বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ আলোচনায় চারটি ভাগে বিভক্ত করেছিলাম। এখানে সেই চারটি শ্রেণীর ছোট শিরককে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছি। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

১। কোন ব্যক্তি বা বস্তুত আচার আচরণে কল্যান অকল্যায় রয়েছে বলে বিশ্বাস করাঃ

মহান আল্লাহকে কল্যান অকল্যান একমাত্র মালিক বিশ্বাস করেও যদি কেউ কোন ব্যক্তি বা বস্তু আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান আছে মনে করে, তবে তা ছোট শিরক হবে। আল্লাহতে বিশ্বাসি কোন বান্দা কোন ব্যক্তি বা বস্তুর আচার আচরণে বা দর্শণে কল্যান অকল্যান কথা চিন্তা করতে পারে না। ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি দর্শণেই অমঙ্গল বিশ্বাস করা কিংবা তাদের কোনরূপ আচরণ, ডাক, শব্দ বা ধ্বনির শ্রবণকে অকল্যান বিশ্বাস করা ছোট শিরকের পর্যায় পড়বে। যুগ যুগ ধরেই জাতীয় কুলক্ষণবোধ বিশ্বাস আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। মূসা (আ.) কে তার সম্প্রদায় অমঙ্গল হিসাবে বিশ্বাস করত। মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের জন্য।’ আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। সুরা আরাফ : ১৩১

সামূদ জাতিও তাদের নবীকে অমঙ্গল মনে করত। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

) قَالُواْ ٱطَّيَّرۡنَا بِكَ وَبِمَن مَّعَكَ‌ۚ قَالَ طَـٰٓٮِٕرُكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ‌ۖ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ۬ تُفۡتَنُونَ

তারা বলল, আমরা তো তোমাদেরকে ও তোমার সাথীদেরকে অমঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি৷ সালেহ জবাব দিল, “তোমাদের মঙ্গল অমঙ্গলের উৎস তো আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ সুরা নমল : ৪৭

পূর্বের নবি রাসূলগন অমঙ্গল মনে করার আগেকটি প্রমান হলো। মহান আল্লাহ আরও বলেন-

قَالُوْا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ، لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوْا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالُوْا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ، أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُوْنَ

তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। তোমরা যদি বিরত না হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে’। সুরা ইয়াসিন : ১৮

অথচ সকল কল্যান আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে আর অকল্যান হল আমাদের খারাপ কাজের ফল। মহান আল্লাহ বলেন-

أَيۡنَمَا تَكُونُواْ يُدۡرِككُّمُ ٱلۡمَوۡتُ وَلَوۡ كُنتُمۡ فِى بُرُوجٍ۬ مُّشَيَّدَةٍ۬‌ۗ وَإِن تُصِبۡهُمۡ حَسَنَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِ ٱللَّهِ‌ۖ وَإِن تُصِبۡهُمۡ سَيِّئَةٌ۬ يَقُولُواْ هَـٰذِهِۦ مِنۡ عِندِكَ‌ۚ قُلۡ كُلٌّ۬ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِ‌ۖ فَمَالِ هَـٰٓؤُلَآءِ ٱلۡقَوۡمِ لَا يَكَادُونَ يَفۡقَهُونَ حَدِيثً۬ا

আর মৃত্যু, সে তোমরা যেখানেই থাকো না কেন সেখানে তোমাদের লাগাল পাবেই, তোমরা কোন মজবুত প্রসাদে অবস্থান করলেও৷ যদি তাদের কোন কল্যাণ হয় তাহলে তারা বলে, এতো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে৷ আর কোন ক্ষতি হলে বলে, এটা হয়েছে তোমার বদৌলতে৷ বলে দাও, সবকিছুই হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে৷ লোকদের কী হয়েছে, কোন কথাই তারা বোঝে না৷ সুরা নিসা : ৭৮

সাধারণ মানুষ যে পশু, পাখি ও বস্তুতে কল্যায় অকল্যান মনে করি সে সম্পর্কে হাদিসে সঠিক দিক নির্দেশন দিয়ে বলা হয়েছে, কোন কিছুতেই মঙ্গল অমঙ্গল নাই।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ عَدْو‘ى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الأَسَدِ.

রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক। সহিহ বুখারি : ৫৭০৭,

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ غُوْلَ، فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! فَمَا بَالُ الإِبِلِ تَكُوْنُ فِيْ الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَجِيْءُ الْبَعِيْرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيْهَا، فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا، قَالَ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟

ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। কুলক্ষণ বলতেই তা একান্ত অমূলক। হুতোম পেঁচা, সফর মাস, রাশি-তারকা অথবা পথ ভুলানো ভূত কারোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! কখনো এমন হয় যে, মরুভূমির মধ্যে শায়িত কিছু উট। দেখতে যেমন হরিণ। অতঃপর দেখা যাচ্ছে, চর্ম রোগী একটি উট এসে এগুলোর সাথে মিশে গেলো। তাতে করে সবগুলো উট চর্ম রোগী হয়ে গেলো। তখন রাসূল (সা.) বললেন: বলো তো: প্রথমটির চর্ম রোগ কোথা থেকে এসেছে? সহিহ বুখারি : ৫৭১৭, ৫৭৭০, ৫৭৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২২০

আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

الطِّيَرَةُ شِرْكٌ ـ ثَلاَثًا ـ وَمَا مِنَّا إِلاَّ … وَلَكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ

কোনো বস্তুকে কুলক্ষণ মনে করা শিরক, কোনো বন্তুকে কুলক্ষণ ভাবা শিরক। একথা তিনি তিনবার বললেন। আমাদের কারো মনে কিছু জাগা স্বাভাবিক, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করলে তিনি তা দূর করে দিবেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯১০, সুনানে তিরমিজি : ১৬১৪, সুনানে ইবনু মাজাহ :  ৩৬০৪,  ইবনু হিববান : ১৪২৭

আমাদের বিশ্বাস করতে হবে কোন ব্যক্তি, বস্তু, প্রানী বা পাখি আল্লাহর কল্যায় অকল্যানে ভাগ বসাতে পারে না। তিনিই একমাত্র যাবতীয় কল্যান ও অকল্যানের মালিক। তাই শরীয়ত সম্মত সব কাজ তারই উপর ভরসা করেই শুরু করে দিতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি বা বস্তুর কুৎসিত রূপ দেখে অথবা কোন অরুচিকর বাক্য শুনে সে কাজ বন্ধ করে দেই তবে নিজের অজান্তেই শির্কে লিপ্ত হয়ে যাব।

মুয়াবিয়া বিন হাকাম্ সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-

وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُوْنَ، قَالَ: ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُوْنَهُ فِيْ صُدُوْرِهِمْ، فَلاَ يَصُدَّنَّهُمْ

আমাদের অনেকেই কোন না কোন কিছু দেখে বা শুনে কুলক্ষণ বোধ করেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন: এটি হচ্ছে মনের ওয়াস্ওয়াসা। অতএব তারা যেন এ কারণে কোন কাজ বন্ধ না করে। সহিহ মুসলিম : ৫৩৭

আনাস্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ طِيَرَةَ، وَالطِّيَرَةُ عَلَى مَنْ تَطَيَّرَ، وَإِنْ يَكُ فِيْ شَيْءٍ فَفِيْ الدَّارِ وَالْفَرَسِ وَالْـمَرْأَةِ

শরীয়তের দৃষ্টিতে কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে অলক্ষণ শাস্তি সরূপ ওর পক্ষে হতে পারে যে শরীয়ত বিরোধীভাবে কোন বস্ত্ত বা ব্যক্তিকে অলক্ষুনে ভাবলো। শরীয়তের দৃষ্টিতে সত্যিকারার্থে যদি কোন বস্ত্তর মাঝে অকল্যাণ নিহিত থাকতো তা হলে ঘর-বাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া ও স্ত্রীমহিলাদের মধ্যে তা থাকা যুক্তিসঙ্গত ছিলো’’। ইবনু হিববান : ৬০৯০

২। চাঁদ ও তারাকাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা

অমুসলিমগণ তারকারাজীর পুজা করে। তারা তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে। যদি তাদের মত কোন মুসলিম তারকারাজীর পুজা করে তবে শিরকে আকবর হবে এবং সে ইসলাম থেকে বাহির হয়ে যাবে। কেননা, সে আল্লাহ ক্ষমতার সাথে তারকারাজীকে সম্পৃক্ত করেছে। যুগে যুগে এই শিরকি বিশ্বাস ও পুজা চলে আসছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিমগন তারকারাজীর পুজা না করলেও মুশরিকদের দেখাদেখি ইহাকে শুভ অশুভ বিশ্বাসও করে যা মুলত শিরকে আসগর। যেহেতু আদম সন্তান তারকারাজী ব্যাপারে পুর্ব থেকেই শির্কে পতিত হয়ে আসছে, তাই আল্লাহ কুরআনে তারকারাজী ক্ষমতা, কাজ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। কুরআনে তারকারাজী তিনটি বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্য আর কোনো ক্ষমতা বা গুণাবলী আছে জানা যায় না।

(১) আকাশের সোভা বর্ধনের জন্য তারকারাজীকে সৃষ্টি করা হয়েছে।  মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدۡ زَيَّنَّا ٱلسَّمَآءَ ٱلدُّنۡيَا بِمَصَٰبِيحَ

‘আমরা দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দিয়ে’’। সূরা মুলক : ৫

(২) শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য মহান আল্লাহ বলেন:

وَجَعَلۡنَٰهَا رُجُومٗا لِّلشَّيَٰطِينِۖ 

‘আর আমরা তা শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত রেখেছি’’। সূরা মুলক : ৫

 (৩) দিক নির্ণয়ের সাহায্য করি হিসাবে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَلَٰمَٰتٖۚ وَبِٱلنَّجۡمِ هُمۡ يَهۡتَدُونَ 

আর পথ-নির্দেশক চি‎হ্নসমূহ, আরা তারকার মাধ্যমে তারা পথ পায়। সুরা নাহল :১৬

তারকারাজীকে শুভ অশুভ বিশ্বাস করা যাবে না। এই সম্পর্ক হাদিসে দিক নির্দশনা এসেছে।

যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহর করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। সহিহ বুখারি ৮৪৬, ১০৩৮, ৪১৪৭, সহিহ মুসলিম : ৭১,

তারকারাজী মহান আল্লাহ এক বিশ্বয়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বয়কর সৃষ্টি দেখে সৃষ্টিকর্তা মনে করা অজ্ঞ আদম সন্তারের খুব পুরান অভ্যাস। কাজেই তারকারাজী ব্যাপারটিও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারকারাজী মানুষের ভাগ্য বা অন্য কোন ব্যাপারে বিশেষ কোন ক্ষমতা রাখে বিশ্বাস করা শিরক। আমাদের উপমহাদেশে অনেক হিন্দুদের চাঁদের প্রতি এই রূপ ধারনা করেত দেখা যায়। তারা চাঁদের তারিখ অনুযায়ী শুভ অশুভ বিশ্বাস করে নিশিপালন ও উপবাস করে থাকে। এই শুভ অশুভ উপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন শুভ কাজ আরম্ভ করে থাকে। তাদের দেখা দেখি উপমহাদেশের অনেক অজ্ঞ মুসলিমও শুভ অশুভ দিন তারিখ দেখ কাজকর্ম করে থাকে যা ছোট শিরকের আওতাভূক্ত।

৩। অসীলা বলতে পীর ধরা বিশ্বাস করা

অসীলা সম্পর্কে কুরআনের সূরা মায়েদায় ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَـٰهِدُواْ فِى سَبِيلِهِۦ لَعَلَّڪُمۡ تُفۡلِحُونَ  

হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহকে ভয় করো, তাঁর দরবারে নৈকট্যলাভের উপায় (অসীলা) অনুসন্ধান করো এবং তার পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করো, সম্ভবত তোমরা সফলকাম হতে পারবে৷ সুরা মায়েদা : ৩৫

সুফিবাদী অনেক আলেমকে এই আয়াতের ‘অসীলা’ শব্দের অর্থ করে পরিস্কার ভাবে বলেছেন, আল্লাহ  ‘অসীলা’ অনুসন্ধান করতে বলেছেন অর্থাৎ পীর ধরতে বলেছেন। অথচ এই আয়াতের ‘অসীলা’ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস, আতা, মুজাহিদ (রহ.) এর মত হল আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করা। কাতাদাহ বলেন, অসীলা’ শব্দের অর্থ পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর এটাই হচ্ছে সাহাবিদের মত। কাজেই এমন আমল অনুসন্ধান করতে হবে যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। অসীলা সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ আরো বলেন,

 قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً (٥٦)أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় ‘ অসীলা’ খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ সুরা বণী ঈসরাইল : ৫৬-৫৭

অলী, আউলিয়া, নবী, রাসুল অথবা ফেরেশতা কারোই তোমাদের প্রার্থনা শুনার এবং তোমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা নেই। তোমরা নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাদেরকে অসিয়ায় পরিণত করছো কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, তারা নিজেরাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তার আযাবের ভয়ে ভীত এবং তার বেশী বেশী নিকটবর্তী হবার জন্য অসিলা ও উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ইবনে কাছীর (রহ.) এর মতে ‘অসীলা’ শব্দটির অর্থ হল, আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম হল, ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের করা। তাই খাটি ইবাদত ব্যতিত আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের আশা করা যায় না। আর খাটি ইবাদাতের করতে হলে আল্লাহর কিতাব এবং নবী (সাল্ল.) এর সুন্নাহর বাহিরে কোন আমল করা যাবে না। তাই প্রথমত ইবাদাত হবে এক মাত্র আল্লাহর জন্য এবং তরিকা হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেগ।  মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ‌ۚ وَذَٲلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ (٥) 

তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোন হুকুম দেয়া হয়নি যে, তারা নিজেদের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদাত করবে, নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে, এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দীন৷ সূরা বাইয়্যেনাহ : ৫

আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

 ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ‌ۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣)

হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের (আওলিয়াদের) অনুসরণ করো না৷ কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ (সুরা আরাফ ৭:৩)।

আমাদের সমাজে অনেক আলম আছে যারা অসীলা বলতে পীর বুঝান না, তারা অসীলা বলতে শুধু দুয়ার ক্ষেত্রে অসীলা বুঝে থাকেন। দুয়া যেহেতু ইবাদাত এবং যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। তাই দুয়াও অসীলান অন্যতম মাধ্যম।

 আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম এবং উন্নত গুণাবলীর মাধ্যমে তার নিকট দুয়া করার। (সুরা আরাফ ৭:১৮০)। বান্দার কৃত নেক আমলেন অসীলা দিয়ে দুয়া করা।  (বুখারীর বর্ণনায় বনী ইসরাইলে তিন লোকের গুহা থেকে মুক্তি লাভ)।  কোনো জীবিত উপস্থিত সৎ লোকের নিকট এসে দুয়া চাওয়া। (সহীহ বুখারীতে বর্ণিত, উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর যামানায় যখন অনাবৃষ্টির সময় তিনি আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর অসীলায় বৃষ্টি চাইতেন)। আল্লাহ তা‘আলা নাম,  নেক আমল, জীবিত উপস্থিত লোক এই তিনটি বৈধ অসীলা দিয়ে দুয়া করা।

শরিয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ অসীলা হলো, সেই সকল অসীলা যার কোন দলিল কুরআন বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে নেই, এমনকি সাহাবি (রা.), তাবেঈ বা তাবে-তাবেঈনদের আমলেও পাওয়া যায় না। যেমন, মৃত অলী, পীর, আওলীয়া, নেকবান্দা, নবী এবং রাসূলগণের অসীলা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য দুয়া করা।

যেমন: কেউ বলল,  হে আল্লাহ! তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীলায় বা তোমার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তার অসীলায় আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে অনুগ্রহ কর এবং জান্নাতে প্রবেশ করাও। এ প্রকার দো‘আ শিরক নয় বরং বিদ‘আত।

এ প্রকার দো‘আ যদি নবী ﷺ ব্যতীত অন্য কারো নিকট করে তবে তা ছোট শিরক হবে, কিন্তু এতে সে দ্বীন থেকে সে বের হয়ে যাবে না। যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহ আব্বাস বা আব্দুল কাদীরের সত্তার অসীলায় মাপ কর।

অপরদিকে আল্লাহ তা‘আলার ন্যায় কোনো সৃষ্টিকে ডাকা, যেমন কেউ বলল: হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আমার বিপদ দূর করে দিন, বা আমার ঋণ পরিশোধ করে দিন, অথবা আমার রোগ ভাল করে দিন। এটি অসীলা নয় বরং এটি বড় শিরক, তাতে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে, কারণ আগেই বলা হয়েছেঅ দুয়া একটি ইবাদত, আর কোনো ইবাদত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য করা সকল আলেমের ঐক্য মনে শিরক।

কথার দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা

 আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা ছোট শিরক। যেমন পিতার নামে, মূর্তির নামে, কাবার নামে, আমানতের নামে বা আরো অন্যান্য বস্ত্তর নামে শপথ করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللهِ أَوْ لِيَصْمُت

কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে। সহহি বুখারি : ২৬৭৯, ৩৮৩৬, ৬১০৮, ৬৬৪৬, ৬৬৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَلَا بِأُمَّهَاتِكُمْ، وَلَا بِالْأَنْدَادِ، وَلَا تَحْلِفُوا إِلَّا بِاللَّهِ، وَلَا تَحْلِفُوا بِاللَّهِ إِلَّا وَأَنْتُمْ صَادِقُونَ

তোমরা নিজেদের পিতা-মাতা কিংবা দেবদেবীর নামে শপথ করবে না। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর নামে শপথ করবে। আর তোমরা আল্লাহর নামে কেবল সে বিষয়েই শপথ করবে যে বিষয়ে তোমরা সত্যবাদী। আবু দাউদ : ৩২৪৮, সুনানে নাসায়ী : ২৭৯৬

সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু উমার (রাঃ) একজন লোককে বলতে শুনলেন, না, কাবার শপথ! ইবনু উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺকে আমি বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক শপথ করল সে যেন কুফরী করল অথবা শিরক করল। সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৫, সহিহাহ : ২০৪২

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তাঁর পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে। সহিহ বুখরি : ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৪৬, সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৩, ১৫৩৮, ১৫৩৫, সুনানে নাসায়ী ৩৭৬৬, ৩৭৬৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৯

২। কথার মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার করা

ইবনে ইসহাক বলেন, আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতা জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন যে, জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উহুদের দিন আমি নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দেখলাম। যখন আমাদের ভয় প্রচন্ড আকার ধারণ করল, তখন আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিদ্রা দ্বারা আচ্ছাদিত করলেন। আমাদের প্রত্যেকের থুতনী তার বক্ষদেশের সাথে লেগে যাচ্ছিল। জুবাইর বলেন, আল্লাহর শপথ! ঐ অবস্থায় আমি স্বপ্নের মতই মু’তিব বিন কুশাইরকে বলতে শুনলাম, এ ব্যাপারে যদি আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতামনা। তার নিকট থেকে শুনে আমি কথাটি মুখস্থ করে ফেললাম। মু’তিবের ঐ কথাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহর এই বাণী নাযিল হয়-

لُونَ لَوۡ كَانَ لَنَا مِنَ ٱلۡأَمۡرِ شَىۡءٌ۬ مَّا قُتِلۡنَا هَـٰهُنَا‌ۗ قُل لَّوۡ كُنتُمۡ فِى بُيُوتِكُمۡ لَبَرَزَ ٱلَّذِينَ كُتِبَ عَلَيۡهِمُ ٱلۡقَتۡلُ إِلَىٰ مَضَاجِعِهِمۡ‌ۖ وَلِيَبۡتَلِىَ ٱللَّهُ مَا فِى صُدُورِڪُمۡ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِى قُلُوبِكُمۡ‌ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ (١٥٤) 

তারা বলে, যদি এ বিষয়ে আমাদের কোন অধিকার থাকতো তাহলে এখানে আমরা নিহত হতামনা। তুমি বল, যদি তোমরা তোমাদের গৃহের মধ্যেও থাকতে তবুও যাদের প্রতি মৃত্যু বিধিবদ্ধ হয়েছে তারা নিশ্চয়ই স্বীয় মৃত্যু স্থানে এসে উপস্থিত হত; তোমাদের অন্তরের মধ্যে যা আছে, আল্লাহ তা পরীক্ষা করে থাকেন; এবং আল্লাহ মনের অন্তর্নিহিত ভাব জ্ঞাত আছেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৪। তাওহীদ পন্থীদের নয়নমণি,  শাইখ আব্দুর রাহমান বিন হাসান বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ)

যদি সাধারন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সকল কর্মে ব্যবহৃত হয। অতীতে কোন ক্ষতির কারনে বিষণ্ণতা বা হতাশা দুর করার জন্য যদি শব্দটি বলা হয়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মের শর্তের কারনে যদি ব্যবাহারে কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু অতীত ক্ষতির কারনে বিষণ্ণগ্রস্ত হয়ে কিংবা অতীতে সংঘটিত কোন দুর্ঘটনার জন্য আফসোস করে এবং তাকদীরের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে যদি শব্দটি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। যেমন কেউ বলল, আমি যদি এমন করতাম তাহলে এমন হত, এমন না করলে এমন হতনা, সেখানে না গেলে আমি দুর্ঘটনার কবলে পড়তাম না ইত্যাদি। এ ধরণের কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ্ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَقَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ اِذَا ضَرَبُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَوۡ کَانُوۡا غُزًّی لَّوۡ کَانُوۡا عِنۡدَنَا مَا مَاتُوۡا وَمَا قُتِلُوۡا ۚ لِیَجۡعَلَ اللّٰہُ ذٰلِکَ حَسۡرَۃً فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করেছে এবং তাদের ভাইদেরকে বলেছে, যখন তারা যমীনে সফরে বের হয়েছিল অথবা তারা ছিল যোদ্ধা। যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে তারা মারা যেত না এবং তাদেরকে হত্যা করা হত না’। যাতে আল্লাহ তা তাদের অন্তরে আক্ষেপে পরিণত করেন এবং আল্লাহ জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা। সূরা আল ইমরান : ১৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَلَّذِیۡنَ قَالُوۡا لِاِخۡوَانِہِمۡ وَقَعَدُوۡا لَوۡ اَطَاعُوۡنَا مَا قُتِلُوۡا ؕ قُلۡ فَادۡرَءُوۡا عَنۡ اَنۡفُسِکُمُ الۡمَوۡتَ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

যারা তাদের ভাইদেরকে বলেছিল এবং বসেছিল, ‘যদি তারা আমাদের অনুকরণ করত, তারা নিহত হত না’। বল, ‘তাহলে তোমরা তোমাদের নিজ থেকে মৃত্যুকে দূরে সরাও যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা আল ইমরান : ১৬৮

অতীত কালের ঘটে যাওয়ার ঘটনাকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করাতে আল্লাহ আয়াত নাজির করে সতর্ক করলেন। তাকদিরে বিশ্বাস করা ফরজ। অতীতের ঘটনা যা ঘটেছে তা তাকদিরে এভাবেই লিখিত আছে। কাজেই এর সাথে যদি জড়িত করে প্রশ্ন করা তাকদিরকেউ অস্বীকার করার নামান্তর। তাছাড়া আমারা ইচ্ছা করতে পারি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অতীতের ইচ্ছা করা কোন ক্ষমতা আমাদের নাই। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের করার অধিকার থাকলেও ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা আমাদের হাত নাই। ইহা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا تَشَآءُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন। সুরা তাকবির : ২৯

কাজেই অতীত কালের বিপদ, হতাশা, কষ্টকে যদি দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করার অর্থ ভাগ্যকে অস্বীকার করা ও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমাতকে বিশ্বাস করা। এই সম্পর্কে যদি ব্যবহার করা হাদিসেও নিষদ্ধ করা হয়েছে।

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ শক্তিধর ঈমানদার দুর্বল ঈমানদারের তুলনায় আল্লাহর নিকট উত্তম ও অতীব পছন্দনীয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে, যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর। তুমি অক্ষম হয়ে যেও না। এমন বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলে যে, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননাلَوْ (যদি) শব্দটি শাইতানের (শয়তানের) কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।  সহহি মুসলিম : ২৬৬৪

০৩। মহাকালেকে গালি দেওয়া

মহাকাল বলতে দিবারাত্রির আবর্তন-বিবর্তনকে বুঝানো হয়েছে। রাত্রি উপনীত হলে অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর দিন প্রকাশ পেতেই সমস্ত জিনিস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দিবারাত্রি অতিবাহিত হওয়ার নামই হল কাল, যুগ বা সময়। যা আল্লাহর কুদরত ও কারিগরি ক্ষমতা প্রমাণ করে। অন্ধকার যুগে আরবরা যখন কঠিন বিপদে পড়ত তখই মহকাল বা সময়কে গালি দিত। তারা ভাবত মহাকালই তাদের বিপদের কারন। মহাকালকে গালি প্রদানকারীর হুকুমের দুটি পর্যায়, হয়ত সে আল্লাহকে গালি দিচ্ছে অথবা আল্লাহর সাথে মহাকালকে শরীক করছে। যদি কেউ মনে করে মহাকাল এবং আল্লাহ যৌথভাবে বিপদ সংঘটিত করেন তাহলে শিরকে আকবর হয়ে যাবে এবং সে মুশরিক হয়ে যাবে আর যদি স্বীকার করে যে, আল্লাহই এককভাবে তা সংঘটিত করেছেন তারপরও ঐ সংঘটিত কাজকে গালি দিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকেই গালি দিল। তখন তার দ্বারা কবিরা গুরাহ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالُوۡا مَا ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا یُہۡلِکُنَاۤ اِلَّا الدَّہۡرُ ۚ وَمَا لَہُمۡ بِذٰلِکَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ

আর তারা বলে, ‘দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর মহাকাল-ই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।’ বস্তুত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু ধারণাই করে। সুরা জাসিয়া : ২৪

আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদাম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই জামানা অর্থাৎ যুগ বা কাল। আমার হাতেই ক্ষমতা, দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি। সহিহ বুখারি : ৪৮২৬, ৮১৬১, সহিহ মুসলিম : ২২৪৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৭৪, আহমাদ : ৭২৪৫

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আদাম সন্তান সময় ও কালকে গালি-গালাজ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত্রি ও দিবস। সহিহ মুসলিম : ৫৭৫৫

মহান আল্লাহর একচ্চন্ন ক্ষমতা বিশ্বাস করা পরও যদি কেউ মনে মনে এই বিশ্বাস রাখে যে অনেক ঘটনার পেছনে মহাকালেরও ভুমিকা আছে। তবে সে ছোট শিরক করল।

০৪। মহাকালে মত বাতাসকে অকল্যান মনে করে গালি দেওয়া

বাতাসকে গালি দেয়া ছোট শির্ক। কারণ, যে ব্যক্তি বাতাসকে গালি দেয় সে অবশ্যই এ কথা বিশ্বাস করে যে, বাতাস এককভাবে কারোর কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে। বাতাসকে গালি দেয়ার কোন মানে হয় না।

উবাই বিন্ কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لاَ تَسُبُّوْا الرِّيْحَ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ مَا تَكْرَهُوْنَ ؛ فَقُوْلُوْا: اللَّهُمَّ! إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيْحِ وَخَيْرِ مَا فِيْهَا، وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ، وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيْحِ، وَشَرِّ مَا فِيْهَا، وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ

বাতাসকে তোমরা গালি দিও না। অপছন্দনীয় কোন কিছু দেখতে পেলে তোমরা এই দুআ পড়বে, “হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আকাঙ্ক্ষা করি এ বাতাসের কল্যাণ, এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত আছে তা এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার কল্যাণ। আমরা এ বাতাসের অকল্যাণ হতে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, এর মধ্যে নিহিত ক্ষতি হতে এবং সে যে বিষয়ে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তার অকল্যাণ হতে”। সুনানে তিরমিজি : ২২৫২, মিশকাত : ১৫১৮, সহীহাহ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৯৩৩-৯৩৬

 আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছিঃ

الرِّيحُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ قَالَ سَلَمَةُ: فَرَوْحُ اللَّهِ تَأْتِي بِالرَّحْمَةِ، وَتَأْتِي بِالْعَذَابِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهَا فَلَا تَسُبُّوهَا، وَسَلُوا اللَّهَ خَيْرَهَا، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ شَرِّهَا

বায়ু আল্লাহর অন্যতম রহমত। তা কখনো শান্তি বয়ে আনে আবার কখনো আযাব নিয়ে আসে। সুতরাং বাতাস প্রবাহিত হতে দেখলে তোমরা তাকে গালাগলি দিবে না, বরং আল্লাহর নিকট এর কল্যাণ চাইবে এবং তার খারাবী থেকে আল্লাহর নিকট মুক্তি প্রার্থনা করবে। আবু দাউদ : ৫০৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৯২৯, ৯৩১, ৯৩২

আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ تَلْعَنِ الرِّيْحَ ؛ فَإِنَّهَا مَأْمُوْرَةٌ، وَإِنَّهُ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهُ بِأَهْلٍ رَجَعَتِ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ

‘বাতাসকে অভিশাপ দিওনা। কারণ, সে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে আদিষ্ট। আর যে ব্যক্তি অভিশাপের অনুপযুক্ত বস্ত্তকে অভিশাপ দেয় সে অভিশাপ পুনরায় তার উপরই ফিরে আসে’’। সুনানে তিরমিজি : ১৯৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৮, ইবনু হিব্বান : ১৯৮৮

০৫। আল্লাহ্ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতোনা এমন বলার শির্ক

আল্লাহ তায়ালা এবং তুমি না চাইলে কাজটা হতো না এ জাতীয় কথা বলা ছোট শির্ক। কেননা এখানে তাব বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন এই কথার মাধ্যমে সে মহান আল্লাহকে বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। কথায় বোঝা যায় তিনি আল্লাহতে বিশ্বাসি সাথে শিরক ও করেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا یُؤۡمِنُ اَکۡثَرُہُمۡ بِاللّٰہِ اِلَّا وَہُمۡ مُّشۡرِکُوۡنَ

তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদাতে) শিরক করা অবস্থায়। সুরা ইউসুফ : ১০৬

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْت‏

তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৭, সহীহাহ ১৩৬, ১৩৯, ১০৯৩।

আব্দুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم: مَا شَاءَ اللهُ وَشِئْتَ، فَقَالَ: أَجَعَلْتَنِيْ لِلَّهِ نِدًّا؟ بَلْ مَا شَاءَ اللهُ وَحْدهُ

জনৈক ব্যক্তি নবী (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা এবং আপনি চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। তখন নবী (সা.) বললেন, তুমি কি আমাকে আল্লাহ তা’আলার শরীক বানাচ্ছো? এমন কথা কখনো বলবে না। বরং বলবে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই চেয়েছেন বলে কাজটি হয়েছে। নতুবা হতো না। আদাবুল মুফরাদ : ৭৮৩, মুসনাদে আহমাদ : ২১৪, ২২৪, ২৮৩, ৩৪৭ , তাবারানি :  ১৩০০৫, ১৩০০৬

হুযাইফাহ্ ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাত হলে সে বললো, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখাইনি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ যা চান’’।  ইবনু মাজাহ্ : ২১১৮

নুষের মুখে এ জাতীয় আরো অনেক বাক্য প্রচলিত রয়েছে। যেমন: ‘‘আল্লাহ্ এবং আপনি না থাকলে আমার অনেক সমস্যা হয়ে যেতো’’। ‘‘আমার জন্য শুধু আল্লাহ্ এবং আপনিই রয়েছেন’’। ‘‘আমি আল্লাহ্ এবং আপনার উপর নির্ভরশীল’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার পক্ষ হতে’’। ‘‘এটি আল্লাহ্ এবং আপনার বরকতেই হয়েছে’’। ‘‘আমার জন্য আকাশে আছেন আল্লাহ্ এবং জমিনে আছেন আপনি’’। উপরে আল্লাহ বার নিচে আপনি ইল্লা। আল্লাহর সাথে ইল্লা লাগে। এই ধরণের সকল প্রকার কথাই ছোট শিরকের অন্তর্গত।

৬। ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে কুফরি কথা ব্যবহার করা

চোখ লাগা, জাদু, মানসিক ও শারীরিক অসুখ বিসুখ দূরীকরণে জন্য ঝাড় ফুঁক ফলপ্রসূ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ঝাড় ফুঁক করেছেন, তেমনি তিনি ঝাড়-ফুঁক নিয়েছেন। আবার অনেক সময় রোগীর গায়ে ফুঁ দিয়েছেন এবং রোগীর গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শসহ বা স্পর্শ ছাড়াই আয়াত বা মাসনূন দু‘আ পড়েছেন।  ঝাড় -ফুঁকের মাধ্যে শরীয়াত পরিপন্থী কোনো কিছু না থাকলে তা বৈধ।

আওফ ইবনু মালিক আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ فَقَالَ ‏ “‏ اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ ‏

আমরা জাহিলী যুগে মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ জন্যে আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার নিকট উপস্থাপন করো, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তাতে কোন শিরক (জাতীয় কথা) না থাকে। সহিহ মুসলীম : ২০০

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরা (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুঁক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মাসাহ করতেন। এরপর যখন মৃত্যু-রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরা দু’টি দিয়ে তাঁর শরীরে ফুঁ দিতাম, যা দিয়ে তিনি ফুঁ দিতেন। আর আমি তাঁর হাত দ্বারা তাঁর শরীর মাসাহ করিয়ে দিতাম। সহিহ বুখারি ৪৪৩৯, ৫০১৬, ৫৭৩৫, ৫৭৫১, সহিহ মুসলিম : ২১৯২

মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ ইবনু সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাস (রহঃ) থেকে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ সাবিত ইবনু কায়িস (রাঃ)-এর নিকট গেলেন। আহমাদ বলেন, তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তিনি বলেনঃ হে মানুষের রব! সাবিত ইবনু কায়িস ইবনু সাম্মাসের রোগ দূর করে দিন। অতঃপর তিনি বাতহান নামক উপত্যকার কিছু ধূলামাটি নিয়ে একটি পাত্র রাখলেন এবং পানিতে মিশিয়ে তার দেহে ঢেলে দিলেন। আবু দাউদ : ৩৮৮৫

আবূ সাঈদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ -এর একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার (আরোগ্যের) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তখন তাদের কেউ বলল, এ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভাল হত। সম্ভবত, তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? তাদের (সাহাবীদের) একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা এক পাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। তারপর তিনি গিয়ে (الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) ‘‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’’ (সূরা ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের স্বীকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিল। সাহাবীদের কেউ কেউ বলেন, এগুলো বণ্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন এটা করব না, যে পর্যন্ত না আমরা নবী ﷺ -এর নিকট গিয়ে তাঁকে এই ঘটনা জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন। তারা আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি [নবী ﷺ ] বলেন, তুমি কিভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দু‘আ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখ। এ বলে নবী ﷺ হাসলেন। শো’বা (রহ.) বলেন, আমার নিকট আবূ বিশর (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি মুতাওয়াক্কিল (রহ.) হতে এ হাদীস শুনেছি। সহিহ বুখারি : ২২৭৬, ৫০০৭, ৫৭৩৬, ৫৭৪৯, সহিহ মুসলিম : ২২০১,

সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, ঝাড়-ফুঁকের জন্য পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক্ব, সূরা নাস, সূরা এখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা বাক্বারা ও বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া ফলপ্রসূ। ঝাড়-ফুঁক শরীয়াত সম্মত হলেও অনেক সময় প্রয়োগকারী ও ব্যবহার কারির প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য শিরক হয়। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁক করার সময়  শির্কী ও কুফরী শব্দ ব্যবহারের করে, এমন শব্দের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করে যার অর্থ বোধগম্য নয় বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ছোট শিরকের অন্তরভূক্ত হবে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক নিজস্ব কোনো প্রভাব এবং ক্ষমতা আছে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। নিজের জন্য নিজের ঝাড়-ফুঁক সবচেয়ে বেশী উপকারী। অথচ মানুষ ঝাড়-ফুঁক জন্য অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই সুযোগে অনেক খপ্পরে পড়ে ঈমান, আমল নষ্ট করছে। সেই সাথে মিথ্যা লাভের আসায় নিজেস্ব অর্থের অপচয় করে। জ্যোতিষ, গনক ও জাদুকরগন সাধারনত কুফরি বাক্য দ্বরা ঝাড়-ফুঁক করে থাকে যা মুলত শিরক। এদের পরিত্যাগ করা জরুরী।

৭। নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত হওয়া এবং নিজের প্রশংসা শুনতে চাওয়া

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে। সবাই মনে করবে লোকটি বড়ই মুত্তাকী, পরহেজগার, দ্বীনদার, সাধু, দীনের খাদেম, শরীয়াতের সাহায্যকারী, সংস্কারক, উত্তম চরিত্রের অধিকারি। নিজেদের নামের শেষে নিজে অথবা চামচা দিয়ে বিভিন্ন প্রশংসা সুচক শব্দ বা বাক্য ব্যাবহার করে মনে হয় পৃথিবীতে শুধু খেদমত বা ইবাদতের জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। এমনও প্রশংসা পেতে চায় যা সে করেনি। মহান আল্লাহ বলেন, 

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা নিজেদের কার্যকলাপে আনন্দিত এবং যে কাজ যথার্থই তারা নিজেরা করেনি সে জন্য প্রশংশা পেতে চায়, তাদেরকে তোমরা আযাব থেকে সংরক্ষিত মনে করো না। আসলে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী রয়েছে৷ সুরা আল ইমরান : ১৮৮

৮। আল্লাহকে ঈম্বর, তার বাণীকে ঐশীবাণী, তার গ্রন্থেকে ঐশীগ্রন্থ, তার জ্ঞানকে ঐশীজ্ঞান বলা

হিন্দুরা আল্লাহকে ঈশ্বর সম্বোধন করে। ঈশ্বর শব্দটি পুরুষবাচক। এর স্ত্রীবাচক শব্দ হচ্ছে, ঈশ্বরী। এভাবে ভগবানের স্ত্রীবাচক ভগবতী ও দেবতার স্ত্রীবাচক দেবী। ঐশীবাণী অর্থ- ঈশ্বরের বাণী, ঐশীজ্ঞান অর্থ- ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান আর ঐশ্বরিক অর্থ- ঈশ্বর সম্বন্ধীয়। কুরআনের বাণী বোঝাতে আমরা ঐশীবাণী শব্দটা ব্যবহার করি। এভাবে কুরআনে জ্ঞান বোঝাতে ঐশীজ্ঞান লিখি। হিন্দুশাস্ত্র মতে ঈশ্বর থেকে আগত বাণীকে ঐশী বাণী বল হয়ে থাকে। তাই ঐশীবাণী, ঐশীজ্ঞান ও ঐশ্বরিক- এই শব্দগুলো লিখলে বা বললে শিরিক হতে পারে। কেননা ‘আল্লাহ’ শব্দটি ক্লীবলিঙ্গ। এর কোন পুরুষ বা স্ত্রীবাচক শব্দ নাই। আল্লাহ বলেন-

لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ  وَلَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ

তাঁর কোন সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন। সুরা ইখলাস : ৩

সুতারং আল্লাহ এবং ঈশ্বর এক নয়। তাহলে কী করে আল্লাহর বাণী বা ওহী তথা কুরআন ঈশ্বরের বাণী হতে পারে? আর আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি কী করে ঐশী শক্তি হতে পারে? অনেকে অন্য ধর্মের প্রতি বেশী উদারতা দেখাতে গিয়ে এরূপ শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। অথচ মহান আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। এই ধরনের নামে (ঈম্বর) তাকে না ডেকে, তার দেওয়া সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَلِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ۪ وَذَرُوا الَّذِیۡنَ یُلۡحِدُوۡنَ فِیۡۤ اَسۡمَآئِہٖ ؕ سَیُجۡزَوۡنَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

এই আয়াত বলা হয়েছে যার তার নামের বিকৃতি ঘটাবে তাদের অচিরেই প্রতিফল দিবেন। অর্থাত কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে হবে। তাই কোন প্রকার শিরকি নাম আল্লাহ নামের বিপরীতে ব্যবহার করা কত বড় মারাত্বক অন্যায়। হয়তো অনেক মুসলিম না জেনে ভাষার প্রতি উদারতা দেখাতে গিয়ে না বুঝে এমনটি করে থাকতে পাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে বিধর্মীদের ইসলামে বিরোধী কর্মকান্ডে কোন উদারত নয় বরং বিধর্মীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিপরীত আমল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

আমর ইবনু শু‘আইব রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ ‏

বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাসারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীগণ আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের ইশারায় সালাম দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৬৯৫

৯। একথা বলা যে, ‘মানুষের ভুল আছে শয়তানের ভুল নেই

মহান আল্লাহই একমাত্র ভুলের উর্ধ্বে। এ ছাড়া তিনি যাকে যখন ভুলের উর্ধ্বে রাকবেন তিনিও ভুলের উর্ধ্বে। মহান আল্লাহ যাকে প্রতারণ বলেছেন সে কি করে ভুরের উর্ধ্বে হয়। শয়তানের জন্মই তার কৃত ভুল থেকে। শয়তান কোন শুদ্ধ কর্ম করতে পারে না। ভুল তার আজীবন ধর্ম। মানুষের ভুল কখনো কখনো হয়। কিন্তু শয়তানের ভুল সদা সর্বদা। শয়তায় প্রথম যে ভুল করেছে তা হলো মহান আল্লাহর নির্দশ অমান্য করে। ভুল না করে সে যদি আল্লাহর নির্দশ মান্য করত হবে সফলকাম হত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ

আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারা : ৩৪

শয়তানতো ভুলের মাঝেই আছে। ভুল থেকেই তার জন্ম। শয়তানের কর্মকান্ড দেখলেই বুঝবেন সে কি করে ভুলের উর্ধ্বে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ প্রদত্ত সরল পথে ছেড়ে যে পাপাচারের পথ বেছে নেয় তার থেকে আর কেউ বিভ্রান্ত পথের পথিক হতে পারেনা। শয়তায় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তার কর্ম হিসাবে নিয়ে বড় ভুল পথে রয়েছে। তাহলে একজন মুসলমান কি করে এ কথা বলতে পারে যে, শয়তানের ভুল নাই। এ ধরনের উক্তি মূলত ইসলাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে। তাই এ ধরনের কথা একেবারেই অবান্তর ও বিভ্রান্তিকর।

১০। প্রলয়ংকারি ঝড়ের প্রচণ্ডতাকে তাণ্ডবলীলা বলা

লীলা অর্থ ক্রীড়া, প্রমোদ, যৌন কেলী। যা দেবতার কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন কৃষ্ণের লীলা। আবার লীলা শব্দের পূর্বে তাণ্ডব যোগ করে হয় তাণ্ডবলীলা। তাণ্ডব অর্থ নৃত্য। তাহলে তাণ্ডবলীলা অর্থ দাঁড়ায় দেবতার প্রমোদ নৃত্য। প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত বঝড়ের ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতিকে আমরা কিভাবে দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে স্বীকৃতি দিতে পারি? প্রাণ বিনাশী এ অবস্থাকে আমরা তাণ্ডব বলতে পারি না। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি তো আল্লাহর পক্ষ হতে গযব আকারে আসে। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِمۡ حَاصِبًا اِلَّاۤ اٰلَ لُوۡطٍ ؕ  نَجَّیۡنٰہُمۡ بِسَحَرٍ ۙ

নিশ্চয় আমি তাদের উপর কংকর-ঝড় পাঠিয়েছিলাম, তবে লূত পরিবারের উপর নয়। আমি তাদেরকে শেষ রাতে নাজাত দিয়েছিলাম। সুরা কামার : ৩৪

মহান আল্লাহ বলেন-

فَکُلًّا اَخَذۡنَا بِذَنۡۢبِہٖ ۚ فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَرۡسَلۡنَا عَلَیۡہِ حَاصِبًا ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَخَذَتۡہُ الصَّیۡحَۃُ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ خَسَفۡنَا بِہِ الۡاَرۡضَ ۚ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اَغۡرَقۡنَا ۚ وَمَا کَانَ اللّٰہُ لِیَظۡلِمَہُمۡ وَلٰکِنۡ کَانُوۡۤا اَنۡفُسَہُمۡ یَظۡلِمُوۡنَ

তাদের প্রত্যেককেই তাদের অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম; তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচন্ড ঝটিকা, তাদের কেহকে আঘাত করেছিল মহানাদ, কেহকে আমি প্রোথিত করেছিলাম ভূ-গর্ভে এবং কেহকে করেছিলাম নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি কোন যুল্‌ম করেননি; তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুল্‌ম করেছিল। সুরা আনকাবুত : ৪০

কুরআনে বহু স্থানে বলা হয়েছে, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধস, পাথর বর্ষণ ইত্যাদি আল্লাহর পক্ষ হতে গযব। এই গযবকে তাণ্ডবলীলা বা দেবতার প্রমোদ নৃত্য বলে কিভাবে উপহাস করা হয়। ইহা মহান আল্লাহকে মর্যাদাকে ছোট করা হয়। যা শিরক থেকেও জঘন্য অপরাধ। তাছাড়া হাদিসে এসেছে আল্লাহ যাকার কল্যাণ চান তাকে তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلاَءِ وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلاَهُمْ فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ

আল্লাহ তা’আলা যখন তার কোন বান্দার কল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে তাকে বিপদে নিক্ষেপ করেন। আর যখন তিনি তার কোন বান্দার অকল্যাণ সাধন করতে চান তখন তাকে তার অপরাধের শাস্তি প্রদান হতে বিরত থাকেন। তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাকে পুরাপুরি শাস্তি দেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৯৬, মিশকাত : ১৫৬৫, সহিহাহ : ১২২০

১১। মুমূর্য ব্যক্তিকে সম্পর্কে বলা হয়, সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে

মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করার সময় বলে থাকি অমুকে কিছু দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে আজকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। এমন কথা বলা একেবারেই ঠিক নয়। কেননা, জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। মৃত্যুকে মোকাবিলা করা যায় না, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা বা কুস্তি কোনটাই চলে না। রোগ আল্লাহ দেন, চিকিৎসা জ্ঞানও তারই দান। তিনি ইচ্ছা করলে নিরাময় করবেন, ইচ্ছা করলে আমৃত্যু ভোগাবেন। তিনি যাকে চান মৃত্যু দে যাকে চায় হায়াত দেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

تُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَتُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ۫ وَتُخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَتُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ ۫ وَتَرۡزُقُ مَنۡ تَشَآءُ بِغَیۡرِ حِسَابٍ

‘আপনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান। আর মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর যাকে চান বিনা হিসাবে রিয্ক দান করেন’। সুরা আর ইমরান : ২৭

আল্লাহ কোন ক্ষতি করতে চাইলে কেউই আর উপকার করতে পারবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ؕ قُلۡ فَمَنۡ یَّمۡلِکُ لَکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ شَیۡئًا اِنۡ اَرَادَ بِکُمۡ ضَرًّا اَوۡ اَرَادَ بِکُمۡ نَفۡعًا ؕ بَلۡ کَانَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرًا

বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের কোন ক্ষতি করতে চান কিংবা কোন উপকার করতে চান, তবে কে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমাদের জন্য কোন কিছুর মালিক হবে’? বরং তোমরা যে আমল কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত। সুরা ফাতাহ : ১১

কাজেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার কথা বলে প্রকারান্তরে আমরা আল্লাহর শক্তির মুকাবিলায় মানুষকে দাঁড় করাচ্ছি। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা’ এ কথা দ্বারা কঠিনভারে দীর্য দিন রোগাক্রান্ত হওয়া বুঝাতে বলা হয়ে থাক। আপনি যে ভাবেই বলেন না কেন, আল্লাহ সাথে শিরক হয় এমন কথা কোনভাবেই বলা যাবে না। আমার আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ রাখেন, সি বিচার হবে আখেরাতে কিন্তু যে কথা দ্বার শিরক প্রকাশ পায় তা বুঝতে আখেরাত পর্যন্ত অপেক্ষার দরকার নাই।

১২। লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা

অনেক মুসলিম পরিবারে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী সোনা, লক্ষ্মী মেয়ে এমন সম্বোধন শোনা যায়। মুসলমানদের লেখনীতেও অনেক সময় এরুপ লক্ষণীয়। এমন বলার সরাসরি ইসরাম বিরোধী। লক্ষ্মী হিন্দুদের দেবীর নাম। হিন্দুরা এমন সম্বোধন করতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের এরূপ সম্বোধন করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে তাদের ধর্মের সাথে সম্পৃক্ততা বুঝায় ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি আত্মসমর্পন করা হয়। হিন্দুধর্ম মতে, লক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুপত্নী। তিনি ধন সম্পদ ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তার সুনজরে যারা আছেন তারা সৎ, শান্ত, সুবোধ ও ধনবান। আর যাদের উপর লক্ষ্মীর সুনজর নেই অথবা লক্ষ্মী যাদের ছেড়ে চলে গেছেন তারা হন হতভাগা, দুষ্ট, দরিদ্র এবং অশান্ত। এ হচ্ছে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস; এবার বলুন এদের শাস্ত্রীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে আমরা অর্থাৎ মুসলমানরা কি লক্ষ্মীকে দেবতা মেনে তার নাম সব সময় জপ করতে পারি? লক্ষ্মী নাম কি আমরা উপমায় আনতে পারি? যদি আনি তাহলে আমাদের ঈমান থাকছে কোথায়?

হিন্দুরা লক্ষ্মীর পূজা করেন। মুসলমানরা লক্ষ্মী পূজা করেন না। একজন মুসলমানের স্ত্রী অবশ্যই মুসলমান, মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর সন্তানও মুসলমান। তাই যদি হয় তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে লক্ষ্মী ছেলে আর লক্ষ্মী মেয়ে হয়? মুসলমানের ছেলেমেয়েরা কেমন করে মা- বাবাকে লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী বাবা বলতে পারে? পরিবারের পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা যদি এই হয়, তাহলে তাদের ছেলে-মেয়ে কেমন করে হবে রাসূল এর আদর্শের অনুসারী? যেখানে লক্ষ্মী সেখানে হিন্দুধর্ম, সেই সংস্কৃতি, সেই কৃষ্টি, সেই ধর্মেই আমেজ ও মেজাজ থাকবেই। যেখানে লক্ষ্মী থাকে সেথায় আল্লাহর রহমত তো বর্ষণ হতে পারে না।

লক্ষ্মীর জায়গায় লক্ষ্মী আছেন এবং থাকবেনও তাদের জন্য যাদের কাছে তিনি পূজিত। আমরা কেন তাকে নিয়ে টানাটানি করি? তিনি তো আমাদের নন। আমাদের ছেলে-মেয়েদের জীবন ও চরিত্র আর তকদীরকে সুন্দর, বরকতময়, পবিত্র ও রহমতের বারিধারায় সিক্ত করার মতো সর্ব শক্তিমান আল্লাহ যখন আছেন, তখন কেন বিষ্ণুর শ্রী লক্ষ্মীর শরণাপন্ন হই? লক্ষ্মী তো নিজেই স্বাধীন নন, তিনি অন্যের স্ত্রী, তিনি কতটুকু আমাদের দিতে পারেন?

তাই এ জাতীয় সম্বোধন, লেখনীতে এ জাতীয় উপমার ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। অজানাবশত যারা এরূপ ব্যবহার করেছেন, মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন ইনআল্লাহ। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার পরও যারা হিন্দু সংস্কৃতির অন্ধপ্রীতি বা নিজেকে আরো সংস্কৃতবাণ হবার জন্য এরূপ শব্দের ব্যবহার করে থাকেন, তারা প্রকৃত পক্ষে কপাল পোড়া। ঈমান নামক মহা মূল্যবান সম্পদ তাদের নসিবে থাকতে পারে না। প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪১, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৩। কাউকে প্রশংসায় গর্ববোধে ‘সূর্য সন্তান’, ‘শতাব্দির সূর্য সন্তান’ বলা

মরা সাধারণত জানি যে, সূর্য একটি গ্রহ। কিন্তু হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী সূর্যও একটি দেবতা। এ দেবতার তিন পুত্র সন্তান; শনি, যম ও  কর্ণ। সূর্যের তিন মেয়ে, যমুনা, তপতী ও বিদ্যুৎ। মুসলমানদের মধ্যে যারা গর্ব করে সূর্য সন্তান বলে দাবি করেন বা যারা অন্যদের সূর্য সন্তান বলে পরিচয় দেন, তাদের দাবি বা পরিচয়ে সূর্য দেবতাকে নিশ্চয় স্মরণ করেন। অযোধ্যায় পৌরাণিক রাজ বংশের সদস্যরা নিজেদেরকে সূর্য বংশীয় বলে দাবি করতেন। আমাদের ‘সূর্য সন্তান’রা কি সেই বংশের সন্তান? মুসলমানরা কি জেনে শুনে নিজেদেরকে সূর্য দেবতার সন্তান বা সূর্যকন্যা পরিচয় দিতে পারেন? ‘অগ্নিপুরুষ’ আর ‘অগ্নি কন্যাও’ অনুরূপ একটি ভুয়া ও অপসংস্কৃতিমূলক দাবি।

সূর্য আল্লাহর সৃষ্টি একটি গ্রহ মাত্র। সৃষ্টির কল্যাণে এর সৃষ্টি। এর বংশ বিস্তারের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। সূর্যের স্ত্রী-পুত্র পরিবার কিছুই নেই। সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করা অর্থহীন অযৌক্তিক। কোন মুসলিম সন্তান নিজেকে কখনো সূর্যের সন্তান বলে দাবি করতে পারে না। এটি কবীরাহ গুনাহ।

বর্তমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মত আরবের জাহেলী যুগের মানুষেরা সূর্যকে দেবতা মানত। তার উপাসনা করত। ইসলাম এসে এসব কর্মকাণ্ড শিরক হিসেবে ঘোষণা করে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আর বর্তমান সভ্যতার চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করে আমরা সেই অসভ্য জাহেলী যুগের কর্মকাণ্ডকে লালন করতে গর্ববোধ করছি? ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, পৃ-৩৪২, ড. খ শ আব্দুর রাজ্জাক

১৪। আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা

কুরআনের বহু আয়াতে মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা ষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলা হয় নাই। সহিহ হাদিসেও মহান আল্লাহ হাত, পা, চোখ, মুখ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। কোথাও আল্লাহর কুদরতি হাত, কুদরতি পা, কুদরতি মুখ কুদরতি চোখ ইত্যাদি বলে উল্লেখ করা নাই।

নিচের আয়াতগুলি লক্ষ করুন, মহান আল্লাহ নিজে তার হাত, পা, মুখের কথা উল্লেখ করছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, কোথাও কুদরত শব্দ ব্যবহার করেন নাই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ

তিনি বললেন, হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?

সুরা সোয়াদ : ৭৫

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬ 

সেদিন কোন কোন মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামিন বলেন-

 يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ 

সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোন কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। কাজেই তার সত্তার সাথে কুদরত লাগিয়ে বর্ণনা করা সঠিক নয়।

কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত

অনেক মুসলিমের বিশ্বাস মানতে ফলে উপকার হয়। যাদের মানত সম্পর্কে জ্ঞান নাই তারাই এর উপর ভুল বিশ্বাসের আলোকে আমাল করে থাকে। যে আমল করা নিজের উপর ওয়াজিব ছিল না, এমন কোন আমল নিজের উপর ওয়াজিব করে নেয়াকে মানত বলে। মানত শর্তযুক্তও হতে পারে আবার শর্ত মুক্তও হতে পারে। মান্নত করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন। এই জন্য মানত করা মাকরুহ।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ النَّذْرِ وَقَالَ إِنَّهُ لاَ يَرُدُّ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنْ الْبَخِيلِ

নাবী ﷺ মানত করতে নিষেধ করেছেন। এই মর্মে তিনি বলেন, মানত কোন জিনিসকে দূর করতে পারে না। এ দ্বারা শুধুমাত্র কৃপণের মাল খরচ হয়। সহিহ বুখারি হাদিস : ৬৬০৮, ৬৬৯২, ৬৬৯৩, সহিহ মুসলিম : ১৬৩৯

আমরা অনেকে মনে করি মান্নত করলে বিপদ আপদ দুর হবে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে, কল্যান লাভ হবে, এটা সওয়াবের কাজ, আল্লাহ খুশী হবেন ইত্যাদি। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়। মানত  কোন মতেই সওয়াবের কাজ নয়। আল্লাহর রাসূল ﷺ যা করতে নিষেধ করেছেন তাতে আল্লাহ খুশী হবেন না। এবং এতে কোনো সওয়াবও হয় না। তাই আমাদের উচিত হবে কোনো অবস্থায় মানত না করা। অবশ্য মানত করে ফেললে তা পালন করতেই হবে। মান্নত করলে অবশ্যই তা পূরন করতে হবে। মান্নত পূরণ করা একটি ইবাদত। মানত করতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য এবং পূরণ করতে হবে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে। মানত করা সওয়াব না হলেও তা আদায় করা অশব্যই ওয়াজিব ও সওয়াবের কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ

অতঃপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে ও তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের। সূরা হজ্জ্ব : ২৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يُوفُونَ بِٱلنَّذۡرِ وَيَخَافُونَ يَوۡمً۬ا كَانَ شَرُّهُ ۥ مُسۡتَطِيرً۬ا

তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে যার অকল্যাণ হবে সুবিস্তৃত। সূরা ইনসান : ৭

অসৎ কাজের মানত আদায় করা জায়েয নেই।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন-

مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلاَ يَعْصِهِ

যে ব্যক্তি এরূপ মানত করে যে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে। আর যে মানত করে, সে আল্লাহর নাফরমানী করবে, সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে। সহিহ বুখারি ৬৬৯৬, ৬৭০০

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে নাবী ﷺ এক বৃদ্ধ ব্যাক্তিকে তাঁর দুই ছেলের উপর ভর করে হেটে যেতে দেখে বললেন, তাঁর কি হয়েছে? তাঁরা বললেন, তিনি পায়ে হেটে হজ করার মানত করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, লোকটি নিজেকে কষ্ট দিক আল্লাহ তা’আলার এর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তিনি তাঁকে সওয়ার হয়ে চলার জন্য আদেশ করলেন। (সহিহ বুখারি হাদিস ১৮৬৫

আল্লাহ নিকট ইবাদতের নিমিত্তে মানত করা মাকরুহ পর্যায়ের জায়েয হলে তা পুরন করা ওয়াজিব। একটুকু ঠিকই আছে কিন্ত মানত যখন গাইরুল্লাহ বা কোনো পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে করা হবে তখন তা ছোট শিরক হয়ে যাবে। শুধু গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানত করা শিরকে আকবর। আর যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঐ সকল লোকদের সুপারিশের জন্য বা কোন না কোন ভাবে উপকার পাবার জন্য করে থাকে তবে তা ছোট শিরক হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন-

 وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا ڪُلَّ ذِى ظُفُرٍ۬‌ۖ وَمِنَ ٱلۡبَقَرِ وَٱلۡغَنَمِ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتۡ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلۡحَوَايَآ أَوۡ مَا ٱخۡتَلَطَ بِعَظۡمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ جَزَيۡنَـٰهُم بِبَغۡيِہِمۡ‌ۖ وَإِنَّا لَصَـٰدِقُونَ

আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট! সুরা আনাম : ১৩৬

মানতকারী যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, অলী ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন না। তার দোয়া বা নেক নজর পাওয়ার নিয়তও করে না। কিংবা শাফাআত বা অসীলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু ভাবে যে, তিনি আল্লাহর অলী, তাকে সম্মান করা সওয়াবের কাজ এ জন্য আমি মাজারে মান্নত করি। তাহলেও ছোট শিরক হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এখন মুসলমানেরা শুধু মৃত পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে মান্নত করে তৃপ্ত নয়, বরং তাদের মাজারের কচ্ছপ, কুমির, মাছের নামেও মান্নত করে থাকে। কতবড় নিকৃষ্ট শিরকের দিকে আমাদের জাতি ধাবিত হচ্ছে।

২। দুয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম ধরা

দোয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন :

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ

আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি ৷ যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে ৷ সুরা বাকারা : ১৮৬

আল্লাহ তাআলা আমাদের এতো কাছে অবস্থান করর যে, কোন প্রকার মাধ্যমে ও সুপারিশ ছাড়াই  নিজেই সরাসরি সবসময় আমাদের আবেদন নিবেদন শুনেন। কাজেই আমাদের উচিৎ মুর্খতার বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলা। আল্লাহ তাআলার আহবানে সাড়া দিয়ে তার দিকে ফিরে যেতে হবে এবং তারই বন্দেগী ও আনুগত্য করতে হবে। সরাসরি সবসময় তারই নিকট চাইব কেননা কোনো কিছু চাওয়ার নিয়ম তো আল্লাহ্‌ তাআলাই ভাল জানেন। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছ

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ

এবং তোমাদের রব বলেছেন আমার কাছে চাও, আমিই দিব। সুরা গাফির : ৪০

সুতরাং বান্দা তার রবের কাছেই চাইবে। অন্য কারো অছিলায় চাওয়া মুলত আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার কে খর্ব করে। তেমনি অন্যকেও এ কাজে জড়িয়ে ফেলা হয়, সে জন্য এটি শির্কেই নামান্তর। সরাসরি গাউরুল্লাহ নিকট দুয়ার মাধ্যামে চাওয়া শিরকে আকবর কিন্তু যদি দুয়া কবুলের আশায় মাধ্যম ধরা বা কারো সুপারিশ লাভের আশায় মাধ্যম ধরা শির্ক আসগর।

৩। গাইরুল্লাহ নামে পশু জবেহ করা

পশুকে যবেহ একটি ইবাদাত। ইবাদাতের জন্য অবশ্য আল্লাহর হুকুম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরন করতে হবে। এই জন্য আল্লাহ পশুকে যবেহ করার নীতিমালা ঘোষনা করছেন। গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করল শিরক হবে কেননা আল্লাহ নিজের নামে কুরবানী করার হুকুম দিয়েছেন। যে সকল লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তারা মুশরিক। তাই মুমিনের ফরজ দায়িত্ব হল আল্লাহর নামে জবেহ করা যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,  (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর। সুরা কাওসার : ২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান (কুরবানী), আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। সুরা আনআম : ১৬২

যা কিছু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয় তা যে হারাম এ ব্যাপারে মুসলিমদের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত। তাই পশু জবেহ দেওযার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান না মেনে অন্যদের আনুগত্য করে জবেহ করলে শিরক হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু জবেহ করে সে শয়তানের আনুগত্য করল এবং মুশরিক হল। তার দলিল নিম্মের আয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ

 আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশ্ খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷  কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

এখানে আল্লাহ তাআলা অন্য ধর্মের লোকদের বিধান অনুযায়ী চলা এবং তাদের আনুগত্য করিকে মুশরিক বলেছেন। কারন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর আনুগত্য কায়েম করার নামই তাওহীদ। অপর পক্ষে জবেহর সময় যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্‌ত খাও হালাল করা হয়েছে৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَـٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ

এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্ খাও৷ সুরা আনআম : ১১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيۡڪُمُ ٱلۡمَيۡتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحۡمَ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ‌ۖ

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, মৃতদেহ খেয়ো না, রক্ত ও শূকরের গোশত থেকে দূরে থাকো। আর এমন কোন জিনিস খেয়ো না যার ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৩

৪। মাজার, মুর্তি, দে্তার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা

মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদাত। আর ইবাদাতের মুল উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন। মাজার, মুর্তি, দেবতার পুজা করা শিরকে আকবর তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু তাদের পুজা না করে ভালো কর্ম মনের করে কিছু পেশ করা হয় তবে তা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর মাধ্যম গাইরুল্লাহ ইবাদতে সহযোগীতা করা হয়। কোন অবস্থায়ই মাজার, মুর্তি, দেতার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَـٰمِ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে, তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদা : ৩

তারিক বিন শিহাব হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ﷺ বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কিভাবে হলো? তিনি বললেনঃ দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু কুরবানী করো’। সে বললো, কুরবানী দেয়ার মত আমার কিছুই নেই। তারা বলল, অন্ততঃ একটি মাছি হলেও কুরবানী দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তির জন্য কুরবানী দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, মূর্তিকে তুমিও কিছু কুরবানী করো। সে বললঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কারো জন্য কুরবানী দেইনা। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৭৩৪৩, ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৩০৩৮, ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫;

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন গাছ বা অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা শিরকের অন্তরভুক্ত। যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু উৎসর্গ বা জবেহ করবে তার ব্যাপারে কঠোর শাস্তির কথা হাদিসে এসেছে,

আবু তোফায়েল থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আলী ইবনে আবি তালেব (রা.) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, নবী কারীম স. গোপনে আপনাকে কি বলেছিলেন?’ বর্ণনাকারী বলেন, আলী (রা.) এ কথা শুনে রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী কারীম স. মানুষের কাছে গোপন রেখে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল, ‘হে আমিরুল মোমিনীন! সে চারটি কথা কি ? তিনি বললেন-

১. যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে অভিশাপ দেয় আল্লাহ তাকে অভিশাপ দেন।

২. যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবেহ করে আল্লাহ তার উপর লানত করেন।

৩. ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ লানত করেন যে ব্যক্তি কোন বেদআতীকে প্রশ্রয় দেয়।

৪. যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে আল্লাহ তাকে লা’নত করেন। সহিহ মুসলিম, শরহে নবভী

৫। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা

কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা কখন জায়েয আবার কখন নাজায়েয শিরক। ইসলামি শরিয়তে যে সকল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করার কথা বলা হয়েছে শুধু সে গুল থেকেই বরকত হাসিল করা যাবে। ইসলামি শরিয়তে নেই এমন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করা অনেক সময় হরাম আবার অনেক সময় শিরক। বিষয়টি সম্পর্কে পরিস্কার ধারনার জন্য উভয়টি সম্পর্কে জানা দরকার।

জায়েয তাবার্রুক বা বরকতঃ

(১) ব্যক্তি হিসেবে রসূলুল্লাহ থেকে বরকত হাসিলঃ

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالْحَلاَّقُ يَحْلِقُهُ وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ فَمَا يُرِيدُونَ أَنْ تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلاَّ فِي يَدِ رَجُلٍ ‏.‏

আমি দেখেছি নাপিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল ছাটছে আর সাহাবীরা তার চতুস্পার্শ ঘিরে রেখেছেন। তারা চাইতেন যে, কোন চুল যেন মাটিতে না পড়ে তা যেন কারো না কারো হাতে পড়ে। সহিহ মুসলিম ২৩২৫

আবূ জুহাইফা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে একটি লাল বর্ণের একটি তাবূতে দেখেছি, আমি আরো দেখেছি বেলাল (রা.) কে, তিনি তাঁর ওযূর পানি নিয়ে আসলেন, অতঃপর আমি দেখলাম লোকজন তাঁর ওযূর পানি নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে এবং তারা তা (শরীরে) মেখে নিচ্ছেন। রাবী বলেন, “তারপর বিলাল (রা.) একটি বর্ষা নিয়ে আসেন, অতঃপর তিনি তা গেড়ে দেন, তারপর রাসূল ﷺ এক জোড়া লাল বর্ণের শেরওয়ানী পরিধান করে বের হয়ে আসেন এবং সেটাকে (বর্ষা) সামনে রেখে সালাত আদায় করেন। আর মানুষ ও চতুষ্পদপ্রাণী সেটির সামনে দিয়ে চলাচল করছিল। সহিহ বুখারি : ৩৭৬, সহিহ মুসলিম : ৫০৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১২৬৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ৬৮৮

সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর অজুর পানি, থুথু, ঘাম, চুল, পোশাক দ্বারা সাহবিগণ (রা.) বরকত হাদিসর করতেন। এখন যদি কেউ ভাবেন তাহলে তো আমাদের পীর, বুজুর্গ, আকাবিরদের থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করা যাবে কারন তারা নবীদের ওয়ারিস। তা হলে মহা ভুল করবেন কারন এটা শুধু রাসূল ﷺ জন্য খাস ছিল। তা না হলে আমাদের পীরের পীর, বুজুর্গদের বুজুর্গ, অলীদির অলী আবু বক্কর (রা.), ওমর (রা:), আলী (রা:), ওসমানসহ (রা:) কোন সাহাবির থুথু,  ঘাম, পোশাক থেকে কেউ বরকত লাভ করছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া আমরা যাকে তার বাহিজ্জিক আমল আখলাক দেখে আল্লাহর অলী মনে করছি। মহান আল্লাহর কাছে সে অলী না ও হতে পারে। 

অপর পক্ষে সকলের জন্য খাদ্য হিসাবে যাইতুনের তৈল, দুধ, মধু ও যমযমের পানি, আজও বরকতময়। মসজিদে হারাম, মসজিদে নবী, মসজিদে আকসা, এমনকি পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ আজও বরকত হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহর জিকির কারি বা নেককারদের সোহবত বরকতময় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

(২) খাদ্যা হিসাবে বরকত আছেঃ

মহান আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ کُلِیۡ مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ فَاسۡلُکِیۡ سُبُلَ رَبِّکِ ذُلُلًا ؕ یَخۡرُجُ مِنۡۢ بُطُوۡنِہَا شَرَابٌ مُّخۡتَلِفٌ اَلۡوَانُہٗ فِیۡہِ شِفَآءٌ لِّلنَّاسِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

অতঃপর তুমি (মৌমাছি) প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর এবং তুমি তোমার রবের সহজ পথে চল। তার (মৌমাছি) পেট থেকে এমন পানীয় (মধু) বের হয়, যার রং ভিন্ন ভিন্ন, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগ নিরাময়। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা নাহল : ৬৯

যাইদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা (যাইতুনের) তেল খাও এবং তা শরীরে মালিশ কর। কেননা এটা বারকাত ও প্রাচুর্যময় গাছের তেল। সুনানে তিরমিজি : ১৮৫১, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ১৩১৯

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিকট দুধ আনা হলে তিনি বলতেন, এক অথবা দু’ বরকত। ইবনে মাজাহ : ৩৩২১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, কালো জিরা ’সাম’ ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ। ইবনু শিহাব বলেছেন, আর ’সাম’ অর্থ হল মৃত্যু। সহিহ বুখারি : ৫৬৮৮

তাই খাদ্য হিসেবে যাইতুন, মধু, দুধ ও কালোজিরা যে বরকত মত তাতে কোন  সন্দেহ নাই। বর্তমানে বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে যে সকল হালাল খাদ্যে উপকার আছে তা গ্রহনেও কোন বাধা নাই।

(৩) স্থান হিসবে তিন সমজিদঃ

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (নেকির আশায়) সফর করা যায় না। এ মসজিদগুলো হল, মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মাসজিদুল আকসা। সহিহ বুখারি : ১১৮৯, সহিহ মুসলিম : ১৩৯১, সুনানে নাসায়ী ৭০০, সুনানে  আবূ দাঊদ ২০৩৩, ইবনু মাজাহ : ১৪০৯

 (৪) শিরকি তাবার্রুক

সহিহ হাদসি দ্বারা প্রমানিত আরাফাত, মিনা ও মুজদালিফায় বরকতময় ও দুয়া কবুলের স্থান। পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ অন্য সকল স্থান থেকে উত্তম বলা হয়েছে। কিন্ত যদি কেউ ররকত হাসিলের জন্য হেরাগুহা, জাবারে শুর, জাবালে রহমত, শোহাদায়ে ওহুদের কবর জিয়ারত করে করে কাজটি ছোট শিরক হবে। কেননা বরকত দানের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ বা তার রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সকল স্থানে বরকত হাসিলের কথা বলেন নাই। বরকত হাসিল করা যা কোন সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন দসায় বা ওফাতের পর এখান আসেন নাই। যদি বরকত হাসিলের জন্য ক্বাবা ঘরের গিলাফ, কোন মসজিদ বা মাজারের দেয়াল, মাটি, জানালা, দরজা ইত্যাদি চুমু খাওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভূকক্ত। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সব বস্তু দ্বারা বরকত হাসিল কে মুর্তি পুজার সাথে তুলানা করছেন।

আবূ ওয়াক্বিদ আল লায়সী (রা.) হতে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ’যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ’যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’সুবহানাল্লহ। তোমাদের এ দাবীটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতি ছাড়া আর কিছু্‌ই নয়, যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছো যা বনী ইসরাইল মূসা (আ.) কে বলেছিল, হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা’বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা’বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছ, (আরাফ-১৩৮। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতিই অবলম্বন করছো। সুনানে তিরমিজি : ২১৮০, মিশকাত : ৫৪০৮, মুসনাদে আহমাদ : ২১৯৪৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৭০২, তবারানী :৩২১৮।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

َّقَدۡ رَضِىَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِى قُلُوبِہِمۡ فَأَنزَلَ ٱلسَّكِينَةَ عَلَيۡہِمۡ وَأَثَـٰبَهُمۡ فَتۡحً۬ا قَرِيبً۬ا  

 আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে তোমরা কাছে বাইয়াত করছিলো৷  তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন৷ তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন, পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করেছেন৷  সুরা ফাতহা : ১৮

যে গাছর নীচে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সে গাছির কোন আলাদা মর্জাদা সহাবাগন দেন নাই।  সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে, ইবনে সা’দে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েবের। তিনি বলেন, আমার পিতা বাইয়াতে রিদওয়ান শরীক ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন পরের বছর আমরা যখন উমরাতুল কাযার জন্য গিয়েছিলাম তখন গাছটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনুসন্ধান করেও তার কোন হদিস করতে পারিনি। হযরত উমর ( রা) তাঁর খিলাফত কালে যখন হুদাইবিয়া অতিক্রম করেন তখন জিজ্ঞেস করেন, যে গাছটি নিজে বাইয়াত হয়েছিলো তা কোথায়৷ কেউ বলে, অমুক গাছটি এবং কেউ বলেন অমুকটি। তখন হযরত উমর (রা:) বলেন, এ কষ্ট বাদ দাও, এর কোন প্রয়োজন নেই।

সময় হিসাবে: সাহাবিগন রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর কখন তার জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকি পালন করেনি। ঈদে মিলাদন্নবী নাম করন করেনি। তেমনি ভাবে মিরাজের রাত্রি, অহুদ দিবস, বদর দিবস, হিজরত দিবস পালন করে নি। অথচ তাদের কাছে সময় এবং সুযোগ ছিল। তারা আমাদের চেয়ে দ্বীণ ভাল বুঝতেন। সুতারং সাহাবিগন যা করেনি তাতে কোন বরকত হতে পারে না বরং তা বিদাত বা শিরকি আলাম হবে।

৬। সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিরক

সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠান যা ইসলাম অনুমোধন করেনি, তা ইসলামি আদতে পালন করে উত্তম বা নেকির কাজ মনে করা হারাম। এই হারাম কাজটি যখন গইরুল্লাহর ইবাদত করা পর্যায় পৌছে যাবে, তখন আর হারাম থাকবে না, তখন কাজটি শিরক হবে। যেমন-

মৃত্যু ব্যক্তির লাসের উপর ফুল দেওয়া, বিভিন্ন বেদিবতে ফুল দেওয়া, তার সমানে নিরবতা পালন করা। কোন কিছুর সম্মান প্রদর্শের জন্য খালি পায়ে হাটা বাধ্য করে নেওয়া। নববর্ষে বিভিন্ন জীব জন্তুর প্রতিকৃতি বহন করে তাকে শুভ-অশুর প্রতিক বলে বিশ্বাস করা বা প্রচার করা। অথচ আল্লাহ সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আমাদেরকে বলেন-

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِيناً فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

 যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে দীন হিসাবে অনুসন্ধান করবে, তার নিকট থেকে তা কবুল করা হবেনা। আর আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

৭। জোতিষবিদ বা গণকের কাছে গমন করা

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে ও পাখি দিয়েও ভাগ্য নির্ধারণের মিথ্যা অপচেষ্টা চলে। একটু লক্ষ করলেই শহরের রাস্তাঘাটে এ বিষয়টি নজরে পড়বে। অনেক মানুষ ভবিষ্যতের ভালো মন্দ জানার জন্য বা ভাগ্য গণনা করতে জোতিষবিদ ও গণকের কাছে গমন করে। তাদের যদি এ বিশ্বাস থাকর যে, তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী তবে তারা কুফরিতে লিপ্ত হল যার অর্থ হচ্ছে তারা কাফির হয়ে গেল। নবী ﷺ এর কয়েকজন সহধর্মিনী হতে বর্ণিত আছ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً»

যে ব্যক্তি গণকের কাছে যাবে এবং তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে অতঃপর তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে ব্যক্তির চল্লিশ দিনের সালাত কবুল হবে না’’। সহিহ মুসলিম : ২২৩০

আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে জ্যোতিষের কাছে যাবে এবং তাদের কথা বিশ্বাস করলো সে নবী ﷺ এর উপরে নাযিলকৃত বিষয়ে কুফরি করলো’’। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯০৪

আবূ মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ وَمَهْرِ الْبَغِيِّ وَحُلْوَانِ الْكَاهِنِ

কুকুরের বিক্রয় মূল্য, বেশ্যার পারিশ্রমিক এবং গণকের উপঢৌকনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ২০৭১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২১৫৯)।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ أَوْ أَتَى امْرَأَتَهُ حَائِضًا أَو أَتَى امْرَأَته من دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষের কাছে যায় এবং সে যা কিছু বলে তা বিশ্বাস করে অথবা যে ব্যক্তি ঋতুমতী অবস্থায় নিজের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে কিংবা যে ব্যক্তি স্ত্রীর পিছন দ্বার দিয়ে সহবাস করে, সে ঐ জিনিস হতে সম্পর্কহীন হয়ে গেল, যা মুহাম্মাদ ﷺ এর ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৯০৪, সুনানে ইবনু মাজাহ ৬৩৯, মিশকাত : ৪৫৯৯,  আহমাদ ৯৫৩৬, সহিহাহ : ২৬৫০, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৪৪।

ইকরিমাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলা যখন আকাশে কোন ফায়সালা করেন তখন মালায়িকাহ আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অতি নম্রভাবে তাদের ডানা ঝাড়তে থাকে; যেন মসৃণ পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। যখন তাদের মনের ভয়-ভীতি দূর হয় তারা (একে অপরকে) জিজ্ঞেস করে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা বলেন, তিনি যা বলেছেন, সত্যই বলেছেন। তিনি মহান উচ্চ। যে সময়ে লুকোচুরিকারী (শায়ত্বন) তা শোনে, আর লুকোচুরিকারী এরূপ একের ওপর এক। সুফ্ইয়ান তাঁর হাত উপরে উঠিয়ে আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে দেখান। তারপর শায়ত্বন কথাগুলো শুনে নেয় এবং প্রথমজন তার নিচের জনকে এবং সে তার নিচের জনকে জানিয়ে দেয়। এমনিভাবে এ খবর দুনিয়ার জাদুকর ও জ্যোতিষের কাছে পৌঁছে দেয়। কোন কোন সময় কথা পৌঁছানোর আগে তার উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয় আবার অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে সে কথা পৌঁছিয়ে দেয় এবং এর সাথে শত মিথ্যা মিশিয়ে বলে। এরপর লোকেরা বলাবলি করে সে কি অমুক দিন অমুক অমুক কথা আমাদের বলেনি? এবং সেই কথা যা আসমান থেকে শুনে এসেছে তার জন্য সব কথা সত্য বলে মনে করে। সহিহ বুখারি : ৪৮০০

গনক, জ্যোতিষ এবং এ ধরনের কাজের সাথে জড়িতরা কাফির। কেননা তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের দাবী করে অথচ গায়েবী বিষয় একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলাই পরিজ্ঞাত। অন্য কেউই গায়েব জানে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُۚ 

আপনি বলুন, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও যমীনের কেউ অদৃশ্যের সংবাদ জানেন না। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّي مَلَكٌۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ

বল, আমি বলছি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে, আমি গায়েবও জানি না। আমি তোমাদের এ কথাও বলছি না যে , আমি একজন ফেরেশতা। আমি অনুসরণ করি শুধু তাই যা আমার কাছে ওহী হয়ে আসে। সূরা আনাআম : ৫০

৮। যাদুকরের নিকট গমন করা

বর্তমানে সমাজে মানুষ যাদুকে একটি শিল্প হিসাবে গণ্য করছে। ইহার চর্চাকারীদের উৎসাহিত করার জন্য তারা নানান প্রতিযোগিতার এবং পুরস্কার প্রদান ব্যবস্থা করছে। জ্ঞানের অভাবে অনেক মুমলিম ইহাদের ব্যাপারে ঢিলামি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। বরং যাদুকে অনেকেই গর্বের বিষয় মনে করে, ইহা শিক্ষা গ্রহনের জন্য সময় ও অর্থ খরচ করে থাকে। ইসলামের সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে যাদুকরদের প্রদর্শিনে হাজির হয়ে থাকে। যাদুকরগন ও হাজার হাজার দর্শকদের চিত্তবিনোদ করে জিবীকা নির্বাহ করে থাকে। যাদুতে বিশ্বাস করা যেহেতু শিরকি আকিদা তাই এই আক্বীদার ব্যাপারে গাফিলতি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না।  

যাদু একটি স্পষ্ট শয়তানী কাজ। যাদু বিদ্যা আয়ত্ব করেত হলে অধিকাংশ ক্ষেতে শিরকি কাজের সাহায্য নিতে হয়। দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য হাসিল করতে হয়। আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করাই মুমিনদের এক মাত্র কাজ। যাদু শিক্ষার প্রধান কাজই হল, দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের নৈকট্য হাসিল করা যা শিরকি কাজ। এই শিরকি যাদুর সত্যি সত্যি অস্তিত্ব রয়েছে যার প্রমান কুরআন ও সহিহ হাসিদের সুস্পষ্ট বর্ননা (সূরা বাকারা- ১০২)। সুরা ফালাক এবং সুরা নাসের শানে নুযুলে বলা হয়েছে, সপ্তম হিজরীতে ইহুদিরা যখন মদীনায় রসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর যাদু করেছিল এবং তার প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন এ সূরা দুটি নাযিল

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ এত এত দিন এমন অবস্থায় অতিবাহিত করছিলেন যে, তাঁর খেয়াল হতো যেন তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, অথচ তিনি মিলিত হননি। ’আয়িশাহ বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, হে ’আয়িশাহ! আমি যে ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। (আমি স্বপ্নে দেখলাম) আমার কাছে দু’জন লোক আসল। একজন বসলো আমার পায়ের কাছে এবং আরেকজন মাথার কাছে। পায়ের কাছে বসা ব্যক্তি মাথার কাছে বসা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলঃ এ ব্যক্তির অবস্থা কী? সে বললঃ তাঁকে যাদু করা হয়েছে। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ তাঁকে কে যাদু করেছে? সে বললঃ লাবীদ ইবনু আ’সাম। সে আবার জিজ্ঞেস করল, কিসের মধ্যে? সে বলল, নর খেজুর গাছের খোসার ভিতরে তাঁর চিরুনীর এক টুকরা ও আঁচড়ানো চুল ঢুকিয়ে দিয়ে ’যারওয়ান’ কূপের মধ্যে একটা পাথরের নীচে রেখেছে। এরপর নবী ﷺ গিয়ে দেখে বললেন, এ সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। সেখানের খেজুর গাছের মাথাগুলো যেন শয়তানের মাথা এবং সে কূপের পানি যেন মেহদী ভেজা পানি। এরপর নবী ﷺ এর হুকুমে তা কূপ থেকে বের করা হলো। ’আয়িশাহ বলেন, তখন আমি বললাম। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন অর্থাৎ এটি প্রকাশ করলেন না? নবী ﷺ বললেন, আল্লাহ তো আমাকে আরোগ্য করে দিয়েছেন, আর আমি মানুষের নিকট কারো দুষ্কর্ম ছড়িয়ে দেয়া পছন্দ করি না। আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ লাবীদ্ ইবনু আ’সাম ছিল ইয়াহূদীদের মিত্র বনূ যুরায়কের এক ব্যক্তি। সহিহ বুখারি : ৬০৬৩

বলা যায় যাদু আমাদের নবী ﷺ এর উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই যাদু মানুষের মনের উপর, দেহের উপর আছর করে। ফলে সে কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে এমন কি কখনো নিহতও হয়। যাদু দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়। তবে বিশ্বাস করতে হবে, যাদুর এই আছর ও আল্লাহ তাআলার পার্থিব ও তাক্বদীরে নির্ধারিত হুকুম ও অনুমতি ক্রমেই হয়ে থাকে। যেহেতু অনেকে যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে মনে করে। যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে এই কথা মনে প্রানে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। তবে আল্লাহ উপর বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও জাদুকরের নিকট গমন তার তদবির গ্রহণ করা শিরকে আসগর।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا ڪَفَرَ سُلَيۡمَـٰنُ وَلَـٰكِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ ٱلنَّاسَ ٱلسِّحۡرَ وَمَآ أُنزِلَ عَلَى ٱلۡمَلَڪَيۡنِ بِبَابِلَ هَـٰرُوتَ وَمَـٰرُوتَ‌ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٌ۬ فَلَا تَكۡفُرۡ‌ۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنۡهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَزَوۡجِهِۦ‌ۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنۡ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذۡنِ ٱللَّهِ‌ۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ‌ۚ وَلَقَدۡ عَلِمُواْ لَمَنِ ٱشۡتَرَٮٰهُ مَا لَهُ ۥ فِى ٱلۡأَخِرَةِ مِنۡ خَلَـٰقٍ۬‌ۚ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡاْ بِهِۦۤ أَنفُسَهُمۡ‌ۚ لَوۡ ڪَانُواْ يَعۡلَمُونَ  

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত। সূরা বাকারা : ১০২   

উক্ত আয়াতে বলা হইয়াছে, যাদু শয়তানদের শিখানো বস্তু যা হাসিল করা কুফরি কাজ। এতে গায়েবী এলেমের প্রতি বিশ্বাস জম্মে ও অদৃশ্য বিষয়ে নগদ ফলাফলের আশা করা হয়, যা আল্লাহর সাথে শিরক  করার সমতুল্য।

৯। তাবীজ লটকানো, রিং, তাগা পরিধান করা, হাতে লোহা বা রাবারের আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতির মালা বা অনুরূপ বস্তু ব্যবহার করা

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাবী ‘আবদুল্লাহ্‌ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সংবাদ বহনকারী পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়। সহিহ বুখারি : ৩০০৫

নোটঃ  জাহেলী যুগে কুসংস্কারের কারণে উটের গলায় মালা লটকানো হতো যাতে উট বদ নজর থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ভ্রান্ত ধারণা ও রসম উৎখাতের ব্যবস্থা করেন।

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

টিকা : এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শির্কী কালামের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহীহ হাদীছে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারন সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহীহা : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রহ.

উকবা বিন আমের আল-জোহানি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে একদল লোক উপস্থিত হল। তিনি দলটির নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার সাথে তাবিজ রয়েছে। অতঃপর তিনি স্বহস্তে তা ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বায়আত করলেন, আর বললেন, যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল। সহিহ মুসনাদে আহমদ, হাকেম হাদিসের মান সহিহ।

নিম্ম লিখিত কারনে তাবিজ-কবজ নাই-

ক। যে কালামের ভাষা বুঝা যায়না তা দ্বারা তাবিজ-কবজ করা হয়।

খ। সংখ্যা সম্ভলিত তাবিজ-কবজ জায়েজ নাই কারন ইহা অনেকটা জ্যেতিষীদের রাশি এবং ভাগ্য গনণার মত। তাছাড়া ইহার আবিস্কারক হল গ্রীসরা যা পরে আরবদের মাঝে প্রসার লাভকরে। ইসলামের মুল উত্স কুরআন হাদিসে এর অস্তিস্থ খুজেও পাবে না।

গ। শির্ক যুক্ত কালাম বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আশ্রায় খোজা। যেমন: ইয়া ফিরাউন, ইয়া হামান, ইয়া কিতমির (জিনের সর্দার) ইত্যাদি লিখে তাবিজ দেওয়া হয়।

ঘ। নকসা সম্ভলিত তাবিজ দেয়া  হয়। যেমন- নবী সা. এর জুতার নকসা, আলি (রা.) তলোযারের নকসা, কাবার নকসা ইত্যাদি।

ঙ। যদি কেউ এ বিশ্বাস করে যে, তাবিজ-কবজ বা ঝাড়-ফুকের নিজস্ব ক্ষমতা আছে তবে শিরকে আকবর হবে।

এই সব কারনে সালাফিগণ সকল প্রকারের তাবিজ-কবজের ব্যবহার কে ছোট শিরক মনে করে। কিন্তু ইহার উপর তাওয়াক্কুল করা কে বড় শির্ক মনে করে, যা কোন ব্যক্তি কে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। 

১০ বরকত লাভের আশায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো  

সুফিগন মাজারে যে সকল বিদআত করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হল- মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো ও চাদর চড়ান। এ ধরনের বিদাআতি কাজ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিলনা। এ সকল কাজ সমাজে মুশরিক বা অগ্নি পুজকদের মাঝে প্রচলিত। আস্তে আস্তে কাল ক্রমে মুশরিকদের নিকট থেকেই মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করে, আজ যা মুসলিদের বিশেষ একটা অংশ ইবাদাত মনে করে পালন করে থাকে। তাদের ধারনা মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালালে মাজারে শায়িত ব্যক্তি খুসি হবে এবং তারা বরকত লাভ করবে। প্রথমত গাইরুল্লাহকে খুসি করার জন্য তারা এই বিদআতি কর্মটি শিরকে পরিনত করল। দ্বিতীয়ত বরকত দানের একমাত্র আল্লাহ অথচ তার এই গুনের মধ্যে সুফিরা তাদের অলীকে সম্পৃক্ত করে শিরক করল। তৃতীয়ত মৃত্যুর পর দুনিয়ার সাথে মৃত ব্যক্তির সকল প্রকারের সম্পর্কি বিচ্ছিন্ন হয় যায়। অথচ সুফিরা মনে করেন তাদের অলীগণ মরে না। তারা তাদের কবরে জীবিত। এক কথায় বলা যায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানোর মাধ্যামে মাজার পুজারীগণ উপরের তিনটি শিরকে লিপ্ত হয়।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ

রাসূলুল্লাহ ﷺ কবর যিয়ারাতকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করেছেন। যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং কবরে বাতি জ্বালায় তাদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনান নাসায়ী : ১১৮, মিশকাত : ৮৪০ মান জইফ।

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত করেছেন।  

১১।  নিজেকে মালিকুল আমলাক (রাজাধিরাজ) উপাধিতে ভুষিত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَتَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَتُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। সুরা আল ইমরান : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡاَرۡضَ لِلّٰہِ ۟ۙ یُوۡرِثُہَا مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَالۡعَاقِبَۃُ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

এই পৃথিবীর সার্বভৌম মালিক আল্লাহ, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা উহার উত্তরাধিকারী করেন, শুভ পরিণাম ও শেষ সাফল্য লাভ হয় আল্লাহভীরুদের জন্য। সুরা আরাফ : ১২৮

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَخْنَى الأَسْمَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَسَمَّى مَلِكَ الأَمْلاَكِ ‏

আল্লাহ তাআলার নিকট কিয়ামত দিবসে এ ব্যাক্তির নাম সব চাইতে ঘৃণিত, যে তার নাম ধারণ করেছে মালিকাল আমলাক (مَلِكَ الأَمْلاَكِ) বা রাজাধিরাজ। সহিহ বুখারি : ৬২০৫

এমনই কিছু শব্দ যা উপাধি বা নাম হিসাবে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয়। যেমন-

শাহ জাহান, শাহান শাহ, কাজিউল কুজাত, হাকিমুল হুক্কাম,  হাকিমুল হাকিম। একই অর্থবহন করে এমন বাংলা নামও আছে। যেনম- রাজাধিরাজ, মহারাজ, জগতের বাদশাহ, বিচারকদের বিচারক, শাসকদের শাসক ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষ মহান আল্লাহই হলেন, রাজাধিরাজ। কিয়ামের দিন মহান আল্লাহ নিজেকে রাজাধিরাজ ঘোষণা করবেন।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَقْبِضُ اللَّهُ الأَرْضَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَطْوِي السَّمَاءَ بِيَمِينِهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ مُلُوكُ الأَرْضِ ‏

 আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যমীন ও আসমানকে গুটিয়ে তাঁর ডান হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, পৃথিবীর রাজা-বাদশারা (আজ) কোথায়? সহহি বুখারী : ৪৮১২, ৭৩৮২, ৭৪১৩; মুসলিম : ২৭৮৭, ইবনে মাজাহ : ১৯২

যে নামগুলো রাখলে মহান আল্লাহ খান নাম এসে যায়, সেই নামে রাখার যাবে না। যে নামগুলো সরাসির আল্লাহর গুনের সাথে সরাসরি  সম্পৃক্ত তা রাখল শিরকি কাজ হবে।

১২। ক্ষমা পাওয়ার আশায় গাইরুল্লাহ নিকট তাওবা করা

মহান আল্লাহ তাওবা করার হুকুম দান করেছে। নবী রাসুল সকলেই মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা শিরকি কাজ। হিন্দুরা মুর্তির সামনে ঠাকুরের কাছে পাপ মোচনের জন্য ধর্না দেয়। খৃষ্টারগন তাদের নির্বাচিত ফাদারের কাছে পাপের কথা বলে পাপ মোচন করে। মুসলিমগন ও তাদের দেখাদেখি আজ কাল পীরের হাতে হাত দিয়া তাওবা করছেন। অথচ তাওবা হল অনুতপ্ত হয়ে একমাত্র আল্লহর দরবারে কান্না কাটি করা। যদি হিন্দু ও খৃণ্টানদের মত আকিদা রাখি আল্লাহ মাধ্যম (ফাদার বা ঠাকুর) ছাড়া তাওবা কবুল করেন না। তবে তো মুশরিকি আকিদা পোষশ করা হল। অথচ কুরআনে আল্লাহ বারবার ঘোষনা করছেন আল্লাহর নিকট তাওবা কর, তিনিই তাওবা কবুল কারি। তিনি ছাড়া তওবা কবুল করার আর কেউ নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَـٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَہُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ

আর যারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন গোনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আবার সংগে সংগে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে তাঁর কাছে নিজেদের গোনাহ খাতার জন্য মাফ চায়। কারণ আল্লাহ ছাড়া আর কে গোনাহ মাফ করতে পারেন এবং জেনে বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জোর দেয় না। সুরা আল ইমরান : ১৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَهُوَ ٱلَّذِى يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّيِّـَٔاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ

 তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং মন্দ কাজসমূহ ক্ষমা করেন৷ অথচ তোমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে তার জানা আছে৷ সুরা শুরা : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ

হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷ সুরা নুর ২৪:৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا لَنَا لَا نُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَمَا جَآءَنَا مِنَ ٱلۡحَقِّ وَنَطۡمَعُ أَن يُدۡخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلصَّـٰلِحِينَ

তবে কি তারা আল্লাহর কাছে তাওবা করবে না এবং মাফ চাইবে না? আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সুরা মায়েদা : ৭৪

যারা আজ ঠাকুর, ফাদার, পুরহীদদের নিকট তাওবা করে গুনা মাফের ফরিয়াদ করছে। তাদের এই শিরকি কাজের জন্য তাদের তাওবা কবুল হবে না। এবং কাল কিয়ামতের কঠিন ময়দানে তাদের তাওবা করার সুযোগই দেওয়া হবে না, তাওবা কবুল করা তো অনেক দুরের কথা। তাদের সম্পর্কে কুরআনের কিছু আয়ত দেওয়া হল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَلِكُمْ بِأَنَّكُمُ اتَّخَذْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا وَغَرَّتْكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ لَا يُخْرَجُونَ مِنْهَا وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ

তোমাদের এই পরিণাম এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত করেছিলে এবং দুনিয়ার জীবন তোমাদের ধোকায় ফেলে দিয়েছিলো৷ তাই আজ এদেরকে দোযখ থেকেও বের করা হবে না কিংবা একথাও বলা হবে না যে, তাওবা চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো৷  সুরা জাসিয়াহ : ৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَيَوۡمَ نَبۡعَثُ مِن كُلِّ أُمَّةٍ۬ شَهِيدً۬ا ثُمَّ لَا يُؤۡذَنُ لِلَّذِينَ ڪَفَرُواْ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٨٤)

যেদিন আমি উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী দাঁড় করাবো, তারপর কাফেরদের যুক্তি-প্রমাণ ও সাফাই পেশ করার সুযোগও দেয়া হবে না৷ আর তাদের কাছে তাওবা ইসতিগফারেরও দাবী জানানো হবে না৷ সুরা নাহল : ৮৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَيَوۡمَٮِٕذٍ۬ لَّا يَنفَعُ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مَعۡذِرَتُهُمۡ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٥٧)

কাজেই সেদিন জালেমদের কোন ওজর- আপত্তি কাজে লাগবে না এবং তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে না৷ (সুরা রুম ৩০:৫৭)।

কাজেই সময় থাকতে মহান আল্লাহর নিকট খালেছ তাওবা করে পর কালের জন্য প্রস্তত হতে হবে। কারন পরকালে কোন প্রকার তাওবার সুযোগও নাই। যিনি কবুল করবেন সেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা কতটুকু যৌক্তিক কাজ হবে?

১৩  কফিনে ফুল দেয়া বা পুষ্পস্তবক অর্পণ করা

বর্তমানে আমাদের ঢাকা শহরে কোন কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, এমপি, মিনিষ্টার বা বিখ্যাত নামকরা কেউ মারাগেলে তার প্রতি শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে শহীদ মিনার বা তার কর্মস্থলে রাখা হয়। তার নিকট প্রিয়জন বা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগন তার কফিনে ফুল দেন। তারা ফুল দিয়ে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসর অর্ঘ্য অর্পণ করেন থাকেন, তবে তারা সকলে মৃত ব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে বা সওয়াব পাঠানোর নিয়তে করেন কিনা তা ষ্পষ্ট নয়। কারন ইসলামি শরীয়তে মৃত্যুর জন্য কিছু করতে হল তা অবশ্যই আল্লাহর হুকুম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখান পথে করতে হবে। যদি কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা না হয় বা লোক দেখানোর জন্য হয় অথবা আল্লাহর রাসূল কর্তৃক কাজটি অনুমোদিত না হয়, তাহলে এ কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

 আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

যদি কেউ আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৬

তবে এ আমল যে মুসলামানদের নয় সে ব্যাপারটি সুষ্পষ্ট। মৃত্যুর পর ফুল দিয়ে, বাতি জ্বালীয়ে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণ করার রেওয়াজ অধিকাংশ পাশ্চাত্যের মানুষ করে থাকে, যারা কঠোর ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী। আর আমরা আমদের সঠিক ও সহিহ আমলকে বাদ দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তির অনুকরণে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে এমনটি করে থাকি যা হারাম। যদি সৃষ্টিকে খুসি করার ইচ্ছা থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণ করা হয় তবে তা ছোট শিরক। কিন্তু যদি কর্মকে ইবাদতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন আর ছোট শিরক থাকবে না বড় শিরকে পরিনত করবে। 

১৪ মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ।

আমাদের উপমহাদেশে অনেককে মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান খাদেম হিসাবে কাজ করে। তাদের এই কাজ শিরকি কাজে সহায়তা ছাড়া কিছুই নয়। যে শিরক করতে সহায়তা করে সে মুলত শিরকি কাজ করে। কাজেই মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ। এমনকি আল্লাহ নিজের ঘর কাবাকে ও শিরক  বিদাআত থেকে পবিত্র রাখতে বলেছেন। আর যেখানটি (মাজার) তৈরি করা হয়েছে শুধুই শিরক করার জন্য তার খেদমত কতটুকু যুক্তি যুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَیۡتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَالۡعٰکِفِیۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ

আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’। সুরা বাকারা : ১২৫

উক্ত আয়াতে আল্লাহ ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কে কাবা ঘর পাক পবিত্র রাখার নির্দেষ দিয়েছন। এর অর্থ কেবলমাত্র ময়লা-আবর্জনা থেকে পাক-পবিত্র রাখা নয়। আল্লাহর ঘরের আসল পবিত্রতা হল শিরক থেকে পবিত্র রাখা এবং সেখানে আল্লাহর ছাড়া আর কারোর নাম উচ্চারিত হবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে মালিক, প্রভু, মাবুদ, অভাব পূরণকারী ও ফরিয়াদ শ্রবনকারী হিসেবে ডাকে, সে আসলে তাকে নাপাক ও অপবিত্র করে দিয়েছে।

১৫ কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً لَّا یَخۡلُقُوۡنَ شَیۡئًا وَّہُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ وَلَا یَمۡلِکُوۡنَ لِاَنۡفُسِہِمۡ ضَرًّا وَّلَا نَفۡعًا وَّلَا یَمۡلِکُوۡنَ مَوۡتًا وَّلَا حَیٰوۃً وَّلَا نُشُوۡرًا

আর তারা আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে; তারা নিজদের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থান করতেও সক্ষম হয় না।সুরা ফুরকান : ৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

مَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ حَسَنَۃٍ فَمِنَ اللّٰہِ ۫ وَمَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ سَیِّئَۃٍ فَمِنۡ نَّفۡسِکَ ؕ

তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে। সুরা নিসা : ৭৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ ؕ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ بِخَیۡرٍ فَهُوَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সব কিছুর উপর ক্ষম তাবার্রুক ন। সুরা আনাম : ১৭

আমাদের বিশ্বাস সকল প্রকারের কল্যাণ, বরকত, উপকার মহান আল্লাহর পক্ষে থেকে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰہُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَہٗۤ اِلَّا ہُوَ ۚ وَاِنۡ یُّرِدۡکَ بِخَیۡرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضۡلِہٖ ؕ یُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু’। সুরা ইউনুস : ১০৭

উপমহাদেশে কবরের প্রতি ভক্তি অনেক পুরান। আমাদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল, মূর্তি পুজার প্রতি তাদের বড় ঝোঁক ছিল। অনেকে হিন্দু থেকে কালের আবর্তে মুসলিম হয়েছে ঠিকই কিন্তু জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে কবরকে মূর্তির মত পূজা শুরু করে। তাই তারা কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করে এবং মাজারকে পূজনীয় মনে করে তার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা প্রদর্শন করে থাকে যা মুলাত একটি শিরকি কর্ম। আল্লাহর পরিবর্তে মাজারে থেকে বরকত লাভের আশায় এর উপর মশারি, ও শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে থাকে। যখনই কোনো মাজার ভক্ত মাজারে যায় তখন তারা হিন্দুদের মত হাত মুখে ও কপালে লাগায়। কবরকে তারা এতই বরকত মনে করে যে কবরের গায় তারা হাত লাগায় এবং পেট ও পিঠ ঠেকায় এবং অনেকেই কবরকে চুম্বন করে। বুজুর্গের মাজার বা কাবর স্থান থেকে ফিরে আসর সময় কবরের দিকে মুখ করে বেরিয়ে আসা। তাদের এই অতিরিক্ত ভক্তি করাকে হিন্দুদের মূর্তি ভক্তির চেয়ে সামান্য টুকুও কম নয়। তাদের মাজার আর হিন্দুদের মূর্তির পার্থক্য হল তাদের বুজুর্গ মাটির নিচে আর হিন্দুদের মূর্তি মাটির উপরে। কাজেই যদি কেউ মূর্তি ভক্তি দেখে থাকেন তাকে আর মাজার ভক্তি দেখার দরকার নেই। তার যার মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করে এই মঙ্গলের  মালিক স্বংয় আল্লাহ আমার প্রিয় কেও এই মঙ্গল অমঙ্গলের মালিক করা হয় নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنِّیۡ لَاۤ اَمۡلِکُ لَکُمۡ ضَرًّا وَّلَا رَشَدًا

(হে নবি) বল, আমি তোমাদের মঙ্গল-অমঙ্গলের মালিক নই। সুরা জ্বিন : ২১

১৬ আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা

ইচছা করে আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা কুফরি কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ ٱتَّبَعُوا۟ مَآ أَسْخَطَ ٱللَّهَ وَكَرِهُوا۟ رِضْوَٰنَهُۥ فَأَحْبَطَ أَعْمَٰلَهُمْ

এটা এজন্য যে, তারা সেই কাজ করেছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে তারা অপছন্দ করেছে। তাই তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন। সুরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَوَلَّوْا۟ قَوْمًا غَضِبَ ٱللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا۟ مِنَ ٱلْءَاخِرَةِ كَمَا يَئِسَ ٱلْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَٰبِ ٱلْقُبُورِ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছে, যেমনিভাবে কাফিররা কবরবাসীদের সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে। সুরা মুমতাহীনা : ১৩

জনৈক মাদীনাবাসী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সময় উম্মুল মুমিনীন আয়শা (রা.) কে মুয়াবিয়া (রা.) লিখে পাঠান, আমাকে লিখিতভাবে কিছু উপদেশ দিন, তবে তা যেন দীর্ঘ না হয়। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আয়শা (রা.) মুয়াবিয়া (রা.) কে লিখলেন,  আপনাকে সালাম। তারপর এই যে, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আকাঙ্খা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট হতে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তায়ালাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তায়ালা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আপনাকে আবারো সালাম। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৪)

সাধারণ মহান আল্লাহর ক্ষমতা, ইবাদতের মাঝে অংশ বসালে শিরক হয়। আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা শুধু আল্লাহর অংশ বা সমকক্ষ করে নাই। বরং তার চেয়ে নিজে স্থানকে দিয়েছেন আল্লাহকে। নাউজুবিল্লাহ

১৭। কদমবুছির করা

একজন মুসলমানের সাথে অন্যে মুসরমানের দেখা হলে সালাম (আস-সালামু আলাইকুম বলা)  দেওয়া একটি সার্বজনিন সুন্নত। আবার যাকে সালাস দেওয়া হবে তার পক্ষ থেকে উত্তর প্রদান করাও ইসলামী সুন্নাত। মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর মতনিত প্রিয় বান্দা, শ্রেষ্ঠতম রাসুল ও হাবীব, যাকে ভালবাসা আর আল্লাহকে ভালবাসা একই কথা এবং আল্লাহর কাছে নাজাতের অন্যতম ওসীলা। (ইমরান-৩১)। সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তী জীবনের প্রতিদিন অগণিত সাহাবী তাঁর দরবারে এসেছেন। সেই সকল সাহাবি (রা.) ছিলেন, মানব ইতিহাসের অতুলনীয় অনুসারি, যারা নিজের জীবন থেকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেশি ভালবেসেছেন, ভক্তি করেছেন ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এই মহান দরবারের মহান ভক্তবৃন্দ কেউই কোনদিন কদমবুছি করলেন না। সবাই এসে সালাম দিয়ে দরবারে বসছেন। সালাম দিয়ে দরবার ত্যাগ করছেন। কখনো হয়ত মোসাফাহা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে নবুয়তী জিন্দেগিতে তার লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দুই একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহাস্রাধিকবার এসেছেন। এই দীর্ঘ নবুয়তী জিন্দেগিতে শুধুমাত্র তিন চার জন্য নবাগত, দরবারের সুন্নাতের সাথে অপরিচিত মানুষ পায়ে চুমু খেয়েছেন বলে কোনো কোনো হাদীসে জানা যায়। সেই বর্ণনাগুলি প্রায় সবই যয়ীফ বা দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেননি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা কয়েকজন বেদুঈন বা ইহুদি, যারা দরবারে থাকেনি বা দরবারের আদব ও সুন্নাত জানত না। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ফাতেমা, বেলাল (রা) ও তাঁদের মতো অগণিত প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে দীর্ঘ ২৩ বৎসরে হাজার হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদমবুছি করেন নি বা কদম মুবারকে চুমু খাননি। এমনকি কদম মুবারকে হাত রেখে সেই হাতের উপরও চুমু খাননি। এহইয়াউস সুনান, পঞ্চম অধ্যায়, পৃ-৩৮৬ খন্দোকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ,


কিন্তু আমাদের দেশের ভন্ডপীরে দরবারের কথা ভাবুর। পীর সাহেব বসে আছেন অগণিত ভক্ত এসে সালাম করছেন, মুসাফাহা করছেন, এরপর হাতে বা পায়ে চুমুখাচ্ছেন আর সাথে কিছু সেলামি দিচ্ছেন। যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারেন সম্পুর্ণ ভিন্ন সুন্নত বিরোধী।

আবার অনেকে বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ী, উস্তাদকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুছি করে থাকেন। এটা জায়েয হবার ভিত্তি খুবই দুর্বল। একেতো সুন্নত বিরোধী বিদআত তারপর একাজটি সম্মানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করা যা শিরকের আহ্বায়ক। সর্বসিদ্ধান্ত মাসআলা হল, সম্মানে অতিরঞ্জিত করা হল, শিরকের আহ্বায়ক। আর শিরকের আহ্বায়ক হারাম। ইহা অনেক সময় সিজদার সাথে সামঞ্জস্যমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সিজদার সাথে সামঞ্জস্য হলে যে শিরক তাতে কোন সন্ধেহ নাই। তাইতো বর্তমানে দেখা যায় অনেক মাযারে পীরের কদমবুছি না করে সরাসরি সিজদা করছে।

ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। লোক দেখান সালাত আদায় করা

আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সালাত আদায় করে না। বৃদ্ধ অবস্থায় সালাত শুরু করে, তখন আর কুরআন সহিহ করে পড়ার সময় থাকে না। আবার অনেকের যখন বয়স বাড়ে, ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার সময় হয়, তখন চক্ষু লজ্জার ভয়ে দাড়ি রাখে পাশাপাশি সালাত শুরু করে। অনেকটা সমাজের ভয়ে কে কি বলে, এর জন্য সালাত শুরু। এভাবে সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে সালাত আদায় করা মুনাফিকের লক্ষন, পাশাপাশি ছোট শিরকেও বটে। মুনাফিকরা শৈথিল্য সহকারে সালাতে আসত কারন তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিদের (রাদি.) সালাতে হাজির দেখান। ঠিক যেভাবে মুমিনদের মুনাফিকেরা ধোকা দিত। আজকের সমাজের সমাজ রক্ষার সালাত ও ঠিক তেমনি ভাবে আল্লাহকে ধোকা দিচ্ছে আর তারা নিজেরা নিজেদের ধোকা দিচ্ছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَہُوَ خَادِعُہُمۡ ۚ  وَاِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا کُسَالٰی ۙ  یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَلَا یَذۡکُرُوۡنَ اللّٰہَ اِلَّا قَلِیۡلًا ۫ۙ

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। আন নিসা : ১৪২

আলা ইবনু আবদুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি একদিন আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) এর বসরাস্থ বাড়ীতে গেলেন। আর বাড়ীটি মসজিদের পাশেই অবস্থিত ছিল। তিনি (আলা ইবনু আবদুর রহমান) তখন সবেমাত্র যুহরের সালাত আদায় করছেন। আলা ইবনু ’আবদুর রহমান বলেনঃ আমরা তার (আনাস ইবনু মালিকের) কাছে গেলে তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি আসরের সালাত আদায় করছ? আমরা জবাবে তাকে বললাম, আমরা এই মাত্র যুহরের সালাত আদায় করে আসলাম। এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ যাও আসরের সালাত আদায় করে আসো। এরপর আমরা গিয়ে আসরের সালাত আদায় করে তার কাছে ফিরে আসলে তিনি বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ ঐ সালাত হলো মুনাফিকের সালাত যে বসে বসে সূর্যের প্রতি তাকাতে থাকে আর যখন তা অস্তপ্রায় হয়ে যায় তখন উঠে গিয়ে চারবার ঠোকর মেরে আসে। এভাবে সে আল্লাহকে কমই স্মরণ করতে পারে। সহিহ মুসলিম : ৬২২, সুনানে তিরমিযী: ১৬০, নাসায়ী : ৫১১

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নামায পড়তে শুরু করল। এমতাবস্থায় নামাযের মধ্যেই সে দেখল, তাকে অন্য কেউ লক্ষ করছে তাই সে তার সালাতে রুকনগুলি ধীরস্থিরভাবে আদায় করল। সিজদা রুকুতে সময় বেশী লাগাল। যদিও এতে আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় সালাত হলো ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সালাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন মু’মিন ব্যক্তি এরূপ সালাত করতে পারে না।

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমাদের প্রতিপালক যখন তাঁর পায়ের গোড়ালির জ্যোতি বিকীর্ণ করবেন, তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষ সবাই তাঁকে সিজদা করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য সিজদা করত, তারা কেবল অবশিষ্ট থাকবে। তারা সিজদা করতে চাইলে তাদের পিঠ একখণ্ড কাঠফলকের মত শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯

মনে রাখতে হবে, সালাতের মধ্যে অন্য চিন্তা এসে যাওয়া এক কথা আর অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় ভিন্ন কথা। প্রথম অবস্থাটি মানবিক দুর্বলতার স্বাভাবিক দাবি আর অপরটি ইচ্ছাকৃত রিয়া।সালা্তে মনোনিবেশই ইহার ক্ষতিপূরণ। কিন্তু সালাত শুরু থেকে সালাম ফেরা পর্যন্ত একবারের জন্যও মনোনিবেশ না এলে কিন্তু সালাত সঠিকভাবে আদায় হয়েছে বলা যাবে না। তবে অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় করলে সালাত সম্পুর্ন বাতিল হয়ে যাবে কারন এটা ছোট শিরকে । 

এভাবে নামাজের রুকু সিজদাহ মত কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো ছোট শিরক। সওয়াবের আশায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করা শিরক। কাজেই সালাত হেফাজতের জন্য কেবল আল্লাহর সামনে অনুগত বান্দারমত দাড়াতে হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 حَـٰفِظُواْ عَلَى ٱلصَّلَوَٲتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلۡوُسۡطَىٰ وَقُومُواْ لِلَّهِ قَـٰنِتِينَ

তোমাদের নামাযগুলো সংরক্ষণ করো, বিশেষ করে এমন নামায যাতে নামাযের সমস্ত গুণের সমন্বয় ঘটেছে।  আল্লাহর সামনে এমনভাবে দাঁড়াও যেমন অনুগত সেবকরা দাঁড়ায়। সুরা বাকারা : ২৩৮

২। লোক দেখান বা লোক চক্ষুল লজ্জায় সিয়াম পালন করা

আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা ইসলাম সচেতন নয়। ইসলামি কোন ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত থাকে না। এমন কি নিয়মিত সালাতও আদায় করে না। কিন্তু রমজান মাসের পরিবেশ পরিস্থিতির করানে সিয়াম রাখতে বাধ্য হয়। তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর হুকুম থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষেই বেশী ভয় পায়। এই ভাবে লোক দেখানো বা লজ্জার কারনে নিয়াম রাখা কবিরা গুনাহ। আমাদের সকল ইবদতের এক মাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়ামের মাধ্যমে আমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

 يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡڪُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِڪُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 

হে ইমানদারগন, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। সূরা বাকারা : ১৮৩

সিয়ামের উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া। এখান আমারা যদি আল্লাহ ভয় না করে সমাজ ও সমাজের মানুষেই ভয়ে সিয়াম পালন করি, তবে রিয়া ছাড়া কি হবে?

৩।  হজ্জ্বের ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

হজ্জ্বের এমন একটি ইবাদাত যেখানে ছোট শিরকে পতিত হোওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সালাতের মত আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে হজ্জ্ব পালন করে। আল্লাহর রহমতে বান্দা যখন হজ্জ্ব করার যোগ্যতা অর্জন করে। অর্থাৎ যখন টাকা পয়সার মালিক হয়, তখন সে কার্পন্য করতে থাকে। মনে হয় এটাই সমাজের রীতি। কিন্তু সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, সে অনেকটা বাধ্য হয়েই হজ্জ্বে গমন করে। বলুন এটা কি ছোট শিরকে নয়? তার প্রমান, হজ্জ্ব পালন করার পরও তাহার মুখে দাড়ি উঠেনি, সালাতে গর হাজির, অন্যান্য ইবাদাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

আর এক শ্রেণীর লোকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল নামের পিছনে আলহাজ্ব লাগাবে। যদি আলহাজ্ব লাগানোর ইচ্ছায় হজ্জ্ব হয় তবে ছোট শিরকে হবে, এতে কোন সন্ধেহে নাই।

আবার অনেকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। হজ্জ্ব করবে সাথে সাথে স্বর্ন নিয়ে দেশে ফিরবে। এতে হজ্জ্ব ও হল আবার লাভও হল। বেশ তো একই সাথে দু্‌ই কাজ। কাজ দুটিই হল কিন্তু ছোট শিরক হল নেকি পাবেন না। এসব আলম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি লোকর নিকট ন্যায় পরায়ন সাজার জন্য বা স্বনামধন্য হবার জন্য হজ্জ্ব পারন করল সে শিরক করল। (মুসনাদে আহম্মদ)।

দেখবেন অনেক বিধর্মী পৃথিবীতে আনাচে কানাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা তারা জানা বা দেখার নেষা থেকেই করছে। কেউ তাদের বাধ্য করছেনা। ঠিক কোন মুসলিম যদি  জানা বা দেখার নেষা থেকে হজ্জ্বে গমন করে তা হলে এটাও ছোট শিরক হবে।

লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা করা

শুধু লোক দেখাবার জন্য সে যেসব জাকাত বা দান ছদগা করা হয়। সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে স্রষ্টা মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের দানের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না। প্রবল বর্ষণে যেমন পাথরের উপরের মাটি ধুয়ে পরিস্কার করে দেয়, লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা ও নেকিহীন পরিছন্ন দান হিসাবে পরিগনিত হয়। তার এই দান অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া নেয়ামতকে তাঁর পথে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করার পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ব্যয় করে অথবা আল্লাহর পথে কিছু অর্থ ব্যয় করলে ব্যয় করার সাথে কষ্টও দিয়ে থাকে, সে আসলে অকৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর অনুগ্রহ বিস্মৃত বান্দা। আর সে নিজেই যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় না তখন তাকে অযথা নিজের সন্তুষ্টির পথ দেখাবার আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন,

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

এবং যারা লোকদের দেখানোর জন্য স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনা, আর যাদের সহচর শাইতান। সে নিকৃষ্ট সঙ্গীই বটে। সুরা নিসা : ৩৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা রাকারা : ২৬৪

কাউকে খুশী করা, কারো প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য অনেকেই জাকাত দেন/দান করে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে ছাওয়াবের নিয়তে যে কোনো ভাল কাজ করা ইবাদতেরই অংশ। আর ইবাদত পাওয়ার একমাত্র যোগ্য সত্তাই হচ্ছেন, মহান  রাব্বুল আলামীন। যে জন্য যে সকল ভাল কাজের সামান্য হলেও লোক দেখান বা প্রশংসা কুড়ানোর আশা বিদ্যমান থাকে, তা মূলত বাতিল। লোক দেখানো  অর্থ ব্যয় না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই অর্থ ব্যয় করলে আল্লাহ তাকে পুরাপুরি প্রতিদান দিবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

۞ لَّيۡسَ عَلَيۡكَ هُدَٮٰهُمۡ وَلَـٰڪِنَّ ٱللَّهَ يَهۡدِى مَن يَشَآءُ‌ۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ فَلِأَنفُسِڪُمۡ‌ۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ وَجۡهِ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ يُوَفَّ إِلَيۡڪُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ (٢٧٢)

অর্থ: মানুষকে হিদায়াত দান করার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হয়নি ৷ আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন ৷ তোমরা যে ধন-সম্পদ দান –খয়রাত করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো ৷ তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই তো অর্থ ব্যয় করে থাকো ৷ কাজেই দান-খয়রাত করে তোমরা যা কিছু অর্থ ব্যয় করবে , তার পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই তোমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হবে না। সুরা বাকারা : ২৭২

লোক দেখান অনিচ্ছাকৃত দান মুনাফিকের লক্ষন। মুনাফিকেরা আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য দান করত না। মনে গহিনে দানের প্রতিরোধ স্পস্ট তারপরও দান কারন লোক দেখান (রিয়া)। আল্লাহ কাছে তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 وَمَا مَنَعَهُمۡ أَن تُقۡبَلَ مِنۡہُمۡ نَفَقَـٰتُهُمۡ إِلَّآ أَنَّهُمۡ ڪَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَبِرَسُولِهِۦ وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ ڪُسَالَىٰ وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمۡ كَـٰرِهُونَ (٥٤)

অর্থ: তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত না হবার এ ছাড়া আর কোন কারন নেই যে, তারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে, নামাযের জন্য যখন আসে আড়মোড় ভাংতে ভাংতে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলে তা করে অনিচ্ছাকৃতভাবে।( সুরা তাওবা- ৯:৫৪)।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 وَٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٲلَهُمۡ رِئَآءَ ٱلنَّاسِ وَلَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۗ وَمَن يَكُنِ ٱلشَّيۡطَـٰنُ لَهُ ۥ قَرِينً۬ا فَسَآءَ قَرِينً۬ا (٣٨)

অর্থ: আর আল্লাহ তাদেরকেও অপছন্দ করেন, যারা নিজেদের ধন-সম্পদ কেবল মাত্র লোকদেরকে দেখাবার জন্য ব্যয় করে এবং আসলে না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে আর না আখেরাতের দিনের প্রতি৷ সত্য বলতে কি, শয়তান যার সাথী হয়েছে তার ভাগ্যে বড় খারাপ সাথীই জুটেছে৷ (সুরা নিসা ৪:৩৮)।

৫। কোরবানি ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

শুধুই প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য হাটের সবচেয়ে বড় গরুটা আমার চাই দাম যা লাগে সমস্যা নাই। দাম বেশী হলেও সমস্যা নাই, মানুষতো প্রশংসা করল বা বাহ বাহ দিন তাতেই বা কম কিসে। অথবা শুধুই মাংশ খাওয়ার ইচ্ছা। এটা একটা প্রমাণিত কথা যে, পশু উৎসর্গ করে জবেহ করা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা শিরক।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন-

قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَا وَمَمَاتِيْ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ

বল, নিশ্চয় আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্য নিবেদিত। তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি এর প্রতি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলমান। সুরা আন আম ১৬২-১৬৩

আল্লাহ্‌ তাআলা আরো বলেন-

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাকে (হাউজে) কাওসার দান করেছি, সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর। সুরা আল কাওছার : ১ ও ২।

৬।  আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশে জ্ঞান অর্জন করা

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

বল, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? সুরা যুমার : ৯

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ*

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। সুরা ফাতির : ২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَـٰتٍ۬‌ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٌ۬

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ যাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন তাদেরকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। সুরা মুজাদালাহ : ১১

মুয়াবিয়া (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকেই দ্বীনী জ্ঞান দান করেন। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৩৬৪১, ৭৩১২, ৭৪৬০, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিলত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার উদ্দেশ্যে ইলম করা ছোট শির্ক বা কবিরা গুনাহ। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي رِيحَهَا

যে ইল্মের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না। সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫২

জাবির বিন আবদ (রা.) থেকে নবী ﷺ বলেন, তোমরা আলিমদের উপর বহাদুরি প্রকাশের জন্য, নির্বোধদের সৎ ঝগড়া করার জন্য এবং জনসভার বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য ধর্ম জ্ঞান শিক্ষার জন্য। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তার জন্য রয়েছে আগুন আর আগুন। সুনানে ইবনে মাজাজ : ২৫৪, সহিহ তারগীব : ১০২, আলবানী সহিহ বলেছেন

কাব ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে লোক আলিমদের সাথে তর্ক বাহাস করা অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে বাকবিতণ্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশে ইলম অধ্যয়ন করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৬৫৪, মিশকাত : ২২৫

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিরত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার  উদ্দেশ্যে ইলম করা শিরক। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না। অনেক টাকা পয়সা আয় করার জন্য ইলম অর্জন করে থাকে। আবার কেউ দুনিয়ার সুনাম সুখ্যাতি পাওয়ার আসায় ইলম অর্জন করে। সে ভাবে লোকে তাকে জ্ঞানি মনে করে সম্মান করবে। আলেম বলে সম্ভোধন করবে। কেই যদি এমনি ভাবে নিয়ত করে যে, আমি ইলম অর্জন করলে লোকে তাকে আলেম বলবে, ক্বারি বলবে, হাফিজ বলবে তবে তা শিরক হবে। পার্থিব সুনাম-সুখ্যাতির উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। হাদীস শরীফে এসেছে যে, জাহান্নামে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত তিন ব্যক্তির একজন হবে ঐ আলিম, যে লোকের কাছে আলিম হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার জন্য ইলম চর্চা করেছে।

লোক দেখান বিদআতী পদ্ধতিতে জিকির করাঃ 

জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্বিধ্য লাভ হয়। জিকির একটি ইবাদাত। আর এই নফল ইবাদাতটি করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মুসলিম ব্যক্তিকে সকাল বিকাল জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرً۬ا كَثِيرً۬ا  وَسَبِّحُوهُ بُكۡرَةً۬ وَأَصِيلاً

মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। সূরা আহযাব : ৪১-৪২

 নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর এই আদেশ পালন করছেন। সাহাবাদের (বা.) নিজ হাতে শিক্ষাদান করেছেন এবং তারা ও জিকির করেছেন। কাজেই তাদের ইবাদতের পদ্ধতির বাহিরে নতুন কোন পদ্ধতি আবিস্কার করলে বিদআত হবে। আল্লাহ তাকে স্মরন করার পদ্ধতি বর্নণা করে বলেন-

 وَٱذۡكُر رَّبَّكَ فِى نَفۡسِكَ تَضَرُّعً۬ا وَخِيفَةً۬ وَدُونَ ٱلۡجَهۡرِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأَصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلۡغَـٰفِلِينَ

হে নবী! তোমার রবকে স্মারণ করো সকাল সাঁঝে মনে মনে কান্নাজড়িত স্বরে ও ভীতি বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে৷ তুমি তাদের অন্তরভুক্ত হয়ো না যারা গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে৷ সুরা আরাফ : ২০৫

আবূ মূসা আল আশআরী (রা.) থেকে বর্নিত। তিনি বলেনঃ একবার নাবী ﷺ একটি গিরিপথ দিয়ে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, একটি চুড়া হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক ব্যাক্তি এর উগরে উঠে জোরে বলল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার। আবূ মূসা বলেন, তখন রাসুল ﷺ তার খচ্চরে আরোহী ছিলেন। তখন নাবী ﷺ বললেন, তোমরা তো কোন বধির কিংবা কোন অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। অতঃপর তিনি বললেন, হে আবূ মূসা অথবা বললেন, হে আবদুল্লাহ আমি কি তোমাকে জান্নাতের ধনাগারের একটি বাক্য বাতলে দেব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, বাতলে দিন। তিনি বললেন, তা হল ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ’। সহিহ বুখারী : ৬৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৬৬১৮ ইফাঃ

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে জিকির করা যে রিয়া বা ছোট শিরক তাতে কেউ সন্দেহ করে না। এমনকি সশব্দে জিকির করার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন তারাও ইহাকে রিয়া বা ছোট শিরক বলে বিশ্বাস করে। তাছাড়া মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে আল্লাহর জিকির করাতো মহান আল্লাহর নির্দেশ।

আল্লাহর স্মরনের পরিবর্তে গায়রুল্লাহকে স্মরন করলে শিরক হবে। শয়তান অনেক সময় মানুষকে গায়রুল্লার জিকির করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তখন তারা পীর, অলী, গাউস. কুতুর, জ্বীন,ভুত ইত্যাদির জিকির করে থাকে যা মুলত শিরকে আকবর। যারা হক পন্থিপীর দাবি করে, তারাও মুরিদদের পীরের ধ্যান করার আদেশ  দেন। আর শতভাগ ভন্ডরা বলে, জিকিরের সময় মনে করতে হবে আমার পীরের ক্বলব হতে যিকিরের তাছির, ফায়েজ, তাওয়াজ্জুহ সরাসরি আমার ক্বলবে প্রবেশ করছে। জিকির করব আল্লাহর আর ধ্যান করব পীরের আর ফায়েজও আসবে পীর থেকে এ কেমন অবিচার।

অনেক শিরক পন্থিপীর জিকিরের সুন্নাহ বিরোধী পদ্দিতি দিয়ে বলে থাকেন। এই পদ্দতিতে জিকির করতে পারলে অল্প দিনের মধ্যেই জিকিরের হালত পয়দা হবে। ক্বলবের মাকাম ও রং স্পষ্ট দেখা যাবে। শরীরকে হালকা মনে হবে। যিকিরের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিকভাবে মক্কা-মদিনা, আরশ, কুরসী, লৌহ মাহফুজ, জান্নাত প্রভৃতি বিষয়াবলী দেখতে পারবেন। আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পেলে অদৃশ্য জগতে ভ্রমণও করতে পারবেন। অর্থাৎ এলমে গাইবের অধিকারী হবেন।

কিন্তু দুঃথের বিষয় হল এমন হালত আমাদের অনুসরনীয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হয়নি। কোন সাহাবি এমনটি দাবি করছেন বলে কেউ প্রমান করতে পারবে না। তাহলে নিশ্চয় ইহা আলাদা তরিকা বা পথ। শিরকি পথ। ইহা ইসলামের কোন পথ নয়।

মানিক গজ্ঞের এক পীর তার অনেকগুলি লিখিত বই আছে। তার প্রতিটি বইয়ের শেষে তৃতীয় সবকের সাছিরে লিখেছেন, এই সবকের তাসিরে ছত্রিশ কোটি পশমের গোড়া গিয়ে আল্লাহর জিকির বাহির হবে। এবং কোন কোন সময় হালত এরকম হবে, দেখবেন, নাভী হতে দেহের উপরের অংশ কোটি কোটি মাইল উর্ধ্বে উঠে গিয়েছে। নাভির নিচের অংশ টুকু জমিনে পড়ে আছে। এ আবার কেমন হালত যা কোন নবী, রাসুল, সাহাবি কারোই হয়নি। যা কুরআনে নেই, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলে নাই, সাহাবিগন ও জানেন না, তা কি করে ইসলাম হয়?  আর যদি কেউ,  জিকিরের মাধ্যমে নামাযে বা অন্য কোনো ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়, কোনো ব্যক্তির বিশ্রামে সমস্যা করে, আওয়াজ বড় করে অর্থাৎ  চিৎকার করে বা মাইক ব্যবহার করে জিকির তবে তা সুন্নাহ বিরোধী হবে। এমন কি যে সকল জিকিরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করন নাই, সে সকল জিকিরে সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করা সুন্নাহ বিরোধী।

 সুকণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত ক্ষেতে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা:

কুরআন তেলাওয়াত করা নফল ইবাদাত হলেও আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। প্রত্যেক মুসলিমকে কুরআন পড়া জানতে হবে। সহিহ শুদ্ধ ভাবে কুরআন তেলাওয়াত না জানলে গুরিত্বপূর্ণ আমল সালাত পরিপূর্ন হবে না। তাই যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবী করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা করা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্ব প্রথম কুরআনের যে আয়াতটি নাজিল করেন তাতে কুরআন পড়ার নির্দেষ দান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ

পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সূরা আলাক : ০১

কুরআন শিক্ষায় কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। উম্মাতকে কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর। মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ৮৫৭২

কুরআন তেলাওয়াত করাকে আল্লাহ ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। মানুষ ব্যবসার জন্য নিজের অর্থ, শ্রম, ও মেধা নিয়োগ করে কিছু মুনাফা অর্জন করার জন্য। কিন্তু তার ব্যবসায় লাভ এবং ক্ষতি দুটিরই সম্ভাবনা থাকে। কুরআন তেলাওয়াত এমন ব্যবসা যেখানে লাভ ছাড়া কোন প্রকার ক্ষতির আশংকা নেই। কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহর সাথে একটি লাভজনক ব্যবসা। । এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ (٢٩) لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ (٣٠) 

যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা ফাতির ৩৫:২৯-৩০]

যে কুরআন শিখা থেকে  থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কতইনা দুর্ভাগা! আলকুরআনে এসেছে,

 وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِڪۡرِى فَإِنَّ لَهُ ۥ مَعِيشَةً۬ ضَنكً۬ا وَنَحۡشُرُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ أَعۡمَىٰ (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِىٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرً۬ا (١٢٥) قَالَ كَذَٲلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَـٰتُنَا فَنَسِيتَہَا‌ۖ وَكَذَٲلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ (١٢٦

অর্থ: আর যে আমার যিকর (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে,  নিশচয় তার জীবন যাপন হবে  সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থয় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন?  অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ?  তিনি বলবেন, অনুরুপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অত:পর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। (সূরা ত্বহা ২০:১২৪-১২৬)।

 যে ব্যবসায় লাভ বেশী সেই ব্যবসায় লোকশান হলে ক্ষতির পরিমান ও বেশী হয়। কুরআন তেলাওয়াত যদি আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য না হয়ে অন্য কারনে হয়ে থাকে তবেতো ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াবাসিকে শুনানোর জন্য কুরআন তেলাওয়াত করল, সে ছোট শিরক করল। কুরআন তেলাওয়াত  ইবাদাত আর গাইরুল্লার জন্য ইবাদাত শিরক। অনেকের আবার কুরআন তেলাওয়াত খুবই সুমধুর। সবাই তাদের কুরআন তেলাওয়াত শুনেন আর প্রশংসা করে। প্রশংসা শুনে শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত করে। শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত নিশ্চই শিরক হবে। ইদনিং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কেউ যদি নিজের সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের জন্য তেলাওয়াত করে তবে তাও শিরক হবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা জুবুল হুযন’ হতে আল্লাহ তা’আলার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জুব্বুল হুযন কি? তিনি বললেনঃ তা জাহান্নামের মধ্যকার একটি উপত্যকা, যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামও দৈনিক শতবার আশ্রয় প্রার্থনা করে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! তাতে কে প্রবেশ করবে? তিনি বললেনঃ যেসব কুরআন পাঠক লোক দেখানো আমল করে। তিরমিজি : ২৩৮৩  ইবনু মাজাহ : ২৫৬

১০। দুনিয়া লাভের আশায় কুরআন শিক্ষা করা বা শিক্ষা প্রদান করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَلَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَلَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّاِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ

আর তোমাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারীস্বরূপ আমি যা নাযিল করেছি তার প্রতি তোমরা ঈমান আন এবং তোমরা তা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। সুরা বাকারা : ৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمْ تَسْـَٔلُهُمْ أَجْرًا فَهُم مِّن مَّغْرَمٍ مُّثْقَلُونَ

তুমি কি তাদের কাছে পারিশ্রমিক চাচ্ছ? ফলে তারা ঋণের কারণে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। (সুরা কালাম ৬৮:৪৬)

উবাই বিন কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যাক্তিকে কুরআন শিক্ষা দিলে সে আমাকে একটি ধনুক উপহার দেয়। আমি তা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তুমি এটি গ্রহণ করলে (জানবে যে), তুমি জাহান্নামের একটি ধনুক গ্রহণ করেছ। অতএব আমি তা ফেরত দিলাম। ইবনে মাজাহ : ২১৫৮

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা তিনি জনৈক কুরআন তিলাওয়াতকারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তখন কুরআন পাঠ করতে করতে (মানুষের নিকট) ভিক্ষা করছিল। তিনি “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজি ঊন’ পাঠ করে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কুরআন তিলাওয়াতকারী ব্যক্তি যেন এর দ্বারা শুধু আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করে। কেননা অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষের নিকট ভিক্ষা করবে। সুনানে ইবনে : ২৯১৭

যারা মাদ্রাসা নিজেদে পেশা হিসাবে শিক্ষাকতা করান তাদের ইহা ছাড়া অন্য কোন পেশা নাই তারা হাদিয়া বা বেতন হিসাবে টাকা নিতে পারবে। কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয কিনা এ ব্যাপারে ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা জবাব দেন যে, হ্যাঁ, আলেমগণের দুইটি মতের মধ্যে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে- কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয। দলিল হচ্ছে- নবী ﷺ এর বাণীর ব্যাপকতা “তোমরা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ কর এর মধ্যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে উপযুক্ত। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] এছাড়া যেহেতু এর প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহই উত্তম তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ এর প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আল্লাহই ভাল জানেন। http://islamqa.info/bn/20100)

১১লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে জিহাদ

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, এক লোক বীরত্ব দেখানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, এক লোক গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে এবং এক লোক মানুষকে দেখানোর জন্য যুদ্ধ করে এদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার পথে তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা’আলার বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে শুধুমাত্র সেই আল্লাহর পথে (জিহাদ)। সুনানে তিরমিজি : ১৬৪৬ সুনানে মাজাহ : ২৭৮৩

হযরত আবু মুসা আশ’আরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ এক ব্যক্তি শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের জন্য, এক ব্যক্তি আত্মগৌরব ও বংশীয় মর্যাদার জন্য এবং অপর এক ব্যক্তি লোক দেখানের জন্য লড়াই করে। এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করে? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার জন্য লড়াই করে সে-ই আল্লাহর পথে রয়েছে। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

হযরত আবু বাকরাহ নুফাই’ ইবনে হারিস সাকাফী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’জন মুসলমান তরবারী কোষমুক্ত করে পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়। আমি নিবেদন করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর জাহান্নামের হকদার হওয়াটাতো বুঝলাম; কিন্তু নিহত ব্যক্তির জাহান্নামী হওয়ার কারণটা কী? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কারণটা হলো এই যে, সেও তো  তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

এক ব্যক্তি  কাছে এসে বললেন, ঐ ব্যক্তি সম্মন্ধে কি বলেন, যে ব্যক্তি সোওয়াব ও সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তিন বার পূণরাবৃত্তি করল। তিন বার একই উত্তর দিলেন। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য কৃত আমল ব্যতিত, যা দ্বারা আল্লাহ সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। (সুনানে নাসাঈ : ৩১৪২)

১২ নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা আল ইমরান : ১৮৮

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রসূলুল্লাহ ﷺ বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রসূলুল্লাহ ফিরে আসলে তাঁর কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬ *

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, আল ইমরান-১৮৮। সহিহ বুখারি : ৪৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ২৭৭৭)

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে, তাও যদি আবার অন্যায় কাজ করে। ভালো কাজ করে প্রশংশা শুনতে চাওয়া রিয়ার মত গুনাহ হয়। নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া জঘন্য কবিরা গুনাহ।

রিয়া থেকে মুক্তির উপায়

১।  সম্মান, সুনাম, সুখ্যাতি লাভের ইচ্ছা্ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, ইহা অন্তর থেকে বের করতে হবে।

২। কোন আমল শুরু করার আগেই বার বার অন্তরের নিয়ত পরিশোধিত করা। রিয়ার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা।

৩।  আমল করার সময় রিয়া আসাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। খুব কম লোকই আছে যাদের রিয়া আসেনা।  কাজেই রিয়া আসার সাথে সাথে নিয়ত সহিহ করতে হবে। যত বারই অন্তরে রিয়া আসবে ততবারই নিয়ত সহিহ করতে হবে। আমর না ছেড়ে  সহীহ নিয়ত অন্তরে উপস্থিত করে আমল করে যেতে হবে।

৪। যে ইবাদত প্রকাশ্যে করার বিধান (নামাজ, সালাত, সাওম, হজ্জ্ব, জাকাত, দ্বীন প্রচার, জিহাদ ইত্যাদি) তাতো প্রকাশ্যে করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য ইবাদত যেমন: নফল সালাত, দান সদকা, তাহাজ্জুদ, নফল সাওম, মানুষের উপকার ইত্যাদি গোপনে করার চেষ্টা করতে হবে।

৫।     শিরক থেকে  বাচার জন্য রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন।

দুয়াটি হচ্ছে:

اللَّهُمَّ  إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَلِمَا لاَ أَعْلَمُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।

অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

(আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩; হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬)।

উপরের আমলগুলি অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে আশা করা যায় মহান আল্লাহ ধীরে ধীরে আমাদের ইবাদত রিয়া মুক্ত করে দিবেন। ইনশাআল্লাহ। আমিন। সুম্মা আমিন।

ফারওয়াহ ইবনু নাওফাল (রা.) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাওফাল (রা.)-কে বলেনঃ তুমি “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” সূরাটি পড়ে ঘুমাবে। কেননা তা শিরক হতে মুক্তকারী। সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫

ইসলামের দৃষ্টিতে মতবিরোধের কুফল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামের দৃষ্টিতে মতবিরোধের কুফল

পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ছয়শত কোটি মানুষ বাস করে। তাঁদের মধ্যে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, গোত্রগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, সীমানাগত, বিভক্তি লক্ষ করা যায়। মুসলিমদের মধ্যে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, গোত্রগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, সীমানাগত, বিভক্তি না থাকলেও আজ তারাও শত শত দলে বিভক্ত হয়ে আছে। এ বিভক্তির কারণে সঠিক ইসলামকে টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে দাড়িয়েছে। নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে নিজেরাই নানা প্রকার দু:খ-কষ্ট, বালা-মুসিবতে মধ্যে কালাতিপাত করছে। এমনি ভয়াবহ যুদ্ধের মত ফেতনায় জর্জরিত। যার প্রকৃত উদাহরণ হল ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিমগণ শিয়া, খারিজী, মুতাজিলা, জাহমী, কাদারী, জাবরিয়াসহ অনেক ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যায়। আজও তারা বিভিন্ন নামে বিভক্ত। এক বাংলাদেশেই হাজারের অধিক ফির্কা বা দলেন সন্ধান পাওয়া যাবে। পৃথিবীতে বর্তমানে যে দেড়শত কোটি মুসলিম বাস করে। আধুনিক কালের ফির্কা সমূহের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আজ মুসলিম বিশ্ব দুটি ধারায় বিভক্ত। তাদের একটি হল শিয়া আর অপরটি হল সুন্নি। উভয়ই ধারাই ইসলামের মূল ধারা হিসেবে দাবি করে থাকে। অথচ শিয়াদের সাথে ইসলামের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাদের আকিদা বিশ্বাস ইসলাম থেকে যোজন বিয়োজন দুরে। ইসলামের শুরু থেকে অদ্যাবধি মক্কা মদিনায় ইসলামের মূলধারা বিদ্যমান আছে। সুদূর পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইসলামের নামে কি হচ্ছে, কি আকিদা পোষণ করছে, কি ইবাদত তৈরি করছে, কি অনুষ্ঠান পালন করছে? তা জানলে আপনার ঘৃণাই প্রকাশ পাবে। তাদের আকিদা বিশ্বাস জানলে আপনি কখন তাদের মুসলিম ভাবতে পারবেন না।  অন্যান্য ধর্মমতের মত তাদের মতকে শীয়া মতবাদ বলা হয় যা ইসলাম থেকে বহু দুরে। তবে সমস্যা হয় তাদের শীয়া মতবাদের সকল কাজগুলি ইসলাম বলে চালিয়ে দেয়, তখন তো ইসলামে আত্ম মর্যাদার জন্য অবশ্যই হানিকর। শিয়ারা যে বাতিল ফির্কা তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু আমরা যারা সুন্নি দাবি করি তারাও আজ শত শত দলে বিভক্ত। সবাই আজ নিজেদের “”আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআহ” (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআহ” এর অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করছি। কিন্তু কে সত্যিকারের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআহ” এর দলভুক্ত? সুন্নিদের সকল ফির্কার অনুসারীগণ নিজেদের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআহ” এর সঠিক অনুসারী দাবি কারে থাকে তার কারণ একটি হাদিসে এসেছে।

মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দণ্ডায়মান হলেন, অতঃপর বললেন-

أَلَا إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَهِيَ الْجَمَاعَةُ.

জেনে রেখো! তোমাদের পূর্ব যুগের আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এই উম্মত অচিরেই তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে বাহাত্তর দলই জাহান্নামে যাবে, আর একটি মাত্র দল যাবে জান্নাতে, সে দলটি হল জামআত।  সহিহ তারগিব ওয়াত তাহরিব : ৫১ হাদিসের মান সহিহ, সহিহাহ : ৪০৪-৪১৪

আরেকটি হাদিসে এসেছে-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ‏ “‏ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلاَنِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ مُفَسَّرٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ مِثْلَ هَذَا إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ ‏.‏

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উম্মতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামি হবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবিগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮

প্রথম হাদিসে একমাত্র দলের নাম উল্লেখ করে জামআত বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদিসের ভাষ্য মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ  বলেন, একমাত্র আমি এবং আমার সাহাবিদের মতের অনুসারী দল। তাই এই উম্মতের সুন্নি মুসলিমগণ সে জামআত এর নাম দিয়েছেন- ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। অর্থাৎ যে যত বেশী রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তার সাহাবিদের (রা.) অনুসরণ করবে সে তত বেশী “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর অনুসারী হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন, যে যত বেশী বিদআত চালু করছে এবং সাহাবিদের (রা,) আমলের বিরোধিতা করছে, সে তত বেশী “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর অনুসারী দাবি করছে। আবার কেউ তো দলের নাম রেখেছেন “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। আসলে “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” কোন দলেন নাম নয়, এটা হল এক দল মুসলিমদের উপাধি যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একনিষ্ঠ অনুসীরি এবং তাদের অনুসরণের মানদণ্ড হল সাহাবিগণ। যারা সত্যিকার অর্থেই “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। বর্তমানে তারাও বহু নামে বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্বের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর বিভক্তির খতিয়ান বেশ লম্বা। শুধু ভারত উপমহাদেশের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” দাবিদার মুসলিমগণ বহু ফির্কায় বিভক্ত। উপমহাদেশের শিয়া ও তাদের শাখাসমূহ ব্যতীত, যারা “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” দাবিদার তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত। কোন কোন গবেষক এই ফির্কার সংখ্যা লক্ষাধিক বলেছেন।

এই সকল ফির্কার উৎপত্তি, আকিদা, আলম এবং তাদের অনুসারী সম্পর্ক জানতে পারলে, আপনি অনায়াসে বুঝে যাবেন “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর সাথে তাদের কার কত টুকু সম্পর্ক আছে।

অপর পক্ষে মাজহাব অনুসারে হানাফি মাজহাব, শাফিঈ মাজহাব, মালেকি  হাবহাব এবং  হাম্বলি  মাজহাব নামে চারটি ভাগে বিভক্ত। আবার তরিকার নামের আজ আমরা বিভক্ত। অনুসন্ধানে জানা যায় এই মাযহাবের বিভাজন সম্পর্কে মাযহাবের ইমামগণ কিছুই জানেন না। তরিকার ব্যাপারটি প্রায় একই ধরনের। অধিকাংশ তরিকা প্রতিষ্ঠাতা হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। প্রাথমিক যুগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন দশায়  ইসলাম ধর্মের মাঝে কোনো বিভক্তি ছিল না। ইসলাম বিস্তারের সাথে সাথে (আরব বাদে) বিভিন্ন স্থানের মানুষ ইসলামকে বিভিন্নভাবে বুঝতে থাকে এবং বিভিন্ন আকিদা প্রষোণ করতে থাকে। আকিদার ভিন্নতার দরুন তাদের আমল আখলাকে ও ভিন্নতার ছাপ লক্ষ করা যায়। আস্তে আস্তে মুসলিমদের মাঝে মত পার্থক্যও প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। এমনিভাবে ইসলাম ভেঙ্গে হাজার হাজার ধর্মের উদ্ভব ঘটে। রাত দিন শত শত তরিকার কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাফালা হলেও তাদের মাঝে ছয়টি সুফিবাদি তারিকা বেশ প্রসিদ্ধ।

প্রসিদ্ধ এই তরিকাগুলো হল-

ক.  কাদেরিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা আবদুল কাদির জিলানি ৫৬১ হি.)

খ.  চিশতিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি ৬৩৩ হি.)

গ. মাইজভান্ডারিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ১৯০৬ খৃ.)

ঘ. নকশবন্দিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী ৭৯১ হি.)

ঙ. মুজাদ্দিদিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দী মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানি ১০০৭ হি.) এবং

চ. সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ৬৮১ হি.)।

এমনি ভাবে তরিকার নামেও শত শত ফির্কার উদ্ভব ঘটেছে। এক এক জন ব্যক্তির আন্দাস এবং অনুমানের উপর ভর করে সৃষ্টি হয়েছে এই সকল তরিকা। এদের আমল ও আকিদা ইসলাম থেকে বহু দুরে। 

ইসলামে কি এই ধরনের ফির্কা সৃষ্টির অনুমতি আছে?

ইসলামে ধর্মের মাঝে এমনিভাবে তরিকার নামে, মাযহাবের নামে, ব্যক্তির নামে, গোষ্ঠীর নামে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামে ধর্মের মাঝে এই ধরনের ফির্কা সৃষ্টির ন্যূনতম স্থান বা অনুমতি নেই। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায় ইসলামে বিভক্তি, ফির্কাবাজি বা দলাদলি করা সম্পূর্ণ হারাম। তার পরও ফির্কাবাজি বা দলাদলি চলছে। হাজার হাজার নজর কাড়া, মন ভুলান নামে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ফির্কা। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ লোকগুলি ফির্কার যাতা কলে পড়ে বিদআতি এবং শির্ক মিশ্রিত আমল করে ইমান হারাচ্ছে। অথচ ইসলামে ফির্কাবাজি বা দলাদলির কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের যে সত্য দ্বীনে দান করেছে তার মাঝে ঐক্য বিনষ্ট করতে তিনি (আল্লাহ) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। নবি মুহাম্মাদ ﷺ বিভিন্ন হাদিসেও ঐক্য বিনষ্ট করতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসের গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করলে বিভক্তির খারাপ দিকগুলি ফুটে উঠার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক ভবিষ্যৎ বাণী পাওয়া যাবে, যেখানে তিনি উম্মতের মাঝে ব্যাপক মতবিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মতবিরোধ হবে বলে উল্লেখ করেছেন মাত্র, তিনি মতবিরোধ করতে বলেননি। তিনি শুধু উম্মতকে সতর্ক করা জন্য বলেছেন যে, আমার পরবর্তী কালে তোমাদের মাঝে মতবিরোধ হবে কিন্তু যারা এই বিরোধ থেকে মুক্ত থাকবে তারাই সফলকাম। এই মতবিরোধ থেকে বেচে সফলকাম হতে হলে কি কাজ করে হবে তারও বিস্তারিত বিবরণ তিনি বলেছেন। এমনই একটি উপদেশ মুলক হাদিস উল্লেখ করছি।

ইরবাজ ইবনু সারিয়া (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নসিহত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন। তিনি ﷺ বলেন-

عَلَيْكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا وَسَتَرَوْنَ مِنْ بَعْدِي اخْتِلاَفًا شَدِيدًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَالأُمُورَ الْمُحْدَثَاتِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, হাফসি গোলাম আমির হলেও তার কথা শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্মক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২, সুনান তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ : ১৬৬৯২, দারিমী : ৯৫

এই হাদিসে উম্মতের দলাদলি বা ফির্কাবাজী করার ইঙ্গিত পাই। তিনি বিভিন্ন দলে ভাগ হবে বলেছেন কিন্তু ভাগ হতে বলেন নি। উম্মতের অনৈক্য সৃষ্টি করে ফির্কা তৈরি করার সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আলোকে আলোচন করব। কুরআন ও হাদিসে ফির্কা সৃষ্টির অপকার এবং শাস্তি সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। আবার যারা ফির্কা সৃষ্টি না করে মিলেমিশে থাকবে, তাদের জন্য মহান আল্লাহ ইহকাল ও পরকালের পুরস্কারের কথা উল্লেখ আছে। মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক বাণী জানতে পারলে খুব সহজেই ফির্কাবাজি বা দলাদলির কুফল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারব। কুরআন সুন্নাহ আলোকে ফির্তবাজির কুফলগুলো উল্লেখ করা হল।

ফির্কাবাজি বা দলাদলির ফলে কুফল-

১। মতবিরোধ করে দ্বীনে বিভক্তির সৃষ্টিকারীদের হত্যার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে

এই সম্পর্কে প্রথমেই সুনানে নাসায়ি এ বর্ণিন একটি হাদিস লক্ষ করুন-

أَخْبَرَنِي أَحْمَدُ بْنُ يَحْيَى الصُّوفِيُّ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ قَالَ: حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ مَرْدَانِبَةَ، عَنْ زِيَادِ بْنِ عِلَاقَةَ، عَنْ عَرْفَجَةَ بْنِ شُرَيْحٍ الْأَشْجَعِيِّ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَخْطُبُ النَّاسَ، فَقَالَ: «إِنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ، فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ، أَوْ يُرِيدُ يُفَرِّقُ أَمْرَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَائِنًا مَنْ كَانَ فَاقْتُلُوهُ، فَإِنَّ يَدَ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ يَرْكُضُ»

আরফাজা ইবন শুরায়াহ আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত, আমি নবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে মিম্বরের উপর লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে দেখেছি। তিনি বলছিলেন, আমার পরে অনেক ফিতনা দেখা দেবে, এসময় তোমরা যাকে দেখবে মুসলমানদের দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, অথবা উম্মতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছে; সে যে-ই হোক না কেন, তাকে হত্যা করবে। কেননা আল্লাহ্ তা’আলার রহমতের হাত মুসলমানদের দলের উপর থাকবে। আর যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে পৃথক হয়ে যায়, শয়তান তার সাথি হয় এবং তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়। সুনানে নাসায়ি : ৪০২০, সহিহুল জামে : ৩৬২১

আরফাযা ইবন রায়হ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَرَفَعَ يَدَيْهِ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُرِيدُ تَفْرِيقَ أَمْرِ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُمْ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنًا مَنْ كَانَ مِنْ النَّاسِ

আমার পরে নিশ্চয়ই অনেক ফিতনা-ফাসাদ হবে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বললেন, তখন তোমরা যাকে দেখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ইচ্ছা করছে, অথচ তারা একতাবদ্ধ; তখন তোমরা তাকে হত্যা করবে, সে যে-ই হোক না কেন। সুনানে নাসায়ি : ৪০২১, সহিহুল জামে : ৩৬২২

মহান আল্লাহ বলে,

إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُواْ أَوْ يُصَلَّبُواْ أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْاْ مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থ : যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। সুরা মায়েদ : ৩৩

সুরা মায়েদার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুনানে নাসায়ির ৪০২৩ নম্বর হাদিসের বলা হয়-

أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ قُدَامَةَ قَالَ: حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ، عَنْ زِيَادِ بْنِ عِلَاقَةَ، عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا رَجُلٍ خَرَجَ يُفَرِّقُ بَيْنَ أُمَّتِي، فَاضْرِبُوا عُنُقَهُ»

উসামা ইবন শরীক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির তৎপরতা চালাবে, তার গর্দান উড়িয়ে দাও। সুনানে নাসায়ি : ৪৬২৩

২। মতবিরোধ করে ফির্কা সৃষ্টিকারীদের থেকে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দায় মুক্তি :

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের উদ্দেশ্যই হল মানুষ জাতির হিদায়দের পথ প্রদর্শন করা। কিন্তু মানুষ জাতি যখন মুশরিকদের স্বভাব ধারণ করে ইসলামি দ্বীনের মাঝে  ফাটল ধরিয়ে টুকরা টুকরা করবে তখন মহান আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দ্বীনে বিভক্তি সৃষ্টিকারীদের থেকে দূরে রাখবেন। অর্থাৎ যারা দ্বীনে অনৈক্য সৃষ্টি করবে মহান আল্লাহ তাদের দায়িত্ব থেকে তার নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মুক্ত ঘোষণা করছেন।

 আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থঃ যারা নিজেদের দিনকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে নিঃসন্দেহে তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই৷  তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রয়েছে৷ তারা কি করেছে, সে কথা তিনিই তাদেরকে জানাবেন৷  সূরা আন‘আম : ১৫৯

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ফার্রাকু (فَرَّقُوا) শব্দটির ব্যবহার করেছেন যার অনুবাদ করা হয়েছে, ধর্মের নামে বিভক্ত করা। দ্বীনকে বিভক্ত করলে তার দায় থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বাধীন হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে ভীষণ বিপদের সময় মহান আল্লাহর অনুমতি ক্রমে তার প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের সাফায়েত করে জান্নাত প্রদানের জন্য মহান আল্লাহর নিকট অনুরোধ করবেন। মহান আল্লাহরও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুপারিশে হাজার হাজার পাপী মানুষকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবেন। কিন্তু যারা দ্বীন মাঝে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করবে তাদের দায়িত্ব বা সুপারিশ থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায় মুক্ত থাকবেন। মহান আল্লাহর এহেন সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মুসলমানগণ আজ ধর্মের নামে, নেতার নামে, দলেন নামে, পীরের নামে, মাযহাবের নামে, তরিকার নামে, কুরআনের নামে হাদিসের নামে বিভক্ত হচ্ছে।

৩।  দ্বীনে নিয়ে বিরোধে লিপ্ত হলে কঠিন শাস্তির ঘোষণা :

মহান আল্লাহ দ্বীনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করছেন এবং তিনি এর জন্য শাস্তির ও ঘোষণা করছেন। ইসলাম ধর্মের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি করা হারাম ও কবিরা গুনাহর কাজ।  মহান আল্লাহ বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

এবং তাদের মতো হয়োনা যাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পর মতভেদে লিপ্ত রয়েছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। সূরা আল-ইমরান : ১০৫

এই আয়াতে মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী নবিদের উম্মাতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, তারা সঠিক দ্বীন পেয়েছিল কিন্তু তারা সঠিক দীনের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করছিল। তাদের নিকট মহান আল্লাহর নিকট থেকে সত্য, সঠিক, সরল ও সুস্পষ্ট  ধর্ম এসেছিল তারা তা থেকে শিক্ষাও লাভ করেছিল। কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর দীনের মূল বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে দীনের সাথে সম্পর্কবিহীন গৌণ ও অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি বিষয়াবলির ভিত্তিতে নিজেদেরকে একটি আলাদা ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে দিয়েছিল। তারপর অবান্তর ও আজেবাজে কথা নিয়ে এমনভাবে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, আল্লাহ তাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন তার কথাই তারা ভুলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাস ও নৈতিকতার যে-সব মূলনীতির ওপর আসলে মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, তার প্রতি কোন আগ্রহই তাদের ছিল না। এই সকল লোকদেরকে মহান আল্লাহর আজাব ভোগ করতে হবে।

৪। মতবিরোধ করা একটি পার্থিব আজাব

সে সকল মানুষ সত্য দ্বীন থেকে বিমুখ, তারাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে আর নিজেদের মাঝে মারামারি, খুনাখুনি ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হবে। আমরা জানি ভূমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছাস, সুনামি, ঝরঝঞ্চা, মহামারি ইত্যাদি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠান ইহকালের আজাব। একটি মাত্র ঝট্‌কা তোমাদের সমগ্র জনপদকে ধূলিস্মাত করে দেবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মহান আল্লাহ আনিত দ্বীনকে অস্বীকার করলে ইহকালে মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে একদল দিয়ে অন্য দলকে শাস্তি দিবেন। তার শান্তি এমন যে, মানুষ বিভিন্ন নিজেদের মধ্যে এমন শত্রুতা জন্ম দিবে যার ফলে বছরের পর বছর ধরে রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে না। যখন দেখবে দেশে দেশে, গোত্রে গোত্রে, জাতিতে জাতিতে, মুসলিম মুসলিমে, ভাই ভাইয়ে বিবাদে লিপ্ত তখন বুঝবে এটা মহান আল্লাহ কর্তৃক পাঠান আজাব। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ هُوَ الْقَادِرُ عَلَى أَن يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِّن فَوْقِكُمْ أَوْ مِن تَحْتِ أَرْجُلِكُمْ أَوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعاً وَيُذِيقَ بَعْضَكُم بَأْسَ بَعْضٍ انظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الآيَاتِ لَعَلَّهُمْ يَفْقَهُونَ

অর্থঃ বলুন, তিনিই শক্তিমান যিনি তোমাদের উপর কোন শাস্তি উপর দিক থেকে অথবা তোমাদের পদতল থেকে প্রেরণ করবেন অথবা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে সবাইকে মুখোমুখি করে দিবেন এবং এককে অন্যের উপর আক্রমণের স্বাদ আস্বাদন করাবেন। দেখ, আমি কেমন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিদর্শনাবলি বর্ণনা করি যাতে তারা বুঝে নেয়। সুরা আনয়াম : ৬৫ 

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামের মাঝে আজ যে আমরা দলাদলি দেখতে পাচ্ছি তা আমাদের প্রতি মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে পাঠান আজাব মাত্র। এই আজাব থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হল কুরআন সুন্নাহর আলোকে তাওহীদের ভিত্তিতে সকলকে এক হয়ে যাওয়া।

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ فَقَالَ الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ

নুমান বিন বাশীর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছেন, জামায়াত (ঐক্য) হল রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা (মতবিরোধ) হল আজাব। হাদিস সম্ভার : ১৮৪৪, সহিহুল জামে : ৩১০৯, কিতাবুস সুন্নাহ, শায়বানী : ৮৯৫

৫। মুশরিকদের স্বভাব অর্জন করা

কুরআনুল মাজিদে মহান আল্লাহ মুশরিকদের অনেক শিরকই কাজের পাশাপাশি ধর্মের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে ধর্মকে টুকরা টুকরা করার মত স্বভাবটিও উল্লেখ করেছেন। ধর্মের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করা নিঃসন্দেহে একটি মন্দ কাজ। মতবিরোধ বা বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্ম টুকরা টুকরা হয়ে যায়। মহান আল্লাহর দ্বীনকে টুকরা টুকরা মুশরিকি স্বভাব হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিন ইরশাদ করেন-

وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِڪِينَ.  مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَڪَانُواْ شِيَعً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ

অর্থঃ তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে এবং যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়েই খুশি। সূরা রুম : ৩১-৩২

এই আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা মুশরিকগণ তাদের দ্বীনে বিভক্তি সুষ্টি করছ। মুশরিকদের বিভক্তির কারণ হল, তাদের নিকট সঠিক তাওহীদের জ্ঞান ছিল না। দুনিয়ায় যতগুলো ধর্ম পাওয়া যায়, তার সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছে আসল বা ঐশী দ্বীনের বিকৃতি সাধনের মাধ্যমে। এ বিকৃতি আসার কারণ হল, বিভিন্ন ব্যক্তি প্রাকৃতিক সত্যের ওপর নিজেদের নতুন নতুন কথা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের জন্য এক একটি আলাদা ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। মুশরিকদের মত আজ মুসলিমগণও ধর্মের মাঝে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি করছে এবং তারা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ নিয়েই সন্তুষ্টও বটে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 وَإِنَّ هَـٰذِهِۦۤ أُمَّتُكُمۡ أُمَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ وَأَنَا۟ رَبُّڪُمۡ فَٱتَّقُونِ (٥٢) فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَہُمۡ زُبُرً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٥٣) فَذَرۡهُمۡ فِى غَمۡرَتِهِمۡ حَتَّىٰ حِينٍ (٥٤)

অর্থঃ তোমাদের এই দীন তো একই দীন। আর আমি তোমাদের রব, অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর। তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দ্বীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল। সুতরাং কিছুকালের জন্য তাদেরকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকতে দাও। সুরা মুমিনুন : ৫২-৫৪

সকল যুগে সমগ্র মানব জাতি একই দল ও একই মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের কার্যকলাপ তাদের মধ্য বিভেদের সৃষ্টি করছে। তারা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে চলত এবং নিজেদের মাঝে ফির্কার সৃষ্টি করে ফির্কা বন্দী জিবন যাপন করতে। পূর্বে দুনিয়ায় যত নবি রাসূল এসেছিল তারা সবাই একই দীন ও জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন। তাদের সকলের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তারা সকলে কেবলমাত্র এক ও একক আল্লাহ দিতে মানুষকে আহ্বান করতেন। সকল নবি একই ধর্ম নিয়ে এসেছে তাদের সকলের ধর্ম ছিল ইসলাম। অথচ মুশরিকগণ তাদের কার্যকলাপ বা স্বভাব দ্বারা দ্বীনে বিভক্তি সৃষ্টি করে ছিল। এই মর্ম মহান আল্লাহ বলেন-

*وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ كُلٌّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ* إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ

অর্থঃ তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের। একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার বন্দেগি কর। এবং মানুষ তাদের কার্যকলাপ দ্বারা পারস্পরিক বিষয়ে ভেদ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকেই আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।  সুরা আম্বিয়া : ৯২-৯৩

৬। পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ ও হিংসা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছ

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، وَلاَ تَحَسَّسُوا، وَلاَ تَجَسَّسُوا، وَلاَ تَنَاجَشُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا ‏”‏‏.‏

তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে চলো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পরকে ধোঁকা দিও না, আর পরস্পরকে হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করো না। বরং সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৬

আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ تَبَاغَضُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا، وَلاَ يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ ‏

তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তিন দিনের অধিক তার ভাইকে ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয়। সহিহ বুখারি : ৬০৬৫, ৬০৭৬,সহিহ মুসলিম  : ২৫৫৯

ফির্কাবাজি বা দলাদলি পরিত্যাগ করার সুফল

১। ফির্কাবাজি পরিত্যাগ করলে সকলের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন।

২। দ্বীনের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি না করা সকল নবীর সুন্নত।

১। মতবিরোধ পরিত্যাগ করলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে আল্লাহ সকলের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন-

মতবিরোধ পরিত্যাগ করলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে মহান আল্লাহ পরস্পরের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দেন। ইসলামের আগমেনর পূর্বে আরববাসীরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা, কথায় কথায় ঝগড়া বিবাদ এবং রাতদিন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের লেগেই থাকত। কোন কোন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ তো বছরের পর বছর ধনে চলত। এমন কি মৃত্যুর সময় সন্তানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অসিয়ত করে যেত। আওস ও খাযরাজ দু’টি গোত্রে বছরের পর বছর যুদ্ধ করেছিল। তারা ছিল পরস্পরের রক্ত পিপাসু। তাদের এই যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের কে ধ্বংসের কবলে নিক্ষিপ্ত করছিল। তাদের এই মর্মান্তিক অবস্থা এক মাত্র কারণ ছিল অনৈক্য বা নিজের মাঝে মতবিরোধ। এই চরম অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করে ছিল ইসলাম। তাদের মধ্যে থেকে যারাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, মহান আল্লাহ তাদের সকলের আন্তরে মিল মহব্বত ঢেলে দিয়েছিল। যার ফলে তারা একে অপরের ভাই বা বন্ধু হয়ে যায়। ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পরের মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন, যদি আদম সন্তান তার রজ্জুকে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধভাবে তার দ্বীন ধারণ করে তবে তিনি তাদের মধ্যে শত্রুতার পরিবর্তে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا

অর্থঃ “তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর ঐক্যবদ্ধভাবে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ্ তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন। সুরা আল-ইমরান : ১০৩

ইসলাম কে  আল্লাহর একটি রজ্জু সাথে তুলনা করেছেন। মহান আল্লাহ তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ প্রদান করছেন। আল্লাহর রজ্জু বলতে তাঁর দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর দ্বীনকে রজ্জুর সাথে তুলনা করার কারণ হয়েছে। ইসলামি দ্বীনের প্রতি ইমান আনার সাথে সাথে তাদের মাঝে একটি ঈমানি শক্তির সৃষ্টি হয়।

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবি করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রা.) আমাদের সামনে খুতবাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাঁড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমার সাহাবিদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ যমানা), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোনো মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি :২১৬৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৩৬৩

২। দ্বীনের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি না করা সকল নবীর সুন্নত-

পৃথিবীতে যত নবি রসূলই আগমন করেছেন তাঁরা সবাই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। তাদেরকে দ্বীন কায়েম করা পাশাপাশি দ্বীনে বিভেদ বা দালালি সৃষ্টি না করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

অর্থঃ তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না।” (সূরা শুরা ৪১:১৩)।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ পাঁচ জন নবি আলাইহিস সালামের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, আমি তাদের সকলকে এক ও অভিন্ন দ্বীন দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছি। শুধু তাই নয় পৃথিবীতে যত নবী-রসূলই আগমন করেছেন তাঁরা সবাই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। নমুনা হিসেবে এমন পাঁচজন মহান নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যাঁদের মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষ সুবিখ্যাত আসমানি শরীয়তসমূহ লাভ করেছে। এই আয়াতে আলোকে বুঝা যায় মহান আল্লাহ তাদের দুটি নির্দেশ প্রদান করেছেন। এক. দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা। দুই. দ্বীনে মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে পরস্পর ভিন্ন না হয়। সকল নবিদের কাজই ছিল মহান আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন কায়েম করা। আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, দ্বীনে বিভেদের সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে।

দ্বীনে বিভেদ পরিহার করা সকল নবিদের সুন্নত। সকল নবীকে মহান আল্লাহ এ বিষয়টি পরিহার করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। পূর্ববর্তী উম্মাতগুলোর মতভেদ ও বিভক্তি প্রসঙ্গে কুরআন কারিমে বারবারই বলা হয়েছে যে, জ্ঞানের আগমনের পরেও তারা বাড়াবাড়ি করে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ

অর্থ: তাদের নিকট ইলম আগমনের পরে পারস্পরিক বাড়াবাড়ি করেই শুধু তারা দলাদলি করেছে।” সূরা শূরা : ১৪

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : প্রথম পর্ব (১-২)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উম্মতের মতবিরোধ এই উম্মতের একটা রড় ক্ষতির কারণ। আলোচনার শুরুতেই খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকবে মতবিরোধের মূল কারণসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করা। একজন ডাক্তার প্রথমত রোগীর রোগ নির্ণয় করে, তার পরই তার রোগের জন্য সঠিক ঔষধ প্রদান করেন। কাজেই এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ হল মতবিরোধ সৃষ্টির কারণ জেনে তার প্রতিকার করার প্রয়োজনীয় উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা। মতবিরোধের কারণ, প্রতিকার সম্পর্কে নিরপেক্ষ জ্ঞান অর্জন করতে পারলে বা এই সম্পর্কে আসল সত্য চোখের সমানে প্রকাশিত হলে সরল ও সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া সহজ হবে।

সাধারণত মতভেদ থেকে শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন ফির্কা বা দলের, যারা মূল ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। আর এই বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া কে বলা হয় ইফতিরাক। কিন্তু আকিদা হোক বা ফিকহি মাসলা মাসায়েল হোক উভয় ক্ষেত্রে ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া ইসলামি শরিয়তে একটি হারাম কাজ। যেহেতু, ইখতিলাফ বা মতভেদ হল ইফতিরাক বা বিভক্তির অন্যতম কারণ। তাই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ইখতিলাফ বা মতভেদ একটি মানবীয় প্রকৃতি। কখনোই দুজন মানুষ  শতভাগ একমত প্রকাশ করতে পারেন না। এই জন্যই ইসলামে পরামর্শের বিধান রাখা হইয়াছে। ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয। কিন্তু ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া সকল অবস্থায়ই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

অর্থাৎ : আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।  (সূরা আল ইমরান ৩: ১০৩)।

সমাজে আমরা প্রায়ই সর্বত্রই মতভেদ দেখতে পাই। সকল মতভেদ খারাপ নয়। মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে না তখন তা খারাপ নয়। সাহাবিগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মার ইমাম ও আলিমদের মধ্যে ‘মতভেদ’ বা ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা বা ইফতিরাক ছিল না। ইখতিলাফকারী আলিম নিন্দিত নন, বরং তিনি ইখলাস ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রশংসিত ও পুরস্কার-প্রাপ্ত। মুজতাহিদ ভুল করলে একটি পুরস্কার ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে দুটি পুরস্কার লাভ করেন।

মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে তখন তা চূড়ান্তভাবে নিন্দনীয়। এরও কারণ আছে মানুষ যখন নিজের মতামত কে নির্ভুল জ্ঞান করে আর অন্যদের ভ্রান্ত ভাবে তখনই শুরু হয় বিরোধ। বিরোধ থেকে শুরু হয় বিভক্তি বা দলাদলি। তাই যে মতভেদ বিভক্তি বা দলাদলির সৃষ্টি করে তা পরিহার করা সকলের কর্তব্য। এ লক্ষ্যে আমাদের কুরআন সুন্নাহ মাফিক জীবক পরিচালিত করতে হবে। আর এটাই হল, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সা.) এর শেখান মূলনীতি।

নিজেদের কুসংস্কার, কল্পনা, বিলাসিতা, আন্দাজ-অনুমান ও নিজেদের দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার ছাঁচে ফেলে তার আকীদা বিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে। কখনও কখনও কাঁট ছাঁট করে দ্বীন ধর্ম পুরোপুরি বিকৃত করে দিয়েছে। অনেক নতুন বিষয় উদ্ভাবন করে তার সাথে জুড়ে দিয়েছে মনগড়া যতসব আমল ও বিশ্বাস। ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছে। গুরুত্বপূর্ণকে গুরুত্বহীন ও গুরুত্বহীনকে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে দিয়েছে।

যুগে যুগে বহু নবী-রসূল আল্লহর মনোনীত দ্বীন দীন প্রচার করেছেন। তাদের দেখান পথ অনুসরণ করে আমাদের পূর্ববর্তী মহান মনীষী ও বুযর্গগণ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত রেখে জীবনপাত করে গেছেন। পরবর্তীতে তাদের অনুসারিগণ তাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছেন। আবার কারো কারো প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং তাদের বিরোধিতা করেছে। এভাবে অসংখ্য ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে চলেছে। এভাবের বিরোধের মাধ্যমে সৃষ্টি প্রত্যেকটি ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব মানব সমাজকে কলহ, বিবাদ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত করেছে। এভাবে মানব সমাজ দ্বন্দ্বমুখর দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে চলেছে।

আমরা যদি মতবিরোধ করে নিজের সুবিধামতো দ্বীন পালন করি তা হলে, সত্যিকারের ধার্মিক লোকদের থেকে আলাদা হয়ে যাব। ধর্মের আকিদা আমল হবে কুরআন সুন্নাহর আলোকে। এখানে মনগড়া বিষয় নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া কোনো সুযোগ নাই। তারপরও সমাজের এক শ্রেণির সুসীল বুদ্ধিজীবী যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করে, তারা ধর্মকে নিজেদের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখে। তাদের উপর ধর্মের কোনো প্রভাব নাই। এই রকম বিভিন্ন মতের মানুষ ধর্মের নামে নিজেদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলে এবং প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজস্ব চিন্তাধারাকে অভ্রান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করে, ফলে ধর্মের মূল ঐক্য বিনষ্ট হয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে সমাজে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। উম্মার মতবিরোধ থেকেই মূলত বিভিন্ন ফির্কা বা দলের সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি

২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।

৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে পরের দুটি কারণ আলোচিত হলো :

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি-

আকিদা বা বিশ্বাসের উপরই ভর করে মুসলিমগণ আজ ফির্কাবাজি বা দলাদলিতে লিপ্ত। আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সংশয়ের স্থান নাই অথচ মুসলিমগণ আজ আকিদাকে সংশয়পূর্ণ করে বিভিন্ন ফির্কা তৈরি করেছে। মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে তার আকিদা বা বিশ্বাসের জম্ম নেয়। মানুষের জ্ঞানের উৎস হল, প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি। আধুনিক কালের সকল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক।

যৌক্তিক কোনো কাজ সহজে যে কেউ মেনে নেন। আর বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত কোন জ্ঞানতো সাথে সাথে মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামি আকিদার মূল হল অদৃশ্যে বিশ্বাস এখানে জাগতিক কোন বিষয় থাকলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করা যেত কিন্তু অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হলে অদৃশ্য থেকে প্রাপ্ত অহির উপর নির্ভর করতে হবে। অহী ভিন্ন যে কোনো উৎস থেকে আকিদা গ্রহণ করলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যে কোনোটাই হতে পারে। ইসলামি আকিদা বিশ্বাস সব সময় আল্লাহকে কেন্দ্র অদৃশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তাই ইসলামি আকিদার মূল উৎস হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক।

অদৃশ্যের একটি ব্যাপার হল কবরের আজাব। কবরে আজাব হবে এটাই সত্য। কিন্তু কাউকে যুক্তি দিয়ে কি কবরের আজাব বুঝাতে বা দেখাতে পাওয়ার। কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ক্যামেরা দ্বারা কি এই আজাব দেখাতে পারব। না, পাওয়ার না। এটা একটি গাইবের বিষয়, কুরআন সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে হবে। কোনো যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণের কোনো অবকাশ নাই।

অপর পক্ষে আমলের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এখানে কুরআন হাদিসের বাহিরে ইজমা কিয়াজের দরকার হয়। নতুন কোনো সমস্যা আসলে কিয়াস করে মাসায়েল দিতে হয়। যেমন- মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না।তাই কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস করে সমাধান দিতে হয়। কাজেই একটি কথা মনে রাখতে হবে-

لفَرْقُ الأَسَاسِيُّ بَيْنَ العَقِيدَةِ وَالفِقْهِ هُوَ أَنَّ الفِقْهَ قَدْ يَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ، لَكِنَّ العَقِيدَةَ لَا تَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ.

আকিদা ও ফিকহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নেই”।

এক কথায় বলে গেলে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট কোন রেফারেন্স ছাড়া আকিদা গ্রহণীয় নয়। যদি কেউ যুক্তি দিয়ে আকিদা বুঝাতে আসে তাকে সালাম জানাতে হবে। 

কুনআন সুন্নাহকে উৎস হিসেবে না নিলে আকিদার ভিন্নতা তো থাকবেই। আর বিভক্তির মূল কারণ হল আকীদা বা বিশ্বাসগত ইখতিলাফ বা মতভেদ। আকিদার মতভেদ কখনও মতভেদ হয়ে থাকেনি সব সময় মতবিরোধে রূপ নিয়েছে। কুরআন হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, এমন ফিকহি মাসলা মাসায়েলের ক্ষেতে ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয হলেও, আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মতভেদ জায়েয নেই। কারণ আকিদার ছয়টি বিষয় (আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, রাসূলগনের প্রতি বিশ্বাস শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস, তকদিরের  ভালো মন্দেন প্রতি বিশ্বাস) যার সবগুলিই গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত এবং গায়েব জানার জন্য অহির প্রয়োজন। যতি কেউ তার আকিদাকে অহি ভিত্তিক না করে, যুক্তি ভিত্তিক করে, তাহলে তার বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

আকিদার মতভেদ মুসলিমদের মাঝে এত প্রকট আকার ধারণ করছে যে, তাদের আকিদার মতভেদ আলোচনা করলে আলাদা গ্রন্থ রচনা হবে। আমি শুধু উপমহাদেশের প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যার মতবিরোধের কারণেই আজ উপমহাদেশে শত শত ফির্কার সৃষ্টি। 

এই গ্রন্থে বেশ কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা করার সাথে সাথে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক আকিদা তুলে ধরেছি। আকিদার মতভেদই যে ফির্কা সৃষ্টির অন্যতম কারণ সে কথাটা বুঝানোর জন্য অত্র গ্রন্থে বিস্তরিত না হলেও সংক্ষেপে কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আকিদার সম্পর্কে আলোচনার আগে একটা কথাকে মনে খোদাই করে লিখে রাখেন, “আকিদা গাইবের প্রতি বিশ্বাস, এই বিশ্বাস হবে অহী নির্ভর, কোন প্রকার যুক্তিতর্কের অবতারণা করা যাবেনা”।

আমি আমার ওয়েব সাইডে সঠিক আকিদা সম্পর্কি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত রেফারেন্সসহ উল্লেখ করেছি। যার লিংক হলো :

১.

২.

৩.

এখানে কিছু সঠিক আকিদার শিরোনাম তুলে ধরা হলো। এগুলোর উপর মতভেদের কারনেই মতোরিধের সৃষ্টি হয়। এফলে শত শত ফির্কার জন্ম হয়।

১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।

২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

 কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।

৩।  রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।

৪। রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

৫।  আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।

৬। নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

৮। রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।

৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।

১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না।

১১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।

১২। কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো– কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা শিরক।

১৩। দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একক মালিক মহান আল্লাহ, এ জন্য তার কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন নাই।

১৪। গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।

১৫। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পাওে না।

১৬। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখতে পারে না।

১৭। আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।

১৮। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পাওে না।

১৯। কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালাই এতমাত্র উত্তম ফয়সালাকারী।

২০। আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহই একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্তম উৎস।

২১। আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ তায়ালাই শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের একক মালিক।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম- নীতি, পদ্ধতি, নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই।

২২।  অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

২৩। অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

২৪। হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’  বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা তার সৃষ্টির মাঝে হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’ করে বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

২৫। অহেদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ আকিদায় বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা ও সৃষ্টির অজুদ বা অস্তিত¦ একই বলে বিশ্বাস করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

নোট : এ স্পষ্ট আকিদা বিশ্বাসগুলোই অনেক বিদআতি বিকৃতি করে তাদের পীর, মাশায়েখ, শাইখ, মুরব্বিদের ক্ষমতা বা হক হিসেবে বিশ্বাস করে। যার ফলে বিশুদ্ধ বিশ্বাসিদের সাথে মতরিরোধ হয়ে নতুন ফির্কার জম্ম হয়।

২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ

ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নাজিলকৃত সুমহান কুরআনের মহান বাণী, যার নাজিল শুরু হয়েছিল মক্কার হেরা গুহা থেকে আর শেষ হয়েছে মদিনায়। এই দীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী নাজিল হয় স্বয়ং সম্পূর্ণ ইসলামি জীবন বিধান। কিন্তু মক্কি জীবনে পবিত্র কুরআনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাজিল হলেও তার খুব সামান্য অংশই ছিল বিধি বিধান সম্বলিত এবং প্রায় সবটুকুই ছিল দ্বীনের মৌলিক বিষয় যেমন, আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, পরকাল, জান্নান, জাহান্নাম এবং পূর্ববর্তী জাতির ও তাদের প্রতি প্রেরিত নবি রাসুলদের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ। এই সময়কালে ইসলাম ধর্মের সঠিক বিশ্বাস, চলমান ধর্মেগুলির অসারতা প্রচার, মানুষের মাঝে সৎগুনাবলীর বিকাশ এবং সামাজিক কু-প্রথাগুলোর নিন্দা প্রচারই ছিল নাজিলকৃত কুরআনের মূল কথা। আহকাম সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত আয়াতই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরত করার পর থেকে নাজিল হতে থাকে এবং মাদানী জীবনের দশ বছর ব্যাপী তা চলতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীন বুঝেছেন এবং সেই অনুযায়ী পালন করছেন।

নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সময়ে একদিকে যেমন মানুষকে তাওহীদ, রেসালত ও আখেরাতে কথা বলে দাওয়াত দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম হাতে কলমে আমল শিক্ষা দিয়েছেন। তাই তো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের প্রচার  এবং আমল দুটি কাজে যুগপথ ভাবেই চলতে থাকে। প্রচারের জন্য সরাসরি দাওয়াত দিতেন, আর মাঝে মাঝে পত্রের মাধ্যমে দুরে দাওয়াত পাঠাতেণ। অর্থাৎ প্রচারের যতটুকু সুযোগ সুবিধা ছিল পুরটাই কাজে লাগাতেন, যদিও আধুনিক কালের মত এত প্রাচর মাধ্যমও ছিল না। আমলে ক্ষেত্রে নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি অনুসরণই একমাত্র মাধ্যম। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলতেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ সেভাবে সালাত আদায় কর। সাহাবিরা যেমন নতুন কোনো মানুষকে অজু শেখানোর সময় তাদের সামনে বসে অজু করতেন এবং বলতেন, এই ছিল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অজু। ইসলামের প্রতিটি বিধানই প্রাথমিকভাবে এর ধারক বাহকদের মাধ্যমে ব্যবহারিক তথা প্রায়োগিকভাবেই বিস্তৃত ও প্রচলিত হতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ যে হিকমা দান করেছে তার মাধ্যমে ইসলামি বিধান চলতে থাকল।  মহান আল্লাহ বলেন,

لَقَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ ۚ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ

অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। সুরা আল ইমরান : ১৬৪

মহান আল্লাহ তায়ালাই বলছেন ইসলামের যাবতীয় বিধান তার তরফ থেকেই আসে। এখানে মানব রচিত কোনো বিধান চলবে না। তিনি কুরআন নাজিলের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ও দান করেছেন হিকমা বা জ্ঞান। অর্থাৎ আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ এক ধরনের জ্ঞান দান করছেন, যার দ্বারা তিনি ও শরিয়তের বিধি বিধান মানব জাতির সামনে তুল ধরেছেন। যাকে আমরা তার হাদিস হিসাবে জানি।

হাদিসও এক ধরনের অহি যা মহান অল্লাহর তরফ থেকে আসে। মহান আল্লাহর বাণী তিনি বলেন,

وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ .-لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ . ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ .فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَـٰجِزِينَ

অর্থঃ যদি এ নবি নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷  তোমাদের কেউই (আমাকে) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ সুরা হাক্কাহ : ৪৪-৪৭

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণ আমনতদারী ও বিশ্বাসিকতার সাথে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করছেন, এবং আমাদের নিকট অবিকৃতভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তার বিকল্প ভাবার বা করার সামান্যতম অবকাশ তার ছিল না। এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী এখানে পরীক্ষার জন্য অল্প কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান। এই অবস্থানকালে কি ভাবে চললে  এবং  কি আমল করলে কৃতকার্য হওয়া যাবে, তারই একটি দিক নির্দেশনা হল কুরআন ও হাদিস।  তাইতো কুরআন ও হাদিসে যেমন ইবাদতের নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন তেমনি দিয়েছেন পার্থিব আইন কানুনের বিধি বিধান।

মহান আল্লাহ বাণী ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঠিক দিক নির্দেশনা থাকার কারণে সাহাবিদের মাঝে কোন মতভেদ ছিল না। যদি কোনো বিষয় মতভেদ দেখা যেত সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা নিয়ে নিতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে মুজতাহিদ আলেমগন ফিকহি অনেক বিষয় মতভেদ করেন। মুজতাহিদ ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত কুরআন-হাদিসের গবেষণা লব্ধ ব্যাখ্যা প্রদানে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কখন উভয়ের ইজতিহাদ পরস্পর বিরোধী কিন্তু উভয়ই সঠিক। আবার কখন একজন অপরজন থেকে কুরআন সুন্নার অধিক নিকটবর্তী। যে মতভেদ সাহাবিদের জামানা থেকে শুরু হয়েছিল তা তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ী, আম্মিয়ায়ে মুজতাহিদ হয়ে আজও বিদ্যমান আছে। ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ খারাপ নয় তা জায়েয। এই ইখতিলাফ বা মতভেদের জন্য মতবিরোধ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম কাজ। মুজতাহীদগনের ইজতিহাদি মতভেদ জায়েয কারণ তারা ভুল ইজতিহাদ করলেও সওয়াবের অধিকারী। আমাদের পূর্ববর্তী মুজতাহিদ আলেম, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) মৃত্যু ১৫০ হিজরী, ইমাম মালেক (রহ .) মৃত্যু ১৭৯ হিজরী, ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) মৃত্যু  ২০৪ হিজরী এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) মৃত্যু ২৪১ হিজরি তাদের সকলেম মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালবাসতের, দোয়া করতেন। তাদের মাঝে কোন কোন মতভেদ এমনও ছিল যে পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় তারা উভয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এই ফিকহি মতভেদই ইসলামের প্রস্থতা।  শুরু এ চার ইমাম নয়। আরও অনেক প্রসিদ্ধ ইমাম ছিল। যেমন- ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর নামে “ছাওরী’ মাজহাব, লাইছ ইবন সা’দ এর নামে “ লাইছী” মাযহাব এবং ইমাম আওযাই এর নাম “আওযাই” মাযহাব  প্রবর্তিত হয়। এই সকল মুজতাহিদ আলেম তৎকালীন সময়ে প্রখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। তারা ইমামদের মত এত বেশী খ্যাতি লাভ করতে পারে নাই। এই সকল মুজতাহিদ আলেমগণও মতভেদ করছেন। তাদের এ মতভেদ থেকে মুসলিমদের মাঝে আস্তে আস্তে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় যা তারা কখনও পছন্দ করতেন না। আর মতবিরোধের ফল এই মাযহাব। পূর্বের আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামের উত্স হিসাবে এক প্রাথমিক যুগে শুধু কুরআন এবং হাদিসকে বুঝায়।

বাতিল ফির্কা (শীয়া, কাদিয়ানি, ব্রেলভী) বাদে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বিষয় কারও কোন মতভেদ নেই। ফিকহি মাসায়েলে অনেক মতভেদ লক্ষ করা যায়। কুরআন-সুন্নাহ’র পরোক্ষ, অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগন নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কিছু বায় প্রদান করছে যাতে তাদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। যার ইজতিহাদ কুরআন সুন্নাহ অধিক নিকটবর্তী তার ইজতিহাদ অধিক গ্রহণীয়। আবার তাদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। তাদের এমন ভুল হাদিস না জানার কারণে (তার নিকট পৌঁছায়নি) হতে পারে। সহিহ হাদিস জানতে অথচ তিনি হাদিস বিরোধী ইজতিহাদ করেছেন এমনটা কষ্টিম কালেও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যখন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ হাদিসের বিরোধী হবে, যখন ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদিসের অনুসরণ করা ফরজ। পরবর্তী কালে সময়ের সাথে ইসলামকে তাল মিলিয়ে নিতে এবং নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে জন্য ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের উত্স পরিগনিত হয়। এভাবে সাহাবী, তাবেয়ী, এবং  তাবে তাবেয়ী যুগ থেকেই কুরআন সুন্নাহ আলোকে ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়। মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ করার কারণ হল-

(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ

(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ

(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-

(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ

(৫) জাল ও যঈফ হাদিসের কারণে মত বিরোধ

(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ

কুরআনের এমন আয়াত আছে যার ব্যাখ্যা হাদিস ছাড়া সম্ভব নয়। কুরআনে স্পষ্ট করেনি কিন্তু হাদিসে ব্যাখ্যায় স্পষ্ট। আবার এমন আয়াত বা হাদিস আছে যার একাধিক অর্থ গ্রহণ করা যায়। তাই কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদান বা ফিকাহ রচনার সময় মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।

যেমন- আলী বিন আবু তালেব (রা.) এবং আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রা.)-এর মতে, কোন গর্ভবতীর স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে চার মাস দশ দিন অথবা বাচ্চা প্রসবের দিন। এই দুই সময়ের মধ্যে দীর্ঘতম সময় পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করবে। অতএব যদি সে চার মাস দশ দিনের আগে বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে তাঁদের নিকট তার ইদ্দত পালনের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। [অর্থাৎ বাচ্চা প্রসব সত্ত্বেও তাকে ইদ্দত পালন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন দীর্ঘতম সময়]। আর যদি বাচ্চা প্রসবের আগে চার মাস দশ দিন শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাচ্চা প্রসব করা পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করতে থাকবে। (যেহেতু এক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসবের সময় হচ্ছে দীর্ঘতম সময়) কেননা আল্লাহপাক এরশাদ করেন,

وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ

 অর্থঃ আর তারা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করো৷ সূরা তালাক : ৬

অন্যত্র তিনি বলেন,

وَٱلَّذِينَ يُتَوَفَّوۡنَ مِنكُمۡ وَيَذَرُونَ أَزۡوَٲجً۬ا يَتَرَبَّصۡنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرۡبَعَةَ أَشۡہُرٍ۬ وَعَشۡرً۬ا‌ۖ

 অর্থঃ তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যায়, তাদের পরে যদি তাদের স্ত্রীরা জীবিত থাকে, তাহলে তাদের চার মাস দশ দিন নিজেদেরকে (বিবাহ থেকে) বিরত রাখতে হবে ৷ (বাকারা ২:২৩৪)।

উক্ত আয়াতদ্বয়ের মধ্যে ‘আম-খাছ ওয়াজ্‌হী’ এর সম্পর্ক। আর এমন সম্পর্কযুক্ত দুই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতি হল এমনভাবে হুকুম গ্রহণ করতে হবে, যাতে উভয় আয়াত বা হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। তবে তা করতে গেলে আলী ও ইবনু আববাস (রা.)-এর পদ্ধতি মেনে নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। কিন্তু সুন্নাত এসবের ঊর্ধ্বে। এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হাদিসে এসেছে-

عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ فَجَاءَتْ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَاسْتَأْذَنَتْه“ أَنْ تَنْكِحَ فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ.

৫৩২০. মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, সুবায়আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫৩২০, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪

সূরা তালাকের উক্ত আয়াতের অনুসরণ করব। আর এই আয়াতে আল্লাহর সাধারণ ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। এ কথা নিশ্চিতভাবে যে, যদি এই হাদিস আলী ও ইবনু আববাস (রা.) পর্যন্ত পৌঁছত, তাহ’লে তাঁরা নিশ্চয় তা মেনে নিতেন এবং নিজেদের মত ব্যক্ত করতেন না। এমন অস্পষ্ট বিষয়ে কোন প্রকার মতামত প্রদান করা থেকে বিরত থাকতেন।

(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ

 দুটি হাদিসই সহিহ অথচ দুটির হুকুম সম্পূর্ণ আলাদা। সুনান আবু দাউদ এমনই দুটি হাদিস পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। যার একটি হাদিস বলা হয়েছে, যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে। অপর হাদিসে বলা হয়েছে, পুরুষাঙ্গ তো একটি গোশতের টুকরা তাই স্পর্শ করলে অজু  করতে হবে না।

প্রথম হাদিস :

উরওয়া (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি কারণে অজু করার প্রয়োজন হয়? জবাবে মারওয়ান বলেন, পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তখন উরওয়া জিজ্ঞেস করেন, আপনি তা কীরূপে জানলেন? মারওয়ান বলেন, বুসরা বিনতে সাফওয়ান (রা) আমাকে জানিয়েছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-

‏ مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ ‏‏

যে ব্যক্তি নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে। সুনান আবু দাউদ : ১৮১

দ্বিতীয় হাদিস :

ক্বায়িস ইবনু তালক থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قَدِمْنَا عَلَى نَبِيِّ اللهِ صلي الله عليه وسلم فَجَاءَ رَجُلٌ كَأَنَّهُ بَدَوِيٌّ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللهِ مَا تَرَى فِي مَسِّ الرَّجُلِ ذَكَرَهُ بَعْدَ مَا يَتَوَضَّأُ فَقَالَ ‏”‏ هَلْ هُوَ إِلَّا مُضْغَةٌ مِنْهُ ‏”‏ ‏.‏ أَوْ قَالَ – ‏”‏ بَضْعَةٌ مِنْهُ ‏

আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন সম্ভাব্য এক বেদুইন ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তি অজু করার পর নিজ পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওটা তো তার শরীরের মাংসের একটি টুকরা বা অংশ মাত্র। সুনান আবু দাউদ : ১৮১

হানাফি মাযহাবের আলেমদের মতে যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে না। অপর পক্ষে হাম্বলি মাযহাব, সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমদের মতে পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে অজু করতে হবে। দুটি মতই সঠিক। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা জ্ঞান স্বল্পতার কারেন এই ধরনের প্রশস্ত মাসয়ালা নিয়া উম্মতের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-

আমাদের সমাজে প্রচলিত চার মাযহাবের ইমাম তো দূরের কথা তাদের পরবর্তী যুগ বা হাদিস সংকলনের যুগেও যারা হাদিস সংকলনের জন্য জীবন মরণ চেষ্টা করেছেন তাদের কেউই সকল হাদিস সংকলন করতে পাবে নাই। ২০০ হিজরি থেকে ৪০০ হিজরির মাঝেই প্রধান প্রধান হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়। এই সময় ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলীম, ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম ইবনে মাজাহ, ইমাম নাসাঈ এর মত জগৎ বিখ্যাত হাদিসের মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছে। তারা সকলে হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও বাছাই-ছাঁটাইর পর সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হাদিসের সমন্বয়ে উন্নত ধরনের গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করছেন। এই বিরাট ও দুরূহ কাজের জন্য যে প্রতিভা ও দক্ষতা অপরিহার্য ছিল, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহাতে ভূষিত হইয়াছে।  তারা ছয়খানি সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন। এই ছয়টি গ্রন্থ ছাড়াও আরও বহু হাদিসের গ্রন্থ সংকলন হয়েছে। যেমনি সহিহ ইবনে খোযায়মা, সহিহ ইবনে হাব্বান, মোস্তাদরেক ইবনে হাকিম, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মুহম্মদ, কিতাবুল আছার, মসনদে শাফেয়ী,  মসনদে আবূ ইয়ালী,  মসনদে আব্দুর রাজ্জাক, মোছান্নেফে আবূ বকর ইবনে আবী শায়বা, সুনানে দারে কুতনী,  সুনানে দারেমী, সুনানে বায়হাক্বী, মারেফাতু সুনানে বায়হাক্বী, মুজামুল কবীর তিবরানী, মুজামুস সগীর-তিবরানী,  মসনদে বাজ্জাজ,ক. মিশকাতুল মাসাবীহ, আত-তাগরীব ওয়াত তারহীব,আল-মুহাল্লা, রিয়াদুস-সালেহীন, মাসাবীহুস সুন্নাহ ইত্যাদি। এই হাদিসের গ্রন্থগুলির নাম উল্লেখ করার প্রধান কারণ হল- এই হাদিসের গ্রন্থ সংকলন কারি কোন মুহাদ্দিস এ দাবি করেননি যে, আমি সকল সহিহ হাদিস অথবা সকল জঈফ হাদিস পেয়েছি বা লিপিবদ্ধ করেছি। প্রমাণ করার চেয়ে দাবি করা অনেক সহজ হলেও কোন মুহাদ্দিস এমন দাবিও করেনি। তাহলে এ কথা দিবালোকের মত পরিষ্কার যে কোন মুজতাহিদ বা মুহাদ্দিস এককভাবে সকল হাদিস আয়ত্ত করে সংকলন করতে পারেনি। কিন্তু ৪০০ পর যখন সকল হাদিস সংকলনের কাজ শেষ হয়ে যায়, তখন থেকে মুহাদ্দিসগন কম পরিশ্রমে অনায়াসে বহু হাদিসের কিতাব পেয়ে যেতেন। আধুনিক কালে এক কাজ আরও অধিক সহতর হয়েছে।

কাজেই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে থেকে এককভাবে কেহ সকল হাদিস পেয়েছেন এ কথা বলা ঠিক হবেনা। চার ইমামদের মাঝ সবচেয়ে বেশী হাদিস সংকলন করেছেন ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল, তিনিও সকল হাদিস সংকলন করতে পারেনি। কোন মুজতাহিদ আলেম হাদিস না জানার কারণে যদি ইজতিহদ করে রায় দিতে পাবের। তখন তার রায় সঠিক বা ভুল দুটিই হতে পারে। কিন্তু সঠিক দলিল জানার পর ভুল ইজতিহাদ থেকে ফিরে আসা ওয়াজিব। কিন্তু বিপত্তি বাধে অনুসারীদের মাঝে। তাদের ভুল আমলের পরিবর্তে সঠিক দলিল প্রদান করলে তারা শুধু এই যুক্তিতে সঠিক দলিল ত্যাগ করে যে, আমাদের মুজতাহিদ কি কম বুঝেছে?

তাদের একটুকু জানা দরকার ছিলে যে, আমাদের অনুসারী মুজতাহিদ আলেম সকল হাদিস না পেতে পারে, হয়ত তিনি এই মাসায়ালাটি ইজতিহাদ করে প্রদান করছেন। এখন যখন সহিহ হাদিসের আলোকে মাসয়ালাটি জানতে পারলাম, তাই আমল পরিবর্তন করে সঠিক দিকে ফিরে আসি। এভাবে সঠকি আমল থেকে দুরে থাকার কারণে উম্মতের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। আর মতভেদ থেকে সৃষ্টি হয় মতবিরোধ। এইভাবে বিভক্তির কারণে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়।

(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন দশায় সাহাবিদের মাঝে মতভেদ হলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে সমাধান নিলে কোন  মতভেদ থাকত না। একক উত্স এবং একক বর্ণনাকারী থাকায় কোন প্রকার মতভেদ অবশিষ্ট থাকত না, তাই কোন ইজমা এবং কিয়াসের দরকার ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর শরীয়তের এমন অনেক সমস্যা দেখা দিল যার দিক নির্দেশনা সরাসরি কুরআন হাদিসে নেই। আবার সাহাবিদের ইজমা বা আমল দ্বারাও তার সমাধান করা যায় না। ঠিক এমন সময় মুজতাহিদ আলেমগন কুরআন সুন্নাহর আলোকে উক্ত সমস্যার সমাধান প্রদান করে। একই বিষয়ে বিভিন্ন মুজতাহিদের ভিন্ন ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। তাই মুজতাহিদ আলেমদের কিয়াস ইসলামের নামে নতুন কোনো বিধান রচনা না করলেও একটা মতভেদ সৃষ্ট করে। তাই ফিকহি মাসয়ালা সামায়েলে মতভেদ জায়েয করা হয়েছে। মুজতাহিদ আলেমদের জীবনীতে দেখতে পাই তারের মাঝে শত শত ফিকহি মতভেদ থাকলেও একে অপরকে ভালোবাসতেন তার জন্য দুয়া করতেন। 

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের আধুনিক জীবনের সাথে একাকার হয়ে জড়িয়ে আছে টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা। শুরুর দিকে টেলিভিশন জায়েয/নাজায়েয নিয়ে বহু আলোচনা  হয়েছে। ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে তরজমানুল কুরআন নামক পত্রিকায় মাওলানা মওদূদী (রহ 🙂 কতগুলি শর্ত সাপেক্ষে সিনেমা দেখা জায়েয বলে ফতোয়া প্রদান করেন। তার এই ফতোয়া প্রকাশের সাথে সাথে ভারত উপমহাদেশের প্রায় সকল আলেম এক যোগে প্রতিবাদ করে। অনেকে আগ বাড়িয়ে তাকে কাফির ফতোয়াও প্রাদান করে।  কিন্তু মজার ব্যাপার হল মাওলানা মওদূদী (রহঃ) শর্তগুলি দিয়া এখন প্রায় সকল আলেমই টিভি নয় সিনেমা দেখাও জায়েয বলছেন।

এর কারন হল টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জামানায় ছিলনা। তিনি এ সম্পর্ক স্পষ্ট কোর বক্তব্য রেখে যাননি। তাই এ সম্পর্ক মুজতাহিদ আলেমগন অশ্লীলতা, নারী, পর্দা, জিনা, নেষা, সময় অপচয়, শিক্ষা, উপকার, অপকার, সমাজিক অবক্ষয়, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং দ্বীন দুনীয়ার সামগ্রিক উপকারিতা ইত্যাদি বিবেচনা করে কুরআন হাদিসের আলোকে রায় প্রাদান করেছেন। সকলের চিন্তা চেতনা ও ইলমি গবেষণা সমান নয়, তার তাদের মাঝে কিয়াসের ভিন্নতা দেখা যায়।

একজন আধুনিক মুসলিম কখন ইন্টারনেট, মোবাইল এবং কম্পিউটার ছাড়া চলতে পারেনা। অনেক আলেমতো ইন্টারনেটকেই দ্বীন প্রচার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। কিন্তু  ইন্টারনেট অশ্লীলতার কথা বিবেচনা করে অনেক আলেম ইহা ব্যবহার হারাম বলেছেন। কোন কোন আলেম আবার শর্ত সাপেক্ষে ইন্টারনেরট ব্যবহার করতে বলেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যারা ইন্টারনেট এর অশ্লীলতা থেকে বাঁচতে চেয়েও যারা বাঁচতে পারেনা তাদের এই মাধ্যমে দ্বীন শেখা জায়েজ নয়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, গুগল ইত্যাদি ব্যবহার করে দ্বীন প্রচার করা সম্পর্কেও আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। এমনিভাবে, শেয়ার বাজার, ব্যাংকিং ও জীবনবিমা সম্পর্কে আলেমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।

সরাসরি কুরআন হাদিস পেলে আমরা এই ইজতিহাদগত মতভেদ থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু তাতো আর সম্ভব নয়। কাজেই যতদিন মুজতাহীদগন কিয়াস করবেন তত দিন মতভেদ থাকবে। আমাদের দায়িত্ব হল। কিয়াসগত ইজতিহাদ যারটা কুরআন সুন্নাহর অধিক কাছাকাছি মনে হবে তার অনুসরণ করা। আর অন্য ব্যাপারে খারাপ ধারণা না রাখা। কারণ হয়ত সেই কুরআন সুন্নাহর অধিক নিতটবর্তী। কিন্তু যখনই আমরা নিজের অনুসারী আলেমদের কিয়াস শতভাগ সঠিক মনে করব আর অন্য আলেমদের ভ্রান্ত জানব তখনতো মতবিরোধ হবেই। তাই বর্তমান আধুনিক যুগে অধিকাংশ সাধারণ মুসলিম যাদের ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নেই তারা এই কিয়াস কৃত মাসয়ালা নিয়ে বিরোধে জড়ায় আর এক শ্রেণির আলেম তাদের পালে হাওয়া দেয়। এর ফলে মুসলিম উম্মার মাঝে যে বিভাজনের সৃষ্টি হয় তার দায়ভার সাধারণ মুসলিমদের সাথে ঐ সকল আলেমদেরও নিতে হবে। এটা নিশ্চয় অন্যায়।

(৫) অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের কারণে মতবিরোধ-

হাদিসের মান বর্ণার ক্ষেতে সহিহ, জঈফ, হাসান ও জাল কথাগুলি ব্যবহার করছি। তাই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝার জন্য সহিহ হাদিস, হাসান হাদিস, জাল হাদিস ও যঈফ হাদিস সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা দরকার।  তা হলেই সহজে বুঝতে পারব কেন অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর আমল করার ফলে বিদআতের সৃষ্টি হয়। তাই খুবই সংক্ষেপে এই সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা হল।

সহিহ হাদিস :

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদিসের মধ্যে ৫টি শর্ত বিদ্যমান তাকে সহিহ হাদীস বলা হয়-

১. আদালত : হাদিসের সকল রাবী পরিপূর্ণ সৎ ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত।

২. যাবত : সকল রাবীর “নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ পূর্ণরূপে বিদ্যমান বলে প্রমাণিত।

৩. ইত্তিসালঃ সনদের প্রত্যেক রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।

৪. শুযুয মুক্তি বা শায না হওয়া : হাদিসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত।

৫. মিল্লাত মুক্তি : হাদিসটির মধ্যে সূক্ষ্ণ কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত।

প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক ও শেষের দুটি শর্ত মূলত অর্থ কেন্দ্রিক। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য আমরা বলতে পারি যে, প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদির বিষয়ে যতটুকু নিশ্চয়তা অনুভব করলে একজন বিচারক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন, বর্ণিত হাদিসটি সত্যিই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন বলে অনুরূপভাবে নিশ্চিত হতে পারলে মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘‘সহিহ” বা বিশুদ্ধ হাদীস বলে গণ্য করেন।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, “হাদিসের নামে জালিয়াতী” বইয়ের প্রথম পর্ব, পৃষ্ঠা নম্বর-১৩৩)

হাসান হাদিস :

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাসান হাদিসের মধ্যেও সহিহ হাদিসের সকল শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের (যাবত) ক্ষেত্রে যদি সামান্য দুর্বলতা দেখা যায় তবে হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলা হয়। রাবীর নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা বা ‘যাবত’ কিছুটা দুর্বল বলে বুঝা যায়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এরূপ রাবীর বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বলে গণ্য। হবে হাদিসের সনদের রাবীগণ ব্যক্তিগতভাবে সৎ, প্রত্যেকে হাদীসটি ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।

জঈফ হাদিস :

জঈফ অর্থ দুর্বল। যে হাদিসের মধ্যে সহিহ হাদিসের শর্তাবলি থেকে এক বা একাধিক শর্তের ঘাটতি রয়েছে সেটিকে জঈফ হাদীস বলা হয়। সনদ বা বর্ণনা সূত্রের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণতা, দ্বীনদারী, তাকওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, অথবা এটা প্রামাণিত হওয়া যে, বর্ণনকারী হাদীস যথার্থভাবে সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে হোক বা তার কাছে সংরক্ষিত হাদিসের কিতাবগুলো কোন কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হোক। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। তাই হাদীস শাস্ত্রের বিদগ্ধ মুহাদ্দিসগণ সার্বিক দিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কোনও হাদীস সহিহ না কি জঈফ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।

জঈফ হাদীস কি আমল যোগ্য?

জঈফ হাদীস সাধারণভাবে আমল যোগ্য নয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন।  জঈফ হাদীস আমল করার শর্তগুলি হলো

১. জঈফ হাদিসটি খুবই জঈফ না হয়। 

২. ইসলামি শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

৩. আকিদা সম্পর্কিত হবে না।

৪. হালাল-হারাম সংক্রান্ত হবে না।

৫. নেক আমলটি সহিহ হাদিসের আলোকে হওয়া।

জঈফ হাদীস আমলের ক্ষেত্র হলো

১. জঈফ হাদিসটি নেক আমলের ফজিলত ক্ষেত্রে,

২. কুরআনের ‘তাফসীর’ বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ও

৩. ইতিহাস বা ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে।

শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহসহ বহু সালাফি আলিম জঈফ হাদিসের উপর আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অপরপক্ষে একদল মুহাদ্দিস পূর্বোক্ত শর্তাবলি সাপেক্ষে শুধু ফজিলতের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, জঈফ হাদিসকে রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) এর কথা বলে বিশ্বাস করা যাবে না। জঈফ হাদিসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে একথা মনে করা যাবে না যে, রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) সত্যিই একথা বলেছেন। তাই আমার মতে জঈফ হাদিসে উপর আমল না ভালো, কেননা সহিহ হাদির উপরই আমল করে শেষ করতে পারি না।

যখন সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও কেউ অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে আমল করে তখন দুই দলের মাঝে মাসায়েল গত বিশার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে দুই দলের মতভেদ থেকে মতবিরোধের জম্ম নেয়। এই মতবিরোধই নতুন ফির্কার জম্ম দেয়।

একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলো-

বিশিষ্ট তাবিয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকির (১১৫ হি.) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরাতে বর্ণনা করেছে-

مَن صَلَّى فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِن شَعْبَانَ مِائَةَ رَكْعَةٍ، وَقَرَأَ فِيهَا أَلْفَ مَرَّةٍ سُورَةَ الإِخْلَاصِ، بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهِ قَبْلَ مَوْتِهِ مِائَةَ مَلَكٍ: ثَلاَثُونَ يُبَشِّرُونَهُ بِالْجَنَّةِ، وَثَلاَثُونَ يُنَجُّونَهُ مِنَ النَّارِ، وَثَلاَثُونَ يُصَحِّحُونَ خَطَايَاهُ، وَعَشَرَةٌ يَكْتُبُونَ أَسْمَاءَ أَعْدَائِهِ.”

যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তার কাছে একশত জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ত্রিশ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ত্রিশজন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।

হাদিসটি জাল বলেছেন  ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫১; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৯; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১১৩-১১৪; এ হাদীসও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাত পরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত, হাদিসের নামে জালিয়াতী, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৩৯।

এই রকম অসংখ্য জাল হাদিস উপর ভিত্তি করে সমাজে অনেক আমল প্রচলিত আছে। যেমন- আমাদের সমাজে প্রচলিত মিরাজের রজণী নাম দিয়ে ২৭ শে রজব ইবাদতে মধ্যে রাত কাটান, পরের দিন সিয়াম পালন করা, শাবান মাসের ১৫ তারিখ দিনের বেলা রোজা রাখা, রাতে নির্দিষ্ট সালাত আদায় করা, মহররম মাসের ইরাদাত, আখেরি চাহার সোম্বা, ঈদের রাতের ইবাদাত ইত্যাদি। এই সকল আমল দুর্বল ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যারা এই সকল বিদআতি আমলের বিরোধিতা করবে তাদের সাথে ঐ বিদআতিদের সংঘর্ষ অনিবার্য।

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : দ্বিতীয় পর্ব (৩-৬)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।

২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে পরের চারটি (৩-৬)  কারণ আলোচিত হলো :

৩। আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ :

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  জীবন দশায় কোন আকিদা বা ফিকহি কোনো সমস্যা হলে তার নিকট উপস্থিত হলেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর তার অনুপস্থিতির কারণে সাহাবিগনের এই সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়। ফলে কোন কোন ফিকহি বিষয় সাহাবিগণের মাঝেও মতভেদ দেখা দেয়। তাদের মতভেদের কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ-

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

প্রথম উদাহরনণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَهْلَ الْمَدِينَةِ سَأَلُوا ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ امْرَأَةٍ طَافَتْ ثُمَّ حَاضَتْ قَالَ لَهُمْ تَنْفِرُ قَالُوا لاَ نَأْخُذُ بِقَوْلِكَ وَنَدَعُ قَوْلَ زَيْدٍ قَالَ إِذَا قَدِمْتُمْ الْمَدِينَةَ فَسَلُوا فَقَدِمُوا الْمَدِينَةَ فَسَأَلُوا فَكَانَ فِيمَنْ سَأَلُوا أُمُّ سُلَيْمٍ فَذَكَرَتْ حَدِيثَ صَفِيَّةَ رَوَاهُ خَالِدٌ وَقَتَادَةُ عَنْ عِكْرِمَةَ

ইকরিমা (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাওয়াফে যিয়ারাহর পর ঋতু এসেছে এমন মহিলা সম্পর্কে মদিনা্বাসী ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদের বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললেন, আমরা আপনার কথা গ্রহণ করব না এবং জায়েদের কথাও বর্জন করব না। তিনি বললেন, তোমরা মদিনায় ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে। তাঁরা মদিনায় এসে জিজ্ঞেস করলেন যাঁদের কাছে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ও ছিলেন। তিনি তাঁদের উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সহিহ বুখারি : ১৭৫৮

তাঊস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম। জায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, আপনি কি এই ফাতওয়া দিয়েছেন যে, হায়যগ্রস্ত মহিলারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই প্রস্থান করতে পারবে? ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বললেন, যদি আপনি আশ্বস্ত না হতে পারেন, তবে অমুক আনসারী মহিলাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন? তাঊস বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হাসতে হাসতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি মনে করি আপনি সত্য কথাই বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ১৩২৮

       মদিনার অধিবাসীরা ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে জানতে চান, একজন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারাহ সম্পন্ন করার পর ঋতুমতী হলে, তার করণীয় কি? তিনি তাদের বলেন, ঐ মহিলা (মক্কা থেকে)  রওয়ানা হয়ে যেতে পারবে। এই মতামতের বিপরীত মত জায়দ (রা.) থেকে এসেছিল বিধায় তারা ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর মতামতও বিবেচনায় রাখব। এরপর ঘটনাটি আরো স্পষ্ট করতে, তারা মদিনায় ফিরে উম্মে সুলাইম (রা.) এর কাছ থেকে উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি শুনে নিশ্চিত হন যে তাওয়াফে যিয়ারাহ শেষ করার পর ঋতুমতী হন, তাহলে তার মক্কা ত্যাগে বাধা নেই। কারণ, তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে এবং হজের মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। এখানে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে, দলিল প্রমাণের আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো। সাহাবায়ে কিরাম ইজতিহাদ এবং দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করতেন। মতভেদ দেখা দিলে, তারা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাউস (রহ.) এর বর্ণনায় ও এমনটি দেখা যায় যে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন।

নোট : সাহাবিদের (রা.) শিক্ষা হলো দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে যার মতামত অধিক সঠিক তার মতামত গ্রহণ করা। আমরা দলিল প্রমাণের চেয়ে আমাদের আকাবিরদের বেশী গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। মনে রাখতে হবে কোন মুজতাহিদ সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত নন। যখন হাদিসের সঠিক দলিল প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখন আর কারো মতমতা প্রদান করা অধিকার থাকে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ-

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনু খাত্তাব সিরিয়ার দিকে রওনা করেছিলেন। শেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ ’উবাইদাহ ইবনু জার্রাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানালেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের বিস্তার ঘটেছে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন ’উমার বলল, আমার নিকট প্রবীণ মুহাজিরদের ডেকে আন। তখন তিনি তাঁদের ডেকে আনলেন। ’উমার তাঁদের সিরিয়ার প্লেগের বিস্তার ঘটার কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, বাকী লোক আপনার সঙ্গে রয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিগণ। কাজেই আমরা সঠিক মনে করি না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।

উমার (রা.) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই মতপার্থক্য করলেন।

উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা জয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তাঁরা পরস্পরে মতভেদ করলেন না। তাঁরা বললেন, আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ’উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারির পিঠে আরোহণ করবে।

আবূ ’উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদির থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন? ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আবূ ’উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! হাঁ, আমরা আল্লাহর, এক তকদির থেকে আল্লাহর আরেকটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত, তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও যেখানে আছে দু’টি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোন এলাকায় প্লেগের) বিস্তারের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন। সহিহ বুখারি : ৫৭২৯, ৫৭৩০, ৬৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২১৯

মন্তব্যঃ কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, উভয়টাই শরীয়ত সম্মত হলেও মতভেদের সময় দলিল পাওয়া গেলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।

এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে সকল সাহাবি (রা.) সকল ফিকহি বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে সমানভাবে জ্ঞাত ছিলেন না। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে ইমল আসার পর আর ইজতিহাদ করে মতামত প্রদান করা জায়েয নাই। দলিল প্রমাণের পরও মুরুব্বি বা বড়দের দোহাই দিয়ে মতবিরোধ করা যাবে না।

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

প্রথম উদাহরণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ يَقُولُ كُنَّا لاَ نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلاَثِ مِنًى فَرَخَّصَ لَنَا النَّبِيُّ فَقَالَ كُلُوا وَتَزَوَّدُوا فَأَكَلْنَا وَتَزَوَّدْنَا قُلْتُ لِعَطَاءٍ أَقَالَ حَتَّى جِئْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لاَ

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানির গোশত মিনায় তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেন, খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি আত্বা (রহ.) কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদিনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। সহিহ বুখারি : ১৭১৯, ২৯৮০, ৫৪২৪, ৫৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৯৭২, সুনানে নাসায়ী ৪৪২৬, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৫৯২৫, মিশকাত : ২৬৩৯

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে: “জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাসউদ, কাতাদা, নুমানসহ বহু সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গেছে। এই মানসুখের বিষয়টি আলী এবং ইবনু উমার (রা.) এর বিষয়টি জানা ছিল না।

হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার গ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহিহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। লক্ষ করুন, একটি জরুরি দুই জন বিশিষ্ট সাহাবির গোচরি ভূক্তই হয় নাই।

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

উদাহরণ- 

আল্লাহ রব্বুল আলামি বলেন-

أَسۡكِنُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ سَكَنتُم مِّن وُجۡدِكُمۡ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡہِنَّ‌ۚ وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ‌ۚ

অর্থঃ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। সূরা তালাক : ৬

আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত বিজ্ঞ মানুষের একটি হাদিছটি অজানা ছিল বিধান তিনি এই আয়াতে ব্যাখ্যায় ভুল করে বসেন। তিনি মতামত প্রদান করেন যে, তালাকে বাইন বা একসাথে তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পক্ষ থেকে খোরপোশ ও আবাসনের পাবে। সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّهُ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَنْفَقَ عَلَيْهَا نَفَقَةَ دُونٍ فَلَمَّا رَأَتْ ذَلِكَ قَالَتْ وَاللَّهِ لأُعْلِمَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ لِي نَفَقَةٌ أَخَذْتُ الَّذِي يُصْلِحُنِي وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لِي نَفَقَةٌ لَمْ آخُذْ مِنْهُ شَيْئًا قَالَتْ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏ “‏ لاَ نَفَقَةَ لَكِ وَلاَ سُكْنَى

ফাতমিা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তার স্বামী তাকে তালাক (তালাক) দেন। এরপর তার স্বামী তার জন্য (ইদ্দাতকালীন সময়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য) সামান্য পরিমাণ খোরপোশ দিয়েছিলেন। তিনি তা দেখে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোচরে আনব। যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য হয় তবে তা আমি এ পরিমাণ উসুল করব যাতে সুচারুভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়। আর যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য না-ই হয় তাহলে আমি তার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, এবার আমি বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উত্থাপন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্য কোন খোরপোশ নেই, বাসস্থানও নেই। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০

এই হাদিস উল্লেখ করার পরও আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতু কায়স হয়ত (রা.) ভুলে গেছেন। এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব, অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে? অর্থাৎ আমীরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এই দলিলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেননি।

এরূপ ঘটনা শুধু উমর (রা.) নয়, অন্যান্য সাহাবিগণ এবং তাবেয়িন-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাই তো দেখা যায় বিদ্বানগণের এক জন এক হাদিসকে সহিহ মনে করে দলিল দিচ্ছেন অপর জন যঈফ মনে করে তা পরিত্যাগ করছেন। ফলে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু দৃষ্টিতে যেটি শক্তিশালী মনে হয়েছে সেটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাদের পরেও হাদিস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মাঝেও এমন মতভেদ দেখা যায়। সনদ বিচারে একজন সহিহ বলেছেন তো আরেক জন যঈফ বলেছেন। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা মহান সহাবিগণ (রা.) এর অনুসরণ করব। যে মতটি অধিক সঠিক বা সত্যের কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করতে হবে।

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ হতে ফিরে পথে আমাদেরকে বললেন, বনূ কুরাইযাহ এলাকায় পৌঁছার পূর্বে কেউ যেন ‘আসর সালাত আদায় না করে। কিন্তু অনেকের রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল, তখন তাদের কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে না পৌঁছে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা সালাত আদায় করে নেব, আমাদের নিষেধ করার এ উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি যাওয়া।  নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ কথা উল্লেখ করা হলে, তিনি তাঁদের কারোর ব্যাপারে কড়াকড়ি করেননি। সহিহ বুখারি : ৯৪৬, ৪১১৯

এই হাদিসের মূল কথা হলো- খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন এবং যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম রাখলেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন আমরা এখন অস্ত্র রাখিনি। অতএব আপনি চুক্তি ভঙ্গকারি বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদি সম্প্রদায় “বনি কুরায়জা’র উদ্দেশ্যে বের হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের একটি দলকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌঁছে কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল হাদিসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী বললো, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌঁছা, নামাজ না পড়া নয়, অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। সাহাবিগন নিজ কানে সরাসরি শুনে ও মর্ম বুঝতে ভুল করলেন। এক এক দল এক এক ধরনের বুঝলেন এবং আমল ও করলেন ভিন্ন ভিন্ন অথচ উভয় দলই সঠিক ছিল। এটাই মতভেদ মতবিরোধ নয়। আজ কাল আমরা যা করছি তা মতবিরোধ, মতভেদ নয়।

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

আবদুর রহমান ইবনু আবযা (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমরা কোন (পানিবিহীন) জায়গায় এক-দুই মাস অবস্থান করে থাকি (সেখানে অপবিত্র হলে করণীয় কি?)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি তো পানি না পাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ’আম্মার (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আপনার কি ঐ ঘটনার কথা মনে নেই, যখন আমি ও আপনি উটের পালে ছিলাম। আমরা জুনুবি হয়ে গেলাম এবং আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম।

আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন তোমাদের জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি মাটিতে উভয় হাত মেরে হাতে ফুঁ দিলেন। তারপর হাত দিয়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের অর্ধেক পর্যন্ত মুছলেন। ’উমার (রাঃ) বললেন, হে ’আম্মার! আল্লাহকে ভয় কর। তিনি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনি চাইলে আমি আর কখনো তা বর্ণনা করব না। ’উমার (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার উদ্দেশ্য এরূপ নয়, বরং তুমি চাইলে অবশ্যই তোমার বক্তব্যের স্বাধীনতা তোমাকে দিব। সুনানে আবু দাউদ : ৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৬৯, সুনানে নাসায়ি : ৩১৮

উপরের আলোচনায় দেখতে পারলাম সাহাবিদের (রা.) মাঝে বহু ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা যখনই সহিহ সুন্নাহর খবর পেতেন নিজেদের মতভেদ ভুলে সহিহ সুন্নাহর অনুসরণ করেছেন। আর আমাদের অবস্থা হল তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের কেউ কোন সহিহ সুন্নাহর কথা বললে আমাদের আমল পরিবর্তন করে ফিরে আসা প্রায় অসম্বর। আমরা যে মত বা পথের অনুসন করি তা ত্যাগ করা এতই কঠিন যে, তার জন্য জীবন দান করাও সাহস। কাজেই মতভেদ দূর করার একমাত্র পদ্ধতি হল সাহাবিদের (রা.) পথ অনুসরণ করা। তাদের অনুসরণীয় নীতি থেকে দুরে সরে আসার ফলে আমাদের মাঝে মতবিরোধ দিন দিন প্রকট হচ্ছে যার ফলে নতুন নতুন দলের সৃষ্টি হচ্ছে।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

তাওহীদ না বুঝার কারণে অধিকাংশ মুসলিম শিরকি কাজে জড়িত। সমাজে এমন অনেক শির্ক কাজ আছে যা আহরহ করছে। কোন আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিলেও বলবে আরে এটাতো শির্ক নয়। এর প্রধান কারণ তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

আমাদের সমাজে গাইরুল্লাহ নামে মান্নত করে, আল্লাহ ব্যতীত অলি আওলিয়াদের নিকট ফরিয়াদ করে, সাহায্য তলব করে, আশ্রয় প্রার্থনা করে, কবর-মাজারে সিজদা করে, মৃত ব্যক্তির ক্ষতি বা উপকার করতে পারে তাদের করবের জন্য ভ্রমণ করে তাদের নিকট ফরিয়াদ করে ইত্যাদি। এ সকল শির্ক কাজ সমাজে এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে কেউ যদি সঠিক তাওহীদের কথা বলে তবে তাকেই ভ্রান্ত মনে করা হয়। কারণ সমাজের এই লোকগুলো জম্ম থেকেই শিরকি কাজকে নেক আমল মনে করে পালন করে আসছে। যদি তারা জন্মের পর পরই তাওহীদের সঠিক জ্ঞান পেত তবে তাহলে এমন জঘন্য শিরকই কাজে লিপ্ত হত না। কাজেই আলোচনার এ পর্যায় তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য একটু আলোচনা করা হল।

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু বান্দা যখন এই ফরজ জ্ঞান অর্জন না করে, তখন সে তওহীদ পরিপন্থি কাজ করে। তাওহীদ পরিপন্থি কাজ করলে তাওহীদবাদীদের সাথে মতবিরোধ হবে এটাই স্বাভাবিক।

তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা,  তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বতোভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়্যাতে (প্রভুত্বে), উরুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না।

তাওহীদ এর শ্রেণীবিভাগ

উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায় তাওহীদ তিন প্রকারে বিশ্বাসের সমষ্টি।

০১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

০২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

০৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম

এখন এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে জানব :

১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক এককত্ত্বঃ

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। যেমন: সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগণ এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্তাগত হোক। [সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম]

এই হল তাওহীদের সামান্য ধারণা মাত্র। যদি কাহারও তাওহীদের জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা না থাকে সে অবশ্য শিরকই কাজে লিপ্ত হবে অথচ সে মনে করবে সে নেক আমলই করছে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়্যাহ বিশ্বাসী হলেও কাফির-

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٤) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٨٥) قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ (٨٦) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ (٨٧) قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٨) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ (٨٩)

অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ।  বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন?  তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?  সুরা ইউনুস ১০:৩১

এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু  উলুহিয়্যাত (ইবাদতে (ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।

আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে ওরস করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا يُؤۡمِنُ أَڪۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ

অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। (ইউসুফ-১২ : ১০৬)

যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্‌যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।

অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

কোন মানুষই শতভাগ সঠিক হতে পারেনা, ঠিক তেমনি কোন দল বা সংগঠন ও শতভাগ সঠিক হতে পারেনা। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের নামে অনেক সঠিক অনুসারী মুসলিম আছে। তাদের কেউই শতভাগ সঠিক নয়। যদি কারও নিকট কোনো প্রকারের বিদআত পাওয়া যায়। সাথে সাথে কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদিদের দালাল ইত্যাদি হাজারও বিশেষণ দেয়া হয়। আসলে তার এই বিদআতটি এত বেশী ছিল না যে তাকে কাফির বলা যাবে। কোনো  ভুল হলে সংশোধর করার অধিকার আছে কিন্তু কাফির বলার অধিকার নেই।

এমনি ভাবে আমরা যদি ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েলের প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখব একটি ব্যাপারে দ্বিমত থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন অনেক ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েল আছে যার দুটিমতই সঠিক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে নিজের আমলকে সঠিক ভেবে অন্যদের ভ্রান্ত ভাবি। অনেক সময় নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করি। এ ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ মানুষ নয় অনেক ফির্তাবন্দী আলেমকেও সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখা যায়।

সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া না পড়া নিয়ে, রউফুল ইয়াদাইন করা না করা নিয়ে, ফাতিহার শেষে আমিন বলা না বলা নিয়ে এমনকি হাত বাধা স্থান নিয়েও অনেক কে সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখি। এর ফলে মানুষে প্রতি মানুষের হিংসার সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন দলে দলে ভাগ হয়। অথচ এই সব আমলে সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝে ভিন্নতা ছিল কিন্তু তাদের মাঝে এই ধরনের আমল নিয়ে দলাদলি ছিল না।

৬। নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

সবচেয়ে বড় মূর্খতা হল নিজের মতামতকে শতভাগ নির্ভুল মনে করা। কাফির ও মুশরিকদের অন্যতম খারাপ দিক হল দ্বীনের মধ্যে বিভক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দলে ভাগ হওয়া। প্রত্যেক দলই তাদোর নিজেদের হক মনে করে এবং নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

مُنِيبِينَ إِلَيۡهِ وَٱتَّقُوهُ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِڪِينَ (٣١) مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَڪَانُواْ شِيَعً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٣٢)

অর্থঃ আল্লাহ অভিমুখী হয়ে এবং তাকে ভয় করো, আর নামাজ কায়েম করো  এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না, যারা নিজেদের আলাদা আলাদা দীন তৈরি করে নিয়েছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল। (সূরা রূম : ৩১-৩২)।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরাও বলেন-

 فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَہُمۡ زُبُرً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٥٣) فَذَرۡهُمۡ فِى غَمۡرَتِهِمۡ حَتَّىٰ حِينٍ (٥٤)

অর্থঃ কিন্তু তাহারা নিজেদের দীনের মধ্যে বহুধা বিভক্ত করিয়াছে। প্রত্যেক দলই তাহাদের নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আনন্দিত। সুতরাং কিছু কালের জন্য উহাদিগকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকিতে দাও”। (সূরা মু’মিনূন : ৫৩-৫৪

নবি রাসুলদের জামানা থেকে উম্মত যতই দুরে সরতে থাকবে তাদের মধ্যে আন্দাজ ও অনুমানের পরিমাণ বেড়ে যাবে। সকলেই নিজ নিজ আন্দাজ ও অনুমান কে সঠিক মনে করবে। তাই আমরা দেখি যত নতুন ধর্ম আছে সকলেই তাদের আসল ধর্মীয় দর্শন বিকৃতি করে নতুন ধর্ম রচনা করেছে এবং নিজেদের মূল বা রুট হিসাবে দাবি করছেন। মহান আল্লাহর ভাষায় “প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল, (৩০:৩২)। মহান আল্লাহ যেখানে বলেছেন ফির্কা বা দলাদলির সৃষ্টির নিজ মতামতকে সঠিক জ্ঞান করা সেখান প্রশ্নতোলা মানেই হল জালেমদের অন্তর ভুক্ত হওয়া। এভাবে নিজ মতামত কে সঠিক জ্ঞান করার ফলে অন্যদের মতামত সঠিক হলেও তা প্রত্যাখান করা হচ্ছে এবং ভিন্ন মতামত ধারণ কারীদের মাঝে বিরোধের বিষ বপন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোন ব্যক্তি যখন নিজের ইমান আমল সঠিক মনে করবে তখন অন্যদের আমলে প্রত্যাখান করবে। এভাবে সকলে যদি একে অপরের ইমান আমল প্রত্যাখান করি তবে সকলের মাঝে মহা বিরোধেন সৃষ্টি হবে। যদি সকলে একই উত্স থেকে ইমান আমলে প্রহন করি তাহলে আর মতবিরোধ থাকবে। নিজের মতামতকে কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি। সকলেই যদি কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি তা হলে সকলে একথা বদ্ধ থাকতে পারব। এর বিন্ন কোন পথ অবলম্বন করলে শত শত মতের মানুষ দ্বারা শত শত ফির্কাবন্ধী হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : তৃতীয় পর্ব (৭-১০)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।

২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।

৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে শেষের ৪ টি কারণ আলোচিত হলো :

৭। ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি

যুগে যুগে বহু মনীষী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তাদের ত্যাগ ও খেদমত ইসলাম আজ এমন পর্যায় উপনীত হয়েছে। আবার এর বিপরীতে অনেক কাজ্জার আছে যারা ইসলামের নাম নিয়ে ব্যাপক শির্ক এ বিদআতের প্রসার ঘটিয়েছেন। এই উভয় শ্রেণির লোকের মৃত্যুর পর তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানান ফির্কা। যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকার সৃষ্টি হয় তাকে নিয়ে তার ভক্তরা তৈরি করে নানান আজগোবি গল্প কাহিনী এবং তার নামে চালিয়ে দেয় হাজার হাজার মিথ্যা কেরামতি। যাদের ইসলাম, শির্ক এবং বিদআত সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই সেই সকল সরল মনা মানুষগুলি এই বানান আজগুবি গল্প শুনে তার খাটি ভক্ত হয়ে যায়।

যাদের কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সৃষ্টি হয় তারা অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। এমনকি তাদের মৃত্যুর শত শত বছর পরে তাদের নামে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সুষ্টি হয়েছে। আবার এমন অনেক মিথ্যাবাদী লোকও আছে যারা তাদের নিজের জীবন দশায় অনেক বাতিল ফির্কা সৃষ্ট করে গেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ইসলামের শুরুর দিকে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে শীয়া ফির্কা, ওয়াছিল ইবনে আতা (মৃত ১৩১ হি.) মুতাজিলা  ফির্কা এবং সীসওয়াহ কাদেরীয়া ফির্কার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল কাজ্জাবদের প্রায় একক প্রচেষ্ঠায় এই ফির্কাগুলি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। (ইসলামি আকিদাও ভ্রান্ত মতবাদ)

মহান চার মুজতাহিদ আলেমের নামে মাযহাব সৃষ্টি :

মহামতি চার ইমামের নামে মূর্তি সৃষ্টি করা হয়েছে অথচ তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তাদের নামে মাযহাব সৃষ্ট করা হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। একটু আলোচনা করলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর সাহাবিদের মাঝে ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল কিন্তু উম্মতের ঐক্য নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করেনি। মহান চার খলিফায়ে মুসলমানদের ওফাতের পর ইসলাম ও মুসলিমদের উপর যেমন জুলুম চলছিল, ঠিক তেমনিভাবে কুরআন হাদিস এর চর্চাও চলছিল। সম্মানিত চার ইমাম নিজ নিজ সময়ে স্ব স্ব এলাকায় বড় আলিম হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ফলে লোকজন তাঁদেরকে জরুরি মাসআলা-মাসাইল জিজ্ঞাসা করতো। তাঁরাও ফয়সালা দিতেন। ইমামগণের ইস্তেকালের পর তাঁদের ভক্তরা তাঁদের মতামত ও নীতি প্রচার প্রসার করেন। এমনকি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে থাকেন। এক ইমামের ভক্তরা অন্য ইমামের ভক্তদের সাথে তর্ক-বাহাস করতে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন দলে এবং এলাকা কেন্দ্রীক ইমাম ও মুহাদ্দিসদের অনুসরণ শুরু হয়।

কুফা শহর কে কেন্দ্র করে ইমাম আবু হানিফার অনুসরণ চলতে থাকে। মদিনা শহরকে কে কেন্দ্র করে ইমাম মালিক এর অনুসরণ চলতে থাকে। বাগদাদকে কেন্দ্র করে ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল এর অনুসরণ চলতে থাকে। মিশর কে কেন্দ্র করে ইমাম শাফেঈ এর অনুসরণ চলতে থাকে। এভাবে ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর, ইমাম লাইছ ইবন সা’দ, ইমাম মুবারক, ইমাম আওযাইসহ প্রায় ১১/১২ জন মুজতাহিদ আলেমের নামে ১১/১২ টি মাযহাবের সৃষ্টি হয়। কিন্তু মজার ব্যাপর হল, এই সকল ইমামদের কেউই মাযহার সৃষ্টি করে নাই এমন কি সৃষ্টি করতেও বলেন নাই। তারা সকলে একনিষ্টভাবে কুরআন ও হাদিসের অনুসারি ছিলেন এবং সমসাময়িক জটিল ব্যপারে ইজতিহাদ করতেন। তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লষণের কারনে সমসাময়িক আলেম ও সাধারণ লোকদের মাঝে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজম্মের পর প্রজম্মের চলেত থাকে। মুসলিমগণ নবুয়ত থেকে যত দূরে যেতে থাকে, তাদের নিকট থেকে কুরআন হাদিস এর চর্চাও কমতে থাকে। আস্তে আস্তে তারা  কুরআন হাদিস বিমুখ হতে থাকে এবং আলেমদের ব্যাখ্যা নির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে কুরআন হাদিসের ব্যবহারিক পতন ঘটতে শুরু করে। এরই পটভূমিতে মুসলিমদের মাঝে ফির্কাবন্দী হয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মুজতাহিদ আলেমকে একমাত্র অনুসরণীয় ভাবতে থাকে। যার যার অনুসারী ইমামের নামে মাযহাব এর সৃষ্ট করে তারই অনুসরণ করতে থাকে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে শাসকবর্গও এতে জড়িত হয়ে পড়েন। এভাবে কালক্রমে ধীর ধীর প্রচলিত চার মাযহাবের রূপ ধারণ করেছে। ৩১৭ হিজরি আগ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী ইত্যাদি বলতেন না বরং স্ব স্ব অনুসরণীয় আলেমদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করতেন। পরবর্তীতে প্রত্যেকেই নিজের জন্য পৃথক পৃথক দলীয় নাম নির্ধারিত করে নিতেন এবং নিজ অনুসরণীয় আলেমদের নির্দেশ খুঁজে বের না করা পর্যন্ত কোরআন ও হাদিসের ব্যবস্থা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। সুতরাং মতভেদ দৃঢ়তর হল, মাযহাবের সূত্রপাত হল।

মাযহাবের মহাব্যাধি মুসলমানগণের জাতীয় জীবনে প্রবেশ করায় ইসলামের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। ৩১৭ হিজরিতে একটি আয়াতের অন্তর্ভুক্ত মাকামে মাহমুদের ব্যাখ্যা নিয়ে বাগদাদে হাম্বলী ও অপর তিন মাযহাবের অনুসারীগণের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়, এই সংগ্রামে সৈন্য বাহিনী ও জনসাধারণও যোগ দেয় এবং শত সহস্র লোক হতাহত হয়। ৩২৩ হিজরিতে হাম্বলী ও শাফেয়ীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে ৭ বছর পর্যন্ত চলে।

উপমহাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলিম, ভারতবর্ষের বিখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ ও হানাফীদের শিক্ষাগুরু যাকে হানাফীরা ভারতবর্ষের ‘ইমাম বুখারী’ বলে থাকেন সেই শাহ আলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহেলভী (রহ) বলেছেন। তোমরা জেনে রাখ যে ৪০০ হিজরির আগে লোকেরা কোন একটি বিশেষ মাযহাবের উপর জমে ছিল না।  (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ পৃষ্ঠা নম্বর ১২৫)।

ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ (কওমি মাদ্রাসার নিসাবভুক্ত) গ্রন্থের ৪৪৯ পৃষ্ঠায় মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দিন লিখেন হিজরি চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত চার মাযহার ছাড়া অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা হত। কিন্তু অন্যান্য মুজাহিদের মাযহাবগুলো এরূপে সংরক্ষিত হয়নি, যার ফলে সেগুলো অনেক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংকলিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকবে নি। ফলে চতুর্থ শতাব্দীর পর চার মাযহাব ব্যতীত অন্য কোন মাযহাব অবশিষ্ট থাকেনি। আল্লাহর রহমতে এই মাযহাব চতুষ্টয়ে তাকলীদে শাখসি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ৪০০ হিজরির আগে নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী বা মালেকী বলে পরিচয় দিতো না। আর চারশো হিজরির অনেক আগে ইমামরা ইন্তেকাল করেন।

আমাদের সমাজে চারটি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জীবনে আলোচনা করে দেখতে পাই, তারা ইসলামের এক এক জন নক্ষত্র তুল্য ইমাম ও মুজতাহিদ ছিল। প্রতিষ্ঠিত চার ইমামের সময় কাল ছিল নিম্মরুপঃ

আবু হানীফা (রহঃ) জম্ম ৮০ হিজরী এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরী

ইমাম মালেক (রহঃ) জম্ম  ৯৩ হিজরী এবং মৃত্যু ১৭৯ হিজরী

ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) জম্ম  ১৫০ হিজরী এবং মৃত্যু  ২০৪ হিজরী

আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) জম্ম  ১৬৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৪১ হিজরী

অপর পক্ষে বিশিষ্ট হানাফী বিদ্বান শাহ ওলিউল্লাহ দেহেলভী (রহ) এর কথা যদি মেনে নেওয়া হয় যে, ৪০০ হিজরির আগে কোনো মাযহাব ছিল না, এবং ৪০০ হিজরির পরে মানুষেরা মাযহাব সৃষ্টি করেছে। তার মানে এটা দাঁড়ায় যে আবু হানীফার ইন্তেকালের ২৫০ বছর পর হানাফী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেকের ইন্তেকালের ২২১ বছর পর মালেকী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেরীর ইন্তেকালের ১৯৬ বছর পরে শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমাদের ইন্তেকালের  ১৫৯ বছর পর হাম্বলী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে।  তাহলে আমরা কি করে বলি যে, চার ইমামের যে কোন একজনকেই মানতে হবে। সর্ব বিষয়ে এক মাযহাবের মাসআলা মতেই চলতে হবে। অন্য কোর ইমামের অনুসরণ করা যাবেনা। মহান ইমাম যাদের নামে আমরা মাযহাব রচনা করেছি, তারাও এই নাম গুলো দেয়নি। মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত চারটি মাযহাব, দল বা ফির্কাহ ইসলামের কোনো নিয়ম বা বিধান মেনে তৈরি করা হয়নি। কারণ ইসলাম ধর্মে কোনো দলবাজি বা ফির্কাবন্দী নেই। মুসলমানদের বিভক্ত হওয়া থেকে এবং ধর্মে নানা মতের সৃষ্টি করা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে, (সূরা আনাম ৬:১৫৯)। এই মাযহাবগুলো রসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রা) সময় সৃষ্টি হয়নি। এমনকি ইমামগণের সময়ও হয়নি।

৮০৯ হিজরিতে কাবার ইব্রাহিমী মুসাল্লাতে দাঁড়াই ইমামতি নিয়ে ১০/১১টি মাজহাবি দলের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বাঁধে। তাহাতে বহু মুসলমান হতাহত হয়। জাহল বাদশা ফারহা ইবনে বয়কুফ সংঘর্ষ মিটাবার উদ্দেশ্যে বিবাদরত দলগুলির মধ্যে হতে চারটি দলকে কাবার চার পার্শ্বে খাড়া করিয়া দিলেন। অন্যান্য দল এই চার মাযহাবের মধ্যে মিশিয়া গেল। ফলে কাবাঘরের চার কোণে চার মাযহাবের চারখানা ভিন্ন ভিন্ন মুসাল্লাহ তৈরি হইল। প্রতি ওয়াক্তে চার মাজহাবের চার ইমাম চার মুসাল্লায় দাঁড়িয়ে পর্যায়ক্রমে নামাজ আদায় করিতে থাকেন। এই নিয়ম প্রায় ৫০০ বছর পর্যন্ত চালু থাকে।  তখন থেকে এক আল্লাহর দ্বীন এবং মুসলিম জাতির প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। অর্থাৎ সত্য ধর্মকে চারটি মাযহাবে বিভক্ত করে নবীর দ্বীনে বিপর্যয় ঘটান হল।

যার ফলে চার মাযহাবের অনুসারীগণ চার ইমামের পেছনে ভিন্ন-ভিন্নভাবে জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ হানাফী অনুসারীগণ হানাফী মাযহাবের ইমামের পেছনে, মালেকী মাযহাবের অনুসারীগণ মালেকী মাযহাবের ইমামের পেছনে, এভাবে অপর দুটি মাযহাবের অনুসারীগণও তাঁদের স্ব-স্ব মাযহাবের ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করতেন। এই ঘটনার সাড়ে পাঁচশত বৎসর পর সৌদী আরবের বাদশাহ আব্দুল আযীয আল সউদের রাজত্বকালে ১৩৪৩ হিজরিতে বাদশা সাউদ ইবনে আবদুল আযীয তাঁর সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ প্রবেশ করেন। তিনি তখন তিনি হারাম শরিফে সকল মুসল্লিকে একই ইমামের পেছনে একই সাথে জামায়াতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ জারি করেন। কাবার হেরেম হতে এ জঘন্য বিদ’আত রহিত করেন। কাবার হেরেম থেকে মূল উৎপাটিত হলেও পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম প্রধান দেশে এই মাযহাবগত বিভক্তি এখনও প্রকটভাবে বিদ্যমান।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ‏”‏‏.‏ قَالَ عِمْرَانُ فَلاَ أَدْرِي أَذَكَرَ بَعْدَ قَرْنِهِ قَرْنَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا ‏”‏ ثُمَّ إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلاَ يُسْتَشْهَدُونَ، وَيَخُونُونَ وَلاَ يُؤْتَمَنُونَ، وَيَنْذُرُونَ وَلاَ يَفُونَ، وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السِّمَنُ ‏

আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। ‘ইমরান (রাঃ) বলেন, তিনি তাঁর যুগের পর দু’যুগ অথবা তিন যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। অতঃপর এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না। তারা হবে চর্বিওয়ালা মোটাসোটা। সহিহ বুখারী : ৩৬৫০, ৬৪২৮

এই তিনটি যুগ যেহেতু শ্রেষ্ঠ এবং তাদের মাঝেও মতভেদ ছিল কিন্তু তারা মাযহাব সৃষ্টি করেননি। তাদের পরে অনেক মুহাদ্দিস বহু সহিহ হাদিস সংকলন করেছেন, কিন্তু তাদের নামে মাযহাব তৈরি করতে বলেনি। অথচ চার নাম মহান মুজতাহিদ আলেম ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তাদেরই নামে মাযহাব সৃষ্টি করা হল।

৮। সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা:

আমরা হয়ত অনেক সময় অনুমান করে বলে থাকি কালের আবর্তে মানুষেরা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্মে সৃষ্টি করেছে। মহান আল্লাহ কিন্তু কুরআনে সঠিক কথা বলে দিয়েছেন যে, পরিপূর্ণ তাওহীদের আলোকেই মানুষ ধর্ম সূচনা করে  আদম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। কারণ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম তাকে সৃষ্টি করেছিলেন তাকে প্রকৃত সত্যের জ্ঞান দান করেছিলেন এবং তাকে সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দিয়েছিলেন। তারপর থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনী আদম সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন তারা একটি উম্মাত ও একই দলভুক্ত ছিল। কালের আবর্তে তারা তাওহীদ ভুলে যায়  এবং আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে তারা নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে থাকে। তাদের আবার সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দান করে ইহকাল ও পরকালের অনিষ্টকারিতা থেকে মুক্তিদানের লক্ষ্যে মহান আল্লাহ নবি পাঠাতে শুধু করেন। মানুষের সামনে তাদের হারানো সত্যপথ সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরে তাদেরকে পুনরায় একই উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হতভাগ্য আদম সন্তান সত্য ও সঠিক বুঝান পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে সত্য কে অস্বীকার করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবি পাঠানোর উদ্দেশ্য হল, তাওহীদের সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু মহন আল্লাহর আয়াত বলছে সত্য প্রকাশ করার পরও তারা শুধু জেদ এবং বিদ্বেষের বসিভুত হয়ে মতভেদ করে থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلاَّ الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ لِمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللّهُ يَهْدِي مَن يَشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ*

অর্থঃ সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুত কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত, তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন। সুরা বাকারা : ২১৩

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরও বলেন

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ إِلاَّ مِن بَعْدِ مَا جَاءهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত। সুরা আল ইমরান ৩:১৯

৯। সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে

ভারত উপমহাদেশে পীরের আস্তানা বা খানকা মাধ্যমে শির্ক প্রচারের পাশাপাশি ইসলামও প্রচার লাভ করে। কিন্তু এই সকল আস্তানা বা এলাকা অনেক হিন্দু মুসলিম বানালেও খাটি মুসলিম বানাতে পারে নাই। বরং বানিয়োছে মুশরিক মুসলিম। এই সকল আস্তানা বা খানকা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কোন না কোন সুফি তরিকার লোক। তাই এদের আমলের শিরকের পাশাপাশি আকিদার শির্ক ও পরিরক্ষিত হয়। আমাদের উপমহাদেশের সুফিগণ প্রচুর শির্ক আকিদা প্রষোণ করে। এ আলোচনার শুরু যে দশটি ভ্রান্ত আকিদা আলোচনা করা হয়েছে তার সবগুলিই সুফিদের মাঝে বিরাজমান। এই ভ্রান্ত আকিদাগুলি তারা আস্তানা বা খানকা আশ্রয় করেই প্রচার করে। তাই তো অনেক জ্ঞানী মনে করেন, ইসলাম মন্দিরে বা গির্জায় যত টুকু অসম্মান হয়েছে তার চেয়ে বেশী অসম্মান হয়েছে এই আস্তানা বা খানকা। এর সত্যতা ও পাওয়া যায় এখানকার আচার আচরণ লক্ষ করলে। এই সকল আস্তানা বা খানকায় পীরের মৃত্যু বার্ষিকী কে কেন্দ্র করে দুটি ঊরশ করা। কোন কোন পীরের আস্তানায় পুরুষ ও মহিলা সহাবস্থান করে নাচ, গান, জুয়া ও মদের আসর বসায়। তারা  পীরের মৃত্যুর পর তার কবর পাকা করা সেখানে গম্বুজ তৈরি করে থাকে। পীরের কবরের নিকট ঊরশ উপলক্ষ্যে সিরনি, মিষ্ট, গরু, ছাগল, সবজি ইত্যাদি মান্নত করে। এমনকি সেখানে নিয়মিত শির্ক মিশ্রিত মারেফাতি গানের আয়োজন করা হয়। এই সকল মাজারের খানকায় প্রায়ই বড় বড় আওয়াজে হু হু হু হু শব্দে আল্লাহকে ডাকে এবং তাদের পীরের ধ্যান করে।  কোনো পীরের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে। তাদের বিদআতি কাজ কর্মের উপর ভিত্তি করে তারা তাদের মধ্যেও বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন।

সত্যিকারের মুসলিম যখনই এই সকল শির্ক ও বিদআতি কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে তখনই উম্মতের মাঝে বিভক্তির বিষ বপন হয়। সুফিদের উত্থানের ফলে শিরক ও বিদআতি আমলেরও উত্থান ঘটে। সুফিদের বিভিন্ন তরিকা আছে। এক এক তরিকার লেবাস বা পোশাক এক এক ধরনের। তাঁর আমলের মাঝেও পার্থক্য দেখা যায়। তাদের এই ভিন্নতার জন্য তাদের মাঝেও শত শত তরিকা বা ফির্কা বিদ্যমান। তাদের মাঝের এই ফির্কাবাজিও ইসলামকে টুকরা টুকরা করে ছেড়েছে। অনেক মুসলিম তাদের এ সকল শির্ক ও বিদআতি আমল ইলমের সাহায্য প্রত্যাখান করে। ফলে বিদআতিদের সাথে সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের বিবাধ বাধে। এভাবে সুফিগন প্রকৃত আলেমদের নিকট থেকে দুরা সরে যায় আর সুফিবাদী ফির্কার উৎপত্তি হয়। মূলত বিদআতের ভিন্নতার কারণে তাদের তরিকাও ভিন্ন। নিম্ন তাদের কিছু তরিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(১) বিভিন্ন সুফিদের নামে তরিকা সৃষ্টি

বিদআতি আমলের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে আজ হাজার হাজার তরিকা বিদ্যমান। এই তরিকার নামে ইসলাম ধর্মকে টুকরা টিকরা করে ছেড়েছে। এক এক তরিকার আমল এক এক প্রকারের তাদের আকিদাগত মতবিরোধের সাথে আকিদাগত ভ্রান্তি আছে। ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে আশরারি ও মাতুরিদি মতবাদ নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাজহাব নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক এলমে তাসাউফের ক্ষেত্রেও সুফিদের ভিন্ন ভিন্ন রীতি পদ্ধতি রয়েছে এটাকেই বলা হয় তরিকা। এলমে ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ইমামদের নামানুসারেই মাজহাবের নামকরণ করা হয়েছে, তেমনি এলমে তাসাউফের তরিকাগুলোকেও বিশেষ সুফিসাধকদের নাম দ্বারা নামকরণ করা হয়েছে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচরণ স্থান মক্কা মনীনায় কোন যুগেই সুফিদের প্রভাব ছিল না এবং আজও নেই। সুফিদের নামে সুফিবাদ বর্তমান সমাজে চালু আছে তাদের উৎপত্তি ও উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে (ইরান)। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত সুফিদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরিকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। চরমোনাই পীর সৈয়দ মোঃ ফজলুল করীম সাহেব ভেদে মারেফত বা ইয়াদে খোদা কিতাবে ১২৬ তরিকা থাকার কথা বলেছেন। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী তরিকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি তরিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরিকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরিকার নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরিকা হচ্ছে-

ক। কাদেরিয়া তরিকা, খ. চিশতিয়া তরিকা,  গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা, গ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা, ঙ।  নকশবন্দিয়া তরিকা  এবং চ। সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা।

এই সকল তরিকা যাদের নামের তাদের সাথে সম্পৃক্ত, তারা তারা এই তরিকা প্রতিষ্ঠিত করতে কতটুকু দায়ী ছিলেন তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে অধিকাংশ সুফিগণই তরিকা সৃষ্টির জন্য যে সকল উপদান দরকার তা সরবরাহ করে গিয়েছেন। শুধু বড় পীর ক্ষেত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ কোন তরিকা সৃষ্টি করেনি বলে জানা যায়। তার মৃত্যুর পর তার ভক্তরাই তার নামে কাদেরীয়া তরিকা প্রতিষ্ঠাতা করেছেন।

ক। কাদেরিয়া তরিকা : 

আব্দুল কাদের জিলানী হলেন ইসলাম ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসেবে সুবিদিত। হজরত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।  হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউসসানী আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ পরলোক গমন করেন। বিদাআতি মুসলিমগণ প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার মৃত্যু দিবস পালন করে যার নাম দিয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম। তার নামে সবচেয়ে বেশি শির্ক মিশ্রিত কল্প কাহিনী সমাজে প্রচলিত আছে। তার নামেই কাদেরিয়া বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

খ। চিশতিয়া তরিকাঃ

মইনুদ্দিন চিশতী হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক। তিনি গরিবে ‘নেওয়াজ’ নামেও পরিচিত। ১১৩৮ ইংরেজিতে (৫৩৭ হিজরী) মধ্য এশিয়ায় খোরাসানের অন্তর্গত সিস্তান রাজ্যের সানজার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিস্তিয়া তরিকার অপর প্রসিদ্ধ ছুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খেলাফত বা ছুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন। মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরির ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইন্তেকাল করেন। ভারতের আজমীরে তাকে দাফন করা হয় এবং এ আজমিরে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এর মাজার অবস্থিত। মোগল সম্রাট আকবর তার মাজার শরিফ বেষ্টনী করে একটি সুরম্য সমাধিসৌধ নির্মাণ করে দেন। ৯৭৮ হিজরিতে বাদশাহ আকবর খাজা সাহেবের মাজার সংলগ্ন স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি সাদা ও লাল মর্মর পাথরে নির্মিত। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমিরে তার সমাধিস্থলে উরস অনুষ্ঠিত হয়। আজমীর শরীফ কালক্রমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে এখানে আসেন দর্শক হিসেবে। কিছু অজ্ঞ পীর পন্থী মুসলীম এখানে আসে তাদের মনের আশা পূরণ করতে। তারা মনে করে আজমীর হল শ্রেষ্ঠ রুহানী রাজধানী এবং  ফয়েজ বরকত হাসিলের মারকাজ অথচ এসব কারণে তারা ইসলাম ও মুসলিম থেকে খারিজ হয়ে যায়। ভারতবর্ষে শিরক ও পৌত্তলিক জাহিলিয়াতের অন্ধকারের সাথে তারা মিলেমিশে শির্ক কাজ করে ইসলামের নামে। তারা মুসলিম দাবি করে কিন্তু ইসলামের নামে বিদআতও করে থাকে।  মইনুদ্দিন চিশতী নামে চিশতিয়া তরিকা সমাজে প্রচলিত আছে এবং তরিকা প্রতিষ্ঠা করার পিছনে তার সরাসরি ভূমিকা লক্ষণীয়।

গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা :

মাইজভান্ডারি দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর। কথিত আছে, তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দীন গৌড়ি ১৫৭৫ সালে ইসলাম প্রচার মানুষে চট্টগ্রামে আগমন করেন। এবং পটিয়া থানার কাঞ্চননগরে বসতি স্থাপন করেন। তার এক পুত্র সন্তান সৈয়দ আবদুল কাদের ফটিকছড়ি থানার আজিম নগরে ইমামতির দায়িত্ব নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। তার প্রপৌত্র মওলানা সৈয়দ মতি উল্লাহর পবিত্র ঔরসে শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার মাইজভান্ডার শরীফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ৭৯ বছর বয়সে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। প্রতি বছর ৮, ৯ ও ১০ মাঘ তার ওফাত দিবস উপলক্ষ্যে ৩ দিনব্যাপী ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশবিদেশের লক্ষ-লক্ষ মাইজভান্ডারিয়া তরিকার ভক্তের সমাগম ঘটে। এই ভণ্ড কাজ্জাব নিজেই মাইজভান্ডারিয়া তরিকা তরিকা প্রতিষ্ঠা করে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ঈমান নষ্ট করে চলছে।

ঘ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা :

মুজাদ্দিদে আলফে সানির পুর নাম ছিল, শাইখ আহমেদ আল ফারুকি সিরহিন্দি। তাকে অনেক একজন ইসলামি পণ্ডিত হিসাবেও চিনে। তিনি ফিকহের ক্ষেত্র হানাফি মাযহার অনুসরণ করতেন এবং তরিকার ক্ষেত্র নকশবন্দি সুফি তরিকার অনুসারী করতেন। তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বলা হয় যার অর্থ “দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক”। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধীতার জন্য তিনি অধিক পরিচিত। মুজাদ্দিদে আলফে সানি ১৫৬১ সাল মোতাবেক ৯৭১ হিজরির জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৬২৪ সালে মারা যান। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। ভারতের সিরহিন্দে তার মাজার অবস্থিত। তিনি নকশবন্দি তরিকার অনুসারী হলেও পরে তার নামেই মুজাদ্দিদিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ঙ। নকশবন্দিয়া তরিকা :

শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী (রঃ) বোখারার সন্নিকটে কাসরে আরেফান নামক স্থানে ৭১৮ হিজরি সনের মহররম মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হজরত জালানুদ্দীন।

শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী ৭৯১ হিজরিতে ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মাজার  কাসবে আরেফানে অবস্থিত। তাকেই নকশবন্দী তরিকার প্রতিষ্ঠানা মনে করা হয়।

চ। সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা :

সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১১৪৫ সালে তার জন্ম হয়। তার জম্ম নিয়ে অনেক ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি মোসেলের নিকটবর্তী ইরবিলে হিজরি ৬০৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরি ৬৮১ সালে ৫৩ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। কারো কারো মতে, তার জীবনকাল ঈসায়ী ১২১১ হতে ১২৮২ সাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষায় সুফীতত্ত্বের ওপর প্রচুর বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং তরিকতের আলোচনায় সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার বর্ণনাও স্থান পেয়েছে। কথিত আছে এই বিখ্যাত সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১২৩৪ সালে তার মৃত্যু হয় তবে এর সত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার নামেই সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

যে সকল তরিকাসমূহ উল্লেখ করা হল এ ধরনের কিছু ইসলামে নেই, অথবা এর কাছাকাছিও কিছু নেই। এই ধরনের তরিকা সৃষ্টি করা ইসলাম পরিপন্থি কাজ। কাল কিয়ামতের দিনে অবশ্যই মহান আল্লাহ নিকট জবার দিহি করতে হবে। কুরআন হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী এক দল বাদে সকলেই ভ্রান্ত দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। হাদীস যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, “ইহুদিরা একাত্তর ফিরকাহ’য় বিভক্ত হয়েছে এবং খ্রিস্টানেরা হয়েছে বাহাত্তর ফিরকায়। আমার উম্মাহ বিভক্ত হবে তিহাত্তর ফিরকা হবে। আর এদের প্রত্যেকটি হবে জাহান্নামি একটি ব্যতীত। জানতে চাওয়া হল, “তারা কারা, হে আল্লাহর রাসূল?” এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের অনুসরণ করতে থাকবে এবং বিজয়ী হবে, এবং তাদের যারা অভিশাপ দেয় কিংবা বিরোধিতা করে তারা সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর ফরমান নাজিল হয়। মনে রাখতে হবে ‘সত্য’ আছে কুরআন এবং সহিহ হাদীস অনুসরণের মধ্যে। এটাই আল্লাহর পথ, এবং সরল পথ। মহান আল্লাহ বলেন,

وَكَذَٲلِكَ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ رُوحً۬ا مِّنۡ أَمۡرِنَا‌ۚ مَا كُنتَ تَدۡرِى مَا ٱلۡكِتَـٰبُ وَلَا ٱلۡإِيمَـٰنُ وَلَـٰكِن جَعَلۡنَـٰهُ نُورً۬ا نَّہۡدِى بِهِۦ مَن نَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِنَا‌ۚ وَإِنَّكَ لَتَہۡدِىٓ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬ (٥٢) صِرَٲطِ ٱللَّهِ ٱلَّذِى لَهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ أَلَآ إِلَى ٱللَّهِ تَصِيرُ ٱلۡأُمُورُ (٥٣)

অর্থঃ এভাবেই আমি আপনার প্রতি ওহি প্রেরণ করেছি, কুরআন আমার নির্দেশ। আপনিতো আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি। কিন্তু সেই কুরআনকে আমি একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ দেখিয়ে থাকি৷ নিশ্চয়ই আপনি এর সাহায্যে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন। সেই আল্লাহর পথ যিনি, যা কিছু আছে আসমানে ও যা কিছু আছে জমিনে তার মালিক। জেনে রাখ, যাবতীয় বিষয় সেই আল্লাহর সমীপে প্রত্যাবর্তন করে। (সুরা আশ-শুরা ৪২:৫১-৫৩)।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ থেকে ইসলাম যতই দুরে যাচ্ছে কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে ততই সুফিবাদের ধ্যানধারণা এবং বিজাতীয়দের আমল আখলাক মুসলিমদের মাঝে প্রসার লাভ করে। বিজাতির নোংরা রীতি-নীতির জালে আটকা পড়ে ইসলাম তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর হাজার হাজার শিরকি আকিদা ও বিদআতী রীতি-নীতির ইসলামে ঢুকে পড়েছে। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা এর বিষাক্ত থাবায় ঈমান হারাচ্ছে। এভাবে মানুষ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরছে।  একক তরিকা বাদ দিয়া হাজারও তরিকা তালাশ করছে।

১০। মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়

মাজার কেন্দ্রিক আমল কে কেন্দ্র করেও ইসলাম আজ হাজার হাজার ফির্কাবন্দী। ইসলামে মাজার বা করব কেন্দ্রিক কোনো আমলের স্থান নেই। তাই যখনই কোন মুসলিম মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে এবং ইহাকে ইসলামি শরীয়তের আমল বলে দাবি করে তখন মূল ধারার কুরআন সুন্নাহ আলেমদের সাথে মতবিরোধ বাধে। অধিকাংশ মাজার পন্থীদের আকিদা ভ্রান্ত তাই তাদের নিজেদের মাঝেও বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত। তারা মনে করে তাদের কল্পিত অলি,  আওলিয়া, পীর কবরে আমাদের মতই জীবিত আছেন।  তারা মানুষের ভালো মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন। তারা মরার পরও বিপদে আপদে সাহায্য করতে পারে এমনকি মরার পর তাদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই তারা তাদের পীর বা অলি আওলিয়াদের আহ্বান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু বিপদে থেকে উদ্ধার কামনা করে। তোদের পীরদের মাঝে আবার যারা গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদি উপাধি পেয়েছেন তারা আরও বেশি হাজত পুরা করতে পারে। এই জন্য তারা তাদের অলি-আওলিয়া ও তরিকার মাশায়েখদের কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ, তাতে বাতি জ্বালানো, কবর ও মাজার জিয়ারত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। সেখানে তারা তাদের আহ্বান করে জরুরত পুরা করার জন্য দোয়া করে। অথচ দোয়া বা ফরিয়াদ শুধু আল্লাহর জন্যই খাস।

এভাবে তারা কবর কে মাজার (দর্শনীয় স্থান) এ পরিণত করে। আর হাজার হাজার ভক্ত তাদের ফরিয়াদ নিয়ে মাজারে শায়িত ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ জানাতে আসে। হিন্দুরা যেমন সিজদা দ্বারা তাদের  দেবীকে খুসি করে ঠিক তেমনি অনেকে মাজার ভক্ত মুসলীম মাজারে সিজদা করে তার দ্বারা শায়িত ব্যক্তিকে খুশি করে তার সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্টি কামনা করে যা তাদের হিন্দু বা  মুশরিক বানিয়ে দিয়েছে। যে মুসলীম এদের মুশরিক ভাবতে পারবে না, সে তাদেরই সমর্থক হবে। এভাবে মাজার কেন্দ্রিক তারা উরশ এর আয়োজন করে, মাজার কে কাবার মত তাওয়াফ করে। মাজার কেন্দ্রিক কিছু আমল আছে যা সরাসরি কুরআন হাদিসর বিপরীত। এখান থেকেই সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে তাদের বিরোধ বা বিভক্তির সূত্রপাত হয়।

ক। প্রথম উদাহরণ :

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

আল্লাহ তা’য়ালা ইয়াহূদীদের ধ্বংস করুন। তারা তাদের নবিদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৭

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, উম্মে হাবীবা ও উম্মে সালমা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটি গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন-

إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‏

তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহর কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টি বলে গণ্য হবে। সহিহ বুখারি  : ৪২৭

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মসজিদকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরি করতে নিষেধ করেছেন। সেখানে বিদআতিগণ মসজিদকে কেন্দ্র করে মাজার তৈরি করে সত্যিকারের মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে।

খ। দ্বিতীয় উদরাহরণ-

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ

তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না এবং আমার কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার উপর দোয়া পাঠ করো। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে। সুনানে আবু দাউদ : ২০৪২

এই হাদিসে কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত নিষধ করা হয়েছে, তারপরও পীরভক্ত মানুষ এই কাজ করে নেকীর আশায় করে থাকে। তারা ইসলাম বিরোধী কাজ করে মহান আল্লাহ স্বন্তষ্টির আশায় মাজারে উরস করে থাকে।

গ। তৃতীয় উদরাহরণ-

ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতকারিণী মহিলাদের উপর লা’নত করেছেন। আর যারা কবরের উপর মসজিদ বানায় এবং বাতি জ্বালায়, তাদের উপরও তিনি অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬ হাদিসের মান জঈফ

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন ঐ সকল স্ত্রী লোককে যারা (ঘন ঘন) কবর জিয়ারত করতে যায় এবং ঐ সব লোককেও অভিশাপ দিয়েছেন যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে বা তাতে বাতি জ্বালায়। মিশকাত : ৭৪০, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনানে নাসায়ী : ২০৪৩ হাদিসের মান জঈফ

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট বলা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত বর্ষিত হয়। অথচ মাজার ভক্ত লোকের এই কাজর করে সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে। নতুন বিদআতি ফির্কার জম্ম দিচ্ছে।

মাজার কেন্দ্রিক এই শির্ক ও বিদআতি আমলের সাথে ইসলামে কোনো সম্পর্ক নেই। যারাই এই ধরনের বিদআতি আমলের সাথে জড়িত তাদের সাথে সঠিক পথের অনুসারীদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এ সকল বিদআতী আমলের কারণে কবর পূজারি এবং মাজার ব্যবসাই নামে নতুন একটি ফির্কার সৃষ্টি হয়,  যারা নিজেরা বিভ্রান্ত এবং সাথে সাথে অন্যদের বিভ্রান্ত করে তাদের ফির্কা ভারি করে।

মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুসলিম উম্মার মাঝে বিভিন্ন দল সৃষ্টির ফলে আজ আমাদের এমন করুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দেই আর আমাদের দেশের দিকে দৃষ্ট দেই, সকল স্থানেই আমাদেরকে মাঝে বিভেদ আর বিশৃঙ্খলা বেড়া জাল দ্বারা আটকে রেখেছে। এই বইটিতে উম্মতের মতবিরোধের কুফল ও কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এই পর্যায় মতবিরোধ দূর করার জন্য আমাদের করণীয় কাজসমূহ উল্লেখ করব, (ইনশাআল্লাহ)। মতবিরোধ দুর কারণে আমাদের করণীয় প্রথম ও প্রধান কাজ হল- যে সকল কারণে বিভক্ত সৃষ্ট হয়েছে তা পরিহার করা। বিভক্তির কারণ হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করেছিলাম উম্মতের মাঝে আকীদার ব্যাপারে ব্যাপক মতভেদ আছে এবং সে সম্পর্কে আলোচনাও করেছি। প্রথমে আমাদের সালাফদের গৃহীত শির্ক বর্জিত, সহিহ ও সঠিক আকিদা অনুসারী হতে হবে। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ থাকলেও তারা সাহাবিগণের পদ্ধতি অনুসরণ করে মতভেদের ব্যাপারে ব্যাপক প্রশস্ততা দেখিয়েছেন। তারা কোনো স্পষ্ট বিষয়ে মতভেদ করেনি। কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষা, পরস্পর বিরোধী হাদিস, হাদিস না জানার জন্য মতভেদ করতেন কিন্তু যখনই কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট দলিল পেতেন নিজের মতামত ছেড়ে দিতেন। মুজতাহিদ আলেমদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল- তারা তাদের কোন ইজতিহাদকে শতভাগ সঠিক মতে করতেন না, তাই তারা হাদিস পেলে ইজতিহাদ ছেড়ে হাদিসের অনুসরণ করতে বলতেন। অপর পক্ষে তারা অন্য মুজতাহিদ আলেমের রায়কেও সম্মান দেখাতেন। এই কারণে মুজতাহিদ আমাদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ হলেও তাদের মাঝে মতবিরোধ বা দলালদি হয়নি। কাজেই আমাদেরও ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েলে প্রশস্ততা দেখাতে হবে। উম্মতে মাঝে তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা ব্যাপক। তারা যেন তাওহীদের সঠিক অর্থ বুঝে সঠিক বিশ্বাস নিয়ে চলতে পারে তার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে তাওহীদের সঠিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। ইমাম জুমার খুতবায়, বক্তাগণ তাদের বিভিন্ন বক্তৃতায়, লেখকগণ তাদের লেখায় তাওহীদের সঠিক মর্মবাণী তুলে ধরতে হবে। উপমহাদেশে সুফিদের পরিচালিত কর্মকাণ্ড যতটুকু শির্ক বা বিদআত আছে তা সম্মানের সাথে যুক্তি সংগতভাবে তুলে ধরতে হবে, তা না হলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। কারণ সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করলে কেউ আপনার সঠিক কথায় মূল্যায়ন করবে না। এ কথা বলেও তৃপ্তির ঢেকুল গেলা যাবেনা যে, আমার নিজের মতামত শতভাগই নির্ভর। আমাদের দেশে মাজার ভক্তের সংখ্যা একেবারে কম নয়। মাজার ভক্তের অধিকাংশই অশিক্ষিত। তাই তাদের মাজার কেন্দ্রিক আমল সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। এক কথায় বিভক্তির কারণ থেকে করণীয় আলোচনা করা হল। ইহার পাশাপাশি মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে আমাদের নিম্নের কাজেগুলি করত হবে তবেই মতবিরোধ বা দলাদলি থেকে মুক্তি পাব। মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

০৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে প্রথম চারটি আলোচিত হলো :

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

ঐক্য বজায় রাখা ফরজ। ঐক্য মুসলিম জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ তায়ালা ও  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবি হচ্ছে- ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন।    তাওহিদের পরে মুমিনদেরকে যে ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা হলো- ঐক্য। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا ۚ وَكُنْتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

“তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে মিল সৃষ্টি করেছিলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। সুরা আলে ইমরান : ১০৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

অর্থ : তিনি তোমাদের জন্য সেই ধর্ম নির্ধারণ করেছেন যা নূহকে আদেশ দিয়েছিলেন, যা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি, এবং যা ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে আদেশ দিয়েছিলাম। ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভক্ত হয়ো না। সূরা শুরা : ১৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোশ মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।সুরা হুজুরাত : ১০

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। তা না হলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে। ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। সুরা আনফাল : ৪৬

মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখা সকল উম্মতের উপর ফরজ। ফির্কাবাজী করে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হওয়া হারাম কাজ। মহান আল্লাহ এই নির্দেশ মেনে সকল উম্মত কে ঐক্য বজায় রেখে চলতে হবে। আমাদের মাঝে যে সকল মতভেদ বিদ্যমান আছে, তা ভুলে একই কাতারে এসে দাঁড়ান এখন সময়ের দাবি। কোন দল বা নেতার কথা কান না দিয়ে মহান আল্লাহ নির্দেশ পালনার্থে সবাইকে ঐক্য বদ্ধ হতে হবে। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবিদের অনুসৃত পথই হল আসল ও হেদায়েতের পথ তাদের পথে চললে ঐক্য থাকা খুবই সহজ হবে। তারাই মহান আল্লাহর এই নির্দেশ বেশী বুঝেছেন এবং বেশী অনুসরণ করেছেন। ঐক্যবদ্ধ থাকতে যে কোনো প্রকারের স্বার্থ কুরবানি করতে প্রস্তত থাকতে হবে। কুরআন সুন্নাহর সামনে নিজে সমর্পণ করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই একটি মাত্র নিয়তই সমাজের মতবিরোধ কমাতে অনেকাংশে ভূমিকা রাখতে পারে। যার ফলে মুসলিমরা আল্লাহ আদেশ মেন ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে-

জামাত শব্দটি আরবি “جَمَاعَة” (জামাআহ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দল, গোষ্ঠী বা সংঘ। ইসলামের পরিভাষায়, জামাত বলতে সেই গোষ্ঠী বা দলকে বোঝানো হয় যারা কুরআন ও সুন্নাহকে তাদের জীবন ও কাজের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে এবং ইসলামের মূল আদর্শের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে।

অপর পক্ষে ফিরকা শব্দটি আরবি “فِرْقَة” (ফিরকাহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ বিভক্তি বা গোষ্ঠী। ইসলামের পরিভাষায়, ফিরকা বলতে সেই দল বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা ইসলামের মূল শিক্ষাগুলো থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতবাদ, চিন্তাধারা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এ ধরনের বিভক্তি সাধারণত কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থি এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে জামাত এবং ফিরকা দুটো ভিন্ন বিষয়। জামাত সাধারণত ইসলামের মূল আদর্শে ঐক্যবদ্ধ একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ফিরকা বলতে বিভক্ত গোষ্ঠী বা মতবাদের দলকে বোঝায়, যারা কোনো বিশেষ মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এদের মধ্যে ১০টি মূল পার্থক্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ঐক্য বনাম বিভাজন

জামাত: ইসলামের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে ঐক্য বজায় রাখে।

ফিরকা: ভিন্ন মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভাজন সৃষ্টি করে।

২. আদর্শের ভিত্তি

জামাত: কুরআন ও সহিহ হাদিসকে তাদের মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।

ফিরকা: তাদের নিজস্ব মতবাদ, ইজতিহাদ, বা দার্শনিক চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে।

৩. ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি

জামাত: ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ ও প্রচার করার চেষ্টা করে।

ফিরকা: কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা মতবাদে অধিক জোর দেয়।

৪. আন্তর্জাতিকতা বনাম আঞ্চলিকতা

জামাত: জাতি, বর্ণ, ও অঞ্চলভেদে সকল মুসলিমকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে চায়।

ফিরকা: নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

৫. ধর্মীয় নেতৃত্ব

জামাত: নেতৃত্ব নির্বাচনে ইসলামি নীতিমালা মেনে চলে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ প্রচারে কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

৬. বিধানের প্রয়োগ

জামাত: ইসলামের শারী‘আহর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ চায়।

ফিরকা: শারী‘আহর নির্দিষ্ট অংশের উপর জোর দেয়।

৭. সাম্প্রদায়িকতা

জামাত: সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়।

ফিরকা: নিজেদের গোষ্ঠী বা মতবাদকে প্রাধান্য দেয়।

৮. মতভেদের প্রতি মনোভাব

জামাত: মতভেদের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাধান খোঁজে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ সঠিক প্রমাণে জেদ ধরে।

৯. প্রভাব ও প্রসার

জামাত: ইসলামের প্রকৃত বার্তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চায়।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ বা চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

১০. ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা

জামাত: ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফিরকা: ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে কখনো কখনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থঃ নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন।৷  সূরা আনআম : ১৫৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَلَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ تَفَرَّقُوۡا وَاخۡتَلَفُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَہُمُ الۡبَیِّنٰتُ ؕ  وَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ۙ

আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব। সুরা আল ইমরান : ১০৫

ফির্কা সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকার বিপদ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ

জামাআতের উপর আল্লাহ্ তায়ালার হাত (রহমত) থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৬, মিশকাত : ১৭৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلَالَةٍ وَيَدُ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذَّ شَذَّ فِي النَّار

আল্লাহ তা’আলা আমার গোটা উম্মাতকে; অপর বর্ণনাতে তিনি বলেছেন, উম্মাতে মুহাম্মাদিকে কখনও পথভ্রষ্টতার উপর একত্রিত করবেন না। আল্লাহ তা’আলার হাত (রহমত ও সাহায্য) জামা’আতের উপর রয়েছে। যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সে বিচ্ছিন্ন হয়ে (অবশেষে) জাহান্নামে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৭, মিশকাত : ১৭৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাঁড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বলেন, আমার সাহাবিদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩৬৩

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসলামে জামাত তথা ঐক্যবদ্ধ থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ব্যক্তিকে শয়তান সহজে ধ্বংস করতে পারে। মুসলিম উম্মাহকে বিভেদ এড়িয়ে ঐক্যের পথ অনুসরণ করতে হবে।

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

মুসলিম উম্মার মাঝে ঐক্য ঠিক রাখতে হলে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ করতে হবে। এই উম্মায় নিজেদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত না হয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তার কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ করতে হবে।

আল্লাহ রব্বূল আলামিন বলেন-

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সূরা নিসা : ৫৯

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থঃ অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। সূরা নিসা : ৬৫

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا

অর্থঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়। সুরা আহযাব : ৩৬

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ

“তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করো, তার সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। সুরা শুরা : ১০

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

রাসূল তোমাদের যা দান করেন, তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”

সুরা হাশর : ৭

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, মতবিরোধ দেখা দিলে মুসলমানদের উচিত কুরআন ও রাসুলের সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং এর মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সঠিক পথনির্দেশ নিশ্চিত হয়। এই সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিসের প্রতি লক্ষ করুন।

আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَرَكْتُ فيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُما كِتابَ الله وسُنَّتي وَلَنْ يَتَفَرَّقا حَتَّى يَرِدا عَلَيَّ الحَوْضَ

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৫০০, হাকেম : ৩১৯

মুয়াত্তা মালিকের এক হাদিসে এসেছে-

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ

মালিক (রহঃ) বলেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, আমি তোমাদের নিকট দুইটি বস্তু ছাড়িয়া যাইতেছি। তোমরা যতক্ষণ উহাকে ধরিয়া থাকিবে পথভ্রষ্ট হইবে না। উহা হইল আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নত। মুয়াত্তা মালিক : ১৬৬১,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّتِي”

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি এগুলো আঁকড়ে ধরো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। মুসনাদ আহমদ: ৮৮৪৫,  সুনান দারিমি

উপরোক্ত হাদিসগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমদের জীবনের সব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসা উচিত। এটি মতভেদ সমাধানের প্রধান পন্থা এবং ইসলামি ঐক্য বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।

মতবিরোধ বা দলাদলির অন্যতম কারণ হল কুরআন সুন্নাহ থেকে দুরে থাকা। তাই কোনো বিষয় মতবিরোধ দেখা দিলে কুরআন সুন্নাহ থেকে সমাধান নিব। যদি সকলে সত্যিকারের কুরআন সুন্নাহর অনুসারী হত তবে মুসলিমদের মাঝে এত মতভেদ আর মতবিরোধ হতো না। ফিকহি মাসায়েল নিয়ে মতভেদ দেখা দিলেও তারা ঐক্য বদ্ধ থাকত। স্পষ্ট কুরআন সুন্নাহর বিপরীত কথা বলার মত সাহস কোন সত্যিকারের মুসলিম কোনো কালে করেনি আজও করবেনা। কাজেই মতভেদ পূর্ণ বিষয়গুলি কুরআন সুন্নাহ উপর ছেড়ে দিলে মুসলীম উম্মাহ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের হারান জৌলুস ফিরে পেত।

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

কুনআন সুন্নাহ মানদণ্ডে পরীক্ষতি আমিরের আনুগত্য ফরজ। কুনআন সুন্নাহ অনুসারী নতা বা আমিরকে আনুগত্য না করে, নতুন আমিরে তৈরি করে ইসলামকে টুকরা টুকরা করে দলে উপদলে ভাগ করা ইসলামি শরীয়ত হারাম।  কুরআন সুন্নার বহু স্থানে আমিরের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (আমির, বিচারক, শাসক)। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا فَمَاتَ عَلَيْهِ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

যে ব্যক্তি তার আমীরের কোন কার্যকলাপ অপছন্দ করে, তার উচিত ধৈর্যধারণ করা। কেননা যে কোন ব্যক্তিই শাসকের থেকে (আনুগত্য থেকে) বেরিয়ে গিয়ে বিঘত পরিমাণ সরে যাবে এবং তারপর এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৪৯

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

وَبِهَذَا الْإِسْنَادِ مَنْ أَطَاعَنِيْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمَنْ يُطِعْ الأَمِيْرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيْرَ فَقَدْ عَصَانِيْ وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ

যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানি করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই নাফরমানি করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানি করল সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানি করল। ইমাম তো ঢাল স্বরূপ। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ এবং তাঁরই মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জন করা হয়। অতঃপর যদি সে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার জন্য এর পুরস্কার রয়েছে আর যদি সে এর বিপরীত করে তবে এর মন্দ পরিণাম তার উপরই বর্তাবে। সহিহ বুখারি : ২৯৫৭, ৭১৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৩৫, মিশকাত : ৩৬৬১, সহিহ আল জামি : ৬০৪৪

নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) আবদুল্লাহ ইবনু মুতী (রা.) এর নিকট এলেন তখন হাররা (হৃদয় বিদারক) এর ঘটনা ঘটেছে এবং যুগটা ছিল ইয়াযীদ ইবনু মুয়াবিয়ার যুগ। তখন তিনি (ইবনু মুতী’) বললেন, আবূ আবদুর রহমানের জন্য বিছানা পেতে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে বসতে আসিনি, এসেছি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যে হাদীস শুনেছি তা তোমাকে শুনাতে। আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে তার কোন দলিল থাকবে না। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলো আর তার ঘাড়ে আনুগত্যের কোন চুক্তি নেই তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৫১

উপরের কুরআন ও হাদিসের আলোকে দেখতে পেলাম মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমিরের আনুগত্য করতে হবে। আমিরের আনুগত্য মেনে চললে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তির পথে আগানো সম্ভব। ইসলাম নেতৃত্ব মানার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম আমিরের অনুসরণ বা আনুগত্যের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। কিন্তু একটি কথা সব সময় লক্ষ রাখতে হবে আমিরের আনুগত্য শর্ত সাপেক্ষ। তাকে অনুসরণের মাপকাঠিও কুরআন সুন্নায় বিস্তারিত বলেছেন। কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী নেতার আনুগত্য প্রকাশ অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। সে সকল আমির আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে তাদের কোন আনুগত্য নাই। যে আয়াতে মহান আল্লাহ আমিরের আনুগত্য করার কথা বলেছেন, সে আয়াতেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থঃ অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

এ আয়াতে উলুল আমর বা আমিরের আনুগত্য শর্ত হলো তাদের মাঝে কোন বিষয় মতবিরোধ হলে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমাধা করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই তারা কুরআ সুন্নাহর বাহিরে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করার ক্ষেত্রে  আনুগত্য করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের আনুগত্য করল তারা মূলত আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ দাড় করার মত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মাবুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগি কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যে-সব মুশরিক কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১

বোঝা গেল, শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমাণ ছাড়াই আমিরের হালাল বা হারাম সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। উপরের আয়াত সম্পর্কে একটি হাদিস-

আদী ইবনু হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এলাম। তিনি বললেন, হে ’আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা তওবার  নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অনুবাদ) “তারা আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসারবিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। সূরা তওবা-৩১

তারপর তিনি বললেন, তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য উহাকে হারাম বলে মেনে নিত। সুনানে তিরমিজ : ৩০৯৫

তাফসিরে ইবনে কাসির লিখেন-

আদী ইবনে হাতেম নবি (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিল খ্রিষ্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবি (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে আদী বলেন, হ্যাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্য এমনটি করতাম। রসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদের প্রভু বানিয়ে নেয়া। সুরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, ইবনে কাসির

আমিরের আনুগত্য শুধু মাত্র হকের উপর-

আলী (ইবনু আবূ তালিব) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আনসারদের এক ব্যক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তাঁর (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। (কোন কারণে) আমির রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি বললেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনো। তাঁরা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তাঁরা ওতে আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে প্রবেশ কর। তারা আগুনে প্রবেশ করতে সংকল্প করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন অন্যদের বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়ে গিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ইতস্তত করতে করতে আগুন নিভে গেল এবং তার ক্রোধও ঠান্ডা হল। এরপর এ সংবাদ নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য (করতে হবে) কেবল সৎ কাজের। সহিহ বুখারি ৪৩৪০, ৭১৪৫, ৭২৫৭

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই-

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি নেতা বা কারো আনুগত্য করতে পারবে না। যাদের আনুগত্য করা ইসলামে জরুরি পাপের কাজে তাদেরও আনুগত্য করতে কেউ বাধ্য নয়। যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেন,

وَتَعَاوَنُواْ عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থ : সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা মায়েদা : ২ 

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ২৯৫৫, ৭১৪৪)

আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوف

নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সহিহ মুসলিম : ১৮৪০, আবূ দাঊদ : ২৬২৫, নাসায়ী : ৪২০৫, মিশকাত : ৩৬৬৫, আহমাদ : ৭২৪।

এই আলোচনা দ্বারা দুটি বিষয় বোঝ যায়-

(১) কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক শরীয়ত সম্মত আমিরের আদেশ মান্য করা ফরজ। এ সকল বিষয় মতবিরোধ করা হারাম। এ মতবিরোধ থেকেই নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

(২) অপর পক্ষে শর্থহীভাবে আমিরের অনুসরণ করে, তার সীমা লঙ্ঘনকে সহায়তা করে দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি। আমিরের ভ্রান্ত নীতির ফলে সত্যপন্থীরা তার থেকে দূরে চলে যায় এবং নতুন করে ফির্কার সৃষ্ট হয়।

৪। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কঠিন সতর্ক বাণী শুনে মতবিরোধ বা ফির্কা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকা-

মহান আল্লাহ নিষেধ করার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মতবিরোধ করে ফির্কা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। ঐক্যবদ্দভাবে মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থ: যারা নিজেদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে নিঃসন্দেহে তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই৷  তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রয়েছে৷ তারা কি করেছে, সে কথা তিনিই তাদেরকে জানাবেন৷  সূরা আন‘আম : ১৫৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

এবং তাদের মতো হয়ো না যাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পর মতভেদে লিপ্ত রয়েছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। সূরা আল-ইমরান : ১০৫

আরফাযা ইবন রায়হ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَرَفَعَ يَدَيْهِ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُرِيدُ تَفْرِيقَ أَمْرِ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُمْ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنًا مَنْ كَانَ مِنْ النَّاسِ

আমার পরে নিশ্চয়ই অনেক ফিতনা-ফাসাদ হবে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বললেন, তখন তোমরা যাকে দেখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ইচ্ছা করছে, অথচ তারা একতাবদ্ধ; তখন তোমরা তাকে হত্যা করবে, সে যে-ই হোক না কেন। সুনানে নাসায়ি : ৪০২১, সহিহুল জামে : ৩৬২২

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ فَقَالَ الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ

নুমান বিন বাশীর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছেন, জামআত (ঐক্য) হল রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা (মতবিরোধ) হল আজাব। হাদিস সম্ভার : ১৮৪৪, সহিহুল জামে : ৩১০৯, কিতাবুস সুন্নাহ, শায়বানী : ৮৯৫

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এই উম্মতকে একত্র করে এই ছাতার নিজে রেখে নেতৃত্ব নিয়েছেন এর মাত্র তার অনুসরণের মাধ্যমেই এই উম্মত আবার একই ছাতার নিচে আনা সম্ভব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসের মর্মবাণী উপলব্ধি করে দলাদলি বাদ দিতে হবে এবং তার প্রচারিত তাওহীদের ভিত্তিতে সকল উম্মত কে মুসলিম পরিচয়ে হতে হবে।

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে-

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

০৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে মাঝের চারটি আলোচিত হলো :

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

উম্মতের মতবিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে জাল ও জঈফ হাদিসের উপর আমল করাকে চিহ্নিত করেছি। ঐ আলোচনায় সহিহ, হাসান, জঈফ ও জাল হাদিস সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণ দেওয়া হয়েছে এবং এ কথা বলার বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে জাল ও জঈফ হাদিসের উপর আমল করার ফলে যারা সহিহ হাদিসের উপর সঠিক আমল করবে তাদের সাথে একটা বিরোধের সৃষ্টি হবে। এই আলোচনায় আমরা দেখব কিভাবে জাল ও জঈফ হাদিস পরিহার করে সহিহ হাদিসের উপর আমল করে মতবিরোধকে  প্রতিহত করতে পারি।

এই উম্মতের সকলে যদি জাল ও জঈফ হাদিস পরিহার করে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে অনুসরণ করে তবে নিজের মাঝে বিরোধ অনেকাংশে কমে যাবে। আমরা জানি- “ফিকহি মাসায়েল প্রদানের ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর পাশাপাশি ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজন। কিন্তু আকিদার বিষয় কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর বাহিরে কোন ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজন নাই।“

এই জন্য মাজহাবের ইমামদের মাঝে হাজার হাজার ফিকহি মতভেদ থাকলেও আকিদার কিছু সূক্ষ্ম বিষয় বাদে সকল আকিদা একই। আকিদার ক্ষেত্র উম্মার সকলে কুরআন ও সহিহ অনুসরণ করলে মতবিরোধের সিংহভাগই করে যাবে। মতবিরোধ কবার ফলে সকলে ফিকহি মাসায়েলেও প্রস্থতা দেখাবে। এমনি সুন্নাহ ও মুস্তাহাবে মতভেদ থাকলেও মতবিরোধ দেখা দিবে না।

মতবিরোধের পিছনে যেহেতু জাল ও জঈফ হদিসের বিরাট ভূমিকা তাই আমাদের প্রথম কাজ হলো এই 

জাল ও জঈফ হদিস চিহ্নিত করা। নিম্ন লিখিত উপায় জাল ও জঈফ হাদিস চিহৃত করতে পারি।

ক। জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে

খ। যে সকল বইয়ে জাল ও জঈফ হাদিসে ভরপুর তা পরিহার করা

গ। দ্বীন নেওয়া ক্ষেত্রে সঠিক আলেম নির্বাচন করা।

ক। জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে-

জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে জাল এ জঈফ হাদিস চিহ্নিত করতে পারলে সহজেই সহজে এর খপ্পর থেকে বাঁচা সম্ভব। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য এই সম্পর্কিত কিছু বই হলো-

১. বিশ্ব বিখ্যাত “সিলসিলাহ যায়ীফাহ” যা “যঈফ ও জাল হাদিস” নামে প্রকাশিত হয়। লেখক : শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ

২. হাদিসের নামে জালিয়াতী, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ। 

৩. এসব হাদিস নয় (দুই খন্ড), লেখক : মাওলানা মুতীউর রহমান ও মাওলানা আব্দুল মালেক।

৪. প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, ড.খ.ম. আব্দুর রাজ্জাক। 

৫. ইসলাম আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন।

৬. প্রচলিত জাল হাদীস”, আল্লামা হাফেয জুনায়েদ বাবুনগরী রাহিমাহুল্লাহ।

৭. মাউযূ হাদিস বা প্রচলিত জাল হাদিস”, প্রফেসর ড. মুফতি মুহাম্মদ মানজুরুর রহমান।

৮. জাল হাদীস, আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা, মাওলানা ডক্টর শাহ্‌ মুহাম্মাদ আবদুর রাহীম এবং

৯. বহুল প্রচলিত ১০০ জাল হাদিস, ড. মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন।

খ। যে সকল বইয়ে জাল ও জঈফ হাদিসে ভরপুর তা পরিহার করা

ইসলামি জ্ঞানচর্চায় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে কিছু বই ও সংকলনে জাল (মিথ্যা) ও জঈফ (দুর্বল) হাদিস স্থান পেয়েছে। এ ধরনের বইগুলো পড়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। নিম্নে এমন কিছু বইয়ের উদাহরণ দেওয়া হলো, যেগুলোতে জাল ও জঈফ হাদিস রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন

১. ফাযায়েলে আমল (মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী)

এই বইটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসিহত রয়েছে, তবে কিছু হাদিসের সূত্র দুর্বল বা জাল বলে পরিচিত।

এটি মূলত তাবলিগ জামাতের একটি প্রচলিত বই। পড়ার সময় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি।

২. ইহইয়াউল উলুম (ইমাম গাজ্জালী)

ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর রচিত এই বিখ্যাত বইটি ইসলামের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে অমূল্য। তবে এতে কিছু জঈফ ও জাল হাদিসের উপস্থিতি রয়েছে বলে হাদিস বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছেন।

৩. আল-মাওয়াইয ওয়াল-মাজালিস (ইবনে আল-জাওযী)

এই বইটিতে ইসলামের নসিহতমূলক বক্তব্য সংকলিত আছে। তবে কিছু হাদিস জাল বা জঈফ হিসেবে প্রমাণিত।

৪. কাসাসুল আম্বিয়া (ইবনে কাসির বা অন্য লেখকদের)

নবিদের কাহিনী সংকলিত এ ধরনের বইতে প্রায়ই জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা পাওয়া যায়।

৫. নাশরুত ত্বিব (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)

আধ্যাত্মিকতা নিয়ে লেখা কিছু বইয়ে এমন বহু হাদিস পাওয়া যায়, যেগুলোর সূত্র প্রমাণিত নয় বা জাল।

সতর্কতা

৬. মাকসুদুল মোমিনীন (শাহ মাখদুম রূপোশ তবে বিভিন্ন লেখকের নামে পাওয়া যায়)

এই বইটিতে কিছু দোয়া ও আমলের উল্লেখ রয়েছে, তবে সেগুলোর উৎস হিসেবে জাল বা ভিত্তিহীন হাদিস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

৭. নেয়ামুল কুরআন (হজরত মাওলানা শামসুল হক)

এই বইটি আমল ও দোয়া সংক্রান্ত, তবে এতে অনেক জঈফ বা ভিত্তিহীন হাদিস স্থান পেয়েছে।

৮. আমলে নাজাত (আলহাজ হাফেজ ছৈয়দ মনির উদ্দিন)

এটি একটি জনপ্রিয় বই, তবে এতে কিছু দোয়া ও আমল জঈফ হাদিস থেকে প্রাপ্ত বলে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন।

৯ . ফাযায়েল দুরুদ (মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী)

দুরুদ ও তার ফজিলত নিয়ে লেখা হলেও এতে জঈফ ও জাল হাদিস স্থান পেয়েছে।

১০. রুহুল বাইয়ান (ইসমাইল হাক্কি)

এটি একটি তাফসির গ্রন্থ। তবে এতে কিছু মনগড়া কাহিনী ও জাল হাদিস রয়েছে।

১১. নূরুল ইযাহার (মাওলানা আবদুল্লাহ)

এটি ফিকহ ও আমল সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ। তবে কিছু দুর্বল বা ভিত্তিহীন হাদিসের উপস্থিতি রয়েছে।

কাজেই পড়ার সময় নির্ভরযোগ্য আলেমদের বা গবেষকদের থেকে হাদিসের সত্যতা যাচাই করা। নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ পড়া: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান ইবনে মাজাহ, তিরমিজি ইত্যাদি মূল উৎস থেকে হাদিস জানা। নির্ভরযোগ্য প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত ও আলেমদের দ্বারা অনুমোদিত বইগুলো পড়া।

গ। দ্বীন নেওয়া ক্ষেত্রে সঠিক আলেম নির্বাচন করা।

দ্বীনের বিষয়ে সঠিক আলেম নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বীনের সঠিক বুঝ ও আমল নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানীর উপর। সঠিক আলেম নির্বাচন করার জন্য নিম্নোক্ত কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারেন:

১. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ইসলামি জ্ঞানের গভীরতা

আলেমটি কোথা থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং তার শিক্ষা কোন মাদ্রাসা, জামিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন হয়েছে তা জেনে নিন। প্রখ্যাত ও গ্রহণযোগ্য ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেমন- দারুল উলুম দেওবন্দ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে পড়াশোনা করা আলেমদের সাধারণত নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

২. কুরআন ও সহিহ হাদিসে গভীর জ্ঞান

আলেমটি কুরআন এবং সহিহ হাদিসের সাথে কতটা সুস্পষ্ট এবং সঠিকভাবে সংযুক্ত তা বিবেচনা করুন।

দেখুন তিনি সহিহ সূত্র থেকে জ্ঞান প্রদান করছেন কিনা এবং দুর্বল বা জাল হাদিস এড়িয়ে চলেন কিনা।

৩. ফিকহ ও মাজহাব অনুসরণে ভারসাম্যপূর্ণতা

আলেমটি কোন মাজহাব বা ফিকহি মতের অনুসারী তা জেনে নিন। যদি তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামতকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন বা অন্যান্য মাজহাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেন, তবে সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

৪. আখলাক ও ব্যক্তিগত চরিত্র

আলেমটির ব্যক্তিগত জীবন কেমন? তিনি বিনয়ী, পরিশুদ্ধ এবং ভালো চরিত্রের অধিকারী কিনা তা দেখুন।

সচ্চরিত্র ও আখলাক আলেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলির একটি।

৫. গুরুত্বপূর্ণ ইলমি ও আকিদাগত বিষয়ের প্রতি মনোযোগ

সঠিক আকীদা (বিশ্বাস) এবং তাওহীদের বিষয়ে আলেমটি কতটা পরিষ্কার তা যাচাই করুন।

তিনি শিরক, বিদআত এবং ভুল আকীদা থেকে মুক্ত কিনা তা নিশ্চিত করুন।

৬. মৌলিকত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা

আলেমটি দ্বীনের বিষয়গুলো সহজভাবে ও প্রাসঙ্গিক ভাষায় উপস্থাপন করেন কিনা। দেখুন তিনি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ইসলামের শিক্ষাকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কিনা।

৭. প্রশংসাপত্র ও সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা

স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে আলেমটির গ্রহণযোগ্যতা কেমন? অন্যান্য অভিজ্ঞ আলেম বা ইলমি প্রতিষ্ঠান কি তাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে?

৮. সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত

আলেমটি কি রাজনৈতিক দল বা এমন কোনো গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত, যা দ্বীনের খাঁটি মর্মবাণী থেকে তাকে বিচ্যুত করেছে?  তিনি জ্ঞান ও আমলের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাবের অধীন নয়।

কোনো আলেমকে অনুসরণ করার আগে তার বক্তৃতা, বই বা বক্তব্য বিশ্লেষণ করুন। যারা অভিজ্ঞ এবং দ্বীনের জ্ঞানে প্রজ্ঞাবান, তাদের কাছ থেকে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের নাম জানতে চান। একজন আলেমের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মতামত সংগ্রহ করুন। যে আলেম বিদআত, জাল হাদিস, বা ভুল আকীদা প্রচার করেন, তাদের থেকে দূরে থাকুন। তারা কখনো দ্বীনের প্রকৃত মর্মার্থ বুঝতে বা বুঝাতে সক্ষম হবেন না। সঠিক আলেমের কাছে দ্বীন শেখার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

মতবিরোধ বা দলাদলির অন্যতম কারণ হল “মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ”। তারা মতভেদ করতেন সত্য কিন্তু আমাদের মত মতবিরোধ করতেন না। আর তাদের এ মতভেদ থেকে মুসলিমদের মাঝে আস্তে আস্তে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় যা তারা কখনও পছন্দ করতেন না। আর মতবিরোধের ফল এই মাযহাব। ইসলামি শরীয়তের উত্স হিসেবে প্রাথমিক যুগে শুধু কুরআন এবং হাদিসকে বুঝায়। বাতিল ফির্কা (শীয়া, কাদিয়ানি, ব্রেলভী) বাদে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বিষয় কারও কোন মতভেদ নেই। ফিকহি মাসায়েলে অনেক মতভেদ লক্ষ করা যায়। কুরআন-সুন্নাহ’র পরোক্ষ, অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগন নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কিছু বায় প্রদান করছে যাতে তাদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। যার ইজতিহাদ কুরআন সুন্নাহ অধিক নিকটবর্তী তার ইজতিহাদ অধিক গ্রহণীয়। আবার তাদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। তাদের এমন ভুল হাদিস না জানার কারণে (তার নিকট পৌঁছায়নি) হতে পারে। সহিহ হাদিস জানতে অথচ তিনি হাদিস বিরোধী ইজতিহাদ করেছেন এমনটা কষ্ট কালেও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যখন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ হাদিসের বিরোধী হবে, যখন ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদিসের অনুসরণ করা ফরজ। পরবর্তীকালে সময়ের সাথে ইসলামকে তাল মিলিয়ে নিতে এবং নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে জন্য ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের উত্স পরিগনিত হয়। এভাবে সাহাবী, তাবেয়ী, এবং  তাবে তাবেয়ী যুগ থেকেই কুরআন সুন্নাহ আলোকে  ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়।

মুজতাহিদ ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত কুরআন-হাদিসের গবেষণা লব্ধ ব্যাখ্যা প্রদানে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কখন উভয়ের ইজতিহাদ পরস্পর বিরোধী কিন্তু উভয়ই সঠিক। আবার কখন একজন অপরজন থেকে কুরআন সুন্নার অধিক নিকটবর্তী। যে মতভেদ সাহাবিদের জামানা থেকে শুরু হয়েছিল তা তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ী, মুজতাহিদ হয়ে আজও বিদ্যমান আছে। ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ খারাপ নয় তা জায়েয। এই ফিকহি  মতভেদ বা ইখতিলাফ থেকেই মতবিরোধ বা ইফতিরাক সৃষ্টি হয়েছে আর ইফতিরাক থেকে বিভিন্ন দল বা গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। এই ইখতিলাফ বা মতভেদের জন্য মতবিরোধ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম কাজ। মুজতাহীদগনের ইজতিহাদি মতভেদ জায়েয কারণ তারা ভুল ইজতিহাদ করলও সওয়াবের অধিকার। আমাদের পূর্ববর্তী মুজতাহিদ আলেম যেমন- ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) মৃত্যু ১৫০ হিজরি, ইমাম মালেক (রহঃ) মৃত্যু ১৭৯ হিজরি, ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) মৃত্যু  ২০৪ হিজরি এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) মৃত্যু ২৪১ হিজরি তাদের সকলের মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন, দোয়া করতেন। তাদের মাঝে কোন কোন মতভেদ এমনও ছিল যে পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় তারা উভয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এই ফিকহি মতভেদই ইসলামের প্রস্থতা। মতভেদ বা ইখতিলাফ যেহেতু জায়েয এবং মতবিরোধ বা ইফতিরাক যেহেতু হারাম কাজেই বিষয়টে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে চাই।

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক :

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক ইসলামি চিন্তায় দুটি ভিন্ন ধারণা। এগুলোকে বুঝতে হলে তাদের মূল অর্থ এবং প্রভাব পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন। নিচে তাদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো-

ইখতিলাফ (اختلاف):

ইখতিলাফ (اختلاف) আরবি শব্দ যার অর্থ মতভেদ বা ভিন্নমত। এটি কোনো বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা অভিমত পোষণ করা। ইখতিলাফ স্বাভাবিক এবং ইসলামে অনুমোদিত, যদি তা সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে হয়। মতভেদ মানবীয় প্রকৃতি। আমরা সমাজের বা রাষ্ট্রের সকল স্তরে মতভেদ দেখি এমনকি সাহাবিদের মাঝে ও ছিল। সাহাবিগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মার ইমাম ও আলিমদের মধ্যে ‘মতভেদ’ বা ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা বা ইফতিরাক ছিল না। ইসলামের জন্য উপকারী হতে পারে: ইখতিলাফ ইসলামি চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শরীয়াহর সমাধান প্রদান করে। ইখতিলাফ থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব।

কোনো ব্যাপারে দুজন মানুষ কখনোই শতভাগ একমত হতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রী বা পিতা-পুত্র থেকে শুরু করে পরিবার বা সমাজ সর্বত্রই মতভেদ বিদ্যমান। এই মতভেদ কখন নিন্দনীয় নয় যতক্ষণ না মতবিরোধে বা শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি, বিচ্ছিন্নতা, দলাদলি সৃষ্টি না করে।

উদাহরণ-

ইসলামি ফিকহে চার মাজহাবের (হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি) মধ্যে কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকা।

নামাজের কিছু আমলে ভিন্নতা (যেমন রুকু থেকে ওঠার পর হাত বাঁধা বা না বাঁধা)।

আল্লাহ বলেন- Al-Quran 5:48

وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَجَعَلَکُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّلٰکِنۡ لِّیَبۡلُوَکُمۡ فِیۡ مَاۤ اٰتٰىکُمۡ فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ  اِلَی اللّٰہِ مَرۡجِعُکُمۡ جَمِیۡعًا فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ فِیۡہِ تَخۡتَلِفُوۡنَ ۙ

এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে। সুরা আল-মায়েদা : ৪৮

ইফতিরাক (افتراق):

ইফতিরাক (افتراق) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ বিভক্তি বা দলাদলি। ইফতিরাক (افتراق) শব্দটি তার্ফারুক বা ফারক শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ হল পার্থক্য, পৃথক, বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা করা। মতভেদ চূড়ান্ত পর্যায় মতবিরোধ সৃষ্টি করে। তাই ইফতিরাক সব সময় বিভক্তি বা দলাদলি মাধ্যমে পারস্পরিক শত্রুতা সৃষ্টি করে। ইফতিরাক হলো এমন মতভেদ যা মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে এবং গোষ্ঠীবদ্ধ সংঘাত সৃষ্টি করে। কুরআন ও হাদিসে বারবার বিভক্তি, ফির্কাবাজি বা দলাদলি থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থঃ তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে, এদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।” সূরা আল-ইমরান : ১০৫

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ৭১ বা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মাহ ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, যার মধ্যে একমাত্র দল জান্নাতে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক এর মাঝে পার্থক্য :

বিষয়  ইখতিলাফ (মতভেদ)ইফতিরাক (মতবিরোধ)
অর্থমতভেদ করা।মতবিরোধ করা
হুকুমবৈধ ও শালীন মতভেদঅশালীন ও ধ্বংসাত্মক বিভক্তি
প্রভাবউম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেউম্মাহকে দুর্বল ও বিভক্ত করে
কারণজ্ঞান, ব্যাখ্যার ভিন্নতাঅহংকার, গোঁড়ামি, বিদআত
বৈধতা বৈধ, যদি তা সীমার মধ্যে থাকেহারাম, ইসলাম বিরোধী
ধরণএকটি স্বাভাবিক এবং গঠনমূলকক্ষতিকর, একতা ও শক্তিকে ধ্বংস করে।
ফলাফলজ্ঞানের প্রসার, আখলাকের উন্নতিদলাদলি, শত্রুতা, সমাজের অবক্ষয়
চুড়ান্ত ফলাফলদলাদলি সৃষ্টি করে না।দলাদলি মাধ্যমে ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে।

উপরের আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, মতভেদ জায়েয আর মতবিরোধ হারাম। আমাদের মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ ছিল কিন্তু মতবিরোধ ছিল না। মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ হলে তারা মতবিরোধ না করে একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতের, দোয়া করতেন।

আমাদের শিক্ষা : আমরা যদি ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের উদার ও প্রশস্ততা দেখাতে পারি তা হলে আমাদের মতবিরোধ কমে আসবে। আমরা একে অন্য কাছে আসতে পারব এবং আমাদের মাঝের দলাদলি কমে যাবে।

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

আকিদা বা বিশ্বাসের উপরই মানুষের আমল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ভ্রান্ত আকিদা গ্রহণের ফলে তারা মূল ধারার সঠিক আকিদা ধারণকারীদের সাথে মতবিরোধ করে ফির্কাবাজীতে লিপ্ত হয়। মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে তার আকিদা বা বিশ্বাসের জম্ম নেয়। মানুষের জ্ঞানের উৎস হল, প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি। আধুনিক কালের সকল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক।

যৌক্তিক কোনো কাজ সহজে যে কেউ মেনে নেন। আর বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত কোন জ্ঞানতো সাথে সাথে মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামি আকিদার মূল হল অদৃশ্যে বিশ্বাস এখানে জাগতিক কোন বিষয় থাকলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করা যেত কিন্তু অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হলে অদৃশ্য থেকে প্রাপ্ত অহির উপর নির্ভর করতে হবে। অহী ভিন্ন যে কোনো উৎস থেকে আকিদা গ্রহণ করলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যে কোনোটাই হতে পারে। ইসলামি আকিদা বিশ্বাস সব সময় আল্লাহকে কেন্দ্র অদৃশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তাই ইসলামি আকিদার মূল উৎস বা ভিত্তি হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক।

মহান আল্লাহ বলেন-

 ذَٲلِكَ ٱلۡڪِتَـٰبُ لَا رَيۡبَ‌ۛ فِيهِ‌ۛ هُدً۬ى لِّلۡمُتَّقِينَ (٢) ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ يُنفِقُونَ (٣)

অর্থঃ এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ৷ এটি হিদায়াত সেই মুত্তাকিদের জন্য। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে। এবং যে রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।

সুরা বাকারা আয়াত : ২-৩

মহান আল্লাহ এখানে অদৃশ্য বা না দেখা বস্তুর উপর ইমান বা বিশ্বাস আনার শর্ত আরোপ করছেন। অদৃশ্য জ্ঞান এমন না সাধারণত কোন মানুষ তার প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জন করতে পারে না।

আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি, ফেরেশতা, অহী, জান্নাত, জাহান্নাম, পরকাল, হাশরের মাঠ কবরের আজার, কবরের সয়াল জওয়াব ইত্যাদি কার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। অদৃশ্যের একটি ব্যাপার হল কবরের আজাব। কবরে আজাব হবে এটাই সত্য। কিন্তু কাউকে যুক্তি দিয়ে কি কবরের আজাব বুঝাতে বা দেখাতে পাওয়ার। কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ক্যামেরা দ্বারা কি এই আজাব দেখাতে পারব।

অপর পক্ষে আমলের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এখানে কুরআন হাদিসের বাহিরে ইজমা কিয়াজের দরকার হয়। নতুন কোনো সমস্যা আসলে কিয়াস করে মাসায়েল দিতে হয়।

মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না। তাই কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস করে সমাধান দিতে হয়। কাজেই একটি কথা মনে রাখতে হবে, “আকিদা ও ফিকহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে  ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নেই”।

এক কথায় বলে গেল কুরআন হাদিসের স্পষ্ট কোন রেফারেন্স ছাড়া আকিদা গ্রহণীয় নয়। যদি কেউ যুক্তি দিয়ে আকিদা বুঝাতে আসে তাকে সালাম জানাতে হবে। পৃথিবীতে শতকরা এক ভাগ ও পাওয়া যাবেনা যে এক মাত্র স্রষ্টা আল্লাহকে মানে না। কাজেই আল্লাহর একত্ত্বাবাদ বা তাওহীদের জ্ঞান মানুষকে সহিহ আকিদা অর্জনে সাহায্য করবে। তাই ভ্রান্ত আকিদাগুলির সংশোধনের জন্য একমাত্র অহির জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। যখনই কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোন জ্ঞান জানতে পারবে তখন মুমিনের গুণাবলি হবে আল্লাহর বিধান শুনলাম এবং মেনে নিলাম।  মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَا‌ۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ (٢٨٥)

অর্থঃ আমরা নির্দেশ শুনেছি ও অনুগত হয়েছি ৷ হে প্রভু! আমরা তোমার কাছে গোনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করছি। আমাদের তোমারই দিকে ফিরে যেতে হবে। সুরা বাকারা : ২৮৫

আকিদার বিষয় আলোচনার ক্ষেত্রে কুরআনো সহিহ হাদিসের বর্ণনা পেলে বলতে হবে শুনলাম এবং মেনে নিলাম। কারণ সকল মুস্তাহিদ আলেমগন এ ব্যাপারে একমত যে আকিদার ক্ষেত্রে কখনও ইসতিহাদ, কিয়াস যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নাই। আকিদার উৎস যেহেতু কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ তাই কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত কোন আকিদাকে শুনার সাথে সাথে মেনে নিতে হবে। অপর পক্ষে আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীন তার নাজিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে যদি কেউ তার প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ, বুজুর্গের উক্তি, পীরের বাণী ইত্যাদি থেকে আকিদা প্রহন করে হবে তাদের এই ভ্রান্ত আকিদায় নানার বৈপরিত্ত দেখা যাবে। যার ফলে তাদের মাঝে অনেক বাতিল ও ভ্রান্ত ফির্কার উৎপত্তি হবে। এমন কি মানুষ যদি আধুনিক কালের যুক্তি ও বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে তার বিশ্বাসের মূল ভিত্ত হিসাবে গ্রহণ করে তবে সে বাতিল ফির্কার জম্ম দিবে। তার তা জ্ঞান ও যুক্তি ভীত্তিক আকিদা বা বিশ্বাস অদুশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পাবরেনা।

কাজেই আকিদার মূল উত্স কুরআন সুন্নাহ থেকে সকলে প্রমাণভিত্তিক আকিদা গ্রহণ করলে আকিদার মতভেদ থেকে মুক্তি পার। আকিদার মতভেদ থেকে মুক্ত হতে পারলে আকিদার মাধ্যমে মুসলিমদের মাছে যে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে মুক্তি পাব। ইনশাআল্লাহ।

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

মহানবী মুহম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত সুন্নাহের বিরোধী আমলই হল বিদআত। মুহম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত পথের বাহিরে আমল করা থেকে বিরত থাকতে তিনি নিজেই নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ সকল আমলকে তিনি বিদআত বলে উল্লেখ করেছেন। বিদআদ সম্পর্ক ধারণা থাকলে খুব সহজে বুঝতে পারব এই বিদআত কিভাবে সমাজের মাঝে ফির্কাবাজীর সৃষ্টি করছে আর বিদআত পরিহার করলে কিভাবে উম্মত ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য।

(১) বিদআত পরিচিতি-

বিদআত অর্থ নতুন সৃষ্টি। শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত বলা হয় দ্বীনের মধ্যে কোন নতুন আমলের পদ্ধতি সৃষ্টি করে, তাকে ইবাদত মনে করে অতিরিক্ত সওয়াবের আশায় আমল করা।

অর্থাৎ দ্বীনের মাঝে এমন কোন আমলের প্রচলন করা যা রাসূল (সাঃ) সাহাবী ও তাবেঈদের যুগে অর্থাৎ আদর্শ যুগে ছিল না এবং কুরআন ও হাদিসের কোন দলিলও তা সমর্থন করে না।

সুন্নাহ সম্মত সকল আমলের ক্ষেত্রে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর মধ্যে অবশ্যই কোন না কোন দলিল আছে। কিন্তু নব আবিষ্কৃত বিদআত এর কোন প্রকার দলিল কুরআন সুন্নাহতে নেই। ইবাদের পদ্ধতি নয় কিন্তু ইবাদতের উপকরণ বা জাগতিক কাজের উপকরণ যদিও নতুন আবিষ্কার তাকে বিদআত বলা হবে না। যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করা।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-

ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।  সূরা আল মায়িদা : ৩

যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন তাই এটিই মহান আল্লাহ পছন্দনীয় এবং এর বাহিরে কেউ দ্বীন অনুসন্ধান করলে তাও তিনি গ্রহণ করবেন না। তিনি কুরআনে ঘোষণা করেন,

مَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ

যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না’’।  সূরা আলে-ইমরান : ৮৫

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ ﷺ-এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ওয়াদা দেওয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না, সুরা আনাম-১৩৪। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কণ্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোনো সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতেন, তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো (অথবা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যা কল্যাণময় হোক)। তিনি আরো বলতেন, আমার প্রেরণ ও কিয়ামত  এ দুটি আঙ্গুলের অবস্থানের মত পরস্পর নিকটবর্তী। তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে দেখান। অতঃপর তিনি বলেন, সবচেয়ে উত্তম নির্দেশ হল আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হল মুহাম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত পথ। দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজ। প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তি ধন-সম্পদ রেখে (মারা) গেলে তা তার পরিবারবর্গের এবং কোনো ব্যক্তি দেনা অথবা অসহায় সন্তান রেখে (মারা) গেলে তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার এবং তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভারও আমার জিম্মায়। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫, সুনানে নাসায়ি : ১৫৭৮, ১৯৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪, আহমাদ : ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬; সুনানে দারিমী : ২০৬

(২) বিদআত বিভক্তির অন্যতম মূল কারণ ইসলামে নতুন সংযোজন-

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মতভেদ করেছে, এদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। সূরা আল ইমরান : ১০৫

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামি শরীরও পরিপূর্ণ। কাজেই আমল আকিদার ক্ষেত্রে আর সংযোজন করার কোনো প্রয়োজন নেই। একটি একটা ভরা কলসিতে যদি পানি ঢালা হয় তবে যতটুকু পানি কলসি থেকে পড়ে যাবে ঠিক ততটুকু পানিই কলসিতে ঢুকবে। অনুরূপভাবে ইসলামি শরীয়তের যেখানেই বিদআত ঢুকবে সেখান থেকেই কুরআন বিদায় নিবে।

ইসলামে নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে বিদআত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করে। যারা সঠিক পদ্ধতিতে ইসলাম মানার চেষ্টা করে তারা বিদআতকে ঘৃণা করে। ফলে ইসলামের মাঝে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক যুগ থেকেই বিদআতকে গ্রহণ ও বর্জনের প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহ শিয়া ও সুন্নি এবং পরবর্তী কালে আরো শত দলে বিভক্ত হয়ে গেল। কত প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, রক্তপাত হল। যদি সকলে কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ করত এবং বিদআত পরিহার করত তবে বিশ্বের সকল মুসলিম এক হতে পারত। এমন কি প্রায়ই বিদআতি বিদআতি নিজেদের আমল নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়। কাজেই এক কথায় বলা যায় বিদআত মুসলমানদের বিভক্তির দিকে আহ্বান করে।

(৩) বিদআত সহিহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করার ফলে বিভক্তি সৃষ্টি করে-

হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ্) (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة.

কোনো জাতি যখন দীনের মধ্যে কোনো বিদআত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। কিয়ামত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।

মিশকাত : ১৮৮, সুনানে দারেমী : ৯৮

ইসলামি শরীয়ত পরিপূর্ণ। কখন, কোথায়, কিভাবে আমল করতে হবে তার পরিপূর্ণ বর্ণনা ইসলামি শরীয়তে সুনিপুণভাবে ধারণ করা আছে। কাজেই যদি কেউ নতুন কোন আমল করে তবে অবশ্যই সে এক বা একাধিক সুন্নাত পরিত্যাগ করে। উলামায়ে কিরাম বলেছেন, যখন কোনো দল সমাজে একটা বিদআতের প্রচলন করে, তখন সমাজ থেকে কম করে হলেও একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কাজেই যারাই সুন্নাহ সম্মত আমল করবে তাদের সাথে বিদআত পন্থীদের সংঘর্ষ অনিবার্য। সমাজে বিদআতি ও সহিহ সুন্নাহ অনুসারীদের মাঝে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করছে। এই জন্য বিদআতিগণ পৃথক হয়ে তাদের আলাদা নাম ও পরিচয় নির্ধারণ করে নিয়েছে। যদি সবাই সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করত তবে সমাজে এই বিশৃঙ্খলা এ বিভক্তি দেখা যেত  না।

(৪) বিদআতিদের সাথে বিভক্তির অন্যতম কয়েকটি কারণ :

বিদআতিদের সাথে বিভক্তির মূল কারণগুলো ধর্মীয়, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। নিচে এই বিভক্তির অন্যতম কয়েকটি কারণ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. বিদআত কর্মে বাধা প্রদানে মতবিরোধের সৃষ্টি-

বিদআত কিভাবে মতবিরোধ সৃষ্টি করেছেন তার একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ উরুশ উদ্‌যাপন করে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে একটু জ্ঞান যারা রাখেন তারা জানেন এই কাজটি সম্পূর্ণ বিদআত। যা কুরআন সুন্নাহতে নেই এমন কি আমাদের পূর্বসূরি সালাফদের মাঝেও ছিল না কিন্তু কিছু পথভ্রষ্ট পীরের অনুসারী মুরিদ এই বিদআতি কাজটি ইবাদাত বলে চালাচ্ছে। যখনই আপনি এই বিদাতের বিরোধিতা করবেন সাথে সাথে দেখবেন উরশ পন্থী লোকজন আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। এই বিদআত দ্বারা মুসলিমদের মাঝে দুটি ভাগ হল। ঠিক এভাবেই প্রচলিত বিদআত দ্বারা মুসলিম জাতী আজ হাজার হাজার ফির্কাবন্ধী।

আস্তে আস্তে জিকির করা সুন্নাহ। এক দল জোরে জিকির করে। আপনি যদি বলেন, ভাই, জোরে জোরে জিকির করা বিদআতি কাজ। দেখবেন আপনার সাথে মতবিরোধ করছে। কোনো দলিলের ধার ধারবে না। এখান সমাজে জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী পালক করেছে। ঈদে মিলাদুন নবি” নাম দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী  পালন করেছ। যারা তাদের কথা না শুনে, কুরআন সুন্নাহ মত চলার চেষ্টা করে, তাদের সাথে এই বিদআতিদের সাথে সংঘর্ষ অনিবার্য।

২. ধর্মীয় অপব্যাখ্যা

বিদআত প্রচারকারীরা প্রায়শই ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে নিজেদের মত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে, যা কুরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা নতুন নতুন প্রথা ও বিশ্বাসকে ধর্মের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যার ফলে, যারা বিদআত মানে না, তাদের সঙ্গে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়।

৩. কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে পার্থক্য

কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি বিদআতিদের দৃষ্টিভঙ্গি মূলধারার মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়। বিদআতিরা নিজেদের প্রচলিত প্রথাকে সুন্নাহর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়। এতে সুন্নাহ অনুসারী ও বিদআতিদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।

৪. ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্রতা

বিদআতিরা প্রায়শই নিজেদের মতবাদকে একমাত্র সঠিক বলে দাবি করে। তাদের যতই কুরআন সুন্নাহ থেকে দলিল প্রদান কর হোকনা কেন তারা নিজেরদের মতমতই প্রাধান্য দেয় এবং অন্যদের ভুল হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের উপর দোষারোপ করে। তাদের এই মনোভাব সমাজে বিভাজন ও শত্রুতা বৃদ্ধি করে।

৫. বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য

বিদআতিরা প্রায়শই এমন বিশ্বাস ও আচার পালন করে, যা ইসলামের মূলধারার বাইরে। তারা ইসলামের মূল ধারার বাহিরে নতুন নতুন আমলের মাধ্যামে ধর্মীয় আচার পালন। যার ফলে মূল ধারায় আমলকারীর সাথে তাদের এগুলো নিয়ে বিতর্ক ও মতানৈক্য তৈরি হয়।

৬. তারা সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করে। আস্ত আস্তে সমাজে বিদআতকরিদের সাথে সাধারণ মুসলিমদের বিভক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৭. বিদআতিদের সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব

বিদআতিরা প্রায়শই নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে এবং তাদেরকে সঠিক ধর্মীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরে।

আমাদের করণীয় কি?

১. কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি গুরুত্ব:

সঠিক ইসলামি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বিদআত থেকে দূরে থাকা। সবাই যদি সঠিকভাবে কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ করে তবে বিদআতে কোন স্থান থাকবে। সবার আকিদা বিশ্বাস ও আমল এক হলে বিভক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সমাজে সবার মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কাজেই কুরআন ও সুন্নাহকে গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞান অর্জন করেত  হবে।

২. বিদআতেদের সাথে আলোচনা করা কিন্তু বিতর্কের পরিহার:

শান্তিপূর্ণ উপায়ে ধর্মীয় সমস্যার সমাধান করা। তাদের সাথে আলোচন করে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান হিকমতের সাথে প্রদান করা যাকে তারা এই ভয়াবহ ফিতনা থেকে বেচে যায় এবং সমাজেও বিভক্তি লোপ পায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে বির্তক কোনো সমাধান আনতে পারে না। বিতর্ক শুধু দূরত্বই বৃদ্ধি করে দিতে পারে।

৩. ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষা প্রচার:

গবেষণায় দেখা যায় বিদআতে মূল কারণ ইসলামি শিক্ষার অভাব। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে জাহেল ও ভণ্ড পীর, অলি আওলিয়াদের ভ্রান্ত কথা পরে সাধারণ মানুষ বহু বিদআতে লিপ্ত। সমাজে সঠিক ইসলামি শিক্ষা বিস্তার করতে পারলে সহজে বিদআত দুর হবে। বিদআতের সাথে সাথে বিভক্তিও লোপ পাবে, সমাজে মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের সৃষ্ট হবে।