তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের সুন্নাহসমূহ আলোচনা করা হলোঃ তাওয়াফের সুন্নাহ সম্মত আমল হলোঃ

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী হলোঃ

১। অজুসহকারে তাওয়াফ করাঃ

২। তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করা

৩। কাবায় ঢুকেই হাজারে আসওয়াদের নিকট আসা

৪। সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

৫। চুম্বন সম্বব না হলে ইশারায় চুম্বর করাঃ

৬। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করাঃ

৭। তাওয়াফের সময় দোয়া করাঃ

৮। ইযতিবা করাঃ

৯। প্রথম তিন চক্করে রমল করাঃ

১০। বাকী চার চক্কর সাধারণ গতিতে আদায় করা

১১। প্রতি চক্করেই রোকনে ইয়ামীনি স্পর্ম করাঃ

১২। প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা ইশারা দ্বারা চুম্বন করাঃ

১৩। প্রতি চক্করে তাকদির দেয়া

১৪। পায়ে হেঁটে বা বাহনে চড়ে তাওয়াফ করাঃ

১৫। তাওয়াফের মাঝে দোয়া ও জিকির করাঃ

১৬। তাওয়াফের মাঝে জরুরী কথা বলা ও কাজ করা যায়ঃ

১৭। তাওয়াফ শেষ করে জমজমের পানি পান করা

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী হলোঃ

১। অজুসহকারে তাওয়াফ করাঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম অযূ করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। (রাবী) ‘উরওয়াহ (রহঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই তাওয়াফটি ‘উমরাহ’র তাওয়াফ ছিল না। (তিনি আরো বলেন) অতঃপর আবূ বকর ও ‘উমর (রাঃ) অনুরূপভাবে হজ্জ করেছেন। এরপর আমার পিতা যুবাইর (রাঃ)-এর সাথে আমি হজ্জ করেছি তাতেও দেখেছি যে, সর্বপ্রথম তিনি তাওয়াফ করেছেন। এরপর মুহাজির, আনসার সকল সাহাবা (রাঃ)-কে এরূপ করতে দেখেছি। আমার মা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি, তাঁর বোন এবং যুবাইর ও অমুক অমুক ব্যক্তি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধেছেন, যখন তাঁরা তাওয়াফ সমাধা করেছেন, হালাল হয়ে গেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৪)


সুন্নহ হলো অজু করা

অনেক মুজতাহীদ আলেম মনে করেন, তাওয়াফে নামাযের মত শুদ্ধতার জন্য পবিত্রতা শর্ত। অজু না করা পর্যন্ত অপবিত্র ব্যক্তির নামায যেমন শুদ্ধ হয় না তেমনি তাওয়াফও। তাই তওয়াফের আগে সুন্দর করে অজু করে নিতে হবে। এর বীপরিতে অনেক মুজতাহীদ আলেম মনে করেন, তাওয়াফের জন্য অজু শর্ত নয়। তাওয়াফের পূর্বে অজু করে নেয়া উত্তম তবে অপরিহার্য় বা ফরজ নয়। বড় অপবিত্রতা (মাসিক) থাকলে তাকে পবিত্র হয়েই তাওয়াফ করেত হবে।

যে সকল মুজতাহীদ আলেম বলেন তাওয়াফের জন্য অজু অপরিহার্য় বা ফরজ তাদের দলিল।

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাত আদায় করার মতই। তবে সালাতে তোমরা কথা বলতে পার না কিন্তু এতে কথা বলতে পার। সুতরাং এ সময় ভাল কথা ছাড়া কিছূ বলবে না। (সুনানে তিরমিযি ৯৬০, আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন)

২. সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ করতে চাইতেন তখন তিনি ওযু করে নিতেন।” আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন: “তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজ্জের কার্যাবলি শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম ১২৯৭)

শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লার মতে, অজু ছাড়া তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। তাঁকে আরও জিজাসা করা হয় যে, “এক ব্যক্তি তাওয়াফ শুরু করার পর তার বায়ু বেরিয়েছে। তার উপর তাওয়াফ কর্তন করা কী আবশ্যক? নাকি সে তাওয়াফ চালিয়ে যাবে?”

জবাবে তিনি বলেনঃ যদি কেউ তাওয়াফের মধ্যে বায়ু, পেশাব, বীর্য, লজ্জাস্থান স্পর্শ করা কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন কারণে অপবিত্র হয় তাহলে সে নামাযের ন্যায় তার তাওয়াফ স্থগিত করে পবিত্রতা অর্জন করতে যাবে; এরপর নতুনভাবে তাওয়াফ শুরু করবে। এটাই সঠিক অভিমত; যদিও এ মাসয়ালাতে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু, তাওয়াফ ও নামাযের ক্ষেত্রে এটাই সঠিক অভিমত। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যদি তোমাদের কেউ নামাযের মধ্যে নিঃশব্দে বায়ু ত্যাগ করে তাহলে সে যেন বেরিয়ে গিয়ে ওযু করে আসে এবং পুনরায় নামায আদায় করে।” (সুনানে আবু দাউদ)। তাই সামগ্রিক দৃষ্টিতে তাওয়াফ নামায শ্রেণীয়।  [(মাজমুউ ফাতাওয়াস শাইখ বিন বায (১৭/২১৬-২১৭)]

কোন কোন আলেমের মতে, তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। এটি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর অভিমত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ অভিমতটিকে পছন্দ করেছেন। তারা প্রথম অভিমতের দলিলঃগুলোর নিম্নোক্ত জবাব দেনঃ

** যে হাদিসে বলা হয়েছে যে, “বায়তুল্লাহকে তাওয়াফ নামাযতুল্য” এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হিসেবে ‘সহিহ’ নয়; তবে এটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। ইমাম নববী তার ‘আল-মাজমু’ কিতাবে বলেন: বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে- এটি ইবনে আব্বাসের উক্তি (মাওকুফ হাদিস)। বাইহাকী ও অন্যান্য হাফেযে-হাদিস মুহাদ্দিস এমনটি বলেছেন।

** তারা আরও বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র অবস্থায় তাওয়াফ করা: এর দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না যে, পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা ওয়াজিব; বরং এর দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ আমল করেছেন। কিন্তু, সাহাবীদেরকে নির্দেশ দেননি।

*** আর আয়েশা (রাঃ) কে যে তিনি বলেছেন, “একজন হাজী যা যা করে তুমিও তা তা কর; কিন্তু তুমি পবিত্র হওয়া অবধি তাওয়াফ করবে না” : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রাঃ) তাওয়াফ করতে বাধা দেয়ার কারণ হল, আয়েশা (রাঃ) হায়েযগ্রস্ত থাকা। কেননা হায়েযগ্রস্ত নারী মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:

যারা তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা শর্ত বলেন: মূলতঃ দলিলঃ তাদের পক্ষে নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাওয়াফের জন্য ওযু করার নির্দেশ বর্ণিত হয়নি; না সহিহ সনদে; আর না যয়ীফ (দুর্বল) সনদে। অথচ তাঁর সাথে বিশাল সংখ্যক মানুষ হজ্জ আদায় করেছেন। এবং তিনি কয়েকটি উমরাও করেছেন। তার সাথে অনেক মানুষ উমরা করেছে। তাই তাওয়াফের জন্য ওযু থাকা যদি ফরয হত তাহলে তিনি সাধারণভাবে সেটা বর্ণনা করতেন। আর তিনি যদি বর্ণনা করতেন তাহলে মুসলমানেরা তার থেকে সেটা বর্ণনা করতেন; অবহেলা করতেন না। কিন্তু, সহিহ হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি যখন তাওয়াফ করেছেন তখন তিনি ওযু করেছেন। শুধু এ দলিলঃ ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশনা দেয় না। কারণ তিনি প্রত্যেক নামাযের জন্য তাওয়াফ করতেন। তিনি আরও বলেছেন: “আমি পবিত্র না হয়ে আল্লাহ্‌র যিকির করা অপছন্দ করেছি…”[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/২৭৩)]

এই অভিমতটি অর্থাৎ ‘তাওয়াফের জন্য পবিত্রতার শর্ত না করা’ মজবুত হওয়া সত্ত্বেও এবং দলিলঃ-প্রমাণে সে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কোন মানুষের পবিত্রতা ছাড়া তাওয়াফ করা উচিত নয়। কেননা পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা উত্তম, অধিক সতর্কতাপূর্ণ ও দায়মুক্তির অধিক উপযুক্ত এতে কোন সন্দেহ নেই। এর উপর আমল করার মাধ্যমে ব্যক্তি জমহুর আলেমের অভিমতের বিপরীত আমল করা থেকে নিরাপদে থাকবে।

তবে, ওযু রক্ষা করতে গিয়ে তীব্র কষ্ট-ক্লেশের মুখোমুখি হলে মানুষ এ অভিমতের উপর আমল করতে পারে; যে পরিস্থিতি মওসুমগুলোতে তৈরী হয়ে থাকে। কিংবা ব্যক্তি যদি অসুস্থ হয় নতুবা বয়োবৃদ্ধ হয় যাতে করে প্রচণ্ড ভীড়, তীব্র ঢেলাঠেলি ইত্যাদি কারণে ওযু রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়।

শাইখ বিন উছাইমীন (রহঃ) জমহুর আলেমের দলিলঃগুলোর জবাব দেয়ার পর বলেন, পূর্ব আলোচনার ভিত্তিতে বলতে পারি, যে অভিমতের প্রতি হৃদয় প্রশান্ত হচ্ছে সে অভিমতটি হচ্ছে: তাওয়াফের জন্য লঘু অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়া শর্ত নয়। তবে, কোন সন্দেহ নাই যে, পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা উত্তম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের দিক থেকে অধিক পরিপূর্ণ। এক্ষেত্রে জমহুর আলেমের বিরুদ্ধে গিয়ে এটি লঙ্ঘন করা উচিত নয়। কিন্তু, কখনও কখনও ব্যক্তি শাইখুল ইসলামের মনোনীত অভিমতটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। যেমন- তীব্র ভীড়ের মধ্যে কেউ যদি অপবিত্র হয়, সেক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে, বের হয়ে ওযু করে আসা তার উপর আবশ্যক এবং বিশেষতঃ তার যদি কয়েকটি চক্কর বাকী থাকে- এতে তীব্র কষ্ট রয়েছে। আর যাতে তীব্র কষ্ট রয়েছে এবং দলিলঃ যদি সুস্পষ্ট না হয় সেক্ষেত্রে মানুষকে এমন অভিমতের উপর আমলে বাধ্য করা উচিত নয়। বরং আমরা সহজ্জটির উপর আমল করব। কেননা দলিলঃ ছাড়া কষ্টকর অভিমতের উপর মানুষকে আমল করতে বাধ্য করা আল্লাহ্‌র বাণী “আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ্জ করতে চান; কঠিন করতে চান না” এর খিলাফ।[সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১৮৫; আল-শারহুল মুমতি (৭/৩০০)]

২। তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করাঃ

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হারামের নিকটবর্তী স্থানে পৌছলে তালবিয়া পাঠ বন্ধকরে দিতেন। অত:পর যী-তুয়া নামক স্থানে রাত যাপন করতেন। এরপর সেখানে ফজরের সালাত আদায় করতেন ও গোসল করতেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করতেন। (সহিহ বুখারি ১৫৭৩) 

তাওয়াফের বিস্তারিত বিবরণে দেখেসি, ‘হাজারে আসওয়াদ (কাল পাথরের) কাছে গিয়ে, বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার বলে পাথরকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ কার্য শুরু করতে হবে। কাবাঘরকে বামপাশে রেখে তাওয়াফ করতে হয়।

মন্তব্যঃ সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, হারামের নিকটবর্তী স্থানে পৌছলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়া পাঠ বন্ধকরে দিতেন। তাওয়াফের সময় তিনি দোয়া ও জিকিরে ব্যস্ত থাকতেন।  তাই সুন্নাহের দাবি হলে, তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিতে হবে।

কাবায় ঢুকেই হাজারে আসওয়াদের নিকট আসাঃ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনাহ্ হতে (হজ্জ্জ ও ‘উমরা পালনের জন্য) মাক্কায় প্রবেশ করে হাজারে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হলেন, একে চুমু খেলেন। তারপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলেন, এরপর সাফা পাহাড়ের দিকে এলেন এবং এর উপর উঠলেন যাতে বায়তুল্লাহ দেখতে পান। তারপর দু’ হাত উঠালেন এবং উদারমনে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ করতে লাগলেন। (আবু দাউদ ১৮৭২, মিসকাত ২৫৭৫)

সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মক্কায় উপনীত হয়ে তাওয়াফের শুরুতে হাজ্‌রে আসওয়াদ ইসতিলাম (চুম্বন, স্পর্শ) করতে এবং সাত চক্করের মধ্যে প্রথম তিন চক্করে রামল করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৬০৩)

২. আসলাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উমর ইব্‌নু খাত্তাব (রাঃ) কে হাজ্‌রে আসওয়াদ চুম্বন করতে দেখেছি। আর তিনি বললেন, যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তাহলে আমিও তোমায় চুম্বন করতাম না। (সহিহ বুখারি ১৬১০)

৩. সালিম (রহঃ) থেকে। তার পিতা তাকে বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছেন যে, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হাজারে আসওয়াদে চুম্বন করে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি নিশ্চিত জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। অনুরূপ একটি হাদীস যায়দ ইবনু আসলাম থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ মুসলিম ২৯৩৭ ইফাঃ)

৪. আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মাদীনাহ থেকে) আগমন করে মক্কায় প্রবেশ করলেন, এরপর ‘হাজরে আসওয়াদের’ নিকটবর্তী হয়ে তাতে চুমু খেলেন এবং বায়তুল্লাহ তওয়াফ করলেন। অতঃপর সাফা পাহাড়ের চুড়ায় উঠলেন এবং সেখান থেকে বায়তুল্লাহ দৃষ্টিগোচর হলেই তিনি দুই হাত উত্তলোন করে যতক্ষন ইচ্ছে মহান আল্লাহর যিকির করলেন এবং দু’আ করলেন। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, এ সময় সিঁড়ির পাথর তার নীচে ছিলো। হাশিম (রহঃ) বলেন, সেখানে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ইচ্ছেমত দু’আ করেন। (আবু দাউদ ১৮৭২)

চুম্বন সম্বব না হলে ইশারায় চুম্বর করাঃ

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইঙ্গিত করতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১২)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩২)

বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করাঃ

হাজারে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হয়ে ডান হাত দিয়ে আপনি তা স্পর্শ করে এতে চুম্বন করবেন। যদি হাত দিয়ে পাথরটিকে স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেদিকে ফিরে ডান হাত দিয়ে ইশারা করবেন। তবে হাতে চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় বলবেন ‘‘আল্লাহু আকবার। (সহিহ বুখারি)

বায়হাকীর এক বর্ণায় সহিহ সনদে ইবনে উমার থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তাওয়াফের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বলা উত্তম। (বায়হাকী ৫/৭৯ এবং আত-তালখীসুল হাবীর ২/২৪৭ হাফেজ ইবনে হাজার, সনদ সহিহ)

তাওয়াফের সময় দোয়া করাঃ

১. আবদুল্লাহ্ ইবনুস সায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’ রুকনের মাঝখানে বলতে শুনেছিঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯০ ইফাঃ)

ইযতিবা করাঃ

ইফরাদ হজ্জকারী বাইতুল্লাহ এসে প্রথম একটি তাওয়াফ করে এবং কেরান হজ্জকারী ও তামাত্তু হজ্জকারী উমরার উদ্দেশ্যে যে তাওয়াফ করে থাকেন তাকে তাওয়াফে কুদুম বা আগমনি তাওয়াফ বলে। এই তাওয়াফের সময় রমল করা হয়। এই রমল করা সময়  পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেয়, যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে তাওয়াফ করবে। এই নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা করা সুন্নাত।

সুনানে তিরমিজিতে হাসান সদনে একটি হাদিসে এসেছেঃ

১. ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একটি চাদরের মধ্যভাগ ডান বগলের নীচে দিয়ে এবং তার দুই প্রান্ত বাম কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো (ইযতিবা) অবস্থায় (বাহু খোলা রেখে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্ তাওয়াফ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৫৯, আবু দাউদ ১৮৮৩ ইফাঃ)

২. ইয়ালা ইবনে উমাইয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান কাঁধ খোলা রেখে এবং বাম কাঁধের উপর চাদরের উভয় কোণ একত্রে লটকিয়ে তাওয়াফ করেন। কাবীসা (রাঃ) তার বর্ণনায় বলেন, তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর। (সুনানে ইবনে মাজা ২৯৫৪)

প্রথম তিন চক্করে রমল করাঃ

রামল শুরু হয় সপ্তম হিজরীতে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ষষ্ঠ ‘হিজরীতে হুদায়বিয়া থেকে ফিরে যান উমরা আদায় না করেই। হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী বছর তিনি ফিরে আসেন উমরা পালনের উদ্দেশ্যে। সময়টি ছিল যিলকদ মাস। সাহাবাদের কেউ কেউ জ্বরাক্রান্ত হয়েছিলেন। তাই মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদেরকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল, ‘এমন এক সম্প্রদায় তোমাদের কাছে আসছে ইয়াছরিবের (মদিনার) জ্বর যাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবাদেরকে (রাঃ) রামল অর্থাৎ আমাদের যুগের সামরিক বাহিনীর কায়দায় ছোট ছোট কদমে গা হেলিয়ে বুক টান করে দৌড়াতে বললেন। উদ্দেশ্য, মুমিন কখনো দুর্বল হয় না এ কথা মুশরিকদেরকে বুঝিয়ে দেয়া। একই উদ্দেশ্যে রামলের সাথে সাথে ইযতিবা অর্থাৎ চাদর ডান বগলের নীচে রেখে ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখারও নির্দেশ করলেন তিনি। সেই থেকে রমল ও ইযতিবার বিধান চালু হয়েছে।

এই কথার দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কা্ আগমন করলে মুশরিকরা মন্তব্য করল, এমন একদল লোক আসছে যাদেরকে ইয়াসরিব-এর (মাদ্বীনার) জ্বর দুর্বল করে দিয়েছে (এ কথা শুনে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রামল’ করতে (উভয় কাঁধ হেলে দুলে জোর কদমে চলতে) এবং উভয় রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটুকু স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবীদের প্রতি দয়াবশত সব ক’টি চক্করে রামল করতে আদেশ করেননি। (সহিহ বুখারি ১৬০২)

বনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ শরীফ প্রথমবারের তাওয়াফে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে তাওয়াফ করতেন। তিনি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈর সময় (বাতনুল মাসীল) মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়াতেন। ইবনু উমর (রাঃ)-ও তাই করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৮)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় তিন চক্করে রামল করেতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা’ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৭

সেই সপ্তম হিজরী থেকে রমল করা শুরু হয়ে আজও এইকাজ সুন্নাহ হিসাবে পরিগনিত হয়ে আসছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় সাহাবী রাদুয়াল্লাহু আনহুগন ও এই আমল ছাড়েন নাই।

দলিলঃ আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ ‘উমর ইব্‌নু খাত্তাব (রাঃ) হাজ্‌রে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে! আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিতরূপে জানি তুমি একটি পাথর, তুমি কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। এরপর তিনি চুম্বন করলেন। পরে বললেন, আমাদের রামল করার উদ্দেশ্য কী ছিল? আমরা তো রামল করে মুশরিকদেরকে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করেছিলাম। আল্লাহ এখন তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর বললেন, যেহেতু এই (রামল) কাজটি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছেন, তাই তা পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না। (সহিহ বুখারি ১৬০৫)

১০বাকী চার চক্কর সাধারণ গতিতে আদায় করা

১. ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মক্কায় পৌছে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার জন্য বায়তুল্লাহর যে তাওয়াফ করতেন, তাতে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে সম্পন্ন করতেন। তাপর দু’রাকাআত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৯)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাজরে আসওয়াদ হতে শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন বার দ্রুত পদক্ষেপে তাওয়াফ করেন এবং ধীর পদক্ষেপে চারবার তাওয়াফ করেন। (তিরমিজি ৮৫৭)

১১প্রতি চক্করেই রোকনে ইয়ামীনি স্পর্ম করাঃ

রুকনে ইয়ামানী এটি কাবাঘরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এটি ইয়ামান দেশের দিকে হওয়াতে একে রুকনে ইয়ামানী বলা হয়েছে থাকে। কাবা ঘরের এই অংশে কখনো  চুম্বন  করবেন না, তবে স্পর্শ করা মুস্তাহাব। মনে রাখতে হবে শুধু হাজরে আসওয়াদ পাথটি চুম্বন করব আর রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করব।  যা সহহি হাদিস দ্বারা প্রমানিত। ইহা ছাড়া অন্য কোন স্থান ষ্পর্শ বা চুম্বন কোন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয়। যা হয় শুধুই আবেগের ফল। বিষয়টি বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেই।

১. একবার হযরত মু‘আবিয়া ও ইবনু আববাস (রাঃ) একত্রে ত্বাওয়াফরত অবস্থায় মু‘আবিয়া (রাঃ) কাবাগৃহের সবগুলি রুকন (চারটি কোণ) স্পর্শ করলে ইবনু আববাস (রাঃ) তার প্রতিবাদ করে বলেন, কেন আপনি এ দু’টি রুকন স্পর্শ করছেন? অথচ রাসূল (ছাঃ) এ দু’টি স্পর্শ করেননি। জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বলেন, কা‘বাগৃহের কোন অংশই পরিত্যাগ করার নয়। তখন ইবনু আববাস আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে’ (আহযাব ২১) জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বললেন, আপনি সত্য বলেছেন’। (ত্বাবারাণী আওসাত্ব ২৩২৩, আহমাদ ৩৫৩২ হাদিসে সনদ সহহি)

২. আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু স্তম্ভ (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে। (সুনানে নাসাঈ ২৯২২ হাদিসের মান সহিহ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সুন্নত হচ্ছে, এটিকে চুমু না দিয়ে শুধু স্পর্শ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে এ রুকনটিতে স্পর্শ করতেন।

১. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল ইয়ামানী রুকন দু’টিই স্পর্শ করতে দেখেছি। (সহিহ মুসলিম ২৯১৩)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দুই ইয়ামানী রুকন ব্যতীত বায়তুল্লাহর অন্য কিছু স্পর্শ করতে দেখিনি।  (সহিহ মুসলিম ২৯৫১)

৩. উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখি, যা আপনার অন্য কোন সঙ্গীকে করতে দেখিনা। তিনি বললেন, ‘ইবনু জুরায়জ, সেগুলো কি?’ তিনি বললেন, আমি দেখি, (১) আপনি তাওয়াফ করার সময় রুকনে ইয়ামানী দু’টি ব্যতীত অন্য রুকন স্পর্শ করেন না। (২) আপনি ‘সিবতী’ (পশমবিহীন) চপ্পল পরিধান করেন; (৩) আপনি (কাপড়ে) হলুদ রং ব্যবহার করেন এবং (৪) আপনি যখন মক্কায় থাকেন লোকে চাঁদ দেখে ইহরাম বাঁধে; কিন্তু আপনি তারবিয়ার দিন (৮ ই যিলহাজ্জ) না এলে ইহরাম বাঁধেন না।

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ রুকনের কথা যা বলেছ, তা এজন্য করি যে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইয়ামানী রুকনদ্বয় ছাড়া আর কোনটি স্পর্শ করতে দেখিনি। আর ‘সিবতী’ চপ্পল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পশমবিহীন চপ্পল পরতে এবং তা পরিহিত অবস্থায় অজু করতে দেখেছি, তাই আমি তা করতে ভালবাসি। আর হলুদ রং, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা দিয়ে কাপড় রঙিন করতে দেখেছি, তাই আমিও তা দিয়ে রঙিন করতে ভালবাসি। আর ইহরাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে তাঁর সওয়ারি রওনা না হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ইহরাম বাঁধতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি ১৬৭ ইফাঃ)

১২প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা ইশারা দ্বারা চুম্বন করাঃ

১. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার ইঙ্গিত করতেন এবং তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি  ১৬১৩)

২. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইঙ্গিত করতেন। (সহিহ বুখারি  ১৬১২)

মন্তব্যঃ বর্তমান ভীড়ের কারনে প্রতি চক্করতো দুরের কথা, পুরা সফরেই একবার চুম্বন করা সম্বব নয়। আর মহিলাদেরতো হজ্জের মৌসুমে চুম্বন করার প্রশ্নই আসে না। যা হোক সরাসরি চুম্বন করা আর ইশারায় চুম্বর করার মাঝে তেমন পার্থক্য নাই কেননা, আমলটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি প্রমানিত যে, তিনি প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ ইশারা দ্বারা চুম্বন করেছেন।

১৩। প্রতি চক্করে তাকদির দেয়াঃ

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩২)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের উপর সওয়ার অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন। হাজারে আসওয়াদের কাছে পৌঁছেই নিজের হাতের কোন জিনিস (লাঠি) দিয়ে ইশারা করতেন এবং (আল্লা-হু আকবার) তাকবীর দিয়েছেন। (মিসকাত ২৫৭০)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখাই ১৬০৭)

১৪পায়ে হেঁটে বা বাহনে চড়ে তাওয়াফ করাঃ

১. সাফিয়্যাহ বিনতু শাইবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপদ হওয়ার পর তাঁর উটে সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন এবং তাঁর হাতের লাঠির সাহায্যে (ইশারায়) হাজরে আসওয়াদে চুমু দিলেন। সাফিয়্যাহ বলেন, আমি এ দৃশ্য তাকিয়ে দেখেছিলাম। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৭৮)

২. আবুত তুফাইল (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর সাওয়ারীতে চড়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে দেখেছি। তিনি তাঁর লাঠির সাহায্যে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার পর তাতে চুমু দিয়েছেন। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি‘র বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তিনি সাফা ও মারওয়ায় যান এবং স্বীয় বাহনে আরোহিত অবস্থায়ই সাত বার তাওয়াফ (সাঈ) করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৭৯)

মন্তব্যঃ এখন ভীরের কারনে বাহনে চড়ে তাওয়াফ করার আর প্রশ্ন উঠে না। তবে যারা অসুস্থ, বৃদ্ধ, মাজুর, মহিলা, শিশু ইত্যাদি লোক জন তাদের উপরের কারনে হুইল চেয়ারে করে কাবা তাওয়াফ করতে পারেন।

১৫তাওয়াফের মাঝে দোয়া ও জিকির করাঃ

তাওয়াফরত অবস্থায় খুব বেশী বেশী জিকির, দোয়া ও তাওবা করতে থাকবেন। কুরআন তিলাওয়াতও করা যায়। কিছু কিছু বইতে আছে প্রথম চক্রের দোয়া, ২য় চক্রের দোয়া ইত্যাদি। কুরআন হাদীসে এ ধরনের চক্রভিত্তিক দোয়ার কোন ভিত্তি নাই।

১. তাওয়াফের করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নীচের দোয়াটি পড়তেন। দোয়াটি হলঃ

**اَللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيْقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مَحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم**-

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রতি ঈমান এনে, তোমার কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য তোমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে এ তাওয়াফ কার্যটি করছি।

২. এর পর মাকামে ইব্রাহীমের নিকট পড়েছেন,

*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। ( সুরা বাকারা ২:১২৫)

৩. ইয়ামানীর পাশে এসে পৌঁছলে ভীড় না হলে এ কোণকে ডান হাত দিয়ে ষ্পর্শ করার চেষ্টা করা। কিন্তু সাবধান, এ রুকনে ইয়ামেনীকে চুমু দেবেন না, এর পাশে এসে হাত উঠিয়ে ইশারাও করবেন না এবং সেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ও বলবেন না। ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন হাজরে আসওয়াদে পৌঁছে। রুকনে ইয়ামেনী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নের এ দোয়াটি পড়া মুস্তাহাবঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)

৪. উপরের দোয়াটি পড়তে পড়তেই আপনি রুকনে ইয়ামেনী থেকে হাজরে আসওয়াদে চলে এসেছেন। আপন এবার নতুন তাওয়াফ চক্কর শুরু করছেন। তাওয়াফের প্রত্যেক চক্রেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা ষ্পর্শ করা উত্তম। কিন্তু হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড়ের কারণে এটি খুবই দূরূহ কাজ। সেক্ষেত্রে প্রতি চক্রেই হাজরে আসওয়াদের পাশে এসে এর দিকে মুখ করে ডান হাত উঠিয়ে ইশারা করবেন। ইশারাকৃত এ হাত চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় একবার বলবেন (بسم الله الله أكبر ) ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’।

১৬তাওয়াফের মাঝে জরুরী কথা বলা ও কাজ করা যায়ঃ

তাওয়াফ মহান আল্লাহর জন্য খাসভাবে নিবেদীত একটি ইবাদাত। ইবাদতের সময় আজে বাদে কথা ও কাজ থেকে দুরে থাকা ইমানের দাবি। কাজেই তাওয়াফ করার সময় কোন প্রকার ফাহেসা করা ও কাজ না করা ভাল। তবে প্রয়োজন সাথীদের সাথে কথা বলেলে তাওয়াফ ভঙ্গ হয় না। আবার এমন জরুরী কাজ যা না করলে তাওয়াফ ব্যাহত হয়। সে সকল কাজ তাওয়াফের মাঝে করা যায়। এমনকি সালাতের ইকামত হলে তাওয়াফ স্থগিত রেখে জামাতে অংশগ্রহন করতে হয়। সালাত শেষে বাকি তাওয়াফ করতে হয়।

দলিলঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাত আদায় করার মতই। তবে সালাতে তোমরা কথা বলতে পার না কিন্তু এতে কথা বলতে পার। সুতরাং এ সময় ভাল কথা ছাড়া কিছূ বলবে না। (সুনানে তিরমিজি ৯৬৩ ইফাঃ)

২. তাওয়াফ করার সময় কথাবার্তা বলাঃ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সময় এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, সে চামড়ার ফিতা বা সূতা অথবা অন্য কিছু দ্বারা আপন হাত অপর এক ব্যক্তির সাথে বেঁধে দিয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাঁর বাঁধন ছিন্ন করে দিয়ে বললেন, হাত ধরে টেনে নাও। (সহিহ বুখারি ১৬২০)

৩. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বায়তুল্লাহর তাওয়াফও সালাতই, তবে তাওয়াফের মধ্যে কথা বলা আল্লাহ হালাল করেছেন (যা সালাতে হারাম)। ফলে যে ব্যক্তি এতে (তাওয়াফের মধ্যে) কথা বলবে, সে যেন কল্যাণকর কথা ব্যতীত অন্য কোনো কথা না বলে। (সুনানে আদ দামেরী ১৮৮৪)

১৭তাওয়াফ শেষ করে জমজমের পানি পান করা

 যমযমের পানি পান করতে যাওয়া মুস্তাহাব। পান শেষে যমযমের কিছু পানি মাথার উপর ঢেলে দেয়া সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন।

১. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৪)

২. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে যমযমের পানি পান করিয়েছি। তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় তা পান করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৪)

তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহ আলোচনা করা হলোঃ

তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহঃ

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মনে করা

২। ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

৩। প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়া

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করা

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়া

৭। সাত চক্করেই তাওয়াফে রমল করা

৮। অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা

৯। মহিলাদের রমল

১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করা

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করা

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করা

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়

১৪। তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করা

১৫। মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

১৬। বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

১৭। বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করা

১৮। নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করাঃ

পূর্বে উল্লেখিত বহু হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমানিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বা ইশারার সাহায্য চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করছেন। তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মুলত একটি সুন্নাহ আমল। এই আমলটিকে জ্ঞানের সল্পতার কারনে বা না জানার কারনে অনেক ওয়াজিব মনে করে থাকে। যারা ওয়াজিব মনে করে তারা মনে করে,হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা না করলে মনে হয় তাওয়াফে শুদ্ধ হবে না।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা একটি সুন্নাহ। তাই কোন ব্যক্তি যদি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন না করে বা ভিড়ের কারনে করতে না  পারে তবে তার তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না। তাই তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করা এতটি ভুল ধারনা মাত্র।

ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

ইযতিবা অর্থ চাদরের দু’প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর রেখে দিয়ে ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখা। ইযতিবা করতে হয় তাওয়াফ করার সময়। সুনানে তিরমিজিতে হাসান সদনে একটি হাদিসে এসেছেঃ

ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একটি চাদরের মধ্যভাগ ডান বগলের নীচে দিয়ে এবং তার দুই প্রান্ত বাম কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো (ইযতিবা) অবস্থায় (বাহু খোলা রেখে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্ তাওয়াফ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৫৯, আবু দাউদ ১৮৮৩ ইফাঃ)

কেউ কেউ ইহরাম বাধার নিয়ত করার পর থেকে ইযতিবা করে থাকেন। অনেক হজ্জযাত্রী ইহরামের শুরু থেকে হালাল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি করে থাকেন। আবার কেউ কেউ তাওয়াফ শেষে ইযতিবা অবস্থাতেই দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা। অনেক আবার সাফা মারওয়ায় সাঈ করার সময় করে থাকে। এভাবে ইযতিবা করা একটি ভুল পদ্ধতি। ইযতিবা শুধুমাত্র তাওয়াফে কুদুমের মধ্যে করতে হয়, যেমনটি হাদিসে এসেছে। সাঈয়ের মধ্যেও বা তাওয়াফের আগে করা যাবে না।

মন্তব্যঃ তামাত্তু ও কেরান হজ্জের ফরজ তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা নাই। ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীদের ফরজ হজ্জের সময় তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা করতে হয়। তাওয়াফের সময় পুরুষের জন্য রামল ইযতিবা করেত হলেও নারীদের রামল ইযতিবা করতে হয় না।

    প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়াঃ

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ (٢٩)

অর্থঃ তারপর নিজেদের ময়লা দূর করে, নিজেদের মানত পূর্ণ করে এবং প্রাচীন গৃহের তাওয়াফ করে(সুরা হজ্জ ২২:২৯)

কাবা ঘরের তাওয়াফ একটি ফরজ ইবাদাত। এই ইবাদতে আদায়ের যথাযত পদ্দতি কুরআন সুন্নাহ দ্বারা ষ্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজে আমল করে রেখে গেছেন। তাওয়াফের কোথায় কি দোয়া আমল করতে হবে তাও সহিহ হাদিসে বিবৃত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন বইতে দেখা যায় প্রতি তাওয়াফে আলাদা আলাদ দোয়ার কথা লেখা আছে।

অনেক খুব কষ্ট করে এই আবরী দোয়া মুখস্ত করে হজ্জে গমন করেন। দোয়া কষ্ট করে মুখস্ত করলেও তার অর্থ কিন্তু অজানা থেকে যায়। এই দোয়াগুলো অর্থের দিক থেকে ভাল। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও এই ধরনের আমল করেন নাই।

মূলত নতুনভাবে আবিষ্কৃত, বেদাত। তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। তবে তাওয়াফের এই পুরো সময়টুকু দোয়া কবুলের সময়। তাই যেকোনো ধরনের দোয়া এই সময় আপনি করতে পারেন। সবচেয়ে উত্তম দোয়া হচ্ছে, যেটি আপনার অন্তরের মধ্যে এসেছে, আপনি আপনার ভাষায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পেশ করলেন। এটা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম দোয়া।

দোয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে দুটি। প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে চাইতে হবে। অর্থাৎ চাওয়াটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে হতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, কী চাইছেন, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। আপনি দোয়া করলেন, কিন্তু আপনি সেটা বুঝলেন না। তাহলে তো আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে চাইতে পারেননি। এ জন্য আরবিতে কতগুলো দোয়া লিখে নিয়ে গেলেন, আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে বললেন। অথচ আপনি জানলেনই না আপনি কী বললেন। এটা আসলে ভুল কাজ। তবে রাসূল (সা.) যে দোয়াগুলো শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো যদি কেউ জানেন, সেটাও উত্তম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জিনিসটা বুঝতে হবে যে আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে কী চাইলেন।

তাই যাঁদের কাছে আরবি ভাষার জ্ঞান নেই অথবা যাঁরা মূলত আরবি বুঝতে পারেন না, উত্তম হচ্ছে, তাঁরা বাংলায় অথবা তাঁদের মাতৃভাষায় দোয়া করবেন। কারণ, তিনি সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। আপনি যখন জিনিসটা বুঝবেন, তখন আবেগ তৈরি হবে, সেখানে একটু আবেগ আসবে। এই জন্য সেই আবেগের সঙ্গে অত্যন্ত মিনতির সঙ্গে যদি আল্লাহতায়ালার কাছে সেটা তুলে ধরেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল্লাহর বান্দার সেই দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।  

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করাঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি। ইন্দুনেশীয়ার অনেক মুসলীম ভাই বোনেরা জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করেন। তাদের সকলের মাথায় এক রকমের রুমাল বা স্ক্রাপ পড়া। আমার ধারনা  তারা হয়ত একে অপর থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে এ কাজটি করে থাকেন। আসলে তাদের উদ্দেশ্য হল জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা। তাদের জামাতের কেউ দল ছুট হয়ে গেলে, মাথার রুমালের কালার দেখে তাড়াতাড়ি মাতাফে তাদের অবস্থান বুঝতে পাবরে এবং আবার জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে। দলের সাথে একত্র হওয়ার জন্য দল ছুট ব্যাক্তি মাতাফে এলোমোলো চলাচল করে ফলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।  অপর পক্ষে জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার ফলে মাতাফে ভিড় সৃষ্টি হয়। অন্যদের ওপর অস্বাভাবিক চলাচলে চাপ পড়ে। এতে অন্যদের ভীষণ কষ্ট হয়। অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা খারাপ। সার কথা হলোঃ  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম এমনটি করেননি। উলামায়ে কিরাম এটিকে বিদআত বলেছেন। বিশুদ্ধ হলো একাকী নিজে নিজে তালবিয়াহ পাঠ করা। ।

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করাঃ

জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার সময় দেখা যায় এরা জামাতবদ্ধ হয়ে মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করে থাকে। জামাতের মধ্যে একজন মুখস্থ বা দেখে দেখে উঁচু আওয়াজে দোয়া পড়ে আর তার সঙ্গে পুরো জামাত সমস্বরে দোয়া পড়তে থাকে। এই কাজটি পরিষ্কার বিদআত। এই ধরনের আমল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার সাহাবি রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। আমাদের পূর্বসুরি কোন মুজতাহীদ আলেম থেকেও প্রমানিত নয়। দোয়ার করার যে সহজ্জ সরল পদ্দতি আছে তার সাথে এর কোন মিল নাই। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করলে নিজে শুধু গদবাধা কথা মুখে উচ্চারণ করে। এতে নিজের চাহিদা মত দোয়া করা সম্ভব হয়ণা এবং উচ্চস্বরের জন্য অন্যদের একাগ্রতা বিঘ্নিত হয়। যার ফলে নিজের দোয়ার সাথে সাথে মাতাফে অবস্থানরত সকল হাজিদের দোয়া নষ্ট করছি। এই বিদআত ত্যাগ করা খুবই জররী। আশার কথা হল, আরবেদের মত আমাদের উপমহাদেশে হাজিগন এই বিদআত থেকে অনেকটিই মুক্ত।

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়াঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি অনকেভাই তাওয়াফ করার সময় এক থাকে বই রেখে দিয়ে বইয়ের দিক তাকিয়ে পড়ছেণ আর হাঁটছেন। দোয়ার দিকে, দোয়ার অর্থের দিকে, তাওয়াফের দিকে এমন কি পাশের লোকের দিকেও কোন খেয়ার নেই। এক দিকে শুধুই খেয়ার কিভাবে দোয়ার রিডিং পড়ে শেষ করবে। এতে কোন তাওয়াফের সময় তার কি ভাব হলে তা বলা কষ্টকর হলে ও এ কথা বলা যায় যে, তার মনযোগ পড়ার প্রতি থাকায় মাতাফে অন্যদের কষ্ট হয়। যদি সকলেই নিজে নিজে চলত এবং দেখে দেখে দোয়া না পড়ত, যা মুখস্থ আছে তা-ই পড়ত তাহলে মাতাফে হঠাৎ যে চাপ সৃষ্টি হয় তা হত না। সকলেই একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে নিমগ্ন থেকে দোয়া ও তাওয়াফ করতে পারত।

৭। পুরো তাওয়াফে রমল করাঃ

তাওয়াফের সময় মুজাহিদের মতো বীরদর্পে দুই কাঁধ দুলিয়ে দ্রুতপায়ে চলা। হজ্জের সফরে মক্কার মুশরিকরা সাহবিদের লক্ষ করে বলছিল, ইয়াসরিবের (মদিনার) আবহাওয়া মুসলমানদেরকে দুর্বল ও রুগ্ন করে ফেলেছে। মুশরিকদের এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দেন। যেমন হাদিসে এসেছেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে নিয়ে মক্কায় আগমন করলে মুশরিকরা মন্তব্য করল, এমন একদল লোক আসছে যাদেরকে ইয়াসরিব এর (মদিনার) জ্বর দুর্বল করে দিয়েছে (এ কথা শুনে) নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করতে এবং উভয় রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটুকু স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবাদের প্রতি দয়াবশত সব কয়টি চক্করে রমল করতে আদেশ করেন নি। (সহিহ বুখারী ১৫০৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ অতপর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং পরেও এ বিধান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। কিন্তু নফল তাওয়াফ অর্থাৎ হজ্জ ও ওমরার নিয়্যাতে নয়, বাইতুল্লায় নামাজের সময় বা আগে পরে তাওয়াফ করার সময় রমল বা ইযতিবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, অনেককে দেখা যায়, তাওয়াফের ৭ চক্করেই রমল করে থাকে। আবার কেউ কেউ নফল তাওয়াফেও রমল করে। মনে করে, রমল সকল তাওয়াফে এবং তাওয়াফের সব চক্করেই করতে হয়। অথচ এটি ভুল। রমল শুধু ওই তাওয়াফেই করতে হয়, যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে। আর এই তাওয়াফেরও সব চক্করে নয়, শুধু প্রথম তিন চক্করে।

অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করাঃ

রমল করা সুন্নত। মাতাফে কোনো কোনো সময় অস্বাভাবিক ভিড় হয়। বিশেষ করে হজের আগে দু-এক দিন এবং যিলহজের ১০-১১ তারিখে। তখন মাতাফে চলাই মুশকিল হয়। সামান্য নড়াচড়ার প্রভাব পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু আশ্চর্য হলো, ওই কঠিন ভিড়েও কাউকে কাউকে রমল করতে দেখা যায়। এতে নিজেরও প্রচুর কষ্ট হয়। বিশাল জনসমুদ্রকেও কষ্ট দেয়া হয়। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, রমলটা তাওয়াফের ফরজ অংশ। এজন্যই বুযুর্গগণ বলেন, ‘যথাযথ হজ্জ করতে হলে সামান্য ইলম যথেষ্ট নয়; বরং প্রচুর ইলম এবং তার সঙ্গে অনেক বেশি আকলের প্রয়োজন।’ রমল ছাড়াও তাওয়াফ আদায় হয়ে যায়। তাই প্রচন্ড ভিড়ে অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা যাবে না; বরং তখন স্বাভাবিকভাবে চলবে। চলতে চলতে কখনো সামান্য ফাঁকা পেলে এবং অন্যের কষ্ট না হলে স্বাভাবিক গতিতে রমলের চেষ্টা করবে। (সহিহ মুসলিম ৪১০)।

৯। মহিলাদের রমলঃ

রমল শুধু পুরুষের জন্য। এ বিধানটি মহিলাদের জন্য নয়। কিন্তু কখনো কখনো মহিলাদেরকেও তা করতে দেখা যায়। এটি ভুল। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদিস ১৩১১০)।

.১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করাঃ

উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কে বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখছি- যা আপনার সঙ্গী-সাথীদের কাউকে করতে দেখিনি। তিনি বললেন, হে ইবনু জুরায়জ! সেগুলো কি কি? তিনি বললেন, আমি দেখেছি আপনি রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত আর কোন রুকন স্পর্শ করেন না। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি পশমবিহীন চামড়ার স্যাণ্ডেল পরিধান করেন। আমি আরও দেখেছি যে, আপনি হলুদ বর্ণ ব্যবহার করেন। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি মক্কায় অবস্থানকালে (যিলহাজ্জ মাসের) আট তারিখে ইহরাম বাধেন। অথচ লোকেরা নতূন চাঁদ দেখার সাথে সাথে ইহরাম বাধে।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, রুকন সমূহের ব্যাপারে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ছাড়া অন্য কোন রুকন স্পর্শ করতে দিতে দেখিনি। আর পশমবিহীন স্যাণ্ডেলের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পশমবিহীন চামড়ার স্যান্ডেল পরিধান করতে দেখেছি। তিনি তা পায়ে দিয়ে উযুও করতেন। আমিও তাই এ ধরনের স্যাণ্ডেল পছন্দ করি। হলুদ রঙ এর সম্পর্কে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এই রং ব্যবহার করতে দেখেছি। অতএব আমিও এই রং পছন্দ করি। ইহরাম সম্পর্কে বলতে হয় যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তখনি তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছি যখন তাঁর উট যাত্রা শুরু করেছে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৯ ইফঃ)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনি তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইশারা করতেন এবং তাকবীর বলতেন। (সহহি বুখারী ১৫১৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আগেই জেনেছি, সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন বা স্পর্শ করা সুন্নত। পক্ষান্তরে সম্ভব না হলে কেবল ইশারা করাই সুন্নত। ঠিক তেমনিভাবে সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা সুন্নাহ। কিন্তু অনেকে এই সুন্নাহ বাদ দিয়ে হাজরে আসওয়াদ মতই রুকনে ইয়ামেনিকে চুম্বন করে থাকে। এটা ঠিক নয়, বরং সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা ও এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা। স্পর্শ করা সম্ভব না তাকে আর হাজরে আসওয়াদের মত হাতের ইশারায় চুম্বন করার কোন বিধান নেই। তাওয়াফের সময় কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সারকথাঃ সম্ভব হলে তাওয়াফ শুরুতে আসওয়াদ চুম্বন অথবা ইশারা করব। অপর পক্ষে প্রতি চক্করে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করব কিন্তু সম্বব না হলে,  চুম্বন বা ইশারা কোনটাই করব না। তাওয়াফের সময় অনেকেই মাকামে ইবরাহীমকে হাত অথবা রুমাল-টুপি দিয়ে স্পর্শ করে থাকে। আবার কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন দাড়িয়ে থাকে। এগুলি আবেগী মনের ভাবনা মাত্র। এই সব কোন সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। এক জনের দেখা দেখি অন্য জন করছে। জরুরী মনে কের এই কাজগুলি বিদআত হবে এতে কোন প্রকার সন্দেহ নাই। কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাহাবী (রাঃ) কেউ হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করাঃ

অনেক আবেগী হাজিকে দেখা যায় কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করছে। মহান আল্লাহ ভয়ে কান্নাকাটি করা নিঃসন্দেহ একটি উত্তম আমল। কিন্তু এই ভয়ের কান্না হবে গোপনে ও নিরবে। আর যে কোন কারনে এ কান্না প্রকাশ্যে হলেও দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের রাসুল ও তার সাহাবীগন এইভাবে কাবার দেয়ার ধরে কান্নাকাটি করেনি যেমন আমরা করছি। যদি কেউ ইহাকে ইবাদাত বা আল্লাহকে খুসি করার জন্য করে তবে বিদআত হবে। কাজেই এই ধরনের আবেগ থেকে দুরা থাকি। 

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করাঃ

তাওয়াফের সময় কেউ কেউ হাতীমের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। এরূপ করলে তাওয়াফ হবে না। কেননা হাতীম পবিত্র কাবার অংশ হিসেবে বিবেচিত। হাতিমের পুর্ব পাশ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে পশ্চিম পাশ দিয়ে বাহির হলে তো আর কাবা ঘর সম্পূর্ণ তাওয়াফ হবে না। এর হলে তার তাওয়াফ ছুটে যাবে। ফলে তাকে আবার তওয়াফ করতে হবে।

আবূস্‌ সাফর (রহঃ) বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনেছি, হে লোক সকল! আমি যা বলছি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর এবং তোমরা যা বলতে চাও আমাকে শোনাও এবং এমন যেন না হয় যে তোমরা এখান থেকে চলে গিয়ে বলবে ইবনু ‘আব্বাস এরূপ বলেছেন। (অতঃপর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন) যে ব্যাক্তি বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতে ইচ্ছা করে সে যেন হিজর এর বাহির থেকে তাওয়াফ করে এবং এ স্থানকে হাতীম বলবেনা কারণ, জাহেলীয়াতের যুগে কোন ব্যাক্তি ঐ জায়গাটিতে তার চাবুক, জুতা তীর ধনু ইত্যাদি নিক্ষেপ করে হলফ করত। (সহিহ বুখারী ৩৫৬৯ ইফাঃ)

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়ঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى

অর্থঃ যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সহহি বুখারি ১৫২৮ ইফাঃ )

এ থেকে অনেকের ধারণা মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে। এই নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া মাসজিদের অন্য কোথাও তাওয়াফের দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা যাবে না। এ ধারণাও সঠিক নয়। বরং মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায় করবে সম্ভব না হলে হারামের যে কোন স্থানে পড়ে নিবে। আর কারন বসত হারামের বাহিরেও আদায় করা যায়ঃ প্রমান নিম্মের হাদিসঃ

উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অসুস্থতার কথা জানালাম, অন্য সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু হারব (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে প্রস্থান করার ইচ্ছা করলে উম্মু সালামা (রাঃ)-ও মক্কা ত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, অথচ তিনি (অসুস্থতার কারনে) তখনও বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁকে বললেনঃ যখন ফজরের সালাতের ইকামত দেওয়া হবে আর লোকেরা সালাত আদায় করতে থাকবে, তখন তোমর উটে আরোহণ করে তুমি তাওয়াফ আদায় করে নিবে। তিনি তাই করলেন। এরপর (তাওয়াফের) সালাত আদায় করার পূর্বেই মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। (সহহি বুখারি ১৫২৭ ইফাঃ )

১৪ তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করাঃ

অনেকে ধারনা প্রতি চক্করে মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করতে হবে। সহিহ হাদিস সমুহে প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদকে ষ্পর্শ করার কথা প্রমানি হলেও কোন জাল বা যঈফ হাদিসেও তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করার কথা বলা হয় নাই। কাজেই যদি ইবাদত বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করে তবে তাজ কাজটি ইবাদাত না হয়ে বিদআত হবে। কোন কারন ছাড়া মাকামে ইবরাহীম নিকট গেলে বা ষ্পর্শ করলে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু আমলের নিয়তে বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে করা বা ভাবা যাবে না।

১৫ মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

তাওয়াফ শেষ করা পর দুই রাকাত সালাত আদায়কে অনেক ওয়াজিব বলেছেন। মুলত এই সালাত আদায় করা সু্ন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

* وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى *

অর্থঃ আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

এই আয়াতে আলোকে অনেকে ভাবেন তাওয়াফের এই দুই রাকাত সালাত মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। মাকামে ইবরাহীর পিছেন এই সালাত পড়লে কোন সমস্যা নাই। এই সালাত কাবা ঘরের যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। তবে যদি কেউ মনে করে যে, এই সালাত শুধু মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। অন্য স্থানে পড়া যাবে না বা অন্য স্থানে পড়লে আদায় হবে না। তাদের এই ধারনা ভুল। এই সালাত যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। হজ্জের মৌসুমে প্রচুর ভীড় থাকে এই সময় মাকামে ইবরাহীমের পিছেন তাওয়াফ করাই কষ্টকর, সালাত আদায়তো অনেক দুরের কথা। তবে হ্যা, দিন রাতের কোন এক সময় ভাগ্যক্রমে ফাঁকা পাওয়া যেতে পারে। ফাঁকা পেলে এখানে সালাত আদায়ে সমস্যা নাই। কিন্তু দেখা যায়, প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে একজন দাড়িয়ে সালাত আদায় করছে। আর হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাতের যেহেতু কোন অতিরিক্ত ফজিলত নাই তাই ভীড় হলে এখানে সালাত আদায় না করাই উত্তম। 

১৬বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্নভাবে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেনপ্রত্যাবর্তন না করে যাবত না তার সর্বশেষ কাজ হবে শেষবারের মত বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। (সহহি মুসলীম ৩০৮৯ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, লোকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (প্রত্যাবর্তনকালে) তাদের সর্বশেষ কাজ যেন হয় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। কিন্তু ঋতুমতী মহিলাদেরকে তা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। (সহহি মুসলীম ৩০৯০ ইফাঃ )

মন্তব্যঃ বিদায়ী তাওয়াফই হল হজ্জ ও উমরার শেষ ওয়াজিব আমল। তাই বিদয়ী তাওয়াফের পর কোন শরীয়ত সম্মত কারণ বা যাত্রার ব্যস্ততা ব্যতীত বিনা প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করা। অনেক কঙ্কর নিক্ষেপের কাজ শেষ করার পূর্বেই বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করে। যা একটি ভুল কাজ।

১৭বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করাঃ

অনেক অজ্ঞ লোক কাবাকে বেশী সম্মান দিতে গিয়ে, বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই ধরনের কাজ ইসলমি শরীয়তের বিদআত হিসাবে অবিহীত করে। কেননা, এই সকল আমলের কোন দলিল নেই। মতগড়া ও ভিত্তিহীন আবেগের স্থান ইসলামে নেই। আমাদের দেশে মুলত বিদআতি কিছু মাজার পালগ ভক্ত এমন কাজ করে থাকে সুফীদের মাজারকে কেন্দ্র করে। তারা মাজার থেকে বাহির হওয়ার সময়  উল্টোপায়ে হেটে মাজার চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই সকল বিদআতি মুসলিম সম্ববত এই বিদআতটি মাজার থেকে কাবায় নিয়ে গেছে। ইহার পাশাপাশি আবার অনেক কে দেখা যায়, বিদায়ী তাওয়াফের পর কাবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। তাদের এই আমলটিও একটি বিদাআতি আমল।

১৮নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরীঃ

কাবার একটি সাধারণ দৃশ্য হলো, নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করা। যুগ যুগ ধরে এমন আমল চলে আসছে। পুরুষের সঙ্গে নারীদের তাওয়াফ করা মুলত একটি বৈধ কাজ হিসাবে আলেমগন মত দিয়ছেন। কেননা, কাবার তাওয়াফকারীদের সংখ্যা এত বেশী যে, নারী পুরুষ আলাদা সময় বের করে তাওয়াফ করা সম্বব নয়। এই কারনে অনেক অজ্ঞ মুসলিম ধরনা করে থাকে, কাবায় নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী নয়। তাদের এই ধারনা ভিত্তিহীন। নারী পুরুষের পর্দা করা সব সময়ের জন্য ফরজ। তাওয়াফের সময় পর্দা সিথীল নয়। তবে পরিস্থিতীর কারনে নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করে। এই পরিস্থিতির কারনে একত্র তাওয়াফ করলেও তাকে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। এই জন্য নারীগন নিচের পরামর্শ গ্রহন করতে পারেন।

১. নারীকে হজ্জে গমনের সময় যেমন তার সফর সঙ্গী মাহরাম পুরুষ থাকতে হয়, তাওয়াফের সময়ও ঠিক তেমনি মাহরাম পুরুষ থাকতে হবে।

২. তাকে সব সময় ভীর এড়িয়ে কাবার একটু দুর দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। যাতে সরাসরি পুরুষের সাথে সংঘর্স না হয়।

৩. যখন ভীর কম থাকার সম্বাবনা তখন তাকে তাওয়াফের সময় বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে সকাল ১০ টা থেকে ১২ টার সময়। আরার রাত ১২ থেকে ফজরের আগ পর্যান্ত। এই সময় কাবার চত্বরে ভীর একটু কম থাকে।

৪. তাওয়াফের সময় পর পুরুষ পাশ কাটিয়ে চলতে হবে।

৫. মাহরম পুরুষ সাথীকে নারীর সামনে রেখে তাওয়াফ করা। প্রয়োজন বোধে নারী তার সাথীর কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করবে।

দলিলঃ  

আত্বা (রহঃ) বলেছেন, ইব্‌নু হিশাম (রহঃ) যখন মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে তাওয়াফ করতে নিষেধ করেন, তখন ‘আত্বা (রহঃ) তাঁকে বললেন, আপনি তাদের কী করে নিষেধ করেছেন, অথচ নবী সহধর্মিণীগন পুরুষদের সঙ্গে তাওয়াফ করেছেন? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, তা কি পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পরে, না পূর্বে? তিনি [আত্বা (রহঃ)] বললেন, হ্যাঁ আমার জীবনের কসম, আমি পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরের কথাই বলছি। আমি জানতে চাইলাম পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে কিভাবে তাওয়াফ করতেন? তিনি বললেন, পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে তাওয়াফ করতেন না। ‘আয়েশা (রাঃ) বরং পুরুষদের পাশ কাটিয়ে তাওয়াফ করতেন, তাদের মাঝে মিশে যেতেন না। এক মহিলা ‘আয়েশা (রাঃ) কে বললেন চলুন, হে উম্মুল ‘মু’মিনীন! আমরা তাওয়াফ করে আসি। তিনি বললেন, “তোমার মনে চাইলে তুমি যাও” আর তিনি যেতে অস্বীকার করলেন। তাঁরা রাতের বেলা পর্দা করে বের হয়ে (সম্পূর্ণ না মিশে) পুরুষদের পাশাপাশি থেকে তাওয়াফ করতেন। উম্মুল মু’মিনীনগন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে চাইলে সকল পুরুষ বের করে না দেয়া পর্যন্ত তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। ‘আত্বা (রহঃ) বলেনহ, ‘ঊবাইদ ইব্‌নু ‘উমাইর এবং আমি ‘আয়েশা (রাঃ) এর কাছে গেলাম, তিনি তখন “সবীর” পর্বতে অবস্থান করছিলেন।? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি বললাম, তখন তিনি কি দিয়ে পর্দা করছিলেন? আত্বা (রহঃ) বললেন, তখন তিনি পর্দা ঝুলানো তুর্কী তাঁবুতে ছিলেন, এছাড়া তাঁর ও আমাদের মাঝে অন্য কোন কিছু ছিলনা। (অকস্মাৎ দৃষ্টি পড়ায়) আমি তাঁর গায়ে গোলাপি রং-এর চাদর দেখতে পেলাম।  (সহিহ বুখারি ১৬১৮)

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের সাত চক্করের একটিতেও রমল করেননি। (সুনানে আবু দাউদ ২০০১)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযার (তাওয়াফে যিয়ারতের) সাত চক্কর রমল করেননি (জোর পায়ে চলেননি)। (মিসকাত ২৬৭৩)

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানোর বিধান

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানোর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানো

সাঈ অর্থ দৌড়ানো। কাবার অতি নিকটেই দু’টো ছোট্ট পাহাড় আছে যার একটি ‘সাফা’ ও অপরটির নাম ‘মারওয়া’। এ দু’ পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে মা হাজেরা শিশুপুত্র ইসমাঈলের পানির জন্য ছোটাছুটি করেছিলেন। ঠিক এ জায়গাতেই হজ্জ ও উমরা পালনকারীদেরকে দৌড়াতে হয়। শাব্দিক অর্থে দৌড়ানো হলেও পারিভাষিক অর্থে স্বাভাবিক গতিতে চলা। শুধুমাত্র দুই সবুজ পিলার দ্বারা চিহ্নিত মধ্যবর্তী স্থানে সামান্য একটু দৌড়ের গতিতে চলতে হয়। তবে মেয়েরা দৌড়াবে না।

উরওয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্জেস করলাম যে, মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

*إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ *

নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। (সুরা বাকারা ২:১৫৮)

(আমার ধারণা যে,) সাফা-মারওয়ার মাঝে কেউ সা‘ঈ না করলে তার কোন দোষ নেই। তখন তিনি [‘আয়িশাহ (রাযি.)] বললেন, ওহে বোনপো! তুমি যা বললে, তা ঠিক নয়। কেননা, যা তুমি তাফসীর করলে, যদি আয়াতের মর্ম তাই হতো, তাহলে আয়াতের শব্দ বিন্যাস এভাবে হতো।

 (لاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا ) 

‘‘দু’টোর মাঝে সা‘ঈ না করায় কোন দোষ নেই।’’

কিন্তু আয়াতটি আনসারদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুশাল্লাল নামক স্থানে স্থাপিত মানাত নামের মূর্তির পূজা করত, তার নামেই তারা ইহরাম বাঁধত। সে মূর্তির নামে যারা ইহরাম বাঁধত তারা সাফা-মারওয়া সা‘ঈ করাকে দোষাবহ মনে করত। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! পূর্বে আমরা সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করাকে দোষা মনে করতাম। (এখন কী করবো?) এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা‘আলা

 (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ ) 

অবতীর্ণ করেন। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, (সাফা ও মারওয়ার মাঝে) উভয় পাহাড়ের মাঝে সা‘ঈ করা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধান দিয়েছেন। কাজেই কারো পক্ষে এ দুয়ের সাঈ পরিত্যাগ করা ঠিক নয়। (রাবী বলেন) এ বছর আবূ বাকার ইবনু ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) কে ঘটনাটি জানালাম। তখন তিনি বললেন, আমি তো এ কথা শুনিনি, তবে ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ব্যতীত বহু ‘আলিমকে উল্লেখ করতে শুনেছি যে, মানাতের নামে যারা ইহরাম বাঁধত তারা সকলেই সাফা ও মারওয়া সায়ী করত, যখন আল্লাহ কুরআনে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা উল্লেখ করলেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার আলোচনা তাতে হলো না, তখন সাহাবাগণ বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করতাম, এখন দেখি আল্লাহ কেবল বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা অবতীর্ণ করেছেন, সাফার উল্লেখ করেননি। কাজেই সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করলে আমাদের দোষ হবে কি? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা অবতীর্ণ করেন,

 ( إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ ) 

আবূ বাকার (রাঃ) আরো বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি, আয়াতটি দু’ প্রকার লোকদের উভয়ের প্রতি লক্ষ্য করেই অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ যারা জাহিলী যুগে সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করা হতে বিরত থাকতেন, আর যারা তৎকালে সা‘য়ী করত বটে, কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সা‘য়ী করার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের দ্বিধার কারণ ছিল আল্লাহ বাইতুল্লাহ তাওয়াফের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার কথা উল্লেখ করেননি? অবশেষে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা আলোচনা করার পর আল্লাহ সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করার কথা উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারী ১৬৪৩)

আমর ইব্‌নু দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-এর নিকট জিজ্জেস করলাম, কোন ব্যক্তি ‘উমরাহ করতে গিয়ে শুধু বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে, আর সাফা ও মারওয়া সা’ঈ না করে, তার পক্ষে কি স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে? তখন তিনি বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মক্কায়) উপনীত হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ সাত চক্করে সমাধা করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন, এরপর সাত চক্করে সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করলেন। [এতটুকু বলে ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] “তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”(আল-আহযাবঃ ২১)। (সহিহ বুখারি ১৬৪৫)

জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমরা জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে উক্ত বিষয়ে জিজ্জেস করলাম। তখন তিনি বললেন, সাফা ও মারয়ার সা’ঈ করার পূর্বে কারো পক্ষে স্ত্রী সহবাস মোটেই বৈধ হবে না। (সহিহ বুখারি ১৬৪৬)

আসিম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) কে বললাম, আপনারা কি সাফা ও মারওয়া সা’ঈ করতে অপছন্দ করতেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। কেননা তা ছিল জাহিলী যুগের নিদর্শন। অবশেষে মহান আল্লাহ অবতীর্ণ করেনঃ “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন। কাজেই হজ্জ বা ‘উমরাকারীদের জন্য এ দুইয়ের মধ্যে সা’ঈ করায় কোন দোষ নেই”। (সু্রা বাকারা-১৫৮)। (সহিহ বুখারি ১৬৪৮)

সাঈ না করলে হজ্জ ও উমরা আদায় হবে নাঃ

হিশাম ইবনু উরওয়াহ্ (রহঃ) থেকে তার পিতা সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ্ (রাযিঃ) কে বললাম, আমি মনে করি কোন ব্যক্তি সাফা-মারওয়াহ পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ না করলে তার কোন ক্ষতি হবে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন কেন? আমি বললাম, কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ ‘সাফা-মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম ……… “— (সূরা আল বাকারাহ ২ঃ ১৫৮)। তখন আয়িশাহ (রাযিঃ) বললেন, কোন ব্যক্তি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ না করলে আল্লাহ তার হাজ্জ ও উমরাহ পূর্ণ করেন না। তুমি যা বলেছ যদি তাই হতো তবে আয়াতটি এভাবে হতো, “ঐ দুই পাহাড়ের মাঝে না দৌড়ালে কোন অসুবিধা নেই।” তুমি কি জান ব্যাপারটি কী ছিল? ব্যাপার তো ছিল এই যে, আনসারগণ জাহিলী যুগে দু’টি প্রতিমার নামে সমুদ্রের তীরে ইহরাম বাঁধত। একটির নাম ইনসাফ, অপরটির নাম নায়িলাহ। তারা এসে সাফা-মারওয়াহ সাঈ করত। অতঃপর মাথা কামাতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর তারা জাহিলী যুগে যা করত, সে কারণে সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করা খারাপ মনে করল। তাই আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেনঃ “সাফা-মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম ………।” অতঃপর লোকেরা সাঈ করে।(সহিহ মুসলিম ২৯৬৯ হাদিস ফাউন্ডেশন)

সাঈ এর ধারাবাহিক কাজগুলো নিম্ম রুপঃ

ক) তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত সালাত আদায় করে কিছু জমজমের পানি পান করেই ‘সাফা’ পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দেবেন।

খ) সা‘ঈ করতে যাচ্ছেন এ মর্মে মনে মনে নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ করুন। সা‘ঈ করতে যাবার পূর্বে হাজরে আসওয়াদ পাথর ‘ইস্তিলাম’ (চুম্বন-স্পর্শ) করা উত্তম। তবে ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে কোনো সমস্যা নেই, সরাসরি সাফা পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়ে পড়ুন। তবে এ সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরের দিকে হাত তুলে ইশারা করা বা তাকবীর বলার কোনো বিধান নেই। সাফা পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব উঠে বা কাছাকাছি পৌছে এ দো‘আটি শুধুমাত্র এখন একবারই পড়ুন। দোয়াটি হলোঃ

«إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ»

(উচ্চারণঃ‘‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আয়িরিল্লাহ, আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি’’।)

অর্থঃ ‘‘অবশ্যই ‘সাফা’ এবং ‘মারওয়া’ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহের অন্যতম।’’ আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন আমিও সেভাবে শুরু করছি।

এ দোয়াটি এখানে ছাড়া আর কোথাও পড়বেন না। সাঈর প্রথম চক্রের শুরুতেই শুধুমাত্র পড়বেন। প্রতি চক্রে বারবার এটা পুনরাবৃত্তি করবেন না।

গ) অতঃপর,যতটুকু সম্ভব সাফা পাহাড়ে উঠুন। একেবারে চূড়ায় আরোহণ করা জরুরী নয়। তারপর কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত তুলে নীচের দোয়াটি পড়ুনঃ

اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَه لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَـه، أَنْجَزَ وَعْدَه، وَنَصَرَ عَبْدَه، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.

(উচ্চারণঃ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ্, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়া‘দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু’’।)

অর্থঃ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আসমান যমীনের সার্বভৌম আধিপত্য একমাত্র তাঁরই। সকল প্রশংসা শুধু তাঁরই প্রাপ্য। তিনিই প্রাণ দেন এবং তিনিই আবার মৃত্যুবরণ করান। সবকিছুর উপরই তিনি অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই। যত ওয়াদা তাঁর আছে তা সবই তিনি পূরণ করেছেন। স্বীয় বান্দাকে তিনি সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রুদলকে পরাস্ত করেছেন। (আবূ দাউদঃ ১৯০৫)

এ দোয়াটি তিনবার পড়ার পর দু’হাত উঠিয়ে যত পারেন দোয়া করুন, আরবীতে বা নিজের ভাষায় দুনিয়া ও আখেরাতের অসংখ্যকল্যাণ চাইতে থাকুন ।

অথবা উক্ত দো‘আটি প্রথমে একবার পাঠ করে তারপর আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। ফের উক্ত দো‘আটি পড়ে আবার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। শেষ আর একবার এমনভাবে দো‘আ পড়বেন। অর্থাৎ তিন বার এভাবে করবেন। (সহিহ মুসলিম ২১৩৭)

ঘ) দোয়া শেষ করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলতে শুরু করুন। এখানে কাবাকে উদ্দেশ্য করে হাতের উঠানো বা তাকবীর বলা কিংবা তালুতে চুম্বন করার কোনো নিয়ম নেই। তাওয়াফের মত এখানেও আপনি ইচ্ছে করলে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার করতে পারেন। মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকুন নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য এবং মুসলিম মিল্লাতের সবার জন্য। তবে আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোনো জিকির বা দোয়া করা সুন্নাহ সম্মত নয়। অথচ লক্ষ্য করে দেখবেন এখানে অনেকেই এ ভুল কাজটি করছেন।

ঙ) স্বাভবিকভাবে হেঁটে সাফা থেকে মারওয়া পাহাড় এসে পৌছলে ১ চক্কর সম্পন্ন হল। মারওয়া পাহাড়ে উঠে বা যতটুকু সম্ভব মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আবার কা‘বার দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে উপরোক্ত বড় দো‘আটি আবার ৩বার পড়ুন। ঠিক একই পদ্ধতিতে যেমন সাফা পাহাড়ে করেছিলেন।

চ) চলতে চলতে সাফা পাহাড় থেকে কিছু দূর এগুলেই উপরে ও ডানে-বামে সবুজ আলোর বাতি আপনার নজরে আসবে।  এ সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে শুধু পুরুষরা আস্তে আস্তে জগিং করার মতো দৌঁড়াবেন (রমল এর মতো)। সবুজ আলো অতিক্রম করার পর আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন। সা‘ঈ করার সময় যতবারই এ সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবারই জগিং করার মতো দৌড়াবেন। কিন্তু মহিলারা এখানে দৌড়াবেন না, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন। এবং নিম্মের দোয়াটি পাঠ করতে থাকবে। দোয়াটি হলোঃ

«رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ»

(উচ্চারণঃ রাবিবগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ‘আযযুল আকরাম)

অর্থঃ ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয় আপনি সমধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।’

ছ) যখনই সবুজ চিহ্নিত স্থান অতিক্রম করে ফেলবেন তখনি আবার সাধারণ গতিতে হাঁটতে থাকবেন। ‘সাফা’ পাহাড়ে পৌঁছে প্রথমবার যা যা পড়েছিলেন ও করেছিলেন এবারও তা এখানে পড়বেন ও করবেন। আবার মারওয়ায় গিয়েও তাই করবেন। এভাবে প্রত্যেক চক্রেই এ নিয়ম পালন করে যাবেন। মারওয়া থেকে হেঁটে সাফা পাহাড়ে পৌঁছলে ২ চক্কর সম্পন্ন হল।

জ) যাদের সাঈ সম্পর্কে জ্ঞান কম তারা মনে করে থাকেন সাফা থেকে মারওয়া গিয়ে আবার সাফায় আসলে এক চক্কর হবে। আসলে ব্যাপারটি তা নয়। সাফা থেকে মারওয়ায় গেলেই এক চক্কর আবার মারওয়া থেকে সাফায় আসলেই এক চক্কর। এমনিভাবে মোট সাতবার যাওয়া আসা করলেই সাত চক্কর সম্পন্ন হয়ে যাবে।

ঝ) মারওয়া’য় গিয়ে যখন সাত চক্কর সম্পূর্ণ হবে তখন চুল কেটে আপনি হালাল হয়ে যেতে পারেন যদি আপনার হাদি কুরবানী হয়ে থাকে। আর যদি হাদি কুরবাণী না হয়ে থাকে তবে অপেক্ষ করুন। এই জন্য অনেক হাদী কুরবানীর পরই তাওয়াফ ও সাঈ করে থাকে। যারা কুরবানীর পর সাঈ করেছেন তারা (পুরুষেরা) মাথা মুন্ডন করবে অথবা সমগ্র মাথা থেকে চুল কেটে ছোট করে নেবে। আর মহিলারা আঙ্গুলের উপরের গিরার সমপরিমাণ চুল কেটে হালাল হয়ে যাবেন। অর্থাৎ ইহরামের কাপড় খুলে অন্য কাপড় পরবেন। ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ আপনার জন্য নিষিদ্ধ ছিল এগুলো এখন বৈধ হয়ে গেল।

ঞ) সাঈ করার সময় কোনো সালাতের ইকামত হলে সঙ্গে সঙ্গে সালাত আদায় করে নিবেন এবং যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে ফের শুরু করবেন।

ট) সা‘ঈ করার সময় এদিক ওদিক তাকানো ও ঘুরাঘুরি না করে একাগ্রচিত্তে বিনয়ের সাথে সা‘ঈ করাই উত্তম। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া সাঈ করার সময় কথা না বলাই ভালো। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত দোয়াগুলো মুখস্ত করে অর্থ জেনে সাঈ করার সময় পড়তে পারেন।

ঠ) সাঈ করার সময় দলবদ্ধ হয়ে সাঈ করা সহজ্জ। কারণ বেজমেন্ট/প্রথম তলা/দ্বিতীয় তলা/ছাদের উপরও প্রয়োজনে সা‘ঈ করা যায়, তাই সা‘ঈ করার সময় লোকের ভিড় ও চাপ তাওয়াফের তুলনায় কিছুটা কম হয়।

মন্তব্যঃ ঋতুবতী নারীগন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্য সকল কার্য সম্পাদন করতে পারে বিধায় তারাও এই অবস্থায় সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’ঈ করবে। দলিল হিসাবে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি।

১. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি মক্কা-য় আসার পর ঋতুবতী হওয়ার কারণে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা সা’ঈ করতে পারিনি। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এ অসুবিধার কথা জানালে তিনি বললেনঃ পবিত্র হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত অন্য সকল কাজ অপর হাজীদের ন্যায় সম্পন্ন করে নাও। (সহিহ বুখার ১৬৫০)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সঙ্গে হজ্জ আদায় করে কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করলাম। এ সময় সাফিয়্যাহ (রাঃ)-এর ঋতু দেখা দিল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গে তা ইচ্ছা করছিলেন যা একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে ইচ্ছা করে থাকে। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো ঋতুবতী। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তবে তো সে আমাদের আটকিয়ে ফেলবে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সাফিয়্যাহ (রাঃ) তো কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করে নিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তবে রওয়ানা হও। কাসিম, ‘উরওয়া ও আসাদ (রহঃ) সূত্রে ‘আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাফিয়্যা কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৩৩)

৩. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, লোকদের আদেশ দেয়া হয় যে, তাদের শেষ কাজ যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। তবে এ হুকুম ঋতুবর্তী মহিলাদের জন্য শিতিল করা হয়েছে। (সহিহ বুখার ১৭৫৫)

সাঈয়ের ওয়াজিব, সুন্নহ ও ভূলত্রুটিসমূহ

সাঈয়ের ওয়াজিব, সুন্নহ ও ভূলত্রুটিসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উমরা ও হজ্জের ক্ষেত্রে সাফা এবং মারওয়াতে পাহাড়ের মাঝে সাঈ আদায় করা একটি ওয়াজিব আমল। তবে অনেকে ইহাকে ফরজও বলেছেন। মূলত সাঈ একটি ওয়াজিব আমল। সাঈ আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক আমল আছে যেগুলো বাদ দিলে সাঈ আদায় হবে না। অর্থাৎ সাঈটি বাদ হয়ে যাবে। এমন কাজই সাঈয়ের ওয়াজিব। আমরা এমন অনেক সুন্নাহ আমল আছে যা বাদ দিলে সাঈ আদায় হবে কিন্তু সুন্নাহ সম্মত সাঈ হবে না। আবার অনেক আমল আছে যা সাঈকে প্রশ্নবিদ্ধ করে করে। অর্থাৎ সাঈ আদায় করে অনেক ভুল করে থাকে যা কাম্য নয়। ভুল যদি ওয়াজিব পর্যায় হয় তবে সাঈ বাতিল হয়ে যায় আর সুন্নাহ পর্যায় থাকলে নেকী কম হয়ে যাবে।

সাঈয়ের ওয়াজিবসমূহ হলোঃ

১। তাওয়াফ আদায়ের পরে সাঈ করা

২। সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করা

৩। প্রতিবারই সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে

৪। সাফা এবং মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবে

৫। সাত চক্র পূর্ণ করা

সাঈয়ের সুন্নাতসমূহঃ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

৩। তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

৪। সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

৫। সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

৬। প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

৭। সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

৮। সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

৯। উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

সাইয়ের ভুলত্রুটি হলোঃ

১। নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

২। দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

৩। ইযতিবা বা রমল করাঃ

৪। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

সাঈয়ের ওয়াজিব

১। তাওয়াফ আদায়ের পরে সাঈ করাঃ

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ বিদায় হাজ্জে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বাহনে চড়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করেন, যাতে লোকেরা তাঁকে দেখে, তাঁর কাজের প্রতি দৃষ্টি দেয় এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞেস করে নেয়। কারন লোকেরা চতুর্দিক থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছিলো। (আবু দাউদ ১৮৮০)

আমর (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ইবন উমর (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি। আমরা তাঁকে এমন এক ব্যক্তি সম্বন্ধে প্রশ্ন করছিলাম, যে উমরা করতে এসে কা’বার তাওয়াফ করে, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার সাঈ করেনি। সে কি তার পরিবারের কাছে গমন (সহবাস) করবে? তিনি বললেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় আগমন করেন, তখন তিনি সাতবার তাওয়াফ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দুই রাক’আত সালাত আদায় করেন এবং সাফা ও মারওয়া সাঈ করেন। “আর তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে”। (সুনানে নাসাঈ ২৯৩০)

মন্তব্যঃ প্রতিটি হাদিসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের পর সাফা মারওয়া সাঈ করার কথা উল্লেখ আছে। আমলের ক্ষেত্রেও যুগ যুগ ধরে এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। ইসলাম আগমনের পর থেকেই প্রতি দিন উমরা ও হজ্জ আদায়কারী তাওয়াফের পর সাঈয়ের আমল করে থাকে। এই আমলের ব্যতক্রম আমল পাওয়া যায় না। তাই কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নাই যে, তাওয়াফের পর দুই রাকাত সালাত আদায় করে একটু জমজমের পানি পান করেই সাত চক্কর সাই করতে হবে।

সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করাঃ

সাঈ সাফা থেকে শুরু, নাকি মারওয়া থেকে শুরু করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোন প্রকার মতভেদ নেই। সবল যুগের সকল মুসলিম একমত সাঈ সাফা থেকে শুরু করতে হবে। কেননা, এমন আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রমানি। যুগ যুগ ধরে সালাফদের মাঝে প্রচলিত।

দলিলঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতবার বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন, এতে তিনবার রমল করেন এবং চারবার সাধারণভাবেই হেঁটে তাওয়াফ করেন। তারপর মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়িয়ে দু’রাকাত সালাত আদায় করেন এবং পড়েনঃ

* وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى *

এ সময় তিনি লোকদেরকে শোনাবার জন্য উচ্চকণ্ঠে পড়েন। এরপর সেখান থেকে এসে তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করেন। তারপর সাফার দিকে গমন করেন এবং বলেন, আমরা তা হতে আরম্ভ করবো, আল্লাহ যা হতে আরম্ভ করেছেন। এরপর তিনি সাফা হতে আরম্ভ করে তার উপর আরোহণ করেন। সেখান থেকে তিনি বায়তুল্লাহ দেখতে পান এবং তিনি তিনবার বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি আল্লাহু আকবর বলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন এরপর তার জন্য যা নির্ধারিত ছিল তিনি তা দিয়ে দু’আ করেন। পরে তিনি পায়ে হেঁটে নেমে এসে বাতনে মাসীলে (উপত্যকায়) এসে পৌঁছেছেন। তারপর তিনি দ্রুত হেঁটে চলেন, যাতে তাঁর পদদ্বয় উঠে যায়। পরে তিনি মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করেন। এখানেও বায়তুল্লাহ তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। এখানেও তিনি তিনবার বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন, সুবহানাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ বলেন, এখানে তিনি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী দু’আ করলেন। দুআ করেন এবং এভাবে তিনি তাওয়াফ শেষ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭৭ ইফাঃ)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শুনেছি যে, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফায় গমনের ইচ্ছায় মসজিদ (অর্থাৎ তাওয়াফের স্থান) থেকে বের হলেন, তখন তিনি বললেন, আমরা সেখান থেকে আরম্ভ করব যেখান থেকে আল্লাহ্‌ তা’আলা আরম্ভ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৯)

৩. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফার দিকে বের হয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা যে স্থান থেকে আরম্ভ করেছেন, আমরাও সে স্থান থেকে আরম্ভ করবো। তারপর তিনি পাঠ করেন,

* إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ*

অর্থঃ সাফা ও মারওয়া আল্লাহ্‌ তাআলার ‘শি’আর’ (বিশেষ) প্রতীক সমুহের অন্তর্ভুক্ত (সুরা বাকারা ২:১৫৮)। সুতরাং যারা বায়তুল্লাহ্‌র হজ্জ করবে তাদের জন্য এ দুটিতে সা’ঈ করলে কোন অপরাধ হবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭০)

মন্তব্যঃ  সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করলে মারওয়া পাহাড়ে গেলেই এক চক্কর গনণা করা হবে। আমার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে আসালে আরেক চক্কর হয়ে যাবে। অনেকে মনে করে থাকে সাফা থেকে মারওয়া গিয়ে আবার সাফা ফিরে আসলে এক চক্কর হবে। তাদের ধারানা ভুল। তাই সাফা থেকে শুরু করার পর সাত চক্কর পর মারওয়াতে গিয়ে সাঈ শেষ হবে।

।  সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম করতে হবেঃ

সাঈ সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড়ে গেলেই এক চক্কর গনণা করা হবে। আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে আসালে আরেক চক্কর হয়ে যাবে। এখন যদি কেউ সাফা বা মারওয়া পাহাড়ের উপর না উঠে, পাহাড়ের কাছে থেকে ফিরে আসে তবে তার চক্কর সম্পূর্ণ হবে না। অর্থাৎ সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম না করলে ঐ চক্কর কাউন্ট হবে না। তাওয়াফের অন্যতাম শর্ত হলে সাত চক্কর সাঈ করা কিন্তু কোন চক্করে যদি আংশিক সম্পন্ন হবে তবে সাত চক্ক না হয়ে কম হবে। সে ক্ষেত্র সাঈয়ের ওয়াজির সাত চক্কর সম্পন্ন হবে না বিধায় তার সাঈ বাতিল হয়ে যাবে।

সাফা মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবেঃ

সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা সাঈ করা জন্য নির্দষ্ট স্থান আছে। এই স্থান দিয়েই সাঈ করতে হবে। বর্তমানে সাঈয়ের স্থানকে একটি বিল্ডিং দ্বারা আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এই বিল্ডিং টি তিল তলা বিশষ্ট করা হয়েছে যাতে করে প্রচন্ড ভীরের সময় যে যথেষ্ঠ স্থান থাকে। কাজেই সাঈ করতে হলে এই তিন তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং এর সীমানার ভীতর থেকেই করতে হবে। এই বিল্ডিং এর যে কোন তলা দিয়েই সাঈ করলে সাঈ হয়ে যাবে। কেননা, বিল্ডিং এর বেজমেন্ট, প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলা এবং ছাদ সম্পূর্ণটাই সাঈয়ের স্থান। বিল্ডিং এই স্থান বাদ দিয়ে এর সমান্তাল বাহিরে কোন স্থান দিয় সাঈ করলে সাঈ আদায় হবে না। যেমনঃ বিল্ডিং টির পূর্বপাশে যথেষ্ট পরিমান ফাকা জায়গা আছে যদি কেউ ভীরের কারনে বেজমেন্ট, প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলা এবং ছাদ বাদ দিয়ে ঐ ফাকা জায়গার সাঈ করে তবে তার সাই শুদ্ধ হবে না। সাঈ কে শুদ্ধ করার অন্যতম ওয়াজিব কাজ হলো, সাফা ও মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবে।

সাত চক্র পূর্ণ করাঃ

সাঈয়ের অন্যতাম ওয়াজিব হলে সাত চক্করে সাঈ করতে হবে। সাত চক্করের কম করলে সাঈ আদায় হবে না। কেউ যদি সাতের কম পাচ বা ছয় চক্কর আদায় করে তবে তবে তার সাঈয়ের ওয়াজিব আদায় হবে না। তাকে কাফ্ফার আদায় করে দায় মুক্ত হতে হবে।

আমর ইব্‌নু দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-এর নিকট জিজ্জেস করলাম, কোন ব্যক্তি ‘উমরাহ করতে গিয়ে শুধু বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে, আর সাফা ও মারওয়া সা’ঈ না করে, তার পক্ষে কি স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে? তখন তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কায়) উপনীত হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ সাত চক্করে সমাধা করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন, এরপর সাত চক্করে সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করলেন। [এতটুকু বলে ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] “তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”-(আল-আহযাবঃ ২১)।(৩৯৫)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হজ্জের সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ ও ‘উমরাহ একসাথে পালন করেছেন। তিনি হাদী পাঠান অর্থাৎ যুল-হুলাইফা হতে কুরবানীর জানোয়ার সাথে নিয়ে নেন। অত:পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধেন, এরপর হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধেন। সাহাবীগণ তাঁর সঙ্গে ‘উমরাহ’র ও হজ্জের নিয়্যাতে তামাত্তু‘ করলেন। সাহাবীগণের কতেক হাদী সাথে নিয়ে চললেন, আর কেউ কেউ হাদী সাথে নেননি। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা পৌছে সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যারা হাদী সাথে নিয়ে এসেছ, তাদের জন্য হজ্জ সমাপ্ত করা পর্যন্ত কোন নিষিদ্ধ জিনিস হালাল হবে না। আর তোমাদের মধ্যে যারা হাদী সাথে নিয়ে আসনি, তারা বাইতুল্লাহ এবং সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ করে চুল কেটে হালাল হয়ে যাবে। এরপর হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধবে। তবে যারা কুরবানী করতে পারবে না তারা হজ্জের সময় তিনদিন এবং বাড়িতে ফিরে গিয়ে সাতদিন সওম পালন করবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা পৌঁছেই তাওয়াফ করলেন। প্রথমে হাজরে আসওয়অদ চুম্বন করলেন এবং তিন চক্কর রামল করে আর চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করলেন। বাইতুল্লাহর তাওয়াফ সম্পন্ন করে তিনি মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দু’রাক‘আত সালাত আদায় করলেন, সালাম ফিরিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় আসলেন এবং সাফামারওয়ার মাঝে সাত চক্কর সাঈ করলেন। হজ্জ সমাধান করা পর্যন্ত তিনি যা কিছু হারাম ছিল তা হতে হালাল হননি। তিনি কুরবানীর দিনে হাদী কুরবানী করলেন, সেখান হতে এসে তিনি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করলেন। অত:পর তাঁর উপর যা হারাম ছিল সে সব কিছু হতে তিনি হালাল হয়ে গেলেন। সাহাবীগণের মধ্যে যাঁরা হাদী সাথে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা সেরূপ করলেন, যেরূপ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৯১)

সাঈয়ের সুন্নাহ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

৩। তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

৪। সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

৫। সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

৬। প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

৭। সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

৮। সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

৯। উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

সাঈয়ে সুন্নাতসমূহের বিস্তারিত বিবরণঃ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

যে কোন ইবাদতের জন্য পরিস্কার পরিচ্চন্না থাকা উত্তম। তাওয়াফে জন্য কিছু মুসতাহীদ আলেম অজুকে শর্ত আরপ করলেও সাঈয়ের জন্য অজু শর্ত করেন নাই। বড় অপবিত্রতা থেকে মুক্ত না হয়ে তাওয়াফ করা যাবে না, কিন্তু এই অবস্থায় সাঈ আদায় করা যাবে। তাওয়াফ শেষ করে সালাত আদায় করেই সাঈ আদায় করতে হয়। তাই দেখা যায় সাঈ আদায়ের সময় অধিকাংশের অজু থাকে। এই অজুসহকারে সাঈয়ের আমল করা সুন্নাহ। যদি অজু না থাকে এবং অজুকরা কষ্টকর তবে অজু ছাড়াই সাঈ আদায় করা যায়। আর সতল ঢাকা একটি ফরজ কাজ। কোন অস্থায় সতল খোলা যাবে না। জাহেলী জামানায় অনেক অজ্ঞ লোক সতল না ঢেকে তাওয়াফ ও সাঈ আদায়  করত। কাজেই এখন শুধু সতর খোলা নয় পর্দার প্রতিও খেয়াল রেখে পোশাক পড় সাঈ আদায় করতে হবে।

..২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় আরোহণ করে যখন তিনি বায়তুল্লাহ্‌ দেখতে পান তখন তাকবীর বলেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭১ হাদিসের মান সহিহ)

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় (পাহাড়ে) আরোহণ করে তিনবার তাকবীর (আল্লাহু আকবর) বলেন। এরপর তিনি বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

(আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।) তিনি এইরূপ তিনবার বলেন, পরে দু’আ করেন। মারওয়া পাহাড়েও তিনি এইরূপ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭২ হাদিসের মান সহিহ)

তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

সহিহ হাদিসমূহের বর্ণনা থেকে জানা যায় রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ করে, দুই রাকাত সালাত আদায় করে, জমজমের কিছু পানি পান করেই সাঈ করেন। আমাদের সালাফদের আমলও তাই তারা উমরা বা হজ্জের সময় তাওয়াফ শেষ করেই সাঈ করে থাকেন। এই দুটি আমল পাশাপাশি আদায় আদায় করার সাথে সাথে এর প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে যেন তাওয়াফ ও সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় ক্ষেপন না হয়। 

সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

সাঈ কোন কষ্টসাধ্য আমল নয়। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব ৩০০ মি (৯৮০ ফুট)। সাতবার আসা যাওয়া করার পর মোটামুটি ২.১ কিমি (১.৩ মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। বেশী বয়স্ক ও মাজুর না হলে ২.১ কিমি সাধারণ গতিতে হাটা একেবারেই সহজ্জ আমল। কাজেই সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে থাকা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আমাদের সালাফদের আমল এক নাগালে সাত চক্কর দিয়ে সাঈ শেষ করা।

সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৭)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ মুসলিম পর্ব ১৫/৩৯ হাঃ ১২৬১)

প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফার দিকে গেলেন এবং তাতে আরোহণ করলেন। এরপর বায়তুল্লাহ তার দৃষ্টিগোচর হলো। এরপর তিনি মহান আল্লাহর তাওহীদ বর্ণনা করে তাকবীর পাঠ করলেন। তিনি বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি চলতে লাগলেন যখন তাঁর পদদ্বয় উপত্যকাতে নামলো তখন সাঈ করলেন। যখন উভয় পদ ‘উপতাকা থেকে উপরে উঠে এলো, তখন তিনি হেঁটে মারওয়ায় আগমন করেন। এখানেও তাই করলেন, যা তিনি সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। এভাবে তিনি তার তাওয়াফ শেষ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯88 ইফাঃ)

২. জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারওয়ায় এসে তার উপর আরোহণ করেন। তারপর বায়তুল্লাহ্‌ তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। তখন তিনি তিনবার বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

(আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।) এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে স্মরণ (যিকির) করেন, সুবহানাল্লাহ ও আল-হামদুলিল্লাহ বলেন। তারপর তিনি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা অনুযায়ী দু’আ করেন এবং এভাবে তিনি তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮৭ ইফাঃ)

সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

সাঈ আদায়কালে নির্দষ্ট কোন দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয় নাই। শুধু সবুজ বাতিল স্থানে একটি দোয়া কথা হাদিসে উল্লেখ আছে। ইহা ছাড়া সাফ ও মারওয়া পাহাড়ে আরহনের পর দোয়া করা বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সাঈ যেহেতু মহান আল্লাহ অন্যতাম নিদর্শণ তাই সাঈ করার সময় মহান আল্লাহ জিকির করা ইমানের দাবি। কাজেই এই সময় মহান আল্লাহ প্রসংশামূকল জিকির করেত থাকি। জিকিরের মাঝে বীতিতভাবে মনের আশা পূরনের জন্য শ্রেষ্ঠ দাতা মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করে চাই। সাঈয়ের সময় সাফা মারওয়া চলাচলের পথে আজেবাযে চিন্তা না করে মহান আল্লাহ জিকির ও তার নিকটি দোয়া করে কাটানই উত্তম আমল হবে।

সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফা থেকে অবতরন করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভুমিতে অবতরিত হলে তিনি সা’ঈ করে তা পার হতেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮৪ ইফাঃ)

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যদি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করে দৌঁড়াই তবে তা এজন্য যে, আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাঈ করতে দেখেছি। আমি যদি তা হেঁটে অতিক্রম করি তবে তা এজন্য যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা হেঁটে অতিক্রম করতে দেখেছি। আমি তো একজন অতি বৃদ্ধ। (ইবনে মাজাহ ২৯৮৮)

কাসীর ইব্‌ন জুমহান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি ইব্‌ন উমর (রাঃ) -কে দেখেছি তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যস্থলে হাঁটছেন। তিনি বলেন : যদি আমি হেঁটে চলি, তা এজন্য যে, আমি রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে হাঁটতে দেখেছি। আর যদি আমি দ্রুত ছুটে চলি (সা’ঈ করি), তা এজন্য যে, আমি রাসুলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে দ্রুত ছুটে চলতে দেখেছি। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭৯ ইফাঃ)

উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

তাওয়াফের ক্ষেত্র আমরা দেখেছি নফল তা্‌ওয়াফ আছে। অর্থাৎ আপনি ইচ্ছা করলে মক্কা থাকাকালীন সময় যে কোন সময় নফল তাওয়াফ করতে পারবেন। উমরা ও হজ্জের তাওয়াফ ফরজ হলেও অন্য সময় তাওয়াফ একটি নফল আমল। কিন্ত সাঈয়ের ক্ষেত্র উমরা বা হজ্জের সময় ওয়জিব হলেও নফল কোন সাঈ নাই। তাই উমরা ও হজ্জ ব্যতিত অন্য সময় সাঈ করা সুন্নাহ সম্মত আমল নয়। বরং অন্য সময় সাঈ করা একটি বিদআত আমল। ঠিক তেমনিভাবে উমরা ও হজ্জের তাওয়াফের পর মাত্র একবারই সাঈ করা হয়। বার বার বা একাধীকবার সাঈ করার কোন প্রমান পাওয়া যায় না। বরং একবারের বেশী সাঈ করতে নিষেধ করেছেন।

দলিলঃ

আবূ যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জাবির (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা ও মারওয়ার মধ্যে একবারের বেশি সাঈ করেন নি। (সুনানে তিরমিজি ২৯৮৯ ইফাঃ)

আবূ যুবায়র (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণ সাফা-মারওয়ার মাঝে একবারের অধিক সাঈ করেননি। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৫)

জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ সাফা-মারওয়ার মাঝে একবারই তাওয়াফ করেছেন। এটাই ছিলো তাঁর প্রথমবারের তাওয়াফ। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯৫)

সাঈয়ের আদায়ের ত্রুটি

সাইয়ের ভুলত্রুটি হলো :

১। নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

২। দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

৩। ইযতিবা বা রমল করাঃ

৪। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

অনেক সাঈ করার পূর্বে গদবাধা নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়ে থাকে। অন্যান্য নিয়তের মত শুধু মনে মনে নিয়ত করতে হবে। সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করতে হবে। অনেক না জেনে মারওয়া পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করে, এটা তাদের একটি ভুল আমল।

দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

অনেক মনে করে সাফা মারওয়ায় কোন প্রকার দোয়া নাই, শুধু সাঈ করতে হবে। হ্যা, সাঈতো করবই সাথে সাথে এখনে এসে দু’হাত তুলে শুধু দোয়া করতে হয়। অনেক মনে করেন হাত তুলে দোয়া নাই। হাত তুলে দোয়া করা সময় সময়ের জন্য বিদআত নয়, এই সেই স্থানগুলির একটি যেখানে হাত তুলে দোয়া করা সুন্নাহ। কোন কোন মুসলিম মনে করে, সাঈ করার সময় প্রতি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করতে হয়। বরং প্রতি চক্কর শেষেই চাহিদামত দোয়া করা যায়, প্রতি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া নাই।

ইযতিবা বা রমল করাঃ

অনেক মুসলিম ভাই অজ্ঞতার কারনে সাঈ করার সময় তাওয়াফের মত রমল করে থাকেন। আগের আলোচনায় দেখেছি সাফা মারওয়া সাঈয়ের সময় সবুজ বাতি এখাকায় প্রতি চক্করেই উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটি (সবুজ আলো দ্বারা আলোকিত) দ্রুত চলতে হবে।  যেহেতু, সাঈ করার সময় রমল করতে হয় না, তাই এখানে কোন প্রকার ইযতিবা (ইহরামের কাপড় কাদের নিচে নামিয়ে দেয়) নেই। কেউ কেউ সাঈ করার সময়ও ইযতিবা করে থাকে। এটা ভুল। ইযতিবা কেবল তাওয়াফে কুদুমের (আগমণী তাওয়াফে) সময় করতে হয়।

দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত সাঈ করার পুরো সময়টাতে আস্তে আস্তে চলাচল করা সুন্নাহ। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করা একটি ভুল আমল।

জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফা থেকে অবতরন করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভুমিতে অবতরিত হলে তিনি সাঈ করে তা পার হতেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮১)

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারী ১৬১৭ আধুঃ)

উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটি এখন সবুজ আলো দ্বারা আলোকিত করা হয়েছে। তাই সাঈ করার সময় কেবল সবুজ দুই চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে দ্রুত চলতে হবে। পুরুষদের জন্য সবুজ চিহ্নের মাঝে সাঈ তথা দৌড়ে না চলা একটি ভুল আমল। তবে মহিলাদের দৌড়াতে হবে না।

আরাফার ময়দানের আমল ও ভুল-ত্রুটি

আরাফার ময়দানের আমল ও ভুল-ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। মিনা হয়ে আরাফা গমন : মিনায় প্রথম দফা

মিনায় হাজ্জিগণ জিলহজ্জের মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২/১৩ তারিখ পর্যান্ত অবস্থান করে। মাঝের ৯ জিলহজ্জ তারিখ আরাফার ময়দানে ও ১০ জিলহজ্জ তারিখ রাতে মুজদালিফায় ময়দানে অবস্থান করে। কাজেই, ৮ জিলহজ্জ ইহরাম বাঁধার পর হাজিগণ সরাসরি আরাফার ময়দানে না গিয়ে মিনায় যাওয়াই সুন্নহ। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর নামাজসহ এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে প্রত্যেক নামাজ সুন্নাত মোতাবেক পড়ার নিয়ম হলো, প্রত্যেক ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) নামাজ উহার নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া। মাগরিব ও ফজর নামাজ ব্যতিত, কেননা এ দুই নামাজে কসর নেইল।

দলিলঃ

১. আবদুল ‘আযীয ইব্‌নু রুফাই‘ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্‌সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারি ১৬৫৩),

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় যুহর ও ফজরের নামায (অর্থাৎ যুহর হতে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের নামায) আদায় করলেন। তারপর ভোরেই আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৮০, হাদিসের মান সহিহ)

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর (রাঃ)-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে [অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় থেকে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে] হায়! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতেই আমর ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারী ১৫৫৪ ইফাঃ)

আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন এবং আবূ বকর, ‘উমর (রাঃ) -ও। আর ‘উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের প্রথম ভাগেও দু’রাক’আত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫৫)

৪. হারিসা ইব্‌নু ওয়াহব খুযা’য় (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে মিনাতে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। এ সময় আমরা আগের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিলাম এবং অতি নিরাপদে ছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৬৫৬)

৬. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে (অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ) -এর সময় হতে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে) আহা! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতই আমার ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারি ১৬৫৭)

*** উসমান (রাঃ) এই চার রাকআত পুরো আদায় করার বিরোধীতা করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)। সহিহ বুখারীতে এসেছেঃ

ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে মিনায় চার রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। তারপর এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) কে বলা হল, তিনি প্রথমে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়লেন। এবপর বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিনায় দু’ রাকা’আত পড়েছি, আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি এবং উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি। কতই না ভাল হতো যদি চার রাকা’আতের পরিবর্তে দু’রাকা’আত মাকবূল সালাত হতো। (সহীহ বুখারী ১০২৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মন্তব্যঃ উপরের সহিহ হাদিসসমূহের আলোকে বলা যায়, ৮ ই জিলহজ্জ ইহরাম বেঁধে মিনায় রওয়ানা হওয়া এবং সেখানেই রাত্রি যাপন করা। চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযগুলো দু’রাকআত করে পড়তে হবে। এটাকে কসর করা বলা হয়। সে নামাযগুলো হলো যুহর, আসর ও এশা। হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুয্দালিফায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের সকল লোককে নিয়ে এ সালাতগুলো কসর করে পড়েছিলেন, এটা সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে তিনি মুকীম বা মুসাফিরের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। অর্থাৎ মক্কার লোকদেরকেও চার রাকআত করে পড়তে বলেননি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ও ফাতাওয়া ইবনে বায)

তবে মনে রাখতে হবে যে, ফজর ও মাগরিবের ফরয নামায অর্থাৎ দুই এবং তিন রাকআত বিশিষ্ট নামায কখনো কসর হয় না। মিনাতে প্রত্যেক সালাত ওয়াক্তমত আদায় করবেন, জমা করবেন না। অর্থাৎ যুহর-আসর একত্রে এবং মাগরিব-এশা একত্রে পড়বেন না। এমনকি মুসাফির হলেও না। বিস্তারিত সফরের বিধান নামক অধ্যায় আলোচনা করা হয়েছ।

কাজেই সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত মিনায় সালাত চার নয় দুই বাকআতই আদায় করা উত্তম। কিন্তু কেউ পূর্ণ সালাত আদায় করলে তাদের গবেষণার উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সামনে সহিহ হাদিসগুলি তুলে ধরে বুঝাতে হবে। এ নিয়ে ফতোয়াবাজী করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করা যাবেনা। কারন আমাদের অনুকরনী তৃতীয় খলীফা (রাঃ) শেষের দিকে পূর্ণ সালাত আদায় করেছেন বলে প্রমানিত যদিও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার বিরোধীতা করেছেন।

২। মিনার গমনের পূর্বে কিছু আমলঃ

ক। আট জিলহজ্জ সকালে ফজরের সালাত কাবায় আদায় করে বাস্থানে চলে আসতে হবে। কেননা হজ্জের নিজ নিজ ঘর বা বাসস্থান থেকেই ইহরাম বাঁধতে হবে। মক্কায় অবস্থানকারীরাও নিজ নিজ ঘর থেকে ইহরাম বাঁধবেন।  তামাত্তু হাজি যারা ইহরাম ত্যাগ করে হালাল হয়ে মক্কা অবস্থান করে ছিল তারা, মক্কার বাসস্থান থেকেই ইহরাম বাধবেন। ইফরাদ ও কেরান হাজীগণ যারা আগে থেকেই ইহরাম পরা অবস্থায় আছেন, তাঁরা ইহরাম অবস্থায়ই থাকবেন। ইহরামের পোষাক পরার পর হজ্জের নিয়ত করে ফেলবেন। হজ্জের ইহরাম বাধার জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া, গোসল করা ও গায়ে সুগন্ধি মাখা সুন্নাহ। তবে কুরবানী দিবেন তারা ১লা যিলহজ্জ থেকে কুরবানীর পূর্ব পর্যন্ত চুল-নখ কাটবেনা।

খ।  হাজিদের কেউ যিলহজ্জের আট তারিখে ইহরাম বেঁধে তাওয়াফ ও সাঈ করে মিনায় রওয়ানা দেয় এবং দশ তারিখে তাওয়াফ করে আর সাঈ করে না। এটা ভুল। শুদ্ধ হলো ইহরাম বাঁধার পর তাওয়াফ ছাড়া মিনায় রওয়ানা দেবেন।

গ। সূর্যোদয়ের পর থেকে যুহরের নামাযের আগেই রওয়ানা দেয়া মুস্তাহাব। অর্থাৎ যুহরের নামাযের আগেই মিনায় চলে যাওয়া উত্তম। মক্কা থেকে মিনায় পায়ে হেটে যাওয়া মুস্তাহার। তবে গাড়িতে গেলে কোন প্রকার অসুবিধা নাই।

আবদুল ‘আযীয ইবনু রুফাইয়‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারী ১৬৫৩)

ঘ। যারা মাজুর ও মহিলা তারা জিলহজ্জের সাত তাখির রাতের মধ্যেই মিনায় চলে যায়। মুহাক্কিক আলেমদের মনে কোন অসুবিধা নাই। কারন বর্তমানে ভিড়ের কারনে সকালে মহিলা ও মাজুরদের মিনায় হেটে যাওয়া খুবই কষ্টকর। আর সকালে গাড়ির বিশাল যানজট থাকে।

ঙ। মিনায় আজকের রাত্রি যাপন মুস্তাহাব বা সুন্নাত। যেহেতু আগামীকাল আরাফার দিন, সেহেতু আজকের রাতকে বলা হয় ‘‘আরাফার রাত’’। এ রাতে সূর্য উদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত মিনাতেই অবস্থান করা সুন্নাত।

চ। কেউ কেউ সূর্যোদয়ের আগে মিনায় রওয়ানা দেয়। এটাও ভুল।

ছ। তালবীয় পাঠ করতে করতে আরাফায় যাওয়াঃ

১. মুহাম্মদ ইব্‌নু আবূ বাক্‌র সাক্বাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা সকাল বেলা মিনা হতে যখন ‘আরাফাতের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ)-এর নিকট তালবিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে কিরূপ করতেন? তিনি বললেন, তালবিয়া পাঠকারী তালবিয়া পড়ত, তাকে নিষেধ করা হতো না। তাকবীর পাঠকারী তাকবীর পাঠ করত, তাকেও নিষেধ করা হতো না। (সহিহ বুখারি ৯৭০)

২. মুহাম্মদ ইবন আবু বকর আস-সাকাফী (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-এর সঙ্গে সকাল বেলা মিনার দিকে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা এই দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে তালবিয়ায় কি করতেন? তিনি বললেনঃ যে তালবিয়া পড়তো, সে তালবিয়া পড়তো। তাকে কেউ বাধা দিত না। আর যে তাকবীর বলতো, সে তাকবীর বলতো, তাকেও কেউ বাধা দিত না। (নাসাঈ ৩০০৩)

৩। যিলহাজের আট তারিখের একটি ভুল আমলঃ

আবদুল ‘আযীয ইবনু রুফাইয়‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারী ১৬৫৩ আধুনিক)

মন্তব্যঃ এই হাদিসে দেখা যায় যিলহজ্জের আট তারিখ মিনায় গিয়েছিলেন এবং নয় তারিখ সকালে আরাফায় গিয়েছেন। কিন্তু অনেকে একটা ভুল করে থাকে যে, তারা আট তারিখে মিনাতে না এসে সরাসরি আরাফায় চলে যাওয়া। আবার অনেক মিনায় যায় ঠিকই কিন্তু মিনায় পর্যাপ্ত স্থান থাকা সত্ত্বেও মিনার বাইরে অবস্থান করে। সুন্নাহ হল সকালে মসজিদে হারামে ফজরের সালাত আদায় করে, বাসায় এসে গোসল করে, পরিস্কার পরিছন্ন হয়ে, ইহবার বেঁধে, তারবিয়া পাঠ করতে করতে মিয়ার চলে যাওয়া। আর কেরান ও ইফরাদ হাজ্জি, যাদের ইহরাম বাধা আছে তারা ফজরের সালাত আদায় করে, বাসায় এসে গোসল করে সকালের নাস্তা খেয়ে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে।

৪। মিনায় সালাত জমা একটি ভুল আমলঃ

সালাত জমা করার অর্থ হল দুই ওয়াক্তের সালাত কে একত্রে আদায় করা। অর্থাৎ যুহর ও আসরের এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা। সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিতে হাজিরা আরাফাতের ময়দানের জোহর ও আসরের একত্রে আদায় করে। আবার মুজদালীফায় মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করে। কিন্তু মিনায় জোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রিত করে আদায় করতেন না। আর যদি তিনি এমনটি করতেন তাহলে বিষয়টি হাদিসের গ্রস্থে উল্লেখ থাকত। কাজেই আমরা নির্দধায় বলতে পারি মিনায় সালাত জমা একটি ভুল আমল।

মিনা থেকে আরাফাতের দিকে যাত্রাঃ

জিলহজ্জের নয় তারিখ হল “ইয়ামুল আরাফ” বা আরাফার দিন। আরাফার দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করা সর্বসম্মতি ক্রমে ফরজ। যতি কেউ জিলহজ্জের নয় তারিখ আরাফায় অবস্থান না করে হজ্জের সকল কাজ সমাধা করে তবেও তার হজ্জ হবে না। কোন প্রকার দম দিয়াও এর ক্ষতি পূরণ হবে না। কাজেই এই দিন সম্পর্কে শতর্ক থাকি।

জিলহজ্জের নয় তারিখ মিনা থেকে আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সকালে মিনায় ফরজের সালাত আদায় করে। সূর্য় উদয়ের পর আস্তে আস্তে আরাফার দিকে রওয়ানা দিতে তবে। এই সময় হেঁটে আরাফায় যাওয়া সুন্নাহ তবে বাহন ব্যবহার করায় কোন ক্ষতি নাই। অনেক সময় দেখা যায় মহিলা ও মাজুর হাজিগণ আট তারিখ দিবাগত রাত্রিতে গাড়িতে করে আরাফার ময়দানে যায়। উজর বসত যাওয়া সঠিক হলেও অনেকেই তাদের সাথে রাত্রিতে আরাফাতের ময়দানে যায় যা সু্ন্নাহ সম্মত নয়।

৬। সর্বনিম্ম কখন আরাফার ময়দানে পৌছাতে হবে?

মিনা থেকে ফজরের সালাত আদায় করে হালকা খাবার খেয়ে আরাফাতের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিতে হবে। হেঁটে আরাফায় যাইতে ৩/৪ ঘন্টা লাগতে পারে। কোন সমস্যা নাই কেননা, দুপুরে সূর্য পশ্চিমে ঢলার পর থেকে আরাফার প্রকৃত সময় শুরু হয়। তবে ইমাম হাম্বলের মতে সেদিনের সকালের ফজর উদয় হওয়া থেকেই এ সময় শুরু হয়। আর এর শেষ সময় হল আরাফার দিবাগত রাত্রির ফজর উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।

দলিলঃ ১. আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ হজ্জ হলো আরাফায় (অবস্থান)। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৯)

২. বুকাইর ইবনে আতা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। আমি আবদুর রহমান ইবনে ইয়ামুর আদ-দায়লী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরাফাতে উপস্থিতকালে তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলাম। নাজদ এলাকার কতক লোক তাঁর নিকট হাযির হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! হজ্জ কিভাবে সম্পন্ন হয়? তিনি বলেনঃ ‘‘আরাফাতে অবস্থান হচ্ছে হজ্জ’’। অতএব যে ব্যক্তি মুজদালিফার রাতে ফজর নামাযের পূর্বেই আরাফাতে এসে পৌঁছলো তার হজ্জ পূর্ণ হলো। মিনায় তিন দিন (১১, ১২ ও ১৩ যুলহিজ্জা) অবস্থান করতে হয়। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি দু’ দিন অবস্থানের পর চলে আসে, তবে তাতে কোন গুনাহ নেই। অতঃপর তিনি কোন ব্যক্তিকে নিজ বাহনের পেছনে উঠিয়ে নিলেন এবং সে উচ্চস্বরে একথা ঘোষণা করতে থাকলো। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০১৫)

বুকায়র ইবন আতা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি আবদুর রহমান ইবন ইয়া’মার দীলী (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ আমি আরাফায় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে দেখেছি, তাঁর কাছে নাজদ হতে কতিপয় লোক এসে তাদের একজনকে তারা প্রতিনিধি নিযুক্ত করে, সে তাঁকে হজ্জ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে, তিনি বলেনঃ হজ্জ হলো আরাফায় অবস্থান। যে ব্যক্তি মুযদালিফায় রাতে ভোরের সালাতের পূর্বে সেখানে আগমন করলো, সে তার হজ্জ পেল। মিনার দিন হচ্ছে (তিন দিন) যে ব্যক্তি দুই দিনের পর তাড়াতাড়ি চলে যায়, তার কেন পাপ নেই। আর যে ব্যক্তি দেরি করে তারও কোন পাপ নেই। তারপর তিনি একজন লোককে তাঁর পশ্চাতে আরোহণ করান, যিনি এ কথাগুলো লোকের মধ্যে প্রচার করছিলেন। (সুনানে নাসাঈ ৩০৪৪)

মন্তব্যঃ অনিবার্য কারণবশতঃ দিনের বেলায় আরাফায় যেতে পারল না। পৌঁছল ঐ দিন রাতের বেলায়। ফলে শুধু রাতের অংশেই সেখানে অবস্থান করল। এ ক্ষেত্রে আরাফাতে কিছুক্ষণ অবস্থান করলে তার হজ্জ হয়ে যাবে। মুযদালিফায় গিয়ে রাতের বাকী অংশ যাপন করবে।

আরাফার দিনে মর্যাদা ও ফযীলতঃ

১. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, এমন কোন দিন নেই, যে দিন আরাফার দিন হতে অধিক বান্দা অথবা বান্দীকে মহান মহিয়ান আল্লাহ্‌ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি সেদিন (বান্দার) নিকটবর্তী হন এবং তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে তাদের (মর্যাদার) ব্যাপারে গর্ব করে বলেন, এরা কী কামনা করে? আবূ আবদুর রহমান (রহঃ) বলেন : এই হাদীসের রাবী (ইউনুস) সম্ভবত, ইউনুস ইব্‌ন ইউসুফ, যার কাছ থেকে ইমাম মালিক (রহঃ) হাদীস বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন। (সুনানে নাসাঈ ৩০০৩)

২. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরাফাতের দিন জাহান্নাম থেকে যতো অধিক সংখ্যক বান্দাকে নাজাত দেন, অন্য কোন দিন এতো অধিক বান্দাকে নাজাত দেন না। মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ এ দিন (বান্দার) নিকটবর্তী হন, অত:পর তাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের নিকট গৌরব করে বলেন, তারা কী চায়? (ইবনে মাজাহ ৩০১৪, সহিহ মুসলিম ১৩৪৮)

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যিলহজ্জ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললেনঃ “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নি। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (সহিহ হাদিসে কুদসি ১০১ এবং ইবনে হিব্বান)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা‘আলা আরাফার লোকদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন, তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ তারা এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় আমার কাছে এসেছে”। [(সহিহ হাদিসে কুদসি ১০২ এবং ইবনে হিব্বান)

৩. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল ইয়াউমুল মাওউদ”— (সূরা বুরুজ ২) অর্থ- কিয়ামতের দিন; “আল-ইয়াউমুল মাশহুদ”— (সূরা হুদ ১০৩) অর্থঃ আরাফাতে (উপস্থিতির) দিন এবং “আশ-শাহিদ” (সূরা বুরুজ ৩) অর্থঃ জুমুআর দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ যে সমস্ত দিনে সূর্য উদিত হয় ও অস্ত যায় তার মাঝে জুমুআর দিনের তুলনায় বেশি ভাল কোন দিন নেই। এ দিনের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, ঠিক সে সময় কোন মুমিন বান্দা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করলে তার প্রার্থনা তিনি কবুল করেন এবং যে বস্তু (অনিষ্ট) হতে সে আশ্রয় প্রার্থনা করে তা হতে তিনি তাকে আশ্রয় দান করেন।(তিরমিজি ৩৩৩৯)

৪. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ‘আরাফাতের মাঠে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে অবস্থান করছিলেন, আকস্মাৎ তিনি তাঁর সওয়ারী হতে পড়ে গেলে তাঁর ঘাড় ভেঙ্গে যায় অথবা সওয়ারীটি তার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। (ফলে তিনি মারা যান)। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে কুলগাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ পানি দ্বারা গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে কাফন দাও। তবে তার শরীরে সুগন্ধি মাখাবে না আর তার মাথা ঢাকবে না এবং হানূতও লাগাবে না। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা তাকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন। (সহিহ বুখারি ১৮৫০, সহহি মুসলিম ২৭৮২)

উপরের সহিহ হাদিসের আলোকে আরাফাতের ফজিলত নিম্মরূপঃ

১) মহান আল্লাহ এই দিনে জাহান্নাম থেকে অধিক সংখ্যা বান্দাকে মুক্তি দেন।

২) এই দিনে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার নিকটবর্তী হন।

৩) ফেরেশতাদের কাছে বান্দার (মর্যাদার) ব্যাপারে গর্ব করে এবং প্রশ্ন করেন, তারা কি চায়?

৪) মহান আল্লাহ এই দিনে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হন।

৫) আল্লাহর কাছে ঐ দিনের চেয়ে উত্তম আর কোন দিন নেই।

৬) আরাফার দিনে মৃত ব্যক্তিকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন

৭) এই দিনকে পরিত্র কুরআনে “আল-ইয়াউমুল মাশহুদ” (সূরা হুদ ১০৩) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরাফায় অবস্থান নিম্মের কাজগুলো করা ভালঃ

(১) গোসল করে নেয়া,

(২) পরিপূর্ণ পবিত্র থাকা

আরাফার ময়দানে হাজীদের করণীয়

১। মসজিদে নামিরার নিকটে অবস্থান করাঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনা থেকে যখন রওয়ানা হলেন, তখন কুরাইশরা সন্দেহাতীতভাবে মনে করছিল যে, তিনি মাশ‘আরে হারাম (অর্থাৎ) ‘মুযদালিফাতেই।] অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা, কুরাইশরা জাহেলী যুগে এরকম করত। কিন্তু রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশ‘আরে হারাম অতিক্রম করে আরাফার নিকট উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।  এই কারনে আরাফায় পৌঁছে মসজিদে ‘নামিরা’র কাছে অবস্থান করা মুস্তাহাব অর্থাৎ উত্তম। সেখানে জায়গা না পেলে আরাফার সীমানার ভিতরে যে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারেন। এতে কোন অসুবিধা নেই।

দলিলঃ

১. ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন ভোরে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেই (মিনা হতে) রওয়ানা করে আরাফাহ্তে এসে পৌঁছে ‘নামিরাহ’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। এটা আরাফার সেই স্থান যেখানে ইমাম (আরাফার দিন) অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর যুহর সলাতের ওয়াক্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাড়াতাড়ি সলাতের জন্য রওয়ানা হলেন এবং যুহর ও ‘আসরের সলাত একত্রে আদায় করে লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, তারপর সেখান থেকে প্রস্থান করে আরাফাহ্‌র ময়দানের অবস্থান স্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন। (সুনানে আবু দাইদ ১৯১৩)

২. জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফর করে যখন আরাফাতে আসলেন এবং ‘নামিরা’ নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি নির্দিষ্ট তাবু খাটানো হয়েছে দেখতে পেলেন, তখন তিনি সেখানে অবতরণ করলেন। যখন সূর্য ঢলে পড়লো তখন তখন তাঁর নির্দেশে ‘কাসওয়া’ নামক উষ্ট্রীর পিঠে হাওদা লাগানো হলো। তারপর যখন ‘বাতনুল ওয়াদী’ তে পৌঁছালেন, সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তারপর বিলাল (রাঃ) আযান ও ইকামত বললেন। তিনি যোহরের সালাত আদায় করলেন, পুনরায় ইকামত বলার পর আসর আদায় করলেন এবং এই দুই সালাতের মধ্যে আর কোন সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬০৪)

৩. উবাইদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু আকরাম আল-খুযাঈ (রাঃ) হতে তাঁর পিতার সূত্রে থেকে বর্ণিত, তিনি (আবদুল্লাহ) বলেন, আমি আমার পিতার সাথে নামিরার সমতল ভূমিতে অবস্থান করছিলাম। ইতিমধ্যে একদল সাওয়ারী (আমাদের) পার হয়ে গেল। হঠাৎ দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন। রাবী বলেন, যখন তিনি সাজদাহ্‌য় যেতেন তখন আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখে নিতাম। (সুনানে তিরমিজি ২৭৪, ইবনু মাজাহ৮৮১ হাদিসের মান সহিহ)।

২।  আরাফার ময়দানের বাহিরে অবস্থান না করাঃ

তবে পাশেই ‘উরানা’ নামের একটি উপত্যকা আছে। সেটি আরাফার চৌহদ্দির বাইরে। কাজেই সেখানে যাবেন না। ঐখানে অবস্থান করবেন না।

দলিলঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (হজ্জে) কুরায়শরা মুযদালিফায় অবস্থান করতো (আরাফায় যেত না) এবং তাদেরকে বলা হতো ‘হুমছ’। আর আরবের অন্যান্য লোকেরা আরাফায় অবস্থান করতো। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া ত’আলা তাঁর নবীকে আরাফায় অবস্থান করতে এরপর সেখান হতে রওনা হতে আদেশ করলেন। এ প্রসঙ্গে মহান মহিয়ান আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করলেনঃ (আরবি) (অর্থ: তোমরা সেখান (আরাফা) থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, যেখান থেকে লোকেরা ফিরে যায়। (সুনানে নাসাই ৩০১২)

ইয়াযীদ ইবনু শাইবান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু মিরবা আনসারী (রাঃ) আমাদের নিকটে আসলেন। আরাফাতের এমন এক জায়গায় আমরা অবস্থান করছিলাম যাকে আমর (রাঃ) (ইমামের স্থান হতে) বহু দূর বলে মনে করছিলেন। ইবনু মিরবা আনসারী (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিনিধি হিসাবে আমি তোমাদের নিকটে এসেছি। তিনি বলেছেনঃ হজ্জের নির্ধারিত স্থানসমূহে তোমরা অবস্থান কর। কারণ, তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর ওয়ারিসী প্রাপ্ত হয়েছ। (তিরমিজি ৮৮৩ ও ইবনু মাজাহ ৩০১১)।

৩। সালাত জমা করাঃ

যুহরের সময় হলে ইমাম সাহেব খুৎবা দেবেন। খুৎবার পর যুহরের ওয়াক্তেই যুহর ও আসরের সালাত একত্রে জমা করে পড়বেন। দু’ নামাযেরই আযান দেবেন একবার, কিন্তু ইকামাত দেবেন দু’বার। কসর করে পড়বেন। অর্থাৎ যুহর দু’রাকআত এবং আসরও দু’রাকআত পড়বেন। যুহরের ওয়াক্তেই আসর পড়ে ফেলবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসী ও বহিরাগত সব হাজীকে নিয়ে একত্রে এভাবে নামায পড়িয়েছিলেন। এটা সফরের কসর নয়, বরং হজ্জের কসর। কোন নফল-সুন্নাত নামায আরাফায় পড়বেন না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েননি।

দলিলঃ

ইব্‌নু উমর (রাঃ) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম (রহঃ) বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে ‘আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও ‘আসর এক সাথেই আদায় করতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? (সহিহ বুখারি ১৬৬২)

আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন।(সহিহ বুখারি ১৬৭৪)

৪। মসজিদে নামিরায় যাওয়া সম্বব না হলে নিজ তাবুতে সালাত আদায়ঃ

মসজিদে নামিরায় যেতে না পারলে নিজ নিজ তাবুতেই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে জামা‘আতের সাথে যুহর-আসর একত্রে যুহরের আউয়াল ওয়াক্তে দুই দুই রাক‘আত করে কসর ও জমা করে পড়বেন।

দলিলঃ

ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাতের ময়দানে ‘নামিরা’ উপত্যকায় অবতরণ করেছিলেন। রাবী বলেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, যুবায়ের (রাঃ) কে হত্যা করার পর বিন উমার (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করে পাঠায় যে, আজকের এ দিনের কোন সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (খোতবা দিতে মাঠের কেন্দ্রস্থলে) রওয়ানা হতেন? তিনি বলেন, সেই সময় উপস্থিত হলে স্বয়ং আমরাই রওয়ানা হবো। অতএব তিনি কখন রওয়ানা হন তা লক্ষ্য করার জন্য হাজ্জাজ একজন লোক পাঠায়। বিন উমার (রাঃ) যখন রওয়ানা হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? লোকেরা বললো এখনও ঢলেনি। তিনি বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? তারা বললো, এখনও ঢলেনি। কিছুক্ষণ পর তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? তারা বললো, হাঁ। তারা যখন বললো, সূর্য ঢলেছে তখন তিনি রওয়ানা হলেন। (ইবনে মাজাহ ৩০০৯ সনদ হাসান)

আরাফার ময়দানে বেশী বেশী দোয়া এবং জিকির করাঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান কালে হাজ্জিদের প্রধান কাজই হলো দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ তালাস করা। এই দিনে মহান আল্লাহর ক্ষমা প্রদানে ঘোষনা আছে। তাই, ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য এই দিনে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহ প্রশংসাসহ জিকির এবং কুনআন তিলওয়াত মাধ্যমে অতিবাহিত করা উত্তম। এই জন্য আরাফাতে ময়দানে যাওয়া আগেই দোয়া করার প্রতস্তি নিতে হবে এবং যে দোয়াগুলো করবে তার অর্থ জেনে নিবে। অর্থ না জানলে মনে ভীতরে কোন আবেগের সৃষ্ট হবে না। হাদীসে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাক্যে দোয়া করা উত্তম কারন, এই দোয়াগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং অধিক উপকারী। তবে বান্দা ইচ্ছা মনের আবেগ দিয়ে তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় দোয়া করতে পারে। এতে করে তার চাহিদামত দোয়া করা সম্বব হবে। দোয়া করার সময় নিম্মের বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে আশা করি দোয়া কবুলের সহায়ক হবে। বিষয়গুলে হলোঃ

০১. আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে দোয়া করা

০২. দোয়ার আগে আল্লাহর প্রতি ‘হামদ’ (প্রশংসা)। (যেমনঃ আয়তুল কুরাসী, সুরা হাসরের শেষ তিন আয়াত তিলওয়াত করা)

০৩. রাসুলের প্রতি ‘সালাত’ (দরুদ) পাঠ করা

০৪. কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা

০৫. হাদিসে বর্ণিত বাক্যে দোয়া করা

০৬ আরাফার ময়দানে দু’হাত উঠিয়ে দোয়া করা

০৭. মনকে বিনম্র ও খুশু-খুযু রেখে মুনাজাত করা

০৮. এখলাস বা নিষ্ঠার সঙ্গে দোয়া করা

০৯. আল্লাহর প্রশংসাসূচক গুণবাচক নামের সঙ্গে দোয়া করা।

১০. কেবলামুখী হয়ে হাত উঠিয়ে দোয়া করা

১১. দোয়া কবুলের প্রচণ্ড আশা নিয়ে দোয়া করা

১২. অশ্রুসিক্ত হয়ে দোয়া করা

১৩. দোয়ার সময় কণ্ঠস্বর নীচু রাখা, উচ্চঃস্বরে দোয়া না করা

১৪. একান্তে দোয়া করা এবং

১৫. দৃঢ়তার সঙ্গে দোয়া করা

১৬. দোয়া কবুলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করা

আরাফাতের ময়দানে প্রধাণ আমলই হলো, দোয়া ও জিকির। সহিহ হাদিসে বর্ণিত এমনই কিছু দোয়া জিকির উল্লেখ করব। আপনি চাইলে এর মাধ্যমে আরাফাতের ময়দানে দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে সময় কাটাতে পারেন।

ক। হাদিসে বর্ণিত কিছু দোয়া নিম্মে উল্লেখ করা হলোঃ

আরাফাতের ময়দানে বেশী বেশি ইস্তিগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। বান্দা অন্যায় করে আর মহান আল্লাহ ক্ষমা করেন। ক্ষমা লাভের প্রধান হাতিয়ার হল ইস্তিগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর  ক্ষমা  লাভের  জন্য  তাঁর  কাছে  ক্ষমা  প্রার্থনা  করতে  হবে।  আল্লাহ  বলেন,

* وَاسْتَغْفِرُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ*

অর্থঃ ‘আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়। (সুরা বাকারা ২:১৯৯)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللّهَ يَجِدِ اللّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا

অর্থঃ যে গোনাহ, করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়। (সুরা নিসা ৪:১০০)

১. আবূ বুরদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী আগার্‌র (রাঃ) থেকে শুনেছি যে, ইবনু উমর (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর। কেননা আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক একশ’ বার তাওবা করে থাকি। (সহিহ মুসলিম হাদিস ৬৬১৩ ইফাঃ)

২। আবূ মালিক আশজায়ী (রহঃ) তাঁর পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই দুআ শিক্ষা দিতেনঃ

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي

“হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি রহম করুন, আমাকে হিদায়াত করুন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন।” (সহিহ মুসলিম ৬৬০৪ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

 ৩. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বলে দু‘আ করতেন,

(اللَّهُمّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ)

‘হে আমাদের প্রভু! এ দুনিয়াতেও আমাদের কল্যাণ দান কর এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান কর এবং দোজখের ‘আযাব থেকে আমাদের রক্ষা কর’’ (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:২০১)। (সহিহ বুখারি ৪৫২২)

৪. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা (বল)

 *(اللَّهُمّ إنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ، وَمِنْ دَرَكِ الشِّقَاءِ، وَمِنْ سُوْءِ الْقَضَاءِ، وَمِنْ شَمَاتَةِ الْأعْدَاءِ)*

(আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন জাহদিল বালা-ই ওয়া মিন দারাকিশ শিকা-ই, ওয়া মিন সুইল কাযা-ই। ওয়া মিন শামাতাতিল আ‘দা-ই)

অর্থঃ হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি বিপদ-আপদের কষ্ট হতে, দুর্ভাগ্য হওয়া থেকে, মন্দ ফায়সালা হতে এবং শত্রুদের খুশী হওয়া থেকে। (সহিহ বুখারি ৬৬১৬)

৫। আবূ মালিক (রহঃ) এর পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছেন যে, তাঁর কাছে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যখন আমার রবের কাছে প্রার্থনা করব তখন কিভাবে তা ব্যক্ত করব? তিনি বললেন, তুমি বল,

(,اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَعَافِنِي وَارْزُقْنِي))

অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমার প্রতি রহম করুন, আমাকে মাফ করে দিন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন। আর (দু’আ করার সময়) বৃদ্ধাঙ্গুলী ব্যতীত সব আংশুল একত্র করবে। (তিনি বললেন) এই শব্দগুলো তোমার দুনিয়া ও আখিরাতকে একত্র করে দেবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬০৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ সাধারণত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা দোয়া তিনবার করে করতেন। কিন্তু আরাফার মাঠে পুনরাবৃত্তি করতেন আরো বেশী পরিমাণে। তাই আপনি ইচ্ছা করলে একই দোয়া বার বার করতে পারেন। এই সময় কান্নাকাটি করে মাতা-পিতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বেশী বেশী দোয়া করতে হবে। এমনটি হজ্জে গমন করার জন্য যারা দোয়া চেয়েছে তাদের নাম ধরে ধরে দোয়া করা। সবার নাম নেয়া সম্ভব না হলে বললে, হে আল্লাহ যারা যারা আমার নিকটি তোমার কাজে দোয়া করতে বলেছে, তাদের সকলের মনে নেক আশা তুমি কবুল কর।  

খ। জিকির সম্পর্কিত হাদিসগুলো হলোঃ

১. আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) কর্তৃক পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সনদে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরাফাতের দিনের দু’আই উত্তম দুআ। আমি ও আমার আগের নাবীগণ যা বলেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্তম কথা। (তা হলো)

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু, লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হাম্দু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর)

অর্থঃ আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, সার্বভৌমত্ব তারই এবং সমস্ত কিছুর উপর তিনি সর্বশক্তিমান”। (তিরমিযী ৩৫৮৫, আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)

২. আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন যে কিতাবুল্লাহর একটি অক্ষর পড়ল তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি অবধারিত। এবং তাকে একটি নেকির দশ গুণ ছাওয়াব প্রদান করা হবে। আমি বলছি না আলিফ লাম মীম একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, এবং লাম একটি অক্ষর, এবং মীম একটি অক্ষর। (তিরমিজি-২৭৩৫)।

৩. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই আমার এ (বাক্যে) বলা, সুবহান আল্লাহ, আলহামদুল্লিল্লাহ, অ-লাইলাহ ইল্লাহল্লাহ, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর এবং আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, আল্লাহ মহান) পাঠ করা আমার অধিক পছন্দনীয় সে সব জিনিসের চাইতে, যার উপর সূর্য উদিত হয়। (সহিহ মুসলীম ৬৬০২ ইফাঃ)।

৪। মুসআব ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন যে, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ কি প্রতিদিন এক হাজার নেকী অর্জন করতে সক্ষম? তখন সেখানে উপবিষ্টদের মধ্য থেকে এক প্রশ্নকারী বলল, আমাদের কেউ কিভাবে এক হাজার নেকী অর্জন করতে পারবে? তিনি বললেনঃ যে একশ’বার তাসবীহ (سبحان الله ) পাঠ করলে তার জন্য এক হাজার নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে (অথবা) এবং তার থেকে এক হাজার গুনাহ মিটিয়ে দেওযা হবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬০৭ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৫। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার ফাতিমা (রাঃ) একজন খাদিমের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং কাজের অভিযোগ করলেন। তিনি বললেনঃ আমার কাছে তো কোন খাদিম নেই। তিনি বললেনঃ তবে আমি কি তোমাকে এমন কিছুর কথা বলবনা, যা তোমার খাদিম থেকে উত্তম? তা হল রাতে শয্যা গ্রহণের সময় তুমি ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬৭০ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৬। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

* لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهْوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ  *

(এই বাক্যটি) যে ব্যাক্তি দিনের মধ্যে একশ বার পড়বে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজত্ব একমাত্র তারই, হামদ তারই, সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান” সে একশ গোলাম আযাদ করার সাওয়াব অর্জন করবে এবং তার জন্য একশটি নেকী লেখা হবে, আর তার একশটি গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে। আর সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটা তার জন্য রক্ষা কবচে পরিণত হবে এবং তার চাইতে বেশী ফযীলত ওয়ালা আমল আর কারো হবে না। তবে যে ব্যাক্তি এ আমল তার চাইতেও বেশী করবে। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬১ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৭। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি প্রত্যহ একশত বার (سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ -আল্লাহ পবিত্র ও সমস্ত প্রশংসা তাঁরই) সুবাহানআল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলবে তার গুনাহগুলি মাফ করে দেওয়া হবে তা সমুদ্রের ফেনা পরিমান হলেও। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন, সহিহ মুসলিম ৬৫৯৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৮। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুটি বাক্য এমন যে, মুখে তার উচ্চারন অতি সহজ্জ কিন্তু পাল্লায় অনেক ভারী, আর আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। তা হলঃ সুবাহানআল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবাহানআল্লাহিল আযীম। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬৪ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

৯। আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক সকালে ও বিকালে একশত বার বলেঃ সুবাহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী”, কিয়ামতের দিন তার চাইতে উত্তম (আমালকারী) আর কেউ হবে না। তবে যে লোক তার ন্যায় কিংবা তার চাইতে অধিক পরিমান তা বলে (সে উত্তম ‘আমালকারী বলে গণ্য হবে)। (তিরমিজী ৩৪৭৯ হাদিসেরমান সহিহ)।

১০। জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমি বলতে শুনেছি : “লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” অতি উত্তম যিক্‌র এবং “আলাহামদু লিল্লাহ্‌” অধিক উত্তম দু‘আ। (সুনানে তিরমিজি ৩৩৮৩, ইবনে মাজাহ ৩৮০০)

১১। ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মি’রাজের রাতে আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ” আপনার উম্মাতকে আমার সালাম পৌছিয়ে দিন এবং তাদেরকে জানান যে, জান্নাতের যামীন অতীব সুগন্ধি সমৃদ্ধ এবং সেখানকার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু। তা একটি সমতল ভূমি এবং তার গাছপালা হল “সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামৃদু লিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার”। (তিরমিজি ৩৪৫২ হাদিসের মান হাসান সহিহ)।

১২। আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্‌ তা’আলার নিরানব্বইটি নাম আছে অর্থাৎ এক কম এক শত। যে লোক এই নামসমুহ মুখস্ত করবে বা পড়বে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি ৩৫০৬, মিশকাত ২২৮৮, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।

মন্তব্যঃ কাজেই আরাফাতের ময়দানে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে কোন বাক্য মহান আল্লাহ তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর ইত্যাদি পড়া যায়।

আরাফা দিবসের ভুল-ত্রুটিঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের অন্যতম ফরজ কাজ। আরাফাতে ঠিক মত আস্থান না হলে তার হজ্জ হবে না। কাজেই এই স্থানে ভূলত্রুটিগুলির প্রতি একটু বেশী খেয়াল রাখতে হবে।

১। আরাফাতের বাইরে অবস্থার করাঃ

আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ হজ্জ হলো আরাফায়। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৯)

মন্তব্যঃ এই কারনে যদি কেউ আরাফার সীমানায় প্রবেশ না করে তার হজ্জ হবে না। ঠিক তেমনিভাবে কেউ যদি যথাযথ ইহরান বেধে মিনায় না গিয়েও সরাসরি সূর্যাস্তের আগে আরাফায় ময়দানে ঢুকতে পারে এবং বাকি কাজে ঠিক মত আদায় করে তবে তার হজ্জ আদায় হবে বলে ধরা হয়। আলাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হবে। কিন্তু কেউ যদি সূর্যাস্তের আগে আরাফায় ময়দান ত্যাগ করে তবে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। কোন প্রকার দম দিলেও হজ্জ আদায় হবে না। কারন ফরজ ছুটে গেলে দম দ্বারা পূর্ণ হয় না। আরাফার অবস্থান করা ছিল ফরজ। হজ্জের ফরজ কখনও দম দ্বারা আদায় হয় না। এখান আর একটি কথা মনে রাখতে হবে মাসজিদে নামিরার সম্মুখভাগের অংশটি আরাফার সীমানার বাইরে। কাজেই এখান অবস্থান করলে ফরজ আদায় কবে না। তাই আগে ভাগে আরাফার ম্যাপ দেখে নিজের অবস্থান ঠিক করে নিবেন। না বুঝলে অন্যের দ্বারা হলেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

২। হাজ্জিগণ আরাফার দিনের সিয়াম রাখবে নাঃ

আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃরাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (সুনানে তিরমিজি ৭৪৯ ও ইবনু মাজাহ ১৭৩০)

আবূ ক্বাতাদাহহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আরাফার দিনের রোযা রাখলে আল্লাহ্‌র নিকট আশা রাখি যে তিনি বিগত এক বছরের ও আগামী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

আরাফার দিনের সিয়াম পালন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। বিশেষ করে মাঠে অবস্থানকারী হাজীদের জন্য ঐ দিন রোযা না রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ রোযা না রাখাই বিধান। কারণ খানাপিনা না খেলে এ কঠিন ইবাদতের জন্য শরীরে শক্তি পাবে না। হজ্জের এ পরিশ্রান্ত ইবাদত যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য শক্তির প্রয়োজন। তাই খাবার গ্রহণ করা জরুরী। নিম্মের হাদিসটি একটু লক্ষ করুন।

মায়মূনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওম পালন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৯৮৯)

উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আরাফার দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। (সহিহ বুখারী ১৬৫৮ তাওহিদ এবং ১৫৫৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আরাফার দিনে হাজিদের সিয়াম পালণ একটি ভুল আমল।

৩। আরাফার ময়দানে নফল সালাতঃ

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যিলহজ্জ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললেনঃ “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নি। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (হাদিসে কুদসি ১০১ ও ইব্‌ন হিব্বান)

উসামা ইবন যায়দ (রাঃ) বলেন, আমি আরাফায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে একই বাহনে সাওয়ার ছিলাম। তিনি দু‘আয় উভয় হাত উত্তোলন করলেন এমন সময় তার উট তাঁকে নিয়ে একদিকে হেলে গেল, ফলে তার নাকের রশি পড়ে যেতে লাগলো, তিনি তাঁর এক হাতে তা ধরে ফেললেন, এ সময় তাঁর অন্য হাত উঠানোই ছিল। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৪)

আরাফার ময়দানেরাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত তুলে দোয়া করেছেন। এই স্থান অনেক কে দেখা যায় দোয়া না করে নফল সালাত আদায় করে যা মুলত একটি ভুল আমন। এখানে জোহর ও আসর সালাত কে জমা করে আদায় করার বিধান দেয়া হয়েছে। তাই নফল সালাত আদায় করা ঠিন নয়। আরাফা হল দোয়া কবুলের স্থান তাই এখানে হাত তুলে একাকী দোয়া করতে হবে। এখানে তাবলীগের বিশ্ব ইজতিমার মত সম্মিলিত দোয়া কোন ব্যবস্থা করা হয় না কারন এখান একাকী দোয়া করাই সুন্নাহ সম্মত আমল। কিন্তু দোয়ার সময় একটি বিষয় খুব লক্ষ করবেন। যেন কোন অবস্থায়ই কিবলাকে পিছনে রেখে জাবালে আরাফার দিকে মুখ করে দুআ করা যাবে না।

৪। জাবালে রহমত থেকে পাথর সংগ্রহঃ

আরাফাতের ময়দানে অনেক পাহাড় আছে। একটি পাহাড়ের পাদদেশে বিদায় হজের খুতবা দিয়েছিলেন। সেই পাহাড়টি যাতে সহজে চিনতে পারেন এজন্য এই চিহ্ন সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। এই পাহাড়ের নাম জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। জাবালে রহমত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর বিশেষ কোন ফজিলত বর্ণিত হয়নি। তারপরও অনেক হাজি জাবালে রহমত কে তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় মনে করে সেখান থেকে বরকতের আশায় পাথর সংগ্রহ করা। যা একটি ভূল ধারন ও কাজ।

৫। জাবালে রহমত সামনে রেখে কাবাকে পিছনে রেখে দোয়া করাঃ

আরাফাতের ময়দানে অনেক পাহাড় আছে। একটি পাহাড়ের পাদদেশে বিদায় হজের খুতবা দিয়েছিলেন।

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ হলো :

১। আরাফা থেকে মুজদালিফার প্রত্যাবর্তনঃ

২। আরাফা হতে প্রত্যাবর্তনে চলার গতিঃ

৩।  পথী মধ্যে অজু করছেন কিন্তু সালাত আদায় করেন নাইঃ

৪। সালাত জমা করে আদায় করাঃ

৫। মুযদালিফায় রাত্রিযাপনঃ

৬। দুই সালাতের মাঝে কোন নফল সালাত নাইঃ

৭। আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করাঃ

৮। ফরজের সালাত আদায় করে কিছু সময় দোয়াকরাঃ

৯। মিনায় আসার পথে পাথড় কুড়ানঃ

১। আরাফা থেকে মুজদালিফার প্রত্যাবর্তনঃ

যখন সূর্য ডুবে যাবে এবং সূর্য অস্ত গিয়েছে এরূপ নিশ্চিত হবেন তখন প্রশান্ত মনে ধীরে সুস্থে মুযদালিফায় রওয়ানা দেবেন। এ সময় বেশী বেশী তালবিয়াহ পড়তে থাকবেন। সাবধান, কোন অবস্থাতেই সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা যাবে না। তবে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরাফাতে মাগরিবের নামায না পড়ে মুযদালিফায় রওয়ানা দেবেন। পৌঁছতে দেরী হলেও মাগরিব-এশা মুযদালিফায়ই পড়তে হবে। এ দেরীকে কাযা মনে করবেন না। সেদিনের জন্য এটাই নিয়ম। তবে যদি ঈশার সালাত কাজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে পথিমধ্যেই মাগরিক ও ঈশার সালাত আদায় করা।

সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরাফাত থেকে যখন মুযদালিফায় রওয়ানা সময়টি খুবই কঠিন। আরাফাতের ময়দানে সারাদিন অবস্থানের পর সবাই মুজদালিফায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয় থাকে। অনেক আসরের সালাতের পরই গাড়িতে বসে অপেক্ষা করে থাকে। কারন হাজিদের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম। কাজেই মহিলা ও মাজুল ছাড়া সকলের উচিত হেটে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যাওয়া। সূর্যাস্তের সাথে সাথে প্রায় ত্রিশ/চল্লিশ লক্ষ লোক এক সময়ে একযোগে আরাফা থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা দেয়। অভিজ্ঞতা বলে গাড়ি থেকে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় হেটে যাওয়া অনেক সহজ্জ। কারন গাড়ির তুলনায় হাজিদের সংখ্যা বিশ ত্রিশ গুন বেশী। যেখান ভিড়ের কারনে হেটে যাওয়াই কষ্টকর সেখান গাড়িতো চলারই কথা নয়। বিষয়টি বাস্থবেও তাই ট্রাফিকজ্যাম কতটা কঠিন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। মাঝে মধ্যে গাড়ীগুলো এমনভাবে থেমে থাকে মনে হয় যেন আর চলবে না। যদি সকল গাড়ি ড্রাইভার মক্কা বা সৌদিবাসি হত তবে যাতায়তে একটু সুবিধা হত। কিন্তু বেশির ভাগ ড্রাইভার বিদেশী ও নতুন তারা ঠিক মত মক্কার রাস্তাঘাট চিনে না। তাই তারা অনেক সময় ভুল রাস্তা অনুসরণ করে। অনেক সময় হাজিদের পথি মধ্যে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘‘সব রাস্তা বন্ধ, গাড়ী আর চলবে না। অনেক গাড়িতে বসে থাকে কেউ রাত দুইটায়, কেউ রাত ৩টায় কেউ আবার রাত চারটায় মুজদালিফায় পৌছায়।  এমন কি যারা গাড়িতে আসেন তাদের কোন কোন গাড়ি ফজরের আগে মুযদালিফায় পৌঁছতেই পারে না। অথচ আরাফা থেকে মুযদালিফার দূরত্ব মাত্র ৬ থেকে৭ কিলোমিটার।

হাজি ও গাড়ির ড্রাইভার দুই জনই নতুন থাকায় অনেকে মুজদালিফার সীমান চিনতে পারেনা। ট্রাফিকজামে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, মুজদালিফায় পৌছে গেছি। তাই তারা ভুলে মুজদালিফায় পৌছার পূর্বেই মুজদালিফা এসে গেছে ধারণা করে মাঝপথে মাগরিব এশা পড়ে ও রাত্রি যাপন করে। তাদের দেখাদেখি অনেক বিদশী হাজিও এই একই ভুল করে। অবশেষে ফজর বাদ মুযদালিফার সীমানায় এসে সাইনবোর্ড দেখে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আক্ষেপ করেঅ। এভাবে হজ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় অনেক হাজীর। কিন্তু  যারা হেটে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যাবে তাদের এই ভুল হওয়া সম্ভাবনা নাই। কেননা, শুধু হাঁটার জন্য আলাদা পথ রয়েছে, যা সমতল ও পীচ ঢালা। এ পথে কোন যানবাহন ঢুকেনা। তাই হাঁটতে বেশ আরাম। রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি থাকে। মেঘবৃষ্টি সাধারণতঃ হয় না। আবহাওয়া থাকে ভাল। সকলেই একযোগে একমুখী চলা। সবার মুখে একই তালবিয়া ‘‘লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক…’’ প্রয়োজনে রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে পারেন। দলবদ্ধ হয়ে পথ চললে ভাল হয়। যাদের সাথে নারী ও শিশু থাকবে তারা হেটে আসার সময় একটু সতর্ক থাকবেন। কেননা, অনেক সময় ভিড়ের কারণে হারিয়েও যায়। হারিয়ে গেলে চিন্তায় খুবই কষ্ট পাবেন। এই জন্যই সাথে শিশু ও নারী থাকলে বিশেষ সাবধান অবলম্ভন করতে হবে। নতুবা নারী-শিশুদেরকে বাসেই আনবেন। এই হিসাবে একান্ত মাজুর, অতি বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু, দুর্বল ও রোগী হলে গাড়িতে যাওয়া ভাল। তা না হলে সবার জন্যই আরাফাত থেকে মুযদালিফায় হেটে যাওয়া খুবই উত্তম হবে। সে জন্য আগে থেকেই নিয়তের পাশাপাশি প্রস্ততি সরূপ আরাফাতের ময়দানে হালকা বিছানা পত্র ছাড়া ভারী কোন লাগেজ না নেয়াই ভাল।

আরাফা হতে প্রত্যাবর্তনে চলার গতিঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে তার ভাই ফায্‌ল ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাহনে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আরাফাতে সন্ধ্যাবেলা এবং মুযদালিফায় ভোরবেলা লোকদের উদ্দেশে বললেন, যখন তারা অগ্রসর হচ্ছিল- “তোমরা ধীরে-সুস্থে অগ্রসর হও।” তিনিও নিজে উষ্ট্রীর গতি ধীর করে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং এভাবে মুহাস্‌সির পৌঁছলেন- যা মিনার অন্তর্গত। তিনি (এখানে) বললেন, তোমরা নুড়ি পাথর তুলে নাও যা জামরায় নিক্ষেপ করা হয়।

রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরায় পাথর নিক্ষেপ পর্যন্ত অনবরত তালবিয়াহ্‌ পাঠ করতে থাকলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮০)

 ‘উরওয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, উসামাহ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন আমি সেখানে উপবিষ্ট ছিলাম, বিদায় হজ্জের সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ‘আরাফা হতে ফিরতেন তখন তাঁর চলার গতি কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্রুতগতিতে চলতেন এবং যখন পথ মুক্ত পেতেন তখন তার চাইতেও দ্রুতগতিতে চলতেন।

(সহিহ বুখরি ১৬৬৬)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে ফিরে আসছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিছনের দিকে খুব হ্যাঁকডাক ও উট পিটানোর শব্দ শুনতে পেয়ে তাদের চাবুক দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হে লোক সকল! তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন কর। কেননা, উট দ্রুত হাকানোর মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। (সহিহ বুখরি ১৬৭১)

৩।  পথী মধ্যে অজু করছেন কিন্তু সালাত আদায় করেন নাইঃ

১. উসামাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার ময়দান হতে রওনা হলেন এবং উপত্যকায় পৌঁছে নেমে তিনি পেশাব করলেন। অতঃপর উযূ করলেন কিন্তু উত্তমরূপে উযূ করলেন না। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র রসূল! সালাত আদায় করবেন কি?’ তিনি বললেনঃ ‘সালাতের স্থান তোমার সামনে’। অতঃপর তিনি আবার সওয়ার হলেন। অতঃপর মুযদালিফায় এসে সাওয়ারী থেকে নেমে উযূ করলেন। এবার পূর্ণরূপে উযূ করলেন। তখন সালাতের জন্য ইক্বামাত দেওয়া হলো। তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সকলে তাদের অবতরণস্থলে নিজ নিজ উট বসিয়ে দিলো। পুনরায় ‘ইশার ইক্বামাত দেয়া হলো। অতঃপর তিনি ‘ইশার সালাত আদায় করলেন এবং উভয় সালাতের মধ্যে অন্য কোন সালাত আদায় করলেন না। (সহিহ বুখারি ১৩৯)

২. উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করছিলেন তখন তিনি একটি গিরিপথের দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটিয়ে উযূ করলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সালাত আদায় করবেন? তিনি বললেনঃ সালাত তোমার আরো সামনে।(সহিহ বুখারি ১৬৬৭)

৩. উসামাহ ইব্‌নু যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আরাফা হতে ফেরার সময় গিরিপথে অবতরণ করে পেশাব করলেন এবং অযূ করলেন। তবে পূর্ণাঙ্গ অযূ করলেন না। আমি তাঁকে বললাম, সালাত? তিনি বললেন, সালাত তো তোমার সামনে। অত:পর তিনি মুযদালিফায় এসে অযূ করলেন এবং পূর্ণাঙ্গ অযূ করলেন। অত:পর সালাতের ইক্বামাত হলে তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। এরপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে উট দাঁড় করিয়ে রাখার পর সালাতের ইক্বামাত দেয়া হলো। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। ‘ইশা ও মাগরিবের মধ্যে তিনি আর কোন সালাত আদায় করেননি। (সহহি বুখারি ১৬৭২)

৪. নাফি‘ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত এক সাথে আদায় করতেন। এছাড়া তিনি সেই গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করতেন যে দিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম গিয়েছিলেন। আর সেখানে প্রবেশ করে তিনি ইসতিনজা করতেন এবং অযূ করতেন কিন্তু সালাত আদায় করতেন না। অবশেষে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছে সালাত আদায় করতেন। (সহহি বুখারি ১৬৬৮)

৫. নাফি‘ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত এক সাথে আদায় করতেন। এছাড়া তিনি সেই গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করতেন যে দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিয়েছিলেন। আর সেখানে প্রবেশ করে তিনি ইসতিনজা করতেন এবং উযূ করতেন কিন্তু সালাত আদায় করতেন না। অবশেষে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছে সালাত আদায় করতেন।(সহিহ বুখারি ১৬৬৮)

সালাত জমা করে আদায় করাঃ

মুযদালিফায় রাত্রিযাপন হজ্জের একটি ওয়াজিব আমল। এই আমল কোনভাবেই ত্যাগ করা যাবে না। আরাফা থেকে মুজদালিফায় এসে প্রথম কাজ মাগরিব ও এশা জমা করে কসর আদায় করা। বিলম্ব হলেও মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব-এশা পড়তে হবে, এর আগে নয়। এই দুই সালাতকে বিলম্ব করতে করতে অর্ধ রাত্রির পরে নিয়ে যাওয়া জায়েয হবে না। তবে উজর থাকলে জায়েয।

দলিলঃ

১. আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন। (সহহি বুখারি ১৬৭৪)

২. সালামা ইব্‌ন কুহায়ল (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রাঃ) -কে দেখেছি যে, তিনি (মুযদালিফায়) মাগরিবের তিন রাক‘আত এবং ইশার দুই রাক‘আত সালাত আদায় করেন এবং বলেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) তাঁদেরসহ এই স্থানে এরূপ করেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই স্থানে এরূপই করেছিলেন। (সুনানে নাসাঈ ৪৮১)

৩. উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আরাফাহ্ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর সওয়ারীতে পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। উপত্যকায় পৌঁছে তিনি তাঁর উটনী বসালেন, এরপর প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য গেলেন। তিনি ফিরে এলেন। আমি পাত্র থেকে পানি ঢেলে দিলাম এবং তিনি ওযূ করলেন, এরপর সওয়ার হলেন এবং মুযদালিফায় পৌঁছে তিনি মাগরিব ও ‘ইশার সালাত একত্রে আদায় করলেন।  (সহিহ মুসলিম ২৯৯৫)

৪. সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র(রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ইব্‌ন উমর (রাঃ) যখন আরাফাত হতে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা করেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। মুযদালিফায় এসে তিনি মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করলেন। সালাত সমাপ্ত করে বললেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই স্থানে এইরূপ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ৬০৬)

৫. জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলতে চলতে মুযদালিফায় পৌঁছলেন। সেখানে এক আযান ও দুই একামতের সাথে মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করলেন। এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সময় কোন সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬৫৬)

৬. জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাহর ময়দানে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে যুহর ও ‘আসরের সলাত আদায় করেছেন। কিন্তু এ দুই সলাতের মধ্যখানে কোনো তাসবীহ পড়েননি। অনুরূপভাবে তিনি মুযদালিফায় এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং দুই সলাতের মাঝখানে কোন তাসবীহ পড়েননি। (আবু দাউদ ১৯০৬)

৭. হাকাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রাঃ) আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মুযদালিফায় মাগরিবের তিন রাক‘আত এবং ইশার দুই রাক‘আত সালাত আদায় করেন। এরপর বলেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) এরূপ করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –ও এরূপ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ৪৮৩)

৮. আশ্‘আস ইবনু সুলাইম (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাযি.)-এর সাথে আরাফা থেকে মুযদালিফা পর্যন্ত আসি। মুযদালিফায় আসা পর্যন্ত তিনি তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করেছেন। এরপর তিনি আযান ও ইকামাত দেন অথবা এক ব্যক্তিকে নির্দেশ করলে সে আযান ও ইকামাত দিলে তিনি আমাদেরকে নিয়ে মাগরিবের তিন রাক‘আত সালাত আদায় করলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, সালাত। অতঃপর নিয়ে তিনি দুই রাক‘আত ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। এরপর রাতের খাবার আনতে বললেন। বর্ণনাকারী আশ‘আস বলেন, ‘ইলাজ ইবনু ‘আমর, ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে আমার পিতা বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে ইবনু ‘উমার (রাযি.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এভাবেই সালাত আদায় করেছি। (আবু দাউদ ১৯৩৩)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মুযদালিফায়) মাগরিব ও ‘ইশার সলাত একত্রে (একই সময়ে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন নিয়্যাতে) আদায় করেছেন। তিনি এক ইক্বামাতেই মাগরিবের সলাত তিন রাক‘আত এবং ‘ইশার সলাত দু’রাক‘আত আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ৩০০৫)

মুযদালিফায় রাত্রিযাপনঃ

সালাত আদায় শেষ হওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়বেন যাতে পরবর্তী দিনের কার্যাবলী সক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা যায়। ঘুমানো জন্য স্থান পাওয়া খুবই কষ্ট কর তারপর ক্লান্ত শরীরে ঘুম এসে যাবে। ধনী-গরিব আজ এক কাতারে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়ার সময়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই।

দলিলঃ

‘আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কুরায়শগণ এবং তাদের ধর্মের অনুসারীরা (জাহিলী যুগে) মুযদালিফায় অবস্থান করত। তারা নিজেদের নামকরণ করেছিল ‘আল-হুম্‌স’। আর সমস্ত আরববাসীরা ‘আরাফাতে অবস্থান করত। যখন ইসলামের আবির্ভাব হ’ল, আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘আরাফায় অবস্থান করার ও সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। আল্লাহর বাণীর তাৎপর্যও তাই :‘‘অতঃপর অন্যান্য লোক যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে, তোমরাও সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করবে”- (সূরাহ্‌ আল বাক্বারাহ্‌ ২ : ১৯৯)। (সহিহ মুসলিম ২৮৪৪)

১. জাফর ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, আমরা জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর কাছে আগমন করলাম, তিনি আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুযদালিফার সমস্ত স্থানই মওকিফ বা অবস্থানের জায়গা।(সুনানে নাসাঈ ৩০৪৮)

২. জাবির (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি আরাফার এ স্থানে অবস্থান করেছি। কিন্তু পুরো আরাফাই অবস্থানের স্থান। আর আমি মুযদালিফার এ স্থানে অবস্থান করেছি। তবে মুযদালিফার পুরো এলাকাটিই অবস্থান স্থল। আমি মিনার এ স্থানে কুরবানী করেছি। মিনার পুরো এলাকাই কুরবানীর স্থান। কাজেই তোমরা তোমাদের নিজ নিজ অবস্থানে কুরবানী করো।(আবু দাউদ ১৯৩৬)

৩. জুবাইর ইবনু মুত‘য়িম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার একটি উট হারিয়ে ‘আরাফার দিনে তা তালাশ করতে লাগলাম। তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ‘আরাফায় উকূফ করতে দেখলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো কুরায়শ বংশীয়। (সহিহ বুখারি ১৬৬৪)

৪. জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাহর ময়দানে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে যুহর ও ‘আসরের সলাত আদায় করেছেন। কিন্তু এ দুই সলাতের মধ্যখানে কোনো তাসবীহ পড়েননি। অনুরূপভাবে তিনি মুযদালিফায় এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং দুই সলাতের মাঝখানে কোন তাসবীহ পড়েননি। আবু দাউদ ১৯০৬)]

৬। দুই সালাতের মাঝে কোন নফল সালাত নাইঃ

মাগরিবের তিন রাকাত ফরজ, এশার দুই রাকাত ফরজ এবং বিতর পড়তে হবে। এই দুই ওয়াক্ত সালাতের জন্য মাত্র একবার আযান এবং দুই বার ইকামাত দিতে হবে। কোন নফল সুন্নাত নামায নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় পড়েননি। কাজেই ঘুম বাদ দিয়ে নফল-সুন্নাত  সালাত আদায় করা সুন্নাহ সম্মত নয়।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশা এক সাথে আদায় করেন। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা ইকামত দেয়া  হয়। তবে  উভয়ের  মধ্যে বা পরে তিনি কোন নফল সালাত আদায় করেননি। (সহিহ বুখারি ১৬৭৩)

২. আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুযদালিফায় দু’ সালাত একত্রে আদায় করেছেন এবং দু’ সালাতই তিনি এক ইকামতসহ আদায় করেন এবং দু’ সালাতের কোন সালাতেরই পূর্বে বা পরে কোন নফল সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬৬০)

৩. ইবন শিহাব (রহঃ) বলেনঃ উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ তাঁকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তার পিতা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন, এবং উভয় সালাতের মধ্যে কোন নফল আদায় করেন নি। মাগরিব আদায় করেন তিন রাকআত, ইশার সালাত আদায় করেন দুই রাকআত। আবদুল্লাহ্ ইবল উমর (রাঃ)-ও এরূপ একত্রে আদায় করতেন, মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত। (সুনানে নাসাঈ ৩০৩২)

৪. ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশা একসাথে আদায় করেন। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা ইকামত দেওয়া হয়। তবে উভয়ের মধ্যে বা পরে তিনি কোন নফল সালাত আদায় করেননি। (সহিহ বুখারী ১৫৬৮ ইফাঃ)

৭। আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করাঃ

১. ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ইশা ও মাগরিবের সলাতকে মুযদালিফায় একত্রে আদায় করা এবং পরের দিন ফাজ্‌রের সলাত ওয়াক্তের পূর্বে (আউয়াল ওয়াক্তে) আদায় করে নেয়া, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এই দুই সলাত ছাড়া কোন সলাত ওয়াক্তের পূর্বে আদায় করতে দেখিনি। (আবু দাউদ ১৯৩৪)

২. আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কোন সালাত তার নির্ধারিত ওয়াক্ত ছাড়া আদায় করতে দেখেনি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশার সালাত ব্যতিক্রম এবং পরবর্তী ভোরে ফজরের সালাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৬ ইফাঃ)

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দু’টি সালাত ব্যতীত আর কোন সালাত তার নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত আদায় করতে দেখিনি। তিনি মাগরিব ও ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন এবং ফজরের সালাত তার ওয়াক্তের আগে (আউয়াল ওয়াক্তে) আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮২)

৪. আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্ধারিত ওয়াক্তেই সলাত আদায় করতে দেখেছি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং রাতের ভোরে ফজরের সলাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছে। (সহিহ মুসলিম ৩০০৭)

৫. আসমা (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ, তিনি বলেন, আমাকে আসমা (রাঃ) মুযদালিফাহ্ অবস্থানকালে জিজ্ঞেস করলেন, চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, না। অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ সলাত আদায় করলেন। পরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে বৎস! চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সাথে রওনা হও। আমরা রওনা হলাম এবং জামরাহ্ (পৌঁছে) তিনি কাঁকর নিক্ষেপ করলেন, এরপর নিজের তাঁবুতে সলাত আদায় করলেন। আমি তাকে বললাম, হে সম্মানিত মহিলা! আমরা খুব ভোরে রওনা হয়েছিলাম। তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই হে বৎস! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহিলাদের খুব ভোরে রওনা হবার অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ৩০১৩)

৮। ফরজের সালাত আদায় করে কিছু সময় দোয়াকরাঃ

মুজদালিফায় ফজরের সালাত অন্ধকার থাকতেই আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে হবে। দুই রাকাত ফরজের সাথে দুই রাকাত সুন্নতও পড়বেন। এরপর ‘‘মাশআরুল হারাম’’-এর নিকটবর্তী কিবলামুখী দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে দোয়া-মুনাজাত করা। কাজেই মুজদালিফায় অবস্থান কালে ‘মাশআরুল হারাম’’ নিকটে থাকা উত্তম, তবে দুরে মুজদালিফার যে কোন স্থানে থাকাই সুন্নাহ। ‘মাশআরুল হারাম’’ একটি পাহাড়ের নাম। এটি মুযদালিফায় অবস্থিত। এখানে একটি মসজিদও আছে। এখানে হাজীদের জন্য বিশেষ কিছু আমল আছে তবে আমলগুল জরুরী নয়। আমলগুলো হলঃ

ক। মাশআরুল হারামের নিকট কিবলামুখী হয়ে দাড়িয়ে তাকবীর বলা

খ। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহাম্দু লিল্লাহ’ এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইত্যাদি জিকির করা

গ। খুশু-খুযু ও বিনম্র হয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করা

ঘ। দোয়ার সময় এখানে হাত তুলে মুনাজাত করা মুস্তাহাব

ঙ। এভাবে ফজরের নামাযের পর থেকে মিনায় রওয়ানা হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত দোয়া করা মুস্তাহাব।

দলিলঃ

১. সালিম (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ, তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের আগেই পাঠিয়ে দিয়ে রাতে মুযদালিফাতে মাশআরে হারামের নিকট উকূফ করতেন এবং সাধ্যমত আল্লাহর যিকর করতেন। অতঃপর ইমাম (মুযদালিফায়) উকূফ করার ও রওয়ানা হওয়ার আগেই তাঁরা (মিনায়) ফিরে যেতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ মিনাতে আগমন করতেন ফজরের সালাতের সময় আর কেউ এরপরে আসতেন, মিনাতে এসে তাঁরা কঙ্কর মারতেন। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলতেন, তাদের জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কড়াকড়ি শিথিল করে সহজ্জ করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৬)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী ‘উমরাহ আদায়ের পর যদ্দিন হালাল অবস্থায় থাকবে তদ্দিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এরপর যখন ‘আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজ্জলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা ‘আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি ‘আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর ‘আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে ‘আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত ‘ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌঁছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহ্কে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’ তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। সহিহ বুখারি ৪৫২১)

৩. বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুযদালিফার দিন ভোরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ হে বিলাল! লোকেদের চুপ করতে বলো। অতঃপর তিনি বলেনঃ এই মুযদালিফায় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করেছেন, তোমাদের উত্তম লোকেদের উসীলায় তোমাদের গুনাহগারদের ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীল ব্যক্তি যা প্রার্থনা করেছে তিনি তাকে তা দিয়েছেন। অতএব তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যাবর্তন করো। (ইবনে মাজাহ ৩০২৪)

৪. সালিম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের আগেই পাঠিয়ে দিয়ে রাতে মুযদালিফাতে মাশ‘আরে হারামের নিকট উকূফ করতেন এবং সাধ্যমত আল্লাহর যিকর করতেন। অতঃপর ইমাম (মুযদালিফায়) উকূফ করার ও রওয়ানা হওয়ার আগেই তাঁরা (মিনায়) ফিরে যেতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ মিনাতে আগমন করতেন ফজরের সালাতের সময় আর কেউ এরপরে আসতেন, মিনাতে এসে তাঁরা কঙ্কর মারতেন। ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলতেন, তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কড়াকড়ি শিথিল করে সহজ্জ করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৬)

মন্তব্যঃ হাজ্জিদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারনে এখান ‘‘মাশআরুল হারাম’’ এর কাছে প্রচন্ড ভীল থাকে। কাজেই ভীড়ের কারণে ‘‘মাশআরুল হারাম’’এর কাছে যেতে না পারলে মুযদালিফার যে কোন স্থানে দাঁড়িয়ে এভাবে দোয়া করা উত্তম। তবে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিক ও ইশার সালাত আদায়ের পর ঘুমাতে হবে। অতপর, আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সুন্নাহসহ ফরজ আদায় করেত হবে। ফজরের ফরজ সালাত আদায়ের পরই কেমল এই জিকির ও দোয়া করতে হবে। যখন আকাশ ফর্সা হবে কিন্তু সূর্য উঠে নাই, এমন সময় মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে।

৯। মিনায় আসার পথে পাথড় কুড়ানঃ

সুন্নাত হলো প্রথম দিনের সাতটি কংকর মাশআরুল হারাম থেকে রওয়ানা দেয়ার পর মুযদালিফা থেকেই কুড়াবেন। এখান থেকে এর বেশী নয়। আর বাকী ৩ দিনের প্রত্যেক দিনের ২১টি করে কংকর মিনা থেকেই কুড়ানো যায়। এটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। তবে হারামের মধ্যবর্তী যে কোন স্থান থেকেই কংকর কুড়ানো জায়েয আছে।

দলিলঃ

১. ফযল ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের পেছনে বসাছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘আরাফার সন্ধ্যায় ও মুযদালিফায় ভোরে লোকেদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা (অবশ্যই) প্রশান্তির সাথে ধীরে সুস্থে চলবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও নিজের উষ্ট্রীকে মিনার অন্তর্গত মুহাস্‌সির নামক স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত সংযত রেখেছিলেন। এখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তোমরা আঙ্গুল দিয়ে ধরা যায় এমন ছোট পাথর জামারাতে মারার জন্য লও’। ফযল বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারায় পাথর মারা পর্যন্ত সব সময় তালবিয়াহ্ পড়ছিলেন। (মিসকাতুল মাসাবিহ ২৬১০ ও সহিহ মুসলিম)

২. ইবন আব্বাস (রাঃ) সূত্রে ফযল ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যিনি (হজ্জের সময়) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে একই বাহনে সওয়ার ছিলেন, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফায় সন্ধ্যায় এবং মুযদালিফায় সকালে লোকদেরকে বললেনঃ যখন তারা (আরাফা ও মুযদালিফা হতে) প্রস্থান করে শান্তভাবে চলো। তিনি তাঁর উটনীর লাগাম টেনে রাখছিলেন। যখন তিনি মুহাস্সিরে -যা মিনার একটি অংশ প্রবেশ করলেন, তখন বললেনঃ তোমরা আংগুলে ছুঁড়ে মারার মত কংকর (পাথরের ছোট ছোট টুকরা) সংগ্রহ কর। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তালবিয়া পড়তে থাকলেন, জামরাতুল আকাবায় কংকর মারা করা পর্যন্ত। (সুনানে নাসাঈ ৩০২০)

মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ

মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ হলোঃ

১। সূর্য উঠার আগেই মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হতে হবে

২। দুর্বল ব্যক্তিদের আগেভাগে মুযদালিফা ত্যাগ কার জায়েয

৩। মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে ধীর স্থিরভাবে চলতে হবে

৪। ওয়াদী মুহাসসির নামক স্থানে দ্রুত চলা

৫। বড় জামারায় পৌছার পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা

১। সূর্য উঠার আগেই মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হতে হবেঃ

ফজরের সালাত আদায় না করা পর্যন্ত মুযদালিফায় থাকতে হবে। তাই আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করতে হবে। ফজরের সালাত শেষে  তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল, তাকবীর ও দোয়া শেষ করে, আকাশ ফর্সা হয়ে গেলে সূর্য উঠার আগেই মিনায় রওয়ানা দেবেন। প্রচন্ড ভীড়ের কারণে ট্রাফিক জামের দরুন বাসের অপেক্ষা না করে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দেয়াই ভাল। জাহিলী যুগের লোকেরা মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা জন্য সূর্য উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপরীত শিক্ষা আমাদের দিলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন।

দলিলঃ

১. আমর ইব্‌নু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি, ‘উমর (রাঃ) -এর সাথে ছিলাম। তিনি মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আদায় করে (মাশ‘আরে হারামে) উকূফ করলেন এবং তিনি বললেন, মুশরিকরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত রওয়ানা হত না। তারা বলত, হে সাবীর! আলোকিত হও। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপরীত করলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন। (সহিহ বুখরি ১৬৮৪)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, সূর্য উঠার আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মুযদালিফা হতে) যাত্রা করেন।  (সুনানে তিরমিজি ৮৯৫ হাদিসের মান সহিহ)

৩. আমর ইবনু মাইমূন (রহঃ) বলেন, আমরা মুযদালফায় অবস্থানরত ছিলাম। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তখন বললেনঃ সূর্য না উঠা পর্যন্ত মুশরিকরা এখান হতে রাওয়ানা হত না। তারা বলতঃ হে সাবির। আলোকিত হও। কিন্তু তাদের বিপরীত নীতি অনুসরণ করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর সূর্য উঠার পূর্বেই উমর (রাঃ)-ও রাওয়ানা হন। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৬ হাদিসের মান হাসান সহিহ)

৪. আমর ইবনে মায়মুন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সাথে হজ্জ করেছি। আমরা যখন মুযদালিফা থেকে প্রত্যাবর্তন করলাম তখন তিনি বলেন, মুশরিকরা বলতো, হে সাবীর (মুযদালিফার একটি পাহাড়)! উজ্জ্বল হও, আমরা প্রত্যাবর্তন করবো। তারা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (মুযদালিফা থেকে) প্রত্যাবর্তন করতো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিপরীত আমল করেন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে (মিনার উদ্দেশ্যে) রওয়ানা করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০২২, নাসাঈ ৩০৩৭)

৫. আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উমর (রাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আদায় করে (মাশা’আরে হারামে) উকুফ করলেন এবং তিনি বললেন, মুশরিকরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত রওয়ানা হত না। তাঁরা বলত, হে সাবীর! আলোকিত হও! নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বিপরীত করলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন। (সহিহ বুখারী ১৫৭৯ ইফাঃ)

২। দুর্বল ব্যক্তিদের আগেভাগে মুযদালিফা ত্যাগ কার জায়েযঃ

দুর্বল নারী ও শিশু এবং অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য অর্ধ রাত্রির পর মুযদালিফা থেকে মিনায় চলে যাওয়া জায়েয হবে। দুর্বল ও অসুস্থদের সাহায্যার্থে তাদের সাথে সুস্থ অভিভাবকরাও যেতে পারবে। এরূপ ওযর ছাড়া মুযদালিফায় ফজর আদায় না করে কারো মিনায় চলে যাওয়া ঠিক হবে না। চলে গেলে দম দিতে হবে।

১. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মুযদালিফায় অবতরণ করলাম। মানুষের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হওয়ার জন্য সওদা (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অনুমতি চাইলেন। আর তিনি ছিলেন ধীরগতি মহিলা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনুমতি দিলেন। তাই তিনি লোকের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হলেন। আর আমরা সকাল পর্যন্ত সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হলেন, আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। সওদার মত আমিও যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অনুমতি চেয়ে নিতাম তাহলে তা আমার জন্য হতে অধিক সন্তুষ্টির ব্যাপার হতো।(সহিহ বুখারি ১৬৮১, সহিহ মুসলিম ৩০০৯)

২. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) মুযদালিফার রাতে (মিনা যাওয়ার জন্য) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অনুমতি চাইলেন, তিনি তাঁকে অনুমতি দেন। সওদাহ (রাঃ) ছিলেন ভারী ও ধীরগতিসম্পন্না নারী। (সহিহ বুখারি ১৬৮০)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মালপত্রের সাথে মুযদালিফা হতে রাত্রিকালে প্রেরণ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৮৫৬)

৪. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারের মধ্যে দুর্বলদের (মুযদালফা হতে মিনায়) আগেই পাঠিয়ে দেন। আর তিনি বলেদেনঃ তোমরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (জামরায়) কংকর নিক্ষেপ করবে না। (সুনানে তিরমিজ ৮৯৩, আবু দাউদ ১৯৪১)

৫. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারে যেসব দুর্বল লোকেদের (মুযদালিফা থেকে মিনায়) আগেভাগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৬)

৬. ফযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ হাশিমের দুর্বলগণকে আদেশ করেন যে, তারা যেন মুযদালিফা থেকে আগে ভাগে চলে যায়।(সুনানে নাসাঈ ৩০৩৭)

মন্তব্যঃ বীনা ওজরে আগেভাগে চলে যাওয়া সঠিক কাজ নয়। যদি কেউ আগেভাগে মিনায় গিয়ে ফজরের সালাত আদায় করে তবে তাকে দম দিতে হবে।

৩। মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে ধীর স্থিরভাবে চলতে হবেঃ

১. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, যখন তারা সন্ধ্যায় আরাফা ও সকালে মুযদালিফা ত্যাগ করেন, তোমরা ধীর-স্থিরভাবে চল। তখন তিনি তার উটনীর লাগাম টেনে রাখেন। এরপর যখন তিনি মিনায় প্রবেশ করেন তখন তিনি অবতরণ করেন। ‘মুহাসসির’ নামক স্থানে তিনি বলেন : তোমরা ‘খায়ক’ (দুই আংগুলে মারার ছোট) কংকর সাথে নাও, যা জামরায় মারতে হবে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে ইঙ্গিত করে বলেন, যেরূপ কংকর মানুষ সাধারণত মেরে থাকে। (সুনানে নাসাঈ ৩০৫৮)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে ধীরেসুস্থে (মুযদালিফা থেকে) রওয়ানা করেন এবং লোকেদেরও শান্তভাবে রওয়ানা হতে বলেন। (মিনায় পৌঁছার পর) তিনি তাদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন ক্ষুদ্র কাঁকর নিক্ষেপ করে। তিনি নিজে (মুযদালিফা ও মিনার মাঝখানে অবস্থিত) ওয়াদী মুহাসসির দ্রুত অতিক্রম করেন এবং বলেনঃ আমার উম্মাত যেন হজ্জের অনুষ্ঠানাদি শিখে নেয়। কারণ এ বছরের পর হয়তো আমি তাদের সাথে মিলিত হতে পারবো না। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৩)

৪। ওয়াদী মুহাসসির নামক স্থানে দ্রুত চলাঃ

চলার সময় বেশী বেশী লাববাইকা অর্থাৎ তালবিয়াহ ও আল্লাহু আকবার পড়তে থাকবেন। ওয়াদি মুহাস্সির নামক স্থানে পৌঁছলে সামান্য দ্রুত গতিতে হাঁটা মুস্তাহাব, যদি অন্য মানুষকে কষ্ট দেয়া ছাড়া এটি করা যায়, তবেই তা করবেন। ‘‘ওয়াদী মুহাস্সির’’ নামক জায়গাটি মুযদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম।

দলিলঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়াদী মুহাসসারে তার উট দ্রুত হাঁকিয়ে যান। এই হাদীসে বিশর আরো উল্লেখ করেন যে, তিনি শান্তভাবে মুযদালিফা হতে ফিরে আসেন এবং লোকদেরকেও শান্তভাব অবলম্বনের হুকুম দেন। আবূ নুআইম আরো বর্ণনা করেনঃ তিনি নুড়ি পাথর (জামরায়) ছুঁড়ে মারার হুকুম দেন এবং বলেনঃ এই বছরের পর হয়ত আমি আর তোমাদের দেখা পাব না। (সুনানে তিরমিজ ৮৮৬)

২. জা’ফর ইবন মুহাম্মাদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি জাবির ইবন আবদুল্রাহ্ (রাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বললামঃ রাসূলুল্রাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হজ্জ সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করুন। তিনি বললেনঃ রাসূলুল্রাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই মুযদালিফা ত্যাগ করেন এবং ফযল ইবন আব্বাসকে তাঁর বাহনে তাঁর পেছনে বসিয়ে নেন, মুহাস্সিরে এসে তিনি তাঁর বাহনকে দ্রুতগতিতে পরিচালনা করেন। পরে তিনি সে পথ ধরে চলেন যা তোমাকে জামরায় কুবরায় (বড় শয়তান) পৌঁছে দেবে। এরপর তিনি বৃক্ষের নিকটের জামরায় উপনীত হন এবং সেখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন। তিনি এগুলোর প্রত্যেকটি নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলেন। তিনি (কংকর) নিক্ষেপ করেন উপত্যকার নিম্নভূমি থেকে। (সুনানে নাসাঈ ৩০৫৪)

৩. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফা হতে শান্তভাবে রওয়ানা হলেন এবং লোকদেরকে ছোট কংকর মারার নির্দেশ দিলেন। তিনি দ্রুত গতিতে মুহাসসির উপত্যকা অতিক্রম করেন। (আবু দাউদ ১৯৪৪)

৫। বড় জামারায় পৌছার পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করাঃ

মিনায় পৌছরা পর যখই বড় জামারায় পৌছাবেন, সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবেন।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ‘আরাফাহ হতে মুয্দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৩)

২. ফাযল ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তার বাহনের পিছনে বসিয়ে এনেছেন। জামরা আকাবায় কংকর মারা পর্যন্ত তিনি অনবরত তালবিয়া পাঠ করেন। (সুনানে তিরমিজি ৯১৮)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফায় ফায্লকে বাহনে তাঁর পিছনে বসালেন। রাবী বলেন, এরপর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আমাকে অবহিত করলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামরাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত অনবরত তালবিয়াহ্ পাঠ করতে থাকেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৯)

কিছু পরামর্শঃ মুজদালিফায় জায়গা বাড়ে নাই বেড়েছে হাজিদের সংখ্যা। তাই ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। বিছানা বিছানোর মত কোন সুবিধাজনক স্থান পেলেই সালাত আদায়ের সাথে সাথে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে বালু ও ছোট ছোট পাথরের কনা প্রচুর বিধায় ঘুমান কষ্টকর। মহান আল্লাহর ইবাদাতের কথা মনে করে, বালু কণা আর পাথরের টুকরা যাই থাকুক এরই উপর একটি মাদুর বিছিয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে পড়বেন। এখানে প্রায় স্থানেই অজু ও টয়লেটের ব্যবস্থা আছে তার পরও সারা রাত প্রতিটি টয়লেটের সামনে দীর্ঘ লাইন লেগেই থাকে। এজন্য পানি কম খাওয়া ভাল। মুজদালিফা থেকে পায়ে হেঁটে মিনায় পৌঁছতে হবে। গাড়িতে মিনা যাওয়ার কল্পনা করা যায় না। কেননা মানুষের ভিড়ে বাস্তায গাড়ী চলাচলের সুযোগ তাকে না বললেই চলে।

এই দিন সরাসরি মিনায় পাথর নিক্ষেপের জন্য জামারাতে না গিয়ে তাবুতে যাওয়া ভাল। সকলে সবাই জামারাতে যাওয়া চেষ্টা করে বিধায় বিশাল ভিড় লেগে যায়। সকাল ১০/১১ টার দিকে ভিড় একটু কমে যায়। মিনায় তাঁবুতে পৌঁছে নাস্তা খেয়ে একটু বিশ্রাম করে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে কংকর নিক্ষেপ করতে যেতে পারেন। মিনায় তাবুতে পৌছাতে হবে আপনাকে সঠিক লোকেশন জানতে হবে। তাই মুয়াল্লীমকে হাত ছাড়া করা চলবে না। সাথে সাথে নিজের নোটবুকে লিখে রাখুন, কত নম্বর খুঁটির নিকটে মিনায় আপনার তাঁবু। কারণ এখান থেকে হারিয়ে গেলে জনরাশির মহাস্রোতে আপনাকে খুঁজে বের করা খুব দুরহ।

মুজদালিফারভুল-ত্রুটি

মুজদালিফার ভুল-ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সারা দিন আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফা যেতে প্রান আনচান করতে থাকে। আগেই বলেছি, যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আরাফাহ থেকে মুজদালিফায় যায় তবে হজ্জ হবে না। কাজেই আরাফাতের ময়দানে বসে, সূর্য অস্ত দেখে, ধীর স্থির ও শান্ত ভাব বজায় রেখে মুযদালিফার পথে রওয়ানা দিতে হবে। মুজদালিফায় পৌছে মাগরিব ও এশার সালাত একত্র আদায় করে জমিনে ঘুমিয়ে পরা। এখানে ঘুমই ইবাদাত। কিছু কিছু মানুষ মুযদালিফার রাত নামায আদায়, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরের মাধ্যমে কাটায়। এটি সুন্নাহ বিরোধী। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ রাতে এ ধরণের কোন ইবাদত করেননি। নিম্মে সুনানে আবু দাউদে সহিহ সনদে বর্ণিত একটি বিশাল হাদিসের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি।

জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তাঁর পিতার থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা আমরা জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট যাই। আমরা তার নিকটবর্তী হলে তিনি (অন্ধ হওয়ার কারণে) আগন্তুকদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং এক পর্যায়ে আমার কাছাকাছি এলে আমি বললাম, আমি মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলী ইবনু হুসাইন ইবনু ‘আলী (রাঃ)। আমার কথা শুনে তিনি আমার মাথার দিকে হাত বাড়ান, আমার জামার উপরের ও নিচের বোতাম খুলে তার হাতের তালু আমার বুকের উপর রাখলেন। …………………

অতঃপর বিলাল (রাঃ) (আরাফায়) আযান অতঃপর ইক্বামাত দিলেন। তিনি যুহরের সলাত আদায় করলেন, পুনরায় ইক্বামাত দিলে ‘আসরের সলাত আদায় করলেন। কিন্তু এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অন্য (নফল) সলাত পড়েননি। অতঃপর তিনি কাসওয়া উষ্ট্রীতে আরোহণ করে আরাফাতে অবস্থানের স্থানে এলেন এবং কাসওয়া উষ্ট্রীকে ‘জাবালে রহমাতের’ পাদদেশে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে তিনি পাহাড়কে সামনে রেখে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। সূর্য ডুবে আকাশের লালিমা কিছুটা মুছে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। সূর্যের লালিমা বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি ‘উসামাকে তাঁর পেছনে সওয়ারীতে বসিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখান থেকে রওয়ানা হলেন এবং উষ্ট্রীর লাগাম শক্ত করে ধরলেন, ফলে উটের মাথা হাওদার সম্মুখভাগের সাথে ছুটতে লাগলো। এ সময় তিনি ডান হাতের ইশারায় বলতে লাগলেন : ধীরস্থিরভাবে পথ চলো, হে লোকেরা, ধীরস্থিরভাবে চলো, হে লোকজন! তিনি কোন বালির টিলার নিকট এলে উষ্ট্রীর লাগাম সামান্য ঢিলা করতেন যাতে তা সহজে টিলায় উঠে সামনে অগ্রসর হতে পারে। অবশেষে তিনি ‘মুযদালিফায়’ উপস্থিত হলেন। এখানে এসে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত একত্রে আদায় করেন। এ দুই সলাতের মাঝখানে তিনি অন্য কোনো (নফল) সলাত পড়েননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম এ স্থানে ভোর পর্যন্ত বিশ্রামকরেন। ফাজ্‌রের সময় হলে তিনি ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেন। তিনি এ সলাত আদায় করেছেন এক আযান ও এক ইক্বামাতে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯০৫)

মন্তব্যঃ এই সহহি হাদিসে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার নামায আদায় করার পর ফজর হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম করেছেন। ফজর হওয়ার পর তিনি ফজরের নামায আদায় করেছেন। তিনি এই রাতে কোন তাহাজ্জুদের নামায, ইবাদত বন্দেগী, তাসবিহ, যিকির-আযকার বা কুরআন তেলাওয়াত নেই।

মুজদালিফার ৯ টি ভুল-ত্রুটি হলঃ

১। মুজদালিফায় আসার জন্য তাড়াহুড়া করা ২। মুজদালিফার বাহিরে অবস্থান করা  ৩। মুজদালিফাতে পৌঁছার আগেই পথিমধ্যে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় ৪। মুজদালিফায় পৌছাতে সালাত কাজা করা

৫। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় না করা ৬। সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করা   ৭। মুযদালিফার উপর দিয়ে যায় কিন্তু কিছু সময়ের জন্যও অবস্থান করে না ৮। মিনা মনে করে মুজদালিফায় অবস্থান করা  ৯। সকল কঙ্কর মুজদালিফায় কুড়ানো জরুরী মনে করা

১। মুজদালিফায় আসার জন্য তাড়াহুড়া করাঃ

 হিশাম (রহঃ) থেকে তার পিতার হতে বর্ণিত। তিনি (উরওয়া) বলেন, উসামা (রাঃ) কে আমার উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসা করা হল অথবা আমি উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে তাঁর সওয়ারীর পেছনে বসিয়েছিলেন, তখন তিনি কিভাবে চলেছিলেন? তিনি বললেন, তিনি ধীর গতিতে সওয়ারী চলছিলেন, যখন খোলা জায়গা পেলেন, তখন দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৬ ইফাঃ}

মন্তব্যঃ আরাফা থেকে মুযদালিফাতে আসার সময় হাজীসাহেবগণ খুই তাড়াতাড়ি করে থাকেন। সূর্য ডোবার সাথে সাথে সবাই তাড়াহুড়ো করে মুজদালিফার পানে ছুটতে থাকেন। তারা একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করা। এমনকি গাড়িগুলোও ছুটতে থাকে, যার ফলে কখনও কখনও এক্সিডেন্ট হয়। অথচ উপরের হাদিস থেকে বুঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার ময়দান থেকে ধীর গতিতে চলছেন শুধু খোলা জায়গা পেলে দ্রুত গতিতে চলতেন।  অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতেন। আমাদেরও পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলা উচিত।

২। মুজদালিফার বাহিরে অবস্থান করাঃ

কেউ যদি মুজদালিফায় রাত্রিযাপন না করে সরাসরি মিনায চলে যায় তবে তার ওয়াজিব ছুটে যাবে। তাকে দম দিতে হবে। কাজেই মুযদালিফায় অবস্থান না করে মিনায় চলে যাওয়া যানে না। যারা হেঁটে হেঁটে আরাফার ময়দান থেকে মুজদালিফায় যান, তারা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে অক্ষম হয়ে পড়েন। ফলে তারা মুযদালিফাতে পৌঁছার আগেই অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই ফজরের সালাত আদায় করে মীনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। যে ব্যক্তি এমনটি করেছে তার মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন ছুটে গেছে। এর ফলে হাজি সাহেবদের রুকন ছুটে যাবে। কারণ মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন কোন কোন আলেমের মতে, হজ্জের একটি রুকন। এই জন্য হাজীসাহেবের কর্তব্য হচ্ছে, নিজে না জানলে বা না বুঝলে মুয়াল্লিমের মাধ্যমের মুযদালিফাতে রাত্রি নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে মুযদালিফা ত্যাগ ত্যাগ না করা।  কিন্তু অনেকে আছেন যারা মুজদালিফার সীমানাই জনেন না। অনেক গাড়িতে থাকে বিদেশী ড্রাইভার তারাও মুজদালিফার সীমান জানেন না। ফলে না জেনে, মুজদালিফার সীমানার বাইরে অবস্থান করে। এই জন্য হাজি সাহেব ও ড্রাইভার উভয়ের জন্য জরুরী হল মুজদালিফার সীমান জানা। কিন্তু অপারগতা কারনে ভুল হলে মহান আল্লাহ নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি কারও উপর তার সাধ্যের চেয়ে বেশী বোঝা চাপিয়ে দেন না। (২:২৮৬)। আল্লাহু আলাম।

৩। মুজদালিফাতে পৌঁছার আগেই পথিমধ্যে মাগরিব ও এশার সালাত আদায়ঃ

উসামাহ ইবনু যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আরাফা হতে সওয়ারীতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে আরোহণ করলাম। মুযদালিফার নিকটবর্তী বামপার্শ্বের গিরিপথে পৌঁছলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটটি বসালেন। এরপর পেশাব করে আসলেন। আমি তাঁকে উযূর পানি ঢেলে দিলাম। আর তিনি হালকাভাবে উযূ করে নিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সালাত? তিনি বললেনঃ সালাত তোমার আরো সামনে। এ কথা বলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করে মুযদালিফা আসলেন এবং সালাত আদায় করলেন। মুযদালিফার ভোরে ফযল [ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)] আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে আরোহণ করলেন।  (সহিহ বুখারী ১৬৬৯ তাওহীদ প্রকাশনী, সহিহ মুসলিম ২৯৬৯ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ এই সহিহ হাদিসটি থেকে বুঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফাতে পৌঁছেই সালাত আদায় করেছিলেন। এশার নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশ করার পর তিনি মাগরিব ও এশার নামায জমা করে আদায় করেছেন। তাই কোন ওজর বা অসুবিধা ছাড়াই মুজদালিফাতে পৌঁছার আগে পথিমধ্যে সাধারণ অবস্থার মত মাগরিব ও এশার নামায আদায় করা একটি ভুল আমল। যা সুন্নাতে খেলাপ।

৪। মুজদালিফায় পৌছাতে সালাত কাজা করাঃ

বর্তমানে অনেকই হাঁটার পাশাপাশি গাড়ি করে আরাফা থেকে মুজদালিফায় যায়। কোন কোন গাড়ি মুজদালিফায় হাজিদের নামিয়ে দিয়ে আবার আরাফার ময়দানে হাজিদের নিতে আসে। এই সকল গাড়ি দুই তিন বার আরাফা ও মুজদালিফায় যাতায়াত করে। প্রচন্ড যানজটের কারনে বা বিদেশী অপরিচিত ড্রাইভারের ভুলের কারন আরাফা থেতে মুজদালিফায় যেতে অনেক সময় রাত ৩/৪ টা পর্যান্ত বেজে যায়। যার প্রমান আমি নিজে। আমাদের জামাতে প্রায় ৫০ জনের মত লোক ছিলাম। আমাদের মত পাকিস্থানি ও কয়েকটি জামাত ছিল। আমাদের মত তাদের সাথেও নারী ও শিশু ছিল। আমরা সবাই গাড়ির জন্য অপেক্ষা থাকলাম রাত ১১ টার পর গাড়ি পেলাম রাস্তায় প্রচন্ড যানজট। তাই মুজদালিফায় পৌছাতে আমাদের প্রায় রাত  ৩ টা থেকে ৪ টা বেজে যায়। অর্থৎ আমরা এশার নামাযের ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে মুযদালিফাতে পৌঁছেছিলাম। এখানে মনে রাখতে হবে যদি কোন কারনে এশার সালাতে সময় মুজদালিফায় পৌছাতে না পারি সে ক্ষেত্রে পথিমধ্যেই এশার ও মাগরিবের সালাত আদায় করতে হবে। মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব হলেও, এখানে এসে সালাত জমা করে আদায় করা একটি সুন্নাহ আমল। একটি সুন্নাহকে বাস্তবায়ন করেতে গিয়ে সালাত কাজা করা যাবে না। করন আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

 إِنَّ الصَّلاَةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

অর্থঃ নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। (সুরা নিসা ৪:১০৩)

এই কারনে সালাত কাজা করে মুজদালিফায় আদায় করা জায়েয নয়। বরং হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন সহহি হাদিসের দলিলের ভিত্তিতে, সালাতকে নির্দিষ্ট সময় থেকে বিলম্বে আদায় করা হারাম। সকল মুসলিমকে সালাতের সময়সীমা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।  

অতএব, হাজীসাহেব যদি এই আশংকা করেন যে, মুযদালিফাতে পৌঁছার আগেই এশার নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে সেক্ষেত্রে তাঁর উপর আবশ্যক হচ্ছে- নামায আদায় করে নেয়া। এমনকি মুযদালিফাতে না পৌঁছলেও; তিনি যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থাতেই নামায আদায় করে নিবেন। যদি তিনি পদব্রজী হন তাহলে দাঁড়িয়ে কিয়াম ও রুক-সিজদাসহ নামায আদায় করে নিবেন। আর যদি আরোহী হন এবং নামা সম্ভবপর না হয় তাহলে গাড়ীতে থেকে হলেও নামায আদায় করে নিবেন। এর দলিলঃ হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআলার বলেন,

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পন্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (সুরা তাগাবুন ৬৪:১৬ )

যদিও গাড়ী থেকে নামতে না পারার সম্ভাবনাটি একেবারেই দূরবর্তী। কারণ প্রত্যেক মানুষই রাস্তার ডানপার্শ্বে বা বামপার্শ্বে নেমে নামায পড়তে পারেন। কারো জন্য মাগরিব ও এশার নামায আদায়ে এত বিলম্ব করা জায়েয হবে না যাতে করে এশার ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।

৫। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় না করাঃ

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কোন সালাত তার নির্ধারিত ওয়াক্ত ছাড়া আদায় করতে দেখেনি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশার সালাত ব্যতিক্রম এবং পরবর্তী ভোরে ফজরের সালাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৬ ইফাঃ)

মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আগে আগে আদায় করা বাঞ্ছনীয়। এর অর্থ এই নয় যে, ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় করা। হাজীসাহেবের উপর আবশ্যক হলো, ফজরের ওয়াক্ত হওয়া নিশ্চিত হওয়ার পর বা প্রবল ধারণা হওয়ার পর ফজরের নামায আদায় করা। হাদিসের ভাষ্য মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে আগে আদায় করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায পড়া হবে।  তিনি সাধারনত ফজর ওয়াক্ত হওয়ার একটু পরে সালাত আদায় করেতেন কিন্তু মুজদালিফায় তার সালাত আদায়ের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন।  কিন্তু এ সম্পর্কে ভুল আমল হলোঃ কিছু কিছু হাজীসাহেব ফজরের নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই নামায পড়ে ফেলেন। নামায পড়েই তারা রওয়ানা হয়ে যান। ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায আদায় করলে নামায কবুল হবে না। বরং তা হারাম কাজ। কেননা সেটি আল্লাহ্‌র সীমারেখার লঙ্ঘন। যেহেতু নামাযের ওয়াক্ত নির্ধারিত। শরিয়ত ওয়াক্তের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করে দিয়েছে। অতএব, কারো জন্য ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায আদায় করা জায়েয নয়।

৬। সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করাঃ

আমর ইবন মায়মূন (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয়ের পূর্বে মুযদালিফা হতে প্রত্যাবর্তন করতো না, যতক্ষণ না সূর্য ‘সাবীর’ পর্বতের উপর দেখা যেত। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহার বিপরীত করেন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বেই মুযদালিফা হতে প্রতাবর্তন করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৩৬ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ সূর্য উঠার আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুযদালিফা হতে) যাত্রা করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৫)

অনেক হাজীসাহেব সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করে ইশরাকের সালাত আদায় করেন। ইশরাকের সালাত আদায়ের পর মিনার দিকে রওয়ানা হন। এই আমলটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের খেলাফ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফা থেকে আকাশ ভালভাবে ফর্সা হওয়ার পর সূর্যোদয়ের আগেই রওয়ানা হয়েছেন আর জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করত। অতএব, আমাদের আমলকে ত্রুটি মুক্ত করতে চাইলে অবশ্যই ফজরের সালত আদায় করে সূর্যোদয়ের আগেই রওয়ানা দিতে হবে।

একটি সংশয়ের নিরশনঃ  যারা শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর তারা কি ফজরের আগে রওয়ানা দিতে পারবে?

উত্তরঃ হ্যা, যারা শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর তারা ফজরের আগে রওয়ানা দিতে পারবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের মধ্যে যারা শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন তাদেরকে রাত থাকতেই মুযদালিফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছেন। দলিল নিম্মের হাদিসগুলঃ

ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের দুর্বল শ্রেণীকে (নারী ও শিশু) অন্ধকার থাকতে (মুযদালিফা) হতে পাঠিয়ে দিতেন এবং তাদেরকে এরূপ নির্দেশ দিতেন যে, তাঁরা যেন (মিনায় পৌঁছে) সূর্যোদয়ের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ না করে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৩৯ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পরিবারের মধ্যে দুর্বলদের (মুযদালিফা হতে মিনায়) আগেই পাঠিয়ে দেন। আর তিনি বলে দেনঃ তোমরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (জামরায়) কংকর নিক্ষেপ করবে না। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৩, ইবনে মাজাহ ৩০২৫)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও স্থুলদেহী। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মুযদালিফা থেকে রাত থাকতেই প্রস্থান করার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, হায়! যদি সওদা (রাঃ) এর মত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমিও অনুমতি প্রার্থনা করতাম! আয়িশা (রাঃ) ইমামের সাথে মুযদালিফা হতে রওনা হতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৯ ইফাঃ)

আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমিও যদি সওদা (রাঃ) এর অনুরূপ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করতাম! তিনি মিনায় পৌছে ফজরের সালাত আদায় করেন এবং লোকদের পৌঁছার পূর্বেই জামরায় পাথর নিক্ষেপ করেন। আয়িশা (রাঃ) কে বলা হল, সওদা (রাঃ) কি তাঁর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি ছিলেন স্থুলদেহী এবং ভারী, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৯০ ইফাঃ)

এখন প্রশ্ন হল, ফজরের ওয়াক্ত এর কত আগে রওয়ানা দেয়া যাবে?

প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে হাদিসটি মনযোগ দিয়ে পড়ি।

আসমা (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে আসমা (রাঃ) মুযদালিফা অবস্থানকালে জিজ্ঞাসা করলেন, চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, না। অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। পরে পূনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সাথে রওনা হও। আমরা রওনা হলাম এবং জামরা (পৌঁছে) তিনি কাঁকর নিক্ষেপ করলেন, এরপর নিজের তাঁবুতে সালাত আদায় করলেন। আমি তাকে বললাম, হে সম্মানিত মহিলা! আমরা খুব ভোরে রওনা হয়েছিলাম। তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই হে বৎস! নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের খুব ভোরে রওনা হওযার অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৯২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কাজেই শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর ব্যাক্তিগণ আরাফা থেকে মুজদালিফায় নাম মাত্র অবস্থান করে মধ্যরাতের আগেই মিনার দিকে রওয়ানা দেয়া যাবে না। আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থান হল জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ। ঐ রাতের চন্দ্র নিশ্চিতভাবে মধ্যরাতের পরেই অস্ত যাবে এবং তখন রাতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কেটে যায়। আসমা (রাঃ) সময় সুযোগ থাকা সত্বেও  চন্দ্র অস্ত যাওয়ার পরই মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কাজেই মাজুর হিসাবে মিনায় আগে চলে যাওয়ার সময়টা চন্দ্র অস্ত যাওয়ার সাথে নির্দিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়। কেননা এটা একজন সাহাবীর আমল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের যারা দুর্বল ছিলেন তাদেরকে রাতে মুযদালিফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু রাতের কখন তারা মুযদালিফা ত্যাগ করবে সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। এ সাহাবীর এ আমল সে অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। তাই দুর্বল ও অন্য যাদের জন্য মানুষের ভিড়ে গমন করা কষ্টকর তাদের মুযদালিফা ত্যাগ করার জন্য এ সময়টিকে তথা চন্দ্র অস্ত যাওয়াকে নির্দিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়।

 ৭। মুযদালিফার উপর দিয়ে যায় কিন্তু কিছু সময়ের জন্যও অবস্থান করে নাঃ

সুনানে আবু দাউদ এর একটি সহিহ দীর্ঘ হাদিসের শেষে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ স্থানে ভোর পর্যন্ত বিশ্রামকরেন। ফাজ্‌রের সময় হলে তিনি ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেন। তিনি এ সলাত আদায় করেছেন এক আযান ও এক ইক্বামাতে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯০৫)

অনেক হাজি সাহেব আছেন যারা আরাফা থেকে যাত্রা শুরু করে মুজদালিফার উপর দিয়ে মিনায় চলে যান। তিনি চলার মধ্যেই আছেন এবং অতিক্রম করে যাচ্ছেন; থামছেন না। তিনি বলেন: অতিক্রম করে যাওয়াই তো যথেষ্ট। এটি মহা ভুল। কারণ অতিক্রম করা যথেষ্ট নয়। বরং সুন্নাহ্‌ প্রমাণ করে যে, হাজীসাহেব মুযদালিফাতে ফজরের নামায পড়া পর্যন্ত অব্স্থান করবেন।

সারকথা হলোঃ আল মাশআরুল হারামের নিকটে অবস্থান করে ফজরের শেষ ওয়াক্তে যখন ফর্সা হবে অর্থা  সূর্যোদয়ের পূর্বে, দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই, মিনার উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করবেন।

৮। মিনা মনে করে মুজদালিফায় অবস্থান করাঃ

হাজ্জিদের সংখ্যা বাড়ার কারনে সকল হাজ্জিদের মিনায় জায়গা দেয়া সম্বন হচ্ছে না। তাই বর্তমানে মুযদালিফার কিছু অংশ মিনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ননব্যালটি অধিকাংশ বাংলাদেশী হাজীর মিনার তাঁবু মুযদালিফায় অবস্থিত। এ জায়গাটুকু মিনা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও যেহেতু মৌলিকভাবে তা মুযদালিফার অংশ তাই এ অংশে রাত্রিযাপন করলেও মুযদালিফায় রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। কাজেই যদি কোন উপায়ই মিনা থাকা সম্বব না হয়, সে ক্ষেত্র আলেমদের মত হল মিনা তাবুর সাথে মিজদালিফার তাবু মিলিয়ে স্থাপন করতে হবে। তাহলে ওজরের কারনে আদায় হয়ে যাবে। অনেক মুনাফাখোর এজেন্সিও মিনায় জায়গা ঠিক না করে অনেক সময় মিনার বাহিরে হোটেলে রাখে। যদি হোটেল মিনার সীমানার বাহির হয় তবে তাকে দম দিতে হবে কেননা আগেই উল্লেখ করেছি মিনায় অবস্থা করা একটি ওয়াজিব আমল।

৯। সকল কঙ্কর মুজদালিফায় কুড়ানো জরুরী মনে করাঃ

অনেক হাজী সাহেব মনে করেন, মুযদালিফা থেকে কঙ্কর কুড়ানো ফযীলতপূর্ণ কাজ। এটা একেবারে ভুল ধারণা। বরং যেখান থেকে সহজ হয় সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করা যাবে। তবে বর্তমানে মিনায় গিয়ে কঙ্কর খুঁজে পাওয়া রীতিমতো কষ্টের ব্যাপার। তাই মুযদালিফা থেকে তা কুড়িয়ে নিলে কোনো অসুবিধা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু প্রথম দিনের কঙ্করই মুযদালিফা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। তাই শুধু প্রথম দিনের সাতটি কঙ্কর কুড়িয়ে নিলেই হবে। পরবর্তীগুলো মিনা থেকে নিলে চলবে। আর যদি মনে করেন যে, একবারে সব দিনের পাথর নিয়ে নেবেন তবে তাও নিতে পারেন। সে হিসেবে যদি মিনায় ১৩ তারিখ থাকার ইচ্ছা থাকে তবে ৭০টি কঙ্কর নেবেন। নতুবা ৪৯টি পাথর নেবেন। তবে একেবারে সমান সমান না নিয়ে দু’একটি বেশি নেয়া ভাল। কারণ নিক্ষেপের সময় কোনটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তখন কম পড়ে যাবে। আর সেখানে কঙ্কর পাবেন না।  বুটাকৃতির কঙ্কর নেবেন, যা আঙুল দিয়ে নিক্ষেপ করা যায়। কঙ্কর পানি দিয়ে ধুতে হবে এমন কোনো বিধান নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্কর ধুয়েছেন বলে কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না।

মিনায় অবস্থানের সময় আমল

মিনায় অবস্থানের সময় আমল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মিনায় দ্বিতীয় দফা অবস্থান :

জিলহজ্জের দশ তারিখ মুজদালিফা থেকে দ্বিতীয় দফা মিনায় আসা হয়। এই স্থানে ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্জ অবস্থান করা ওয়াজিব। এই কয় দিন মিনায় অবস্থানের অন্যতম কারন জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ। কঙ্কর নিক্ষেপ হজ্জের একটি ওয়াজিব আমল। মক্কা বা মিনার বাহিরে রাত্রি যাপন করে এসে মিনায় কঙ্কর মারলেই হবে না। সহিহ হাদিসে মিনায় অবস্থান করার কথাই ষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ জিলহজ্জ মিনাতে রাত্রিযাপন করালেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। কোন কারনে ১২ জিলহজ্জ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখও অবস্থান করতে হবে। পরের দিন ১৩ই যিলহজ্জ দুপুরের পর ৩টি জামারাকে আরো ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে পরে মিনা ত্যাগ করতে হবে। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) এর মতে দুপুরের আগে কঙ্কর মারা জায়েয আছে। কিন্তু একই মাযহাবের তাঁরই দুজন সঙ্গী ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে দুপুরে সূর্য ঢলার আগে কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয হবে না। কাজেই দুপুরের আগে নিক্ষেপ না করাই উত্তম।

মিনায় থাকার হুকুমঃ

বিশুদ্ধ মতে, আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে হাজ্জি সাহেবদের জন্য মিনায় রাত্রিযাপন করা ওয়াজিব। তাই উক্ত দিনগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মিনায় অবস্থায় করতে হবে। হাজী সাহেবগণ যদি কোন রাতই মিনায় যাপন না করেন, তাহলে আলিমদের মতে, তার ওপর দম দেয়া ওয়াজিব হবে। আর যদি কিছু রাত মিনায় থাকেন এবং কিছু রাত অন্যত্র, তাহলে গুনাহগার হবেন। এক্ষেত্রে কিছু সদকা করতে হবে। পারতপক্ষে দিনের বেলায়ও মিনাতেই থাকুন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোও মিনায় কাটিয়েছেন।

দলিলঃ

১. আবদুর রাহমান ইবনু ইয়ামার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ সূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটে নাজদবাসী কিছু লোক আসলো। তিনি তখন আরাফাতে অবস্থান করছিলেন। তারা হজ্জ সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করে। এই মর্মে এক ঘোষণাকারীকে তিনি ঘোষণা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেনঃ হজ্জ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান। মুযদালিফার রাতে ফজর উদয় হওয়ার পূর্বেই কোন লোক এখানে পৌঁছতে পারলে সে হজ্জ পেল। তিনটি দিন হচ্ছে মিনায় অবস্থানের। দুই দিন অবস্থান করে কোন লোক তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করলে তাতে কোন সমস্যা নেই। আর তিন দিন পর্যন্ত অবস্থানকে কোন লোক বিলম্বিত করলে তাতেও কোন সমস্যা নেই। মুহাম্মাদ আল-বুখারী বলেন, ইয়াহইয়ার বর্ণনায় আরো আছেঃ এক লোককে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পিছনে আরোহণ করালেন। সে লোক তা ঘোষণা দিতে থাকল। (সুনানে তিরমিজ ৮৮৯, ইবনু মাজাহ (০১৫)।

২. ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর রা. আকাবার ওপারে (মিনার বাইরে) রাত্রিযাপন করা থেকে নিষেধ করতেন এবং তিনি মানুষদেরকে মিনায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দিতেন’। (ইবন আবী শায়বা ১৪৩৬৮)।

উজরের কারনে মিনার রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থানঃ

ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আব্বাস (রাঃ) পানি পান করানোর জন্য মিনার রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থানের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চাইলেন। তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৫)

হাজ্জীদেরকে পানি পান করানোর জন্য মক্কা অবস্থানঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল-‘আব্বাস (রাঃ) হাজ্জীদেরকে পানি পান করানোর জন্য মিনায় অবস্থানের রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থান করার অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাকে অনুমতি দেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৫৯)

মিনায় অবস্থান কালে প্রধান আমলঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ বা ঈদের দিনের কাজঃ

মুজদালিফায় থেকে ফজরের পর রওয়ানা দিয়ে মিনায় খুব সকালে পৌছান যায় এবং সূর্যোদয়ের পর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু হয়। কিন্তু মাজুল, দুর্বল, শিশু, নারী ও অক্ষম ব্যক্তিরা যারা মুজদালিফা থেকে মধ্য রাতেই চলে এসেছিল, তারা মধ্যরাত্রির পর থেকে কঙ্কর মারা শুরু করতে পারে। তবে ফজরের আউয়াল ওয়াক্ত থেকে সূর্য উঠার আগেও কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয আছে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে,  এই ঈদের দিনে কঙ্কর নিক্ষেপের উত্তম সময় হল সূর্যোদয় থেকে শুরু করে দুপুরে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত। সন্ধ্যা পর্যন্ত মারাও জায়েয আছে। কারণবশতঃ সন্ধ্যার পর থেকে ঐ দিবাগত রাতের ফজর উদয় হওয়ার আগেও যদি মারে তবু চলবে। তবে এ সময়ে মাকরূহ হবে। আর অন্যান্য দিনে দুপুর পর থেকে মারা সুন্নাহ। জিলহজ্জের দশ তারিখ বা ঈদের দিন সকালে মিনায় পৌছেই বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। মুস্তাহাব হলো এর আগে অন্য কোন কাজ না করা। হারাম শরীফ থেকে মিনায় আসলে ঐ পথে যেটা কাবার নিকটতম সেটাই বড় জামরা। এখন আর এই সব হিসাব করার দরকার নাই। তিনটি জামারা পর পর আছে। কাবা দিক থেকে প্রথম জামারাই হলো বড় জামারাহ।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন জামরাতুল আকাবায় কংকর মেরে মিনায় তাঁর অবস্থান স্থলে ফিরে এসে কুরবানীর পশু আনিয়ে তা যাবাহ করলেন। পরে নাপিত ডাকিয়ে প্রথমে তাঁর মাথার ডান দিকের চুল মুড়ালেন এবং তিনি উপস্থিত লোকদেরকে এক বা দুইগাছি করে চুল বিতরণ করলেন। তারপর মাথার বাম দিকের চুল মুড়ালেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এখানে আবু ত্বালহা আছে কি না? অবশিষ্ট চুলগুলো তিনি আবু ত্বালহা (রাঃ)-কে দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮১)

কঙ্কর নিক্ষেপর আগে জামারার অবস্থান দেখে নিন।

খ। ১১ জিলহজ্জ বা ঈদের পরের দিনের কাজঃ

১০ যিলহজ দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ যিলহজের রাত মিনাতেই যাপন করতে হবে। এটি যেহেতু আইয়ামুত-তাশরীকের রাত তাই সবার উচিত এ সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করা এবং পরদিন ১১ তারিখের আমলের জন্য প্রস্তুত থাকা।

প্রাথমিকভাবে হালাল হওয়ার জন্য সে সকল কাজ করা দরকার তা না করে থাকলে আজ প্রথমেই সেই কাজগুলো করতে হবে। যদি কোন কারনে ১০ তারিখের আমলের মধ্যে হাদী যবেহ, মাথা মু্ণ্ডন বা চুল ছোট করা অথবা তাওয়াফে ইফাযা বা যিয়ারত সম্পাদন বাকি থাকে, তবে তিনি আজ তা সম্পন্ন করতে পারেন। গত কাল শুধু বড় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করেছিল। আজ তিনটি জামরাতেই কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। প্রত্যেক জামরাতে সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। সবগুলোর সমষ্টি দাঁড়াবে একুশটি কঙ্কর। তবে আরো দু’চারটি বাড়তি কঙ্কর সাথে নেবেন। যাতে কোন কঙ্কর লক্ষভ্রষ্ট হয়ে নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পড়ে গেলে তা কাজে লাগানো যায়। আজ ছোট জামরা থেকে শুরু করতে হবে এবং বড় জামরা দিয়ে শেষ করতে  হবে।  কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হলো সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে। এদিন সূর্য হেলে যাওয়ার পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করা জায়েয নয়।

দলিলঃ

১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন সূর্য পূর্ণভাবে আলোকিত হওয়ার পর জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। আর পরের দিনগুলোতে (নিক্ষেপ করেছেন) সূর্য হেলে যাওয়া পর। সহিহ মুসলিম ১২৯৯)

২.  ওয়াবারা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

কঙ্কন নিক্ষেপের যে বিস্তারিত পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে তার অনুসরণেই এই দিনে কঙ্কন নিক্ষেপ করতে হবে। তবে এই দিনে যিনি ইমাম বা ইমামের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তিনি লোকজনের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করবেন। এ খুতবায় তিনি দীনের বিষয়সমূহ তুলে ধরবেন।

দলিলঃ

১. ইবনু আবূ নাজীহ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা থেকে বনী বাকরের দুই ব্যক্তি সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘আইয়্যামে তাশরীকে’ মধ্যের দিন (বারো তারিখ) খুৎবা দিতে দেখেছি। এই সময় আমরা তাঁর সওয়ারীর নিকটেই ছিলাম। মিনাতে এটাই ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেশকৃত খুৎবা। (আবু দাউদ ১৯৫২)

আজকের দিনটি আইয়ামে তাশরীকের অন্তর্ভুক্ত। আইয়ামে তাশরীক হলো আল্লাহর যিকর করার দিন। হাজীদের কর্তব্য স্থান, কাল ও অবস্থার মর্যাদা অনুধাবন করে তদনুযায়ী চলা ও আমল করা। সময়টাকে আল্লাহ তা‘আলার যিকর, তাকবীর বা অন্য কোন নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগানো এবং সব রকমের অন্যায়, অপরাধ, ঝগড়া, অনর্থক ও অহেতুক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা।

১২ জিলহজ্জ দিনের কাজঃ

১২ জিলহজ্জের আমল পুরোপুরি ১১ জিলহজ্জের আমলের মত। এই দিনে হাজ্জি সাহেবগণ সাধারণত ‘মুতা‘আজ্জেল’ তথা দ্রুতপ্রস্থানকারী এবং ‘মুতা’আখখের’ তথা ধীরপ্রস্থানকারী এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যান। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوۡمَيۡنِ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِۖ لِمَنِ ٱتَّقَىٰۗ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّكُمۡ إِلَيۡهِ تُحۡشَرُونَ ٢٠٣ ﴾

অর্থঃ অতঃপর যে তাড়াহুড়া করে দু’দিনে চলে আসবে। তার কোনো পাপ নেই। আর যে বিলম্ব করবে, তারও কোনো অপরাধ নেই। (এ বিধান) তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় তোমাদেরকে তাঁরই কাছে সমবেত করা হবে। (সুরা বাকারা ২:২০৩)

মুতা‘আজ্জেল বা দ্রুতপ্রস্থানকারী হাজীগন এই দিন মিনা থেকে সূর্যাস্তের পূর্বেই বের যেতে হবে। সূর্য অস্ত গেলে আর বের হওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এবং তিনি মিনায় রাত্রিযাপন করবেন এবং পরের দিন কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন।

কারণ ইবন উমর রা. বলেন, ‘আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝির দিকে (১২ তারিখ) যে ব্যক্তি মিনায় থাকতে সূর্য ডুবে যায়, সে যেন পরদিন কঙ্কর নিক্ষেপ না করে (মিনা থেকে) প্রস্থান না করে। (মুয়াত্তা মালিক ১/১০৪)

যদি দ্রুতপ্রস্থানকারী হাজীগণ বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং চেষ্টা করেছেন তারপরও কোন কারণে বের হতে পারেননি বা পথিমধ্যে সূর্য অস্ত গিয়েছে। তবে তারা অধিকাংশ আলিমের মতে মুতা‘আজ্জেল থাকবেন এবং বের হয়ে যেতে পারবেন। অনুরূপভাবে মুতা‘আজ্জেল হাজীগণ যদি মিনায় তাদের কোন সামগ্রী রেখে আসেন এবং সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা থেকে বের হয়ে যান, তাহলে তারাও ফিরে গিয়ে তা নিয়ে আসতে পারবেন। এ জন্য আর পরদিন থাকতে হবে না।

মুতা‘আজ্জেল বা দ্রুতপ্রস্থানকারী এবং মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজীদের মধ্যে মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজ্জি সাহেবগনই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ১৩ তারিখ মিনায় অবস্থান করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর হুবহু অনুসরণের মধ্যেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত। তবে যদি কেউ ১২ তারিখ বিকালে আসতে চায তবে কোন অসুবিধা নাই। যদি কেউ হজ্জের কাজ থেকে বিরক্ত হয়ে শেষ দিন কঙ্কর নিক্ষেপ ত্যাগ করে বা আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনায় মিনা ত্যাগ করে, তবে তার কাজটি তাকওয়ার পরিপন্থি হবে। এই জন্যই সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত ১৩ মিনায় অবস্থান করা। 

মিনায় অবস্থান কালে ফরজ ও ওয়াজিব আদায়ঃ

মিনায় রাত্রি জাপন ওয়াজিব। মিনার এই ওয়াজিব পালনের পাশিপাশি কিছু আমলও চালিতে যেতে হবে। মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার পর চারটি আবশ্যকীয় আমল করেত হবে। কাজ চারটি হলোঃ

১. কঙ্কর নিক্ষেপ করা

২. কুরবানী করা

৩. মাথা মুন্ডন করা বা চুল ছোট করা

৪. তাওয়াফে ইফাদা বা হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা

মন্তব্যঃ এই চারটি কাজের মধ্যে তাওয়াফে ইফাদা ব্যতিত প্রতিটি কাজই ওয়াজিব। তাই কোন কাজ হালকা করে নেয়া যাবে না। মিনায় অবস্থান কাজেই এই ফরজ ও ওয়াজিবগুলো গুরুত্ব দিয় আদায় করতে হয়। তাওয়াফে ইফাদা ব্যতিত বাকি তিনটি কাজই মিনায় করা যায়। তাওয়াফে ইফাদা আদায়ের জন্য মক্কায় গেলেও আবার মিনায় ফিরে এসে রাত্রিযাপন করতে হবে।

দিনের বেলায় মিনা ত্যাগ করাতে অসিবুধা নাইঃ

 মিনায় শুধু রাত্রি জাপন ওয়াজিব। তাই দিনের বেলায় হাজ্জিগন হজ্জের অন্যতম কাজ তাওয়াফে ইফাযা ও সা‘ঈ করার জন্য মক্কায় চলে যেতে পারেন। যারা মক্কা গমন করবে, তাঁদেরকে অবশ্যই তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে মিনায় ফিরে আসতে হবে। আবার অনেকে কুরবানী করার জন্যও মিনার বাহিরে যায়। তাদেরও দিন শেষে আবার মিনায় রাত্রি জাপনের জন্য ফিরে আসতে হবে। মনে রাখা দরকার যে, মিনায় রাত্রিযাপন গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এমনকি সঠিক মতে এটি ওয়াজিব।

দলিলঃ

১. হিশাম ইবনু উরওয়াহ (র) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেছেন মিনায় অবস্থানের রাত্রিসমূহে কেউ যেন মিনা ব্যতীত অন্যত্র রাত্রি যাপন না করে। (মুয়াত্তা মালিক ৯০৫, হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন)

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন মক্কায় এসে তাওয়াফে যিয়ারত সমাপ্ত করে পুনরায় মিনায় ফিরে এসে সেখানে যুহরের সলাত আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৯৮)

৩. ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মক্কায় এসে তাওয়াফে যিয়ারা সমাপ্ত করে পুনরায় মিানয়ই ফিরে এসে সেখানে যুহরের সালাত আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৯৮)

৪. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মাক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাযাহ্ (তাওয়াফে যিয়ারত) করলেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিনায় ফিরে যুহরের সালাত আদায় করলেন। (মিসকাত ২৬৫২)

৫. আয়িশাহ্ (রাঃ)] থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত আদায়ে পর দিনের শেষ বেলায় তাওয়াফে ইফাযাহ্ সম্পন্ন করেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার মিনায় ফিরে এলেন এবং সেখানেই আইয়্যামে তাশরীক্বের দিনগুলো অবস্থান করলেন। এ দিনগুলোতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সূর্যাস্তের পর জামারায় সাতটি করে পাথর মারতেন। প্রত্যেক পাথর মারার সাথে সাথে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। আর প্রথম ও দ্বিতীয় জামারার নিকট দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন ও আল্লাহর কাছে (অনুনয়-বিনয় করে) প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তৃতীয় জামারায় (পূর্বের ন্যায় পাথর মারার পর) অপেক্ষা করতেন না। (মিসকাত ২৬৭৬, আবূ দাঊদ ১৯৭৩)

মিনায় রাত্রিযাপনের সময় আমলঃ

বলাবাহুল্য, মিনায় রাত্রিযাপনের অর্থ মিনার এলাকাতে রাত কাটানো। রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু ঘুমিয়ে বা শুয়ে থাকতে হবে। সুতরাং যদি মিনায় বসে সালাত আদায় করে, দোয়া যিকর কিংবা কথাবার্তা বলে তাহলেও রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। মিনা রাত্রযাপন কালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছেন। হজ্জের বিধান বর্ণনা করছেন। এমনি কি তিনি সাহাবীদের জন্য ওয়াজ নসিয়ত করেছেন। তাই হাজ্জিদের মিনা অবস্থান কাজে ব্যক্তিগত আমলের পাশাপাশি আলেমদের বক্তব্য শুনার চেষ্টা করতে হবে। নিজ দেশের ও নিজের ভাষার বহু আলেম হজ্জে যায়। তাদের কাছে থেকে ইমল অর্জন করে আমলের চেষ্টা করি।

দলিলঃ

১. আবূ বাক্‌রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানী দিবসে মিনায় ভাষণ দানকালে বলেছেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সন্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদাসম্পন্ন । (উবনু মাজাহ ২৩৩, আহমাদ ১৯৮৭৩)

২. আবূ বাক্‌রাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি একদা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে বলেন, (মিনায়) তিনি তাঁর উটের উপর উপবেশন করলেন। জনৈক ব্যক্তি তাঁর উটের লাগাম ধরে রেখেছিলো। তিনি বললেনঃ ‘এটা কোন্‌ দিন?’ আমরা চুপ করে রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এ দিনটির আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ “এটা কি কুরবানীর দিন নয়?” আমরা বললাম, ‘জি হ্যাঁ।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘এটা কোন্‌ মাস?’ আমরা নীরব রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এর আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ ‘এটা কি যিলহাজ্জ মাস নয়?’ আমরা বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদাসম্পন্ন। এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা (আমার এ বাণী) যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এসব কথা পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্তে রাখতে পারবে। (সহিহ বুখারি ৬৭, ১০৫, ১৭৪১, ৩১৯৭, ৪৪০৬, ৪৬৬২, ৫৫৫০)

৩. আবদুর রহমান ইবনু মুয়ায আত-তাইমী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। এ সময় আমরা ছিলাম উৎকর্ণ, যাতে তার বক্তব্য (ভাল করে) শুনতে পাই। আমরা আমাদের নিজ নিজ অবস্থানেই ছিলাম। তিনি তাদের হাজ্জের যাবতীয় বিধি-বিধান শিখালেন, এমনকি কংকর মারা সম্পর্কেও। তিনি তাঁর উভয় শাহাদাত আঙ্গুল নিজের দু’ কানের মধ্যে রেখে বললেনঃ কংকরগুলো খুবই ক্ষুদ্র হওয়া চাই। তারপর মুহাজিরদেরকে নির্দেশ দিলে তারা মাসজিদের পেছনে গিয়ে অবস্থান করলেন। অত:পর অন্যান্য লোক তাদের অবস্থান গ্রহণ করে। (আব দাউদ ১৯৫৭)

মিনায় রাত্রযাপন কালে সালাতঃ

প্রথম দফায় ইহরাম বাঁধার পর হাজ্জিগণ মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে যাওয়াই হলো সুন্নাত তরিকা। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে এই পাঁচ প্রত্যেক ওয়াক্ত সালাতে তিন ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) সালাত নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া।

দ্বিতীয় দফায় ১০ জিলহজ্জ সকালের ফজর সালাত আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসা হয়। এ সময় একটাকা ৪/৫ দিন মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময়ও সালাতের কসর আদায় করেত হবে। তবে অনেকে পূর্ণ সালাতও আদায় করে থাকে। তাদেরও দলিল আছে। দুটি দলিল পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মিনার সকল সালাত কসরই হবে বলে মনে হবে। সে যা হোক আপনি অধিক যৌক্তিক ও হাদিস সম্মত কসরই আদায় করবেন তবে যদি কেউ কোন দলিলের আলোকে এখানে সালাত কসর না করে তবে তাকে ভতসনা করা যাবে না। তার সাথে বিবাদে জড়ান যাবে না। বিস্তরিত সফরের পরিচ্ছেদে দলিলসহ বর্ণানা করা হয়েছে।

মিনায় অবস্থানের সময় কাল বা আইয়ামে তাশরিক

মিনায় অবস্থানের সময় কাল বা আইয়ামে তাশরিক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১০ জিলহজ্জ মুজদালিফায় থেকে ফজরের পর রওয়ানা দিয়ে মিনায় খুব সকালে পৌছে, বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। দিনের বেলায় কুরবানী, তাওয়াফ ও মাথা মুন্ডনসহ হজ্জ সংশ্লিষ্ট কাজে করে রাতে মিনায় থাকতে হবে। যদি হজ্জ সংশ্লিষ্ট কাজ বাকি থাকে তবে ১১ জিলহজ্জ তারিখ সকালে করার চেষ্টা করতে হবে। এই দিন বিকালে তিনটি জামারার প্রতিটটিতে সাতটি করে মোট ২১ পাথার মারতে হবে এবং দিবাগত রাত মিনায় থাকতে হবে। মাজুর না হলে হজ্জের কোন আমল বাকি থাকার কথা না। তাই ১২ জিলহজ্জ তারিখ সকালে মিনায় বিশ্রাম করে বিকালে তিনটি জামারার প্রতিটটিতে সাতটি করে মোট ২১ পাথার মারতে হবে। যদি সম্বম হয় কঙ্কর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কোন কারনে যদি ১২ তারিখ সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারেন তবে এই রাতও মিনায় থাকতে হবে।  তখন যথারীতি ১৩ জিলহজ্জ কঙ্কর মেরে তারপর মিনা ত্যাগ করতে হবে।

মনে রাখত হবে, রাতের বেশির ভাগ কিংবা অর্ধরাত অবস্থানের মাধ্যমে রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। এ হুকুম তাদের জন্য যাদের পক্ষে মিনায় অবস্থান করা সহজ এবং যারা তাঁবু পেয়েছে। পক্ষান্তরে যারা মিনায় তাঁবু পাননি বরং তাদের তাঁবু মুযদালিফার সীমায় পড়ে গেছে, তাদের তাঁবু যদি মিনার তাঁবুর সাথে লাগানো থাকে, তবে তারা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করলেই মিনায় রাত্রিযাপন হয়ে যাবে।

এককথায় ১০ জিলহজ্জ থেকে ১২ জিলহজ্জ মিনায় থাকা ওয়াজিব। ১২ তারিখ সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারেলে ১৩ জিলহজ্জ মিনায় থাকতে হবে।

দলিলঃ

১. আবদুর রহমান ইবনু ইয়া‘মুর আদ্ দায়লী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি ‘আরাফাই হচ্ছে হজ্জ। যে ব্যক্তি ‘আরাফায় মুযদালিফার রাতে (৯ যিলহজ্জ শেষ রাতে) ভোর হবার আগে ‘আরাফাতে পৌঁছতে পেরেছে সে হজ্জ পেয়ে গেছে। মিনায় অবস্থানের সময় হলো তিনদিন। যে দুই দিনে তাড়াতাড়ি মিনা হতে ফিরে আসলো তার গুনাহ হলো না। আর যে (তিনদিন পূর্ণ করে) দেরী করবে তারও গুনাহ হলো না। (মিসকাত ২৭১৪, আহমাদ ১৮৭৭৪, দারিমী ১৯২৯, ইবনু হিব্বান ৩৮৯২।

আইয়ামে তাশরিকের ফজিলতঃ

এ দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ রাববুল আলামীনের যিকর ও তাঁর শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ۞وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ﴾

অর্থঃ আর আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে। (সুরা রাকারা ২:২০৩)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস রা. বলেন, ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে আইয়ামুত-তাশরীক বুঝানো হয়েছে। (সহিহ বুখারী ঈদ অধ্যায়ের ভুমিকা)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আইয়ামুত-তাশরীক হলো, খাওয়া-দাওয়া ও আল্লাহ রাববুল আলামীনের যিকরের দিন। (সহিহ মুসলিম ১১৪১)

ইমাম ইবন রজব রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আইয়ামুত-তাশরীক এমন কতগুলো দিন যাতে ঈমানদারদের দেহ-মনের নিয়ামত তথা স্বতঃস্ফূর্ততা একত্র করা হয়েছে। কারণ, খাওয়া-দাওয়া দেহের খোরাক আর আল্লাহর যিকর ও শুকরিয়া মনের খোরাক। আর এভাবেই এ দিনসমূহে নিয়ামতের পূর্ণতা লাভ করে।

. আইয়ামুত-তাশরীক তথা তাশরীকের দিনগুলো ঈদের দিন হিসেবে গণ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও মিনার দিনগুলো (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের তথা ইসলাম অনুসারিদের ঈদের দিন। (আবূ দাউদ : ২৪১৯)

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের আমল ও ফজিলতঃ

মহান আল্লাহ তায়াল আমাদের জন্য চারটি মাস পবিত্র এ সম্মানিত করেছেন। এই মাসগুলোর মধ্যে জিলহজ্জ মাস অন্যতম। এই মাসের প্রথম দশদিনের আবার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ্জ এই মাসের প্রথম দশকেই হয়ে থাকে। কুনআন সুন্নাহে তাই এই মাসের প্রথম দশদিনের বেশ গুরত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে।  এই দশকের সম্মান ও পরিত্রতা প্রকাশান্তে এই দশকের রাতের নামে মহান আল্লাহ শপথ করে ইরশাদ করেন, 

وَٱلۡفَجۡرِ (١) وَلَيَالٍ عَشۡرٍ۬ (٢) وَٱلشَّفۡعِ وَٱلۡوَتۡرِ (٣)

অর্থঃ শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির, শপথ তার, যা জোড় ও যা বিজোড়। (সুরা ফাজর ১-৩)

সুরা ফজরের আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ লিখেন, দশ রজনী দ্বারা জিলহজ্জ মাসের প্রথশ দশ রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। এই কথা ইবনে আব্বাস রাঃ, ইবনে জুবায়ের রাঃ ও মুজাহীদ রহঃ এবং আগে পরের বহু গুরুজন বলেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (সুরা হজ্জ আয়াত ২৮)

‌এই আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলতে কোনো দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ সহিহ বুখারির ৯৬৯ নম্বর হাদিসের শিরোনামে বলেন,

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) বলেন, وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ  مَعْدُودَاتٍ   (সূরা বাকরাহ ২:২০৩) দ্বারা (যিলহাজ্জ মাসের) দশ দিন বুঝায় এবং   مَعْدُودَاتٍ  দ্বারা ‘আইয়ামুত তাশরীক’ বুঝায়। ইবনু ‘উমার ও আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) এই দশ দিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবীরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবীর বলত। মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলী (রহ.) নফল সালাতের পরেও তাকবীর বলতেন।

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না। (সহিহ বুখারি ৯৬৯)

জিলহজ্জের প্রথম দশদিনের ফজিলতঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহর নিকট যে কোনো দিনের সৎ আমলে চেয়ে যিলহজ্জ (হজ্জ) মাসের দশ প্রথম দিনের আমলের অধিক প্রিয়। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? তিনি বললেনঃ না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে জিহাদে বের হয় এবং কোনো একটি নিয়েও ফিরে না আসে তার কথা স্বতন্ত্র। (আবূ দাউদ : ২৪৩৮)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কোন দিন নেই যে দিনসমূহের সৎকাজ আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যুলহিজ্জা মাসের এই দশ দিনের সৎকাজ অপেক্ষা বেশি প্রিয়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদ করাও কি (এত প্রিয়) নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার পথে জিহাদও তার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। তবে জান-মাল নিয়ে যদি কোন লোক আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদে বের হয় এবং এ দুটির কোনটিই নিয়ে যদি সে আর ফিরে না আসতে পারে তার কথা (অর্থাৎ সেই শহীদের মর্যাদা) আলাদা। (তিরমিজি ৭৫৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়। (মুসনাদ আহমদ ২/৭৫)

উপরের হাদিসের আলোকে জানা যায় যে, বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফযীলত প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এই দশকে নিম্মের আমলগুলো করা যেতে পারে

ক। হজ্জ ও উমরা পালন করাঃ

হজ্জ ও উমরা আদায়ের ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই দশকের বাহিরে হজ্জ করার কোন প্রশ্নই উঠেনা কেননা এই মাসের ০৮ তারিখ ইহরাম বেধে মিনায় যায়, ০৯ তারিখ আরাফাতের অবস্থানের মাধ্যমে হজ্জ শুরু করে। ১০ তারিখ হজ্জের বাকি কাজগুলো করে সময় কাটায়। ইসলামি শরীয়তে এর কোন বিকল্প নাই। তবে এই মাসের বাহিরে যে কোন সময উমরা করা যায়। রমজান মাসের উমরার ফজিলত বেশী বর্ণিত হয়েছে।

কুরবানি করাঃ

এই সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই মাসের কত তারিখে, কখন কিভাবে কুরবানি করতে হবে। কুরবানির হুকুম কি? এর ফজিলতও বর্নণা করা হয়েছে। কাজেই সামর্থবানদের উচিত এই মাসের কুরবানি করা।

কুরবানী আদায়কারী চুল ও নখ কাটবে নাঃ

যারা কুরাবানীর নিয়ত করবে তারা এই ১০ তিন চুল ও নখ কাটবে না। এই মর্মে বহু সহিহ হাদিস আছে। যেমনঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

ঘ এই দশকের পুরাটাই সিয়াম পারন করা বিশেষ করে আরাফার দিনের সিয়ামঃ

১. আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (সুনানে তিরমিজি ৭৪৯ ও ইবনু মাজাহ ১৭৩০)

২. আবূ ক্বাতাদাহহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আরাফার দিনের রোযা রাখলে আল্লাহ্‌র নিকট আশা রাখি যে তিনি বিগত এক বছরের ও আগামী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

আরাফার দিনের সিয়াম পালন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। বিশেষ করে মাঠে অবস্থানকারী হাজীদের জন্য ঐ দিন রোযা না রাখা মুস্তাহাব। নিম্মের হাদিসটি একটু লক্ষ করুন।

১. মায়মূনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওম পালন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৯৮৯)

২. উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আরাফার দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। (সহিহ বুখারী ১৬৫৮ তাওহিদ এবং ১৫৫৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আরাফার দিনে হাজিদের সিয়াম পালণ একটি ভুল আমল।

খাঁটি তওবা করাঃ

তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। মহান আল্লাহ আদেশ অমান্য করে যে সকল কাজ করা হয়েছে তা থেকে এই তওবা করা। অতীতে যে সকল আদেশ অমান্য করেছে তার জন্য অনুতপ্ত হবে, ভবিশ্যতে আর করবেনা এবং বান্দার হক থাকরে তা মিটিয়ে ফেলাম নামই তওবা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানি থেকে ফিরে আসা, আল্লাহর হুকুমের পাবন্দি করার উপর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা এবং অতীতের কৃত কর্মের উপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তা ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আল্লাহর নাফরমানি না করা ও তার হুকুমের অবাধ্য না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা। এ দিন গুলোতে তাওবা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ يَوۡمَ لَا يُخۡزِي ٱللَّهُ ٱلنَّبِيَّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَعَهُۥۖ نُورُهُمۡ يَسۡعَىٰ بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَبِأَيۡمَٰنِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَتۡمِمۡ لَنَا نُورَنَا وَٱغۡفِرۡ لَنَآۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ٨ ﴾

অর্থঃ হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর—বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মোমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সুরা তাহরিম ৮)

চ। ফরজ সালাতের পাশাপাশি নফল সালাত আদায় করাঃ

ফরয ও নফল সালাতগুলো গুরুত্বের সাথে আদায় করা। অর্থাৎ ফরয ও ওয়াজিবসমূহ সময়-মত সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল ইবাদতসমূহ তার সুন্নত, মোস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। ফরয সালাতগুলো সময় মত সম্পাদন করা, বেশি বেশি করে নফল সালাত আদায় করা। যেহেতু এগুলোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সর্বোত্তম মাধ্যম। 

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার উপর ফরয করেছি শুধুমাত্র তা দ্বারাই কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না বরং আমার বান্দা সর্বদা নফল ‘ইবাদাত দ্বারা আমার অধিক নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোন কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি-না, যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি।(সহিহ বুখারি ৬৫০২)

বেশী বেশী দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াত করাঃ

বান্দার আমলের সময়ই আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে প্রিয়। সকল প্রকারে আমলে আগে প্রস্ততি দরকার হয় কিন্তু দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াতের জন্য কোন প্রকার পূর্ব প্রস্ততি প্রয়োজন নাই। তাই এই বরকতময় দিনগুলোতে বেশী বেশী দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াত করা। এই দিনগুলিতে জিকিরের নির্দেশ আল্লাহই দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (সুরা হজ্জ আয়াত ২৮)

মন্তব্যঃ নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে বলা হয়েছে। এর অর্থ হলে এই জিলহজ্জের শেষ দশকে স্মরণ করা। আর স্মরনের সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম জিকির ও দোয়া।

১. আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লাইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে আদায় কর।’ (মুসনাদে আহমদ ৫৪৪৬, বায়হাকি ৩৭৫০, ত্ববারানী ১১১১৬)

উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করা

এ দিনগুলোতে আল্লাহ রাববুল আলামীনের মহত্ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। এ তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে মসজিদে, বাড়ি-ঘরে, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বত্র উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা বাঞ্ছনীয়। তবে মহিলাদের তাকবীর হবে নিম্ন স্বরে। তাকবীরের শব্দগুলো নিম্নরূপঃ

اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ وَلِله الحَمْدُ.

(আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ)

যিলহজ্জ মাসের সূচনা হতে আইয়ামে তাশরীক শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ তাকবীর পাঠ করা সকলের জন্য ব্যাপকভাবে মুস্তাহাব। তবে বিশেষভাবে আরাফা দিবসের ফজরের পর থেকে মিনার দিনগুলোর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ যেদিন মিনায় পাথর নিক্ষেপ শেষ করবে সেদিন আসর পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের পর উক্ত তাকবীর পাঠ করার জন্য বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবু হুরাইরা রা. যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও তাকবীর পাঠ করতেন, লোকজনও তাদের অনুসরণ করে তাকবীর পাঠ করতেন। অর্থাৎ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই দুই প্রিয় সাহাবি লোকজনকে তাকবীর পাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।