শরীয়তের দৃষ্টিতে আশুর ও শিয়াদের উদ্যাপন মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। মুসলিম উম্মাহর দ্বারে কড়া নাড়ে প্রতি বছর। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মাদ ﷺ-এর হিজরত ও তার দাওয়াতী জিন্দেগি শুরু ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা। এ মাসে রয়েছে এমন একটি দিন, দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে যে দিনে নবি মুসা (আ.) এর বিজয় হয়েছিল। পতন হয়েছিল তখনকার সবচেয়ে শক্তিশালী জালেম সম্রাট ফেরাউন ও তার সম্রাজ্যের। সে দিনটিই হল আশুরা বা মুহাররম মাসের দশ তারিখ। আশুরা একটি আরবি শব্দ। আবরী যে কোন মাসের দশ তারিখের বিশেষণকে আরবিতে বলা হয় আশুরা। আরবিতে আশারা মানে হল দশ। এই আশারা থেকে আশুরা বুঝায়। কিন্তু অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।
আশুরার পটভূমি এবং সিয়ামের ফজিলত আশুরার বৈশিষ্ট্য ও তার সিয়ামের ফজিলাত সম্পর্কে বিশেষ কিছু লেখার প্রয়োজন নাই, সহিহ হাদিসগুলি অধ্যায় করলেই মোটামুটি একটা ধারণা হবে। তাই এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস তুলে ধরব শিরোনামসহ উল্লেখ করছি।
১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস– আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم “ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ আশুরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবি ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫
ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত- قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ، فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ ” مَا هَذَا ”. قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى. قَالَ ” فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ ”. فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ. তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা ‘আশুরার দিন সিয়াম রাখে। রসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২
২. আশুরার সিয়ামের গুরুত্ব রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার আশুরার সিয়াম রাখতে আদেশ করেছেন। কিন্তু রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর তিনি তার উম্মতের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ كَانَ مَنْ شَاءَ صَامَ، وَمَنْ شَاءَ أَفْطَرَ. রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে আশুরার পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রমযানের সিয়াম সিয়াম ফরজ করা হল তখন যার ইচ্ছা আশুরার সিয়াম পালন করত আর যার ইচ্ছা করত না। সহিহ বুখারি : ২০০১
৩. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলত হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ রমজানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনো নবি ﷺ কে সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে ‘আশুরার দিনের সিয়াম ছাড়া অন্য কোন দিনের সিয়ামকে এবং এ মাস অর্থাৎ রমাযান ছাড়া অন্য কোন মাসের সিয়ামকে অধিক মর্যাদা দিতে দেখিনি। সহিহ বুখারী : ২০০৬, সহিহ মুসলিম : ১১৩২, মিশকাত : ২০৪০
৪. আশুরার সিয়াম বিগত এক বছরের গুনাহ মাপ করে আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত-
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ، قَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ وَالبَاقِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ المَاضِيَةَ» وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاثْنَيْنِ، قَالَ: «ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَبُعِثْتُ فِيهِ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ» رَوَاهُ مُسْلِمٌ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪
৫. আশুরার দিনে দুটি সিয়াম রেখে ইহুদিদের বিরোধিতা করা ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- «لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لأَصُومَنَّ التَّاسِعَ» “আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে মুহাররম মাসের নবম তারিখে অবশ্যই রোযা রাখব। সহিহ মুসলিম : ১১৩৪ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আশুরার দিন সিয়াম পালন করেন এবং লোকদেরকে সিয়াম পাননের নির্দেশ দেন তখন সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি এবং নাসারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও সিয়াম পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। সহিহ মুসলীম : ২৫৩৭ ইফকাঃ
আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবি ﷺ যখন নিজে আশুরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯
ভাবে বহু হদিস দ্বারা আশুরার সিয়ামের হুকুম ও ফজিলত প্রমাণিত। চান্দ্রমাস মুহাররমের দশ তারিখ কে আশুরার দিন বলা হয়। তবে হাদিসের আলোকে বলা যায় এই মাসের ৯ ও ১০ তারিখ এ দু’দিন রাখা উত্তম। অথবা ১০ ও ১১ তারিখেও রাখা যায়। শুধুমাত্র ১০ তারিখে সিয়াম রাখাকে উলামায়ে কিরাম মাকরুহ বলেছেন। এই দিনের সিয়াম পালনের সাথে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শহীদ হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। এই সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পরে আসবে। আশুরার এ দিনটি পূর্ববর্তী যামানার নাবীদের সময় থেকেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূণ দিন হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এ দিনে মূসা (আ.) কে ফিরআউনের হাত থেকে আল্লাহ রক্ষা করেছিলেন। তবে এ দিনের অনেক কাহিনি শোনা যায় যার কিছু হল দুর্বল, আর বেশির ভাগই তথ্য নির্ভর নয়। এরপরও এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদা সম্পন্ন।
আশুরা সম্পর্কিত জাল বর্ণনাসমূহ : কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় জালিয়াতগন এ সম্পর্কেও বহু জাল হাদিস রচনা করেছে। আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস তুল ধরছি।
১. মুহাররম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলত। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে এই সম্পর্কে জাল হাদিসগুলি হলো :
ক. যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখে, তা তার চল্লিশ বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।
খ. মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।
গ. আশুরার তারিখে রোজা আদায়কারীর আমলনামার সাত আসমান-জমিনের অধিবাসীদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।
ঘ. হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান সওয়াব দিবেন। ঙ. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।
চ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর সওয়াব পাইবে।
ছ. আরও হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতিমের মাথায় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহতাআলা ঐ এতিমের মাথার প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় সওয়াব পাইবে।
জ. নবি (সা.) বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বৎসর রোযা সালাত করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য সওয়াব পাইবে।… তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসরের গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।
ঝ. রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল। … মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।… তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আজাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন… মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে। এই জাল কথাগুলি পাবেন।
২. আশুরার সম্পর্কে সমাজে বহুল প্রচলিত মিথ্যা ঘটনাবলি। আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এই জাল কাথাগুলি বলা হয় দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও জমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফুজ, আরশ, কুরসি, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন, দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাজিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানি করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন। আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জুদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবি-তাবিয়ী থেকে বর্ণিত।
এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস হলো- ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, মিশকাত : ২০৬৭ এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরাউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এই বর্ণনাটি সত্য হলেও বাকি সব জাল।
৩. দশই মুহাররম আশুরার দিন কিয়ামত হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়ামত হবে। হাদিসটি জাল বলেছেন, আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযু বা বানোয়াট; শায়খ আলবানি জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০২; জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৯; মুহাম্মদ ইব্ন আলি আল-কিনানী, তানযীহুশ শরীআতিল মারফুআহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯; মাউযূ হাদিস বা প্রচলিত জাল হাদিস, হাদিস নং-১০৬।
আশুরা উপলক্ষ্যে আমরা কি করছি মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। শরীয়তের ঈমান, আকিদা ও ইবাদাতে কোন প্রকার কমতি রাখা হয় নাই। ইবাদতের বিষয়টিকে আরও বেশী কড়াকড়ি করা হয়েছে। কাজ কীভাবে করলে ইবাদাত হবে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ ছাড়া কেউ বলতে পারবেনা। এখন তিনি নাই, তাই কুরআন সুন্নাহর বাইরে গিয়ে কোন আমল করা যাবে না। কারণ সেই আমলের পদ্ধতি কি হবে? কখন করতে হবে? মহান আল্লাহ কতটুকু খুশি হবেন, এ সব বিষয় অহির উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নাই। অথচ অহির দরজা বন্ধ তাই কুরআন ও সহিহ হাদিসই একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আশুরার আমলে আমরা মুসলিম জাতিকে পরিষ্কার তিনটি দলে ভাগ হয়ে ইবাদত করতে দেখি। সকলে দাবি করছে আমরাই সঠিক পদ্ধতিতে আমল করছি। তিনটি দল হল- ১. সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিস (সুন্নী মুসলিম) ২. ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসী (সুন্নী সুমলিম) ৩. শীয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম
১. সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিসগণের আশুরার আমল : উপরের আশুরা কেন্দ্রিক সহিহ হাদিসের যে বর্ণনাগুলি তুলে ধরছি আমার জানা মতে সালাফি, দেওবন্দী ও আহলে হাদিস অনুসারীগণ ঠিক ঐভাবেই আমর করে থাকে। তারা এই দিনকে হাদিসের আলোকে বিচার বিবেচনা করে মহররম মাসের দশ তারিখের সাথে মিলিয়ে দুটি সিয়াম পালন করে। তাদের কেউ কেউ নয় ও দশ তারিখ সিয়াম পালন করে আবার কেউ কেউ দশ ও এগারো তারিখ সিয়াম পান করে। তবে তারা নয় ও দশ তারিখ সিয়াম পালন মুস্তাহাব মনে করে। এদের সমজিদগুলিতে মহররমের প্রথম জুমার খুতবায় এই সম্পর্ক বিস্তারিত আলোচনা করে। এই আলোচনায় সিয়াম পালন সম্পর্কে গুরুত্ব প্রদান করা হয় এবং আশুরায় শীয়া ও ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসীদের সম্পর্কে কঠিন সতর্ক বাণী উচ্চরণ করা হয়। তারপরও কোন কোন অতি উৎসাহী আলেমকে আশুরার দিনে মসজিদে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করতে দেখা যায়। কেউ কেউ মাহফিরের পর মিলাদ পড়ে ও মিষ্টি বিতরণ করে যদিও এদের মাঝে এই সংখ্যা কম। ইলম চর্চার ফলে সালাফি ও আহলে হাদিসদের মাঝে এই কাজ প্রায় শূন্যের কোটায়। দেওবন্দী ঘরানার আলেমগণও আস্তে আস্তে মিলাদ মহফিল থেকে বের হয়ে আসছে। কিন্তু দেওবন্দী ঘরানার অনেক আলেমকে আশুরা সম্পর্কে একটি যঈফ হাদিসে উপর আমল করার জন্য উৎসাহ প্রদান করতে দেখা যায়। যেমন- আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবারের উপর সচ্ছলতা দেখাবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য উক্ত বছরকে সচ্ছল করে দিবেন। মুজামে ইবনুল আরাবী : ২২৫, আলমুজামুল আওসাত : ৯৩০২, আল মুজামুল কাবীর : ১০০০৭, শুয়াবুল ঈমান – : ৩৫১৩, ৩৫১৫, ৩৫১৬ এই হাদিসটি যারা জাল বা বানোয়াট বলেছেন, ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-১১৩-১১৭; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-১০৯-২১১; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২৪,
ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫০; ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩২-১৩৩; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২; হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮।
দেওবন্দী আলেমগনও জানের হাদিসটি যঈফ কিন্তু তারা বলেন, ফাজায়েলের ক্ষেত্রে যঈফ হাদিসও গ্রহণ যোগ্য। তাই এই হাদিসের উপর আমল করলে কোন অসুবিধা নাই। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় হল, পরিবারের উপর সাধ্যানুপাতে খরচ করা জায়েজ আছে। বা খরচ করা উচিত। কিন্তু এদিন সম্মিলিতভাবে খিচুরী পাকানো, বিশাল খাবারের আয়োজন করে বিলানো, এসবই খারেজীদের সাথে মিলে যায়। যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য ও নাজায়েজ। মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, পরিচালক, তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা।
অপর পক্ষে এই হাদিস সম্পর্কে ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল বলেন, হাদিসটি কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকটি সনদই অত্যন্ত দুর্বল। বিভিন্ন সনদের কারণে বাইহাকী, ইরাকি, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে ‘জাল’ হিসেবে গণ্য না করে ‘দুর্বল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনু হাজার হাদিসটিকে ‘অত্যন্ত আপত্তিকর ও খুবই দুর্বল’ বলেছেন। অপরদিকে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ইবনু তাইমিয়া প্রমুখ মুহাদ্দিস একে জাল ও বানোয়াট বলে গণ্য করেছেন। তাঁরা বলেন যে, প্রত্যেক সনদই অত্যন্ত দুর্বল হওয়ার ফলে একাধিক সনদে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় না। বর্ণিত হাদিসটি রসূল ﷺ থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসের বিরোধী। সহীহ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইহূদীরা আশুররা দিনে উৎসব আনন্দ করে। তোমরা তাদের বিরোধিতা করবে, এ দিনে সিয়াম পালন করবে এবং উৎসব বা আনন্দ করবে না। আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا، قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم “ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ আশূরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবি ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি : ২০০৫ কাজেই আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতে হবে ইয়াহুদিদের মত আনন্দ করা যাবে না। যদি এ দিনে ভাল খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয় তবে তা ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্য আচরণ বলে গণ্য হবে।
২. ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসীদের আশুরার আমল : মূলত ব্রেলভী বা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসিগণই হল উপমহাদেশে বিদআতি আমলের পাওয়ার হাউজ। এই সকল মুসলিম জনসাধারণের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন যে, তারা এ আশুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং এ কাজগুলো তারা আশুরার আমল মনে করেই করে থাকে। যেমন- ক। আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে খ। বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে গ। ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে ঘ। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে ঙ। কেউ কেউ পশু জবেহ চ। কেউ কেউ শীয়দের অনুকরণে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের স্মরণে প্রতিকৃতি বানায় ছ। অনেকে শোক প্রকাশের জন্য শিয়াদের মত তাযিয়া মিছিল বের করে কষ্টের ব্যাপার হল, এগুলো বিভ্রান্ত শিয়া ও রাফেজীদের কাজ হলেও দুঃখজনক ভাবে এই বিদআতগুলি আজ সুন্নী নামের কিছু মুসলিম ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আমাদের জেনে নিতে হবে কোনটা আশুরা সম্পর্কিত আমল আর কোনটা ভেজাল বা বিদআত। যদি আমাদের আমলগুলো শরীয়ত সম্মত হয় তা হলে তা দ্বারা আমরা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও সওয়াব লাভ করতে পারব। আর যদি আমলগুলো শরীয়ত সমর্থিত না হয়, বিদ’আত হয়, তাহলে তা পালন করার কারণে আমরা গুনাহগার হবো। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পরিবর্তে তার থেকে দূরে সরে পড়ব। বর্তমানে এই তরিকার মুসলিমদের মাঝে অনেক আলেম দাবি করে। তারা মাজার কেন্দ্রিক বড় বড় মাদ্রাসও প্রতিষ্ঠা করছে। আমরা আশা করি এরা কুরআন হাদিস নিয়ে প্রতিটি আমলের চুরচেরা বিশ্লেষণ করবে এবং কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক আমল করবে। তারা নিজেরাও বিদআতি কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং তাদের অনুসারী মুসলিমদেরও বিরত রাখবে।
৩. শীয়া সম্প্রদায়ের আশুরার বিদআতি আমল শীয়া সম্প্রদায়ের লোকদের এই দিনটি খুবই পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস আশুরার দিনে তাদের প্রাণ প্রিয় ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু (প্রাণ তাদের ইমাম (আ.) কে বলে) এই দিনে কারবালাতে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তারা এ সম্পর্কে এমন সব উদ্ভট আকিদা রাখেন যার সমর্থনে কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোন প্রমাণ নেই। তাদের বক্তব্য শুনে মনে হবে বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ আশুরাতে ঘটিয়েছেন ও আগত ভবিষ্যতের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ আশুরাতে ঘটাবেন। পৃথিবীর সৃষ্টি ও ধ্বংস সবই নাকি এ দিনে হয়েছে ও হবে। এমন সব উদ্ভট আকিদা তারা রাখে যার প্রমান কোন সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। তাদের প্রচার প্রসারের ফলে সুন্নী অজ্ঞ মুসলিমও আজ মনে প্রাণে এই সকল ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাস করতে শুরু করছে। যদি কোন আলেম এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান করে তবে তাকে বিভিন্ন ভাবে ভৎষোনা করা হয়। শিয়ারা ভ্রান্ত আকিদা ও বিদআতি কর্মের সাথে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের কথা যোগ করে থাকে। তারা দাবি করে এই সকল ঘটনার সাথে আশুরার দিনের যেমন সম্পর্ক আছে। ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতেরও তেমনি সম্পর্ক আছে। তাই শীয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা আশুরা মানে শুধু শুধুমাত্র কারবালাল হৃদয় বিদারক ঘটনাকেই বুঝে তাকে। তাদের সাথে মিডিয়ার প্রচারের ফলে বর্তমানে আমরা দেখছি প্রায় সর্ব মহল থেকে আশুরার মূল বিষয় বলে কারবালার ঘটনাকেই বুঝানো হচ্ছে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সঠিক নয়। ইসলামের আগমনের পূর্বে আশুরা ছিল। যেমন আমরা হাদিস দ্বারা জানতে পেরেছি। তখন মক্কার মুশরিকরা যেমন আশুরার সিয়াম পালন করত তেমনি ইহুদিরা মুছা (আ.) এর বিজয়ের স্মরণে আশুরার সিয়াম পালন করত। আল্লাহর রসূল ﷺ আশুরার সিয়াম পালন করেছেন জীবনের প্রতিটি বছর। তার ইন্তেকালের পর তার সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আশুরা পালন করেছেন।
কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার সম্পর্ক কি? কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণের সাথে আশুরার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা হাদিসের আলোকে যে আশুরার করা বলেছি উহা রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগের ঘটনা। তিনি নিজে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সাহাবিদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুছা আলাইহিস সালামে বিজয়ের শুকরিয়া স্বরূপ সিয়াম পালন করেছে। যেমন হাদিসে এসেছে, ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইহুদিরা ‘আশুরার দিন সিয়াম রাখে। রসুলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশুরার দিন রসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ : ৩১১২ অপর পক্ষ, শিয়ারা যে আশুরা কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে থাকে তা এক নয়। রসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের নেতা, রসুলুল্লাহ ﷺএর প্রিয় নাতি সাইয়েদুনা হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। ঘটনাক্রমে এ মর্মান্তিক ইতিহাস এ আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি। আল্লামা ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন হুসাইনের রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু শাহাদতের ঘটনাটি মহা বিপদগুলোর একটি। কারণ, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু এবং তাঁর আগে উসমান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু-এর শহীদ হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে উম্মতের ওপর নেমে এসেছে অনেক মহা দুর্যোগ। আর তাঁদের শহীদ করেছে আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দারা। মাজমু ফাতাওয়া, তৃতীয় খণ্ড. পৃ-৪১১
মুসলিমদের প্রতিটি আমল হতে হবে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক। আশুরাকে কেন্দ্র করে যদি কোন আমল করতে হয়। তা হলে কুনআন সুন্নাহ থেকে দলিল নিতে হবে। কাজেই আমরা যে আশুরার কথা বললাম তার দলিল এ দিলাম। সহিহ হাদিসের এমন কোন গ্রন্থ নেই যেখানে আশুরার সিয়ামের কথা নেই। যদিও এই সিয়াম উম্মতের জন্য সুন্নাহ বা নফল কিন্তু কোন মুহাক্কিক আলেমই তার হাদিসের গ্রন্থে আশুরার বিষয়টি এড়িয়ে যান নাই। কিন্তু শীয়া সম্প্রদায় যে আশুরার কথা বলে তা সংঘটিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে। রসুলুল্লাহ ﷺ এই পৃথিবীতে নাই। তাহলে আমলের হাদিসতো থাকার কথা নয়। যার কথায় বিনা বাক্যে ইবাদত করা যায় তিনি তো নেই। কারবালার এ দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর আল্লাহর রসূল ﷺ এর সাহাবাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.), আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.), আনাস বিন মালেক (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.), সাহল বিন সায়াদ (রা.), যায়েদ বিন আরকাম (রা.), সালামাতা ইবনুল আওকা (রা.), সহ বহু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। তারা তাদের পরবর্তী লোকদের চেয়ে রসুলুল্লাহ সﷺ ও তার পরিবারবর্গকে অনেক বেশী ভালোবাসতেন। তারা আশুরার দিনে কারবালার ঘটনার স্নরণে কোন কিছুর প্রচলন করেননি। আমরা যে আশুরাকে সম্মান করি, যে আশুরায় সিয়াম পালন করি তারা কথা আল্লাহর রসূল সﷺ বলে গিয়েছেন। এবং তার সাহাবায়ে কেরাম যে আশুরার সিয়াম পালনের মাধ্যমে উৎজাপন করেছেন। আল্লাহর রসূল সﷺযে আশুরার আমল উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রেখে গেছেন তার সাথে কারবালার ঘটনার কোন ভূমিকা ছিল না।
উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। নিজে নিজেই আশুরার বা মুহাররম মাসের দশ তারিখের সুন্নাহ সম্মত আমল পালন করতে পাওয়ার। এখান আশুরার উপলক্ষ্যে শিয়া সমাজে প্রচলিত কিছু বিদআতি আমল আলোচনা করছি।
১. আশুরার দিনে মাতম করা বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.) এর নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই। এমন কি আহলে বাইতের নামে প্রচলিত মাজহাবেও তার কোনো দলিল নেই এবং সর্বোপরি ইসলামি আকীদার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই নিকৃষ্ট বিদআত আস্তে আস্তে তাদের মধ্য প্রসার ঘটে। শিয়াগণ সঠিকভাবে কখন এর দলিল দিতে পারবেনা। হুসাইন (রা.)র বহু সাহাবি শহীদ হয়েছেন। এমন কি মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ খলিফা উসমান (রা.) উমর (রা.) ও আলি (রা.) শহীদ হয়েছেন। তারা আলি (রা.) বাদে সকল সাহাবিদের শাহাদত বরণে শোক তো দূরের কথা, বরং আনন্দ দিবসে পরিণত হয়। আববাসীয় খলীফা মুত্বী বিন মুক্বতাদিরের সময়ে (৩৩৪-৩৬৩হি.) তাঁর কট্টর শীয়া আমির আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামি ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫১ হিজরির ১৮ই জিলহজ তারিখে বাগদাদে উছমান (রা.) এর শাহাদত বরণের তারিখকে তাদের হিসাবে খুশির দিন মনে করে ‘ঈদের দিন’ হিসাবে ঘোষণা করেন। শিয়াদের নিকটে এই দিনটি পরবর্তীতে ঈদুল আযহার চাইতেও গুরুত্ব পায়। অতঃপর ৩৫২ হিজরির শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। আল্লাহর বান্দা ও রাসুলের সাহাবিদেরকে গালাগালি করাকে আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন মনে করেই করে থাকেন। এর চেয়ে অধিক মূর্খতা আর কি হতে পারে? আবার দেখুন, মাতম করার পর তারা তারা মানুষের মাঝে গোশত, খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য বস্তু বিতরণ করে। কারবালা সম্পর্কিত বিভিন্ন শিরকি কবিতা আবৃতি করে রাত পার করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত হুসাইন (রা.) ্এর শাহাদতের ঘটনায় খুবই মর্মাহত কিন্তু শোক প্রকাশেএ ইসলামি শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করে না। হুসাইন রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তাকেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত অস্বীকার করে না। কিন্তু অজ্ঞ শিয়াদের মত গালে ছুরি চালানো, বুকে চাপড়ানো এবং নিজেকে ক্ষত-আহত করার মত গর্হিত কাজ করে না। ইদানীং আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে সকল জাহেলি কাজ শুরু হয়ে তা সকলের জানা। মিডিয়ার কল্যাণে আজ সবাই এ সকল ভ্রান্তি দেখে দেখে মূল শিক্ষা আমল থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। শিয়াদের এই সকল গর্হিত কাজ সম্পূর্ণ হারাম। ইসলামি শরীয়তে মৃত্যুর জন্য শোক পালন যা করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। কাজেই ভুল করার সুযোগ নাই। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন- لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ সে আমাদের উম্মতভুক্ত নয় যে গালে আঘাত করে, বুকের কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলি কথাবার্তা বলে। সহিহ বুখারী : ১২৯৪, ১২৯৮, ৩৫১৯, সহিহ মুসলিম : ১০৩ আবূ মূসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আমি তাদের থেকে মুক্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ যাদের থেকে মুক্ত। আর সাল্লাল্লাহু ﷺ (শোকে) মাথা মুণ্ডনকারিণী, বিলাপকারিণী এবং বুক বিদীর্ণকারিণী থেকে মুক্ত। সহিহ বুখারী : ১২৩৪, সহিহ মুসলিম : ১০৪ তেমনি আবূ মালেক আশআরী (রব) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আমার উম্মত জাহেলি যুগের চারটি স্বভাব সহজে ছাড়তে পারবে না। বংশ নিয়ে গর্ব, বংশ তুলে গালি দেয়া, তারকা দেখে বৃষ্টি চাওয়া এবং মৃত ব্যক্তির ওপর বিলাপ করা। তিনি বলেন, বিলাপকারিণী যদি মৃত্যুর আগে তওবা না করে তাহলে কেয়ামতের দিন তাকে এমনভাবে উঠানো হবে যে, তার সর্বাঙ্গ খোস-পাঁচড়া ও আলকাতরায় ভরা থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩৪
২. শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করা আলোচনার প্রথমে আশুরার সম্পর্কে হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। আশুরার চেতনা হল, অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ৯ ও ১০ই মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ই মুহাররম সিয়াম পালন করা। বর্তমান সুন্নী মুসলিম সমাজে উক্ত দু’টি সিয়াম পালনের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু শীয়া ও তাদের পাশাপাশি সামান্য কিছু সুফি তরিকার লোক শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরিয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা এই সিয়ামের সূচনা হয়েছে মূসা (আ.) এর সময় থেকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশাতেই মুহাররমের সিয়াম পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার সিয়াম পালন করেছিলেন অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.)-এর নাজাতের আনন্দে আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ। পক্ষান্তরে আমরা আজ তা পালন করছি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের শোক স্বরূপ। অথচ ওমর (রা.), ওছমান (রা.) সহ আরো অনেক সাহাবি শাহাদত বরণ করেছেন। আমরা তাঁদের স্মরণে কিছুই করি না। যদি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের কারণে শোক দিবস পালন করা হয়, তাহ’লে ওমর ও ওছমান (রা.)-এর শোক দিবস পালনের অধিক হক রাখে।
৩. ১০ ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করা শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে। এ দিনে রাফেযীদের শোক দিবস যেমন বিদ‘আত; তেমনি তাদের বিরোধিতার লক্ষ্যে এ দিনে আনন্দ উৎসব করাও বিদ‘আত। এটা যেন বিদ‘আত দিয়ে বিদ‘আত এবং মিথ্যা দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করার চেষ্টা। অথচ উচিত ছিল সুন্নাত দিয়ে বিদ‘আত প্রতিহত করা। সত্য দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করা। রাসূল ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনটিকে শোক দিবস হিসাবেও পালন করেননি। আবার আনন্দ উৎসবেও পরিণত করেননি। তাঁরা শুধুমাত্র ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ছিয়াম পালন করেছেন।
৪. তাজিয়া মিছিল বাহির করা পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি, কট্টর শীয়া আমির আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামি ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫২ হিজরির শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শীয়ারা খুশী মনে এই নির্দেশ পালন করে। তার চালু করা বিদআত আজও শীয়ারা পালন করে আসছে। অথচ এই সকল কাজ শরিয়ত সম্মত নয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবি ﷺ ইরশাদ করেছেন- لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ যারা শোকে গালে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার দেয়, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারী : ১২৯৬ আবূ মূসা (রা.) কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মাথা তাঁর পরিবারের এক মহিলার কোলে ছিল। সে মহিলা চিৎকার করে উঠলো। তিনি তাকে তা থেকে বাধা দিতে পারেননি। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরলো তখন বললেন, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন, যার থেকে রসুলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন। যে ব্যক্তি (মৃতের শোকে) উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটি করে, মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলে, রসুলুল্লাহ ﷺ তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। সহিহ মুসলিম : ১০৪
মিডিয়ার কারণে ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটে এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাজিয়া মিছিল। তাজিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ। যায়নাব বিন্তু আবূ সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবি ﷺ এর সহধর্মিণী উম্মু হাবীবা (রা.) এর নিকটে গেলাম। তখন তিনি বললেন- سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لاَ يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُحِدُّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلاَثٍ إِلاَّ عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا আল্লাহর রসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ্ এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়। তবে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন (বৈধ)। সহিহ বুখারী : ১২৮১ অথচ শীয়ারা এর শোক যুগের পর যুগ চালিয়ৈ যাচ্ছে। শিয়াদের উদ্ভাবিত এই বেদাতি প্রথার অনুসরণেই বাংলাদেশের বিদআতিরা ১০ই মুহাররমে মিছিল বের করে থাকে। প্রত্যেক আল্লাহভীরু মুসলমানের এই সব বিদ‘আত হ’তে দূরে থাকা আবশ্যক।
৫. ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম আশূরার দিনে চোখে সুরমা লাগাননি এবং এর কোন ফযীলত বর্ণনা করেননি। এই সম্পর্কিত জাল হাদিসটি হলো- রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথাটি হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, مَنِ اكْتَحَلَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ بِالإِثْمِدِ، لَمْ تَرْمُدْ عَيْنُهُ أَبَداً যে ব্যক্তি আশূরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না। হাদিসটি জাল বলেছন- ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১১৬; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১১; মোল্লা আলি কারী (১০১৪ হি.), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২২, মাসনূ, পৃষ্ঠা- ১৪১; ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৫৭; ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩১-১৩২; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২; হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮। ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করার ফলে চোখের উপকার হয় এই মর্মে সহহি হাদিস বিদ্যমান : আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করবে। কেননা তা চোখের ময়লা দূর করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতায় লোম গজায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৪৯৫ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো এবং তা দিয়ে তোমাদের মৃতদের কাফন পরাও। কেননা তা তোমাদের উত্তম পোশাক। আর তোমাদের জন্য উত্তম সুরমা হলো ‘ইসমিদ’ সুরমা, কারণ তা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতার চুল গজায়। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৭৮, ৪১৬১ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহুর
৬. ১০ই মুহাররমে বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা শিয়াগণ ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফজিলতের আশায় বিশেষ পদ্ধতিতে সালাত আদায় করা হয়ে থাকে। যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনে বিশেষ কোন সালাত আদায় করেছেন মর্মে কোন সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে যা পাওয়া যায় তার সবগুলিই জাল বা বানোয়াট। যেমন- ক। আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘আশুরার দিনে যে ব্যক্তি চার র্যাক‘আত সালাত আদায় করবে এবং প্রত্যেক র্যাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা ও পঞ্চাশবার সূরা ইখলাছ তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার অতীতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ এবং ভবিষ্যতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন’। উল্লিখিত হাদিছটি জাল বা বানোয়াট। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ-১২২ খ। রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে যোহর ও আছরের সালাতের মাঝখানে চল্লিশ র্যাক‘আত সালাত আদায় করবে। প্রত্যেক রাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা, দশবার আয়াতুল কুরসি, দশবার সূরা ইখলাছ, পাঁচবার সূরা ফালাক এবং পাঁচবার সূরা নাস তেলাওয়াত করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করবেন’। অত্র হাদীছটিও জাল বা বানোয়াট। ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতীয় খণ্ড. পৃ-১২২-১২৩; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদুল মাজমু‘আহ, পৃ-৪৮
৭. তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। এই বিষয়টি খুবই স্পর্শ কাতর একদিকে আমাদের নয়ন মনি নবি এর ﷺ দহিত্র। অপর পক্ষে একজন তাবেয়ী ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা যে সরাসরি এই কাজে অংশগ্রহণ করেনি। এই ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হয়নি। শীয়াগণ হত্যার জন্য তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালাউন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেয়। তারা তাকে কাফির ও ফাসিক বলেই মনে করে। আবার অনেকে আছে যারা তাকে প্রসংশা করতে করতে এই হত্যা কাণ্ড থেকে মুক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু বিষয় যেহেতু আমাদের নিকট অস্পষ্ট তাই কাউকে গালি বা অভিশাপ না দিয়ে বিচারের ভার মহান আল্লাহ উপর ছেড়ে দেই। যারা সরাসরি এই কিলিং মিশনে ছিল দুনিয়াতেই তাদের কিছু শাস্তি হয়েছে। যেমন পরবর্তীতে আল-আশতার নাখ‘য়ীর হাতে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ নির্মমভাবে নিহত হন। যখন নিহত হলেন তখন তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে রাখা হল। তখন দেখা গেল একটি সাপ এসে মাথার চারপাশে ঘুরছে। পরিশেষে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হল। ফের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে নাকের ছিদ্র দিয়ে তিনবার বের হতে দেখা গেল। তিরমিযী, ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান আলহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইতিহাস ও জীবনীর কিতাবগুলোতে দেখা যায় সালাফে সালেহীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং অনুকরণীয় কোনো ইমামের কিতাবে ইয়াযীদের উপর লানত করা বৈধ হওয়ার কথা আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি। কেউ তার নামের শেষে (রহ.) বা লা‘আনা হুল্লাহ- এ দু’টি বাক্যের কোনোটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং তিনি যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছেন, তাই তার ব্যাপারে আমাদের জবান দরাজ করা ঠিক নয়। তাকে গালাগালি করাতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু অর্জিত হবে না। তার আমল নিয়ে তিনি চলে গেছেন। আমাদের আমলের হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব তিনিই দিবেন। ইমাম যাহাবী (রহ.) ইয়াজিদ সম্পর্কে বলেন- আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালোও বাসবো না। মদ পান করা, বানর নিয়ে খেলা করা, ফাহেশা কাজ করা এবং আরও যে সমস্ত পাপ কাজের অপবাদ ইয়াযীদের প্রতি দেওয়া হয়, তা সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তাঁর চেয়ে হুসাইন যে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের বিশ্বাস হবে ইয়াযীদ মুসলিম ছিলেন। আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালোও বাসবো না। তার নামের শেষে (রহ.) বলে দোয়া করবনা। আবার লাআনা হুল্লাহ বলে অভিশাপ দিব না। তার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমরা যেহেতু উপস্থিত ছিলাম না, তাই তার ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই অধিক নিরাপদ।
৮. হোসাইনের কফিন বহন তার এই দিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে কাঠ বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা নির্মিত হোসাইনের কফিন বহন করে শোভাযাত্রা বাহির করে এবং সকল প্রকার সৌন্দর্য ও অলংকার দ্বারা সুসজ্জিত ঘোড়া পরিচালিত করে। আর এর দ্বারা তারা কারবালার ময়দানে হোসাইনের ঘোড়া ও তার দলবলের সেই দিনের অবস্থার অভিনয় করে। ৯. সাহাবি গাল দেয় এই দিনে তারা রসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবি বিশেষ করে আবূ বকর, ওমর ও ওসমানের মত খলিফাদের থেকে নিজেদেরকে মুক্ত মনে করে এবং গালি দেয়, নিন্দা করে।
ইসলামের শরীয়তে যে কোন শোকে কান্নাকাটি বা হা-হুতাশ করা, বক্ষ বিদীর্ণকরণ ও গালে আঘাত করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছ। তাই কারবালার ইতিহাস স্মরণের নামে যে সকল মাতম, মর্সিয়া, তাযিয়া মিছিল, শরীর রক্তাক্ত করাসহ যা কিছু করা হয় এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ইসলাম এ সকল কার্যকলাপের অনুমোদন দেয় না। এগুলো সন্দেহাতীতভাবে বিদআত। আর যদি এই সব কর্মকাণ্ডকে ইসলামি শরিয়ত মনে করি, তবে ইসলাম অস্বীকার করার মত পাপে আক্রান্ত হবে। তাই হোসাইন (রা.)র শাহাদাতের স্মরণে শোকের মাতম করা থেকে বিরত থেকে আল-কুরআনের আদেশ মতধৈর্য ধারণ করব। কারণ মহান আল্লাহর তার সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٣ ﴾ অর্থ : “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: ﴿ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥ ٱلَّذِينَ إِذَآ أَصَٰبَتۡهُم مُّصِيبَةٞ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦﴾ অর্থ : তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে, যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভোবে আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী।” সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৬) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: ﴿ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ ٣ ﴾ অর্থ : এবং তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” (সূরা আসর-৩)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: ﴿ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡمَرۡحَمَةِ ١٧ ﴾ অর্থ : এবং যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের ও দয়া-দাক্ষিণ্যের।”( সূরা আল-বালাদ: ১৭) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, وَٱلصَّٰبِرِينَ فِي ٱلۡبَأۡسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَحِينَ ٱلۡبَأۡسِۗ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُتَّقُونَ ١٧٧﴾ অর্থ : অর্থ-সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকী। (সূরা আল-বাকারা ২:১৭৭) তাছাড়া হাদিস সমূহে শোক পালনের জন্য নিষধ করা হইয়াছে। উম্মে আতিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘‘মৃত ব্যক্তির জন্য আমাদেরকে তিনদিনের বেশি শোক করতে নিষেধ করা হয়েছে শুধুমাত্র স্বামী মারা গেলে স্ত্রীদের জন্য চার মাস দশদিন শোক পালন করতে হয়।’’ সহিহ বুখারী : ৫৩৪১ সুতরাং হুসাইন (রা.) এর মৃত্যু হয়েছে চৌদ্দশত বছর পূর্বে কাজেই এতবছর পরও শোক পালন করা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশ অমান্য করার নামান্তর। রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি গালের উপর চপেটাঘাত করল, বক্ষদেশ বিদীর্ণ করল এবং জাহিলিয়াতের ডাকের অনুসরণ করে আহ্বান করল সে আমাদের (মুসলমানদের) অন্তর্ভুক্ত নয়।’’ সহিহ বুখারী : ১২৩৬ ও সহিহ মুসলিম : ২৯৬ অপর বর্ণনায় এভাবে এসেছে- উম্মে আতিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বাইয়াত গ্রহণকালে আমাদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যেন আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশার্থে উচ্চশব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে কান্নাকাটি না করি। সহিহ বুখারী : ১৩০৬ ও সহিহ মুসলিম : ২০৮৮ আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘‘দুটি বিষয় এমন যা মানুষের মধ্যে কুফরি বলে গণ্য হয়। বংশধারাকে কলঙ্কিত করা ও মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশার্থে উচ্চশব্দে কান্নাকাটি করা।’’ সহিহ মুসলিম : ১২১
নওরোজ একটি ফার্সি শব্দ যার বাংলা অর্থ ‘নতুন দিন’। ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে পালিত ইরানি নববর্ষ। ইহাকে ‘পারস্য নববর্ষ’ ও বলা হয়। ইরানি শীয়া মতের অনুসরীগন এই উৎসবকে পালন করে থাকে। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়।
নওরোজের ইতিহাস
কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন।
আবু রায়হান আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত বই অসারুল বাকিয়্যাহ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বিখ্যাত পারস্য লেখক তাকি যাদেহ মাদ রাজত্বকালে (৭০৮ খ্রিষ্টপূর্ব-৫৫০-৫২৯ খ্রিষ্টপূর্ব) বাবেল বা বর্তমান ইরাক, তুরস্ক, আজারবাইজান, আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানসহ এতদঞ্চলে তিনটি ঈদ পালনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঈদে নওসারদ (নওরোজ উৎসব), তার ইয়াসকাই (তিরগান বা গ্রীষ্মকালীন উৎসব) ও মেহরানকাই (হেমন্তকালীন উৎসব)। তবে নওরোজ উৎসবটি অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ ও চাকচিক্যময় আকার ধারণ করেহাখামানশি রাজত্বকালে (৫৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩৩০-৩২৭ খ্রিষ্টপূর্ব)।
আবার অনেক ঐতিহাসিকগনের মতে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলো। (ইসলামি বিশ্বকোষ, ইসলামি ফাউন্ডেশন)
নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত :
নওরোজকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইরানে বেশ কিছু বিদআতি উৎসব ও শিরকি রীতিনীত প্রচলিত আছে। নওরোজ পালনের উৎস পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সেই হতে যুগে যুগে নওরোজ উদ্যাপিত হইতেছে। এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উংসব। পারসিক কালচারে সমৃদ্ধ কাট্টা শিয়া রাষ্ট্র ইরানে এখনো ইহা জাতীয় দিবস এবং দেশের সকল অধিবাসীর মহা আনন্দ উৎসবের সঙ্গে উদ্যাপন করিয়া থাকে। সাধারণত বিশ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। এই দিন সমগ্র ইরানে ঈদ-ই নওরোজের রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। বর্তমানে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, ইরাক, জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও কম বেশী নওরোজের উৎসব পালিত হয়।
নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত তার জানার ইচ্ছা সকলের। তাদের এই উৎসব রীতিনীত জানতে পারলে খুব সহজেই আপনি বুঝতে পারবের ইহার সাথে ইসলামি শরীয়তের সম্পর্ক কতটুকু।
১. নওরোজ হলো শিয়াদের ঈদ
পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের নওরোজ হল শিয়াদের ঈদের দিন তারা এই দিনটি ঈদের চেয়েও বেশী মর্যাদা প্রদান করে থাকে। ইরানি শিয়াগণ এই উৎসবকে সবচেয়ে বড় ঈদ বলেও মনে করে। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই উৎসবের জন্য দেশটিতে অন্য যেকোনো জাতীয় উৎসবের বেশী দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে থাকে। প্রায় ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে প্রায় দীর্ঘ এক মাস। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অথচ মুসলিমদের ঈদ অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত খুশি যা ইসলামি শরিয়ত মত উদ্যাপন করা হয়। যার ফলে দুনিয়া ও আখেরত কল্যাণ লাভ হয়। মুসলিম এমন ঈদ দুটি, তৃতীয় কোন ঈদ নাই।
তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবি (ﷺ) মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্রের দিন এবং কুরবানির দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬
এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব পালন করার সুযোগ নেই। অথচ শিয়ারা নওরোজে তৃতীয় ঈদ হিসেবে উদযাবন করেছে।
২. হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ
ঘরে ঘরে নওরোজের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে উৎসব শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই এক ব্যক্তি অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে নতুন দিনের জয়গান গায়। পরনে থাকে লাল জামা ও লাল টুপি এবং মুখমণ্ডল কৃষ্ণকায়। এই ব্যক্তি কে হাজি ফিরুজ হিসাবে নাম করন করা হয়। এই ব্যক্তিই হলো, আনন্দ, উৎসব ও নতুনের আগমনি প্রতীক। হাজি ফিরুজের পাশাপাশি আমু নওরোজ বা নববর্ষ চাচাও সমান জনপ্রিয়। আমু নওরোজ ঈদের রাতগুলোতে বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। আমু নওরোজের পোশাকের রং হচ্ছে সাদার ওপরে বিভিন্ন কারুকার্য করা পোশাক, সাদা দাঁড়ি ও গোঁফ, মাথায় সাদা টুপি। আমু নওরোজের উৎস সন্ধানে দেখা যায় চমৎকার এক প্রেমকাহিনি। আমু নওরোজ এখনো তার প্রেমিকার অপেক্ষায় আছে এবং সে বিশ্বাস করে তার প্রেমিকার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।
এই সকলই পারসিক অগ্নীপুজকদের রুসম রেওয়াজ ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নাই। হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ অনেকটা খ্রিষ্টানদের ফাদারের মত।
নওরোজ উদ্যাপনের প্রস্ততি
নওরোজের আগেই ইরানিরা ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়াপড়শি ও আপনজনদের সহায়তা করেন। অনেকে আগেই পুরোনো আসবাবপত্র বা জরাজীর্ণ জিনিস ফেলে দিয়ে তারা নতুন জিনিস কেনেন। আমাদের দেশের ঈদুল ফিতরের মত নতুন জামা, কাপড়, জুতা প্রভৃতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। নওরোজের মেহমানদারির জন্য তারা ব্যাপক পরিমাণ ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে থাকেন। এ সময় স্থায়ী বাজার ছাড়াও অনেক অস্থায়ী বাজার বা মেলার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে।
ইসলামে সাথে সম্পর্ক :
যদিও শিয়াদের দাবি নওরোজ উৎসব পালনের জায়েয। আসলে ইসলামের সাথে এই উৎসবের কোন সম্পর্ক নাই। তারা এর সাথে শত শত বিদআত সৃষ্টি করে ইসলামের পোশাক দ্বারা আবৃত করছে মাত্র। ইরানি জাতির নওরোজ উৎসব পালনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামি আচার অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং “হাফতসিন” নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী।
হাফত সিন বা শিন
হাফত সিন বা সাতটি জিনিস হল নওরোজের প্রধান আকর্ষণ। এটি ছাড়া নওরোজ কল্পনাও করা যায় না।
হাফত সিন হল একটি সুসজ্জিত টেবিল যাতে সাত প্রকার খাদ্য থাকবে যাদের প্রতিটির প্রথম অক্ষর ফারসি অক্ষর সিন (س) দ্বারা গঠিত। নওরোজ শুরুর দিন কয়েক দিন আগে থেকে ইরানের পথেঘাটে বেরোলেই চোখে পড়বে হাফত সিনের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রয়ের দৃশ্য। নওরোজকালীন সময়ে এটি প্রায় প্রতিটি বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষ বা অফিস-আদালতে অপরিহার্য একটি অংশ।
যেমন : একটি টেবিলে শাম, শারাব, শিরিন, শাহদ, শামশাদ, শারবাত ও শাকায়েক রাখা হল। এই টেবিলটিই হল হাফত সিন বা শিন। এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো শাম অর্থ মোমবাতি, শারাব অর্থ মদ, শিরিন অর্থ মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য, শাহদ অর্থ মধু, শামশাদ অর্থ বৃক্ষ বিশেষ, শারবাত অর্থ শরবত ও শাকায়েক অর্থ লাল রঙের টিউলিপ জাতীয় ফুল গাছ বিশেষ।
ইসলাম আগমনের আগে নওরোজের টেবিলে সজ্জিতকরণে এগুলো ছিল অপরিহার্য উপাদান। ইসলাম আগমন করার পর লোকজন চেষ্টা করলেন প্রাচীন রীতিনীতিগুলোকে সংরক্ষণ করবেন এবং নওরোজের মত উসবকে টিকিয়ে রাখবেন। যেহেতু ইসলামে শরাব বা মদ হারাম তাই শরাবের স্থলে সেরকে নির্বাচিত করলেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে শিন দ্বারা লিখিত ও সজ্জিত সাতটি বস্তুর বদলে সিন দ্বারা প্রচলিত সাতটি বস্তু নির্বাচন করলেন।
ইসলাম আগমনের পর বা বর্তমান হাফত সিনের মূল উপাদ্য হচ্ছে, সিব, সেরকে, সামানু, সোমাক, সির, সেঞ্জেদ, সাবযেহ, সেক্কে ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন।
এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো : সিব অর্থ আপেল, সেরকে অর্থ সিরকা, সামানু অর্থ অঙ্কুরিত গম, বালি বা অন্যান্য শস্যদানা আর আটা দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন বা হালুয়া বিশেষ, সোমাক অর্থ মধ্যমাকারের গাছ বিশেষ যার ফল দেখতে মসুরের ডালের মতো, তবে সামান্য বড় ও টক, সির অর্থ রসুন, সেঞ্জেদ অর্থ দেখতে বরইয়ের মতো ফল, সাবযেহ অর্থ সবজি। সেক্কে অর্থ ধাতব কয়েন ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন। এ ছাড়া ডিম, মাছের উপস্থিতিও হাফত সিনে দেখা যায়।
যারা নওরোজ উদ্যাপন করে তাদের বিশ্বাস এগুলোর প্রত্যেকটির অভ্যন্তরে এক একটি পারিভাষিক অর্থ বিরাজমান রয়েছে, যেমন পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী চিত্র। প্রথমত বুঝতেই পারছেন এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটি কোন ধর্মীয় বিষয় নয়। যদি কেউ এর সাথে ইসলামি শরীয়তের কোন সম্পর্ক দাড় করায় তবে এই কাজ করা বিদআত। কিন্তু এ সম্পর্কে আকিদা রাখে যে, এইগুলি পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী তাহলে আর বিদআত থাকবে না। এটি কুফরি কাজ হবে। কাজেই মুসলিম হিসাবে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরানের শিয়াগন এই আমলের সাথে ধর্মকে যোগ করে শির্ক ও বিদআতেমত কাজ কাজ করছে।
চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব
ইসলাম আগমনের আগে পারশ্যবাসীর (ইরান) অধিকাংশ লোক অগ্নি পুজক ছিল। অপর পক্ষে নওরোজও তাদের বহু পুরা সংস্কৃতি। তাই অগ্নীপুজকগণ নওরোজকে স্বাগতম জানাতে চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব উদ্যাপন করে থাকে। ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন হচ্ছে ঔজ্জ্বল্য, পবিত্রতা, আনন্দ ও উৎফুল্ল এবং জীবন ও সুস্থতার প্রতীক। প্রাচীন ইরানের জনগণ চাহার শাম্বে সূরিতে হলুদাভ বিবর্ণতা, অপবিত্রতা, নোংরা, দূষিত ও যাবতীয় রোগ-শোককে অগ্নিতে বিসর্জন দেন। ফলশ্রুতিতে রক্তিমতা, প্রফুল্লতা, বর্ণিলতা, সুস্থতা ও কর্মনিষ্ঠতা অগ্নি থেকে গ্রহণ করেন। আনন্দদায়ক এই অগ্নি উৎসবে রংবেরঙের বিস্ফোরকদ্রব্য ও আতশবাজি এবং শত শত ফানুস রাতের ইরানকে আলোকিত করে।
মন্তব্য : এই ধরনের কুফরি আকিদা নিয়ে অগ্নীপুজকদের চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব করা একজন মুসলিমের পক্ষে কীভাবে সম্ভব! ইসলাম সম্পর্কে যাদের সাধারণ ধারণা আছে তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবে আশা করি।
সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতির দিন
প্রাচীন ইরানে নওরোজ উৎসব পালনের পর ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হতেন। এই দিনটি কে বলা হয়ঃ সিজদাহ বেদার বা রুযে তাবিয়াত বা প্রকৃতির দিন। বর্তমান ইরানীরা এই দিনে মরুভূমি, উন্মুক্ত প্রান্তর, ঝরনার প্রান্ত, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং অত্যন্ত আনন্দ-উৎফুল্লতা এবং হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠতেন। সঙ্গে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হয়। আবার কোনো কোনো গবেষক ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনকে বছরের প্রথম কৃষিকার্যের সূচনা দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নওরোজ উপলক্ষ্যে ভ্রমণ :
এই উৎসব নববর্ষের প্রথম তারিখ থেকে শুরু হয় এক টানা ১৩ দিন চলে। ১৩ তম দিনে ইরানিদের কেউই ঘরে থাকে না। তারা সেদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মনোরম প্রাকৃতিক স্পটে সময় কাটান। বিশেষ করে উদ্যান, ঝর্ণা, পাহাড়, পার্ক- এসব স্থানে তারা চাদর বিছিয়ে বা তাঁবু খাটিয়ে খোশগল্প করে এবং মজাদার খাবার খেয়ে সময় কাটান। আগেই উল্লেখ করেছি, নওরোচ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানে ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে এক মাস। এই সুযোগে ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। অনেকে এ উপলক্ষ্যে পবিত্র কোম শহরে তাদের ইমাম রেজার বোন মাসুমার মাজারে যান, কেউবা ইরাকে ইমাম হোসাইনর মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন।
উপহার বা বখশিশের প্রচলন
নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়।
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলা নববর্ষ যেমন বাঙালি হিন্দুদের উৎসব, ইংরেজি নববর্ষ যেমন খ্রিষ্টানদের উৎসব ঠিক তেমনি নওরোজ হল প্রাচীর পারস্যের অগ্নীপুজকদের উৎসব। ইরানের ইসলামি নামধারী শিয়ারা যতই ইসলামের লেবাস লাগিয়ে নওরোজ উদ্যাপন করুক না কেন কোন অবস্থায়ই ইসলামি শরীয়ত সমর্থন করবে না।
কাজেই শিয়াদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদাসমুহ নিজে জানার পর অপর কে জানান, যাতে করে সকল মুসলিম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকিদা-বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। এবং শিয়াদের মিথ্যা বর্ণনাসমূহ, আকিদা, বিশ্বাস এবং তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ক হেফাজত থাকতে পারে। হে মহান আল্লাহ, এই সামান্য খেদমত টুকু কবুল করে আমাদের সকল কে নাজাত দান করুন। আমিন
বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যা মতবিরোধ বা ফির্কাবাজি। সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পার ইসলামের মুল অনুসারী মুসলিমগণ আজ বিচ্ছিন্ন হয়ে কেন শত শত দল বা ফির্কার বিভক্ত হয়ে আছে। এদের মাঝে সঠিক ও সত্যপন্থী দল খুজে বের করে তাদের অনুসরণ করা ফরজ। কিন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হলো যদ দল বা ফির্কা সমাজে প্রচলিত আছে তারা সকলেই নিজেদের সঠিক ও সত্যপন্থী দল বলে দাবি করে। কিন্তু সকল দলই সঠিক ও সত্যপন্থী হবে, এমন বিশ্বাস কেউই রাখে না। কাজেই সত্যপন্থী দল আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এই লক্ষে নিন্মের হাদিসগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫২, ৩৬৫১, ৬৪২৯, ৬৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৫৩৩
মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত-
عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَا يَزَالُ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِيْ ظَاهِرِيْنَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ ظَاهِرُوْنَ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে। এমনকি যখন ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) আসবে তখনও তারা বিজয়ী থাকবে। সহিহ বুখারি : ৩৬৪০, ৭৩১১, ৭৪৫৯, সহুহ মুসলিম : ১৯২১
ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ফজরের নামযের পর আমাদেরকে মর্মস্পশী ওয়াজ শুনালেন, যাতে (আমাদের) সকলের চোখে পানি এলো এবং অন্তর কেঁপে উঠলো। কোন একজন বলল, এ তো বিদায়ী ব্যক্তির নাসীহাতের মতো। হে আল্লাহর রাসূল! এখন আপনি আমাদেরকে কি উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার এবং (নেতৃআদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। সুনানে তিরমিজি ২৬৭৬, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২
এ হাদিসগুলো মূল বক্তব্য একত্রে কলে দাড়ায়-
১. একটি মাত্র দল নাজাত প্রাপ্ত এবং সেই দল হবে নবি (সা.) ও সাহাবীদের অনুসারি।
২. সাহাবীগণ ও তাদের পরে দুই যুগ (তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়ি) হকের উপর তাকবে।
৩. বিভ্রান্তির যুগে খোলাফায়ে রাসেদিনদের কর্মকে মানদণ্ড হিসেবে ধরতে হবে।
৪. উপরের বর্ণিত বৈশিষ্ট্য সম্বলিত দলটি কিয়ামত পর্যন্ত বিজয় থাকবে এবং এটিই সেই নাজাত প্রপ্ত দল।
নাজাতপ্রাপ্ত দলের নাম :
উপরের বর্ণিত হাদিসে একটি দলকে নাজাতপ্রাপ্ত দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। উম্মতের সকলেই সেই দলটির অন্তর্ভুক্ত হতে চাই। সমার মনে প্রশ্ন সেই দলের নাম কি? তাদের বৈশিষ্ট কেমন? কিভাবে আমারা সেই দল চিহিৃত করে তার অন্তর্ভুক্ত হব। এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুজব। উম্মার মাঝে ব্যপকভাবে প্রচলিত আছে সেই দলটি হলো- আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ)।এ কারণে সবাই নিজেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচয় প্রদান করতে সাচ্ছন্দ বোধ করে। “আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত” বলতে বোঝায় সেই মুসলিম গোষ্ঠী, যারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ইসলামের মূল শিক্ষাগুলি অনুসরণ করে এবং সাহাবাদের পথ ও চেতনার অনুসারী। তারা বিভিন্ন বিভাজন ও গোমরাহি থেকে দূরে থেকে উম্মাহর ঐক্য ও সত্যের ধারক।
শব্দের ব্যাখ্যা:
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বাক্যটি চারটি শব্দের নিয়ে গঠিত-
أَهْلُ (আহলু) – “পরিবার” বা “গোষ্ঠী” অর্থে।
السُّنَّةِ (আস্-সুন্নাহি) – রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথ বা শিক্ষা।
وَ (ওয়া) – “এবং” (সংযোগের জন্য ব্যবহৃত)।
الْجَمَاعَةِ (আল-জামাআতি) – “সম্মিলিত দল” বা “সমাজ”। পারিভাষিক অর্থে অনেকে এই জামআত বলেত সাহাবীদের জামাআতকে বুঝিয়েছেন।
এই চারটি শব্দ একত্রে করলে দাড়ায়-
أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ
অর্থ : সুন্নাহ বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথে পরিচালিত সেই দল বা গোষ্ঠী, যারা ঐক্যবদ্ধ এবং মূলধারার ইসলামী শিক্ষার অনুসারী। অর্থাৎ, যারা মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে এবং বিভক্তি বা দলবাজি থেকে বিরত থাকে।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হলো সেই দল, যারা:
(১) কুরআন ও হাদীসের অনুসরণে অটল।
(২) সাহাবা (রাযি.) এবং তাবেয়ীনদের পথকে সঠিক পথ হিসেবে গ্রহণ করে।
(৩) বিভিন্ন বিদআত (ধর্মে নতুন সংযোজন) ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে মুক্ত থাকে।
(৪) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং সত্য ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
অনুবাদ: তারা হলো সেই গোষ্ঠী, যারা কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহীন (সাহাবা ও তাদের অনুসারীরা) এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী অনুসরণ করে, বিদআত ও বিভক্তি থেকে দূরে থাকে, এবং সত্যের পতাকাতলে মুসলিমদের ঐক্যের দিকে আহ্বান জানায়।”
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত মানে সেই মুসলিম সম্প্রদায় যারা ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি অটল থেকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহ ও সাহাবাদের ঐতিহ্য ধরে রাখে এবং উম্মাহর ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মূলধারার মুসলিমদের মধ্যে নাজাতপ্রাপ্ত দলটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই পরিচিতি ব্যবহারের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে-
১. আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত-কে “নাজাত প্রাপ্ত দল” বলা হয় কারণ এই দলটি কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী তাদের আকিদা ও আমল পরিচালনা করে। এ বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবগুলো দল জাহান্নামে যাবে, শুধুমাত্র একটি দল ব্যতীত। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল! সেই দলটি কারা?’ নি বললেন: ‘যারা আমার এবং আমার সাহাবাদের পথ অনুসরণ করবে। সুনান তিরমিজি : ২৬৪১
এই হাদিসটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নসিহত। এতে বলা হয়েছে, আখিরাতে নাজাত পেতে হলে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবাদের পথ অনুসরণ করেত হবে। বাস্তবেও দেখি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআল এর অনুসারিগন সাহাদের পথকেই নিজেদের পথ হিসেবে গ্রহন করেছেন। বাতিল ফির্কা শিয়া, রাফেজি, খারেজিদের মত সাহাবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। এটি একটি প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ পথ হিসেবে স্বীকৃত, যা বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে দূরে।
২. ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত নামে পরিচিত দলটি মূলধারার প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এটি মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং ঐক্যের প্রতীক।
৩. বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর মতবাদ ও ফির্কা ইসলামে রয়েছে, যেমন খারিজি, শিয়া, মুতাজিলা ইত্যাদি। নিজেদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষ বোঝাতে চায় যে তারা ভ্রান্ত পথের অনুসারী নয়।
৪. “আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত” শব্দটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি মাধ্যম। এটি বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং ইসলামের মূল শিক্ষা ও আকিদার প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।
৫. অনেকেই এই পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের ধর্মীয় অবস্থানকে সুদৃঢ় এবং মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে চান। এটি তাঁদের কাছে একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিচয়।
৬. তবে, এই পরিচয় ব্যবহার কখনো কখনো ফির্কা সৃষ্টির কাজে লাগান হয়েছে। অনেক সময় মূলধারার মুসলিমগণও বাতিল নতুন ফির্কা সৃষ্টি করে তার নাম দিয়েছে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত। কখনো কখনো এই নামটি রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে যা ইসলামের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এই পরিচয়ের প্রকৃত অর্থ এবং তা প্রয়োগের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) বা নাজাতপ্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-
মুসলিম বিশ্বে ব্যপকভাবে প্রচলিত নাজাত প্রাপ্ত দলের নাম ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ)। এ কারণে সকল দল ও মতের মানুষ যখন ফির্কা বা দলের সৃষ্টি করে তখন তারা নিজেদের দলের বা ফির্কার নাম ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দিয়ে নিজেদের সঠিক বা সত্যপন্থী দল হিসাবে দাবি করে। কোনো কোনো ফির্কা অন্য নাম দিয়ে ফির্কা বা দলের সৃষ্টি করলেও নিজেদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ অন্তর্ভুক্ত দাবি করে। কেননা, নাজাতপ্রাপ্ত দলে মানেও ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’।
হকপন্থী বা বাতিলপন্থী সকলে হাদিসগুলোর আলোকে নিজেদের ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দাবি করে। কিন্তু হাদিসের ভবিষ্যৎ বানী বলে দেয় সকলে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ অন্তভূক্ত থাকবে না। ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এর যারা অনুসারি হবে তাদের সংখ্যা অন্যদের থেকে কম হবে। কিয়ামতের কঠিন বিপদের সময় মুক্তি পেতে হলে এই নাজাতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী দলের মধ্য অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। তাই সঠিক দল নির্বাচন করা খুবই কঠিন। ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ নাম দিলেই সঠিক বা সত্যপন্থীদল হিসবে পরিগনিত হবে না। নাজাতপ্রান্ত বা সত্যপন্থী দল হতে হলে সত্যি কারের ইসলামের অনুসরী হতে হবে। এমন কি ভিন্ন নামের একাধীক দল ও ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দলের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যদি কিনা তারা কুরআন সুন্নাহর সঠিক অনুসারী হয়। নাম নয় তাদের আমল আখলাক বা বৈশিষ্ট্যের জন্যই তারা ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা নাজাতপ্রাপ্ত দল হয়ে থাকে।
এই নাজাতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এ অন্তর্ভুক্ত হতে হলে প্রথমেই তাদের পরিচয় বা তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর তাদের অনুসারী হবে হবে। সকলে যদি তাদের বৈশিষ্ট্য দেখে অনুসরণ করে, তবে সত্যিকার ইসলামের অনুসারি মুসলীমদের মাঝে একতা সৃষ্টি হবে এবং ফির্কা বা বিভক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অত্র অধ্যায় ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দলের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব, যাতে সহজে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা নাজাত প্রাপ্ত সঠিক দল নির্বাচন করতে সহজ হয়। এখান কুরআন সুন্নাহর আলোকে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এর কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করব, ইহাই তাদের সকল বৈশিষ্ট বলা যাবে না। ইহার বাহিরে আরও বৈশিষ্ট আছে। পরবর্তী অলোচনায় ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা নাজাত প্রপ্ত দলের কিছু বৈশিষ্ট তুলে ধরা হল। এক নজরে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১। বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী হবে
২। তাওহিদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা থাকবে-
৩। কুরআন ও সহিহ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে
৪। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী হবে
ক) কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ
খ) সাহাবীদের সম্মান ও অনুসরণ
গ) তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের অনুসরণ
ঘ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না-
ঙ) শর্তসাপেক্ষে আমিরের অনুসরণ
৫। ইবাদতের গুরুত্ব প্রদান ও ভারসাম্য রক্ষা করে
৬। গাইরুল্লাহ ইবাদত থেকে নিজেকে দূরে রাখবে
৭। বিদআত মুক্ত আমল করবে
৮। দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত ও জিহাদে সতেষ্ট হবে
৯। মাবন রচিত শরীয়ত পরিপন্থী আইন ও বিচারের বিরোধিতা করে
১০। দ্বীন পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন
১১। জামায়াতবদ্ধ থাকা/ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া।
ঈমান (إِيمَانٌ) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অর্থ বিশ্বাস। ইসলামি পরিভাষায়, ঈমান বলতে এমন এক শক্তিশালী বিশ্বাস বোঝায় যা মৌখিক স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং তদনুযায়ী আমল করা।
ঈমানের তিনটি স্তর-
ক। অন্তরের বিশ্বাস-
মহান আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক আনিত দ্বীনকে অন্তর থেকে সঠিক হিসেবে বিশ্বাস করা।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই এবং আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সহিহ বুখারি : ৮৩১, ৫৩, ১২০২, ৬২৩০, সহিহহ মুসলিম : ৪০২
কেননা প্রায় শতভাগ নও মুসলিমকে এই কালিমা পাঠ করিয়ে মুসলিম করা হয়ে ছিল।
গ। কর্মে প্রকাশ-
ঈমানের চুড়ান্ত প্রকাশ হল আল্লাহর আদেশ মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা।
১। ঈমানের রুকন ছয়টি-
কুরআন, সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলেমগণ হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন । ঈমানের এই ছয়টি মূল ভিত্তি হলো–
(১) আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস
(২) ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস
(৩) কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস
(৪) রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস
(৫) শেষ দিবস ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস
(৬) তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস।
নোটঃ অনেক গবেষক আলেম শেষ দিবস ও পরকাল আলাদা আলাদা উল্লেখ করে, ঈমানের রুকন সাতটি বলে উল্লেখ করেছেন।
২। উপরের এই বিষয় সম্পর্কিত কুরআন ও সহহি হাদিসের বর্ণনাসমূহ-
হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসূলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরী করলোসে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো, (সুরা নিসা :১৩৬)।
রাসূল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনগণও ! এরা প্রত্যেকে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবে, তাঁর রাসূলগণে বিশ্বাস স্থাপন করে, (সুরা বাকারা ২:২৮৫)
আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমীনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভেজা এবং না কোন শুষ্ক কিছু; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে। সুরা আনআম : ৫৯
উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি আমাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করলেন। ধবধবে সাদা তাঁর পোশাক। চুল তাঁর কুচকুচে কালো। না ছিল তাঁর মধ্যে সফর করে আসার কোন চিহ্ন, আর না আমাদের কেউ তাকে চিনতে পেরেছেন। তিনি এসেই নবী ﷺ এর নিকট বসে পড়লেন। নবী ﷺ এর হাঁটুর সাথে তাঁর হাঁটু মিলিয়ে দিলেন।
তাঁর দু’হাত তাঁর দুই উরুর উপর রেখে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলুন, অর্থাৎ ইসলাম কি?
উত্তরে তিনি (ﷺ) বললেন, ’’ইসলাম হচ্ছে- তুমি সাক্ষ্য দিবে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রসূল, সালাত কায়িম করবে, জাকাত আদায় করবে, রমাযান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।’’ আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন।’’ আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম একদিকে তিনি রসূল ﷺ কে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করলেন, আবার অপরদিকে রসূলের বক্তব্যকে (বিজ্ঞের ন্যায়) সঠিক বলে সমর্থনও করলেন।
এরপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ’’আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি (ﷺ) উত্তর দিলেন, ঈমান হচ্ছে- আল্লাহ তা’আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ এবং পরকালকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এছাড়া তাক্বদীরের উপর, অর্থাৎ- জীবন ও জগতে কল্যাণ-অকল্যাণ যা কিছু ঘটছে, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে এ কথার উপর বিশ্বাস করা। উত্তর শুনে আগন্তুক বললেন, ’’আপনি ঠিকই বলেছেন’’।
অতঃপর তিনি আবার বললেন, ’’আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।’’ তিনি (ﷺ) বললেন, ইহসান হচ্ছে, ’’তুমি এমনভাবে আল্লাহর ’ইবাদাত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছো। আর তুমি যদি তাকে না-ও দেখো, তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখছেন’’।
আগন্তুক এবার বললেন, ’’আমাকে ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) সম্পর্কে বলুন।’’ উত্তরে তিনি ﷺ বললেন, ’’এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি প্রশ্নকারীর চাইতে অধিক কিছু জানেন না।’’ আগন্তুক বললেন, ’’তবে কিয়ামতের (কিয়ামতের) নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে বলুন।’’ তিনি ﷺ বললেন, কিয়ামতের নিদর্শন হলো, দাসী তাঁর আপন মুনীবকে প্রসব করবে, তুমি আরো দেখতে পাবে- নগ্নপায়ী বিবস্ত্র হতদরিদ্র মেষ চালকেরা বড় বড় দালান-কোঠা নিয়ে গর্ব ও অহংকার করবে।’’ উমার (রাঃ) বললেন, অতঃপর আগন্তুক চলে গেলে আমি কিছুক্ষণ সেখানেই অবস্থান করলাম। পরে তিনি ﷺ আমাকে বললেন, হে ’উমার! প্রশ্নকারী আগন্তুককে চিনতে পেরেছো?’’ আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, ’’ইনি হচ্ছেন জিবরাইল (আ,)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন’’। সহিহ মুসলিম মুসলিম : ৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬৯৫, সুনানে নাসায়ি : ৪৯৯০, সিহহ আত তারগীব : ৩৫১, আহমাদ : ৩৬৭।
৩। কুরআনের আলোকো বিশুদ্ধ ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা
আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগী করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে৷ আর যারা এরপর কুফরী করবেতারাই ফাসেক ৷ সুরা নুর : ৫৫
পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবে এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।
সূরা নাহল: ৯৭
(৯) ঈমান আনলে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর রবকত সমূহের দুয়ার খুলে দিবেন।
যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর রবকত সমূহের দুয়ার খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ লাভ। সূরা আরাফ : ৯৬
এ ঈমানদার পুরুষ ও নারীকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদেরকে তিনি এমন বাগান দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহমান হবে এবং তারা তার মধ্যে চিরকাল বাস করবে৷ এসব চির সবুজ বাগানে তাদের জন্য থাকবে বাসগৃহ এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে৷ এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। সুরা তাওবা : ৭২
ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার বান্দার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। চৃড়ান্তভাবে ঈমারের বদৌলতে তিনি তার বান্দাকে নাজাত দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
৩। সহিহ হাদিসের আলোকো বিশুদ্ধ ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা-
(১) উসমান (রাযিঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
যে ব্যক্তি অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করলো যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৭, শুআবুল ঈমান : ৯৪
(২) আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
একবার জিবরীল (আ.) আমাকে বললেন, আপনার উম্মাত থেকে যদি এমন ব্যাক্তি মারা যায়, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে নাই, তবে সে ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে কিংবা তিনি বলেছেন, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, যদিও (সে যিনা করে ও চুরি করে)। সহিহ বুখারি : ৩২২২
(৩) আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।
আবূ আবদুল্লাহ বলেন, আবান (রহ.) বর্ণনা করেছেন, আনাস (রা.) হতে এবং তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে নেকী এর স্থলে ’ঈমান’ শব্দটি রিওয়ায়াত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪৪
(৪) সুহায়ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯
(৫) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ), ‘নূহ (আঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর দুই ছেলেকে অছিয়ত করে বলেন-
আমি তোমাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (বলার) আদেশ করছি। কেননা সাত আসমান এবং সাত যমীনকে যদি মীযানের এক পাল্লায় রাখা হয় আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তাহ’লে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র পাল্লা বেশী ভারী হবে। যদি সাত আসমান এবং সাত যমীন নিরেট গোলাকার বস্ত্ত হয়, তাহলেও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে’। সিলসিলা আহাদিস আস সহিহহা : ১৩৪, আহমাদ : ৭১০১
(৬) আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে প্রশ্ন করা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০
আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। বান্দা তার নাম, সিফাত এবং কর্মাবলীর ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করা। ভাল মন্দ, লাভ লোকসান সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত ও সঙ্ঘটিতব্য সকল ঘটনা অনুঘটনা এক মাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং তাঁর ইশারাতেই হয়ে থাকে। এখানে অন্য কোন মাধ্যম ও কার্যকারণের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। প্রত্যেক মানুষ সকল বিষয়কে উপরোক্ত বিশ্বাসের আলোকে বিচার করবে। এটিই হচ্ছে মূলত তাওহীদের সার কথা। আর প্রভূত্ব, ইবাদাত, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের অস্তিত্বকে প্রমাণ করা হল তাওহীদ। সুতরাং এক মাত্র তারই ইবাদাত করবে। যে ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবে না। আর যে ব্যক্তি তাওহীদের শিক্ষা ও তাৎপর্য বাস্তবায়ন করলো সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাকে কোনোই শাস্তি পেতে হবে না। শিরক ও বিদআত হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মারঅস্ত্র। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার তাওহীদ বা একত্ববাদের কথা মহা গ্রন্থ আল কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে তুলে ধরছেন। আল্লাহর মারোফাত বা পরিচয়ের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ কয়েকটি আয়াতগুলো দেওয়া হলো-
অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত (এ আয়াতটি কে আয়াতুল কুরসী বলা হয়)।
অর্থ: তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই। যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব জানেন। তিনি মহান এবং পরম করুণাময়। তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনিই সার্বভৌম, পবিত্র, শান্তি উৎস, ঈমানের বিধায়ক, নিরাপত্তার রক্ষক, পরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, সর্বশ্রেষ্ঠ। মহিমা আল্লাহ্র। তারা আল্লাহ্র সম্বন্ধে যে শরীক আরোপ করে তিনি তার উর্দ্ধে। তিনিই আল্লাহ্ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, আকৃতির রূপকার, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা হাশর : ২২-২৪
তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা, তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমন্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়াতে (প্রভুত্বে), উলুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না। নিম্মে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের সমষ্টিই হল তাওহীদ।
১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব
২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক
৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম
বুঝার জন্য বিষয় তিনটিকে আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করা হল:
(১) তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব:
আল্লাহকে তার কর্ম সমুহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক, রিজিক দাতা, জীবন- মৃত্যু দাতা এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষি নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান। সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগন এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল। যেমন-
অর্থ : তিনিই পৃথিবীর সকল বস্তু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। উপরন্তু তার পরিকল্পনা আকাশকেও অন্তর্ভূক্ত করে, তিনি সপ্ত আসমান তৈরির কাজকে সুষম করেন। সকল বিষয় সম্বন্ধে তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। সুরা বাকারা : ২৯
আল্লাহ তায়ালা একক সৃষ্টিকর্তা হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল:
আল আনাম : ১৭৩-১০১; আর রাদ : ১৬; আল আম্বিয়া : ৩৩; মুমিনুন : ১২-১৪; আন নুর : ৪৫; আল ফুরকান : ২; লোকমান :১০; আর রহমান : ১৪-১৫
অর্থ : বল, “হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্ ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান কর, এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছে কর ক্ষমতা কেড়ে নাও। যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত কর, এবং যাকে ইচ্ছা তুমি অসম্মানিত কর। সকল কল্যাণ তোমার হাতেই। নিশ্চয়ই তুমি সবার উপরে সর্বশক্তিমান। সুরা ইমরান : ২৬
আল্লাহ তায়ালা একমাত্র মালিক হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল: আন আন নিসা- ৫৩; আল মায়িদা- ১৭৬; আন নাহল-৭৩; বনী ইসরাইল-১১১; সাবা-২২; ফাতির-১৩; জুমার-৪৩; যোখরুফ-৮৬; আল ফাতহ- ১১-১৪। মুমিনুন ২৩: ৮৮-৮৯)।
অর্থ: নিসন্দেহ এটা নির্ভুল সত্য বৃত্তান্ত ৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ আর আল্লাহর সত্তা প্রবল পরাক্রান্ত এবং তার জ্ঞান ও কর্মকৌশল সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় সক্রিয়। সুরা আল ইমরান : ৬২
নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা: সূরা আল বাকারা-১৬৩ & ২৫৫; আন নিসা-১৭১; আল মায়িদা-৭৩; আল আনআম-৪৬; আল আ’রাফ-৬৫; ইব্রাহিম-৫২; আন নাহল-২২ &৫১; বনী ইসরাইল-২২; আল ক্বাহফ-১১০; আল আম্বিয়া ১০৮; আল হাজ্জ-৩৪; আল মোমেনুন-৯১; আন নামল-৬০; আল কাছাছ-৭১; সাদ-৬৫; মীম সিজদাহ-৬ যোখরুখ৮৪; আত তূর-৪৩।
০২. তাওহীদে উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা-
ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে তাওহীদুল উলুহিয়াহ বলা হয়। বান্দার যাবতীয় ইবাদাত সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলোয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদির এক মাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তষ্টির জন্য করা। সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিরংকুশ করা।
এই তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবী রাসুল প্রেরন করছেন। তারা এসে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।
আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সূরা আম্বিয়া : ২৫
অর্থ: ‘আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরা মুমিনুন : ১৭
অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা বনী ইসরাইল : ৫৭
মজার বিষয় হলো- মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়াহতে বিশ্বাসী হলেও কাফির-
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়াহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?
তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ। বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন? তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯
তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না? সুরা ইউনুস ১০:৩১
এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।
আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে উরশ করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। সুরা ইউসুফ : ১০৬
এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত না। কিন্তু ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে।
সুরা ফিলের সানে নুযুল থেকে পাই, বাদশা আবরাহা যখন কাবা ধ্বংস করার জন্য আসে তখন তার অগ্রবাহিনী তিহামার অধিবাসী ও কুরাইশদের উট , ছাগল , ভেড়া ইত্যাদি বহু পালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবেরও দু’ শো উট ছিল। এরপর সে মক্কাবাসীদের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠায়। তার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের কাছে এই মর্মে বাণী পাঠায় : আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি শুধুমাত্র এই ঘরটি ( কাবা ) ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে । যদি তোমরা যুদ্ধ না করো তাহলে তোমাদের প্রাণ ও ধন – সম্পত্তির কোন ক্ষতি আমি করবো না। তাছাড়া তার এক দুতকেও মক্কাবাসীদের কাছে পাঠায়। মক্কাবাসীরা যদি তার সাথে কথা বলতে চায় তাহলে তাদের সরদারকে তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। আবদুল মুত্তালিব তখন ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার। দূত তাঁর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি বলেন , আবরাহার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। দূত বলে , আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন এবং দূতের সাথে আবরাহার কাছে যান। তিনি এতই সুশ্রী , আকর্ষণীয় ও প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে , আবরাহা তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে সিংহাসন থেকে নেমে এসে নিজে তাঁর কাছে বসে পড়ে। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে , আপনি কি চান ? তিনি বলেন , আমার যে উটগুলো ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলো আমাকে ফেরত দেয়া হোক। আবরাহা বলল , আপনাকে দেখে তো আমি বড়ই প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন , অথচ এই যে ঘরটা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না , আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন , আমি তো কেবল আমার উটের মালিক এবং সেগুলোর জন্য আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি । আর এই ঘর। এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা জবাব দেয় , তিনি একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বলেন , এ ব্যাপারে আপনি জানেন ও তিনি জানেন । একথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে পড়েন । আবরাহা তাঁকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দেয়। আবরাহার সেনাদলের কাছ থেকে ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে বলেন , নিজেদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর চলে যাও , এভাবে তারা ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তারপর তিনি ও কুরাইশদের কয়েকজন সরদার হারম শরীফে হাযির হয়ে যান। তারা কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতে থাকেন যে , তিনি যেন তাঁর ঘর ও তাঁর কাদেমদের হেফাজত করেন। সে সময় কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। কিন্তু এই সংকটকালে তারা সবাই এই মূর্তিগুলোর কথা ভুলে যায়। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য হাত ওঠায় । ইতিহাসের বইগুলোতে তাদের প্রার্থনা বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিবের নিম্নোক্ত কবিতাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন
“ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো। আগামীকাল তাদের ক্রুশ ও তাদের কৌশল যেন তোমার কৌশলের ওপর বিজয় লাভ না করে । যদি তুমি ছেড়ে দিতে চাও তাদেরকে ও আমাদের কিবলাহকে তাহলে তাই করো যা তুমি চাও। সুহাইলী ‘ রওযুল উনুফ’ গ্রন্থে এ প্রসংগে নিম্নোক্ত কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন : ক্রুশের পরিজন ও তার পূজারীদের মোকাবিলায় আজ নিজের পরিজনদেরকে সাহায্য করো। ”
আবদুল মুত্তালিব দোয়া করতে করতে যে , কবিতাটি পড়েছিলেন ইবনে জারীর সেটিও উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছে :
“হে আমার রব ! তাদের মোকাবিলায় তুমি ছাড়া কারো প্রতি আমার আশা নেই, হে আমার রব ! তাদের হাত থেকে তোমার হারমের হেফাজত করো । এই ঘরের শত্রু তোমার শত্রু , তোমার জনপদ ধবংস করা থেকে তাদের বিরত রাখো। ”
এ দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীরাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে দিন আবরাহা মক্কায় প্রবশে করার জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় ঝাঁকে ঝাকে পাখিরা ঠোঁটে ও পাঞ্জার পাথর কণা নিয়ে উড়ে আসে । তারা এ সেনাদলের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকে। যার ওপর পাথর কণা পড়তো তার দেহ সংগে সংগে গলে যেতে থাকতো। (তাফসীরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআনের সুরা ফিলের তাফসির।
ঘটনা বলার উদ্যেষ্য হল মক্কার মুসরিকদের রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি ইমান কত পাকা ছিল শুধু একথাটা বুঝানোর জন্য। আবদুল মুত্তালিবের বক্তব্য দেখুন “আর এই ঘর, এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হিফাজত করবেন।“ “ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো।“ আল্লার রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) প্রতি বিশ্বাস কত মজবুত ছিল।
যদি কোন ব্যক্তি রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্রে এ কথা শত ভাগ বিশ্বাস ও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলা এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সকল কিছুর তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন কিন্তু তিনি ইবদতের ক্ষেত্রে আংশিক বা পূর্ন ভাবে অংশিদারত্ব স্থাপন করেন তবে সে মুশরিক।
কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অর্থাত আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। মক্কার মুশরিকরা এ কথা ভালো করেই জানত। তাই তারা এই কলেমা স্বীকার করেনি। কিন্তু বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম কালিমায়ে তাইয়্যবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর সঠিক অর্থ না জেনে, কালিমাকে স্বীকার করে এবং সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে। মক্কার মুশরিকগণ আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে স্বীকার করে হজ করত, বাইতুল্লাহ তাওয়াব করত কিন্তু যখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) দাওয়াত দেওয়া হল তারা বুঝতে পারল। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। তারা আল্লাহ স্বীকার করার পরও লাত, মানাত, উজ্জসহ বহু মুর্তির পুজা করত, আল্লাহ সাথে শিরক করত। কিন্তু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) তাদের ঐ সকর মুর্তির ইবাদত অস্বীকার করে বিধায় তারা এই কলেমা গ্রহণ করে নাই।
তৎকালিন মুশরিক আবু জাহেল, ওতবা, সায়বা, আবু লাহাব, রাবিয়া, উবাইয়া বিন খলফসহ সকলে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এই কলেমাকে অস্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করেছিল। আর আমরা এই কলেমা স্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করছি।
বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমানদের অবস্থা জাহিলিয়াতের যুগের মুসলিমদের অবস্থার তুলনায় অনেক খারাপ। বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম এ কালিমার বিশুদ্ধ অর্থ সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখে না। পক্ষান্তরে তৎকালীন যুগের আরবরা কালিমার অর্থ কি তা জানত ও বুঝত, কিন্তু তারা তাতে বিশ্বাস করত না। আনেক দাওয়াত দান কারিকে দেখবেন কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ করে আল্লাহ ছাড়া কোন প্রতিপালক নেই। অর্থাৎ আমার হায়াতের মালিক, মৌয়তের মালিক, রিজিকের মালিক, সব কিছুর মালিক এক মাত্র আল্লাহ। কিছু থেকে কিছু হয়না সব কিছু আল্লাহ থেকে হয়। তারা কেন অধিকাংশ মুসলিমই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর এই অর্থ ও ব্যাখ্যাই করে, তারা প্রকৃত পক্ষে এ কথার সত্যিকার অর্থ কি, তা জানে না। ভুলটা কোথায় একবার দেখুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ হবে: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্যিকার) উপাস্য নাই’। আর আমরা অর্থ করছি: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব (প্রতিপালক) নাই’। তা হলে কথা দাড়াল আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ সম্পূর্ণ উল্টা ও বিপরীত জানি। আমরা ইলাহ এর অর্থ করছি রব (প্রতিপালক) কিন্তু ইলাহ এর অর্থ উপাস্য (ইবাদতের মালিক)। মক্কার কুফরেরা বিশ্বাস করত যে, এ জগতের একজন স্রষ্টা আছে, যার কোন শরিক নাই, কিন্তু তারা আল্লাহর সাথে ইবাদাতে অসংখ্যা শরিক সাব্যস্ত করত কেননা তাদের শরিকগণ মহান আল্লাহর নিকট তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে। আল্লাহকে স্বীকার করার পর তার নিকট সুপারিশ পেতে গাইরুল্লাহ ইবাদত করার করা শিরকেরই নামান্ত। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের এ বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে গাইরুল্লাহর ইবাদাত বলে আখ্যায়িত । তারা বিশ্বাস করত রব এক কিন্তু তারা এ ও বিশ্বাস করত যে উপাস্য অসংখ্য।
মক্কার মুশরিকগন ইবাদাতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত এই আশায় যে তাদের উপাস্যরা তাদের কে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে অর্থাৎ সুপারিশ করবে৷ যখনই জিজ্ঞাসা করা হত তোমরা কেন এক বাদ দিয়ে অসংখ্য উপাস্যের ইবাদাত করছ। তারা জবাব দিত, এই সকল উপাস্যই আমাদের আল্লাহ নিকটবর্তি করে দিবে।
জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। সুরা জুমার : : ০৩
অর্থ: এ লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করছে তারা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না৷ আর তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী ৷ হে মুহাম্মাদ ! ওদেরকে বলে দাও, “তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের খবর দিচ্ছো যার অস্তিত্বের কথা তিনি আকাশেও জানেন না এবং যমিনেও না!” তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পাক -পবিত্র এবং তার উর্ধে৷ সুরা ইউনুস : ১৮
লক্ষ করুন, আরবের মুশরীকেরা আল্লাহর তাওহীদের সঠিত অর্থ বুঝেছির কিন্তু স্বীকার না করে হজ্জের মওসুমে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধত, তালবিয়া পড়ত, কাবা ঘরের প্রভুর ইবাদাত করত, কাবা ঘর তাওয়াব করত, হাজিদের পানি পান করাত, আল্লাহ কাছ চাইত (সুরা ফিলের শানে নুযুল), সাফা মারওয়া সাই করত, দান সদকা করত। এসবগুলি রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পরিচয় বহন করে। আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পর ও কি তাহাদের ঠিকানা জাহন্নাম? জী, হ্যা। কারন তারা প্রভুর ইবাদাতে শরীক বা অংশীদার স্থাপন করছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের একটি মাত্র উপায় আ তা হল মানুষকে এ কালিমার দাওয়াত দিতে হবে এবং এ কালিমার মর্মার্থ সঠিক ভাবে তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দিন। আমিন।
(৩) তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম:
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতির হল :
আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুনগুলি আচরনগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম
তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর নামসমূহ (আসমা) এবং গুণাবলির (সিফাত) প্রতি একত্ববাদের ভিত্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিকভাবে গ্রহণ করা, কোনো পরিবর্তন, বিকৃতি, অস্বীকার বা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা না করা।
তাওহীদে আসমা (নামসমুহ):
আসমা বা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ, যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো আল্লাহর সত্তার বিশেষ দিক নির্দেশ করে। এগুলো আল্লাহর সত্তাকে নির্দেশ করে এবং কুরআন ও হাদিসে উল্লেখিত নামগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহ্র অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০
আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মনে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, ৬৪১০, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৫০৮
আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে নিরাপত্তা চায়, তাকে নিরাপত্তা দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে ভিক্ষা চায়, তাকে দাও। যে ব্যক্তি তোমাদেরকে দাওয়াত করে তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তোমরা তার উত্তম প্রতিদান দাও। প্রতিদান দেয়ার মতো কিছু না পেলে তার জন্য দু’আ করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমরা অনুধাবন করতে পারো যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো।
ইহা ছাড়া অসংখ্যা সহিহ হাদিসে আল্লাহর নামে নিয়ে সকল কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে। অজুর শুরুতে, খাওয়ার শুরুতে, জবেহ করার শুরুতে, শিকার করার শুধুতে আল্লাহ নাম নিতে বলা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সবসময় (بِاللَّهِ) বিসমিল্লাহ ব্যবহার করা হয়।
আসমা বা আল্লাহ নাম সম্পর্কে আমাদের আকিদা হবে-
১. আল্লাহর নামের অর্থে বিকৃতি না করা (تَحْرِيف)
আল্লাহর নামগুলোর প্রকৃত অর্থ পরিবর্তন করা বা বিকৃত করা সম্পূর্ণ হারাম।
উদাহরণ: “আর-রহমান” (পরম দয়ালু) নামকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।
২. আল্লাহর নামকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা না করা (تَشْبِيه)
আল্লাহর নাম বা গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।
অর্থ: “তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”
(সূরা আশ-শুরা: ১১)
৩. আল্লাহর নাম অস্বীকার না করা (تَعْطِيل)
আল্লাহর নাম সম্পূর্ণ অস্বীকার করা বা তা মানতে অস্বীকৃতি জানানো নিষিদ্ধ।
৪. আল্লাহর নামের প্রকৃত অর্থে সন্দেহ না করা (تَكْيِيف)
আল্লাহর নাম বা গুণাবলির বাস্তব রূপ বা কেমন তা জানতে চেষ্টা করা উচিত নয়। আমরা কেবল কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট অর্থে তা গ্রহণ করব। যেমন- আল্লাহ “শোনেন” (সামীউন), কিন্তু তাঁর শ্রবণ সৃষ্টির মতো নয়।
আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমা-উল-হুসনা):
নাম (আরবি)
বাংলা উচ্চারণ
বাংলা অর্থ
اللَّهُ
আল্লাহ
একমাত্র উপাস্য
الرَّحْمَٰنُ
আর-রহমান
পরম দয়ালু
الرَّحِيمُ
আর-রহিম
পরম করুণাময়
الْمَلِكُ
আল-মালিক
সর্বশক্তিমান শাসক
الْقُدُّوسُ
আল-কুদ্দুস
একেবারে পবিত্র
السَّلَامُ
আস-সালাম
শান্তি দানকারী
الْمُؤْمِنُ
আল-মু’মিন
নিরাপত্তা দানকারী
الْعَزِيزُ
আল-আজিজ
পরাক্রমশালী
الْغَفَّارُ
আল-গফফার
অতিশয় ক্ষমাশীল
الْوَدُودُ
আল-ওয়াদুদ
অগাধ ভালোবাসার অধিকারী
الرَّزَّاقُ
আর-রায্জাক
রিজিক দানকারী
الْعَلِيمُ
আল-আলীম
সর্বজ্ঞ
السَّمِيعُ
আস-সামী
সর্বশ্রোতা
الْبَصِيرُ
আল-বাসীর
সর্বদ্রষ্টা
الْحَكِيمُ
আল-হাকীম
প্রজ্ঞাময়
التَّوَّابُ
আত-তাওয়াব
অনুতপ্তদের ক্ষমাকারী
الشَّكُورُ
আশ-শাকুর
কৃতজ্ঞতা গ্রহণকারী
الْكَرِيمُ
আল-করিম
মহা উদার
الرَّؤُوفُ
আর-রউফ
অত্যন্ত দয়ালু
الْجَبَّارُ
আল-জাব্বার
মহা ক্ষমতাবান
الْخَالِقُ
আল-খালিক
স্রষ্টা
الْبَارِئُ
আল-বারি
সৃষ্টির আদর্শ রূপদানকারী
الْمُصَوِّرُ
আল-মুসাওয়ার
রূপকার
তাওহীদে সিফাত (গুণাবলি):
তাওহীদে সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর গুণাবলির প্রতি সঠিক বিশ্বাস স্থাপন করা, যা কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত। আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা না করা এবং তা বিকৃত বা অস্বীকার না করা। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে, যা আল্লাহ নিজে কুরআনে বলেছেন বা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহর সিফাতের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে উদাহরণ তুলে ধরা হলো :
১. আল্লাহ সর্বশ্রোতা (সামি‘)
কুরআনের দলিল:
“إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ”
অর্থ: “নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। সূরা আশ-শোআরা : ২২
২. আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা (বাসীর)
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا”
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। সূরা আন-নিসা : ৫৮
আল্লাহ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহ্ফুজে লিখেন, যা আরশের উপর তাঁর নিকট আছে। নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রবল। সহিহ বুখারি : ৩১৯৪, ৭৪০৪, ৭৪১২, ৭৪৫৩, ৭৫৫৩, ৭৫৫৪, সহিহ মুসলিম : ২৭৫১, আহমাদ ৯৬০৩
৫. আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু
আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ তাহকীক সানী (হাঃ ২৩৩৬)
সিফাত সম্পর্ক আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো-
১. তাতিল (অস্বীকার না করা):
আল্লাহর কোনো গুণ অস্বীকার করা যাবে না।
২. তাহরিফ (বিকৃতি না করা):
আল্লাহর গুণাবলির অর্থ বিকৃত করা নিষিদ্ধ।
৩. তাকইফ (কিভাবে তা হয়, তা নির্ধারণ না করা):
আমরা জানি না আল্লাহর গুণাবলি কীভাবে কাজ করে।
যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।
অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত কুরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে তাদের আকিদা (বিশ্বাস) এবং আমল প্রতিষ্ঠা করে। তাদের আকিদা নিম্নোক্ত মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা তাওহিদ (একত্ববাদ) বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং একমাত্র উপাস্য। আল্লাহর কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তাঁর গুণাবলি (সিফাত) তাঁর সত্তার সাথে সংগতিপূর্ণ। রিসালাত সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস আল্লাহর রাসূলগণ তাঁর নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরিত। সকল রাসুলগণই হক ও সত্যের উপর থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশেষ নবি এবং তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবে না (খাতামুন নাবিয়্যিন)। তারা আখিরাত তথা মৃত্যুর পরে জীবনের, কিয়ামতের দিন, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর এবং বিচার দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। তাদের বিশ্বাস কিয়ামতের দিন আমল ও বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ হবে। তাদের বিশ্বাস কুরআন আল্লাহর কালাম এবং এটি বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা এবং জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা। তারা সাহাবাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কনে ও তাদের অনুসরণ করা। তাদের মধ্যকার বিভেদ নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনা না করা। তাদের শুধু প্রশংসা করে, সমালোচনা এড়িয়ে চলে। তারা তাকদির বা আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণের প্রতি বিশ্বাস। ভালো ও মন্দ সবই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত এবং তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে। ইবাদতে ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করে এবং ধর্মে কোনো নতুন সংযোজন বা পরিবর্তনকে বিদআত (নবপ্রবর্তিত কর্ম) হিসেবে পরিহার করা। এই জামাত উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং অযথা বিভেদ সৃষ্টি না করা থেকে বিরত থাকাকে ফরজ মনে করে।
এই হলো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদার মূল ভিত্তি। কিন্তু কালের আবর্তনের ফলে তাদের মাঝেও অনেক ভ্রান্ত আকিদা প্রবেশ করেছেন। যার ফলে মূল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারিগণ দূরে সরে গিয়েছেন। ভ্রান্ত আকিদা ধারণকারী নতুন ফির্কা সৃষ্টি করে নতুন নামকরণ করলেও তারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারী দাব করে থাকে।
মজার বিষয় হলো, তাদের এই ভ্রান্ত আকিদা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এর থেকে আলাদা হলেও তারা নিজের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় ধারণ করে আছে। এই জামাতের সহিহ আদিকা সম্পর্কে বহু কিতাব রচিত হয়েছে। আকিদা জানতে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সে সকল কিতাব পাঠ করতে পারেন। আমি এখানে যারা ভ্রান্ত আকিদা ধারণ করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় দেয় তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যাতে এই ভ্রান্ত আকিদা দেখলেই বুঝতে পারবেন এরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।
যদি কেউ নিম্নের ভ্রান্ত আকিদাগুলি ধারণ করে, প্রচার করে ও বিশ্বাস করে তবে বুঝবেন তারা এই সঠিক, সত্যপন্থি, মুক্তি প্রাপ্ত দল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা একটি ভ্রান্ত ধারণার অনুসারী। যদিও তারা দাবি করে আমরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী কিন্তু ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাস করার কারণ তারা বাতিল ফির্কা। নিম্নে সতর্ক করার জন্য বাতিল ফির্কার কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুল ধরছি। যাতে সহজে বুঝতে পারেন, এই সব বাতিল ফির্কা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নাম ব্যবহার করে তাদের ভ্রান্ত আকিদা প্রচার ও প্রসার করেছে। নিম্নে তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা হরা হলো-
১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।
তারা আল্লাহর যথাযথ সম্মান করেন না। কিয়ামাত দিবসে সমস্ত পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুষ্টিতে এবং আকাশমণ্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। সুরা জুমার : ৬৭
তিনি বললেন, হে ইবলিস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন? সুরা সোয়াদ : ৭৫
সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহ্বান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েই স্বীয় রবের নিকট অভিযোগ করল। জান্নাত বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ব্যাপারটি কী যে তাতে শুধু নিঃস্ব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই প্রবেশ করবে। এদিকে জাহান্নামও অভিযোগ করল অর্থাৎ আপনি শুধু অহংকারীদেরকেই আমাকে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহ্ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আমার রহমত। জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার আজাব। আমি যাকে চাইব, তোমাকে দিয়ে শাস্তি পৌঁছাব। তোমাদের উভয়কেই পূর্ণ করা হবে। তবে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো উপর জুলুম করবেন না। তিনি জাহান্নামের জন্য নিজ ইচ্ছানুযায়ী নতুন সৃষ্টি করবেন। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নাম বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? জাহান্নামে আরো নিক্ষেপ করা হবে, তখনো বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? এভাবে তিনবার বলবে। অবশেষে আল্লাহ তাঁর পা জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তখন জাহান্নামের একটি অংশ অন্য অংশকে এ উত্তর করবে- আর নয়, আর নয়, আর নয়। সহিহ বুখারি : ৭৪৪৯
কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারণা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোনো সৃষ্টির আকারে সৃষ্টি করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোনো কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের গ্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সবদ্র্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নয়। কাজেই আল্লাহ তায়ালার কাছে আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩
এ সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উক্তিটি যথার্থ। তিনি বলেন-
আল্লাহর ইয়াদ (হাত) আছে, ওয়াজহ (মুখমন্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলো উল্লেখ করেছেন। কুরআনে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন- মুখমন্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তাঁর বিশেষণ, কোনো ‘স্বরূপ’ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর বিশেষণ বাতিল করা। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারিয়া ও মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ, কোনো স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ, আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনো ‘কাইফ’ বা ‘কীভাবে’ প্রশ্ন করা ছাড়াই।
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, আল ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃ-২২৫
কাজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর কোন নির্দিষ্ট আকার দেয়া বা তাকে নিরাকার সাব্যস্ত করা, দু’টিই কবিরা গুনাহ অন্তর্ভুক্ত।
২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারেফাত বা পরিচয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধি আর কল্পনা দ্বারা মানব সত্তার অবস্থানের মত অবস্থান কল্পনা করা যাবে না। তিনি কোথায় সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন আমাদের জন্য ওয়াজিব। এই সম্পর্কে কিছু বলার আগে কুরআনের কিছু আয়াত দেখেনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। সুরা ত্বহা : ৫
যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর। সুরা ফুরকান : ৫৯
আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে অবগত, সে ব্যাপারে তুমি কি সচেতন নও? যখনই তিন ব্যক্তির মধ্যে কোন গোপন কানাঘুষা হয়, তখন সেখানে আল্লাহ অবশ্যই চতুর্থজন হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ যখনই পাঁচজনের মধ্যে গোপন সলাপরামর্শ হয় তখন সেখানে ষষ্ঠ জন হিসেবে আল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন৷ গোপন সলাপরামর্শকারীরা সংখ্যায় এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক, এবং তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন৷ তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা কি কি করেছে৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ৷ সুরা মুজাদালা : ৭
পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ১১৫
ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি আমাদের সাথে আছি, সবরকারীদের সাথে আছি, মুত্তাকিদের সাথে আছি, মুমিনদের সাথে আছি।
প্রথম দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন। পরের দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সাথে আছেন। তাহলে এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা কী?
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি বলেন-
তিনি নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। সুরা হাদীদ : ৪
ভাল করে লক্ষ করুন হাদীদের এই আয়াতের প্রথমে আল্লাহ তায়ালা বললেন, তিনি আরশের উপর সমুন্নত আছেন এবং এই আয়াতই তিনি বললেন, আমাদের সাথে আছেন। তাহলে আল্লাহ কি আত্মভোলা (নাউজুবিল্লাহ)। এ আয়াতের তাফসির আয়াতেরই শেষাংশ আর তা হল, আল্লাহ সব কিছু দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টির সাথে আছেন। অর্থাৎ তিনি সপ্ত আসমানের উপর অবস্থিত আরশের উপর থেকেই সব কিছু দেখছেন, সব কিছু শুনছেন, সকল বিষয়ে জ্ঞাত আছেন।
সাথে থাকার অর্থ, গায়ে গায়ে লেগে থাকা নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মূসা ও হারূন আ. কে ফেরাউনের নিকট যেতে বললেন, তারা ফেরাউনের অত্যাচারের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন। আল্লাহ তাদের সম্বোধন করে বললেন, ‘‘তোমরা ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। শুনছি এবং দেখছি। সুরা ত্বহা : ৪৬ এখানে সাথে থাকার অর্থ এটা নয় যে, মূসা আ. এর সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউনের দরবারে গিয়েছিলেন। বরং সাথে থাকার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করছেন এই বলে যে, ‘‘শুনছি এবং দেখছি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশে আছেন বলেই, কুরআন পৃথিবীতে নাজিল করা হয়েছে এবং মিরাজে রাসূল ﷺ কে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করান। তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজ মান হলে জিবরাইল আ. এর মাধ্যমে কুরআন নাজিল করার প্রয়োজন ছিন না। মিরাজেও ঊর্ধ্বাকাশের গমনেন প্রয়োজন ছিল না। অতএব আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ হলো জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে, আর স্ব-সত্তায় তিনি আরশের উপর রয়েছেন।
তা হলে প্রশ্ন হল ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান’ কথাটা কি সঠিক?
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান” বাক্যটির অর্থ যদি হয় ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” তা হলে কথাটি সরাসরি বাতিল। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতা দ্বারা সর্বত্র বিরাজমান তাহলে সঠিক হবে। আমরা শত শত কিলোমিটার দুর থেকে লাইভ টেলিকাস্ট দেখি আর ভাবি এত আমার চোখের সামনেই ঘটছে। কারণ আমার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ঐ ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত।
সুরা বাকারার ১১৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরবীদ হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনু কাসীর রহ. বলেন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে কোন জায়গা শূন্য নেই, এর ভাবার্থ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ইলম’ বা অবগতি হয় তাহলে অর্থ সঠিক হবে, যে কোন স্থানেই আল্লাহ পাকের ইলম হতে শূন্য নেই। আর যদি এর ভাবার্থ হয় ‘আল্লাহ তা আল্লাহ সত্তা’ তবে এটা সঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে, তার সৃষ্টি জীবের মধ্য হতে কোন জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন তা থেকে তার পবিত্র সত্তা বহু ঊর্ধ্বে। তাফসিরে ইবনে কাসির প্রথম খণ্ড পৃ-৩৭২
আবু মুতি আল হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ আল বালাখি রহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেউ যদি বলে, আমি জানি না আল্লাহ্ কোথায় পৃথিবীতে না আসমানে,তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন সে কাফির। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। (সুরা ত্বহা ২০:৫)। আবু মুতি বলেছেন, অতঃপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করে ছিলাম যে কেউ যদি বলে, আল্লাহ উপরে অধিষ্ঠিত কিন্তু আমি জানিনা আরশ কোথায় অবস্থিত, আকাশে না পৃথিবীতে। তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন, সে ব্যক্তি কাফির কেননা সে এ কথা অস্বীকার করে যে, ‘পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। আল ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃষ্ঠা -২৬১; ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ.
কুরআন, সহিহ হাদিস ও সালাফদের উক্ত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। কিন্তু তিনি স্বভাবগত ভাবে, সাত আসমানের উপর আরশে আযীমে সমুন্নত। আর এটাই হল বিশুদ্ধ আকীদা। আল্লাহ সম্পর্কে এর বিকল্প চিন্তা করা শিরকের মত কবিরা গুনাহ।
৩। রাসুলুল্লাহ ﷺআমাদের মত মানব ছিলেন না।
ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ ﷺআমাদের মত মানব ছিলেন না।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।
বলুন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহি করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে। সুরা আল কাহাব : ১১০
(হে নবি) বলুন, আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস। সুরা হা-মিম-সিজদা : ৬
কুরআনের আয়াতগুলিতে স্পষ্ট ঘোষণা রাসুল ﷺ আমাদের মতই একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ ﷺ কে নবি ও রাসুল বানিয়ে সর্বোউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা আসনে বসিয়েছেন। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ মহা মানব না বলে, অতি মানব বা মানুষ ছিলেন বলা কবিরা গুনাহে অন্তর্ভুক্ত।
৪। রাসুলুল্লাহ ﷺআল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺআল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ¦ারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই জানেন মানুষ কে তিনি কোন উপাদানে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-
আমি মানুষকে তৈরি করেছি মাটির উপাদান থেকে। সুরা মুমিনুন : ১২
মানুষ মাটির তৈরি এ সম্পর্কিত আরও আয়াত: সুরা আল ইমরান : ৫৯, সুরা আনাম : ২, সুরা আরাফ : ১২, সুরা সাফফাত : ১১, সুরা সোয়াদ : ৭১, ৭৫, ৭৬।
আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সৃষ্টি করছেন নুর দিয়ে, জিনদের সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা থেকে (সুরা আর রহমান : ১৫)। আর মানুষকে সৃষ্টি করছেন মাটির উপাদান থেকে। প্রত্যেক সৃষ্টির উপাদান আলাদা, তাই সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য ও আলাদা। মানুষ হিসেবে তাদের কিছু মানবিয় বৈশিষ্ট্য ও আছে। যেমন- খাবার গ্রহণ করা, পিপাসার জন্য পানি পান করা, বিবাহ করা, সন্তানের জন্মে দেওয়া, বাজারে গমন করা, দুনিয়াবি বিভিন্ন কাজে অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। এই মানবিয় বৈশিষ্ট্যগুলি ও তাদের মধ্যে ছিল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নুরের তৈরি এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আবী হানীফা, মুআত্তা মালিক, মুসনাদ আহমাদ, মিশকাত প্রভৃতি গ্রন্থ কোন হাদিস নাই। চার ইমামসহ ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরের মধ্যে কেউ কোন হাদিস গ্রন্থ নুর সম্পর্কে কোন হাদিন লিপিবদ্ধ করে নাই। হাদিস সংকলনের ৫০০ বছরের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা লিখবেন অথচ পূর্বের কোন কিতাবের রেফারেন্স দিবেন না, তা কি করে হয়? মনে রাখবেন হাদিস সংকলনের ৫০০ বছর পর কেউ কোন কথা লিখলে বা বললে তাকে অবশ্যই কিতাবের রেফারেন্স দিতে হবে। তা না হলে সে যে কথাটি লিখল বা বলল তা অবশ্যই তার নিজস্ব মতামত বা জাল কথা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহর নূরে তৈরি হয়েছে এ কথাটা খুবই বিপদ জনক, ইসলামে থাকা না থাকার প্রশ্ন। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নূর। যদি এ অর্থে বলা হয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর, তাহলে তা কুরআন বিরোধী, কারণ কুরআনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি আল্লাহর সত্তা নূর। তাহলে রাসুল ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর হওয়ার তো কোন প্রশ্ন আসে না।
যদি কেউ বলে রাসুল ﷺ কে আল্লাহর স্বভাবগত নূর থেকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহলে তো বলা হল রাসুল ﷺ স্বয়ং আল্লাহর সত্তা। তাহলে তার সুস্পষ্ট মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহই রাসূল এবং রাসূলই আল্লাহ। আর এটা যে প্রকাশ্য কুফর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যদি বলা হয়, রাসূল আল্লাহর জাতি নূর মানে হুবহু আল্লাহর সত্তা নন, বরং তাঁর সত্তার অংশ বিশেষ, তাহলে এর পরিষ্কার মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহর সত্তায় রাসূল অংশীদার। অথচ এটা যে প্রকাশ্য শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৫। আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।
মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছুই নয়। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথাযথ পুরস্কার দেবেন। আলে ইমরান : ১৪৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ
নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা জুমার : ৩০
আর তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷ আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷ সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫
আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর মারা গেছেন কিনা এ সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?
সুতরাং যদি বিশ্বাস করি কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয়েছে তবে তা হবে কুরআন বিরোধী শিরকি বিশ্বাস। মৃত্যুর পরে এবং পুনূরূত্থানের পূবের্র জীবনকে বলা হয় ‘বারযাখি জীবন’। ‘বারযাখি হায়াত’’ সময়টাকে আমরা সকলে কবরে অবস্থানের সময়কে বুঝিয়ে থাকি। এই জীবনের কবি, শহিদ, মুসলিম, অমুসলিম সকলে জীবিত। কেননা, কবর আজাব সত্য। অপর পক্ষে নবি ও শহিদের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা আছে। কিন্তু তাদের হায়াতকে ‘বারযাখী হায়াত’ না বলে, পৃথিবীর মত স্বাভাবিক জীবন আছে মনে করা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। কাজেই ‘বারযাখি হায়াত’ এর রেফারেন্স দিয়ে যদি বলা হয়, আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়াগর মৃত্যু নাই। তাহলে নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে।
আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম, ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না। আমি তো শুধু একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা ইমানদারদের জন্য। সুরা আরাফ : ১৮৮
অর্থ: বল, “আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না। আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী। তার সৃষ্টিজগতের কাউকে তিনি এই বিষয়ে ভাগ প্রদান করেন নাই। এই সম্পর্কিত কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করা হল-
এই সকল আয়াতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসুলুল্লাহ ﷺ কে পরিস্কারভাবে ঘোষণা দিতে বললেন যে, তুমি বল আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখি না। আমাদের রাসুলুল্লাহ ﷺ যেখানে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না, সেখানে সাধারণ একজন অলি, আওলিয়া বা পিরের পক্ষে কীভাবে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখবেন। অদৃশ্যের জ্ঞান রাখা আল্লাহ একক গুণের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহর এই আদেশ কাউকে দেওয়া হয়নি, এমন কি আমাদের প্রাণ প্রিয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুর মুহাম্মদ ﷺ কেও না। অন্যান্য নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগরতো অনেক দূরের কথা। কাজেই কুরআনের বিরোধী আকিদা প্রষোণ করা নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋতুমতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,
কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবি রাসুলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিঃসন্দেহে শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।
৮। রাসুলুল্লাহ ﷺসর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺসর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।
এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহির মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য। সুরা হুদ : ৪৯
মুহাম্মদ ﷺ কে গায়েবের বিষয় ওহির মাধ্যমে জানতে হত। তিনি সর্বত্র সবদ্রা হাজির নাজির থাকলে ওহির জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না।
আর তোমাদের আশপাশের মরূবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদ্বীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আজাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আজাবের দিকে। সুরা তওবা : ১০১
মুহাম্মদ ﷺ এর চার পাশে অনেক মুনাফিক লোক ছিল। তিনি তাদের চিনতেন না। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন কে কে মুনাফিক ছিল। যদি তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকতেন তবে মুনাফিকের কার্যকলাপ দেখতে পেতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক তাকে আর অবহিত করার প্রয়োজন ছিন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি দ্বারা সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির। কুরআনের আয়াতগুলো প্রমাণ করে মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ এই গুণটি দান করেন নাই। বরং তিনি তার প্রয়োজন মাফিক অহি করে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর এই গুণের সাথে অন্য কোন নবি, রাসুল, ওলি, আওলিয়াকে যুক্ত করলে বড় শির্কে পতিত হবে যা কবিরা গুনাহ থেকেও ভয়াবহ।
৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।
দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। আল্লাহকে কোন দৃষ্টিশক্তি আয়ত্ত করতে পারবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকুল আবেদন জানালো, হে প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো৷ তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পারো না৷ হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও। সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে অবশ্য তুমি আমাকে দেখতে পাবে৷ কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো৷ সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললো, পাক-পবিত্র তোমার সত্তা৷ আমি তোমার কাছে তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন৷ সুরা আরাফ : ১৪৩
সুস্পষ্ট আয়াতের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, পৃথিবীতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে একটি সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয় নি, যাতে তিনি বলেছেন ‘আমি জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে বা মিরাজে চর্ম চক্ষে আল্লাহকে দেখেছি। নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়া, পীর, বুজুর্গ, আধ্যাত্মিক গুরু যে কেউই দাবি করতে পারে যে, সে দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখেছেন। দাবি করা আর বাস্তবতা ভিন্ন কথা। আল্লাহ তায়ালা কে নবি মুসা আ. দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু পারেন নাই। তার পরও যদি কেউ দাবি করে বা বিশ্বাস করে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ দেখা সম্ভব তবে তার শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে।
১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না।
আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮
আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূণর্রূপে তার ইচ্ছাধীন। এক শ্রেণীর মুশরিকগণ চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবিগণ, রাসুলগণ, ফেরেতাগণ বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করতে পারবেন। সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুমতি।
দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরির গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোনো প্রকারের সুপারিশের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-
আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাযয়্যিনাহ : ৬
এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই। আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ করা হবে। সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম সুপারিশের অনুমতি পাবেন।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের নেতা হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০
আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩
রসুলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবি রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন
আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সুরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়স্তÍ পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সুরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সুরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪
নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২
১১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।
হেদায়েতের এক মাত্র মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এই সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। নিচের সহিহ হাদিসটি দিকে লক্ষ করুন-
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ 🙂 তাঁর পিতা (রা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে নবি ﷺ তার কাছে গেলেন। এসময় আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াও সেখানে বসা ছিল। নবি ﷺ বললেন, হে চাচা! আপনি পড়ুন ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আপনার মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এটা দলিল হিসেবে পেশ করব। এ কথা শুনে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়াহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করে দিবে? নবি ﷺ বললেন, হে চাচা! আমি আপনার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ ক্ষমা চাইতে থাকব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়-
নবি ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয় যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামি, সুরা তওবা-১১৩। সহিহ বুখারি : ৪৬৭৫
উক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝতে পারি, ব্যক্তিগত ভালবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে যদি কোন ব্যক্তির হেদায়াত লাভ করত তাতে তিনি ছিলেন আবু তালেব। কিন্তু তাকে হেদায়াত দান করার শক্তি যখন নবি ﷺ কে দিলেন না, তা হলে একথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, কাউকে হেদায়াত দান করা বা কাউকে হেদায়াত বঞ্চিত করা নবি ﷺ ক্ষমতার বাইরে। এবং বিষয়টি সম্পূণর্রূপে আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন। সুরা কাসাস : ৫৬
যদি কেহ মনে করে তার পীর, শাইখ বা মুরুব্বি তাকে হিদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তবে হিদায়েততো দূরের কথা তার ইমানই চলে যাবে। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।
১২। কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো– কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা শিরক।
আর কিছু লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর রহমতে ইমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সুরা বাকারা : ১৬৫
বল, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত’। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। সুরা তওবা : ২৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালবাসা, এমনই এক ভালবাসা যার আবেদন অনেক ব্যাপক, যা পরিপূর্ণ বিনয় এবং সর্বাত্মক আনুগত্যকে অনিবার্য করে। আল্লাহ প্রতি ভালবাসা হলো, তাকে সর্বশক্তিমান জেনে তার প্রতিটি হুকুম আহকামে সর্বাত্মক আনুগত্য প্রদর্শন করা। এই ভালবাসা প্রকাশ পায় তার ইবাদতের মাধ্যমে। যদি তার সর্বাত্মক আনুগত্য ও ইবাদতে অন্যকে শরিক করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে তিনি যে ভালবাসা পাওয়ার কথা তা দিতে বান্দা ব্যর্থ। বান্দার এই ব্যর্থ ভালোবাসাই কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
একজন ইমানদারের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্য সবার সন্তুষ্টির ওপর অগ্রাধিকার লাভ করবে। কোনো কিছুকে এমন মর্যাদার আসনে সমাসীন করবেনা যেন আল্লাহ প্রতি ভালোবাসার কমতি দেখা যায়। আর এটাই হচ্ছে আকিদা বিশ্বাসের মৌলিক উপাদান ও মেরূদণ্ড। আল্লাহ প্রতি ভালবাসা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হলো, তার রসুল ﷺ এর তার উপর নাজিলকৃত দ্বিনের পরিপূর্ণ অনুসরণ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
হে নবি! লোকদের বলে দাও, ‘যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন ৷ তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সুরা আল ইমরান- : ৩১
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছের তার প্রতি ভালোবাসার মান দণ্ড। যদি কেউ দাবি করে আমি আল্লাহকে ভালোবাসি তাহলে তাকে প্রমাণ হিসাবে রসুল ﷺ এর তার উপর নাজিলকৃত দ্বিনের পরিপূর্ণ অনুসরণ দেখাবে হবে। যদি কেউ রসুল ﷺ কে অনুসরণ না হবে আল্লাহ ভালোবাসার দাবি করে তবে সে মিথ্যাবাদী।
১৩। দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একক মালিক মহান আল্লাহ, এ জন্য তার কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন নাই।
বল, ‘আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিজিক দেন? অথবা কে শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? কে সব বিষয় পরিচালনা করেন’? তখন তারা আবার বলবে, ‘আল্লাহ’। সুতরাং, তুমি বল, ‘তারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না’? সুরা ইউনুস : ৩১
খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের বিশ্বাস আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেহেতু একা সেহেতু তার একার পক্ষে পুরো বিশ্বজগৎ পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মুয়াল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজির ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাওছুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে প্রায় ৪০ জন আল্লাহ তায়ালার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। আর আওলিয়া দ্বারা সৃষ্ট জীবের হায়াত, রুজি, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মানো ও মুছিবত বিদূরণের কার্য সম্পাদন করেন। মৃতগণ কবরে শ্রবণ, দর্শন ও উপলব্ধি করে থাকেন। তাদের শ্রবণ ও দর্শন যদিও সব সময় থাকে, কিন্তু জুমুয়ার দিনে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সাধারণ মৃত ব্যক্তিরাও কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া যিয়ারাতকারীদের সাথে কথা বলে। এই সবই শিরকি কথা ইহার সাথে কুরআন সুন্নাহর কোন সম্পর্ক নাই। যা কিছু বল হয়েছে সবই ভণ্ড সুফিদের বানান কথা মাত্র। এ সব কুফরি কথা কে শুধু কবিরা গুনাহ বললে ভুল হবে।
এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। সুরা রাদ : ২
১৪। গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করা।
তারা কি আল্লাহর দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু তালাশ করছে? অথচ আসমানসমূহ ও যমিনে যা আছে তা তাঁরই আনুগত্য করে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় এবং তাদেরকে তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন করা হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৩
এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা। সুরা নিসা : ১৩
১৫। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পাওে না।
বল, ‘নিশ্চয় অনুগ্রহ আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে চান, তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’। সুরা আল ইমরান : ৭৩
সমস্ত প্রাচুযের্র ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হাতে। যদি কেউ সমান্যও বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে তবে শির্কে আকবর হবে