অন্যদের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার ফলে আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পায়। নতুন কিছু শেখা বা একটি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করা ভীতিভাব ও জড়তা কাটাতে সাহায্য করে। এই আত্মবিশ্বাস জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

১৭. একঘেয়েমি দূর করে:

নিয়মিত জীবনযাত্রার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো থেকে সৃষ্ট ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য বিনোদন একটি কার্যকর হাতিয়ার। এটি রুটিন থেকে একটি পরিকল্পিত প্রস্থান যা মনকে নতুনত্ব ও উত্তেজনা এনে দেয়। বিনোদনের মাধ্যমে মানসিক উদ্দীপনা পুনরায় জাগ্রত হয় এবং জীবন আরও আনন্দময় ও অর্থপূর্ণ মনে হয়। এটি মানসিক অবসাদ এড়াতেও সহায়তা করে।

১৮. সময় ব্যবস্থাপনা শেখায়:

একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে বিনোদনের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিনোদনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে মানুষ কাজ, বিশ্রাম ও আনন্দের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য রক্ষা করতে শেখে। এই অনুশীলন ব্যক্তিকে তার সময়কে দক্ষতার সাথে অগ্রাধিকার দিতে এবং অপচয় রোধ করতে শেখায়, যা সামগ্রিক সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়িয়ে তোলে।

১৯. সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখে:

বৈধ উৎসব, খেলাধুলা বা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো বিভিন্ন পটভূমির মানুষকে একত্রিত করে। এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতাগুলো সমাজে ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। মানুষ একে অপরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে, যা সামাজিক বিভেদ কমিয়ে মিলন ও একতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।

২০. ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে:

বিনোদন মনকে প্রফুল্ল ও হালকা রাখে, যা হতাশা, ক্রোধ বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে। এটি জীবনের প্রতি একটি আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। নিয়মিত বিনোদন মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, যাতে ব্যক্তি জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো আরও সহজে মোকাবেলা করতে পারে। একটি ইতিবাচক মানসিকতা সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক।

বিনোদনের প্রকারভেদ

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান যা মানুষের জীবনে কাজ, ইবাদত এবং বিশ্রামের মাঝে সামঞ্জস্য বিধানের কথা বলে। বিনোদন মানুষের একটি সহজাত চাহিদা হলেও, ইসলাম এটিকে শরীয়তের নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে রেখেছে, যা বিনোদনকে বৈধ (হালাল) বা অবৈধ (হারাম) নির্ধারণ করে। বিধানের ভিত্তিতে ইসলামে বিনোদনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. হারাম বিনোদন,

২. হালাল বিনোদন এবং

৩. হারাম-হালালের সংমিশ্রণে বিনোদন।

১. হারাম বিনোদন বা নিষিদ্ধ বিনোদন

যে বিনোদনমূলক কার্যকলাপ ইসলামের মৌলিক নীতিমালা, বিশ্বাস বা নৈতিকতার সরাসরি পরিপন্থী এবং যা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা হলো হারাম বিনোদন। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং পাপে লিপ্ত করে।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ:

ক বিশ্বাস বিরোধী উপাদান

যে বিনোদনমূলক কাজের মাধ্যমে শিরক (আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা), কুফরী (অবিশ্বাস) বা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো বিষয়কে প্রচার, উৎসাহিত বা উদযাপন করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

উদাহরণস্বরূপ, এমন কোনো অনুষ্ঠান বা চলচ্চিত্র দেখা যেখানে সরাসরি মূর্তিপূজা, জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ গণনা (যা কেবল আল্লাহর জ্ঞান) বা ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি উপহাস করা হয়। এই ধরনের বিনোদন একজন মুসলিমের ঈমান (বিশ্বাস) ও তাওহীদ (একত্ববাদ)-এর ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই বিনোদনগুলো মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং অন্য শক্তির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে।

খ. নৈতিকতা ও পাপের উৎসাহ

যে বিনোদন অশ্লীলতা, ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, মিথ্যাচার বা হিংসাত্মক কার্যকলাপকে সরাসরি উৎসাহিত করে, প্রদর্শন করে বা স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরে, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেমন: পর্নোগ্রাফিক বা অত্যন্ত অশ্লীল দৃশ্যযুক্ত চলচ্চিত্র, গান বা অনুষ্ঠান; জুয়ার আড্ডা বা অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণ; এমন বিনোদনমূলক খেলা বা অনুষ্ঠান যেখানে বিনা কারণে চরম সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতাকে বীরত্ব হিসেবে দেখানো হয়। এই কার্যকলাপগুলো সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত নৈতিকতাকে ধ্বংস করে, যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী এবং সমাজে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে।

গ. দায়িত্ব থেকে গাফিলতি

যে বিনোদন মানুষের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে সে ফরয ইবাদত, যেমন সালাত (নামায) ও সিয়াম (রোজা), অথবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও জাগতিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে গাফেল হয়ে যায়, তা হারাম বিনোদন হিসেবে গণ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো খেলাধুলা, সিনেমা বা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে ওয়াক্তের নামায ছেড়ে দেওয়া বা নামাযের সময় পার করে দেওয়া। বিনোদন যদি ব্যক্তির পরিবার, চাকরি বা অন্যান্য সামাজিক দায়িত্ব পালনে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটায় এবং তাকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে, তবে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা।

ঘ. সম্পদ ও সময়ের চরম অপচয়

যে বিনোদন চূড়ান্তভাবে মূল্যহীন (‘লাহ্ওয়াল হাদিস’) এবং যার পেছনে সম্পদ ও মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, বিশেষ করে যদি তা মারাত্মক আসক্তিতে রূপ নেয়, তবে তা নিন্দনীয় বা হারাম। যদিও সামান্য অবকাশ বৈধ, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন কার্যকলাপে মগ্ন থাকা যা কোনো জ্ঞান, স্বাস্থ্য বা নৈতিক উপকার দেয় না, বরং সম্পদ ও জীবনের মূল্যবান সময়কে নিঃশেষ করে দেয়, তা ইসলামে অনুমোদিত নয়। যেমন: উদ্দেশ্যবিহীনভাবে অর্থ খরচ করে জুয়াসদৃশ গেমিং-এ আসক্ত হওয়া বা দীর্ঘ সময় ধরে এমন সামগ্রী দেখা যা চূড়ান্তভাবে কোনো কল্যাণ বহন করে না। সময় আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত, যার অপচয় হারাম।

২. হালাল বিনোদন বা বৈধ বিনোদন

যে বিনোদন কুরআন ও সুন্নাহর নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা মানুষকে মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি দেয় এবং কোনো প্রকার হারাম কাজে লিপ্ত করে না, তা হলো হালাল বিনোদন। এই ধরনের বিনোদন জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং আত্মাকে সতেজ করতে সহায়ক।

প্রধান নীতিমালা:

ক. শরীয়তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ

হালাল বা বৈধ বিনোদনকে অবশ্যই ইসলামের মৌলিক বিধান, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, কোনো বিনোদন যেন ইসলামী জীবনপদ্ধতির কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতিকে লঙ্ঘন না করে বা এর প্রতি অবজ্ঞা না দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন পাঠ, প্রকৃতি দেখা, জ্ঞানমূলক আলোচনা বা শিশুদের সাথে খেলাধুলা করা এই নীতির অধীনে পড়ে। এই ধরনের বিনোদন মন ও আত্মাকে সতেজ করে এবং একই সাথে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশিত পথে জীবন যাপনে সাহায্য করে। বিনোদনের উদ্দেশ্য হবে মানসিক শান্তি অর্জন, কোনো পাপের দ্বার উন্মোচন করা নয়।

খ. হারাম উপাদানের বর্জন

বৈধ বিনোদনের প্রধান শর্ত হলো এতে মদ, জুয়া, মিথ্যাচার, অশ্লীলতা এবং নারী-পুরুষের অবাধ ও অনৈসলামিক মেলামেশার মতো কোনো হারাম উপাদান বা কার্যকলাপের উপস্থিতি থাকবে না। যদি কোনো খেলা বা অনুষ্ঠানে এই ধরনের উপাদান যুক্ত হয়, তবে তা সাথে সাথে অবৈধ বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, গান শোনা বৈধ, কিন্তু যদি সেই গানে অশ্লীল কথা, মদ্যপানের বা জুয়ার প্রচার থাকে, তবে তা হারাম হয়ে যায়। পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা হালাল বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

গ. শরীয়ত পালন কোন অবহেলা নয়

হালাল বিনোদন কখনই ব্যক্তিকে তার ফরয ইবাদত (যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও সিয়াম) এবং অন্যান্য পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না। বিনোদন অবশ্যই সময়ের এমন একটি অংশ হবে যা দায়িত্ব পালনে সহায়ক, বাধা সৃষ্টিকারী নয়। উদাহরণস্বরূপ, বৈধ খেলাধুলা করা ভালো, কিন্তু খেলার কারণে যদি নামাযের ওয়াক্ত চলে যায় বা বাবা-মা’র খেদমত করার সময় নষ্ট হয়, তবে সেই বিনোদন আর হালাল থাকে না। ইসলামে আল্লাহ্‌র অধিকার ও মানুষের অধিকার (হুকুকুল ইবাদ) উভয়ই রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘ. শারীরিক নিরাপত্তা থাকবে

ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সংরক্ষণের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এমন কোনো বিনোদন বৈধ নয় যা শরীরের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর বা জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিনোদন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে, ক্ষতি করবে না। যদিও সাহসিকতা প্রদর্শন প্রশংসনীয়, তবে কোনো খেলাধুলা বা কার্যকলাপ যদি নিশ্চিত আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়, তবে তা শরীয়তে অনুমোদিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়া চরম বিপজ্জনক খেলাধুলায় অংশ নেওয়া হালাল বিনোদনের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

ঙ, অপচয় থেকে মুক্ত হবে

হালাল বিনোদন অবশ্যই সম্পদ বা মূল্যবান সময়ের চরম অপচয়ে পরিণত হবে না। ইসলামে মিতব্যয়িতা এবং সম্পদের সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই যে বিনোদনের পেছনে অযথা প্রচুর অর্থ খরচ হয় বা যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট করে দেয়, তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) অথবা হারাম হওয়ার ঝুঁকি রাখে। হালাল বিনোদন হবে কার্যকর এবং পরিমিত। উদাহরণস্বরূপ, অল্প সময়ের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ইনডোর গেম খেলা বৈধ, কিন্তু দিনে দশ ঘণ্টা ব্যয় করে কোনো মূল্যহীন ভিডিও গেমে আসক্ত হওয়া অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।

৩. হারাম-হালালের সংমিশ্রণে বিনোদন

এই প্রকারের বিনোদন এমন কার্যকলাপকে বোঝায়, যা মূলত হালাল (বৈধ) হলেও তাতে কোনো হারাম উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে, অথবা বৈধ হলেও তা এমনভাবে করা হয় যে তা হারামের কাছাকাছি চলে যায়। ইসলামী পরিভাষায় এটিকে উলামাগণ ‘মাকরূহ তাহরীমি’ বা ‘মাকরূহ তানযিহি’ (না-পছন্দনীয়) হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারেন, যা পরিস্থিতিভেদে হারামও হতে পারে।

ক. বৈধ কাজে অবৈধ অনুপ্রবেশ

বৈধ বিনোদনে অবৈধ কাজের অনুপ্রবেশ করলে বিনোদনটি হারাম হয়ে যায়। অর্থাত হালাল কার্যকলাপের মধ্যে হারাম উপাদানের প্রবেশ ঘটা।

উদাহরণস্বরূপ, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা করা শারীরিকভাবে বৈধ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন। কিন্তু যদি এই খেলার ফলাফল নিয়ে জুয়া খেলা হয় বা খেলোয়াড়রা জয়ের জন্য বারবার মিথ্যা কথা বলে (যেমন রেফারির কাছে মিথ্যা অভিযোগ করা), তবে সেই বিনোদনটি অবৈধ বা হারাম উপাদানের কারণে নিষিদ্ধে পরিণত হয়। অর্থাৎ, কাজটি নিজে বৈধ হলেও, তার পার্শ্ববর্তী আচরণ বা উদ্দেশ্য তাকে হারাম করে দেয়।

খ. বিনোদনের সময় সতর প্রকাশ পাওয়া :

খেলাধুলা বা অন্য কোনো বৈধ বিনোদনের সময় যদি এমন পোশাক পরিধান করা হয় যা সতর (ইসলামে আবৃত করা আবশ্যকীয় শরীরের অংশ) প্রকাশ করে, তবে সেই বিনোদনটি হারাম হয়ে যায়।  ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক পরিধান করা ফরজ।

উদাহরণস্বরূপ, সাঁতার বা কিছু খেলাধুলার জন্য সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করতে হলেও, তা যদি ইসলামী শালীনতার সীমারেখা অতিক্রম করে এবং সতর উন্মোচন করে, তবে সেই বিনোদন অবৈধ হবে। এই নীতি মূলত নৈতিকতা ও শালীনতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেয়।

গ. আসক্তি ও দায়িত্বে ব্যাঘাত

যে বিনোদন মূলত বৈধ (যেমন ভিডিও গেম, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বা খেলাধুলা), তাতে যখন ব্যক্তি এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে যে তা তার ফরয ইবাদত (নামায, রোজা) বা পারিবারিক ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটায়, তখন তা অপছন্দনীয় হিসেবে গণ্য হয়। এই ক্ষেত্রে কাজটি নিজে হারাম নয়, কিন্তু এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং ক্ষতিকর ফলাফল এটিকে নিষিদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। সারাদিন গেম খেলে সময় নষ্ট করা বা রাতের পর রাত জেগে বিনোদন করার কারণে পরিবারকে সময় না দিতে পারা—এই বিনোদনের উদাহরণ।

ঘ. বিনোদনে অসৎ আচরণ

বৈধ বিনোদনের সময় মিথ্যা বলা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা অন্যকে মানসিকভাবে আঘাত দেওয়া বা অপমান করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়। খেলাধুলা বা আড্ডার সময় মজা করার অজুহাতে যদি অন্যকে অপমান করা হয়, বা মিথ্যা বলে আনন্দ নেওয়া হয়, তবে এই আচরণ হারাম। যদিও খেলা বা আড্ডা হালাল, কিন্তু এই ধরনের অসৎ ও ক্ষতিকর আচরণ একে পাপের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। ইসলামে ঠাট্টার ক্ষেত্রেও সত্যতা ও সম্মান বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ কারো অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া একটি গুরুতর অন্যায়।

উপসংহার : ইসলামে বিনোদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, বরং এটিকে জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা অবশ্যই শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থাকতে হবে। মুসলিম ব্যক্তিকে বিনোদনের ক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি সজাগ থাকতে হবে। যেকোনো বিনোদনের বৈধতা যাচাইয়ের মূল মাপকাঠি হলো—তা কি আমাকে আল্লাহর পথে অগ্রসর করছে, নাকি গাফেল করে দিচ্ছে?

মৃত্যুর ব্যক্তির ভালো ও খারাপ আলামতসমূহ

 মৃত্যুর ব্যক্তির ভালো ও খারাপ আলামতসমূহ

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। ভালো মৃত্যুর আলামত

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ۟ ثُمَّ اِلَیۡنَا تُرۡجَعُوۡنَ

প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুরা আনকাবুত : ৫৭

মৃত্যুর মুহুর্তটি একজন মানুষের জন্য স্পর্শকাতর। শেষ ভালো যার, সবভালো তার। যদি কেউ জীবনের শেষ মুহুর্তে ঈমান ও বিশ্বাসের সাথে মৃত্যু বরণ করেত পারে তবে সে সফলকাম হয়ে পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করবে। এই শেষ মুহুর্তটিতে আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করে যেতে পারে একজন মুমিনের জন্য সৌভাগ্যের। মৃত্যুর সময় যিনি আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ উদ্রেককারী গুনাহ হতে বিরত থাকতে পারবেন এবং পাপ থেকে তওবা করতে পারবেন, নেকীর কাজ ও ভাল কাজ বেশি বেশি করার তাওফিক পাবেন। তিনি সন্তোষজনক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলে ধরা হবে। এবং এই অবস্থায় মারা গেলে তা ভালো মৃত্যুর আলামত বলে বিবেচিত। ভাল মৃত্যুর আলামত অনেক তবে নির্দিষ্ট নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিস আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু আলমত খুঁজে পাঠকদের সামতে তুল ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহই উত্তম তৌফিক দাতা।

 । মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ পাঠ করতে পারা

মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ

যার সর্বশেষ বাক্য হবে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩১১৬

 ২. মৃত্যুর সময় কপালে ঘাম বের হওয়া।

বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

الْمُؤْمِنُ يَمُوتُ بِعَرَقِ الْجَبِينِ

কপালের ঘামসহ মু’মিন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৫২, সুনানে তিরমিজি : ৯৮২, সুনানে নাসায়ী : ১৮২৮, আহমাদ : ২২৫১৩, মিশকাত : ১৬১০

 । জুমার রাতে বা দিনে মৃত্যুবরণ করা

আদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلاَّ وَقَاهُ اللَّهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ

জুমুআর দিনে অথবা জুমুআর রাতে কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরের ফিতনা হতে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। সুনানে তিরমিজি : ১০৭৪, মিশকাত : ১৩৬৭

৪। প্লেগ বা মহামারীতে মৃত্যু বরণ করা

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন

الطَّاعُونُ شَهَادَةٌ لِكُلِّ مُسْلِمٍ

মহামারীতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। সহিহ বুখারি : ২৮৩০, ৫৭৩২, সহিহ মুসলিম : ১৯১৬, আহমাদ : ১২৫২১

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বললেন, তা একটি আযাব। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা করেন তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। আর আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দাগণের উপর তা রহমত করে দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি যখন প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ্ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে তাহলে সে একজন শহীদের সমান সওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ৩৪৭৪

৫। আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٲتَۢا‌ۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ عِندَ رَبِّهِمۡ يُرۡزَقُونَ (١٦٩) فَرِحِينَ بِمَآ ءَاتَٮٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ وَيَسۡتَبۡشِرُونَ بِٱلَّذِينَ لَمۡ يَلۡحَقُواْ بِہِم مِّنۡ خَلۡفِهِمۡ أَلَّا خَوۡفٌ عَلَيۡہِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ (١٧٠)

যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনও মৃত মনে করনা; বরং তারা জীবিত, তারা তাদের রাব্ব হতে জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন, তাতে তারা খুশি। আর তারা উৎফুল¬ হয়, পরবর্তীদের থেকে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের বিষয়ে। এজন্য যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। সূরা আ ইমরান : ১৬৯-১৭১

৬। নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি-

مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ

যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। সহিহ বুখারি : ২৪৮০

সাঈদ ইবনু যাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-

مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ

যে লোক নিজের ধনমাল রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক নিজের দীনকে হিফাযাত করতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ। যে লোক নিজের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে মারা যায় সেও শহীদ। সুনানে তিরমিজি : ১৪২১

৭। সীমান্ত প্রহরা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে

সালমান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ

একটি দিবস ও একটি রাতের সীমান্ত প্রহরা একমাস সিয়াম পালন এবং ইবাদাতে রাত জাগার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আর যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে, তাতে তার এ আমলের সাওয়াব জারী থাকবে যে আমল সে করত এবং তার (শহীদসুলভ) রিযক অব্যাহত রাখা হবে এবং সে ব্যক্তি ফিৎনাসমূহ থেকে নিরাপদে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ১৯১৩

৮। শহীদের মর্যাদায় মৃত্যুবরণ করা।

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি পথ চলাকালে একটি কাটাযুক্ত গাছের ডাল রাস্তায় পেয়ে তা সরিয়ে দিল, তখন আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিদানে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি আরও বললেন, শহীদ পাঁচ প্রকারঃ (১) প্লেগগ্রস্ত, (২) উদরাময়গ্রস্ত, (৩) ডুবন্ত, (৪) কোন কিছু চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং (৫) আল্লাহর পথে শহীদ। সহিহ মুসলিম : ১৯১৪

জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। (১) আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, (২) মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, (৩) যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ, (৪) পানিতে ডুবে, (৫) আগুনে পুড়ে ও (৬) ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৮৪৬, ৩১৯৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩১১১, আহমাদ : ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫২।

উপরের হাদিস দ্বারা বোঝা যায় ভালো মৃত্যুর অন্যতম কারণ শহিদী মৃত্যু। আল্লাহর পথে, প্লেগগ্রস্ত, উদরাময়গ্রস্ত, কোন কিছু চাপা পড়ে, মহামারীতে, গর্ভাবস্থায়, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে ও ক্ষয়রোগে মৃত্যু বরণকারী শহীদের মর্যাদা পাবেন। এক কথায় বলতে পারি, ভালো বা শহীদি মৃত্যুর অন্যতম কারণসমূহ হলো-

১. প্লেগ রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ

২. পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৩. পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি শহীদ

৪. প্রাচীর চাপায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৫. আভ্যন্তরীণ বিষ ফোঁড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৬. আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি শহীদ

৭. প্রসবকালে মৃত রমনী শহীদ।

৮. মহামারীতে মৃত ব্যক্তি শহীদ ও

৯. ক্ষয়রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ

এই আলামতগুলো ব্যক্তির ভাল মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে এ নিশ্চয়তা দিব না যে, তিনি জান্নাতি। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন তারা ছাড়া। যেমন চার খলিফার ব্যাপারে তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন।  আল্লাহ আমাদের সকলকে ভাল মৃত্যু দান করুন।

খারাপ মৃত্যুর আলামতঃ

উপরের আলোচনায় দেখেছি ভালো মৃত্যুর কিছু আলামত আছে। তেমনিভাবে খারাপ মৃত্যুরও কিছু আলামত কুরআন সুন্নাহে আছে। নিন্মে খারাপ মৃত্যুর আলামতসমূহ তুলে ধরা হলো-

১। ঈমান থাকার পরও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা

আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলন-

وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ

তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর সাথে শরীক করে। সুরা ইউসুফ : ১০৬

মহান আল্লাহ প্রতি ঈমান আছে কিন্তু এর সাথে তার সাথে শরীক রকে থাকে। যার ফলে ঐ ঈমানদার মুশরিকে পরিনত নয়। আর মহান আল্লাহ মুশরিক চিরস্থায়ী জান্নাহ নামে প্রবেশ করবে। ঈমানের সাথে কোন আবস্থায় শিরকি কর্ম অনুমিত নয়। শিরকি কাজ হওয়া সাথে সাথে তওবা করে ইসলামে ফিরে আসতে হবে। নথুবা চিরস্থানী জাহান্নামে থাকতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

মুআবিয়াহ বিন হায়দাহ বিন মুআবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।

একজন মুসলিম দাবিদার মাজারে সিজদা করে, মাজারে মৃত অলির অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে, বিপদ আপদে তাকে আহবান করে। এই হলো ঈমানের দাবিদার মুশরিক। এই অবস্থায় তওবা ছাড়া মৃত্যু বরণ জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হবে।

২। মৃত্যু আসার পূর্বে দান না করে যাওয়া

আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলন-

وَاَنۡفِقُوۡا مِنۡ مَّا رَزَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ اَحَدَکُمُ الۡمَوۡتُ فَیَقُوۡلَ رَبِّ لَوۡلَاۤ اَخَّرۡتَنِیۡۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَاَکُنۡ مِّنَ الصّٰلِحِیۡنَ

আমি তোমাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তোমরা তা হতে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার পূর্বে; অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রাব্ব! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। সুরা মুনাফিকুন : ১০

৩। সময় সুযোগ থাকা সত্বেও নেক আমল না কে মৃত্যু বরণ করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَہُمۡ یَصۡطَرِخُوۡنَ فِیۡہَا ۚ  رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا نَعۡمَلۡ صَالِحًا غَیۡرَ الَّذِیۡ کُنَّا نَعۡمَلُ ؕ  اَوَلَمۡ نُعَمِّرۡکُمۡ مَّا یَتَذَکَّرُ فِیۡہِ مَنۡ تَذَکَّرَ وَجَآءَکُمُ النَّذِیۡرُ ؕ  فَذُوۡقُوۡا فَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ نَّصِیۡرٍ 

আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করে দিন, আমরা পূর্বে যে আমল করতাম, তার পরিবর্তে আমরা নেক আমল করব’। (আল্লাহ বলবেন) ‘আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি যে, তখন কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাজে তো সতর্ককারী এসেছিল। কাজেই তোমরা আযাব আস্বাদন কর, আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা ফাতির : ৩৭

৪। আত্নহত্যার করে মৃত্যুবরণ করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

হে মু’মিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পদ গ্রাস করনা; কেবলমাত্র পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা কর তা বৈধ এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করনা; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল। সুরা নিসা : ২৯

জুন্দাব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী ﷺ ইরশাদ করেন-

كَانَ بِرَجُلٍ جِرَاحٌ فَقَتَلَ نَفْسَهُ، فَقَالَ اللهُ: بَدَرَنِيْ عَبْدِيْ بِنَفْسِهِ، حَرَّمْتُ عَلَيْهِ الْـجَنَّةَ.

জনৈক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে সে তার ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বললেন: আমার বান্দাহ্ স্বীয় জান কবযের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করেছে অতএব আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম’’। সহিহ বুখারী : ১৩৬৪

সাবিত বিন জাহহক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী ﷺ ইরশাদ করেন-

مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ فِيْ الدُّنْيَا عَذَّبَهُ اللهُ بِهِ فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ.

যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন বস্ত্ত দিয়ে আত্মহত্যা করলো আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে সে বস্ত্ত দিয়েই শাস্তি দিবেন। সহিহ বুখারি : ১৩৬৩, ৬০৪৭, ৬১০৫, ৬৬৫২, সহিহ মুসলিম : ১১০

৫। নেশা করতে করতে মারা যাওয়া

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ لَمْ يَتُبْ مِنْهَا حُرِمَهَا فِي الآخِرَةِ.

যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করেছে অতঃপর তাত্থেকে তওবা করেনি, সে আখিরাতে তাত্থেকে বঞ্চিত থাকবে। সহিহ বুখারি : ৫৫৭৫, সহহি মুসলিম : ২০০৩, আহমাদ : ৪৬৯০

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لاَ يَزْنِيْ الزَّانِيْ حِيْنَ يَزْنِيْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلا يَشْرَبُ الْـخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ؛ وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيْهَا أَبْصَارَهُمْ حِيْنَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوْضَةٌ بَعْدُ

ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। লুটেরা যখন মানব জনসম্মুখে লুট করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়”। স হিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০; সহিহ মুসলিম : ৫৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৮৯, সুনানে  ইবন মাজাহ, :  ৪০০৭

৬। পিতা মাতার অসন্ত্বষ্ট থাকা অবস্থানয় মৃত্যুবরণ করা

সাথে খারাপ আচার-আচরণত অবস্থায় অথবা পিতা মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোনো সন্তানের মৃত্যু,

যে কোনো পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র ঈমানের প্রশ্ন ব্যতিত বাবা মায়ের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। এমনকি ঈমানের প্রশ্নেও বাবা মায়ের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। শুধুমাত্র তারা যদি শিরকের দিকে ডাকে তাহলে সে ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِنۡ جَاہَدٰکَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡہُمَا وَصَاحِبۡہُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا ۫ وَّاتَّبِعۡ سَبِیۡلَ مَنۡ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ

আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে। সুরা লোকমান : ১৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُوا إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلاَ تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا- وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا- رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِنْ تَكُونُوا صَالِحِينَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا-

‌আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন’। সুরা ইসরা : ২৩-২৫

৭। স্বামীকে নারাজ অবস্থায় রেখে স্ত্রীর মৃত্যুবরণ করা

আবূ বকর বিন আবূ শায়বাহ-মুহাম্মাদ বিন ফুযাইল, আবূ নাসর আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান-মুসাবির হিমইয়ারী মাতা বলেন, আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتْ الْجَنَّةَ

স্বামী খুশী থাকা অবস্থায় কোন স্ত্রীলোক মারা গেলে সে জান্নাতী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৪, সুনানে তিরমিজি : ১১৬১

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا

আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯,  ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩, সুনানে আবু দাউদ : ২১৪০, দারিমী :১৫০৪

৮। সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যুবরণ করা।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক সাহাবী একটি জানাযার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাঁরা তার প্রশংসা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওয়াজিব হয়ে গেল। একটু পরে অপর একটি জানাযা অতিক্রম করলেন। তখন তাঁরা তার নিন্দাসূচক মন্তব্য করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেলে। তখন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) আরয করলেন, (হে আল্লাহর রাসূল!) কি ওয়াজিব হয়ে গেল? তিনি বললেনঃ এ (প্রথম) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা উত্তম মন্তব্য করলে, তাই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল। আর এ (দ্বিতীয়) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাসূচক মন্তব্য করায় তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেল। তোমরা তো পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র সাক্ষী। সহিহ বুখারি : ১৩৬৭, ২৬৪২, সহিহ মুসলিম : ৯৪৯, আহমাদ : ১২৯৩৭

সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যুবরণ করার অর্থ হলো, তার আচার আচরণে মানুষ কষ্ট পেয়েছে। তার কারণে সমাজের মানুষ জুলুমের স্বীকার হয়েছেন। এই ধরণের মানুষ মারা গেলে সাথে সাথে সমাজের মানুষ হাব ছেড়ে বেঁচে যায়। উপরের সহিহ হাদিসটি দেখুন, যদি মানুষ তার ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে তার মৃত্যুর পর নিন্দা করলে তার জান্নাম অবধারিত। কাজেউ মরার আগেই মানুষকে ভালো ব্যবহার দ্বারা খুশি রাখতে হবে। সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যু বরণকারী জাহান্নামি।

মৃত্যুর প্রস্তুতি

মৃত্যুর প্রস্তুতি

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ؕ وَاِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ اُجُوۡرَکُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ فَمَنۡ زُحۡزِحَ عَنِ النَّارِ وَاُدۡخِلَ الۡجَنَّۃَ فَقَدۡ فَازَ ؕ وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। সুরা আল ইমরান : ১৮৫

প্রত্যেক মানুষের মৃত্যু অবধারিত এবং তার সময়ও নির্ধারিত। মৃত্যু আসবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং তার মৃত্যুর নির্ধরিত সয়ের এক সেকেন্ডও এদিক-সেদিক হবে না। কিন্তু বোকা মানুষ কখন তার মৃত্যু নিয়ে কল্পনা করে না,  সে সারাক্ষন ভবিষ্যত জীবনের সুখের আবাস গড়ার কল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দুনিয়ার আরাম-আয়েশের পেছনে ছুটে চলা মানুষগুলো দেখলে কারো মনে হবেনা যে এই পৃথিবী ছেড়ে তাকে একদিন চলে যেতে হবে। যদি কোন মানুষ তার আসল গন্তব্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করত তবে সে মৃত্যু চিন্তা ভুলে যেতে পারত না। কেননা, মৃত্যুর পরই তার দুনিয়ায় সকল কর্ম, প্রকাশিত হবে। কোনো কিছু আর গোপন থাকবে না। মানুষ মানুষকে ফাঁকি দিতে পারে, কিন্তু মহান রাব্বুল আলামিনকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। এই চিন্তাটুকু মাথায় থাকা জরুরি। একজন মানুষের জন্য মৃত্যুর সময় বড়ো কঠিন সময়। মৃত্যু কতোটা কঠিন কিংবা সহজ হবে সেটি নির্ভর করছে নিজ আমলের ওপর। উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহর পরিস্কার ঘোষণা, মৃত্যুর পর তার ভালো মন্দ কর্মের ফল সরূপ জান্নাত বা জান্নাহে প্রবেশ করাবেন। এই কথা মাথায় রেখে দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করার পাশাপাশি আমাদের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মৃত্যুর দিন ক্ষণ আমাদের নিকট অজানা। আমি এখন, এই মুহুর্তে, আজই মৃত্যু বরণ করেত পারি। কাজেই আজ এই মুহুর্ত থেকে আমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। হটাত মালাকুল মাউতের  আগমন ঘটবে। তখন আর প্রত্তুতি নেওয়া সময় থাকবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّـهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪

একবার মন্দ ফয়সালা প্রদানের পর আর ফিরে এসে ভালো কাজ করার সুযোগ প্রদান করা হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡا لَوۡ اَنَّ لَنَا کَرَّۃً فَنَتَبَرَّاَ مِنۡہُمۡ کَمَا تَبَرَّءُوۡا مِنَّا ؕ  کَذٰلِکَ یُرِیۡہِمُ اللّٰہُ اَعۡمَالَہُمۡ حَسَرٰتٍ عَلَیۡہِمۡ ؕ  وَمَا ہُمۡ بِخٰرِجِیۡنَ مِنَ النَّارِ 

আর যারা অনুসরণ করেছে, তারা বলবে, ‘যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন, তাদের জন্য আক্ষেপস্বরূপ। আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না। সুরা বাকারা : ১৬৭

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءَ أَحَدَهُمُ ٱلۡمَوۡتُ قَالَ رَبِّ ٱرۡجِعُونِ ٩٩ لَعَلِّيٓ أَعۡمَلُ صَٰلِحٗا فِيمَا تَرَكۡتُۚ كَلَّآۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَآئِلُهَاۖ وَمِن وَرَآئِهِم بَرۡزَخٌ إِلَىٰ يَوۡمِ يُبۡعَثُونَ

অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সূরা মুমিনূন : ৯৯-১০০

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَہُمُ الۡمَوۡتُ قَالَ رَبِّ ارۡجِعُوۡنِ ۙ

অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান। সুবা মুমিনুন : ৯৯

এই দুনিয়ার জীবনে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। নিজেকে সংশোধন করে নেওয়ার একটাই সুযোগ, দ্বিতীয় কোন সুযোগ নেই। সুতারং ঝুকি নেওয়ার কোন সুযোগই নাই। ফিরে আসারও সুযোগ থাকবে না। পরকালের সফলাতের জন্য মুমিনের দায়িত্ব অবশ্যই কর্তব্য হলো এই মুহুর্ত থেকে মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া। এই লক্ষে নিন্মের আমলগুলো করতে পারি।

১. ঈমানকে চুড়ান্তভাবে বিশুদ্ধ রাখার চেষ্টা করতে হবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করে থাকেন। সুরা হজ্জ : ৫৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَـٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ

যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনিম তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত।  সূরা আনআম : ৮২

উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ

যে ব্যক্তি (খাঁটি মনে) এ বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে যে, ’আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই’ সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৭, শুয়াল ঈমান : ৯৪

উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন মা’বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসূল, আল্লাহ (তাঁর অনুগ্রহে) তার ওপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। সহিহ মুসলিম : ২৯, সুনানে তিরমিযী : ২৬৩৮, আহমাদ : ২২৭১১, সহিহ ইবনু হিব্বান : ২০২, সহিহ আল জামি : ৬৩১৯

২. নেক আমল দিয়ে জীবনকে সাজানো

মুমিন বান্দা যে কাজে নিজের জীবন অতিবাহিত করবে, সে কাজের ওপরই তার মৃত্যু হবে। যদি কেউ কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন-যাপন করে তবে তার মৃত্যুও কোরআন-সুন্নাহর আলোকে হবে। এ কারণেই দুনিয়ার জীবনে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী নেক আমলে জীবন সাজানো জরুরি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا مِّنۡ ذَکَرٍ اَوۡ اُنۡثٰی وَہُوَ مُؤۡمِنٌ فَلَنُحۡیِیَنَّہٗ حَیٰوۃً طَیِّبَۃً ۚ وَلَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব। সুরা নহল : ৯৭

 আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ ‏”‏ ‏.‏ فَقِيلَ كَيْفَ يَسْتَعْمِلُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ الْمَوْتِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

আল্লাহ তা’আলা যদি তার কোন বান্দার কল্যাণ করার ইচ্ছা করেন তাহলে তাকে কাজ করার তাওফিক প্রদান করেন। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি কিভাবে তাকে কাজ করার তাওফিক দেন? তিনি বললেনঃ তিনি সেই বান্দাহকে মারা যাবার আগে সৎকাজের সুযোগ দান করেন। সুনানে তিরমিজি : ২১৪২, মিশকাত : ৫২৮৮

৩। প্রতিটি কাজ সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে করার চেষ্টা করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর”। সূরা আনফাল ৮: ১

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতমত আমল না করলে আমল ধ্বংস হয়ে যাবে। তার আমল কবুল করা হবে না। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبۡطِلُوٓاْ أَعۡمَـٰلَكُمۡ  

হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল ধ্বংস করো না৷ সুরা মুহম্মাদ : ৩৩

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ -এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ও’য়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- (সূরাহ আনাম-১৩৪)। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

৪। গুনাহ থেকে বেচে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা

গুনাহ পরিহারের মাধ্যমে মুমিন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের পাপ নিষিদ্ধ করেছেন।

قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ وَالۡاِثۡمَ وَالۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَاَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ سُلۡطٰنًا

বল,‘আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ- যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। সুরা আরাফ : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

اِنۡ تَجۡتَنِبُوۡا کَبَآئِرَ مَا تُنۡہَوۡنَ عَنۡہُ نُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَنُدۡخِلۡکُمۡ مُّدۡخَلًا کَرِیۡمًا

তোমরা যদি সে সব বড় গুনাহ পরিহার কর, যা থেকে তোমাদের বারণ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের ছোট গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাব সম্মানজনক প্রবেশস্থলে। সুনা নিসা : ৩১

৫। হারাম আয় ও কাজ ছেড়ে হালাল জীবন যাপনে দৃঢ় থাকা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِلّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ

হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর। সুরা বাকারা : ১৭২

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-

‏يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

“হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত। মু’মিনূন-৫১

তিনি আরো বলেন “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর। (বাকারাহ-১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। সুনানে তিরমিজি : ২৯৮৯

৬। সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাঃ

আমি তোমাদের যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো। মৃত্যু কখন আসে কেউ জানেনা। হায়াত থাকতেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে পরকালে এই সম্পদের জন্য আফছস করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُلۡهِكُمۡ أَمۡوَٲلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَـٰدُڪُمۡ عَن ذِڪۡرِ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡخَـٰسِرُونَ (٩) وَأَنفِقُواْ مِن مَّا رَزَقۡنَـٰكُم مِّن قَبۡلِ أَن يَأۡتِىَ أَحَدَكُمُ ٱلۡمَوۡتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوۡلَآ أَخَّرۡتَنِىٓ إِلَىٰٓ أَجَلٍ۬ قَرِيبٍ۬ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ ٱلصَّـٰلِحِينَ (١٠) وَلَن يُؤَخِّرَ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِذَا جَآءَ أَجَلُهَا‌ۚ وَٱللَّهُ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ (١١)

হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আর আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় কর, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে। কেননা তখন সে বলবে, হে আমার রব, যদি আপনি আমাকে আরো কিছু কাল পর্যন্ত অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি দান-সদাকা করতাম। আর সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। আর আল্লাহ কখনো কোন প্রাণকেই অবকাশ দেবেন না, যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা মুনাফিকুন : ৯-১১

৭। দুনিয়াতে আগুন্তক বা পফিকের মত জীবন যাপন করাঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমার দু’ কাঁধ ধরে বললেন,  তুমি দুনিয়াতে থাক যেন তুমি একজন প্রবাসী অথবা পথচারী।

আর ইবনু উমার (রাঃ) বলতেন, তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকালের আর অপেক্ষা করো না এবং সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যার আর অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার পীড়িত অবস্থার জন্য প্রস্তুতি লও। আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি লও। সহিহ বুখারি : ৬৪১৬, সুনানে তিরমিজি : ২৩৩৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১১৪

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং এর মধ্যখানে একটি রেখা টানলেন, যা তাত্থেকে বের হয়ে গেল। তারপর দু’পাশ দিয়ে মধ্যের রেখার সঙ্গে ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট রেখা মিলালেন এবং বললেন, এ মাঝের রেখাটা হলো মানুষ। আর এ চতুর্ভুজটি হলো তার আয়ু, যা বেষ্টন করে আছে। আর বাইরে বেরিয়ে যাওয়া রেখাটি হলো তার আশা। আর এ ছোট ছোট রেখাগুলো বাধা-বন্ধন। যদি সে এর একটা এড়িয়ে যায়, তবে আরেকটা তাকে দংশন করে। আর আরেকটি যদি এড়িয়ে যায় তবে আরেকটি তাকে দংশন করে। সহিহ বুখারি : ৬৪১৭, সুনানে তিরমিজি : ২৪৫৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৩১

৮। গুনাহ পরিত্যাগ করে তওবা করতে থাকা

মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তির তওবা কবুল হবে না যে মন্দ কাজ করতেই থাকে এবং মৃত্যুর প্রাক্কালে তওবা করে।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَیۡسَتِ التَّوۡبَۃُ لِلَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ السَّیِّاٰتِ ۚ حَتّٰۤی اِذَا حَضَرَ اَحَدَہُمُ الۡمَوۡتُ قَالَ اِنِّیۡ تُبۡتُ الۡـٰٔنَ وَلَا الَّذِیۡنَ یَمُوۡتُوۡنَ وَہُمۡ کُفَّارٌ ؕ اُولٰٓئِکَ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا

আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবা করলাম, আর তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমি এদের জন্যই তৈরী করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা নিসা : ১৮

ইহা ছাড়া তওবার দরজান সব সময়ের জন্য খোলা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُوْلَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ

নিশ্চয় তাওবা কবূল করা আল্লাহর জিম্মায় তাদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে। তারপর শীঘ্রই তাওবা করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবা কবুল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।সূরা নিসাঃ ১৭

কিন্তু গুনাহ ত্যাগ করে তওবা করলে, তার তওবা করার সুযোগ থাকবে মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত। সহিহ হাদিসে এসেছে-

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ ‏”‏ ‏.‏

রূহ কণ্ঠাগত না হওয়া (মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত) পর্যন্ত মহামহিম আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন। ইবনে মাজাহ : ৪২৩৫, সুনানে তিরমিযী ৩৫৩৭, মিশকাত : ২৩৪৩।

৯। বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ ‏”‏ ‏.‏ يَعْنِي الْمَوْتَ

তোমরা অধিক পরিমাণে জীবনের স্বাদ হরণকারী অর্থাৎ মৃত্যুকে স্মরণ করো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫৮, সুনানে তিরমিযী : ২৩০৭, সুনানে নাসায়ী : ১৮২৪, আহমাদ : ৭৮৬৫, মিশকাত : ১৬১০

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম। এমতাবস্থায় এক আনসারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে তাকে সালাম দিলো। অতঃপর বললো, হে আল্লাহর রাসূল! মুমিনদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম কে? তিনি বলেন, স্বভাব-চরিত্রে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক উত্তম। সে পুনরায় জিজ্ঞেস কররো, মুমিনদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান কে? তিনি বলেনঃ তাদের মধ্যে যারা মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য উত্তমরূপে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তারাই সর্বাধিক বুদ্ধিমান। সুনানেইবনে মাজাহ : ৪২৫৯, সহিহাহ : ১৩৮৪

১০। অসিয়ত লিখে রাখা

মৃত্যুর আগে নিজের সম্পদের সুষম বণ্টনের অসিয়ত লিখে রেখে যাওয়া জরুরি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

کُتِبَ عَلَیۡکُمۡ اِذَا حَضَرَ اَحَدَکُمُ الۡمَوۡتُ اِنۡ تَرَکَ خَیۡرَۨا ۚۖ  الۡوَصِیَّۃُ لِلۡوَالِدَیۡنِ وَالۡاَقۡرَبِیۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ  حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ ؕ

তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে যে, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হবে, যদি সে কোন সম্পদ রেখে যায়, তবে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়ভিত্তিক অসিয়ত করবে। এটি মুত্তাকীদের দায়িত্ব। সুরা বাকারা : ১৮০

১১। প্রতি দিন ঘুমানোর সময় সারা দিনের হিসাব গ্রহন করা

প্রতি দিন ঘুম থেকে মনে মনে ভাবতে হবে, পৃথিবিতে আজ আমার শেষ দিন। তাই যতটা সম্ভব ভালো কাজের মাধ্যমে আল্লাহকে খুশি করে যেতে পারি। একই সাথে রাতে ঘুমানোর সময় সারা দিনের হিসাব গ্রহন করতে হবে। আজ সারা দিনে কী কী কাজ করার কথা ছিল, আর কী কী করলাম? কী কী গুনাহে জড়ালাম আর কী কী ভালো কাজ করলাম? কাকে কাকে কষ্ট দিলাম বা কাকে ইকরাম করলাম। এ সবগুলোর হিসাব নেয়া চাই। এই সময়ে গুনাহের জন্য তওবা করি আর যদি কারো হক নষ্ট করে থাকি, তবে আগামিকাল তার হক পূরণ করা নিয়ত করি। সেই সাথে ঘুমানোর আগে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, অন্তর থেকে সমস্ত মুমিনকে মাফ করে দেওয়া। আমার মৃত্যু তো আজ রাতেও হয়ে যেতে পারে। তাই আমার মৃত্যু যেন এ অবস্থায় না হয় যে, একজন মুমিন বান্দার সাথে আমার মনোমালিন্য ছিল।

১২। হেদায়েত পাওয়ার পর যেন গোমড়া না হয়ে যাই তার জন্য দোয়া করাঃ

ঈমানের উপর অটল থাকতে নির্জনে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। যাতে দুনিয়ার জীবনের সার্বিক কল্যাণ ও পরকালের অন্তিম মুহূর্তে ঈমান ও প্রশান্তির মৃত্যু নসিব হয়। তাই চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوۡبَنَا بَعۡدَ اِذۡ ہَدَیۡتَنَا وَہَبۡ لَنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ رَحۡمَۃً ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡوَہَّابُ

হে আমাদের রব, আপনি হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা। সুরা আল ইমরান : ৮

১৩। সদগায়ে জারিয়ার আমল করা

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ

যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া। (১) সাদাকা জারিয়াহ্ অথবা (২) এমন ইলম যার দ্বারা উপকার হয় অথবা (৩) পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্যে দু’আ করতে থাকে।  সহিহ মুসলিম : ১৬৩১, সুনানে তিরমিযী : ১৩৭৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৬৫১, সুনানে আবূ : দাঊদ ২৮৮০, আহমাদ : ৮৬২৭, দারিমী : ৫৫৯।

এ হিসেবে নিন্মের কাজগুলি করে মৃত্যু বরণ করেত পারলে কবরেও সওয়াব পৌছাতে থাকবে। ইনশাললাহ।

দ্বীনি ইলম চর্চার ব্যবস্থা করা, সন্তানকে নেককার করে তোলা। মসজিদ, মাদ্রাসা, ইয়াতিম খানা, মুসাফির খানা ইত্যাদি তৈরি করা। কুপ, টিউব ওয়েল, পুল, রাস্তা ঘাট ইত্যাদি নির্মাণ করা। বেশী বেশী ফলের গাছ লাগানো। আথাত এমন কাজ করে যাওয়া চেষ্টা করা যার মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মানুষ সুফল ভোগ করবে।

একটি সতর্কতাঃ

মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিবে কিন্তু মৃত্যু কামনা করা যাবে নাঃ

আনাস ইবনু মলিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

اَ يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمْ الْمَوْتَ مِنْ ضُرٍّ أَصَابَه“ فَإِنْ كَانَ لاَ بُدَّ فَاعِلاً فَلْيَقُلْ اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتْ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتْ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي.

তোমাদের কেউ দুঃখ দৈন্যে নিপতিত হওয়ার কারণে যেন মৃত্যু কামনা না করে। যদি এমন একটা কিছু করতেই হয়, তা হলে সে যেন বলে হে আল্লাহ! আমাকে জীবিত রাখ, যতদিন পর্যন্ত আমার জন্য জীবিত থাকা কল্যাণকর হয় এবং আমাকে মৃত্যু দাও, যখন আমার জন্য মৃত্যু কল্যাণকর হয়। সহিহ বুখারি : ৫৬৭১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। সহিহ বুখারি : ৫৬৭৩

সুদের বিধান :

লেখক :মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সুদের বিধান :

ইসলামি শরীয়তে সুদ বা রিবা (اَلرِّبَا) এর বিধান

সুদ বা রিবা (اَلرِّبَا) ইসলামী অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুদ একটি হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়। কুরআনে সুদ বা রিবা সম্পর্কে কয়েকটি স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَاَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা শাইতানের স্পর্শে মোহাভিভূত ব্যক্তির অনুরূপ কিয়ামাত দিবসে দন্ডায়মান হবে; এর কারণ এই যে, তারা বলে, ব্যবসা সুদের অনুরূপ বৈ তো নয়; অথচ আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন; অতঃপর যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ সমাগত হয়, ফলে সে নিবৃত্ত হয়; সুতরাং যা অতীত হয়েছে তার কৃতকর্ম আল্লাহর উপর নির্ভর; এবং যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানেই চিরকাল অবস্থান করবে। সুরা বাকারা : ২৭৫

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یَمۡحَقُ اللّٰہُ الرِّبٰوا وَیُرۡبِی الصَّدَقٰتِ ؕ وَاللّٰہُ لَا یُحِبُّ کُلَّ کَفَّارٍ اَثِیۡمٍ

আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদাকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অতি কুফরকারী পাপীকে ভালবাসেন না। সুরা বাকারা : ২৭৬

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَمَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ رِّبًا لِّیَرۡبُوَا۠ فِیۡۤ اَمۡوَالِ النَّاسِ فَلَا یَرۡبُوۡا عِنۡدَ اللّٰہِ ۚ وَمَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ زَکٰوۃٍ تُرِیۡدُوۡنَ وَجۡہَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُضۡعِفُوۡنَ

আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত। সূরা রূম : ৩৯

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ ‏.‏

রসূলুল্লাহ ﷺ লা’নাত করেছেন সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দু’জনের উপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান। সহিহ মুসলিম : ১৫৯৮

কুরআন ও সহিহ হাদিসে সুদ বা রিবা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এটি নৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। কুরআন ও সুন্নাহ সুদ গ্রহণ ও প্রদানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং এর পরিবর্তে একটি ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে। ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

সুর হারমা হওয়ার হিকমত :

মুমিন মাত্রেই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কিছুর নির্দেশ দেন না বা এমন কিছু থেকে বারণ করেন না যাতে কোনো না কোনো হিকমত বা নিগূঢ় রহস্য লুকায়িত থাকে নেই। আমরা যদি সে রহস্য জানতে পারি তাহলে তা আমাদের জন্য অতিরিক্ত অর্জন। যদি না জানি তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের কাম্য ও কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহ ও রাসূল ﷺ যা করতে বলেন তা সম্পাদন করা আর যা বারণ করেন তা থেকে বিরত থাকা। সুদ হারাম হওয়ার পেছনে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিকমত বা জ্ঞানগর্ভ উদ্দেশ্য রয়েছে। ইসলাম মানবসমাজের কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে। রিবা এই নীতিগুলোর পরিপন্থী বলে এটিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। নিচে রিবা হারাম হওয়ার কিছু হিকমত তুলে ধরা হলো:

১. অর্থনৈতিক শোষণ রোধ

সুদের মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তি দরিদ্রদের বা আর্থিকভাবে দুর্বলদের ওপর শোষণ চালাতে পারে। ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে সুদদাতা অধিক মুনাফা অর্জন করেন, যা সমাজে আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। ইসলাম এই ধরনের শোষণমূলক প্রথাকে নিষিদ্ধ করেছে।

২. সম্পদ বণ্টনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

সুদের মাধ্যমে সম্পদ কেবল ধনী ব্যক্তিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এটি ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব করে তোলে। ইসলামে এই বৈষম্য দূর করার জন্য সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাকাত এবং সাদাকার মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে।

৩. পরিশ্রমের ভিত্তিতে আয়ের নীতিকে সমর্থন

ইসলামic অর্থনীতি পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং ন্যায্য ব্যবসার ভিত্তিতে আয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। সুদ একটি প্যাসিভ উপার্জনের পদ্ধতি, যেখানে কোনো শ্রম বা ঝুঁকি গ্রহণ না করেই অর্থ উপার্জন করা হয়। এটি নৈতিকভাবে ইসলামিক অর্থনীতির মূলনীতির পরিপন্থী।

৪. সামাজিক সংহতি বজায় রাখা

সুদভিত্তিক লেনদেন সমাজে শ্রেণীসংঘাত সৃষ্টি করে। এটি ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে বৈরিতা এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। সুদমুক্ত অর্থনীতি এই ধরনের বিভাজন দূর করে সামাজিক সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে উৎসাহিত করে।

৫. আর্থিক সংকট ও অস্থিরতা রোধ

সুদভিত্তিক অর্থনীতি অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। উচ্চ সুদের কারণে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে, যা দেউলিয়াত্ব, সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ইসলামে সুদের পরিবর্তে অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ ব্যবস্থা (যেমন মুদারাবা বা মুশারাকা) চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা ঝুঁকি এবং লাভ-ক্ষতি উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

৬. মানবিক দৃষ্টিকোণ রক্ষা

সুদ অর্থনীতিতে ঋণগ্রহীতার প্রয়োজন এবং দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়। এটি মানবিক সহমর্মিতার অভাবকে প্রকাশ করে। ইসলাম চায় মানুষ একজন আরেকজনের প্রতি সহানুভূতিশীল হোক এবং দান বা বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে একে অপরকে সাহায্য করুক।

৭. আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য

সর্বোপরি, রিবা হারাম হওয়ার কারণ হলো, এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন। আল্লাহ কুরআনে রিবাকে হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল বলে ঘোষণা করেছেন:

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিনে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে সেই ব্যক্তি দন্ডায়মান হয়, যাকে শয়তান স্পর্শ করে উন্মাদ করে দিয়েছে। কারণ তারা বলে, ‘ব্যবসা তো সুদের মতোই।’ অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”

(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

রিবা হারাম হওয়ার মূল কারণ হলো, এটি সমাজে শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে পরিশ্রম এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে অর্থ উপার্জন করে এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখে।

হাদিসের আলোক সুদ :

সুদ হলো অতিরিক্ত অর্থ যা একটি ঋণের বিনিময়ে নির্দিষ্ট শর্তে ধারক বা ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে পরিশোধ করে। অন্যভাবে বলতে গেলে সুদ হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ধার নেওয়ার পর, ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধের সময় মূল পরিমাণ অর্থের সাথে অতিরিক্ত একটি পরিমাণ অর্থ (সুদ) প্রদান করে। এটি সাধারণত নির্দিষ্ট একটি সুদের হারে হিসাব করা হয়, যা ঋণ দেওয়ার সময়েই নির্ধারিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদকে হারাম করা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তে প্রধান তিন পন্থায় দেনদেন বা ক্রয় বিক্রয় করলে সুন হয়। যাথা : –

১. রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) বা উৎকর্ষের সুদ

২. রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ) সময়কালীন সুদ

৩. রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্ম বাণিজ্যের সুদ

প্রতিটির ক্ষেত্রে সুদের ধারণা ও প্রক্রিয়া ভিন্ন হলেও এগুলো হারাম বলে শরীয়তে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিচে প্রতিটি প্রকার বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১. রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) বা উৎকর্ষের সুদ

রিবা-ই-ফযল এমন সুদ যা একই ধরনের পণ্য বিনিময়ে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্রহণ করার মাধ্যমে হয়। যখন একই ধরনের পণ্য (যেমন সোনা, রুপা, গম, খেজুর ইত্যাদি) বিনিময় করা হয় এবং এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে, তখন এটি রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) হিসেবে গণ্য হয়।

রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) সম্পর্কিত কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হলো। এগুলোতে রিবা-ই-ফযল

+বা উৎকর্ষের সুদের নিষেধাজ্ঞা এবং তার বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, রিবা-ই-ফযল (বিনিময়জনিত সুদ) নির্দিষ্ট ছয় প্রকার বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই ছয়টি বস্তু হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এগুলো হলো-

সোনা (ذَهَبٌ), রূপা (فِضَّةٌ), গম (بُرٌّ), জব বা যব (شَعِيرٌ), খেজুর (تَمْرٌ) ও লবণ (مِلْحٌ)

(১) সোনা, রুপা, গম, খেজুর, জব ও লবন নগদ ছাড়া বিনিময় বিক্রি বৈধ নয়

উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ سَوَاءً بِسَوَاءٍ يَدًا بِيَدٍ فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الأَصْنَافُ فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ ‏”‏ ‏.‏

স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান পরিমাণ ও হাতে হাতে (নগদ) হবে। অবশ্য এ দ্রব্যগুলো যদি একটি অপরটির ব্যতিক্রম হয় তোমরা যেরূপ ইচ্ছা বিক্রি করতে পার যদি হাতে হাতে (নগদে) হয়। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৭

আবূ সাঈদ (রাযিঃ) আপন অঙ্গুলি দ্বারা তার দু’চোখ ও দু’কানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আমার চক্ষুদ্বয় দেখেছে ও কর্ণদ্বয় শুনেছে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ وَلاَ تَبِيعُوا الْوَرِقَ بِالْوَرِقِ إِلاَّ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَلاَ تُشِفُّوا بَعْضَهُ عَلَى بَعْضٍ وَلاَ تَبِيعُوا شَيْئًا غَائِبًا مِنْهُ بِنَاجِزٍ إِلاَّ يَدًا بِيَدٍ ‏

তোমরা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না এবং রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না, সমান সমান পরিমাণ ব্যতীত। আর তোমরা সেটার এক অংশকে অন্য অংশ অপেক্ষা বেশী করো না এবং হাতে হাতে ব্যতীত নগদের বিনিময়ে বাকীতে বিক্রি করো না। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৪

মালিক ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একশ দ্বীনারের বিনিময় সারফ এর জন্য লোক সন্ধান করছিলেন। তখন তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা বিনিময় দ্রব্যের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করতে থাকলাম। অবশেষে তিনি আমার সঙ্গে সারফ করতে রাজী হলেন এবং আমার হতে স্বর্ণ নিয়ে তার হাতে নাড়া-চাড়া করতে করতে বললেন, আমার খাযাঞ্চী গাবা (নামক স্থান) হতে আসা পর্যন্ত (আমার জিনিস পেতে) দেরী করতে হবে। ঐ সময়ে উমার (রাঃ) আমাদের কথা-বার্তা শুনছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম! তার জিনিস গ্রহণ না করা পর্যন্ত তুমি তার হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, নগদ নগদ না হলে স্বর্ণের বদলে স্বর্ণের বিক্রয় (সুদ) হবে। নগদ নগদ ছাড়া গমের বদলে গমের বিক্রয় সুদ হবে। নগদ নগদ ছাড়া যবের বদলে যবের বিক্রয় রিবা হবে। নগদ নগদ না হলে খেজুরের বদলে খেজুরের বিক্রয় সুদ হবে। সহিহ বুখারি : ২১৭৪

উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের সাথে যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ আদান-প্রদান না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। গমের বিনিময়ে গমের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে (সমান) আদান-প্রদান না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। খেজুরের বিনিময় খেজুরের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ লেনদেন (সম-পরিমাণ) না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। যবের বিনিময়ে যবের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ লেনদেন (সম-পরিমাণ) না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৩৪৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৫৩

(২) নগদ ছাড়া খেজুরের পরিবর্তে খেজুর বিক্রয় করা সুদ ;

উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলে-

الْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ

হাতে হাতে (নগদ নগদ) ছাড়া গমের বদলে গম বিক্রি করা সুদ, নগদ নগদ ছাড়া যবের বদলে যব বিক্রয় সুদ, নগদ নগদ ব্যতীত খেজুরের বিনিময়ে খেজুর বিক্রয় সুদ। সহিহ বুখারি : ২১৭০

(৩) শুকনো আঙ্গুরের পরিবর্তে শুকনো আঙ্গুর এবং খাদ্য দ্রব্যের পরিবর্তে খাদ্য দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়।

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ الْمُزَابَنَةِ وَالْمُزَابَنَةُ بَيْعُ الثَّمَرِ بِالتَّمْرِ كَيْلاً وَبَيْعُ الزَّبِيبِ بِالْكَرْمِ كَيْلاً

আল্লাহর রাসূল ﷺ মুযাবানা নিষেধ করেছেন। তিনি (রা.) বলেন, মুযাবানা হলো তাজা খেজুর শুকনো খেজুরের বদলে ওজন করে বিক্রি করা এবং কিসমিস তাজা আঙ্গুরের বদলে ওজন করে বিক্রি করা। সহিহ বুখারি : ২১৭০, ২১৭২, ২১৭৫, ২২০৫, সহিহ মুসলিম : ১৫৪২

(৩) মুহাকালা, মুখাদারা, মুখাবারা ও মুযাবানার বিক্রি নিষেধ

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَهَى عَنْ الْمُزَابَنَةِ وَالْمُحَاقَلَةِ وَالْمُزَابَنَةُ اشْتِرَاءُ الثَّمَرِ بِالتَّمْرِ فِي رُءُوسِ النَّخْلِ

আল্লাহর রাসূল ﷺ মুযাবানা ও মুহাকালা বারণ করেছেন। মুযাবানার অর্থ- শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের মাথায় অবস্থিত তাজা খেজুর ক্রয় করা। সহিহ বুখারি : ২১৮৬, সহিহ মুসলিম : ১৫৪৬,

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

 نَهَى رَسُولُ اللهِ  ﷺ عَنْ الْمُحَاقَلَةِ وَالْمُخَاضَرَةِ وَالْمُلاَمَسَةِ وَالْمُنَابَذَةِ وَالْمُزَابَنَةِ

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাকালা, মুখাদার, মুলামাসা, মুনাবাযা ও মুযাবানা নিষিদ্ধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ২২০৭

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাকালা, মুযাবানা, মুখাবারা এবং খেজুর লাল বা মেটে লাল অথবা খাদ্যোপযোগী হওয়ার পূর্বে খরিদ করতে নিষেধ করেছেন। মুহাকালা হল ক্ষেতের শস্য নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা। মুযাবান হচ্ছে- গাছের খেজুর কয়েক ওসক খুরমার বিনিময়ে বিক্রি করা। মুখাবারা বলা হয়- এক তৃতীয়াংশ, এক চতূর্থাংশ বা এইরূপ নির্দিষ্ট কোন অংশকে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৬৭ ইফা.

মুহাকালা অর্থ- ওজন বা মাপকৃত ফজলের বদলে শীষে থাকাবস্থায় ফসল বিক্রি করা।

মুখাদারা অর্থ- কাঁচা ফল শস্য বিক্রি করা।

মুযাবানা অর্থ- শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের মাথায় অবস্থিত তাজা খেজুর ক্রয় করা।

মুখাবারা অর্থ –  এক তৃতীয়াংশ, এক চতূর্থাংশ বা এইরূপ নির্দিষ্ট কোন অংশ।

দ্রব্যে বিনিময়ে বেশী নিলে সুদ হবে-

খেজুর, লবন ও গমের বিনিময়ে বাকিতে করলে সুদ হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

التَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْحِنْطَةُ بِالْحِنْطَةِ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ يَدًا بِيَدٍ فَمَنْ زَادَ أَوِ اسْتَزَادَ فَقَدْ أَرْبَى إِلاَّ مَا اخْتَلَفَتْ أَلْوَانُهُ ‏

খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব ও লবণের বিনিময়ে লবণ সম পরিমাণ ও হাতে হাতে হতে হবে। কেউ যদি বেশী দেয় বা বেশী নেয় তবে সুদ হবে। তবে যদি এর শ্রেণী পরিবর্তন হয়। (তবে কম-বেশী জায়িয হবে)। “যে পণ্য একই ধরনের, তা বিনিময় করতে হলে সমান পরিমাণে এবং হাতেহাতে হওয়া আবশ্যক। যদি তা সময়ক্ষেপণ করা হয়, তবে তা রিবা। সহিহ মুসলিম: ১৫৮৮, সুনানে নাসায়ি : ৪৫৫৪

আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন বিলাল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ’বার্‌নী’ জাতীয় খুরমা নিয়ে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই জাতীয় খুরমা কোথায় পেলে? বিলাল বললেন, আমার কাছে কিছু খারাপ খুরমা ছিল। আমি এগুলোর দু’ সা’ এ জাতীয় এক সা’ খুরমার বিনিময়ে বিক্রি করেছি। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আহ! এটাই তো ’সুদী’ লেনদেন। এটাইতো প্রকৃত সুদ। এরূপ করবে না, বরং তুমি এ খারাপ খুরমা পরিমাণে বেশি দিয়ে ভালো খুরমা পরিমাণে কম কিনতে চাইলে পৃথকভাবে মুদ্রার বিনিময়ে খারাপ খুরমা বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে ভালো খুরমা ক্রয় করবে। সহিহ বুখারি : ২২১২, সহিহ মুসলিম ১৫৯৪, নাসায়ী ৪৫৫৭, মিশকাত : ২৮১৪ আহমাদ ১১৫৯৫।

উপরে বর্ণিত হাদিসগুলোতে رِبَا الْفَضْلِ (রিবা-ই-ফযল) বা উৎকর্ষের সুদ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলাম সুদকে সমাজের শোষণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে দেখে। তাই রিবা-ই-ফযল থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

২. রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ) সময়কালীন সুদ :

ঋণের নির্ধারিত সময় সীমা বৃদ্ধি করার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা গ্রহণের মাধ্যমে যে সুদ হয় তাকে রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ)। যখন কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ দেয় এবং বিনিময়ে অতিরিক্ত মুনাফা বা সুবিধা আদায় করে তখন তাকে রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ)  বলা হয়। এটি সুদের সর্বাধিক প্রচলিত প্রকার। রিবা-ই-নাসিয়া কে সময়কালীন সুদও বলা হয়।

আমাদের সমাজে সুধ বলতে মুলত এই সুদকে বুঝান হয়। পুর্বের যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই সুদই মুলত ব্যাপক প্রচলিত। আমাদের বর্তমান বিশ্বে যতগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, বীমা) আছে সবাই এই সুদের সাথে জড়িত। এই সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণ অর্থ লগ্নী করে বা টাকা ঋন দিয়ে উক্ত অর্থ পরিশোধের সময় নির্ধারণ করে দেয় এবং পরিনামে ঋন গ্রীহিতার নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা। ইসলমি শরীয়তে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাকে রিবা-ই- নাসিয়া বলা হয়। ঋণের সময় সীমা বৃদ্ধির বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ আদা|য় ইসলামি  শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রিবা-ই-নাসিয়া সম্পর্কিত কুরআন ও হাদিস থেকে উল্লেখ করা হলো-

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوا الرِّبٰۤوا اَضۡعَافًا مُّضٰعَفَۃً ۪  وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ۚ

হে মুমিনগণ, তোমরা সুদ খাবে না বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। সুরা আল ইমরান : ১৩০

উসামা ইবনে যায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا ثُمَّ اشْتَرَطَ عَلَيْهِ زِيَادَةً فَهُوَ الرِّبَا”

কোনো ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করতে দেরি করলে এবং সে শর্ত দেয় যে তাকে অতিরিক্ত কিছু দিতে হবে, তবে তা রিবা। মুস্তাদরাক আল-হাকিম : ২১৯২

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-

“الرِّبَا رِبَاءَانِ، فَرِبًا لَا يَحِلُّ، وَرِبًا يُتَّقَى، فَأَمَّا الرِّبَا الَّذِي لَا يَحِلُّ فَالرِّبَا فِي النَّسِيئَةِ.”

সুদ দুই প্রকার। এর মধ্যে সময় বৃদ্ধির শর্তে যে বাড়তি নেওয়া হয়, সেটি সর্বাধিক নিষিদ্ধ। সুনানে দারকুতনি : ২৯৫৫

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) তাফসির উল্লেখ করেন-

إِنَّمَا كَانَ رِبَا الْجَاهِلِيَّةِ أَنْ يَكُونَ لِلرَّجُلِ عَلَى الرَّجُلِ الْحَقُّ إِلَى أَجَلٍ، فَإِذَا حَلَّ الْأَجَلُ قَالَ: أَتَقْضِي أَمْ تُرْبِي؟

“জাহেলি যুগে সুদের রূপ ছিল এই যে, কোনো ব্যক্তির কাছে অন্য ব্যক্তির নির্দিষ্ট একটি ঋণ থাকত নির্ধারিত সময় পর্যন্ত। যখন সেই সময় শেষ হতো, তখন ঋণদাতা বলত: ‘তুমি কি পরিশোধ করবে, নাকি সুদ (অতিরিক্ত) দেবে?

 মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ২০৬৭২, তাফসির ইবনে কাসির: সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১৩০ এর তাফসিরে।

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ ‏.‏

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দু’জনের উপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান। সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮, সুনান আত-তিরমিজি : ১২০৬, সুনান আবু দাউদ : ৩৩৩৩

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ ‏

নগদ আদান-প্রদান না হলে সোনার বিনিময়ে স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণ সুদের অন্তর্ভুক্ত। গমের পরিবর্তে গম নগদ বিনিময় না হলে সূদ হবে। বার্লির সাথে বার্লির নগদ বিনিময় না হলে সুদ হবে। খেজুরের সাথে খেজুরের বিনিময় নগদ না হলে সুদ হবে।

ইবনু মাজাহ : ২২৫৩, ২২৫৯, ২২৬০, সহীহুল বুখারী ২১৩৪, ২১৭০, ২১৭৪, মুসলিম ১৫৮৬, তিরমিযী ১২৪৩, নাসায়ী ৪৫৫৮, আবূ দাউদ ৩৩৪৮, আহমাদ ১৬৩, ২৪০, ৩১৬, মুয়াত্তা মালেক ১৩২৮, ১৩৩৩, দারেমী ২৫৭৮, ইরওয়া ১৩৪৭, রাওদুন নাদীর ৭২৯।

৩. রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্মবাণিজ্যের সুদ

রিবা-ই-বাইয়ে ইনা এমন একটি সুদ যেখানে বাণিজ্যের আড়ালে শর্ত সাপেক্ষে একটি পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা হয় এবং পরে কম দামে ফিরে কেনা হয়। যখন দুটি পক্ষ বাণিজ্যের ছদ্মবেশে সুদ আদান-প্রদান করে। একজন অন্যজনকে একটি পণ্য বিক্রি করে এবং পরে তা বেশি মূল্যে ক্রয় করে, তখন এটি রিবা-ই-বাইয়ে ইনা। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ধারে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-১

জাহিদ, তারিককের নিটক ১০,০০০ টাকায় একটি মোবাইল ফোন বিক্রি করল এই শর্ত যে তুমি আমাকের এক বছর পর এই ১০,০০০ টাকার পরিশেধ করবে। আর্থাত মোবাইলটি বাকিতে বিক্রি করল। কিন্তু পরে জাহিদ আর তারিকের নিকট হতে সেই একই মোবাইল ৮০০০ টাকায় ক্রয় করে নিল। জাহিদের মোবাইল জাহিদের নিকটই রইল। অপর পক্ষে তারিক ৮০০০ টাকা পেলে। এই ৮০০০ টাকা তারিক জাকিদকে এক বছর পর দিবে। কিন্তু তাকে ৮০০০ টাকা নয় তাকে ১০০০০ টাকা ফেরত দিতে হবে। তারিককে অতিরিক্ত ২০০০ টাকা সুদ দিতে হবে।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-২

এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-৩

জহির রায়হানের নিকটি একটি মেশিন বিক্রি করল ৫ লাখ টাকায়, যা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। মেশিনটি আবার জহিরের নিকট রায়হান তাৎক্ষণিকভাবে ৪ লাখ টাকায় নগদ বিক্রি করে দিল। যার ফলে বায়হান এখন ৪ লাখ টাকা নগদ পেল এবং ছয় মাস পর ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করবে। আসল উদ্দেশ্য ছিল ১ লাখ টাকা সুদ আদান-প্রদান।

দুই ব্যবসায়ীর মাঝে তৃতীয় ব্যক্তির মধ্যস্থতাঃ-

এ ব্যবসা এই রূপ যে, ঋণদাতা ও গ্রহীতা নির্দিষ্ট টাকার আদান প্রদানে নিজের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু সুদ থেকে বাচতে তারা চতুরতার আশ্রয় নেয়। অতঃপর উভয়ে বাজারে কোন দোকানদারের নিকট এসে চুক্তি পরিমাণ টাকার পণ্য ঋণ দাতা খরীদ করে নেয়। অতঃপর সে ঋণ গ্রহীতার নিকট উক্ত পণ্য ধারে বিক্রয় করে। পুনরায় ঋণ গ্রহীতা এ পণ্য ঘুরে দোকানদারকে কম দরে বিক্রয় করে। এইভাবে দোকানদার এই সূদী কারবারে মধ্যস্থতা করে। টাকা পরিশোধের সময় বেশী পায় ঋণ দাতা। মাঝখান থেকে মধ্যস্থতার নামে লাভ হয় দোকানদারেরও। আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘এ কারবার সূদী কারবারের পর্যায়ভুক্ত। ফতোয়া ইবনে তাইমিয়াহ ২৯/৪৪১, শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন, ‘এ কারবার নিঃসন্দেহে হারাম। আল- মুদায়ানাহ, পৃ-৮

উদারহণ-

জাহিদ রফিককে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিবে বলে চুক্তিবদ্ধ হয়। সরাসরি টাকা না দিয়ে জাহিদ মটর সো রুমে গিয়ে ৫০ হাজার টাকায় একটি বাইক ক্রয় করে। এই বাইকটি জাহিদ রফিকের নিকট ধারে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। বাইকের মালিক এখন রফিক। এবার রফিক উক্ত বাইকটি পুরনায সো রুমের মালিকের নিকট ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। এইভাবে দোকানদার এই সূদী কারবারে মধ্যস্থতা করে লাভবান হয়।

এই দুটি উদারহর দ্বারা মনে হয় রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্মবাণিজ্যের সম্পর্কে বুঝতে পেরেছেন। এই সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস উল্লেখ করছি।

মহান আল্লাহ বলেন-

 ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا

আল্লাহ ব্যসাকে (الۡبَیۡعَ) হালাল করেছেন এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

মহান আল্লাহ ক্রয় বিক্রয় বা ব্যবসা হালাল করেছে। এই কারনে সরাসরি টাকা ঋন না দিয়ে, ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে প্রতারণার করে ছদ্ম বানিজ্যের আশ্রয় নেয়। কিন্তু মহান আল্লাহ সুক্ষদর্শী তিনি এই সকল বানিজ্যকে হারাম করেছন।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনা সম্পর্কিত কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো-

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلًّا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ

যখন তোমরা ঈনা (ছদ্মবাণিজ্য) পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দিবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদেরকে এই অপমান থেকে মুক্তি দিবেন না। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬২. সহিহাহ : ১১, সহিহ আল জামে : ৪২৩

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত:

لَا يَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ إِلَّا أَكَلُوا الرِّبَا، فَإِنْ لَمْ يَأْكُلُوهُ أَصَابَهُمْ مِنْ غُبَارِهِ

মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন তারা সকলেই সুদ গ্রহণ করবে। যদি তারা সরাসরি সুদ না খায়, তবে এর ধুলো-বালু তাদের স্পর্শ করবে। সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩১

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-

“إِذَا بَاعَ الرَّجُلُ السِّلْعَةَ ثُمَّ اشْتَرَاهَا بِأَكْثَرَ مِنْ ثَمَنِهَا، فَهُوَ الرِّبَا.”

যদি একজন ব্যক্তি একটি পণ্য বিক্রি করে এবং পরে তা আগের দামের চেয়ে বেশি দামে পুনরায় ক্রয় করে, তাহলে এটি মূলত সুদ। সুনান দারকুতনি : ৩৩৪২

উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত-

إِنَّكُمْ تَسْتَحِلُّونَ الرِّبَا بِالْبَيْعِ

তোমরা বাণিজ্যের নামে সুদকে বৈধ করার চেষ্টা করবে। মুসনাদ আহমদ : ২৫৪০০

রিবা-ই-বাই’আল-ইনা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এটি বাণিজ্যের আড়ালে সুদকে বৈধ করার একটি পদ্ধতি। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে ইসলামের মূলনীতি হলো শোষণ মুক্ত এবং ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তাই মুসলমানদের এই ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা উচিত।

হারাম মাল বিক্রি করা হারাম : মদ, মৃতজন্তু, শূকর ও মূর্তি বিক্রি করা হারাম

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ حُرِّمَ عَلَيْهِمُ الشَّحْمُ فَبَاعُوهُ وَأَكَلُوا ثَمَنَهُ ‏”

আল্লাহ ইয়াহুদী জাতিকে ধ্বংস করুন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছে, তারপর তারা তা বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে। সহহি মুসলিম : ১৫৮৩

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর (রাযিঃ) এর নিকট এ খবর এলো যে, সামুরা (রাযিঃ) মদ বিক্রি করেছেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ সামুরার ধ্বংস করুন। সে-কি জানে না যে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আল্লাহ ইয়াহুদী জাতির উপর অভিশাপ দিয়েছেন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছিল। এরপর তারা তা গলিয়ে বিক্রি করে। সহহি মুসলিম : ১৫৮২

এমন কিছু লেনদের আছে যা সুদমুক্ত ;

সোনার পরিবর্তে অন্য ধাতুর কমবেশীতে বিক্রি সুদ হবে না-

আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন-

لاَ تَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ إِلاَّ سَوَاءً بِسَوَاءٍ وَالْفِضَّةَ بِالْفِضَّةِ إِلاَّ سَوَاءً بِسَوَاءٍ وَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالْفِضَّةِ وَالْفِضَّةَ بِالذَّهَبِ كَيْفَ شِئْتُمْ

সমান সমান ছাড়া তোমরা সোনার বদলে সোনা বিক্রয় করবে না। অনুরূপ রূপার বদলে রূপা সমান সমান ছাড়া (বিক্রি করবে না)। রূপার বদলে সোনা এবং সোনার বদলে রূপা যেভাবে ইচ্ছে, কেনা বেচা করতে পার। সহিহ বুখারি ২১৭৫, সহিহ মুসলিম : ১৫৯০, আহমাদ ২০৪১৭

উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান পরিমাণ ও হাতে হাতে (নগদ) হবে। অবশ্য এ দ্রব্যগুলো যদি একটি অপরটির ব্যতিক্রম হয় (অর্থাৎ- পণ্য এক জাতীয় না হয়) তোমরা যেরূপ ইচ্ছা বিক্রি করতে পার যদি হাতে হাতে (নগদে) হয়। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৭

আরিয়া পদ্ধতির লেনদেন বা গাছের মাথার খেজুর অনুমানে ক্রয়-বিক্রয়

জায়িদ ইবনে সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَرْخَصَ لِصَاحِبِ الْعَرِيَّةِ أَنْ يَبِيعَهَا بِخَرْصِهَا

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাছের উপরিস্থিত খেজুর অনুমানে পরিমাণ নিরূপণ করে বিক্রয় করার অনুমতি দিয়েছেন। সহহি বুখারি : ২১৮৮, ২১৯৩, ২৩৮০, সহিহ মুসলিম ১৫৩৪, ১৫৩৯, সুনানে তিরমিজি :  ১৩০০, ১৩০২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৬৮, ২২৬৯, সুনানে নাসায়ী : ৪৫৩২, ৪৫৩৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৩৬২

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপযোগী হওয়ার আগে ফল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। এর কিছুই দ্বীনার ও দিরহাম এর বিনিময় ব্যতীত বিক্রি করা যাবে না, তবে আরায়্যার হুকুম এর ব্যতিক্রম। সহহি বুখারি : ২১৮৯, সহিহ  মুসলিম : ১৫৩৬

যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাইয়ার ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন যে, ওযনকৃত খেজুরের বিনিময়ে গাছের অনুমানকৃত খেজুর বিক্রি করা যেতে পারে। মূসা ইবনু ‘উকবা (রহ.) বলেন, আরাইয়া বলা হয়, বাগানে এসে কতগুলো নির্দিষ্ট গাছের খেজুর (শুকনা খেজুরের বদলে) ক্রয় করে নেয়া। সহিহ বুখারি : ২১৯২

আবিয়া পদ্ধতিতে ফলের উপযুক্ততা প্রকাশের পর বিক্রি করতে হবে :

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ بَيْعِ الثِّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا نَهَى الْبَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ২১৯৪, সহহি মুসলিম : ১৫৩৪

আনাস ইবনু মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর ফল পোখতা হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) বলেন, অর্থাৎ লালচে হওয়ার আগে। সহিহ বুখারি : ২১৯৫

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফলের রং পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। রাবী বলেন, অর্থাৎ লালচে বর্ণের বা হলুদ বর্ণের না হওয়া পর্যন্ত এবং তা খাওয়ার যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত। সহিহ বুখারি : ২১৯৬

উপযুক্ততা প্রকাশের পূর্বে বিক্রয় করলে, যদি কোন কারণে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি মালিক উপর বর্তবে :

ইবনু শিহাব (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি যদি ফলের উপযুক্ততা প্রকাশের পূর্বে তা ক্রয় করে, পরে তাতে মড়ক দেখা দেয়, তবে যা নষ্ট হবে তা মালিকের উপর বর্তাবে। [যুহরী (রহ.)] বলেন, আমার নিকট সালিম ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহ.) ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার পূর্বে তোমরা ফল ক্রয় করবে না এবং শুকনো খেজুরের বিনিময়ে তাজা খেজুর বিক্রি করবে না। সহিহ বুখারি : ২১৯৯

অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে

 ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আসলেন তখন সেখানকার লোকেরা এক, দুই অথবা তিন বছরের মেয়াদে খেজুর অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেউ অগ্রিম খেজুর ক্রয়-বিক্রয় করলে তাকে তা নির্দিষ্ট পরিমাপে, নির্দিষ্ট ওজনে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে করতে হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬৩

চতুস্পদ জন্তু অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়

১/২২৮৫। আবূ রাফে (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির নিকট থেকে ধারে একটি উঠতি বয়সের উট কিনেন এবং বলেনঃ যাকাতের উট এলে তোমার ধার পরিশোধ করবো। অতঃপর যাকাতের উট এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে আবূ রাফে! সেই লোকের উটটি পরিশোধ করো। অতএব আমি চার বছর বা ততোধিক বয়সের উট ছাড়া আর কোন উট পেলাম না। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বলেনঃ ওটাই তাকে দাও। কেননা লোকেদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৮৫, মুসলিম ১৬০০, তিরমিযী ১৩১৮, নাসায়ী ৪৬১৭, আবূ দাউদ ৩৩৪৬, আহমাদ ২৬৬৪০, মুয়াত্তা মালেক ১৩৮৪, দারেমী ২৫৬৫, বায়হাকী ফিস সুনান ৬/২১, ইরওয়া ১৩৭১।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অস্পষ্ট চুক্তি নিষিদ্ধ-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“مَنْ بَاعَ بَيْعَتَيْنِ فِي بَيْعَةٍ، فَلَهُ أَوْكَسُهُمَا، أَوِ الرِّبَا.”

যে ব্যক্তি একই দ্রব্য বিক্রয়ে দু’টি শর্ত বা নিয়ম রাখে, তাকে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে (সর্বনিম্ন মূল্য) গ্রহণ করতে হবে, নতুবা এটি হবে সুদ। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬১, সুনানে তিরমিজি : ১২৩৬

উদাহরণ:

একজন বিক্রেতা ক্রেতাকে বললেন, তুমি যদি নগদ টাকা দিয়ে এই পণ্য কিনো, তাহলে মূল্য হবে ১০০০ টাকা। তুমি যদি কিস্তিতে পরিশোধ করো, তাহলে মূল্য হবে ১২০০ টাকা। ক্রেতা হয়তো চুক্তি সম্পাদনের সময় এই দু’টির মধ্যে কোনো একটি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করেনি, বরং পরে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে এটি “এক দ্রব্যের জন্য দু’টি মূল্য নির্ধারণ” হয়ে যায়, যা দ্ব্যর্থতা সৃষ্টি করে।  ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এই ধরনের অস্পষ্টতা নিষিদ্ধ। বিক্রেতা এবং ক্রেতার মধ্যে চুক্তি সুস্পষ্ট হতে হবে। যদি বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে চুক্তির সময় সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নেয় এবং পরে বেশি মূল্য দাবি করে, এটি মূলত সুদের মতো হয়। কারণ ক্রেতা দ্ব্যর্থতার মধ্যে থেকে পরে বেশি পরিশোধ করতে বাধ্য হতে পারে, যা জুলুম ও রিবা (সুদ) হিসেবে বিবেচিত।

ইসলাম সুদ ও ব্যবসা

ইসলাম সুদ ও ব্যবসা

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সুদের ইতিহাস : কুরআন ও হাদিসের আলোকে

সুদ একটি প্রাচীন অর্থনৈতিক প্রথা, যা মানবসভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত ছিল। ইসলাম এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং কুরআন ও হাদিসে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। নিচে সুদের ইতিহাস ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হলো।

প্রাচীন যুগে সুদের প্রচলন

সুদ ব্যবস্থা পৃথিবীর আদিকাল থেকেই সমাজে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সভ্যতায়, বিশেষ করে ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, গ্রিক এবং রোমান সাম্রাজ্যে সুদ প্রথা প্রচলিত ছিল। ধনী শ্রেণি দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে চড়া সুদ আদায় করত, যা তাদের আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিত। প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা এবং প্রাচীন গ্রন্থে তথ্য পাওয়া যায়।

১. ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় সুদ

ব্যাবিলনীয়দের মধ্যে সুদপ্রথার অস্তিত্ব পাওয়া যায় “হাম্মুরাবির বিধান” (Hammurabi’s Code) এ, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের কাছাকাছি সময়কার। এই বিধানে ঋণের সুদের হার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল এবং সুদখোরদের জন্য কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। Hudson, Michael. The Lost Tradition of Biblical Debt Cancellations (1993).

২. মিশরীয় সভ্যতায় সুদ

প্রাচীন মিশরীয়রা কৃষি ও ব্যবসার জন্য ঋণ গ্রহণ করত, এবং এর বিপরীতে চড়া সুদ গুণতে হতো। মিশরীয় প্যাপিরাস লিপিতে সুদসহ ঋণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। Henry, John F. The Evolution of Economic Institutions (2004).

৩. গ্রিক সভ্যতায় সুদ

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (Aristotle) সুদকে অন্যায় ও অপ্রাকৃতিক আয়ের উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। Finley, Moses. The Ancient Economy (1973).

৪. ইহুদি ধর্মে সুদের প্রচলন ছিল

ইহুদিরা সেই আদিকাল থেকেই ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল প্রিয় জাতি হিসেবে প্রসিদ্ধ। তারা তাদের কাছে প্রেরিত নবীদের (আ.) বিরুদ্ধে নানা কূটচাল চালত। তাদের সেসব কূটকৌশলের একটি ছিল সুদ খাওয়ার ব্যাপারে কৌশলের আশ্রয় নেয়া। অথচ তাদের নবী এ থেকে তাদের বারণ করেছেন এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ ۚ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

সুতরাং ইয়াহুদীদের জুলুমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। সুরা নিসা :১৬০-১৬১

হাফেজ ইবনে কাসির রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সুদ খেতে নিষেধ করেন, তারপরও তারা সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকেনি। এজন্য তারা নানা কৌশল গ্রহণ করল। বিষয়টিকে সন্দেহের বাতাবরণে ঢেকে ফেলল আর মানুষের সম্পদ খেতে লাগল অবৈধ পন্থায়। তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড-১, পৃ-৫৮৪

ইহুদি তাদের কুট কৌশল দ্বারা সুদ খাওয়াকে জাযেয করে নেন। কুরআন বলে তাদের জন্য সুদ খাওয়া নিষেধ ছিল। আর তাদের বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থ বলে সুদ খাওয়া জায়য আছে। সুদের প্রচলন ছিল এবং এটি তাদের ধর্মীয় শাস্ত্র (বর্তমানে বিকৃত) “তৌরাত” (Torah) ও তালমুদ (Talmud) এ উল্লেখিত রয়েছে। ইহুদিদের মাঝে সুদের ব্যবস্থাকে দুইভাবে দেখা হতো—

১. নিজেদের (ইহুদিদের) মধ্যে সুদ হারাম ছিল।

২. অন্য জাতির (ইহুদি নয়) প্রতি সুদ গ্রহণ বৈধ ছিল।

১. তৌরাতে (Old Testament) সুদের বিধান

তৌরাতে সুদের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে একজন ইহুদি তার ভাইয়ের (অন্য ইহুদির) কাছ থেকে সুদ নিতে পারবে না, কিন্তু অইহুদিদের কাছ থেকে সুদ গ্রহণ বৈধ।

ক। সুদ হারাম করা হয়েছে ইহুদিদের মধ্যে:

“তোমার কোনো ভাই (ইহুদি) যদি দরিদ্র হয়ে যায়, তাকে সুদ বা লভ্যাংশ দিও না। তোমার ঈশ্বরের ভয় করো, যাতে তোমার ভাই তোমার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে। তোমার কাছে টাকা ধার নিলে তার ওপর সুদ নিও না, খাবারের জন্য লভ্যাংশ নিও না।  লেবীয় পুস্তক/Leviticus 25:35-37

খ। কিন্তু অইহুদিদের থেকে সুদ নেওয়া বৈধ:

“তুমি অইহুদি (গয়ের) থেকে সুদ নিতে পারবে, কিন্তু তোমার ভাইয়ের (ইহুদি) কাছ থেকে নিতে পারবে না, যাতে তোমার ঈশ্বর যে দেশ তোমাকে দিতে চলেছেন, তাতে তুমি সমৃদ্ধ হতে পারো।” ব্যবস্থা বিবরণী /Deuteronomy 23:19-20

২. তালমুদে সুদের অনুমোদন

তালমুদ হলো ইহুদিদের ব্যাখ্যামূলক ধর্মগ্রন্থ, যেখানে সুদের বিষয়ে নানা বিধান দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ আছে যে, একজন ইহুদি তার সম্প্রদায়ের বাইরে (অইহুদি) সুদ নিতে পারবে, কারণ তারা ইহুদিদের মতো “নির্বাচিত জাতি” নয়।

 ক। সুদ নেওয়া অনুমোদিত:

“ঋণ দেওয়ার সময় যদি ঋণগ্রহীতা একজন অইহুদি হয়, তবে তাকে সুদ নেওয়া বৈধ, কিন্তু যদি সে একজন ইহুদি হয়, তবে তার কাছ থেকে সুদ নেওয়া হারাম। (Talmud, Bava Metzia 70b)

খ। সুদের মাধ্যমে অইহুদিদের দুর্বল করার কৌশল:

“ঈশ্বর বলেছেন: আমি তোমাদের অন্য জাতিগুলোর উপর শাসন দিতে চাই, তোমরা তাদের থেকে সুদ গ্রহণ করো, যাতে তারা তোমাদের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। (Talmud, Baba Kamma 113a)

৩. ইহুদিদের বাস্তব জীবনে সুদের প্রভাব

ইতিহাসে দেখা যায়, ইউরোপসহ বহু দেশে ইহুদিরা সুদের ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে এবং সামাজিকভাবে বিরোধের সম্মুখীন হয়েছে।

(১) মধ্যযুগে ইহুদিদের সুদ ব্যবসা:

মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টানদের জন্য সুদ নিষিদ্ধ থাকায়, ইহুদিরা ব্যাপকভাবে সুদখোর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডে ১২৯০ সালে ও ফ্রান্সে ১৩০৬ সালে ইহুদিদের সুদের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Werner Sombart তার বই “The Jews and Modern Capitalism” (1911)-এ উল্লেখ করেছেন কিভাবে ইহুদিরা ইউরোপে সুদের মাধ্যমে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।

(২) শেক্সপিয়রের নাটক “The Merchant of Venice”

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক The Merchant of Venice-এ ইহুদি মহাজন শাইলক (Shylock) চড়া সুদে অর্থ ধার দিতেন, যা ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদের সুদ ব্যবসার প্রতিফলন বলে মনে করা হয়।

ইহুদি ধর্মে সুদের বিষয়ে দ্বৈতনীতি ছিল। ইহুদিদের মধ্যে সুদ হারাম, কিন্তু অইহুদিদের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। ইতিহাসে দেখা যায়, এই নীতির কারণে ইহুদিরা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও বহু সমাজে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছিল। ইসলামে সুদের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যেখানে এটি সর্বজনীনভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে  সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯

৫। ইসলামের আগের আরবে সুদের প্রচলন:

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব সমাজে সুদ (রিবা) ছিল একটি প্রচলিত ও গভীরভাবে প্রোথিত আর্থিক ব্যবস্থা। বাণিজ্যিক লেনদেন, ব্যক্তিগত ঋণ ও সম্পদের বৃদ্ধি লাভের অন্যতম উপায় ছিল সুদ। ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দরিদ্রদের ঋণ দিত এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে মূলধনের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করত। এভাবে অর্থনীতিতে এক শোষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে দরিদ্ররা ক্রমাগত ঋণের জালে আবদ্ধ থাকত এবং ধনীরা আরও ধনী হতো। কুরআন, সুদের এই প্রচলন এবং তার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট আলোচনা পাওয়া যায়। সেই যুগের প্রচলিত সুদের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কুরআনে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং একে সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ . فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা রয়েছে। সূরা বাকারা : ২৭৮-২৭৯

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে সুদ অব্যাহত রাখলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ইসলামের পূর্বে আরবে সুদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাই ইসলাম এটিকে নির্মূল করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

সুদ ও ব্যবসা

সুদ এবং ব্যবসা উভয়ই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এ দুটির প্রকৃতি ও প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করে এবং সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুদ হলো অতিরিক্ত মুনাফা যা কোনো বিনিময় বা ঝুঁকি ছাড়াই ঋণের ওপর আদায় করা হয়। এটি শোষণমূলক এবং সমাজে আর্থিক বৈষম্য ও অবিচার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, ব্যবসা হলো পণ্য বা সেবার বিনিময়ে ন্যায্য লাভ অর্জনের বৈধ মাধ্যম। এটি ঝুঁকি ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে হয় এবং উভয় পক্ষের জন্য উপকারী।

কুরআন ও হাদিসে সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন-

 ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا

আল্লাহ ব্যবসাকে (الۡبَیۡعَ) হালাল করেছেন এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

সুদ সমাজে ধনী এবং গরিবের মধ্যে বৈষম্য বাড়ায়, যা আর্থিক শোষণের কারণ হয়। অপরদিকে, ব্যবসা আর্থিক সুষমতা বজায় রাখে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবসায় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং হালাল পণ্য ও সেবার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুদ এবং ব্যবসার এই মৌলিক পার্থক্য সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

সুদ বা (اَلرِّبَا) রিবা :

সুদ বা (اَلرِّبَا) রিবা একটি আবরি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হল, লাভ, বৃদ্ধি, আধিক্য, স্ফীতি প্রভৃতি। رَبَا অর্থাৎ বেড়েছে বা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা বিনিময় ছাড়াই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হলো এমন অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা কোনো ব্যক্তি ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বিনিময় ছাড়াই গ্রহণ করে।

ব্যবসা বা (الۡبَیۡعَ) বাইয়া :

ব্যবসব (الۡبَیۡعَ) আল-বাইয়া শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো বিক্রয় বা ব্যবসা। এটি মূলত একটি আর্থিক লেনদেন, যেখানে একটি পক্ষ নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কোনো পণ্য, সেবা, বা সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় করে।

শরিয়তের ভাষায় الۡبَیۡعَ বলতে বোঝায়, দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোনো পণ্য বা সম্পদ নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। কুরআনে বাণিজ্যকে (الۡبَیۡعَ) বৈধ এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যবসা (الۡبَیۡعَ) বা আল-বাইয়া ইসলামে একটি বৈধ ও পবিত্র উপার্জনের মাধ্যম। এটি আল্লাহর নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করে নিচে  সুদ ও ব্যবসার কিছু পার্থক্য দেওয়া হলো:

১. সংজ্ঞা ও প্রকৃতি :

সুদ : কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা বিনিময় ছাড়াই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়। এটি শোষণ মূলক।

কুরআন: আল্লাহ বাণিজ্যকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

ব্যবসা : এটি পণ্যের লেনদেন বা বিনিয়োগের মাধ্যমে ন্যায্য মুনাফা অর্জন। উভয় পক্ষ লাভ-ক্ষতিতে অংশীদার হয়।

২. দ্রব্য হস্তান্তর করা:

সুদ : কোন জিনিসের মূল্য নয় বরং কেবল ঋণ গ্রহীতাকে তার ঋণ পরিশোধে কিছু সময় ও অবকাশ দেওয়ার বিনিময় অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া হয় ।

ব্যবসা : কোন জিনিসকে নির্দিষ্ট মুল্যে নিষ্পত্তির মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে হস্তান্তর করা হয়। অতঃপর সেই দাম বা মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা সেই জিনিসটাকে বিক্রেতার নিকট থেকে গ্রহণ করে।

৩. বিনিময় ভিন্নতা

সুদ : এই কারবারে দুই পক্ষের মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয় না। সুদ গ্রহীতা তো এক নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ নিয়ে নেয়। ফলে সে নিশ্চিতরূপে উপকৃত হয়। কিন্তু সুদদাতার জন্য কেবল ঋণ পরিশোধে অবকাশ মিলে যাতে থেকে সে উপকৃত হয় কি না তা অনিশ্চিত।

ব্যবসা : ব্যবসায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয়ে থাকে। ক্রেতা বিক্রেতার নিকট থেকে ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হয় ফলে বিক্রেতাও তার প্রদত্ত শ্রম, বুদ্ধি এবং সময়ের মূল্য গ্রহণ করে।

৪। বিনিময়ের ধরণ :

সুদ : সুদী কারবারে বিনিয়োগকারি তার বিনিয়োগের উপর ধারাবাহিকভাবে বারংবার মুনাফা বা সূদ গ্রহণ করতে থাকে এবং সময়ের গতি বাড়ার সাথে সাথে তার সুদের অঙ্কও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এই কারবারে ঋণ গ্রহীতা টাকা নিয়ে খরচ করে ফেলে। অতঃপর সেই খরচ-করা টাকা যোগাড় করে বাড়তি সুদসহ ফেরৎ দিতে হয়।

ব্যবসা : ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যত পরিমাণেই লাভ গ্রহণ করুক না কেন, গ্রহণ করে সে মাত্র একবার। ব্যবসায় পণ্য-দ্রব্য ও তার মূল্য বিনিময় হওয়ার সাথে সাথেই আদান-প্রদানের ব্যাপার শেষ হয়ে যায়। এর পরে ক্রেতা স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে এবং বিক্রেতাকে কোন জিনিস ফেরৎ দিতে হয় না।

৫. পরিশ্রমের ধরণ :

সুদ : সুদী কারবারে সুদখোর কেবলমাত্র তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল দিয়ে বিনা মেহনত ও কষ্টে অপরের উপার্জনে অংশীদার হয়।

ব্যবসা : ব্যবসায় মানুষ নিজের মেহনত ও বুদ্ধি ব্যয় করে এবং তারই পারিশ্রমিক গ্রহণ করে।

৬. বৈধতা দিক দিয়ে

সুদ (রিবা): ইসলামে সুদ সম্পূর্ণ হারাম।

হাদিস: যে সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদ লেখে এবং এর সাক্ষ্য দেয়, তারা সবাই সমানভাবে গুনাহগার। সহিহ মুসলিম : ১৫৯৮

ব্যবসা: হালাল ও বৈধ পন্থায় ব্যবসা করা সুন্নত।

কুরআন: “তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করো আল্লাহর অনুমতিক্রমে। সূরা নিসা : ২৯

৭. ঝুঁকি ও দায়িত্ব

সুদ (রিবা): ঋণদাতা কোনো ঝুঁকি নেয় না এবং শুধুমাত্র মুনাফা পেতে চায়।

ব্যবসা: ব্যবসায় উভয় পক্ষই ঝুঁকি গ্রহণ করে। লাভ বা ক্ষতির দায় উভয়ের ওপর বর্তায়।

৭. উপার্জনের উৎস

সুদ (রিবা): উপার্জন অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য উৎস থেকে আসে। এটি সম্পদকে অনৈতিকভাবে বৃদ্ধি করে।

ব্যবসা: হালাল পণ্য ও সেবার মাধ্যমে উপার্জন করা হয়। এটি সমাজে ন্যায্যতা বজায় রাখে।

৮. অর্থনৈতিক প্রভাব

সুদ (রিবা): ধনী এবং গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। এটি শোষণমূলক।

ব্যবসা: ব্যবসা আর্থিক সুষমতা বজায় রাখে এবং গরিবদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

৯. নৈতিকতা

সুদ (রিবা): এটি সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতি সৃষ্টি করে।

ব্যবসা: নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হলে ব্যবসা সৎ ও কল্যাণমুখী হয়।

১০. আখিরাতের ফলাফল

সুদ (রিবা): সুদ গ্রহণকারীদের জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে।

হাদিস: “রাত্রির মেরাজে আমি দেখেছি, যেসব ব্যক্তি সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন তাদের পেট বিশাল আকারে দেখতে পাবে এবং তাতে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৭৩

ব্যবসা: হালাল ব্যবসা আখিরাতে সাওয়াব ও বরকতের কারণ।

১১. লাভের পদ্ধতি

সুদ (রিবা): মুনাফা নির্ধারিত এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যবসা: মুনাফা বিনিয়োগ ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে অর্জিত হয়।

১২. সামাজিক প্রভাব

সুদ (রিবা): এটি সমাজে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক শোষণ বৃদ্ধি করে।

ব্যবসা: ব্যবসা সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।

৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি

সুদ (রিবা): সুদগ্রহীতা আল্লাহর ক্রোধের সম্মুখীন হয়।

কুরআন: “যদি তোমরা সুদ থেকে ফিরে না আসো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।” সূরা বাকারা : ২৭৯

ব্যবসা: হালাল ব্যবসার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।

শিরকে আসগর ও রিয়া

শিরকে আসগর ও রিয়া

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরকে আসগর

শিরকে আসগর এর অর্থ হলো ছোট শিরক। ছোট শিরক বলতে এমন শিরকি কথা, কাজ ও ইবাদতকে বুঝানো হয় যা বললে বা করলে ইসলামি শরিয়ত কোন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বহিস্কার না। কিন্তু তার ঐ কর্মটি কবিরা গুনাহ থেকে নিকৃষ্ট হতে পারে এবং তাকে কাফির না বলে ফাসিক বা পাপিষ্ঠ বলা হয়।

ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ

অনেক গবেষক আলেম ছোট শিরক সহজ করে বুঝাতে শ্রণী বিভাগ করে আলোচনা করেছেন। তারা ছোট শিরক প্রকাশ্য ছোট শিরক, গোপনীয় ছোট শিরক, নিয়তে ছোট শিরক, আমলে ছোট শিরক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ করে আলোচনা করছেন। সাধারণ মানুষ বিভীন্ন কারনে, বিভিন্নভাবে ছোট শিরক করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের মুল ভিত্তি হলে বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসকে কথা ও কাজ দ্বারা প্রতিফলিত করে থাকে। বিশ্বাসের চুড়ান্ত পর্যায় হলো আল্লাহ প্রদত্ত কিছু নিয়ম সম্বলিত ইবাদত।  এই বিশ্বাস, কথা, কর্ম ও ইবাদতের উপর ভিত্তি করে সাধারনত চারটি পদ্দতিতে ছোট শিরক সম্পাদিত হয়। যেহেতু চারটি পদ্ধতিতে ছোট শিরক হয় তাই চারটি ভাগে বিভক্ত করে ছেট শিরা আলোচনা কবর। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি কেউ কোনো বস্তু সম্পর্কে বিশ্বাস করল যে, তা উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায়, অথচ আল্লাহ ইহাকে উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায় সাবস্ত করেনি। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি শয়তানের হাত আছে তবে ছোট শিরক হবে। যেমন-

আবুল মালীহ (রহঃ) হতে এক ব্যক্তির সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জন্তুযানে নবী ﷺ এর পিছনে বসা ছিলাম। হঠাৎ তাঁর সাওয়ারী হোঁচট খেলে আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। তিনি বললেন, একথা বলো না যে, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। কেননা তুমি একথা বললে সে অহংকারে ঘরের মতো বড় আকৃতির হয়ে যাবে এবং সে বলবে, আমার ক্ষমতায় হয়েছে। অতএব বলো, (بِسْمِ اللَّهِ) আল্লাহর নামে। যখন তুমি ’আল্লাহর নামে’ বলবে তখন শয়তান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে মাছির মত হয়ে যাবে। আবু দাউদ : ৪৯৮২

তবে পরিপূর্ণ বিশ্বাস না করে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য আমল করে থাকলে তার পরিণতি শিরকে আকবর। সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا 

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

অন্তরে সঠিক বিশ্বাস থাকার পরও যদি ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা উপকার বা অপকারের উপায় সাবস্ত করে তাদের খুশির জন্য আমল ছোট শিকর। তবে মনে রাখতে হবে আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ জানানে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ ‏

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৪

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও কেউ এমন কথা বলে যা আল্লাহর সাথে অংশিদার সাব্যস্থ করে, তবে সে কথার দ্বারা ছোট শিরক করল, যদিও গাইরুল্লাহকে সম্মান করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সমকক্ষ উদ্দেশ্য না হয়। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে কেউ বলল, আল্লাহর সাথে ইল্লাহও লাগে, যা আল্লাহ চেয়েছেন এবং আপনি চেয়েছেন, পীরের অসিলায় ভাল আছি, বিপদে আপনি না থাকলে যে কি হত, ভাগ্যিস চাকুরিটা ছিল অথবা কেউ গায়রুল্লাহর নামে কসম করল। যেমন-

হুযাইফাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

لَا تَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ، وَشَاءَ فُلَانٌ، وَلَكِنْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فُلَانٌ

তোমরা বলো না যে, আল্লাহ যা চান এবং অমুক লোক যা চায়। সুতরাং তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান, অতঃপর অমুক যা চায়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮০, সহিহাহ : ১৩৯

কেউ যদি এভাবে বলা যে-

যদি আল্লাহ এবং আপনি না থাকতেন! তাহলে আমার বিপদ হত। আমার তো শুধু আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া আর কেউ নেই কিংবা আমি আল্লাহ এবং আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি, ইত্যাদি। তাহলে কথার দ্বারা ছোট শিরক।

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

যদি কেউ একই সাথে আল্লাহর এবং মানুষের সন্তস্টি অর্জনের জন্য কর্ম সম্পাদন করে যে কর্ম মহান আল্লাহ নির্ধারন করেনি তাহলে কর্মের দ্বারা ছোট শিরক হবে। কর্মের ছোট শিরক দ্বারা মানুষ গুনাহগার হবে, কর্মের কোন প্রতিদান পাবেনা এবং আমল প্রত্যাখ্যাত হবে। যেমন-

মসজিদের দরজাসমূহ চুমু খাওয়া, কবর স্পর্শ করা, কবরের গিলাপ ধরে দোয়া করা। কবর, মসজিদ বা আলীদের স্মৃতি বিজরিত স্থানের মাটির বরকতের নেশায় বা রোগ মুক্তি কামনায় করা বা গায়ে মাখা। রোগ মুক্তি আশায় তাবিজ লটকালো, অথবা আংটি কিংবা তাগা পরিধান করল, ইত্যাদি কর্মসমূহ ছোট শিরক। যেমন-

নবী ﷺ বলেন,  (مَنْ تَعَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ)   যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো সে শিরক করল। সিলসিলায়ে সহিহাহ : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ, চতুর্খ খণ্ড, হাদিস : ১৫৬

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে রাজি খুশি কারর জন্য ইবাদত করলে মানুষের ইহকালীন জীবন যেমন সুন্দর হয়, পরকালীন জীবনও তেমনি মঙ্গলময় হবে। ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্ত্বষ্ট করা। কিন্তু যখন সে ইবাদত মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে না হয়ে গাইরুল্লাহ বা লোক দেখানোর জন্য সুন্দর করা হয় তখন তাকে রিয়া বলা হয়। এক কথায়, লোক দেখানো আমল কে রিয়া বলা হয়।

রিয়া (رِئَآءَ) অর্থ প্রদর্শন করা বা প্রদর্শনেচ্ছা। আল্লাহর জন্য করণীয় ইবাদত পালনের মধ্যে মানুষের দর্শন, প্রশংসা বা বাহবা পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাকে রিয়া বলে। কোন নেক ইবাদাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র গায়রুল্লাহকে দেখানোর উদ্দেশ্যে বা মানুষের প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় অথচ তার ইবাদতটি দেখে মানুষে যেন আল্লাহর ইবাদাত বলেই মনে করে। যদিও সে ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় ইবাদাত হলো ছোট শিরক বা রিয়া। এ ধরনের ‘ইবাদাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন সত্যিকারের কোন মুমিন বান্দা এরূপ রিয়া করতে পারে না।  এই রিয়া বা ছোট শিকর থেকেই বড় শিরকে পরিনত হয়। অর্থাৎ বান্দা যদি তার ইবাদাতে গায়রুল্লাহকে আল্লাহর প্রাপ্য ও অধিকারে শামিল বা অংশীদার করা উদ্দেশ্য হয়, কিংবা মুল কাজটাই যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, তাহলে তা শিরকে আকবার (বড় শিরক) বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

রিয়াকারিগর সৎকাজ আন্তরিক সংকল্প সহকারে আল্লাহর জন্য করে না। বরং যা কিছু করে অন্যদের দেখাবার জন্য করে। এভাবে তারা নিজেদের প্রশংসা শুনাতে চায়। তারা চায়, লোকেরা তাদের সৎ লোক মনে করুক, তাদের সৎকাজের সুনাম করুক। এর মাধ্যমে তারা কোন না কোনভাবে দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধার করবে। অর্থাৎ তারা লোক দেখানো কাজ করে। সাধারনত মুনফিকদের শ্রেণীর মুসলিমগন মানুষের সামনে লজ্জায় পড়ে নেক আমল করে, মানুষ জন না থাকলে আমল ত্যাগ করে। এই সকল কারনে লোক দেখান আমল কবিরা গুনাহের অন্তরভূক্ত।

মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ: الرِّيَاءُ

তোমাদের ব্যাপারে আমার সর্বাপেক্ষা ভয়ের বস্তু যা আমি ভয় পাচ্ছি তা হচ্ছে ছোট শির্ক বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)। বুলুগুল মারাম : ১৪৮৪, আহমাদ : ২৩১১৯, ২৭৭৪২

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিব না, যে বিষয়টি আমার কাছে মাসীহ দাজ্জালের চাইতেও ভয়ঙ্কর? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে গোপন শিরক। একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এ জন্যই তার সালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার সালাত দেখছে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২০৪

রিয়া (ছোট শিরক) বা লোক দেখানো ইবাদত বুঝাতে নিচের একটি হাদিসই যথেষ্ট। বিয়া কি? এর পরিমান কি? সবই পাবের তিরমিজির নিম্মের হাদিসটিতে।

শুফাই আল-আসবাহী (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, কোন একদিন তিনি মদীনায় পৌছে দেখতে পেলেন যে, একজন লোককে ঘিরে জনতার ভিড় লেগে আছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ইনি কে? উপস্থিত লোকেরা তাকে বলল, ইনি আবূ হুরাইরা (রা.) (শুফাই বলেন), আমি কাছে গিয়ে তার সামনে বসলাম। তখন লোকদের তিনি হাদীস শুনাচ্ছিলেন। তারপর তিনি যখন নীরব ও একাকী হলেন, আমি তাকে বললাম, আমি সত্যিকারভাবে আপনার নিকট এই আবেদন করছি যে, আপনি আমাকে এমন একটি হাদীস শুনাবেন, যা আপনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট শুনেছেন, ভালোভাবে বুঝেছেন এবং জেনেছেন।

আবূ হুরাইরা (রা.) বললেন, আমি তাই করব, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন এবং আমি তা বুঝেছি ও জেনেছি। আবূ হুরাইরা (রা.) একথা বলার পর কেমন যেন তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। অল্প সময় এভাবে থাকলেন। তারপর তন্ময়ভাব চলে গেলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ঘরের মধ্যে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন আমি ও তিনি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে মুখমণ্ডল মুছলেন, তারপর বললেন, আমি তোমার নিকট অবশ্যই এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন এই ঘরে তিনি ও আমি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা আবার বেহুশ হয়ে গেলেন; তিনি পুনরায় হুশে ফিরে এসে তার মুখমণ্ডল মুছলেন এবং বললেন, আমি তা করব। আমি অবশ্যই তোমার নিকট এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যাহা তিনি আমাকে বর্ণনা করেছেন।

আমি তখন তার সাথে এই ঘরে ছিলাম। আমি আর তিনি ব্যতীত তখন আর কেউ ছিলনা। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন এবং বেহুশ হয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি অনেকক্ষণ তাকে ঠেস দিয়ে রাখলাম। তারপর হুশ ফিরে এলে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য কিয়ামত দিবসে তাদের সামনে হাযির হবেন। সকল উন্মাতই তখন নতজানু অবস্থায় থাকবে।

তারপর হিসাব-নিকাশের জন্য সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিদের ডাকা হবে তারা হলো কুরআনের হাফিয, আল্লাহ্ তা’আলার পথের শহীদ এবং প্রচুর ধনৈশ্বর্যের মালিক।

সেই কারী (কুরআন পাঠক)-কে আল্লাহ তা’আলা প্রশ্ন করবেন, আমি আমার রাসূলের নিকট যা প্রেরণ করেছি তা কি তোমাকে শিখাইনি? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, শিখিয়েছেন। তিনি বলবেন, তুমি যা শিখেছ সে অনুযায়ী কোন কোন আমল করেছ? সে বলবে, আমি রাত-দিন তা তিলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যা বলেছ। আল্লাহ তা’আলা তাকে আরো বলবেন, বরং তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, তোমাকে বড় কারী (হাফিয) ডাকা হোক। আর তা তো ডাকা হয়েছে।

তারপর সম্পদওয়ালা ব্যক্তিকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে বলবেন, আমি কি তোমাকে সম্পদশালী বানাইনি? এমনকি তুমি কারো মুখাপেক্ষী ছিলেনা? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, তা বানিয়েছেন। তিনি বলবেন, আমার দেয়া সম্পদ হতে তুমি কোন কোন (সৎ) আমল করেছ? সে বলবে, আমি এর দ্বারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রেখেছি এবং দান-খাইরাত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, মানুষের নিকট তোমার দানশীল-দানবীর নামের প্রসার হোক, আর এরূপ তো হয়েছেই।

তারপর যে লোক আল্লাহ্ তা’আলার রাস্তায় শাহাদাৎ বরণ করেছে তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, তুমি কিভাবে নিহত হয়েছ? সে বলবে, আমি তো আপনার পথে জিহাদ করতে আদিষ্ট ছিলাম। কাজেই আমি জিহাদ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেছি। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, আর ফেরেশতারাও তাকে বলবে তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে লোকমুখে একথা প্রচার হোক যে, অমুক ব্যক্তি খুব সাহসী বীর। আর তাতো বলাই হয়েছে।

তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার হাটুতে হাত মেরে বললেন, হে আবূ হুরাইরা কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্টির মধ্য হতে এ তিনজন দ্বারাই প্রথমে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে।

ওয়ালীদ অর্থাৎ আবূ উসমান আল-মাদাইনী বলেন, উকবা ইবনু আমাকে বলেছেন যে, উক্ত শুফাই (শাফী) এ হাদীসটি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিকট গিয়ে বর্ণনা করেন। আবূ উসমান আরো বলেন, আলা ইবনু আবূ হাকীম আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, সে (শাফী) ছিল মুয়াবিয়া (রা.) এর তলোয়ার বাহক।

সে বলেছে যে, জনৈক ব্যক্তি মুয়াবিয়া (রা.) এর নিকট এসে উক্ত হাদীসটি আবূ হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তখন মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, যদি তাদের সাথে এমনটি করা হয় তাহলে অন্যসব লোকের কি অবস্থা হবে? তারপর মুআবিয়া (রা.) খুব বেশি কান্না করলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কাঁদতে কাঁদতে মারা যাবেন। আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, এই লোকটিই আমাদের এখানে অনিষ্ট নিয়ে এসেছে (অর্থাৎ সে এই হাদীসটি বর্ণনা না করলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না)। ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) হুশ ফিরে পেলেন এবং তার চেহারা মুছলেন, তারপর বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূল ﷺ সত্যই বলেছেন। (এই বলে তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন)

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার জৌলুস কামনা করে, আমি সেখানে তাদেরকে তাদের আমলের ফল পুরোপুরি দিয়ে দেই এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। এরাই তারা, আখিরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই এবং তারা সেখানে যা করে তা বরবাদ হয়ে যাবে আর তারা যা করত, তা সম্পূর্ণ বাতিল, সুরা হুদ: ১৫-১৬। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮২, তালিক আলা ইবনে খুজাইমাহ : ২৪৮২, সহিহ তারীকুর রাগিব, প্রথম খণ্ড, পৃ-২৯-৩০, হাদসের মান সহিহ

২। শিরকে আকবার (বড় শিরক) ও শিরকে আসগার (ছোট শিরক) এর মধ্যে পার্থক্য

(১) শিরকে আকবার নিঃসন্দেহে কবিরা গুনাহ কিন্তু শিরকে আসগর কবিরা বা সগিরা গুনাহ হতে পারে।

শিরকে আকবার সবচেয়ে বড় অন্যায় ও অপরাধ বা কবিরা গুনাহ। মহান আল্লাহ বলেন-

وَاِذۡ قَالَ لُقۡمٰنُ لِابۡنِہٖ وَہُوَ یَعِظُہٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِکۡ بِاللّٰہِ ؕؔ اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ

আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয় শিরক হল বড় জুলুম। সুরা লুকমান :১৩

আবূ বকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

(২) শিরকে আকবর তাওবা ছাড়া ক্ষমা করা হবে না কিন্তু শিরকে আসগর তাওবা ছাড়াও ক্ষমা করা হতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

অপর পক্ষে শিরকে আসগর যখন সগিরা গুনাহ হবে তখন আল্লাহ তাওবা ছাড়াই ক্ষমা করেত পারেন। মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یَجۡتَنِبُوۡنَ کَبٰٓئِرَ الۡاِثۡمِ وَالۡفَوَاحِشَ اِلَّا اللَّمَمَ ؕ  اِنَّ رَبَّکَ وَاسِعُ الۡمَغۡفِرَۃِ ؕ 

যারা ছোট খাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার। সুরা নাজম : ৩২

(৩) শিরকে আকবর সকল আমলকে ধ্বংস করে দেয় কিন্ত শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

কিন্তু শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়। যদি কেউ লোক দেখানোর জন্য দান  করে, সিয়াম আদায় করে বা হজ আদায় করে তখন তার দান, সিয়াম বা হজ সংশ্লিষ্টি সকল নেকী বাদ হয়ে যাবে।

(৪) শিরকে আকবরের কারনে জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে কিন্তু শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

‘আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

পক্ষান্তরে শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না। নির্দিষ্ট শান্তি ভোগের পর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِن تَجْتَنِبُواْ كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلاً كَرِيمًا

যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সে সব বড় গোনাহ গুলো থেকে বেঁচে থাকতে পার। তবে আমি তোমাদের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেব এবং সম্মান জনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করার। সুরা নিসা :৩১

শিরকে আসগর সর্বেচ্চ কবিরা গুনাহ হয়। আর কবিরা গুনাহকারী ইমানের কারনে আল্লাহ ক্ষমার আশা রাখে কাজেই সে জাহান্নামে স্থায়ী হবে না।  

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন-

‏ أَتَانِي جِبْرِيلُ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏

জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবূ যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ১৭৩

(৫) শিরকে আকবর ইসলাম থেকে বের করে দিলেও আসগর বের করে দেয় না।

শিরকে আকবরে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গন্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয়। এর বিপরীতে শিরকে আসগরের কারনে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয় না। মহান আল্লাহ বলেন-

وَیَقُوۡلُوۡنَ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالرَّسُوۡلِ وَاَطَعۡنَا ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ؕ وَمَاۤ اُولٰٓئِکَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ

তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমরা আনুগত্য করেছি’, তারপর তাদের একটি দল এর পরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তারা মুমিন নয়। সুরা নুর : ৪৭

পক্ষান্তরে শিরকে আসগার মুসলমানকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করে দেয় না। অর্থাৎ শিরকে আসগার করার কারণে কোন মুসলিম, কাফির-মুশরিকে পরিণত হয় না।

(৬) শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি কাফির আর কাফিরের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুপারিশ থাকবে না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগন ব্যক্তি ফাসিক তার জন্য এর সুপারিশ তাকবে। ইনশাল্লাহ

(৭) মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিলে তার জাল মালের নিরাপত্তা নাই।

যে মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিবে, তাকে তাওবা করে নতুন করে ইসলাম গ্রহণ না করেলে শারীয়াতের দৃষ্টিতে তার জান ও মালের কোন নিরাপত্তা নেই। শারীয়াতের দৃষ্টিতে সে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্তযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا انۡسَلَخَ الۡاَشۡہُرُ الۡحُرُمُ فَاقۡتُلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ وَخُذُوۡہُمۡ وَاحۡصُرُوۡہُمۡ وَاقۡعُدُوۡا لَہُمۡ کُلَّ مَرۡصَدٍ ۚ فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَخَلُّوۡا سَبِیۡلَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাওবা : ০৫

পক্ষান্তরে শিরকে আসগারকারী যদিও ফাসিক, তথাপি মুমিন হওয়ার কারণে শারী‘য়াতের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রয়েছে। সে মৃত্যুদন্ড যোগ্য নয় এবং তার সম্পদও বাজেয়াপ্তযোগ্য নয়।

৩। ছোট শিরকের পরিনামঃ

কুরআন ও বিভিন্ন হাদিসে রিয়াকে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক এবং শিরকে খাফি বা লুকায়িত শিরক বলা হয়েছে। শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলতে এমন কাজ ও কথাকে বুঝানো হয়, যা তাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেবে না বটে, তবে তা মাঝে মাঝে সগিরা গুনাহের গন্ডি ছাড়িয়ে কবিরা গুনাহ অপেক্ষাও জঘন্য মনে হবে। সবচেয়ে ভয়ানা হলো- এই গুনাহ থেকে সামান্য কারনে শিরকে আকবর হয়ে যেতে পারে।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقَّرَاتِ الأَعْمَالِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللَّهِ طَالِبًا ‏‏

 হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪৩, আহমাদ : ২৩৮৯৪, সুনানে দারেমী : ২৭২৬, সহীহাহ ৫১৩।

আনাস (রা.) থেকে বলেন, তোমরা এমন সব কাজ করে থাক, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবি ﷺ এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম। সহিহ বুখারি : ৬৪৯২

আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, লোক দেখানোর জন্য আমল করে আল্লাহ তার এই রিয়াকে প্রকাশ করে দেন। যে ব্যক্তি যশ লাভের জন্য আমল করে আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে তা প্রকাশ করে দেন।  ইবনু মাজাহ : ৪২০৬

(১) ছোট শিরক বান্দার আমল বাতিল করে দেয়ঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً

আমি তোমাদের উপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শির্কে আসগর (ছোট শির্ক)। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! শির্কে আসগর কি? তিনি বললেন, রিয়া আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদেরকে (রিয়াকারীদের) বলবেন, যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেয়া হবে, তোমরা তাদের কাছে যাও যাদেরকে তোমরা দুনিয়াতে দেখাতে। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা? সহিহ হাদিসে কুদসি : ০৭ হাদিস বিডি, মুসনাদে আহমদ, পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নম্বর- ৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ : ১০২, হাদিসের মান সহিহ

আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَرَأَيْتَ رَجُلًا غَزَا يَلْتَمِسُ الْأَجْرَ وَالذِّكْرَ، مَالَهُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى

اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، يَقُولُ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا، وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ»

এক ব্যক্তি রাসুলূল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে বললেনঃ ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কি বলেন, যে ব্যক্তি সওয়াব এবং সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? রাসুলূল্লাহ ﷺ বললেনঃ তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন। রাসুলূল্লাহ ﷺ তাকে (একটি কথাই) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তারপর তিনি ﷺ বললেন, আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর জন্য কৃত খাঁটি আমল ব্যতীত, যা দ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। সুনানে আন-নাসায়ী: ৩১৪০, সুনানে বাইহাকি: ৪৩৪৮

(২) ছোট শিরক শয়তানের সাথিঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

আর যারা নিজ ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং ঈমান আনে না আল্লাহর প্রতি এবং না শেষ দিনের প্রতি। আর শয়তান যার সঙ্গী হয়, সঙ্গী হিসেবে কতইনা নিকৃষ্ট সে! সুরা নিসা : ৩৮

(৩) ছোট শিরককারীর আমলের জন্য তাকে আপমান করা হবেঃ

সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জুনদুবকে বলতে শুনেছি নবী ﷺ বলেন। তিনি ছাড়া আমি অন্য কাউকে ’নবী ﷺ বলেন’ এমন বলতে শুনিনি। আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং তাঁকে বলতে শুনলাম। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللهُ بِهِ

যে ব্যাক্তি লোক শোনানো ইবাদত করে আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে লোক শোনানো দিবেন। আর যে ব্যাক্তি লোক-দেখানো ইবাদত করবে আল্লাহ এর বিনিময়ে “লোক দেখানো দিবেন। সহিহ বুখারি : ৬৪৯৯, ৭১৫২, সহিহ মুসলিম :  ২৯৮৬

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِهِ وَمَنْ يُسَمِّعْ يُسَمِّعِ اللَّهُ بِهِ

যে লোক মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তাকে তাই দেখাবেন এবং সুনাম-সুখ্যাতির অন্বেষণের উদ্দেশ্যে যে লোক আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তার আমল প্রচার করে দেবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৬

(৪) ছোট শিরক দাজ্জালের ফিতনা থেকেও ভয়ানকঃ

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন—

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ الْـمَسِيْحَ الدَّجَّالَ، فَقَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِيْ مِنَ الْـمَسِيْحِ الدَّجَّالِ؟ قُلْنَا: بَلَى، قَالَ: الشِّـرْكُ الْـخَفِيُّ؛ أَنْ يَقُوْمَ الرَّجُلُ يُصَلِّيْ، فَيُزَيِّنُ صَلاَتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ الرَّجُلِ

রাসুল ﷺ আমাদের নিকট আসলেন যখন আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু সম্পর্কে সংবাদ দেবো, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ঙ্কর। আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, গোপন শিরক (রিয়া)। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিলো, অতঃপর কেউ তাকে দেখছে বলে সে নামাজকে খুব সুন্দর করে পড়তে শুরু করলো”। সুনানে ইবনু মাজাহ: ৪২০৪, আহমাদ : ১০৮৫৯, মিশকাত : ৫৩৩৩ 

(৫) ছোট শিরক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুঃচিস্তাঃ

শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَتَخَوَّفُ عَلَى أُمَّتِي الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ أَمَا إِنِّي لَسْتُ أَقُولُ يَعْبُدُونَ شَمْسًا وَلاَ قَمَرًا وَلاَ وَثَنًا وَلَكِنْ أَعْمَالاً لِغَيْرِ اللَّهِ وَشَهْوَةً خَفِيَّةً

আমি আমার উম্মাতের জন্য যেসব বিষয়ের ভয় করি তার মধ্যে অধিক আশংকাজনক হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, তারা সূর্য, চন্দ্র বা প্রতিমার পূজা করবে, বরং আল্লাহ ব্যতীত অপরের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা এবং গোপন পাপাচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৫, মসনদে আহমাদ : ১৬৬৭১, ১৬৬৯০

৪। ছোট শিরক সম্পর্কে যে দুটি বিষয় জানা দরকারঃ

(১) গোপন আমল প্রকাশ পেলেও রিয়া হবে নাঃ

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর (রা.) মহানবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদ ও যুদ্ধ সম্বন্ধে বলুন, এর কোনটি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য? তিনি বলেন, হে আবদু্ল্লাহ ইবন ’আমর! যদি তুমি ধৈর্যের সাথে আল্লাহ নিকট হতে পুণ্য লাভের আশায় যুদ্ধ কর তবে আল্লাহ্ তোমাকে গর্বিত ও লোক দেখানোরূপে চিহিৃত করবেন। হে আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর! তুমি যে অবস্থায় যুদ্ধ কর বা মারা যাও তোমাকে সে অবস্থায় তোমার নিয়্যাত অনুযায়ী আল্লাহ্ উত্থিত করবেন। সুনানে আবু দাউদ : ২৫১১

(২) সমালোচনার ভয়ে নেক আমল ছেড়ে দেওয়া যাবে নাঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)

হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় ধর্ম হতে বিচ্যুত হবে, আল্লাহ সত্ত্বরই এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে, তারা মুসলিমদের প্রতি মেহেরবান থাকবে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরওয়া করবেনা। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তা তিনি যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন; বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। সুরা মায়েদা : ৫৪

আবূ মাস’ঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন সাদকার আয়াত অবতীর্ণ হল তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যাক্তি এসে প্রচুর মাল সাদকা করলো। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগল, এ ব্যাক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করেছে, আর এক ব্যাক্তি এসে সা’ পরিমাণ দান করলে তারা বললো, আল্লাহ তো এ ব্যাক্তির এক সা’ থেকে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসংগে অবতীর্ণ হয়, (আল্লাহ বলেন)-

اَلَّذِیۡنَ یَلۡمِزُوۡنَ الۡمُطَّوِّعِیۡنَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ فِی الصَّدَقٰتِ وَالَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ اِلَّا جُہۡدَہُمۡ فَیَسۡخَرُوۡنَ مِنۡہُمۡ ؕ سَخِرَ اللّٰہُ مِنۡہُمۡ ۫ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ

যারা দোষারোপ করে সদাকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাদানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, তাওবা-৭৯। সহিহ বুখারি : ১৪১৫

উবাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে বাইআত হলাম এ মর্মে যে, আমরা শুনবো ও মানবো, সংকটের সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়, খুশীর অবস্থায় ও অপছন্দের অবস্থায় এবং আমাদের উপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দিলেও। আর এ মর্মে যে, আমরা যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব বরণ করে নিতে কোনরূপ কোন্দল করবো না। আর এ মর্মে যে, আমরা যেখানেই থাকবো হক কথা বলব। আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবো না। সহিহ মুসলিম : ১৭০৯

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন এবং তাঁর ভাষণে বলেন, সাবধান! মানুষের ভয় যেন কোন ব্যক্তিকে সজ্ঞানে সত্য কথা বলতে বিরত না রাখে। রাবী বলেন আবূ সাঈদ (রা.) কেঁদে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা বহু কিছু লক্ষ্য করেছি কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০০৭, সুনানে তিরমিযী : ২১৯১, সহীহাহ : ১৬৮

মুমিনের অন্যতাম বৈশিষ্ট হলো, মহান আল্লাহর আনুগত্য ও হুকুম পালনের ক্ষেত্রে কোন কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় বা পরোয়া করবে না। আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা আল্লাহর হুকুম মত জীবন চালাত চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারের মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা নেই বলে তারা আমল ছেড়ে দেয়। অনেক যুবক আছে তারা দাড়ি রাখতে চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে দাড়ি রাখছে না।

৫। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক চেনায় উপায়ঃ

(১) যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে, যতক্ষণ না সেগুলো বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে সেগুলো শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

(২) আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কাজ যদি বান্দা কোন মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছায় করে তবে সেই আমল শিরকে আসগার বা ছোট শিরক  বলে বিবেচিত হবে।

(৩) আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমপরিমাণ মর্যাদা না হওয়া পর্যান্ত শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে। (সমপরিমাণ মর্যাদা দিলে বড় শিরক হবে)।

(৪) আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

৬। ছোট শিরক সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকে

মুমিন বান্দা মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টির জন্য আমল করবে এটাই সাভাবিক। কিন্তু তার আমল করা সময় তার কুপ্রবৃত্তি বার বার দুয়িয়ার লোভ দেখিয়ে গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদত করতে উদভূদ্ধ করে থাকে। সে যখনই আমল করার নিয়ত করে, তখনই তাকে ধোকা দেয়। আবার কখনো শুরুতে ধোকা দিতে ব্যর্থ হলে আমলের মাঝে বা শেষেও ধোকা দিতে চেষ্টা করে। এ সকল বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় ছোট শিরক সাধারনত তিনটি সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সম্পাদিত হয়।

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

কোন আমল শুরু করার পূর্বে মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার কোন ইচ্ছাই তার নেই, তবে সে মুনাফিক। কারন সকলে জানবে, সে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করছে অথচ সে গাইরুল্লারকে সন্তষ্টি করছে। নবী ﷺ এর জামানায় মুমিনেরা বিপুল উৎসাহ আগ্রহ নিয়ে মসজিদে আসতো, জামায়াতের সময়ের পূর্বেই মসজিদে পৌঁছে যেতো এবং নামায শেষ হবার পরও মসজিদে বসে থাকতো। কোন ব্যক্তি নিয়মিত নামায না পড়ে মুসলমানদের দলের অন্তরভুক্ত হতে পারতো। তাই বড় বড় কট্টর মুনাফিকদেরও সে যুগে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে হাযিরা দিতে হতো। অপর পক্ষে মুনাফিকেরা অনিচ্ছায় স্বত্বেও নেহাত দায়ে ঠেকে লোক দেখাতে মসজিদে আসত। এই মুনাফিকরা আল্লাহর এবং তার রসুলের (সা:) সাথে ধোঁকাবাজি করছে এবং নিছক লোক দেখাবার জন্য সালাত আদায় করছে। আমল  শুরু পূর্বেই লোক দেখাবার পাক্কা নিয়ত। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬ (١٤٢)

এই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করছে৷ অথচ আল্লাহই তাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখে দিয়েছেন৷ তারা যখন নামাযের জন্য ওঠে, আড়মোড়া ভাংতে ভাংতে শৈথিল্য সহকারে নিছক লোক দেখাবার জন্য ওঠে এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে৷ সুরা নিসা : ১৪২

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

ইবাদাত করাকালীন বা চলাকালীন মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কেউ তা দেখে ফেললে বা অবহিত হয়ে গেলে তাতে আনন্দিত ও উল্লাসিত হয়ে লোক দেখানোর জন্য ইবাদাতকে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করলে আমল মাঝে রিয়া প্রবেশ করে। আমল শুরুর প্রাথমিক নিয়ত ভাল ছিল কিন্তু আমলের মাঝেই লোক দেখানোর (রিয়া) ইচ্ছা পোষন করে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি বাতিল হয়ে যাবে। কারন সে পরবর্তীতে তার আমল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করতে শুরু করেছে।

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

এখানে তিনটি সুরত আছে:

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করলে আমল বাতিল হবে না।

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানীর জন্য গরু ক্রয় করল। এমতাবস্থায় গরুর প্রতি নজর দিয়ে সে ভাবল খুব রড় গরু লোকে ভাল বলবে আবার মাংশও বেশী পাব অর্থাৎ তার অন্তরে রিয়ার উদ্রেক হলো। সাথে সাথে সে তার অন্তর থেকে এই কুমন্ত্রণা ও কুমনোভাব দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করল। এবং এক মাত্র আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য কুরবানী  সম্পন্ন করল, তাহলে এই রিয়া তার ‘আমালে কোন প্রভাব ফেলবে না এবং আল্লাহ চাহেতো তার এই  কুরবানী বাতিল হবে না।

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান না করলে আমল বাতিল হবে।

যদি সে ব্যক্তি তার অন্তরের এই কুমন্ত্রণা দূর করার এবং ‘আমালকে রিয়ামুক্ত করার চেষ্টা না করে, বরং রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য অন্তরে পোষণ করেই আমাল সম্পন্ন করে থাকে, তাহলে তার এই ‘আমাল সম্পূর্ণ বাতিল ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। নিছুক লোক দেখাবার জন্য সে যেসব কাজ করে সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে আল্লাহ মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের কাজের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

আল্লাহ এই উপমায় প্রবল বর্ষণ বলতে বান্দা নিয়ত আর মাটির দ্বারা তার দান খয়রাতকে বুঝানো হয়েছে। প্রবল বর্ষণের ফলে সমস্ত মাটি ধুয়ে গেলো অর্থাৎ লোক দেখাবার জন্য সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে গেল। 

গ। উভয় অংশের আলাদা আলাদা নেকি/গুনাহ থাকবে।

আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির উদ্দেশে কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় ‘আমালটির  যদি এমন হয় যে, তার এক অংশ অপর অংশের উপর নির্ভরশীল নয় বরং তার প্রতিটি অংশ পৃথক পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাহলে সেই আমাল সে অংশটুকু রিয়া মিশ্রিত হবে, শুধুমাত্র সে অংশটুকু বাত্বিল হয়ে যাবে, তবে তার সম্পূর্ণ ‘আমাল বাত্বিল হবে না। যেমন-

কোন ব্যক্তি একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কিছু  টাকা মসজিদে দান করার নিয়তে বাড়ি থেকে মসজিদে জুমার সালাতে হাজির হল। মসজিদে এসে কিছু টাকা দানও করল, ইতোমধ্যে ইমাম সাহেবের খুতবা শুনে অনেক মুসল্লী দান করা শুরু করলো। অনেক মুসল্লীকে ইমাম সাহেব বাহবা দিচ্ছে এবং তার প্রশংসা করছে। তখন সে আরো বেশি বাহবা ও প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে বা লোক দেখানোর জন্য আবার দান করল। এমতাবস্থায় তার দানকৃত প্রথম টাকা আল্লাহ্‌র নিকট গৃহীত হবে এবং পরবর্তীতে দানকৃত টাকা রিয়ার কারনে আল্লাহ্‌র নিকট বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য হবে।

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

শিরকে আসগার বা ছোট শিরকের সাধারনত ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের দ্বারা  সঙ্গটিত হয়। আমল শেষ করার পর ইচ্ছা, সংকল্প বা নিয়্যাত করার আর কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না। তাই আমল শেষ করার পর রিয়া অনুভুত হওয়া শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র এতে আমলকারীর আমলেন উপর কোন প্রভাব পরবেনা। আল্লাহ্‌র জন্যে পূর্ণ নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে কোন আমাল আরম্ভ ও সম্পন্ন করার পর অন্তরে রিয়ার উদ্ভব হওয়া আর না হওয়া সমান কথা। যেমন-

অনেক সময় লোকজনের মুখে নিজের আমাল সম্পর্কে প্রশংসা শুনে নীরবে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ হয়। যদিও এটা রিয়া কিন্তু এ জাতীয় রিয়া, সম্পাদিত সেই আমালের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা এবং এর দ্বারা আমল বাতিল বা বিনষ্ট হবে না। কেননা তা আমল সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকাশ পেয়েছে। এ সম্পর্কে একটি হাদিস হলো-

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

প্রশংসা শুনে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ করা করা ঠিক নয় বরং ইহার পরিবর্তে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ কারন তিনিই তো আমাকে আমল করার সুযোগ দিয়েছেন।

আল কুরআনের পথ:

আল কুরআনের পথ: আলোর সন্ধানে একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক যাত্রা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

(পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি)

যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির দিশারি, আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর।

ভূমিকা: হৃদয়ের স্পন্দন ও একটি স্বপ্নের শুরু

“আল কুরআনের পথ”—এটি কেবল একটি ওয়েবসাইটের নাম নয়, বরং এটি একটি আদর্শ, একটি জীবনদর্শন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফেরার এক নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম। তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে যখন পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়, তখন সত্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি মিথ্যার গোলকধাঁধায় পথ হারানোও খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানকে আধুনিক মানুষের ভাষায়, সহজবোধ্য আঙ্গিকে এবং যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনায় তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

আমরা বিশ্বাস করি, মানবজীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে আল-কুরআনের পরশপাথরে। সেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এবং তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।

________________________________________

আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Our Mission & Vision)

১. দ্বীন প্রচার ও তাত্ত্বিক আলোচনা: আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ইসলামের মৌলিক আকিদা, ইবাদত, আখলাক এবং সমকালীন জীবনব্যবস্থার সাথে ইসলামের সামঞ্জস্য নিয়ে গঠনমূলক লেখালেখি করা। ইন্টারনেটের এই বিশাল প্রান্তরে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। “আল কুরআনের পথ” চেষ্টা করবে নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সলফে সালেহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিশুদ্ধ দ্বীনি জ্ঞান প্রচার করতে।

২. জ্ঞান ও লেখনীর সেতুবন্ধন: একজন লেখক হিসেবে আমার বিশ্বাস—কালি আর কলম হলো মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। আমার লিখিত বইগুলোর মাধ্যমে আমি পাঠকদের অন্তরে ইমানের নূর জ্বালিয়ে দিতে চাই। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আপনি সরাসরি আমার প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, প্রবন্ধ এবং গবেষণামূলক কাজগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারবেন।

৩. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: আমাদের সমাজে যখন অপসংস্কৃতি আর অনৈতিকতার জোয়ার বইছে, তখন সুস্থ বিনোদন এবং নৈতিক শিক্ষা সম্বলিত বই ও কনটেন্ট মানুষের হাতে তুলে দেওয়া সময়ের দাবি। আমরা চাই প্রতিটি পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠুক, বিশেষ করে সেই বই যা মানুষকে তার রবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

লেখকের কথা: কলমের শক্তি ও দায়বদ্ধতা

আমি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামি সাহিত্য, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের ওপর কাজ করার চেষ্টা করছি। লেখালেখি আমার কাছে কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের একটি মাধ্যম। আমার বইগুলোতে আমি চেষ্টা করেছি—

•      কুরআন ও সুন্নাহর গভীর তত্ত্বকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে।

•      যুগজিজ্ঞাসার আলোকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে।

•      পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের নৈতিক অবক্ষয় রোধে ইসলামের বিধানগুলো তুলে ধরতে।

এই ওয়েবসাইটের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে আমার বইগুলোর পরিচিতি। আপনি চাইলেই এখান থেকে সরাসরি আপনার পছন্দের বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রতিটি বইয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রম এবং গবেষণার ছাপ। আশা করি, এই বইগুলো আপনার জীবনকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

সেবা ও পণ্য: হালাল রিযিক ও স্বচ্ছতা

ইসলাম আমাদের কেবল ইবাদতের শিক্ষা দেয় না, বরং হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহের নির্দেশও দেয়। “আল কুরআনের পথ” ওয়েবসাইটটি যেমন একটি দাওয়াতি প্ল্যাটফর্ম, তেমনি এটি একটি আস্থার বিপণি কেন্দ্রও হতে পারে।

বই বিক্রয় কেন্দ্র: এখানে আমার নিজের লেখা বইগুলো আপনি সরাসরি কিনতে পারবেন। আমরা চেষ্টা করব খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পাঠকদের হাতে বই পৌঁছে দিতে।

লোকাল প্রডাক্ট ও উদ্যোগ: ভবিষ্যতে আমরা স্থানীয় ও বিশুদ্ধ কিছু পণ্য (যেমন: ভালো মানের মধু, কালোজিরা তেল বা ইসলামিক লাইফস্টাইল পণ্য) আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো—ক্রেতা যেন ঘরে বসে নিশ্চিন্তে বিষমুক্ত এবং মানসম্মত পণ্য পেতে পারেন। ব্যবসার ক্ষেত্রেও আমরা “আল কুরআনের পথ” বা ইসলামের ইনসাফপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কেন “আল কুরআনের পথ” অন্য সবার চেয়ে আলাদা?

আপনারা হয়তো ভাবছেন, ইন্টারনেটে তো অনেক ওয়েবসাইট আছে, তাহলে আমাদের বিশেষত্ব কী? আমাদের মূল শক্তি হলো আস্থা ও নির্ভরতা।

•      নির্ভরযোগ্য তথ্য: আমরা প্রতিটি তথ্য কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহী কিতাবের আলোকে যাচাই করে প্রচার করি।

•      ব্যক্তিগত সংযোগ: এখানে আপনি সরাসরি লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমরা তা সাদরে গ্রহণ করি।

•      সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা: যেহেতু আমরা জানি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিকাশ বা নগদে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাই আমাদের ওয়েবসাইটে আপনি খুব সহজেই পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন।

আগামীর পথচলা: আপনার অংশগ্রহণ কাম্য

একটি মহৎ উদ্দেশ্য সফল করতে হলে একা চলা সম্ভব নয়। আপনাদের দোয়া, সমর্থন এবং অংশগ্রহণ আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

•      পাঠক হিসেবে: আমাদের লেখাগুলো পড়ুন, গঠনমূলক সমালোচনা করুন এবং ভালো লাগলে অন্যের সাথে শেয়ার করে দ্বীন প্রচারে শরিক হোন।

•      ক্রেতা হিসেবে: আমাদের বই বা পণ্য ক্রয় করে একটি সুস্থ ধারার উদ্যোগকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করুন।

•      শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে: আমাদের জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মেহনতকে কবুল করেন এবং রিয়া বা লোকদেখানো আমল থেকে আমাদের অন্তরকে পবিত্র রাখেন।

উপসংহার

পরিশেষে, “আল কুরআনের পথ” ওয়েবসাইটটি আপনার আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি মাধ্যম হয়ে উঠুক—এটাই আমার প্রার্থনা। আমরা কোনো দল বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ প্রচারণায় বিশ্বাসী নই, বরং উম্মাহর ঐক্য এবং সার্বজনীন ইসলামের সৌন্দর্যে বিশ্বাসী।

আসুন, আমরা সবাই মিলে কুরআনের আলোয় নিজেদের জীবনকে রাঙিয়ে তুলি। সত্যের এই মিছিলে আপনিও হোন আমাদের সফরসঙ্গী।

আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

বিনীত, ইসরাফিল হোসাইন প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক,

আল কুরআনের পথ www.mdisrafilhossain.com

You may be interested in…

আল কুরআনের পথ:

Your cart is currently empty!

Browse store


New in store