কুরআনে আঙুলের ছাপের অলৌকিকত্ব রহস্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন কোনো বিজ্ঞান সাময়িকী নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। তবে এই ঐশী গ্রন্থের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এমন সব বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত, যা অবতীর্ণ হওয়ার সময়কালে মানুষের কল্পনারও অতীত ছিল। এমনই এক বিস্ময়কর বিষয় হলো মানুষের আঙুলের ডগা বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট (Fingerprint)। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন মানুষ জানত না যে প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ আলাদা, তখন কুরআন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই ক্ষুদ্র অঙ্গটির গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

১. আঙুলের ছাপ নিয়ে কুরআনের চ্যালেঞ্জ:

মানুষ যখন মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়া নিয়ে সন্দেহ পোষণ করত, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন-

اَیَحْسَبُ الْاِنْسَانُ اَلَّنْ نَّجْمَعَ عِظَامَہٗ ؕ﴿۳﴾ بَلٰی قٰدِرِیْنَ  عَلٰۤی  اَنْ  نُّسَوِّیَ بَنَانَہٗ ﴿۴﴾

“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিগুলো একত্রিত করতে পারব না? হ্যাঁ, অবশ্যই! আমি তার আঙুলের ডগা (Fingertips) পর্যন্ত সঠিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম। সূরা কিয়ামাহ : ৩-৪

এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহ শুধু হাড় বা শরীর পুনর্গঠনের কথা বলে ক্ষান্ত হননি, বরং বিশেষভাবে ‘আঙুলের ডগা’ (بَنَانَهُ – বানানাহু) কথাটি উল্লেখ করেছেন। কেন আল্লাহ সারা শরীরের বদলে ক্ষুদ্র এই আঙুলের ডগার কথা বললেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানে।

২. আঙুলের ছাপের অনন্যতা: বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে

উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত মানুষ মনে করত মানুষের আঙুলের ডগার রেখাগুলো নিছক কিছু সাধারণ চামড়ার ভাঁজ। ১৮৮০ সালের দিকে স্যার ফ্রান্সিস গ্যাল্টন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে আসে যে, এই রেখাগুলো আসলে মানুষের অনন্য এক পরিচয়পত্র।

অদ্বিতীয়তা (Uniqueness):

আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন দুজন মানুষ পাওয়া যায়নি যাদের আঙুলের ছাপ হুবহু এক। এমনকি আইডেন্টিক্যাল টুইনস (Identical Twins) বা অভিন্ন জমজ শিশু, যাদের ডিএনএ (DNA) পর্যন্ত প্রায় এক থাকে, তাদের আঙুলের ছাপও ভিন্ন হয়।

স্থায়ীত্ব:

মাতৃগর্ভে ভ্রূণ থাকা অবস্থায় ৩ থেকে ৪ মাস বয়সেই আঙুলের ছাপ স্থায়ী রূপ পায়। মৃত্যু এবং পচনের আগ পর্যন্ত এই ছাপ অপরিবর্তিত থাকে। যদি কেউ আঙ্গুলের চামড়া পুড়িয়ে ফেলে বা কেটে ফেলে, তবে নতুন চামড়া গজালেও সেখানে আগের সেই একই প্যাটার্ন বা নকশা ফিরে আসে।

জটিল বিন্যাস:

আঙুলের ছাপে মূলত তিনটি প্রধান নকশা থাকে—লুপ (Loops), হোরল (Whorls) এবং আর্চ (Arches)। এই নকশাগুলোর ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম রেখা (Ridges) এবং সেগুলোর বিভাজন (Bifurcations) প্রতিটি মানুষকে বিশ্বের অন্য বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ থেকে আলাদা করে।

৩. আধুনিক বারকোড সিস্টেম ও আঙুলের ছাপ

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে আমরা পণ্য শনাক্ত করার জন্য বারকোড (Barcode) বা কিউআর কোড (QR Code) ব্যবহার করি। প্রতিটি পণ্যের যেমন আলাদা কোড থাকে, তেমনি আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মানুষের শরীরে একটি প্রাকৃতিক বারকোড দিয়ে দিয়েছেন, আর সেটি হলো তার আঙুলের ছাপ।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ যখন পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছিল, তখন আল্লাহ এই ‘আঙুলের ডগা’র কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কেবল মানুষকে জীবনই দেবেন না, বরং প্রত্যেককে তার সূক্ষ্মতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসহ (Identity) ফিরিয়ে আনবেন। অর্থাৎ, হাশরের ময়দানে কোটি কোটি মানুষের ভিড়েও একজনের আঙুলের ছাপ অন্যজনের সাথে মিশে যাবে না। এটি আল্লাহর অসীম কুদরত এবং নিখুঁত সৃষ্টিশৈলীর এক অনন্য স্বাক্ষর।

৪. কুরআনে আঙুলের ব্যবহার: অলঙ্কারিক ও বৈজ্ঞানিক দিক

আপনার উল্লেখিত সূরা আল-বাকারাহ (আয়াত ১৯) এবং সূরা নূহ (আয়াত ৭)-এ দেখা যায়, মানুষ যখন চরম ভয় পায় বা সত্য শুনতে অস্বীকার করে, তখন তারা কানে আঙুল দেয়।

ভয় ও অস্বীকারের বহিঃপ্রকাশ: সূরা বাকারাহ-তে বজ্রপাতের শব্দ থেকে বাঁচতে কানে আঙুল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি মানুষের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।

অহংকার ও সত্যবিমুখতা: সূরা নূহ-তে হযরত নূহ (আ.) এর কওমের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বাণী না শোনার জন্য কানে আঙুল গুঁজে দিত।

যদিও এই আয়াতগুলোতে মানুষের আচরণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সূরা কিয়ামাহ-তে যখন আল্লাহ পুনরুত্থানের প্রসঙ্গে আঙুলের ডগার কথা বলেন, তখন তা সরাসরি ‘পরিচয় শনাক্তকরণ’ (Identity Identification) বিজ্ঞানের দিকে ইঙ্গিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং বাস্তব ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানেরও উৎস।

৫. ১৯শ শতাব্দীর আবিষ্কার বনাম ১৪শ শতাব্দীর কুরআন

আঙুলের ছাপের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ বা পরিচয় নিশ্চিত করার পদ্ধতি (Dactyloscopy) ১৮৫৮ সালে স্যার উইলিয়াম হারশেল প্রথম ব্যবহার শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ১৮৯২ সালে এটি বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পায়। কিন্তু কুরআন এই তথ্য দিয়েছে এমন এক যুগে যখন মরুভূমির আরবরা কল্পনাও করতে পারত না যে, তাদের বুড়ো আঙুলের ছাপটি বিশ্বের আর কারো সাথে মিলবে না।

এই ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যটি প্রমাণ করে যে:

  • কুরআন কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়।
  • যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এই কিতাব নাজিল করেছেন (যিনি স্রষ্টা, তিনিই বিজ্ঞানী)।
  • পরকালে পুনরুত্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব।

৬. আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও কৃতজ্ঞতা

মায়ের দুধের অলৌকিকতা যেমন আমাদের শৈশবে সুরক্ষা দেয়, তেমনি আঙুলের ছাপ আমাদের বড় বেলায় দান করে একটি স্বতন্ত্র সত্তা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শরীরের প্রতিটি ক্ষুদ্রতম অংশে তার কুদরতের নিদর্শন রেখে দিয়েছেন। তিনি আমাদের শরীরের এমন একটি জায়গায় আমাদের ‘আইডেন্টিটি’ লিখে দিয়েছেন যা আমরা সবসময় বহন করি কিন্তু কখনো খেয়াল করি না।

আঙুলের ছাপের এই মহাবিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা কেউ এই পৃথিবীতে অপ্রয়োজনীয় বা তুচ্ছ নই। আমাদের প্রত্যেকের একটি আলাদা পরিচয় আছে এবং আল্লাহর কাছে আমরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র গুরুত্বের অধিকারী।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, আঙুলের ছাপের রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞান আসলে কুরআনের সত্যতাকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সূরা কিয়ামাহ-এর ৪ নম্বর আয়াতটি আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, আজকের বায়োমেট্রিক সিস্টেম, স্মার্টফোন আনলক পদ্ধতি এবং ফরেনসিক ল্যাবরেটরিগুলো সেই চ্যালেঞ্জের অকাট্য সত্যতা প্রমাণ করছে। আল্লাহ যে কেবল আমাদের হাড়গুলো একত্রিত করবেন তাই নয়, বরং আমাদের আঙুলের ডগাগুলোকেও তাদের সমস্ত সূক্ষ্ম রেখাসহ পুনর্গঠন করবেন—এই ঘোষণাটি মানুষের অহংকার চূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট।

কুরআন ও পরাগায়ন (Pollination)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَرۡسَلۡنَا الرِّیٰحَ لَوَاقِحَ فَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَسۡقَیۡنٰکُمُوۡہُ ۚ وَمَاۤ اَنۡتُمۡ لَہٗ بِخٰزِنِیۡنَ

আর আমি বায়ুকে ঊর্বরকারীরূপে প্রেরণ করি অতঃপর আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। তবে তোমরা তার সংরক্ষণকারী নও। সুরা হিজর : ২২

এই আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ “لَوَاقِحَ (লাওয়াকিহ)” শব্দের অর্থ গর্ভবতী করা, উর্বর করা, পরিপক্ক বা ফলপ্রসূ করা। এই আয়াতে বায়ুকে “উর্বরকারী” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আয়াতটিকে পরাগায়ন (Pollination) প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে সম্পর্কিত করে বিশ্লেষণ করা বেশ যৌক্তিক এবং এটি কুরআনের বহু-অর্থবোধক নিদর্শনের একটি চমৎকার উদাহরণ। তবে পরাগায়ন (Pollination) এর যৌক্তিকতা বোঝার জন্য শব্দটির ব্যাপকতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট উভয়ই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পরাগায়ন :

শব্দটির একটি প্রধান এবং সুস্পষ্ট অর্থ হলো উদ্ভিদের পরাগায়ন বা নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া। পরাগায়ন হলো উদ্ভিদের প্রজননের জন্য পরাগরেণু (Pollen) এক ফুল থেকে অন্য ফুলে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া।

বায়ু-বাহিত পরাগায়ন (Anemophily) :

লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ, যেমন—ঘাস, অধিকাংশ শস্য (ধান, গম, ভুট্টা), এবং অনেক প্রকারের গাছ (যেমন—ওক, ম্যাপল), তাদের পরাগায়নের জন্য সম্পূর্ণভাবে বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। বাতাস তাদের পরাগরেণু বহন করে নতুন ফুলকে উর্বর করে এবং ফল ও বীজ সৃষ্টিতে সাহায্য করে।

কুরআনে যখন বাতাসকে “উর্বরকারী” বলা হয়, তখন এর অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে এই বায়ু-বাহিত পরাগায়নকে ইঙ্গিত করা হয়। ১৪শ বছর আগে যখন উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত ছিল, তখন কুরআনের এই সূক্ষ্ম ইঙ্গিতটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

২. জলচক্র ও মেঘের নিষিক্তকরণ (Cloud Fertilization) সংক্রান্ত যৌক্তিকতা

অনেক তাফসীরকারক (কুরআনের ব্যাখ্যাকারী) “লাওয়াকিহ” শব্দটির একটি বৃহত্তর অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন, যা জলচক্র এবং বৃষ্টিপাতের সাথে সম্পর্কিত। আধুনিক বিজ্ঞান এই ব্যাখ্যাটিকেও সমর্থন করে।

বায়ুর ভূমিকা: বাতাস জলীয় বাষ্পপূর্ণ মেঘকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যায়। এছাড়াও, বাতাস বিভিন্ন উৎস থেকে ধূলিকণা বা লবণের কণা (Aerosols) বহন করে, যা মেঘের মধ্যে ঘনীভবন কেন্দ্র (Condensation Nuclei) হিসেবে কাজ করে।

“নিষিক্তকরণ” অর্থে ব্যবহার: এই ধূলিকণা বা লবণ কণাগুলো মেঘের ফোঁটাগুলোকে একত্রিত হতে সাহায্য করে এবং ফোঁটাগুলো বড় হয়ে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ে। এই প্রক্রিয়াকে এক ধরনের “নিষিক্তকরণ” বা “উর্বরকরণ” হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে বায়ু মেঘকে বৃষ্টি দান করার জন্য প্রস্তুত করে। এটি জলচক্রকে সচল রেখে ভূমিকে “উর্বর” করে তোলে।

৩. ভাষার সৌন্দর্য ও বহু-অর্থবোধকতা

কুরআনের ভাষা এমনভাবে রচিত যে একটি আয়াত একই সাথে একাধিক বৈজ্ঞানিক বা আধ্যাত্মিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে।

বিষয়লাওয়াকিহ” এর অর্থবৈজ্ঞানিক/ প্রাকৃতিক সত্য
উদ্ভিদপরাগায়নকারীবায়ু পরাগরেণু বহন করে উদ্ভিদকে বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
বৃষ্টিমেঘকে প্রস্তুতকারীবায়ু জলীয় বাষ্প এবং ঘনীভবন কণা বহন করে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
ভূমিউর্বরকারীবায়ু-বাহিত বৃষ্টির মাধ্যমে শুষ্ক জমিতে জীবন দান করা হয়।

উপসংহার :

 “লাওয়াকিহ” (لَوَاقِحَ) শব্দটি মূলত ‘উর্বর করা’ বা ‘নিষিক্ত করা’ অর্থ বহন করে, যা সরাসরি উদ্ভিদের প্রজনন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। বহু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য শস্য সহ বিশাল সংখ্যক উদ্ভিদ বাতাসের মাধ্যমে পরাগায়িত হয়—এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য। এই আয়াত একইসাথে উদ্ভিদের পরাগায়ন এবং জলচক্রের মাধ্যমে ভূমির উর্বরতা, উভয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। অতএব, এই আয়াতটি কুরআনের অন্যতম নিদর্শনের (Signs) একটি, যা আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে আরও সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। এটি প্রমাণ করে যে সৃষ্টিকর্তার জ্ঞান সমস্ত সৃষ্টির প্রক্রিয়ার ওপর বিস্তৃত।

সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) ও কুরআন :

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন ১৪৫০ বছর আগে সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছে, যখন সালোকসংশ্লেষণের বিজ্ঞানীয় ব্যাখ্যা অজানা ছিল। আয়াতে পানির মাধ্যমে উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং তার অস্থায়িত্ব দেখিয়ে আল্লাহর সৃষ্টির অলৌকিকত্ব প্রকাশ করে, যা আধুনিক বিজ্ঞানে সালোকসংশ্লেষণের মেকানিজম দিয়ে নিশ্চিত হয়। এটি কুরআনের ঐশ্বরিক জ্ঞান প্রমাণ করে, যা বিজ্ঞানের সাথে সংঘর্ষ করে না বরং এর সাথে মিলে যায়, চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন হিসেবে।

১. ট্রান্সপিরেশন (Transpiration) বা প্রস্বেদন কী?

ট্রান্সপিরেশন হলো এমন একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে উদ্ভিদ তার মূল দ্বারা শোষিত অতিরিক্ত পানি বাষ্প আকারে পাতার ছিদ্র (পত্ররন্ধ্র বা Stomata) দিয়ে বায়ুমণ্ডলে ত্যাগ করে। এটি মূলত উদ্ভিদের একটি “ঘামানো” প্রক্রিয়ার মতো, যা উদ্ভিদকে শীতল রাখে এবং মূল থেকে পাতায় খনিজ লবণ পৌঁছাতে সাহায্য করে।

চিত্র : ট্রান্সপিরেশন (Transpiration) বা প্রস্বেদন প্রক্রিয়া

২. সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়া

সালোকসংশ্লেষণ হলো এমন একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সাহায্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি ব্যবহার করে শর্করা জাতীয় খাদ্য (গ্লুকোজ) তৈরি করে। প্রক্রিয়ার মূল ধাপ:

উপাদান: পানি (H2O) + কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) + সূর্যালোক + ক্লোরোফিল।

বিক্রিয়া: 6CO2 + 12H2O __( সূর্যালোক + ক্লোরোফিলের উপস্থিতি)___ C6H12O6 + 6O2 + 6H2O

ফলাফল: উদ্ভিদ নিজের জন্য খাদ্য (গ্লুকোজ) তৈরি করে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন ত্যাগ করে, যা প্রাণিকুল শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যবহার করে।

চিত্র : সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) প্রক্রিয়া।

৩. কুরআনের আলোকে সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاضۡرِبۡ لَہُمۡ مَّثَلَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا کَمَآءٍ اَنۡزَلۡنٰہُ مِنَ السَّمَآءِ فَاخۡتَلَطَ بِہٖ نَبَاتُ الۡاَرۡضِ فَاَصۡبَحَ ہَشِیۡمًا تَذۡرُوۡہُ الرِّیٰحُ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ مُّقۡتَدِرًا

তাদের কাছে পেশ কর পার্থিব জীবনের উপমা – এটা পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যদ্বারা ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদ্গত হয়, অতঃপর তা বিশুস্ক হয়ে এমন চূর্ণ বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। সুরা কাহফ : ৪৫

এই আয়াতের বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক সমন্বয় নিচে দেওয়া হলো:

ক. প্রাণের সূচনা ও পানির ভূমিকা (সালোকসংশ্লেষণের ভিত্তি)

আয়াতে বলা হয়েছে আকাশ থেকে পানি বর্ষণের কথা। বিজ্ঞানের ভাষায়, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার প্রধান কাঁচামাল হলো পানি। পানি ছাড়া ক্লোরোফিল সক্রিয় হতে পারে না এবং উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করতে পারে না। আল্লাহ যখনই পানি বর্ষণ করেন, তখনই সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং নির্জীব মাটি থেকে “উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদ্গত হয়।”

খ. শক্তি রূপান্তর ও “সবুজায়ন”

আয়াতে ‘উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট’ হওয়ার বিষয়টি সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে। আলোক শক্তি যখন রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন উদ্ভিদ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে, উদ্ভিদের এই সবুজ রঙের পেছনে রয়েছে ক্লোরোফিল, যা মূলত সূর্যের শক্তিকে সঞ্চয় করে রাখে।

গ. জীবনের চক্র ও শক্তির বিনাশ (তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র)

আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে— “…অতঃপর তা বিশুস্ক হয়ে এমন চূর্ণ বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।”

এটি সালোকসংশ্লেষণ ও প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার সমাপ্তি এবং জীবনের নশ্বরতা প্রকাশ করে। যখন একটি উদ্ভিদ মারা যায়, তখন তার ভেতরের সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তি ও পানি নিঃশেষ হয়ে যায়। সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে যে কার্বন সে গ্রহণ করেছিল, পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা আবার প্রকৃতিতে ফিরে যায়।

টেবিলের মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক সমন্বয়

আয়াতের অংশবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি”বৃষ্টি → সালোকসংশ্লেষণের প্রধান উপাদান
ভূমির উদ্ভিদ ঘন হয়ে উঠে”পানি + সূর্যালোক → উদ্ভিদের বৃদ্ধি
পরে তা শুকিয়ে যায়”পানি বন্ধ হলে সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ
বাতাস উড়িয়ে নেয়”ট্রান্সপিরেশন ও পরিবেশগত প্রভাব

সমন্বিত বিশ্লেষণ

কুরআনের এই আয়াতটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম (Ecosystem) বা বাস্তুতন্ত্রের চিত্র তুলে ধরে:

  • ইনপুট: আকাশ থেকে পানি (বৃষ্টি)।
  • প্রক্রিয়া: পানির সংস্পর্শে উদ্ভিদের বৃদ্ধি (সালোকসংশ্লেষণ)।
  • আউটপুট: ঘন সবুজ প্রকৃতি।
  • পরিণতি: শুষ্কতা ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া (জৈব পদার্থের রূপান্তর)।

আল্লাহ তাআলা এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সালোকসংশ্লেষণ যেমন একসময় থেমে যায় এবং সবুজ উদ্ভিদ ধূলায় মিশে যায়, দুনিয়ার জাঁকজমকপূর্ণ জীবনও তেমনি সাময়িক।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : পাহাড়-পর্বত সম্পর্কে কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

প্রকৃতি এবং এর বিশালতা মহান রাব্বুল আলামিনের এক অপার সৃষ্টি। মানুষের দৃষ্টির সীমানায় যা ধরা পড়ে এবং যা পড়ে না—সবই তাঁর অসীম কুদরত। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করে তাকে চিন্তা ও গবেষণার শক্তি দান করেছেন। এই পৃথিবীকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে সাজিয়ে সেখানে মানুষকে ‘খিলাফাত’ বা প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ঘোষণা করেন-

الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ فِرَاشًا وَّالسَّمَآءَ بِنَآءً ۪ وَّاَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخۡرَجَ بِہٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزۡقًا لَّکُمۡ ۚ فَلَا تَجۡعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا وَّاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ

যিনি তোমাদের জন্য যমীনকে করেছেন বিছানা, আসমানকে ছাদ এবং আসমান থেকে নাযিল করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর তাঁর মাধ্যমে উৎপন্ন করেছেন ফল-ফলাদি, তোমাদের জন্য রিয্কস্বরূপ। সুতরাং তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করো না। সূরা বাকারা : ২২

সৃষ্টিতত্ত্ব ও কুরআনের আহ্বান

পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, এই বিশ্বপ্রকৃতি তাঁরই সৃষ্টি। সূরা ওয়াকিয়ায় আল্লাহ মানুষকে তাদের জন্ম এবং শস্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে—বীজ থেকে ফসল মানুষ উৎপাদন করে নাকি স্বয়ং আল্লাহ? এই জিজ্ঞাসাই মানুষকে গবেষণার পথে চালিত করে।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো আবহাওয়া বিজ্ঞান। বায়ুমণ্ডলের স্থায়িত্ব এবং ভূপৃষ্ঠের প্রকৃতির ওপর মানুষের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলো মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। কুরআন এ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছে-

اَفَاَمِنۡتُمۡ اَنۡ یَّخۡسِفَ بِکُمۡ جَانِبَ الۡبَرِّ اَوۡ یُرۡسِلَ عَلَیۡکُمۡ حَاصِبًا ثُمَّ لَا تَجِدُوۡا لَکُمۡ وَکِیۡلًا ۙ

তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গিয়েছ যে, তিনি তোমাদেরসহ স্থলের কোন দিক ধ্বসিয়ে দেবেন না অথবা তোমাদের উপর শিলা বর্ষণকারী বাতাস প্রেরণ করবেন না? তারপর তোমরা তোমাদের জন্য কোন কর্মবিধায়ক পাবে না। সূরা বনি ইসরাইল : ৬৮

আধুনিক বিজ্ঞান আজ শত বছরের গবেষণায় যা প্রমাণ করছে, ইসলাম তা দেড় হাজার বছর পূর্বেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ল্যাবরেটরি ছাড়াই বর্ণনা করেছে। বিজ্ঞানের প্রতিটি সত্য মূলত ইসলামের সত্যেরই অনুগামী।

মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মুসলিম জাতি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল পবিত্র কুরআনের প্রেরণায়। ডক্টর হার্টউইগ হার্শফেল্ডের মতে, কুরআনই হলো সকল বিজ্ঞানের উৎস। আকাশ, পৃথিবী, বাণিজ্য এবং মানবজীবনের প্রতিটি বিষয় এতে স্পর্শ করা হয়েছে। আল্লাহ নিজেই কুরআনকে ‘হাকীম’ বা বিজ্ঞানময় বলে অভিহিত করেছেন। ডক্টর মরিস বুকাইলি তাঁর বিখ্যাত ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ বইতে লিখেছেন যে, কুরআনে এমন কোনো বক্তব্য নেই যা আধুনিক বিজ্ঞানের বিচারে খণ্ডন করা সম্ভব।

ল্যাটিন ও জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসী অসংখ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সন্ধান পেয়েছে। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কাল ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের স্বর্ণযুগ। জাবির বিন হাইয়ান, আল-কিন্দি, আল-খারেজমী, আল-বিরুনী এবং ইবনে সিনার মতো মনীষীরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইবনে সিনার ‘কানুন ফিততীব’ গ্রন্থটি ইউরোপে দীর্ঘ পাঁচশ বছর চিকিৎসা বিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ বা ‘বাইবেল’ হিসেবে পঠিত হয়েছে।

প্রকৃতি ও আবহাওয়া বিজ্ঞানে কুরআনিক নিদর্শন

আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো এবং বজ্রধ্বনির যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজ আমরা জানি, তা কুরআন সুনিপুণভাবে বর্ণনা করেছে। বিদ্যুৎ চমকানোর ফলে বাতাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রসারণের ফলে যে বিকট শব্দ হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও পূর্ণাঙ্গ রহস্য ভেদ করতে পারেননি। অথচ কুরআন বলছে-

وَیُسَبِّحُ الرَّعۡدُ بِحَمۡدِہٖ وَالۡمَلٰٓئِکَۃُ مِنۡ خِیۡفَتِہٖ ۚ  وَیُرۡسِلُ الصَّوَاعِقَ فَیُصِیۡبُ بِہَا مَنۡ یَّشَآءُ وَہُمۡ یُجَادِلُوۡنَ فِی اللّٰہِ ۚ  وَہُوَ شَدِیۡدُ الۡمِحَالِ ؕ

আর বজ্র তার সপ্রশংস তাসবীহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারাও তার ভয়ে। আর তিনি গর্জনকারী বজ্র পাঠান। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তা দ্বারা আঘাত করেন এবং তারা আল্লাহ সম্বন্ধে ঝগড়া করতে থাকে। আর তিনি শক্তিতে প্রবল, শাস্তিতে কঠোর। সূরা রাদ : ১৩

আবহাওয়া বিজ্ঞানে ‘অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝড়’ বা আগুনের ঝাপটাবিশিষ্ট ঝড়ের ধারণা আধুনিককালে স্বীকৃত হলেও কুরআন তা দেড় হাজার বছর আগেই উল্লেখ করেছে-

اَیَوَدُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ تَکُوۡنَ لَہٗ جَنَّۃٌ مِّنۡ نَّخِیۡلٍ وَّاَعۡنَابٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۙ  لَہٗ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ ۙ  وَاَصَابَہُ الۡکِبَرُ وَلَہٗ ذُرِّیَّۃٌ ضُعَفَآءُ ۪ۖ  فَاَصَابَہَاۤ اِعۡصَارٌ فِیۡہِ نَارٌ فَاحۡتَرَقَتۡ ؕ  کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ تَتَفَکَّرُوۡنَ 

তোমাদের কারও যদি এমন একটি খেজুর ও আঙ্গুর উদ্যান থাকে যার তলদেশ দিয়ে নদী-নালা প্রবাহিত, সেখানে সর্ব প্রকার ফলের সংস্থান তার রয়েছে, আর সে বার্ধক্যে উপনীত হল, অথচ তার কতকগুলি দুর্বল (অপ্রাপ্ত বয়স্ক) সন্তান-সন্ততি রয়েছে, এ অবস্থায় সেই বাগানে উপস্থিত হল অগ্নিসহ এক বাত্যাবর্ত, আর তা পুড়ে (ভস্মীভূত হয়ে) গেল; তোমরা কেহ এটা পছন্দ করবে কি? এ রূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করেন, যেন তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর। সূরা বাকারা : ২৬৬

মরুভূমির ‘লুহাওয়া’ বা বিজ্ঞানের ‘সেন্ট এলমার ফায়ার’ যা প্রবল ঘর্ষণে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায় তার বাস্তব উদাহরণ আমরা ১৯৯১ সালের বাংলাদেশের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়েও দেখতে পেয়েছি।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বাঁধ নির্মাণের ইতিহাসও কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। সূরা সাবায় ‘মাআরিব বাঁধ’ ভেঙে যাওয়ার ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের অবাধ্যতা ও শুকরিয়া আদায় না করার কারণে সমৃদ্ধ জনপদও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

আজকের আধুনিক বিশ্বে মুসলমানরা গবেষণায় পিছিয়ে থাকলেও অতীতে তাদের অবদানই বর্তমান বিজ্ঞানের ভিত্তি। শব্দের গতির চেয়ে আলোর গতি যে অনেক বেশি, তা ১১শ শতকেই ইবনে হাইছাম ও আল-বিরুনী প্রমাণ করেছিলেন। বর্তমান সময়েও ডক্টর আব্দুস সালাম বা ফাতেমার মতো মুসলিম বিজ্ঞানীরা সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করছেন।

প্রকৃতি কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর আজ্ঞাবহ। পবিত্র কুরআন আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রকৃতিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে। তাই বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক। কুরআন কেবল আচার-সর্বস্ব ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি চিন্তা, গবেষণা এবং মহাবিশ্বকে জানার এক শাশ্বত গাইডলাইন। যারা বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, তাদের জন্য প্রাকৃতিক নিদর্শনের মাঝেই স্রষ্টাকে চেনার পথ উন্মুক্ত রয়েছে।

পাহাড়-পর্বত সম্পর্কে কুরআন

কুরআন ও আধুনিক ভূ-বিজ্ঞানের আলোকে পাহাড়-পর্বতের ভূমিকা

সৃষ্টিকর্তার মহাবাণী আল-কুরআন ১৪৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানবজাতির জন্য হেদায়েতের আলোকবর্তিকা। এর নির্দেশনা যেমন জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে চিরন্তন, তেমনি এতে বর্ণিত সৃষ্টিজগতের রহস্যসমূহ আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাহাড়-পর্বত মানবসভ্যতার ইতিহাসে বরাবরই বিস্ময় ও কৌতূহলের বিষয় হয়ে এসেছে। মানুষের দৃষ্টিতে পাহাড় মানে কেবল ভূমির উপর উঁচু, কঠিন ও স্থির এক বিশাল অবয়ব। কিন্তু আধুনিক ভূ-বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে—পাহাড়ের প্রকৃত আকৃতি ও ভূমিকা আমাদের চোখে দেখা অংশের চেয়ে অনেক গভীর, বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পবিত্র কুরআন প্রায় চৌদ্দ শত বছর আগেই পাহাড়-পর্বতের সেই গভীর বাস্তবতাকে এমন ভাষায় উপস্থাপন করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পাহাড়ের গভীর শিকড়

আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, আমরা মাটির উপরে যে বিশাল পর্বতশৃঙ্গ দেখি, তার মাটির নিচেও সুদূরপ্রসারী এবং গভীর শিকড় রয়েছে। এই শিকড়গুলি ভূপৃষ্ঠের ওপরে তাদের উচ্চতার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই ধারণার ভিত্তিতে, পাহাড়কে বর্ণনা করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ হলো ‘পেরেগ’ বা ‘কীলক’ (Peg), কারণ একটি কীলকের বেশিরভাগ অংশই মাটির নিচে লুকানো থাকে, যা এটিকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করে।

ভূ-বিজ্ঞানের ইতিহাস অনুসারে, পাহাড়ের এই গভীর শিকড় থাকার তত্ত্বটি উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে প্রবর্তিত হয়েছিল। তবে, আল-কুরআন এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে বহু আগেই অত্যন্ত নির্ভুলভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন-

اَلَمْ  نَجْعَلِ الْاَرْضَ مِهٰدًا ۙ﴿۶﴾ وَّ  الْجِبَالَ  اَوْتَادًا ﴿۪ۙ۷﴾

আমি কি পৃথিবীকে শয্যা (রূপে) নির্মাণ করিনি? এবং পর্বতসমূহকে কীলক রূপে নির্মাণ করিনি?

সুরা নাবা : ৬-৭

আরবিতে পর্বতকে এখানে “আওতাদ” (أَوْتَادًا) শব্দটি দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ হলো কীলক বা পেগ। কীলকের এই বর্ণনাটি আধুনিক ভূ-বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে হুবহু মিলে যায়, যা নির্দেশ করে যে পাহাড়ের দৃশ্যমান অংশের চেয়ে এর মাটির গভীরে প্রোথিত অংশই এটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, ঠিক যেমন একটি তাঁবুর খুঁটিকে মাটিতে গেঁথে রাখার জন্য কীলক ব্যবহার করা হয়।

অধ্যাপক ইমেরিটাস ফ্রাঙ্ক প্রেসের মতো প্রখ্যাত ভূ-বিজ্ঞানীরা, যিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁর ‘আর্থ’ (Earth) নামক মৌলিক পাঠ্যপুস্তকে এই ধারণার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পাহাড়ের ‘অভ্যন্তরীণ মূল বা শিকড়’ (underlying roots) রয়েছে, যা মাটির গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। এই শিকড়ের কারণে পাহাড়গুলি কীলক বা খিলান-এর আকার ধারণ করে। আধুনিক ভূতত্ত্বের বিভিন্ন রেখাচিত্র (যেমন Anatomy of the Earth, Cailleux; Earth Science, Tarbuck and Lutgens-এ প্রদর্শিত) এই কীলকের মতো আকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে।

উপরের ছবিতে দেখা যায় : পর্বতগুলি, কীলকের মতো, মাটির গভীরে প্রোথিত গভীর শিকড় ধারণ করে। (Anatomy of the Earth, কাইলিউ, পৃ. ২২০।

আরেকটি চিত্র দেখায় যে, কীভাবে পর্বতগুলি তাদের গভীর শিকড়ের কারণে কীলকের মতো আকৃতি ধারণ করে। (Earth Science, টারবাক এবং লুটজেন্স, পৃ. ১৫৮।

পাহাড়ের গভীর শিকড় মাটির নিচে থাকে। (Earth, প্রেস এবং সিভার, পৃ. ৪১৩

কার্টারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁর ‘আর্থ’ (Earth) নামক মৌলিক পাঠ্যপুস্তকে এই ধারণার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পাহাড়ের ‘অভ্যন্তরীণ মূল বা শিকড়’ (underlying roots) রয়েছে, যা মাটির গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। এই শিকড়ের কারণে পাহাড়গুলি কীলক বা খিলান-এর আকার ধারণ করে। আধুনিক ভূ-তত্ত্বের বিভিন্ন রেখাচিত্র (যেমন Anatomy of the Earth, Cailleux; Earth Science, Tarbuck and Lutgens-এ প্রদর্শিত) এই কীলকের মতো আকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে।”

পৃথিবীর স্থিতিশীলকারী হিসেবে পাহাড় :

কুরআন কেবল পাহাড়ের গঠন বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কেও আলোকপাত করেছে। পাহাড়-পর্বত পৃথিবীর ভূত্বককে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা পৃথিবীর কম্পন বা ঝাঁকুনিকে বাধা দেয়, যা জীবনের বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যক। আল্লাহ্‌ তা’আলা সূরা নাহলের ১৫ নং আয়াতে এই স্থিতিশীলকারী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন-

وَاَلۡقٰی فِی الۡاَرۡضِ رَوَاسِیَ اَنۡ تَمِیۡدَ بِکُمۡ وَاَنۡہٰرًا وَّسُبُلًا لَّعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ ۙ

আর তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয় এবং স্থাপন করেছেন নদ-নদী ও পথ, যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পার। সুরা নাহল: ১৫

এই আয়াতে পাহাড়কে “রাওয়াসিয়া” (رَوَاسِیَ) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ হলো দৃঢ়ভাবে প্রোথিত বা নোঙর স্বরূপ। এর উদ্দেশ্য হলো “আন তামিয়া বি-কুম” (اَنۡ تَمِیۡدَ بِکُمۡ) বা “যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে আন্দোলিত না হয়”।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও অপেক্ষাকৃত আধুনিক। আধুনিক প্লেট টেকটোনিক্স (Plate Tectonics) তত্ত্ব অনুসারে, যা ১৯৬০-এর দশকের শেষদিক থেকে মাত্র বোঝা যেতে শুরু করেছে, পাহাড়গুলি সত্যিই পৃথিবীর জন্য স্টেবিলাইজার বা স্থিতিশীলকারী হিসেবে কাজ করে। যখন ভূ-পৃষ্ঠের প্লেটগুলো নড়াচড়া করে বা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন পর্বতমালার গভীর শিকড় ও বিশাল ভর ভূত্বককে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, যা টেকটোনিক অস্থিরতা ও কম্পনের তীব্রতাকে হ্রাস করে পৃথিবীর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

উপসংহার : পাহাড়ের কীলক-সদৃশ আকৃতি এবং পৃথিবীর স্থিতিশীলকারী হিসেবে এর ভূমিকা—এই দুটি বৈজ্ঞানিক সত্যের নির্ভুল বর্ণনা আল-কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসের অকাট্য প্রমাণ। চৌদ্দশ বছর আগে যখন ভূ-বিজ্ঞানের আধুনিক জ্ঞান মানুষের কাছে ছিল না, তখন মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পক্ষে এই তথ্যগুলি দেওয়া সম্ভব ছিল না। কুরআনের এই আয়াতগুলি প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এমন এক জ্ঞানভাণ্ডার যা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে তাল মিলিয়ে চলে, বরং কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পথকেও নির্দেশনা দেয়। পাহাড়-পর্বত সম্পর্কে কুরআনের এই জ্ঞান ইঙ্গিত করে যে, এই কিতাবের রচয়িতা আর কেউ নন, তিনি হলেন স্বয়ং আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা), যিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি রহস্য সম্পর্কে অবগত।

পাহাড়ের চলাচল

আমাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালকার পাহাড়গুলোকে দেখলে মনে হয় এগুলো অটল, অবিচল এবং স্থির। পাহাড়ের এই আপাত স্থায়িত্বের কারণে মানুষের মনে দীর্ঘকাল ধরে এই বিশ্বাস ছিল যে, পাহাড়গুলো সৃষ্টির শুরু থেকে একইভাবে আছে। কিন্তু আধুনিক ভূ-তত্ত্ব (Geology) এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞান বলছে, পাহাড়গুলো মোটেও স্থির নয়, বরং এগুলো প্রতিনিয়ত চলাচল করছে। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, বহু বছর আগে পবিত্র কুরআনে পাহাড়ের এই গতির কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। মেঘের মতোই পাহাড় চলাচল করে এ  সম্পর্কে কুরআন এক বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَتَرَی الۡجِبَالَ تَحۡسَبُہَا جَامِدَۃً وَّہِیَ تَمُرُّ مَرَّ السَّحَابِ ؕ صُنۡعَ اللّٰہِ الَّذِیۡۤ اَتۡقَنَ کُلَّ شَیۡءٍ ؕ اِنَّہٗ خَبِیۡرٌۢ بِمَا تَفۡعَلُوۡنَ

আর তুমি পাহাড়সমূকে দেখছ, সেগুলোকে তুমি স্থির মনে করছ। অথচ তা মেঘমালার ন্যায় চলতে থাকবে। (এটা) আল্লাহর কাজ, যিনি সব কিছু দৃঢ়ভাবে করেছেন। নিশ্চয় তোমরা যা কর, তিনি সে সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত। সূরা নামল : ৮৮

এখানে আল্লাহ বলছেন যে, মানুষের দৃষ্টিতে পাহাড়কে স্থির মনে হলেও আসলে তা মেঘের মতো গতিশীল। আকাশপথে মেঘ যেমন বাতাসের তোড়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভেসে যায়, পাহাড়গুলোও ঠিক সেভাবে পৃথিবীর ভূত্বকের ওপর চলাচল করছে।

আলফ্রেড ওয়েগনার ও মহাদেশীয় বিচলন তত্ত্ব :

বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত বিজ্ঞান জগৎ জানত না যে মহাদেশ বা পাহাড়গুলো নড়াচড়া করে। ১৯১২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রেড ওয়েগনার (Alfred Wegener) প্রথম প্রস্তাব করেন যে, পৃথিবীর মহাদেশগুলো একসময় একত্রে যুক্ত ছিল এবং পরে সেগুলো ভেঙে একে অপরের থেকে দূরে সরে গেছে। তিনি এই তত্ত্বের নাম দেন ‘কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’ (Continental Drift)** বা মহাদেশীয় বিচলন।

ওয়েগনারের মতে, প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভাগ একটি মাত্র বিশাল ভূখণ্ড ছিল, যার নাম ছিল ‘প্যানজিয়া’ (Pangaea)’। ১৮০ মিলিয়ন বছর আগে এই প্যানজিয়া ভেঙে গন্ডোয়ানা ও লরেশিয়া নামক দুটি ভাগে বিভক্ত হয়। পরবর্তী ১৫০ মিলিয়ন বছরে এগুলো আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত হয়ে বর্তমান পৃথিবীর রূপ নিয়েছে।

পাহাড়ের এই চলার রহস্য কী?

পাহাড়ের এই গতির কারণ হলো পৃথিবীর ভূত্বকের গঠন। পৃথিবীর উপরিভাগ বা ভূত্বক (Lithosphere) কিছু বড় বড় খণ্ড বা ‘প্লেট’-এ বিভক্ত। এই প্লেটগুলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের উত্তপ্ত ও আঠালো ম্যান্টেল স্তরের ওপর ভাসমান অবস্থায় থাকে।

প্লেট টেকটোনিক্স:

পৃথিবীতে ৬টি প্রধান এবং বেশ কিছু ছোট ছোট টেকটোনিক প্লেট রয়েছে। এই প্লেটগুলো যখন ম্যান্টেলের ওপর নড়াচড়া করে, তখন সেই প্লেটের ওপর অবস্থিত মহাদেশ এবং পাহাড়গুলোও একই গতিতে চলতে থাকে।

গতির হার:

বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করেছেন যে, এই প্লেটগুলো বা মহাদেশগুলো প্রতি বছর গড়ে ১ থেকে ৫ সেন্টিমিটার করে সরে যায়। এই গতি এতটাই ধীর যে সাধারণ চোখে পাহাড়কে স্থির মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, আটলান্টিক মহাসাগর প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার চওড়া হচ্ছে এবং আমেরিকা ও ইউরোপ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

কুরআনের শব্দের অলৌকিকত্ব

কুরআনের আয়াতে পাহাড়ের চলাচলকে মেঘের চলার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। কারণ, মেঘ যেমন নিজের শক্তিতে চলে না বরং বায়ুমণ্ডলের গতির সাথে চলে, পাহাড়গুলোও তেমনি নিজের শক্তিতে চলে না, বরং যে টেকটোনিক প্লেটের ওপর তারা অবস্থান করছে, সেই প্লেটের চলাচলের সাথে সাথে তারাও ‘ভেসে’ চলে। কুরআনে ‘ভেসে যাওয়া’ (Drifting) বোঝাতে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞানীরাও মহাদেশীয় গতির জন্য ‘Continental Drift’ (মহাদেশীয় বিচলন বা ভেসে যাওয়া) শব্দটিই বেছে নিয়েছেন।

উপসংহার : পাহাড়ের চলাচল বা প্লেট টেকটোনিক্সের এই সত্যটি আধুনিক বিজ্ঞানের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, যা কেবল বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ভূতাত্ত্বিকদের কাছে পূর্ণভাবে স্পষ্ট হয়েছে। অথচ এমন একটি তথ্য চৌদ্দশ বছর আগের একটি কিতাবে থাকা—যে সময়ে কোনো আধুনিক টেলিস্কোপ বা ভূ-তাত্ত্বিক মাপার যন্ত্র ছিল না—অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকেই নাজিল হয়েছে। পাহাড়ের এই মেঘের মতো চলাচল আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক নিদর্শন এবং কুরআনের চিরন্তন অলৌকিকত্বের বহিঃপ্রকাশ।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : লোহার অলৌকিকতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের বর্ণনা থাকলেও ‘লোহা’ বা আয়রন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিস্ময়কর। কুরআনের ৫৭ নম্বর সূরার নামই হলো ‘সূরা আল-হাদীদ’, যার বাংলা অর্থ ‘লোহা’। এই সূরার একটি আয়াতে লোহার উৎস সম্পর্কে এমন একটি তথ্য দেওয়া হয়েছে যা বিংশ শতাব্দীর আগে মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞান যখন বলছে লোহা এই পৃথিবীর কোনো মৌলিক পদার্থ নয়, বরং এটি মহাকাশ থেকে আগত; তখন কুরআনের সেই বাণীটি অলৌকিক সত্য হিসেবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা লৌহা সম্পর্কে বলেন-

لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِالۡبَیِّنٰتِ وَاَنۡزَلۡنَا مَعَہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ ۚ  وَاَنۡزَلۡنَا الۡحَدِیۡدَ فِیۡہِ بَاۡسٌ شَدِیۡدٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِیَعۡلَمَ اللّٰہُ مَنۡ یَّنۡصُرُہٗ وَرُسُلَہٗ بِالۡغَیۡبِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ قَوِیٌّ عَزِیۡزٌ

নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরো নাযিল করেছি লোহা, তাতে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহাশক্তিধর,

এই আয়াতে ‘নাযিল করেছি’ বোঝাতে আরবি ‘আনযালনা’ (Anzalna) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত কুরআন অবতীর্ণ হওয়া বা আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ার ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অনেক অনুবাদক এটিকে রূপক অর্থে ‘প্রদান করা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার এর আক্ষরিক অর্থ বা ‘উপর থেকে নিচে পাঠানো’র সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যানুসন্ধান:

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের গবেষণা অনুযায়ী, লোহা (Fe) এমন একটি উপাদান যা পৃথিবীতে বা আমাদের সৌরজগতে তৈরি হওয়া অসম্ভব। এর কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. অত্যধিক তাপমাত্রার প্রয়োজনীয়তা: আমাদের সূর্য একটি মাঝারি আকারের নক্ষত্র। এর কেন্দ্রে যে তাপমাত্রা রয়েছে, তা লোহা উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। লোহা তৈরি হতে হলে কয়েকশ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন, যা কেবল সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় বিশাল নক্ষত্রগুলোতে (Giant Stars) সম্ভব।

২. সুপারনোভা বিস্ফোরণ: যখন কোনো বিশাল নক্ষত্রের কেন্দ্রে লোহা উৎপাদিত হয় এবং এর পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট স্তর অতিক্রম করে, তখন নক্ষত্রটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে নক্ষত্রটি এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ফেটে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সুপারনোভা’ (Supernova) বলা হয়। এই বিস্ফোরণের ফলেই লোহা ধারণকারী কণা বা উল্কাপিণ্ডগুলো মহাবিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৩. পৃথিবীতে আগমন: কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো এই লোহা সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ডগুলো পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বলের আকর্ষণে এখানে আছড়ে পড়ে। অর্থাৎ, লোহা পৃথিবীর মাটিতে উৎপন্ন হয়নি, বরং এটি আক্ষরিক অর্থেই ‘আকাশ থেকে নাযিল’ হয়েছে।

লোহার উপকারিতা ও প্রচণ্ড শক্তি

আয়াতে লোহার দুটি গুণের কথা বলা হয়েছে: ‘প্রচণ্ড শক্তি’ এবং ‘মানুষের জন্য কল্যাণ’।

•      প্রচণ্ড শক্তি: লোহার পারমাণবিক গঠন অত্যন্ত স্থিতিশীল। এটি মহাবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ধাতু। আধুনিক বিশ্বের অবকাঠামো, যুদ্ধাস্ত্র, আকাশচুম্বী ভবন থেকে শুরু করে সুঁই পর্যন্ত সবকিছুতেই লোহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

•      মানুষের কল্যাণ: কেবল শিল্প-কারখানায় নয়, মানুষের প্রাণের অস্তিত্বের জন্যও লোহা অপরিহার্য। আমাদের রক্তের হিমোগ্লোবিনে লোহার উপস্থিতি রয়েছে, যা শরীরের কোষে অক্সিজেন বহন করে। লোহা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল।

তথ্য ও উপাত্তের আলোকে অলৌকিকত্ব

লোহার সাথে সূরা হাদীদ-এর একটি গাণিতিক মিলও লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিক গবেষকরা তুলে ধরেছেন:

আরবি ‘আল-হাদীদ’ (The Iron) শব্দের সংখ্যাগত মান (Abjad Value) হলো ৩১।

আবার ‘হাদীদ’ (Iron) শব্দের মান ২৬, যা লোহার পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number) ২৬-এর সাথে হুবহু মিলে যায়।

৫৭ নম্বর সূরাটি কুরআনের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত, এবং বিজ্ঞানের মতে লোহার নিউক্লিয়াস পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থান করে পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে।

উপসংহার : চৌদ্দশ বছর আগে মরুভূমির পরিবেশে বসে লোহা আকাশ থেকে পাঠানো হয়েছে—এমন বৈজ্ঞানিক ঘোষণা দেওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আধুনিক টেলিস্কোপ ও ল্যাবরেটরি ছাড়াই কুরআন লোহাকে ‘নাযিল করা’ বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন সেই মহান স্রষ্টার বাণী যিনি লোহা সৃষ্টি করেছেন এবং এটি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। লোহার এই অলৌকিকতা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের জন্য ঈমান বৃদ্ধির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআন ও পানিচক্র

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পানিচক্র হলো সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পৃথিবীর জলীয় বাষ্প, তরল ও কঠিন অবস্থায় ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে এবং এক ভাণ্ডার থেকে অন্য ভাণ্ডারে আবর্তিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি প্রধানত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়,  বাষ্পীভবন (Evaporation), যেখানে সূর্যের তাপের ফলে সমুদ্র, নদী, হ্রদ এবং মাটি থেকে জল বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ঘনীভবন (Condensation), যেখানে বায়ুমণ্ডলের শীতলতা ও উচ্চতার কারণে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে; অধঃক্ষেপণ (Precipitation), যেখানে মেঘের মধ্যে জমা হওয়া জলের কণাগুলি বৃষ্টি, বরফ বা শিলারূপে পৃথিবীতে পতিত হয়; এবং সংগ্রহ (Collection) বা প্রবাহ (Flow), যেখানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হওয়া জল নদী, নালা ও ভূগর্ভস্থ জল হিসেবে পুনরায় সমুদ্রে ফিরে যায় অথবা ভূগর্ভে সংরক্ষিত হয়। এই অবিরাম চক্রটি পৃথিবীর জলবায়ু এবং জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র কুরআনে পানিচক্র (Water Cycle) বা জলচক্রের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে একাধিক আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও “পানিচক্র” শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি, তবে মেঘের সৃষ্টি, বৃষ্টি বর্ষণ, এবং সেই পানি মাটির অভ্যন্তরে সংরক্ষণ ও প্রবাহিত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে পানিচক্র সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত এবং সেগুলির সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো :

বৃষ্টি বর্ষণ এবং বায়ুর ভূমিকা

পানিচক্রের এই ধাপে জলীয় বাষ্পের মেঘে পরিণত হওয়া এবং বাতাস কীভাবে এতে সাহায্য করে তার বর্ণনা আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَرۡسَلۡنَا الرِّیٰحَ لَوَاقِحَ فَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَسۡقَیۡنٰکُمُوۡہُ ۚ وَمَاۤ اَنۡتُمۡ لَہٗ بِخٰزِنِیۡنَ

আর আমি বায়ুকে ঊর্বরকারীরূপে প্রেরণ করি অতঃপর আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। তবে তোমরা তার সংরক্ষণকারী নও। সূরা হিজর : ২২

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহই বাতাসকে চালনা করেন যা বৃষ্টির কারণ (বাষ্প ও মেঘকে বহন করে) এবং আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করে, যার ভান্ডার মানুষের কাছে নেই।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ الَّذِیۡ یُرۡسِلُ الرِّیٰحَ فَتُثِیۡرُ سَحَابًا فَیَبۡسُطُہٗ فِی السَّمَآءِ کَیۡفَ یَشَآءُ وَیَجۡعَلُہٗ کِسَفًا فَتَرَی الۡوَدۡقَ یَخۡرُجُ مِنۡ خِلٰلِہٖ ۚ  فَاِذَاۤ اَصَابَ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖۤ اِذَا ہُمۡ یَسۡتَبۡشِرُوۡنَ ۚ

আল্লাহ, যিনি বাতাস প্রেরণ করেন ফলে তা মেঘমালাকে ধাওয়া করে; অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে খন্ড- বিখন্ড করে দেন, ফলে তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে নির্গত হয় বারিধারা। অতঃপর যখন তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের উপর ইচ্ছা বারি বর্ষণ করেন, তখন তারা হয় আনন্দিত। সূরা রূম : ৪৮

মেঘ তৈরি, সেটির সঞ্চালন এবং বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়াকে এখানে বর্ণনা করা হয়েছে।

মাটির অভ্যন্তরে সংরক্ষণ ও ঝর্ণার সৃষ্টি

বৃষ্টির পানি পৃথিবীতে আসার পর তা কীভাবে সংরক্ষিত হয়, সেই ধাপের বর্ণনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ فَاَسۡکَنّٰہُ فِی الۡاَرۡضِ ٭ۖ  وَاِنَّا عَلٰی ذَہَابٍۭ بِہٖ لَقٰدِرُوۡنَ ۚ

আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি তা যমীনে সংরক্ষণ করেছি। আর অবশ্যই আমি সেটাকে অপসারণ করতেও সক্ষম। সূরা মুমিনূন : ১৮

এতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং সেই পানি ভূগর্ভে (যেমন ভূগর্ভস্থ জল বা জলাধার হিসেবে) সংরক্ষিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَسَلَکَہٗ یَنَابِیۡعَ فِی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یُخۡرِجُ بِہٖ زَرۡعًا مُّخۡتَلِفًا اَلۡوَانُہٗ ثُمَّ یَہِیۡجُ فَتَرٰىہُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَجۡعَلُہٗ حُطَامًا ؕ  اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَذِکۡرٰی لِاُولِی الۡاَلۡبَابِ 

তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর যমীনে তা প্রস্রবন হিসেবে প্রবাহিত করেন তারপর তা দিয়ে নানা বর্ণের ফসল উৎপন্ন করেন, তারপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তোমরা তা দেখতে পাও হলুদ বর্ণের তারপর তিনি তা খড়-খুটায় পরিণত করেন। এতে অবশ্যই উপদেশ রয়েছে বুদ্ধিমানদের জন্য। সূরা যুমার : ২১

এই আয়াতে বৃষ্টির পানি মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ঝর্ণা বা স্রোতের মাধ্যমে আবার ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে তুলে ধরা হয়েছে।

উপসংহার : এই আয়াতগুলো এবং আরও অনেক আয়াতে জলচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ— বাষ্পীভবন (Evaporation) (যা মেঘ তৈরির কারণ), ঘনীভবন (Condensation) (মেঘ সৃষ্টি), অধঃক্ষেপণ (Precipitation) (বৃষ্টি বর্ষণ), এবং সঞ্চালন ও প্রবাহ (Collection & Flow) (ভূমিতে সংরক্ষণ ও ঝর্ণা সৃষ্টি) সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআন ও মেঘমালা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত এক চিরন্তন বাণী। এটি কোনো বিজ্ঞানের কিতাব না হলেও, এতে প্রকৃতির এমন সব সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে আরও স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদ্যা বা মেটিওরোলজি (Meteorology) এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কুরআনের বর্ণনা এবং আধুনিক গবেষণার এক অভাবনীয় মেলবন্ধন দেখা যায়। বিশেষ করে মেঘের গঠন, বৃষ্টিপাত এবং বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলো কুরআনের আয়াতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, বহু বছর আগের কোনো মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। এই প্রবন্ধে আমরা সূরা নূরের ৪৩ নম্বর আয়াতের আলোকে মেঘমালার গঠনপ্রক্রিয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ উৎপাদনের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

মেঘের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস ও কিউমুলোনিম্বাস মেঘ

পবিত্র কুরআনের আল্লাহ তাআলা মেঘমালা গঠন এবং বৃষ্টি হওয়ার যে পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা দিয়েছেন, তা আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের (Meteorology) দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিস্ময়কর। আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞান অনুযায়ী, বৃষ্টির মেঘ বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ তৈরি হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু ধাপ রয়েছে। কুরআন মাজিদ এই ধাপগুলোকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ یُزۡجِیۡ سَحَابًا ثُمَّ یُؤَلِّفُ بَیۡنَہٗ ثُمَّ یَجۡعَلُہٗ رُکَامًا فَتَرَی الۡوَدۡقَ یَخۡرُجُ مِنۡ خِلٰلِہٖ ۚ  وَیُنَزِّلُ مِنَ السَّمَآءِ مِنۡ جِبَالٍ فِیۡہَا مِنۡۢ بَرَدٍ فَیُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ وَیَصۡرِفُہٗ عَنۡ مَّنۡ یَّشَآءُ ؕ  یَکَادُ سَنَا بَرۡقِہٖ یَذۡہَبُ بِالۡاَبۡصَارِ ؕ

তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে পরিচালিত করেন, তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন, তারপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন, তারপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টির বের হয়। আর তিনি আকাশে স্থিত মেঘমালার পাহাড় থেকে শিলা বর্ষণ করেন। তারপর তা দ্বারা যাকে ইচ্ছা আঘাত করেন। আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা তা সরিয়ে দেন। এর বিদ্যুতের ঝলক দৃষ্টিশক্তি প্রায় কেড়ে নেয়। সূরা নূর: ৪৩

এই একটি আয়াতে আধুনিক বিজ্ঞানের তিনটি প্রধান ধাপের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। আর বিজ্ঞানীরাও মেঘকে তাদের আকৃতি, উচ্চতা ও গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—সিরাস (Cirrus), স্ট্রাটাস (Stratus), কিউমুলাস (Cumulus) এবং কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ। বৃষ্টির মেঘ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। এই মেঘ থেকেই প্রবল বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত এবং কখনো কখনো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। আবহাওয়াবিদরা বহু বছর ধরে গবেষণা করে দেখেছেন যে, কিউমুলোনিম্বাস মেঘ হঠাৎ সৃষ্টি হয় না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ও ধাপে ধাপে সংঘটিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়। কিউমুলোনিম্বাস মেঘ গঠনের ধাপসমূহ-

১. বায়ুপ্রবাহ ও মেঘের সঞ্চালন (Driving the Clouds)

কুরআনের ভাষায়: “তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ মেঘমালাকে চালনা করেন…”

যেকোনো বৃষ্টিবাহী মেঘ গঠনের প্রাথমিক শর্ত হলো বায়ুপ্রবাহ। বিজ্ঞানের ভাষায়, কিউমুলোনিম্বাস মেঘ সরাসরি আকাশে তৈরি হয় না। প্রথমে বাতাসের তোড়ে জলীয় বাষ্পপূর্ণ ছোট ছোট কিউমুলাস (Cumulus) মেঘ এক জায়গায় হতে থাকে। বাতাস এখানে ‘ড্রাইভার’ বা চালকের ভূমিকা পালন করে। এই বাতাস না থাকলে বিচ্ছিন্ন মেঘগুলো কখনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা হয়ে ঘনীভূত হতে পারত না। আধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজিংয়েও দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরের বায়ুপ্রবাহই মেঘের প্রাথমিক দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।

২. মেঘের সংযুক্তি বা মিলন (Joining Together)

কুরআনের ভাষায়: “…তারপর তিনি সেগুলোকে একত্রে জুড়ে দেন…”

যখন বাতাস ছোট ছোট মেঘখণ্ডগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে আসে, তখন সেগুলো একে অপরের সাথে মিশে বড় আকার ধারণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Coalescence। এই ধাপে ছোট ছোট মেঘের কণাগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে সংযুক্ত হয়। আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইউআল্লিফু’ (یُؤَلِّفُ) এর অর্থ হলো প্রেম বা মায়ার সাথে জুড়ে দেওয়া বা একত্রিত করা। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই পর্যায়ে মেঘের ভেতরের জলকণাগুলো বৈদ্যুতিক চার্জ এবং চাপের পার্থক্যের কারণে একে অপরের সাথে স্থায়ীভাবে মিশে যায় এবং একটি বিশাল মেঘের ভিত্তি তৈরি করে।

৩. স্তূপীকরণ ও উলম্ব বৃদ্ধি (Stacking and Vertical Growth)

কুরআনের ভাষায়: “…তারপর সেগুলোকে স্তূপীকৃত করেন এবং তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টি নির্গত হয়।”

এটি মেঘ গঠনের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ছোট ছোট মেঘগুলো যুক্ত হওয়ার পর মেঘের ভেতরে এক ধরনের শক্তিশালী উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ বা Updraft তৈরি হয়। এই বাতাসের চাপে মেঘটি আর ডানে-বামে না বেড়ে স্তরে স্তরে উপর দিকে উঠতে থাকে। আয়াতে বর্ণিত ‘রুকামান’ (رُکَامًا) শব্দটির অর্থ হলো একটির ওপর একটি সাজানো স্তূপ।

বিজ্ঞানীরা বলেন, যখন এই মেঘটি উলম্বভাবে (Vertically) বৃদ্ধি পায়, তখন এটি বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত শীতল স্তরে পৌঁছে যায়। সেখানে জলকণাগুলো ঘনীভূত হয়ে বড় ফোঁটায় পরিণত হয় এবং মহাকর্ষ বলের টানে বৃষ্টি হিসেবে নিচে পড়তে থাকে। কুরআনের বর্ণনায় ঠিক এই ‘স্তূপীকৃত’ হওয়ার পরেই বৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।

৪. পাহাড়ের মতো বিশাল আকৃতি (The Mountains in the Sky)

আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, “তিনি আকাশস্থিত পাহাড়সদৃশ মেঘমালা থেকে শিলা বর্ষণ করেন।”

আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা যখন রাডার বা বিমান থেকে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ দেখেন, তখন তা দেখতে ঠিক বিশাল হিমালয় পাহাড়ের মতো মনে হয়। এই মেঘগুলো ভূমি থেকে প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ ফুট পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে। এই বিশাল উচ্চতার কারণেই মেঘের উপরিভাগ অত্যন্ত শীতল থাকে এবং সেখানে বরফ বা শিলা (Hail) তৈরি হয়। কুরআন এখানে মেঘের উচ্চতা বোঝাতে ‘জিবাল’ (جِبَالٍ) বা পাহাড় শব্দটি ব্যবহার করেছে, যা এর বিশালতা ও গঠনের একটি নিখুঁত জ্যামিতিক বর্ণনা।

উপসংহার : আজ থেকে ১৪৫০ বছর আগে যখন মানুষের কাছে কোনো স্যাটেলাইট, রাডার বা বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস মাপার কোনো যন্ত্র ছিল না, তখন মেঘ গঠনের এই পর্যায়ক্রমিক (চালনা → সংযুক্তি → স্তূপীকরণ → বৃষ্টি/শিলা) বর্ণনা দেওয়া একমাত্র সৃষ্টিকর্তার পক্ষেই সম্ভব। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের সত্যতা ও বিজ্ঞানের এক জীবন্ত নিদর্শন।

আপনি কি এই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সূরা আন-নূরের সেই নির্দিষ্ট আয়াতের পূর্ণাঙ্গ তাফসির বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব সম্পর্কে জানতে চান?

মঘমালার পর্যায়ক্রমিক চিত্র : চালনা সংযুক্তি ও স্তূপীকরণ বৃষ্টি/শিলা)

বৃষ্টির অনুপাত ও জলচক্রের ভারসাম্য

পৃথিবীর অস্তিত্ব এবং প্রাণকুলের টিকে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য উপাদান। প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়—বৃষ্টিপাত—কেবল একটি সাধারণ আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং এটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং গাণিতিক হিসাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা। আধুনিক জলবিজ্ঞান বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট অনুপাত সম্পর্কে যে তথ্য দিচ্ছে, তা আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে আল-কোরআনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।

১. আল-কোরআনে বৃষ্টির সুনির্দিষ্ট মাপের বর্ণনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ ۚ فَاَنۡشَرۡنَا بِہٖ بَلۡدَۃً مَّیۡتًا ۚ کَذٰلِکَ تُخۡرَجُوۡنَ

আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। সূরা যুখরুফের : ১১

এই আয়াতে ‘নির্দিষ্ট মাপে’ (بِقَدَرٍ – বি-কাদারিন) শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নির্দেশ করে যে, বৃষ্টিপাত কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, গতিবেগ এবং অনুপাত কাজ করে। আধুনিক বিজ্ঞান এই ‘মাপ’ বা ‘পরিমাণ’ শব্দটির গভীরতা আজ উন্মোচন করছে।

২. আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য ও উপাত্ত: জলচক্রের ধ্রুবক

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ পানি বাষ্পীভূত হয় এবং ঠিক যে পরিমাণ পানি বৃষ্টি হিসেবে ফিরে আসে, তার মধ্যে একটি বিস্ময়কর গাণিতিক ধ্রুবক কাজ করে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী-

সেকেন্ড প্রতি বাষ্পীভবন:

পৃথিবী থেকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৬ মিলিয়ন টন পানি বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়।

বার্ষিক মোট হিসাব:

এই প্রক্রিয়াটি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, যার ফলে এক বছরে পৃথিবী থেকে বাষ্পীভূত হওয়া মোট পানির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন।

সমতার বিস্ময়:

অবাক করার মতো বিষয় হলো, প্রতি বছর এই সমপরিমাণ পানিই অর্থাৎ ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন পানিই বৃষ্টি, তুষার বা শিশির আকারে পৃথিবীতে আবার ফিরে আসে।

এর অর্থ হলো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পানির যে ভারসাম্য (Global Water Budget), তা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদি ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের বদলে ৫১৪ ট্রিলিয়ন টন পানি ফিরে আসত, তবে পৃথিবী ধীরে ধীরে মহাপ্লাবনে তলিয়ে যেত। আবার যদি পরিমাণে সামান্য কম আসত, তবে পৃথিবী ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতো।

৩. বৃষ্টিপাতের গতিবেগ ও উচ্চতার “মাপ”

কোরআনের ‘নির্দিষ্ট মাপে’ কথাটি কেবল মোট পরিমাণের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বৃষ্টির পতনের গতিবেগের ক্ষেত্রেও সত্য।

পতনের গতিবেগ:

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যদি সাধারণ মাধ্যাকর্ষণ সূত্র মেনে অতি উচ্চতা (মেঘের উচ্চতা সাধারণত ১২০০ থেকে ১০,০০০ মিটার হয়) থেকে পড়ত, তবে সেগুলো বুলেট বা কামানের গোলার মতো গতিপ্রাপ্ত হতো। কিন্তু বায়ুর ঘর্ষণ এবং বৃষ্টির ফোঁটার বিশেষ গঠনের কারণে একটি ‘টার্মিনাল ভেলোসিটি’ বা প্রান্তিক বেগ তৈরি হয়। যার ফলে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পৃথিবীতে এমন এক শান্ত ও পরিমিত গতিতে (৮-১০ কিমি/ঘণ্টা) পতিত হয়, যা ফসলের ক্ষতি করে না বরং সেচ দেয়।

উচ্চতার প্রভাব:

বৃষ্টি কতটুকু উচ্চতা থেকে পড়বে এবং তার ঘনত্ব কেমন হবে, তাও প্রকৃতির এক সুনিপুণ মাপে নির্ধারিত।

৪. পরিবেশগত ভারসাম্যে এই অনুপাতের গুরুত্ব

বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বজায় থাকা কেন জীবনের জন্য অপরিহার্য, তার কিছু গুরত্বপূর্ণ দিক নিচে আলোচনা করা হলো:

লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ:

সমুদ্র থেকে যে পানি বাষ্পীভূত হয়, তা বিশুদ্ধ ও লবণমুক্ত। এই পানি যখন বৃষ্টি হিসেবে পতিত হয়, তখন তা নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রের লবণাক্ততা বজায় রাখে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যেত।

মৃত ভূমিকে পুনরুজ্জীবন:

কোরআনে বলা হয়েছে, “যার দ্বারা আমরা একটি মৃত ভূমিকে আবার জীবিত করে তুলি।” বিজ্ঞান আজ জানে যে, বৃষ্টির পানিতে নাইট্রোজেন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান মিশে থাকে যা মাটির জন্য প্রাকৃতিক সারের কাজ করে। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক।

তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ:

পৃথিবীর জলচক্র একটি বিশাল এয়ার কন্ডিশনারের মতো কাজ করে। ৫১৩ ট্রিলিয়ন টন পানির এই সঞ্চালন না থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা মেরু অঞ্চলে হিমাঙ্কের অনেক নিচে এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে উত্তপ্ত অগ্নিপিণ্ডে পরিণত হতো।

৫. মানুষের সীমাবদ্ধতা ও কোরআনের অলৌকিকতা

বর্তমান বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মানুষ কৃত্রিমভাবে এই বিশাল জলচক্রের পুনরুৎপাদন করতে সক্ষম নয়। আমরা ছোট পরিসরে ‘ক্লাউড সিডিং’ (Cloud Seeding) এর মাধ্যমে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারলেও, বিশ্বব্যাপী ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের এই বিশাল গাণিতিক চক্র বজায় রাখা মানুষের সাধ্যের অতীত।

কোরআনের এই ঐশী বাণীতে এই “নির্দিষ্ট মাপে” পানি নাযিলের কথাটি এমন এক যুগে বলা হয়েছে যখন মানুষের কাছে হাইড্রোলজি বা জলবিদ্যার কোনো জ্ঞান ছিল না। প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত বৃষ্টিপাত দেব-দেবীর ইচ্ছায় বা কোনো জাদুর প্রভাবে হয়। কিন্তু কোরআন স্পষ্টভাবে একে একটি ‘হিসাব’ বা ‘মাপে’র অধীন বলে ঘোষণা করেছে।

৬. জলবায়ু পরিবর্তন ও সতর্কবার্তা

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির এই ‘সুনির্দিষ্ট মাপে’র ভারসাম্য কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি আবার কোথাও দীর্ঘ অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, স্রষ্টা প্রদত্ত সেই ‘মাপ’ যখন মানুষের কৃতকর্মের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা বা ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে আমরা যেন প্রকৃতির এই মহান ভারসাম্যকে রক্ষা করি।

উপসংহার : বৃষ্টির এই সুনির্দিষ্ট অনুপাত এবং ৫১৩ ট্রিলিয়ন টনের এই গাণিতিক হিসাব প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা এক মহান পরিকল্পনাকারীর (Master Designer) নির্দেশনায় পরিচালিত। কোরআনের এই বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা নির্দেশ করে যে, এটি কোনো মানুষের কল্পনা নয়, বরং এটি সেই মহান সত্তার বাণী যিনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে মরুভূমির বুকে বৃষ্টির এই গাণিতিক রহস্যের ঘোষণা দেওয়া নিঃসন্দেহে এক বড় মোজেজা বা অলৌকিক নিদর্শণ।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : কুরআনে নদী ও সাগর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল-কুরআন, যা প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে নাজিল হয়েছিল, তাতে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে যা কেবল আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যেই সম্প্রতি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্র, নদী এবং তাদের মিলনস্থলের বর্ণনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) যে তথ্যগুলো প্রদান করে, কোরআনের আয়াতগুলো তার সাথে এক গভীর সাদৃশ্য বহন করে।

১. দুটি সমুদ্রের মিলনস্থল : অদৃশ্য অন্তরায় (Barrier)

আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে যখন দুটি ভিন্ন সমুদ্রের জলরাশি মিলিত হয়, তখন তারা তাৎক্ষণিকভাবে মিশে যায় না। তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর ‘বাধা’ (Barrier) বিদ্যমান থাকে, যা দুটি জলরাশিকে পৃথক রাখে। এই বাধার কারণে, প্রতিটি সমুদ্রের জলরাশি তার নিজস্ব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে:

তাপমাত্রা (Temperature): এক সমুদ্রের জল অন্যটির চেয়ে উষ্ণ বা শীতল হতে পারে।

লবণাক্ততা (Salinity): লবণাক্ততার মাত্রা ভিন্ন হয়।

ঘনত্ব (Density): ঘনত্বে পার্থক্য থাকে, যা জলরাশির স্তরবিন্যাসে ভূমিকা রাখে।

ভূমধ্যসাগরের জল আটলান্টিক মহাসাগরের জলের তুলনায় উষ্ণ, অধিক লবণাক্ত এবং তুলনামূলকভাবে কম ঘনত্বের। যখন ভূমধ্যসাগরের জল জিব্রাল্টার প্রণালীর নিচে অবস্থিত জিব্রাল্টার সিল (Gibraltar Sill)-এর উপর দিয়ে আটলান্টিকে প্রবেশ করে, তখন এটি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রায় ১০০০ মিটার গভীরতায় বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। এই জলরাশি এই গভীরতায় এমনভাবে স্থিতিশীল হয় যে এটি তার বৈশিষ্ট্য হারাতে প্রায় কয়েকশ কিলোমিটার অতিক্রম করে।

এই দুটি সমুদ্রের মিলনস্থলে প্রতিনিয়ত বড় তরঙ্গ, শক্তিশালী স্রোত এবং জোয়ার-ভাটা বিরাজ করা সত্ত্বেও, তারা এই অদৃশ্য বাধাকে লঙ্ঘন করে না এবং দ্রুত মিশ্রিত হয়ে যায় না। জলরাশি ধীরে ধীরে মিশ্রিত হলেও, এই বাধা একটি সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা বা সীমান্ত হিসেবে কাজ করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের বর্ণনা আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَرَجَ  الْبَحْرَیْنِ یَلْتَقِیٰنِ ﴿ۙ۱۹﴾ بَیْنَهُمَا بَرْزَخٌ  لَّا  یَبْغِیٰنِ ﴿ۚ۲۰﴾ فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿۲۱﴾

তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না। অতএব (হে মানব ও জ্বীন) তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? সরা আর রহমান : ১৯-২১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمَّنۡ جَعَلَ الۡاَرۡضَ قَرَارًا وَّجَعَلَ خِلٰلَہَاۤ اَنۡہٰرًا وَّجَعَلَ لَہَا رَوَاسِیَ وَجَعَلَ بَیۡنَ الۡبَحۡرَیۡنِ حَاجِزًا ؕ  ءَاِلٰہٌ مَّعَ اللّٰہِ ؕ  بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ

বরং তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।  সুরা নামল : ৬১

কুরআনের এই আয়াতে “অন্তরায়’ (আরবিতে ‘বারযাখ’) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দুটি সমুদ্রের জলরাশিকে পৃথক রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক তথ্য যা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান আবিষ্কারের বহু শতাব্দী আগেই কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে এই প্রাকৃতিক ঘটনা খালি চোখে দেখা বা বোঝা প্রায় অসম্ভব ছিল।

২. মোহনা এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনস্থল: দৃঢ় বিভাজন (Forbidding Partition)

যখন কোরআন সমুদ্রের মতো দুটি লবণাক্ত জলের মিলনের কথা বলে, তখন কেবল ‘বাধা’ (Barrier) বা ‘অন্তরায়’-এর উল্লেখ করে। কিন্তু যখন মিষ্টি (সুস্বাদু) জল (যেমন নদী বা ভূগর্ভস্থ জল) ও নোনা জলের (যেমন সমুদ্রের জল) মিলনের কথা বলে, তখন বর্ণনাটি আরও বিস্তারিত হয়। কোরআন এই ক্ষেত্রে বাধার (barrier) পাশাপাশি একটি “দৃঢ় বিভাজন” (forbidding partition)-এর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করে।

আল্লাহ কোরআনে বলেছেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ مَرَجَ الۡبَحۡرَیۡنِ ہٰذَا عَذۡبٌ فُرَاتٌ وَّہٰذَا مِلۡحٌ اُجَاجٌ ۚ وَجَعَلَ بَیۡنَہُمَا بَرۡزَخًا وَّحِجۡرًا مَّحۡجُوۡرًا

আর তিনিই দু’টো সাগরকে একসাথে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট এবং তিনি এতদোভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় ও একটি অনতিক্রম্য সীমানা স্থাপন করেছেন। সূরা ফুরকান : ৫৩

এখানে প্রশ্ন জাগে: কেন দুটি সমুদ্রের মিলনে শুধু ‘ অন্তরায় ‘ এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনে ‘বাধা’র সঙ্গে অতিরিক্ত ‘দৃঢ় বিভাজন’-এর কথা বলা হয়েছে? এর উত্তরও লুকিয়ে আছে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারে। এই ব্যবধানের  অন্যতম একটি প্রধান কারন হচ্ছে দুই সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বা Salinity এর মধ্যে পার্থক্য। যাকে ইংরেজীতে বলা হয় Halocline। দেখা গেছে লবণাক্ততার পার্থ্যকের জন্য দুই সমুদ্রের পানির ঘনত্বও আলাদা হয়ে যায়। ফলে পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও একটা লাইন বরাবর পানি আলাদা থাকে। আর এই লাইনটিকেই ইংরেজীতে Halocline বলা হয়। বিস্ময়করভাবে উপরের আয়াতের শুরুতেই পাশাপাশি প্রবাহিত  সাগরের পানির লবণাক্ততা বা Salinity এর পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে- ” একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট”  এ ব্যাপারটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাথে পুরোপুরি মিলা যায়।

আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে স্পস্ট ব্যবধান চোখে পড়ে। গবেষণায় দেখা যায় এই দুই সাগরের পানির মধ্যে ঘণত্ব, লবণাক্ততা আর উষ্ণতার পার্থক্যের কারনে একটির পানি অন্যটির সাথে মিশতে পারে না। ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক সাগরের পানির মধ্যেও এরকম পার্থক্য দেখা যায়।

 ১৪০০ বছর আগে নবী মুহাম্মদ (সা) এর পক্ষে এ ধরনের তথ্য যানা থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া এ ধরনের স্রোত শুধু আরব উপদ্বীপের চারপাশেই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয় বরং ভূমধ্যসাগরীয় ও ভারতীয় অঞ্চলসমূহেও এ স্রোতের দেখা পাওয়া যায় না। সর্বপথম এ প্রকারের স্রোতধারা আবিষ্কৃত হয় ১৯৪২ সালে। বর্তমানে সেগুলিকে কৃত্রিম satellite- এর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীচের চার্টে বিভিন্ন সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার পার্থক্য দেখান হয়েছে। ল্যান্ডলক্ড বা আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগরের লবণাক্ততা।

সংখ্যানামধরনগড় লবণাক্ততা ()প্রধান লবণাক্ততার কারণঅবস্থান ও গুরুত্ব
 মৃত সাগর (Dead Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)340-342‰উচ্চ বাষ্পীভবন, খুব কম জল সরবরাহ, বদ্ধ অববাহিকা।জর্ডান এবং ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত, পৃথিবীর গভীরতম হাইপারস্যালাইন হ্রদ।
 লোহিত সাগর (Red Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর40-41‰উচ্চ বাষ্পীভবন, নিম্ন বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময়।আফ্রিকা ও এশিয়ার মাঝে অবস্থিত। বিশ্বের উষ্ণতম এবং সবচেয়ে লবণাক্ত সাগরগুলোর মধ্যে একটি।
 পারস্য উপসাগর  (Persian Gulf)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর40-45‰উচ্চ বাষ্পীভবন, কম বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময় (হরমুজ প্রণালী দিয়ে)।মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত, তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 ভূমধ্যসাগর (Mediterranean Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর38-39‰উচ্চ বাষ্পীভবন, কম বৃষ্টিপাত, সীমিত জল বিনিময় (জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে)।ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে অবস্থিত, ঐতিহাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
 গ্রেট সল্ট লেক (Great Salt Lake)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)50-280‰ (অংশের ভিত্তিতে)উচ্চ বাষ্পীভবন, জল নিষ্কাশনের পথ নেই, মরুভূমি জলবায়ু।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ রাজ্যে অবস্থিত। পশ্চিম গোলার্ধের বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ।
 কাস্পিয়ান সাগর (Caspian Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)12-14‰ (উত্তর অংশ কম)মূলত একটি হ্রদ, যদিও ‘সাগর’ নামে পরিচিত। উচ্চ লবণাক্ততা শুধুমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব অংশে দেখা যায়।ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত, বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ।
 বাল্টিক সাগর (Baltic Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর3-15‰উচ্চ পরিমাণ নদীর মিষ্টি জলের প্রবাহ, সীমিত জল বিনিময় (ডেনিশ প্রণালী দিয়ে), নিম্ন বাষ্পীভবন।উত্তর ইউরোপে অবস্থিত। পৃথিবীর বৃহত্তম ব্র্যাকিশ (Brackish) জলের অববাহিকা।
 ব্ল্যাক সি (Black Sea)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর17-18‰ (উপরে), 30‰ (গভীরে)উচ্চ নদীর জলের প্রবাহ, সীমিত জল বিনিময় (বসফরাস প্রণালী দিয়ে)।ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝে অবস্থিত। এর গভীর স্তরে প্রায় কোনো অক্সিজেন নেই।
 আরাল সাগর (Aral Sea)ল্যান্ডলক্ড হ্রদ (Lake)100-200‰ (বর্তমান অবশিষ্টাংশ)নদী থেকে জল প্রত্যাহারের কারণে আয়তন হ্রাস পেয়েছে এবং লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে অবস্থিত। পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রতীক।
 অ্যাজোফ সাগর (Sea of Azov)আংশিকভাবে আবদ্ধ সাগর10-15‰প্রচুর নদীর জলের প্রবাহ, ছোট আকার, স্বল্প গভীরতা।কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে অবস্থিত। পৃথিবীর সবচেয়ে অগভীর সাগর।

এই বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো দুটি সমুদ্রের মধ্যে শুধু বাধা এবং মিষ্টি ও নোনা জলের মিলনস্থলে বাধা ও দৃঢ় বিভাজন সম্প্রতি উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে যেমন তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং ঘনত্ব পরিমাপের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে দুটি সমুদ্রের মিলনস্থলকে বা মোহনার ত্রিমাত্রিক স্তরবিন্যাসকে পৃথকভাবে দেখা অসম্ভব।

৩. পিকনোক্লাইন জোন (Pycnocline Zone) :

আধুনিক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে মোহনাগুলিতে (Estuaries), যেখানে নদী এবং সমুদ্রের জল মিলিত হয়, সেখানে পরিস্থিতি দুটি সমুদ্রের মিলনের চেয়ে ভিন্ন। মোহনার ক্ষেত্রে, মিষ্টি জল এবং নোনা জলের মাঝে একটি সুস্পষ্ট এবং কার্যকর পৃথকীকরণ অঞ্চল (Zone of Separation) তৈরি হয়। এই অঞ্চলটিকে সমুদ্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় “পিকনোক্লাইন জোন (Pycnocline Zone)” বলা হয়।

এই পিকনোক্লাইন জোনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

ক. ঘনত্বের সুস্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা (Marked Density Discontinuity): এটি একটি মধ্যবর্তী স্তর, যেখানে জলের ঘনত্বে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে।

খ. ভিন্ন লবণাক্ততা: এই বিভাজন অঞ্চলের লবণাক্ততা মিষ্টি জল এবং মূল নোনা জল—উভয় থেকে আলাদা হয়। এটি মূলত মিষ্টি জল এবং নোনা জলের ধীরে ধীরে মিশ্রিত হওয়ার ফলস্বরূপ সৃষ্ট একটি সংমিশ্রণ স্তর।

গ. কার্যকরী বিভাজন: এই ঘনত্বের পার্থক্য দুটি জলস্তরকে (উপরে হালকা মিষ্টি জল এবং নিচে ভারী নোনা জল) কার্যকরভাবে পৃথক করে রাখে, যা কোরআনে বর্ণিত ‘দৃঢ় বিভাজন’ (forbidding partition)-এর ধারণাকে সমর্থন করে। এই স্তরটি মিষ্টি জলকে নোনা জলের সাথে দ্রুত মিশ্রিত হতে বাধা দেয়।

কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কেবল তার ঐশ্বরিক উৎসেরই প্রমাণ বহন করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে কোরআন এমন জ্ঞান ধারণ করে যা এর নাজিলের সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরে ছিল। এটি কুরআনের একটি অলৌকিক দিক যা বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় তুলে ধরে।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : গভীর সমুদ্র এবং অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَوۡ کَظُلُمٰتٍ فِیۡ بَحۡرٍ لُّجِّیٍّ یَّغۡشٰہُ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ مَوۡجٌ مِّنۡ فَوۡقِہٖ سَحَابٌ ؕ  ظُلُمٰتٌۢ بَعۡضُہَا فَوۡقَ بَعۡضٍ ؕ  اِذَاۤ اَخۡرَجَ یَدَہٗ لَمۡ یَکَدۡ یَرٰىہَا ؕ  وَمَنۡ لَّمۡ یَجۡعَلِ اللّٰہُ لَہٗ نُوۡرًا فَمَا لَہٗ مِنۡ نُّوۡرٍ 

অথবা (তাদের আমলসমূহ) গভীর সমূদ্রে ঘনিভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার; এক স্তরের উপর অপর স্তর। কেউ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যাকে নূর দেন না তার জন্য কোন নূর নেই। সুরা নুর : ৪০

পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি সমুদ্রবিজ্ঞানের (Oceanography) এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এই আয়াতে গভীর সমুদ্রের অন্ধকার এবং ঢেউয়ের স্তরীভূত অবস্থা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান কেবল গত শতাব্দীতে সাবমেরিন ও উন্নত সেন্সর আবিষ্কারের পর জানতে পেরেছে।

১. গভীর সমুদ্রের অন্ধকার (Darkness in the Deep Sea)

সমুদ্রের উপরিভাগ আলোকিত মনে হলেও গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে আলো দ্রুত হারিয়ে যায়। একে আলোক বর্ণালীর শোষণ (Absorption of Spectrum) বলা হয়। সূর্যালোক যখন সমুদ্রে প্রবেশ করে, তখন পানির অণুগুলো আলোর সাতটি রঙকে (বেনীআসহকলা) ক্রমান্বয়ে শোষণ করে নেয়:

  • প্রথম ১০-১৫ মিটারের মধ্যে লাল রঙ শোষিত হয়।
  • এরপর একে একে কমলা, হলুদ এবং সবুজ রঙ হারিয়ে যায়।
  • ২০০ মিটার গভীরতার পর নীল আলোও প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে। একে বলা হয় ‘ইউফোটিক জোন’ (Euphotic Zone)-এর সমাপ্তি।
  • ১০০০ মিটার গভীরতার পর সমুদ্র হয়ে পড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার বা ‘অ্যাফোটিক জোন’ (Aphotic Zone)।

কুরআনের বর্ণনা— “হাত বের করলে দেখা যায় না”—এটি গভীর সমুদ্রের সেই তীব্র অন্ধকারের নিখুঁত চিত্রায়ন, যা আধুনিক ওশেনোগ্রাফি দ্বারা প্রমাণিত।

উপরের চিত্রে : সূর্যালোকের ৩ থেকে ৩০ শতাংশ সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয়। এরপর প্রথম ২০০ মিটারের মধ্যেই আলোক-বর্ণালির সাতটি রঙের প্রায় সবগুলো একে একে শোষিত হয়ে যায়, নীল রঙের আলো ব্যতীত। Oceans, Elder and Pernetta, পৃষ্ঠা ২৭)

২. তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ: অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের রহস্য

আয়াতের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো: “যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ (مَوْجٌ مِنْ فَوْقِهِ مَوْجٌ)।” সাধারণ মানুষ জানে যে ঢেউ কেবল সমুদ্রের উপরিভাগেই থাকে। কিন্তু কুরআন এখানে দুই স্তরের ঢেউ বা তরঙ্গের কথা বলছে।

বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার (Internal Waves):

সমুদ্রবিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকে আবিষ্কার করেছেন যে, সমুদ্রের গভীরেও বিশাল বিশাল ঢেউ খেলে যায়, যাদের বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ’ (Internal Waves)।

  • কেন এই তরঙ্গ তৈরি হয়? সমুদ্রের ওপরের স্তরের পানির ঘনত্ব কম এবং তাপমাত্রা বেশি থাকে। কিন্তু নিচের স্তরের পানির ঘনত্ব বেশি এবং তাপমাত্রা কম থাকে। এই দুই ভিন্ন ঘনত্বের স্তরের মিলনস্থলে (Pycnocline) অভ্যন্তরীণ ঢেউ সৃষ্টি হয়।
  • বিশালতা: এই অভ্যন্তরীণ ঢেউগুলো কখনও কখনও কয়েকশো ফুট উঁচু হতে পারে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ঢেউয়ের চেয়েও বড়।
  • অদৃশ্যতা: এই ঢেউগুলো সমুদ্রের ওপর থেকে দেখা যায় না। এগুলো কেবল তাপমাত্রা, লবণাক্ততা বা সাবমেরিনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।
  • কুরআন যখন বলে “ঢেউয়ের ওপর ঢেউ”, তখন এটি স্পষ্টত সমুদ্রের তলদেশের সেই অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ এবং তার ওপরের স্তরের পৃষ্ঠতরঙ্গের (Surface Waves) কথা বলছে।

উপরের চিত্রে : ভিন্ন ঘনত্বের দুটি পানির স্তরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ। একটি স্তর অধিক ঘন (নিচেরটি), অপরটি কম ঘন (উপরেরটি)। Oceanography, Gross, পৃষ্ঠা ২০৪

৩. মেঘমালা ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব

আয়াতে আরও বলা হয়েছে: “তার উপরে মেঘমালা (مِنْ فَوْقِهِ سَحَابٌ)।” এটি পরিবেশের একটি পূর্ণাঙ্গ স্তরবিন্যাস প্রকাশ করে। সমুদ্রের গভীরে অন্ধকার, তার ওপর অভ্যন্তরীণ ঢেউ, তার ওপর উপরিভাগের ঢেউ এবং তার ওপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। মেঘ সূর্যালোককে প্রতিফলিত ও শোষণ করে অন্ধকারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

৪. সমুদ্রের গভীরতা ও মানুষের সীমাবদ্ধতা

আয়াতে সমুদ্রকে ‘বাহরিন লুজ্জিয়িন’ (بَحْرٍ لُجِّيٍّ) বা ‘তলহীন গভীর সমুদ্র’ বলা হয়েছে।

  • প্রাচীনকালে মানুষ কেবল অগভীর সমুদ্রে মাছ ধরত বা মুক্তা সংগ্রহ করত। কোনো মানুষের পক্ষেই সরঞ্জাম ছাড়া ৪০-৫০ মিটারের নিচে যাওয়া সম্ভব নয়।
  • ২০০ মিটারের নিচে অক্সিজেন এবং আলো অত্যন্ত কমে যায় এবং পানির চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • অথচ কুরআন ১৪০০ বছর আগে ১০০০ মিটারের নিচের সেই অন্ধকারের কথা বলছে, যা দেখার জন্য আধুনিক সাবমেরিন ও আলোর যন্ত্র প্রয়োজন।

৫. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াত ও সমুদ্রবিজ্ঞান

কুরআনের অন্য স্থানেও সমুদ্রের রহস্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন-

“তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন যারা একে অপরের সাথে মিলিত হয়, কিন্তু তাদের মাঝে রয়েছে এক অন্তরাল (Barzakh) যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।” (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)

এটি সমুদ্রের পানি ভিন্ন ঘনত্ব, লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রার কারণে মিশ্রিত না হওয়ার বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্যকে তুলে ধরে, যা গভীর সমুদ্রের অন্ধকার ও অভ্যন্তরীণ তরঙ্গের স্তরীভূত অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

উপসংহার

সূরা নূরের এই আয়াতটি কোনো বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ নয়, বরং একটি উপমা। তবে এই উপমায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ বৈজ্ঞানিকভাবে কতটা নির্ভুল, তা আজ বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছেন। মরুভূমির পরিবেশে থাকা একজন মানুষের পক্ষে সমুদ্রের তলদেশের অদৃশ্য তরঙ্গ বা আলোক বর্ণালীর শোষণ সম্পর্কে জানা অসম্ভব ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক সত্তার বাণী, যিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি স্তরের স্রষ্টা এবং এর গূঢ় রহস্য সম্পর্কে সম্যক অবগত।

সমুদ্রের এই অন্ধকার যেমন আলোহীন, তেমনি হিদায়াতহীন জীবনও অন্ধকারের স্তূপ। আয়াতে শেষ করা হয়েছে এই বলে— “আল্লাহ যাকে নূর দান করেন না, তার জন্য কোন নূর নেই।” অর্থাৎ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো থাকলেও হৃদয়ে আল্লাহ্‌র হিদায়াত না থাকলে মানুষ প্রকৃত সত্যের সন্ধান পায় না।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : পৃথিবীর পানি উত্স দুটি

প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : পৃথিবীর পানি উত্স দুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরে (প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে) মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস তৈরি হয়। অক্সিজেন, যা পানির জন্য অপরিহার্য, তৈরি হয় তারকাদের অভ্যন্তরে। প্রথম তারকারা বিগ ব্যাং-এর ১০০-২০০ মিলিয়ন বছর পরে গঠিত হয় এবং তাদের জীবনকাল শেষে সুপারনোভা বিস্ফোরণে অক্সিজেনসহ ভারী উপাদান ছড়িয়ে দেয়। এই অক্সিজেন হাইড্রোজেনের সাথে মিশে প্রথম পানির অণু তৈরি করে, যা গ্যাসীয় ক্লাউডসে ছিল। এই পানি মহাবিশ্বের প্রথম দিকের তারকা-গঠন প্রক্রিয়ার অংশ, এবং এটি জুপিটারের মতো বড় ক্লাউডস বা পৃথিবীর মতো ছোট পরিমাণে তৈরি হয়।

পৃথিবীতে পানির আগমন

পৃথিবী গঠিত হয় সৌরজগতের প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিস্ক থেকে, প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে। তখন পৃথিবী ছিল গরম এবং শুষ্ক, কারণ সূর্যের কাছাকাছি অঞ্চলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। পানি পৃথিবীতে আসে মূলত দুটি উপায়ে:

বাংলায় Comet (কমেট) এবং Asteroid (অ্যাস্টেরয়েড) এর অর্থ হলো:

ধূমকেতু ও গ্রহাণু  থেকে:

সৌরজগতের বাইরের অংশ থেকে বরফ-সমৃদ্ধ কমেটস এবং অ্যাস্টারয়েডস পৃথিবীতে আঘাত করে পানি নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়া “লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট” নামে পরিচিত, যা পৃথিবীর গঠনের পরে ঘটে। লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট হলো সৌরজগতের শুরুর দিকে, প্রায় ৪ থেকে ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, অভ্যন্তরীণ সৌরজগতে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর ব্যাপক সংঘর্ষের একটি তত্ত্ব, যা চাঁদ ও অন্যান্য পাথুরে গ্রহের পৃষ্ঠে প্রচুর খাদ (crater) তৈরি করে এবং মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় গঠনসহ গ্রহের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশাল গ্রহগুলোর কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে গ্রহাণু বেল্ট থেকে প্রচুর ধ্বংসাবশেষ অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলিতে আছড়ে পড়েছিল এবং এই সময়কালে পৃথিবীতে পানি ও জৈব পদার্থ পৌঁছানো বা জীবনের উত্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করা হয়।

চিত্র : মহাকাশে ধূমকেতু ও গ্রহাণু।

পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে: কিছু পানি পৃথিবীর গঠনের সময় তার অভ্যন্তরে আটকে থাকে এবং পরে ভলক্যানিক অ্যাকটিভিটি দিয়ে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে বৃষ্টির মাধ্যমে মহাসাগর তৈরি করে। কিছু পানি পাথরের মধ্যে থেকে পৃথিবীতে বাহির হয়ে আসে।

আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর উৎপত্তির শুরুর দিকে পানি ছিল না। উপরের এ দুটি পদ্ধতিতে পৃথিবীতে বিপুল পরিমাণ পানি জমা হয়েছে। কুরআনেও এ দুটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১. আকাশ থেকে পানি বর্ষিত হয় :

পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে আকাশ বা মহাকাশ থেকে পানি বর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

وَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ فَاَسۡکَنّٰہُ فِی الۡاَرۡضِ ٭ۖ  وَاِنَّا عَلٰی ذَہَابٍۭ بِہٖ لَقٰدِرُوۡنَ ۚ

আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি তা যমীনে সংরক্ষণ করেছি। আর অবশ্যই আমি সেটাকে অপসারণ করতেও সক্ষম। সুরা মুমিনুন :১ ৮

আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আয়াত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡ نَزَّلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءًۢ بِقَدَرٍ ۚ فَاَنۡشَرۡنَا بِہٖ بَلۡدَۃً مَّیۡتًا ۚ کَذٰلِکَ تُخۡرَجُوۡنَ

আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে। সুরা যুখরুফ : ১১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَسَالَتۡ اَوۡدِیَۃٌۢ بِقَدَرِہَا فَاحۡتَمَلَ السَّیۡلُ زَبَدًا رَّابِیًا ؕ 

তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, এতে উপত্যকাগুলো তাদের পরিমাণ অনুসারে প্লাবিত হয়, ফলে প্লাবন উপরস্থিত ফেনা বহন করে নিয়ে যায়। সুরা আর-রাদ :

১৭

২. পাথর ফেঁটে পানি বাহির হয় :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ قَسَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ فَہِیَ کَالۡحِجَارَۃِ اَوۡ اَشَدُّ قَسۡوَۃً ؕ وَاِنَّ مِنَ الۡحِجَارَۃِ لَمَا یَتَفَجَّرُ مِنۡہُ الۡاَنۡہٰرُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَشَّقَّقُ فَیَخۡرُجُ مِنۡہُ الۡمَآءُ ؕ وَاِنَّ مِنۡہَا لَمَا یَہۡبِطُ مِنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ ؕ وَ مَا اللّٰہُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর তোমাদের অন্তরসমূহ এর পরে কঠিন হয়ে গেল যেন তা পাথরের মত কিংবা তার চেয়েও শক্ত। আর নিশ্চয় পাথরের মধ্যে কিছু আছে, যা থেকে নহর উৎসারিত হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা চূর্ণ হয়। ফলে তা থেকে পানি বের হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। আর আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে গাফেল নন। সুরা বাকারা : ৭৪

চিত্র : পাথর ফেঁটে পানি বাহির হয়ে ঝর্ণা সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞানময় কুরআন – পর্ব এক :: মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বিস্ময়কর নিদর্শন

মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সবিস্ময়কর নিদর্শন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex) বা মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের কার্যাবলী সম্পর্কে কুরআন এবং আধুনিক নিউরোসায়েন্সের মধ্যে চমৎকার মিল রয়েছে।  এটি কেবল কাকতালীয় নয়, বরং এক বিস্ময়কর নিদর্শন। নিচে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَلَّا لَئِنْ لَّمْ یَنْتَهِ ۬ۙ  لَنَسْفَعًۢا بِالنَّاصِیَۃِ ﴿ۙ۱۵﴾ نَاصِیَۃٍ كَاذِبَۃٍ خَاطِئَۃٍ ﴿ۚ۱۶﴾

“কখনও নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে নাসিয়াহ (নাসিয়াহ-এর সম্মুখভাগ) ধরে হেঁচড়াব। এমন নাসিয়াহ যা মিথ্যাবাদী ও পাপিষ্ঠ।” সুরা আলাক : ১৫-১৬

যখন আবু জাহল রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাবা প্রাঙ্গণে সালাত আদায়ে বাধা দিচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তখন কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করে এই আয়াতগুলো তখন নাজিল হয়েছিল। এখানে আরবি ‘নাসিয়াহ’ (نَاصِيَة) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আভিধানিক অর্থ হলো কপালের উপরিভাগ বা মাথার সম্মুখভাগ। আয়াতটিতে শুধু কপালের কথা বলা হয়নি, বরং সেই কপাল বা সম্মুখভাগকে ‘মিথ্যাবাদী’ এবং ‘পাপিষ্ঠ’ বলে বিশেষায়িত করা হয়েছে।

২. আধুনিক নিউরোসায়েন্স কী বলে?

দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে মানুষের সব চিন্তাভাবনা বা অনুভূতি হৃদপিণ্ড থেকে আসে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যক্তিত্ব প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণের কেন্দ্রবিন্দু হলো মস্তিষ্কের একদম সামনের অংশ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বলা হয়।

চিত্র : মাথার সামনের কমরা কালারের অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে;।

মিথ্যা বলার কেন্দ্র: ২০০১ সালে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিন ল্যাঙ্গেলবেন (Sean Langleben) এফএমআরআই (FMRI) স্ক্যানের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, যখন মানুষ সত্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, তখন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে রক্ত প্রবাহ এবং স্নায়বিক উদ্দীপনা বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের এই অংশটিই মিথ্যা ‘তৈরি’ বা ‘পরিচালনা’ করে।

পাপ বা ভুল সিদ্ধান্ত: মানুষের নৈতিকতা এবং ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতাও এই অংশে থাকে। কোনো অপরাধ করার আগে যে পরিকল্পনা বা তাড়না কাজ করে, তা এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই কুরআন যখন একে ‘পাপিষ্ঠ’ বলে সম্বোধন করে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।

৩. প্যাথলজিক্যাল মিথ্যুক ও হোয়াইট ম্যাটার

২০০৫ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অভ্যাসগতভাবে মিথ্যা বলে (Pathological Liars), তাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ‘হোয়াইট ম্যাটার’ (White Matter) বা সাদা পদার্থের পরিমাণ স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় প্রায় ২২% থেকে ২৬% বেশি থাকে। হোয়াইট ম্যাটার মূলত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বেশি হোয়াইট ম্যাটার থাকার অর্থ হলো, সেই ব্যক্তি খুব দ্রুত তথ্য জাল করতে পারে এবং জটিল মিথ্যা সাজাতে পারে।

৪. দৃষ্টিশক্তি ও প্রচলিত ভুল ধারণা

মানুষ আগে মনে করত চোখ যেহেতু সামনে, তাই হয়তো দেখার কাজ মাথার সামনেই হয়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের শিখিয়েছে যে, চোখের সংকেতগুলো মস্তিষ্কের একেবারে পেছনের অংশ ‘অক্সিপিটাল লোব’ (Occipital Lobe)-এ প্রক্রিয়াজাত হয়। যদি কুরআন কেবল মানবিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে রচিত হতো, তবে হয়তো এখানে দৃষ্টিশক্তির কথা থাকত। কিন্তু কুরআন সুনির্দিষ্টভাবে মিথ্যা এবং পাপকে কপালের সাথে যুক্ত করেছে।

চিত্র : মাথার পিছনে হলুদ অংশ ‘অক্সিপিটাল লোব‘।

চিন্তার খোরাক : ১৪৫০ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে বসে একজন মানুষ (রাসুলুল্লাহ সা.), যাঁর কাছে কোনো ল্যাবরেটরি বা এমআরআই মেশিন ছিল না, তাঁর পক্ষে মানুষের মাথার খুলির ভেতরে থাকা ঘিলুর কোন অংশ কী কাজ করে তা জানা অসম্ভব ছিল। সেই সময়ে মানুষের ধারণা ছিল কপাল কেবল চুলের আধার বা সৌন্দর্যের অংশ।

কিন্তু কুরআন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এই ‘নাসিয়াহ’ বা সম্মুখভাগকে অপরাধের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং এটি সেই মহান সত্তার বাণী যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি সুক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অবগত।