তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহ আলোচনা করা হলোঃ

তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহঃ

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মনে করা

২। ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

৩। প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়া

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করা

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়া

৭। সাত চক্করেই তাওয়াফে রমল করা

৮। অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা

৯। মহিলাদের রমল

১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করা

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করা

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করা

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়

১৪। তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করা

১৫। মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

১৬। বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

১৭। বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করা

১৮। নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করাঃ

পূর্বে উল্লেখিত বহু হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমানিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বা ইশারার সাহায্য চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করছেন। তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মুলত একটি সুন্নাহ আমল। এই আমলটিকে জ্ঞানের সল্পতার কারনে বা না জানার কারনে অনেক ওয়াজিব মনে করে থাকে। যারা ওয়াজিব মনে করে তারা মনে করে,হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা না করলে মনে হয় তাওয়াফে শুদ্ধ হবে না।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা একটি সুন্নাহ। তাই কোন ব্যক্তি যদি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন না করে বা ভিড়ের কারনে করতে না  পারে তবে তার তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না। তাই তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করা এতটি ভুল ধারনা মাত্র।

ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

ইযতিবা অর্থ চাদরের দু’প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর রেখে দিয়ে ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখা। ইযতিবা করতে হয় তাওয়াফ করার সময়। সুনানে তিরমিজিতে হাসান সদনে একটি হাদিসে এসেছেঃ

ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একটি চাদরের মধ্যভাগ ডান বগলের নীচে দিয়ে এবং তার দুই প্রান্ত বাম কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো (ইযতিবা) অবস্থায় (বাহু খোলা রেখে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্ তাওয়াফ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৫৯, আবু দাউদ ১৮৮৩ ইফাঃ)

কেউ কেউ ইহরাম বাধার নিয়ত করার পর থেকে ইযতিবা করে থাকেন। অনেক হজ্জযাত্রী ইহরামের শুরু থেকে হালাল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি করে থাকেন। আবার কেউ কেউ তাওয়াফ শেষে ইযতিবা অবস্থাতেই দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা। অনেক আবার সাফা মারওয়ায় সাঈ করার সময় করে থাকে। এভাবে ইযতিবা করা একটি ভুল পদ্ধতি। ইযতিবা শুধুমাত্র তাওয়াফে কুদুমের মধ্যে করতে হয়, যেমনটি হাদিসে এসেছে। সাঈয়ের মধ্যেও বা তাওয়াফের আগে করা যাবে না।

মন্তব্যঃ তামাত্তু ও কেরান হজ্জের ফরজ তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা নাই। ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীদের ফরজ হজ্জের সময় তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা করতে হয়। তাওয়াফের সময় পুরুষের জন্য রামল ইযতিবা করেত হলেও নারীদের রামল ইযতিবা করতে হয় না।

    প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়াঃ

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ (٢٩)

অর্থঃ তারপর নিজেদের ময়লা দূর করে, নিজেদের মানত পূর্ণ করে এবং প্রাচীন গৃহের তাওয়াফ করে(সুরা হজ্জ ২২:২৯)

কাবা ঘরের তাওয়াফ একটি ফরজ ইবাদাত। এই ইবাদতে আদায়ের যথাযত পদ্দতি কুরআন সুন্নাহ দ্বারা ষ্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজে আমল করে রেখে গেছেন। তাওয়াফের কোথায় কি দোয়া আমল করতে হবে তাও সহিহ হাদিসে বিবৃত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন বইতে দেখা যায় প্রতি তাওয়াফে আলাদা আলাদ দোয়ার কথা লেখা আছে।

অনেক খুব কষ্ট করে এই আবরী দোয়া মুখস্ত করে হজ্জে গমন করেন। দোয়া কষ্ট করে মুখস্ত করলেও তার অর্থ কিন্তু অজানা থেকে যায়। এই দোয়াগুলো অর্থের দিক থেকে ভাল। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও এই ধরনের আমল করেন নাই।

মূলত নতুনভাবে আবিষ্কৃত, বেদাত। তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। তবে তাওয়াফের এই পুরো সময়টুকু দোয়া কবুলের সময়। তাই যেকোনো ধরনের দোয়া এই সময় আপনি করতে পারেন। সবচেয়ে উত্তম দোয়া হচ্ছে, যেটি আপনার অন্তরের মধ্যে এসেছে, আপনি আপনার ভাষায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পেশ করলেন। এটা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম দোয়া।

দোয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে দুটি। প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে চাইতে হবে। অর্থাৎ চাওয়াটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে হতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, কী চাইছেন, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। আপনি দোয়া করলেন, কিন্তু আপনি সেটা বুঝলেন না। তাহলে তো আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে চাইতে পারেননি। এ জন্য আরবিতে কতগুলো দোয়া লিখে নিয়ে গেলেন, আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে বললেন। অথচ আপনি জানলেনই না আপনি কী বললেন। এটা আসলে ভুল কাজ। তবে রাসূল (সা.) যে দোয়াগুলো শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো যদি কেউ জানেন, সেটাও উত্তম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জিনিসটা বুঝতে হবে যে আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে কী চাইলেন।

তাই যাঁদের কাছে আরবি ভাষার জ্ঞান নেই অথবা যাঁরা মূলত আরবি বুঝতে পারেন না, উত্তম হচ্ছে, তাঁরা বাংলায় অথবা তাঁদের মাতৃভাষায় দোয়া করবেন। কারণ, তিনি সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। আপনি যখন জিনিসটা বুঝবেন, তখন আবেগ তৈরি হবে, সেখানে একটু আবেগ আসবে। এই জন্য সেই আবেগের সঙ্গে অত্যন্ত মিনতির সঙ্গে যদি আল্লাহতায়ালার কাছে সেটা তুলে ধরেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল্লাহর বান্দার সেই দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।  

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করাঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি। ইন্দুনেশীয়ার অনেক মুসলীম ভাই বোনেরা জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করেন। তাদের সকলের মাথায় এক রকমের রুমাল বা স্ক্রাপ পড়া। আমার ধারনা  তারা হয়ত একে অপর থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে এ কাজটি করে থাকেন। আসলে তাদের উদ্দেশ্য হল জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা। তাদের জামাতের কেউ দল ছুট হয়ে গেলে, মাথার রুমালের কালার দেখে তাড়াতাড়ি মাতাফে তাদের অবস্থান বুঝতে পাবরে এবং আবার জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে। দলের সাথে একত্র হওয়ার জন্য দল ছুট ব্যাক্তি মাতাফে এলোমোলো চলাচল করে ফলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।  অপর পক্ষে জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার ফলে মাতাফে ভিড় সৃষ্টি হয়। অন্যদের ওপর অস্বাভাবিক চলাচলে চাপ পড়ে। এতে অন্যদের ভীষণ কষ্ট হয়। অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা খারাপ। সার কথা হলোঃ  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম এমনটি করেননি। উলামায়ে কিরাম এটিকে বিদআত বলেছেন। বিশুদ্ধ হলো একাকী নিজে নিজে তালবিয়াহ পাঠ করা। ।

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করাঃ

জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার সময় দেখা যায় এরা জামাতবদ্ধ হয়ে মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করে থাকে। জামাতের মধ্যে একজন মুখস্থ বা দেখে দেখে উঁচু আওয়াজে দোয়া পড়ে আর তার সঙ্গে পুরো জামাত সমস্বরে দোয়া পড়তে থাকে। এই কাজটি পরিষ্কার বিদআত। এই ধরনের আমল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার সাহাবি রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। আমাদের পূর্বসুরি কোন মুজতাহীদ আলেম থেকেও প্রমানিত নয়। দোয়ার করার যে সহজ্জ সরল পদ্দতি আছে তার সাথে এর কোন মিল নাই। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করলে নিজে শুধু গদবাধা কথা মুখে উচ্চারণ করে। এতে নিজের চাহিদা মত দোয়া করা সম্ভব হয়ণা এবং উচ্চস্বরের জন্য অন্যদের একাগ্রতা বিঘ্নিত হয়। যার ফলে নিজের দোয়ার সাথে সাথে মাতাফে অবস্থানরত সকল হাজিদের দোয়া নষ্ট করছি। এই বিদআত ত্যাগ করা খুবই জররী। আশার কথা হল, আরবেদের মত আমাদের উপমহাদেশে হাজিগন এই বিদআত থেকে অনেকটিই মুক্ত।

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়াঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি অনকেভাই তাওয়াফ করার সময় এক থাকে বই রেখে দিয়ে বইয়ের দিক তাকিয়ে পড়ছেণ আর হাঁটছেন। দোয়ার দিকে, দোয়ার অর্থের দিকে, তাওয়াফের দিকে এমন কি পাশের লোকের দিকেও কোন খেয়ার নেই। এক দিকে শুধুই খেয়ার কিভাবে দোয়ার রিডিং পড়ে শেষ করবে। এতে কোন তাওয়াফের সময় তার কি ভাব হলে তা বলা কষ্টকর হলে ও এ কথা বলা যায় যে, তার মনযোগ পড়ার প্রতি থাকায় মাতাফে অন্যদের কষ্ট হয়। যদি সকলেই নিজে নিজে চলত এবং দেখে দেখে দোয়া না পড়ত, যা মুখস্থ আছে তা-ই পড়ত তাহলে মাতাফে হঠাৎ যে চাপ সৃষ্টি হয় তা হত না। সকলেই একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে নিমগ্ন থেকে দোয়া ও তাওয়াফ করতে পারত।

৭। পুরো তাওয়াফে রমল করাঃ

তাওয়াফের সময় মুজাহিদের মতো বীরদর্পে দুই কাঁধ দুলিয়ে দ্রুতপায়ে চলা। হজ্জের সফরে মক্কার মুশরিকরা সাহবিদের লক্ষ করে বলছিল, ইয়াসরিবের (মদিনার) আবহাওয়া মুসলমানদেরকে দুর্বল ও রুগ্ন করে ফেলেছে। মুশরিকদের এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দেন। যেমন হাদিসে এসেছেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে নিয়ে মক্কায় আগমন করলে মুশরিকরা মন্তব্য করল, এমন একদল লোক আসছে যাদেরকে ইয়াসরিব এর (মদিনার) জ্বর দুর্বল করে দিয়েছে (এ কথা শুনে) নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করতে এবং উভয় রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটুকু স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবাদের প্রতি দয়াবশত সব কয়টি চক্করে রমল করতে আদেশ করেন নি। (সহিহ বুখারী ১৫০৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ অতপর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং পরেও এ বিধান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। কিন্তু নফল তাওয়াফ অর্থাৎ হজ্জ ও ওমরার নিয়্যাতে নয়, বাইতুল্লায় নামাজের সময় বা আগে পরে তাওয়াফ করার সময় রমল বা ইযতিবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, অনেককে দেখা যায়, তাওয়াফের ৭ চক্করেই রমল করে থাকে। আবার কেউ কেউ নফল তাওয়াফেও রমল করে। মনে করে, রমল সকল তাওয়াফে এবং তাওয়াফের সব চক্করেই করতে হয়। অথচ এটি ভুল। রমল শুধু ওই তাওয়াফেই করতে হয়, যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে। আর এই তাওয়াফেরও সব চক্করে নয়, শুধু প্রথম তিন চক্করে।

অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করাঃ

রমল করা সুন্নত। মাতাফে কোনো কোনো সময় অস্বাভাবিক ভিড় হয়। বিশেষ করে হজের আগে দু-এক দিন এবং যিলহজের ১০-১১ তারিখে। তখন মাতাফে চলাই মুশকিল হয়। সামান্য নড়াচড়ার প্রভাব পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু আশ্চর্য হলো, ওই কঠিন ভিড়েও কাউকে কাউকে রমল করতে দেখা যায়। এতে নিজেরও প্রচুর কষ্ট হয়। বিশাল জনসমুদ্রকেও কষ্ট দেয়া হয়। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, রমলটা তাওয়াফের ফরজ অংশ। এজন্যই বুযুর্গগণ বলেন, ‘যথাযথ হজ্জ করতে হলে সামান্য ইলম যথেষ্ট নয়; বরং প্রচুর ইলম এবং তার সঙ্গে অনেক বেশি আকলের প্রয়োজন।’ রমল ছাড়াও তাওয়াফ আদায় হয়ে যায়। তাই প্রচন্ড ভিড়ে অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা যাবে না; বরং তখন স্বাভাবিকভাবে চলবে। চলতে চলতে কখনো সামান্য ফাঁকা পেলে এবং অন্যের কষ্ট না হলে স্বাভাবিক গতিতে রমলের চেষ্টা করবে। (সহিহ মুসলিম ৪১০)।

৯। মহিলাদের রমলঃ

রমল শুধু পুরুষের জন্য। এ বিধানটি মহিলাদের জন্য নয়। কিন্তু কখনো কখনো মহিলাদেরকেও তা করতে দেখা যায়। এটি ভুল। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদিস ১৩১১০)।

.১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করাঃ

উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কে বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখছি- যা আপনার সঙ্গী-সাথীদের কাউকে করতে দেখিনি। তিনি বললেন, হে ইবনু জুরায়জ! সেগুলো কি কি? তিনি বললেন, আমি দেখেছি আপনি রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত আর কোন রুকন স্পর্শ করেন না। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি পশমবিহীন চামড়ার স্যাণ্ডেল পরিধান করেন। আমি আরও দেখেছি যে, আপনি হলুদ বর্ণ ব্যবহার করেন। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি মক্কায় অবস্থানকালে (যিলহাজ্জ মাসের) আট তারিখে ইহরাম বাধেন। অথচ লোকেরা নতূন চাঁদ দেখার সাথে সাথে ইহরাম বাধে।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, রুকন সমূহের ব্যাপারে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ছাড়া অন্য কোন রুকন স্পর্শ করতে দিতে দেখিনি। আর পশমবিহীন স্যাণ্ডেলের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পশমবিহীন চামড়ার স্যান্ডেল পরিধান করতে দেখেছি। তিনি তা পায়ে দিয়ে উযুও করতেন। আমিও তাই এ ধরনের স্যাণ্ডেল পছন্দ করি। হলুদ রঙ এর সম্পর্কে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এই রং ব্যবহার করতে দেখেছি। অতএব আমিও এই রং পছন্দ করি। ইহরাম সম্পর্কে বলতে হয় যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তখনি তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছি যখন তাঁর উট যাত্রা শুরু করেছে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৯ ইফঃ)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনি তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইশারা করতেন এবং তাকবীর বলতেন। (সহহি বুখারী ১৫১৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আগেই জেনেছি, সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন বা স্পর্শ করা সুন্নত। পক্ষান্তরে সম্ভব না হলে কেবল ইশারা করাই সুন্নত। ঠিক তেমনিভাবে সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা সুন্নাহ। কিন্তু অনেকে এই সুন্নাহ বাদ দিয়ে হাজরে আসওয়াদ মতই রুকনে ইয়ামেনিকে চুম্বন করে থাকে। এটা ঠিক নয়, বরং সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা ও এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা। স্পর্শ করা সম্ভব না তাকে আর হাজরে আসওয়াদের মত হাতের ইশারায় চুম্বন করার কোন বিধান নেই। তাওয়াফের সময় কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সারকথাঃ সম্ভব হলে তাওয়াফ শুরুতে আসওয়াদ চুম্বন অথবা ইশারা করব। অপর পক্ষে প্রতি চক্করে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করব কিন্তু সম্বব না হলে,  চুম্বন বা ইশারা কোনটাই করব না। তাওয়াফের সময় অনেকেই মাকামে ইবরাহীমকে হাত অথবা রুমাল-টুপি দিয়ে স্পর্শ করে থাকে। আবার কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন দাড়িয়ে থাকে। এগুলি আবেগী মনের ভাবনা মাত্র। এই সব কোন সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। এক জনের দেখা দেখি অন্য জন করছে। জরুরী মনে কের এই কাজগুলি বিদআত হবে এতে কোন প্রকার সন্দেহ নাই। কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাহাবী (রাঃ) কেউ হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করাঃ

অনেক আবেগী হাজিকে দেখা যায় কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করছে। মহান আল্লাহ ভয়ে কান্নাকাটি করা নিঃসন্দেহ একটি উত্তম আমল। কিন্তু এই ভয়ের কান্না হবে গোপনে ও নিরবে। আর যে কোন কারনে এ কান্না প্রকাশ্যে হলেও দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের রাসুল ও তার সাহাবীগন এইভাবে কাবার দেয়ার ধরে কান্নাকাটি করেনি যেমন আমরা করছি। যদি কেউ ইহাকে ইবাদাত বা আল্লাহকে খুসি করার জন্য করে তবে বিদআত হবে। কাজেই এই ধরনের আবেগ থেকে দুরা থাকি। 

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করাঃ

তাওয়াফের সময় কেউ কেউ হাতীমের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। এরূপ করলে তাওয়াফ হবে না। কেননা হাতীম পবিত্র কাবার অংশ হিসেবে বিবেচিত। হাতিমের পুর্ব পাশ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে পশ্চিম পাশ দিয়ে বাহির হলে তো আর কাবা ঘর সম্পূর্ণ তাওয়াফ হবে না। এর হলে তার তাওয়াফ ছুটে যাবে। ফলে তাকে আবার তওয়াফ করতে হবে।

আবূস্‌ সাফর (রহঃ) বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনেছি, হে লোক সকল! আমি যা বলছি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর এবং তোমরা যা বলতে চাও আমাকে শোনাও এবং এমন যেন না হয় যে তোমরা এখান থেকে চলে গিয়ে বলবে ইবনু ‘আব্বাস এরূপ বলেছেন। (অতঃপর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন) যে ব্যাক্তি বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতে ইচ্ছা করে সে যেন হিজর এর বাহির থেকে তাওয়াফ করে এবং এ স্থানকে হাতীম বলবেনা কারণ, জাহেলীয়াতের যুগে কোন ব্যাক্তি ঐ জায়গাটিতে তার চাবুক, জুতা তীর ধনু ইত্যাদি নিক্ষেপ করে হলফ করত। (সহিহ বুখারী ৩৫৬৯ ইফাঃ)

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়ঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى

অর্থঃ যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সহহি বুখারি ১৫২৮ ইফাঃ )

এ থেকে অনেকের ধারণা মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে। এই নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া মাসজিদের অন্য কোথাও তাওয়াফের দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা যাবে না। এ ধারণাও সঠিক নয়। বরং মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায় করবে সম্ভব না হলে হারামের যে কোন স্থানে পড়ে নিবে। আর কারন বসত হারামের বাহিরেও আদায় করা যায়ঃ প্রমান নিম্মের হাদিসঃ

উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অসুস্থতার কথা জানালাম, অন্য সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু হারব (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে প্রস্থান করার ইচ্ছা করলে উম্মু সালামা (রাঃ)-ও মক্কা ত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, অথচ তিনি (অসুস্থতার কারনে) তখনও বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁকে বললেনঃ যখন ফজরের সালাতের ইকামত দেওয়া হবে আর লোকেরা সালাত আদায় করতে থাকবে, তখন তোমর উটে আরোহণ করে তুমি তাওয়াফ আদায় করে নিবে। তিনি তাই করলেন। এরপর (তাওয়াফের) সালাত আদায় করার পূর্বেই মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। (সহহি বুখারি ১৫২৭ ইফাঃ )

১৪ তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করাঃ

অনেকে ধারনা প্রতি চক্করে মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করতে হবে। সহিহ হাদিস সমুহে প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদকে ষ্পর্শ করার কথা প্রমানি হলেও কোন জাল বা যঈফ হাদিসেও তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করার কথা বলা হয় নাই। কাজেই যদি ইবাদত বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করে তবে তাজ কাজটি ইবাদাত না হয়ে বিদআত হবে। কোন কারন ছাড়া মাকামে ইবরাহীম নিকট গেলে বা ষ্পর্শ করলে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু আমলের নিয়তে বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে করা বা ভাবা যাবে না।

১৫ মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

তাওয়াফ শেষ করা পর দুই রাকাত সালাত আদায়কে অনেক ওয়াজিব বলেছেন। মুলত এই সালাত আদায় করা সু্ন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

* وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى *

অর্থঃ আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

এই আয়াতে আলোকে অনেকে ভাবেন তাওয়াফের এই দুই রাকাত সালাত মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। মাকামে ইবরাহীর পিছেন এই সালাত পড়লে কোন সমস্যা নাই। এই সালাত কাবা ঘরের যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। তবে যদি কেউ মনে করে যে, এই সালাত শুধু মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। অন্য স্থানে পড়া যাবে না বা অন্য স্থানে পড়লে আদায় হবে না। তাদের এই ধারনা ভুল। এই সালাত যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। হজ্জের মৌসুমে প্রচুর ভীড় থাকে এই সময় মাকামে ইবরাহীমের পিছেন তাওয়াফ করাই কষ্টকর, সালাত আদায়তো অনেক দুরের কথা। তবে হ্যা, দিন রাতের কোন এক সময় ভাগ্যক্রমে ফাঁকা পাওয়া যেতে পারে। ফাঁকা পেলে এখানে সালাত আদায়ে সমস্যা নাই। কিন্তু দেখা যায়, প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে একজন দাড়িয়ে সালাত আদায় করছে। আর হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাতের যেহেতু কোন অতিরিক্ত ফজিলত নাই তাই ভীড় হলে এখানে সালাত আদায় না করাই উত্তম। 

১৬বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্নভাবে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেনপ্রত্যাবর্তন না করে যাবত না তার সর্বশেষ কাজ হবে শেষবারের মত বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। (সহহি মুসলীম ৩০৮৯ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, লোকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (প্রত্যাবর্তনকালে) তাদের সর্বশেষ কাজ যেন হয় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। কিন্তু ঋতুমতী মহিলাদেরকে তা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। (সহহি মুসলীম ৩০৯০ ইফাঃ )

মন্তব্যঃ বিদায়ী তাওয়াফই হল হজ্জ ও উমরার শেষ ওয়াজিব আমল। তাই বিদয়ী তাওয়াফের পর কোন শরীয়ত সম্মত কারণ বা যাত্রার ব্যস্ততা ব্যতীত বিনা প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করা। অনেক কঙ্কর নিক্ষেপের কাজ শেষ করার পূর্বেই বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করে। যা একটি ভুল কাজ।

১৭বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করাঃ

অনেক অজ্ঞ লোক কাবাকে বেশী সম্মান দিতে গিয়ে, বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই ধরনের কাজ ইসলমি শরীয়তের বিদআত হিসাবে অবিহীত করে। কেননা, এই সকল আমলের কোন দলিল নেই। মতগড়া ও ভিত্তিহীন আবেগের স্থান ইসলামে নেই। আমাদের দেশে মুলত বিদআতি কিছু মাজার পালগ ভক্ত এমন কাজ করে থাকে সুফীদের মাজারকে কেন্দ্র করে। তারা মাজার থেকে বাহির হওয়ার সময়  উল্টোপায়ে হেটে মাজার চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই সকল বিদআতি মুসলিম সম্ববত এই বিদআতটি মাজার থেকে কাবায় নিয়ে গেছে। ইহার পাশাপাশি আবার অনেক কে দেখা যায়, বিদায়ী তাওয়াফের পর কাবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। তাদের এই আমলটিও একটি বিদাআতি আমল।

১৮নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরীঃ

কাবার একটি সাধারণ দৃশ্য হলো, নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করা। যুগ যুগ ধরে এমন আমল চলে আসছে। পুরুষের সঙ্গে নারীদের তাওয়াফ করা মুলত একটি বৈধ কাজ হিসাবে আলেমগন মত দিয়ছেন। কেননা, কাবার তাওয়াফকারীদের সংখ্যা এত বেশী যে, নারী পুরুষ আলাদা সময় বের করে তাওয়াফ করা সম্বব নয়। এই কারনে অনেক অজ্ঞ মুসলিম ধরনা করে থাকে, কাবায় নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী নয়। তাদের এই ধারনা ভিত্তিহীন। নারী পুরুষের পর্দা করা সব সময়ের জন্য ফরজ। তাওয়াফের সময় পর্দা সিথীল নয়। তবে পরিস্থিতীর কারনে নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করে। এই পরিস্থিতির কারনে একত্র তাওয়াফ করলেও তাকে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। এই জন্য নারীগন নিচের পরামর্শ গ্রহন করতে পারেন।

১. নারীকে হজ্জে গমনের সময় যেমন তার সফর সঙ্গী মাহরাম পুরুষ থাকতে হয়, তাওয়াফের সময়ও ঠিক তেমনি মাহরাম পুরুষ থাকতে হবে।

২. তাকে সব সময় ভীর এড়িয়ে কাবার একটু দুর দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। যাতে সরাসরি পুরুষের সাথে সংঘর্স না হয়।

৩. যখন ভীর কম থাকার সম্বাবনা তখন তাকে তাওয়াফের সময় বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে সকাল ১০ টা থেকে ১২ টার সময়। আরার রাত ১২ থেকে ফজরের আগ পর্যান্ত। এই সময় কাবার চত্বরে ভীর একটু কম থাকে।

৪. তাওয়াফের সময় পর পুরুষ পাশ কাটিয়ে চলতে হবে।

৫. মাহরম পুরুষ সাথীকে নারীর সামনে রেখে তাওয়াফ করা। প্রয়োজন বোধে নারী তার সাথীর কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করবে।

দলিলঃ  

আত্বা (রহঃ) বলেছেন, ইব্‌নু হিশাম (রহঃ) যখন মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে তাওয়াফ করতে নিষেধ করেন, তখন ‘আত্বা (রহঃ) তাঁকে বললেন, আপনি তাদের কী করে নিষেধ করেছেন, অথচ নবী সহধর্মিণীগন পুরুষদের সঙ্গে তাওয়াফ করেছেন? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, তা কি পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পরে, না পূর্বে? তিনি [আত্বা (রহঃ)] বললেন, হ্যাঁ আমার জীবনের কসম, আমি পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরের কথাই বলছি। আমি জানতে চাইলাম পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে কিভাবে তাওয়াফ করতেন? তিনি বললেন, পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে তাওয়াফ করতেন না। ‘আয়েশা (রাঃ) বরং পুরুষদের পাশ কাটিয়ে তাওয়াফ করতেন, তাদের মাঝে মিশে যেতেন না। এক মহিলা ‘আয়েশা (রাঃ) কে বললেন চলুন, হে উম্মুল ‘মু’মিনীন! আমরা তাওয়াফ করে আসি। তিনি বললেন, “তোমার মনে চাইলে তুমি যাও” আর তিনি যেতে অস্বীকার করলেন। তাঁরা রাতের বেলা পর্দা করে বের হয়ে (সম্পূর্ণ না মিশে) পুরুষদের পাশাপাশি থেকে তাওয়াফ করতেন। উম্মুল মু’মিনীনগন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে চাইলে সকল পুরুষ বের করে না দেয়া পর্যন্ত তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। ‘আত্বা (রহঃ) বলেনহ, ‘ঊবাইদ ইব্‌নু ‘উমাইর এবং আমি ‘আয়েশা (রাঃ) এর কাছে গেলাম, তিনি তখন “সবীর” পর্বতে অবস্থান করছিলেন।? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি বললাম, তখন তিনি কি দিয়ে পর্দা করছিলেন? আত্বা (রহঃ) বললেন, তখন তিনি পর্দা ঝুলানো তুর্কী তাঁবুতে ছিলেন, এছাড়া তাঁর ও আমাদের মাঝে অন্য কোন কিছু ছিলনা। (অকস্মাৎ দৃষ্টি পড়ায়) আমি তাঁর গায়ে গোলাপি রং-এর চাদর দেখতে পেলাম।  (সহিহ বুখারি ১৬১৮)

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের সাত চক্করের একটিতেও রমল করেননি। (সুনানে আবু দাউদ ২০০১)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযার (তাওয়াফে যিয়ারতের) সাত চক্কর রমল করেননি (জোর পায়ে চলেননি)। (মিসকাত ২৬৭৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *