মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
শিশু মাসের যে তারিখকে জন্মগ্রহণ করেছে বছর ঘুরে সে তারিখটি আবার ফিরে আসলে সেটাই তার তথা জন্মদিন। সে দিনে আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধক নিয়ে বড় কেক টেকে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। এতে আমন্ত্রিত মেহমানদের সুস্বাধু খাবার দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে। মেহমানরা তাকে জন্মদিনের শুভকামনা জানান এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করে দোয়া করেন। সেই সাথে তার জন্য উপহার সামগ্রীও দিয়ে থাকেন।
আজকের সমাজে জন্মদিন পালন করাটা আধুনিকতা হয়ে গেছে। আর জন্মদিন পালন না করাটা হয়ে গেছে ব্যাক ডেটেড। একজন মুসলিম হিসেবে এই সম্পর্কে ভাবা উচিত । জন্মদিন পালন করা ইসলামি চেতনার পরিপন্থি। জন্মদিন পালন করা মুসলিমদের কালচার নয়। এটি এসেছে খ্রিস্টানদের কাছ থেকে যা মুসলিমদের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। এই উপলক্ষ্যে আনন্দ-ফুর্তি করা অথবা কোন আমল করার বিষয়ে কুরআন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত নয়। রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে তাবেয়ীদের যুগে জন্মদিন পালনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। যদি জন্মদিন বলতে ইসলামে কোন কিছু থাকত তাহলে হাদীস ও ইতিহাসের কিতাব গুলোতে সাহাবী ও তাবাঈন (রাঃ) এর জন্মদিন পালনের কোন না কোন ঘটনা থাকত। বর্তমানে এই কথা যাচাইয়ের জন্য আর আলেম হতে হয় না। আপনার সামনে সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহম্মদসহ বহু হাদিসের গ্রন্থ অনুদিত। সময় থাকলে মিলিয়ে নেন। কোন হাদিস গ্রন্থে এমন প্রমান নাই যে, সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ীদের কেউ জম্মদিন পালন করেছেন। আমাদের প্রিয়নবী ﷺ রবিউল আওয়াল মাসের কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন এটা নিশ্চিত ভাবে জানা না থাকায় সীরাত প্রণেতাদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। আমাদের মাঝে অতি প্রাসিদ্ধ বারই রবিউল আউয়া্লও সর্ব সম্মত মত নয়। সিরাতের প্রন্থে কম পক্ষে রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর ২০ টি জম্ম তারিখ পাওয়া যায়। যদি জম্মদিন পালনে বিশেষ কোন ফজিলত থাকত তাহলে সাহাবিগণ (রাঃ) যে কোন উপায় রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর জম্ম তারিখ বের করে পালন করেতেন। অথচ জন্মদিন পালন তো দূরের কথা তারা প্রিয় মানুষির জন্ম তারিখই সংরক্ষণ করে নাই। এর মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয় জন্মদিন বলতে বর্তমানে যা বুঝায় ইসলামে এর কোন অস্তিত্বই ছিল না।
কিছু দিবস রয়েছে, যেগুলো মানুষকে সচেতন করার জন্য বা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মেসেজ দেওয়ার জন্য পালন করা হয়ে থাকে। তবে ইবাদতের কোনো ফরম্যাট এর মধ্যে থাকতে পারবে না, তাহলে এই কাজটি বেদাত হয়ে যাবে।
ইমানদার ব্যক্তিগণ বেহুদা কাজ থেকে নিজেদের দূরে রাখবেন। এসব কাজে সময় নষ্ট করার সামান্যতম কোনো সুযোগ তাঁদের নেই। রাসুল ﷺ হাদিসের মধ্যে বলেছেন, ‘একজন মুসলিমের প্রকৃত সৌন্দর্য হচ্ছে সেখানেই, সে এমন কাজ পরিহার করে চলবে, যেটা তার জন্য অপ্রয়োজনীয়।’
জম্মদিনের খারাপ দিকঃ
(১) জন্মদিন কেক কেটে পালন করা হচ্ছে যা পশ্চিমাদের সংস্কৃতি। কোন মুসলিম বিধর্মীদের বা বিজাতী লোকের অনুসরণ করতে পারে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ
আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
যে ব্যক্তি কোন জাতির সাথে যে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখলো সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবূ দাউদ : ৪০৩১
(২) অনেক ক্ষেত্র জম্মদিনের পার্টিতে নারী পুরুষ একত্র হয় অনুষ্ঠান উপভোদ করে যেখানে পর্দার কোন বালাই থাকে না। পর্দার ফরজ লংঘন করে এই ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান করা হারাম।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَقَرْنَ فِى بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ ٱلْأُولَىٰۖ وَ
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সুরা আহজাব : ৩৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯
(৩) যারা জম্মদিন পালনের জন্য বড় অনুষ্ঠান করে তারা অনেক সময় নাচ গানের আসর বসায়। এই ধনের অনুষ্ঠানে যে কোন গানের অনুষ্ঠান করা হারাম। অনেক সময় মুউজিক্যাল সাউন্ডের সাথে যুবক যুবতীরা নাচতে থাকে। যা মুলত হারাম কাজ।
(৪) এই দিন উপলক্ষে অতিতীদের আপ্যায়নের জন্য খাবরের আয়োজন করে যা মুলত অপচয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ
হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ
অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১
ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস পালন করা এবং এ উপলক্ষে যে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয় তা হারাম এবং বিদআত। জন্ম দিবস পালনের কোন প্রমাণ কিংবা চর্চা রাসুল সা. কিংবা তাঁর সাহাবী (রাঃ) দের মাধ্যমে হয়েছিল বলে কোন প্রমাণ নাই। বর্তমানে জন্মদিন পালন করাটা হয়ে গেছে যেন একে অপরের প্রতি মহবত্তের পরিচায়ক। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবাগন ছিলেন সত্যিকারার্থে নবীপ্রেমিক ও সর্বোত্তম অনুসারী। নবী প্রেমের নজীর ও দৃষ্টান্ত তারাই স্থাপন করেছেন। যদি জন্মদিন পালন করাটা ভাল হত ও মহব্বতের পরিচায়ক হত তবে তারা তা অবশ্যই করতেন।