মৃত্যুর ব্যক্তির ভালো ও খারাপ আলামতসমূহ
লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১। ভালো মৃত্যুর আলামত
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ۟ ثُمَّ اِلَیۡنَا تُرۡجَعُوۡنَ
প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুরা আনকাবুত : ৫৭
মৃত্যুর মুহুর্তটি একজন মানুষের জন্য স্পর্শকাতর। শেষ ভালো যার, সবভালো তার। যদি কেউ জীবনের শেষ মুহুর্তে ঈমান ও বিশ্বাসের সাথে মৃত্যু বরণ করেত পারে তবে সে সফলকাম হয়ে পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করবে। এই শেষ মুহুর্তটিতে আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করে যেতে পারে একজন মুমিনের জন্য সৌভাগ্যের। মৃত্যুর সময় যিনি আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ উদ্রেককারী গুনাহ হতে বিরত থাকতে পারবেন এবং পাপ থেকে তওবা করতে পারবেন, নেকীর কাজ ও ভাল কাজ বেশি বেশি করার তাওফিক পাবেন। তিনি সন্তোষজনক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলে ধরা হবে। এবং এই অবস্থায় মারা গেলে তা ভালো মৃত্যুর আলামত বলে বিবেচিত। ভাল মৃত্যুর আলামত অনেক তবে নির্দিষ্ট নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিস আলোকে ভালো মৃত্যুর কিছু আলমত খুঁজে পাঠকদের সামতে তুল ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহই উত্তম তৌফিক দাতা।
১। মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ পাঠ করতে পারা
মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
যার সর্বশেষ বাক্য হবে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩১১৬
২. মৃত্যুর সময় কপালে ঘাম বের হওয়া।
বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الْمُؤْمِنُ يَمُوتُ بِعَرَقِ الْجَبِينِ
কপালের ঘামসহ মু’মিন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৫২, সুনানে তিরমিজি : ৯৮২, সুনানে নাসায়ী : ১৮২৮, আহমাদ : ২২৫১৩, মিশকাত : ১৬১০
৩। জুমার রাতে বা দিনে মৃত্যুবরণ করা
আদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلاَّ وَقَاهُ اللَّهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ
জুমুআর দিনে অথবা জুমুআর রাতে কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরের ফিতনা হতে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। সুনানে তিরমিজি : ১০৭৪, মিশকাত : ১৩৬৭
৪। প্লেগ বা মহামারীতে মৃত্যু বরণ করা
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন
الطَّاعُونُ شَهَادَةٌ لِكُلِّ مُسْلِمٍ
মহামারীতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। সহিহ বুখারি : ২৮৩০, ৫৭৩২, সহিহ মুসলিম : ১৯১৬, আহমাদ : ১২৫২১
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বললেন, তা একটি আযাব। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা করেন তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। আর আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দাগণের উপর তা রহমত করে দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি যখন প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ্ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে তাহলে সে একজন শহীদের সমান সওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ৩৪৭৪
৫। আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٲتَۢاۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ عِندَ رَبِّهِمۡ يُرۡزَقُونَ (١٦٩) فَرِحِينَ بِمَآ ءَاتَٮٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ وَيَسۡتَبۡشِرُونَ بِٱلَّذِينَ لَمۡ يَلۡحَقُواْ بِہِم مِّنۡ خَلۡفِهِمۡ أَلَّا خَوۡفٌ عَلَيۡہِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ (١٧٠)
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনও মৃত মনে করনা; বরং তারা জীবিত, তারা তাদের রাব্ব হতে জীবিকা প্রাপ্ত। আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন, তাতে তারা খুশি। আর তারা উৎফুল¬ হয়, পরবর্তীদের থেকে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের বিষয়ে। এজন্য যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। সূরা আ ইমরান : ১৬৯-১৭১
৬। নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি-
مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। সহিহ বুখারি : ২৪৮০
সাঈদ ইবনু যাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-
مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ
যে লোক নিজের ধনমাল রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক নিজের দীনকে হিফাযাত করতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ। যে লোক নিজের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদ। যে লোক তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে মারা যায় সেও শহীদ। সুনানে তিরমিজি : ১৪২১
৭। সীমান্ত প্রহরা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে
সালমান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-
رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ
একটি দিবস ও একটি রাতের সীমান্ত প্রহরা একমাস সিয়াম পালন এবং ইবাদাতে রাত জাগার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আর যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে, তাতে তার এ আমলের সাওয়াব জারী থাকবে যে আমল সে করত এবং তার (শহীদসুলভ) রিযক অব্যাহত রাখা হবে এবং সে ব্যক্তি ফিৎনাসমূহ থেকে নিরাপদে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ১৯১৩
৮। শহীদের মর্যাদায় মৃত্যুবরণ করা।
আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ব্যক্তি পথ চলাকালে একটি কাটাযুক্ত গাছের ডাল রাস্তায় পেয়ে তা সরিয়ে দিল, তখন আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিদানে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি আরও বললেন, শহীদ পাঁচ প্রকারঃ (১) প্লেগগ্রস্ত, (২) উদরাময়গ্রস্ত, (৩) ডুবন্ত, (৪) কোন কিছু চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং (৫) আল্লাহর পথে শহীদ। সহিহ মুসলিম : ১৯১৪
জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। (১) আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, (২) মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, (৩) যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ, (৪) পানিতে ডুবে, (৫) আগুনে পুড়ে ও (৬) ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৮৪৬, ৩১৯৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩১১১, আহমাদ : ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫২।
উপরের হাদিস দ্বারা বোঝা যায় ভালো মৃত্যুর অন্যতম কারণ শহিদী মৃত্যু। আল্লাহর পথে, প্লেগগ্রস্ত, উদরাময়গ্রস্ত, কোন কিছু চাপা পড়ে, মহামারীতে, গর্ভাবস্থায়, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে ও ক্ষয়রোগে মৃত্যু বরণকারী শহীদের মর্যাদা পাবেন। এক কথায় বলতে পারি, ভালো বা শহীদি মৃত্যুর অন্যতম কারণসমূহ হলো-
১. প্লেগ রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ
২. পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ
৩. পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি শহীদ
৪. প্রাচীর চাপায় মৃত ব্যক্তি শহীদ
৫. আভ্যন্তরীণ বিষ ফোঁড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ
৬. আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি শহীদ
৭. প্রসবকালে মৃত রমনী শহীদ।
৮. মহামারীতে মৃত ব্যক্তি শহীদ ও
৯. ক্ষয়রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ
এই আলামতগুলো ব্যক্তির ভাল মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে এ নিশ্চয়তা দিব না যে, তিনি জান্নাতি। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন তারা ছাড়া। যেমন চার খলিফার ব্যাপারে তিনি নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে ভাল মৃত্যু দান করুন।
খারাপ মৃত্যুর আলামতঃ
উপরের আলোচনায় দেখেছি ভালো মৃত্যুর কিছু আলামত আছে। তেমনিভাবে খারাপ মৃত্যুরও কিছু আলামত কুরআন সুন্নাহে আছে। নিন্মে খারাপ মৃত্যুর আলামতসমূহ তুলে ধরা হলো-
১। ঈমান থাকার পরও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলন-
وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ
তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর সাথে শরীক করে। সুরা ইউসুফ : ১০৬
মহান আল্লাহ প্রতি ঈমান আছে কিন্তু এর সাথে তার সাথে শরীক রকে থাকে। যার ফলে ঐ ঈমানদার মুশরিকে পরিনত নয়। আর মহান আল্লাহ মুশরিক চিরস্থায়ী জান্নাহ নামে প্রবেশ করবে। ঈমানের সাথে কোন আবস্থায় শিরকি কর্ম অনুমিত নয়। শিরকি কাজ হওয়া সাথে সাথে তওবা করে ইসলামে ফিরে আসতে হবে। নথুবা চিরস্থানী জাহান্নামে থাকতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ
আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬
মুআবিয়াহ বিন হায়দাহ বিন মুআবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ
কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।
একজন মুসলিম দাবিদার মাজারে সিজদা করে, মাজারে মৃত অলির অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে, বিপদ আপদে তাকে আহবান করে। এই হলো ঈমানের দাবিদার মুশরিক। এই অবস্থায় তওবা ছাড়া মৃত্যু বরণ জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হবে।
২। মৃত্যু আসার পূর্বে দান না করে যাওয়া
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলন-
وَاَنۡفِقُوۡا مِنۡ مَّا رَزَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ اَحَدَکُمُ الۡمَوۡتُ فَیَقُوۡلَ رَبِّ لَوۡلَاۤ اَخَّرۡتَنِیۡۤ اِلٰۤی اَجَلٍ قَرِیۡبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَاَکُنۡ مِّنَ الصّٰلِحِیۡنَ
আমি তোমাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তোমরা তা হতে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার পূর্বে; অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রাব্ব! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। সুরা মুনাফিকুন : ১০
৩। সময় সুযোগ থাকা সত্বেও নেক আমল না কে মৃত্যু বরণ করা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
وَہُمۡ یَصۡطَرِخُوۡنَ فِیۡہَا ۚ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا نَعۡمَلۡ صَالِحًا غَیۡرَ الَّذِیۡ کُنَّا نَعۡمَلُ ؕ اَوَلَمۡ نُعَمِّرۡکُمۡ مَّا یَتَذَکَّرُ فِیۡہِ مَنۡ تَذَکَّرَ وَجَآءَکُمُ النَّذِیۡرُ ؕ فَذُوۡقُوۡا فَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ نَّصِیۡرٍ
আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করে দিন, আমরা পূর্বে যে আমল করতাম, তার পরিবর্তে আমরা নেক আমল করব’। (আল্লাহ বলবেন) ‘আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি যে, তখন কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাজে তো সতর্ককারী এসেছিল। কাজেই তোমরা আযাব আস্বাদন কর, আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা ফাতির : ৩৭
৪। আত্নহত্যার করে মৃত্যুবরণ করা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا
হে মু’মিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পদ গ্রাস করনা; কেবলমাত্র পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা কর তা বৈধ এবং তোমরা নিজেদের হত্যা করনা; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল। সুরা নিসা : ২৯
জুন্দাব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী ﷺ ইরশাদ করেন-
كَانَ بِرَجُلٍ جِرَاحٌ فَقَتَلَ نَفْسَهُ، فَقَالَ اللهُ: بَدَرَنِيْ عَبْدِيْ بِنَفْسِهِ، حَرَّمْتُ عَلَيْهِ الْـجَنَّةَ.
জনৈক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলে সে তার ক্ষতগুলোর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলো। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বললেন: আমার বান্দাহ্ স্বীয় জান কবযের ব্যাপারে তড়িঘড়ি করেছে অতএব আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম’’। সহিহ বুখারী : ১৩৬৪
সাবিত বিন জাহহক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী ﷺ ইরশাদ করেন-
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ فِيْ الدُّنْيَا عَذَّبَهُ اللهُ بِهِ فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ.
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন বস্ত্ত দিয়ে আত্মহত্যা করলো আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে সে বস্ত্ত দিয়েই শাস্তি দিবেন। সহিহ বুখারি : ১৩৬৩, ৬০৪৭, ৬১০৫, ৬৬৫২, সহিহ মুসলিম : ১১০
৫। নেশা করতে করতে মারা যাওয়া
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ لَمْ يَتُبْ مِنْهَا حُرِمَهَا فِي الآخِرَةِ.
যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করেছে অতঃপর তাত্থেকে তওবা করেনি, সে আখিরাতে তাত্থেকে বঞ্চিত থাকবে। সহিহ বুখারি : ৫৫৭৫, সহহি মুসলিম : ২০০৩, আহমাদ : ৪৬৯০
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لاَ يَزْنِيْ الزَّانِيْ حِيْنَ يَزْنِيْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلا يَشْرَبُ الْـخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ؛ وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيْهَا أَبْصَارَهُمْ حِيْنَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوْضَةٌ بَعْدُ
ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। লুটেরা যখন মানব জনসম্মুখে লুট করে তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তাওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়”। স হিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০; সহিহ মুসলিম : ৫৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৮৯, সুনানে ইবন মাজাহ, : ৪০০৭
৬। পিতা মাতার অসন্ত্বষ্ট থাকা অবস্থানয় মৃত্যুবরণ করা
সাথে খারাপ আচার-আচরণত অবস্থায় অথবা পিতা মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোনো সন্তানের মৃত্যু,
যে কোনো পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র ঈমানের প্রশ্ন ব্যতিত বাবা মায়ের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। এমনকি ঈমানের প্রশ্নেও বাবা মায়ের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। শুধুমাত্র তারা যদি শিরকের দিকে ডাকে তাহলে সে ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَاِنۡ جَاہَدٰکَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِکَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡہُمَا وَصَاحِبۡہُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا ۫ وَّاتَّبِعۡ سَبِیۡلَ مَنۡ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرۡجِعُکُمۡ فَاُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে। সুরা লোকমান : ১৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُوا إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلاَ تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا- وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا- رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِنْ تَكُونُوا صَالِحِينَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا-
আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন’। সুরা ইসরা : ২৩-২৫
৭। স্বামীকে নারাজ অবস্থায় রেখে স্ত্রীর মৃত্যুবরণ করা
আবূ বকর বিন আবূ শায়বাহ-মুহাম্মাদ বিন ফুযাইল, আবূ নাসর আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান-মুসাবির হিমইয়ারী মাতা বলেন, আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتْ الْجَنَّةَ
স্বামী খুশী থাকা অবস্থায় কোন স্ত্রীলোক মারা গেলে সে জান্নাতী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৪, সুনানে তিরমিজি : ১১৬১
আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯, ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩, সুনানে আবু দাউদ : ২১৪০, দারিমী :১৫০৪
৮। সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যুবরণ করা।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক সাহাবী একটি জানাযার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাঁরা তার প্রশংসা করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওয়াজিব হয়ে গেল। একটু পরে অপর একটি জানাযা অতিক্রম করলেন। তখন তাঁরা তার নিন্দাসূচক মন্তব্য করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেলে। তখন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) আরয করলেন, (হে আল্লাহর রাসূল!) কি ওয়াজিব হয়ে গেল? তিনি বললেনঃ এ (প্রথম) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা উত্তম মন্তব্য করলে, তাই তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল। আর এ (দ্বিতীয়) ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা নিন্দাসূচক মন্তব্য করায় তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেল। তোমরা তো পৃথিবীতে আল্লাহ্র সাক্ষী। সহিহ বুখারি : ১৩৬৭, ২৬৪২, সহিহ মুসলিম : ৯৪৯, আহমাদ : ১২৯৩৭
সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যুবরণ করার অর্থ হলো, তার আচার আচরণে মানুষ কষ্ট পেয়েছে। তার কারণে সমাজের মানুষ জুলুমের স্বীকার হয়েছেন। এই ধরণের মানুষ মারা গেলে সাথে সাথে সমাজের মানুষ হাব ছেড়ে বেঁচে যায়। উপরের সহিহ হাদিসটি দেখুন, যদি মানুষ তার ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে তার মৃত্যুর পর নিন্দা করলে তার জান্নাম অবধারিত। কাজেউ মরার আগেই মানুষকে ভালো ব্যবহার দ্বারা খুশি রাখতে হবে। সমাজের মানুষকে অসন্ত্বষ্ট রেখে মৃত্যু বরণকারী জাহান্নামি।