কঙ্কর নিক্ষেপের শর্ত

কঙ্কর নিক্ষেপের শর্ত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কঙ্কর নিক্ষেপের শর্তসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো :

১। ঈদের দিন (১০ জিলহজ্জ) বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে

২। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে     

৩। কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা

৪। মাটি বা ইটের নিক্ষেপ করলে হবে না

৫। কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে

৬। প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবে

৭। ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না

৮। সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করা

৯। কঙ্কর নিক্ষেপের সিরিয়াল ঠিক রাখতে হবে

১০। সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা

১। ঈদের দিন (১০ জিলহজ্জ) বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি কোরবানির দিন সকাল বেলা জমরাতুল আকাবাতে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন; যেটি সর্বশেষ জমরাত ও মক্কার নিকটবর্তী। প্রত্যেকটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলেছেন। কঙ্করগুলো ছিল আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে নিক্ষেপ করার মত কঙ্কর অর্থাৎ ছোলার চেয়ে কিছুটা বড়।

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২. আবদুর রাহমান ইবনু ইয়াযীদ হতে বর্ণিত, তিনি ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর সঙ্গে হাজ্জ আদায় করলেন। তখন তিনি বাইতুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে বড় জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখেছেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকরা নাযিল হয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ     

জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে হবে। অন্যদিকে টার্গেট করে মারলে খুঁটিতে লাগলেও শুদ্ধ হবে না। প্রতিটি কঙ্করই জামারার হাউজের মধ্যে ফেলতে হবে সন্দেহ হলে, সেই কটা আবার মারতে হবে। কঙ্কর হাউজের বাইরে পড়লে ঐ কঙ্কর পুনরায় মারতে হবে। নিক্ষিপ্ত কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে না পড়লে সে নিক্ষেপ করা সহিহ হবে না। তবে, যদি প্রবল ধারণা হয় যে, কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে পড়েছে তাহলে সেটা যথেষ্ট। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া শর্ত নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর নয়। যদি কোন ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে প্রবল ধারণার ভিত্তিতে আমল করা হয়। কারণ শরিয়তপ্রণেতা নামাযে সন্দেহ হলে, কয় রাকাত পড়া হয়েছে, তিন রাকাত; নাকি চার রাকাত; সেক্ষেত্রে প্রবল ধারণার উপর আমল করার কথা বলেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সে ব্যক্তি যেন কোনটা সঠিক সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে; এরপর এর ভিত্তিতে বাকী নামায শেষ করে। (নানে আবু দাউদ (১০২০)

এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, ইবাদতের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রবল ধারণা যথেষ্ট। এটি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সহজ্জতা। কেননা কখনও কখনও ইয়াকীন বা নিশ্চিত জ্ঞান অসম্ভব হতে পারে। যদি কঙ্করগুলো হাউজের ভিতরে পড়ে এতেই ব্যক্তির দায়িত্ব মুক্ত হবে। চাই সেটা হাউজের ভেতরে থেকে যাক; কিংবা গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ে যাক। তবে যদি ধারনা হয় বাহিরে পড়ছে তবে পুনরায় মারতে হবে। যদি এক বা একাধিক কঙ্কর কম নিক্ষেপ করে থাকে তবে প্রতিটি কংকরের জন্য অর্ধেক সাআ (অর্থাৎ এক কেজি বিশ গ্রাম) পরিমাণ গম, খেজুর বা ভুট্টা দান করতে হবে। আর ঘাটতি কংকরের সংখ্যা ৩ এর অধিক হলে দম দিতে হবে। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ না করলে আপনার কঙ্কর নিক্ষেপের ওয়াজিব আদয় হবে না। কেননা এর ফলে প্রমানিত হবে আপনি জামায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেন নাই। আর যদি ৪  বা তার অধিক নিক্ষেপ নিশ্চিত হয়ে তবে দম দিতে হবে না।

কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাঃ

কঙ্করগুলো খুব জোরে নিক্ষেপ করার যাবে না আবার জামারার নিকটি গিয়ে ফেলে দিলে হবে না। এমন কি কঙ্করগুলো জামারার নিকটি গিয়ে ষ্পর্শ করালেও হবে না। সরাসরি মধ্যম গতিতে নিক্ষপর করতে হবে। এমন জোরেও নিক্ষেপ করা যাবে না যে, কঙ্করটি জামারায় আঘাত করে আবার ফিরে এসে কোন হাজিকে আহত করে। অনেকে জামাকে শয়তায় মনে করে এত জোরে জোরে কঙ্কর নিক্ষেপ করে যে দেখতে খুবই দৃষ্টিকটু এবং অন্য হাজ্জিদের জন্য কষ্টের কারন। তাই কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করি।

মাটি বা ইটের নিক্ষেপ করলে হবে নাঃ

কঙ্কর বলতে আমরা পাথরের ছোট ছোট টুকরা বুঝে থাকি। যাকে অনেকে নুড়ি পাথরও বলে থাকে। যার সাইজ হবে গুলালের গুলির কাছাকাছি বা চানা বুটের দানার চেয়ে একটু বড়। তাই মাটি বা ইটের টুকরা কে কঙ্কর হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। 

দলিলঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল ‘আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেনঃ এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেনঃ দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকেদেরকে দীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৯, নাসাঈ ৩০৫৯)

কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবেঃ

সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো, কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে। কোন প্রকার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, ছেলে-মেয়েদের খেলনা, গুলাল, তীর বা পা দিয়ে লাথি মেরে নিক্ষেপ করলে হবে না। হাতে নিক্ষেপ করতে হবে। সুতরাং তীরের সাহায্যে নিক্ষেপ করলে কিংবা পা দিয়ে ঠেলে দিলে জায়েয হবে না। কঙ্কর সত্যিকার অর্থে নিক্ষেপ করতে হবে। জামরার জায়গায় রেখে দেওয়া নয়। কেউ যদি কঙ্কর তুলে জামরার জায়গায় রেখে দেয়, তবে এটা জায়েয হবে না। কেননা, একে নিক্ষেপ করা বলা হয় না। তিন হাত কিংবা আরও বেশি দূর থেকে কঙ্কর নিজ হাতের দ্বারা ছুঁড়ে মারতে হবে। ওজর ব্যতিত অন্যের দ্বারা নিক্ষেপ করা যাবেনা। কঙ্কর নিজে নিক্ষেপ করতে হবে। সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বিনা ওজরে অন্যের দ্বারা কঙ্কর নিক্ষেপ করানো জায়েয নয়। ওজর থাকলে জায়েয। সুতরাং কোনো রোগীর পক্ষ থেকে তার আদেশে অন্য ব্যক্তি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে জায়েয হবে। যদি কঙ্কর নিক্ষেপের পর সময়ের মধ্যেই রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তবে তাকে পুনরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। যদি রোগী কঙ্কর নিক্ষেপ না করে এবং তার পক্ষ থেকেও কেউ কঙ্কর নিক্ষেপ না করে, তবে ফিদিয়া দেওয়া ওয়াজিব হবে।

প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবেঃ

সাতটি কঙ্কর হাতের মুঠোয় ভরে একেবারে নিক্ষেপ করা যাবে না। প্রতিবারে একটি একটি করে কঙ্কর হাতে নিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে। কঙ্কর সাতটি, সাত বারে মারা ওয়াজিব। যদি কেউ একবারই সাতটি মারে তবে একরারই নিক্ষেপ হবে। যদিও সাতটা একবারে মারা ঠিক নয়। তাই ওয়াজিব আদায়ের জন্য আপনাকে একটি একটি করে আলাদা আলাদাভাবে সাতবারে সাতটি নিক্ষপ করেত হবে। মুঠোয়ভরে হাত মুঠো নিক্ষেপ করলে সাতবার হবে কিন্তু সাতটি হবে না। আবার একটি মুঠোয় সাতটি নিক্ষেপ করলে সাতবার নিক্ষেপ হবে না, একবার নিক্ষেপ করে। তাই প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবে। এর কোন প্রকার ব্যতিক্রম হলে নিক্ষেপ সঠিক হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা হজ্জ ও উমরা আল্লাহ্‌র জন্য পরিপূর্ণ কর”, (২:১৯৬)। তাই সুন্নাহ সম্মত নিক্ষেপের কোন প্রকার ব্যতিক্রম গ্রহণীয় নয়।  

ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা যাবে নাঃ

বর্তমানে ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা কোনই সুযোগ নাই। কেননা বর্তমানে জামারাহগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে কঙ্কর নিক্ষেপের পর নিচে চলে যায়। কোথায় যায় কিভাবে যায় তা সাধারণ হাজ্জিদের জানার কথা নয়। কাজেই ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা কোন সুযোগ নাই। যদি ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে তবে তা জায়েয হতো না।

সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

কঙ্কর নিক্ষেপের সঠিক সময় আছে। সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ না করতে পারলে ওয়াজিব ছুটে পাবে এবং দম দিতে হবে। কাজেই এই সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবাশ্যিক। কুরবানির দিন বা ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করা নিক্ষেপ করা হলেও আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপ হয় থাকে। অর্থাৎ কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য চার দিনে দুটি পৃথম সময় হয়ে থাকে। যথঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করাঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করাঃ

সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। জিলহজ্জের ১০ তারিখ কুরবানির দিন। এই মুজদালিফা থেকে এসে সূর্যোদয়ের পর থেকে নিয়ে দুপুর বারটা পর্যান্ত মারা সুন্নাহ। তবে ওজরের কারনে সূর্যোদয়ের পুর্বে বা দুপুরের পরও নিক্ষেপ করা জায়েয।

দলিলঃ

খ। আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপঃ

দলিলঃ

ওয়াবারা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

গ। ওজরের কারনে ফরজের পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি মুযদালিফার রাতে মুযদালিফার কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে সালাতে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অত:পর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি অস্তমিত হয়েছে? আমি বললাম, না। তিনি আরো কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অত:পর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি ডুবেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, চল। আমরা রওয়ানা হলাম এবং চললাম। পরিশেষে তিনি জামরায় কঙ্কর মারলেন এবং ফিরে এসে নিজের অবস্থানের জায়গায় ফজরের সালাত আদায় করলেন। অত:পর আমি তাঁকে বললাম, হে মহিলা! আমার মনে হয়, আমরা বেশি অন্ধকার থাকতেই আদায় করে ফেলেছি। তিনি বললেন, বৎস! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদের জন্য এর অনুমতি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৯)

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, সাওদা (রাঃ) মুযদালিফার রাতে (মিনা যাওয়ার জন্য) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট অনুমতি চাইলেন, তিনি তাঁকে অনুমতি দেন। সাওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও ধীরগতিসম্পন্না নারী। (সহিহ বুখারি ১৬৮০)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, আমরা মুযদালিফায় অবতরণ করলাম। মানুষের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হওয়ার জন্য সাওদা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চাইলেন। আর তিনি ছিলেন ধীর গতি মহিলা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে অনুমতি দিলেন। তাই তিনি লোকের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হলেন। আর আমরা সকাল পর্যন্ত সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রওয়ানা হলেন, আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। সওদার মত আমিও যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চেয়ে নিতাম তাহলে তা আমার জন্য অধিক সন্তুষ্টির ব্যাপার হতো। (সহিহ বুখারি  ১৬৮১)

ঘ। আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপঃ

আইয়্যামে তাশরীকের দিনগুলোর হল, ১১, ১২ ও ১৩ ই যিলহজ্জ। এই তিন দিনে তিনটি জামারায়ই কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজি। প্রতিবারে সাতটি করে তিনটি জামারায় মোট (৭×৩)= ২১ টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। এটা বাদ গেলে দম দিতে হবে। এই সময় কঙ্কর নিক্ষেপর সময় হলো, দুপুরের পর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপে শুরু হয়ে সূর্য ডুবার পূর্ব পর্যন্ত নিক্ষেপ করা সুন্নাহ। তবে রাতেও মারা যাবে অর্থাৎ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত জায়েয আছে।

দলিলঃ

ওয়াবারা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইব্‌নু উমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

ঙ। আইয়্যামে তাশরীকের কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাতসমূহ হলোঃ

(১) দুপুর হলে পরে কঙ্কর নিক্ষেপ আগে, এরপর যুহরের সালাত আদায় এভাবে সিরিয়াল করা মুস্তাহাব। (বুখারী) প্রচন্ড ভীড় থাকে বিধায় এ সিরিয়াল ঠিক রাখার চেষ্টা না করাই ভাল।

(২) মিনার মসজিদে ‘খায়েফ’ থেকে কাবার দিকে অগ্রসর হলে প্রথমে ছোট এরপর মধ্যম এবং শেষে বড় জামরা দেখতে পাবেন। আগে ছোট ‘জামারায়’ কঙ্কর নিক্ষেপ করে এটাকে বামে রেখে এখান থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে কিবলামুখী হয় দাঁড়িয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়বেন এবং দু’হাত উঠিয়ে দোয়া করবেন।

(৩) এরপর যাবেন মধ্যম ‘জামারায়’। এখানেও পূর্বের মত ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন এবং পরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, পড়বেন এবং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঠিয়ে আরবীতে বাংলায় যত পারেন লম্বা মুনাজাত করবেন। একাকি মুনাজাত করাই সুন্নাত।

(৪) সবশেষে বড় জামরায় এসে ৭টি কঙ্কর মেরে আর থামবেন না সেখানে। জামারা ত্যাগ করবেন। একই নিয়মে শেষ ৩ দিন প্রতিদিন ৭+৭+৭= ২১টি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন।

কঙ্কর নিক্ষেপের সিরিয়াল ঠিক রাখতে হবেঃ

প্রথমে ছোট, এরপর মধ্যম এবং সর্বশেষে বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপে তারতীব অর্থাৎ সিরিয়াল ঠিক রাখার ওয়াজিব। কাজেই সিরিয়াল ঠিক রাখি।

দলিলঃ

আবু উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জামরাতুল উলাতে এক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহর রাসুল! কোন জিহাদ অধিক উত্তম? তিনি তাকে কিছু না বলে নীরব থাকলেন। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপকালে সে পুনরায় একই প্রশ্ন করলো। তিনি এবারও নিশ্চুপ থাকলেন। তিনি জামরাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার পর বাহনে আরোহণের জন্য পাদানিতে পা রেখে জিজ্ঞাসা করলেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? সে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! এই যে আমি। তিনি বলেনঃ যালেম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা (উত্তম জিহাদ)। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪০১২)

১০সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

১. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) এর সাথে হজ্জ করেন। রাবী বলেন, তিনি (আবদুল্লাহ) জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন- বায়তুল্লাহকে বামদিকে এবং মিনাকে ডানদিকে রেখে এবং তিনি বলেন, এই সে স্থান যেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সূরা আল বাকারাহ নাযিল করা হয়েছিল। (সহিহ মুসলীম ৩০০১ ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

২. আবদুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বাইতুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে বড় জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকারা নাযিল হয়েছে।(সহিহ বুখারি ১৭৪৭,১৭৪৮)

এই হাদিসের আলোকে যানা যায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেত হবে।

কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাহসমূহ

কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাহসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। মিনায় প্রবেশ করেই কঙ্কর নিক্ষেপর করা

২। কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করার পূর্বে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দেয়া

৩। প্রতিটি কঙ্কর এর সঙ্গে তাকবীর পাঠ

৪। কংকরের সাইজ ঠিক রাখা

৫। বায়তুল্লাহকে হাতের বামে এবং মিনাকে ডানে রেখে কঙ্কর নিক্ষেপ

৬। দুই কংকরের মধ্যে বেশী সময় না নেয়া

৭। কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাব

৮। কঙ্কর নিক্ষেপের পর সমতলে গিয়ে হাত তুলে দোয়া করা

৯। বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে

১০। কঙ্কর নিক্ষেপের পর স্থান ত্যাগ করা

১১। প্রয়োজনে বাহনে বসে কঙ্কন নিক্ষেপ

১২। ওজরের কারনে কঙ্কর পরে নিক্ষেপ

১৩। ওজরের কারনে সময়ের কঙ্কর আগে নিক্ষেপ

১। মিনায় প্রবেশ করেই কঙ্কর নিক্ষেপর করাঃ

মিনায় প্রবেশ করে কঙ্কর নিক্ষেপের আগে অন্য কিছু না করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২। কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করার পূর্বে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দেয়াঃ

ইহরাম বাধার পর থেকে তালবিয়া বলা শুরু হয়েছিল। জামারায় পৌছার পর কঙ্কর নিক্ষেপের আগেই তালবিয়া বলা বদ্ধ কর একটি সুন্নাহ সম্মত কাজ।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৩, ১৬৮৫, ১৬৮৫, ১৬৮৭)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

প্রতিটি কঙ্কর এর সঙ্গে তাকবীর পাঠঃ

প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলা। ডান হাতে নিক্ষেপ করা। পুরুষের হাত উঁচু করে নিক্ষেপ করা। মেয়েরা হাত উঁচু করবে না।

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রথম জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষন দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু’আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামারায় কঙ্কর মারতেন এবং দীর্ঘক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামারায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১, ১৭৫২, ১৭৫৩)

উম্মু জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি কোরবানির দিন জামরাতুল আকাবার নিকটে উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। তিনি প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সাথে সাথে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন, অতঃপর প্রত্যাবর্তন করেন। ইবনে মাজাহ ৩০৩১)

কংকরের সাইজ ঠিক রাখাঃ

কংকরের সাইজ হবে গুলালের গুলির কাছাকাছি বা চানা বুটের দানার চেয়ে একটু বড়।

সা’ঈদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্‌ফাল (রাঃ)-এর একজন নিজের লোক ছোট ছোট পাথর ছুঁড়লে তিনি তাকে তা করতে বারণ করেন এবং বললেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছোট ছোট পাথর নিক্ষেপ বারণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এটা না শিকার করতে পারে আর না শত্রুকে পরাভূত করতে পারে; বরং এটি দাঁত ভাঙ্গে আর চোখে আঘাত করে। সা’ঈদ (রহঃ) বলেন, লোকটি যখন পূণরায় এ কাজ করল তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে হাদীস শোনাচ্ছি যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে নিষেধ করেছেন, এরপরও তুমি কঙ্কর নিক্ষেপ করছো? তোমার সঙ্গে আমি কখনো কথা বলবো না। (সহিহ মুসলিম ৪৯৪৭)

উম্মু জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কোরবানির দিন জামরাতুল আকাবার নিকটে আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে খচ্চরের পিঠে আরোহিত অবস্থায় দেখেছি। তখন তিনি বলেছেনঃ হে লোকসকল! যখন তোমরা জামরায় (কংকর ) নিক্ষেপ করতে যাবে তখন সেখানে ক্ষুদ্র আকারের কংকর নিক্ষেপ করবে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৮)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরাতুল আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেনঃ এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেনঃ দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৯]

বায়তুল্লাহকে হাতের বামে এবং মিনাকে ডানে রেখে কঙ্কর নিক্ষেপঃ

কঙ্কর নিক্ষেপের সময় দাড়ানোর সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো, মক্কাকে বামপাশে এবং মিনাকে ডানে রেখে ‘জামারার’ দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। এরপর নিক্ষেপ করবে। প্রচন্ড ভীড় হলে যে কোন দিকে দাঁড়িয়েও মারতে পারেন।

আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জামারাতুল কুবরা বা বড় জামারার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৭)

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

আবদূর রাহমান ইব্‌নু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ)-এর সঙ্গে হজ্জ আদায় করলেন। তখন তিনি বায়তুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে জামারাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখেছেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকারা নাযিল হয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৭৪৯)

দুই কঙ্করের মধ্যে বেশী সময় না নেয়াঃ

একবার কঙ্কর মারা শুরু কলরে একাধারা মারতে থাকা। প্রতিটির মাঝে ৫/১০ সেকেন্ড দেরী হলে সমস্যা নাই। কিন্তু একটা কঙ্করের নিক্ষেপের পর সময় নিয়ে বা অন্য কোন কাজ করে আবার একটি নিক্ষেপ করা সুন্নাহতে খিলাফ। জারাতে কঙ্কর নিক্ষেপের সময় প্রচন্ড ভীড় থাকে। কাজেই পর পর সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করে অন্য মুসলিম ভাইদের নিক্ষেপ করার সুযোগ করে দেই। যদি একটি একটি করে ধীরে ধীর কঙ্কর নিক্ষপ করি। তবে সময়ের অপচয় তবে। অন্যদের কষ্ট দেয়া মুলত হারাম কাজ। কাজেই পর পর সাতটি নিক্ষেপ করে অন্যকে সুযোগ দিতে হবে। এমনকি কঙ্কর নিক্ষেপের পরও আর ওখানে থেকে সময় নষ্ট করা যাবে না। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে আসতে হবে।

সালিম ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) নিকটবর্তী জামরায় সাতটি কঙ্কর মারতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। এরপর সামনে এগিয়ে গিয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলা মুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় অনুরূপভাবে কঙ্কর মারতেন। এরপর বাঁ দিক হয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলা মুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন। অতঃপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন এবং এর কাছে তিনি দেরী করতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি অনুরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫২)

কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাবঃ

মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ একটি ইবাদাত। আর এই ইবাদের মাধ্যম হলে ছোট নুড়ি কঙ্কর। কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাব। অপবত্রি কঙ্কর দেখলে তার দিয়ে আমল না করাই ভাল। তবে ওজরের কারনে অপবিত্র হলেও তা দিয়ে নিক্ষেপ করা যাবে। তবে মাকরূহ হবে। এই কঙ্কর সাধারণত খোলা ময়দান থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাই অনেকের ধারনা কঙ্করগুলো অপবিত্র। তারা কঙ্কর সংগ্রহ  করার পর সেগুলোকে ধৌত করেন। তাদের ধারনা কঙ্করগুলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া উত্তম। কিন্তু মনে রাখতেহবে খোলা জায়গা থাকলেই কঙ্কর অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই মনে সন্দেহ নিয়ে কঙ্কর ধৌত করা বিদআত। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা করেননি। তিনি খোলা জায়গা থেকেই কঙ্কর সংগ্রহ করছেন। যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি ইবাদতের উদ্দেশ্যে সে কাজ করা বিদআত। আর ইবাদতের উদ্দেশ্যে না হলে এমন কাজ করা বোকামি ও সময় নষ্ট।

কঙ্কর নিক্ষেপের পর সমতলে গিয়ে হাত তুলে দোয়া করাঃ

সালিম ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) নিকটবর্তী জামারায় সাতটি কঙ্কর মারতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। এরপর সামনে এগিয়ে গিয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু’আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামারায় অনুরূপভাবে কঙ্কর মারতেন। এরপর বাঁ দিক হয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলামুখী হয়ে দীর্ধক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু’আ করতেন। অতঃপর বাতন ওয়াদী হতে জামারায়ে আকাবায় কঙ্কর মারতেন এবং এর কাছে তিনি দেরী করতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমি অনুরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫২)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১)

বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ

মহান আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণার (তাকবীর) সাথে বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। অনেক মূর্খরা যেমন হৈ হুল্লুড় ও গালী-গালাজ করে তাদের মত করবে না। কেননা জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অমর্ত্মভূক্ত। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

*ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ*

যে কেউ আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান করবে সে তো তার অন্তরস্থিত আল্লাহ-ভীতি থেকেই তা করবে। (সুরা হজ্জ ২২:৩২)

আর হাদীসে নাবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়ার সাঈ এবং জামরাগুলিতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা আল্লাহর যিকির (স্মরণ) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে বিধি-বদ্ধ করা হয়েছে। (সহিহ ইবনে খুযাইমাহ ২৮৮২)।

১০। কঙ্কর নিক্ষেপের পর স্থান ত্যাগ করা

ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পর সেখানে আর অবস্থান করেন নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে , নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও এরূপ করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩২)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাকঙ্মরাতুল আকাবায় ককর নিক্ষেপ করে চলে যেতেন, অবস্থান করতেন না। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৩)

১১। প্রয়োজনে বাহনে বসে কঙ্কন নিক্ষেপঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সওয়ারীতে আরোহিত অবস্থায় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৪)

কুদামাহ বিন আবদুল্লাহ আল-আমিরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কোরবানির দিন লাল-সাদা মিশ্র বর্ণের একটি উষ্ট্রীতে সওয়ার অবস্থায় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। এতে না ছিল আঘাত, না ছিল হাঁকানো, না এদিক, না ওদিক। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৫)

১২। ওজরের কারনে পরে কঙ্কর নিক্ষেপঃ

১. আবুল বাদ্দাহ ইবনে আসেম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট চালকদের একদিন কাঁকর নিক্ষেপ করার ও একদিন বিরতি দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৬)

২. আবুল বাদ্দাহ ইবনে আসেম (রহঃ) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট চারকদের মিনায় অথবা তার বাইরে রাত যাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন তারা কোরবানীর দিন কংকর নিক্ষেপ করে। এরপর কোরবানীর পরে দু’ দিনের কংকর একসাথে নিক্ষেপ করবে। তারা ঐ দু’ দিনের যে কোন একদিন তা নিক্ষেপ করবে। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, আমার মনে হয় আবদুল্লাহ ইবনে আবূ বাকর বলেছেন, প্রথম দিন (কোরবানীর দিন) কংকর নিক্ষেপ করবে, অতঃপর প্রস্থানের দিন কংকর নিক্ষেপ করবে। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৭)

১৩। ওজরের কারনে সময়ের আগে কঙ্কর  নিক্ষেপঃ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজরের কারনে সময়ের আগে কঙ্কর নিক্ষেপ করার অনুমিত প্রদান করেছেন। ওজরের বা মহিলাদের আগের কঙ্কর নিক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট সহিহ দ্বারা প্রমানিত।

দলিলঃ

আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি মুযদালিফার রাতে মুযদালিফার কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে সালাতে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি অস্তমিত হয়েছে? আমি বললাম, না। তিনি আরো কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি ডুবেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, চল। আমরা রওয়ানা হলাম এবং চললাম। পরিশেষে তিনি জামরায় কঙ্কর মারলেন এবং ফিরে এসে নিজের অবস্থানের জায়গায় ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, হে মহিলা! আমার মনে হয়, আমরা বেশি অন্ধকার থাকতেই আদায় করে ফেলেছি। তিনি বললেন, বৎস! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের জন্য এর অনুমতি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৯)

বদলীতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার শর্তঃ

কঙ্কর নিক্ষেপ একটি কষ্টকর ইবাদাত। তীব্র ভিড়ে এটি আদায় করা আরও কঠিন কাজ। কিন্তু কেউ অক্ষম হয় এবং তার পক্ষে নিজে নিজে কঙ্কর মারা কোনভাবেই সম্ভবপর নয়। তবে তার ক্ষেত্রে অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে এই আমল করা জায়েয, বিশেষ করে যারা দুর্বল ও বৃদ্ধ। এমনকি কোন নারী যদি মানুষের ভিড়ে কঙ্কর মারা নিজের জন্য বিপদজনক মনে করেন তাহলে তিনি পরে রাতের বেলায় কঙ্কর মারতে পারেন। স্বপক্ষে দলিল নিম্মের হাদিস।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও স্থুলদেহী। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মুযদালিফা থেকে রাত থাকতেই প্রস্থান করার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, হায়! যদি সওদা (রাঃ) এর মত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমিও অনুমতি প্রার্থনা করতাম! আয়িশা (রাঃ) ইমামের সাথে মুযদালিফা হতে রওনা হতেন। (সহিহ মুসলীম ২৯৮৯ ইফাঃ)

মোদ্দাকথা হচ্ছেঃ যে অক্ষমতার কারণে কেউ নিজে কঙ্কর মারতে পারে না সে অক্ষমতা ব্যতীত হাজীসাহেব কর্তৃক অন্যকে কঙ্কর মারার দায়িত্ব দেয়া বড় ধরণের ভুল। কেননা এটি ইবাদত পালনে অবহেলা এবং ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় কাজ পালনে অলসতা।

দুর্বল, রোগী, অতি বৃদ্ধ ও শিশুদের পক্ষ থেকে পক্ষে বদলী কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয। তবে নিম্মের শর্তগুলো খেয়াল রাখতে হবে।

(১) যিনি বদলী মারবেন তিনি একই বছরের হাজী হতে হবে।

(২) যার পরিবর্তে বদলী মারবেন তিনি অবশ্যই অক্ষম ব্যক্তি হতে হবে।

(৩) প্রথমে হাজী নিজের কঙ্কর মারবেন, এরপর অক্ষম ব্যক্তির কঙ্কর মারবেন।

কঙ্কর নিক্ষেপের ভুলত্রুটিসমূহ

কঙ্কর নিক্ষেপের ভুলত্রুটিসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুজদালিফায়ই কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবে

২। জমরাতগুলো শয়তান মনে করা।

। কঙ্কর নিক্ষেপের কয়েকটি ভুল পদ্ধতি।

৪। তাওয়াফে যিয়ারাতের পূর্বে ইহরাম ত্যাগ করা যায়।

১। মুজদালিফায়ই কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবেঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জমরাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপের দিন ভোরে তাঁর সওয়ারীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় আমাকে বললেন, আমার জন্য (কঙ্কর) কুড়িয়ে আন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাঁর জন্য কঙ্কর কুড়িয়ে আনলাম। সেগুলো আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে ছুড়ে মারা যায় এমন। তিনি সেগুলো নিজের হাতে রেখে বললেন: আপনারা এগুলোর মত কঙ্কর নিক্ষেপ করুন…। দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে সাবধান থাকুন। কেননা আপনাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৯),

অনেক ধারনা করে থাকে মুজদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করত হবে। তারা মনে করে মুজদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করা সুন্নাহ। আসলে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোন বর্ণনা আসেনি যে, তিনি মুযদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করেছেন বা তার উম্মতকে সংগ্রহ করতে বলেছেন। তাই এই কাজটি সুন্নাহ নয় ওয়াজিবতো অনেক দুরের কথা। সুন্নাহ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ বা অনুমোদন। এর কোনটি মুযদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। কাজেই আমরা কঙ্কর যে কোন স্থান থেকে সংগ্রহ করা যাবে, মুযদালিফা থেকে, মীনা থেকে, কিংবা অন্য যে কোন স্থান থেকে। উদ্দেশ্য হচ্ছে কঙ্কর হওয়া।

২। জমরাতগুলো শয়তান মনে করাঃ

আমাদের সমাজে ‘জামারাগুলোকে’ শয়তান অর্থে ব্যবহারের একটা প্রচলন আছে। অর্থাৎ বড় শয়তান, মধ্যম শয়তান ও ছোট শয়তান বলা হয়। এরূপ নামকরণ কোন অবস্থায়ই ঠিক নয়। এ ৩টি জামারা শয়তানের প্রতিকি চিহ্নও নয়। এগুলোকে কঙ্কর নিক্ষেপ করলে শয়তানকে কঙ্কর মারা হয়, এ কথাও ঠিক নয়। এটা একটা ভুল ধারণা ও বিভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস। এই আকিদা বা ধারণা করে যে, এ জমরাতগুলো শয়তান মনে করে তারা ভাবে যে, শয়তানকেই কঙ্কর নিক্ষেপ করছে। এ কারণে আপনি দেখবেন যে, কেউ কেউ তীব্র রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়াশীল আসে। যেন শয়তান তার সামনে। এরপর এই জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করে। যার ফলে নিম্নোক্ত অনিষ্টগুলো ঘটে থাকেঃ

১। এই জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করি আল্লাহ্‌র যিকিরকে বুলন্দ করার জন্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে এবং ইবাদত হিসেবে। কেননা কোন মানুষ যদি কোন নেকীর কাজের উপকারিতা না জানা সত্ত্বেও সেটা পালন করে. সে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র ইবাদত হিসেবেই সেটা করে। এটি আল্লাহ্‌র প্রতি তার পরিপূর্ণ নতিস্বীকার ও পূর্ণ আনুগত্যের প্রমাণ।

২। কেউ কেউ তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্রোধ, রাগ, শক্তি ও আবেগ তাড়িত হয়ে কঙ্কর মারতে আসে। এরফলে সে ব্যক্তি অন্য মানুষকে কঠিন কষ্ট দেয়। সে কোন মানুষ আর মানুষ করে না, দুর্বলদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।

৩। এই কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র জন্য একটি ইবাদত পালন করছে। এ কারণে সে ব্যক্তি শরিয়ত অনুমোদিত যিকির-আযকার বাদ দিয়ে শরিয়তে অনুমোদন নেই এমন কথাবার্তা বলে। আপনি দেখবেন যে, কঙ্কর মারার সময় সে ব্যক্তি বলছে: ‘হে আল্লাহ্‌! শয়তানকে অসন্তুষ্টকরণ ও রহমানকে সন্তুষ্ট করণস্বরূপ’। অথচ কঙ্কর মারার সময় এমন কথা বলা শরিয়তসম্মত নয়। বরং শরিয়তের বিধান হচ্ছে- তাকবীর বলা, যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন।

নিম্মের হাদিস দুটি লক্ষ করিঃ

১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর ঘরে তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ এবং জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ আল্লাহ তা‘আলার যিকর প্রতিষ্ঠা করার জন্যই করা হয়েছে। (তিরমিযী)

একটা ভুল অনুভূতি নিয়ে জামারাগুলোকে কঙ্কর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে মানুষের ভাবাবেগের পরিবর্তন হয়ে যায়, বাড়াবাড়ি করে ফেলে। ফলে নানা অঘটনও ঘটে যায়। আসুন আমরা ভুল আকীদা পরিহার করি।

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১ তাওহীদ প্রকাশনী)

মন্তব্যঃ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন (জিকির করতেন) এবং এর পর কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। কিন্তু অনেকে ধারণা করে, এই জামারাতগুলো শয়তান এবং তারা শয়তানকেই কঙ্কর নিক্ষেপ করছে। যার ফলে কেউ কেউ তীব্র রাগ, ক্ষোভ কারনে কঙ্করের পাশাপাশি ছাতা, জুতা, বড় কঙ্কর ইত্যাদি নিক্ষেপ করে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। যেন শয়তান তার সামনে।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা হলো, জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে  আল্লাহ্‌র যিকিরকে বুলন্দ করব। আর আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করছি ক্ষোপ প্রকাশের জন্য। যদি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে কঙ্কর নিক্ষপ করি তবে তা ইবাদত হবে। আর যদি শয়তায় মনে করে তীব্র প্রতিক্রিয়া বা ক্রোধের সাথে কঙ্কর নিক্ষপ করি তাহলে ইবাদাত হবে? যখন কেউ কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় তখনজামারার সামনে অবস্থানরত হাজিদের শুধু  কষ্টই হয়। জামারাকে শয়তার মনে করা একটি ভ্রান্ত আকিদার। যার ফলে সে একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত কে বড় বড় কঙ্কর, ছাতা, কাষ্ঠখণ্ড, জুতা ইত্যাদি নিক্ষেপ করে শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার দাবি করে থাকে। জামারাগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বাস রাখব যে, আমরা আল্লাহ্‌র মহত্ব প্রকাশ ও আল্লাহ্‌র ইবাদত পালন করছি। যেহেতু আমলটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণ হিসেবে করছি তাই মহান আল্লাহ পুরস্কারের আশা করছি।

৩। কঙ্কর নিক্ষেপের কয়েকটি ভুল পদ্ধতিঃ

১। অনেকে জামারার সামনে এতো জোরে কঙ্কর নিক্ষেপ করে যে, কঙ্কর জামারায় লেগে আবার স্বজোরে ফিরে আসে। যার ফলে অন্য হাজিদের গায় লাগে এবং তারা কষ্ট পায়। কাজেই জামারা লক্ষ করে আস্তে নিক্ষেপ করেত হবে। 

২। নিক্ষিপ্ত কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে ফেলার চেষ্টা করেত হবে, তা না হলে নিক্ষেপ করা সহিহ হবে না। কিন্তু অনেক হাজি আছে তারা কঙ্কর নিক্ষেপ করার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দেন না। নির্ধারিত স্থানে পড়ল, নাকি পড়ল না, তারা তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেন না। যাহোক চেষ্টা থাকবে কঙ্করগুলো যেন জামারার হাউজের ভিতরে পড়ে এতেই ব্যক্তির দায়িত্ব মুক্ত হবে। আবার অনেকে মনে করে যে, কঙ্কর নিক্ষেপ সহিহ হওয়ার জন্য কঙ্করটি পিলারের গায়ে লাগাতে হবে। এটা ভুল ধারনা, কেননা এই পিলার নির্মাণ করা হয়েছে নিক্ষেপের জায়গাটি নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত করার আলামত হিসেবে। কঙ্করটি যদি নিক্ষেপের জায়গায় গিয়ে পড়ে তাহলে সেটাই যথেষ্ট।

৩।  প্রতি জামারায় সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেত হবে। একটি একটি করে আলাদা আলাদা করে নিক্ষেপ করতে হবে। এক সাথে সাতটি কঙ্কর একবার মুষ্টিবদ্ধ করে নিক্ষেপ করা একটি ভুল আমল।

৪। শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বে অন্যকে দিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা যাবে না। কারণ কঙ্কর নিক্ষেপ হজ্জের অন্যতম একটি আমল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “তোমরা হজ্জ ও উমরা আল্লাহ্‌র জন্য পরিপূর্ণ কর”। (সুরা বাকারা ২:১৯৬) এ আয়াতটির বিধান যাবতীয় কর্মসহ হজ্জ সম্পন্ন করাকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই মানুষের উপর ওয়াজিব হচ্ছে হজ্জের কার্যাবলী নিজেই পালন করা এবং অন্য কাউকে দায়িত্ব না দেয়া।

৫।  ১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ দুপুরের আগেই কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকে। এ কাজটা ভুল। সময় শুরু হয় দুপুরের পর থেকে।

৬।  কেউ কেউ কঙ্কর ধৌত করে থাকে। এ কাজ ঠিক না।

৭। ধাক্কাধাক্কি করে অন্য হাজীদেরকে কষ্ট দিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকে। এরূপ করা অন্যায়।

৪। তাওয়াফে যিয়ারাতের পূর্বে ইহরাম ত্যাগ করা যায়ঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আমার এ দু’হাত দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে খুশবু লাগিয়েছি, যখন তিনি ইহ্‌রাম বাঁধার ইচ্ছা করেছেন এবং তাওয়াফে যিয়ারাহ্‌র পূর্বে যখন তিনি ইহ্‌রাম খুলে হালাল হয়েছেন। এ কথা বলে তিনি তাঁর উভয় হাত প্রসারিত করলেন। (সহিহ বুখারি ১৭৬৪)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে তাঁর ইহ্‌রামের সময় এবং তাঁর ইহ্‌রাম খোলার জন্যও, জামরাতুল আকাবায় (বড় শয়তানকে) কঙ্কর নিক্ষেপের পর এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফের পুর্বে সুগন্ধি লাগিয়েছি। (সুনানে নাসাঈ ২৬৮৭)

কুরবানির হুকুম

কুরবানির হুকুম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরবানি করা মুলত একটি ওয়াজিব ইবাদত। ইসলামি শরীয়তের অধিকাংশ মুজতাহীদ আলেম সামর্থবান মুসলিমের উপর বছরে একবার পশু কুরবানি করাকে ওয়াজিব আমল বলছেন। আমাদের চার ইমামের প্রসিদ্ধ তিন ওয়জিব বলেছেন। তারা হলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম মালেক (রহঃ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)। তবে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর প্রসিদ্ধ মত হলো, কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ইহা ছাড়া ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস ও ইমাম তাইমিয়া ওয়াজিব বলেছেন। বর্তমানের যুগের অন্যতম সৌদী ফিকাহবীদ আলেম শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) উভয় পক্ষের দলিলঃ-প্রমাণ উল্লেখ করার পর বলেন, এ সকল দলিলঃ-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয় বরং একটা অন্যটার সম্পূরক। তার মতে,  যারা কুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী।

যারা কুরবানি ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল হলোঃ

আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন,

* فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ*

অর্থঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং (পশু) কুরবানি কর। (সূরা কাউছার ১০৮:২)

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যে কোন নির্দেশ পালন করা ওয়াজিব। তিনি যেহেতু বলেছেন কুরবনি করে তাই করা ওয়াজিব। আমাদের প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিয়মিত কুরবানি করেছেন যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। তিনি কুরবানি করার পাশাপাশি আমাদের ও করতে  আদেশ করেছেন। তার দলিল পাওয়া যায় নিচের সহিহ হাদিসে।

মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আরাফাতের ময়দানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অবস্থানরত ছিলাম। তখন তিনি বলেনঃ হে জনগণ! প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একটি কোরবানী ও একটি আতীরা রয়েছে। তোমরা কি জানো আতীরা কী? তা হলো, যাকে তোমরা রাজাবিয়া বলো। (ইবনে মাজাহ ৩১২৫, তিরমিজি ১৫১৮, আবু দাউদ ২৭৮৮)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)

মন্তব্যঃ এই দুটি হাদিসের আলোচকে বুঝায় যায কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি উপরের হাদিস একটি সতর্ক বাণী। তাই কুরবানি ওয়াজিব।

অপর পক্ষে যারা কুরবানীকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলেছেন তাদের দলিলঃ

উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করতে চায়, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামএর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

মন্তব্যঃ এই হাদিস দুটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  ‘যে কুরবানি করার নিয়ত করে বা কুরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়। অপর পক্ষে, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কুরবানি ওয়াজিব নয়।

হজ্জের সাথে কুরবানীর হুকুমঃ

বইয়ের শুরুতে দেখতে পেয়েছি হজ্জ তিন প্রকার। তামাত্তু হজ্জ, কেরান হজ্জ এবং ইফরাদ হজ্জ।  এই তিন প্রকারের মধ্যে তামাত্তু হজ্জ এবং কেরান হজ্জে গমনকারীদের উপর কুরবানী ওয়াজিব। যারা হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধে মক্কায় প্রবেশ করে কিন্তু তাদের সাথে হাদী থাকে না। তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে এদের হজ্জকে তামাত্তু হজ্জ বলা হয়। অর্থাৎ একই সফরে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। অপর পক্ষে যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন এবং একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন, তাদের হজ্জকে কেরান হজ্জ বলা হয়। অর্থাৎ একই সফরে এক ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করা কে কেরান হজ্জ বলে। কেরান হজ্জযাত্রীতো হাদি নিয়েই আসে এবং এই হাদী কুরআনী দেয়া তাদের উপর ওয়াজিব। তামাত্তু ও কেরান হাজ্জিদের ইহরাম ত্যাগ করা আগে কুরবাণী দেয়া ওয়াজিব।

দলিল নিম্মের হাদিসঃ

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হলাম এবং একে হাজ্জের সফর বলেই আমরা জানতাম। আমরা যখন (মক্কা্য়) পৌঁছে বাইতুল্লাহ-এর তাওয়াফ করলাম তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেনঃ যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসেনি তারা যেন ইহরাম ছেড়ে দেয়। তাই যিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেননি তিনি ইহরাম ছেড়ে দেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ তাঁরা ইহরাম ছেড়ে দিলেন। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, আমি ঋতুমতী হয়েছিলাম বিধায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। (সহিহ বুখারি ১৫৬১ নম্বর হাদিসের প্রথম আংশ)

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫)

হাদী কুরবানী করতে সমর্থ না হলে করনীয়ঃ

হজ্জের সময়ের মিকাত হলো, পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। এই সময়ের আগে বা পরে আসলে হজ্জের ইহরান বেধে মক্কা প্রবেশ করা যাবে না। শুধু উমরার ইহরাম বাধা যাবে। আর এই সময় মাঝে আসলে হজ্জ ও উমরা উভয়ের নিয়তে মক্কা প্রবেশ করা যাবে। কেননা, মহান আল্লাহই হজ্জের তারিখ নির্দষ্ট করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُوْلِي الأَلْبَابِ

অর্থঃ হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়।

আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলেনঃ যদি কেউ হজ্জের মাসে অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকা’দা, যিলহজ্জ মাসে হজ্জের পূর্বে উমরা আদায় করিয়া মক্কায় এতদিন অবস্থান করে, যতদিনে সে হজ্জই আদায় করিতে পারে, তাহার এই হজ্জ তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাহার উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। যদি কুরবানী করার সামর্থ্য তাহার না থাকে তবে মক্কায় অবস্থানকালে তিনদিন এবং বাড়ি ফিরিয়া আর সাতদিন তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ উক্ত হুকুম তখনই প্রযোজ্য হইবে যখন উমরা সমাপন করিয়া হজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত থাকিবে এবং হজ্জও করিবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ মক্কার বাসিন্দা কোন ব্যক্তি অন্য কোথাও গিয়া বসতি স্থাপন করিল। হজ্জের মাসে সে উমরা করিতে আসিয়া মক্কায় অবস্থান করিয়া হজ্জ সমাধা করিল। তাহার এই হজ্জ হজ্জে তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে। এই ব্যক্তির উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। কুরবানী করিতে না পারিলে তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মক্কার অপরাপর স্থায়ী বাসিন্দার মত তাহার হুকুম হইবে না। (মুয়াত্তা মালিক ৭৬০, হজ্জ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৯, রেওয়াত ৬৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কোন ব্যক্তি যদি শাওয়াল মাস আসার পূর্বেই উমরার ইহরাম করে এবং (বাকি সময়টা) মক্কায় অবস্থান করে সেই বছরেই হাজ্জও করে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব হবে না। কারণ, সে তামাত্তুকারী নয়। কেননা সে হাজ্জের মাস আসার পূর্বেই উমরার ইহরাম করেছে। হাজ্জে তামাত্তু ও কেরান হাজ্জির জন্য হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে যে, সে যেন মক্কা বা হারামের এলাকার অধিবাসী না হয়। সুতরাং যারা মক্কা বা হারামের এলাকার অধিবাসী তাদের উপর হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব নয়। যার দলিল মহান আল্লাহর বাণী,

**(فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ )البقرة **

যে কেউ উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে উচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এ মোট দশদিন সিয়াম পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

মক্কা বা হারামের বাইরের কোন শহর যদি কেউ হজ্জ করতে আসে আর যদি তারা তামাত্তু বা কেরান হজ্জের নিয়ত করে, তবে তাদের প্রতি হাদী (কুরবানী) করা ওয়াজিব। কারণ, তারা মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। তবে যদি মক্কার অধিবাসী বিদ্যার্জনের জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশে মক্কার বাইরে সফর করে, অতঃপর হাজ্জে তামাত্তু বা কেরানের নিয়তে মক্কা ফিরে আসে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) করা ওয়াজিব হবে না। কারণ, এক্ষেত্রে তার বাসস্থানকে কেন্দ্র করতে হবে, আর তা হলো মক্কা মুকার্রামাহ।

মন্তব্যঃ তামাত্তু হজ্জ এবং কেরান হজ্জ আদায়কারী যদি হাদী (কুরবানীর পশু) না পায় বা তার খরচ-খরচা এবং বাড়ি ফিরে আসার মত পয়সার অতিরিক্ত কুরবানী ক্রয় করার পয়সা না থাকে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) ওয়াজিব হবে না, বরং তার সিয়াম পালন করা আবশ্যক হবে। যার দলিল মহান আল্লাহর বাণী,

**(فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ )البقرة **

যে কেউ উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে উচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এ মোট দশদিন সিয়াম পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

তাশরীক্বের দিনগুলিতে কি এই সিয়াম পালন করা যাবে?

হ্যা, তাশরীক্বের দিনগুলিতে এই সিয়াম আদায় করা জায়েয। তাশরীক্বের দিনগুলো হলো, আরবী যিলহাজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ। তামাত্তু ও কিরান হজ্জযাত্রীগণ এই দিনে হাদি কুরবাণীর কাফ্ফারা হিসাবে সিয়াম পালন করতে পারলেও সাধারণত কোন হাজ্জিকে এই দিনে সিয়াম পালনের অনুমতি প্রদান করা হয় নাই। এই দিনে সিয়াম জায়েয হওয়ার দলিলঃ

*** আয়িশাহ্ (রাযি.) ও ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, যাঁর নিকট কুরবানীর পশু নেই তিনি ব্যতীত অন্য কারও জন্য আইয়্যামে তাশরীকে সওম পালন করার অনুমতি দেয়া হয়নি। (সহিহ বুখারী ১৯৯৭-১৯৯৮)

তামাত্তু এবং কিরান হজ্জযাত্রী ব্যাক্তি যদি বুঝতে পারে যে, হজ্জের সময় তিনি হাদি কুরবাণী দিতে পারবেন না। অর্থাৎ হজ্জের অন্যতম ওয়াজিব কাজ কুরবানী তিনি আদায় করতে সমর্থ হবেন না। এই ব্যাক্তি ইচ্ছা করলে উমরার ইহরাম বাঁধার পরে, হজ্জের কার্যক্রম শুরুর আগেই তিনটি সিয়াম পালন করতে পারে। এইকথার দলিলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী,

*** ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত পর্যন্ত হাজ্জের মধ্যে উমরাও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। (সুনানে তিরমিজি ৯৩২)

*** ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এ সেই ‘উমরা যা থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি। কাজেই যার সাথে কুরবানীর পশু নেই সে সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যাবে। আর ‘উমরা কিয়ামাত পর্যন্ত হজের (হজ্জের) মধ্যে প্রবেশ করলো।(সুনানে আবু দাউদ ১৭৯০)

মন্তব্যঃ যদি উমরার অবস্থায় তিনটি সিয়াম পালন করে তাহলে সে হাজ্জের দিনেই সিয়াম পালন করল। তবে ঈদের দিনে এই সিয়াম পালন করবে না।

*** আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ (দিনের) সিয়াম ও দু’ (প্রকারের) ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করা হয়েছে, ঈদুল ফিতর ও কুরবানীর (দিনের) সিয়াম এবং মুলামাসা ও মুনাবাযা (পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়) হতে। (সহিহ বুখারি ১৯৯৩)

উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের মুসলিম জনগণের ঈদের দিন হচ্ছে আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও তাশরীকের দিন। এ দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন।  (তিরমিজি ৭৭৩)

আর এই সিয়ামগুলি পরস্পর রাখা এবং বিরতি দিয়েও রাখা জায়েয। তবে তাশরীক্বের দিনগুলির পরে রাখবে না। আর অবশিষ্ট সাতটি সিয়াম নিজ গৃহে ফিরার পরে মন চাইলে বিনা বিরতিতে অথবা বিরতি দিয়ে আদায় করবে। কারণ, আল্লাহ পাক এই সিয়াম ওয়াজিব করেছেন, কিন্তু এক নাগাড়ে সিয়াম পালনের শর্তারোপ করেননি।

কুরবানির শর্তসমূহ

কুরবানির শর্তসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ কুরবানিকে সঠিকভাবে করতে হলে রাসূল এর দেখান সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি আদায় করতে হবে। আমাদের মন মত যে কোন পশু ধরে জবেহ দিলেই কুরবানী আদায় হবে না। কোন পশু কোন তারিখে কি পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবে। জবেহকৃত পশুর গোশ্তের বিধানা কি এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান কুরআন সুন্নাহ থেকে জেনে আমল করতে হবে। কুরবানিকে সঠিক ও কবুল যোগ্য কারার জন্য আমাদের নিম্মের শর্তগুলি লক্ষ রাখতে হবে।

১। এক মাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবে

২। পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবে

৩। কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবে

৪। পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত হতে হবে

৫। পশুটি অবশ্যই সুসাস্থের অধিকারী হতে হবে

৬। বড় পশুকে সাতজন ও ছোট পশুকে একজনে কুরবানি দিতে হবে

৭। হাজ্জিদেরকে মিনা অথবা মক্কার অলীগলিতে পশু জবেহ করতে হবে

৮। হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরিকে দিনে জবেহ করতে হবে

৯। ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে না

১০। শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবে

১১। দাঁত ও নখ দ্বারা জবেহ করা যাবে না

১২। আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবে

১৩। গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে না

১৪। জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকে

১৫। শরীয়ত সম্মতভাবে গোশ্ত বন্টন করা

১৬। কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে না

১৭। কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে না

১। এক মাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবেঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ*

অর্থঃ এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। ( সুরা হাজ্জ্ব ২২:৩৭ )

২। পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবেঃ

কুরবাণীর পশু হলো, উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। এর দলিল মহান আল্লাহর বলেন,

(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ)

অর্থঃ আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক্ দেয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। কারণ, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। (সুরা হজ্জ ২২:৩৪)

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহ পশুর ধরণ বলেছেন, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। আমাদের সমাজে প্রচলিত গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হলোঃ- উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ।

১. আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন আমাদের খুৎবা দিলেন এবং দু’টি কালো-সাদা রঙের দুম্বার নিকট গিয়ে তা যবেহ করলেন। (নাসাঈ ৪৩৮৮)

২. আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’টি শিংওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা কুরবানী করলেন, যার পা সমূহ শুভ্র ছিল আর পূর্ন শরীর কালো আর তার পেট ছিল কালো, আর চোখও ছিল কালো। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯০)

৩. .জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন ‘আয়িশা (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেন। (সহিহ মুসলিম ৩০৮২)

৪. যিয়াদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ইবনু ‘উমার (রাঃ) এক ব্যক্তির কাছে এলেন। সে তার উটকে বসিয়ে কুরবানী করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিনি বললেন, এটাকে দাঁড় করিয়ে কুরবানী কর। এটাই তোমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত। (সহিহ মুসলিম ৩০৮৪)

৫. আবূ জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কে তামাত্তু‘ হাজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে তা আদায় করতে আদেশ দিলেন। এরপর আমি তাঁকে কুরবানী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তামাত্তু‘র কুরবানী হলো একটি উট, গরু বা বকরী অথবা এক কুরবানীর পশুর মধ্যে শরীকানা এক অংশ। আবূ জামরাহ (রহ.) বলেন, লোকেরা তামাত্তু হাজ্জকে যেন অপছন্দ করত। একদা আমি ঘুমালাম তখন দেখলাম, একটি লোক যেন (আমাকে লক্ষ্য করে) ঘোষণা দিচ্ছে, উত্তম হাজ্জ এবং মাকবূল তামাত্তু‘। এরপর আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে বললেন, এটাই তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। আদম, ওয়াহাব ইবনু জারীর এবং গুনদার (রহ.) শু‘বাহ্ (রহ.) হতে মাকবূল ‘উমরাহ এবং উত্তম হাজ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৮)

৩। কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়ত পশুর নির্ধারিত বয়স ঠিক করে দিয়ছে। আর তা হচ্ছে, উঁটের বয়স পাঁচ বছর সম্পূর্ণ হওয়া, গরুর বয়স দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়া, ছাগলের বয়স এক বছর সম্পূর্ণ হওয়া, মেষ বা দুম্বার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া। এর কম বয়সের হলে তা কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না। এর দলিলঃ

১. উকবা ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মধ্যে কুরবানীর পশু বণ্টন করলেন। আমার অংশে একটি এক বছরের বকরী পড়লো। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার অংশে একটি এক বছরের বকরী পড়েছে। তিনি বললেনঃ তুমি তা কুরবানী কর। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮১)

২. উকবা ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে একটি এক বছর বয়সী ভেড়া কুরবানী করেছি। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮৩)

৩. কুলায়ব (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার সফরে ছিলাম, তখন কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হলো। আমাদের একেক ব্যক্তি দুটি বা তিনটি এক বছরের ভেড়ার পরিবর্তে একটি দু’ বছরের বয়সের ভেড়া খরিদ করছিল। তখন মুযায়না গোত্রের এক ব্যক্তি বললোঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। এমন সময় দিনটি উপস্থিত হলে এক ব্যক্তি দুটি বা তিনটি এক বছরের ভেড়ার পরিবর্তে একটি দু বছরের ভেড়া তালাশ করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বকরীর ক্ষেত্রে দু বছর বয়সী দ্বারা যেভাবে কুরবানী আদায় হয়, তদ্রুপ এক বছর বয়সী দ্বারাও আদায় হয়ে যাবে। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮৪)

৪। আসিম ইবনু কুলাইব (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিতঃ তিনি (কুলাইব) বলেন, আমরা বনী সুলাইম গোত্রের মুজাশি’ নামক নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এক সাহাবীর সাথে ছিলাম। একবার বকরীর মূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পেলে তিনি ঘোষককে নির্দেশ দেয়ায় সে ঘোষণা করলো রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেনঃ এক বছর বয়সের ছাগলের স্থানে ছয় মাস বয়সের ভেড়া যথেষ্ট। আবূ দাউদ (রহঃ) বলেন, তিনি মাসউদের পুত্র মুজাশি’ (রাঃ)। (আাবু দাউদ ২৭৯৯)

৫। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে একবার উটের স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি লোকেদেরকে গরু কোরবানী করার নির্দেশ দেন। (ইবনে মাজাহ ৩১৩৪)

৬। মুজাশি‘ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ (কুলায়ব) বলেন, আমরা সুলায়ম গোত্রের মুজাশি‘ (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এক সাহাবীর সাথে ছিলাম। মেষ-বকরীর স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি একজন ঘোষককে নির্দেশ দিলেন এবং তদনুযায়ী সে ঘোষণা করলোঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেনঃ এক বছর বয়সের বকরীর দ্বারা যে কাজ হয় (কোরবানীর ক্ষেত্রে) ছয় মাস বয়সের মেষ দ্বারাও তা হতে পারে। (ইবনে মাজাহ ৩১৪০, আলবালীঃ হাদিসের মান সহিহ, নাসায়ী ৪৩৮৩, ৪৩৮৪, আবূ দাউদ ২৭৯৯)

৭। আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সালাতের পূর্বে যে যবেহ্ করবে তাকে পুনরায় যবহ্ করতে হবে। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আজকের এ দিনটিতে গোশত খাবার আকাঙ্ক্ষা করা হয়। সে তার প্রতিবেশীদের অবস্থা উল্লেখ করল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। সে বলল, আমার নিকট এখন ছয় মাসের এমন একটি মেষ শাবক আছে, যা আমার নিকট দু’টি হৃষ্টপুষ্ট বকরীর চাইতেও অধিক পছন্দনীয়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেটা কুরবানী করার অনুমতি দিলেন। অবশ্য আমি জানি না, এ অনুমতি তাকে ছাড়া অন্যদের জন্যও কিনা? (সহিহ বুখারি ৯৮৪, ৫৫৪৬, ৫৫৪৯, ৫৫৬১)

৮. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা মুসিন্নাহ্‌ (দুধ দাঁত পড়ে গেছে এমন পশু) ছাড়া কুরবানী করবে না। তবে এটা তোমাদের জন্য কষ্টকর মনে হলে তোমরা ছ’মাসের মেষ-শাবক কুরবানী করতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৭৬)

৪। পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত হতে হবেঃ

১. উবাইদ ইবনে ফাইরূয (রাঃ) বলেন, আমি বারাআ ইবনে আযিব (রাঃ) কে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধরনের পশু কোরবানী করতে অপছন্দ অথবা নিষেধ করেছেন সেই সম্পর্কে আমাদের বলুন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতের ইশারায় বলেন, এরূপ, আর আমার হাত তাঁর হাতের চেয়ে ক্ষুদ্র। চার প্রকারের পশু কোরবানী করলে তা যথেষ্ট হবে না। অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে। উবাইদ (রাঃ) বলেন, আমি ক্রটিযুক্ত কানবিশিষ্ট পশু কোরবানী করা অপছন্দ করি। বারাআ (রাঃ) বলেন, যে ধরনের পশু তুমি নিজে অপছন্দ করো তা পরিহার করো, কিন্তু অন্যদের জন্য তা হারাম করো না। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৪)

২. বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) মারফু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হিসাবে বর্ণনা করেছেনঃ খোড়া জন্তু যার খোড়ামী স্পষ্টভাবে প্রকাশিত; অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত; রুগ্ন পশু যার রোগ দৃশ্যমান এবং ক্ষীণকায় পশু যার হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে- তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। (সুনানে তিরমিযী ১৪৯৭)

৩. বনী শায়বানের আযাদকৃত দাস আবু যাহহাক উবায়দ ইবন ফায়রূয (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বারা (রাঃ)-কে বললাম, যে সকল পশু কুরবানী করতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, তা আমার নিকট বর্ণনা করুন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খুতবা দিতে) দাঁড়ালেন আর আমার হাত তাঁর হাত অপেক্ষা ছােট। তিনি বললেন, চার প্রকার পশু কুরবানী বৈধ নয়, কানা পশু যার কানা হওয়াটা সুস্পষ্ট, রুগ্ন যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার খোঁড়া হওয়া সুস্পষ্ট; দুর্বল, যার হাঁড়ে মজ্জা নেই। আমি বললামঃ আমি শিং ও দাঁতে ত্রুটি থাকাও পছন্দ করি না। তিনি বললেনঃ তুমি যা অপছন্দ কর, তা ত্যাগ কর; কিন্তু অন্য লোকের জন্য তা হারাম করো না।

(নাসায়ী ৪৩৭০, ৪৩৭১)

৪. হুজায়্যা ইব্‌ন আদী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আলী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করেছেন আমরা যেন কুরবানীর পশুর চোখ ও কান উত্তমরূপে দেখে নিই। (নাসায়ী ৪৩৭৬)

উপরের হাদিসগুলো থেকে ষ্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়ে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি দোষ হতে কুরবানীর পশুর মুক্ত হওয়া জন্য বলেছেন। কুরবানীর পশুর যে চারটি দোষমুক্ত হবে তা হলোঃ

১। অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট

২। রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট

৩। খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং

৪। কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।

৫। পশুটি অবশ্যই সুসাস্থের অধিকারী হতে হবেঃ

কুরবানীর পশুতে যে সব গুণ থাকা উত্তম তা হলো, কুরবানীর পশুর মোটা হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, দৈহিক গঠনে বড় হওয়া এবং দেখতে সুন্দর হওয়া। সুতরাং কুরবানীর পশু যত ভাল হবে ততই মহান আল্লাহর নিকট তা প্রিয় হবে। আর সহীহ হাদীসে রয়েছে, আল্লাহ সুন্দর ও উত্তম, তাই তিনি সুন্দর ও উত্তম ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।

দলিলঃ

১. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন শিংবিশিষ্ট মোটাতাজা দুম্বা কুরবানী করেছেন যার চোখ, মুখ ও পা কালো বর্ণের ছিলো। (আবু দাউদ ২৭৯৬)

২. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানির ইচ্ছা করলে দু’টি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধুসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর এর একটি নিজ উম্মাতের যারা আল্লাহ্‌র একত্বের সাক্ষ্য দেয় এবং তাঁর নবুয়াতের সাক্ষ্য দেয় তাদের পক্ষ থেকে এবং অপরটি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন। ইবনে মাজাহ ৩১২২)

৩. আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে (কোরবানীর পশুর) চোখ ও কান উত্তমরূপে পরীক্ষা করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৩)

বড় পশুকে সাতজন ও ছোট পশুকে একজনে কুরবানি দিতে হবেঃ

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হুদাইবিয়ার বছর (৬ষ্ঠ হিজরী) আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে প্রতি সাতজনের পক্ষ থেকে একটি উট এবং প্রতি সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেছি। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৬)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হাজ্জের ইহরাম বেঁধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে রওনা হলাম। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি উট বা গরু সাতজনে মিলে কুরবানী করার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৭)

৩. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জ ও ‘উমরাহ্ পালনকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাতজনে মিলে একটি উট কুরবানী করেছি। এক ব্যক্তি জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, জাযূর-এ যে ক’জন শারীক হতে পারে- বাদানাহ্-তেও কি অনুরূপ শারীক হওয়া যায়? তখন তিনি বললেন, উভয় তো একই। জাবির (রাঃ) হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা ঐদিন ৭০টি উট কুরবানী করেছি। প্রতিটি উটেই ৭ জন শারীক ছিলাম। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৯)

৪. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কোন এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ আসলে আমরা একটি গরুতে সাতজন এবং একটি উটে দশজন করে শরীক হই। (তিরমিজি ৯০৫, ইবনু মাজাহ ৩১৩১)

৫. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে ছিলাম, তখন কুরবানীর সময় উপস্থিত হলে আমরা একটি উটে দশজন শরীক হলাম, আর একটি গাভীতে সাতজন। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯৩)

৬. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগে তামাত্তু হাজ্জ করতাম এবং সাতজন মিলে একটি গরু কুরবানী করতাম। অনুরূপভাবে একটি উটেও সাতজন শরীক হয়ে কুরবানী করেছি। আবু দাইদ ২৮০৭)

৭. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সঙ্গে তামাত্তু হজ্জ করতাম। আমরা সাতজনের পক্ষ থেকে গরু যবেহ করতাম এবং তাতে শরীক হতাম। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯৪)

৮. আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যে সকল স্ত্রী উমরাহ (অর্থাৎ তামাত্তো হাজ্জ) করেন, তিনি তাদের সকলের পক্ষ থেকে একটি গাভী কোরবানী করেন।  ইবনে মাজাহ ৩১৩৩

মন্তব্যঃ এই সকল হাদীস থেকে প্রমানিত হয় যে, ভাগে কুরবানী তথা কয়েকজন মিলে একটি পশু কুরবানী করা জায়িয। অধিকাংশ মুজতাহীদ আলেমদের অভিমত হল ভাগে কুরবানী জায়িয, কুরবানী ওয়াজিব হোক আর মুস্তাহাব হোক। উপরে বর্ণিত হাদিসই তার দলিল। অন্যদিকে সামান্য কিছু আলেমদের মত হলো, নাফলের ক্ষেত্রে ভাগ দেয়া, বৈধ ওয়াজিব এর ক্ষেত্রে নয়।

ইমাম আবূ হানিফার মতে, সকলেরই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য হয় তবে ভাগে কুরবানী জায়িয, অন্যথায় জায়িয নয় (অর্থাৎ শারীকদের মধ্যে কেউ যেন কেবল গোশত খাওয়ার নিয়্যাত না করে)।

আর সকলের ঐকমত্যে ছাগল-বকরীতে ভাগে কুরবানী জায়িয নয় । বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, উট এবং গরুর ক্ষেত্রে সাত সাতজন ব্যক্তি শারীক হতে পারে। যাবির (রাঃ)-এর শেষ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তামাত্তু‘ হাজ্জ পালনকারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব এবং ওয়াজিব কুরবানীতে ভাগে কুরবানী করা জায়িয । মূলকথা কুরবানী ভাগে না দিয়ে একাই দেয়াই উত্তম।

হাজ্জিদেরকে মিনা অথবা মক্কার অলীগলিতে পশু জবেহ করতে হবেঃ

হজ্জ সংশ্লিষ্ট সকল স্থানই হাদী জবেহ করার স্থান নয়। শুধু মিনা এবং মক্কা বা হারামের এলাকায় হাদী জবেহ জায়েয। এর দলিলঃ

১. আত্বা (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আরাফাহ্‌র পুরো এলাকাই অবস্থানের জায়গা। মিনার সম্পূর্ণ এলাকা কুরবানীর স্থান এবং মুযদালিফার বিস্তৃত এলাকা অবস্থানের স্থান এবং মক্কার প্রতিটি অলি-গলি চলাচলের পথ এবং কুরবানীর স্থান। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৭)

২. ‘আতা (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযি.) আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরাফার পুরো এলাকাই অবস্থানের জায়গা। মিনার সম্পূর্ণ এলাকা কুরবানীর স্থান এবং মুযদালিফার বিস্তৃত এলাকা অবস্থানের স্থান এবং মক্কার প্রতিটি অলি-গলি চলাচলের পথ এবং কুরবানীর স্থান। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৭)

৩. জাবির (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এ স্থানে কুরবানী করেছি। আর মিনার পুরো এলাকাই কুরবানীর স্থান। তিনি আরাফার এক স্থানে অবস্থান করেছেন এবং বলেছেনঃ আমি এ স্থানে অবস্থান করেছি, আর আরাফার সম্পূর্ণ এলাকাই অবস্থানের স্থান। তিনি মুযদালিফার এক স্থানে অবস্থান করেছেন এবং বলেছেনঃ আমি এ স্থানে অবস্থান করেছি, আর মুযদালিফার পুরো এলাকাই অবস্থানের স্থান। (আবু দাউদ ১৯০৭)

৪. জাবির (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত। তার এ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আমি এখানে কুরবানী করেছি এবং মিনার গোটা এলাকা কুরবানীর স্থান। অতএব তোমরা যার যার অবস্থানে কুরবানী কর। আর আমি এখানে অবস্থান করছি এবং গোটা ‘আরাফাহই অবস্থানস্থল (মাওকিফ), মুযদালিফার সবই অবস্থানস্থল এবং আমি এখানে অবস্থান করছি।” (সহিহ মুসলিম ২৮৪২)

৫. আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফায় রাত যাপনের পর সকালে ‘কুযাহ’ পাহাড়ে অবস্থান করেন এবং বললেনঃ এটি ‘কুযাহ’ এবং এটাই অবস্থানস্থল। মুযদালিফার গোটা এলাকাই অবস্থানের স্থান। (তারপর মিনায় এসে বললেন) আমি এ স্থানে কুরবানী করেছি। মিনার পুরো এলাকাই কুরবানী স্থান। সুতরাং তোমরা তোমাদের নিজ নিজ অবস্থানে কুরবানী করো। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৫)

৬. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন মিনার সমস্ত এলাকাই কোরবানীর স্থান, মক্কার প্রতিটি প্রশস্ত সড়কই রাস্তা এবং কোরবানীর স্থান, আরাফাতের গোটা এলাকাই অবস্থানস্থল এবং মুযদালিফার সমস্ত এলাকাও অবস্থানস্থল। ইবনে মাজাহ ৩০৪৮)

মন্তব্যঃ ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, হারামের সমস্ত এলাকা হচ্ছে কুরবানীস্থল, সুতরাং হাজ্জে বা উমরায় হারামের যে কোন স্থানে কুরবানী করলেই যথেষ্ট হবে। তাই যদি দেখা যায় যে, কুরবানী মক্কায় করলে দরিদ্রদের বেশী লাভ হবে তাহলে মক্কাতেই কুরবানী করবে, তা ঈদের দিন হোক কিংবা তার পরের তিন দিনে হোক। আর যদি কেউ হারামের এলাকার বাইরে, যেমন আরফায় বা অন্য কোন হালাল স্থানে হাদী জবেহ করলে প্রসিদ্ধ মতে তা যথেষ্ট হবে না।

হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরিকে দিনে জবেহ করতে হবেঃ

১০ ই জিলহাজ্জ অর্থাৎ ঈদের দিন সূর্য এক বর্ষা পরিমাণ উদয় হওয়া ও ঈদের সলাত সমাপ্ত হওয়ার পর থেকে হাদী জবেহের সময় শুরু হয়। এই কাজ একটা তাশরীকের শেষ দিন অর্থাৎ ১৩ই জিলহাজ্জ সূর্যাস্তের আগ পর্যান্ত চলতে থাকবে। তবে সুন্নাহ হলে ঈদের সালাতের পর দেরী না করে সকাল সকাল কুরআনী দেয়া, কেননা, নাবী (সা.) নিজ কুরবানীর পশু ঈদের দিন সকাল বেলা যবাহ করেছেন।

দলিল পেলে দিব

অনুরূপ তাশরীকের দিনগুলি অতিবাহিত হওয়ার পর কুরবানী করা জায়েয নয়। কারণ, ইহা কুরবানীর জন্য নির্ধারিত দিনের বাইরে। আর এই চার দিনের রাত দিন যে কোন সময় কুরবানী করা জায়েয, তবে দিনে কুরবানী করা উত্তম।

ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে নাঃ

ঈদের দিন মাঠে দু’রাক’আত নামায আদায়ের পূর্বে কেউ যদি কুরবানীর পশু যাবাহ করে ফেলে তাহলে সেটি কুরবানী হবে না বরং তা সাধারণ পশু যাবাহের মত হবে।

১. জুনদুব ইবন সুফয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, সালাত শেষে দেখলেন একটি বকরী যবেহ করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, সালাতের পূর্বে কে যবেহ করলো? সে যেন এর পরিবর্তে অন্য একটি বকরী যবেহ করে। আর যে এখনও যবেহ করেনি, সে যেন আল্লাহর নামে যবেহ করে। (নাসায়ী ৪৩৬৯)

২. বারাআ ইবনু ‘আযিব (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল আযহার দিন সালাতের পর আমাদের উদ্দেশে খুৎবাহ দান করেন। খুৎবাহ্য় তিনি বলেনঃ যে আমাদের মত সালাত আদায় করল এবং আমাদের মত কুরবানী করল, সে কুরবানীর রীতিনীতি যথাযথ পালন করল। আর যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করল তা সালাতের পূর্বে হয়ে গেল, এতে তার কুরবানী হবে না। বারাআ-এর মামা আবূ বুরদাহ্ ইবনু নিয়ার (রাযি.) তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জানা মতে আজকের দিনটি পানাহারের দিন। তাই আমি পছন্দ করলাম যে, আমার ঘরে সর্বপ্রথম যবহ্ করা হোক আমার বকরীই। তাই আমি আমার বকরীটি যবহ্ করেছি এবং সালাতে আসার পূর্বে তা দিয়ে নাশ্তাও করেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার বকরীটি গোশ্তের উদ্দেশ্যে যবেহ্ করা হয়েছে। তখন তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নিকট এমন একট ছয় মাসের মেষ শাবক আছে যা আমার নিকট দু’টি বকরীর চাইতেও পছন্দনীয়। এটি (কুরবানী করলে) কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তবে তুমি ছাড়া অন্য কারো জন্য যথেষ্ট হবে না। (সহিহ বুখারি ৯৮৫)

৩. জুন্‌দাব ইবনু সুফ্‌ইয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ঈদুল আয্‌হায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি অন্য কোন কাজ না করে সলাত আদায় করলেন। সলাত শেষে সালাম ফিরলেন। অতঃপর তিনি কুরবানীর গোশ্‌ত দেখতে পেলেন, যা তাঁর সলাত আদায়ের আগেই যাবাহ করা হয়েছিল। তারপর তিনি বললেন, যে লোক সলাত আদায়ের আগে তার কুরবানীর পশু যাবাহ করেছে, সে যেন এর জায়গায় অন্য একটি পশু যাবাহ করে। আর যে ব্যক্তি যাবাহ করেনি সে যেন আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে (বিস্‌মিল্লা-হ) যাবাহ করে। (সহিহ মুসলিম ৪৯৫৮)

১০। শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবেঃ

কুরবানি দাতা নিজের কুরবানির পশু নিজেই যবেহ করবেন, যদি তিনি ভালভাবে যবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যবেহ করেছেন। আর যবেহ করা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কুরবানি নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিৎ। উট জবেহ করার ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো, পশু দাঁড় করে সামনের বাম পা বাঁধা অবস্থায় কুরবানী করা। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে পশু দাঁড়ান অবস্থায় বা বসা অবস্থায় জবেহ করবে। পক্ষান্তরে উঁট ছাড়া অন্য পশু যবহের ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো, পশুকে কাত করে শুয়ে দিয়ে জবেহ করা। দাঁড় করে জবেহ করা পশুর বুকের দিক থেকে গলার নিচভাগে হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে শুইয়ে যবহ করা পশুর মাথার দিক থেকে গলার উপরভাগে হয়ে থাকে। দাঁড় করে যবহ করা হোক কিংবা শুইয়ে যবহ করা, উভয় ক্ষেত্রে পশুর গলার ‘ওয়াদাজ’ নামক দুটো শিরা কেটে রক্ত প্রবাহিত করা আবশ্যক। আর রক্ত প্রবাহিত করার শরীয়াত সম্মত পদ্ধতি হলো, গলার দুটো শিরা কেটে দেয়া। দুই ওয়াদাজ হলো, খাদ্য নালীর দুই পাশ্বের মোটা শিরা। আর তা সম্পূর্ণভাবে কাটতে হলে খাদ্যনালী এবং কণ্ঠনালীও তার সাথে কাটতে হবে। পশুর প্রতি সহনশীল আচরণ করে জবেহ করা উচিত। যাতে প্রানীর কষ্ট কম হয় তার প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।

দলিলঃ

শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি জিনিসের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনের আবশ্যকতা গণ্য করেছেন। অতএব তোমরা (কিসাসে অথবা জিহাদে) কোন লোককে হত্যা করলে উত্তম পন্থায় হত্যা করবে এবং কোন কিছু যবেহ করার সময় উত্তম পন্থায় যবেহ করবে। তোমাদের মধ্যে যে কেউ যেন তার ছুরি ভালভাবে ধারালো করে নেয় এবং যবেহ করার পশুটিকে আরাম দেয়। (সুনানে তিরমিজি ১৪০৯, ইবনু মাজাহ ৩১৭০ হাদিসের মান সহিহ)

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি ধারালো করতে এবং তা পশুর দৃষ্টির অগোচরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যবেহ করার সময় যেন দ্রুত যবেহ করে।(ইবনে মাজাহ ৩১৭২)

১১। দাঁত ও নখ দ্বারা জবেহ করা যাবে নাঃ

রাফি’ ইবনু খাদীজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমরা আগামীকাল শত্রুর সঙ্গে মুকাবিলা করবো। অথচ আমাদের সঙ্গে কোন ছুরি নেই। তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি কিংবা ভালভাবে দেখে নিখঁতভাবে যাবাহ করবে। যা রক্ত প্রবাহিত করে, যার উপর আল্লাহ্‌র নাম নেয়া হয় তা (দিয়ে যাবাহকৃত জন্তু) খাও। তবে তা যেন দাঁত ও নখ না হয়। আমি তোমাদের কাছে এর কারণ বর্ণনা করেছি। কেননা দাঁত হলো হাড় বিশেষ, আর নখ হলো হাবশীদের ছুরি। রাবী বলেন, আমরা গনীমাতের কিছু উট ও বকরী পেলাম। সেখান থেকে একটি উট ছুটে গেলে এক লোক তীর মেরে সেটাকে আটকিয়ে ফেললো। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এসব উটের মধ্যেও বন্য প্রাণীর মতো আচরণ রয়েছে। অতএব এগুলোর মাঝে কোন একটি যদি নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে যায় তবে তার সঙ্গে এরূপ ব্যবহারই করবে। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৬)

রাফি‘ ইবনু খাদীজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম। আগামী দিন আমরা শত্রুর সম্মুখীন হব অথচ আমাদের সঙ্গে কোন ছুরি নেই। তিনি বললেনঃ সতর্ক দৃষ্টি রাখ কিংবা তিনি বলেছেন, জলদি কর। যে জিনিস রক্ত প্রবাহিত করে এবং যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়, সেটি খাও। যতক্ষণ না সেটি দাঁত কিংবা নখ হয়। এ ব্যাপারে তোমাদের জানাচ্ছি, দাঁত হল হাড়, আর নখ হল হাবশীদের ছুরি। দলের দ্রুতগতি লোকেরা আগে বেড়ে গেল এবং গনীমতের মালামাল লাভ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন লোকজনের পেছনে। তারা ডেকচি চড়িয়ে দিল।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে তা উল্টে দেয়ার আদেশ দিলেন, তারপর সেগুলো উল্টে দেয়া হল। এরপর তিনি তাদের মধ্যে মালে গনীমত বণ্টন করলেন এবং দশটি বক্রীকে একটি উটের সমান গণ্য করলেন। দলের অগ্রভাগের নিকট হতে একটি উট ছুটে গিয়েছিল। অথচ তাদের সঙ্গে কোন অশ্বারোহী ছিল না। এ অবস্থায় এক ব্যক্তি উটটির দিকে তীর ছুঁড়লে আল্লাহ উটটিকে থামিয়ে দিলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সকল চতুষ্পদ জীবের মধ্যে বন্য পশুর স্বভাব আছে। কাজেই, এগুলোর কোনটি যদি এমন করে, তাহলে তার সঙ্গে এরকমই ব্যবহার করবে। (সহিহ বুখারি ৫৫৪৩)

১২। আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবেঃ

দাড়ান বা কাত করে শোয়ানোর পর ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলে ছুরি দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করতে হবে। জবেহ করার সময় কমপক্ষে (بسْمُ اللَّهِ) ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ফরজ কাজ। কারণ, কোন পশুর জবেহ করার পূর্বে আল্লাহর নাম না পাঠ করলে সেই পশুর গোশত খাওয়া হারাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ

অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও। (সুরা আন’য়াম ৬:১১৮)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَلاَ تَأْكُلُواْ مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ

যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। (সুরা আন’য়াম ৬:১২১)

মন্তব্যঃ এই কারনে মৃ্ত পড়ে থাকা জন্তু খাওয়া হলাল নয়। কেননা, কেউ জানেনা এই জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে শিকার বা জবেহ করা হয়েছিল কি না!

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’ শিং বিশিষ্ট সাদা-কালো ধুসর রংয়ের দু’টি দুম্বা স্বহস্তে যাবাহ করেন। তিনি ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লহু আকবার’ বলেন এবং (যাবাহ্‌কালে) তাঁর একখানা পা দুম্বা দু’টির ঘাড়ের পাশে রাখেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮১, আবু দাউদ ২৭৯৪)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’শিং যুক্ত সাদা-কালো বর্ণের দু’টি দুম্বা কুরবানী করেন। তিনি আরও বলেন, আমি-তাঁকে দুম্বা দু’টি স্বহস্তে যাবাহ করতে দেখেছি। আরও দেখেছি, তিনি ও দু’টির ঘাড়ের পাশে নিজ পা দিয়ে চেপে রাখেন এবং ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলেন।  (সহিহ মুসলিম ৪৯৮২)

আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানী করার জন্য শিংওয়ালা দুম্বাটি আনতে নির্দেশ দেন- যেটি কালোর মধ্যে চলাফেরা করতো (অর্থাৎ- পায়ের গোড়া কালো ছিল), কালোর মধ্যে শুইতো (অর্থাৎ- পেটের নিচের অংশ কালো ছিল) এবং কালো মধ্য দিয়ে দেখতে (অর্থাৎ- চোখের চারদিকে কালো ছিল)। সেটি আনা হলে তিনি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, ছোরাটি নিয়ে এসো। অতঃপর বলেন, ওটা পাথরে ধার দাও। তিনি তা ধার দিলেন। পরে তিনি সেটি নিলেন এবং দুম্বাটি ধরে শোয়ালেন। তারপর সেটা যাবাহ করলেন এবং বললেন,

** بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ‏”‏ **

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার ও তাঁর উম্মাতের পক্ষ হতে এটা ক্ববূল করে নাও। তারপর এটা কুরবানী করেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৫, আবু দাউদ ২৮১০)

১৩। গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে নাঃ

গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে হারাম। হান আল্লাহ আরও বলেন,

((*وَلاَ تَأْكُلُواْ مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ*))

যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। (সুরা আন’য়াম ৬:১২১)

আবূ তুফায়ল ‘আমির ইবনু ওয়াসিলাহ্‌ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক লোক তাঁর নিকট এসে বলল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে আড়ালে কি বলেছিলেন? রাবী বলেন, তিনি রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদের কাছ থেকে গোপন রেখে আমার নিকট একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি (বিশেষ শিক্ষণীয়) কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল হে আমীরুল মু’মিনীন! সে চারটি কথা কি? তিনি বললেনঃ ১. যে লোক তার পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করে, আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করেন, ২. যে লোক আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কারো নামে যাবাহ করে আল্লাহ তার উপরও অভিসম্পাত করেন, ৩. ঐ ব্যক্তির উপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, যে কোন বিদ‘আতী লোককে আশ্রয় দেয় এবং ৪. যে ব্যক্তি জমিনের (সীমানার) চিহ্নসমূহ অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করে, তার উপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করে। (সহিহ মুসলিম ৫০১৮)

১৪। জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকেঃ

আতা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আবূ আইয়ূব (রাঃ)-কে আমি প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যামানায় কুরবানীর বিধান কেমন ছিল। তিনি বললেন, কোন লোক তার ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী আদায় করত এবং তা নিজেরাও খেত, অন্যান্য লোকদেরকেও খাওয়াত। অবশেষে মানুষেরা গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তা তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছ। (সুনানে তিরমিজি ১৫০৫)

আতা’ ইয়াসার বলেন থেকে বর্ণিতঃ আমি আবূ আইউব আল-আনসারী (রাঃ) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে আপনাদের কোরবানী কিরূপ ছিল? তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে কোন ব্যক্তি নিজের ও স্বীয় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বকরী কোরবানী করতো। তা থেকে তারাও আহার করতো এবং (অন্যদেরও) আহার করাতো। পরবর্তী কালে লোকেরা কোরবানীকে অহমিকা প্রকাশের বিষয়ে পরিণত করে এবং এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৭)

১৫। শরীয়ত সম্মতভাবে গোশ্ত বন্টন করাঃ

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন:

لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাব গ্রস্থকে আহার করাও। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৮ )

১. সালামাহ্‌ ইবনু আক্‌ওয়া’ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে যেন ঈদের তৃতীয় রাতের পর তার বাড়িতে কুরবানীর পশুর কোন কিছু সঞ্চিত না রাখে। আগামী বছর যখন আগত হলো, তখন লোকজনেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা কি গত বছরের মতো করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর তো মানুষ খুব দুর্দশায় ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম যাতে সকলের কাছে কুরবানীর (গোশ্‌ত) পৌঁছে যায়। (সহিহ মুসলিম ৫০০৩)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ওয়াকিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিন দিনের উপরে কুরবানীর গোশ্‌ত খেতে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ করেছেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ বাক্‌র (রহঃ) বলেন, আমি বিষয়টি ‘আম্‌রাহ্‌ (রাঃ) এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ইবনু ওয়াকিদ সত্যই বলেছেন। আমি ‘আয়িশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যামানায় ‘ঈদুল আযহার সময় বেদুঈনদের কিছু পরিবার শহরে আগমন করে, তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমরা তিনদিনের পরিমাণ জমা রেখে বাকী গোশ্‌তগুলো সাদাকাহ্‌ করে দাও। পরবতী সময়ে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষেরা তো কুরবানীর পশুর চামড়া দিয়ে পাত্র প্রস্তুত করছে এবং তার মাঝে চর্বি গলাচ্ছে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাতে কি হয়েছে? তারা বলল, আপনিই তো তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত খাওয়া হতে বারণ করেছেন। তিনি বললেনঃ আমি তো বেদুঈনদের আগমণের কারণে এ কথা বলেছিলাম। অতঃপর এখন তোমরা খেতে পার, জমা করে রাখতে পার এবং সাদাকাহ্‌ করতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৭)

৩. জাবির (রাঃ) কর্তৃক নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিতঃতিনি তিনদিনের পরেও কুরবানীর গোশ্ত খেতে বারণ করেছেন। তারপর পরবর্তীকালে তিনি বলেছেন, এখন তোমরা খেতে পার, পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করতে পার এবং সঞ্চয় করে রাখতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৮

৪. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা মিনায় তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত খেতাম না। পরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি দিয়ে বললেনঃ তোমরা খেতে পার এবং অতিরিক্ত হিসেবে জমাও রাখতে পার। (ইবনু জুরায়জ বলেন) আমি ‘আতাকে বললাম, জাবির (রাঃ) কি ‘মাদীনায় আগমন করা পর্যন্ত’ কথাটি বলেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৯)

৫. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত জমা করে রাখতাম না। পরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনদিনের পরেও এ থেকে খাওয়ার এবং পথেয় হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আমাদের অনুমতি দেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৫)

৬. ইবনু বুরাইদাহ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছিলাম। এখন আমি শেষ বিষয়ে তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি। আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত করো। কেননা তা দর্শনে (মৃত্যুকে) স্মরণ হয়।

৭. আমি তোমাদেরকে পানপাত্র সম্পর্কে নিষেধ করেছিলাম যে, তোমরা চামড়ার পাত্রে নবীয পান করবে। এখন তোমরা যে কোনো পাত্রে পান করতে পারো। কিন্তু তোমরা কখনো মাদক দ্রব্য পান করো না। আমি তোমাদের উপর কুরবানীর গোশতের ব্যাপারে তা তিন দিনের পর না খেতে বলেছিলাম। এখন তোমরা তা (দীর্ঘদিন) খেতে পারো এবং তোমাদের সফরে তা কাজে লাগাতে পারো। সুনানে আবু দাউদ ৩৬৯৮)

মন্তব্যঃ আমাদের সমাজ প্রচলিত আছে, কুরবানীর গোশ্ত সমান তিন ভাগ করার পর এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে এবং এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়। এই কথার সুন্নাহ সম্মত কোন দলিল নাই। তবে সুন্নাত হলো, কুরবানীর গোশ্ত নিজে খাওয়া এবং তা হতে অন্যদেরও খাওয়ানো। আর প্রয়োজন হলে ভবিশ্যতের জন্য সংরক্ষন করে রাখবে।

অনেক হাজ্জিকে দেখা যায় কুরবানী করা পর গোশ্ত ফেলে রেখে আসে। কিন্তু কুরবানীর গোশ্ত নিজে না খেয়ে এবং অপরকে তা দান না করে শুধু-শুধু যবহ করে ফেলে রেখে দেয়া যথেষ্ট নয়। কারণ, ইহা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করার শামিল। তাই যতক্ষণ এমন স্থানে না যবহ করবে যেখানে নিজের আশে-পাশ্বে দরিদ্র-অভাবীরা থাকবে, অতঃপর কুরবানীর পশু যবহ করে তাদেরকে দান করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরবানীকারী দায়িত্ব মুক্ত হবে না। সুতরাং হাজীর জন্য উচিত যে, সার্বিক দিক থেকে নিজ কুরবানীর প্রতি গুরুত্ব দিবে, যাতে করে তার কুরবানী মহান আল্লাহর নিকট গৃহিত হয় ও তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয় এবং আল্লাহর বান্দাদের জন্য তা যেন লাভজনক হয়।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কঙ্কর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলছিলেন : তোমরা হাজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। তিনি আরো বলেনঃ আমি অবহিত নই আমার এই হাজ্জের পর আবার হাজ্জ করার সুযোগ পাবো কি না। (আবু দাউদ ১৯৭০)

১৬। কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে নাঃ

‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তাঁকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের কুরবানীর জানোয়ারের পাশে দাঁড়াতে আর এগুলোর সমুদয় গোশ্ত, চামড়া এবং পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে নির্দেশ দেন এবং তা হতে যেন কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছুই না দেয়া হয়।  (সহিহ বুখারি ১৭১৭)

কুরবানীর জন্তুর কিছুই কসাইকে দেয়া যাবে না।

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাঠালেন, আমি কুরবানীর জানোয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, অতঃপর তিনি আমাকে আদেশ করলেন। আমি ওগুলোর গোশ্‌ত বণ্টন করে দিলাম। এরপর তিনি আমাকে আদেশ করলেন। আমি এর পিঠের আবরণ এবং চামড়াগুলোও বিতরণ করে দিলাম। (সহিহ বুখারি ১৭১৬)

১৭। কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে নাঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

কুরবানী সংক্রান্ত কয়েকটি মাসায়েল

কুরবানী না করে হালাল হওয়া যাবে নাঃ

হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! লোকদের কী হল যে, তারা ‘উমরাহ করে হালাল হয়ে গেল অথচ আপনি ‘উমরাহ হতে হালাল হননি! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো আমার মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং পশুর গলায় কিলাদা ঝুলিয়েছি। তাই কুরবানী না করে আমি হালাল হতে পারি না। (সহিহ বুখারি ১৭২৫)

ব্যতিক্রমি মাসায়েলঃ

১। হাদীর পীঠে সওয়ার হওয় যায়ঃ

*** আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে কুরবানীর উট হাঁকিয়ে নিতে দেখে বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। সে বলল, এ তো কুরবানীর উট। তিনি বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। লোকটি বলল, এ তো কুরবানীর উট। তিনি বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। সহিহ বুখারি ১৬৯০)

মক্কায় নিজে না গিয়ে শুধু হাদী পাঠালে ইহরাম সাব্যস্ত হয় নাঃ

আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদ্বীনা হতে কুরবানীর পশু পাঠাতেন, আমি তার গলায় কিলাদার মালা পাকিয়ে দিতাম। এরপর মুহরিম যে কাজ বর্জন করে, তিনি তার কিছু বর্জন করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৬৯৮)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তিনি সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন। পরে হাদীর পশু তার যথাস্থানে (হারামে) পৌঁছার পূ্ববর্তী সময় পর্যন্ত তিনি ঐ সমস্ত কাজই করতেন, যা একজন হালাল ব্যক্তি করে থাকে। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৬)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তারপর তিনি মদীনায় অবস্থান করতেন, ইহরাম বাঁধতেন না। (অর্থাত ‘ইহরাম বেঁধেছেন’ বলে সাব্যস্ত হত না। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৭)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তারপর তিনি তাঁর হাদীকে তা পরিয়ে (মক্কাভিমুখে) পাঠিয়ে দিতেন। পরে তিনি মদীনায় অবস্থান করতেন এবং মুহরিম যা পরিহার করে, তার কিছুই পরিহার করতেন না। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৮)

মন্তব্যঃ কিলাদা (قِلادة) একটি আবরী শব্দ যার অর্থ নেকলেস, মালা ।

হাদী ছাড়াও অতিরিক্ত কুরবানী করার বিধান

বিজ্ঞ আলিমগণ হজের হাদীকে হাদী ও কুরবানী উভয়টার জন্যই যথেষ্ট হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে কুরবানী করলে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। হাজী যদি মুকীম হয়ে যায় এবং নেসাবের মালিক হয়, তার ওপর ভিন্নভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব বলে ইমাম আবূ হানীফা রহ. মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে হাজী মুকীম না মুসাফির, এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও বাস্তবে হাজী সাহেবগণ মুকীম নন। তারা তাদের সময়টুকু বিভিন্নস্থানে অতিবাহিত করেন। তাছাড়া দো‘আ কবুল হওয়ার সুবিধার্থে তাদের জন্য মুসাফির অবস্থায় থাকাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

৪। অজানা ভুলের জন্য দম দেয়ার বিধান

হজকর্ম সম্পাদনের পর কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন যে কে জানে কোথাও কোনো ভুল হল কি-না। অনেক গ্রুপ লিডার হাজী সাহেবগণকে উৎসাহিত করেন যে ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে তাই ভুলের মাশুল স্বরূপ একটা দম দিয়ে দিন। নিঃসন্দেহে এরূপ করা শরীয়ত পরিপন্থি। কেননা আপনি ওয়াজিব ভঙ্গ করেছেন তা নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা হওয়া ছাড়া নিজের হজকে সন্দেহযুক্ত করছেন। আপনার যদি সত্যি সত্যি সন্দেহ হয় তাহলে বিজ্ঞ আলেমগণের কাছে ভাল করে জিজ্ঞেস করবেন। তারা যদি বলেন যে, আপনার ওপর দম ওয়াজিব হয়েছে তাহলে কেবল দম দিয়ে শুধরিয়ে নেবেন। অন্যথায় নয়। শুধু সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে দম দেওয়ার কোনো বিধান ইসলামে নেই। তাই যে যা বলুক না কেন এ ধরনের কথায় মোটেও কর্ণপাত করবেন না। অনেক এটাকে দমে-খাতা ভুলের মাশুল বলা হয়।

হজ্জের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাঃ

হাজ্জিগণ হজ্জের কার্যক্রমের একটি ধারাবাহি কাজ করে থাকে। মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার পর তার সামনে চারটি তিনটি ওয়াজিব ও একটি ফরজ কাজ থাকে। অর্থাৎ মিনায় এসে তিনি প্রথম বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন তারপর কুরবাণী করবেন। কুরবাণী আদায়ের পরই তিনি মাথা মুন্ডন করার মাধ্যমে ইহরাম ত্যাগ করে হালাল হয়ে যাবেন। হালাল হওয়ার পরও তাওয়াফ করা যায়। তবে মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার দিনে না পারলে পরবর্তী ২ দিনের মধ্যে বা অন্য যে কোন সময় করলেও চলবে। হানাফি মাযহাবের মতে হজ্জের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ওয়াজিব। অর্থাৎ কুরবাণী করার আগে মাথা মুন্ডান বা চুল ছোট করা যাবেনা। তাদের দলিলঃ

মহান আল্লহ কালাম।মহান আল্লাহ বলেন,

*وَأَتِمُّواْ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ*

অর্থঃ আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজ্জলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। ( সুরা বাকারা ২:১৯৬ )

মন্তব্যঃ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির আহসানুল বায়ান লিখেনঃ

যদি পথে শত্রু অথবা কঠিন অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে একটি পশু, উট অথবা গরু (গোটা অথবা এক সপ্তমাংশ) অথবা ছাগল বা ভেড়া সেখানেই যবেহ করে মাথা নেড়া করে হালাল হয়ে যাও। যেমন, নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ হুদাইবিয়্যাতে কুরবানী যবেহ করেছিলেন। আর হুদাইবিয়্যা হারাম সীমানার বাইরে। অতঃপর আগামী বছরে তার কাযা কর। যেমন, নবী করীম (সাঃ) সন ৬ হিজরীর উমরার কাযা সন ৭ হিজরীতে করেছিলেন। আর এর সম্পর্ক হল নিরাপদ পরিস্থিতির সাথে। অর্থাৎ, নিরাপদ অবস্থায় ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা নেড়া করবে না (ইহরাম খুলে হালাল হবে না), যতক্ষণ না হজ্জের সমস্ত কার্যাদি পূরণ করেছ। (তাফসিরে আহসানুল বয়ান সুরা বাকারার ১৯৬ আয়াতের ব্যাখ্যা)

তাই হানাফি মাযহাবের ফিকাহবিদগন মনে বলে থাকেন, যদি কেই কুরবানির আগে মাথা মুন্ডন করে তবে তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর প্রখ্যাত দুই ছাত্র ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. ১০ যিলহজের কাজসমূহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলেও দম ওয়াজিব হবে না বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। (বাদায়েউস্সানায়ে  ২/১৫৮)

অপর পক্ষে নবীজীর বিদায় হজ্জের আমল অনুসারে ১০ যিলহজের ধারাবাহিক আমল হল, প্রথমে কঙ্কর নিক্ষেপ করা, অতপর হাদীর পশু যবেহ করা, এরপর মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করা। এরপর তাওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করা ও সা‘ঈ করা। সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে এ দিনের এই চারটি আমলের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করা তথা আগে-পিছে করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের পরিপন্থি কাজ। তবে যদি কেউ উযর বা অপারগতার কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারে, অথবা ভুলবশত আগে-পরে করে বসে, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ করার সময় সাহাবায়ে কিরামের কেউ কেউ এরূপ আগে-পিছে করেছেন। উযর কিংবা অপরাগতার কারণে সেসবের আলোকে আমল করলে ইনশাআল্লাহ হজের কোনো ক্ষতি হবে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় আর হাদী যবেহ প্রক্রিয়াও অনেক জটিল। তাই বিষয়টিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সহজভাবে দেখেছেন আমাদেরও সেভাবে দেখা উচিত।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আমর ইব্‌নু ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হাজ্জের দিবসে মিনায় লোকদের সম্মুখে (বাহনের উপর) দাঁড়ালেন। লোকেরা তাঁকে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করছিলো। জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো, আমি ভুলক্রমে কুরবানীর পূর্বেই মাথা কামিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ যবেহ করো, কোন ক্ষতি নেই। আর এক ব্যক্তি এসে বললো, আমি ভুলক্রমে কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ কঙ্কর ছুঁড়ো, কোন অসুবিধে নেই। ‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘আমার (রাঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেদিন পূর্বে বা পরে করা যে কোন কাজ সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হচ্ছিলেন, তিনি এ কথাই বলেছিলেন, করো, কোন ক্ষতি নেই। (সহিহ বুখারী ৮৩, ১২৪, ১৭৩৬, ১৭৩৭, ১৭৩৮, ৬৬৬৫)

২. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাজ্জের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞাসিত হলেন। কোন একজন বললো : আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই যবেহ (কুরবানী) করে ফেলেছি। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেনঃ কোন অসুবিধে নেই। আর এক ব্যক্তি বললো, আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি। তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন, কোন ক্ষতি নেই। (সহিহ বুখারি ৮৪, ১৭২১, ১৭২২, ১৭২৩, ১৭৩৪, ৬৬৬৬)

মন্তব্যঃ এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে অনেক সালাফি আলেম হজ্জের সময়ের আমলগুলোর ধারা বাহিকভাবে রক্ষা করার জন্য বাধ্যবাধকতা আরপ করেন না। তারা মনে করেন এর মাধ্যমে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত হয় মাত্র। যা হোক মাসায়েলটি একটু মতভেদ পূর্ন। আশা করি দুটি মতই সঠিক আপনি যে কোনটি আমল করতে পারেন। কিন্তু ইহা নিয়ে বিবেভ সৃষ্টি করা হারাম। সতর্ক হই। আল্লাহু আলাম।

চুল ছোট বা সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন সম্পর্কিত বিধান

চুল ছোট বা সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন সম্পর্কিত বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

চুল ছোট করার চেয়ে সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন করা উত্তমঃ

ইয়াহইয়া ইবনু হুসায়ন (রহঃ) থেকে তার দাদীর সুত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদী) বিদায় হাজ্জকালে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার এবং চুল ছোটকারীদের জন্য একবার দু’আ করতে শুনেছেন। ওয়াকীর “বিদায় হাজ্জ” কথাটুকু উল্লেখ করেননি। (সহিহ মুসলীম ৩০২০ ইফাঃ)

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জকালে নিজের মাথার চুল মুন্ডন করেছেন। (সহিহ মুসলীম ৩০২১ ইফাঃ, সুনানে আবু দাউদ ১৯৭৭)

যেহেতু সহিহ হাদিস প্রমান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জকালে নিজের মাথার চুল মুন্ডন করেছেন। তাই চুল ছোট করার চেয়ে সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন করা উত্তম। অনেক হাজি উত্তম আমলটি না জানার করানে চুল ছোট করে থাকে, যদিও ইহা সুন্নাহ সম্মত আমল।

আরেকটি ভুল হলো কুরবানী করার আগেই মাথার চুল মুন্ডন করা। মিনায় কঙ্কর মারার পর ঐ দিন (১০ জিলহজ্জ) হাদি কুরবানী করার পরই মাথা চুল মুন্ডন যাবে যদি এই দিন হাদি কুরবানী না হয় তবে চুল মুন্ডন যাবে না। সে ক্ষেত্রে পরের দুই দিনের যে কোন দিন হাদি কুরবানী করার পরই মাথা চুল মুন্ডন যাবে। কাজেই হাদি কুরবানী না অন্যের দেখা দেখি ১০ ই জিলহজ্জ মাথা চুল মুন্ডন একটি ভুল আমল। কারন মাথা মুন্ডনের অর্থই হল ইহরাম ত্যাগ করে নিজেকে হালাল করে নেয়া। হাদি কুরবানী করার নিজেকে হালাল করে নেয়া যায় না।

মহিলাদের চুলের সীমাঃ

হজ্জ বা উমরার সময় মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল ছোট করা একটি ওয়াজিব কাজ। পুষের জন্য মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট দুটিই জায়েয তবে মাথা মুন্ডান উত্তম কারন তার মাথা মুন্ডন করেছিলেন। নারীদের জন্য মাথা মুণ্ডন করার অনুমতি নেই। তাদের জন্য অনুমোদিত হল চুল ছোট করা। তবে অগ্রগণ্য মতানুযায়ী মাথার সবগুলো চুল ছোট করা আবশ্যক। এটি মালেকি ও হাম্বলি মাযহাবের অভিমত। যদি কারো মাথার চুলগুলো বেণী করা থাকে তাহলে সবগুলো বেণীর মাথা থেকে কাটবে। যদি বেণী করা না থাকে তাহলে সবগুলো চুল একত্রিত করে সবগুলো চুল থেকে কাটবে। মুস্তাহাব হচ্ছে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ কাটা। এর চেয়ে কমও কাটতে পারেন। যেহেতু চুল কাটার পরিমাণ নির্ধারণমূলক কোন শরয়ি দলিলঃ বর্ণিত হয়নি।

আল-বাযি (রহঃ) ‘আল-মুনতাকা’ গ্রন্থে (৩/২৯) বলেন: পক্ষান্তরে, কোন নারী যখন ইহরাম করার মনস্থ করবেন তখন তিনি তার চুল বেণী করে নিবেন যেন তিনি হালাল হওয়ার জন্য চুল কাটতে পারেন। কী পরিমাণ চুল কাটবেন? ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ। ইবনে হাবিব ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেন যে, আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ কিংবা এর চেয়ে একটু বেশি কিংবা এর থেকে একটু কম। ইমাম মালেক বলেন: আমাদের মাযহাবে এর সুনির্দিষ্ট কোন পরিমাণ নেই। যতটুকু কাটে সেটা জায়েয হবে। তবে, মাথার সবগুলো চুল কাটতে; সেটা লম্বা চুল হোক কিংবা খাটো চুল হোক।

ইবন জুরায়জ (রহঃ) বলেছেন, আমি সাফিয়্যা বিনত শায়বা ইবন উসমান হতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, আমাকে উম্মে উসমান খবর দিয়েছেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন স্ত্রীলোকদের জন্য মাথা মুন্ডনের প্রয়োজন নেই, বরং (এক আঙ্গুল পরিমাণ চুল) কর্তন করবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮০)

ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, স্ত্রীলোকদের জন্য মাথা মুন্ডনের দরকার নেই, বরং তারা (এক আঙ্গুল পরিমান চুল) কর্তন করবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮১)

খাল্লাস (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এই সূত্রে আলী (রাঃ) এর উল্লেখ নাই। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদিসটিকে ইয্তিরাব রয়েছে। হাম্মাদ ইবনু সালাম- কাতাদা -আয়িশা (রাঃ) এ হাদিসটি বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের মাথা মুন্ডনের অনুমতি দেন না। তবে তাদের (ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য) কিছূ চুল ছাটার অভিমত পোষণ করেছেন।  (তিরমিজী হাদিস নম্বর ৯১৭, হাদিসে মান  নির্নিত নয়)

ইমাম আহমাদ বলতেনঃ “চুলের প্রত্যেক বেণী থেকে এক কর পরিমাণ কর্তন করবে।” এটি ইবনে উমর (রাঃ), শাফেয়ি, ইসহাক, আবু সাওর প্রমুখের অভিমত। আবু দাউদ বলেন, “আমি ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। নারীরা কি সম্পূর্ণ মাথার চুল ছোট করবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। মাথার সবগুলো চুলকে সামনের দিকে এনে চুলের আগা থেকে আঙ্গুলের কর পরিমাণ কর্তন করবে। (ফতোয়াতে উসায়মিন রাহিঃ)

কাজেই নারীদের মাথার যে কোন স্থান থেকে সামান্য চুল ছোট করলেই হবে না। সম্পুর্ণ মাতা থেকে সমান করে আঙ্গুলের এক করের কিছু কম বেশী চুল ছোট করতে হবে।

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার ভুল-ত্রুটিঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! মাথা মুন্ডুনকারীদের ক্ষমা করুন। সাহাবীগন বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! মাথা মুন্ডুনকারীদেরকে ক্ষমা করুন। সাহাবীগন বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি তিনবার বলেন, এরপর বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদেরকেও। (সহিহ বুখারী ১৬২০ ইফাঃ)

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার উমরা বা হজ্জের একটি ওয়াজিব কাজ। এই কাজ না করলে উমরা বা হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। উমরা বা হজ্জ আদায়ে পর, হালাল হওয়ার পূর্বে সম্পুর্ণ মাথার চুল মুন্ডুন করতে হবে। আর যদি কেউ চুল ছোট করতে চায় তবে তাকে সম্পূর্ণ মাথা পরিব্যাপ্ত করে ছোট করতে হবে। কিছু কিছু লোক মাথার কিয়দাংশ খুর দিয়ে ভালভাবে মুণ্ডন করে; বাকীটুকু রেখে দেয়। এই সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে তারা মনে করে থাকে যে,  যেহেতু তারা উমরা ও হজ্জ একত্র করবে তাই উমরা সময় অর্ধেক মুণ্ডন করব আর হজ্জ করার পর বাকী অর্ধেক মুন্ডন করব। এটি অজ্ঞতা ও গোমরাহি। আবার অনেক আছে যারা অজ্ঞতার কারনে সম্পূর্ণ মাথা পরিব্যাপ্ত না করেই ছোট করে থাকে। মাথার কোন একটি অংশ থেকে কিছু চুলের আগা কেটে বলে থাকে চুল ছোট করছে। তাদের এই আমল কুরআনের এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاء اللَّهُ آمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُؤُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ

অর্থঃ আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। (সুরা ফাতাহ ৪৮:২৭)

অতএব, চুল ছোট করার প্রভাবটা মাথার উপর স্পষ্টভাবে দেখা যেতে হবে। সবাই জানে যে, সামন্য কিছু চুল কাটলে সেটা কোন প্রভাব ফেলে না বিধান সামান্য চুল কাটা এই আয়াতের বাহ্যিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই যদি মুণ্ডন করতে চায় তাহলে গোটা মাথার চুল মুণ্ডন করবে। আর যদি চুল ছোট করতে চায় তাহলে সম্পূর্ণ মাথার চুল ছোট করবে।

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট না করেই হালাল হয়ে যাওয়াঃ

উমরা বা হজ্জের সময় তাওয়ার ও সাঈ আদায়ে পর মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার ওয়াজিব কাজ। কিন্তু অনেকে এই কাজটি না করেই বাসায় গিয়ে স্বাভাবিক কাপড় চোপড় পরে। তার পর সুবিধা জনক সময় মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করে থাকে। অথচ সঠিক সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো ইহরামের কাপড় গায়ে থাকা অবস্থায় মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করা। মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার পরই ইহরামের কাপড় খুলে হালাল হতে হবে। যেমনঃ

জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ হজ্জের ইহরাম বাঁধেন। কিন্তু তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত আর কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর এ সময় আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে আগমন করেন এবং তার সাথেও কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরূপ ইহরাম বেঁধেছেন আমিও সেরূপ ইহরাম বাঁধলাম।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন এটাকে উমরায় পরিণত করে এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে এবং মস্তক মুন্ডনের (বা চুল ছোট করে কর্তনের) পর হালাল হয়। অবশ্য যাদের সাথে কুরবানীর পশু আছে তারা ব্যতীত। তারা বলেন, আমরা মিনার দিকে এমন অবস্থায় যাই যে আমরা স্ত্রী সহবাস করেছি। এই কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, আমি যা পরে অবহিত হয়েছি যদি তা পূর্বে অবগত হতে পারতাম তবে আমি সাথে করে কুরবানীর পশু আনতাম না। আর আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি অবশ্যই ইহরাম খুলে ফেলতাম।

এ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, চুল ছোট করা ছাড়া হালাল হওয়া যাবে না। কিন্তু অজ্ঞতাবশতঃ মাথা মুণ্ডন করা কিংবা চুল ছোট করার আগে এই মনে করে হালাল হয়ে গেছে যে, এটি জায়েয তাহলে তার অজ্ঞতার কারণে কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু, জানার সাথে সাথে তাকে স্বাভাবিক কাপড়-চোপড় খুলে ইহরামের কাপড় পরতে হবে। কেননা, সে হালাল হয়নি এ কথা জানার পর আর গড়িমসি করা জায়েয হবে না। অতঃপর সে মাথা মুণ্ডন করা কিংবা চুল ছোট করার পর হালাল হবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৭৮৯)

আইয়ামুততাশরীকে মিনায় রাত্রীজাপন না করাঃ

আইয়ামুত-তাশরীক বলা হয় কুরবানির পরবর্তী তিন দিনকে। অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের এগারো, বারো ও তেরো তারিখকে আইয়ামুত-তাশরীক বলা হয়। তাশরীক শব্দের অর্থ শুকানো। মানুষ এ দিনগুলোতে গোশত শুকাতে দিয়ে থাকে বলে এ দিনগুলোর নাম ‘আইয়ামুত-তাশরীক’ বা ‘গোশত শুকানোর দিন’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকির ও তার শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَاذْكُرُواْ اللّهَ فِي أَيَّامٍ مَّعْدُودَاتٍ فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلاَ إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلا إِثْمَ عَلَيْهِ

অর্থঃ আর স্মরণ কর আল্লাহকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি দিনে। অতঃপর যে লোক তাড়াহুড়া করে চলে যাবে শুধু দুদিনের মধ্যে, তার জন্যে কোন পাপ নেই। আর যে লোক থেকে যাবে তাঁর উপর কোন পাপ নেই, অবশ্য যারা ভয় করে। (সুরা বাকারা ২:২০৩)

আইয়ামুততাশরীক হল ১১, ১২ ও ১৩ ই যিলহজ্জ। এই সময় মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এটা বাদ গেলে দম দিতে হবে। কিন্তু হানাফি ওলামাগন মিনায় অবস্থান কে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলে থাকেন। উপরের আয়াতের আলোকে অনেকে আলেম মনে করে থাকেন আইয়ামুত-তাশরীকে মিনা থেকে মক্কার দিকে ১২ই বা ১৩ যিলহজ্জ যেদিনেই ফিরে আসা হোক না কেন তাতে কোন ক্ষতি নেই। এই দিনগুলোতে আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতে হবে। কোন প্রকারে উৎসব অনুষ্ঠান বা মেলায় ঘুরে ফূর্তি সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।

মন্তব্যঃ আইয়ামুত-তাশরীকের প্রথাধ ভুল হল বীনা ওজরে মিনায় রাত্রীজাপন না করে মক্কায় অবস্থান করা।

কুরবানীর ভুল ত্রুটিঃ

হারাম সীমানার বাইরে হাদী জবেহ করা যাবে না। কাজেই মক্কা ও মিনার হামার সীমানা জেনে হাদি জবেহ করা উচিত। এ ক্ষেত্র হজ্জের সময় যে মুয়াল্লিম থাকবে তার সাহায্য নিতে হবে। তা হলে আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। হাদি কুরবানির জন্য উপযুক্ত কিনা তা যাচাই না করে জবেহ করা। কারন হাদিসে বর্ণিত চারটি খুত থাকল হাদি কুরবানি হবে না।

হজ্জের সফরের অধিকাংশ মুয়াল্লামি থাকে ব্যবসায়ী। এই সফরে একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারবেন আপনার সাথী মুয়াল্লিম ব্যক্তি কেমন। যদি মনে করে তার উপর আস্থা রাখা যায় তবে নিজে না গিয়ে তার মাধ্যমে হাদি জবেহ করাতে পারেন। আর যদি মনে করেন তিনি অথটা আস্থা ভাজন ব্যক্তি নয় তবে নিজে গিয়ে হাদির জবেহের ব্যবস্থা করবেন। কারন অনেক মুয়াল্লিম অসত হয়, তারা হাদি জবেহ না করেই, জবেহ হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়। দশ জনের টাকা নিয়ে পাঁচটি হাদি জবেহ করই বলে দেয় সবার হাদি জবেহ হয়েছে। পাঁচ শত রিয়েলের চুক্তি করে দুই/তিন শত বিয়েলের হাদি জবেহ করে। তবে হ্যা, সে যদি বলে আমি হাদি কুরবানী বাবত এক/দুই শত রিয়েল নিব আর হাদি বাবদ যা আসে আপনার তবে ঠিক আছে। কিন্তু যদি বলে সচ্ছতার অভাব থাকে তবে মুয়াল্লীম গুনাগার হবে। এই জন্যই বলেছি, মুয়াল্লিম আস্থা ভাজন ব্যক্তি হলে আর চিন্তা করার দরকার নাই। যদি মনে করেন তাও সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্র সৌদি হজ্জ কমিটির অধিনে নির্ধিষ্ট টাকা জনা দিলে, তারা আপনার হাদি যবেহের ব্যবস্থা করবেন। এ ক্ষেত্র একটা ভুল হয়ে থাকে। অনেক হাদি যবেহ হওয়ার আগেই মাথার মুন্ডন করে ফেলে। এই জন্য আপনাকে মেসেস বা অন্য কোন মাধ্যমে আপনাকে জানান হবে যে, আপনার হাদি জবেহ করা হয়েছে। এরপরই আপনি মাথার মুন্ডন করতে পারবেন।

বর্তমানে যারা প্রবাসী হিসাবে হজ্জ করে থাকেন তাদের গোশত পাক করে খাওয়া বা সংরক্ষন করে রাখার কোন ব্যবস্থা নাই তাই তারা হাদির গোসত নিয়ে বিপাকে পরে যায়। মক্কায় বর্তমানে ফকির মিসকিন পাওয়াও খুব কষ্টের ব্যপার। তাই এই অনেক হাদির গোশত ফেলে দেন যা একটি ভুল আমল। তাই যদি কেউ নিজে না খেতে পারে বা ফকির মিসকিনকে দিতে না পারে, সে কেত্রে কয়েক রিয়েল খরচ করে সরকারি কসাই খানায় জবেহ করে, সম্পূর্ণ গোশত তাদের হাওলায় ছেড়ে দিতে পারেন। আশা করি তারা একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন।

অনেক হাজি সাহেব মুজদালিফায় রাত্রি জাপন করে, মিনায় গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ না করে, নিজেদের তাবুতে যায়। তারা ভাবেন এই সময় ভিড় থাকবে, তাই একটু পরে আসানের সাথে গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। এটা কোন ভুল আমল নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হাদি জবের আগেকটি ভুল আমল হলো, তারা কঙ্কর নিক্ষেপ করার আগেই সুযোগ বুঝে হাদি জবেন করেন। সহিহ সুন্নাহ হলো কঙ্কর নিক্ষেপের পরই হাদি জবেহ করতে হবে।

স্ত্রীদের পক্ষ হতে তাদের আদেশ ছাড়াই স্বামী কর্তৃক গরু কুরবানী করা।

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, যিল-কা’দাহ মাসের পাঁচ দিন বাকী থাকতে আমরা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। হজ্জ আদায় করা ব্যতীত আমাদের অন্য কোন ইচ্ছা ছিল না। যখন আমরা মক্কার কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদেশ করলেনঃ যার সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই সে যেন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করে হালাল হয়ে যায়। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, কুরবানীর দিন আমাদের কাছে গরুর গোশ্‌ত আনা হলে আমি বললাম, এ কী? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে কুরবানী করেছেন। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, উক্ত হাদীসখানা কাসিমের নিকট আলোচনা করলে তিনি বললেন, সঠিকভাবেই তিনি হাদীসটি তোমার কাছে বর্ণনা করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭০৯)

কুরবানীর গোশ্‌ত সঞ্চয় করে রাখা যাবেঃ

জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানীর গোশ্‌ত মিনা’র তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেনঃ খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি ‘আত্বা (রহঃ)-কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদীনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারি ১৭১৯

মাথা মুণ্ডানোর পূর্বে কুরবানী করা।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সে ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল, যে মাথা কামানোর আগে কুরবানী অথবা অনুরূপ কোন কাজ করেছে। তিনি বললেনঃ এতে কোন দোষ নেই, এতে কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৭২১)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হল, সন্ধ্যার পর আমি কঙ্কর মেরেছি। তিনি বললেনঃ কোন দোষ নেই। সে আবার বলল, কুরবানী করার আগেই আমি মাথা কামিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ এতো কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৭২৩)

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলতেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জের সময় তাঁর মাথা কামিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৭২৬)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহম করুন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যারা মাথার চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহম করুন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। এবার আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। লায়স (রহঃ) বলেন, আমাকে নাফি’ (রফ.) বলেছেন, আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, এ কথাটি তিনি একবার অথবা দু’বার বলেছেন। রাবী বলেন, ‘উবায়দুল্লাহ (রহঃ) নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন, চতুর্থবার বলেছেনঃ চুল যারা ছোট করেছে তাদের প্রতিও। (সহিহ বুখারি ১৭২৭)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের ক্ষমা করুন। সাহাবীগণ বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করুন। সাহাবীগণ বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথাটি তিনবার বলেন, এরপর বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদের উপরও। (সহিহ বুখারি  ১৭২৮)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) ও মু’আবিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একটি কাঁচি দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুল ছোট ছোট করে দিয়েছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৭৩০)

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আ করলেন : হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমাত বর্ষণ করুন। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের? তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমাত বর্ষণ করুন। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের? এবার তিনি বললেনঃ এবং চুল খাটোকারীদের প্রতিও। আবু দাউদ ১৯৭৯

তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদা মাধ্যমে হজ্জের পরিসমাপ্তি করা

তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদা মাধ্যমে হজ্জের পরিসমাপ্তি করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদা হলো হজ্জের মুল তাওয়াফ। সকল হজ্জকারীকেই এ তাওয়াফটি আদায় করতে হয়। এটা হল হজ্জের ফরজ তাওয়াফ যা বাদ পড়লে হজ্জ সম্পন্ন হবে না। তাওয়াফে ইফাযা  মাধ্যমেই হজ্জের পূর্ণতা লাভ করে। তওয়াফে ইফাযাকে তাওয়াফে জিয়ারতও বলা হয়। আবার অনেকে এটাকে হজের তাওয়াফও বলে থাকেন। এটি না হলে হজ শুদ্ধ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾

অর্থঃ তারপর তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে। (সুরা হজ্জ ২২:২৯)

তাওয়াফে ইফাদার সময়ঃ

তাওয়াফে ইফাদার জন্য সর্বোত্তম সময় হলো কুরবানীর দিন কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানী এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার পর। তাওয়াফে ইফাযার সর্বপ্রথম জায়েয সময় হচ্ছে, কুরবানীর দিন মধ্যরাত থেকে। অথবা (কঙ্কর নিক্ষেপের প্রথম ওয়াক্ত সংক্রান্ত আলিমদের ভিন্ন মতের ভিত্তিতে) ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পর থেকে। মোট কথা, জিলহজ্জে ০৯ তারিখ আরাফার কাটানোর পর ১০ মিনায় এসে জামারায় পাথর নিক্ষেপের পরই এই তাওয়াফে ইফাদা বা জিয়ারত আদায় করা হয়। জমহুর ফুকাহার নিকট ১৩ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বে সম্পন্ন করা ভাল। এর পরে করলেও কোনো সমস্যা নেই। সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ) এর নিকট তাওয়াফে  ইফাদা আদায়ের সময়সীমা উন্মুক্ত। ইমাম আবু হানিফা (র) এর নিকট তাওয়াফে জিয়ারত আদায়ের ওয়াজিব সময় হল ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এ সময়ের পরে তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করলে ফরজ আদায় করলে ফরজ আদায় হয়ে যাবে তবে ওয়াজিব তরক হওয়ার কারণে দম দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে হবে। উত্তম হলো, তাওয়াফে ইফাযা বিলম্বিত না করা ১২ তারিখের মধ্যে আদায় করা। উযর ছাড়া যিলহজের পর পর্যন্ত তাওয়াফে ইফাযা বিলম্বিত করা জায়েয হবে না। হাজী সাহেবদের কেউ যদি বিদায় মুহূর্ত পর্যন্ত তাওয়াফে ইফাদা বিলম্বিত করে, তবে তাওয়াফে ইফাদার সাথে তার বিদায়ী তাওয়াফও আদায় হয়ে যাবে। তাকে আর বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে না।

তাওয়াফে ইফাদার আগে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল নয়ঃ

অনেকে মনে করে কঙ্কর নিক্ষেপ, হাদী জবেহ, মাথা মুণ্ডন অথবা চুল ছোট করার পর ইহরামের পোশাক পাল্টে হালাল হলেই স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল হয়ে যায়। তাদের ধারনা ভুল, তাওয়াফে ইফাদার বা জিয়ারত আদায়ের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল হয় না। ঐ তিন কাজে (কঙ্কর নিক্ষেপ, হাদী জবেহ, মাথা মুণ্ডন) পর তাওয়াফে ইফাদা করলে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের জন্য হালাল হয়ে যায়।

দলিলঃ

উম্মু সালামাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার পালার রাতটি ছিলো কুরবানীর দিন সন্ধ্যায়। সুতরাং সেদিন তিনি আমার কাছে ছিলেন। এ সময় ওয়াহব ইবনু যাম‘আহ এবং তার সাথে আবূ উমায়্যাহ পরিবারের জনৈক ব্যক্তি উভয়েই জামা পরিহিত অবস্থায় আমার নিকট প্রবেশ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াহবকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আবূ ‘আব্দুল্লাহ! তুমি কি তাওয়াফে ইফাদা সম্পন্ন করেছো? সে বললো, না, আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি তোমার জামা খুলে ফেলো। উম্মু সালামাহ (রাযি.) বলেন, তিনি মাথার দিক থেকে তা খুললেন এবং তার সাথীও মাথার দিক থেকে তার জামা খুললো।

অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ রাসূল! এরূপ করার কারণ কি? তিনি বললেনঃ আজকের দিনে তোমাদের জন্য বিধান শিথিল হয়েছে। তোমরা যখন জামরায় কংকর মেরে, কুরবানী সম্পন্ন করে চুল মুড়াবে, তখন একমাত্র স্ত্রীসহবাস ছাড়া এ পর্যন্ত ইহরামের কারণে যা কিছু তোমাদের জন্য হারাম ছিলো তা হালাল হবে। আর যদি আজকে বায়তুল্লাহ তাওয়াফের আগে রাত হয়ে যায় তাহলে তাওয়াফ করা পর্যন্ত তোমরা অনুরূপভাবে ইহরাম অবস্থায় থেকে যাবে, যেভাবে ছিলে জামরায় কংকর মারার আগে। (সুনানে আবু দাইদ ১৯৯৯)

ঋতুবতী মহিলার তাওয়াফে ইফাদাঃ

ঋতুবতী মহিলা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাওয়াফ করবে না। তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্য সব বিধান যেমন আরাফায় অবস্থান, মুযদালিফায় রাত্রিযাপন, কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানী ও দো‘আ-যিকর ইত্যাদি সবই করতে পারবে। কিন্তু স্রাব বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাওয়াফ করতে পারবে না। স্রাব বন্ধ হলে তাওয়াফে জিয়ারত সেরে নেবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো দম দিতে হবে না। আর যদি ঋতুবতী মহিলা পবিত্র হওয়া পর্যন্ত কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণে তাওয়াফে ইফাদার জন্য অপেক্ষা করতে না পারে এবং পরবর্তীতে তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করে নেয়ারও কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে সে গোসল করে ন্যাপকিন বা এ জাতীয় কিছুর সাহায্য নিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করে তাওয়াফ করে ফেলবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কাউকে তার সাধ্যাতীত কাজের আদেশ করেন না। ইবন তাইমিয়া (রহঃ) বলেন, এর জন্য সে মহিলার ওপর কোন দম ওয়াজিব হবে না। তবে মুজতাহীদ  আলেমগণ মনে করেন যে, শারীরিক ক্ষতি না হয় এমন ওষুধ ব্যবহারের মাসিক স্রাব বন্ধ বা বিলম্ব করে তাওয়াফে ইফাযা সম্পর্ক করা জায়েয আছে।

তাওয়াফে ইফাদাতে রমল নাইঃ

হজ্জের সফরে তাওয়াফে কুদুম বা আগমণী তাওয়াফে শুধু রমল করতে হয়। আর কোন প্রকার তাওয়াফে রমন নাই। তাই তাওয়াফে ইফাদাতে রমল নাই।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের সাত চক্করের একটিতেও রমল করেননি। (সুনানে আবু দাউদ ২০০১)

২. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারার সাত চক্করে রমল (বাহু দুলিয়ে বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপ) করেননি। আতা (রহঃ) বলেন, তাওয়াফে যিয়ারাতে রমল করতে হয় না। (ইবনে মাজাহ ৩০৬০)

তাওয়াফে বিদাঃ

বায়তুল্লাহ শরীফ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় যে তাওয়াফ করা হয় তাকে তাওয়াফে বিদা বলে। এই তাওয়াফটি বহিরাগত হাজ্জিদের জন্য মুজতহীদ আলেমগণ ওয়াজিব বলে গন্য করেছেন। কাজেই যারা মিনায় আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলি অবস্থান শেষ করবেন, তারা সরাসরি নিজ নিজ দেশে চলে যেতে পারবেন না। কেননা, কাবাঘরের শেষ ওয়াজিব তাওয়াফটি এখনও বাকি আছে। তবে মক্কাবাসিগন মিনা থেকে সরাসরি তাদের বাড়িতে চলে যেতে পারবেন। কেননা তাদের তাওয়ায়ে বিদা করতে হয় না। কিন্তু বহিরাগত হাজ্জিগন মক্কা হয়ে বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করে নিজ নিজ বাস স্থানে ফিরবেন। এই তাওআফের মাঝেই বহিরাগত হাজ্জিগন তাদের হজ্জ শেষ করে মক্কা থেকে প্রস্থানের অনুমতি পায়। 

বহিরাগত হাজিদের জন্য বিদায়ি তাওয়াফ ওয়াজিবঃ

বিদায়ি তাওয়াফের পূর্বেই হজ্জের সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে বহিরাগত হাজিদের জন্য বিদায়ি তাওয়াফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিদায়ী তাওয়াফ আদায় করা হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব হিসাবে গন্য করা হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্ন পথ দিয়ে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেন শেষবারের মতো বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফ না করা পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন না করে।” (সহিহ মুসলিম ৩১১১)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা তাওয়াফে যিয়ারাত সম্পন্ন করে মক্কার চতুর্দিক দিয়ে চলে যাচ্ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করলেনঃ তোমাদের কেউ যেন শেষ বারের মতো বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে চলে না যায়। (সুনানে আবু দাউদ ২০০২)

বিদায়ী তাওয়াফ কি হজ্জের অংশ?

আমরা জানি, বিদায়ী তাওয়াফ কেবল বহিরাগতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মক্কায় বসবাসকারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেহেতু মক্কায় বসবাসকারী হাজিদের জন্য প্রযোজ্য নয়, তাই এ তাওয়াফ হজ্জের অংশ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেননা হজ্জের অংশ হলে মক্কাবাসী এ থেকে অব্যাহতি পেত না। আবার উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই (রাঃ) ত্বওয়াফে ইফাযাহ্ করার পর হায়যগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাকে বিদায়ী তাওয়াফ না করেই মক্কা ত্যাগের অনুমিত প্রদান করেন। যদি হজ্জের অংশ হত তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এই তাওয়াফ সম্পন্ন না করে মক্কা ত্যাগ করেত দিতেন না। তাওয়াফে ইফাদা বা হজ্জের ফরজ তাওয়াফে কোন প্রকার ছাড় দেয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ নাই। কেননা তাওয়াফে ইফাদা হজ্জের অংশ।

দলিলঃ

১. আবূ সালামাহ্ ও ‘উরওয়াহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যাহ্ বিনতু হুয়াই (রাঃ) ত্বওয়াফে ইফাযাহ্ করার পর হায়যগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। ‘আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, আমি তার হায়িযের কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উল্লেখ করলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ সে কি আমাদেরকে আটকিয়ে রাখবে? ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সে ত্বওয়াফে ইফাযাহ্ করার পর হায়যগ্রস্ত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে সে রওনা হতে পারে। (সহিহ মুসলিম ৩১১৩)

২. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহধর্মিণী সাফিয়্যা বিনত হুয়াই (রাঃ) ঋতুবর্তী হলেন এবং পরে এ কথাটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে অবগত করানো হয়। তখন তিনি বললেনঃ সে কি আমাদের যাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে? তারা বললেন, তিনি তো তাওয়াফে যিয়ারাহ্ সমাধা করে নিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে তো আর বাধা নেই। (সহিহ বুখারি ১৭৫৭, আবু দাউদ ২০০৩)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাওয়াফে যিয়ারাহ্ আদায় করার পর ঋতুমতী মহিলাকে রওয়ানা হয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৭৬০)

৪. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ লোকদেরকে (প্রত্যাবর্তনকালে) শেষবারের মত বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঋতুবতী মহিলাদেরকে তা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম ৩১১২)

মন্তব্যঃ সারকথা হলো, ঋতুবর্তী মহিলা যারা তাওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করে ফেলেছেন, তাদের জন্য সম্ভব হলে পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন এবং পবিত্রতা অর্জন শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। এটাই উত্তম। অন্যথায় তাদের থেকে এই তাওয়াফ রহিত হয়ে যাবে।

বিদায়ী তাওয়াফের পদ্ধতিঃ

বিদায়ী তাওয়াফ অন্য তাওয়াফের মতই। তবে এ তাওয়াফ সাধারণ পোশাক পরেই করা হয়। তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করতে হয়। এর সাতটি চক্করে কোন রমল এবং ইযতিবা কিছুই নেই। তাওয়াফ শেষ করার পর দু’রাক‘আত তাওয়াফের সালাত আদায় করতে হবে। মাকামে ইবরাহীমের সামনে সম্ভব না হলে হারামের যেকোনো জায়গায় আদায় করবেন। এ তাওয়াফের পর কোন সা‘ঈ নেই। অনেক এখানে উল্টা পায়ে বা পিছের দিকে হাটি যা মুলত বিদআত। এতদিন স্বাভাবিক যেভাবে কাবাঘর থেকে ফিরেছেন আজও ঠিক সেই ভাবে ফিরবেন। তবে নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করে ফিরে আসাতে মনের মাঝে একটু কষ্ট আসতেই পারে। এতে কোন সমস্যা নাই। কেননা, কাবার মহব্বত তো মহান আল্লাহ জন্য।

মন্তব্যঃ হাজী সাহেবদের সর্বশেষ আমল হবে এই তাওয়াফ। এই তাওয়াফের পর আর দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করা যাবে না। করলে পুনরায় বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে। তবে যদি সামান্য সময় অবস্থান করে, যেমন কোন সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা, খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ের জন্য অপেক্ষা কিংবা উপহার সামগ্রীর জন্য অপেক্ষা।

ঘ। মক্কাবাসিদের জন্য বিদায়ি তাওয়াফ নাইঃ

ক্কার বাসিন্দাদের উপর বিদায়ী তাওয়াফ নেই। কারণ বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব হয় বায়তুল্লাহকে বিদায় জানানোর কারণে। এই কারণ মক্কাবাসীদের মধ্যে পাওয়া যায় না। যেহেতু মক্কা তাদেরই দেশ। বিদায়ী তাওয়াফ যে হজ্জের রুকন নয় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া সে কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, এ কারণে মক্কাবাসীর উপর তাওয়াফে কুদুম ও তাওয়াফে বিদা’ (বিদায়ী তাওয়াফ) নেই। যেহেতু তাদের ক্ষেত্রে এ কার্যকারণ অনুপস্থিত। কারণ তারা তো মক্কার দিকে আগমন (কুদুম) করে আসেনি। কিংবা মক্কাকে বিদায় (বিদা’) দিয়েও যাবে না। যেহেতু তারা সেখানেই থাকে। (মাজমুউল ফাতাওয়া (২৬/২৬১)

শাইখ বিন বায (রহঃ) বলেন, মক্কাবাসীর উপর বিদায়ী তাওয়াফ নেই। (ফাতাওয়া ১৭/৩৯৩)

হারামের ভেতরে অবস্থানকারী সকলের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য।

ইবনে কুদামা বলেন: যার গৃহ হারাম এলাকার ভেতরে সে মক্কাবাসী; তার উপর বিদায়ী তাওয়াফ নেই। (আল-মুগনি (৩/২৩৭)

কিন্তু কোন মক্কাবাসী যদি হজ্জ আদায় করার পরপর মক্কা ছেড়ে চলে যেতে চায় তাহলে মক্কা থেকে বের হওয়ার পূর্বে তাকে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে।

ইমাম নববি (রহঃ) বলেন: আমাদের মাযহাবের আলেমগণ বলেন, যে ব্যক্তি হজ্জ শেষ করার পর মক্কাতে অবস্থান করার নিয়ত করেছে তার উপর বিদায়ী তাওয়াফ নেই। এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। হোক না এ ব্যক্তি মূলত মক্কার অধিবাসী কিংবা ভিনদেশী। আর যদি মক্কা থেকে তার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য অথবা অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য বের হতে চায় তাহলে সে বিদায়ী তাওয়াফ করবে। (আল-মাজমু ৮/২৫৪]

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন: যদি কোন মক্কাবাসী হজ্জ আদায় করে হজ্জের পরপর সফর করতে চান তাহলে তিনি বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে বাণী: “তোমাদের কেউ বের হবে না যতক্ষণ না তার সর্বশেষ আমল হয় বায়তুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত”[সহিহ মুসলিম (১৩২৭)] এটি একটি আম বা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সাধারণ দলিল। অতএব, আমরা মক্কাবাসীকে বলব: আপনি যেহেতু হজ্জের দিনগুলোতে সফর করছেন এবং আপনি হজ্জও আদায় করেছেন সুতরাং আপনি বিদায়ী তাওয়াফ না করে সফর করবেন না। (ফাতাওয়া ২৩/৩৩৯)

আল্লাহই ভাল জানেন। (ফতোয়াটির উৎসঃ (https://islamqa.info) ইসলামি প্রশ্ন উত্তর, প্রশ্ন নম্বর ৪১৮৯৪)

হজ্জের পরিসমাপ্তিঃ

হজ্জ সম্পন্ন করার পর আপনি যতো বেশি পারেন মসজিদুল হারামে ফরয, সুন্নাত, নফল, জানাযা, চাশত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন এবং নফল তাওয়াফ করুন। নফল তাওয়াফ করার নেকী অনেক অনেক বেশি। হজ্জের পর যদি আপনার বাড়ি ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট থাকে তবে বিদায় তাওয়াফ করে ফ্লাইট ধরুন। আর যদি ফ্লাইট একটু দেরী হয় তবে হজ্জের পরও আপনি কিছু ইসলামিক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখে আসতে পারেন। আপনি এ সময়ে কিছু কেনাকাটাও করতে পারেন। আর যদি মদিনা আগে না গিয়ে থাকের তবে বিদায়ী তাওয়াফ করে মদিনার পথে রওয়ানা হবেন। এই তাওয়াফে ইফদার মাধ্যমে হজ্জের কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমের বহিরাগত হাজ্জিদের এ হজ্জ ও মক্কার কার্যক্রমের পরিসমাপ্তি ঘটে। এবার যার যার বাড়ি ফেরার পালা। সবাই সুবিধা মত বাড়িতে ফিরবেন কিন্তু এই মুহুর্তে মহান আল্লাহ একটি হুকুম আছে। মহান আল্লাহ হজ্জের কার্যাদি সম্পন্ন করার পর অধিক পরিমাণে জিকির ও ইস্তিগফার করার নির্দেশ প্রদান করছেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

*فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُواْ اللّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا فَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلاَقٍ*

অর্থঃ আর অতঃপর যখন হজ্জ্বের যাবতীয় অনুষ্ঠান ক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদের কে। বরং তার চেয়েও বেশী স্মরণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে পরওয়াদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই। (সুরা বাকারা ২:২০০)

এই আয়াতের আদেশ মত নিজ নিজ বাড়ি ফেরার শুরু থেকেই মহান আল্লাহকে সব সময় স্মরনে রাখতে হবে। এই লক্ষে সফরের শুরু থেকেই স্থান ও কালভেদে দোয়া গুলো পড়া শুরু করি। এই কাজটি সারা জীবন চালিয়ে যাওয়ার নিয়ত করি। সফরসঙ্গী ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সদয় ও উন্নত আচরণ করবেন। যদি তাদের রীতি এমন হয়ে থাকে যে, সেখানে হাদিয়া নিয়ে যেতে হয়, তাহলে তাদের মনোতুষ্টির জন্য হাদিয়া নিয়ে যাবেন।

মসজিদে নব্বীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মসজিদে নব্বীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র মদিনা মুসলিম উম্মাহর কাছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ শহর। মুসলিম হৃদয়ে এই নগরীর প্রতি রয়েছে অপরিসীম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মর্যাদা। কেননা এখানেই শুয়ে আছেন প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পবিত্র এই ভূমিতেই ইসলামের উত্থান হয়েছিল এবং এখান থেকেই সারা পৃথিবীতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় সাহাবী আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। উমর (রাঃ) এর খিলাফতকালে সে স্মৃতির উপর ভিত্তি করে ইসলামি বর্ষপঞ্জি প্রতিষ্ঠিত হয় যা হিজরী সাল নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐতিহাসিকভাবে মদিনা একটু গুরুত্বপূর্ণ নগরী কারণ রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পরে মদিনায় বসবাস করেছেন। রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শেষ ১০ বছর এই নগরীতেই কাটিয়েছেন। মূলত আল্লাহ এই নগরীকে ইসলামের জন্য কবুল করেছিলেন বিধায় এই নগরীটি মুনলিমদের নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধার।  

মদিনা সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলের একটি শহর এবং মদিনা প্রদেশের রাজধানী। এটি ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্র শহর, যেখানে মুসলমানদের শেষ নবী মুহাম্মাদের কবর নানান ঐতিহাসিক কারণে মদিনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক তিনটি মসজিদ যেমন মসজিদে নববী, কুবা মসজিদ (যেটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ) এবং মসজিদ আল কিবলাতাইন (যে মসজিদে মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তন হয়েছিল) অবস্থিত।

ইসলামের ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থে মদিনার অনেক নাম পাওয়া যায়, যা তার সম্মান ও মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। মদিনা কে সরকারী ভাবে (المدينة المنورة) আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ‎‎ বলা হয়। তবে পৃথিবীর সকলের নিকট মদিনা হিসেবে পরিচিত। অনারবগন আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ‎‎ কে মদিনা হিসাবেই উল্লেখ করে থাকে। আল্লামা সামহুদি মদিনার ৯৪ টি নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ‘মদিনা’ নামটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে মদিনা শব্দটি কমপক্ষে ১৩ বার এসেছে, যার মধ্যে সরাসরি চারটি স্থানে মদিনা নগরীর কথা বলা হয়েছে। যেমনঃ সুরা তাওবা ৯:১০১ ও ৯:১২০, সুরা আহজাব ৩৩:৬০ এবং সুরা মুনাফিকুন ৬৩:৮। ইহা ছাড়া বাকি সকল স্থানে মদিনা শব্দের অর্ত শহর বা নগর হিসাবের ব্যবহৃত হয়েছে। তবে অসংখ্যা হাদিসে মদিনা শহরের নামটি বার বার ব্যবহার হয়েছে। মদিনার আরেকটি প্রসিদ্ধ নাম ‘তাইবাহ”।

যাইদ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিক্বদের প্রসঙ্গে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে…..”। (সূরা নিসা:৮৮) আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীদের (মুসলিম বাহিনীর) মধ্য হতে কিছু সংখ্যক লোক (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) ফিরে আসে। তাদের প্রসঙ্গে সাহাবীগণ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যান। এক দলের বক্তব্য ছিল, তাদেরকে হত্যা কর। অন্য দলের মত ছিল, তাদেরকে হত্যার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) : “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিক্বদের ব্যাপারে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে….। (সুরা নিসা ৪:৮৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মাদীনা হল তাইবাহ-পবিত্র নগরী। তা ময়লা আবর্জনা (অপবিত্রতা মুনাফিক্বী) এমনভাবে দূর করে দেয় যেভাবে আগুন লোহার ময়লা দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ৪৫৮৯, তিরমিজি ৩০২৮)

মদিনার উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি নাম হলো আদ-দার, আল-হাবিবা, দারুল হিজরা, দারুল ফাতহ ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার আগে এ নগরীর নাম ছিল ইয়াসরিব। নুহ আলাইহিস সালাম এর এক ছেলের নাম ছিল ইয়াসরিব। তাঁর বংশধরদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনি মদিনায় এসে বসবাস করেন। তাঁর নামানুসারে এ শহরের নাম ইয়াসরিব রাখা হয়। ইয়াসরিব অর্থ অভিযুক্ত করা বা ধমক দেওয়া। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হিজরতের পর এ নগরীর নাম রাখা হয় মদিনা। আগেই উল্লেখ করেছি, মদিনা শব্দের অর্থ শহর। নবীজি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইয়াসরিবে আগমনে স্থানীয় সব ধর্মবিশ্বাসের এবং সব গোত্রের সব অধিবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে শান্তির দূত ও অভিভাবক হিসেবে সানন্দে মেনে নেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে আনন্দে উদ্বেলিত জনতা নিজ শহরের নাম বদলে ফেলে রাখলেন মাদিনাতুন নবী, অর্থাৎ নবীর শহর। তখন থেকেই ইয়াসরিব হয়ে যায় মদিনা।

হিজরত করে মদিনা পৌছানোর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম কাজ হল মসজিদে নাবাবীর নির্মাণ। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষ অংশে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, ‘উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ)-কে সাদা রঙ্গের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদিনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা হতে মদিনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রতিদিন সকালে মদিনার হার্রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতেন থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইয়াহূদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীসঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরা অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি- যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ। মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদিনার হাররার উপকন্ঠে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু ‘আমর ইবনু ‘আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবি‘উল আউয়াল মাসের সোমবার। আবূ বাকর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যাঁরা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেননি তাঁরা আবূ বাকর (রাঃ)-কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বাকর (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু ‘আমার ইবনু ‘আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সালাত আদায় করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উঁনীতে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদিনায় মসজিদে নাবাবীর স্থানে পৌঁছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সালাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনু যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ্, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বালক দু’টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মাসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মাসজিদ তৈরি করলেন। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসজিদ নির্মাণকালে সহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ

এ বোঝা খায়বারের বোঝা বহন নয়।          

ইয়া রব, এর ভোঝা অত্যন্ত পুণ্যময় ও অতি পবিত্র।

তিনি আরো বলছিলেন, হে আল্লাহ্! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান।              

সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।

এক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এছাড়া অপর কোন পূর্ণ কবিতা পাঠ করছেন বলে, কোন কথা আমার কাছে পৌঁছেনি। (সহিহ বুখারি ৩৯০৫)

সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে, মদিনা মসজিদের নির্মাণের জন্য নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সোহাইল নামক দু’জন বালকের নিকট হতে জমি ক্রয় করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দশ দীনার মূল্যে স্থানটি খরীদ করলেন। আবুবকর (রাঃ) মূল্য পরিশোধ করলেন। অতঃপর তার আশপাশের কবরগুলি এবং বাড়ী-ঘরের ভগ্নস্তূপসহ স্থানটি সমতল করলেন। গারক্বাদের খেজুর গাছগুলি উঠিয়ে সেগুলিকে ক্বিবলার দিকে সারিবদ্ধভাবে পুঁতে দেওয়া হয়। ঐ সময় ক্বিবলা ছিল বায়তুল মুক্বাদ্দাস, যা ছিল মদীনা হতে উত্তর দিকে। তিনটি দরজার দু’বাহুর স্তম্ভগুলি পাথরের, মধ্যের খাম্বাগুলি খেজুর বৃক্ষের, দেওয়াল কাঁচা ইটের, ছাদ খেজুর ডালপাতার এবং বালু ও ছোট কাঁকর বিছানো মেঝে-এই নিয়ে তৈরী হল মসজিদে নববী, যা তখন ছিল ৭০×৬০×৭ হাত আয়তন বিশিষ্ট। পরবর্তীতে মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন প্রতিটি কোণ হতে তীর নিক্ষেপ করে যে পরিমাণ জায়গা পাওয়া গেল তা হলো একটি ক্ষেত্র। বর্গের প্রতিটি বাহুর পরিমাণ হয় ১০০ হাত বা ৫৬ গজ। অর্থাত্ মদিনা মসজিদের আয়তন হল ১০০X১০০ হাত বা ৫৬X৫৬ গজ। ইবনে সাদ ও দিয়ার বকরী বলেন, মসজিদের ভিটি ও দেয়ালের নিম্নভাগ ৩ হাত পর্যন্ত প্রস্তর নির্মিত ছিল। প্রথম পর্যায়ে মদিনা মসজিদ রৌদ্র শুষ্ক ইট দ্বারা নির্মিত হয়। এই রৌদ্র শুষ্ক ইট বাকী আল-খাবখাবা উপত্যকা হতে আনিত কাদা দ্বারা তৈরি হয়েছিল। তখন মদিনা মসজিদের দেয়াল ছিল ৭ হাত উঁচু। ছাদকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার জন্য মদিনা মসজিদের ৩৬টি খেজুর গাছকে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতা দিয়ে। ছাদকে সুন্দর করার জন্য, রৌদ্র ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য খেজুর পাতার ওপর কাঁদামাটির আস্তরণ দেয়া হয়েছিল। ১৬ বা ১৭ মাস পরে ক্বিবলা পরিবর্তিত হলে উত্তর দেওয়ালের বদলে দক্ষিণ দেওয়ালের দিকে ক্বিবলা ঘুরে যায়। কেননা মক্কা হল মদীনা থেকে দক্ষিণ দিকে। এ সময় উত্তর দেওয়ালের বাইরে একটা খেজুর পাতার ছাপড়া দেওয়া হয়। আরবীতে বারান্দা বা চাতালকে ‘ছুফফাহ’ বলা হয়। উক্ত ছুফফাহ’তে নিঃস্ব ও নিরাশ্রয় মুসলমানদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হত। পরবর্তীতে তাদের কোন ব্যবস্থা হয়ে গেলে তারা চলে যেতেন। বারান্দায় বা চাতালে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণকারীগণ ইতিহাসে ‘আছহাবে ছুফফাহ’ (أصحاب الصفة) নামে খ্যাতি লাভ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর আবু বক্কর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় এই মসজদি আর সংস্কার হয়নি। পরবর্তিতে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এবং ওসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর যুগে মসজিদের সম্প্রসারণ ঘটে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নব্বীর সম্প্রসারণ করেন। তিনি মসজিদটি উত্তর দিকে ৩০ হাত, দক্ষিণ দিকে ১০ হাত, পশ্চিম দিকে ২০ হাত সম্প্রসারণ করেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় মসজিদের পরিমাণ দাঁড়ায় উত্তর-দক্ষিণে ১৪০ হাত, পূর্ব-পশ্চিমে ১২০ হাত। হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় ৬৪৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে খেজুরপাতার পরিবর্তে ছাদে সেগুণ কাঠ ব্যবহার করা হয়। ছাদের আকার দাঁড়ায় ১৬০X১৩০ হাত। এ সময় সম্প্রসারিত হয়ে মসজিদের আকার দাঁড়ায় উত্তর দক্ষিণে ১৬০ হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫০ হাত।

উমর ইবনে আবদুল আজীজ ৮৭ হিজরীতে তিনি মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল মসজিদে নববী পুনঃনির্মাণ ও ইহার সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এ বিরাট কীর্তি তিনি মদীনায় শুভাগমন করার এক বছর পর অর্থাৎ ৮৮ হিজরীর সফর মাসে শুরু করেন এবং ৮৯ হিজরীতে শেষ করেন। তবে অনেকের মতে ইহা শেষ হয়েছিল ৯১ হিজরীতে।। ঐতিহাসিকগণ খলিফা ওয়ালীদকে মসজিদের নির্মাতা বলে উল্লেখ করেছেন, তা যথার্থই করেছেন। খলিফা ওয়ালীগ এ হিসেবেই এর নির্মাতা যেহেতু, তিনি এ মহান কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য গাড়ী বোঝাই করে ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন মুসলিম শাসকের আমলে মসজিদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ঘটে। খলিফা আল ওয়ালিদের সময় মদিনা মসজিদটি আধুনিক ইমারতে পরিণত হয়। ওয়ালিদ ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মসজিদে নববীকে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর সময় মসজিদে নববীর পরিমাপ দাঁড়ায় ২০০X২০০ হাত। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সর্ব প্রথম মদিনা মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার নির্মাণ করেন আল ওয়ালিদ। তখন প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ছিল ৫০ হাত এবং প্রস্থে ছিল ৮ হাত।

খলিফা মাহদী ৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন ৩০০ X ৩০০ হাত। আর মামলুক সুলতান কয়েত-বে মসজিদে নববীতে গম্বুজ প্রতিষ্ঠিত করেন। এতে গম্বুজ করা হয় ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে। গম্বুজ সবুজ রং-এর আস্তরণ দিয়েছিলেন ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে।

বিশালকার মসজিদে নববীর সমস্ত রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সৌদি রাজ পরিবারের। তাই বর্তমান আধুনিকায়নে মসজিদ-এ নববীর রূপদান করেন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ। তিনি এর পরিকল্পনা করেন  ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে।  সৌদি সরকার যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৫১ ইং সালে বাদশাহ আব্দুল আযীয মসজিদের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিকের আশেপাশের ঘর-বাড়ি খরিদ করে ভেঙে ফেলেন। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১২৮ মিটার ও প্রস্থ ৯১ মিটার করা হয় এবং আয়তন ৬২৪৬ বর্গ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬৩২৬ বর্গমিটার করা হয়। মসজিদের মেঝেতে ঠান্ডা মার্বেল পাথর লাগানো হয়। মসজিদের চার কোনায় ৭২ মিটার উচুঁ চারটি মিনার তৈরি করা হয়। এ সম্প্রসারণে ৫ কোটি রিয়াল খরচ হয় ও কাজ শেষ হয় ১৯৫৫ সালে।

বাদশাহ ফয়সাল এর আমলে ক্রমবর্ধমান হাজীদের জায়গার সংকুলান করার জন্য পশ্চিম দিকের জায়গা বৃদ্ধি করা হয় যার আয়তন ছিল ৩৫০০০ বর্গমিটার।

সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বাদশাহ ফাহাদ ইবন আব্দুল আযীয কর্তৃক মসজিদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন ও বিস্তার সাধিত হয়। পূর্ববর্তী মসজিদের আয়তনের তুলনায় নয় গুণ আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। মসজিদকে এত সুন্দর করা হয় যা মুসলিমদের অন্তর জয় করে। মসজিদের ছাদ এমনভাবে বানানো হয়েছে যে প্রয়োজনে দ্বিতল বানানো সম্ভব হবে। মূল গ্রাউণ্ড ফ্লোরের আয়তন ৮২০০০ বর্গমিটার হয়। মসজিদের চারপাশে ২৩৫০০০ বর্গমিটার খোলা চত্বরে সাদা শীতল মার্বেল পাথর বসানো হয়। এর ফলে মসজিদের ভিতরে ২৬৮০০০ মুসল্লি এবং মসজিদের বাইরের চত্বরে ৪৩০০০০ মুসল্লির সালাত আদায়ের জায়গা হয়। সম্পূর্ণ মসজিদে এসি, আন্ডারগ্রাউন্ডে ওয়াশরুম ও কার পার্কিং এর ব্যবস্থা করা হয়। মসজিদের কাজ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে আর শেষ হয় ১৯৯৪ সালে।

মন্তব্যঃ হজ্জ পরিসমাপ্তির পর প্রত্যকে হাজ্জিকে মদীনা যেতে হবে এমন কোন বাধ্য বাধকতা ইসলামি শরীয়তে নাই। হজ্জের সাথে মদীনা শরীফ যিয়ারত করাও অপরিহার্য নয়। মদীনার যিয়ারত করা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত। অধিকাংশ হাজ্জি মক্কা মনীদার বাহির থেকে হজ্জ আদায়ের জন্য আসেন। তাদের জন্য এই সময় মদীনা সফর করা একটি সুযোগ আসে। আলাদা আলাদাভাবে দুজায়গা সফরের লক্ষ্যে দুবার আসা খুবই কষ্টকর। কষ্ট হলেও অনেকের আবার আর্থিকভাবেও সমর্থবান নয়। বিধায় হজ্জের সফরের কারনে এক সঙ্গেই তারা দুজায়গায় সফর করেন। তাই বিষয়টি অন্যভাবে বিবেচনা না করে, হজ্জ পরিসমাপ্তির পর মদীনা জিয়ারত করা যেতে পারে। তাহলে এতটুকু ষ্পষ্ট যে, হজ্জের সফর হোক আর অন্য সময়ে হোক মদীনা যিয়ারত করা যেতেই পাবে।

কোন নিয়তে মদীনা যাবেন?

এই সম্পর্কে দুটি প্রশিদ্ধ মত পাওয়া যায়। এক দল বলেছেন, মদীনা সফর মানে মসজিদে নব্বী সফরের নিয়ত করতে হবে। আরেক দল বলেছেন না, কবর বা রওজা মোবারক যিয়ারতের নিয়তে সফর করতে হবে। যারা কবর বা রওজা মোবারক যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যাবার পক্ষে তারা শুধু ব্রেলভী বা রিজভী নয়, তারা আমাদের দেওবন্দী আলেমও। এই মাসায়েলে তারা দুটি দলই এতটাই অগ্রগন্য যে এ সম্পর্কে দলিল দ্বারা প্রমান করার দরকার নাই। তাদের আলেমদের জিজ্ঞাসা করলেই এর পক্ষে মতমত প্রদান করে। তারপরও পাঠদের বুঝাতে দুটি রেফারেন্স দিলাম।

দেওবন্দীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারত ওয়াজিব বা এর কাছাকাছি মনে করে।

ক। ‘আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ এ বর্ণিত মক্কা-মদিনার আলমগন প্রশ্ন করে ছিল। (১ম প্রশ্ন) “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা সম্পর্কে আপনাদের মত কি?

উত্তরে তারা লিখেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে জিয়ারত আমরা ও আমাদের পূবর্সূরীহনের মতে আল্লাহর অধিক নৈকট্য লাভ, অতিশয় পূণ্য লাভ উন্নত স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মাধ্যম। বরং উম্মতের জন্য তা ওয়াজিব না হলেও তার কাছা কাছি বিষয়।

রওদ্বায়ে পাক জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও এ উদ্দেশ্যে ব্যয় করা সৌভাগ্যের বিষয়। কেউ যদি রওজা পাক যিয়ারতের নিয়তের সাথে সাথে মসজিদে নব্বীও তত্সংশ্লষ্ট মুবারক জাযগা সমুহের নিয়ত কর তাতে কোন আপত্তি নেই। (‘আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ খলিল আহম্মদ সাহরনাপুলী, ভারত, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪)।

খ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতে যাওয়ার ব্যপারে দেওবন্দ আলেদের অরস্থান একেবারে স্পষ্ট। “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” বইটিতে একটা অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন “রওযায়ে আতহার যিয়ারতে যাওয়ার নিয়ত প্রসঙ্গে”  লেখক এখানে সালাফি আলেম ইবনে তাইমিয়া (র) এর আনিত অভিযোগ খন্ডন করার নিমিত্তে তার (ইবনে তাইমিয়া) উল্লেখিত হাদিসের (তিনটি স্থান ব্যতিত নেকির উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না) ব্যাখ্যা ও  কয়েক জন বিসিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদের মতামত তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারত জন্য সফর করা নেকির কাজ। (“ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, পৃষ্ঠা – ৪৬৭)।

পক্ষান্তরে সালাফিরা কবর জিয়ারত কে সুন্নাত মনে করে কিন্তু কবর জিয়ারত উদ্দেশ্যে সফর করা কে নাজায়িয মনে করে থাকে।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, যদি হাজীসাহেব হজ্জের আগে অথবা পরে মসজিদে নববি যিয়ারত করতে চান তাহলে তিনি মসজিদে নববি যিয়ারত করার নিয়ত করবেন, কবর নয়। কারণ নেকি হাছিল করার জন্য কোন কবরকে উদ্দেশ্য করে সফর করা জায়েয নয়। বরং সফর করা যায় তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো হচ্ছে- মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদে আকসা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে তিনি বলেন, “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন কিছুকে উদ্দেশ্য করে সফর করা যাবে না, মসজিদে হারাম, আমার মসজিদ ও মসজিদে আকসা। (সহিহ বুখারি ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭)

সালাফি আলেমদের মতে, মসজিদে নববী যিয়ারত করা সুন্নত ওয়াজিব নয়। হজ্জের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এটি হজ্জকে পূর্ণ করবে এমন কিছু নয়। মসজিদে নববীর যিয়ারতকে হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত করে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে এর সবগুলো মাওজু (বানোয়াট) ও মিথ্যা। যে ব্যক্তি তাঁর মদিনার সফরের মাধ্যমে মসজিদে নববী যিয়ারত ও মসজিদে নববীতে নামায পড়ার উদ্দেশ্য করবে তার উদ্দেশ্য পূণ্যময়, তাঁর আমল সওয়াবসম্ভাব্য। আর যে ব্যক্তির সফরের উদ্দেশ্য কবর যিয়ারত ও কবর-ওয়ালাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা ছাড়া অন্য কিছু নয় তার উদ্দেশ্য হারাম, তার কর্ম মন্দ।

দলিলঃ

১. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন গন্তব্যে সফর করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদে আকসা।”(সহিহ বুখারী ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭, আবু দাইদ ২০৩৩)

২. জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “সফর করার সবচেয়ে উত্তম গন্তব্য হচ্ছে- আমার এ মসজিদ ও বাইতুল আতিক (কাবা)”। (মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৫০, আলবানী তাঁর ‘আল-সিলসিলাতুস সহিহা’ গ্রন্থে ১৬৪৮) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)

মন্তব্যঃ ইমামগণ এবং অধিকাংশ শরীয়ত বিশেষজ্ঞ একমত পোষণ করেছেন যে, সফরকারির সফরের উদ্দেশ্য যদি শুধু নবীর কবর যিয়ারত হয়, তাঁর মসজিদে সালাত আদায় করা না হয় তবে তা  শরীয়ত সম্মত নয়। (ইবন তাইমিয়া, আল-ফাতাওয়াল কুবরা : ৫/১৪৯)

ইবন তাইমিয়া রহ. আরো বলেন, ‘জেনে রাখো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত বহু ইবাদত থেকে মর্যাদাপূর্ণ, অনেক নফল কর্ম থেকে উত্তম। কিন্তু সফরকারীর জন্য শ্রেয় হচ্ছে, সে মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়ত করবে। অতপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত করবে এবং তাঁর ওপর সালাত ও সালাম পেশ করবে। (আল-ফুরকান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ওয়া আউলিয়ায়িশ শয়তান : ১/৩০৭)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘জাহেলী যুগের মানুষেরা তাদের ধারণামত মর্যাদাপূর্ণ স্থানসমূহকে উদ্দেশ্য করে তা যিয়ারত করত এবং তার মাধ্যমে (তাদের ধারণামত) বরকত লাভ করত। এতে রয়েছে সত্যচ্যুতি, বিকৃতি ও ফাসাদ যা কারো অজানা নয়। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ফাসাদ চিরতরে বন্ধ করে দেন, যাতে শা‘আয়ের (আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর ইবাদতের স্থানসমূহ) নয় এমন বিষয়গুলো শা‘আয়ের-এর অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং যাতে এটা গায়রুল্লাহর ইবাদতের মাধ্যম না হয়। আমার মতে সঠিক কথা হচ্ছে, কবর ও আল্লাহর যে কোন ওলীর ইবাদতের স্থান, তূর পাহাড় ইত্যাদি সবকিছু উপরোক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ : ১/৪০৮)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘হ্যাঁ, সফকারির জন্য মুস্তাহাব হচ্ছে, মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়তে সফর করা। আর এটা নৈকট্য লাভের অন্যতম বড় উপায়। অতপর সে যখন মদীনা পৌঁছবে, তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর কবর যিয়ারত করাও মুস্তাহাব। কেননা তখন সে মদীনা নগরীতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর তখন নগরীতে অবস্থিত কবরগুলো যিয়ারত করা অবস্থানকারীর ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। (ফায়যুল বারী : ৪/৪৩।

সুতরাং মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যিয়ারত করতে হবে। কবর যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যিয়ারত হলে, তা সহীহ হবে না। মনে রাখবেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর কেন্দ্রিক সকল উৎসব জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর আমার কবরকে তোমরা উৎসবের উপলক্ষ্য বানিও না। (আবূ দাউদ : ১৭৪৬)

অর্থাৎ আমার কবর-কেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করো না।’ এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করাও শামিল।

মদিনার হারামের সীমা ও বিভিন্ন স্থানের ফজিলত

মদিনার হারামের সীমা ও বিভিন্ন স্থানের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মসজিদে নববীর রয়েছে ব্যাপক মর্যাদা ও অসাধারণ শ্রেষ্ঠত্ব। কুরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে একাধিক ঘোষণা এসেছে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَّمَسۡجِدٌ أُسِّسَ عَلَى ٱلتَّقۡوَىٰ مِنۡ أَوَّلِ يَوۡمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِۚ فِيهِ رِجَالٞ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُواْۚ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُطَّهِّرِينَ ١٠٨ ﴾

অর্থঃ অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে তা বেশী হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন। (সুরা তওবা ৯:১০৮।

মন্তব্যঃ আল্লামা সামহুদী বলেন, ‘কুবা ও মদীনা- উভয় স্থানের মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। উক্ত আয়াতে তাই উভয় মসজিদের কথা বলা হয়েছে।’(শায়খ সফিউর রহমান মুবারকপুরী, তারীখুল মাদীনাতিল মুনাওয়ারা ৭৫ পৃষ্ঠা)

বহু সহিহ হাদিসে মদিনা ফজিরত বর্ণনা করা হয়েছে। উদহরণ সরূপ কয়েকটি তুলে ধরা হলোঃ

১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আমার এ মসজিদে নামায আদায় করা অন্য মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি সওয়াব; তবে মসজিদে হারাম ছাড়া। (সহিহ বুখারী ১১৯০ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৪)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান আর আমার মিম্বর অবস্থিত আমার হাউয (কাউসার) এর উপরে। (সহিহ বুখারি ১১৯৬, ১৮৮৮, ৬৫৮৮, ৭৩৩৫)

৩. ইয়াজিদ ইবনে আবু উবাইদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি সালামা বিন আকওয়া এর সাথে আসতাম এবং মুসহাফের নিকটবর্তী পিলারের কাছে নামায পড়তাম। অর্থাৎ রিয়াদুল জান্নাতে। আমি বললাম: হে আবু মুসলিম, আপনাকে দেখি এ পিলারের কাছে নামায পড়তে বেশি আগ্রহী? তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ পিলারের কাছে নামায পড়তে আগ্রহী দেখেছি। (সহিহ বুখারী ৫০২)

৪. আবদুল্লাহ্ ইবনু যায়দ মাযিনী (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার ঘর ও মিম্বার-এর মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান। (সহিহ বুখারি ১১৯৫, সহিহ মুসলিম ১৩৯০)

৫. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন গন্তব্যে সফর করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদে আকসা।”(সহিহ বুখারী ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭, আবু দাইদ ২০৩৩)

৬. জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “সফর করার সবচেয়ে উত্তম গন্তব্য হচ্ছে- আমার এ মসজিদ ও বাইতুল আতিক (কাবা)”। (মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৫০, আলবানী তাঁর ‘আল-সিলসিলাতুস সহিহা’ গ্রন্থে ১৬৪৮) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)

৭. আবূ হুরাইয়া রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে আমার এই মসজিদে কেবল কোনো কল্যাণ শেখার জন্য কিংবা শেখানোর জন্য আসবে, তার মর্যাদা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য। পক্ষান্তরে যে অন্য কোন উদ্দেশ্যে তা দেখতে আসবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে অন্যের মাল-সামগ্রীর প্রতি তাকায়। (ইবন মাজাহ্‌ : ২৭৭)

৮. আবূ উমামা আল-বাহেলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র কোন কল্যাণ শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে মসজিদে (নববীতে) আসবে, তার জন্য পূর্ণ একটি হজের সওয়াব লেখা হবে। (মাজমাউয যাওয়াইদ : ১/১২৩)

মন্তব্যঃ রওযা শরীফ ও এর আশেপাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পূর্ব দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর হুজরা শরীফ। তার পশ্চিম দিকের দেয়ালের মধ্যখানে তাঁর মিহরাব এবং পশ্চিমে মিম্বর। এখানে বেশ কিছু পাথরের খুঁটি রয়েছে। যেসবের সাথে জড়িয়ে আছে হাদীস ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও স্মৃতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর যুগে এসব খুঁটি ছিল খেজুর গাছের। এগুলো ছিল নিম্মরূপঃ

১. উসতুওয়ানা আয়েশা বা আয়েশা রা.-এর খুঁটি।

২. উসতুওয়ানাতুল-উফূদ বা প্রতিনিধি দলের খুঁটি।

৩. উসতুওয়ানাতুত্তাওবা বা তওবার খুঁটি।

৪. উসতুওয়ানা মুখাল্লাকাহ বা সুগন্ধি জালানোর খুঁটি।

৫. উসতুওয়ানাতুস-সারীর বা খাটের সাথে লাগোয়া খুঁটি এবং উসতুওয়ানাতুল-হারছ বা মিহরাছ তথা পাহাদারদের খুঁটি।

মুসলিম শাসকগণের কাছে এই রওযা ছিল বরাবর খুব গুরুত্ব ও যত্নের বিষয়। উসমানী সুলতান সলীম রওযা শরীফের খুঁটিগুলোর অর্ধেক পর্যন্ত লাল-সাদা মারবেল পাথর দিয়ে মুড়িয়ে দেন। অতপর আরেক উসমানী সুলতান আবদুল মাজীদ এর খুঁটিগুলোর সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করেন। ১৯৯৪ সালে সৌদি সরকার পূর্ববর্তী সকল বাদশাহর তুলনায় উৎকৃষ্ট পাথর দিয়ে এই রওযার খুঁটিগুলো ঢেকে দেন এবং রওযার মেঝেতে দামী কার্পেট বিছিয়ে দেন।

মসজিতে কুবায় সালাত আদায় করা

মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ এটি। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে কুবা পল্লীতে আমর ইবন আউফ গোত্রের কুলছুম ইবন হিদমের গৃহে অবতরণ করেন। এখানে তাঁর উট বাঁধেন। তারপর এখানেই তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এর নির্মাণকাজে তিনি সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। এ মসজিদে তিনি নামাজ পড়তেন। এটিই প্রথম মসজিদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে তাঁর সাহাবীদের নিয়ে প্রকাশ্যে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। এ মসজিদের কিবলা প্রথমে বাইতুল মাকদিসের দিকে ছিল। পরে কিবলা পরিবর্তন হলে কা‘বার দিকে এর কিবলা নির্ধারিত হয়। মদীনা মসজিতে নব্বী বাদে এই মসজিদের ফজিলত সহিহ হাদিসর দ্বারা প্রমানি। কাজেই যখন মদীন যাওয়ার সৌভাগ্য হবে তখন মসজিদে কুবায় যেতে ভুলে যাবেন না। এই মসজিদে সালাত আদায় করলে উরমার সওয়াব পাওয়া যাবে।

দলিলঃ

১.  সাহল বিন হুনাইফ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি (স্বগৃহ হতে ওযূ করে) বের হয়ে এই মসজিদে (কুবায়) উপস্থিত হয়ে নামায আদায় করে, সে ব্যক্তির একটি উমরাহ আদায় করা সমান সওয়াব লাভ হয়। (হাদিস সম্ভার ১১৯৭, ইবনে মাজাহ ১৪১২)

২. উসাইদ বিন যুহাইর আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুবার মসজিদে নামায পড়ার সওয়াব একটি উমরাহ করার সমতুল্য। (হাদিস সম্ভার ১১৯৮, ইবনে মাজাহ ১৪১১)

৩. নাফি (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ‘উমার (রাযি.) দু’ দিন ছাড়া অন্য সময়ে চাশ্তের সালাত আদায় করতেন না, যে দিন তিনি মক্কা্য় আগমন করতেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি চাশ্তের সময় মক্কা্য় আগমন করতেন। তিনি বাইতুল্লাহ্ ত্বওয়াফ করার পর মাকামে ইব্রাহীম-এর পিছনে দাঁড়িয়ে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। আর যে দিন তিনি কুবা মসজিদে গমন করতেন। তিনি প্রতি শনিবার সেখানে গমন করতেন এবং সেখানে সালাত আদায় না করে বেরিয়ে আসা অপছন্দ করতেন। নাফি‘ (রহ.) বলেন, তিনি (ইবনু ‘উমার (রাযি.) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবা মাসজিদ যিয়ারাত করতেন- কখনো সওয়ারীতে, কখনো পদব্রজে। (সহিহ বুখারি ১১৯১, সহিহ মুসলিম ৩২৬৬)

৪. নাফি (রহ.) বলেন, তিনি (ইবনু ‘উমার (রাযি.) তাঁকে আরো বলতেন, আমি আমার সাথীদেরকে যেমন করতে দেখেছি তেমন করব। আর কাউকে আমি দিন রাতের কোন সময়ই সালাত আদায় করতে বাধা দিইনা, তবে তাঁরা যেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় (সালাতের) ইচ্ছা না করে। (সহিহ বুখারি ১১৯২)

৫. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন, কখনো পদব্রজে, কখনো সওয়ারীতে। ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.)-ও ঐরূপ করতেন। (সহিহ বুখারি ১১৯৩)

৬. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করে কিংবা পায়ে হেঁটে কুবা মসজিদে আসতেন। ইবনু নুমায়র (রহ.) নাফি‘ (রহ.) হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি ১১৯৪, সহিহ মুসলিম ৩২৬০ ইফাঃ)

মদিনার নগরীর ফজিলাত

১.  আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, সাহাবাগণ (তাদের বাগানে) সর্বপ্রথম পাকা ফল দেখলে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে (হাদীয়াহ স্বরূপ) নিয়ে আসত। ফলটি নিজ হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদের ফলমূলে আমাদেরকে বারাকাত দাও, আমাদের শহরে আমাদেরকে বারাকাত দাও এবং আমাদের দাঁড়িপাল্লায় আমাদের বারাকাত দাও। “হে আল্লাহ! ইবরাহীম নিশ্চয়ই তোমার বান্দা, তোমার বন্ধু ও তোমার নাবী এবং আমিও তোমার বান্দা ও তোমার নাবী। তোমার নিকট তিনি মক্কা ভূমির জন্য দু’আ করেছিলেন। তোমার নিকট আমিও মাদীনার জন্য দু’আ করছি, যেভাবে তিনি মক্কার জন্য তোমার নিকট দু’আ করেছিলেন এবং আরও সম-পর্যায়ের”। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি কোন বালককে উপস্থিত দেখতে পেলে ফলটি তাকে দিয়ে দিতেন।( সুনানে তিরমিজি ৩৪৫৪, শামায়েলে তিরমিজি ১৪৯, সহিহ মুসলিম ৩৪০০)

২. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মদীনার অধিবাসীদের ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করবে, তাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে গলিয়ে দিবে, যেভাব লবণ পানিতে গলে যায়। (ইবনে মাজাহ ৩১১৪, সনদ সহিহ আলবানী)

৩ .ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মদীনায় মৃত্যুবরণ করতে পারে, সে যেন তাই করে। কারণ যে ব্যক্তি এখানে মারা যাবে, আমি তার পক্ষে সাক্ষী হবো। (ইবনে মাজাহ ৩১১২, সনদ সহিহ আলবানী)

৪. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঈমান মদিনাতে ফিরে আসবে যেমন সাপ তার গর্তে ফিরে আসে। (সহিহ বুখারি ১৮৭৬)

৫. যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলে যারা তাঁর সঙ্গে বের হয়েছিল, তাদের কিছু সংখ্যক লোক ফিরে এলো। নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ তাদের ব্যাপারে দু’দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর বললেন, আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। অপর দল বললেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এ সময় অবতীর্ণ হয় আয়াতটিঃ

*فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُواْ*

‘তোমাদের কী হল যে, তোমরা মুনাফিকদের সম্বন্ধে দু’দল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ্ তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের কৃতকর্মের দরুন’।(সূরা নিসা ৪:৮৮)। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা পবিত্র স্থান। আগুন যেমন রুপার ময়লা দূরে করে, তেমনি মদিনা্ও গুনাহকে দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ৪০৫০)

৬. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি এমন এক জনপদে হিজরত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যে জনপদ অন্য সকল জনপদের উপর জয়ী হবে। লোকেরা তাকে ইয়াসরিব বলে থাকে। এ হল মদীনা। তা অবাঞ্ছিত লোকদেরকে এমনভাবে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে কামারের অগ্নিচুলা লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ১৮৭১)

৭. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর হতে ফিরে আসার পথে যখন মদিনার প্রাচীরগুলোর দিকে তাকাতেন, তখন তিনি মদিনার প্রতি ভালবাসার কারণে তাঁর উটকে দ্রুত চালাতেন আর তিনি অন্য কোন জন্তুর উপর থাকলে তাকেও দ্রুত চালিত করতেন। (সহিহ বুখারি ১৮৮৬)

৮. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফেরেশ্তা পাহারায় নিয়োজিত আছে। তাই প্লেগ রোগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। (সহিহ বুখারি ১৮৮০)

৯. আবূ বাকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ) বলেছেন, মদীনাতে দাজ্জালের ত্রাস ও ভীতি প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ সময় মদীনার সাতটি প্রবেশ পথ থাকবে। প্রত্যেক পথে দু’জন করে ফেরেশতা (মোতায়েন) থাকবে। (সহিহ বুখারি ১৮৭৯)

মদীনা হারাম বা সম্মানিত স্থান

মুসলিমদের পবিত্র ভুমি মক্কার যেমন হারাম বা সম্মানিত নগরী ঠিক তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় ভুমি মনিদাও মুসলিমদের নিকট হারাম বা সম্মানিত নগরী। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহ ইচ্ছায় যেমন মক্কাকে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মহান আল্লাহ ইচ্ছায় মদিনাকে হারাম সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। তাই শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে মক্কা নগরীর পরেই  মদিনার স্থান। সুতরাং মদীনাও নিরাপদ শহর। এখানে রক্তপাত বৈধ নয়। বৈধ নয় শিকার করা বা গাছ কাটা।

দলিলঃ

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ মদীনা এখান হতে ওখান পর্যন্ত হারাম (রূপে গণ্য)। সুতরাং তার গাছ কাটা যাবে না এবং এখানে কোন ধরনের অঘটন (বিদ‘আত, অত্যাচার ইত্যাদি) ঘটানো যাবে না। যদি এখানে কোন অঘটন ঘটায় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ্‌র এবং ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের লা’নত (অভিশাপ)।(সহিহ বুখারি ১৮৬৭)

২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উহুদ পর্বত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বললেন, এ পর্বত আমাদের ভালবাসে আর আমরাও তাকে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইবরাহীম (‘আঃ) মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন আর আমি হারাম ঘোষণা করছি এর দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে (মদীনাকে)। এ হাদীসটি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) ও নবী‎ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেছেন। (সহিহ বুখারি ৩৩৬৭)

৩. ‘আলী (রাযি.) থেকে পূর্বোক্ত হাদীসের ঘটনা প্রসংগে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মদীনার) সবুজ ঘাস কাটা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না এবং পড়ে থাকা বস্তু উঠানো যাবে না। তবে ঘোষক ঘোষণার উদ্দেশ্যে তা তুলতে পারবে। কেউ সেখানে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে কোনো হাতিয়ার নিয়ে যেতে পারবে না এবং সেখানকার কোনো বৃক্ষও কাটা যাবে না, তবে কেউ তার উটের খাদ্য সংগ্রহ করলে তা ভিন্ন কথা।(আবু দাউদ ২০৩৫)

৪. সা‘দ (রাযি.) এর মুক্তদাস সূত্রে বর্ণিত। সা‘দ (রাযি.) মদীনার কতিপয় গোলামকে মদীনার গাছপালা কাটতে দেকে তাদের মালপত্র কেড়ে নিলেন এবং তাদের মনিবদের বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মদীনার গাছপালা কাটতে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, কেউ এখানকার কিছু কাটলে তার মালপত্র সেই পাবে যে তা কেড়ে নিবে।কথা। (আবু দাউদ ২০৩৮)

৫. জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংরক্ষিত এলাকায় গাছের পাতা না পাড়ে এবং কর্তন না করে, তবে কোমলভাবে পাতায় আঘাত করা যাবে। (আবু দাইদ ২০৩৯)

৬. ‘আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবরাহীম (আ.) মক্কা্কে হারাম ঘোষণা করেছেন ও তার জন্য দু‘আ করেছেন। আমি মদিনা্কে হারাম ঘোষণা করেছি, যেমন ইবরাহীম (আ.) মক্কা্কে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং আমি মদিনার মুদ ও সা‘ এর জন্য দু‘আ করেছি। যেমন ইবরাহীম (আ.) মক্কার জন্য দু‘আ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ২১৩৯)

হারামের সীমারেখা হলো

উত্তরে লম্বায় উহুদ পাহাড়ের পেছনে সাওর পাহাড় থেকে দক্ষিণে আইর পাহাড় পর্যন্ত। পূর্বে হার্রা ওয়াকিম অর্থাৎ কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকা থেকে পশ্চিমে হার্রা আল-ওয়াবরা অর্থাৎ কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকা পর্যন্ত।

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার দু’ পাথুরে ভূমির মধ্যবর্তী স্থান আমার ঘোষণা মোতাবেক হারাম হিসাবে নির্ধারিত করা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনূ হারিসের নিকট তাশরীফ আনেন এবং বলেন, হে বনূ হারিসা! আমার ধারণা ছিল যে, তোমরা হারামের বাইরে অবস্থান করছ, অতঃপর তিনি সেদিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ (না তোমরা হারামের বাইরে নও) বরং তোমরা হারামের ভিতরেই আছ। (সহিহ বুখারি ১৮৬৯)

২. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলতেন, আমি যদি মদীনাতে কোন হরিণকে বেড়াতে দেখি তাহলে তাকে আমি তাড়াব না। (কেননা) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার প্রস্তরময় পাহাড়ের দুই এলাকার মধ্যবর্তী এলাকা হল হারম বা সম্মানিত স্থান। (সহিহ বুখারি ১৮৭৩)

৩. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আ.) তোমার বন্ধু ও নবী। তুমি মক্কাকে ইবরাহীম (আ.)-এর যবানীতে হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা করেছো। হে আল্লাহ! আমিও তোমার বান্দা ও নবী। অতএব আমি মদীনাকে, তার দুপ্রস্তরময় জমীনের মধ্যস্থল হারাম ঘোষণা করছি। আবূ মারওয়ান (রাঃ) বলেন, ‘লাবাতাইহা’ শব্দের অর্থ মদীনার দু’প্রান্তের প্রস্তরময় ভূমি। (ইবনে মাজাহ ৩১১৩, তাহকীক আলবানীঃ সহীহ)।

৪. আলী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আল্লাহর কুরআন এবং তাঁর এ সহীফার মধ্যে যা লিখিত আছে তা ব্যতীত অন্য কিছু লিপিবদ্ধ করিনি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনা ‘আয়ের’ থেকে ‘সাওর’ পর্যন্ত হারাম এলাকা। এখানে যদি কেউ বিদ‘আত করে কিংবা বিদ‘আতীকে আশ্রয় দেয়, তবে তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তিনি আরো বলেছেনঃ সকল মুসলিমের নিরাপত্তা বিধান সমান গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি একজন সাধারণ ব্যক্তির নিরাপত্তাও। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের প্রদত্ত নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাবে তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ‘ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো কাওমের লোকদের অনুমতি ছাড়াই তাদের নেতা হয় তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ‘ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। (সহিহ বুখারি ১৮৭০ এবং সুনানে আবু দউদ ২০৩৪)

মসজিদে নববীতে প্রবেশের আদব

ক। পবিত্র হয়ে দোয়া পড়ে প্রবেশ করাঃ

আবাসস্থল থেকে উযূ-গোসল সেরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ধীরে-সুস্থে মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে গমন করবেন। আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ করবেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করবেন। নিচের দো‘আ পড়তে পড়তে ডান পা দিয়ে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করবেন এবং বলবে,

«أَعُوذُ بِاللَّهِ العَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» [بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ] [وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ] «اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ».

অর্থঃ আমি মহান আল্লাহ্‌র কাছে তাঁর সম্মানিত চেহারা ও প্রাচীন ক্ষমতার ওসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ্‌র নামে (প্রবেশ করছি), সালাত ও সালাম আল্লাহ্‌র রাসূলের উপর। “হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।

দলিলঃ

১. হাইওয়াহ ইবনু শুরায়িহ (রহঃ) বলেন, আমি ‘উক্ববাহ্ ইবনু মুসলিমের সাথে সাক্ষাত করে বলি, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার নিকট ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ হাদীস বর্ণনা করা হয়েছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশের সময় বলতেনঃ ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অতীব মর্যাদা ও চিরন্তন পরাক্রমশালীর অধিকারী মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, এতটুকুই? আমি বললাম, হ্যাঁ। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, কেউ এ দু‘আ পাঠ করলে শয়তান বলে, এ লোকটি আমার (অনিষ্ট ও কুমন্ত্রণা) থেকে সারা দিনের জন্য বেঁচে গেল। (আবু দাউদ ৪৬৬)

২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশকালে বলতেনঃ আল্লাহ্‌র নামে (প্রবেশ) এবং আল্লাহ্‌র রাসূলকে সালাম। হে আল্লাহ্! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার দয়ার দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিন। তিনি (মাসজিদ থেকে) বের হওয়ার সময় বলতেনঃ আল্লাহ্‌র নামে (প্রস্থান) এবং সালাম আল্লাহ্‌র রাসূলকে। হে আল্লাহ্! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার অনুগ্রহের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিন। (ইবনে মাজাহ ৭৭১)

খ। প্রবেশের পরই সালাত আদায় করাঃ

মসজিদে প্রবেশ করে যদি কোন দেখেন ফরয সালাতের জামাত চলছে তবে সরাসরি জামাতে অংশ নিন। আর যদি অন্য সময় প্রবেশ করেন তবে বসার আগেই দু’রাক‘আত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়বেন।

দলিলঃ 

১. আবূ কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কেউ মাসজিদে প্রবেশ করলে দু’ রাক’আত সলাত (তাহিয়্যাতুল-মাসজিদ) আদায় করার পূর্বে যেন না বসে। (সহিহ বুখারী ৪৪৪, ১১৬৭, তিরমিযী ৩১৬, নাসায়ী ৭৩০, আবূ দাঊদ ৪৬৭, ইবনু মাজাহ ১০১৩)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমা’আর দিন মিম্বারে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় সুলায়ক আল গাত্বাফানী মাসজিদে এসে (তাহিয়্যাতুল মাসজিদ) সলাত আদায় করার আগেই বসে পড়ল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন, তুমি কি দু’ রাক‘আত সলাত আদায় করেছো? সে বলল, না। তিনি বলেন, তুমি উঠে দু’ রাক‘আত সলাত আদায় কর। (সহিহ মুসলিম ১৯০৮)

গ। সম্ভব হলে রাওযার সীমানার সালাত আদায় করবেনঃ

সম্ভব হলে রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত সালাত আদায় করবেন কেননা সহিহ হাদিসে এই স্থানটি জান্নাতের অংশ বলা হয়েছে। তাই ফজিলত অর্জনের উদ্দেশ্যে রাওযার সীমানার মধ্যে এই নামায পড়বেন।

দলিলঃ

১. আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের অংশটুকু রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত (জান্নাতের উদ্যানসমুহের একটি উদ্যান)। (সহিহ বুখারী ১৮৮৮, ৬৫৮৮)

২. আবদুল্লাহ ইবন্‌ যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যস্থিত স্থান বেহেশতের বাগানসমূহের একটি বাগান। (সুনানে নাসাঈ ৬৯৫)

মন্তব্যঃ তবে এখানে প্রচুর ভীড় থাকে তাই সম্ভব না হলে মসজিদে নববীর যেখানে সম্ভব সেভাবেই পড়বেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদের এ অংশকে অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক গুণে গুণান্বিত করা দ্বারা এ অংশের আলাদা ফযীলত ও বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করছে। আর সে শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযীলত অর্জিত হবে কাউকে কষ্ট না দিয়ে সেখানে নফল নামায আদায় করা, আল্লাহর জিকির করা, কুরআন পাঠ করার দ্বারা।

ঘ। সব সময় সমানের কাতারে আদায়ের চেষ্টা করাঃ

যে কয়দিন মদিনা অবস্থান করবে, প্রতিদিন চেষ্টা থাকবে ফরজ সালাতের প্রথম কাতারগুলোতে সালাত আদায় করার চেষ্টা করা। কেননা সামনের কাতারে সালাত আদায়ের ফজিলত সহিহ হাদিসে প্রমানিত বিষয়।   

দলিলঃ

১. বারা’ বিন আযেব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ প্রথম কাতারের(নামাযীদের) উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। মুআয্‌যিনকে তার আযানের আওয়াযের উচ্চতা অনুযায়ী ক্ষমা করা হয়। তার আযান শ্রবণকারী প্রত্যেক সরস বা নীরস বস্তু তার কথার সত্যায়ন করে থাকে। তার সাথে যারা নামায পড়ে তাদের সকলের নেকীর সমপরিমাণ তার নেকী লাভ হয়।” (সুনানে নাসাঈ ৬৪৬)

২.  আবদুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ প্রথম কাতারের লোকদের উপর রহমত নাযিল করেন। (ইবনে মাজাহ ৯৯৯)

৩. উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আমাদেরকে নিয়ে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাম ফিরানোর পর বললেন, অমুক লোক কি হাযির আছে? সহাবীগণ বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুণরায় বললেন, অমুক লোক কি হাযির আছে? সহাবীগণ বললেন, না। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সব সলাতের মাঝে এ দু’টি সলাত (ফাজ্‌র ও ‘ইশা) মুনাফিক্বদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। তোমরা যদি জানতে এ দু’টি সলাতের মাঝে কত পুণ্য, তাহলে তোমরা হাঁটুর উপর ভর করে হলেও সলাতে আসতে। সলাতের প্রথম কাতার মালায়িকাহ্‌’র (ফেরেশ্‌তাদের) কাতারের মতো (মর্যাদাপূর্ণ)। তোমরা যদি প্রথম কাতারেরফাযীলাত জানতে তবে এতে অংশগ্রহণ করার জন্য তাড়াতাড়ি পৌছার চেষ্টা করতে। আর একা একা সলাত আদায় করার চেয়ে অন্য একজন লোকের সঙ্গে মিলে সলাত আদায় করা অনেক সাওয়াব। আর দু’জনের সাথে মিলে সলাত আদায় করলে একজনের সাথে সলাত আদায় করার চেয়ে অধিক সাওয়াব পাওয়া যায়। আর যত বেশী মানুষের সঙ্গে মিলে সলাত আদায় করা হয়, তা আল্লাহর নিকট তত বেশী প্রিয়। (মিসকাত ১০৬৬, আবূ দাঊদ ৫৫৫, নাসায়ী ৮৪৩)

কবর যিয়ারতে বিধান ও পদ্ধতি

কবর যিয়ারতে বিধান ও পদ্ধতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার তার মতি প্রদান করেছেন।

বুরায়দা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কবর যিয়ারত করা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করতাম এখন তোমরা যিয়ারত কর। তিন দিনের অধিক কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করতাম, এখন যত দিন সম্ভব সংরক্ষণ করে খেতে থাক এবং নাবীয (খেজুর ভিজানো পানি) পান করা হতে নিষেধ করতাম। (মশক ব্যতীত অন্যান্য পাত্রে) এখন সকল পাত্রে পান কর। কিন্তু নেশা হয় এমন অবস্হায় নয়। ইবনু নুমায়র তার বর্ণনায়عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيهِ বলেছেন। (সহিহ মুসলিম ২১৩২ ইফাঃ)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আম্মার কবর যিয়ারত করলেন এবং কাঁদলেন, উপস্থিত সবাইও কাঁদলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আল্লাহর নিকট তাঁর জন্য ইস্তিগফার করার অনুমতি চেয়েছিলাম, আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি, অতঃপর তাঁর কবর যিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছিলাম, তখন অনুমতি দেয়া হল। তোমরা কবর যিয়ারত করতে থাক, কবর মৃত্যুর কথা (পরকাল) স্মরণ করিয়ে দেয়। (সহিহ মুসলিম ২১৩১ ইফাঃ)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদেরকে আখেরাত স্মরণ করিয়ে দেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৫৬৯, নাসায়ী ২০৩৪, আবূ দাউদ ৩২৩৪)

কবর যিয়ারতে অনুমতি প্রদানের পাশাপাশি যিয়ারতের জন্য দোয়া ও শিক্ষা প্রদান করেছেন। নিম্ম এমন তিনটি হাদিস উল্লেখ করছি।

১. আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে এসে কবরবাসীদের সালাম দিলেন এবং বললেনঃ ‘‘আসসালামু আলাইকুম দারা কাওমিম মুমিনীন ওয়াইন্না ইনশাআল্লাহ তা‘আলা বিকুম লাহিকুন’’ (ঈমানদার কবরবাসীরা! তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অচিরেই আল্লাহর মর্জি আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো)। অতঃপর তিনি বলেনঃ নিশ্চয় আমাদের আকাঙ্ক্ষা এই যে, আমরা আমাদের ভাইদের দেখতে পাবো। তারা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বলেনঃ তোমরা আমার সাহাবী। আর যারা আমাদের পরে আসবে তারা আমার ভাই। আমি তোমাদের আগেই হাওযের নিকট উপস্থিত হবো। তারা জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন লোকেদের আপনার উম্মাতরূপে কিভাবে চিনবেন, যারা এখনও জন্মগ্রহণ করেনি?

তিনি বলেনঃ তোমরা কি দেখো না, যদি কোন ব্যক্তির একটি সাদা পা ও সাদা পেশানীযুক্ত ঘোড়া অপর ব্যক্তির কোলো ঘোড়ার পালে মিশে যায়, তবে সে কি তার ঘোড়াটি চিনতে পারবে না? তারা বলেন, হাঁ, নিশ্চয় চিনতে পারবে। তিনি বলেনঃ তারা কিয়ামতের দিন উযুর বদৌলতে সাদা পেশানী ও সাদা হাত-পাবিশিষ্ট অবস্থায় আসবে। তিনি আরো বলেনঃ আমি তোমাদের আগেই হাওয কাওছারে উপস্থিত হবো। একদল লোক আমার হাওয থেকে বিতাড়িত হবে, যেমন পথভোলা উট বিতাড়িত হয়। আমি তাদেরকে ডেকে বলবোঃ তোমরা এদিকে এসো তোমরা এদিকে এসো। তখন বলা হবে, এসব লোক আপনার পর (দীনকে) পরিবর্তন করেছে এবং অবিরত তারা তাদের পশ্চাতে ফিরে গেছে। তখন আমি বলবোঃ সাবধান! দূর হও দূর হও। (ইবনে মাজাহ ৪৩০৬, সুনানে নাসাঈ ১৫০)

২. বুরায়দা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা দিতেন যখন তারা কবরস্থানে গমন করতেন, তিনি তখন তাদের লক্ষ্য করে বলতেন, (আবূ বকর  রাঃ এর বর্ণনা অনুযায়ী) “আলসালামু আলা আহলিদ দিয়ার” এবং যুহায়র এর বর্ণনা “আসসালামু আলাইকুম কবরবাসী মুমিন ও মুলমানদের উপর সালাম বর্ষিত হউক ইনশাআল্লাহ আমরাও অবশ্য তোমাদের সাথে মিলিত হব। আমাদের এবং তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।”(সহিহ মুসলিম ২১২৯ ইফাঃ)

৩. বুরাইদা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিতঃযখন সাহাবীগণ কবরস্থান যেতেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শিক্ষা দিতেন যে, তোমরা এ দো‘আ পড়ো,

‘আসসালা-মু আলাইকুম আহলাদ্দিয়া-রি মিনাল মু’মিনীনা অলমুসলিমীন, অইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লালা-হিক্বূন, আসআলুল্লা-হা লানা অলাকুমুল আ-ফিয়াহ।’

অর্থাৎ হে মু’মিন ও মুসলিম কবরবাসিগণ! যদি আল্লাহ চান তাহলে আমরাও তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমি আল্লাহর কাছে আমাদের এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা চাচ্ছি। (নাসায়ী ২০৪০, ইবনু মাজাহ ১৫৪৭, আহমাদ ২২৪৭৬, ২২৫৩০)

৪. কবর যিয়ারতের সময় সুন্নাত হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পঠিত দু‘আ পাঠ করা। ইসলামি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত সহিহ মুসলিমের একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষের দিকে কবরবাসীদের সম্পর্কে আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! তাদের (কবরবাসীদের) জন্য আমরা কী বলব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবে বল,

**لْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَلاَحِقُونَ ‏– السَّلاَمُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَيَرْحَمُ اللَّهُ**

(কবরবাসী মুমিন মুসলমানদের প্রতি সালাম, আল্লাহ অগ্রগামী পশ্চাৎগামী সবার প্রতি দয়া করুন আমরাও

ইনশাআল্লাহ অবশ্য তোমাদের সাথে মিলিত হব)। (সহিহ মুসলিম ২১২৮)

মন্তব্যঃ উপরের হাদিসগুলোর সাহায্য জানা যায় যে, কবর যিয়ারত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ। এটি একটি মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল।

খুবই সংক্ষেপে কবর যিয়ারতের নিয়ম

ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না।

খ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত নিয়তে সফর শুরু না করে, পবিত্র মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়ত করে মদীয়া আসতে হবে।

গ। মসজিদে নববীতে প্রবেশ করার জন্য আলাদ কোন আদাব, কায়দা বা দোয়া হাদিস দ্বারা প্রমানিত নয়।  যা কিছু বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে শুধুই মানুষের আবেগ আর ভালোবাসা। পৃথিবীর অন্যান্য মসজিদে যে ভাবে সম্মান ও মর্জাদে দিয়ে দুয়া পড়ে প্রবেশ করি ঠিক তেমনিভাবে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেতে হবে। তাই প্রবেশ করার সময় মুস্তাহাব হল প্রথমে ডান পা আগে দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবেন এবং পড়বেনঃ

أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ – بِسْمِ اللهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ – اَللَّهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ –

মন্তব্যঃ এটি পৃথিবীর যে কোন মসজিদে প্রবেশের দোয়া। শুধু মসজিদে নববী জন্য দোয়াটি খাস করা ঠিক হবে না।

ঘ। মসজিদে প্রবেশের পর দুই রাকআত দুখুলুল মসজিদ অথবা অন্য যে কোন সালাত আপনি আদায় করতে পারেন। কারন যে কোন সমজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করার কথা হাদিসে খুবই গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়েছে।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন সূলায়ক গাতফানী (রাঃ) জুমআর দিনে এলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিচ্ছিলেন। সুলায়ক (রাঃ) বসে পড়লেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সূলায়ক! তুমি দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দু’রাকআত সালাত আদায় করে নাও। তারপর বললেন, তোমাদের কেউ জুমু’আর দিন মসজিদে এলে, ইমাম তখন খুৎবারত থাকলে সংক্ষিপ্ত আকারে দু’ রাকআত সালাত আদায় করে নেবে। (সহিহ মুসলিম ১৮৯৭ ইফাঃ)

অতঃপর আপনার ইচ্ছা মোতাবেক দোয়া মুনাজাত করতে থাকবেন। উত্তম হলো এগুলো রিয়াদুল জান্নাতে বসে করা। আর এ স্থানটি হলো মসজিদটির মিম্বর থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরের মধ্যবর্তী অংশের জায়গাটুকু। এ স্থানটি সাদা কার্পেট বিছিয়ে নির্দিষ্ট করা আছে। ভীড়ের কারণে সেখানে জায়গা না পেলে মসজিদের যে কোন স্থানে বসে সালাত আদায় ও দোয়া-দরূদ পড়তে পারেন।

ঙ। সালাত আদায়ের পর কবর যিয়ারত করতে চাইলে আদব ও বিনয়ের সাথে কোন প্রকার শোরগোল না করে ধীরে ধীরে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিম্মের বাক্যে সালাম দিন। 

السَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ – اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ – اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

অথবা এতদসঙ্গে আপনি এভাবেও বলতে পারেনঃ

اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

চ। এরপর একটু ডানে অগ্রসর হলেই আবূ বকর রাদিআল্লাহু আনহু এর কবর। তাকে সালাম দিবেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করবেন। আর একটু ডানদিকে এগিয়ে গেলে দেখতে পাবেন উমর রাদিআল্লাহু আনহু-এর কবর। তাকেও সালাম দেবেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ উক্ত তিনজনকে আপনি এভাবেও সালাম দিতে পারেনঃ

اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَارَسُوْلَ اللهِ – اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا أَبَا بَكْرٍ – اَلسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا عُُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশী না বলাই উত্তম। এরপর এ স্থান ত্যাগ করবেন।

ছ। হজ্জগমনকারী নারীদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত জায়েয নয়। কোন নারীকেই (যে কোন) কবর যিয়ারত করার অনুমোধণ ইসলামি শরীয়তে দেয় নাই।  হাদিসে এসেছেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘন ঘন কবর যিয়ারত কারিণীদের অভিসম্পাত করেছেন। (ইবনে মাজাহ ১৫৭৫)

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতকারী মহিলাদের লা’নত করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ১০৫৬ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ নারীদের কবর যিয়ারত করা হারাম। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারত কারীনীদেরকে লা‘নত করেছেন। অতএব কোন অবস্থায়ই নারীদের জন্য কবর যিয়ারত হালাল নয়। নারীগণ মসজিদে নববীতে নামায পড়তে যাবে এবং নিজ জায়গায় বসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম দিবে। যে কোন জায়গা থেকে সালাম পাঠালেও তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজায় পৌঁছিয়ে দেয়া হয়।

এই কথার দলিল হলোঃ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ আমার ওপর সালাম পাঠ করলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার কাছে আমার রূহ ফেরত দেন যাতে আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি। (আবূ দাঊদ ২০৪১, মিসকাতুল মাসবিহ ৯২৫)