হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জের প্রকারভেদ আলোচনা পূর্বে নিম্মের হাদিসগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ি। হাদিসের  আলোকেই হজ্জের শ্রেণীভিবাগ করা হবে।

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

২. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ইয়ামানে আমার গোত্রের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি (হজ্জ-এর সফরে) বাতহা নামক স্থানে অবস্থানকালে আমি (ফিরে এসে) তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ তুমি কোন্‌ প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? আমি বললাম, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইহরামের অনুরূপ আমি ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তিনি বললেনঃ তোমার সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে কি? আমি বললাম, নেই। তিনি আমাকে বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ করতে আদেশ করলেন। আমি বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ার সা’য়ী করলাম। পরে তিনি আদেশ করলে আমি হালাল হয়ে গেলাম। অতঃপর আমি আমার গোত্রীয় এক মহিলার নিকট আসলাম। সে আমার মাথা আঁচড়িয়ে দিল অথবা বলেছেন, আমার মাথা ধুয়ে দিল। এরপর ‘উমর (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে এক উপলক্ষে আসলেন। (আমরা তাঁকে বিষয়টি জানালে) তিনি বললেনঃ কুরআনের নির্দেশ পালন কর। কুরআন তো আমাদেরকে হজ্জ ও ‘উমরাহ পৃথক পৃথকভাবে যথাসময়ে পূর্ণরূপে আদায় করার নির্দেশ দান করে। আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা হজ্জ ও ‘উমরাহ আল্লাহ’র উদ্দেশে পূর্ণ কর” (২:১৯৬)। আর যদি আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে অনুসরণ করি, তিনি তো কুরবানীর পশু যবহ্‌ করার আগে হালাল হননি। (সহিহ বুখারি ১৫৫৯ তাওহীদ)

৩. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে বের হলাম এবং একে হজ্জের সফর বলেই আমরা জানতাম। আমরা যখন (মক্কায়) পৌঁছে বাইতুল্লাহ-এর তাওয়াফ করলাম তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিলেনঃ যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে আসেনি তারা যেন ইহ্‌রাম ছেড়ে দেয়। তাই যিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেননি তিনি ইহ্‌রাম ছেড়ে দেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ তাঁরা ইহ্‌রাম ছেড়ে দিলেন। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি ঋতুবতী হয়েছিলাম বিধায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। (ফিরতি পথে) মুহাসসাব নামক স্থানে রাত যাপনকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই ‘উমরাহ ও হজ্জ উভয়টি সমাধা করে ফিরছে আর আমি কেবল হজ্জ করে ফিরছি। তিনি বললেনঃ আমরা মক্কা পৌঁছলে তুমি কি সে দিনগুলোতে তওয়াফ করনি? আমি বললাম, জ্বীনা। তিনি বললেন, তোমার ভাই-এর সাথে তান্‌’ঈম চলে যাও, সেখান হতে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধবে। অতঃপর অমুক স্থানে তোমার সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ কী বললে! তুমি কি কুরবানীর দিনগুলোতে তাওয়াফ করনি! আমি বললাম, হ্যাঁ করেছি। তিনি বললেনঃ তবে কোন অসুবিধা নেই, তুমি চল। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এমতাবস্থায় আমার সাক্ষাৎ হলো যখন তিনি মক্কা ছেড়ে উপরের দিকে উঠছিলেন, আর আমি মক্কার দিকে অবতরণ করছি। অথবা ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি উঠছি ও তিনি অবতরণ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৬১ তাওহীদ)


৪. মারওয়ান ইবনু হাকাম (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উসমান ও ‘আলী (রাঃ)-কে (উসফান নামক স্থানে) দেখেছি, ‘উসমান (রাঃ) (তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন) হাজ্জ ও ‘উমরাহ একত্রে আদায় করতে নিষেধ করতেন। ‘আলী (রাঃ) এ অবস্থা দেখে হাজ্জ ও উমরার ইহরাম একত্রে বেঁধে তালবিয়া পাঠ করেন (لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ )  হে আল্লাহ! আমি ‘উমরাহ ও হাজ্জ-এর ইহরাম বেঁধে হাযির হলাম। এবং বললেন, কারো কথায় আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাত বর্জন করতে পারব না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৩ তাওহীদ)

৫. নবী সহধর্মিণী হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকদের কী হল, তারা ‘উমরাহ শেষ করে হালাল হয়ে গেল, অথচ আপনি ‘উমরাহ হতে হালাল হচ্ছেন না? তিনি বললেনঃ আমি মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং কুরবানীর জানোয়ারের গলায় মালা ঝুলিয়েছি। কাজেই কুরবানী করার পূর্বে হালাল হতে পারি না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৬. আবূ শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধে হজ্জে তামাত্তু’র নিয়্যতে তারবিয়্যাহ দিবস (আট তারিখ)-এর তিন দিন পূর্বে মক্কায় প্রবেশ করলাম, মক্কাবাসী কিছু লোক আমাকে বললেন, এখন তোমার হজ্জের কাজ মক্কা হতে শুরু হবে। আমি বিষয়টি জানার জন্য ‘আত্বা (রহঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর উট সঙ্গে নিয়ে হজ্জে আসেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সাহাবীগন ইফরাদ হজ্জ-এর নিয়্যাতে শুধু হজ্জের ইহ্‌রাম বাধেঁন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কায় পৌছে) তাদেরকে বললেনঃ বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ সমাধা করে তোমরা ইহ্‌রাম ভঙ্গ করে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট কর। এরপর হালাল অবস্থায় থাক। যখন জিলহজ্জ মাসের আট তারিখ হবে তখন তোমরা হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বেঁধে নিবে, আর যে ইহ্‌রাম বেঁধে এসেছ তা তামাত্তু‘ হজ্জের ‘উমরাহ বানিয়ে নিবে। সাহাবীগন বললেন, এ ইহ্‌রামকে আমরা কিরূপে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বানাব? আমরা হজ্জ-এর নাম নিয়ে ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তখন তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা আদেশ করছি তাই কর। কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে না আসলে তোমাদেরকে যা করতে বলছি, আমিও সেরূপ করতাম। কিন্তু কুরবনী করার পূর্বে (ইহরামের কারনে) নিষিদ্ধ কাজ (আমার জন্য) হালাল নয়। সাহাবীগন সেরূপ পশু যবহ করলেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ্‌ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, আবূ শিহাব (রহঃ) হতে মারফূ’ বর্ণনা মাত্র এই একটিই পাওয়া যায়। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৭. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে ( হজ্জের উদ্দেশ্যে) মদীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা’দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। জিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহ্‌রাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা’বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয। (সহিহ বুখারি ১৫৪৫ তাওহীদ)

৮. জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে আমরা হজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে (মক্কায়) উপনীত হলাম। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নির্দেশ দিলেন, আমরা হজ্জকে ‘উমরাহ’তে পরিণত করলাম।(সহিহ বুখারি ১৫৭০ তাওহীদ)

৯. জাবির ইব্‌নু ‘আব্দুল্লাহর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বাঁধেন, তাঁদের মাঝে কেবল নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল না। ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে আগমন করে, তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি [আলী (রাঃ)] বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছেন, আমি ও সেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণের মধ্যে যাদের নিকট কুরবানীর পশু ছিল না, তাদের ইহ্‌রামকে ‘উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন, তারা যেন তাওয়াফ করে, চুল ছেঁটে অথবা মাথা মুণ্ডিয়ে হালাল হয়ে যায়। তারা বলাবলি করতে লাগলেন, (যদি হালাল হয়ে যাই তা হলে) স্ত্রীর সাথে মিলনের পরপরই আমাদের পক্ষে মিনায় যাওয়াটা কেমন হবে! তা অবগত হয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমি পরে যা জানতে পেরেছি তা যদি আগে জানতে পারতাম, তাহলে কুরবানীর পশু সাথে আনতাম না। আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকলে অবশ্যই ইহ্‌রাম ভঙ্গ করতাম। (হজ্জ এর সফরে) ‘আয়েশা (রাঃ) ঋতুবতী হওয়ার কারণে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ব্যতীত হজ্জ-এর অন্য সকল কাজ সম্পন্ন করে নেন। পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ আদায় করেন, (ফিরার পথে) ‘আয়েশা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়টি আদায় করে ফিরছে, আর আমি কেবল হজ্জ আদায় করে ফিরছি, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদুর রহমান ইব্‌নু আবূ বকর (রাঃ) -কে নির্দেশ দিলেন, যেন ‘আয়েশা (রাঃ) -কে নিয়ে তান’ঈমে চলে যান, সেখানে গিয়ে ‘উমরাহর ইহ্‌রাম বাঁধবেন)। ‘আয়েশা রাঃ হজ্জের পর উমরা আদায় কর নিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫১)

১০. নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ইব্‌নু যুবাইরের খিলাফতকালে খারিজীদের হজ্জ আদায়ের বছর ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হজ্জ পালন করার ইচ্ছা করেন। তখন তাঁকে বলা হল, লোকেদের মাঝে পরস্পর লড়াই সংঘটিত হতে যাচ্ছে, আর তারা আপনাকে বাধা দিতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বললেন, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে উত্তম আদর্শ”- (আল-আহযাবঃ ২১)। কাজেই আমি সেরূপ করব যেরূপ করেছিলেন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, আমি আমার উপর ‘উমরাহ ওয়াজিব করে ফেলেছি। এরপর বায়দার উপকণ্ঠে পৌঁছে তিনি বললেন, হজ্জ এবং ‘উমরাহ’র ব্যাপার তো একই। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, ‘উমরাহ’র সাথে আমি হজ্জকেও একত্রিত করলাম। এরপর তিনি কিলাদা পরিহিত কুরবানীর জানোয়ার নিয়ে চললেন, যেটি তিনি আসার পথে কিনেছিলেন। অতঃপর তিনি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করলেন। তাছাড়া অতিরিক্ত কিছু করেননি এবং সে সব বিষয় হতে হালাল হননি যেসব বিষয় তাঁর উপর হারাম ছিল- কুরবানীর দিন পর্যন্ত। তখন তিনি মাথা মুড়ালেন এবং কুরবানী করলেন। তাঁর মতে প্রথম তাওয়াফ দ্বারা হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে। এ সব করার পর তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপই করেছেন। (১৬৩৯)

       উপরের হাদিসের আলোকে দেখা যায় হজ্জ সম্পাদন করার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি চাল আছে। হাদিসগুলোর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, হজ্জযাত্রী ব্যক্তি মীকাত থেকে শুধু হজ্জে নিয়ত করছে। আবার অনেকে মীকাত থেকে উমরা এবং হজ্জ দুটোরই নিয়ত। যারা হাদি না নিয়ে হজ্জে গমন করেছেন তারা উমরা পর হালাল হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে আবার নতুন কর হজ্জে নিয়ত করে হজ্জ কবছেন। আর যারা হাদি সঙ্গে নিয়ে আসেন, তারা উমরার পর হালাল না হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে একই ইহরানে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে। হাদিসের ভাষ্য মতে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদি নিয়ে হজ্জে আসেন, তাই তিনি হালাল না হয়ে একই ইহরামে হজ্জ সম্পাদন করে কিন্তু তিনি বলেছিলেন হাদি সঙ্গে না থাকলে তিনি হালাল হয়ে যেতেন। সাহবী (রাঃ) আমল থেকে দেখা যায় কেউ উমরার পর হালাল হয়েছেন (উসমান রাদিঃ ও আবূ মূসা আশ’আরী রাদিঃ) আবার কেউ হালাল হন নাই (আলী রাদিঃ)। তাই হাদিসের আলোকে বলা যায় হজ্জ তিন প্রকার। যথাঃ

১। তামাত্তু হজ্জ

২। কিরান হজ্জ

৩। ইফরাদ হজ্জ

ক। তামাত্তু হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধে মক্কায় প্রবেশ করে কিন্তু তাদের সাথে হাদী থাকে না। তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে। অর্থাৎ একই সফরে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। তামাত্তু হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। ৯ জিলহজ্জের পূর্বে যে কোন মুহূর্তে উমরা আদায় করে হালাল হয়ে গিয়ে আবার উকুফে আরাফার পূর্বে নতুন করে হজ্জের ইহরাম বাঁধা। এরপর ধারাবাহিকভাবে হজ্জের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা। হজ্জের নিমিত্তে যারা মক্কার বাহির থেকে আসেন এবং আসার সময় হাদী সঙ্গে নিয়ে আসে না, তাদের জন্য তামাত্তু হজ্জই উত্তম।  কারও কারও মতে সর্বাবস্থায় তামাত্তু হজ্জ উত্তম।

দলিলঃ আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

তামাত্তু হজ্জ দুটি পদ্ধতিতে আদায় করা যায়ঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জের সময় আরম্ভ হতে যদি বেশী দেরী থাকে তবে এর ফাঁকে, হজ্জের পূর্বেই মদিনায় গিয়ে জিয়ারত করে আসা। পরে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে আবার উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

যারা সরাসরি মদিনা গমন করবে, তারাও এই পদ্ধতিতে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাবে এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

খ। কিরান হজ্জঃ

সাধারণ যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন, তারা একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন। এই ভাবে একই ইহরামে ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করা কে কিরান হজ্জ বলে। আমরা জানি তামাত্তু হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং পরে ইহরাম বেধে হজ্জ করে। কিন্তু কিরান হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা কিন্তু হালাল হবে না। অর্থাৎ ইহরাম ত্যাগ করবে না। এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করবে। কিরান হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। তবে হজ্জ শুরুর ২/৪ দিন আগে আসলে এই কিরান করা সম্ভব। শাওয়ার মাসে কিরান হজ্জের নিয়তে মক্কা এসে এক দেড় মাস ইহরামে থাকে খু্বই কষ্ট কর। তাছাড়া এখন মক্কার বাজারে হাদি পাওয়া খুবই সহজ্জ লভ্য তাই হাদি সঙ্গে না এসে হজ্জে তামাত্তু করাই ভাল।

যদিও রাসুল সাঃ কিরান হজ্জ করেছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জের জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি উমরার পর মাত্র কয়েক দিন মক্কায় ইহরাম অবস্থায় ছিলেন।

কেরন হজ্জের দুটি পদ্ধতিঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে একত্রে হজ্জ ও উমরা উভয়টার নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। মক্কায় পৌঁছে প্রথমে উমরা আদায় করা ও ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। হজ্জের সময় হলে এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা। পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর উমরার তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে হজ্জের নিয়ত উমরার সাথে যুক্ত করে নেয়া। উমরার তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে, এহরাম অবস্থায় হজ্জের অপেক্ষায় থাকা ও ৮ জিলহজ্জ একই এহরামে মিনায় গমন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পাদন করা।

গ। ইফরাদ হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের সফলে উমরা করার সময় সুযোগ পান না, তারা ইফরাদ হজ্জ করেন। অর্থাৎ হজ্জের মাসগুলোয় উমরা না করে শুধু হজ্জ করাকে ইফরাদ হজ্জ বলে। এ ক্ষেত্রে মীকাত থেকে শুধু হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হয়। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম (আগমনি তাওয়াফ) করা। ইচ্ছা হলে এ তাওয়াফের পর সাঈও করা যায়। সে ক্ষেত্রে হজ্জের ফরজ তাওয়াফের পর আর সাঈ করতে হবে না। তাওয়াফে কুদুমের পর ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। ৮ জিলহজ্জ একই ইহরামে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে মিনার দিকে রওয়ানা হওয়া। ইফরাদ হজ্জকারীকে হাদী জবেহ করতে হয় না। তাই ১০ জিলহজ্জ কঙ্কর নিক্ষেপের পর মাথা মুন্ডন করে ইফরাদ হজ্জকারী প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যেতে পারে।

এই তিন প্রকারের মধ্যে কোন প্রকার হজ্জ আদায় করা উত্তমঃ

প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি। হাদিস পড়েই আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোন প্রকারের হজ্জ উত্তম।

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫)

২. আবূ জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে তামাত্তু‘ হাজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে তা আদায় করতে আদেশ দিলেন। এরপর আমি তাঁকে কুরবানী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তামাত্তু‘র কুরবানী হলো একটি উট, গরু বা বকরী অথবা এক কুরবানীর পশুর মধ্যে শরীকানা এক অংশ। আবূ জামরাহ (রহ.) বলেন, লোকেরা তামাত্তু‘ হাজ্জকে যেন অপছন্দ করত। একদা আমি ঘুমালাম তখন দেখলাম, একটি লোক যেন (আমাকে লক্ষ্য করে) ঘোষণা দিচ্ছে, উত্তম হাজ্জ এবং মাকবূল তামাত্তু‘। এরপর আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে বললেন, এটাই তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। আদম, ওয়াহাব ইবনু জারীর এবং গুনদার (রহ.) শু‘বাহ্ (রহ.) হতে মাকবূল ‘উমরাহ এবং উত্তম হাজ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৮)

মন্তব্যঃ এইদুটি সহিহ হাদিসের আলোকে ষ্পষ্টভাবে বুঝা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরান হজ্জ আদায় করে ছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জেই উত্তম বলেছেন। যদি তিনি আল্লাহ তরফ থেকে আগেই জানতে পারতেন তবে তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন।

উমরার ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

উমরার ফরজ তিনটি।উমরার ওয়াজিব তিনটি
১. ইহরাম বাঁধা। ২. তাওয়াফ করা ৩. সাঈ করা।  ১. ইহরামের কাপড় পরে উমরার নিয়ত করার কাজটি মীকাত পার হওয়ার আগেই করা। ২. ‘সাফা ও মারওয়া’ এ দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করা। কিছু আলেম একে রুকন অর্থাৎ ফরয বলেছেন। ৩. চুল কাটা (মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা)।

হজ্জের ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

হজ্জের ফরজ তিনটি।হজ্জের ওয়াজিব নয়টি
১. ইহরাম বাঁধা
২. আরাফাতে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে ইফাদা  
১. সাঈ করা। (অনেকের মতে এটা হজ্জের ফরজ আমল)
২. মীকত থেকে ইহরাম বাঁধা
৩. আরাফাতে অবস্থান সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।
৪. মুযদালিফায় রাত্রি যাপন।
৫. মুযদালিফার পর কমপক্ষে দুই রাত্রি মিনায় যাপন করা।
৬. কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
৭. হাদী (পশু) জবাই করা (তামাত্তু ও কিরান হাজীদের জন্য।)
৮. চুল কাটা।
৯. বিদায়ী তাওয়াফ।

এক নজরে তিন প্রকার হজ্জের ধারাবাহিক আমলগুলোঃ

তামাত্তু হজ্জের ধারাবাহিক আমলকিরান হজ্জের ধারাবাহিক আমলইফরাত হজ্জের ধারাবাহিক আমল
১। উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা (মক্কায় পৌছার পরই)
৩। উমরার সাঈ করা ৪। উমরার জন্য মাথা মুন্ডানো (এর মাধ্যমে সে হালাল হলো) ৫। হজ্জের জন্য ইহরাম বাধা (৮ তারিখ মক্কায়) ৬। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৭। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ যে কোন দিন) ৮। হজ্জের সায়ী
৯। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
১০। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
১১। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১২।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৩। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৪। ১২ জিলহজ্জ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৫। বিদায়ী তাওয়াফ করা এর মাঝেঃ  
১। হজ্জ ও উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা  (মক্কায় পৌছার পরই) ৩। উমরার সাঈ করা ৪। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৫। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ একবার) ৬। হজ্জের সায়ী
৭। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
৮। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
৯। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১০।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১১। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১২। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৩। বিদায়ী তাওয়াফ করা  
১। শুধু হজ্জ ইহরাম বাধা ২। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৩। বড় জামারাতে ৭টি পাথর (মারা ১০ জিলহজ্জ সকালে) ৩। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা ৫। হজ্জের সায়ী
৬। মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ৭।  ১১ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৮। ১২ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৯। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১০। বিদায়ী তাওয়াফ করা  

এক নজরে তারিখ অনুসারে হজ্জের ধারাবাহিক কাজগুলোঃ

তারিখস্থানকরনীয় ইবাদত
৮ই জিলহজ্জ  এবং এর আগে যারা বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশ করবেন)মীকাত১) মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধবেন।
মক্কা২) কাবা ঘরে উমরার তাওয়াফ করবেন। ৩) সাঈ করবেন। ৪) চুল কেটে হালাল হয়ে যাবেন।
৮ই জিলহজ্জনিজ বাসস্থান  এবং মিনানিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বেঁধে হজ্জের নিয়ত করে সূর্যোদয়ের পর মিনায় রওয়ানা হবেন। সেখানে যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের সালাত আদায় করবেন।
৯ জিলহজ্জআরাফা ময়দান১) সূর্যোদয়ের পর মিনা অথবা নিজ বাসস্থান থেকে আরাফাতে রওয়ানা হবেন। ২) যুহরের প্রথম ওয়াক্তে যুহর ও আসর পড়বেন একত্রে পরপর দুই দুই রাকআত করে। ৩) আরাফায় দোয়া, দুরুদ ও জিকির করে সময় পার করতে হবে। ৪) সূর্যাস্ত পর্যান্ত অবস্থান করতে হবে। সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করলে হজ্জ শুদ্ধ হবে না।
১০ জিলহজ্জ (৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর)মুজদালীফা১) সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা করবেন। মুযদালিফার পৌছে মাগরিব এশা জমা করে একত্রে পড়বেন। ২) সেখানে রাত্রি যাপন করে প্রথম ওয়াক্তে অন্ধকার থাকতেই ফজর পড়বেন। ৩) আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত কেবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া ও মোনাজাতে মশগুল থাকবেন। ৪) বড় জামারায় নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর এখান থেকে কুড়াতে পারেন।
১০ ই জিলহজ্জমিনা১) বড় জামরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) কুরবানী করবেন, সমস্যা হলে পরে করা যাবে। ৩) চুল কাটাবেন। (কুরবানি না হলে চুল কাটা যাবে না)। ৪) চুল কাটার পর ইহরামের কাপড় বদলিয়ে হালাল হতে হবে।
মক্কা১) তাওয়াফে ইফাদা করবেন। এই দিন না পারলে এটি ১১ বা ১২ তারিখেও করতে পারবেন। ২। তাওয়াফের পর সাথে সাথে সাঈও করবেন।
১১ জিলহজ্জ (আইয়ামে তাশরীকের প্রথম দিন)মিনা১) দুপুরের পর সিরিয়াল ঠিক রেখে প্রথমে ছোট, মধ্যম ও এর পরে বড় জামরায় প্রত্যেকটিতে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) মিনায় রাত্রি যাপন করবেন।
১২ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের দ্বিতীয় দিন)মিনা১) পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী ৩টি জামরায় ৭+৭+৭=২১টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। দুপুরের আগে কংকর নিক্ষেপ করবেন না। ২) সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করবেন। তা না পারলে আজ দিবাগত রাতও মিনায় কাটাবেন।
১৩ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের তৃতীয় দিন)মিনা১) যারা গত রাত মিনায় কাটিয়েছেন তারা আজ দুপুরের পর পূর্ব দিনের নিয়মেই ৭টি করে মোট ২১ টি কংকর মারবেন। অতঃপর মিনা ত্যাগ করবেন।
১৪ জিলহজ্জ বা তার পরের যে কোন দিনমক্কাদেশে ফেরার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।

বদলী হজ্জঃ

যদি কোন ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরজ এবং উমরা ওয়াজিব হয় কিন্তু ওজরের কারনে তার পক্ষে সশরীরে তা আদায় করা সম্বব নয়। এই ক্ষেত্রে, তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে অন্য কোন ব্যক্তিকে দিয়ে হজ্জ বা উমরা আদায় করা কে বদলী হজ্জ বা বদলী উমরা বলে। বেশ কিছু সহিহ হাদিস দ্বারা বদলী হজ্জ ও বদলী উমরার বিধান প্রমাণিত হয়। নীচে হাদিসগুলো উল্লেখ করা হল।

১. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ফযল ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) একই বাহনে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে আরোহণ করেছিলেন। এরপর খাশ‘আম গোত্রের জনৈক মহিলা উপস্থিত হল। তখন ফযল (রাঃ) সেই মহিলার দিকে তাকাতে থাকে এবং মহিলাটিও তার দিকে তাকাতে থাকে। আর আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফযলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে থাকে। মহিলাটি বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আল্লাহ্‌র বান্দার উপর ফরজকৃত হজ্জ আমার বয়োঃবৃদ্ধ পিতার উপর ফরজ হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ্জ আদায় করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (আদায় কর)। ঘটনাটি বিদায় হজ্জের সময়ের। (সহিহ বুখারী ১৫১৩ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬৪৩ ইফাঃ, আবু দাউদ ১৮০৯)

মন্তব্যঃ পুরুষের পক্ষ থেকে নারী হজ্জ আদায় করতে পারে।

২. আবু রুযাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন বয়োবৃদ্ধ লোক, হজ্জ ও উমরাহ করার ক্ষমতা তার নেই এবং বাহনে আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, বিদায় হজ্জের বছর খাস‘আম গোত্রের একজন মহিলা এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর তরফ হতে বান্দার উপর যে হাজ্জ ফরজ হয়েছে তা আমার বৃদ্ধ পিতার উপর এমন সময় ফরজ হয়েছে যখন তিনি সওয়ারীর উপর ঠিকভাবে বসে থাকতে সক্ষম নন। আমি তার পক্ষ হতে হাজ্জ আদায় করলে তার হাজ্জ আদায় হবে কি? তিনি বললেনঃ হাঁ (নিশ্চয়ই আদায় হবে)। (সহিহ বুখারি ১৮৫৪)

কার জন্য বদলী হজ্জ করান ওয়াজিবঃ

যে ব্যক্তি অতি বার্ধক্যে উপনীত অথবা যার সুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন রোগের কারণে হজ্জ-উমরা আদায়ে অক্ষম এ অবস্থায় যদি সে আর্থিকভাবে সক্ষম হয় তবে তার ওপর হজ্জ ফরয হবে না। কেননা হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত তার উপর আরোপিত হয় নাই। হজ্জ ফরজের অন্যতম শর্ত হলো, সফরের আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। অপর পক্ষে কোন ব্যক্তি যদি বর্তমানে শারীরিকভাবে অক্ষম কিন্তু অক্ষম  হওয়ার আগেই তার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছিল। অর্থাৎ সে শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম ছিল। তার কর্তব্য হল, তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়ের জন্য একজনকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা। এমনকি যার ওপর হজ্জ ফরয সে যদি হজ্জ না করেই মারা যায় আর তার সম্পদ থাকে, তাহলে তার সে সম্পদ থেকে হজ্জের খরচ পরিমাণ অর্থ নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে তার বদলী হজ্জ আদায় করাতে হবে।

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য।(সহিহ বুখারি ১৮৫২, ৬৬৯৯, ৭৩১৫, নাসাঈ ২৬৩৩)

বদলী হজ্জের পূর্বে নিজের হজ্জ করা জরুরীঃ

বিশুদ্ধ মতানুসারে হজ্জ ও উমরার প্রতিনিধি হওয়ার আগে তার নিজের হজ্জ করা জরুরী। তবে ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, বদলী হজ্জ করার জন্য তার পূর্বে হজ্জ করা জরুরী নয়। তবে যিনি পূর্বে হজ্জ করেছেন তাকে দিয়ে বদলী হজ্জ করানো উত্তম।

এর বিপরীতে মুজতাহীদ আলেমগন মনে করেন যে, যারা নিজের ফরজ হজ্জ করেন নাই, তাদের জন্য অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করা যাবে না। কোন মুসলিম যদি অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করতে চায় তাহলে আগে তাকে নিজের হজ্জ করতে হবে। এই কথার দলিল হলোঃ

দলিলঃ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেন, ‘‘লাব্বায়েক আন্ শুবরুমা’’ (আমি শুবরুমার পক্ষে হাযির)। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ শুবরুমা কে? সে ব্যক্তি বলে, আমার ভাই অথবা আমার বন্ধু। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ আচ্ছা তুমি কি হজ্জ করেছ? সে বলে, না। তিনি বলেনঃ প্রথমে তুমি নিজের হজ্জ আদায় কর, পরে শুবরুমার হজ্জ সম্পন্ন কর। (সুনানে আবু দাউদ ১৮১১ ইফাঃ)

বদলী হজ্জ প্রকারণঃ

উপরে আলোচিত তিন প্রকার হজের মধ্যে বদলী হজ্জ কোন্ প্রকারের হবে, তা যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করা হচ্ছে তিনি নির্ধারণ করে দেবেন। যদি ইফরাদ করতে বলেন, তাহলে ইফরাদ করতে হবে। যদি কিরান করতে বলেন, তাহলে কিরান করতে হবে। আর যদি তামাত্তু করতে বলেন, তাহলে তামাত্তু করতে হবে। এর অন্যথা করা যাবে না। মনে রাখবেন, বদলী হজ্জ ইফরাদই হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে বলেছিলেন,

তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

এই হাদীসে হজ্জ ও উমরা উভয়টার কথাই আছে। এতে প্রমাণিত হয়, বদলী হজ্জকারী তামাত্তু ও কিরান হজ্জ করতে পারবে। বদলি হজ্জকারী ইফরাদ ভিন্ন অন্য কোনো হজ্জ করলে তার হজ্জ হবে না, হাদিসে এমন কোনো বাধ্য বাধকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘হজ্জ’ শব্দ উচ্চারণ করলে শুধুই ইফরাদ বোঝাবে, এর পেছনেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। বদলি-হজ্জ কেবলই ইফরাদ হজ্জ হতে হবে, ফেকাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবেও এ কথা লেখা নেই। ফেকাহশাস্ত্রের কিতাবে যা লেখা আছে, তা হল, বদলি-হজ্জ যার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে তিনি যে ধরনের নির্দেশ দেবেন সে ধরনের হজ্জই করতে হবে। সার কথা হল, যিনি হজ্জ করাবেন তিনি ইফরাদ বা তামাত্ত যে হজ্জ আদায়ের কথা বলবেন, সেই হজ্জই আদায় করা উত্তম।  (হজ্জ উমরা ও যিয়ারতের গাইড, ইসলাম হাউজ.কম)

বদলী হজ্জ সম্পর্কে কয়েকটি মাসায়েলঃ

ক। বদলী হজে প্রেরণকারীর উচিত একজন সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে তার পক্ষে হজ্জ করতে পাঠানো, যিনি হজ্জ-উমরার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত এবং যার অন্তরে রয়েছে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়।

খ। বদলী হজ্জকারির কর্তব্য আপন নিয়ত পরিশুদ্ধ করা। তার নিয়ত হবে, আমি মুসলিম ভাই বা আত্মীয় হিসাবে মৃত ব্যক্তিকে তার হজ্জের দায় থেকে মুক্ত করতে যাই। এর মাধ্যমে হয়ত তিনি আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে তার উপকার করতে।

গ। যতটুকু অর্থ খরচ হবে তাই গ্রহণ করবে। অবশিষ্টগুলো ফেরত দেবে।

ঘ। যে ব্যক্তি হজ্জ করতে এবং হজের নিদর্শনাবলি দেখতে ভালোবাসে অথচ সে হজের খরচ যোগাতে অক্ষম। অতএব সে তার প্রয়োজন পরিমাণ অর্থ নেবে এবং তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে হজের ফরয আদায় করবে। বদলী হজ্জকারী হজের জন্য টাকা নেবে কিন্তু টাকার জন্য হজে যাবে না। আশা করা যায়, এ ব্যক্তি বিশাল নেকির অধিকারী হবে এবং তাকে প্রেরণকারীর মতো সেও পূর্ণ হজের সওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মানতের হজ্জ আদায়ঃ

যাদের উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং হজ্ব আদায়ের সক্ষমতাও ছিল, কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করেনি। অতপর হজ্ব আদায়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, এমন ব্যক্তি পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানো যায়। কোন ব্যক্তির হজ্জ ফরজ কিন্তু তিনি হজ্জ আদায়ের পূর্বেই মৃত্যু বরণ করেছেন বা কোন ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানোর অসিয়ত করে গিয়েছেন তার পক্ষ থেকেও বদলী হজ্জ করার যাবে।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য। (সহিহ বুখারী ১৮৫২ তাওহীদ, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৪)

২. মূসা ইবন সালামা হুযালী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সিনান ইবন সালামা জুহানী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাকে বললেন, যেন তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেন যে, তার মাতা হজ্জ না করেই ইনতিকাল করেছেন। তার মাতার পক্ষ থেকে সে হজ্জ করলে তা যথেষ্ট হবে কি ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, যদি তার কোন দেনা থাকতো আর তার পক্ষ হতে সে আদায় করতো, তা হলে কি তার মাতার পক্ষ থেকে তা আদায় হতো না। অতএব সে যেন তার মাতার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৫)

৩. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর পিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করল যে, তিনি হজ্জ না করে ইনতিকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩৬)

৪. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, খাছ’আম গোত্রের একজন মহিলা মুযদালফায় সকালে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পিতার অতি বৃদ্ধাবস্থায় তার উপর হজ্জ ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, এমতাবস্থায় আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৭)

৫. আবু রাযীন উকায়লী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি, হজ্জ ও উমরাহ করার মত ক্ষমতা নেই এবং আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ এবং উমরাহ আদায় কর।সুনানে নাসাঈ ২৬৩৯)

এই সফরে বার বার উমরা করাঃ

এক সফরে একাধিক বার উমরা করা ইসলামি শরীয়ত সম্মত কোন ইবাদাত নয়। কারন এই উমরা আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। সময় সুযোগ থাকার সত্বেও আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) এমন আমল করেন নাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে মোট চারবার উমরা পালন করেছেন। তারার উমরাগুলো হলোঃ

হুদাইবিয়ার উমরা, উমরাতুল কাযা, হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় এবং শেষ উমরাটি করের বিদায় হজের সাথে। সাহাবীদের (রাঃ) কেউ বিদায় হজ্জের সফরে এক বারের বেশি উমরা করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ‘উমরাহ পালন করেছেন। তিনি হাজ্জের সঙ্গে যে ‘উমরাটি পালন করেন সেটি ব্যতীত সবকটিই যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর পরের বছরের ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে এবং হুনাইনের প্রাপ্ত গানীমাত যে জিঈরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখানের ‘উমরাটিও ছিল যুলকাদাহ্ মাসে, আর তিনি হাজ্জের সঙ্গে একটি ‘উমরাহ্ পালন করেন। (সহিহ বুখারি ৪১৪৮ তাওহীদ প্রকাশনি)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত বার উমরা করেছেন, তিনি মক্কার বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা করেছেন। কিন্তু মক্কায় প্রবেশের পর মক্কা থেকে বের হয়ে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে, তিনি কখনো উমরা করেন নি। এমনকি হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরো বছর মক্কায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি কখনো মক্বার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে উমরা করেন নি।

হজ্জের সময় দেখা যায় অনেক হাজিগন মক্কার বাইরে তান‘ঈম গিয়ে মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে থাকে। যারা মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে তাদের যুক্তি বিদায় হজ্জের সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তান‘ঈম থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা পালন করেছেন। তাই তারা এই স্থান থেকে ইহবাম বেধে বার বার উমরা করে থাকে।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫ তাওহীদ প্রকাশনি)

মন্তব্যঃ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর উপরা পালনের সাহ্যয্য করেত তার সাথে ছিল তার ভাই আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। সময় সুযোগ সব কিছু থাকা সত্বেও তিনি তার বোন আয়েশার সাথ উমরা করেন নাই। বরং আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু যদি তার বোন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর সাথে উমরা করতে তবে তার আরও বেশী সাহায্য হত। এই থেকে বুঝ যায়, তান‘ঈম থেকে উমরা করার প্রচলনটি ছিল বিশেষ একটি প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। অন্যথায় হজের সফরে বা একই সফরে বার বার উমরা করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত নয়।

সাহাবীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা একবার উমরা আদায় করার পর তাদের মাথার চুল কালো না হওয়া পর্যন্ত পূণরায় উমরা পালন করতেন না। চুল কালো হওয়ার পর উমরা করতেন।

সুন্নাত হচ্ছে হাজীগণ হজের সময় উমরা শেষ করে, হালাল অবস্থায় মক্কা অবস্থান করবেন। আর যারা হাদি সংঙ্গে নিয়েছেন তারা হালাল হবেন না। তাই হজ্জের সফরে একাধিক বার উমরা না করে, বার বার কারা ঘর তাওয়াফ করাই হল অধিক উত্তম। তবে যখন উমরাকারীদের খুব ভীড় থাকবে তখন বেশি বেশি তাওয়াফ না করে বেশি বেশি সালাত, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরে ব্যস্ত থাকা। তাওয়াফ শেষে মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, মুরব্বীদের জন্য দো‘আ করুন। কারো নামে উমরা করা বা কারো জন্য উমরা করা ইত্যাদি পরিহার করুন। আপনি কত বেশি আমল করলেন, এটি আল্লাহর নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আপনি কতটুক আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করলেন।

হজ্জের মীকাত

হজ্জের মীকাত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মীকাত :

হজ্জ বা উমরার নিয়তে মক্কার কাবা ঘরের উদ্যশ্যে গমনকারীদেরকে কাবা হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয় যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই স্থানগুলোকে মীকাত বলা হয়। হারাম শরীফের চর্তুদিকেই মীকাত রয়েছে। হজ্জের সময় নির্দষ্ট দিন ক্ষন থাকলেও উমরা জন্য কোন নির্দিষ্ট দিন ক্ষন নাই। তাই সময়ের হিসাবে ও হজ্জের সময়ের মীকার আছে। এই হিসাবে মীকাত দুই প্রকার। যথাঃ 

১। সময়ের মীকাত

২। স্থানের মীকাত

সময়ের মীকাত :

হজ্জের জন্য সময় নির্দিষ্ট করা আছে। মহান আল্লাহই হজ্জের তারিখ নির্দষ্ট করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُوْلِي الأَلْبَابِ

অর্থঃ হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الأهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ

“নতুন চাঁদ সম্পর্কে লোকেরা আপনাকে প্রশ্ন করে, বলুন, তা মানুষ এবং হজ্জের জন্য সময় নির্দেশক।

(সুরা বাকারাঃ ২:১৮৯)।

১. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়। কিরমান ও খুরাসান হতে ইহ্‌রাম বেঁধে বের হওয়া ‘উসমান (রাঃ) অপছন্দ করেন।

২. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারবিয়ার দিন (৮ যিলহজ্জ) মিনায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামায পড়েন, অতঃপর ভোরবেলা আরাফাতে রওয়ানা হন। (ইবনে মাজাহ ৩০০৪, তিরমিজি ৮৮০ ইফাঃ)

হজ্জের সময়ের মীকাত দুই মাস দশ দিন। সময়ের মীকাত হল শাওয়াল মাস থেকে যিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত এ সময়গুলোকে হজ্জের মাস বলা হয়। অপরদিকে উমরা জন্য কোন সময় নির্দিষ্ট নেই। বছরের যে কোন সময় উমরার নিয়ত করা যাবে, শুধু জিলহজ্জের ৮ থেকে ১৩ পর্যান্ত যে কয় দিন হজ্জের কার্যক্রম চলে এই কয় দিন বাদ দিতে হবে।

১. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়।

২. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলেনঃ যদি কেউ হজ্জের মাসে অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকা’দা, যিলহজ্জ মাসে হজ্জের পূর্বে উমরা আদায় করিয়া মক্কায় এতদিন অবস্থান করে, যতদিনে সে হজ্জই আদায় করিতে পারে, তাহার এই হজ্জ তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাহার উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। যদি কুরবানী করার সামর্থ্য তাহার না থাকে তবে মক্কায় অবস্থানকালে তিনদিন এবং বাড়ি ফিরিয়া আর সাতদিন তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ উক্ত হুকুম তখনই প্রযোজ্য হইবে যখন উমরা সমাপন করিয়া হজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত থাকিবে এবং হজ্জও করিবে।

৩. মালিক (রহঃ) বলেনঃ মক্কার বাসিন্দা কোন ব্যক্তি অন্য কোথাও গিয়া বসতি স্থাপন করিল। হজ্জের মাসে সে উমরা করিতে আসিয়া মক্কায় অবস্থান করিয়া হজ্জ সমাধা করিল। তাহার এই হজ্জ হজ্জে তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে। এই ব্যক্তির উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। কুরবানী করিতে না পারিলে তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মক্কার অপরাপর স্থায়ী বাসিন্দার মত তাহার হুকুম হইবে না। (মুয়াত্তা মালিক ৭৬০, হজ্জ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৯, রেওয়াত ৬৫ ইফাঃ)

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজের মাসসমূহ ছাড়া অন্য মাসে উমরা পালনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি রমাজান মাসে হজ্জ করার ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

৫. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সঙ্গে হাজ্জ করতে তোমার বাধা কিসের? ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) মহিলার নাম বলেছিলেন কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। মহিলা বলল, আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল। কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (অর্থাৎ মহিলার স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আচ্ছা, রমাযান এলে তখন ‘উমরাহ করে নিও। কেননা, রমযানের একটি ‘উমরাহ একটি হাজ্জের সমতুল্য। অথবা এরূপ কোন কথা তিনি বলেছিলেন। (সহিহ বুখারী ১৭৮২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ হজ্জের মাস শুরু হওয়ার আগে হজ্জের ইহরাম সহীহ নয়। আল্লাহ তা‘আলা হজের মাসসমূহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই হজ্জের মাস শুরু হওয়ার আগে (শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের আগে) হজ্জের ইহরাম বাঁধা বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সঠিক নয়। অর্থাৎ শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের আগে ইহরাম বাধলে তান উমরার ইহরাম হিসেবে গণ্য হবে। ঠিক তেমনিভাবে হজ্জের কোন আমল উযর ছাড়া যিলহজ্জ মাসের পরে পালন করা জায়েয নয়। তবে নিফাসবতী মহিলা যিলহজ্জ মাসে পবিত্র না হলে তিনি ফরয তাওয়াফ যিলহজ্জ মাসের পরে আদায় করতে পারবেন।

স্থানের মীকাত :

পূর্বেই বলেছি, হজ্জের উদ্দেশ্য মক্কা (বাইতুল্লহ) গমনকারীদেরকে বাইতুল্লাহ হতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বে থেকে ইহরাম বাঁধতে হয়, যে স্থানগুলো নবীজির হাদীস দ্বারা নির্ধারিত তাকে স্থানের মীকাত বলে।

মিকাত সম্পর্কিত নিম্মের হাদিসগুলো লক্ষ করি।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহ্‌রাম বাঁধার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহফা, নজদবাসীদের জন্য কারনুল-মানাযিল, ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম। উল্লেখিত স্থানসমূহ হাজ্জ (হজ্জ) ও ‘উমরার নিয়্যাতকারী সেই অঞ্চলের অধিবাসী এবং ঐ সীমারেখা দিয়ে অতিক্রমকারী অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান এবং মীকাতের ভিতরে স্থানের লোকেরা নিজ বাড়ি থেকে ইহ্‌রাম বাঁধবে। এমনকি মক্কাবাসীগণ মক্কা থেকেই ইহ্‌রাম বাঁধবে। (সহিহ বুখারী ১৪৩৬ ইফাঃ, ১৫৩০ তাওহীদ সুনানে নাসাঈ ২৬৬০))

২. আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনাবাসীরা ইহরাম বাঁধবে যুলহুলাইফ থেকে, আর সিরিয়াবাসীগণ জুহফা নামক স্থান থেকে, নজদবাসীগণ কারন’ নামক স্থান হতে। আমর নিকট বর্ণনা পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আর ইয়ামানবাসীগণ তালবিয়া পাঠ করবে ইয়ালামালাম থেকে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৫৩)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের জন্য ‘যুল হুলায়াফা’ কে মীকাত নির্ধারণ করেছেন এবং সিরিয়া ও মিশরবাসীদের জন্য ‘জুহফা’, ইরাকীদের জন্য ‘যাতি ইরক’-কে আর ইয়ামানবাসীদের জন্য ‘ইয়ালামালাম’ কে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৫৫)

৪. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ শহর দু’টি (কূফা ও বসরা) বিজিত হল, তখন সে স্থানের লোকগন ‘উমর (রাঃ) এর নিকট এসে নিবেদন করল, হে আমীরুল মু’মিনীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসীগণের জন্য (মীকাত হিসাবে) সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন কারন, কিন্তু তা আমাদের পথ থেকে দূরে। কাজেই আমরা কারন-সীমায় অতিক্রম করতে চাইলে তা হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ‘উমর (রাঃ) বললেন, তা’ হলে তোমরা লক্ষ্য কর তোমাদের পথে কারন-এর সম দূরত্ব-রেখা কোন স্থানটি? তারপর তিনি যাতু’ইরক মীকাতরূপে নির্ধারণ করেছেন। (সহিহ বুখারী ১৪৪০ ইফাঃ)

৫. আবদুল্লাহ ‘ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, যখন এ শহর দু’টি (কূফা ও বস্‌রা) বিজিত হলো, তখন সে স্থানের লোকগণ ‘উমর (রাঃ) এর নিকট এসে নিবেদন করলো, হে আমীরুল মু’মিনীন ! আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাজদবাসীগণের জন্য (মীকাত হিসেবে) সীমা নির্ধারন করে দিয়েছেন ক্বারণ, কিন্তু তা আমাদের পথ হতে দূরে। কাজেই আমরা ক্বারণ-সীমা অতিক্রম করতে চাইলে তা হবে আমদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ‘উমর (রাঃ) বললেন, তা হলে তোমরা লক্ষ্য কর তোমাদের পথে ক্বারণ-এর সম-দূরত্বরেখা কোন স্থানটি? অতঃপর “যাতু ইরক্ব” মীকাতরূপে নির্ধারন করেছেন। (সহিহ বুখারী ১৫৩১ তাওহীদ প্রকাশনী)

৬. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরাকবাসীদের জন্য ‘যাতু ইরক’ কে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (আবু দাউদ ১৭৩৯ ইফাঃ)

উপরের হাদিসগুলো ষ্পষ্টভাবে মীকাতের স্থানগুলোর নাম উল্লেখ করছেন। হাদিসসমূহে উল্লেখ থাকার কারনে হজ্জের মীকাত নিয়ে মুসলিমদের মাঝে কোন প্রকার মতভেদ নাই। হাদিসগুলির আলোকে যে কেউ তার মীকাত সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরাও হাদিসেগুলোর আলোকে বলেত পারি সব মিলিয়ে মীকাতের স্থানগুলো নিম্মরুপঃ

১। মদ্বীনাবাসীদের জন্য যুল হুলাইফা

২। সিরিয়াবাসীদের জন্য আল-জুহফা

৩। নজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল

৪। ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম

৫। ইরাকবাসীদের জন্য যাতুইরক

৬। মীকাতে অবস্থানকারীগণ নিজ বাড়ি

৭। মক্কাবাসীদের মীকাত মক্কা

মন্তব্যঃ মক্কাবাসি বাদে পৃথিবীর সকল মুসলিদের জন্য মীকত পাঁচটি। এই জন্য অনেকে মীকাতের স্থান পাঁচ হিসাবে উল্লেখ করে থাকে। আমি এখানে বুঝার জন্য সাতটি উল্লেখ করছি।

ক। যুল-হুলাইফাঃ

যুলহুলাইফা স্থানটি এখন ‘আবইয়ারে আলী’ নামে পরিচিত। এটি মসজিদে নববী থেকে ১৩ কিলোমিটার এবং মক্কা শহর থেকে ৪২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মদ্বীনাবাসী এবং এ পথ দিয়ে যারা আসে তারা এখান থেকে ইহরাম বাধবে। মক্কা শহর থেকে এটাই সবচেয়ে দূরতম মীকাত।

খ। আলজুহফাঃ

আলজুহফা স্থানটি লোহিত সাগর থেকে ১০ কিলোমিটার ভিতরে ‘রাবেগ’ শহরের কাছে। জুহফাতে চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ‘রাবেগ’ নামক স্থান থেকে এখন লোকেরা ইহরাম পরে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এখন এটি একটি বড় শহর। জম্মুম উপত্যকার পথ ধরে মক্কা শহর থেকে এ স্থানটি ১৮৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যেসব দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম পরিধান করে তা হলঃ

(ক) সিরিয়া, (খ) লেবানন, (গ) জর্দান, (ঘ) ফিলিস্তীন, (ঙ) মিশর, (চ) সূদান, (ছ) মরক্কো, (জ) আফ্রীকার দেশসমূহ (ঝ) সৌদী আরবের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু এলাকা এবং (ঞ) মদ্বীনার পথ ধরে যারা আসে না তারাও এখান থেকে ইহরাম বাঁধে।

গ। কারনুল মানাযিলঃ

কারনুল মানাযিল স্থানটি এখন “সাইলুল কাবীর” নামে প্রসিদ্ধ। সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতসহ এটি এখন একটা বড় গ্রাম। মক্কা থেকে এর দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। যেসব এলাকা ও দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম বাঁধে সেগুলো হলঃ (ক) রিয়াদ, দাম্মাম ও তায়েফ (খ) কাতার (গ) কুয়েত (ঘ) আরব আমীরাত (ঙ) বাহরাইন (চ) ওমান (ছ) ইরাক, (জ) ইরানসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং এ পথ দিয়ে যারা আসে।

ঘ। ওয়াদী মুহরিমঃ

এই স্থানটি তায়েফ-মক্কা রোডে ‘হাদা’ এলাকা হয়ে মক্কা শরীফ গমনের পথে মক্কা থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটা নতুন কোন মীকাত নয়, এটি কারনুল মানাযিলেরই অংশ বিশেষ। অর্থাৎ কারনুল মানাযিলের অনর্ভুক্ত “ওয়াদী মুহরিম” আরেকটি স্থান থেকে লোকেরা ইহরাম বাঁধে।

ঙ। ইয়ালামলামঃ

এটি কোন স্থান নয়। ইহা একটি একটি পাহাড়ের নাম বলে জানা যায়। এ জায়গাটি মক্কা শরীফ থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এলাকাটি ‘সাদীয়া’ নামেও পরিচিত। যেসব দেশের লোকেরা এখান থেকে ইহরাম বাঁধে সেগুলো হলঃ (ক) ইয়ামেন, (খ) বাংলাদেশ, (গ) ভারতবর্ষ, (ঘ) চীন, (ঙ) ইন্দোনেশিয়া, (চ) মালয়েশিয়া, (ছ) দক্ষিণ এশিয়াসহ পূর্বের দেশসমূহ।

চ। যাতুইরকঃ

যাতুইরক স্থানটি মক্কা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে। প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট না থাকায় এটি এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। এটা ছিল ইরাকবাসীদের মীকাত ছিল। তারা এখন তৃতীয় মীকাত ‘সাইলুল কাবীর’ ব্যবহার করে।

এই মীকাতগুলো হারাম শরীফের চর্তুদিকেই রয়েছে। যিনি হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্য মক্কায় আসবেন তাকে অবশ্যই মীকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম বাধতে হবে। মক্কাবাসিদের হজ্জের ইহরাম হলে নিজ নিজ ঘর থেকে, আর উমরার ইহরাম হলে মসজিদে তানয়ীমে যাবে অথবা হারামের সীমানার বাইরে যে কোন স্থানে গিয়ে বাঁধবে। মক্কায় চাকরীরত বিদেশীরাও তাই করবে।

যদি মীকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম বাধতে ব্যর্থ হয় তবে তাকে অবশ্যই আবার মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে, নতুবা একটি দম দিতে হবে অর্থাৎ একটি ছাগল, বকরী বা দুম্বা জবাই করে মক্কায় গরীবদের মধ্যে এর গোশত বিলি করে দিতে হবে। নিজে খেতে পারবে না।

মীকাত সম্পর্কিত একটি ত্রুটিঃ

আমাদের দেশে যারা হজ্জে গমন করে তাদের অধিকাংশই বয়স্ক ও ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ। মীকতের পূর্বে ইহরাম বাধা ওয়াজিব বিষটি সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নাই। যারা শহরে সাথের বা শিক্ষতি তারা বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে বা বই পড়ে যেনে নেন। ফলে তার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু গ্রামের বয়স্ক, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ চাচা যিনি হজ্জে যাচ্ছেন কিন্তু কোন সেমিনারের অংশ গ্রহন করেন নাই বা বই পড়েও শিখেন নাই। তিনি সব কাজের গাইডের উপর নির্ভরশীল তার জন্য বিষয়টি খুবই কষ্টকর। তাই তাকে বার বার বুঝিয়ে দিতে হবে মীকাত কি? কোথায় গিয়ে কখন ইহরাম বাধতে হবে। এ ব্যাপার গাইডের একটি বড় ভুমিকা আছে। গাইডকে একটু সচেতান হতে হবে। তার অধীনে যত জন হজ্জযাত্রী আছেন, তাদের মধ্য যারা বিষয়টি সম্পর্কে বলার পরও আদায় করেত পারবেন বলে মনে হবে, তাদের প্রতি একটু আলাদা খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া হজ্জযাত্রী তার নিজের বাড়ি থেকে কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে গোসল করে আসবেন এবং বিমানে বসে ইহরামের প্রস্তুতি নিবেন। বিমানে উঠার আগেও ইহরামের কাপড় পরে নিতে পারেন। এরপর যখন বিমান মীকাত বরাবর আসবে ঠিক তখন নিয়দ করে ইহরাম বাঁধবেন এবং সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ করবেন। তার জন্য মীকাত থেকে ইহরাম না বেঁধে জেদ্দা থেকে বাঁধা জায়েয হবে না। বিমানে অনেক হজ্জযাত্রী ঘুমিয়ে থাকের তারা বিমানে ঘোষনা শুনতে পান না। যার হলে মীকাত অতিক্রম করার সময় ইহরান বাধতে পারেনা। এই জন্য দেখা যায় আমাদের দেশে অনেক হজ্জযাত্রী এয়ারপোর্টেই ইহরাম বেধে ফেলেন। বিষয়টি সুন্নাহ সম্মত না হলেও অনেক আলেম জায়েয বলেছেন। 

ইহরাম এবং ইহরামের ধারাবাহিক কাজ

ইহরাম এবং ইহরামের ধারাবাহিক কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। ইহরাম কি?

আবরী ইহরাম (اَلْاِحْرَامُ) শব্দটি (حَرَامٌ) হারাম শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো কোনো জিনিসকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়া। আর এই ইহরাম বাঁধাই হলো, হজ্জ ও উরার প্রথম ফরজ কাজ। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হাজ্জ বা উমরার মত ফরজ ইবাদাতের সুচনা হয়। এর মাধ্যমেই উরমা বা হজ্জের ইবাদাতে প্রবেশ করা হয়। হজ্জযাত্রী যখন হজ্জ বা উমরা কিংবা উভয়টি পালনের উদ্দেশ্যে নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ওপর কতিপয় হালাল ও জায়েয বস্তুও হারাম হয়ে যায়। এ কারণেই এ প্রক্রিয়াটিকে ইহরাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়া। তাই বলা যায়, যে কার্যাবলীর মাধ্যমে হাজ্জ বা উমরার ইবাদাত শুরু করা হয় তাকেই ইহরাম বলা হয়।

অন্যভাবে বলা যায়ঃ- পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় আর মহিলাগন স্বাচ্ছন্দ্যময় শালীন পোশাক পরিধান করে, তালবিয়া পাঠ করে, আনুষ্ঠানিকভাবে হাজ্জ বা উমরার আদায়ের উদ্দেশ্য কাবা অভিমুখে রওয়ানা দেয়াই হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার মাধ্যমের একজন হজ্জ ও উমরা আদায়কারী যাত্রী তার নিজের উপর স্ত্রী সহবাস, মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের ক্ষৌর কর্যাদি, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরিধান এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয়কে হারাম করে নেয়। শুধু হজ্জ বা উমরার সংকল্প করলেই কেউ মুহরিম হবে না। যদিও সে নিজ দেশ থেকে সফর শুরুর সময় হজ্জের সংকল্প করে। তেমনি শুধু সুগন্ধি ত্যাগ অথবা তালবিয়া পাঠ আরম্ভ করলেই মুহরিম হবে না। এ জন্য বরং তাকে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার নিয়ত করতে হবে। এই লক্ষে তাকে হজ্জ ও উমরা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি গোসল ও পবিত্রতা অর্জন সম্পন্ন করে ইহরামের কাপড় পরিধান করবেন, অতঃপর হজ্জ অথবা উমরা কিংবা উভয়টি শুরুর নিয়ত করবেন।

২। ইহরামের ওয়াজিব তিনটি যথাঃ

১। মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা

২। সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করা

৩। তালবিয়াহ পাঠ করা (নিয়ত করার পর তালবিয়া পাঠ করা ওয়াজিব)

মীকাত অতিক্রম করার আগেই, মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধাতে হবে। এই কাজটি ওয়াজিব বিধায় বাদ দিলে হজ্জ হবে না। তবে ফিদইয়া বা গুনাহ হতে মুক্তিপণ দিয়ে করে ক্ষতি পূরণ আদায় করা যায়। ইহরামের সময় বা আগে পরে কয়েটি ওয়াজির কাজ আছে আবার অনেকগুল সুন্নাহ সম্মত কাজ আছে। সবগুলি কাজ ধারা বাহিকভাবে আদায় করলে ভুল হওয়ার সম্বাবনা থাকে না। তাই এ পর্যায় ইহরামের কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে আলোচন করা হলো। এর মাধ্যমে ওয়াজ বা সুন্নাহ কোনটিই বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

৩। ইহরামের ধারাবাহিক কাজগুলো হলোঃ

১। গোসল করা

২। সুগন্ধি লাগান

৩। ইহরামের পোশাক পরা

৪। সালাত আদায় করা (ইহরামের জন্য বিশেষ কোন সালাত নাই)

৫। নিয়ত করা

৬। তালবিয়া পড়া

৭। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

১। গোসল করাঃ

আর ইহরামের পূর্বে গোসল করা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সুন্নাত। এমনকি ঋতুবতি এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলাও গোসল করবে। কেননা, আবূ বাকর সিদ্দীক (রা.) এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমায়স বিদায় হাজ্জের বছর যুলহুলাইফা নামক স্থানে মুহাম্মাদ বিন আবু বাকর ভূমিষ্ট করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে গোসল করা নির্দেশ প্রদান করেন।

১. যাইদ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তিনি ইহরামের উদ্দেশ্যে (সেলাই করা) পোশাক খুলতে ও গোসল করতে দেখেছেন। (সুনানে তিরমিজ ৮৩০ হাদিসের মান সহহি)

২. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি আসমা বিনতে উমায়স (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন যুল হুলায়ফা নামক স্থানে নিফাসগ্রস্ত হলেন, তখন রাসুলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) কে বললেনঃ তাকে (আসমা বিনতে উমায়স) গোসল করে ইহরাম বাঁধতে বল। (সহিহ মুসলিম ২৭৯৯, সুনান নাসাঈ ২১৫)

৩. জা’ফর ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমরা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদায় হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলূল্লাহ (স) যুলক্বা’দা মাসের পাঁচ দিন অবশিষ্ট থাকতে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। যখন তিনি যুল-হুলায়ফা পৌঁছলেন, তখন আসমা বিন্তে উমায়স (রাঃ) মুহাম্মদ ইব্ন আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করে পাঠালেনঃ আমি এখন কি করব? তিনি বললেনঃ তুমি গোসল কর তারপর পট্টি পরে নাও এবং ইহরাম বাঁধ। (সুনান নাসাঈ ২৯১)

৪. আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন তাঁর সাথে তার সহধর্মিণী আসমা বিনীত উমায়স খাছ’আমীয়্যাও ছিলেন। যখন তাঁরা যুলহুলায়ফায় ছিলেন, তখন আসমা মুহাম্মদ ইবন আবু বকরকে প্রসব করেন। আবু বকর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ সংবাদ দিলে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বলেন, তাকে গোসল করে হজের ইহরাম বাঁধতে আদেশ করুন। এরপর অন্যান্য লোক যা করে সেও তা করবে। কিন্তু সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। (সুনান নাসাঈ ২৬৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯১২)

৫. আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করবে, তখন তার জন্য গোসল করা সুন্নত। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং: ১৫৮৪৭)

মন্তব্যঃ ইহরামের পূর্বে গোসল করা একটি মুস্তাহাব আমল। অনেক আলেম ইহাকে সুন্নাহও বলছেন। তবে, সময় সুযোগ না হলে হলে গোসল করা জরুরী নয়। এই ক্ষেত্র পবিত্র থেকে অজু করে দুই রাকাত তাইহিয়্যাতুল অজুর সালাত আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু ঋতুবতি এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলা গোসল করে, নিজেদের প্রস্তত করেই ইহরাম বাঁধবে।

ক। ইহরাম বাঁধার পরও গোসল করা যাবেঃ

আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তারা উভয়ে আবওয়া নামক স্থানে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। ইবন আব্বাস বললেনঃ মুহরিম ব্যক্তি তার মাথা ধুইবে, আর মিসওয়ার বললেনঃ সে মাথা ধুইবে না। এরপর আবদুল্লাহ ইবদ আব্বাস আমাকে আবু আইয়ুব আনসরী বাঃ এর নিকট পাঠালেন যেন, আমি তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। আমি তাকে পেলাম, তিনি কূপের পার্শ্বে দু’টি কাঠের মধ্যস্থলে গোসল করছিলেন। আর তিনি ছিলেন এক কাপড়ের পর্দার আড়ালে। আমি তাঁকে সালাম দিয়ে বললামঃ কিরূপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় মাথা ধৌত করতেন, তা আপনার নিকট জিজ্ঞাসা করার জন্য আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। আমার কথা শুনে আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) কাপড়ের উপর হাত রেখে তা সরিয়ে দিলেন, তাতে তার মাথা দৃশ্যমান হলো। তিনি একজন লোককে তার মাথায় পানি ঢালতে বললেন, তারপর দু’হাত দ্বারা তিনি মাথা ঝাড়া দিলেন, পরে উভয় হাতকে একবার সামনের দিকে একবার পেছনের দিকে নিলেন, তারপর তিনি বললেনঃ এভাবে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গোসল করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৮৪০, সুনানে নাসাঈ ২৬৬৭, ইবনে মাজাহ ২৯৩৪)

২। সুগন্ধি লাগানঃ

গোসল করার পর ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি মাখা যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমল থেকে তার প্রমান পাওয়া যায়। কিন্তু ইহরামের কাপড় পরিধানের পর সুগন্ধি মাখা চলবে না। ইহরামের নিয়ত করার পূর্বে মাখা সুগন্ধি মুহরিমের চেহারায় দৃশ্যমান হতে পারে বা তা থেকে সুগন্ধ আসতে পারে। এরপর যখন আবার ইহরাম থেকে মুক্ত হবে, তখন আবার সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে। 

দলিলঃ

১. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহরাম বাধার সময় এবং (হজ্জ সমাপনান্তে) ইহরামমুক্ত হওয়ার পর বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পুর্বেও আমি তাঁকে সুগন্ধি মেখে দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৬৯৫ ইফাঃ)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করিলেন, তখন তঁর ইহরামের সময় আমি তাঁর গায়ে নিজ হাতে সুগন্ধি লাগিয়েছি। আর যখন তিনি ইহরাম খুলছিলেন, তাঁর ইহরাম খোলার পূর্বে আমার নিজ হাতে সুগন্ধি মাখিয়েছি। সুনানে নাসাঈ ২৬৮৬)

৩. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথার সিঁথিতে কস্তুরীর ঔজ্জ্বল্য দেখতে পাচ্ছি, তিনি তখন তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ মুসলিম (২৭০৪ ইফাঃ)

৪. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৮ তাওহীদ)

৩। ইহরামের জন্য পোশাক পরাঃ

গোসল করে সুগন্ধী লাগানোর পর ইহরামের কাপড় পরিধান করবে। আর তা হলো পুরুষদের জন্য সেলাই বিহীন লুঙ্গী ও চাদর। আর মহিলারা সাজ সজ্জা ব্যতীত যে কোন রকম কাপড় পরিধান করতে পারবে। এই কথার দলিল হল নিম্মের হাদিসসমূহঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুহরিম ব্যক্তি কী প্রকারের কাপড় পরবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ সে জামা, পাগড়ী, পায়জামা, টুপি ও মোজা পরিধান করবে না। তবে কারো জুতা না থাকলে সে টাখ্‌নুর নিচ পর্যন্ত মোজা কেটে (জুতার ন্যায়) পরবে। তোমরা জা’ফরান বা ওয়ার্‌স (এক প্রকার খুশবু) রঞ্জিত কোন কাপড় পরবে না। [আবূ ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, মুহরিম ব্যক্তি মাথা ধুতে পারবে। চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না। মাথা ও শরীর হতে উকুন যমীনে ফেলে দিবে। (সহিহ বুখারি ১৫৪২ তাওহীদ)

মন্তব্যঃ জুতা না পেলে মোজাকে টাখনুর নীচ থেকে কেটে তা পরার বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোজা কাটার কথা পূর্বে বলেছিলেন এবং এটা তিনি বলেছিলেন মদীনায় থাকাকালীন। নিচের হাদিসটি লক্ষ করুনঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃএক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলোঃ হে আল্লাহ্‌র রসূল! মুহ্‌রিম কি কাপড় পরবে? নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুহ্‌রিম জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে না। তবে যদি সে জুতা না পায়, তা হলে পায়ের গোড়ালির নীচে পর্যান্ত (মোজা) পরতে পারবে। (সহিহ বুখারী ৫৭৯৪ তাওহীদ, সহিহ মুসলিম ২৬৮২)

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট জানতে চাইল যে, মুহরিম ব্যক্তি কী ধরনের পোশাক পরবে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলছেন, মুহরিম ব্যক্তি জামা, পাগড়ী, পায়জামা, টুপি ও মোজা পরিধান করতে পারবে না। তবে কোন ব্যক্তি চপ্পলের অভাবে মোজা পরিধান করলে তাকে পায়ের গোছার নীচ বরাবর মোজার উপরিভাগ কেটে ফেলতে হবে। তোমরা এমন কাপড় পরিধান কর না যা জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮১, সুনানে নাসাঈ ২৬৭১)

৩. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একদা এক ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আমরা যখন ইহরাম অবস্থায় থাকি তখন আমরা কোন কোন কাপড় পরিধান করবো? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা জামা পরিধান করবে না। আমাদের আরো বললেন, তোমরা জামা পাগড়ী পায়জামা পরিধান করবে না এবং মোজা, ওড়না কিন্তু যদি তোমাদের কারো জুতা না থাকে, তাহলে তা গ্রস্থির নীচ থেকে কেটে নেবে। আর পরিধান করবে না এমন কাপড় যাতে ওয়ারস ও জাফরান রং লেগেঝে। (সুনানে নাসাঈ ২৬৭২)

৪. সালিম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হ‘ল যে, মুহরিম ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় কী পরিধান করবে? তিনি বললেন, মুহরিম ব্যক্তি জামা, পাগড়ী, টুপী, পায়জামা, জাফরান বা ওয়ারস দ্বারা রঞ্জিত কাপড় এবং মোজা পরিধান করবে না। কিন্তু তার চপ্পল না থাকলে সে পায়ের গোছার নিম্নাংশ বরাবর মোজার উপরিভাগ কেটে ফেলে তা পরিধান করতে পারবে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮২)

৫. ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল ! আমাদেরকে ইহরাম অবস্থায় আপনি কি ধরণের পোশাক পরার নির্দেশ দেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ জামা, পাজামা, টুপি, পাগড়ী ও মোজা পরবে না। তবে কোন লোকের জুতা না থাকলে সে চামড়ার মোজা পরবে যা পায়ের গোছার নিচে থাকে। যাফরান ও ওয়ারাস রং-এ রঙ করা কোন পোশাক তোমরা পরবে না। ইহরামধারী মহিলারা মুখ ঢাকবে না এবং হাতে দস্তানা (হাত মোজা) পরবে না। (সুনানে তিরমিজি ৮৩৩)

৬. ‘আয়েশা (রাঃ) ইহ্‌রাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ার্‌স ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়েশা (রাঃ) (ইহ্‌রাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলংকার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইব্রাহীম (নাখ্‌’য়ী) (রহঃ) বলেন, (ইহ্‌রাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। সহিহ বুখারি ১৫৪৪ তাওহীদ)

৭. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে ( হজ্জের উদ্দেশ্যে) মদীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা’দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। যিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহ্‌রাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা’বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয। (সহিহ বুখারি ১৫৪৫ তাওহীদ)

৮.  ইয়ালা ইবনু উমাইয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বেদুঈনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় জুব্বা পরিহিত দেখলেন। তিনি তাকে তা খুলার নির্দেশ দিলেন।(সুনানে তিরমিজি ৮৩৫ হাদিসের মান সহিহ)

৯. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহরিমকে যা’ফরান ও ওয়ারস দ্বারা রঞ্জিত কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৬৬৮)

১০. ইবন উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা ইহরাম অবস্থায় জামা, পায়জামা, পাগড়ী, বুরনুস এবং মোজা পরিধান করবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৬৮০)

ক। মহিলাগন নিকাব ও হাত মোজা পরিধান করবে নাঃ

ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইহরাম অবস্থায় আমাদেরকে কাপড় পরিধান করতে আদেশ করেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জামা,পায়জামা, পাগড়ী এবং বুরনুস পরবে না, আর মোজা পরিধান করবে না। কিন্তু যদি কারো জুতা না থাকে, তবে সে পায়ের গ্রস্থির নিম্ন পর্যন্ত মোজা পরিধান করতে পারে। আর যে কাপড়ে যাফরান বা ওয়ারস রং লেগেছে ঐ সকল কাপড় তোমরা পরিধান করবে না, আর মুহরিম নারী নিকাব পরিধান করবে না। আর হাত মোজাও পরিধান করবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৬৭৫ এবং ২৬৮৩)

খ। হাদিসের আলোকে ইহরাম বাধার পর পোশাক পরিধান হবে নিম্মরূপঃ

১। মুহরিম ব্যক্তি জামা এবং পায়জামা পরিধান করতে পারবে না।

২। মুহরিম ব্যক্তি মাথায় পাগড়ী বা টুপি পরিধান করতে পারবে না।

৩। হাতে ও পায়ে মুজা ব্যবহার করতে পাবরে না তবে চপ্পল ব্যবহার করতে পারবে।

৪।  মুহরিম নারী মুখ ঢাকবে না এবং হাত মোজাও পরবে না।

৫।  মুহরিম নারীদের বুরনুস (টুপির মত এক প্রকার কাপড় যা মহিলারা পরিধান করে) পরিধান করতে পারবে না।

৬। জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করা যাবে না

৭। মুহরিম চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না।

মন্তব্যঃ এই সকল বিষয় বিবেচনা করে হজ্জযাত্রীগন সেলাই বিহীন দুটি সাদা চাদরের মত কাপড় ব্যবহার করে। আর মহিলাগন সুবিধামত সাবলিল পোশাক পরিধান করে থাকে।

৪। সালাত আদায় করাঃ

আমদের সমাজের অনেকের বিশ্বাস ইহরাম বাঁধার প্রাক কালে দুই রাকাত সালাত আদায় করা ওয়াজিব। ইবনে তাইমিয়ার মতে, ইহরামের বিশেষ কোন নামায নেই। কেননা, এ ধরণের কোন নামায নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়নি। ইহরামকালে দুই রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব নয়।

       হজ্জযাত্রীগন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে গোসল করার পর ইহরামের কাপড় পরে ইহরাম বাঁধবে। এই সময় কোন প্রকার সালাত আদায় জরুরী নয়। তবে, যদি কোন নামাযের ওয়াক্ত হয়, যেমনঃ ফরয নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেছে, কিংবা ওয়াক্ত হওয়ার সময় কাছাকাছি এবং সে ব্যক্তি নামায পড়া পর্যন্ত মীকাতে অবস্থান করতে চায় এক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে, নামাযের পর ইহরাম বাঁধা। কাজেই ঋতুবতী এবং নিফাস অবস্থায় থাকা মহিলা ব্যতীত অন্যরা ফরয সলাতের সময় হলে (মীক্বাতে) ফরয সলাত আদায় করবে। যদি ফরয সলাতের সময় না হয়, সে ক্ষেত্রে কোন কোন আলেম ইহরানের নিয়ত না করে, তাহইয়্যাতুল উযূর নিয়তে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার কথা বলেছেন।

৫। নিয়ত করাঃ

সকল ইবাদতের আগে নিয়ত ঠিক করা ফরজ। নিয়তে কারনেই আমলটি কবুল হয়ে থাকে। আবার ভুল নিয়তের কারনে আমলটি শির্কে পরিনত হয়। এই জন্য হয়তো ইমাম বুখারী তার গ্রন্থের প্রথম হাদিসটি নিয়ত সম্পর্কে লিখেছেন। হজ্জ একটি অন্যতাম ফরজ ইবাদাত শুধু নিয়তের কারনেই হজ্জ বাতিল হয়ে যায়। এই ইবাদতের সাথে আর্থিক ও শারীরিক সম্পর্ক থাকার করানে অনেকেরই ফরজ হয় না। যাদের ফরজ হয় তারা কষ্ট স্বীকার করে আদায় করে অথচ নিয়তের কারনে বাতিল হয়ে যায়। প্রথমত না জানার কারনে নিয়তের পদ্ধতিতে ভুল ভুল করে। অশুদ্ধ নিয়তের করার মধ্য অন্যতম হলো, লোক দেখান হজ্জ করা,  মক্কা মদিনা দেখার জন্য, অর্থের লোভে হজ্জ করা, সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, হাজ্জি উপাধী গ্রহনের জন্য, খ্যাতি অর্জনের জন্য, মদিন রাসূল (সাঃ) কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য করে হজ্জে গমন করা ইত্যাদি।

ক। নিয়তের সঠিক পদ্ধতি হলোঃ

নিয়ত আরবী শব্দ। যার অর্থ হল, ইচ্ছা বা সংকল্প। আর ইচ্ছার স্থান হচ্ছে অন্তর। তা মুখে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহ বলেন,

*قُلْ إِن تُخْفُواْ مَا فِي صُدُورِكُمْ أَوْ تُبْدُوهُ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَيَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأرْضِ وَاللّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

অর্থঃ বলে দিন, তোমরা যদি মনের কথা গোপন করে রাখ অথবা প্রকাশ করে দাও, আল্লাহ সে সবই জানতে পারেন। আর আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সেসব ও তিনি জানেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। (সুরা ইমরান ৩:২৯)

উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে- সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর -১)

একজন বিবেকবান, সুস্থ মস্তিষ্ক, বাধ্য করা হয়নি, এমন লোক কোনো কাজ করবে আর সেখানে তার কোনো নিয়ত বা ইচ্ছা থাকবে না সেটা সম্ভব নয়। হজ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, সুতরাং হজ্জে যাত্রা করার পূর্বে সঠিক নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত হল অন্তরের সাথে দৃঢ় সংকল্প, শব্দের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হজ্জ ও উমরার শুরুতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। এই জন্য অনেক আলেম মনে করে, ইহ্‌রাম ব্যতীত অন্য কোন ইবাদাতে মৌখিক নিয়তে শব্দ উচ্চারণ করা শরীয়তে বৈধ নয়। কেননা কেবল ইহরামের সময়ই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ওভাবে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করার কথা বর্ণিত আছে। অবশ্য তা প্রচলিত নাওয়াইতু আন…… বলে গদ বাধা নিয়মে নয়। আমাদের দেশে সালাতে যে গদবাধা নিয়ত বলে সালাত শুরু হয় তা একটি বিদআতি আমল। এমনিভাবে অনেক হজ্জের সময়ও নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে জোরে জোরে বলতে থাকে। তাদের এই আমল সঠিক নয় কারন মনে মনে ওমরাহ বা হজ্জের সংকল্প করা ও তালবিয়াহ পাঠ করাই যথেষ্ট। এই কথার দলিল হলো, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদিস।

আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যোহরের সালাত মদীনায় চার রাক’আত আদায় করলেন এবং ‘আসরের সালাত যুল-হুলাইফায় দু’রাক’আত আদায় করেন। আমি শুনতে পেলাম তাঁরা সকলে উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৮ তাওহীদ)

** সালাত শেষে অন্তরে হজ্জ বা উমরার নিয়ত করে ইহরাম বাঁধবে আর মুখে বলবেঃ

১। যদি তামাত্তুকারী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً**

লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ তামাত্তু হজ্জের নিয়তকারী যেহেতু উমরা করা পর হালাল হয়ে যায়। তাই তার মনে মনে এই সংকল্প থাকতে হবে যে, এই সপরে উমরা থেকে হালাল হবার পর আবার ইহরাম বেঁধে হজ্জ আদায় কবর।

 ২। যদি কিরানকারী হন, তাহলে বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে।

দলিলঃ আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এভাবে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরা উভয়ের তালবিয়া  পাঠ করতে শুনেছিঃ (তিনি বলেছেন)

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا**

লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরা ও হজ্জের উদ্দেশ্যে। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৮ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কিরান হজ্জ কারীর সাথে হাদি থাকে তাই সে উমরার পর হালাল হতে পারে। এই কারনে কিরান হজ্জের নিয়তকারী কে একই ইহরামে হজ্জও উমরা আদায় করতে হয় বিধায় তিনি একই সাথে হজ্জ ও উমরার নিয়ত করবেন।

৩। আর যদি ইফরাদকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু হজ্জের নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ َحَجًّا. **

লাব্বাইকা হাজ্জান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি হজ্জের উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইফরাত হজ্জের নিয়তকারী উমরা করার সুযোগ পায় না, তিনি সরাসরি হজ্জ আদায় করে থাকেন। তাই ইফরাতের হজ্জের জন্য গমন কারী হজ্জযাত্রী শুধু হজ্জের নিয়ত কবরে।

৪। পক্ষান্তরে যদি উমরা পালনকারী হন, অর্থাৎ যিনি শুধু উমরার নিয়ত করবেন তিনি বলবেনঃ

**لَبَّيْكَ عُمْرَةً. **

লাব্বাইকা উমরাতান

অর্থঃ (হে আল্লাহ!) আমি হাজির হয়েছি উমরার উদ্দেশ্যে।

মন্তব্যঃ ইহরামের নিয়ত মনে মনে করার পর এই চার প্রকারের কালিমা মৌখিকভাবে বলতে হবে। তার পর হাদিসে বর্ণিত তাবলিয়া পড়তে হবে।

খ। ওজরের কারণে শর্ত সাপেক্ষে নিয়তঃ

হজ্জ পালনকারী ব্যক্তি যদি অসুখ কিংবা শত্রু অথবা অন্য কোন কারণে হজ্জ সম্পন্ন করার ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করেন, তাহলে নিজের ওপর শর্তারোপ করে বলবেন,

**اللَّهُمَّ مَحِلِّي حَيْثُ حَبَسْتَنِي **

আল্লাহুম্মা মাহিল্লী হাইছু হাবাসতানী

অর্থঃ হে আল্লাহ আপনি আমাকে যেখানে রুখে দেবেন, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলিলঃ

১. আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবা‘আ বিনতে যুবায়র-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তোমার হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে কি? সে উত্তর দিল, আল্লাহর কসম! আমি খুবই অসুস্থবোধ করছি (তবে হাজ্জে যাবার ইচ্ছে আছে)। তার উত্তরে বললেন, তুমি হাজ্জের নিয়্যতে বেরিয়ে যাও এবং আল্লাহর কাছে এই শর্তারোপ করে বল, হে আল্লাহ্! যেখানেই আমি বাধাগ্রস্ত হব, সেখানেই আমি আমার ইহরাম শেষ করে হালাল হয়ে যাব। সে ছিল মিকদাদ ইবনু আসওয়াদের সহধর্মিণী। (সহিহ বুখারী ৫০৮৯ তাওহীদ)

অথবা বলবে,

**لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي.**

(লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ওয়া মাহিল্লী মিনাল আরদি হাইছু তাহবিসুনী)

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, যেখানে তুমি আমাকে আটকে দেবে, সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাব।

এই কথার দলিলঃ

ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন ও দুবা’আ বিনত যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি হজ্জের ইচ্ছা করেছি। এখন আমি কি বলবো? তিনি বললেনঃ তুমি বলবেঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ وَمَحِلِّي مِنَ الأَرْضِ حَيْثُ تَحْبِسُنِي*

লাব্বায়ক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ক, ‘অমাহিল্লি মিনাল আরদী হাইছু তাহবিসুনী” (অর্থঃ আপনি যেখানে আমাকে আটকে রাখেন আমি সেখানে হালাল হয়ে যাব)। কারণ তোমার জন্য তোমার রবের নিকট তাই রয়েছে, যা তুমি শর্ত করেছ। (সুনানে নাসাঈ ২৭৬৮ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ ইহরাম বাধার সময় যদি ব্যাধি বা অন্য কোন বাধার কারণে নিজ হাজ্জের বা উমরার কার্যাবলী সম্পূর্ণ করতে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা করে, তাহলে তার জন্য ইহরামের নিয়্যাত করার পূর্বে শর্ত লাগিয়ে নেয়া সুন্নাত। যেমনটি উপরের হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এখানে মৌখিক উচ্চারণের বিষয়টি এসেছে যেহেতু হজ্জটা মানতের মত। মানত মৌখিক উচ্চারণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। কেননা কোন লোক যদি অন্তরে মানতের নিয়ত করে তাহলে সে মানত সংঘটিত হবে না। যেহেতু হজ্জ পরিপূর্ণ করার দিক থেকে মানতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ শুরু করার সময় এই বাক্য বলে মৌখিকভাবে শর্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসে যে এসেছে, “আমার নিকটে জিব্রাইল এসে বলেন, আপনি এই মোবারকময় উপত্যকায় নামায আদায় করুন এবং বলুন, “উমরাতান ফি হাজ্জা” (উমরাসহ হজ্জ) কিংবা “উমরাতান ওয়া হাজ্জা” (হজ্জ ও উমরা)। এর মানে এ নয় যে, তিনি নিয়ত উচ্চারণ করেছেন। বরং এর অর্থ হচ্ছে, তিনি তাঁর তালবিয়ার মধ্যে হজ্জের প্রকারটি উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ত উচ্চারণ করেননি। (ইসলামী ফতোয়াসমগ্র ২/২১৬)। আল্লাহই ভাল জানেন।

কিন্তু মনে রাখতে হবে যারা হাজ্জ বা উমরা সম্পূর্ণ করতে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা নেই, তার জন্য শর্ত করা ঠিক নয়। কারণ, নাবী (সা.) ইহরাম করার সময় কোন শর্ত করেননি। তিনি সকল সাহাবীকে সাধারণভাবে শর্ত করার নির্দেশ দেননি, বরং একমাত্র যুবাইরের-এর মেয়ে যুবাআ’হ-কে তাঁর ব্যধিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হাজ্জ সম্পাদনে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় শর্ত করার নির্দেশ দেন।

গ। নাবালকের ইহরামঃ

মুহরিম ব্যক্তি যদি ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী ও বোধসম্পন্ন বালক হয়, তাহলে সে সেলাইযুক্ত কাপড় পরিহার করে ইহরামের কাপড় পরিধান করে নিজেই ইহরাম বাঁধবে। হজ্জ বা উমরার যেসব আমল সে নিজে করতে পারে, নিজে করবে। অবশিষ্টগুলো অভিভাবক তার পক্ষ থেকে আদায় করবেন।

বালক যদি ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী বা বোধসম্পন্ন না হয়, তাহলে অভিভাবক তার শরীর থেকে সেলাইযুক্ত কাপড় খুলে ইহরামের কাপড় পরিধান করাবেন। অতপর তার পক্ষ থেকে ইহরাম বাঁধবেন এবং তাকে নিয়ে হজের সকল আমল সম্পন্ন করবেন।

মন্তব্যঃ মুখে ‘নাওয়াইতুল উমরাতা’ বা ‘নাওয়াইতুল হজ্জা’  বলা বিদ‘আত।  উল্লেখ্য যে, হজ্জ বা উমরাহর জন্য ‘তালবিয়াহ’ পাঠ করা ব্যতীত অন্য কোন ইবাদতের জন্য মুখে নিয়ত পাঠের কোন দলিল নেই। নিয়তের স্থান হচ্ছে, কলব বা অন্তর। নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীবর্গ থেকে সাব্যস্ত হয়নি যে, তারা কোন ইবাদতের পূর্বে নিয়ত উচ্চারণ করেছেন। হজ্জ ও উমরার তালবিয়া নিয়ত নয়। শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেনঃ

নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত। সজোরে নিয়ত পড়া কঠিন গুনাহ। সুন্নাহ হচ্ছে, মনে মনে নিয়ত করা। কারণ আল্লাহ তাআলা গোপন ও সঙ্গোপনের সবকিছু জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

*قُلْ أَتُعَلِّمُونَ اللَّهَ بِدِينِكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ*

অর্থঃ বলুন, তোমরা কি তোমাদের ধর্ম পরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহকে অবহিত করছ? অথচ আল্লাহ জানেন যা কিছু আছে ভূমন্ডলে এবং যা কিছু আছে নভোমন্ডলে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। (সুরা হুজুরাত ৪৯:১৬)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিংবা তাঁর সাহাবীবর্গ কিংবা অনুসরণযোগ্য ইমামদের থেকে ‘নিয়ত উচ্চারণ করা’ সাব্যস্ত হয়নি। সুতরাং জানা গেল যে, এটি শরিয়তে সিদ্ধ নয়। বরং নবপ্রচলিত বিদআত। আল্লাহই তাওফিকদাতা। (ইসলামী ফতোয়াসমগ্র (২/৩১৫)

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নামায, তাহারাত (পবিত্রতা), রোজা কিংবা অন্য কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়ত উচ্চারণ করা বর্ণিত হয়নি। এমনকি হজ্জ-উমরার ক্ষেত্রেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন না যে, ‘আল্লাহু্ম্মা ইন্নি উরিদু কাযা ওয়া কাযা…,,,,(অর্থে …হে আল্লাহ, আমি অমুক অমুক আমল করার সংকল্প করেছি…)।

৬। হজ্জের নিয়তে ভুলত্রুটিঃ

যারা হজ্জ করতে যান তাদের নিয়তে অনেক সমস্যা থাকে তার মধ্য নিম্মের ভুলত্রুটিগুলো অন্যতম।

ক।  লোক দেখান হজ্জ করা

খ। মক্কা মদিনা দেখার জন্য

গ। অর্থের লোভে হজ্জ করা

সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে

ক। লোক দেখান হজ্জ করাঃ

আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির বা লোক দেখান হজ্জ করলে তার কখনও করুল হবে না। বরং লোক দেখান হজ্জ করা একটি গুনাহের কাজ। এর পরিনতিও খুবই খারাপ। লোক দেখান কাজের পরিণতি কি হবে? এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেন,

وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا (٢٣) 

অর্থ: (আমি ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য) আর তারা যে কাজ করেছে, আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। (সুরাহ আল-ফুরকান ২৫:২৩)।

হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ননা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের চেহারা ও দেহের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তোমাদের অন্তর ও কর্মের প্রতি লক্ষ্য আরোপ করেন। (সহহি মুসলিম, রিয়াযুস স্ব-লিহীন-৭)

আর এক শ্রেণীর লোকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল নামের পিছনে আলহাজ্ব লাগাবে। যদি আলহাজ্ব লাগানোর ইচ্ছায় হজ্জ্ব হয় তবে ছোট শির্কে হবে, এতে কোন সন্ধেহে নাই। কাজেই যারা লোক দেখান হজ্জ করেন। তাদের উচিত বার বার নিজের নিয়তকে সঠিক করে এক মাত্র মহান আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য হজ্জ করা।

খ। মক্কা মদিনা দেখার জন্যঃ

অনেক বিধর্মী পৃথিবীতে আনাচে কানাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা তারা জানা বা দেখার নেষা থেকেই করছে। কেউ তাদের বাধ্য করছে না। অনেক ভ্রমন পাগল মুসলিমও আছে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে গমন করে জানা বা দেখার জন্য। এমন ভ্রমন পাগল বা সাধারণ যে কোন মুসলিম যদি মনে মনে এই নিয়ত করে যে, পৃথিবীল বিভিন্ন স্থানে তো বহু ভ্রমন করলাম কিন্তু আজও মক্কা মদিন ঘুরে আসতে পারলাম না। আগামি বছর মক্ক মদিনা দেখার জন্য হজ্জ গমন করব। এতে দুটি লাভ হবে প্রথমত মক্কা মনিদা দেখা। আর দ্বিতীয়ত হজ্জ ফরজ ছিল তাও আদায় হয়ে গেল। দেখুন আল্লাহর বান্দার নিয়ত কেমন? তার নিয়তই হল মক্কা মদিনার দেখা সাথে বাড়তি হজ্জ। সে মক্কা মদিনা গিয়েছিল জানা ও দেখান উদ্যেশ্য। যদি সে নিয়ত করত আমি মহান আল্লাহকে রাজি খুসি করার জন্য হজ্জে যাব। তালে তার হজ্জে যাওয়া ইবাদাত হত। কিন্তু তার সমান্য নিয়তের জন্য তার অসামান্য ক্ষতি হল। কাজেই যারা মক্কা মদিয়া দেখার উদ্দেশ্য হজ্জে যাবেন তাদের হজ্জ হবে না।

গ। অর্থের লোভে হজ্জ করাঃ

অনেকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। হজ্জ্ব করবে সাথে সাথে স্বর্ন নিয়ে দেশে ফিরবে। এতে হজ্জ্ব ও হল আবার লাভও হল। বেশ তো একই সাথে দু্‌ই কাজ। কাজ দুটিই হল কিন্তু ছোট শির্ক হল নেকি পাবেন না। এসব আলম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি লোকর নিকট ন্যায় পরায়ন সাজার জন্য বা স্বনামধন্য হবার জন্য হজ্জ্ব পারন করল সে শির্ক করল। (মুসনাদে আহম্মদ)।

ঘ। সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়েঃ

আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে হজ্জ্ব পালন করে। আল্লাহর রহমতে বান্দা যখন হজ্জ্ব করার যোগ্যতা অর্জন করে। অর্থাৎ যখন টাকা পয়সার মালিক হয়, তখন সে কার্পন্য করতে থাকে। মনে মনে ভাবে এত টাকা খরচ করে হজ্জ আদায় করব! পরক্ষণে আবার ভাবে, টাকা পয়সার মালিক হলাম কিন্তু হজ্জ আদায় না করলে সমাজে লোক ভারাপ চোখে দেখবে। সবাই ভাববে আমি কৃপণ। এই সকল ভাবতে ভাবতে এক সময় সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, সে অনেকটা বাধ্য হয়েই হজ্জ্বে গমন করে। বলুন এটা কি বিয়া নয়? তার প্রমান, হজ্জ্ব পালন করার পরও তাহার মুখে দাড়ি উঠেনি, সালাতে গর হাজির, অন্যান্য ইবাদাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

৬.৩.৭ তালবিয়া পড়াঃ

তালবিয়া’ শব্দটি ‘লাব্বা’ (لَبَّى) এর ক্রিয়ামূল। আর ‘লাব্বা’ অর্থ হচ্ছে, মুহরিম ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরাতে ‘লাব্বাইক’ বলল। ইতোপূর্বে আমরা বলেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ইহরাম বাঁধার সময় বলেছিলেন, ‘লাব্বাইক উমরাতান ওয়া হাজ্জাতান’। ‘লাব্বাইক’ (لَبَّيْكَ) শব্দটি কারো ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সুন্দর একটি শব্দ। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় ছাহাবীকে ডেকেছেন এবং তাঁরা ‘লাব্বাইক’ বলে সাড়া দিয়েছেন মর্মে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডাকে তাঁদের কেউ কেউ বলতেন, ‘লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! (لَبَّيْكَ يَا رَسُوْلَ الله), আবার কেউ কেউ বলতেন, ‘লাব্বাইকা ওয়া সাদাইক’ (لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ)।

যে ব্যক্তি ডাকে সাড়া দেওয়ার সময় লাব্বাইক বলবে। আর স্বয়ং মহান আল্লাহ মানুষদেরকে হজ্জ করতে ডেকেছেন। তিনি তাঁর নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কে বলেন,

*وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ*

‘আর মানুষের মধ্যে হজ্জের জন্য ঘোষণা দিয়ে দাও। তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার হালকা-পাতলা উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তোমার কাছে আসবে। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৭)

মন্তব্যঃ অতএব, কোন মুসলিম যখন মীক্বাতে এসে ইহরাম বেঁধে ফেলবে, তখন তালবিয়া পড়বে।

ক। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া কেমন ছিল?

সহিহ হাদিসের আলোকে তালবিয়ার বাক্যগুলো হল নিম্ম রূপঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তালবিয়া নিম্নরূপঃ

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

(লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নিমাতা লাকা ওয়ালমুল্‌ক লা শারি-কা লাকা)।

অর্থঃ আমি হাযির হে আল্লাহ, আমি হাযির, আমি হাযির; আপনার কোন অংশীদার নেই, আমি হাযির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও সকল নি’আমত আপনার এবং কর্তৃত্ব আপনারই, আপনার কোন অংশীদার নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৯ তাওহীদ)

২. উপরের বর্ণিত তালবিয়াই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া। তবে কখনো কখনো কিছু অতিরিক্ত বলতেন। যেমনঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তালবিয়ায় বলেনঃ

* لَبَّيْكَ إِلَهَ الْحَقِّ لَبَّيْكَ*

(লাব্বাইকা ইলাহাল হাক্কি লাব্বাইক)

আমি হাজির হয়েছি, হে সত্য মাবূদ! আমি হাজির হয়েছি। (ইবনে মাজাহ ২৯২০)

৩. উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ

ইবন উমর (রাঃ) তাতে আরও বাড়িয়ে বলেছেনঃ

لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَلُ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫২ হাদিসের মান সহিহ)

৪. আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তালবিয়া ছিলঃ

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ

(সুনান নাসাঈ ২৭৫৩ হাদিসের মানসহিহ)

খ। তালবিয়ার ফজিলতঃ

১. সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তিই তালবিয়া পাঠ করে, সাথে সাথে তার ডান ও বাম দিকের পাথর, গাছপালা অথবা মাটি, এমনকি দুনিয়ার সর্বশেষ প্রান্ত উভয় দিকের সবকিছু তালবিয়া পাঠ করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯২১)

২. আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কোন ধরণের হজ্জ সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেনঃ “আল আজ্জু ওয়াচ্ছাজ্জু’’ উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ আর উট কুরবানী দেওয়া। (সুনানে তিরমিজি ৮২৮)

৩. সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কোন মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডান ও বামে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি সবকিছুই তার সাথে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়। ( মিশকাত ২৫৫০)।

৪. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে আরাফাতে ওয়াকূফ কালে অকস্মাৎ সে তার সওয়ারী হতে পড়ে যান। যার ফলে তাঁর ঘাড় মটকে গেল অথবা রাবী বলেন, ঘাড় মটকে দিল। (যাতে তিনি মারা গেলেন)। তখন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাঁকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও এবং দু’ কাপড়ে তাঁকে কাফন দাও; তাঁকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তাঁর মস্তক আবৃত করবে না। কেননা, আল্লাহ্‌ তা’আলা কিয়ামতের দিন তাঁকে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উত্থিত করবেন। (সহিহ বুখারি ১২৬৬)

তালবিয়াহ পাঠের সুন্নাহ ও ভুলসমূহ 

তালবিয়াহ পাঠের সুন্নাহ ও ভুলসমূহ 

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ ওয়াজিবঃ

২। উচ্চস্বরে পাঠ করবে।

৩। মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবে

৪। কিবলামুখী হয়ে তালবিয়াহ পড়া

৫। তালবিয়া বেশী বেশী পাঠ করা

৬। তালবিয়ার সাথে অন্যান্য জিকির করা

৭। নীচে নামা ও উঁচু স্থানে উঠার সময় তালবিয়া পাঠ করা

৮। ইহরাম বাধা থেকে জামারায় পাথর মারা পর্যান্ত পাঠ করা

৯। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

তালবিয়ার ভুলসমূহঃ

১।  ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ না করাঃ

২। দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করা

১। ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ ওয়াজিবঃ

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে তাঁর সওয়ারী সোজা দাঁড়িয়ে গেলে তিনি তালবিয়া পাঠ করেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫২তাওহীদ)

আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উচ্চস্বরে হাজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা মক্কায় পৌছলে তিনি আমাদের তা উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন। তালবিয়ার দিন এলে আমরা হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে রওনা হলাম। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৩ ইফাঃ)

আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উচ্চস্বরে হাজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা মক্কায় পৌছলে তিনি আমাদের তা উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন। তালবিয়ার দিন এলে আমরা হাজ্জের (হজ্জ) ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে রওনা হলাম। (সহিহ মুসলিম ২৮৯৩ ইফাঃ)

২। উচ্চস্বরে পাঠ করবে।

আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যোহরের সালাত মদীনায় চার রাক’আত আদায় করলেন এবং ‘আসরের সালাত যুল-হুলাইফায় দু’রাক’আত আদায় করেন। আমি শুনতে পেলাম তাঁরা সকলে উচ্চৈঃস্বরে হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তালবিয়া পাঠ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৮ তাওহীদ)

খাল্লাদ ইবনুস সাইব (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার নিকট জিবরীল (আঃ) এসে আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন আমার সাহাবীগণকে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের আদেশ দেই। (ইবনে মাজাহ ২৯২২, তিরমিযী ৮২৯, নাসায়ী ২৭৫৩, আবূ দাউদ ১৮১৪)

৩। মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবেঃ

তবে মহিলারা তালবিয়া মহিলাগন নীচু স্বরে পাঠ করবে। মহিলাদের কন্ঠ পর্দার অন্তরভুক্ত। তাই তারা অন্যান্য যিকির, দোয়া ও কুরআন তিলওয়াত উচ্চস্বরে আদায় করে না। সুতারং তালবিয়াও তারা আস্তে আস্তে পাঠ করবে, এই ক্ষেত্রে পর্দাই হচ্ছে শারঈ বিধান।

মালিক (র) থেকে বর্ণিতঃ, বিজ্ঞ আলিমগণের নিকট শুনেছি, তাঁরা বলতেন, উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করা মহিলাদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। মহিলাগণ আস্তে পড়িবেন যেন কেবল নিজেরাই আওয়ায শুনতে পান।

মালিক (র) বলেন, মসজিদের ভিতরে তালবিয়ার আওয়ায খুব বেশি উঁচু করবে না। বরং এতটুকু শব্দে পড়িবে যেন নিজে এবং পাশের লোকটি কেবল শুনতে পায়। তবে মিনা মসজিদ এবং মসজিদুল হারামে উচ্চৈঃস্বরে ‘লাব্বায়কা’ পাঠ করবে। মালিক (র) বলেন, কতিপয় আলিমের নিকট শুনেছি, প্রত্যেক নামাযের পর এবং চড়াই উতরাই-এর সময় লাব্বায়কা পাঠ করা মুস্তাহাব। (মুয়াত্তা মালিক ৭৩৯)

৪। কিবলামুখী হয়ে তালবিয়াহ পড়াঃ

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) যুল-হুলাইফায় ফজরের সালাত শেষ করে সওয়ারী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিতেন, প্রস্তুত হলে আরোহণ করতেন। সওয়ারী তাঁকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি সোজা কিবলামুখী হয়ে হারাম শরীফের সীমারেখায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকতেন। এরপর বিরতি দিয়ে যূতুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে ভোর পর্যন্ত রাত যাপন করতেন এবং অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করে গোসল করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপই করে ছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৩তাওহীদ)

৫। তালবিয়া বেশী বেশী পাঠ করাঃ

আর মুহরিম ব্যক্তির বেশী বেশী তালবিয়া পাঠ করা উচিত; কারণ, তালবিয়াই হচ্ছে হাজ্জ ও উমরার বাচনিক নিদর্শন। বিশেষ করে অবস্থা ও কালের পরিবর্তনের সময় অধিক মাত্রায় তালবিয়া পাঠ করবে। যেমন, উঁচু স্থানে উঠা বা নীচু স্থানে অবতরণের সময়, কিংবা রাত বা দিনের আগমনের সময়, অথবা কখনো ইহরামের নিষিদ্ধ কাজের মনস্থঃ হওয়ার সময় বা কোন অবৈধ কাজের খেয়াল আসার সময় ইত্যাদি।

৬। তালবিয়ার সাথে অন্যান্য জিকির করাঃ

মুহাম্মদ ইব্‌নু আবূ বাকার সাকাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁরা উভয়ে সকাল বেলায় মিনা হতে ‘আরাফার দিকে যাচ্ছিলেন, আপনারা এ দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে থেকে কিরূপ করতেন? তিনি বললেন, আমাদের মধ্যে যারা তালবিয়া পড়তে চাইত তারা পড়ত, তাতে বাধা দেয়া হতো না এবং যারা তাকবীর পড়তে চাইত তারা তাকবীর পড়ত, এতেও বাধা দেওয়া হতো না। (সহিহ বুখারি ১৬৫৯ তাওহীদ)

৭। নীচে নামা ও উঁচু স্থানে উঠার সময় তালবিয়া পাঠ করাঃ

১. মুজাহিদ (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর নিকটে ছিলাম, লোকেরা দাজ্জালের আলোচনা করে বলল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর দু’ চোখের মাঝে (কপালে) কা-ফি-র লেখা থাকবে। রাবী বলেন, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, এ সম্পর্কে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কিছু শুনিনি। অবশ্য তিনি বলেছেনঃ আমি যেন দেখছি মূসা (‘আ.) নীচু ভূমিতে অবতরণকালে তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৫, ৩৩৫৫, ৫৯১৩)

২. মুজাহিদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমরা ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। উপস্থিত সবাই দাজ্জালের আলোচনা উঠালেন। তখন কোন একজন বললেন, তার (দাজ্জালের) দু’ চোখের মাঝামাঝিতে “কাফির” শব্দ খচিত আছে। তখন ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কিছু বলেছেন বলে আমি শুনিনি। তবে এতটুকু বলতে শুনেছি যে, ইবরাহীম (‘আঃ) এর আকৃতি জানতে হলে তোমাদের এ সাথীরই (নিজের দিকে ইঙ্গিত) দিকে তাকাও। (তিনি অনুরুপই ছিলেন) আর মূসা (‘আঃ) ছিলেন গন্দুমী বর্ণের সুঠামদেহী। তাকে লাল বর্ণের একটি ঊটের পিঠে আরোহিত দেখেছি। আমি যেন তাকে এখনো তালবিয়াহ পাঠ করা অবস্থায় উপত্যকার ঢালু দিয়ে নামতে দেখেছি। (সহিহ মুসলিম ৩১১)

৩. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মাদীনাহয়) যুহরের সলাত আদায় করে সওয়ারীতে চড়েন। অতঃপর তিনি আল-বায়দার উচ্চভূমিতে আরোহণের সময় ‘তালবিয়া’ পাঠ করেন। (আবু দাউদ ১৭৭৪)

৮। ইহরাম বাধা থেকে জামারায় পাথর মারা পর্যান্ত পাঠ করাঃ

ইহরামের কাপড় পরার পর যখনই নিয়ত করা শেষ করবেন তখন থেকে তালবিয়াহ পাঠ শুরু করবেন, আর শেষ করবেন হারাম শরীফে পৌঁছে তাওয়াফ শুরুর পূর্বক্ষণে। আর হজ্জের বেলায় ১০ই যিলহজ্জে বড় জামরায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকবেন।

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় ফযলকে বাহনে তার পিছনে বসালেন। রাবী বলেন, এরপর ইবনু আব্বাস (রাঃ) আমাকে অবহিত করলেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত অনবরত তালবিযা পাঠ করতে থাকেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৫৮ ইফাঃ)

২. আরাফা হতে মুযদালিফা আসার পথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওয়ারীর পেছনে উসামাহ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনার পথে তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাযলকে সওয়ারীর পেছনে বসালেন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তারা উভয়েই বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামারায়ে ‘আকাবাতে কঙ্কর না মারা পর্যন্ত অনবরত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৭)

৩. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুল-হুলাইফার মাসজিদের নিকট হতে ইহ্‌রাম বেঁধেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৫৪৩ তাওহীদ)

৪. ‘ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪ তাওহীদ)

৫. কুরাইব (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) ফযল (রাঃ) হতে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতেন।(সহিহ বুখারি ১৬৭০ তাওহীদ)

মন্তব্যঃ হজ্জে ইহরাম বাঁধার সময় থেকে শুরু করে ঈদের দিন জামরা আক্বাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া অব্যাহত রাখবে হলেও উমরায় তালবিয়া পাঠ করা ইহরাম বাঁধার সময় থেকে শুরু করে তাওয়াফ আরম্ভ করার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত।

৯। ঋতুবতী অবস্থায় মহিলাদের ইহরাম বাধার নিয়ম

উমরার ইহরাম বাঁধার পর যদি কেউ ঋতুবতী হয়ে পড়লে তাকে গোসল করতে হবে এবং উমরার ইহ্‌রাম ছেড়ে দিয়ে হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধাতে হবে। হজ্জের পর পাক-সাফ অবস্থায় আর একটি উমরা করতে হবে। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ঋতুর কারণে বাতিল হয়ে যাওয়া উমরার পরিবর্তে নতুনভাবে ‘উমরাহ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন।

১. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা বিদায় হজ্জের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বের হয়ে ‘উমরাহ’র নিয়্যাতে ইহ্‌রাম বাঁধি। নবী বললেনঃ যার সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে সে যেন ‘উমরাহ’র সাথে হজ্জের ইহ্‌রামও বেঁধে নেয়। অতঃপর সে ‘উমরাহ ও হজ্জ উভয়টি সম্পন্ন না করা পর্যন্ত হালাল হতে পারবে না। [‘আয়েশা (রাঃ) বলেন] এরপর আমি মক্কায় ঋতুবতী অবস্থায় পৌঁছলাম। কাজেই বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী কোনটিই আদায় করতে সমর্থ হলাম না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমার অসুবিধার কথা জানালে তিনি বললেনঃ মাথার চুল খুলে নাও এবং তা আঁচড়িয়ে নাও এবং হজ্জের ইহ্‌রাম বহাল রাখ এবং ‘উমরাহ ছেড়ে দাও। আমি তাই করলাম, হজ্জ সম্পন্ন করার পর আমাকে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদুর রহমান ইব্‌নু আবূ বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে তান’ঈম-এ প্রেরণ করেন। সেখান হতে আমি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ এ তোমার (ছেড়ে দেয়া) ‘উমরাহ’র স্থলবর্তী। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, যাঁরা ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধেছিলেন, তাঁরা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’য়ী সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যান এবং মিনা হতে ফিরে আসার পর দ্বিতীয়বার তাওয়াফ করেন আর যাঁরা হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়ের ইহ্‌রাম বেঁধেছিলেন তাঁরা একটি মাত্র তাওয়াফ করেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৬)

২. জা’ফর ইব্ন মুহাম্মদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমরা জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট গমন করে তাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিদায় হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলূল্লাহ (স) যুলক্বা’দা মাসের পাঁচ দিন অবশিষ্ট থাকতে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। যখন তিনি যুল-হুলায়ফা পৌঁছলেন, তখন আসমা বিন্তে উমায়স (রাঃ) মুহাম্মদ ইব্ন আবূ বকরকে প্রসব করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করে পাঠালেনঃ আমি এখন কি করব? তিনি বললেনঃ তুমি গোসল কর তারপর পট্টি পরে নাও এবং ইহরাম বাঁধ। (সুনান নাসাঈ ২৯১)

৩. আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তখন তাঁর সাথে তার সহধর্মিণী আসমা বিনীত উমায়স খাছ’আমীয়্যাও ছিলেন। যখন তাঁরা যুলহুলায়ফায় ছিলেন, তখন আসমা মুহাম্মদ ইবন আবু বকরকে প্রসব করেন। আবু বকর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ সংবাদ দিলে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বলেন, তাকে গোসল করে হজের ইহরাম বাঁধতে আদেশ করুন। এরপর অন্যান্য লোক যা করে সেও তা করবে। কিন্তু সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। সুনানে নাসঈ ২৬৬৬, ইবনে মাজাহ ২৯১২)

তালবিয়ার ভুলসমূহ

১।  ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ না করাঃ

ইহরাম বাধার সাথে সাথে তালবিয়াহ পাঠ করা সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‌এবং তার সাথীগনও ইহরামের প্রাককালে তালবিয়া পাঠ করছেন। সালফে  সালেহীদের আমলও অনুরূপ। কিন্তু অনেক অজ্ঞতার কারনে ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তালবিয়া পড়ে না। অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া পাঠ করতে ভুলে যান। অথচ ইহরাম বাঁধার পরই বেশি বেশি করে তালবিয়া পাঠ করা উচিত। আবার অনেকে মনে করে তালবিয়া মক্কা গিয়ে পড়তে হয়। তাদের এই ধারনা ভুল। আমাদের সকল মুজতাহীদ আলেমগন যারা হজ্জ পালন করেছেন তারাও তালবীয়া পাঠ করেছেন। তারা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়তেন।

২। দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করাঃ

অনেকে দলবদ্ধভাবে একই স্বরে তালবিয়া পাঠ করে থাকেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশীয়ার হাজীগন দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করে থাকে। তাদের প্রতি দলে একজন করে লীডার গোছের লোক থাকে। যিনি বলার পর সবাই এক থাকে সমস্বরে তারবিয়া বলেন। এরূপ করা ভুল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবাগণ এভাবে তালবিয়া পাঠ করেননি। তবে যদি কারও তালবিয়া মুখস্ত না থাকে সে শুধু শিক্ষার জন্য অন্যের সহযোগিতা নিয়ে তালবিয়া পাঠ করতে পারে। তবে সবার উচিত হজ্জ যাত্রার আগেই গুরুত্ব দিয়ে তালবিয়া মুখস্থ করতে হবে ও বিশুদ্ধভাবে পাঠ করা।

*لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ*

উচ্চারণঃ (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্‌দা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল্‌মুলক, লা শারীকা লাকা)

অর্থঃ তোমার নিকট আমি হাজির হয়েছি, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি, আমি হাজির হয়েছি, তোমার কোন অংশীদার নেই। আমি হাজির হয়েছি, নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামাত এবং রাজত্ব তোমারই। তোমার কোন অংশীদার নেই।

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহ হলো :

১। মাথার চুল মুন্ডন করা বা ছোট করা যাবে  না

২। স্ত্রী সম্ভোগ বা যৌন আকর্ষণে স্পর্শ যাবে নাঃ

৩। স্ত্রীর সাথে সহবাস করা যাবে নাঃ

৪। ইহরাম অবস্থায শিকার করা যাবে নাঃ

৫। অশোভন কাজ বা ঝাগড়া বিবাদ করা যাবে নাঃ

৬। সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে নাঃ

৭। নখ কাটা যাবে নাঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকা যাবে নাঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা মুন্ডল করা যাবে নাঃ

৯। ইহরাম অবস্থায় মহিলারা হাত মুজা ও নেকাপ পরবে নাঃ

১০। সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে নাঃ

১১। বিবাহ করা বা করানো বা বিবাহের পয়গাম পাঠানো যাবে নাঃ

ইহ্‌রাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজগুলির বিস্তরিত বিবরণঃ

১। মাথার চুল মুন্ডন করা বা ছোট করা যাবে  নাঃ

মুহরিম অবস্থায় মাথার চুল মুন্ডন বা ছোট করা যাবে না। এই কথার দলিল মহান আল্লহ কালাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ

অর্থঃ আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। ( সুরা বাকারা ২:১৯৬ )

মন্তব্যঃ এই আয়াতে মাথা মুণ্ডনকে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ইহরাম অবস্থায় চুল ছাটা বা কাটা অথবা মাথা মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ।

ক। কোন কারনে মাথা মুন্ডন করলে ফিদয়া দিতে হবেঃ

তবে অসুস্থতা কিংবা ওযরের কারণে ইহরাম অবস্থায় মাথার চুল ফেলতে বাধ্য হলে কোন পাপ হবে না, তবে তার ওপর ফিদয়া ওয়াজিব হবে।

দলিলঃ মহান আল্লাহ বলেন,

 فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضاً أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ فَإِذَا أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থঃ যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

১. কা‘ব ইবনু ‘উজরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বোধ হয় তোমার এই পোকাগুলো (উকুন) তোমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হাঁ, ইয়া আল্লাহর রাসূল! এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি মাথা মুন্ডন করে ফেল এবং তিন দিন সিয়াম পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে আহার করাও কিংবা একটা বকরী কুরবানী কর। (সহিহ বুখারি ১৮১৪-১৮১৮)

২. আবদুল্লাহ ইবনু মা‘কিল (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কা‘ব ইবনু উজরা-এর নিকট এই কূফার মসজিদে বসে থাকাকালে সওমের ফিদ্য়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আনা হয়। তিনি তখন বললেন, আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরী সংগ্রহ করতে পার? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি তিনদিন সওম পালন কর অথবা ছয়জন দরিদ্রকে খাদ্য দান কর। প্রতিটি দরিদ্রকে অর্ধ সা‘ খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেল। তখন আমার ব্যাপারে বিশেষভাবে আয়াত অবতীর্ণ হয়। তবে তোমাদের সকলের জন্য এই হুকুম। (সহিহ বুখারি ৪৫১৭)

মন্তব্যঃ  মাথা মুণ্ডনের ফিদয়া তিনভাবে দেয়া যায়, (১) ছাগল যবেহ করা (২) তিনটি রোজা রাখা (৩) ছয়জন মিসকীনকে পেট পুরে খাওয়ানো। প্রত্যেক মিসকীনের জন্য অর্ধ সা‘ (এক কেজি ২০ গ্রাম) খাবার। মোট সদকার পরিমাণ হবে ছয় জন মিসকীনের জন্য তিন সা‘ (সাত কেজি ৩০ গ্রাম)। আর পশু যবেহের ইচ্ছা করলে ছাগল বা তার চেয়ে বড় যেকোনো পশু যবেহ করতে হবে। শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তবে পশু যবেহ করার মাধ্যমে ফিদয়ার ক্ষেত্রে এমন ছাগল হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা কুরবানীর উপযুক্ত; যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যাবতীয় ত্রুটি থেকে মুক্ত। 

খ। মাথার কিছু অংশ মুন্ডন করলে ফিদয়া ওয়াজিব নয়ঃ

বিশুদ্ধ মতানুসারে পরিপূর্ণরূপে মাথা মুণ্ডন করা ছাড়া উল্লেখিত ফিদয়া ওয়াজিব হবে না। কেননা পরিপূর্ণ মাথা মুণ্ডন ছাড়া হলক বলা হয় না। তাই মাথার কিছু অংশ মুন্ডন করলে ফিদয়া ওয়াজিব হবে না।

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের অবস্থায় আধ কপালির কারণে তাঁর মাথায় শিঙ্গা লাগান। (সহিহ বুখারি ৫৭০১)

ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত যে, মাথার ব্যথায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ‘লাহয়ী জামাল’ নামের একটি কুয়োর ধারে মাথায় শিঙ্গা লাগান।  (সহিহ বুখারি ৫৭০০)

মন্তব্যঃ মাথায় শিঙ্গা লাগানোর স্থান থেকে অবশ্যই চুল ফেলে দিতে হয়েছে। কিন্তু একারণে তিনি ফিদয়া দিয়েছেন এরকম কোন প্রমাণ নেই।

গ। দেহের অন্য কোন স্থানের লোম বিধানঃ

মাথা ছাড়া দেহের অন্য কোন স্থানের লোম মুণ্ডন করলে অধিকাংশ আলিম তা মাথার চুলের ওপর কিয়াস করে উভয়টিকে একই হুকুমের আওতাভুক্ত করেছেন। কারণ মাথা মুণ্ডন করার ফলে যেমন পরিচ্ছন্নতা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভূত হয়, তেমনি দেহের লোম ফেললেও এক প্রকার স্বস্তি অনুভূত হয়। তবে তারা কিছু ক্ষেত্রে ফিদয়ার কথা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে দমের কথা বলেছেন। বস্তুত এ ক্ষেত্রে দম বা ফিদয়া দেয়া আবশ্যক হওয়ার সপক্ষে কোন শক্তিশালী প্রমাণ নেই। কিন্তু হাজীদের উচিত ইহরাম অবস্থায় শরীরের কোন অংশের চুল বা লোম যেন ছেড়া বা কাটা না হয়। তারপরও যদি কোন চুল পড়ে যায়, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। (হজ উমরা ও জিয়ারত ইসলাম হাউজ.কম)

২। স্ত্রী সম্ভোগ বা যৌন আকর্ষণে স্পর্শ যাবে নাঃ

ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সম্ভোগ করা, নির্লজ্জ কথাবার্তা বলা, যৌন আকর্ষণে স্পর্শ করা বা শরীরের সঙ্গে শরীর লাগানো যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

সুতরাং কোন ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তির জন্য নিজ স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া, কামভাব নিয়ে স্পর্শ করা বা খোঁচা দেয়া বা রসিকতা করা জায়েয নয়। আর মহিলা যদি ইহরাম অবস্থায় থাকে তাহলে তার জন্য স্বামীকে এ ধরণের সুযোগ দেয়াও জায়েয নয়। এমন কি কামভাব নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের দিকে তাকানোও হালাল নয়। কারণ, ইহাও স্পর্শের মতই সম্ভোগের অন্তর্ভুক্ত।

৬.৪.৩। স্ত্রীর সাথে সহবাস করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

আর স্বামী-স্ত্রী মিলন হচ্ছে হাজ্জ ও উমরাহ অবস্থায় সর্বাধিক বড় নিষিদ্ধ কাজ। যার তিনটি অবস্থা হতে পারেঃ

ক। প্রথম অবস্থাঃ আরাফায় অবস্থানের পূর্বে সহবাসঃ

উকুফে আরাফা বা আরাফায় অবস্থানের পূর্বে মুহরিম ব্যক্তির স্ত্রী-সম্ভোগে লিপ্ত হওয়া। এমতাবস্থায় সমস্ত আলিমের মতেই তার হজ বাতিল হয়ে যাবে। তবে তার কর্তব্য হচ্ছে, হজের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীকালে তা কাজা করা। তাছাড়া তাকে দম (পশু কুরবানী) দিতে হবে। পশুটি কেমন হবে এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, তিনি একটি ছাগল যবেহ করবেন। (খালেছুল জুমান ১১৪)। তবে, অন্য ইমামগণের মতে, একটি উট যবেহ করবেন।

ইমাম মালেক রহ. বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি যে, উমর, আলী ও আবূ হুরায়রা রা.-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে মুহরিম থাকা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়েছে। তাঁরা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, সে আপন গতিতে হজ শেষ করবে। তারপর পরবর্তী বছর হজ আদায় করবে এবং হাদী যবেহ করবে। ( মুআত্তা মালেক : ১৩০৭/১)

তিনি বলেন, আলী রা. বলেছেন, পরবর্তী বছর যখন তারা হজের ইহরাম বাঁধবে, তখন হজ শেষ করা অবধি স্বামী-স্ত্রী একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। (প্রাগুক্ত।)

মোটকথা, সর্বসম্মত মত হল, আরাফায় অবস্থানের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করলে হজ বাতিল হয়ে যায়।

খ। দ্বিতীয় অবস্থাঃ আরাফায় অবস্থান ও বড় জামরায় পাথর মারার পর সহবাস করলেঃ

আরাফায় অবস্থানের পরে, বড় জামরায় পাথর মারা এবং হজের ফরয তাওয়াফের পূর্বে যদি সহবাস সংঘটিত হয়, তবে ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, তার হজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু তার ওপর একটি উট যবেহ করা কর্তব্য। এ ব্যাপারে তিনি হাদীসের বাহ্যিক ভাষ্য থেকেই তিনি দলীল গ্রহণ করেছেন। হাদীসে এসেছে الحَجُّ عَرَفَةُ (আল-হাজ্জু আরাফাতু) অর্থাৎ হজ হচ্ছে আরাফা। (আবূ দাউদ ১৯৪৯

পক্ষান্তরে ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমদসহ অধিকাংশ ফকীহর মতে তার হজ ফাসেদ। এ অবস্থায় তাকে দু’টি কাজ করতে হবে।

১. তার ওপর ফিদয়া ওয়াজিব হবে। আর সে ফিদয়া আদায় করতে হবে একটি উট বা গাভি দ্বারা, যা কুরবানী করার উপযুক্ত এবং তার সব গোশত মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে; নিজে কিছুই গ্রহণ করতে পারবে না।

২. সহবাসের ফলে হজটি ফাসিদ বলে গণ্য হবে। তবে এ হজটির অবশিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করা তার কর্তব্য এবং বিলম্ব না করে পরবর্তী বছরেই ফাসিদ হজটির কাযা করতে হবে।

গ। তৃতীয় অবস্থাঃ বড় জামরায় পাথর মারা ও মাথা মুণ্ডনের পরঃ

বড় জামরায় পাথর মারা ও মাথা মুণ্ডনের পর এবং হজের ফরয তাওয়াফের পূর্বে সহবাস সংঘটিত হলে, হজটি সহীহ হিসেবে গণ্য হবে। তবে প্রসিদ্ধ মতানুসারে তার ওপর দু’টি বিষয় ওয়াজিব হবে।

১. একটি ছাগল ফিদয়া দেবেন, যার সব গোশত গরীব-মিসকীনদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। ফিদয়া দানকারী কিছুই গ্রহণ করবে না।

২. হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে নতুন করে ইহরাম বাঁধবেন এবং মুহরিম অবস্থায় হজের ফরয তাওয়াফের জন্য লুঙ্গি ও চাদর পরে নেবেন

মন্তব্যঃ এই মাসায়েলটি “কুরআন ও হাদীছের আলোকে হজ্জ, উমরাহ ও মদীনা যিয়ারত”  শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) কিতার থেকে নকল করা হইয়াছে।

৪। ইহরাম অবস্থায শিকার করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ الْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًا وَاتَّقُواْ اللّهَ الَّذِيَ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সুমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে এবং তোমাদের ইহরামকারীদের জন্যে হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ ইহরাম অবস্থায় থাক। আল্লাহকে ভয় কর, যার কাছে তোমরা একত্রিত হবে। (সুরা মায়েদা ৫:৯৬)

সুতরাং কোন মুহরিম ব্যক্তির জন্য আয়াতে বর্ণিত শিকারী পশু শিকার করা জায়েয নয়, তা সরাসরি হত্যা করা হোক, অথবা তার হত্যার কারণ হওয়া কিংবা ইশারা-ইংগীতের মাধ্যমে হত্যার জন্য সহায্য-সহযোগিতা করা হোক বা তা হত্যার জন্য নিজ অস্ত্র অপর ব্যক্তিকে প্রদান করাই হোক। তবে ইহরাম মুক্ত ব্যক্তি যদি নিজে খাওয়ার জন্য শিকার করে তবে সেই গোশ্ত ইহরাম অবস্থায় খাওয়া যাবে।

১. আবূ কাতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম, এমনকি ‘ক্বাহাহ্’ নামক স্থানে গিয়ে পৌছলাম। আমাদের কতক ইহরাম অবস্থায় এবং কতক ইহরামবিহীন অবস্থায় ছিল। আমি লক্ষ্য করলাম, আমার সঙ্গীরা একটা কিছুর দিকে তাকাচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখলাম, তা একটি বন্য গাধা। অতএব আমি আমার ঘোড়ার জীন বাঁধলাম এবং বল্লম তুলে নিলাম। এরপর ঘোড়ার পিঠে চেপে বসলাম। এ অবস্থায় আমার চাবুক নিচে পড়ে গেল। আমি আমার সঙ্গীদের তা তুলে দিতে বললাম, তারা ইহরাম অবস্থায় ছিল। তাই তারা আল্লাহর শপথ করে বলল, আমরা তোমাকে এ ব্যাপারে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারব না। অতঃপর আমি নিচে নেমে এসে তা তুললাম। অতঃপর ঘোড়ায় চড়ে গাধার পশ্চাদ্ধাবন করলাম। তা ছিল একটি টিলার আড়ালে। আমি বল্লমের আঘাতে এটাকে হত্যা করলাম। অতঃপর আমার সঙ্গীদের কাছে নিয়ে এলাম। তাদের কতক বলল, তা খাও, আর কতক বলল, খেও না। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সম্মুখভাগে ছিলেন। আমি ঘোড়া হাকিয়ে তার নিকট উপস্থিত হলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তা হালাল, অতএব তোমরা তা খাও। (সহিহ মুসলিম ২৭৪১)

২. আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কাতাদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর সকলেই উমরাহ করার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। আমি একটি বন্য গাধা শিকার করলাম এবং আমার মুহরিম সঙ্গীদের এর গোশত খাওয়ালাম। অতঃপর আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অবহিত করলাম যে, শিকারের অবশিষ্ট গোশত আমাদের সাথে আছে। তিনি বললেন, “তোমরা তা খাও”; তখন তারা ছিলেন মুহরিম।আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কাতাদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি ছাড়া আর সকলেই উমরাহ করার জন্য ইহরাম বেঁধেছিলেন। আমি একটি বন্য গাধা শিকার করলাম এবং আমার মুহরিম সঙ্গীদের এর গোশত খাওয়ালাম। অতঃপর আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে অবহিত করলাম যে, শিকারের অবশিষ্ট গোশত আমাদের সাথে আছে। তিনি বললেন, “তোমরা তা খাও”; তখন তারা ছিলেন মুহরিম। (সহিহ মুসলিম ২৭৪৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবনু আবূ কতাদাহ্ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত যে, তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে (সফরে) রওনা হলেন। তারা সবাই ইহরাম অবস্থায় ছিলেন, কিন্তু আবূ কতাদাহ (রাযিঃ) হালাল অবস্থায় ছিলেন। হাদীসের অবশিষ্ট বর্ণনা পূর্ববৎ। তবে এ বর্ণনায় আরও আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এর কিছু গোশত তোমাদের সাথে আছে কি? তারা বললেন, এর পায়ের গোশত আমাদের সাথে আছে। রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নিয়ে আহার করলেন। (সহিহ মুসলিম ২৭৪৮)

৪. সা’ব ইবনু জাসসামাহ আল লায়সী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বন্য গাধা (গোশত) হাদিয়্যাহ (হাদিয়া/উপহার) স্বরূপ দিলেন। আর তিনি তখন আবওয়া অথবা ওয়াদান নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তিনি তার কাছে তা ফেরত পাঠালেন। সা‘ব (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার চেহারা মলিন দেখে বললেন, আমি তোমাকে তা ফেরত দিতাম না, শুধু ইহরামের কারণেই তা ফেরত দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৭৩৫)

৫. জাবির ইবন অবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, স্থলভাগের শিকার করা জন্তুর গোশত তোমাদের জন্য ভক্ষণ করা হালাল, যদি তা তোমরা নিজেরা শিকার না করে থাক অথবা তোমাদের জন্য শিকার না করা হয়। (আবু দাউদ ১৮৫১ ও সুনানে নাসাঈ ২৮২৭, হাদিসের মান যঈফ)

হাদিসটি যঈফ হলেও সুনানে তিরমিজির ৮৪৬ নম্বর সহিহ হাদিসটির সার কথা সাথে এই হাদিসটির মিল আছে। কাজেই হুকুমের দিক থেকে হাদিসটি গ্রহনীয়।

আর যদি কোন মুহরিম ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত কোন শিকারী পশুকে হত্যা করে তাহলে তাকে তার বিনিময় দিতে হবে। এর দলিল হলো কুরআনের আয়াত। মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقْتُلُواْ الصَّيْدَ وَأَنتُمْ حُرُمٌ وَمَن قَتَلَهُ مِنكُم مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنكُمْ هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامُ مَسَاكِينَ أَو عَدْلُ ذَلِكَ صِيَامًا لِّيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ عَفَا اللّهُ عَمَّا سَلَف وَمَنْ عَادَ فَيَنتَقِمُ اللّهُ مِنْهُ وَاللّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامٍ

অর্থঃ মুমিনগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার বধ করো না। তোমাদের মধ্যে যে জেনেশুনে শিকার বধ করবে, তার উপর বিনিময় ওয়াজেব হবে, যা সমান হবে ঐ জন্তুর, যাকে সে বধ করেছে। দু’জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এর ফয়সালা করবে-বিনিময়ের জন্তুটি উৎসর্গ হিসেবে কাবায় পৌছাতে হবে। অথবা তার উপর কাফফারা ওয়াজেব-কয়েকজন দরিদ্রকে খাওয়ানো অথবা তার সমপরিমাণ রোযা রাখতে যাতে সে স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল আস্বাদন করে। যা হয়ে গেছে, তা আল্লাহ মাফ করেছেন। যে পুনরায় এ কান্ড করবে, আল্লাহ তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবেন। আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম। ( সুরা মায়েদা ৫:৯৫ )

 *** এ সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) বলেনঃ

কেউ যদি কোন পায়রাকে হত্যা করে তাহলে তার অনুরূপ হচ্ছে ছাগল। সুতরাং সে ব্যক্তি নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি আদায় করতে পারবে।

(১) একটি ছাগল যবহ করে পায়রার ফিদয়া স্বরূপ গরীব-দরিদ্রদের মাঝে তা বিতরণ করে দিবে,

(২) ছাগলের মূল্য ধরে টাকা দিয়ে খাদ্য দ্রব্য ক্রয় করে প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা’ করে প্রদান করবে। অথবা

(৩) প্রত্যেক মিসকীনের অন্নদানের বিনিময়ে একটি করে সিয়াম রাখবে।

আর গাছ কাটার বিষয়টি ইহরামের কারণে কোন মুহরিম ব্যক্তির প্রতি হারাম হয় না। কেননা ইহা ইহরাম সংক্রান্ত বিধান নয়। তবে যে ব্যক্তি হারামের সীমানার ভিতরে অবস্থান করবে তার প্রতি গাছ কাটা হারাম, সে ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় থাক বা নাই থাক। অতএব আরাফায় মুহরিম ও যে মুহরিম নয় উভয় ব্যক্তির জন্য গাছ কাটা জায়েয। কিন্তু মুজদালিফা এবং মিনায় উভয় শ্রেণীর মানুষের জন্য গাছ কাটা হারাম। (** কিতাবঃ কুরআন ও হাদীছের আলোকে হজ্জ, উমরাহ ও মদীনা যিয়ারত) 

তার এই ফতওয়ার দলিল হলোঃ

কারণ, আরাফা হচ্ছে হারাম সীমানার বাইরে পক্ষান্তরে মুয্দালিফা এবং মিনা হচ্ছে হারাম সীমানার ভিতরে।

ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এ (মক্কা) শহরকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, এর একটি কাঁটাও কর্তন করা যাবে না, এতে বিচরণকারী শিকারকে তাড়া করা যাবে না, এখানে প্রচারের উদ্দেশ্য ব্যতীত পড়ে থাকা কোন বস্তু কেউ তুলে নিবে না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৭ তাওহীদ)

ব্যতিক্রমঃ

১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ এমন চার প্রকার দুষ্ট জন্তু হারাম এবং হারামের বাইরে নিধন করা যায়ঃ চিল (এবং শকুন), কাক, ইঁদুর এবং হিংস্র কুকুর। তিনি (উবায়দুল্লাহ) বলেন, আমি কাসিমকে জিজ্ঞেস করলাম, সাপের বিষয়ে আপনার মত কী? তিনি বললেন, তা হীনভাবে হত্যা করতে হবে। (সহিহ মুসলিম ২৭৫১)

২. আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচটি অনিষ্টকর প্রাণীকে হারামের ভিতর হত্যা করা যায় বিচ্ছু, ইঁদুর, কাক, চিল ও হিংস্ৰ কুকুর। (সহিহ মুসলিম ২৭৫৩)

৩. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পাঁচটি অনিষ্টকর প্রাণী আছে যা হারামের বাইরে ও ভেতরে হত্যা করা বৈধ, সাপ, বুকে বা পিঠে সাদা চিহ্নযুক্ত কাক, ইঁদুর, হিংস্র কুকুর ও চিল। (সুনানে আবু দাউদ ৩০৮৭, তিরমিজি ৮৩৭, নাসাঈ ২৮২৯ হাদিসের মান সহিহ)

যায়দ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবনু উমর (রাযিঃ) এর নিকট জিজ্ঞেস করল, মুহরিম ব্যক্তি কোন কোন জন্তু হত্যা করতে পারে? তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জনৈকা সহধর্মিণী বলেছেন যে, তিনি হিংস্র কুকুর, ইঁদুর, বিচ্ছু, চিল, কাক ও সাপ হত্যা করার নির্দেশ দিতেন।এমনকি সালাতরত অবস্থায়ও তা হত্যা করা যায়। (সহিহ মুসলিম ২৭৬১)

অশোভন কাজ বা ঝাগড়া বিবাদ করা যাবে নাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ

অর্থঃ অর্থঃ হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থঃ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।  (সুরা বাকারা ২:১৯৭ )

১. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হাজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। সহিহ বুখারি ১৫২১, ১৮১৯)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এ ঘরের (বাইতুল্লাহর) হাজ্জ আদায় করল, অশ্লীলতায় জড়িত হল না এবং আল্লাহর অবাধ্যতা করল না, সে মায়ের পেট হতে সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় (হাজ্জ হতে) প্রত্যাবর্তন করল। (সহিহ বুখারি ১৮২০)

সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে নাঃ

সেলাই যুক্ত জামা, পায়জামা, টুপি এবং মোজা পরবে না, এই সম্পর্কি বিস্তারিত পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার শেষে একটি সারসংক্ষেপও তুলে ধরেছিলাম। এখান আর আলোচনা না করে, সেই সারসক্ষেপ কথাগুলোই তুলে ধরলাম।

ইহরাম বাধার পর যে নিয়মে পোশাক পরিধান হবে তা নিম্মরূপঃ

১। মুহরিম ব্যক্তি জামা এবং পায়জামা পরিধান করতে পারবে না।

২। মুহরিম ব্যক্তি মাথায় পাগড়ী বা টুপি পরিধান করতে পারবে না।

৩। হাতে ও পায়ে মুজা ব্যবহার করতে পাবরে না তবে চপ্পল ব্যবহার করতে পারবে।

৪।  মুহরিম নারী মুখ ঢাকবে না এবং হাত মোজাও পরবে না।

৫।  মুহরিম নারীদের বুরনুস (টুপির মত এক প্রকার কাপড় যা মহিলারা পরিধান করে) পরিধান করতে পারবে না।

৬। জাফরান বা ওয়ারস রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরিধান করা যাবে না

৭। মুহরিম চুল আঁচড়াবে না, শরীর চুলকাবে না।

মন্তব্যঃ এই সকল বিষয় বিবেচনা করে হজ্জযাত্রীগন সেলাই বিহীন দুটি সাদা চাদরের মত কাপড় ব্যবহার করে। আর মহিলাগন সুবিধামত সাবলিল পোশাক পরিধান করে থাকে।

নখ কাটা যাবে নাঃ

ইহরাম নখ কাটা যাবে না বিষয়টি সরাসরি কুর্‌আন সুন্নাহে উল্লেখ নাই। ইহরামের অবস্থায় নখ কাটা বা নখ উঠিয়ে ফেলার বিষয়টি মুজতাহীদ আলেমগণের প্রসিদ্ধ মতে মাথা মুণ্ডনের উপর ক্বিয়াস করা হয়েছে। (যা সূরাহ্ বাক্বারার আয়াত নং ১৯৬ তে উল্লেখিত হয়েছে)। হাতের নখ এবং পায়ের নখের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে যদি কোন একটি নখ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে কষ্ট অনুভব হয় তাহলে কষ্টদায়ক অংশটুকু কেটে ফেলে দিলে কোন অসুবিধা নেই এবং তাতে কোন ফিদয়াও লাগবে না।

তবে শুধু হাজ্জি নয় যারা সাধারণ কুরাবানীর নিয়ত করবে তারাও নখ কাটবে। এই মর্ম বহু সহিহ হাদিস আছে। যেমনঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

৮। ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকা যাবে নাঃ

১. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক (মুহরিম) ব্যক্তি মারা গেল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (সাহাবাদেরকে) বললেনঃ তাকে কুল পাতার পানি দ্বারা গোসল করাও এবং তার কাপড়েই তাকে কাফন দাও। তার মাথা ও মুখমন্ডল ঢাকবে না। কেননা তাকে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠানো হবে। (সুননে নাসাঈ ২৭১৪ হাদিসের মান সহিহ)

২. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক মুহরিম ব্যক্তি উট থেকে পড়ে যাওয়ায় তার ঘাড় ভেঙ্গে গেল এবং সে মারা গেল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বলেনঃ তাকে কুল পাতার পানি দ্বারা গোসল দাও এবং ( ইহরামের) দু’কাপড় দিয়েই তাকে দাফন দাও। এরপর তিনি বলেনঃ তার মাথা কাফনের বাইরে থাকবে। আর তার গায়ে খুশবু লাগাবে না। কেননা সে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে। শুবা (রাঃ) বলেনঃ আমি দশ বছর পর তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ঐ হাদীস বর্ণানা করলেন, যেমন পূর্বে তিনি বর্ণনা করতেন। কিন্তু তাতে তিনি বললেন; তার চেহারা এবং মাথা ঢাকবে না। (সুননে নাসাঈ ২৮৫৪ হাদিসের মান সহিহ)

. ইহরাম অবস্থায় মহিলারা হাত মুজা ও নেকাপ পরবে নাঃ

মহিলারা তাদের মাথা আবৃত রাখবে। তাছাড়া তারা ইহরাম অবস্থায় যেকোনো ধরনের পোশাকই পরতে পারবে। তবে অত্যধিক সাজ-সজ্জা করবে না। ইহরাম অবস্থায় তাদের জন্য যা নিষিদ্ধ তা হচ্ছে হাত মুজা ও নেকাপ।

দলিলঃ

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইহরাম অবস্থায় আপনি আমাদেরকে কী ধরনের কাপড় পরতে আদেশ করেন? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জামা, পায়জামা, পাগড়ী ও টুপী পরিধান করবে না। তবে কারো যদি জুতা না থাকে তাহলে সে যেন মোজা পরিধান করে তার গিরার নীচ হতে এর উপরের অংশটুকু কেটে নিয়ে তোমরা যাফরান এবং ওয়ারস্ লাগানো কোন কাপড় পরিধান করবে না। মুহরিম মহিলাগণ মুখে নেকাব এবং হাতে হাত মোজা পরবে না। মূসা ইবনু ‘উকবাহ, ইসমা‘ঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু ‘উকবাহ, জুওয়ায়রিয়া এবং ইবনু ইসহাক (রহ.) নিকাব এবং হাত মোজার বর্ণনায় লায়স (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। ‘উবাইদুল্লাহ (রহ.) وَلاَ الْوَرْسُ এর স্থলে وَلاَ وَرْسُ বলেছেন এবং তিনি বলতেন, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব ও হাত মোজা ব্যবহার করবে না। মালিক (রহ.) নাফি‘ (রহ.)-এর মাধ্যমে ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইহরাম বাঁধা মেয়েরা নিকাব ব্যবহার করবে না। লায়স ইবনু আবূ সুলায়ম (রহ.) এ ক্ষেত্রে মালিক (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৮৩৮)

মন্তব্যঃ এমনভাবে মুখ ঢাকবে যাতে সহজেই সে আবরণ উঠানো যায় এবং নামানো যায়। পর পুরুষের সামনে মুখ ঢেকে রাখবে। কারণ, মাহরাম ছাড়া পর-পুরুষের সামনে মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করা মহিলাদের জন্য বৈধ নয়।

১০সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে নাঃ

ইহরামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকালে গোসল করা, সুগন্ধি মাখার নিয়মগুলি পালন করতে হবে। ইহরামের কাপড় পরিধানের পর সুগন্ধি মাখা চলবে না। ইহরামের নিয়ত করার পূর্বে মাখা সুগন্ধি মুহরিমের চেহারায় দৃশ্যমান হতে পারে বা তা থেকে সুগন্ধ আসতে পারে। ইহ্‌রাম থেকে মুক্ত হওয়ার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চলবে। পূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাই দলিল হিসাবে মাত্র তিনটি হাদিস উল্লেখ করেছি।

১। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইহরাম বাধার সময় এবং (হজ্জ সমাপনান্তে) ইহরামমুক্ত হওয়ার পর বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পুর্বেও আমি তাঁকে সুগন্ধি মেখে দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ২৬৯৫ ইফাঃ)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৮ তাওহীদ)

৩। নবী সহধর্মিণী ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইহ্‌রাম বাঁধার সময় আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গায়ে সুগন্ধি মেখে দিতাম এবং বায়তুল্লাহ তাওয়াফের পূর্বে ইহ্‌রাম খুলে ফেলার সময়ও। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ইহ্‌রাম বাঁধা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সিঁথিতে যে সুগন্ধি তেল চকচক করছিল তা যেন আজও আমি দেখতে পাচ্ছি। (সহিহ বুখারি ১৫৩৯ তাওহীদ)

১১বিবাহ করা বা করানো বা বিবাহের পয়গাম পাঠানো যাবে নাঃ

১. উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইহরাম অবস্থায় কোন ব্যক্তি নিজে বিবাহ করবে না, অন্যকেও বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাবও দিবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৯৬৬)

২. নুবাইহ ইবনু ওয়াহব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ইবনু মামার তার (ইহরামধারী) ছেলেকে বিয়ে করাতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি আমাকে আমীরুল হজ্জ আবান ইবনু উসমানের নিকট পাঠালেন। তাঁর নিকট এসে আমি বললাম, আপনার ভাই তাঁর ছেলেকে বিয়ে করাতে চান। এই বিষয়ে তিনি আপনাকে সাক্ষী রাখতে চান। তিনি বললেন, আমি দেখছি সে তো এক মূৰ্খ বেদুঈন! ইহরামধারী ব্যক্তি না নিজে বিয়ে করতে পারে আর না অন্যকে বিয়ে করাতে পারে, অথবা এরকমই বলেছেন। নুবাইহ বলেন, এরপর তিনি হাদীসটিকে উসমান (রাঃ)-এর মারফতে মারফূভাবে বর্ণনা করেছেন।(তিরমিজ ৮৪০, আবু দাউদ ১৮৪১)

৩. ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত একটি শায হাদিসে আছে তিনি বলেন, মায়মূনা বিনতুল হারিস কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় বিবাহ কলেন। এটি একটি শায হাদিস এর বিপরীতে একাধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনায় দেখা যায় তিনি ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করেন নাই।

মাইমূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাকে বিয়ে করেন তিনি তখন ইহরামমুক্ত অবস্থায় ছিলেন এবং একই অবস্থায় তিনি তার সাথে বাসর যাপন করেন। পরবর্তী কালে মাইমূনা (রাঃ) সারিফেই মারা যান এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাথে যে ঝুপড়িতে (কুঁড়ে ঘরে) বাসর যাপন করেন আমরা তাকে সেই স্থানেই দাফন করি। তিরমিজি ৮৪৫, সহীহ, ইবনু মা-জাহ (১৯৬৪)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করেন। (ইবনু মাজাহ ১৯৬৪)

মায়মূনা বিনতুল হারিস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হালাল (ইহরামমুক্ত) অবস্থায় বিবাহ করেন। রাবী ইয়াযীদ ইবনু আসম্ম বলেন, মায়মূনা (রাঃ) ছিলেন আমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর খালা। (ইবনে মাজাহ ২৯৬৪, আবূ দাউদ ১৮৪৩)

মন্তব্যঃ কাজেই ইহরামে থাকা কালে মুহরিম কোন অবস্থায়‌ই বিবাহ করতে পারবে না।

১২ইহরামের ফিদয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়াঃ


ক। ভুলে বা বাধ্য হয়ে কিংবা নিদ্রিত অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজে গুনাহ হবে নাঃ

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজে যদি ভুলে বা বাধ্য হয়ে কিংবা নিদ্রিত অবস্থায় করে তবে কোন গুনাহ হবে না। তার ওপর কোন কিছু ওয়াজিবও হবে না।

দলিলঃ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٞ فِيمَآ أَخۡطَأۡتُم بِهِۦ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوبُكُمۡۚ﴾

‘আর এ বিষয়ে তোমরা কোন ভুল করলে তোমাদের কোন পাপ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকলে (পাপ হবে)।(সুরা আহযাব ৩৩:৫)

অন্য এক আয়াতে এসেছে,

﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ﴾

‘হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।’(সুরা বাকারা ২:২৮৬)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿ مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلۡكُفۡرِ صَدۡرٗا فَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٦ ﴾

অর্থঃ যে ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করেছে এবং যারা তাদের অন্তর কুফরী দ্বারা উন্মুক্ত করেছে, তাদের ওপরই আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা আযাব। ওই ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরী করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত। (সুরা নাহল ১৬:১০৬)

১. আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, (২) অসুস্থ (পাগল) ব্যক্তি, যতক্ষণ না আরোগ্য লাভ করে এবং (৩) অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না বালেগ হয়।(সুনানে আবু দাউদ ৪৩৯৮)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা যেনার অপরাধে জনৈকা উম্মাদিনীকে ধরে এনে উমার (রাঃ)-এর নিকট হাযির করা হয়। তিনি এ ব্যাপারে লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাকে পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ সময় আলী (রাঃ) তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন এর কি হয়েছে? উপস্থিত লোকেরা বললো, সে অমুক গোত্রের উম্মাদিনী (পাগল মহিলা), সে যেনা করেছে। উমার (রাঃ) তাকে পাথর মেরে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে ফিরে যাও। অতঃপর তিনি উমারের নিকট এসে বললে, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আপনি কি জানেন না, তিন ধরণের লোকের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছেঃ (১) পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়, (২) নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয় এবং (৩) নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না বালেগ হবে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। আলী (রাঃ) বলেন, তাহলে তাকে পাথর মারা হবে কেন? তিনি বলেন, কোনো কারণ নেই। আলী (রাঃ) বলেন, তবে তাকে ছেড়ে দিন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন এবং ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। (সুনানে আবু দাউদ ৪৩৯৯)

মন্তব্যঃ উপরের আয়াত ও হাদীস থেকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মাণ হয় যে, উপর্যুক্ত অবস্থায় যদি কারো ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয় সংঘটিত হয়ে যায়, তবে তা হুকুম ও শাস্তির আওতাভুক্ত হবে না। বরং তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তবে যখন উযর দূর হবে এবং অজ্ঞাত ব্যক্তি জ্ঞাত হবে, বিস্মৃত ব্যক্তি স্মরণ করতে সক্ষম হবে, নিদ্রিত ব্যক্তি জাগ্রত হবে, তৎক্ষণাৎ তাকে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে হবে এবং দূরে রাখতে হবে। উযর দূর হওয়ার পরও যদি সে ওই কাজে জড়িত থাকে, তবে সে পাপী হবে এবং যথারীতি তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে।

খ। নিষিদ্ধ বিষয় উযর সাপেক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত করলে ফিদয়া দিতে হবেঃ

 নিষিদ্ধ বিষয় উযর সাপেক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত করা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে পাপী হবে না, তবে তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَلَا تَحۡلِقُواْ رُءُوسَكُمۡ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ ٱلۡهَدۡيُ مَحِلَّهُۥۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوۡ بِهِۦٓ أَذٗى مِّن رَّأۡسِهِۦ فَفِدۡيَةٞ مِّن صِيَامٍ أَوۡ صَدَقَةٍ أَوۡ نُسُكٖۚ ﴾

‘আর তোমরা তোমাদের মাথা মুণ্ডন করো না, যতক্ষণ না পশু তার যথাস্থানে পৌঁছে। আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা তার মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে তবে সিয়াম কিংবা সদাকা অথবা পশু জবাইয়ের মাধ্যমে ফিদয়া দেবে।(সুরা বাকারা ২:১৯৬।

গ। নিষিদ্ধ বিষয় বৈধ কোন উযর ছাড়া সংঘটিত করলে হজ্জ বাতিল বা ফিদয়া ওয়াজিব হবেঃ

নিষিদ্ধ বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে বৈধ কোন উযর ছাড়া সংঘটিত করা। এ ক্ষেত্রে তাকে ফিদয়া প্রদান করতে হবে এবং সে পাপীও হবে। কোন অপরাধের দরুণ কী ফিদয়া দিতে হবে, এ সম্পর্কিত শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া উল্লেখ করছি।  তিনি লিখেন, ফিদয়ার ক্ষেত্রে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজসমূহ চার ভাগে বিভক্তঃ

ক। এমন নিষিদ্ধ কাজ যা করে ফেললে তাতে কোন ফিদয়া ওয়াজিব হবে না। আর তা হল নিজে বিবাহ করা কিংবা অপরের বিবাহের ওলী (অভিভাবক) বা উকীল হয়ে বিবাহ করানো।

খ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে উঁটের কুরবানী করা। আর তা হাজ্জের অবস্থায় প্রাথমিক হালাল হওয়ার পূর্বে সহবাসের কারণে ওয়াজিব হয়।

গ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে তার বিনিময় বা বিনিময়ের মূল্য। আর তা হলো, ইহরাম অবস্থায় শিকার করা।

গ। এমন নিষিদ্ধ কাজ যার ফিদয়া হচ্ছে সিয়াম পালন করা বা মিসকীনকে সাদকাহ করা কিংবা কুরবানী করা। যেমন উপরে মাথামুণ্ডনের ফিদয়ার বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর আলিমগণ উপরোক্ত তিনটি নিষিদ্ধ কাজ ছাড়া অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজগুলিকে মাথামুণ্ডনের ফিদয়ার উপর কিয়াস করেছেন।

ইহরামের অবস্থায় যে সকল কাজ করা যায়

ইহরামের অবস্থায় যে সকল কাজ করা যায়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহরামের অবস্থায় নিচের কাজসমূহ করা যায়

১। পুরুষ লুঙ্গি না পেলে পায়জামা পরতে পারবেঃ

২। জুতা না পেলে চামড়ার মোজা পরতে পারবেঃ

৩। লুঙ্গিতে গিরা বা ফিতা দিয়ে বাঁধা যাবেঃ

৪। গোসল করা, মাথা ধোয়া যাবে

৫। প্রয়োজন বোধে মাথা চুলকানো যাবেঃ

৬। প্রয়োজনে মহিলাদের মুখমন্ডলের উপর ওড়না ঝুলাতে পারবেঃ

৭। প্রয়োজনে মহিলাদের হস্তদ্বয় বস্ত্র বা অন্য কিছু দিয়ে ঢাকা যাবেঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় পাপড় ধৌত করা বা বদলানো যাবেঃ।

৯। শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা।

১০। জরুরী জিনিস পড়তে বা রাখতে পরবেঃ

১১। শিঙ্গা লাগাতে পারবেঃ

১২। মিসওয়াক বা ব্রাস ব্যবহার করতে পারবেঃ

১৩। ব্যবসা করতে পারবে।

১৪। মাথার সাথে মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করাঃ

১৫। ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণী হত্যা করা যাবেঃ

১৬। আরও কিছু কাজ যা মুহরিম ব্যক্তি করেত পারেঃ

পুরুষ লুঙ্গি না পেলে পায়জামা পরতে পারবেঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তাঁর ভাষণে বলতে শুনেছি, মুহরিম ব্যক্তির কাপড় না থাকলে সে পায়জামা পরতে পারবে এবং তার চপ্পল না থাকলে সে মোজা পরতে পারবে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৪, সুনানে নাসাঈ ২৬৭৩)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যার কাপড় নেই সে পায়জামা পরিধান করতে পারে, আর যার চপ্পল নেই সে মোজা পরতে পারে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৭)

মন্তব্যঃ এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায ওজরের কারনে জামা ও পায়জামা পড়া যায়। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক কালে মানুষের সামর্থ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তাদের নিকট জামা ও পায়জামা পরিবর্তে সেলাই বিহীন ইহরামের কাপড় যোগার করা খুবই সহজ্জ সাধ্য। তাই এখন মনে হয় আর কারো সেলাই যুক্ত ইহরামের কাপড় পরিধান করা চিন্তাও আসে না।

জুতা না পেলে চামড়ার মোজা পরতে পারবেঃ

সালিম (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মুহরিম ব্যক্তি কিরূপে কাপড় পরিধান করবে। তিনি বলেছিলেনঃ মুহরিম ব্যক্তি পরিধান করবে না জামা, বুরনুস, (টুপিম মত মেয়েরা পরিধান করে), পাজামা, পাগড়ী এবং ঐ সকল কাপড়, যা যাফরান বা ওয়ারস দ্বারা রং করা হয়েছে। আরও পরিধান করবে না মোজা। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যার জুতা না থাকে। যদি জুতা না পায় তাহলে নিম্ন পর্যন্ত মোজা কেটে তা পরিধান করবে। সুনানে নাসাঈ ২৬৬৯)

লুঙ্গিতে গিরা বা ফিতা দিয়ে বাঁধা যাবেঃ

লুঙ্গিতে গিরা দিয়ে বাঁধা যাবে কিংবা সূতা, ফিতা বা রশি জাতীয় কিছু দিয়ে বাঁধা যাবে। ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে, জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করা। দলিলঃ

সালিম (রহঃ) হতে তার পিতার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলো, মুহরিম ব্যক্তি কি ধরনের কাপড় পরিহার করবে? তিনি বললেনঃ মুহরিম ব্যক্তি জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ী, জাফরান অথবা ওয়ারাস মাখা কোন কাপড় ও মোজা পরবে না। তবে যার জুতা নেই সে মোজা পরতে পারবে। কিন্তু মোজা দু’টি সে এমনভাবে কেটে নিবে যাতে তা গোছাদ্বয়ের নীচে থাকে। (সুনানে  আবু দাউদ ১৮২৩)

আলেমগণ এ পাঁচটি পরিধেয়কে একত্রে ‘مخيط’ (মাখিত অর্থ- সেলাইকৃত) বলে থাকেন। অনেক সাধারণ মানুষ مخيط (সেলাইকৃত) বলতে যে পোশাকে خياطة (সেলাই) আছে সেটা বুঝে থাকে। আসলে বিষয়টি এমন নয়। বরং এর দ্বারা আলেমগণ উদ্দেশ্য করে থাকেন এমন পোশাক যা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবয়ব অনুযায়ী কেটে তৈরী করা হয়েছে; যেমন- জামা, পায়জামা। এটাই তাদের উদ্দেশ্য। তাইতো কোন মুহরিম যদি তালি দেয়া চাদর পরিধান করে কিংবা তালি দেয়া লুঙ্গি পরিধান করে তাতে কোন অসুবিধা নেই।  অথচ তিনি যদি সেলাইবিহীন জামা পরিধান করে সেটা হারাম হবে।

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে (হাজ্জের উদ্দেশে) মাদ্বীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা‘দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। যিলহাজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা‘য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহরাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হাজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা‘বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা‘য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয।(সহিহ বুখারি ১৫৪৫)

গোসল করা, মাথা ধোয়া যাবে

‘আবদুল্লাহ ইবনু হুনায়ন (রহ.) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবাওয়া নামক জায়গায় ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ)-এর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, মুহরিম ব্যক্তি তার মাথা ধুতে পারবে আর মিসওয়ার (রাঃ) বললেন, মুহরিম তার মাথা ধুতে পারবে না। এরপর ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আমাকে আবূ আইউব আনসারী (রাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আমি তাঁকে কুয়া হতে পানি উঠানো চরকার দু’ খুঁটির মধ্যে কাপড় ঘেরা অবস্থায় গোসল করতে দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, কে? বললাম, আমি ‘আবদুল্লাহ ইব্ন হুনায়ন। মুহরিম অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে তাঁর মাথা ধুতেন, এ বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন। এ কথা শুনে আবূ আইউব (রাঃ) তাঁর হাতটি কাপড়ের উপর রাখলেন এবং সরিয়ে দিলেন। ফলে তাঁর মাথাটি আমি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তিকে, যে তার মাথায় পানি ঢালছিল, বললেন, পানি ঢাল। সে তাঁর মাথায় পানি ঢালতে থাকল। অতঃপর তিনি দু’ হাত দিয়ে মাথা নাড়া দিয়ে হাত দু’খানা একবার সামনে আনলেন আবার পেছনের দিকে টেনে নিলেন। এরপর বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এরকম করতে দেখেছি।(সহিহ বুখারি ১৮৪০)

নাফি‘ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) যুল-হুলাইফায় ফজরের সালাত শেষ করে সওয়ারী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিতেন, প্রস্তুত হলে আরোহণ করতেন। সওয়ারী তাঁকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি সোজা কিবলামুখী হয়ে হারাম শরীফের সীমারেখায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকতেন। এরপর বিরতি দিয়ে যূ-তুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে ভোর পর্যন্ত রাত যাপন করতেন এবং অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করে গোসল করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করে ছিলেন। ইসমা‘ঈল (রহ.) গোসল সম্পর্কিত বর্ণনায় আইয়ূব (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৩)

৫। প্রয়োজন বোধে মাথা চুলকানো যাবেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, মুহরিম ব্যক্তি গোসলখানায় প্রবেশ করতে পারবে। ইবনু ‘উমার এবং ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) মুহরিম ব্যক্তির শরীর চুলকানোতে কোন দোষ আছে বলে মনে করেন না। (সহিহ বুখারি ১৮৪০ নম্বর হাদিসের ভুমিকায়)

প্রয়োজনে মহিলাদের মুখমন্ডলের উপর ওড়না ঝুলাতে পারবেঃ

ইহরাম অবস্থায় নারীদের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে নেকাব। নেকাব হচ্ছে এমনভাবে মুখ ঢাকা যাতে চোখ দুটো ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। অনুরূপভাবে স্কার্ফ পরাও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় নারীগণ নেকাব বা স্কার্ফ পরবে না। নারীর মুখ খোলা রাখা শরিয়তসঙ্গত। তবে বেগানা পুরুষের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে মুখ ঢেকে নিবে। যে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকবে সেটা যদি মুখ স্পর্শ করে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

দলিলঃ ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ইহরাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ারস্ ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) (ইহরাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলঙ্কার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইবরাহীম (নাখ্‘য়ী) (রহ.) বলেন, (ইহরাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

৭। প্রয়োজনে মহিলাদের হস্তদ্বয় বস্ত্র বা অন্য কিছু দিয়ে ঢাকা যাবেঃ

‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইহরাম অবস্থায় নারীদের হাত মোজা ও মুখমন্ডলের নিকাব ঝুলাতে এবং ‘ওয়ারস’ ঘাস ও জাফরান মিশ্রিত কাপড় পরতে নিষেধ করতে শুনেছেন। তবে এগুলো বাদে অন্য কাপড় পরতে পারবে, যদিও তা রেশমী, কারুকার্য খচিত পায়জামা বা জামা কিংবা মোজা হয়। (সুনানের আবু দাইদ ১৮২৭)

৮। ইহরাম অবস্থায় পাপড় ধৌত করা বা বদলানো যাবেঃ।

ইহরাম অবস্থায় যেমন গোসল করা যাবে ঠিক তেমনিভাবে ইহরামের কাফড় ময়লা বা ঘর্মে সিক্ত তা ধৌত করা বা বদলানো যাবে।

দলিলঃ আয়িশাহ্ (রাযি.) ইহরাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ারস্ ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) (ইহরাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলঙ্কার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইবরাহীম (নাখ্‘য়ী) (রহ.) বলেন, (ইহরাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

৯। শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা।

ইহরাম অবস্থায় অশ্লীল কথা বর্তা বলা যাবে না। কারে সাথে ঝগড়া বিদাদে জড়ান যাবে। কিন্তু শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা যাবে।  ইহার ফলে ইহরাম ভঙ্গ হবে না।

দলিল দিবঃ

১০। জরুরী জিনিস পড়তে বা রাখতে পরবেঃ

জরুরী জিনিস বলেত বুঝায় টাকা পয়সা, পাচপোর্ট, পাচপোর্ট রাখার ব্যাগ, মিসওয়াক, হালকা ব্যাগ, মোবাইল, মোবাইল রাখার ব্যাগ ইত্যাদি তার সাথে রাখানে ইহরামের কোন প্রকার ক্ষতিহবে।

১১। শিঙ্গা লাগাতে পারবেঃ

মুহরিম ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগাতে পারবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের অবস্থায় আধ কপালির কারণে তাঁর মাথায় শিঙ্গা লাগান। (সহিহ বুখারি ৫৭০১)

২. সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ্ (রহ.) বলেন, আমর (বিন দিনার) বলেছেন যে, আমি সর্বপ্রথম ‘আতা ইবনু আব্বাস-কে বলতে শুনেছি তা হলো তিনি বলেছেন যে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় রক্তমোক্ষম (সিঙ্গা) লাগিয়েছিলেন।(সহিহ বুখারি ১৮৩৫)

৩. ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত যে, মাথার ব্যথায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ‘লাহয়ী জামাল’ নামের একটি কুয়োর ধারে মাথায় শিঙ্গা লাগান।  (সহিহ বুখারি ৫৭০০)

১২মিসওয়াক বা ব্রাস ব্যবহার করতে পারবেঃ

ইহরাম অবস্থায় মিসওয়াক করা যাবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শর্তহীনভাবেই বেশি বেশি মিসওয়াক করতে উদ্বুব্ধ করেছেন।

১. আবূ হুরায়য়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের উপর যদি কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে আমি তাদেরকে মিস্ওয়াক করার হুকুম করতাম। (সহিহ মুসলিম ৭২৪০)

২. আমর ইবনু সুলাইম আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাযি.) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুমু‘আহর দিন প্রত্যেক বালিগের জন্য গোসল করা কর্তব্য। আর মিস্ওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।(সহিহ বুখারি ৮৮০)

মন্তব্যঃ মিসওয়াকের স্থলে এ জাতীয় অন্য কিছু দিয়ে দাঁত মাজা যাবে। যেমনঃ ব্রাশ দিয়ে অনেকে দাঁত মেজে থাকে। এই ব্রাস ব্যবহারেরও অবকাশ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ টুটপেষ্টে সুগন্ধি থাকে, এর বিধান কি? এই সুগন্ধি যুক্ত টুটপেষ্ট ব্যবহারে কোন অসুবিধান নাই। কেননা এর দ্বারা সুবাস পেতে কেউ ব্যাবহার করে না।। কিন্তু যদি কেউ কোন প্রকার সুবাস পেতে এই সুগন্ধি ব্যবহার করে থাকে, তবে জায়েয হবে না।

১৩ব্যবসা করতে পারবে।

ইহরাম অবস্থায় ব্যবসা করা যাবে। তবে ব্যবসার নিয়তে হজ্জে গেলে হজ্জ হবে না। হজ্জেন নিয়ত থাকবে মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টি অর্জনের জন্য তার আদেশ পালন করা। এর পর হজ্জে গিয়ে কোন প্রকার ব্যবসা সুযোগ আসলে তা গ্রহন করা জায়েয।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ لَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَبۡتَغُواْ فَضۡلٗا مِّن رَّبِّكُمۡۚ﴾

অর্থঃ তোমাদের ওপর কোন পাপ নেই যে, তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ অনুসন্ধান করবে।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহিলী যুগে যুল-মাজায ও ‘উকায লোকেদের ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। ইসলাম আসার পর মুসলিমগণ যেন তা অপছন্দ করতে লাগল, অবশেষে এ আয়াত নাযিল হলঃ ‘হাজ্জের মৌসুমে তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোন পাপ নেই’- (আল-বাকারাঃ ১৯৮)। (সহিহ বুখারি ১৭৭০, ২০৯৮)

তাফসিরে আহসানুল বয়ানে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়ছেঃ

فَضل (অনুগ্রহ) এর অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থাৎ, হজ্জের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্য করাতে কোন দোষ নাই। অবশ্য আসল উদ্দেশ্য হজ্জই হতে হবে। আসল উদ্দেশ্য ব্যবসা হলে হজ্জ হবে না। অন্য সকল তাফসিরেও এই আয়াতে ‘অনুগ্রহ’ দ্বারা ব্যবসায়িক মুনাফা বুঝানো হয়েছে।

১৪। মাথার সাথে মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করাঃ

মাথার সাথে লেপটে যায় বা সম্পূর্ণ মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করা যাবে। যেমনঃ ছাতা, গাড়ির হুড, তাঁবু ইত্যাদি ব্যবহার করা।

দলিলঃ

উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বিদায় হাজ্জ করেছি এবং আমি দেখেছি, তিনি জামরাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপ করে সওয়ারীতে চড়ে ফিরে আসেন এবং তার সাথে ছিলেন বিলাল ও উসামাহ্ (রাঃ)। তাদের একজন উটের লাগাম ধরে তা টেনে নিচ্ছিলেন এবং অপরজন সূর্যের তাপের কারণে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথার উপরকাপড় ধরে রাখছিলেন। উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) আরো বলেন, রসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক কথা বললেন। এরপর আমি তাঁকে বলতে শুনেছিঃ যদি নাক-কান কাটা কোন কাফ্রী (কালো) ক্রীতদাসকেও তোমাদের নেতা নিয়োগ করা হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করে, তবে তার (নির্দেশ) শোন এবং আনুগত্য কর। (সহিহ মুসলিম ৩০২৯ হাদিস একাডেমি)

১৫। ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণী হত্যা করা যাবেঃ

ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণীকে শিকার-জন্তু হিসেবে গণ্য করা হবে না। সুতরাং হারাম শরীফের এলাকা কিংবা অন্য যেকোনো স্থানে মুহরিম বা হালাল ব্যক্তি, সকলের জন্য তা হত্যা করা বৈধ।

হাদিসে মুহরিম ব্যক্তি সাপ, বিচ্ছু, ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, চিল, পাগলা কুকুর, হিংস্র পশু ইত্যাদি হত্যা করা বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলিলঃ

১. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণী এত ক্ষতিকর যে, এগুলোকে হারামের মধ্যেও হত্যা করা যেতে পারে। (যেমন) কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও হিংস্র কুকুর। (সহিহ বুখারি ১৮২৯)

২. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণীকেইহরাম অবস্থায় মারলে কোন পাপ হবে না। সেগুলো হলো- চিল, ইঁদুর, দংশনকারী কুকুর, বিচ্ছু এবং কাক। (সুনানে নাসাঈ ২৮৩২)

৩.আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ইহরামধারী ব্যক্তি আক্রমণকারী হিংস্র জীব, হিংস্ৰ কুকুর, ইদুর, বিছা, চিল ও কাক হত্যা করতে পারে। (তিরমিজি ৮৩৮)

১৬। আরও কিছু কাজ যা মুহরিম ব্যক্তি করেত পারেঃ

উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো ছাড়াও নিম্মের কাজগুলো ইহরাম অবস্থায় করা মুহরিমের জন্য অনুমতি রয়েছ।

১. সুগন্ধিযুক্ত ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করতে পারবে।

২। পোষা প্রাণী যবেহ করতে পারবে। কারণ, এটি শিকারের আওতায় পড়ে না। যেমন, হাঁস, মুরগী ও ছাগল ইত্যাদি।

৩।  চশমা, ঘড়ি বা আংটি পরা কিংবা শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে। এমনি আয়নায় মুখ দেখাও যাবে।

৪।  স্বাভাবিকভাবে মাথার চুল আচড়ানো বা চুলকানো পারবে তবে এমন জোরে চিরুনি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত সাধারণত যাতে চুল পড়ে।

৫. মাথায় আসবাব-পত্র বহন করা, যদিও তা মাথার কিছু অংশ ঢেকে রাখে। কারণ, সাধারণত এর মাধ্যমে কেউ মাথা আবৃত করার উদ্দেশ্য করে না, বরং বোঝা বহন করাই মূল উদ্দেশ্য থাকে।

৬. পানিতে ডুব দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই, যদিও এর ফলে সম্পূর্ণ মাথা আবৃত হয়ে যায়।

৭. পরিধান না করে জামা শরীরের সাথে জড়িয়ে রাখা।

৮. স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে লম্বা জামা পরিধান করা হয়, সেভাবে পরিধান না করে চাদর হিসেবে ব্যবহার করাতে কোন দোষ নেই।

৯. তালি যুক্ত চাদর পরিধানে কোন বাধা নেই।

১০. গলায় পানির মশক বা পানপাত্র ঝুলাতে পারবে।

ইহরামের চারটিত্রুটি

ইহরামের চারটি ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহরামের ত্রুটিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো :

১। ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করাঃ

উপরে বর্ণিত পাঁচটি মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা হজ্ব ও উমরার ওয়াজিব। অতএব যে ব্যক্তি হজ্ব বা উমরা করতে চায় সে ব্যক্তি স্থল, জল বা আকাশ যে পথে আগমন করুক না কেন তার জন্য ইহরাম ব্যতীত মীকাত অতিক্রম করা জায়েয নেই। উপরে বর্ণিত সহিহ বুখারী ১৪৪০ নম্বর হাদিস থেকে দেখা যায় যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যেহেতু ইরাক বাসিদের সমদূরত্ব যাতু’ইরক মীকাতরূপে নির্ধারণ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, মীকাতের বরাবর কোন স্থান অতিক্রম করলে সেটা মীকাত অতিক্রম করার পর্যায়ভুক্ত। যে ব্যক্তি বিমানে চড়ে মীকাতের উপর দিয়ে অতিক্রম করে সে যেন মীকাতই অতিক্রম করে। অতএব, তার কর্তব্য হচ্ছে- মীকাতের বরাবরে আসলে ইহরাম বাঁধা। তার জন্য ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করে জেদ্দা থেকে ইহরাম বাঁধা জায়েয হবে না। যদি কেউ বিমানে যাতায়াত কাজে যে কোন কারনে ইহরাম বাঁধতে ভুলে যায় তবে তাকে বিমান থেকে অবতরণ করার পর মীকাতে ফিরে যাওয়া ওয়াজিব। যদি কেউ মীকাতে ফিরে না যান এবং মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বেঁধে থাকে তাহলে আলেমদের অগ্রগণ্য মত হলো, একটি ছাগল যবেহ করে মক্কার ফকীরদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া। আল্লাহই ভাল জানেন।

২। জুতা পরার সম্পর্কে ভুল ধারণাঃ  

কিছু কিছু মানুষ বিশ্বাস করে যে, জুতা পরেই ইহরাম বাঁধতে হবে। যদি ইহরামকালে কেউ জুতা না পরে তাহলে পরবর্তীতে তার জন্য জুতা পরা জায়েয হবে না। এটি ভুল। কারণ ইহরামের সময় জুতা পরা ওয়াজিব নয়; শর্তও নয়। জুতা পরা ছাড়াই ইহরাম হয়ে যায়। ইহরামের সময় জুতা না পরলেও পরবর্তীতে জুতা পরতে পারবে। এতে কোন অসুবিধা নেই।

৩। ইহরামের কাপড়ঃ

অনেক অসিয়ত করে থাকে তাকে যেন মরার পর ইহরামের কাপড় দ্বারা কাফন পরান হয়। ইহরামের কাপড় দ্বারা কাফন পরাতে কোন অসুবিধা নাই। অসিয়ত করাও দোষের কিছু নয়। কিন্তু জরুরী মনে করে অসিয়ত করা বিদআত হবে।

কিছু কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন, যে কাপড় দিয়ে ইহরাম ব বাঁধা হবে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই কাপড় আর পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ ইহরাম বাধার পর তাকে এক কাপড়েই থাকতে হবে। এটি ভুল একটি ভুল ধারন মাত্র। কেননা ইহরামকারীর জন্য বিশেষ কারণে কিংবা কোন কারণ ছাড়াই ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা জায়েয আছে। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যে ব্যক্তি কোন একটি ইহরামের কাপড় পরে ইহরাম বেঁধেছেন তিনি সে কাপড় পরিবর্তন করতে চাইলে পরিবর্তন করতে পারেন। ইহরামের কাপড়ে কোন নাপাকি লাগলে পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়ে। আবার বেশী ময়লা হলেও কাপড়টি খুলে ধৌত করা যায়। কাজেই এই বিশ্বাস ঠিক নয় যে, কেউ যদি কোন একটি কাপড়ে ইহরাম বাঁধে তাহলে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত এ কাপড়টি খুলতে পারবে না।

সাধারণত পুরুষগণ সাদা কাপড় দ্বারা ইহরাম বাধে। তাই অনেক মহিলা ধারণা করেন, ইহরামের জন্য কালো, সবুজ বা সাদা এ জাতীয় কালারের পোশাক দরাকার।  ইসলামি শরীয়াতে এর ভিত্তি নেই। মহিলারা যেকোনো কাপড় পরিধান করতে পারবেন। তবে পোশাকটি সৌন্দর্য প্রদর্শনে সহায়ক হবে না। খুব পাতলা হবে না। আটশাট হবে না কিংবা পুরুষ বা অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে না।

অনেক মহিলা তার চেহারা ও নেকাবের মধ্যস্থানে কাঠ বা এ জাতীয় কিছু রাখেন। যাতে নেকাব তার চেহারা স্পর্শ না করে। এও এক ভিত্তিহীন লৌকিকতা। ইসলামের সূচনা যুগের কোন মুসলিম মহিলা এমন করেননি; বরং মহিলারা পরপুরুষ সামনে এলে মুখে নেকাব না দিয়ে ওড়না ঝুলিয়ে চেহারা আড়াল করবে। পরপুরুষ না থাকলে মুখ খোলা রাখবেন। ওড়না তার চেহারা স্পর্শ করলেও কোন সমস্যা নেই।

৪। মহিলা হায়েয বা নিফাস অবস্থায় মীকাত থেকে ইহরাম না বাঁধাঃ

হজ্জ বা উমরা যাত্রাকালে অনেক সময় মহিলাদের প্রকৃতিক গতভাবে হায়েয বা নিফাস হয়ে থাকে। এই অবস্থায় মহিলাগন মীকাত অতিক্রম কালে ইহরাম বাঁধেন না। অথচ নিফাস বা হায়েযবতী মহিলার জন্যও মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা ফরয। নিফাস বা হায়েযবিহীন স্বাভাবিক মহিলাগন যেভাবে ইহরাম বাধে তারাও  ঠিক সেইভাবে গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করে ইহরাম বাধবে। এই কথার দলিল নিম্মের হাদিসটি।

জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি আসমা বিনতে উমায়স (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে নিফাসগ্রস্ত হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ তাকে (আসমা বিনতে উমায়স) গোসল করে ইহরাম বাঁধতে বল। (সুনানে নাসাঈ ২১৪)

আর ইহরাম অবস্থায় আয়েশা রা. এর ঋতুস্রাব শুরু হলে তিনি তাওয়াব বাদে সকল কাজ সবার সাথে সমানতালে সমাধা করেছেন। নিম্মের হাদিসটি লক্ষ করেনঃ

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জের সময় বের হয়েছিলাম। আমাদের কেউ ইররাম বেঁধেছিল উমরার আর কেউ ইহরাম বেঁধেছিল হাজ্জের। আমরা মক্কায় এসে পৌঁছালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যারা উমরার ইহরাম বেঁধেছে কিন্তু কুরবানীর পশু সাথে আনেনি, তারা যেন ইহরাম খুলে ফেলে। আর যারা উমরার ইহরাম বেঁধেছে ও কুরবানীর পশু সাথে এনেছে, তারা যেন কুরবানী করা পর্যন্ত ইহরাম না খোলে। আর যারা হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছে, তারা যেন হাজ্জ (হজ্জ) পূর্ণ করে।

আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ এরপর আমার হায়য শুরু হয় এবং আরাফার দিনেও তা বহাল থাকে। আমি শুধু উমরার ইহরাম বেঁধেছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মাথার বেণী খোলার চুল আঁচড়িয়ে নেওয়ার এবং উমরার ইহরাম ছেড়ে হাজ্জের ইহরাম বাঁধার নির্দেশ দিলেন। আমি তাই করলাম। পরে হাজ্জ (হজ্জ) সমাধা করলাম। এরপর ‘আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ)-কে আমার সাথে পাঠালেন। তিনি আমকে তান’ঈম থেকে আমার আগের পরিত্যক্ত উমরার পরিবর্তে উমরা করতে নির্দেশ দিলেন। (সহহি বুখারী ৩১৩ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কাজেই মহিলাগণ হায়েয বা নিফাস অবস্থায় মীকাত করলে ইহরাম বাঁধবে।

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক কাজ

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক নিচের কাজসমূহ করা সুন্নাহ :

১। মক্কায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম করা

২। গোসল করে নেয়া

৩। মক্কায় উঁচুভূমি দিয়ে পবেশ করা

৪। বাবুস সালাম গেট দিয়ে হারামে প্রবেশ করা

৫। দোয়া পড়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করা

৬। তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দুই রাকাত সালাত আদায় করা

৭। তাওয়াফের পূর্বে সম্ভব হলে আসওয়াদ চুম্বন করা

৮। মক্কা প্রবেশ কালের ভুলত্রুটিঃ

১। মক্কায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম করাঃ

মক্কায় পৌঁছে সুবিধাজনক কোন স্থানে একটু বিশ্রাম করা, যাতে ক্লান্তি দূর হয় এবং শক্তি অর্জিত হয়।

যুহায়র ইবনু হারব ও উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ইয়াহইয়া থেকে তিনি উবায়দুল্লাহ থেকে তিনি নাফি’ থেকে এবং তিনি ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যু-তুওয়া নামক স্থানে ভোর পর্যন্ত রাত্রি যাপন করলেন, অতঃপর মক্কায় প্রবেশ করলেন। নাফি (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ (রাঃ)-ও তাই করতেন। ইবনু সাঈদের বর্ণনায় আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে ফজরের সালাত আদায় করলেন। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, অথবা তিনি (উবায়দুল্লাহ) বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফাঃ)

২। গোসল করে নেয়াঃ

সম্ভব হলে গোসল করে নেয়া মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন। সুযোগ না পেলে না-করলেও চলবে। তবে নাপাকী থেকে অবশ্যই পবিত্র হতে হবে।

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবনু উমর (রাঃ) যু-তুওয়ায় ভোর পর্যন্ত রাত যাপন না করে মক্কায় উপনীত হতেন না। তিনি (সেখানে) গোসল করতেন, তারপর দিনের বেলায় মক্কায় প্রবেশ করতেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাই করতেন বলে তিনি বলেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফাঃ)

৩। মক্কায় উঁচুভূমি দিয়ে পবেশ করাঃ

উচ্চ গিরিপথ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ, নিম্নপথ দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান এবং যে পথ দিয়ে শহর থেকে বের হয়েছে তার বিপরীত পথ দিয়ে সেখানে প্রবেশ করা মুস্তাহাব।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর মক্কার উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত ‘কাদা’-র দিক দিয়ে প্রবেশ করেন। হিশাম বলেন, আমার পিতা উভয় স্থান দিয়েই প্রবেশ করতেন, তবে অধিকাংশ সময় “কাদা” টিলা দিয়ে প্রবেশ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৩ ইফাঃ)

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাজারার পথ দিয়ে (মদিনা থেকে) বের হতেন এবং মুআর্‌রাশ এর পথ দিয়ে সেখানে প্রবেশ করতেন। তিনি মক্কায় প্রবেশকালে উচ্চ গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করতেন এবং নিম্ন পথ দিয়ে বের হতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১০ ইফাঃ)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় পৌঁছলেন, তখন উচ্চ এলাকা দিয়ে প্রবেশ করলেন এবং নীচু এলাকা দিয়ে বের হলেন।(সহিহ মুসলিম ২৯১২ ইফাঃ)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সানিয়্যাতুল ‘উলয়া (হারমের উত্তর-পূর্বদিকে কাদা নামক স্থান দিয়ে) মক্কায় প্রবেশ করতেন এবং সানিয়্যা সুফলা (হারমের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কুদা নামক স্থান) দিয়ে বের হতেন। (সহিহ বুখারী ১৫৭৫) 

৪। বাবুস সালাম গেট দিয়ে হারামে প্রবেশ করাঃ

বহু মুসলিম ধরণা করে থাকে যে, হজ্জ বা উমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তিকে মসজিদে হারামের নির্দিষ্ট একটি গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এই বিষয়ে কেউ কেউ তাদের লিখনিতেও প্রকাশ করছেন। কারো মতে বাবুস সালাম গেট দিয়ে প্রবেশ করা ভাল। আবার কানে মত, উমরা গেটি দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। কারো ধারনাতো এমনই যে, যদি উমরা পালনেচ্ছুক হয় তাকে অবশ্যই ‘বাবুল উমরা’ (উমরা গেট) দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এই গেটি দিয়ে প্রবেশ করা উমরা পালনকালীকে অবশ্যই কর্তব্য কারন এটি শরিয়তের বিধান। অপর একদল আছেন যারা মনে করেন তাকে অবশ্যই ‘বাবুস সালাম’ (সালাম গেট) দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, অন্য গেট দিয়ে প্রবেশ করা গুনাহ কিংবা মাকরূহ।

ইসলামি শরীয়তে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নেই। বরং হজ্জ ও উমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তি যে কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারেন। যখন সে মসজিদে প্রবেশ করবে তখন ডান পা এগিয়ে দিবে এবং সকল মসজিদে প্রবেশ করার সময় যে দোয়া পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে সে দোয়াটি পড়বে।

৫। দোয়া পড়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করাঃ

আমাদের দেশে প্রচলিত অনেক কিতাবে কাবাগৃহ দেখার সময় নির্দিষ্ট কিছু দোয়া বর্ণিত আছে। অনেকে এই সকল বইপড়ে মনে করে থাকেন, কাবাগৃহ দেখার সাথে সাথে এই দোয়া বড়তে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কাবাগৃহ দেখে দোয়া করা বা পড়ার মত কিছুই বর্ণিত হয়নি। এমনকি কোন সাহাবী (বাঃ) কাবাগৃহ দেখে আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করছেন তারও কোন প্রমান নেই। কাজেই কাজটি নিসন্দেহে একটি বিদআত। কেননা যে কথা, কাজ কিংবা বিশ্বাস এর ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীবর্গ ছিলেন না সেটা দিয়ে আল্লাহ্‌র ইবাদত করা বিদাত ও পথভ্রষ্টতা। এর থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন। তাই যে বা যারা এই কাজটি করে থাকেন, আশা করি জানার পর পরিহার করে চলবেন। কাবাগৃহে প্রবেশ কালে মসজিদে হারামের ভিতর দিয়া প্রবেশ করতে হয় বিধায়। মসজিদে হারামে প্রবেশকালে উত্তম হলো ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করা এবং নীচের দোয়াটি পড়াঃ

**أَعُوذُ بِاللهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ بِسْمِ اللهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ – اَللَّهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ**

এবং মসজিদে হারাম থেকে বের হওয়ার সময় পড়াঃ

**بِسْمِ اللهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ**

মন্তব্যঃ এই দোয়াগুলো পৃথিবীর অন্যসব মসজিদেও পড়া সুন্নত।

৬। তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দুই রাকাত সালাত আদায় করাঃ

বহু মুসলিম দিধায় থাকে, মসজিদে হারামে প্রবেশ করে কি দুই রাকাত সালাত আদায় করব না কি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করব। যদি কেউ হজ্জ বা উমরার তাওয়াফের নিয়তে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে বা কোন নফল তাওয়াফের নিয়তে প্রবেশ করে তবে তার জন্য উত্তম হলো, সালাত আদায় না করে কাবার তাওয়াফ করা। সেক্ষেত্রে আপনি দুই রাকাত সালাত না পড়ে তাওয়াফ করাই যথেষ্ট। কেনানা, মসজিদে হারামের তাহিয়্যা (সম্ভাষণ) হচ্ছে, তাওয়াফ। এই তাওয়াফের মাধ্যমেই আপনার সালাতের কাজ সমাধা হয়ে যাবে। অপর পক্ষে আপনি যদি তাওয়াফের নিয়ত ব্যতীত অন্য নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করেন। যেমনঃ নামাযের জন্য অপেক্ষা, কিংবা কোন দারসে হাযির হওয়া কিংবা অনুরূপ অন্য কোন নিয়তে। সে ক্ষেত্রে মসজিদে হারাম বা অন্য যে কোন মসজিদের প্রবেশের পর পরই বসার আগে দুই রাকাত সালাত আদায় করে নিবেন। এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ থাকার কারণে। সার কথা হলো, তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দু’রাকআত সালাত আদায় না করে মসজিদে কখনো বসবেন না। তবে, জামাআত দাঁড়িয়ে গেলে সরাসরি জামাআতে শরীক হয়ে যাবেন।

আবদুল্লাহ ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে হজ্জ বা ‘উমরাহ উভয় অবস্থায় সর্বপ্রথম যে তাওয়াফ করতেন, তার প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলতেন। তাওয়াফ শেষে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করে সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৬)

মন্তব্যঃ আমাদের অনেক মনে করে থাকে যে, মসজিদে হারামে প্রবেশের পর প্রথম সুন্নাহ সমম্ত আমল হলো, বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা। তারা বিশ্বাস করেন যে, মসজিদে হারামের তাহিয়্যা (সম্ভাষণ) হচ্ছে। তাওয়াফ আদায় করা। অর্থাৎ যে ব্যক্তিই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে তার জন্য তাওয়াফ করা সুন্নত। অথচ প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমন নয়। বরং এক্ষেত্রে মসজিদে হারামও অন্য সকল মসজিদের ন্যায়। তবে পার্থক্য হলো হজ্জ, উমর বা নফল তাওয়াফের নিয়তে থাকলে সালাত আদায় না করেই তাওয়াফ করা।

৭। তাওয়াফের পূর্বে সম্ভব হলে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, আমি দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছে যখন হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতেন, তখন তিনি সাত চক্করের মধ্যে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে সমাধা করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯২০)

৮। মক্কা প্রবেশ কালের ভুলত্রুটিঃ

অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া পাঠ করতে ভুলে যান। অথচ তখনি বেশি বেশি করে তালবিয়া পাঠ করার সময়। আবার অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে থাকেন। মক্কা প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দো‘আ নেই। অনেক হাজী সাহেব একসাথে সমস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে থাকেন। এটি সুন্নত পরিপন্থী কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম ভিন্ন ভিন্নভাবে তালবিয়া পাঠ করেছেন। এ সময় অনেক হাজী সাহেব অপরের সমালোচনা ও দোষ চর্চা করেন, এমন পবিত্র স্থানে যা একেবারেই পরিত্যাজ্য।

তাওয়াফের ফজিল, প্রকার ভেদ এবং পদ্ধতি

তাওয়াফের ফজিল, প্রকার ভেদ এবং পদ্ধতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওয়াফঃ তাওয়াফ (طواف) একই আরবী শব্দ যার অর্থ হলো প্রদক্ষিণ করা বা চক্কর দেয়া। কোনো কিছুর চারদিকে প্রদক্ষিণ করাকে শাব্দিক অর্থে তাওয়াফ বলে। হজ্জের ক্ষেত্রে কাবা শরীফের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলে। অর্থাৎ হজ্জ ও উমরার সময় মুসলিমরা কাবার চারপাশে ঘড়ির কাটার বিপরীতদিকে সাতবার ঘোরে যা তাওয়াফ নামে পরিচিত। পবিত্র কাবা ব্যতীত অন্য কোনো জায়গায় কোনো জিনিসকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করা হারাম। হজ্জ উমরার সময় বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা একটি ফরজ কাজ। যা আদায় না করলে হজ্জ ও উমরা বিশুদ্ধ হবে না। তবে হজ্জ এবং উমরার ছাড়াও যে কোন সময় বাইতুল্লাহ এর চর্তুদিকে তাওয়াফ করা একটি নফল ইবাদাত। তাওয়াফ করা আগে নিয়ত করতে হবে এবং মসজিদে হারামের সীমানার ভিতর থেকে কাবার চারপাশে সাত চক্কর দিতে হবে। কম বেশী দিলে না তাওয়াফ হিসাবে গন্য হবেনা।

তাওয়াফের ফজিলত

তাওয়াফের ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীস এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাওয়াফকারির প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে একটি করে নেকি লিখবেন এবং একটি করে গুনাহ মাফ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 أَوَلَمْ نُمَكِّن لَّهُمْ حَرَمًا آمِنًا يُجْبَى إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِزْقًا مِن لَّدُنَّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থঃ আমি কি তাদের জন্যে একটি নিরাপদ হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সর্বপ্রকার ফল-মূল আমদানী হয় আমার দেয়া রিযিকস্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না। (সুরা কাসাস ২৮:৫৭)

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ (মক্কা) শহরকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, এর একটি কাঁটাও কর্তন করা যাবে না, এতে বিচরণকারী শিকারকে তাড়া করা যাবে না, এখানে মু‘আরিফ (পৌছের দেয়ার ঘোষনা) ব্যতীত পড়ে থাকা কোন বস্তু কেউ তুলে নিবে না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৬)

২. উমায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ইবনু উমার (রাঃ) চাপাচাপি করে হলেও হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামনী বায়তুল্লাহর এই দুই রুকনে যেতেন। আমি একদিন তাঁকে বলাম, আপনি এ দুটি রুকনে ভীড়ে চাপাচাপি করে হলেও গিয়ে উপস্থিত হন কিন্তু অন্য কোন সাহাবী তো ইমন চাপাচাপি করে সেখানে যেতে দেখি না। তিনি বললেন, যদি আমি এরূপ চাপাচাপি-ধাক্কাঁধাক্কি করি তাতে দোষ কি? আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, এ দুটো রুকন স্পর্শ করণে গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায় তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, কেউ যদি যথাযথ ভাবে বায়তুল্লাহর সাতবার তাওয়াফ করে একটি ক্রীতদাস করার মত ছওয়াব হয়। আমি তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, তাওয়াফ করতে গিয়ে এমন কোন কদম সে রাখেনা বা তা উঠায়না যদ্বারা তার একটি গুনাহ মাফ না হয় এবং একটি নেকী লেখা না হয়। (সুনানে তিরমিজি ৯৬২ ইফাঃ, মিসকাত ২৫৮০)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ লোকেদের করলো এবং দু’ রাক‘আত নামায পড়লো, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫৬)

৪. উক্ত ইবনে উমার (রাঃ) হতেই বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাত চক্র তওয়াফ করার সওয়াব একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করার সমান।  (হাদিস সম্ভার ১১৬৩ হাদিসের মান সহিহ)

৫. আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে।(সুনানে নাসাঈ ২৯২২)

তাওয়াফের প্রকাভেদ

ইসলামি শরীয়তে সাত প্রকার তাওয়াফের প্রচলন রয়েছে। এই সাত প্রকার তাওয়াফ হলোঃ

১। তাওয়াফে কুদুম বা আগমণী তাওয়াফঃ

২। তাওয়াফে জিয়ারত বা এফাদাঃ

৩। তাওয়াফে উমরাঃ

৪। তাওয়াফে নজরঃ

৫। তাওয়াফে তাহিয়্যাঃ

৬।নফল তাওয়াফঃ

৭। তাওয়াফে বিদাঃ

তাওয়াফে কুদুম বা আগমণী তাওয়াফঃ

কুদুম শব্দের অর্থ আগমণ। সে হিসেবে তাওয়াফে কুদুম কেবল বহিরাগত হাজিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মক্কায় বসবাসকারীরা যেহেতু অন্য কোথাও থেকে আগমন করে না, তাই তাদের জন্য তাওয়াফে কুদুম সুন্নত নয়।

ইফরাদ হজ্জকারী মক্কায় এসে প্রথম যে তাওয়াফ আদায় করে তাকে তাওয়াফে কুদুম বলে। কেরান হজ্জকারী ও তামাত্তু হজ্জকারী উমরার উদ্দেশ্যে যে তাওয়াফ করে থাকেন তা তাওয়াফে কুদুমেরও স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কেরান হজ্জকারীকে উমরার তাওয়াফের পর ভিন্নভাবে তাওয়াফে কুদুম আদায় করতে হয়। হানাফি মাজহাবে তামাত্তু ও শুধু উমরা পালনকারীর জন্য কোনো তাওয়াফে কুদুম নেই।

মন্তব্যঃ যে সকল হজ্জযাত্রীদের সাথে হাদী থাকে না, তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে তাদের হজ্জ কে তামাত্তু হজ্জ বলে। অপর পক্ষে যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন, তারা একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন তাদের হজ্জ কে কেরান হজ্জ বলে। সাধারণ যারা হজ্জের সফলে উমরা করার সময় সুযোগ পান না তাদের হজ্জ কে ইফরাদ হজ্জ বলে।

২। তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদাঃ

তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদা হলো হজ্জের একটি ফরজ আমল। এই সাত প্রকার তাওয়াফের মধ্য এটিই হলো, হজ্জের মুল তাওয়াফ। সকল হজ্জকারীকে এ তাওয়াফটি আদায় করতেই হবে। এই তাওয়াফটি বাদ পড়লে হজ্জ সম্পন্ন হবে না। তাওয়াফে ইফাযা  মাধ্যমেই হজ্জের পূর্ণতা লাভ করে। তওয়াফে ইফাযাকে তাওয়াফে জিয়ারতও বলা হয়। আবার অনেকে এটাকে হজের তাওয়াফও বলে থাকেন। এটি না হলে হজ শুদ্ধ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾

অর্থঃ তারপর তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে। (সুরা হজ্জ ২২:২৯)

৩। তাওয়াফে উমরাঃ

তামাত্তু হজ্জযাত্রীগণ প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে। কেরাম হজ্জযাত্রীগণ একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন। অর্থাৎ তামাত্তু ও করান হজ্জ আদায়কারীগন হজ্জের আগে উমরা করা সুযোগ পান। এই উমরা তাওয়াফ করা একটি ফরজ আমল। এই তাওয়াফ না করলে উমরা বাতিল হয়ে যাবে। উমরা আদায়ের ক্ষেত্রে এই ফরজ তাওয়াফকে তাওয়াফে

উমরা বলা হয়। এই তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রমল করবে বা হেলে দুলে তাওয়াফ করবে। পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেবেন যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে তাওয়াফ করবে। এই নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা করা সুন্নাত।

৪। তাওয়াফে নজরঃ

কেউ যদি তাওয়াফ করার মান্নত করে তাহলে তার জন্য তাওয়াফ আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। যে কোন মান্নত আদায় করার নিমিত্তে যে তাওয়াফ করা হবে তাকে তাওয়াফে নজর বলে। যদি কোন প্রকার মান্নক করা সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। কিন্তু মান্নহ করার পর ভাল কাজের মান্নত আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

তাওয়াফে তাহিয়্যাঃ

মসজিদে প্রবেশের পর মসজিদের সম্মানে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। আর কাবা ঘরে হাজির হলে মসজিদুল হারামের সম্মানার্থে একটি তাওয়াফ করা মুস্তাহাব। তবে মসজিদে হারামে প্রবেশের পর অন্য কোনো তাওয়াফ করলেও তাতে তাওয়াফে তাহিয়্যা আদায় হয়ে যাবে। এলফল সমজিদে হারামে প্রবেশের সম্মানে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত সালাত আর আদায করার প্রয়োজন হবে না বলে মুজতহীদ আলেমগণ মতপ্রদান করেছেন।

নফল তাওয়াফঃ

মক্কায় থাকা অবস্থায় যখনই সুযোগ পাওয়া যায় তখনই নফল তাওয়াফ করা যায়। অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় নফল তাওয়াফ করা বেশি বাঞ্ছনীয়। কারন পৃথিবীর থোকাও কোন সমজিদেই এই আমল করার সুযোগ নাই। যারা হজ্জের মক্কা গমন করেন তারা একটি নির্দিষ্ট সময় সেখানে অবস্থান করে হজ্জের জন্য অপেক্ষা করেন। এই অবসর সময় বেশী বেশী নফল তাওয়াফ করে আল্লাহকে খুসি করা চেষ্টা করা। এই নফল তাওয়াফে কোন প্রকার রমল বা ইযতিবা নাই। নফল তাওয়াফ আদায় কারর সময় কোন প্রকার ইহরামের কাপড় পড়তে হয় না। সাধারণ পোশাকেই কাবাঘরের চতুর্পাশে সাত চক্কর দিলে তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে। অনেকের মনে করে থাকেন হজ্জের ন্যায় শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের পক্ষ থেকে ও তাওয়াফ করা যায়। যেমনঃ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি আপন  জনের পক্ষ থেকে। কিন্তু কারও পক্ষ থেকে নফল তাওয়াফ করা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়। 

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী ‘উমরাহ আদায়ের পর যত দিন হালাল অবস্থায় থাকবে ততদিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এরপর যখন ‘আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজ্জলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা ‘আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি ‘আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর ‘আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে ‘আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত ‘ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌঁছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহ্কে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’ তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। (সহিহ বুখারি ৪৫২১)

৭। তাওয়াফে বিদাঃ

হজ্জ শেষে বহিরাগত হাজ্জি সাহেবগন যখন বায়তুল্লাহ থেকে প্রত্যাবর্তনের করবেন তখন আরেক বার বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতে হয়। এই শেষবার বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করাকে তাওয়াফে বিদা বলে। এই তাওয়াফটি বহিরাগত হাজ্জিদের জন্য মুজতহীদ আলেমগণ ওয়াজিব বলে গন্য করেছেন। কাজেই কোন হাজ্জি মিনায় থেকে সরাসরি নিজ নিজ দেশে চলে যেতে পারবেন না। কেননা, কাবাঘরের শেষ ওয়াজিব তাওয়াফটি এখনও বাকি আছে। তাই বহিরাগত হাজ্জিগন মক্কা হয়ে বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করে নিজ নিজ বাস স্থানে ফিরবেন। এই তাওআফের মাঝেই বহিরাগত হাজ্জিগন তাদের হজ্জ শেষ করে মক্কা থেকে প্রস্থানের অনুমতি পায়। এই বিদায়ী তাওয়াফ আদায় করা হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব হিসাবে গন্য করা হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্ন পথ দিয়ে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেন শেষবারের মতো বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফ না করা পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন না করে।” (সহিহ মুসলিম ৩১১১, সুনানে আবু দাউদ ২০০২)

এক নজরে পুর্নাঙ্গ তাওয়াফ করার পদ্ধতি

ক) কারা ও মসজিদের হারামের যথাযত সম্মান ভক্তি প্রদর্শণ করে কারার চত্তরে প্রবেশ করে তাওয়াফ শুরু করতে হবে। তাওয়াফ শুরু করার পূর্বেই তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিতে হবে। যে কোন স্থান থেকেই তাওয়াফ শুরু করা যাবে না। রুকনে হাজরে আসওয়াদ বা কাবার যে কোনায় হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করা আছে সেই কোন থেকে তাওয়াফ শুরু করেত হবে। হাজরে আসওয়াদ কাবাঘরের দক্ষিন-পূর্ব কোনে স্থাপন করা আছে। কাবাঘরের ‘‘হাজরে আসওয়াদ’’ কোণ থেকে মসজিদে হারামের দেয়াল ঘেষে সবুজ বাতি জ্বালান থাকে। ঐ বাতি দেখেই তাওয়াফ শুরুর স্থান চিনে নিতে হবে।

খ) প্রথমে মনে মনে তাওয়াফের নিয়ত করা। নিয়ত না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না, কেননা কোন আমলের জন্য নিয়ত করা ফরজ।

গ) নিয়ত করার পর, প্রথমে ‘হাজারে আসওয়াদ (কাল পাথরের) কাছে গিয়ে, ‘‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’’  বলতে হবে এবং এই পাথরকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ কার্য শুরু করতে হবে। কাবাঘরকে বামপাশে রেখে তাওয়াফ করতে হয়। তাওয়াফের করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নীচের দোয়াটি পড়তেন। তাই তাওয়াফের সময় নিম্মের দোয়াটি পড়লে ভাল। কারন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এমনটি করতেন। দোয়াটি হলঃ

**اَللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيْقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مَحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم**-

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রতি ঈমান এনে, তোমার কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য তোমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে এ তাওয়াফ কার্যটি করছি।

ঘ) রমজান ও হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড় থাকে। এই ভীড়ের মধ্য শতকরা দুই চার জন ছাড়া কেউই চুমু দিতে পারে না। বয়স্ক, বৃদ্ধ ও মহিলাদের জন্য পাথর চুম্বন দেয়াতো প্রশ্ন উঠে না। তারপরও যদি কেউ চুমু প্রদান করতে যায়, তবে কোন প্রকার ধাক্কা ধাক্কি করা যাবে না। এই কাজটি হলো সুন্নাহ আর ধাক্কা ধাক্কি করে কাউকে কষ্ট দেয়া হারাম। সুন্নাহ আমল করতে গিয়ে হামার কাজ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত কাজ হবে। কিন্তু ভীড়ের মাঝে কষ্ট না দিয়ে তাওয়াফ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই বেশী ভীড় দেখলে ধাক্কাধাক্কি করে চুমু দেওয়ার চেষ্টা না করাই উত্তম তবে ভীড় কম হলে এবং যে কোন কারনে চুমু দেওয়ার সুযোগ হবে অবশ্যই চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করা। চুমু দেয়া সম্ভব না হলে, ইশারায় চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করে দিতে হবে। ইশারায় চুমু দিয়ে শুরু করা ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত আমল।

ঙ) তাওয়াফ শুরু করার আগে আরও একটি কাজ করতে হবে তা হলো, ইযতিবা করা। ইযতিবা হলো, পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেবেন যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে ফেলবেন। এ নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা শুধুমাত্র প্রথম তাওয়াফে করতে হয়। পরবর্তী তাওয়াফগুলোতে এ নিয়ম নেই। এটা করা সুন্নাত। যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।

ছ) তাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর রমল করা। রমল হলো, তাওয়াফের সময় মুজাহিদের মতো বীরদর্পে দুই কাঁধ দুলিয়ে দ্রুতপায়ে চলা। বিদায় হজ্জের সময়, মক্কার মুশরিকরা যখন বলাবলি করতে থাকে যে, ইয়াসরিবের (মদিনার) আবহাওয়া মুসলমানদেরকে দুর্বল ও রুগ্ন করে ফেলেছে। মুশরিকদের এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমল করে তাওয়াফ করার নির্দেশ দেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং পরেও এ বিধান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

মক্কায় প্রবেশ করে প্রথম যে তাওয়াফটি করতে হয় শুধু এটাতেই প্রথম তিন চক্রের রমলের এ বিধান। এরপর যতবার তাওয়াফ করবেন সেগুলোতে আর “রম্‌ল” করতে হবে না। এমনকি নফল তাওয়াফ অর্থাৎ হজ্জ ও উমরার নিয়্যাতে নয়, বাইতুল্লায় নামাজের সময় বা আগে পরে তাওয়াফ করার সময় রমল বা ইযতিবা প্রয়োজন নেই। মহিলাদের রমল করতে হয় না।

জ) তাওয়াফ শুরু সাথে সাথে নজরে আসবে মাকামে ইবরাহীম। মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান হলো, কাবার পূর্ব পাশে। কাজেই এই স্থানে এসে কুরআন এই আয়াতটি তিলওয়াত করা মু্স্তাহাব। আয়াতটি হলো,

(*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও। (সুরা বাকারাহ ২:১২৫)

ঝ) মাকামে ইবরাহীম অতিক্রমের পরই হাতের বামপাশে নজরে আসবে হিজর বা হাতীম। এটি কাবার উত্তরদিকে অবস্থিত অর্ধেক বৃত্তাকার অংশ যার পরিমান প্রায় পাঁচ হাতের মত। মক্কার কুরাইশগন কাবা নির্মাণের সময় অর্থাভাবের কারনে সম্পূর্ণ কাবা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়, ফলে তারা এই অংশটুকু ছেড়ে যায়। এই ছাদহীন অর্ধ-বৃত্তাকার দেয়ালঘেরা হাতিম মুলত কাবাঘরেই অংশ। তাই তাওয়াফ করার সময় যদি কেউ হাতিমে প্রবেশ করে এবং হাতীমের ভীতর দিয়ে তাওয়াফ করে তবে তার তাওয়াফ হবেনা। কেননা, তাওয়াফ করতে হবে কাবার চতুর পাশ দিয়ে। কাবার ভীতর দিয়ে তাওয়ফ করা যাবে না।

ঞ) হাতীম অতিক্রম করা পর আপনি চলে আসবেন কাবার পশ্চিম পাশে। এই পাশে তাওয়াফের সাথে সাথে চেষ্টা করেতে হবে যাতে কাবার নিকটি দিয়ে যাওয়া যায়। কারন এই পশ্চিম ও দক্ষিন কোনাকে বলা হয় রুকনে ইয়ামানী, যা ষ্পর্শ করাও একটি মুস্তাহাব কাজ। কাজেই প্রতিটি তাওয়াফের সাথে এই রুকনে ইয়ামনী ষ্পর্শ করা চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু প্রচন্ড ভীড় থাকলে, এই আমল না করলে কোন অসুবিধা নাই। ভীড়ের মধ্যে কাউকে কষ্ট দিল ষ্পর্শ না করাই ভাল। তবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, সাথে নারী, শিশু বা বয়স্ক কেউ না থাকলে ভীড়ের মধ্যেও কাউকে কষ্ট না দিয়ে রুকনে ইয়ামানী ষ্পর্শ করা সম্বব। তাই রুকনে ইয়ামানীর পাশে এসে পৌঁছলে ভীড় না হলে এ কোণকে ডান হাত দিয়ে ষ্পর্শ করার চেষ্টা করা। কিন্তু সাবধান, এ রুকনে ইয়ামেনীকে চুমু দেবেন না, এর পাশে এসে হাত উঠিয়ে ইশারাও করবেন না এবং সেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ও বলবেন না। ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন হাজরে আসওয়াদে পৌঁছে। রুকনে ইয়ামেনী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নের এ দোয়াটি পড়া মুস্তাহাবঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯০ ইফাঃ)

কাজেই এই দোয়াটি পড়তেই থাকবেন। পড়তে পড়তে আপনি হাজরে আসওয়াদ বরাবরা পৌছে যাবেন। অর্থাৎ আপনার এক চক্কর সমাপ্তের পথে।

ট) দোয়াটি পড়তে পড়তেই আপনি রুকনে ইয়ামেনী থেকে হাজরে আসওয়াদে চলে এসেছেন। আপন এবার নতুন তাওয়াফ শুরু করছেন। মনে রাখবেন, তাওয়াফের প্রত্যেক চক্রেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা ষ্পর্শ করা উত্তম। কিন্তু হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড়ের কারণে এটি খুবই দূরূহ কাজ। সেক্ষেত্রে প্রতি চক্রেই হাজরে আসওয়াদের পাশে এসে এর দিকে মুখ করে ডান হাত উঠিয়ে ইশারা করবেন। ইশারাকৃত এ হাত চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় একবার বলবেন (بسم الله الله أكبر )‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’।

ঠ) হাজরে আসওয়াদের যে কোনা থেকে সবুজ বাতি দেখে তাওয়াফ শুরু করেছিলেন, আবার সেখানে আসলে তাওয়াফের এক চক্র শেষ হবে। এভাবে সাত চক্কর পূর্ণ করতে হবে। ভীড়ের পরিমাণ যদি আরো বেশী দেখতে পান এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ করা কঠিন মনে করেন তাহলে দু’তলা বা ছাদের উপর দিয়েও তাওয়াফ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সময় একটু বেশী লাগলেও ভীড়ের চাপ থেকে রেহাই পাবেন। ছাদের উপর তাওয়াফ করলে দিনের প্রখর রৌদ্রতাপ ও প্রচন্ড গরমে না গিয়ে রাতের বেলায় করবেন। বেশী ভীড়ের মধ্যে ঢুকে মানুষকে কষ্ট দেবেন না। দিলে ইবাদত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এই ক্ষেতে মনে রাখতে হবে মসজিদে হারামের সীমার বাইলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না।

ড) তাওয়াফরত অবস্থায় খুব বেশী বেশী জিকির, দোয়া ও তাওবা করতে থাকবেন। কুরআন তিলাওয়াতও করা যায়। কিছু কিছু বইতে আছে প্রথম চক্রের দোয়া, ২য় চক্রের দোয়া ইত্যাদি। কুরআন হাদীসে এ ধরনের চক্রভিত্তিক দোয়ার কোন ভিত্তি নেই। যত পারেন একের পর এক দোয়া আপনি করতে থাকবেন। আপনার নিজ ভাষায় আপনার মনের কথাগুলো আল্লাহ্‌র কাছে বলতে থাকবেন, মিনতি সহকারে চাইতে থাকবেন। দলবেঁধে সমস্বরে জোরে জোরে দোয়া করে অন্যদের দোয়ার মনোযোগ নষ্ট করবেন না। আরবীতে দোয়া করলে এগুলোর অর্থ জেনে নেয়ার চেষ্টা করবেন যাতে আল্লাহর সাথে আপনি কি বলছেন তা যেন হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন

ঢ) তাওয়াফ করার সময় যদি জামা’আতের ইকামত দিয়ে দেয় তখন সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াফ বন্ধ করে দিয়ে নামাযের জামা’আতে শরীক হবেন এবং ডান কাঁধ ও বাহু চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলবেন। নামায রত অবস্থায় কাঁধ ও বাহু খোলা রাখা জায়েয না। সালাত শেষে তাওয়াফের বাকী অংশ পূর্ণ করবেন। অর্থাৎ আপনি যদি সালাতে আগে তিন চক্ক দিয়ে থাকেন তবে সালাতে পর বাকি চার চক্কর দিয়ে তাওয়াফ শেষ করবেন।

ণ) তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইবরাহীমের পিছনে গিয়ে কাবার দিকে মুখ করে দু্‌ই রাকাত সালাত আদায় করতে হবে।

ত) সালাত আদায়ের পর জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব।

মন্তব্যঃ প্রচন্ড ভীড়ের কারণে কোন পর মহিলার গা স্পর্শ হলে এতে তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না, অযুও ছুটবে না। তবে সতর্ক থাকতে হবে। তাওয়াফরত অবস্থায় শরীরের কোন স্থান ক্ষত হয়ে গেলে বা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়লে এতে তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না।বিশেষ করে মসজিদে হারামে মুসল্লীর সামনে দিয়ে কেউ হাঁটলে তার গোনাহ হবে না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ), তবে মুহাদ্দিস আলবানী (রহ.)-এর মতে হাঁটা জায়েয নয়। সেজন্য সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। তাওয়াফ শেষে দু’রাক‘আত সালাত দিন ও রাতের যে কোন সময় এমনকি নিষিদ্ধ ও মাকরূহ ওয়াক্তেও আদায় করা যাবে। তবে নিষিদ্ধ তিনটি সময়ে নামায না পড়া উত্তম।

তাওয়াফের ওয়াজিব আমলসমূহ

তাওয়াফের ওয়াজিব আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের ওয়াজিব সমূহ আলোচনা করা হলোঃ তাওয়াফের ওয়াজিব আমল হলোঃ

১। তাওয়াফের নিয়ত করা

২। বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া

৩। ছতর ঢাকা রাখা

৪। হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করা

৫। কাবাঘরকে হাতের বামপাশে রেখে তাওয়াফ করা

৬। হাতিম বা হিজরের ভিতরে তাওয়াফ না করা

৭। মসজিদে হারামের ভেতর দিয়ে তাওয়াফ করা

৮। বিরতিহীন ভাবে ‘সাতবার চক্কর’ দিয়ে তাওয়াফ পূর্ণ করা

৯। সাত চক্করে শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা

তাওয়াফের ওয়াজিব সমূহ বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলোঃ

১। তাওয়াফের নিয়ত করাঃ

যে কোন আসলের জন্য নিয়ত করা ফরজ। বিষয় সম্পর্কে বহু বার আলোচনা করা হয়েছে। এই জন্য এই ব্যপারে শুধু এতটুকু বলব যে তাওয়াফের জন্য গদবাধা কোন নিয়ত নেই। শুধু মনে মনে সংকল্পকরে মহান আল্লাহর হুকুম আদায়ের জন্য তাওয়াফ করা। যতি কেউ উমরার তাওয়াফ করে তা মনে মনে সংকল্পর করবে আমি উমরার তাওয়াফ করছি। কেউ হজ্জের তাওয়াফ করলে মনে মনে সংকল্পর করবে আমি হজ্জের তাওয়াফ করছি। হজ্জ ও উমরা ব্যতিত কোন নফল তাওয়াফ করলে সেই সংকল্প করেই তাওয়াফ কবরে। তাওয়াফের নিয়ত না করে সারাদিন হাজার হাজার বার বাইতুল্লাহর চার পাশে চক্কর দিলেই তাওয়াফ হবে না। কাজেই নিয়ত হলো তাওয়াফের প্রথম ফরজ কাজ। এটি বাদ পড়লে তাওয়াব হবে না, তবে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়। 

বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়াঃ

তাওয়াফ করা অন্যতাম ওয়াজিব হলো, বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া। যদি কারো বড় নাপাকি যেমন- হায়েজ, নিফাজ, গোসল ফরজ ইত্যাদি থাকে তবে তার জন্য বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা জায়েয নয়। এই বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া পরই কেমন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা যাবে।

দলিল সহিহ বুখারির হাদিসঃ

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে প্রবেশ করলেন। অথচ মক্কা প্রবেশের পূর্বেই ‘সারিফ’ নামক জায়গায় তার মাসিক শুরু হয়। তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার কী হয়েছে? মাসিক শুরু হয়েছে না কি? তিনি বললেনঃ হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা তো এমন এক ব্যাপার যা আল্লাহ আদাম আঃ)-এর কন্যাদের উপর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কাজেই হাজীগণ যা করে থাকে, তুমিও তেমনি করে যাও, তবে তুমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। এরপর আমরা যখন মিনায় ছিলাম, তখন আমার কাছে গরুর গোশ্ত নিয়ে আসা হল। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? লোকজন উত্তর করলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানী করেছেন। (সহিহ বুখারি ৫৫৪৮)

ছতর ঢাকা রাখাঃ

উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা যাবে না। কেউ উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করে তাহলে তার তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। জাহেলী যুগে লোকেরা উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করত। উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার প্রমানঃ  

১৬৬৫. ‘উরওয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, জাহিলী যুগে হুমস ব্যতীত অন্য লোকেরা উলঙ্গ অবস্থায় (বাইতুল্লাহর) তাওয়াফ করত। আর হুমস্ হলো কুরায়শ এবং তাদের ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি। হুমসরা লোকেদের সেবা করে সওয়াবের আশায় পুরুষ পুরুষকে কাপড় দিত এবং সে তা পরে তাওয়াফ করত। আর স্ত্রীলোক স্ত্রীলোককে কাপড় দিত এবং এ কাপড়ে সে তাওয়াফ করত। হুমসরা যাকে কাপড় না দিত সে উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করত। সব লোক ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করত আর হুমসরা প্রত্যাবর্তন করত মুযদালিফা হতে। রাবী হিশাম (রহ.) বলেন, আমার পিতা আমার নিকট ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াতটি হুমস সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ

 (ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ) (এরপর যেখান হতে অন্য লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে, তোমরাও সেখান হতে প্রত্যাবর্তন করবে) রাবী বলেন, তারা মুযদালিফা হতে প্রত্যাবর্তন করত, এতে তাদের ‘আরাফাহ পর্যন্ত যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হল। (সহিহ বুখারি ১৬৬৫)

নবম হিজরীর হজ্জের মৌসুমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে আজ থেকে কোন মুশরিক হজ্জে আসবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কবরে না।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের পূর্বে যে হাজ্জে (হজ্জ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) কে আমীর নিযুক্ত করেন, সে হাজ্জে (হজ্জ) কুরবানীর দিন [আবূ বকর (রাঃ)] আমাকে একদল লোকের সঙ্গে পাঠালেন, যারা লোকদের কাছে ঘোষণা করবে যে, এ বছরের পর থেকে কোন মুশরিক হাজ্জ (হজ্জ) করবে না এবং বিবস্ত্র হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। (সহিহ বুখারি ১৫২৪ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ সৌদি আরবের বিশিষ্ট মুজতাহীদ আলেম শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, যদি কোন উলঙ্গ ব্যক্তি তাওয়াফ করে তাহলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। কেননা তা করা নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হচ্ছে, “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যাতে আমাদের অনুমোদন নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত। (আল-শারহুল মুমতি’ ৭/২৫৭)

৪। হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করাঃ

হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করতে হবে। হাজরে আসওয়াদের সামনে থেকে শুরু করলে তার সাতটি চক্কর পূর্ণ হবে না। ঠিক তেমনিভাবে হাজরে আসওয়াদে পৌছার আগে শেষ করলে তার সম্পম চক্কর পূর্ণ হবে না। তাই  হাজরে আসওয়াদ থেকেই তাওয়াফ শুরু ও শেষ করতে হবে।

দলিলঃ

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করতেন তখন প্রথম তিন চক্করে (তাওয়াফে) রামল করতেন (বাহু দুলিয়ে বীরদর্পে প্রদক্ষিণ করতেন) এবং চার চক্করে সাধারণ হেঁটে তাওয়াফ করতেন, হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত। ইবনে উমার (রাঃ)-ও তাই করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫০)

মন্তব্যঃ কেউ যদি কাবার ফটক থেকে তাওয়াফ শুরু করে তাহলে তার তাওয়াফ অপূর্ণ ও অশুদ্ধ হবে। যদি কোন ব্যক্তি কাবার ফটক থেকে তাওয়াফ শুরু করবে এবং এর উপর ভিত্তি করে তাওয়াফ শেষ করবে তার তাওয়াফ পরিপূর্ণ হবে না। এমনকি যদি কেউ হাজারে আসওয়াদের সমান্তরালের সামান্য কিছু পর থেকে তাওয়াফ শুরু করে সেক্ষেত্রে তার এ চক্করটি বাতিল। আর যদি যে জানতে পারে যে সে হাজরে আসওয়াদের কিছু পর থেকে তাওয়াফ শুরু করে ছিল, তবে জানার সাথে সাথে তার তাওয়াফটি বাতিল হয়ে যাবে। তাকে আবার নতুন করে সম্পূর্ণ তাওয়াফ আদায় করতে হবে। কেননা তার সাতটি চক্কর পূর্ণ হয় নাই। ঠিক তেমনিভাবে যদি কেউ সপ্তম চক্করে হাজর আসওয়াদে পৌছার আগেই চক্কর বাদ দিয়ে চলে যায় তারও তাওয়াফটি বাতিল হবে। কেননা, সে  সাতটি চক্কর সমাপ্ত করে নাই। তাই ফরজ বা ওয়াজিব তাওয়াফ হলে তাকে অবশ্যই আবার তাওয়াফটি নতুন করে আদায় করতে হবে।

৫। কাবাঘরকে হাতের বামপাশে রেখে তাওয়াফ করাঃ

বায়তুল্লাহ্‌কে বাম দিকে রেখে তাওয়াফ করা। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ্‌কে বামে রেখে তাওয়াফ করেছেন। শত শত বছর থেকে বায়তুল্লাহ্‌কে বাম দিকে রেখে লক্ষ লক্ষ মুসলিম সর্বক্ষন চারপাশে তাওয়াফ করে আসছে এর কোন ব্যাতিক্রম পাওয়া যায় না।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কংকর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলছিলেন, তোমরা হাজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। তিনি আরো বলেনঃ আমি অবহিত নই আমার এই হাজ্জের পর আবার হাজ্জ করার সুযোগ পাবো কি না। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৭০)

৬। হাতিম বা হিজরের ভিতরে তাওয়াফ করাঃ

১। আবদুল হামিদ ইবন জুবায়র (রহঃ) তার ফুফু সফিয়া বিনত শায়বা সূত্রে বলেছেন, আমাদের কাছ আয়েশা (রাঃ) বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি কা’বায় প্রবেশ করবো না? তিনি ইরশাদ করলেন, তুমি হিজারে প্রবেশ কর। কেননা, তা কাবারই অংশ। (সুনানে নাসঈ ২৯১৪)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ইচ্ছা হতো কাবায় প্রবেশ করে তাতে সালাত আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে প্রবেশ করিয়ে বললেনঃ যখন তুমি কাবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেছ, তখন এখানে সালাত আদায় কর, কেননা এটি কাবারই এক অংশ। কিন্তু তোমার গোত্র যখন একে নির্মাণ করে, তখন তাকে সংক্ষিপ্ত করেন।(সুনানে (সুনানে নাসঈ ২৯১৪৫, সুনানে তিরমিজি ৮৭৬)

৩। অন্য এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! কাবা ঘরে প্রবেশ করব না কি?’ তিনি বললেন, “তুমি হিজরে প্রবেশ কর। তা কাবা ঘরেরই অংশ।” (নাসাঈ ২৯১৪)

মন্তব্যঃ সহিহ হাদিসের আলোকে জানতে পারছি যে, হাতিম বা হিজর কাবারই অংশ। আমাদের জানা আছে, তাওয়াফ করতে হয় কাবার চার পাশে। কাবার ভিতর দিয়ে তাওয়াফ হবে না। কাজেই কাবা ঘরের তাওয়াফকারী অবশ্যই হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবে।

৭। মসজিদে হারামের ভেতর দিয়ে তাওয়াফ করাঃ

তাওয়াফের ক্ষেত্রে ফরয হচ্ছে বায়তুল্লাহ্‌কে তাওয়াফ করা। যদি কেউ মসজিদে হারামের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করে তাহলে সে মসজিদকে তাওয়াফ করল, বায়তুল্লাহ্‌কে নয়।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, আলেমগণ বলেন: তাওয়াফ সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে মসজিদে হারামের ভেতরে হওয়া। মসজিদের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করে তাহলে আদায় হবে না। এজন্য কেউ যদি মসজিদে হারামের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করতে চায় তাহলে সেটা জায়েয হবে না। কেননা সেক্ষেত্রে সে মসজিদকে তাওয়াফকারী হবে, কাবাকে নয়। আর যারা মসজিদের ভেতরে উপরে কিংবা নীচে দিয়ে তাওয়াফ করেন তাদের তাওয়াফ জায়েয হবে। তবে, সাফা-মারওয়া দিয়ে কিংবা সাফা-মারওয়ার উপর দিয়ে তাওয়াফ করা থেকে সাবধান। কেননা সাফা-মারওয়া মসজিদের অংশ নয়। (তাফসিরু সুরাতিল বাক্বারা ২/৪৯)

বিরতিহীন ভাবে সাতবার চক্কর দিয়ে তাওয়াফ পূর্ণ করাঃ

১. ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মক্কায় পৌছে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার জন্য বায়তুল্লাহর যে তাওয়াফ করতেন, তাতে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে সম্পন্ন করতেন। তাপর দু’রাকাআত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৯)

২. আম্‌র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-কে জিজ্জেস করলাম, ‘উমরাহকারীর জন্য সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে কি? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ সমাপ্ত করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেন, অতঃপর সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করেন। এরপর ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) তিলাওয়াত করেন, “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে”। (আল-আহযাবঃ ২৩)। (সহহি বুখরি ১৬২৩)

মন্তব্যঃ পরিপূর্ণ সাত চক্কর তাওয়াফ করা। সাত চক্করের চেয়ে এক কদমও কম হলে তাওয়াফ পরিপূর্ণ হবে না। ইমাম নববী বলেন: তাওয়াফের শর্ত হচ্ছে, সাত চক্কর হওয়া। প্রত্যেকবার হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে হাজারে আসওয়াদ শেষ করবে। যদি সাত চক্করের চেয়ে এক কদমও কম হয় তাহলে তার তাওয়াফ ধর্তব্য হবে না। চাই সে ব্যক্তি মক্কাতে অবস্থান করুক কিংবা মক্কা থেকে বের হয়ে তার নিজ দেশে ফিরে আসুক। দম বা পশু জবাই করে কিংবা অন্য কোন আমলের মাধ্যমে তাওয়াফের ঘাটতিকে পূরণ করা সম্ভবপর নয়। (আল-মাজউ (৮/২১)

তাওয়াফ করার সময় যদি জামা‘আতের ইকামত দিয়ে দেয় তখন সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াফ বন্ধ করে দিয়ে নামাযের জামা‘আতে শরীক হবেন এবং ডান কাঁধ ও বাহু চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলবেন। নামায রত অবস্থায় কাঁধ ও বাহু খোলা রাখা জায়েয না। সালাত শেষে তাওয়াফের বাকী অংশ পূর্ণ করবেন।

সাত চক্করে শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করাঃ

তাওয়াফের সাত চক্কর শেষ হলে দু’কাঁধ এবং বাহু ইহরামের কাপড় দিয়ে আবার ঢেকে ফেলবেন এবং ‘‘মাকামে ইব্রাহীমের’’ কাছে গিয়ে পড়বেনঃ

* وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلّىً*

অর্থঃ ইব্রাহীম (পয়গাম্বর)-এর দন্ডায়মানস্থলকে সালাত আদায়ের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।

অতঃপর তাওয়াফ শেষে এ মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে এসে দু’রাকআত সালাত আদায় করবেন। ভীড়ের কারণে এখানে জায়গা না পেলে মসজিদে হারামের যে কোন অংশে এ সালাত আদায় করা জায়েয আছে। মানুষকে কষ্ট দেবেন না, যে পথে মুসল্লীরা চলাফেরা করে সেখানে সালাতে দাঁড়াবেন না। সুন্নত হলো এ সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার পর প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ইখলাস পড়া।

এই কথার দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘উমরাহ করতে গিয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলেন ও মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর সাথে এ সকল সাহাবী ছিলেন যারা তাঁকে লোকদের হতে আড়াল করে ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন কিনা? এক ব্যক্তি আবূ আওফা (রাঃ)-এর নিকট তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারি ১৬০০ তাওহীদ)

২. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বাইতুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”। (আল-আহযাবঃ ২৩)। (সহিহ বুখারি ১৬২৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ লোকেদের করলো এবং দু’ রাক‘আত নামায পড়লো, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫৬)