জান্নাতের বিবরণ : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জান্নাত (جَنَّة) :

জান্নাত (جَنَّة) একটি আরবি শব্দ যার শাব্দিক অর্থ হলো বাগান, উদ্যান বা আবৃত স্থান। ফারসি ভাষায় একে বেহেশত এবং বাংলায় একে স্বর্গ বলা হয়। কুরআনে জান্নাত (جَنَّة) এর মূল শব্দ দুই শতাধীক স্থানে ব্যবহৃত হলেও জান্নাত (جَنَّة) শব্দটি কুরআনে প্রায় ১৪৭ স্থানে এসেছে। এই সংখ্যায় এর একবচন, দ্বিবচন এবং বহুবচন উভয় রূপই অন্তর্ভুক্ত। তবে, এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ‘বাগান’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন দুনিয়ার বাগান, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পরকালের পুরস্কার হিসেবে ‘জান্নাত’ বা ‘বেহেশত’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ইসলামী পরিভাষায়, জান্নাত হলো এমন একটি স্থান যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য পরকালে পুরস্কার হিসেবে তৈরি করে রেখেছেন। এটি সাধারণ বাগান নয় বরং এক চিরস্থায়ী বাসস্থান যার বর্ণনা কল্পনাতীত সৌন্দর্য, শান্তি ও প্রাচুর্যে ভরপুর। কুরআন হাদিসে জান্নাতকে এমন এক স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট, ক্লান্তি বা অসুস্থতা থাকবে না। সেখানে সময় চিরন্তন আনন্দ ও স্বস্তিতে কাটবে। জান্নাতের অধিবাসীরা এমন সব নেয়ামত লাভ করবেন যা তারা পৃথিবীতে কখনো কল্পনাও করেননি।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-

فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, তিরমিযী ৩১৯৭, ইবনু মাজাহ ৪৩২৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৯৭৮, সহীহুল জামি ৪৩০৭, আবূ ইয়া’লা : ৬২৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৩৬৯, শু’আবূল ঈমান : ৩৮২, দারিমী : ২৮২৮, আহমাদ : ৯৬৫৫।

হল ইবনু সা‘দ আস্সা‘য়িদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতে চাবুক পরিমাণ সামান্য জায়গাও দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা আছে তার থেকে উত্তম। সহিহ : ৩২৫০

জান্নাতের মধ্যে রয়েছে সুন্দর সবুজে ভরা বাগান, দুধ, মধু ও শরাবের ঝরনা, এবং নানা ধরনের সুস্বাদু ফলমূল। সবচেয়ে বড় নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

জান্নাতকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্তর তার অধিবাসীর আমল বা সৎকর্মের মানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরকে ‘জান্নাতুল ফিরদাউস’ বলা হয়। এটি এমন এক স্থান, যেখানে পৌঁছানো জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জান্নাত কোনো অলৌকিক বা অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং এটি একটি বাস্তব স্থান যা আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তৈরি করেছেন। বিশ্বাসীদের জন্য এটি হলো তাদের পার্থিব জীবনের সকল ত্যাগ ও ধৈর্যের চূড়ান্ত প্রতিদান। জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা মুসলিমদের সৎ পথে চলতে এবং ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে। এটি শুধু একটি পুরস্কারই নয়, বরং তা মানব জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ।

১. জান্নাত সম্পর্কে সাধারণ ধারণা

জান্নাত এক অতুলনীয় শান্তিনিবাস যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নজিরবিহীন বাস স্থান। জান্নাতের কোনো কিছুকেই দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। সেখানে সবকিছুই অনন্য এবং অতুলনীয়। এর আলো, সৌরভ, অট্টালিকা, খাবার এবং অন্যান্য সব নেয়ামত মানুষের কল্পনার বাইরে। জান্নাতের অট্টালিকাগুলো সোনা ও রুপার ইঁট দিয়ে তৈরি, যার গাঁথুনি হলো মেশকের সুগন্ধি। এর মাটি জাফরান দ্বারা আবৃত। এই বর্ণনাগুলো প্রতীকী অর্থে জান্নাতের ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের বিশালতা প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে চিরসুখী হবে, কোনো কষ্ট পাবে না এবং কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তার পোশাক পুরোনো হবে না এবং যৌবনও নষ্ট হবে না। এটি জান্নাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সুখ ও কষ্টের বিপরীতে জান্নাত হলো চিরস্থায়ী আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্থান।

وَاِذَا رَاَیۡتَ ثَمَّ رَاَیۡتَ نَعِیۡمًا وَّمُلۡکًا کَبِیۡرًا

তুমি দেখলে সেখানে দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। সূরা ইনসান : ২০

এই আয়াতটি জান্নাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে:

বিশাল রাজ্য (مُلْكًا كَبِيرًا): জান্নাত শুধু একটি আরামদায়ক স্থান নয়, বরং এটি একটি বিশাল সাম্রাজ্য। মুমিনরা সেখানে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু লাভ করবে। প্রতিটি মুমিনকে এমন একটি রাজ্য দেওয়া হবে, যার পরিসীমা হবে বিশাল। এই রাজ্য হবে তার নিজস্ব রাজত্ব, যেখানে তার কোনো কিছুর অভাব থাকবে না।

ভোগ-বিলাস (نَعِيمًا): জান্নাতে প্রতিটি আনন্দের উপকরণ থাকবে, যা মানব মনকে তৃপ্ত করবে এবং চোখকে শীতল করবে। সেখানে থাকবে ফল, খাদ্য, পানীয়, এবং সুন্দর সঙ্গিনী। এই নেয়ামতগুলো শুধু ভোগের জন্য নয়, বরং এর মাধ্যমে মুমিনরা তাদের সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারবে।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, বদরের যূদ্ধে হারিসা (রাঃ) আদৃশ্য তীরের আঘাতে শাহাদাতবরণ করলে তার মাতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার অন্তরে হারিসার স্নেহ-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাত লাভ করে তবে আমি তার জন্য কান্নাকাটি করব না। আর যদি ব্যতিক্রম হয় তবে আপনি অচিরেই দেখতে পাবেন আমি কি করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তো নির্বোধ। জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নতমানের জান্নাত ফিরদাউসে রয়েছে। তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর রাস্তায় চলা দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। তীরের দু’প্রান্তের দূরত্বের সমান বা কদম পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তৎমধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে তবে সমস্ত দুনিয়া আলোকিত ও খুশবুতে মোহিত হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর নাসীফ (ওড়না) দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। সহিহ বুখারী : ৬৫৬৮, সহিহ মুসলিম : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১৬৪৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৩১১৯, সহীহুল জামি : ৪১৫১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৯৮

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি চাবুক রাখা পরিমাণ স্থান গোটা দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। সহহি বুখারী : ৩২৫০, মিশকাত : ৫৬১৩, সুনানে তিরমিযী : ৩০১৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩৩০, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯৭৮, সহীহুল জামি : ৬৬৩৫, আবূ ইয়ালা : ৭৫১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪১৭, তবারানী : ৫৬২১, হাকিম : ৩১৭০, বায়হাকী : ১৮৯৬১

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-

فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, আহমাদ : ৯৬৫৫।

২. জান্নাতে সংখ্যা ও নাম

আমাদের সমাজে ব্যাপকভারে আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করলেও আসলে সে নামগুলি সবই জান্নাতের গুণবাচক নাম। অবশ্য কোন কোন জান্নাতের নাম স্পষ্টতভাবে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। আাবার অনেক স্থানে জান্নাতের দরজার কথা বলা হয়েছে। অনেকে ঐ দরজার নামকেই জান্নাতের নাম হিসেবে উল্লেখে করেছেন। একটি সহিহ হাদিসে বুঝা যায জান্নাতের আটি দরজা আছে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।

বিভিন্ন তাফসীরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে আটি দরজা মানে আটটি জান্নাত। তবে একটি জান্নাতের আটটি দরজা থাকাও অমূল নয়। কোন কোন মুফাস্সির সরাসরি আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করেছে। আটটি জান্নাতের নাম ও বর্ণনা কুরআন হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো। জান্নাতের নামগুলো হলো-

ক. জান্নাতুল ফিরদাউস (جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ): জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর।

খ. জান্নাতুল আদ্‌ন (جَنَّةُ عَدْنٍ): চিরস্থায়ী আরামের বাগান।

গ. জান্নাতুন নাঈম (جَنَّةُ النَّعِيْمِ): নেয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বাগান।

ঘ. জান্নাতুল মা’ওয়া (جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ): প্রকৃত আশ্রয়স্থল।

ঙ. জান্নাতুল খুলদ (دَارُ الْخُلْدِ): চিরস্থায়ী নিবাস।

চ. দারুস সালাম (دَارُ السَّلَامِ): শান্তির নিবাস।

ছ. দারুল মুক্বামাহ (دَارُ الْمُقَامَةِ): স্থায়ী বসবাসের স্থান।

জ. দারুল কারার (دَارُ الْقَرَارِ): শেষ পরিণতি বা চূড়ান্ত আবাস।

ক. জান্নাতুল ফিরদাউস

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡفِرۡدَوۡسَ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা (মুমিনগণ) বসবাস করবে চিরকাল।সুরা মুমিনুন : ১১

হারিসা (রাঃ) জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছ

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, হারিসাহ (রাঃ) একজন নও জওয়ান লোক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করার পর তাঁর আম্মা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হারিসাহ আমার কত প্রিয় ছিল আপনি তা অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি সবর করব এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা পোষণ করব। আর যদি ব্যাপার অন্য রকম হয় তাহলে আপনি তো দেখতেই পাবেন, আমি যা করব। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কী হল, তুমি কি অজ্ঞান হয়ে গেলে? জান্নাত কি একটি? জান্নাত অনেকগুলি, সে তো জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩৯৮২

জান্নাতুল ফিরদাউস সর্বোচ্চ জান্নাত

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যে ঈমান আনল, সালাত আদায় করল ও রমাযানের সিয়াম পালন করল সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক কিংবা স্বীয় জন্মভূমিতে বসে থাকুক, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি লোকদের এ সুসংবাদ পৌঁছে দিব না? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে একশ’টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু’টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মত। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। মুহাম্মদ ইবনু ফুলাইহ্ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে (নিঃসন্দেহে) বলেন, এর উপর রয়েছে আরশে রহমান। সহিহ বুখারি : ২৭৯০, ৭৪২৩

খ. জান্নাতুল আদন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ لَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْزِي اللَّهُ الْمُتَّقِينَ

তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ) যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। তারা চাইবে, তাদের জন্য তার মধ্যে তাই থাকবে। এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকীদের প্রতিদান দেন। সুরা নাহল : ৩১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ

তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন-এ (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যেখানে তাদের স্বর্ণ-নির্মিত কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং যেখানে তাদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের। (ফাত্বিরঃ ৩৩)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَٰنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا

সেই জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যার প্রতিশ্রুতি পরম দয়াময় নিজ দাসদেরকে অদৃশ্যভাবে দিয়েছেন; নিশ্চয় তার প্রতিশ্রুত বিষয় অবশ্যম্ভাবী। সুরা মরিয়াম : ৬১

এ ছাড়া আরো বহু আয়াতে (তাওবা-৭২, রাদ-২৩, ইবরাহীম-৩১, কাহফ-৩১, ত্বহা-৭৬, ফাতির-৩৩, সাদ-৫০, গাফির-৮, সফ-১২, বাইয়েনা-৮) এ জান্নাতের কথা উল্লিখিত হয়েছে।

গ. জান্নাতুন নাঈম

নাঈম মানে সম্পদশালী, সুখময়। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُم بِإِيمَانِهِمْ ۖ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, জান্নাতুন নাঈম-এ (আরামদায়ক জান্নাতসমূহে) যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। সুরা ইউনুস : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ

নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে জান্নাতুন নাঈম (সুখের উদ্যান)। সুরা লোকমান : ৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتِ النَّعِيمِ

আল্লাহভীরুদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই জান্নাতুন নাঈম (ভোগ-বিলাসপূর্ণ জান্নাত) রয়েছে। কালাম : ৩৪

ইব্রাহীম (আঃ) এই জান্নাত চেয়ে দুআ করে বলেছিলেন-

وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ

আমাকে সুখকর (নাঈম) জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। সুরা শুয়ারা : ৬৫

ঘ. জান্নাতুল মাওয়া

মা’ওয়া মানে ঠিকানা বা বাসস্থান। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ فَلَہُمۡ جَنّٰتُ الۡمَاۡوٰی  نُزُلًۢا بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের বাসস্থান হবে জান্নাত, তারা যা করত তার আপ্যায়ন হিসেবে। সুর সিজদা : ১৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ (13) عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ (14) عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ (15)

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত। সুনা নাজম : ১৩-১৫

ঙ. জান্নাতুল খুলদ

খুলদ  মানে চিরস্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اَذٰلِکَ خَیۡرٌ اَمۡ جَنَّۃُ الۡخُلۡدِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ کَانَتۡ لَہُمۡ جَزَآءً وَّمَصِیۡرًا

বল, সেটা উত্তম না  জান্নাতুল খুলদ (স্থায়ী জান্নাত), মুত্তাকীদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তা হবে তাদের পুরস্কার ও প্রতাবর্তনস্থল। সুরা ফুরকান : ১৫

সাহাবী ইবনে মাসউদ দুআয় বলেছিলেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيمَانًا لا يَرْتَدُّ , وَنَعِيمًا لا يَنْفَدُ , وَمُرَافَقَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَعْلَى غُرَفِ جَنَّةِ الْخُلْدِ.

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন ঈমান চাই, যা কখনও ফিরে যায় না। এমন নেয়ামত চাই, যা কখনও শেষ হয় না এবং জান্নাতুল খুলদের সর্বোচ্চ কক্ষগুলোতে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সঙ্গ চাই। সহীহাহ : ২৩০

চ. দারুস সালাম

দারুস সালাম’ মানে শান্তিনিকেতন। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِندَ رَبِّهِمْ ۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে দারুস সালাম (শান্তির আলয়) এবং তারা যা করত, তার কারণে তিনি হবেন তাদের অভিভাবক। সুরা আনাম : ১২৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

আল্লাহ (মানুষ)- কে দারুস সালাম-এর (শান্তির আবাসের) দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন। সুরা ইউনুস : ২৫

ছ. দারুল মুক্বামাহ

দারুল মুক্বামাহ মানে স্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِي أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِن فَضْلِهِ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٌ

যিনি নিজ অনুগ্রহে, আমাদেরকে দারুল মুক্বামাহ (স্থায়ী আবাস) দান করেছেন; যেখানে আমাদেরকে কোন প্রকার ক্লেশ স্পর্শ করে না এবং স্পর্শ করে না। কোন প্রকার ক্লান্তি। সুরা ফাতির : ৩৫

জ. দারুল কারার

দারুল ক্বারার মানে চিরস্থায়ী আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ

হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে দারুল কারার (চিরস্থায়ী আবাস)। সুরা মুমিন : ৩৯

এই আটটি জান্নাত ছাড়াও কুরআনে আরও একটি জান্নাতের নামের কথা জানা যায়।

আদ-দারুল আখিরাহ

আদ-দারুল আখিরাহ মানে পরকালের আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

 আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বই আর কিছুই নয় এবং যারা সাবধানতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই (দারুল আখিরাহ) শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না? সুরা আনাম : ৩২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

এ পরলোকের আবাস (দারুল আখিরাহ), যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। সুরা কাসাস : ৮৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ ۚ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ

আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখিরাতের নিবাসই (দারুল আখিরাহ) হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। সুরা আনকাবুত : ৬৪

৩. জান্নাতে দরজা বা গেট :

জান্নাতের গেট সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَسِیۡقَ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ اِلَی الۡجَنَّۃِ زُمَرًا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءُوۡہَا وَفُتِحَتۡ اَبۡوَابُہَا وَقَالَ لَہُمۡ خَزَنَتُہَا سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ طِبۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡہَا خٰلِدِیۡنَ

আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর’। সূরা যুমার : ৭৩

এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হলো যে, জান্নাতে অনেকগুলো গেট আছে।

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোন মুসলিম ব্যাক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর বলে-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

“আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তাঁর কোন শারীক নাই, তিনি একক এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।

এ হাদিসের আলোকে বলা হয় জান্নাতের আটটি গেট রয়েছে। গেটগুলো এত বিশাল যে, একটি গেটের দুপাটের মধ্যে দুরত্ব হলো মক্কা থেকে হিজর পর্যন্ত (প্রায় ১১৬০ কিলোমিটার) অথবা মক্কা থেকে বসরা পর্যন্ত (প্রায় ১২৫০ কি.মি)।

ক. আবূ বকর (রা.) সকল দরজা হতে ডাকা হবে

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া ব্যয় করবে তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ হতে ডাকা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। অতএব যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা হতে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ, তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। যে সিয়াম পালনকারী, তাকে রাইয়্যান দরজা হতে ডাকা হবে। যে সাদাকা দানকারী, তাকে সাদাকার দরজা হতে ডাকা হবে। এরপর আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, সকল দরজা হতে কাউকে ডাকার কোন প্রয়োজন নেই, তবে কি কাউকে সব দরজা হতে ডাকা হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ। আমি আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে। সহিহ বুখারি : ১৮৯৭, ২৭৪১, ৩২১৬, ৩৬৬৬, মুসলিম : ১০২৭, ১১৫২, আহমাদ : ৭৬৩৭

খ. রাইয়্যান দরজা থেকে সিয়াম পালনকারীকে ডাকা হবে

সাহাল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে একটি গেট রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন সিয়াম পালনকারীরাই শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। যখন তারা প্রবেশ করবে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না”। সহিহ বুখারি : ১৮৯৬, সহিহ মুসলিম : ১১৫২

গ. জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান ওয়াসিলা

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে উত্তরে সে শব্দগুলোরই পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে (এর পরিবর্তে) আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ’ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ’ওয়াসীলা’ হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা এ বান্দা আমিই হব। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ’ওয়াসীলা’র দু’আ করবে, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। সহিহ মুসলিম : ৩৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৩, মিশকাত : ৬৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৬৭৮, সুনানে তিরমিযী : ৩৬১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ১৬৯০, ইরওয়া : ২৪২, সহীহ আল জামি : ৬১৩।

৪. জান্নাতের মাঝে বিভিন্ন স্তর হবে

আল্লাহ তায়ালব বলেন-

وَمَن يَأۡتِهِۦ مُؤۡمِنٗا قَدۡ عَمِلَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلدَّرَجَٰتُ ٱلۡعُلَىٰ ٧٥

আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা, : ৭৫

আল্লাহ তায়ালব বলেন-

فَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ دَرَجَةٗۚ وَكُلّٗا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡحُسۡنَىٰۚ وَفَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٩٥ دَرَجَٰتٖ مِّنۡهُ وَمَغۡفِرَةٗ وَرَحۡمَةٗۚ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمًا

“নিজদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বসে থাকাদের ওপর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ জিহাদকারীদেরকে বসে থাকাদের উপর মহা পুরস্কার দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। সূরা নিসা : ৯৫-৯৬

এ সকল আয়াতের সবগুলোতে আমরা দেখতে পেলাম, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে মর্যাদার বিভিন্ন স্তর রেখেছেন।

উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একশতটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বর্তমান। ফিরদাউস হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু স্তরের জান্নাত, সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং এর উপরেই (আল্লাহ তা’আলার) আরশ স্থাপিত। তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩১ মিশকাত : ৫৬১৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৯২২,সহীহুল জামি : ৪২৪৫, আহমাদ : ৮৪০০, শু’আবূল ঈমান : ৪২৫৮

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতের একশত স্তর (ধাপ) রয়েছে। প্রত্যেক দু স্তরের মাঝখানে রয়েছে একশত বছরের ব্যবধান। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৯, সহিহাহ : ৯২২

মু’আয ইবনু জাবাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক রামাযানের রোযা রেখেছে, নামায আদায় করেছে এবং বাইতুল্লাহর হাজ্জ আদায় করেছে, বর্ণনাকারী বলেন, মু’আয (রাযিঃ) যাকাতের কথা বলেছেন কি-না আমার মনে নেই, তার অপরাধ ক্ষমা করা আল্লাহ তা’আলার দায়িত্ব হয়ে যায়, চাই সে আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় হিজরত করুক কিংবা আপন জন্মস্থানেই অবস্থান করুক। মু’আয (রাযিঃ) বলেন, আমি কি মানুষের নিকট এই খবর পৌছে দিব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ লোকদেরকে ’আমল করতে ছেড়ে দাও। কেননা, জান্নাতে একশ স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু’স্তরের মাঝখানে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বিদ্যমান। আর সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট জান্নাত হচ্ছে ফিরদাউস। এর উপরেই রয়েছে আল্লাহ তা’আলার আরশ এবং এখান থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ প্রবাহমান। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩০, সহীহাহ : ৯২১

জান্নাতের বিবরণ : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৫. জান্নাতের অধিবাসিগণ

জান্নাত হলো সেই চিরস্থায়ী আবাস, যা আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। জান্নাত লাভের প্রধানতম শর্ত হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা এবং কোনো কিছুকে তাঁর সাথে শরীক না করা। যারা শিরকবিহীন ঈমানের সাথে জীবনযাপন করে, তারাই জান্নাতের প্রকৃত হকদার। যদি কোনো ব্যক্তি জীবনের কোনো পর্যায়ে শিরকের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়েও আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং তওবার পর মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেন। কারণ ইসলামে তওবার দরজা সর্বদা খোলা। কিন্তু যারা শিরক থেকে তওবা না করে অথবা শিরক ও কুফরীর ওপর অটল থেকে মৃত্যুবরণ করে, তাদের জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম। আল্লাহ তাআলার কোনো বিষয়কে মিথ্যা জ্ঞান করা বা অস্বীকার করাও কুফরীর শামিল, যা জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বহু স্থানে জান্নাতবাসীদের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন। সেখানে বারবার বলা হয়েছে যে, জান্নাত কেবল তাদেরই জন্য, যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে। ঈমান ও নেক আমলের এই সমন্বিত রূপই জান্নাত লাভের একমাত্র পথ। শুধুমাত্র ঈমান আনলেই হবে না, বরং সেই ঈমানের প্রতিফলন জীবনে আমলের মাধ্যমে দেখাতে হবে। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এই মূলনীতি আলোকে নিন্মে জান্নাতের অধিবাসিদের নাম উল্লেখ করা হলো।

জান্নাতে অধিবাসি হওয়া প্রথম শর্তই হলো- ঈমান

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ رِّزْقًا ۙ قَالُوا هَٰذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِن قَبْلُ ۖ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا ۖ وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ ۖ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। যখনই তাদেরকে জান্নাত থেকে কোন ফল খেতে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘এটাই তো পূর্বে আমাদেরকে খেতে দেয়া হয়েছিল’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করে এবং তাদের জন্য তাতে থাকবে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّا ظَلِيلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়। সুরা নিসা : ৫৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে? সুরা নিসা : ১২২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং (ওয়াদা দিচ্ছেন) স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসফলতা। সুরা তাওবা : ৭২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَخْبَتُوا إِلَى رَبِّهِمْ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং বিনীত হয়েছে তাদের রবের প্রতি, তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা হুদ : ২৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, আরামদায়ক জান্নাতসমূহে যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। সুরা ইউনুস : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا ٭ أُولَئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَّكِئِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ نِعْمَ الثَّوَابُ وَحَسُنَتْ مُرْتَفَقًا

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, নিশ্চয় আমি এমন কারো প্রতিদান নষ্ট করব না, যে সুকর্ম করেছে। এরাই তারা, যাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ। সেখানে তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণের চুড়ি দিয়ে এবং তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু সিল্কের সবুজ পোশাক। তারা সেখানে (থাকবে) আসনে হেলান দিয়ে। কী উত্তম প্রতিদান এবং কী সুন্দর বিশ্রামস্থল! সুরা কাহফ : ৩০-৩১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَا * جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ جَزَاءُ مَنْ تَزَكَّى

 আর যারা তাঁর নিকট বিশ্বাসী হয়ে ও সৎকর্ম করে উপস্থিত হবে, তাদের জন্য আছে সমুচ্চ মর্যাদাসমূহ। স্থায়ী জান্নাত যার নিচে নদীমালা প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এই পুরস্কার তাদেরই যারা পবিত্র। সুরা ত্বহা : ৭৫-৭৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَنُکَفِّرَنَّ عَنۡہُمۡ سَیِّاٰتِہِمۡ وَلَنَجۡزِیَنَّہُمۡ اَحۡسَنَ الَّذِیۡ کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, অবশ্যই আমি তাদের থেকে তাদের পাপসমূহ দূর করে দেব এবং আমি অবশ্যই তাদের সেই উত্তম আমলের প্রতিদান দেব, যা তারা করত। সূরা আনকাবুত : ৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۬ؕؑ  ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡکَبِیۡرُ ؕ

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ। এটাই বিরাট সফলতা। সূরা বুরুজ :১১

দ্বিতীয় প্রধান শর্ত ঈমানে সাথে নেক আমল

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করেছেন, তবে এর জন্য কেবল ঈমান আনাই যথেষ্ট নয়। ঈমানের সাথে সাথে নেক আমল করা এবং বদ আমল থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এগুলো আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমা বা হুদুদ। কোনো ঈমানদার যদি আল্লাহর এই সীমা লঙ্ঘন করে, অর্থাৎ বড় কোনো গুনাহ করে এবং তওবা না করে মারা যায়, তাহলে তাকে তার পাপের সাজা ভোগ করার জন্য জাহান্নামে যেতে হতে পারে। তবে তার ঈমানের কারণে, সাজা ভোগের পর একসময় সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতের হকদারদের মধ্যে আমলের দিক থেকে যারা সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, তারা হলেন নবী-রাসূলগণ, শহীদগণ, সিদ্দিকগণ এবং সালেহীনগণ। তাঁদের মর্যাদা তাঁদের অতুলনীয় ঈমান ও সৎকর্মের কারণে। তাঁদের জীবন ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত, যা তাঁদেরকে জান্নাতের সুউচ্চ আসনে আসীন করেছে। নেক আমলের দিক দিয়ে যারা অগ্রগামী তাদের জান্নাতে ঘোষনা কুরআন ও সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়। যেমন-

ক. নবী ও রাসূলগণ

নবী-রাসূলগণ হলেন আল্লাহর নির্বাচিত মানুষ, যাদেরকে তিনি মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁদের আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি তাঁদের পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের কারণে তাঁরা জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَالرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَالصِّدِّیۡقِیۡنَ وَالشُّہَدَآءِ وَالصّٰلِحِیۡنَ ۚ  وَحَسُنَ اُولٰٓئِکَ رَفِیۡقًا ؕ

আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম। সূরা নিসা : ৬৯

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নবীগণ হলেন সেইসব ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম, যারা জান্নাতের উচ্চ মর্যাদার অধিকারী।

খ. সিদ্দীকগণ

সিদ্দীক বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি সত্যকে পূর্ণভাবে বিশ্বাস করেন এবং তার বাস্তব জীবনে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) হলেন সিদ্দীকগণের আদর্শ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, (একবার) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বকর, উমর, উসমান (রাঃ) উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়টি নড়ে উঠল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উহুদ! থামো তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ রয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৭৫, ৩৬৮৬, ৩৬৯৯

গ. শহীদগণ

শহীদ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেন। শাহাদাতের কারণে তাদের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায় এবং তাঁরা জান্নাতের বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন।

মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

শহীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ছয়টি পুরস্কার বা সুযোগ আছে। তার প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করা হয়, তাকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হয়, কবরের আযাব হতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, সে কঠিন ভীতি হতে নিরাপদ থাকবে, তার মাথায় মর্মর পাথর খচিত মর্যাদার টুপি পরিয়ে দেওয়া হবে। এর এক একটি পাথর দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছু হতে উত্তম। তার সাথে টানা টানা আয়তলোচনা বাহাত্তরজন জান্নাতী হুরকে বিয়ে দেওয়া হবে এবং তার সত্তরজন নিকটাত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কুবুল করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৬৬৩, সহিহাহ : ৩২১৩

সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, রাতে দু’জন লোক আমার কাছে এসে আমাকে গাছের উপর চড়ালো এবং আমাকে একটি সুন্দর ও উত্তম ঘরে প্রবেশ করালো, ওর চাইতে সুন্দর (ঘর) আমি কখনো দেখিনি। তারা বলল, এই ঘরটি হচ্ছে শহীদদের ঘর। আংশিক সহিহ বুখারি : ১৩৮৬

জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। (১) আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, (২) মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, (৩) যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ, (৪) পানিতে ডুবে, (৫) আগুনে পুড়ে ও (৬) ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৮৪৬, ৩১৯৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩১১১, আহমাদ : ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫২।

উপরের হাদিস দ্বারা বোঝা যায় ভালো মৃত্যুর অন্যতম কারণ শহিদী মৃত্যু। আল্লাহর পথে, প্লেগগ্রস্ত, উদরাময়গ্রস্ত, কোন কিছু চাপা পড়ে, মহামারীতে, গর্ভাবস্থায়, পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে ও ক্ষয়রোগে মৃত্যু বরণকারী শহীদের মর্যাদা পাবেন। এক কথায় বলতে পারি, ভালো বা শহীদি মৃত্যুর অন্যতম কারণসমূহ হলো-

১. প্লেগ রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ

২. পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৩. পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি শহীদ

৪. প্রাচীর চাপায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৫. আভ্যন্তরীণ বিষ ফোঁড়ায় মৃত ব্যক্তি শহীদ

৬. আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি শহীদ

৭. প্রসবকালে মৃত রমনী শহীদ।

৮. মহামারীতে মৃত ব্যক্তি শহীদ ও

৯. ক্ষয়রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ

ঘ. মেয়ে সন্তান পালল পালনকারী

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার তিনটি মেয়ে অথবা তিনটি বোন আছে, অথবা দুটি মেয়ে অথবা দুটি বোন আছে, সে তাদের প্রতি ভাল ব্যবহার করলে এবং তাদের (অধিকার) সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করলে তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত। সুনানে তিরমিজি : ১৯১৬, ইবনে হিব্বান : ২০৪৫, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৯৬

ঙ. ইয়াতিমের প্রতিপালনকারী

সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি ও ইয়াতীমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনিভাবে নিকটে থাকবে। এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দু’টি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং এ দু’টির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন। সহিহ বুখারি : ৫৩০৪, ৬০০৫

চ. সালাত ও সিয়াম আদায়করী

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে আর সালাত কায়েম করবে ও সিয়াম পালন করবে আল্লাহর উপর দায়িত্ব হলো, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সে ব্যক্তি তার জন্ম ভূমিতে বসে থাকুক বা আল্লাহর পথে জিহাদ করুক। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি এ সুসংবাদটি মানুষকে দেব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই জান্নাতে একশ স্তর রয়েছে বিভিন্ন মর্যাদার। যা আল্লাহ সে সকল লোকদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছে। এক একটি মর্যাদার ব্যপ্তি হবে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার দুরত্বের সম পরিমাণ। যখন তোমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করবে তখন তোমরা জান্নাতুল ফেরদাউস চাবে। কারণ এটা জান্নাতের মধ্যবর্তী ও সুউচ্চ মর্যাদার স্থান। এর উপর রয়েছে দয়াময় আল্লাহর আরশ”। সহীহ বুখারী : ২৭৯০।

ছ. কুরআন তিওয়াতকারী :

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে (জান্নাতের) সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, মিশকাত : ২১৩৪, সহীহাহ : ২২৪০

জ. যাদের অন্তর পাখিদের মতো

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَقْوَامٌ أَفْئِدَتُهُمْ مِثْلُ أَفْئِدَةِ الطَّيْرِ

এমন কিছু লোক জান্নাতে যাবে, যাদের অন্তর পাখীর অন্তরের মতো। সহিহ মুসলিম : ২৮৪০, মিশকাত : ৫৬২৫, মুসনাদে আহমাদ : ৮৩৬৪, সহীহুল জামি : ৮০৬৮, আবূ ইয়া’লা : ৫৮৯৬।

নোট : অন্তর পাখীর অন্তরের মতো বলতে বুঝানো হয়েছে- যাদের অন্তর হবে পাখিদের মতো সরল, নিষ্পাপ, জটিলতা, কপটতা বা হিংসা-বিদ্বেষ ছল-চাতুরি, ধোঁকাবাজি বা কুটিলতা থেকে মুক্ত। সাথে সাথে পাখির মত অল্পে তুষ্ট ও আল্লাহ নির্ভর।

ঝ. রাতে ইবাদাতকারী উত্তম চরিত্রের ব্যক্তি

আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা্য় পদার্পণ করলে লোকেরা তাঁকে দেখার জন্য ভীড় জমায় এবং বলাবলি হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন। আমিও লোকেদের সাথে তাঁকে দেখতে গেলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে, এ চেহারা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তখন তিনি সর্বপ্রথম যেকথা বলেন তা হলো, হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, অভুক্তকে আহার করাও এবং রাতের বেলা মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাত পড়ো। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৩৪, ৩২৫১, সুনানে তিরমিযী : ২৪৮৫, দারিমী : ১৪৬০

ঞ. ন্যায়পরায়ণ, দানশীল ও সফল শাসক জান্নাতি

ইয়াদ ইবনে হিমার আল-মুজাশিঈ (রাঃ)। নবী করীম ﷺ বলেছেন, তিন প্রকারের লোক জান্নাতী। তারা হলো- ন্যায়পরায়ণ, দানশীল ও সফল শাসক,  প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলিমের প্রতি দয়াশীল কোমল-হৃদয় ব্যক্তি, পবিত্র চরিত্রের অধিকারী এবং অভাবী হয়েও কারো কাছে হাত পাতে না এমন সন্তানবান ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ৭২৯৪

ট. যে ব্যক্তি জীবে দয়া করে সে জান্নাতি

১৭৩. আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ (পূর্ব যুগে) জনৈক ব্যক্তি একটি কুকুরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ভিজা মাটি চাটতে দেখতে পেয়ে তার মোজা নিল এবং কুকুরটির জন্য কুয়া হতে পানি এনে দিতে লাগল যতক্ষণ না সে ওর তৃষ্ণা মিটাল। আল্লাহ্ এর বিনিময় দিলেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন। সহহি বুখারি : ১৭৩, ২৩৬৩, ২৪৬৬, ৬০০৯

ঠ. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরানোর

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) এর সানাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক লোককে একটি গাছের কারণে জান্নাতে আনন্দ ফুর্তি করতে দেখেছি। এ গাছটি সে রাস্তার উপর হতে দূর করেছিল, যেটি মানুষকে কষ্ট দিত। সহিহ মুসলিম : ১৯১৪

ড. যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডা সালাত আদায় করবে

আবূ বকর ইবনু আবূ মূসা (রাযি.) হতে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুই শীতের (ফজর ও ’আসরের) সালাত আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ৫৭৪, সহিহ মুসলিম : ৬৩৫, আহমাদ : ১৬৭৩০

ঢ. তাওহীদের স্বীকৃতি দিলেই জান্নাত

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শারীক না করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সম্মুখে উপস্থিত হবে এমন অবস্থায় যে, সে আল্লাহর সাথে শারীক স্থির করে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩

ণ. মৃ্ত্যু কালে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’ সাক্ষ্য প্রদানকারী

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার সর্বশেষ বাক্য হবে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩১১৬

ইহা ছাড়াও যে ব্যক্তি সুরা ইখলাস ভালোবাসে, জিহবা ও লজ্জাস্থান হিফাজত করে, দৈনিক ১২ রাকাত সুন্নাহ আদায় করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকেও জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছে।

৬. দুনিয়াতে বসেই যাদের জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে

আমাদের সমাজের অধিকাংশের ধারণা, সকল সাহাবীর মধ্য হতে শুধুমাত্র দশজন সাহাবি (রাঃ) কে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়ছে। তাদেরকে আশারায়ে মুবাশশারা বলা হয়। এই দশজন ছাড়াও আর সাহাবী (রাঃ) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেনঃ

ক. সাঈদ ইবনু যাইদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নয়জন লোক প্রসঙ্গে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তারা জান্নাতী। যদি আমি দশম ব্যাক্তি প্রসঙ্গেও সাক্ষ্য দেই তবে তাতেও আমি পাপী হব না। প্রশ্ন করা হল, তা কীভাবে? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ   এর সাথে আমরা হেরা পর্বতের উপর অবস্থানরত ছিলাম। (হেরা কেঁপে উঠলে) তিনি বললেন, হেরা! শান্ত হও। অবশ্যই তোমার উপরে একজন নবী কিংবা একজন সিদ্দীক্ব (পরম সত্যবাদী) অথবা একজন শহীদ আছেন। বলা হল, তারা কারা? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ), আবূ বাক্কর, ‘উমার, ‘উসমান, ‘আলী, ত্বালহা, যুবাইর, সা’দ ও ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাকে প্রশ্ন করা হল, দশম লোকটি কে? তিনি বললেন, আমি। সুনানে তিরমিজি:  ৩৭৫৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৪৮

খ. ফাতিমাহ্‌ জান্নাতের নারীদের নেত্রী এবং হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের নেতা। সুনানে তিরমিজি : ৩৭৮১, মিশকাত ২১৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১১৮

গ. খাদীজাহ (রাঃ) জান্নাতের একটি ভবনের খোশ খবর দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৩৮২০

ঘ. হারিসাহ (রাঃ) জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩৯৮২

ঙ. বিলাল (রাঃ) জান্নাতে সুসংবাদ পেয়েছেন।  মিসকাত : ১৩২৬, সুনানে তিরমিযী : ১৩৮৯

চ. আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম (রাঃ)। সহিহ বুখারি : ৩৮১৩

ছ. এক বেদুইন নবী ﷺ   জান্নাতে সুসংবাদ দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ১৩৯৭

উপরের সহিহ হাদিসগুলো দ্বারা এ কথা প্রমানিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ   শুধুমাত্র দশজন সাহাবি (রাঃ) কে জান্নাতের সুসংবাদ দেন নাই। তিনি এই দশজনের বাহিরে বহু সাহাবিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। অনুসন্ধানমতে এ রকম সহিহ হাদিসেই ২৮ জন সাহাবীর কথা আমি পেয়েছি, যাদের ব্যাপারে নবীজী ﷺ   প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

৭. জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তি

আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتفْتِحُ، فَيَقُولُ الْخَازِنُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَأَقُولُ: مُحَمَّدٌ، فَيَقُولُ: بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَكَ

“আমি কিয়ামতের দিন জান্নাতের গেটে এসে জান্নাত খুলে দিতে বলবো। তখন দারোয়ান প্রশ্ন করবে, আপনি কে? আমি বলবো, আমি মুহাম্মাদ। তখন সে বলবে, আমাকে নির্দেশ দেওয়া আছে যে, আপনার পূর্বে আমি যেন কারো জন্য জান্নাতের দরজা খুলে না দেই”। সহিহ মুসলিম : ১৯৭

৮. জান্নাতী লোকেরা আল্লাহর দর্শন লাভ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وُجُوۡہٌ یَّوۡمَئِذٍ نَّاضِرَۃٌ ۙ اِلٰی رَبِّہَا نَاظِرَۃٌ ۚ

সেদিন কতক মুখমন্ডল হবে হাস্যোজ্জ্বল। তাদের রবের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপকারী। । সূরা কিয়ামা : ২২-২৩

আবদুল্লাহ ইবনু কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (জান্নাতের মধ্যে) দু’টি বাগান থাকবে। এ দু’টির সকল পাত্র এবং এর ভিতরে সকল বস্তু রৌপ্য নির্মিত হবে এবং (জান্নাতে) আরো দু’টি উদ্যান থাকবে। এ দু’টির সকল পাত্র এবং ভিতরের সকল বস্তু সোনার তৈরী হবে। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতী লোকেরা তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। এ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের এ দর্শনের মাঝে আল্লাহর সত্তার ওপর জড়ানো তাঁর বিরাটত্বের চাদর ছাড়া আর কোন জিনিস থাকবে না। সহিহ বুখারি : ৪৮৭৮, ৪৮৮০, ৭৪৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৮০, আহমাদ : ৮৪২৭

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে মু’মিনদের জন্য মুক্তা দ্বারা তৈরি একটি তাঁবু থাকবে, যার মাঝে ফাঁকা হবে। তার প্রশস্ততা, অন্য বর্ণনায় তার দৈর্ঘ্য ষাট মাইল। তার প্রত্যেক কোণে থাকবে তার পরিমাণ। এক কোণের লোক অন্য কোণের লোককে দেখতে পাবে না। ঈমানদারগণ তাদের কাছে যাতায়াত করবে। দু’টি জান্নাত হবে রৌপ্যের, তার ভিতরের পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী হবে রৌপ্যের এবং অপর দুটি জান্নাত হবে স্বর্ণের। যার পাত্র ও ভিতরের সব জিনিস হবে সোনার। আর ’আদন জান্নাত’ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রভুর দিদার লাভের মাঝখানে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আভা ছাড়া আর কোন আড়াল থাকবে না। সহীহ বুখারী : ৪৮৭৮, সহিহ মুসলিম : ২৮৩৮, মিশকাত : ৫৬১৬, সুনানে তিরমিযী : ২৫২৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬, সহীহুল জামি : ৩১০১, মুসনাদে বাযার : ৩০৮৭, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৭৪৬, আবূ ইয়া’লা : ৭৩৩১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৮৬, শু’আবূল ঈমান : ৯৭৬২

সুহায়ব (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলবেন, তোমরা কি আরো কিছু চাও, যা আমি তোমাদেরকে অতিরিক্ত প্রদান করব। তারা বলবে, তুমি কি আমাদের মুখমণ্ডলকে আলোকিত করনি? তুমি কি আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাওনি। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা’আলা হিজাব বা পর্দা তুলে ফেলবেন, তখন তারা আল্লাহ তা’আলার দর্শন লাভ করবে। মূলত আল্লাহ তা’আলার দর্শন লাভ ও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকার তুলনায় বেশি প্রিয় কোন বস্তুই তাদেরকে প্রদান করা হয়নি। অতঃপর তিনি কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন- “যারা উত্তম কাজ করেছে তার প্রতিদান ভালোই (অর্থাৎ জান্নাত তার উপর অতিরিক্ত)”- (সূরাহ্ ইউনুস ১০: ২৬)। তার উপর অতিরিক্ত হলো- তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং তার উপর অতিরিক্ত অবদান (অর্থাৎ দীদারে এলাহী)। সহিহ মুসলিম : ১৮১, মিশকাত : ৫৬৫৬, আহমাদ : ১৮৯৫৫, সহীহুল জামি’ : ৫২৩

৯. জান্নাতে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলে আল্লাহর সন্তুষ্টি

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা জান্নাতবাসীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! উত্তরে তারা বলবেন, ’আমরা উপস্থিত, সৌভাগ্য তোমার কাছ থেকে অর্জিত এবং যাবতীয় কল্যাণ তোমারই হাতে।” তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা উত্তরে বলবে, কেন সন্তুষ্ট হব না, হে আমাদের প্রভু! অথচ আপনি আমাদেরকে এমন জিনিস দান করেছেন যা আপনার সৃষ্ট জগতের কাউকেও দান করেননি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কি তা অপেক্ষাও উত্তম জিনিস তোমাদেরকে দান করব না? তারা বলবে, হে প্রভু! তা অপেক্ষা উত্তম কিছু আর কি হতে পারে?

অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি তোমাদের ওপর আমার সন্তুষ্টি দান করছি, অতএব এরপর তোমাদের ওপর আর কখনো আমি অসন্তুষ্ট হব না।

সহীহ বুখারী : ৬৫৪৯, সহিহ মুসলিম : ২৮২৯, মিশকাত : ৫৬২৬, সুনানে তিরমিযী : ২৫৫৫, সহীহুল জামি : ১৯১১, আহমাদ : ১১৮৫৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪৪০

১০. জান্নাতে নিম্ম স্তরের জান্নাতিরও সকল আশা পূরণ করা হবে।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

তোমাদের মধ্যে যে লোক জান্নাতে সবচেয়ে নিম্ন স্তরের হবে তাকে বলা হবে, তুমি তোমার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ কর। তখন সে আগ্রহ প্রকাশ করবে, আরো আগ্রহ প্রকাশ করবে (বার বার)। তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, তোমার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়েছে কি? সে বলবে, হ্যাঁ। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি যতটুকু আশা-আকাঙ্ক্ষা করেছ তা এবং তার সমপরিমাণ (দ্বিগুণ) তোমাকে দেয়া হলো। সহহি মুসলিম : ১৮২, মিশকাত : ৫৬২৭, মুসনাদে আহমাদ ৮১৫৩, ১১২৩২, সহীহুল জামি : ১৫৫৭, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ২৬০১, আবূ ইয়া’লা : ৬৩৬০, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪৩১, শুআবূল ঈমান : ৩১৮

মুগীরা ইবন শোবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুসা আলাইহিস সালাম তার প্রতিপালককে জিজ্ঞেস করলেন, জান্নাতবাসীদের মধ্যে সর্বনিম্ন মর্যাদার লোকটি মর্যাদা কি রকম হবে? আল্লাহ তা‘আলা বললেন, সে হলো এমন এক ব্যক্তি, জান্নাতের অধিবাসীদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর আমি তাকে বলবো, তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলবে, হে রব! কীভাবে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো যখন সকলকে নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী স্থান নিয়ে গেছে এবং তাদের পাওনাগুলো গ্রহণ করেছে? তখন তাকে বলা হবে, দুনিয়ার সম্রাটদের মত একজন সম্রাটের যা থাকে তোমাকে সে পরিমাণ দেওয়া হলে তুমি কি সন্তুষ্ট হবে? সে উত্তরে বলবে হে প্রভূ, আমি সন্তুষ্ট হবো। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমাকে সে পরিমাণ দেওয়া হবে, তারপরও সে পরিমাণ আবার দেওয়া হবে, তারপরও সে পরিমাণ আবার দেওয়া হবে তারপর আবার সে পরিমাণ দেওয়া হবে। পঞ্চমবার সে বলবে, হে প্রভু আমি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তাহলে এ পরিমাণ তোমার সাথে এর আরো দশগুণ তোমাকে দেওয়া হলো। আর তোমার জন্য রয়েছে যা তোমার মন কামনা করে আর যা তোমার চোখ দেখতে চায়। সে বলবে, হে রব আমি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। তারপর মুসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! আর সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তির স্থান কেমন হবে? আল্লাহ তা‘আলা বললেন: তারা হলো. যাদের মর্যাদার বীজ আমি নিজ হাতে বপন করেছি এবং তার উপর সীলমোহর এঁটে দিয়েছি। কাজেই সেখানের মর্যাদা ও সুখ-শান্তি এমন যা কোনদিন কোনো চোখ দেখে নি। কোনো কান শোনে নি। কোনো মানুষের অন্তর তার কল্পনা করে নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর সত্যতা তোমরা আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীতে পেতে পারো যেখানে তিনি বলেছেন, “অতএব, কোনো ব্যক্তি জানে না চোখ জুড়ানো কি জিনিস তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সুরা সিজদা : ১৭। সহিহ মুসলিম : ১৮৯।

১১. জান্নাতে সাধারণ মানুষে সাধারণ চাহিদাও পূরন করা হবে

বুরয়দাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন জনৈক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে ঘোড়া পাওয়া যাবে কি? তিনি (সা.) বললেন, যদি আল্লাহ তা’আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান আর তুমি ঘোড়ায় সওয়ার হবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ কর, তখন তোমাকে লাল বর্ণের মুক্তার ঘোড়ায় আরোহণ করানো হবে এবং তুমি জান্নাতের যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা করবে ঘোড়া তোমাকে দ্রুত উড়িয়ে সেখানে নিয়ে যাবে। আর এক লোক প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে উট পাওয়া যাবে কি? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি পূর্বের লোককে যেভাবে উত্তর দিয়েছেন, এ লোককে সেভাবে উত্তর না দিয়ে বললেন, যদি আল্লাহ তা’আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তবে তুমি সে সকল জিনিস পাবে, যা কিছু তোমার মনে চাবে এবং তোমার চোখ জুড়াবে। সুনানে তিরমিযী : ২৫৪৩, সিলসিলাতু সহীহাহ্ : ৩০০১, মিশকাত : ৫৬৪২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলছিলেন, তখন তাঁর নিকট গ্রামের একজন লোক উপবিষ্ট ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন যে, জান্নাতবাসীদের কোন একজন তার রবের কাছে চাষাবাদের অনুমতি চাইবে। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে বলবেন, তুমি কি যা চাও, তা পাচ্ছ না? সে বলবে, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার চাষ করার খুবই আগ্রহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন সে বীজ বুনবে এবং তা চারা হওয়া, গাছ বড় হওয়া ও ফসল কাটা সব কিছু পলকের মধ্যে হয়ে যাবে। আর তা (ফসল) পাহাড় সমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, হে আদম সন্তান! এগুলো নিয়ে নাও। কোন কিছুই তোমাকে তৃপ্তি দেয় না। তখন গ্রাম্য লোকটি বলে উঠল, আল্লাহর কসম, এই ধরনের লোক আপনি কুরায়শী বা আনসারদের মধ্যেই পাবেন। কেননা তাঁরা চাষী। আর আমরা তো চাষী নই। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। সহিহ বুখারি : ২৩৪৮, ৭৫১৯, মিশকাত : ৫৬৫৩, আহমাদ : ১০৬৫০, সহীহুল জামি :  ২০৮০।

১২. জান্নাতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মদীর সংখ্যা হবে সর্বাধিক

বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতীদের একশত বিশটি কাতার হবে, তার মধ্যে এই উম্মাতের হবে আশিটি কাতার এবং অন্যান্য সকল উন্মাতের হবে চল্লিশটি। সুনানে তিরমিযী ২৫৪৬, ইবনু মাজাহ ৪২৮৯, মিশকাত : ৫৬৪৪, আর রওযুন নাযীর ৬০৮, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ৩১৭১৩, মুসনাদে বাযযার ১৯৯৯, মুসনাদে আহমাদ ২২৯৯০, দারিমী ২৮৩৫, আল মু’জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ১০১৯৬, আল মু’জামুস সগীর লিত্ব তবারানী ৮২, আল মু’জামুল আওসাত্ব ১৩০১

আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে একটি তাঁবুর মধ্যে ছিলাম। তিনি বলেনঃ তোমরা কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, তোমরা জান্নাতীদের সংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হবে? আমরা বললাম, হাঁ। তিনি আবার বলেনঃ তোমরা কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, তোমরা জান্নাতীদের সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ হবে? আমরা বললাম, হাঁ। তিনি বলেনঃ জান্নাতীদের অর্ধেক হবে তোমরা। এজন্য যে, জান্নাতে কেবল মুসলিম ব্যক্তিই প্রবেশ করবে। তোমরা মুশরিকদের তুলনায় কালো ষাঁড়ের চামড়ায় সাদা লোম সদৃশ অথবা লাল ষাঁড়ের চামড়ায় কালো লোম সদৃশ। সহিহ বুখারী : ৬৫২৮, ৬৬৪২, সহিহ মুসলিম : ২২১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৮৩, সুননে তিরমিযী : ২৫৪৭, আহমাদ : ৩৬৫৩, সহীহাহ : ৮৪৯

জান্নাতের বিবরণ : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৩. সত্তর হাজার লোকের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের সত্তর হাজার অথবা সাত লাখ লোক একে অপরের হাত ধরে জান্নাতে দাখিল হবে। বর্ণনাকারীর এ দু’সংখ্যার মাঝে সন্দেহ রয়েছে। তাদের প্রথম থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত সকলেই জান্নাতে দাখিল হবে আর তাদের চেহারাগুলো পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় জ্বল জ্বল করতে থাকবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪৩

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আগের উম্মাতদের আমার সামনে পেশ করা হয়। কোন নবী তাঁর বহু উম্মাতকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। কোন নবীর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ছোট দল। কোন নবীর সঙ্গে আছে দশজন উম্মাত। কোন নবীর সাথে আছে পাঁচজন আবার কোন নবী একা একা যাচ্ছেন। দৃষ্টি দিতেই, হঠাৎ দেখি অনেক বড় একটি দল। জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিব্রীল! ওরা কি আমার উম্মাত? তিনি বললেন, না। তবে আপনি শেষ প্রান্তের দিকে তাকিয়ে দেখুন! আমি দৃষ্টি দিলামঃ হঠাৎ দেখি অনেক বড় একটি দল। তিনি বললেন, ওরা আপনার উম্মাত। আর তাদের অগ্রবর্তী সত্তর হাজার লোকের কোন হিসাব হবে না, তাদের কোন আযাব হবে না।

আমি বললাম, কারণ কী! তিনি বললেন, তারা শরীরে দাগ লাগাত না, ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিত না এবং শুভ অশুভ লক্ষণ মানত না। আর তারা কেবল তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করত। তখন উক্কাশা ইবনু মিহসান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি আমার জন্য দু’আ করুন আল্লাহ্ যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’হে আল্লাহ্ তুমি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর।’’ এরপর আরেক জন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার জন্য দু’আ করুন আল্লাহ্ যেন আমাকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ ব্যাপারে উক্কাশা তোমার আগে চলে গেছে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, আমার উম্মাত থেকে কিছু লোক দল বেঁধে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের সংখ্যা সত্তর হাজার। তাদের চেহারাগুলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মত জ্বল জ্বল করবে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, এতদশ্রবণে উক্কাশা ইবনু মিহসান আসাদী তাঁর গায়ে চাদর জড়ানো অবস্থায় দাঁড়ালেন, এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দু’আ করুন, আল্লাহ্ যেন আমাকে তাঁদের মধ্যে শামিল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ্! আপনি একে তাদের মধ্যে শামিল করুন। এরপর আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের মধ্যে শামিল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ্! আপনি একে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এরপর আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ্! আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের মধ্যে শামিল করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উক্কাশা এ ব্যাপারে তোমার চেয়ে এগিয়ে গেছে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪২

১৪. জান্নাতিদের মৃত্যু বা ঘুম নাই ।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে জিজ্ঞেস করল, জান্নাতবাসীগণ কি ঘুমাবে? তিনি বললেন, নিদ্রা তো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসী মরবে না (অতএব তাদের কোন নিদ্রা নেই)। মিশকাত : ৫৬৫৪, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৪৭৪৫, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৮৭, সহীহুল জামি : ৬৮০৮

১৫. জান্নাতবাসীরা পৃথিবীর অবিশ্বাসী সাথীদের অবস্থা দেখতে পাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَأَقۡبَلَ بَعۡضُہُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٍ۬ يَتَسَآءَلُونَ (٥٠) قَالَ قَآٮِٕلٌ۬ مِّنۡہُمۡ إِنِّى كَانَ لِى قَرِينٌ۬ (٥١) يَقُولُ أَءِنَّكَ لَمِنَ ٱلۡمُصَدِّقِينَ (٥٢) أَءِذَا مِتۡنَا وَكُنَّا تُرَابً۬ا وَعِظَـٰمًا أَءِنَّا لَمَدِينُونَ (٥٣) قَالَ هَلۡ أَنتُم مُّطَّلِعُونَ (٥٤) فَٱطَّلَعَ فَرَءَاهُ فِى سَوَآءِ ٱلۡجَحِيمِ (٥٥) قَالَ تَٱللَّهِ إِن كِدتَّ لَتُرۡدِينِ (٥٦) وَلَوۡلَا نِعۡمَةُ رَبِّى لَكُنتُ مِنَ ٱلۡمُحۡضَرِينَ (٥٧)

অতঃপর তারা মুখোমুখি হয়ে পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করবে। তাদের একজন বলবে, (পৃথিবীতে) আমার এক সঙ্গী ছিল, সে বলত, তুমি কি সে লোকদের অন্তর্ভুক্ত যারা বিশ্বাস করে আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে যাবো তখনও কি আমাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে? আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি উঁকি দিয়ে দেখবে? অতঃপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে (পৃথিবীর সঙ্গীকে) দেখবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে। সে বলবে, আল্লাহর কসম! তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলে! আমার রবের অনুগ্রহ না থাকলে আমিও তো (জাহান্নামে) হাযিরকৃতদের একজন হতাম”। সূরা সাফফাত : ৫০- ৫৭

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

كُلُّ نَفۡسِۢ بِمَا كَسَبَتۡ رَهِينَةٌ ٣٨ إِلَّآ أَصۡحَٰبَ ٱلۡيَمِينِ ٣٩ فِي جَنَّٰتٖ يَتَسَآءَلُونَ ٤٠ عَنِ ٱلۡمُجۡرِمِينَ ٤١ مَا سَلَكَكُمۡ فِي سَقَرَ ٤٢ قَالُواْ لَمۡ نَكُ مِنَ ٱلۡمُصَلِّينَ ٤٣ وَلَمۡ نَكُ نُطۡعِمُ ٱلۡمِسۡكِينَ ٤٤ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ ٱلۡخَآئِضِينَ ٤٥ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤٦ حَتَّىٰٓ أَتَىٰنَا ٱلۡيَقِينُ ٤٧ فَمَا تَنفَعُهُمۡ شَفَٰعَةُ ٱلشَّٰفِعِينَ ٤٨ فَمَا لَهُمۡ عَنِ ٱلتَّذۡكِرَةِ مُعۡرِضِينَ

“প্রতিটি প্রাণ নিজ অর্জনের কারণে দায়বদ্ধ; কিন্তু ডান দিকের লোকেরা নয়, জান্নাতসমূহের মধ্যে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করবে অপরাধীদের সম্পর্কে: কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করালো? তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আর আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করতাম না। আর আমরা অনর্থক গল্প-গুজবকারীদের সাথে (বেহুদা আলাপে) মগ্ন থাকতাম। আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অবিশ্বাস করতাম। অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে। অতএব সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না। আর তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ বাণী থেকে বিমুখ?” সূরা মুদ্দাসসির : ৩৮-৪৯

১৬. জান্নাতের অধিকাংশ অধিবাসী হবে দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীর মানুষ।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

আমি জান্নাতে তাকালাম, অধিকাংশ অধিবাসী গরীবদের ছিল; আর দোযখে তাকালাম, অধিকাংশ অধিবাসীই মহিলা ছিল। , সহিহ বুখারি : ৩২৪১, ৫১৯৮, ৬৪৪৯, ৬৫৪৬

৪৮৫০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম পরস্পর বিতর্ক করে। জাহান্নাম বলে দাম্ভিক ও পরাক্রমশালীদের দ্বারা আমাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। জান্নাত বলে, আমার কী হলো? আমাতে কেবল মাত্র দুর্বল এবং নিরীহ ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’আলা জান্নাতকে বলবেন, তুমি আমার রহমত। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে আমি অনুগ্রহ করব। আর তিনি জাহান্নামকে বলবেন, তুমি হলে আযাব। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেব। জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে পূর্ণতা। তবে জাহান্নাম পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না তিনি তাঁর পা তাতে রাখবেন। তখন সে বলবে, বাস, বাস, বাস। তখন জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যাবে এবং এর এক অংশ অপর অংশের সঙ্গে মুড়িয়ে দেয়া হবে। আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো প্রতি জুলুম করবেন না। অবশ্য আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতের জন্য অন্য মাখলূক সৃষ্টি করবেন। সহিহ বুখারি : ৪৮৫০, সহিহ মুসলিম : ২৮৪৬, আহমাদ : ৮১৭০

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে জান্নাতীদের সম্পর্কে অবহিত করব না কি? (তারা হল) প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তি এবং এমন ব্যক্তি যাকে দুর্বল মনে করা হয়। সে যদি আল্লাহর নামে কসম খায়, তাহলে তা তিনি নিশ্চয়ই পুরা করে দেন। আমি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করব না কি? (তারা হল) প্রত্যেক রূঢ় স্বভাব, কঠিন হৃদয় ও দাম্ভিক ব্যক্তি।” সহীহ মুসলিম : ৬৯৮২

১৭. গরীবরা ধনীদের চেয়ে আগে জান্নাতে যাবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ فُقَرَاءَ الْمُهَاجِرِينَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ قَبْلَ أَغْنِيَائِهِمْ بِمِقْدَارِ خَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ

দরিদ্র মুহাজিরগণ তাদের বিত্তবানদের তুলনায় পাঁচ শত বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১২৩, সুনানে তিরমিযী ২৩৫১, মিশকাত : ২১৯৮।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন ফকীর মুহাজির ব্যক্তিগণ ধনীদের চেয়ে চল্লিশ বছর পূর্বে জান্নাতে পৌছে যাবে। একথা শুনে তারা বললেন, আমরা ধৈর্য ধারন করব, আমরা কিছুই চাই না। সহিহ মুসলিম : ৭১৯৩ আংশিক

১৮. জান্নাত লাভ কর বড় কঠিন কাজ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

حُجِبَتْ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ وَحُجِبَتْ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ>

জাহান্নাম কামনা বাসনা দ্বারা বেষ্টিত। আর জান্নাত বেষ্টিত দুঃখ-মুছিবত দ্বারা। সহিহ বুখারি : ৬৪৮৭, সহিহ মুসলিম :  ২৮২২, ২৮২৩, আহমাদ ১২৫৬০

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক ভয় পায় সে ভোররাতেই যাত্রা শুরু করে, আর ভোররাতেই যে লোক যাত্রা শুরু করে, সে গন্তব্য স্থলে পৌছতে পারে। জেনে রাখ, আল্লাহ তা’আলার পণ্য খুবই দামী। জেনে রাখ, আল্লাহ্ তা’আলার পণ্য হলো জান্নাত। সুনানে তিরমিজি : ২৪৫০,  সহিহাহ : ৯৫৪, ২৩৩৫, মিশকাত : ৫৩৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল (আঃ)-কে জান্নাতের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলেনঃ জান্নাত এবং আমি এর মধ্যে জান্নাতীদের জন্য যেসব দ্রব্যাদি সৃষ্টি করে রেখেছি, তুমি সেগুলো দেখে এসো। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি জান্নাতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিকৃত সমস্ত দ্রব্যাদি দেখলেন এবং তার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে কেউ জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ প্রসঙ্গে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশের চেষ্টা করবে। তারপর তিনি আদেশ করলেন। ফলে কষ্ট-মুসীবাতের বস্তু দ্বারা জান্নাতকে ঘেরাও করা হলো। তিনি জিবরীল (আঃ)-কে পুনরায় বললেনঃ তুমি আবার জান্নাতে প্রবেশ কর এবং জান্নাতীদের জন্য আমার তৈরিকৃত সামগ্ৰী দেখে এসো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  তারপর তিনি সেখানে ফিরে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তা কষ্ট ও মুসীবাতের বস্তু দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তিনি আল্লাহ তা’আলার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! আমার ভয় হচ্ছে যে, এতে কোন ব্যক্তিই যেতে পারবে না। এবার আল্লাহ তা’আলা তাকে বললেনঃ আমি জাহান্নাম এবং জাহান্নামীদের জন্য যে আযাব তৈরী করে রেখেছি তুমি গিয়ে তা দেখে এসো। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, এর একাংশ অন্য অংশের উপর চড়াও হচ্ছে (একটি অন্যটিকে গ্রাস করছে)। তিনি তা দেখার পর আল্লাহ তা’আলার সামনে ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে ব্যক্তি এর বর্ণনা শুনবে সে এতে প্রবেশ করবে না। তারপর তার নির্দেশে জাহান্নামকে লোভ-লালসা দ্বারা ঘিরে ফেলা হলো। এবার জিবরীল (আঃ)-কে তিনি বললেনঃ তুমি আবার সেখানে যাও (এবং তা দেখে এসো)। তিনি সেখানে আবারো গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের কসম! আমার তো ধারণা হচ্ছে যে, কেউই এই থেকে মুক্তি পাবে না, সকলেই এতে প্রবেশ করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪৪

১৯. জান্নাতে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশী হবে

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেনঃ ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১, ৭৪৮, ১০৫২, ৩২০২, ৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪

উসামা ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতের গেটে দাড়ালাম, দেখলাম যারা তাতে প্রবেশ করেছে তারা অধিকাংশ ছিল দুনিয়াতে দরিদ্র অসহায়। আর ধনী ও প্রভাবশালীদের আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে যাদের জাহান্নামে যাওয়ার ফয়সালা হয়ে গেছে তাদের কথা আলাদা। আর আমি জাহান্নামের প্রবেশ পথে দাড়ালাম। দেখলাম, যারা প্রবেশ করছে তাদের অধিকাংশ নারী”। সহিহ বুখারী : ৫১৯৬।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে নারীগণ! তোমরা দান-সদকা করো। বেশি বেশি করে আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। কেননা আমি জাহান্নামে তোমাদের অধিকহারে দেখেছি। এ কথা শোনার পর উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে একজন (যার নাম ছিল জাযলা) প্রশ্ন করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কেন এ অবস্থা? কেন জাহান্নামে আমরা বেশি সংখ্যায় যাবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা স্বামীর প্রতি বেশি অকৃতজ্ঞ ও অভিশাপ দাও বেশি”। সহীহ মুসলিম : ৭৯।

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০ আহমাদ : ৫৪৪৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ তারাই, যারা বেপর্দা ও অহংকারী। আর এ ধরনের নারীরা কপট। তারা লাল ঠোঁট ও পা-বিশিষ্ট কাকের মতো (বিরল সংখ্যক) জান্নাতে যাবে। মুসনাদ আহমাদ : ২৬৮২

২০. মৃত শিশুদের জান্নাত-জাহান্নাম

কাফির ব্যক্তি তার কুফরীর কারণে জাহান্নামে যাবে এবং মুমিন ব্যক্তি তার ঈমানের কারণে জান্নাতে যাবে—এটি ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। কিন্তু মৃত শিশু ঈমান বা কুফরি কোন গ্রহন করা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই যেসব শিশু সাবালক হওয়ার আগেই মারা যায়, তাদের ওপর কোনো শরয়ী বিধান প্রযোজ্য হয় হবে না। এ সম্পর্কে কুরআনের একটি আয়াত লক্ষ করি। আল্লাহ তায়াল বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَاتَّبَعَتۡہُمۡ ذُرِّیَّتُہُمۡ بِاِیۡمَانٍ اَلۡحَقۡنَا بِہِمۡ ذُرِّیَّتَہُمۡ وَمَاۤ اَلَتۡنٰہُمۡ مِّنۡ عَمَلِہِمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ ؕ کُلُّ امۡرِیًٴۢ بِمَا کَسَبَ رَہِیۡنٌ

আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে। সুরা তুর : ২১

এ আয়াতে দ্বারা বুঝা যায়, মুমিনদের শিশুরা জান্নাতে তাদের পিতামাতার সাথে থাকবে। এটি মহান আল্লাহর এক বিশেষ দয়া। কাফিরদের শিশুদের ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও, বেশিরভাগ আলেমদের মত হলো তারাও জান্নাতে যাবে। কারণ, তারা কোনো পাপ করার আগেই মারা গেছে।

মৃত শিশুর শুধু জান্নাতে যাবে একটুকুই শেষ না, তারা তাদের ঈমানদার পিতামাতাকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাবে।

মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তানের মাতা তাতে সওয়াব আশা করলে ঐ সন্তান তার নাভিরজ্জু দ্বারা তাকে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ :  ১৬০৯, মিশকাত : ১৭৫৪, আহমাদ : ২১৫৮৫

আবু হাসসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বললাম, আমার দুটি সন্তান মারা গেছে। আপনি আমাদের এমন একটি হাদিস শোনান, যা দ্বারা আমাদের মন শান্ত হয়। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, “মুসলিমদের যে তিনটি শিশু মারা যায়, তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তাদের পিতামাতার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে। যখন তারা জান্নাতের দরজায় আসবে, তখন তাদের বলা হবে, ‘প্রবেশ কর।’ তারা বলবে, ‘আমাদের পিতামাতা প্রবেশ না করা পর্যন্ত আমরা প্রবেশ করব না।’ তখন বলা হবে, ‘তাদেরকেও প্রবেশ করাও।’ এরপর তারা তাদের পিতামাতার কাপড় ধরে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সহীহ মুসলিম : ৬৯৮৫

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নারীরা একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলল, পুরুষেরা আপনার নিকট আমাদের চেয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তাই আপনি নিজে আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দিন। তিনি তাদের বিশেষ একটি দিনের অঙ্গীকার করলেন; সে দিন তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের নাসীহাত করলেন ও নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদের যা যা বলেছিলেন, তার মধ্যে একথাও ছিল যে, তোমাদের মধ্যে যে স্ত্রীলোক তিনটি সন্তান পূর্বেই পাঠাবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। তখন জনৈক স্ত্রীলোক বলল, আর দু’টি পাঠালে? তিনি বললেনঃ দু’টি পাঠালেও। সহিহ মুসলিম : ১০১, ১২৪৯,৭৩১০, সহিহ মুসলিম : ২৬৩৩, আহমাদ : ১১২৯৬

নোট : পরকালে এমন কিছু শ্রেণির মানুষের অবস্থা কী হবে, যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, কিংবা যারা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত?

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, যেসব মানুষের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) দাওয়াত সঠিক পন্থায় পৌঁছায়নি, তাদের ব্যাপারে আলেমগণ বলেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের একটি বিশেষ পরীক্ষার মুখোমুখি করবেন। তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠানো হবে, যিনি তাদের পরীক্ষা নেবেন। যদি তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তবে তারা জান্নাতে যাবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে তাদের পরিণতি জাহান্নাম হবে। কারণ আল্লাহ তা’আলা তাঁর কোনো বান্দাকে দাওয়াত পৌঁছানো ছাড়া শাস্তি দেবেন না। এ বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ আয়াত হলো-

مَنِ اہۡتَدٰی فَاِنَّمَا یَہۡتَدِیۡ لِنَفۡسِہٖ ۚ وَمَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا یَضِلُّ عَلَیۡہَا ؕ وَلَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰی ؕ وَمَا کُنَّا مُعَذِّبِیۡنَ حَتّٰی نَبۡعَثَ رَسُوۡلًا

যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই। সূরা বনী ইসরাঈল : ১৫

২১. জান্নাত কোন আমলের মূল্য নয়

জান্নাত এক বিশাল ও অমূল্য নিয়ামত, যা কোনো আমলের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়। বরং আমল হলো জান্নাত লাভের মাধ্যম বা উসিলা মাত্র। জান্নাত হলো আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ, যা তিনি তাঁর অনুগত বান্দাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে পুরস্কার হিসেবে দান করবেন। মানুষের আমল যত ভালোই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত ও দয়া ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। সহিহ বুখারি : ৫৬৭৩, সহিহ মুসলিম : ৭০৬৮

২২. জান্নাতিগণ এক অপরের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ نَزَعْنَا مَا فِیْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ اِخْوَانًا عَلٰی  سُرُرٍ  مُّتَقٰبِلِیْنَ ﴿۴۷﴾

আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সুরা হিজর : ৪৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلٰی بَعْضٍ یَّتَسَآءَلُوْنَ ﴿۲۵﴾ قَالُوْۤا اِنَّا کُنَّا قَبْلُ فِیْۤ   اَهْلِنَا مُشْفِقِیْنَ ﴿۲۶﴾   فَمَنَّ اللّٰهُ عَلَیْنَا وَ  وَقٰىنَا عَذَابَ السَّمُوْمِ ﴿۲۷﴾  اِنَّا کُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوْهُ ؕ اِنَّہٗ  هُوَ الْبَرُّ   الرَّحِیْمُ ﴿۲۸﴾

তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করবে এবং বলবে, নিশ্চয় আমরা পূর্বে পরিবার-পরিজনের মধ্যে শংকিত অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে উত্তপ্ত ঝড়াে হাওয়ার শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। নিশ্চয় আমরা পূর্বেও আল্লাহকে আহবান করতাম। নিশ্চয় তিনি কৃপাময়, পরম দয়ালু।’ সুরা তুর : ২৫-২৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلٰی بَعْضٍ یَّتَسَآءَلُوْنَ ﴿۵۰﴾ قَالَ  قَآئِلٌ مِّنْهُمْ  اِنِّیْ كَانَ لِیْ قَرِیْنٌ ﴿ۙ۵۱﴾ یَّقُوْلُ  اَئِنَّكَ  لَمِنَ  الْمُصَدِّقِیْنَ ﴿۵۲﴾ ءَ اِذَا مِتْنَا وَ کُنَّا تُرَابًا وَّ  عِظَامًا  ءَ اِنَّا لَمَدِیْنُوْنَ ﴿۵۳﴾ قَالَ  هَلْ  اَنْتُمْ  مُّطَّلِعُوْنَ ﴿۵۴﴾ فَاطَّلَعَ  فَرَاٰهُ  فِیْ  سَوَآءِ  الْجَحِیْمِ ﴿۵۵﴾قَالَ تَاللّٰهِ   اِنْ  كِدْتَّ  لَتُرْدِیْنِ ﴿ۙ۵۶﴾ وَ لَوْ لَا نِعْمَۃُ رَبِّیْ  لَکُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِیْنَ ﴿۵۷﴾ اَفَمَا نَحْنُ بِمَیِّتِیْنَ ﴿ۙ۵۸﴾ اِلَّا مَوْتَتَنَا الْاُوْلٰی وَ مَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِیْنَ ﴿۵۹﴾ اِنَّ هٰذَا  لَهُوَ  الْفَوْزُ  الْعَظِیْمُ ﴿۶۰﴾ لِمِثْلِ هٰذَا فَلْیَعْمَلِ الْعٰمِلُوْنَ ﴿۶۱﴾

তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাদের কেউ বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিল; সে বলত, “তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হলেও আমাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে?’ (আল্লাহ) বলবেন, তোমরা কি তাকে উকি মেরে দেখতে চাও?’ অতঃপর সে উঁকি মেরে দেখবে এবং ওকে জাহান্নামের মধ্যস্থলে দেখতে পাবে; বলবে, আল্লাহর কসম! তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করেছিলে, আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ না থাকলে আমাকেও (তোমাদের মাঝে) উপস্থিত করা হত। (সত্যই) কি আমাদের আর মৃত্যু হবে না, প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেওয়া হবে না? নিশ্চয়ই এ মহাসাফল্য। এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত। সুরা সাফফাত : ৫০-৬১

এই আয়াতগুলোতে বর্ণিত হয়েছে যে, জান্নাতবাসিরা একে অপরের সাতে সাক্ষাত করে পারস্পরিক ভালোবাসা, অতীত জীবনের কষ্ট স্মরণ করবে।

২৩. জান্নাতের মধ্যে সে সব মানুষ নেতা হবেন

মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জান্নাতবাসিনী হবেন খাদীজা, ফাতেমা, মারয়াম ও আসিয়া

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে মারিয়াম বিনতু ‘ইমরান, খাদীজাহ্‌ বিনতু খুয়াইলিদ, ফাতিমাহ্‌ বিনতু মুহাম্মাদ এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়াহ্‌ তোমার জন্য যথেষ্ট। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৭৮, মিশকাত : ৬১৮১

মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ وَ طَهَرَكِ وَ اصْطَفٰكِ عَلٰی نِسَآءِ  الْعٰلَمِیْنَ ﴿۴۲﴾

যখন ফিরিশ্তাগণ বলেছিল, ‘হে মারয়াম! আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে নির্বাচিত করেছেন। সুরা আল ইমরান : ৪২

আবু বাকর (রা.) ও উমার(রা.) বয়স্কদের সর্দার হবে

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আবু বাকর ও উমার হলেন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল জান্নাতবাসীর মধ্যে বয়স্কদের সর্দার, শুধুমাত্র নবীগণ ছাড়া। সুনানে তিরমিযী : ৩৬৬৫

ফাতিমা (রাঃ) মু’মিন নারীদের সরদার হবে

 আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর চলার ভঙ্গিতে চলতে চলতে ফাতিমা (রাঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাঁকে দেখে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমার স্নেহের কন্যাকে মোবারাকবাদ। অতঃপর তাঁকে তার ডানপাশে বা বামপাশে বসালেন এবং তাঁর সঙ্গে চুপিচুপি কথা বললেন। তখন ফাতিমা (রাঃ) কেঁদে দিলেন। আমি কাঁদছেন কেন? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুনরায় চুপিচুপি তার সঙ্গে কথা বললেন। ফাতিমা (রাঃ) এবার হেসে উঠলেন। আমি বললাম, আজকের মত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ও খুশী আমি আর কখনো দেখিনি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী বলেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর গোপন কথাকে প্রকাশ করব না। শেষে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর ইন্তেকাল হয়ে যাবার পর আমি তাঁকে (আবার) জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কী বলেছিলেন?  তিনি বললেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম বার আমাকে বলেছিলেন, জিব্রাঈল (আঃ) প্রতি বছর একবার আমার সঙ্গে কুরআন পাঠ করতেন, এ বছর দু’বার পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায় বেলা উপস্থিত এবং অতঃপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। অতঃপর বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতবাসী নারীদের অথবা মু’মিন নারীদের তুমি সরদার হবে। এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। সহিহ বুখারি : ৩৬২৩-৩৬২৪, ৩৮৫৬, সহিহ মুসলিম : ২৪৫০

হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা

ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা এবং তাদের পিতা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে। সুনানে ইবন মাজাহ : ১১৮, সুনানে তিরমিজি : ৩৭৬৮, সহীহাহ : ৯৭৯।

২৪. জান্নাতের সূখ-শান্তি হবে স্থায়ী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اَؤُنَبِّئُکُمۡ بِخَیۡرٍ مِّنۡ ذٰلِکُمۡ ؕ  لِلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا عِنۡدَ رَبِّہِمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَاَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ وَّرِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ ؕ  وَاللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ۚ

তুমি বলঃ আমি কি তোমাদেরকে এটা অপেক্ষাও উত্তম বিষয়ের সংবাদ দিব? যারা ধর্মভীরু তাদের জন্য তাদের রবের নিকট জান্নাত রয়েছে যার তলদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে শুদ্ধা সহধর্মিনীগণ ও আল্লাহর প্রসন্নতা রয়েছে এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী। সুরা আল ইমরান : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ ابۡیَضَّتۡ وُجُوۡہُہُمۡ فَفِیۡ رَحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

আর যাদের চেহারা সাদা হবে, তারা তো আল্লাহর রহমতে থাকবে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা আল ইমরান : ১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ یُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

ল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা । সুরা নিসা : ১৩

আবু সায়ীদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা জান্নাতবাসীদের বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! তারা বলবে, উপস্থিত হে রব, সৌভাগ্য ও কল্যাণতো আপনারই হাতে। তারা বলবে, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছো? তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কেন সন্তুষ্ট হবো না? আপনি আমাদের এমন নেওয়ামত ও সূখ-শান্তি দিয়েছেন যা কখনো অন্য কাউকে দেননি। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি কি তোমাদের এরচেয়ে উত্তম কোনো কিছু দেব? তখন তারা বলবে, হে প্রতিপালক! যা দিয়েছেন তার চেয়ে আবার উত্তম কোনো জিনিস আছে কী? আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আজ থেকে আমার সন্তুষ্টি তোমাদের উপর স্থায়ী হয়ে গেল। আর কোনো দিন তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না”। সহীহ বুখারী : ৭৫১৮; সহীহ মুসলিম : ২৮২৯।

আবু সায়ীদ ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত. তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে: তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা চিরদিন জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু আসবে না। তোমরা চিরদিন যুব থাকবে। বার্ধক্যে তখনো তোমাদের স্পর্ষ করবে না। তোমরা সর্বদা পরিতৃপ্ত থাকবে। কখনো ক্ষুধার্ত হবে না। আর এটা আল্লাহ তায়ালার সেই কথার বাস্তবায়ন: তাদেরকে ডেকে বলা হবে, ঐ হলো জন্নাত। তোমরা যা কাজ করেছো, তার বিনিময়ে এর উত্তরাধিকারী করা হলো”। সহীহ মুসলিম : ২৮৩৭

আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

যে লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সেখানে সুখে-স্বচ্ছন্দে আয়েশের মধ্যে ডুবে থাকবে, কোন প্রকারের দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা তাকে পাবে না এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ ময়লা বা পুরাতন হবে না, আর তার যৌবনও নিঃশেষ হবে না। মিশকাত : ৫৬২১

জান্নাতের বিবরণ : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২৫. জান্নাতীদের আকৃতি-প্রকৃতি

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  الْاَبْرَارَ لَفِیْ نَعِیْمٍ ﴿ۙ۲۲﴾ عَلَی الْاَرَآئِكِ یَنْظُرُوْنَ ﴿ۙ۲۳﴾ تَعْرِفُ فِیْ  وُجُوْهِهِمْ نَضْرَۃَ  النَّعِیْمِ ﴿ۚ۲۴﴾

পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে। মুতাফফিফীন : ২২-২৪

ক. জান্নাতিদের দেহ ষাট হাত লম্বা হবে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-

আল্লাহ তা’আলা আদাম (আঃ) –কে তাঁর যথাযোগ্য গঠনে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে বললেনঃ তুমি যাও। উপবিষ্ট ফেরেশতাদের এই দলকে সালাম করো এবং তুমি মনোযোগ সহকারে শোনবে তারা তোমার সালামের কী জবাব দেয়? কারণ এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ। তাই তিনি গিয়ে বললেনঃ ‘আস্‌সালামু ‘আলাইকুম’। তাঁরা জবাবে বললেনঃ ‘আস্‌সালামু ‘আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ’। তাঁরা বাড়িয়ে বললেনঃ ‘ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বাক্যটি। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বললেনঃ যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা আদাম (আঃ) –এর আকৃতি বিশিষ্ট হবে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত মানুষের আকৃতি ক্রমে ক্রমে কমে আসছে। সহিহ বুখারি : ৬২২৭

খ. জান্নাতীরা সকলেই ৩৩ বছরের যুবক হবে

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের সময় তাদের শরীরে লোম থাকবে না, দাড়ি-গোঁফও থাকবে না এবং চোখে সুরমা লাগানো থাকবে। তারা হবে ত্রিশ অথবা তেত্রিশ বছরের যুবক। সুনানে তিরমিজি : ২৫৪৫

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক বৃদ্ধা মহিলাকে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, কি কারণে বৃদ্ধারা জান্নাতে যাবে না? অথচ এ বৃদ্ধা মহিলা কুরআন পাঠ করেছিল। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন-

তুমি কি কুরআনের এ আয়াত পাঠ করনি-

اِنَّاۤ اَنۡشَاۡنٰہُنَّ اِنۡشَآءً ۙ

নিশ্চয় আমি হূরদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব। সুরা ওয়াকিয়া : ৩৫। মিশকাত : ৪৮৮৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ২৯৮৭

গ. জান্নাতীরা অসীম রূপবান ও রূপবতী হবে

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ সেখানে আহার করবে, সেখানে পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না, মল-মূত্র ত্যাগ করবে না এবং তাদের নাক থেকে শ্লেষ্মা ঝরবে না। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এমতাবস্থায় তাদের খাদ্যের পরিণতি কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, ঢেকুর এবং মিশকের মতো সুগন্ধি ঘামের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাদের অন্তরে এমনভাবে ঢেলে দেয়া হবে যেমন শ্বাস-নিঃশ্বাস অনবরত চলছে। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৪১, মিশকাত : ৫৬২০, সহীহুল জামি : ২০২৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৫২০, মুসনাদে আহমাদ : ১৪৯৬৪, আবূ ইয়া’লা : ১৯০৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪২৪

ঘ. জান্নাতে কখনো অসুস্থ, বার্ধক্যে, হতাশ ও দুশ্চিন্তা আসবে না

আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশ করার পর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন, তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, আর কখনো রোগগ্রস্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে আর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, আর কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না এবং সর্বদা আরাম-আয়েশে থাকবে, আর কখনো হতাশ ও দুশ্চিন্তা তোমাদেরকে পাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৭, মিশকাত : ৫৬২২, সহীহুল জামি : ৮১৬৪, ত্ববারানী : ২১৩। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

ঙ. জান্নাতে প্রত্যেক লোককে একশত পুরুষের শক্তি দান করা হবে

আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতী মুমিনদেরকে এত এত সহবাসের শক্তি প্রদান করা হবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এক লোক এত শক্তি রাখবে কি? তিনি (সা.) বললেন, প্রত্যেক লোককে একশত পুরুষের শক্তি দান করা হবে। সুনানে তিরমিযী : ২৫৩৬, মিশকাত : ৫৬৩৬, সহীহুল জামি : ৮১০৬

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতীদের শরীরে কোন লোম থাকবে না, দাঁড়ি-গোফ থাকবে না এবং চোখে সুরমা লাগানো থাকবে। কখনো তাদের যৌবন শেষ হবে না, জামাও পুরাতন হবে না। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩৯, মিশকাত : ৫৬৩৮, ৫৬৩৯, সহীহুল জামি : ৮০৭২,  সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২৯৮৭

চ. জান্নাতে যৌবন কখনোও নিঃশেষ হবে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ۫ وَّنُدۡخِلُہُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়।   সুরা নিসা : ৫৭

২৬. জান্নাতি হুরদের অসাধারণ গুনাবলী

ক. হুরেরা হবে সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ حُوْرٌ عِیْنٌ ﴿ۙ۲۲﴾ كَاَمْثَالِ اللُّؤْلُؤَ  الْمَکْنُوْنِ ﴿ۚ۲۳﴾

আর (তাদের জন্য থাকবে) আয়তলোচনা হুর যেন সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। সুরা ওয়াকিয়া : ২২-২৩

খ. হুরদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করে নাই

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیْهِنَّ قٰصِرٰتُ الطَّرْفِ ۙ لَمْ  یَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ  وَ لَا  جَآنٌّ ﴿ۚ۵۶﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۵۷﴾ كَاَنَّهُنَّ الْیَاقُوْتُ  وَ الْمَرْجَانُ ﴿ۚ۵۸﴾

সে সবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তারা (সৌন্দর্যে) যেন হীরা ও প্রবাল। সুরা আর রাহমান : ৫৬-৫৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیْهِنَّ خَیْرٰتٌ حِسَانٌ ﴿ۚ۷۰﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۷۱﴾ حُوْرٌ  مَّقْصُوْرٰتٌ فِی  الْخِیَامِ ﴿ۚ۷۲﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۷۳﴾ لَمْ یَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَ لَا جَآنٌّ ﴿ۚ۷۴﴾

সে সকলের মাঝে রয়েছে উত্তম চরিত্রের সুন্দরীগণ। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তারা তাঁবুতে সুরক্ষিত হুর। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। সুরা আর রাহমান : ৭০-৭৪

গ. হুরগণ হবে কুমারী, প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ (27) فِي سِدْرٍ مَّخْضُودٍ (28) وَطَلْحٍ مَّنضُودٍ (29)

তাদেরকে (হুরীগণকে) আমি সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে। তাদেরকে করেছি কুমারী। প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা। ডান হাত-ওয়ালাদের জন্য। (যাদেরকে ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। সেখানে আছে কঁাটাহীন। কুলগাছ। কাঁদি ভরা কলাগাছ। সুরা ওয়াকিয়াহ : ২৭-২৯

ঘ. সমবয়স্কা নব্য-যৌবনা তরুণী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا (31) حَدَائِقَ وَأَعْنَابًا (32) وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا (33)

নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্যই রয়েছে সফলতা; উদ্যানসমূহ ও নানাবিধ আঙ্গুর এবং নব্য-যৌবনা সমবয়স্কা তরুণীগণ। সুরা নাবা : ৩১-৩৩

ঙ. হুর হবে আনতনয়না, ডাগরচোখা ও সমময়সী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعِنۡدَہُمۡ قٰصِرٰتُ الطَّرۡفِ عِیۡنٌ ۙ کَاَنَّہُنَّ بَیۡضٌ مَّکۡنُوۡنٌ

তাদের কাছে থাকবে আনতনয়না, ডাগরচোখা (হুর) যেন তারা সুরক্ষিত ডিম।”। সূরা সাফফাত : ৪৮-৪৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہٰذَا ذِکۡرٌ  وَإِنَّ لِلۡمُتَّقِينَ لَحُسۡنَ مَ‍َٔابٖ ٤٩ جَنَّٰتِ عَدۡنٖ مُّفَتَّحَةٗ لَّهُمُ ٱلۡأَبۡوَٰبُ ٥٠ مُتَّكِ‍ِٔينَ فِيهَا يَدۡعُونَ فِيهَا بِفَٰكِهَةٖ كَثِيرَةٖ وَشَرَابٖ ٥١ وَعِندَهُمۡ قَٰصِرَٰتُ ٱلطَّرۡفِ أَتۡرَابٌ ٥٢ هَٰذَا مَا تُوعَدُونَ لِيَوۡمِ ٱلۡحِسَابِ ٥٣ إِنَّ هَٰذَا لَرِزۡقُنَا مَا لَهُۥ مِن نَّفَادٍ

এটি এক স্মরণ, আর মুত্তাকীদের জন্য অবশ্যই রয়েছে উত্তম নিবাস- চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দরজাসমূহ থাকবে তাদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে তারা হেলান দিয়ে আসীন থাকবে, সেখানে তারা বহু ফলমূল ও পানীয় চাইবে। আর তাদের নিকটে থাকবে আনতনয়না সমবয়সীরা। হিসাব দিবস সম্পর্কে তোমাদেরকে এ ওয়াদাই দেওয়া হয়েছিল। নিশ্চয় এটি আমার দেওয়া রিযিক, যা নিঃশেষ হবার নয়”। সূরা সাদ : ৪৯-৫৪

চ. জান্নতে হুরগণ হবে পবিত্র

জান্নাতীদের জন্য জান্নাতে পবিত্র সঙ্গিনী থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ۫ وَّنُدۡخِلُہُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়। সরা নিসা : ৫৭

ছ. হুরদের অন্তর ঈর্শাহীন ও বিদ্বেষহীন হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ مِّنۡ غِلٍّ

আর তাদের অন্তরে যা কিছু ঈর্ষা ও বিদ্বেষ রয়েছে তা আমি দূর করে দিব।

জ. হুর হবে মানবীয় সমস্যা মুক্ত ও সুগন্ধি যুক্ত

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ সেখানে আহার করবে, সেখানে পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না, মল-মূত্র ত্যাগ করবে না এবং তাদের নাক থেকে শ্লেষ্মা ঝরবে না। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এমতাবস্থায় তাদের খাদ্যের পরিণতি কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, ঢেকুর এবং মিশকের মতো সুগন্ধি ঘামের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাদের অন্তরে এমনভাবে ঢেলে দেয়া হবে যেমন শ্বাস-নিঃশ্বাস অনবরত চলছে। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৪১, মিশকাত : ৫৬২০, সহীহুল জামি : ২০২৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৫২০, মুসনাদে আহমাদ : ১৪৯৬৪, আবূ ইয়া’লা : ১৯০৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪২৪

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে, পূর্ণিমা রজনির চাঁদের মতো রূপ ধারণ করেই তারা প্রবেশ করবে। আর পরবর্তী  তাদের যে দল যাবে, তারা হবে আকাশের সমুজ্বল তারকার মতো উদ্দীপ্ত, জান্নাতবাসী সকলের অন্তর এক লোকের অন্তরের মতো হবে। তাদের মধ্যে কোন ঝগড়া থাকবে না এবং কোন হিংসা-বিদ্বেষও থাকবে না। তাদের প্রত্যেকের জন্য হুরিদের থেকে দুই দুইজন স্ত্রী থাকবে। সৌন্দর্যের কারণে তাদের হাড় ও মাংসের উপর থেকে নলার ভিতরের মজ্জা দেখা যাবে। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনায় ব্যস্ত থাকবে। তারা কখনো রোগাগ্রস্ত হবে না। তাদের পেশাব হবে না, পায়খানাও করবে না,থুথু ফেলবে না, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরবে না। তাদের পাত্রসমূহ হবে সোনা-রূপার। আর তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের এবং তাদের ধুনীর জ্বালানি হবে আগরের, তাদের গায়ের ঘর্ম হবে কস্তুরীর মতো (সুগন্ধি)। তাদের স্বভাব হবে এক লোকের মতো, শারীরিক গঠন অবয়বে হবে তাদের পিতা আদাম আলায়হিস সালাম এর ন্যায়, উচ্চতায় ষাট গজ লম্বা। সহিহ বুখারী : ৩৩২৭, সহিহ মুসলিম : ২৮৩৪, সুনানে তিরমিযী : ২৫৩৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ১৭৩৬, সহীহুল জামি : ২০১৫, দারিমী : ২৮২৩

সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যদি জান্নাতের কোন জিনিসের এক চিমটি পরিমাণও (পৃথিবীতে) আসতে পারতো তাহলে আসমান-যমীন সকল স্থান আলোকিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে যেতো। কোন জান্নাতী যদি দুনিয়াতে উকি দিত এবং তার হস্তালংকার প্রকাশিত হয়ে পড়তো তাহলে তা সূর্যের আলোকে নিস্তেজ করে দিত যেভাবে সূর্যের আলো নক্ষত্রসমূহের আলোকে নিস্তেজ করে দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৫৩৮, মিশকাত : ৫৬৩৭, আহমাদ : ১৪৪৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৩৯৬, সহীহুল জামি : ৫২৫১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, বদরের যুদ্ধে হারিসা (রাঃ) অজ্ঞাত তীরের আঘাতে শাহাদাত লাভ করলে তাঁর মা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অন্তরে হারিসার মায়া-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাতে থাকে তবে আমি তার জন্য রোনাজারি করব না। আর যদি তা না হয় তবে আপনি শীঘ্রই দেখবেন আমি কী করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি কি জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছ। জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নত মর্যাদার জান্নাত ফিরদাউসে আছে।

তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর পথে চলা দুনিয়া ও তার মাঝের সবকিছুর চেয়ে উত্তম। তোমাদের কারো ধনুক পরিমাণ বা পা রাখার জায়গা পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তার মাঝের সবকিছুর চেয়ে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি উঁকি মারে তবে তামাম দুনিয়া আলোকিত ও সুঘ্রাণে পূর্ণ হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর ওড়না দুনিয়া ও তার ভিতরের সব কিছুর চেয়ে উত্তম। সহহি বুখারি : ৬৫৬৭ ও ৬৫৬৮ দুটি হাদিস একত্রে

ঝ. হুরগণ জান্নাতে সুরেলা আওয়াযে গান গাইবে

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে আয়াতলোচনা হুরদের সমবেত হওয়ার একটি জায়গা রয়েছে। তারা সেখানে এমন সুরেলা আওয়াযে গান গাইবে, যেমন আওয়ায কোন মাখলুক ইতিপূর্বে কখনো শুনেনি। তারা এই বলে গান গাইবেঃ আমরা তো চিরঙ্গিনী, আমাদের ধ্বংস নেই। আমরা তো আনন্দ-উল্লাসের জন্যই, দুঃখ-কষ্ট নেই আমাদের। আমরা চির সন্তুষ্ট, আমরা কখনো অসন্তুষ্ট হব না। তাদের কতই না সৌভাগ্য যাদের জন্য আমরা এবং আমাদের জন্য যারা। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬৪, হাদিসের নাম জঈফ

ঞ. জান্নাতে হুরদের স্ত্রীর মর্জাদা প্রদান হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَذَٰلِكَ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

 এরূপই ঘটবে ওদের; আর আয়তলোচনা হুরদের সাথে তাদের বিবাহ দেব। সুরা দুখান  : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ۖ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

অর্থাৎ, তারা বসবে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে; আমি তাদের বিবাহ দেব আয়তলোচনা হুরদের সঙ্গে। সুরা তুর : ২০

ট. একজন শহীদের সাথে বাহাত্তরটি হুরের সাথে বিবাহ দেওয়া হবে

মিকদাম ইবনু মা’দীকারির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কাছে শহীদদের জন্য রয়েছে ছয়টি বৈশিষ্টঃ রক্ত ক্ষরণের প্রথম মূহূর্তেই তাকে মাফ করা হবে। জান্নাতে তার নির্ধারিত স্থান প্রদর্শন করা হবে। কবর আযাব থেকে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সবচেয়ে মহাভীতির দিনে তাকে নিরাপদে রাখা হবে, তাঁর মাথায় সম্মানের তাজ পরানে হবে, এর একটি ইয়াকুত পাথর দুনিয়া ও এর সব কিছু থেকে উত্তম হবে; বাহাত্তর জন আয়াত লোচন হুরের সঙ্গে তার বিবাহ হবে, তার সত্তর জন নিকট আত্মীয় সম্পর্কে তার সুপারিশ কবুল করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৬৬৩, সহীহাহ : ৩২১৩

মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ শহীদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।(১) তার দেহের রক্তের প্রথম ফোঁটাটি বের হতেই তিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং জান্নাতে তার ঠিকানা তাকে দেখানো হয়, (২) কবরের আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হয়, (৩) (কিয়ামতের) ভয়ংকর ত্রাস থেকে সে নিরাপদ থাকবে, (৪) তাকে ঈমানের চাদর পরানো হবে, (৫) আয়তলোচনা হুরের সাথে তার বিবাহ দেয়া হবে এবং (৬) তার নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তরজনের পক্ষে তাকে শাফা’আত করার অনুমতি দেয়া হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১৬৬৩, আহমাদ : ১৬৭৩০, মিশকাত : ৩৮৩৪

২৭. জান্নাতে নিজের পরিবার পরিজনদের সাথে একত্র প্রবেশ করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِم مِّن كُلِّ بَابٍ

স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যাতে তারা এবং তাদের পিতৃপুরুষগণ, তাদের স্ত্রীগণ ও তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা সৎ ছিল তারা প্রবেশ করবে। আর ফেরেশতারা প্রতিটি দরজা দিয়ে তাদের নিকট প্রবেশ করবে। সুরা রাদ : ২৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اُدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ اَنۡتُمۡ وَاَزۡوَاجُکُمۡ تُحۡبَرُوۡنَ

তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিনীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। সুরা যুখরুফ : ৭০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ

তারা এবং তাদের স্ত্রীগণ সুশীতল ছায়ায় থাকবে এবং হেলান দিয়ে বসবে সুসজ্জিত আসনে। সুরা ইয়াসীন : ৫৬

পার্থিব স্ত্রীর রূপ-গুণ বেহেশ্তী স্ত্রীদের তুলনায় অধিক হবে। বেহেশতী হুরগণ তাদের পার্থিব সপত্নীর খিদমত করবে।

২৮. জান্নাতে গর্ভবতী হবে না তবে ইচ্ছা করলে সন্তান ধারন করতে পারবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মু’মিন লোক যদি জান্নাতে সন্তানের আকাঙ্খা করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রী গর্ভধারণ করবে ও সন্তান প্রসব করবে এবং সন্তানটি হবে বয়সে যুবক। তার ইচ্ছা অনুযায়ী মুহুর্তের মধ্যেই এসব হয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬৩

২৯. জান্নাতীদের সেবক গিলমান

জান্নাতবাসীদের অতিরিক্ত আরাম ও সেবার জন্য মহান আল্লাহ চিরকিশোর ‘গিলমান’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। এই গিলমানরা জান্নাতে ঘুরে-ফিরে তাদের খিদমত করবে। তবে, তাদের পরিচয় নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, তারা হলো মুসলিমদের সেইসব শিশু, যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মারা গেছে। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, তারা হবে কাফেরদের সেইসব শিশু, যারা দুনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত হলো, তারা জান্নাতের একটি আলাদা সৃষ্টি।

ক. গিলমান হবে চির কিশোর

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُورًا

চির কিশোরগণ (গেলমান) তাদের কাছে (সেবার জন্য) ঘুরাঘুরি করবে, তুমি তাদেরকে দেখলে তোমার মনে হবে, তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। সুরা দাহর : ১৯

খ. তাদের মনে হবে সুরক্ষিত মুক্তা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَّكْنُونٌ

তাদের (সেবায়) তাদের কিশোরেরা তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করবে; যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। সুরা তুর : ২৪

গ. গিলমানেরা প্রস্রবণ নি:সৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা পরিবেশন করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُونَ (17) بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيقَ وَكَأْسٍ مِّن مَّعِينٍ (18)

তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে। সুরা ওয়াকিয়া : ১৭-১৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ ۖ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

স্বর্ণের থালা ও পান পাত্র নিয়ে ওদের মাঝে ফিরানো হবে, সেখানে রয়েছে এমন সমস্ত কিছু, যা মন চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়। সেখানে। তোমরা চিরকাল থাকবে। সুরা যুখরুফ : ৭১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرَا

তাদের উপর ঘুরানো করা হবে রৌপ্যপাত্র এবং স্ফটিকের মত স্বচ্ছ পান-পাত্র। সুরা দাহর : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُطَافُ عَلَیۡہِمۡ بِصِحَافٍ مِّنۡ ذَہَبٍ وَّاَکۡوَابٍ ۚ  وَفِیۡہَا مَا تَشۡتَہِیۡہِ الۡاَنۡفُسُ وَتَلَذُّ الۡاَعۡیُنُ ۚ  وَاَنۡتُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ۚ

স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। সুরা যুখরুফ : ৭১

৩০ জান্নাতীদের সাজ-সজ্জা

জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য মহান আল্লাহ অসাধারণ সাজ-সজ্জার ব্যবস্থা রেখেছেন। জান্নাতে তাদের হাতে পরানো হবে স্বর্ণ ও মুক্তার ঝলমলে কঙ্কন, যা তাদের মর্যাদা ও সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তাদের পরনে থাকবে সূক্ষ্ম ও নরম রেশমের পোশাক, যা দুনিয়ার কোনো বস্ত্রের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এসব অলংকার ও পোশাক তাদের সৎকর্মের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ।

ক. হুরেরা স্বর্ণ ও মুক্তার কঙ্কণ পরিধান করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كُلَّمَا أَرَادُوا أَن يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ أُعِيدُوا فِيهَا وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ

যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেথায়। তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা এবং সেথায় তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। সুরা হজ : ২৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أُولَٰئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِّن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ

তাদেরই জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেথায় তাদেরকে স্বর্ণ-কঙ্কণে অলঙ্কৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও স্থূল রেশমের সবুজ বস্ত্র। সুরা কাহফ : ৩১

খ. জান্নাতিদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ

অর্থাৎ, তারা প্রবেশ করবে স্থায়ী জান্নাতে, যেখানে তাদের স্বর্ণ-নির্মিত কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং যেখানে তাদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের। সুরা ফাতির : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقٌ ۖ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ

তাদের দেহে হবে মিহি সবুজ এবং মোটা রেশমী কাপড়, তারা অলক্ত হবে রৌপ্য-নির্মিত কনে। সুরা দাহর : ২১

গ. জান্নাতে রেশমের তৈরি পুরু ফরাশ ও স্বর্ণখচিত সারি সারি আসন থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ ۚ وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ

সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায়। সুরা আর রহমান : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ

তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ বালিশে ও সুন্দর গালিচার উপরে। সুরা আর রহমান : ৭৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ۖ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

তারা বসবে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে। সুরা তুর : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

عَلَىٰ سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ (15) مُّتَّكِئِينَ عَلَيْهَا مُتَقَابِلِينَ (16)

স্বর্ণখচিত আসনে। তারা আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে। সুরা ওয়াকিয়া : ১৫-১৬

ঘ. আভিজাত্য সম্পন্ন উন্নত খাট, পালঙ্ক, শয্যা ও পানপাত্র থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِيهَا سُرُرٌ مَّرْفُوعَةٌ (13) وَأَكْوَابٌ مَّوْضُوعَةٌ (14) وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ (15) وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَةٌ (16)

সেখানে রয়েছে সমুচ্চ বহু খাট-পালঙ্ক এবং সদা প্রস্তুত পান পাত্রসমূহ ও সারি সারি বালিশসমূহ এবং বিছানো গালিচাসমূহ। সুরা গাশিয়াহ :  ১৩-১৬

৩১.  জান্নাত ও তার নির্মান উপকরণা

ক. কস্তুরী ও জাফরানের মতো সুগন্ধময় মাটি

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল আমাদের কি হলো যে, আমরা দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হয়ে যাই এবং আমাদেরকে পরকালবাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করতে থাকি। তারপর আপনার কাছ থেকে সরে গিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়ে দুনিয়াবী কাজে জড়িয়ে পড়ি এবং সন্তানাদির সুগন্ধ পেতে থাকি, তখন আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা যে অবস্থায় আমার নিকট হতে বেরিয়ে যাও, সবসময় যদি সেই অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বাড়ীতে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতো। আর তোমরা অপরাধ না করলে আল্লাহ তা’আলা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করতেন। যাতে তারা অপরাধ করে আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেন।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কি দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ পানি দিয়ে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কি দিয়ে জান্নাত তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ সোনা-রুপার ইট দিয়ে। একটি রূপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট, এভাবে গাথা হয়েছে। এর গাথুনির উপকরণ (চুন-সুরকি-সিমেন্ট) সুগন্ধি মৃগনাভি এবং কংকরসমূহ মণি-মুক্তার ও মাটি হলো জাফরান। জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দে থাকবে, কোন দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল এতে অবস্থান করবে আর মৃত্যুবরণ করবে না। না তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে আর না তার যৌবনকাল শেষ হবে।

তিনি পুনরায় বললেন, তিনজনের দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয়নাঃ ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ, রোযাদারের ইফতারের সময়কালীন দু’আ এবং মাযলুমের দু’আ আল্লাহ তা’আলা একে (মায়ালুমের দু’আ) মেঘমালার উপর তুলে নেন, তার জন্য আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ আমার ইজ্জাত ও সম্মানের শপথ! কিছু দেরিতে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করবো। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৬

খ. সাদা ধবধবে মিহি আটার মতো মাটি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “জান্নাতের মাটি হবে সাদা মিহি আটার মতো, তার কঙ্কর হলো মুক্তা ও ইয়াকুত এবং তার ইট হলো সোনা ও রুপার।” মুসনাদ আহমাদ : ১৪৪৫৭

গ. মিশকের ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত

আবূ সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইবনু সায়্যাদ জান্নাতের মাটি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ জান্নাতের মাটি ময়দার মত সাদা এবং খাঁটি মিশকের ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত হবে। সহিহ মুসলিম : ৭০৮৮

৩২. জান্নাতে মধু, দুধ ও মদের নদি থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَثَلُ الۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ فِیۡہَاۤ اَنۡہٰرٌ مِّنۡ مَّآءٍ غَیۡرِ اٰسِنٍ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ لَّبَنٍ لَّمۡ یَتَغَیَّرۡ طَعۡمُہٗ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ خَمۡرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیۡنَ ۬ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ وَمَغۡفِرَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ؕ کَمَنۡ ہُوَ خَالِدٌ فِی النَّارِ وَسُقُوۡا مَآءً حَمِیۡمًا فَقَطَّعَ اَمۡعَآءَہُمۡ

মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে? সুরা মুহাম্মদ : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجۡرَ مَنۡ أَحۡسَنَ عَمَلًا ٣٠ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ جَنَّٰتُ عَدۡنٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهِمُ ٱلۡأَنۡهَٰرُ يُحَلَّوۡنَ فِيهَا مِنۡ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٖ وَيَلۡبَسُونَ ثِيَابًا خُضۡرٗا مِّن سُندُسٖ وَإِسۡتَبۡرَقٖ مُّتَّكِ‍ِٔينَ فِيهَا عَلَى ٱلۡأَرَآئِكِۚ نِعۡمَ ٱلثَّوَابُ وَحَسُنَتۡ مُرۡتَفَقٗا

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, নিশ্চয় আমরা এমন কারো প্রতিদান নষ্ট করব না, যে সু-কর্ম করেছে। এরাই তারা, যাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ। সেখানে তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণের চুড়ি দিয়ে এবং তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু সিল্কের সবুজ পোশাক। তারা সেখানে (থাকবে) আসনে হেলান দিয়ে। কী উত্তম প্রতিদান এবং কী সুন্দর বিশ্রামস্থল”! সূরা কাহফ : ৩০-৩১

হাকীম ইবনু মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে রয়েছে পানির সমুদ্র, মধুর দরিয়া, দুধের সমুদ্র এবং শরাবের দরিয়া। অতঃপর তা থেকে আরো বহু নদী প্রবাহিত হবে।  সুআনে তিরমিযী : ২৫৭১, মিশকাত : ৫৬৫০, সহীহুল জামি : ৩৮৮৫

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহরগুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফুরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে। এরপর আমাকে বাইতুল মা’মুর-এ উঠানো হল। বললাম, হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে বাইতুল মামুর। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনো আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। সহিহ মুসলিম : ১৬৪ আংশিক

জান্নাতের বিবরণ : পঞ্চম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৩৩. জান্নাতের ঝর্ণামূহ

জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসে বেশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা এসেছে। এগুলো শুধু পানি নয়, বিভিন্ন প্রকারের পানীয়, সৌন্দর্য ও স্বাদে অনন্য, এবং জান্নাতবাসীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত। কুরআনে সরাসরি কয়েকটি ঝর্ণার নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন-

ক. সালসাবিল

সালসাবিল জান্নাতের একটি ঝর্ণা যার পানি কপূর-মিশ্রিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  الْاَبْرَارَ  یَشْرَبُوْنَ مِنْ كَاْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا  كَافُوْرًا ۚ﴿۵﴾ عَیْنًا یَّشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللّٰهِ یُفَجِّرُوْنَهَا تَفْجِیْرًا ﴿۶﴾

নিশ্চয় সৎকর্মশীলরা পান করবে এমন পানপাত্র থেকে যার মিশ্রণ হবে কাফূর। এমন এক ঝর্ণা যা থেকে আল্লাহর বান্দাগণ পান করবে, তারা এটিকে যথা ইচ্ছা প্রবাহিত করবে। সুরা দাহর : ৫-৬

এটি হবে জান্নাতবাসীদের জন্য ঠাণ্ডা ও স্বাদে অপূর্ব পানি।

খ. রাহীকুল মাখতূম

তাসনিম নামে জান্নাতে একটি ঝর্ণা আছে যার পানি কস্তুরী-মিশ্রিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُسْقَوْنَ مِنْ  رَّحِیْقٍ مَّخْتُوْمٍ ﴿ۙ۲۵﴾ خِتٰمُہٗ  مِسْکٌ ؕ وَ فِیْ ذٰلِكَ فَلْیَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ ﴿ؕ۲۶﴾

অর্থ : তাদের পান করানো হবে সিলমোহরকৃত খাঁটি (রাহীকুল মাখতূম) পানীয়। যার শেষাংশ হবে কস্তুরীর সুগন্ধে। এ জন্য প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। সূরা মুতাফফিফীন : ২৫-২৬

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ঈমানদার ব্যক্তি কোন ক্ষুধার্ত ঈমানদার ব্যক্তিকে খাদ্য দান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। যে মু’মিন ব্যক্তি কোন তৃষ্ণাৰ্ত মু’মিন ব্যক্তিকে পানি পান করাবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সীলমোহর করা খাটি “রাহীক মাখতুম” পান করবেন। যে মু’মিন ব্যক্তি কোন বস্ত্রহীন মু’মিন ব্যক্তিকে পোশাক দান করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরাবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৪৪৯, সুনানে আবু দাউদ : ৩০০, মিশকাত : ১৯১৩। হাদিসের মান জঈফ

 গ. তাসনিম

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ مِزَاجُہٗ  مِنْ تَسْنِیْمٍ ﴿ۙ۲۷﴾ عَیْنًا یَّشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُوْنَ ﴿ؕ۲۸﴾

এর মিশ্রণ হবে তাসনীম ঝরনা থেকে, যা নিকটবর্তী বান্দারা পান করবে। সূরা মুতাফফিফীন : ২৫-২৮

ঘ. আল কাউসার ঝর্ণ

হাউজে কাউসার কে সহিহ হাদিসে কাউসার ঝর্ণ নামে অধিহিত করা হয়েছে।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল-কাউসার হচ্ছে অধিক বা অধিক কল্যাণ, যা আল্লাহ্ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দান করেছেন। রাবী আবূ বিশর বলেন, আমি সা’ঈদকে বললাম যে, লোকেরা তো ধারণা করে সেটি জান্নাতের একটা ঝর্ণা। তখন সা’ঈদ বললেন, ওটা সেই ঝর্ণা যা জান্নাতের মাঝে রয়েছে। তার ভিতর আছে এমন কল্যাণ যা আল্লাহ্ তাঁকে প্রদান করেছেন। সহিহ বুখারি : ৬৫৭৮

ঙ. মুত্তাকিরা থাকবে বিভিন্ন সাধের ঝর্নাযুক্ত জান্নাতে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الۡمُتَّقِیۡنَ فِیۡ ظِلٰلٍ وَّعُیُوۡنٍ ۙ

মুত্তাকীরা থাকবে ছায়ায় ও প্রস্রবণ বহুল স্থানে। সুরা মুরসালাত : ৪১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الۡمُتَّقِیۡنَ فِیۡ جَنّٰتٍ وَّعُیُوۡنٍ ؕ

নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা থাকবে প্রস্রবন বহুল জান্নাতে। সুরা হিজর : ৪৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیۡہِمَا عَیۡنٰنِ تَجۡرِیٰنِ ۚ

উভয়ের মধ্যে থাকবে দু’টি ঝর্ণাধারা যা প্রবাহিত হবে। সুরা আর রহমান : ৫০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیۡہِمَا عَیۡنٰنِ نَضَّاخَتٰنِ ۚ

এ দু’টিতে থাকবে অবিরাম ধারায় উচ্ছলমান দু’টি ঝর্ণাধারা। সুরা আর রহমান : ৬৬

৩৪. জান্নাতের বৃক্ষরাজি

জান্নাতের বৃক্ষরাজি ও ফলমূল দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উন্নত। কুরআন ও হাদিসে এগুলোর বর্ণনা এসেছে, যা মুমিনদের জন্য অনুপ্রেরণা ও আকাঙ্ক্ষার উৎস।

জান্নাতের গাছপালা অপরূপ সুন্দর ও সুশোভিত। এগুলো কাঁটাবিহীন, সুশোভিত এবং অসংখ্য ফলের ভারে নুয়ে থাকে।

ক. জান্নাতে সিডর গাছ বা কুল গাছ থাকবে

জান্নাতে অসংখ্য সিডর বা কুল গাছ থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیۡ سِدۡرٍ مَّخۡضُوۡدٍ ۙ

তারা থাকবে এক উদ্যানে, সেখানে আছে কন্টকহীন কুল বৃক্ষ। সুরা ওয়াকিয়া : ২৮

খ. জান্নাতে তুম্বা গাছ থাকবে : জান্নাতের একটি গাছের নাম হলো তুম্বা।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে এমন একটি বিশাল গাছ আছে (তূবা’ নামক) যদি কোন বাহন তার ছায়ায় একশত বছরও পরিভ্রমণ করে, তবুও তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌছতে পারবে না। জান্নাতে তোমাদের কারো একটি ধনুকের সমান স্থানও এর চেয়ে উত্তম, যার উপর সূর্য উদিত হয় এবং অস্ত যায়।

সহিহ বুখারী : ৪৮৮১, সহিহ মুসলিম : ২৮২৮, সুনানে তিরমিযী : ২৫২৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩৩৫, মিশকাত : ৫৬১৫, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯৮৫, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ২০৮৭৭, আহমাদ : ৭৪৮৯, আবূ ইয়া’লা : ৫৮৫৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪১২, তবারানী : ৫৮০৬

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের প্রতিটি গাছের কাণ্ডই স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৫, মিশকাত : ৫৬৩১, সহীহুল জামি’ ৫৬৪৭, আবূ ইয়া’লা ৬১৯৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৭৩৮৭৪, শু’আবূল ঈমান ৭১০১

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে যার ছায়ায় কোন আরোহী শত বছর পর্যন্ত চলতে পারবে। আর তোমরা ইচ্ছা করলে তিলাওয়াত করতে পার وَظِلٍّ مَمْدُوْدٍ এবং দীর্ঘ ছায়া। সহিহ বুখারি : ৩২৫২,সহিহ মুসলিম : ২৮২৬, আহমাদ ৯৪১৭

গ. জান্নাতে সীমান্ত বৃক্ষ বা সিদরাতুল মুনতাহা :

সিদরাতুল মুনতাহা হলো এক বিশেষ বৃক্ষ, যা সপ্তম আসমানের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে দুনিয়া ও আখিরাতের জগতের মধ্যে একটি সীমা রয়েছে। এর উপরে কোনো সৃষ্টি প্রবেশ করতে পারে না। এটি এতটাই বিশাল যে তার সৌন্দর্য বর্ণনা করা অসম্ভব। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে-

وَ لَقَدْ رَاٰهُ  نَزْلَۃً   اُخْرٰی  ﴿ۙ۱۳﴾عِنْدَ سِدْرَۃِ  الْمُنْتَهٰی ﴿۱۴﴾عِنْدَهَا جَنَّۃُ  الْمَاْوٰی  ﴿ؕ۱۵﴾اِذْ  یَغْشَی السِّدْرَۃَ  مَا یَغْشٰی  ﴿ۙ۱۶﴾مَا زَاغَ الْبَصَرُ  وَ مَا طَغٰی ﴿۱۷﴾لَقَدْ رَاٰی مِنْ اٰیٰتِ رَبِّهِ  الْکُبْرٰی ﴿۱۸﴾

নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট, যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া* অবস্থিত। খন কুল গাছটিকে যা আচ্ছাদিত করার তা আচ্ছাদিত করেছিল। তার দৃষ্টি এদিক-সেদিক যায়নি এবং সীমাও অতিক্রম করেনি। নিশ্চয় সে তার রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ থেকে দেখেছে। সুরা নাজম : ১৩-১৮

৩৫. জান্নাতের ফলমূল

জান্নাতের ফলমূলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো দুনিয়ার ফলের মতো হলেও স্বাদে ও রূপে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক গুণ উন্নত।

ক. জান্নাতে ফলমূল হবে সহজলভ্য:

জান্নাতের ফল পেতে কোনো কষ্ট করতে হবে না। জান্নাতিরা বিছানায় শুয়ে থেকেই সহজেই হাতের কাছে ফল পেড়ে নিতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّکِـِٕیۡنَ عَلٰی فُرُشٍۭ بَطَآئِنُہَا مِنۡ اِسۡتَبۡرَقٍ ؕ  وَجَنَا الۡجَنَّتَیۡنِ دَانٍ ۚ

সেখানে পুরু রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায় তারা হেলান দেয়া অবস্থায় থাকবে এবং দুই জান্নাতের ফল-ফলাদি থাকবে নিকটবর্তী। সুরা আর রহমান : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

مُتَّکِـِٕیۡنَ فِیۡہَا یَدۡعُوۡنَ فِیۡہَا بِفَاکِہَۃٍ کَثِیۡرَۃٍ وَّشَرَابٍ

সেখানে তারা হেলান দিয়ে আসীন থাকবে, সেখানে তারা বহু ফলমূল ও পানীয় চাইবে। সুরা সাদ : ৫১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  الْمُتَّقِیْنَ فِیْ ظِلٰلٍ وَّ  عُیُوْنٍ ﴿ۙ۴۱﴾ وَّ  فَوَاكِهَ  مِمَّا یَشْتَهُوْنَ ﴿ؕ۴۲﴾ کُلُوْا  وَ اشْرَبُوْا هَنِیْٓــًٔۢا بِمَا کُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ ﴿۴۳﴾

আল্লাহ-ভীরুরা থাকবে ছায়া ও ঝরনাসমূহে। আর নিজদের বাসনানুযায়ী ফলমূল-এর মধ্যে। তোমরা তোমাদের কর্মের পুরস্কার স্বরূপ তৃপ্তির সাথে পানাহার কর। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। সুরা মুরসালাত ৪১-৪৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُطُوۡفُہَا دَانِیَۃٌ

তার ফলসমূহ নিকটবর্তী থাকবে। সুরা হাক্বাহ : ২৩

খ. জান্নাতে ফলমূল সর্বদা বিদ্যমান:

জান্নাতের ফলমূলের কোনো মৌসুম নেই। সব ধরনের ফল সর্বদা পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لَہُمۡ فِیۡہَا فَاکِہَۃٌ وَّلَہُمۡ مَّا یَدَّعُوۡنَ ۚۖ

তাদের জন্য আছে সেখানে ফলমূল এবং যা তারা চাইবে।” সূরা ইয়াসিন :  ৫৭

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-

وَّ  فَاكِهَۃٍ   كَثِیْرَۃٍ ﴿ۙ۳۲﴾ لَّا مَقْطُوْعَۃٍ  وَّ لَا  مَمْنُوْعَۃٍ ﴿ۙ۳۳﴾

ফলমূল অসংখ্য, যা শেষ হবে না এবং যা নিষিদ্ধও হবে না। সূরা ওয়াকিয়াহ : ৩২-৩৩

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-

مَثَلُ الْجَنَّۃِ الَّتِیْ وُعِدَ الْمُتَّقُوْنَ ؕ تَجْرِیْ مِنْ  تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ ؕ اُکُلُهَا دَآئِمٌ وَّ ظِلُّهَا ؕ تِلْكَ عُقْبَی الَّذِیْنَ اتَّقَوْا ٭ۖ وَّ عُقْبَی الْکٰفِرِیْنَ النَّارُ ﴿۳۵﴾

মুত্তাকীদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, সেটির দৃষ্টান্ত এরূপ, তার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। তার খাদ্যসামগ্রী ও তার ছায়া সার্বক্ষণিক। যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, এটি তাদের শুভ পরিণাম আর কাফিরদের পরিণাম আগুন। সুরা রাদ : ৩৫

গ. জান্নাতে আঙুর ও ডালিম ফল থাকবে

জান্নাতের ফলের মধ্যে আঙুর ও ডালিমের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

فِیۡہِمَا فَاکِہَۃٌ وَّنَخۡلٌ وَّرُمَّانٌ ۚ

তাদের উভয়ের মধ্যে আছে ফল, খেজুর এবং ডালিম।” সূরা আর-রাহমান :  ৬৮

ঘ. জান্নাতে কলা ও কাটাহিণ কুল থাকবে

وَ اَصْحٰبُ الْیَمِیْنِ ۬ۙ مَاۤ  اَصْحٰبُ الْیَمِیْنِ ﴿ؕ۲۷﴾ فِیْ  سِدْرٍ مَّخْضُوْدٍ ﴿ۙ۲۸﴾ وَّ  طَلْحٍ  مَّنْضُوْدٍ ﴿ۙ۲۹﴾

আর ডান হাত-ওয়ালারা, কত ভাগ্যবান ডান হাত-ওয়ালারা! সেখানে আছে কাটাহীন কুলগাছ। কাঁদি ভরা কলাগাছ। সুরা ওয়াকিয়াহ : ২৭-২৯

ঙ.  জান্নাতে আঙ্গুর ফল থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  لِلْمُتَّقِیْنَ مَفَازًا ﴿ۙ۳۱﴾ حَدَآئِقَ وَ  اَعْنَابًا ﴿ۙ۳۲﴾

নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্যই রয়েছে সফলতা; উদ্যানসমূহ ও নানাবিধ আঙ্গুর। সুরা নাবা : ৩১-৩২)

চ. জান্নাতের ফলসমূহের স্বাদ দুনিয়ার ফলের থেকে আলাদা হবে

জান্নাতের ফলসমূহের নাম দুনিয়ার ফলের মত হলেও, সে সবের স্বাদ কিন্তু এক নয়। যেহেতু জান্নাতের সবকিছুই অতুলনীয়, বেনযীর।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ بَشِّرِ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ ؕ  کُلَّمَا رُزِقُوْا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَۃٍ رِّزْقًا ۙ قَالُوْا هٰذَا الَّذِیْ رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ ۙ وَ اُتُوْا بِہٖ مُتَشَابِہًا ؕ وَ لَهُمْ فِیْهَاۤ اَزْوَاجٌ مُّطَهَرَۃٌ ٭ۙ وَّ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ ﴿۲۵﴾

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। যখনই তাদেরকে জান্নাত থেকে কোন ফল খেতে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘এটাই তো পূর্বে আমাদেরকে খেতে দেয়া হয়েছিল’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করে এবং তাদের জন্য তাতে থাকবে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ২৫

ছ. জান্নাতে গাছ লাগানোর উপায়

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক (একবার) বলে “সুবহানাল্লাহিল আযীম ওয়াবিহামদিহী”, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ লাগানো হয়। সুনানে তিরমিজি : ৩৪৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৮০৭, সহিহাহ : ৬৪

৩৪৬২। ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মি’রাজের রাতে আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ” আপনার উম্মাতকে আমার সালাম পৌছিয়ে দিন এবং তাদেরকে জানান যে, জান্নাতের যমীন অতীব সুগন্ধি সমৃদ্ধ এবং সেখানকার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু। তা একটি সমতল ভূমি এবং তার গাছপালা হল “সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদু লিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার”। সুনানে তিরমিজি : ৩৪৬২, সহিহাহ : ১০৬

৩৬. জান্নাতের প্রাসাদসমূহের বর্ণনা

জান্নাতীরা জান্নাতে বসবাস করবে বিশাল ও মনোরম অট্টালিকায়, যা হবে বহু কক্ষবিশিষ্ট ও বহুতল বিশিষ্ট। সেখানে থাকবে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা। প্রতিটি ঘর হবে সৌন্দর্য, আরাম ও আল্লাহর রহমতের অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত চিরস্থায়ী আবাস।

ক. জান্নাতের কক্ষগুলো সুউচ্চ হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اُولٰٓئِکَ یُجۡزَوۡنَ الۡغُرۡفَۃَ بِمَا صَبَرُوۡا وَیُلَقَّوۡنَ فِیۡہَا تَحِیَّۃً وَّسَلٰمًا ۙ

তারাই, যাদেরকে (জান্নাতে) সুউচ্চ কক্ষ প্রতিদান হিসাবে দেয়া হবে যেহেতু তারা সবর করেছিল সেজন্য। আর তাদের সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে অভিবাদন ও সালাম দ্বারা। সুরা ফুরকান : ৭৫

وَمَاۤ اَمۡوَالُکُمۡ وَلَاۤ اَوۡلَادُکُمۡ بِالَّتِیۡ تُقَرِّبُکُمۡ عِنۡدَنَا زُلۡفٰۤی اِلَّا مَنۡ اٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ۫ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ جَزَآءُ الضِّعۡفِ بِمَا عَمِلُوۡا وَہُمۡ فِی الۡغُرُفٰتِ اٰمِنُوۡنَ

আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে। তবে যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তারাই তাদের আমলের বিনিময়ে পাবে বহুগুণ প্রতিদান। আর তারা (জান্নাতের) সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে। সুরা সাবা : ৩৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَمَسٰکِنَ طَیِّبَۃً فِیۡ جَنّٰتِ عَدۡنٍ ؕ  وَرِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ اَکۡبَرُ ؕ  ذٰلِکَ ہُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ, তাতে তারা চিরদিন থাকবে এবং স্থায়ী জান্নাতসমূহে পবিত্র বাসস্থানসমূহের। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড়। এটাই মহাসফলতা। সুরা তাওবা : ৭২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَٰكِنِ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ رَبَّهُمۡ لَهُمۡ غُرَفٞ مِّن فَوۡقِهَا غُرَفٞ مَّبۡنِيَّةٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ وَعۡدَ ٱللَّهِ لَا يُخۡلِفُ ٱللَّهُ ٱلۡمِيعَادَ ٢٠

কিন্তু যারা নিজদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে কক্ষসমূহ যার উপর নির্মিত আছে আরো কক্ষ। তার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর ওয়াদা; আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না”। সূরা  যুমার :  ২০

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই জান্নাতবাসীরা তাদের উপরের বালাখানার (উঁচু এবং বিলাশবহুল ঘর) বাসিন্দাদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম দিকে উজ্জ্বল দীপ্তিমান নক্ষত্র দেখতে পাও। এটা হবে তাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্যের কারণে। সাহাবীগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এ তো নবীগণের জায়গা। তাদের ব্যতীত অন্যরা সেখানে পৌঁছতে পারবে না। তিনি বললেন, হ্যাঁ, সে সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যেসব লোক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং রাসূলগণকে সত্য বলে স্বীকার করবে। সহিহ বুখারি : ৩২৫৬, ৬৫৫৬, সহিহ মুসলিম : ৮৩১, সুনানে তিরমিযী : ২৫৫৬, ত্ববারানী : ৫৮০৭, আহমাদ : ২২৯৩৯

খ. জান্নাতের প্রষাদগুলো স্বচ্ছ হবে

আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের প্রাসাদগুলো এমন হবে যে, এর ভিতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে এবং বাইরে থেকে ভিতরের সবকিছু দেখা যাবে। এক বেদুঈন উঠে দড়িয়ে প্রশ্ন করলে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব প্রসাদ কাদের জন্য? তিনি বললেনঃ যারা উত্তম ও সুমধুর কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, প্রায়ই রোযা রাখে এবং লোকেরা রাতে ঘুমিয়ে থাকাবস্থায় জাগ্রত থেকে আল্লাহ তা’আলার জন্য নামায আদায় করে তাদের জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৭, মিশকাত : ১২৩৩

গ. জান্নাতের প্রাসাদসমূহ হবে স্বর্ন ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা’আলা সমস্ত সৃষ্টিজীবকে কিসের দ্বারা তৈরি করেছেন? তিনি (সা.) বললেন, পানি দ্বারা। আবার প্রশ্ন করলাম, জান্নাতের নির্মাণ কিসের দ্বারা? তিনি (সা.) বললেন, একটি ইট স্বর্ণের এবং একটি ইট রৌপ্যের। তার খামির বা মসল্লা হলো সুগন্ধময় কস্তুরী এবং তার কঙ্কর মণি-মুক্তা আর জাফরানের মাটি। যে লোক তাতে প্রবেশ করবে সে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো হতাশা বা দুশ্চিন্তায় পতিত হবে না। সেখানে চিরস্থায়ী থাকবে, কখনো মৃত্যুবরণ করবে না, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ময়লা-পুরানা হবে না এবং তাদের। যৌবনও শেষ হবে না। মিশকাত : ৫৬৩০, আহমাদ : ৮০৩০, সুনানে তিরমিযী : ২৫২৬, দারিমী : ২৮২১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৮৭, শু’আবূল ঈমান : ৭১০১, ত্ববারানী : ৮৯৫

৩৭. যে আমলে জান্নাতে প্রসাদ নির্মাণ হবে

ক. দৈনিকা ১২ রাকাত সুন্নাত সালাত আয়াদ করা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী উম্মু হাবীবাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি। (তিনি বলেছেন) কোন মুসলিম বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে প্রতিদিন ফারয (ফরয) ছাড়াও আরো ১২ রাকাআত নফল সালাত আদায় করে আল্লাহ তা’আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করেন অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হয়। সহিহ মুসলিম : ৭২৮, সুনানে তিরমিজি : ৪১৪, সুনানে আবু দাউদ : ১২৫০

খ. দুনিয়াতে মসজিদ নির্মান করলে

উসমান ইবনু আফ্ফান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি (উসমান) যখন মসজিদে নাববী নির্মাণ করেছিলেন তখন লোকজনের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেছিলেন, তোমরা আমার উপর অনেক বাড়াবাড়ি করছ অথচ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মাসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্যে জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন। সহিহ বুখারি : ৪৫০, সহিহ মুসলিম : ৫৩৩, আহমাদ : ৪৩৪

গ. দশবার সুরা ইখলাত পাঠ করলে

মু‘আবিয়া ইবন হাইদাহ আল-কুশাইরী থেকে বর্ণনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “যে ব্যক্তি ‘কুল হুআল্লাহু আহাদ’ শেষ পর্যন্ত ১০ বার পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।” সহিহাহ : ৫৮৯, আহমদ : ২০০২০, দারিমি : ৩৩৯০

ঘ. নিজ সন্তানের মৃত্যুতে সবর করলে

 আবু সিনান (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমার ছেলে সিনানকে আমি দাফন করলাম। কবরের কিনারায় আবু তালহা আল-খাওলানী (রহঃ) বসা অবস্থায় ছিলেন। কবর হতে আমি যখন উঠে আসতে চাইলাম তখন আমার হাত ধরে তিনি বললেন, হে আবু সিনান! তোমাকে কি আমি সুসংবাদ দিব না? আমি বললাম, অবশ্যই দিন। তিনি বললেন, আবু মূসা আল-আশআরী (রাঃ) হতে যাহাক ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আরযাব (রাহঃ) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বান্দার কোন সন্তান মারা গেলে তখন আল্লাহ্ তা’আলা তার ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানকে কি ছিনিয়ে আনলে? তারা বলে, হ্যাঁ। পুনরায় আল্লাহ্‌ তায়ালা প্রশ্ন করেন, তোমরা তার হৃদয়ের টুকরাকে ছিনিয়ে আনলে? তারা বলে, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেন, তখন আমার বান্দা কি বলেছে? তারা বলে, সে আপনার প্রতি প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পাঠ করেছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, জান্নাতের মধ্যে আমার এই বান্দার জন্য একটি ঘর তৈরী কর এবং তার নাম রাখ “বাইতুল হামদ” বা প্রশংসালয়। সুনানে তিরমিজি : ১০২১, সহীহাহ : ১৪০৮, আহমদ : ১৯৬২৩

ঙ. ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করলে

আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবু দউদ : ৪৮০০, সহিহ আত তারগিব : ১৩৩

চ. নির্বাচিত দোয়াটি পাঠ করে বাজারে প্রবেশ করলে

উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশকালে বলে- (’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ইউহ্য়ী ওয়া ইউমীতু ওয়া হুয়া হায়্যুন লা ইয়ামূতু বিয়াদিহিল খাইর কুল্লুহু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়ইন কাদীর’) আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নাই, রাজত্ব তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না, তাঁর হাতেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত এবং তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান।

আল্লাহ তার আমলনামায় দশ লক্ষ পুণ্য লিপিবদ্ধ করেন, তাঁর দশ লক্ষ গুনাহ মাফ করেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৩৫, সুনানে তিরমিযী : ৩৪২৮, ৩৪২৯, আহমাদ : ৩২৯, দারেমী : ২৬৯২,

৩৮. জান্নাতের পাখির বর্ণনা

জান্নাতে পাখী আছে। সেই পাখীর মাংস জান্নাতীদের খাদ্য হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَحۡمِ طَیۡرٍ مِّمَّا یَشۡتَہُوۡنَ ؕ

আর পাখির গোশ্‌ত নিয়ে, যা তারা কামনা করবে।সুরা ওয়াকিয়া : ২১

আবু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি একটি লাগামযুক্ত উটনী নিয়ে হাজির হয়ে বলল, ‘এটি আল্লাহর পথে (জিহাদের জন্য দান করা হল)’। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “কিয়ামতের দিনে তোমার জন্য এর বিনিময়ে সাতশত উটনী হবে, যার প্রত্যেকটি লাগামযুক্ত হবে। সহিহ মুসলিম : ৬৩৩০

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাওযে কাওসার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তা একটি ঝর্ণা যা আল্লাহ তা’আলা জান্নাতে আমাকে প্রদান করেছেন। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। এতে অনেক পাখি রয়েছে যাদের ঘাড় উটের ঘাড়ের মতো উচু। উমর (রা.) বলেন, তাহলে তো এগুলো সতেজ হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যারা এগুলো আহার করবে, তারা আরো সুন্দর ও সুখী হবে। সুনানে তিরিমিজ : ২৫৪২, মিশকাত : ৫৬৪১, সহীহাহ : ২৫১৪, আহমাদ : ১৩৫০৫

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “ছাগল-ভেড়ার খামারে নামায পড় এবং তার পোঁটা মুছে (যত্ন কর)। কারণ, তা জান্নাতের অন্যতম পশু।  সহীহাহ : ১১২৮

৩৯. জান্নাতবাসীদের খাবারের বিবরণ

يَـٰعِبَادِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡكُمُ ٱلۡيَوۡمَ وَلَآ أَنتُمۡ تَحۡزَنُونَ (٦٨) ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِـَٔايَـٰتِنَا وَڪَانُواْ مُسۡلِمِينَ (٦٩) ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ أَنتُمۡ وَأَزۡوَٲجُكُمۡ تُحۡبَرُونَ (٧٠) يُطَافُ عَلَيۡہِم بِصِحَافٍ۬ مِّن ذَهَبٍ۬ وَأَكۡوَابٍ۬‌ۖ وَفِيهَا مَا تَشۡتَهِيهِ ٱلۡأَنفُسُ وَتَلَذُّ ٱلۡأَعۡيُنُ‌ۖ وَأَنتُمۡ فِيهَا خَـٰلِدُونَ (٧١) وَتِلۡكَ ٱلۡجَنَّةُ ٱلَّتِىٓ أُورِثۡتُمُوهَا بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ (٧٢) لَكُمۡ فِيہَا فَـٰكِهَةٌ۬ كَثِيرَةٌ۬ مِّنۡهَا تَأۡكُلُونَ

হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে ঈমান এনেছিল এবং যারা ছিল মুসলিম। তোমরা সস্ত্রীক সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। আর এটিই জান্নাত, নিজদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে।  সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে অনেক ফলমূল, যা থেকে তোমরা খাবে। সূরা যুখরুফ : ৬৮-৭৩

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَٱتَّبَعَتۡہُمۡ ذُرِّيَّتُہُم بِإِيمَـٰنٍ أَلۡحَقۡنَا بِہِمۡ ذُرِّيَّتَہُمۡ وَمَآ أَلَتۡنَـٰهُم مِّنۡ عَمَلِهِم مِّن شَىۡءٍ۬‌ۚ كُلُّ ٱمۡرِىِٕۭ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ۬ (٢١) وَأَمۡدَدۡنَـٰهُم بِفَـٰكِهَةٍ۬ وَلَحۡمٍ۬ مِّمَّا يَشۡتَہُونَ (٢٢) يَتَنَـٰزَعُونَ فِيہَا كَأۡسً۬ا لَّا لَغۡوٌ۬ فِيہَا وَلَا تَأۡثِيمٌ۬ (٢٣) ۞ وَيَطُوفُ عَلَيۡہِمۡ غِلۡمَانٌ۬ لَّهُمۡ كَأَنَّہُمۡ لُؤۡلُؤٌ۬ مَّكۡنُونٌ۬ (٢٤) وَأَقۡبَلَ بَعۡضُہُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٍ۬ يَتَسَآءَلُونَ (٢٥) قَالُوٓاْ إِنَّا ڪُنَّا قَبۡلُ فِىٓ أَهۡلِنَا مُشۡفِقِينَ (٢٦)فَمَنَّ ٱللَّهُ عَلَيۡنَا وَوَقَٮٰنَا عَذَابَ ٱلسَّمُومِ

“আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্তুতি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোনো অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে। আর আমি তাদেরকে অতিরিক্ত দেব ফলমূল ও মাংস যা তারা কামনা করবে। তারা পরস্পরের মধ্যে পানপাত্র বিনিময় করবে; সেখানে থাকবে না কোনো বেহুদা কথাবার্তা এবং কোনো পাপকাজ। আর তাদের সেবায় চারপাশে ঘুরবে বালকদল; তারা যেন সুরক্ষিত মুক্তা। আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তারা বলবে, পূর্বে আমরা আমাদের পরিবারের মধ্যে শঙ্কিত ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন”। সূরা তূর : ২১-২৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ السّٰبِقُوْنَ  السّٰبِقُوْنَ ﴿ۚۙ۱۰﴾ اُولٰٓئِكَ  الْمُقَرَّبُوْنَ ﴿ۚ۱۱﴾ فِیْ  جَنّٰتِ النَّعِیْمِ ﴿۱۲﴾ ثُلَّۃٌ  مِّنَ الْاَوَّلِیْنَ ﴿ۙ۱۳﴾ وَ قَلِیْلٌ  مِّنَ الْاٰخِرِیْنَ ﴿ؕ۱۴﴾ عَلٰی سُرُرٍ مَّوْضُوْنَۃٍ ﴿ۙ۱۵﴾ مُّتَّكِـِٕیْنَ عَلَیْهَا مُتَقٰبِلِیْنَ ﴿۱۶﴾ یَطُوْفُ عَلَیْهِمْ  وِلْدَانٌ   مُّخَلَّدُوْنَ ﴿ۙ۱۷﴾ بِاَکْوَابٍ وَّ اَبَارِیْقَ ۬ۙ وَ كَاْسٍ مِّنْ مَّعِیْنٍ ﴿ۙ۱۸﴾لَّا  یُصَدَّعُوْنَ عَنْهَا وَ لَا  یُنْزِفُوْنَ ﴿ۙ۱۹﴾ وَ فَاكِهَۃٍ   مِّمَّا یَتَخَیَّرُوْنَ ﴿ۙ۲۰﴾ وَ  لَحْمِ  طَیْرٍ  مِّمَّا یَشْتَهُوْنَ ﴿ؕ۲۱﴾وَ حُوْرٌ عِیْنٌ ﴿ۙ۲۲﴾كَاَمْثَالِ اللُّؤْلُؤَ  الْمَکْنُوْنِ ﴿ۚ۲۳﴾ جَزَآءًۢ  بِمَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ ﴿۲۴﴾ لَا یَسْمَعُوْنَ فِیْهَا لَغْوًا  وَّ لَا  تَاْثِیْمًا ﴿ۙ۲۵﴾ اِلَّا  قِیْلًا  سَلٰمًا سَلٰمًا ﴿۲۶﴾ وَ اَصْحٰبُ الْیَمِیْنِ ۬ۙ مَاۤ  اَصْحٰبُ الْیَمِیْنِ ﴿ؕ۲۷﴾ فِیْ  سِدْرٍ مَّخْضُوْدٍ ﴿ۙ۲۸﴾وَّ  طَلْحٍ  مَّنْضُوْدٍ ﴿ۙ۲۹﴾وَّ ظِلٍّ  مَّمْدُوْدٍ ﴿ۙ۳۰﴾وَّ مَآءٍ  مَّسْکُوْبٍ ﴿ۙ۳۱﴾ وَّ  فَاكِهَۃٍ   كَثِیْرَۃٍ ﴿ۙ۳۲﴾لَّا مَقْطُوْعَۃٍ  وَّ لَا  مَمْنُوْعَۃٍ ﴿ۙ۳۳﴾وَّ فُرُشٍ مَّرْفُوْعَۃٍ ﴿ؕ۳۴﴾ اِنَّاۤ  اَنْشَاْنٰهُنَّ  اِنْشَآءً ﴿ۙ۳۵﴾فَجَعَلْنٰهُنَّ  اَبْكَارًا ﴿ۙ۳۶﴾عُرُبًا  اَتْرَابًا ﴿ۙ۳۷﴾ لِّاَصْحٰبِ الْیَمِیْنِ ﴿ؕ۳۸﴾ ثُلَّۃٌ  مِّنَ  الْاَوَّلِیْنَ ﴿ۙ۳۹﴾ وَ ثُلَّۃٌ  مِّنَ  الْاٰخِرِیْنَ ﴿ؕ۴۰﴾

আর অগ্রগামীরাই অগ্রগামী। তারাই সান্নিধ্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নিআমতপূর্ণ জান্নাতসমূহে। বহুসংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে, আর অল্পসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে। স্বর্ণ ও দামী পাথরখচিত আসনে! তারা সেখানে হেলান দিয়ে আসীন থাকবে মুখোমুখি অবস্থায়। তাদের আশ-পাশে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা, পানপাত্র, জগ ও প্রবাহিত ঝর্ণার শরাবপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে। তা পানে না তাদের মাথা ব্যথা করবে, আর না তারা মাতাল হবে। আর (ঘোরাফেরা করবে) তাদের পছন্দ মতো ফল নিয়ে। আর পাখির গোশ‌ত নিয়ে, যা তারা কামনা করবে। আর থাকবে ডাগরচোখা হূর। যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা। তারা যে আমল করত তার প্রতিদানস্বরূপ। তারা সেখানে শুনতে পাবে না কোনো বেহুদা কথা এবং না পাপের কথা; শুধু এই বাণী ছাড়া, সালাম, সালাম। আর ডান দিকের দল; কত ভাগ্যবান ডান দিকের দল! তারা থাকবে কাঁটাবিহীন কুলগাছের নিচে, আর কাঁদিপূর্ণ কলাগাছের নিচে, আর বিস্তৃত ছায়ায়, আর সদা প্রবাহিত পানির পাশে, আর প্রচুর ফলমূলে, যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না। (তারা থাকবে) সুউচ্চ শয্যাসমূহে; নিশ্চয় আমি হূরদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব। অতঃপর তাদেরকে বানাব কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়সী। ডানদিকের লোকদের জন্য। তাদের অনেকে হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে। আর অনেকে হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে”। সূরা ওয়াকিয়া : ১০-৪০

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে পানাহার করবে। তবে থু-থু ফেলবে না, প্ৰস্ৰাব-পায়খানা করবে না এবং নাকও ঝাড়বে না। এ কথা শুনে সাহাবাগণ বললেন, তবে ভক্ষিত খানা যাবে কোথায়? উত্তরে তিনি বললেন, এক ঢেকুরে শেষ হয়ে যাবে। তাদের শরীরের ঘাম মিশকের মতো সুঘ্ৰাণযুক্ত হবে। আল্লাহর পবিত্রতা এবং প্রশংসা তাদের অন্তঃকরণে এভাবে দেয়া হবে। যেভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস দেয়া হয়। সহীহ মুসলিম : ২৮৩৫।

৪০. জান্নাতের একটি বিশাল তাবু থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُوۡرٌ مَّقۡصُوۡرٰتٌ فِی الۡخِیَامِ ۚ

তারা হূর, তাঁবুতে থাকবে সুরক্ষিতা। সুরা আর রহমান : ৭২

আবদুল্লাহ ইবনু কায়স (রাযিঃ) এর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুমিনদের জন্য জান্নাতে মধ্যস্থলে ফাঁকা এমন একটি মুক্তার তাবু নির্মাণ করা হবে যার দৈর্ঘ্য হবে ষাট মাইল। মু’মিনদের সহধর্মিণীগণও এতে থাকবে। তারা তাদের সকলের নিকট গমন করবে। তবে স্ত্রীগণ পরস্পর একে অন্যকে দেখতে পাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৮

জান্নাতে আরামদায়ক তাপমাত্রা থাকবে

জান্নাতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন আলো। সেখানে চন্দ্র-সূর্য নেই, রাত-দিন নেই। সূর্যের তাপ নেই।  সব সময় জান্নাতে আরামদায়ক তাপমাত্রা থাকবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُّتَّکِـِٕیۡنَ فِیۡہَا عَلَی الۡاَرَآئِکِ ۚ  لَا یَرَوۡنَ فِیۡہَا شَمۡسًا وَّلَا زَمۡہَرِیۡرًا ۚ

তারা সেখানে সুউচ্চ আসনে হেলান দিয়ে আসীন থাকবে। তারা সেখানে না দেখবে অতিশয় গরম, আর না অত্যধিক শীত। সুরা দাহর : ১৩

৪১. জান্নাতের সুগন্ধির বর্ণনা

জান্নাত একটি সুগন্ধময় স্থান, যেখানে সুগন্ধ শুধু এর ভিতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বহুদূর থেকে তা অনুভূত হয়। নবী ﷺ এর অনেক সহিহ হাদীসে এই বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়, যা জান্নাতের অতুলনীয় সৌন্দর্য ও মর্যাদাকে উপস্থাপন করে। নিচে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস উল্লেক করা হলো—

আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন জিম্মীকে কতল করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যাবে।’ সহিহ বুখারি : ৩১৬৬, ৬৯১৪

আবদুল্লাহ ইবনে ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের পিতাকে বাদ দিয়ে অপর ব্যক্তিকে বাপ বলে পরিচয় দেয়, সে জান্নাতের সুবাসটুকুও পাবে না। অথচ পাঁচ শত বছরের দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুবাস পাওয়া যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৬১১, আহমাদ : ৬৫৫৫, সহীহাহ : ২৩০৭

জান্নাতিদের প্রথম দল সম্পর্কে এক হাদিসে বলা হয়েছে, “তাদের ঘাম হবে মিশকের ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত। সহিহ বুখারী : ৩২৪৫, সহিহ মুসলিম :২৮৩৪

জান্নাতের মাটিগুলো খাঁটি মিশকের মতো সুগন্ধিযুক্ত হবে। সহিহ মুসলিম : ৭০৮৮

যারা জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না

ক. যে নারী অহেতুক স্বামীর কাছে তালাক চায়। সুনানে আবূ দাউদ : ২২২৬

খ. যে নারী এমন পোশাক পরে যা পরার পরও উলঙ্গ থাকে এবং পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে। সহীহ মুসলিম : ২১২৮

গ. যে শাসক জনগণের প্রতি কল্যাণকামী নয়। সহীহ বুখারী : ৭১৫০

ঘ. যে ব্যক্তি কালো খেজাব ব্যবহার করে। (সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস: ৪২১২)।

৪২. জান্নাতে বাজার থাকবে

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি বাজার আছে। জান্নাতবাসীগণ সপ্তাহের প্রত্যেক জুমু’আর দিন সেখানে একত্রিত হবে। তখন উত্তরী বাতাস প্রবাহিত হবে এবং তা তাদের মুখমণ্ডলে ও কাপড়চোপড়ে সুগন্ধি নিক্ষেপ করবে, ফলে তাদের রূপ-সৌন্দর্য আরো অধিক বৃদ্ধি পাবে। অতঃপর যখন তারা বর্ধিত সুগন্ধি ও সৌন্দর্য অবস্থায় নিজেদের স্ত্রীদের কাছে যাবে, তখন স্ত্রীগণ তাদেরকে বলবে, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো আমাদের অবর্তমানে সুগন্ধি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে ফেলেছ। তার উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ শপথ! আমাদের অনুপস্থিতিতে তোমাদের রূপ-সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। সহীহ মুসলিম : ২৮৩৩, মিশকাত : ৫৬১৮, সহীহুল জামি : ২১২৪, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ : ৩৪৭১, মুসনাদে আহমাদ : ১৪০৬৭

জাহান্নামের বিবরণ : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জাহান্নাম (جَہَنَّمَ) :

জাহান্নাম (جَہَنَّمَ) একটি আরবি শব্দ। যার অর্থ গভীর খাদ, অতল গহ্বর, ভয়াবহ আগুন, শাস্তির স্থান, অপমান ও যন্ত্রণা দানকারী স্থান ইত্যাদি। জাহান্নাম শব্দটি কুরআনের ৭৭ জায়গায় এসেছে। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ لِّلَّذِیْنَ کَفَرُوْا سَتُغْلَبُوْنَ وَتُحْشَرُوْنَ اِلٰی جَہَنَّمَ ؕ وَبِئْسَ الْمِہَادُ

তুমি কাফিরদেরকে বল, ‘তোমরা অচিরেই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামের দিকে সমবেত করা হবে। আর সেটি কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল’! সুরা আল ইমরান : ১২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَادْخُلُوْۤا اَبْوَابَ جَہَنَّمَ خٰلِدِیْنَ فِیْہَا ؕ فَلَبِئْسَ مَثْوَی الْمُتَکَبِّرِیْنَ

সুতরাং তোমরা জাহান্নামের দরজাগুলো দিয়ে প্রবেশ কর, তাতে স্থায়ী হয়ে। অতএব অবশ্যই অহঙ্কারীদের আবাস অতিনিকৃষ্ট। সুরা নাহল : ২৯

ইসলামী পরিভাষায় জাহান্নাম বলতে আখিরাতে কাফের, মুশরিক, মুনাফিক ও বড় গুনাহে লিপ্ত অথচ তওবা না করা মানুষের জন্য প্রস্তুত করা ভয়াবহ শাস্তিস্থলকে বোঝায়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে জাহান্নামের ভয়াবহতা, তার প্রকারভেদ, স্তর, অধিবাসী ও শাস্তির বর্ণনা বিশদভাবে এসেছে। কুরআনে জাহান্নামকে “আন-নার” (আগুন), “সা‘ইর” (প্রজ্বলিত আগুন), “হাওয়িয়া” (অতল গহ্বর), “সাকার” (প্রচণ্ড তাপ), “জাহিম” (দাহনশীল আগুন) ইত্যাদি নামে ডাকা হয়েছে, যা এর ভয়াবহতার বহুমাত্রিক দিক প্রকাশ করে। এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রতিফলন, যেখানে অবিশ্বাসী ও অপরাধীরা তাদের কর্মফল ভোগ করবে। জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের তুলনায় সত্তর গুণ তীব্র, যার খাদ্য হবে “জাক্কুম” বৃক্ষের তিক্ত ফল এবং পানীয় হবে ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। এর সাতটি দরজা আছে এবং প্রতিটি দরজা নির্দিষ্ট অপরাধীদের জন্য নির্ধারিত। এর শাস্তি কখনো হালকা হবে না, বরং সময়ের সাথে বাড়তেই থাকবে। যারা ঈমান ও সৎকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে বা অহংকারে ডুবে ছিল, তাদের জন্য জাহান্নাম চিরস্থায়ী আবাস। তবে কিছু মুমিন যারা বড় গুনাহ করেছে কিন্তু তওবা করেনি, তারা শাস্তি ভোগের পর আল্লাহর রহমতে মুক্তি পাবে। জাহান্নামের বর্ণনা মূলত মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি জাগানো, অন্যায় ও গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং ন্যায়পথে আহ্বান করার জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا قُوْۤا اَنْفُسَکُمْ وَاَہْلِیْکُمْ نَارًا وَّقُوْدُہَا النَّاسُ وَالْحِجَارَۃُ عَلَیْہَا مَلٰٓئِکَۃٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا یَعْصُوْنَ اللّٰہَ مَاۤ اَمَرَہُمْ وَیَفْعَلُوْنَ مَا یُؤْمَرُوْنَ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকূল, আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তারা সে ব্যাপারে তার অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়। সূরা তাহরীম: ৬

তাই জাহান্নামের বাস্তবতা উপলব্ধি করে প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো ঈমানকে দৃঢ় করা, সৎকর্মে লেগে থাকা এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

১. জাহান্নামের নামসমূহ

মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধারণা হলো, জাহান্নাম সাতটি। যদিও কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে “সাতটি জাহান্নামের নাম” একত্রে বর্ণিত হয়নি। তবে কুরআন ও হাদিসে জাহান্নামের স্তর বা দরজার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা থেকে কেউ কেউ সাতটি স্তর নির্ধারণ করেছেন। আবার অনেকে এই স্তরগুলোকেই আলাদা আলাদা জাহান্নামের নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেমন— জাহিম, সাকার, হুতামাহ, লাযা, সা‘ইর, হাওয়িয়া ও জাহান্নাম। প্রকৃতপক্ষে এগুলো নাম না স্তরের বর্ণনা— এ বিষয়ে স্পষ্ট দলিল নেই। তাই সঠিক ধারণা পেতে কুরআন-সুন্নাহর বর্ণনাই অনুসরণ করা উচিত। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

ক. হুতামাহ (الْحُطَمَۃِ)

হুতামাহ অর্থ হলো- প্রজ্বলিত আগুন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَلَّا  لَیُنْۢبَذَنَّ فِی الْحُطَمَۃِ ۫﴿ۖ۴﴾وَ  مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا  الْحُطَمَۃُ ؕ﴿۵﴾ نَارُ اللّٰهِ الْمُوْقَدَۃُ ۙ﴿۶﴾الَّتِیْ  تَطَّلِعُ  عَلَی الْاَفْـِٕدَۃِ ؕ﴿۷﴾ اِنَّهَا عَلَیْهِمْ  مُّؤْصَدَۃٌ ۙ﴿۸﴾ فِیْ  عَمَدٍ  مُّمَدَّدَۃٍ ﴿۹﴾

কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়। কিসে তোমাকে জানাল, হুতামা কি? তা হল আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি। যা হৃদয়কে গ্রাস করবে। নিশ্চয়ই তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে। দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে। সুরা হুতামাহ : ৪-৯

খ. সাঈর (السَّعِیْرِ) :

‘সাঈর’ অর্থ হলো- প্রজ্বলিত আগুন। এ নামটিও বহু জায়গায় এসেছে। তার মধ্যে এক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الشَّیْطٰنَ لَکُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوْهُ عَدُوًّا ؕ اِنَّمَا یَدْعُوْا حِزْبَہٗ  لِیَکُوْنُوْا مِنْ  اَصْحٰبِ  السَّعِیْرِ ؕ﴿۶﴾

নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য কর। সে তার দলকে কেবল এজন্যই ডাকে যাতে তারা সাঈরের (প্রজ্বলিত আগুনের) অধিবাসী হয়। সুরা ফাতির : ৬

গ. সাকার (سَقَرَ)

‘সাক্বার’ অর্থ হলো- ঝলসিয়ে দেওয়া, গলিয়ে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ یُسْحَبُوْنَ فِی النَّارِ عَلٰی وُجُوْهِهِمْ ؕ ذُوْقُوْا مَسَّ سَقَرَ ﴿۴۸﴾

সেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নেয়া হবে। (বলা হবে) সাক্কার (জাহান্নামের) ছোঁয়া আস্বাদন কর। সুরা কামার : ৪৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

سَاُصْلِیْهِ سَقَرَ ﴿۲۶﴾ وَ  مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا سَقَرُ ﴿ؕ۲۷﴾لَا  تُبْقِیْ  وَ لَا  تَذَرُ ﴿ۚ۲۸﴾ لَوَّاحَۃٌ  لِّلْبَشَرِ ﴿ۚۖ۲۹﴾ عَلَیْهَا تِسْعَۃَ عَشَرَ ﴿ؕ۳۰﴾

আমি তাকে নিক্ষেপ করব সাকারে (জাহান্নামে)। কিসে তোমাকে জানাল, সাকার কী? এটা অবশিষ্টও রাখবে না এবং ছেড়েও দেবে না। ওটা দেহের চামড়া দগ্ধ করে দেবে। ওর তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশ জন প্রহরী। সুরা মুদ্দাসসির ২৬-৩০

ঘ. জাহিম (الْجَحِیْمِ)

জাহীম’ অর্থ হলো- কঠিন অগ্নিদাহ। এ নামটিও বহু জায়গায় এসেছে। তার মধ্যে দুই জায়গায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا وَ كَذَّبُوْا بِاٰیٰتِنَاۤ  اُولٰٓئِكَ  اَصْحٰبُ  الْجَحِیْمِ ﴿۱۰﴾

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই জাহিমের (কঠিন আগুনের) অধিবাসী। সুরা মায়িদা : ১০

ঙ. হাবিয়াহ (ٗ  هَاوِیَۃٌ ؕ)

‘হাবিয়াহ’ অর্থ হলো- গভীর গর্ত, পাতাল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ﴿۸﴾ فَاُمُّہٗ  هَاوِیَۃٌ ؕ﴿۹﴾وَ مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا هِیَہْ ﴿ؕ۱۰﴾ نَارٌ حَامِیَۃٌ ﴿۱۱﴾

কিন্তু যার পাল্লা হাল্কা হবে, তার স্থান হবে হাবিয়াহ। কিসে তোমাকে জানাল, তা কি? তা অতি উত্তপ্ত অগ্নি। সুরা কারিয়াহ : ৮-১১

চ. লাজা (لَظٰی)

‘লাজা’ অর্থ হলো- লেলিহান আগুন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَلَّا ؕ اِنَّهَا  لَظٰی ﴿ۙ۱۵﴾ نَزَّاعَۃً   لِّلشَّوٰی  ﴿ۚۖ۱۶﴾تَدْعُوْا  مَنْ  اَدْبَرَ  وَ تَوَلّٰی ﴿ۙ۱۷﴾وَ  جَمَعَ   فَاَوْعٰی ﴿۱۸﴾  

না, কখনই নয়! এটা তো লাজা (লেলিহান অগ্নি)। যা দেহ হতে চামড়া খসিয়ে দেবে। জাহান্নাম ঐ ব্যক্তিকে ডাকবে, যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সে সম্পদ পুঞ্জীভূত এবং সংরক্ষিত করে রেখেছিল। সুরা মাআরিজ : ১৫-১৮

ছ. অইল বা ওয়াইল ()

অইল’ বা ‘ওয়াইল’ অইল’-এর অর্থ দুর্ভোগ বা ধ্বংস করা হয়ে থাকে। কেউ কেউ এটিকে জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম গণ্য করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

,

فَوَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِينَ

(অইল) দুর্ভোগ সেদিন মিথ্যাশ্রয়ীদের। সুরা তুর : ১১

وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ

(অইল) ধংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। সুরা মুতাফফিফিন : ১

২. জাহান্নামের বিশালতা

আমরা পৃথিবীর বিশালতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে যে সূর্যের কথা বলি, তা আমাদের কাছে বিশাল মনে হলেও আল্লাহর সৃষ্টিজগতের এক অতি ক্ষুদ্র সুষ্টি। ঠিক তেমনই, আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে জাহান্নামের বিশালতা কল্পনা করা সম্ভব নয়। জান্নাত যেমন মানুষের সকল ধারণার বাইরে, জাহান্নামের ভয়াবহতা ও বিশালতাও তেমনই।

ক. জাহান্নামের বিশাল মানুষের কল্পনাতীত

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাহান্নামের মধ্যে কাফিরের দেহের চামড়া হবে বিয়াল্লিশ হাত মোটা, দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে মক্কাহ্-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্ব সমান পরিমাণ। সুনানে তিরমিজি : ২৫৭৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১১০৫, মিশকাত : ৫৬৭৫,  সহীহুল জামি’ : ২১১৪, হাকিম : ৮৭৬০।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে কাফিরদের উভয় ঘাড়ের দূরত্ব হবে কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের ভ্রমণের দূরত্ব পরিমাণ। অপর এক বর্ণনায় আছে- কাফিরের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং তার দেহের চামড়া হবে তিন দিনের সফরের দূরত্ব পরিমাণ পুরু বা মোটা। সহিহ বুখারী : ৬৫৫১, সহিহ মুসলিম : ২৮৫২, মিশকাত : ৫৬৭২, সহীহুল জামি ৫৫৯১, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩৬৮১, আল মু’জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ৬২৭

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন কাফিরের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো, রান বা উরু হবে বায়যা পাহাড়ের মতো মোটা এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে তিন দিনের দূরত্ব পরিমাণ বিস্তীর্ণ। যেমন- ’রবযাহ’ (মদীনাহ্ হতে তিন দিনের দূরত্বের ব্যবধান)। সুনানে তিরমিযী : ২৫৭৮, মিশকাত : ৫৬৭৪, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১১০৫, সহীহুল জামি : ৩৮৯০, মুসনাদে আহমাদ : ৮৩২৭

জিন-ইনসান মিলে অগণিত কোটি সংখ্যক ব্যক্তি জাহান্নামে স্থান পাবে। আবার কোন কোন জাহান্নামীর দেহ এত বিরাট হবে যে, তার দাঁতটাই হবে উহুদ পাহাড়ের সমান! বসার স্থান হবে মক্কাহ্-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্ব সমান পথ! প্রকাশ থাকে যে, উহুদ পাহাড়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিমি. প্রস্থ প্রায় ২-৩ কিমি. এবং উচ্চতা ৩৫০ মিটার। জানি না, এই শ্রেণীর জাহান্নামীর সংখ্যাই বা কত। তা সত্ত্বেও জাহান্নাম পরিপূর্ণ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوۡمَ نَقُوۡلُ لِجَہَنَّمَ ہَلِ امۡتَلَاۡتِ وَتَقُوۡلُ ہَلۡ مِنۡ مَّزِیۡدٍ

সেদিন আমি জাহান্নামকে বলব, ‘তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছ’? আর সে বলবে, ‘আরো বেশি আছে কি’? সুরা কাফ : ৩০

আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ লোকদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। খালীফা ও মুতামির (রহ.) আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ জাহান্নামীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতে থাকবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে আরো বেশি আছে কি? আর শেষে আল্লাহ্ রাববুল আলামীন, তাঁর কদম জাহান্নামে রাখবেন। তখন এর এক অংশ অন্য অংশের সঙ্গে মিশে স্থির হতে থাকবে। আর বলবে আপনার ইয্যত ও করমের কসম! যথেষ্ট হয়েছে। জান্নাতের কিছু জায়গা শূন্য থাকবে। অবশেষে আল্লাহ্ সেই শূন্য জায়গার জন্য নতুন কিছু মাখলুক সৃষ্টি করবেন এবং জান্নাতের সেই খালি জায়গায় এদের বসতি করে দেবেন। সহিহ বুখারি : ৪৮৪৮, ৭৩৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৪৮

খ. জাহান্নামের কল্পনাতীত বিশাল গভীরতা

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে থাকার সময় হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শোনেন। তখন তিনি সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করেন, “তোমরা জান এটা কিসের শব্দ?” সাহাবীরা উত্তর দেন, “আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন।” তখন রাসূল (ﷺ) বলেন, “এটি একটি পাথর, যা সত্তর বছর পূর্বে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এটি এতোক্ষণ ধরে নিচে যাচ্ছিল এবং এখন তা জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছল, যার পড়ার আওয়াজ তোমরা শুনতে পেলে।” সহিহ মুসলিম : ৬৯০৪।

গ. জাহান্নামের সত্তরটি লাগাম ধরে সত্তর হাজার মালাক টেনে আনবে

ইবনু মাস্’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে এমন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে যে, তার সত্তরটি লাগাম থাকবে এবং সত্তর হাজার মালাক (ফেরেশতা) প্রতিটি লাগামের সাথে থাকবে, তারা তা টেনে আনবে। সহিহ মুসলিম : ২৮৪২, সুনানে তিরমিযী : ২৫৭৩, মিশকাত : ৫৬৬৬, সহীহুল জামি : ৮০০১

ঘ. কিয়ামতের দিন সূর্য ও চাঁদকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে

হাসান বাসরী (রহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সূর্য ও চাঁদকে দুটি পনীরের আকৃতি বানিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন হাসান (রহিমাহুল্লাহ) প্রশ্ন করলেন, তাদের অপরাধ কী? উত্তরে আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে এ সম্পর্কে যা কিছু শুনেছি, তাই বর্ণনা করলাম। এ কথা শুনার পর হাসান (রহিমাহুল্লাহ) নীরব হয়ে গেলেন। মিশকাত : ৫৬৯২, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১২৪

৩. জাহান্নামের স্তরসমূহ

অবাধ্য মানুষের অবাধ্যতা ও অপরাধ যেমন বিভিন্ন প্রকার, তেমনি জাহান্নামের স্তরও আছে ভিন্ন ভিন্ন। আযাবের কঠিনতাও ভিন্ন ভিন্ন হবে। যত নিম্নস্তরের আগুন হবে, তার উত্তাপ তত বেশি হবে। মুনাফিকরা যেহেতু ঘর শত্রু, তাদের দ্বারা ইসলামের ক্ষতি বেশি, তাই তাদের ঠাই হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا

 মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা অবশ্যই দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে এবং তাদের জন্য তুমি কখনও কোন সাহায্যকারী পাবে না। সুরা নিসা : ১৪৫

জান্নাতের স্তরসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চই হল সর্বশ্রেষ্ঠ। আর জাহান্নামের স্তরসমূহের মধ্যে সর্বনিম্নই হল সর্বনিকৃষ্ট।

৪. জাহান্নামের দরজাসমূহ

জান্নাতের যেমন আটটি দরজা আছে, তেমনি জাহান্নামের দরজা আছে সাতটি। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ  اِنَّ جَهَنَّمَ  لَمَوْعِدُهُمْ  اَجْمَعِیْنَ ﴿۟ۙ۴۳﴾ لَهَا سَبْعَۃُ  اَبْوَابٍ ؕ لِکُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ  مَّقْسُوْمٌ  ﴿۴۴﴾

অবশ্যই (শয়তানের অনুসারীদের) তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান হবে জাহান্নাম। ওর সাতটি দরজা আছে। প্রত্যেক দরজার জন্য তাদের মধ্য থেকে পৃথক পৃথক দল আছে। সুরা হিজর : ৪৩-৪৪

হিসাবের পর দলে দলে কাফেরদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। জাহান্নামের নিকটে পৌছনো মাত্র তার দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ سِیْقَ الَّذِیْنَ  كَفَرُوْۤا اِلٰی جَهَنَّمَ  زُمَرًا ؕ حَتّٰۤی  اِذَا جَآءُوْهَا فُتِحَتْ  اَبْوَابُهَا وَ قَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَاۤ  اَلَمْ یَاْتِکُمْ رُسُلٌ مِّنْکُمْ یَتْلُوْنَ عَلَیْکُمْ اٰیٰتِ رَبِّکُمْ وَ یُنْذِرُوْنَکُمْ لِقَآءَ یَوْمِکُمْ هٰذَا ؕ قَالُوْا بَلٰی وَ لٰكِنْ حَقَّتْ كَلِمَۃُ الْعَذَابِ عَلَی الْکٰفِرِیْنَ ﴿۷۱﴾ قِیْلَ  ادْخُلُوْۤا اَبْوَابَ جَهَنَّمَ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا ۚ فَبِئْسَ مَثْوَی الْمُتَكَبِّرِیْنَ ﴿۷۲﴾

সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন ওরা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হবে, তখন তার দরজা খুলে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা ওদেরকে বলবে, ‘তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্য হতে রসূল আসেনি; যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াত আবৃত্তি করত এবং এ দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তোমাদেরকে সতর্ক করত? ওরা বলবে, অবশ্যই এসেছিল। কিন্তু সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের প্রতি শাস্তির বাক্য বাস্তবায়িত হয়েছে। ওদেরকে বলা হবে, জাহান্নামে স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য তোমরা ওতে প্রবেশ কর। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল!’ সুরা জুমার : ৭১-৭২

জাহান্নামে প্রবিষ্ট হলে তার দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেখান থেকে বের হওয়ার কোন পথ থাকবে না কাফেরদের। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا بِاٰیٰتِنَا هُمْ اَصْحٰبُ الْمَشْـَٔمَۃِ ﴿ؕ۱۹﴾ عَلَیْهِمْ  نَارٌ  مُّؤْصَدَۃٌ ﴿۲۰﴾

পক্ষান্তরে যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হল হতভাগ্য। তাদের উপরই রয়েছে অবরুদ্ধ অগ্নি। সুরা বালাদ : ১৯-২০

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমাযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানগুলোকে শিকলবন্দী করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ১৮৯৯, সহিহ মুসলিম : ১০৭৯

৫. জাহান্নামের জ্বালালী

জাহান্নামের ইন্ধন বা জ্বালানী হবে এক শ্রেণীর মানুষ,  এক শ্রেণীল জিন ও এক শ্রেণীর পাথর। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَن تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ۖ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ

যদি তোমরা তা (আনয়ন) না কর, এবং কখনই তা করতে পারবে না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে। সুরা বাকারা : ২৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারপরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিশ্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। সুরা তাহরীম : ৬

এক শ্রেণীর জ্বিনও হবে জাহান্নামের ইন্ধন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّ اَنَّا مِنَّا  الْمُسْلِمُوْنَ وَ مِنَّا الْقٰسِطُوْنَ ؕ فَمَنْ  اَسْلَمَ فَاُولٰٓئِكَ تَحَرَّوْا  رَشَدًا ﴿۱۴﴾وَ  اَمَّا  الْقٰسِطُوْنَ فَكَانُوْا  لِجَهَنَّمَ حَطَبًا ﴿ۙ۱۵﴾

আর নিশ্চয় আমাদের (জিন) মধ্যে কিছু সংখ্যক আছে আত্মসমর্পণকারী এবং আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক সীমালংঘনকারী। কাজেই যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তারাই সঠিক পথ বেছে নিয়েছে’। ‘আর যারা সীমালঙ্ঘনকারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন’। সুরা জিন ১৪-১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ ؕ وَ لِذٰلِكَ خَلَقَهُمْ ؕ وَ تَمَّتْ كَلِمَۃُ رَبِّكَ لَاَمْلَـَٔنَّ  جَهَنَّمَ  مِنَ الْجِنَّۃِ  وَ النَّاسِ  اَجْمَعِیْنَ ﴿۱۱۹﴾

তবে যাদেরকে তোমার রব দয়া করেছেন, তারা ছাড়া। আর এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমার রবের কথা চূড়ান্ত হয়েছে যে, ‘নিশ্চয়ই আমি জাহান্নাম ভরে দেব জিন ও মানুষ দ্বারা একত্রে’। সুরা হুদ : ১১৯

৬. জাহান্নামের তত্ত্বাবধান হবেন ফিরেশতাগণ

জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে অসংখ্য ফিরিস্তা মোতায়েন আছেন। সেই ফিরিশতাগণের প্রকৃতি সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

 হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারপরিজনকে রক্ষা কর অগ্নি হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফিরিস্তাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে। সুরা তাহরিম : ৬

জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক ফিরিস্তার সংখ্যা উনিশ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

سَاُصْلِیْهِ سَقَرَ ﴿۲۶﴾وَ  مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا سَقَرُ ﴿ؕ۲۷﴾ لَا  تُبْقِیْ  وَ لَا  تَذَرُ ﴿ۚ۲۸﴾ لَوَّاحَۃٌ  لِّلْبَشَرِ ﴿ۚۖ۲۹﴾ عَلَیْهَا تِسْعَۃَ عَشَرَ ﴿ؕ۳۰﴾ وَ مَا جَعَلْنَاۤ  اَصْحٰبَ النَّارِ  اِلَّا مَلٰٓئِكَۃً ۪ وَّ مَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ  اِلَّا فِتْنَۃً لِّلَّذِیْنَ كَفَرُوْا ۙ لِیَسْتَیْقِنَ  الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ وَ یَزْدَادَ  الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِیْمَانًا وَّ لَا یَرْتَابَ  الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ ۙ وَ لِیَقُوْلَ الَّذِیْنَ  فِیْ  قُلُوْبِهِمْ  مَّرَضٌ وَّ الْکٰفِرُوْنَ مَاذَاۤ  اَرَادَ  اللّٰهُ  بِهٰذَا  مَثَلًا ؕ  كَذٰلِكَ یُضِلُّ  اللّٰهُ  مَنْ یَّشَآءُ  وَ  یَہْدِیْ  مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ مَا یَعْلَمُ جُنُوْدَ  رَبِّكَ اِلَّا هُوَ ؕ وَ مَا هِیَ  اِلَّا  ذِکْرٰی لِلْبَشَرِ ﴿۳۱﴾

আমি তাকে নিক্ষেপ করব সাক্কার (জাহান্নামে)। কিসে তোমাকে জানাল, সাক্বার কী? ওটা তাদেরকে (জীবিত অবস্থায়) রাখবে না, আর (মৃত অবস্থায়ও) ছেড়ে দেবে না। ওটা দেহের চামড়া দগ্ধ করে দেবে। ওর তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশ জন প্রহরী। আমি ফেরেশ্তাদেরকেই করেছি জাহান্নামের প্রহরী। আর অবিশ্বাসীদের পরীক্ষা স্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা উল্লেখ করেছি, যাতে কিতাবধারীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে, বিশ্বাসীদের বিশ্বাস বর্ধিত হয় এবং বিশ্বাসীরা ও কিতাবধারীগণ সন্দেহ পোষণ না করে। এর ফলে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা ও অবিশ্বাসীরা বলবে, এ বর্ণনায় আল্লাহর উদ্দেশ্য কি? এইভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ নির্দেশ করেন। তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন। (জাহান্নামের) এই বর্ণনা তো মানুষের জন্য উপদেশ বাণী। সুরা মুদ্দাসসির :২৬-৩১

উক্ত উনিষজন ফিরেশতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন-  

وَقَالَ الَّذِينَ فِي النَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ

জাহান্নামীরা জাহান্নামের প্রহরীদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতিপালককে বল, তিনি যেন আমাদের নিকট থেকে একদিনের শাস্তি লাঘব করেন। সুরা মুমিন : ৪৯

তাঁদের মধ্যে একজনের নাম হল মালেক। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ ۖ قَالَ إِنَّكُم مَّاكِثُونَ

ওরা চিৎকার করে বলবে, হে মালেক (জাহান্নামের অধিকর্তা)! তোমার প্রতিপালক আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিন। সে বলবে, তোমরা তো (চিরকাল) অবস্থান করবে। সুরা যুখরুফ : ৭৭

৭. জাহান্নামের অধিবাসীগণ

নীচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জাহান্নামের অধিবাসীদের দলিলসহ কিছু উদাহরণ দিলাম—

ক. কাফেররা বা অবিশ্বাসীরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ ۚ لَا یُقْضٰی عَلَیْهِمْ  فَیَمُوْتُوْا وَ لَا یُخَفَّفُ عَنْهُمْ  مِّنْ عَذَابِهَا ؕ كَذٰلِكَ  نَجْزِیْ  کُلَّ كَفُوْرٍ ﴿ۚ۳۶﴾

আর যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। সুরা ফাতির : ৩৬

খ. মুশরিকরা বা আল্লাহর সাথে শরিক স্থাপনকারীরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّہٗ مَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَیْهِ الْجَنَّۃَ وَ مَاْوٰىهُ النَّارُ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیْنَ مِنْ اَنْصَارٍ ﴿۷۲﴾

নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা মায়েদা : ৭২

গ. মুনাফিকরা বা কপট ঈমানদাররা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ فِی الدَّرْکِ الْاَسْفَلِ مِنَ النَّارِ ۚ  وَلَنْ تَجِدَ لَہُمْ نَصِیْرًا ۙ

নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না। সুরা নিসা : ১৪৫

ঘ. আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যকারীরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِلَّا بَلٰغًا مِّنَ اللّٰہِ وَرِسٰلٰتِہٖ ؕ  وَمَنْ یَّعْصِ اللّٰہَ وَرَسُوْلَہٗ فَاِنَّ لَہٗ نَارَ جَہَنَّمَ خٰلِدِیْنَ فِیْہَاۤ اَبَدًا ؕ

কেবল আল্লাহর বাণী ও তাঁর রিসালাত পৌঁছানোই দায়িত্ব। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাতে তারা চিরস্থায়ী হবে। সুরা জিন : ২৩

ঙ. আল্লাহর আয়াত ও আখিরাতকে অস্বীকারকারী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا وَکَذَّبُوْا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصْحٰبُ الْجَحِیْمِ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সূরা মায়েদাহ : ১০

চ. অহংকারী ও গর্বিতরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَادْخُلُوْۤا اَبْوَابَ جَہَنَّمَ خٰلِدِیْنَ فِیْہَا ؕ فَلَبِئْسَ مَثْوَی الْمُتَکَبِّرِیْنَ

সুতরাং তোমরা জাহান্নামের দরজাগুলো দিয়ে প্রবেশ কর, তাতে স্থায়ী হয়ে। অতএব অবশ্যই অহঙ্কারীদের আবাস অতিনিকৃষ্ট। সুনা নাহল : ২৯

ছ. যাদুকররা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ وَلَقَدْ عَلِمُوْا لَمَنِ اشْتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الْاٰخِرَۃِ مِنْ خَلَاقٍ

এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা (জাদু) ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। সুরা বাকারা : ১০২

জ. সুদখোররা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ عَادَ فَأُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

এবং যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানেই চিরকাল অবস্থান করবে। সুরা রাকারা : ২৭৫

ঝ. আত্মহত্যাকারীরা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে, চিরকাল সে জাহান্নামের ভিতর ঐভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে লোক বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে লোক লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের ভিতর সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে। সহিহ বুখারি : ৫৭৭৮, সহিহ মুসলিম : ১০৯, আহমাদ : ১০৩৪১০

ঞ. অন্যায়ভাবে হত্যাকারীরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ یَّقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُہٗ جَہَنَّمُ خٰلِدًا فِیْہَا وَغَضِبَ اللّٰہُ عَلَیْہِ وَلَعَنَہٗ وَاَعَدَّ لَہٗ عَذَابًا عَظِیْمًا

আর যে ইচ্ছাকৃত কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা‘নত করবেন এবং তার জন্য বিশাল আযাব প্রস্তুত করে রাখবেন। সূরা আন-নিসা : ৯৩

ট. এতিমের সম্পদ গ্রাসকারীরা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیْنَ یَاْکُلُوْنَ اَمْوَالَ الْیَتٰمٰی ظُلْمًا اِنَّمَا یَاْکُلُوْنَ فِیْ بُطُوْنِہِمْ نَارًا ؕ  وَسَیَصْلَوْنَ سَعِیْرًا 

নিশ্চয় যারা ইয়াতীমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে; আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। সূরা আন-নিসা : ১০

ঠ. সালাত  ত্যাগকারীরা বা অবহেলাকারী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَخَلَفَ مِنْۢ بَعْدِہِمْ خَلْفٌ اَضَاعُوا الصَّلٰوۃَ وَاتَّبَعُوا الشَّہَوٰتِ فَسَوْفَ یَلْقَوْنَ غَیًّا ۙ

তাদের পরে আসল এমন এক অসৎ বংশধর যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং শীঘ্রই তারা জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। সূরা মারইয়াম : ৫৯

৮. জাহান্নামের আগুনের তিব্রতা

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী জাহান্নামের আগুন পৃথিবীর আগুনের তুলনায় এতটাই তীব্র ও ভয়ঙ্কর যে মানুষের কল্পনাশক্তিও তার প্রকৃত ভয়াবহতা ধারণ করতে পারে না। নিচে সংক্ষেপে কুরআন ও হাদিসের দলিলসহ ধারণা তুলে ধরা হলো—

ক. কুরআনের আলোক জাহান্নামের আগুনের তিব্রতা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِذَا  رَاَتْهُمْ مِّنْ مَّكَانٍۭ بَعِیْدٍ سَمِعُوْا  لَهَا تَغَیُّظًا وَّ  زَفِیْرًا ﴿۱۲﴾

দূর হতে আগুন যখন তাদেরকে দেখবে তখন তারা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও প্রচন্ড চিৎকার শুনতে পাবে। সুরা ফুরকান : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوْهُهُمْ فِی النَّارِ یَقُوْلُوْنَ یٰلَیْتَنَاۤ  اَطَعْنَا اللّٰهَ  وَ اَطَعْنَا الرَّسُوْلَا ﴿۶۶﴾

যেদিন তাদের চেহারাগুলো আগুনে উপুড় করে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসূলের আনুগত্য করতাম’! সুরা আহজাব : ৬৬

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَ اَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ﴿۸﴾ فَاُمُّہٗ  هَاوِیَۃٌ ؕ﴿۹﴾ وَ مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا هِیَہْ ﴿ؕ۱۰﴾  نَارٌ حَامِیَۃٌ ﴿۱۱﴾

অর্থাৎ, কিন্তু যার পাল্লা হাল্কা হবে, তার স্থান হবে হাবিয়াহ। কিসে তোমাকে জানাল, তা কি? তা অতি উত্তপ্ত অগ্নি। সুরা কারিয়াহ : ৮-১১

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَ اَصْحٰبُ الشِّمَالِ ۬ۙ مَاۤ  اَصْحٰبُ  الشِّمَالِ ﴿ؕ۴۱﴾ فِیْ  سَمُوْمٍ  وَّ  حَمِیْمٍ ﴿ۙ۴۲﴾ وَّ ظِلٍّ  مِّنْ  یَّحْمُوْمٍ ﴿ۙ۴۳﴾ لَّا  بَارِدٍ  وَّ  لَا كَرِیْمٍ ﴿۴۴﴾

আর বাম হাত-ওয়ালারা, কত হতভাগা বাম হাত-ওয়ালারা! তারা থাকবে অতি গরম বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে। কালোবর্ণ ধোয়ার ছায়ায়। যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়। সুরা ওয়াকিয়া : ৪১-৪৪

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

سَاُصْلِیْهِ سَقَرَ ﴿۲۶﴾ وَ  مَاۤ  اَدْرٰىكَ مَا سَقَرُ ﴿ؕ۲۷﴾ لَا  تُبْقِیْ  وَ لَا  تَذَرُ ﴿ۚ۲۸﴾ لَوَّاحَۃٌ  لِّلْبَشَرِ ﴿ۚۖ۲۹﴾

আমি তাকে নিক্ষেপ করব সাক্কার (জাহান্নামে)। কিসে তোমাকে জানাল, সাক্বার কী? ওটা তাদেরকে জীবিত অবস্থায় রাখবে না, আর (মৃত অবস্থায়ও) ছেড়ে দেবে না। ওটা দেহের চামড়া দগ্ধ করে দেবে।  সুরা মুদ্দাসসির : ২৬-২৯

খ. জাহান্নামের আগুনের দুনিয়ার থেকে সত্তর গুন বেশি উত্তপ্ত

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের একভাগ মাত্র। বলা হল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য দুনিয়ার আগুনই তো যথেষ্ট ছিল।’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার আগুনের উপর জাহান্নামের আগুনের তাপ আরো ঊনসত্তর গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, প্রত্যেক অংশে তার সম পরিমাণ উত্তাপ রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩২৬৫

গ. গ্রীষ্মতাপকে জাহান্নামেরই তাপ

আবূ যার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ছিলাম। এক সময় মুয়ায্যিন যুহরের আযান দিতে চেয়েছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ গরম কমতে দাও। কিছুক্ষণ পর আবার মুয়ায্যিন আযান দিতে চাইলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (পুনরায়) বললেনঃ গরম কমতে দাও। এভাবে তিনি (সালাত আদায়ে) এতো বিলম্ব করলেন যে, আমরা টিলাগুলো ছায়া দেখতে পেলাম। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের উত্তাপ হতে। কাজেই গরম প্রচন্ড হলে উত্তাপ কমার পর সালাত আদায় করো। সহিহ বুখারি : ৫৩৯, সহিহ মুসলিম : ৬১৫

৫৩৭. জাহান্নাম তার প্রতিপালকের নিকট এ বলে নালিশ করেছিলো, হে আমার প্রতিপালক! (দহনের প্রচন্ডতায়) আমার এক অংশ আর এক অংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে দু’টি শ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন, একটি শীতকালে আর একটি গ্রীষ্মকালে। আর সে দু’টি হলো, তোমরা গ্রীষ্মকালে যে প্রচন্ড উত্তাপ এবং শীতকালে যে প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভব কর তাই। সহিহ বূখারি : ৫৩৭, ৩২৬০, সহিহ মুসলিম : ৬১৫, ৬১৭, আহমাদ : ৭২৫১

ঘ. জাহান্নামের আগুনের রঙ কালো

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ الَّذِیْنَ كَسَبُوا السَّیِّاٰتِ جَزَآءُ سَیِّئَۃٍۭ بِمِثْلِهَا ۙ وَ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّۃٌ ؕ مَا لَهُمْ مِّنَ اللّٰهِ مِنْ عَاصِمٍ ۚ كَاَنَّمَاۤ  اُغْشِیَتْ وُجُوْهُهُمْ قِطَعًا مِّنَ الَّیْلِ مُظْلِمًا ؕ اُولٰٓئِكَ اَصْحٰبُ النَّارِ ۚ هُمْ فِیْهَا خٰلِدُوْنَ ﴿۲۷﴾

আর যারা মন্দ উপার্জন করবে, প্রতিটি মন্দের প্রতিদান হবে তারই অনুরূপ; আর লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। আল্লাহর পাকড়াও থেকে তাদের কোন রক্ষাকারী নেই। যেন অন্ধকার রাতের এক অংশ দিয়ে তাদের চেহারাগুলো ঢেকে দেয়া হয়েছে। তারাই আগুনের অধিবাসী, তারা তাতে স্থায়ী হবে। সুরা ইউনুস : ২৭

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَ اَصْحٰبُ الشِّمَالِ ۬ۙ مَاۤ  اَصْحٰبُ  الشِّمَالِ ﴿ؕ۴۱﴾ فِیْ  سَمُوْمٍ  وَّ  حَمِیْمٍ ﴿ۙ۴۲﴾ وَّ ظِلٍّ  مِّنْ  یَّحْمُوْمٍ ﴿ۙ۴۳﴾ لَّا  بَارِدٍ  وَّ  لَا كَرِیْمٍ ﴿۴۴﴾

আর বাম হাত-ওয়ালারা, কত হতভাগা বাম হাত-ওয়ালারা! তারা থাকবে অতি গরম বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে। কালোবর্ণ ধোয়ার ছায়ায়। যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়। সুরা ওয়াকিয়া : ৪১-৪৪

একটি জঈফ হাদিসে জাহান্নামের আগুন কালো বর্ণ হওয়ার কথা আছে।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জাহান্নামের আগুন হাজার বছর ধরে উত্তপ্ত করার পর তা সাদা রং ধারণ করে আবার তা হাজার বছর ধরে উতপ্ত করার পর লাল রং ধারণ করে। আবার হাজার বছর ধরে উত্তপ্ত করার পর তা কালো বর্ণ ধারণ করে। এখন তা গভীর অন্ধকার রাতের মতো অন্ধকার অবস্থায় আছে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩২০, সুনানে তিরমিজি : ২৫৯১ হাদিসের মান জঈফ

জাহান্নামের বিবরণ : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৯. জাহান্নামের দর্শন ও কথন

কিয়ামতের দিন জাহান্নাম নিজেই কথা বলবে, যা কাফিরদের জন্য এক ভয়ংকর বাস্তবতা। সূরা ফুরকান ও মূলকের আয়াতে বলা হয়েছে, জাহান্নাম দূর থেকেই কাফিরদের প্রতি ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার করবে। এর আগুনের তীব্র রোষে যেন তা ফেটে পড়বে। যখন কাফিরদেরকে তাতে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নামের রক্ষীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে, “তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?” এ থেকে বোঝা যায়, জাহান্নাম শুধু শাস্তির স্থান নয়, বরং তা জীবিত সত্তার মতো অনুভূতি ও কথোপকথনের ক্ষমতা রাখে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ ۖ وَأَعْتَدْنَا لِمَن كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا (11) إِذَا رَأَتْهُم مِّن مَّكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا (12)

বরং ওরা কিয়ামতকে মিথ্যা মনে করে। আর যারা কিয়ামতকে মিথ্যা মনে করে, তাদের জন্য আমি জ্বলন্ত জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি। দূর হতে (জাহান্নাম) যখন ওদেরকে দেখবে, তখন ওরা তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার শুনতে পাবে। সুরা ফুরকান : ১১-১২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلِلَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (6) إِذَا أُلْقُوا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُ (7) تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ ۖ كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ (8)

আর যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি, আর তা বড় নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! যখন তারা তাতে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন জাহান্নামের গর্জন শুনবে, আর তা উদ্বেলিত হবে। রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে, যখনই তাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তখনই তাদেরকে তার রক্ষীরা জিজ্ঞাসা করবে, ‘তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসেনি?’ সুরা মুলক : ৬-৮

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে জাহান্নাম হতে একটি গর্দান (মাথা) বের হবে। এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে, দুটি কান থাকবে যা দিয়ে সে শুনবে এবং একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। সে বলবে, তিন ধরনের লোকের জন্য আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছেঃ (১) প্রতিটি অবাধ্য অহংকারী যালিমের জন্য, (২) আল্লাহ তা’আলার সাথে অন্য কোন কিছুকে যে ব্যক্তি ইলাহ বলে ডাকে তার জন্য এবং (৩) ছবি নির্মাতাদের জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৫৭৪, সহীহাহ : ৫১২

১০. জাহান্নামের অধিবাসীগণ একে অপরকে দোষারোপ করবে

কাফির ও মুশরিকদের যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা চরম হতাশা ও আক্ষেপে একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করবে। তারা পরস্পরের প্রতি রাগ, ঘৃণা ও অভিশাপ বর্ষণ করবে। একদল নিজেদের পূর্বসূরি ও পূর্ববর্তী বিভ্রান্ত অনুসারীদের দোষারোপ করবে, যারা তাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। অপরদল দোষ চাপাবে তাদের নেতাদের ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপর, যারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেখিয়ে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করেছিল। এভাবেই তারা পরস্পরের উপর দায় চাপিয়ে নিজেদের মুক্তি খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করবে, কিন্তু তাতে তাদের শাস্তি বিন্দুমাত্র কমবে না, বরং আক্ষেপ ও যন্ত্রণাই আরও বাড়বে। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনেক কথা বলেছেন তার কিছু এখানে তুলে ধরলাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قَالَ ادْخُلُوْا فِیْۤ  اُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِکُمْ مِّنَ الْجِنِّ وَ الْاِنْسِ فِی النَّارِ ؕ کُلَّمَا دَخَلَتْ اُمَّۃٌ  لَّعَنَتْ اُخْتَهَا ؕ حَتّٰۤی اِذَا ادَّارَکُوْا فِیْهَا جَمِیْعًا ۙ قَالَتْ اُخْرٰىهُمْ  لِاُوْلٰىهُمْ رَبَّنَا هٰۤؤُلَآءِ اَضَلُّوْنَا فَاٰتِهِمْ عَذَابًا ضِعْفًا مِّنَ النَّارِ ۬ؕ قَالَ لِکُلٍّ ضِعْفٌ وَّ لٰكِنْ  لَّا  تَعْلَمُوْنَ ﴿۳۸﴾ وَ قَالَتْ اُوْلٰىهُمْ لِاُخْرٰىهُمْ فَمَا كَانَ لَکُمْ عَلَیْنَا مِنْ فَضْلٍ فَذُوْقُوا الْعَذَابَ بِمَا کُنْتُمْ تَکْسِبُوْنَ ﴿۳۹﴾

“তিনি বলবেন, আগুনে প্রবেশ কর জিন্ন ও মানুষের দলগুলোর সাথে, যারা তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে। যখনই একটি দল প্রবেশ করবে, তখন পূর্বের দলকে তারা লানত করবে। অবশেষে যখন তারা সবাই তাতে একত্রিত হবে তখন তাদের পরবর্তী দলটি পূর্বের দল সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব, এরা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। তাই আপনি তাদেরকে আগুনের দ্বিগুণ আযাব দিন। তিনি বলবেন, সবার জন্য দ্বিগুণ, কিন্তু তোমরা জান না। আর তাদের পূর্ববর্তী দল পরবর্তী দলকে বলবে, তাহলে আমাদের উপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। অতএব, তোমরা যা অর্জন করেছিলে, তার কারণে তোমরা আযাব আস্বাদন কর”। সূরা আরাফ : ৩৮-৩৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اِذْ یَتَحَآجُّوْنَ فِی النَّارِ فَیَقُوْلُ الضُّعَفٰٓؤُا لِلَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْۤا اِنَّا کُنَّا لَکُمْ تَبَعًا فَهَلْ  اَنْتُمْ مُّغْنُوْنَ عَنَّا نَصِیْبًا مِّنَ النَّارِ ﴿۴۷﴾ قَالَ الَّذِیْنَ اسْتَکْبَرُوْۤا  اِنَّا  کُلٌّ  فِیْهَاۤ  ۙ اِنَّ اللّٰهَ  قَدْ حَكَمَ  بَیْنَ الْعِبَادِ ﴿۴۸﴾ وَ قَالَ الَّذِیْنَ فِی النَّارِ لِخَزَنَۃِ جَهَنَّمَ ادْعُوْا رَبَّکُمْ یُخَفِّفْ عَنَّا یَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ ﴿۴۹﴾ قَالُوْۤا  اَوَ لَمْ تَکُ تَاْتِیْکُمْ رُسُلُکُمْ بِالْبَیِّنٰتِ ؕ قَالُوْا  بَلٰی ؕ قَالُوْا فَادْعُوْا ۚ وَ مَا  دُعٰٓؤُا الْکٰفِرِیْنَ  اِلَّا فِیْ ضَلٰلٍ ﴿٪۵۰﴾

আর জাহান্নামে তারা যখন বানানুবাদে লিপ্ত হবে তখন দুর্বলরা, যারা অহঙ্কার করেছিল, তাদেরকে বলবে, আমরা তো তোমাদের অনুসারী ছিলাম। অতএব, তোমরা কি আমাদের থেকে আগুনের কিয়দংশ বহন করবে? অহঙ্কারীরা বলবে, আমরা সবাই এতে আছি; নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা করে ফেলেছেন। আর যারা আগুনে থাকবে তারা আগুনের দারোয়ানদেরকে বলবে, তোমাদের রবকে একটু ডাকো না! তিনি যেন একটি দিন আমাদের আযাব লাঘব করে দেন। তারা বলবে, তোমাদের কাছে কি সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তোমাদের রাসূলগণ আসেনি? জাহান্নামীরা বলবে, হ্যাঁ অবশ্যই। দারোয়ানরা বলবে, তবে তোমরাই দো‘আ কর। আর কাফিরদের দো‘আ কেবল নিষ্ফলই হয়”। সূরা মুমিন : ৪৭-৫০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَرَزُواْ لِلَّهِ جَمِيعٗا فَقَالَ ٱلضُّعَفَٰٓؤُاْ لِلَّذِينَ ٱسْتَكْبَرُوٓاْ إِنَّا كُنَّا لَكُمْ تَبَعٗا فَهَلْ أَنتُم مُّغْنُونَ عَنَّا مِنْ عَذَابِ ٱللَّهِ مِن شَيْءٖۚ قَالُواْ لَوْ هَدَىٰنَا ٱللَّهُ لَهَدَيْنَٰكُمْۖ سَوَآءٌ عَلَيْنَآ أَجَزِعْنَآ أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِن مَّحِيصٖ ٢١

“আর তারা সবাই আল্লাহর সামনে হাজির হবে, অতঃপর যারা অহঙ্কার করেছে দুর্বলরা তাদেরকে বলবে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম। সুতরাং তোমরা কি আল্লাহর আযাবের মোকাবেলায় আমাদের কোনো উপকারে আসবে? তারা বলবে, যদি আল্লাহ আমাদের হিদায়াত করতেন, তাহলে আমরাও তোমাদের হিদায়াত করতাম। এখন আমরা অস্থির হই কিংবা ধৈর্য ধারণ করি, উভয় অবস্থাই আমাদের জন্য সমান। আমাদের পালানোর কোনো জায়গা নেই”। সূরা ইবরাহীম : ২১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَعَنَ ٱلْكَٰفِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا ٦٤ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۖ لَّا يَجِدُونَ وَلِيّٗا وَلَا نَصِيرٗا ٦٥ يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي ٱلنَّارِ يَقُولُونَ يَٰلَيْتَنَآ أَطَعْنَا ٱللَّهَ وَأَطَعْنَا ٱلرَّسُولَا۠ ٦٦ وَقَالُواْ رَبَّنَآ إِنَّآ أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَآءَنَا فَأَضَلُّونَا ٱلسَّبِيلَا۠ ٦٧ رَبَّنَآ ءَاتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ ٱلْعَذَابِ وَٱلْعَنْهُمْ لَعْنٗا كَبِيرٗا

“নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে লানত করেছেন এবং তাদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছেন। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। তারা না পাবে কোনো অভিভাবক এবং না কোনো সাহায্যকারী। যেদিন তাদের চেহারাগুলো আগুনে উপুড় করে দেওয়া হবে, তারা বলবে, হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসূলের আনুগত্য করতাম, তারা আরো বলবে, হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের রব, আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দিন এবং তাদেরকে বেশি করে লা‘নত করুন”। সূরা আহযাব : ৬৪-৬৮ 

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

﴿ وَبُرِّزَتِ ٱلْجَحِيمُ لِلْغَاوِينَ ٩١ وَقِيلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ ٩٢ مِن دُونِ ٱللَّهِ هَلْ يَنصُرُونَكُمْ أَوْ يَنتَصِرُونَ ٩٣ فَكُبْكِبُواْ فِيهَا هُمْ وَٱلْغَاوُۥنَ ٩٤ وَجُنُودُ إِبْلِيسَ أَجْمَعُونَ ٩٥ قَالُواْ وَهُمْ فِيهَا يَخْتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذْ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ ٩٨ وَمَآ أَضَلَّنَآ إِلَّا ٱلْمُجْرِمُونَ ٩٩ فَمَا لَنَا مِن شَٰفِعِينَ ١٠٠ وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٖ ١٠١ فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةٗ فَنَكُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ ١٠٢

“এবং পথভ্রষ্টকারীদের জন্য জাহান্নাম উন্মোচিত করা হবে। আর তাদেরকে বলা হবে, তারা কোথায় যাদের তোমরা ইবাদাত করতে আল্লাহ ছাড়া? তারা কি তোমাদেরকে সাহায্য করছে, না নিজেদের সাহায্য করতে পারছে। অতঃপর তাদেরকে এবং পথভ্রষ্টকারীদেরকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, আর ইবলিসের সকল সৈন্যবাহিনীকেও। সেখানে পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর কসম! আমরা তো সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম। আর অপরাধীরাই শুধু আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। অতএব, আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধুও নেই। হায়, আমাদের যদি আরেকটি সুযোগ হত, তবে আমরা মুমিনদের অর্ন্তভুক্ত হতাম”। সূরা শুআরা : ৯১-১০২

১১. অনুসারীদের থেকে শয়তানের দায়মুক্তির ঘোষনা করবে

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ছিল সত্য, কিন্তু আমি মিথ্যা বলেছি। তোমাদের ওপর আমার কোনো জোর-জবরদস্তি ছিল না, শুধু প্রলোভন দিয়েছি আর তোমরা তা মেনে নিয়েছ। তাই আমার উপর নয়, নিজেদেরকেই দোষ দাও। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالَ الشَّیۡطٰنُ لَمَّا قُضِیَ الۡاَمۡرُ اِنَّ اللّٰہَ وَعَدَکُمۡ وَعۡدَ الۡحَقِّ وَوَعَدۡتُّکُمۡ فَاَخۡلَفۡتُکُمۡ ؕ وَمَا کَانَ لِیَ عَلَیۡکُمۡ مِّنۡ سُلۡطٰنٍ اِلَّاۤ اَنۡ دَعَوۡتُکُمۡ فَاسۡتَجَبۡتُمۡ لِیۡ ۚ فَلَا تَلُوۡمُوۡنِیۡ وَلُوۡمُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ مَاۤ اَنَا بِمُصۡرِخِکُمۡ وَمَاۤ اَنۡتُمۡ بِمُصۡرِخِیَّ ؕ اِنِّیۡ کَفَرۡتُ بِمَاۤ اَشۡرَکۡتُمُوۡنِ مِنۡ قَبۡلُ ؕ اِنَّ الظّٰلِمِیۡنَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ

আর যখন যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তবে আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, এখন আমি তা ভঙ্গ করলাম। তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, আর তোমরা আমার দাওয়াতে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না, বরং নিজদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, আর তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা আমাকে যার সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয় আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। সূরা ইবরাহীম : ২২

১২. জাহান্নামবাসীদের শুধু আফসোস করতে থাকবে

জাহান্নাবাসীরা জাহান্নামে গিয়ে যে আফসোস ও অনুতাপ করবে, তার বিস্তারিত বর্ণনা মহান আল্লাহ কুরআনে তুলে ধরেছেন। সহিহ হাদিসে এ সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। নিচে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَأَسَرُّواْ ٱلنَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَۚ وَجَعَلۡنَا ٱلۡأَغۡلَٰلَ فِيٓ أَعۡنَاقِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْۖ هَلۡ يُجۡزَوۡنَ إِلَّا مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

আর তারা যখন আযাব দেখবে তখন তারা অনুতাপ গোপন করবে। আর আমি কাফিরদের গলায় শৃঙ্খল পরিয়ে দেব। তারা যা করত কেবল তারই প্রতিফল তাদেরকে দেওয়া হবে”। সূরা সাবা :৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَوۡ أَنَّ لِكُلِّ نَفۡسٖ ظَلَمَتۡ مَا فِي ٱلۡأَرۡضِ لَٱفۡتَدَتۡ بِهِۦۗ وَأَسَرُّواْ ٱلنَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَۖ وَقُضِيَ بَيۡنَهُم بِٱلۡقِسۡطِ وَهُمۡ لَا يُظۡلَمُونَ ٥٤

আর যমীনে যা রয়েছে, তা যদি যুলুম করেছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তির হয়ে যায়, তবে তা সে মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে দিবে এবং তারা লজ্জা গোপন করবে, যখন তারা আযাব দেখবে। আর তাদের মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করা হবে এবং তাদেরকে যুলুম করা হবে না”। সূরা ইউনূস : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوۡمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيۡهِ يَقُولُ يَٰلَيۡتَنِي ٱتَّخَذۡتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلٗا ٢٧ يَٰوَيۡلَتَىٰ لَيۡتَنِي لَمۡ أَتَّخِذۡ فُلَانًا خَلِيلٗا ٢٨ لَّقَدۡ أَضَلَّنِي عَنِ ٱلذِّكۡرِ بَعۡدَ إِذۡ جَآءَنِيۗ وَكَانَ ٱلشَّيۡطَٰنُ لِلۡإِنسَٰنِ خَذُولٗا

আর সেদিন যালিম (অনুতাপে) নিজের হাত দুটো কামড়িয়ে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোনো পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। অবশ্যই সে তো আমাকে উপদেশবাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে তা আসার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য চরম প্রতারক”। সূরা ফুরকান : ২৭-২৯

এ সম্পর্ক দুটি সহিহ হাদিস তুলে ধরছি-

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক জান্নাতীকে যদি তার কর্ম খারাপ হতো তাহলে জাহান্নামে তার অবস্থান কোথায় হত তা দেখানো হবে। তখন সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আর প্রত্যেক জাহান্নামীকে, যদি তার কর্ম ভালো হতো তাহলে জান্নাতে তার অবস্থান কোথায় হতো তা দেখানো হবে। তখন সে অনুতাপ করবে”। সহীহ বুখারী : ৬৫৬৯।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন জান্নাতীরা জান্নাতে যাবে আর জাহান্নামীরা জাহান্নামে যাবে তখন মুত্যুকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থানে জবেহ করে দেওয়া হবে। অতঃপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবে, হে জান্নাতবাসীরা! আর কোনো মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসীরা! আর কোনো মৃত্যু নেই। এ ঘোষণা শুনে জান্নাতীদের আনন্দ-ফুর্তি আরো বেড়ে যাবে। আর জাহান্নামীদের দুঃখ- অনুতাপ আরো বেড়ে যাবে। (বর্ণনায়: বুখারী ও মুসলিম) আবু সায়ীদ আল খুদরী বর্ণিত মুসলিমের বর্ণনায় একটি বাক্য বেশি আছে। তা হলো: একথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করেছেন যে,

وَأَنذِرۡهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡحَسۡرَةِ إِذۡ قُضِيَ ٱلۡأَمۡرُ وَهُمۡ فِي غَفۡلَةٖ وَهُمۡ لَا يُؤۡمِنُونَ

আর তাদেরকে সতর্ক করে দাও পরিতাপ দিবস সম্পর্কে যখন সব বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে, অথচ তারা রয়েছে উদাসীনতায় বিভোর এবং তারা ঈমান আনছে না”। সূরা মারইয়াম : ৩৯।

উদাসীনতায় বিভোর কথাটি বলার সময় তিনি দুনিয়ার দিকে হাত দ্বারা ইশারা করেছেন”। সহীহ বুখারী : ৬৫৪৮; সহীহ মুসলিম : ২৮৪৯।

১৩. কাফিররা ও মুশরিকদের জাহান্নামে স্থায়ী হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা বাকারা : ৩৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَوۡلِیٰٓـُٔہُمُ الطَّاغُوۡتُ ۙ  یُخۡرِجُوۡنَہُمۡ مِّنَ النُّوۡرِ اِلَی الظُّلُمٰتِ ؕ  اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। সুরা বাকারা : ২৫৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَنۡ تُغۡنِیَ عَنۡہُمۡ اَمۡوَالُہُمۡ وَلَاۤ اَوۡلَادُہُمۡ مِّنَ اللّٰہِ شَیۡـًٔا ؕ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

নিশ্চয় যারা কুফরী করে, আল্লাহর বিপক্ষে তাদের ধন-সম্পদ না তাদের কোন কাজে আসবে, আর না তাদের সন্তানাদি। আর তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা আল ইমরান : ১১৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ ٱلۡمُجۡرِمِينَ فِي عَذَابِ جَهَنَّمَ خَٰلِدُونَ ٧٤ لَا يُفَتَّرُ عَنۡهُمۡ وَهُمۡ فِيهِ مُبۡلِسُونَ ٧٥ وَمَا ظَلَمۡنَٰهُمۡ وَلَٰكِن كَانُواْ هُمُ ٱلظَّٰلِمِينَ ٧٦ وَنَادَوۡاْ يَٰمَٰلِكُ لِيَقۡضِ عَلَيۡنَا رَبُّكَۖ قَالَ إِنَّكُم مَّٰكِثُونَ ٧٧ لَقَدۡ جِئۡنَٰكُم بِٱلۡحَقِّ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَكُمۡ لِلۡحَقِّ كَٰرِهُونَ ٧٨

নিশ্চয় অপরাধীরা জাহান্নামের আযাবে স্থায়ী হবে, তাদের থেকে আযাব কমানো হবে না এবং তাতে তারা হতাশ হয়ে পড়বে। আর আমি তাদের উপর যুলুম করি নি; কিন্তু তারাই ছিল যালিম। তারা চিৎকার করে বলবে, হে মালিক, তোমার রব যেন আমাদেরকে শেষ করে দেন। সে বলবে, নিশ্চয় তোমরা অবস্থানকারী। অবশ্যই তোমাদের কাছে আমি সত্য নিয়ে এসেছিলাম; কিন্তু তোমাদের অধিকাংশই ছিলে সত্য অপছন্দকারী”। সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৭৪-৭৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

﴿ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَهُمۡ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقۡضَىٰ عَلَيۡهِمۡ فَيَمُوتُواْ وَلَا يُخَفَّفُ عَنۡهُم مِّنۡ عَذَابِهَاۚ كَذَٰلِكَ نَجۡزِي كُلَّ كَفُورٖ ٣٦ وَهُمۡ يَصۡطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَآ أَخۡرِجۡنَا نَعۡمَلۡ صَٰلِحًا غَيۡرَ ٱلَّذِي كُنَّا نَعۡمَلُۚ أَوَ لَمۡ نُعَمِّرۡكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَآءَكُمُ ٱلنَّذِيرُۖ فَذُوقُواْ فَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِن نَّصِيرٍ ٣٧

“আর যারা কুফুরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোনো ফয়সালা দেওয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। আর সেখানে তারা আর্তনাদ করে বলবে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করে দিন, আমরা পূর্বে যে আমল করতাম, তার পরিবর্তে আমরা নেক আমল করব। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি যে, তখন কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল। কাজেই তোমরা আযাব আস্বাদন কর, আর যালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই”। সূরা ফাতির : ৩৬-৩৭

১৪. চিরস্থায়ী জাহান্নামী হওয়ার প্রধান প্রধান কারণ

প্রত্যেক শাস্তির একটা সীমা আছে। কিন্তু কিছু অপরাধকে মহান আল্লাহ ক্ষমা অযোগ্য ঘোষণা করেছেন। এ সকল গুনাহের শাস্তি অসীম। এ সকল অপবাধ সম্পর্কে কুরআনে শত শত আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।   এখানে কতিপয় অপরাধের কথা উল্লেখ করা হল-

ক. কুফরি করলে বা অস্বীকার করলে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা বাকার : ৩৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَتۡلُوۡنَہٗ حَقَّ تِلَاوَتِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ ؕ  وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ 

যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যথার্থভাবে। তারাই তার প্রতি ঈমান আনে। আর যে তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। সুরা বাকারা : ১২১

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡفُرُونَ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيۡنَ ٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيَقُولُونَ نُؤۡمِنُ بِبَعۡضٍ۬ وَنَڪۡفُرُ بِبَعۡضٍ۬ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيۡنَ ذَٲلِكَ سَبِيلاً ٠ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ حَقًّ۬ا‌ۚ وَأَعۡتَدۡنَا لِلۡكَـٰفِرِينَ عَذَابً۬ا مُّهِينً۬ا

নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে, ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি আর কতকের সাথে কুফরী করি এবং তারা এর মাঝামাঝি একটি পথ গ্রহণ করতে চায়। তারাই প্রকৃত কাফির এবং আমি কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করেছি অপমানকর আযাব। সূরা নিসা : ১৫০-১৫১

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

*اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَ مَاتُوۡا وَ هُمۡ کُفَّارٌ اُولٰٓئِکَ عَلَیۡهِمۡ لَعۡنَۃُ اللّٰهِ وَ الۡمَلٰٓئِکَۃِ وَ النَّاسِ اَجۡمَعِیۡنَ *

নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের লানত। সূরা আল বাকারা : ১৬১

এই সম্পর্কিত হাদিস জানতে দেখুন-

সহিহ বুখারি : ১৬, ২১, ২৬৫৪, ৩৫০৮, ৬৮৫৭, ৬০৪১, সহিহ মুসলিম : ৪৩, ৬১, ২৭২, ২৬৯, সুনানে তিরমিযী : ১৯০১, ২৬২৪, ৩০১৯, সুনানে নাসায়ী : ৪৯৮৭, ৪৯৮৮, ৪৯৮৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৩৩।

খ. শির্ক বা অংশীদার স্থাপন করলে

আল্লাহর রুববিয়্যাহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করা কে শির্ক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শি‌র্ক। ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিটি অনু পরমাণু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ইসলামে এমন কোনো নিয়মনীতি নেই, যেখানে এই শির্কের সামান্য গন্ধও খুঁজে পাওয়া যাবে। ইসলামে শির্ক হচ্ছে একটি ভয়াবহ কবিরা গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। শির্ককারির গুনাহ মাপ হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفۡتَرَىٰٓ إِثۡمًا عَظِيمًا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেননা এবং এ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে কেহ আল্লাহর অংশী স্থির করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হল। সূরা নিসা : ৪৮

শির্ক কারির সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয় হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ

আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহি হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শিরক করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন বলে গণ্য হবেন। সূরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا

এবং তাদের সমস্ত কৃতকর্ম নিয়ে আমি ধূলোর মতো উড়িয়ে দেবো৷ (সুরা ফুরকান ২৩)

মুশরিক জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বাইয়্যিনাহ : ৬

এই সম্পর্কিত হাদিস জানতে দেখুন-

সহিহ বুখারি : ১৮, ১২৩৮, ২৬৫৪, ২৭৬৬, ২৭৬৭, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, সহিহ মুসলিম : ৮৯, ১৭০৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৬৭১, ৪১৬১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫৩৬।

গ. আল্লাহ তায়ালার পাশাপাশি অন্য ইলাহ স্বীকার করলে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُ‌ۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِى مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِى مَنۡ هُوَ كَـٰذِبٌ۬ ڪَفَّارٌ۬

জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। সুরা জুমার : ০৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَیَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰہَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন’? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সূরা ইউনুস : ১৮

ঘ. মহান আল্লাহ নামে মিথ্যা বললে

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِٱلْحَقِّ لَمَّا جَآءَهُۥٓۚ أَلَيْسَ فِى جَهَنَّمَ مَثْوًى لِّلْكَٰفِرِينَ

আর সে ব্যক্তির চেয়ে যালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তার নিকট সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে? জাহান্নামের মধ্যেই কি কাফিরদের আবাস নয়? সুরা আনকাবুত : ৬৮

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِـَٔايَٰتِهِۦٓۗ إِنَّهُۥ لَا يُفْلِحُ ٱلظَّٰلِمُونَ

আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে? নিশ্চয়ই যালিমরা সফলকাম হয় না। সুরা আনাম : ২১

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِـَٔايَٰتِهِۦٓۚ

সুতরাং তার চেয়ে কে অধিক যালিম, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ রটায় কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। সুরা আরাফ : ৩৭

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَبَ عَلَى ٱللَّهِ وَكَذَّبَ بِٱلصِّدْقِ إِذْ جَآءَهُۥٓۚ أَلَيْسَ فِى جَهَنَّمَ مَثْوًى لِّلْكَٰفِرِينَ

তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাসস্থল নয়? সুরা যুমার : ৩২

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন, আল্লাহ তায়ালাবলেন, আদম সন্তান আমার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে। অথচ তার এ কাজ ঠিক নয়। আমাকে গালি দিয়েছে অথচ তার জন্য এটা ঠিক নয়। তার আমার প্রতি মিথ্যারোপ হল, সে বলে যে, আমি তাকে (মৃত্যুর) পূর্বের মত পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নই। আর আমাকে তার গালি দেয়া হলতার এ কথা যে, আমার সন্তান আছে অথচ আমি স্ত্রী ও সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র। সহিহ বুখারি : ৪৪৮২

ঙ. মহান আল্লাহর নিদর্শন বা আয়াতসমূহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করা

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَحِيمِ

আর যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

কিন্তু যারা অস্বীকার করবে এবং আমার প্রমাণসমূহকে মিথ্যা বলবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সুরা বাকারা : ৩৯

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

*قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُۥ لَيَحْزُنُكَ ٱلَّذِى يَقُولُونَۖ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ يَجْحَدُونَ

আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। কিন্তু তারা তো তোমাকে অস্বীকার করে না, বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। সুরা আনাম : ৩৩

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا صُمٌّ وَبُكْمٌ فِى ٱلظُّلُمَٰتِۗ مَن يَشَإِ ٱللَّهُ يُضْلِلْهُ وَمَن يَشَأْ يَجْعَلْهُ عَلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ

যারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে তারা অন্ধকারের মধ্যে বধির ও বোবা। আল্লাহ যাকে চান বিপথগামী করেন এবং যাকে চান সঠিক পথে রাখেন। সুরা আনাম : ৩৯

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَٱسْتَكْبَرُوا۟ عَنْهَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

আর যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলবে এবং সেগুলোর ব্যাপারে ঔদ্ধত্য দেখাবে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সুরা আরাফ : ৩৬

চ. যে কথায় আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হবেন এমন কথা বলা

বিলাল ইবনুল হারিস আল-মুযানী (রাঃ) নামীয় রাসূলুল্লাহ ﷺএর সাহাবী থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি কখনো আল্লাহ্‌ তায়ালার সন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে ধারণাও করে না যে, তা কোথায় গিয়ে পৌছবে, অথচ আল্লাহ্‌ তাআলা তার এ কথার কারণে তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য স্বীয় সন্তুষ্টি লিখে দেন। আবার তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি কখনো আল্লাহ্‌ তায়ালার অসন্তুষ্টির কথা বলে, যার সম্পর্কে সে চিন্তাও করে না যে, তা কোন পর্যন্ত গিয়ে পৌছবে। অথচ এ কথার কারণে আল্লাহ তাআলা তার সাথে মিলিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তার জন্য অসন্তুষ্টি লিখে দেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৬৯

ছ. রিসালতকে অস্বীকার করা

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

فَإِن كَذَّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ جَآءُو بِٱلْبَيِّنَٰتِ وَٱلزُّبُرِ وَٱلْكِتَٰبِ ٱلْمُنِيرِ

আর তারা যদি তোমাকে অস্বীকার করে তাহলে তোমার আগেও তো এমন অনেক রসূলকে অস্বীকার করা হয়েছিল যারা নিদর্শনসমূহ, আসমানি সহীফা ও আলো দানকারী কিতাব নিয়ে এসেছিল। সুরা আল ইমরান : ১৮৪

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

*فَقَدْ كَذَّبُوا۟ بِٱلْحَقِّ لَمَّا جَآءَهُمْۖ فَسَوْفَ يَأْتِيهِمْ أَنۢبَٰٓؤُا۟ مَا كَانُوا۟ بِهِۦ يَسْتَهْزِءُونَ *

অতএব, সত্য যখন তাদের কাছে এসেছে তারা তাকে অবলীলায় মিথ্যা বলেছে। তবে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা করত তাদের কাছে অচিরেই তার সংবাদ আসবে। সুরা আনাম :৫

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

فَإِن كَذَّبُوكَ فَقُل رَّبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍ وَٰسِعَةٍ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُۥ عَنِ ٱلْقَوْمِ ٱلْمُجْرِمِينَ

অতঃপর তারা যদি তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে তাহলে তুমি বলবে, “তোমাদের প্রভু অসীম দয়ার মালিক এবং অপরাধীদের থেকে তাঁর শাস্তি ফিরিয়ে নেয়া হয় না।” সুরা আনাম : ১৪৭

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

*وَلَقَدْ جَآءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْهُمْ فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمُ ٱلْعَذَابُ وَهُمْ ظَٰلِمُونَ

তাদের কাছে তাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল এল। তারা তাকে অস্বীকার করল। ফলে আজাব ওদেরকে পাকড়াও করল। আর ওরা ছিল জালেম। সুরা নাহল : ১১৩

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَكَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَمَا بَلَغُوا۟ مِعْشَارَ مَآ ءَاتَيْنَٰهُمْ فَكَذَّبُوا۟ رُسُلِىۖ فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ

তাদের পূর্ববর্তীরাও অবিশ্বাস করেছিল। আমি তাদেরকে যা দিয়েছিলাম এরা তো তার দশভাগের এক ভাগও পায়নি। তারপরও তারা আমার রসূলদেরকে মিথ্যা বলেছিল। অতএব, কেমন (ভয়ানক) ছিল আমার শাস্তি! সুরা সাবা : ৪৫

জ. কুরআন বা অন্য কোন আসমানি কিতাবকে অস্বীকার করা

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

أَلَمْ تَكُنْ ءَايَٰتِى تُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না?’ তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে। সুরা মুমিনুন : ১০৫

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِٱلْكِتَٰبِ وَبِمَآ أَرْسَلْنَا بِهِۦ رُسُلَنَاۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ

যারা কিতাব এবং আমার রাসূলগণকে যা দিয়ে আমি প্রেরণ করেছি তা অস্বীকার করে, অতএব তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। সুরা গাফির : ৭০

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَمَّا جَآءَهُمْ رَسُولٌ مِّنْ عِندِ ٱللَّهِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِّنَ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ كِتَٰبَ ٱللَّهِ وَرَآءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রসূল এসেছেন যিনি তাদের কাছে বিদ্যমান কিতাবের সত্যতা স্বীকার করেন তখন এই কিতাবধারীদের একটি দল আল্লাহর কিতাবকে এমনভাবে পেছনে ফেলে রেখেছে, যেন তারা (এসম্পর্কে) জানেই না। সুরা বাকারা : ১০১

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ نَزَّلَ ٱلْكِتَٰبَ بِٱلْحَقِّۗ وَإِنَّ ٱلَّذِينَ ٱخْتَلَفُوا۟ فِى ٱلْكِتَٰبِ لَفِى شِقَاقٍۭ بَعِيدٍ

এটা এজন্য যে, আল্লাহ সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছেন। কিন্তু যারা এই কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করেছে তারা গভীর বিরোধের মধ্যে (লিপ্ত) রয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৬

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

هَٰٓأَنتُمْ أُو۟لَآءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِٱلْكِتَٰبِ كُلِّهِۦ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوْا۟ عَضُّوا۟ عَلَيْكُمُ ٱلْأَنَامِلَ مِنَ ٱلْغَيْظِۚ قُلْ مُوتُوا۟ بِغَيْظِكُمْۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

দেখ, তোমরাই তাদেরকে ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। আর তোমরা সব কিতাব বিশ্বাস করো (কিন্তু তারা তা করে না)। তারা যখন তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, “আমরা বিশ্বাস করেছি।” আর যখন নিজেরা একান্তে মিলিত হয় তখন তোমাদের প্রতি রাগে (দাঁত দিয়ে) আঙ্গুল কামড়ায়। বল, “তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মর। নিশ্চয়ই আল্লাহ (মানুষের) মনের কথা ভালভাবে জানেন। সুরা আল ইমরান : ১১৯

ঝ. পরকাল, কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নকে মিথ্যা প্রতপন্ন করা

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَلِقَآءِ ٱلْءَاخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَٰلُهُمْۚ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

যারা আমার নিদর্শনসমূহ ও পরকালের সাক্ষাৎ অবিশ্বাস করে তাদের যাবতীয় কাজকর্ম নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তারা যা করত তা ছাড়া কি অন্য কিছুর প্রতিফল তাদেরকে দেওয়া হবে? সুরা আরাফ : ১৪৭

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ كَأَن لَّمْ يَلْبَثُوٓا۟ إِلَّا سَاعَةً مِّنَ ٱلنَّهَارِ يَتَعَارَفُونَ بَيْنَهُمْۚ قَدْ خَسِرَ ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِلِقَآءِ ٱللَّهِ وَمَا كَانُوا۟ مُهْتَدِينَ

আর যেদিন তিনি তাদেরকে একত্র করবেন, যেন তারা দিবসের মুহূর্তকালমাত্র অবস্থান করেছে। তারা একে অপরকে চিনতে পারবে। তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ অস্বীকার করেছে, আর তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল না। সুরা ইউনুস : ৪৫

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلْ كَذَّبُوا۟ بِٱلسَّاعَةِۖ وَأَعْتَدْنَا لِمَن كَذَّبَ بِٱلسَّاعَةِ سَعِيرًا

বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর কিয়ামতকে যে অস্বীকার করে তার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুন। সুরা ফুরকান : ১১

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالَ ٱلْمَلَأُ مِن قَوْمِهِ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِلِقَآءِ ٱلْءَاخِرَةِ وَأَتْرَفْنَٰهُمْ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا مَا هَٰذَآ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يَأْكُلُ مِمَّا تَأْكُلُونَ مِنْهُ وَيَشْرَبُ مِمَّا تَشْرَبُونَ

আর তার সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ যারা কুফরী করেছে, আখেরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে এবং আমি দুনিয়ার জীবনে যাদের ভোগ বিলাসিতা দিয়েছিলাম, তারা বলল, ‘সে কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ, সে তাই খায় যা থেকে তোমরা খাও এবং সে তাই পান করে যা থেকে তোমরা পান কর। সুরা মুমিনুন : ৩৩

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَمَّا ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَلِقَآئِ ٱلْءَاخِرَةِ فَأُو۟لَٰٓئِكَ فِى ٱلْعَذَابِ مُحْضَرُونَ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রূপ : ১৬

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

هَٰذِهِ ٱلنَّارُ ٱلَّتِى كُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

এটি সেই জাহান্নাম যা তোমরা অস্বীকার করতে। সুরা আত-তুর : ১৪

জাহান্নামের বিবরণ : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৫. জাহান্নামীদের সংখ্যা জান্নাতীদের তুলনায় বেশি হবে

মানুষের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

وَمَاۤ اَکۡثَرُ النَّاسِ وَلَوۡ حَرَصۡتَ بِمُؤۡمِنِیۡنَ

আর তুমি আকাঙ্খা করলেও অধিকাংশ মানুষ মুমিন হবার নয়। সুরা ইউসুফ : ১০৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدۡ صَدَّقَ عَلَیۡہِمۡ اِبۡلِیۡسُ ظَنَّہٗ فَاتَّبَعُوۡہُ اِلَّا فَرِیۡقًا مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ

তাদের সম্বন্ধে ইবলীস তার ধারণা সত্য প্রমাণ করল, ফলে তাদের মধ্যে একটি মু’মিন দল ব্যতীত সবাই তার অনুসরণ করল। সুরা সাদ : ২০

আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ডেকে বলবেন, হে আদম! তিনি বলবেন, আমি তোমার খিদমতে হাযির। যাবতীয় কল্যাণ তোমারই হাতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদের বের কর। আদম (আ.) বলবেন, কী পরিমাণ জাহান্নামী বের করব? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শ’ নিরানব্বই জন। আর এটা ঘটবে ঐ সময়, যখন শিশু বুড়িয়ে যাবে। (আল্লাহ বলেন)

وَتَضَعُ کُلُّ ذَاتِ حَمۡلٍ حَمۡلَہَا وَتَرَی النَّاسَ سُکٰرٰی وَمَا ہُمۡ بِسُکٰرٰی وَلٰکِنَّ عَذَابَ اللّٰہِ شَدِیۡدٌ

এবং প্রত্যেক গর্ভধারিণী তার গর্ভপাত করে ফেলবে, তুমি দেখবে মানুষকে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়। তবে আল্লাহর আযাবই কঠিন। সূরাহ হাজ : ২

এ ব্যাপারটি সাহাবাগণের নিকট বড় কঠিন মনে হল। তখন তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্য থেকে (মুক্তি প্রাপ্ত) সেই লোকটি কে হবেন? তিনি বললেনঃ তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর যে ইয়ায়ুয ও মাযূয থেকে এক হাজার আর তোমাদের হবে একজন। এরপর তিনি বললেনঃ শপথ ঐ সত্তার, যাঁর করতলে আমার প্রাণ! আমি আশা রাখি যে তোমরা জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ হবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমরা ’আল হামদুলিল্লাহ্’ ও ’আল্লাহু আকবার’ বলে উঠলাম। তিনি আবার বললেনঃ শপথ ঐ সত্তার, যাঁর হাতের মুঠোয় আমার প্রাণ! আমি অবশ্যই আশা রাখি যে তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। অন্য সব উম্মাতের তুলনায় তোমাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে কাল ষাঁড়ের চামড়ায় একটি সাদা চুলের মত। অথবা সাদা দাগ, যা গাধার সামনের পায়ে হয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২২, আহমাদ ১১২৮৪

আওফ ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহূদী জাতি একাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে একটি ফেরকা জান্নাতী এবং অবশিষ্ট সত্তর ফেরকা জাহন্নামী। খৃস্টানরা বাহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে। তার মধ্যে একাত্তর ফেরকা জাহান্নামী এবং একটি ফেরকা জান্নাতী। সেই মহান সত্তার শপথ যাঁর হতে মুহাম্মাদের প্রাণ! অবশ্যই আমার উম্মাত তিয়াত্তর ফেরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে একটি মাত্র ফেরকা হবে জান্নাতী এবং অবশিষ্ট বাহাত্তরটি হবে জাহান্নামী। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ফেরকাটি জান্নাতী। তিনি বলেন, জামাআত।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৯২, সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, সুনান আবু দাউন : ৪৬৯৫ ,সহিহাহ : ১৪৯২

১৬. তাওহীদবাদী গুনাহগারদের জাহান্নাম থেকে মুক্ত করা

আবু সায়ীদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যারা জাহান্নামবাসী তারা মরবেও না আবার বাঁচবেও না। কিন্তু যে সকল (ঈমানদার) মানুষ পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে তাদের এক ধরনের মৃত্যু ঘটানো হবে। তারা পুরে কয়লা হয়ে যাবে। তখন তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। তাদেরকে এক এক দল করে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। অতঃপর জান্নাতের নদীতে রাখা হবে। এরপর বলা হবে হে জান্নাতবাসীরা! তোমরা তাদের উপর পানি ঢালো। ফলে তারা উদ্ভিদের মতো জীবন লাভ করবে, যেমন বন্যার পানির পলি পেয়ে উদ্ভিদ জন্ম লাভ করে থাকে”। সহীহ মুসলিম : ১৮৫।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সর্বশেষ যে ব্যাক্তি জাহান্নাম থেকে বের হবে এবং সর্বশেষ যে ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে তার সম্পর্কে আমি জানি। এক ব্যাক্তি অধোবদন অবস্থায় জাহান্নাম থেকে বের হবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে, জান্নাত পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং সে ফিরে আসবে ও বলবে, হে প্রভূ! জান্নাত তো পরিপূর্ন দেখতে পেলাম। পুনরায় আল্লাহ তাআলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তখন সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে, জান্নাত পরিপূর্ন হয়ে গিয়েছে। তাই সে ফিরে এসে বলবে, হে প্রভু! জান্নাত তো ভরপুর দেখতে পেলাম। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। কেননা জান্নাত তোমার জন্য সমতুল্য এবং তার দশ গুন। অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দশ গুন। তখন লোকটি বলবে, প্রভু! তুমি কি আমার সাথে বিদ্রূপ বা হাসি-ঠাট্টা করছ? (রাবী বলেন) আমি তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এভাবে হাসতে দেখলাম যে তার দন্তরাজি প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল এবং বলা হচ্ছিল এটা জান্নাতীদের নিম্নতম মর্যাদা। সহিহ বুখারী : ৬৫৭১, সহিহ মুসলিম : ১৮৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩৩৯, সহীহুল জামি : ২৪৮৯, মুসনাদে বাযযার : ১৭৮৩, মুসনাদে আহমাদ : ৭৩৯১, আবূ ইয়া’লা : ৫১৩৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪৭৫, তবারানী : ১০১৮৭।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: কিছু সংখ্যক লোক তাদের কৃত গুনাহের কারণে শাস্তিস্বরূপ জাহান্নামের আগুনে জ্বলে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর রহমত ও দয়ায় তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তবে সেখানে তাদেরকে জাহান্নামী বলে ডাকা হবে। সহিহ বুখারী : ৭৪৫০, মিশকাত : ৫৫৮৪,  মুসনাদে আহমাদ : ১২৫১১, আবূ ইয়া’লা : ২৯৭৮

ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) সুত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদল লোককে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফাআতে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদেরকে জাহান্নামী বলে আখ্যায়িত করা হবে। সহিহ বুখারী : ৬৫৬৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩১৫, মিশকাত : ৫৫৮৫,  সহীহুল জামি : ৫৩৬২, আবূ ইয়া’লা : ৩২০৬

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নাম থেকে চার লোককে বের করে আল্লাহ তা’আলার সামনে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাদেরকে আবার জাহান্নামে পাঠানোর জন্য নির্দেশ করা হবে। তখন তাদের একজন পিছন ফিরে তাকিয়ে বলবে, হে প্রভু! আমি তো এ আশায় ছিলাম যে, যখন তুমি একবার আমাকে তা থেকে বের করে এনেছ, পুনরায় আমাকে সেখানে ফেরত পাঠাবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে দিবেন। সহিহ মুসলিম : ১৯২, মিশকাত : ৫৫৮৮, মুসনাদে আহমাদ : ১৩৩৩৭, সহীহুল জামি : ৮০৫৮

১৭. জাহান্নামীদের খাদ্য

জাহান্নামীদেরকে ক্ষুধার যন্ত্রনা দিয়ে শাস্তি দেওয়া যেত। কিন্তু আল্লাহ জাহান্নামিদের খাদ্য দিয়ে কঠিন শাস্তি দিবেন। তাদের খাদ্য ক্ষুধা নিবারণের জন্য নয়, বরং তাদের শাস্তি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। কুরআনে বিভিন্ন স্থানে এই ভয়াবহ খাদ্যগুলোর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের জন্য চরম যন্ত্রণা নিয়ে আসবে।

ক. জাহান্নামের যাক্কুম বৃক্ষ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  شَجَرَتَ الزَّقُّوْمِ ﴿ۙ۴۳﴾طَعَامُ  الْاَثِیْمِ ﴿ۖۛۚ۴۴﴾كَالْمُہْلِ ۚۛ یَغْلِیْ  فِی الْبُطُوْنِ ﴿ۙ۴۵﴾ كَغَلْیِ  الْحَمِیْمِ ﴿۴۶﴾ خُذُوْهُ فَاعْتِلُوْهُ  اِلٰی سَوَآءِ الْجَحِیْمِ ﴿٭ۖ۴۷﴾ثُمَّ صُبُّوْا فَوْقَ رَاْسِہٖ  مِنْ عَذَابِ الْحَمِیْمِ ﴿ؕ۴۸﴾  ذُقْ ۚۙ  اِنَّكَ اَنْتَ الْعَزِیْزُ  الْكَرِیْمُ ﴿۴۹﴾ اِنَّ هٰذَا مَا کُنْتُمْ بِہٖ  تَمْتَرُوْنَ ﴿۵۰﴾

“নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ পাপীর খাদ্য; গলিত তামার মতো, উদরসমূহে ফুটতে থাকবে। ফুটন্ত পানির মতো (বলা হবে) ওকে ধর, অতঃপর তাকে জাহান্নামের মধ্যস্থলে টেনে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে দাও। (বলা হবে) তুমি আস্বাদন কর, নিশ্চয় তুমিই সম্মানিত, অভিজাত। নিশ্চয় এটা তা-ই যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে”। সূরা দুখান : ৪৩-৫০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَذٰلِكَ خَیْرٌ  نُّزُلًا  اَمْ شَجَرَۃُ  الزَّقُّوْمِ ﴿۶۲﴾اِنَّا جَعَلْنٰهَا فِتْنَۃً  لِّلظّٰلِمِیْنَ ﴿۶۳﴾ اِنَّهَا شَجَرَۃٌ  تَخْرُجُ فِیْۤ  اَصْلِ الْجَحِیْمِ ﴿ۙ۶۴﴾ طَلْعُهَا كَاَنَّہٗ  رُءُوْسُ الشَّیٰطِیْنِ ﴿۶۵﴾ فَاِنَّهُمْ لَاٰكِلُوْنَ مِنْهَا فَمَالِـُٔوْنَ مِنْهَا الْبُطُوْنَ ﴿ؕ۶۶﴾ ثُمَّ  اِنَّ لَهُمْ عَلَیْهَا لَشَوْبًا مِّنْ حَمِیْمٍ ﴿ۚ۶۷﴾ ثُمَّ   اِنَّ  مَرْجِعَهُمْ  لَا۠ اِلَی  الْجَحِیْمِ ﴿۶۸﴾ اِنَّهُمْ  اَلْفَوْا  اٰبَآءَهُمْ  ضَآلِّیْنَ ﴿ۙ۶۹﴾ فَهُمْ عَلٰۤی  اٰثٰرِهِمْ  یُہْرَعُوْنَ ﴿۷۰﴾

“আপ্যায়নের জন্য এগুলো উত্তম না যাক্কুম বৃক্ষ, নিশ্চয় আমি তাকে যালিমদের জন্য করে দিয়েছি পরীক্ষা। নিশ্চয় এ গাছটি জাহান্নামের তলদেশ থেকে বের হয়। এর ফল যেন শয়তানের মাথা, নিশ্চয় তারা তা থেকে খাবে এবং তা দিয়ে পেট ভর্তি করবে। তদুপরি তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। তারপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে জাহান্নামের আগুনে। নিশ্চয় এরা নিজদের পিতৃপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছিল, ফলে তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে দ্রুত ছুটেছে”। সূরা সাফফাত : ৬২-৭০

 ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত আছে। রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَلَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَاَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না। সূরা আল ইমরান : ১০২

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাক্কুম-এর একটি বিন্দুও যদি দুনিয়াতে পতিত হতো তাহলে দুনিয়াবাসীদের জীবন দুৰ্বিসহ হয়ে যেত। আর এটা যাদের খাদ্য হবে তাদের কি অবস্থা হবে। সুনানে তিরমিজি :২৫৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩২৫

খ. জারি নাম প্রকার কন্টকময় বিষাক্ত গুল্ম

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَّيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا مِن ضَرِيعٍ (6) لَّا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِن جُوعٍ (7)

তাদের জন্য বিষাক্ত কন্টক ব্যতীত খাদ্য নেই। যা পুষ্ট করে না এবং ক্ষুধা নিবারণ করে না। সুরা গাশিয়া : ৬-৭

গ. গলায় আটকে যায় এমন খাদ্য

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا (12) وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا (13)

নিশ্চয় আমার নিকট আছে শৃংখল, প্রজ্বলিত অগ্নি। আর আছে এমন খাদ্য, যা গলায় আটকে যায় এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (মুযযাম্মিলঃ ১২-১৩)।

ঘ. জাহান্নামীদের ক্ষতনিঃসৃত স্রাব বা গিসলীন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَاهُنَا حَمِيمٌ (35) وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ (36) لَّا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ (37)

অতএব এই দিন সেখানে তার কোন সুহৃদ থাকবে না এবং কোন খাদ্য থাকবে না ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ ব্যতীত। যা অপরাধীরা ব্যতীত কেউ খাবে। সুরা হাক্কাহ : ৩৫-৩৭

ঙ. আগুনের অঙ্গার খাদ্য হিসেবে খাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۙ أُولَٰئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে (পাপ-পঙ্কিলতা থেকে) পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সুরা আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا ۖ وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا

নিশ্চয় যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা আসলে নিজেদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। আর অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। সুরা নিসা : ১০

গ. গলিত পুঁজ হবে জাহান্নামীদের খাদ্য

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اسْتَفْتَحُوْا وَ خَابَ  کُلُّ جَبَّارٍ عَنِیْدٍ ﴿ۙ۱۵﴾  مِّنْ وَّرَآئِہٖ جَهَنَّمُ وَ یُسْقٰی مِنْ مَّآءٍ صَدِیْدٍ ﴿ۙ۱۶﴾   یَّتَجَرَّعُہٗ  وَ لَا یَكَادُ یُسِیْغُہٗ  وَ یَاْتِیْهِ الْمَوْتُ مِنْ کُلِّ مَكَانٍ وَّ مَا هُوَ  بِمَیِّتٍ ؕ وَ مِنْ  وَّرَآئِہٖ  عَذَابٌ  غَلِیْظٌ ﴿۱۷﴾

“আর তারা বিজয় কামনা করল, আর ব্যর্থ হলো সকল স্বৈরাচারী হঠকারী। এর সামনে রয়েছে জাহান্নাম, আর তাদের পান করানো হবে গলিত পুঁজ থেকে। সে তা গিলতে চাইবে এবং প্রায় সহজে সে তা গিলতে পারবে না। আর তার কাছে সকল স্থান থেকে মৃত্যু ধেঁয়ে আসবে, অথচ সে মরবে না। আর এর পরেও রয়েছে কঠিন আযাব”। সূরা ইবরাহীম : ১৫-১৭

১৮. জাহান্নামীদের পানীয়

জাহান্নামে পিপাসার কষ্ট হবে অসহনীয়। কিন্তু এই পিপাসা নিবারণের জন্য তাদের কোনো শীতল পানি দেওয়া হবে না। বরং তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত গরম পানি (হামিম), পুঁজ ও রক্ত মিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি (গাসসাক) এবং গলিত তামার মতো বিষাক্ত তরল। এই পানি পান করলে তাদের পেটের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এবং যন্ত্রণা আরও তীব্র হবে, যা তাদের আযাবকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।

ক. হামীম অত্যুষ্ণ ফুটন্ত পানি পান করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَشَارِبُونَ عَلَيْهِ مِنَ الْحَمِيمِ (54) فَشَارِبُونَ شُرْبَ الْهِيمِ (55)

 তারপর তোমরা পান করবে ফুটন্ত পানি। পান করবে পিপাসার্ত উটের ন্যায়। সুরা ওয়াকিয়া : ৫৪-৫৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَثَلُ الۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ فِیۡہَاۤ اَنۡہٰرٌ مِّنۡ مَّآءٍ غَیۡرِ اٰسِنٍ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ لَّبَنٍ لَّمۡ یَتَغَیَّرۡ طَعۡمُہٗ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ خَمۡرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیۡنَ ۬ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ وَمَغۡفِرَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ؕ کَمَنۡ ہُوَ خَالِدٌ فِی النَّارِ وَسُقُوۡا مَآءً حَمِیۡمًا فَقَطَّعَ اَمۡعَآءَہُمۡ

মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে? সুরা মুহাম্মদ : ১৫

খ. গাস্সাক নামে অতিশয় দুর্গন্ধময় তিক্ত পানি

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هَٰذَا ۚ وَإِنَّ لِلطَّاغِينَ لَشَرَّ مَآبٍ (55) جَهَنَّمَ يَصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمِهَادُ (56) هَٰذَا فَلْيَذُوقُوهُ حَمِيمٌ وَغَسَّاقٌ (57)

এমনই, আর নিশ্চয় সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম নিবাস। জাহান্নাম, তারা সেখানে অগ্নিদগ্ধ হবে। কতই না নিকৃষ্ট সে নিবাস!  এমনই, সুতরাং তারা এটি আস্বাদন করুক, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। সুরা সাদ ; ৫৫-৫৭

এমনই, সুতরাং তারা এটি আস্বাদন করুক, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ।

إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتْ مِرْصَادًا (21) لِّلطَّاغِينَ مَآبًا (22) لَّابِثِينَ فِيهَا أَحْقَابًا (23) لَّا يَذُوقُونَ فِيهَا بَرْدًا وَلَا شَرَابًا (24) إِلَّا حَمِيمًا وَغَسَّاقًا (25) جَزَاءً وِفَاقًا (26)

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওঁৎ পেতে রয়েছে—সীমালংঘনকারীদের প্রত্যাবর্তনস্থল রূপে। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে। সেখানে তারা কোন ঠান্ডা (বস্তুর) স্বাদ গ্রহণ করতে পাবে না, আর কোন পানীয়ও (পাবে না); ফুটন্ত পানি ও (প্রবাহিত) পুঁজ ব্যতীত। এটাই (তাদের) উপযুক্ত প্রতিফল। (নাবাঃ ২১-২৬)

গ. স্বাদীদ নামে জাহান্নামীদের পচনশীল ক্ষত-নির্গত পুঁজ-রক্ত বা ঘাম

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاسْتَفْتَحُوا وَخَابَ كُلُّ جَبَّارٍ عَنِيدٍ (15) مِّن وَرَائِهِ جَهَنَّمُ وَيُسْقَىٰ مِن مَّاءٍ صَدِيدٍ (16) يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيغُهُ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِن كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّتٍ ۖ وَمِن وَرَائِهِ عَذَابٌ غَلِيظٌ (17)

প্রত্যেক উদ্ধত হঠকারী ব্যর্থকাম হল। তাদের প্রত্যেকের সম্মুখে রয়েছে জাহান্নাম এবং প্রত্যেককে পান করানো হবে পূজমিশ্রিত পানি। যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে এবং তা গিলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; সর্বদিক হতে তার নিকট আসবে মৃত্যু-যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না এবং তার পরে থাকবে কঠোর শাস্তি। সুরা ইবরাহিম : ১৫-১৭

ঘ. গলিত ধাতু মত নিকৃষ্ট পানি

وَقُلِ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّکُمۡ ۟ فَمَنۡ شَآءَ فَلۡیُؤۡمِنۡ وَّمَنۡ شَآءَ فَلۡیَکۡفُرۡ ۙ اِنَّاۤ اَعۡتَدۡنَا لِلظّٰلِمِیۡنَ نَارًا ۙ اَحَاطَ بِہِمۡ سُرَادِقُہَا ؕ وَاِنۡ یَّسۡتَغِیۡثُوۡا یُغَاثُوۡا بِمَآءٍ کَالۡمُہۡلِ یَشۡوِی الۡوُجُوۡہَ ؕ بِئۡسَ الشَّرَابُ ؕ وَسَآءَتۡ مُرۡتَفَقًا

আর বল, ‘সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যে ইচ্ছা করে সে যেন ঈমান আনে এবং যে ইচ্ছা করে সে যেন কুফরী করে। নিশ্চয় আমি যালিমদের জন্য আগুন প্রস্ত্তত করেছি, যার প্রাচীরগুলো তাদেরকে বেষ্টন করে রেখেছে। যদি তারা পানি চায়, তবে তাদেরকে দেয়া হবে এমন পানি যা গলিত ধাতুর মত, যা চেহারাগুলো ঝলসে দেবে। কী নিকৃষ্ট পানীয়! আর কী মন্দ বিশ্রামস্থল! সুরা কাহাব : ২৯

ঙ. জাহান্নামের পুজের ঝর্ণা বা নহরুন খাবাল

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদ পানকারী ব্যক্তির চল্লিশ দিনের নামায কুবুল করা হয় না। সে তাওবা করলে তবে আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা কুবুল করেন। যদি আবার সে মদ পান করে তাহলে আল্লাহ তা’আলা তার চল্লিশ দিনের নামায কুবুল করেন না। যদি সে তাওবা করে তাহলে আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা গ্রহণ করেন। সে যদি আবার মদ পানে লিপ্ত হয় তাহলে তার চল্লিশ দিনের নামায আল্লাহ তা’আলা গ্রহণ করেন না। যদি সে তাওবা করে আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা কবুল করেন। সে চতুর্থ বারে মদ পানে জড়িয়ে পড়লে আল্লাহ তা’আলা তার চল্লিশ দিনের নামায গ্রহণ করেন না। যদি সে তাওবা করে আল্লাহ তা’আলা তার তাওবা কুকূল করবেন না এবং তাকে ’নাহরুল খাবাল হতে পান করাবেন। প্রশ্ন করা হল, হে আবূ আবদুর রাহমান (ইবনু উমার) খাবাল নামক ঝর্ণাটি কি? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের পূজের ঝর্ণা। সুনানে তিরমিজি : ১৮৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৩৭৭

১৯. জাহান্নামীদের পোষাক

জান্নামীদের পোশাক তাদের শাস্তিরই অংশ। সূরা ইবরাহীম অনুসারে, অপরাধীদের পোশাক হবে আলকাতরার, যা আগুনের মতো জ্বলবে। তাদের হাত-পা শিকলে বাঁধা থাকবে এবং আগুন তাদের মুখমণ্ডল ঢেকে ফেলবে। সূরা রা’দ এ বলা হয়েছে, তাদের গলায় থাকবে শিকল। এই পোশাক ও শিকল কোনো আরামের জন্য নয়, বরং তাদের যন্ত্রণাকে আরও তীব্র ও ভয়াবহ করে তুলবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ تَـرَی الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ مُّقَرَّنِیْنَ فِی  الْاَصْفَادِ ﴿ۚ۴۹﴾سَرَابِیْلُهُمْ مِّنْ قَطِرَانٍ وَّ تَغْشٰی وُجُوْهَهُمُ  النَّارُ ﴿ۙ۵۰﴾

“আর সে দিন তুমি অপরাধীদের দেখবে তারা শিকলে বাঁধা। তাদের পোশাক হবে আলকাতরার এবং আগুন তাদের চেহারাসমূহকে ঢেকে ফেলবে”। সূরা ইবরাহীম : ৪৯-৫০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اِنْ تَعْجَبْ فَعَجَبٌ قَوْلُهُمْ ءَ اِذَا کُنَّا تُرٰبًا ءَ اِنَّا لَفِیْ خَلْقٍ جَدِیْدٍ ۬ؕ اُولٰٓئِكَ الَّذِیْنَ  كَفَرُوْا بِرَبِّهِمْ ۚ وَ اُولٰٓئِكَ  الْاَغْلٰلُ فِیْۤ  اَعْنَاقِهِمْ ۚ وَ اُولٰٓئِكَ اَصْحٰبُ  النَّارِ ۚ هُمْ  فِیْهَا  خٰلِدُوْنَ ﴿۵﴾

আর যদি তুমি আশ্চর্য বোধ কর, তাহলে আশ্চর্যজনক হলো তাদের এ বক্তব্য, আমরা যখন মাটি হয়ে যাব, তখন কি আমরা নতুন সৃষ্টিতে পরিণত হব? এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফুরী করেছে,আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে”। সূরা রাদ : ৫

২০. জাহান্নামের আযাবের ভয়াবহতা

জাহান্নামের আযাব এতটাই কঠিন ও ভয়ানক হবে যে, এর এক মুহূর্তের শাস্তি থেকেও মুক্তি পেতে একজন জাহান্নামী তার মুক্তিপণ হিসেবে দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে, সবকিছু দিতে প্রস্তুত থাকবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন যে, অপরাধীরা সেদিন তাদের প্রিয় সন্তান, স্ত্রী, ভাই এমনকি গোটা গোত্রকেও মুক্তিপণ হিসেবে দিতে চাইবে, তবুও তা কবুল করা হবে না। সেই মুক্তিপণ শুধু তাদের সীমাহীন যন্ত্রণাই বাড়িয়ে তুলবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ أَنَّ لَهُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَمِثْلَهُ مَعَهُ لِيَفْتَدُوا بِهِ مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَا تُقُبِّلَ مِنْهُمْ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

যারা অবিশ্বাস করেছে পৃথিবীতে যা কিছু আছে, যদি তাদের তার সমস্ত থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরো থাকে এবং কিয়ামতের দিন শাস্তি হতে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ তা দিতে চায়, তবুও তাদের নিকট হতে তা গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি বর্তমান। সুরা মায়েদা : ৩৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ (11) وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ (12) وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ (13) وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنجِيهِ (14)

অপরাধী সেই দিনে শাস্তির বদলে দিতে চাইবে নিজ সন্তানসন্ততিকে। তার স্ত্রী ও ভাইকে। তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত। এবং পৃথিবীর সকলকে, যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়। সুরা মায়ারিজ : ১১-১৪

আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে শুনে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ আযাব ভোগকারীকে জিজ্ঞেস করবেন, যদি পৃথিবীর ধন-সম্পদ তোমার হয়ে যায়, তবে তুমি কি আযাবের বিনিময়ে তা দিয়ে দিবে? সে উত্তর দিবে, হাঁ। তখন আল্লাহ বলবেন, যখন তুমি আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠে ছিলে, তখন আমি তোমার নিকট এর থেকেও সহজ একটি জিনিস চেয়েছিলাম। সেটা হল, তুমি আমার সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। কিন্তু তুমি তা না মেনে শির্ক করতে লাগলে। সহিহ বুখারি : ৩৩৩৪, ৬৫৩৮, ৬৫৫৭, সহিহ মুসলিম : ২৮০৫, আহমাদ : ১২৩১৪

নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, ’আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে ভীতি প্রদর্শন করেছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে ভীতি প্রদর্শন করেছি।’ তিনি এ বাক্যগুলো বারংবার এমনভাবে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকলেন যে, বর্তমানে আমি যে স্থানে বসে আছি, যদি তিনি (সা.) এ স্থান হতে উক্ত বাক্যগুলো বলতেন, তবে তা বাজারের লোকেরাও শুনতে পারত। আর তিনি এমনভাবে বাক্যগুলো বলেছেন যে, তার কাঁধের উপর রক্ষিত চাদরটি পায়ের উপরে গড়িয়ে পড়েছিল। মিশকাত : ৫৬৮৭, দারিমী : ২৮১২, মুসনাদে আহমাদ : ১৮৪২২, মুসনাদে বাযযার : ৩২২৪, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম : ১০৫৮।

আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা কম ও সহজতর শাস্তিপ্রাপ্ত লোককে বলবেন, যদি গোটা পৃথিবী পরিমাণ সম্পদ তোমার থাকত, তাহলে তুমি কি সেগুলোর বিনিময়ে এ শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আদমের ঔরসে থাকাকালে এর চেয়েও সহজতর বিষয়ে আমি আদেশ করেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না, কিন্তু তুমি এটা অগ্রাহ্য করেছ এবং আমার সাথে শারীক করেছ। সহিহ বুখারী : ৬৫৩৮, সহিহ মুসলিম : ২৮০৫, মিশকাত : ৫৬৭০, মুসনাদে আহমাদ : ১৪১৩৯, আবূ ইয়া’লা : ২৯২৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫১।

ক. এক মুহর্তে জান্নাত ও জাহান্নামের অনূভুতি

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য থেকে দুনিয়ার সর্বাধিক সম্পদশালী লোককে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে চুবিয়ে উঠানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনো আরাম-আয়েশ দেখেছ? পূর্বে কি কখনো তোমার নি’আমাতের সুখ অর্জিত হয়েছিল? সে বলবে, না আল্লাহর শপথ, হে আমার প্রভু! অতঃপর জান্নাতবাসীদের থেকে এমন এক লোককে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচাইতে দুঃখ-কষ্টের জীবনযাপন করেছিল। তখন তাকে মুহুর্তের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে প্রশ্ন করা হবে, হে আদাম সন্তান! তুমি কি কখনো দুঃখ-কষ্ট দেখেছ? এবং তুমি কি কখনো কঠোরতার মুখোমুখী হয়েছিলে? সে বলবে, না আল্লাহর শপথ, হে আমার প্রভু! আমি কখনো দুঃখকষ্টে পতিত হইনি। আর কখনো কোন কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। সহিহ মুসলিম : ২৮০৭, মিশকাত : ৫৬৬৯, মুসনাদে আহমাদ ১৩১৩৪, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব ৩৬৯০।

খ. মাথার উপর থেকে ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هٰذٰنِ خَصْمٰنِ اخْتَصَمُوْا فِیْ رَبِّهِمْ ۫ فَالَّذِیْنَ كَفَرُوْا قُطِّعَتْ لَهُمْ ثِیَابٌ مِّنْ نَّارٍ ؕ یُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُوْسِهِمُ الْحَمِیْمُ ﴿ۚ۱۹﴾ یُصْهَرُ  بِہٖ  مَا فِیْ  بُطُوْنِهِمْ  وَ الْجُلُوْدُ ﴿ؕ۲۰﴾  وَ لَهُمْ  مَّقَامِعُ مِنْ  حَدِیْدٍ ﴿۲۱﴾  کُلَّمَاۤ  اَرَادُوْۤا اَنْ یَّخْرُجُوْا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ  اُعِیْدُوْا فِیْهَا ٭ وَ ذُوْقُوْا عَذَابَ الْحَرِیْقِ ﴿۲۲﴾

এরা দু’টি বিবাদমান পক্ষ, যারা তাদের রব সম্পর্কে বিতর্ক করে। তবে যারা কুফুরী করে তাদের জন্য আগুনের পোশাক প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের মাথার উপর থেকে ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি। যার দ্বারা তাদের পেটের অভ্যন্তরে যা কিছু রয়েছে তা ও তাদের চামড়াসমূহ বিগলিত করা হবে। আর তাদের জন্য থাকবে লোহার হাতুড়ী। যখনই তারা যন্ত্রণাকাতর হয়ে তা থেকে বের হয়ে আসতে চাইবে, তখনই তাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং বলা হবে, দহন-যন্ত্রণা আস্বাদন কর”। সূরা হজ : ১৯-২২

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের মাথার উপর তপ্ত গরম পানি ঢালা হবে এবং তা তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করবে, ফলে পেটের মধ্যে যা কিছু আছে, সমস্ত কিছু বিগলিত হয়ে পায়ের দিক দিয়ে নির্গত হবে। কুরআনে বর্ণিত (الصِّهْرُ) (বিগলিত) করা হবে দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে। আবার সে আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। সুনানে তিরমিযী : ২৫৮২, মিশকাত : ৫৬৭৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৭০

গ. জাহান্নামে আজাবের জন্য শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَمَّا رَاَوُا الۡعَذَابَ ؕ وَجَعَلۡنَا الۡاَغۡلٰلَ فِیۡۤ اَعۡنَاقِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ؕ ہَلۡ یُجۡزَوۡنَ اِلَّا مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে এবং আমি কাফিরদের গলদেশে শৃংখল পরিয়ে দিব। তারা যা করত তারই প্রতিফল তাদেরকে দেয়া হবে। সুরা সাবা : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ فِیۡ سِلۡسِلَۃٍ ذَرۡعُہَا سَبۡعُوۡنَ ذِرَاعًا فَاسۡلُکُوۡہُ ؕ

পুনরায় তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃংখলে। সুরা হাক্কাহ : ৩২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّاۤ اَعۡتَدۡنَا لِلۡکٰفِرِیۡنَ سَلٰسِلَا۠ وَاَغۡلٰلًا وَّسَعِیۡرًا

আমি কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি শেকল, বেড়ি ও প্রজ্বলিত অগ্নি। সুরা ইনসান : ৪

ঘ. শৃঙ্খলিত অবস্থায় নিহের ধ্বংশ বা মৃত্যু কামনা করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اِذَاۤ  اُلْقُوْا مِنْهَا مَكَانًا ضَیِّقًا مُّقَرَّنِیْنَ  دَعَوْا  هُنَالِكَ ثُبُوْرًا ﴿ؕ۱۳﴾   لَا تَدْعُوا الْیَوْمَ ثُبُوْرًا وَّاحِدًا وَّ ادْعُوْا ثُبُوْرًا كَثِیْرًا ﴿۱۴﴾

আর যখন তাদেরকে গলায় হাত পেঁচিয়ে জাহান্নামের সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, সেখানে তারা নিজদের ধ্বংস আহবান করবে। একবার ধ্বংসকে ডেকো না; বরং অনেকবার ধ্বংসকে ডাকো।’ সুরা ফুরকান ১৩-১৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا یَتَمَنَّوۡنَہٗۤ اَبَدًۢا بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ

আর তারা, তাদের হাত যা আগে পাঠিয়েছে সে কারণে কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত। সুরা জুমুয়া : ৭

ঙ. কাফেরদেরকে উল্টা করে মুখের উপর ভর দিয়ে জাহান্নামে আনা হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّہۡدِ اللّٰہُ فَہُوَ الۡمُہۡتَدِ ۚ وَمَنۡ یُّضۡلِلۡ فَلَنۡ تَجِدَ لَہُمۡ اَوۡلِیَآءَ مِنۡ دُوۡنِہٖ ؕ وَنَحۡشُرُہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ عَلٰی وُجُوۡہِہِمۡ عُمۡیًا وَّبُکۡمًا وَّصُمًّا ؕ مَاۡوٰىہُمۡ جَہَنَّمُ ؕ کُلَّمَا خَبَتۡ زِدۡنٰہُمۡ سَعِیۡرًا

আর আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন সে-ই হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং যাকে তিনি পথহারা করেন তুমি কখনো তাদের জন্য তাঁকে ছাড়া অভিভাবক পাবে না। আর আমি কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম; যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। সুরা ইসরা : ৯৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یُحۡشَرُوۡنَ عَلٰی وُجُوۡہِہِمۡ اِلٰی جَہَنَّمَ ۙ  اُولٰٓئِکَ شَرٌّ مَّکَانًا وَّاَضَلُّ سَبِیۡلًا 

যাদেরকে মুখের উপর ভর দেয়া অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে। এরা মর্যাদায় অধিক নিকৃষ্ট এবং পথের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট। সুরা ফুরকান : ৩৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَفَمَنۡ یَّمۡشِیۡ مُکِبًّا عَلٰی وَجۡہِہٖۤ اَہۡدٰۤی اَمَّنۡ یَّمۡشِیۡ سَوِیًّا عَلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ

যে ব্যক্তি উপুড় হয়ে মুখের উপর ভর দিয়ে চলে সে কি অধিক হিদায়াতপ্রাপ্ত নাকি সেই ব্যক্তি যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে ? সুরা মুলক : ২২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوۡمَ یُسۡحَبُوۡنَ فِی النَّارِ عَلٰی وُجُوۡہِہِمۡ ؕ ذُوۡقُوۡا مَسَّ سَقَرَ

সেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নেয়া হবে। (বলা হবে) জাহান্নামের ছোঁয়া আস্বাদন কর। সুরা কামার : ৪৮

চ. জাহান্নামের শাস্তিতে পেটের নাড়ি-ভূড়ি বের হয়ে যাবে

উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি উসমান (রাযিঃ) এর কাছে গিয়ে আলোচনা করেন না কেন? উত্তরে তিনি বলেন, তোমরা কি এটা মনে করছ যে, শুধু আমি তোমাদেরকে নিয়েই তার সাথে কথা বলি? আল্লাহর শপথ আমার ও তার মধ্যকার যে কথা বলবার, আমি তাকে তা বলেছি। তবে আমি এসব বিষয়ে মুখ খুলতে চাই না, যে ব্যাপারে কথা বললে আমিই হব এর প্রথম ব্যক্তি। আর যে লোক আমার আমীর বা নেতা তাদের কারো ব্যাপারে আমি এ কথাও বলতে চাই না যে, তিনিই সর্বোত্তম ব্যক্তি। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, কিয়ামত দিবসে এক লোককে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। ফলে তার পেটের নাড়ি-ভূড়ি বের হয়ে যাবে। এরপর গাধা যেমন চাকীর চারপাশে ঘুরে অনুরূপভাবে সেও এগুলো নিয়ে ঘুরতে থাকবে। এ দেখে জাহান্নামীরা তার চারপাশে এসে একত্রিত হবে এবং তাকে বলবে, হে অমুক তোমার কি হয়েছে? তুমি কি ভালো কাজের আদেশ দিতে না এবং মন্দ কাজ হতে দূরে থাকতে বলতে না? জবাবে সে বলবে, হ্যাঁ, তবে আমি ভালো কাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু স্বয়ং তা পালন করতাম না এবং মন্দ কাজে বাধা দিতাম কিন্তু নিজেই আবার তা করতাম। সহিহ মুসলিম : ২৯৮৯।

ছ. জাহান্নামে সবচেয়ে নিম্নমানের শাস্তির ধরন

নুমান ইবন বশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ، يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ كَمَا يَغْلِ الْمِرْجَلُ، مَا يَرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ مِنْهُ عَذَابًا وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابًا»

জাহান্নামীদের মধ্যে যার সবচেয়ে হাল্কা শাস্তি হবে তার শাস্তির ধরনটা এমন হবে যে, তার পায়ে আগুনের দুটো জুতা থাকবে ও আগুনের দুটো ফিতা থাকবে। এর আগুনের তাপে তার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে যেমন ডেগের মধ্যে পানি ফুটতে থাকে। লোকেরা তার অবস্থা দেখে মনে করবে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছু নেই। অথচ এ শাস্তিটা হলো সবচেয়ে হাল্কা শাস্তি”। সহিহ বুখারি : ৬৫৬১, ৬৫৬২, সহিহ মুসলিম : ২১২, ২১৩, সুনানে তিরমিযী : ২৬০৪, মিশকাত : ৫৬৬৭, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১৬৮০, সহীহুল জামি : ২০৩৩,  মুসনাদে বাযযার : ৩২৩৫, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৯০, দারিমী : ২৮৪৮

সামুরা ইবন জুনদাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জাহান্নামীদের কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত আগুনে স্পর্শ করবে। করো হাটু পর্যন্ত আগুনে স্পর্শ করবে। কারো কোমর পর্যন্ত আবার কারো কণ্ঠ পর্যন্ত আগুন স্পর্শ করবে”।  সহিহ মুসলিম : ২৮৪৫

জ. জাহান্নামে কম সাজা হবে আবু তালেবের

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সহজতর শাস্তি হবে আবূ ত্বালিব-এর। তার দুই পায়ে দু’টি আগুনের জুতা পরিয়ে দেয়া হবে। তাতে তার মাথার মগজ ফুটতে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ২১২, সহিহ বুখারী : ৬৫৬২, মিশকাত : ৫৬৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৩৬, সহীহুল জামি : ২৫৩২

ঝ. জাহান্নামের শাস্তির ভিন্নতা

সামুরাহ্ ইবনু জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: জাহান্নামীদের মধ্যে কোন কোন লোক এমন হবে, জাহান্নামের আগুন তার পায়ের টাখনু অবধি পৌছবে। তাদের মধ্যে কারো হাঁটু পর্যন্ত আগুন পৌছবে, কারো কারো কোমর পর্যন্ত এবং কারো কারো ঘাড় পর্যন্ত পৌছবে। সহিহ মুসলিম : ২৮৪৫, মিশকাত : ৫৬৭১, মুসনাদে আহমাদ : ২০১১৫, সহীহুল জামি : ২২৩৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৫৪৫, মুসনাদে আহমাদ : ২০১১৫, শু’আবূল ঈমান : ৩১৭

ঞ. শরীর পুড়ে গেলে পুনরায় নতুন চামড়া সৃষ্টি হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا

নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে, তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে প্রবিষ্ট করব। যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নূতন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ৫৬

জাহান্নামের বিবরণ : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২১. জাহান্নামির বিশার আকৃতির দেহ প্রদান করা হবে

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জাহান্নামের মধ্যে কাফিরের দেহের চামড়া হবে বিয়াল্লিশ হাত মোটা, দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে মক্কাহ্-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্ব সমান পরিমাণ। সুনানে তিরমিজি : ২৫৭৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১১০৫, মিশকাত : ৫৬৭৫,  সহীহুল জামি’ : ২১১৪, হাকিম : ৮৭৬০।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জাহান্নামের মধ্যে কাফিরদের উভয় ঘাড়ের দূরত্ব হবে কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের ভ্রমণের দূরত্ব পরিমাণ। অপর এক বর্ণনায় আছে- কাফিরের এক একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান এবং তার দেহের চামড়া হবে তিন দিনের সফরের দূরত্ব পরিমাণ পুরু বা মোটা। সহিহ বুখারী : ৬৫৫১, সহিহ মুসলিম : ২৮৫২, মিশকাত : ৫৬৭২, সহীহুল জামি ৫৫৯১, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩৬৮১, আল মু’জামুল কাবীর লিত্ব তবারানী ৬২৭

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন কাফিরের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মতো, রান বা উরু হবে বায়যা পাহাড়ের মতো মোটা এবং জাহান্নামে তার বসার স্থান হবে তিন দিনের দূরত্ব পরিমাণ বিস্তীর্ণ। যেমন- ’রবযাহ’ (মদীনাহ্ হতে তিন দিনের দূরত্বের ব্যবধান)। সুনানে তিরমিযী : ২৫৭৮, মিশকাত : ৫৬৭৪, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১১০৫, সহীহুল জামি : ৩৮৯০, মুসনাদে আহমাদ : ৮৩২৭

জিন-ইনসান মিলে অগণিত কোটি সংখ্যক ব্যক্তি জাহান্নামে স্থান পাবে। আবার কোন কোন জাহান্নামীর দেহ এত বিরাট হবে যে, তার দাঁতটাই হবে উহুদ পাহাড়ের সমান! বসার স্থান হবে মক্কাহ্-মদীনার মধ্যবর্তী দূরত্ব সমান পথ! প্রকাশ থাকে যে, উহুদ পাহাড়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিমি. প্রস্থ প্রায় ২-৩ কিমি. এবং উচ্চতা ৩৫০ মিটার। জানি না, এই শ্রেণীর জাহান্নামীর সংখ্যাই বা কত। তা সত্ত্বেও জাহান্নাম পরিপূর্ণ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوۡمَ نَقُوۡلُ لِجَہَنَّمَ ہَلِ امۡتَلَاۡتِ وَتَقُوۡلُ ہَلۡ مِنۡ مَّزِیۡدٍ

সেদিন আমি জাহান্নামকে বলব, ‘তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছ’? আর সে বলবে, ‘আরো বেশি আছে কি’? সুরা কাফ : ৩০

আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ লোকদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। খালীফা ও মুতামির (রহ.) আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ জাহান্নামীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতে থাকবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে আরো বেশি আছে কি? আর শেষে আল্লাহ্ রাববুল আলামীন, তাঁর কদম জাহান্নামে রাখবেন। তখন এর এক অংশ অন্য অংশের সঙ্গে মিশে স্থির হতে থাকবে। আর বলবে আপনার ইয্যত ও করমের কসম! যথেষ্ট হয়েছে। জান্নাতের কিছু জায়গা শূন্য থাকবে। অবশেষে আল্লাহ্ সেই শূন্য জায়গার জন্য নতুন কিছু মাখলুক সৃষ্টি করবেন এবং জান্নাতের সেই খালি জায়গায় এদের বসতি করে দেবেন। সহিহ বুখারি : ৪৮৪৮, ৭৩৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৪৮

২২. যে অপরাধের কারনে জাহান্নামে যেতে হবে

মানুষ জাহান্নাম যাবে মূলত তিনটি কারনে, ঈমান না আনার কারনে, আমলেস সলেহা আদায় না করার কারনে ও আল্লাহর নিষধকৃত কাজ করার কারনে। এ সব কারনে কখনো কখনো কুরআন হাদিসে সরাসরি জাহান্নামের আজাব ভোগকরা করা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে এ সম্পর্কিত কুরআন হাদিস উল্লেখ কর  নানা ধরনের আযাব হবে। কতক প্রকার আযাবের কথা কুরআন-হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে, তার কিছু নিম্নরূপঃ

(১) কাফির জাহান্নামে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাযয়িনাহ : ৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَحِيمِ

আর যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

কিন্তু যারা অস্বীকার করবে এবং আমার প্রমাণসমূহকে মিথ্যা বলবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সুরা বাকারা : ৩৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُۥ لَيَحْزُنُكَ ٱلَّذِى يَقُولُونَۖ فَإِنَّهُمْ لَا يُكَذِّبُونَكَ وَلَٰكِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ يَجْحَدُونَ

আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। কিন্তু তারা তো তোমাকে অস্বীকার করে না, বরং জালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। সুরা আনাম : ৩৩

(২) মুশরিক জাহান্নামে যাবে

মুশরিক জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়্যিনাহ : ৬

এই সম্পর্কিত হাদিস জানতে দেখুন-

সহিহ বুখারি : ১৮, ১২৩৮, ২৬৫৪, ২৭৬৬, ২৭৬৭, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, সহিহ মুসলিম : ৮৯, ১৭০৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৬৭১, ৪১৬১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫৩৬।

(৩) মুনাফিক জাহান্নামে যাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ فِی الدَّرۡکِ الۡاَسۡفَلِ مِنَ النَّارِ ۚ  وَلَنۡ تَجِدَ لَہُمۡ نَصِیۡرًا ۙ

নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের নিম্নস্তরের অবস্থান করবে এবং তুমি কখনও তাদের জন্য সাহায্যকারী পাবেনা। সুরা নিসা : ১৪৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَدَ اللّٰهُ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَ الۡمُنٰفِقٰتِ وَ الۡکُفَّارَ نَارَ جَهَنَّمَ خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَا ؕ هِیَ حَسۡبُهُمۡ ۚ وَ لَعَنَهُمُ اللّٰهُ ۚ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ مُّقِیۡمٌ

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফিরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, এটি তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের লা‘নত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আজাব। সুরা তাওবাহ : ৬৮

(৪) আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপকারী

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَبَ عَلَى ٱللَّهِ وَكَذَّبَ بِٱلصِّدْقِ إِذْ جَآءَهُۥٓۚ أَلَيْسَ فِى جَهَنَّمَ مَثْوًى لِّلْكَٰفِرِينَ

তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাসস্থল নয়? সুরা যুমার : ৩২

(৫) আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا صُمٌّ وَبُكْمٌ فِى ٱلظُّلُمَٰتِۗ مَن يَشَإِ ٱللَّهُ يُضْلِلْهُ وَمَن يَشَأْ يَجْعَلْهُ عَلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ

যারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে তারা অন্ধকারের মধ্যে বধির ও বোবা। আল্লাহ যাকে চান বিপথগামী করেন এবং যাকে চান সঠিক পথে রাখেন। সুরা আনাম : ৩৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَٱسْتَكْبَرُوا۟ عَنْهَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

আর যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলবে এবং সেগুলোর ব্যাপারে ঔদ্ধত্য দেখাবে তারাই জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। সুরা আরাফ : ৩৬

(৬) ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা হাদিস বর্ণানাকারী জাহান্নামে যাবে

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি :  ১০৮

আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতা জুবায়েরকে বললাম, আমি তো আপনাকে অমুক অমুকের মত আল্লাহর রসূল ﷺ এর হাদিস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেন, ‘জেনে রাখো, আমি তাঁর থেকে দূরে থাকিনি, কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তাঁর ঠিকানা বানিয়ে নিবে। সহিহ বুখারি : ১০৭, আবু দাউদ : ৪২৬৮

(৭) আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতাকারী জাহান্নামে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَنۡ یَّعۡصِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَیَتَعَدَّ حُدُوۡدَہٗ یُدۡخِلۡہُ نَارًا خَالِدًا فِیۡہَا ۪  وَلَہٗ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ 

আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আযাব। সুরা নিসা : ১৪

(৮) জালিমের জুলুমে সহযোগিতা করো

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেন,

وَلَا تَرْكَنُوْا إِلَى الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ، وَمَا لَكُمْ مِنْ دُوْنِ اللهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُوْنَ

তোমরা জালিমদের ওপর ঝুঁকে পড়ো না তথা তাদেরকে জুলুমের সহযোগিতা করো না। অন্যথায় তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে। আর তখন আল্লাহ ছাড়া কেউ তোমাদের সহায় হবে না। অতএব তখন তোমাদেরকে কোনো সাহায্যই করা হবে না। সুরা হুদ : ১১৩

(৯) সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করা

নবি ﷺ এর স্ত্রী উম্মু সালামা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে লোক রৌপ্যের বাসনে পান করে সে যেন তার পেটের ভিতরে জাহান্নামের আগুন প্রবেশ করায়। সহিহ মুসলিম ২০৬৫, সহিহ বুখারি ৫৬৩৪, ইবনে মাজাহ ৩৪১৩

(১০) মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে নির্যাতনকারি জাহান্নামে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ فَتَنُوا۟ ٱلْمُؤْمِنِينَ وَٱلْمُؤْمِنَٰتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا۟ فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ ٱلْحَرِيقِ

নিশ্চয়ই যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে নির্যাতন করেছে, তারপর তাওবাও করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি এবং তাদেরকে আগুনে জ্বলার শাস্তি দেওয়া হবে। সুরা বুরুজ : ১০

(১১) আল্লাহ ইবাদতে অহংকার করলে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

*وَقَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ  *

তোমার প্রভু বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিরত থাকে তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” সুরা গাফির : ৬০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হবে। সুরা মুমিন : ৬০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَٱدۡخُلُوٓاْ أَبۡوَٲبَ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَا‌ۖ فَلَبِئۡسَ مَثۡوَى ٱلۡمُتَكَبِّرِينَ

সুতরাং তোমরা জাহান্নামের দরজাগুলো দিয়ে প্রবেশ কর, তাতে স্থায়ী হবে। অতএব অবশ্যই অহংকারীদের আবাস অতি নিকৃষ্ট। সুরা নাহাল- : ২৯

(১২) রাসুলুল্লাহ এর উপর মিথ্যা আরোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন-

আমার নামে তোমরা নাম রেখো; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখো না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়। সহিহি বুখারি : ১১০

(১৩) রাসুলুল্লাহ এর আনিত দিনের বিরোধিতাকারী জাহান্নামে যাবে।  

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَ‌ۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا

কিন্তু ব্যক্তি রসুলের বিরোধিতায় কোমর বাঁধে এবং ইমানদারদের পথ পরিহার করে অন্য পথে চলে, অথচ তার সামনে সত্য সঠিক পথ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, তাকে আমি সেদিকেই চালাবো যেদিকে সে চলে গেছে এবং তাকে জাহান্নামে ঠেলে দেবো, যা নিকৃষ্টতম আবাস৷  সুরা নিসা : ১১৫

(১৪) শয়তানের অনুসারী জাহান্নামে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَـٰدِلُ فِى ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٍ۬ وَيَتَّبِعُ ڪُلَّ شَيۡطَـٰنٍ۬ مَّرِيدٍ۬ (٣) كُتِبَ عَلَيۡهِ أَنَّهُ ۥ مَن تَوَلَّاهُ فَأَنَّهُ ۥ يُضِلُّهُ ۥ وَيَہۡدِيهِ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلسَّعِيرِ (٤)

কতক লোক এমন আছে যারা জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর ব্যাপারে বিতর্ক করে এবং প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের অনুসরণ করতে থাকে৷ অথচ তার ভাগ্যেই তো এটা লেখা আছে, যে ব্যক্তি তার সাথে বন্ধুত্ব করবে তাকে সে পথভ্রষ্ট করে ছাড়বে এবং জাহান্নামের আযাবের পথ দেখিয়ে দেবে৷ সুরা হজ্জ : ৩-৪

(১৫) জাকাত আদায় না করার কারনে জাহান্নামে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ ڪَثِيرً۬ا مِّنَ ٱلۡأَحۡبَارِ وَٱلرُّهۡبَانِ لَيَأۡكُلُونَ أَمۡوَٲلَ ٱلنَّاسِ بِٱلۡبَـٰطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ‌ۗ وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَہَا فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ۬ (٣٤) يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِى نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِہَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُہُمۡ وَظُهُورُهُمۡ‌ۖ هَـٰذَا مَا ڪَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ (٣٥)

হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পন্ডিত ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। সেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলিকে উত্তপ্ত করা হবে, অতঃপর ঐগুলি দ্বারা তাদের ললাটসমূহে, পার্শ্বদেশসমূহে এবং পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে, আর বলা হবেঃ এটা হচ্ছে ওটাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে, সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ কর। সুরা তাওবা : ৩৪-৩৫

আনাস ইবনু মালেক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَانِعُ الزَّكَاةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيْ النَّارِ-

যাকাত ত্যাগকারী ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সহিহ আত তারগীম : ৭৬২, সহিহুল  জামেহ : ৫৮০৭।

বহু হাদিসে জাকান আদায় না কারনে জাহান্নামের শাস্তির ঘোষনা এসেছে।  সহিহ বুখারি : ১৪০৩, ১৪৬০, ৪৫৬৫, ৬৬৩৮, ৪৬৫৯, ৬৯৫৭, সহিহ মুসলিম : ৯৯০, সুনানে আবূদাউদ : ১৫৬৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১৯ আহমাদ : ২১৪০৯

(১৬) আত্মহত্যাকারী জাহান্নামে যাবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

হে মু’মিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পদ গ্রাস কর না, কেবল মাত্র পরস্পর সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা কর তা বৈধ এবং তোমরা নিজেদের হত্যা কর না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল। সুরা নিসা : ২৯

সাবিত বিন জাহক (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবি ﷺ ইরশাদ করেন-

যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করলো আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে সে বস্তু দিয়েই শাস্তি দিবেন। সহিহ বুখারি : ১৩৬৩, ৬০৪৭, ৬১০৫, ৬৬৫২, সহিহ মুসলিম : ১১০

(১৭) জানা সত্ত্বেও অন্যকে পিতা দাবি করা

সাদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবি ﷺ-কে বলতে শুনেছি-

যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। সহিহ বুখারি : ৬৭৬৬, সহিহ মুসলিম : ৬৩

আবূ যার (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, যে কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে অন্যকে নিজের বাপ বলে দাবি করে, সে কুফরি করে। যে ব্যক্তি এমন কিছু দাবি করে, যা তার নয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। আর সে যেন নিজস্ব বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি কাউকে কাফের বলে ডাকে বা আল্লাহর দুশমন’ বলে, অথচ বাস্তবে যদি সে তা না হয়, তাহলে তার  উপর তা বর্তায়। সহিহ বুখারি : ৩৫০৮, সহিহ মুসলিম : ২২৬

(১৮) অশ্লীলতা ও অন্যায় আচরণকারী জাহান্নামে যাবে। সুনানে তিরমিজী :  ২০০৯

(১৯) মিথ্যা পাপের পথ দেখায় এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। সহিহ বুখারি ৬০৯৪ , সহিহ মুসলিম : ৬৮০৩-৬৮০৫

(২০) প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে। সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬০৯, সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২,

(২১) আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথার কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৬৪৭৮, ৬৪৭৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৮৮

(২২) ভাস্কর্য বা মূর্তি সম্মানে একটি মাছি উৎসর্গ করার কারণে জান্নাতের গিয়েছিল। আহমাদ : ২২, আয যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫; বায়হাকি শুয়াবুল ইমান : ৭৩৪৩, ইবনে আবি শায়বা :৩৩০৩৮

(২৩) গনিমতের প্রাপ্ত সম্পদ বণ্টনের পূর্বে আত্মসাৎ করা করল জাহান্না যাবে। সুনানে তিরমিজি : ১৫৭৪, সহিহ মুসলিম : ২০৯, সহিহ মুসলীম : ৭৩৭৩

(২৪) জীব জন্তুকে কষ্ট দেয়া, পশুর অঙ্গহানি করা, মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কোনো জন্তুকে আটকে রাখা। সহিহ বুখারি : ২৩৬৫, ৩৩১৮, ৩৪৮২, সহিহ  মুসলিম : ২২৪২

৫৬। মানুষকে কষ্ট দেয়া

(২৫) মিথ্যা শপথকারী জাহান্নামে যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩২৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৬

(২৬) জালিমদের নিকট যাওয়া, তাদেরকে সম্মান করা ও ভালবাসা প্রদর্শন করা। সুনানে তিরমিজি : ৬১৪

(২৭) সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা না দেওয়ার কারনে। সহিহ বুখারি : ৩২৬৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৮৯

(২৮) আমলহীন বক্তাগণ জাহান্নামে যাবে। সহীহ বুখারী : ৪৯৯, ৩২৬৮, মুসনাদ আহমাদ : ১২২১৩ সহীহ তারগীব : ১২০

(২৯) মাদকদ্রব্য সেবনকারী জাহান্নামে যাবে। সহিহ মুসলিম : ২০০২

(৩০)_গীবতকারী জাহান্নামে যাবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৮২

২৩. নির্দিষ্ট কতিপয় জাহান্নামী ব্যক্তি

সাধারণত কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক আমল দেখে তাকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে রায় দিতে পারি না। কারণ অন্তরের অবস্থা এবং জীবনের শেষ মুহূর্তের পরিণতি একমাত্র আল্লাহই জানেন। তবে কুরআন ও হাদিসে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদেরকে জাহান্নামী ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন-

ক. ফিরআউন : মূসা (আঃ)-এর বিরোধীতা করেছেন এবং ঈমান গ্রহন করে নাই। সূরা ইউনুস : ৯০-৯১, সুরা হুদ : ৯৮

খ. নূহ আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী। সুরা তাহরিম : ১০

গ. নূহ আলাইহিস সালাম এর ছেলে কেনান। সুরা হুদ ৪২-৪৬

ঘ. লূত আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী। সুরা তাহরিম : ১০

ঙ. আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিল : রাসূল (ﷺ)-এর কট্টর শত্রু। সুরা লাহার : ১-৪

চ. আবু জাহেল : ইসলামের কট্টর বিরোধী এবং বদর যুদ্ধে নিহত। সহীহ মুসলিম : ১৭৯৪

ছ. উমাইয়া ইবনে খালাফ : বেলাল (রাঃ)-কে নির্যাতনকারী। সহীহ বুখারী : ৩১৪১, সহিহ মুসলিম : ১৭৯৪

জ. আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল: মুনাফিকদের সর্দার। সহীহ বুখারী : ৪৬৭২,  ১৩৬৬, সহীহ মুসলিম : ২৭৭৪, সুরা তাওবা : ৮০, ৮৪

ঝ. আমর বিন আমের আল-খুযায়ী। সহীহ বুখারী : ৪৬২৩, ৬৬৬৩, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৬।

২৪. জাহান্নামকে পরিপূর্ণ করা হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوۡمَ نَقُوۡلُ لِجَہَنَّمَ ہَلِ امۡتَلَاۡتِ وَتَقُوۡلُ ہَلۡ مِنۡ مَّزِیۡدٍ

সেদিন আমি জাহান্নামকে বলব, ‘তুমি কি পরিপূর্ণ হয়েছ’? আর সে বলবে, ‘আরো বেশি আছে কি’? সুরা কাফ : ৩০

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলে জাহান্নাম বলবে, আরো আছে কি? শেষে আল্লাহ্ তাঁর পা সেখানে রাখবেন, তখন সে বলবে, আর না, আর না। সহিহ বুখারি : ৪৮৪৮, ৬৬৬১

আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ লোকদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। খালীফা ও মুতামির (রহ.) আনাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ জাহান্নামীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতে থাকবে। তখন জাহান্নাম বলতে থাকবে আরো বেশি আছে কি? আর শেষে আল্লাহ্ রাববুল আলামীন, তাঁর কদম জাহান্নামে রাখবেন। তখন এর এক অংশ অন্য অংশের সঙ্গে মিশে স্থির হতে থাকবে। আর বলবে আপনার ইয্যত ও করমের কসম! যথেষ্ট হয়েছে। জান্নাতের কিছু জায়গা শূন্য থাকবে। অবশেষে আল্লাহ্ সেই শূন্য জায়গার জন্য নতুন কিছু মাখলুক সৃষ্টি করবেন এবং জান্নাতের সেই খালি জায়গায় এদের বসতি করে দেবেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৮৪

২৫. বান্দাদের জাহান্নাম জাহান্নাম ফয়সালার পর মৃত্যুকে জবেহ করা হবে

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন জান্নাতবাসীগণ জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখন মৃত্যুকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি স্থানে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে জবেহ করে দেয়া হবে। অতঃপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! (এখানে কোন) মৃত্যু আর নেই। হে জাহান্নামীরা! মৃত্যু আর নেই। তাতে জান্নাতীদের আনন্দের উপর আনন্দ আরো অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে, অপরদিকে জাহান্নামীদের দুশ্চিন্তার উপর আরো দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পাবে। সহীহ বুখারী : ৬৫৪৮, মুসলিম : ২৮৫০, মিশকাত : ৫৫৯০, মুসনাদে আহমাদ : ৬০২২, সহীহুল জামি : ৬৩৬,  আবূ ইয়া’লা : ৫৫৮৫, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪৭৪, তবারানী : ১৩১৫৬।

২৬. জাহান্নামীদের আর্তি ও আর্জি

জাহান্নামের আযাব হবে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কুরআন জানায়, সেখানে থাকবে হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস ও ক্রন্দন, কিন্তু মৃত্যু আসবে না এবং আযাবও কমবে না। অধিবাসীরা ফেরেশতাদের কাছে আযাব লাঘবের আকুতি জানাবে, মৃত্যুর জন্য ডাক দেবে, তবু মুক্তি পাবে না। তারা এত কান্না করবে যে অশ্রু শেষ হয়ে রক্ত প্রবাহিত হবে, আর চিৎকারে দুনিয়ার মানুষ শুনলে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেত। এ সম্পর্কে কিছু আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করছি।

ক. মৃত্যুর জন্য আহাজারি করবে, কিন্তু মৃত্যুও আসবে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَىٰ عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابِهَا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ

আর যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। সেখানে তাদের মৃত্যু হবে না যে তারা মরবে, আর তাদের আযাব লাঘবও করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক কুফরকারীকে প্রতিফল দিই। সূরা ফাতির : ৩৬

খ.আযাবের তীব্রতায় তারা মুক্তির জন্য চিৎকার করবে

 আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قَالُوا رَبَّنَا غَلَبَتْ عَلَيْنَا شِقْوَتُنَا وَكُنَّا قَوْمًا ضَالِّينَ 106 رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْهَا فَإِنْ عُدْنَا فَإِنَّا ظَالِمُونَ

তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের উপর প্রাধান্য পেয়েছে, আমরা ছিলাম পথভ্রষ্ট। হে আমাদের রব! আমাদের এখান থেকে বের করে দিন; যদি আমরা আবার ফিরে যাই, তবে আমরা নিশ্চয়ই জালিম।’ সূরা মু’মিনূন :১০৬-১০৭

গ. জাহান্নামের শব্দ ও উত্তাপ শুনেই আতঙ্কিত হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِذَا أُلْقُوا فِيهَا سَمِعُوا لَهَا شَهِيقًا وَهِيَ تَفُورُ 7 تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ ۖ كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ

যখন তারা এতে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তারা এর ভয়ঙ্কর গর্জন শুনবে এবং এটি জ্বলে ফুটতে থাকবে। প্রায় ক্রোধে ফেটে যাবে।” সূরা মুলক : ৭-৮

ব্যাখ্যা:

হাহাকারের কারনে অন্য কিছুই শুনা যাবে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَهُمْ فِيهَا لَا يَسْمَعُونَ

বাংলা: “সেখানে তাদের জন্য থাকবে হাহাকার, আর সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না। সূরা আম্বিয়া : ১০০

ঙ. কষ্ট লাঘবের আশায় তারা ফেরেশতাদের অনুরোধ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَ الَّذِينَ فِي النَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِّنَ الْعَذَابِ

বাংলা: “আগুনে অবস্থানকারীরা জাহান্নামের প্রহরীদের বলবে, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে প্রার্থনা করো, যাতে অন্তত এক দিনের জন্য আমাদের আযাব লাঘব করা হয়। রা গাফির : ৪৯

চ. আযাব সহ্য করতে না পেরে তারা মৃত্যুর আকুতি জানাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ ۖ قَالَ إِنَّكُم مَّاكِثُونَ

বাংলা: “তারা ডাক দেবে, ‘হে মালিক! আপনার রব যেন আমাদের মৃত্যু ঘটান।’ সে বলবে, ‘তোমরা তো এখানে স্থায়ী থাকবে।’” সূরা যুখরুফ : ৭৭

ছ. এ সম্পর্কে সহিহ হাদিস থেকে কিছু উদাহরণ

(১) কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে আনা হবে। এর থাকবে সত্তর হাজার লাগাম, প্রতিটি লাগাম টানবে সত্তর হাজার ফেরেশতা। আগমনের সময় জাহান্নাম ভয়ঙ্কর গর্জন করবে। সহিহ বুখারি : ৪৮৪৮

(২) জাহান্নামের অধিবাসীরা এত কান্না করবে যে তাদের অশ্রুর স্রোতে নৌকা চলতে পারত, আর অশ্রু শেষ হলে তারা রক্ত দিয়ে কান্না করবে।” সহিহ মুসলিম : ২৮৪৩

(৩) তারা ডাক দেবে: ‘হে আমাদের রব! আমাদের বের করে দিন, আমরা সৎকর্ম করব।’” সহিহ মুসলিম : ২৮৫০

(৪) জাহান্নামের অধিবাসীরা এত কান্না করবে যে তাদের চোখের পানি মুখে খাঁজ তৈরি করবে।” সহিহ মুসলিম : ২৮৪২

(৫) আল্লাহ বলবেন: ‘চুপ থাকো এতে, আর আমার সাথে কথা বলো না। তখন তাদের সব আর্তনাদ বন্ধ করে দেওয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৭১

২৭. জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায়

কুরআন-সুন্নাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে সঠিক ঈমান, অবিরাম নেক আমল, পাপ থেকে বেঁচে থাকা, তাওবা করতে এবং আল্লাহর কাছে মুক্তির দুআ। এ পাঁচটি মূলনীতি আঁকড়ে ধরলে একজন মুমিন জাহান্নামের আযাব থেকে নিরাপদে থাকতে পারবে ইনশাআল্লাহ।

ক. ঈমান আনতে হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি (খাঁটি মনে) এ বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে যে, ’’আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই’’ সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৬. শু‘আবুল ঈমান : ৯৪

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন, জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবূ যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ৯৪

খ. নেক আমল করতে হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত প্রদান করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। সুরা বাকারা  : ২৭৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সুরা নিসা : ১২২

ব্যাখ্যা: সালাত, সিয়াম, যাকাত, সাদকা, কুরআন তিলাওয়াত, সৎ পরামর্শ ইত্যাদি নেক আমল জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবে।

গ. পাপ বর্জন করতে হবে

পাপ বর্জন করা আসলে জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রধানতম উপায়গুলোর একটি। কুরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বড় গুনাহ বর্জন, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা, ও হারাম কাজ পরিহার করা, এগুলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য অপরিহার্য শর্ত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ

যারা বড় গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকে, ক্ষুদ্র ত্রুটি ব্যতীত, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমায় প্রসারিত।” সূরা আন-নাজম : ৩২

ব্যাখ্যা: বড় গুনাহ বর্জন করলে আল্লাহ ক্ষুদ্র গুনাহ ক্ষমা করে দেন, ফলে আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

 আল্লাহ তায়ালা বলেন—

إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا

অর্থ: “যদি তোমরা তোমাদের নিষিদ্ধ বড় গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাকো, তবে আমি তোমাদের ছোট গুনাহগুলো মোচন করব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ করাব। সূরা আন-নিসা : ৩১

ব্যাখ্যা: সরাসরি ঘোষণা—বড় গুনাহ বর্জন জান্নাতের গ্যারান্টি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি।

ঘ. তাওবা করত হবে করতে হবে

তাওবা বা অনুশোচনা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার এক শক্তিশালী উপায়। এটি কেবল মুখের কথা নয়, বরং এটি একটি আন্তরিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। তাওবার মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমা। যখন একজন বান্দা আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তার অতীতের সব পাপ ক্ষমা করে দেন। যেহেতু জাহান্নামের শাস্তি পাপের কারণে হয়, তাই পাপ ক্ষমা হয়ে গেলে সেই শাস্তির আর কোনো কারণ থাকে না। এভাবে তাওবা পাপের কলুষতা দূর করে মানুষকে পবিত্র করে তোলে, যা তাকে জান্নাতের উপযুক্ত করে তোলে।

তাওবার শর্তআল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ فَتَنُوا الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ لَمۡ یَتُوۡبُوۡا فَلَہُمۡ عَذَابُ جَہَنَّمَ وَلَہُمۡ عَذَابُ الۡحَرِیۡقِ ؕ

নিশ্চয় যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে আযাব দেয়, তারপর তাওবা করে না, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব। আর তাদের জন্য রয়েছে আগুনে দগ্ধ হওয়ার আযাব। সুরা বুরুজ : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

اِلَّا مَنۡ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَاُولٰٓئِکَ یُبَدِّلُ اللّٰہُ سَیِّاٰتِہِمۡ حَسَنٰتٍ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا

তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা ফুরকান : ৭০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ یَقۡبَلُ التَّوۡبَۃَ عَنۡ عِبَادِہٖ وَیَعۡفُوۡا عَنِ السَّیِّاٰتِ وَیَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُوۡنَ ۙ

আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবূল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তা তিনি জানেন। সুরা আশ শুরা : ২৫

ঙ. দুআর মাধ্যমে সাহায্য চাইতে হবে

মহান আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

 হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোযখ-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর। সুরা বাকারা : ২০১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ ۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا (65) إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি নিবৃত্ত কর; জাহান্নামের শাস্তি তো নিশ্চিতভাবে ধ্বংসাত্মক; নিশ্চয় তা আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসাবে অতীব নিকৃষ্ট!’ সুরা ফুরকান : ৬৫-৬৬

সন্তান জন্মের আগে প্রস্তুতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তানের জন্ম কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয় সন্তান ধারণের অনেক আগে থেকেই। একজন সুস্থ ও আদর্শ সন্তান পাওয়ার জন্য মা-বাবাকে তাদের জীবনধারার বিভিন্ন দিক নিয়ে সচেতন থাকতে হয়। এই প্রস্তুতি শুরু হয় সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে, যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিবাহের সম্পর্ক এমনভাবে স্থাপিত হওয়া উচিত যা ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী পবিত্র ও বৈধ।

সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই শুরু হয় আরেকটি নতুন অধ্যায়। এ সময় গর্ভবতী মায়ের প্রতি পরিবারের সবার, বিশেষ করে স্বামীর, যত্নশীল হওয়া অপরিহার্য। মাকে কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক সহায়তাও প্রদান করা উচিত। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের আচরণ ও জীবনযাপন সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এ সময়ে মাকে অবশ্যই ইসলাম-বিরোধী কাজ, যেমন অশ্লীল বিনোদন বা মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে, ইসলামী দিকনির্দেশনা মেনে চলা এবং কুরআনের শিক্ষা অনুশীলন করা গর্ভস্থ শিশুর জন্য কল্যাণকর। আধুনিক বিজ্ঞানও গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকার ওপর জোর দেয়। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা একটি সুস্থ, সুন্দর ও নৈতিকভাবে উন্নত প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপন করে। এ সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করা হলো।

পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন

ইসলামে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু দুটি মানুষের মধ্যে চুক্তি নয়, বরং একটি সুখী পরিবারের ভিত্তি। ইসলাম এই ক্ষেত্রে দ্বীনদারীকে (ধার্মিকতা) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এর পাশাপাশি সচ্চরিত্র, উত্তম আখলাক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনা করা উচিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, উত্তম সঙ্গী নির্বাচন একটি সফল জীবনের চাবিকাঠি। সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পরিবারে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়, যা তাদের জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। তাই, এটি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত যা ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়েও সমাজের কল্যাণের সাথে জড়িত।

১. পাত্রী নির্বাচনের আগে দেখে নেওয়া ভালো

বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখে নেওয়া একটি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্য। যখন দুটি মানুষ একে অপরকে দেখে, তখন তাদের মধ্যে একটি মানসিক সংযোগ স্থাপন হয়, যা তাদের সম্পর্ককে মজবুত করে এবং এর মাধ্যমে দুজনের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মিল সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। তাই পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখে নিলে তাদের মধ্যে এই সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।

মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি এক মহিলার নিকট বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাকে দেখে নাও, তোমাদের মধ্যে এটা ভালবাসার সৃষ্টি করবে। সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭,

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন-

اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَفَعَلَ فَتَزَوَّجَهَا فَذَكَرَ مِنْ مُوَافَقَتِهَا

তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

২. একজন দ্বীনদার নারীকে বিবাহ করা

আবু হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। মিশকাত : ৩০৯০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৭, ইরওয়া ১৮৬৮

আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৫

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সহিহ মুসলিম : ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ী ৩২৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৮, মিশকাত : ৩০৭৪,  আহমাদ : ৯৫২১, ৯৫২৬,  ইরওয়া : ১৭৮৩, সহীহ আল জামি : ৩০০৩

৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করতে হবে

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৮, সহীহাহ : ১০৬৭

৪. পাত্রী নির্বাচনে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনা করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

انْكِحُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ

তোমরা বিবাহ করো আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৩

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেন, এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

৫. কুমারীত্ব নারীকে বিবাহ করা উত্তম

আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ

তোমাদের কুমারী মেয়ে বিবাহ করা উচিত। কেননা তারা মিষ্টিমুখী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট হয়। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬১, মিশকাত : ৩০৯২, সহীহাহ : ৬২৩, সহীহ আল জামি : ৪০৫৩।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত। জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। সহিহ বুখারী : ৫২৪৭, ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

৬. সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

উট আরোহণকারিণীদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী কুরায়শ বংশের নারীগণ, তারা শৈশবকালে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা হয় এবং স্বামীর ধন-সম্পদের উত্তম রক্ষনাবেক্ষণকারিণী হয়। সহিহ বুখারি : ৫০৮২, সহিহ মুসলিম : ২৫২৭, মিশকাত : ৩২০৪ সহীহাহ্ ১০৫২, সহীহ আল জামি‘ ৩৩২৯।

যাদের সাথে বিবাহ হারাম

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের সাথে বিবাহ করা হারাম বা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হল রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَبَنٰتُکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ وَعَمّٰتُکُمۡ وَخٰلٰتُکُمۡ وَبَنٰتُ الۡاَخِ وَبَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَاُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَاُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَرَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫  فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫  وَحَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ  وَاَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۙ

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৩

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

বিবাহের শরীয়ি পদ্ধতি

ইসলামে বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু দুটি মানুষের বন্ধন নয়, বরং একটি ইবাদত। দুঃখজনকভাবে, আমরা আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ করে থাকি। ইসলাম বিয়ের প্রথম ধাপ, অর্থাৎ কনে দেখার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দ্বীনদারী (ধার্মিকতা)-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। কনে দেখার সময় শরীয়তের বিধি-বিধান মেনে পর্দা রক্ষা করা, মেয়ের ব্যাপারে ভালোভাবে খোঁজ নেওয়া এবং কোনো ধরনের অনৈসলামিক বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকা জরুরি। বিয়ের এই শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তাহলে পুরো দাম্পত্য জীবনই আল্লাহর রহমতে ভরে ওঠে।

শরীয়তে বিবাহ বলতে কী বুঝায় :

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ একটি পবিত্র চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে। এটি শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত ও সুন্নাহ, যার মাধ্যমে একটি নতুন পরিবার গঠিত হয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ের মূল কার্যক্রম পাঁচটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া (প্রপোজাল)

‘ইজাব’ শব্দের অর্থ হলো প্রস্তাব দেওয়া। বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে বিয়ের জন্য যে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাকে ইজাব বলে। সাধারণত, ছেলে পক্ষ মেয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু এর উল্টোটাও হতে পারে। এই প্রস্তাব হতে পারে সরাসরি, যেমন “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”, অথবা অভিভাবকের মাধ্যমে, যেমন “আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।” এটি বিয়ের প্রথম পদক্ষেপ এবং একটি বৈধ চুক্তির শুরু।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি :  ৫০৬

ক. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১

খ. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :

বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ 

আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।

তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।

গ. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :

আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.

‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি :  ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।

আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১

ক. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

(১) পিতা, (২) দাদা, (৩) ভাই, (৪) চাচা, (৫) অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়, (৬) ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসকঅ

যদি কনের কোনো ওয়ালি না থাকে, অথবা ওয়ালি থাকা সত্ত্বেও তিনি দূরে থাকেন, বা বিবাহে বাধা দেন কিন্তু শরিয়তসম্মত কোনো কারণ না দেখাতে পারেন, তাহলে ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক কনের ওয়ালি হবেন।

খ. অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা

কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-

(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)

(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

(৩) স্বাধীন হওয়া

(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)

(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না

(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)

৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকবে

বিয়েকে বৈধতা ও স্বীকৃতি দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। ইসলামে কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। সাক্ষীরা বিয়ের চুক্তিটির সত্যতা নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্য হয় এবং সমাজে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ থাকে না।

ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।

ক. সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।

খ.  সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২

যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।

ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»

“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

‘মোহর’ হলো এমন একটি অর্থ বা সম্পদ যা স্বামী তার স্ত্রীকে বিবাহের চুক্তির অংশ হিসেবে প্রদান করে। এটি স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার, যা তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। মোহরের পরিমাণ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত, যাতে তা দিতে বরের কোনো কষ্ট না হয়। মোহর নির্ধারণের মাধ্যমে স্ত্রীকে সম্মানিত করা হয় এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪ 

আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬,  সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।

৫. কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:

পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”

যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।

ইজাব ও কবুলের শর্ত

একটি সঠিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:

ক. একই মজলিস : ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে। আল-ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৮৭

খ. সাক্ষী : ইজাব ও কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হলেও চলবে। এটি বিয়ের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সূরা তালাক : ২

গ. স্পষ্ট ভাষা: প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়ই স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৬৭

এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :

আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি  মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১

খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯

এই পাঁচটি ধাপ হলো একটি ইসলামী বিবাহের মূল ভিত্তি। এই নিয়মগুলো মেনে চললে বিবাহ একটি মজবুত ও বরকতময় বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দাম্পত্য জীবনের সুন্নাহ সম্মত আমল

১. বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল দুআ পাঠ করা

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ স্ত্রী, খাদেম অথবা আরোহণের পশু লাভ করে তখন সে যেন তার কপালে হাত রেখে বলে-

اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করি এবং যে কল্যাণ এর মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। আমি তোমার নিকট এর অনিষ্ট হতে এবং যে অনিষ্টসহ একে সৃষ্টি করা হয়েছে তা হতে আশরয় চাই’’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯১৮, বাইহাকী, সুনান কুবরা : ১৪২১১

আমর ইবনু শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে অথবা কোনো দাসী ক্রয় করে তখন সে যেন বলে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ،

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর মধ্যকার কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ চাই এবং তার মধ্যে নিহিত অকল্যাণ ও তার মাধ্যমে অকল্যাণ থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।’’

আর যখন কোনো উট কিনবে তখন যেন সেটির কুঁজের উপরিভাগ ধরে অনুরূপ দু’আ করে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আবূ সাঈদের বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তার কপালের চুল ধরে বলবে। স্ত্রী এবং দাসীর ব্যাপারেও বরকতের দু’আ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৬০

০২. স্বামী-স্ত্রী  উভয়ে একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করা :

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে যাবে, স্বামী তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আর স্ত্রীও দাঁড়িয়ে যাবে তার পেছনে। অতপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করবে এবং বলবে-

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي أَهْلِي، وَبَارِكْ لَهُمْ فِيَّ، اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي مِنْهُمْ وَارْزُقْهُمْ مِنِّي، اللَّهُمَّ اجْمَعَ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ إِلَى خَيْرٍ، وَفَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন আর আমার ভেতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। আয় আল্লাহ, আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযক দিন আর আমার থেকে তাদেরও রিযক দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্র রাখুন আর আমাদের মাঝে যখন বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন তখন কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন। . তাবরানী, মুজামুল কাবীর : : ৮৯০০, মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ১৭৪৩৩

০৩. সহবাস করার ইচ্ছা করলে দুআ দুআ পাঠ করা

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে-

بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏

“আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

 অতঃপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ১৪১, ৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৪, সুনানে তিরমিযী ১০৯২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৬১, আহমাদ : ১৮৭০, ১৯১১, ২১৭৯, ২৫৫১, ২৫৯২, দারেমী : ২২১২, ইরওয়াহ : ২০১২

০৪. সহবাসের সময় পর্দা করা।

উতবা ইবনু আব্দ আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর নিকট এসে যেন (নির্জনে মিলনে) পর্দা (গোপনীয়তা) রক্ষা করে এবং গর্দভের ন্যায় বিবস্ত্র না হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, ইরওয়া : ২০০৯

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইনি বা তা দেখিনি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, আহমাদ ২৩৮২৩, ইরওয়া : ১৮১২, মিশকাত : ৩১২৩

০৫. নিষিদ্ধ সময় ও জায়গা থেকে বিরত থাকা :

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে অথবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়।  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে। সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৩৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’। সূরা বাকারা : ২২৩। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু মলদ্বার ও ঋতুবতী হতে বিরত থাক। মিশকাত : ৩১৯১, সুনানে তিরমিযী : ২৯৮০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯২৫, আহমাদ : ২৭০৩, সহীহ আল জামি :  ১১৪১।

০৬. ঘুমানোর আগে অযূ বা গোসল করা :

স্ত্রী সহবাসের পর সুন্নত হলো অযূ বা গোসল করে তবেই ঘুমানো। অবশ্য গোসল করাই উত্তম।

আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ، إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ

তিন প্রকার ব্যক্তির নিকট ফিরিশতারা আসেন না। (১) কাফিরের লাশের নিকট (জানাযায়). (২) জাফরান রঙ ব্যবহারকারী এবং (৩) নাপাক ব্যক্তির নিকট, তবে সে উযু করলে ভিন্ন কথা। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৮০

০৭. স্ত্রী ঋতুবতীর হলেও যা যা অনুমতি রয়েছে

স্বামীর জন্য ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে যোনি ব্যবহার ছাড়া অন্য সব আচরণের অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী পবিত্র হবার পর গোসল করলে তার সঙ্গে সবকিছুই বৈধ।

আনাস (রা. থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীগণ তাদের মহিলাদের হায়িয হলে তার সাথে এক সঙ্গে খাবার খেত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন-

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  সূরা বাকারা : ২২২

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়।

অতঃপর উসায়দ ইবনু হুযায়র (রা.) ও আব্বাদ ইবনু বিশ্বর (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এমন এমন বলছে। আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্থায়) সহবাস করব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এতে আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি তাদের উপর ভীষণ রাগাম্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুধ হাদিয়া এলো। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্যে লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বুঝল যে, তিনি তাদের উপর রাগ করেননি। সহিহ মুসলিম : ৩০২

০৮. কোন দিন স্ত্রী সান্বিধ্যের গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

০৯. বিশুদ্ধ নিয়তে স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬