জান্নাতের বিবরণ : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৩. সত্তর হাজার লোকের বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের সত্তর হাজার অথবা সাত লাখ লোক একে অপরের হাত ধরে জান্নাতে দাখিল হবে। বর্ণনাকারীর এ দু’সংখ্যার মাঝে সন্দেহ রয়েছে। তাদের প্রথম থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত সকলেই জান্নাতে দাখিল হবে আর তাদের চেহারাগুলো পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় জ্বল জ্বল করতে থাকবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪৩

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আগের উম্মাতদের আমার সামনে পেশ করা হয়। কোন নবী তাঁর বহু উম্মাতকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। কোন নবীর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ছোট দল। কোন নবীর সঙ্গে আছে দশজন উম্মাত। কোন নবীর সাথে আছে পাঁচজন আবার কোন নবী একা একা যাচ্ছেন। দৃষ্টি দিতেই, হঠাৎ দেখি অনেক বড় একটি দল। জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিব্রীল! ওরা কি আমার উম্মাত? তিনি বললেন, না। তবে আপনি শেষ প্রান্তের দিকে তাকিয়ে দেখুন! আমি দৃষ্টি দিলামঃ হঠাৎ দেখি অনেক বড় একটি দল। তিনি বললেন, ওরা আপনার উম্মাত। আর তাদের অগ্রবর্তী সত্তর হাজার লোকের কোন হিসাব হবে না, তাদের কোন আযাব হবে না।

আমি বললাম, কারণ কী! তিনি বললেন, তারা শরীরে দাগ লাগাত না, ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিত না এবং শুভ অশুভ লক্ষণ মানত না। আর তারা কেবল তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করত। তখন উক্কাশা ইবনু মিহসান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি আমার জন্য দু’আ করুন আল্লাহ্ যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ’’হে আল্লাহ্ তুমি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর।’’ এরপর আরেক জন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার জন্য দু’আ করুন আল্লাহ্ যেন আমাকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ ব্যাপারে উক্কাশা তোমার আগে চলে গেছে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, আমার উম্মাত থেকে কিছু লোক দল বেঁধে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের সংখ্যা সত্তর হাজার। তাদের চেহারাগুলো পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মত জ্বল জ্বল করবে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, এতদশ্রবণে উক্কাশা ইবনু মিহসান আসাদী তাঁর গায়ে চাদর জড়ানো অবস্থায় দাঁড়ালেন, এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দু’আ করুন, আল্লাহ্ যেন আমাকে তাঁদের মধ্যে শামিল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ্! আপনি একে তাদের মধ্যে শামিল করুন। এরপর আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের মধ্যে শামিল করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ্! আপনি একে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এরপর আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ্! আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের মধ্যে শামিল করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উক্কাশা এ ব্যাপারে তোমার চেয়ে এগিয়ে গেছে। সহিহ বুখারি : ৬৫৪২

১৪. জান্নাতিদের মৃত্যু বা ঘুম নাই ।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে জিজ্ঞেস করল, জান্নাতবাসীগণ কি ঘুমাবে? তিনি বললেন, নিদ্রা তো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসী মরবে না (অতএব তাদের কোন নিদ্রা নেই)। মিশকাত : ৫৬৫৪, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৪৭৪৫, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৮৭, সহীহুল জামি : ৬৮০৮

১৫. জান্নাতবাসীরা পৃথিবীর অবিশ্বাসী সাথীদের অবস্থা দেখতে পাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَأَقۡبَلَ بَعۡضُہُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٍ۬ يَتَسَآءَلُونَ (٥٠) قَالَ قَآٮِٕلٌ۬ مِّنۡہُمۡ إِنِّى كَانَ لِى قَرِينٌ۬ (٥١) يَقُولُ أَءِنَّكَ لَمِنَ ٱلۡمُصَدِّقِينَ (٥٢) أَءِذَا مِتۡنَا وَكُنَّا تُرَابً۬ا وَعِظَـٰمًا أَءِنَّا لَمَدِينُونَ (٥٣) قَالَ هَلۡ أَنتُم مُّطَّلِعُونَ (٥٤) فَٱطَّلَعَ فَرَءَاهُ فِى سَوَآءِ ٱلۡجَحِيمِ (٥٥) قَالَ تَٱللَّهِ إِن كِدتَّ لَتُرۡدِينِ (٥٦) وَلَوۡلَا نِعۡمَةُ رَبِّى لَكُنتُ مِنَ ٱلۡمُحۡضَرِينَ (٥٧)

অতঃপর তারা মুখোমুখি হয়ে পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করবে। তাদের একজন বলবে, (পৃথিবীতে) আমার এক সঙ্গী ছিল, সে বলত, তুমি কি সে লোকদের অন্তর্ভুক্ত যারা বিশ্বাস করে আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে যাবো তখনও কি আমাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে? আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি উঁকি দিয়ে দেখবে? অতঃপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে (পৃথিবীর সঙ্গীকে) দেখবে জাহান্নামের মধ্যস্থলে। সে বলবে, আল্লাহর কসম! তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলে! আমার রবের অনুগ্রহ না থাকলে আমিও তো (জাহান্নামে) হাযিরকৃতদের একজন হতাম”। সূরা সাফফাত : ৫০- ৫৭

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

كُلُّ نَفۡسِۢ بِمَا كَسَبَتۡ رَهِينَةٌ ٣٨ إِلَّآ أَصۡحَٰبَ ٱلۡيَمِينِ ٣٩ فِي جَنَّٰتٖ يَتَسَآءَلُونَ ٤٠ عَنِ ٱلۡمُجۡرِمِينَ ٤١ مَا سَلَكَكُمۡ فِي سَقَرَ ٤٢ قَالُواْ لَمۡ نَكُ مِنَ ٱلۡمُصَلِّينَ ٤٣ وَلَمۡ نَكُ نُطۡعِمُ ٱلۡمِسۡكِينَ ٤٤ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ ٱلۡخَآئِضِينَ ٤٥ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤٦ حَتَّىٰٓ أَتَىٰنَا ٱلۡيَقِينُ ٤٧ فَمَا تَنفَعُهُمۡ شَفَٰعَةُ ٱلشَّٰفِعِينَ ٤٨ فَمَا لَهُمۡ عَنِ ٱلتَّذۡكِرَةِ مُعۡرِضِينَ

“প্রতিটি প্রাণ নিজ অর্জনের কারণে দায়বদ্ধ; কিন্তু ডান দিকের লোকেরা নয়, জান্নাতসমূহের মধ্যে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করবে অপরাধীদের সম্পর্কে: কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করালো? তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আর আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করতাম না। আর আমরা অনর্থক গল্প-গুজবকারীদের সাথে (বেহুদা আলাপে) মগ্ন থাকতাম। আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অবিশ্বাস করতাম। অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে। অতএব সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না। আর তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ বাণী থেকে বিমুখ?” সূরা মুদ্দাসসির : ৩৮-৪৯

১৬. জান্নাতের অধিকাংশ অধিবাসী হবে দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণীর মানুষ।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

আমি জান্নাতে তাকালাম, অধিকাংশ অধিবাসী গরীবদের ছিল; আর দোযখে তাকালাম, অধিকাংশ অধিবাসীই মহিলা ছিল। , সহিহ বুখারি : ৩২৪১, ৫১৯৮, ৬৪৪৯, ৬৫৪৬

৪৮৫০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম পরস্পর বিতর্ক করে। জাহান্নাম বলে দাম্ভিক ও পরাক্রমশালীদের দ্বারা আমাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। জান্নাত বলে, আমার কী হলো? আমাতে কেবল মাত্র দুর্বল এবং নিরীহ ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’আলা জান্নাতকে বলবেন, তুমি আমার রহমত। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে আমি অনুগ্রহ করব। আর তিনি জাহান্নামকে বলবেন, তুমি হলে আযাব। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেব। জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে পূর্ণতা। তবে জাহান্নাম পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না তিনি তাঁর পা তাতে রাখবেন। তখন সে বলবে, বাস, বাস, বাস। তখন জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যাবে এবং এর এক অংশ অপর অংশের সঙ্গে মুড়িয়ে দেয়া হবে। আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো প্রতি জুলুম করবেন না। অবশ্য আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতের জন্য অন্য মাখলূক সৃষ্টি করবেন। সহিহ বুখারি : ৪৮৫০, সহিহ মুসলিম : ২৮৪৬, আহমাদ : ৮১৭০

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে জান্নাতীদের সম্পর্কে অবহিত করব না কি? (তারা হল) প্রত্যেক দুর্বল ব্যক্তি এবং এমন ব্যক্তি যাকে দুর্বল মনে করা হয়। সে যদি আল্লাহর নামে কসম খায়, তাহলে তা তিনি নিশ্চয়ই পুরা করে দেন। আমি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের সম্পর্কে অবহিত করব না কি? (তারা হল) প্রত্যেক রূঢ় স্বভাব, কঠিন হৃদয় ও দাম্ভিক ব্যক্তি।” সহীহ মুসলিম : ৬৯৮২

১৭. গরীবরা ধনীদের চেয়ে আগে জান্নাতে যাবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ فُقَرَاءَ الْمُهَاجِرِينَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ قَبْلَ أَغْنِيَائِهِمْ بِمِقْدَارِ خَمْسِمِائَةِ سَنَةٍ

দরিদ্র মুহাজিরগণ তাদের বিত্তবানদের তুলনায় পাঁচ শত বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১২৩, সুনানে তিরমিযী ২৩৫১, মিশকাত : ২১৯৮।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন ফকীর মুহাজির ব্যক্তিগণ ধনীদের চেয়ে চল্লিশ বছর পূর্বে জান্নাতে পৌছে যাবে। একথা শুনে তারা বললেন, আমরা ধৈর্য ধারন করব, আমরা কিছুই চাই না। সহিহ মুসলিম : ৭১৯৩ আংশিক

১৮. জান্নাত লাভ কর বড় কঠিন কাজ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

حُجِبَتْ النَّارُ بِالشَّهَوَاتِ وَحُجِبَتْ الْجَنَّةُ بِالْمَكَارِهِ>

জাহান্নাম কামনা বাসনা দ্বারা বেষ্টিত। আর জান্নাত বেষ্টিত দুঃখ-মুছিবত দ্বারা। সহিহ বুখারি : ৬৪৮৭, সহিহ মুসলিম :  ২৮২২, ২৮২৩, আহমাদ ১২৫৬০

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক ভয় পায় সে ভোররাতেই যাত্রা শুরু করে, আর ভোররাতেই যে লোক যাত্রা শুরু করে, সে গন্তব্য স্থলে পৌছতে পারে। জেনে রাখ, আল্লাহ তা’আলার পণ্য খুবই দামী। জেনে রাখ, আল্লাহ্ তা’আলার পণ্য হলো জান্নাত। সুনানে তিরমিজি : ২৪৫০,  সহিহাহ : ৯৫৪, ২৩৩৫, মিশকাত : ৫৩৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরীল (আঃ)-কে জান্নাতের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলেনঃ জান্নাত এবং আমি এর মধ্যে জান্নাতীদের জন্য যেসব দ্রব্যাদি সৃষ্টি করে রেখেছি, তুমি সেগুলো দেখে এসো। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি জান্নাতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিকৃত সমস্ত দ্রব্যাদি দেখলেন এবং তার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে কেউ জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ প্রসঙ্গে শুনবে, সে-ই তাতে প্রবেশের চেষ্টা করবে। তারপর তিনি আদেশ করলেন। ফলে কষ্ট-মুসীবাতের বস্তু দ্বারা জান্নাতকে ঘেরাও করা হলো। তিনি জিবরীল (আঃ)-কে পুনরায় বললেনঃ তুমি আবার জান্নাতে প্রবেশ কর এবং জান্নাতীদের জন্য আমার তৈরিকৃত সামগ্ৰী দেখে এসো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  তারপর তিনি সেখানে ফিরে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তা কষ্ট ও মুসীবাতের বস্তু দ্বারা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তিনি আল্লাহ তা’আলার নিকট ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! আমার ভয় হচ্ছে যে, এতে কোন ব্যক্তিই যেতে পারবে না। এবার আল্লাহ তা’আলা তাকে বললেনঃ আমি জাহান্নাম এবং জাহান্নামীদের জন্য যে আযাব তৈরী করে রেখেছি তুমি গিয়ে তা দেখে এসো। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন যে, এর একাংশ অন্য অংশের উপর চড়াও হচ্ছে (একটি অন্যটিকে গ্রাস করছে)। তিনি তা দেখার পর আল্লাহ তা’আলার সামনে ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের শপথ! যে ব্যক্তি এর বর্ণনা শুনবে সে এতে প্রবেশ করবে না। তারপর তার নির্দেশে জাহান্নামকে লোভ-লালসা দ্বারা ঘিরে ফেলা হলো। এবার জিবরীল (আঃ)-কে তিনি বললেনঃ তুমি আবার সেখানে যাও (এবং তা দেখে এসো)। তিনি সেখানে আবারো গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন, আপনার সম্মানের কসম! আমার তো ধারণা হচ্ছে যে, কেউই এই থেকে মুক্তি পাবে না, সকলেই এতে প্রবেশ করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪৪

১৯. জান্নাতে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশী হবে

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেনঃ ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১, ৭৪৮, ১০৫২, ৩২০২, ৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪

উসামা ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি জান্নাতের গেটে দাড়ালাম, দেখলাম যারা তাতে প্রবেশ করেছে তারা অধিকাংশ ছিল দুনিয়াতে দরিদ্র অসহায়। আর ধনী ও প্রভাবশালীদের আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে যাদের জাহান্নামে যাওয়ার ফয়সালা হয়ে গেছে তাদের কথা আলাদা। আর আমি জাহান্নামের প্রবেশ পথে দাড়ালাম। দেখলাম, যারা প্রবেশ করছে তাদের অধিকাংশ নারী”। সহিহ বুখারী : ৫১৯৬।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে নারীগণ! তোমরা দান-সদকা করো। বেশি বেশি করে আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। কেননা আমি জাহান্নামে তোমাদের অধিকহারে দেখেছি। এ কথা শোনার পর উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে একজন (যার নাম ছিল জাযলা) প্রশ্ন করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কেন এ অবস্থা? কেন জাহান্নামে আমরা বেশি সংখ্যায় যাবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা স্বামীর প্রতি বেশি অকৃতজ্ঞ ও অভিশাপ দাও বেশি”। সহীহ মুসলিম : ৭৯।

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০ আহমাদ : ৫৪৪৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের নারীদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ তারাই, যারা বেপর্দা ও অহংকারী। আর এ ধরনের নারীরা কপট। তারা লাল ঠোঁট ও পা-বিশিষ্ট কাকের মতো (বিরল সংখ্যক) জান্নাতে যাবে। মুসনাদ আহমাদ : ২৬৮২

২০. মৃত শিশুদের জান্নাত-জাহান্নাম

কাফির ব্যক্তি তার কুফরীর কারণে জাহান্নামে যাবে এবং মুমিন ব্যক্তি তার ঈমানের কারণে জান্নাতে যাবে—এটি ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। কিন্তু মৃত শিশু ঈমান বা কুফরি কোন গ্রহন করা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই যেসব শিশু সাবালক হওয়ার আগেই মারা যায়, তাদের ওপর কোনো শরয়ী বিধান প্রযোজ্য হয় হবে না। এ সম্পর্কে কুরআনের একটি আয়াত লক্ষ করি। আল্লাহ তায়াল বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَاتَّبَعَتۡہُمۡ ذُرِّیَّتُہُمۡ بِاِیۡمَانٍ اَلۡحَقۡنَا بِہِمۡ ذُرِّیَّتَہُمۡ وَمَاۤ اَلَتۡنٰہُمۡ مِّنۡ عَمَلِہِمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ ؕ کُلُّ امۡرِیًٴۢ بِمَا کَسَبَ رَہِیۡنٌ

আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে। সুরা তুর : ২১

এ আয়াতে দ্বারা বুঝা যায়, মুমিনদের শিশুরা জান্নাতে তাদের পিতামাতার সাথে থাকবে। এটি মহান আল্লাহর এক বিশেষ দয়া। কাফিরদের শিশুদের ব্যাপারে মতভেদ থাকলেও, বেশিরভাগ আলেমদের মত হলো তারাও জান্নাতে যাবে। কারণ, তারা কোনো পাপ করার আগেই মারা গেছে।

মৃত শিশুর শুধু জান্নাতে যাবে একটুকুই শেষ না, তারা তাদের ঈমানদার পিতামাতাকে সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাবে।

মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! গর্ভপাত হওয়া সন্তানের মাতা তাতে সওয়াব আশা করলে ঐ সন্তান তার নাভিরজ্জু দ্বারা তাকে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ :  ১৬০৯, মিশকাত : ১৭৫৪, আহমাদ : ২১৫৮৫

আবু হাসসান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে বললাম, আমার দুটি সন্তান মারা গেছে। আপনি আমাদের এমন একটি হাদিস শোনান, যা দ্বারা আমাদের মন শান্ত হয়। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, “মুসলিমদের যে তিনটি শিশু মারা যায়, তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে তাদের পিতামাতার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে। যখন তারা জান্নাতের দরজায় আসবে, তখন তাদের বলা হবে, ‘প্রবেশ কর।’ তারা বলবে, ‘আমাদের পিতামাতা প্রবেশ না করা পর্যন্ত আমরা প্রবেশ করব না।’ তখন বলা হবে, ‘তাদেরকেও প্রবেশ করাও।’ এরপর তারা তাদের পিতামাতার কাপড় ধরে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সহীহ মুসলিম : ৬৯৮৫

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নারীরা একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলল, পুরুষেরা আপনার নিকট আমাদের চেয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তাই আপনি নিজে আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দিন। তিনি তাদের বিশেষ একটি দিনের অঙ্গীকার করলেন; সে দিন তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের নাসীহাত করলেন ও নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদের যা যা বলেছিলেন, তার মধ্যে একথাও ছিল যে, তোমাদের মধ্যে যে স্ত্রীলোক তিনটি সন্তান পূর্বেই পাঠাবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। তখন জনৈক স্ত্রীলোক বলল, আর দু’টি পাঠালে? তিনি বললেনঃ দু’টি পাঠালেও। সহিহ মুসলিম : ১০১, ১২৪৯,৭৩১০, সহিহ মুসলিম : ২৬৩৩, আহমাদ : ১১২৯৬

নোট : পরকালে এমন কিছু শ্রেণির মানুষের অবস্থা কী হবে, যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, কিংবা যারা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধি থেকে বঞ্চিত?

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, যেসব মানুষের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) দাওয়াত সঠিক পন্থায় পৌঁছায়নি, তাদের ব্যাপারে আলেমগণ বলেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের একটি বিশেষ পরীক্ষার মুখোমুখি করবেন। তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠানো হবে, যিনি তাদের পরীক্ষা নেবেন। যদি তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তবে তারা জান্নাতে যাবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে তাদের পরিণতি জাহান্নাম হবে। কারণ আল্লাহ তা’আলা তাঁর কোনো বান্দাকে দাওয়াত পৌঁছানো ছাড়া শাস্তি দেবেন না। এ বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ আয়াত হলো-

مَنِ اہۡتَدٰی فَاِنَّمَا یَہۡتَدِیۡ لِنَفۡسِہٖ ۚ وَمَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا یَضِلُّ عَلَیۡہَا ؕ وَلَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ وِّزۡرَ اُخۡرٰی ؕ وَمَا کُنَّا مُعَذِّبِیۡنَ حَتّٰی نَبۡعَثَ رَسُوۡلًا

যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের (স্বার্থের) বিরুদ্ধেই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই। সূরা বনী ইসরাঈল : ১৫

২১. জান্নাত কোন আমলের মূল্য নয়

জান্নাত এক বিশাল ও অমূল্য নিয়ামত, যা কোনো আমলের বিনিময়ে কেনা সম্ভব নয়। বরং আমল হলো জান্নাত লাভের মাধ্যম বা উসিলা মাত্র। জান্নাত হলো আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ, যা তিনি তাঁর অনুগত বান্দাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে পুরস্কার হিসেবে দান করবেন। মানুষের আমল যত ভালোই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত ও দয়া ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। সহিহ বুখারি : ৫৬৭৩, সহিহ মুসলিম : ৭০৬৮

২২. জান্নাতিগণ এক অপরের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ نَزَعْنَا مَا فِیْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ اِخْوَانًا عَلٰی  سُرُرٍ  مُّتَقٰبِلِیْنَ ﴿۴۷﴾

আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সুরা হিজর : ৪৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلٰی بَعْضٍ یَّتَسَآءَلُوْنَ ﴿۲۵﴾ قَالُوْۤا اِنَّا کُنَّا قَبْلُ فِیْۤ   اَهْلِنَا مُشْفِقِیْنَ ﴿۲۶﴾   فَمَنَّ اللّٰهُ عَلَیْنَا وَ  وَقٰىنَا عَذَابَ السَّمُوْمِ ﴿۲۷﴾  اِنَّا کُنَّا مِنْ قَبْلُ نَدْعُوْهُ ؕ اِنَّہٗ  هُوَ الْبَرُّ   الرَّحِیْمُ ﴿۲۸﴾

তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করবে এবং বলবে, নিশ্চয় আমরা পূর্বে পরিবার-পরিজনের মধ্যে শংকিত অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে উত্তপ্ত ঝড়াে হাওয়ার শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। নিশ্চয় আমরা পূর্বেও আল্লাহকে আহবান করতাম। নিশ্চয় তিনি কৃপাময়, পরম দয়ালু।’ সুরা তুর : ২৫-২৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلٰی بَعْضٍ یَّتَسَآءَلُوْنَ ﴿۵۰﴾ قَالَ  قَآئِلٌ مِّنْهُمْ  اِنِّیْ كَانَ لِیْ قَرِیْنٌ ﴿ۙ۵۱﴾ یَّقُوْلُ  اَئِنَّكَ  لَمِنَ  الْمُصَدِّقِیْنَ ﴿۵۲﴾ ءَ اِذَا مِتْنَا وَ کُنَّا تُرَابًا وَّ  عِظَامًا  ءَ اِنَّا لَمَدِیْنُوْنَ ﴿۵۳﴾ قَالَ  هَلْ  اَنْتُمْ  مُّطَّلِعُوْنَ ﴿۵۴﴾ فَاطَّلَعَ  فَرَاٰهُ  فِیْ  سَوَآءِ  الْجَحِیْمِ ﴿۵۵﴾قَالَ تَاللّٰهِ   اِنْ  كِدْتَّ  لَتُرْدِیْنِ ﴿ۙ۵۶﴾ وَ لَوْ لَا نِعْمَۃُ رَبِّیْ  لَکُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِیْنَ ﴿۵۷﴾ اَفَمَا نَحْنُ بِمَیِّتِیْنَ ﴿ۙ۵۸﴾ اِلَّا مَوْتَتَنَا الْاُوْلٰی وَ مَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِیْنَ ﴿۵۹﴾ اِنَّ هٰذَا  لَهُوَ  الْفَوْزُ  الْعَظِیْمُ ﴿۶۰﴾ لِمِثْلِ هٰذَا فَلْیَعْمَلِ الْعٰمِلُوْنَ ﴿۶۱﴾

তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাদের কেউ বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিল; সে বলত, “তুমি কি এতে বিশ্বাসী যে, আমাদের মৃত্যু হলে এবং আমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হলেও আমাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে?’ (আল্লাহ) বলবেন, তোমরা কি তাকে উকি মেরে দেখতে চাও?’ অতঃপর সে উঁকি মেরে দেখবে এবং ওকে জাহান্নামের মধ্যস্থলে দেখতে পাবে; বলবে, আল্লাহর কসম! তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করেছিলে, আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ না থাকলে আমাকেও (তোমাদের মাঝে) উপস্থিত করা হত। (সত্যই) কি আমাদের আর মৃত্যু হবে না, প্রথম মৃত্যুর পর এবং আমাদেরকে শাস্তিও দেওয়া হবে না? নিশ্চয়ই এ মহাসাফল্য। এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত। সুরা সাফফাত : ৫০-৬১

এই আয়াতগুলোতে বর্ণিত হয়েছে যে, জান্নাতবাসিরা একে অপরের সাতে সাক্ষাত করে পারস্পরিক ভালোবাসা, অতীত জীবনের কষ্ট স্মরণ করবে।

২৩. জান্নাতের মধ্যে সে সব মানুষ নেতা হবেন

মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জান্নাতবাসিনী হবেন খাদীজা, ফাতেমা, মারয়াম ও আসিয়া

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সারা বিশ্বের নারীদের মধ্যে মারিয়াম বিনতু ‘ইমরান, খাদীজাহ্‌ বিনতু খুয়াইলিদ, ফাতিমাহ্‌ বিনতু মুহাম্মাদ এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়াহ্‌ তোমার জন্য যথেষ্ট। সুনানে তিরমিজি : ৩৮৭৮, মিশকাত : ৬১৮১

মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَ اِذْ قَالَتِ الْمَلٰٓئِكَۃُ یٰمَرْیَمُ اِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ وَ طَهَرَكِ وَ اصْطَفٰكِ عَلٰی نِسَآءِ  الْعٰلَمِیْنَ ﴿۴۲﴾

যখন ফিরিশ্তাগণ বলেছিল, ‘হে মারয়াম! আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে নির্বাচিত করেছেন। সুরা আল ইমরান : ৪২

আবু বাকর (রা.) ও উমার(রা.) বয়স্কদের সর্দার হবে

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আবু বাকর ও উমার হলেন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল জান্নাতবাসীর মধ্যে বয়স্কদের সর্দার, শুধুমাত্র নবীগণ ছাড়া। সুনানে তিরমিযী : ৩৬৬৫

ফাতিমা (রাঃ) মু’মিন নারীদের সরদার হবে

 আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর চলার ভঙ্গিতে চলতে চলতে ফাতিমা (রাঃ) আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাঁকে দেখে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমার স্নেহের কন্যাকে মোবারাকবাদ। অতঃপর তাঁকে তার ডানপাশে বা বামপাশে বসালেন এবং তাঁর সঙ্গে চুপিচুপি কথা বললেন। তখন ফাতিমা (রাঃ) কেঁদে দিলেন। আমি কাঁদছেন কেন? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুনরায় চুপিচুপি তার সঙ্গে কথা বললেন। ফাতিমা (রাঃ) এবার হেসে উঠলেন। আমি বললাম, আজকের মত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ও খুশী আমি আর কখনো দেখিনি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী বলেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর গোপন কথাকে প্রকাশ করব না। শেষে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর ইন্তেকাল হয়ে যাবার পর আমি তাঁকে (আবার) জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কী বলেছিলেন?  তিনি বললেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম বার আমাকে বলেছিলেন, জিব্রাঈল (আঃ) প্রতি বছর একবার আমার সঙ্গে কুরআন পাঠ করতেন, এ বছর দু’বার পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায় বেলা উপস্থিত এবং অতঃপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। অতঃপর বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতবাসী নারীদের অথবা মু’মিন নারীদের তুমি সরদার হবে। এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম। সহিহ বুখারি : ৩৬২৩-৩৬২৪, ৩৮৫৬, সহিহ মুসলিম : ২৪৫০

হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা

ইবনু উমার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের নেতা এবং তাদের পিতা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে। সুনানে ইবন মাজাহ : ১১৮, সুনানে তিরমিজি : ৩৭৬৮, সহীহাহ : ৯৭৯।

২৪. জান্নাতের সূখ-শান্তি হবে স্থায়ী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اَؤُنَبِّئُکُمۡ بِخَیۡرٍ مِّنۡ ذٰلِکُمۡ ؕ  لِلَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا عِنۡدَ رَبِّہِمۡ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَاَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ وَّرِضۡوَانٌ مِّنَ اللّٰہِ ؕ  وَاللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ۚ

তুমি বলঃ আমি কি তোমাদেরকে এটা অপেক্ষাও উত্তম বিষয়ের সংবাদ দিব? যারা ধর্মভীরু তাদের জন্য তাদের রবের নিকট জান্নাত রয়েছে যার তলদেশে স্রোতস্বিনীসমূহ প্রবাহিতা, তন্মধ্যে তারা সদা অবস্থান করবে এবং সেখানে শুদ্ধা সহধর্মিনীগণ ও আল্লাহর প্রসন্নতা রয়েছে এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী। সুরা আল ইমরান : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ ابۡیَضَّتۡ وُجُوۡہُہُمۡ فَفِیۡ رَحۡمَۃِ اللّٰہِ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

আর যাদের চেহারা সাদা হবে, তারা তো আল্লাহর রহমতে থাকবে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা আল ইমরান : ১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ یُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

ল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা । সুরা নিসা : ১৩

আবু সায়ীদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা জান্নাতবাসীদের বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! তারা বলবে, উপস্থিত হে রব, সৌভাগ্য ও কল্যাণতো আপনারই হাতে। তারা বলবে, তোমরা কি সন্তুষ্ট হয়েছো? তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কেন সন্তুষ্ট হবো না? আপনি আমাদের এমন নেওয়ামত ও সূখ-শান্তি দিয়েছেন যা কখনো অন্য কাউকে দেননি। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি কি তোমাদের এরচেয়ে উত্তম কোনো কিছু দেব? তখন তারা বলবে, হে প্রতিপালক! যা দিয়েছেন তার চেয়ে আবার উত্তম কোনো জিনিস আছে কী? আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আজ থেকে আমার সন্তুষ্টি তোমাদের উপর স্থায়ী হয়ে গেল। আর কোনো দিন তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবো না”। সহীহ বুখারী : ৭৫১৮; সহীহ মুসলিম : ২৮২৯।

আবু সায়ীদ ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত. তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে: তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে কখনো রোগাক্রান্ত হবে না। তোমরা চিরদিন জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু আসবে না। তোমরা চিরদিন যুব থাকবে। বার্ধক্যে তখনো তোমাদের স্পর্ষ করবে না। তোমরা সর্বদা পরিতৃপ্ত থাকবে। কখনো ক্ষুধার্ত হবে না। আর এটা আল্লাহ তায়ালার সেই কথার বাস্তবায়ন: তাদেরকে ডেকে বলা হবে, ঐ হলো জন্নাত। তোমরা যা কাজ করেছো, তার বিনিময়ে এর উত্তরাধিকারী করা হলো”। সহীহ মুসলিম : ২৮৩৭

আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

যে লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে সেখানে সুখে-স্বচ্ছন্দে আয়েশের মধ্যে ডুবে থাকবে, কোন প্রকারের দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা তাকে পাবে না এবং তার পোশাক-পরিচ্ছদ ময়লা বা পুরাতন হবে না, আর তার যৌবনও নিঃশেষ হবে না। মিশকাত : ৫৬২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *