মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
পবিত্রতার মৌলিক জ্ঞান অর্জন
তাহারাত (الطَّهَارَةُ) :
তাহারাত আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্তি। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য তাহারাত অপরিহার্য। অজু, গোসল এবং তায়াম্মুম এ তিনটির মাধ্যমে তাহারাত বা পবিত্রতা অর্জিত হয়। তাহারাত অর্জনের তিনটি পদ্ধতি:
১. অজু ও অজুর ফজিলত :
ইসলামী পরিভাষায় অজু বলতে বুঝায়, “নির্ধারিত একটি পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়তসহ বিশেষ অঙ্গসমূহ ধৌত করার মাধ্যমে শরীয়ত সম্মত উপায় পবিত্রতা অর্জন করাকে অজু বলে।
উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“ مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ خَرَجَتْ خَطَايَاهُ مِنْ جَسَدِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِهِ
অর্থ : যে ব্যক্তি অজু করল এবং উত্তমভাবে অজু করল, তার গুনাহসমূহ তার দেহ থেকে বের হয়ে যায়, এমনকি তা তার নখের নিচ থেকে বের হয়ে যায়। সহিহ মুসলিম : ২৪৫, মিশকাত : ২৮৪
অজু বিধান :
পরিবেশ পরিস্থিতির কারনে অজু কখন ফরজ, কখনও ওয়াজিব আবার কথনও মুস্তাহাব। মহান আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ
অর্থঃ হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর। সুরা মায়েদা : ৬
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাক-পবিত্রতা ছাড়া সালাত এবং হারাম ধন-সম্পদের দান-খয়রাত কবূল হয় না। সহিহ মুসলিম : ২২৪, মিশকাত : ৩০১, সুনানে তিরমিজি : ০১
যে অবস্থায় অজু করা ফরজ হয় :
১। সালাত আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। সহিহ বুখারী ১৩৫, সহিহ মুসলিম ২২৪, ২২৫, মিশকাত : ৩০১, সুনানে তিরমিজি : ০১
২. জানাযার সালাত আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। সুনান আল কুবরা, বাইহাকি : ২১২, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৫৮৭
৩. তিলাওয়াতের সিজদা আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। ইবনে মাজাহ ২৭২, সহিহ মুসলিম ২২৪, তিরমিযী ১, আহমাদ ৪৬৮৬
অজু ওয়াজিব হওয়ার কারনসমূহ :
১. বাইতুল্লাহ তাওয়াফের জন্য অজু করা ওয়াজিব। সুরা বাকারা ১২, সহিহ বুখারি ৩০৫
২. কুরআন স্পর্শ করার জন্য অজু করা ওয়াজিব। মিসকাত ৪৬৫, মালিক ৪৬৮, দারাকুত্বনী, সহীহুল জামি ৭৭৮০, আল মুয়াত্তা ৫৩৪
যে সকল কারণে অজু করা সুন্নাত বা মুস্তাহাব :
১। গোসলের পূর্বে অজু করা সুন্নাত। সহিহ বুখারি ২৪৯, ২৫৭, ২৫৯, ২৬০, ২৬৬, সহিহ মুসলিম ৩১৮
২। ঘুমানা পূর্বে অযু করা সুন্নাত। সহিহ বুখারি : ২৪৭
৩। জানাবাত বা গোসল ফরজ অবস্থায় ঘুমানোর আগে অজু করা। সহিহ বুখারি : ২৮৬
৪। সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে রওয়ানা হওয়া আগে অজু করা। সুনানে ইবনে মাজাহ :২৮০৫।
৫। অজু থাকা অবস্থায় ঘন ঘন অজু নবায়ন করা। সহিহ বুখারি : ১৩৬
৬। একাধিক বার স্ত্রীসহবাসের পর নতুন অজু করা সুন্নাহ। সহিহ মুসলিম : ৩০৮; আবু দাউদ : ২১৮
৭। প্রত্যেক সালাতের জন্য নতুন অজু (যদি পূর্বের অজু ভঙ্গ না হয়)। সুনানে আবু দাউদ : ৩০৫, মিশাকাত : ৪২৫, দারেমী : ৭২০
৯। গুনাহের পর তাওবা ও অজু করা। তাবরানি, মুজামুল আওসাত : ৬২৩৫
১০। রাগের সময় অজু। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৮৪
১১। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর অজু করা। সহিহ বুখারি : ১৬২
অজুর ফরজ আমলসমূহ :
অজুর ফরজ চারটি। যথা-
১। সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করা।
২। দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা।
৩। মাথা মাসেহ করা।
৪। দুই পা টাকনুসহ ধৌত করা।
ইহা ছাড়াও নিম্মের কাজগুলিকে কিছু আলেম ওয়াজিব বলে উল্লেখ করেছেন।
১. অঙ্গগুলো ধৌত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের বিরতি না দেয়া।
২. অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। এ মত প্রকাশ করেছেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)।
৩. অজুর অঙ্গগুলোর মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ধারাবাহিকতা হলো- প্রথম মুখণ্ডল ধৌতকরা অতপর হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ করা সর্বশেষে পা ধোয়া। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে অজুর এ ধারাবাহিক কাজগুলি ওয়াজিব নয় বরং সুন্নত।
অজুর সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি :
ধারাবাহিক কাজগুলো সুন্দর করে উপস্থাপন করা হলো :-
(১) প্রথমেই অজুর নিয়ত করা। বুখারি : ১, মিশকাত : ১
(২) বিশমিল্লাহ বলে অজু শুরু করা। সুনানে তিরমিজি : ২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৮, সহীহুল জামি : ৭৫১৪, মিশকাত : ৪০২, সুনানে আবু দাউদ : ১০১
(৩) জোড়া অঙ্গগুলির ডান অঙ্গকে আগে ধোয়া। মিশকাত : ৪০১, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪১৪১, সহীহুল জামি : ৭৮৭, আহমাদ : ৮৬৫২।
(৪) উভয় হাত কবজি র্পযন্ত ধৌত করা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৭৩, সুনানে তিরমিযী ৪৮, সুনানে নাসায়ী ৯৬, মিশকাত : ৪১০
(৫) কপালের গোড়া থেকে দুই কানের লতী হয়ে থুৎনীর নীচ পর্যন্ত পুরা মুখমণ্ডল ধৌত করা। সহিহ বুখারি : ২৯১৮
(৬) অজুতে প্রতি অঙ্গ তিন বার ধৌত করা। সহিহ বুখারি : ১৫৯, ১৬০, ১৬৪, ১৯৩৪, ৬৪৩৩, সহিহ মুসলিম ২২৬, সুনানে আবূ দাঊদ ১৪৫, মিশকাত : ৪০৮, ৪০৯ সুনানে তিরমিযী ৩১,
(৭) তিন বার কুলি করা ও নাকে পানি দিবে। সহিহ বুখারি : ১৮৫, সুনানে আবূ দাঊদ ১১৯, সুনানে তিরমিযী ২৮, মিশকাত : ৪১২
(৮) তিন বারের কম বেশী হলেও সমস্যা নাই। সহিহ বুখারি : ১৫৭, ১৫৮, মিশাকাত : ৩৯৫, ৩৯৬
(৯) তিনের অধিকবার বাড়াবাড়ি। মিশকাত : ৪১৭, সুনানে নাসায়ী : ১৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২২, সহীহাহ : ২৯৭০
(১০) অজুতে গড়গড়া করে কুলি করা (সিয়াম অবস্থায় নয়)। সুনানে নাসায়ী : ৮৪
(১১) অজুর সময় নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা। সুহিহ বখারি : ১৬১, ১৬২, সহিহ মুসলিম ২৩৭
(১২) দাড়ি থাকলে খলিাল করা। সুনানে আবু দাউদ : ১৪৫, সুনানে তিরমিজি : ৩১, ইবনে মাজাহ ৪৩০।
(১৩) আঙুলসমূহ খিলাল করা। সুনানে আবূ দাঊদ ১৪২, সুনানে তিরমিযী ৭৮৮, সুনানে নাসায়ী ১১৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৪৮, মিশকাত : ৪০৫
(১৪) মাথার সামনরে থেকে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা। সহহি মুসলমি : ২৩৫।
(১৫) উভয় কানরে ভতেরে ও বাইরে মাসহে করা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩৯, মিশকাত : ৪১৩, সুনানে নাসায়ী : ১০২, আবূ দাউদ ১৩৭, ইবনু মাজাহ ৪৩৯।
(১৬) বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান হাত ধোয়া এবং বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান পা ধোয়া। আবূ দাঊদ ৪১৪১, মিশকাতুল ৪০১, সহিহ বুখারী ৪২৬, সহিহ মুসলিম ২৬৮, মিশকাতুল ৪০০।
(১৭) অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। সুরা মায়েদা : ৬।
(১৬) আংটি থাকলে পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। সহিহ বুখারি ১৬৫, সহিহ মুসলিম ২৪২।
(১৭) অজুর শেষে অবশিষ্ট পানি পান করা। তিরমিযী ৪৮, নাসায়ী ৯৬,মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪১০।
(১৮) অজুর শেষ করার পর দোয়া। সহিহ মুসলিম ২৩৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৭০
নোট : পাগড়ীবিহীন অবস্থায় মাথার কিছু অংশ বা এক চতুর্থাংশ মাথা মাসাহ করার কোন দলীল নেই। বরং কেবল পূর্ণ মাথা অথবা মাথার সামনের কিছু অংশ সহ পাগড়ীর উপর মাসাহ অথবা কেবল পাগড়ীর উপর মাসাহ প্রমাণিত। মুহাম্মাদ আসাদুল্লহ আল গালিব, ছালাতুর রাসুল (ছা.), পৃ.-৫৯
অজুর শেষ করার পর দুআ পাঠ করা :
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কোন মুসলিম ব্যাক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর বলে (কালিমা শাহাদাত)-
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
“আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তাঁর কোন শারীক নাই, তিনি একক এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল”।
তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে নাসায়ী : ১৪৮, আহমাদ : ১৬৯৪২
অজু ভঙ্গের কারণঃ
১। পায়খানা বা প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়া (হোক তা গ্যাস, পেশাব বা পায়খানা)। সহিহ বুখারি: ১৩৫, সহিহ মুসলিম: ২২৫
২। গ্যাস বা বায়ু নির্গত হওয়া। সহিহ বুখারি: ১৩৭, সহিহ মুসলিম: ৩৬২, তিরমিযী ১১৬৫ ও আবূ দাঊদ ২০৫, মিশকাত : ৩০৬
৩। মচি বা কামরস বের হলেই অজু নষ্ট হবে।সুনানে তিরমিযী ১১৪, মিসকাত ৩১১, সহিহ বুখারী ১৩২, ১৭৮, ১৬৯, সহিহ মুসলিম ৩০৩
৪। দেহের প্রত্যেক প্রবহমান রক্তব বা পুঁজের কারণেই অজু ভঙ্গ হয়। মিসকাত ৩৩৩, দারাকুত্বনী ১/১৫৭
নোট : এই হাদসিটি মান যঈফ তাই অনেক মুহাদ্দিস বলেছেন, পুঁজ অথবা রক্ত যদি দেহ থেকে বাহির হয় তবে অজু নষ্ট হবে না।
৫। ঘুমিয়ে যাওয়া (যদি তা গভীর হয় বা বসার ভঙ্গি থেকে সরে যায়)। সুনান আবু দাউদ: ২০৩, মিসকাত ৩১৬, সহীহুল জামি : ৭১১৭।
গভীর ঘুমের উপর কিয়াস করে মুহাদ্দিসগন বলেছেন, বেহুশ বা জ্ঞানশূন্য হলে অজু নষ্ট হয়।
নোট : তবে বসে বসে ঘুমালে অজু নষ্ট হবে না। আবূ দাঊদ ২০০, তিরমিযী ৭৮, সহিহ মুসলিম ৩৭৬
৬। উটের মাংস খেলে অজি নষ্ট হয়ে যাবে। সহিহ মুসলিম ৩৬০, সুনানে আবু দাউদ: ১৮৪, সুনানে তিরমিযী: ৮১ মিশকাত ৩০৫
৭। লজ্জাস্থান (লিঙ্গ) স্পর্শ করলে অজু ভঙ্গ হবে (নগ্ন হাতে)। সুনান ইবনে মাজাহ: ৩৯৫, সুনানে তিরমিযী ৮২, সুনানে নাসায়ী ১৬৩-৬৪, সুনানে আবূ দাঊদ ১৮১, মিশকাত : ৩১৯, আহমাদ : ২৬৭৪৯, ২৭৭৪৬, মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৯১, দারিমী : ৭২৪-২৫।
নোটঃ তবে হাদিসে এসেছেঃ- ত্বলক্ব ইবনু আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, অজু করার পর কেউ যদি তার পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করে তাহলে এর হুকুম কী? তিনি ﷺ বললেন, সেটা তো মানুষের শরীরেরই একটা অংশবিশেষ। সুনানে আবূ দাঊদ : ১৮২, তিরমিযী : ৮৫, নাসায়ী ১৬৫, মিসকাত ৩২০, ইমাম মুহয়্যিইউস সুন্নাহ (রহ.) বলেছেন, এ হাদীসটি মানসূখ (রহিত), কেননা আবূ হুরায়রা (রা.) ত্বলক্ব এর মদীনাহ আগমনের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
৮। হানাফি মাজহাব মতে, নামাজে অট্টহাসি দিলে অজু ভেঙে যায়।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মারফু হাদিস-
“أَيُّكُمْ ضَحِكَ فِي الصَّلَاةِ فَلْيُعِدِ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ”
তোমাদের কেউ নামাজে হেসে ফেললে, সে যেন পুনরায় অজু ও নামাজ করে। দারাকুতনী: ১/১২৪, মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩৯০৭, মুসান্নাফ ইবন আবু শাইবা: ২/২৮৩
এ হাদিসটি ইমাম বুখারি, ইমাম আহমাদ, ইবনু হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ একে মুনকার বলেছেন বিধায়
মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের ফকিহগণ অজু না ভাঙ্গার পক্ষে মত দিয়েছেন।
যে সকল কারনে অজু নষ্ট হবে না :
(১) খাবার খাইলে অজু নষ্ট হবে না। সহিহ বুখারী ২০৭, সহিহ মুসলিম ৩৫৪, ৩৫৭, মিশকাত : ৩২৬, ৩২৯
(২) স্ত্রীকে চুমু দিলে অথবা তার স্বীয় হাত দিয়ে স্পর্শ করলে অজু নষ্ট হবে না। মিশকাত : ৩২৩, ৩৩০, আবু দাউদ : ১৭৮, ১৭৯ মুয়াত্ত্বা মালিক : ৯৭
(৩) সন্দেহের কারনে অজু নষ্ট হবে না। সহিহ মুসলিম ৩৬২, মিসকাত ৩০৬, তিরমিযী ১১৬৫ ও আবূ দাঊদ ২০৫,
নোট : বায়ু বের হলে অজু নষ্ট হবে এতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু যদি সন্দেহ থাকে যে তার বায়ু বের হয়েছে কিনা তবে তাকে শব্দ বা গন্ধ পেতে হবে। সন্দেহে বসিভূত হয়ে অজুর দরকার নাই।
গোসল
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গোসল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম। এটি কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় ফরজ এবং কিছু অবস্থায় মুস্তাহাব বা সুন্নত হয়।
গোসল (اَلْغُسْلُ) মূলত তিন প্রকারে বিভক্ত :
১. ফরজ গোসল।
২. সুন্নত গোসল।
৩. মুস্তাহাব গোসল।
গোসল ফরজ হওয়ার কারণসমূহঃ
(১) যে কোন কারনে পুরুষ-মহিলার বীর্য বের হলে গোসল ফরহ হয়। সুনানে নাসায়ী : ১৯৩, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ :৬০৭
(২) স্বামী স্ত্রী সহবাস করলে গোসল ফরজ হয়। । সহিহ মুসলিম : ৩৪৮, মিসকাত : ৪৩০
(৩) পুরুষ-মহিলার স্বপ্নদোষ হলে গোসল ফরজ হয়। সহিহ বুখারী : ১৩০, ২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১, সহিহ মুসলিম ৩১৩, মিমকাত : ৪৩৩।
(৪) পুরুষ-মহিলা হস্তমৈথুন করলে বা যে কোন উপায় যৌন তৃপ্তিভোগ করলে।
সুরা মায়েদা : ৬, সূরা মায়ারিজ ২৯, সুরা মুমিনূন : ৫-৭, সুনানে তিরমিযী ১১৪, মিসকাত ৩১১, সহিহ বুখারী ১৩২, ১৭৮, ১৬৯, সহিহ মুসলিম ৩০৩
(৫) হায়িজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হলে গোসল ফরজ হয় : সহিহ বুখারি ৩২০, সুনানে ইবনে মাজাহ ৬২০, সুনানে নাসায়ী ৩৪৯, ৩৫৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৮০, ২৮৬, ৩০৪)
(৬). নিফাস বা সন্তান প্রসব পরবর্তী ইদ্দতকালীন সময় শেষ হলে গোসল ফরজ। সহিহ মুসলিম : ১২১০, সুনানে আবূ দাউদ : ১৯০৫, সুনানে নাসায়ী : ৪২৯, সুনানে সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৪৮, ৬৪৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৯
(৭) যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করালেই গোসল ফরজ। সহিহ মুসলিম ৩৪৯, ৩৫০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬০৮, মিশকাত : ৪৪২ভ।
(৮) শুধু কামরস/মযি (مَذْيٌ) বের হলে গোসল ফরজ হয় না। সহিহ সহিহ বুখারী: ২৬৯, ২৯৩, সহিহ মুসলিম : ৩৪৬
** বীর্য (মনী) ও কামরস (মযি) এর মাঝে মৌলিক পার্থক্য
গোসল সুন্নাহসমূহ হলো-
(১) জুমআর ছালাতের পূর্বে গোসল করা।
সহিহ বুখারি : ৮৭৭, সহিহ মুসলিম ৮৪৪, মিশকাত : ৫৩৭, ৫৪৪, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৫৩
(২) মৃত ব্যাক্তির গোসল দানকারীর জন্য গোসল করা।
মিসকাত : ৫৪১, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩১৬১, সুনানে তিরমিযী : ৯৯৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৪৬৩, আহমাদ : ৯৮৬২।
(৩) ইসলাম গ্রহণের সময় গোসল করা।
মিসকাত : ৫৪৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৩৫, সুনানে তিরমিযী : ৬০৫, সুনানে নাসায়ী : ১৮৮।
(৪) হজ্জ বা ওমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধার পূর্বে গোসল করা।
সহিহ মুসলিম : ১২১০, সুনানে তিরমিজ ৮৩০, সুনানে নাসায়ী ২১৫, সুনানে ইবনু মাজাহ ২৯১৩, ৩০৭৪
(৫) আরাফার দিন গোসল করা।
সিলসিলাতুল আহাদিস সহিহাহ : ৩৫৩, সুনানুল কুবরা বাইহাকি : ৫৯১৯,
(৬) দুই ঈদের দিন সকালে গোসল করা। মুয়াত্তা মালিক : ৪১৫
(৭) সপ্তাহে অন্তত একবার গোসল করা।
সহিহ বুখারি : ৮৯৮, ৮৯৭, সহিহ মুসলিম ৮৪৯, মিশকাত : ৫৩৯
(৮) সিঙ্গা লাগালে গোসল করা।
সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৪৮, মিসকাত ৫৪২ হাদিসের মান জঈফ
(৯) মক্কাহয় প্রবেশের পূর্বে গোসল করা। সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফা.
(১০) একবার স্ত্রী সহবাসের পর পুনরায় সহবাস করতে চাইলেঃ সুনানে আবু দাউদ ২১৯, ৫৯০
১.৫.০। গোসলের ফরজসমূহঃ
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গোসলের ফরজ ) কাজ হলো তিনটি। যথা-
(১) পূর্ণ শরীরে পানি প্রবাহিত করা। সহিহ বুখারী : ২৭৪
(২) গড়গড়া করে কুলি করা সহিহ বুখারি ২৫৭, ২৬৫
(৩) নাকে পানি দেওয়া সহিহ বুখারী: ২৭৬, মিসকাত ৪৪৩, আবূ দাঊদ ২৪৮, তিরমিযী ১০৬, ইবনু মাজাহ ৫৯৭
গোসলের সুন্নতসমূহ হলোঃ
(১) গোসলের আগে মিসওয়াক করা। সহিহ মুসলিম: ১৮৪৫, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৫, ইবনে মাজাহ : ২৮৭, সুনানে তিরমিযী : ২২
(২) গোসলের আগে অজু করা। সহিহ বুখারি : ২৪৮, ২৬২, ২৭২, সহিহ মুসলিম : ৩১৬, আহমদ : ২৫৭০৪।
(৩) দুই হাতের কজ্বি ধৌত করা। সহিহ বুখারি : ২৭৬, ২৬২, সহিহ মুসলিম : ৩১৭
(৪) শরীরের কোন নাপাকি থাকলে প্রথমে ধুয়ে ফেলা। সহিহ বুখারি : ২৪৯, ২৫৭, ২৫৯, ২৬০, ২৬৬, ২৭৪, ২৭৬, ২৮১
(৫) গুপ্তস্থান ধৌত করে নাপাকি পরিষ্কার করা। সহিহ বুখারী : ২৬০
(৬) মাথা ও শরীর তিনবার ধৌত করা। সহিহ বুখারী: ২৫৪, ২৫৫, ২৭৭, সহিহ মুসলিম ৩২৭, ৩২৯, সুনানে নাসায়ী : ৪২৬,
(৭) সবশেষে পা ধোয়া এবং ডান দিক থেকে শুরু করা।
সুনানে তিরমিযী : ১০৭, সুনানে আবু দাউদ : ২৫০, সুনানে নাসাঈ: ২৫২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৭৯)
তায়াম্মুম (اَلتَّيَمُّمُ):
তায়াম্মুম (اَلتَّيَمُّمُ) একটি আরবি শব্দ। তায়াম্মুম শব্দের অর্থ সংকল্প। ইসলামের বিধান অনুসারে, তায়াম্মুম হল অজু বা গোসলের বিকল্প স্বরূপ বালি, মাটি বা ধূলা দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের একটি
তায়াম্মুম করা জায়েয হওয়ার কারন সমূহ :
(১) আশেপাশে কোথাও পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম জায়েয। সুরা মায়েদা : ৬, সহিহ বুখারি : ৩৪৮; সহিহ মুসলিম : ৬৮২ মিসকাত : ৫৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৩২, সুনানে তিরমিযী : ১২৪
(২) অভিজ্ঞতা ডাক্তার যদি বলেন যে পানি ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য মরাত্বক ক্ষতিকর। মিসকাত : ৫৩২, আবূ দাঊদ : ৩৩৬, ইবন মাজাহ: ৫৭২
(৩) প্রচন্ড ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা হলে তায়াম্মুম করা যাবে। সুনানে আবু দাউদ ৩৩৪, আহমাদ ৪/২০৩, ২০৪), বায়হাক্বী ‘সুনানুল কুবরা’১/২৫৫, হাকিম ১/১৭৭)
তায়াম্মুমের ফরজ আমল। তায়াম্মুমের ফরজ দুইটি হলো :
১. নিয়ত
২. মুখমণ্ডল ও উভয় হাত মাসেহ করা
১. নিয়ত : মনে মনে সংকল্প করবে যে, আমি অজু বা গোসলের বিকল্প হিসেবে পবিত্রতা অর্জনের জন্য আল্লাহর খুশি উদ্দেশ্য তায়াম্মুম করছি। সহিহ বুখারি : ১, সহিহ মুসলিম : ১৯০৭
২. মুখমণ্ডল ও উভয় হাত মাসেহ করা
পবিত্র মাটি বা ধূলিতে হাত রেখে তা দিয়ে প্রথমে মুখ ও পরে দুই হাত মাসেহ করা (হানাফি মতে কব্জি পর্যন্ত, অন্য মাযহাব মতে কনুই পর্যন্ত)। সূরা মায়িদা : ৬, সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৬
নোট : হানাফি ও মালিকি : মুখ ও হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করা ফরজ। বদায়েউস সানায়ে ১/৪৭ (হানাফি), আশ-শারহুল কাবীর ১/১৭৬ (মালেকি)
শাফিয়ী ও হাম্বলি: মুখ ও কনুই পর্যন্ত মাসেহ ফরজ। আল-মাজমূ‘ ২/২২৪ (শাফেয়ি), আল-মুগনী ১/১৬৬ (হাম্বলী)
তায়াম্মুম ভঙ্গ বা নষ্ট হওয়ার কারন :
যে সকল কারণে অজু ভঙ্গ হয়, ঠিক সে কারণে তায়াম্মুমও ভঙ্গ হয়ে যায়। এ ছাড়া যে অসুবিধার কারণে তায়াম্মুম করা হয়েছিল, সেই অসুবিধা দূর হয়ে গেলেই তায়াম্মুম নষ্ট হয়ে যায়। যেমন পানি না পাওয়ার কারণে তায়াম্মুম করলে পানি পাওয়ার সাথে সাথে তায়াম্মুম শেষ হয়ে যায়। অসুখের কারণে করলে, অসুখ দূর হয়ে যাওয়ার পর পরই আর তায়াম্মুম থাকে না। স্বালাতে মুবাশশির পবিত্রতা, আবদুল হামীদ ফাইযী, ফিকহুস সুন্নাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৬৩ উর্দু
কুরআন শিক্ষা করা
স্কুল জীবনে মুসলিম বালকের কুরআন শিক্ষা করা ও নিয়মিত তিলাওয়াতের করা খুবি জরুরি আমল। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে দুনিয়ায় সঠিকভাবে জীবন যাপনের জন্য কুরআনুল কারীম নাযিল করেছেন। কুরআন শুধুমাত্র ধর্মীয় বই নয়, বরং এটি মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। একজন মুসলিমের জীবনকে সফল করতে হলে শৈশব থেকেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশেষত স্কুল জীবনে একজন মুসলিম বালকের জন্য কুরআন শিক্ষা করা এবং নিয়মিত তিলাওয়াত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই সময়েই শিশুর মানসিক ও চারিত্রিক গঠন হয়।
কুরআন শিক্ষা করা ফরজ
একজন প্রকৃত মুসলিমের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ফরজ বা অবশ্যকরণীয় ইবাদত। এই সালাতে কুরআনের নির্দিষ্ট কিছু অংশ তিলাওয়াত করতে হয়। এই অংশটুকু সঠিকভাবে তিলাওয়াত করা ফরজে আইন, অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য এটি শেখা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া পুরো কুরআন বুঝে পড়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।
কুরআনকে শুধু তিলাওয়াত করলেই হবে না, বরং এর সঠিক মাখরাজ (উচ্চারণস্থান) অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে পাঠ করাও ফরয। শৈশবে যদি কুরআন তিলাওয়াতের এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে না শেখা হয়, তাহলে পরবর্তীতে তা শুদ্ধ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন শেখানো জরুরি। বিশুদ্ধ কুরআন তিরওয়াত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَرَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ
আর কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো। সূরা মুজাম্মিল : ৪
উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ أَفْضَلَكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম তারা, যারা নিজেরা কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। সহিহ বুখাই : ৫০২৮
এই আয়াত ও হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, কুরআন শিক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। একজন মুসলিম বালকের জন্য কুরআন শেখা শুধু নামাযে তিলাওয়াত করার জন্য নয়, বরং পুরো জীবনকে কুরআনের আলোকে গড়ে তোলার জন্য।
শৈশবে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্ব
শৈশব হলো মানুষের চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় অর্জিত জ্ঞান পাথরের ওপর খোদাই করা অক্ষরের মতোই স্থায়ী হয়, যেমনটি আরবি প্রবাদে বলা হয়েছে-
العِلْمُ فِي الصِّغَرِ كَالنَّقْشِ فِي الحَجَرِ
“শৈশবে অর্জিত জ্ঞান হচ্ছে পাথরে খোদাই করার মতো স্থায়ী।”
তাই স্কুল জীবনের শুরু থেকেই শিশুদের কোরআনের হরফ, হরকত, মাখরাজ এবং তাজবীদসহ বিশুদ্ধভাবে কুরআন শেখানো উচিত। এতে করে তারা সারাজীবন সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি মজবুত হবে।
নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা
আমাদের মাতৃভাষা আরবি না হওয়ায় নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত না করলে তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কুরআন তিলাওয়াত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল, যা প্রতিদিন করলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। শৈশব থেকে এই অভ্যাস গড়ে তুললে তা সারা জীবন বজায় রাখা সহজ হয়।
আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-
“اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ، فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” সহিহ মুসলিম :৮০৪
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে মুসলিম বালক নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আখিরাতে যখন মানুষ চরম বিপদের মুখোমুখি হবে, তখন কুরআন তার পক্ষে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। এটি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নয়, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার একটি নিশ্চিত মাধ্যম।
কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত
কুরআন তিলাওয়াত ঈমান বৃদ্ধি করেঃ
কুরআন তিলাওয়াত করা বান্দার জন্য এমন উপকারী। এবং কুরআন তিলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ ٢
অর্থ: ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’। সুরা আনফাল : ২
মুমিনের অত্যতম গুন কুরআন তিলওয়াত করা
মহান আল্লাহ আরো বলেন-
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاَوَتِهِ أُوْلَـئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمن يَكْفُرْ بِهِ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
অর্থঃ আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সুরা বাকারা : ১২১
মহান আল্লাহ আরো বলেন-
لَيْسُواْ سَوَاء مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللّهِ آنَاء اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ
অর্থঃ তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। সুরা ইমরান : ১১৩
কুরআন তিলওয়াতে প্রতি হরফের জন্য সওয়াব প্রদান করা হয় :
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
আল্লাহ তা’আলার কিতাবের একটি হরফ যে ব্যক্তি পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব আছে। আর সাওয়াব হয় তার দশ গুণ হিসেবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। সুনানে তিরমিজি : ২৯১০, মিশকাত : ২১৩৭
কুরআন তিলাওয়াত হলো সর্বোত্তম যিকির, যা শিশুর হৃদয়ে শান্তি আনে।
১. নৈতিক চরিত্র গঠন: কুরআনের শিক্ষার মাধ্যমে বালকের মনে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল চরিত্র গড়ে ওঠে।
২. পাপ থেকে দূরে রাখা: রাসূল ﷺ বলেন, কুরআন মানুষকে জান্নাতের দিকে ডাকে এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে।
৩. স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মনোযোগের ক্ষমতা বাড়ে, যা স্কুলের পড়াশোনাতেও সহায়ক হয়।
অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা
স্কুল জীবনে একজন বালকের কুরআন শিক্ষা নিশ্চিত করতে অভিভাবকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি স্কুলগুলোতে দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেন শিশুরা ধর্মীয় ও দুনিয়াবি শিক্ষায় সমানভাবে অগ্রসর হতে পারে।
কুরআন শিক্ষা ও নিয়মিত তিলাওয়াত একজন মুসলিম বালকের জন্য জীবনের অপরিহার্য অংশ। এর মাধ্যমে তার হৃদয় পরিশুদ্ধ হবে, চরিত্র হবে আদর্শবান এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সে মনোযোগী হবে। শৈশবেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা গেলে ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ মুসলিম, সুনাগরিক এবং দুনিয়া-আখিরাতে সফল মানুষ হতে পারবে।
সালাতের সাধারণ নিয়ম শিক্ষা করা
দুই রাকাত সালাতের ধারাবাহিক নিয়ম :
সরাসরি একটি সহিহ হাদিস থেকে :
মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর ইবনু ‘আত্বা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একদল সাহাবীর সঙ্গে বসা ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তখন আবূ হুমাইদ সা‘ঈদী (রাযি.) বলেন, আমিই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত সম্পর্কে অধিক স্মরণ রেখেছি। আমি তাঁকে দেখেছি (সালাত শুরু করার সময়) (১) তিনি তাকবীর বলে দু’ হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। (২) আর যখন রুকূ‘ করতেন তখন দু’ হাত দিয়ে হাঁটু শক্ত করে ধরতেন এবং পিঠ সমান করে রাখতেন। (৩) অতঃপর রুকূ‘ হতে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন যাতে মেরুদন্ডের হাড়গুলো স্ব-স্ব স্থানে ফিরে আসতো। (৪) অতঃপর যখন সিজদা্ করতেন তখন দু’ হাত সম্পূর্ণভাবে মাটির উপর বিছিয়ে দিতেন না, আবার গুটিয়েও রাখতেন না। এবং তাঁর উভয় পায়ের আঙ্গুলির মাথা কিবলামুখী করে দিতেন। (৫) যখন দু’রাকআতের পর বসতেন তখন বাম পা-এর উপর বসতেন আর ডান পা খাড়া করে দিতেন এবং যখন শেষ রাক‘আতে বসতেন তখন বাঁ পা এগিয়ে দিয়ে ডান পা খাড়া করে নিতম্বের উপর বসতেন। সহিহ বুখারি : ৮২৮, মিশকাত : ৭৯২, সুনানে তিরমিজি : ৩০৪, সুনানে আবু দাউদ : ৭৩০
উপরের সহিহ হাদিস মোটামুটি দুই রাকাত সালাতের অধিকাংশ চলে এসেছে। তারপরও একটু খোলাসা করে দুই রাকাত সালাতের ধারাবাহিক আমলগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
১. শরীয়ত সম্মত পবিত্র পোশাক পরিধান করে, শরীর পবিত্র (গোসল ও অজু) করে কিবলামুখী হয়ে পবিত্র মুসাল্লাহ উপর দাড়িয়ে যাই। তাকবিরে তাহরিমা বা আল্লাহু আকবার বলে হাতকে কান/কাধ পর্যন্ত তুলে বুকের উপর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখি।
২. সানা পাঠ করি। একটি সানা হলে-
*سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ *
উচ্চারনঃ সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তা’আলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গায়রুকা।”
অর্থাঃ হে আল্লাহ! তোমারই পবিত্রতা বর্ণনা করি এবং তোমারই শুকর আদায় করি, তোমার নাম বড়ই বারাকাতপূর্ণ, তোমার মর্যাদা সর্বোচ্চ, তুমি ছাড়া আর কেউ মাবূদ নেই।
৩. আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতো-নির রজীম। বিসমিল্লা-হির রাহমা-নির রাহীম। বলে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা।
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِِ
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ﴿۱﴾ اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۲﴾ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ۙ﴿۳﴾ مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ ؕ﴿۴﴾ اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ ؕ﴿۵﴾ اِهْدِ نَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ ۙ﴿۶﴾ صِرَاطَ الَّذِیْنَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِمْ ۬ۙغَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ لَا الضَّآلِّیْنَ ﴿۷﴾
অর্থ : পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। বিচার দিবসের মালিক। আপনারই আমরা ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট আমরা সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন। যাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন।যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।
৪. সুরা ফাতিহার পর কুরআন থেকে অন্য একটি সুরা/আয়াত (ছোট আয়াত হলে কমপক্ষে তিনটি) তিলাওয়াত করা।
৫. আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে গমন করা এবং রুকুর তাসবিহ পাঠ করা।
রুকুর এতটি তাসবিহ হলো : সুবহানা রব্বিয়াল আযীম’ (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ)
৬. সামি আল্লাহু লিমান হামিদা’ বলে ধীর স্থীরভাবে রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাড়াতে হবে এবং সামান্য অপেক্ষা করা।
৭. আল্লাহু আকবার বলে রুকু থেকে সিজদাতে চলে যেতে হবে। সাত অঙ্গের সাথে সিজদা করতে হবে এবং সিজদার তাসবিহ পাঠ করতে হবে। সিজদার একটি সহজ তাসবিহ হল : “সুবহানা রব্বিয়াল আলা (سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى)। আল্লাহু আকবার কবে সিজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে সামান্য অপেক্ষা করে দ্বিতীয় সিজদা প্রদান করা।
৮. দ্বিতীয় সিজদা শেষ করে আল্লাহু আকবার বলে দাড়িয়ে যেতে হবে এবং পূর্বেন ন্যায় সুরা ফাতিহা ও কিরায়াত পাঠের পর রুকু সিজদা করতে হবে।
৯. অতঃপর তাশাতহুদের জন্য বসে। তাশাহুদ, দুরুদ ও দুআ পাঠ করা।
তাশাহুদটি হলো :
اَلتَّحِيَّاتُ لِلّٰهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبىُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُه السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِيْنَ اَشْهَدُ اَنْ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُوْلُه-
অর্থ : ’সমস্ত মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর প্রতি সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। সালাম আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেক বান্দাগণের প্রতি।’’ তোমরা যখন তা বলবে তখন আসমান বা আসমান ও যমীনের মধ্যে আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার নিকট তা পৌঁছে যাবে। (এরপর বলবে) ’’আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন মাবূদ নাই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’’
একটি বহুল পরিচিত দুরূদ হলো :
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত।
দুআ মাসুরাটি হলো :
«اَللّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِيْ مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِيْ إِنَّك أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ».
অর্থা :হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নাফসের উপর অনেক যুলুম করেছি। তুমি ছাড়া গুনাহ মাফ করার কেউ নেই। অতএব আমাকে তোমার পক্ষ থেকে মাফ করে দাও। আমার উপর রহম কর। তুমিই ক্ষমাকারী ও রহমতকারী।
১০. তাশাহুদ, দুরূদ ও দুআ পাঠের পর ডানে বামে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করা।
সালাতের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ১০ টি ছোট সুরা বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদসহ নিচে দেওয়া হলো :
১. সুরা আল ফিল
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اَلَمْ تَرَ كَیْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِاَصْحٰبِ الْفِیْلِ ؕ﴿۱﴾اَلَمْ یَجْعَلْ كَیْدَهُمْ فِیْ تَضْلِیْلٍ ۙ﴿۲﴾ وَّ اَرْسَلَ عَلَیْهِمْ طَیْرًا اَبَابِیْلَ ۙ﴿۳﴾ تَرْمِیْهِمْ بِحِجَارَۃٍ مِّنْ سِجِّیْلٍ ۪ۙ﴿۴﴾ فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّاْکُوْلٍ ﴿۵﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)-
অনুবাদ : (১) আপনি কি শোনেন নি, আপনার প্রভু হস্তীওয়ালাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন? (২) তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? (৩) তিনি তাদের উপরে প্রেরণ করেছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি (৪) যারা তাদের উপরে নিক্ষেপ করেছিল মেটেল পাথরের কংকর (৫) অতঃপর তিনি তাদের করে দেন ভক্ষিত তৃণসদৃশ।
(২) সুরা কুরাইশ
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
لِاِیْلٰفِ قُرَیْشٍ ۙ﴿۱﴾اٖلٰفِهِمْ رِحْلَۃَ الشِّتَآءِ وَ الصَّیْفِ ۚ﴿۲﴾ فَلْیَعْبُدُوْا رَبَّ هٰذَا الْبَیْتِ ۙ﴿۳﴾ الَّذِیْۤ اَطْعَمَهُمْ مِّنْ جُوْعٍ ۬ۙ وَّ اٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ ﴿۴﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) কুরায়েশদের আসক্তির কারণে (২) আসক্তির কারণে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের (৩) অতএব তারা যেন ইবাদত করে এই গৃহের মালিকের (৪) যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় অন্ন দান করেছেন এবং ভীতি হ’তে নিরাপদ করেছেন।
(৩) সুরা আল মাউন
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اَرَءَیْتَ الَّذِیْ یُكَذِّبُ بِالدِّیْنِ ؕ﴿۱﴾ فَذٰلِكَ الَّذِیْ یَدُعُّ الْیَتِیْمَ ۙ﴿۲﴾ وَ لَا یَحُضُّ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْكِیْنِ ؕ﴿۳﴾ فَوَیْلٌ لِّلْمُصَلِّیْنَ ۙ﴿۴﴾الَّذِیْنَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُوْنَ ۙ﴿۵﴾ الَّذِیْنَ هُمْ یُرَآءُوْنَ ۙ﴿۶﴾وَ یَمْنَعُوْنَ الْمَاعُوْنَ ﴿۷﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচার দিবসকে মিথ্যা বলে? (২) সে হ’ল ঐ ব্যক্তি, যে ইয়াতীমকে গলা ধাক্কা দেয় (৩) এবং মিসকীনকে খাদ্য দানে উৎসাহিত করে না (৪) অতঃপর দুর্ভোগ ঐ সব মুছল্লীর জন্য (৫) যারা তাদের সালাত থেকে উদাসীন (৬) যারা লোকদেরকে দেখায় (৭) এবং নিত্য ব্যবহার্য বস্ত্ত দানে বিরত থাকে।
(৪) সুরা আল কাউসার
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اِنَّاۤ اَعْطَیْنٰكَ الْكَوْثَرَ ؕ﴿۱﴾ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ ؕ﴿۲﴾ اِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْاَبْتَرُ ﴿۳﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে ‘কাওছার’ দান করেছি (২) অতএব আপনার প্রভুর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন (৩) নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।
(৫) সুরা আল কাফিরূন
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْکٰفِرُوْنَ ۙ﴿۱﴾ لَاۤ اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُوْنَ ۙ﴿۲﴾وَ لَاۤ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ اَعْبُدُ ۚ﴿۳﴾ وَ لَاۤ اَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدْتُّمْ ۙ﴿۴﴾ وَ لَاۤ اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ اَعْبُدُ ؕ﴿۵﴾ لَکُمْ دِیْنُکُمْ وَلِیَ دِیْنِ ﴿۶﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) আপনি বলুন! হে কাফেরবৃন্দ! (২) আমি ইবাদত করি না তোমরা যাদের ইবাদত কর (৩) এবং তোমরা ইবাদতকারী নও আমি যার ইবাদত করি (৪) আমি ইবাদতকারী নই তোমরা যার ইবাদত কর (৫) এবং তোমরা ইবাদতকারী নও আমি যার ইবাদত করি (৬) তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্য আমার দ্বীন।
(৬) সুরা আন নাসর
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
اِذَا جَآءَ نَصْرُ اللّٰهِ وَ الْفَتْحُ ۙ﴿۱﴾ وَ رَاَیْتَ النَّاسَ یَدْخُلُوْنَ فِیْ دِیْنِ اللّٰهِ اَفْوَاجًا ۙ﴿۲﴾ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَ اسْتَغْفِرْهُ ؕؔ اِنَّہٗ كَانَ تَوَّابًا ﴿۳﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) যখন এসে গেছে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় (২) এবং আপনি মানুষকে দেখছেন দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে (ইসলামে) প্রবেশ করছে (৩) তখন আপনি আপনার পালনকর্তার প্রশংসা সহ পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অধিক তওবা কবুলকারী।
(৭) সুরা আল মাজাদ/লাহাব
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
تَبَّتْ یَدَاۤ اَبِیْ لَهَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾ مَاۤ اَغْنٰی عَنْهُ مَالُہٗ وَ مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾سَیَصْلٰی نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾وَّ امْرَاَتُہٗ ؕ حَمَّالَۃَ الْحَطَبِ ۚ﴿۴﴾ فِیْ جِیْدِهَا حَبْلٌ مِّنْ مَّسَدٍ ﴿۵﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হৌক এবং ধ্বংস হৌক সে নিজে (২) তার কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা কিছু সে উপার্জন করেছে (৩) সত্বর সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে (৪) এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহনকারিণী (৫) তার গলদেশে খর্জুর পত্রের পাকানো রশি।
(৮) সুরা আল ইখলাস
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾اَللّٰهُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾ لَمْ یَلِدْ ۬ۙ وَ لَمْ یُوْلَدْ ۙ﴿۳﴾وَ لَمْ یَکُنْ لَّہٗ کُفُوًا اَحَدٌ ﴿۴﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) বলুন, তিনি আল্লাহ এক (২) আল্লাহ মুখাপেক্ষীহীন (৩) তিনি (কাউকে) জন্ম দেননি এবং তিনি (কারও) জন্মিত নন (৪) এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
(৯) সুরা আল ফালাক
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ۙ﴿۱﴾ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ۙ﴿۲﴾ وَ مِنْ شَرِّ غَاسِقٍ اِذَا وَقَبَ ۙ﴿۳﴾ وَ مِنْ شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِی الْعُقَدِ ۙ﴿۴﴾ وَ مِنْ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَ ﴿۵﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) বলুন! আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের প্রতিপালকের (২) যাবতীয় অনিষ্ট হ’তে, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন (৩) এবং অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট হ’তে, যখন তা আচছন্ন হয় (৪) গ্রন্থিতে ফুঁকদান কারিণীদের অনিষ্ট হ’তে (৫) এবং হিংসুকের অনিষ্ট হ’তে যখন সে হিংসা করে।
(১০) সুরা আন নাস
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ ۙ﴿۱﴾ مَلِكِ النَّاسِ ۙ﴿۲﴾ اِلٰهِ النَّاسِ ۙ﴿۳﴾ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ ۬ۙ الْخَنَّاسِ ۪ۙ﴿۴﴾ الَّذِیْ یُوَسْوِسُ فِیْ صُدُوْرِ النَّاسِ ۙ﴿۵﴾ مِنَ الْجِنَّۃِ وَ النَّاسِ ﴿۶﴾
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)
অনুবাদ : (১) বলুন! আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার (২) মানুষের অধিপতির (৩) মানুষের উপাস্যের (৪) গোপন কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হ’তে (৫) যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তর সমূহে (৬) জিনের মধ্য হ’তে ও মানুষের মধ্য হতে।