যে সকল দিবস উদযাপণ করা হারাম-০২ :: ইংরেজী নববর্ষ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমাদের দেশে নববর্ষ হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। তেমনি ১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে উৎসবের মেজাজে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে। কিছু জাতি যেমন চীনা, ইহুদি, মুসলমান প্রভৃতির মধ্যে নিজ নিজ ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষ পালন করতে দেখা যায়। আজ কাল ০১ জানুয়ারির যে ইংরেজী  নববর্ষ উদযাপন করা হয় তা নতুনই বলা চলে। কারণ বেশীদিন হয়নি যখন থেকে এই তারিখ সর্বজনীনভাবে নববর্ষ হিসেবে গৃহীত হয়ে আসছে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে বছরের শুরু হয় জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হলোঃ ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রোগোরির এক আদেশ অনুসারে এই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন ঘটে। সেই বছর কিছু রোমান ক্যাথলিক দেশ গ্রেগোরিয় বর্ষপঞ্জী গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে ক্রমশ অন্যান্য দেশসমূহেও এটি গৃহীত হয়। আর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করে ১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন তারা তাদের ক্যালেন্ডার থেকে ১১ দিন বাদ দেয়। তাই ১৭৫২ সালের ক্যালেন্ডারে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর এই ১১ টি দিন পাওয়া যায় না।

বিশ্বের যে সকল দেশ এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে সিভিল ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা সবাই ইংরেজি নববর্ষ পালন করে থাকে। তবে অনেক দেশই ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করার পূর্বে নববর্ষের রীতিটি গ্রহণ করেছে। যেমনঃ ১৫৫৬ সালে স্পেন, পর্তুগাল, ১৫৫৯ সালে সুইডেন, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স, ১৬০০ সালে স্কটল্যান্ড, ১৭০০ সাল রাশিয়া,  ১৭৫২ সাল ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ব্রিটিশ কলোনিগুলো, এই রীতি অনুসরণ শুরু করে। কিন্তু ইসরায়েল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে থাকলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। আবার কিছু কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করেনি। যেমনঃ সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া এবং আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। আমাদের ব্যবহৃত বর্তমান ইংরেজী ক্যালেন্ডারটি ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’।

প্রায় সারাবিশ্বে প্রচলিত ইংরেজী ক্যালেন্ডার এখন ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। ইংরেজী নববর্ষের শুরু হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২-টা ০১ মিনিটে। আর তখন থেকেই শুরু হয় আতশবাজি, বাদ্য-বাজনা, নাচ-গান, যুবক-যুবতীর ফ্রি স্টাইল ফূর্তি। উল্লাস আর বেলেল্লাপনায় কেটে যায় সারাটি রাত। রাতের গুরুত্বপূর্ণ যে সময়টিকে তারা টগবগে যৌবনের লাগামছাড়া নেশা মেটানোর সময় হিসাবে বেছে নিয়েছে সে সময়টিতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারী ১১৪৫ তাওহীদ, ১০৭৯ ইফাঃ)

মহান স্রষ্টার আহবানকে উপেক্ষা করে যারা শয়তানের আহবানে রাত জাগে, তাদের পরিণাম আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। তিনিই সুক্ষ বিচারক।

বাংলা নববর্ষ এবং ইংরেজী নববর্ষ উদযাপনের মধ্য একটু পার্থক্য আছে। বাংলা সংস্কৃতির আবহে, বাংলা নববর্ষকে গানের মাধ্যমে দিনের শুরুতে আহবান করা হয়। আর ইংরেজী নববর্ষ শুরু হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২-টা ০১ মিনিটে। এই রাতকে থার্টি ফাষ্ট নাইট হিসাবে পালন করা হয়। রাত বারটি বাজার সাথে সাথে বিশ্বের নাম করা সব শহরে আতঁশ বাজির ঝলসানিতে চোখ ঝাঝিয়ে দেয়। তারা এর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে থাকে। পৃথিবীতে এক সাথে এত বেশী আতঁশ বাজি করা হয় না। ক্ষনিকের আনন্দ উপভোগে এত টাকা খরচ করাকে অপচয় ছাড়া কিছু নয়। বাংলা নববর্ষকে দিনের বেলায় স্বাগতম জানন হয় কিন্তু ইংরেজী নববর্ষ উদযাপনের সময়ই হল নিজ নিজ দেশের মধ্য রাত। এরপর যারা এই দিনটিকে ঘটা করে পালন কর তারা হল বিধর্মী। পর্দা কি, অশ্লীলতা কাকে বলে, যৌনতা কি? এসব তাদের ডিকসনারীতেই নাই। কাজেই ইংরেজী নববর্ষ মানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা, সাথে মদের আসর। বড় বড় হোটেলে পার্টির আয়োজন বা ড্যান্স বারের নর্তকীদের উদ্দাম নাচ। যা হোন এ সব অশ্লীশ কাজতো আর আমাদের ধর্মের কোন সমস্যা করে না। তারা যে ধর্মের অনুসরণ করে সেই ধর্ম মতে কতটুকু শুদ্ধ আর কত টুকু অশুদ্ধ তা তাদের বিষয়। আমাদের নাক গলানোর কিছু নাই। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। আজ কার ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন আর তাদের বিষয় নয়। কারন আমাদের দেশে এখন ইংরেজী নববর্ষ বেশ জোর শোরে পালিত হচ্ছে।

ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন করা হারামঃ

বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলা নববর্ষ থেকে ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন একটু আলাদা। বাংলা দেশের অধিকাংশ মুসলিম হওয়াতে বাংলা নববর্ষ কিছুটা শালীনতা আছে। কিন্তু ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন করে থাকে অধিকাংশই বিধর্মী যাদের নিকটি অশ্লীলতা, যৌনতা ও মাদকতা কোন পাপ নয়। এই দৃষ্টি কোন থেকে বুঝা যায় ইসলামি শরীয়তের আলোকে বাংলা নববর্ষ থেকে ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপনে কতটা বেশী অশ্লীলাতা থাকবে। ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপনে অশ্লীলাতা থাকলে মুসলিমদের মাথা ব্যথার কারন নয় কারন এটাতো আর মুসলিমদের অনুষ্ঠান নয়। হ্যা, এই কথাটা সত্য হলে আমরা আর লেখার কোন প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে আমাদের দেশসহ সকল মডারেট মুসলিম দেশের মুসলিমগণ ইংরেজী নিউ ইয়ার কে খু্বই ধুমধামের সাথে উদযাপন করছে। শুধু একটি কথাই বলল যে, কম অশ্লীতায় উদযাপিত বাংলা নববর্ষ যদি উদযাপন ইসলাম সমর্থন না করে, তা হলে অশ্লীলতায় ভরা ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন করা কতটা মারাত্বক বুঝে নিন।

যে সকল দিবস উদযাপণ করা হারাম-০৩ :: নওরোজ ও শিয়া আকিদা

নওরোজ ও শিয়া আকিদা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নওরোজ একটি ফার্সি শব্দ যার বাংলা অর্থ ‘নতুন দিন’। ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে পালিত ইরানি নববর্ষ। ইহাকে ‘পারস্য নববর্ষ’ ও বলা হয়।  ইরানি শীয়া মতের অনুসরীগন এই উৎসবকে পালন করে থাকে। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়।

নওরোজের ইতিহাস

কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন।

আবু রায়হান আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত বই অসারুল বাকিয়্যাহ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বিখ্যাত পারস্য লেখক তাকি যাদেহ মাদ রাজত্বকালে (৭০৮ খ্রিষ্টপূর্ব-৫৫০-৫২৯ খ্রিষ্টপূর্ব) বাবেল বা বর্তমান ইরাক, তুরস্ক, আজারবাইজান, আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানসহ এতদঞ্চলে তিনটি ঈদ পালনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঈদে নওসারদ (নওরোজ উৎসব), তার ইয়াসকাই (তিরগান বা গ্রীষ্মকালীন উৎসব) ও মেহরানকাই (হেমন্তকালীন উৎসব)। তবে নওরোজ উৎসবটি অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ ও চাকচিক্যময় আকার ধারণ করে হাখামানশি রাজত্বকালে (৫৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩৩০-৩২৭ খ্রিষ্টপূর্ব)।

 আবার অনেক ঐতিহাসিকগনের মতে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলো। (ইসলামি বিশ্বকোষইসলামি ফাউন্ডেশন)

নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত :

নওরোজকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইরানে বেশ কিছু বিদআতি উৎসব ও শিরকি রীতিনীত প্রচলিত আছে। নওরোজ পালনের উৎস পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সেই হতে যুগে যুগে নওরোজ উদ্‌যাপিত হইতেছে। এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উংসব। পারসিক কালচারে সমৃদ্ধ কাট্টা শিয়া রাষ্ট্র ইরানে এখনো ইহা জাতীয় দিবস এবং দেশের সকল অধিবাসীর মহা আনন্দ উৎসবের সঙ্গে উদ্‌যাপন করিয়া থাকে। সাধারণত বিশ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। এই দিন সমগ্র ইরানে ঈদ-ই নওরোজের রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। বর্তমানে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, ইরাক, জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও কম বেশী নওরোজের উৎসব পালিত হয়।

নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত তার জানার ইচ্ছা সকলের। তাদের এই উৎসব রীতিনীত জানতে পারলে খুব সহজেই আপনি বুঝতে পারবের ইহার সাথে ইসলামি শরীয়তের সম্পর্ক কতটুকু।

১. নওরোজ হলো শিয়াদের ঈদ

পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের নওরোজ হল শিয়াদের ঈদের দিন তারা এই দিনটি ঈদের চেয়েও বেশী মর্যাদা প্রদান করে থাকে। ইরানি শিয়াগণ এই উৎসবকে সবচেয়ে বড় ঈদ বলেও মনে করে। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই উৎসবের জন্য দেশটিতে অন্য যেকোনো জাতীয় উৎসবের বেশী দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে থাকে। প্রায় ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুলকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে প্রায় দীর্ঘ এক মাস। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অথচ মুসলিমদের ঈদ অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত খুশি যা ইসলামি শরিয়ত মত উদ্‌যাপন করা হয়। যার ফলে দুনিয়া ও আখেরত কল্যাণ লাভ হয়। মুসলিম এমন ঈদ দুটি, তৃতীয় কোন ঈদ নাই।

আনাস ইব্‌ন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত,

كَانَ لَكُمْ يَوْمَانِ تَلْعَبُونَ فِيهِمَا وَقَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْفِطْرِ، وَيَوْمَ الْأَضْحَى

তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবি (ﷺ) মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্‌রের দিন এবং কুরবানির দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬

এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব পালন করার সুযোগ নেই। অথচ শিয়ারা নওরোজে তৃতীয় ঈদ হিসেবে উদযাবন করেছে।

২. হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ

ঘরে ঘরে নওরোজের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে উৎসব শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই এক ব্যক্তি অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে নতুন দিনের জয়গান গায়। পরনে থাকে লাল জামা ও লাল টুপি এবং মুখমণ্ডল কৃষ্ণকায়। এই ব্যক্তি কে হাজি ফিরুজ হিসাবে নাম করন করা হয়। এই ব্যক্তিই হলোআনন্দ, উৎসব ও নতুনের আগমনি প্রতীক। হাজি ফিরুজের পাশাপাশি আমু নওরোজ বা নববর্ষ চাচাও সমান জনপ্রিয়। আমু নওরোজ ঈদের রাতগুলোতে বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। আমু নওরোজের পোশাকের রং হচ্ছে সাদার ওপরে বিভিন্ন কারুকার্য করা পোশাক, সাদা দাঁড়ি ও গোঁফ, মাথায় সাদা টুপি। আমু নওরোজের উৎস সন্ধানে দেখা যায় চমৎকার এক প্রেমকাহিনি। আমু নওরোজ এখনো তার প্রেমিকার অপেক্ষায় আছে এবং সে বিশ্বাস করে তার প্রেমিকার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।

এই সকলই পারসিক অগ্নীপুজকদের রুসম রেওয়াজ ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নাই। হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ অনেকটা খ্রিষ্টানদের ফাদারের মত

নওরোজ উদ্‌যাপনের প্রস্ততি

নওরোজের আগেই ইরানিরা ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়াপড়শি ও আপনজনদের সহায়তা করেন। অনেকে আগেই পুরোনো আসবাবপত্র বা জরাজীর্ণ জিনিস ফেলে দিয়ে তারা নতুন জিনিস কেনেন। আমাদের দেশের ঈদুল ফিতরের মত নতুন জামা, কাপড়, জুতা প্রভৃতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। নওরোজের মেহমানদারির জন্য তারা ব্যাপক পরিমাণ ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে থাকেন। এ সময় স্থায়ী বাজার ছাড়াও অনেক অস্থায়ী বাজার বা মেলার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে

ইসলামে সাথে সম্পর্ক :

যদিও শিয়াদের দাবি নওরোজ উৎসব পালনের জায়েয। আসলে ইসলামের সাথে এই উৎসবের কোন সম্পর্ক নাই। তারা এর সাথে শত শত বিদআত সৃষ্টি করে ইসলামের পোশাক দ্বারা আবৃত করছে মাত্র।  ইরানি জাতির নওরোজ উৎসব পালনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামি আচার অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং “হাফতসিন” নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী

হাফত সিন বা শিন

হাফত সিন বা সাতটি জিনিস হল নওরোজের প্রধান আকর্ষণ। এটি ছাড়া নওরোজ কল্পনাও করা যায় না।

হাফত সিন হল একটি সুসজ্জিত টেবিল যাতে সাত প্রকার খাদ্য থাকবে যাদের প্রতিটির প্রথম অক্ষর ফারসি অক্ষর সিন (س) দ্বারা গঠিত। নওরোজ শুরুর দিন কয়েক দিন আগে থেকে ইরানের পথেঘাটে বেরোলেই চোখে পড়বে হাফত সিনের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রয়ের দৃশ্য। নওরোজকালীন সময়ে এটি প্রায় প্রতিটি বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষ বা অফিস-আদালতে অপরিহার্য একটি অংশ।

যেমন : একটি টেবিলে শাম, শারাব, শিরিন, শাহদ, শামশাদ, শারবাত ও শাকায়েক রাখা হল। এই টেবিলটিই হল হাফত সিন বা শিন। এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো শাম অর্থ মোমবাতি, শারাব অর্থ মদ, শিরিন অর্থ মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য, শাহদ অর্থ মধু, শামশাদ অর্থ বৃক্ষ বিশেষ, শারবাত অর্থ  শরবত ও শাকায়েক অর্থ  লাল রঙের টিউলিপ জাতীয় ফুল গাছ বিশেষ।

ইসলাম আগমনের আগে নওরোজের টেবিলে সজ্জিতকরণে এগুলো ছিল অপরিহার্য উপাদান। ইসলাম আগমন করার পর লোকজন চেষ্টা করলেন প্রাচীন রীতিনীতিগুলোকে সংরক্ষণ করবেন এবং নওরোজের মত উসবকে টিকিয়ে রাখবেন। যেহেতু ইসলামে শরাব বা মদ হারাম তাই শরাবের স্থলে সেরকে নির্বাচিত করলেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে শিন দ্বারা লিখিত ও সজ্জিত সাতটি বস্তুর বদলে সিন দ্বারা প্রচলিত সাতটি বস্তু নির্বাচন করলেন।

ইসলাম আগমনের পর বা বর্তমান হাফত সিনের মূল উপাদ্য হচ্ছে, সিব, সেরকে, সামানু, সোমাক, সির, সেঞ্জেদ, সাবযেহ, সেক্কে ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন।

এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো : সিব অর্থ আপেল, সেরকে অর্থ সিরকা, সামানু অর্থ অঙ্কুরিত গম, বালি বা অন্যান্য শস্যদানা আর আটা দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন বা হালুয়া বিশেষ, সোমাক অর্থ মধ্যমাকারের গাছ বিশেষ যার ফল দেখতে মসুরের ডালের মতো, তবে সামান্য বড় ও টক, সির অর্থ রসুন, সেঞ্জেদ  অর্থ দেখতে বরইয়ের মতো ফল, সাবযেহ অর্থ সবজি। সেক্কে অর্থ ধাতব কয়েন ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন। এ ছাড়া ডিম, মাছের উপস্থিতিও হাফত সিনে দেখা যায়।

যারা নওরোজ উদ্‌যাপন করে তাদের বিশ্বাস এগুলোর প্রত্যেকটির অভ্যন্তরে এক একটি পারিভাষিক অর্থ বিরাজমান রয়েছে, যেমন পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী চিত্র। প্রথমত বুঝতেই পারছেন এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটি কোন ধর্মীয় বিষয় নয়। যদি কেউ এর সাথে ইসলামি শরীয়তের কোন সম্পর্ক দাড় করায় তবে এই কাজ করা বিদআত। কিন্তু এ সম্পর্কে আকিদা রাখে যে, এইগুলি পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী তাহলে আর বিদআত থাকবে না। এটি কুফরি কাজ হবে। কাজেই মুসলিম হিসাবে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরানের শিয়াগন এই আমলের সাথে ধর্মকে যোগ করে শির্ক ও বিদআতেমত কাজ কাজ করছে।

চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব

ইসলাম আগমনের আগে পারশ্যবাসীর (ইরান) অধিকাংশ লোক অগ্নি পুজক ছিল। অপর পক্ষে নওরোজও তাদের বহু পুরা সংস্কৃতি। তাই অগ্নীপুজকগণ নওরোজকে স্বাগতম জানাতে চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব উদ্‌যাপন করে থাকে। ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন হচ্ছে ঔজ্জ্বল্যপবিত্রতা, আনন্দ ও উৎফুল্ল এবং জীবন ও সুস্থতার প্রতীক। প্রাচীন ইরানের জনগণ চাহার শাম্বে সূরিতে হলুদাভ বিবর্ণতা, অপবিত্রতা, নোংরা, দূষিত ও যাবতীয় রোগ-শোককে অগ্নিতে বিসর্জন দেন। ফলশ্রুতিতে রক্তিমতা, প্রফুল্লতা, বর্ণিলতা, সুস্থতা ও কর্মনিষ্ঠতা অগ্নি থেকে গ্রহণ করেন। আনন্দদায়ক এই অগ্নি উৎসবে রংবেরঙের বিস্ফোরকদ্রব্য ও আতশবাজি এবং শত শত ফানুস রাতের ইরানকে আলোকিত করে।

মন্তব্য : এই ধরনের কুফরি আকিদা নিয়ে অগ্নীপুজকদের চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব করা একজন মুসলিমের পক্ষে কীভাবে সম্ভব! ইসলাম সম্পর্কে যাদের সাধারণ ধারণা আছে তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবে আশা করি।

সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতির দিন

প্রাচীন ইরানে নওরোজ উৎসব পালনের পর ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হতেন। এই দিনটি কে বলা হয়ঃ সিজদাহ বেদার বা রুযে তাবিয়াত বা প্রকৃতির দিন। বর্তমান ইরানীরা এই দিনে মরুভূমি, উন্মুক্ত প্রান্তর, ঝরনার প্রান্ত, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং অত্যন্ত আনন্দ-উৎফুল্লতা এবং হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠতেন। সঙ্গে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হয়। আবার কোনো কোনো গবেষক ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনকে বছরের প্রথম কৃষিকার্যের সূচনা দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নওরোজ উপলক্ষ্যে ভ্রমণ :

এই উৎসব নববর্ষের প্রথম তারিখ থেকে শুরু হয় এক টানা  ১৩ দিন চলে। ১৩ তম দিনে ইরানিদের  কেউই ঘরে থাকে না। তারা সেদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মনোরম প্রাকৃতিক স্পটে সময় কাটান। বিশেষ করে উদ্যান, ঝর্ণা, পাহাড়, পার্ক- এসব স্থানে তারা চাদর বিছিয়ে বা তাঁবু খাটিয়ে খোশগল্প করে এবং মজাদার খাবার খেয়ে সময় কাটান। আগেই উল্লেখ করেছি, নওরোচ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানে ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে এক মাস। এই সুযোগে ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। অনেকে এ উপলক্ষ্যে পবিত্র কোম শহরে তাদের ইমাম রেজার বোন মাসুমার মাজারে যান, কেউবা ইরাকে ইমাম হোসাইনর মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন।

উপহার বা বখশিশের প্রচলন

নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়।

উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলা নববর্ষ যেমন বাঙালি হিন্দুদের উৎসব, ইংরেজি নববর্ষ যেমন খ্রিষ্টানদের উৎসব ঠিক তেমনি নওরোজ হল প্রাচীর পারস্যের অগ্নীপুজকদের উৎসব। ইরানের ইসলামি নামধারী শিয়ারা যতই ইসলামের লেবাস লাগিয়ে নওরোজ উদ্‌যাপন করুক না কেন কোন অবস্থায়ই ইসলামি শরীয়ত সমর্থন করবে না।

কাজেই শিয়াদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদাসমুহ নিজে জানার পর অপর কে জানান, যাতে করে সকল মুসলিম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকিদা-বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। এবং শিয়াদের মিথ্যা বর্ণনাসমূহ, আকিদা, বিশ্বাস এবং তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ক হেফাজত থাকতে পারে। হে মহান আল্লাহ, এই সামান্য খেদমত টুকু কবুল করে আমাদের সকল কে নাজাত দান করুন। আমিন

যে সকল দিবস উদযাপণ করা হারাম-০৪ :: জন্মদিন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিশু মাসের যে তারিখকে জন্মগ্রহণ করেছে বছর ঘুরে সে তারিখটি আবার ফিরে আসলে সেটাই তার তথা জন্মদিন। সে দিনে আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধক নিয়ে বড় কেক টেকে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। এতে আমন্ত্রিত মেহমানদের সুস্বাধু খাবার দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে। মেহমানরা তাকে জন্মদিনের শুভকামনা জানান এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করে দোয়া করেন। সেই সাথে তার জন্য উপহার সামগ্রীও দিয়ে থাকেন।

আজকের সমাজে জন্মদিন পালন করাটা আধুনিকতা হয়ে গেছে। আর জন্মদিন পালন না করাটা হয়ে গেছে ব্যাক ডেটেড। একজন মুসলিম হিসেবে এই সম্পর্কে ভাবা উচিত । জন্মদিন পালন করা ইসলামি চেতনার পরিপন্থি। জন্মদিন পালন করা মুসলিমদের কালচার নয়। এটি এসেছে খ্রিস্টানদের কাছ থেকে যা মুসলিমদের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। এই উপলক্ষ্যে আনন্দ-ফুর্তি করা অথবা কোন আমল করার বিষয়ে কুরআন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত নয়। রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে তাবেয়ীদের যুগে জন্মদিন পালনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। যদি জন্মদিন বলতে ইসলামে কোন কিছু থাকত তাহলে হাদীস ও ইতিহাসের কিতাব গুলোতে সাহাবী ও তাবাঈন (রাঃ) এর জন্মদিন পালনের কোন না কোন ঘটনা থাকত। বর্তমানে এই কথা যাচাইয়ের জন্য আর আলেম হতে হয় না। আপনার সামনে সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহম্মদসহ বহু হাদিসের গ্রন্থ অনুদিত। সময় থাকলে মিলিয়ে নেন। কোন হাদিস গ্রন্থে এমন প্রমান নাই যে, সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ীদের কেউ জম্মদিন পালন করেছেন। আমাদের প্রিয়নবী ﷺ রবিউল আওয়াল মাসের কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন এটা নিশ্চিত ভাবে জানা না থাকায় সীরাত প্রণেতাদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। আমাদের মাঝে অতি প্রাসিদ্ধ বারই রবিউল আউয়া্লও সর্ব সম্মত মত নয়। সিরাতের প্রন্থে কম পক্ষে রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর ২০ টি জম্ম তারিখ পাওয়া যায়। যদি জম্মদিন পালনে বিশেষ কোন ফজিলত থাকত তাহলে সাহাবিগণ (রাঃ) যে কোন উপায় রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর জম্ম তারিখ বের করে পালন করেতেন। অথচ জন্মদিন পালন তো দূরের কথা তারা প্রিয় মানুষির জন্ম তারিখই সংরক্ষণ করে নাই।  এর মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয় জন্মদিন বলতে বর্তমানে যা বুঝায় ইসলামে এর কোন অস্তিত্বই ছিল না।

কিছু দিবস রয়েছে, যেগুলো মানুষকে সচেতন করার জন্য বা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মেসেজ দেওয়ার জন্য পালন করা হয়ে থাকে। তবে ইবাদতের কোনো ফরম্যাট এর মধ্যে থাকতে পারবে না, তাহলে এই কাজটি বেদাত হয়ে যাবে।

ইমানদার ব্যক্তিগণ বেহুদা কাজ থেকে নিজেদের দূরে রাখবেন। এসব কাজে সময় নষ্ট করার সামান্যতম কোনো সুযোগ তাঁদের নেই। রাসুল ﷺ হাদিসের মধ্যে বলেছেন, ‘একজন মুসলিমের প্রকৃত ‌সৌন্দর্য হচ্ছে সেখানেই, সে এমন কাজ পরিহার করে চলবে, যেটা তার জন্য অপ্রয়োজনীয়।’

জম্মদিনের খারাপ দিকঃ

(১) জন্মদিন কেক কেটে পালন করা হচ্ছে যা পশ্চিমাদের সংস্কৃতি। কোন মুসলিম বিধর্মীদের বা বিজাতী লোকের অনুসরণ করতে পারে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি কোন জাতির সাথে যে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখলো সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবূ দাউদ : ৪০৩১

(২) অনেক ক্ষেত্র জম্মদিনের পার্টিতে নারী পুরুষ একত্র হয় অনুষ্ঠান উপভোদ করে যেখানে পর্দার কোন বালাই থাকে না। পর্দার ফরজ লংঘন করে এই ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান করা হারাম।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَرْنَ فِى بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ ٱلْأُولَىٰۖ وَ

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সুরা আহজাব : ৩৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯

(৩) যারা জম্মদিন পালনের জন্য বড় অনুষ্ঠান করে তারা অনেক সময় নাচ গানের আসর বসায়। এই ধনের অনুষ্ঠানে যে কোন গানের অনুষ্ঠান করা হারাম। অনেক সময় মুউজিক্যাল সাউন্ডের সাথে যুবক যুবতীরা নাচতে থাকে। যা মুলত হারাম কাজ।

(৪) এই দিন উপলক্ষে অতিতীদের আপ্যায়নের জন্য খাবরের আয়োজন করে যা মুলত অপচয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস পালন করা এবং এ উপলক্ষে যে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয় তা হারাম এবং বিদআত। জন্ম দিবস পালনের কোন প্রমাণ কিংবা চর্চা রাসুল সা. কিংবা তাঁর সাহাবী (রাঃ) দের মাধ্যমে হয়েছিল বলে কোন প্রমাণ নাই। বর্তমানে জন্মদিন পালন করাটা হয়ে গেছে যেন একে অপরের প্রতি মহবত্তের পরিচায়ক। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবাগন ছিলেন সত্যিকারার্থে নবীপ্রেমিক ও সর্বোত্তম অনুসারী। নবী প্রেমের নজীর ও দৃষ্টান্ত তারাই স্থাপন করেছেন। যদি জন্মদিন পালন করাটা ভাল হত ও মহব্বতের পরিচায়ক হত তবে তারা তা অবশ্যই করতেন।

যে সকল দিবস উদযাপণ করা হারাম-০৫ :: ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত হয়। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়ে থাকে, যদিও অধিকাংশ দেশেই দিনটি ছুটির দিন নয়।

১। ইতিহাসঃ

বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস প্রাচীন। এই দিনের সূচনা প্রায় ১৭শ’ বছর আগের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালবাসা’র মধ্য দিয়ে। এই দিন সম্পর্কে নানান কল্পকাহিনী জড়িত আছে। কোনটা সত্য আর কোনটি মিথ্যা তার বলা কঠিত। ভ্যালেনটাইন ডে সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্য থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হল।

১. ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। আর তাই তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেন্টাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন।

২. রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর আমলের ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেনটাইন সম্রাটের খ্রিস্টধর্ম ত্যাগের আহবান প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।

৩. ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমকদের লেসিয়াস দেবীর পবিত্র দিন। এদিন তিনি দু’টি শিশুকে দুধ পান করিয়েছিলেন। যারা পরবর্তীতে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিল।

৪. ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমানদের বিবাহ দেবী ‘ইউনু’-এর বিবাহের পবিত্র দিন।

৫. রোম সম্রাট ক্লডিয়াস তার বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করতে গিয়ে যখন এতে বিবাহিত পুরুষদের অনাসক্ত দেখেন, তখন তিনি পুরুষদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করেন। কিন্তু জনৈক রোমান বিশপ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন ও গোপনে বিয়ে করেন। সম্রাটের কানে এ সংবাদ গেলে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। সেদিন থেকে দিনটি ভালবাসা দিবস হিসাবে কিংবা এ ধর্মযাজকের নামানুসারে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে বিশ্ব ভালবাসা  দিবস কি ভাবে আর্বিভাব হয়?

১৯৯৩ সালের দিকে বাংলাদেশে বিশ্ব ভালবাসা দিবসের আর্বিভাব ঘঠে। যায় যায় দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান। তিনি পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের ছোঁয়া নিয়ে দেশে এসে লন্ডনী সংস্কৃতির প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি প্রথম যায় যায় দিন পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্ব ভালবাসা দিবস বাংলাদেশীদের কাছে তুলে ধরেন। তেজগাঁওয়ে তার পত্রিকা অফিসে কেউ চাকরী নিতে গেলে না কি সাথে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে যেতে হতো। প্রেমের যুগললবন্দী কপোত-কপোতীকে দেখে ওনি না কি খুব খুশী হতেন। এজন্য শফিক রেহমানকে বাংলাদেশে ভালবাসা দিবসের জনক বলা হয়।

খৃস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানেও ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সে দেশের আদালত। বর্তমানকালে, পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ওশুভেচ্ছা কার্ড ক্রয় করে এবং আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়। (উৎসঃ উইকিপিডিয়া এবং দৈনিক ইনকিলাব)

আগেকার দিনে বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ পালিত হত বিচিত্র অনুষ্ঠানাদির মধ্যে দিয়ে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল। দু’জন শক্তিশালী পেশিবহুল যুবক গায়ে কুকুর ও ভেড়ার রক্ত মাখত। অতঃপর দুধ দিয়ে তা ধুয়ে ফেলার পর এ দু’জনকে সামনে নিয়ে বের করা হ’ত দীর্ঘ পদযাত্রা। এ দু’যুবকের হাতে চাবুক থাকত যা দিয়ে তারা পদযাত্রার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে আঘাত করত। রোমক রমণীদের মাঝে কুসংস্কার ছিল যে, তারা যদি এ চাবুকের আঘাত গ্রহণ করে তবে তারা বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তি পাবে। এ উদ্দেশ্যে তারা এ মিছিলের সামনে দিয়ে যাতায়াত করত।

২। বর্তমান অবস্থাঃ

বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতেই এই দিনটি বেশী উদযাপিত হয়। এই দিনে সেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উপহার বিনিময় হয়। উপহার সামগ্রীর মধ্যে আছে পত্র বিনিময়, খাদ্যদ্রব্য, ফুল, বই, ছবি, প্রেমের কবিতা, গান, শ্লোক লেখা কার্ড প্রভৃতি। এ দিন স্কুলের ছাত্ররাও তাদের ক্লাসরুম সাজায় এবং অনুষ্ঠান করে।

পশ্চিমা যুবক যুকতীগন এই দিনে চুম্বনাবদ্ধ হয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। কোথাও কোথাও চুম্বনাবদ্ধ হয়ে ৫ মিনিট অতিবাহিত করে ঐ দিনের অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে। শুধু পশ্চিমা দেশগুলো যুবক যুকতীগন নয়, বরং সবাই এই দিন নানান অনুষ্ঠানে মাধ্যমে উপভোগ করে থাকে।  ‘ভালবাসা দিবস’ কে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন হোটেল, ড্যান্স বার, মদের বার ইত্যাদি সাজান হয় বর্ণাঢ্য সাজে। নানা রঙের বেলুন আর অসংখ্য ফুলে স্বপ্নিল করা হয় বলরুমের অভ্যন্তর। জম্পেশ অনুষ্ঠানের সূচিতে থাকে লাইভ ব্যান্ড কনসার্ট, ডেলিশাস ডিনার এবং উদ্যাম নাচ। আগতদের সবাই সম্মিলিত নাচে অংশ গ্রহন করে।

পশ্চিমাদের থেকে আমাদের দেশও পিছিয় নেই। বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে স্যাটেলাইটের কল্যাণে আমাদের সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণ করছে। নিজেদের স্বকীয়তা-স্বাতন্ত্র্যকে ভুলে গিয়ে, ধর্মীয় অনুশাসনকে উপেক্ষা করে তারা আজকে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে, তাদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা বিশ্ব ভালবাসা দিবস উদযাপন করে থাকে। আমাদের দেশে উঠতি বয়সের যুবক যুকতীরা ভালবাসায় মাতোয়ারা থাকে। ভালবাসা দিবসে যুবগ যুবতীরা রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন করে থাকে। এই দিনে বাজধানী ঢাকার পার্ক, রেস্তোরাঁ, ভার্সিটির করিডোর, টিএসসি, ওয়াটার ফ্রন্ট, ঢাবির চারুকলার বকুলতলা, আশুলিয়া- সর্বত্র থাকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের তুমুল ভিড়। মনে হবে আর ভালবাসার ঈদের দিন। পশ্চিমাদের মতই আমাদের দেশের নামী-দামী হোটেলের বলরুমে বসে তারুণ্যের মিলন মেলা। মনে হবে কোন অভিজাত পশ্চিমা দেশের হোটেলে বসে ভালবাসা দিবস পালন করছি।  ঢাবির টিএসসি এলাকায় প্রতি বছর এ দিবসে বিকেল বেলা অনুষ্ঠিত হয় ভালবাসা র‌্যালি। এতে বেশ কিছু খ্যাতিমান দম্পতির সাথে প্রচুরসংখ্যক তরুণ-তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকা যোগ দেয়। প্রেমের কবিতা আবৃত্তি, প্রথম প্রেম, দাম্পত্য এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়াদির স্মৃতি চারণে অংশ নেয় তারা।

এই ধরনের ভালাবাসায় কোন নৈতিকরা নাই। আছে শুধু সার্থের টান। ইসলামের ভালবাসা থাকে একক যার মাঝে কোন খাদ থাকে না। এই ভালবাসার একজনই দাবিদার, আর পেয়েও যায় একজন। কিন্তু বর্তমানের ভ্যালেন্টাইন এর ভালবাসা হলঃ জীবনজ্বালা আর জীবন জটিলতার নাম। মা-বাবা, ভাইবোন হারাবার নাম। নৈতিকতার বন্ধন মুক্ত হওয়ার নাম। তাদের ভালবাসার পরিণতি ‘ধর ছাড়’ আর ‘ছাড় ধর’ নতুন নতুন সঙ্গী। তাদের এ ধরা-ছাড়ার বেলেল্লাপনা চলতে থাকে জীবনব্যাপী।

৩। ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে হারাম কেন?

১। এই দিনে ইতিহাস বলছে ইহা একটি খাটি খৃষ্টানদের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানর সাথে একাত্ত প্রকাশ মানে খৃষ্টানদের সাথে একাত্ত প্রকাশ।

২। বর্তমান খৃষ্টান ধর্মে পর্দার কোন বিধান নেই। যৌনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা তাকের নিকট কোন পাপ কাজ নয়। অপর পক্ষে পর্দা করা ইসলামে ফরজ এবং যৌনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা হারাম। কাজেই ভালবাসা দিবসে পশ্চিমা খৃষ্টানগণ যে সকল অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা কাজ করে তাদর কাছে কোন অন্যায় নয়। কিন্তু একজন মুসলিমের  নিকট এই সকল  অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা হারাম কাজ। প্রতিটি কাজের জন্য সে কবিরা গুনাহে পতিত হবে। তাওবা ছাড়া আল্লাহ এই সকল গুনাহ মাপ করবেন না। এখান একবার ভাবুন তো পশ্চিমা অনুকরনে ভালবাসা দিবস উদযাপন করা কতটুকু গুনাহের কাজ?

() পশ্চিমা আদতে দেশের ‘ভালবাসা দিবস’ কে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন হোটেল ও ড্যান্স বার সাজান হয় বর্ণাঢ্য সাজে। নামি-দামী হোটেলের বলরুমে বসে তারুণ্যের মিলন মেলা। এখনে চলে ইসলাম বিরোধী অশ্লীলাত মহা উৎসব। অশ্লীলাতার বাহিরে সবচেয় বড় গুনাহের কাজ হল অপচয় করা। এই দিবসের উপলক্ষে যত ব্যয় করা হবে সবই হারাম কাজ হবে।

(৪) মানুষের অন্তর অনুকরণ প্রিয়, এই অনুকরন হবে কুরআন হাদিসের। কিন্তু ইসলামি বিরোধী কাজের অনুসরণ সব সময় নিন্দিত। বিশেষ করে অনুকরণীয় বিষয় যদি হয় আক্বীদা, ইবাদত, ধর্মীয় আলামত বিরোধী, আর অনুকরণীয় ব্যক্তি যদি হয় বিধর্মী, বিজাতি। দুর্ভাগ্য যে, মুসলমানরা ক্রমশ ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসে দুর্বল হয়ে আসছে এবং বিজাতিদের অনুকরণ ক্রমান্বয়ে বেশি বেশি আরম্ভ করছে। যার অন্যতম হল ভালবাসা দিবস। মুসলমানদের জন্য এসব বিদস পালন জঘন্য অপরাধ। দেখুন হাদিসে কিভাবে বিধর্মীদের অনুসকণ করতে নিষেধ করেছন।

আবূ ওয়াকীদ লায়ছী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হুনায়ন অভিযানে বের হন তখন মুশরিকদের একটি বৃক্ষের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। একে ’‘যাত আনওয়াত’’ বলা হত। তারা এতে তাদের অস্ত্র-সস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এদের যেমন ’‘যাত আনওয়াত’’ আছে আমাদের জন্যও একটা ’যাত আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দিন। নাবী ﷺ বললেন, সুবহানাল্লাহ! এতো মূসা (আঃ)-এর কওমের কথার মত হলো যে, এদের (কাফিরদের) যেমন অনেক ইলাহ আছে আমাদের জন্যও ইলাহ বানিয়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি অবলম্বন করবে। (তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৮০ ইসলামি ফাউন্ডেশন, হাদিসের মান সহিহ)

৪। ভালবাসা দিবস পালন সম্পর্কে একটি ফতোয়াঃ

ভালবাসা দিবস পালন করা সম্পর্কে সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি প্রদত্ত একটি ফতোয়া নিম্মে উল্লেখ করা হল।

প্রশ্নঃ কিছু কিছু মানুষ প্রতি বছর ঈসায়ী সনের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবস পালন করে থাকে। এ দিনে তারা লাল গোলাপ বিনিময় করে, লাল পোশাক পরিধান করে, একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। কিছু কিছু মিষ্টির দোকান লাল রঙের মিষ্টি তৈরী করে, এর উপরে ‘লাভ চিহ্ন’ অংকন করে। কিছু কিছু দোকান এ দিনের জন্য তৈরী বিশেষ বিশেষ সামগ্রীগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচার করে থাকে। সুতরাং নিম্নোক্ত বিষয়ে আপনাদের অভিমত কি?

১. এ দিনটি পালন করার বিধান কি?

২. এ দিন উদযাপনকারী দোকান থেকে কেনাকাটা করার বিধান কি?

৩. এ দিনে যারা উপহার বিনিময় করে থাকে তাদের কাছে এসব উপকরণ বিক্রি করার বিধান কি?

উত্তরঃ

কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল ও সলফে সালেহিনের ইজমার ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইসলামে ঈদ শুধু দুইটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এ ছাড়া যত উৎসব আছে সে উৎসব কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হোক, দলকেন্দ্রিক হোক, কোন ঘটনাকেন্দ্রিক হোক অথবা বিশেষ কোন ভাবাবেগকেন্দ্রিক হোক সেগুলো বিদআত। মুসলমানদের জন্য সেসব উৎসব পালন করা, তাতে সম্মতি দেয়া, এ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা অথবা এক্ষেত্রে সহযোগিতা করা নাজায়েয। কারণ এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের শামিল। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজ আত্মার উপরই জুলুম করে। এর সাথে এ উৎসব যদি কাফেরদের উৎসব হয়ে থাকে তাহলে এটি এক গুনাহর সাথে আরও একটি গুনাহর সম্মিলন। কারণ এ উৎসব পালনের মধ্যে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য ও তাদের সাথে মিত্রতা গ্রহণের বাস্তবতা পাওয়া যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ ও তাদের মিত্রতা গ্রহণ থেকে নিষেধ করেছেন এবং নবী ﷺ থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের দলভুক্ত”। ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ সম্পর্কে বলা হয়- এটি পৌত্তলিক ও খ্রিস্টান ধর্মের উৎসব। সুতরাং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের জন্য এ দিবস পালন করা, এটাকে সমর্থন করা অথবা এ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা জায়েয হবে না। বরং মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এবং আল্লাহর গজব ও শাস্তির কারণসমূহ থেকে দূরে থাকার নিমিত্তে এটি বর্জন করা এবং এর থেকে দূরে থাকা। অনুরূপভাবে এ গর্হিত দিবস উদযাপনে কোন ধরনের সহযোগিতা করা থেকে বেঁচে থাকা। যেমন-পানাহার, বেচাবিক্রি, কেনাকাটা, পণ্যপ্রস্তুত, উপহার বিনিময়, পত্র বিনিময়, বিজ্ঞাপন প্রদান ইত্যাদি যে কোন প্রকারের সহযোগিতা হোক না কেন সেসব থেকে বেঁচে থাকা। কারণ এ ধরনের সহযোগিতা গুনাহর কাজ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন: “সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ২] একজন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে- সর্বাবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে থাকা; বিশেষতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময়। মুসলমানের উচিত যাদের উপর আল্লাহ লানত পড়েছে, যারা পথভ্রষ্ট, যারা পাপাচারী- আল্লাহকে সম্মান করে না, ইসলামের সম্মান চায় না এ সকল মানুষের বিভ্রান্তির ব্যাপারে সচেতন থাকা। মুসলমানের দায়িত্ব আল্লাহর কাছে ধর্না দিয়ে তাঁর নিকট হেদায়েতের জন্য ও এর উপর অটল থাকার জন্য প্রার্থনা করা। কারণ আল্লাহ ছাড়া কোন হেদায়েতদাতা নেই, তিনি ছাড়া অটল রাখার কেউ নেই। তিনি পবিত্রময়, তিনিই তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। সমাপ্ত।

যে সকল দিবস উদযাপণ করা হারাম-০৬ :: আমাদের রাষ্ট্রিয় তিন দিবস উদযাপন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। আন্তর্জাতীক মাতৃভাষা দিবস :

আমাদের ভাষা রক্ষার জন্য জীবন দানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছি আন্তর্জাতীক মাতৃভাষা দিবস এবং দেশের জন্য জীবন দানের বিনীময় পেয়ছি স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস। এই তিনটি দিবস সম্পর্কেই ইসলামি শরীয়ততের বিধান আলোচনা করব। এই তিনটি দিবস সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। তাই বিষয়টির কলরব বৃদ্ধি না করে খুবই সংক্ষেপে একটু ভুমিকা দিয়ে ইসলামি দৃষ্ট কোন থেকে আলোকপাত করব। 

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গ তথা সমস্ত বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও সুপরিচিত। বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাম, বরকত সহ অনেকেই। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫২ সাল থেকে ভাষা শহীদদের স্বরণে প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।

পরবর্তিতে কানাডায় বসবাসরত দুই জন বাঙ্গালী রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম  ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের তৎকালিন মহাসচিব কফি আনানের কাছে এই দিনটি আন্তর্জাতীক  মাতৃভাষা হিসাবে ঘোষণার জন্য আবেদন জানান হয়। সে সময় সেক্রেটারী জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের নজরে এ চিঠিটি আসে। তিনি ১৯৯৮ সালের ২০ শে জানুয়ারী রফিককে অনুরোধ করেন তিনি যেন জাতিসংঘের অন্য কোন সদস্য রাষ্ট্রের কারো কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন। পরে রফিক, আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে “মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দ্যা ওর্য়াল্ড” নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী, একজন কাচ্চিভাষী সদস্য ছিলেন। তারা আবারো কফি আনানকে “এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওর্য়াল্ড”-এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন, এবং চিঠির একটি কপি ইউএনওর কানাডীয় দূত ডেভিড ফাওলারের কাছেও প্রেরণ করা হয়।

১৯৯৯ সালে তারা জোশেফের সাথে ও পরে ইউনেস্কোর আনা মারিয়ার সাথে দেখা করেন, আনা মারিয়া পরামর্শ দেন তাদের প্রস্তাব ৫ টি সদস্য দেশ – ক্যানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দ্বারা আনীত হতে হবে। তারপর বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকর্তা প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দানে ২৯টি দেশ অনুরোধ জানাতে কাজ করেন।

১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ও এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ। – এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। মে মাসে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।

কিভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়ঃ

শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে সরকারি কর্মসূচি

১. বাংলাদের সরকার প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে সরকার। সরাকার প্রধান রাত বারটা এক মিনিটে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদের সম্মানে ফুলের শুভেচ্ছা প্রদান করেন। তার পর পরই সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাগন ফুলের শুভেচ্ছা প্রদান করে। এরপর বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা কর্মীগন ফুলের শুভেচ্ছা প্রদান করে। এই ভাবে একটানা দুপুর পর্যান্ত দেশ প্রেমিক জনগন শহীদ মিনারে ফুলের শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়।

২. দিনের শুরুতে বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয়, স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রী নগ্ন পায়ে প্রভাত ফেরীতে অংশ গ্রহন করেন। বর্তমানে শুধু ছাত্র ছাত্রী নয়, বিভিন্ন পেশার লোকজন নগ্ন পায়ে প্রভাত ফেরীতে অংশ গ্রহন করেন। প্রভাত ফেরীল পর শহীদ মিনারে ভাষা শহীদের সম্মানে ফুলের শুভেচ্ছা প্রদান করেন।

৩। বর্তমানে এই দিন উপলক্ষে আজিমপুর কবরস্থানের মসজিদসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদে শহিদদের রুহের মাগফিরাতের জন্য ফাতেহা পাঠ ও কোরান খতমের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের জন্য বিশেষ প্রর্থনা করা হয়।

৪. এই দিনে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহে সঠিক নিয়মে ও মাপে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা নিজ নিজ উদ্ধগে প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি শহীদ মিনারে ফুল দেন।

৫. দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, আর্কাইভস্ ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রন্থমেলা, আলোচনাসভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আবৃত্তি ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

৭. দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপসমূহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাজনক স্থানসমূহে বাংলা বর্ণমালা সংবলিত ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়। সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ একুশের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে।

৭. বিদেশে অবস্থানরত বাংলা ভাষাভাসি এই দিন উপলক্ষে আমাদের মতই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে থাকে।

২. মহান স্বাধীনতা দিবস

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার গভীর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) নিরীহ জনগণের উপর হামলা চালায়। অপারেশন সার্চলাইট নামে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ করা হয়, অনেক স্থানে নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অনেক স্থানে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকান্ড চালানো হয়। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকদের আদেশে পরিচালিত, যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত অপারেশন ব্লিটজ এর পরবর্তি অনুষঙ্গ। অপারেশনটির আসল উদ্দেশ্য ছিল ২৬ মার্চ এর মধ্যে সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হবার একটু আগে ২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর (২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তত্কালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়। ঘোষণাটি নিম্নরুপঃ

“এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক’।

২৬শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েক’জন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। পরে ২৭শে মার্চ  তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার[] মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণাপত্রটির ভাষ্য নিম্নরুপঃ

“আমি,মেজর জিয়া, বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমাণ্ডার-ইন-চিফ, শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি”।

আমি আরো ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবর রহমানের অধীনে একটি সার্বভৌম ও আইনসিদ্ধ সরকার গঠন করেছি যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার জোট-নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। এ রাষ্ট্র সকল জাতির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং বিশ্বশান্তির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমি সকল দেশের সরকারকে তাদের নিজ নিজ দেশে বাংলাদেশের নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।

শেখ মুজিবর রহমানের সরকার একটি সার্বভৌম ও আইনসম্মত সরকার এৰং বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবার দাবিদার।

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর আমাদের প্রিয় মাতৃভূলি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে এ দিনটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এই মহান দিনের কর্মসুচি কি?

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বেশ বর্ণাঢ্য ভাবে উদযাপন করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে উদযাপন শুরু হয়। ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের শুভ সূচনা করা হয়।

২. সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন রঙের পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়।

৩. জাতীয় স্টেডিয়ামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ, কুচকাওয়াজ, ডিসপ্লে ও শরীরচর্চা প্রদর্শন করা হয়।

৪. এই দিনটিতে পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে।

৫.  বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে এই পদক প্রদান করা হয়। এই পুরস্কার জাতীয় জীবনে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের নাগরিক এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে প্রদান করা হয়ে থাকে।

মহান বিজয় দিবস

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বর। এই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানী বাহিনী এই দিনে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেদিন ঢাকার কেন্দ্রস্থলে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। তিনি যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক ও ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার উপস্থিত ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। আত্মসমর্পণ দলিলের ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ।

পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ৯ মাস ব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্রায় সকল দেশ স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তাই ১৯৭২ সাল থেকে ১৬ ডিসেম্বর তাখিখ থেকে বাংলাদেশে বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে। 

কিভাবে এই দিনটি উদযাপন করা হয়ঃ

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস বেশ বর্ণাঢ্য ভাবে উদযাপন করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে উদযাপন শুরু হয়।

২. সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন রঙের পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়।

৩. এই দিন উপলক্ষে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের আয়োজন করে থাকে,।

৪. এই দিনটিতে পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে।

৫. এছাড়া দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ, বিভিন্ন খেলা ধুলার আয়োজন করা হয়, বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান, মতবিনিময় সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।

এইভাবে দিবস পালনের যৌক্তিকতাঃ

উপরের তিনটি দিবস সম্পর্কে আলোচনা না করলেও চলত কারন এই বিষয় আমরা সকলেই কম বেশী অবগত আছি। এই দিবসগুলি কি ভাবে উদযাপিত হইয়তে তার সাক্ষি আমরা নিজেরাই। এই দিবসগুলি যেভাবে পালিত হয়, তা আমাদের সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। যে কেউ এই সংবিধান অনুসরন করে এই দিবসগুলি উদযাপন করতে পাবরে। কেউ বাধা প্রদান করলে সে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে গন্য হবে। কিন্তু যদি আপনি ইসলামি দৃষ্টি কোন থেকে দেখেন, তা হলে যে পদ্ধতি দিন পালন করা হয় তা জায়েয নয়। এই পদ্ধতি দিবস পালন করা ইসলামি শরীয়তে কোন বিধান নাই। প্রথমত আল্লাহ ও তার রাসূল ﷺ ব্যতিত কেউ কোন দিবস পালনের বিধান দিতে পারে না। তবে লেখার শুরুতে দেয়া পাঁচটি শর্ত অনুসরণ করে দিবস পালন করা জায়েয আছে। পাঠকদের স্বরণ করা জন্য শর্তগুলি আবার উল্লেখ করছি।

১। কুনআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবস উদযাপন করাকে ইবাদাত মনে করা যাবে না।

২। দিবস উদযাপন করার ক্ষেত্রে কুফরি আকিদা প্রষোণ করা করা যাবে না।

৩। দিবস উদযাপন করার সময় ইসলাম বহির্ভূত হারাম কাজ লিপ্ত হওয়া যাবে না।

৪। দিবস উদযাপন করার ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় করা যাবে না।

৫। বিধর্মীদের অনুসকরণে কোন দিবস উদযাপন করা যাবে না।

আমাদের এই শর্তগুলির মাঝে প্রথম শর্তটি এই তিন দিবস উদযাপনের মাঝ নেই। আমাদের কেউ এই দিবস উদযাপন করাকে ইবাদাত মনে করে না। দিবস পালন সম্পর্কে আমাদের সমাজে কোন কুফরি আকিদাও প্রচলিত নাই। কিন্তু দিবস উদযাপনের এক পর্যায় শির্কি কাজে লিপ্ত হতে হয়।  যেমনঃ শহীদ মিনারে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা এবং অর্পণের সময় সম্মান দেয়ার জন্য সোজা দাড়িয়ে থাক। পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের সম্মান প্রদর্ষিত হয়েছে মনে করা যাবে না। এই সময় বিষয় ইসলামি শরীয়ত বিরোধী। তৃতীয় শর্তটি আমাদের মাঝে ব্যপক হারে লঙ্গিত হয়। এই সকল দিবসগুলি উদযাপন করার সময় নারী পুরুষের অবাধ বিচরণ সাথে সর্বত্র  যা পর্দার মত ফরজ হুকুমকে উপেক্ষা করে থাকে। দিবস পালনের জন্য ইসলাম বহির্ভূত হারাম কাজ লিপ্ত হওয়া যাবে না। চতুর্থ শর্তও উপেক্ষা করা হয় চরমভানে। আমদের দেশে দিবস উদযাপন করার ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থের অপচয় করা হয়। যা একটি হারাম কাজ। পঞ্চম শর্ততে বলা হয়েছে, “বিধর্মীদের অনুসকরণে কোন দিবস উদযাপন করা যাবে না”। কিন্তু খোজ নিয়ে দেখা যাবে দিবস পালনের সকল নিয়ম কানুনের প্রথম ও প্রধান উদ্ধাক্তা হল বিধর্মী সমাজ।

ইসলাম ধর্মে অনেক স্বরনীয় দিবস আছে। যেমনঃ হিজরের দিন, মক্কা বিজয়ের দিন, বরদের যুদ্ধের দিন, ওহুদ যুদ্ধের দিন, হুদাইবিয়ার সন্ধির দিন, বাইয়াতে রিদওয়ানের দিন ইত্যাদি। এই মহান দিনগুলোর কোনটিই মুসলিমগন কোন দিবসই উদযাপন করে না। কারন তাদের নিকট আল্লাহ প্রদত্ত সকল দিনই সমান, যদি না কুনআন সুন্নহ কোন দিনকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান না করে। যেমন দু্ই ঈদের দিন, আরাফার দিন, হজ্জের সময় মিনার দিনগুলী ইত্যাদি সম্পর্ক কুরআন সু্ন্নাহ বর্ণিত আছে বিধায় এই দিনগুলির বিশেষ মর্জাদা আছে।

দেশ ভাষার জন্য জীবন দানকারী শহিদদের মর্যাদাঃ

আলোচনায় এ পর্যায় দেখব, যারা আমাদের দেশের জন্য বা ভাষার জন্য জীবন দিলেন ইসলামে তাদের মর্জাদা কত টুকু। তার পর নির্ধারণ করব তাদের জন্য আমাদের কি করণীয়। তাদের মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহ কি বলে একটু দেখে আসি। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।  সুরা ইমরান : ২০০

সাহল ইবনু সা’দ সায়ি’দী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর উপর যা কিছু আছে তাঁর চাইতে উত্তম। জান্নাতে তোমাদের কারো চিবুক পরিমাণ জায়গা দুনিয়া এবং ভূপৃষ্ঠের সমস্ত কিছুর চাইতে উত্তম।’ সহিহ বুখারী ২৬৯৩ ইফাঃ

সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর রাহে একটি দিবস ও একটি রাতের সীমান্ত প্রহরা একমাস সিয়াম পালন এবং ইবাদতে রাত জাগার চাইতেও উত্তম। আর যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে, তাতে তার এ আমলের সাওয়াব জারী থাকবে। এবং তার (শহীদসুলভ) রিযক অব্যাহত রাখা হবে এবং সে ব্যক্তি ফিতনাসমূহ থেকে নিরাপদে থাকবে। সহিহ মুসলিম ৪৭৮৫ ইফাঃ

মূসা ইবন আনাস তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা যুদ্ধে আসার সময়ে কিছুলোক, মদীনায় ফেলে এসেছে (যারা অপারগতার কারণে তোমাদের সঙ্গে বের হতে পারিনি)। তোমরা যতদূর সফর করেছ, যা কিছু যুদ্ধে ব্যয় করেছ এবং যে পথ অতিক্রম করেছ, তারা এসব কাজে তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। একথা শুনে অনেকে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তারা তো মদীনায় অবস্থান করছে এমতাবস্থায় কী করে আমাদের সঙ্গে থাকবে? তিনি উত্তর করলেন, তাদেরকে তো অপারগতা (যুক্তিসঙ্গত কারণ) আটকে রেখেছে। (আবু দাউদ ২৫০০)

১৬৭৩। হাসান ইবনু আলী খাললাল (রহঃ) … উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর আযাদকৃত দাস আবূ সালিহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মিম্বরে আরোহন করে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশংকায় রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে শ্রুত একটি হাদীস আমি তোমাদের থেকে গোপন রেখেছিলাম। পরে আমার খেয়াল হলো যে তা তোমাদের কাছে বর্ণনা করি যাতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিবেচনা মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, অন্য কোন স্থানে এক হাজার দিন অতিবাহিত করা অপেক্ষা আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা প্রদান উত্তম। (সুনানে তিরমিজী ১৬৭৩)

আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে একথা বলতে শুনেছিঃ “চারটি আমলের ছোয়াব মৃত্যুর পরেও জারি থাকেঃ (১) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারারত থেকে মৃত্যু বরণ করে। (২) যে ব্যক্তি (মানুষকে) এলেম শিক্ষা দেয়। তদানুযায়ী যা আমল করা হয় তার ছোয়াব তার জন্যে জারি থাকে। (৩) যে ব্যক্তি সাদকায়ে জারিয়া করে। যতদিন ঐ সাদকার উপকার জারি থাকে। ততদিন ছোয়াবও তার জন্যে জারি থাকবে। (৪) যে ব্যক্তি নেক সন্তান রেখে যায়, যে তার জন্যে দু’আ করে।” (সহিহ তারগির ওয়াত তাহরিক হাদিস নম্বর ১১৪)

উপরের হাদিস থেকে বুঝা যায় সিমান্ত পাহারাদার কারির মর্যাদা অনেক বেশী। আর যে সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে মৃত বরণ করেন তার মর্যাদা আরও বেশী। কাজেই যারা আমাদের দেশ রক্ষার জন্য বা ভাষা রক্ষার জন্য জীবন দান করেছেন তারা শহীদের মর্যাদা পাবেন। যদিও শহীদ হওয়া বিষয়টি  তাদের নিয়তের উপর নির্ভর করে। আমরা তাদের নিয়ত সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবা। আমাদের সাধারণ কথা হবে যারা দেশের জন্য জীবন দিবেন তারা শহীদ। এ সম্পর্কে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। এই ভাবে যারা অপরের কল্যানে জীবন দিল, তারা পরকালে তাদের পূর্ণ প্রতিফল পাবেন বলে আশা করছি। কিন্তু পরকালে বিশ্বাসি হয়ে হারাম কাজের মাধ্যমে কিভাবে তাদের মঙ্গল কামনা করতে পারি। তাই এই বিষয়টির উপর সঠিক জ্ঞান অর্জণ করে তাদের করণীন নির্ধারণ করা উচিত। এ পর্যায় শহীদদের জন্য করণীয় নির্ধারণ করব।

আমাদের করণীয়ঃ

আমাদের দিবস পালনের প্রধান লক্ষ হল শহীদের স্বরণ করা। তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করা। অথচ আমরা যারা শরীয়ত বিরোধী কাজের মধ্যমে তাদের স্বরণ করছি। এতে করে শহীদদের কোন উপকার হবে না বরং তাদের ও আমাদের উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের সকলের উপকারের জন্য আমাদের দুটি করণীয় কাজ আছে।

১। সঠিক ইবাদতে মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করা

২। প্রচলিত হারাম কাজ ত্যাগ করে মঙ্গল কামনা করা

সঠিক ইবাদতে মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করাঃ

যারা আমাদের দেশের জন্য বা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে শরীয়ত সম্মত ইবাদাত করা। মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তির জন্য যেভাবে সওয়াব পৌছান যায়, ঠিক সেভাবেই তাদের জন্য সওয়াব পৌছাতে হবে। মাইয়াতের জন্য সওয়াব পৌছারন সুন্নাহ সম্মত আমলগুলো হলো-

১। শহীদের জন্য বেশী বেশী দু‘আ করা

২। তাদের জন্য  দান-ছাদকাহ করা।

৩। তাদের নামে সাদাকায়ে জারিয়াহ প্রদান করা

৪। তাদের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করা

৫। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা

৬। তাদের ভাল কাজসমূহ জারী রাখা

৭। তাদের কবর যিয়ারত করা

৮। তাদের কবর কেন্দ্রিক গুনাহ বন্ধ করা।

প্রচলিত হারাম কাজ ত্যাগ করে মঙ্গল কামনা করাঃ

শহীদদের মঙ্গল কামনার্থে আমরা যারা হারাম কাজের মাধ্যমে তাদের স্বরণ করছি, তাদের উচিত হারাম পরিত্যাগ করা। এখনে দুটি দিক আছে, একটি দিক হল আমাদের সংবিধানিক বাধ্য বাধকতা আর অপরটি হল ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টি ভঙ্গি। বাংলাদের একটি মুসলিম দেশ। এখানের অধিকাংশ লোকই মুসলিম। মুসলিম দেশ হলেও আমাদের দেশে কুরআন সুন্নাহ আইন অনুসারে পরিচালিত হয় না। আমাদের দেশের নিজেস্ব সংবিধান আছে। কুরআন সুন্নাহর আইনের সাথে আমাদের সংবিধানের অনেক বিষয় বিরোধ আছে। তাই আমারা যারা এই দিবসগুলি পালন করি তারা দুটিভাগে বিভক্ত।

(১) যারা সরকারে থেকে আইন তৈরি করে

(২) সাধারণ জনগন যারা আইন মান্য করে

(১)। যারা সরকারে থেকে আইন তৈরি করেঃ

যারা সরকারে থেকে দেশ পরিচারণা করেন ও আইন তৈরি করে তারা সংবিধানিক বাধ্য বাধকতার জন্য এই সব দিবসে নানান ইসলাম বিরোধী কাজে অংশ গ্রহন করতে বাধ্য হয়। তাদের অনেকেরই ইসলামি শরীয়ত সম্পর্কে তেমন জ্ঞান নাই। অজ্ঞতার কারনেই এই কাজ করে থাকে। প্রথমত তাদের দায়ীত্ব ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জণ করা। তার পর তার হাতে তাথা ক্ষমতা প্রয়োগ করে সঠিক শরীয়ত সম্মত আইন পাশ করা। এই কাজটি যদি কাজটি যদি সরকারে থাকে আইন প্রনেতাগণ করে থাকের তা হলে আর কোন সমস্যাই থাকবে না।

(২)  সাধারণ জনগন যারা আইন মান্য করেঃ

আমাদের সাধারণ জনগনও ইসলামি শরীয়ত সম্পর্কে বেখবর। তাদের শির্ক বিদআত সম্পর্কে তেমন জ্ঞন নেই। প্রথমে তাদের এই সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে হবে। যখন তারা সঠিক জ্ঞান পাবে, তখন আর এই শির্কি বিদআতী কাজ করবে না। যদিও ক্ষমতার অভাবে সে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে এই সকল অনইসলামিক আজ দুর করতে পাবরেনা। কিন্তু সে অন্তত নিজেকে এ থেকে দুরা রাখতে পারবে আশা করা যায়। সাধারণ জনগন সবার ক্ষমতা সমান নয়। কাজেই যার যার ক্ষমতা অনুসারে জনগনকে এই খারাপ কাজ থেকে দুরে রাখবে। সাধ্য অনুসারে ভাল কাজ করা ও খারাপ থেকে নিজে বাঁচা ও জনগনকে বাঁচান হল জিহাদ। মুসলিম সমাজে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুসারে ফরজ হয়ে থাকে। ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুসারে মন্দ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজের হাদিসটি লক্ষ করুনঃ

তারিক ইবনু শিহাব (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-

وَهَذَا حَدِيثُ أَبِي بَكْرٍ – قَالَ أَوَّلُ مَنْ بَدَأَ بِالْخُطْبَةِ يَوْمَ الْعِيدِ قَبْلَ الصَّلاَةِ مَرْوَانُ فَقَامَ إِلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ الصَّلاَةُ قَبْلَ الْخُطْبَةِ ‏.‏ فَقَالَ قَدْ تُرِكَ مَا هُنَالِكَ ‏.‏ فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ أَمَّا هَذَا فَقَدْ قَضَى مَا عَلَيْهِ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ ‏

ঈদের সালাত এর পুর্বে মারওয়ান ইবনু হাকাম সর্বপ্রথম খুতবা প্রদান আরম্ভ করেন। তখন এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, খুতবার আগে হবে সালাত। মারওয়ান বললেন, এ নিয়ম রহিত করা হয়েছে। এতে আবূ সাঈদ (রাঃ) বললেন, ‘এ ব্যাক্তি তো কর্তব্য পালন করেছে’। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজকে ঘূণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নতম স্তর। সহিহ মুসলিম : ৪৯

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, সহজ পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ সম্ভব হলে কঠোর পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। কোন মন্দ কাজ আদেশ নিষেধের মাধ্যমে সমাধান করা গেলে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন নেই। আবার প্রতিবাদের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হলে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করার দরকার নেই। আদেশ, নিষেধ এবং প্রতিবাদের জন্য স্বভাবতই ক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন। সমাজে ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা সম্পন্ন লোক জনই আদেশ, নিষেধ এবং প্রতিবাদের জন্য দায় বদ্ধ থাকে। সবার ক্ষমতা ও যোগ্যতার সমান নয়। তাই সবাইকে আমভাবে মহান আল্লাহ নিকট জবাব দীহি করতে হবে না। একটি উদাহরণ দিলে আশা করি ব্যাপরটি পরিস্কার হবে। প্রতিটি সমাজে কিছু কর্তৃত্বশীল লোক থাকে যাদের আমরা সমাজপতি বা সমাজের নেতা বা সমাজের মুরুব্বী হিসাবে জানি।  উক্ত সমাজের অধিকাংশ লোক তাদের আদেশ নিষেধ মেনে চলে। কোন অন্যায় দেখা দিলে, তারা সবাই মুখের দ্বারা নিষেধ করতে পারেন। আশা করা যায় সমাজে সকলে তাদের নিষেধ মেনে চলবে, মেনে না চললেও সমাজ তাকে যে ক্ষমতা প্রদান করেছে, তার জন্য ঐ আইন অমান্য কারিও তার কোন ক্ষতি করতে পাবরেনা। সমাজপতিগণ যদি কোন অন্যায় কাজ করে তবে সমাজের একজন সাধারন লোক মুখের দ্বারা এর প্রতিবাদ করলে তার প্রতি জুলুম চলে আসতে পারে। তাই সে সমাজপতিদের ঐ অন্যায় কাজের প্রতিবাদ মুখে না করে অন্তরে ঘৃনা করবে।

অপর পক্ষে রাষ্ট্রের নিকট এমন ক্ষমায় আছে যার বলে সে সমাজপতি ও সাধারণ দুজনেরই বিচার করতে পাবরেন। এ জন্য যারা সমাজে ও রাষ্ট্রে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকরী তাদের সকলের উপর ফরজ হল, বল প্রয়োগে ঐ অন্যায় কারের প্রতিকার করা। কারন তাদের জন্য এ দায়িত্ব পালন করা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফরজে আইন। দায়িত্ব ও ক্ষমতা যত বেশি, আদেশ ও নিষেধের দায়িত্বও তত বেশি। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয়ও তাদের তত বেশি। কারন আল্লাহ বলেন,

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ

অর্থঃ যাদেরকে আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে বা ক্ষমতাবান করলে তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয়, সৎকার্যে নির্দেশ দেয় এবং অসৎকার্যে নিষেধ করে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে।  সূরা হজ্জ : ৪১

এ জন্য এ বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসনের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, আঞ্চলিক প্রশাসকবর্গ, বিচারকবর্গ, আলিমগণ, বুদ্ধিজীবিবর্গ ও সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি, তাদের জন্য আশংকাও বেশি। তাদের মধ্যে কেউ যদি দায়িত্ব পালন না করে নিশ্চুপ থাকেন তবে তার পরিণতি হবে কঠিন ও ভয়াবহ। অনুরূপভাবে নিজের পরিবার, নিজের অধীনস্থ মানুষগণ ও নিজের প্রভাবাধীন মানুষদের আদেশ-নিষেধ করা গৃহকর্তা বা কর্মকর্তার জন্য ফরজে আইন। কারণ আল্লাহ তাকে এদের উপর ক্ষমতাবান ও দায়িত্বশীল করেছেন এবং তিনি তাকে এদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জেনে রেখো! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল; আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব ইমাম, যিনি জনগণের দায়িত্বশীল তিনি তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ গৃহকর্তা তার পরিবারের দায়িত্বশীল; সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবার, সন্তান-সন্ততির উপর দায়িত্বশীল, সে এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কোন ব্যাক্তির দাস স্বীয় মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল; সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব জেনে রাখ, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ৭১৩৮

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, অন্যায় ও অসৎকর্মের প্রতিবাদ করা শুধুমাত্র এদেরই দায়িত্ব। বরং তা সকল মুসলমানের দায়িত্ব। যিনি অন্যায় বা গর্হিত কর্ম দেখবেন তার উপরেই দায়িত্ব হয়ে যাবে সাধ্য ও সুযোগমত তার সংশোধন বা প্রতিকার করা। সমাজের কোন দায়িত্ব সম্পন্ন লোক না হলেও যদি অন্যায় কাজের বাধা প্রদান করার ক্ষমাতা থাকে তবে ঐ টুকু ক্ষমাতাই প্রয়োগ করতে হবে। যদি সমাজে কোন মুমিনের অবন্থা এমন হয় যে, অন্যায় ও অসৎকর্মের প্রতিবাদ করলে তার উপর জুলুম হতে পারে, হবে সে ঐ অন্যায় ও অসৎকর্মের করবে না। কিন্ত মনে রাখতে হবে ঐ অন্যায় ও অসৎ কর্ম সে ঘৃনার চোখে দেখবে। মুমিনের এ সাধ্যাতীত কাজের জন্য মহান আল্লাহর নিকট জবাব দিহী করতে হবে না। কারন তিনি কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। মহান আল্লাহ বলেন,

لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ

আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। সুরা বাকারা : ২৮৬

সার কথা হলঃ প্রত্যেক মুমিনেরই দায়িত্ব হলো, অন্যায় দেখতে পেলে সাধ্য ও সুযোগ মত তার প্রদিবাদ করা। যদি হাত বা মুখের দ্বারা প্রতিবাদ, পরিবর্তন বা সংশোধন করতে না পারে তবে সে এই অন্যায়কে অন্তর থেকে ঘৃণা করবে। অন্তরের ঘৃনার মাধ্যমে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রত্যেক মুমিনের উপরেই ফরজ। অন্যায়ের প্রতি হৃদয়ের বিরক্তি ও ঘৃণা না থাকা ঈমান হারানোর লক্ষণ। আমরা অগণিত পাপ, কুফর, হারাম ও নিষিদ্ধ কর্মের সয়লাবের মধ্যে বাস করি। বারংবার দেখতে দেখতে আমাদের মনের বিরক্তি ও আপত্তি কমে যায়। তখন মনে হতে থাকে, এ তো স্বাভাবিক বা এ তো হতেই পারে। পাপকে অন্তর থেকে মেনে নেওয়ার এ অবস্থাই হলো ঈমান হারানোর অবস্থা। তবে অন্তরে ঘৃনা প্রকাশের একটি লক্ষন হলঃ যে অন্যায় কাজটি হতে দেখল তা হাত বা মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পেরে এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই আমারা যদি কোন অন্যায় কাজ হাত বা মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পারি তবে এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা চালাব চাই তা গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে হোক। মুখতাসার যাদুল মাআদে ইমাম ইবনে কাইউম এই জিহাদের তিনটি স্থর উল্লেখ করেছেন।

১. সক্ষম হলে (ক্ষমতাবান) শক্তি প্রয়োগ করে তা রুখে দেয়া।

২. শক্তি প্রয়োগে অক্ষম হলে মুখের কথা দিয়ে তা রুখবে।

৩. তাতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে তাকে (কাজকে) ঘৃণা করবে এবং তা প্রতিহত করার চিন্তায় ব্যাপৃত থাকবে।  মুখতাসার যাদুল মাআদ, প্রকাশনায় ওয়াহিদা লাইব্রারী ঢাকা, পৃ-১৯৩

যারা সরকারে থেকে আইন তৈরি করে, তাদের প্রতি আইন মন্যকারী জনগনের দায়িত্ব কি?

মুসলিম কোন শ্বাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত কোন ইসলামি রাষ্ট্রের শ্বাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা যাবে না, তাই সে যতবড় জুলুমবাজ হোকনা কেন। কিন্ত সে যদি ইসলামি কোন ফরজ হুকুর পালন না করতে আদেশ প্রদান করে অথবা বাধা প্রদান করে।

উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের ওপর এমন শাসকবর্গ নিযুক্ত হবে যারা ভালো-মন্দ উভয় প্রকারের কাজ করতে দেখতে পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার অসৎ কাজের প্রতিবাদ করল, সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেল। আর যে ব্যক্তি অন্তর থেকে ঘৃণা করল, সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু যে ব্যক্তি উক্ত কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল ও শাসকের আনুগত্য করল, তখন সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায় কি আমরা তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়িম করে। রাবী বলেন, প্রতিবাদ ও মন্দ জানার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে ও অগ্রাহ্য করে। সহিহ মুসলিম : ১৮৫৪, সুনানে তিরমিযী : ২২৬৫, আহমাদ : ২৬৫২৮, সহি আল জামি : ২৩৯৫, মিশকাত : ৩৬৭১

আলোচ্য হাদীছগুলো দ্বারা বুঝা যায় যে, আমীর বা নেতার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে যদি তিনি ন্যায়ের আদেশ দেন তাহলে। আর যদি তিনি অন্যায়ের বা পাপের কাজে নির্দেশ দেন তাহলে তার কথা মান্য করা যাবে না। যদি তিনি প্রকাশ্য কুফুরী বা শিরকী কাজে জড়িয়ে পড়েন তাহলে তার আনুগত্য করা বৈধ হবে না। তখন তার আনুগত্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে। যদিও আমরা বর্তমান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাপের কাজেও স্বীয় দল বা নেতার আদেশ মান্য করি। মনে রাখতে হবে। ফরজ হুকুমের বিরোধীতার কারনে সে আর মুসলীম থাকেনা, তখন দ্বীনদার আলেমেদের ফতোয়া মোতাবেক শ্বাসকদের সাথে জিহাদ করা ফরজ হয়ে যায়। অর্থাৎ যুদ্ধ ছাড়া ইসলামি শরীয়ত পালনের আর বিকল্প পথ থাকেনা তখনই বাধ্য হয়ে দেশের শীর্ষ স্থানীয় দ্বীনদার আলিমেদের ফতোয়া মোতাবেক জিহাদের চুড়ান্ত স্তর সশস্ত্র যুদ্ধের মত কঠিন সিদ্ধান্ত  নেয়ার অনুমতি দিবেন।

জিহাদ আহবানের একমাত্র অধিকার রাখে মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। যখন রাষ্ট্রপ্রধান কোন সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র বা ধর্ম রক্ষার জন্য জিহাদের নির্দেশ প্রদান করবেন, তখন সকলের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহন ফরজ হয়ে যাবে। তাহলে আলেম সমাজ কেন ও কিভাবে জিহাদের ডাক দিবন?

কথা হলো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপ্রধান জুলুমবাজ হলেও জিহাদ করা যাবে না কিন্তু রাষ্ট্র যখন ইসলামি ফরজ হুকুম মানতে বাধা প্রধান করে তখন আলেমগণ জিহাদ বাধ্যতামূলক হবার ব্যাপারে ফতোয়া দিতে পারেনযেমনঃ

ক) তাতারদের বিরুদ্ধে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহর রাহিমাহুল্লাহ ফতোয়া যেখানে তিনি তাতারদের বিরুদ্ধে কতালকে ওয়াজিব বলেছেন। মুসলিমদের নিকট থেকে তাতারগণ ক্ষমাতা নিয়ে মুসলিমদের উপর শুধু জুলুম করে তাদের ইসলম ধর্মের হুকুম মানতেও বাধা দিয়েছিল। ঠিক তখই শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহসহ (রাহিমাহুল্লাহ) বহু আলেম তাদের সাথে জিহাদ করাকে ওয়াজিব বলে মত দেন।

খ) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শাহ আবদুল আযিয মুহাদ্দিস দেহলভির রাহিমাহুল্লাহ ফতোয়া, যেখানে তিনি হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা করেছেন।

গ) রাশিয়ান হানাদার এবং কমিউনিসমের দ্বারা প্রভাবিত ও কমিউনিসম অনুযায়ী জীবনযাপন করা আফগান মুরতাদদের বিরুদ্ধে আফগান মুসলিম জনতার প্রতিরোধ ও যুদ্ধকে শরীয়ত সম্মত জিহাদ বলে ঘোষনা। রাবেতা আল-আলাম ইসলামি এর (ফিক্বহ কাউন্সিল ১৪০৮ হিজরির ২৪-২৮শে সফর) দশম অধিবেশনে আফগান যুদ্ধকে স্বাগত জানিয়েছিল এবং এই কাউন্সিলের সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে মুসলিম বিশ্বের সাধারন জনতা ও সরকারগুলোর প্রতি নৈতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও বস্তুগত সম্ভাব্য সব উপায়ে আফগান জিহাদকে সমর্থন করার আহবান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঘ) সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধ ফিলিস্তিনী মুসলিম ভাইদের প্রতিরোধ জিহাদ হিসাবে সকল মুসলিম আলেমদের নিকট স্বীকৃত। তাদের দেশ দখল করার পর সরকার না থাকা সত্বেও জিহাদ চালিয়েছিল। নিজ দেশে মুসলিম শ্বাসকের বিরুদ্ধে ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধের করা একটি স্পর্স কাতর বিষয় তাই এ ব্যাপার মুহাক্কিক আলেম বা যারা দেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেম তাদরে সকলের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। একা একা ফতোয়া জানি করে মুসলিমদের জাল মাল হালাল করার ফতোয়া জারি করা হারাম। এই ক্ষেত্র মনে রাখতে হবে রাসূল ﷺ একটি হাদিস তিনি বলেন, “কালিমা সাক্ষ্য দান কারিকে হত্যা করা যাবে না”।

দাম্পত্য জীবনের বিধান ও যোগ্যতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দাম্পত্য জীবন হলো একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে একটি পবিত্র এবং আইনসম্মত বন্ধন, যা ইসলামে বিবাহ (নিকাহ) নামে পরিচিত। এই সম্পর্ক কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস। ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে শুধুমাত্র সামাজিক সম্পর্ক বা শারীরিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটিকে একটি ইবাদত, রহমত ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা রূম : ২১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাম্পানত্য জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রশান্তি ও শান্তি অর্জন।  স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য মানসিক আশ্রয়স্থল এবং ভরসার জায়গা। আল্লাহ এই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া এমনভাবে স্থাপন করেছেন, যা দুনিয়ার অন্য কোনো সম্পর্কে পাওয়া যায় না।

বিবাহের বিধান

ইসলামে বিবাহের হুকুম (আহকাম) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার কারণে পরিবর্তিত হয়। আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিচে সংক্ষেপে প্রতিটি হুকুম, তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরছি—

১. বিবাহ করা ওয়াজিব

যখন কোনো ব্যক্তি জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম হয় এবং সে আশঙ্কা করে যে ব্যভিচার (যিনা) করে ফেলবে, তখন তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব।

আল্লাহ বলেন—

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সূরা আন-নূর ২৪:৩২

আয়াতে আল্লাহ অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎ দাস-দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। কাজেউ যারা জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম তাদের বিবাহ কার ওয়াজিব বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ

আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সুরা নূর : ৩৩

আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।” এখানে সংযম বলতে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই বোঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মনকে খারাপ চিন্তা থেকে দূরে রাখাও বোঝানো হয়েছে। এটি একটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, ইসলামে কেবল বাহ্যিক আমলই নয়, বরং মনের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই সংযম অবলম্বন করা ফরজ, যাতে তারা কোনোভাবেই যিনা বা ব্যভিচারের মতো গুরুতর পাপে জড়িয়ে না পড়ে।

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬,  সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

ব্যাখ্যা : এখানে নবী ﷺ স্পষ্ট করেছেন, যদি দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা না যায় তবে বিয়ে করা অপরিহার্য।

২. বিবাহ করা সুন্নাহ

যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ব্যভিচারের আশঙ্কা নেই—তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাহ বা মু’আক্কাদাহ সুন্নাহ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪

নবী ﷺ বিবাহকে নিজের সুন্নাহ বলেছেন, তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যভিচারের ভয় না থাকে তবে এটি সুন্নাহ।

৩. বিবাহ মুস্তাহাব

যখন কেউ ব্যভিচারের ভয় পায় না, আবার বিবাহ না করলে কোনো ক্ষতির শঙ্কাও নেই, তবে বিবাহ করলে দ্বীন পালন, আত্মীয়তার বন্ধন ও সন্তান উৎপাদনের সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে বিবাহ মুস্তাহাব।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, সহিহ ইবন হিব্বান : ৪০৩১

এখানে সন্তান উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কেউ যদি ব্যভিচারের আশঙ্কা না রেখেও বিবাহ করে, তবে এটি মুস্তাহাব। যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, তার জন্য বিবাহ করা মুস্তাহাব। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই।

৪. বিবাহ করা হারাম

যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে, সে স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ক্ষতি করবে, অথবা বিবাহের উদ্দেশ্য হারাম কাজে ব্যবহার করা (তালাক দিয়ে কষ্ট দেয়া, ধোঁকা দেয়া) তাহলে তার জন্য বিবাহ হারাম।

যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। ফিক্বহুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩১

অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনছাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ

আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময় দেবে তার মাধ্যমে তারা উভয়ে মুক্ত হয়ে গেলে তাতে কোনো পাপ নেই। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। সূরা বাকারা : ২২৯

খায়সামাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার কোষাধ্যক্ষ আসলেন। তিনি বললেন, তুমি কি গোলামদের খাবারের ব্যবস্থা করেছো? তিনি বললেন, না! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাদের খাবার দিয়ে আসো। বর্ণনাকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের ভরণ-পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করে আটকে রাখাই কোন ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহিহ মুসলিম : ৯৯৬

 যে ব্যক্তি স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না, তার বিয়ে করা হারাম, কারণ এটি জুলুম ও গুনাহর কারণ।

দাম্পত্য জীবন শুরু যোগ্যতা

আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বিদায় হাজ্জে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং ওয়াজ-নসীহত করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ শুনে নাও। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নাই যে, তারা যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না। স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও তাদের অধিকার আছে। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের শয্যা তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদের দ্বারা মাড়াবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদেরকে তোমাদের ঘরে প্রবেশানুমতি দিবে না। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদের ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সজ্জার ব্যাপারে তোমরা তাদের প্রতি শোভনীয় আচরণ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ : ১৯৯৭-২০২০

সুতরাং, ইসলামে দাম্পত্য জীবন হলো একটি পবিত্র বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, সহানুভূতি এবং দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবার গঠিত হয় এবং সমাজ নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। যেমন-

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ২৮৫

দাম্পত্য জীবন শুরু করার শর্ত :

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দাম্পত্য জীবন শুরু করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং এটি ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আর্থসামাজিক এবং ধর্মীয় প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। ইসলামে বিয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঈমানকে পূর্ণতা দেওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা এবং একটি সুস্থ ও শান্তিময় পরিবার গঠন করা। তাই যখন কোনো ব্যক্তি এসব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করে, তখনই তার জন্য বিয়ে করা উত্তম। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবন শুরু করার উপযুক্ত হওয়ার কিছু শর্ত আলোচনা করা হলো-

১. শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা :

বিয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَابۡتَلُوا الۡیَتٰمٰی حَتّٰۤی اِذَا بَلَغُوا النِّکَاحَ ۚ فَاِنۡ اٰنَسۡتُمۡ مِّنۡہُمۡ رُشۡدًا فَادۡفَعُوۡۤا اِلَیۡہِمۡ اَمۡوَالَہُمۡ ۚ

আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে পরীক্ষা কর যতক্ষণ না তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা নিসা : ৬

আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বিয়ের জন্য শুধু শারীরিক নয়, মানসিক পরিপক্কতা বা বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, পিতৃহীন শিশুদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে তাদের পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে যে তারা বিবাহের উপযুক্ত হয়েছে কিনা এবং তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা এসেছে কিনা। এটি কেবল বয়সের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা যাচাই করার নির্দেশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে একটি গুরুতর দায়িত্ব, যার জন্য শুধুমাত্র শারীরিক বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, বরং জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা আবশ্যক। তাই ইসলামে বিয়ের জন্য বয়স নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতি ও পরিপক্কতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই পরিপক্কতা অর্জনের পর একজন ব্যক্তি একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারে।

২. বালেগ বা প্রপ্ত বয়স হওয়া

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতার অন্যতম লক্ষণ হলো বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া। বালেগ হওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির জন্য শরিয়তের সকল বিধিবিধান সালাত, সাওম, হজ, যাকাত ইত্যাদি আবশ্যিক করে তোলে। বালেগ হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শরীয়তের দৃষ্টিতে বালেগ হওয়ার কয়েকটি সুস্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। বালেগ হওয়ার শারীরিক লক্ষণগুলো হলো-

ক. সস্বপ্নদোষ হওয়া

ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই বয়ঃপ্রাপ্তির অন্যতম লক্ষণ হলো স্বপ্নদোষ। ঘুমের মধ্যে এটি হলে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে বলে ধরা হয়। স্বপ্নদোষ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই বালেগ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, (২) অসুস্থ (পাগল) ব্যক্তি, যতক্ষণ না আরোগ্য লাভ করে এবং (৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না বালেগ হয়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৯৮

খ. মাসিক স্রাব হওয়া

মেয়েদের ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়া প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন নারী শারীরিকভাবে সন্তান ধারণের জন্য সক্ষম হয়েছেন এবং তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ ফাতিমা বিনতু আবূ হুবায়শ (রাঃ) আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমি কখনও পবিত্র হই না। এমতাবস্থায় আমি কি সালাত ছেড়ে দেব? আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ হলো এক ধরনের বিশেষ রক্ত, হায়েযের রক্ত নয়। যখন তোমার হায়েয শুরু হয় তখন তুমি সালাত ছেড়ে দাও। আর হায়েয শেষ হলে রক্ত ধুয়ে সালাত আদায় কর। সহিহ বুখারি : ৩০৬

গ. সন্তান ধারণের সক্ষমতা :

একজন নারীর যখন সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা তৈরি হয়, তখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হিসেবে গণ্য হন। সাধারণত ঋতুস্রাব বা মাসিক শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এই সক্ষমতা প্রকাশ পায়। এটি বয়ঃপ্রাপ্তির একটি প্রধান শারীরিক লক্ষণ।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৩

ঘ. শুক্লসদৃশ আঠালো পদার্থ নির্গত হওয়া :

পুরুষদের ক্ষেত্রে, উত্তেজনার ফলে বীর্যপাত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক বা বালেগ হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। এটি একজন পুরুষের শারীরিক ও যৌন পরিপক্কতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

উম্মু সালামাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উম্মু সুলায়ম (রাযি.) এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’হ্যাঁ, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।’ তখন উম্মু সালামাহ (লজ্জায়) তার মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদেরও স্বপ্নদোষ হয় কি?’ তিনি বললেন, ’হ্যাঁ, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! (তা না হলে) তাদের সন্তান তাদের আকৃতি পায় কীভাবে? সহিহ বুখারি : ১৩০, ২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১; মুসলিম : ৩১৩, আহমাদ : ২৬৬৭৫

ঙ. গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল বৃদ্ধি পাওয়া

গোপনাঙ্গের আশেপাশে চুল গজানো বালেগ হওয়ার শরিয়ত নির্ধারিত চিহ্ন। রাসূল ﷺ খাইবার যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে ছোট ছেলে-মেয়ে আলাদা করার সময় নির্দেশ দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চিহিৃত করেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন –

ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ فِي بَنِي قُرَيْظَةَ ‏”‏ لاَ يُقْتَلُ مِنْهُم مَنْ لَمْ يُنْبِتْ ‏”‏ ‏.‏ فَاسْتَحْيَا النَّاسُ حَتَّى بَعَثُوا إِلَيْهِ، فَنَظَرَ إِلَى الْعَانَةِ فَتَرَكَهُ، وَمَنْ أَنْبَتَ قَتَلَهُ ‏.‏

 নবী ﷺ বনু কুরাইজা সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের মধ্যে থেকে তাকে হত্যা করা হবে না, যার (জননাঙ্গে) চুল গজায়নি।’ তখন লোকজন লজ্জাবোধ করল, এমনকি তারা তার (সাদ ইবনে মু’আযের) কাছে লোক পাঠাল। অতঃপর তিনি তার লজ্জাস্থান দেখলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। আর যার (চুল) গজায়নি, তাকে হত্যা করলেন। সহিহব বুখারি : ২৫৪১

এই হাদিসটি বনু কুরাইজা গোত্রের ঘটনা সম্পর্কিত। যুদ্ধের পর তাদের বিচার করা হয়। রাসূল ﷺ নির্দেশ দেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক (যাদের জননাঙ্গে লোম গজায়নি) ছেলেদের হত্যা করা হবে না, শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের (যাদের লোম গজিয়েছে) হত্যা করা হবে। এই হাদিসটি ইসলামী আইনে বালক বালেগ হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান শারীরিক লক্ষণ হিসেবে জননাঙ্গে লোম গজানোকে প্রমাণ করে। এটি নির্ধারণ করে যে, একজন ব্যক্তি কখন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আইনের আওতায় আসবে।

চ. বয়সের ভিত্তিতে বালেগ নির্ধারণ

যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে উপরের কোনো লক্ষণই প্রকাশ না পায়, তাহলে বয়সের ভিত্তিতে বালেগ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত হবে। অধিকাংশ ফিকহবিদদের মতে, ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই বালেগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যদি এর আগে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়। এই মতের পক্ষে দলিল হলো ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিস।

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট তাকে (ইবনু উমরকে) পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবনু ‘উমার বলেন) তখন তিনি আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক। নাফি‘ (রহ.) বলেন, আমি খলীফা ‘উমার ইবনু ‘আবদুল ‘আযীযের নিকট গিয়ে এ হাদীস শুনালাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। অতঃপর তিনি তাঁর গভর্নরদেরকে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে, (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স পনের হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করেন। সহিহ বুখারি : ২৬৬৪, ৪০৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৬৮

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে যারা ১৫ বছর বয়সে উপনীত হতেন, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। ইসলামী শরীয়তে বালেগ হওয়ার জন্য প্রথমে শারীরিক লক্ষণগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যদি সেগুলো প্রকাশ পায়, তাহলে সে বয়সেই ব্যক্তি বালেগ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে সর্বসম্মত মত অনুযায়ী ১৫ বছর বয়সে উপনীত হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই বয়সের পর থেকে সকল ইসলামী বিধান পালন করা তার ওপর বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

৩. আর্থিক সক্ষমতা :

ইসলামে বিয়ে শুধু একটি ধর্মীয় চুক্তি নয়, এটি একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বন্ধনও। যদিও ইসলামে বিয়ের জন্য বিশাল ধন-সম্পদের শর্ত নেই, তবে জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। একজন পুরুষের জন্য বিয়ের আগে এমন আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করা উচিত যাতে সে তার স্ত্রী এবং ভবিষ্যতের সন্তানদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, এবং শিক্ষা। আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে, যা একটি সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য বাধা। তাই, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করা অপরিহার্য কারণ এটি একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫

তবে মোটামুটি ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

৪. বিবাহ সম্পর্কে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা :

স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে একটি পরিবারকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা সহজ হয় এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়। ইসলামে বিবাহকে শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি একটি দ্বীনি দায়িত্ব। বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি এবং পরস্পরের ভালোবাসা। এই প্রশান্তি ও ভালোবাসা তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। আর এই সচেতনতা আসে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। একজন মুসলিম হিসেবে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত এই অধিকার ও দায়িত্বগুলো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। যেমন-

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলমান হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম তারাই তোমাদের মধ্যে অতি উত্তম। সুনানে তিরমিজি : ১১৬২, সহীহাহ : ২৮৪

এই হাদিসটি একজন মুসলিম পুরুষের জন্য স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরে। উত্তম আচরণ তখনই করা সম্ভব, যখন সে তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে। একইভাবে, স্ত্রীরও তার স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও সম্মান দেখানো উচিত।

বিবাহিত জীবনের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো একটি প্রজন্মকে ইসলামের পথে পরিচালনা করা। সন্তান জন্মদানের পর তাদের সঠিক শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব স্বামী-স্ত্রীর উপর বর্তায়। যদি দম্পতি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ হয় তাহলে সন্তান কিভাবে ইসলামের জ্ঞান পাবে। সুতরাং, বিবাহকে সফল ও অর্থবহ করতে হলে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অর্জন করা অপরিহার্য। এটি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করে না, বরং একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠনেও সাহায্য করে।

পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি শরীয়তে পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, বিবাহ শুধু দুটি মানুষের মধ্যে একটি চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা একটি নতুন পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করে। এই নির্বাচনের উপর একটি পরিবারের সুখ-শান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভর করে। ইসলামে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা একজন মুসলিমকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মীয় গুণাবলীকে (দ্বীনদারী) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। যদিও দ্বীনদারী প্রধান শর্ত, তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করা উচিত। তার মধ্যে অন্যতম হলো- সচ্চরিত্র, আখলাক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ও আর্থিক সক্ষমতা। যদিও ইসলামি শরীয়তে  বিশাল ধন-সম্পদ শর্ত নয়, তবে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়।

ইসলামে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। এটি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পরিবার এবং সমাজের কল্যাণের সাথে জড়িত। সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পরিবার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। ইসলাম এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা মেনে চললে একটি পরিবারে সুখ, শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।

১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করার প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো ঈমান

বর্তমান যুগে অনেক অজ্ঞ মুসলিম মুশরিক নারীকে বিবাহ করছে। বিশেষ করে যারা ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি জ্ঞান রাখেন না, তারা ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা মনে করে যে ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি-নিষেধের কোনো স্থান নেই। কিন্তু এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাবেক প্রধান মন্ত্রী হাসিনা ছেলে একজন খ্রীষ্টান মেয়ে বিবাহ করেছেন। সংবিধার বিশে রচয়িতা ও বিশিষ্ট আইনজীবি ড. কামালের মেয়ে একজন ইহুদি ছেলেকে বিবাহ করেছেন। বিষিষ্ট নাট্য অভনেতা ফেদৌসি মজুমদান, বিবাহ করেছেন মুশরিক রামেন্দ্র মজুমদার কে। এ কাজ ইসলাম সম্পূর্ণ হারাম।

কাজেই পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনে সময় প্রথম ও প্রধান  শর্ত হলো তাকে ঈমানদার হতে হবে। যদি কোন ইহুদী, খ্রীষ্টান বা মুশরিক ঈমানের স্বীকৃতি দেয় তবে তাকে বিবাহ করার কোন অসুবিধা নাই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ  وَلَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکَۃٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ ۚ  وَلَا تُنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ  وَلَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَکُمۡ

আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে এবং মুমিন দাসী মুশরিক নারীর চেয়ে নিশ্চয় উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। আর মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিয়ো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। সূরা বাকারা : ২২১

এই আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট যে, পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ঈমান। সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান—এগুলো কখনোই ঈমানের ওপর অগ্রাধিকার পেতে পারে না। যদি কোনো অমুসলিম ব্যক্তি (ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিক) আন্তরিকভাবে ইসলামের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে ঈমান আনে, তবে তাকে বিবাহ করা জায়েয।

২. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে দ্বীনদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া

এটি পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শর্ত। একজন ধার্মিক জীবনসঙ্গী তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সহিহ মুসলিম : ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ী ৩২৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৮, মিশকাত : ৩০৭৪,  আহমাদ : ৯৫২১, ৯৫২৬,  ইরওয়া : ১৭৮৩, সহীহ আল জামি : ৩০০৩

নবীজি (সাঃ) এই চারটি গুণের কথা উল্লেখ করার পর স্পষ্টভাবে বলেছেন, “সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে, নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে অন্য সব গুণের চেয়ে ধর্মীয় জ্ঞান এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যই একজন জীবনসঙ্গীর সবচেয়ে মূল্যবান বৈশিষ্ট্য।

অন্যান্য গুণ, যেমন সম্পদ, বংশ বা সৌন্দর্য, ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। সম্পদ ফুরিয়ে যেতে পারে, বংশমর্যাদা সবসময় সুখ নিশ্চিত করে না, এবং সৌন্দর্য সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা হলো এমন একটি গুণ যা জীবনের সব পরিস্থিতিতে স্থির থাকে এবং একটি পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। একজন ধার্মিক জীবনসঙ্গী ভালো ও মন্দ উভয় সময়েই আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে এবং পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করবে।

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الدُّنْيَا كُلُّهَا مَتَاعٌ وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَة الصَّالِحَة»

“দুনিয়া পুরোটাই হলো ভোগের সামগ্রী, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম ভোগের সামগ্রী হলো নেককার নারী।”

সহিহ মুসলিম ১৪৬৭, মিশকাত : ৫০৮৩, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩২, আহমাদ : ৬৫৬৭, সহীহ আল জামি :  ৩৪১৩

হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। মিশকাত : ৩০৯০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৭, ইরওয়া ১৮৬৮

সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সোনা-রূপা (মূল্যবান সম্পদ) পুঞ্জীভূত করে রাখার সমালোচনায় কুরআনের আয়াত নাযিল হলে সাহাবায়ে কিরাম বলেন, তাহলে আমরা কোন্ সম্পদ ধরে রাখবো? ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি তা জেনে তোমাদের বলে দিবো। অতঃপর তিনি তার উটকে দ্রুত হাঁকিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ পেয়ে গেলেন। আমিও তার পিছনে পিছনে গেলাম। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল আমরা কোন্ সম্পদ সঞ্চয় করবো? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের প্রত্যেকেই যেন অর্জন করে কৃতজ্ঞ অন্তর, যিকিরকারী জিহ্বা এবং আখেরাতের কাজে তাকে সহায়তাকারী ঈমানদার স্ত্রী। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৬, সুনানে তিরমিজি : ৩০৯৪, রওযা ১৭৯

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৫

বিয়ে শুধু পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। সম্পদ, বংশ বা সৌন্দর্য আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং নেককার পরিবারের ভিত্তি হলো দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা। তাই, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় এই গুণটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা শুধু পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়, পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ। যদিও পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারীর গুরুত্ব তুলে ধরেছে, এর মূল শিক্ষা পাত্র-পাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

মেয়ের অভিভাবকের জন্য এটি একটি বিশাল দায়িত্ব যে, তারা তাদের মেয়ের জন্য এমন একজন জীবনসঙ্গী খুঁজে বের করবেন যিনি তার ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। কারণ, একজন দ্বীনদার পাত্র তার স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং তাকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে। সে তার পরিবারকে আল্লাহর ভয় এবং ভালোবাসা দিয়ে পরিচালিত করবে, যা একটি সুখী এবং শান্তিময় জীবনের ভিত্তি। একজন দ্বীনদার পাত্র শুধুমাত্র বাহ্যিক সম্পদ, সৌন্দর্য বা বংশমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না। বরং সে তার স্ত্রীকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখে। সে স্ত্রীকে সম্মান করে এবং তার সাথে উত্তম আচরণ করে। এছাড়া, একজন ধার্মিক স্বামী তার সন্তানদের সৎ ও ধর্মভীরু হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আদর্শ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে, যে পাত্রের মধ্যে দ্বীনদারী নেই, তার সম্পদ বা বংশমর্যাদা যতই থাকুক না কেন, সে যেকোনো সময় বিপথে যেতে পারে এবং তার স্ত্রীর ওপর অবিচার করতে পারে। এমন সম্পর্ক শুধুমাত্র পার্থিব জীবনেই নয়, পরকালেও ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতএব, হাদিসের শিক্ষানুসারে, মেয়ের বা মেয়ের অভিভাবকের উচিত জাগতিক ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোর চেয়ে একজন দ্বীনদার পাত্রের ধার্মিকতা, সততা এবং উত্তম চরিত্রের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, এর মাধ্যমেই একটি পরিবার দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারে।

৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সচ্চরিত্র ও নৈতিকতা দেখতে হবে

দ্বীনদারীর পাশাপাশি উত্তম চরিত্র থাকা অপরিহার্য। একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি তার জীবনসঙ্গীর সাথে দয়া ও সম্মানের সাথে আচরণ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যে ব্যক্তির দীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সাথে বিয়ে দাও। তা যদি না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি : ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

৪. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করতে হবে

বংশের পবিত্রতা ও সামাজিক মর্যাদা দেখে বিবাহ করা উচিত, কারণ এর মাধ্যমে পরিবারের নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি মজবুত হয়।

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৮, সহীহাহ : ১০৬৭

৫. পাত্রী নির্বাচনে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনায় নিতে হবে

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেন, এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

৫. পাত্রী নির্বাচনে অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

انْكِحُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ

তোমরা বিবাহ করো আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৩,

৬. পাত্র নির্বাচনে ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা থাকা দরকার

পুরুষের জন্য বিবাহের আগে ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা থাকা জরুরি, কারণ তাকে পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

তবে মোটামুটি ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

৭. কুমারীত্ব নারীকে বিবাহ করা উত্তম

ইসলামে কুমারী নারীকে বিবাহ করাকে উৎসাহিত করা হয়, কারণ তারা সাধারণত স্বামীর প্রতি বেশি অনুগত ও প্রেমময়ী হয়।

আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ

তোমাদের কুমারী মেয়ে বিবাহ করা উচিত। কেননা তারা মিষ্টিমুখী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট হয়। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬১, মিশকাত : ৩০৯২, সহীহাহ : ৬২৩, সহীহ আল জামি : ৪০৫৩।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত।

জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। সহিহ বুখারী : ৫২৪৭, ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

৮. পাত্রী নির্বাচনে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

উট আরোহণকারিণীদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী কুরায়শ বংশের নারীগণ, তারা শৈশবকালে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা হয় এবং স্বামীর ধন-সম্পদের উত্তম রক্ষনাবেক্ষণকারিণী হয়। সহিহ বুখারি : ৫০৮২, সহিহ মুসলিম : ২৫২৭, মিশকাত : ৩২০৪ সহীহাহ্ ১০৫২, সহীহ আল জামি‘ ৩৩২৯।

৯. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধার্মিক পুরুষের জন্য ধার্মিক নারী হতে হবে

আপনি যদি একজন ভালো জীবনসঙ্গী চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিবাহের জন্য পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের আগে নিজেদের চরিত্রকে উন্নত করা উচিত। কারণ, আপনার চরিত্র যেমন হবে, আপনার জীবনসঙ্গীর চরিত্রও তেমনই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সম্পদ, সৌন্দর্য বা বংশমর্যাদার চেয়েও ধর্মীয় জ্ঞান, সততা এবং নৈতিক গুণাবলীকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, এই গুণগুলোই একজন মানুষকে “সচ্চরিত্র” হিসেবে তৈরি করে এবং একটি সুখী ও স্থিতিশীল সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلۡخَبِیۡثٰتُ لِلۡخَبِیۡثِیۡنَ وَالۡخَبِیۡثُوۡنَ لِلۡخَبِیۡثٰتِ ۚ  وَالطَّیِّبٰتُ لِلطَّیِّبِیۡنَ وَالطَّیِّبُوۡنَ لِلطَّیِّبٰتِ ۚ  اُولٰٓئِکَ مُبَرَّءُوۡنَ مِمَّا یَقُوۡلُوۡنَ ؕ  لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ 

দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। আর সচ্চরিত্রা নারীরা সচ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষরা সচ্চরিত্রা নারীদের জন্য; লোকেরা যা বলে, তারা তা থেকে মুক্ত। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। সুরা নুর : ২৬

সূরা নূরের এই আয়াতটি আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয় যে, পাত্র-পাত্রী নির্বাচন কোনো বাহ্যিক বিষয় নয়। এটি আসলে নিজেদের ভেতরের প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকেই ভালো জীবনসঙ্গী দান করেন, যারা নিজেরা ভালো এবং পবিত্র জীবনযাপন করে। তাই, বিবাহের জন্য যোগ্য পাত্র-পাত্রী খোঁজার আগে আমাদের উচিত নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সচ্চরিত্রবান মানুষ হিসেবে তৈরি করা।

১০. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সুন্দর মুখাবয়ব ও আকর্ষণীয় রূপ-সৌন্দর্য

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন-

اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَفَعَلَ فَتَزَوَّجَهَا فَذَكَرَ مِنْ مُوَافَقَتِهَا

তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

১১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে ধর্মীয় শিক্ষার বা দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হলে ভালো হয়

হুমায়দ ইবনু ‘আবদুর রহমান (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি মু‘আবিয়াহ (রাযি.)-কে খুৎবায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের ‘ইল্ম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহ্ই (জ্ঞান) দাতা। সর্বদাই এ উম্মাত কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের উপর কায়িম থাকবে, বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৩৬৪১,৭৩১২, ৭৪৬০, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭, আহমাদ : ১৬৮৪৯, ১৬৮৭৮, ১৬৯১০

১৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সুস্থতা ও শারীরিক সক্ষমতা জেনে নিতে হবে :

পাত্র-পাত্রীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, সুস্থ জীবন যাপন এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য শারীরিক সক্ষমতা জরুরি। যদি কোনো গুরুতর রোগ থাকে, যা দাম্পত্য জীবনে বা সন্তান ধারণে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তা বিবাহের আগে জেনে নেওয়া উচিত। ইসলামে এই ধরনের বিষয়গুলো গোপন রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঞ্চয়শীলতা, একে অপরের প্রতি সম্মান, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া খুবই জরুরি। এসব গুণগুলো দাম্পত্য জীবনকে আরও সুন্দর ও স্থিতিশীল করে তোলে। বিবাহ শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের বন্ধন। তাই উভয় পক্ষের পরিবারের প্রতি সম্মান দেখানো এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

১৪. যাদের সাথে বিবাহ হারাম

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের সাথে বিবাহ করা হারাম বা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হল রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَبَنٰتُکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ وَعَمّٰتُکُمۡ وَخٰلٰتُکُمۡ وَبَنٰتُ الۡاَخِ وَبَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَاُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَاُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَرَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫  فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫  وَحَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ  وَاَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۙ

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৩

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

}

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পুরুষের পক্ষে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন- কোনো রমণীকে তার ফুফুর সাথে, ফুফুকে তার ভাইয়ের মেয়ের সাথে, ভাইয়ের মেয়েকে তার ফুফুর সাথে, খালাকে তার বোনের মেয়ের সাথে অথবা বোনের মেয়েকে তার খালার সাথে; এমনিভাবে ছোট বোনকে বড় বোনের সাথে, বড় বোনকে ছোট বোনের সাথে। সুনানে তিরমিযী : ১১২৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৬৫, সুনানে নাসায়ী : ৩২৯৮, মিশকাত : ৩১৭১, দারিমী : ২২২৪, আহমাদ : ৯৫০০।

রক্তের সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

কুরআনের সূরা নিসায় সরাসরি উল্লেখ আছে যে রক্তের সম্পর্কের কারণে বিবাহ করা হারাম। এদেরকে বলা হয় ‘মুহাররামাত’।   উপরের আয়াতের আলোক যে সকল রক্তের সম্পর্কের নারীর সাথে বিবাহ হারাম তারা হলো-

ক. মা এবং নানী-দাদী : নিজের জন্মদাত্রী মা, এবং মায়ের মা ও বাবার মা (নানী-দাদী) এর সাথে বিবাহ হারাম।

খ. মেয়ে এবং নাতনি : নিজের ঔরসের মেয়ে, ছেলের মেয়ে ও মেয়ের মেয়ে (নাতনি) এর সাথে বিবাহ হারাম।

গ. বোন : আপন বোন, সৎ বোন (পিতার বা মাতার দিক থেকে) এর সাথে বিবাহ হারাম।

ঘ. ফুফু : পিতার বোন।

ঙ. খালা : মায়ের বোন।

চ. ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি) : ভাইয়ের ঔরসের মেয়ে।

ছ. বোনের মেয়ে (ভাগ্নি): বোনের ঔরসের মেয়ে।

দুধের সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

দুধপানের মাধ্যমে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, ইসলামে তা রক্তের সম্পর্কের মতোই গণ্য হয়। সহিহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে বলা হয়েছে, “রক্তের কারণে যাদেরকে হারাম করা হয়েছে, দুধের কারণেও তারা হারাম হবে।” অর্থাৎ, কোনো শিশু যদি কোনো মহিলার দুধ পান করে, তাহলে সেই মহিলা তার দুধ-মা এবং তার স্বামী সেই শিশুর দুধ-বাবা হয়ে যান।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বংশগত (রক্ত সম্পর্কের) কারণে ও দুধপান সম্পর্কের ভিত্তিতে সকল ক্ষেত্রে বিবাহ হারাম। সহিহ বুখারী ৫২৩৯, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৫৫, মিশকাত : ৩১৬১, দারিমী : ২২৯৫, সহীহ আল জামি : ৮০৩৩।

দুধপানের মাধ্যমে নিম্নোক্ত সম্পর্কগুলো হারাম হয়ে যায়:

দুধ-মা, এবং তার মা (দুধ-নানী-দাদী)।

দুধ-বোন, অর্থাৎ যে মেয়ে ওই একই মহিলার দুধ পান করেছে।

দুধ-মেয়ে, অর্থাৎ যে শিশুর সাথে আপনি একই মহিলার দুধ পান করেছেন।

দুধ-খালা (দুধ-মায়ের বোন)।

দুধ-ফুফু (দুধ-বাবার বোন)।

দুধ-ভাতিজি ও দুধ-ভাগ্নি।

দুধপানের মাধ্যমে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হলো, শিশুটি দুই বছর বয়সের মধ্যে অন্তত পাঁচবার পূর্ণ তৃপ্তির সাথে দুধ পান করবে।

১. শিশুটিকে পূর্ণ তৃপ্তির সাথে অন্তত পাঁচবার দুধ পান করতে হবে।

দুধপানের মাধ্যমে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে “দুই বছর বয়সের মধ্যে অন্তত পাঁচবার পূর্ণ তৃপ্তির সাথে দুধ পান করা” – এই শর্তটি সরাসরি নিম্নোক্ত হাদিস থেকে এসেছে। এই বিষয়ে সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং শক্তিশালী দলিলটি হলো সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কুরআনে যা নাযিল হয়েছিল, তার মধ্যে এটিও ছিল যে, ‘দশবার দুধপানে হারাম সাব্যস্ত হয়’। অতঃপর তা ‘পাঁচবার দুধপানে হারাম সাব্যস্ত হয়’ দ্বারা রহিত (মানসুখ) হয়ে যায়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মারা যান, তখন এই আয়াতগুলো (শেষোক্ত বিধান) কুরআনের তিলাওয়াতযোগ্য অংশ হিসেবেই ছিল।” সহিহ মুসলিম : ১৪৫২; সুনানে আবু দাউদ : ২০৬২; সুনানে তিরমিজি : ১১৫০

প্রথমে দুধপানের সম্পর্ক হারাম হওয়ার জন্য দশবার দুধপানের বিধান ছিল। পরবর্তীতে এই বিধানটি রহিত হয়ে যায় এবং পাঁচবার দুধপানের বিধান বহাল হয়। আয়েশা (রা.) এর বক্তব্য অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের সময় এই পাঁচবারের বিধানটি কার্যকর ছিল।

উম্মুল ফাযল (রাঃ) (’আব্বাস (রাঃ)-এর স্ত্রী) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একবার বা দু’বারের দুধপানে হারাম হয় না। সহিহ মুসলিম : ১৪৫১, ইবনু মাজাহ : ১৯৪০, মিশকাত : ৩১৬৪

আর ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে, (তিনি বলেন) একবার বা দু’বার চোষণে হারাম হয় না। সহিহ মুসলিম : ১৪৫০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৩১০, সুনানে তিরমিযী : ১১৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৪১, মিশকাত : ৩১৬৫

২. দুধ পানের বয়সসীমা : অধিকাংশ ফকীহ (ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ) এবং উলামাদের মতে, এই দুধপান অবশ্যই শিশুর দুগ্ধপানের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে হতে হবে। যেমন –

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সূরা বাকারা : ২৩৩।

আবদুল্লাহ্ ইবনুযু যুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ا رَضَاعَ إِلَّا مَا فَتَقَ الْأَمْعَاءَ

দুধপান (যার কারণে হারাম সাব্যস্ত হয়) কেবল সেই দুধপান, যা অন্ত্র (পাকস্থলী) ভেদ করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৪৬, ইরওয়াহ : ২১৫০

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুধ ছাড়ানোর বয়সের পূর্বে স্তনের বোটা হতে শিশুর পাকস্থলীতে দুধ না গেলে দুধপানের নিষিদ্ধতা কার্যকর হয় না। সুনানে তিরমিজি : ১১৫২, মিশকাত : ৩১৭৩, ইরওয়া : ২১৫০, সহীহ আল জামি : ৭৬৩৩।

সুতরাং, এই হাদিসগুলো একত্রিত করে উলামায়ে কিরামগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোনো শিশুর জন্য দুধের সম্পর্ক হারাম হওয়ার জন্য দুটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:

ক. শিশুটির বয়স দুই বছরের মধ্যে হতে হবে।

খ .শিশুটিকে পূর্ণ তৃপ্তির সাথে অন্তত পাঁচবার দুধ পান করতে হবে।

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যাদেরকে বিবাহ করা হারাম

কোনো নারী বা পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে কিছু সম্পর্ক স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়।

ক. স্থায়ীভাবে হারাম

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَنۡکِحُوۡا مَا نَکَحَ اٰبَآؤُکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً وَّمَقۡتًا ؕ  وَسَآءَ سَبِیۡلًا 

আর তোমরা বিবাহ করো না নারীদের মধ্য থেকে যাদেরকে বিবাহ করেছে তোমাদের পিতৃপুরুষগণ। তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (তা ক্ষমা করা হল)। নিশ্চয় তা হল অশ্লীলতা ও ঘৃণিত বিষয় এবং নিকৃষ্ট পথ। সূরা নিসা : ২২

শ্বাশুড়ি : স্ত্রীর মা, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পন্ন হলে তার মাকে বিবাহ করা চিরতরে হারাম হয়ে যায়।

বউয়ের মেয়ে (সৎ মেয়ে): স্ত্রীর পূর্বের স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া মেয়ে। তবে এটি হারাম হবে যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস সম্পন্ন হয়। সূরা নিসা : ২৩

পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ): নিজের পুত্রের স্ত্রী। সূরা নিসা : ২৩

পিতার স্ত্রী (সৎ মা) : পিতার কোনো স্ত্রীর সাথে বিবাহ করা হারাম, তিনি জীবিত থাকুন বা মৃত।

অন্যের স্ত্রী থাকা অবস্থায় : আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّالۡمُحۡصَنٰتُ مِنَ النِّسَآءِ

আর (হারাম করা হয়েছে) নারীদের মধ্য থেকে সধবাদেরকে। সুরা নিসা : ২৪

খ. অস্থায়ীভাবে হারাম

এই সম্পর্কগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত হারাম থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার পরিবর্তন না হয়।

একই সময়ে দুই বোনকে বিবাহ করা হারাম। এর দলিল সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৩-এ রয়েছে। “তোমাদের জন্য আরও হারাম করা হয়েছে দুই বোনকে একত্রে (স্ত্রী হিসেবে) রাখা।” কিন্তু এক বোন মৃত বরণ করা পর অন্য বোনকে বিবাহ করা জায়েয। যেমন-

সৎ মা এবং তার বোন : কোনো মহিলার সাথে বিবাহে থাকা অবস্থায় তার ফুফু বা খালাকে বিবাহ করা হারাম।  হাদিসে এসেছে-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যেন ফুফু ও তার ভাতিজীকে এবং খালা এবং তার বোনঝিকে একত্রে বিয়ে না করে। সহিহ বুখারি : ৫১০৯, ৫১১০, সহিহ মুসলিম : ১৪০৮, আহমাদ : ১০০০২

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত বংশগত, সামাজিক এবং নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য করা হয়েছে।

বিবাহের আহকামসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এতে নামাজ, রোজা, এবং অন্যান্য ইবাদতের মতো বিয়ে-শাদীরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, আজকাল আমরা মসজিদ বা ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মানলেও, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ করি। বিয়ের প্রথম ধাপ হলো কনে দেখা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।

ইসলাম বিয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটির জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কনে দেখার ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং দ্বীনদারী বা ধার্মিকতাকেও প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব বা কনে দেখার সময় ছেলে ও মেয়ের পক্ষ থেকে কিছু মৌলিক নীতি মেনে চলা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে পর্দা রক্ষা করে দেখা-সাক্ষাৎ করা, কনে সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অনৈসলামিক রীতি পরিহার করা।

বিয়েকে সহজ করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই শরিয়তসম্মত নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য। কারণ, বিয়ের শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তাহলে পুরো দাম্পত্য জীবনটাই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার তৌফিক দিন।

শরীয়তে বিবাহ বলতে কী বুঝায় :

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ হলো একটি সামাজিক চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত। এটি শুধু একটি জৈবিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত এবং সুন্নাহ। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। ইসলামে বিবাহকে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং সমাজে নৈতিকতা ও পবিত্রতা রক্ষার একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়। এটি মানবজাতির বংশবৃদ্ধির একটি বৈধ ও সম্মানজনক পদ্ধতি। পাত্র পাত্রি নির্বচনের পর বিবাহে মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ের মূল কার্যাক্রমের ৫ টি পর্যায়ে সংঘটিত হয়।

১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকবে

৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

৫. রবের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা তোমাদের অধিক কর্তব্য এজন্য যে, এর মাধ্যমেই তোমাদেরকে স্ত্রী অঙ্গ ভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারী : ৫১৫১, সহিহ মুসলিম : ১৪১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৪, আহমাদ : ১৭৩০২, ইরওয়া : ১৮৯২, সহীহ আল জামি : ১৫৪৭

ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হয় তার জন্য সমীচীন হলো ওই মেয়ের অভিভাবকের মাধ্যমে তাকে পেতে চেষ্টা করা। এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিয়ে করতে চাওয়া যার কাছ থেকে এমন প্রস্তাব গ্রহণ হতে পারে। এটি বিবাহ পর্ব সূচনাকারীদের প্রাথমিক চুক্তি। এটি বিবাহের ওয়াদা এবং বিবাহের প্রথম পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপ গ্রহনের আগে নিচের আমলগুলো করা জরুরি।

১. ইস্তিখারা[MIH1]  করা :

মুসলিম নর-নারীর জীবনে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই যখন তারা বিবাহের সিদ্ধান্ত নেবেন তাদের জন্য কর্তব্য হলো ইস্তিখারা তথা আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।

হাসান (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ইস্তিখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না, আর যে পরামর্শ নেয় সে কখনো অনুতপ্ত হয় না।” মুসনাদ আহমদ : ১৭২৪৫; সিলসিলা সহিহাহ : ৬১১

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সব কাজে ইস্তিখারাহ্* শিক্ষা দিতেন। যেমন পবিত্র কুরআনের সূরাহ্ আমাদের শিখাতেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ কোন কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন ফরজ নয় এমন দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার পর এ দু’আ পড়ে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي قَالَ وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ.

প্রভু হে! আমি তোমার জ্ঞানের ওয়াসিলাতে তোমার অনুমতি কামনা করছি। তোমার কুদরতের ওয়াসিলায় শক্তি চাচ্ছি আর তোমার অপার করুণা ভিক্ষা করছি। কারণ তুমিই সর্বশক্তিমান আর আমি দুর্বল। তুমিই জ্ঞানী আর আমি অজ্ঞ এবং তুমিই সর্বজ্ঞ। প্রভু হে! তুমি যদি মনে কর যে, এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায়, ইহকালে ও পরকালে সত্বর কিংবা বিলম্বে আমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে তা হলে আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দাও এবং তার প্রাপ্তি আমার জন্য সহজতর করে দাও। অতঃপর তুমি তাতে বারাকাত দাও। আর যদি তুমি মনে কর এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায় ইহকালে ও পরকালে আমার জন্য ক্ষতিকর হবে শীঘ্র কিংবা বিলম্বে তাহলে তুমি তাকে আমা হতে দূর করে দাও এবং আমাকে তা হতে দূরে রাখো; অতঃপর তুমি আমার জন্য যা মঙ্গলজনক তা ব্যবস্থা কর- সেটা যেখান থেকেই হোক না কেন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্টচিত্ত করে তোল। সহিহ বুখারি : ১১৬২, ৬৩৮২, ৭৩৯০

২. আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরামর্শ করা :

বিবাহ করতে চাইলে আরেকটি করণীয় হলো বিয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ, পাত্রী ও তার পরিবার সম্পর্কে ভালো জানাশুনা রয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاعۡفُ عَنۡہُمۡ وَاسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ وَشَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡنَ

সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরার্মশ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ۪  وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۚ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। সুরা শুরা : ৩৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে অধিক পরিমাণে পরামর্শ করতেন।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে তাঁর সাহাবাদের সাথে পরামর্শের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি :  ১৭১৪, বাইহাকী : ১৯২৮০।

এদিকে পরামর্শদাতার কর্তব্য বিশ্বস্ততা রক্ষা করা। তিনি যেমন তার জানা কোনো দোষ লুকাবেন না, তেমনি অসদুদ্দেশে আদতে নেই এমন কোনো দোষের কথা বানিয়েও বলবেন না। আর অবশ্যই এ পরামর্শের কথা কাউকে বলবেন না।

৩. প্রস্তাব দেওয়ার আগে একে অপরকে দেখে নেয়া উচিত

ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি এবং স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করা। এই সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং এটি মানবিক আকর্ষণ ও বোঝাপড়ার ওপরও প্রতিষ্ঠিত। বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীকে দেখে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় যাতে তাদের মধ্যে প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। জীবনসঙ্গীর চেহারা বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে স্বস্তি লাভ করে। এর ফলে বিবাহের প্রতি তার আগ্রহ ও সন্তুষ্টি বাড়ে, যা একটি সফল বৈবাহিক জীবনের জন্য খুবই জরুরি। অনেক সময় বাহ্যিক চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে মানুষের মনে কিছু ধারণা বা প্রত্যাশা থাকে। পাত্র-পাত্রী দেখে নেওয়ার মাধ্যমে এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা হতাশা এড়ানো সম্ভব হয়।

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তাকে বলল যে, সে আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে একবার দেখেছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও! তুমি তাকে এক নযর দেখে নাও। কারণ আনসারদের চোখে কিছুটা ক্রটি আছে। সহিহ মুসলিম : ১৫২৪, মিশকাত : ৩০৯৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৬, আহমাদ : ৭৮৪২, সহীহাহ্ : ৯৫

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি :  ৫০৬।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, সহীহাহ : ১৫১-১৫২

মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে এক মহিলাকে বিবাহ করার ব্যাপারে তাঁর সাথে আলাপ করলাম। তিনি বলেনঃ তুমি যাও এবং তাকে দেখে নাও। হয়তো তাতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। অতএব আমি এক আনসার মহিলার নিকটে এসে তার পিতা-মাতার নিকট তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলাম এবং সাথে সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসও তাদের অবহিত করলাম। কিন্তু মনে হলো তার পিতা-মাতা এটা অপছন্দ করলো। রাবী বলেন, মেয়েটি পর্দার আড়াল থেকে উক্ত হাদীস শুনে বললো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে পাত্রী দেখার আদেশ দিয়ে থাকলে আপনি দেখে নিন। অন্যথায় আমি আপনাকে শপথ দিচ্ছি (না দেখার জন্য)। সে যেন ব্যাপারটিকে অভিনব মনে করলো। রাবী বলেন, আমি তাকে দেখে নিলাম এবং তাকে বিবাহ করলাম। পরে মুগীরাহ (রাঃ) তার সাথে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

৪. ছবি বিনিময়ের শরয়ী বিধান

ইসলামে সাধারণত অপ্রয়োজনে বা এমনভাবে ছবি ব্যবহার করা নিরুৎসাহিত করা হয়, যা ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করতে পারে। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিয়ের প্রস্তাবের জন্য নারী-পুরুষের ছবি আদান-প্রদান করাকে অনেক আলেম মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:

ক. পর্দার লঙ্ঘন : ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি বিনিময় করলে তা বহু লোকের হাতে চলে যেতে পারে, যাদের কাছে ওই ছবি দেখা বৈধ নয়। এতে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়।

খ. বাস্তবের সঙ্গে অমিল : ছবি অনেক সময় বাস্তবের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। ছবি এডিট করে বা নির্দিষ্ট কোণ থেকে তুলে কাউকে আকর্ষণীয় দেখানো হতে পারে, যা পরে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে।

গ. সম্মানের হানি : যদি কোনো কারণে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যায়, তবে ছবিগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তখন সেগুলো অপব্যবহার হওয়ার বা অসম্মানের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৫. সরাসরি দেখা ও কথা বলার গুরুত্ব-

শরিয়তের নির্দেশনা হলো, বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীকে সরাসরি দেখা। এটি হলো কনে দেখা পর্ব। এর মূল উদ্দেশ্য হলো একে অপরের চেহারা, চলাফেরা, এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা। এই দেখার সময় পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে কেবল বৈধ সম্পর্কের ভিত্তিতে পর্দার বিধান বজায় রেখে দেখা ও কথা বলার অনুমতি রয়েছে।

জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু যেন দেখে নেয় যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। অতঃপর আমি তার মাঝে এমন কিছু দেখি যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আকৃষ্ট করলো। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করি সুনানে আবু দাউদ : ২০৮২, মিশকাত : ৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি : ৫০৬।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে সরাসরি দেখাই হচ্ছে বিয়ের জন্য সঠিক পদক্ষেপ। সুতরাং, ছবি আদান-প্রদান করে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। এর পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীর পরিবারের সম্মতিতে এবং ইসলামিক বিধান মেনে একে অপরকে সরাসরি দেখে নেওয়া উত্তম ও নিরাপদ। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্ক মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

৬. প্রস্তাবদানকারীর সঙ্গে বাইরে নির্জনে অবস্থান করা যাবে না

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মানেই মেয়েটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে যায়নি। বিয়ের চুক্তি বা ‘আকদ’ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণভাবে শরিয়তসম্মত স্বামী-স্ত্রী নয়। তাই এই সময়ে তাদের মধ্যে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। বিয়ের আগে নির্জন স্থান বা একা একা ঘোরাঘুরি ফিতনার (পরীক্ষা বা ফিতনা) কারণ হতে পারে এবং এটি ইসলামের পর্দার নীতির পরিপন্থী।

আজকাল অনেক অভিভাবকই এই বিষয়ে উদাসীন। তারা মনে করেন, যেহেতু বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তাই পাত্র-পাত্রীর মেলামেশা বা বাইরে যাওয়া-আসা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ধরনের মনোভাব শরিয়ত সম্মত নয়। ইসলামে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো, তাদের সন্তানদের নৈতিক ও ইসলামিক মূল্যবোধের মধ্যে বড় করা। বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের এমন অবাধ মেলামেশা নৈতিকতা ও পর্দার বিধান উভয়কেই লঙ্ঘন করে, যা পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে।

বিয়ের আগের এই সময়টুকুতে বর-কনের মধ্যে শুধু প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ও শরিয়তসম্মত উপায়ে একে অপরকে জানার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোনোভাবেই নির্জনতা বা ব্যক্তিগত মেলামেশার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। বিবাহ পূর্ববর্তী এই ধরনের সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হলেই কেবল তারা একে অপরের জন্য বৈধ হবেন এবং তাদের জন্য মেলামেশার পথ উন্মুক্ত হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ’জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাড়িয়ে বলেনঃ হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ যমানা), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৩৬৩

৭. বিবাহের আগে যোগাযোগের সীমারেখা মানতে হবে

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এমন নারী-পুরুষ এখনও একে অপরের জন্য ‘বেগানা’ বা অপরিচিতই রয়েছেন। যতক্ষণ না তারা শরিয়তসম্মত উপায়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন, ততক্ষণ তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাই এই সময় তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়।

মূলত, এই যোগাযোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিয়ের শর্ত, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। অর্থাৎ, তাদের কথাবার্তা শুধু বিয়ের চুক্তি ও শর্তাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এই যোগাযোগে আবেগ বা ভালোবাসা প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। আবেগপ্রবণ বা রোমান্টিক ভাষায় কথা বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এই ধরনের কথাবার্তা সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ফিতনার কারণ হতে পারে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যে এমন কথাবার্তা বৈধ নয়। বিয়ের আলোচনা যেহেতু একটি পারিবারিক বিষয়, তাই এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের, বিশেষ করে পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের সম্মতি থাকা উত্তম। এটি সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সামনে বা তাদের জ্ঞাতসারে যোগাযোগ হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সম্পর্কটি একটি সম্মানজনক গণ্ডির মধ্যে থাকে।

৮. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :

যে নারীর কোথাও বিয়ের কথাবার্তা চলছে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া বৈধ নয়।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১

হ্যা, দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা যদি প্রথম প্রস্তাবদাতার কথা না জানেন তবে তা বৈধ। এ ক্ষেত্রে ওই নারী যদি প্রথমজনকে কথা না দিয়ে থাকেন তবে দু’জনের মধ্যে যে কাউকে গ্রহণ করতে পারবেন।

৯. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :

বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ 

আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।

তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।

১০. এ্যাংগেজমেন্ট করা :

ইসলামে ‘এ্যাংগেজমেন্ট’ বা বাগদান অনুষ্ঠান, যেটিতে আংটি পরানোর রেওয়াজ আছে, এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজে এসেছে। ইসলামে বিয়ে পূর্ববর্তী সম্পর্ককে সহজ ও পবিত্র রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত, পাত্র-পাত্রী একে অপরের কাছে বেগানা বা অপরিচিতই থাকেন। তাই এই সময়ে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা শরিয়তসম্মত নয়।

এ্যাংগেজমেন্টের মাধ্যমে অনেকেই মনে করেন যে বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেল। এর ফলে বর-কনে এমনভাবে মেলামেশা শুরু করে, যেন তারা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু ইসলামে শুধুমাত্র বিবাহের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বৈধ হয়। এ্যাংগেজমেন্টের আংটি কোনোভাবেই এই আকদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।

সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো, প্রস্তাবদানকারী পুরুষ নিজের হাতে কনেকে আংটি পরিয়ে দেয়। ইসলামে বেগানা নারী-পুরুষের জন্য একে অপরের শরীর স্পর্শ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেহেতু বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বামী-স্ত্রী নন, তাই এই ধরনের শারীরিক স্পর্শ শরিয়ত লঙ্ঘন করে।

ইসলামের বিধান হলো-

কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বা আংটি পরানোর প্রথা ছাড়াই যত দ্রুত সম্ভব বিবাহের আকদ সম্পন্ন করা উচিত। এতে শরিয়তসম্মতভাবে পাত্র-পাত্রী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন এবং এরপর তাদের পারস্পরিক মেলামেশা ও সম্পর্ক স্থাপন বৈধ হবে।

১১. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :

উপযুক্ত পাত্র পেলে তার প্রস্তাব নাকচ করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.

‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি :  ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।

আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫

তাই যে কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-

(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)

(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

(৩) স্বাধীন হওয়া

(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)

(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না

(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)

১. ইসলামে কনের ওয়ালি ছাড়া নিকাহ বৈধ নয়

বিবাহে কনের অভিভাবক বা ওয়ালীর সম্মতি আবশ্যক। এই বিষয়ে ইসলামে একাধিক হাদিস রয়েছে। এই সম্মতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বৈধ হয় না। এ প্রশ্নের সবচেয়ে সরাসরি উত্তর দিতে পারে এমন একটি হাদিস হলো:

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,

২. কোন নারী কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবক হতে পারবে না

 আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا

কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকে বিবাহ দিবে না এবং কোন মহিলা নিজেকেও বিবাহ দিবে না। কেননা যে নারী স্বউদ্যোগে বিবাহ করে সে যেনাকারিণী।সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮২, ইরওয়াহ : ১৮৪১

৩. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ওয়ালি বা অভিভাবক হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি নিজের অধীনস্থ ব্যক্তির আর্থিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিবাহের ক্ষেত্রে ওয়ালি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কনের পক্ষ থেকে বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী আইনে সাবালিকা নারীর বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য ওয়ালির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

ক. পিতা:

বিবাহের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার প্রথম ও প্রধান হকদার হলেন তার পিতা। কারণ, তিনি কনের নিকটতম রক্ত সম্পর্কীয় অভিভাবক এবং তার উপর সবচেয়ে বেশি স্নেহ ও অধিকার রয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ এ বিষয়ে একমত। ইমাম শাফেঈ উল্লেখ করেছেন, “বিয়ের ক্ষেত্রে পিতার অধিকার সবচেয়ে বেশি, এমনকি তিনি যদি নাবালিকাও হন।” আল-উম্ম, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৫৫

খ. দাদা:

পিতার অনুপস্থিতিতে (যদি তিনি মৃত বা অযোগ্য হন) কনের ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন তার দাদা (পিতার পিতা)। দাদার স্থান পিতার পরেই কারণ তিনি মূল সম্পর্কীয় দিক থেকে দ্বিতীয় নিকটতম পুরুষ।

আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯,  আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭

গ. ভাই:

পিতা ও দাদা উভয়ের অনুপস্থিতিতে আপন ভাই ওয়ালি হবেন। এরপর যদি আপন ভাই না থাকে, তাহলে বৈমাত্রেয় ভাই (পিতা ভিন্ন, কিন্তু মাতা এক) ওয়ালি হবেন।

ইমাম ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯, আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭

ঘ. চাচা:

ভাইদের অনুপস্থিতিতে চাচা (পিতার আপন ভাই) ওয়ালি হবেন। চাচার অধিকার ভাইয়ের পরের স্থানে কারণ তিনি পিতার সমান্তরাল অবস্থানে থাকেন এবং সম্পর্কীয় নৈকট্যের দিক থেকে ভাইয়ের পরেই তার স্থান। : এই বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ একমত পোষণ করেছেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯

ঙ. অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়:

উপরোক্ত ওয়ালিদের অনুপস্থিতিতে, নিকটবর্তী রক্ত সম্পর্কীয় পুরুষ আত্মীয়গণ ক্রমানুসারে ওয়ালি হবেন। যেমন—চাচাতো ভাই, মামা, ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে, মিরাসে (উত্তরাধিকার) যারা অগ্রাধিকার পান, তারাই ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯

চ. ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক:

যদি কনের কোনো ওয়ালি না থাকে, অথবা ওয়ালি থাকা সত্ত্বেও তিনি দূরে থাকেন, বা বিবাহে বাধা দেন কিন্তু শরিয়তসম্মত কোনো কারণ না দেখাতে পারেন, তাহলে ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক কনের ওয়ালি হবেন।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

উম্মু হাবীবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি (’উবাইদুল্লাহ) ইবনু জাহশের স্ত্রী ছিলেন। স্বামী মারা গেলে তিনি হিজরতকারীদের সাথে হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর হাবশার বাদশা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাকে বিয়ে দেন। তিনি (অভিভাবক ছাড়া) তাদের কাছেই অবস্থান করেন। সুনানে আব দাউদ : ২০৮৬

৪. বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :

কোনো নারী নিজে নিজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না। তার জন্য অবশ্যই একজন ওয়ালি থাকতে হবে। ওয়ালি কেবল বিবাহ সম্পন্নকারী হিসেবে কাজ করেন। ওয়ালি হতে হলে কনের মতামত নেওয়া আবশ্যিক। কনের সম্মতি ছাড়া ওয়ালি তাকে বিবাহ দিতে পারেন না।

আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি  মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১

খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯

আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ও মুজাম্মে ইবনু ইয়াযীদ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। খিযাম নামক এক ব্যক্তি তার মেয়েকে বিবাহ দেন। সে তার পিতার এই বিবাহ অপছন্দ করে। মেয়েটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতার দেয়া তার এই বিবাহ রদ করে দেন। পরে সেই মেয়ে আবূ লুবাবা ইবনু ’আবদুল মুনযির (রাঃ)-কে বিবাহ করে। মিশকাত : ১৮৭৩, সুনানে নাসায়ী ৩২৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২১০১, আহমাদ : ২৬২৪৬, ২৬২৫১, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৫, দারেমী : ২১৯১ ২১৯২, , ইরওয়াহ : ১৩৮০

৫. বিবাহে ওয়ালী বা অভিভাবকের বাধা

একজন উপযুক্ত যুবক যদি কোন মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় (অর্থাৎ সেই যুবক দ্বীনদারী ও চরিত্রের দিক থেকে পছন্দনীয় হয়), আর মেয়েও ঐ যুবককে পছন্দ করে, আর শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত মেয়ের অভিভাবক ঐ বিবাহে বাধা প্রদান করে তবে শরীয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয়, العضل বা বিবাহে বাধা। ইবনে কুদামা, মুগনী, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৩৬৮

 এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে-

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ اَنۡ یَّنۡکِحۡنَ اَزۡوَاجَہُنَّ اِذَا تَرَاضَوۡا بَیۡنَہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ ذٰلِکَ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکُمۡ اَزۡکٰی لَکُمۡ وَاَطۡہَرُ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছবে তখন তোমরা তাদেরকে বাধা দিয়ো না যে, তারা তাদের স্বামীদেরকে বিয়ে করবে যদি তারা পরস্পরে তাদের মধ্যে বিধি মোতাবেক সম্মত হয়। এটা উপদেশ তাকে দেয়া হচ্ছে, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে। এটি তোমাদের জন্য অধিক শুদ্ধ ও অধিক পবিত্র। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুরা বাকারা : ২৩২

আল হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’’তোমরা তাদেরকে আটকে রেখো না’’-এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) বলেছেন যে, উক্ত আয়াত তার সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি আমার বোনকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেই, সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়। যখন তার ইদ্দাতকাল অতিক্রান্ত হয় তখন সেই ব্যক্তি আমার কাছে আসে এবং তাকে পুনরায় বিয়ের পয়গাম দেয়। কিন্তু আমি তাকে বলে দিই, আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম এবং তোমরা মেলামেশা করেছ এবং আমি তোমাকে মর্যাদা দিয়েছি। তারপরেও তুমি তাকে তালাক দিলে? পুনরায় তুমি তাকে চাওয়ার জন্য এসেছ? আল্লাহর কসম, সে আবারও কখনও তোমার কাছে ফিরে যাবে না। মা’কিল বলেন, সে লোকটি অবশ্য খারাপ ছিল না এবং তার স্ত্রীও তার কাছে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ’’তাদেরকে বাধা দিও না,’ (২:২৩২) এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার বোনকে তার কাছে বিয়ে দেব। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে তার সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩০

ইমাম বুখারী বলেন, যদিও এখানে বিবাহিতা নারীকে কেন্দ্র করে আয়াতটি নাযিল হয়েছে, কিন্তু এখানে কুমারী নারীও শামিল। অর্থাৎ কুমারীর জন্যও একই হুকুম।

কি করলে অভিভাবক বা বাধাপ্রদাকারী হিসেবে গণ্য হবে?

(১) অভিভাবকের অধিনস্থ মেয়ে যদি নির্দিষ্টভাবে কোন যুবককে পছন্দ করে এবং পাত্রও উপযুক্ত হয়, তখন যদি অভিভাবক তার সাথে বিবাহ দিতে (শরীয়ত সম্মত) কোন কারণ ছাড়াই বা দুর্বল যুক্তিতে (যেমন, লেখাপড়া শেষ করা ইত্যাদি) অস্বীকার করে, তাহলে সে বাধাপ্রদানকারী হবে। আল মাওসুয়া আল ফেকহিয়্যা ৩৪/২৬৫

(২) অভিভাবক যদি বিবাহের প্রস্তাবকারীদের উপর অহেতুক কঠিন শর্ত আরোপ করে, যা শুনলেই তারা পলায়ন করবে এবং তা পূর্ণ করা অনেক সময় অসাধ্য হয়ে যায়, তখন সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে। ইবনে তাইমিয়া- কিতাবুল ইনসাফ ৮/৭৫

শাইখ ইবনে জাবরীন (রহঃ) বলেন, প্রস্তাবকারীর উপর কঠরোতা আরোপ করা, অথবা অপ্রয়োজনীয় অত্যধিক শর্তারোপ করা, অথবা উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করা, অথবা অতিরিক্ত মোহর চাওয়া। অভিভাবক যদি এরূপ করে তবে সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে এবং সে হবে ফাসেক। তখন তার অভিভাবকত্ব বাতিল হয়ে যাবে।

বিবাহের শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, বিবাহের অন্যতম শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা। এই শর্তটি বিবাহকে প্রকাশ্য ও বৈধতা প্রদান করে। সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হলে তা ইসলামী আইন অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হয়। বিবাহে সাক্ষী থাকার কারণ হলো, এর মাধ্যমে বিবাহটি গোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করে। এটি শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি চুক্তি নয়, বরং একটি সামাজিক চুক্তি। সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে কোনো ধরনের সন্দেহ বা বিরোধ দেখা দিলে তা সহজেই মীমাংসা করা যায়।

১. সাক্ষীর সংখ্যা ও যোগ্যতা:

ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।

ক. প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) : সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।

খ. মুসলিম: সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। একজন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে না।

গ. ন্যায়পরায়ণ (আদিল): সাক্ষী ফাসিক (পাপী) না হয়ে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) হওয়া উত্তম। যদিও অনেক ফিকহবিদ ফাসিকের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য বলেছেন, তবে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী থাকা অধিক পছন্দনীয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২

যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।

বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন। কোরআনের অন্য একটি আয়াত থেকে নারী-পুরুষের সাক্ষীর সংখ্যার বিষয়ে ফকিহগণ দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّامۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّہَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىہُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىہُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ وَلَا یَاۡبَ الشُّہَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوۡا ؕ

আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। সূরা বাকারা : : ২৮২

এই আয়াতটি মূলত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে হলেও, ফিকহবিদগণ এই সাধারণ নীতিকে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রয়োগ করেছেন।

ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»

“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

২. ফতোয়া ও ফিকহি কিতাবের দলিল:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, বিবাহে কমপক্ষে দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে হবে। আল-হেদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২১৮

ইমাম শাফেঈ (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ অধিকাংশ ফিকহবিদ এই বিষয়ে একমত যে, সাক্ষীর উপস্থিতি বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাদের মতে, সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বাতিল। আল-মুগনি, নবম খণ্ড ৯, পৃ.-৪৬২; আল-উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-১৬১

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

মহর বা দেনমোহর নির্ধারণ ও আদায়

ইসলামে, মহর বা মোহর হলো বিবাহের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত একটি অপরিহার্য আর্থিক দায় বা সম্পদ। এটি কেবল একটি উপহার নয়, বরং বিয়ের চুক্তির একটি বাধ্যতামূলক অংশ, যা স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রতীক। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে সম্মান ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রদান করা হয়। মহর নির্ধারণ ছাড়া কোনো বিবাহ পূর্ণাঙ্গ ও শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয় না। তবে মহর বাকি থাকলে বিবাহ বৈধ হবে। মহর নির্ধাণ বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত আর মহর আদায় করা, ঋন আদায়ের মত ফরজ কাজ।

প্রাচীন আরবে কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার সময় যৌতুক বা পণ প্রথার প্রচলন ছিল, যেখানে কনের পরিবারকে অর্থ বা সম্পদ দেওয়া হতো। রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুয়ত প্রাপ্তির পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশে এই অন্যায় ও অসম্মানজনক যৌতুক প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেন। এর পরিবর্তে তিনি আবশ্যক দেনমোহর প্রথা চালু করেন, যা নারীদের সম্মান ও অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ব্যবস্থাটি কেবল একটি সামাজিক পরিবর্তনই ছিল না, বরং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি বিপ্লবী পদক্ষেপও ছিল।

১. মহরের তাৎপর্য ও গুরুত্ব :

ক. স্ত্রীর অধিকার : মহর সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এর উপর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। স্ত্রী এটি নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারেন।

খসম্মানের প্রতীক :  মহর নারীকে একটি সম্মান ও মর্যাদা দিতে এবং তাকে স্বামীর কাছে একটি মূল্যবান সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়।

গ. মহর ধার্য্য ও আদায় করা ফরজ বা ওয়জিব :

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করতে পারেন: স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় এবং খুশি মনে তার প্রাপ্য মহরের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ মহর মাফ করে দেন, তবে তা জায়েয। তবে, কোনো ধরনের চাপ বা লজ্জার কারণে মাফ করালে তা শরীয়ত সম্মত নয়।

মৃত্যু বা তালাক : যদি মহর পরিশোধের আগেই স্বামী মারা যান, তাহলে মহর তার ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার সম্পদ থেকে স্ত্রীর মহর পরিশোধ করা হবে। একইভাবে, যদি তালাক হয়, তবে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ মহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। যদি সহবাসের আগেই তালাক হয় এবং মহর নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে অর্ধেক মহর পরিশোধ করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪ 

উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মাহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। সহিহ বুখারি ৫১২৭ হাদিসের প্রথম অংশ

এ সকল কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বুঝা যায় মহর আলায় করা ওয়াজিব। তাছাড়া যে সকল বিবাহে মহর নির্ধারন ছাড়া ইজার কবুল হয়। তাদের মহরও অটোমেটিকভাবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী) ধার্য হয়ে যায়। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।

ঘ. ইচ্ছা করে মহর আদায় না করা গুরুতর পাপ : মহর পরিশোধ করার নিয়ত ছাড়া বিবাহ করলে বা পরিশোধ না করার ইচ্ছা থাকলে তা ব্যভিচারের সমতুল্য। হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে।

মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি-

أَيُّمَا رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً بِمَا قَلَّ مِنَ الْمَهْرِ أَوْ كَثُرَ، لَيْسَ فِي نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْهَا حَقَّهَا، خَدَعَهَا، فَمَاتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْهَا حَقَّهَا، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ زَانٍ

যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩

ঙ. মহর নির্ধারণ না করে বিবাহ করা

আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট নাও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)। অর্থাত্ এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটি বাদ দিলেও বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে কিন্তু মহর অটোমেটিকভাবে ধার্য হয়ে যাবে। মহর নির্দিষ্ট না থাকলেও বিবাহ বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সূরা বাকারাহ : ২৩৬

এখানে স্পষ্ট বলা হলো, মহর নির্ধারণ না করেই বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে।আর যদি মহর একেবারেই নির্ধারণ না করা হয়ে থাকে, তাহলে সহবাস ঘটলে স্ত্রী মোহরে মিসল পাবেন।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তাকে প্রশ্ন করা হলঃ এক লোক এক মহিলাকে বিয়ের পর তার মোহর না ঠিক করে এবং তার সাথে সহবাস না করেই মৃত্যুবরণ করল, তার জন্য কি হুকুম আছে? ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, মহিলাটি তার পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সম-পরিমাণ মোহর পাবে, তার কমও পাবে না বেশিও পাবে না। তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে মহিলাটি ইদ্দাত পালন করবে এবং সে (তার) ওয়ারিসের অধিকারীও হবে। তখন মাকিল ইবনু সিনান আল-আশজাঈ (রাঃ) দাড়িয়ে বললেন, আপনি যে ধরণের ফায়সালা করেছেন, আমাদের বংশের মেয়ে ওয়াশিকের কন্যা বিরওয়াআ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একই ফায়সালা করেছেন। ইবনু মাসউদ (রাঃ) এটা শুনে খুবই আনন্দিত হন। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।

এখানে মহর নির্ধারণকে উৎসাহিত করা হয়েছে, তবে শর্ত করা হয়নি যে, মহর ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না।

ফকিহদের বক্তব্য হলো-

ইবনুল হুমাম (হানাফি ফকিহ) বলেন, “মহর নির্ধারণ ছাড়াও বিবাহ সম্পন্ন হবে, তবে সহবাস বা স্বামীর মৃত্যু হলে ‘মোহরে মিসল’ ওয়াজিব হবে।” ফাতহুল কাদির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০০”

ইবন কুদামাহ (হাম্বলি ফকিহ) বলেন, “যদি মহর নির্ধারণ ছাড়াই বিবাহ হয়, তবুও তা বৈধ হবে এবং স্ত্রী ‘মোহরে মিসল’ এর অধিকারী হবেন।” “আল-মুগনি লি ইবনে কুদামাহ, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৭৮

আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট না-ও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)।

২. মহরের প্রকারভেদ

আসলে ইসলামে মহরের কোনো নির্দিষ্ট প্রকারভেদ নেই। তবে বাস্তবে মহর আদায় ও প্রদান ব্যবস্থার ভিত্তিতে মহরকে প্রধানত দুই প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে।

ক. তাৎক্ষণিক মহর

খ. বিলম্বিত মহর

ক. তাৎক্ষণিক মহর :

তাৎক্ষণিক মহর হলো সেই মোহর, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে নগদে বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মোহরের ওপর অবিলম্বে অধিকার দেওয়া। এটি সাধারণত বিয়ের মজলিসেই আদায় করা হয়, অথবা এমন কোনো নির্ধারিত সময়ে, যা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়।.মহর আদায়ের নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও। সূরা নিসা : ৪

উদাহরণস্বরূপ, যদি বিয়ের চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে যে, “পুরো মোহর নগদ ২ লাখ টাকা এবং এটি বিয়ের দিনই পরিশোধ করা হবে,” তাহলে এটি তাৎক্ষণিক মহর। সাধারণত বিয়ের সময় বা বাসর রাতের আগেই এটি পরিশোধ করা উত্তম।

খ.বিলম্বিত মহর :

বিলম্বিত মহর হলো সেই মোহর, যার কিছু অংশ অথবা পুরোটা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ কোনো ঘটনার পর পরিশোধ করার শর্ত থাকে। এই শর্তটি সাধারণত বিয়ের সময় নির্ধারণ করা হয় এবং বিবাহের চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ اَرَدۡتُّمُ اسۡتِبۡدَالَ زَوۡجٍ مَّکَانَ زَوۡجٍ ۙ وَّاٰتَیۡتُمۡ اِحۡدٰہُنَّ قِنۡطَارًا فَلَا تَاۡخُذُوۡا مِنۡہُ شَیۡئًا ؕ اَتَاۡخُذُوۡنَہٗ بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا

আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রীকে বদলাতে চাও আর তাদের কাউকে তোমরা প্রদান করেছ প্রচুর সম্পদ, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু নিও না। তোমরা কি তা নেবে অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে? সূরা আন-নিসা ৪:২০

এখানে বলা হয়েছে, বিপুল মহর দেওয়া যায়, যা অনেক সময় একসাথে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন প্রথাগতভাবে মহরের একটি অংশ বিলম্বিত থাকে। যদি চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, হোক তা তালাকের মাধ্যমে বা স্বামীর মৃত্যুর কারণে, তখন বিলম্বিত মহর সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর পাওনা হয়ে যায় এবং তা পরিশোধ করা স্বামীর (বা তার উত্তরাধিকারীদের) ওপর ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।

মহরের পরিমাণ

ইসলামে মহরের পরিমাণের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি। এর পরিমাণ সম্পূর্ণভাবে বরের আর্থিক সামর্থ্য এবং কনের সামাজিক অবস্থান ও সম্মানের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এটি এমন একটি বিধান যা উভয় পক্ষের জন্য সহজ করে দেয়, যাতে কোনো পক্ষই অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে। মহর এমন হতে পারে যা বরের পক্ষে পরিশোধ করা সহজ, আবার তা এত বেশিও হতে পারে যা তার সামর্থ্যের বাইরে নয়। এর মাধ্যমে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬,  সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একজন মহিলা এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজেকে পেশ করলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কী আছে? সে উত্তর দিল, আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও, তালাশ কর, কোন কিছু পাও কিনা? দেখ যদি একটি লোহার আংটিও পাও। লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, কিছুই পেলাম না এমনকি একটি লোহার আংটিও না; কিন্তু আমার এ তহবন্দখানা আছে। এর অর্ধেকাংশ তার জন্য। সাহল (রাঃ) বলেন, তার দেহে কোন চাদর ছিল না। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার তহবন্দ দিয়ে সে কী করবে? যদি তুমি এটা পর, মহিলার শরীরে কিছুই থাকবে না, আর যদি এটা সে পরে তবে তোমার শরীরে কিছুই থাকবে না। এরপর লোকটি অনেকক্ষণ বসে রইল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চলে যেতে দেখে ডাকলেন বা তাকে ডাকানো হল এবং বললেন, তুমি কুরআন কতটুকু জান? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে সূরাগুলোর উল্লেখ করল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে পরিমাণ কুরআন জান, তার বিনিময়ে তোমাকে এর সঙ্গে বিয়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ২৩১০, ২৩১১, ৫০২৯, ৫০৩০, ৫০৮৭, ৫১২১, ৫১২৬, ৫১৩২, ৫১৩৫, ৫১৪১, ৫১৪৯, ৫৮৭১, মুসলিম ১৪১৫, নাসায়ী ৩২০০, ৩২৮০, ৩৩৫৯, আবূ দাউদ ২১১১, আহমাদ ২২২৯২, ২২৩২০, ২২৩৪৩

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন, তাদের মোহর ছিল ইসলাম গ্রহণ। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; যদি তুমি ইসলাম কবুল কর তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে পারে। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ইসলাম গ্রহণ তাঁদের বিয়ের মোহর বলে গণ্য হয়। মিশকাত : ৩২০৯, সুনানে নাসায়ী ধ ৩৩৪০

মোহরে ফাতেমি :

মোহরে ফাতেমি হলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহের সময় যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেই পরিমাণকে বোঝানো হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম রৌপ্য মুদ্রা। আধুনিক হিসাবে এই ৫০০ দিরহামের মূল্য কত, তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এর একটি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হিসাব দেওয়া যায়।

১ দিরহাম = ২.৯৭৫ গ্রাম রূপা।

৫০০ দিরহাম = ৫০০ × ২.৯৭৫ গ্রাম = ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপা।

বর্তমান বাজারে রূপার দামের ওপর ভিত্তি করে এই ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপার মূল্য হিসাব করা হয়। এই মূল্য প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রূপার দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।

আধুনিক সমাজে সরাসরি মোহরে ফাতেমির পরিমাণে মোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর মূল স্পিরিট বা চেতনা অনুসরণ করাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ, সামর্থ্য অনুযায়ী এমন পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা উচিত, যা কনের জন্য সম্মানজনক এবং বরের জন্য বোঝা নয়।

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪

সামর্থে বাইরে মহল নির্ধারণ ঠিক না

ইসলামে মহর ধার্য করার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা লোকলজ্জার ভয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ নির্ধারণ করাকে উৎসাহিত করা হয় না। ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো সহজ ও বরকতময় একটি সম্পর্ক স্থাপন করা, যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হয়।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا، وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا، وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا»

“নিশ্চয়ই নারীর বরকতের লক্ষণ হলো, তার প্রস্তাব সহজ হওয়া, তার মোহর সহজ হওয়া এবং তার গর্ভধারণ সহজ হওয়া।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ : ২৪৫৯৫, ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : ২৭০৯, ইমাম বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৮৫, সহিহাহ : ২২৩৬`

উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি (রাঃ) বলেছেন, মহিলাদের মাহরের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। কেননা তা যদি পার্থিব জীবনে সম্মান অথবা আল্লাহর কাছে তাক্ওয়ার প্রতীক হতো, তাহলে তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের মাহর বারো উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। কখনও অধিক মাহর স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মনে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, এমনকি সে বলতে থাকে, আমি তোমার জন্য পানির মশক বহনে বাধ্য হয়েছি অথবা তোমার জন্য ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েছি। (রাবী বলেন), আমি একজন বেদুইন। অতএব আমি ’’আলাকাল কিরবা’’ বা ’’আলাকাল কিরবা’’-এর অর্থ কি তা জানি না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৭, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৬, ২৮৭, দারেমী :  ২২০০, মিশকাত : ৩২০৪

অধিক মহর ধার্য করার মাধ্যমে বিবাহকে কঠিন করে তোলা হয়, যা এই হাদিসের শিক্ষার পরিপন্থী। যখন মহর অতিরিক্ত হয়, তখন তা অনেক যুবকের জন্য বিবাহকে অসম্ভব করে তোলে, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।

আমের ইবনু রবীআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি এক জোড়া পাদুকার বিনিময়ে বিবাহ করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিবাহ অনুমোদন করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী : ১১১৩, আহমাদ : ১৫২৪৯, ১৫২৬৪, ইরওয়াহ : ১৯২৬।

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ কে তাকে বিবাহ করবে? এক ব্যক্তি বললো, আমি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাকে একটি লোহার আংটি হলেও তা (মারহস্বরূপ) দাও। সে বললো, আমার কাছে কিছুই নাই। তিনি বলেনঃ তোমার কাছে কুরআনের যে অংশ আছে, তার বিনিময়ে আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম। সন সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৯.

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে মহর কম হওয়া উত্তম। কারণ, মহর যত কম হবে, বিয়ে করা তত সহজ হবে এবং সমাজে বিবাহর প্রচলন বাড়বে। রাসূল (ﷺ) নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিয়েতে কম মহর নির্ধারণ করে উম্মতকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন।

সমাজের কিছু মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে বা সামাজিক মর্যাদার কারণে এমন পরিমাণ মহর ধার্য করে যা বরের সাধ্যের বাইরে। এর ফলে হয় বরকে মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হয়, নয়তো তাকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। ইসলামে এমন অনর্থক বোঝা চাপানোকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মহরের মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে নিরাপত্তা দেওয়া এবং বিবাহের বন্ধনকে মজবুত করা। কিন্তু যখন এটি লোক দেখানো প্রথায় পরিণত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং তা পারিবারিক জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, অতিরিক্ত মহরের কারণে স্বামী তা পরিশোধ করতে না পেরে দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলমানের উচিত বিবাহের ক্ষেত্রে সরলতা অবলম্বন করা। মহর এমন পরিমাণ ধার্য করা উচিত যা বরের জন্য সহজ এবং যা সে সন্তুষ্টচিত্তে পরিশোধ করতে পারে। সামাজিক রীতিনীতি বা লোকলজ্জার পরিবর্তে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া   উচিত। অধিক মহর ধার্য করে বিবাহের পথ কঠিন করার চেয়ে বরং অল্প মহরে বরকতময় একটি বিবাহ করা উত্তম। এটি একটি সুস্থ ও সহজ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বরের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

ইসলামে নিকাহ্‌ (বিবাহ) একটি ইবাদত ও চুক্তি। এ ক্ষেত্রে ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (স্বীকৃতি) শর্ত। ইজাব ও কবুল হলো ইসলামি আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী একটি বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ দ্বারা গঠিত মৌখিক বা লিখিত চুক্তির মাধ্যমেই একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধতা লাভ করে। এই চুক্তিটি একটি আইনি চুক্তি, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য কিছু অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।

ইজাব (প্রস্তাব) :

ইজাব হলো বিবাহের জন্য এক পক্ষ কর্তৃক প্রস্তাব পেশ করা। সাধারণত, পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আসে। প্রস্তাবটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। যেমন-

পাত্রের পক্ষ থেকে : “আমি অমুকের মেয়ে অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম।”

পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করলাম।”

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই কুমারী মেয়েরা লজ্জা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার সম্মতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৭, ৬৯৪৬, ৬৯৭১

এখানে উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি যে কোনো এক পক্ষ থেকে আসতে পারে, তবে তা স্পষ্ট হতে হবে। প্রস্তাবের ভাষা এমন হতে হবে, যেন তাতে কোনো অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা না থাকে।

কবুল (গ্রহণ) :

কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:

পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”

যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।

ইজাব ও কবুলের শর্ত

একটি সঠিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:

ক. একই মজলিস : ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে। আল-ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৮৭

খ. সাক্ষী : ইজাব ও কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হলেও চলবে। এটি বিয়ের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সূরা তালাক : ২

গ. স্পষ্ট ভাষা: প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়ই স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৬৭

ইজাব ও কবুলের ধারণা সরাসরি কোরআন বা হাদিসে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা না থাকলেও, এর ভিত্তি ইসলামি ফিকাহ (আইনশাস্ত্র) এবং ইজমা (ইসলামি পণ্ডিতদের ঐক্যমত্য) থেকে এসেছে। এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ইজাব ও কবুল যে নিকাহর রুকন ও শর্ত—এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল তুলে ধরছি।

ক. ইমাম ইবনু কুদামাহ (হাম্বলি) বলেন-

وَالنِّكَاحُ لَا يَنْعَقِدُ إِلَّا بِلَفْظِ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ বৈধ হয় না, যতক্ষণ না ইজাব ও কবুলের উচ্চারণ হয়।” আল-কাফি, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৮)-

খ. ইমাম মারগিনানি (হানাফি) বলেন-

لَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।” আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৮

গ. ইমাম নববী (শাফেয়ি) বলেন-

رُكْنُ النِّكَاحِ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ، وَلَا يَنْعَقِدُ بِدُونِهِمَا

“নিকাহর রুকন হলো ইজাব ও কবুল। এ দু’টির ছাড়া নিকাহ বৈধ হয় না।” রাওদাতুত ত্বলিবীন, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮)

ঘ. ইমাম মালিক (মালিকি) বলেন-

لَا يَكُونُ النِّكَاحُ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَإِيجَابٍ وَقَبُولٍ

ওয়ালি, ইজাব এবং কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না। আল-মুদাওয়ানাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৫৫

ইজাব (প্রস্তাব)  ও কবুল (গ্রহণ) সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস-

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, যখন ’উমার (রাঃ)-এর কন্যা হাফসাহ (রাঃ) খুনায়স ইবনু হুযাইফাহ সাহমীর মৃত্যুতে বিধবা হলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী ছিলেন এবং মদিনায় ইন্তিকাল করেন। ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং হাফসাহকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিলাম; তখন তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। এরপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমার কাছে এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, যেন এখন আমি তাকে বিয়ে না করি। ’উমার (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, যদি আপনি চান তাহলে আপনার সঙ্গে ’উমারের কন্যা হাফসাহকে বিয়ে দেই। আবূ বকর (রাঃ) নীরব থাকলেন এবং প্রতি-উত্তরে আমাকে কিছুই বললেন না। এতে আমি ’উসমান (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক অসন্তুষ্ট হলাম, তারপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন এবং হাফসাহ্কে আমি তার সঙ্গে বিয়ে দিলাম। এরপর আবূ বকর (রাঃ) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাহকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোন উত্তর দেইনি। ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোন কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহর বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাহকে গ্রহণ করতাম। সহিহ বুখারি : ৪০০৫, ৫১২২


 [MIH1]

বিবাহের সুন্নাহ সম্মত কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিবাহের ফরজ কাজ হলো- কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকে দুইজন সাক্ষির সামনে নির্ধারিত মহরের কথা উল্লখ করে ছেলের নিটক কন্যা বিবাহের প্রস্তাব দিবেন। কন্যার ওয়ালির প্রস্তাবে সম্ততি দানের মাধ্যমে ছেলে বিবাহ সম্মত হবে। এতটুকু কাজই ফরজ। ইহার বাহিরে বিবাহে কিছু আমল বা অনুষ্ঠান করা হয় যা সুন্নাহ বা জায়েয হিসেবে ধরা হয়। নিচে এমন কতগুলো বিষয় উল্লেখ করা হলো-

১. বিবাহের খুতবা

বিবাহে খুতবা প্রদান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এটি বিবাহের একটি অংশ, যা বর-কনের জন্য বরকত ও হেদায়েত কামনা করে এবং বিবাহের গুরুত্ব সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই খুতবাকে খুতবাতুন-নিকাহ (খুতবায়ে নিকাহ) বলা হয়। বিবাহের খুতবার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর প্রশংসা করা, রাসূল (ﷺ)-এর ওপর দরূদ পাঠ করা এবং বর-কনেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এটি মূলত বিবাহের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরে।

এই খুতবার মাধ্যমে বর-কনেকে তাদের নতুন জীবনের শুরুতে আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। খুতবাটি বিবাহের গুরুত্ব, দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বিষয়ে উপস্থিত সকলকে সচেতন করে তোলে।

ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করেন, পূর্বাঞ্চল থেকে দু’ব্যক্তি এসে (বিবাহে) বক্তৃতা দিল। তখন নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোন কোন বক্তৃতায় যাদু আছে। সহিহ বুখারি : ৫১৪৬, ৫৭৬৭

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত খুতবাহ পড়েছেন-

’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাই। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট হতে এবং আমাদের কার্যকলাপের নিকৃষ্টতা হতে আশরয় চাই। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নাই। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নাই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও তাঁর রসূল। অতঃপর…। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৩., সুনানে নাসায়ী : ৩২৭৮, আহমাদ : ২৭৪৪, ৩২৬৫, খুতবাতুল হাজাহ ৩১ নং পৃষ্ঠা।

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কল্যাণসমূহের উৎস, তাঁর সমষ্টি এবং তার সমাপ্তি দান করা হয়েছে। তিনি আমাদের সালাতের খুতবা এবং প্রয়োজনের (বিবাহের) খুতবা শিক্ষা দিয়েছেন। সালাতের খুত্বা (তাশাহ্হুদ) হলোঃ সমস্ত সম্মান, ’ইবাদাত ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বারাকাতও। আমাদের উপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাহ্দের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দাহ্ ও তাঁর রসূল। আর বিবাহের খুতবা হলো-

’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট ও আমাদের কাজের নিকৃষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশরয় চাই। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নাই। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তিনি এক এবং তাঁর কোন শরীক নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল’’।

এরপর তোমরা তোমাদের খুত্বার সাথে কুরআনের এ তিনটি আয়াত যোগ করবে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوْتُنَّ  اِلَّا وَ اَنْتُمْ  مُّسْلِمُوْنَ ﴿۱۰۲﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না। সূরা আল ইমরান :  ১০২

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَ بَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِیْرًا وَّ نِسَآءً ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِہٖ وَ الْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلَیْکُمْ  رَقِیْبًا ﴿۱﴾

হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সূরা নিসা : ১

یُّصْلِحْ  لَکُمْ  اَعْمَالَکُمْ وَ یَغْفِرْ لَکُمْ ذُنُوْبَکُمْ ؕ وَ مَنْ یُّطِعِ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ  فَقَدْ  فَازَ  فَوْزًا عَظِیْمًا ﴿۷۱﴾  اِنَّا عَرَضْنَا الْاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ الْجِبَالِ فَاَبَیْنَ اَنْ یَّحْمِلْنَهَا وَ اَشْفَقْنَ مِنْهَا وَ حَمَلَهَا الْاِنْسَانُ ؕ اِنَّہٗ كَانَ ظَلُوْمًا جَهُوْلًا ﴿ۙ۷۲﴾

’হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের কার্যাবলি সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে। সূরা আহযাব : ৭০-৭১। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯২, সুননে তিরমিযী : ১১০৫, ১৪০৪, সুননে আবূ দাউদ : ২১১৮, আহমাদ : ৪১০৪, দারেমী : ২২০২, মিশকাত : ৩১৪৯, সহিহাহ : ১৪৮৩

২. বিবাহে ওয়ালীমা

মুসলিমদের বিবাহে ওয়ালীমা হলো একটি বিশেষ ভোজ বা বিবাহোত্তর ভোজের আয়োজন, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানাতে এবং তাদের সুখের জন্য দোয়া করতে অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে এর প্রচলন ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

ক. ওয়ালিমার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত: ওয়ালীমা রাসূল (ﷺ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তিনি নিজে তাঁর বিবাহের সময় ওয়ালীমার আয়োজন করেছেন এবং সাহাবীদেরকেও এর জন্য উৎসাহিত করেছেন। ওয়ালীমার মাধ্যমে বিবাহকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়, যা সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করে এবং বিবাহকে ব্যভিচার থেকে আলাদা করে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

এটি পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা নবদম্পতির জন্য দোয়া করেন, যা তাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত নিয়ে আসে।

খ. ওয়ালিমা করার জন্য হাদিসে উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বিয়ে করেন, তখন ওয়ালীমা করেন, কিন্তু যাইনাব (রাঃ)-এর বিয়ের সময় যে পরিমাণ ওয়ালীমার ব্যবস্থা করেছিলেন, তা অন্য কারো বেলায় করেননি। সেই ওয়ালীমা ছিল একটি ছাগল দিয়ে। সহিহ বুখারি : ৫১৬৮ ৪৭৯১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যাহ (রাঃ)-কে আযাদ করে বিয়ে করেন এবং এই আযাদ করাকেই তাঁর মাহর নির্দিষ্ট করেন এবং তার ’হায়স’(এক প্রকার সুস্বাদু হালুয়া) দ্বারা ওয়ালীমাহ’র ব্যবস্থা করেন। সহিহ বুখারি : ৫১৬৯, ৩৭১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) মদ্বীনায় আগমন করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ ইবনু রাবী‘ আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। সা‘দ (রাঃ) ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘আবদুর রহমান (রাঃ)-কে বললেন, আমি তোমার উদ্দেশে আমার সম্পত্তি অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিতে চাই এবং তোমাকে বিবাহ করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও। তিনি বাজার হতে মুনাফা করে নিয়ে আসলেন পনীর ও ঘি। এভাবে কিছুকাল কাটালেন। একদিন তিনি এভাবে আসলেন যে, তাঁর গায়ে বিয়ের হলুদ রংয়ের চিহ্ন লেগে আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জনৈকা আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কী দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমা কর। সহিহ বুখারি : ২০৪৯, ৫১৫৩, সহহি মুসলিম : ১৪২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯০৭, সুনানে তিরমিজি : ১০৯৪, আহমাদ : ১৩৩৬৯

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ওয়ালীমা আয়োজন করার নির্দেশ স্বয়ং রাসূল (ﷺ) দিয়েছেন এবং এর জন্য খুব বেশি সম্পদশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিয়ে হলেও এর আয়োজন করা উচিত।

গ. বিত্তবান ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য করা নিকৃষ্ট কাজ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ওয়ালীমায় কেবল ধনীদেরকে দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদেরকে দাওয়াত করা হয় না সেই ওয়ালীমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে অবাধ্যতা করে। সহিহ বুখারি : ৫১৭৭, সহিহ মুসলিম : ১৪৩২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯১৩, আহমাদ : ৭২৭৯, দারিমী : ২১১০, ইরওয়া : ১৯৪৭, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫১

এই হাদিসটি ওয়ালীমার আয়োজনে সামাজিক সমতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। ওয়ালীমা শুধু ধনী বা সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের জন্য নয়, বরং সবার জন্য হওয়া উচিত।

ঘ. দাওয়াত গ্রহণ করা জরুরি :

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকে ওয়ালীমার দাওয়াত করা হলে তা অবশ্যই গ্রহণ করবে। সহিহ বুখারী : ৫১৭৩, ৫১৭৯, সহিহ মুসলিম : ১৪২৯, আহমাদ : ৪৯৪৯

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বন্দীদেরকে মুক্তি দাও, দাওয়াত কবূল কর এবং রোগীদের সেবা কর। সহহি বুখারি : ৩০৪৬, ৫১৭৪

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকেও খাবার আয়োজনে দা’ওয়াত দিলে, সে যেন গ্রহণ করে। তবে ইচ্ছা থাকলে খাবে, অন্যথায় খাবে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৫১,  মিশকাত : ৩২১৭, আহমাদ : ১৫২১৯, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫৫।

এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ওয়ালীমার দাওয়াত গ্রহণ করাও একটি সুন্নাত। ওয়ালীমা একটি আনন্দময় ও বরকতময় অনুষ্ঠান যা বিবাহের ঘোষণাকে পূর্ণতা দেয় এবং সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।

ঙ. বীনা দাওয়াতে খাওয়া ঠিক নয়, খাইতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে

আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণের মধ্যে আবূ শু’আয়ব নামক এক ব্যক্তির গোশ্ত/মাংস বিক্রেতা একজন ক্রীতদাস ছিল। সে ক্রীতদাসকে বলল, তুমি আমার জন্য পাঁচজনের অনুপাতে খাদ্য প্রস্তুত কর। আমি পাঁচজনের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও দা’ওয়াত করতে ইচ্ছুক। সুতরাং সে হিসাবে তাঁর জন্য খাবার তৈরি করা হলো। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা’ওয়াত করলেন। অতঃপর পথিমধ্যে তাঁদের (পাঁচজনের) সাথে একজন শামিল হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ শু’আয়বকে ডেকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তাকে (অতিরিক্ত লোকটিকে) অনুমতি দিতে পার, ইচ্ছা করলে না করতে পার। সে বলল, না, বরং আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সহিহ বুখারী : ৫৪৬১, সহিহ মুসলিম : ২০৩৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৯, মিশকাত : ৩২১৯, সহীহাহ : ৩৫৭৯।

চ. ওয়ালিমান অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে নব দম্পত্তির জন্য দোয় করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেন-

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

৩. বিবাহ আনন্দ প্রকাশ করা বা দফ বাজান

সাহাবীগণ (রা.) বিবাহে কবিতা আবৃত্তি ঔ  দফ বাজানোর মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদ করতেন বলে হাদিসে প্রমান পাওয়া যায়। ইসলামে বিবাহ একটি উৎসব এবং আনন্দের বিষয়। যা প্রকাশ করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করেত হয়।

গান ও কবিতা আবৃত্তি: বিবাহের দিন বা তার পরে নারীদের জন্য হালকা বাদ্যযন্ত্র (যেমন— দফ) ব্যবহার করে কবিতা বা হামদ-নাত আবৃত্তি করা জায়েয। হাদিসে আনসারদের আমোদ-প্রমোদ প্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে, পুরুষদের জন্য ঢোল বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার গোত্রের জনৈক পুরুষের সাথে জনৈকা নারীর বিয়ের পরে যখন তাকে স্বামীর নিকট ঘরে পাঠানো হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট কি কোনো (আনন্দোল্লাস উপকরণ স্বরূপ) ক্রীড়াকৌতুক ছিল না? আনসারগণ তো আমোদ-প্রমোদপ্রিয়। সহিহ :বুখারী ৫১৬২, মিশকাত : ৩১৪১, সহীহ আল জামি : ৭৯১

রুবায়ই বিনতু মু‘আওয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ্[1] বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭, সুনানে তিরমিযী : ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২, আহমাদ : ২৬৪৮১, ২৬৪৮৭

 আর ‘ঈদের দিন সুদানীরা বর্শা ও ঢালের খেলা করত। আমি নিজে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ, অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর পিছনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তাঁর গালের সাথে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করছিলে তা করতে থাক, হে বনূ আরফিদা। পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও। সহিহ বুখারি : ৯৫০, ৯৫২, ৯৮৮, ২৯০৮, ৩৫৩০, ৩৯৩১, ৫১৯০, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৮, সুনানে নাসায়ী : ১৫৯৭

৪. শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে বিবাহ করা

শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে মসজিদে বিবাহ সম্পাদন করা। উল্লেখ্য, সকল মাসের যে কোন দিন বিবাহ করা যায়িজ আছে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাও্ওয়াল মাসে বিবাহ করেছেন এবং ঐ মাসেই আমার বাসর রজনী হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের মধ্যে আমার চেয়ে কে অধিক (তার ভালোবাসা প্রাপ্তিতে) সৌভাগ্যবতী ছিলেন? সহিহ মুসলিম :  ১৪২৩, মিশকাত : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৩,  সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯৯০, আহমাদ ২৫৭১৬।

৫. বিবাহের খবর ব্যাপকভাবে প্রচার কর

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

فَصْلُ مَا بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ

হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

৬. নব দম্পতিকে মুবারকবাদ জানানো।

আকীল ইবনু আবূ ত্বলিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বনু জুশম গোত্রের এক মহিলাকে বিবাহ করলে লোকেরা (মুবারকবাদ দিয়ে) বললো, সুখী হও এবং অধিক সন্তান হোক। তিনি বলেন, তোমরা এরূপ বলো না, বরং যেরূপ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তদ্রূপ বলো-

 اللّٰهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ وَبَارِكْ عَلَيْهِمْ

’’হে আল্লাহ্! তাদেরকে বরকত দান করুন এবং তাদের উপর বরকত নাযিল করুন।’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৭১, আহমাদ : ১৭৪০, ১৫৩১৩, দারেমী : ২১৭৩

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেনঃ

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন।’’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ : ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

বাসর রাতের সুন্নাহ সম্মত আমল

১. বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল দুআ পাঠ করা

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ স্ত্রী, খাদেম অথবা আরোহণের পশু লাভ করে তখন সে যেন তার কপালে হাত রেখে বলে-

اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করি এবং যে কল্যাণ এর মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। আমি তোমার নিকট এর অনিষ্ট হতে এবং যে অনিষ্টসহ একে সৃষ্টি করা হয়েছে তা হতে আশরয় চাই’’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯১৮, বাইহাকী, সুনান কুবরা : ১৪২১১

আমর ইবনু শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে অথবা কোনো দাসী ক্রয় করে তখন সে যেন বলে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ،

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর মধ্যকার কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ চাই এবং তার মধ্যে নিহিত অকল্যাণ ও তার মাধ্যমে অকল্যাণ থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।’’

আর যখন কোনো উট কিনবে তখন যেন সেটির কুঁজের উপরিভাগ ধরে অনুরূপ দু’আ করে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আবূ সাঈদের বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তার কপালের চুল ধরে বলবে। স্ত্রী এবং দাসীর ব্যাপারেও বরকতের দু’আ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৬০

২. স্বামী-স্ত্রী  উভয়ে একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করা :

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে যাবে, স্বামী তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আর স্ত্রীও দাঁড়িয়ে যাবে তার পেছনে। অতপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করবে এবং বলবে-

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي أَهْلِي، وَبَارِكْ لَهُمْ فِيَّ، اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي مِنْهُمْ وَارْزُقْهُمْ مِنِّي، اللَّهُمَّ اجْمَعَ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ إِلَى خَيْرٍ، وَفَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন আর আমার ভেতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। আয় আল্লাহ, আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযক দিন আর আমার থেকে তাদেরও রিযক দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্র রাখুন আর আমাদের মাঝে যখন বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন তখন কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন। . তাবরানী, মুজামুল কাবীর : : ৮৯০০, মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ১৭৪৩৩

৩. বাসর রাতে সহবাস করার ইচ্ছা করলে দুআ দুআ পাঠ করা

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে-

بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏

“আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

 অতঃপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ১৪১, ৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৪, সুনানে তিরমিযী ১০৯২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৬১, আহমাদ : ১৮৭০, ১৯১১, ২১৭৯, ২৫৫১, ২৫৯২, দারেমী : ২২১২, ইরওয়াহ : ২০১২

৪. সহবাসের সময় পর্দা করা।

উতবা ইবনু আব্দ আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর নিকট এসে যেন (নির্জনে মিলনে) পর্দা (গোপনীয়তা) রক্ষা করে এবং গর্দভের ন্যায় বিবস্ত্র না হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, ইরওয়া : ২০০৯

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইনি বা তা দেখিনি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, আহমাদ ২৩৮২৩, ইরওয়া : ১৮১২, মিশকাত : ৩১২৩

৫. নিষিদ্ধ সময় ও জায়গা থেকে বিরত থাকা :

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে অথবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়।  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে। সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৩৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’। সূরা বাকারা : ২২৩। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু মলদ্বার ও ঋতুবতী হতে বিরত থাক। মিশকাত : ৩১৯১, সুনানে তিরমিযী : ২৯৮০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯২৫, আহমাদ : ২৭০৩, সহীহ আল জামি :  ১১৪১।

৬- ঘুমানোর আগে অযূ বা গোসল করা :

স্ত্রী সহবাসের পর সুন্নত হলো অযূ বা গোসল করে তবেই ঘুমানো। অবশ্য গোসল করাই উত্তম।

আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ، إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ

তিন প্রকার ব্যক্তির নিকট ফিরিশতারা আসেন না। (১) কাফিরের লাশের নিকট (জানাযায়). (২) জাফরান রঙ ব্যবহারকারী এবং (৩) নাপাক ব্যক্তির নিকট, তবে সে উযু করলে ভিন্ন কথা। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৮০

৭. বাসর রাতে স্ত্রী ঋতুবতীর হলেও যা যা অনুমতি রয়েছে

স্বামীর জন্য ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে যোনি ব্যবহার ছাড়া অন্য সব আচরণের অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী পবিত্র হবার পর গোসল করলে তার সঙ্গে সবকিছুই বৈধ।

আনাস (রা. থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীগণ তাদের মহিলাদের হায়িয হলে তার সাথে এক সঙ্গে খাবার খেত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন-

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  সূরা বাকারা : ২২২

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়।

অতঃপর উসায়দ ইবনু হুযায়র (রা.) ও আব্বাদ ইবনু বিশ্বর (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এমন এমন বলছে। আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্থায়) সহবাস করব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এতে আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি তাদের উপর ভীষণ রাগাম্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুধ হাদিয়া এলো। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্যে লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বুঝল যে, তিনি তাদের উপর রাগ করেননি। সহিহ মুসলিম : ৩০২

৮. বাসর রাতের স্ত্রী সান্বিধ্যের গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

৯. বাসর রাতে বিশুদ্ধ নিয়তে স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে

নারী-পুরুষের উভয়ের উচিত বিয়ের মাধ্যমে নিজকে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর নিয়ত করা। তাহলে উভয়ে এর দ্বারা ছাদাকার ছাওয়াব লাভ করবে।

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬

বিবাহে যে কাজগুলো বর্জনীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. মেয়ের পক্ষ থেকে ওয়ালীমার করার হুকুম

বিয়ের পর ওয়ালীমার মূল দায়িত্ব বর বা ছেলের পক্ষের। এটি অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যা বিবাহের ঘোষণা ও আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বরপক্ষের জন্য একটি নেকীর কাজ।

যখন কনে বা তার পরিবার ওয়ালীমার নামে কোনো ভোজের আয়োজন করে, তখন তা শরীয়তের ওয়ালীমা হিসেবে গণ্য হয় না, বরং এটি একটি সামাজিক প্রথা বা রেওয়াজ মাত্র। এটি নিঃসন্দেহে সুন্নাহর স্পষ্ট বিপরীত। কারণ, এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এবং সমাজের প্রচলিত প্রথাকে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ইসলামের আনিত নিয়ম বাদ দিয়ে সমাজের বা বাপ দাদাদের প্রথাকে অনুসরণ করেত আল্লাহ  নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَکَذٰلِکَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ قَبۡلِکَ فِیۡ قَرۡیَۃٍ مِّنۡ نَّذِیۡرٍ اِلَّا قَالَ مُتۡرَفُوۡہَاۤ ۙ اِنَّا وَجَدۡنَاۤ اٰبَآءَنَا عَلٰۤی اُمَّۃٍ وَّاِنَّا عَلٰۤی اٰثٰرِہِمۡ مُّقۡتَدُوۡنَ

এভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন ওর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলত, আমরাতো আমাদের পূর্ব-পুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের অনুসারী এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। সুরা যুখরুফ : ৪৩

মুসলিমদের উচিত বিয়ের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক প্রথা পরিহার করা।

যদি কনে পক্ষ কেবল সাধারণ আপ্যায়ন বা অতিথি সংবর্ধনার উদ্দেশ্যে কোনো ভোজের আয়োজন করে এবং তাকে ওয়ালীমা না বলে, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সমাজে এই ধরনের ভোজকেই “ওয়ালীমা” বলা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বরপক্ষের সুন্নাহসম্মত ওয়ালীমাকে বাদ দিয়ে শুধু কনেপক্ষের আয়োজনকেই প্রধান্য দেওয়া হয়।

২. ওয়ালীমার পুরস্কার নেওয়া

ইসলামে উপহার (হাদিয়া) আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। মহানবী (সা.) নিজেও হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং উপহার দিতে উৎসাহিত করতেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। লোকেরা তাদের হাদিয়া পাঠাবার ব্যাপারে ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর জন্য নির্ধারিত দিনের অপেক্ষা করত। এতে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করত। সহিহ বুখারি : ২৫৭৪, ২৫৮০, ২৫৮১, ৩৭৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৪৪১, ২৪৪২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে।” আল-আদাব আল-মুফরদ : ৫৯৪

ওয়ালীমা হলো নবদম্পতির জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানানোর একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত গ্রহীতা যদি নবদম্পতিকে কোনো উপহার দেন, তবে তা হাদিয়া হিসেবেই গণ্য হবে। এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ, কারণ এর মাধ্যমে নতুন দম্পতির প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ–ভারতের অনেক সমাজে দেখা যায়, ওয়ালীমার দাওয়াতে যারা যায়, তারা খাবারের সাথে খুশি হয়ে টাকা বা উপহার দিয়ে যায়। ওয়ালীমার এ ধরনের উপহারের পিছনে নিচে ইসলমা বিরোধী কাজগুলো লুকিয়ে থাকে।

ক. ওয়ালীমা ইবাদত ছাড়া কোন ব্যবসা নয় :

ওয়ালীমা মূলত একতরফা খাওয়ানো। অতিথির কাছ থেকে কিছু নেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্যের বিরোধী।

এতে ইবাদত সামাজিক লেনদেনে পরিণত হয়।

খ. উপহার প্রদান রেওয়াজে আবদ্ধ হয় :

অনেকে ভাবে, “অমুক আমাদের ওয়ালীমায় এত টাকা দিয়েছে, আমরাও তার দাওয়াতে দিতে বাধ্য।” এটি চাপ সৃষ্টি করে, অথচ ইসলাম অতিথিকে চাপ দেয়নি, বরং খেতে আসাটাই সুন্নাহ। যদি এটি একটি চক্রে পরিণত হয় (আমি তাকে দিয়েছি, তাই সে আমাকে দেবে), তবে এর পবিত্রতা নষ্ট হয়।

গ. সাদাসিধে ওয়ালীমা হারিয়ে যাওয়া :

পুরস্কার-প্রত্যাশী মনোভাব ওয়ালীমাকে আড়ম্বরপূর্ণ করে ফেলে। অথচ নবিজি ﷺ বলেছেন, সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটিই, যেখানে খরচ কম হয়। মুসনাদ আহমাদ : ২৪৫৯৫, সহিহ

ঘ. বিদআতের রূপান্তিরিত হয় :

নবিজি ﷺ এবং সাহাবাদের যুগে ওয়ালীমায় কারো থেকে টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি। অথচ এখন সমাজে এটি প্রচলিত। সুতরাং এটি বিদআতী রেওয়াজ।

ঙ. লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে :

যখন উপহার দেওয়া-নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ভালোবাসা বা সহযোগিতা না হয়ে লোক দেখানো বা সামাজিক চাপ হয়, তখন তা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়।

চ. বাধ্যবাধকতা : অনেক সমাজে এটি এমনভাবে প্রচলিত হয়েছে যে, উপহার না দিলে তা অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। ইসলামে কোনো উপহার দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। ওয়ালীমা হলো খাওয়ানোর ইবাদত, “খেয়ে উপহার নেওয়ার রেওয়াজ” নয়। ইসলামে দাওয়াতের বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করা ইবাদতের সাথে খেলা করা, তাই একে ইসলামের পরিভাষায় বলা যায়— বিদআত ও সুন্নাহ-বিরোধী রেওয়াজ।

৩. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে বেপর্দা গমন গুনাহের কাজ

ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নারীদের বেপর্দা এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ নিঃসন্দেহে ইসলামে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ইসলামে পর্দার বিধান শুধু একটি পোশাক নয়, বরং এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা নৈতিকতা, শালীনতা এবং পারস্পরিক সম্মান রক্ষা করে।

ইসলামে পর্দার গুরুত্ব

ইসলামে পর্দার বিধান কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।  সুরা আহযাব : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

ক. বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা ও ফ্যাশন শো-এর কুফল

বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা হওয়া এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে কয়েকটি কারণে গর্হিত কাজ:

খ. আল্লাহর বিধানের লঙ্ঘন :

এটি সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের লঙ্ঘন। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করা একটি বড় পাপ।

গ. দৃষ্টির ফিতনা :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যখন নারীরা আকর্ষণীয় পোশাক ও সাজে নিজেদের প্রকাশ করে, তখন তা পুরুষদের দৃষ্টির ফিতনার কারণ হয়। তাছাড়া, বেপর্দা মেলামেশা থেকে প্রেম, ব্যভিচার ও অনৈতিক সম্পর্কের পথ উন্মুক্ত হয়।  ফরে নারী পুরুষ উভয়ই গুনাহগার হয়।

ঘ. আড়ম্বর ও অপচয় :

ইসলামে বিয়েকে সহজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বেপর্দার সঙ্গে ফ্যাশন শো-এর মতো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করা অপচয়ের (ইসরাফ) অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। আল্লাহ অহংকারী ও অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না।

إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

“নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না। সূরা আনআম : ১৪১

ঙ. অহংকার ও রিয়া :

এই ধরনের অনুষ্ঠানে অনেক সময় লোক দেখানো বা অহংকার প্রদর্শনের প্রবণতা থাকে, যা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত) এবং এটি মুসলিমদের জন্য একটি মারাত্মক নৈতিক দুর্বলতা।

এটি সরাসরি একটি হারাম কাজ। কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বেপর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করা সুস্পষ্টভাবে হারাম।

সুতরাং, আমাদের দেশের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে যে বেপর্দার প্রচলন আছে, তা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি একটি মারাত্মক নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়। মুসলিমদের উচিত বিয়ের মতো একটি পবিত্র অনুষ্ঠানে আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা।

৪. ওয়ালীমাতে অপচয় করা এবং আভিজাত্য জাহির করা :

ওয়ালীমা একটি সুন্নত অনুষ্ঠান, এটি আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। কিন্তু ইসলাম এর মধ্যে আভিজাত্য জাহির ও অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কুরআন-হাদিসে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যেন আমরা ভোগ-বিলাস ও অপচয়ের পথে না যাই। যেমন-

ক. বিয়ের জন্য দামি দাওয়াত কার্ড ছাপা

বিয়ের দাওয়াত কার্ড মূলত খবর পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। কিন্তু অনেকেই এই মাধ্যমকে আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেন। দামি, জাঁকজমকপূর্ণ, এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় কার্ড ছাপিয়ে অর্থ নষ্ট করা হয়, যা কোনোভাবেই ইসলামে অনুমোদিত নয়। ইসলাম সবক্ষেত্রে সরলতা এবং মিতব্যয়িতার ওপর জোর দেয়। বিয়েতে দাওয়াত কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে জানানো, সেটা যেকোনো সহজ উপায়েও হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। সূরা বনী ইসরাঈল ; :২৭

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যেকোনো ধরনের অপচয়ই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

খ. হোটেল ও কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা

বিয়েতে বিলাসবহুল হোটেল বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা আজকাল একটি সাধারণ প্রবণতা। এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, যা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঋণের বোঝা তৈরি করে। ইসলামে বিয়ে একটি সহজ ও বরকতময় ইবাদত। এটি এমন কোনো অনুষ্ঠান নয় যেখানে আভিজাত্য দেখাতে গিয়ে অন্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিয়ে তার আসল উদ্দেশ্য (স্বামী-স্ত্রীর মিলন) থেকে দূরে সরে গিয়ে লোক দেখানো একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন-

“أَعْظَمُ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مَئُونَةً”

সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো সেটি, যাতে খরচ সবচেয়ে কম হয়। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৭৩, সুনানে বাইহাকি : ১৩৫৮৮

আমর ইবনে শো’আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যাবত না তার সাথে অপচয় বা অহংকার যুক্ত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০৫, আহমাদ : ৬৬৫৬, ৬৬৬৯, মিশকাত : ৪৩৮১।

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, বিয়ের বরকত খরচের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর সহজতা ও সরলতার ওপর নির্ভর করে।

গ. শুধু বিয়ের জন্য বাহারি পোশাক কেনা

অনেকেই শুধু বিয়ের দিনের জন্য এক বা একাধিক ব্যয়বহুল পোশাক কেনেন, যা পরে আর কোনো কাজে লাগে না। এটি এক ধরনের অপচয়। ইসলামে পোশাকের ব্যাপারে মার্জিত ও শালীনতার কথা বলা হয়েছে, তবে তা অবশ্যই সামর্থ্যের মধ্যে হতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অর্থ খরচ করা এবং পরে তা ফেলে রাখা বা ব্যবহার না করা ইসলামে নিন্দনীয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

এই আয়াতটি খাওয়া-পরাসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে অপচয় বর্জন করার নির্দেশ দেয়।

আবূ উমামাহ সালাবাহ আল-আনসারী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ তাঁর সামনে দুনিয়াদারী সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি শুনতে পাও না, তোমরা কি শুনতে পাও না যে, পোশাক-পরিচ্ছদের নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ, পোশাক-পরিচ্ছদে নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদে বাবুগিরী প্রদর্শন না করা। সুনানে আবু  দাউদ : ৪১৬১

ঘ. খাবারে অপচয় করা

বিয়েতে সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় খাবারে। আয়োজনকারীরা অতিথিদের সংখ্যা এবং খাবারের পরিমাণ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারায় প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। এই অপচয় করা খাবারগুলো সমাজের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যের উৎস হতে পারত। ইসলামে খাবার নষ্ট করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তা তুলে নেয়। তারপর তাতে যে আবর্জনা স্পর্শ করেছে তা যেন দূরীভূত করে এবং খাদ্যটুকু খেয়ে ফেলে। শাইতানের জন্য সেটি যেন ফেলে না রাখে। আর তার আঙ্গুল চেটে না খাওয়া পর্যন্ত সে যেন তার হাত রুমাল দিয়ে মুছে না ফেলে। কেননা সে জানে না খাদ্যের কোন অংশে বারাকাত রয়েছে। সহিহ মুসলিম : ২০৩৩

এই হাদিসটি খাবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অপচয় থেকে বিরত থাকার কথা বলে।

ঙ. বিয়ের অনুষ্ঠানে লাইটিং করা

বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বা লাইটিং করা হয়, যা মূলত আভিজাত্য ও জৌলুস দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। এই অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জায় প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং খরচও বৃদ্ধি পায়। ইসলামে বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো সহজ ও সাবলীলভাবে একটি নতুন পরিবার গঠন, যেখানে এসব বাহ্যিক প্রদর্শনীর কোনো স্থান নেই।

শা‘বী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রহ.)-এর কাতিব (একান্ত সচিব) বলেছেন, মু‘আবিয়া (রাঃ) মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রাঃ)-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ হতে আপনি যা শুনেছেন তার কিছু আমাকে লিখে জানান। তিনি তাঁর কাছে লিখলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- (১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সওয়াল করা। সহিহ বুখারি : ১৪৭৭

চ. মেয়েরা পোশাক-আশাকের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে

বিয়েতে কনের জন্য পোশাক-আশাক, গহনা এবং অন্যান্য সাজসজ্জার পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। এই ব্যয় অনেক সময় পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। সমাজে এটি একটি অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছে যে, কনেকে যত বেশি জাঁকজমকপূর্ণ সাজানো হবে, তত তার সম্মান বাড়বে। অথচ ইসলামে নারী-পুরুষ সবার জন্যই সরলতা এবং মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

বিয়েতে অপচয় ও আভিজাত্য জাহির করা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী। এর ফলে শুধু অর্থ ও সম্পদের অপচয়ই হয় না, বরং সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, এসব অহেতুক রীতিনীতি পরিহার করে ইসলাম নির্দেশিত পথে সহজ ও বরকতময় বিয়ের আয়োজন করা।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ أَلْبَسَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَوْبًا مِثْلَهُ زَادَ عَنْ أَبِي عَوَانَةَ ثُمَّ تُلَهَّبُ فِيهِ النَّارُ

যে ব্যক্তি খ্যাতি লাভের জন্য পোশাক পরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সেরূপ পোশাক পরাবেন, অতঃপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। সুনানে  আবু দাউদ : ৪০২৯

ছ. অশ্লীল কিংবা প্রসিদ্ধি ও অহংকারের পোশাক পরা :

অতি টাইট, পাতলা ও গোপন সৌন্দর্যকে প্রস্ফূটিত করে এমন পোশাক পরা। বক্ষ, বাহু ও কটি দৃশ্যমান হয় এমন অপ্রচলিত ও দৃষ্টিকটু পোশাক পরে অহংকার দেখানো এবং পর পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

জ. নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার করা :

বিবাহ অনুষ্ঠানে ইদানীং মেয়েরা বিশেষত তরুণীরা মহা উৎসাহে সেন্ট ব্যবহার করে অংশগ্রহণ করে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ، فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ

‘যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে অতপর মানুষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তার সুগন্ধি পায়, সে ব্যভিচারিণী। সুনানে  নাসায়ি : নাসায়ী : ৯৩৬১; আহমদ : ১৯৭২৬।

৫. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে গান বাজনা করা

পুর্বের আলোচনাতে দেখেছি বিবাহর অনুষ্ঠানে দফ জানান জায়েয। কিন্তু আমাদের সমাজে দফ নয়, সরাসরি নাজ গানের আয়োজন করা হয় তা নিশ্চয়ই হারাম। তাই দফ বাজানো জায়েয হলে আলেমগণ শর্ত সাপেক্ষে জায়েয করেছেন।

বিয়ের ওয়ালীমায় দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যার শুধু একদিক খোলা) ব্যবহার করা জায়েয। তবে এর সাথে অশ্লীল বা অনর্থক কথা, অশ্লীল গান, এবং নারীদের বাদ্যযন্ত্র বাজানো জায়েয নয়। নিচের শর্তাবলী অনুসরণ করে দফ বাজানো জায়েয়। ওয়ালীমা অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো খাবার পরিবেশন করা, গান-বাজনা নয়।

অবশ্য কিছু আলোম গান-বাজনাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। তারা বলেন- ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম। তারা এই মতের পক্ষে বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধুমাত্র ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নয়, বরং কোনো অনুষ্ঠানেই গান-বাজনা করা জায়েয নয়। আলেমগণ একমত যে অশ্লীল গান-বাজনা, অশ্লীল বা অনর্থক কথা, এবং অশ্লীল বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হারাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ

অর্থ : আর মানুষদেরই মধ্যে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষ কে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (গান) খরিদ করে।  এবং তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসাবে গ্রহন করে। এ ধরনের লোকদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব৷ সুরা লুকমান : ৬

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’ অবলম্বন করে, সে দোজখের কঠিন শাস্তি প্রাপ্ত হবে, কাজেই তা হারাম। উক্ত আয়াত-এ বর্ণিত (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসির বলেন- ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর অর্থ- সঙ্গীত বা গান-বাজনা। বেশীর ভাগ তাফসির কারকগণ  ‍লাহওয়াল হাদিস বলতে গানকে বুঝিয়েছেন।

প্রখ্যাত সাহাবী আ’ব্দুল্লাহ ইবনু মাসউ’দ (রা.) বলেন, “আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, (এই আয়াতে উল্লেখিত) ‘লাহুয়াল হাদীস’ (অবান্তর-কথাবার্তা) কথার অর্থ হচ্ছে গান।” ‘ইবলীসের আওয়াজ’।

তাফসিরে তাফহিমুল কুরআনে মাওলানা মউদুদী বলেন-

“লাহওয়াল হাদীস” অর্থাৎ এমন কথা যা মানুষকে আত্ম-সমাহিত করে অন্য প্রত্যেকটি জিনিস থেকে গাফিল করে দেয়। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দগুলোর মধ্যে নিন্দার কোন বিষয় নেই। কিন্তু খারাপ, বাজে ও অর্থহীন কথা অর্থে শব্দটির ব্যবহার হয়। যেমন গালগল্প, পুরাকাহিনী, হাসি-ঠাট্টা, কথা-কাহিনী, গল্প, উপন্যাস, গান বাজনা এবং এ জাতীয় আরো অন্যান্য জিনিস।

আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২০, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৬৮৮, আহমাদ : ২২৩৯৩, মিশকাত : ৪২৯২, সহীহাহ : ১৩৮-১৩৯।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে  দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৬. বিয়েতে হারাম কাজ হলেও তাতে অংশ নেয়া :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি নিষিদ্ধ কিছুর আয়োজন থাকে তবে তাতে অংশ নেয়ার অনুমতি নেই।  আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল আমার নিকট এসে বলেন, গত রাতে আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু আমি প্রবেশ করিনি। কারণ ঘরের দরজায় ছবি ছিলো। ঘরের মধ্যে ছিলো ছবিযুক্ত পর্দা এবং ঘরের ভিতরে ছিলো কুকুর। সুতরাং আপনি ঘরে ঝুলানো ছবির মাথা কেটে দেয়ার আদেশ করুন, তাহলে তা গাছের আকৃতিতে পরিণত হবে। আর পর্দাটি কেটে দু’টি বালিশের ভিতরের কাপড় বানাতে আদেশ করুন এবং কুকুরটিকে বের করে দেয়ার হুকুম দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশ মতো কাজ করলেন। কুকুরটি ছিলো হাসান বা হুসাইনের এবং তা তাদের খাটের নীচে শুয়ে ছিলো। তিনি সেটাকেও বের করে দেয়ার আদেশ দেন এবং তা বের করে দেয়া হলো। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আন-নাযাদ হচ্ছে কাপড় রাখার বস্তু, গদি সদৃশ। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৫৮, সুনানে তিরমিজি : ২৫০৬, সুনানে নাসায়ী : ৫৩৫১

ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে, কোনো মুসলমানের এমন কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিত নয় যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে-

ক. হারাম কাজ থেকে দূরে থাকা একটি ইবাদত। কোনো অনুষ্ঠানে এমন কিছু থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এতে পুণ্য অর্জনের সুযোগ নষ্ট হয়।

খ. রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদিস অনুযায়ী, যে ঘরে ছবি বা মূর্তি থাকে, সেখানে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। একইভাবে, গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা অন্যান্য হারাম কাজ যেখানে হয়, সেখানেও আল্লাহর রহমত থাকে না।

গ. কোনো অনুষ্ঠানে হারাম কাজ থাকলে তা থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ, সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এটি সমাজে সেই হারাম কাজকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

ঘ. একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ঈমানকে রক্ষা করা। হারাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে ঈমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ইমাম আওযায়ী (রহ.)-এর বক্তব্যটি এই নীতিরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছেন, যে দাওয়াতে তবলা বা বাদ্যযন্ত্র থাকে, সেখানে যাওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো, ওয়ালীমার মূল উদ্দেশ্য বরকতময় করা এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। তাই কোনো অনুষ্ঠানে যদি এমন কিছু থাকে যা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপন্থী, তবে সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৭. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানর ভিডিও ও ছবি তোলা :

ওয়ালীমার অনুষ্ঠান ভিডিও ও ছবি তোলা বিষয়টি আধুনিক যুগের একটি মাসআলা। কুরআন-হাদিসে সরাসরি ভিডিও বা ফটোগ্রাফির উল্লেখ নেই, তবে এ বিষয়ে ইসলামি উলামারা কুরআন-সুন্নাহর মূল নীতিমালা থেকে হুকুম নির্ধারণ করেছেন।

১. কুরআনের দিক থেকে নির্দেশনা আছে মানুষ যেন অশ্লীলতা ও বেপর্দা এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

অপ্রয়োজনীয় চিত্র বা মূর্তি ব্যবহার থেকে বারণ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই কিয়ামতের দিবসে মানুষের মধ্যে (কঠিন শাস্তি ভোগকারী হবে ছবি তৈরিকারীরা। সহিহ মুসলিম : ২১০৯

আবূ তালহাহ্ (রাযিঃ)-এর সানাদে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ফেরেশতাগণ সে গৃহে প্রবেশ করেন না, যে গৃহে কোন কুকুর অথবা কোন (প্রাণীর) ছবি থাকে। সহিহ মুসলিম : ২১০৬

৫৯৫০. মুসলিম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) মাসরূকের সাথে ইয়াসার ইবনু নুমাইরের ঘরে ছিলাম। মাসরূক ইয়াসারের ঘরের আঙিনায় কতগুলো মূর্তি দেখতে পেয়ে বললেনঃ আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে শুনেছি এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, (কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সব থেকে শক্ত শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি তৈরি করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৫০, সহিহ মুসলিম : ২১০৯, আহমাদ : ৩৫৫৮

 এ সম্পর্কে আলেমদের মতামত

পুরনো যুগে “ছবি” বলতে মূলত আঁকা ছবি বা ভাস্কর্য বোঝানো হতো। সেগুলো শিরকের মাধ্যম হওয়ায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আধুনিক যুগে ক্যামেরার ছবি/ভিডিও নিয়ে উলামাদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম বলেন, এটি “আসল ছবি আঁকার মতো” নয়, বরং প্রতিফলন (reflection), তাই প্রমাণস্বরূপ, পরিচয়ের প্রয়োজনে, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে জায়েজ। তবে যদি তা অশ্লীলতা, বেপর্দা, পুরুষ-নারীর মিশ্রণ, গায়িকা/বাদ্যযন্ত্র, অপচয় প্রভৃতির সাথে হয়, তাহলে তা স্পষ্টতই হারাম।ইসলামি শরিয়তে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে ভিডিও ও ছবি তোলার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের মূল কারণ হলো, ছবি ও ভিডিওর বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।

ক. শর্ত সাপেক্ষে ওয়ালীমায় ভিডিও ও ছবি তোলার জায়েয :

অধিকাংশ আধুনিক আলেম ছবি ও ভিডিওকে জায়েজ মনে করেন, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। হাদিসের নিষেধাজ্ঞা ছিল প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরির জন্য, যা পূজা বা শিরকের উদ্দেশ্যে করা হতো। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা বা ভিডিও করা সেই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। ভিডিও ও ছবি হলো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি, যা হাতে আঁকা ছবি বা মূর্তির মতো নয়। অনেক ইসলামিক কাজ, যেমন শিক্ষার জন্য, দাওয়াতের জন্য, এবং পারিবারিক স্মৃতি রক্ষার জন্য ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি এতে কোনো হারাম কাজ না থাকে, যেমন গান-বাজনা, অশ্লীল দৃশ্য ইত্যাদি, তবে তা বৈধ হতে পারে। অনেক আলোম নিচের শর্তে ছবি করার আনুমতি দিয়েছেণ অনুমোদনযোগ্য শর্তে:

১. কেবল স্মৃতিচারণ বা হালাল উদ্দেশ্যে,

২. যেখানে নারী-পুরুষের মিশ্রণ নেই,

৩. বেপর্দা, অশ্লীলতা বা অপচয়ের দৃশ্য ধারণ করা হয় না।

৪. ভিডিও পরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া যারে না

৫. অনুষ্ঠানে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র ও অশ্লীল পোশাক থাকা যাবে না।

খ. যারা ছবি ও ভিডিওকে হারাম মনে করেন:

কিছু আলেম, যারা প্রাণীর ছবি আঁকা বা মূর্তি বানানো হারাম মনে করেন, তারা ভিডিও এবং ছবি তোলাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেন। তাদের যুক্তি হলো- হাদিসে বর্ণিত ছবি ও মূর্তির নিষেধাজ্ঞা ভিডিও এবং ছবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভিডিওতে অনেক সময় নারীদের অনিয়ন্ত্রিতভাবে দেখানো হয়, যা পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এগুলো সাধারণত অহংকার ও অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানের ভিডিওতে করা হয় তাতে হারাম গান-বাজনা, নারী অশ্লীল দৃশ্য বা কর্মকাণ্ড থাকা খুবই সাভাবিক বিষয়। এ অনুষ্ঠানে নারী ও পুরুষদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়না। তাই তাদের ছবি ও ভিডিও তোলার ফলে নারীদের পর্দা লঙ্ঘিত হয়। কোন অপ্রয়োজনীয় ছাড়াই  ছবি ও ভিডিও তোলা হয়,  এর ফলে আর্থিক অপচয় হয়।  ইসলামে অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবাহ হলো ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মুসলিম নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একটি পবিত্র চুক্তি। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধি রয়েছে। এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা অপরিহার্য। তবে, দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজে বিবাহের সময় কিছু প্রচলিত প্রথা দেখা যায়, যা ইসলামের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৯. মুসলিম বিবাহে প্রচলিত কিছু কুপ্রথা

ক. পাত্রী দেখা

পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে ইসলামী নিয়ম হলো, যিনি বিবাহ করবেন, শুধু তিনিই পাত্রীকে দেখতে পারবেন। এর উদ্দেশ্য হলো, পাত্রীকে ভালোভাবে দেখে তার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। পাত্রীর চেহারা, শারীরিক গঠন এবং অন্যান্য বিষয় দেখা অনুমোদিত। তবে, যারা পাত্রীর মাহরাম নন, তাদের সামনে পাত্রীর যাওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ, যিনি বিবাহ করবেন, তার সঙ্গে তার বাবা, চাচা বা অন্য পুরুষ আত্মীয়রা থাকলে পাত্রীকে তাদের সামনে পর্দা করতে হবে। অথচ আমাদের সমজে নামাহরাম পুরুষ পাত্রী দেখে থাকে যা হারাম।

উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো পুরুষ অপর (মাহরাম নয়) নারীর সাথে নিঃসঙ্গে দেখা হলেই শয়তান সেখানে তৃতীয় জন হিসেবে উপস্থিত হয়। সুনানে তিরমিজি : ১১৭১, ২১৬৫, মিশকাত : ৩১১৮

২. গায়ে হলুদের রীতি

ইসলামে গায়ে হলুদের কোনো বিধান নেই। এটি মূলত হিন্দুধর্মের একটি প্রথা, যা বর ও কনের পরিবারে আনন্দ এবং উৎসবের জন্য প্রচলিত হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রথা অনুসরণ করা উচিত নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করবে, অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ করে নয়।

(১) গায়ে হলুদের উৎপত্তি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি হিন্দু ধর্মের একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি, যা বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বর-কনেকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করা এবং তাদের দাম্পত্য জীবনের শুভ কামনা করা। এই ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-আচরণ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ ইসলামে সকল প্রকার কুসংস্কার এবং অন্য ধর্মের রীতিনীতি অনুসরণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করা বাধ্যতামূলক।

(২) ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ

ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা ও আচার-আচরণ অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য গ্রহণ) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে-

 ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

গায়ে হলুদ যেহেতু অমুসলিমদের একটি ধর্মীয় প্রথা, তাই এটি পালন করা মুসলিমদের জন্য জায়েজ নয়।

(৩) সৌন্দর্যবর্ধনে হলুদের ব্যবহার

ব্যক্তিগতভাবে সৌন্দর্যের জন্য হলুদ ব্যবহার করা ইসলামী শরিয়তে জায়েজ। অর্থাৎ, যদি বর বা কনে নিজেরা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হলুদ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক বা দলগতভাবে করার প্রয়োজন নেই। তবে, এটি যেন অন্য ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে হলুদ মাখা এবং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের প্রথা অনুসরণ করা এক জিনিস নয়।

(৪) অশ্লীল পোশাক পরিধান করা

এ অনুষ্ঠানে নারীদের পর্দা না করে অশ্লীল পোশাক পরিধান করে অংশ গ্রহণ করে, যা সম্পূর্ণ হারাম।  বিবাহ একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান হলেও ইসলামে এর পবিত্রতা বজায় রাখা উচিত। নারীদের জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক।

গ. উকিল পিতা বানানো

ইসলামে বিবাহের জন্য অবশ্যই একজন অভিভাবকের (ওয়ালি) অনুমতি প্রয়োজন। যিনি মেয়ের আইনগত অভিভাবক, তিনিই এই দায়িত্ব পালন করবেন। এই দায়িত্ব সাধারণত বাবা পালন করেন। পুর্বে বিস্তারিত আ্লোচন করা হয়েছে যে, বাবার অবর্তমানে দাদা, ভাই, চাচা, বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যিনি মাহরাম, তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে উকিল বানানো শরিয়ত সম্মত নয়, কারণ এটি বিবাহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশে অনেক অঞ্চলে বৈধ অভিভাবকে বাদ দিয়ে পরপুরুষকে উকিল পিতা বানোন হয়। যা একটি হারাম কাজ। এ বানানো উকিল পিতা পর্বরতীত ঔ নারীর সাথে পিতার মত আচরন করে। পিতার সাথে কন্যার যেমন মাহরান ঐ বানানো উকিল পিতাও তার সাথে মাহরামের মত মেলামেসা করা, যা পরিস্কার হারাম।

৭৬৬. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। সহিহ বুখারি : ৪৩২৬, ৬৭৬৬, সহিহ মুসলিম : ৬৩, আহমাদ : ১৫৫

 ঘ. বিয়ে উপলক্ষে রব বা কনের গোসল

ইসলামে পবিত্রতা একটি মৌলিক বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। তাই প্রতিটি মুসলিমকে তার ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতার বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। গোসল হলো শরীরকে পবিত্র করার একটি অন্যতম মাধ্যম। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী গোসল করার কিছু নিয়ম রয়েছে, যা মানা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে, গোসল করার সময় সতর (শরীরের লজ্জাস্থান) ঢেকে রাখা এবং নামাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ) ব্যক্তির সামনে সতর খোলা না রাখা।

ইসলামে বিয়ের আগে বা পরে বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিক গোসলের প্রথা নেই। এটি সম্পূর্ণই একটি সামাজিক কুপ্রথা, যা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একজন পুরুষকে তার মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন মা, বোন, খালা ইত্যাদি) নারী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়। একইভাবে, একজন নারীকেও তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যা সাধারণত পরিবার বা সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত হয়, এর পেছনে কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই। এটি মূলত লোকালোকি ও কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে চলে আসছে। ইসলামে এমন কোনো কুপ্রথাকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি, যা শরীয়তের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত, সকল কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতি-নীতি থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা এবং শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে চলা।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যেখানে নামাহরাম ব্যক্তিরা বর-কনের গোসলে অংশ নেয়, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বর্জনীয়।

ঙ. নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিয়ে করা

চন্দ্র বর্ষের কোন মাসে বা কোন দিনে অথবা বর/কনের জন্ম তারিখে বা তাদের পূর্ব পুরুষের মৃত্যুর তারিখে বিবাহ শাদী হওয়া অথবা যে কোন শুভ সৎ কাজ করার জন্য ইসলামী শারী’য়াতে বা ইসলামী দিন তারিখের কোন বিধি নিষেধ নেয়। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে শুভ বা অশুভ মনে করা হয় না। আল্লাহ তা’আলা সব দিনকেই সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাই, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিবাহ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেকোনো ভালো দিনে বিবাহ করা যেতে পারে, যখন উভয় পক্ষ রাজি থাকে এবং ইসলামী বিধান অনুসারে সবকিছু প্রস্তুত থাকে।

চ. হিন্দুয়ানী প্রথা

ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুসলিম বিবাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলাম চায় তার অনুসারীরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখুক এবং অন্য কোনো ধর্মের রীতিনীতি বা কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকুক।

ইসলামে অন্য ধর্মের আচার-আচরণ বা প্রথা অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ বলা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ।

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

বাঁশের কুলায় চন্দন, মেহদি, হলুদ, কিছু ধান-দূর্বা ঘাস কিছু কলা, সিঁদুর ও মাটির চাটি নেওয়া, বরকে পিড়িতে বসিয়ে বা সিল-পাটাই দাড় করিয়ে দই-ভাত খাওয়ান ইত্যাদি হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা। এগুলো ব্যবহার করা সরাসরি সেই ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করা। এই ধরনের কাজ মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইসলামে যেকোনো ধরনের কুসংস্কারের স্থান নেই। বাঁশের কুলা বা সিঁদুরের মতো জিনিসগুলো প্রায়শই কোনো ধরনের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা ইসলামে শিরকের (আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার করা) অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামে সকল প্রকার ক্ষমতা ও কল্যাণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই, কোনো বস্তুকে শুভ বা অশুভ মনে করা এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথা অনুসরণ করা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের পরিপন্থী।

ছ. ওয়ালীমাতে পটকা-আতশবাজি ফুটান

বিবাহ উৎসবে অথবা অন্য যে কোন উৎসবে পটকা-আতশবাজি ফুটান হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ সকল কাজ অবৈধ ও অপচয়।

আল্লাহু-তা’য়ালা বলেনঃ

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

“নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বানী ইসরাঈল : ২৭

জ. নামাহরাম ব্যক্তি কনেকে কোলে তুলে বহন করা।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিবাহের পর কনেকে নামাহরাম ব্যক্তির কোলে তুলে বহন করা একটি অনৈসলামিক ও অত্যন্ত আপত্তিকর কাজ। এই ধরনের প্রথা বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা এবং ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

নামাহরাম সম্পর্ক ও ইসলামী পর্দা

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাহরাম ব্যক্তি (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন বাবা, ভাই, চাচা) ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে নামাহরাম বলা হয়। বরের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা কনের মাহরাম নন, তাদের সামনে কনের নিজেকে উন্মুক্ত রাখা বা তাদের সাথে শারীরিক স্পর্শে আসা ইসলামী পর্দার লঙ্ঘন। কনেকে কোলে তুলে বহন করা এই বিধানকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।

বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, যা আল্লাহর নির্দেশিত পথে সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। জনসমক্ষে বা মুরুব্বীদের সামনে একজন নামাহরাম ব্যক্তির দ্বারা কনেকে কোলে তুলে বহন করা চরম বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতার পরিচায়ক। ইসলামে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই। ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, স্বামী এবং স্ত্রী একে অপরের জন্য হালাল। কিন্তু অন্যদের সামনে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করা অনুমোদিত নয়। বরের কোলে স্ত্রীর যাতায়াত বা অন্য কোনো নামাহরাম পুরুষের দ্বারা তাকে বহন করা— এই ধরনের প্রথাগুলো ইসলামী বিধানের সীমালঙ্ঘন করে। এগুলি মুসলিম সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিপন্থী।

সুতরাং, এই ধরনের প্রথাগুলো থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত। বিবাহকে আনন্দপূর্ণ করার জন্য অনেক হালাল উপায় আছে, তবে সেগুলো যেন কখনও ইসলামী বিধানের বাইরে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

ঝ. বিবাহ অনুষ্ঠানে খেজুর ছিটানো, কুড়ানো বা কাড়াকাড়ি করা

এ বিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কোনো সহীহ হাদীস নেই। হাদীসগুলোর সনদ অত্যন্ত যয়ীফ এবং সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ সেগুলোকে জাল বলে গণ্য করেছেন। তাবারানী, আল-আউসাত ১/৪৪; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত ২/১৭০-১৭২; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/২৩; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/১৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৯০; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/১৬৫-১৬৬; তাহির পাটনী, পৃ. ১২৬।

বিবাহের বিধান সম্পর্কিত কিছু হাদিস :

১. নাবালিকা বিবাহ দেওয়া জায়েয :

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৩৮৯৪, ৫১৩৩

২.  শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ।

ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। রাবী বলেন, শিগার বিবাহ এই যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রস্তাব দিলো, তুমি আমার সাথে তোমার মেয়েকে অথবা বোনকে বিবাহ দাও এবং তার পরিবর্তে আমি আমার মেয়েকে অথবা বোনকে তোমার সাথে বিবাহ দিবো, আর এতে কোন মাহর থাকে না। সহিহ বুখারী : ৫১১২, ৬৯২০, সহিহ মুসলিম : ১৪১৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী ১১২৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৩৪, ৩৩৩৭, ৩৩৩৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৭৪, আহমাদ : ৪৫১২, ৪৬৭৮, ৫২৬৭, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৪, দারেমী : ২১৮০, ইরওয়াহ : ১৮৯৫