সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: তৃতীয় কিস্তি

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান কি?

মোজার উপর মাসেহ করা সম্পর্রে কারো কোন দ্বিমত নেই। এ সম্পর্কে অসংখ্যা সহিহ হাদিস বিদ্যমান। প্রায় সত্তর জনের সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু মোজা মাসাহ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। কসর সালাত ও তাইয়ামুমের মত মোজার উপর মাসেহ করার বিধান মহার আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির উপর জন্য বিশেষ এহসান।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি অপছন্দ করেন তাঁর শানে কোনো পাপ সংঘটন করা”।(ইবন খুযাইমাহ ৯৫০, ২০২৭)।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া ফরযগুলো পালন করা”। ( ইবন হিব্বান ৩৫৬৮)।

ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম কারন ঈদের দিন আল্লাহ আনন্দ করার হুকুম দিয়েছেন। তাই শরীয়তের বিধান জেনে  যখন যা সহজ্জ তার জন্য তাই করা উত্তম। অতএব, যে ব্যক্তি মোজা পরিধান করাবস্থায় রয়েছে এবং তার মোজায় মোজা মাসাহ’র শর্তগুলোও পাওয়া যাচ্ছে তার জন্য উচিত মোজা না খুলে মোজার উপর মাসাহ করা। কারণ, তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের অনুসরণ ও অনুকরণ করা হবে।

এই সহজ্জ বিধান কে  সুন্নাহ সম্মতভাবে আদায় করতে গিয়ে একটি বিতর্ক চলছে তা হল মোজার ধরণ নিয়ে মুজা কি চামড়ার হবে, নাকি কাপড়ের হলেও চলবে।

চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোন মতভেদ বা ইকতিলাব নেই। এ ব্যাপার সকল উম্মত একমত বা ইজমা হয়েছে। কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোর মতভেদ বা ইকতিলাব আছে। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের আলেমদের মতামত তুলে ধরব যাতে সহজে সঠিক মত গ্রহন করা সহজ্জ হয়।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে নাঃ

উপমহাদেশের প্রায় সকল হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা শরীয়ত সম্মত বললেও কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না। তাদের প্রায় সকল আলেমের ঐক্যমত হল :

“আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের মোজার উপর মাসেহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়”

যেমন কওমী মাদ্রাদার আলের যারা হানাফি মাযহারভুক্ত তাদের কতৃর্ক প্রকাশিত মাসিক আল কাউসার পত্রিকার ১৮০৩ নম্বর প্রশ্ন ছিলঃ

প্রশ্নঃ এক খতীব সাহেবকে জুমআর বয়ানে বলতে শুনেছি যে, মোজার উপর মাসেহ বৈধ হওয়ার জন্য তা চামড়ার হওয়া জরুরি নয়। বরং আমাদের দেশে প্রচলিত সব ধরনের মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। চাই তা সুতার হোক বা পশমের হোক বা অন্য কোনো কিছুর হোক। জানতে চাই, তার এ কথা কতটুকু সঠিক? (মুহাম্মাদ মাহমুদ হাসান, ধানমণ্ডি, ঢাকা থেকে)

উত্তরঃ

খতীব সাহেবের ঐ কথা ঠিক নয়। চামড়ার মোজার উপর মাসেহ জায়েয আছে। কিন্তু চামড়া ছাড়া সুতা বা পশমের তৈরি যেসব মোজা সচরাচর পাওয়া যায় এর উপর মাসেহ সহীহ নয়। তবে সুতা বা পশমের মোজায় নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলে তার উপর মাসেহ জায়েয হবে। শর্তগুলো হচ্ছে :
ক) মোজা এমন মোটা ও পুরু হওয়া যে, জুতা ছাড়া শুধু মোজা পায়ে দিয়ে তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়। এতে মোজা ফেটে যায় না এবং নষ্টও হয় না।

খ) পায়ের সাথে কোনো জিনিস দ্বারা বাঁধা ছাড়াই তা লেগে থাকে এবং তা পরিধান করে হাঁটা যায়। 
গ) মোজা এমন মোটা যে, তা পানি চোষে না এবং তা ভেদ করে পানি পা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ঘ) তা পরিধান করার পর মোজার উপর থেকে ভিতরের অংশ দেখা যায় না। সচরাচর ব্যবহৃত সুতা বা পশমের মোজায় যেহেতু এসব শর্ত পাওয়া যায় না তাই এর উপর মাসেহ জায়েয হবে না।

হানফী মাযহারের আরেক জন আলেম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী যিনি তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা এর পরিচালক। তিনি ও উক্ত শর্ত ৪ টি ঊল্লেখ করেন অতপর বলেন, সুতরাং পরিস্কার হয়ে গেল যে, আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের পাতলা মোজার উপর মাসাহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়।

হানফী মাযহারের আরেক বিশ্ব বিখ্যাত আলেম মুফতি ত্বকি উসমানি। তিনি করাচি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আল বালাগ’ এর জমাদিউল উলা ১৩৯৭ হি. সংখ্যায় ‘প্রচলিত মোজার উপর মসেহ’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।  যেখানে তিনিকাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে নাজায়েয বলেছেন। এবং যারা এর মাসাহ করার পক্ষে তাদের সমালোচনা করেছেন। বিশেষত জামায়াত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা জনাব মাওলানা মওদুদী রাহিমাহুল্লার সমালোচনা করেন যিনি কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয বলেছেন।

মন্তব্যঃ আর কোন রেফারেন্স দেয়ার দরকার নেই কারন উপমহাদেশের হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না।  এ কথা বলে তাকে অভিযোগ করলে তিনি স্বীকার করেন ও এর সমর্থনে যুক্তি পেশ করেন।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করেঃ

বর্তমানে সৌদি আরবের সকল আলেম যাদের আমরা সালাফি বলে চিনি। আমাদের দেশে যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত তারা সকলে কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে থাকে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্ম এই মতেরই অনুসারী। এরা সকলে “যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তাদের দলিলঃ হল এই হাদিস যা ইমাম তিরমিজী উল্লখ করেছেন। হাদিসটি হলঃ

 *وَعَنْهُ قَالَ تَوَضَّاَ النَّبِىِّ ﷺ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ وَالنَّعْلَيْنِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وأَبُوْ دَاوٗدَ وَابْنُ مَاجَةَ*

অনুবাদঃ মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অজু করলেন এবং জুতার সাথে ‘জাওরাব’ ও পা’ দু’টোর উপরের দিকও মাসাহ করলেন। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্, ছাহীহ: আবূ দাঊদ ১৫৯, তিরমিযী ইঃ ফাঃ ৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৫৫৯, ইরওয়া ১০১, মিশকাতুল মাসাবীহ/মিশকাত: ৫২৩; ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী বলেনঃ এই হাদিসটি হাসান ও সহীহ। একাধিক আলিমের অভিমত এই। হাদিসের মানঃ ছাহীহ)


হাদীছটির ব্যাখ্যা: جَوْرَبَيْنِ ‘জাওরাবায়ন’ শব্দটি جَوْرَبْ ‘জাওরাব’-এর দ্বিবচন। এর অর্থ কাপড়ের মোজা। বর্ণিত হাদীসে প্রমাণ হয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাওরাবায়ন বা পায়ের ঢাকনীর উপর মাসাহ করেছেন। সেটা চাই পশমী হোক বা চুলের হোক। আর চামড়ার হোক বা পস্নাস্টিকের হোক। মোটা হোক বা পাতলা হোক সেটার উপর মাসাহ করা জায়িয আছে। জাওরাবায়ন জুতার ন্যায় যা জমিন হতে পাকে রক্ষা করে। সেটার উপর মাসাহ করা উত্তম। ইমাম ইবনু হাযম সেটা মোটা হওয়ার জন্য শর্ত করেছেন। অনেক সাহাবায়ি কিরাম এর ওপর ‘আমাল করেছেন। হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী  রহঃ ছহীহ বলেছেন।

প্রশ্নঃ এক ভাই জানতে চেয়েছেন ওজুর সময় মুজার ওপর পা মাসেহ করা জায়েজ কিনা? আমরা জানি আমাদের রাসূল (সা:) চামড়ার মুজার ওপর মাসাহ করতেনএখন প্রশ্ন হল নরমাল সব মুজার ওপর মাসেহ করা যাবে কি না? রেফারেন্স সহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তরঃ মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয় চাই তা চামড়ার তৈরি হোক বা সুতার তৈরী হোক। সাহাবীগণ অনেকেই কাপড়ের তৈরী মোজা পরিধান করতেন আর তার উপর মাসেহ করতেন।

উল্লেখ্য যে, আরবীতে চামড়ার তৈরী মোজাকে ‘খুফ’ আর সুতার তৈরী মোজাকে ‘জাওরাব’ বলা হয়। উভয় প্রকার মুজার উপর মাসেহ করা বৈধ।

চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা সর্ব সম্মতক্রমে বৈধ। তবে সুতার তেরী মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ কি না- এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও সঠিক মত হল, জায়েয।

*বিস্তারিত*
সাধারণভাবে সকল ধরণের জাওরাব (সুতার তৈরী মুজা) এর উপর মাসাহ বৈধ, এমনকি যদি তা খুব পাতলা হয় তবুও: এটাই ইবনু হাযম ও ইবনু তাইমিয়ার স্পষ্ট মাযহাব। আর এ মতকেই ইবনু উছাইমীন ও আল্লামা শানক্বীতী পছন্দ করেছেন।

[আল-মুহালস্না (২/৮৬), আল-মাসায়িলুল মারদিনিয়্যাহ (৫৮ পৃ.), মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া (২১/১৮৪), আল-মুমতি’ (১/১৯০), আযওয়াউল বায়ান (২/১৮, ১৯), এখানে এ বিষয়ে মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।] 
*এটাই অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।*

এখানে জাওরাবের উপর মাসাহ বৈধ মর্মে বর্ণিত শেষ দু‘টি অভিমতের প্রবক্তাগণ নিম্নোক্ত দলিল গুলোকে দলিল হিসাবে দাড় করান। যথাঃ

عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ، وَالنَّعْلَيْنِ

(১) মুগীরা বিন শোবা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস: ‘নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) একবার ওযূ করলেন এবং জাওরাব ও দু জুতার উপর মাসাহ করলেন। (এ হাদীসকে আলবানী সহীহ বলেছেন, আবূ দাউদ (১৫৯), তিরমিযী (৯৯), আহমাদ (৪/২৫২), এ ব্যাপারে বিস্তারিত ‘আল-ইরওয়া (১০১)-দ্রষ্টব্য।)

عَنِ الأزرق بن قيس قال رأيت أنس بن مالك أحدث فغسل وجهه ويديه ومسح برأسه ، ومسح على جوربين من صوف فقلت : أتمسح عليهما ؟ فقال : إنهما خفان ولكنهما من صوف

(২) আয়রাক্ব ইবনে কায়েস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনে মালিককে লক্ষ্য করেছি, তিনি বায়ু নিঃসরণ হলে তাঁর চেহারা ও দুহাত ধৌত করতেন এবং পশমের তৈরি জাওরাবের উপর মাসাহ করতেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি জাওরাবের উপর মাসাহ করলেন? তিনি বললেন, এ দু’টি মোজা যা পশমের তৈরি। [এ হাদীসকে আহমাদ শাকির সহীহ বলেছেন; আলকূনী (১/১৮১) দাওলাবী প্রণীত।]

এখানে আনাস (রাঃ) খাফ বা মোজা চামড়ার তৈরি হওয়ার ব্যাপারে আম (ব্যাপক), সে কথা স্পষ্ট করেছেন। উল্লেখ্য যে, তিনি আরবী ভাষাবিদদের অন্যতম একজন সাহাবী ছিলেন।

(৩) জাওরাবের উপর মাসাহ করার হাদীস ১১ জন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। যাদের মধ্যে উমার তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বিন উমর, আলী, ইবনে মাসউদ আনাস প্রমুখ সাহাবী অন্যতম। তাদের সমসাময়িক কোন সাহাবী তাদের বিরোধিতা করেন নি। বরং, সকলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। পরবর্তীতে জমহুর উলামা পাতলা জাওরাবের উপর মাসাহ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা দ্বারা ফরযের স্থান আচ্ছাদিত হয় না। অথচ এটা মাসাহ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত নয় যা ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে চামড়ার তেরী মোজার তুলনায় সুতার তৈরী মোজার প্রচলন বেশি। সেহেতু মোজার উপর মাসেহ করার জন্য চামড়ার তেরী হওয়ার শর্তারোপ করা ইসলাম প্রদত্ব প্রশস্ত বিধানকে সংকুচিত করে দেয়ার শামিল। (আল্লাহু আলাম)। (উত্তর দিয়েছেন শাইখ আব্দূল্লাহ হাদি)

শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাতলা বা ছেঁড়া মোজাতে মাসেহ করার বিধান কি?

বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, ছেঁড়া মোজা এবং বাইরে থেকে চামড়া দেখা যায় এমন পাতলা মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। যে অঙ্গের উপর মাসেহ হবে তাকে পরিপূর্ণরূপে ঢেকে রাখতে হবে এটা উদ্দেশ্য নয়। কেননা পা তো আর সতর নয়। মাসেহ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ওযুকারী ব্যক্তির উপর সহজ্জতা ও হাল্কা করা। অর্থাৎ- আমরা প্রত্যেক ওযুর সময় মোজা পরিধানকারীকে মোজা খুলে পা ধৌত করতে বাধ্য করব না। বরং বলব, এর উপর মাসেহ করাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর এই সহজ্জতার উদ্দেশ্যেই মোজার উপর মাসেহ শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে। অতএব কোন পার্থক্য নেই চাই মোজা ছেঁড়া হোক বা ভাল হোক, পাতলা হোক বা মোটা হোক। (গ্রন্থের নামঃ ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, বিভাগের নামঃ পবিত্রতা, ক্রমিন নং ১৪৫)।

সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ

সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ হানাফি আলেম হয়েও মতামত দিয়েছেন, সব ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করা হলে তিনি আবার সুন্দর করে তার উত্তর প্রদান করেন যা রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড “মোজার উপর মসেহ করার বিধান” শিরনামে উল্লখ করা হয়েছে নিম্ম তা হুবহু তুলে ধরা হলঃ

প্রশ্নঃ রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ডে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, সুতি হোক, পশমি হোক, পাতলা মোজার উপর মসেহ করা চলবেনা। কেননা পবিত্র কুরআন ও উৎকৃষ্ট মানের সহীহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত বিধিকে দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে শিথিল করা যায়না। হযরত মুগীরা ইবনে শুবার যে হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে এবং যা অত্যন্ত সহীহ হাদিস, তাতে একমাত্র চামড়ার মোজার উপরে মসেহ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর অপর যে হাদিসটিতে জাওরাইন (সুতি ও পশমি মোজা) শব্দটি সংযোজিত হয়েছে, হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণ তাকে দুর্বল বলে রায় দিয়েছেন। 

বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে এরূপ যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে যে, ‘জওরাব’ ও চামড়ার তৈরি হয়ে থাকে বিধায় ‘জওরাব’ ও এক ধরনের খুফ্‌ (চামড়ার মোজা) সুতরাং হয় চামড়ার মোজার উপরই মসেহ জায়েয মেনে নিতে হবে, নচেত জাওরাব যদি চামড়ার না হয়, তবে তাকে এমন শর্ত আরোপ করতে হবে যাতে তা খুফ্‌ তথা চামড়ার মোজার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। অন্যথায় চামড়ার মোজা ছাড়া আর কোনো মোজার উপর মসেহ করা জায়েয হবে না।


যিন্দেগীর উক্ত সংখ্যায় যে বিতর্ক, প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তরজমানুল কুরআনে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা আসা জরুরী হয়ে পড়েছে। যে কোনো মোজার উপর যে মসেহ করা চলে, সে সম্পর্কে প্রাচীন ইমামদের কোনো উক্তি থাকলে সেটাও তুলে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জবাবঃ  চামড়ার মোজার উপর মসেহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সুন্নি ইমামরা প্রায় সকলেই একমত। তবে জাওরাব তথা চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপর মসেহ করার জন্য ফেকাহবিদগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন তা মোটা হওয়া চাই, গাঢ় ও পুরু হওয়া চাই, পানি নিরোধক হওয়া চাই এবং তাতে জুতার সমপরিমাণ চামড়াযুক্ত থাকা চাই। তবে প্রাচীন ফেকাহবিদদের কেউ কেউ আবার সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করাকে জায়েয মনে করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্‌ম এই মতেরই প্রবক্তা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে সুতি হোক, পশমি হোক, চামড়াযুক্ত হোক বা না হোক- যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে একটি ফতোয়া লিপিবদ্ধ রয়েছে। রসূল সা. চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপরও মসেহ করতেন এই মর্মে যেসব হাদিস বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ

এই হাদিসগুলোর বক্তব্য হাদিসবেত্তাদের মানদণ্ডে সহীহ প্রমাণিত না হলেও স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধির দৃষ্টিতে এই বক্তব্য সঠিক। মাসাহের প্রয়োজন উভয় ক্ষেত্রেই সমান। উভয় ক্ষেত্রেই মাসাহের প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা একই রকম। কাজেই এ দুটোর মধ্যে বৈষম্য করা সমমানের জিনিসকে অসম বলারই নামান্তর এবং সুবিচারের পরিপন্থী।

অনুরূপভাবে, চামড়া বেশি টেকসই হয়ে থাকে এবং তাতে পানি ঢোকে না এ যুক্তিও তাঁর মতে গুরুত্ববহ নয়। তিনি বরঞ্চ মনে করেন, সুতি বা পশমি মোজায় পানি শোষণ ও ভেতরে পানি প্রবেশ করা পবিত্রতার প্রয়োজনে অধিকতর অগ্রগণ্য এবং কর্তব্য। এসব মোজার পাতলা বা ঢিলে হওয়া অথবা বাঁধার প্রয়োজন না হওয়ায় তাঁর মতে অসুবিধার কিছু নেই।

আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থে মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে কাইয়েমও এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। এসব হাদিসের সনদ যে নির্ভরযোগ্য নয়, সে কথা তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তার বিভিন্ন জবাবও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, সুতি ও পশমি মোজায় মসেহ বৈধ হওয়ার ব্যাপারটা শুধুমাত্র রসূল স.-এর প্রত্যক্ষ বক্তব্য বা আচরণ সম্বলিত হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ১৩ জন সাহাবির কার্যধারা থেকেও তা সমর্থিত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল র. এই হাদিসগুলোকে দুর্বল আখ্যায়িত করা সত্বেও সুতি ও পশমি কাপড়ের মোজার উপর মসেহকে বৈধ বলে রায় দিয়ে সুবিচার ও ইনসাফের পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবাদের কার্যধারা ও সুস্পষ্ট যৌক্তিকতার আলোকেই তিনি এরূপ রায় দিয়েছেন। আসলে ‘জাওরাবাইন’ তথা সুতি ও পশমি মোজা এবং ‘খুফ্‌ফাইন’ তথা চামড়ার মোজার এমন কোনো কার্যকর পার্থক্য নেই, যা শরিয়তের বিধানে পার্থক্য সুচিত করতে পারে। ইবনে কায়েম অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এতে তিনি সুতি ও পশমি মোজার উপর মাসাহের শর্তাবলীর সমালোচনা করেছেন এবং এ জাতীয় মোজার উপর মাসাহের বৈধতা সম্বলিত হাদিসগুলোতে সনদ ও যুক্তির বিচারে যে খুঁত ধরা হয়েছে, তা খণ্ডন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পরিহাসচ্ছলে একটা তীর্যক মন্তব্যও ছুড়ে দিয়েছেন যে, কোনো কোনো ফেকাহ শাস্ত্রবিদদের কাছে চামড়ার মোজার সাথে সুতি ও পশমির মোজাকেও মসেহযোগ্য ধরা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অথচ এ ধরনের কোনো সংযোজন যখন তাদের ফেকাহ শাস্ত্রীয় মতামতের পক্ষে যায়, তখন সেটাকে তারা নি:সংকোচে গ্রহণ করেন।

“ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের দাবি এই যে, আপনি নিজের পণ্য যে পাল্লা দিয়ে মাপেন, আপনার বিরুদ্ধবাদীর পণ্যও সেই পাল্লা দিয়েই মাপবেন। নেয়া ও দোয়ার পাল্লা আলাদা রাখবেন না।”

ইবনে হাজমও তদীয় গ্রন্থ মুহাল্লাতে বিশদ আলোচনা করে ও সকল হাদিস উদ্ধৃত করে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, পায়ে  চামড়া, সুমি, পশমি, বা অন্য কোনো কাপড়ের তৈরি যাই পরা হোক না কেন, তাতে মসেহ চলবে। এতো সব ইতিবাচক মতামত ও বক্তব্য বর্তমান থাকা অবস্থায় কেউ যদি পূর্ববর্ণিত ফকীহদের উল্লেখিত শর্তাবলী সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ ও সর্বপ্রকারের মোজার উপর মসেহ করাকে বৈধ মনে করে, তবে তার বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এরপর আরো কয়েকটি কথা বলা সমীচীন মনে করছি। প্রথম কথা হলো, সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ জায়েয এই মর্মে মুগীরা ইবনে শুবা রা. বর্ণিত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী সহীহ ও উত্তম বলেছেন। এই হাদিসটিকে একই সাহাবি বর্ণিত চামড়ার মোজায় মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের বিপরীত বলে অগ্রাহ্য করা যায়না। এতোটুকু বৈপরিত্য মেনে নেয়া যেতো যদি মাসাহের ঘটনা এক আধবার ঘটতো। ওযু করা ও পবিত্রতা অর্জন করা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তাই উভয় ধরনের মোজায় মসেহ করার প্রয়োজনীয়তা স্বভাবতই একাধিকবার দেখা দেয়ার কথা। তাছাড়া হযরত মুগীরা দীর্ঘদিন যাবত রসূল সা.-এর সাথে থেকেছেন। তাই তার এই দু’ধরণের বর্ণনায় রসূল সা.-এর বিভিন্ন সময়কার কার্যধারার প্রতিফলন ঘটেছে ধরে নিতে অসুবিধে কোথায়? সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে রসূল সা. -এর আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিশেষ ধরনের মোজা নয় বরং যে কোনো ধরনের মোজার উপরই মসেহ জায়েয। তাই মসেহকে শুধুমাত্র চামড়ার মোজার সাথে নির্দিষ্ট করা এবং সুতি বা পশমির মোজা হলে তাকেও চামড়ার মোজা সদৃশ্য ঘন ও পুরু ইত্যাদি হওয়ার শর্তযুক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাটা আরো একটু সহজ্জবোধ্য করার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। সোনা ও রূপার যাকাতের সর্বনিম্ন পরিমাণ আলাদা আলাদা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মোধ্যে রূপার নিসাব সম্বলিত হাদিস সবচেয়ে বিশুদ্ধ। কিন্তু সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিস সনদের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। ছয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থের মধ্যে কেবলমাত্র আবু দাউদ শরিফে সোনার নিসাব ২০ দিনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই হাদিসের বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বিতর্কিত। তা সত্ত্বেও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমান সোনা ও রূপার আলাদা আলাদা নিসাবই মেনে চলে। নিসাব সংক্রান্ত এই হাদিসকে গ্রহণ করলে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণে যাকাত থেকে অব্যাহতি মেলে, ঠিক যেমন মাসাহের হাদিস গ্রহণ করলে মসেহ করে পা ধোয়ার হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। নিসাবের প্রশ্নটা যাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত সম্পাদনের সাথে জড়িত। এখন সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিসটি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তাহলে কুরআনের কঠোর সতর্কবাণী অনুযায়ী যাকাত না দিয়ে স্বর্ণের একটা তারও রাখা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। আর যদি (একই কারণে অর্থাৎ হাদিসটি দুর্বল হলে অগ্রাহ্য করার কারণে) সোনাকে রূপার সমপর্যায়ের ধাতু ধরে নিয়ে সোনার নিসাব ও রূপার নিসাবের সমান মনে করা হয়, (যেমন সুতি ও পশমি মোজাকে চামড়ার মোজার সমপর্যায়ের ধরা হয়) তাহলে একতোলা সোনার উপরও যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু চামড়ার মোজা ও কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার অনুমতিকে যদি পৃথক পৃথক অনুমতি মেনে নেয়া হয় এবং একটির সাথে অন্যটিকে জড়িয়ে ফেলা না হয়, তাহলে মোজা মোটা বা পাতলা যাই হোক, বিধি অপরিবর্তিতই থাকবে। কোনো জিনিসের পুরু বা পাতলা হওয়াটা আপিক্ষিক গুণ বা অবস্থা মাত্র, মূল জিনিসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মোটা বা পাতলা যাই হোক চামড়া চামড়াই এবং পশম পশমই। আজকাল যে ধরনের পাতলা ও কোমল চামড়ার পায়তাবা পরে কেউ কেউ মসেহ করে থাকেন, সে মসেহ জায়েয হলে সুতি পশমি ও নাইলনের মোজায় মসেহ করা নাজায়েয কেন হবে?
আরবিতে খুফ্‌ ও (জাওরাব) বলতে যে মোজা বুঝায়, সেই উভয় মোজাই চামড়ার হয়ে থাকে- এ কথা ঠিক নয়। প্রচলিত আরবিতে খুফ্‌ বলতে চামড়ার মোজা এবং জাওরাব বলতে চামড়া ছাড়া অন্যান্য মোজা বুঝায়। তবে লিসানুল আরব, কামুস ও তাজুল আরুসে এই দুটো শব্দের আভিধানিক অর্থ বলা হয়েছে ‘পায়ের পোশাক।’ চামড়ার তৈরি না অন্য কিছুর তৈরি, এই দু’টি শব্দের আসল আভিধানিকদের কাছে কোনো ধরাবাধা ব্যাপার নয়। তাজুল আরুস এবং লিসানুল আরবে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জাওরাব আসলে ফার্সী শব্দ ‘গোরব’-এর আরবি রূপ। আর ফার্সী আভিধানে গোরব অর্থ হলো পশম বা সুতার মোজা। আরবি ভাষায় খুফ্‌ শব্দ দ্বারা জাওরাব এবং জাওরাব দ্বারা খুফ্‌ বুঝানোও বিচিত্র নয়। ইমাম দুলাবী স্বীয় গ্রন্থ ‘আসমা ও কুনাতে’ হযরত আনাস সম্পর্কে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্বীয় পশমি মোজায় মসেহ করে বললেন “এ দুটো হচ্ছে পশমের তৈরি খুফ্‌”।’

এ থেকে বুঝা গেলো যে, পশমি মোজাকে হযরত আনাস একশ্রেণীর খুফই বলেছেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, এটা খুফ তো নয়, তবে অত্যাধিক মোটা ও পুরু বলে এটা খুফেরই পর্যায়ভুক্ত এবং এ কারণেই তার উপর মসেহ বৈধ। [তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮]

মন্তব্যঃ উপমাদেশের হানাফি আলেমগন যে মতামত দিয়েছেন, যেমনঃ মোজামোটা ও পুরু হওয়া, মোজা পায়ে দিয়ে ৩/৪ মাইল পর্যন্ত হাঁটা যাবে, পায়ের সাথে লেগে থাকা, পানি চোষে না বা ভেদ করে পানি ঠোকে না ইত্যাদি। সঠিক কথা বলতে, এই ধরনের কোন শর্ত মোজার উপর মাসাহ করার জন্য আরোপ করা হয়নি। তবে হ্যা, সালাফদের অনেক মোজা মোটা হওয়ার কথা বলেছেন।

তিরমিজিতে মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান ছাওরী, ইবনু মুবারাক, শাফিঈ, আহমদ ও ইসহাক (রহঃ) ও এই অভিমত পোষণ করেন, তারা বলেনঃ কাপড়ের মোযা যদি মোটা হয় তাহলে পায়ে চপ্পল না থাকলেও তাতে মাসেহ করা যাবে। (ইসলামি ফাউন্ডেশন, তিরমিজী হাদিস ৯৯ এর ব্যাখ্যা)।

যেহেতু মুজার উপর হাদিসে কোন শর্ত আরোপ করেনি তাহলে আমরা কেন করব। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করছেন তার অনুসরণই একমাত্র শ্রেষ্ঠ মানদন্ড। বর্তমান সময়ে লোকেরা কাপড়ের তৈরী মোজাই পরিধান করে থাকে। সুতরাং হাদীছে যেহেতু বিনা পার্থক্যে মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ রাখা হয়েছে, তাই সকল প্রকার মোজার উপর মাসেহ করাই বৈধ। তা চামড়ার তৈরী হোক বা সুতার তৈরী হোক। পরিভাষায় যাকে মোজা বলা হয় তার উপরই মাসেহ করা বৈধ। ইসলাম মানুষের উপর সহজ্জ করতে উৎসাহ দিয়েছে এবং কঠোরতা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং দলিল বিহীন কোন কঠিন মাসআলা মানুষের চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।

তার পরও একটা কথা থাকে। মাসায়েলের ক্ষেত্রে এ উম্মতের প্রশস্ততা আছে। একই বিষয় একাধিক মতামত থাকতে পারে। যার মতামত কুরআন সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী তাই সবার অনুসরণ করা উচিত। তবে অন্যমতকেও সম্মানের চোখে দেখা উচিত, কারন ইসলামি শরীয়তের মৌলিক বিষয়ে বাতিল ফির্কা ছাড়া কার মাঝে বিভেধ নেই। (সব বিষয় আল্লাহই ভাল জানেন)। আমিন।।।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান : চতুর্থ কিস্তি

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

সিয়াম পালন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করছেন এবং কোন শরীয়ত সম্মত ওজর ছাড়া পরিত্যাগ করা যাবেনা। সিয়াম ত্যাগ করা হারাম এবং অস্বীকার কারি কাফির। রমজান মাস ব্যাপিয়া সিয়াম পালন করা ফরজ। কিন্তু মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম এই ফরজ হিসাব মুসাফিরের জন্য কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। যে আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ফরজ করেছেন সেই আয়াতেই তিনি মুসাফিরের জন্য সিয়াম পালনে ছাড় দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম পালন ও মুসাফিরের অবকাশ প্রদান করে সুরা বাকারায় এরশাদ করেন,

*شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

অর্থঃ রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। (সুরা বাকারা ২:১৮৫)।

সালাতের ব্যাপারে দেখেছি সফরের সময় মুসাফির সালাতের কসর করছে। সিয়ামের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ভাঙ্গার অবকাশ প্রদাণ করছেন কিন্তু মুসাফির যখন মুকিম হবে তখন তার উপর ঐ সিয়ামের কাযা করা ওয়াজির হয়ে যায়। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। (সুরা বাকারা ২:১৮৪)।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা অসুস্থ ব্যক্তি, সফরে থাকা ব্যক্তি বা মুসাফির, হায়েজ-নেফাস আক্রান্ত নারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, এবং দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে উদ্ধারকাজে নিয়োজিক ব্যক্তি উপর সিয়াম পালন করা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন।

এই সকল ব্যক্তির যে সকল ওজরের কারনে সিয়াম পালন সাময়িক স্থগিত ছিল, তাদের সে সকল ওজর দুরিভূত হলে ঐ ভাঙ্গা বা বাদপড়া সিয়ামগুলি গননা করে পুনরায় আদায় করতে হবে। অর্থাৎ যখন অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হবে, সফরে থাকা ব্যক্তি সফর শেষ কবরে অর্থাৎ মুসাফির ব্যক্তি মুকিম হবে, নারীগণ হায়েজ-নেফাস এর সময় অতিক্রান্ত করবে, গর্ভবতী নারী সস্তান প্রষব করবে এবং স্তন্যদানকারী নারীর সন্তান স্তন্য পানের সময় অতিক্রান্ত করবে তখন সে তার ভাঙ্গা সিয়ামগুলি আদায় করা ওয়াজিব।

মহান আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট ঘোষনার পর এ সম্পর্কে আর কোন সংশয় থাকার কথা নয়। তাই এ সম্পর্কিত বিধী বিধাণ জানার জন্য কিছু সহিহ হাদিস উল্লেখ করব।

সফরের সময় সিয়াম না থাকার নির্দেষঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের বছর) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনাহ্ হতে মক্কার দিকে রওনা হলেন। (এ সফরে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম রেখেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন (মক্কা হতে দু’ মঞ্জীল দূরে) ‘উসফান’-এ (নামক ঐতিহাসিক স্থানে) পৌঁছলেন তখন পানি চেয়ে আনালেন। এরপর তা হাতে ধরে অনেক উঁচুতে উঠালেন। যাতে লোকেরা পানি দেখতে পায়। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম ভাঙলেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় পৌঁছলেন। এ সফর হয়েছিল রমাযান (রমজান) মাসে। ইবনু ‘আব্বাস বলতেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে সিয়াম রেখেছেন, আবার ভেঙেছেন। অতএব যার খুশী সওম রাখবে (যদি কষ্ট না হয়)। আর যার ইচ্ছা রাখবে না। (সহিহ বুখারী ১৮২০, সহিহ মুসলিম ১১১৩, মিসকাত ২০২৩, আবূ দাঊদ ২৪০৪, নাসায়ী ২৩১৪, আহমাদ ২৬৫২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৬০, ইবনু হিব্বান ৩৫৬৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসে (মাদীনাহ্ হতে) মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি (মক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী স্থান ‘উসফানের কাছে) ‘‘কুরা-‘আল গমীম’’ পৌঁছা পর্যন্ত সওম রাখলেন। অন্যান্য লোকেরাও সওমে ছিলেন। (এখানে পৌঁছার পর) তিনি পেয়ালায় করে পানি চেয়ে আনলেন। পেয়ালাটিকে (হাতে উঠিয়ে এতো) উঁচুতে তুলে ধরলেন যে, মানুষেরা এর দিকে তাকাল। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করলেন। এরপর কিছু লোক আরয করল যে, (এখনো) কিছু লোক সওম রেখেছে (অর্থাৎ- রসূলের অনুসরণে সওম ভাঙেনি)। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এসব লোক পাক্কা গুনাহগার, এসব লোক পাক্কা গুনাহগার। (সহিহ মুসলিম ১১১৪, মিসকাত ২০২৭, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০১৯, সহীহ ইবনু হিববান ৩৫৪৯, সহীহ আত্ তারগীব ১০৫৩।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের কেউ সায়িম ছিলেন। আবার কেউ সওম রাখেননি। আমরা এক মঞ্জীলে পৌঁছলাম। এ সময় খুব রোদ ছিল। (রোদের প্রখরতায়) সায়িম ব্যক্তিগণ (মাটিতে) ঘুরে পড়ল। যারা  সিয়ামরত ছিল না, ঠিক রইল। তারা তাঁবু বানাল, উটকে পানি পান করাল। (এ দৃশ্য দেখে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সিয়াম না থাকা লোকজন আজ সাওয়াবের ময়দান জিতে নিলো। (সহিহ বুখারী ২৮৯০, সহিহ মুসলিম ১১১৯, মিসকাত ২০২২, নাসায়ী ২২৮৩, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৯৬১, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০৩৩, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৫, ইবনু হিববান ৩৫৫৯, সহীহ আল জামি‘ ৩৪৩৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক সফরে ছিলেন। এক স্থানে তিনি কিছু লোকের সমাগম ও এক ব্যক্তিকে দেখলেন। (রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য) ওই লোকটির ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হয়েছে। (এ দৃশ্য দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে কী হয়েছে? লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি সায়িম (দুর্বলতার কারণে পড়ে গেছে)। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সফর অবস্থায় সিয়াম রাখা নেক কাজ নয়। (সহিহ বুখারী ১৯৪৬, সহিহ মুসলিম ১১১৫, মিসকাত ২০২১, দারিমী ১৭৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৪)।

সফরের সময় সিয়াম রাখা ইচ্ছধীনঃ

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হামযা ইবনু ‘আমর আসলামী (রাঃ) অধিক সিয়াম পালনে অভ্যস্থ ছিলেন। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আমি সফরেও কি সিয়াম পালন করতে পারি? তিনি বললেনঃ ইচ্ছা করলে তুমি সিয়াম পালন করতে পার, আবার ইচ্ছা করলে নাও করতে পার। (সহিহ বুখারী ১৮১৯, সহিহ মুসলিম ১১২১, তিরমিযী ৭১১, নাসায়ী ২৩০৬, ইবনু মাজাহ ১৬৬২, মিসকাত ২০১৯, আহমাদ ২৫৬০৭, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৮, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ২৯৬৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৬)।

হামযাহ্ ইবনু ‘আমর আল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সফর অবস্থায় আমি সওম পালনে সমর্থ। (না রাখলে) আমার কী কোন গুনাহ হবে? তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ‘আযযা ওয়াজাল্লা তোমাকে অবকাশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ অবকাশ গ্রহণ করবে, সে উত্তম কাজ করবে। আর যে ব্যক্তি সওম রাখা পছন্দ করবে (সে রাখবে), তার কোন গুনাহ হবে না। (মিসকাত ২০২৯, হাদিসের মান সহিহ; সহিহ মুসলিম ১১২১, নাসায়ী ২৩০৩, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৬, দারাকুত্বনী ২৩০১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৫৬৭, ইরওয়া ৯২৬, সহীহাহ্ ১৯২)।

আবূ সা‘ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে রওনা হলাম। সে সময় রমাযান (রমজান) মাসের ষোল তারিখ অতিবাহিত হয়েছিল। (এ সময়) আমাদের কেউ সওম রেখেছে, আবার কেউ রাখেনি। সায়িমগণ সওমে না থাকা লোকদেরকে খারাপ জানেনি আবার সওমে না থাকা লোকজনও সায়িমগণকে খারাপ মনে করেনি।  (মিসকাত ২০২০ হাদিসের মান সহিহ, সহিহ মুসলিম ১১১৬, আহমাদ ১১৭০৫, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬২)।

বাইতুল্লাহ নির্মাণ ও সংস্কারের ইতিহাস

বাইতুল্লাহ নির্মাণ ও সংস্কারের ইতিহাস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বাইতুল্লাহ হলো পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব নিদর্শন। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বাইতুল্লাহকে তাঁর মনোনীত বান্দাদের মিলনমেলা হিসেবে কবুল করেছেন। ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। বাইতুল্লাহকে কেন্দ্র করে ইসলামের রাজধানী হিসেবে মক্কা জগত বিখ্যাত এবং সুপরিচিত। পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য সর্ব প্রথম এই বাইতুল্লাহ নির্মাণ করা হয়। এই বাইতুল্লাহ কে উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেনঃ

*إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সর্ব প্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপন করা হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত। যা বিশ্বাবাসির জন্য বরকতময় হেদায়েত। ( সুরা ইমরান ৩:৯৬)

বাইতুল্লাহ প্রথম নির্মান নিয়ে সমাজে অনেক কথা প্রচলিত আছে। এই সকল কথার উত্তর খুজে পাওয়া যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে। তাফসিরে ইবনে কাসিরে সুরা বাকারার ১২৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় এক পর্যায় লিখেনঃ “বাইতুল্লাহ সর্বপ্রথম নির্মাতা কেউ কেউ বলেন যে, কাবা শরীফ ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) সর্বপ্রথম পাঁচটি পর্বত দ্বারা কাবা শরীফ নির্মাণ করেন। পর্বত পাঁচটি হচ্ছেঃ (১) হেরা, (২) তুরে সাইনা, (৩) ভূরে যীতা, (৪) জাবাল-ই-লেবানন এবং (৫) জুদী। কিন্তু একথাটিও সঠিক নয়। কেউ বলেন যে, হযরত শীষ (আঃ) সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। কিন্তু এটাও আহলে কিতাবের কথা।

হাদিসের নামে জালিয়াতি কিতাবে ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল রাহিমাহুল্লাহ লিখেনঃ

আদম আলাইহিস সালাম বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত আছে। মূলত বিভিন্ন ঐতিহাসিক, মুফাস্সির বা আলিমের কথা এগুলো। এ বিষয়ক হাদীসগুলো দুর্বল সনদে বর্ণিত। কোনো কোনো মুহাদ্দিস এ বিষয়ক সকল বর্ণনাই অত্যন্ত যয়ীফ ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। আল্লামা ইবনু কাসীর বাইতুল্লাহ বিষয়ক আয়াতগুলো উল্লেখ করে বলেন, এ সকল আয়াতে আল্লাহ সুস্পষ্ট জানিয়েছেন যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য বিশ্বের সকল মানুষের জন্য নির্মিত সর্বপ্রথম বরকতময় ঘর বাইতুল্লাহকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেন। এ স্থানটি সৃষ্টির শুরু থেকেই মহা সম্মানিত ছিল। আল্লাহ সে স্থান ওহীর মাধ্যমে তাঁর খলীলকে দেখিয়ে দেন। তিনি আরো বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটিও সহিহ হাদীস বর্ণিত হয়নি যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর পূর্বে কাবা ঘর নির্মিত হয়েছিল…। এ বিষয়ক সকল বর্ণনা ইসরাঈলীয় রেওয়ায়াত। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, এগুলোকে সত্যও মনে করা যাবে না, মিথ্যাও বলা যাবে না। (আল-বিদায়া ১/১৬৩, তাফসীর ইবন কাসীর ১/১৭৩-১৭৪, ৩/২১৬, হাদিসের নামে জালিয়াতি)

সমাজে প্রচলিত মিথ্যা বা ঈজরাইলী বর্ণানাগুল নিম্মরুপঃ

প্রথম বর্ণনাঃ ফিরিস্তাগন কর্তৃক বাইতুল্লাহ নির্মাণ

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম বর্ণিত হাদিস থেকে ‘বাইতুল মামুর’ সম্পর্কে জানা যায়। মিরাজ সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনার এক পর্যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর বায়তুল মামূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বাইতুল মামূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন না। (সহিহ বুখারী ৩২০৭, সহিহ মুসলিম ৩০০ ও ৩০০৫)।

এই হাদিসের আদতে জালিয়াতগন ফিরিস্থাদের নামেও মিথ্যা রচনা করছেন। তাদের দাবী, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে ফেরেশতারা বাইতুল মামূর আদতে কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবা ঘরের ঠিক ওপরে ঊর্ধ্ব আকাশে ‘বাইতুল মামুরে’ ফেরেশতারা অনেক আগে থেকে তওয়াফ করে আসছিলেন। তাই আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের দ্বারা এই বাইতুল্লাহ নির্মাণ করো। যখন তাঁরা কাবা ঘর নির্মাণ করেন, তখন থেকেই আল্লাহ তায়ালা তাঁদের কাবাঘর তাওয়াফ করার নির্দেশ দেন।

দ্বিতীয় বর্ণনাঃ আদম আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণ

সমাজে প্রচলিত আছেঃ আল্লাহ তায়ালা হজ্জরত আদম ও হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে বলেন, ‘আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করো। অতঃপর হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এর অঙ্কিত স্থানে খননকাজ শুরু করে দেন। আর হজ্জরত হাওয়া আলাইহিস সালাম সেই মাটি বহন করে নিয়ে যেতেন। একপর্যায়ে সেখানে পানির দেখা মিলল। হঠাৎ কে যেন ডাক দিয়ে বলল, ‘হে আদম! যথেষ্ট হয়েছে। ‘যখন তাঁরা এ ঘর নির্মাণ করেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁদের এ ঘর তওয়াফ করার নির্দেশ দিলেন। এ সম্পর্কে আরও বর্ণিত আছে, হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম পাঁচটি পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবাগৃহ নির্মাণ করেছেন। ফিরিস্তগন এই পাথরগুলো সঞ্চয় করে দিতেন। আর পাহাড়গুল হলো, জাবালে হেরা, জুদি, লুবনান, সিনাই ও জাইতুন।

আদম আলাইহিস সালাম ও হাওয়া আলাইহিস সালাম এর পৃথিবীতে মিলন হলে তারা উভয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আদম আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন এবং বাইতুল মামুরের আকৃতিতে পবিত্র কাবাঘর স্থাপন করেন। এখানে হজ্জরত আদম আলাইহিস সালাম সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকেন। 

তাদের মতে, মানব সৃষ্টির বহু আগে মহান আল্লাহ তায়ালা কাবাঘর সৃষ্টি করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বাইতুল্লাহর স্থানকে সমগ্র ভূপৃষ্ট থেকে দু’হাজার বছর আগে সৃষ্টি করেন এবং আদম আলাইহিস সালাম কাবাঘর আল্লাহর আদেশে পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর বহুদিন অতিক্রম হলো। শত শত বছর অতিবাহিত হলো। আল্লাহর বান্দারা কাবাঘর জিয়ারত করতো, আল্লাহর কাছে হাজিরা দিতো এ কাবাঘরে সমবেত হয়ে। কাবাঘরে এসে মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও অংশীদারহীনতা ঘোষণা দিত। এভাবে চলতে চলতে দিন গত হতে থাকলো। এরপর হজ্জরত শীষ আলাইহিস সালাম কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করলেন। দিন দিন একত্ববাদীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

তৃতীয় বর্ণনাঃ বাইতুল্লাহ বা কাবা কে কন্দ্রকরে পৃথিবী সৃষ্ট হয়ঃ

কথিত আছে, পৃথিবীতে ভূমির সৃষ্টি হয় বিশাল সাগরের মাঝে, এর মাঝে মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘরের স্থলকে কেন্দ্র করেই। তাই, কাবার নিচের অংশটুকু অর্থাৎ কাবাঘরের জমিনটুকু হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম মাটি। ধীরে ধীরে এর চারপাশ ভরাট হয়ে সৃষ্টি হয় একটি বিশাল মহাদেশের। পরে এক মহাদেশ থেকেই সৃষ্টি হয় সাত মহাদেশের। মাটিতে রূপান্তর হওয়ার আগে কাবা সাদা ফেনা আকারে ছিল। সে সময় পৃথিবীতে পানি ছাড়া কিছু ছিল না।

আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর। মাটি বিছানোর পর জমিন নড়তে থাকে। হেলতে থাকে। এর জন্য মহান আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় (হেলে না যায়)।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১৫)। এভাবেই পবিত্র কাবার বরকতে পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। ধীরে ধীরে এখানে মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন হয়।

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আল্লাহ পবিত্র কাবা শরিফকে তার মনোনীত বান্দাদের মিলনমেলাস্থল হিসেবে কবুল করেছেন। দুনিয়া জুড়ে মুসলমানদের কিবলা এই কাবা শরিফ।

মন্তব্যঃ আমরা আগেই জেনেছি বাইতুল্লাহ নির্মাণ করেন ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম। আদম আলাইহিস সালামের প্রশ্ন আসে না। কিন্তু জালকারীগণ তাদের বর্ণনা সাথে কুরআন ও সহিহ হাদিসকে এমন ভাবে জুড়ে দেয় যে, সঠিক জ্ঞান না থাকলে ধরা কষ্টকর। আগের বর্ণায় সহিহ হাদিসের বর্ণিত বাইতুল মামুরকে সম্পৃক্ত করেছে। যাতে সাধারণ লোক ধোঁকা খায়।

চতুর্থ বর্ণনাঃ সনদবিহীন বর্ণনা সত্য মিথ্যা জানা যায় নাঃ

অনেক ঐতিহাসিকের মতে কা‘বাঘর ১২ (বারো) বার নির্মাণ পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। নিচে নির্মাতা, পুনঃনির্মাতা ও সংস্কারকের নাম উল্লেখ করা হলঃ

১. ফেরেশতা। ২. আদম। ৩. শীছ ইবন আদম। ৪. ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ.। ৫. আমালেকা সম্প্রদায়। ৬. জুরহুম গোত্র। ৭. কুসাই ইবন কিলাব। ৮. কুরাইশ। ৯. আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের রা. (৬৫ হি.)। ১০. হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ (৭৪ হি.)। ১১. সুলতান মারদান আল-উসমানী (১০৪০ হি.) এবং বাদশাহ ফাহদ ইবন আবদুল আজীজ (১৪১৭ হি.)। (ড. মুহাম্মদ ইলিয়াস আব্দুল গনী, তারীখু মাক্কাতিল মুকাররামা, মাতাবিউর রাশীদ, মদীনা মুনাওয়ারা।

মন্তব্যঃ প্রথম বর্ণানাগুলোর সনদ নাই কিন্তু সাত নম্বরের পরেরগুলোর ঐতিহাদিক সদন আছে। 

বাইতুল্লাহ ছবি

২। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণঃ

সবচেয়ে নিভর্রযোগ্য বর্ণনা মতে মহান আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কাবাগৃহ নির্মাণ করেন। ইসমাইল আলাইহিস সালাম পাথর নিয়ে আসতেন এবং ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম নির্মাণ কাজ করতেন। ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম কর্তৃক নির্মাণ করার সুষ্পষ্ট প্রমান কুরআনুর কারিমে পাওয়া যায়। তাদের দুজনকে কাবাঘর নির্মানের জন্য নির্দেষ প্রদান করা হয়। সাথে সাথে এই ঘর নির্মানের কারন ব্যাখ্যা করে আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

অর্থঃ যখন আমি কাবা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মেলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। ( সুরা বাকারা ২:১২৫ )

মন্তব্যঃ এই আয়াত আলোকে বলা যায়, বাইতুল্লাহ বা কাবাঘর নির্মানের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, সালাত আদায় ও হজ্জ করা তথা সকল মানুষের জন্যে সম্মেলন ও শান্তির স্থল হিসাবে তৈরি করা।

*** কাবা ঘর নির্মাণকালে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহ দরবানে দোয়া করেছিলেন, সেই কথাও পবিত্র কুরআন আল্লাহ উল্লেখ করছেন। তিনি এরশাদ করেন,

وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٲهِـۧمُ رَبِّ ٱجۡعَلۡ هَـٰذَا بَلَدًا ءَامِنً۬ا وَٱرۡزُقۡ أَهۡلَهُ ۥ مِنَ ٱلثَّمَرَٲتِ مَنۡ ءَامَنَ مِنۡہُم بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۖ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ ۥ قَلِيلاً۬ ثُمَّ أَضۡطَرُّهُ ۥۤ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلنَّارِ‌ۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ (١٢٦) وَإِذۡ يَرۡفَعُ إِبۡرَٲهِـۧمُ ٱلۡقَوَاعِدَ مِنَ ٱلۡبَيۡتِ وَإِسۡمَـٰعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ (١٢٧) رَبَّنَا وَٱجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَيۡنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةً۬ مُّسۡلِمَةً۬ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبۡ عَلَيۡنَآ‌ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ (١٢٨) رَبَّنَا وَٱبۡعَثۡ فِيهِمۡ رَسُولاً۬ مِّنۡہُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَيُزَكِّيہِمۡ‌ۚ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (١٢٩)

অর্থঃ স্মরণ করুন যখন ইব্রাহীম বলেছিলেনঃ

*হে আমার প্রতিপালক! একে নিরাপদ শহর করুন আর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন।

তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কেউ কুফরী করবে তাকেও কিছুকালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব। অতপর তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব এবং তা কত নিকৃষ্ট পরিণাম! স্মরন করুন, যখন ইব্রাহীম ও ইসমা’ঈল কা’বা ঘরের প্রাচীর তুলছিলেন তখন তারা বলেছিলেন,

*হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।

*হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত উম্মাত করুন। আমাদেরকে ‘ইবাদাতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হন, আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

হে পরওয়ারদেগার! তাদের মধ্যে থেকেই তাদের নিকট একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুণ যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিবেন। এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় তুমিই পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। (আল-বাকারা ২:১২৬-১২৯)

**ইবাদতের পাশাপাশি বাইতুল্লাহ নির্মাণের উদ্দেশ্য হল, শির্কমু্ক্ত নির্ভেজাল একত্ববাদের প্রতিষ্ঠার করা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ

অর্থঃ যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৬) 

৩। কাবা ধ্বংশের ব্যর্থ চেষ্টাঃ

আবরাহা সাবাহ হাবশী (তিনি নাজ্জাশী সম্রাট হাবশের পক্ষ হতে ইয়ামানের গভর্ণর ছিলেন) যখন দেখলেন যে, আরববাসীগণ ক্বাবা’হ গৃহে হজ্জব্রত পালন করছেন এবং একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন সেখানে আগমন করছেন তখন সানআয় তিনি একটি বিরাট গীর্জা নির্মাণ করলেন এবং আরববাসীগণের হজ্জব্রতকে সেদিকে ফিরিয়ে আনার জন্য আহবান জানালেন। কিন্তু বনু কিনানাহ গোত্রের লোকজন যখন এ সংবাদ অবগত হলেন তখন তাঁরা এক রাত্রে গোপনে গীর্জায় প্রবেশ করে তার সামনের দিকে মলের প্রলেপন দিয়ে একদম নোংরা করে ফেললেন। এ ঘটনায় আবরাহা ভয়ানক ক্রোধান্বিত হন এবং প্রতিশোধ গ্রহণ কল্পে ক্বাবা’হ গৃহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ষাট হাজার অস্ত্র সজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীসহ মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হন। তিনি নিজে একটি শক্তিশালী হস্তীপৃষ্ঠে আরোহণ করেন। সৈন্যদের নিকট মোট নয়টি অথবা তেরটি হস্তী ছিল। (আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী)

সুরা ফিলের সানে নুযুল থেকে পাই, বাদশা আবরাহা যখন কাবা ধ্বংস করার জন্য আসে তখন তার অগ্রবাহিনী তিহামার অধিবাসী ও কুরাইশদের উট, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি বহু পালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবেরও দু’শো উট ছিল। এরপর সে মক্কাবাসীদের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠায়। তার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের কাছে এই মর্মে বাণী পাঠায়, আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি শুধুমাত্র এই ঘরটি (কাবা) ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। যদি তোমরা যুদ্ধ না করো তাহলে তোমাদের প্রাণ ও ধন সম্পত্তির কোন ক্ষতি আমি করবো না। তাছাড়া তার এক দুতকেও মক্কাবাসীদের কাছে পাঠায়। মক্কাবাসীরা যদি তার সাথে কথা বলতে চায় তাহলে তাদের সরদারকে তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। আবদুল মুত্তালিব তখন ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার। দূত তাঁর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি বলে, আবরাহার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। দূত বলে , আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন এবং দূতের সাথে আবরাহার কাছে যান। তিনি এতই সুশ্রী ও আকর্ষণীয় প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে আবরাহ তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং সিংহাসন থেকে নেমে এসে নিজে তাঁর কাছে বসে পড়ে। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে , আপনি কি চান? তিনি বলেন , আমার যে উটগুলো ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলো আমাকে ফেরত দেয়া হোক। আবরাহা বলল, আপনাকে দেখে তো আমি বড়ই প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন, অথচ এই যে ঘরটা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না, আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন, আমি তো কেবল আমার উটের মালিক এবং সেগুলোর জন্য আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আর এই ঘর! এর একজন রব, মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা জবাব দেয়, তিনি একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বলেন, এ ব্যাপারে আপনি জানেন ও তিনি জানেন। একথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে পড়েন। আবরাহা তাঁকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দেয়।  আবরাহার সেনাদলের কাছ থেকে ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে বলেন, নিজেদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর চলে যাও , এভাবে তারা ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তারপর তিনি ও কুরাইশদের কয়েকজন সরদার হারম শরীফে হাযির হয়ে যান। তারা কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতে থাকেন যে, তিনি যেন তাঁর ঘর ও তাঁর কাদেমদের হেফাজত করেন। সে সময় কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। কিন্তু এই সংকটকালে তারা সবাই এই মূর্তিগুলোর কথা ভুলে যায়। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য হাত ওঠায়। ইতিহাসের বইগুলোতে তাদের প্রার্থনা বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিবের নিম্নোক্ত কবিতাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন  

 “হে আল্লাহ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো। আগামীকাল তাদের ক্রুশ ও তাদের কৌশল যেন তোমার কৌশলের ওপর বিজয় লাভ না করে। যদি তুমি ছেড়ে দিতে চাও তাদেরকে ও আমাদের কিবলাহকে তাহলে তাই করো যা তুমি চাও। সুহাইলী ‘রওযুল উনুফ’ গ্রন্থে এ প্রসংগে নিম্নোক্ত কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন, ক্রুশের পরিজন ও তার পূজারীদের মোকাবিলায় আজ নিজের পরিজনদেরকে সাহায্য করো। আবদুল মুত্তালিব দোয়া করতে করতে যে , কবিতাটি পড়েছিলেন ইবনে জারীর সেটিও উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছেঃ

“হে আমার রব! তাদের মোকাবিলায়

তুমি ছাড়া কারো প্রতি আমার আশা নেই,

হে আমার রব! তাদের হাত থেকে

তোমার হারমের হেফাজত করো।

এই ঘরের শত্রু তোমার শত্রু,

তোমার জনপদ ধবংস করা থেকে

তাদের বিরত রাখো।”

এ দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীরাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে দিন আবরাহা মক্কায় প্রবশে করার জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় ঝাঁকে ঝাকে পাখিরা ঠোঁটে ও পাঞ্জার পাথর কণা নিয়ে উড়ে আসে । তারা এ সেনাদলের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকে। যার ওপর পাথর কণা পড়তো তার দেহ সংগে সংগে গলে যেতে থাকতো। (তাফসীরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআন এর সুরা ফিলের তাফসির)

আর রাহীকুল মাখতূম এর বর্ণানায় এসেছেঃ আবরাহা ইয়ামান হতে অগ্রসর হয়ে মুগাম্মাস নামক স্থানে পৌঁছলেন এবং সেখানে তাঁর সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করে নিয়ে মক্কায় প্রবেশের জন্য অগ্রসর হলেন। তারপর যখন মুজদালেফা এবং মিনার মধ্যবর্তী স্থান ওয়াদিয়ে মুহাস্সারে পৌঁছলেন তখন তার হাতী মাটিতে বসে পড়ল। ক্বাবা’হ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোন ক্রমেই তাকে উঠানো সম্ভব হল না। অথচ উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্ব মুখে যাওয়ার জন্য উঠানোর চেষ্টা করলে তা তৎক্ষণাৎ উঠে দৌঁড়াতে শুরু করত। এমন সময়ে আল্লাহ তা‘আলা এক ঝাঁক ছোট ছোট পাখী প্রেরণ করলেন। সেই পাখীগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে পাথরের ছোট ছোট টুকরো সৈন্যদের উপর নিক্ষেপ করতে লাগল। প্রত্যেকটি পাখি তিনটি করে পাথরের টুকরো বা কংকর নিয়ে আসত একটি ঠোঁটে এবং দুইটি দু’পায়ে। কংকরগুলোর আকার আয়তন ছিল ছোলার মতো। কিন্তু কংকরগুলো যার যে অঙ্গে লাগত সেই অঙ্গ ফেটে গিয়ে সেখান দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে হতে সে মরে যেত।

এ কাঁকর দ্বারা সকলেই যে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিল তা নয়। কিন্তু এ অলৌকিক ঘটনায় সকলেই ভীষণভাবে আতংকিত হয়ে পড়ল এবং প্রাণভয়ে পলায়নের উদ্দেশ্যে যখন বেপরোয়াভাবে ছুটাছুটি শুরু করল তখন পদতলে পিষ্ট হয়ে অনেকেই প্রাণত্যাগ করল। কংকরাঘাতে ছিন্নভিন্ন এবং পদতলে পিষ্ট হয়ে পলকে বীরপুরুষগণ মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়তে লাগল। এদিকে আবরাহার উপর আল্লাহ তা‘আলা এমন এক মুসিবত প্রেরণ করলেন যে তাঁর আঙ্গুল সমূহের জোড় খুলে গেল এবং সানা নামক স্থানে যেতে না যেতেই তিনি পাখির বাচ্চার মতো হয়ে পড়লেন। তারপর তাঁর বক্ষ-বিদীর্ণ হয়ে হৃদপিন্ড বেরিয়ে এল এবং তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হলেন।

মক্কা অভিমুখে আবরাহার অগ্রাভিযানের সংবাদ অবগত হয়ে মক্কাবাসীগণ প্রাণভয়ে নানা দিকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পলায়ন করে পাহাড়ের আড়ালে কিংবা পর্বত চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তারপর যখন তাঁরা অবগত হলেন যে, আবরাহা এবং তাঁর বাহিনী সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তাঁরা স্বস্তির নিংশ্বাস ত্যাগ করে আপন আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। অধিক সংখ্যক চরিতবেত্তাগণের অভিমত হচ্ছে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্মলাভের মাত্র ৫০ কিংবা ৫৫ দিন পূর্বে মুহাররম মাস। অত্র প্রেক্ষিতে এটা ধরে নেয়া যায় যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ৫৭১ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রেব্রুয়ারী মাসের শেষ ভাগে কিংবা মার্চ মাসের প্রথম ভাগে। হস্তী বাহিনীর এ ঘটনা ছিল আগামী দিনের নাবী (সাঃ) এবং ক্বাবা’হ শরীফের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও সাহায্যের এক সুস্পষ্ট নিদর্শন। [আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ)]

৪। কুরাইশদের কাবাগৃহ নির্মাণঃ

খোজায়া গোত্রের পতনের পর মক্কার শাসনভার গ্রহণ করেন কুরাইশ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুসাই বিন কিলাব। কুরাইশরা ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় পর্যন্ত মক্কার শাসন ও কাবার রক্ষণাবেক্ষণ করে। তিনি তাওয়াফের জন্য কাবার আঙিনা চিত্রিত করেন, যা আজও বিদ্যমান। তিনিই কাবার ছায়ায় ‘দারুন নদওয়া’ বা পরামর্শ সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে কাবায় চূড়ান্তরূপে মূর্তি পূজা শুরু হয়।

ক্বাবা’হ গৃহ পুনঃ নির্মাণ এবং হজ্জরে আসওয়াদ সম্পর্কিত বর্ণনা আর রাহিকুল মাখতুমে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করেন তখন কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কারণ, ক্বাবা’হ গৃহের স্থানটি চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় ছিল মাত্র। দেয়ালের উপর কোন ছাদ ছিল না। এ অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু সংখ্যক চোর এর মধ্যে প্রবেশ করে রক্ষিত বহু মূল্যবান সম্পদ এবং অলঙ্কারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আঃ)-এর আমল হতেই এ ঘরের উচ্চতা ছিল ৯ হাত।

গৃহটি বহু পূর্বে নির্মিত হওয়ার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যে কোন মুহূর্তে তা ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া সেই বছরেই মক্কা প্লাবিত হয়ে যাওয়ার কারণে ক্বাবা’হমুখী জলধারা সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া প্রবাহিত হওয়ায় ক্বাবা’হগৃহের দেওয়ালের চরম অবনতি ঘটে এবং যে কোন মুহূর্তে তা ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। এমন এক নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ হলেন ক্বাবা’হ গৃহের স্থান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তা পুনঃনির্মাণের জন্য।

ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকল গোত্রের কুরাইশগণ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কতিপয় নীতি নির্ধারণ করে নিলেন। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমেঃ ক্বাবা’হ গৃহ নির্মাণ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বৈধ অর্থ-সম্পদ (হালাল) ব্যবহার করা হবে। এতে বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ, সুদের অর্থ এবং হক নষ্ট করে সংগৃহীত হয়েছে এমন কোন অর্থ নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা চলবে না। এ সকল নীতির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন করে নির্মাণ কাজ আরম্ভ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হল।

নতুন ইমারত তৈরির জন্য পুরাতন ইমারত ভেঙ্গে ফেলা প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলার কাজে হাত দিতে কারো সাহস হচ্ছে না, অবশেষে ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ মাখযুমী সর্বপ্রথম ভাঙ্গার কাজে হাত দিলেন এবং অন্যেরা ভীত-সম্ভ্রন্ত চিত্তে তা প্রত্যক্ষ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু অংশ ভেঙ্গে ফেলার পরও যখন তাঁরা দেখলেন যে তাঁর উপর কোন বিপদ আপদ আসছে না তখন সকলেই ভাঙ্গার কাজে অংশ গ্রহণ করলেন। যখন ইবরাহীম (আঃ)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলা হল তখন নির্মাণ কাজ শুরু হল। প্রত্যেক গোত্র যাতে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ লাভ করে তজ্জন্য কোন্ গোত্র কোন্ অংশ নির্মাণ করবেন পূর্বাহ্নেই তা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে প্রত্যেক গোত্রই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রস্তর সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। বাকূম নামক একজন রুমীয় মিস্ত্রির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছিল। নির্মাণ কাজ যখন কৃষ্ণ প্রস্তরের স্থান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল তখন নতুনভাবে এক সমস্যার সৃষ্টি হল। সমস্যাটি হল ‘হাজারে আসওয়াদ’ তথা ‘কৃষ্ণ প্রস্তর’টি স্থাপন করার মহা গৌরব অর্জন করবেন তা নিয়ে। এ ব্যাপারে ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি চার বা পাঁচ দিন চললো।

সকলেই নিজে বা তাঁর গোত্র কৃষ্ণ প্রস্তরটি যথাস্থানে স্থাপন করার দাবীতে অনড়। সকলেরই এক কথা, এ কাজটি তাঁরাই করবেন। কেউই সামান্য ছাড় দিতেও তৈরি নন। সকলেরই একই কথা, একই জেদ। জেদ ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হল রেষারেষিতে। রেষারেষির পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে রক্তারক্তি। এ ব্যাপারে রক্তারক্তি করতেও তাঁরা পিছপা হবেন না। সকল গোত্রের মধ্যেই চলছে সাজ সাজ রব। শুরু হয়েছে অস্ত্রের মহড়া। একটু নরমপন্থীগণ সকলেই আতঙ্কিত কখন যে যুদ্ধ বেধে যায় কে তা জানে।

এমন বিভীষিকাময় এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্ষীয়ান নেতা আবু্ উমাইয়া মাখযূমী এ সমস্যা সমাধানের একটি সূত্র খুঁজে পেলেন। তিনি সকলকে লক্ষ্য করে প্রস্তাব করলেন যে, আগামী কাল সকালে যে ব্যক্তি সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবেন তাঁর উপরেই এ বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব অর্পণ করা হোক। সকলেই এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কী অপার মহিমা! দেখা গেল সকল আরববাসীর প্রিয়পাত্র ও শ্রদ্ধেয় আল-আমিনই সর্ব প্রথম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছেন। নাবী কারীম (সাঃ)-এর এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠলঃ

*هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ،*

আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সকলেই এর উপর সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মাদ (সাঃ)।

তারপর নাবী কারীম (সাঃ) যখন তাঁদের নিকটবর্তী হলেন তখন ব্যাপারটি সবিস্তারে তাঁর নিকট পেশ করা হল। তখন তিনি এক খানা চাদর চাইলেন। তাঁকে চাদর দেয়া হলে তিনি মেঝের উপর তা বিছিয়ে দিয়ে নিজের হাতে কৃষ্ণ প্রস্তরটি তার উপর স্থাপন করলেন এবং বিবাদমান গোত্রপতিগণকে আহবান জানিয়ে বললেন, ‘আপনারা সকলে চাদরের পার্শ্ব ধরে উত্তোলন করুন। তাঁরা তাই করলেন। চাদর যখন কৃষ্ণ প্রস্তর রাখার স্থানে পৌছল তখন তিনি স্বীয় মুবারক হস্তে কৃষ্ণ প্রস্তরটি উঠিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। এ মীমাংসা সকলেই হৃষ্টচিত্তে মেনে নিলেন। অত্যন্ত সহজ্জ, সুশৃঙ্খল এবং সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

এ দিকে কুরাইশগণের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল। এ জন্যই উত্তর দিক হতে ক্বাবা’হ গৃহের দৈর্ঘ আনুমানিক ছয় হাত পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হল। এ অংশটুকুই ‘হিজর’ ‘হাতীম’ নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ ক্বাবা’হর দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারে যাকে তাঁরা অনুমতি দেবেন। যখন দেয়ালগুলো পনের হাত উঁচু হল তখন গৃহের অভ্যন্তর ভাগে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হল এবং তার উপর ছাদ দেয়া হল। ক্বাবা’হ গৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে একটি চতুর্ভূজের রূপ ধারণ করল। বর্তমানে ক্বাবা’হ গৃহের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর বিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎঃ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে দশ দশ মিটার। কৃষ্ণ প্রস্তর মাতাফের জায়গা হতে দেড় মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দরজা বিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল বার মিটার করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে দু’মিটার উঁচুতে। দেয়ালের পাশেই চতুর্দিকে নীচু জায়গা এক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে শাজে বওয়া (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। [আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ)]

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার শাসক হলেন আবদুল মুত্তালিব। তিনিই প্রথম কাবায় স্বর্ণখচিত লৌহদরজা নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনামলে ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা ‘সানা’য় প্রতিষ্ঠিত ‘কুলাইস গির্জাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য কাবা থেকে হজ্জ স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কাবা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে বিরাট হস্তীবাহিনী পাঠায়। আল্লাহ তায়ালা তার সমুচিত জবাব দিয়ে দেন। যা পবিত্র কোরআনে সুরা ফিলে বিবৃত হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন এক মহিলা কাবাগৃহে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর বন্যার কারণে কাবার গিলাফ ও দেয়াল ধ্বংস হয়ে যায়। তখন সবার সম্মতিক্রমে কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।

৫। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) এর নির্মাণঃ

ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া এর শাসনামলে হুসাইন নামক এক ব্যক্তির মিনজানিক (আগুনের গোলা)  ব্যবহারের দরুন মতান্তরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মিনজানিক হামলার কারণে কাবা শরিফ পুড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ফলে তা পুনর্নির্মাণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) কাবা পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। তিনি হাতিমে কাবাকে কাবার সাথে যুক্ত করে তার আদিরূপ ফিরিয়ে আনতে ইচ্ছুক ছিলেন। মুহাম্মদ সাঃ নিজেও তার জীবদ্দশায় এমন ইচ্ছা করেছিলেন তবে তা নতুন ইসলাম গ্রহণকারীরা সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না ভেবে বাস্তবায়ন করেননি। হাদিসে এসেছেঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেনঃ তুমি কি জান না! তোমার কওম যখন কা’বা ঘরের পুনর্নির্মান করেছিল তখন ইব্রাহীম (আ:) কর্তৃক কা’বা ঘরের মূল ভিত্তি হতে তা সঙ্কুচিত করেছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির উপর পুন:স্থাপন করবেন না? তিনি বললেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হত তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম। ‘আবদুল্লাহ (ইব্‌নু ‘উমর) (রা: ) বলেন, যদি ‘আয়েশা (রাঃ) নিশ্চিতরূপে তা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় যে, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির উপর নির্মিত না হবার কারণেই আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (তাওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু’টি কোণ স্পর্শ করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৩)

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বলেনঃ হে ‘আয়েশা! যদি তোমার কওমের যুগ জাহিলিয়াতের নিকটবর্তী না হত তাহলে আমি কা’বা ঘর সম্পর্কে নির্দেশ দিতাম এবং তা ভেঙ্গে ফেলা হত। অত:পর বাদ দেয়া অংশটুকু আমি ঘরের অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম এবং তা ভূমি বরাবর করে দিতাম ও পূর্ব-পশ্চিমে এর দু’টি দরজা করে দিতাম। এভাবে কা’বাকে ইব্রাহীম (আঃ) নির্মিত ভিত্তিতে সম্পন্ন করতাম। (বর্ণনাকারী বলেন), আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ উক্ত কা’বা ঘর ভাঙতে (‘আবদুল্লাহ) ইব্‌নু যুবাইর (রহঃ)-কে অনুপ্রাণিত করেছে। (রাবী) ইয়াযীদ বলেন, আমি আমি ইব্‌নু যুবাইর (রাঃ)-কে দেখেছি তিনি যখন কাবা ঘর ভেঙে তা পুনর্নির্মাণ করেন এবং বাদ দেয়া অংশটুকু (হাতীম) তার সাথে সংযোজিত করেন এবং ইব্রাহীম (আঃ)-এর নির্মিত ভিত্তির পাথরগুলো উটের কুঁজোর ন্যায় আমি দেখতে পেয়েছি। (রাবী) জারীর (রহঃ) বলেন, আমি তাকে (ইয়াযীদকে) বললাম, কোথায় সেই ভিত্তি মূলের স্থান? তিনি বললেন, এখনই আমি তোমাকে দেখিয়ে দিব। আমি তাঁর সাথে বাদ দেয়া দেয়াল বেষ্টনীতে (হাতীমে) প্রবেশ করলাম। তখন তিনি একটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে। জরীর (রহঃ) বলেন, দেয়াল বেষ্টিত স্থানটুকু পরিমাপ করে দেখলাম ছয় হাত বা তার কাছাকাছি। (সহিহ বুখারি ১৫৮৪)

আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ (রাহঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু যুবাইর (রাঃ) তাকে বললেন, তোমাকে উম্মুল মু’মিনীন আইশা (রাঃ) যে হাদীস বলেছেন, তা আমার নিকটে বর্ণনা কর। আসওয়াদ বলেন, তিনি আমাকে বলেছেন যে, তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায় জাহিলী যুগের এত নিকটে এবং ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে নবদীক্ষিত না হত তাহলে আমি কা’বা ঘরকে ভেঙ্গে (পুনঃনির্মাণ করে) এর দুটো দরজা বানাতাম। (সুনানে তিরমিজ ৮৭৫)

আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রাঃ) কর্তৃক সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে নতুনভাবে কাবা নির্মাণ করা হয় এবং এতে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পূর্ব ও পশ্চিমে দুটি দরজা স্থাপন করা হয়। তাছাড়া অর্ধবৃত্তাআরা হাতিম কাবার সাথে যুক্ত করা হয়। হজ্জরে আসওয়াদকে রূপার ফ্রেমে বাধিয়ে কাবায় সংযুক্ত করা হয়। এই পবিত্র পাথরের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে এটি আট টুকরো। আগে হাজরে আসওয়াদ ছিল আস্ত একটি পাথর। হজ্জরত আবদুল্লাহ বিন জোবায়েরের শাসনামলে কাবা শরিফে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদ কয়েক টুকরা হয়ে যায়। তাই তিনি ভাঙা টুকরাগুলো রুপার ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেন। ফ্রেম সংস্করণের সময় চুনার ভেতর কয়েকটি টুকরা ঢুকে যায়। বর্তমানে হাজরে আসওয়াদের আটটি টুকরা দেখা যায়। বড় টুকরাটি খেজুরের সমান

তিনি কাবাকে তিনি পুরো ইব্রাহিমি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। গমন বহির্গমনের সুবিধার্থে তিনি ‘মাতাফে’র সঙ্গে মিশিয়ে দুটি দরজা নির্মাণ করে সর্বসাধারণের জন্য অবমুক্ত করে দেন। ছাদের ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনি কাবার অভ্যন্তরে তিনটি কাঠের স্তম্ভ স্থাপন করেন এবং কাবার উচ্চতা আরো ১০ হাত বৃদ্ধি করে দেন। ইবনে আসিরের বর্ণনা মতে, এ ঘটনা ছিল ৬৫ হিজরিতে।

পুরাতন বাইতুল্লাহ কয়েকটি ছবি দিলামঃ

৬। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাবা নির্মাণঃ

৭৪ হিজরিতে (৬৯৪ খৃষ্টাব্দে)  আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) কে শহীদ করেন। ইবনে জুবাইরের কাবা নির্মাণকে হাজ্জাজ আত্মচিন্তা প্রসূত জ্ঞান করে কাবাকে কুরাইশি কাঠামোতে ফিরিয়ে নিতে উৎসাহী হন। ইবনে মারওয়ানের সম্মতিক্রমে তিনি ইবনে জুবাইরের স্মৃতিচিহ্নকে ধুলায় ধূসরিত করে দেন। তিনি ইব্রাহিমি কাঠামো পরিবর্তন করে কাবাকে কুরাইশি ফ্রেমে বন্দি করেন। পরবর্তী সময়ে হজ্জরত আয়েশা (রা.)-এর হাদিস শুনে ইবনে মারওয়ান খুবই অনুতপ্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। এরপর বাদশাহ হারুনুর রশিদ কাবাকে ইবনে জুবাইরের আদলে নির্মাণ করতে চাইলে ফেতনার আশঙ্কায় তৎকালীন আলেম সমাজ বিশেষত ইমাম মালেক (রহ.) তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

এর পর থেকে নির্মাণের পরিবর্তে কাবা শরিফের সংস্কারকাজ অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে। ৯১ (৭১০ খৃষ্টাব্দে) হিজরিতে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার করেন।

৭। উসমানি খেলাফতকালে সংস্কারঃ

১০১৯ হিজরিতে (১৬১০ খৃষ্টাব্দে) কাবার দেয়াল বিদীর্ণ হয়ে গেলে বাদশাহ আহমদ খান তা সংস্কার করেন। ১০৩৯/১০৪০ হিজরি (১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) এক ভয়াবহ বন্যায় কাবার পশ্চিম দিকের দরজাটি ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া কাবার দেয়ালে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। বাদশাহ মুরাদ খান পাশার অর্থায়নে কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার আনা হয়। ১২৭৬ হিজরিতে (১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ আবদুল মজিদ একটি ‘মিজাব’ (নালা) হাদিয়া দেন, যাতে ২৩ কেজি (প্রায়) স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছিল।

৮। সৌদি রাজবংশের সংস্কারকাজঃ

১৩৬৩ হিজরিতে (১৯৪৪ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ আবদুল আজিজ কাবার দরজা পরিবর্তন করেন। ১৩৭৭ হিজরিতে (১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ সৌদ কাবার ওপরের ছাদ ভেঙে পুনর্নির্মাণ ও নিচের ছাদ নবায়ন করেন। এমনকি দেয়ালগুলো নতুন করে মেরামত করেন। ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ ফয়সাল কাবার দরজায় সংস্কার আনেন। ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ খালেদ প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করে নতুন দরজা প্রতিস্থাপন করেন।

১৪১৬ হিজরিতে (১৯৯৫ খৃষ্টাব্দে) বাদশাহ ফাহদ কাবার বাইরের দেয়াল সংস্কার করেন। ১৪১৭ হিজরিতে (১৯৯৬খৃষ্টাব্দে) তিনি কাবাগৃহের ছাদ, খুঁটি, দেয়ালসহ সব কিছু সংস্কার করে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান। তাঁর এ নির্মাণকাজকে কাবার সর্বশেষ নির্মাণ বা সর্বশেষ সংস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

বর্তমান বাইতুল্লাহ এর ছবি

৯। বাইতুল্লাহর তাওয়াফ কি কখনও বন্ধছিল?

হ্যা, বিভিন্ন কারনে বাইতুল্লাহ বহুবার বন্ধ ছিল। ইসলামী ধর্ম আবির্ভাবের আগে এবং আবির্ভাবের পরে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারির প্রাদুর্ভাব, বৈরী আবহাওয়াসহ নানা কারণে  বেশ কয়েক বার বাইতুল্লাহ বন্ধছিল। ইসলামের ইতিহাসে দেখাযায় নবম হিজরিতে হজ্জ ফরজ হওয়ার পর হজ্জ উমরা বন্ধ ছিল। যে যে সময় কাবা বন্ধছিল তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

আবরাহার আক্রমণঃ

হস্তিবর্ষে আবরাহার আক্রমণের ফলে পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে হজ্জ ও তাওয়াফ বন্ধ থাকে। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ভেতর ঘটনাটি ঘটেছে। এ বছরই রাসুল (সা.) জম্মগ্রহণ করেছিলেন। কাবা ধ্বংস করে মানুষকে ইয়েমেনে নিতে চেয়েছিল আবরাহা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাবা রক্ষা করেছিলেন। এ সময়ও কাবায় তাওয়াফ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে।

কাবা পুনর্নির্মাণঃ

এ ছাড়া নবুয়তের পাঁচ বছর আগে বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাবা ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে কোরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। আর তখনো কাবায় তাওয়াফ বন্ধ থাকতে পারে। যেহেতু তাতে দীর্ঘ সময় লেগে ছিল। রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে হাজরে আসওয়াত স্থাপনের ঘটনা এ সময় ঘটেছিল।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের আক্রমণঃ

৭৩ হিজরি (৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে) খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশনায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কাবা অবরোধ করে। সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) আত্মগোপন করেছিলেন। খলিফার পক্ষে বাইআত না করে তিনি নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এভাবে ৯ বছর অতিবাহিত হয়। এই সময়ে আক্রমণের কারণে কাবার বিভিন্ন দিক ধ্বংস হয় এবং নামাজ ও ওমরাহ বন্ধ থাকে। এমনকি আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বিজয়ী হলে আবদুল্লাহ বিন জুবায়েরের নির্মিত অংশটুকুও ভেঙে ফেলা হয়। ফলে কাবা পুনর্নির্মাণের সময় নামাজ ও তাওয়াফ বন্ধ থাকে।

কারামিয়াদের আক্রমণঃ

শিয়াদের একটি দল হলো কারামিয়া। ইরাকের আব্বাসি শাসক ও মিসরে উবায়াদি শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে আরব উপদ্বীপের পূর্ব প্রান্তে বাহরাইনে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, ‘হজ্জ জাহেলি যুগের একটি নিদর্শন। হজ্জ মূর্তির উপাসনার মতো।’ তাই ইসলামের ফরজ বিধান হজ্জ বন্ধ করতে কারামিয়া শাসকরা তৎপর হয়ে ওঠে। মূলত ইসলামের ইতিহাসে হজ্জ ফরজ হওয়ার পর কারামিয়ারা সর্বপ্রথম কাবায় আক্রমণ করে হাজিদের হত্যা করে।

৩১৭ হিজরি (৯৩০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল মুসলিমদের বেদনাদায়ক ইতিহাস। বাতিল ফেরকায় বিশ্বাসী বাহরাইনের শাসক আবু তাহের কারামিয়া নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী সর্ববৃহৎ হাজিদের কাফেলায় আক্রমণ করে। অনেক নারী-পুরুষকে হত্যা করে এবং তাদের সম্পদ ছিনতাই করে। ইরাক ও সিরিয়া থেকে মক্কা আসার পথে তারা আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে ৩১৭ হিজরি থেকে ৩২৭ হিজরি পর্যন্ত হজের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। (তারিখুল ইসলাম, আজ জাহাবি, ২৩/৩৭৪)।

ক। মাশিরি নামক মহামারিঃ

৩৫৭ হিজরিতে (৯৬৮ খৃষ্টাব্দে) মক্কায় মাশিরি নামের একটি রোগ মহামারি আকারে দেখা দেয়। এ সময় হাজিদের বেশির ভাগ লোকই মৃত্যুবরণ করে। কেউ কেউ মক্কায় আসার পথে পিপাসায় কাতর হয়ে মারা যায়। আর অনেকে হজ্জ সম্পন্ন করে মারা যায়। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/১৪৫)।

মুসলিক সংঘাতের কারনেঃ

৩৭২ হিজরিতে (৯৮২ খৃষ্টাব্দে) আব্বাসি খলিফা ও মিসরের উবাইদি শাসনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। ফলে ৩৭২ থেকে ৩৮০ হিজরি (৯৮২-৯৯০ খৃষ্টাব্দে) পর্যন্ত ইরাকের কেউ হজ্জ করতে পারেনি। (ইবনে তাগরি বারদ, আন নুজুম জাহেরা : ৪/২৪৬)

খ। প্রাকৃতি কারনে বিভিন্ন জাতী হজ্জ করতে পারে নাইঃ

৪১৭ হিজরিতে মিসর ও প্রাচ্যের কারো পক্ষে হজ্জ করা সম্ভব হয়নি। ৪২১ হিজরিতে ইরাক ছাড়া অন্যরা হজ্জ করতে পারেনি। ৪৩০ হিজরিতে ইরাক, খোরাসান, শাম ও মিসরের কেউ হজ্জ করতে পারেনি। কারণ এ সময় দোজলা নদীসহ অন্যান্য বড় নদীর পানি বরফ আবৃত হয়। ফলে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। (ইবনুল জাওজি, আল মুনতাজাম, ৯/১৬৬)।

নিরাপত্তাহীনতাঃ

৪৯২ হিজরিতে মুসলিম বিশ্বের শাসকদের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে ব্যাপক সংঘাত দেখা দেয়। এতে মক্কায় গমনের পথ অনিরাপদ হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস খ্রিস্টানদের দখলে যাওয়ার পাঁচ বছর আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

গ।মক্কায় ব্যাপক বন্যা কারনেঃ

১০৩৮ হিজরি ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় ব্যাপক বন্যা হয়। ফলে কাবার দেয়াল ভেঙে পড়ে। সুলতান চতুর্থ মুরাদের নির্দেশে কাবা পুনর্নির্মাণের সময় হজ্জ ও ওমরাহর কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল কাবার সর্বশেষ নির্মাণ।

ফরাসিদের আক্রমণের কারনেঃ

১২১৩ হিজরিতে ফরাসিদের আক্রমণের ফলে নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে হজ্জও বন্ধ থাকে।

ঘ। কলেরা মহামারীর করানেঃ

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রকাশ পাওয়া কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিন-চতুর্থাংশ হাজি মারা যায়। এ ছাড়া আরো কিছু মহামারির প্রকাশ ঘটে। ফলে ১৮৩৭ থেকে ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘদিন মক্কায় হাজিদের আগমন বন্ধ ছিল।

(তথ্যসূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দারাতুল মালিক আবদুল আজিজ, আনাদোলু নিউজ এজেন্সি, আল খালিজ অনলাইন ডটনেট)

ঙ। করোনা মহামারীর কারনেঃ

করোনা মহামারীর কারনে ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ সাল উমরা যাওয়া বন্ধ করে সৌদি হজ্জ কর্তৃপক্ষ। এই বছর আর্থাৎ ২০২০ সালে খুবই সিমিত পর্যায় হজ্জ পালন করা হয়ে। এই হজ্জে সৌদির সিলেক্টেড হাজ্জি ব্যাতিত বিশ্বের কোন দেশের হাজ্জি হজ্জে অংশ গ্রহন করতে পারে নাই। দীর্ঘ সাত মাস উমরা ও তাওয়াফ বন্ধ থাকার পর অক্টোবর ২০২০ সালে আবার বাইতুল্লাহ তাওয়াফের অনুমতি প্রদান করা হয়। 

১০। বাইতুল্লার অবকাঠামোঃ

সৌদি গেজেট মতে, কাবাগৃহের উচ্চতা পূর্ব দিক থেকে ১৪ মিটার। (অন্য একটি সূত্র মতে ১২.৮৪ মিটার)। পশ্চিম দিক থেকে ১২.১১ মিটার। উত্তর দিক থেকে ১১.২৮ মিটার। দক্ষিণ দিক থেকেও ১২.১১ মিটার। (সূত্র : সৌদি গেজেট, ৩ জানুয়ারি, ২০১০ ইং)

ভূমি থেকে কাবার দরজার উচ্চতা ২.৫ মিটার। দরজার দৈর্ঘ্য ৩.০৬ ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। বর্তমান দরজা বাদশা খালেদের উপহার, যা নির্মাণে প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর সিলিংকে তিনটি কাঠের পিলার ধরে রেখেছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। কাবা শরিফের ভেতরের দেয়ালগুলো সবুজ ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আবৃত। এই পর্দাগুলো প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়। এর ছাদে ১২৭ সে.মি. লম্বা ও ১০৪ সে.মি. প্রস্থের একটি ভেন্টিলেটর রয়েছে, যা দিয়ে ভেতরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। এটি একটি কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রতিবছর দুবার কাবা শরিফের ভেতরটা ধৌত করার সময় এ কাচ খোলা হয়।

এক নজরে কাবাঘরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতাঃ

উচ্চতামুলতাযামের দিকে দৈর্ঘ্যহাতীমের দিকে দৈর্ঘ্যরুকনে ইয়ামানী ও হাতীমের মাঝখানের দৈর্ঘ্যহাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝখানের দৈর্ঘ্য
১৪ মিটার১২.৮৪ মিটার১১.২৮ মিটার১২.১১ মিটার১১.৫২ মিটার

মসজিদ আল-হারাম

মসজিদ আল-হারাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মসজিদ আলহারাম ইসলামের ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান যা বাইতুল্লাহ কে ঘিরে অবস্থিত।  এই মসজিদটি বাইতুল্লাহ কে কেন্দ্র করে অবস্থিত বিধায় পৃথিবীর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ মসজিত। মসজিদটি ভিতরের ও বাইরের সালাতের স্থান মিলে বর্তমান কাঠামো প্রায় ৩,৫৬,৮০০ বর্গমিটার (৮৮.২ একর) জুড়ে অবস্থিত। মসজিদ সার্বক্ষণিক খোলা থাকে। হজ্জের সময় এখানে উপস্থিত হওয়া মানুষের জমায়েত পৃথিবীর বৃহত্তম মানব সমাবেশের অন্যতম।

মসজিদ আল-হারাম

কেন এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলা হয়?

এই মসজিদের নাম কোন মানুষ রাখেন নাই। স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা এই মসজিদের নাম রেখেছেন। কুরআনের বহু আয়াতে এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলে উল্লেখ করছেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

*فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّواْ وُجُوِهَكُمْ شَطْرَهُ *

অর্থঃ অতএব তুমি সম্মানিত মসজিদের দিকে তোমার মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নাও এবং তোমরা যেখানে আছ তোমাদের মুখ সেদিকেই প্রত্যাবর্তিত কর। (সূরা বাক্বারা ২:১৪৪)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَصَدٌّ عَن سَبِيلِ اللّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِندَ اللّهِ *

অর্থঃ আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। (সুরা বাকারা ২:২১৭)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّواْ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُ لِئَلاَّ يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيْكُمْ حُجَّةٌ

অর্থঃ আর তোমরা যেখান থেকেই বেরিয়ে আস এবং যেখানেই অবস্থান কর, সেদিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্য তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِنَّهُ لَلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ *

অর্থঃ আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও-নিঃসন ্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। ( সুরা বাকারা ২:১৪৯ )

মন্তব্যঃ ইহা ছাড়াও সরাসরি সুরা বাকারার-১৯৬, সুরা মায়েদা-২, আনফালের-৩৪, সুরা তওবার-৯ ও ১৯, সুরা বনী ইসরাইলের-১, সুরা হজ্জের-২৫ এবং সুরা ফাতহা-২৫ আয়াতে সরাসরি এই মসজিদকে মসজিদে হারাম বলে উল্লেখ করছেন।

একটি বিশ্লষনঃ

“মসজিদে হারাম” নামটিতে দুটি আরবি শব্দ আছে। একটি হলো, মসজিদ অপরটি হলো হারাম। মসজিদ শব্দটির উৎপত্তি আরবি (السجود) থেকে, যার আভিধানিক অর্থ শ্রদ্ধাভরে মাথা অবনত করা। অর্থৎ সিজদার করা। এই হিসাবে মসজিদ এর অর্থ হলে সিজদার স্থান। সাধারণভাবে, যে সব ইমারত বা স্থাপনায় মুসলমানেরা একত্র হয়ে প্রাত্যহিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, তাকে মসজিদ বলে।

অপর পক্ষে হারাম শব্দের দুটি অর্থ আছে। ‘হারাম’ শব্দের একটি অর্থ হলো ‘নিষিদ্ধ’। আর একটি অর্থ হলো ‘সম্মানিত’। মসজিদে হারাম বলেত এখানে সম্মানিত মসজিদ বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে হারাম শব্দের অর্থ পবিত্র বা সম্মানিত অর্থে ব্যবহার করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন,

 *الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُواْ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ*

অর্থঃ সম্মানিত মাসই সম্মানিত মাসের বদলা। আর সম্মান রক্ষা করারও বদলা রয়েছে। বস্তুতঃ যারা তোমাদের উপর জবর দস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। (সুরা বাকারা ২:১৯৪)

মন্তব্যঃ এখান মহান আল্লাহ হারাম মাস বলতে সম্মাতি মাস বুঝিয়েছন।

‘হারাম’ শব্দের অপর একটি অর্থ হলো ‘নিষিদ্ধ’। আমাদের সমাজে এবং আরবি ভাষায় হারাম শব্দটি নিষিদ্ধ অর্থেই বেশী ব্যবহৃত হয়। পবিত্র কুরআনেও হারাম শব্দটি ‘নিষিদ্ধ’ অর্থে এসেছে। পবিত্র কুরআনে আয়াত বিদ্যমান। মহান আল্লাহ বলেন,

*يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ قُلْ قِتَالٌ فِيهِ كَبِيرٌ*

অর্থঃ তারা তোমাকে নিষিদ্ধ (হারাম) মাস সম্পর্কে  জিজ্ঞেস করে। তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। (সুরা বাকারা ২:২১৭)

এই হিসাবে আবার কেউ কেউ করেন মসজিদটি মক্কার হারাম এলাকায় অবস্থিত বিধায় এর নাম মসজিদে হারাম। মক্কার বাইতুল্লাহর আশপাশের এলাকাকে মহান আল্লাহ হারাম এলাকা ঘোষনা করেছেন। অর্থাৎ এই এলাকার বিশেষ কিছু কাজ করা হারাম কিন্তু পৃথিবীর অন্য এলাকায় তা হালাল। মুলত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের দোয়ার বরকতে মক্কার এই বিশেষ এলাকাকে হারাম করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

(আর স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখুন। হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে আপনিতো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে নিয়ে বসবাস করালাম এই অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র গৃহের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! এই জন্যে যে, তরা যেন সালাত কায়েম করে। সুতরাং আপনি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলাদি দ্বারা তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” [সূরা ইবরাহীম ১২:৩৫-৩৭]

মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

*وَلاَ تُقَاتِلُوهُمْ عِندَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتَّى يُقَاتِلُوكُمْ فِيهِ فَإِن قَاتَلُوكُمْ فَاقْتُلُوهُمْ كَذَلِكَ جَزَاء الْكَافِرِينَ*

অর্থঃ আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি। (সুরা বাকারা ২:১৯১)]

মহান আল্লাহ ঘোষিত, এই হারাম এলাকাতে বিশেষ কিছু বিধান প্রযোজ্য। মহান আল্লাহ্‌ এই মসজিদকে সম্মানিত করেছেন, পাশাপাশি এর সীমানায় বিশেষ কিছু কাজ হারাম ঘোষিত। নিম্ম লিখিত কাজ মক্কার হারাম এলাকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

১. হারাম এলাকায় রক্তপাত, মারামারি, যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ

১২. শিকারযোগ্য যে কোনো হালাল জানোয়ার হত্যা করা হারাম

৩. শিকারযোগ্য প্রাণী হত্যার জন্য অস্ত্র সরবরাহ কিংবা ইসারা করে দেখিয়ে দেয়ার দ্বারা সাহায্য করাও হারাম।

৪. গাছপালা, এমনকি ঘাসও কাটা যাবে না

৫. পড়ে যাওয়া জিনিস নেয়া যাবে না (শুধু এই উদ্দেশ্যে জায়েজঃ আসল মালিককে ফিরিয়ে দেয়া)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে মক্কা বিজয় দান করলেন, তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হামদ ও সানা (প্রশংসা) বর্ণনা করলেন। এরপর বললেন, আল্লাহ তা‘আলা মক্কা্য় (আবরাহার) হস্তি বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেননি এবং তিনি তাঁর রাসূল ও মু’মিন বান্দাদেরকে মক্কার উপর আধিপত্য দান করেছেন। আমার আগে অন্য কারোর জন্য মক্কায় যুদ্ধ করা বৈধ ছিল না, তবে আমার পক্ষে দিনের সামান্য সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল, আর তা আমার পরেও কারোর জন্য বৈধ হবে না। কাজেই এখানকার শিকার তাড়ানো যাবে না, এখানকার গাছ কাটা ও উপড়ানো যাবে না, ঘোষণাকারী ব্যক্তি ব্যতীত এখানকার পড়ে থাকা জিনিস তুলে নেয়া যাবে না। যার কোন লোক এখানে নিহত হয় তবে দু’টির মধ্যে তার কাছে যা ভাল বলে বিবেচিত হয়, তা গ্রহণ করবে। ফিদ্ইয়া গ্রহণ অথবা কিসাস। ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, ইযখিরের অনুমতি দিন। কেননা, আমরা এগুলো আমাদের কবরের উপর এবং ঘরের কাজে ব্যবহার করে থাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইযখির ব্যতীত (অর্থাৎ তা কাটা ও ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হল)। তখন ইয়ামানবাসী আবূ শাহ (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে লিখে দিন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আবূ শাহকে লিখে দাও। (ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম বলেন) আমি আওযায়ীকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে লিখে দিন তাঁর এ উক্তির অর্থ কী? তিনি বলেন, এ ভাষণ যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ হতে তিনি শুনেছেন, তা লিখে দিন। (সহিহ বুখারি ২৪৩৪)

হারাম এলাকা সীমানা কতটুকুঃ

ইমাম নববির মতে, এই হারাম এলাকার সিমান হলো, মদিনার দিকে মক্কার হারাম এলাকার সীমানা হচ্ছে মক্কা থেকে ৩ মাইল দূরে তানয়ীমের আগে বনি নিফার গোত্রের বাড়ি ঘরের কাছাকাছি। ইয়েমেনের দিকের সীমানা হচ্ছে- মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আদাত লাবানের প্রান্তভাগ। তায়েফের দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আরাফা ময়দানের নামিরার নীচুভূমি। ইরাকের দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৭ মাইল দূরে আল-মুকাত্তা নামক স্থানের পাহাড়ি পথ পর্যন্ত। আল জিয়িরানার দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ৯ মাইল দূরে আব্দুল্লাহ বিন খালেদ বংশের গিরিপথ। জেদ্দার দিকের সীমানা হচ্ছে, মক্কা থেকে ১০ মাইল দূরে ‘মুনকাতিউল আ’শাশ’ নামক স্থান পর্যন্ত। (আল-মাজমু (৭/৪৬৩) থেকে সমাপ্ত)

মসজিদ আলহারাম এর ফজিলত

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মাসজিদুল হারাম ব্যতীত অপরাপর মসজিদের সালাত অপেক্ষা আমার মসজিদের সালাত হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ (ফাযীলাতপূর্ণ)। অন্যান্য মসজিদের সালাতের তুলনায় মাসজিদুল হারামের সালাত এক লক্ষ গুণ উত্তম (ফাযীলাতপূর্ণ)।(ইবনে মাজাহ ১৪০৬, আলবানী সহিহ বলেছেন)।

২. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ আমার মসজিদে সালাত আদায় করা আন্য মসজিদের এক হাজার সালাত হতে উত্তম, মাসজিদুল হারাম ব্যতীত। আবু আবদুর রহমান (রহঃ) বলেনঃ মুসা জুহানী (রহঃ) ব্যতীত অন্য কেউ নাফি’ (রহঃ) সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) থেকে এই হাদিস রিওয়ায়ত করেছেন বলে আমার জানা নেই। ইবন জুরায়জ (রহঃ) ও অন্যান্য বর্ণনাকারীরা এ রিওয়ায়ত ভিন্ন সনদে বর্ণনা করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৮৯৭)

৩. সা’দ ইবন ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আবূ সালামা(রাঃ) বলেছেনঃ আমি এই হাদিস সম্পর্কে আমর (রাঃ) -কে জিজ্ঞাস করেছি, তিনি বলেছেন যে, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা কাবা শরীফের মসজিদ ব্যতীত অন্যান্য মসজিদের তুলনায় এক হাজার গুণ বেশী মর্যাদা রাখে। (সুনানে নাসাঈ ২৮৯৯)

৪. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের প্রতি সফর করা হবে না; আমার এই মসজিদ (নববী), মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসা।” (বুখারী ১১৮৯, মুসলিম ৩৪৫০)

৫. সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, বর্ণনাকারী ‘আবদুর রহমান বলেন, সালমান (রাঃ) কে বলা হলো, তোমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে সবকিছুই শিক্ষা দিয়েছেন, এমন কি পায়খানা করার নিয়মও। সালমান (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নিষেধ করেছেন ক্বিবলাহমুখী হয়ে পেশাব-পায়খানা করতে, ডান হাতে শৌচ করতে, শৌচকার্যে আমাদের কারো তিনটি ঢিলার কম ব্যবহার করতে এবং গোবর অথবা হাড় দ্বারা শৌচ করতে। (সুনানে আবু দাউদ ০৭) 

৬. আবূ আইউব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা পায়খানায় গিয়ে ক্বিবলাহমুখী হয়ে পায়খানা-পেশাব করবে না, বরং পূর্ব অথবা পশ্চিমমুখী হয়ে বসবে। আবূ আইউব (রাঃ) বলেন, আমরা সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পেলাম, সেখানকার শৌচাগারগুলো ক্বিবলাহমুখী করে বানানো। সেজন্য উক্ত স্থানে আমরা একটু বেঁকে বসতাম এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতাম।(সুনানে আবু দাউদ ০৯) 

মসজিদুল আকসাই প্রথম নির্মত মসজিদকথাটি কতটুকু সত্য?

কথাটি মোটেই সত্যা নয়। কুনআন ও সহিহ হাদিস মতে কাবাই প্রথম ইবাদতের নিমিত্তে নির্মিত ঘর। তবে একথা বলা যায় মসজিদুল আকসাই প্রথম কিবলা। তবে মানব জাতীর ইবাদাতে জন্য নির্মিত প্রথম ঘর বাইতুল্লাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

*إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সর্ব প্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে স্থাপন করা হয়েছে, যা মক্কায় অবস্থিত। যা বিশ্বাবাসির জন্য বরকতময় হেদায়েত। ( সুরা ইমরান ৩:৯৬)

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, উভয় মসজিদের (তৈরীর) মাঝে কত ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। অতঃপর তোমার যেখানেই সালাতের সময় হবে, সেখানেই সালাত আদায় করে নিবে। কেননা এর মধ্যে ফযীলত নিহিত রয়েছে। (সহিহ বুখারী ৩৩৬৬)

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সর্বপ্রথম কোন্ মাসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, এ দু’য়ের নির্মাণের মাঝখানে কত তফাৎ? তিনি বললেন, চল্লিশ বছরের। (অতঃপর তিনি বললেন,) যেখানেই তোমার সালাতের সময় হবে, সেখানেই তুমি সালাত আদায় করে নিবে। কারণ, পৃথিবীটাই তোমার জন্য মাসজিদ। (সহিহ বুখারী ৩৪২৫)

বাইতুল্লাহ নির্মাণের চল্লিশ বছর মসজিদুল আকসা নির্মত হয়। এই কথার দলিল একটি সহিহ হাদিস। ইবরাহীম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রাস্তায় বসে আমার পিতার নিকট কুরআন পাঠ করতাম, যখন আমি সিজদার আয়াত পাঠ করলাম তিনি সিজদা করলেন, তখন আমি বললাম আব্বা! আপনি রাস্তায় সিজদা করছেন! তিনি বললেন, আমি আবূ যর (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোন মসজিদটি প্রথম নির্মিত হয়? তিনি বলেছিলেন, মসজিদুল হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি ? তিনি বললেন, মসজিদুল আকসা। আমি বললাম, এতদুভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। আর যমীন তোমার জন্য মসজিদ (সিজদার স্থান)। অতএব, যেখানেই সালাতের স্থান হবে, সেখানেই সালাত আদায় করবে। (সুনানে নাসাঈ ৬৯০, হাদিসের মান সহহি)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : প্রথম কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : প্রথম কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাজরে আসওয়াদঃ

‘হাজরে আসওয়াদ’ হলো, কাবাঘরের দেয়ালে বিশেষভাবে স্থাপনকৃত একটি পাথরের নাম। আরবি ‘হাজর’ শব্দের অর্থ পাথর আর ‘আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ কালো। অর্থাৎ ‘হাজরে আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ হলো, কালো পাথর। ‘হাজরে আসওয়াদ’ বেহেশতের মর্যাদাপূর্ণ একটি পাথর। হজ্জযাত্রীরা হজ্জ করতে গিয়ে এতে সরাসরি বা ইশারার মাধ্যমে চুম্বন দিয়ে থাকেন। এই কালো পাথরটি কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, ভুমি থেকে ১.১০ মিটার উচ্চতায় স্থাপিত। এই পাথটির দৈর্ঘ্যে ২৫ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ১৭ সেন্টিমিটার। পূর্বে হাজরে আসওয়াদ এক খণ্ড ছিল। কারামাতা সম্প্রদায় ৩১৯ (তিনশত উনিশ) হিজরীতে পাথরটি উঠিয়ে নিজদের অঞ্চলে নিয়ে যায়। সে সময় পাথরটি ভেঙে ৮ (আট) টুকরো হয়ে যায়। এ টুকরোগুলোর সবচে’ বড়টি খেজুরের মতো। টুকরোগুলো বর্তমানে অন্য আরেকটি পাথরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যার চারপাশে দেয়া হয়েছে রুপার বর্ডার। তাই রুপার বর্ডারবিশিষ্ট পাথরটি চুম্বন নয় বরং তাতে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদের টুকরোগুলো চুম্বন বা স্পর্শ করতে পারলেই কেবল হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করা হয়েছে বলে ধরা হবে।

হাজরে আসওয়াদের ঐতিহাসিক তথ্যঃ

ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম কাবার প্রাচীর তৈরি করতে করতে যখন রুকনের স্থানে পৌঁছান তখন ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিবেদিত প্রাণপুত্র ইসমাঈলকে বলেনঃ “একটি সুন্দর পাথর খুঁজে নিয়ে এসো। পাথরখানা এখানে রাখবো। তাহলে মানুষের কাবা প্রদক্ষিণের চিহ্নের কাজ দেবে”। পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পিতাকে বলেনঃ “পিতা! আমি অত্যন্ত ক্লান্ত”। তিনি বলেনঃ “তবুও যাও”। তারপর পুত্র পাথরের সন্ধানে বের হলেন। এমন সময় জীবরাঈল আলাইহিস সালাম পাথরখানা নিয়ে আসেন (তারিখে মক্কা, ইবনে কাসীর)।

কাবা ঘর বহু ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তার সাথে হাজরে আসওয়াদ ও স্থানচ্যুত হয়েছে। এই কালো পাথরের সাথে বিশ্বনাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম এর সম্পর্ক জড়িত। পূর্বেই উল্লেখ করছি, ইসলামপূর্ব কোরাইশদের যুগে কাবা শরিফের গিলাফ যখন পুড়ে গিয়েছিল, তখন হাজরে আসওয়াদও পুড়ে গিয়েছিল। ফলে তার কৃষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পায়। বিশ্বনাবীর নবুয়্যাত প্রাপ্তির কয়েক বছর আগে কাবা ঘরের নির্মাণ কাজ করার পর পাথরটি সস্থানে রাখার নিয়ে মক্কাবাসি বিভিন্ন গোত্রের মাঝে বিবাদের সৃষ্টি হয়। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় এবং তাদের দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। হাজরে আসওয়াদ জান্নাতের পাথর। তাই পাথর ফেরেশতাদের স্পর্শও আদম, ইব্রাহীম, ইসমাঈল আলাইহিমুস সালাম এর স্পর্শ জড়িত আছে।

 ৬৪ হিজরিতে হজ্জরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে কাবা ঘরে আগুন লাগলে হাজরে আসওয়াদটি ভেঙে একাধিক খণ্ড হয়ে যায়। কেউ কেউ বলেন এটি ৩ খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। পরে হজ্জরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের এটিকে রুপার ফ্রেমে বাধাই করে পুনরায় কাবা চত্বরে স্থাপন করেন।আর তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী।

• ১৭৯ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ হাজরে আসওয়াদকে হীরা দিয়ে ছিদ্র করে রুপা দিয়ে ঢালাই করেন।

• ৩১৭ হিজরিতে কারামতিয়ারা হারাম শরিফে অতর্কিত আক্রমণ করে। এই শীয়া সম্প্রদায় কাবা ঘরে প্রচুর ভাংচুর ও লুন্ঠন চালায়। কাবা ঘরের বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদও লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় তারা। সে সময় দীর্ঘ ২২ বছর কাবা ঘরে হাজরে আসওয়াদ ছিল না। ২২ বছর পর ৩৩৯ হিজরিতে কারামতি সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পাথরটি উদ্ধার করা হয়। লুণ্ঠনের সময় পাথরটি ব্যাপক ক্ষতি ও টুকরো টুকরো হয়ে যায়। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলোর মধ্যে এখনো কয়েকটি খন্ড নিখোঁজ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন এখনো পাথরের ৮ খণ্ডাংশ নিখোঁজ রয়েছে। হাজরে আসওয়াদের ভাঙা অংশগুলো কাদামাটি, মোম, অম্বর ইত্যাদি দিয়ে অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনায় মেরামতপূর্বক বাধাই করে রাখা হয়েছে।

• ৪১৩ হিজরিতে এক নাস্তিক লৌহ শলাকা দ্বারা হাজরে আসওয়াদের ওপর হামলে পড়ে। ফলে তা ছিদ্র হয়ে যায়। এরপর বনি শায়বার কিছু লোক তার ভগ্নাংশগুলো একত্রিত করে কস্তুরী দ্বারা ধৌত করে তার টুকরোগুলো ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়।

• ১৩৩১ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মদ রাশাদ হাজরে আসওয়াদের চারপাশে রুপার একটি নতুন বেষ্টনী তৈরি করে দেন।

• ১৩৫১ হিজরির এপ্রিলের ১৮ তারিখে বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আলেম-ওলামাসহ কাবা শরিফে উপস্থিত হন এবং হাজরে আসওয়াদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তাতে মেশকে আম্বরের মতো মূল্যবান পাথর সংযুক্ত করেন।

• ১৪১৭ হিজরিতে পবিত্র কাবাঘরের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদেও বিশেষ রুপার দ্বারা নতুন বেষ্টনী স্থাপিত হয়। যখনই পাথরটিতে কোনো সমস্যা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চিহ্ন দেখা যায় তখনই হারামাইন কর্তৃপক্ষ তা সংস্কার করে থাকেন।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের ফজিলতঃ

ক। কিয়ামতের দিন চুম্বরকারীর পক্ষে স্বাক্ষ্য দিবেঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কসম, এটি কিয়ামতের দিন এভাবে উত্থিত হবে যে, এর দুটি চোখ থাকবে যা দ্বারা সে দেখবে। একটি যবান হবে যদ্বারা সে কথা বলবে সত্য হৃদয়ে যে ব্যক্তি এর ইস্তিলাম করে এ তার সম্পর্কে আল্লাহর কাছে স্বাক্ষ্য দিবে। (তিরমিজি ৯৬৪, মিশকাত ২৫৭৮ হাদিসের মান হাসান)

২. সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন এই পাথরকে উপস্থিত করা হবে। তার দু‘টি চোখ থাকবে, তা দিয়ে সে দেখবে, যবান থাকবে তা দিয়ে সে কথা বলবে এবং সে এমন লোকের অনুকূলে সাক্ষ্য দিবে যে তাকে সত্যতার সাথে চুমা দিয়েছে। (ইবনে মাজাহ ৯৪৪, তিরমিযী ৯৬১, আহমাদ ২২১৬, মিশকাত ২৫৭৮)

খ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন করেছেনঃ

১. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি দেখেছি, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাক্কায় পৌঁছে যখন হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করতেন, তখন তিনি সাত চক্করের মধ্যে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে সমাধান করতেন। সহিহ মুসলিম ২৯৪০)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনি তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইশারা করতেন এবং তাকবীর বলতেন। ইবরাহীম ইবনু তাহমান (রহঃ) খালিদ হাযযা (রহঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় খালিদ ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) এর আনুসরন করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৫১৭ ইফাঃ)

গ। এই পাথরটি জান্নাত থেকে এসেছেঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, হাজারে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহীম জান্নাতের ইয়াকূতসমূহের মধ্যে দু’টি ইয়াকূত। আল্লাহ এদের নূর (আলো) দূর করে দিয়েছেন। যদিও এ দু’টির নূর (আলো) আল্লাহ তা‘আলা দূর করে না দিতেন। তবে এরা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের মধ্যে যা আছে তাকে আলোকময় করে দিতো। (সুনানে তিরমিযী ৮৭৮, মিশকাত ২৫৭৯)

ঘ। গুনাহের কারনে পাথরটি কালো করে দেয়া হয়েছেঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হাজারে আসাওয়াদ যখন জান্নাত হতে নাযিল হয়, তখন তা দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। অতঃপর আদাম সন্তানের গুনাহ একে কালো করে দেয়। ( মিশকাত ২৫৭৭, সহিহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২৭৩৩, সহিহ আল জামি ৬৭৫৬, সহিহ আত্ তারগীব ১১৪৬)।

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে অবতীর্ন হয়েছিল তখন সেটি ছিল দুধ থেকেও শুভ্র। মানুষের গুণাহ খাতা এটিকে এমন কালো করে দিয়েছে। (তিরমিজ ৮৭৮,  মিশকাত ২৫৭৭)

ঙ। সকল বরকতের মালিক মহান আল্লাহঃ

১. আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ‘উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) হাজরে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে! আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিতরূপে জানি তুমি একটি পাথর, তুমি কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। এরপর তিনি চুম্বন করলেন। পরে বললেন, আমাদের রমল করার উদ্দেশ্য কি ছিল? আমরা তো রমল করে মুশরিকদেরকে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করেছিলাম। আল্লাহ এখন তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর বললেন, যেহেতু এই (রমল) কাজটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, তাই তা পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না।(সহিহ বুখারি ১৫১০ইফাঃ)

২. উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা চুম্বন করে বললেন, আমি অবশ্যই জানি যে, তুমি একখানা পাথর মাত্র, তুমি কারো কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে কখনো আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। (সহিহ বুখারি ১৫০২ইফাঃ)

হাজরে আসওয়াদের কিছু বৈশিষ্ট্য

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে হাজরে আসওয়াদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা এসেছে। হজ্জের কার্যাবলীর মধ্যে হাজরে আসওয়াদের একটি সম্পর্ক রয়ছে। সহিহ হাদিসের আলোকে নিম্মে হাজরে আসওয়াদের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরলাম।

ক। হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করাঃ

১. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে হাজারে আসওয়াদ পর্যন্ত তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৪১)

২. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, হাজরে আসওয়াদ হতে আরম্ভ করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত তাওয়াফে (চক্করে) তিনি রমল করেছেন। (মুয়াত্তা মালেক ৮০২ সহিহ মুসলিম ১২৬৩)

৩. ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফের শুরুতে হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করেন, অতঃপর আল্লাহু আকবার বলেন এবং তাওয়াফের তিন চক্করে রমল করেন। আর তাঁরা যখন রুকনে ইয়ামীনের নিকট পৌঁছতেন এবং কুরায়শদের দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতেন, তখন হাঁটতেন। আবার তাঁরা যখন তাদের (মুশরিক) সম্মুখীন হতেন, তখন রমল করতেন। এতদ্দর্শনে কুরাইশগণ বলত, এরা তো হরিণের ন্যায়। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর এটা সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত হয়। (আবু দাউদ ১৮৮৭)

খ। হাজারে আসওয়াদ তাওয়াফ শেষ করাঃ

সাত চক্কের মাধ্যমে তাওয়াফ শেষ করতে হয়। যেহেতু হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করা হয় কাজেই সাত চক্কর শেষে হাজারে আসওয়াদ এসেই তাওয়াফ শেষ করতে হয়।

গ। সরাসরি বা ইশারায় হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন করাঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইশারা করতেন। (সহিহ বুখারি ১৫১৬ ইফাঃ)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটের পিঠে আরোহণ করে তাওয়াফ করার সময় ছড়ির মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। দারাওয়ার্দী (রহ.) হাদীস বর্ণনায় ইউনুস (রহ.)-এর অনুসরণ করে ইবনু আবিয যুহরী (রহ.) সূত্রে তার চাচা (যুহরী) (রহ.) হতে রিওয়ায়াত করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬০৭)

৩. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাহনে আরোহী হয়ে তাওয়াফ করেছেন, হাজরে আসওয়াদের কাছে পৌছে তিনি এর দিকে ইশারা করতেন। (তিরমিজ ৮৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯৪৮)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : দ্বিতীয় কিস্তি

হিজর বা হাতীম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হিজর বা হাতীম হচ্ছে, কাবার উত্তরদিকে অবস্থিত অর্ধেক বৃত্তাকার অংশ যার পরিমান প্রায় পাঁচ হাত। মক্কার কুরাইশগন কাবা নির্মাণের সময় অর্থাভাবের কারনে সম্পূর্ণ কাবা  নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়। এই অংশটুকু তারা ছেড়ে যায়। কাজেই কাবার উত্তর পার্শ্বের অর্ধ-বৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থান যা পূর্বে কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান ছাদহীন ফাঁকা পড়ে আছে তাই হাতীম বা হিজর নামে পরিচিত। হাতীম শব্দের অর্থ ভগ্নাংশ আর হিজর’ শব্দের অর্থ ‘পরিত্যক্ত’ তবে হিজরের অর্থ পাথর স্থাপন করা হয়ে থাকে। যাহোক বর্তমান কাবার যে ভিত্তি আমরা দেখছি তা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তির ওপর নির্মাণ হয় নাই। হাতীম বা হিজর ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভিত্তিতে কাবার ভীতরে ছিল। তাই যে এই স্থানে প্রবেশ করবে ও সালাত আদায় করবে তার জন্য কারায় প্রবেশ ও সালাত আদয়ে বলে বিবেচিত হবে।

কুরাইশগন অর্থাভাবের কারনে হাতীমের অংশ বাদ দেয়ঃ

১। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করলাম, (হাতীমের) দেয়াল কি বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত, তিনি বললেনঃ হাঁ। আমি বললাম, তাহলে তারা বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করল না কেন? তিনি বললেনঃ তোমার গোত্রের (অর্থাৎ কুরাইশের কাবা নির্মাণের) সময় অর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। আমি বললাম, কাবার দরজা এত উঁচু হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেনঃ তোমার কওম তা এ জন্য করেছে যে, তারা যাকে ইচ্ছা তাকে ঢুকতে দিবে এবং যাকে ইচ্ছা নিষেধ করবে। যদি তোমার কওমের যুগ জাহিলিয়্যাতের নিকটবর্তী না হত এবং আশঙ্কা না হত যে, তারা একে ভাল মনে করবে না, তা হলে আমি দেয়ালকে বায়তুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত করে দিতাম এবং তার দরজা ভূমি বরাবর করে দিতাম। (সহিহ বুখারি ১৪৮৯ ইফাঃ)

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা ছিল হাতীমকে কাবার অন্তর্ভুক্ত করাঃ

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেনঃ তুমি কি জানো না! তোমার সম্প্রদায় যখন কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ করেছিল তখন ইব্‌রাহীম (আঃ) কর্তৃক কাবাঘরের মূল ভিত্তি থেকে তা সংকুচিত করেছিল। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি একে ইবরাহীমী ভিত্তির উপর পুনঃস্থাপন করবেন না? তিনি বললেনঃ যদি তোমার সম্প্রদায়ের যুগ কুফরীর নিকটবর্তী না হত তা হলে অবশ্য আমি তা করতাম। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন, যদি ‘আয়িশা (রাঃ) নিশ্চিতরূপে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনে থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় যে, বায়তুল্লাহ হাতীমের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ইবরাহিমী ভিত্তির উপর নির্মিত না হওয়ার কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তওয়াফের সময়) হাতীম সংলগ্ন দু‘টি কোণ স্পর্শ করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৪৮৮ ইফাঃ)

২। ইবন জুবাইর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘আয়শা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ যদি কুফরের সাথে মানুষের যুগ নিকটবর্তী না হতো, আর আমার কাছে এমন সম্পদও নেই যা আমাকে শক্তি যোগায়, (আর তা যদি থাকতো,) তাহলে আমি হিজরের ২ আরও পাঁচ হাত এতে মিলাতাম এবং এর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক প্রবেশ করতো। আর একটি দরজা রাখতাম, যা দিয়ে লোক বের হতো। (সুনানে নাসাঈ ২৯১৩)

হিজর কাবারই অংশঃ

১। আবদুল হামিদ ইবন জুবায়র (রহঃ) তার ফুফু সফিয়া বিনত শায়বা সূত্রে বলেছেন, আমাদের কাছ আয়েশা (রাঃ) বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি কা’বায় প্রবেশ করবো না? তিনি ইরশাদ করলেন, তুমি হিজারে প্রবেশ কর। কেননা, তা কাবারই অংশ। (সুনানে নাসঈ ২৯১৪)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ইচ্ছা হতো কাবায় প্রবেশ করে তাতে সালাত আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে প্রবেশ করিয়ে বললেনঃ যখন তুমি কাবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেছ, তখন এখানে সালাত আদায় কর, কেননা এটি কাবারই এক অংশ। কিন্তু তোমার গোত্র যখন একে নির্মাণ করে, তখন তাকে সংক্ষিপ্ত করেন।(সুনানে (সুনানে নাসঈ ২৯১৪৫, সুনানে তিরমিজি ৮৭৬)

৩। অন্য এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! কাবা ঘরে প্রবেশ করব না কি?’ তিনি বললেন, “তুমি হিজরে প্রবেশ কর। তা কাবা ঘরেরই অংশ।” (নাসাঈ ২৯১৪)

হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবেঃ

সহিহ হাদিসের আলোকে জানতে পারছি যে, হাতিম বা হিজর কাবারই অংশ। আমাদের জানা আছে, তাওয়াফ করতে হয় কাবার চার পাশে। কাবার ভিতর দিয়ে তাওয়াফ হবে না। কাজেই কাবা ঘরের তাওয়াফকারী অবশ্যই হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত ভুলেরই একটি হচ্ছে এটাকে ‘হিজর ইসমাঈল’ করে নামকরণ করা। এ নামকরণটি সঠিক নয়। কিছু মানুষ মনে করে, ইসমাঈল আলাইহিস সালাম অথবা অন্য অনেক নবীকে এখানে দাফন করা হয়েছে। এটি আরও জঘন্য ধারণা। (ড. আবদুল্লাহ দুমাইজী, আল-বালাদুল হারাম, ফাযাইল ওয়া আহকাম ৬৬)।


মন্তব্যঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ স্থান বাইরে ছিল বলে নির্ধারণ করেছেন সেটুকুই কাবার অংশ। বর্তমানে উত্তর দিকের দেয়ালের ভেতরে যতটুকু স্থান ঢোকানো হয়েছে, তা সঠিক পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। যে এখানে সালাত আদায় করতে চায়, তার উচিত হাদীসে বর্ণিত সঠিক স্থানটুকু তালাশ করে বের করা।

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : তৃতীয় কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : তৃতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মাকামে ইবরাহীম ও যমযম  কূপ

মাকাম শব্দের আভিধানিক অর্থ, দন্ডায়মান হওয়ার জায়গা। আর মাকামে ইবরাহীম অর্থ ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দন্ডায়মান হওয়ার জায়গা। এটি একটি বড় পাথর, যার ওপর দাঁড়িয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কাবাঘর নির্মাণ করেছিলেন। কাবা নির্মাণ করার সময় যখন দেয়ালটি হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের শারীরিক উচ্চতার উপরে উঠে যায় তখন তিনি একটি পাথরখণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার জন্য ইসমাঈল আলাইহিস সালাম নিয়ে এসেছিলেন, যাতে পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কা‘বাঘর নির্মাণ করতে পারেন। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম পাথর এনে দিতেন এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পবিত্র হাতে তা কা‘বার দেয়ালে রাখতেন। তাওয়াফের সুবিধার্থে পাথরটিকে মূল জায়গা থেকে খানিকটা পেছন দিকে সরিয়ে আনা হয়েছে। তাওয়াফেল পর এর পেছনে দু’ রাকাত নামায পড়া মুস্তাহাব।

মাকামে ইবরাহীমের বৈশিষ্টঃ

মহান আল্লাহ একটি নির্দশনঃ

মাকামে ইবরাহীম হল মহান আল্লাহ একটি নির্দশন। এই পাথটির কথা মহান আল্লাহ কুরআনুর কারীমে উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কি বহু সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ মাকামে ইবরাহীম সম্পর্কে এরশাদ করেন।

*وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ যখন আমি কাবা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। ( সুরা বাকারা ২:১২৫)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, কাবাঘরে আল্লাহর কুদরতের স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নিদর্শনাবলি রয়েছে, যার মধ্যে একটি হল, পাথর যার উপর দাঁড়িয়ে তিনি কাবাঘর নির্মণ করেছিলেন এবং আজও তার পদচিহ্ন বিদ্যমান।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর (রাঃ) বলেছেনঃ তিনটি বিষয়ে আমার অভিমত আল্লাহর অহির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা যদি মাকামে ইবরাহীম কে সালাতের স্থান বানাতে পারতাম! তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

 (*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى* “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও” (২ : ১২৫)

*(দ্বিতীয়) পর্দার আয়াত, আমি বললামঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি আপনার সহধর্মিনীগনকে পর্দার আদেশ করতেন! কেননা, সৎ ও অসৎ সবাই তাদের সাথে কথা বলে। তখন পর্দার আয়াত নাযিল হয়।

* (তৃতীয়) আর একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ অভিমান সহকারে তাঁর নিকট উপস্থিত হন। তখন আমি তাদেরকে বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তোমাদের তালাক দেয়, তাহলে তাঁর রব তাঁকে তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়।

  *(عَسَى رَبُّهُ إِن طَلَّقَكُنَّ أَن يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِّنكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُّؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا*

অর্থঃ যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবতঃ তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী। (৬৬:৫) (সহিহ বুখারী ৩৯৩ ইফাঃ)

এটি একটি জান্নাতী পাথরঃ

এই পাথরটি জান্নাত থেকে আগত ইয়াকূত পাথর। হাদিসের আলোকে যানা যায় হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম এই পাথর দু’খানি জান্নাতের ইয়াকুত পাথরগুলোর মধ্য থেকে দু’টি পাথর, আল্লাহ যেগুলোকে আলোহীন করে দিয়েছেন।

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, “হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের পদ্মরাগরাজির দুই পদ্মরাগ। আল্লাহ এ দুয়ের নূর (প্রভা) কে নিষ্প্রভ করে দিয়েছেন। যদি উভয়মণির প্রভাকে তিনি নিষ্প্রভ না করতেন, তাহলে উদয় ও অস্তাচল কে উভয়ে জ্যোতির্ময় করে রাখত।” (তিরমিযী ৮৭৮, সহীহুল জামে ১৬৩৩)

মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাত আদায় করাঃ

১. ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘উমরা করতে গিয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলেন ও মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাকাআত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর সাথে ঐ সকল সাহাবী ছিলেন যারা তাকে লোকদের থেকে আড়াল করে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবার ভিতর প্রবেশ করেছিলেন কি না – জনৈক ব্যাক্তি আবূ আওফা (রাঃ) এর নিকট তা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারী ১৫০৫ ইফাঃ)

২. আমর (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনু ‘উমর (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উমরাকারীর জন্য সাফা ও মারওয়া সা‘য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে কি? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ সমাপ্ত করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন, তারপর সাফা ও মারওয়া সা‘য়ী করেন। এরপর ইবনু ‘উমর (রাঃ) তিলাওয়াত করেন, “তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (রাবী) ‘আমর (রহঃ) বলেন, আমি জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ নয়। (সহিহ বুখারি ১৫২৫ ইফাঃ)

৩.  ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সহিহ বুখারি ১৫২৮ ইফাঃ)

যমযম  কূপ

যমযম পৃথিবীতে মহান আল্লাহ এক অসাধারণ নিদর্শন। পৃথিবী আল্লাহ যত নিদর্শন আছে তার মধ্য অন্যতম নিদর্শন হলে এই কূপ। একটু ভাবুনতো মক্কার কোথাও ডিপ টিউবলে পানি উঠে না। লক্ষ লক্ষ লিটার পানি আরব সাগর থেকে পরিশোধন করে মক্কাবাসিকে দিতে হয়। কিন্তু এই যমযম কূপ শত শত বছর থেকে সেই পানিহীন মক্কাকে পানি সরবরাহ করছে। তার পানি সরবরাহে কোন প্রকার কমতি নাই। কোথা থেকে কিভাবে এই পানি আসে? এ সকল প্রশ্নের একটিই উত্তর মহান আল্লাহ কুদরত। যেখানে মসজিদে হারামের পাশে কুপ খনন করেও পানির সন্ধান মেলে নাই। সেখান প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ হাজ্জিদের পান করানোর জন্য লক্ষ লক্ষ লিটার পানি উত্তলন করা হয়। এই কূপের পানি কি শুধু হাজ্জিদের পান করান হয়? এই পানি মদীনাসহ সম্পূর্ণ সৌদি আবরে পান করার জন্য পাঠান হয়। এমন কি পৃথিবীর প্রতিটি দেশে লক্ষ লক্ষ লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে হজ্জে মৌসুমে প্রত্যক হাজ্জিকে পানি সরবরাহ করা হয়। আবার অনেক হাজ্জির নিজের উদ্দগ্যেও পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রশ্ন হল যেখানে ভূগর্বে পানিরই সন্দান পাওয়া যায়না। সেখানে থেকে আবার এত পানি কি করে উত্তলন করা সম্ভব। তাই এটাই পৃথিবী বাসির হিদায়াতের জন্য একটি অনুপম দৃষ্টান্ত। যার ইচ্ছা এখান থেকে শিক্ষা নিবে তিনি নিতে পারেন।

অবস্থানঃ

যমযম কুপটি মক্কায় মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত। এটি কাবা থেকে ২০ মি (৬৬ ফুট) পূর্বে অবস্থিত। অর্থাৎ সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের দিকে। বর্তমানে কুয়া কাবা চত্বরে দেখা যায় না। এটি ভূগর্ভস্থ অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং এখানে থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করা হয়। মসজিদুল হারামের বিভিন্ন স্থানে তা সরবরাহ করা হয়।

যমযম সৃষ্টির ইতিহাসঃ

ইসলামের ইতিহাসে যমযম  কুপের উৎপত্তি নিয়ে বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ খলিল ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা আলাইহিস সালাম  ও শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম কে আল্লাহর আদেশে মক্কার বিরান মরুভূমিতের রেখে আসেন। তার রেখে যাওয়া খাদ্য পানীয় শেষ হয়ে গেলে হাজেরা আলাইহিস সালাম পানির সন্ধানে পার্শ্ববর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাতবার ছোটাছুটি করেছিলেন। এসময় জিবরাঈল (আ) এর পায়ের আঘাতে মাটি ফেটে পানির ধারা বেরিয়ে আসে। ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে হাজেরা আলাইহিস সালাম পাথর দিয়ে পানির ধারা আবদ্ধ করলে তা কুপের রূপ নেয়। এসময় হাজেরা আলাইহিস সালাম উদগত পানির ধারাকে যমযম বা থাম থাম বলায় এই কূপের নাম হয় যমযম।

যদি হাজেরা আলাইহিস সালাম থাম থাম বা যমযম না বলতেন, তবে এটি কূপ না হয়ে ঝর্ণায় পরিনত হত।

*** ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী‎ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইসমাঈলের মায়ের প্রতি আল্লাহর রহম করুন। যদি তিনি তাড়াহুড়া না করতেন, তবে যমযম একটি প্রবহমান ঝরণায় পরিণত হত।(সহিহ বুখারি ৩২৬২)  বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়

সংস্কারঃ

সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, নবী‎ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানার পূর্বেই যমযম এর ব্যাপর পরিচিতি ছিল। এখানের পানি দ্বারাই মক্কার পানির চাহিদা মিটত।

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ আমি মক্কায় অবস্থানকালে ঘরের ছাদ ফাঁক করা হল এবং জিবরাঈল (‘আঃ) অবতরণ করলেন। এরপর তিনি আমার বক্ষ বিদারণ করলেন এবং তা যমযমের পানি দ্বারা ধুলেন, এরপর ঈমান ও হিক্‌মতে পরিপূর্ণ একটি সোনার পেয়ালা নিয়ে এলেন এবং তা আমার বুকে ঢেলে দিয়ে জোড়া লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে দুনিয়ার আসমানে গেলেন এবং জিবরাঈল (‘আঃ) এই আসমানের তত্ত্বাবধানকারী ফেরেশ্‌তাকে বললেন, (দরজা) খোল। তিনি বললেন কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। (সহিহ বুখারি ১৬৩৬)

এই হাদিসে প্রমান করে যমযমের পানি পূর্ন থেকেই ভালো পানি হিসাবে মক্কাবাসির নিকট কদর ছিল। কিন্তু তখনকার সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তবে ১৫৪/১৫৫ হিজরীতে (৭৭১ খৃষ্টাব্দে) খলিফা আল মনসুরের সময় এটির উপর গম্বুজ এবং মার্বেল টাইলস বসানো হয়। এর আগে এটি বালি ও পাথর দিয়ে ঘেরা অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে খলিফা আল মাহদি এটি আরো সংস্কার করেন। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ সালে সৌদি বাদশাহ সংস্কার করেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ জমজমের পূর্ব ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দুটি স্থান নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ৬টি এবং পূর্বদিকে ৩টি ট্যাপ লাগানো হয়। বর্তমানে কাবা ঘরের ২০ মিটার দূরে অবস্থিত এই কূপটি থেকে পাম্পের সাহায্যে প্রতিদিন ২০ লক্ষাধিক ব্যারেল পানি উত্তলিত হয়। এই কূপের পানি বণ্টনের জন্য ১৪০৩ হিজরিতে সৌদি বাদশাহের এক রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী হজ্জ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইউনিফাইড ‘জামাজেমা দফতর’ গঠিত হয়। এই দফতরে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ মোট ১১ জন সদস্য ও ৫ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। বাদশাহ আব্দুল্লাহ যমযম  পানি কমপ্লেক্সটি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ৭০০ মিলিয়ন রিয়াল ব্যয়ে মক্কাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা প্রতিদিন ২০০,০০০ বোতল পানি সরবরাহ করতে পারে।

যমযমের পানির খাদ্য উপদানঃ

যমযম কূপের পানির কোনও রং বা গন্ধ নেই, তবে এর বিশেষ একটি স্বাদ রয়েছে। বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় যমযম কূপের পানি পরীক্ষা করেছে এবং তারা এর পুষ্টি গুণ ও উপাদান সমূহ নির্ণয় করেছে।

যমযম  পানির উপাদানসমূহঃ

খনিজের ঘনীভবন বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত
খনিজঘনীভবন
mg/Loz/cu in
সোডিয়াম১৩৩৭.৭×১০−৫
ক্যালসিয়াম৯৬৫.৫×১০−৫
ম্যাগনেসিয়াম৩৮.৮৮২.২৪৭×১০−৫
পটাশিয়াম৪৩.৩২.৫০×১০−৫
বাইকার্বোনেট১৯৫.৪০.০০০১১২৯
ক্লোরাইড১৬৩.৩৯.৪৪×১০−৫
ফ্লোরাইড০.৭২৪.২×১০−৭
নাইট্রেট১২৪.৮৭.২১×১০−৫
সালফেট১২৪.০৭.১৭×১০−৫
মোট দ্রবীভূত কঠিন বস্তুর৮৩৫০.০০০৪৮৩

সহিহ হাদিসের আলোকে যমযম কুপের কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হলোঃ

ক। যমযমের পানি পানে উপকার হয়ঃ

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যমযমের পানি যে উপকার লাভের আশায় পান করা হবে, তা অর্জিত হবে। (ইবনে মাজাহ ৩০৬২)

খ। যমযমের পানিতে খাদ্যগুন ও রোগমুক্তি হয়ঃ

আবু যার্র (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তা (যমযমের পানি) বরকতপূণ। তা তৃপ্তিকর খাদ্য এবং রোগনিরাময়ের ঔষধ।” (হাদিস সম্ভার ১২০১, ত্বাবারানীর ২৯৫, সহীহুল জামে ২৪৩৫)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হল যমযমের পানি। তাতে রয়েছে তৃপ্তির খাদ্য এবং ব্যাধির আরোগ্য।” (হাদিস সম্ভার ১২০২, ত্বাবারানীর ৩৯১২, ৮১২৯, সহীহুল জামে’ ৩৩২২)

আবূ জামরাহ যুবা’য়ী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মক্কায় ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট বসতাম। একবার আমি জ্বরাক্রান্ত হই। তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি তোমার গায়ের জ্বর যমযমের পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর।’ কারণ, আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এটা জাহান্নামের উত্তাপ হতেই হয়ে থাকে। কাজেই তোমরা তা পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর অথবা বলেছেন। যমযমের পানি দিয়ে ঠাণ্ডা কর। এ বিষয়ে বর্ণনাকারী হাম্মাম সন্দেহ পোষণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ৩২৬১)

গ। যমযমের পানি দাড়িয়ে পান করা মু্স্তাহাবঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়ানো অবস্থায় যমযমের পানি পান করতেন। (সামায়েলে তিরমিজি ১৫২, সহিহ মুসলিম ৫৪০০)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমযমের পানি দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় পান করেছেন। (ইবনে মাজাহ ১৮৮২)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যমযমের পানি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পেশ করলাম। তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করলেন। (রাবী’) ‘আসিম বলেন, ‘ইকরিমা (রাঃ) হলফ করে বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন উটের পিঠে আরোহী অবস্থায়ই ছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩৭)

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : চতুর্থ কিস্তি

বাইতুল্লাহ বিভিন্ন অংশের বর্ণনা : চতুর্থ কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৭। বাইতুল্লাহ গিলাফঃ

বাইতুল্লাহকে কারুখচিত একটি কালো কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখা হয় যাকে আমরা গিলাফ বলা হয়। আরবের লোকেরা ইহাকে ‘কিসওয়া’ বলে থাকে। প্রতি বছর এই কাপড়টি পরিবর্তন করে আরেকটি কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয়। হজ্জের কয়েক দিন আগে থেকেই কাবা শরিফের গিলাফের নিচু অংশ উপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়। এতে কাবা শরিফের দেয়ালের বাইরের অংশ দেখা ও ধরা যায়। কাবাঘরের দরজা ও বাইরের গিলাফ দুটোই মজবুত রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়। গিলাফের মোট পাঁচটি টুকরো বানানো হয়। চারটি টুকরো চারদিকে এবং পঞ্চম টুকরোটি দরজায় লাগানো হয়। টুকরোগুলো পরস্পর সেলাইযুক্ত।

প্রতিবছর আরাফার দিন ৯ জিলহজ্জ একটি নতুন গিলাফ দ্বারা কাবাঘরকে আবৃত করা হয়। তখন পুরাতন গিলাফটি খুলে ফেলা হয়। এই দিন হাজ্জিগন আরাফায় অবস্থান করে বিধায় বাইতুল্লাহ খালি থাকে। আর মসজিদে হামারের কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে গিলাফটি পরিবর্তন করে থাকেন। ১০ জিলহজ্জ হাজ্জিগণ মক্কায় ফিরে কাবাঘরের গায়ে নতুন গিলাফ দেখতে পান। প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন রেশম দিয়ে তৈরি করা হয় কাবার গিলাফ। রেশমকে রং দিয়ে কালো করা হয়। পরে গিলাফে বিভিন্ন দোয়ার নকশা আঁকা হয়। গিলাফের উচ্চতা ১৪ মিটার। ওপরের তৃতীয়াংশে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া বন্ধনীতে কোরআনের আয়াত লেখা। বন্ধনীতে ইসলামি কারুকাজ করা একটি ফ্রেম থাকে। বন্ধনীটি সোনার প্রলেপ দেওয়া রুপালি তারের মাধ্যমে এমব্রয়ডারি করা। এই বন্ধনীটা কাবা শরিফের চারদিকে পরিবেষ্টিত। ৪৭ মিটার লম্বা বন্ধনীটি ১৬টি টুকরায় বিভক্ত। বন্ধনীটির নিচে প্রতি কোনায় সূরা আল-ইখলাস লেখা। নিচে পৃথক পৃথক ফ্রেমে লেখা হয় পবিত্র কোরআনের ৬টি আয়াত। এতে এমব্রয়ডারি করে ওপরে সোনা ও রুপার চিকন তার লাগানো হয়।

বাইতুল্লাহ গিলাফ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিসঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমাযানের সওম ফর্‌য হওয়ার পূর্বে মুসলিমগণ ‘আশূরার সওম পালন করতেন। সে দিনই কা‘বা ঘর (গিলাফে) আবৃত করা হত। অতঃপর আল্লাহ যখন রমাযানের সওম ফর্‌য করলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘আশূরার সওম যার ইচ্ছা সে পালন করবে আর যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দিবে। (সহিহ বুখারি ১৫৯২)

নাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মক্কা বিজয়ের বছর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম লৌহ শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় (মক্কা) প্রবেশ করেছিলেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিরস্ত্রাণটি মাথা হতে খোলার পর এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললেন, ইব্‌নু খাতাল কা’বার গিলাফ ধরে আছে। তিনি বললেনঃ তাকে তোমরা হত্যা কর।(সহিহ বুখারি ১৮৪৬)

৮। রুকনে ইয়ামানীঃ

রুকনে ইয়ামানী এটি কাবাঘরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এটি ইয়ামান দেশের দিকে হওয়াতে একে রুকনে ইয়ামানী বলা হয়েছে থাকে। কাবা ঘরের এই অংশে কখনো  চুম্বন  করবেন না, তবে স্পর্শ করা মুস্তাহাব। মনে রাখতে হবে শুধু হাজরে আসওয়াদ পাথটি চুম্বন করব আর রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করব।  যা সহহি হাদিস দ্বারা প্রমানিত। ইহা ছাড়া অন্য কোন স্থান ষ্পর্শ বা চুম্বন কোন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয়। যা হয় শুধুই আবেগের ফল। বিষয়টি বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেই।

একবার হযরত মু‘আবিয়া ও ইবনু আববাস (রাঃ) একত্রে ত্বাওয়াফরত অবস্থায় মু‘আবিয়া (রাঃ) কাবাগৃহের সবগুলি রুকন (চারটি কোণ) স্পর্শ করলে ইবনু আববাস (রাঃ) তার প্রতিবাদ করে বলেন, কেন আপনি এ দু’টি রুকন স্পর্শ করছেন? অথচ রাসূল (ছাঃ) এ দু’টি স্পর্শ করেননি। জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বলেন, কা‘বাগৃহের কোন অংশই পরিত্যাগ করার নয়। তখন ইবনু আববাস আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে’ (আহযাব ২১) জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বললেন, আপনি সত্য বলেছেন’। (ত্বাবারাণী আওসাত্ব ২৩২৩, আহমাদ ৩৫৩২ হাদিসে সনদ সহহি)

আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু স্তম্ভ (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে। (সুনানে নাসাঈ ২৯২২ হাদিসের মান সহিহ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সুন্নত হচ্ছে, এটিকে চুমু না দিয়ে শুধু স্পর্শ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে এ রুকনটিতে স্পর্শ করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দুই ইয়ামানী রুকন ব্যতীত বায়তুল্লাহর অন্য কিছু স্পর্শ করতে দেখিনি।  (সহিহ মুসলিম ২৯৫১)

উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখি, যা আপনার অন্য কোন সঙ্গীকে করতে দেখিনা। তিনি বললেন, ‘ইবনু জুরায়জ, সেগুলো কি?’ তিনি বললেন, আমি দেখি, (১) আপনি তাওয়াফ করার সময় রুকনে ইয়ামানী দু’টি ব্যতীত অন্য রুকন স্পর্শ করেন না। (২) আপনি ‘সিবতী’ (পশমবিহীন) চপ্পল পরিধান করেন; (৩) আপনি (কাপড়ে) হলুদ রং ব্যবহার করেন এবং (৪) আপনি যখন মক্কায় থাকেন লোকে চাঁদ দেখে ইহরাম বাঁধে; কিন্তু আপনি তারবিয়ার দিন (৮ ই যিলহাজ্জ) না এলে ইহরাম বাঁধেন না।

‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ রুকনের কথা যা বলেছ, তা এজন্য করি যে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইয়ামানী রুকনদ্বয় ছাড়া আর কোনটি স্পর্শ করতে দেখিনি। আর ‘সিবতী’ চপ্পল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পশমবিহীন চপ্পল পরতে এবং তা পরিহিত অবস্থায় অজু করতে দেখেছি, তাই আমি তা করতে ভালবাসি। আর হলুদ রং, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা দিয়ে কাপড় রঙিন করতে দেখেছি, তাই আমিও তা দিয়ে রঙিন করতে ভালবাসি। আর ইহরাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে তাঁর সওয়ারি রওনা না হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ইহরাম বাঁধতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি ১৬৭ ইফাঃ)

৯। মুলতাযাম স্পর্শ করাঃ

মুলতাযাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ এঁটে থাকার জায়গা। হাজরে আসওয়াদ থেকে কা‘বা শরীফের দরজা পর্যন্ত জায়গাটুকুকে মুলতাযাম বলে। বিদায়ি তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফের নিয়মে বায়তুল্লাহ সাত বার প্রদক্ষিণ করবেন। তাওয়াফ শেষে ইচ্ছে হলে মুলতাযামে চেহারা, বুক ও দুই বাহু ও দুই হাত রেখে আল্লাহর কাছে যা খুশি চাইতে পারেন। এই কাজটি অবশ্য মুস্তাহাব।

১. আমর ইবনে শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ‘ইবনে আমর (রাঃ) এর সাথে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলাম। আমরা সাতবার তাওয়াফ শেষে কা‘বার পশ্চাতে নামায পড়লাম। অতঃপর আমি বললাম, আমরা কি আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবো না? তিনি বলেন, আমি আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি অগ্রসর হয়ে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন, অতঃপর হাজরে আসওয়াদ ও কা‘বার দরজার মাঝ বরাবর দাঁড়ান, অতঃপর তার নিজের বুক, হস্তদ্বয় ও গাল তার সাথে লাগান এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সুনানে ইবন মাজাহ ২৯৬২)

২. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কা‘বা গৃহের দরজা এবং রুকনের মাঝামাঝি স্থানটি মুলতাযাম। মালিক (র) থেকে বর্ণিত, আমি জেনেছি, আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলতেন, হাজরে আসওয়াদ এবং কা’বা শরীফের দরজার মধ্যবর্তী স্থানটি হল মুলতাযাম। (হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন)। (মুয়াত্তা মালিক ৯৪৬)

৩. আবদুর রহমান ইবন সাফওয়ান বলেন, ‘আমি মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীদের কা‘বাঘর থেকে বের হতে দেখলাম। অতঃপর তারা কা‘বাঘরের দরজা থেকে নিয়ে হাতীম পর্যন্ত স্পর্শ করলেন এবং তাঁরা তাঁদের গাল বাইতুল্লাহ্‌র সাথে লাগিয়ে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের মাঝে ছিলেন। (সুনানে আবূ দাঊদ ১৮৯৮।

মন্তব্যঃ এই হাদীসের সনদে দুর্বলতা আছে। কিন্তু উপরে আবদুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি রুকন ও দরজার মাঝখানে দাঁড়ালেন। তিনি তার বক্ষ, দু’বাহু ও দু’হাতের তালু সম্প্রসারিত করে কা‘বাঘরের ওপর রাখলেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে এমনটি করতে দেখেছি। শায়খ আলবানী বলেন, রুকনে ইয়ামেনী ও দরজার মাঝখানে লেগে থাকার অংশটুকু প্রমাণিত আছে। সাহাবায়ে কিরাম মক্কায় এসে মুলতাযামে যেতেন এবং সেখানে দু’হাতের তালু, দু’হাত, চেহারা ও বক্ষ রেখে দোয়া করতেন। বিদায়ী তাওয়াফের পূর্বে বা পরে অথবা অন্য যেকোনো সময় মুলতাযামে গিয়ে দো‘আ করা যায়।

ইবন তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, ‘যদি সে ইচ্ছা করে হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মধ্যবর্তী স্থান মুলতাযামে আসবে। অতপর সেখানে তার বক্ষ, চেহারা, দুই বাহু ও দুই হাত রাখবে এবং দোয়া করবে, আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজনগুলো চাইবে, তবে এরূপ করা যায়। বিদায়ী তাওয়াফের পূর্বেও এরূপ করতে পারবে। মুলতাযাম ধরার ক্ষেত্রে বিদায়ী অবস্থা ও অন্যান্য অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর সাহাবীগণ যখন মক্কায় প্রবেশ করতেন তখন এরূপ করতেন। (ইবন তাইমিয়া, মাজমু‘ ফাতাওয়া ২৬/১৪২)।

লক্ষণীয়ঃ বর্তমান যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে মুলতাযামে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সুযোগ পেলে সেখানে যাবেন। অন্যথায় যাওয়ার দরকার নেই। কেননা মুলতাযামে যাওয়া তাওয়াফের অংশ নয়। তাওয়াফের সময় তা করা যাবে না। তাওয়াফ শেষে এই মুস্তাহাব আমল করা যেতে পারে, তবে হজ্জের মৌসুমে এত ভীড় থাকে যে এই কাজ করা খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যাপার।

১০। মাতাফঃ 

কাবাঘরের চারদিকে অবস্থিত তওয়াফের স্থানকে ‘মাতাফ’ বা চত্বর বলা হয়। মূলত তাওয়াফের জন্য ব্যবহৃত হলেও জামাতের সময় হলে এই স্থানে সালাত আদায় করা হয়। সালত শেষে পুনরায় তাওয়াফ শুরু হয়। পূর্বে যমযম  কূপ মাতাফেই অবস্থিত ছিল। পরে ভূপৃষ্ঠ থেকে কূপের অংশ সরিয়ে নেয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে এই ব্যবস্থা রয়েছে।

১১। মিযাবে রহমতঃ

কাবাঘর ধোওয়া হলে বা বৃষ্টি বর্ষিত হলে, ছাদের পানি এ জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হয়। বায়তুল্লাহর উত্তর দিকের ছাদে (হাতিমের মাঝ বরাবর) যে নালা বসানো আছে, তাকে ‘মিযাবে রহমত’ বলা হয়। সাধারণত এই নালা দিয়ে ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ে।

১২. রুকনঃ

রুকনের অর্থ হলো, স্তম্ভ। হজ্জের রুকনের অর্থ হজ্জের স্তম্ভগুলো। যার ওপর হজ্জের ভিত্তি। এর কোনোটি বাদ গেলে হজ্জ আদায় হয় না।

১৩। . শাযারওয়ানঃ

ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সময় কাবার দুটি দরোজা ছিল। কুরাইশ গোত্র যখন কাবা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন তারা হালাল অর্থের সংকটের কারণে একটি দরজা নির্মাণ করে। কিছু অংশ রেখে দেয়। সেই অংশটাই হজ্জরে ইসমাঈল নামে পরিচিত। অনির্মিত অংশের খানিকটা মূল ভিত্তিমূলের মাঝেও রয়েছে। যা বর্তমানে শাযারওয়ান নামে পরিচিত। কা‘বার ভিত্তিমূলের কাছাকাছি, দেয়াল লাগোয়া অংশটাই শাযারওয়ান।

১৪ বাইতুল্লাহর চারটি কোনার চারটি নামঃ

ক। রুকনে হজ্জরে আসওয়াদঃ কাবার যে কোনায় হজ্জরে আসওয়াদ বা কালো পাথর পাথর আছে, সেই কোনাকে রুকনে হজ্জরে আসওয়াদ বলা হয়। এই কোনা থেকেই তাওয়াফ  শুরু ও শেষ করতে হয়।

খ। রুকনে ইরাকিঃ হজ্জরে আসওয়াদ পর তাওয়াফ শুরু করলে প্রথম যে কোনা পড়বে তাকে রুকনে ইরাকি বলে। অর্থাৎ বাইতুল্লাহর পূর্ব-উত্তর কোনাকে রুকনে ইরাকি বলা হয়। এর পরই কাবার অনির্মিত অংশ হাতিম।

গ। রুকনে শামিঃ হাতিম অতিক্রমের পর যে কোনা সামনে আসবে তাই হলো রুকনে শামি। অর্থাৎ বাইতুল্লাহর উত্তর-পশ্চিম কোনাকে রুকনে শামি বলা হয়।

রুকনে ইয়ামানিঃ বাইতুল্লাহর পশ্চিম-দক্ষিন কোনাকে রুকনে ইয়ামানি বলা হয়। এই সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

হজ্জ সংক্রান্ত কিছু পরিভাষা

হজ্জ সংক্রান্ত কিছু পরিভাষা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিশ্বের নানা প্রান্তের, নানা ভাষার মানুষ হজ্জ পালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন। হজ্জ ও উমরার সময় ব্যবহৃত হয় কিছু আরবি পরিভাষা, যেগুলি জানা থাকলে হজ্জ পালন অনেকটাই সহজ্জ হয়, হজ্জের বিধীবিধান পালনে সহজ্জ হয়। যেহেতু পরিভাষাগুলো আরবি এবং বহুল ব্যবহৃত, তাই সেসব পরিভাষা সম্পর্কে আজকে আলোচনা করা হলো। আশা করি, অনুসন্ধানী হজ্জযাত্রীদের এগুলো উপকারে আসবে।

১. হজ্জঃ

হজের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা।  শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জ অর্থ নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক নির্দিষ্ট কিছু কর্ম সম্পাদন করা। (হজ্জ উমরা ও জিয়ারত, ইসলামহাউজ.কম)

২. উমরাঃ

উমরার আভিধানিক অর্থ যিয়ারত করা। শরীয়তের পরিভাষায় উমরা অর্থ, নির্দিষ্ট কিছু কর্ম অর্থাৎ ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার মাধ্যমে বায়তুল্লাহ শরীফের যিয়ারত করা। (হজ্জ উমরা ও জিয়ারত, ইসলামহাউজ.কম)

৩. মীকাতঃ

হজ্জ বা উমরার নিয়তে মক্কার কাবাঘরেরউদ্যশ্যেগমনকারীদেরকেকাবাহতেএকটিনির্দিষ্টপরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয় যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই স্থানগুলোকে মীকাত বলা হয়। হারাম শরীফের চর্তুদিকেই মীকাত রয়েছে।

৪. তালবীয়াঃ

উমরা বা হজ্জের নিয়ত করার পর যে তাওহীদের বাক্য বলে সর্বক্ষন মহান আল্লাহ স্মরণ করা হয় তাকে তালবিয়া বলা হয়। সহিহ হাদিসের তালবীয়া নিম্মের বাক্যে এসেছে।

 *لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

(লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা)।

৫. ইহরামঃ

হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেওয়া। হজ্জ ও ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু কথা ও কাজ নিজের ওপর নিষিদ্ধ করে নেওয়ার সংকল্প করা। বানানভেদে অনেকেই এটাকে এহরামও বলেন।

৬. তাওয়াফঃ

প্রদক্ষিণ করা। পবিত্র কাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলে।

৭. ইযতিবাঃ

ডান বগলের নিচ দিয়ে চাদরের প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর উঠিয়ে রাখা। এভাবে ডান কাঁধ খালি রেখে উভয় প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে রাখা। যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে পুরুষের জন্য সে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করা সুন্নত। আর ওই তাওয়াফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইজতিবা অবস্থায় থাকা পৃথক একটি সুন্নত।

৮. রমলঃ

ঘন পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটা। হজ্জ বা ওমরার প্রথম তাওয়াফের সময় প্রথম তিন চক্কর ডান কাঁধ খোলা রেখে বীরের বেশে দ্রুততার হাঁটতে হয়, এটাকে রমল বলে।

৯. তাওয়াফে কুদুমঃ

কুদুম অর্থ আগমন করা। সুতরাং এর অর্থ আগমনি তাওয়াফ। মিকাতের বাইরের লোকেরা যখন হজ্জ বা ওমরার উদ্দেশ্যে কাবা শরিফে আসেন, তখন তাদের বায়তুল্লাহ তথা কাবার সম্মানার্থে এ তাওয়াফটি করতে হয়, এটি সুন্নত।

১০. তালবীয়াঃ

সাড়া দেওয়া। আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে আগমনকারীকে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইকৃ’ বলে যে কথাগুলো পাঠ করতে হয় তাকে তালবিয়া বলে।

১১. হলকঃ

হজ্জ বা উমরার কাজ সম্পন্ন হলে মাথার চুল কামাতে বা ছোট করতে হয়। মাথা কামানোকে হলক এবং চুল ছোট করাকে কসর বলা হয়।

১২. কসরঃ

কসর অর্থ সংক্ষিপ্ত করা। চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজগুলো দুই রাকাত করে আদায় করা।

১৩. সাফা ও মারওয়াঃ

সাফা ও মারওয়া কাবার পাশে দুটি পাহাড়। বর্তমানে মসজিদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এগুলোকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর স্ত্রী হাজেরা আলাইহিস সালাম তার শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর জন্য পানির সন্ধানে এই দুই পাহাড়ে সাতবার ছোটাছুটি করেছিলেন। তার অনুকরণে এই দুই পাহাড়ে হজ্জ ও উমরার সময় সায়ি করা হয়। পবিত্র কুরআনে এই পাহাড় দুটিকে আল্লাহ তার নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

(٢) إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّهِۖ فَمَنْ حَجَّ ٱلْبَيْتَ أَوِ ٱعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَن يَطَّوَّفَ بِهِمَاۚ وَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَإِنَّ ٱللَّهَ شَاكِرٌ عَلِيمٌ

অর্থঃ নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন। (সূরা বাকার ২:১৫৮)

১৪. মাসআঃ

সাঈ করার স্থান। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গা। অর্থাৎ হজ্জ বা উমরারা সময় যে স্থানে সাঈ করা হয়, সেই স্থানকে মাস’আ বলা হয়। মাস’আ দীর্ঘে ৩৯৪.৫ মিটার ও প্রস্থে ২০ মিটার। মাসআ’র গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলা সুন্দরভাবে সাজানো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভিড় হলে প্রথম তলায় গিয়েও সাঈ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে ছাদে গিয়েও সাঈ করা যাবে তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার সাঈ যেন মাসআ’র মধ্যেই হয়। মাসআ থেকে বাইরে দূরে কোথাও সাঈ করলে সাঈ হয় না।

সাঈঃ সাঈয়ের অর্থ দৌঁড়ানো। এখানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার যাওয়া আসা করাকে সাঈ বলা হয়।

১৫. জাবালে আরাফাঃ

আরাফায় অবস্থিত পাহাড়, যাকে সাধারণ মানুষ জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড় বলে থাকে।

১৬. তাওয়াফে যিয়ারাঃ

১০ জিলহজ্জ কোরবানি ও হলক-কসরের পর থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে কাবা শরিফের তাওয়াফ করাকে তাওয়াফে ইফাজা বা তাওয়াফে জিয়ারা বলে। এ তাওয়াফ ফরজ।

১৭. আইয়ামে তাশরিকঃ

জিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়।

১৮. ইয়াওমুত তালবিয়াঃ

জিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ মিনায় যাওয়ার দিন।

১৯. ইয়াওমুল আরাফাঃ

আরাফা দিবস। জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূযাস্ত পর্যন্ত ফরজ হিসেবে আরাফায় অবস্থান করতে হয়। এ দিনকে ইয়াওমু আরাফা বলে।

২০. উকুফঃ

অবস্থান করা। আরাফা ও মুজদালিফায় অবস্থান করাকে যথাক্রমে উকুফে আরাফা ও উকুফে মুজদালিফা বলা হয়।

২১. জামারাঃ

শাব্দিক অর্থ পাথর। মিনায় অবস্থিত তিনটি জামারা আছে। এই জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। অনেকে এই জামারাকে প্রতীকী শয়তানের স্তম্ভ মনে করে কঙ্কর নিক্ষেপ করে। তাদের ধারনা ভুল, মহান আল্লাহ জিকির বুলন্দ করাই হলো জামারায় পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য।

২২. দমঃ

হজ্জ ও উমরা আদায়ে ওয়াজিব ছুটে যাওয়া, ভুলত্রুটি হলে তার কাফফারাস্বরূপ একটি পশু জবাই করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়; এই পশু জবাইকে বলে দম দেওয়া।

২৩. ফিদইয়াঃ

সাধারণ কোনো অপরাধ হয়ে গেলে তিনটি কাজের যে-কোনো একটি করতে হয়। ছয়জন মিসকিনকে এক কেজি দশ গ্রাম পরিমাণ খাবার প্রদান কিংবা তিন দিন রোজা পালন করা অথবা ছাগল জবাই করে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া।

মাবরুরঃ হাদিসে কবুল হজ্জকে মাবরুর হজ্জ বলা হয়েছে।

২৪. হারামঃ

নিষিদ্ধ বস্তুকে হারাম বলে। আবার সম্মানিত স্থানকেও হারাম বলে। মক্কা ও মদিনার নির্দিষ্ট সীমারেখাকে হারাম বলে।

২৫. হালালঃ

ইহরাম শেষ হওয়ার পর মুক্ত অবস্থাকে হালাল হওয়া বলে।

২৬. রওজাঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজ মিম্বর ও ঘরের মাঝখানের অংশকে রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাত বা জান্নাতের একটি বাগান বলে অভিহিত করেছেন। নবী করিম (সা.) তার ঘরের মাঝে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

২৭. হজ্জে আকবরঃ

জিলহজের ১০ তারিখের দিনকে কোরআনে কারিমে ‘ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার’ তথা বড় হজের দিন বলা হয়েছে। জিলহজের ৯ তারিখ তথা আরাফা দিবস যদি শুক্রবারে হয় তাহলে আরাফা দিবস ও জুমাবার- উভয়ের ফজিলত লাভ হয়। তবে এটি আকবরি হজ্জ নামে যে লোকমুখে প্রচলিত- ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই, এগুলো মানুষের বানানো কথা।

২৮. কিলাদাঃ

কিলাদা অর্থ গলার মালা। আরবি অর্থ নেকলেস, মালা। হজ্জের সময় হাদির গলায় যে মালা ঝুলান হয় তাকে কিলাদা বলা হয়।

২৯. জান্নাতুল মুয়াল্লাহঃ

মসজিদে হারামের পূর্ব দিকে মক্কা শরিফের বিখ্যাত কবরস্থান।  এখানে মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (বাঃ), দাদা ও অন্যান্য পূর্বপুরুষদের কবর রয়েছে। এই নামে শুধু উপমহাদের লোকে চেনে। মক্কাবাসী এখানে বলে গারকে মুয়াল্লাহ।

৩০. হেরা পাহারঃ

এই হেরা পাহার কে অনেক জাবালে নুর বলে থাকে। মক্কার সর্বাধিক উঁচু পাহাড়। এখানে হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এখানে ধ্যানমগ্ন থাকা অবস্থায় সর্ব প্রথম অহি নাজিল হয়।

৩১. গারে সাওরঃ

মসজিদুল হারামের পশ্চিমে হিজরতের সময় এই প্রকাণ্ড সুউচ্চ পাহাড়ে হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। ইহাকে জাবালে সাওর ও বলা হয়।

৩২. জাবালে রহমাতঃ

আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত। এ পাহাড়ে সর্ব প্রথম নবী হজ্জরত আদম (আঃ)-এর দোয়া কবুল হয়। এখানে তিনি বিবি হাওয়া (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পান। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হজ্জরত মুহাম্মদ (সাঃ) বিদায় হজের খুতবাও এখান থেকে দিয়েছিলেন।

৩৩। ওয়াদি মুহাস্সারঃ

এটি মুযদালিফা ও মিনার মাঝামাঝি একটি জায়গার নাম, যেখানে আবরাহা ও তার হস্তী বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছিল। স্থানটি হেরেমের ভেতরে অবস্থিত কিন্তু ইবাদতের স্থান নয়। এখানে পৌঁছলে আল্লাহর গজব নাযিল হওয়ার স্থান হিসেবে তা দ্রুত অতিক্রম করা উচিত।

৩৪। ওয়াদি উরনাহঃ

আরাফার মাঠের পাশে বিস্তৃত উপত্যকা, যা মুযদালিফার দিক থেকে আরাফায় প্রবেশের ঢোকার সময় প্রথম সামনে পড়ে।

৩৫। কিরানঃ

মিলিয়ে করা। হজ ও উমরাকে একই সাথে আদায় করার নাম কিরান করা। এটি তিন প্রকার হজের অন্যতম।

৩৬। তামাত্তুঃ উপকৃত হওয়া, উপকার নেয়া, ভোগ করা। একই সফরে প্রথমে উমরা আর পরে হজ আলাদাভাবে আদায় করাকে তামাত্তু বলে। এটি তিন প্রকার হজের অন্যতম।

৩৭। বাতনে ওয়াদীঃ  বাতন অর্থ পেট বা মধ্যভাগ। আর ওয়াদী অর্থ উপত্যকা। তাই বাতনে ওয়াদী শব্দদু’টির অর্থ উপত্যকার মধ্যভাগ। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝখানে নিচু উপত্যকা এলাকা ছিল। সে উপত্যকাটিকেই বাতনে ওয়াদী বলে।

৩৮। তাওহীদঃ

আল্লাহর একত্ববাদ।

৩৯। তাকবীরঃ

বড় করা। ইসলামী পরিভাষায় ‘আল্লাহু আকবার’ বলাকে তাকবীর বলে।

৪০। তাহলীলঃ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলাকে তাহলীল বলা হয়।

৪১। নহরঃ

নহর অর্থ কুরবানী করা। উট কুরবানী করার জন্য দাঁড়ানো অবস্থায় তার গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এ প্রক্রিয়াকে নহর বলে।

৪২। মাবরুরঃ

মাবরুর অর্থ মকবুল বা কবুলযোগ্য। হাদীসে কবুলযোগ্য হজ্জকে হজ্জে মাবরূর বলা হয়েছে।

৪৩। মাশ‘আরঃ

নিদর্শন সম্বলিত স্থান। আর মাশ‘আরুল হারাম বলতে মুযদালিফাকে বুঝানো হয়েছে।

৪৪। সাঈঃ

দৌড়ানো। এখানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার যাওয়া আসা করাকে বুঝায়।

হজ্জ ও উমরার ফজিলত

হজ্জ ও উমরার ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জ ইসলামি শরীয়তে অন্যতম ফরজ ইবাদাত। ইহার মাধ্যমে একজন পাপিষ্ট মুসলিম নিস্পাপ মুসলিমে রুপান্তরিত হয়। এমন মুসলিম সদ্যভুমিষ্ট শিশুর মত নিস্পাপ হয়ে যায়। যদি হজ্জের কোন প্রকার ফজিলত না থাকত, তবু ফরজ হিসাবে প্রতিটি ঈমানের দাবিদার মুসলিম হজ্জ করতে বাধ্য থাকত। মহান আল্লাহর অপরিসীম করুনা যে তিনি তার হুকুম পালনের মাধ্যমে বান্দাকে ভালবান করবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 (٩) لِّيَشْهَدُوا مَنَٰفِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا ٱسْمَ ٱللَّهِ فِىٓ أَيَّامٍ مَّعْلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَٰمِۖ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا ٱلْبَآئِسَ ٱلْفَقِيرَ

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। (সূরা হজ্জ ২২:২৮)

হজ্জ একটি ফরজ ইবাদত। মহান আল্লাহর নেকট্য লাভের প্রধার উপায় হল ফরজ কাজ যথাযথভাবে আদায় করা। হজ্জের মাধ্যমে যে বান্দা মহান আল্লাহ নৈকট্য ভাল করবে তাতে কোন প্রতার সংশয় নাই। তারপরও বহু সহিহ হাদিসে আলাদা আলাদাভাবে হজ্জের ফজিলত বর্ণনা করেছে। নিম্মে এমনই কিছু সহিহ হাদিস উপস্থাপন করছি।

হজ্জ সর্বোত্তম আমলঃ

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে জিজ্ঞেস করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞেস করা হল , অতঃপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞেস করা হল, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেনঃ হজ্জ-ই-মাবরূর (মাকবূল হজ্জ)। (সহিহ বুখারী ১৫১৯ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৬ ইফাঃ) )

হজ্জের প্রতিদানে জান্নাতঃ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জে মাবরূরের জান্নাত ব্যতীত কোন প্রতিদান নেই। আর এক উমরাহ অন্য উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ের জন্য গুনাহের কাফফারা হয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৪ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৫ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক উমরাহ অন্য উমরাহ্ পর্যন্ত কাফফারা হয় উভয়ের মধ্যবর্তী পাপের। আর হজ্জে মাবরূর এর বিনিময় জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩১ ইফাঃ)

মহিলাদের জিহাদ হলো মাবরূর হজ্জঃ

উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম ‘আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হল, হজ্জে মাবরূর। (সহিহ বুখারী ১৫২০ তাওহীদ প্রকাশনী)

আয়েশা বিনত তালহা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি আপনার সাথে জিহাদে যোগদান করবো না? আমি কুরআনে জিহাদ আপেক্ষা উত্তম কোন আমলই দেখছি না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, বরং অতি উত্তম জিহাদ হলো বায়তুল্লাহর হজ্জ অর্থাৎ হজ্জে মাবরূর।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩০ ইফাঃ)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বৰ্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল এবং নারীদের জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ করা। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)

হজ্জের কারনে গুনাহ মাফঃ

১. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হজ্জ হতে ফিরে আসবে যে দিন তার মা জন্ম দিয়েছিল। (সহিহ বুখারী ১৫২১ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ‘উমরাহ’র পর আর এক ‘উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান । (সহিহ বুখারী ১৭৭৩)

হজ্জ দরিদ্রতা দুর করে দেয়ঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ ও ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা হজ্জ ও উমরা পালন কর। কেননা হজ্জ ও উমরা উভয়টি দারীদ্রতা ও পাপরাশিকে দূরীভূত করে যেমনিভাবে রেত স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহার মরিচা দূর করে দেয়। আর মাবরূর হজ্জের বদলা হল জান্নাত।” (সুনানে তিরমিযী ৮১০, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৩ ইফাঃ)

আমর ইবন দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ সমাপনের পর উমরা এবং উমরার পর হজ্জ করবে, কেননা তা অভাব অনটন ও পাপকে দূর করে দেয়। যেমন হাপর লোহার মরিচ দূর করে থাকে।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩২ ইফাঃ)

হজ্জযাত্রীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেনঃ

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর পথের সৈনিক, হজ্জযাত্রী ও উমরা যাত্রীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করলে, তিনি তা কবুল করেন এবং কিছু চাইলে তা তাদের দান করেন।  (ইবনে মাজাহ ২৮৯৩ হাদিসের মান হাসান)

হজ্জযাত্রী আল্লাহর প্রতিনিধিঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি, গাযী, হাজী ও উমরাহ্ আদায়কারী। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৭ ইফাঃ)

হজ্জে জন্য খরচের নেকী সাতশ গুন বৃদ্ধি পায়ঃ

বুরাইদা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হজ্জে খরচ করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) খরচ করার সমতূল্য সাওয়াব। হজ্জে খরচকৃত সম্পদকে সাতশত গুণ বাড়িয়ে এর প্রতিদান দেয়া হবে। (মসনদে আহমাদ ২২৪৯১)

রমাজানের উমরা হজ্জের সমানঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি এক আনসারী মহিলাকে বললেন যার নাম ইবনু আব্বাস (রাঃ) উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তার নাম ভুলে গেছি- আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিল? মহিলা বলল, আমাদের পানি বহনকারী মাত্র দুটি উট আছে। আমার ছেলের বাপ (স্বামী) ও তার ছেলে এর একটিতে চড়ে হাজ্জ (হজ্জ) করেন এবং অপরটি আমাদের জন্য রেখে যান পানি বহনের উদ্দেশ্যে। তিনি বললেন, রমযান মাস এলে তুমি উমরা কর। কারণ এ মাসের উমরা একটা হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৮ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সিনান এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? মহিলা বলল, অমুকের পিতা- অর্থাৎ তার স্বামীর দুটি পানি বহনকারী উট আছে। এর একটি নিয়ে সে ও তার ছেলে হজ্জে গিয়েছে। অপরটির সাহায্যে আমাদের গোলাম পানি বহন কর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে রমযান মাসের উমরা-হজ্জের সমান কিংবা তিনি বলেছেন, আমাদের সঙ্গে একটি হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৯ ইফাঃ)

হজ্জে মাবরূরঃ

সহিহ হাদিসসমূহে হজ্জের ফজিলত বর্ণনায় ‘হজ্জে মাবরুর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হজ্জে মাবরূর অর্থ মকবুল হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় শব্দটির বিভিন্ন অর্থ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বটে কিন্তু সব কথার সার একটিই আর তা হলোঃ হজ্জে যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থেকে পাপমুক্ত হজ্জ সম্পাদিত হওয়াকে ‘হজ্জে মাবরুর’ বলে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত বিধানকে সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে আদায় করলে কবুল হওয়া আশা করা যায়। কাজে যে হজ্জ পরিপূর্ণভাবে আদায় করার ফলে কবুল হবে তাকে হজ্জে মাবরুর বলা হয়। তাই অনেকে কবুলযোগ্য হজ্জকেও হজ্জে মাবরূর বলেছেন। এই হজ্জের প্রতিদার একমাত্র জান্নাত।

১. আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাতব্যতীত আর কিছুই নয়। (তিরমিজ ৮১০,  ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।

২. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ এক উমরা অপর উমরা পর্যন্ত সংঘটিত গুনাহসমূহের কাফফারা স্বরূপ। ক্ববূল হজ্জ্জের প্রতিদান জান্নাতছাড়া আর কিছু নেই। (তিরমিজ ৯৩৩, ইবনে মাজাহ ২৮৮৮)

৩. আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলঃ সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ কোনটি এবং উত্তম বা কল্যাণকর কোন ধরণের কাজ? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা। আবার প্রশ্ন করা হল, এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ জিহাদ হচ্ছে সকল কাজের চূড়া বা শিখর। আবার প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ (আল্লাহ্ তা’আলার নিকট) হজ্জে মাবরুর বা কবুলযোগ্য হজ্জ। (সহিহ বুখারি ২৬, তিরমিজি ১৬৫৮)

মাবরুর হজ্জের জন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ

আমাদের সকলের উচিৎ মাবরূর হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের চেষ্টা করা। হজ্জে সফরের সাথে আর্থিক ও শারীরিক সম্পর্ক থাকে বিধায় আমলটি কঠিন। তাই শ্রম দিয়ে অর্থ দিয়ে যদি কবুলযোগ্য হজ্জজ্ আদায় করেতে না পাবি তবে বিষয়টি খুবই পরিতাপের। তাই হজ্জে মাবরুল বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের জন্য নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।

ঈমান থাকাঃ

কাফির ও মুশরিক কোন আমল মহান আল্লাহ নিকট গ্রহনীয় নয়। যদি ইমান এসে মুসলিম হয়, তখন তার ইবাদাত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এমন কি কেউ ইমান আনার পর ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ করলেও তার কোন ভাল কাজ বা ইবাদাত গৃহীত হবে না।

ইখলাসঃ 

আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি অর্জনের জন্য ভাল কাজ বা ইবাদাত করাই হল ইখলাস। আমাদের সকর ইবাদাতের একমাত্র উপাশ্য হলেন মহান আল্লাহ। তাই আল্লাহ ছাড়া কোন গাইরুল্লাহে খুশি করার জন্য ইবাদাত করলে তা গ্রহণ যোগ্য হবে না। প্রতিটি কাজ বা আমলের এক মাত্র উদ্দেশ্য হবে মহান আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি। সকল প্রকার ইবাদাত ও ভাল কাজ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশী করার নিয়তে করতে হবে। এটাকেই বলা হয় ইখলাস।


সুন্নাত তরীকাঃ 

ইবাদাত কবুলের অন্যতম শর্ত হলো, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় আমল করা। সালাত, সিয়াম, জিকির, দান সদগা ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদাত যখন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় করা হবে তখন ইবাদাত। আর যখন সুন্নাহ তরীকার বাহিরে মনগড়া পদ্ধতিতে করা হবে তখন বিদআত। সকল প্রকার বিদআত পরিত্যাজ্য। তাই সুন্নাহ সম্মত কাজ বা আমলই ইবাদাত বলে গণ্য হবে। তাই সহিহ সুন্নাহ সম্মত দলিল ছাড়া বা মনগড়া কিছুই করা যাবে না।

শির্কমুক্ত থাকাঃ

 মহান আল্লাহ শির্ক যুক্ত ইবাদাত গ্রহন করে না। তার কোন অংশিদার নাই। তাই তিনি সকল প্রকার শির্কি আমল প্রত্যাখান করে থাকেন এবং তার সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

* وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ *

অর্থঃ ‘‘আপনার ও আপনার  পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শির্ক করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন বলে গণ্য হবেন। (সুরা যুমার ৩৯৬৫)

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:

ذَٲلِكَ هُدَى ٱللَّهِ يَہۡدِى بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ‌ۚ وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (٨٨)

অর্থঃ এটি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত, নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে তিনি যাকে চান তাকে এর সাহায্যে হেদায়াত দান করেন৷ কিন্তু যদি তারা কোন শির্ক করে থাকতো তাহলে তাদের সমস্ত কৃতকর্ম ধ্বংস হয়ে যেতো৷ (আনআম:৮৮)

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন: শরীকদের মধ্যে অংশীদারির অংশ (শির্ক) থেকে আমিই অধিক অমুখাপেক্ষী। যে কেউ এমন আমল করল যাতে আমার সাথে অপরকে শরিক করেছে, আমি তাকে ও তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি”। (সহহি মুসলিম)।

মন্তব্যঃ কাজেই কবুল তথা হজ্জে মাবরুর আদায় করতে হলে অবশ্য এই তারটি শর্ত পূরন সাপেক্ষে হজ্জের যাবতীয় বীধি বিধন যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।

ঙ. বৈধ উপার্জন

হজের সফর দো‘আ কবুলের সফর। তারপরও যদি হারাম মাল দিয়ে তা করে তবে তা কবুল না হওয়ার বিষয়টি এসেই যায়। হাদীসে এসেছে

২৯৮৯। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত”- (সূরাঃ আল-মু’মিনূন ৫১)।

তিনি আরো বলেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। (সুনানে তিরমিজ ২৯৮৯ হাদিসের মান হাসান)

চ। হজ্জ হতে হবে শুধুই আল্লাহ জন্যঃ

যদি হজ্জ আল্লাহর জন্য না হয়ে লোক দেখানো কিংবা সুনাম কুড়ানোর জন্য হয় থাকে তবে সেই হজ্জ মহান আল্লাহ নিকটি কবুলযোগ্য হজ্জ হবে না। তাই লোক দেখান হজ্জ করার মানসিকতা বর্জন করা উচিৎ।

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উটের পিঠে) একটি পুরাতন জিন ও পালানে উপবিষ্ট অবস্থায় হজ্জ করেন। তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর যার মূল্য চার দিরহাম বা তারও কম। অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! এ এমন হজ্জ, যাতে কোন প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা নেই। (ইবন মাজাহ ২৮৯০)

ছ। আহার করানো ও ভালো কথা বলা

জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজ হজ্জকে মাবরূর করে? তিনি বললেন, ‘আহার করানো এবং ভালো ও সুন্দর কথা বলা। (মুস্তাদরাক ১/১৭৭৮)

খাল্লাদ ইবন আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবন যুবাইরকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ হাজী উত্তম? তিনি বললেন, যে আহার করায় এবং তার জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, আমাকে ছাওরী বলেছেন, আমরা শুনেছি, এটিই মাবরূর হজ্জ। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৫/৮৮১৬)

জ। সালাম বিনিময়

জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সা. কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজের দ্বারা হজ্জ মাবরূর হয়? তিনি বললেন, ‘খাবার খাওয়ানো এবং বেশি বেশি সালাম বিনিময়ের দ্বারা’। (মুসনাদে আহমদ ৩/৩২৫)

ঝ। তালবিয়া পাঠ ও কুরবানী করা

১. আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল, কোন প্রকার হাজ্জ সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেনঃ চিৎকার করা (উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ) ও রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী দেওয়া)। (সুনানে তিরমিজ ৮২৭, ইবনু মাজাহ ২৯২৪)

২. খাল্লাদ ইবনুল সাইব (রাঃ) হতে তাঁর পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জিবরাঈল (আ) আমার নিকট এসে বলেন যে, আমার সাহাবীদেরকে যেন আমি উচ্চস্বরে তালবিয়াপাঠের নির্দেশ প্রদান করি। (ইবনু মাজাহ ২৯২২)

মাবরুর হজ্জে সম্পাদনের লক্ষনঃ

একজন হাজ্জি উপরের বিষয়গুলি খেয়াল রেখে হজ্জ আদায় করলেন। হজ্জ সম্পাদনের পর যথাযত নিজ দেশে ফিরেও আসলেন। যদি দেখা যায় ঐ হাজ্জির মধ্য আমলগত ও আচরণগত পরিবর্ত ঘটছে তবে বুঝতে হবে তার হজ্জ কবুলযোগ্য বা মাবরুর হজ্জ হয়েছে। অর্থাৎ যদি তাকে পর্যবেক্ষন করে দেখা যায় তার সালাত, জাকাত, আচার-আচরণ, লেনদেন, আমানতদারী, অন্যের হক আদায় এবং ইবাদতের ওপর অবিচলতায় তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে তবে বুঝতে হবে, তার হজ্জ মাবরূর হয়েছে।

সমাজে বহুল প্রচারিত একটি যঈফ হাদিস হলোঃ

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি এতটুকু পাথেয় ও সফর সংক্রান্ত্রের অধিকারী হয়, যা তাকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, এরপরও যদি সে হজ্জ পালন না করে তবে সে ইয়াহুদী হয়ে মরল বা নাসারা হয়ে মরল এই বিষয়ে (আল্লাহর) কোন পরওয়া নেই। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কিতাবে ইরশাদ করেনঃ ( ‏وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً) ‏ ‘‘মানুষের মাঝে যার সেখানে যাবার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য’’। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ হাদিসের মান যঈফ)