শিয়াদের দল উপদল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বর্তমান যুগের শিয়াদের দল উপদল

বর্তমানেও শিয়ারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। তাদের দলের সংখ্যা যেহেতু সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। তাছাড়া প্রাথমিক যুগের শিয়াদের সাথে বর্তমান যুগের শিয়াদের অনেক পার্থক্য আছে আবার মিল ও আছে। বর্তমান যুগের শিয়া দাবিকৃত দলগুলির  সাথে প্রথমিক যুগের শিয়ার কোন সম্পর্ক নেই যদিও আকিদায় অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাথমিক যুগের শিয়াদের আকিদাকে আরও ফুলিয়ে ফাপিয়ে, রংঙ লাগিয়ে, বিকৃত করা হইয়াছে। ‘ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে। সাবইয়্যা শিয়ারা ৩৯ টি উপদলে বিভক্ত। আর গুলাত বা চরমপন্থি শিয়ারা ২৪ টি উপদলে বিভক্ত। যাদের একটি দল হল ইমামিয়া। এই ইমামিয়া শিয়ারাই, শিয়াদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তাদের প্রধান ও সংখ্যাগরিষ্ঠচরমপন্থি

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া

১। ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া

ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية) বা বার ইমামপন্থী শিয়া মুসলিম জগতে শিয়াদের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী উপদল। এরা ১২ জন ইমামকে অপরিহার্যভাবে মানে বলে এদের নাম হয়েছে ইসনা আশারিয়া (إثنا عشرية – অর্থ: বারোজন)। তাদের ইমামিয়া শিয়া, বার ইমামি, জাফরিয়া শিয়া হিসেবে ও পরিচিতি আছে।

ক. ইসনা আশারিয়া শিয়াদের মূল আকিদাগুলি হলো

ইসনা আশারিয়া শিয়াদের বিশ্বাস করে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাদের প্রত্যেকেই একে অপরের বৈধ উত্তরসূরি এবং ইলাহি জ্ঞান ও মাসুমিয়াত (নিরাপরাধিতা) দ্বারা পূর্ণ।

বারো ইমামের তালিকা :

ক্র : নংনামমৃত্যু সন
১মআলি ইবনে আবি তালিব৪০ হিজরি
২য়হাসান ইবনে আলি৫০ হিজরি
৩য়হুসাইন ইবনে আলি৬১ হিজরি
৪র্থআলি ইবনে হুসাইন (যাইনুল আবিদিন)৯৫ হিজরি
৫মমুহাম্মাদ আল-বা‌কির১১৪ হিজরি
৬ষ্ঠজাফর আস-সাদিক১৪৮ হিজরি
৭মমূসা আল-কারিম১৮৩ হিজরি
৮মআলি আল-রিদা২০৩ হিজরি
৯মমুহাম্মাদ আল-তাকি২২০ হিজরি
১০মআলি আল-নাকি২৫৪ হিজরি
১১তমহাসান আল-আসকারী২৬০ হিজরি
১২তমমুহাম্মাদ আল-মাহদী (গায়েব/অদৃশ্য)২৬০ হিজরি থেকে গায়েব

বারতম ইমাম সম্পর্কে শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, তিনি হবেন ইমাম মাহদী। তিনি এখন গায়েব (অদৃশ্য) অবস্থায় আছেন এবং কিয়ামতের আগে ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। বার ইমামের বিশ্বাস ছাড়াও

তাদের আকিদাগুলি হলো:

ইমামত : নবুয়তের পর ইমামত হলো দ্বীনের মূল স্তম্ভ। ইমামগণ আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত, নির্ভুল  এবং তাদের কথা শোনাও ফরজ।

তাওয়াসসুল ও শাফা‘আত কী?

শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাওয়াসসুল এবং শাফা’আত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের এবং তাঁর কাছে কোনো আবেদন পেশ করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই দুটি ধারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নবী-রাসূলগণ এবং তাঁদের পবিত্র বংশধর ইমামগণ।

তাওয়াসসুল :

তাওয়াসসুল শব্দের অর্থ হলো মাধ্যম বা উপায়। শিয়া বিশ্বাসে, তাওয়াসসুল হলো আল্লাহ’র কাছে কিছু চাইতে বা তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য কোনো পবিত্র সত্তা (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) বা তাঁর বংশধর ইমামগণ) কে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহ’র কাছে আবেদন করা হয়, তবে সেই আবেদনের শক্তি বা গুরুত্ব বৃদ্ধি করার জন্য আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের নাম ব্যবহার করা হয়। শিয়াদের মতে, এর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি কোনোভাবেই সেই পবিত্র সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ এবং তাঁর প্রিয়পাত্রদের মর্যাদা স্বীকার করা।

শাফাআত :

শাফা’আত শব্দের অর্থ হলো সুপারিশ। শিয়া বিশ্বাসে, শাফা’আত হলো পরকালে, কেয়ামতের দিনে, কোনো বিশেষ ব্যক্তি (যেমন: নবী মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর বংশধর ইমামগণ) কর্তৃক পাপী মুমিনদের জন্য আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা ও করুণার সুপারিশ করা। শাফা’আতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর অনুমতি এবং সেই সুপারিশ করার অধিকার শুধু তারাই পাবেন, যাদেরকে আল্লাহ এই ক্ষমতা দিয়েছেন। শিয়াদের মতে, নবী ও ইমামগণ তাঁদের মর্যাদা ও পুণ্যের কারণে এই অধিকার লাভ করেছেন, এবং এর মাধ্যমে তারা মুসলিম উম্মাহকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবেন।

তাওসুল ও শাফায়াৎ : ইমামদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে উসিলা চাওয়াকে তারা বৈধ মনে করে।

শাফায়াৎ : বিপদে পড়লে বিশ্বাস গোপন করাকে তারা জায়েয মনে করে।

আশুরা ও কারবালার স্মরণ : ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদত স্মরণে মাতম, নওহা, তাজিয়া, শোকানুষ্ঠান পালন করে।

ফিকহ : ইসনা আশারিয়ারা নিজেদের জন্য জাফরি ফিকহ অনুসরণ করে যা মূলত ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.) এর শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

খ. বর্তমান অবস্থান ও দেশভিত্তিক জনসংখ্যা

ইসনা আশারিয়া শিয়ারা বর্তমানে নিম্নোক্ত দেশগুলিতে বাস করে:

দেশআনুমানিক শতাংশমন্তব্য
ইরান৯০–৯৫%রাষ্ট্রীয় ধর্ম, শিয়া আলেমদের শাসনব্যবস্থা
ইরাক৬০–৭০%কূফা, কারবালা, নাজাফ, সামাররার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর আছে
আজারবাইজান৮০–৮৫%ধর্মীয়ভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ
বাহরাইন৬৫–৭০%জনসংখ্যার অধিকাংশ শিয়া, কিন্তু শাসক সুন্নি
ইয়েমেন৩৫%-৬৫%শিয়ারা মূলত জায়েদি, তবে ইসমাইলি ও ইসনা আশারিয়াদের হুতিরা মুলত জায়েদি শিয়া।
লেবানন৩০–৪০%হিজবুল্লাহসহ শক্তিশালী ইসনা আশারিয়া সংগঠন
পাকিস্তান১০–১৫%“শিয়া হাজারা” জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য
ভারত৮–১০%লক্ষ্ণৌ ও কাশ্মীরে শক্তিশালী উপস্থিতি
আফগানিস্তান১০–১৫%বিশেষত “হাজারা” জনগোষ্ঠী ইসনা আশারিয়া, হেরাত প্রদেশে।
সিরিয়া১০% এর কমআলাওয়ি সম্প্রদায়, পতিত স্বৈরশাসক আসাদ পন্থী

বৈশিষ্ট্য ও চিহ্ন : ইমাম হুসাইনের শাহাদত (১০ মহররম) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পালন করে। কারবালার ঘটনাকে ধর্ম ও রাজনীতির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ মনে করে। ইমামবাড়া, হোসেনিয়াহ, তাজিয়া, মাতম ইত্যাদি ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ বহন করে।

২। ইসমাঈলিয়্যাহ (الإسماعيلية) শিয়া

ইসমাঈলিয়্যাহ শিয়া (الإسماعيلية) শিয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পুরাতন উপদল। তারা বার ইমামি শিয়াদের মতোই প্রথম ছয়জন ইমামকে মানে, কিন্তু সপ্তম ইমাম হিসেবে তারা ইমাম জাফর আস-সাদিক এর পুত্র ইসমাঈল ইবনে জাফর-কে মানে এখান থেকেই তাদের নাম “ইসমাঈলিয়াহ”।

ক. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

ইমামত বিশ্বাস ইমাম জাফর আস-সাদিক (৬ষ্ঠ ইমাম) এর পুত্র ইসমাঈল ও তার বংশধররাই প্রকৃত ইমাম। মতবাদের শাখাগুলো হলো-

১. নিজারী ইসমাঈলিয়াহ ইমাম নিজারকে মানে, আগা খান ফির্কা।

২. মুস্তালীয় বা বোহরা, আল-মুতলাকের নেতৃত্বে মেনে চলে।

৩. দুরুজ, ফাতিমি খলিফা হাকিম বিল্লাহকে ইলাহ মনে করে, আলাদা ধর্ম হিসেবে বিবেচিত

৪. আখবারি বা বাতিনি গোষ্ঠী, মূলত গোপন ব্যাখ্যা নির্ভর দল।

খ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের মূল আকিদা ও বিশ্বাস

ইমামত : তাদের বিশ্বাস ইমামগণ অলৌকিক, গায়েবি জ্ঞানসম্পন্ন, আল্লাহর হুকুমের প্রতিনিধি।

বাতিনী ব্যাখ্যা : কুরআন ও শরিয়তের বাইরের গোপন ব্যাখ্যা থাকে যা তাদের ইমামগণ জানেন।

তাকইয়াহ : বিপদে বা অন্য কোন কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা জায়েয ও কৌশল।

ইমাম মাহদী : ইমাম জীবিত আছেন এবং ফিরবেন কিন্তু কে তিনি, তা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হবে।

গ. ইসমাঈলিয়াহ শিয়াদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

সময়ঘটনা
২য় হিজরিইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর বিভাজন
২৯৭ হিজরিফাতিমি খেলাফত প্রতিষ্ঠা (উত্তর আফ্রিকা, ইজিপ্ট)
৩৬২ হিজরিকায়রোতে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (শুরুতে শিয়া ঘাঁটি)
৪৮৭ হিজরিসেলজুক সুন্নি শক্তি ও নুরউদ্দীন জঙ্গী কর্তৃক পতন
১২শ শতাব্দী“হাসান সাব্বাহ” কর্তৃক আলমুত দুর্গে ইসমাঈলিয়া ঘাঁটি
১৯–২০ শতাব্দীআগা খান গোষ্ঠীর পুনরুত্থান, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ

. বর্তমানে ইসমাঈলিয়ারা কোথায় বাস করে?

দেশশাখাজনসংখ্যা (আনুমানিক)
পাকিস্তানআগা খানি (নিজারী)৫–৭ লাখ
ভারত (গুজরাট, মহারাষ্ট্র)দাওদি বোহরা১০–১৫ লাখ
ইরানবিক্ষিপ্ত, অনেক গোপনীয়হাজারখানেক
সিরিয়াদুরুজ, নুসায়রি (আলাওয়ি সংশ্লিষ্ট)লক্ষাধিক
লেবাননদুরুজ ও কিছু বোহরা-নিজারী৪–৫ লাখ
তানজানিয়া, কেনিয়া, উগান্ডাআগা খানি (নিজারী)২–৩ লাখ
কানাডা, ইউকে, ইউএসএআগা খান অনুসারী প্রবাসীবিস্তর সম্প্রদায়

ঙ. খুব পরিচিত আগা খানি ইসমাঈলিয়ারা:

বর্তমানে নিজারী ইসমাঈলিয়া শিয়াদের ইমাম হচ্ছেন  প্রিন্স কারিম আগা খান চতুর্থ। তিনি “ইমাম” হিসেবে সম্মানিত এবং তাঁর ছবি ঘরে টাঙানো, দান করা, ব্যাখ্যা চাওয়া প্রভৃতি চর্চা চালু আছে। আগা খানি সম্প্রদায় আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয়। অনেক সময় তাদের ধর্মবিশ্বাস খুবই “বাতিনী” ও সাধারণ ইসলামিক শারিয়তের বাইরে চলে যায়।

সারকথা : ইসমাঈলিয়া শিয়া মতবাদ একটি অত্যন্ত পুরাতন ও দার্শনিকভাবে জটিল শাখা। বর্তমানে তারা আগা খানি, দাওদি বোহরা ও দুরুজ নামক উপশাখায় বিভক্ত। তারা আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে আছে। তবে ধর্মীয়ভাবে তারা মূলধারার ইসলাম থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে বলে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ মনে করেন।

৩। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া :

জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়া মুসলিমদের একটি প্রাচীন ও তুলনামূলকভাবে মডারেট উপধারা। জায়েদিয়্যাহ (الزيدية) শিয়াদের নাম এসেছে ইমাম যায়দ ইবনে আলি (৭৯ হি./৬৯৮ খ্রিঃ – ১২২ হি./৭৩৯ খ্রিঃ) থেকে, যিনি ইমাম জয়নুল আবেদীনের পুত্র এবং হুসাইন (রা.)-এর প্রপৌত্র। তারা অন্যান্য শিয়াদের থেকে অনেকটা আলাদা। তারা জায়েদ বিন আলি বিন হুসাইন আল জয়নাল আবেদীনের অনুসারী। তারা মনে করেন, অত্যাচারী বাদশার বিপক্ষে যুদ্ধ করা ইমামদের দায়িত্ব। ১২১ হিজরীতে হিসামের বিপক্ষে যুদ্ধে, যারা যায়েদ বিন আলির সৈন্যবাহিনীর অংশ হয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে জায়েদি বলা হয়। যারা তাকে ফেলে চলে যায় তাদেরকে রাফিদি বলা হয়। আর এই রাফিদিরাই আবু বকর সিদ্দিকী (রা.) এবং উমর (রা.) এর প্রতি বিদ্দেষ ছড়ায়। কিন্তু জায়েদি শিয়ারা আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) কেও ভালোবাসে। শুধু মাত্র আলি (রা.) কে অন্যান্য সাহাবিদের থেকে উপরে স্থান দেয়।

ক. আকিদা ও বিশ্বাসে মধ্যপন্থা :

জায়েদিরা প্রথম চার ইমামকে মানে তারা হলেন, আলি (রা.), হাসান (রা.), হুসাইন (রা.), যায়দ ইবনে আলি। তারা বিশ্বাস করে যে, যিনি আল্লাহর জন্য জিহাদ ও বিদ্রোহের মাধ্যমে নেতৃত্ব দাবি করেন, তাকেই ইমাম হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তাই ইমাম নির্ধারণে “বিদ্রোহী” মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। তারা অনেকাংশে সুন্নি মতবাদ বিশেষত হানাফি বা মুতাজিলা মতের কাছাকাছি। তারা সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সুন্নিদের মতোই সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তাদের মাঝে “তাকইয়াহ”, “গায়ব ইমাম”, “বাতিনী ব্যাখ্যা” এসব বিশ্বাস নেই। তারা ফিকহে স্বতন্ত্র মাযহাব গড়ে তুলেছে: জায়েদি মাযহাব, যা ইয়েমেনে প্রচলিত।

খ. জায়েদি বনাম ইসনা আশারিয়া শিয়াদে মাঝে বিশ্বাসগত পার্থক্য:

বিষয়জায়েদি শিয়াইসনা আশারিয়া (বার ইমামি)
ইমাম সংখ্যাসীমাহীন (বিদ্রোহ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে)১২ জন নির্দিষ্ট
ইমামত ধারাগোপন নয়, যোগ্যতা নির্ভরনির্ধারিত উত্তরাধিকার
তাকইয়াহস্বীকার করে নামৌলিক আকিদা
গায়েব ইমামঅস্বীকার করেবিশ্বাস করে (মাহদী গায়েব)
সাহাবা মতসম্মানজনক (বিশেষত আবু বকর, উমর)অধিকাংশ সাহাবাকে প্রত্যাখ্যান করে
শরিয়াহনিজস্ব মাজহাব (জায়েদি)জাফরি মাজহাব

গ. জায়েদি শিয়াদের আবাস :

বর্তমানে তাদের মূল আবাস ইয়েমেন। তাদের রাজনৈতিক দলের নাম হুথি আন্দোলন (আনসারুল্লাহ)।  বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তরাংশে প্রভাবশালী, ইরান দ্বারা আংশিক সমর্থিত। ২০০৪ সাল থেকে হুথি আন্দোলন শুরু হয়, যারা নিজেকে “জায়েদি শিয়া” বলে দাবি করে। তারা ইয়েমেনে সরকারবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ২০১৪ রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ফিলস্তানী মুজাহিদ হামাসের সমর্থে দখনদার ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে ২০২৪-২০২৫ সালে যুদ্ধ করে মুসলিম উম্মার মন জয় করে নিয়েছিল। যদিও হুতিরা নামে জায়েদি, অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তারা ইরানি শিয়াবাদের (ইসনা আশারিয়া) দিকে দার্শনিকভাবে ধাবিত হয়েছে।

ঘ. জায়েদি শিয়াদের প্রতিষ্ঠাতা যায়দ ইবন আলির একটি সাক্ষাৎকার :

জায়েদি ফির্কা প্রতিষ্ঠিত সেই যায়দ ইবন আলির নিকট গিয়ে শিয়াদের একটি দল প্রশ্ন করে এবং তিনি তার উত্তর প্রদান করেন। এ প্রশ্ন উত্তর তার আকিদা বিশ্বাস ফুটে উঠেছে। সাক্ষাৎকারটি হলো:

শিয়াদের প্রশ্ন : মহান আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন৷ আবু বাকর (রা.) ও উমর (রা.) এর ব্যাপারে আপন র অভিমত কী?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : মহান আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি আমার পরিবারের কাউকে তাদের থেকে নিঃসম্পর্ক হতে শুনিনি৷ আর আমিও তাদের সম্পর্কে ভাল ছাড়া বলছি না ৷

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি নবি পরিবারের রক্ত প্রত্যাশা করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : তার কারণ এ বিষয়টির (ক্ষমতার) আমরা অধিকতর হকদার৷ অথচ, মানুষ সে ক্ষেত্রে আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে এবং আমাদেরকে তা হতে সরিয়ে রেখেছে৷ তবে আমাদের মতে তারা কুফরে উপনীত হয়নি৷ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে তারা ন্যায়বিচার করেছে এবং কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী আমল করেছে।

শিয়াদের প্রশ্ন : তাহলে আপনি এদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন কেন?

যায়দ ইবন আলির উত্তর : এরা তো ওদের মত নয়৷ এরা জনগণের উপর এবং নিজেদের উপর জুলুম করেছে। আর আমি মহান আল্লাহর কিতাব, মহান আল্লাহর নবির সুন্নাহ জীবতিকরণ  ও বিদ্আত নির্মুলকরণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷ কাজেই তোমরা যদি আমার কথা মান্য কর, তবে তা তোমাদের জন্যও মঙ্গল হবে, আমার জন্যও৷ আর যদি অস্বীকার কর, তাহলে আমি তোমাদের কোন জিম্মাদার নই৷

কিন্তু তারা তার বায়আত ভঙ্গ করে তাকে ত্যাগ করে চলে যায়৷ এ কারণেই সেদিন হতে তাদেরকে রাফেযী (ত্যাগকারী) নাম দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, যারা যায়দ ইবন আলির অনুসরণ করেছে, তারা আখ্যায়িত হয় যায়দিয়াহ্ নামে৷ কুফাবাসীদের অধিকাংশই রাফেযী আর আজ অবধি পবিত্র মক্কাবাসীগণের বেশির ভাগ মানুষ যায়দিয়্যাহ মতবাদের অনুসারী তাদের মতাদর্শের একটি সভা আছে তা হলো, আবুবকর (রা.) ও উমর (রা.) উভয়কে সত্যপন্থী বলে বিশ্বাস করা৷

আবার একটি ভ্রান্তিও আছে। তা হলো, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) এর উপর আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়া। অথচ, আলি (রা.) তাদের চেয়ে উপরে নন। এমনকি আহলুসৃ-সুন্নাহর সুপ্ৰতিষ্ঠিত অভিমত ও সাহাবিগণের থেকে বর্ণিত সঠিক বর্ণনা অনুপাতে উছমানও (রা.) তাদের উপর অপ্রগণ্য নন৷

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-১ : শিয়াদের ইমাম সম্পর্কে আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যার মৌলিক ভিত্তি হলো কুরআন, সহিহ সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত বুঝ। নবি করিম ﷺ এর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও চিন্তাগত বিভ্রান্তির ফলে মুসলিম সমাজে কিছু গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়, যারা ইসলামি আকিদা ও শরিয়াহর মূল নীতিমালার ব্যাপারে বিচ্যুত হয়। এসব ফিরকার মধ্যে শিয়া মতবাদ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিমূলক ও বিপজ্জনক, কারণ তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয়ে উপস্থাপন করলেও মূলধারার ইসলাম থেকে অনেক মৌলিক বিষয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। শিয়ারা ইমামতকে দ্বীনের রুকন মনে করে, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি প্রকাশ্যে অবমাননা করে, কুরআনের বিকৃতি বিশ্বাস করে, তাকইয়াহ ও গায়েবি ইমামতকে ঈমানের অংশ বানায় এবং এমন অনেক আকিদা গ্রহণ করে যা কুরআন ও সহিহ হাদিসের সরাসরি বিরোধী। অতএব, ইসলামি উম্মাহর দায়িত্ব হলো—শিয়াবাদের এসব ভ্রান্ত বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ ও খণ্ডনের মাধ্যমে সাধারণ মুসলিমদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা, যাতে কেউ অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্তিতে না পড়ে। আমরা উপরের আলোচনতা শিয়াদের বিভিন্ন ভাগ দেখেছি। লক্ষ করেছি, তাদের বিভিন্ন ভাগের আকিদা বিশ্বাসও ভিন্ন ভিন্ন। নিচের আলোচনা শিয়াদের কোন ভাগকে আলাদা না করে, তাদের সকলের মাঝে যে ভ্রান্ত আকিদ বিশ্বাস আছে, আলোচনার শার্তে আলাদা না করে একই সাথে তুলে ধরছি। এ পর্যায়ে আমরা শিয়াদের এসব ভ্রান্ত আকিদার পর্যালোচনা করে এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে খণ্ডন করব, ইনশাআল্লাহ।

শিয়াদের ইমাম সম্পর্কে আকিদা :

ইমামদের সম্পর্কে শিয়াদের অনেক ভ্রান্ত কুফরি আদিকা আছে। তাদের শুধু এই একটি আকিদা আলোচনা করতেই একটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। তাই খুবইসংক্ষেপে তাদের ইমামত আকিদা সম্পর্কে তুলে ধরা হল :

১. শিয়াদের বিশ্বাস মানব জাতির হেদায়াতের জন্য বার ইমাম মনোনীত করা হয়েছে :
শিয়াদের প্রধান আকিদা হল ইমামত সংক্রান্ত আকিদা। আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির জাতির জন্য সর্বশেষ রাসূল মুহম্মদ ﷺ প্রেরণ করেন। তার মৃত্যুর পর যেহেতু আর কোন নবি বা রাসূল আসবেন না, তাই মানুষ জাতির হেদায়াতের জন্য ইমাম মনোনীত করবেন। আর শিয়াদের মতে আল্লাহ তায়ালা বার জন ইমাম নিযুক্ত করছেন। কিয়ামত পর্যন্ত তারাই পৃথিবীবাসির হেদায়াতের জন্য কাজ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরে আলি (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যাদের প্রত্যেকেই একে অপরের বৈধ উত্তরসূরি এবং ইলাহি জ্ঞান ও মাসুমিয়াত (নিরাপরাধিতা) দ্বারা পূর্ণ। পূর্বের ইসনা আশারিয়া শিয়াদের আলোচনায় এ ১২ জন ইমামের নাম উল্লেখ করেছি।
বারতম ইমামের নাম হবে ইমাম মাহদী। তিনি এখন গায়েব (অদৃশ্য) অবস্থায় আছেন। শিয়া আকিদা অনুযায়ী এখন থেকে প্রায় বার শত বছর আগে ২৫৫ অথবা ২৫৬ হিজরিতে জম্ম গ্রহণ করে ৪/৫ বছর বয়সে অলৌকিকভাবে লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যান এবং ‘সুররা মান রায়া’ নামক একটি গুহায় আত্মগোপন করে আছেন। শেষ জামানায় কিয়ামতের আগে তিনি ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তার উপরই পৃথিবীতে কিয়ামত হবে। শিয়া মতবাদে বারতম ইমাম বা ইমাম মাহদীর গায়েব (অদৃশ্য) থাকা এবং ভবিষ্যতে তাঁর আবির্ভাব নিয়ে আকিদা সম্পর্কে তাদের বহু মৌলিক কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিয়া কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করা হলো:

ক। আবূ আব্দিল্লাহ (আঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

إِنَّ لِلْقَائِمِ (ع) غَيْبَتَيْنِ، إِحْدَاهُمَا تَطُولُ حَتَّى يَقُولَ بَعْضُهُمْ: مَاتَ، وَبَعْضُهُمْ: قُتِلَ، وَبَعْضُهُمْ: ذَهَبَ، وَلَا يَطَّلِعُ عَلَى مَوْضِعِهِ أَحَدٌ مِنْ وُلْدِهِ وَلَا غَيْرُهُ، إِلَّا الْمَوْلَى الَّذِي يَلِي أَمْرَهُ.
“নিশ্চয়ই কায়েম (ইমাম মাহদী) এর দু’টি গায়বাত (অদৃশ্য থাকা) রয়েছে। তাদের একটিকে দীর্ঘায়িত করা হবে—এমনকি কেউ বলবে: তিনি মারা গেছেন; কেউ বলবে: তাঁকে হত্যা করা হয়েছে; আবার কেউ বলবে: তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন। আর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তাঁর সন্তানদের কেউও জানবে না, অন্যরাও না—শুধু সেই বিশেষ প্রতিনিধি ছাড়া, যিনি তাঁর দায়িত্ব সামলাবেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৪০, হাদিস নম্বর : ৬

খ। শিয়াদের একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) ও আলেম। তিনি শিয়াদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় চার মুহাদ্দিসের (الثقات الأربعة) একজন হিসেবে বিবেচিত। আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন-
وُلِدَ القَائِمُ (عليه السلام) بَعْدَ نِصْفِ شَعْبَانَ سَنَةَ خَمْسٍ وَخَمْسِينَ وَمِائَتَيْنِ (٢٥٥هـ)…وَغَابَ عَنْ أَعْيُنِ النَّاسِ، وَلَا يَرَاهُ أَحَدٌ حَتَّى يَأْذَنَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ أَنْ يَظْهَرَ…
“কায়েম (ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম) জন্মগ্রহণ করেন ২৫৫ হিজরির শা’বান মাসের মধ্যরাতের পর।
এরপর তিনি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। তাঁকে কেউই দেখতে পাবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রকাশের অনুমতি দেন।” : শেখ সাদুক, কমালুদ্দীন ও আতমামুন্নিমাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ০৯–৪১০

গ। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
إِنَّ صَاحِبَ هَذَا الأَمْرِ لَهُ غَيْبَةٌ، الْمُتَمَسِّكُ فِيهَا بِدِينِهِ كَالْخَارِطِ لِلْقَتَادِ، ثُمَّ قَالَ: لَهُ غَيْبَةٌ يَطُولُ أَمَدُهَا.
“নিশ্চয়ই এ বিষয়ের (ইমামত) অধিকারী (ইমাম মাহদী) এর একটি গায়বাত (অদৃশ্য থাকা) থাকবে। সে সময় তার দ্বীনের ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা হবে যেন কাঁটার ঝোপে (কাঁটাযুক্ত গাছ) হাত চালানোর মতো কষ্টকর। অতঃপর তিনি বলেন, তাঁর এই গায়বাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১৬৪, হাদিস : ১০.

ঘ। আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী যিনি শেখ মুফিদ নামেও খ্যাত। তিনি বলেন-
وَلِدَ (عليه السلام) فِي النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ سَنَةَ خَمْسٍ وَخَمْسِينَ وَمِائَتَيْنِ، وَغَابَ عَنْ أَعْيُنِ النَّاسِ، وَهُوَ الْقَائِمُ الْمُنْتَظَرُ.
তিনি (আলাইহিস সালাম) ২৫৫ হিজরির শা’বান মাসের মধ্যরাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। তিনিই হলেন প্রতীক্ষিত কায়েম (ইমাম মাহদী)। শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৩৯

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰۤی اٰدَمَ وَنُوۡحًا وَّاٰلَ اِبۡرٰہِیۡمَ وَاٰلَ عِمۡرٰنَ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ
নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ ও ইবরাহীমের পরিবারকে এবং ইমরানের পরিবারকে সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন। সুরা আল ইমরান : ৩৩
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর জন্য নবি রসূল মনোনীত করেছেন। তিনি কোন ইমম মনোনীত করেন নাই। তবে সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় ইমাম মাহদী নামে একজন ইমমা আসবেন।
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে, আমাদের রাসূল ﷺ ্এর পরে নতুন কোন দুর্ঘটনা ঘটবে। সুতরাং আমরা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মাঝে মাহদীর আগমন ঘটবে, সে পাঁচ অথবা সাত অথবা নয় বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকবে (যাইদ সন্দেহে পতিত হয়েছেন যে, ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারী কোন সংখ্যাটি বলেছেন)। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা প্রশ্ন করলাম, এই সংখ্যায় কি বুঝায়? তিনি বললেন বছর। মানুষ তার নিকট এসে বলবে, হে মাহদী। আমাকে কিছু দান করুন, আমাকে কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তারপর সে তার কাপড় বা থলেতে যেটুকু পরিমাণ বহন করে নিতে পারবে তিনি তাকে সেটুকু পরিমাণ দান করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২২৩২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪০৮৩
শিয়াদের এই ১২ ইমাম সংক্রান্ত আকিদা কুরআন সুন্নুহ বিরোধী। মানুষ জাতির হেদায়াতের জন্য ১২ জন ইমাম মনোনীত করার প্রমাণ কুরআন ও হাদিসে পাওয়া যায় না। বরং এটা মনগড়া শিয়াদের তৈরি করা আকিদা মাত্র। এ সম্পরই বিস্তরিত পাবেন শিয়াদের নিকট সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদিসের গ্রন্থ “উসুলুল কাফি”-তে। (১) (১) শিয়াদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী (মৃত্যু: ৩২৯ হিজরি)। তিনি ‘উসুলুল কাফী’ বইটি সংকলন করেন। এ বইটি শিয়া মুসলিমদের নিকট হাদিস সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ, যা সুন্নিদের সহিহ বুখারির সমতুল্য মর্যাদা বহন করে। এই গ্রন্থটি সংকলন করেন, যাতে ১৬,১৯৯টি হাদিস স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে বহু সংখ্যক হাদিসের সনদ ও বক্তব্য সুন্নি মানদণ্ডে দুর্বল, এমনকি শিয়াদের মধ্যেও বিতর্কিত। তবুও শিয়ারা আকিদা ও আমলের প্রধান উৎস হিসেবে একে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন গ্রন্থরূপে গণ্য করে। উসুলুল কাফী তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: উসুল (মৌলিক বিশ্বাস), ফুরু (ব্যবহারিক ফিকহ) এবং রাওযা (বিবিধ শিক্ষা)। এতে তাওহীদ, নবুয়ত, ইমামত, আখিরাত ও নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। আমরা শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা প্রমাণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশ আকিদার কথা উসুলুল কাফী গ্রন্থে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করব বিধায় আপনাদের নিকট এ বইটির সামান্য পরিচয় তুলে ধরলাম।

২. শিয়াদের নির্বাচিত ইমামগণ নিষ্পাপ :

ক। ইমাম ইবনে মূসা (আঃ) এর প্রসঙ্গ বিষয়ে উসুলুল কাফির মধ্যে একটি দীর্ঘ খুতবা (খুৎবাহ) রয়েছে। এতে বারবার ইমামদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের ইস্মাত বা নিষ্পাপত্বের ব্যাপারে বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই খুৎবাহটি “ হুজ্জত অধ্যায়, ইমামগণই পৃথিবীর স্তম্ভ” পরিচ্ছেদ অংশে স্থান পেয়ে থাকে। কয়েকটি মূল বাণী নিচে উপস্থিত করা হলো:
ثُمَّ ذَكَرَ الْحَدِيثَ الْأَوَّلَ…وَكَذَلِكَ يَجْرِي الْأَئِمَّةُ الْهُدَى وَاحِداً بَعْدَ وَاحِدٍ جَعَلَهُمُ اللَّهُ أَرْكَانَ الْأَرْضِ أَنْ تَمِيدَ بِأَهْلِهَا وَحُجَّتَهُ الْبَالِغَةُ عَلَى مَنْ فَوْقَ الأَرْضِ وَمَنْ تَحْتَ الثَّرَى…وَمَا جَاءَ بِهِ عَلِيٌّ ع آخُذُ بِهِ…وَمَا نَهَى عَنْهُ أَنْتَهِي عَنْهُ…جَرَى لَهُ مِنَ الْفَضْلِ مِثْلُ مَا جَرَى لِمُحَمَّدٍ ص…
অর্থ : এমনভাবেই ইমামগণ হিদায়াতের ধারক, পরপর একের পর একজন; আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবীর স্তম্ভ বানিয়েছেন যেন তা নড়ে না। তারা আসমান-জমিন উভয়ের ওপর সামনে প্রমাণ (হুজ্জাহ) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।” এবং “যে আইন আলি (রা.) প্রতিষ্ঠা করেছেন আমি (ওই আইন) গ্রহণ করি, ও যে কিছু তিনি নিষেধ করেছেন আমি তা থেকে বিরত থাকি; তার জন্য তার সম্মান এবং মর্যাদা এমন যা মুহাম্মাদ ﷺ এর সাথেও তুলনীয়।” এছাড়া, দ্বিতীয় সূত্র হিসেবে উল্লিখিত যে, উসুলুল কাফির সেই অংশেও ইমাম আল-রেজা (আঃ) নিজেই বলেছেন-
“الْإِمَامُ خَالٍ مِنَ الذَّنْبِ وَطَاهِرٌ مِنْ كُلِّ عَيْبٍ … لاَ يُدْانَى عِلْمُهُ وَلاَ يُنَالُ دَرَجَتُهُ”
অর্থ : “ইমাম সম্পূর্ণরূপে পাপমুক্ত, প্রতিটি দোষ থেকে নির্মল… তার জ্ঞান অনুপম এবং কেউই তার উচ্চ মর্যাদায় উপনীত হতে পারে না।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৬৪-৬৫

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
নিষ্পাপ হওয়া শুধু নবি রাসূরদের গুন। কোন মানুষের জন্য এমনগুন মানায় না। ইসলামে নবি ﷺ ছাড়া কারো আনুগত্য বাধ্যতামূলক করা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ  وَیُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ  وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَکۡسِبُ غَدًا ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ 
কিয়ামাতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর নিকট রয়েছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন যা জরায়ুতে রয়েছে। কেহ জানেনা আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেহ জানেনা কোন্ স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ব বিষয়ে অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪
কাজেই ইমামদের সম্মানে দাবি করা হয়েছে যে, তারা গায়েবের খবর রাখেন তা ষ্পষ্টই শির্ক। কেউই জানেনা তার মৃত্য কখন হবে এবং কোথায় হবে, এমন দাবি অমুল ও শিরক। শিয়া ইমামদের এমন জ্ঞান রাখার ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করা শিরক। কেননা এর মাধ্যমে জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর সমকক্ষ হয় যাবে। এহেন গঘন্য আকিদা থেকে মহান আল্লাহকে তাদের ও আমাদের পবিত্র রাখুক।

৩. শিয়াদের ইমমাগণ পৃথিবীতে হুজ্জত বা পরিপূর্ণ দলিল

এ সম্পর্কে শিয়াদের উসুলুল কাফীর একটি হাদিসে ইমাম জাফার আস-সাদিক (আ.) নিজেকে “অল্লাহর জ্ঞান ও নির্দেশনার খজানা (খাজানা), অনুবাদক, এবং আসমান-জমিনের উপর মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ হুজ্জত” হিসেবে উল্লিখিত করছেন। আবু সুদাইর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইমাম আবু জাফর (আঃ) বলেছেন-
:نَحْنُ خُزَّانُ عِلْمِ اللَّهِ، وَنَحْنُ تَرْجَمَةُ وَحْيِ اللَّهِ، وَنَحْنُ الحُجَّةُ البَالِغَةُ عَلَى مَنْ دُونَ السَّمَاءِ وَمِنْ فَوْقِ الأَرْضِ
“আমরাই আল্লাহর জ্ঞানের ভাণ্ডার, আমরাই আল্লাহর ওহির অনুবাদক, এবং আমরাই আসমানের নিচে ও জমিনের ওপর যাদের উপরে রয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহর পরিপূর্ণ দলিল।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৯২

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা : ইসলাম ধর্মের হুজ্জত বা দলিল হলো কুরআন সুন্নাহ। মানুষ হিসেবে হুজ্জত হলো রাসুলুল্লাহ সা.। কোন ইমাম হুজ্জত হবে এ সম্পর্কে কুরআন হাদিসে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ সা. হুজ্জত বা দলিল তার প্রমাণ, আল্লাহ তায়ালা বলেন-
  وَمَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ  وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ۘ
রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। সুরা হাশর : ৭

৪. শিয়াদের আকিদা জগত পরিচালনার দায়িত্ব ইমামদের

জগতের একমাত্র পরিচালক মহান আল্লাহ তায়ালাতার এ গুনের সমকক্ষ জ্ঞান করা শির্কের অন্তরভূক্ত। অথচ শিয়াগণ মহান আল্লাহর এই একক গুনের সাথে তাদের ইমামদের সম্পৃক্ত করে চরমভাবে তাওহীদের উপর আঘাত করছে। তবে বিষয়টি ইমামদের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ও বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব সম্পর্কে শিয়া ধর্মতত্ত্বের মূল ধারণাকে প্রতিফলিত করে।
ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে বলেন-
“الأئمة خلفاء الله في أرضه، الخليفة السلطان الأعظم…
“ইমামগণ হলেন আল্লাহর নিদর্শন, তাঁর খলিফা এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের কর্তৃত্ব তাদের হাতে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, কিতাবুল হুজ্জাহ, প্রথম খণ্ড
খ। আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী যিনি শেখ মুফিদ নামেও খ্যাত। তিনি বলেন-
الإمامُ خَلِيفَةُ اللهِ، وَهُوَ الْمُتَوَلِّي عَلَى جَمِيعِ أُمُورِ الْعَالَمِ، وَأَمْرُهُ وَنَهْيُهُ فَوْقَ الطَّبِيعَةِ.
অর্থ: “ইমাম হলেন আল্লাহর প্রতিনিধি, যিনি জগতের সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বাবধান করেন। তাঁর আদেশ ও নিষেধ প্রকৃতিরও ঊর্ধ্বে।” শেখ মুফীদ, আল-ইরশাদ, ইমামতের প্রকৃতি ও ইমামদের গুণাবলী অধ্যায়,
পৃ.-৩৪৫

গ। ইমামদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও বিশ্ব পরিচালনায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে শিয়া আলিম মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী বলেন, “ইমামগণ হচ্ছেন আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাশীল। সমগ্র সৃষ্টি তাদের আনুগত্যের অধীন।” মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ২৯৮
ঘ। আল্লামা মুহাম্মদ হোসাইন তাবাতাবাই ছিলেন বিশিষ্ট শিয়া, দার্শনিক, মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিক, যিনি শিয়া চিন্তাধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন-
ইমামত একটি ঐশী পদমর্যাদা, যা নবুয়তের চেয়েও উচ্চ। ইমামই বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক।
শিয়া আলিম আল্লামা তাবাতাবাই, তাফসীর আল-মীযান, ভলিউম ১, পৃ.-২৭৩, সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতের তাফসির।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ‌ۖ كُلٌّ۬ يَجۡرِى لِأَجَلٍ۬ مُّسَمًّ۬ى‌ۚ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ يُفَصِّلُ ٱلۡأَيَـٰتِ لَعَلَّكُم بِلِقَآءِ رَبِّكُمۡ تُوقِنُونَ
এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। সুরা রাদ : ২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ بِیَدِہِ الۡمُلۡکُ ۫  وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ ۙ
রকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান। সূরা -মুলক ৬৭:১
আল্লাহ তায়ালা ছাড়া এই বিশ্বজগৎ কেউ পরিচালনা করতে পারে না। ইমাম সম্পর্কে এমন আকিদা রাখা কুফরি। এই বিশ্বজগৎ পরিচালনার এক মাত্র দাবিদার আল্লাহ তায়ালা। চরমপনথী গুলাত শিয়া ছাড়া কেউ এমন আকিদা রাখে না। এমনিক গুনাত ছাড়া অন্য শিয়ারা এমন আকিদা রাখে না। মক্কার মুসরিকগণ ও বিশ্বাস করত বিশ্বজগৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ পরিচালনা করতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে বলেন-
إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ
অর্থ: “নিশ্চয়ই পৃথিবী আল্লাহর, তিনি যাকে ইচ্ছা তা উত্তরাধিকার স্বরূপ দান করেন।”। সূরা আরাফ : ১২৮
وَلِلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ
অর্থ : “আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই”। সূরা আলে ইমরান : ১৮৯
فَلِلَّهِ ٱلۡأٓخِرَةُ وَٱلۡأُولَىٰ
অর্থ : “বস্তুত ইহকাল ও পরকাল আল্লাহরই”। সূরা নাজম : ২৫
لَهُ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ
অর্থ : আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র তারই”। সূরা আল- হাদীদ: ২
تَبَٰرَكَ ٱلَّذِي بِيَدِهِ ٱلۡمُلۡكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ
অর্থ : মহামহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর নিয়ন্ত্রণে, তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। সূরা মুলক : ৩০
এ সম্পর্কে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের শিয়াদের মত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেহেতু একা সেহেতু তার একার পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মুআল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীর ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাওছুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তাযালার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন।
সতর্কতা : শিয়াদের কিছু গ্রন্থে ইমামদের অলৌকিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সীমালঙ্ঘন (غلو) হিসেবে বিবেচিত হয়। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতএগুলোকে শিরকি আকিদা বলে বিশ্বাস করে।

৫. শিয়াগণ আলি (রা.) কে আল্লাহ তায়ালার মত উলুহিয়াতের মর্যাদা প্রদান করে থাকে
আলি (রা.) কে আল্লাহ তায়ালার মত উলুহিয়াতের মর্যাদা প্রদান করার দাবিটি মারাত্মক কুফরি যা চরম শিয়া গুলাত ফির্কার একটি আকিদা। এই ধরনের আকিদা মূলধারার শিয়ারা (ইমামিয়া বা জায়েদি) সাধারণত গ্রহণ করে না। এটি গুলাত শিয়া যারা ইমামদেরকে আল্লাহর মর্যাদায় উন্নীত করে তাদের বক্তব্য।
ক। মোল্লা মুহসিন ফায়েজ কাশানী (মৃত্যু: ১০৯১ হিজরি) তিনি বলেন-
“أن عليا هو الله”
আলিই আল্লাহ পাক। মোল্লা মুহসিন ফায়েজ কাশানী, জিলাউল আইয়ুন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৬৬

খ। রিজালু কাশী গ্রন্থে শিয়া আলিম আবু আমর মুহাম্মদ ইবন উমর ইবন আব্দুল আজিজ আল-কাশশী (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরি) তার গ্রন্থে লিখেন, আলি বলেন-
أَنَا ٱلَّذِي أُحْيِي وَأُمِيتُ، أَنَا ٱلْأَوَّلُ وَٱلْآخِرُ، وَٱلظَّاهِرُ وَٱلْبَاطِنُ…
“আমি সেই ব্যক্তি, যে জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই; আমিই প্রথম এবং শেষ; আমিই প্রকাশ্য এবং অদৃশ্য…” । আব্দুল আজিজ আল-কাশশী, রিজালু কাশী, পৃ.-১৩৮।
উক্ত আরবি বাক্যটি আক্ষরিকভাবে আল্লাহর গুণবাচক শব্দসমূহ হুবহু ব্যবহার করে গঠিত। কেউ যদি তা নিজের দিকে সম্বন্ধ করে (যেমন শিয়াদের কিছু চরমপন্থি ফিরকা বলে থাকে আলি বলেছে), তবে তা ইসলামের মৌল আকিদার বিরোধী এবং তা কুফর ও গুলু (অতিরঞ্জন) হিসেবে গণ্য হবে। এই আকিদা থেকে আলি (রা.) পবিত্র ও মুক্ত। তিনি এই ধরনের জঘন্য মিথ্যা কথা বলতেই পারেন না। আলি (রা.) নামে এসব কথা শিয়ারা বানিয়ে নিয়েছেন। এই বাক্যটি মূলত আল্লাহর গুণাবলি প্রকাশকারী আয়াত ও হাদিসসমূহের অনুরূপ। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ہُوَ الۡاَوَّلُ وَالۡاٰخِرُ وَالظَّاہِرُ وَالۡبَاطِنُ ۚ وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ
অর্থ : তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই ব্যক্ত, তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সম্যক অবহিত। সুরা হাদিদ : ৩

৬. শিয়াদের বিশ্বাস তাদের ইমামগণ গায়েবের খবর রাখেন :
ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নীর মতে ইমামগণ যা হয়েছে এবং যা হবে, তার জ্ঞান রাখেন। আর তাদের নিকট কোন কিছুই গোপন নেই। আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
হরকতসহ আরবি:
إِنِّي لَأَعْلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَاوَاتِ وَمَا فِي ٱلْأَرْضِ، وَأَعْلَمُ مَا فِي ٱلْجَنَّةِ وَمَا فِي ٱلنَّارِ، وَأَعْلَمُ مَا كَانَ وَمَا يَكُونُ.
“আমি জানি আসমানে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, এবং আমি জানি জান্নাত ও জাহান্নামে যা কিছু আছে, এবং আমি জানি যা হয়েছে এবং যা হবে।”
“আমি অবশ্যই আসমান ও যমিনে যা কিছু আছে, তা জানি এবং আমি আরও জানি জান্নাত ও জাহান্নামে যা কিছু আছে। আর যা হয়েছে এবং যা হবে, তাও আমি জানি। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৬১

আবূ আবদিল্লাহ বা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত, আমীরুল মুমিনীন (আ). বেশি বেশি বলতেন, “জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বণ্টনকারী … আমাকে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কাউকে দেয়া হয়নি। আমি জানি মৃত্যু, বালা-মুসিবত, বংশ এবং বক্তৃতা-বিবৃতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে। সুতরাং আমার পূর্বেকার কোন বিষয় আমার জানা থেকে বাদ পড়েনি এবং আমার নিকট থেকে যা অদৃশ্য, তাও আমার কাছ থেকে অজানা থাকে না। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১১৭

গ. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন, “ইমামগণ জানেন যে, তারা কখন মারা যাবেন। আর তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মারা যাবেন। আবূ আবদিল্লাহ (আ.) বলেন: কোন ইমাম যদি তার উপর আপতিত বিপদাপদ ও তার পরিণতি সম্পর্কে না জানে। তবে সে ইমাম আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে দলিল (হিসেবে গ্রহণযোগ্য) নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৭৮

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল্লাহ তায়ালা ছাড়া এই বিশ্ব জাহানের কারো নিকট অদৃশ্যের জ্ঞান নেই। এমনটি আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ ও এই অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী শিয়াদের দাবি তাদের ইমামগণ এমন ইলম সম্পর্কেও অবহিত যা কোন নবি, রাসুল বা ফিরেশতাগণও জানেনা। এই ধরনের আকিদা পোষণ কারী কোন মুসলীম হবে পারে না। সে অবশ্যই মুশরিক। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِى خَزَآٮِٕنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّى مَلَكٌ‌ۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ‌ۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُ‌ۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ
অর্থ : বল, আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহ্‌র ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না। আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০
এ আয়াতে ও আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলুল্লাহ ﷺ কে পরিষ্কার ভাবে ঘোষণা দিতে বললেন যে, আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
يَسۡـَٔلُكَ ٱلنَّاسُ عَنِ ٱلسَّاعَةِۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ ٱللَّهِۚ وَمَا يُدۡرِيكَ لَعَلَّ ٱلسَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا
অর্থ : লোকে তোমাকে (কেয়ামতের) সময় সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বল, ইহার জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে। এবং তুমি তা কি ভাবে বুঝবে? সম্ভবত, সময় নিকটবর্তী। সুরা আহজাব :৬৩
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্‌র ঘোষণা “কিয়ামতের সময় সম্বন্ধে জ্ঞান কেবল আল্লাহ্‌র। যেহেতু রাসূল ﷺ এর অদৃশ্যের সম্বন্ধে জ্ঞান নাই আল্লাহর প্রশ্ন “এবং তুমি তা কি ভাবে বুঝবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُ‌ۚ وَمَا يَشۡعُرُونَ أَيَّانَ يُبۡعَثُونَ
অর্থ : তাদেরকে বল, আল্লাহ ছাড়া পৃথিবীতে ও আকাশে কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না৷ এবং তারা জানেনা কবে তাদেরকে উঠিয়ে নেয়া হবে। সুরা নামল : ৬৫
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ غَيۡبَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۚ وَٱللَّهُ بَصِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত গুপ্ত বিষয় জানেন। এবং তোমরা যা কর আল্লাহ তা অবশ্য দেখেন। সুরা হুজুরাত : ১৮
কিন্তু শিয়াগণ তাদের ইমামদেরকে অদৃশ্যের জ্ঞানের ব্যাপারে আল্লাহর সাথে শরিক করে। লক্ষ্য করুন, তারা তাদের ইমামদেরকে তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ফেরেশতা, নবি ও রাসুলগণের চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করে। আর জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার অংশীদার মনে করে। এই সবগুলোই মিথ্যা, বানোয়াট ও কুফরি।

৭. শিয়াদের বিশ্বাস তাদের ইমামগণ হালাল ও হারাম করার ক্ষমতা রাখেন।
শিয়াদের মতে, ইমামগণকে আল্লাহ কর্তৃক এমন একটি ক্ষমতা ‘উলয়া’ দান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা ধর্মীয় আইন প্রয়োগ ও বিধি-নির্ধারণ করতে পারেন, তবে সেই সব বিধি সর্বদা কুরআন ও বাইরের মহান আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্গত:
…وَصَارُوا يُشَرِّعُونَ التَّشْرِيعَ بِمَا أُوتُوا مِنْ عِلْمٍ وَدَلِيلٍ، وَلَيْسَ فِيهِمْ مُعَارِضٌ لِمَا فِي كِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ…
“তারা নিজেরা [ধর্মীয়] আইন প্রণয়ন করেন—তবে যে-সব বিষয় উপর তারা প্রজ্ঞা ও দলিল পেয়েছেন, এবং যা কখনোই কুরআন ও নবির শরীয়তের বিপরীতে নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.- ২৭৮

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা হলো ;
আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَاۤ اَحَلَّ اللّٰہُ لَکَ ۚ تَبۡتَغِیۡ مَرۡضَاتَ اَزۡوَاجِکَ ؕ
হে নবি, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? সুরা তাহরীম :১
সুতরাং আল্লাহ যখন তাঁর রাসূল ﷺ কে হালাল জিনিসকে হারাম করার কারণে সতর্ক করে দিয়েছেন, তখন নবি ﷺ ব্যতীত অন্যের দ্বারা তা কি করে সম্ভব হতে পারে?

৮. ইমামদের আনুগত্য ফরজ :
আবূ সাবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দিল্লাহ (আলাইহিস সালাম)-কে বলতে শুনেছি-
“أَشْهَدُ أَنَّ عَلِيًّا إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ، وَأَنَّ الْحَسَنَ إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ، وَأَنَّ الْحُسَيْنَ إِمَامٌ، فَرَضَ اللَّهُ طَاعَتَهُ…”
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলি (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হাসান (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হোসাইন (আ.) একজন ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরজ করেছেন…..। মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৬-১৮৭

মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী আরও উল্লেখ করেন, ইমাম মুহাম্মদ বাকের বলেন-
আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে কদরের রাতসমূহে নবি এবং অসীদের (ইমামদের) নিকট নির্দেশ আসত যে, এটা কর; আর এই নির্দেশটি তারা ভালোভাবেই শিখেছিল, কীভাবে তারা তা কার্যে পরিণত করবে। মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১০৯

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা হলো :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَاَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَاُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ۚ  فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَالرَّسُوۡلِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ  ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّاَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا 
হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ
“কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল”। সূরা আন-নিসা: ৮০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا
“কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে ফিরায়ে দেব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব; আর তা কত মন্দ আবাস!”সূরা আন-নিসা: ১১৫

৯. শিয়াদের বিশ্বাস ইমামগণের গর্ভ ও জন্ম হয় অদ্ভুত প্রক্রিয়ায়।
মুহাম্মাদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
. نورُ الأئمّةِ لا يَسْتَقِرُّ في الرَّحِمِ
ইমামদের নূর (আলো) জরায়ুতে স্থির হয় না। মুহাম্মাদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম : ২৭।
অর্থাৎ, তাদের জন্ম পদ্ধতি সাধারণ মানুষের মতো নয় বরং তাদের নূর (আলোক প্রকাশ) জগতে সরাসরি প্রকাশ ঘটে। এটি শিয়াদের তানজীহ’ আকিদার অংশ, যেখানে তারা ইমামদের সমস্ত অপবিত্র বস্তু ও প্রক্রিয়া থেকে পবিত্র মনে করে।
আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
একাদশতম ইমাম হাসান আসকারী থেকে রেওয়াত করেছেন যে, আমাদের ইমামগণের গর্ভ মায়ের পেটে বা জরায়ুতে স্থির হয় না। বরং পার্শ্বে থাকে আমরা জরায়ু থেকে বাইরে আসি না। বরং জননীর উরু থেকে জম্ম গ্রহণ করি। কেননা আমরা আল্লাহর নুর। তাই আমাদের নোংরামি আবর্জনা থেকে দূরে রাখা হয়। আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী, ‘হাক্কুল ইয়াকীন’ পৃ.-১২৬, মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, পৃ-২৫৩

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
এ সকর কথার কোন শরীয়ি ভিত্তি নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ اَنَّمَاۤ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 
বল, ‘আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে’। সুরা কাহাফ : ১১০
রাসুলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত :
উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “رَأَتْ أُمِّي حِينَ وَضَعَتْنِي نُورًا خَرَجَ مِنْهَا أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ.”
“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি এক নূর দেখতে পেলেন, যা সিরিয়ার জপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত করেছিল।” মুসনাদ আহমাদ : ১৭৫৫০
কুরআন ও সুন্নাহ প্রমাণ করে যে আমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বাভাবিকভাবেই জম্মগ্রহণ করে। সেখনা শিয়াদে বাদি এর বংশধরেরা বা আহলে বাইয়াত কেন অলৌকিকভাবে জম্ম গ্রহণ করবে?

১০. শিয়াদের বিশ্বাস নবি মুহাম্মাদ ﷺ ব্যতীত সকল নবির চেয়ে তাদের ইমামগণ উত্তম।
আল্লামা মুহাম্মদ বাকির ইবনে মুহাম্মদ তাকী আল-মাজলিসী বলেন-
يَجِبُ أَنْ يُعْتَقَدَ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَخْلُقْ خَلْقًا أَفْضَلَ مِنْ مُحَمَّدٍ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ) وَالْأَئِمَّةِ (عَلَيْهِمُ السَّلَامُ)، وَأَنَّهُمْ أَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَأَكْرَمُهُمْ…
আকিদা রাখা আবশ্যক যে, আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ (সা,) ও ইমামগণের (আ.) চেয়ে উত্তম কোনো সৃষ্টি সৃষ্টি করেননি, এবং তারা হলেন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টিসমূহ। আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম ২৬, পৃ.- ২৯৭

আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী বলেন-
بَلِ الضَّرُورَةُ مِنْ قَوْلِ الْإِمَامِيَّةِ عَلَى أَنَّهُ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) أَفْضَلُ بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ) مِنْ جَمِيعِ الْأَنْبِيَاءِ…
বরং এটা শিয়া ইমামিয়াদের মাঝে জরুরি ও পরিষ্কার আকিদা যে, (ইমাম) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পর সকল নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আল্লামা মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ভলিউম ২৬, পৃ.- ২৯৭
এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবিগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়ি) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে তাবেয়ী) যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ৩৬৫১, ২৫০৮, ৬৪২৯, সহিহ মুসলিম ২৫৩৩, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৫৯, আহমদ : ১২৯০৮
কুরআন ও সহিহ হাদিসে ইমমাত সম্পর্কিত আকিদাই নাই। অথচ শিয়ার তাদের মান সম্মান নবিদের উপর স্থান প্রদান করে, যা মূলত ইসলামের সাথে উপহাস করার সমান।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-২ : বর্তমান কুরআন ও ইমাম মাহদি (আ.) সম্পর্কে শিয়াদের ভ্রান্ত বিশ্বাস।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. শিয়াদের আকিদা কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন করা হয়েছে :
শিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন কিতাবে এমন বিশ্বাস প্রকাশ পাওয়া যায় যে, কুরআনে তাহরীফ (تحريف) বা পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন ঘটেছে, বিশেষ করে আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত আয়াতগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, এমন আকিদা তারা পোষণ করে থাকে।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী শিয়াদের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস, যিনি “আল-কাফি” গ্রন্থ সংকলন করেন। এই কিতাব শিয়াদের কাছে “সহিহ বুখারি” এর সমতুল্য। এই গ্রন্থে অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে, যেগুলো কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন ঘটেছে এমন বিশ্বাসকে সমর্থন করে। যেমন-
عن أبي عبد الله قال: «إِنَّ القُرْآنَ الَّذِي جَاءَ بِهِ جِبْرَائِيلُ إِلَى مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ»
আবু ইবনে আব্দুল্লাহ (ইমাম জাফর আস-সাদিক) বলেন, “নিশ্চয়ই কুরআন, যা জিবরাইল মুহাম্মদ ﷺ এর কাছে নিয়ে এসেছিলেন, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১

খ। নিমাতুল্লাহ আল-জাযায়েরি (মৃত্যু: ১১১২ হিজরি), তিনি স্পষ্টভাবে বলেন-
إِنَّ الأَحَادِيثَ الدَّالَّةَ عَلَى وُقُوعِ التَّحْرِيفِ فِي القُرْآنِ، قَدْ تَجَاوَزَتْ حَدَّ التَّوَاتُرِ۔
“কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে এ মর্মে প্রমাণদাতা হাদিসসমূহ তাওতারের (মিথ্যা হওয়ার) সীমা অতিক্রম করেছে। আল-আনওয়ার আন-নুমানিযয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড,পৃ.-৪৭৫

গ। আল-নূরী আত-তাবরসী (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) তার লিখিত বই “ফাসলুল খিতাব ফি ইসবাত তাহরিফে কিতাবে রাব্বিল আরবাব” অর্থাৎ “প্রভুর কিতাবে তাহরীফ প্রমাণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক কথা”। এই বইতে লেখক দাবি করেন যে, কুরআনে সাহাবাগণ পরিবর্তন এনেছে এবং আহলে বাইতের প্রশংসাসমূহ বাদ দিয়েছে।

২. শিয়াদের আকিদা আউসিয়া (أوصياء)” বা অসীয়তকৃতগণ ছাড়া কারো নিকট সম্পূর্ণ কুরআন নাই :
শিয়া সম্প্রদায়ের চরমপন্থি দলিল ও বিশ্বাস অনুযায়ী, “আউসিয়া (أوصياء)” অর্থাৎ ইমামগণ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সম্পূর্ণ ও যথাযথ কুরআন নেই। এই বিশ্বাস মূলত শিয়া ইসেনে আশারী বা ইমামিয়া দ্বাদশী ফির্কার একটি মূল আকিদার অংশ, যেখানে তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকালের আগে আলি (রা.) কে অসী বা আউলিয়া আমর হিসেবে মনোনীত করে গেছেন, এবং পরে তাঁর বংশের ১২ জন ইমাম যারা ‘আহলে বাইতের’ অন্তর্ভুক্ত তারা একে একে কুরআনের আসল ও গভীর জ্ঞান ও তাফসিরের উত্তরাধিকারী হয়েছেন। এমন বক্তব্য তাদের প্রাথমিক হাদিস গ্রন্থে পাওয়া যায়।
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন-
: أنّهُ لَم يَجمَعِ القُرآنَ كُلَّهُ إِلّا الأئِمَّةُ
নিশ্চয়ই কুরআনের পূর্ণসংকলন কেউ করেনি/পারে না, শুধুমাত্র ইমামগণ ব্যতীত।” আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১
❝ٱلْقُرْآنُ ٱلَّذِي أُنْزِلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ، مَا جَمَعَهُ إِلَّا ٱلْأَوْصِيَاءُ❞
“যে কুরআন মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাজিল করা হয়েছে, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত; একমাত্র ওসীয়্যতপ্রাপ্তগণ (অর্থাৎ ইমামগণ) ব্যতীত কেউ তা সংকলন করেনি। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ৩

৩. কুরআনে আহলে বাইত বা ইমামদের নাম ছিল তা বাদ দেওয়া হয়েছে:
শিয়াদের বিশ্বাস কুরআনের কিছু আয়াতে আলি (রা.) ও ইমামদের নাম ছিল, সাহাবারা তা মুছে দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
“وَلَوْلَا أَنَّهُ زِيدَ فِي كِتَابِ اللّٰهِ وَنُقِصَ مِنْهُ، مَا خُفِيَ حَقُّنَا عَلَى ذِي حِجَى.”
অর্থ : তিনি বললেন, “যদি আল্লাহর কিতাবের (কুরআনের) মধ্যে কিছু যোগ না করা হতো এবং কিছু বাদ না দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের (আহলুল বয়াতের) অধিকার ধামাচাপা পড়ত না।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১০০

৪. আসল কুরআন ইমাম মাহদির সাথে আছে :
শিয়াদের আকিদা অনুসারে, সাহাবারা কুরআন থেকে কিছু আয়াত বাদ দিয়েছে বা পরিবর্তন করেছে, আর কুরআনের আসল ও পূর্ণ রূপ কেবলমাত্র ইমাম মাহদী (আল-মাহদী) ও তাঁর পূর্ববর্তী ইমামগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি বিশ্ব শেষ সময় ফিরে এসে পুরো কুরআন পুনরুদ্ধার করবেন। তিনি ফিরে এসে তা প্রকাশ করবেন এবং প্রকৃত ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন।
মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী বলেন-
“كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ، يُبَايِعُ النَّاسَ عَلَى كِتَابٍ جَدِيدٍ، عَلَى الْعَرَبِ شَدِيدٍ.”
“আমি যেন তাকে (ইমাম মাহদিকে) দেখছি কুফা ও মাকামের মাঝে দাঁড়িয়ে, মানুষের সঙ্গে নতুন একটি কিতাবের ওপর বায়াত নিচ্ছে, যা আরবদের প্রতি কঠোর।” মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী, আল-গায়বা, পৃ.- ১৫৭
তারা একটি ইমাম মাহদির মাধ্যমে একটি “নতুন কুরআনের” আগমনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার কিতাব লিখেন, আবু আবদুল্লাহ (আ) বলেছেন-
“مَا ادَّعَى أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ أَنَّهُ جَمَعَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا كَذَّابٌ، وَمَا جَمَعَهُ وَحَفِظَهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا عَلِيٌّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَالْأَئِمَّةُ مِنْ بَعْدِهِ.”
যে ব্যক্তি দাবি করে যে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি পূর্ণ কুরআন যেভাবে নাজিল করেছেন, অনুরূপ সে তা একত্র করেছেন, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পাক তিনি যেভাবে কুরআন নাজিল করেছেন, আলি (রা.) এবং উনার পরবর্তী ইমামগণ ছাড়া কেউই তা হুবহু একত্র ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হননি।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭
সঠিক আকিদা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সময়, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবির শাহাদতের কারণে কুরআন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন উমর (রা.)-এর পরামর্শে আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দেন। এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর উপর, যিনি ওহি লিখতেন এবং নির্ভরযোগ্য হাফিজ ছিলেন। তিনি সতর্কতা ও ঈমানদারির সাথে কুরআনের আয়াতসমূহ সাহাবিদের নিকট থেকে দুজন সাক্ষীর ভিত্তিতে গ্রহণ করেন। তিনি তা খাতা আকারে সংকলন করেন, যা পরে উমর (রা.) এবং উমরের মৃত্যুর পর হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। এই সংকলনই পরবর্তীতে উসমান (রা.)-এর সময় একটি মানক মুসহাফ আকারে ছাপিয়ে সর্বত্র প্রেরণ করা হয়। এই উদ্যোগ ইসলামের ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস হলো, কুরআনে কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি। কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, যেমনটি রাসূল ﷺ-এর যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া কুরআন হিফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ারা নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমরাই এই জিকির (কুরআন) নাজিল করেছি, এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” সূরা হিজর : ৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন ও তিনি উলঙ্গ হয়ে আত্মপ্রকাশ করবেন :
ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম বাই‘আত গ্রহণকারী হবেন মুহাম্মাদ ﷺ ও তারপর আলি (রা.)
এটি শিয়াদের একটি রহস্যময় ও তাত্ত্বিক বিশ্বাসের অংশ। তারা মনে করে, নবি মুহাম্মাদ ﷺ ও ইমাম আলি (আ.) রূহানিয়ভাবে বা অন্যভাবে ইমাম মাহদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
الرِّوَايَةُ: “فَأَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ.”
অর্থ : সর্বপ্রথম যিনি তাঁর (ইমাম মাহদির) প্রতি বাই‘আত করবেন, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।”
শায়খ আল-নুমানী, আল-গায়বা, কিয়ামাতের আলামত অধ্যায়, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩২৬
শায়খ তুসী, মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন-
تَذْكُرُ فِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ (ص) وَعَلِيًّا (ع) هُمَا أَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُ الْقَائِمَ عِنْدَ ظُهُورِهِ۔
অর্থ : এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবি (সা.) এবং আলি (আ.)—তাঁরা উভয়ে কায়েম (ইমাম মাহদী)-এর আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম তাঁর কাছে বা্ইয়াত করবেন। শায়খ তুসী, আল-গায়বা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪–৪৭৫

৩. ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন
সূর্যের গোলকের সামনে ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। এটি শিয়াদের একটি জঘন্য ও মিথ্যা আকিদা। শায়খ তুসী ও নুমানি ইমাম রেজা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
يَخْرُجُ الْقَائِمُ عُرْيَانًا أَمَامَ الشَّمْسِ…
অর্থ : কায়েম (ইমাম মাহদি) সূর্যের সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৫২, পৃ. ২৮৬-২৮৮
সঠিক আকিদা :
এই সকল মতবাদ ও বর্ণনা সুন্নি আকিদা এবং সহিহ হাদিসসমূহের পরিপন্থী। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের বিশ্বাস অনুযায়ী, রাসূল ﷺ তো সকল নবিদের শেষ এবং সবার নেতা, তার পক্ষ থেকে কোনো “বাই‘আত” গ্রহণের কথা একেবারে অকল্পনীয় ও বাতিল। তেমনি, ইমাম মাহদির বিবস্ত্র হয়ে আত্মপ্রকাশের মত ধারণা শরিয়ত, লজ্জাশীলতা ও নবি পরিচিত আদর্শবিরোধী।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৩ : রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পরিবার সম্পর্কে তাদের জঘন্যতম বিশ্বাস।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. উম্মুল জননী আয়িশা (রা.) ও হাফসা (রা.) এর প্রতি মিথ্যা আপাবাদ :
শিয়ারা বিশেষ করে রাফিদি গোষ্ঠী উম্মুল মুমিনীনগণের প্রতি অনেক মিথ্যা ও অশ্লীল অপবাদ আরোপ করেছে, বিশেষত আয়িশা (রা.) ও হাফসা (রা.)-কে লক্ষ্য করে। এগুলোর পেছনে তাদের নিজস্ব আকিদা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে, যা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। শিয়াদের কিছু গ্রন্থ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করে থাকেন, যদিও শিয়াদের মধ্যেও এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। নিচে কিছু প্রসিদ্ধ শিয়া গ্রন্থ থেকে দলিলসহ তাদের অপবাদ তুলে ধরা হলো-

২. আয়িশা (রা.) আলি (রা.) এর বিরোধিতা করেছিলেন :
শিয়াদের কিছু মতে, আলি (রা.)-এর শাসনকালে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তালহা ও যুবাইর (রা.)-কে নিয়ে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা শিয়াদের কাছে একটি গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচিত। তাদের দাবি আয়িশা (রা.) নবি ﷺ এর পরে ধর্মদ্রোহিতা করেছিলেন। তাদের কিতাবে উল্লেখ আছে-
إِنَّ عَائِشَةَ ارْتَدَّتْ بَعْدَ النَّبِيِّ، وَخَرَجَتْ تُقَاتِلُ وَصِيَّهُ عَلِيًّا…
“নিশ্চয় আয়িশা নবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওফাতের পর ধর্মত্যাগ করে এবং তাঁর ওসী আলি (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বের হয়। ক্বাযী নু‘মান আল-মাগরিবী, শরহুল আখবার ফি ফাযায়িলিল আহলিল বায়ত, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১০৯।

৩. নবিজি (সা.) এর জীবনে অশান্তি সৃষ্টি :
শিয়াদের কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, আয়িশা (রা.) নবিজি (সা.)-এর পরিবারে বিবাদ সৃষ্টি করেছিলেন এবং বিশেষত হাফসা (রা.)-এর সাথে মিলে নবিজির ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। নবি ﷺ তাকে তালাক দিয়েছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের লেখা গ্রন্থে এমনই আছেঅ
إِنَّ النَّبِيَّ أَمَرَ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ أَنْ يُطَلِّقَا ابْنَتَيْهِمَا مِنْ بَعْدِهِ.
নবি ﷺ আবু বকর ও উমরকে আদেশ করেছিলেন যেন তারা তাঁর মৃত্যুর পর তাদের কন্যাদ্বয়কে (আয়িশা ও হাফসা) তালাক দেয়। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ২৪১

৪. উম্মুল মুমিনীন হওয়া নিয়ে সন্দেহ:
কিছু চরমপন্থী শিয়া মতবাদে (যেমন কিছু গুলাত শিয়া) আয়িশা (রা.)-কে “উম্মুল মুমিনীন” হিসেবে স্বীকার করে না এবং তাকে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) কে তারা কাফির বলে অপবাদ প্রদান করেন শিয়া আলিম নূরী তাবরসী বলেন-
إِنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ مِنْ أَعْدَاءِ أَهْلِ الْبَيْتِ، وَهِيَ كَافِرَةٌ بِذَلِكَ
“নিশ্চয়ই আয়িশা ছিল আহলুল বাইতের শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত, এবং এ কারণেই সে কাফির। নূরী তাবরসী, আল-আনওয়ার আন-নুমানিয়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৫৯

৫. উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) ও আয়িশা (রা.) কে মুনাফিক অপবাদ প্রদান :
সূরা আত-তাহরীম তিন নম্বর আয়াতে রাসূল ﷺ এর একটি গোপন কথা স্ত্রীদের মধ্যে ফাঁস করে দেওয়ার আলোচনা রয়েছে তার ব্যাখ্যায় এ মিথ্যা অপবাদ প্রদান কর শিয়া আলেম মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদাহ আল-আইয়াশি লিখেন-
إِنَّ حَفْصَةَ وَعَائِشَةَ تَظَاهَرَتَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، وَكُنَّ مُنَافِقَاتٍ.
“নিশ্চয় হাফসা ও আয়িশা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বিরুদ্ধে একত্র হয়েছিল, এবং তারা ছিল মুনাফিক।” মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদাহ আল-আইয়াশি, তাফসীরুল আ’ইয়াশি, তাফসীর আল-আইয়াশি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৪।

৬. মৃত্যু পরবর্তী শাস্তির মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী:
শিয়াদের কিছু হাদিসে দাবি করা হয় যে, নবিজি (সা.) বা ইমাম আলি (আ.) আয়িশা (রা.) এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন এবং তাকে জাহান্নামের ভয় দেখানো হয়েছিল। এসব হাদিস শিয়াদের বানান জাল হাদিস।

৭. মিথ্যা ব্যভিচার অভিযোগে সম্পৃক্ততা :
আয়িশা (রা.) সম্পর্কে মিথ্যাও কাল্পনিক ব্যভিচারের অভিযোগ উঠলে মহান আল্লাহ তায়ালা তার পরিত্রতার পক্ষে কুরআন নাজিল করে। কিন্তু বিভ্রান্ত শিয়ারা প্রচার করে কুরআনের এ আয়াত হয়তো অন্যান্য নারী (যেমন মারিয়া কিবতীয়া) এর জন্য নাজিল হয়েছে; সুতরাং আয়শার নির্দোষিতা নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত আয়িশা (রা.) কে ‘উম্মুল মুমিনীন’, হাদিসের প্রধান বর্ণনাকারী এবং নবিজি (সা.) এর প্রিয় স্ত্রী হিসেবে সম্মান করে। তারা জামালের যুদ্ধকে একটি ফিতনা (বিভ্রান্তি) হিসেবে দেখে, যেখানে সাহাবিদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, কিন্তু আয়িশা (রা.) এর ইচ্ছা ভালো ছিল বলে বিশ্বাস করে। যা এই বইয়ের বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনা থেকেও জানতে পেরেছেন। অপর পক্ষে আয়িশা (রা.) বিরুদ্ধে মিথ্যাও কাল্পনিক ব্যভিচারের অভিযোগের উত্তরে মহান আল্লাহ তায়ালা তার পবিত্রতা ও পরিপূর্ণতার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সূরা নূরের ১১ থেকে ২০, এই ১০ আয়াত নাজিল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) প্রতি অপবাদকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ جَآءُوۡ بِالۡاِفۡکِ عُصۡبَۃٌ مِّنۡکُمۡ ؕ لَا تَحۡسَبُوۡہُ شَرًّا لَّکُمۡ ؕ بَلۡ ہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ لِکُلِّ امۡرِیًٴ مِّنۡہُمۡ مَّا اکۡتَسَبَ مِنَ الۡاِثۡمِ ۚ وَالَّذِیۡ تَوَلّٰی کِبۡرَہٗ مِنۡہُمۡ لَہٗ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
নিশ্চয়ই যারা এ (আয়িশা রা.)অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে করো না, বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রয়েছে, যতটুকু পাপ সে অর্জন করেছে। আর তাদের থেকে যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাআযাব। সূরা আন-নূর: ১১
আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছে মিথ্যা অপবাদ যারা দেয় তারা কখনো মুমিন নয় বরং সে ব্যক্তি মুনাফিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তায়ালা সূরার শেষ অংশে বলেন,
﴿يَعِظُكُمُ ٱللَّهُ أَن تَعُودُواْ لِمِثۡلِهِۦٓ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ ١٧﴾
অর্থ : “আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, ‘তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনও অনুরূপ আচরণের পূনরাবৃত্তি করো না।” সূরা আন-নূর: ১৭
তাহলে বলুন কেমন দুঃসাহস দেখান সাহাবিদের দুশমন শিয়াগণ। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি তাদের কোন সম্মানবোধ নেই বলেই শিয়ারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রিয় স্ত্রী আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) কে অপবাদ দেয়। অথচ তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক সনদ প্রাপ্ত জান্নাতি।

উম্মুল জননী বা নবি ﷺ এর স্ত্রীদেরকে অপমান করা :
আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী (মৃত্যু ১১১০ হিজরি) একজন প্রভাবশালী শিয়া আলেম বলেন, দায়মুক্তির ব্যাপারে আমাদের (শিয়াদের) আকিদা ও বিশ্বাস হল, আমরা আবূ বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মত চার মূর্তি থেকে মুক্ত। আমরা আরও মুক্ত আয়িশা (রা.), হাফসা (রা.), হিন্দা (রা.) ও উম্মুল হাকিম (রা.) এর মত চার নারী এবং তাদের অনুসারী ও তাদের বিভিন্ন দল-গোষ্ঠী থেকে। আর তারা হল পৃথিবীর বুকে আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি। আর তাদের শত্রুদের থেকে মুক্ত হওয়ার পরেই শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইমামদের প্রতি ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৪২, আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৮৫, ছায়া অধ্যায় ।

উম্মুল মুমিনীন বিরুদ্ধে শিয়াদের মিথ্যা ও অশ্লীল অভিযোগ
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
إِنَّ نِسَاءَ النَّبِيِّ (ص) خَانُوهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ”
অর্থ : নবিজির স্ত্রীরা দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর সাথে খিয়ানত করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৫৭

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
নবি ﷺ এর স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ
অর্থ : নবি মু’মিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্টতর এবং তার স্ত্রীরা তাদের মা। সূরা আহযাব : ৬
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ
হে নবি-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। সূরা আল-আহযাব ৩২
উম্মুহাতুল মুমেনীনদের সম্পর্কে আয়াত নাজিল হয় :
إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗ
অর্থ : হে নবি-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। সূরা আল-আহযাব -৩৩

নবি ﷺ এর কন্যাদের অপমান দেওয়া :
দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত–পাকিস্তান) শিয়া সম্প্রদায় মনে করে যে নবি ﷺ এর একমাত্র জৈবিক কন্যা ছিলেন সাইয়্যেদা ফাতেমা (রা.)। বাকী তিন জন সাইয়্যেদা যাযনব (রা.), রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) কে তারা জীবিক বা দত্তক কন্যা হিসেবে অভিহিত করে। এই আকীদার ভিত্তি হিসেবে তারা কিছু শিয়া ও মুসলিম গবেষণা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি কাজ করে। আল্লামা সাইয়্যেদ জাফর মুরতাজা, যিনি একজন সমকালীন রাফিদি শিয়া ইতিহাসবিদ ও লেখক, যিনি শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে সিরাতুন্নবী, সাহাবা ও আহলে বাইত সম্পর্কিত বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি নবির চার কন্যার মধ্যে চারজনই জৈবিক ছিলেন কি নাতা নিয়ে আলোচনা ও প্রমাণ উপস্থাপন করে। এক পর্যায় ফাতিমা (রা.) ছাড়া বাকি তিন জন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে লিখেন-
بَناتُ النَّبِيِّ أَمْ رَبَائِبُهُ؟
“নবিজির কন্যারা, না কি তাঁর দত্তক কন্যারা?” আল্লামা সাইয়্যেদ জাফর মুরতাজা, গ্রন্থের নাম আল-আমেলি।
সঠিক আকিদা : আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সকল অনুসারী কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, নবি ﷺ এর কন্যাদের সংখ্যা চারজন। সাইয়্যেদা যাযনব (রা.), রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.) আও ফাতিমা (রা.)। আর অনুরূপ মত পোষণ করে সাধারণ শিয়াগণও। তবে ভারত ও পাকিস্তানের শিয়াগণ তিন কন্যাকে অস্বীকার করে। তারা আল্লাহ তায়ালার বিধানের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿ ٱدۡعُوهُمۡ لِأٓبَآئِهِمۡ هُوَ أَقۡسَطُ عِندَ ٱللَّهِ﴾
অর্থ : তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার পরিচয়ে ডাক। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটাই অধিক ন্যায়সংগত। সূরা আহযাব: ৫
তাদের এই মত প্রকাশের একমাত্র কারণ হল ওসমান (রা.) এর সাথে শত্রুতা করা, যাতে তাঁর উচ্চ মর্যাদা স্বীকৃত না হয়। কারণ, নবি ﷺ তাঁর নিকট প্রথমে সাইয়্যেদা রুকাইয়া (রা.) কে বিয়ে দেন। অতঃপর যখন তিনি (রুকাইয়া) ইন্তিকাল করেন, তখন তাঁর নিকট নবি ﷺ উম্মে কুলসুম (রা.) কে বিয়ে দেন। আর এ জন্য তাকে ‘যূন্নুরাইন’ নামে ডাকা হত। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّ ﴾
অর্থ : হে নবি! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।” সূরা আল-আহযাব: ৫৯

ফাতিমা (রা.) কে স্বংয় আল্লাহ তায়ালা আলি (রব.) সাথে বিবাহ দেন :
ফুরুউল-কাফীতে (আল-কুলাইনি) উল্লেখিত হাদিসটি বর্ণনা করেনীভ
لَمَّا زَوَّجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلِيًّا فَاطِمَةَ عَلَيْهُمَا السَّلَامُ دَخَلَ عَلَيْهَا وَهِيَ تَبْكِي، فَقَالَ لَهَا: “مَا يُبْكِيكِ؟ وَاللَّهِ لَوْ كَانَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، قَدْرُ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنْ عَلِيٍّ، لَزَوَّجْتُكِ بِهِ، وَلَمْ أُزَوِّجْكِ بِهِ. بَلْ اللَّهُ هُوَ الَّذِي زَوَّجَكِ بِهِ.”
“যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আলি (আ.)-কে সাইয়্যেদা ফাতেমা (রা.) এর নিকট বিয়ে দেন, তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং দেখেন তিনি কাঁদছেন। তখন তিনি বললেন, ‘তোমার কাঁদার কারণ কী? আমি আল্লাহর নামে শপথ করছি—যদি আমার পরিবারে এমন কেউ থাকত, যার যোগ্যতা আলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তবে আমি তোমাকে তাকে বিয়ে দিতাম; কিন্তু আমি তোমাকে আলির নিকট বিয়ে দেইনি। বরং আল্লাহ তোমাকে আলির নিকট বিয়ে দিয়েছেন।’” মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি, ফুরুউল-কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়, পৃ.-১৫৭

আল-কুলাইনী আরও উল্লেখ করেন, “আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফাতেমা (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলল, “আপনি আমাকে তুচ্ছ মোহরের বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন? তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তো তোমাকে বিয়ে দেইনি। বরং আল্লাহই তোমাকে আকাশ থেকে বিয়ে দিয়েছেন। মুহাম্মদ ইবনু ইয়াকুব আল-কুলাইনি, ফুরুউল-কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়, পৃ.-১৫৭

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৪ : সাহাবি (রা.) সম্পর্কে শিয়াদের জঘন্য ভ্রান্ত আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিয়া ইসলামের কিছু চরমপন্থী গ্রন্থে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সম্পর্কে অত্যন্ত জঘন্য ও ভিত্তিহীন আকিদা বিদ্যমান, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। নিম্নে শিয়া গ্রন্থ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি সহ তাদের ভ্রান্ত আকিদা উপস্থাপন করা হলো:
১. প্রথম তিন খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান রা.) সম্পর্কে কুফরি অপবাদ :
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী তার কিতাবে লিখেন-
“وَلَعَنَ اللهُ الْخِلَافَةَ الْغَاصِبَةَ وَمَنْ تَوَلَّاهَا مِنَ الصَّحَابَةِ”
অর্থ: “আল্লাহ ঐ সকল খিলাফত দখলকারী ও তাদের সমর্থনকারী সাহাবাদের উপর লানত বর্ষণ করুন। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ২৪৮
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী,
“إِنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانَا كَافِرَيْنِ”
অর্থ: “নিশ্চয় আবু বকর ও উমর কাফির ছিলেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, রওজা অধ্যায়, শেষ খণ্ড, পৃ.-৬৪-৬৫
আবু বকর ও উমর (রা.) ইসলাম ধ্বংসকারী
শিয়াদের বিশিষ্ট তাফসির কারণ আবু নাদর মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদা ইবনু ইসহাক আল-আয়াশি বলেন-
“إِنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ أَضَلَّا الْأُمَّةَ عَنِ الْحَقِّ”
অর্থ: আবু বকর ও উমর উম্মতকে সত্য থেকে বিচ্যুত করেছেন। আবু নাদর মুহাম্মাদ ইবনু মাসআদা ইবনু ইসহাক আল-আয়াশি , তাফসীর আল-আয়াশি, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৫৬

আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মাজলিসী উল্লেখ করেন, নিশ্চয় আবূ বকর এবং ওমর উভয় হলেন, ফেরাউন ও হামান। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন পৃ.-৩৬৭

. তিন জন সাহাবি (রা.) বাদে সকলেই ঈমান ত্যাগকরে মুরতাদ হয়েছিল :
রিজাল আল-কাশশি (رجال الكشي) একটি শিয়া রিজাল (ব্যক্তিত্ব-বিশ্লেষণ) গ্রন্থ, যা শিয়া লেখক আবু আমর মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আব্দুল আজীজ আল-কাশশি (মৃত্যু: ৩৪০ হিজরি) রচনা করেছেন। এটি শিয়া ইসলামের প্রাথমিক যুগের হাদিস বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা ও জীবনী নিয়ে রচিত। এই গ্রন্থে কিছু স্থানে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা পাওয়া যায়। শিয়াদের একটি অংশ এ ধরনের বর্ণনাকে ব্যবহার করে সাহাবাদের (রা.) মর্যাদাহানি করার চেষ্টা করে। উক্ত কিতাবে মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি তার কিতাবে লিখেন-
مَا بَقِيَ مَعَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ إِلَّا ثَلَاثَةٌ، وَالْبَقِيَّةُ انْقَلَبُوا عَلَى أَعْقَابِهِمْ حَتَّى نِسَاءُ النَّبِيِّ…
আমিরুল মুমিনীন (আলি) এর সঙ্গে কেবল তিনজনই থেকে গিয়েছিল, আর বাকি সবাই তাদের পেছন ফিরে গিয়েছিল, এমনকি নবির স্ত্রীরাও…”। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ৩৩৩, মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৩,

মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি কিতাবে লিখেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
“لَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) ارْتَدَّ النَّاسُ إِلَّا ثَلَاثَةً: الْمِقْدَادُ وَأَبُو ذَرٍّ وَسَلْمَانُ، ثُمَّ إِنَّ النَّاسَ عَادُوا فِي الْإِسْلَامِ…”
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মানুষ মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, মাত্র তিনজন (মিকদাদ, আবু যর ও সালমান) ছাড়া। পরে তারা ফিরে এসে ইসলামে প্রবেশ করে…”। মুহাম্মাদ ইবনে উমার আল-কাশশি, রিজাল আল-কাশশি, পৃ.-৩, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, অষ্টম খণ্ড, পৃ.-২৪৫।
শিয়াদের এই বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবি (সা.)-এর পর অধিকাংশ সাহাবা (রা.) ঈমান ত্যাগ করেছিলেন, শুধু আলি (আ.), সালমান ফারসি (রা.), আবু যর গিফারী (রা.) ও মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) অবিচল ছিলেন।
মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি আরও লিখেন-
“مَا أَسْلَمَ الْقَوْمُ وَلَكِنِ اسْتَسْلَمُوا”
অর্থ: “সাহাবাগণ ঈমান আনেননি, বরং তারা আত্মসমর্পণ করেছিলেন।” মুহাম্মাদ ইবনু উমার আল-কাশশি, রিজালুল কাশশি, পৃ.-১২

৩. সাহাবাদেরকে নবিজির হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা :
আল-সাইয়্যিদ ইবনে তাউস ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিয়া ইমামিয়া আলেম, মুহাদ্দিস এবং সুফিবাদী লেখক। তিনি লিখেন-
“إِنَّ الصَّحَابَةَ سَمُّوا النَّبِيَّ (ص)”
অর্থ: “নিশ্চয় সাহাবাগণ নবি (সা.) কে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন। সৈয়দ ইবনে তাউস, ইকবাল আল-আমাল, পৃষ্ঠা ৪৫৬

৪. আলি (রা.) ছাড়া সকল সাহাবাকে মুনাফিক হয়ে ছিল :
আবু মনসুর আহমদ ইবন আলি ইবন আবী তালিব আল-তাবরিসি ছিলেন শিয়াদের বিখ্যাত তাফসীর ‘ফদল ইবন হাসান আল-তাবরিসি’। তিনি বলেন-
“إِنَّمَا كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ عَلِيٌّ وَسَلْمَانُ وَأَبُو ذَرٍّ وَالْمِقْدَادُ”
অর্থ: “আলি, সালমান, আবু জর ও মিকদাদ ছাড়া কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনেননি।” আবু মনসুর আহমদ ইবন আলি ইবন আবী তালিব তাবরিসি, আল-ইহতিজাজ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৫২

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন:
أَنَّهُ قَالَ: لَمَّا قُبِضَ النَّبِيُّ (ص) ارْتَدَّ النَّاسُ إِلَّا ثَلَاثَةً”
অর্থ: নবি (সা.)-এর ওফাতের পর মানুষ মুরতাদ হয়ে ছিল, মাত্র তিনজন ব্যতীত। আল-কাফি, কিতাবুর রুদা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-২৪৪
নোট : এই হাদিস দ্বারা শিয়ারা দাবি করে যে অধিকাংশ সাহাবাই ঈমান ত্যাগ করেছিলেন, যা কুরআনের সূরা ফাতহ ৪৮:২৯-এর সরাসরি খণ্ডন। এই বক্তব্য কুরআনের সূরা আত-তাওবাহ ৯:১০০-এর বিপরীত, যেখানে আল্লাহ প্রথম মুহাজির-আনসারদের প্রশংসা করেছেন।

৫. সাহাবারা কুরআন বিকৃত করেছে”
আল-হাজ মির্জা হোসাইন নূরী তাবরসী, (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইমামিয়া শিয়া আলেম এবং মুহাদ্দিস। নূরী তাবরসী এই গ্রন্থে দাবি করেন, কুরআন শরীফে সাহাবারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাহরীফ (বদলানো, সংযোজন বা বিয়োজন) করেছেন। যেমন- ফাসলুল খিতাব ফি ইসকাত তাহরিফিল কিতাবে শিয়া আলেম নূরী তাবরিসি বলেন-
“إِنَّ الصَّحَابَةَ حَرَّفُوا القُرْآنَ بَعْدَ النَّبِيِّ ﷺ”
অর্থ: সাহাবাগণ নবি ﷺ এর পর কুরআন বিকৃত করেছেন। আল-হাজ মিরজা হোসাইন নূরী তাবরসী, ফাসলুল খিতাব ফি ইসকাত তাহরিফিল কিতাব।
শিয়া মতে, রাসূল ﷺ-পরবর্তী সময়ে সাহাবাদের বিশাল অংশ (এবং এমনকি নবির স্ত্রীগণও) সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন — যা আহলুস সুন্নাহর দৃষ্টিতে চরম বিদ্বেষপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর আকিদা।

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আল-কুরআন সাহাবি (রা.) কে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সনদ দিয়েছে। আল্লাহ যাদের প্রতি তার ক্ষমা ও সন্তুষ্টির ঘোষণা প্রদান করতে নিন্দকদের নিন্দার ফলে তাতে সামান্যতম ও ক্ষতি হবেনা। বরং নিন্দুরেরাই লাঞ্ছিত অপমানিত হবে। সাহাবিদের (রা.) জান্নাত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সনদের প্রমাণ মহান আল্লাহর ঘোষণা। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
অর্থ : আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান কৃতকার্যতা। সুরা তাওবা : ১০০
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ  لَہُمۡ دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ وَمَغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ ۚ

এরাই সত্যিকারের ঈমানদার, এদের জন্য রয়েছে তাদের রবের সন্নিধানে উচ্চ পদসমূহ, আরও রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। সূরা আনফাল : ৪
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَاَلۡزَمَہُمۡ کَلِمَۃَ التَّقۡوٰی وَکَانُوۡۤا اَحَقَّ بِہَا وَاَہۡلَہَا ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا 
এবং তাকওয়ার বাণী তাদের জন্য অপরিহার্য করলেন, আর তারাই ছিল এর সর্বাধিক উপযুক্ত ও এর অধিকারী। আর আল্লাহ হলেন প্রত্যেক বিষয়ে সর্বজ্ঞ। সূরা আল-ফাতহ: ২৬
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَلٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَزَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَکَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَالۡفُسُوۡقَ وَالۡعِصۡیَانَ ؕ  اُولٰٓئِکَ ہُمُ الرّٰشِدُوۡنَ ۙ
কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। সূরা হুজুরাত : ৭

সাহাবিদের (রা.) অনুসারী দলটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে :
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামি হবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবিগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজ : ২৬৪১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৯২ মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮
এ ছাড়াও বহু আয়াতে সাহাবিদের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিগণ ছিলেন আল-কুরআন, নবুওয়াত ও সুন্নাতের বাস্তব সাক্ষী। সুতরাং সাহাবিদের উপর মিথ্যারোপ করার অর্থই হল ইসলাম ও মুসলিমের সাথে শত্রুতা করা। সাহাবিদের কুৎসা রটনা করা মানেই আল-কুরআন, নবুওয়াত ও সুন্নাতের কুৎসা রটনা করা। উপরের দিকে থুথু নিক্ষেপ করার সমিল।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৫ : মুতআ বিয়ে বা চুক্তি ভিত্তিক সাময়িক বিয়ে সম্পর্কে শিয়াদের আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মুত‘আ বিয়ে বা চুক্তি ভিত্তিক সাময়িক বিয়ে জায়েয মনে করা। শিয়াদের নিজস্ব প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ থেকে মুতআ (مُتْعَة) বা সাময়িক বিবাহ সম্পর্কে কিছু দলিলসহ উদ্ধৃতি পেশ করা হলো।

ক. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
عَنْ أَبِي عَبْدِ اللّٰهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ: لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يُؤْمِنْ بِرَجْعَتِنَا، وَيَسْتَحِلُّ مُتْعَتَنَا، وَيُؤْمِنُ بِوَلَايَتِنَا.
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের রজআ (পুনরাগমন) এ বিশ্বাস রাখে না, মুতআকে হালাল মনে করে না এবং আমাদের ওলায়াত (নেতৃত্ব) এ ঈমান আনে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৪৫২
খ. মুহাম্মদ ইবন মাসউদ আল-আইয়াশী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
قَالَ أَبُو جَعْفَرٍ (ع): الْمُتْعَةُ نَزَلَ بِهَا الْقُرْآنُ وَجَرَى بِهَا السُّنَّةُ مِنْ رَسُولِ اللّٰهِ (ص)، وَهِيَ حَلَالٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
ইমাম আবু জাফর (আ.) বলেন: মুতআ সম্পর্কে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং রাসূল (সা.) এর সুন্নাহর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এটি কিয়ামত পর্যন্ত হালাল। মুহাম্মদ ইবন মাসউদ আল-আইয়াশী. তাফসীর আল-আইয়াশী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৪৬৮, সূরা আন-নিসা ২৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর

গ. তাহযীবুল আহকাম গ্রন্থে আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
إِنَّ الْمُتْعَةَ دِينِي وَدِينُ آبَائِي، وَمَنْ عَمِلَ بِهَا عَمِلَ بِدِينِنَا، وَمَنْ أَنْكَرَهَا أَنْكَرَ دِينَنَا، وَاعْتَقَدَ بِغَيْرِ دِينِنَا.
নিশ্চয় মুতআ আমার দ্বীন এবং আমার পিতৃপুরুষদের দ্বীন। যে মুতআ অনুযায়ী আমল করে সে আমাদের দ্বীন অনুযায়ী আমল করে, আর যে মুতআ অস্বীকার করে, সে আমাদের দ্বীন অস্বীকার করে এবং ভিন্ন দ্বীনে বিশ্বাস করে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আত-তাহযীব, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৫১, হাদিস : ১০৫৩

ঘ. তাহযীবুল আহকাম গ্রন্থে আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
قَالَ أَبُو عَبْدِ اللّٰهِ (ع): مَا اسْتُحِلَّتِ الْمُتْعَةُ إِلَّا لِيَعْلَمَ مَنْ يَتَّقِي اللّٰهَ مِمَّنْ يَعْصِيهِ.
মুতআ হালাল করা হয়েছে এজন্যই, যাতে বোঝা যায় কে আল্লাহকে ভয় করে এবং কে তাঁকে অমান্য করে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইস্তিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪২

ঙ. আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন-
مَا مِنْ رَجُلٍ تَمَتَّعَ ثُمَّ اغْتَسَلَ إِلَّا خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ ذَلِكَ الْمَاءِ سَبْعِينَ مَلَكاً يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
কোন ব্যক্তি মুতআ করলে এবং তারপর গোসল করলে, আল্লাহ তার বীর্য থেকে ৭০ জন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন, যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য মাগফিরাত চায়। শেখ সাদূক, মান লা ইয়াহযুরুহুল ফকিহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.- ৪৬৩

চ. ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
عَنْ أَبِي عَبْدِ اللّٰهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ: أُحِبُّ لِلرَّجُلِ أَنْ لَا يَخْرُجَ مِنَ الدُّنْيَا حَتَّى يَتَزَوَّجَ الْمُتْعَةَ، وَإِنْ مَرَّةً.
আমি পছন্দ করি যেন কোনো পুরুষ দুনিয়া থেকে যাওয়ার আগেই অন্তত একবার মুতআ করে নেয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৪৫৮

ছ. শিয়াদের অষ্টম ইমাম আলি ইবন মূসা আল-রিদা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
وَالْمُتْعَةُ سُنَّةٌ نَزَلَ بِهَا الْقُرْآنُ، وَجَرَى بِهَا الْعَمَلُ مِنْ قِبَلِ رَسُولِ اللّٰهِ (ص)، وَهِيَ حَلَالٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
মুতআ একটি সুন্নাত, যা কুরআনের দ্বারা এসেছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আমল দ্বারা তা কার্যকর হয়েছে। এটি কিয়ামত পর্যন্ত হালাল। ইমাম আলি ইবন মূসা আল-রিদা (৮ম ইমাম), ফিকহুর রিদা, পৃ-৩৫৭

জ. আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলি ইবন হুসাইন ইবন বাবুয়াইহ আল-কুম্মী যিনি শেখ সাদুক নামে পরিচিত তিনি তার গ্রন্থে লিখেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
قَالَ أَبُو عَبْدِ اللّٰهِ (ع): إِنَّ النَّاصِبَ لَوْ مَتَّعَ ثُمَّ اغْتَسَلَ، خَلَقَ اللّٰهُ مِنْ ذَلِكَ الْمَاءِ سَبْعِينَ مَلَكاً يَسْتَغْفِرُونَ لَهُ.
যদি কোনো নাসিবী (আহলুল বায়তের শত্রু) মুতআ করে এবং তারপর গোসল করে, আল্লাহ তার বীর্য থেকে ৭০ জন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন, যারা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। শেখ সাদূক, আল-ইলাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৩৫

ঝ. আল-কুলাইনী তার ‘আল-কাফী’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন
আবূ আবদিল্লাহ (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক মহিলা উমরের নিকট আগমন করল, অতঃপর বলল, আমি ব্যভিচার করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করুন। অতঃপর তিনি (উমর) তাকে পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আমীরুল মুমিনীন (আ.) কে এই ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কীভাবে ব্যভিচার (জিনা) করেছ? তখন সে বলল: আমি মরুভূমিতে পথ অতিক্রম করেছি, অতঃপর আমাকে প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণায় পেল, আমি এক বেদুইনের নিকট পানি প্রার্থনা করলাম, কিন্তু সে আমাকে পানি পান করাতে অস্বীকার করল যতক্ষণ না আমি তাকে আমার উপর ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেই। অতঃপর পিপাসা যখন আমাকে ক্লান্ত করে ফেলল এবং আমি আমার জীবন নিয়ে আশঙ্কাবোধ করলাম, তখন সে আমাকে পানি পান করাল; আর আমিও আমার নিজের উপর তাকে ক্ষমতাবান করে দিলাম। এ কথা শুনে আমীরুল মুমিনীন (আ.) বললেন: কাবার মালিকের শপথ, এটা তো বিবাহ।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, ফুরুউল কাফী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৯৮
উপর শিয়াদের গ্রন্থ থেকে মাত্র কয়েকটি দলিল পেশ করেছি যা থেকে বুঝা যায় শিয়াদের নিকট মু্তআ বিবাহ করা শুধু জায়েয নয় বরং নেকির কাজ। তাদের রচিত গ্রন্থসমূহে এমন শত শত দলিল আছে। তারচেয়েও বড় কথা কোন দলিল প্রমাণের দরকার নাই কারণ তারা এ কথা স্বীকার করে ও তাদের আমলও চলমান।

মুতআ বিবাহ ইসলামি শরীয়তের হারাম :
শিয়ারা ধ্বংস হোক কেননা, তারা রাসূল ﷺ ও আমীরুল মুমিনীন আলি ইবন আবি তালিব (রা.) সাথে এই ধরনের মিথ্যাসমূহের সম্পর্কযুক্ত করেছে। কোন মুসলিম এমন দাবি করতে পারে না যা ঐসব শিয়া নামের খবিসগণ যা দাবি করে থাকে। আল্লাহ তায়ালার বলেন০
﴿ قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ١ ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ ٢ وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ ٣ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِلزَّكَوٰةِ فَٰعِلُونَ ٤ وَٱلَّذِينَ هُمۡ لِفُرُوجِهِمۡ حَٰفِظُونَ ٥ إِلَّا عَلَىٰٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُهُمۡ فَإِنَّهُمۡ غَيۡرُ مَلُومِينَ ٦ فَمَنِ ٱبۡتَغَىٰ وَرَآءَ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡعَادُونَ ٧ ﴾
অর্থ : “অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের সালাতে, যারা ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাত দানে সক্রিয়, যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভূক্ত দাসীগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না, আর কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তার হবে সীমালঙ্ঘনকারী। সূরা আল-মুমিনুন ১-৭
সুতরাং এই আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হল যে, পুরুষ ব্যক্তির জন্য তার স্ত্রী ও অধিকারভূক্ত দাসীগণ ব্যতীত অন্য কোন নারী বৈধ নয়। অতএব এর বাইরে কোন নারীকে ব্যবহারের পথ খুঁজলে, সে হবে সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا تَعۡدِلُواْ فَوَٰحِدَةً أَوۡ مَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡ
অর্থ : আর যদি আশঙ্কা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভূক্ত দাসীকে। সূরা আন-নিসা : ৩
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যায়ের আশঙ্কা করবে, সে যেন একজন স্ত্রী অথবা তার অধিকারভূক্ত দাসীকে যথেষ্ট মনে করে। সুতরাং কোথায় মুত‘আ বিয়ে? অতএব যদি তা হালাল হত, তবে তিনি (আল্লাহ) তা উল্লেখ করতেন। কারণ, প্রয়োজনের সময় আলোচনা বিলম্বিত করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ مِنۡکُمۡ طَوۡلًا اَنۡ یَّنۡکِحَ الۡمُحۡصَنٰتِ الۡمُؤۡمِنٰتِ فَمِنۡ مَّا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ مِّنۡ فَتَیٰتِکُمُ الۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ  وَاللّٰہُ اَعۡلَمُ بِاِیۡمَانِکُمۡ ؕ  بَعۡضُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡضٍ ۚ  فَانۡکِحُوۡہُنَّ بِاِذۡنِ اَہۡلِہِنَّ وَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ مُحۡصَنٰتٍ غَیۡرَ مُسٰفِحٰتٍ وَّلَا مُتَّخِذٰتِ اَخۡدَانٍ ۚ  فَاِذَاۤ اُحۡصِنَّ فَاِنۡ اَتَیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ فَعَلَیۡہِنَّ نِصۡفُ مَا عَلَی الۡمُحۡصَنٰتِ مِنَ الۡعَذَابِ ؕ  ذٰلِکَ لِمَنۡ خَشِیَ الۡعَنَتَ مِنۡکُمۡ ؕ  وَاَنۡ تَصۡبِرُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ ؕ  وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ 
আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন-মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে না, সে (বিবাহ করবে) তোমাদের মুমিন যুবতীদের মধ্য থেকে, তোমাদের হাত যাদের মালিক হয়েছে তাদের কাউকে। আর আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। তোমরা একে অন্যের থেকে (এসেছ)। সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের মালিকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও এমতাবস্থায় যে, তারা হবে সতী-সাধ্বী, ব্যভিচারিণী কিংবা গোপন যৌনসঙ্গী গ্রহণকারিণী নয়। অতঃপর যখন তারা বিবাহিত হবে তখন যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের উপর স্বাধীন নারীর অর্ধেক আজাব হবে। এটা তাদের জন্য, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারের ভয় করে এবং ধৈর্যধারণ করা তোমাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা নিসা : ২৫
সুতরাং যদি মুত‘আ বিয়ে হালাল হত, তবে তিনি (আল্লাহ) তা উল্লেখ করতেন। বিশেষ করে তিনি উল্লেখ করেছেন ﴿ مَنۡ خَشِيَ ٱلۡعَنَتَ ﴾ অর্থাৎ- ‘যারা ব্যভিচারকে ভয় করে’। আর (যদি মুতআ বিয়ে হালাল হত) তিনি তা উল্লেখ করতেন না। সুতরাং এটাই প্রমাণ হয় যে, নিঃসন্দেহ তা (মুত‘আ বিয়ে) হারাম।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغۡنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ
অর্থ : যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সূরা আন-নূর : ৩৩
শিয়াগণ মুতআ বিয়ের বৈধতার ব্যাপারে আমাদের নিকট বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত কিছু সংখ্যক হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে; তার জওয়াব হল- ঐসব হাদিস মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। তাদের পক্ষে তার মুতআ বিয়ের বৈধতার ব্যাপারে কোন দলিল নেই। বরং মু্তআ বিবাহ হারাম হওয়া দলিল আছে। যেমন-
আলি ইবনু আবূ তালিব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أَكْلِ لُحُوْمِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার যুদ্ধের দিন মহিলাদের মুতআ করা থেকে এবং গৃহপালিত গাধার মাংস খেতে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪২১৬, ৫১১৫, ৫৫২৩, ৬৯৬১, সহিহ মুসলিম : ১৪০৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬১, সুনানে তিরমিযী ১১২১, ১৭৯৪, সুনানে নাসায়ী ৩৩৬৫, ৩৩৬৬, আহমাদ ৫৯৩, ৮১৪, ১২০৭, মুয়াত্তা মালেক : ১১৫১, দারেমী : ১৯৯০, ২১৯৭।

রাবী ইবনু সাবুরাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَرَّمَ مُتْعَةَ النِّسَاءِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সাথে মুত’আহ বিয়ে হারাম করেছেন। সুনান আবু দাউদ : ২০৭৩

আয়াশ ইবনু সালামা (রহ.) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন-
رَخَّصَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَامَ أَوْطَاسٍ فِي الْمُتْعَةِ ثَلاَثًا ثُمَّ نَهَى عَنْهَا ‏
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওতাস যুদ্ধের বছর তিন দিনের জন্য মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তা নিষিদ্ধ করেন। সহিহ মুসলিম : ৩২৮৮ ইফা.

সাবরাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে বিদায় হাজ্জে রওয়ানা হলাম। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! স্ত্রীহীন অবস্থায় থাকা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন : তাহলে তোমরা এসব মহিলার সাথে মুত’আ করো (সাময়িকভাবে উপকৃত হও)। অতএব আমরা তাদের সান্নিধ্যে পৌঁছলাম, কিন্তু তারা আমাদের এবং তাদের মাঝে নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ ব্যতীত আমাদের সঙ্গে বিবাহ বসতে অস্বীকার করলো। সাহাবিগণ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তাহলে তোমাদের ও তাদের মাঝে মেয়াদ নির্দিষ্ট করে নাও।
অতএব আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই (এই উদ্দেশে) বের হলাম। তার সাথে ছিল একটি চাদর এবং আমার সাথেও ছিল একটি চাদর। তার চাদরটি ছিল আমার চাদর থেকে বেশি সুন্দর। আর আমি ছিলাম তার চাইতে অধিক যুবক। আমরা দু’জন এক নারীর নিকট আসলাম। সে বললো, চাদর দু’টি তো একই মানের। অতঃপর আমি তাকে বিবাহ করলাম এবং তার কাছেই ঐ রাত কাটালাম। ভোরে আমি ফিরে এলাম, তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বা ঘরের দরজা ও রুকনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলছিলেন : হে লোকসকল! আমি তোমাদের মুত’আ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলাম। এখন তোমরা শুনে নাও যে, আল্লাহ্ কিয়ামত পর্যন্ত এই প্রকার বিবাহ হারাম করেছেন। অতএব তোমাদের কারো কাছে এ ধরনের কোন নারী থাকলে সে যেন তাকে ছেড়ে দেয় এবং তোমরা তাদেরকে যা কিছু দিয়েছো তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না। সহিহ মুসলিম : ১৪০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬২, সুনানে নাসায়ী ৩৩৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২০৭২, ২০৭৩, সহীহাহ ৩৮১ আহমাদ ১৪৯১৩, ১৪৯২১, দারেমী ২১৯৫, ২১৯৬, ইরওয়াহ ১৯০১, ১৯০২।

নোট : আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম আল-কুশাইরি তার গ্রন্থ সহিহ মুসলিম মুতআ বিবাহ অধ্যায়ের শিরোনাম করেন “মুতআ বিবাহ বৈধ ছিল, পরে তা বাতিল করা হয়, অতঃপর বৈধ করা হয়, আবার বাতিল করা হয় এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত স্থির থাকবে।”
উপরে কয়েকটি সহিহ হাদিস এ কথার প্রমাণ বহন করে। সহিহ মুসলিমেও মুতআ বিবাহ করার অনুমিত সংক্রান্ত করেকটি হাদিস এসেছে যেগুলো প্রমন বহন করে এক সময় জায়েয ছিল। কাজেই ঐ সকল হাদিস দেখে শিয়াদের মত ধোঁকা খাওয়া যাবে না।
ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর লোকেদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে মাত্র তিন দিন মুত’আ বিবাহের অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর তিনি তা হারাম ঘোষণা করেন। আল্লাহর শপথ! আমি যদি কোন বিবাহিত পুরুষের ব্যাপারে জানতে পারি যে, সে মুত’আ বিবাহ করে তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিবো। তবে সে যদি আমার সামনে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে, যারা সাক্ষ্য দিবে যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুত’আ বিবাহ হারাম ঘোষণার পর আবার তা হালাল করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৩
এমনকি শিয়াদের কিতাবসমূহের মধ্যেও মুতাআ বিবাহ নিষিদ্ধের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন-
আলি (আ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ مُتْعَةِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ أَكْلِ لُحُوْمِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ.
রাসূলুল্লাহ ﷺ খায়বরের যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাদার গোশত ও মুতআ বিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আত-তাহযীব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৬, আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইস্তিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪২

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৬ : গুপ্তাঙ্গ ধার করার (বেশ্যাবৃত্তি) বৈধতার আকিদা।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আত-তুসী শিয়াদের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী ফকিহ ও মুহাদ্দিস। তিনি “শায়খ আত-তুসী” নামে অধিক পরিচিত। তার সময়কাল ছিল চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরি শতাব্দীতে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ইসতিবসার। এটি শিয়াদের চারটি প্রাথমিক হাদিসগ্রন্থের একটি। শিয়ারা তাদের এ গ্রন্থগুলোকে ‘আল-কুতুবুল আরবাআ’ (الكتب الأربعة) বলে থাকে। শিয়া হাদিসচর্চায় ‘আল-ইসতিবসার’ চারটি মূল হাদিসগ্রন্থের একটি, যেগুলো হলো:
১. আল-কাফি, আল-কলিনীর
২. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকীহ, ইবনে বাবুয়াইহ আল-কুম্মীর
৩. তাহযীবুল আহকাম, শায়খ আত-তুসী
৪. আল-ইসতিবসার, শায়খ আত-তুসী


আল-ইসতিবসার গ্রন্থটি মূলত এমন হাদিসসমূহ সংকলন করেছে, যেগুলোর মাঝে পরস্পরবিরোধী অর্থ বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। আত-তুসী নিজে এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন বা ফিকহি ব্যাখ্যা দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সংকলনে তিনি প্রায় ৫,৫০০ হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। শিয়া হাদিসসমূহে যে সব পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যকার সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করা। ৮। গুপ্তাঙ্গ ধার করা বা বেশ্যাবৃত্তি বৈধতার সম্পর্ক শিয়াদের এ মুল চারটি মধ্য থেকে শুধু আল-ইসতিবসার কয়েকটি দলিলসহ উদাহরণ দিচ্ছি।
ক। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُسْلِمٍ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) قَالَ:قُلْتُ لَهُ: الرَّجُلُ يَحِلُّ لِأَخِيهِ فَرْجَ جَارِيَتِهِ؟ قَالَ: نَعَمْ، لَا بَأْسَ بِهِ لَهُ مَا أَحَلَّ لَهُ مِنْهَا.
মুহাম্মদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ জাফর (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে জানতে চান, “এক ব্যক্তি কি তার ভাইয়ের জন্য তাঁর দাসী (গৃহকর্মী)–এর গোপনাঙ্গ বৈধ (হালাল) করে দিতে পারে?” এতে আবূ জাফর বলেছেন, “হ্যাঁ, এতে কোনো সমস্যা নেই যতটুকু তিনি (মালিক) তাকে (আপনার ভাইকে) তার মধ্যে থেকে বৈধ করেছেন।” আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

খ। মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
لَا بَأْسَ بِأَنْ يُحِلَّ الرَّجُلُ جَارِيَتَهُ لِأَخِيهِ۔
কোনো ব্যক্তির জন্য তার দাসীকে তার ভাইয়ের জন্য হালাল করে দেওয়া কোনো দোষের নয়।
আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

গ। জাফর ইবন মুহাম্মাদ ইবন হাকীম, কাররাম ইবন আমর, মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম-এর মাধ্যমে আবু জাফর (আলাইহিস সালাম) থেকে বর্ণিত—
قَالَ: قُلْتُ لَهُ… قَالَ: نَعَمْ، لَا بَأْسَ بِهِ، لَهُ مَا أَحَلَّ لَهُ مِنْهَا.
তিনি বলেন: আমি তাঁকে বললাম…, তিনি বললেন: হ্যাঁ, এতে কোনো দোষ নেই; সে তার (মালিকের) পক্ষ থেকে যা হালাল করা হয়েছে, তা উপভোগ করতে পারবে। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

ঘ. মুহাম্মদ ইবন মরাদাব থেকে বর্ণনা: আবু আবদুল্লাহ (আ.) আমাকে বললেন—
يَا مُحَمَّدُ، خُذْ هَذِهِ الْجَارِيَةَ تَخْدِمُكَ وَتُصِيبُ مِنْهَا، فَإِذَا خَرَجْتَ فَرُدَّهَا إِلَيْنَا۔
‘হে মুহাম্মাদ! এই দাসীটি নিয়ে নাও—সে তোমার সেবা করবে এবং তুমি তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে। আর যখন (তোমার কাজ শেষে) বের হয়ে যাবে, তখন তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবে।’ আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬

ঙ। ইবনু মাহবূব, ইবনু রিআব-এর সূত্রে, আবু বাসীর বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
: سَأَلْتُ أَبَا عَبْدِ اللَّهِ (عَلَيْهِ السَّلَامُ) عَنْ ٱمْرَأَةٍ أَحَلَّتْ لِٱبْنِهَا فَرْجَ جَارِيَتِهَا، قَالَ: هُوَ لَهُ حَلَالٌ، قُلْتُ: أَفَيَحِلُّ لَهُ ثَمَنُهَا؟ قَالَ: لَا، إِنَّمَا يَحِلُّ لَهُ مَا أَحَلَّتْ لَهُ۔
আমি আবু আবদিল্লাহ (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এক নারী তার ছেলেকে তার (নিজের) দাসীর যৌনাঙ্গ হালাল করে দিয়েছে, এ বিষয়ে কী হুকুম? তিনি বললেন: এটা তার (ছেলের) জন্য হালাল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম: তাহলে কি তার (দাসীর) মূল্যও (ছেলের জন্য) হালাল হবে? তিনি বললেন: না, তার জন্য কেবলমাত্র তাই হালাল, যা তার মা তার জন্য হালাল করেছেন। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩৬
নোট : এই বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে শিয়া আইনে কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের দাসীর “গুপ্তাঙ্গ” বৈধ এর অনুমতি পেতে পারেন, বন্দোবস্ত মালিকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। একাধিক বার উদ্ধৃত একই মত বিভিন্ন রিওয়ায়েতে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে (যেমন, ভাই, পিতা, বিভিন্ন শায়খ) খালি “অবস্থান” নয়, “ব্যবহার-ভিত্তিক অনুমতি” মূলমন্ত্র হলো “যতটুকু বৈধ করেছেন, ততটুকুই বৈধ।” আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নিকট সম্পূর্ণভাবে অস্বীকৃত ও অবৈধ। এ কাজ পরিষ্কার জিনা-ব্যভিচার ও হদ যোগ্য অপরাধ।

ছ. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বর্ণনা করেন, ইবনু উমাইর আল-আজামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আবূ আবদিল্লাহ (আ.) বলেন-
হে আবূ উমর! নিশ্চয় দীনের দশ ভাগের নয় ভাগ ‘তাকীয়ার’ মধ্যে; যার ‘তাকীয়া’ নেই, তার ধর্ম নেই। আর মদ ও মোজার উপর মাসেহ ব্যতীত সকল বস্তুর মধ্যে ‘তাকীয়া’ আছে। আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৪৮২

এ সম্পর্কে সঠিক আকিদা :
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের দৃষ্টিকোণ হলো জীবনরক্ষা বা চরম বিপদের সময় সীমিত সময়ের জন্য তাকিয়া করা জায়েয। আহলে সুন্নাহ মনে করে, চরম নির্যাতনের মুখে একজন মুসলমান যদি কুফরি কথা বা বিশ্বাস মুখে বলে নিজের প্রাণ বাঁচায়, অথচ অন্তরে ঈমান অটুট রাখে, তবে তা আল্লাহর অনুমোদিত। অর্থাত কাউকে নির্যাতনের মাধ্যা বাধ্য করা হলে সে গুনাহগার হবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَنۡ کَفَرَ بِاللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ اِیۡمَانِہٖۤ اِلَّا مَنۡ اُکۡرِہَ وَقَلۡبُہٗ مُطۡمَئِنٌّۢ بِالۡاِیۡمَانِ وَلٰکِنۡ مَّنۡ شَرَحَ بِالۡکُفۡرِ صَدۡرًا فَعَلَیۡہِمۡ غَضَبٌ مِّنَ اللّٰہِ ۚ وَلَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরি করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরি দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের উপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাআযাব। ঐ ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরি করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। সূরা নাহল : ১০৬
এই আয়াত থেকে ইমাম শাফিঈ, ইমাম মালিক, ইমাম আহমদ ও অন্যান্য আহলে সুন্নাহ ইমামরা বলেন, প্রাণনাশ বা চরম নির্যাতনের আশঙ্কায় বিশ্বাস লুকানো (তাকিয়া) বৈধ হতে পারে, কিন্তু তা মৌলনীতি নয়, বরং ব্যতিক্রম। ইসলামি শরিয়তের তাকিয়া মূলনীতি নয় বরং ব্যতিক্রম। এটি চরম বাধ্যবাধকতার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধ, স্থায়ী আচরণ নয়। তাকিয়া কেবল শত্রু ও প্রাণহানির আশঙ্কায় বৈধ হতে পারে;
সাধারণ অবস্থায় তা মুনাফিকির কাছাকাছি বিবেচিত হয়। ইসলামের দাওয়াত, সাক্ষ্য, ও সত্য প্রকাশে সাহস ও স্পষ্টবাদিতা হলো আহলে সুন্নাহর আদর্শ।
সার কথা : আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতে, তাকিয়া ইসলামে স্থায়ী কোনো বৈধতা নয়। এটি কেবল জরুরি পরিস্থিতিতে, প্রাণরক্ষার প্রয়োজনে সীমিত অনুমোদন পায়। ইসলাম মূলত সত্য প্রকাশ, স্পষ্টতা ও দৃঢ়তা শিক্ষা দেয়। অতএব, নিয়মিতভাবে বিশ্বাস লুকানো, দ্বিমুখিতা বা মতাদর্শ ঢেকে রাখা সুন্নি আকিদার পরিপন্থী।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৭ : নারীদের সাথে তার পিছনের পথে সংগমে মিলিত হওয়াকে বৈধ মনে করে।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী ‘আল-ইসতিবসার’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন
আবদুল্লাহ ইবন আবি ইয়াফুর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ আবদিল্লাহ (আ.) কে জিজ্ঞাসা করলাম ঐ পুরুষ ব্যক্তি সম্পর্কে, যে তার স্ত্রীর সাথে তার পিছনের পথে সংগমে মিলিত হয়। তখন তিনি বললেন, সে রাজি থাকলে কোন অসুবিধা নেই। আমি বললাম, তাহলে আল্লাহ তায়ালার বাণী-
فَأۡتُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ أَمَرَكُمُ ٱللَّهُ
অর্থ : তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন।
এর বাস্তবতা কোথায়?
তখন তিনি বললেন, এই আয়াতের বিধান সন্তান কামনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং তোমরা সন্তান অনুসন্ধান কর, আল্লাহ যেভাবে তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলেন-
نِسَآؤُكُمۡ حَرۡثٞ لَّكُمۡ فَأۡتُواْ حَرۡثَكُمۡ أَنَّىٰ شِئۡتُمۡ
অর্থ : তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের ক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর। সূরা বাকারা : ২২৩। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইসতিবসার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪৩

তিনি ‘আল-ইসতিবসার’ (الاستبصار) নামক গ্রন্থে আরও বর্ণনা করেন-
মূসা ইবন আবদিল মুলক থেকে বর্ণিত, তিনি জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবুল হাসান রেজা (আ.) কে জিজ্ঞাসা করলাম পুরুষ ব্যক্তি কর্তৃক তার স্ত্রীর পিছনের পথে সংগমে মিলিত হওয়ার বিষয়ে। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালার কিতাবের একটি আয়াত তা বৈধ করে দিয়েছে, লুত (আ.) এর উক্তি। আল্লাহ বলেন-
قَالَ یٰقَوۡمِ ہٰۤؤُلَآءِ بَنَاتِیۡ ہُنَّ اَطۡہَرُ لَکُمۡ فَاتَّقُوا اللّٰہَ
অর্থ : সে বলল, ‘হে আমার কওম, এরা আমার মেয়ে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। সুরা হুদ : ৭৮।
কারণ, তিনি জানতেন যে, তারা সম্মুখস্থ গুপ্তাঙ্গের প্রত্যাশী ছিল না। আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন হাসান আত-তুসী, আল-ইসতিবসার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪৩

এ সম্পর্কে সঠিক কথা হলো :
আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নারীদের সাথে সমকামিতা অবৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
نِسَآؤُكُمۡ حَرۡثٞ لَّكُمۡ فَأۡتُواْ حَرۡثَكُمۡ أَنَّىٰ شِئۡتُمۡ
অর্থ : তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর।”সূরা বাকারা : ২২৩
নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা চাষের জায়গায় আসার অনুমতি দিয়েছেন আর তা হল লজ্জাস্থান। আর তিনি পায়ূ পথে গমনের অনুমতি দেননি আর তা হল পিছনের রাস্তা।
অসংখ্যা সহিহ হাদিসে পায়ুপথে বা পিছনের রাস্থায় সংগম করা নিষেধ করেছেন। যেমন-১
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে গুহ্যদ্বারে সংগম করে সে অভিশপ্ত। সুনানে আবু দাউদ “ ২১৬২
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
‏ مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ‏.
যে ব্যক্তি ঋতুমতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের (আল্লাহর কিতাবের) বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিযী : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৯০৪, আহমাদ ৯০৩৫, ৯৮১১; দারিমী ১১৩৬, মিশকাত : ৫৫১।

তলাক বিন আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ সালাতে বায়ু ত্যাগ করবে, সে যেন সালাত ছেড়ে চলে যায় তারপর ওযূ করে সালাত পুনরায় আদায় করে। আর তোমরা স্ত্রীদের পায়ুপথে মিলন করবে না। সহিহ ইবেন হিব্বান : ২২৩৪, সুনানে তিরমিযী: ১১৬৪, মিশকাত : ৩১৪, ১০০৬, দারাকুতনী : ১৫৩, শারহুস সুন্নাহ : ৭৫২

আমরা ইবন খুযাইমা ইবন সাবিত তাঁর পিতা থেকে, আর তিনি খুযাইমা ইবন সাবিত (রা.) থেকে বর্ণনা করেন-
سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَنَ يَأْتِيَ النِّسَاءَ فِي أَدْبَارِهِنَّ، فَقَالَ ﷺ: “إِنَّ اللَّهَ لا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ، لا تَأْتُوا النِّسَاءَ فِي أَدْبَارِهِنَّ.”
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে জিজ্ঞাসা করলো, “স্ত্রীদের পায়ুপথে সহবাস করা যাবে কি?” তিনি ﷺ বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ হক কথা বলতে লজ্জা করেন না। তোমরা স্ত্রীদের পায়ুপথে সহবাস করো না। সহীহুল জামে : ১৮৫২

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৮ : তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) বা ধর্মীয় স্বার্থে কোনো কিছুকে অন্যদের থেকে গোপন করা জায়েয।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আরবি শব্দ “التَّقِيَّةُ” (তাকিয়াহ) এসেছে “وَقَىٰ – يَقِي” ধাতু থেকে, যার অর্থ হ চ্ছে আত্মরক্ষা, বাঁচানো বা নিরাপদ রাখা। তাই تَقِيَّةٌ শব্দের আভিধানিক অর্থ: আত্মরক্ষার্থে বিশ্বাস বা চিন্তা গোপন করা। পারিভাষিক অর্থে তাকিয়া হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে কেউ জীবন, সম্মান বা সম্পদ রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের প্রকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করে। এটি মূলত চরম বিপদের সময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাকিয়া (التَّقِيَّةُ) এটি শিয়া মতবাদের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস, যার দ্বারা তারা পরিস্থিতির কারণে নিজেদের প্রকৃত বিশ্বাস গোপন করতে বৈধ মনে করে। শিয়া কিতাবসমূহে তাকিয়াকে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে তাদের স্বনামধন্য কিতাব থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ دِينِي وَدِينُ آبَائِي، وَلَا دِينَ لِمَن لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ : “তাকিয়াহ হলো আমার ধর্ম এবং আমার পিতৃপুরুষদের ধর্ম; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ধর্ম নেই।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ.-২১৭, হাদিস নং ৩

খ। আলি ইবনে ইব্রাহিম আল-কুম্মির (মৃত্যু: ৩০৭ হি.) লিখিত একটি বিখ্যাত তাফসির ‘তাফসীরুল কুম্মি; (تفسير القميّ) শিয়াদের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ তাফসীরগ্রন্থ। এটি ইমামিয়া শিয়াদের আকিদা, ফিকহ ও ইমামত বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে লেখা একটি ব্যাখ্যামূলক কুরআন তাফসীর। উক্ত তাফসিরে সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতের তাফসির তিনি বলেন-
فِي قَولِهِ تَعَالَى: ﴿إِلَّا أَن تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً﴾ قَالَ: «التَّقِيَّةُ فِي الدِّينِ حَتَّى يَأْتِيَ القَائِمُ»
অর্থ : আয়াতে “তাদের থেকে তাকওয়া অবলম্বন করো” (আলে ইমরান: ২৮) এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “তাকিয়া থাকবে দ্বীনের মধ্যে, যতক্ষণ না কায়েম (ইমাম মাহদি) আগমন করেন। তাফসীরুল কুম্মি, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৮৮।

গ। শিয়া আলিম ইবনে শোবা আল-হারানী (ابن شُعْبَة الحَرَّانِيّ) তাঁর রচিত কিতাব “তুহফাতুল উকূল” (تحف العقول) শিয়া আকিদাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ গ্রন্থে তিনি লিখেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ تُقَى وَالتَّقِيَّةُ حِصْنُ المُؤْمِنِ»
“তাকিয়া হচ্ছে সতর্কতা, আর তাকিয়া হলো মুমিনের জন্য ঢাল।” ইবনে শোবা আল-হারানী, তুহফাতুল উকূল, পৃ.-১০৩

ঘ। মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী (মৃত্যু: ১১১১ হি.) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
«التَّقِيَّةُ وِقَايَةٌ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আত্মরক্ষার উপায়, আর যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো দ্বীন নেই।”
মুহাম্মাদ বাকির আল-মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড: ২৭, পৃ.-৩৪০

ঙ। আবু জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে বাবওয়াইহ আল-কুম্মী যিনি ইমাম শেখ সাদূক নামে বেশী পরিচয়। তিনি তার শিয়া ইমামি মাযহাবের মৌলিক বিশ্বাসগুলো সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপ করে “আল-ইতিকাদ” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি উক্ত গ্রন্থে বলেন-
«اعْتِقَادُنَا فِي التَّقِيَّةِ أَنَّهَا وَاجِبَةٌ، مَنْ تَرَكَهَا كَالمَنْكِرِ لِلصَّلَاةِ»
“তাকিয়া সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হলো, এটি ওয়াজিব (আবশ্যক)। যে এটি পরিত্যাগ করল, সে যেন সালাত অস্বীকার করল।” শেখ সাদূক, আল-ইতকাদ, পৃ.-১১৪

চ। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন। ইমাম আবু আব্দুল্লাহ (আ.) বলেন-
«التَّقِيَّةُ فِي كُلِّ شَيْءٍ يُضْطَرُّ إِلَيْهِ ابْنُ آدَمَ، فَقَدْ أَحَلَّهُ اللَّهُ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া মানুষের জন্য প্রতিটি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে বৈধ, যেখানে সে বাধ্য হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা তার জন্য হালাল করে দিয়েছেন।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফি, পঞ্চম খণ্ড. পৃ.-২০, হাদিস নং ৩

ছ। নাহজুল বালাগা (نهج البلاغة) শিয়া মতাদর্শে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ, যা আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) এর বিভিন্ন খুতবা, পত্র এবং সংক্ষিপ্ত বাণীর সংকলন করা হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ আছে। “আলি (আ.) বলেছেন-
«التَّقِيَّةُ مِنْ دِينِ اللَّهِ، وَدِينِ آبَائِي، وَلَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ»
অর্থ: “তাকিয়া হলো আল্লাহর দ্বীনের অংশ, এটি আমার পিতৃপুরুষদের দ্বীনের অংশ; যার মধ্যে তাকিয়া নেই, তার কোনো ঈমান নেই।” আল-শরীফ আর-রাদী, নাহজুল বালাগা, পৃ.-৪৮৯
উপরের দলিল থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, শিয়ারা তাকিয়াকে ঈমান, দ্বীন ও দায়িত্বের অংশ মনে করে। এমনকি কোনো বিপদ ছাড়াও তাকিয়া চালিয়ে যাওয়াকে বৈধ মনে করে। এটি ইসলামি আকিদা ও সাহাবায়ে কিরামের আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

শিয়াগণ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাজ‘আ বা পুনর্জন্মের বিশ্বাসী
শিয়াগণ রাজ‘আ (পুনর্জীবন) সম্পর্কে বেশ কিছু প্রখ্যাত আলেম তাদের গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। এখানে কয়েক জন শিয়া লেখক ও তাদের গ্রন্থ থেকে দলিল উপস্থাপন করা হলো, আরবি উদ্ধৃতি সহ:
ক। আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“وَ الرَّجْعَةُ حَقٌّ، وَ هِيَ قَوْلُ جَمِيعِ الْإِمَامِيَّةِ إِلَّا مَنْ شَذَّ مِنْهُمْ، وَ هِيَ رُجُوعُ أَقْوَامٍ مِنَ الْمَوْتَى إِلَى الدُّنْيَا قَبْلَ الْقِيَامَةِ.”
“রাজ‘আ সত্য, এবং এটি সকল ইমামিয়া (শিয়া) এর মত, অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এটি হলো কিয়ামতের আগে কিছু মৃত ব্যক্তির দুনিয়ায় ফিরে আসা।” আল্লামা মুহাম্মদ বাকির আল-মাজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫২০

খ। শায়খ আব্বাস আল-কুমী তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ الرَّجْعَةَ مِنَ الْمُعْتَقَدَاتِ الَّتِي تُوجِبُ الْإِيمَانَ بِهَا، وَ قَدْ نَصَّ الْأَئِمَّةُ (ع) عَلَى وُقُوعِهَا لِأَصْحَابِ الْقِيَامِ بِالْقِسْطِ.”
রাজ‘আ এমন একটি বিশ্বাস যা মান্য করা আবশ্যক। ইমামগণ (আ.) সুস্পষ্টভাবে এর সংঘটনের কথা বলেছেন, বিশেষত ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারীদের জন্য।” শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১১৭, বৈরুত, ৩য় সংস্করণ

গ। শায়খ সাদুক তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ لَيْسَتْ بِعَامَّةٍ، بَلْ هِيَ خَاصَّةٌ بِالْمُؤْمِنِينَ الْخَالِصِينَ وَ الْكَافِرِينَ الْخَالِصِينَ.”
রাজ‘আ সবার জন্য নয়, বরং তা খাঁটি মুমিন ও চরম কাফিরদের জন্য সীমাবদ্ধ। শায়খ সাদুক, আল-ই‘তিকাদাত, পৃ.-৬৩

ঘ। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُعِيدُ قَوْمًا بَعْدَ مَوْتِهِمْ لِيَنْتَصِرَ لِلْأَئِمَّةِ (ع) وَ يُظْهِرَ الْحَقَّ.”
আল্লাহ তাআলা কিছু লোককে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেন, যাতে তারা ইমামগণের (আ.) জন্য বিজয় অর্জন করতে পারে এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সাইয়েদ নেয়ামতুল্লাহ আল-জাজাইরি, আল-আনওয়ার আন-নু‘মানিয়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩০২

ঙ। আল্লামা তাবাতাবাই তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
“الرَّجْعَةُ مِنَ الْعَقَائِدِ الْمَثْبُتَةِ عِنْدَنَا، وَ قَدْ دَلَّتْ عَلَيْهَا الرِّوَايَاتُ الْمُتَوَاتِرَةُ.”
রাজ‘আ আমাদের (শিয়া) নিকট প্রতিষ্ঠিত আকীদা, এবং এ বিষয়ে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।” আল্লামা তাবাতাবাই (রহ আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন আল্লামা তাবাতাবাই, আল-মীযান ফী তাফসিরুল কুরআন, খণ্ড ১৭, পৃ.-২৩৫
আস-সাদিক (আ.) বলেন-

চ। যে ব্যক্তি আমাদের পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে না এবং মুত‘আ বিয়ের বৈধতাকে স্বীকৃতি দেয় না, সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। শায়খ আব্বাস আল-কুমী, মুন্তাহাল আমাল, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৪১

ছ। ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.) বলেন, যখন ইমাম মাহাদী আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তিনি অতিসত্বর আয়িশাকে জীবিত করবেন এবং তার উপর শাস্তির বিধান (হদ) কায়েম করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, হক্কুল ইয়াকীন, পৃ.-৩৪৭
নোট : পুনর্জন্ম বা মৃত্যুর পর দুনিয়াতে পুনরায় ফিরে আসার বিশ্বাস মূলত হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফরি ধর্মে প্রচলিত একটি ধারণা। শিয়ারা তাদের পূর্বপুরুষ অগ্লীপূজারীদের থেকে এ আকিদা গ্রহণ করছে। ইসলামে এমন বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত সুস্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, মানুষ মৃত্যুর পর বরযখে অবস্থান করবে এবং পুনরুত্থান কেবল কিয়ামতের দিনই হবে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এটি একটি পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত আকিদা। যারা কিয়ামতের আগেই মৃতদের দুনিয়ায় ফিরে আসার ধারণা পোষণ করে, তারা ভ্রান্ত বিশ্বাসে লিপ্ত এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা থেকে বিচ্যুত।

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-৯ : গাদিরে খামের ঘটনা সম্পর্কে শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

গাদীর খুম একটি কূপের নাম বা স্থানের নামও বলা জেতে পারে, যেখানে মহানবি ﷺ এর তাঁর জীবনের শেষ হজ শেষে ফিরবার পথে ১৮ই জিলহজ্জ্ব তারিখে মক্কা থেকে মদীনা যাওয়ার পথে বিশ্রাম নিয়ে ছিলেন এবং সাহাবিদের কিছু নসিয়ত করে ছিলেন। এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত আছে। গাদীরে খুম অবস্থান কালের কিছু সহিহ হাদিস এর বিকৃত উপস্থাপনাই হল শিয়া বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। শিয়া আকিদায় বিশ্বাসী যে কোন লোক কে গাদিরে খুম সম্পর্ক জিজ্ঞাসা করলেই বুঝতে পারবেন, এ সম্পর্কে তাদের আকিদা কত ভ্রান্ত। তারা ‘গাদীর খুম’ এর প্রতি এই আবেগ প্রবন যে, তারা এই ঘটনার দিনক্ষণ বের করে প্রতি চন্দ্র বছরের ১৮ই জিলহজ্জ্ব দিনটিকে ঈদের দিন হিসাবে পালন করে, যার নাম ‘ঈদে গাদির’। অসংখ্য শিয়া বিদ’আতের ভেতর ঈদে গাদিরও একটি বিদআত। আপনি শিয়া না হলে আপনি হয়ত ‘গাদীর খুম’ বা ‘ঈদে গাদির’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। রাসূল ﷺ এর কথার বিকৃতি ঘটিয়ে তারা নাটকের নতুন দৃশ্য দোওয়ার চেষ্টা করছে।
গাদীর খুম হলো সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য কয়েকটি হাদিস গ্রন্থে উল্লেখিত একটি কুপ বা কুয়ার নাম। এখানে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আলি (রা.) এর ব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলেন। অনেকে গাদিরে খুমের আসল হাদিসটি না জানার জন্য, শিয়া আকিদায় বিশ্বাসিগণ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মুসলিমকে বিভ্রান্ত করে থাকে এবং বিকৃত করে এমনভাবে গাদির খামের হাদিস শুনিয়ে দিবে, যদি আপনার হাদিটি জানা না থাকে তবে ভুল ধরার কোন সুযোগই পাবেন না। তাই গাদিরে খুম সম্পর্কিত হাদিসগুলো পাঠকের সামনে প্রকাশ করার পূর্বে জানা দরকার এই স্থানে রাসূলুল্লাহ ﷺ কেন গিয়েছেল? সেখানে তিনি কি বলেছিলেন? এই হাদিসের পূর্বকার প্রেক্ষাপট কি ছিল?

গাদীরে খুম হাদিসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের দশম বর্ষে আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) কে ইয়েমনে একটি অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেন। আলি (রা.) সেখানে সফলভাবে অভিযান চালিয়ে যুদ্ধলব্ধ মাল ও গনিমত নিয়ে ফিরেন। তিনি খুমুস বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ সংরক্ষণ করেন, যার মধ্যে মূল্যবান লিলেন কাপড়ও ছিল। কিছু সাহাবি তা ব্যবহার করতে চাইলে আলি (রা.) তা দিতে অস্বীকার করেন এবং সরাসরি রাসূল ﷺ এর কাছে তা হস্তান্তরের ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপরে আলি (রা.) বাহিনীর দায়িত্ব খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) এর হাতে সোপর্দ করেন হজে অংশ নিতে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মক্কা পৌঁছে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে হজ সমাপন করেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.), আলি (রা.) এর অনুপস্থিতিতে সৈন্যদেরকে সাময়িকভাবে সেই কাপড় ব্যবহারের অনুমতি দেন।
হজ শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আলি (রা.) পুরো দলের সঙ্গে গাদিরে খুম নামক স্থানে মিলিত হয়। কিন্তু আলি (রা.) তাদের পরনে সেই লিনেন কাপড় পড়তে দেখে অবাক হয় এবং সৈন্য দলকে কাপড় খুলে ফেলার কড়া নির্দেশ প্রদান করেন। এতে সৈন্যদের একাংশ, বিশেষ করে বুরাইদা (রা.) আলির আচরণে অসন্তুষ্ট হন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট অভিযোগ করেন। রাসূল ﷺ তাদের উদ্দেশ্যে এ স্থানে একটি বক্তব্য প্রদান করেন। এই ঘটনা গাদীরে খুম নামক স্থানে ঘটেছিল বিধায় স্থানটি বিখ্যাত হয়ে যায়। এ স্থানের এ বক্তব্য নিয়েই মতবিরোধ, শিয়াদের দাবি সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ জনসমক্ষে আলির (রা.) কে পরবর্তী ইমাম বা খলিফার জন্য নির্বাচিত করেন। অপর পক্ষে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের দাবি করে, এ বক্তব্যে আলি (রা.) এর মর্যাদা ও সম্মাদের কথা বললেও তাকে খলিফা বা ইমাম নির্বাচনের মত কোন বিষয় এখানে ছিল না। এ সম্পর্কিত কিছু সহিহ হাদিস-

বুরাইদা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আলিকে ইয়েমেনে পাঠান এবং আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। পরে সাহাবিরা তাঁকে কিছু উট ব্যবহারের অনুরোধ করেন, আলি (রা.) অনুমতি দেন। যখন হজ শেষ করে আমরা মদিনায় ফিরলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন
يَا بُرَيْدَةُ! أَبْغَضْتَ عَلِيًّا؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: لَا تُبْغِضْهُ، فَإِنَّهُ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّكُمْ بَعْدِي.
“বুরাইদা! তুমি কি আলিকে অপছন্দ করো?” আমি বললাম: “হ্যাঁ।” তখন তিনি বললেন: “তাকে ঘৃণা কোরো না, সে আমারই অংশ, আমিও তার অংশ, সে আমার পরে তোমাদের অভিভাবক।” মুসনাদ আহমদ : ২৯৯৬২

বুরাইদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আলি (রা.) কে গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে আসার জন্য খালিদ (রা.) এর কাছে পাঠালেন। আমি (রাবি) আলি (রা.) এর প্রতি অসন্তুষ্ট, আর তিনি গোসলও করেছেন। তাই আমি খালিদ (রা.) কে বললাম, আপনি কি তার দিকে দেখছেন না? এরপর আমরা নবি ﷺ এর কাছে ফিরে আসলে আমি তাঁর কাছে বিষয়টি জানালাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরাইদাহ! তুমি কি ‘আলির প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি বললাম, জ্বী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট থেকে না। কারণ খুমুসে তার প্রাপ্য এর চেয়েও অধিক আছে। সহিহ বুখারি : ৪৩৫০
আবূ সারীহাহ অথবা যাইদ ইবনু আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“‏ مَنْ كُنْتُ مَوْلاَهُ فَعَلِيٌّ مَوْلاَهُ ‏”
আমি যার মাওলা (সাথী, অবিভাবক), আলিও তার মাওলা (সাথি, অভিভাবক)। সুনানে তিরমিজি : ৩৭১৩, সহিহাহ : ১৭৫০, মিশকাত : ৬০৮২, হাদিসের মান সহিহ

আলি (রা.) খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গাদিরে খুমের ভাষণ শুনেছে সে যেন উঠে দাঁড়ায়। এ কথা শুনে সাঈদের পক্ষ থেকে ছয় জন এবং জায়িদের পক্ষ থেকে ছয়জন উঠে দাঁড়ালো। তারা সাক্ষ্য দিল যে, তারা গাদিরে খুমে আলি (রা.) কে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছে, আল্লাহ কি মুমিনদের জন্য অধিকতর আপনজন নন? সবাই বললো, অবশ্যই। তিনি বললেন-
রাসূল ﷺ গাদীরে খুমে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে বলেন-
مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَهَذَا عَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ، وَانْصُرْ مَنْ نَصَرَهُ، وَاخْذُلْ مَنْ خَذَلَهُ۔
“আমি যার বন্ধু, আলিও তার বন্ধু । হে আল্লাহ! যিনি আলিকে বন্ধু, মনে করে, তুমি তার বন্ধু হও; আর যিনি তার বিরুদ্ধে, তুমি তার বিরুদ্ধে হও; যিনি তার সাহায্য করে, তুমি তাকে সাহায্য করো; আর যে তাকে পরিত্যাগ করে, তুমি তাকে অপদস্থ করো। মুসনদে আহমদ : ৯৫০, ৯৬১, ৮৬৪

যায়দ বিন আরকাম বলেন, একদিন মক্কা-মদিনার মধ্যপথে ‘খুম’ নামক জলাশয়ের ধারে রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। সুতরাং তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে ওয়ায-নসিহত করার পর বললেন, ‘‘অতঃপর হে লোক সকল! শোনো, আমি একজন মানুষ মাত্র, শীঘ্রই (আমার নিকট) আমার প্রতিপালকের দূত আসবেন এবং আমি (আল্লাহর নিকট যাওয়ার জন্য) তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তার মধ্যে একটি আল্লাহর কিতাব, যাতে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং তা মজবুত ক’রে ধারণ কর।’। সহিহ মুসলিম : ৬৩৭৮; হাদিস সম্ভার : ১৫০৯

ইয়াযীদ ইবনু হায়্যান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি, হুসায়ন ইবনু সাবুরা এবং উমার ইবনু মুসলিম, আমরা যায়দ ইবনু আরকাম (রা.) এর নিকট গেলাম। আমরা যখন তার কাছে বসি, তখন হুসায়ন বললেন, হে যায়দ! আপনি তো বহু কল্যাণ প্রত্যক্ষ করেছেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ কে দেখেছেন, তাঁর হাদিস শুনেছেন, তার পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। আপনি বহু কল্যাণ লাভ করেছেন, হে যায়দ! আপনি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যা শুনেছেন, তা আমাদের বলুন না। যায়দ (রা.) বললেন, ভ্রাতূষ্পূত্র! আমার বয়স হয়েছে, আমি পুরানো যুগের মানুষ। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছ থেকে যা আমি সংরক্ষণ করোছিলাম, এর কিছু অংশ ভুলে গিয়েছি। তাই আমি যা বলি, তা কবুল কর আর আমি যা না বলি, সে ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিও না।
তারপর তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী “খুম্ম” নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা শেষে ওয়াজ-নসিহত করলেন। তারপর বললেন, সাবধান, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফিরিশতা আসবে, আর আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেব। আমি তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং নূর রয়েছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অবলম্বন কর, একে শক্ত করে ধরে রাখো। এরপর কুরআনের প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। তারপর বললেন, আর হলো আমার আহলে বাইত। আর আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। হুসায়ন বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ‘আহলে বাইত’ কারা, হে যায়দ? রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিবিগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?
যায়দ (রা.) বললেন, বিবিগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত; তবে আহলে বাইত তাঁরাই, যাদের উপর যাকাত গ্রহণ হারাম। হুসায়ন বললেন, এ সব লোক কারা? যায়দ (রা.) বললেন, এরা আলি, আকীল, জাফের ও আব্বাস (রা.) এর পরিবার-পরিজন। হুসায়ন বললেন, এদের সবার জন্য যাকাত হারাম? যায়দ (রা.) বললেন, হ্যাঁ। সহিহ মুসলিম : ২৪০৮, আহমাদ ১৮৭৮০, ১৮৮২৬, দারেমী ৩৩১৬

গাদীরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের বর্ণিত হাদিস হল :
শিয়া ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, গাদিরে খুমের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (স.) আলি (রা.)-কে তার পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত (ইমাম ও খলিফা) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিয়া সূত্রে এই দাবির সমর্থনে বেশ কিছু তারা পেশ করে। নিচে তাদের প্রসিদ্ধ কয়েকটি গ্রন্থের রেফারেন্স সহ হাদিসগুলো উল্লেখ করা হলো:

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -১
“قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص): مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.”
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা (নেতা), আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, তুমিও তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো এবং যে আলির শত্রুতা করবে, তুমিও তার শত্রুতা করো। শায়খ তুসী, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড: ১, পৃ.-৫৮-৬২

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -২
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-৩
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟ قَالُوا: بَلَى. قَالَ: فَمَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ.”
হে লোকসকল! তোমরা কি এ কথা স্বীকার করো না যে, মুমিনদের উপর তাদের নিজেদের চেয়ে আমার অধিকার বেশি? তারা বলল, হ্যাঁ, তিনি বললেন: ‘তাহলে যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। আল্লামা আমিনী, আল-গাদীর, খণ্ড: ১, পৃ.-১৪-২০

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৪
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ (ص) قَالَ فِي غَدِيرِ خُمٍّ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ.
রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো।
আল্লামা মাজলিসী (র.) বিহারুল আনোয়ার, খণ্ড: ৩৭,পৃষ্ঠা: ১১০-১৩০

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৫
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন-

“عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ (ص) بِغَدِيرِ خُمٍّ: أَلَا إِنَّ عَلِيًّا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ، وَهُوَ وَلِيُّ كُلِّ مُؤْمِنٍ بَعْدِي.”
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (স.) গাদিরে খুমে বলেছেন, জেনে রাখো, আলি আমার থেকে এবং আমি তার থেকে। সে আমার পর প্রত্যেক মুমিনের অভিভাবক (ওয়ালী)। শায়খ সাদুক (র.) কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নিআম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৭০-২৭৫

শিয়াদের গ্রন্থের হাদিস -৬
عَنِ النَّبِيِّ (ص) أَنَّهُ قَالَ: مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ
নবি (স.) বলেছেন: ‘যার আমি মাওলা, আলিও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলিকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে আলির শত্রুতা করে, তুমিও তার শত্রুতা করো। আল-কুন্দুজী আল-হানাফী ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২

আব্দুল হুসাইন আল-আমিনী ও তার গ্রন্থ আল-গাদীরের ভাষ্য :
শিয়া আলিমগণ এ ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছুসংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘আল গাদীর’ গ্রন্থ সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ, যা বিখ্যাত শিয়া লেখক আব্দুল হুসাইন আল‑আমিনী (১৪০০ হি.) বিশাল ২০ খণ্ডে সমাপ্ত করেছেন। তিনি তার গ্রন্থে গাদীরে খুমের দিন ঘটেছে এবং এটি আলির (রা.) ইমামত ও নেতৃত্ব ঘোষণার সাথে সম্পর্কিত বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আল‑আমিনী বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় শেষ করে ১০ হিজরির ১৮ জিলহজ নয়মাসে গাদীর‑খুম নামক স্থানে অবস্থান করেন, তখন জিব্রাঈল (আ.) তাঁর কাছে নিম্নলিখিত বার্তা নিয়ে আসে। আল্লাহ বানী-
یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَہٗ ؕ
হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও আর যদি তুমি না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছালে না। সুরা মায়েদা : ৬৭
এরপর নিজে মঞ্চে উঠে তাকবীর-ধ্বনি উচ্চারণ করেন, অতঃপর তিনি বললেন, “মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যে, তিনি তাঁর দ্বীনকে পূর্ণতা প্রদান করেছেন এবং তাঁর নেয়ামত চূড়ান্ত করেছেন এবং আমার পর আলির ওয়াসায়াত এবং বেলায়েতের এবং ইমামতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন ” এরপর মহানবি ﷺ উঁচু স্থান থেকে নিচে নেমে এসে আলি (আঃ) কে একটি তাঁবুর নীচে বসার জন্য বললেন, যাতে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাঁর সাথে মুসাফাহা করে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
সবার আগে আবু বকর ও উমর আলিকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন এবং শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁকে তাঁদের ‘মাওলা’ (নেতা) বলে অভিহিত করেন। হাসসান ইবনে সাবিত এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মহানবি ﷺ এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনা করেন এবং তা মহানবি ﷺ এর সামনে আবৃত্তি করেন। আমরা এখানে এ কবিতার মাত্র দু’টি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি দিচ্ছি- “অতঃপর তিনি তাঁকে বললেন, হে আলি ! উঠে দাঁড়াও।
কারণ আমি তোমাকে আমার পরে ইমাম (নেতা) ও পথপ্রদর্শক মনোনীত করেছি।
অতএব, আমি যার মাওলা (অভিভাবক), সেও তার ওয়ালী ।
তাই তোমরা সবাই তার সত্যিকার সমর্থক ও অনুসারী হয়ে যাও।”

আল‑আমিনী আরও লিখেন, এ হাদিস সকল যুগে ও সবসময় মহানবি ﷺ এর সকল সাহাবির ওপর মাওলা আলি (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সবচেয়ে বড় দলিল। এমনকি আমীরুল মুমিনীন আলি (আঃ) দ্বিতীয় খলীফার ইন্তেকালের পর নতুন খলীফা নিযুক্তকারী পরামর্শ বা শুরা সভার অধিবেশনে, উসমানের খিলাফতকালে এবং তাঁর নিজের খিলাফতকালে এ হাদিসের দ্বারা খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর দাবী উত্থাপন এবং এ সংক্রান্ত যুক্তি পেশ করেছিলেন। এছাড়াও বড় বড় মুসলিম মনীষী, আলি (আঃ) এর রিরোধী ও খিলাফত সংক্রান্ত তাঁর অধিকার অস্বীকারকারীদের বিপক্ষে এ হাদিসের মাধ্যমে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন। (‘চিরভাস্বর মহানবি ﷺ দ্বিতীয় খণ্ড ।

তারা এর সাথে আরও একটি জাল হাদিস বেশ ঘটা করে প্রচার করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার সময় গাদিরে খুম নাম স্থানে এক লক্ষও অধিক সাহাবি সামনে আলি (রা.) কে খেলাফত দান করেন। (এই জাল হাদিস সম্পর্কে নাসির উদ্দির আলবানি বলেন, এই হাদিস টি এক লক্ষেরও অধিক সাহাবি সামনে বলা হয়েছে অথচ বর্ণনা কারি ঐ একজন সাহাবি ছাড়া আর কেহই হাদিসটি বর্ণনা করে নাই। যঈফ ও মওজু হাদিসের সংকলন, পৃষ্ঠা ৩৮

গাদিরে খুম সম্পর্কে শিয়াদের দাবি
শিয়াদের দাবি গাদিরে খুমের ভাষণে মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা ছিল। তার মাঝে প্রথমটি ছিল ‘কুরআন ও আহলে বাইতের’ অনুসরণের আদেশ। দ্বিতীয়টি ছিল আলি (রা.) এর ‘অভিষেক’, অর্থাৎ আলি (রা.) কে মুসলিম জাতির মওলা (অভিভাবক) ঘোষণা করা। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফতের পর মুসলিম উম্মার খেলাফতের এক মাত্র উত্তারাধীকারি আলি (রা.)। তাদের বিশ্বাস আলি (রা.) এর আগের তিনজন মুসলীম খলীফাগণ অবৈধ এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। (নাউজুবিল্লাহ)

তাদের দাবির যৌক্তিকতা :
উপরদের আলোচিত সহিহ হাদিসগুলো থেকে এ কথা সত্য যে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পথে গাদীরে খুম নামক স্থানে ভাষণ দিয়েছিলেন এবং যা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মসনদে আহম্মদ সহ অনেক হাদিস গ্রন্থে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদিস দ্বারা আহলে বাইত তথা আলি (রা.) মর্যাদা প্রমাণিত এবং কুরআন ও আহলে বাইতের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। হাদিসগুলো মন দিয়ে অধ্যায় করলে দেখা যাবে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বর্ণিত অন্যান্য হাদিসের মাঝে সামান্য পার্খক্য আছে। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের হাদিসটির মাঝে অতিরিক্ত অংশ টুকু নেই যা অন্য হাদিস গ্রন্থে এসেছে। এই হাদিসগুলো অনেক মুহাদ্দিস সহিহ বলে রায় প্রদান করছেন। যদিও ইবন তাইমিয়াহ সহ কিছু প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এর বাইরের কোন বর্ণনাকে সহিহ বলেননি। অপর পক্ষে শিয়া আলেমদের বর্ণিত প্রথম হাদিটিতে অনেক মনগড়া কথা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। হাদিসগুলোর শেষের দিকে অতিরিক্ত কথাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বলে আলি (রা.) এর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।

যদি আলোচনার স্বার্থে আমরা উপরের হাদিসের অতিরিক্ত বর্ণনাকে সহিহ ধরে নেই, তা হলে তাদের বক্তব্য সার কথা হবে- আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা। এই কথাটুকু সহিহ বুখারি ও মুসলিম বাদে অন্য হাদিসের উল্লেখ আছে। তাদের হাদিসে দেখতে পেয়েছি এই অতিরিক্ত বর্ণনার বাইরেও আরো অনেক বাড়তি বর্ণনা রয়েছে যার সবই শিয়াদের তৈরি বা জাল করা। অধিকাংশ শিয়া স্কলার রেফারেন্স হিসাবে এই দুই বর্ণনার অতিরিক্ত অতিরঞ্জিত বর্ণনাগুলো বলেন না। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো যে, গাদির খুমের হাদিসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা বুখারী ও মুসলিমের রেফারেন্স উল্লেখ করলেও প্রায় সকল ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বর্ণনাগুলি একই সাথে চালিয়ে দেয় যদিও সেগুলো বুখারী-মুসলিমে নেই।
শিয়া আলেমগণ প্রায়ই বলে থাকে, গাদিরে খুমের এ মহান ঐতিহাসিক ঘটনা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ১১০ জন সাহাবি বর্ণনা করেছেন। তাবেয়ীগণের যুগেও ৮৯ জন তাবেয়ী এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী শতকসমূহে হাদিসে গাদীরের রাবিগণ সবাই আহলে সুন্নাতের আলেম। তাঁদের মধ্য থেকে ৩৬০ জন এ হাদিস তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে সংকলন ও উল্লেখ করেছেন। হিজরী তৃতীয় শতকে ৯২ জন আলেম, চতুর্থ শতকে ৪৩ জন, পঞ্চম শতকে ২৪ জন, ষষ্ঠ শতকে ২০ জন, সপ্তম শতকে ২১ জন, অষ্টম শতকে ১৮ জন, নবম শতকে ১৬ জন, দশম শতকে ১৪ জন, একাদশ শতকে ১২ জন, দ্বাদশ শতকে ১৩ জন, ত্রয়োদশ শতকে ১২ জন এবং চতুর্দশ শতকে ২০ জন আলেম এ হাদিস বর্ণনা করেছেন।
মজার ব্যাপার হল তাদের এই কথা সত্য হলেও এর মাঝে সূক্ষ্ম কারচুপি আছে। সাহাবি বা মুহাদ্দিসগনের বর্ণিত সকল হাদিসের মূল কথাগুলো এই গ্রন্থের উপরে বর্ণিত হাদিসের মত। কিন্তু শিয়া আলেমগণ প্রতিটি হাদিসে অতিরিক্ত অংশ যোগ করে আলি (রা.) কে খেলাফতের উত্তারাধীকারি প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।
যাহোক আলি (রা.) এর খেলাফতের উত্তারাধীকারি অংশ টুকু মিথ্যা হলেও তাদের এ (আমি যার মাওলা, আলিও তার মাওলা) কথাটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনেক মুহাদ্দস উল্লখ করছেন। এখান হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ মাওলা শব্দটি ব্যবহার করছেন।
‘মাওলা’ একটা আরবি শব্দটি। মাওলা শব্দটি মহান আল্লাহ কুরআনে কয়েক স্থানে উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াতে তিনি (আল্লাহ) নিজে মাওলা বা প্রভু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরবি ভাষায় অনেক শব্দেরই একাধিক অর্থ থাকে ঠিক তেমনি মাওলা শব্দটিরও একাধিক অর্থ আছে। আর এই বহু অর্থেরই সুযোগ গ্রহণ করেছে শিয়ারা অন্যায়ভাবে। যেমন ‘মাওলা’ এর অর্থ হতে পারে কর্তা, মালিক, বন্ধু, অভিভাবক, ভালোবাসার মানুষ, আযাদকৃত দাস, দাস, কাজিন ইত্যাদি। মাওলা দিয়ে যেমন বন্ধু বুঝায় একই শব্দ দিয়ে এমনকি আল্লাহকেও বুঝায় বাক্যের গতি অনুসারে। এখানে মাওলা শব্দের অর্থ ‘ভালোবাসার মানুষ’ হিসাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ ব্যবহার করেছেন, যা শিয়ারা না মেনে বরং ‘ইমাম’, ‘খলিফা’ কিংবা ‘ক্ষমতার উত্তরাধিকারী’ হিসাবে এর অর্থ করে।
গাদির খুমের হাদিস নিয়ে শিয়া বাড়া বাড়ির ভয়াবহতা সত্য থেকে তাদের অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। খিলাফতের উত্তরাধিকারের মতো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন কুয়াশাচ্ছন্ন কথা দিয়ে মুড়িয়ে রাখবেন তা হতে পারে না এবং তা রাসুল ﷺ এর ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। গাদির খুমের ঘটনাটি যখন ঘটেছে তখন সেখানে ছিল মদীনাবাসী সাহাবাগণ। এর সামান্য কিছুদিন আগে বিদায় হজে তিনি মক্কা, মদীনা নির্বিশেষে সকল সাহাবাকে কাছে পেয়েছেন। সে হিসাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্য বিদায় হজ্জের ভাষণ ছিল সেরা সময়, কিন্তু তিনি তখন এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এই সময়ের আগে কিংবা পরে অসংখ্যবার মুহাজির ও আনসার শীর্ষস্থানীয় সাহাবগণ রাসুলের সাথে বিভিন্ন সময় বসেছেন এবং পরামর্শ করেছেন। আলি (রা.) এর খলিফা হওয়ার মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা রাসুল ﷺ কাউকে বলেননি।
গাদির খুমের ঘটনায় রাসুল ﷺ আলি সম্পর্কে যেভাবে বলেছেন, একইভাবে কিংবা এর চেয়ে জোরালোভাবে তিনি অন্য সাহাবাদের প্রসঙ্গেও অনেকবার বলেছেন। আবু বকরের কথা সরাসরি কুরআনে এসেছে। উমার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আল্লাহর শপথ উমার, তুমি যে পথে হাঁটো, শয়তান সে পথে আসেনা” (বুখারী)। উমার (রা.) প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, “আমার পর যদি কোন নবি হতো তা হতো উমার।। তিনি আরো বলেছেন, “উমারের সাথে যদি কেউ রাগান্বিত হলো সে যেন আমার উপর রাগান্বিত হলো এবং উমারকে যে ভালোবাসলো, সে যেনো আমাকেই ভালোবাসলো। উমার (রা.) এই হাদিসগুলো জানার পরও এগুলোকে তার প্রথম খলিফা হিসাবে মনোনয়নের জন্য ব্যবহার করেননি বা করতে দেননি।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক নবির উম্মাহর মধ্যে একজন থাকে যে হয় ওই উম্মাহর সবচেয়ে বিশ্বস্ত। আমার উম্মাতের ভেতর সেই লোকটি হলো আবুউবাইদাহ। মুয়াজ ইবন জাবাল (রা.) কে তিনি বলেছেন, “ওহে মুয়াজ, তুমি হলে আমার ভালোবাসার একজন। আবু জর আল গিফারী (রা.) প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আকাশের নিচে এবং মাটির উপর আবু জরের চেয়ে সত্যবাদী আর কেউ নেই।
এভাবে সাহাবিদের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে। তাই বলে কি, তাদের নামে আলাদা আলাদা দল গঠন করতে হবে। সকল সাহাবি আল্লাহ এবং তার রাসুল ﷺ এর নিকট প্রিয়। কারও প্রশংসা করতে গিয়ে অন্য জন কে ছোট করা হারাম কাজ। এই কাজটিই করেছে শিয়ারা। ইসলামের অন্যতম খাদেম ও খলীফা আলি (রা.) এর মর্জানা বাড়াতে গিয়ে প্রথম তিন খলীফাসহ সকল সাহাবি (রা.) এর উপর মুনাফিকের মত টাইটেল লাগিয়ে দিয়েছেন। যা তাদের ইসলাম থেকে বের করে দিয়েছে। আলি (রা.) রাসুল ﷺ এর আপন চাচার ছেলে, তার কলিজার টুকরা ফাতিমা (রা.) স্বামী, তার আদরের দুলাল হাসান, হুসাইলের পিতা সর্বপুরী তিনি আহলে বাইয়াত এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তার মর্জানাকে ছোট করার সাহস কোন মুসলীম দেখাবে না। কিন্তু তাকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে কেন অন্য সাহাবিদের প্রতি মিথ্যা দুর্নাম দিব? শিয়াদের এই কাজ ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবিদের সাথে চরম বেয়াদবি ছাড়া কিছু নয়। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।