প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও কুরআন : লোহার অলৌকিকতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের বর্ণনা থাকলেও ‘লোহা’ বা আয়রন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিস্ময়কর। কুরআনের ৫৭ নম্বর সূরার নামই হলো ‘সূরা আল-হাদীদ’, যার বাংলা অর্থ ‘লোহা’। এই সূরার একটি আয়াতে লোহার উৎস সম্পর্কে এমন একটি তথ্য দেওয়া হয়েছে যা বিংশ শতাব্দীর আগে মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল। বিজ্ঞান যখন বলছে লোহা এই পৃথিবীর কোনো মৌলিক পদার্থ নয়, বরং এটি মহাকাশ থেকে আগত; তখন কুরআনের সেই বাণীটি অলৌকিক সত্য হিসেবে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা লৌহা সম্পর্কে বলেন-

لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِالۡبَیِّنٰتِ وَاَنۡزَلۡنَا مَعَہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡمِیۡزَانَ لِیَقُوۡمَ النَّاسُ بِالۡقِسۡطِ ۚ  وَاَنۡزَلۡنَا الۡحَدِیۡدَ فِیۡہِ بَاۡسٌ شَدِیۡدٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِیَعۡلَمَ اللّٰہُ مَنۡ یَّنۡصُرُہٗ وَرُسُلَہٗ بِالۡغَیۡبِ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ قَوِیٌّ عَزِیۡزٌ

নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরো নাযিল করেছি লোহা, তাতে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহাশক্তিধর,

এই আয়াতে ‘নাযিল করেছি’ বোঝাতে আরবি ‘আনযালনা’ (Anzalna) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত কুরআন অবতীর্ণ হওয়া বা আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ার ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অনেক অনুবাদক এটিকে রূপক অর্থে ‘প্রদান করা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার এর আক্ষরিক অর্থ বা ‘উপর থেকে নিচে পাঠানো’র সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যানুসন্ধান:

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের গবেষণা অনুযায়ী, লোহা (Fe) এমন একটি উপাদান যা পৃথিবীতে বা আমাদের সৌরজগতে তৈরি হওয়া অসম্ভব। এর কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. অত্যধিক তাপমাত্রার প্রয়োজনীয়তা: আমাদের সূর্য একটি মাঝারি আকারের নক্ষত্র। এর কেন্দ্রে যে তাপমাত্রা রয়েছে, তা লোহা উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। লোহা তৈরি হতে হলে কয়েকশ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রয়োজন, যা কেবল সূর্যের চেয়ে বহুগুণ বড় বিশাল নক্ষত্রগুলোতে (Giant Stars) সম্ভব।

২. সুপারনোভা বিস্ফোরণ: যখন কোনো বিশাল নক্ষত্রের কেন্দ্রে লোহা উৎপাদিত হয় এবং এর পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট স্তর অতিক্রম করে, তখন নক্ষত্রটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে নক্ষত্রটি এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ফেটে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সুপারনোভা’ (Supernova) বলা হয়। এই বিস্ফোরণের ফলেই লোহা ধারণকারী কণা বা উল্কাপিণ্ডগুলো মহাবিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

৩. পৃথিবীতে আগমন: কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো এই লোহা সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ডগুলো পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বলের আকর্ষণে এখানে আছড়ে পড়ে। অর্থাৎ, লোহা পৃথিবীর মাটিতে উৎপন্ন হয়নি, বরং এটি আক্ষরিক অর্থেই ‘আকাশ থেকে নাযিল’ হয়েছে।

লোহার উপকারিতা ও প্রচণ্ড শক্তি

আয়াতে লোহার দুটি গুণের কথা বলা হয়েছে: ‘প্রচণ্ড শক্তি’ এবং ‘মানুষের জন্য কল্যাণ’।

•      প্রচণ্ড শক্তি: লোহার পারমাণবিক গঠন অত্যন্ত স্থিতিশীল। এটি মহাবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ধাতু। আধুনিক বিশ্বের অবকাঠামো, যুদ্ধাস্ত্র, আকাশচুম্বী ভবন থেকে শুরু করে সুঁই পর্যন্ত সবকিছুতেই লোহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

•      মানুষের কল্যাণ: কেবল শিল্প-কারখানায় নয়, মানুষের প্রাণের অস্তিত্বের জন্যও লোহা অপরিহার্য। আমাদের রক্তের হিমোগ্লোবিনে লোহার উপস্থিতি রয়েছে, যা শরীরের কোষে অক্সিজেন বহন করে। লোহা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল।

তথ্য ও উপাত্তের আলোকে অলৌকিকত্ব

লোহার সাথে সূরা হাদীদ-এর একটি গাণিতিক মিলও লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিক গবেষকরা তুলে ধরেছেন:

আরবি ‘আল-হাদীদ’ (The Iron) শব্দের সংখ্যাগত মান (Abjad Value) হলো ৩১।

আবার ‘হাদীদ’ (Iron) শব্দের মান ২৬, যা লোহার পারমাণবিক সংখ্যা (Atomic Number) ২৬-এর সাথে হুবহু মিলে যায়।

৫৭ নম্বর সূরাটি কুরআনের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত, এবং বিজ্ঞানের মতে লোহার নিউক্লিয়াস পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থান করে পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখে।

উপসংহার : চৌদ্দশ বছর আগে মরুভূমির পরিবেশে বসে লোহা আকাশ থেকে পাঠানো হয়েছে—এমন বৈজ্ঞানিক ঘোষণা দেওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আধুনিক টেলিস্কোপ ও ল্যাবরেটরি ছাড়াই কুরআন লোহাকে ‘নাযিল করা’ বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন সেই মহান স্রষ্টার বাণী যিনি লোহা সৃষ্টি করেছেন এবং এটি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। লোহার এই অলৌকিকতা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের জন্য ঈমান বৃদ্ধির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *