কুরআনের সুরা ও আয়াত কেন্দ্রিক ফজিলত

কুরআনের সুরা ও আয়াত কেন্দ্রিক ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ কুরআনুল কারিম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত যার প্রতিটি শব্দ এবং আয়াতের মধ্যে রয়েছে অসীম ফজিলত ও বরকত। সম্পুর্ন কুরআনই ফজিলতপূর্ণ তারপরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ বিশেষ কিছু সুরা বা আয়াতে বিশেষভাবে ফজিলতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সুরাগুলো শুধু তিলাওয়াত করে হাদিসে বর্ণিত ফজিলত লাভ করা যায় বিধায় সম্পূর্ণ কুরআন পাশাপাশি ঐ আয়াত বা সুরাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। যেমন সূরা ফাতিহাকে কুরআনের ‘উম্মুল কিতাব’ বলা হয়েছে, সূরা বাকারা ও আয়াতুল কুরসি আমাদের রক্ষাকবচ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এসব সুরা ও আয়াত শুধু ফজিলতপূর্ণ আমল নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। নিম্মের লেখায় আমরা সেসব বিশেষ সুরা ও আয়াতের ফজিলত সম্পর্কে আলোকপাত করব,

সেগুলো ভালোভাবে শিক্ষা করে নিয়মিত বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে, সহিহ হাসিসে বর্ণিত কয়েকটি সুরা ও আয়াতের ফজিলত আলোচনা করা হল।

০১। সূরা ফাতিহার ফজিলত ও মহাত্ব

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أُمُّ الْقُرْآنِ هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِيْ وَالْقُرْآنُ الْعَظِيْمُ

উম্মুল কুরআন (সূরাহ ফাতিহা) হচ্ছে বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহা কুরআন। সহিহ বুখারি : ৪৭০৪

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার উবাই ইবনু কাবকে জিজ্ঞেস করলেন-

«كَيْفَ تَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ؟» فَقَرَأَ أُمَّ الْقُرْآنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أنزلت فِي التَّوْرَاة وَلَا فِي الْإِنْجِيل وَلَا فِي الزبُور وَلَا فِي الْفرْقَان مِثْلُهَا وَإِنَّهَا سَبْعٌ مِنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُعْطِيتُهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَرَوَى الدَّارِمِيُّ مِنْ قَوْلِهِ: «مَا أُنْزِلَتْ» وَلَمْ يَذْكُرْ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ

তুমি সালাতে কিভাবে কুরআন পড়ো? উত্তরে উবাই ইবনু কাব রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সূরা আল ফাতিহা পড়ে শুনালেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! এর মতো কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর বা ফুরকান-এ নাযিল হয়নি। এ সূরা হলো সাবউল মাসানী (পুনরাবৃত্ত সাতটি আয়াত) ও মহান কুরআন। এটি আমাকেই দেয়া হয়েছে। সুনানে তিরমিজি : ২৮৭৫, মিশকাত : ২১৪২, সুনানে দারিমী : ৩৪১৬।

আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে, কোন এক সফরে সুরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করার ফলে একজন সাপে কাটা রোগীকে সুস্থ হয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০০৭ হাদিসটি দীর্ঘ বিধায় উল্লেখ করলাম না।

আবূ সা’ঈদ ইবনু মু’আল্লা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা মসজিদে নাববীতে সালাত আদায় করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকেন। কিন্তু ডাকে আমি সাড়া দেইনি। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ কি বলেননি যে, ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা সাড়া দেবে আল্লাহ্ ও রাসূলের ডাকে, যখন তিনি তোমাদেরকে ডাক দেন। সূরাহ আনফাল-২৪। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই তোমাকে আমি কুরআনের এক অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিব। তারপর তিনি আমার হাত ধরেন। এরপর যখন তিনি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করেন তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি বলেননি যে আমাকে কুরআনের অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিবেন? তিনি বললেন, الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ -সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, এটা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন যা কেবল আমাকেই দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৪, ৪৬৪৭, ৪৭০৩, ৫০০৬,  সুনানে নাসায়ী ৯১৩, সুনানে আবূ দাউদ ১৪৫৮, আহমাদ ১৫৩০৩, ১৭৩৯৫, দারেমী ১৪৯২, ৩৩৭১,

সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ সাথে কথোপকথোন-

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সালাত আদায় করল অথচ তাতে উন্মুল কুরআন (সূরাহ ফা-তিহাহ্) পাঠ করেনি তার সালাত ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেল, পূর্ণাঙ্গ হল না। এ কথাটা তিনবার বলেছেন। আবূ হুরাইরাহ (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হল, আমরা যখন ইমামের পিছনে সালাত আদায় করব তখন কী করব? তিনি বললেন, তোমরা চুপে চুপে তা পড়ে নাও। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ বলেছেন, আমার এবং আমার বান্দার মাঝে আমি সালাতকে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিয়েছি এবং আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়।

বান্দা যখন বলে-  الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য),

আল্লাহ তা’আলা তখন বলেন- আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।

সে যখন বলে- الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ‏ (তিনি অতিশয় দয়ালু এবং করুণাময়)।

আল্লাহ তা’আলা বলেন- বান্দা আমার প্রশংসা করেছে, গুণগান করেছে।

সে যখন বলে- مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (তিনি বিচার দিনের মালিক)।

তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে আল্লাহ আরো বলেন, বান্দা তার সমস্ত কাজ আমার উপর সমর্পণ করেছে।

সে যখন বলে, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি)।

তখন আল্লাহ বলেন- এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। (এখন) আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়।

যখন সে বলে-اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ (আমাদের সরল-সঠিক পথে পরিচালনা করুন। যেসব লোকদের আপনি নি’আমাত দান করেছেন, তাদের পথে নয় যাদের প্রতি আপনার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

তখন আল্লাহ বলেন-এসবই আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে রয়েছে সে যা চায়।

সহিহ মুসলিম : ৩৯৫, সুনানে তিরমিযী ২৯৫৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮৪, সুনানে নাসায়ী ৯০৯, আহমাদ ৭২৪৯, ৭৭৭৭, ৯৬১৬, মুয়াত্তা মালেক : ১৮৯,

২। সূরা বাকারার ফজিলকত –

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

“لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَفِرُّ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ”

“তোমরা তোমাদের ঘর-বাড়িগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা হয়, সেই ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। সহিহ মুসলিম ৭৮০, সুনানে তিরমিজ : ২৮৭৭

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ سِنَامًا وَسِنَامُ الْقُرْآنِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ

অবশ্যই প্রত্যেক বস্তুরই চূড়া আছে; আর কুরআনের চূড়া হল সূরা বাক্বারাহ। হাদিস সম্ভার : ১৪৫৯, হাকেম : ২০৬০, সিলসিলাহ সহীহাহ : ৫৮৮

৩। আয়াতুল কুরসী পড়ার ফযীলত

আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيّ دُبُرَ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُوْلِ الْجنَّة إِلَّا أَنْ يَمُوتَ

যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের পশ্চাতে ’আয়াতুল কুরসী’ পাঠ করবে, সে ব্যক্তির জন্য তার মৃত্যু ছাড়া আর অন্য কিছু জান্নাত প্রবেশের পথে বাধা হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৪৬৩, নাসাঈ কুবরা : ৯৯২৮, ত্বাবারানী : ৭৫৩২, সহীহুল জামে : ৬৪৬৪

উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আবূল মুনযিরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে আবূল মুনযির আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? আবূল মুনযির বলেন, জবাবে আমি বললামঃ এ বিষয়ে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলই সর্বাধিক অবগত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেনঃ হে আবূল মুনযির! আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? তখন আমি বললাম, اللَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ (এ আয়াতটি আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ)। এ কথা শুনে তিনি আমার বুকের উপর হাত মেরে বললেন, হে আবূল মুনযির! তোমার জ্ঞানকে স্বাগতম। সহিহ মুসলিম : ৮১০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমাযানের যাকাত হিফাযত করার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এক ব্যক্তি এসে আঞ্জলা ভর্তি করে খাদ্য সামগ্রী নিতে লাগল। আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুব অভাবগ্রস্ত, আমার যিম্মায় পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমার প্রয়োজন তীব্র। তিনি বললেন, আমি ছেড়ে দিলাম।

যখন সকাল হলো, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ হুরাইরা, তোমার রাতের বন্দী কি করলে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার তীব্র অভাব ও পরিবার, পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়, তাই তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, সাবধান! সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে। ‘সে আবার আসবে’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তির কারণে আমি বুঝতে পারলাম যে, সে পুনরায় আসবে।

কাজেই আমি তার অপেক্ষায় থাকলাম। সে এল এবং অঞ্জলি ভরে খাদ্র সামগ্রী নিতে লাগল। আমি ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে নিয়ে যাব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। কেননা, আমি খুবই দরিদ্র এবং আমার উপর পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব ন্যস্ত, আমি আর আসব না। তার প্রতি আমার দয়া হল এবং আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ হুরাইরাহ! তোমার বন্দী কী করল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার তীব্র প্রয়োজন এবং পরিবার-পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, খবরদার সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে। তাই আমি তৃতীয়বার তার অপেক্ষায় রইলাম।

সে আবার আসল এবং অঞ্জলি ভর্তি করে খাদ্য সামগ্রী নিতে লাগল। আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অবশ্যই নিয়ে যাব। এ হলো তিনবারের শেষবার। তুমি প্রত্যেকবার বল যে, আর আসবে না, কিন্তু আবার আস। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দেব। যা দিয়ে আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, সেটা কী?

সে বলল, যখন তুমি রাতে শয্যায় যাবে তখন আয়াতুল কুরসী (اللهُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ)  আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়বে। তখন আল্লাহর তরফ হতে তোমার জন্যে একজন রক্ষক নিযুক্ত হবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। কাজেই তাকে আমি ছেড়ে দিলাম। ভোর হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, গত রাতের তোমার বন্দী কী করল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমাকে বলল যে, সে আমাকে কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেবে যা দিয়ে আল্লাহ আমাকে লাভবান করবেন। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।

তিনি আমাকে বললেন, এই বাক্যগুলো কী? আমি বললাম, সে আমাকে বলল, যখন তুমি তোমার বিছানায় শুতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী ( اللهُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ )  প্রথম হতে আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়বে এবং সে আমাকে বলল, এতে আল্লাহর তরফ হতে তোমার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবেন এবং ভোর পর্যন্ত তোমার নিকট কোন শয়তান আসতে পারবে না। সাহাবায়ে কিরাম কল্যাণের জন্য বিশেষ লালায়িত ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, এ কথাটি তো সে তোমাকে সত্য বলেছে। কিন্তু হুশিয়ার, সে মিথ্যুক। হে আবূ হুরাইরাহ! তুমি কি জান, তিন রাত ধরে তুমি কার সাথে কথাবার্তা বলেছিলে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন, না। তিনি বললেন, সে ছিল শয়তান। সহিহ বুখারি ২৩১১, ৩২৭৫, ৫০১০

৪। সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের ফজিলত-

আবূ মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ “‏ مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ‏”‏‏

কেউ যদি রাতে সূরাহ বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করে, সেটাই তার জন্য যথেষ্ট। সহিহ বুখারি ৫০০৯

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসেছিলেন। সে সময় তিনি উপর দিক থেকে দরজা খোলার একটা প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পেয়ে মাথা উঠিয়ে বললেনঃ এটি আসমানের একটি দরজা। আজকেই এটি খোলা হ’ল- ইতোপূর্বে আর কখনো খোলা হয়নি। আর এ দরজা দিয়ে একজন মালায়িকাহ পৃথিবীতে নেমে আসলেন। আজকের এ দিনের আগে আর কখনো তিনি পৃথিবীতে আসেননি। তারপর তিনি সালাম দিয়ে বললেনঃ আপনি আপনাকে দেয়া দু’টি নূর বা আলোর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনার পূর্বে আর কোন নবীকে তা দেয়া হয়নি। আর ঐ দু’টি নূর হ’ল ফা-তিহাতুল কিতাব বা সূরাহ আল ফাতিহাহ এবং সূরাহ আল বাকারাহ-এর শেষাংশ। এর যে কোন হারফ আপনি পড়বেন তার মধ্যকার প্রার্থিত বিষয় আপনাকে দেয়া হবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৬

৫. সুরা আলে ইমরানের ফজিলত

নাওওয়াস ইবনু সামান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

“‏ يُؤْتَى بِالْقُرْآنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَهْلِهِ الَّذِينَ كَانُوا يَعْمَلُونَ بِهِ تَقْدُمُهُ سُورَةُ الْبَقَرَةِ وَآلُ عِمْرَانَ ‏”‏ ‏.‏ وَضَرَبَ لَهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثَلاَثَةَ أَمْثَالٍ مَا نَسِيتُهُنَّ بَعْدُ قَالَ ‏”‏ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ ظُلَّتَانِ سَوْدَاوَانِ بَيْنَهُمَا شَرْقٌ أَوْ كَأَنَّهُمَا حِزْقَانِ مِنْ طَيْرٍ صَوَافَّ تُحَاجَّانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا

কিয়ামতের দিন কুরআন ও কুরআন অনুযায়ী যারা আমল করত তাদেরকে আনা হবে। সূরাহ আল বাকারাহ ও সূরাহ আল ইমরান অগ্রভাগে থাকবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ দু’টি সম্পর্কে তিনটি উদাহরণ দিয়েছিলেন যা আমি কখনো ভুলিনি। তিনি বলেছিলেনঃ এ সূরাহ দুটি দু’খণ্ড ছায়াদানকারী মেঘের আকারে অথবা দু’টি কালো চাদরের মতো ছায়াদানকারী হিসেবে আসবে যার মধ্যখানে আলোর ঝলকানি অথবা সারিবদ্ধ দু’ ঝাক পাখীর আকারে আসবে এবং পাঠকারীদের পক্ষ নিয়ে যুক্তি দিতে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৫

৬। সুরা কাহাফের ফজিলত –

আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

“‏ مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ ‏

‘যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দিক থেকে দশটি আয়াত মুখস্ত করবে,সে দাজ্জালের (ফিৎনা) থেকে পরিএাণ পাবে।’’ অন্য বর্ণনায় ‘কাহফ সূরার শেষ দিক থেকে’ উল্লেখ হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ৮০৯, , আলবানি, সহিহা : ৫৮২

আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ.

“যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে নূর (আলোক) চমকাবে। সুনান আন-নাসাঈ আল-কুবরা: ৫২৮৯, মুস্তাদরাক আল-হাকিম : ৩৩৯২, সুনান আদ-দারিমি : ৩৪০০

বারা ইবনু আযিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি সূরাহ আল কাহফ পড়ছিল। সে সময় তার কাছে মজবুত লম্বা দু’টি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। এ সময়ে একখণ্ড মেঘ তার মাথার উপরে এসে হাজির হ’ল। মেঘ খণ্ডটি ঘুরছিল এবং নিকটবর্তী হচ্ছিল। এ দেখে তার ঘোড়াটি ছুটে পালাচ্ছিল। সকাল বেলা সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে ঐ বিষয়টি বর্ণনা করল। এসব কথা শুনে তিনি বললেনঃ এটি ছিল (আল্লাহর তরফ থেকে) রহমত বা প্রশান্তি যা কুরআন পাঠের কারণে অবতীর্ণ হয়েছিল  সহিহ মুসলিম : ৭৯৫

৭। সুরা মুলকের ফজিলত –

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

سُورَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً تَشْفَعُ لِصَاحِبِهَا حَتَّى يُغْفَرَ لَهُ ‏(تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

কুরআনে তিরিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরাহ রয়েছে। সূরাহটি তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে, শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। সূরাহটি হচ্ছে ’তাবারকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক।’ সুনানে ইমাম আবু দাউদ : ১৪০০, সুনানে তিরমিজি : ২৮৯১, সহিহ আত-তারগিব ওয়াত তারহিব: ১৪৭৫

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ কোন এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক সাহাবী একটি কবরের উপর তার তাবু খাটান। তিনি জানতেন না যে, তা একটি কবর। তিনি হঠাৎ বুঝতে পারেন যে, কবরে একটি লোক সূরা আল-মুলক পাঠ করছে। সে তা পাঠ করে সমাপ্ত করলো। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি কবরের উপর তাঁবু খাটাই। আমি জানতাম না যে, তা কবর। হঠাৎ বুঝতে পারি যে, একটি লোক সূরা আল-মুলক পাঠ করছে এবং তা সমাপ্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সূরাটি প্রতিরোধকারী নাজাত দানকারী। এটা কবরের আযাব হতে তিলাওয়াতকারীকে নাজাত দান করে। সুনানে তিরমিজি : ২৮৯০

৮। সুরা ওয়াকিয়ার ফজিলত-

বাইহাকি শুয়াবুল ইমান গ্রন্থে এই সুরার ফজিলতে একটি হদিস আছে-

“مَن قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَقْرَةٌ أَبَدًا.” عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি প্রতিদিন রাতে সুরা ওয়াকিয়া তেলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দরিদ্রতা স্পর্শ করবে না। বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ২৪৯৮

৭. সুরা হাশরের ফজিলত-

হাসান (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

مَنْ قَرَأَ ثَلَاثَ آيَاتٍ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْحَشْرِ إِذَا أَصْبَحَ فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ ذَلِكَ طُبِعَ بِطَابَعِ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ قَرَأَ إِذَا أَمْسَى فَمَاتَ مِنْ لَيْلَتِهِ طُبِعَ بِطَابَعِ الشُّهَدَاءِ

যে ব্যক্তি সকালে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করে, সে যদি সেই দিন মৃত্যুবরণ করে, তবে তাকে শাহাদাতের সীল (টিকিট) প্রদান করা হবে এবং সন্ধ্যায় তা পাঠ করলে সে যদি সেই রাতে মৃত্যুবরণ করে, তবে তাকে শাহাদাতের সীল লাভ প্রদান করা হবে। সুনান আদ-দারেমী : ৩৪৬২ হাদিসের মান সহিহ (হাদিসবিডি)

মাকিল ইবন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সকালে তিনবার পাঠ করবে-

أَعُوذُ بِاللهِ السَّمِيعِ العَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

এরপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা নিযুক্ত করে দেন। যাঁরা বিকাল পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকেন। এই দিন যদি সে মারা যায় তবে তার শহীদী মৃত্যু হয়। আর যদি বিকালে পাঠ করে তবুও ঐ ফজিলতই হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯২২, বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ২৫০২। সুনান আদ-দারেমী : ৩৪৬২ হাদিসের মান জঈফ

৯. সুরা কাফিরুনের ফজিলত

আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكافِرُونَ عَدَلَتْ لَهُ بِرُبْعِ الْقُرْآنِ وَمَنْ قَرَأَ قُلْ هُوَ الله أَحَدٌ عَدَلَتْ لَهُ بِثُلُثِ الْقُرْآنِ

যে ব্যক্তি ’ক্বুল ইয়া-আইয়্যুহাল কা-ফিরূন’ পাঠ করবে, তার এক চতুর্থাংশ কুরআন পাঠের সমান সওয়াব লাভ হবে। আর যে, ব্যক্তি ’ক্বুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ’ পাঠ করবে তার এক তৃতীয়াংশ কুরআন পাঠের সমান সওয়াব লাভ হবে। হাদিস সম্ভার : ১৪৪৭, সুনানে তিরমিযী : ২৮৯৩, সহীহুল জামে : ৬৪৬৬

১০। সূরা ইখলাসের ফজিলত

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ‏ تَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ ‏

’কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’’ সূরাটি কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮৭, সুনানে তিরমিযী ২৮৯৯, ২৯০০, আহমাদ ৯২৫১, দারেমী ৩৪৩২

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَقْبَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَسَمِعَ رَجُلاً يَقْرَأُْ ‏(‏قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ * اللَّهُ الصَّمَدُ ‏)‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ وَجَبَتْ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَمَا وَجَبَتْ قَالَ ‏”‏ الْجَنَّةُ ‏”‏

একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আসছিলাম। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ” পাঠ করতে শুনলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওয়াজিব (অবধারিত) হয়ে গেছে। আমি প্রশ্ন করলাম, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে? তিনি বললেনঃ জান্নাত। সুনানে তিরমিজি : ২৮৯৭,

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে ’কুল হুআল্লাহু আহাদ’ পড়তে শুনলেন। সে বার বার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে বললেন। যেন ঐ ব্যক্তি তাকে কম মনে করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ

সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন। এ সূরাহ হচ্ছে সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। সহিহ বুখারি : ৫০১৩, ৬৬৪৩

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছেন-

أَيَعْجِزُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَقْرَأَ ثُلُثَ الْقُرْآنِ فِيْ لَيْلَةٍ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ وَقَالُوْا أَيُّنَا يُطِيْقُ ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ فَقَالَ اللهُ الْوَاحِدُ الصَّمَدُ ثُلُثُ الْقُرْآنِ

তোমাদের কেউ কি এক রাতে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করা সাধ্যাতীত মনে কর? এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। এরপর তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে যে, এটা পারবে? তখন তিনি বললেন, ’’কুল হুআল্লাহ আহাদ’’ অর্থাৎ সূরাহ ইখ্লাস কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ। সহিহ বুখারি : ৫০১৫, ৫০১৪, ৫৫৪৩, ৭৩৭৫, নাসায়ী ৯৯৫, আবূ দাউদ ১৪৬১, আহমাদ ১০৬৬৯, ১০৭৩১, মুওয়াত্তা মালিক ৪৭৭, ৪৮৩

মুআয বিন আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ’ক্বুল হুঅল্লা-হু আহাদ’ শেষ পর্যন্ত ১০ বার পাঠ করবে, আল্লাহ সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতে এক মহল নির্মাণ করবেন। এ কথা শুনে উমার বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বললেন, তাহলে আমরা বেশি বেশি করে পড়ব হে আল্লাহর রসূল! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহও বেশি দানশীল ও বেশি পবিত্র। হাদিস সম্ভার : ১৪৪৮, আহমাদ ১৫৬১০, সহীহাহ : ৫৮৯

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে একটি মুজাহিদ দলের প্রধান করে অভিযানে পাঠালেন। সালাতে তিনি যখন তাঁর সাথীদের নিয়ে ইমামত করতেন, তখন ইখ্লাস সূরাটি দিয়ে সালাত শেষ করতেন। তারা যখন অভিযান থেকে ফিরে আসল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে ব্যাপারটি আলোচনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাঁকেই জিজ্ঞেস করে কেন সে এ কাজটি করেছে? এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিলেন, এ সূরাটির আল্লাহ্ তা’আলার গুণাবলী রয়েছে। এ জন্য সূরাটিতে পড়তে আমি ভালোবাসি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহ্ তাঁকে ভালবাসেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ৮১৩

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এক জায়গায় জমায়েত হও। কারণ আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাদেরকে কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশ পড়ে শুনাব। সুতরাং যাদের জমায়েত হওয়ার তারা জমায়েত হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসলেন এবং “কুল হওয়াল্ল-হু আহাদ” সূরাটি পড়লেন। তারপর তিনি গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তখন আমরা একে অপরকে বলতে থাকলাম, আমার মনে হয় আসমান থেকে কোন খবর এসেছে আর সে জন্যই তিনি ভিতরে প্রবেশ করেছেন। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে এসে বললেনঃ আমি তোমাদের বলেছিলাম যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তোমাদেরকে কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করে শোনাব। জেনে রাখ এটি (সূরাহ ইখলাস) কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশের সমান। সহিহ মুসলিম : ৮১২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুবা মসজিদে আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক তাদের ইমামতি করতেন। তিনি নামাযে সূরা আল-ফাতিহার পর কোন সূরা পাঠ করার ইচ্ছা করলে প্রথমে সূরা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ পাঠ করতেন এবং এ সূরা শেষ করার পর এর সাথে অন্য সূরা পাঠ করতেন। তিনি প্রতি রাকাআতেই এরূপ করতেন।

তার সাথীরা তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করে বললেন, আপনি এ সূরাটি পাঠ করার পর মনে করেন যে, এটা বুঝি যথেষ্ট হয়নি, তাই এর সাথে অন্য আরেকটি সূরাও পাঠ করেন। আপনি হয় এ সূরাটিই পাঠ করবেন, না হয় এটা বাদ দিয়ে অন্য কোন সূরা পাঠ করবেন। তিনি বললেন, আমি এ সূরা বাদ দিতে পারব না। যদি তোমাদের পছন্দ হয় তবে আমি এ সূরাসহ ইমামতি করি, আর পছন্দ না হলে ইমামতি ছেড়ে দেই। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সবচাইতে উত্তম ব্যক্তি। তাই তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইমাম বানাতে তারা সম্মত হলেন না। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলে তারা বিষয়টি তাকে জানালেন। তিনি বললেনঃ হে অমুক! তোমার সাথীরা তোমাকে যে নির্দেশ দিচ্ছে তা পালন করতে তোমাকে কিসে বাধা দিচ্ছে? আর তোমাকে প্রতি রাকআতে এ সূরা পাঠ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটি খুব ভালোবাসি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর প্রতি তোমার ভালোবাসাই তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯০১

১১। সূরা ফালাক ও সূরা নাসের ফজিলত-

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَتَعَوَّذُ مِنَ الْجَانِّ وَعَيْنِ الإِنْسَانِ حَتَّى نَزَلَتِ الْمُعَوِّذَتَانِ فَلَمَّا نَزَلَتَا أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا ‏.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিন এবং মানুষের কু-দৃষ্টি হতে আশ্রয় চাইতেন। তারপর সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হলে তিনি এ সূরা দুটি গ্রহণ করেন এবং বাকীগুলো পরিত্যাগ করেন। সুনানে তিরমিজি : ২০৫৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৫১১

‘আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত-

كَانَ إِذَا أَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيْهِمَا فَقَرَأَ فِيْهِمَا{قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ}وَ {قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} وَ {قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ} ثُمَّ يَمْسَحُ بِهِمَا مَا اسْتَطَاعَ مِنْ جَسَدِهِ يَبْدَأُ بِهِمَا عَلَى رَأْسِهِ وَوَجْهِهِ وَمَا أَقْبَلَ مِنْ جَسَدِهِ يَفْعَلُ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ

প্রতি রাতে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিছানায় যাওয়ার প্রাক্কালে সূরা ইখ্‌লাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে দু’হাত একত্র করে হাতে ফুঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তাঁর দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার এরূপ করতেন। সহিহ বুখারি : ৫০১৭

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا اشْتَكَى يَقْرَأُ عَلَى نَفْسِهِ بِالْمُعَوِّذَاتِ وَيَنْفُثُ فَلَمَّا اشْتَدَّ وَجَعُهُ كُنْتُ أَقْرَأُ عَلَيْهِ وَأَمْسَحُ بِيَدِهِ رَجَاءَ بَرَكَتِهَا

যখনই নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হতেন তখনই তিনি ‘সূরায়ে মু’আব্বিযাত’ পড়ে নিজের উপর ফুঁক দিতেন। যখন রোগ কঠিন হয়ে গেল, তখন বাকাত অর্জনের জন্য আমি এই সূরা পাঠ করে তাঁর হাত দিয়ে শরীর মাসহ্ করিয়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ৫৭৪৫, ৫৭৪৬, সহিহ মুসলিম : ২১৯৪, আহমাদ : ২৪৬৭১

একদা ইবনে আবেস জুহানী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

يَا ابْنَ عَابِسٍ أَلَا أُخْبِرُكَ بِأَفْضَلِ مَا تَعَوَّذَ بِهِ الْمُتَعَوِّذُونَ؟ قُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ وَقُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ

হে ইবনে আবেস! আমি তোমাকে উত্তম ঝাড়-ফুঁকের কথা বলে দেব না কি, যার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনাকারীরা আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে? তিনি বললেন, অবশ্যই বলে দিন, হে রাসূলাল্লাহ! তিনি ফালাক ও নাস সূরা দুটিকে উল্লেখ করে বললেন, এ সূরা দুটি হল মুআব্বিযাতান (ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্র)। হাদিস সম্ভার : ১৪৫৩, আহমাদ ১৫৪৪৮, ১৭২৯৭, নাসাঈ কুবরা ৭৮৪৭

আবূ সাঈদ খুদরী ( রাঃ) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সূরা ফালাক্ক ও নাস অবতীর্ণ হবার পূর্ব পর্যন্ত নিজ ভাষাতে) জিন ও বদ নজর থেকে (আল্লাহর) আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। পরিশেষে যখন উক্ত সূরা দু’ টি অবতীর্ণ হল, তখন ঐ সূরা দু’টি দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করতে লাগলেন এবং অন্যান্য সব পরিহার করলেন’। সুনানে তিরমিজী : ২০৫৮, হাদিস সম্ভার : ১৪৫৩

১২।  সূরা ফাতহ এর ফজিলত –

আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত-

 رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَهُوَ يَقْرَأُ عَلَى رَاحِلَتِهِ سُوْرَةَ الْفَتْحِ

মাক্কাহ বিজয়ের দিন আমি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে (উটের পিঠে) আরোহন অবস্থায় ‘সুরাহ আল্‌ ফাত্‌হ’ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। সহিহ বুখারি : ৫০৩৪

১৩। সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা আয-যুমার ফজিলত

এই সম্পর্কে একটি হাদিস-

قَالَتْ عَائِشَةُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لاَ يَنَامُ عَلَى فِرَاشِهِ حَتَّى يَقْرَأَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَالزُّمَرَ ‏

আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা আয-যুমার তিলাওয়াত না করা পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমাতেন না। সুনানে তিরমিজি : ২৯২০

কুরআনের আয়াত ও সুরার ফজিলত অর্জনের পাশাপাশি পুরো কুরআন তাজবীদ ও তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করা উচিত। যারা কুরআন বোঝেন, তাদের এটি আরও যত্নসহকারে করা উচিত। যারা বোঝেন না, তাদের সহীহ তিলাওয়াত শেখার পর বোঝার চেষ্টা করতে হবে, যাতে কুরআনের হেদায়েত লাভ করা যায়। সবার উচিত গভীর চিন্তা ও সত্যিকারের উপলব্ধি মাধ্যমে কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ বলেন-

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা সাদ : ২৯

১৪. কুরআন বিশেষ একটি আয়াতে ফজিলত

ইরবায বিন সারিয়াহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْرَأُ الْمُسَبِّحَاتِ قَبْلَ أَنْ يَرْقُدَ، وَقَالَ: إِنَّ فِيهِنَّ آيَةً أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ آيَةٍ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয়ন করার আগে শুরুতে তসবীহ (’সাব্বাহা’ বা ইউসাব্বিহু) বিশিষ্ট (বনী ইসরাঈল, হাদীদ, হাশর, সাফ্, জুমুআহ, তাগাবুন, ও আ’লা এই সাতটি) সূরা পাঠ করতেন। তিনি বলেন, ঐ সূরাগুলির মধ্যে এমন একটি আয়াত নিহিত আছে যা এক হাজার আয়াত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সুনানে আবু দাউদ : ৫১৫৭, হাদিস সম্ভার : ১৪৫৮, আহমাদ ১৭২৯২

কয়েকটি জঈফ ও জাল ফজিলত

১. মাকিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের কাছে সূরা ইয়াসিন পড়ো। ইবনে মাজাহ : ১৪৪৮, সুনানে আবু দাউদ : ৩১২১, আহমাদ ১৯৭৮৯, ১৯৮০৩, মিশকাত : ১৬২২, যঈফাহ ৫৮৬১। হাদিসটির মান জঈফ কোন মতভেদ নাই।

২. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ قَلْبًا وَقَلْبُ الْقُرْآنِ يس وَمَنْ قَرَأَ يس كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِقِرَاءَتِهَا قِرَاءَةَ الْقُرْآنِ عَشْرَ مَرَّاتٍ ‏”‏

প্রত্যেকটা বস্তুর কলব (হৃদয়) আছে। কুরআনের কলব হচ্ছে সূরা ইয়াসীন। যে ব্যক্তি এ সূরা একবার পাঠ করবে আল্লাহ তা’আলা এর পরিবর্তে তার জন্য দশবার কুরআন পাঠের সমান সাওয়াব নিরূপণ করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৮৮৭, অনেকই হাদিসটি জঈপ বললেও প্রকৃত পক্ষে হাদিসের মান জাল।

হাদিসটি সুনানে তিরমিজি ও সুনানে দামেরীতে থাকা স্বত্ত্বেও শাইখ নাসিরউদ্দন অনেক গবেষনা করে বলেছেন হাদিসটি জাল। বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে তার লিখিত জঈফা কিতাবের ১৬৯ নম্বর হাদিস দেখে নিতে পারেন।

৩.  যে ব্যাক্তি তার পিতা-মাতা উভয়ের কবর প্রত্যেক জুম’আর দিবসে যিয়ারত করবে। অতঃপর তাদের উভয়ের নিকট অথবা পিতার কবরের নিকট সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে, প্রত্যেক আয়াত অথবা অক্ষরের সংখ্যার বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। এই হাদিসটি জাল শাইখ নাসিরউদ্দিন আলবানি জঈফা : ৫০

কুরআন তিলওয়াতের ফজিলত

কুরআন তিলওয়াতের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন তিলওয়াত মহান আল্লাহর আদেশ আল কুরআন মাজীদে ইরশাদ করা হয়েছে এভাবে-

اُتۡلُ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنَ الۡکِتٰبِ وَاَقِمِ الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ

তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত কর এবং সালাত কায়েম কর। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। সূরা আনকাবুত : ৪৫

আল্লাহ রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আদেশ দিচ্ছেন কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য। আল্লাহ এই আদেশ তার সকল উম্মতের জন্যই প্রযোজ্য। কুরআন তিলওয়াতের মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। এটি ঈমান দৃঢ় করে এবং আখিরাতে সুপারিশকারী হয়। কুরআন তিলাওয়াত ঈমান শক্তিশালী করে, জ্ঞান বাড়ায় এবং আল্লাহর হেদায়েত অনুসরণে সহায়তা করে। কুরআন তিলাওয়াত মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে প্রেরণা জোগায়। কুরআন তিলাওয়াত করা কুরআনের অন্যতম হক।

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশিগ্রন্থ আল কুরআন। কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ বুঝে কিংবা না বুঝে যেভাবেই পড়ুক না কেন পাঠকের জন্য নেকি আছে। এমন কি এই  ঐশি গ্রন্থের সাথে ভালবাসা রাখাও নেকির কাজ। কুরআন যথাযথ তেলওয়ার শিক্ষা গ্রহন করার পর নিয়মিত কুরআন তিলওয়ার করতে হবে। কুরআন তেলাওয়াত করা মহান আল্লাহর হুকুম, তা সত্বেও নিয়মিত কুরআন তেলওয়াত করা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল। এটি জরুরী বা ফরজ পর্যায়ের আমল নয়। এই আমল না করলে কোন মুসলমান গুনাহগার হবেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে কুরআন তেলওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ন ইবাদাত। প্রয়োজন পরিমান কুরআন শিক্ষা করা ও মুখন্ত করা অবশ্যই ফরজ।

কুরআন তিলাওয়াত এইটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি ও সওয়াব অর্জনের হয।। প্রতিটি অক্ষরের তিলাওয়াতে বহু গুণ সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এটি হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, পাপ মোচন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করে। নিম্মে কুরআন তিলাওয়াতের অপরিসীম ফজিলতের বর্ণনা প্রদান করা হলো-

কুরআনের আলোকে কুরআন তিলাওয়াত ফজিলত

১. কুরআন তিলওয়াত একটি ব্যবসা যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে :

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَتۡلُوۡنَ کِتٰبَ اللّٰہِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاَنۡفَقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ سِرًّا وَّعَلَانِیَۃً یَّرۡجُوۡنَ تِجَارَۃً لَّنۡ تَبُوۡرَ ۙ

নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না। সুরা ফাতির : ২৯-৩০

কুরআন তিলওয়াত এমন একটি ব্যবসা যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কাজেই এই ব্যবসার প্রতি গুরুত্ব আরফ করে নিয়মিত কুরআন তিলওয়াত করি।

২. কুরআন তিলাওয়াত ঈমান বৃদ্ধি করেঃ

কুরআন তিলাওয়াত করা বান্দার জন্য এমন উপকারী। এবং কুরআন তিলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ ٢ 

অর্থ: ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’। সুরা  আনফাল : ২

৩. মুমিনের অত্যতম গুন কুরআন তিলওয়াত করা

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاَوَتِهِ أُوْلَـئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمن يَكْفُرْ بِهِ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

অর্থঃ আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সুরা বাকারা : ১২১

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

لَيْسُواْ سَوَاء مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللّهِ آنَاء اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ

অর্থঃ তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। সুরা ইমরান : ১১৩

৪. কুরআন তিলওয়াত কাফিরদের অসন্তোষ কর তোলে :

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِ الَّذِينَ كَفَرُوا الْمُنكَرَ يَكَادُونَ يَسْطُونَ بِالَّذِينَ يَتْلُونَ عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا قُلْ أَفَأُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَلِكُمُ النَّارُ وَعَدَهَا اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

অর্থঃ যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, তখন তুমি কাফেরদের চোখে মুখে অসন্তোষের লক্ষণ প্রত্যক্ষ করতে পারবে। যারা তাদের কাছে আমার আয়াত সমূহ পাঠ করে, তারা তাদের প্রতি মার মুখো হয়ে উঠে। বলুন, আমি কি তোমাদেরকে তদপেক্ষা মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? তা আগুন আল্লাহ কাফেরদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন। এটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। সুরা হাজ্জ্ব : ৭২

সহিহ হাদিসের আলোকে কুরআন তিলাওয়াত ফজিলত

১. সে ব্যক্তি উত্তম, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়

উসমান (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। সহিহ বুখারি :৫০২৭, ৫০২৮

২.  কুরআন তিলওয়াতে প্রতি হরফের জন্য সওয়াব প্রদান করা হয় :

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

আল্লাহ তা’আলার কিতাবের একটি হরফ যে ব্যক্তি পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব আছে। আর সাওয়াব হয় তার দশ গুণ হিসেবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। সুনানে তিরমিজি : ২৯১০, মিশকাত : ২১৩৭

৩. কুরআনের তিলওয়াতে সালাতের মত সওয়াব

তামীম দারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ مِائَةَ آيَةٍ فِي لَيْلَةٍ كُتِبَ لَهُ قُنُوتُ لَيْلَةٍ

যে ব্যক্তি এক রাতে একশ’টি আয়াত পাঠ করবে, সে ব্যক্তির আমলনামায় ঐ রাত্রির কিয়াম (নামাযের) সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে। হাদিস সম্ভার : ১৪২৩, আহমাদ ১৬৯৫৮, নাসাঈর কুবরা ১০৫৫৩, ত্বাবারানী ১২৩৮, দারেমী ৩৪৫০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৪৪

ফাযালাহ বিন উবাইদ (রাঃ) ও তামীম দারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ عَشْرَ آيَاتٍ فِي لَيْلَةٍ كُتِبَ لَهُ قِنْطَارٌ وَالْقِنْطَارُ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

যে ব্যক্তি রাত্রে দশটি আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য ’ক্বিন্তার’ পরিমাণ সওয়াব লেখা হবে। ’ক্বিন্তার’ পৃথিবী ও তন্মধ্যস্থিত সকল বস্তু হতে শ্রেষ্ঠ। হাদিস সম্ভার : ১৪২৪, ত্বাবারানীর কাবীর ১২৩৯, আওসাত্ব ৮৪৫১, সহিহ আত তারগীব ৬৩৮

৪. কুরআন তিলওয়াত গাভিন উষ্ট্রী প্রাপ্তি থেকেও উত্তম

অবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

‏”‏ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ إِذَا رَجَعَ إِلَى أَهْلِهِ أَنْ يَجِدَ فِيهِ ثَلاَثَ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ ‏”‏ ‏.‏ قُلْنَا نَعَمْ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَثَلاَثُ آيَاتٍ يَقْرَؤُهُنَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلاَتِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ ثَلاَثِ خَلِفَاتٍ سِمَانٍ عِظَامٍ ‏”.‏>

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কেউ কি তার ঘরে ফিরে এসে সেখানে তিনটি হৃষ্টপুষ্ট গর্ভবতী উষ্ট্রী পেতে পছন্দ করে? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ তার নামাযে তিনটি আয়াত পড়লে তার জন্য হৃষ্টপুষ্ট তিনটি গর্ভবতী উষ্ট্রীর চেয়ে উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮২, আহমাদ ৯৬৮৭, ১০০৬৯, দারেমী ৩৩১৪

উক্বাহ ইবনু আমির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন। তখন আমরা সুফফাহ বা মসজিদের চত্বরে অবস্থান করছিলাম। তিনি বললেনঃ তোমরা কেউ চাও যে, প্রতিদিন “বুত্বহান” বা আকীকের বাজারে যাবে এবং সেখানে থেকে কোন পাপ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ছাড়াই বড় কুঁজ বা চুঁটবিশিষ্ট দু’টি উটনী নিয়ে আসবে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা এরূপ চাই। তিনি বললেনঃ তাহলে কি তোমরা কেউ মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কিতাবের দু’টি আয়াত শিক্ষা দিবে না কিংবা পাঠ করবে না? এটা তার জন্য ঐরুপ দু’টি উটনীর চেয়েও উত্তম। এরূপ তিনটি আয়াত তিনটি উটনীর চেয়ে উত্তম এবং চারটি আয়াত চারটি উটনীর চেয়ে উত্তম। আর অনুরূপ সমসংখ্যক উটনীর চেয়ে তত সংখ্যক আয়াত উত্তম। সহিহ মুসলিম : ৮০৩

৫. কুরআন কিয়ামতের দিন তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশ করবে :

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

“اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ، فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ

তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন-

الْقُرْآنُ شَافِعٌ مُشَفَّعٌ وَمَاحِلٌ مُصَدَّقٌ، مَنْ جَعَلَهُ أَمَامَهُ قادَهُ إِلَى الْجَنَّةِ وَمَنْ جَعَلَهُ خَلْفَهُ سَاقَهُ إِلَى النَّارِ

এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে। হাদিস সম্ভার : ১৪১১, সহিহ ইবনে হিব্বান ১২৪, সহীহ তারগীব : ১৪২৩

আবু উমামাহ বাহেলী (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি, তিনি বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বরকত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না। মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকর দল। সহিহ মুসলিম : ১৯১০, হাদিস সম্ভার : ১৪১২

৬. কুরআন তিলওয়কর আল্লাহ ও তাঁর রসূল কে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোবাসার নিদর্সন

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُحِبَّ الله وَرَسُولَهُ فَلْيَقْرَأْ في المُصْحَفِ

যে ব্যক্তি চায় যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে (অধিক) ভালবাসুক (অথবা আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাকে ভালবাসুন), সে যেন কুরআন দেখে পাঠ করে। হাদিস সম্ভার : ১৪১৩, ইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ২২১৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৩৪২

৭. কুরআন তিলওয়াতকারি আল্লাহর খাস লোক :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ لِلهِ أَهْلِينَ مِنْ النَّاسِ فَقِيلَ مَنْ أَهْلُ اللهِ مِنْهُمْ قَالَ أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللهِ

মানবমণ্ডলীর মধ্য হতে আল্লাহর কিছু বিশিষ্ট লোক আছে; আহলে কুরআন (কুরআন বুঝে পাঠকারী ও তদনুযায়ী আমলকারী ব্যক্তিরাই) হল আল্লাহর বিশেষ ও খাস লোক। হাদিস সম্ভার : ১৪১৬, আহমাদ ১২২৭৯, সহীহুল জামে : ২১৬৫

৮. কিয়ামতের দিন কুরআনের বাহককে অলংকার পড়ান হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُولُ يَا رَبِّ حَلِّهِ فَيُلْبَسُ تَاجَ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ ارْضَ عَنْهُ فَيَرْضَى عَنْهُ فَيُقَالُ لَهُ اقْرَأْ وَارْقَ وَتُزَادُ بِكُلِّ آيَةٍ حَسَنَةً ‏”

কুরআন কিয়ামত দিবসে হাযির হয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! একে (কুরআনের বাহককে) অলংকার পরিয়ে দিন। তারপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তাকে আরো পোশাক দিন। সুতরাং তাকে মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কাজেই তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। তারপর তাকে বলা হবে, তুমি এক এক আয়াত পাঠ করতে থাক এবং উপরের দিকে উঠতে থাক। এমনিভাবে প্রতি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সাওয়াব (মর্যাদা) বাড়ানো হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৫, হাদিস সম্ভার : ১৪২৬, হাকেম ২০২৯, দারেমী ৩৩১১, সহীহুল জামে ৮০৩০

৯. কুরআনের বাহককে জান্নাতে প্রবেশ কালে পাঠ করবে আর আরহন করতে থাকবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ إِذَا دَخَلَ الْجَنَّةَ اقْرَأْ وَاصْعَدْ ‏.‏ فَيَقْرَأُ وَيَصْعَدُ بِكُلِّ آيَةٍ دَرَجَةً حَتَّى يَقْرَأَ آخِرَ شَىْءٍ مَعَهُ

কুরআনের বাহককে জান্নাতে প্রবেশকালে বলা হবে, তুমি পাঠ করতে থাকো এবং উপরে আরোহণ করতে থাকো। অতঃপর সে পড়তে থাকবে এবং প্রতিটি আয়াত পড়ার সাথে সাথে একটি স্তর অতিক্রম করবে। এভাবে সে তার জ্ঞাত শেষ আয়াতটি পর্যন্ত পড়বে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮০, হাদিস সম্ভার : ১৪২৮, আহমাদ ১০৯৬৮,  সহীহাহ ২২৪০, সহীহুল জামে : ৮১২১

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا ‏”‏

(কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, সুনানে আব দাউদ : ১৪৬৬, মিশকাত : ২১৩৪, সহীহাহ : ২২৪০

১০. কুরআন তিলওয়াতকারীদের আল্লাহ প্রশংসা করেন-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ تَعَالَى يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ ‏”‏

যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোন ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফিরিশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখে, এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফিরিশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৪৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৫, সুনানে তিরমিজি : ২৯৪৫, সুনানে দামিরি : ৩৪৪

১১. কুরআন তিলাওয়াত একটি ঈর্শানীয় আমল

ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন—

سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ لَا حَسَدَ إِلَّا عَلَى اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْكِتَابَ وَقَامَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَرَجُلٌ أَعْطَاهُ اللهُ مَالًا فَهُوَ يَتَصَدَّقُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ.

আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, দু’টি বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। প্রথমত, যাকে আল্লাহ্ তা’আলা কিতাবের জ্ঞান দান করেছেন এবং তিনি তা থেকে গভীর রাতে তিলাওয়াত করেন। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ্ তা’আলা সম্পদ দান করেছেন এবং তিনি সেই সম্পদ দিন-রাত দান করতে থাকেন। সহিহ বুখারি : ৫০২৫, ৭৫২৯, সহিহ মুসলি : ১৯৩০

১২. কুরআন তিলওয়াত বান্দাকে জান্নাতে উচ্চাশনে নিয়ে যাবে

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

(কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, মিশকাত : ২১৩৪, সহীহাহ :২২৪০

১৩. কিয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে-

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে শাফা’আতকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সূরাহ অর্থাৎ সূরাহ আল বাকারাহ এবং সূরাহ্ আ-লি ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরাহ এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরাহ আল বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। হাদীসটির বর্ণনাকারী আবূ মু’আবিয়াহ বলেছেন- আমি জানতে পেরেছি যে, বাতিলের অনুসারী বলে যাদুকরদের কথা বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

১৪. কুরআন অভিজ্ঞ ব্যক্তি মালাকগণের সাথে থাকবে

আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ ‏‏ ‏.‏>

কুরআন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ঐসব মালাকগণের সাথে থাকবে যারা আল্লাহর অনুগত, মর্যাদাবান এবং লেখক। আর যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তার জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বারবার পড়ে সে ব্যক্তির জন্য দু’টি পুরস্কার নির্দিষ্ট আছে। সহিহ মুসলিম : ৭৯৮

১৫. কুরআন তিলওয়াতকারীকে সুঘ্রাণ ও উত্তম সাদের লেবুর সাথে তুলনা-

আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কুরআন পাঠকারী মুমিনের হচ্ছে ঠিক কমলা লেবুর মত; যার ঘ্রাণ উওম এবং স্বাদও উওম। আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে ঠিক খেজুরের মত; যার (উওম) ঘ্রাণ তো নেই, তবে স্বাদ মিষ্ট। (অন্যদিকে) কুরআন পাঠকারী মুনাফিকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সুগন্ধিময় (তুলসি) গাছের মত; যার ঘ্রাণ উওম কিন্ত স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে ঠিক মাকাল ফলের মত; যার (উওম) ঘ্রাণ নেই, স্বাদও তিক্ত। সহিহ বুখারী : ৫০২০, সহিহ মুসলিম : ৭৯৭

১৬. কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বারবার তিলওয়াতের জন্য দু’টি পুরস্কার-

আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ ‏

“কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি সম্মানিত এবং পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে এবং তাতে আটকে যায় বা কষ্ট অনুভব করে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।” সহিহ বুখারি: ৪৯৩৭, সহিহ মুসলিম: ৭৯৮

১৭. কুরআন অবহেলাকারীকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উঠান হবে-

কুরআন শিখা থেকে থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কতইনা দুর্ভাগা! মহান আল্লাহ বলেন-

 وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِڪۡرِى فَإِنَّ لَهُ ۥ مَعِيشَةً۬ ضَنكً۬ا وَنَحۡشُرُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ أَعۡمَىٰ (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِىٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرً۬ا (١٢٥) قَالَ كَذَٲلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَـٰتُنَا فَنَسِيتَہَا‌ۖ وَكَذَٲلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ (١٢٦

অর্থঃ আর যে আমার যিকর (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশচয় তার জীবন যাপন হবে  সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থয় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ?  তিনি বলবেন, অনুরুপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অত:পর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬

১৮. কুরআন খতম করার ফজিলত :

আওযাঈ হতে বর্ণিত, আব্দাহ বলেন-

إِذَا خَتَمَ الرَّجُلُ الْقُرْآنَ بِنَهَارٍ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَتَّى يُمْسِيَ وَإِنْ فَرَغَ مِنْهُ لَيْلًا صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَتَّى يُصْبِحَ

কোন লোক দিনের বেলায় কুরআন খতম করলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মালাইকাগণ তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকে। আর রাতের বেলায় কুরআন খতম (শেষ) করলে সকাল পর্যন্ত মালাইকাগণ তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকে। সুনান আদ-দারেমী : ৩৫১৪ হাদিসবিডি. হাদিসের মান সহিহ

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কত দিনে কুরআন খতম করতে পারি? তিনি বললেন, “তুমি এক মাসে কুরআন খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে পঁচিশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “তাহলে বিশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “তাহলে পনেরো দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে দশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে পাঁচ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “না” (এর কমে করো না)। সুনান আদ-দারেমী : ৩৫২৫ হাদিসবিডি. সহিহ ইবনু হিব্বান নং ৮৫৬, ৮৫৭ তে। নাসাঈ, ৯১; ইবনু কাছীর , ফাযাইলুল কুরআন পৃ. নং ২৪৭ হাদিসের মান সহিহ

১৯. কুরআন নিয়মিত তিলাওয়াত করে স্মরণ রাখা

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ تَعَاهَدُوا الْقُرْآنَ فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَصِّيًا مِنَ

তোমরা কুরআনের প্রতি লক্ষ্য রাখবে (অর্থাৎ নিয়মিত তিলাওয়াত ও চর্চা করবে)। আল্লাহর কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, কুরআন বাঁধনহীন উটের চেয়েও দ্রুত পালিয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০৩৩, সহিহ মুসলিম : ৭৯১, আহমাদ ১৯৫৬৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الإِبِلِ الْمُعَقَّلَةِ إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْ.

যে ব্যক্তি অন্তরে কুরআন গেঁথে (মুখস্থ) রাখে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মালিকের ন্যায়, যে উট বেঁধে রাখে। যদি সে উট বেঁধে রাখে, তবে সে উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু যদি সে বাঁধন খুলে দেয়, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০৩১, সহিহ মুসলিম : ৭৮৯, ৫০৩১, নাসায়ী ৯৪২, আহমাদ ৪৬৫১, ৪৭৪৫, ৪৮৩০, ৫২৯৩, ৫৮৮৭, মুয়াত্তা মালেক ৪৭৩,

উকবাহ বিন আমের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَعَلَّمُوا كِتَابَ اللهِ وَتَعَاهَدُوهُ وَتَغَنُّوا بِهِ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَلُّتًا مِنْ الْمَخَاضِ فِي الْعُقُلِ

তোমরা আল্লাহর কিতাব শিক্ষা কর, (পাঠ করার মাধ্যমে) তার যত্ন কর, তা ঘরে রাখ এবং সুরেলা কণ্ঠে তা তেলাঅত কর। কারণ, উট যেমন রশির বন্ধন থেকে অতর্কিতে বের হয়ে যায়, তার চেয়ে অধিক অতর্কিতে কুরআন (স্মৃতি থেকে) বের হয়ে (বিস্মৃত হয়ে) যায়। হাদিস সম্ভার : ১৪৩১, আহমাদ : ১৭৩১৭, দারেমী : ৩৩৪৯, সিলসিলাহ সহীহাহ : ৩২৮৫

আল কুরআনের গুরুত্ব ফজিলত  

আল কুরআনের গুরুত্ব ফজিলত  

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং বুঝে, শিখে, এবং তা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য নাজিল হয়েছে। কুরআনের প্রথম এবং মূল হক হলো এর প্রতি ঈমান আনা। অর্থাৎ, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত একমাত্র সত্য কিতাব, যা মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও দিকনির্দেশনা। ঈমান আনার অর্থ হলো -কুরআনের প্রতিটি আয়াতই সত্য এবং নির্ভুল। ঈমান আনার সাথে সাথে কুরআন শিক্ষা গ্রহন করে নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَرَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ

আর কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো। সূরা মুজাম্মিল : ৪

উসমান (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। সহিহ বুখারি : ৫০২৭

নিয়মিত তিলওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের অর্থ বুঝে পড়তে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে আয়াতের গভীরতা বুঝার জন্য কেবল অর্থ পড়া যথেষ্ট নয়, বরং বিশুদ্ধ তাফসির অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কারণ, কুরআনের কিছু আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট হলেও কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়। কুরআনের তাফসির বুঝতে হলে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ থেকে কুরআন অধ্যয়ন করা। যেমন- তাফসির ইবনে কাসির, তাফসির আত-তাবারি, তাফসির সাঈদি ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন-

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা সাদ : ২৯

কুরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা। কেবল তিলাওয়াত বা মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়; বরং কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনা করাই আসল উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আমি মানুষ ও জিনকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়াত : ৫৬

সততা, ধৈর্য, বিনয়, দয়া ও ইনসাফ কুরআনের শিক্ষা। হারাম ও অন্যায় কাজ পরিহার করা: সুদ, মিথ্যা, জুলুম, পরনিন্দা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কুরআনের বিধান মেনে চলা: বিবাহ, ব্যবসা, উত্তরাধিকারসহ সব বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন “চলমান কুরআন”, অর্থাৎ তিনি তাঁর জীবনে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। তাই আমাদেরও কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে।

কুরআনের প্রতি আমাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন মাধ্যমে আমারা আমাদের জীবনকে কুরআনের আলোতে আলোকিত করতে পারি। যারফলে আমরা পরকালে সফলতা লাভ করতে পারব।

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফজিলত :

কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। এটি আল্লাহর নাজিলকৃত সর্বশেষ আসমানী কিতাব এবং হিদায়াতের চূড়ান্ত উৎস। কুরআন আল্লাহর নির্দেশ এবং মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। এতে জীবন পরিচালনার জন্য সব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি না মানলে একজন মানুষ পথভ্রষ্ট হতে পারে এবং আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,

ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ  فِیۡہِ ۚۛ  ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ

এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। সূরা বাকারা : ২

কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা আল্লাহর প্রতি কুফরি করার সমান। এটি ঈমানের মূল ভিত্তি এবং একজন মুমিনের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। যারা কুরআন মেনে চলে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনা দুনিয়ায় শান্তি, আখিরাতে সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। সুতরাং, কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ এবং তা না মানলে চরম ক্ষতির কারণ হবে। নিম্মে কুরআনের উপর ঈমান আনার কিছু ফজিলত তুলে ধরছি।

২। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পুরস্কার :

কুরআনের প্রতি ঈমানের মাধ্যমেই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হয়। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে এবং আখিরাতে সফলতার পথ সুগম করে। কুরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আনা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ

অর্থ : রসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। সুরা বাকারা : ২৮৫

কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি এরশাদ করেন-

فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنزَلْنَا وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

অর্থঃ অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং অবতীর্ন নূরের (কুরআনের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। সুরা তাগাবুন : ৮

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার আল্লাহ নির্দেশ হওয়ার কারণে অসংখ্য পুরস্কার বা লাভ রয়েছে। দুনিয়া ও আখিরাতে এই ঈমান মানুষের জন্য হিদায়াত, শান্তি, সফলতা এবং চিরস্থায়ী কল্যাণের পথ উন্মোচন করে। নিচে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার প্রধান পুরস্কারগুলো কুরআনের আয়াতের আলোকে উল্লেখ করা হলো :

(১) জান্নাতের অধিকারী হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ

এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সূরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সূরা কাহফ : ১০৭

(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ  وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ

অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫

(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সূরা রা’দ: ২৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ ٪

যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। সূরা আনআম: ৮২

(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার

মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সূরা মায়েদাহ : ৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ

আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। সুরা আনফাল : ৭৪

(৫) দুনিয়ায় মর্যাদা ও সাফল্য লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সূরা মুজাদালাহ : ১

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَنَّ ہٰذَا صِرَاطِیۡ مُسۡتَقِیۡمًا فَاتَّبِعُوۡہُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمۡ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ

আর এটি তো আমার (কুরআনের) সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। সূরা আনআম : ১৫৩

(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খৃষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

আর আমি রাসূলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮

(৭) হিদায়াত ও আল্লাহর রহমত লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮

মহান আল্লাহ বলেন-

 ؕ  وَنَزَّلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً وَّبُشۡرٰی لِلۡمُسۡلِمِیۡنَ 

আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।

(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ

আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা : ৭৫

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ

এরাই তাদের রবের পক্ষ হতে প্রাপ্ত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং এরাই পূর্ণ সফলকাম।  সুরা বাকারা : ৫

(৯) আল্লাহর  শিফা এবং রহমত লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

وَنُنَزِّلُ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ مَا ہُوَ شِفَآءٌ وَّرَحۡمَۃٌ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۙ وَلَا یَزِیۡدُ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا خَسَارًا

আর আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়। সূরা আল-ইসরা: ৮২

(১০) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে

মহান আল্লাহ বলেন

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তন নেই। এটিই মহাসফলতা। সূরা ইউনুস : ৬৩-৬৪

(১১) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন

মহান আল্লাহ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ 

যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭

(১২) সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে দিবেন। 

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَـٰلِحً۬ا نُّؤۡتِهَآ أَجۡرَهَا مَرَّتَيۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقً۬ا ڪَرِيمً۬ا

অর্থঃ আর তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকাজ করবে তাকে আমি দুবার প্রতিদান দেবো এবং আমি তার জন্য সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছি৷  (সুরা আহজাব ৩৩:৩১)।

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে দুনিয়ায় এবং আখিরাতে অজস্র পুরস্কার পাওয়া যাবে। এটি মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে, দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও সফলতা নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর চিরস্থায়ী নৈকট্য লাভের পথ উন্মোচন করে। তাই কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

৩। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার শাস্তি

কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ

আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সূরা বাকারা: ৮৯

(২) অস্বীকারীগণ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬

(৩) অন্তর অন্ধ হয়ে যাওয়া

মহান আল্লাহ বলেন-

قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا () قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ ()

সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’? তিনি বলবেন, ‘এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী (কিতাব) এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল’। সুরা ত্বহা : ১২৫-১২৬

(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ

যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮

(৫) আখিরাতে শাস্তির দিন অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব

মহান আল্লাহ বলেন-

تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥

“আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ

আর যারা কুফরী করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আযাব। এ কারণে যে তারা কুফরী করত। সুরা ইউনুস : ৪

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরী করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫

(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চুড়ান্ত পথভ্রষ্ট

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, এরপর কুফরীকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(৭)  দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অতঃপর যারা কুফরী করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আযাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬

(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا

অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫

(৯) জাহান্নামে স্থায়ী হবেন

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯

(১০) পরকালে আজাব দেওয়া হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে যমীন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

কুরআন মানব জাতির জন্য আল্লাহর পাঠানো সর্বশেষ পথপ্রদর্শক। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এর নির্দেশনা অনুসারে জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।

কুরআন সুন্নাহর পার্থক্য

কুরআন সুন্নাহর পার্থক্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন এবং সুন্নাহ উভয়টির মূল উত্স হল ওহী। মহান আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মাধ্যমে অথবা ইলহাম এর মাধ্যমে দ্বীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাজিল করেছেন। তার মধ্য তিনি নিজের কোন কথা সংযোজন বা বিয়োজন করেন নাই। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ (٤٤)-لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ (٤٥) ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ (٤٦) فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَـٰجِزِينَ (٤٧) 

অর্থ : যদি এ নবী নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো। তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷ তোমাদের কেউ-ই (আমাকে) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ সুন হাকক : ৪৪-৪৭

এ আয়াত প্রমান করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের তরফ থেকে কিছুই বলতে পারেন না, যা কিছু বলেন মহান আল্লাহর তরফ থেকেই বলেন। অপর আয়াতে দেখা যায় আল্লাহ যেমন কুরআন নাযিল করেছেন তেমনি হিকমত তথা সুন্নাহ (হাদিস) ও নাজিল করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ وَمَآ أَنزَلَ عَلَيۡكُم مِّنَ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡحِكۡمَةِ يَعِظُكُم بِهِۦ‌ۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ۬

অর্থ : আর তোমরা স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং তোমাদের উপর কিতাব ও হিকমত যা নাযিল করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন। আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয় সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ২৩১

আল্লাহ তা’আলা তা’আলা কুরআনে সূন্নাহকে হিকমাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

 وَأَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمۡ تَكُن تَعۡلَمُۚ

আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। সূরা নিসা : ১১৩

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

 وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا

আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত (হাদিস) পঠিত হয় তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সুরা আহযাব :৩৪

এখানে হিকমত অর্থ সুন্নাত বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ (হাদিস) যা আল্লাহ পরোক্ষভাবে কোন ফেরেশতার মাধ্যম ব্যতীত তাঁর নবীর কাছে নাজিল করেছেন। আল-মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ، وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ، وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ،

জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখো! এমন এক সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই গ্রহণ করো, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল এবং যা হারাম পাবে তা হারাম মেনে নিবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৪, আহমদ : ১৭১৭৪ আংশিক

এই হাদিসে অনুরূপ কিছু দেয়ার কার বলা হয়েছে তা আর কিছু নয়, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, আল্লাহ্ এই আয়াতে “কিতার” উল্লেখ করেছেন তার অর্থ হচ্ছে কুরআন। আর উল্লেখ করেছেন হিকমাত যার অর্থ, আমি কুরআনের পণ্ডিতদের নিকট শুনেছি তাঁরা বলেছেন যে, এখানে হিকমত হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাত। তিনি বলেন, এখানে হিকমত অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কিছু করা জায়েজ হবে না। কেননা উহা কিতাবের কথা উল্লেখ করার সাথে সাথেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ্ তাঁর নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করা মানুষের উপর ফরয করে দিয়েছেন।

সাধারণত ওহী দুই প্রকার :

ইসলামের শরীয়তের মুল উত্স হচ্ছে ওহি। এবং দ্বীনে ইলাহীর ভিত্তি শুধুমাত্র আল্লাহর নাজিলকৃত ওহীর উপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি পন্ডিতেরা মনে করে শরীয়তের উত্স হিসাবে ওহী দুই প্রকার :

১। ওহীয়ে মাতলু (আল-কুরআন)

২। ওহীয়ে গাইরে মাতলু (সুন্নাহ ও হাদীস)।

একটি আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন ও অপরটি রসূলের সুন্নাত।। আর উভয়টি ‘ওহী’ একটি হল ওহী মাতলু অর্থাৎ যা তিলাওয়াত করা হয়; অপরটি গাইরি মাতলু অর্থাৎ যা তিলাওয়াত করা হয় না। কিন্তু উভয়টি ‘ওহী’। কোন প্রকার ওহী পরিবর্তণ পরিবর্ধনের ক্ষমাতা আল্লাহ আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেন নাই।  মহান আল্লাহ বলেন-

ۚ قُلۡ مَا يَكُونُ لِىٓ أَنۡ أُبَدِّلَهُ ۥ مِن تِلۡقَآىِٕ نَفۡسِىٓ‌ۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ‌ۖ إِنِّىٓ أَخَافُ إِنۡ عَصَيۡتُ رَبِّى عَذَابَ يَوۡمٍ عَظِيمٍ۬ (١٥)

হে মুহাম্মাদ! ওদেরকে বলে দাও, “নিজের পক্ষ থেকে এর মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন করা আমার কাজ নয়৷ আমি তো শুধুমাত্র আমার কাছে যে অহী পাঠানো হয়, তার অনুসারী৷ যদি আমি আমার রবের নাফরমানী করি তাহলে আমার একটি ভয়াবহ দিনের আযাবের আশংকা হয়”৷ সূরা ইউনুস : ১৫

মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ (٣) إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡىٌ۬ يُوحَىٰ (٤)

সে (মুহাম্মাদ সাঃ) নিজের খেয়াল খুশীমত কথা বলে না৷ যা তার কাছে নাযিল করা হয়, তা অহী ছাড়া আর কিছুই নয়৷  সূরা আন-নাজম : ৩-৪

উপরের আলোচনার সার কথা যদি এক কথায় বলেত চাই তবে বলেত পারি, হাদিস বা সুন্নাহও এক প্রকারে ওহি যা মহান আল্লাহ তার প্রিয় রাসূর ﷺ এর মাধ্যমে নাজিল করেছেন।

কুরআন এবং সুন্নার মধ্যে সম্পর্ক :

১. কুরআন হল মুল পাঠ আর সুন্নাহ (হাদিস) হল দার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ :

কুরআন এবং হাদিস দুটিই ইসলামি শরীয়তের মুল উত্স। কুরআনুল কারীমের পর ইসলামের দ্বিতীয় উৎস হাদিস। কুরআন হল মুল পাঠ আর হাদিস হল দার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

মহান আল্লাহ বলেন-

بِٱلۡبَيِّنَـٰتِ وَٱلزُّبُرِ‌ۗ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّڪۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡہِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ

অর্থ : তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে। সুরা নাহল : ৪৪

২. কুরআন এবং হাদিস উভয়ই শরীয়তের প্রধান দুটি উত্স :

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ۬ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ ۥۤ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاً۬ مُّبِينً۬ا

অর্থ : যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সুরা আহজাব : ৩৬

অথচ এর নিজের থেকে হারাম হালাল করার কোন অধিকার আল্লাহ দেন নাই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَاۤ اَحَلَّ اللّٰہُ لَکَ ۚ تَبۡتَغِیۡ مَرۡضَاتَ اَزۡوَاجِکَ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাহরিন : ০১

সকল হারাম হালাল বিধিবিধান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের থেকে কোন বিধান প্রদান করেন না। কাজের হাদিসে প্রদত্ত সকর বিধিবিধান আল্লাহ প্রদত্ত ওহি।

কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে পার্থক্য

নিচে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে ১০টি মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা হলো-

বিষয়কুরআনসুন্নাহরেফারেন্স
উৎসসরাসরি আল্লাহর বাণীরাসূল ﷺ-এর বক্তব্য, কাজ ও সমর্থনকুরআন: ৪:৮০;  বুখারি ৬৩০৭
সংরক্ষণআল্লাহ নিজে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেনউম্মতের মাধ্যমে সংরক্ষিতকুরআন: ১৫:৯
শব্দ ও অর্থউভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকেঅর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু শব্দ রাসূল ﷺ-এরমুসলিম: ২৭৮৮
গুরুত্বপ্রথম ও প্রধান উৎসকুরআনের পর দ্বিতীয় উৎসকুরআন: ৫৯:৭
পাঠে সওয়াবপ্রতিটি অক্ষরে সওয়াবপাঠে সওয়াব আছে, কিন্তু অক্ষরপ্রতি নির্দিষ্ট নয়তিরমিজি: ২৯১০
ইবাদতে ব্যবহারসালাতে কেবল কুরআন পাঠ জায়েযসালাতে হাদিস পড়া জায়েয নয়সহিহ বুখারি: ৭৫৬
লিখিত রূপওহির সময় থেকেই লিখিতভাবে সংরক্ষিতঅধিকাংশ মৌখিক, পরবর্তীতে লিপিবদ্ধবুখারি: ৪৯৯৯
ভাষাসবটাই আরবিআরবিতে মূল, তবে অনুবাদ বৈধকুরআন: ৪৩:৩
অপ্রতিদ্বন্দ্বীতাঅনন্য ও চ্যালেঞ্জযোগ্য নয়চ্যালেঞ্জ নয়, বরং ব্যাখ্যামূলককুরআন: ২:২৩
কিতাব রূপে সংকলনরাসূল ﷺ এর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণরাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর সংকলিতবুখারি: ৪৯৮৬

শিরকের কুফল

শিরকের কুফল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরকের কিছু কুফল তুলে ধরা হলো :

১। মুশরিকের গুনাহ ক্ষমা করা হবে না :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন। অন্য বর্ণনায় রাসুল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

“‏ مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, বারাকাতময় আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ হাদিসের মান হাসান

আব্দুল্লাহ ইবনে আবু যাকারিয়া বর্ণনা করেছেন, আমি উম্মু দারদাকে বলতে শুনেছি, আমি আবু দারদা (রা.) কে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ  কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে। সুনানে আবু দাউদ : ৪২৭০

২। মুশরিকের সকল ভালো আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

অর্থ : আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অচিরেই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوۡ اَشۡرَکُوۡا لَحَبِطَ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

অর্থ : এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আবু সাদ বিন আবু ফাদালাহ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ـ ‏ “‏ إِذَا جَمَعَ اللَّهُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ لِيَوْمٍ لاَ رَيْبَ فِيهِ نَادَى مُنَادٍ مَنْ كَانَ أَشْرَكَ فِي عَمَلٍ عَمَلَهُ لِلَّهِ فَلْيَطْلُبْ ثَوَابَهُ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ ‏”

অর্থ : আল্লাহ তায়ালা যখন কিয়ামতের দিন, যে দিনের আগমনে কোন সন্দেহ নাই, পূর্বাপর সকলকে একত্র করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে কাউকে শরীক করেছে, সে যেন গাইরুল্লাহর নিকট নিজের সওয়াব চেয়ে নেয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা শরীকদের শেরেক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৩, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৪, আহমাদ : ১৭৪৩১, মিশকাত : ৫৩১৮

৩। মুশরিকদের কোন আমলই কবুল হবে না :

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ

অর্থ : বাহয ইবনে হাকিম (রা.) থেকে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যতক্ষণ যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলিমদের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহিহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানী হাসান।

৪। মুশরিক জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

অর্থ : আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

৫। মুশরিকের সমস্ত কৃতকর্ম ধুলোর মতো উড়িয়ে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰہُ ہَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا

অর্থ : আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

৬। মুশরিকের জন্য জান্নাত হারাম :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

 ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَمَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ

অর্থ : নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা মায়েদা : ৭২

‏‏

এ সম্পর্কিত একটি হাদিস

حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُعَاذٍ الْعَنْبَرِيُّ، حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي عِمْرَانَ الْجَوْنِيِّ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   قَالَ ‏ “‏ يَقُولُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى لأَهْوَنِ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا لَوْ كَانَتْ لَكَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا أَكُنْتَ مُفْتَدِيًا بِهَا فَيَقُولُ نَعَمْ فَيَقُولُ قَدْ أَرَدْتُ مِنْكَ أَهْوَنَ مِنْ هَذَا وَأَنْتَ فِي صُلْبِ آدَمَ أَنْ لاَ تُشْرِكَ – أَحْسَبُهُ قَالَ – وَلاَ أُدْخِلَكَ النَّارَ فَأَبَيْتَ إِلاَّ الشِّرْكَ

অর্থ : আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা জাহান্নামীদের মধ্যে যার আজাব সবচেয়ে হালকা, তাকে বলবেন, যদি তোমার জন্য দুনিয়া এবং তাতে যা কিছু আছে সব হতো, তুমি কি তা মুক্তিপণ হিসেবে দিতে চাইতে?

সে বলবে: হ্যাঁ।

তখন আল্লাহ বলবেন: আমি তো তোমার থেকে এর চেয়েও সহজ একটি জিনিস চেয়েছিলাম যখন তুমি আদমের ঔরসে ছিলে—তা হলো: তুমি আমার সাথে কোন কিছু শরীক করবে না। বর্ণনাকারী বলেন, সম্ভবত নবি ﷺ বলেননি—আর আমি তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো না। কিন্তু তুমি এতে অস্বীকৃতি জানালে, বরং তুমি শির্কই করলে। সহিহ মুসলিম : ২৮০৫, সহিহ হাদিসে কুরসি : ৯

৭। মুশরিক পথভ্রষ্ট :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। সুরা নিসা : ১১৬

৮। মুশরিককের আল্লাহ মূল্যহীন বস্তুর সাথে তুলনা করেছেন :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

حُنَفَآءَ لِلّٰہِ غَیۡرَ مُشۡرِکِیۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ

অর্থ : আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে দূরের কোনো জায়গায় নিক্ষেপ করল। সুরা হজ : ৩১

৯। মুশরিক মৃত্যুর পরও মুসলিমদের দুআ থেকে বঞ্চিত থাকবে :

সকলের হেদায়েতের জন্য দুআ করা ঈমানের দাবি। কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে তার ক্ষমার জন্য দুআ করা যাবে না। ইব্রাহীম ইব্রাহীম (আ.) তার মুশরিক পিতা আজরের  জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে পারেনি। এমনি প্রিয় নবি মুহম্মাদ তার পিতা মাতার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে পারেনি। যখন কেউ মুশরিক অবস্থায় মারা যায় তখন সে তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত হয়ে যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ یَّسۡتَغۡفِرُوۡا لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ وَلَوۡ کَانُوۡۤا اُولِیۡ قُرۡبٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

অর্থ : নবি ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা তওবা : ১১৩

১০। শিরক পরিত্যাগকারীর স্থান হবে জান্নাতে :

‏‏َحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، وَابْنُ، بَشَّارٍ قَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ وَاصِلٍ الأَحْدَبِ، عَنِ الْمَعْرُورِ بْنِ سُوَيْدٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا ذَرٍّ، يُحَدِّثُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   أَنَّهُ قَالَ ‏”‏ أَتَانِي جِبْرِيلُ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ

অর্থ : আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন, জিবরীল (আ.) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবু যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ৯৪

জাবির (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবি ﷺ এর সামনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল- ইয়া রাসুলুল্লাহ! ওয়াজিবকারী (অবশ্যম্ভাবী) দুটি বিষয় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক না করে যে ব্যক্তি মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, এক বেদুইন নবি ﷺ -এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যদি আমি তা সম্পাদন করি তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসুল ﷺ বললেন, আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরজ সালাত আদায় করবে, ফরজ জাকাত প্রদান করবে, রমাজান মাসে সিয়াম পালন করবে। সে বলল, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবি ﷺ বললেন, যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়।  সহিহ বুখারি : ১৩৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৪, আহমাদ ৮৫, সহিহ আত্ তারগিব ৭৪৮; মিশকাত : ১৩

মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি  বলেন, আমি এক সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর গাধা উফায়রের পিঠে তার পিছনে বসা ছিলাম।  রাসুল ﷺ বললেন, হে মুয়াজ! তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী ? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভাল জানেন। রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোনোকিছু শরীক করবে না। আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তাঁর সঙ্গে শরীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দিবেন না। মুয়াজ (রা.) বললেন, আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি লোকদের এ সংবাদ জানিয়ে দেব? তিনি বললেন, না, লোকদের এ সংবাদ দিও না, দিলে এর উপরই তারা ভরসা করে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৩০

১১। শিরককারী এর সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে :

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

অর্থ : প্রত্যেক নবির জন্য একটি করে দুআ আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবি তাঁর দুআর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দুআ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফায়াত প্রাপ্ত হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭, সুনানে তিরমিজি ৩৬০২, আহমাদ ৭৬৫৭, ২৭৩৪৮, মুয়াত্তা মালেক : ৪৯২, দারেমী : ২৮০৫।

১২। শিরক একটি নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ :

অর্থ : আবু বকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন-   ‏

“‏ أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ ‏

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কবিরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেন, হাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

আবু বকরা (রা.) বলেন যে, আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে বলব না? তিনি এ কথাটি তিনবার বললেন। (তারপর বললেন) সেগুলো হলো, আল্লাহর সাথে শারীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কিংবা কথা বলা। এ সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ হেলান দিয়ে বসা ছিল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং (শেষোক্ত) কথাটি বারবার বলতে লাগলেন। এমন কি আমরা মনে মনে বলছিলাম, আহা তিনি যদি থামতেন। সহিহ মুসলিম : ৮৭

আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে নবি ﷺ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, (১) আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা (২) যাদু (৩) আল্লাহ্ তায়ালা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতিমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মুমিনদের অপবাদ দেয়া। সহিহ বুখারি : ২৭৬৬, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, সহিহ মুসলিম : ৮৯, সুনানে নাসায়ি : ৩৬৭১, সুনানে আবু দাউদ : ২৮৭৪

আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ﷺ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ গণ্য কর অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। লোকটি বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর হলো, তুমি তোমার সন্তানকে এ ভয়ে হত্যা কর যে, সে তোমার সঙ্গে খাদ্য খাবে। লোকটি বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর হলো, তুমি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে জিনা কর। অতঃপর আল্লাহ্ এ কথার সত্যতায় অবতীর্ণ করলেন, ’’এবং তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে আহ্বান করে না, আল্লাহ্ যার হত্যা নিষেধ করেছেন উপযুক্ত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে’’। সুরা ফুরকান-৬৮)। সহিহ বুখারি : ৬৮৬১, সহিহ মুসলিম : ৮৬, সুনানে নাসায়ি :৪০১৩, সুনানে আবু দাঊদ : ২৩১০, সুনানে তিরমিজি : ৩১৮২, মিশকাত : ৪৯

১৩। মুশরিকদের ইলাহ এর কোন অস্তিত্ব নাই :

মুশরিকদের ইলাহ কারো উপকার বা অপকার করতে পারে না, এমনকি আল্লাহ নিকট সুপারিশও করতে পারেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَیَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰہَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও জমিনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সুরা ই্উনুস : ১৮

তাওহীদের ফজিলত

তাওহীদের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. তাওহীদের স্বীকৃতি দিলেই জান্নাত হবে :

উসমান (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»

যে ব্যক্তি (খাঁটি মনে) এ বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে যে, ’’আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই’’ সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৬. শুয়াবুল ঈমান : ৯৪

আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবি ﷺ বলেছেন-

‏”‏ يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ ‏”‏‏.‏

অর্থ : যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী (ঈমান) থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। সহিহ বুখারি : ৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৯৩, আহমাদ : ১২১৫৪

জাবির (রা.) বলেন, যে এক ব্যক্তি নবি ﷺ এর সামনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল- ইয়া রাসুলুল্লাহ! ওয়াজিবকারী (অবশ্যম্ভাবী) দুটি বিষয় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক না করে যে ব্যক্তি মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩, মিশকাত : ৩৭, আহমাদ : ২৫২০০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ১৩২৯৬।

উবাদাহ (রা.) সূত্রে নবি ﷺ বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই আর মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসুল আর নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল এবং তাঁর সেই কালিমা যা তিনি মারইয়ামকে পৌঁছিয়েছেন এবং তাঁর নিকট হতে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন। জুনাদাহ (রহ.) হতে বর্ণিত হাদিসে জুনাদাহ অতিরিক্ত বলেছেন যে, জান্নাতে আট দরজার যেখান দিয়েই সে চাইবে। সহিহ বুখারি : ৩৪৩৫, সহিহ মুসলিম :  ২৮, আহমাদ : ২২৭৩৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২০৭, সহিহ আল জাম : ৬৩২০, সহিহ আত তারগিব : ১৫২১

আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবি ﷺ এর নিকট আসলাম। তাঁর পরনে তখন সাদা পোশাক ছিল। তখন তিনি ছিল নিদ্রিত। কিছুক্ষণ পর আবার এলাম, তখন তিনি জেগে গেছেন। তিনি বললেন, যে কোন বান্দা ’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং এ অবস্থার উপরে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেন, যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও। আমি বললাম, যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও? তিনি বললেন যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আবু যারের নাক ধূলি ধুসরিত হলেও। আবু যার যখনই এ হাদিস বর্ণনা করতেন তখন আবু যারের নাসিকা ধুলাচ্ছন্ন হলেও বাক্যটি বলতেন। আবু ’আবদুল্লাহ ইমাম বুখারি) বলেন, এ কথা প্রযোজ্য হয় মৃত্যুর সময় বা তার পূর্বে যখন সে তওবা করে ও লজ্জিত হয় এবং বলে ’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’, তখন তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ৫৮২৭, মুসলিম ৯৪, মিশকাত : ২৫, আহমাদ ২১৪৬৬, সহিহ আল জামি ৫৭৩৩।

আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ وَقُلْتُ أَنَا مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ

যে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যে আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুর শির্ক না করা অবস্থায় মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ১২৩৮, ৪৪৯৭, ৬৬৮৩

আবু যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন-

أَتَانِي آتٍ مِنْ رَبِّي فَأَخْبَرَنِي أَوْ قَالَ بَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ

অর্থ : একজন আগন্তুক [জিবরীল (আ.)] আমার প্রতিপালকের নিকট হতে এসে আমাকে খবর দিলেন অথবা তিনি বলেছেন, আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর  সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যদিও সে জিনা করে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে? তিনি বললেন : যদিও সে জিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে। সহিহ বুখারি : ১২৩৭, ১৪০৮, ২৩৮৮, ৩২২২, ৫৮২৭, ৬২৬৮, ৬৪৪৩ ৬৪৪৪, ৭৪৮৭, সহিহ মুসলিম : ৯৪, আহমাদ : ২১৪৭১

আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, একদা আমরা (সাহাবাগণ) রাসুলুল্লাহ ﷺ কে ঘিরে বসেছিলাম। আমাদের জামা’আতে আবু বকর এবং উমর (রা.) ও ছিল। এ সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝ থেকে উঠে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ অতিক্রান্তের পর আমরা শঙ্কিত হলাম যে, তিনি কোথাও কোন বিপদের সম্মুখীন কিনা। তাই আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আর আমি সর্বপ্রথম বিচলিত হলাম। তাই আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর খোঁজে বের হয়ে পড়লাম। আমি বানু নাজ্জারের জনৈক আনসারীর বাগানের নিকট এসে উপনীত হলাম। আর বাগানের অভ্যন্তরে প্রবেশের কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সেজন্য চারদিকে ঘুরলাম। কিন্তু পেলাম না। হঠাৎ দেখতে পেলাম বাইরের একটি কুয়া থেকে একটি নালা বাগানের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। সংকীর্ণ নালাকে জাদওয়াল’ বলা হয়। অতঃপর আমি নিজেকে শেয়ালের ন্যায় সংকুচিত করে নর্দমার মধ্য দিয়ে গিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপনীত হলাম।

তিনি বললেন, আবু হুরায়রা নাকি? আমি বললাম, জী-হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? আমি বললাম, আপনি আমাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ উঠে চলে আসলেন, আর দীর্ঘক্ষণ পরও ফিরে না যাওয়ায় আমরা বিচলিত হয়ে পড়েছি। আমাদের অনুপস্থিতিতে কোথাও বিপদের সম্মুখীন হলেন কিনা আমাদের এ আশঙ্কা হল। আর আমি সর্বপ্রথম বিচলিত হয়ে পড়ি। আমি এ দেয়ালের কাছে এসে শেয়ালের ন্যায় সংকুচিত হয়ে নালার ভিতর দিয়ে এখানে উপস্থিত হলাম। অন্যান্যরা আমার পেছনে আছেন। তিনি তার জুতা জোড়া আমাকে দিয়ে বললেন, হে আবু হুরায়রা! আমার জুতা জোড়া সাথে নিয়ে যাও। এ বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে বলো, “যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”

বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, সর্বপ্রথম উমর (রা.) এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে বললেন, হে আবু হুরায়রা! জুতা জোড়া কার? আমি বললাম, আল্লাহর রাসুলের। তিনি আমাকে এ জুতা জোড়াসহ এই বলে পাঠিয়েছেন যে, “যে ব্যক্তি প্রশান্ত মনে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তাকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ দিবে” তিনি আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমার এ কথা শুনে উমর (রা.) আমার বুকের উপর এমন জোরে চপেটাঘাত করলেন যে, আমি পেছন দিকে পড়ে গেলাম। আর তিনি বললেন, হে আবু হুরায়রা! তুমি (রাসুলুল্লাহ ﷺ এর) নিকট ফিরে চলো। তাই আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কাঁদো কাঁদো অবস্থায় ফিরে আসলাম। আমার পেছনে পেছনে উমর (রা.) সেখানে উপস্থিত হলেন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম, আমার সাথে উমারের সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং আপনি আমাকে যে সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তাকে এটা জানালে তিনি আমার বুকে এমন জোরে ঘুসি মারলেন যে, আমি পিছন দিকে পড়ে যাই। তিনি এটাও বলেছেন যে, আমি যেন (আপনার নিকট) ফিরে আসি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে উমর! কোন বস্তু তোমাকে এমন কাজ করতে উদ্যত করলো? তিনি বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক। আপনি কি আপনার জুতা জোড়াসহ আবু হুরায়রাকে এ বলে পাঠিয়েছেন যে, যার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে বলো, যে ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে এ সাক্ষ্য দিবে যে, “আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই” তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও? তিনি বললেন, হ্যাঁ।

উমর (রা.) বললেন, এরূপ করবেন না, কেননা আমার আশঙ্কা হচ্ছে এতে লোকেরা (আমল বর্জন করে) এর উপর ভরসা করে বসে থাকবে, কাজেই লোকদেরকে আমল করার সুযোগ দিন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আচ্ছা তাদেরকে ছেড়ে দাও। সহিহ মুসলিম : ৩১, ২৪০৮, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৫১, সহিহাহ : ১৩১৪, ২৩৫৫, আহমাদ : ১৮৭৮০, ১৮৮৪৬, দারেমী : ৩৩১৬

২. তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়ে মৃত্যু বরণ করলে সুপারিশের আশা করা যায় :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لاَ يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ، لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ ‏

অর্থ : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল ﷺ -কে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসুল ﷺ বললেন, আবু হুরায়রা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদিসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠ চিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০

ইবনে মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহ.) হতে বর্ণনা করেন, যখন আবু তালিবের মুমূর্ষু অবস্থা তখন নবি ﷺ তার নিকট গেলেন। আবু জাহেলও তার নিকট উপবিষ্ট ছিল। নবি ﷺ তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান, لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ কলেমাটি একবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া বলল, হে আবু তালিব! তুমি কি ‘আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবু তালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তাহল, আমি ‘আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবি ﷺ বললেন, আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাজিল হল,

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ یَّسۡتَغۡفِرُوۡا لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ وَلَوۡ کَانُوۡۤا اُولِیۡ قُرۡبٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

নবি ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। তাওবা : ১১৩। আরো নাজিল হলো-

اِنَّکَ لَا تَہۡدِیۡ مَنۡ اَحۡبَبۡتَ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ

নিশ্চয় তুমি যাকে ভালোবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন। সুরা কাসাস-৫৬। সহিহ বুখারি : ৩৮৮৪, ৪৬৭৫, ৪৭৭২, ৬৬৮১

৩. আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার না করলে তিনি বান্দার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি-

“‏ قَالَ اللَّهُ يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلاَ أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلاَ أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لاَ تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لأَتَيْتُكَ  بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً ‏”‏

অর্থ : আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮

৪. তাওহীদের স্বীকৃতি জাহান্নাম হারাম করে দেয় :

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  : “إِنِّي لَأَعْلَمُ كَلِمَةً لَا يَقُولُهَا عَبْدٌ حَقًّا مِنْ قَلْبِهِ فَيَمُوتُ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ لَا إِلَهَ إِلَّا الله

উমর বিন খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন: ’আমি এমন একটি বাক্য জানি, যা কোন যদি অন্তর থেকে সত্যনিষ্ঠভাবে বলে অতঃপর তার উপর মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দিবেন। বাক্যটি হলো ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। সহিহ ইবনে হিব্বান : ২০৪, মুসনাদ আহমাদ: ৬৩, ৬৫, সহিহ মুসলিম : ২৬, সুনানে নাসায়ি : ১১১৫। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি ইবনে হিব্বান থেকে সংকলন করা হয়েছে।

উবাদা  ইবনে সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

«مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَرَّمَ الله عَلَيْهِ النَّار»

যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ (তাঁর অনুগ্রহে) তার ওপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। সহিহ মুসলিম : ২৯, মিশকাত : ৩৫, তিরমিজি ২৬৩৮, আহমাদ ২২৭১১, সহিহ ইবনে হিব্বান ২০২, সহিহ আল জামি ৬৩১৯।

একদা মুআয (রা.) নবি ﷺ -এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলেন, তখন তিনি তাকে ডাকলেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল আমি আপনার সার্বিক সহযোগিতা ও খিদমাতে হাজির আছি। তিনি ডাকলেন, মু‘আয! মু‘আয (রা.) উত্তর দিলেন, আমি হাজির হে আল্লাহর রাসুল এবং প্রস্তুত।’ তিনি আবার ডাকলেন, মু‘আয। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি হাজির এবং প্রস্তুত’। এরূপ তিনবার করলেন। অতঃপর বললেন, যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল’-তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে।’ মু‘আয (রা.) (জীবন ভর এ হাদিসটি বর্ণনা করেননি) মৃত্যুর সময় এ হাদিসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে (‘ইল্ম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়। সহিহ বুখারি : ১২৮, ১২৯,  সহিহ মুসলিম : ৩২

সুনাবিহী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি উবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন। সুনাবিহী বলেন, উবাদাহ ইবনে সীমিত (রা.) যখন মৃত্যু শয্যায় তখন আমি তার নিকট গেলাম, (তাকে দেখে) আমি কেঁদে ফেললাম। এ সময় তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, থামো, কাঁদছ কেন? আল্লাহর কসম! আমাকে যদি সাক্ষী বানানো হয়, আমি তোমার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিবো, আর যদি সুপারিশ করার অধিকারী হই তবে তোমার জন্য সুপারিশ করবো। আর যদি তোমার কোনো উপকার করতে পারি, নিশ্চয় সেটাও করবো। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এ যাবৎ আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যে কোন হাদিস শুনেছি, যার মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে, তা আমি অবশ্যই তোমাদের কাছে বর্ণনা করেছি। কিন্তু একটি মাত্র হাদিস (যা এতদিন আমি তোমাদেরকে বলিনি) আজ এখনই তা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করবো। কেননা বর্তমানে আমি মৃত্যুর বেষ্টনীতে আবদ্ধ। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন। সহিহ মুসলিম : ২৯

৫. তাওহীদের উপর থাকলে মহান আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন না :

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন_

كُنْتُ رِدْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   عَلَى حِمَارٍ يُقَالُ لَهُ عُفَيْرٌ قَالَ فَقَالَ ‏”‏ يَا مُعَاذُ تَدْرِي مَا حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ وَمَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَحَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لاَ يُعَذِّبَ مَنْ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ أُبَشِّرُ النَّاسَ قَالَ ‏”‏ لاَ تُبَشِّرْهُمْ فَيَتَّكِلُوا

আমি এক সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর গাধা উফায়র এর পিঠে তার পিছনে বসা ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মুআয! তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তার সঙ্গে কোন কিছু শারীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তার সঙ্গে শারীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দিবেন না। মু’আয বললেন, ’আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি লোকদের এ সংবাদ জানিয়ে দেব না? তিনি বললেন, না; লোকেদের এ সংবাদ দিও না, তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৩০, সহিহ বুখারি : ২৮৫৬ ও ৫৯৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৯৬, সহিহ আল জামি : ৭৯৬৮।

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সময় নবি ﷺ এর বাহনের পিছনে বসা ছিলাম। আমার ও নবি ﷺ এর মাঝে হাওদার কাঠের টুকরা ব্যতীত কোন ব্যবধান ছিল না। নবি ﷺ বললেন, “হে মুআয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! উপস্থিত আছি আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, ’হে মুআয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! উপস্থিত আছি, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। তিনি বললেন, তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর কী হক রয়েছে? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসূলই তা উত্তম জানেন। নবি ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা তার ইবাদাত করবে এবং তার সঙ্গে কোন কিছুকে শারীক করবে না। অতঃপর কিছু দূর চললেন, নবি ﷺ আবার বললেন, হে মু’আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! উপস্থিত আছি, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। নবি ﷺ বললেন, তুমি কি জানো, এগুলো করলে আল্লাহর কাছে বান্দার কী হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ তার রাসূলই ভালো জানেন। নবি বললেন, “আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিবেন না। সহিহ মুসলিম : ৪৯

আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত যে, একদা মু‘আয (রা.) নবি ﷺ -এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলেন, তখন তিনি তাকে ডাকলেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল আমি আপনার সার্বিক সহযোগিতা ও খিদমাতে হাজির আছি। তিনি ডাকলেন, মু‘আয! মু‘আয (রা.) উত্তর দিলেন, আমি হাজির হে আল্লাহর রাসুল এবং প্রস্তুত।’ তিনি আবার ডাকলেন, মু‘আয। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি হাজির এবং প্রস্তুত’। এরূপ তিনবার করলেন। অতঃপর বললেন, যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল’-তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে।’ মু‘আয (রা.) (জীবন ভর এ হাদিসটি বর্ণনা করেননি) মৃত্যুর সময় এ হাদিসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে (‘ইল্‌ম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়। সহিহ বুখারি : ১২৮, ১২৯, সহিহ মুসলিম : ৩২, সহিহ আত্ তারগিব : ১৫২২, শুয়াবুল ঈমান : ১২৫

৬. তাওহীদের স্বীকৃতি জান ও মালের নিরাপত্তা দেয় :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ـ ‏ “‏ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فَإِذَا قَالُوهَا عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‏”‏

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন, আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে আর যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলবে সে তার জান ও মাল আমার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিল। অবশ্য ইসলামের কর্তব্যাদি আলাদা, আর তার হিসেব আল্লাহর উপর ন্যস্ত।

 সহিহ বুখারি : ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫, সহিহ মুসলিম : ২১, সুনানে তিরমিজি ২৬০৬-৭, সুনানে নাসায়ি ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; সুনানে আবু দাঊদ ২৬৪০, সহিহাহ ৪০৭

ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন-

“‏ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ

আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও জাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসেবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত। সহিহ বুখারি : ২৫, সহিহ মুসলিম : ২২, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৭৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৫১৪১।

৭. তাওহীদের বাণীই সবচেয়ে ভারী আমল নামা :

’আবদুল্লাহ ইবনে ’আমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ سيخلِّصُ رجلا من أُمّتي على رُؤُوس الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلًّا كُلُّ سِجِلٍّ مِثْلَ مَدِّ الْبَصَرِ ثُمَّ يَقُولُ: أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا؟ أَظَلَمَكَ كَتَبَتِي الحافظون؟ فَيَقُول: لَا يارب فَيَقُول: أَفَلَك عذر؟ قَالَ لَا يارب فَيَقُولُ بَلَى. إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ الْيَوْمَ فَتُخْرَجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولُ احْضُرْ وَزْنَكَ. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السِّجِلَّاتِ؟ فَيَقُولُ: إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ قَالَ: فَتُوضَعُ السِّجِلَّاتُ فِي كِفَّةٍ وَالْبِطَاقَةُ فِي كِفَّةٍ فَطَاشَتِ السِّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ الله شَيْء .

অর্থ : কিয়ামতের দিন এমন এক লোককে (মুক্তি দেয়া হবে এভাবে যে, তাকে) জনসম্মুখে উপস্থিত করা হবে যার ’আমলনামা খোলা হবে নিরানব্বই ভলিউমে এবং প্রতিটি ভলিউম বিস্তীর্ণ হবে দৃষ্টির সীমা অবধি। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রশ্ন করবেন, আচ্ছা বল দেখি, তুমি এর কোন একটিকে অস্বীকার করতে পারবে? অথবা আমার লেখক মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) কি তোমার প্রতি অবিচার করেছে? সে বলবে না; হে আমার প্রভু!

আল্লাহ তায়ালা প্রশ্ন করবেন, তবে কি তোমার পক্ষ হতে কোন ওযর পেশ করার আছে? সে বলবে, না; হে আমার রব! তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হ্যাঁ, তোমার একটি পুণ্য আমার নিকট আছে। তুমি নিশ্চিত জেনে রাখ, আজ তোমার প্রতি কোন জুলুম বা অবিচার করা হবে না। এরপর এক টুকরা কাগজ বের করা হবে, যাতে রয়েছে- (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ) “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল”।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবেন, তোমার ’আমালের ওজন দেখার জন্য উপস্থিত হও। তখন সে বলবে, হে প্রভু! ঐ সমস্ত বিরাট বিরাট রেজিস্ট্রারের মোকাবিলায় এই এক টুকরা কাগজের মূল্যই বা কি আছে?

তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তোমার ওপর কোনো অবিচার করা হবে না। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর ঐ সকল রেজিস্ট্রারগুলো পাল্লার এক পালিতে এবং এ কাগজের টুকরাখানি আরেক পালিতে রাখা হবে। তখন দফতরগুলোর পালি হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে এবং কাগজের টুকরার পালি ভারী হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে থাকবে। মোটকথা, আল্লাহর নামের সাথে অন্য কোন জিনিস ওজন হতে পারবে না।

মিশকাত : ৫৫৫৯, সুনানে তিরমিজি ২৬৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ ৪৩০০, সহিহ জামি : ১৭৭৬, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ১৩৫, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২২৫, শুয়াবুল ঈমান : ২৮৩

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ مَا قَالَ عَبْدٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَطُّ مُخْلِصًا إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ حَتَّى تُفْضِيَ إِلَى الْعَرْشِ مَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ ‏”‏

অর্থ : কোন বান্দা সততার সাথে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” বললে তার জন্য আকাশের দ্বারগুলো খোলা হয়। ফলে উক্ত কালিমা আরশে আজীম পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যতক্ষণ সে কবীরাহ গুনাহ ত্যাগ করে”। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৯০, সহিহ জামেউস সাগির : ৫৬৪৮

৮. মৃত্যুর সময়ও তাওহীদের স্বীকৃতি দিলে জান্নাতে যাবে :

উসমান (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏

অর্থ : যে ব্যক্তি এই অবস্থায় মারা যাবে যে, সে জানে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ২৬

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

  : مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ

অর্থ : যার সর্বশেষ বাক্য হবে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩১১৬, রিয়াদুস সালেহীন : ৯২২, মাসনদে আহমাদ : ২১৫২৯, ২১৬২২

আবু সাঈদ ও আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যায় তাকে কালিমায়ে ’লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ তালকিন দিও।  মুসলিম ৯১৬, ৯১৭, আত্ তিরমিজি ৯৭৬, নাসায়ি ১৮২৬, ইবনে মাজাহ্ ১৪৪৪, ১৪৪৫, মিশকাত : ১৬১৬

সুদা আল মুররিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের পর উমর (রা.) তালহা (রা.) এর নিকট দিয়ে যেতে তাকে বলেন, তোমার কী হয়েছে, তুমি বিষণ্ন কেন? তোমার চাচাতো ভাইয়ের খেলাফত কি তোমার অপছন্দ হয়েছে? তালহা (রা.) বলেন, না। বরং আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমার এমন একটি বাক্য জানা আছে, যা কোন ব্যক্তি তার মৃত্যুর সময় বললে সেটা তার আমলনামার জন্য নূর হবে এবং নিশ্চয় তার দেহ ও আত্মা মৃত্যুর সময় তাকে শান্তি ও স্বস্তি দিবে। সেটি আমি তাকে জিজ্ঞেস করিনি, এরই মধ্যে তিনি ইনতিকাল করেন। উমর (রা.) বলেন, আমি সেটি জানি। তা হলো সেই কলেমা যা তিনি তাঁর চাচার নিকট পেশ করেছিলেন। যদি তিনি জানতেন যে, সেই কলেমার চেয়েও অধিক নাজাত দানকারী কিছু আছে, তবে অবশ্যই তিনি সেটি তাঁর চাচার নিকট পেশ করতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৯৫, আহমাদ : ১৩৮৭। তাহকীক আলবানি হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, এক বেদুইন নবি ﷺ -এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যদি আমি তা সম্পাদন করি তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসুল ﷺ বললেন, আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরজ সালাত আদায় করবে, ফরজ জাকাত প্রদান করবে, রমাজান মাসে সিয়াম পালন করবে। সে বলল, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবি ﷺ বললেন, যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়। সহিহ বুখারি : ১৩৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৪, আহমাদ : ৮৫, সহিহ আত তারগিব : ৭৪৮।

আবু জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে ‘আব্বাস (রা.)-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হতে কিয়দংশ প্রদান করব। আমি তাঁর সাথে দু’মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আবদুল কায়েস-এর একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসুল ﷺ -এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন, তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন,, প্রতিনিধিদলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের।’ তিনি বললেন, স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! শাহরুল হারাম ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফিরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারি। তারা পানীয় সম্বন্ধেও জিজ্ঞেস করল।

তখন তিনি তাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ এবং চারটি বিষয় হতে নিষেধ করলেন। তাদেরকে এক আল্লাহ্তে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বললেন, এক আল্লাহর প্রতি কীভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা হয় তা কি তোমরা অবগত আছ?’ তাঁরা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জ্ঞাত।’ তিনি বললেন, ‘তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত আদায় করা, রমজানের সিয়াম পালন করা; আর তোমরা গনিমতের সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে। তিনি তাদেরকে চারটি বিষয় হতে বিরত থাকতে বললেন। আর তা হচ্ছে- সবুজ কলস, শুকনো কদুর খোল, খেজুর বৃক্ষের গুড়ি হতে তৈরি বাসন এবং আলকাতরা দ্বারা রাঙানো পাত্র।  সহিহ বুখারি : ৫৩, ৮৭, ৫২৩, ১৩৯৮, ৩০৯৫, ৩৫১০, ৪৩৬৮, ৪২৬৯, ৬১৭৬, ৭২৬৬, ৭৫৫৬; মুসলিম : ১৭, মিশকাত : ১৬, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৭২, আহমাদ : ২০২০, সহিহ আল জামি : ১০

৯. তাওহীদের স্বীকৃতি বান্দাকে দুনিয়া এবং আখিরাতের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন :

বারা ইবনে ’আজিব (রা.) হতে বর্ণিত। নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহﷺ বলেছেন-

الْمُسْلِمُ إِذَا سُئِلَ فِي الْقَبْرِ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ فَذَلِكَ قَوْلُهُ (يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ

অর্থ : কবরে মুসলিমকে যখন প্রশ্ন করা হবে, তখন সে সাক্ষ্য দিবে ’’লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’’ আল্লাহর বাণীতে এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। বাণীটি হলো এই ’’যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন’। সুরা ইবরাহীম-২৭।

সহিহ বুখারি : ৪৬৯৯, সুনানে আবু দাঊদ ৪৭৫০, সহিহ আল জামি : ৬৭০৮, সহিহাহ ; ৩৯৬৩, সুনানে নাসায়ি ২০৫৭, সুনানে তিরমিজি ৩১২০

বারা ইবনে আযিব (রা.) এর সূত্রে নবি ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর বাণী- “যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন” সম্পর্কে বলেন, এ আয়াত কবরের আজাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কবরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ এবং আমার নবি মুহাম্মাদ। এটাই আল্লাহর নিম্নবর্ণিত বাণীর মর্ম, “যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়া ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৮৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ্ ৪২৬৯।

তাওহীদ ও শিরক

তাওহীদ ও শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওহীদ (توحيد) শব্দটি আরবি। যার অর্থ একত্ববাদ। কোনো কিছুকে এক মনে করা, এক ঘোষণা করা বা “একত্ব স্বীকার করা”। ইসলামি পরিভাষায় “আল্লাহ তায়ালা যে সত্তা, তাঁর গুণাবলি, কাজ, অধিকার ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি এক ও অনন্য। এ বিশ্বাস করা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি।

তাওহীদের তিনটি শাখা বা প্রকারভেদ :

তাওহীদকে সহজভাবে বুঝানোর জন্য আলেমগণ এটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব :

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, পরিচালনাকারী ও জীবিকা প্রদানকারী। কেউই তার এই গুণে শরিক নয়। তিনিই আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই বৃষ্টি দেন, মৃত্যু ও জীবন দেন।

বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষী নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَللّٰہُ خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ ۫ وَّہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ وَّکِیۡلٌ

অর্থ : আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। সুরব যুমার : ৬২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُ‌ۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬‌ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ‌ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَ‌ۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ‌ۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَا‌ۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيم

অর্থ :  “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। সুরা বাকারা : ২৫৫

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, ’’বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। বানী আদম আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার জন্য উচিত হয়নি। আমার প্রতি মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ্ আমাকে যে রকম প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন না। অথচ তাকে আবার জীবিত করা অপেক্ষা প্রথমবার সৃষ্টি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমাকে তার গালি দেয়ার অর্থ হল, সে বলে, আল্লাহ্ তায়ালা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং কেউ আমার সমকক্ষ নয়। সহিহ বুখারি : ৪৯৭৪, সুনানে নাসায়ি : ২০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২৬৭।

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ, জাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দুআ, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

সকল মুসলিম তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। এমনকি মুশরিকগণও তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। কিন্তু তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবি রাসুল প্রেরণ করছেন। তারা এসে তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা শুধু আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

অর্থ : আপনার পূর্বে আমি যে রাসুল পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সুরা আম্বিয়া : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

অর্থ : আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসুল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

অর্থ : আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসেব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরব মুমিনুন : ১১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا

অর্থ : এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা ইসরা : ৫৭

অতএব তাওহীদ আল ইবাদাত এর ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি একাই ইবাদত পাওয়ার অধিকারী এবং তিনিই মানুষকে ইবাদাতের কল্যাণকর প্রতিদান দেওয়ার অধিকারী।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সূত্র: তাফসীরুল উসরিল আখির মিনাল কুরআনুল কারীম

তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত  আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলিতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي

অর্থ : কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন, সুরা শুরা-১১)

যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্তার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَا‌ۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦ‌ۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কিছু উদাহরণ হল: আর রহমান (দয়াবান), আর রহিম (দয়ালু), আস সামী (সর্বদ্রষ্টা), আল বাসির (সর্বশ্রোতা),আল আযিয(পরাক্রমশালী), আল হাকিম (প্রজ্ঞাময়), আল হালিম (সহনশীল), আর আলিম (সর্বজ্ঞ) আল আলীউল কাবির (সর্বোচ্চ), আল হাইউল (চিরঞ্জীব) আল কাইউম

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুল ﷺ বলেন-

«إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجَنَّةَ»

অর্থ : আল্লাহর নিরানব্বই নামটি নাম রয়েছে যে ব্যক্তি সেগুলোর যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭

শিরক (شِرۡکَ)

তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য ধারনা পেলাম। তাওহীদের বিপরীত কর্ম হলে শিরক। তাওহীদকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শিরকতে বুঝতে হবে। তাই খুবই সংক্ষেপে শিরক ও তার কুফল সম্পর্কে আলোচন করা হবে।

একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরিকের সংমিশ্রণ। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ 

অর্থ : অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।

এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡ ۙ

অর্থ : এবং তাকে আমার কাজের অংশী করুন। সুরা ত্বহা : ৩২

এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়তের অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন- 

মূর্তি বা দেবতার পূজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।

শরীয়তের পরিভাষায় শির্ক :

আল্লাহর রুববিয়াহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়াহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করাকে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।

এই সংজ্ঞা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও গুণাবলিতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।“ এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨

অর্থ : সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল। শির্ক যখন আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত।

শিরকের প্রকারভেদ :

উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।

খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।

ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-

আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবি, অথবা অলি, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান  বা ফিরিশতাগণ কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসুলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য জবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারণত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-

১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক

২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক

৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক

খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

অর্থ : সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ,  হজ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

হুযাইফাহ ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-

أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ

অর্থ : আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখানি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮

এ হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথাবার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ ‏ ‏

অর্থ : তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭

 শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরিটি  না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাওহীদ ও শিরকের মাঝে পার্থক্য :

বিষয়তাওহীদশিরক
সংজ্ঞাআল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলা ও মানাআল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা
ইবাদতের অধিকারকেবল আল্লাহরআল্লাহ ছাড়া অন্যকেও দেওয়া
উদ্দেশ্যআল্লাহর সন্তুষ্টিআল্লাহর সাথে অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন
ইবাদতের দৃষ্টিভঙ্গিশুধুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদতকাউকে ইবাদতের অংশীদার করা
ক্ষমতার বিশ্বাসআল্লাহর সব কিছুর ক্ষমতা আছেঅন্যেরও অলৌকিক ক্ষমতা আছে মনে করা
প্রভাবজান্নাতের পথে নিয়ে যায়জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়
নবিদের দাওয়াতসব নবি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেননবিরা শিরকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন
তাওবা না করলে পরিণতিক্ষমারযোগ্য, যদি ভুল হয়ক্ষমাহীন গুনাহ, যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যু হয়
অন্তর ও আমলের প্রভাবএকনিষ্ঠতা, শান্তি, একাগ্রতাবিভ্রান্তি, ভয়ের মিশ্রতা
ফলাফলজান্নাতের সফলতাজাহান্নামের শাস্তি ও চিরস্থায়ী ব্যর্থতা

ঈমানের ফজিলত

ঈমানের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআনের আলোক ঈমানদারের কিছু ফজিলত :

ঈমান ইসলামের মৌল ভিত্তি। এটি ছাড়া কোনো আমল, কোনো ইবাদত, কোনো নেক কাজই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনুল কারিমে বারবার ঈমান আনার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ঈমানকে সফলতার প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই ঈমান আনা প্রতিটি মানুষের মুক্তির জন্য ফরজ। মহান আল্লাহ কুরআনে অসংখ্য আয়াতে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা করেছেন। নিম্নে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-

(১) জান্নাতের অধিকারী হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ

অর্থ : এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ  وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ

অর্থ : অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫

(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সুরা রা’দ: ২৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত। সুরা আনাম: ৮২

(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার পাবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সুরা মায়েদাহ : ৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক। সুরা আনফাল : ৭৪

(৫) দুনিয়ায় ও আখেরত মর্যাদাবান করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ

অর্থ : তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সুরা মুজাদালাহ : ১

(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : আর আমি রাসুলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং সালাত কায়েম করে, আর জাকাত প্রদান করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। সুরা বাকারা  : ২৭৭

(৭) আল্লাহর রহমত লাভ করবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮

(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ

অর্থ : আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সুরা ত্বাহা : ৭৫

(৯) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে

মহান আল্লাহ বলেন

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই মহা সফলতা। সুরা ইউনুস : ৬৩-৬৪

(১০) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭

(১১)  ঈমান আনলে আল্লাহ নিরাপত্তা ও হেদায়েত দিবেন :

 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَـٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত।  সুরা আনাম : ৮২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী। সুরা হজ : ৫৪

(১২) ঈমানদারকে সাহায্য ও রক্ষা করা আল্লাহর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَٱنتَقَمۡنَا مِنَ ٱلَّذِينَ أَجۡرَمُواْ‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অতঃপর যারা অপরাধ করেছিল আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম। আর মুমিনদেরকে সাহায্য করা তো আমার কর্তব্য। সুরা রূম : ৪৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না, সুরা হজ : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ‌ۚ كَذَٲلِكَ حَقًّا عَلَيۡنَا نُنجِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (١٠٣)

অর্থ : এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে রক্ষা করি৷ এটিই আমার রীতি৷ মুমিনদের রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। সুরা ইউনুস : ১০৩

(১৩)  দুনিয়া আখেরাতে সফলকাম হবে :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে ও হিজরাত করেছে, আর নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তারা মর্যাদায় আল্লাহর কাছে অতি বড়, আর তারাই হচ্ছে পূর্ণ সফলকাম । সুর তাওবা : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ (١)

অর্থ : নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, সুরা মুমিনুন :১

(১৪) ঈমানদার মুমিন জন্য সম্মান ও মর্যাদা :

 :: আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‌ۚ وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের জন্য। সুরা মুনাফিকুন : ৮

(১৫) পৃথিবীতে খিলাফত বা শাসনভার প্রদান করবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَہُمُ ٱلَّذِى ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّہُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنً۬ا‌ۚ يَعۡبُدُونَنِى لَا يُشۡرِكُونَ بِى شَيۡـًٔ۬ا‌ۚ وَمَن ڪَفَرَ بَعۡدَ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡفَـٰسِقُونَ

অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগি করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে৷ আর যারা এমন কুফরি করবে তারাই ফাসেক ৷ সুরা নুর : ৫৫

(১৬) ঈমান আনলে আল্লাহ উত্তম জীবন দান করবেন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَنۡ عَمِلَ صَـٰلِحً۬ا مِّن ذَڪَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٌ۬ فَلَنُحۡيِيَنَّهُ ۥ حَيَوٰةً۬ طَيِّبَةً۬‌ۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا ڪَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবে এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে। সুরা নাহল

 : ৯৭

(১৭) আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

  وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡہِم بَرَكَـٰتٍ۬ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَـٰهُم بِمَا ڪَانُواْ يَكۡسِبُونَ

অর্থ : যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ লাভ। সুরা আরাফ : ৯৬

(১৮) ঈমান বান্দার পূর্বেকৃত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেয় :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ 

অর্থ : হে নবি আপনি অমুসলিমদের বলে দিন যে, তারা যদি বিরত হয়ে যায়, তাহলে পূর্বে সংঘটিত সব ক্ষমা করে দেয়া হবে। পক্ষান্তরে আবারও যদি তাই করে তাহলে পূর্ববর্তীদের পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে।  আনফাল : ৩৮

কুরআনের আলোকে ঈমান না আনার শাস্তি :

ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১) কুফরির কারণ জাহান্নামে বাসিন্দা হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ لِیَصُدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  فَسَیُنۡفِقُوۡنَہَا ثُمَّ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ حَسۡرَۃً ثُمَّ یُغۡلَبُوۡنَ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِلٰی جَہَنَّمَ یُحۡشَرُوۡنَ ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তারা নিজেদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে, আল্লাহর রাস্তা হতে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। তারা তো তা ব্যয় করবে। অতঃপর এটি তাদের উপর আক্ষেপের কারণ হবে এরপর তারা পরাজিত হবে। আর যারা কুফরি করেছে তাদেরকে জাহান্নামে সমবেত করা হবে। সুরা আনফাল : ৩৬

(২) কুফরির কারণে পরকালে আজাব দেওয়া হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে জমিন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(৩) অস্বীকারী  ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬

(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ

অর্থ : যারা কুফরি করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮

(৫) আখিরাতে অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥

অর্থ : আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আজাব। এ কারণে যে তারা কুফরি করত। সুরা ইউনুস : ৪

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অর্থ : এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরি করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫

(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চূড়ান্ত পথভ্রষ্ট

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, এরপর কুফরিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(৭)  দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬

(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا

অর্থ : অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫

(১০) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ

অর্থ : আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সুরা বাকারা: ৮৯

(১১) ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তি কালে কোন সাহায্যকারী পাবে না :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুর আল ইমরান : ৫৬

(১২) পরকালে কোন কিছুর বিনিময়ে মুক্তি প্রদান করা হবে না:

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করেছে ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মুক্তির বিনিময়ে যদি পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ দেয়া হয় তবুও কক্ষনো তা গ্রহণ করা হবেনা। ওদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং ওদের জন্য কোনোই সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(১৩) কাফির চুড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(১৪) কাফিরকে ক্ষমা করবেন না এবং হিদায়েতও দিবেন না :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَظَلَمُوۡا لَمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ طَرِیۡقًا

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাসী হয়েছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না ।সুরা নিসা : ১৬৮

সহিহ হাদিসের আলোকে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা :

১. অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না :

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

 ‏ “‏ لاَ يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ وَلاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرِيَاءَ ‏

অর্থ : যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যক্তির অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মুসলিম ৯১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৯৮-৯৯, সুনানে আবু দাঊদ ৪০৯১, আহমাদ : ৩৭৭৯, ৩৯০৩, ৩৯৩৭, ৪২৯৮।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 ‏”‏ يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ‏.‏ فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ اسْوَدُّوا فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَا ـ أَوِ الْحَيَاةِ، شَكَّ مَالِكٌ ـ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي جَانِبِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً ‏”‏‏.‏ قَالَ وُهَيْبٌ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ‏”‏ الْحَيَاةِ ‏”‏‏.‏ وَقَالَ ‏”‏ خَرْدَلٍ مِنْ خَيْرٍ

অর্থ : বেহেশতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা ফিরিশতাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনো। তারপর তাদের জাহান্নাম হতে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা (পুড়ে) কালো হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের বৃষ্টিতে বা হায়াতের [বর্ণনাকারী মালিক (রহ.) শব্দ দু’টির কোনটি এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন] নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন নদীর তীরে ঘাসের বীজ গজিয়ে উঠে। তুমি কি দেখতে পাও না সেগুলো কেমন হলুদ বর্ণের হয় ও ঘন হয়ে গজায়? সহিহ বুখারি : ২২, ৬৫৬০, সহিহ মুসলিম : ৮৪।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেন, মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশ পূজারি ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তি পূজারিরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইহুদিদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কীসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উজা্ইর  (আ.) এর ’ইবাদত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসিহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেককার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবি ﷺ বলেন, এরপর মহা ক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবিগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদায় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবিগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। একেবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়- ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’। সুরা নিসা : ৪০। তারপর নবি ﷺ, ফিরিশতা ও মুমিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফায়াত বাকী রয়েছে।

তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গেছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদ্‌গত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ নির্গত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আজাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবে। তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। সহিহ বুখারি : ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৮৩, সুননে ইবনে মাজাহ : ৬০, সহিহাহ : ৩০৫৪, আহমাদ : ১১১২৭

২. ইমান আনয়ন করা সবচেয়ে উত্তম আমল :

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   سُئِلَ أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ فَقَالَ ‏”‏ إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ حَجٌّ مَبْرُورٌ ‏

অর্থ : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘মাকবুল হাজ্জ সম্পাদন করা। সহিহ বুখারি : ২৬, ১৫১৯, সহিহ মুসলিম : ৮৩

৩. ঈমান গ্রহণ অতীতের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায় :

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ نَاسًا، مِنْ أَهْلِ الشِّرْكِ قَتَلُوا فَأَكْثَرُوا وَزَنَوْا فَأَكْثَرُوا ثُمَّ أَتَوْا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا إِنَّ الَّذِي تَقُولُ وَتَدْعُو لَحَسَنٌ وَلَوْ تُخْبِرُنَا أَنَّ لِمَا عَمِلْنَا كَفَّارَةً فَنَزَلَ ‏(‏ وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا‏)‏ وَنَزَلَ ‏(‏ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لاَ تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ‏)‏

অর্থ : ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, মুশরিকদের কিছু লোক যারা ব্যাপকভাবে হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল, তারা মুহাম্মাদ ﷺ এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি যে দীনের প্রতি মানুষদের আহ্বান জানাচ্ছেন, এতো অনেক উত্তম বিষয়। তবে আমাদের পূর্বকৃত গুনাহসমূহের প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কে আপনি যদি আমাদের নিশ্চিতভাবে কিছু অবহিত করতেন। তখন এ আয়াত নাজিল হয়ঃ “এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে”- (সুরাহ্ আল ফুরকান ২৫ঃ ৬৮)। আরো নাজিল করেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না”। সুরা জুমার : ৫৩। সহিহ মুসলিম : ১২২

ইবনে শামাসাহ আল মহরি (রহ.) বলেন, আমরা ’আমর ইবনে আস (রা.) কে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে অনেকক্ষণ কাঁদছিলেন। তার পুত্র তাকে তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রদত্ত বিভিন্ন সুসংবাদের উল্লেখপূর্বক সান্ত্বনা দিচ্ছে যে, আব্বা রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাবী বলেন, তখন তিনি পুত্রের দিকে মুখ ফিরালেন এবং বললেন, আমার সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া।

আর আমি অতিক্রম করেছি আমার জীবনের তিনটি পর্যায়। এক সময় তো আমি এমন ছিলাম যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধাচরণে আমার চেয়ে কঠোরতর আর কেউই ছিল না। সে সময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ কে কবজায় পেয়ে হত্যা করা ছিল আমার সবচাইতে প্রিয় ভাবনা। যদি সে অবস্থায় আমার মৃত্যু হত তবে নিশ্চিত আমাকে জাহান্নামে যেতে হত।

এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর দরবারে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ জানালাম যে, আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বাই’আত করতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি আমার হাত টেনে নিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমর, কি ব্যাপার? বললাম, পূর্বে আমি শর্ত করে নিতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কি শর্ত করবে? আমি উত্তর করলাম, আল্লাহ যেন আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’আমর! তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়। আর হিজরত পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আর হজ পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আমর বলেন, এ পর্যায়ে আমার অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা বেশি প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ নেই। অপরিসীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তার দৈহিক আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয় তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ চোখ ভরে আমি কখনোই তার প্রতি তাকাতে পারিনি। ঐ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হত তবে অবশ্যই আমি জান্নাতী হওয়ার আশাবাদী থাকতাম।

পরবর্তীকালে আমরা নানা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছি, তাই জানি না, এতে আমার অবস্থান কোথায়? সুতরাং আমি যখন মারা যাব, তখন যেন কোন বিলাপকারিণী অথবা আগুন সে জানাযার সাথে না থাকে। আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট জবেহ করে তার মাংস বণ্টন করতে যে সময় লাগে ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যেন তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্ক মুক্ত অবস্থায় থাকি ও চিন্তা করতে পারি যে, আমার প্রতিপালকের দূতের কি জবাব দিব। সহিহ মুসলিম : ১২১, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ :২৫১৫, সহিহ আল জামি : ১৩২৯, সহিহ আত্ তারগিব : ১০৯৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৮৯৯০

৪. ঈমান গ্রহণ অতীতের নেক আমল জমা থাকে :

عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَشْيَاءَ كُنْتُ أَفْعَلُهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ – قَالَ هِشَامٌ يَعْنِي أَتَبَرَّرُ بِهَا – فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ أَسْلَمْتَ عَلَى مَا أَسْلَفْتَ لَكَ مِنَ الْخَيْرِ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ فَوَاللَّهِ لاَ أَدَعُ شَيْئًا صَنَعْتُهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ إِلاَّ فَعَلْتُ فِي الإِسْلاَمِ مِثْلَهُ

হাকিম ইবনে হিযাম (রা.) বলেন,  আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! জাহিলী যুগে যে সকল নেক কাজ করতাম আমি কি তার কোন প্রতিদান পাবো? রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমার সে সব নেক কাজের বিনিময়ে তুমি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! জাহিলী যুগে যে সব নেক কাজ আমি করেছি ইসলামি জিন্দেগীতেও আমি তা করে যাব। সহিহ মুসলিম : ১২৩

৫. ঈমানদার ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন-

قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ خَيْبَرَ أَقْبَلَ نَفَرٌ مِنْ صَحَابَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ فُلاَنٌ شَهِيدٌ حَتَّى مَرُّوا عَلَى رَجُلٍ فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ كَلاَّ إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ فِي بُرْدَةٍ غَلَّهَا أَوْ عَبَاءَةٍ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ اذْهَبْ فَنَادِ فِي النَّاسِ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَخَرَجْتُ فَنَادَيْتُ ‏”‏ أَلاَ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏

অর্থ : খাইবারে অমুক অমুক শহীদ হয়েছেন। অবশেষে এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে তারা বললেন যে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, কখনই না। গনিমতের মাল থেকে চাঁদর আত্মসাৎ করার কারণে আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! যাও লোকেদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে কেবলমাত্র প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, তারপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করে দিলাম, “সাবধান! শুধুমাত্র প্রকৃত মুমিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ১১৪

৬. আহলে কিতাব থেকে যারা ঈমান আনবে, তাদের দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে :

আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন-

‏ “‏ ثَلاَثَةٌ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ الرَّجُلُ تَكُونُ لَهُ الأَمَةُ فَيُعَلِّمُهَا فَيُحْسِنُ تَعْلِيمَهَا، وَيُؤَدِّبُهَا فَيُحْسِنُ أَدَبَهَا، ثُمَّ يُعْتِقُهَا فَيَتَزَوَّجُهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ، وَمُؤْمِنُ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِي كَانَ مُؤْمِنًا، ثُمَّ آمَنَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَلَهُ أَجْرَانِ، وَالْعَبْدُ الَّذِي يُؤَدِّي حَقَّ اللَّهِ وَيَنْصَحُ لِسَيِّدِهِ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ قَالَ الشَّعْبِيُّ وَأَعْطَيْتُكَهَا بِغَيْرِ شَىْءٍ وَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يَرْحَلُ فِي أَهْوَنَ مِنْهَا إِلَى الْمَدِينَةِ‏.‏

অর্থ : তিন প্রকারের ব্যক্তিকে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। যে ব্যক্তির একটি বাদী আছে সে তাকে শিক্ষা দান করে, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয় এবং তাকে উত্তমরূপে শিষ্টাচার দান করে। তারপর তাকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বিয়ে করে। সে ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। আর আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মুমিন ব্যক্তি যে তার নবির উপর ঈমান এনেছিল। তারপর নবি ﷺ এর প্রতি ঈমান এনেছে। তাঁর জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। যে গোলাম আল্লাহর হক যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্বীয় মনিবের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। সহিহ বুখারি : ৩০১১, সহিহ মুসলিম : ১৫৪, সুনানে নাসায়ি ৩৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ১১১৬, দারিমী ২২৯০, সহিহ আল জামি : ৩০৭৩, সহিহ আত তারগিব :১৮৮২।

৭. দুনিয়াতে কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন :

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন বিপদ দূর করে দিবে, আল্লাহ তায়ালা বিচার দিবসে তার থেকে বিপদ সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তায়ালা তার নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৮। ঈমানদারের নেক আমল বৃদ্ধি করা হলেও পাপ বৃদ্ধি করা হয় না :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন-

إِذَا أَحْسَنَ أَحَدُكُمْ إِسْلاَمَهُ، فَكُلُّ حَسَنَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، وَكُلُّ سَيِّئَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِمِثْلِهَا

অর্থ : তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন সে যে আমলে সালেহ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত (পুণ্য) লেখা হয়। আর সে যে পাপ কাজ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য ঠিক ততটুকুই পাপ লেখা হয়। সহিহ বুখারি : ৪২, সহিহ মুসলিম : ১২৯, আহমাদ : ৮২১৭, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২২৮, শুয়াবুল ঈমান : ৭০৪৬, সহিহ জামি : ২৮৭

ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈমান (الإيمان) কি?

ঈমান (الإيمان) ইসলামি পরিভাষায় একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি একজন মুসলমানের জীবন ও আমলের ভিত্তি। ঈমান’ শব্দটি আরবি “أمن” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নিরাপত্তা, বিশ্বাস, শান্তি। পরিভাষায় ঈমান অর্থ- মৌখিক স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং তদনুযায়ী কাজের নামই হচ্ছে ঈমান। মনেপ্রাণে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া। ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা এবং শিরক ও মুশরিকদের সাথে সম্পর্কে ছিন্ন করা।

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের ﷺ আনীত সকল বিষয়ের প্রতি অন্তর দিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, তা মুখে বলবে এবং তার আচরণ ও কাজেও সে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাবে—এটাই ঈমান।

কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী ঈমানের সংজ্ঞা:

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَـٰبِ ٱلَّذِى نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلَّذِىٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُ‌ۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدًا (١٣٦)

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরি করলো সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো। সুরা নিসা : ১৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ‌ۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّن رُّسُلِهِۦ‌ۚ

রাসূল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনগণও! এরা প্রত্যেকে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবে, তাঁর রাসুলদের বিশ্বাস স্থাপন করে। সুরা বাকারা : ২৮৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

অর্থঃ বরং প্রকৃতপক্ষে সৎকাজ হলো- ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফিরিশতাদের উপর, এবং সমস্ত নবি রাসুলগণের উপর। সুরা বাকারা : ১৭৭

ঈমান সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস  :

ইবন উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-

“‏ بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‏”‏‏

ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। (১) আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। (২) সালাত কায়িম করা। (৩) জাকাত আদায় করা। (৪)  হাজ্জ সম্পাদন করা এবং (৫) রমজানের সিয়াম পালন করা।

সহিহ বুখারি : ৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম ১৬, সুনানে তিরমিজি ২৬০৯, সুনানে নাসায়ি ৫০০১, আহমাদ ৬০১৫, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ্ ১৮৮০;

ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাসরার অধিবাসী মা’বাদ জুহাইনাহ প্রথম ব্যক্তি যে তাকদীর অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনে ’আবদুর রহমান উভয়ে হজ অথবা উমরাহ’র উদ্দেশে রওয়ানা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যে কোন সাহাবার সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ঐ সব লোক তাকদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাখী তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সঙ্গে আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। (কারণ আমি ছিলাম বাক পটু)। আমি বললাম, “হে আবু আবদুর রহমান। আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াহইয়া তাদের কিছু গুণাবলীর কথাও উল্লেখ করলেন। তাদের ধারণা (বক্তব্য) হচ্ছে, তাকদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়।”

ইবনে উমর (রা.) বললেন, “যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের উপর ঈমান না আনবে। অতঃপর তিনি বললেন, আমার পিতা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোন চিহ্নও তার মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউই তাকে চিনেও না।

অবশেষে সে নবি ﷺ এর সামনে বসলো। সে তার হাটুদ্বয় নবি ﷺ এর হাটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তার (অথবা নিজের) উরুর উপর রাখলো এবং বলল, হে মুহাম্মাদ ﷺ! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইসলাম হচ্ছে এই– তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়িম করবে, জাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ করবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন। বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, আমরা তার কথা শুনে আশ্চার্যান্বিত হলাম। কেননা সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে।

এরপর সে বললো, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাকুল, তার কিতাবসমূহ, তার প্রেরিত নবিগণ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখবে এবং তুমি তাকদীর ও এর ভালো ও মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।

এবার সে বললো, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইহসান এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাকে দেখছো, যদি তাকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।

এবার সে জিজ্ঞেস করলো। আমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। অতঃপর সে বলল, তাহলে আমাকে এর কিছু নিদর্শন বলুন। তিনি বললেন, দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে এবং নগ্ন পদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র, বকরীর রাখালদের বড় দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গৰ্ব অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে।

বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরজ করলাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। সহিহ মুসলিম : ৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩, সুনানে নাসায়ি :  ৪৯৯০, ৪৬৯৫,  সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৯৫, আহমাদ : ১৮৫, ৩৬৯, ৩৭৬।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় তাঁর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ঈমান কী?’ তিনি বললেন, ‘ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, (কিয়ামতের দিন) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রাসুলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কী?’ তিনি বললেন, ‘ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ জাকাত আদায় করবেন এবং রমাযান-এর সিয়াম ব্রত পালন করবেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেন, ‘আপনি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিয়ামত কবে?’ তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে আমি আপনাকে কিয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছি, বাঁদি যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। (কিয়ামতের জ্ঞান) সেই পাঁচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ জানে না।’ অতঃপর আল্লাহর রাসূল ﷺ এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন-

اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ  وَیُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ  وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَکۡسِبُ غَدًا ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ٪

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪

এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেন, ‘তোমরা তাকে ফিরিয়ে আন।’ তারা কিছুই দেখতে পাইল না। তখন তিনি বললেন, ‘ইনি জিবরীল (আ)। লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫০, সহিহ মুসলিম : ১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৪, ৪০৪৪; সহিহ ইবনে খুযায়মাহ : ২২৪৪, আহমাদ ৯৫০১, হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ (أركان الإيمان) ছয়টি :

কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাইলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-

(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান, 

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, 

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান,

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং

(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।

(১) আল্লাহর ওপর ঈমান  (١ الإيمانُ باللهِ),

কী বিশ্বাস করতে হব- আল্লাহ একমাত্র উপাস্য (ইলাহ)। তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা ও শাসক। তাঁর কোনো শরীক নেই—না সত্তায়, না গুণে, না ইবাদতে। তিনি দৃষ্টিগোচর নন, কিন্তু সবকিছুই দেখেন ও জানেন। তিনি রাগ করেন, ভালোবাসেন, রহমত করেন এবং শাস্তি দেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেহই নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالمَلَائِكَةِ),

বিশ্বাস করতে হবে, ফেরেশতারা আল্লাহর তৈরি করা আলো সদৃশ জীব। তারা খাওয়া-দাওয়া করে না, ঘুমায় না, অবাধ্য হয় না। তারা সার্বক্ষণিক আল্লাহর আদেশ পালন করে থাকে। কিছু কিছু ফিরিশতার কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। জিবরা্ই (আ.) যুগে যুগে নবি রাসুলদের নিকট অহি আনয়নকারী।  মিকাঈল (আ.) আল্লাহ আদেশে রিজিক ও বৃষ্টি বণ্টন করে থাকেন। ইসরাফীল (আ.) আল্লাহর আদেশে কিয়ামতের পূর্বে শিঙ্গা ফুঁকবেন। আজরাইল (আ.) বা মালাকুল মউত আল্লাহ আদেশে তার সৃষ্টি জীবের জান কবজ করে থাকেন। ইহা ছাড়া মানুষের ডানে বামে আমল লেখক ফিরিশতা থাকেন। সামনে পিছে মানুষ হিফাজতের জন্য ফিরিশতা থাকেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَکَمۡ مِّنۡ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغۡنِیۡ شَفَاعَتُہُمۡ شَیۡئًا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اَنۡ یَّاۡذَنَ اللّٰہُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَیَرۡضٰی

অর্থ : আর আসমানসমূহে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনোই কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেয়ার পর। সুরা কামার : ২৬

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالكُتُبِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ যুগে যুগে মানব জাতির হিদায়াতের জন্য কিতাব দিয়েছেন। ইহার মাঝে প্রধান কিতাব চারটি। যথা-

তাওরাত যা মূসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

জাবুর যা দাউদ (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

ইনজীল যা ঈসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব কুরআন যা  মুহাম্মদ ﷺ এর উপর নাজিল হয়েছে। কুরআন পূর্ববর্তী সব কিতাবকে বাতিল করে দিয়েছে এবং এটিই চিরকাল প্রযোজ্য।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

بِالۡبَیِّنٰتِ وَالزُّبُرِ ؕ وَاَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الذِّکۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَیۡہِمۡ وَلَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ

অর্থ : তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে। সুরা নাহল : ৪৪

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান (٤ الإيمانُ بالرُّسُلِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ প্রতি জাতির জন্য একজন করে রাসুল পাঠিয়েছেন। তারা মানুষ নন, ফেরেশতা নন। সকল রাসুল তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সদস্য হলেন মুহাম্মদ ﷺ।  তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا 

অর্থ : মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবি। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। সুরা আহযাব : ৪০

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং ( الإيمانُ باليَوْمِ الآخِرِ)

বিশ্বাস করতে হবে, মৃত্যুর পর সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে। হাশর-মহাশর, হিসেব-নিকাশ, মীযান (আমলের পাল্লা), সিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম এসব বাস্তব বিষয়। জান্নাত হবে মুমিনদের চিরস্থায়ী পুরস্কার। জাহান্নাম হবে কুফর ও গুনাহগারদের শাস্তির স্থান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَّاَنَّ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا 

অর্থ : আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আজাব। সুরা ইসরা : ১০

(৬) তাকদীর বা পূর্ব নিয়তির প্রতি ঈমান (٦ الإيمانُ بالقَدَرِ) ।

বিশ্বাস করতে হবে, সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানে ও ইচ্ছায় ঘটে। যা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে সবকিছু আল্লাহ জানেন। মানুষের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ—সব আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ.

অর্থ : আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি। সুরা কামার : ৪৯

এই ছয়টি বিষয়ের প্রতি ঈমানই একটি মুসলিমের ঈমানের মূল ভিত্তি। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস থাকা মানে হলো সে ইসলামের মূল ভিত্তিতে বিশ্বাসী।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ঈমানের মাপকাঠি ও বৈশিষ্ট্য

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি : 

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি হবে সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত। সেই সময়কার মুশরিক ও মুনাফিকদের আল্লাহ সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবাদের (রা.) ঈমান কে-ই ঈমানের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَإِنۡ ءَامَنُواْ بِمِثۡلِ مَآ ءَامَنتُم بِهِۦ فَقَدِ ٱهۡتَدَواْ‌ۖ وَّإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا هُمۡ فِى شِقَاقٍ۬‌ۖ فَسَيَكۡفِيڪَهُمُ ٱللَّهُ‌ۚ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

অর্থ : তোমরা যেমনি ঈমান এনেছো তারাও যদি ঠিক তেমনিভাবে ঈমান আনে, তাহলে তারা হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলতে হবে ৷ আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সোজা কথায় বলা যায়। (সুরা বাকারা : ১৩৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُ‌ۗ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَـٰكِن لَّا يَعۡلَمُونَ

অর্থ : আর যখন তাদের বলা হয়েছে, অন্য লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো  তখন তারা এ জবাবই দিয়েছে- আমরা কি ঈমান আনবো নির্বোধদের মতো? সাবধান !আসলে এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা জানে না ৷ সুরা বাকারা : ১৩

ঈমানদারের কিছু লক্ষন বা বৈশিষ্ট্য :

১. কুরআন তিলওয়াত ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধিপায় করে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَاِذَا تُلِیَتۡ عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتُہٗ زَادَتۡہُمۡ اِیۡمَانًا وَّعَلٰی رَبِّہِمۡ یَتَوَکَّلُوۡنَ ۚۖ

মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। সুরা আনফাল : ০২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ 

অর্থ : আর যখন কোন সুরা অবতীর্ণ করা হয় তখন কেহ কেহ বলে, তোমাদের মধ্যে এই সুরা কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অবশ্যই যে সব লোক ঈমান এনেছে, এই সুরা তাদের ঈমানকে বর্ধিত করেছে এবং তারাই আনন্দ লাভ করছে। সুরা তাওবা : ১২৪

২. ঈমানদার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইদের জন্যও তা পছন্দ করবে।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ـ قَالَ ‏ “‏ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ – أَوْ قَالَ لِجَارِهِ – مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ‏

অর্থ : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৬, সুনানে তিরমিজি ২৫১৫, সুনানে নাসায়ি ৫০১৬, ৫০১৭, ৫০৩৯; আহমাদ ১২৩৯০, ১২৭৩৪, সুনানে দারিমী ২৭৪০।

৩.  মুমিনের নিকট নিজ পিতা ও সন্তান থেকেও রাসুলুল্লাহ ﷺ বেশী প্রিয় : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন-

 لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

অর্থ : তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৭, সুনানে নাসায়ি : ৫০১৩-১৪, আহমাদ : ১২৭৩৯, ১৩৪৯৯, সুনানে দারিমী : ২৭৪১।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ، وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي

অর্থ : যে লোকের মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ ঘটে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে। (১) তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা দুনিয়ার সকল কিছু হতে অধিক প্রিয়। (২) যে লোক একজন মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই ভালোবাসে। (৩) যে লোক কুফরি হতে নাজাতপ্রাপ্ত হয়ে ঈমান ও ইসলামের আলো গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এত অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।  সহিহ বুখারি : ২১, সহিহ মুসলিম : ৪৩, নাসায়ি ৪৯৮৮, তিরমিজি ২৬২৪, ইবনে মাজাহ ৪০৩৩, আহমাদ ১২৭৬৫।

৪. ঈমানদার পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ‏”‏ ‏.

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬৮৮, আহমাদ ৮৮৪১, ৯৪১৬।

আবু উমামাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتكْمل الْإِيمَان

যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসে, আর আল্লাহর ওয়াস্তে কারও সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত করে, আবার আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত থেকে বিরত থাকে। সে ঈমান পূর্ণ করেছে। সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮১, মিশকাত : ২৯, সহিহুল জামি ;৫৯৬৫।

৫. কোন ঈমানদার অপর ঈমানদারকে গালি দিতে পারে না :

عَنْ زُبَيْدٍ قَالَ سَأَلْتُ أَبَا وَائِلٍ عَنِ الْمُرْجِئَةِ فَقَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللهِ أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

অর্থ : জুবাইদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু ওয়াইল (রহ.) কে মুরজিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ আমার নিকট বলেছেন, নবি ﷺ বলেছেন-

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি। সহিহ বুখারি : ৪৮, সহিহ মুসলিম : ৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৮৩, ২৬৩৪-৩৫, সুনানে নাসায়ি : ৪১০৫-১৩।

৬. ঈমানদার লজ্জাশীল হবে :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 “‏ الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ ‏”

অর্থ :, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা। সহিহ বুখারি : ৯, সহিহ মুসলিম ৩৫, মিশকাত : ৫, সুনানে দারিমী : ৪৬৭৬, সুনানে নাসায়ি ৫০০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৭, আহমাদ : ৯৩৬১, ইবনে হিব্বান : ১৬৬।

৭. ঈমানদার প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান প্রদর্শন করবে :

আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন-

‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ ‏

অর্থ যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথির অভ্যর্থনা ও আদর-যত্ন করে। আর যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২৫০০, ইরওয়া : ২৫২৫, আবু দাঊদ : ৩৭৪৮, ৫১৫৪,  সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫০৬, দারিমী : ২০৩৬, আস সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ১৭১০৬।

আবু শুরাইহ আদাবী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার দু’কান শুনেছে এবং দুই চক্ষু দেখেছে, যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

‏”‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا وَمَا جَائِزَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يَوْمُهُ وَلَيْلَتُهُ وَالضِّيَافَةُ ثَلاَثَةُ أَيَّامٍ فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ – وَقَالَ – مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালোভাবে নিজ মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তখন সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ভালোভাবে মানে কী? তখন তিনি বললেন, তাকে একদিন ও এক রাত্রি আপ্যায়ন করবে। আর (সাধারণভাবে) মেহমানদারির সময়কাল তিন দিন। এর চাইতে বেশি দিন মেহমানদারি করা তার জন্য সাদাকা স্বরূপ। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। সহিহ মুসলিম : ৪৮, ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৫, সুনানে তিরমিজি : ১৯৬৭

৮. প্রথম ঈমান শিখবে অতঃপর কুরআন শিখবে :

عَنْ جُنْدُبِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ    ـ وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ فَتَعَلَّمْنَا الإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا ‏”‏ ‏

অর্থ : জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবি ﷺ এর সাথে ছিলাম। আমরা ছিলাম শক্তিশালী এবং সক্ষম যুবক। আমরা কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছি, অতঃপর কুরআন শিখেছি এবং তার দ্বারা আমাদের ঈমান বেড়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬১

৯. ঈমান আনতে হবে শুধু ইসলাম ধর্মের উপর :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يسمع بِي أحدق مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ من أَصْحَاب النَّار»

অর্থ : যে প্রতিপালকের হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁর কসম! এ উম্মাতের যে কেউই চাই ইহুদি হোক বা খ্রিষ্টান, আমার রিসালাত ও নুবূওয়্যাত মেনে না নিবে ও আমার প্রেরিত শারীয়াতের উপর ঈমান না এনেই মৃত্যুবরণ করবে, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামি। সহিহ : মুসলিম ১৫৩, মিশকাত : ৯, আহমাদ ৮৬০৯, সহীহাহ ১৫৭, সহিহাহ আল জামি : ৭০৬৩।

১০. ঈমানদার মুসলিমের হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ»

যে ব্যক্তি মুসলিম যার হাত ও মুখ হতে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। আর (প্রকৃত ও পরিপূর্ণ) মুমিন সে ব্যক্তি যার থেকে মানুষ নিজের জীবন ও সম্পদকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করে। মিশকাত : ৩২,  সুনানে নাসায়ি : ৪৯৯৫, সহিহ জামি : ৬৭১০।

১১. ঈমানদার আমানতকারী ও ওয়াদা পুরনকাররী

وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَلَّمَا خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا قَالَ: «لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরূপ খুতবা খুব কমই দিয়েছেন যাতে এ কথা বলেননি যে, যার আমানাতদারী নেই তার ঈমানও নেই এবং যার অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বীনও নেই। মিশকাত : ৩৪, সহীহুত্ তারগিব : ৩০০৪, শু‘আবুল ঈমান ৪০৪৫।

১২. মুমিনকে পাপাচার পীড়া দেয় :

আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক লোক রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! ঈমান কী? তিনি ﷺ বললেন-

«مَا الْإِيمَانُ قَالَ إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا الْإِثْمُ قَالَ إِذَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ شَيْءٌ فَدَعْهُ»

যখন তোমাকে নেক (সৎ) কাজ আনন্দ দিবে ও খারাপ (অসৎ) কাজ পীড়া দিবে, তখন তুমি মুমিন। আবার সে লোকটি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! খারাপ (অসৎ) কাজ কি? উত্তরে তিনি ﷺ বললেন, যখন কোন কাজ করতে তোমার মনে দ্বিধা ও সন্দেহের উদ্রেক করে (তখন মনে করবে এটা গুনাহের কাজ), তখন তা ছেড়ে দিবে। মিশকাত : ৪৪, আহমাদ ২১৬৬২, সহীহুত্ তারগিব ১৭৩৯।

১৩। পাপ কাজ করার সময় মানুষের ঈমান চলে যায় :

ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহﷺ বলেছেন-

لاَ يَزْنِي الْعَبْدُ حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَقْتُلُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ

মুমিন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। মুমিন থাকা অবস্থায় কোন চোর চুরি করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্য পান করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ হত্যা করে না।

ইক্বরিমাহ (রহ.) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, তার থেকে ইমান কিভাবে ছিনিয়ে নেয়া হয়? তিনি বললেন, এভাবে। আর অঙ্গুলিগুলো পরস্পর জড়ালেন, এরপর অঙ্গুলিগুলো বের করলেন। যদি সে তওবা করে তবে আগের অবস্থায় এভাবে ফিরে আসে। এ বলে অঙ্গুলিগুলো আবার পরস্পর জড়ালেন। সহিহ বুখারি : ৬৮০৯, মিশকাত : ৫৪

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মুমিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম ৫৭, সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮৯, সুনানে নাসায়ি : ৪৮৭০, সুনানে তিরমিজি : ২৬২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৬, মিশকাত : ৫৩, সহিহাহ : ৩০০০

রাসুলুল্লাহ ﷺজম্ম এবং নাম

রাসুলুল্লাহ জম্ম এবং নাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল কুরআনের বাণী :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ ؕ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ قَالُوۡا ہٰذَا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ

অনুবাদ : আর যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিল, ‘হে বনী ইসরাঈল, নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ’। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, ‘এটাতো স্পষ্ট যাদু’। সুরা সফ : ০৬

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসুলুল্লাহ ﷺ সোমবার জম্ম গ্রহণ করেন।

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا مَهْدِيُّ بْنُ مَيْمُونٍ، عَنْ غَيْلاَنَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَعْبَدٍ الزِّمَّانِيِّ، عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الأَنْصَارِيِّ، ر  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَأَنَّرَسُولَ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ ‏”‏ ‏

অনুবাদ : আবূ কতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে সোমবারের সওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ঐদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং ঐদিন আমার উপর (কুরআন) নাযিল হয়েছে।

সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৬, মিশকাত : ২০৪৫, আহমাদ : ২২৫৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৮৪৩৪, শুআবূল ঈমান : ১৩২৩। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর -০২ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্ম গ্রহণের বছর

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ ابْنُ أَبِيْ رَجَاءٍ حَدَّثَنَا النَّضْرُ عَنْ هِشَامٍ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أُنْزِلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِيْنَ فَمَكَثَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً ثُمَّ أُمِرَ بِالْهِجْرَةِ فَهَاجَرَ إِلَى الْمَدِيْنَةِ فَمَكَثَ بِهَا عَشْرَ سِنِيْنَ ثُمَّ تُوُفِّيَ صلى الله عليه

অনুবাদ : ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপর যখন (ওহি) নজিল করা হয় তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। অতঃপর তিনি মক্কা্য় তের বছর অবস্থান করেন। অতঃপর তাঁকে হিজরত করার আদেশ দেয়া হয়। তিনি হিজরত করে মদিনা্য় চলে গেলেন এবং সেখানে দশ বছর অবস্থান করলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয় ﷺ। সহিহ বখারি : ৩৮৫১, ৩৯০২, ৩৯০৩, ৪৪৬৫, ৪৯৭৯

নোট : সহিহ হাদিস নিশ্চিত করে যে রাসুলুল্লাহ ﷺ ৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভ করেন।  ঐতিহাসিকভাবে, নবুওয়ত লাভের সময় ৬১০ খ্রিস্টাব্দ বলে নির্ধারিত হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বয়স তখন ৪০ বছর ধরা হয়, তবে হিসাব অনুযায়ী জন্ম সাল দাঁড়ায়—৬১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪০ বছর বাদ দিলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ হয়।  অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্ভবত ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন।

সঠিক সন নির্ধারিত না হলেও তিনি আমরে ফিল বা হাতির বছর জম্ম গ্রহণ করেন-

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম ‘হাতির বছর’ (عام الفيل) সংঘটিত হয়েছে। এ তথ্য সরাসরি সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না, তবে এটি বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক ও সিরাহ গ্রন্থগুলোতে উল্লেখিত আছে। অনেক প্রাচীন ইসলামি ঐতিহাসিক, তাবেয়ি এবং মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেন।

বিশিষ্ট ইসলামি জীবনীকার ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তাঁর সিরাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَعَامَ الْفِيلِ، وَذَلِكَ مَا اتَّفَقَ عَلَيْهِ أَهْلُ السِّيَرِ وَالْمَغَازِي.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সিরাহ ও মাগাজি (জিহাদ সম্পর্কিত ইতিহাস) বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মত। সিরাতু ইবন হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৫-১৭৬

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  তার লিখিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ وَهَذَا هُوَ الْمَشْهُورُ عِندَ الْجُمْهُورِ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সাধারণ মুসলিম ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মতামত। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন সা’দ (মৃত্যু: ২৩০ হিজরি)  তার ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ بِمَكَّةَ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কায় হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন।

আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবন সাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১০০

রাসূলুল্লাহ এর জন্ম গ্রহণের তারিখ :

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুনির্দিষ্ট জন্ম তারিখ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকগনের কাছে তারিখ সম্পর্কে ২০ এর অধিক মতামত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল বেশি প্রসিদ্ধ হলেও সমকালীন সিরাত প্রণেত শফিউর রহমান মোবারকপুরি ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

হাদিস নম্বর-০৩ :: রাসুলুল্লাহ অনেকগুলো নাম ছিল।

حَدَّثَنِيْ إِبْرَاهِيْمُ بْنُ الْمُنْذِرِ قَالَ حَدَّثَنِيْ مَعْنٌ عَنْ مَالِكٍ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَلِيْ خَمْسَةُ أَسْمَاءٍ أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُوْ اللهُ بِي الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ>

অনুবাদ : জুবায়র ইবনু মুত‘ঈম (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন-

আমার পাঁচটি (প্রসিদ্ধ) নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি আল-মাহী আমার দ্বারা আল্লাহ কুফর ও শির্ককে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আমি আল-হাশির আমার চারপাশে মানব জাতিকে একত্রিত করা হবে। আমি আল-আক্বিব (সর্বশেষে আগমনকারী)।

সহিহ বুখারি : ৩৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৩৫৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৪ :: রাসুলুল্লাহ এর সুন্দর নামসমূহঅ

أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ أَخْبَرَنِيْ مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَيَقُوْلُ إِنَّ لِيْ أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُو اللهُ بِيَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ.

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ এবং আমি মাহী। আমার দ্বারা আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত কুফরী দূর করবেন। আমি হাশির, আমার পেছনে সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে এবং আমি ’আকিব, সকলের শেষে আগমনকারী।

সহিহ বুখারি : ৪৮৯৬; সহিহ মুসলিম : ৬২৫২: মুসনাদে আহমাদ : ১৬৫৮০; মুসনাদে বাযযার : ৩৪১৩; তাবারানী : ১৫০৪; ইবনে হিব্বান : ৬৩১৩। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৫ :: রাসুলুল্লাহ ইবরাহিম (আ.) এর দুআ, ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ, এবং তার মায়ের দেখা স্বপ্ন।

وَعَن العِرْباض بن ساريةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنِّي عِنْدَ اللَّهِ مَكْتُوبٌ: خَاتَمُ النَّبِيِّينَ وَإِنَّ آدَمَ لِمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ وَسَأُخْبِرُكُمْ بِأَوَّلِ أَمْرِي دَعْوَةُ إِبْرَاهِيمَ وَبِشَارَةُ عِيسَى وَرُؤْيَا أُمِّي الَّتِي رَأَتْ حِينَ وَضَعَتْنِي وَقَدْ خَرَجَ لَهَا نُورٌ أَضَاءَ لَهَا مِنْهُ قُصُورُ الشَّامِ

অনুবাদ : ইরবাজ ইবনু সারিয়াহ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলার কাছে আমি তখনো ’খাতামুন্‌ নাবিয়্যিন’ হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম যখন আদম আলায়হিস সালাম ছিলেন মাটির খামিরায়। আমি তোমাদেরকে আরো বলছি যে, আমার নুবুওয়াতের প্রথম প্রকাশ হলো ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর দু’আ এবং ঈসা আলায়হিস সালাম -এর ভবিষ্যদ্বাণী আর আমার মায়ের সরাসরি স্বপ্ন, যা তিনি আমাকে প্রসবকালে দেখেছিলেন যে, তাঁর সামনে একটি আলো উদ্ভাসিত হয়েছে, যার আলোতে তিনি সিরিয়ার রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত দেখতে পান।

মিশকাত : ৫৭৫৯, মুসনাদ আহমাদ : ১৭১৯১, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩৭৩, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ৯৭১৮, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৪০৪, সুানানে দারিমী : ১৩, তবারানী : ১৫০৩৪। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “رَأَتْ أُمِّي حِينَ وَضَعَتْنِي نُورًا خَرَجَ مِنْهَا أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ.”​

অনুবাদ : উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি এক নূর দেখতে পেলেন, যা সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত করেছিল।” মুসনাদ আহমাদ : ১৭৫৫০; সহিহ লিগাইরিহি

হাদিস নম্বর-০৭ :: রাসূলুল্লাহ মক্কায় জম্ম গ্রহন করেন ও মদিনায হিজরত করেন।

 ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত-

তিনি কা’ব আল আহবারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: তুমি তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী কেমন পেয়েছ? কাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা তাওরাতে পেয়েছি যে, মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ ﷺ মক্কায় জন্ম গ্রহণ করবেন, ত্ববাহ বা মদীনায় হিজরত করবেন, আর তাঁর রাজ্য শাম পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আর অশ্লীলতার সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক থাকবে না, তিনি হাটে-বাজারে শোরগোলকারীও হবেন না, তিনি মন্দ আচরণের প্রতিদানে মন্দ আচরণ করবেন না, বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করবেন। আর তাঁর উম্মত মহান আল্লাহ’র অধিক হামদ বর্ণনাকারী, তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ’র প্রশংসা করবে, তারা অঙ্গসমূহ (ধুয়ে) ওযু করবে এবং প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে (আরোহণ কালে) তাকবীর উচ্চারণ করবে। তারা ’ইযার’ বা তহবন্দ (এর নিম্নাংশ) পরিধান করবে তাদের (পায়ের গোছার) মাঝ বরাবর। তারা যেভাবে যুদ্ধে সারিবদ্ধ হবে, তারা তাদের সালাতেও তদ্রূপ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মসজিদসমূহে তাদের (তিলাওয়াত ও যিকিরের) আওয়াজ হবে মৌমাছির গুণগুণ আওয়াজের মত। আর তাদের আহ্বানকারীর আহ্বান (মুয়াযযিনের আযান) দূর আকাশে শোনা যাবে।

সুনানে আদ দারিমী : ০৮, ইবনু হিব্বান (রহ.) এ হাদীসের বর্ণনাকারী সম্পর্কে তার ‘আস সিক্বাত’ গ্রন্থে ইবনু আব্বাস থেকে তার যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তা সঠিক হলে এর সনদ সহিহ।