ইহরামের অবস্থায় যে সকল কাজ করা যায়

ইহরামের অবস্থায় যে সকল কাজ করা যায়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহরামের অবস্থায় নিচের কাজসমূহ করা যায়

১। পুরুষ লুঙ্গি না পেলে পায়জামা পরতে পারবেঃ

২। জুতা না পেলে চামড়ার মোজা পরতে পারবেঃ

৩। লুঙ্গিতে গিরা বা ফিতা দিয়ে বাঁধা যাবেঃ

৪। গোসল করা, মাথা ধোয়া যাবে

৫। প্রয়োজন বোধে মাথা চুলকানো যাবেঃ

৬। প্রয়োজনে মহিলাদের মুখমন্ডলের উপর ওড়না ঝুলাতে পারবেঃ

৭। প্রয়োজনে মহিলাদের হস্তদ্বয় বস্ত্র বা অন্য কিছু দিয়ে ঢাকা যাবেঃ

৮। ইহরাম অবস্থায় পাপড় ধৌত করা বা বদলানো যাবেঃ।

৯। শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা।

১০। জরুরী জিনিস পড়তে বা রাখতে পরবেঃ

১১। শিঙ্গা লাগাতে পারবেঃ

১২। মিসওয়াক বা ব্রাস ব্যবহার করতে পারবেঃ

১৩। ব্যবসা করতে পারবে।

১৪। মাথার সাথে মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করাঃ

১৫। ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণী হত্যা করা যাবেঃ

১৬। আরও কিছু কাজ যা মুহরিম ব্যক্তি করেত পারেঃ

পুরুষ লুঙ্গি না পেলে পায়জামা পরতে পারবেঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তাঁর ভাষণে বলতে শুনেছি, মুহরিম ব্যক্তির কাপড় না থাকলে সে পায়জামা পরতে পারবে এবং তার চপ্পল না থাকলে সে মোজা পরতে পারবে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৪, সুনানে নাসাঈ ২৬৭৩)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যার কাপড় নেই সে পায়জামা পরিধান করতে পারে, আর যার চপ্পল নেই সে মোজা পরতে পারে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৭)

মন্তব্যঃ এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায ওজরের কারনে জামা ও পায়জামা পড়া যায়। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক কালে মানুষের সামর্থ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, তাদের নিকট জামা ও পায়জামা পরিবর্তে সেলাই বিহীন ইহরামের কাপড় যোগার করা খুবই সহজ্জ সাধ্য। তাই এখন মনে হয় আর কারো সেলাই যুক্ত ইহরামের কাপড় পরিধান করা চিন্তাও আসে না।

জুতা না পেলে চামড়ার মোজা পরতে পারবেঃ

সালিম (রাঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মুহরিম ব্যক্তি কিরূপে কাপড় পরিধান করবে। তিনি বলেছিলেনঃ মুহরিম ব্যক্তি পরিধান করবে না জামা, বুরনুস, (টুপিম মত মেয়েরা পরিধান করে), পাজামা, পাগড়ী এবং ঐ সকল কাপড়, যা যাফরান বা ওয়ারস দ্বারা রং করা হয়েছে। আরও পরিধান করবে না মোজা। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যার জুতা না থাকে। যদি জুতা না পায় তাহলে নিম্ন পর্যন্ত মোজা কেটে তা পরিধান করবে। সুনানে নাসাঈ ২৬৬৯)

লুঙ্গিতে গিরা বা ফিতা দিয়ে বাঁধা যাবেঃ

লুঙ্গিতে গিরা দিয়ে বাঁধা যাবে কিংবা সূতা, ফিতা বা রশি জাতীয় কিছু দিয়ে বাঁধা যাবে। ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে, জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ি ও মোজা পরিধান করা। দলিলঃ

সালিম (রহঃ) হতে তার পিতার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলো, মুহরিম ব্যক্তি কি ধরনের কাপড় পরিহার করবে? তিনি বললেনঃ মুহরিম ব্যক্তি জামা, টুপি, পায়জামা, পাগড়ী, জাফরান অথবা ওয়ারাস মাখা কোন কাপড় ও মোজা পরবে না। তবে যার জুতা নেই সে মোজা পরতে পারবে। কিন্তু মোজা দু’টি সে এমনভাবে কেটে নিবে যাতে তা গোছাদ্বয়ের নীচে থাকে। (সুনানে  আবু দাউদ ১৮২৩)

আলেমগণ এ পাঁচটি পরিধেয়কে একত্রে ‘مخيط’ (মাখিত অর্থ- সেলাইকৃত) বলে থাকেন। অনেক সাধারণ মানুষ مخيط (সেলাইকৃত) বলতে যে পোশাকে خياطة (সেলাই) আছে সেটা বুঝে থাকে। আসলে বিষয়টি এমন নয়। বরং এর দ্বারা আলেমগণ উদ্দেশ্য করে থাকেন এমন পোশাক যা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবয়ব অনুযায়ী কেটে তৈরী করা হয়েছে; যেমন- জামা, পায়জামা। এটাই তাদের উদ্দেশ্য। তাইতো কোন মুহরিম যদি তালি দেয়া চাদর পরিধান করে কিংবা তালি দেয়া লুঙ্গি পরিধান করে তাতে কোন অসুবিধা নেই।  অথচ তিনি যদি সেলাইবিহীন জামা পরিধান করে সেটা হারাম হবে।

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে (হাজ্জের উদ্দেশে) মাদ্বীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা‘দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। যিলহাজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা‘য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহরাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হাজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা‘বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা‘য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয।(সহিহ বুখারি ১৫৪৫)

গোসল করা, মাথা ধোয়া যাবে

‘আবদুল্লাহ ইবনু হুনায়ন (রহ.) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবাওয়া নামক জায়গায় ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাঃ)-এর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, মুহরিম ব্যক্তি তার মাথা ধুতে পারবে আর মিসওয়ার (রাঃ) বললেন, মুহরিম তার মাথা ধুতে পারবে না। এরপর ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আমাকে আবূ আইউব আনসারী (রাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। আমি তাঁকে কুয়া হতে পানি উঠানো চরকার দু’ খুঁটির মধ্যে কাপড় ঘেরা অবস্থায় গোসল করতে দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, কে? বললাম, আমি ‘আবদুল্লাহ ইব্ন হুনায়ন। মুহরিম অবস্থায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে তাঁর মাথা ধুতেন, এ বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য আমাকে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন। এ কথা শুনে আবূ আইউব (রাঃ) তাঁর হাতটি কাপড়ের উপর রাখলেন এবং সরিয়ে দিলেন। ফলে তাঁর মাথাটি আমি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পেলাম। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তিকে, যে তার মাথায় পানি ঢালছিল, বললেন, পানি ঢাল। সে তাঁর মাথায় পানি ঢালতে থাকল। অতঃপর তিনি দু’ হাত দিয়ে মাথা নাড়া দিয়ে হাত দু’খানা একবার সামনে আনলেন আবার পেছনের দিকে টেনে নিলেন। এরপর বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এরকম করতে দেখেছি।(সহিহ বুখারি ১৮৪০)

নাফি‘ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু ‘উমার (রাঃ) যুল-হুলাইফায় ফজরের সালাত শেষ করে সওয়ারী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিতেন, প্রস্তুত হলে আরোহণ করতেন। সওয়ারী তাঁকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি সোজা কিবলামুখী হয়ে হারাম শরীফের সীমারেখায় পৌঁছা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করতে থাকতেন। এরপর বিরতি দিয়ে যূ-তুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে ভোর পর্যন্ত রাত যাপন করতেন এবং অতঃপর ফজরের সালাত আদায় করে গোসল করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করে ছিলেন। ইসমা‘ঈল (রহ.) গোসল সম্পর্কিত বর্ণনায় আইয়ূব (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৫৩)

৫। প্রয়োজন বোধে মাথা চুলকানো যাবেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, মুহরিম ব্যক্তি গোসলখানায় প্রবেশ করতে পারবে। ইবনু ‘উমার এবং ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) মুহরিম ব্যক্তির শরীর চুলকানোতে কোন দোষ আছে বলে মনে করেন না। (সহিহ বুখারি ১৮৪০ নম্বর হাদিসের ভুমিকায়)

প্রয়োজনে মহিলাদের মুখমন্ডলের উপর ওড়না ঝুলাতে পারবেঃ

ইহরাম অবস্থায় নারীদের জন্য খাস নিষিদ্ধ বিষয়াবলীর মধ্যে রয়েছে নেকাব। নেকাব হচ্ছে এমনভাবে মুখ ঢাকা যাতে চোখ দুটো ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। অনুরূপভাবে স্কার্ফ পরাও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় নারীগণ নেকাব বা স্কার্ফ পরবে না। নারীর মুখ খোলা রাখা শরিয়তসঙ্গত। তবে বেগানা পুরুষের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে মুখ ঢেকে নিবে। যে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকবে সেটা যদি মুখ স্পর্শ করে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

দলিলঃ ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ইহরাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ারস্ ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) (ইহরাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলঙ্কার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইবরাহীম (নাখ্‘য়ী) (রহ.) বলেন, (ইহরাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

৭। প্রয়োজনে মহিলাদের হস্তদ্বয় বস্ত্র বা অন্য কিছু দিয়ে ঢাকা যাবেঃ

‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইহরাম অবস্থায় নারীদের হাত মোজা ও মুখমন্ডলের নিকাব ঝুলাতে এবং ‘ওয়ারস’ ঘাস ও জাফরান মিশ্রিত কাপড় পরতে নিষেধ করতে শুনেছেন। তবে এগুলো বাদে অন্য কাপড় পরতে পারবে, যদিও তা রেশমী, কারুকার্য খচিত পায়জামা বা জামা কিংবা মোজা হয়। (সুনানের আবু দাইদ ১৮২৭)

৮। ইহরাম অবস্থায় পাপড় ধৌত করা বা বদলানো যাবেঃ।

ইহরাম অবস্থায় যেমন গোসল করা যাবে ঠিক তেমনিভাবে ইহরামের কাফড় ময়লা বা ঘর্মে সিক্ত তা ধৌত করা বা বদলানো যাবে।

দলিলঃ আয়িশাহ্ (রাযি.) ইহরাম অবস্থায় কুসুমীর রঙ্গে রঞ্জিত কাপড় পরেন এবং তিনি বলেন, নারীগণ ঠোঁট মুখমন্ডল আবৃত করবে না। ওয়ারস্ ও জাফরান রঙে রঞ্জিত কাপড়ও পরবে না। জাবির (রাঃ) বলেন, আমি উসফুরী (কুসুমী) রঙকে সুগন্ধি মনে করি না। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) (ইহরাম অবস্থায়) নারীদের জন্য অলঙ্কার পরা এবং কালো ও গোলাপী রং-এর কাপড় ও মোজা পরা দূষণীয় মনে করেননি। ইবরাহীম (নাখ্‘য়ী) (রহ.) বলেন, (ইহরাম অবস্থায়) পরনের কাপড় পরিবর্তন করায় কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

৯। শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা।

ইহরাম অবস্থায় অশ্লীল কথা বর্তা বলা যাবে না। কারে সাথে ঝগড়া বিদাদে জড়ান যাবে। কিন্তু শরীয়ত এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় কথা কাটাকাটি ও তর্কযুদ্ধ করা যাবে।  ইহার ফলে ইহরাম ভঙ্গ হবে না।

দলিল দিবঃ

১০। জরুরী জিনিস পড়তে বা রাখতে পরবেঃ

জরুরী জিনিস বলেত বুঝায় টাকা পয়সা, পাচপোর্ট, পাচপোর্ট রাখার ব্যাগ, মিসওয়াক, হালকা ব্যাগ, মোবাইল, মোবাইল রাখার ব্যাগ ইত্যাদি তার সাথে রাখানে ইহরামের কোন প্রকার ক্ষতিহবে।

১১। শিঙ্গা লাগাতে পারবেঃ

মুহরিম ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগাতে পারবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের অবস্থায় আধ কপালির কারণে তাঁর মাথায় শিঙ্গা লাগান। (সহিহ বুখারি ৫৭০১)

২. সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ্ (রহ.) বলেন, আমর (বিন দিনার) বলেছেন যে, আমি সর্বপ্রথম ‘আতা ইবনু আব্বাস-কে বলতে শুনেছি তা হলো তিনি বলেছেন যে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় রক্তমোক্ষম (সিঙ্গা) লাগিয়েছিলেন।(সহিহ বুখারি ১৮৩৫)

৩. ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণিত যে, মাথার ব্যথায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ‘লাহয়ী জামাল’ নামের একটি কুয়োর ধারে মাথায় শিঙ্গা লাগান।  (সহিহ বুখারি ৫৭০০)

১২মিসওয়াক বা ব্রাস ব্যবহার করতে পারবেঃ

ইহরাম অবস্থায় মিসওয়াক করা যাবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শর্তহীনভাবেই বেশি বেশি মিসওয়াক করতে উদ্বুব্ধ করেছেন।

১. আবূ হুরায়য়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের উপর যদি কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে আমি তাদেরকে মিস্ওয়াক করার হুকুম করতাম। (সহিহ মুসলিম ৭২৪০)

২. আমর ইবনু সুলাইম আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাযি.) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জুমু‘আহর দিন প্রত্যেক বালিগের জন্য গোসল করা কর্তব্য। আর মিস্ওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।(সহিহ বুখারি ৮৮০)

মন্তব্যঃ মিসওয়াকের স্থলে এ জাতীয় অন্য কিছু দিয়ে দাঁত মাজা যাবে। যেমনঃ ব্রাশ দিয়ে অনেকে দাঁত মেজে থাকে। এই ব্রাস ব্যবহারেরও অবকাশ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ টুটপেষ্টে সুগন্ধি থাকে, এর বিধান কি? এই সুগন্ধি যুক্ত টুটপেষ্ট ব্যবহারে কোন অসুবিধান নাই। কেননা এর দ্বারা সুবাস পেতে কেউ ব্যাবহার করে না।। কিন্তু যদি কেউ কোন প্রকার সুবাস পেতে এই সুগন্ধি ব্যবহার করে থাকে, তবে জায়েয হবে না।

১৩ব্যবসা করতে পারবে।

ইহরাম অবস্থায় ব্যবসা করা যাবে। তবে ব্যবসার নিয়তে হজ্জে গেলে হজ্জ হবে না। হজ্জেন নিয়ত থাকবে মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টি অর্জনের জন্য তার আদেশ পালন করা। এর পর হজ্জে গিয়ে কোন প্রকার ব্যবসা সুযোগ আসলে তা গ্রহন করা জায়েয।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ لَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَبۡتَغُواْ فَضۡلٗا مِّن رَّبِّكُمۡۚ﴾

অর্থঃ তোমাদের ওপর কোন পাপ নেই যে, তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ অনুসন্ধান করবে।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহিলী যুগে যুল-মাজায ও ‘উকায লোকেদের ব্যবসা কেন্দ্র ছিল। ইসলাম আসার পর মুসলিমগণ যেন তা অপছন্দ করতে লাগল, অবশেষে এ আয়াত নাযিল হলঃ ‘হাজ্জের মৌসুমে তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোন পাপ নেই’- (আল-বাকারাঃ ১৯৮)। (সহিহ বুখারি ১৭৭০, ২০৯৮)

তাফসিরে আহসানুল বয়ানে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়ছেঃ

فَضل (অনুগ্রহ) এর অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থাৎ, হজ্জের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্য করাতে কোন দোষ নাই। অবশ্য আসল উদ্দেশ্য হজ্জই হতে হবে। আসল উদ্দেশ্য ব্যবসা হলে হজ্জ হবে না। অন্য সকল তাফসিরেও এই আয়াতে ‘অনুগ্রহ’ দ্বারা ব্যবসায়িক মুনাফা বুঝানো হয়েছে।

১৪। মাথার সাথে মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করাঃ

মাথার সাথে লেপটে যায় বা সম্পূর্ণ মিসে যায় না এমন বস্তু ব্যবহার করা যাবে। যেমনঃ ছাতা, গাড়ির হুড, তাঁবু ইত্যাদি ব্যবহার করা।

দলিলঃ

উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বিদায় হাজ্জ করেছি এবং আমি দেখেছি, তিনি জামরাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপ করে সওয়ারীতে চড়ে ফিরে আসেন এবং তার সাথে ছিলেন বিলাল ও উসামাহ্ (রাঃ)। তাদের একজন উটের লাগাম ধরে তা টেনে নিচ্ছিলেন এবং অপরজন সূর্যের তাপের কারণে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথার উপরকাপড় ধরে রাখছিলেন। উম্মুল হুসায়ন (রাঃ) আরো বলেন, রসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেক কথা বললেন। এরপর আমি তাঁকে বলতে শুনেছিঃ যদি নাক-কান কাটা কোন কাফ্রী (কালো) ক্রীতদাসকেও তোমাদের নেতা নিয়োগ করা হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করে, তবে তার (নির্দেশ) শোন এবং আনুগত্য কর। (সহিহ মুসলিম ৩০২৯ হাদিস একাডেমি)

১৫। ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণী হত্যা করা যাবেঃ

ক্ষতিকর পোকা-মাকড় কিংবা হিংস্র প্রাণীকে শিকার-জন্তু হিসেবে গণ্য করা হবে না। সুতরাং হারাম শরীফের এলাকা কিংবা অন্য যেকোনো স্থানে মুহরিম বা হালাল ব্যক্তি, সকলের জন্য তা হত্যা করা বৈধ।

হাদিসে মুহরিম ব্যক্তি সাপ, বিচ্ছু, ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, চিল, পাগলা কুকুর, হিংস্র পশু ইত্যাদি হত্যা করা বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

দলিলঃ

১. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণী এত ক্ষতিকর যে, এগুলোকে হারামের মধ্যেও হত্যা করা যেতে পারে। (যেমন) কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও হিংস্র কুকুর। (সহিহ বুখারি ১৮২৯)

২. ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পাঁচ প্রকার প্রাণীকেইহরাম অবস্থায় মারলে কোন পাপ হবে না। সেগুলো হলো- চিল, ইঁদুর, দংশনকারী কুকুর, বিচ্ছু এবং কাক। (সুনানে নাসাঈ ২৮৩২)

৩.আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ইহরামধারী ব্যক্তি আক্রমণকারী হিংস্র জীব, হিংস্ৰ কুকুর, ইদুর, বিছা, চিল ও কাক হত্যা করতে পারে। (তিরমিজি ৮৩৮)

১৬। আরও কিছু কাজ যা মুহরিম ব্যক্তি করেত পারেঃ

উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো ছাড়াও নিম্মের কাজগুলো ইহরাম অবস্থায় করা মুহরিমের জন্য অনুমতি রয়েছ।

১. সুগন্ধিযুক্ত ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করতে পারবে।

২। পোষা প্রাণী যবেহ করতে পারবে। কারণ, এটি শিকারের আওতায় পড়ে না। যেমন, হাঁস, মুরগী ও ছাগল ইত্যাদি।

৩।  চশমা, ঘড়ি বা আংটি পরা কিংবা শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে। এমনি আয়নায় মুখ দেখাও যাবে।

৪।  স্বাভাবিকভাবে মাথার চুল আচড়ানো বা চুলকানো পারবে তবে এমন জোরে চিরুনি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত সাধারণত যাতে চুল পড়ে।

৫. মাথায় আসবাব-পত্র বহন করা, যদিও তা মাথার কিছু অংশ ঢেকে রাখে। কারণ, সাধারণত এর মাধ্যমে কেউ মাথা আবৃত করার উদ্দেশ্য করে না, বরং বোঝা বহন করাই মূল উদ্দেশ্য থাকে।

৬. পানিতে ডুব দেয়াতে কোন অসুবিধা নেই, যদিও এর ফলে সম্পূর্ণ মাথা আবৃত হয়ে যায়।

৭. পরিধান না করে জামা শরীরের সাথে জড়িয়ে রাখা।

৮. স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে লম্বা জামা পরিধান করা হয়, সেভাবে পরিধান না করে চাদর হিসেবে ব্যবহার করাতে কোন দোষ নেই।

৯. তালি যুক্ত চাদর পরিধানে কোন বাধা নেই।

১০. গলায় পানির মশক বা পানপাত্র ঝুলাতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *