পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: চতুর্থ কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

বিশ্বের সামনে পাশ্চাত্যের অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন বর্তমান। এ কুফল তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাদের ও অশ্লীল বিনোদন আজ মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। এটি আজকের দুনিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা। কারণ পশ্চিমা সংস্কৃতি ও তথাকথিত বিনোদনের ছোঁয়ায় মুসলিম সমাজের চিন্তা, রুচি, পোশাক, ভাষা এমনকি নৈতিক মানদণ্ড পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের রুচি, সংস্কৃতি ও বিনোদনকেও শালীনতা ও তাকওয়ার সীমায় রাখে। কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্যের অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বিনোদন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। টেলিভিশন, সিনেমা, ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া সব জায়গাতেই নৈতিকতার সীমা ভাঙা দৃশ্য ও আচরণ প্রবলভাবে প্রভাব ফেলছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি সামাজিক বিপর্যয় নয়; বরং এক আত্মিক ও নৈতিক সংকট। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

এই আয়াত মুসলিম সমাজে অশ্লীলতার প্রচারকারীদের জন্য ভয়াবহ সতর্কবাণী। নিচে মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ কিছু কারণ বিশ্লেষণ করেছি—

১. মানুষ অনুসকরণ প্রিয়

২. মানুষ সভাবত কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে

৩. অশ্লীলতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার

৪. সহজ লভ্যতা

৫. আধুনিক ডিজিটার মাধ্যম

৬. আধুনিক সোস্যাল মিয়ায়া (ইউটিউব, ফেসবুক, ইমো, হটস অ্যাপ, ভাইবার ইত্যাতি)

৭. মানুষের আর্থিক অবস্থান উন্নতি

৮. প্রযুক্তিনির্ভরতা ও একাকীত্ব বৃদ্ধি

৯. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিশ্বায়ন

১০. দেশীয় সুস্থ বিনোদনের অপ্রতুলতা

১১. পশ্চিমা জীবনযাত্রার প্রতি আকর্ষণ ও মোহ

১২. চলচ্চিত্র, সংগীত ও ফ্যাশন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব

১৩. গণমাধ্যমে ধর্মবিমুখ বিনোদনের আধিপত্য

১৪. নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা

১৪. পরিবার ও সমাজের দুর্বল নজরদারি

১৬. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব

১৭. ইসলামী বিকল্প বিনোদনের ঘাটতি

১. মানুষ অনুকরণ প্রিয়

মানুষ স্বভাবগতভাবেই অনুকরণপ্রিয় প্রাণী। এই সহজাত প্রবণতা একটি সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে বিনোদনের উপাদান ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। পশ্চিমা বিনোদন, বিশেষত চলচ্চিত্র, সংগীত এবং ফ্যাশন, গ্ল্যামার ও চাকচিক্যের মোড়কে আবৃত হয়ে মুসলিম সমাজের তরুণ প্রজন্মকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। তারা পশ্চিমাদের জীবনধারা, পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরণ এবং বিনোদন সংস্কৃতিকে আধুনিকতা ও সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখে। ফলে, সমালোচনামূলক দৃষ্টি ছাড়াই তারা এই বিনোদনের উপকরণগুলো অন্ধভাবে গ্রহণ করতে থাকে, যেখানে অশ্লীলতা বা কুরুচি লুকিয়ে থাকে। এই অনুকরণের মাধ্যমে পশ্চিমা বিনোদনের অনৈতিক উপাদানগুলো মুসলিম সমাজে সহজে অনুপ্রবেশ করে এবং নিজস্ব মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

মানুষের স্বভাবই হলো অনুকরণ করা। যাকে সে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তার আচরণ, পোশাক, কথা—সব অনুকরণ করতে চায়। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে “উন্নত” ভেবে মুসলমানরা তাদের জীবনধারা অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।

সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

অর্থাৎ, যার সংস্কৃতি অনুসরণ করবে, আখিরাতে তার সঙ্গেই উঠতে হবে। তাই অশ্লীল বিনোদনের অনুসরণ আসলে এক প্রকার নৈতিক আত্মহত্যা।

২. মানুষ স্বভাবত কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে

ইসলাম মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি বা আকর্ষণকে স্বীকার করে: একটি হলো কল্যাণমুখী ‘ফিতরাত’ (স্বাভাবিক প্রকৃতি) এবং অপরটি হলো ‘নফস’ বা কুপ্রবৃত্তি, যা মানুষকে খারাপ কাজের দিকে প্ররোচিত করে। পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন সরাসরি মানুষের এই কুপ্রবৃত্তিকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়, যা যৌনতা, ভোগ এবং তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে ধাবিত করে। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে সহজলভ্যভাবে অনৈতিকতার স্বাদ পেতে উৎসাহিত করে এবং ধর্মীয় বা নৈতিক বিধিনিষেধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন কোনো সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানুষ স্বভাবতই সহজলভ্য ও প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টকারী বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কুপ্রবৃত্তির এই তীব্র আকর্ষণকে পুঁজি করেই অশ্লীল বিনোদনের প্রসার ঘটছে। আল্লাহ মানুষকে “নফস” বা প্রবৃত্তিসহ সৃষ্টি করেছেন। এই নফস যদি সংযমহীন হয়, তবে মানুষ অশ্লীলতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পশ্চিমা বিনোদন এই প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়।

আল্লাহ বলেন-

وَمَاۤ اُبَرِّیٴُ نَفۡسِیۡ ۚ اِنَّ النَّفۡسَ لَاَمَّارَۃٌۢ بِالسُّوۡٓءِ اِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّیۡ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

‘আর আমি আমার নাফ্সকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নাফ্স মন্দ কজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরা ইউসুফ : ৫৩)

ইসলাম এই নফসকে প্রশিক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে—সিয়াম, নামাজ ও তাকওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু পাশ্চাত্যের বিনোদন নফসকে আরো উগ্র করে তোলে।

৩. অশ্লীলতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার

বর্তমানে পশ্চিমা বিনোদন শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমে তা বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে যাচ্ছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো অশ্লীলতা ও কুরুচিপূর্ণ বিষয়বস্তু প্রতিনিয়ত প্রচার করে চলেছে। এই প্রচারণার পেছনে কাজ করে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্য। কোনো বিষয়বস্তু যখন প্রতিনিয়ত ও ব্যাপক পরিসরে প্রচার হতে থাকে, তখন সমাজের মানুষের কাছে তা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে শুরু করে, এমনকি তা নৈতিকভাবে ভুল হলেও। অশ্লীলতার এই ব্যাপক প্রচার মুসলিম সমাজে লজ্জাবোধ ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে, যা পশ্চিমা বিনোদনের অনুকরণের পথ সুগম করছে। বর্তমানে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, গান—সব জায়গায় অশ্লীলতার প্রতিযোগিতা চলছে। এটি যেন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। ইসলামের ভাষায় এটি “ফাহিশাহর প্রচার”, যা সমাজে গুনাহের সাহস জোগায়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেনঃ হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০১৯ হাদিসের প্রয়োজনীয় অংশ।

৪. বিনোদন সামগ্রীর সহজ লভ্যতা

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অশ্লীল বিনোদন সামগ্রী এখন অত্যন্ত সহজলভ্য। একসময় এই ধরনের বিনোদন পেতে মানুষকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো, কিন্তু এখন একটি স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ যেকোনো ধরনের অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ বিনোদনে প্রবেশ করতে পারছে। এই সহজলভ্যতা বিশেষত তরুণদের জন্য ক্ষতিকর, কারণ তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট নৈতিক বা ধর্মীয় জ্ঞান থাকে না। কোনো বাধা বা বিধিনিষেধ না থাকায়, তারা দ্রুতই এই ধরনের বিনোদনে আসক্ত হয়ে পড়ে। সহজলভ্যতার এই দিকটি পরিবার ও সমাজের নজরদারিকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে, ফলে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন মুসলিম সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আগে অশ্লীল বস্তু পাওয়া ছিল কঠিন, এখন মাত্র এক ক্লিকেই সবকিছু হাতে চলে আসে। এ সহজলভ্যতা মুসলমানদের গোপন পাপাচারে ডুবিয়েছে। ইসলামে পাপের সুযোগ সৃষ্টি করাও নিষিদ্ধ; তাই প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা থেকে বাঁচতে আত্মসংযম জরুরি।

৫. আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম

আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমগুলো, যেমন ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট, পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। এই মাধ্যমগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো ব্যবহারকারীকে ব্যক্তিগতভাবে এবং গোপনীয়তার সাথে কন্টেন্ট উপভোগ করার সুযোগ দেয়। ফলে সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত স্পেসে মানুষ সহজেই অনৈতিক বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই মাধ্যমগুলোতে কন্টেন্টের পরিমাণ অসীম এবং এর উপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হয় না। ফলে, পশ্চিমা সংস্কৃতির নোংরা দিকগুলো ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে, তা মুসলিম সমাজের মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে নীরবে ক্ষয় করে দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, ভিডিও গেম, সব জায়গায় এখন নগ্নতা ও অনৈতিক বার্তা। এগুলো তরুণ প্রজন্মের মনকে ধ্বংস করছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَقۡفُ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ؕ اِنَّ السَّمۡعَ وَالۡبَصَرَ وَالۡفُؤَادَ کُلُّ اُولٰٓئِکَ کَانَ عَنۡہُ مَسۡـُٔوۡلًا

আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। সূরা ইসরা : ৩৬

৬. আধুনিক সোস্যাল মিডিয়া

ইউটিউব, ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার-এর মতো আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো পশ্চিমা বিনোদনের অশ্লীল উপাদান ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই মাধ্যমগুলোতে ব্যক্তিগত কন্টেন্ট শেয়ার করা, লাইভ স্ট্রিমিং এবং বিনোদনমূলক ভিডিওর সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীলতা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যবহারকারীরা নিজেরাই কুরুচিপূর্ণ বা উত্তেজক কন্টেন্ট তৈরি করে, যা ভাইরাল হয়ে মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশে পৌঁছে যায়। তাছাড়া, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম প্রায়শই ব্যবহারকারীর আগ্রহের উপর ভিত্তি করে এমন কন্টেন্ট সুপারিশ করে, যা ধীরে ধীরে মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

সলিমের পিতা আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন শুনতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। সহিহ মুসলিম : ৩৬

যখন লজ্জা হারিয়ে যায়, তখন পাপকে পাপ মনে হয় না, যেমন আজ দেখা যাচ্ছে।

৭. মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি

মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে অবসর সময় কাটানোর উপায়ে পরিবর্তন আসে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মানুষকে বিনোদনের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি বা মাধ্যমের দিকে আকৃষ্ট করে। যখন মানুষের হাতে অর্থ ও সময় থাকে, তখন তারা প্রায়শই পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত বিনোদনের উপকরণ, যেমন দামী স্মার্টফোন, হাই-স্পিড ইন্টারনেট বা প্রিমিয়াম স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন কিনতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন সহজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, আর্থিক উন্নতি মানুষকে পশ্চিমা লাইফস্টাইল, ফ্যাশন এবং জাঁকজমকের প্রতি ঝুঁকতে উৎসাহিত করে, যা ঐ সংস্কৃতির বিনোদনের অংশ হিসেবে অশ্লীলতাকেও গ্রহণ করতে প্রেরণা যোগায়। অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষকে ভোগবিলাসে প্রবণ করেছে। অতিরিক্ত আয় বিনোদনে ব্যয় হয়, যার মধ্যে থাকে হারাম উপাদান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আ’রাফ : ৩১

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তখনই কল্যাণকর, যখন তা আল্লাহভীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।

৮. প্রযুক্তিনির্ভরতা ও একাকীত্ব বৃদ্ধি

আধুনিক জীবনে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে একাকীত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হওয়ায় মানুষ বিনোদনের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিগত মাধ্যমের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যখন একজন মানুষ একাকীত্বে ভোগে, তখন সে সান্ত্বনা বা সময় কাটানোর জন্য সহজলভ্য বিনোদনের দিকে দ্রুত ঝুঁকে পড়ে। পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন, যা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে সহজে অ্যাক্সেসযোগ্য, এই একাকীত্বকে পূরণ করার একটি সহজ পথ বলে মনে হতে পারে। প্রযুক্তির পর্দার আড়ালে একাকীত্বে ডুবে থাকা মানুষটি সহজে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অনৈতিক বিনোদনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। মানুষ এখন বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্ক্রিনে বন্দি। একাকীত্ব থেকে মুক্তি খোঁজে অশ্লীল কনটেন্টে।

আমর ইবনু শুয়াইব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন আরোহী (সফরকারী) এক শায়ত্বন, দু’জন আরোহী দুই শায়ত্বন, কিন্তু তিনজন হলো একটি পরিপূর্ণ জামা’আত। সুনানে আবূ দাঊদ : ২৬০৭, সুনানে তিরমিজি : ১৬৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৮৮৪৯, মিশকাত : ৩৯১০

৯. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিশ্বায়ন

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলতে বোঝায় একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি যখন দুর্বল সংস্কৃতির উপর তার মূল্যবোধ ও জীবনধারা চাপিয়ে দেয়। বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতি তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির জোরে মুসলিম জনপদে বিনোদনের মাধ্যমে আগ্রাসন চালাচ্ছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, টেলিভিশন শো ইত্যাদির মাধ্যমে তারা পশ্চিমা জীবনধারাকে স্বাভাবিক ও আধুনিক হিসেবে উপস্থাপন করে। এই আগ্রাসনের ফলে মুসলিম সমাজে নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি হয় এবং মানুষ পশ্চিমা আদর্শকে অনুসরণ করতে শুরু করে। পশ্চিমা বিনোদনের সাথে আসা অশ্লীলতা ও কুরুচিকে তারা আধুনিকতার প্রতীক মনে করে গ্রহণ করে, যা সমাজের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পশ্চিমা মিডিয়া বিশ্বায়নের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিচ্ছে। মুসলমানরা অজান্তে তা গ্রহণ করছে,গান, পোশাক, ভাষা, বিনোদন সবই পশ্চিমমুখী। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল ইমরান : ৮৫

১০. দেশীয় সুস্থ বিনোদনের অপ্রতুলতা

মুসলিম সমাজে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত বিকল্পের অভাব রয়েছে। ইসলাম যদিও বৈধ বিনোদনকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অনেক মুসলিম দেশে সুস্থ চলচ্চিত্র, নাটক, গান বা খেলাধুলার প্ল্যাটফর্মগুলো পশ্চিমা বিনোদনের মতো আকর্ষণীয় বা মানসম্পন্ন হয় না। ফলে, তরুণ প্রজন্ম দ্রুত পশ্চিমা চকচকে ও বৈচিত্র্যময় বিনোদনের দিকে আকৃষ্ট হয়, যেখানে বিনোদনের মোড়কে অশ্লীলতা ও নোংরামি পরিবেশন করা হয়। সুস্থ বিনোদনের অভাবের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন দ্রুত তার স্থান দখল করে নেয়, কারণ মানুষ স্বভাবতই বিনোদন চায় এবং বিকল্প না পেলে সহজলভ্য দিকে ঝুঁকে পড়ে। যখন হালাল বিকল্প থাকে না, মানুষ হারামের দিকে ঝোঁকে। ইসলামী শিক্ষা, নৈতিক নাটক, ইসলামী সংগীত, এসব কমে যাওয়ায় মানুষ অশ্লীল বিনোদনে আসক্ত হচ্ছে।

১১. পশ্চিমা জীবনযাত্রার প্রতি আকর্ষণ ও মোহ

পশ্চিমা জীবনযাত্রা, যা ভোগবাদিতা, অবাধ স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ দ্বারা প্রভাবিত, তা মুসলিম সমাজের অনেক তরুণকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। গণমাধ্যম এবং বিনোদন শিল্পে এই জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত গ্ল্যামারাস এবং সফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই জীবনধারার প্রতি মোহ সৃষ্টি হলে মানুষ পশ্চিমা বিনোদনকে সেই লাইফ স্টাইলের অংশ মনে করে গ্রহণ করে। তারা মনে করে, এই ধরনের বিনোদন উপভোগ করা আধুনিক ও প্রগতিশীল হওয়ার পরিচায়ক। এই মোহের কারণে তারা পশ্চিমা বিনোদনের সাথে আসা অশ্লীলতা ও নৈতিক স্খলনকে উপেক্ষা করে, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পশ্চিমাদের সাজপোশাক, ভাষা, পার্টি, সব মুসলমানদের চোখে “উন্নত জীবন” মনে হয়। অথচ তারা নিজেরাই নৈতিক দেউলিয়া।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی

আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সূরা ত্বাহা : ১৩১

মুসলমানদের উচিত আল্লাহর বিধানকেই আদর্শ মানা, পশ্চিমাকে নয়।

১২. চলচ্চিত্র, সংগীত, ফ্যাশন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব

চলচ্চিত্র, সংগীত ও ফ্যাশন শিল্প হলো পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের প্রধান বাহক। এই শিল্পগুলো সাধারণত ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়, যেখানে বস্তুগত সুখ, সৌন্দর্য এবং যৌনতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। চলচ্চিত্রে খোলামেলা দৃশ্য, সংগীতে উত্তেজক লিরিকস এবং ফ্যাশনে স্বল্পবসনা মডেলদের উপস্থিতি মুসলিম সমাজে যৌনতার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং শালীনতাকে ম্লান করে দেয়। এই বিনোদনগুলো মানুষের মনে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির নেশা সৃষ্টি করে। ভোগবাদী সংস্কৃতির এই শক্তিশালী প্রভাবের কারণে মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে বস্তুবাদী বিনোদনের দিকে ধাবিত হয়। মিডিয়া এখন “তারকা সংস্কৃতি” তৈরি করেছে, যারা ইসলামবিমুখ বার্তা ছড়ায়। ফ্যাশনের নামে নগ্নতা ছড়াচ্ছে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

এই ভবিষ্যদ্বাণী আজ বাস্তব হয়ে গেছে।

১৩. গণমাধ্যমে ধর্মবিমুখ বিনোদনের আধিপত্য

মুসলিম সমাজে প্রচারিত গণমাধ্যম, বিশেষত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে তৈরি হওয়া বিনোদনের আধিপত্য দেখা যায়। অনেক সময় এই বিনোদন সামগ্রীগুলো পশ্চিমা বিনোদনের সরাসরি অনুকরণ বা রূপান্তর হয়। ধর্মবিমুখ বা ধর্মনিরপেক্ষ বিনোদনের এই আধিপত্য সমাজে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়। যখন কোনো বিনোদনে নৈতিক বা ধর্মীয় বার্তা থাকে না, তখন মানুষ অনৈতিক বিষয়বস্তুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করে। সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং ধর্মবিমুখ কন্টেন্টের ব্যাপক প্রচারের ফলে মানুষ পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। মিডিয়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, অশ্লীল নাটক ও গান প্রচার করে। মুসলমানরা প্রতিদিন গুনাহ দেখেই সময় কাটায়। অথচ মুমিনদের গুন ইহার সম্পূর্ণ উল্টা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ۙ

তারা নিরর্থক কথাবার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সূরা মুমিনুন : ৩

ইসলামী সমাজের উচিত এমন গণমাধ্যম গড়া, যা ঈমান ও জ্ঞানের চর্চা বাড়ায়।

১৪. নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা

অনেক মুসলিম তরুণ নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি উদাসীন বা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তারা মনে করে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সেকেলে ও অনাকর্ষণীয়। এর বিপরীতে, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে তারা অত্যাধুনিক, গ্ল্যামারাস এবং অনুসরণযোগ্য মনে করে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই উদাসীনতা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি অতি-আকর্ষণ, তাদেরকে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের দিকে ঠেলে দেয়। যখন কেউ তার শেকড়কে ভুলে যায়, তখন অন্য যেকোনো সংস্কৃতি বা বিনোদন ব্যবস্থা তার উপর সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই উদাসীনতা পশ্চিমা বিনোদনের অশালীন উপাদানগুলো গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে না। মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্য, সাহিত্য ও ইসলামি সৌন্দর্যবোধ ভুলে যাচ্ছে। ফলে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির ভোক্তা হয়ে পড়েছে।

১৫. পরিবার ও সমাজের দুর্বল নজরদারি

পরিবার এবং সমাজ হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা। কিন্তু আধুনিক জীবনে বাবা-মা ও অভিভাবকরা কর্মব্যস্ততা এবং অন্যান্য কারণে সন্তানদের উপর পর্যাপ্ত নজরদারি করতে পারেন না। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমের সহজলভ্যতার যুগে, শিশুরা ব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেটে কী দেখছে বা কী ধরনের বিনোদনে অভ্যস্ত হচ্ছে, তা ট্র্যাক করা কঠিন। সমাজের নজরদারি শিথিল হওয়ায় এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ায়, তরুণ প্রজন্ম পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ বিনোদন মুসলিম সমাজে অবাধে প্রবেশ করছে। পিতা-মাতা সন্তানদের স্ক্রিনের জগতে ছেড়ে দিচ্ছেন, সমাজও দায়িত্ব নিচ্ছে না। ফলে তরুণরা অশ্লীলতার কবলে পড়ছে।

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম (শাসক) একজন দায়িত্বশীল। কাজেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে, আর খাদিম তার মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। [‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)] বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এদের সম্পর্কে (নিশ্চিতভাবেই) শুনেছি। তবে আমার ধারণা; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আর সন্তান তার পিতার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। মোটকথা তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।  সহিহ বুখারি : ২৫৫৮

১৬. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব

পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। ইসলামে হালাল (বৈধ) এবং হারাম (অবৈধ) বিনোদনের স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে এবং সুস্থ বিনোদনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন মানুষের ধর্মীয় জ্ঞান দুর্বল হয়, তখন তারা নৈতিকতা ও অনৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না বা প্রবৃত্তির তাড়নায় হারামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা অশ্লীল বিনোদনের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন থাকে না। ধর্মীয় শিক্ষার অভাবের ফলে, এই ধরনের বিনোদনের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং পশ্চিমা নোংরা বিনোদন সহজেই সমাজে অনুপ্রবেশ করে। যে সমাজে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা নেই, সে সমাজে হারাম-হালালের বোধও থাকে না। ফলে অশ্লীলতাকে বিনোদন মনে করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ

যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন। সূরা তালাক : ২

১৭. ইসলামী বিকল্প বিনোদনের ঘাটতি

যদিও ইসলাম সুস্থ ও নৈতিক বিনোদনকে উৎসাহিত করে, কিন্তু আধুনিক চাহিদা মেটানোর মতো আকর্ষণীয়, উচ্চমানের এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ইসলামী বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম বা কন্টেন্টের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তার কারনও আছ ইসরাম পরকালে বিশ্বাস শিক্ষা দেয়। অশ্লীল বিনোদনে লাগাম লাগায়। তাই ইসলামি  কন্টেন্টগুলো অনেক সময় তরুণদের কাছে আধুনিক বা আকর্ষণীয় বলে মনে হয় না। ফলে, বিনোদনের সহজাত চাহিদা পূরণের জন্য মানুষ সহজলভ্য পশ্চিমা বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে কুরুচিপূর্ণ উপাদান থাকলেও তার পরিবেশনা হয় আকর্ষণীয়। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে তৈরি বিকল্প বিনোদনের অভাব পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের জন্য মুসলিম সমাজে প্রবেশের একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করে।

উপসংহার : মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ এক ভয়াবহ নৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সংকট। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন তিনটি বিষয়—

ইসলামী জ্ঞানের প্রসার,

পরিবার ও সমাজের দৃঢ় নজরদারি,

ইসলামী বিকল্প সংস্কৃতি ও বিনোদন মাধ্যমের বিকাশ।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ؕ

আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তন করে। সূরা রাদ : ১১

সুতরাং, মুসলিম সমাজকে আত্মপরিশুদ্ধি ও ইসলামী চেতনায় ফিরতে হবে; তবেই পাশ্চাত্যের অশ্লীল সংস্কৃতির এই আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

ইসলাম ও পশ্চিমাদের বিনোদনের পার্থক্য?

বিনোদনের ইসলামিক ধারণা হলো এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক আকাঙ্ক্ষা যা আল্লাহর সীমার মধ্যে পূরণ করা যেতে পারে, তবে এটি একজন মুসলিমের জন্য একমাত্র লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। এখানে আমরা বিনোদন সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং পশ্চিমের ধারণার মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য লক্ষ্য করি।

প্রথমত, মুসলিমদের জন্য, বিনোদন নিজের মধ্যে কোনো লক্ষ্য নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে উপভোগ করার জন্য একটি আশীর্বাদ।

দ্বিতীয়ত, ইসলামে বিনোদনের সীমা রয়েছে যা আল্লাহ ﷺ নির্ধারণ করেছেন, যা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।এই কারণগুলি একজন অনুশীলনকারী মুসলিম এবং একজন গড়পড়তা পশ্চিমা ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

উভয়েই নিজেদের বিনোদন দেয়, তবুও মুসলিম আল্লাহকে মান্য করার জন্য অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে, আর পশ্চিমা ব্যক্তি আল্লাহকে ভুলে গিয়ে এবং অনুমোদিত বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে।

এই পার্থক্য ব্যাপক, কারণ এটি অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকেই জড়িত করে। অনুমতিযোগ্য বিনোদনের সাধারণ প্রমাণ আমি এখন নিজেকে বিনোদন দেওয়া এবং অনুমোদিত সমস্ত কিছু উপভোগ করার অনুমতিযোগ্যতার জন্য কিছু সাধারণ প্রমাণ উপস্থাপন করব। এটি বিশেষভাবে তাদের উপকারের জন্য যারা তাদের অজ্ঞতার কারণে প্রায় সব ধরনের বিনোদনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার চরম সীমায় চলে যান, যা তাদের এবং অন্যদের জন্য ইসলামকে কঠিন করে তোলে।

নিষিদ্ধ বিনোদনের সরূপ

নিষিদ্ধ বিনোদনের স্বরূপ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, যখন তা আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে তখন তা আর নির্মল থাকে না; বরং তা ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বইটির এই অধ্যায়ে এমন কিছু বিনোদনের আলোচনা করা হয়েছে যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ, কিন্তু আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাবে যা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

আধুনিক যুগের ঝলমলে বিনোদন ব্যবস্থা একদিকে যেমন মনকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়, অন্যদিকে তা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করে। যেমন- অবৈধ প্রেম, অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া, বেপর্দা পোশাক, বিপরীত লিঙ্গের সাথে অবাধ মেলামেশা, অশালীন নাচ-গান, ডেটিং, যৌন উত্তেজক বই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত কার্যকলাপ একজন ব্যক্তিকে পাপের পথে ঠেলে দেয়। এসব কার্যকলাপ আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও, এগুলি ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে, লজ্জা ও শালীনতাবোধ নষ্ট করে দেয় এবং সর্বশেষে তাকে জিনা-ব্যভিচারের মতো মহাপাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজের একাংশও নিজস্ব সংস্কৃতির নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী। এ অধ্যয় বিতর্কিত প্রথা ও উৎসবগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, যা ধর্মের নামে বা ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয় কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ভিত্তি নেই। ঈদে মীলাদুন্নবী, শবে বরাত, আশুরার দিন আনন্দ-উৎসব, মিলাদ মাহফিল, ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম, পীরের মাজারে উরস, এমনকি নববর্ষের মতো উৎসবগুলিতে গান-বাজনা, বেপর্দা মেলামেশা ও বাড়াবাড়ির মাধ্যমে অনৈসলামিক বিনোদনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিবাহ, আকিকা, এমনকি মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি ও চল্লিশার মতো পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানও আজকাল অনৈতিক গান-নাচ ও বেপর্দার বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ছে, যা মুসলিম সমাজের সরলতা ও পবিত্রতাকে নষ্ট করছে।

অন্যদিকে, বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমা ও অমুসলিম সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের প্রবণতা মুসলিম যুবসমাজকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ অনুকরণ প্রিয়তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পোশাক, স্টাইল, সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ, সিনেমা, নাটক ও খেলাধুলায় অমুসলিমদের অন্ধ অনুসরণ, এবং পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনে গা ভাসিয়ে দেওয়া—এগুলি প্রমাণ করে যে মুসলিমরা নিজেদের স্বকীয়তা ও গৌরব ভুলে গিয়ে অন্যদের অনুকরণে মত্ত হচ্ছে। এই অনুকরণ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে।

সবশেষে, “আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইজ” এর প্রভাবে বিনোদনের জগত যে নতুন মোড় নিয়েছে, তা সংক্ষিপ্তভাবে হলেও আলোচনার দাবি রাখে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বিনোদনকে হাতের মুঠোয় এনে দিলেও, এর অপব্যবহার সমাজের নৈতিক কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করছে। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজকে সেইসব নিষিদ্ধ বিনোদনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও নির্দেশনার আলোকে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা।

যে বিনোদন জিনা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা দিকে ধাবিত করে

১. অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা

২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা

৩. বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরা বা দেখা

৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা

৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা

৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া

৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা

৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা

৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা

১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব

অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা

প্রেম আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। মানুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়, মমতা জন্মে এটা প্রকৃতিগত। কিন্তু যখন এই অনুভূতি শরীয়তের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে, তখন সেটাই হয় অবৈধ প্রেম বা হারাম ভালোবাসা। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন সম্পর্ক, যা বিবাহবন্ধনের বাইরে ঘটে এবং পুরুষ-নারীর মাঝে গোপন ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ সৃষ্টি করে, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

অবৈধ প্রেমের বাস্তব চিত্র

বর্তমান সমাজে “ভালোবাসা দিবস”, “বয়ফ্রেন্ড–গার্লফ্রেন্ড” সংস্কৃতি, “চ্যাটিং”, “ডেটিং” ইত্যাদি নাম দিয়ে এমন এক অশ্লীল প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে যা সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে পরিমিত লজ্জাবোধ ও পরিশুদ্ধতা দিয়েছেন, এসব সংস্কৃতি তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা, মেসেজ, বা চোখের দৃষ্টি থেকে শুরু হয়ে এক সময় তা দেহগত পাপের দিকে গড়ায়। ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ প্রেম হারাম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

এ আয়াত শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং এর কাছেও না যেতে সতর্ক করেছে  অর্থাৎ, এমন সব উপাদান ও আচরণ থেকে দূরে থাকা যা ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে। অবৈধ প্রেম, গোপন সাক্ষাৎ, ফোন বা সামাজিক মাধ্যমে অন্তরঙ্গ বার্তা, এগুলোই সেই “কাছাকাছি যাওয়ার” রূপ।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২

অতএব, প্রেমের নামে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, চ্যাটিং, দেখা করা, অনুভূতি ভাগাভাগি করা, এগুলোও “জিনার ভূমিকা” পালন করে। শয়তান কখনও সরাসরি জিনায় প্ররোচিত করে না। সে শুরু করে “সহানুভূতি”, “বন্ধুত্ব”, “আন্তরিকতা” দিয়ে। ধীরে ধীরে সে হৃদয়ে হারাম ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এক সময় মানুষ নিজের নফসের দাসে পরিণত হয়।

উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পুরুষের জন্য স্ত্রীজাতি অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর কোন ফিতনা আমি রেখে গেলাম না। সহিহ বুখারি : ৫০৯৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৪০

এই কারণেই ইসলামে প্রেমের সম্পর্ক কেবল বৈধ হয় বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহই ভালোবাসাকে পরিশুদ্ধ ও ইবাদতে রূপ দেয়। অপর পক্ষে অবৈধ প্রেম শুধু দীন নয়, দুনিয়াও ধ্বংস করে। এটি মানসিক অস্থিরতা, হৃদয়ভঙ্গ, অবিশ্বাস, পারিবারিক অশান্তি ও লজ্জাহীনতা সৃষ্টি করে। সমাজে ব্যভিচার, অবৈধ সন্তান, তালাকের হার বৃদ্ধি সবকিছুর মূলে এই হারাম সম্পর্ক। ইসলাম প্রেমকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং শরয়ী পথে পরিচালিত করেছে। বৈধ উপায়ে বিবাহের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করা উত্তম ও বরকতময়। অবৈধ প্রেম থেকে বিরত থাকা ইমানের নিদর্শন। যে যুবক-যুবতী আল্লাহর ভয় ও লজ্জাবোধে নিজের দৃষ্টি ও হৃদয় সংযত রাখে, তার জন্য জান্নাতের সুখবর রয়েছে।

২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা

বর্তমান সময়ে বিনোদনের নামে অশ্লীলতা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে সিনেমা, নাটক, সিরিজ, ইউটিউব ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। এগুলো বাহ্যত “বিনোদন” মনে হলেও বাস্তবে এগুলোর অনেকাংশ মুসলিম সমাজে নগ্নতা, জিনা, ব্যভিচার, মাদক, হত্যা, নাস্তিকতা ও ধর্মবিমুখতার প্রচারক হিসেবে কাজ করছে। টিভি সিরিজ, প্রেমভিত্তিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ—এগুলো যুবসমাজের হৃদয়ে জাহেলিয়াতের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সূরা নূর: ১৯

এই আয়াত অশ্লীলতা প্রচারকারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। আজকের সিনেমা ও মিডিয়া আসলে এই অশ্লীলতাই সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে—চোখ, কান ও হৃদয়ের মাধ্যমে। দর্শকও সেই পাপের অংশীদার হয়, কারণ সে তা দেখা ও উপভোগের মাধ্যমে মন্দ কাজকে সমর্থন করছে। আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

“তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো। তবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” সূরা মায়েদা : ২

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না। সহিহ বুখারি : ২৬৭৪

অতএব, যারা অশ্লীল ভিডিও নির্মাণ করে বা সেগুলো দেখা-শোনায় অংশ নেয়, উভয়ই পাপে জড়িত।

চোখের হিফাজত ও নফসের প্রশান্তি

চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। অশ্লীল দৃশ্য দেখলে হৃদয় কলুষিত হয়, নামাজে মনোযোগ হারিয়ে যায়, কুরআন পাঠে তৃপ্তি থাকে না, এমনকি আল্লাহর ভয়ও হারিয়ে যায়।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২

এ কারণেই ইসলামে “অশ্লীল দৃশ্য দেখা” সরাসরি জিনার পথে নিয়ে যায়।

অশ্লীল সিনেমা মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে কল্পনার দুনিয়ায় বন্দী করে রাখে। এতে পরিবারে অবিশ্বাস, বৈবাহিক অসন্তোষ, মানসিক অবসাদ, এমনকি পর্নোগ্রাফির আসক্তি সৃষ্টি হয়। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মুসলিম যুবক-যুবতী এই অশ্লীল মিডিয়ার কারণে নামাজ, লজ্জা ও ইমান হারাচ্ছে। মুমিনের উচিত নিজের চোখ ও কানের পাহারাদার হওয়া।

উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে দেখে, অতঃপর আল্লাহকে ভয় করে (পুনরায় না দেখার জন্য) দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ্ তাকে এমন ইমান দান করেন, যার মিষ্টতা সে তার হৃদয়ে অনুভব করে।” সহিহুল জামে : ৫০৯০, তাবারানী : ৭৮১৯, মুসনাদ আহমাদ : ২৩০২৪,

অতএব, বিনোদনের নামে হারাম দেখার পরিবর্তে মুসলিমদের উচিত হালাল বিকল্প গ্রহণ করা—ইসলামী প্রামাণ্যচিত্র, শিক্ষামূলক কন্টেন্ট, কুরআন–সিরাহ বিষয়ক নাটক ইত্যাদি। এতে মনও প্রশান্ত হয়, ঈমানও বাড়ে।  ইসলামে দৃষ্টি সংযত রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর : ৩০

অশ্লীল মিডিয়া সরাসরি এই নির্দেশনার লঙ্ঘন ঘটায়। দীর্ঘসময় ধরে এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে মানুষের মন পাপের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার কাছে বেপর্দা, অবৈধ সম্পর্ক বা অশালীন আচরণ স্বাভাবিক মনে হতে থাকে, যা তাকে বাস্তব জীবনে সেই কাজগুলো করতে উৎসাহিত করে। মিডিয়াতে দেখানো অবৈধ সম্পর্ককে ‘রোমান্টিক’ বা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে উপস্থাপন করার কারণে দর্শক বাস্তবেও এমন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা ব্যভিচারের পথকে সুগম করে।

বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বস্ত্র দান করেছেন লজ্জাস্থান ঢাকার ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য, প্রদর্শনের নয়। আজকের বিশ্বে পোশাক হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা ও দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম। পুরুষ ও নারীরা উত্তেজক, আঁটসাঁট, আধা-উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ পোশাক পরে নিজেদেরকে “আধুনিকতা”র নামে প্রদর্শন করছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এমন পোশাক শুধু গুনাহ নয়, বরং সমাজে অশ্লীলতার প্রসারের অন্যতম মাধ্যম।

বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা বা তা প্রদর্শন করা উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অশ্লীলতা ও যিনার দিকে ধাবিত করার শক্তিশালী কারণ। পর্দা হলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তাদের সম্মান, পবিত্রতা এবং সমাজের শান্তি রক্ষার একটি ব্যবস্থা। নারীদের জন্য উত্তেজক ও আকর্ষণীয় পোশাক পরা, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা বা অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া সরাসরি আল্লাহর নির্দেশনার লঙ্ঘন কর। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সূরা আহযাব : ৩৩

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ

হে আদম সন্তানগণ! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক দান করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে ও শোভা বৃদ্ধি করে আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। সূরা আরাফ: ২৬

নারীদের জন্য পর্দার নির্দেশ

কুরআনে নারীদেরকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا… وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ

“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া; এবং তারা যেন তাদের ওড়না বুকের উপর ফেলে রাখে। সূরা নূর: ৩১

এছাড়া আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ

“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন যেন তারা নিজেদের চাদর দ্বারা নিজেদের আবৃত করে নেয়। এতে তারা চেনা যাবে এবং কষ্ট পাবে না।” সূরা আহযাব: ৫৯

অতএব, উত্তেজক বা অর্ধনগ্ন পোশাক ইসলামী বিধানের পরিপন্থী। পর্দাহীন পোশাক পুরুষদের মধ্যে কামনা জাগায় এবং নারীর মর্যাদা নষ্ট করে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

এই হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, বেপর্দা ও আকর্ষণীয় পোশাক শুধু গুনাহ নয়; বরং এটি এমন এক অপরাধ যা জান্নাত থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব

অনেকে মনে করে পর্দা শুধু নারীদের বিষয়। কিন্তু ইসলাম পুরুষকেও দৃষ্টি ও পোশাকের শালীনতার নির্দেশ দিয়েছে।

জারহাদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আর তখন তার উরু খোলা অবস্থায় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তোমার উরু ঢেকে রাখ, কেননা এটাও আভরণীয় অঙ্গ। “পুরুষ যেন উরুর নিচের অংশ প্রকাশ না করে।

সুনানে তিরমিজি : ২৭৯৮

এছাড়া পুরুষদেরও হারাম নারীদের দিকে দৃষ্টি নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর: ৩০

বেপর্দা পোশাক সমাজে অশ্লীলতার দরজা খুলে দেয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বাড়ায়, পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করে, এমনকি ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের হার বাড়ায়। এ কারণেই ইসলাম লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অঙ্গ ঘোষণা করেছে। অতএব, পরিশুদ্ধ সমাজের জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত লজ্জা ও পর্দাকে জীবনের অলংকার হিসেবে ধারণ করা এবং বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান না করা।

৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা

বিপরীত লিঙ্গের সাথে নির্জনে বা একান্তে মেলামেশা করাকে ইসলামী পরিভাষায় খালওয়াত বলা হয় এবং এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম। এটি যিনা ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর ধাপগুলির মধ্যে একটি। একান্ত সাক্ষাৎ করাকে জিনার প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে। মানুষের নফস দুর্বল, আর শয়তান তার সুযোগসন্ধানী শত্রু। যখন কোনো নারী ও পুরুষ একান্তে থাকে, তখন তাদের মাঝে তৃতীয় হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের হৃদয়ে পাপের আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে। তাই ইসলাম একান্ত মেলামেশা (খলওয়াহ) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

নির্জন পরিবেশে যখন কেউ শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে, তখন তার পক্ষে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। একান্তে মেলামেশা শারীরিক প্রলোভন সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী পরিস্থিতি তৈরি করে। কথা বলা, স্পর্শ করা, বা আবেগ বিনিময়— ইত্যাদি সহজেই যিনার পথে নিয়ে যায়। এমনকি যদি আপাতদৃষ্টিতে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না-ও থাকে, তবুও শয়তান ধীরে ধীরে তাদের মনে কুচিন্তা ও কামনার বীজ বপন করে। তাই ইসলাম সকল ধরনের সন্দেহ ও পাপের পথকে গোড়াতেই বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। নির্জনতা দূর করার মাধ্যমে ব্যভিচারের মূল কারণটিই দূর করা হয় এবং সমাজকে অনৈতিকতা থেকে রক্ষা করা হয়। নবী ﷺ জানতেন, যতই পবিত্র উদ্দেশ্য থাকুক না কেন, একান্ত পরিবেশে নফসের প্রবৃত্তি জেগে উঠতে পারে, যা পাপের দিকে ধাবিত করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

এই আয়াতে আল্লাহ শুধুমাত্র জিনা নিষিদ্ধ করেননি, বরং বলেছেন “কাছেও যেও না”। একান্ত সাক্ষাৎ, ফোনে আলাদা কথা বলা, বন্ধুত্বের নামে চ্যাটিং করা, এগুলোই “জিনার কাছাকাছি যাওয়া”-এর আধুনিক রূপ। আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারী পুরুষ অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সাথে কাজ করে।

তারা বিভিন্ন কারনে একসাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। যেনম-

• অফিসে গোপন মিটিং,

• বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্প কাজের নামে একান্ত সময়,

• কফিশপে বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ,

• কিংবা অনলাইনে প্রাইভেট ভিডিও কল ও মেসেজ বিনিময়।

এসবই “খলওয়াহ”-এর অন্তর্ভুক্ত, যদিও তা ভার্চুয়াল মাধ্যমেই ঘটে। ইসলামিক ফিকহে এরূপ অবস্থাকে বলা হয় অনলাইন একান্ততা, যা একইভাবে নিষিদ্ধ।

এভাবে একান্তে অনলাইনে বার বার কথা বলার কারনে তাদের অন্তরে হারাম আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আস্তে  আস্তে লজ্জা ও আল্লাহভীতি দূরে সরে যায়। ফলে তাদের বিবাহিত জীবনে অবিশ্বাস ও দাম্পত্য কলহ জন্মায়। অসংখ্য যুবক–যুবতী “বন্ধুত্ব” থেকে শুরু করে “জিনা” পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে কেবল একান্ত মেলামেশার কারণে। ইসলাম পুরুষ–নারীর মধ্যে সম্পূর্ণ দেয়াল টানেনি, বরং শরয়ী শিষ্টাচারের সীমানা নির্ধারণ করেছে। প্রয়োজনে নারী–পুরুষ কথা বলতে পারে, কিন্তু শালীনতা ও প্রয়োজনীয়তার সীমার মধ্যে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ

হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আল-আহযাব: ৩২

৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা

যে সমস্ত গান, নাচ বা সঙ্গীতে অশ্লীল, যৌন উত্তেজক বা অবৈধ প্রেম ও কামনা-বাসনার প্রচার থাকে, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। এটি মানুষের মনকে সরাসরি অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়।

ইসলাম সঙ্গীতকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেনি, তবে যে গান বা সঙ্গীত যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগায়, হারামের দিকে প্ররোচিত করে, বা নারীদের বেপর্দা ও অশালীন চিত্র প্রদর্শন করে, তা নিষিদ্ধ। এ ধরনের গান শ্রবণের যিনা ঘটায় এবং মানুষের মনে কামভাব জাগিয়ে তোলে। গানের কথা বা সুর যখন অবৈধ সম্পর্ক, মদ্যপান বা বেপরোয়া জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে, তখন শ্রোতা সেই পাপের প্রতি মানসিক আকর্ষণ অনুভব করে। বিশেষ করে নাচ ও উদ্দীপক সঙ্গীত, যা নারী-পুরুষের মিশ্র জমায়েতে পরিবেশন করা হয়, তা সরাসরি বেপর্দা ও শারীরিক অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। অবৈধ গানের কারনে আল্লাহ দুনিয়াতেই শান্তি প্রদান করবেন।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

এ হাদিস ইঙ্গিত করে যে এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অশ্লীল গান ও নাচ মানুষের লজ্জা ও তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) কমিয়ে দেয়, ফলে পাপের কাজ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া

অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশগ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম এবং যিনার দিকে ধাবিত হওয়ার একটি মারাত্মক পথ। ডেটিং বা নৈশপার্টি হলো এমন সামাজিক মিলনক্ষেত্র যেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে শরীয়ত-বহির্ভূত অবাধ মেলামেশা ঘটে। সাধারণত এসব পরিবেশে বেপর্দা, নেশা (যেমন মদ) এবং উত্তেজক নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকে। এই তিনটি উপাদানই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এগুলো মানুষকে নৈতিকতা ও আল্লাহর ভয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অবাধ মেলামেশার কারণে পুরুষ ও নারীর মধ্যে দৈহিক আকর্ষণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নৈশপার্টির মতো অন্ধকার ও উদ্দাম পরিবেশে, যেখানে মানুষ নিজেদেরকে ধর্মীয় ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত মনে করে, সেখানে যিনা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। ডেটিং সম্পর্কগুলো শুরু হয় সাধারণ আলাপচারিতা দিয়ে, কিন্তু এটি অনিবার্যভাবে শারীরিক সান্নিধ্যের দিকে এগোয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

তাই ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া  ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা ও যৌন নৈরাজ্য বিস্তারে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫ আংশিক হাদিস।

৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা

যৌন উত্তেজক (পর্নোগ্রাফিক) বই, পত্রিকা বা উপন্যাস পাঠ করা মানসিক ও চিন্তার যিনা ঘটায় এবং ব্যক্তিকে অশ্লীলতার প্রতি আসক্ত করে তোলে। যদিও এটি সরাসরি শারীরিক যিনা নয়, কিন্তু এই ধরনের সাহিত্য পাঠ মানুষের চিন্তা ও কল্পনার জগৎকে কলুষিত করে। আল্লাহ্ তাআলা মানুষকে দৃষ্টি ও চিন্তাকে সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। যখন কেউ এই ধরনের বই পড়ে, তখন তার মনে অবৈধ ও বিকৃত যৌন কামনা তৈরি হয়, যা তাকে বাস্তবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্ররোচিত করে। এটি মনের মধ্যে এমন এক আসক্তি সৃষ্টি করে যে ব্যক্তি আর স্বাভাবিক ও বৈধ সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। এই ধরনের পাঠ তার লজ্জা ও আল্লাহভীতিকে (তাকওয়া) দুর্বল করে দেয়। যে মন সর্বদা অবৈধ কামনায় নিমজ্জিত থাকে, সে ধীরে ধীরে শারীরিক ব্যভিচারের দিকে অগ্রসর হয়। এছাড়া, এই মাধ্যমগুলো অবৈধ সম্পর্ক বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে গৌরবময় বা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পাঠকের নৈতিক মানদণ্ডকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে যিনার দিকে ধাবিত করে।

এ কারণে যৌন উত্তেজক বই, উপন্যাস বা পত্রিকা, রোমান্টিক গল্পের বই যেখানে নেক্কারজনক আচরণ বা প্রেমের নামে অশ্লীলতা প্রচার করা হয়, যা পড়ার মাধ্যমে মানুষ মনের মধ্যে কামনার আগুন জ্বালায় তা পড়া হারাম। এটি সরাসরি জিনার পথকে উন্মুক্ত করে।

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) এর সানাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের যে অংশ লিখিত রয়েছে তা অবশ্যই সে, প্রাপ্ত হবে। নিঃসন্দেহে দু’চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, দু’কানের ব্যভিচার হলো শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথোপকথন করা, হাতের ব্যভিচার হলো শক্ত করে ধরা, পায়ের ব্যভিচার হলো হেঁটে যাওয়া, হৃদয়ের ব্যভিচার হচ্ছে কামনা-বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা সত্যায়িত করে বা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭

৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিইব) অনুপযুক্ত বা অশ্লীল পোস্ট এবং ভিডিও দেখা হলো চোখ ও কানের যিনা, যা আধুনিক যুগে অশ্লীলতা বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।

এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রায়শই বেপর্দা নারীর ছবি, উত্তেজক নাচ বা অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ বিষয়বস্তু প্রদর্শিত হয়। এইগুলো দেখা সরাসরি দৃষ্টি সংযত রাখার ইসলামী নীতির লঙ্ঘন। অনুপযুক্ত ভিডিও বা ছবি দেখার মাধ্যমে মানুষ মানসিক উত্তেজনা অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে পাপের প্রতি তার লজ্জা (হায়া) চলে যায়। বারবার এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে, তার কাছে অবৈধ বা অশ্লীল কাজগুলো স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। এটি তাকে বাস্তবেও এমন আচরণ করতে বা এমন পরিবেশে যেতে উৎসাহিত করে, যেখানে সে এই দৃশ্যের অনুরূপ অভিজ্ঞতা পেতে পারে। এগুলো অনৈতিক ব্যবহার করলে সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে পরিচালিত করে। যুবক-যুবতী ছবি, ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ ও কামনা বৃদ্ধি করে।

বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতে মারফু’ হিসেবে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে ’আলী! বারবার (অননুমোদিত জিনিসের প্রতি) তাকাবে না। তোমার প্রথম দৃষ্টি জায়িয (ও ক্ষমাযোগ্য) হলেও পরের দৃষ্টি (ক্ষমাযোগ্য) নয়। সুনান তিরমিজি : ২৭৭৭, সুনানে আবু দাউদ ২১৪৯

অশ্লীল ভিডিও বা পোস্ট দেখা মানে চোখের জিনার অংশীদার হওয়া। কুরআনও সতর্ক করেছেন—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ

মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর : ৩০

তাই এই পোস্টগুলোর লাইক ও শেয়ারের মাধ্যমে ব্যক্তি অশ্লীলতার প্রচারে অংশ নেয়, যা কোরআনের নির্দেশনার বিপরীত। আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায়। সুতরাং, এই অনুপযুক্ত কনটেন্টগুলো দেখা হলো ব্যভিচারের পথে শয়তানের প্রথম ফাঁদ।

৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা

যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা বা টিকটক ভিডিও তৈরি করা বা উপভোগ করা হলো যিনার পথে কথার ব্যবহার এবং অশ্লীলতাকে জনপ্রিয় করার মাধ্যম।

এ ধরনের কৌতুক বা ভিডিওতে সরাসরি অশ্লীলতা না থাকলেও, সেগুলোতে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, অঙ্গভঙ্গি ও বিষয়বস্তু ব্যবহার করা হয় যা মানুষের মনে যৌন চিন্তা জাগিয়ে তোলে। ইসলামে কথা ও রসিকতায় শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। এই ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টগুলো একদিকে যেমন কথার যিনা ঘটায়, তেমনি অন্যদিকে তা সমাজে লজ্জাহীনতাকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করে। বিশেষ করে টিকটক বা নাটিকার মতো মাধ্যমগুলোতে নারী ও পুরুষের বেপর্দাভাবে অভিনয় করা, অপ্রয়োজনীয় শারীরিক নৈকট্য দেখানো এবং উত্তেজক ভঙ্গিমা প্রদর্শন করার মাধ্যমে দর্শক অবাধে মেলামেশা ও অশ্লীলতার প্রতি উৎসাহিত হয়। যখন সমাজের মানুষ অশ্লীল ইঙ্গিতের প্রতি হাসে ও উপভোগ করে, তখন তাদের হৃদয়ে পাপের প্রতি ঘৃণা কমে যায় এবং তারা ধীরে ধীরে গুরুতর অশ্লীল কাজের দিকে ধাবিত হয়। এই কনটেন্টগুলো ক্ষতিকর মানসিক আসক্তি তৈরি করে, যা বাস্তবে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও পবিত্র বিবাহিত জীবন গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব

বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং বা অনলাইন বন্ধুত্ব হলো কথার যিনা এবং এটি অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

অনলাইনে চ্যাট বা মেসেজিংয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া সম্পর্কগুলো খুব দ্রুত গভীর ও আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সেখানে সরাসরি সাক্ষাতের সামাজিক বাধা থাকে না। প্রথমদিকে এটি হয়তো সাধারণ কথা দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে তা অশোভন, আবেগপূর্ণ এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলাপে পরিণত হয়। ইসলাম নারীদেরকে প্রয়োজন ছাড়া কোমল কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ

হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আহযাব :৩২

অনলাইনে চ্যাটিংয়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরও গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়। এই ধরনের সম্পর্ক হৃদয়ের যিনা ঘটায় এবং চ্যাটিংকারীরা বাস্তবে দেখা-সাক্ষাৎ (খালওয়াত) এবং অবশেষে ব্যভিচারের দিকে ধাবিত হয়। অনলাইন বন্ধুত্ব অবৈধ প্রেমের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা একজন মুসলিমকে তার বৈধ সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ কমাতে এবং ধর্মীয় নৈতিকতা হারাতে সাহায্য করে। অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং মানুষের সময়ের অপচয় এবং চিন্তাকে কুলষিত করার মাধ্যমে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে।

মুসলিমদের অনৈতিক বিনোদন : প্রথম কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী -এর জম্ম উৎসব

আমাদের সমাজের বিশার একটা জনগোষ্ঠী রাসূলুল্লাহ এর জম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ হিসবে পালন করে। যার নাম রেখেছে ঈদে মীলাদুন্নবী। বিদআতীদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো এই দিন। তারা মহা ধুমধামে বিশাল শোভা যাত্রা এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যমে আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল রাসূলুল্লাহ এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এই দিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। আজকাল তারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ এর জ্ম্ম উৎসব পালন কে ফরজ বলেও উল্লেখ করছে।

ঈদে মীলাদুন্নবী কি?

ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ): হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।

২. রাসূলুল্লাহ এর জন্মের সঠিক তারিখ কেউ জাননা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের বছর ও বার নিয়ে তেমন কোন মতভেদ না থাকলেওে, জম্মের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

* কারো জানা ছিল না যে, এ (রাসূলুল্লাহ ﷺ) নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিবারের কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে রাখা হয়নি।

* রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মের পূর্বেই তাহার পিতা মারা জান। মাতা ও ছয় বছর পর মারা যান। কাজেই জম্ম তারিখ মনে রাখার মত আপন আর কেই ছিল না।

* একশত বছর আগের কথা ভাবুন! কত জন মানুষ সঠিকভাবে জম্ম তারিখ জানে? এবার একটু ১৪০০ বছর আগে কথা কল্পনায় নিয়ে আসুন, দেখবেন জম্ম তারিখ মনে রাখা বা লিখে রাখা কতটা অসম্ভব ছিল।

* সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভর যোগ্য উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। অথচ সেখানে জম্মের দিন সোমবার দিন ছাড়া আর কিছু সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয় নি।

৩. এই দিনে খুসিতে যে সব বিনোদন করা হয়

ক. এ দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড, পোষ্টার, ফেস্টুন দিয়ে শোভাযাত্রায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। যা মুলত অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এটা অনেকটা শিয়াদের তাজিয়া মিশিলের অনুকরনে করা হয়ে থাকে।

খ. এ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলেন আয়োজন করে থাকে যার কোন শরিয়তের ভিত্তি নেই। এবং উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কিছু কবিতা আবৃতি করা হয়, যাতে রাসূল ﷺ এর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু’আ করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিয়ে যায়।

গ. তৃতিয় ঈদ মনে করে খাওয়া দওয়ার আয়োজন করে থাকে, যা মুসলেমদের অন্য দুই ঈদের সম পর্যায় নিয়ে যায়। এবং আয়োজোকদের কাছ থেকে এও শুনতে পাোওয়া যায়, ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ।

ঘ. কোন কোন সূফীদের দেখা যায় দলবদ্ধভাবে গান-বাজনা করে, ঢোল বাজায় এবং তাদের বানানো বিদআতী নিয়মে বিভিন্ন জিকির-আজকার করে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এসমস্ত কাজে অংশ নিয়ে থাকে। যার কারণে অনেক সময় অশালীন কাজকর্ম সংঘটিত হওয়ার সংবাদও শুনা যায়।

ঙ,   ইদানিং দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রায় শেষে এ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে থাকে।

চ. অনেকে আবার জলসার আয়োজন করে থাকে, যেখানে তাদের করা পদ্ধতিতে অনুষ্ঠাণ সাজান হয়ে থাকে।

৪. ইসলামে ঈদ হল দুটি যথা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তৃতীয় কোন ঈদ নেই।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী মাদীনায় আগমন করার পর তাদের দু’টি দিন ছিল। এ দিন দু’টিতে তারা খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দু’টিতে আমরা খেলাধুলা করতাম। রসূলুল্লাহ বললেন, এ দু’দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। সুনানে আবূ দাঊদ ১১৩৪, মিশকাত : ১৪৩৯,  আহমাদ : ১৩৬২২, মুসতাদরাক লিল হাকিম : ১০৯১

ইসলামে ঈদ শুধু দু’ টি এ বিষয়টি শুধু সহিহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়, তা রবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। যদি কেউ ইসলামে তৃতীয় আরেকটি ঈদের প্রচলন করে তবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা দ্বীনের মধ্যে একটা বেদআত ও বিকৃতি বলেই গণ্য হবে। ১২ই রবিউল আউয়ালে ঈদে-মীলাদ উদযাপন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ ধরণের কাজ হতে যেমন নিজেদের বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

২. শবে বরাতের বিনোদন

শবে বরাত নামটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই দিন সরকরি ছুটির দিন বলে সকল নাগরিকই জানে এটি একটি ইসলমি দিবস। আমরাও দেখে থাকি এই রাতে প্রতিটি মসজিদে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করে। আবার কিছু লোককে দেখা যায় তারা এ রাতের বিশেষ ইবাদতকে বিদআত হবে। আলোচনা সমালোচায় এক পর্যায় শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর এই আমলকে মুরুব্বিদের দোহাই ও সমাজে প্রচলিত বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলোঃ শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর আমল, বিশেষ নামায পড়া, সিয়াম রাখা, মিলাদ পড়া, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা, আলোক সজ্জা করা ইত্যাদি ইসলামি শরীআতে একটা নব আবিস্কার বিষয়। এই ধরনের কোন আমল বা অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে কিংবা সাহাবাগণের যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের একজন শিয়া মতাদর্শী মন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন খলফ এ দিনকে বিশেষ ঈদ বা অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা শুরু করেন এবং ৪৪৮ হিজরীতে এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দস মসজিদে বিশেষ নামাযের আয়োজন করেন। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

প্রতি বছর হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে মুসলিম উম্মাহ কিছু বিদআতী এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে বহু মনগড়া আমল করে থাকে।

১. শবে বরাত রাতে বিতআতি আমল

এই রাতের আমল সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহে কোন দিক নির্দেশনা নাই। তারপরও কিছু মানুষ এই রাতে নফল নিয়তে কিছু সালাত আদায় করে থাকে। এই রাতের বিদআতের নামে যে আমল করে সে সম্পরকএ নিচে আলোচনা করা হলো :

ক. রাতে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়

বিদআতিগণ রাতে ইবাদত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়ের পদ্ধতি আবিস্কার করেছে।

খ. দিনে সিয়াম পালন

উপমহাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায় ও দিনে সিয়াম পালন করাকে ইসলামি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এখনও এই আমলটি গুরুত্বসহকারে করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দী অনুসরাণী ও সুন্নী নাম ধারি বিদআতিগণ এই আলম চালু রেখেছেন। অবশ্য দুই একজন ব্যতিক্রমও আছে।

গ. এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করাঃ

এই রাতের নির্দিষ্ট সালাত ছেড়ে দিলেও এশা সালাতের পর ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকিরের মাহফিল কায়েম করে থাকেন। অনেক মসজিদে আলোচনা করার পর আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক (দশ বার রাকাত) সালাত আদায় করার সময় প্রদান করেন। এরপর লম্বা একটি সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। কোন কোন মসজিদে আরার আলোচনা শেষ করে ব্যক্তিগত আমল জিকির, সালাত, তিলওয়াত করার সময় প্রদান করে। ফজর সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। ইসলামি আলোচনা, সালাত, তিলওয়াত, জিকির এবং সম্মিলিত মুনাজান কোনটিই বিদআত নয়। কিন্তু শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে সময়ে সাথে নির্দষ্ট করার জন্য বিদআত পরিনত হবে।

ঘ. এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা

অনেক এই রাতে কবর জিয়ারতকে জরুরী মনে করে থাকে। অনেক সময় পূর্নিমার এ রাতে কবরস্থানে শত শত লোক দেখা যায়।

১. শবে বরাত রাতে অনৈতিক বিনোধন

ক.  হালুয়া-রুটি খাওয়াঃ

শবে বরাত উপলক্ষ্যে আমাদের সমাজে হালুয়া রুটি তৈরি বেশ প্রচলন আছে। এই বিদআতি কর্মকান্ডের জন্য দায়ী জাল হাদিস।  এই কথাগুলিকে জাল হাদিস বলতেও ঘৃনা হয়। অথচ যুগ যুগ ধরে অন্ধ ও অজ্ঞ মুসলীমদের মাঝে হাদিস হিসাবে প্রচলিত। এমনই একটি জাল হাদিস হলো-

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯, হাদিসের নামে ভিতিহীন কথা, হাদিস নম্বর : ৫১২

মুহাক্কিক আলেমদের মনে ঐ নির্দষ্ট দিনে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে, মিথ্যা নেকীর উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি বানান সম্পূর্ণ বিদআতি কাজ।

খ. এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা 

শবে বরাতের রাতে মসজিদে এশার সালাত পর মিলাদ একটি রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। আর ৩০/৩৫ বছর ঢাকা আছি অনেক মসজিদে সালাত আদায় করা সৌভাগ্য হয়েছে। মাজার পুজারী বিদআতী ইমাম নয়, ঢাকার অনেক নামিদামি মসজিদের ইমামকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শবে বরাতের মিলাদে জিলাপি কেনার জন্য চাঁদা আদায় করতে দেখেছি। এই রাতকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে মিলাদের জিলপি কেনার টাকা তোলা হয়। বলূত তো এটা কার সুন্নাহ?

রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগন কি এইভাবে মিলাদের আয়োজন করেছেন। আমাদের চার মাযহাবের কোন ইমান কি এমন আমল করতে বলেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ ছাড়াও বিদআতিদের খানকাহ ও দরগায়সমূহে বিশাল আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মিলাদ শেষে চলে মিষ্টি খওয়ার ধুম। চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম জিকিরের মজলিশ। এ সব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়।

গ.  মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করাঃ

চাকুরির সুবাধে চট্রগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখান সৌভাগ্য হয়েছে। এ সব মসজিদে, এ রাতে বিদআতীগণ মিলাদ উপলক্ষে রান্না করা খাবার (পায়েশ, ভাত-গোশতের তরকারী, হালূয়া-রুটি) জমা করে। এশার সালাতের পর সম্মিলিতভাবে মিলাদের আয়োজন করে এবং মীলাদ শেষে সকলে মিলে ঐ জমা করা খাদ্য খায়। মনে হবে, কোন একটি অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া চলছে। এই কাজকে তারা ইসলামি কাজ মনে করে নেকীর জন্য করছে অথচ এর কোন দলীল প্রমান কুরআন সুন্নাহতে নেই। এই ভাবে খেতে অসুবিধা নেই কিন্তু নির্দষ্ট দিনে নেকী আশায় আমল করলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমানিত হতে হবে নতুবা বিদআত হবে।

ঘ. এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা :

আমাদের সমাজে সাধারণ বিহাহের আয়োজনে, আনন্দ উত্সবে বা কোন খুসির কারনে আলোক সজ্জা করা হয়। আতশবাজী ফুটান হয়। এই দুটি কাজই সময় ও অর্থের অপব্যয় করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটি কাজই হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সুরা ইসরা : ২৭

ইবাদাত মনে করে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করা বিদআত। সুতারং এই কাজটি হারাম হওয়া পাশাপাশি বিদআতও বটে। তাই এ রাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা যাবে না। এ কাজ শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে গ্রীক ধর্মের একটি প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালীপূজা নামে মশহুর হয়। আলোক সজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশ করে। যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয় না বরং এগুলো অগ্নি পুজকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

৩. আশুরার দিন আনন্দ–উৎসব করা

ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেগ আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।

১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস-

আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আশূরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নাবী ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি  : ২০০৫

ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা  (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২

২. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলতঃ

হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রমযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারয (ফরয) সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯

আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ () ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম  পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে  নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবী যখন নিজে আশূরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদী ও খৃস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ বললেনঃ আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।  আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯

৩. বিদআত ফির্কার উদযাপন

উপরে সহিহ হাদিসগোলোর মধ্যমে আশুরার পটভূমি সিয়ামের ফজিলত সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু সিয়াম পালনের বাহিরে দুটি ফির্কা এ দিবসে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত বিরোধা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ বাতিল ফির্কা হলো-

ক. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা  

খ. শিয়া ফির্কার

৪. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা উদযাপন :

আমাদের উপমহাদেরশ যারা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসি, সাধারনত তারাই ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা লোক। মূলত মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসিগণই হল উপমহাদেশে বিদআতি আমলের পাওয়ার হাউজ। অথচ তারা তাদের নিজেদের নাম রেখেছে সুন্নি মুসলিম। এ সকল সুন্নি নামধারি বিদআতি মুসলিম জনসাধারণের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন যে, তারা এ আশুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং এ কাজগুলো তারা আশুরার আমল মনে করেই করে থাকে। যেমন-

*আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে

* বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে

* ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে

* মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে

* কেউ কেউ পশু জবেহ

* কেউ কেউ শীয়দের অনুকরণে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের স্মরনে প্রতিকৃতি বানায়

* অনেকে শোক প্রকাশের জন্য শীয়াদের মত তাযিয়া মিছিল বের করে

কষ্টের ব্যাপার হল, এগুলো বিভ্রান্ত শিয়া ও রাফেজীদের কাজ হলেও দুঃখজনক ভাবে এই বিদআতগুলি আজ সুন্নী নামের কিছু মুসলিম ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে।

৫. শিয়া ফির্কার কর্মকান্ড

শীয়া সম্প্রদায়ের লোকদের এই দিনটি খুবই পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস আশুরার দিনে তাদের প্রান প্রিয় ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু (শীয়াগন তাদের ইমাম (আ.) কে বলে) এই দিনে কারবালাতে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তারা এ সম্পর্কে এমন সব উদ্ভট আকিদা রাখেন যার সমর্থনে কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোন প্রমাণ নেই।

৬. কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার সম্পর্ক কি?

কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরনের সাথে আশুরার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা হাদিসের আলোকে যে আশুরার করা বলেছি উহা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগের ঘটনা। তিনি নিজে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সাহাবিদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুছা আলাইহিস সালামে বিজয়ের শুকরিয়া স্বরুপ সিয়াম পালন করেছে। যেমন হাদিসে এসেছে,

ইবনু আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা  (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ : ৩১১২

অপর পক্ষ, শিয়ারা যে আশুরা কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে থাকে তা এক নয়। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের নেতা, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় নাতী সাইয়েদুনা হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। ঘটনাক্রমে এ মর্মান্তিক ইতিহাস এ আশুরার দিনে সংঘঠিত হয়েছিল। এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচে বড় বিপদগুলোর একটি।

উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা ষ্পষ্ট ধারনা হয়েছে যে হাদিসে বর্ণিত আশুরা আর শিয়াদের উদযাপিত আশুর মাঝে কোন প্রকারের সম্পর্ক না্‌ই

৭. এ বিবস উপলক্ষে শিয়াদের বিদআত

ক. আশুরার দিনে মাতম করাঃ

উপরের আলোচনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.) এর নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই।

খ. শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করাঃ

হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। কিন্তু শীয়া ও সুফি তরিকার অনুসরিগণ হুসাইন (রা.) শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে ছিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত।

গ. ১০ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করাঃ

 শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে।

ঘ. তাযিয়া মিছিল বাহির করাঃ

তাযিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ। অথচ শিয়ারা প্রতি বছর শাতাদা বার্ষিকতে ও তাযিয়া মিলিল বের কর। মিডিয়ার কারনে তাযিয়া মিসিলের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটেছে বিধায এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাযিয়া মিসিল।

ঙ. ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ

অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত।

চ. তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়াঃ

ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। বরং সকল মুসলমানের ন্যায় তার মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা উচিত। কেননা মানুষ হিসাবে তার কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন। এজন্য মূলতঃ দায়ী বিশ্বাসঘাতক কূফাবাসী ও নিষ্ঠুর গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। কেননা ইয়াযীদ কেবল হুসাইন (রা.)-এর আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাঁর খুন চাননি। হুসাইন (রা.) সে আনুগত্য দিতেও প্রস্ত্তত ছিলেন। ইয়াযীদ স্বীয় পিতার অছিয়ত অনুযায়ী হুসাইনকে সর্বদা সম্মান করেছেন এবং তখনও করতেন। হুসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক ইয়াযীদের সামনে রাখা হলে তিনি কেঁদে বলে ওঠেন, ‘ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের উপর আল্লাহ লা‘নত করুন। আল্লাহর কসম! যদি হুসাইনের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক থাকত, তাহলে সে কিছুতেই তাঁকে হত্যা করত না। তিনি আরো বলেন, হুসাইনের খুন ছাড়াও আমি ইরাকীদেরকে আমার আনুগত্যে রাযী করাতে পারতাম। (ইবনু তায়মিয়া, মুখতাছার মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৩৫০; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৭৩; আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৭-১০।

৪. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা

আমাদের সমাজে ‘মিলাদ মাহফিল’ একটি ব্যাপক প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মসজিদের ইমাম সাহেব সালাত শেষে প্রায়ই ঘোষণা করে থাকেন, দোয়া বাদ মিলাদ আছে। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে, যেহেতু এটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা এর নেতৃত্ব দেন, তাই এটি নিছন্দেহে একটি বৈধ ইবাদত বা কল্যাণের মাধ্যম। এই কারণে, অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, এত প্রচলিত একটি প্রথাকে ‘বিদআত’ বলা কি সঠিক?

 মিলাদ বিদআত কেন?

১. মিলাদ রাসুল ﷺ, সাহাবী, তাবেই, তাবে-তাবেইন দের যুগ পর্যন্ত ছিলইনা।

২. মিলাদ একটা ইবাদত মনে করা হয় যার পক্ষে রাসুল ﷺ থেকে কোন নির্দেশনা নেই।

৩. মিলাদ আমল হিসাবে আদায় করা হয় এবং এর পদ্ধতিও আবিস্কার করা হয়েছে। প্রত্যেক আদায়কারী এর মাধ্যমে সওয়াব আশা করে থাকে। কাজেই এটা বিদআত।

৪. রাসুল ﷺ তাঁর জন্মের শুকরিয়া হিসেবে সোমবার ব্যক্তিগত সিয়াম পালন করতেন। রাসুল ﷺ সোমবার সিয়াম পালন করতেন সেটা তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতা বোধ আল্লাহর প্রতি। আজকে যারা মিলাদুন নবীর কথা বলে তারা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে সোমবারের কথা কিছুই বলে না। ভন্ডামি করে এই সোমবারের উদাহরণ পেশ করে বাত্সরিক মিলাদ করে থাকে। 

৫. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় বিন্ন উপলক্ষে, যেমন- নতুন ঘর তৈরি বা গৃহে প্রবেশ,  দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন, বিয়ে বা মৃত্যুবার্ষিকী, চল্লিশা, ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে। ইসলামে এই ধরনের পার্থিব বা ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য বিশেষ কোনো সম্মিলিত ইবাদত অনুষ্ঠানের নিয়ম নেই। নো সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ বা দিনে ইবাদতকে আবদ্ধ করে ফেলা বিতআত।

৬. সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই অনুষ্ঠানটিকে একটি স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য করা। অথচ ইবাদত হতে হলে তার পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

নোট : গত কয়েক দশক আগেও হয়তো এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বোঝানো কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইসলামিক জ্ঞান সহজলভ্য হওয়ায়, আলিম সমাজ এবং সচেতন মুসলিমরা বুঝতে পারছেন যে সমাজে প্রচলিত এই মিলাদ মাহফিলের পদ্ধতিটি একটি বিদআত, যা পরিহার করা ইসলামের সঠিক পথে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি কোনো ব্যক্তির সম্মান বা ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করার বিষয়।

এ বিদআতটি কেন বিনোদনে মাঝে উপস্থাপন করলাম?

মিলাদ মাহফিলের আয়োজন একটি ধর্মীয় প্রথা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এটিকে বিনোদনের প্রসঙ্গে নিয়ে আসার মূল কারণ এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং মিষ্টি বিতরণের সামাজিক দিক। ইবাদত এবং বিনোদন, এই দুটি বিষয়ের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে লুপ্ত হয়ে যায়।

ইসলামে ফরজ বা নফল ইবাদত, যেমন সালাত বা রোজা পালনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মিষ্টি বিতরণ বা ভোজের আয়োজন করা হয় না। ইবাদত পালনের উদ্দেশ্য সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, যেখানে বিনোদন হলো মনস্তাত্ত্বিক আনন্দ বা উল্লাস। সমাজে মিষ্টি বিতরণের প্রচলন মূলত পার্থিব আনন্দ সংবাদ—যেমন: কোনো পরীক্ষায় সফলতা, নতুন চাকরি লাভ, বা পারিবারিক শুভ বিবাহের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যখন মিলাদ মাহফিলের মতো একটি অনুষ্ঠান শেষে ব্যাপক হারে মিষ্টি বিতরণ করা হয়, তখন এই পুরো অনুষ্ঠানটি একটি খুশির উপলক্ষ বা সামাজিক উৎসবের মেজাজ লাভ করে।

এই অনুষ্ঠানের মূল ধার্মিকতার চেয়ে শিশুদের এবং অনেক সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে এই মিষ্টি। পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোরেরা এই মাহফিলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, কারণ তারা জানে যে শেষে লাইন ধরে মজা করে মিষ্টি বা তাবারুক নিতে পারবে। তাদের কাছে এটি এক ধরনের ‘প্রাইজ মানি’ বা ‘ঈদ বোনাস’-এর মতো। তাই, তাদের কাছে মিলাদ মাহফিলের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে মিষ্টি সংগ্রহ এবং সেই উপলক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার সামাজিক আনন্দ বা উল্লাস অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এভাবেই, বিদআতের মাধ্যমে সৃষ্ট এই অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় মোড়কের আড়ালে সমাজে একটি সামাজিক বিনোদনমূলক রেওয়াজ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই কারণে, আপনি এটিকে অনৈতিক বা বিদআতি বিনোদনের তালিকায় উপস্থাপন করেছেন, কারণ এর কার্যকারণ এবং ফলাফল একে নিছক ইবাদতের চেয়ে ‘বিনোদন’ বা ‘উৎসব’ হিসেবেই বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫. ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম

রড় পীর খ্যাত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানী ৯১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার কিছু অনুসারি প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার ওফাতের দিন পালন করে থাকেন। তার মৃত্যু বার্ষিকী ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। ফাতিহা ও ইয়াজদাহম দুটি ফার্সি শব্দ। ফাতিহা অর্থ দোয়া, আর ইয়াজদাহম অর্থ এগারো। ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো-এর ফাতিহা বা দোয়াকে বুঝায়। এক কথায় রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াবের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলে। ফার্সি ভাষার প্রভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, বৃহৎ রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, ইরাক প্রভৃতি স্থানে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ অর্থাৎ এগারো-এর ফাতিহা নামে উদ্যাপিত হয়। এই দিনটি উৎযাপন করা যে বিদআতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারন ইসলামে কোন জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হারাম কাজ। 

আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হলেন  ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসাবে সুবিদিত। আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) কে ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। জিলানের অধিবাসি হিসাবে তিনি জিলানী নামে নামে পরিচিতি লাভ করে। তাকে সম্মান প্রদানের জন্য আবু মোহাম্মাদ মুহিউদ্দিন নামে উপাধি প্রদান করা হয়। তার পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। জীবনি লেখকদের মতে তার মাতা হাসান ইবনে আলী (রা.) এর বংশধর।

ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম উপলক্ষে বিদআতি কার্যক্রম

১. বিশেষ ধর্মীয় সভার আয়োজন

দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে বিশেষ মাহফিল বা ওরশ-এর আয়োজন করা হয়। এই মাহফিলে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তবে এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দিনটিকে একটি উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষত মাজারে (তাঁর কবরের কাছে) অনুসারীরা ভিড় করে। অনেকে কবরের চারপাশ তাওয়াফ করে, কবরে সিজদা করে বা কবরে ফুলের চাদর দেয়—যা স্পষ্টতই শিরক-এর অন্তর্ভুক্ত।

২. বিশেষ খাদ্য ও পানীয় বিতরণ

এই দিনে ব্যাপকভাবে শিরনি (মিষ্টান্ন), তাবারুক (খাবার) তৈরি করা ও বিতরণ করা হয়। এই বিশেষ খাবারকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় যে, এই দিনে এই কাজটি করতেই হবে। এটি ঈদ বা অন্য কোনো সুন্নাহসম্মত দিনে খাবার বিতরণের মতো স্বাভাবিক দান নয়, বরং একটি বিদআতি প্রথার অংশ। অনেক অঞ্চলে ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহামের সাথে নির্দিষ্ট কিছু খাবার বা রেসিপি জড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের জন্য নির্ধারিত নয়।

৩. আলোকসজ্জা ও অলংকরণ

ওরশ বা মাহফিলের স্থান, মাজার এবং কখনো কখনো ঘরবাড়িও আলোকসজ্জা করা হয়। এই ধরনের আলোকসজ্জা উৎসবের আমেজ তৈরি করে, যা শুধুমাত্র ইসলামে অনুমোদিত দুটি ঈদ বা সুন্নাহসম্মত উপলক্ষে (যেমন: বিবাহ) করা যেতে পারে। পীর বা বুজুর্গের সম্মানার্থে বিভিন্ন ধরনের রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন, এবং ঝালর দিয়ে স্থানটিকে সাজানো হয়, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ নয়।

৪. সাওয়াবের ভুল ধারণা

‘ইছালে সওয়াব’ (সওয়াব পৌঁছানো) করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। যদিও এককভাবে কারো জন্য দোয়া করা বৈধ, কিন্তু এই দিনটিতে বাধ্যতামূলকভাবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানোর প্রথা প্রতিষ্ঠা করা বিদআত। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সওয়াব অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পুস্তক বা প্রবন্ধ পাঠ করা হয়, যা রাসূল (ﷺ) বা সাহাবীদের (রা.) যুগে প্রচলিত ছিল না।

উপসংহার : আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন মহান বুজুর্গ ও আলিম ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা বা কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসব পালন করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। যেহেতু ইসলামে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হারাম (যেহেতু এর কোনো ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে নেই), তাই এর সাথে যুক্ত হওয়া সকল আনুষ্ঠানিকতাই বিদআত বা শিরক-এর পর্যায়ে পড়ে। মুসলিমদের উচিত, কোনো ব্যক্তি বা দিবসের প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে শরীয়ত বিরোধী কা

৬. পীরের মাজারে উরশ উৎযাপন

১. উরশ কোন ভাষার শব্দ?

উরশ (ﻋُﺮﺱ) একটি আরবি শব্দ।  উরশ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিবাহ বা বিবাহ অনুষ্ঠান, বাসর রাত বা বর ও কনের প্রথম মিলন, ওয়ালীমা বা প্রীতিভোজ। এককভাবে উরুশ (ﻋَﺮُﻭﺱ) শব্দ দ্বারা বর ও কনে উভয়কেই বোঝানো হয়।

২. উরশ শব্দের প্রচলিত পরিভাষা

সাধারণ মুসলিম সমাজে এবং বিশেষ করে সুফিবাদের অনুসারীদের মধ্যে ‘উরশ’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত করে। সুফি সাধকগণ তাদের পীর বা বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী বা ওফাত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বার্ষিক অনুষ্ঠান বা মাহফিলকে পারিভাষিক অর্থে ‘উরশ’ বলা হয়।

উরশের মূল আভিধানিক অর্থ (বিবাহ বা মিলন) থেকে ধারণা নেওয়া হয়েছে। সুফি মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে, একজন নেককার বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যু তাঁর প্রিয়তমের (আল্লাহর) সাথে মহামিলন বা মিলন রাত্রি। তাই তাঁদের মৃত্যুদিবসকে ‘ইয়াওমুল উরস’ (মিলনের দিন) বা সংক্ষেপে ‘উরশ’ নামে অভিহিত করা হয়।

৩. উরশ উপলক্ষ ভক্তগন যে সকর কাজ করে থাকে

১. মাজারে তাওয়াকরে, কোন কোন ক্ষেত্র সিজদা করে

২. নারী পুরুষ একত্র মিলিত হয়ে হু হু হু জিকির করে

৩. মাজারের মানত কালেকশন করে

৪. মানতকৃত গরু, মহিষ, ছাগর জবেন কবে।

৫. ভক্তদের জন্য খাবার বিতরণ করে

৬. রাতে গাজা বা নেষার আশর বসে।

৭. মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন করে ও চাদর চড়ায়।

৮. কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মান করে।

৪. এ কাজগুলো জঘন্য পাপাচার কেন?

পীরের মাজারে ‘উরশ’ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ভক্তরা যে কার্যকলাপগুলো করে, তার সাথে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ন্যূনতম সম্পর্কও পরিলক্ষিত হয় না; বরং এই কার্যকলাপগুলো ইসলামের নীতির (তাওহীদ) সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ঘোর বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) ও শিরক-এর শামিল। উরশের নামে ভক্তদের কার্যকলাপের প্রতিটি ধাপই শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে।

মাজারে তাওয়াফ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে সিজদা করা স্পষ্টত শিরক, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট ইবাদতকে সৃষ্টির প্রতি নিবেদন করে। এই ধরনের কাজ ইসলাম থেকে ব্যক্তিকে বের করে দেয়। একইভাবে, কবর পাকা করা এবং সেগুলোর উপর গম্বুজ বা স্থাপত্য নির্মাণ করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; এর উদ্দেশ্য হলো কবরের প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করে এটিকে পূজা বা উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত করা। উরশ উপলক্ষে মানত (নযর) কালেকশন করা এবং সেই মানতকৃত পশু যবেহ করাও শিরক, কারণ মানত একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে করা হারাম। এছাড়া, মাজার প্রাঙ্গণে নারী-পুরুষের একত্র মিলিত হয়ে ‘হু হু হু’ ধ্বনিতে জিকির করা, যা কথিত আধ্যাত্মিকতার নামে ব্যভিচার ও ফিতনার পথ উন্মুক্ত করে এবং ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে। রাতের আঁধারে গাজা বা নেশার আসর বসানো গুরুতর নৈতিক অপরাধ ও হারাম কাজ, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে চরম পাপাচারকে প্রশ্রয় দেয়। সর্বশেষে, মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন ও চাদর চড়ানোর প্রথাটি হলো কুসংস্কার ও অপচয়, যা অগ্নি উপাসকদের রীতির অনুকরণ এবং মুসলিমদের ধন-সম্পদ নষ্ট করার নামান্তর। সামগ্রিকভাবে, উরশ উদযাপনের এই আটটি কাজই ইসলামের মৌলিক আকিদা ও নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।

পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ

আধুনিক মিডিয়ার প্রচারের কারনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই দিন উপলক্ষে বাঙ্গালীরা নতুন জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় বাহির হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হলেও নিম্মের অনুষ্ঠানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন-

১. ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণঃ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়।

২. নববর্ষ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে একটি শোভাযাত্রা বের করে। এই শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়।

৩. নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীদের হালখাতাঃ

বছরের প্রথম দিন বা নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীগণ তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এই হালখাতার দিন খদ্দেরগণও চেষ্টা করে কিছু বাকি টাকা পরিশোধের। উপলক্ষে  ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান।

৪. হিন্দুদের বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজাঃ

পহেলা বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ধর্মের দোকানী ও ব্যবসায়ীরা পুজা দান করেন। হিন্দুদের দাবী  করে থাকে যে লক্ষী হলো, বিত্তের দেবী। তাই তারা পহেলা বৈশাখের নববর্ষে  লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। তারা এই দিন লক্ষীর নিকট দাবি করে যে, তাদের সারা বছর যেন ব্যবসা ভাল যায়।

নববর্ষ উপলক্ষে গ্রাম অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা

গ্রাম অঞ্চলের লোকেরা খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন থাকে। নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন করে থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। এমন কোন জেলা নাই যেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হয়না।

ববর্ষের সাথে ইসলামের বিরোধ কোথায়?

১. সব অনষ্ঠানই সরাসরি সনাতন ধর্মের আদলে করাঃ

আধুনিক নববর্ষের প্রধান আকর্ষন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণিল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় বাঘ, হাতি, কুমির পেঁচাসহ বহু জীবজন্তুর মূর্তি বা প্রতিকৃতি প্রদর্ষণ করা হয়।  এই শোভাযাত্রার প্রচলন কারীগণ দাবি করে থাকে, এই জীবজন্তুর মূর্তি মাধ্যমে মানুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। এই জন্য তারা এর নাম দিয়েছেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুভাইদেরও দেখি নিজেদের মঙ্গল কামন করে তারা গাছ, পাথর, সাপ, সিংহ, মহিষ, ময়ুর, গাভী, নদীর পুঁজা করে থাকে।

২. ইসলাম বিরোধী আকিদা ধারণ করে

নববর্ষ উপলক্ষে প্রচার কর হয় যে, নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। এই ধরনের কোন তত্ত্ব কথায় সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। এই কথা বিশ্বাস করলে ইসলাম বিরোধী আকিদা হিসাবে চিহৃত হবে।

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস আমাদের সকল প্রকার শুভ অশুভের মালিক এক মাত্র মহান আল্লাহ। কিন্তু নববর্ষে

প্রচার করে থাকে এ বছর মা দূর্গা গজে বা হাতিতে চড়ে এসছেন তাই এ বছর ফসল ভাল হবে। তাছাড়া    নববর্ষকে আহবান করা হয় এই বলে যে, “এসো হে বৈশাখ”। এই ধরনের কোন আপেক্ষিত বন্তুকে আহবান করা নিষেধ।৷ কারন এর দ্বারা মাখলুকের নিকট কল্যাণ কামনা করা হয়৷ অথচ কল্যানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’লা।

مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ

আপনার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে। সুরা নিসা : ৭৯

 ৩. গান বাজনা মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা

নববর্ষে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহন করা হয়। প্রথম কর্মসুচি হলো, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়। অথচ ইসলামি শরীয়তে এই ধরনের গান বাজনা হারাম করা হয়েছে।

৪. নবর্ষের মাধ্যামে বিজাতির অনুসরণ করা হয়

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন,এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ হাদিস বিশারত লিখেছেন, মদীনাবাসী যে দুটি দিবস উদযাপন করত তা ছিল তাদের নববর্ষ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, নববর্ষের বিকল্প হিসাবে আল্লাহ আমাদের দুটি উত্তম দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অথচ আমরা আল্লাহ প্রদত্ত দিবস বাদ দিয়ে মনগড়া দিবস পালন করছি। ইদানিং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে দুই ঈদের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানো হয়।

৫. নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশাঃ

শয়তানের হাতিয়ার হল নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই কাজটি সে আনজান দিয়ে থাকে নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে। নববর্ষ মানে আনন্দ। এই আনন্দ হলো, সর্বস্থরের নারী পুরুষ একত্র হয়ে নগ্নতা, অশ্লিলত, বেহায়া পনার মাধ্যমে নিজকে প্রদর্শণ করান। নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশা আমাদের সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, মনে করা হয় এই বেপর্দা, বেহায়াপনা,  অশ্লীলতা, আমাদের দেশীয় আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অংশ। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয হলো, এসব বাদ দিয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির নামে যুবক যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ করে দিয়ে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছি। আমরা এক বারের জন্যও চিন্তা করি না যে এই নববর্ষ উপলক্ষ্যে এক বারের জন্যও যদি আমাদের কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা অশ্লীলতায় মাঝে নিপতিত হয়, তবে তাদের আর বের করা সম্ভব হবে না। তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকবে।

মনে রাখবেন ব্যভিচার করা হয় শুধু বিশেষ অংগের দ্বারা। বাস্তবতা হলো, ব্যভিচার হতে পারে বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা। আমাদের ইসলামি শরীয়তে এ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাপাচারের প্রথার উৎস হলো, নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এই জন্য বিষয়টি খুবই ইসালাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَرْنَ فِى بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ ٱلْأُولَىٰۖ وَ

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সুরা আহজাব : ৩৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯

৬. সময় ও অর্থ অপচয়কারীঃ

নববর্ষ উপলক্ষে যে কোন সময় ওঅর্থ অপচয় করা সঠিক কাজ হবে না।  এই দিবস উদযাপনের জন্য প্রধানত চারটি স্থান সময় ওঅর্থ অপচয় করে থাকে।

ক. খাবারের পেছনে

খ. পোশাকের পেছনে

গ. বিভিন্ন অনিষ্ঠান আয়োজনের পেছনে

ঘ. শোভাযাত্রার আয়োজনের পেছনে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

৭. মুখোস এবং উল্কি আঁকা একটি ইসলামি বিরোধী সংস্কৃতিঃ

নববর্ষ উপলক্ষে হাজার হাজার যুবগ যুবতী তাদের গালে, কপালে, হাতে উল্কি আঁকাছে। তারা এ সব খুবই মজা করে আকঁছে। কিন্তু এই কাজ যে ইসলামি বিরোধী তারা হয়তো তা জানে না। মানুষের শরীরে উল্কি আঁকা হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। নিম্মে এ সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস বর্ণনা করা হল-

আওন ইবনু আবূ জুহাইফাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি-

إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ، وَثَمَنِ الْكَلْبِ، وَآكِلِ الرِّبَا وَمُوكِلِهِ، وَالْوَاشِمَةِ وَالْمُسْتَوْشِمَةِ‏.‏

নবী রক্তের মূল্য ও কুকুরের মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, উল্কি অঙ্কনকারী উল্কি গ্রহণকারী নারীদের উপর লানত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৫

 মুসলিমদের অনৈতিক বিনোদন : দ্বিতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শেষ রমজানের দিন রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা

শেষ রমজানের দিন মানুষ ঈদের আহব শুনতে পায়। ঈদের জন্য তাদর যেন আর দেরী সইছে না। তাই ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাতের রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা শুরু করে দেয়। ইহা কোন অবস্থায় মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়। রমজানের শেষ রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা বা রাতভর আড্ডা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু হারামই নয়, এটি পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এই ধরনের কাজ কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশের লঙ্ঘন।

১. আতশবাজি ও অপচয়

রমজানের শেষ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লাইলাতুল কদর ও ইতিকাফের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। এই সময়ে আতশবাজি ফোটানো বা এ ধরনের অপচয়মূলক কাজ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلْمُبَذِّرِينَ كَانُوٓا۟ إِخْوَٰنَ ٱلشَّيَٰطِينِۖ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورًا

অপব্যয়কারীরা শয়তানদের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।  সুরা বনীইরাঈল : ২৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُوا۟ لَمْ يُسْرِفُوا۟ وَلَمْ يَقْتُرُوا۟ وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا

আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, আর কৃপণতাও করে না। এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা গ্রহণ করে। সুরা ফুরকান ২৫:৬৭

আতশবাজি বাজি ফোটানো সম্পদের অপচয় এবং একই সাথে পরিবেশ দূষণ ও জনগণের কষ্টের কারণ। তাছাড়া আতশবাজির বিকট শব্দ মুসল্লিদের ইবাদত এবং সাধারণ মানুষের ঘুম ও শান্তি নষ্ট করে, যা ইসলামে অন্যের ক্ষতি করাকে হারাম ঘোষণা করেছে।

২. গান-বাজনা ও অনর্থক কাজ

রমজানের শেষ রাতগুলোতে গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

৩. রাতভর আড্ডা ও ইবাদত থেকে গাফেলতি

রমজানের শেষ রাতে বিনোদনের নামে এসব হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা এবং বরকতময় রাতকে নষ্ট করার শামিল।

সাঈদ ইবন আওস আল-আনসারী তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ বলেছেন, “যখন ঈদুল ফিতরের দিন হয়, তখন ফেরেশতাগণ রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে, ‘হে মুসলিমগণ! তোমরা তোমাদের পরম দয়ালু প্রতিপালকের দিকে যাও, যিনি প্রচুর পুরস্কার দান করেন এবং মহাপাপ ক্ষমা করেন।’ যখন তারা ঈদগাহে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার ফেরেশতারা! আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি আমার বান্দাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তারা রোযা রেখেছে, সালাত কায়েম করেছে, তাই আজ তোমরা ফিরে যাও, তোমাদের সব পাপ ক্ষমা করা হলো, এবং তাদের পাপগুলোকে সওয়াবে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সাহীহাহ : ১৮৮১, শুয়াবুল ঈমান : ৩৬৪৮,

তাই এ রাতে প্রতিটি মুসলিমের চিন্তা করা উচিত আমি কি মহান আল্লাহ ক্ষমার তালিকায় আছি।

৯. বিবাহ বা আকিকায় গান-নাচ ও বেপর্দা অনুষ্ঠান করা

বিবাহ বা আকিকার অনুষ্ঠানে গান, নাচ, ড্যান্স পার্টি এবং বেপর্দা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এই ধরনের কার্যকলাপ ইসলামের মৌলিক নৈতিকতা, শালীনতা এবং শরীয়তের বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। কুরআন ও হাদিস মুসলিমদেরকে এসব অননুমোদিত বিনোদন থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে।

১. অশ্লীল গান, নাচ ও ড্যান্স পার্টির বিধান

গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল কথা ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে নাচ ও ড্যান্স পার্টির আয়োজন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

২. বেপর্দা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা

এই ধরনের অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা এবং অঙ্গভঙ্গি সহকারে নাচ-গানের আয়োজন ইসলামের কঠোর পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কেও পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

অতএব, মুসলিমদের উচিত বিবাহ ও আকিকার মতো পবিত্র ও বরকতময় অনুষ্ঠানগুলো কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে শালীনভাবে পালন করা এবং সকল প্রকার হারাম কার্যকলাপ, যেমন গান, নাচ ও বেপর্দা থেকে দূরে থাকা।

১১. মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির উত্জাপন করা

মৃত্যুর পর শোকাহত পরিবার কর্তৃক মৃত ব্যক্তির জন্য কুলখানি, চল্লিশা, বা বছর পূর্তির মতো বিশেষ উপলক্ষে সম্মিলিত ভোজ ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম। এই প্রথাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজে গভীরভাবে প্রচলিত হলেও, কুরআন ও সহীহ হাদিসে এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) এবং ক্ষেত্রবিশেষে জাহেলিয়াতের রীতির অন্তর্ভুক্ত।

১. এ কাজ বিদআত ও সীমালঙ্ঘন:

কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির মূল সমস্যা হলো, এটিকে সওয়াবের কাজ বা মৃত ব্যক্তির মুক্তির উপায় মনে করা। অথচ ইবাদত বা সওয়াবের কাজ হতে হলে তার নির্দিষ্ট পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

রাসূল (ﷺ), সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বা তাবেঈনদের যুগে মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিনে (তৃতীয় দিন, চল্লিশতম দিন বা বছর পূর্তিতে) সম্মিলিতভাবে কোরআন খতম বা ভোজের আয়োজন করে সওয়াব পৌঁছানোর কোনো প্রমাণ নেই। এটি একটি আবিষ্কৃত রীতি, যা স্পষ্টত বিদআতের শামিল।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।

সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

ইসলামে মৃত্যুতে শোক প্রকাশের সর্বোচ্চ সীমা হলো তিন দিন। এর বেশি আনুষ্ঠানিক শোক পালন করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। চল্লিশা বা বছর পূর্তির আয়োজন এই শোকের সীমা লঙ্ঘন করে এবং দুঃখকে দীর্ঘায়িত করে।

২. সম্মিলিত ভোজের আয়োজন সুন্নাহ বিরোধী কাজ

মৃতের পরিবার কর্তৃক ভোজের আয়োজন করা শরীয়তে বৈধ নয়, বরং এটি জাহেলী যুগের প্রথা হিসেবে চিহ্নিত। এই উপলক্ষে ব্যাপক লোক সমাগম করে খাবারের আয়োজন করা মূলত মৃতের পরিবারকে অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপে ফেলে দেয়। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ হলো, প্রতিবেশীরা বা আত্মীয়-স্বজনরা শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাবে, যেন তারা খাবারের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে শোক পালন ও ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারে। এ কাজ সরাসরি হাদিসের বিরোধিতা।

জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ্ আল-বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃতের বাড়িতে ভীড় জমানো ও খাদ্য প্রস্তুত করা বিলাপের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬১২

 এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তির জন্য ভোজের আয়োজন করা সাহাবাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল।

উপসংহারে : কুলখানি, চল্লিশা বা বছর পূর্তির মতো অনুষ্ঠানগুলো মৃত ব্যক্তিকে কোনো উপকার করে না, বরং জীবিতদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ইবাদতের নামে বিদআতে লিপ্ত করে। মুসলিমদের কর্তব্য হলো, এসব হারাম প্রথা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন করা।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত অনুকরণে বিনোদন

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

ইসলামী বিনোদনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, এটি অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্নের অনুকরণ (তাশাব্বুহ) করবে না। এই অনুকরণ বলতে এমন কোনো পোশাক, আচার-আচরণ, উৎসব বা প্রতীক ব্যবহার করা বোঝায় যা বিশেষভাবে কোনো অমুসলিম ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।

উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিশেষ ধরনের খেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা বা তাদের ধর্মীয় পোশাক পরিধান করা ইসলামী বিনোদনে বৈধ নয়। একজন মুসলিমের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এবং জীবনধারা রয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিনোদনের মাধ্যমে সেই স্বতন্ত্রতাকে বিসর্জন দেওয়া বা অন্য সংস্কৃতিতে বিলীন হওয়ার প্রবণতা তৈরি করা উচিত নয়। তবে, সাধারণ মানবীয় সংস্কৃতি বা যা সকল জাতির মধ্যে প্রচলিত এবং যা শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেই ধরনের সুস্থ বিনোদন গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এই নীতিটি মুসলিমদের তাদের আত্ম-পরিচয় ও ধর্মীয় সীমানার প্রতি সচেতন থাকতে সাহায্য করে।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَلَنۡ تَرۡضٰی عَنۡکَ الۡیَہُوۡدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَہُمۡ 

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সূরা বাকারা : ১২০

এই আয়াত মুসলিমদের সতর্ক করছে যেন তারা অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিক ধারা অনুসরণ না করে। তাদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের আচার-আচরণ বা উৎসব অনুকরণ করা ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল ইমরান : ৮৫

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসলামের বিকল্প কোনো জীবনধারা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিনোদন বা সংস্কৃতিতেও মুসলিমকে ইসলাম-সম্মত নীতি বজায় রাখতে হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে।

ইবনু ’উমার (রাঃ) যখন হাজ্জ বা ’উমরাহ করতেন, তখন তিনি তাঁর দাড়ি মুষ্টি করে ধরতেন এবং মুষ্টির বাইরে যতটুকু বেশি থাকত, তা কেটে ফেলতেন। সহিহ মুসলিম : ৫৮৯২, ৫৮৯৩, সহিহ মুসলিম : ২৫৯, আহমাদ : ৪৬৫৪

রাসূল ﷺ দাড়ি রাখার এবং গোঁফ ছাঁটার নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বলে, “মুশরিকদের বিপরীত হও।”

অর্থাৎ, ইসলাম মুসলিমদের জন্য একটি আলাদা, স্বতন্ত্র চেহারা ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে চায়।

অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণ থেকে বারণ :

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসায়ি : ১৫৫৫

রাসূল ﷺ নিজে অমুসলিমদের উৎসব বা বিনোদনকে বাতিল করে মুসলিমদের জন্য ইসলামসম্মত বিকল্প নির্ধারণ করেছেন। তাই বিনোদনের ক্ষেত্রেও মুসলিমের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত যে অনুকরণ করছে, তার কিছু উদারহন তুলে ধরছি। যেমন-

আজকের যুগে মুসলিম সমাজের বহু অংশ বিনোদনের নামে অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্ন ও রীতির অনুকরণ করছে— যা ইসলামী পরিচয়ের জন্য গুরুতর হুমকি। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যাতে এই তাশাব্বুহ (অমুসলিম অনুকরণ) স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

প্রথমেই বলি, অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক “বিশেষ দিন” বা “বছর” অনুকরণে মুসলিম সমাজের বিনোদনমূলক প্রবণতা বর্তমানে ব্যাপক। ইসলাম মুসলিমদের নিজস্ব উৎসব ও পরিচয় নির্ধারণ করেছে। তাদের প্রদান উত্সব হলো, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও জুমার দিন। এর বাইরে অন্য কোনো “ধর্মীয় আনন্দ দিবস” ইসলাম স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম সমাজে অমুসলিমদের বিশেষ দিন ও বছর উদযাপন ক্রমে বিনোদনের অংশ হয়ে উঠছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো-

ক. ক্রিসমাস ডে (২৫ ডিসেম্বর)

ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন হলো খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। তারা এই দিনটিকে নবী ঈসা (আ.)-এর জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। তবে খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের মূল নীতি অনুসারে, এটি “ঈশ্বরের পুত্র” (গডের পুত্র) ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, যা ইসলামের মূল বিশ্বাস অর্থাৎ তাওহীদ (একত্ববাদ) এর সম্পূর্ণ বিরোধী।

দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং প্রতিষ্ঠানেও এই উৎসবের বিভিন্ন অংশ বিনোদন হিসেবে ঢুকে পড়েছে। অনেকে ক্রিসমাস ট্রি সাজান, শিশুরা সান্তা ক্লজের পোশাক পরে, এবং উপহার বিনিময়ের (গিফট এক্সচেঞ্জ) আয়োজন করেন। অফিস, স্কুল বা বিভিন্ন সামাজিক আড্ডায় “ক্রিসমাস পার্টি”র আয়োজন করা হয়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই ধরনের কাজকে “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন) হিসেবে দেখা হয়। তাদের একটি অংশের মতে, একটি ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উৎসবকে এভাবে পালন বা অনুকরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১, আহমাদ : ৫১০৪

খ. ভ্যালেন্টাইন ডে (১৪ ফেব্রুয়ারি)

ভ্যালেন্টাইন ডে বা তথাকথিত “প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা দিবস” মূলত খ্রিস্টান পুরোহিত “সেন্ট ভ্যালেন্টাইন”-এর নামে উদযাপিত একটি পৌত্তলিক ঐতিহ্যের অংশ। এই দিনটি আজ মুসলিম সমাজে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিনোদনের এক জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই উপলক্ষে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যায়, যেমন- “লাল গোলাপ দিবস,” “লাভ কনসার্ট” এবং “কাপল নাইট”।

এটি কেবল অমুসলিমদের উৎসবের অনুকরণই নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক বিশৃঙ্খলা বা ফিতনার জন্ম হচ্ছে বলে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়। এই উৎসব তরুণ-তরুণীদেরকে ইসলামী বিবাহের পবিত্র বন্ধনের বাইরে গিয়ে অবাধ সম্পর্কের দিকে উৎসাহিত করে, যা ইসলামী নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য চরম ক্ষতিকর।

গ. হ্যালোইন উৎসব (৩১ অক্টোবর)

হ্যালোইন উৎসবের মূল শিকড় হলো কেল্টিক পৌত্তলিকদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, যেখানে মৃত আত্মাদের ভয় দেখানো বা তাদের তাড়ানোর জন্য এই উৎসব পালন করা হতো। পরে এটি খ্রিস্টান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আজকাল মুসলিম সমাজেও এই উৎসব বিনোদনের নামে ঢুকে পড়েছে। মুখোশ পরে “হরর পার্টি” আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুরা “ট্রিক অর ট্রিট” খেলায় অংশ নিচ্ছে এবং অনেক স্কুল বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে হ্যালোইন সাজসজ্জা প্রতিযোগিতা বা ইভেন্ট দেখা যায়।

একটি পৌত্তলিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যকে বিনোদনের নামে অনুসরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য অমর্যাদাকর। এই ধরনের “ভৌতিক” সাজসজ্জা এবং আচার-আচরণ গ্রহণ করাকে “তাশাব্বুহ” বা অমুসলিমদের অনুকরণ হিসেবে দেখা হয়, যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে বেমানান। এটি শিরক ও কুফরী বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত উৎসব; তাই মুসলিমদের জন্য এতে অংশ নেওয়া বা অনুকরণ করা হারাম।

ঘ. নিউ ইয়ার পার্টি (৩১ ডিসেম্বর রাত)

৩১শে ডিসেম্বর রাতে যে “নিউ ইয়ার পার্টি” উদযাপন করা হয়, তা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনমূলক উৎসব। এটি এখন মুসলিমদের মধ্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই রাতে ব্যাপক আতশবাজি, আলোকসজ্জা, ডান্স পার্টি, কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান, মদ্যপান ও গান-বাজনার আসর ইত্যাদি আয়োজন করা হয়।

ইসলামী পন্ডিতদের মতে এটিকে অমুসলিমদের উৎসব হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন যে এই উপলক্ষে বিশেষ বিনোদনে অংশ নেওয়া তাদের সংস্কৃতির অনুকরণ। এছাড়া, এই রাতের আয়োজনগুলিতে প্রায়শই মদ্যপান, অশ্লীল নাচ-গান এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দেখা যায়, যা ইসলামী নৈতিকতা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে। এই ধরনের “আনন্দের দিন” উদযাপন করাকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ غَیۡرَ الۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوۡۤا اَہۡوَآءَ قَوۡمٍ قَدۡ ضَلُّوۡا مِنۡ قَبۡلُ وَاَضَلُّوۡا کَثِیۡرًا وَّضَلُّوۡا عَنۡ سَوَآءِ السَّبِیۡلِ 

বল, ‘হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন কওমের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে। সূরা মায়িদা : ৭৭

ঙ. মাদার্স-ডে, ফাদার্স-ডে ,উইমেনস-ডে ইত্যাদি

এসব দিন পশ্চিমা সমাজে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে বা মানবিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে চালু হয়েছে। আজ মুসলিম সমাজেও তা বিনোদন ও সামাজিক প্রচারণার অংশ হয়ে গেছে।

ইসলামে পিতা-মাতা বা নারীকে সম্মান করা কোনো একদিনের দায়িত্ব নয়, বরং আজীবন ইবাদতস্বরূপ দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا

আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। সূরা ইসরা : ২৩

অতএব, একদিনের নামে বাকি সময় অবহেলা করা ইসলামী চেতনার পরিপন্থী।

চ. বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ, হোলি ইত্যাদি

অনেক মুসলিম সমাজে বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ (নববর্ষ) এবং হোলির মতো অনুষ্ঠানগুলো, যা মূলত হিন্দু ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোকে “সংস্কৃতি” বা “বিনোদন” হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ রঙ খেলা, বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান ও নাচসহ এই উৎসবগুলিতে অংশ নেয়। এই দিনগুলোতে কিছু মুসলিম নারী রঙিন, হালকা বা অশালীন পোশাক পরেন এবং নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা বা নাচ-গানে অংশ নেন।

ইসলামী আলেমদের মতে এই ধরনের উৎসব উদযাপনকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং অমুসলিমদের কাছে “সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ” হিসেবে দেখেন। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে কেবল দুটি ঈদ উৎসব হিসেবে নির্ধারিত, তাই অন্য ধর্মের উৎসব পালন করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বকীয়তা ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়। এই উৎসবগুলোর কিছু অনুষঙ্গ (যেমন—রঙ খেলা বা অবাধ মেলামেশা) ইসলামী শালীনতা ও নৈতিকতার নীতি লঙ্ঘন করে বলেও মনে করা হয়।

ছ. “আন্তর্জাতিক দিবস” বা “বিশ্ব দিবস” কেন্দ্রিক বিনোদন সংস্কৃতি

আধুনিক যুগে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস, যেমন— “ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ডে,” “ওয়ার্ল্ড ড্যান্স ডে,” “ফ্যাশন উইক,” বা “এন্টারটেইনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ডে” মুসলিম সমাজে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই দিবসগুলো মূলত অমুসলিম বা পশ্চিমা বিনোদন সংস্কৃতির অংশ। এই দিবসগুলো সাধারণত মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভোগবাদকে উৎসাহ দেওয়া। শরীরী সৌন্দর্য, প্রদর্শনী ও ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা তৈরি করা। ব্যক্তিগত খ্যাতি (সেলিব্রিটি কালচার) অর্জনে উৎসাহিত করা।

ইসলামী শরীয়ত মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন ও সংস্কৃতির মূল বিষয়বস্তু (যেমন—অতিরিক্ত প্রদর্শনী, খ্যাতি বা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া) ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই দিবসগুলোর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অশালীনতা ও আত্ম-প্রচারের প্রবণতা বাড়ে বলে মনে করা হয়।

জ. জন্মদিনের মোমবাতি নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে” উদযাপন:

জন্মদিনের কেক কেটে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ” গান গেয়ে উদযাপন করা। যদিও এটি আধুনিক সময়ে প্রায় বৈশ্বিক প্রথায় পরিণত হয়েছে, ইসলামী পন্ডিতদের মতে, এই প্রথাটিকে অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে দেখেন। এইসব উৎসব “বিনোদন বা আনন্দের দিন” হিসেবে পালন করা হচ্ছে। যদিও এসব উৎসবের শিকড় স্পষ্টভাবে ধর্মীয়—খ্রিস্টান, হিন্দু বা পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এই প্রথাটি মূলত অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে বিবেচিত। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে এই ধরনের কোনো উৎসব বা উদযাপন নেই, তাই এটি অমুসলিমদের বিনোদন ও আনন্দের দিনের অনুকরণ। কিছু ব্যাখ্যাকার মনে করেন, মোমবাতি নিভিয়ে উদযাপনের এই ঐতিহ্যটি প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাস থেকে এসেছে। তাই, এই ধরনের “বিনোদন বা আনন্দের দিন” পালন করাকে মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিহার করা উচিত।

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

বর্তমানে মুসলিম যুবক-যুবতীদের মধ্যে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক, ফ্যাশন শো এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওতে অমুসলিম বা প্রধানত পশ্চিমা পোশাক ও জীবনযাত্রার স্টাইল অনুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল পোশাক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনধারার প্রকাশ।

নারীদের মধ্যে ওয়েস্টার্ন পোশাকের প্রতি আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা ধাঁচের স্কিন-টাইট (শরীরের সাথে এঁটে থাকা) পোশাক পরিধান করা হচ্ছে, যা ইসলামী শালীনতার নীতির (আয়াতে বর্ণিত পর্দার মূলনীতি) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি হিজাব পরিধান করেও এমনভাবে ফ্যাশন করা হচ্ছে, যা হিজাবের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ শালীনতা রক্ষা করা, থেকে সরে এসে তা নিজেই একটি অশালীন ফ্যাশনের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে।

এই ধরনের পোশাক ও স্টাইল অনুকরণের সমালোচকরা মনে করেন, এগুলি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতীক, যা ভোগবাদ, শরীর প্রদর্শনী এবং ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশনের প্রতি আসক্তি বাড়ায়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মুসলিমদের নিজস্ব একটি স্বকীয়তা ও শালীনতার পোশাকবিধি রয়েছে, যা এ ধরনের অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীকের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়।

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে। সহিহ বুখারি : ৫৮৯২

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

মুসলিম সমাজের বিনোদন জগতে বর্তমানে পশ্চিমা ধাঁচের সংগীত ও নৃত্যের প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিনোদনের নামে নানা ধরনের আয়োজন হচ্ছে, যেমন—র‍্যাপ, পপ, এবং রক মিউজিক কনসার্ট, ডান্স পার্টি, ডিজে নাইট এবং মিউজিক্যাল রিয়্যালিটি শো।

এইসব মাধ্যম সরাসরি পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এবং মুসলিম সমাজে বিনোদনের একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন কেবল অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ইসলামী নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর।

অতএব, এই ধরনের পাশ্চাত্য-অনুপ্রাণিত সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিকে অনেকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেন না, বরং এটিকে মুসলিম সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং ধর্মীয় সীমালঙ্ঘনের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ধরনের সংস্কৃতি অনুকরণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের নিজস্ব বিনোদনমূলক ঐতিহ্যগুলো (যেমন—সাংস্কৃতিক গজল বা হামদ-নাত) ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ

আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। সুরা লোকমান : ৬

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

পাশ্চাত্য বিনোদন মাধ্যমের জনপ্রিয় ধাঁচ বা ফরম্যাট অনুকরণ করে মুসলিম দেশগুলোতেও এখন বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা, নানা ধরনের “রিয়্যালিটি শো”, “বিউটি পেজেন্ট” (সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা), এবং বিভিন্ন “টক শো”।

এই অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

নাটক, সিনেমা ও টক শোতে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা এবং হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়, যা ইসলামী সামাজিক রীতিনীতি ও শালীনতার শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলো মূলত শারীরিক সৌন্দর্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ তাব্বারুজ (অতিরিক্ত প্রদর্শন) এবং নারীদের কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপনের ধারণাকে উৎসাহিত করে।

এই অনুষ্ঠানগুলোর নির্মাণশৈলী এবং বিষয়বস্তু অমুসলিম সংস্কৃতি থেকে সরাসরি ধার করা, এবং এগুলি ইসলামী বিনোদনের মূলনীতি যেমন—শিক্ষা, নৈতিকতা ও শালীনতা—থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

খেলাধুলা যদিও সাধারণভাবে বিনোদনের একটি সুস্থ মাধ্যম, তবে এই ক্ষেত্রেও কিছু অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীক বা রীতির অনুকরণ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

কিছু মুসলিম খেলোয়াড় বা সমর্থক অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক, যেমন—ক্রস চিহ্ন বা লোগোতে অ-ইসলামী ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্রীড়া সামগ্রী বা পোশাকের নকশাও বিতর্কিত প্রতীক বহন করে।  অনেক সময় অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যেমন—ক্রিসমাস কাপ বা ভ্যালেন্টাইন ক্রিকেট ম্যাচ। এই ধরনের প্রতিযোগিতা একটি অমুসলিম উৎসবকে বিশেষ সম্মান বা গুরুত্ব দেয়, যা মুসলিমদের উৎসবের স্বকীয়তা নষ্ট করে।

এই ধরনের অনুকরণ খেলার মতো একটি সুস্থ বিনোদনকেও ইসলামী সীমার বাইরে ঠেলে দেয়। এটি মুসলিম যুবকদের মধ্যে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি স্বাভাবিকতা তৈরি করে এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা হ্রাস করে, যা চূড়ান্তভাবে তাদের “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর দিকে ধাবিত করে।

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

বর্তমানে মুসলিম সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত বেশ কিছু উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক আয়োজন ব্যাপকতা লাভ করেছে। এই আয়োজনগুলো মূলত ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা উৎসবের অনুকরণকে উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে বিশেষ সেল, হ্যালোইন মেকআপ প্রতিযোগিতা বা পার্টি, নিউ ইয়ার পার্টি এবং ক্রিসমাস উপলক্ষে সান্তা ক্লজ গিফট এক্সচেঞ্জ।

এই ধরনের প্রতিটি উৎসবই অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। যেমন—সান্তা ক্লজ খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস উৎসবের প্রতীক, হ্যালোইন ইউরোপীয় পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, এবং ভ্যালেন্টাইন ডে খ্রিস্টান ধর্মীয় কাহিনি ও পশ্চিমা প্রেমের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এই দিনগুলো উদযাপন করা ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যায় ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই উৎসবগুলোর প্রচার মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে। মুসলিম সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী নির্ধারিত ঈদ ছাড়া অন্য কোনো উৎসবকে এভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই আয়োজনগুলো মূলত তরুণ সমাজকে পশ্চিমা ভোগবাদী জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে, যা ধর্মীয় নৈতিকতার বিপরীত।

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উদযাপন, ইবাদত এবং আনন্দের জন্য দুটি পবিত্র দিন দিয়েছেন। এইগুলি হলো ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতর।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসয়ি : ১১৫৫

এটি স্পষ্ট যে নবী তাদেরকে তাদের খেলাধুলা এবং উদযাপন চালিয়ে যেতে অনুমতি দেননি কারণ এটি মদীনার পৌত্তলিক আরবদের একটি প্রথা ছিল। পরিবর্তে, তিনি তাদের বললেন: “আল্লাহ সেগুলি প্রতিস্থাপন করেছেন,” যার অর্থ হলো তোমাদেরকে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা ছেড়ে দিতে হবে এবং যা প্রতিস্থাপন করেছে তা গ্রহণ করতে হবে।

নবী তাঁর সাহাবীদের সেই দিনগুলিতে উদযাপন ও খেলাধুলা করতে অনুমতি দেননি কারণ এটি অন্য একটি ধর্মের অংশ ছিল। এই বিধানটি ধর্মীয় পটভূমিযুক্ত সমস্ত ছুটির উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার মধ্যে ক্রিসমাস, দিওয়ালি, ইস্টার এবং হ্যালোইন অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের কোনো ছুটির উদযাপনে যোগ দেওয়া অনুমোদিত নয়, এমনকি যদি এটি তার ধর্মীয় তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে থাকে। কারণ এর শিকড় শিরকের মধ্যে নিহিত, এবং মুসলিম হিসেবে আমরা শিরককে মহিমান্বিত করতে পারি না। এ সম্পর্কে পূর্ব বর্ণনা করা হয়েছে বিধান আলোচনা সমাপ্ত কররাম।

অপর পক্ষে মুশরিক বা হিন্দুদের পূজাতে অংশগ্রহণ করাও হারাম। অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিত (আলেম ও ফকীহ) এই ব্যাপারে একমত। এর কয়েকটি প্রধান কারণ হলো:

ইসলামে আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরিক করা বা অন্য কারো ইবাদত করাকে শিরক বলা হয়, যা সবচেয়ে বড় পাপ এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ (যদি তওবা না করা হয়)। পূজাতে অংশ নেওয়াকে পরোক্ষভাবে সেই শিরকের প্রতি সমর্থন জানানো বা তাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা বলে গণ্য করা হয়।

পূজার মতো বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাকে বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনের শামিল মনে করা হয়। খলিফা উমর (রা.) মুশরিকদের উৎসবের দিন তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।

ইসলাম অমুসলিমদের সাথে মানবিক সম্পর্ক, ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। তাদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে (যেমন: বিয়ে, মেজবান বা বিপদে সাহায্য) অংশগ্রহণ করা বা সাধারণ সৌজন্যমূলক ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি সেখানে কোনো হারাম কাজ বা ধর্মীয় প্রতীক বহনকারী আচার না থাকে। একজন মুসলমানের জন্য অন্য কোনো ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচারে অংশগ্রহণ করা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী জায়েয নয়।

বিনোদনে আধুনিক প্রযুক্তি

বিনোদনে আধুনিক প্রযুক্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আধুনিক যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আজকের মানুষ কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা এমনকি বিনোদনেও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন, স্মার্টওয়াচ প্রভৃতি ডিভাইস একদিকে আমাদের কাজকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করেছে; অন্যদিকে এগুলো আমাদের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত মোবাইল ও কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও গেম, গান-বাজনা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি নানা উপায়ে সময় কাটাচ্ছে। তবে এ ডিভাইসগুলোর ব্যবহার সব সময় শরীয়তসম্মত হয় না। যেমন—অশ্লীল কনটেন্ট দেখা, হারাম সম্পর্ক গড়া, সময়ের অপচয় করা বা নামাজ ও ইবাদত থেকে গাফিল হওয়া ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে এসব ডিভাইস গুনাহের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। আবার, যদি এগুলো ব্যবহৃত হয় ইসলাম প্রচার, জ্ঞান অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা পারিবারিক যোগাযোগের মতো হালাল উদ্দেশ্যে, তাহলে তা নেকীর কাজ হিসেবেও গণ্য হতে পারে।

আমি এ পর্যায় কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইসের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারন ও তাদের ব্যবহার সম্পর্কে ধারনা দিব। ইহার মাধ্যমেই আপনি বুঝে যাবেন এ সক ডিভাইজ ব্যবহার কতটা শরিয়ত সম্মত আর কতটা শরীয়ত সম্মত  নয়।  সর্বশেষে এ সকল ডিভাইসের ব্যবহার পর্যালোচনা করে ঠিক করব ডিভাইসগুলো কি শর্তে ব্যবহারে করলে শরীয়ত সম্মত হবে।

টেলিভিশন কি?

টেলিভিশন (Television) হলো একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা শব্দ এবং চলমান ছবিকে একই সাথে সম্প্রচার ও প্রদর্শন করে। এটি একটি গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করে যা ক্যাবল, স্যাটেলাইট, বা ওভার-দ্য-এয়ার সম্প্রচারের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে থাকা দর্শকদের কাছে তথ্য, শিক্ষা এবং বিনোদন পৌঁছে দেয়। আধুনিক টেলিভিশনগুলো স্মার্ট সংযোগ সমর্থন করে, যার মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কনটেন্টও দেখা যায়।

টেলিভিশনের ব্যবহার:

১. সংবাদ ও তথ্য পরিবেশন করা।

২. শিক্ষামূলক চ্যানেল, ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান এবং ভাষা শিক্ষার অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে জ্ঞান বৃদ্ধি করা।

৩. বিভিন্ন প্রকার নাটক, সিনেমা, সিরিজ, রিয়েলিটি শো এবং কমিক অনুষ্ঠান প্রচার করা।

৪. বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকনৃত্য, লোকসংগীত এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলি প্রদর্শন করা।

৫. আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সকল প্রকার খেলাধুলার সরাসরি সম্প্রচার দেখা।

৬. স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, এবং সামাজিক সমস্যা সম্পর্কিত সচেতনতামূলক প্রচার করে।

৭. পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা।

৮. রাজনৈতিক টক-শো এবং বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত প্রদান করা।

৯. ইসলামিক ওয়াজ-নসিহত, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী প্রশ্নোত্তর ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সম্প্রচার।

১০. শিশুদের জন্য কার্টুন, শিক্ষামূলক গেম শো এবং নৈতিকতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা।

১১. জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক উৎসব, সরকারি অনুষ্ঠান এবং কনসার্টের মতো সরাসরি ইভেন্টগুলি সম্প্রচার

২. ইন্টারনেট

ইন্টারনেট (Internet) হলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত কোটি কোটি কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল ব্যবস্থা। এটি “Interconnected Network” বা আন্তঃসংযুক্ত জালিকাব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত রূপ। ইন্টারনেট প্রোটোকল (IP) নামক একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ব্যবহার করে এই নেটওয়ার্কগুলো একে অপরের সাথে তথ্য বা ডেটা আদান-প্রদান করে। সহজ কথায়, এটি হলো একটি আন্তর্জাতিক তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ডিভাইসকে যুক্ত করে তথ্য, জ্ঞান ও বিনোদন বিনিময়ের সুযোগ করে দেয়। ইন্টারনেটকে প্রায়শই “বিশ্বগ্রামের মেরুদণ্ড” বা “নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক” বলা হয়।

ইন্টারনেটের ব্যবহার

ইন্টারনেট মানবজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। এর প্রধান ব্যবহারগুলো হলো:

১. যোগাযোগ

ই-মেইল, মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন ভিডিও কলিং) এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন।

২. শিক্ষা ও গবেষণা (Education & Research) :

অনলাইন কোর্স (ভার্চুয়াল ক্লাস, ই-বুক এবং বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে জ্ঞান অর্জন ও গবেষণা করা।

৩. তথ্য ও সংবাদ সংগ্রহ :

দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক সংবাদ ও তথ্য মুহূর্তের মধ্যে জানা এবং যেকোনো বিষয়ে অনুসন্ধান করা।

৪. ব্যবসা-বাণিজ্য

অনলাইন শপিং, কেনা-বেচা, এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা।

৫. ব্যাংকিং ও অর্থ লেনদেন

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ), এবং ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করা।

৬. বিনোদন

: ভিডিও স্ট্রিমিং (ইউটিউব নেটফ্লিস), মিউজিক স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং, এবং পডকাস্ট শোনার মাধ্যমে অবসর সময় কাটানো।

৭. দাওয়াহ ও ধর্ম প্রচার

: ইসলামি ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুকের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর দাওয়াত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ করা।

৮. সরকারি পরিষেবা

জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট আবেদন, ট্যাক্স পরিশোধ, পরীক্ষার ফলাফল জানা এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করা।

৯. কর্মসংস্থান ও ফ্রিল্যান্সিং:

অনলাইনে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্লায়েন্টদের জন্য দূর থেকে কাজ করা।

১০. সামাজিক নেটওয়ার্কিং:

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে নতুন বন্ধু তৈরি, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা ও মতামত প্রকাশ করা।

১১. দূরবর্তী কর্মক্ষেত্র

অফিসের কাজ বাড়ি বা অন্য যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পাদন করা।

২. স্বাস্থ্যসেবা

 ভিডিও কলের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ বা অনলাইন স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করা।

৩. স্মার্টফোন কি?

স্মার্টফোন হলো একটি অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন, যা মূলত একটি পকেট-সাইজড কম্পিউটারের মতো কাজ করে। এটি সাধারণ মোবাইল ফোনের কল করা ও বার্তা পাঠানোর ক্ষমতার পাশাপাশি আরও অনেক উন্নত সুবিধা প্রদান করে।

স্মার্টফোনের সাধারণত স্পর্শ-ভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। এতে অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএস-এর মতো অপারেটিং সিস্টেম থাকে, যা অ্যাপ্লিকেশান (অ্যাপস) চালানোর সুবিধা দেয়। ওয়াই-ফাই ও মোবাইল ডেটার মাধ্যমে দ্রুত ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করা যায়। এটি ক্যামেরা, জিপিএস, মিডিয়া প্লেয়ার, ও গেম খেলার মতো বহুবিধ কাজ করতে পারে।

স্মার্টফোন ব্যবহার

স্মার্টফোন আধুনিক জীবনে একটি উপকারী যন্ত্র হিসেবে নিম্নলিখিত কাজগুলোতে ব্যবহৃত হয়:

১. যোগাযোগ:

দ্রুত কল করা, টেক্সট মেসেজ, এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা।

২. ইন্টারনেট ব্রাউজিং:

প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা এবং বিশ্বের খবরাখবর জানা।

৩. জ্ঞানার্জন :

শিক্ষা ও গবেষণার কাজে বিভিন্ন তথ্য, আর্টিকেল এবং ই-বুক পড়া।

৪. ইসলামিক ইবাদত:

কোরআন তিলাওয়াত করা, তাফসির পড়া এবং হাদিসের গ্রন্থাবলী দেখা। * নামাযের সময় কিবলা (কিবলা ফাইন্ডার) নিশ্চিত হওয়া। * আযানের সময়সূচি এবং সালাতের সঠিক সময় জানা।

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি :

অনলাইন ব্যাংকিং, স্টক ট্রেডিং, এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করা।

৬. সামাজিক যোগাযোগ:

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা।

৭. নেভিগেশন ও দিকনির্দেশনা:

জিপিএস (GPS) ব্যবহার করে অচেনা জায়গায় রাস্তা খুঁজে বের করা।

৮. ছবি ও ভিডিও:

উচ্চ-মানের ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ড করা এবং সেগুলোর এডিটিং করা।

৯. বিনোদন:

 গান, ভিডিও, সিনেমা দেখা এবং বিভিন্ন ধরনের গেম খেলা।

১০. স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ট্র্যাকিং:

 স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য যেমন হার্ট রেট, হাঁটার সংখ্যা (স্টেপ কাউন্ট) ট্র্যাক করা।

১১. দপ্তর ও পেশাগত কাজ:

ইমেইল আদান-প্রদান, ডকুমেন্ট তৈরি, মিটিং করা, এবং ফাইল ব্যবস্থাপনার কাজ করা।

১২. সতর্কতা/রিমাউন্ডার:

অ্যালার্ম, ক্যালেন্ডার এবং রিমাইন্ডার সেট করে দৈনন্দিন কাজগুলো সময়মতো মনে রাখা।

৪. কম্পিউটার কি?

কম্পিউটার (Computer) হলো একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা ডিভাইস যা তথ্য (Data) গ্রহণ করতে, সেই তথ্যকে নির্দেশিত উপায়ে প্রক্রিয়াকরণ (Process) করতে, তথ্য সংরক্ষণ (Store) করতে এবং প্রয়োজন অনুসারে তা ফলাফল হিসেবে প্রদর্শন করতে সক্ষম। ‘Compute’ (কম্পিউট) শব্দটি থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো গণনা করা বা হিসাব করা।

আধুনিক কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী যন্ত্র বলা চলে না। এটি একটি বহুমুখী যন্ত্র, যা গাণিতিক এবং যৌক্তিক উভয় ধরনের জটিল কাজ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এটি হার্ডওয়্যার (যন্ত্রাংশ) এবং সফটওয়্যার (প্রোগ্রাম) এর সমন্বয়ে গঠিত।

কম্পিউটারের ব্যবহার

কম্পিউটার বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর প্রধান ব্যবহারগুলো নিম্নরূপ:

১. শিক্ষা ও গবেষণা:

 অনলাইন লার্নিং: ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে অংশগ্রহণ। * গবেষণা: জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক মডেলিং।

২. যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং:

ই-মেইল ও চ্যাটিং: ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান। * ভিডিও কনফারেন্সিং: দূরবর্তী স্থানে থাকা মানুষের সাথে সভা বা আলোচনা করা।

৩. ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প:

ডেটা ম্যানেজমেন্ট: হিসাবরক্ষণ, ডেটাবেস তৈরি, ইনভেন্টরি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মচারী ব্যবস্থাপনা। * ই-কমার্স: অনলাইনে পণ্য বা পরিষেবা কেনা-বেচা করা।

৪. স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা:

রোগ নির্ণয়: এক্স-রে, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই (MRI) যন্ত্রে ডেটা বিশ্লেষণ করা। * রোগীর ডেটা সংরক্ষণ: হাসপাতালের রেকর্ড এবং রোগীর ইতিহাস ব্যবস্থাপনা।

৫. প্রশাসন ও সরকার (ই-গভর্ন্যান্স):

সরকারি কাজ: বিভিন্ন সরকারি ডেটা সংরক্ষণ, ডিজিটাল পরিষেবা প্রদান (যেমন: পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন)।  জাতীয় নিরাপত্তা: প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ।

৬. বিনোদন ও মিডিয়া :

 ভিডিও উৎপাদন: চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরি করা। * গেমিং: ভিডিও গেম খেলা এবং তৈরি করা।

৭. অর্থ ও ব্যাংকিং :

স্বয়ংক্রিয় লেনদেন, এটিএম (ATM) পরিচালনা এবং অনলাইন ফান্ড ট্রান্সফার করা। * আর্থিক বিশ্লেষণ: স্টক মার্কেট পর্যবেক্ষণ ও বিনিয়োগের পূর্বাভাস দেওয়া।

৮. প্রকাশনা ও ডকুমেন্টেশন:

ডকুমেন্ট তৈরি: চিঠি, রিপোর্ট, বই, এবং প্রবন্ধ লেখা ও সম্পাদনা করা (Word Processing)। * গ্রাফিক ডিজাইন: বিজ্ঞাপন, লোগো এবং বিভিন্ন নকশা তৈরি করা।

৯. প্রকৌশল ও ডিজাইন:

 ক্যাড (CAD) সফটওয়্যার: ভবন, গাড়ি এবং যন্ত্রপাতির নকশা তৈরি ও পরীক্ষা করা। * রোবটিক্স: রোবট নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনা করা।

১০. সময় ব্যবস্থাপনা ও গৃহস্থালি কাজ:

ব্যক্তিগত সময়সূচী তৈরি করা, বিল পরিশোধ করা এবং পরিবারের বাজেট তৈরি করা।

১১. আবহাওয়া পূর্বাভাস:

জটিল গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে আবহাওয়ার ডেটা বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস প্রদান করা।

১২. শিল্প উৎপাদন (Manufacturing):

উৎপাদন প্রক্রিয়ার যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ (CNC মেশিন) এবং মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control) করা।

৫. গেমিং কনসোল

গেমিং কনসোল বা ভিডিও গেম কনসোল হলো এক ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা বিশেষায়িত কম্পিউটার যা প্রধানত ভিডিও গেম খেলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি সাধারণত একটি টেলিভিশন বা মনিটরের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং গেম খেলার জন্য বিশেষ কন্ট্রোলার বা গেমপ্যাড ব্যবহার করা হয়।

এটি কম্পিউটারের মতোই গেম চালানোর জন্য প্রসেসর (CPU), গ্রাফিক্স প্রসেসর (GPU), মেমরি এবং স্টোরেজ নিয়ে গঠিত, তবে এর হার্ডওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম বিশেষভাবে শুধু গেমিংয়ের দিকে মনোনিবেশ করে তৈরি করা হয়।

উদাহরণ: সনি প্লেস্টেশন (PlayStation), মাইক্রোসফট এক্সবক্স (Xbox), নিনটেন্ডো সুইচ (Nintendo Switch) ইত্যাদি।

গেমিং কনসোল ব্যবহার

গেমিং কনসোলের মূল কাজ গেম খেলা হলেও, আধুনিক কনসোলগুলোতে আরও অনেক বহুমুখী সুবিধা রয়েছে:

১. ভিডিও গেম খেলা (মূল ব্যবহার):

কনসোলের মূল ব্যবহার হলো উচ্চ-মানের, গ্রাফিক্স সমৃদ্ধ ভিডিও গেম খেলা। এতে বিভিন্ন ঘরানার গেম উপভোগ করা যায়।

২. বিনোদন কেন্দ্র (Media Center):

কনসোলগুলো ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও-এর মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সিনেমা, টিভি শো এবং ভিডিও দেখার সুবিধা দেয়।

৩. ব্লু-রে এবং ডিভিডি প্লেয়ার:

আধুনিক কনসোলগুলোতে ব্লু-রে ডিস্ক এবং ডিভিডি প্লেয়ারের সুবিধা থাকে, যার মাধ্যমে উচ্চ রেজোলিউশনের সিনেমা দেখা যায়।

৪. অনলাইন যোগাযোগ ও সামাজিকতা:

কনসোলের মাধ্যমে অন্য খেলোয়াড়দের সাথে অনলাইন গেমিং-এ যুক্ত হওয়া, ভয়েস চ্যাটিং করা এবং গেমিং কমিউনিটিতে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।

৫. অন্যান্য অ্যাপস ব্যবহার:

কিছু কনসোলে বিশেষায়িত অ্যাপস ব্যবহার করে সঙ্গীত শোনা বা ব্রাউজিং করাও সম্ভব।

৭. ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরা

ডিজিটাল ক্যামেরা: এটি এমন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা ফিল্মের পরিবর্তে একটি ইলেকট্রনিক ইমেজ সেন্সর (যেমন: CCD বা CMOS) ব্যবহার করে ছবি তোলে। এটি তোলা ছবিগুলোকে ডিজিটাল ডেটা হিসেবে মেমরি কার্ডে সংরক্ষণ করে, যা দ্রুত কম্পিউটারে দেখা, সম্পাদনা বা প্রিন্ট করা যায়। ডিজিটাল ক্যামেরা স্থির ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে তৈরি হলেও বেশিরভাগ আধুনিক ক্যামেরায় ভিডিও ধারণের ক্ষমতা থাকে।

ভিডিও ক্যামেরা (বা ক্যামকর্ডার): এটি একটি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা মূলতঃ চলমান ছবি বা ভিডিও সিকোয়েন্স রেকর্ড করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ডিজিটাল ক্যামেরার মতো এটিও ডিজিটাল ডেটা হিসেবে ভিডিও সংরক্ষণ করে এবং সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য এতে ভালো স্ট্যাবিলাইজেশন এবং জুম সুবিধা থাকে।

ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরার ব্যবহার

ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে, যার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো:

১. স্মৃতি সংরক্ষণ ও ব্যক্তিগত ব্যবহার: * ফটোগ্রাফি: পারিবারিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণ বা দৈনন্দিন জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো স্থির ছবি হিসেবে ধরে রাখা। * ভিডিও রেকর্ডিং: ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ইভেন্টগুলোর ভিডিও ডকুমেন্টেশন তৈরি করা।

২. পেশাগত মিডিয়া ও সাংবাদিকতা: * সংবাদ কভারেজ: সংবাদ সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচারের জন্য ভিডিও ধারণ করা। *লচ্চিত্র ও টিভি প্রোডাকশন: চলচ্চিত্র, সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি এবং বিজ্ঞাপন তৈরি করা।

৩. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: টিউটোরিয়াল তৈরি: অনলাইন শিক্ষামূলক ভিডিও, লেকচার বা ব্যবহারিক কাজের পদ্ধতি ভিডিও করে শেখানো। * প্রশিক্ষণ সামগ্রী: কর্পোরেট বা পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য ভিজ্যুয়াল সামগ্রী প্রস্তুত করা।

৪. নিরাপত্তা ও নজরদারি: সিসিটিভি ও নজরদারি: নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ রেকর্ড করতে ব্যবহার করা। * ট্র্যাফিক মনিটরিং: রাস্তায় ট্র্যাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা।

৫. ব্যবসা ও ই-কমার্স: পণ্য প্রদর্শন: ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য পণ্যের উচ্চ-মানের ছবি এবং ভিডিও তৈরি করা। * ভার্চুয়াল ট্যুর: রিয়েল এস্টেট ব্যবসার জন্য সম্পত্তি বা স্থানের ভিডিও ট্যুর তৈরি করা।

৬. বিজ্ঞান ও গবেষণা: মাইক্রোস্কোপিক ফটোগ্রাফি: অণুজীব বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সূক্ষ্ম ছবি ও ভিডিও ধারণ করা। দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ: বন্যপ্রাণী, মহাকাশ বা দূরবর্তী স্থানে পর্যবেক্ষণ করা।

৭. সোশ্যাল মিডিয়া ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন: ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামের জন্য ব্লগ, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য সৃজনশীল কন্টেন্ট তৈরি করা।

স্মার্ট ওয়াচ

স্মার্ট ওয়াচ হলো একটি ডিজিটাল কব্জিঘড়ি, যা প্রথাগত ঘড়ির সময় দেখানোর পাশাপাশি একটি কম্পিউটারের এবং স্মার্টফোনের অনেক ফাংশন সম্পাদন করতে পারে। এটি সাধারণত একটি টাচস্ক্রিন ইন্টারফেস, বিভিন্ন সেন্সর এবং ওয়্যারলেস কানেক্টিভিটি (যেমন ব্লুটুথ ও Wi-Fi) দিয়ে সজ্জিত থাকে। এটি একটি স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করে এবং স্বাস্থ্য ট্র্যাকিং, নোটিফিকেশন প্রদর্শন এবং অ্যাপস চালানোর মতো কাজগুলো করে থাকে।

স্মার্ট ওয়াচের ব্যবহার

স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ট্র্যাকিং:

এটি ব্যবহারকারীর হৃদস্পন্দন (Heart Rate), রক্তের অক্সিজেন স্তর (SpO2), ঘুমের মান (Sleep Quality) এবং দৈনিক হাঁটা বা দৌড়ানোর পরিমাণ ট্র্যাক করে।

নোটিফিকেশন ও যোগাযোগ:

ফোন পকেট থেকে না বের করেই কল, টেক্সট মেসেজ, ইমেইল এবং সোশ্যাল মিডিয়া নোটিফিকেশন সরাসরি কব্জিতে দেখা যায়।

সময় ব্যবস্থাপনা ও অ্যালার্ম:

এটি অ্যালার্ম, টাইমার এবং রিমাইন্ডার সেট করার মাধ্যমে দৈনিক কাজগুলো সংগঠিত রাখতে সাহায্য করে।

নেভিগেশন ও অবস্থান (GPS):

জিপিএস সুবিধার মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেখা যায় এবং ভ্রমণ বা দৌড়ানোর সময় দূরত্ব ও গতি ট্র্যাক করা যায়।

পেমেন্ট ও ওয়্যারলেস লেনদেন:

কিছু স্মার্ট ওয়াচ NFC (Near Field Communication) ব্যবহার করে কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট (যেমন Google Pay বা Apple Pay) করতে দেয়।

মিউজিক কন্ট্রোল: এটি ফোন থেকে মিউজিক প্লে করা, পজ করা বা ভলিউম বাড়ানো-কমানোর জন্য রিমোট কন্ট্রোল হিসেবে কাজ করে।

ই-বুক রিডার কি?

ই-বুক রিডার (E-Book Reader) হলো একটি বহনযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা বিশেষভাবে ডিজিটাল বই বা ই-বুক (E-Book) পড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের চেয়ে আলাদা কারণ এটি সাধারণত ই-ইঙ্ক (E-Ink) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ই-ইঙ্ক ডিসপ্লে দেখতে অনেকটা সাধারণ কাগজের মতো এবং সরাসরি সূর্যের আলোতে পড়লেও চোখের ওপর চাপ ফেলে না। এটি কম শক্তি খরচ করে এবং ব্যাটারি দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

উদাহরণ: অ্যামাজন কিন্ডল (Amazon Kindle), কোবো (Kobo), নুুক (Nook) ইত্যাদি।

ই-বুক রিডারের ব্যবহার

সহজে বই পড়া ও বহন:

এটিতে হাজার হাজার বই একসাথে সংরক্ষণ করা যায় এবং খুব সহজে বহন করা যায়।

চোখের আরাম:

ই-ইঙ্ক প্রযুক্তির কারণে এটি থেকে কোনো ব্লু লাইট নির্গত হয় না, ফলে দীর্ঘ সময় পড়লেও চোখে কম চাপ পড়ে।

পঠনযোগ্যতা :

এটি ব্যবহারকারীকে ফন্টের আকার, ফন্ট স্টাইল এবং লাইনের ব্যবধান কাস্টমাইজ করার সুবিধা দেয়, যা বয়স্ক বা দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা রয়েছে এমন পাঠকের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

ডিকশনারি ও নোট নেওয়া:

এতে বিল্ট-ইন ডিকশনারি থাকে, যা কোনো শব্দের ওপর ট্যাপ করলেই তার অর্থ দেখিয়ে দেয়। এছাড়া সরাসরি বইয়ের পাতায় নোট নেওয়ার বা অংশবিশেষ হাইলাইট করার সুবিধা থাকে।

দ্রুত অ্যাক্সেস:

ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে যেকোনো নতুন বই ডাউনলোড বা কেনা যায়।

কম আলোতে পড়া: বেশিরভাগ আধুনিক ই-বুক রিডারে সামঞ্জস্যযোগ্য ফ্রন্ট লাইট থাকে, যা রাতের অন্ধকারেও আরামদায়কভাবে পড়ার সুযোগ দেয়।

স্মার্ট স্পিকার কি?

স্মার্ট স্পিকার হলো একটি ওয়্যারলেস (তারবিহীন) হাই-টেক স্পিকার, যাতে একটি ভার্চুয়াল সহকারী যেমন অ্যামাজন অ্যালেক্সা, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অ্যাপল সিরি ইনবিল্ট থাকে। এটি ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কাজ করে এবং ব্যবহারকারীর ভয়েস কমান্ড অনুসরণ করে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করতে পারে। এটি কেবল গান বাজানো নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের একটি “স্মার্ট হোম হাব” বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

স্মার্ট স্পিকারের ব্যবহার

ভয়েস কমান্ডে তথ্য ও উত্তর প্রদান: আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ট্র্যাফিকের খবর, সাধারণ প্রশ্ন বা গণনার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে দেওয়া।

স্মার্ট হোম নিয়ন্ত্রণ: ভয়েসের মাধ্যমে ঘরের অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস (যেমন: লাইট, ফ্যান, এসি, থার্মোস্ট্যাট) চালু বা বন্ধ করা।

মিউজিক ও অডিও কন্টেন্ট প্লেব্যাক: ইন্টারনেট বা স্ট্রিমিং সার্ভিস থেকে গান, পডকাস্ট, কুরআন তিলাওয়াত, বা রেডিও চালানো এবং নিয়ন্ত্রণ করা।

সময় ব্যবস্থাপনা ও রিমাইন্ডার: অ্যালার্ম সেট করা, টাইমার দেওয়া, এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রিমাইন্ডার সেট করা।

যোগাযোগ: কিছু স্পিকারের মাধ্যমে ভয়েস কল করা বা মেসেজ পাঠানো যায়।

সংবাদ ও আপডেট: সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম বা খেলার স্কোর ভয়েস নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শোনা।

ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষতিসমূহ

উপরে যে সকল ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার করার সময় ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সামনে অনেক খারাপ দিন উম্মচিত হবে। টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা, গেমিং কনসোল, স্মার্টওয়াচ, ই-বুক, স্মার্ট স্পিকার ইত্যাদি ডিভাইসগুলোর ব্যবহার গবেষনা করে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক খারাপ দিক উম্মচিত হয়েছে। নিচে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এ সব ডিভাইস খারাপ দিনগুলো তুল ধার হলো।

১. সময়ের অপচয়

সোশ্যাল মিডিয়া, গেম, ভিডিও, চ্যাট ইত্যাদিতে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করে ইবাদত, শিক্ষা ও দুনিয়াবী দায়িত্ব অবহেলা করা।

২. চোখের গুনাহ

অশ্লীল ছবি, ভিডিও, বা গায়রে মাহরামদের দেখা— যা নবী ﷺ চোখের যিনা বলেছেন।

৩. অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়:

ইন্টারনেট ও ভিডিওর মাধ্যমে হারাম, নগ্ন বা অশোভন বিষয়বস্তু প্রচার করা।

৪. ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট:

নোটিফিকেশন, কল, বা মিউজিকের কারণে নামায ও কুরআন তিলাওয়াতের খুশু-খুযু নষ্ট হওয়া।

৫. মিথ্যা ও গুজব ছড়ানো:

যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা সৃষ্টি করা।

৬. অর্থের অপচয় (إسراف):

বিলাসী ডিভাইস, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপস ও সাবস্ক্রিপশনে সম্পদ নষ্ট করা।

৭. গোপনীয়তার লঙ্ঘন (انتهاك الخصوصية):

ছবি, ভিডিও বা রেকর্ডের মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ বা অপব্যবহার করা।

৮. অহংকার ও প্রদর্শনবাদিতা (الرياء):

ছবি-ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে নিজের ইবাদত, সম্পদ বা সৌন্দর্য প্রদর্শন করা।

৯. সহিংসতা ও মানসিক বিকৃতি:

গেম বা ভিডিওর মাধ্যমে সহিংসতা, হত্যা ও নিষ্ঠুরতা শেখা, যা ইসলামের শান্তি-নীতির বিপরীত।

১০. জুয়া ও বাজির প্রবণতা (القمار):

কিছু অনলাইন গেম বা প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা, যা স্পষ্ট হারাম।

১১. পবিত্র বিষয়াবলীর অবমাননা:

কুরআন তিলাওয়াত বা আযানকে রিংটোন বানিয়ে অপবিত্র স্থানে বাজানো।

১২. পর্দা ও লজ্জাশীলতার লঙ্ঘন (الحياء):

নারীদের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করা বা গায়রে মাহরামদের দেখা, যা পর্দাহীনতার কারণ হয়।

১৩. শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি:

ডিভাইস আসক্তির ফলে ঘুমের অভাব, চোখের ক্ষতি ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া।

১৪. অন্যের হক নষ্ট করা:

কপিরাইট ভাঙা, অনুমতি ছাড়া কনটেন্ট ব্যবহার করা, বা মানুষকে কষ্ট দেওয়া।

১৫. ইখলাস ও তাকওয়ার অবক্ষয়:

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা মানুষকে দুনিয়ামুখী ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে ফেলে।

উপসংহার : প্রযুক্তি স্বয়ং হারাম নয়; বরং এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে তা হালাল না হারাম হবে। একজন মু’মিনের কর্তব্য হলো—ডিভাইসগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে কেবল কল্যাণকর, শরীয়তসম্মত ও ইখলাসপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা। অন্যথায়, এই আধুনিক উপকরণগুলো নেকীর পরিবর্তে গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার জায়েয হওয়ার শর্ত

উপরে যে সকল ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার উল্লেখ করেছি। উহার খারাপ দিনগুলো তুল ধার হয়ে। কাজের এ সব ডিভাইস (টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা, গেমিং কনসোল, স্মার্টওয়াচ, ই-বুক, স্মার্ট স্পিকার ইত্যাদি) ব্যবহার করা জায়েয নয়। তবে ইসলামি কিছু নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে জায়েয করা যেতে পারে। নিচে এ সম্পর্কিত নীতিমালা তুলে ধরা হলো :

১. নিয়ত (উদ্দেশ্য) সত্য ও কল্যাণকর হতে হবে :

ডিভাইসটি দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, হালাল জীবিকার কাজ, পরিবারের কল্যাণ বা জরুরি যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হলে তা জায়েয।

২. হারাম কনটেন্ট থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা :

অশ্লীলতা, নগ্নতা, শিরকপ্রবণতা, জুয়া-প্রচেষ্টা, নাস্তিকতা ইত্যাদি দেখা/শেয়ার/প্রচার করা যাবে না।

৩. ইবাদত ও ফরজ কর্তব্যে বিঘ্ন না ঘটানো :

নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতের সময় ডিভাইস বন্ধ/সাইলেন্ট রাখা বা DND মোড ব্যবহার করতে হবে।

৪. সময় নিয়ন্ত্রণ ও অপচয় রোধ :

অনাবশ্যক সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং বা বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে; সময়পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

৫. গোপনীয়তা এবং কারো হক রক্ষা :

অন্যের অনুমতি ছাড়া ছবি/ভিডিও তোলা বা প্রকাশ করা, ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড বা ছড়ানো বাদ দিতে হবে।

৬. মিথ্যা, গীবত ও ফিতনা-প্রচারণা করা যাবে না :

যাচাই না করে সংবাদ, বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট বা অপবাদ ছড়ানো নিষেধ।

৭. পবিত্র শব্দাবলীর মর্যাদা বজায় রাখা — কোরআন, আজান বা জিকিরকে রিংটোন/বেকগ্রাউন্ড হিসেবে অপমানজনক জায়গায় ব্যবহার করলে বারণ; সম্মানজনক ব্যবহারের শর্তে অনুমোদন।

৮. পর্দা, লজ্জাশীলতা ও শিষ্টাচার রক্ষা :

অপরিপক্ব/বিরুদ্ধ লিঙ্গের প্রতি উন্মুক্ত দৃষ্টি, অশোভন পোশাক বা বিরূপ আচরণ উৎসাহিত করা যাবে না।

৯. অর্থিক অপচয় পরিহার করা :

অপ্রয়োজনীয় বিলাসী ডিভাইস বা অবৈধ সাবস্ক্রিপশনে অর্থ অপচয় করা শামিল হতে পারে; প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার জরুরি।

১০. কপিরাইট ও অন্যের শ্রমের সম্মান :

অননুমোদিত কপিরাইট লঙ্ঘন (চোরাই কন্টেন্ট ডাউনলোড/শেয়ার) করা যাবে না।

১১. হারাম সেবাসমূহ (জুয়া, বাজি ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকা :

 অনলাইন গেম বা প্ল্যাটফর্মে জুয়ারূপী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ হারাম।

১২. ডিভাইসের সেটিংসে সুরক্ষা ও নৈতিক ফিল্টার ব্যবহার :

কনটেন্ট ফিল্টার, প্রাইভেসি সেটিংস, প্যারেন্টাল কনট্রোল ইত্যাদি চালু রাখার মাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রতিহত করা।

১৩. স্বাস্থ্য ও শারীরিক ক্ষতি এড়ানো :

দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা, ঘুমের বিঘ্ন বা অতিরিক্ত রেডিয়েশনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করা।

১৪. ইখলাস ও তাকওয়া রক্ষা :

ব্যবহার যেন রিয়া (দেখানোর জন্য ইবাদত) বা দুনিয়ামুখিতা না বাড়ায়; সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য থাকা উচিত।

১৫. পরিবার ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা :

ডিভাইস ব্যবহার পরিবারের সম্পর্ক ও সামাজিক দায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করবো না; পরিবারকে সময় দেওয়া ও সম্মিলিত, নির্মল বিনোদনের বিকল্প রাখা।

উপসংহার: উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে চললে যে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হিসেবে গণ্য হবে — কারণ মূল বিচার হচ্ছে নিয়ত, বিষয়বস্তু, সময় ও প্রভাব। চাইলে আমি এই ১৫টি শর্ত থেকে প্রতিটির জন্য আলাদা-বিশেষ প্রয়োজনীয় নিয়ম বা উদাহরণ (টিভি, মোবাইল, গেমিং কনসোল ইত্যাদির জন্য) সংক্ষেপে লিখে দিতে পারি। তুমি কোনটি আগে চাও — টিভি নাকি স্মার্টফোন?

হজ্জ ও উমরার বিধান

 হজ্জ ও উমরার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উম্মতে মুহাম্মাদির প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন ও সাবালক নর-নারী যাদের পথ খরচের পরিমান অর্থ আছে তাদের উপর হজ্জ ফরজ। নবম হিজরিতে হজ্জ ফরজ করা হয়। হজ্জ সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

১. মহান আল্লহ কুরআনে হজ্জের বিধান বর্ণনা করে বলেন,

وَأَتِمُّواْ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থঃ আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজ্জলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজ্জলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন। [ সুরা বাকারা ২:১৯৬ ]

২. মহান আরও আল্লাহ বলেন,

فِيهِ آيَاتٌ بَيِّـنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

অর্থঃ এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য। যে লোকের সামর্থ? রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না। ( সুরা ইমরান ৩:৯৭)

৩. মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ

অর্থঃ এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৭)

৪. মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

(٤)ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَٰتٌۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِى ٱلْحَجِّۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ ٱللَّهُۗ وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقْوَىٰۚ وَٱتَّقُونِ يَٰٓأُولِى ٱلْأَلْبَٰبِ .

অর্থঃ  হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তো জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানগন! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই। (সূরা বাকার ২:১৯৭)

মন্তব্যঃ এই সকল আয়াতে মহান আল্লাহ তার উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন করার নির্দেশ দেয়। হজ্জের করার কিছু নিয়ম নীতি বর্ণন করেছেন। কুরআনে এই সকল নির্দশ প্রমান করে হজ্জ মহান আল্লাহ তরফ থেকে রাজিকৃত ফরজ ইবাদাত। আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উমরা ও হজ্জ আদায় করেছেন, সাহাবীদেরও আদায় করার নির্দেশ প্রদান করছেন। উমরা ও হজ্জ আদায়  করার বিস্তারিত বিবরন প্রদান করেছেন। এই পর্যায় হজ্জ ফরজ সম্পর্কি কিছু হাদিস উল্লেখ করছি।

হাদিসঃ

১. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার লোকদের সামনে খুৎবা দিলেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের ওপর হজ্জ ফরয করেছেন, তখন এক ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তা কি প্রতি বছরের জন্য? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তর দেওয়া থেকে চুপ রইলেন। লোকটি তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করলো। পরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি আমি বলতাম, হ্যাঁ, তা হলে অবশ্যই তা প্রতি বছরের জন্য ফরয হয়ে যেত। আর যদি ফরয হয়েই যেত, তাহলে তোমরা তা আদায় করতে পারতে না। আমি যা বলি তা বলতে দাও, প্রশ্ন করে সহজ্জ কাজকে জটিল করো না। কেননা তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তারা সঠিক প্রশ্ন করা এবং তাদের নবীদের সাথে মতবিরোধোর কারণে ধ্বংস হয়েছে। আমি যখন তোমাদেরতে কোন কাজের নির্দেশ দেই তখন তা তোমরা সাধ্যানুযায়ী পালন করো।আর যখন কোন কাজ করতে নিষেধ করি, তখন তা পরিত্যাগ করো। (সুনানে নাসাঈ ২৬২১ ইফাঃ)

২. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহ তা’আলা তােমাদের ওপর হজ্জ ফরয করেছেন। তখন আকরা ইবন হাবিস তামীমী (রাঃ) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তা কি প্রতি বছরের জন্য? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ রইলেন। তারপর বললেন আমি যদি বলতাম, হ্যাঁ, তবে তা ফরয হয়ে যেত। তখন তোমরা তা শুনতেও না এবং মানতেও না। কিন্তু তোমরা জেনে রাখ, হজ্জ একবারই ফরয। (সুনানে নাসাঈ ২৬২২ ইফাঃ)

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর রাখা হয়েছে, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা। জাকাত প্রদান করা। রমজানের রোজা রাখা। এবং যে তার সামর্থ রাখে তার জন্য বাইতুল্লাহর হজ্জ করা।  (হাদিসের মান সহিহঃ বুখারি – ৮; মুসলিম – ১৬)।

৪. ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেন, প্রত্যেকের জন্য হাজ্জ ও ‘উমরাহ অবশ্য পালনীয়। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, কুরআনুল কারীমে হাজ্জের সাথেই ‘উমরাহ’র উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী, ‘‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ ও ‘উমরাহ পূর্ণভাবে আদায় কর’’। (আল-বাকারাঃ ১৯৬)। (সহিহ বুখারি হজ্জ অধ্যায়)

হজ্জ কাদের উপর ফরজঃ

সকল মুসলমান এ বিষয়ে একমত যে, বায়তুল্লাহ পর্যান্ত পৌছার সামর্থবান প্রত্যেক মুসলিম নারী পুরুষের  উপর হজ্জ ফরজ। যে অস্বীকার করবে সে কাফের ও মুরতাদ বলে গণ্য হবে। তাকে তাওবা করতে বলা হবে। মহান আল্লাহ তার বান্দার উপর কখনও অন্যায় আদেশ চাপিয়ে দেন না। তিনি তার বান্দার সামর্থের বাইরে কোন আদেশ দেন না। তিনি এরশাদ করেন,

*لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ *

অর্থঃ আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। ( সুরা বাকারা ২:২৮৬) ]

কাজেনই হজ্জ তিনি ফরজ করার সাথে সাথে বলে দিয়েছেন কার উপর হজ্জ ফরজ। তিনি সামর্থবান যাদের পাথেয় খরচ ও শারীরিকভাবে শুস্থ তাদের উপর হজ্জ ফরজ করেছেন। যারা অসুস্থ তাদের জন্য হজ্জের বিধান সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে, অসুস্থ থেকে সুস্থ হলে আদায় করে নিতে হবে। এই জন্য বলা হয় মহান আল্লাহই উত্তম ফয়সালাকারী। তিনি তার বান্দার প্রতি সবচেয়ে বেশী দয়াশীল। তাই তো তিনি নিজেই এরশাদ করেন,

*أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ*

অর্থঃ তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে? ( সুরা মায়েদা ৫:৫০)

তার ফয়সালা হলো যাদের পাথেয় নাই তাদের উপর হজ্জ ফরজ নয়। যখন তিনি সমর্থবান হবেন তখনই তাহার উপর হজ্জ ফরজ হবে। মহান আল্লাহ আরও বলেন,

فِيهِ آيَاتٌ بَيِّـنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

অর্থঃ এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য, যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না। ( সুরা ইমরান ৩:৯৭)

কাদের উপর হজ্জ ফরজঃ

সালাত সবার উপর সমানভাবে ফরজ হলে, হজ্জ জাকাতের মত আর্থিক সংগতির উপর নির্ভর করে। হজ্জ ফরজ হওয়া জন্য বিশেষ কয়েকটি শর্ত আছে। এই সকল শর্ত পূর্ণ করা সাপেক্ষে হজ্জ ফরজ হয়ে থাকে। শর্তসমূহ হলোঃ

১। মুসলিম হতে হবে (অমুসলিম, কাফির, মুশরিক উপর হজ্জ ফরজ নয়)

২। বিবেক সম্পন্ন হতে হবে (পাগলের উপর হজ্জ ফরজ নয়)

৩। সফরের খরচ থাকতে হবে (আর্থিক সংগতি নাই এমন লোকের উপর হজ্জ ফরজ নয়)

৪। প্রাপ্ত বয়স্ক লোক হতে হবে

৫। সফর করার মত শক্তি সামর্থ থাকতে হবে

৬। স্বাধীন হতে হবে

৭। মহিলাদের সঙ্গে মাহরাম থাকতে হবে।

৮। বার্ধক্যে উপনিত ব্যক্তি যার ভাল মন্দের জ্ঞান নেই।

৯। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা যা হতে ভালো হওয়ার আশা করা যায় না

মুসলিম হতে হবেঃ

কোন অমুসলিম বা কাফির যারা এখনও ইসলামের মধ্য প্রবেশ করে নাই তাদের উপর ইসলামের কোন হুকুম আহকাম পালন করা ফরজ নয়। তাছাড়া কাফির ব্যক্তির কোন আমল মহান আল্লাহ দরবারে কবুল হবেনা। মহান আল্লাহ কাফির মুসরীকদের সকল আমল ধ্বংশ করে দিবেন। তাদের আমলের কোন লাভ ক্ষতি নেই। তাদের আমল করা আর না করা সমান কথা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

* وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ * 

অর্থঃ ‘‘আপনার ও আপনার  পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শিরক করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন বলে গণ্য হবেন। (সুরা যুমার ৩৯৬৫)

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:

ذَٲلِكَ هُدَى ٱللَّهِ يَہۡدِى بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ‌ۚ وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (٨٨)

অর্থঃ এটি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত, নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে তিনি যাকে চান তাকে এর সাহায্যে হেদায়াত দান করেন৷ কিন্তু যদি তারা কোন শির্ক করে থাকতো তাহলে তাদের সমস্ত কৃতকর্ম ধ্বংস হয়ে যেতো৷ (আনআম:৮৮)

কাফিদের সমস্ত কৃতকর্ম ধূলোর মতো উড়িয়ে যাবেঃ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا (٢٣)

অর্থঃ এবং তাদের সমস্ত কৃতকর্ম নিয়ে আমি ধূলোর মতো উড়িয়ে দেবো৷ (ফুরকান : ২৩)

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলে, শরীকদের মধ্যে অংশীদারির অংশ (শির্ক) থেকে আমিই অধিক অমুখাপেক্ষী, যে কেউ এমন আমল করল যাতে আমার সাথে অপরকে শরিক করেছে, আমি তাকে ও তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি”।(মুসলিম)।

কাফির ব্যক্তির নিকট হজ্জ আদায় করা আর না করা সমান কথা। যদি কোন সমর্থবান কাফির ব্যক্তি ইসলাম কবুল করে মুসলিম হয়, তবে সমর্থ থাকা সাপেক্ষে তার উপর হজ্জ ফরজ হবে।  

যারা কাফির তাদের দান সদগা ও কবুল করা হয় না। একথার দলিল হল আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ

قُلۡ أَنفِقُواْ طَوۡعًا أَوۡ كَرۡهً۬ا لَّن يُتَقَبَّلَ مِنكُمۡ‌ۖ إِنَّكُمۡ ڪُنتُمۡ قَوۡمً۬ا فَـٰسِقِينَ (٥٣) وَمَا مَنَعَهُمۡ أَن تُقۡبَلَ مِنۡہُمۡ نَفَقَـٰتُهُمۡ إِلَّآ أَنَّهُمۡ ڪَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَبِرَسُولِهِۦ وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ ڪُسَالَىٰ وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمۡ كَـٰرِهُونَ (٥٤) 

অর্থঃ তাদের বলে দাও, “তোমরা নিজেদের ধন-সম্পদ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ব্যয় কর অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যয় কর, তা গৃহীত হবে না৷ কারণ তোমরা ফাসেক গোষ্ঠী”৷তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত না হবার এ ছাড়া আর কোন কারন নেই যে, তারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে, নামাযের জন্য যখন আসে আড়মোড় ভাংতে ভাংতে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলে তা করে অনিচ্ছাকৃতভাবে। (সুরা তাওবা ৯:৫৩-৫৪)।

যদি কুফরির কারনে তাদের দান-সাদকাহ কবুল হয় না, তাহলে বিশেষ ‘ইবাদাতসমূহ (যেমনঃ সালাত, সিয়াম, হজ্জ যার উপকার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ) সেগুলো আরও বেশি কবুল না হওয়ার যোগ্য। যদি কাফির ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে তাকে সমস্ত ফরজ বা ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করার জন্যও শাস্তি পেতে হবে। এমন কি তাকে সিয়াম পালন না করাও শান্তি পেতে হবে। কারণ, আল্লাহর প্রতি অনুগত শারীয়াতের বিধান পালনকারী, একজন মুসলিম যদি শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, তবে একজন অহংকারী (কাফির) শাস্তি পাওয়ার আরও বেশি যোগ্য। একজন মুসলিক কে যদি আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ যেমন-খাবার, পানীয় ও পোশাক ইত্যাদি উপভোগ করার জন্য হিসাব দিতে হয় তবে একজন কাফিরকে কেন হারাম কাজ করা ও ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করার জন্য শাস্তি পেতে হবে না? বরং সে শান্তি পাওয়ার আরও বেশি উপযুক্ত। একথার দলিল হল, মহান আল্লাহ তা‘আলা সুরা মুদাস্সিরে ডানপাশে অবস্থানকারীদের সম্পর্কে বলেছেন যে তারা অপরাধীদেরকে (কাফিরদের) বলবেনঃ

مَا سَلَكَكُمۡ فِي سَقَرَ ٤٢ قَالُواْ لَمۡ نَكُ مِنَ ٱلۡمُصَلِّينَ ٤٣ وَلَمۡ نَكُ نُطۡعِمُ ٱلۡمِسۡكِينَ ٤٤ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ ٱلۡخَآئِضِينَ ٤٥ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوۡمِ ٱلدِّينِ ٤٦ 

অর্থঃ কিসে তোমাদেরকে সাক্বারে (একটি জাহান্নামের নাম) প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারী ছিলাম না, আর আমরা মিসকীনদের খাবার খাওয়াতাম না, আর আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম, আর আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম।”  (সুরা মাদাস্সির ৭৪:৪২- ৪৬)।

সুতরাং সালাম, যাকাত, সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করা এবং প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করার কারনে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হবে। ইহাই মহান আল্লাহ ঘোষনা।

অপর পক্ষে যদি কোন কাফির ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। তার  ব্যক্তিগত আমল (সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত) পালন করা আর না করা সমান ছিল। ইসলাম গ্রহনের সাথে সাথে সব ক্ষমা হয়ে যাবে। এ কথার দলিল হল মহান আল্লাহর বানী। তিনি এরশাদ করেন,

 قُل لِّلَّذِينَ ڪَفَرُوٓاْ إِن يَنتَهُواْ يُغۡفَرۡ لَهُم مَّا قَدۡ سَلَفَ وَإِن يَعُودُواْ فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ ٱلۡأَوَّلِينَ (٣٨) 

অর্থঃ তুমি বলে দাও, কাফেরদেরকে যে, তারা যদি বিরত হয়ে যায়, তবে যা কিছু ঘটে গেছে ক্ষমা হবে যাবে। পক্ষান্তরে আবারও যদি তাই করে, তবে পুর্ববর্তীদের পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে। (আল-আনফাল ৮:৩৮)।

মুলকথা হল, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। রাসূল থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি তাকে ছুটে যাওয়া ওয়াজিবসমূহের কাযা করতে আদেশ করতেন না। কাজেই কোন কাফিরের উপর হজ্জ ফরজ নয়।

২। বিবেগ সম্পন্ন হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়তের আর একটি নীতিমালা হল, পাগল ব্যক্তির উপর ইসলামের কোন ফরজ হুকম কার্যকর হবে না। ইবাদত বাস্তবায়ন করা যদি তার মধ্যে সে যোগ্যতা ও ক্ষমতা থাকে তবে মহান আল্লাহ্‌ তা‘আলা মানুষের উপর তা ফরজ করেন না। যদি কেই বিবেক সম্পন্ন না হয় বা সবকিছু বুঝতে না পারে তার উপর ইসলামি শরীয়ত কোন ইবাদাত চাপিয়ে দেন নাই। মহান আল্লাহ বলেন,

*فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ *

অর্থঃ তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করে চলো। (তাগাবুন ৬৪:১৬)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

*لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ    *

অর্থঃ সাধ্যের বাইরে কোনকিছু আল্লাহ কারোর উপর চাপিয়ে দেন না। (বাকারাহ ২:২৮৬)

হাদিসের আলোকেও দেখতে পাওয়া যায় পাগলের উপর ইমলামের কোন বীধিবিধাণ প্রযোয্য হয় না। যেমনঃ একটি সহিহ হাদিসে এসেছেঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা যেনার অপরাধে জনৈকা উম্মাদিনীকে ধরে এনে উমার (রাঃ)-এর নিকট হাযির করা হয়। তিনি এ ব্যাপারে লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ সময় আলী (রাঃ) তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন এর কি হয়েছে? উপস্থিত লোকেরা বললো, সে অমুক গোত্রের উম্মাদিনী (পাগল মহিলা), সে যেনা করেছে। উমার (রাঃ) তাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে ফিরে যাও। অতঃপর তিনি উমারের নিকট এসে বললে, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কি জানেন না, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়, (২) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং (৩) নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না বালেগ হবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আলী (রাঃ) বলেন, তাহলে তাকে পাথর মারা হবে কেন? তিনি বলেন, কোনো কারণ নেই। আলী (রাঃ) বলেন, তবে তাকে ছেড়ে দিন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন এবং ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। (হাদিসের মান সহীহসুনান আবূ দাউদ ৪৩৯৯ (তাহকিককৃত) আরও দেখুন, ইবনু হিববান, ইবনু খুযাইমাহ, হাকিম, দারাকুতনী)।

হাদিসে ষ্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে পগলের উপর থেকে মহান আল্লাহ কলম উঠিয়ে নিয়েছন। আর্থাৎ তার কর্মের কোন হিসাব দিতে হবে না। কাজেই আমরা বলতে পারি পাগলের উপর ফরজ সিয়াম আদায়ের হুকুর জারি হবে না।

৩। সফরের খরচ থাকতে হবেঃ

হজ্জ ফরজ হওয়ার প্রধান ও প্রথম শর্থ হলো, হজ্জের দীর্ঘ সফরের খরচ থাকতে হবে। আর্থিক সংগতি নাই এমন লোকের উপর হজ্জ ফরজ হয় না। মহান আল্লাহ বলেন,

فِيهِ آيَاتٌ بَيِّـنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

অর্থঃ এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য, যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না। ( সুরা ইমরান ৩:৯৭)

প্রাপ্ত বয়স্ক লোক হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়তের একটি নীতিমালা হল, ইসলামের কোন ফরজ কাজ আয়াদ করতে হলে তাকে অবশ্য প্রাপ্ত বয়স্ক লোক হতে হবে।  তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক লোক হলে এবং সামার্থ তাকলে আবার হজ্জ করা ফরজ হয়ে পূর্বে যে হাদিসে পাগলের উপর শরীয়তের বিধীবিধান রহিত করা হয়েছে, সেখানে ষ্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না বালেগ হবে তার উপর থেকে মহান আল্লাহ কলম উঠিয়ে নিয়েছন। আর্থাৎ তার কর্মের কোন হিসাব দিতে হবে না। কাজেই আমরা বলতে পারি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা নাবালেগ শিশু যতক্ষন পর্যান্ত প্রাপ্ত বয়স্ক না হবে তার উপর ফরজ হজ্জ আদায়ের হুকুর জারি হবে না। কাজেই নাবালেগ বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু কিশোরদের উপর হজ্জ ফরজ নয়। যদি সে তার পিতা মাতা বা অন্য কোন আত্মীয়ের সাহায্য নাবালেগ বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় হজ্জ করে তবে তা সুন্নাহ হিসাবে ধর্তব্য। এই হজ্জের সওয়ার তার অবিভাবক পাবেন।

ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ করে ফেরার পথে যখন রাওহা নামক স্থানে পৌছলেন, তখন একদল লোকের সাথে তার দেখা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমরা কারা? তারা বললোঃ আমরা মুসলমান। তারা জিজ্ঞাসা করলোঃ আপনারা কারা? সাহাবায়ে কিরাম বললেনঃ ইনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রাবী বললেনঃ এমন সময় একজন মহিলা হাওদা থেকে একটি শিশুকে বের করে জিজ্ঞাসা করলোঃ এর জন্য কি হজ্জ আছে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হ্যাঁ, কিন্তু সওয়াব তোমার।(সুনানে নাসাঈ ২৬৫০ ইফাঃ)

ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক মহিলা তার শিশু সন্তানকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে তুলে ধরে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর জন্যও কি হজ্জ রয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, কিন্তু সওয়াব তোমারই। (সুনানে নাসাঈ ২৬৪৭ ইফাঃ)

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজ্জের সময় এক মহিলা তার শিশু সন্তানকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এই শিশুর জন্যও কি হজ্জ? তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, তবে সওয়াব হবে তোমার। (ইবনে মাজাহ ২৯১০)

ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা হাওদা থেকে একটি শিশু সন্তানকে বের করে বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এর জন্যও কি হজ্জ রয়েছে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, কিন্তু সওয়াব তোমার জন্য।(সুনানে নাসাঈ ২৬৪৮ এবং ২৬৪৯ ইফাঃ, )

মন্তব্যঃ যেহতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সনদে শিশুদের হজ্জ সাব্যস্ত হয়েছে। তাই বড়দের মত তারাও অবিভাবকদের সাথে ইহরাম বাঁধবে। শিশুর হজ্জ ও উমরা হুকুম বড়দের মত থাকবে এবং তার অবিভাবক তাকে ইহরামের অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখবে। তবে বড়দের সাথে শিশুদের পার্থক্য হলো যে, শিশুরা ইহরামের অবস্থায় কোন নিষিদ্ধ কাজ ইচ্ছাকৃত ভাবে করে ফেললেও তা ভূলবশতঃ বলে গণ্য হবে। ফলে তারা যদি ইহরামের কোন নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলে তাহলে তাদের উপর বা তাদের অভিভাবকদের উপর কোন ফিদয়া (মুক্তিপণ) দেয়া ফরয হবে না।

প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার কয়েকটি লক্ষনঃ

১। বির্যপাত বা স্বপ্নদোষ হওয়া।

২। নাভীর নিচের চুল গজানো।

৩। পনের বছর বয়স পূর্ণ হওয়া।

৪। মেয়েদের সাবালিকা হওয়ার লক্ষণ হলো, মাসিক বা ঋতুস্রাব।

৫। সফর করার মত শক্তি সামর্থ থাকতে হবেঃ

অতি বৃদ্ধ, অচল ও চিররোগী যাদের উপর হজ্জ ফরজ হয়েছে কিন্তু হজ্জের সফর করার তাদের জন্য খুবই কষ্টকর। তাদের উপর হজ্জ আদায় করা ফরজ নয়। তবে এ ব্যক্তি অন্য কাউকে দিয়ে বদলী হজ্জ করাতে পারে। এমন অনেক লোক আছে যারা বার্ধক্যে উপনিত হয়েছে তাদের কোন ভাল মন্দের জ্ঞান নেই। তাদের উপরও হজ্জ ফরজ নয়। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা যা হতে  ভালো হওয়ার আশা করা যায় না এবং হজ্জের সফর করা একে বারেই অসম্ভব। এমন অসুস্থ ব্যক্তিদের উপর হজ্জ ফরজ নয়। যদি হজ্জ পালন করতে তার জীবনে অশংকা থাকে তবে হজ্জ আদায় করবে না। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا 

অর্থঃ তোমরা নিজেদের হত্যা করনা। আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের প্রতি দয়াশীল। (সূরা নিসা ৪:২৯)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেনঃ

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

অর্থঃ তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা। (সূরা বাকারা ২:১৯৫)

মন্তব্যঃ অতি বৃদ্ধ ব্যক্তির স্বাস্থ্যে ঝুকির জন্য হজ্জ না করে বদলী হজ্জ করারেন। যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল হয় কিন্তু শারীরিক দিক থেকে অপারগ, তাহলে দেখতে হবে যে, তার এই অক্ষমতা বিদূরিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না? যদি তার এই বাধা দূর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যেমন এমন ব্যধি যার আরোগ্যের আশা রয়েছে তবে রোগের আরোগ্যতা লাভ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, অতঃপর নিজের হাজ্জ নিজেই সম্পাদন করবে। আর যদি অপারগতা এমন হয় যে তা বিদূরিত হওয়ার আশা করা যায় না; যেমন বার্ধক্য বা দূরারোগ্য ব্যধি, তাহলে যে কোন আল্লাহভীরু মুসলিম ব্যক্তিকে (পুরুষ হোক বা নারী) দিয়ে বদল হাজ্জ করিয়ে নিবে।

দলিলঃ ইব্‌নু ‘‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ফযল ইব্‌নু ‘‘আব্বাস (রাঃ) একই বাহনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে আরোহণ করেছিলেন। এরপর খাশ’আম গোত্রের জনৈকা মহিলা উপস্থিত হল। তখন ফযল (রাঃ) সেই মহিলার দিকে তাকাতে থাকে এবং মহিলাটিও তার দিকে তাকাতে থাকে। আর আল্লহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফযলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে থাকে। মহিলাটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর বান্দার উপর ফরযকৃত হজ্জ আমার বয়োঃবৃদ্ধ পিতার উপর ফরয হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ্জ আদায় করবো? তিনি বললেনঃ হাঁ (আদায় কর)। ঘটনাটি বিদায় হাজ্জের সময়ের। (সহিহ বুখারি ১৮৫৪, ১৮৫৫, ৪৩৯৯,সুনানে তিরমিযী ৯৩৮, নাসায়ী ২৬৩৫, ২৬৪১, আবূ দাঊদ ১৮০৯, ইবনু মাজাহ ২৯০৭)

এতেই সে সিয়ামের দায় থেকে মুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।

৬। স্বাধীন হতে হবেঃ

হজ্জ ফরজ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, ব্যক্তিকে স্বাধীন হতে হবে। কৃতদাস বা কৃতদাসীর নিজের মালিকানায় নোক সম্পদ থাকে না। কার উপার্জিত অর্থে মালিকও সে নয়। সে যা উপার্জন করে তা মালিকের। তাদের কোন ব্যক্তি মালিকানা নেই। তাদের ভরন পোষনের দায়িত্বও তার মালিক মনিবের।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, কৃতদাসের জন্যে খানা-পিনা ও পোশাক-পরিচ্ছেদ ক্রীতদাসের অধিকার। (তার ব্যবস্থা করা মনিবের কর্তব্য) তার সাধ্যাতীত কোন কাজের জন্য তাকে কষ্ট দেয়া যাবে না। (সহিহ মুসলিম ৪১৭০ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ হজ্জের অন্যতম শর্ত হলে সফরের আর্থিক সংগতি কিন্তু কৃতদাস বা কৃতদাসির এই সংগতি থাকে না বিধায় তাদর উপর দাসত্ব অবস্থায় থাকাকালীন হজ্জ ফরয হবে না।

৭। মহিলাদের সঙ্গে মাহরাম থাকতে হবেঃ

মহিলাদের অর্থিক সংগতি থাকার পাশাপাশি তার সফর সঙ্গি মাহরাম পুরুষ থাকতে হবে। মাহরান বলতে ঐ সকল প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ বুঝায় যাদের সাথে ঐ মহিলার বিবাহ বন্ধন স্থায়ীভাবে হারাম। তাই যদি কোন মহিলার সফরের খরচ থাকে কিন্তু তার সফর সঙ্গি হওয়ার মত কোন মাহরাফ পুরুষ না থাকে তবে তার উরর হজ্জ ফরজ নয়। কারণ, মহিলাদের জন্য মাহরাম ছাড়া সফর করা ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোন মহিলার জন্য মাহরাম ছাড়া হজ্জ বা অন্য কোন সফর করা জায়েয নয়। তাই তার সফর কম হোক আর বেশী হোক, দুরে হোক আর কাছে হোক, মহিল যুবতী হোক আর বৃদ্ধ হোক, সুন্দরী হোক আর কালো হোক, তার সফর হেটে হোক আর বিমান হোক কোন অবস্থায়ই মাহরাম ছাড়া সফর কর যাবে না।   

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তাঁর খুৎবাহতে বলতে শুনেছিঃ কোন পুরুষ কোন স্ত্রীলোকের একাকী সঙ্গী হবে না, তবে তার সঙ্গে যদি তার মাহরাম (স্বামী ও যাদের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ এমন লোক) থাকে। আর কোন মহিলা যেন তার মাহরাম ব্যতীত একাকী সফরে না যায়। এটি শুনে একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সহধর্মিনী হাজ্বের সফরে বেরিয়ে গেছে আর আমি অমুক অমুক যুদ্ধের জন্য লিপিবদ্ধ (নির্বাচিত) হয়েছি। তিন বললেন- যাও, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হাজ্ব পালন কর। (সহিহ বুখারী ১৮৬২ তাওহীদ,  ইবনু মাজাহ ২৯০০)

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে মহিলা আল্লাহ্ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তার পক্ষে কোন মাহরাম পুরুষকে সাথে না নিয়ে একদিন ও এক রাত্রির পথ সফর করা জায়িয নয়। ইয়াহ্ইয়া ইবনু আবূ কাসীর সুহায়ল ও মালিক (রহ.)….হাদীস বর্ণনায় ইবনু আবূ যিব (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারী ১০৮৮, মুসলিম ১৩৩৯, তিরমিযী ১০৭০, দাঊদ ১৭২৩, ইবনু মাজাহ ২৮৯৯)

আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মহিলা যেন তিন দিন বা তার অধিক দূরত্বের পথ সাথে তার পিতা, ভাই, ছেলে, স্বামী অথবা কোন মাহরাম পুরুষ ব্যতীত তিন দিন বা তার অধিক দূরত্বের পথ সফর না করে। (ইবনে মাযাহ ২৮৯৮,তিরমিযী ১১৬৯, আবু দাউদ ১৫১৮)

মন্তব্যঃ প্রথম হাদিসটির আলোকে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবী (রাঃ) কে বিস্তারিত কিছু জিজ্ঞেস করেননি যে, তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন মহিলা আছে কি না? বা তার স্ত্রী যুবতী, সুন্দরী কি না? মাহরাম ছাড়া মহিলা সফরে বাহির হলে নানান প্রকারের অনিষ্ট ও ফিতনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা পুরুষ একাকী সফরে বাহির হলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাই খারাপ চরিত্র ও পাপিষ্টদের থেকে রক্ষা করান জন্য মহান আল্লাহ এই সুরক্ষা কবজ মাহরাম। এর অন্যতম একটি কারন হলো, মহিলারা সাধারণত জ্ঞানে বুদ্ধির দিক থেকে পুরুষদের তুলনায় দুর্বল হয়ে থাকে এবং নিজের সুরক্ষা দিতে অপারগ থাকে।  তাই যুক্তিসঙ্গত কাজ হলো, মহিলা যেন মাহরামের সঙ্গে সফর করে যাতে করে সে তার সুরক্ষা ও হেফাযত করতে পারে। এজন্যই মাহরামের জন্য সাবালক এবং বিবেকসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। সুতরাং মাহরাম নাবালক বা পাগল হলে তা যথেষ্ট নয়। আর মাহরাম বলা হয়, স্বামী বা এমন সাবালক পুরুষ ব্যক্তিকে যার সাথে সফরে ইচ্ছুক মহিলার স্থায়ীভাবে বংশীয় সম্পর্কের কারণে, স্তন্যদানের সম্পর্কের কারণে কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে বিবাহ হারাম। মা

মাহরাম পুরুষ ও মহিলাদের তালিকা নিম্মে দেয়া হলোঃ

*** পুরুষদের মাহরাম ১৫ জনঃ

আপন মা, খালা, ফুফু, শাশুড়ি, দুধ-মা আপন বোন, দাদি, নানি, নাতনি, দুধ-বোন, নিজের মেয়ে, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে, ছেলের বউ, দুধ মেয়ে।


*** মহিলাদের মাহরাম ১৫ জনঃ

আপন বাবা,  চাচা, মামা, শশুর, দুধ- বাপ, আপন ভাই, দাদা, নানা, নাতি, দুধ-ভাই, নিজের ছেলে, ভাই-এর ছেলে, বোনের ছেলে, মেয়ের জামাই, দুধ ছেলে

মনে রাখতে হবে যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম. তাদের থাকে পর্দা করার সিথিলতা আছে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُوْلِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত, প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সুরা নুর ২৪:৩১)

সার কথা হলোঃ হজ্জ করার জন্য স্বশরীরে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে উপস্থিত হতে হয়। এই জন্য মহান আল্লাহ হজ্জ করার জন্য প্রথম শর্ত দিয়েছেন, যার মক্কা বায়তুল্লাহ পৌছানের সমর্থ হরেছে। কাজেই বলা যায় সবার উপর হজ্জ ফরজ নয়। কুরাআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বলা যায় যে, সকল প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন ও সমর্থবান নারী পূরুষের উপরই হজ্জ আদায় করা ফরজ। নাবালেগ-অপ্রাপ্ত বয়স্কদের উপর ওয়াজিব নয়। আর কিশোর বাচ্চা যে ভালো মন্দের বিচার করতে পারে না, তার জন্যও হজ্জ ওয়াজিব নয়। তবে নাবালেগ বা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের কেউ যদি সামর্থবান পিতা মাতা ও অন্যকারো সাথে হজ্জ আদায় করে তার নফল হবে। তবে এতে তার ফরজ আদায় হবে না। বালেগ হওয়া পর সমর্থ থাকলে, তাকে আবার ফরজ হজ্জ আদায় করতে হবে।  

উমরাহঃ

উমরা করার হুকুমঃ হানাফী ও মালেকী মাযহাবে উমরা করা সুন্নাত। আর শাফী ও হাম্বলী মাযহাবে উমরা করা ফরয।  অর্থাৎ যার উপর হজ্জ ফরয তার উপর উমরাও ফরয।

হজ্জ ও উমরার আহকামঃ

উমরার ফরজঃ– উমরার ফরজ কাজ দুটি

১. মিকাতের আগেই ইহরামের কাপড় পরে উমরার নিয়ত করা

২. তাওয়াফ করা

উমরার ওয়াজিবঃ উমরার ওয়াজিব দুটিঃ

১. সাফা ও মারওয়া’ মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করা। (অনেক আলেম সাফা ও মারওয়ার সাঈ করাকে ফরয বলেছেন।
২. চুল কাটা (মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা)।

উমরার এই চারটি কাজ বিস্তারিতভাবে আলাদা আলাদাভাবে হজ্জের কার্যক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। হজ্জের কার্যক্রমে এই চারটি কাজ অন্তরভূক্ত। আমলের ক্ষেত্রে হজ্জের সময় এই চারটি কাজে যেভাবে আদায় করা হয়, উমরার সময়ও ঠিক তেমনিভাবে আদায় করা হয়। মাসায়েতগত কোন পার্থাক্য নাই। তাই এখানে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয় না। হজ্জের আলোচনা থেকে বিস্তারিত জেনে আমল করতে হবে।

হজ্জের ফরজঃ

হজ্জের ফরজ তিনটি যথাঃ

১. ইহরাম বাঁধা (ইহরামের কাপড় পরে হজ্জের নিয়ত করা)।

২. ৯ই যিলহজ্জে আরাফাতে অবস্থান করা।

৩. তাওয়াফ করা।

উল্লেখ্যঃ হজ্জের এই ফরজ থেকে যে কোন একটি ছুটে গেলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে।

হজ্জের ওয়াজিবঃ– হজ্জের ওয়াজিব নয়টি যথাঃ

১. সাফা ও মারওয়ার সাঈ করা (অনেকের মতে এটা হজ্জের ফরজ)

২. ইহরাম বাঁধার কাজটি মীকাত পার হওয়ার পূর্বেই সম্পন্ন করা।

৩. আরাফাতে অবস্থান সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।

৪. মুযদালিফায় রাত্রি যাপন।

৫. মুযদালিফার পর কমপক্ষে দুই রাত্রি মিনায় যাপন করা।

৬. কঙ্কর নিক্ষেপ করা।

৭. হাদী (পশু) জবাই করা (তামাত্তু ও কেরান হাজীদের জন্য)

৮. চুল কাটা।

৯. বিদায়ী তাওয়াফ।

উল্লেখ্যঃ যে কোন কারণেই হোক উপরে বর্ণিত কোন একটি ওয়াজিব ছুটে গেলে দম (পশু জবাই) দেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। দম দিতে সমর্থ না হলে বিধী মোতাবেক সিয়াম পালন করতে হবে।

হজ্জের সুন্নতঃ

হজ্জের সুন্নত অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

১. ইহরামের পূর্বে গোসল করা

২. পুরুষদের সাদা রঙের ইহরামের কাপড় পরিধান করা।

৩. তালবিয়াহ পাঠ করা

৪. ৮ই যিলহজ্জ দিবাগত রাত মিনায় অবস্থান করা

৫. ছোট ও মধ্যম জামারায় কংকর নিক্ষেপের পর দু‘আ করা

৬. কেরান ও ইফরাদ হাজীদের তাওয়াফে কুদূম করা।

উল্লেখঃ তবে কোন কারণে সুন্নত ছুটে গেলে দম দিতে হয় না।

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজঃ

যে সব কাজ হাজ্জ বা উমরাহ অবস্থায় নিষেধ করা হয়েছে তা হলঃ

. মাথার চুল মুণ্ডন করা বা ছোট করা কিংবা উঠিয়ে ফেলা 

২. ইহরামের অবস্থায় নখ কাটা বা নখ উঠিয়ে ফেলা।

৩. ইহরাম করার পর ইহরামের কাপড়ে কিংবা শরীরে অথবা এমন কিছুতে যা শরীরের সাথে লেগে তাকে তাতে সুগন্ধি ব্যবহার করা।

৪. নিজের অথবা অপরের বিবাহ বন্ধন করা।

৫. যৌন কামনার সাথে স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া, স্পর্শ করা কিংবা জড়িয়ে ধরা ইত্যাদি।

৬. সহবাস করা।

৭. ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ হল, শিকার করা।

এ সাতটি নিষিদ্ধ কাজ পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য ইহরাম অবস্থায় হারাম। দু’টি বিষয় এমন রয়েছে যা ইহরাম অবস্থায় শুধু মাত্র পুরুষদের জন্য হারাম। আর তা হলো:

১. মাথা ঢাকা।

২. ইহরাম অবস্থায় সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা।

সফরের বিধি বিধান

সফরের বিধি বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফর বলতে আমরা বুঝি নিজের পরিবার ও জন্মভূমী ত্যাগ করে অন্য কোন অঞ্চলে গমন করা। সফর বিভিন্ন উদ্দেশ্যে হতে পারে। সাধারণত সফর দুনিয়াবী কারনে হয় থাকে তবে বহু মুসলিম দ্বীনের কারনেও সফর করে থাকে। কোন মুসলিমের সফর যখন দ্বীনের উদ্দেশ্যে হবে তখন তার সফর ইবাদাত হিসাবে গন্য হবে। হজ্জ মুলটি একটি বিশাল সফরের নাম। বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকে আল্লাহ পাগল সামর্থবান মুনিন হজ্জের জন্য সফর করে। যদিও সফর একটি কঠিন ও কষ্ট সাধ্য কাজ। ইসলামি শরীয়তে সফর একটি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়। কেননা মুমিন মুসলিককে প্রতিটি মুহুর্তেই মহান আল্লাহকে স্মরন রেখে তার হুকুম মনে চলতে হয়। তাকে সার্বক্ষনই  কোন না কোন ইবাদের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে খুসি করতে হয়। সফর একটি কঠিন ও কষ্ট সাধ্য কাজ বিধায় মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়া দেখিয়ে তার হুকুম আদায়ে জন্য একটু সিথিলতা প্রদান করছেন। তার প্রদানকৃত সিথিলতা গ্রহন করাও ফরজ করে দিয়েছেন। কাজেই প্রতিটি মুসলিমের জন্য সফর সংক্রান্ত বিধী বিধান জানা ফরজ। হজ্জ যেহেতু একটি বড়, কঠিন, কষ্ট সাধ্য কাজ তাই এই সময় মহান আল্লাহ বিধান মেনে আমল করা ফরজ। কিন্তু অনেক মুসলিম অজ্ঞতার কারনে সফরের বিধান সঠিক পালন করতে পারে না।

অনেক কারনে মানুষ সফর করে। প্রতি সফরের বিধান একই। হজ্জের সফর আর ব্যক্তিগত কারনে সফরের বিধানে কোন পার্থক্য নাই। যদিও সফর করা আগের দিনের তুলনায় অনেক কষ্ট এবং সময় কম লাগে।  আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগে সফর বা ভ্রমণ মানুষের নিত্ত নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আগে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করা কল্পনাতীত ছিল কিন্তু এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত এক নিমিসেই পাড়ি দিচ্ছে। মানুষ যেমন আল্লাহ হুকুমে হজ্জের জন্য সফর করে ঠিক তেমনি নিজের  প্রয়োজনে সফর করে থাকে। আবার কেউ আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রতিনিয়তই ভ্রমণ করে থাকে। বিভিন্ন স্থান দর্শনে অনেক জ্ঞানার্জন করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর বিভিন্ন সৃষ্টিজীব, প্রকৃতি, নদী-নালা দেখার মাধ্যমে মুমিন বান্দাগণ আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার সূযোগ পায়। বিশেষ করে আল্লাহর দয়া, ক্ষমতা সর্ম্পকে জানতে পারে। এতে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেনঃ

أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ كَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارُوا الْأَرْضَ وَعَمَرُوهَا أَكْثَرَ مِمَّا عَمَرُوهَا وَجَاءتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

অর্থঃ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? অতঃপর দেখে না যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কি কি হয়েছে? তারা তাদের চাইতে শক্তিশালী ছিল, তারা যমীন চাষ করত এবং তাদের চাইতে বেশী আবাদ করত। তাদের কাছে তাদের রসূলগণ সুস্পষ্ট নির্দেশ নিয়ে এসেছিল। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিলেন না। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। [ সুরা রূম ৩০:৯ ]

মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ

قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُواْ فِي الأَرْضِ فَانْظُرُواْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذَّبِينَ

অর্থঃ তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে। (সুরা ইমরান ৩:১৩৭)

মহান আল্লাহ এমনিভাবে বিভিন্ন জাতির ধ্বংসাবশেষ ও মিথ্যাবাদীদের অবস্থা দেখার জন্য আন‘আম (১১), ইউসুফ (১০৯), নাহল (৩৬), হাজ্জ (৪৬), নামল (৬৯), আনকাবূত (২০), ফাতির (৪৪), গাফির (২১) এবং মুহাম্মাদ (১০) -এ নির্দেষ দিয়েছেন।

সফর বা ভ্রমণের প্রকারভেদঃ

সফর বা ভ্রমণকে কুরআন-হাদীছের আলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

* হারাম বা নিষিদ্ধ সফর

* মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর

* মুবাহ বা জায়েয সফর

* মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর

* ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর

হারাম বা নিষিদ্ধ সফরঃ  

ইসলাম বিরোধিতা বা নিষিদ্ধ কাজ সম্পন্ন করার জন্য সফর করা হারাম। কাজেই, হারাম কাজের উদ্দেশ্যে সফর করা হয় তাহলে সে সফরের হুকুমও হারাম হবে। যেমন, সমাজে ইসলাম বিরোধী উরসের জন্য সফর করা, মাজারের মানত পুরা কারার জন্য সফর করা। গান বাজনা, মেলা, আড়ং, পহেলা বৈশাখ, হিন্দুদের পুজা, ঝগড়া-বিবাদ, যে কোন পাপ কাজ ইত্যাদির জন্য সফর করা হারাম।

এমনকি যেখানে মহামারী আরম্ভ হয়েছে এমন স্থান থেকে সফর করাও নিষেধ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি তোমরা শুনতে পাও (কোন স্থানে মহামারী আক্রান্ত হয়েছে) তাহ’লে সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে আক্রান্ত হ’লে সেখান থেকে বের হয়ো না’। (বুখারী ৫৭২৮-৩০, মুসলিম ২১৮-১৯;  মিশকাত ১৫৪৮)।

এছাড়া কোন মহিলার মাহরাম ছাড়া সফর করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন মহিলার নিকট কোন পুরুষ গমন করতে পারবে না’। (বুখারী ১৮৬২; মুসলিম ১৩৪১)।

মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফরঃ এটা হ’ল ইসলামী পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে সফর করা। যেমনঃ একাকী রাতে সফর করা, তিন জনের অধিক হ’লে কাউকে আমীর নিযুক্ত না করে সফর করা।

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’। ( সহিহ বুখারী ২৯৯৮)।

মুবাহ বা বৈধ সফরঃ  দুনিয়ার হালাল কোন কাজের প্রয়োজনে বা শখের বসে বিভিন্ন স্থানে সফর বা ভ্রমণ করা। কাজেই, কোন জায়েয কাজের উদ্দেশ্যে সফর করা হয় তবে উক্ত সফরও জায়েয বলে গণ্য হবে। যেমন, যারা ব্যবসা করে জীবন যাপন করে তারা ব্যবসার প্রয়োজনে সফর করে। চাকুরী জীবি চাকুরির জন্য সফর করে। কেউ শিক্ষা গ্রহনের জন্য সফর করে। কেউ শুধুই বিনোদনের জন্য সফর করে। আবার কেউ দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য সফর করে। এই ধরনের সফর বৈধ সফর।

মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফরঃ আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করা জন্য সফর করা। অসুস্থ মানুষের সাথে সাক্ষাতের জন্য সফর করা। ফরজ ইলমের অতিরিক্ত দ্বীন শিক্ষার জন্য সফর করা। কোন মানুষকে সাহায্য করা জন্য সফর করা। উপদেশ গ্রহণের জন্য, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ ও তাদের স্মৃতিসমূহ দেখার জন্য সফর করা মুস্তাহাব। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ

أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَكَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً

অর্থঃ তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছে। অথচ তারা তাদের অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী ছিল। (সুরা ফাতির ৩৫:৪৪)।

ইহা ছাড়া মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আক্বছার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা মুস্তাহার কারন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মসজিদুল হারাম, মসজিদুর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং মসজিদুল আক্বছা (বাইতুল মাক্বদিস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। (সহিহ বুখারী ১১৮৯; সহিহ মুসলিম ‘হজ্জ অধ্যায়’) ।

ওয়াজিব বা অবশ্যিক সফরঃ সফর যদি কোন ইবাদাতের উদ্দেশ্যে শুরু করা হয় তবে উক্ত সফরও ইবাদাত বলে গণ্য হবে। আর এই সফর যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন আদেশকে বাস্তবায়নের জন্য সফর করা। যেমন, হজ্জের জন্য মক্কা সফর করা এবং মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক যুদ্ধের আদেশ দিলে যুদ্ধের জন্য সফর করা ইত্যাদি। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ

অর্থঃ এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।(সুরা হজ্জ ২২:২৭)।

ফরয ইলম অর্জন করার জন্য যে কোন স্থানে ভ্রমণ করা। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথ অবলম্বন করলে, আল্লাহ এই অসীলায় তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন’। (ইবনু মাজাহ-২২৩, তিরমিযী-২৬৪৬, মিশকাত-২১২, ছহীহুল জামি ৬২৯৮, ৬৫৭৭)।

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হিঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফরসমূহ চার ধরনের ছিল। হিজরতের জন্য সফর, জিহাদের জন্য সফর, আর এটাই বেশী ছিল, ওমরাহ-এর জন্য এবং

 হজ্জের জন্য সফর।

 ইসলামে অন্যান্য বিধানের ন্যায় সফরের সময় পালনীয় সুন্দর নিয়ম-কানূন রয়েছে। আজ মুসলিম সমাজের অধিকাংশ ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা সফরের নির্দেষ ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানেনা বললেই চলে। মুসলমানের সকল কাজ ইবাদত এবং ভ্রমণও তার বাইরে নয়। প্রত্যেক মুসলিমকে যেহেতু মহান আল্লাহ এক মাত্র তার ইবাদতের জন্য সৃষ্ট করেছেন, (৫১:৫৬)। কাজেই তার প্রতিটি পদক্ষেপেই মহান আল্লাহ হুকুম জেনে নিতে হবে। যদি কোন মুসলিম প্রতি মুহুর্তে মহান আল্লাহ হুকুম ও তার হাবিব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশিত পথে অতিবাহিত করে তবে তার প্রতি মুহুর্তেই ইবাদত হিসাবে পরিগনিত হবে। তাই ইসলাম ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা ও নিয়ম-কানূন নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাসূল (ছাঃ) মাদানী জীবনের ১০ বছরের মধ্যে ৭৮১ দিনের অধিক অর্থাৎ দু’বছরের বেশী সময় যুদ্ধের ময়দানে (সফরে) অতিবাহিত করেছেন। এই অবস্থায় ইসলামের বহু বিধি-বিধান জারী হয়েছে। [মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ)]।

সফরের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজঃ

যদি কেউ ইবাদাতের উদ্দেশ্যে সফর করে তবে তাকে সালত, সিয়ামের বিধানের পাশাপাশি নিম্নের বিষয়সমূহের প্রতি গুরুত্বারোপ করা আবশ্যকঃ

* ইবদতের জন্য সফর হলে নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করতে হবেঃ

* সফরে ফরজ হুকুবে অবহেলা না করা

* সৎ কাজের আদেশ প্রদান অসৎ কাজের নিষেধ করা

* সফরে অন্য সাথীদের কষ্টের কারন না হওয়া

* সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে

* গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করা

* একাকী সফর না করা

* সফর সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো যথাসময় পাঠ করা

ইবদতের জন্য সফর হলে নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করতে হবেঃ

আমারা জানি যে কোন কাজের ফলাফল আল্লাহ তার নিয়তের উপরই দিয়ে থাকেন। কাজেই আমদের সফর সর্বাবস্থায় আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের এবং সৎ উদ্দেশ্যে হতে হবে। মহান আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য সফর করলে, আমাদের যাবতীয় শ্রম ও টাকা পয়সা খরচ শুধু আমাদের নেকী বৃদ্ধি করা হবে না, আমাদের  গুনাহসমূহও ক্ষমা করা হবে এবং মর্যাদা সুউচ্চ হবে।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যাক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করে অথচ সস্পাদন করে নি, তার জন্য একটি সাওয়াব লেখা হয়। আর যে ইচ্ছা করার পর কার্যত সস্পাদন করে, তবে তার ক্ষেত্রে দশ থেকে সাতশ, গুন পর্যন্ত সাওয়াব লেখা হয়। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করে আর তা না করে তবে কোন গুনাহ লেখা হয় না। আর তা করলে (একটি) গুনাহ লেখা হয়। (সহিহ মুসলিম ২৩৭)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ আমার বান্দা যখন কোন সৎকর্মের সংকল্প গ্রহণ করে অথচ এখনও তা সম্পাদন করে নি তখন আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখি; আর যদি কার্যত সম্পাদন করে তবে দশ থেকে সাতশ- গুন পর্যন্ত সাওয়াব লিখি। পক্ষান্তরে যদি অসৎ কর্মের ইচ্ছা করে অথচ এখনো সম্পাদন করে নি তবে এর জন্য কিছুই লিখি না। আর তা কার্যে পরিণত করলে একটি মাত্র পাপ লিখি। (সহিহ মুসলিম ২৩৫)

সফরে ফরজ হুকুবে অবহেলা না করাঃ

সফর একটি কষ্টসাধ্য কাজ। সফল কালে সময়ের অভাবে সঠিকভাবে সালাত করা অনেকের পক্ষ সম্বব হয়ে উঠে না। যাদের ঈমান দুর্বল তারাতো সফরের সালাত ছেড়েই দেয়। সফরে যতই কষ্ট হোকনা কেন কোন অবস্থায়ই ফরজ হুকুবে অবহেলা করা যাবে না। সফরের সময় অনেক মহিলা পর্দার ব্যাপারে গুরত্ব প্রদান করে না। অথচ পর্দা করা প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক নর নারীর জন্য ফরজ। শুধু সালাত আর পর্দা নয় সফরের প্রতিটি ফরজই যথাযথভাবে আদায় করা উচিৎ।

সফরের সালাতগুলো কসর করে যথাযথ আদায় করতেই হবে। কোন অজুহাতে সালাত কাজা করা যাবে না।

সৎ কাজের আদেশ প্রদান অসৎ কাজের নিষেধ করাঃ

সফর দীর্ঘ ও সময় সাপেক্ষ হলে সাধ্য মত সৎকাজের নির্দেশ দেয়া আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা উচিৎ। যদি সফর সঙ্গী বেশী থাকে তবে নিজেদের মাঝেও এই কাজ করা যায়। যেমন, হজ্জের সফরে দীর্ঘ দিন ধরে বহু সাথীকে একই সাথে সফর করতে হয়। এই সুযোগে সাধ্যমত সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজর নিষেধ করা। তাছাড়া চলাচলে পথেও সাধ্যমত এই কাজটি চালিয়ে যেতে হবে।

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো। তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রাস্তায় বসা ব্যতীত গত্যন্তর নেই, আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি। তখন তিনি বললেন, যদি তোমাদের রাস্তায় মজলিস করা ব্যতীত উপায় না থাকে, তবে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কী? তিনি বললেন, তা হলো চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। সালামের জবাব দেয়া এবং সৎকাজের নির্দেশ দেয়া আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। (সহিহ বুখরি ৬২২৯ তাওহীদ)

সফরে অন্য সাথীদের কষ্টের কারন না হওয়াঃ

সফরের বিভিন্ন মন মানুষিকতার লোক থাকে। কেউ রাগি, কেউ স্বর্থপর, কেউ বদমেজাজি, কেউ খিটখিটে স্বভাবের আবার অনেক ভালো স্বভাবের ও আছে। একজন খারাপ সফর সঙ্গি সকলের কষ্টের কারণ হতে পারে। কাজেই সবার করা চিন্তা করে অন্তত এতটুকু ভাবা যে, আমি যেন অন্য সাথীদের কোন কষ্টের কারন না হই। তাই সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবসময় হাঁসিমুখে থাকতে হবে। নিচের উদারতা পরিচয় দিন। সকল সাথীদের খুশী রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করুন। প্রত্যকে এমনটি ভাবলে সফর খুবই সাফল্য মন্ডিত হবে।

আবূ সিরমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক অন্য কারো ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহ তা’আলা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন। যে লোক অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তা’আলা তাকে কষ্টের মধ্যে ফেলেন।(সুনানে তিরমিজ ১৯৪০, ইবনে মাজাহ ২৩৪২)

আবূ সিরমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দিবে আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন।(ইবনে মাজাহ ২৩৪২)

সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবেঃ

সফরের সময় থাকা খাওয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না, বিধায় অনেকের মেজাজ খারাপ থাকে। এই সময় যদি সকলেই ধৈর্যহীন হয়ে যায়, তবে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভাবনা থাকে। সবাই যদি সাথীদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে তবে সফর সুন্দর হবে। এই জন্য সফরে বের হওয়ার পূর্বে কিছু বেশী টাকা এবং পর্যাপ্ত সফর সম্বল নিয়ে নেয়া উচিৎ। কারণ, হঠাৎ তার প্রয়োজন হতে পারে অথবা অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে এবং নিজ প্রয়োজনে এবং মুসলিম ভাইদের প্রয়োজনে ব্যয় করা যায়। যদি সফর সঙ্গীদের সহানুভূতি দেখান তবে দেখবের তারাও আপনাকে সহানুভূতি দেখাবে। সফর সঙ্গীদের পক্ষ হতে আপনার সাথে কোন রকম দুর্ব্যবহার করা হয় বা আপনার মতের উল্টো কাজ হয়, তাহলে তাতে ধৈর্য ধারণ করা এবং ভাল পন্থায় তার সমাধান করার চেষ্টা করুন। এরফলে, আপনি তাদের মাঝে মান সম্মান নিয়ে চলতে পারেন এবং তাদের মন জয় করতে সক্ষম হবেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি।

হজ্জরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা কোনো সফরে নবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি সওয়ারিতে আরোহণ করে আগমন করল। অতঃপর সে তার দৃষ্টি ডানে-বামে ফেরানো শুরু করল। তা দেখে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যার নিকট অতিরিক্ত বাহন আছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে, আর যার নিকট নিজের পাথেয়ের অতিরিক্ত রয়েছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে।’ (সহিহ মুসলিম ১৭২৮)

নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়। (সহিহ বুখারি ৬০১১)

জারীর ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে না, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি ৬০১৩)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ‘আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা‘ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা‘ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। (সহিহ বুখারি ৫৯৯৭)

রাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এবং (রাস্তার হক হলো পথ হারাকে) পথ দেখানো। (আবু দাউদ ৪৮১৬)

গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করাঃ

দীর্ঘ সফরে অনেক সময় যানবাহনে অসল সময় কাটাতে হয়। আর কখন কখন বাহনের অপেক্ষায় যাত্রা বিরত করতে হয়। এই সময় সফরের হক আদায় না করে, অনেকেই বেহুদা কথায় লিপ্ত হয়ে থাকে। যার ফলে যা করার ছিলনা তা করে, যা বলার ছিলনা তাই বলে। অর্থাৎ গীবতে লিপ্ত হয়। গীবত সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকার কারনে সফরের অসল সময় গীবতেই কেটে যায়। তাই সফরে গীবত ও অযথা কথা থেকে জবান হিফাজত করতে হবে। গীবত বা অযথা কথা বলে বলে ইসলামি শরীয়তে যে কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেতে পার। আর সফর সঙ্গীদের মধ্যে যদি কোন আলেম থাকে তবে তার নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করা চেষ্টা করি আর নিজে আলেম হলে অন্যদের সঠিক ইসলামি জ্ঞান দিতে চেষ্টা করি।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন; আরবদের একে অন্যকে সফরের সময় সেবা (খেদমত) করত। আবূ বকর ও উমর (রাঃ)- এর সাথে এক ব্যক্তি ছিল যিনি তাদের খেদমত করত। তারা উভয়ে ঘুমিয়েছিল। অতঃপর তারা জাগ্রত হলেন। (কিন্তু খাদেম) তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেনি (বরং সে ঘুমিয়েছিল) তাদের একজন অন্যকে বলছিল, এ (খাদেম) তোমাদের নবীর ঘুমের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করেছে (অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে, তোমাদের গৃহের ঘুমের সাথে সাদৃশ্যতা রেখেছে)। অতঃপর তারা তাকে (খাদেমকে) জাগিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট গিয়ে তাঁকে বল, যে আবূ বাকার ও উমার (রাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনার কাছে তরকারী (অর্থাৎ খাবার) চেয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাদের সালাম জানাবে এবং বলবে যে, তারা উভয়েই খাবার গ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) তারা ঘাবড়িয়ে গেলেন এবং (উভয়েই) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট খাদেমকে খাবার চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আপনি বলেছেন যে, আমরা খাবার খেয়েছি। তো আমরা কী দিয়ে খাবার খেলাম? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমাদের ভাইয়ের গোশ্‌ত দিয়ে। আল্লাহর শপথ! আমি তার গোশ্‌ত তোমাদের নখের মধ্যে দেখছি। তারা [আবূ বাকার ও উমার (রাঃ)] বললেন, আমাদের ক্ষমা করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সে তোমাদের ক্ষমা করবে। (আস সহীহাহ-২৬০৮)

একাকী সফর না করাঃ

সফরকালীন সময়ে একাকী না গিয়ে তিনজন বা তার বেশি সফরসঙ্গী থাকা উত্তম। কেননা, একাকী সফর করতে সহিহ হাদিসে নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। 

আমর ইবনু শুআইব (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একা ভ্রমণকারী এক শাইতান, দুইজন ভ্রমণকারী দুই শাইতান এবং তিনজন ভ্রমণকারী একটি জামা’আত। (সুনানে তিরমিজি : ১৬৭৪)।

‘আমর ইবনু শু‘আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একাকী সফরকারী হচ্ছে একটি শয়তান, আর একত্রে দু’ জন সফরকারী দু’টি শয়তান। তবে একত্রে তিনজন সফরকারীই হচ্ছে প্রকৃত কাফেলা। (আবু দাউদ ২৬০৭)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না। (সহিহ বুখারি  ২৯৯৮ তাওহীদ)

সফর সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো যথাসময় পাঠ করাঃ

সফরের শুরু থেকে সফর শেষ করা পর্যান্ত বহু মাসনুন দোয়া সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সফর শুরুর আগে এই সকল দোয়া মুখন্ত করা চেষ্টা করি। অতপর, যখন সফর শুরু হবে এই মাসনুন দোয়া যথাস্থানে যথাসময় পাঠ করা চেষ্টা করি। মাসনুন দোয়াগুলি অর্থ বুঝে পাঠ করলে আরো ভাল হয়। আমি কি করছি আর কি বলছি তা যদি নিজেই না যানি তাহলে ভারী অন্যায় হবে।

ক। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়াঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবেঃ

«بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلَاَ حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ».

(বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)

অর্থঃ আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর ভরসা করে (বের হচ্ছি)। আল্লাহ ছাড়া কোন উপায় ও শক্তি নাই।

তখন তাকে বলা হয়, তুমি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছো, রক্ষা পেয়েছো ও নিরাপত্তা লাভ করেছো। সুতরাং শয়তানরা তার থেকে দূর হয়ে যায় এবং অন্য এক শয়তান বলে, তুমি ঐ ব্যক্তিকে কি করতে পারবে যাকে পথ দেখানো হয়েছে, নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং রক্ষা করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৫)

** উম্মু সালামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর হতে বাইরে রাওয়ানা হতেন তখন বলতেন,

 «اللّٰـهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ».

 (আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা আন আদ্বিল্লা, আও উদ্বাল্লা, আও আযিল্লা, আও উযাল্লা, আও আযলিমা, আও উযলামা, আও আজহালা, আও ইয়ুজহালা আলাইয়্যা)

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই যেন নিজেকে বা অন্যকে পথভ্রষ্ট না করি, অথবা অন্যের দ্বারা পথভ্রষ্ট না হই; আমার নিজের বা অন্যের পদস্খলন না করি, অথবা আমায় যেন পদস্খলন করানো না হয়; আমি যেন নিজের বা অন্যের উপর যুলম না করি অথবা আমার প্রতি যুলম না করা হয়; আমি যেন নিজে মুর্খতা না করি, অথবা আমার উপর মূর্খতা করা না হয়। (সুনানে তিরমিজ ৩৪২৭)

খ। সফরে বের হলে যে দোয়া পড়তে হয়ঃ

আবুয যুবাইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। ‘আলী-আযদী (রাঃ) তাকে জানিয়েছেন, ইবনু ‘উমার তাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার সময় উটের পিঠে সোজা হয়ে বসে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এ আয়াত পড়তেনঃ

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا، وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ، وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ

অর্থঃ ‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’[সূরা আয-যুখরুফঃ আয়াত ১৩-১৪] অতঃপর এ দু‘আ পাঠ করতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِي سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى، وَمِنِ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى، اللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا، اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الْبُعْدَ، اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ، وَالْخَلِيفَةُ فِي الْأَهْلِ وَالْمَالِ

তিনি যখন ফিরে আসতেন, এ দু‘আই পাঠ করতেন, শুধু এটুকু বাড়িয়ে বলতেনঃ

 آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সেনাবাহিনী কোনো উঁচু স্থানে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং নীচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ বলতেন। অতঃপর এভাবেই (শুকরিয়া) সালাতে নির্ধারণ হয়। (আবু দাউদ ২৫৯৯)

** আলী ইবনু রবী‘আহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দেখলাম, ‘আলী (রাঃ)-এর কাছে আরোহণের একটি পশু আনা হলে তিনি এর পা-দানিতে পা রাখতেই বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’ এবং এর পিঠে চড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, আল-হামদুলিল্লাহ।’’ অতঃপর তিনি এ আয়াত পড়লেন,‘‘মহান পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের অনুগত বানিয়েছেন, তা না হলে একে বশ করতে ‘আমরা সক্ষম ছিলাম না। নিশ্চয়ই আমাদেরকে আমাদের রবের নিকট ফিরে যেতে হবে।’’[সূরা আয-যুখরুকঃ আয়াত ১৩-১৪] পুনরায় তিনি তিনবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ এবং তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বললেন। অতঃপর বললেন, ‘‘(হে আল্লাহ!) আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমিই আমার উপর যুলুম করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আপনি ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।’’ অতঃপর তিনি হেসে দিলেন।

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কেন হাসলেন? তিনি বললেন, আমি যেরূপ করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও এরূপ করতে দেখেছি। তিনি তখন হেসেছিলেন তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি হাসলেন কেন? তিনি বললেনঃ নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন যখন সে বলেঃ ‘‘(হে আমার রব!) আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করুন।’’ আর বান্দা তো জানে যে, আমি (আল্লাহ) ছাড়া কেউই গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। (আবু দাউদ ২৬০২)

*** বাহন হোঁচট খেলে পড়বে,

রেখে (بِسْمِ الله) বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে) পাঠ করবে। (আবু দাউদ ৪৯৮)

সফরের সময় উঁচু নিচু অতিক্রমকালে পাঠ করবেঃ

সফরের সময় উঁচু জায়গায় উঠার সময় তাকবীর পাঠ করবে এবং কোন নীচু জায়গায় অবতরণের সময় তাসবীহ পাঠ করবেন।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন কোন উঁচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন তাকবীর তাকবীর (اَللهُ أَكْبَرُ – আল্লাহু আকবার) ধ্বনি উচ্চারণ করতাম আর যখন কোন উপত্যকায় অবতরণ করতাম, সে সময় তাসবীহ (سُبْحَانَ اللهِ সুবহানাল্লাহ) বলতাম। (সহিহ বুখারি ২৯৯৩)

সফরে কোন স্থানে যাত্রা বিরতীতে পাঠ করবেঃ

খাওলা বিনতে হাকীম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ কোন গন্তব্যে পৌঁছে যদি এই দোয়া পড়েঃ ‘‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক’’

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

[আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্ তা-ম্মা-তি মিন শার্‌রি মা খলাক্বা]

অর্থঃ আমি আল্লাহ পাকের কল্যাণকর বাক্যাবলীর উসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

তাহলে সে স্থান থেকে বিদায় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ মুসলিম ২৭০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৫৪৭, তিরমিযী ৩৪৩৭)।

ঙ। ঘরে প্রবেশের দোয়াঃ

আবূ মালিক আল-আশ‘আরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কেউ নিজ ঘরে প্রবেশ কররে তখন সে যেন বলে,

«بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا»

(বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়াবিস্‌মিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা)

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহ্‌র নামেই আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহ্‌র উপরই আমরা ভরসা করলাম”। অতঃপর সে যেন তার পরিবারের লোকদের সালাম দেয়। (সুনানে আবু দাউদ ৫০৯৬)

হজ্জের সফরে জন্য বিশেষভাবে কিছু করণীয় কাজ

হজ্জের সফরে জন্য বিশেষভাবে কিছু করণীয় কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিয়ত করা পর প্রথম কাজ কার মাধ্যমে হজ্জ করবেনঃ

সাধারণত কারো উপর হজ্জ ফরজ হলে তিনি হজ্জে যাওয়া নিয়ত করেন। নিয়ত করা পর প্রথম কাজ হলো, আপনিভাবে হজ্জের গমন করে মক্কার নগরীতে পৌছাবেন। আপনি নিজে ইচ্ছা করেই হজ্জের যেতে পারবেন না। আপনাকে যে কোন হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে হজ্জে যেতে হবে। বাংলাদেশ থেকে হজ্জে যেতে হলে দুই ধরনের মাধ্যম আছে। এই দুটির যে কোন একটি মাধ্যমকে আপনি বেচে নিতে পারেন। এই দুটি মাধ্যম হলো, সরকারী ব্যবস্থাপনায় এবং প্রাইভেট হজ্জ-এজেন্সির।  আপনি এই ব্যাপারে যারা আগে হজ্জ করেছেন তাদের সাথে পরামর্শ করে সিন্ধান্ত নিন। এখানে আমি দুটি এজেন্সি সম্পর্কে একটু ধারনা দিলাম।

ক। সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনায় অল্প সংখ্যক লোক হজ্জে গমন করেন। এই ধরুন, মোট হজ্জ যাত্রীর মাত্র ৫% লোক সরকারি ব্যস্থাপনায় যায়। সরকারী ব্যবস্থাপনার আওতায় দুটি ক্যাটাগরি রয়েছে সবুজ ও নীল। এ দুটোর যে কোনো একটার আওতাভুক্ত হয়ে হজ্জের সফর সম্পন্ন করতে পারেন। সবুজ ক্যাটাগরির হাজিদের জন্য মক্কা-মদিনায় প্রায় আধা কিলোমিটার এবং নীল ক্যাটাগরির হাজিদের জন্য এক কিলোমিটার বা তার থেকেও বেশি দূরত্বে বাসা বরাদ্দ করা হয়। দুটি পদ্ধতিতেই প্রাক-নিবন্ধন করতে হবে। কেননা হজ্জে গমন করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল দেশের একটি নির্দিষ্ট কোটা আছে। কোন দেশ কত জন হাজি পাঠাতে পারবে সৌদি হজ্জ কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ঐ দেশেকে জানিয় দেয় এবং সেই কোটা অনুসারে ঐ দেশে ঠিক করে কারা কারা হজ্জে গমন করবে। বাংলাদের ইচ্ছা করলেই বেশী হাজি প্রেরণ করেত পারবেনা। কেনানা এই সফরে যারা মক্কা মদীনা থাকবেন তাদের থাকা, খাওয়া, টয়লেট, বাথরুমসহ সকল প্রকারের জরুরী সেবা প্রদান সাপেক্ষে লোক নেয়া হয়। ধারন ক্ষমতার বেশী লোক গমন করলে এই সকল জরুরী থেকে বঞ্চিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশর যে পরিমান কোটা থাকে, তার থেকেও অনেক বেশী লোক হজ্জে গমন করতে চায়। কাজেই আমাদের দেশে যত লোক হজ্জে গমন করতে চায়, তাদের সবাইকে হজ্জে যেতে দেয়া হয় না। এই জন্য বাংলাদের হজ্জ মন্ত্রনালয় পক্ষে থেকে যারা হজ্জে যেতে চায় তাদের একটি প্রাক-নিবন্ধন  পদ্ধতি চালু করেছে। যারা হজ্জ যাবেন তাদের সবাইকে এই তালিকাভু্ক্ত হতে হবে। এই তালিকা থেকে সিরিয়াল অনুসারে হজ্জে পাঠান হয়।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে গমনেচ্ছুগণ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিস ও ঢাকা হজ্জ অফিস হতে প্রাক-নিবন্ধনের ডাটা এন্ট্রি সম্পন্ন করে ভাউচার গ্রহণ করতে হয় এবং ব্যাংকে টাকা পরিশোধের পর ব্যাংক থে‌কে সিরিয়াল নম্বরসহ প্রাক-নিবন্ধন সনদ পাওয়া যাবে।

আপনি ইচ্ছা করলেই নিবন্ধ করতে পারবে না। এই জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয় বছরের একটি নির্দষ্ট সময় ঘোষনা করে যে আগামি এত তারিখ থেকে এত তারিখের মধ্যে এত সালে হজ্জের জন্য নিবন্ধ করেত হবে ঐ তারিখ মতই আপনাকে নিবন্ধ করতে হবে। যদি আপনার সিরিয়াল অনেক পরে আসে আর আপনি চলিত বছর হজ্জে গমন করতে না পারেন তবে আপনার সিরিয়াল নষ্ট হবে না আপনি পরের বছরেও এই সিরিয়াল অনুসারে আগে হজ্জ করার সুযোগ পাবেন।

আপনার সিরিয়াল আসলে ধর্ম-মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেয়া সময় ও নিয়ম অনুযায়ী টাকা জমা দিন। ধর্ম-মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরবরাহকৃত ফরম পূরণ করে যে কোনো অনুমোদিত ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে প্রদত্ব রসিদ নিয়ে জেলা প্রশাসকের অফিসে রিপোর্ট করুন। টাকা জমা দেয়ার রসিদ ও অন্যান্য কাগজ পত্র রাখতে হবে যত্ন সহকারে ও তা দেখিয়ে অফিস থেকে বলে দেওয়া সময়ে উপস্থিত হয়ে বিমানের টিকিট ও পিলগ্রিম পাস সংগ্রহ করতে হবে হজ্জ ক্যাম্প থেকে। আপনার জমা দেয়া টাকা যে সব খাতে ব্যয় করা হয় তা হল নিম্নরূপঃ

১. বিমান ভাড়া। ২. এম্বারকেশন ফি। ৩. ভ্রমণ কর। ৪. ইনস্যুরেন্স ও সারচার্জ (ব্যাজ কার্ড, পুস্তিকা, কবজি-বেল্ট, আই,টি সার্ভিস, পিলগ্রিম পাস ইত্যাদি) ৬. মুয়াল্লিম – সৌদি আরবের হজ্জ কনট্রাক্টার ফি ৭. মক্কা ও মদিনা শরীফের বাড়ি ভাড়া ৮. সৌদি আরবে অবস্থানকালীন খাওয়া-দাওয়া ও কোরবানি খরচ যা হাজিদেরকে বাংলাদেশেই ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ করতে গেলে সুবিধা হলো, আপনার সকল দায়িত্ব হজ্জ বিষায়ক মন্ত্রনালয় বহন করে আপনি যে কেটাগোরিত টাকা জমা দেবেন আশা করা যায় সেই সুযোগ সুবিধাই পাবেন। বিগত বছরগুলোর আলোকে বলা যায়, সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রী মক্কা মদীনায় মোটামোটি কাছাকাছি রাখে। অপর পক্ষে সৌদি আরবে অবস্থানকালীন খাওয়া-দাওয়া খরচ যা হাজিদেরকে বাংলাদেশেই ফিরিয়ে দেয়া হয় যাব ফলে খুব সহজে বাংলাদেশী হোটেল থেকে চাহিদামত খাবার খাওয়া যায়। যে পরিমান টাকা দেয় তা দিয়ে খাবার খেতে কোনই সমস্যা হয় না।

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ করতে গেলে অসুবিধা হলো, আপনি যদি একটু চালি না হন তবে বেশ ঝামালায় পড়তে হবে। কেননা অনেক সময় মুয়াল্লিম বা হজ্জের গাইড পাবেন না। তাই নিজের হজ্জের সকল কাজ নিজেকেই করতে হতে পারে। অনেক সময় থাকার রুমটিও নিজেকে খুজে নিতে হয়। যদিও সরকার আপনার জন্য মুয়াল্লিম বা হজ্জের গাইড রেখেছেন। খাবার যেহেতু বাইরে থেকে খেতে হয় তাই একটু বাড়তি কষ্ট করতে হয়। কেননা প্রাইভেট হজ্জ-এজেন্সির মধ্যমে গেলে ওরা আপনার খাবার রুমে পৌছে দেয়।  

খ। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জঃ 

বাংলাদেশে শতকরা ৯৫ ভাগ লোক বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জে গমন করে। আমাদের দেশে ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি মাধ্যমে মুসলিমদের হজ্জে পাঠিয়ে থাকে। এই সকল ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে সরকারই হজ্জে পাঠানোর লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। যে সকল ট্রাভেল এজেন্সিদের এই লাইসেন্স আছে সেই সকল ট্রাভেল এজেন্সি হজ্জের জন্য লোক পাঠাতে পারেন। আর এই পদ্ধতিকেই বেসরকারি হজ্জ ব্যবস্থাপনা বলা হয়। আমরা অনেকেই দেখে থাকবো নিজ নিজ এলাকাই বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় এমন অনেক লোক আছে যাদেরকে মোয়াল্লেম বলা হয়ে থাকে, যারা আপনাকে হজ্জে নিয়ে যাবার জন্য চেষ্টা করতে থাকে এরাই সাধারনত বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মোয়াল্লেম। কারন সাধারনত সরকারি ব্যবস্থাপনার কোন মোয়াল্লেম এই কাজ করে থাকেন না। বেসরকারি হজ্জ ব্যবস্থাপনায় একটা সুবিধা হচ্ছে আপনি নিশ্চিত সহকারে একজন মোয়াল্লেম বা গাইড পাবেন। আর সেইটা আপনার পরিচিত মোয়াল্লেমটিই হোক বা আপনার কাফেলার অন্য কোন মোয়াল্লেমই হোক। এই ছাড়া দ্বিতীয় কোন সুবিধা পাবার আশা মোটেও করবেন না। কারন বেশি আশা করলে সেই আশা অনুযায়ি ভরসা না পাইলে বেশি কষ্ট পাবার সম্ভাবনা থাকে। আপনার থাকার জায়গা হবে দুই রকম। 

প্রথমতো, হয় আপনি মক্কাই যেই জায়গায় প্রথমে উঠবেন সেই জায়গায় শেষ পর্যন্ত থেকে যাবেন। এমন ক্ষেত্রে আপনার থাকার জায়গাটি হবে নিম্ন মানের। যা আপনার সাথে প্রতারনা করা হবে। কারন আপনার কাছে তারাতো টাকা কম নেয় নাই যে, এমন পরিবেশে রাখবে। তারা টাকা ঠিকই নিয়েছে শুধু মাত্র প্রফিট বেশি করার জন্য নিম্নমানের হোটেল বা বাসাতে রাখবে।

দ্বিতীয়তো, আপনি মক্কাই যে জায়গায় প্রথমে উঠবেন মদিনা থেকে আসার পর তা পরিবর্তন হবে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ফেতরা। এই ক্ষেত্রে আপনি প্রথম টার্মে হারাম শরিফের কাছে অবস্থান করলে দ্বিতীয় টার্মে আপনাকে দূরে নিয়ে চলে যাবে। এতটাই দুরে যে হারাম শরিফে এসে নামাজ পড়াটাই হয়তো আপনার হবে না; সহজ্জ কোন ব্যবস্থা না থাকাই। আর প্রথম দিকে নিম্ন পরিবেশে থাকলে পারের দিকে একটু ভাল হটেলে নিবে, অথবা প্রথম দিকে একটু ভাল হটেলে থাকলে পরের টার্মে নিম্ন মানের হটেলে নিবে।

খাবারের মান হবে নিম্ন মানের। আপনাকে যে খাবার দেওয়ার কথা সেই ধরনের খাবার আপনি পাবেন না। হাজীদের কি খাবার পরিবেশন করা হবে তার মেনু অনেক আগেই প্রস্তুত হয়ে থাকে যা আপনি হয়তো জানতেই পারবেন না আপনাদের মেনুতে কি কি খাবার আছে। কারন বেসরকারি মোয়াল্লেম গুলো আপনাকে এই ব্যপারে কিছুই জানাবেনা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, সহজ্জ ভাষাই বলতে গেলে বলতে হয় মোয়াল্লেমদের কথার সাথে কাজের কোন মিল নাই।

বেসরকার ব্যবস্থাপনায় হজ্জে যেতে তাদের সম্পর্কে জানুনঃ

আমাদের দেশের অধিকাংশ হজ্জ এজেন্সিগুলো তাদের দেয়া সুযোগ সুবিধার কথা ঠিকমত রাখেন না। কাজেই বেসরকারি হজ্জ এজোন্সির মাধ্যম হজ্জে গমন করতে চাইলে আপনানে ঐ হজ্জ এজোন্সি সম্পর্ক আগে ধারনা নিতে হবে। এই জন্য আপনার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব যারা আগে হজ্জে গমন করেছেন তাদের পরামর্শ নিবেন। মনে রাখবেন বেসরকারি হজ্জ এজোন্সির ও হাজিদের বিভন্ন ক্যাটাগরি আছে। আপনার শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন। যে সব এজেন্সির সুনাম, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সরকারের অনুমোদন রয়েছে সে গুলোর মধ্যে কোনো একটি তালাশ করে বের করুন। তবে নিম্মের বিষয়গুলো ভালো কর জেনেনিনঃ

ক। এজেন্সিকে কত টাকার দিতে হবেঃ

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জে যেতে চাইলে প্রথমে আপনি জেনে নিবেন, এজেন্সিকে কত টাকার দিতে হবে। তবে আপনি টাকা কম-বেশির ভিত্তিতে নয়, প্যাকেজের সুবিধাদি দেখে, শুনে, বুঝে চুক্তি করবেন। বিমানভাড়া, বাসাভাড়া, হজ্জেরর সময় মিনায় তাঁবুতে বা অন্য কোন স্থানে থাকা না–থাকা, কুরবানি, ফিতরা ইত্যাদি আগে থেকে জেনে নিতে হবে।

খ। কত দিনের প্যাকেজঃ

হজ্জে গমন করলে আপনাকে কতদিন কোথায় রাখবে, মক্কায় কত দিন, মদীনায় কত দিন, সৌদি আরবে অবস্থানের মেয়াদ কত দিন, এই সকল স্থান আপনাকে কি কি সুযোগ সুবিধা দিন প্রশ্ন করে যেনে নিবেন।


গ। মক্কা মদীনার বাসস্থানঃ

মক্কা-মদিনার যত দিন থাকবেন এই দিনগুলিতে আপনাকে কোন ধরনের বাসায় রাখবে? মসজিদে হারমা থেকে আপনাকে কত দুরে রাখা হবে? এই সকল বিষয় ষ্পষ্টভাবে জেনে নিবেন।  কারন অনেকে কাছে রাখার কথা বলে ঠিকই কিন্তু হজ্জে গমনের পর আর কথামত স্থানে রাখে না।

ঘ। খাবারঃ

অনেক হজ্জ এজোন্সি আপনাকে দৈনিক তিন বেলা খাবার দিবে না। সকালের নাস্তা অনেক হজ্জ এজোন্সি দেয় না। অনেক সময় হাজ্জিগণ ফরজ সালাত থেকে আসতে দেরী করে বিধায় সকলকে এক সাথে খাবার পৌছাতে ঝামেলা হয় বিধায হজ্জ এজোন্সি এই সিন্ধান্ত নেয়। কাজেই আপানি হজ্জ এজোন্সি জিজ্ঞাসা করুন যে, সৌদি আরবে পৌঁছে তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে কি না? যদি না দেয় তবে খাবারের বিকল্প ব্যবস্থা কী? তা জানতে হবে। মিনায় বা আরাফাতের ময়দানে অনেক হজ্জ এজোন্সি খাবার সঠিকভাবে পৌছাতে পারে না। এই বিষয়গুলো জিজ্ঞাসা করে ক্লিয়ার করে নিবেন।

ঙ। কুরবানিঃ

বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ হাজ্জিই তামাত্তু হজ্জ করে থাকন। তাই আমাদের সবার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব হয় থাকে। প্রথম পছন্দ হলো, নিজে হাজির থেকে কুরবানী করা। কিন্তু অধিকাংশের পক্ষে সম্বব হয় না। দ্বিতীয় অপসন হলো, প্রতারণা এড়াতে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবির কুপন কিনে দেওয়া ভালো। কিন্তু অনেক ভাই মোয়াল্লেম এর মাধ্যমে কুরবানী প্রদান করে, প্রতারণার শিকার হয়। তাই বিষয়টি আগে পরিস্কার করে নিবেন যে, কুরবানির টাকা কি হজ্জের প্যাকের অন্তরভূক্ত ? নাকি কুরবানির টাকা নিজেকে দিতে হবে।?


চ। হজ্জের সময় ফিতরা করেঃ

সরকার ঘোষিত হজ্জ প্যাকেজের চেয়ে কম টাকায় হজ্জে গেলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক হজ্জ এজোন্সি সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে কম নেয়। কম টাকা নেয়ার প্রধান কারন তারা মক্কার কম টাকায় বাড়িভাড়া করে। হামার থেকে থাকার স্থান যত দুরে তার ভাড়াও কম। তাই অনেক হজ্জ এজোন্সি হাজিদের প্রথম দিকে মক্কা নিয়ে যায় এবং কাবার খুবই নিকটে রাখে। হজ্জের ১০/১২ দিন আগে মদীনা নিয়ে যায়। হজ্জের দিন ঘনিয়ে এলে, আবার মক্কার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। হজ্জের সকল কার্যক্রম শেষ করার পর কাবা থেকে ৪০/৫০ মাইল দুর রাখে। এভাবে মক্কার থাকার স্থান একবার কাবার নিকটে, আবার একবার কাবার দুরে থাকে। এমন কি এই কাজটি তারা একাধিকবারও করে থাকে। এই স্থানান্তর করা কে ফিতরা বলে। কাজেই হজ্জ এজোন্সি সাথে কথা বলার সময় জেনেনিন আপনাকে ফিতরা করাবে কিনা। ফিতরা করালে আগে না পরে।

ছ। হজ্জের দিনগুলোঃ

হজ্জের দিনগুলো হল ৮ জিলহজ্জ থেকে ১৩ হজ্জ। এই ৬ দিন হাজ্জিগন মিনা, আরাফা ও মিজদালিফায় কাটায়। এই সময় হজ্জ এজোন্সিগগুলো ইচ্ছা থাকা সত্বেও আপনার চাহিদামত সুযোগ সুবিধা দিতে পারে না। টয়লেট, বাথরুমের থাকার স্থানের পাশাপাশী খাবারের ও সংকট থাকে কারন এই সকল স্থানে রান্না করার কোন সিস্টেম নাই। এই সময় অবিজ্ঞ হজ্জ এজোন্সি ছাড়া অনেকেই খাবার সঠিক সময় প্রদান করতে পারেনা। এ বিষয়টিও আপনি আলোচনায় অন্তরভুক্ত করে নিতে পারেন। কোন কারনে সমস্যা হলে আপনার সবর করা সহজ্জ হবে।

হজ্জ এজোন্সির নিবন্ধ আছে কিনা যাচাই করুনঃ

ইন্টার নেট সার্স দিলেই আপনি জানতে পারবেন হজ্জ এজোন্সির সরকারি নিবন্ধ আছে কিনা। সরকারি নিবন্ধ নাই এমন কোন হজ্জ এজোন্সি কে কখনও টাকা দিবেন না। খরচের হিসাব এবং কী-কী সুবিধা আপনি তাদের কাছ থেকে পাবেন, এ ব্যাপারে মৌখিক নয়, বরং লিখিত চুক্তি করুন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, চুক্তি করেন আর যাই করেন না কেন, হাতেগোনা কিছু এজেন্সি ছাড়া বাকি সকলের কর্তৃক ঘোষিত সুযোগ সুবিধা থেকে আপনি খুব করুণভাবে বঞ্চিত হবেন।

ভাল মুয়াল্লিম আছে কিনা?

হজ্জের জন্য আমার নিকটি এই বিষয়টি উপরের প্রত্যকটি বিষয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমি হজ্জে গমনের পর থাকা খাওয়া একটু কষ্ট হলেও মেনে নেয়া যায় কিন্তু এত কষ্টের পরও যদি শুনতে পান হজ্জের অনেক আমলই সঠিকভাবে করা হয় নাই। যদি একজন সহিহ আকিদার আলেমের সাথে হজ্জ করতে পারেন তবে আপনার হজ্জটি মাবরুর হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। অপর পক্ষে একজন বিদআতি মুয়াল্লিমের সাথে হজ্জ করলে আপনার আমলটি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও শতভাগ। হজ্জ এজেন্সীর মালিক কেমন? এটি আপনাকে জানতে হবে। কেননা, তিনি তার মতাদর্শী আলেমকেই মুয়াল্লিম হিসাবে নিয়োগ বিবেন। কাজেই হজ্জ এজেন্সী পছন্দ করার ক্ষেত্র মালিকের আকিদা বিশ্বাস সম্পর্ক আগে ভালভাবে জেনে নিন। তিনি যদি সহিহ আকিদায বিশ্বাসি হন তবে তিনি সহিহ আকিদার মুয়াল্লিমই নিয়োগ দিবেন। আর সহিহ আকিদার মুয়াল্লিম মানে আপনার হজ্জে সঠিকভাবে সম্পন্না করা পথে। এর পাশাপাশি আপনার চেষ্টা থাকবে,  সহিহ আকিদার হক্কানি আলেম বা নেককার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির সফর-সঙ্গী হওয়া। এরফলে আপনার হজ্জ ও উমরা পালনসহ সহজ্জ হবে। বিশেষ করে ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে-থাকা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

প্রাক নিবন্ধের পর কাজঃ

প্রাক নিবন্ধের করেছেন যার অর্থ হচ্ছে আপনি এখান হজ্জে যাওযার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তত। এখন আর কোন কাজ আধাআধা করা যাবে। সকল প্রয়োজনীয় কার পাকাপাকি করে করতে হবে। কোন কাজে কোন প্রকার সিথিলতা প্রদর্শণ করা যাবে না। প্রাক নিবন্ধের পর নিম্মের কাজগুলো খুবই গুরুত্ব দিয়ে করেত হবে।

পাসপোর্ট তৈরি করাঃ

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আপনার পাসপোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ন দলিলঃ। জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো পাসপোর্টও প্রমাণ করে যে আপনি বাংলাদেশের নাগরিক। দেশে মধ্যে জাতীয় পরিচয় পত্রই যথেষ্ট কিন্তু বিদেশে পাসপোর্টে ছাড়া চলবে না। কাজেই হজ্জে যাইতে চাইলে আপনাকে অবশ্য পাসপোর্ট লাগবে। এটি হজ্জে যাওয়ার জন্য আপনার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আবেদন ফরম করতে নিম্মর ধাপের কাজগুলো করতে হবে।

ক. আবেদন ফরস সংগ্রহঃ

পাসপোর্ট করতে চাইলে প্রথমে আপনাকে আবেদন ফরস সংগ্রহ করতে হবে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয় এবং জেলা কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া ইন্টারনেট থেকেও আবেদন ফরম ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা যায়।

খ. ব্যাংকে টাকা জমা দেয়াঃ

ফরম পূরণের আগেই টাকা জমা দিতে হবে কারণ অনলাইনে আবেদন ফরমে ঐ ব্যাংকের রিসিট নম্বর এবং ফি জমা দেয়ার তারিখ সংযুক্ত করতে হবে। ব্যাংকে পাসপোর্ট ফি জমা দেয়ার জন্য আপনাকে সশরীরে ব্যাংকে যেতে হবে। বাংলাদেশের পাসপোর্ট অফিস কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাংকের শাখাতে আপনি পাসপোর্টের ফি জমা দিতে পারবেন। যেসব ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারবেন সেগুলো হলোঃ সোনালী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংক। রেগুলার পাসপোর্ট সাধারণত এক মাসের মধ্যে পাওয়া যায়। এর জন্য ফি একটু কম আর ইমার্জেন্সি বা আর্জেন্ট পাসপোর্ট পাওয়া যায় ৭/১০ দিনের মধ্যে। এর জন্য ফি প্রায় দ্বিগুন।

গ. ফরম পূরণঃ

আবেদন ফরস সংগ্রহ এবং ব্যাংকে টাকা জমা করার পর নিজে আথবা আপনার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে ফিলাপ করে নিবেন। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন ফরম পূরণ করা যায়। তাই আর ফরমের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না আর দালালের খপ্পরে পরতে হয় না। তাই অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে মনে রাখবেন, আপনার অনলাইনে সাবমিট করা ফরমের তথ্য ১৫ দিন ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। তাই অবশ্যই অনলাইনে ফরম পূরণের ১৫ দিনের মধ্যে তা পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে যেতে হবে।

ঘ. ফরম জমা দেয়ার পূর্ববর্তী কাজ

এবার আপনাকে পূরণকৃত ফরমটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে হবে। তার আগে ফরম গোছাতে হবে। এই জন্য প্রথমে আপনার পূরণ করা অংশ ছাড়াও কিছু স্থানে আপনার স্বাক্ষর দিতে বলা আছে সেখানে আপনার স্বাক্ষর দিন এবং ফরমের সাথে জমা দানের জন্য নিম্মর সকল কাগজপত্র রেডি করতে হবে।

১. সত্যায়িত চার কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি (৫৫×৪৫ মি.মি.)।  ছবি অবশ্যই সদ্য তোলা হতে হবে এবং সাদা পোশাক, টুপি ও সানগ্লাস পরে ছবি তোলা যাবে না।

২. জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি লাগবে।

৩. চেয়ারম্যান/ ওয়ার্ড কমিশনার প্রদত্ত সনদ/ ভোটার আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্রের বিকল্পস্বরূপ) এবং বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানির বিল/ বাড়ির দলিলের ফটোকপি ইত্যাদি।

৪. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র/ পরিচয়পত্র।

৫. ছাত্র/ছাত্রীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত প্রত্যয়ন পত্র/ পরিচয়পত্র দাখিল করতে হবে।

৬. অফিসিয়াল পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক জিও (GO)/ এনওসি(NOC) দাখিল করতে হবে।

৭. ব্যাংকের টাকা জমা দেয়ার রশিদটি

ঙ. ফরম জমাদান

ফরম জমা দেয়ার নির্ধারিত দিন পাসপোর্ট অফিসে খুব সকাল সকাল যাওয়াই উত্তম কারণ অনেক ভীড় হয়ে থাকে। সরাসরি আপনার ফরম সাথে নিয়ে উপস্থিত সেনা সদস্যকে জানান আজ আপনার ছবি তোলার দিন নির্ধারিত আছে। তিনি আপনাকে দেখিয়ে দিবে কোথায় ফরম সহ আপনাকে যেতে হবে। অবশ্যই সাদা পোশাক পরবেন না, ফরমাল পোশাক পরিধান করে যাবেন। সেদিন আপনার ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া ইত্যাদি কাজ করা হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে পুলিশ ভেরিফিকেশন। যদি আপনার স্থায়ী আর বর্তমান ঠিকানা আলাদা হয়, তবে দুই জায়গাতেই পুলিশ ভেরিফিকেশান হয়ে থাকে।

চ. পাসপোর্ট সংগ্রহঃ

প্রোসেসিং চলার মাঝেই আপনার কাজ হয়ে গেলে মোবাইলে একটি মেসেজ আসবে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিস থেকে। এটি আপনার পাসপোর্ট বুঝে নেয়ার তারিখ। আপনি নির্ধারিত সময়ে গিয়ে পাসপোর্টটি বুঝে নিয়ে আসুন। পাসপোর্ট সংগ্রহের পর আপনার পাসপোর্ট ভেরিফাইড হয়েছে কি না অন লাইলে যাচাই করুন।

আর্থিক প্রস্ততিঃ

ইবাদতের কবুলের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, হালাল পন্থায় উপার্জন। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত যে, হারাম উপর্জনের অর্থে হজ্জ করতে গেলে তা আল্লাহর কাছে কবুল করবেন না। হারাম উপার্চজিত টাকায় হজ্জে গিয়ে ‘লাববাইক’ বললে আল্লাহ তার লাববাইক প্রত্যাখ্যান করেবেন।

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু ক্ববূল করেন না। আল্লাহ তাঁর রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মু’মিনদেরকেও সেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত”। (সূরা মুমিনূন-৫১)। তিনি আরো বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক্ব দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর”।(সূরা বাক্বারা-১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে ক্ববূল হতে পারে। (তিরমিজি ২৯৮৯)

এই কারনে হজ্জে গমন করার নিয়ত করেছেন তো রিজকের প্রতি লক্ষ রাখুন। হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে নিজের ও পরিজনের প্রয়োজন মেটানো ও সম্পূর্ণ হালাল রিজিক-সম্পদ থেকে পাই-পাই করে একত্রিত করা। যদি হালাল রিজিক উপার্জন করে হজে যাওয়ার মতো টাকা জোগাড় করতে না পারেন তবে আপনার ওপর হজ্জ ফরজ হবে না। হজে আপনাকে যেতেই হবে, কথা এ রকম নয়। বরং পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে হজ্জে যাওয়ার খরচা হাতে আসলে তবেই কেবল হজ্জ ফরজ হয়। তাই কখনো হারাম পয়সায় হজ্জ করার পরিকল্পনা করবেন না। যদি এমন হয় যে আপনার সমগ্র সম্পদই হারাম, তাহলে আপনি তাওবা করুন। হারাম পথ বর্জন করে হালাল পথে সম্পদ উপার্জন শুরু করুন। আর কোনো দিন হারাম পথে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করুন। এক পর্যায়ে যখন প্রয়োজনীয় হালাল পয়সা জোগাড় হবে কেবল তখনই হজ্জ করার নিয়ত করুন।

হালাল পন্থায় উপার্জিত অর্থ দ্বারাই হজ্জে গমনের জন্য আপনি নিবন্ধ করবেন। আপনার কষ্টে অর্জিত হালাল টাকা সব সময় আপনার হাতে রাখতে হবে এবং হজ্জ এজেন্সীর চুক্তি মাফিক পরিশোধ করুন। যদি মনে করে থাকেন, হজ্জের দেরী আছে কাজেই টাকাটা একটু খাটিয়ে রাখি তা হলে আপনার প্রয়োজন টাকা নাও পেতে পারেন। হজ্জের টাকার গচ্ছিত থাকলে কোন প্রকার চিস্তা থাকবেনা। ব্যবসায় খাটালে বা ধার দিলে হজ্জের সময়ের দিকে খেয়াল রাখুন। অনেক সময় হজ্জ এজেন্সী এক সাথে টাকা নেয়। তাই আপনি টাকাগুলো গচ্ছিত না রাখলে পেরেশানিতে পড়তে পারেন। আর যখন হজ্জ এজেন্সীকে টাকা দিবেন তখন পাকা রসিদ ব্যতীত টাকার দিবেন না। কেবল বিশ্বাসের উপর টাকা দিয়ে এর আগে অনেক হজ্জযাত্রী প্রতারিত হয়েছেন।

হজ্জ এজেন্সির টাকা পরিশোধের পরও আপনার নিকট অতিরিক্ত ৩০/৪০ হাজার রাখতে হবে। সমর্থ থাকলে আরও বেশী টাকা সঙ্গে নিয়ে যাবেন। হজ্জের সফরের সময় এই টাকার অর্ধেটা রিয়াল এর মাধ্যমে পরিবর্তন করে নিবেন। প্রয়োজনে মক্কা ও মদীনাতেও টাকা পরিবর্তন করে রিয়াল করা যায়। এই টাকার আপনি আপনার প্রয়োজনের সময় ব্যয় করতে পারবেন। যেমন, কোনো ভুলের কারণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দম ওয়াজিব হয়ে গেলে হাদি কিনতে টাকা লাগবে, সহযাত্রী হাজিদের আপ্যায়ন করতে টাকার লাগবে, কোন অভাবী হাজিদেরকে সাহায্য করতে টাকা লাগবে, দেশে কারো জন্য যদি কিছু হাদিয়া তোহপা কিনতে টাকার প্রয়োজন হবে। কোন কারনে ক্ষুধা-পিপাসা পেলে কার্পণ্য না করে প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ করতেও টাকা লাগবে।

হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনঃ

হজ্জ মহান আল্লাহ নির্দেশিত একটি ফরজ ইবাদাত। আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিটি ইবাতেরই সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম পদ্ধতি থাকে। এই নিয়ম পদ্ধতিগুলিও মহান আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ প্রদত্ত ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখান পদ্ধতিতেই হজ্জের আমল করতে হয়। এই সুনির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতি বাহিরে কোন আমল করলে হজ্জ হবে না। বরং মনগড়া নতুন ইবাতদের মধ্য বিদআদের সম্পৃক্ততা থাকে বিধায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মনগড় আমল প্রত্যাখাত করতে বলেছেন। কাজেই হজ্জে গমনের পূর্বে আপনাকে হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তিনটি পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।

ক। অন্যদের জিজ্ঞাসা করেঃ

কোন বিষয় নিজে না জানলে অন্যকে জিজ্ঞাসা করে জানার মধ্যে কোন লজ্জা নাই। ইসলমি শরীয়তের ক্ষেত্র এই কাজটি ফরজ। অর্থাৎ কোন আমল সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে সেই বিষয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। মহান আল্লাহ বলেন,

** فَاسْأَلُواْ أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে। (সুরা নাহল ১৬:৪৩)

যে সকল মুসলিমভাই আগে হজ্জ করেছেন তাদের নিকট থেকে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করা যায়। তারা হজ্জে গমনের সময় কি কি সমস্যায় পতিত হয়েছেন। তাদের থাকা খাওয়া সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। তারাই বলতে পারবেন, কি ভাবে ইবাদাত করলে হজ্জের মৌসুমটি কাজে লাগান যাবে। মক্কা, মদীনা, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফায় কি কি আমল, কখন কিভাবে আদায় করা যায়। কোন কাজটি হজ্জের জন্য ফরজ, কোন কাজটি হজ্জের জন্য ওয়াজিব, কোন কাজটি হজ্জের সুন্নাহ এই সকল বিষয় তাদের নিকট থেকে হজ্জে গমনের আগেই জেনে নিতে হবে। এমনকি কোন কাজটি করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে বা কোন কাজটি করলে কাফ্ফারা হিসাবে দম দিতে হবে। এই সকল বিষয় হজ্জে অভিজ্ঞ মুসলিম ভাইদের নিকট থেকে শিখতে হবে। তাছাড়া নিজ মহল্লাহ সমজিদের ইমাম যদি শিক্ষতি আলেম হয় তবে তার নিকটও প্রশ্ন করে হজ্জের বিভন্ন মাসয়ালা মাসায়েল শিখে নেয়া যায়।

খ। সরাসরি হজ্জ সংক্রান্ত বই পড়েঃ

যারা মোটামুটি শিক্ষিত তাদের জন্য এই কাজটি খুবই সহজ্জ। কেননা বর্তমানে হজ্জের উপর বহু গ্রন্থ লেখা হয়েছে। যে কোন বইয়ের দোকানে গেলেই ইচ্ছামত ভালো ভালো আলেমদের গ্রন্থ ক্রয় করে পড়া যায়। তবে গ্রন্থ ক্রয়ের আগে একটু খোজ খবর নিতে হবে। বাজারে ফাজায়েলে হজ্জের মত সহিহ, জাল ও যঈফ মিশ্রিত গ্রন্থও আছে। যাদের এ্যান্ডোয়েড মোবাইল আছে তারা একটু খোজখবর নিয়ে সঠিক হজ্জ সংক্রান্ত এ্যাপ ডাউনলোড করতে পারেন। আবার বিভিন্ন ওয়েব সাইডে বহু বিশুদ্ধ হজ্জ সংক্রান্ত গ্রন্থ আছে।  এই সকল বই ডাউনলোড করেও পড়তে পারেন। মোট কথা হজ্জের প্রাক নিবন্ধ করে আর বসে থাকবেন না। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে হজ্জ সংক্রান্ত বই পড়েতে থাকবেন। দেখবেন কয়েক মাসের মধ্যেই আপনি হজ্জের প্রায় সকল নিয়ম কানুন আয়ত্য করতে পেরেছেন।

মন্তব্যঃ হজ্জের উপর অনেক প্রচলিত বই আছে যা গতানুগাতিভাবে লেখা। এই সকল বই না পড়াই ভালো। বই পড়ার আগে বাচাই করুন কোন কোন আলেমের লেখা বই বড়বেন। যে সকল বইয়ে কুরআন সু্ন্নাহ দলিল প্রমানসহ লিখেছেন, পড়ার ক্ষেত্রে তাদের বই অগ্রাধিকার দিবেন। 

গ। হজ্জ প্রশিক্ষনে অংশ গ্রহন করেঃ

বর্তমানে অনেক বিজ্ঞ আলেম মহান আল্লাহকে খুসি করার জন্য হজ্জ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছেন। তারা ৩/৭ দিন ব্যাপি প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন। অনকে আবার প্রতি শুক্রবার প্রশিক্ষন দিয়ে থাকেন। তারা হজ্জের কার্যক্রম হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এই সকল প্রশিক্ষনে অংশগ্রহন করলে আশা করা যায় হজ্জ সম্পর্কে ভাল একটি আইডিয়া হবে যাবে। অনেক সময় স্থানীয় মসজিদের ইমামগনও নিজ উদ্দেগ্যে হজ্জযাত্রীদের জন্য প্রশিক্ষনের আয়োজন করে থাকে। এই সকল প্রশিক্ষন অংশ গ্রহন করে হজ্জ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা উচিত।

ইহাছাড়া, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রীদের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহে সুবিধা মত সময়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে হজ্জ যাত্রার ৩ দিন পূর্বে হজ্জ ক্যাম্পে অবস্থানের সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বেসরকারি হজ্জ এজেন্সিগুলোর কোনো-কোনোটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৌদি আরব গমনের পূর্বেই একদিন ব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মনোযোগের সাথে অংশগ্রহণ করা উচিৎ।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাঃ

হজ্জের মৌসুমে প্রতিটি জেলায় সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেও বিশেষ বিশেষ হাসপালকে এই বোর্ড গঠনের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। এই মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমেই সরকার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করে থাকেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি এই বোর্ড কর্তৃক মেনিনজাইটিস প্রতিরোধক টিকা প্রদান করে থাকেন। এই টিক নেয়া প্রত্যেক হজ্জযাত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক। কেননা এই টিকা ছাড়া মেডিকেল সার্টিফিকেটের প্রদান করা হয় না। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা নিয়ে এ বোর্ড থেকে আপনাকে মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। জেলা পর্যায়ে এ কাজটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে ঢাকায় হজ্জ ক্যাম্পে এসে সম্পূর্ণ করবেন। এই মেডিকেল সার্টিফিকেট ব্যতীত হজ্জে যাওয়া সম্ভব হবে না।

পুলিশের ছাড়পত্রঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনার হোক আর বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় কোন সকল প্রকারের হাজিদের জন্য পুলিশের ছাড়পত্র লাগবে। পুলিশ ছাড়পত্র না পেলে আপনাকে ইমিগ্রেশন পুলিশ দেশ ত্যাগ করতে দিবে না। কেননা, বিচাধীন কোন  আসামিকে হজ্জের জন্য ছাড়পত্র প্রদান করা হয় না। এই লক্ষে হজ্জ কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নিকট ছাড়পত্রের জন্য হজ্জযাত্রীদের তালিকা প্রেরণ করেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সেরে হজ্জ কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহন করে থাকেন।

হজ্জযাত্রা করার পূর্বে করণীয়

হজ্জ ক্যাম্পে আসাঃ

সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ গমনের ক্ষেত্রে হজ্জ অফিস বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে আপনার ফ্লাইট সিডিউল জেনে নিন। কবে কখন হজ্জ ক্যাম্পে আসতে হবে জেনে সেভাবে নিজেকে প্রস্তত রাখু্ন। বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্জ গমনের ক্ষেত্রে একটু সহজ্জ। আপনি যে লোকের মাধ্যমে হজ্জের যাবতিয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন তার সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখবেন। তিনি যে দিন যেভাবে আপনাকে হজ্জ ক্যাম্প আসতে বলবেন ঠিক সেভাবেই আসবেন।

দেনা পাওনা পরিশোধ করাঃ

মহান আল্লাহই জানেন সফর থেকে ফিরে আসতে পারব কিনা। এই জন্য সফরের আগে সকল প্রকারের দেয়া পাওনা পরিশোধ করে দেয়া। পাওনা পরিশোধের পর যদি সফরের খরচ চালানোর মত টাকা পয়সা না থাকে তবে তার উপর হজ্জ ফরজ নয়। কাজেই হজ্জে যাওয়ার আগেই আপনাকে পাওনা পরিশোধ করে দিতে হবে।  তবে আপনি যদি বড়ো ব্যবসায়ী হন, ঋণ করা যার নিত্যদিনের অভ্যাস বা প্রয়োজন, তাহলে আপনার গোটা ঋণের ব্যাপারে একটা আলাদা অসিয়ত নামা তৈরি করুন। আপনার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার যারা হবেন তাদেরকে এ বিষয়ে দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে আমি তাঁর বিদায় হাজ্জের বক্তৃতায় বলতে শুনেছিঃ ধার করা বস্তু ফেরত দিতে হবে, যামিনদার পাওনা পরিশোধকরার দায় বহন করবে এবং ঋণ পরিশোধ করতে হবে। (সুনানে তিরমিজ ১২৬৫, ইবনু মাজাহ ২৩৯৮)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ঋণ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে সক্ষম ব্যক্তির টালবাহানা করা অন্যায়। তোমাদের কারো পাওনা পরিশোধকরার জন্য ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি কোন সক্ষম ব্যক্তির উপর দায়িত্ব দিলে তা অনুমোদন করা উচিত।(সুনানে তিরমিজ ১২৬৫, ইবনু মাজাহ ২৪০৩)

মন্তব্যঃ হজ্জের সফরের সব কিছু করা হয়েছে, এখন আর হজ্জের সফর বাতিল করা সম্বব নয়। আবার পাওনা পরিশোধের মত সম্পদও নেই। এই ক্ষেত্রে হজ্জে যাওয়ার আগে দেনা-পাওনা বিষয়ে একটি অসিয়তনামা লিখে যেতে হবে এবং উক্ত অসিয়তনামায় একজনকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে হবে।

আমানত থাকলে তা পৌছে দিতে হবেঃ

আপনার কাছে কেউ কোনো জিনিস আমানত রেখে থাকলে তা মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে। যে কোন কারনে আপনার সফর দেরী হতে পারে, সফরে মারা যেতে পারেন তাই আমানতকারীদের সকল প্রকার আমানাত বুঝিতে দিতে হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ তোমার কাছে আমানাত রাখলে তা তাকে ফেরত দাও। যে ব্যক্তি তোমার সাথে খিয়ানাত করেছে তুমি তার সাথে খিয়ানাত করো না। (আবু দাউদ ৩৫৩৫, তিরমিজি ১২৬৪)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি, কথা বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। (সহিহ বুখারি ২৬৮২)

দ্বীন ও দুনিয়ার সম্পর্কে অসিয়াত করাঃ

হজ্জে যাওয়ার আগে দ্বীন ও দুনিয়ার সম্পর্কে অসিয়াত করে সফরে যাওয়া একটি মুস্তাহাব আমল। আপনার অনুপস্থিতে আপনার সম্পদ, ব্যবসা, জমিজমা, টাকা পয়সা কিভাবে খরচ করবে তার জন্য আপনার ছেলে, মেয়ে এবং অধিনাস্ত কর্মচারীদের ভালো করে উপদেশ দিয়ে বুঝিয়ে যায়। শুধু দুনিয়ার ব্যাপারে নয় দ্বীন সম্পর্কেও ছেলে-সন্তান, পরিবার পরিজনকে তাকওয়া পরহেজগারির ব্যাপারে বুঝান এবং তাদের মেনে চলতে অসিয়ত করুন। তারা যেন আপনার অনুপস্থিতিতে আরো বেশি একাগ্রতা নিয়ে দ্বীন-ধর্ম মেনে চলতে পারে এবং কোনো প্রকার পাপ কর্মের ধারে কাছেও না যায়। খারাপ লোকদের সাথে না মিলামিসা না করে। সালাত আদায়ের ব্যাপারে সতেষ্ট থাকে।

সাবার কাছ থেকে বিদায় নিতে হবেঃ

হজ্জে সফরের আগে পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, আলেম-ওলামা ও আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বলে-কয়ে বিদায় নেয়া মুস্তাহাব। যাদের কাছ থেকে বিদায় নিবে তাদের নিকট সফর আরাম দায়ক হওয়ার জন্য দোয়া চাবেন। তাদেরও উচিত আপনার সফরের সাফাল্য কামনা করে দোয়া করা।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিদায় দিয়ে বলেন, আমি তোমাকে আল্লাহর আমানতে সোপর্দ করলাম, যাঁর নিকট সোপর্দকৃত জিনিস ধ্বংস হয় না। (ইবনে মাজাহ ২৮২৫)

প্রয়োজনীয় কাজগপত্র একত্র করাঃ

যে সকল কাগজপত্র এত দিন আপনি অনেক কষ্ট বা শ্রম করে সংগ্রহ কবছেন হজ্জে গমনের পূর্বে এই সকল প্রয়োজনীয় কাজগপত্র একত্র করে একটি ছোট ব্যাগে রাখুন। কমপক্ষে নিম্মের কাগজপত্রগুলি ব্যাগে করে সবসময় সঙ্গে রাখাবেন।

ক। আপনার পাসপোর্ট

খ। মেডিকের সার্টিফিকেট

গ। বিমানের টিকেট (যদি পেয়ে থাকেন)

ঘ। কিছু সৌদি মুদ্রা/রিয়াল (সাথে বাংলাদেশী টাকা)

ঙ। টাকা জমা দানের রশীদ 

ব্যক্তিগত জিনিসপত্রঃ

সফরের সময় আপনার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনেক কিছু নিতে হবে। আপনি প্রতিদিন যে সকল জিনিসপত্র ব্যবহার করেন তা আপনাকে সঙ্গে করে নিত হবে। একজন মানুষের অনেক কিছুই লাগে। আপনার প্রয়োজনি সবকিছুই আপনি নিতে পারবেনা। তবে যা না হলে আপনার চলতে খুবই কষ্ট হবে তা কিন্তু নিতেই হবে। এই হিসেবে নিম্ম লিখিত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আপনার সাথে নিতে হবে।

১. কাগজপত্রের ব্যাগ। (পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, টিকিট, ডকুমেন্ট ইত্যাদি)

২. পুরুষের জন্য ইহরামের কাপড় (কমপক্ষে ২ সেট)

৩. নারীদের জন্য ইহরামের কাপড় নাই তবে ঢিলেঢালা সিলাই যুক্ত ফরমাল পোশাক (৪ সেট)

৪. কমপক্ষে ০২ জোড়া ফিতাওয়ালা নরমাল স্যান্ডেল

৫. গামছা/তোয়ালে, লুঙ্গী, গেঞ্জী, পায়জামা, পাঞ্জাবী, সার্ট ইত্যাদি নিতে হবে (কমপক্ষে ২ সেট)

৬. সাবান, টুথপেস্ট, ব্রাশ, মিশওয়াক, নেইল কাটার, সুঁই-সুতা, নোটবুক, কলম ইত্যাদি নিতে হবে

৭. থালা, বাটি, গ্লাস ইত্যাদি

৮. একটি এ্যান্ডোয়েট মোবাইল ফোন নিতে হবে

৯. নরমাল মোবাইল ফোন হলে হজ্জ সংক্রান্ত বই বা কিছু ইসলিম বই নেয়া জেতে পারে

১০. প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র (ব্যবস্থাপত্রসহ) এবং অন্তত দুইটি চশমা নিতে হবে (যাদের আইভিষণ আছে)

১১. নারীদের জন্য বোরখা নিতে হবে (০২ টি)

১২. মালপত্র নেওয়ার জন্য একটি ব্যাগ (এজেন্সী দিবে) এবং অন্য একটি ছোট হাত ব্যাগ নিতে হবে

১৩. ইহরাম পরার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হলে কটি বন্ধনী (বেল্ট)

১৪. কোমর বন্দী বেল্ট  পাসপোর্ট ও টাকা পয়সা সাথে রাখার জন্য

১৫. একটি টুকরা পরিত্র মাটির চাকা (প্রয়োজনে তাইয়ামুম করা জন্য)

১৬· বাংলাদেশি টাকা (দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার জন্য)

মন্তব্যঃ ইহার বাহিরে আপনার কোন জিনিস থাকলে সংযোগ করতে পারেন। আবার যদি মনে করেন এখান থেকে কোন জিনিস বাদ দিবেন দিতে পারেন। জিনিসের সংখ্যাও কমবেশী করেত পারেন। এটা একটা ধারনা মাত্র।

হজের সময় যেসব পরিহার করবেন

১. টিনের ট্রাঙ্ক, ভারী স্যুটকেস, ভারী কম্বল ও পানির বালতি ইত্যাদি সাথে নেওয়া ঠিক হবে না।

২. ক্যাসেট অথবা সিডি সঙ্গে নিবেন না। কারণ, এর জন্য ইমিগ্রেশন চেক করতে পারে।

৩. পচনশীল অথবা গলে যেতে পারে এমন খাবার নিবেন না। যেমন- ফল, চকলেট, দুধ ইত্যাদি।

৪. পুরুষরা সিগারেট, স্বর্ণের আংটি, স্বর্ণের চেইন (সবই হারাম) সঙ্গে নিবেন না।

৫. মহিলারা ভারী অলঙ্কার সঙ্গে নিবেন না।

৬. শরীরে তাবিজ, কবজ ও ফিতা ইত্যাদি বাঁধা থাকলে তা খুলে ফেলে শির্ক মুক্ত হয়ে যান। কারণ শির্ক ইবাদত কবুল হওয়ার অন্তরায়!

৭. সঙ্গে ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা সাথে না নেওয়া ভালো। কারণ, এতে আপনার ইবাদতের মনসংযোগ নষ্ট হবে।

৮. নখ কাটার মেশিন, সুই-সুতা, কেঁচি, চাকু ইত্যাদি সব সময় মেইন বড় লাগেজে রাখবেন।

হজ্জের জন্য সফর শুরু

হজ্জের সফরের আপনার রুট হবে। বাড়ি থেকে প্রথমে ঢাকার আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে আসবেন। এখানে ৩/৪ দিন থাকার পর শাহজালাল এয়ার পোর্ট হয়ে জেদ্দা বিমান বন্দন সৌদি আবর জেতে হবে। বর্তমান সিলেট ও বন্দর নগরী চট্রগাম থেকেও সরাসরি হজ্জ ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। তাই সকল হাজ্জিকে এখন আর ঢাকা আসতে হবে না। জেদ্দা থেকে অধিকাংশ হাজিকে মক্কা নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কিছু হাজিকে সরাসরি মক্কা না এনে, মদীনা হয়ে মক্কা আনা হয়।

ঢাকায় হজ্জ ক্যাম্পে করণীয়ঃ

হজ্জ অফিস সাথে যোগাযোগ রাখবের। তারা আপনাকে একটি অনুমতিপত্রে পাঠাবে যাতে হজ্জ ক্যাম্পে হাজির হওয়ার নির্ধারিত তারিখ থাকবে। তাদের দেয়া তারিখ মোতাবেগ সকাল ১০টার মধ্যে হজ্জ ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করবেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্জযাত্রীগন এজেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী হজ্জ ক্যাম্পে হাজির হবেন। এখানে সাধারনত তিন দিন থাকতে হয়। কিন্তু ফ্লাইট সিডিউলের কারনে অনেক সময় কমবেশী হবে পারে। আবরা যাদের বাসা ঢাকা শহরে তারা এক দিন আগে আসলেও হয়। তবে এ সম্পর্ক এজেন্সির সাথে কথা বলে নিতে হবে। কেননা অনেক এখান এসেই হজ্জের প্রয়োজনীয় বিষয় ব্রীফ করে থাকে। অনেক সময় হজ্জ ক্যাম্পে দুই একদিন  আগেপিছে আসতে হয়। এই সংবাদ হজ্জ এজেন্সি বা হজ্জ অফিসের আপনাকে জানিয়ে দিবে। হজ্জ ক্যাম্পে রিপোর্ট করার সময় সরকারী ব্যবস্থাপনার হাজি হোক আর বেসরকারি হাজ্জি হোক সবাই পূর্বের দেয়া পরামর্শ মোতাবেগ কাগজপত্র এ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে আসবের। তবে হজ্জ অফিস বা হজ্জ এজেন্সি যদি অতিরিক্ত কোন কিছু আনতে বলে তার প্রতিও খেয়ার রাখবেন। সবসময় এজেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে হবে।

হজ্জ ক্যাম্প ডরমিটরিতে শুধুমাত্র হজ্জযাত্রীদের অনুমতি দেয়া হয়। তাই আত্মীয় স্বজন সাথে আনা উচিৎ নয়। তবে নীচ তলায় আত্মীয় স্বজনগণ তাদের হজ্জযাত্রীকে নানাবিধ দাপ্তরিক কাজে সহায়তা দিতে পারেন। হজ্জ ক্যাম্পে পান খাওয়া বা ধূমপান করা নিষিদ্ধ। প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহের জন্য রয়েছে ৩ টি ক্যান্টিন যা খোলা থাকে রাত দিন ২৪ ঘণ্টা। তাই বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। টিকিট, পিলগ্রিম পাস, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য কাগজপত্র খুবই যত্নের সহিত সংরক্ষণ করবেন। এ গুলো হারিয়ে গেলে হজে যাওয়া সম্ভব হবে না। মালামাল বহনের জন্য যে লাগেজ বহন করবেন তার গায়ে নাম, পিলগ্রিম পাস নং ও ঠিকানা লিখে নেবেন। যদি দেখেন, আপনি কোন জিনিস আনতে ভুলে গেছেন অবথা আপনার কোন জিনিক কম আনা হয়েছে হজ্জ ক্যাম্পের নিচ থেকে এই জিনিসগুলো কিনে নিতে পাবেন। যারা প্রয়োজনীর জিনিস যোগাড় করেত পারেন নাই তারাও এখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনির সংগ্রহ করতে পারেন।

এখানে আসার পর আপনার পাসপোর্টের ফটোকপি নিয়ে একটি সৌদি আবরের সিম ফ্রিদেন আপনি সিমটি সংগ্রহ করে একটিভেট করার সিস্টেম জেনে নিন। আর আপনার সিমের নাম্বারটি নিজের আত্মিয় স্বজনদের জানিয়ে দিবেন। যাতে করে আপনি সৌদি আরবে কোন কারনে যোগাযোগ করতে না পারলে তারাই  আপনার সাথে যোগাযোগ করে নিতে পারে।   

সফর শুরুর আগে একজন আমির নির্বাচন করাঃ

সফরে সকলে মিলে একজনকে আমির নির্ধারণ করা মুস্তাহাব। এতে করে যে কোন বিষয়ে সহজে সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়, এবং ঐক্য সুদৃঢ় হয়।

১. আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ব্যক্তি একত্রে সফর কলে তারা যেন নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর বানায়।(আবু দাইদ ২৬০৮)

২. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ব্যক্তি একত্রে সফর করলে তারা যেন তাদের একজনকে আমীর নিযুক্ত করে। নাফি‘ (রহঃ) আবূ সালামাহকে বললেন, তাহলে আপনি আমাদের নেতা। (আবু দাইদ ২৬০৯)

হজ্জ ক্যাম্প থেকে প্রস্থানঃ

আপনি আগেই জেনেছেন আপনার ফ্লাইট কবে এবং কখন। সেই অনুসারে আপনি আগে থেকেই হজ্জ ক্যাম্প হাজির আছেন। নির্ধারিত তারিখে আপনার মুয়াল্লিম আপনাকে নিয়ে কমপক্ষে চার ঘন্টা আগে বিমান বন্দের মধ্যে ঢুকে যাবে। কেননা, আপনাকে বিভিন্ন নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হব আর এতে কিছু সময়ও লাগবে। বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র এবং আপনার ব্যাগ নিয়েছেন কিনা দেখে নিন। যেমন, ছোট ব্যাগ যাতে পাসপোর্ট, ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র, ভিসা ইত্যাদি রাখা এবং লাগেজ বা বড় ব্যাগ যাতে সব প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র। এরপর মোয়াল্লিমের কথা মত সবকিছু নিয়ে হজ্জ ক্যাম্প থেকে নির্দিষ্ট বাসে করে বিমান বন্দের দিকে জেতে হবে। আপনার ভ্রমন সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ

হতেপর্যন্তদূরত্ব (আনুমানিক)সময় (আনুমানিক)
ঢাকা বিমানবন্দরজেদ্দা বিমানবন্দর৩২৫৩ মাইল/৫২৩৪ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বিমানে)
জেদ্দা বিমান বন্দরমক্কা৫৫ মাইল/৯০ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
জেদ্দা বিমানবন্দরমদীনা২৮০ মাইল/৪৫০ কি.মি৬-৭ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কামদীনা৩০৫ মাইল/৪৯০ কি.মি৭-৮ ঘণ্টা (বাসে)
মক্কাআরাফা১৪ মাইল/২২ কি.মি
মক্কামিনা৫ মাইল/৮কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
মিনাআরাফা৯ মাইল/১৪ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
আরাফামুযদালিফা৮ মাইল/১৩ কি.মি২-৩ ঘণ্টা (বাসে)
মুযদালিফামিনা১.৬ মাইল/২.৫ কি.মি১-২ ঘণ্টা (বাসে)
ভ্রমণের রুটভারত, আরব সাগর, মাস্কট/দুবাই হয়ে সৌদি আরব।
সময়ের ব্যবধানতিন ঘণ্টা (ঢাকায় সকাল ৯টা, মক্কায় তখন সকাল ৬টা)
সৌদি ফোন কোড+৯৬৬XXXXXXXX (আমাদের যেমন +৮৮০XXXXXX)

বিমান বন্দরে করণীয়ঃ

বিমানে উঠার আগে বিমান বন্দরে কিছু ফর্মালিটি অনুসরণ করতে হয়। বিষয়গুলি শুধু হজ্জের জন্য প্রযোজ্য নয়, সকল নতুন যাত্রী যারা বিমানে প্রথম ভ্রমন করছেন তাদের সকলের জন্যই প্রযোজ্য। যারা হজ্জে গমন করেন তাদের অধিকাংশই প্রথম বিমানে ভ্রমন। বিমান ভ্রমন সম্পর্ক অনেকের সাধারণও নাই। তাই বিষয়টি একটু আলোকপাত করছি।

বিমান বন্দরে চেক ইনঃ

বিমান বন্দর টার্মিনালে ঢোকার পর আপনাকে প্রথমেই চেক ইন করতে যেতে হবে। এখান প্রথম ধাপে আপনাকে একটি মেটাল ডিটেকটর মেসিনের মধ্য দিয়া যেতে হবে। আর আপনার সকল লাগেজ বা ব্যাগগুলো একটি স্কান মেসিনের মাধ্যমে স্কান করা হবে। এই স্কানের উদ্দেশ্য হলো, আপনার কাছে বা আপনার লাগেজের মধ্য কোন প্রকার বিপদজনক বস্তু নাই।

লাগেজ মজাদানঃ

আপনার বড় ব্যাগ যাতে আপনি আপনার সকল জিনিস রেখেছেন তা আপনার সাথে রাখতে পারবেন না। এই বড় ব্যাগটি জমা দিতে হবে। আপনার ফ্লাইট খুলে দেয়ার পরই আপনি এটা করতে পারবেন। টার্মিনালের মনিটর এবং বোর্ডের দিকে খেয়াল রাখুন। আপনাকে আপনার টিকেট, পরিচয়পত্র, ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে হবে। এখানে আপনি আপনার লাগেজ জমা দেবেন। চেক ইন অফিসার আপনাকে বোর্ডিং পাস এবং লাগেজের জন্য একটি কার্ড দেবেন। আপনি বডিং পাশ ও লাগেস কার্ড যত্ম করে রাখবেন হারালে বীপদ আছে। বডিং পাশের সাহায্যে আপনি ডিপার্চার লাউঞ্জে (যেখান থেকে বিমান উঠান হবে) ঢুকতে পারবেন। আর লাগেস কার্ডের সাহায্য আপনি জেদ্দায় নিজের লাগেজ বা ব্যাগ খুজে পাবেন।

ইমিগ্রেশন পুলিক কর্তৃক চেকঃ

আপনি যেহেতু দেশের বাইরে যাচ্ছেন তাই আপনাকে ইমিগ্রেশন তথ্য চেক করা হবে। আপনিকি বৈধভাবে না অবৈধভাবে যাচ্ছে তা চেক করাই ইমিগ্রেশন অফিসারের কাজ। ইমিগ্রেশন অফিসারের চেক করার পূর্বে ভ্রমন সংক্রান্ত এক পৃষ্ঠার একটি ফরম ফিরাপ করতে হবে। ফরম ফিলাপ করে লা্‌ইলে দাড়ান এক একজন করে তার নিকট যেতে হবে। আপনাকে সবরকম ডকুমেন্ট দেখাতে হবে এখানে। পাসপোর্ট, ভিসা, ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি। ইমিগ্রেশন পুলিম আপনার আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের আইরিস নিবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আপনাকে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করেত হবে। আর যদি কোনকিছু সন্দেহজ্জনক মনে হলে তারা আপনার ফ্লাইট বাতিল করতে পারে। এখানে বিভিন্ন ধরনের দোকান আছে আপনি ইচ্ছামত সময় কাটাতে থাকুন আর খেয়াল রাখুন কখন আপনার ডাক আসে। আপনার ফ্লাইটেন রুট, নম্বর  এবং কত নম্বর গেট দিয়ে বডিংএ ঢুকবেন তা কয়েকবার মাইকিং করে জানিয়ে দিবে। এই সকল তথ্য আবার টিবির মত স্কিনেও দেখান হয়। যা হোক চোককান খোলা রাখুন।

বোর্ডিং

বোর্ডিং কার্ড দেখে আপনাকে এবার ডিপার্চার লাউঞ্জে (যেখান থেকে বিমান উঠান হবে) ঢোকান হবে। আপনার বডিং পাশের একটি অংশ কেটে রাখা হবে। এখানে আবার আপনাকে এবং আপনার ছোট ব্যাগ যা আপনি সাথে রেখেছেন তা স্কান করা হবে। আগে চেক থেকে এখানে আরও একটু কড়াকড়ি চেক করা হবে। যদি আপনার নিকট পানিজাতীয় কিছু, টুথপেষ্ট, ছুরি, কেচি, নেইল কাটার, সুই ইত্যাদি থাকে তবে তা আর নিতে দেয়া হবে না। এখানে রেখে দেয়া হবে। আপনার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, জ্যাকেট, ল্যাপটপ নিতে দিবে। তবে এই সকল বস্তু বাইরে রেখে আপনাকে চেক করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে সিকিউরিটি অফিসার আপনার হ্যান্ডব্যাগ এবং বোর্ডিং পাসে স্ট্যাম্প দেবেন।

বিমানে উঠার পরঃ

ডিপার্চার লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে থাকুন। কিছু সময় পরই আপনাদের বলা হবে বিমান রেডি আপনারা আসুন। সাধারনত বিমান এনে ডিপার্চার লাউঞ্জে সাথে লাগিয় দেয়া হয়। ডিপার্চার লাউঞ্জের গেটি খুলেই বিমান উঠা যায়। কিন্তু বিমান যদি ডিপার্চার লাউঞ্জ থেকে দুরে থাকে তবে বাসে করে যেয়ে উঠতে হয়। বিমান উঠার পর আপনার সবগুলো ঝামেলার কাজই শেষ। এখন আর কোন চিন্তা নেই। আপনার সীটে বসে পড়ুন। বোর্ডিং পাসে সীট নাম্বার দেয়া থাকে। অনেক ছোট এয়ারলাইন্সে হয়ত সীট নাম্বার নাও দেয়া থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি যেকোন সীটে বসতে পারেন। তবে মহিলা এবং বৃদ্ধদের জন্য সীট আছে কিনা খেয়াল করবেন। সব যাত্রীরা প্রবেশ করলে প্লেনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। প্লেন টেক-অফ করার আগে কিছু সতর্কতা মূলক নির্দেশনা দেয়া হবে। দুশ্চিন্তা করবেন না। টেক-অফ করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, শব্দও বাড়তে পারে। এধরণের শব্দ হয় সীট বেল্ট এলার্ম বা স্মোকিং এলার্ম হিসেবে। সীটবেল্ট সিগন্যাল যখন দেখা যাবে তখন দাঁড়ানো যাবে না। প্লেন যখন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে যাবে তখন এই সিগন্যাল বন্ধ করে দেয়া হবে। এরপর আপনি ফ্রেশ হতে উঠতে পারবেন বা খাবার খেতে যেতে পারবেন। বিমানের ভিতরে আপনাকে হালকা খাবার দেয়া হবে। বিমানের ভিতরে জরুরী প্রয়োজনে টয়লেট আছে কিন্তু পানির পরিবর্তে টিসু পেপার ব্যবহার করতে হবে। বিমান উঠার আগেই অজু করে নিবেন। কিন্তু অজু ভেঙ্গে গেলে তাইয়্যামুম করে নিতে হবে। কোন কিছু বুঝতে সমস্যা হলে আপনার মুয়াল্লিমকে বলুন। বিমানের ভিতরে অনুমানের ভিত্তিতে কোন কাজ করবেন না। যা জানুন তাই করুন।।।

ল্যান্ড করার পরঃ

আস্তে আস্তে বিমান জেদ্দার দিকে এগিয় যাবে। বিমান অপতরনের সময় আপনি টের পাবেন যে বিমান নিচের দিকে যাচ্ছে। বিমানের চাকা রানওয়ে স্পর্শ করলে শব্দ বাড়তে থাকে আর গতি ধীর হতে থাকে। বিমান অনেক সময় ল্যান্ড করা পরও টার্মিনালে যেতে সময় নয়। কেননা জেদ্দা বিশার বিমান বন্দর। বিমান থামার সাথেই দাঁড়িয়ে যাবেন না। আপনাকে সিট বেল্ট খোলার নির্দেশনা দেওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কোন তথ্যের জন্য তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। তারা আপনাকে সহযোগিতা করবেন।

জেদ্দা বিমান বন্দরে বিমান থেকে বিশ্রাম কক্ষে গিয়ে অপেক্ষা করুন। ইমিগ্রেশন অফিসে আপনাকে আপনার পাসপোর্ট দেখাতে বলবেন। এখানেও আপনার আঙ্গুলে ছাপ ও আইরিস নেয়া হবে। বিমান বন্দরে যে বিশ্রাম কক্ষ হতে বহির্গমন বিভাগে গিয়ে পিলগ্রিম পাসে সিলমোহর লাগাতে হবে। এখানে আপনাকে লাইন বেঁধে বসতে হবে। পিলগ্রিম পাসে সিল লাগানো সম্পূর্ণ হলে আপনার ব্যাগ সংগ্রহ করবেন। ব্যাগ মেশিনে স্ক্যান করিয়ে মূল বিল্ডিং থেকে বের হয়ে যাবেন। বের হওয়ার গেটেই ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ আপনার কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে নেবে যা আপনি জায়গা মতো পেয়ে যাবেন।

একটু সামনে এগোলে কিছু অফিসার দেখতে পাবেন। তারা আপনার পিলগ্রিম পাসে বাসের টিকিট লাগিয়ে দেবে। কোনো একটি টিকিট অব্যবহৃত থেকে গেলে তার পয়সা দেশে আসার সময় ফেরত পাবেন যা জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে সংগ্রহ করে নিতে হবে।

বাংলাদেশের পতাকা টানানো জায়গায় গিয়ে পাসপোর্টে মুয়াল্লিমের স্টিকার লাগাবেন। এরপর বাসে ওঠার জন্য লাইন ধরে দাঁড়াবেন। আপনার মাল-সামানা গাড়িতে ওঠানো হল কি-না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন। বাসে ওঠার পর ড্রাইভার হজ্জ যাত্রীদের পিলগ্রিম পাস (পাসপোর্ট) নিয়ে নেবেন, এবং মক্কায় পৌঁছে হজ্জ কন্ট্রাক্টর কাছে সেগুলো হস্তান্তর করবেন।

মক্কায় পৌছে করণীয়ঃ

জেদ্দা থেকে গাড়ি সরাসরি মক্কা যাবে। বাস থেকে নেমে প্রথমে নিজের মাল-সামানা সংগ্রহ করে নেবেন। মাল-সামানা নিয়ে সরকার অথবা এজেন্সির ভাড়া-করা বাসায় আপনার জন্য নির্দিষ্ট করেদেয়া কক্ষে গিয়ে উঠবেন। প্রথমে মক্কায় এসে থাকলে গোসল করে খাওয়া দাওয়া সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে উমরা আদায়ের প্রস্ত্ততি নিন। সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতাধীন হলে আপনার ফ্ল্যাটে অথবা আপনার নাগালের মধ্যে কোনো আলেম আছেন কিনা তা জেনে নিন। আলেম না পেলে হজ্জ উমরা বিষয়ে যাকে বেশি জ্ঞানসম্পন্ন মনে হবে তার নেতৃত্বে উমরা করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। যাওয়ার পথে কিছু জিনিসকে আলামত হিসাবে নির্ধারণ করবেন যাতে হারিয়ে গেলে সহজেই আপনার বাসা খুজে বের করতে পারেন। আলেম অথবা নেতা নির্ধারণের সময় হকপন্থী কিনা, তা ভালো করে যাচাই করে নেবেন। অন্যথায় আপনার উমরা নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

মক্কায় পৌঁছার পর মুয়াল্লিম অফিস থেকে দেয়া বেল্ট সবসময় সঙ্গে রাখবেন। এ বেল্টে মুয়াল্লিম অফিসের নম্বর লেখা আছে, যা আপনি হারিয়ে গেলে কাজে লাগবে। ঘর হতে বাইরে যাওয়ার সময় বেশি টাকা পয়সা সঙ্গে রাখবেন না। কেননা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে অথবা পকেটমারের পালায় পড়তে পারেন। আর সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলার চেষ্টা করবেন। একা কখনো ঘরের বাইরে যাবেন না যতক্ষণ না আপনার বাসার লোকেশন ভালভাবে আয়ত্ব করতে না পারেন।

রোদের মধ্যে বাইরে বেশি ঘোরা-ফেরা করবেন না। প্রচুর ফলের রস ও পানি পান করবেন। প্রয়োজনে লবণ মিশিয়ে পান করবেন। অনেকেই একের পর এক উমরা করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকবেন। শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করলে বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের ডাক্তার অথবা সৌদি সরকার কর্তৃক স্থাপিত চিকিৎসাকেন্দ্রসমূহে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ সংগ্রহ করবেন। এ ব্যাপারে কোন অলসতা করা উচিৎ হবে না। কেননা হজ্জের কার্যক্রম অসুস্থ শরীর নিয়ে সম্পন্ন করা খুবই কঠিন। হজ্জ এজেন্সি বা মুয়াল্লিমের সাথে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে ঠান্ডা মাথায় সমাধানের চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশ হজ্জ মিশনের কর্মকর্তাদের সাহায্যও নিতে পারেন, যদি প্রয়োজন মনে করেন।

কিছু যোগাযোগের ঠিকানা জেনে রাখুনঃ

১। ঢাকা বাংলাদেশ হজ্জ অফিস

ঠিকানা: হজ্জ অফিস, আশকোনা, এয়ারপোর্ট, ঢাকা।

ফোন: ডিরেক্টর (৮৯৫৮৪৬২), সহকারী হজ্জ অফিসার (৭৯১২৩৯১), স্বাস্থ্য (৭৯১২১৩২)

আইটি হেল্প: ৭৯১২১২৫, ০১৯২৯৯৯৪৫৫৫

২। জেদ্দায় বাংলাদেশি দূতাবাস

যোগাযোগের ঠিকানা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কনস্যুলেট জেনারেল

পিও বক্স-৩১০৮৫, জেদ্দাহ ২১৪৯৭, সৌদি আরব।

অবস্থান: ৩ কিলোমিটার, পুরাতন মক্কা রোডের কাছে (মিতশুবিশি কার অফিসের পেছনে) নাজলাহ, পশ্চিম জেদ্দা, সৌদি আরব।

ফোন: ৬৮৭ ৮৪৬৫ (পিএবিএক্স)

৩। জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন

লোকেশন: জেদ্দা ইর্ন্টারনেশনাল এয়ারপোর্ট (বাংলাদেশ প্লাজার নিকটবর্তী)।

ফোন: +৯৬৬-২-৬৮৭৬৯০৮। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৬৮৮১৭৮০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৬৩৪৬৭।

ই-মেইল: jeddah@hajj.gov.bd

৪। মক্কায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন

লোকেশন: ইবরাহীম খলীল রোড, মিসফালাহ মার্কেট ও গ্রিনল্যান্ড পার্কের সামনে।

ফোন: +৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮০,৫৪১৩৯৮১। ফ্যাক্স:০০-৯৬৬-২-৫৪১৩৯৮২

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৬৬৪।

ই-মেইল: makkah@hajj.gov.bd

৫। মদীনায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন:

লোকেশন: কিং ফাহাদ রোড জংশন ও এয়ারপোর্ট।

ফোন: +৯৬৬-০৪-৮৬৬৭২২০।

আইটি হেল্প: +৯৬৬৫৬২৬৫৪৩৭৬।

ই-মেইল: madinah@hajj.gov.bd

৬। মিনায় বাংলাদেশ হজ্জ মিশন:

লোকেশন: ২৫/০৬২ সু-কুল আরব রোড ৬২, ৫৬, জাওয়হারাত রোডের সামান্তরালে।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: প্রথম কিস্তি

সালাতের কসর করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাতের কসর করাঃ

কসর একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হলো কম করা, কমানো। কোন মুসলিম যখন সফরে থাকে তখন তিনি চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত আদায় করে। সালাত কমিয়ে আদায় করাকেই সালাতে কসর বলা হয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, যে ব্যক্তি ভ্রমণ বা সফর করে তাকে সফররত অবস্থায় মুসাফির বলে। আবার যখন নিজ বাড়ী বা বাসভবনে চলে আসে তখন শরিয়তের পরিভাষায় তাকে বলে মুকিম। মুকিম অর্থ হল, নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী। অর্থাৎ শুধু মুসাফির ব্যক্তিই সালাতের কসর আদায় করবে। মুকিম কখনও সালাতের কসর আদায় করবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

 وَإِذَا ضَرَبۡتُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ فَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَقۡصُرُواْ مِنَ ٱلصَّلَوٰةِ إِنۡ خِفۡتُمۡ أَن يَفۡتِنَكُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ‌ۚ إِنَّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ كَانُواْ لَكُمۡ عَدُوًّ۬ا مُّبِينً۬ا (١٠١) 

অর্থঃ আর যখন তোমরা সফরে বের হও তখন নামায সংক্ষেপ করে নিলে কোন ক্ষতি নেই৷ (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে৷ কারণ তারা প্রকাশ্য তোমাদের শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷  (সুরা নিসা ৪:১০১)।

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা সফরত অবস্থায় সালাত কসর করতে বলেছেন। আয়াতটি সরল অনুবাদ দেখলে মনে হয় কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার  আদায় করেত হবে শান্তির অবস্থায় নয়। এই সরল অনুবাদ করে ‘যাহেরী’ ও ‘খারেজী’ ফিকাহর অনুসারীরা বলে থাকে কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার জন্য আর শান্তির অবস্থায় যে সফর করা হয় তাতে কসর করা কুরআন বিরোধী। কিন্তু নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতের মাধ্যমে হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) এই একই সন্দেহটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সামনে পেশ করলে তিনি এর জবাবে বলেন আল্লাহ পক্ষ থেকে সাদাকা বলেছে। হাদিসটি হলঃ

ইয়ালা ইবনু উমায়্যা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে বললাম, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “যদি তোমরা ভয় পাও যে, কাফিররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে, তরে সালাত সংক্ষেপ করে পড়াতে কোন দোষ নেই” কিন্তু এখন তো লোকেরা নিরাপদ। উমর (রাঃ) বললেন, বিষয়টি আমাকেও বিস্মিত করেছে, যা তোমাকে বিস্মিত করেছিল। তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম ও এর জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি একটি সাদাকা। তোমরা তাঁর সাদাকাটি গ্রহণ কর। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৪৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইয়া‘লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘উমারের কাছে নিবেদন করলাম, আল্লাহ তা‘আলার বাণী হলো, ‘‘তোমরা সলাত কম আদায় করো, অর্থাৎ ক্বসর করো, যদি অমুসলিমরা তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে বলে আশংকা করো’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪: ১০১)। এখন তো লোকেরা নিরাপদ। তাহলে ক্বসরের সালাত আদায়ের প্রয়োজনটা কি? ‘উমার (রাঃ) বললেন, তুমি এ ব্যাপারে যেমন বিস্মিত হচ্ছো, আমিও এরূপ আশ্চর্য হয়েছিলাম। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ব্যাপারটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সলাতে কসর করাটা আল্লাহর একটা সাদাকা বা দান, যা তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন। অতএব তোমরা তাঁর এ দান গ্রহণ করো। (মিসকাত ১৩৩৫ থেকে নেয়া, আরও আছে সহীহ মুসলিম ৬৮৬, আবূ দাঊদ ১১৯৯, আত্ তিরমিযী ৩০৩৪, নাসায়ী ১৪৩৩, ইবনু মাজাহ্ ১০৬৫, আহমাদ ১৭৪, দারিমী ১৫৪৬, ইবনু খুযায়মাহ্ ৯৪৫, ইবনু হিব্বান ২৭৩৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৩৭৯, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১০২৪)।

হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপদ অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে মিনায় দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করেন। (সহীহ বুখারী – ১০২২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মহানবী (সাঃ) প্রত্যেক সফরেই কসর করে নামায পড়েছেন এবং কোন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত নেই যে, তিনি কোন সফরে নামায পূর্ণ করে পড়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি নবী (সাঃ), আবূ বাক্‌র, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর সাথে সফরে থেকেছি। কিন্তু কখনো দেখি নি যে, তাঁরা ২ রাকআতের বেশী নামায পড়েছেন।’ ( মিশকাত ১৩৩৮, বুখারী ১১০২, মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩)

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা দিলাম। সেই সফরে তিনি মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত দু’ রাক’আত দু’ রাক’আত করে সালাত আদায় করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি মক্কায় কতদিন ছিলেন? তিনি বললেন দশ দিন।(সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ এই সকল সফর ছিল স্বাভাবিক, কোন যুদ্ধের জন্য সফর ছিল না। তাই সাধারনত যে কোন মুসাফিরই সালাতের কসর করতে পারবে যদি সে সফরের শর্থের মাঝে থাকে।

সফরের দুরত্ব কতটুকু?

আল্লাহ্‌ তা’আলা নির্দিষ্টভাবে সফরের কোন দুরত্ব নির্ধারণ করেননি। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও সফরের দুরত্ব নির্ধারণের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় না। কুরআন সুন্নাহে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা না পাওয়ার কারনে মুজতাহীদ আলেমদের মাঝে এ সম্পর্কে বিশাল মতভেদ আছে। উলামাগণের মাঝে অনেক মত পার্থক্য রয়েছে। ইবনুল মুনযির ও অন্যান্যদের বর্ণনায় প্রায় ২০টি মত রয়েছে।

তবে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় যুহরের সালাত চার রাক্‘আত আদায় করেছেন। তবে যুল হুলায়ফায় ‘আসরের সলাত দু’ রাক্‘আত আদায় করেছেন। (মিসকাত ১৩৩৩, সহীহ  বুখারী ১৫৪৭, মুসলিম ৬৯০, নাসায়ী ৪৭৭, আহমাদ ১২৯৩৪, ইবনু হিব্বান ২৭৪৭, ইরওয়া ৫৭০, আবূ দাঊদ ১২০২।

এই হাদিসের আলোকে ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ক্বসরের সর্বনিম্ন সীমা হলো ৩ মাইল। তিনি দলিল পেশ করেছেন এই সহিহ হাদিস থেকে। হাফিয আসক্বালানী (রহঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে এটাই অধিক বিশুদ্ধ হাদীস।

আর যারা এ মতের বিরোধী তারা বলেন যে, আলোচ্য হাদীস দ্বারা ক্বসর শুরু উদ্দেশ্য, সফরের শেষ গন্তব্য নয়। অর্থাৎ যখন সে দীর্ঘ সফরের ইচ্ছা করবে এবং তিন মাইল দূরত্বে পৌঁছার পর থেকে সে কসর করবে। যেমন হাদিসের অর্থের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় চার রাকআত সলাত আদায় করলেন এবং যুল হুলায়ফায় দু’ রাকআত সলাত আদায় করলেন। অর্থাৎ সফর শুরু করে তিন মাইল অথবা তিন ফারসাখ পরিমাণ দূরত্বে গেলেই সালাত কসর করতে হবে।

সহিহ মুসলিমে এসেছেঃ আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন।(সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

সহিহ মুসলিমে আরও এসেছেঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৭ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইমাম শাফি‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম মালিকরাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্য ফিকহবিদের মত, পূর্ণ একদিন সফরের দূরত্বের কমে সলাত ক্বসর করা যাবে না। আর তা হলো চার বারদ, আর চার বারদ হলো ১৬ ফারসাখ অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা ৮০ কিলোমিটার। কারণ এক বারদ হলো চার ফারসাখ, আর এক ফারসাখ সমান তিন মাইল। (মিসকাতের সফর অধ্যায়)

কোন কোন মুজতাহীদ ৮০ কিলোমিটার এর মত নির্ধিষ্ট পরিমাণ দুরত্ব উল্লেখ না করে বলেছেনঃ সমাজে প্রচলিত রীতিনীতিতে বা দেশীয় প্রথায় যাকে সফর বলা হয় তাতেই নামায কসর করবে। যদিও তা ৮০ কিলোমিটার না হয়। আর মানুষ যদি তাকে সফর না বলে, তবে তা সফর নয়, যদিও তা ১০০ কিলোমিটার হয়। এটাই শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এর মত। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

মন্তব্যঃ প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কেননা ইমামগণ সবাই মুজতাহিদ বা গবেষক। এক্ষেত্রে কোন দোষ হবে না ইনশাআল্লাহ্‌। কিন্তু বর্তমানে মানুষের প্রচলিত রীতিনীতি যেহেতু সুনির্দিষ্ট তাই ইহা গ্রহণ করাই অধিক সঠিক। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

সফরে কত দিন পর্যান্ত কসর সালাত আদায় করা যাবে?

মুসাফির যখন সফরের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন কতদিন অবস্থান করলে সে সালাত কসর করবে এ ব্যাপারে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। সাহাবিদের যুগ থেকেই এ ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। যার ফরে আমরা হাদিসের মধ্যও দিনের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য দেখতে পাই। তাই যখন কোন মুজতাহীদ হাদিসের আলোকে বায় প্রদান করেন, তখন তিনি যেটা অধিক সঠিক মনে করছেন তার উপর রায় প্রদান করেন। অন্য মুজতাহীদ হয়ত অন্য হাদিসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই সাহিবী নয় মুজতাহীদ আলেমদের মাঝেও দিনের সংখ্যা নিয়ে মতদেভ আছে। প্রথমে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস লক্ষ করিঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং সালাত কসর করেন। কাজেই (কোথাও) আমরা উনিশ দিনের সফরে থাকলে কসর করি এবং এর চাইতে বেশী হলে পুরোপুরি সালাত আদায় করি। (সহীহ বুখারী  ১০১৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভ্রমণে গিয়ে ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি দু’ রাক্‘আত করে ফরয সালাত আদায় করেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরাও মক্কা মাদীনার মধ্যে কোথাও গেলে সেখানে ঊনিশ দিন অবস্থান করলে, আমরা দু’ রাক্‘আত করে সলাত আদায় করতাম। এর চেয়ে বেশী দিন অবস্থান করলে চার রাক্‘আত করে সলাত ক্বায়িম করতাম। (মিসকাত ১৩৩৭ হাদিসের মান সহিহ। আত্ তিরমিযী ৫৪৯, ইবনু মাজাহ্ ১০৭৫)

৩. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মক্কা থেকে মদিনায় গমণ করি, আমরা মদিনা ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি দু’রাকা’আত, দু’রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। (রাবী বলেন) আমি (আনাস (রাঃ) কে বললাম, আপনারা মক্কায় কত দিন ছিলেন তিনি বললেন, আমরা সেখানে দশ দিন ছিলাম (সহীহ বুখারী ১০২০ এবং সহিহ মুসলিম ১৪৫৯, ইসলামি ফাউন্ডেশনের প্রকাশনায়)

এক বছরের হাদিস, ছয় মাসের হাদিস

উপরের হাদিসগুলিতে ১৯ দিন, ১০দিন, ছয়মাস ও একবছর দেখতে পাই। আসলে সবগুরি হাদিসই সঠিক। উম্মাতের মাঝে এ সম্পর্কি ভুল বুঝাবুঝি দুর করার জন্য এক এক মুজতাহীদ আলেম এক একটি মতামত প্রদান করেছেন। তাদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ চারটি মতামত বা রায় তুলে ধরছি।

প্রথম মতামতঃ শাফি‘ঈ ও মালিকী রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন চার দিনের অতিরিক্ত অবস্থান করবে তখন সলাত পূর্ণ করবে।

দ্বিতীয় মতামতঃ আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন ১৫ দিনের বেশী অবস্থান করবে, তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

তৃতীয় মতামতঃ ইমাম আহমাদ ও দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন চার দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

চতুর্থ মতামতঃ ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইয়াহ্ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন ১৯ দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

ইমাম শাফি‘ঈ ও মালিক রাহিমাহুল্লাহ এর মতে সলাত কসরের সীমা হলো গন্তব্যে প্রবেশ এবং গন্তব্য থেকে বের হওয়ার দিন ব্যতীত তিন দিন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর নিকট ১৪ দিন, ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর নিকট ৪ দিন, ইসহাক (রহঃ)-এর নিকট ১৯ দিন। মির্‘আত প্রণেতা বলেনঃ আমার নিকট অগ্রগণ্য বা প্রাধান্য মত হলো ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মত। (মিসাতের সফর অধ্যায়ের টিকা থেকে নেয়া হয়েছে)।

মন্তব্যঃ উপরের মতামত গুলি সবই হাদিসের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। কোন মুজতাহীদ আলেমই হাদিসের বাহিরে কিয়াস করেনি। প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কাজেই এটা ঠিক, ওটা ভুল এমন বলে বলে উম্মতের মাঝে ঐক্য নষ্ট করা হারাম।

সফরের সময় সুন্নাত ও নফল পড়ার বিধানঃ

ঈসা ইবনু হাফস ইবনু আসিম ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর পিতা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার রাস্তায় আমি ইবনু উমরের সহচর হলাম। তিনি আমাদের যুহরের সালাত দু’ রাক’আত পড়ালেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে অগ্রসর হলাম। তারপর তিনি তাঁর মনযিলে এসে বসলেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে বসলাম। এরপর যে স্থানে তিনি সালাত আদায় করেছিলেন, সে স্থানের প্রতি দৃষ্টি পড়লে তিনি দেখলেন, কিছু লোক দাঁড়ানো। তিনি বললেন, তারা সেখানে কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সালাত আদায় করছে তিনি বললেন, আমি যদি নফল আদায় করতাম তাহলে আমি আমার সালাত (ফরয) কেই পূর্ণ করতাম।

হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে থেকেছি। কিন্তু ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গেও থেকেছি, তিনিও তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি উমর (রা) এর সঙ্গেও ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত পড়েননি। আমি উসমান (রাঃ) এরও সঙ্গে ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আর আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

হাফস ইবনু ‘আসিম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার মক্কা-মাদীনার পথে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমারের সাথে থাকার আমার সৌভাগ্য ঘটেছে। (যুহরের সলাতের সময় হলে) তিনি আমাদেরকে দু’ রাক্‘আত সলাত (জামা‘আতে) আদায় করালেন। এখান থেকে তাঁবুতে ফিরে গিয়ে তিনি দেখলেন, লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা এটা কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সলাত আদায় করছে। তিনি বললেন, আমাকে যদি নফল সলাতই আদায় করতে হয়, তাহলে ফরয সলাতই তো পরিপূর্ণভাবে আদায় করা বেশী ভাল ছিল। কিন্তু যখন সহজ্জ করার জন্য ফরয সালাত কসর আদায়ের হুকুম হয়েছে, তখন তো নফল সলাত ছেড়ে দেয়াই উত্তম। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকার সৌভাগ্যও পেয়েছি। তিনি সফরের অবস্থায় দু’ রাক্‘আতের বেশী (ফরয) সলাত আদায় করতেন না। আবূ বাকর, ‘উমার, ‘উসমান (রাঃ)-এর সাথে চলারও সুযোগ আমার হয়েছে। তারাও এভাবে দু’ রাক্‘আতের বেশী আদায় করতেন না। (মিসকাত ১৩৩৮, সহীহ বুখারী ১১০২, সহিহ মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩।

অবশ্য সাধারণ নফল, তাহাজ্জুদ, চাশত, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ প্রভৃতি নামায সফরে পড়া চলে। যেমনঃ ফরয নামাযের আগে-পরেও নফলের নিয়তে নামায পড়া দূষণীয় নয়।

মক্কা বিজয়ের দিন উম্মেহানীর ঘরে তিনি চাশতের নামায পড়েছেন। উম্মে হানী (রাঃ) ব্যতিত অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাতুয যুহা (পূর্বাহ্ন এর সালাত) আদায় করতে দেখেছেন বলে আমাদের জানাননি।

উম্মে হানী (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর ঘরে গোসল করার পর আট রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। আমি তাঁকে এর চাইতে সংক্ষিপ্ত কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি, তবে তিনি রুকূ’ ও সিজদা পূর্ণভাবে আদায় করেছিলেন। লায়স (রহঃ) আমির ইবনু রাবীআ’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের বেলা বাহনের পিঠে বাহনের গতিমুখী হয়ে নফল সালাত আদায় করতে দেখেছেন। (সহিহ বুখারী ১০৪০ ইফাঃ)।

 এ ছাড়া তিনি সফরে উটের পিঠে নফল ও বিতের নামায পড়তেন। 

আমীর ইবনু রাবী’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, তিনি সাওয়ারীর উপর উপবিষ্ট অবস্থায় মাথা দিয়ে ইশারা করে সে দিকেই সালাত আদায় করতেন যে দিকে সাওয়ারী ফিরত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সালাতে এরূপ করতেন না। সালিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ (রাঃ) সফরকালে রাতের বেলায় সাওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায় সালাত আদায় করতেন, কোন্ দিকে তাঁর মুখ রয়েছে সে দিকে লক্ষ্য করতেন না এবং ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ারীর উপর নফল সালাত আদায় করেছেন, সাওয়ারী যে দিকে মুখ ফিরিয়েছে সেদিকেই এবং তার বিত্‌র ও আদায় করেছেন। কিন্তু সাওয়রীর উপর ফরয সালাত আদায় করতেন না। (সহিহ বুখারী ১০৩৫ ইফাঃ)।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ার থাকাবস্থায় কিবলা ছাড়া অন্য দিকে মুখ করে নফল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন।(সহিহ বুখারী ১০৩২ ইফাঃ)।

মন্তব্যঃ অনেক আলেম বলে থাকের সফর অবস্থায় নফল সুন্নাহ সালাত ছেড়ে দিবে শুধে ফজরের দুই রাকআত সুন্নাহ ব্যাতিত। সফর অবস্থায় যদি কোথাও হোটেলে বা বাড়িতে অবস্থান করে তার কোন প্রকার সফরের ক্লান্তি না তাকে তবে সে নফল সুন্নাহ সালাত আদায় করতে পারে।

সফর শুরুর পর কত দুর পর মুসাফিরের হুকুম হয়ঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনায় যুহরের সালাত চার রাকা’আত আদায় করেছি এবং যুল-হুলাইফায় আসরের সালাত দু’রাকা’আত আদায় করেছি। (সহীহ বুখারী ১০২৮ ও সহিহ মুসলিম ১৪৫৫ ইসলামি ফাউন্ডেশন সহিহ আবু দাউদ ১০৮৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৫৪৬)

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার রহঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম ১৪৫৭ ইফাঃ)।

ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ সফল শুরু করার পর নিজ এলাকা ত্যাগ করার সাথে সাথেই সফরকারির উপর মুসাফিরের হুকুম কার্যকর হবে। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়  নিজ এলাকা ত্যাগ প্রায় তিন মাইল বা ছয় কিলোমিটারের মত দুরে গেলেই সালাত কসর করতে পারবে।

মিনায় সালাত কসর করাঃ

ক। হজ্জের সময় প্রথম দফায় মিনায় সালাত কসর করাঃ

প্রথম দফায় ইহরাম বাঁধার পর হাজিগণ মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে যাওয়াই হলো সুন্নাত তরিকা। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর নামাজসহ এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে প্রত্যেক নামাজ সুন্নাত মোতাবেক পড়ার নিয়ম হলো, প্রত্যেক ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) নামাজ উহার নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া। মাগরিব ও ফজর নামাজ ব্যতিত, কেননা এ দুই নামাজে কসর নেই।

দলিলঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় যুহর ও ফজরের নামায (অর্থাৎ যুহর হতে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের নামায) আদায় করলেন। তারপর ভোরেই আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৮০, হাদিসের মান সহিহ)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমাদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামায আদায় করলেন, তারপর ভোরে যাত্রা শুরু করেন আরাফাতের দিকে। (সুনানে তিরমিজি ৮৭৯ হাদিসের মান সহিহ)

খ। দ্বিতীয় দফায় মিনায় সালাত কসর করার যৌক্তিকতাঃ

দ্বিতীয় দফায় ১০ জিলহজ্জ সকালের ফজর সালাত আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসা হয়। এ সময় একটাকা ৪/৫ দিন মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময়ও সালাতের কসর আদায় করেত হবে। তবে অনেকে পূর্ণ সালাতও আদায় করে থাকে। তাদেরও দলিল আছে। দুটি দলিল পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মিনার সকল সালাত কসরই হবে বলে মনে হবে। সে যা হোক আপনি অধিক যৌক্তিক ও হাদিস সম্মত কসরই আদায় করবেন তবে যদি কেউ কোন দলিলের আলোকে এখানে সালাত কসর না করে তবে তাকে ভতসনা করা যাবে না। তার সাথে বিবাদে জড়ান যাবে না।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন এবং আবূ বকর, ‘উমর (রাঃ) -ও। আর ‘উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের প্রথম ভাগেও দু’রাক’আত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫৫)

২. হারিসা ইব্‌নু ওয়াহব খুযা’য় (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে মিনাতে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। এ সময় আমরা আগের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিলাম এবং অতি নিরাপদে ছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৬৫৬)

৩. হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় থাকা অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সর্বাধিক সংখ্যক লোকসহ মিনায় (চার রাক’আত ফরযের স্থলে) দুই রাক’আত নামায আদায় করেছি। (তিরমিজ ৮৮২, আবূ দাউদ ১৭১৪)

৪. হারিছা ইব্‌ন ওয়াহ্‌ব খুযায়ী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মিনায় দু’রাকআত সালাত আদায় করলাম অথচ মানুষ তখন অধিক নিরাপদ ছিল। (নাসাঈ ১৪৪৫)

গ। মিনায় মতভেদ করে পুর্ণ সালাত আদায়ঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর (রাঃ)-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে [অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় থেকে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে] হায়! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতেই আমর ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারী ১৫৫৪ ইফাঃ)

২. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে (অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ) -এর সময় হতে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে) আহা! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতই আমার ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারি ১৬৫৭)

৩. উসমান (রাঃ) এই চার রাকআত পুরো আদায় করার বিরোধীতা করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)। সহিহ বুখারীতে এসেছেঃ

ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে মিনায় চার রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। তারপর এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) কে বলা হল, তিনি প্রথমে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়লেন। এবপর বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিনায় দু’ রাকা’আত পড়েছি, আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি এবং উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি। কতই না ভাল হতো যদি চার রাকা’আতের পরিবর্তে দু’রাকা’আত মাকবূল সালাত হতো। (সহীহ বুখারী ১০২৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মন্তব্যঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসী ও অন্যান্য স্থানের অধিবাসীদের নিয়ে মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কসর নামাজ পড়েছিলেন। মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ নামাজ পড়তে নির্দেশ দেন নাই। চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযগুলো দু’রাকআত করে পড়তে হবে। সে নামাযগুলো হলো যুহর, আসর ও এশা। হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুয্দালিফায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের সকল লোককে নিয়ে এ সালাতগুলো কসর করে পড়েছিলেন, এটা সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে তিনি মুকীম বা মুসাফিরের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। অর্থাৎ মক্কার লোকদেরকেও চার রাকআত করে পড়তে বলেননি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ও ফাতাওয়া ইবনে বায)

তবে মনে রাখতে হবে যে, ফজর ও মাগরিবের ফরয নামায অর্থাৎ দুই এবং তিন রাকআত বিশিষ্ট নামায কখনো কসর হয় না। মিনাতে প্রত্যেক সালাত ওয়াক্ত মত আদায় করবেন, জমা করবেন না। অর্থাৎ যুহর-আসর একত্রে এবং মাগরিব-এশা একত্রে পড়বেন না। এমনকি মুসাফির হলেও না। (প্রশ্নোত্তরে হজ্জ ও উমরা, অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম)

কাজেই সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত মিনায় সালাত চার নয় দুই বাকআতই আদায় করা উত্তম। কিন্তু কেউ পূর্ণ সালাত আদায় করলে তাদের গবেষণার উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সামনে সহিহ হাদিসগুলি তুলে ধরে বুঝাতে হবে। এ নিয়ে ফতোয়াবাজী করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করা যাবেনা। কারন আমাদের অনুকরনী তৃতীয় খলীফা ওসমান (রাঃ) শেষের দিকে পূর্ণ সালাত আদায় করেছেন বলে প্রমানিত যদিও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার বিরোধীতা করেছেন।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: দ্বিতীয় কিস্তি

সালাত জমা করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাত জমা করাঃ

সালাত জমা করার অর্থ হল দুই ওয়াক্তের সালাত কে একত্রে আদায় করা। অর্থাৎ যুহর ও আসরের এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা। মুসল্লী আসরের সালাত এগিয়ে এনে যোহরের সময়ে প্রথম যোহর তারপর আসর আদায় করবে। অথবা যোহরকে এমনভাবে দেরী করা যে যোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে, তারপর আসরের ওয়াক্ত আসলে প্রথমে যোহর আদায় করে তারপর আসরের সালাত আদায় করা। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার ক্ষেত্রেও যোহর ও আসরের মত আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিবের সময়ে ইশাকে এগিয়ে এনে প্রথমে মাগরিব তারপর ইশার সালাত আদায় করবে। অথবা মাগরিবকে এমনভাবে পিছিয়ে দিবে যে মাগরিবের সময় শেষ হয়ে যাবে, তারপর ইশার ওয়াক্ত হলে সেখানে প্রথমে মাগরিব আদায় করে তারপর ইশার সালাত আদায় করে নিবে।

আরাফা ও মুজদালিফায় সালাত জমা করাঃ

হাজিরা আরাফাতের ময়দানের জোহর ও আসরের একত্রে আদায় করে। আবার মুজদালীফায় মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করে। তবে ফজরের সাথে কোন সালাত একত্র জমা করা যাবে না, ঠিক তেমনি মাগরিবের সাথে আসরের সালাত ও জমা করা যাবে না।

ইব্‌নু উমর (রাঃ) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম (রহঃ) বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে ‘আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও ‘আসর এক সাথেই আদায় করতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? (সহিহ বুখারি ১৬৬২

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দ্রুত সফর করতেন, তখন মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। ইবরাহীম ইবনু তাহমান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সফরে দ্রুত চলার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করতেন আর মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করতেন। আর হুসাইন (রহঃ)

আনাস ইবনু মলিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালে মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করতেন এবং আলী ইবনু মুবারকও হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় হুসাইন (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ বুখারী ১০৪২ ইফাঃ)।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি যখন সফরে তাঁকে দ্রুত পথ অতিক্রম করতে হত, তখন মাগরিবের সালাত এত বিলম্বিত করতেন যে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) ও দ্রুত সফরকালে অনুরূপ করতেন। তখন ইকামতের পর মাগরিব তিন রাকা’আত আদায় করতেন এবং সালাম ফিরাতেন। তারপর অল্প সময় অপেক্ষা করেই ইশা-এর ইকামাত দিয়ে তা দু’রাকা’আত আদায় করে সালাম ফিরাতেন। এ দু’য়ের মাঝে কোন নফল সালাত আদায় করতেন না এবং ইশার পরেও না। অবশেষে মধ্যরাতে (তাহাজ্জুদের জন্য) উঠতেন। (সহীহ বুখারী ১০৪৩ ইফাঃ)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে এ দু’সালাত একত্রে আদায় করতেন অর্থাৎ মাগরিব ও ইশা। (সহিহ বুখারী  ১০৪৪ ইফাঃ)।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে পড়ার আগে সফর শুরু করলে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত, যুহর বিলম্বিত করতেন এবং উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। আর (সফর শুরু করার আগেই) সূর্য ঢলে গেলে যুহর আদায় করে নিতেন। এরপর (সফরের উদ্দেশ্যে) আরোহণ করতেন। (সহীহ বুখারী  ১০৪৫ ও ১০৪৬ ইফাঃ)।

যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায়ঃ

সাঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে সফরকালে যুহর ও আসর এবং মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করেন। সাঈদ বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁকে তা করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য তার উম্মাতকে কষ্টে না ফেলা। (সহিহ মুসলিম ১৫০৩ ইফাঃ)

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের সময় যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এইরূপ করার কারণ কি? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর উম্মাতকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০৫ ইফাঃ)

উপরের হাদিস দ্বারা বুঝা যায় বিভিন্ন কারনে সালাত জমা করা যায়। তবে সালাত জমা করা অন্যতম কারন হিসাবে সফরকে ধরা হলেও একমাত্র কারন নয়। মুসফির যে কারনে সালাত কসর করে ঠিক সেই কারনে সালাত জমা করা বৈধ। হাদিসের আলোকে দেখতে পাই যে কোন সংকটের কারনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত জমা করেছেন। যেমনঃ তিনি যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায় করছেন। বৃষ্টির কারণে যদি মসজিদে যেতে কষ্ট হয়, তবে দু’নামাযকে একত্রিত করা যাবে। ঠিক তেমনি ভাবে, শীতকালে যদি কঠিন ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয় এবং সে কারণে মসজিদে যাওয়া কষ্টকর হয় তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। নিজের মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। এছাড়া এ ধরণের আরো কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখিন হলে দু’নামাযকে একত্রিত করবে।

এমন কি মুকিম অবস্থায়ও যে কেউ চাইলে সালাত জমা করতে পারে। যেমনঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অথবা ভয়-ভীতি ছাড়াই মদিনায় যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করেছেন। আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি সাঈদকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন এইরুপ করলেন? তিনি বললেন, তুমি যেমন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, আমিও তেমনি ইবনু আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তখন তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল, তার উম্মাতেরকাউকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ মুকিম অবস্থায় সংকট ছাড়া কেউ সালাত জমা করার ব্যাপারে মতামত দেননি। শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষ যখনই দু’নামাযকে একত্রিত না করলে সমস্যা বা সংকটের সম্মুখিন হবে তখনই একত্রিত করণ তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আর সমস্যা না হলে একত্রিত করবে না। কিন্তু যেহেতু সফর মানেই সমস্যা ও সংকট তাই মুসাফিরের জন্য দু’নামাযকে একত্রিত করা জায়েয। চাই তার সফর চলমান হোক বা কোন স্থানে অবস্থান করুক। তবে সফর চলমান থাকলে একত্রিত করা উত্তম। আর সফরে গিয়ে কোন গৃহে বা হোটেলে অবস্থান করলে একত্রিত না করাই উত্তম। কিন্তু মুসাফির যদি এমন শহরে অবস্থান করে যেখানে নামায জামাআতের সাথে অনুষ্ঠিত হয়, তখন জামাআতের সাথে নামায আদায় করা ওয়াজিব। ঐ সময় নামায কসরও করবে না একত্রিতও করবে না। কিন্তু জামাআত ছুটে গেলে কসর করবে একত্রিত করবে না। অবশ্য একত্রিত করা জরূরী হয়ে পড়লে করতে পারে। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)

আলেমগণ দু’সালাত একত্রে আদায় বা জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। এমই কিছু ইজতিহাদ ধর্মী কথা উল্লেখ করছিঃ

১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। (আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫)

২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। (আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১]

৩. শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তে দু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানে দ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্য যদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয় সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিত করার নিয়্যত লাগবে না। সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায় করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বা একত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না। [রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৮]

৪. মালেকী মাযহাবের আলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করার সময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমা করার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়। (আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায় করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউ প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবে তাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুল আদাওয়ী (১/৩৩৫)]

৫. আর এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতের বাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭); আল-ইনসাফ:২/৩৪১]