ইহরামের চারটিত্রুটি

ইহরামের চারটি ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইহরামের ত্রুটিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো :

১। ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করাঃ

উপরে বর্ণিত পাঁচটি মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা হজ্ব ও উমরার ওয়াজিব। অতএব যে ব্যক্তি হজ্ব বা উমরা করতে চায় সে ব্যক্তি স্থল, জল বা আকাশ যে পথে আগমন করুক না কেন তার জন্য ইহরাম ব্যতীত মীকাত অতিক্রম করা জায়েয নেই। উপরে বর্ণিত সহিহ বুখারী ১৪৪০ নম্বর হাদিস থেকে দেখা যায় যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যেহেতু ইরাক বাসিদের সমদূরত্ব যাতু’ইরক মীকাতরূপে নির্ধারণ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, মীকাতের বরাবর কোন স্থান অতিক্রম করলে সেটা মীকাত অতিক্রম করার পর্যায়ভুক্ত। যে ব্যক্তি বিমানে চড়ে মীকাতের উপর দিয়ে অতিক্রম করে সে যেন মীকাতই অতিক্রম করে। অতএব, তার কর্তব্য হচ্ছে- মীকাতের বরাবরে আসলে ইহরাম বাঁধা। তার জন্য ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করে জেদ্দা থেকে ইহরাম বাঁধা জায়েয হবে না। যদি কেউ বিমানে যাতায়াত কাজে যে কোন কারনে ইহরাম বাঁধতে ভুলে যায় তবে তাকে বিমান থেকে অবতরণ করার পর মীকাতে ফিরে যাওয়া ওয়াজিব। যদি কেউ মীকাতে ফিরে না যান এবং মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বেঁধে থাকে তাহলে আলেমদের অগ্রগণ্য মত হলো, একটি ছাগল যবেহ করে মক্কার ফকীরদের মাঝে বণ্টন করে দেয়া। আল্লাহই ভাল জানেন।

২। জুতা পরার সম্পর্কে ভুল ধারণাঃ  

কিছু কিছু মানুষ বিশ্বাস করে যে, জুতা পরেই ইহরাম বাঁধতে হবে। যদি ইহরামকালে কেউ জুতা না পরে তাহলে পরবর্তীতে তার জন্য জুতা পরা জায়েয হবে না। এটি ভুল। কারণ ইহরামের সময় জুতা পরা ওয়াজিব নয়; শর্তও নয়। জুতা পরা ছাড়াই ইহরাম হয়ে যায়। ইহরামের সময় জুতা না পরলেও পরবর্তীতে জুতা পরতে পারবে। এতে কোন অসুবিধা নেই।

৩। ইহরামের কাপড়ঃ

অনেক অসিয়ত করে থাকে তাকে যেন মরার পর ইহরামের কাপড় দ্বারা কাফন পরান হয়। ইহরামের কাপড় দ্বারা কাফন পরাতে কোন অসুবিধা নাই। অসিয়ত করাও দোষের কিছু নয়। কিন্তু জরুরী মনে করে অসিয়ত করা বিদআত হবে।

কিছু কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন, যে কাপড় দিয়ে ইহরাম ব বাঁধা হবে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই কাপড় আর পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ ইহরাম বাধার পর তাকে এক কাপড়েই থাকতে হবে। এটি ভুল একটি ভুল ধারন মাত্র। কেননা ইহরামকারীর জন্য বিশেষ কারণে কিংবা কোন কারণ ছাড়াই ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা জায়েয আছে। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যে ব্যক্তি কোন একটি ইহরামের কাপড় পরে ইহরাম বেঁধেছেন তিনি সে কাপড় পরিবর্তন করতে চাইলে পরিবর্তন করতে পারেন। ইহরামের কাপড়ে কোন নাপাকি লাগলে পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়ে। আবার বেশী ময়লা হলেও কাপড়টি খুলে ধৌত করা যায়। কাজেই এই বিশ্বাস ঠিক নয় যে, কেউ যদি কোন একটি কাপড়ে ইহরাম বাঁধে তাহলে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত এ কাপড়টি খুলতে পারবে না।

সাধারণত পুরুষগণ সাদা কাপড় দ্বারা ইহরাম বাধে। তাই অনেক মহিলা ধারণা করেন, ইহরামের জন্য কালো, সবুজ বা সাদা এ জাতীয় কালারের পোশাক দরাকার।  ইসলামি শরীয়াতে এর ভিত্তি নেই। মহিলারা যেকোনো কাপড় পরিধান করতে পারবেন। তবে পোশাকটি সৌন্দর্য প্রদর্শনে সহায়ক হবে না। খুব পাতলা হবে না। আটশাট হবে না কিংবা পুরুষ বা অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে না।

অনেক মহিলা তার চেহারা ও নেকাবের মধ্যস্থানে কাঠ বা এ জাতীয় কিছু রাখেন। যাতে নেকাব তার চেহারা স্পর্শ না করে। এও এক ভিত্তিহীন লৌকিকতা। ইসলামের সূচনা যুগের কোন মুসলিম মহিলা এমন করেননি; বরং মহিলারা পরপুরুষ সামনে এলে মুখে নেকাব না দিয়ে ওড়না ঝুলিয়ে চেহারা আড়াল করবে। পরপুরুষ না থাকলে মুখ খোলা রাখবেন। ওড়না তার চেহারা স্পর্শ করলেও কোন সমস্যা নেই।

৪। মহিলা হায়েয বা নিফাস অবস্থায় মীকাত থেকে ইহরাম না বাঁধাঃ

হজ্জ বা উমরা যাত্রাকালে অনেক সময় মহিলাদের প্রকৃতিক গতভাবে হায়েয বা নিফাস হয়ে থাকে। এই অবস্থায় মহিলাগন মীকাত অতিক্রম কালে ইহরাম বাঁধেন না। অথচ নিফাস বা হায়েযবতী মহিলার জন্যও মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা ফরয। নিফাস বা হায়েযবিহীন স্বাভাবিক মহিলাগন যেভাবে ইহরাম বাধে তারাও  ঠিক সেইভাবে গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করে ইহরাম বাধবে। এই কথার দলিল নিম্মের হাদিসটি।

জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি আসমা বিনতে উমায়স (রাঃ) এর হাদীসে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন যুল-হুলায়ফা নামক স্থানে নিফাসগ্রস্ত হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেনঃ তাকে (আসমা বিনতে উমায়স) গোসল করে ইহরাম বাঁধতে বল। (সুনানে নাসাঈ ২১৪)

আর ইহরাম অবস্থায় আয়েশা রা. এর ঋতুস্রাব শুরু হলে তিনি তাওয়াব বাদে সকল কাজ সবার সাথে সমানতালে সমাধা করেছেন। নিম্মের হাদিসটি লক্ষ করেনঃ

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জের সময় বের হয়েছিলাম। আমাদের কেউ ইররাম বেঁধেছিল উমরার আর কেউ ইহরাম বেঁধেছিল হাজ্জের। আমরা মক্কায় এসে পৌঁছালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যারা উমরার ইহরাম বেঁধেছে কিন্তু কুরবানীর পশু সাথে আনেনি, তারা যেন ইহরাম খুলে ফেলে। আর যারা উমরার ইহরাম বেঁধেছে ও কুরবানীর পশু সাথে এনেছে, তারা যেন কুরবানী করা পর্যন্ত ইহরাম না খোলে। আর যারা হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছে, তারা যেন হাজ্জ (হজ্জ) পূর্ণ করে।

আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ এরপর আমার হায়য শুরু হয় এবং আরাফার দিনেও তা বহাল থাকে। আমি শুধু উমরার ইহরাম বেঁধেছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মাথার বেণী খোলার চুল আঁচড়িয়ে নেওয়ার এবং উমরার ইহরাম ছেড়ে হাজ্জের ইহরাম বাঁধার নির্দেশ দিলেন। আমি তাই করলাম। পরে হাজ্জ (হজ্জ) সমাধা করলাম। এরপর ‘আবদুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ)-কে আমার সাথে পাঠালেন। তিনি আমকে তান’ঈম থেকে আমার আগের পরিত্যক্ত উমরার পরিবর্তে উমরা করতে নির্দেশ দিলেন। (সহহি বুখারী ৩১৩ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কাজেই মহিলাগণ হায়েয বা নিফাস অবস্থায় মীকাত করলে ইহরাম বাঁধবে।

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক কাজ

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মক্কায় প্রবেশের পূর্বে প্রস্ততি মূলক নিচের কাজসমূহ করা সুন্নাহ :

১। মক্কায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম করা

২। গোসল করে নেয়া

৩। মক্কায় উঁচুভূমি দিয়ে পবেশ করা

৪। বাবুস সালাম গেট দিয়ে হারামে প্রবেশ করা

৫। দোয়া পড়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করা

৬। তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দুই রাকাত সালাত আদায় করা

৭। তাওয়াফের পূর্বে সম্ভব হলে আসওয়াদ চুম্বন করা

৮। মক্কা প্রবেশ কালের ভুলত্রুটিঃ

১। মক্কায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম করাঃ

মক্কায় পৌঁছে সুবিধাজনক কোন স্থানে একটু বিশ্রাম করা, যাতে ক্লান্তি দূর হয় এবং শক্তি অর্জিত হয়।

যুহায়র ইবনু হারব ও উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ (রহঃ) ইয়াহইয়া থেকে তিনি উবায়দুল্লাহ থেকে তিনি নাফি’ থেকে এবং তিনি ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যু-তুওয়া নামক স্থানে ভোর পর্যন্ত রাত্রি যাপন করলেন, অতঃপর মক্কায় প্রবেশ করলেন। নাফি (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ (রাঃ)-ও তাই করতেন। ইবনু সাঈদের বর্ণনায় আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে ফজরের সালাত আদায় করলেন। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, অথবা তিনি (উবায়দুল্লাহ) বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফাঃ)

২। গোসল করে নেয়াঃ

সম্ভব হলে গোসল করে নেয়া মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন। সুযোগ না পেলে না-করলেও চলবে। তবে নাপাকী থেকে অবশ্যই পবিত্র হতে হবে।

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবনু উমর (রাঃ) যু-তুওয়ায় ভোর পর্যন্ত রাত যাপন না করে মক্কায় উপনীত হতেন না। তিনি (সেখানে) গোসল করতেন, তারপর দিনের বেলায় মক্কায় প্রবেশ করতেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাই করতেন বলে তিনি বলেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফাঃ)

৩। মক্কায় উঁচুভূমি দিয়ে পবেশ করাঃ

উচ্চ গিরিপথ দিয়ে মক্কায় প্রবেশ, নিম্নপথ দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান এবং যে পথ দিয়ে শহর থেকে বের হয়েছে তার বিপরীত পথ দিয়ে সেখানে প্রবেশ করা মুস্তাহাব।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর মক্কার উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত ‘কাদা’-র দিক দিয়ে প্রবেশ করেন। হিশাম বলেন, আমার পিতা উভয় স্থান দিয়েই প্রবেশ করতেন, তবে অধিকাংশ সময় “কাদা” টিলা দিয়ে প্রবেশ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৩ ইফাঃ)

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাজারার পথ দিয়ে (মদিনা থেকে) বের হতেন এবং মুআর্‌রাশ এর পথ দিয়ে সেখানে প্রবেশ করতেন। তিনি মক্কায় প্রবেশকালে উচ্চ গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করতেন এবং নিম্ন পথ দিয়ে বের হতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১০ ইফাঃ)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় পৌঁছলেন, তখন উচ্চ এলাকা দিয়ে প্রবেশ করলেন এবং নীচু এলাকা দিয়ে বের হলেন।(সহিহ মুসলিম ২৯১২ ইফাঃ)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সানিয়্যাতুল ‘উলয়া (হারমের উত্তর-পূর্বদিকে কাদা নামক স্থান দিয়ে) মক্কায় প্রবেশ করতেন এবং সানিয়্যা সুফলা (হারমের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কুদা নামক স্থান) দিয়ে বের হতেন। (সহিহ বুখারী ১৫৭৫) 

৪। বাবুস সালাম গেট দিয়ে হারামে প্রবেশ করাঃ

বহু মুসলিম ধরণা করে থাকে যে, হজ্জ বা উমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তিকে মসজিদে হারামের নির্দিষ্ট একটি গেট দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এই বিষয়ে কেউ কেউ তাদের লিখনিতেও প্রকাশ করছেন। কারো মতে বাবুস সালাম গেট দিয়ে প্রবেশ করা ভাল। আবার কানে মত, উমরা গেটি দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। কারো ধারনাতো এমনই যে, যদি উমরা পালনেচ্ছুক হয় তাকে অবশ্যই ‘বাবুল উমরা’ (উমরা গেট) দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এই গেটি দিয়ে প্রবেশ করা উমরা পালনকালীকে অবশ্যই কর্তব্য কারন এটি শরিয়তের বিধান। অপর একদল আছেন যারা মনে করেন তাকে অবশ্যই ‘বাবুস সালাম’ (সালাম গেট) দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, অন্য গেট দিয়ে প্রবেশ করা গুনাহ কিংবা মাকরূহ।

ইসলামি শরীয়তে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নেই। বরং হজ্জ ও উমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তি যে কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারেন। যখন সে মসজিদে প্রবেশ করবে তখন ডান পা এগিয়ে দিবে এবং সকল মসজিদে প্রবেশ করার সময় যে দোয়া পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে সে দোয়াটি পড়বে।

৫। দোয়া পড়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করাঃ

আমাদের দেশে প্রচলিত অনেক কিতাবে কাবাগৃহ দেখার সময় নির্দিষ্ট কিছু দোয়া বর্ণিত আছে। অনেকে এই সকল বইপড়ে মনে করে থাকেন, কাবাগৃহ দেখার সাথে সাথে এই দোয়া বড়তে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কাবাগৃহ দেখে দোয়া করা বা পড়ার মত কিছুই বর্ণিত হয়নি। এমনকি কোন সাহাবী (বাঃ) কাবাগৃহ দেখে আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করছেন তারও কোন প্রমান নেই। কাজেই কাজটি নিসন্দেহে একটি বিদআত। কেননা যে কথা, কাজ কিংবা বিশ্বাস এর ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীবর্গ ছিলেন না সেটা দিয়ে আল্লাহ্‌র ইবাদত করা বিদাত ও পথভ্রষ্টতা। এর থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন। তাই যে বা যারা এই কাজটি করে থাকেন, আশা করি জানার পর পরিহার করে চলবেন। কাবাগৃহে প্রবেশ কালে মসজিদে হারামের ভিতর দিয়া প্রবেশ করতে হয় বিধায়। মসজিদে হারামে প্রবেশকালে উত্তম হলো ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করা এবং নীচের দোয়াটি পড়াঃ

**أَعُوذُ بِاللهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ بِسْمِ اللهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ – اَللَّهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ**

এবং মসজিদে হারাম থেকে বের হওয়ার সময় পড়াঃ

**بِسْمِ اللهِ وَالصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ عَلٰى رَسُوْلِ اللهِ اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ**

মন্তব্যঃ এই দোয়াগুলো পৃথিবীর অন্যসব মসজিদেও পড়া সুন্নত।

৬। তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দুই রাকাত সালাত আদায় করাঃ

বহু মুসলিম দিধায় থাকে, মসজিদে হারামে প্রবেশ করে কি দুই রাকাত সালাত আদায় করব না কি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করব। যদি কেউ হজ্জ বা উমরার তাওয়াফের নিয়তে মসজিদে হারামে প্রবেশ করে বা কোন নফল তাওয়াফের নিয়তে প্রবেশ করে তবে তার জন্য উত্তম হলো, সালাত আদায় না করে কাবার তাওয়াফ করা। সেক্ষেত্রে আপনি দুই রাকাত সালাত না পড়ে তাওয়াফ করাই যথেষ্ট। কেনানা, মসজিদে হারামের তাহিয়্যা (সম্ভাষণ) হচ্ছে, তাওয়াফ। এই তাওয়াফের মাধ্যমেই আপনার সালাতের কাজ সমাধা হয়ে যাবে। অপর পক্ষে আপনি যদি তাওয়াফের নিয়ত ব্যতীত অন্য নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করেন। যেমনঃ নামাযের জন্য অপেক্ষা, কিংবা কোন দারসে হাযির হওয়া কিংবা অনুরূপ অন্য কোন নিয়তে। সে ক্ষেত্রে মসজিদে হারাম বা অন্য যে কোন মসজিদের প্রবেশের পর পরই বসার আগে দুই রাকাত সালাত আদায় করে নিবেন। এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ থাকার কারণে। সার কথা হলো, তাওয়াফের নিয়ত না থাকলে দু’রাকআত সালাত আদায় না করে মসজিদে কখনো বসবেন না। তবে, জামাআত দাঁড়িয়ে গেলে সরাসরি জামাআতে শরীক হয়ে যাবেন।

আবদুল্লাহ ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে হজ্জ বা ‘উমরাহ উভয় অবস্থায় সর্বপ্রথম যে তাওয়াফ করতেন, তার প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলতেন। তাওয়াফ শেষে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করে সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৬)

মন্তব্যঃ আমাদের অনেক মনে করে থাকে যে, মসজিদে হারামে প্রবেশের পর প্রথম সুন্নাহ সমম্ত আমল হলো, বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা। তারা বিশ্বাস করেন যে, মসজিদে হারামের তাহিয়্যা (সম্ভাষণ) হচ্ছে। তাওয়াফ আদায় করা। অর্থাৎ যে ব্যক্তিই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে তার জন্য তাওয়াফ করা সুন্নত। অথচ প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমন নয়। বরং এক্ষেত্রে মসজিদে হারামও অন্য সকল মসজিদের ন্যায়। তবে পার্থক্য হলো হজ্জ, উমর বা নফল তাওয়াফের নিয়তে থাকলে সালাত আদায় না করেই তাওয়াফ করা।

৭। তাওয়াফের পূর্বে সম্ভব হলে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, আমি দেখেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছে যখন হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতেন, তখন তিনি সাত চক্করের মধ্যে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে সমাধা করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯২০)

৮। মক্কা প্রবেশ কালের ভুলত্রুটিঃ

অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া পাঠ করতে ভুলে যান। অথচ তখনি বেশি বেশি করে তালবিয়া পাঠ করার সময়। আবার অনেক হাজী সাহেব মক্কায় প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে থাকেন। মক্কা প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দো‘আ নেই। অনেক হাজী সাহেব একসাথে সমস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে থাকেন। এটি সুন্নত পরিপন্থী কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম ভিন্ন ভিন্নভাবে তালবিয়া পাঠ করেছেন। এ সময় অনেক হাজী সাহেব অপরের সমালোচনা ও দোষ চর্চা করেন, এমন পবিত্র স্থানে যা একেবারেই পরিত্যাজ্য।

তাওয়াফের ফজিল, প্রকার ভেদ এবং পদ্ধতি

তাওয়াফের ফজিল, প্রকার ভেদ এবং পদ্ধতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওয়াফঃ তাওয়াফ (طواف) একই আরবী শব্দ যার অর্থ হলো প্রদক্ষিণ করা বা চক্কর দেয়া। কোনো কিছুর চারদিকে প্রদক্ষিণ করাকে শাব্দিক অর্থে তাওয়াফ বলে। হজ্জের ক্ষেত্রে কাবা শরীফের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলে। অর্থাৎ হজ্জ ও উমরার সময় মুসলিমরা কাবার চারপাশে ঘড়ির কাটার বিপরীতদিকে সাতবার ঘোরে যা তাওয়াফ নামে পরিচিত। পবিত্র কাবা ব্যতীত অন্য কোনো জায়গায় কোনো জিনিসকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করা হারাম। হজ্জ উমরার সময় বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা একটি ফরজ কাজ। যা আদায় না করলে হজ্জ ও উমরা বিশুদ্ধ হবে না। তবে হজ্জ এবং উমরার ছাড়াও যে কোন সময় বাইতুল্লাহ এর চর্তুদিকে তাওয়াফ করা একটি নফল ইবাদাত। তাওয়াফ করা আগে নিয়ত করতে হবে এবং মসজিদে হারামের সীমানার ভিতর থেকে কাবার চারপাশে সাত চক্কর দিতে হবে। কম বেশী দিলে না তাওয়াফ হিসাবে গন্য হবেনা।

তাওয়াফের ফজিলত

তাওয়াফের ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীস এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাওয়াফকারির প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে একটি করে নেকি লিখবেন এবং একটি করে গুনাহ মাফ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 أَوَلَمْ نُمَكِّن لَّهُمْ حَرَمًا آمِنًا يُجْبَى إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِزْقًا مِن لَّدُنَّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থঃ আমি কি তাদের জন্যে একটি নিরাপদ হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সর্বপ্রকার ফল-মূল আমদানী হয় আমার দেয়া রিযিকস্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না। (সুরা কাসাস ২৮:৫৭)

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ (মক্কা) শহরকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, এর একটি কাঁটাও কর্তন করা যাবে না, এতে বিচরণকারী শিকারকে তাড়া করা যাবে না, এখানে মু‘আরিফ (পৌছের দেয়ার ঘোষনা) ব্যতীত পড়ে থাকা কোন বস্তু কেউ তুলে নিবে না। (সহিহ বুখারি ১৫৮৬)

২. উমায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ইবনু উমার (রাঃ) চাপাচাপি করে হলেও হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামনী বায়তুল্লাহর এই দুই রুকনে যেতেন। আমি একদিন তাঁকে বলাম, আপনি এ দুটি রুকনে ভীড়ে চাপাচাপি করে হলেও গিয়ে উপস্থিত হন কিন্তু অন্য কোন সাহাবী তো ইমন চাপাচাপি করে সেখানে যেতে দেখি না। তিনি বললেন, যদি আমি এরূপ চাপাচাপি-ধাক্কাঁধাক্কি করি তাতে দোষ কি? আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, এ দুটো রুকন স্পর্শ করণে গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায় তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, কেউ যদি যথাযথ ভাবে বায়তুল্লাহর সাতবার তাওয়াফ করে একটি ক্রীতদাস করার মত ছওয়াব হয়। আমি তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, তাওয়াফ করতে গিয়ে এমন কোন কদম সে রাখেনা বা তা উঠায়না যদ্বারা তার একটি গুনাহ মাফ না হয় এবং একটি নেকী লেখা না হয়। (সুনানে তিরমিজি ৯৬২ ইফাঃ, মিসকাত ২৫৮০)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ লোকেদের করলো এবং দু’ রাক‘আত নামায পড়লো, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫৬)

৪. উক্ত ইবনে উমার (রাঃ) হতেই বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাত চক্র তওয়াফ করার সওয়াব একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করার সমান।  (হাদিস সম্ভার ১১৬৩ হাদিসের মান সহিহ)

৫. আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে।(সুনানে নাসাঈ ২৯২২)

তাওয়াফের প্রকাভেদ

ইসলামি শরীয়তে সাত প্রকার তাওয়াফের প্রচলন রয়েছে। এই সাত প্রকার তাওয়াফ হলোঃ

১। তাওয়াফে কুদুম বা আগমণী তাওয়াফঃ

২। তাওয়াফে জিয়ারত বা এফাদাঃ

৩। তাওয়াফে উমরাঃ

৪। তাওয়াফে নজরঃ

৫। তাওয়াফে তাহিয়্যাঃ

৬।নফল তাওয়াফঃ

৭। তাওয়াফে বিদাঃ

তাওয়াফে কুদুম বা আগমণী তাওয়াফঃ

কুদুম শব্দের অর্থ আগমণ। সে হিসেবে তাওয়াফে কুদুম কেবল বহিরাগত হাজিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মক্কায় বসবাসকারীরা যেহেতু অন্য কোথাও থেকে আগমন করে না, তাই তাদের জন্য তাওয়াফে কুদুম সুন্নত নয়।

ইফরাদ হজ্জকারী মক্কায় এসে প্রথম যে তাওয়াফ আদায় করে তাকে তাওয়াফে কুদুম বলে। কেরান হজ্জকারী ও তামাত্তু হজ্জকারী উমরার উদ্দেশ্যে যে তাওয়াফ করে থাকেন তা তাওয়াফে কুদুমেরও স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কেরান হজ্জকারীকে উমরার তাওয়াফের পর ভিন্নভাবে তাওয়াফে কুদুম আদায় করতে হয়। হানাফি মাজহাবে তামাত্তু ও শুধু উমরা পালনকারীর জন্য কোনো তাওয়াফে কুদুম নেই।

মন্তব্যঃ যে সকল হজ্জযাত্রীদের সাথে হাদী থাকে না, তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে তাদের হজ্জ কে তামাত্তু হজ্জ বলে। অপর পক্ষে যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন, তারা একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন তাদের হজ্জ কে কেরান হজ্জ বলে। সাধারণ যারা হজ্জের সফলে উমরা করার সময় সুযোগ পান না তাদের হজ্জ কে ইফরাদ হজ্জ বলে।

২। তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদাঃ

তাওয়াফে জিয়ারত বা ইফাদা হলো হজ্জের একটি ফরজ আমল। এই সাত প্রকার তাওয়াফের মধ্য এটিই হলো, হজ্জের মুল তাওয়াফ। সকল হজ্জকারীকে এ তাওয়াফটি আদায় করতেই হবে। এই তাওয়াফটি বাদ পড়লে হজ্জ সম্পন্ন হবে না। তাওয়াফে ইফাযা  মাধ্যমেই হজ্জের পূর্ণতা লাভ করে। তওয়াফে ইফাযাকে তাওয়াফে জিয়ারতও বলা হয়। আবার অনেকে এটাকে হজের তাওয়াফও বলে থাকেন। এটি না হলে হজ শুদ্ধ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾

অর্থঃ তারপর তারা যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে। (সুরা হজ্জ ২২:২৯)

৩। তাওয়াফে উমরাঃ

তামাত্তু হজ্জযাত্রীগণ প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে। কেরাম হজ্জযাত্রীগণ একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন। অর্থাৎ তামাত্তু ও করান হজ্জ আদায়কারীগন হজ্জের আগে উমরা করা সুযোগ পান। এই উমরা তাওয়াফ করা একটি ফরজ আমল। এই তাওয়াফ না করলে উমরা বাতিল হয়ে যাবে। উমরা আদায়ের ক্ষেত্রে এই ফরজ তাওয়াফকে তাওয়াফে

উমরা বলা হয়। এই তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রমল করবে বা হেলে দুলে তাওয়াফ করবে। পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেবেন যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে তাওয়াফ করবে। এই নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা করা সুন্নাত।

৪। তাওয়াফে নজরঃ

কেউ যদি তাওয়াফ করার মান্নত করে তাহলে তার জন্য তাওয়াফ আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। যে কোন মান্নত আদায় করার নিমিত্তে যে তাওয়াফ করা হবে তাকে তাওয়াফে নজর বলে। যদি কোন প্রকার মান্নক করা সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। কিন্তু মান্নহ করার পর ভাল কাজের মান্নত আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

তাওয়াফে তাহিয়্যাঃ

মসজিদে প্রবেশের পর মসজিদের সম্মানে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। আর কাবা ঘরে হাজির হলে মসজিদুল হারামের সম্মানার্থে একটি তাওয়াফ করা মুস্তাহাব। তবে মসজিদে হারামে প্রবেশের পর অন্য কোনো তাওয়াফ করলেও তাতে তাওয়াফে তাহিয়্যা আদায় হয়ে যাবে। এলফল সমজিদে হারামে প্রবেশের সম্মানে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত সালাত আর আদায করার প্রয়োজন হবে না বলে মুজতহীদ আলেমগণ মতপ্রদান করেছেন।

নফল তাওয়াফঃ

মক্কায় থাকা অবস্থায় যখনই সুযোগ পাওয়া যায় তখনই নফল তাওয়াফ করা যায়। অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় নফল তাওয়াফ করা বেশি বাঞ্ছনীয়। কারন পৃথিবীর থোকাও কোন সমজিদেই এই আমল করার সুযোগ নাই। যারা হজ্জের মক্কা গমন করেন তারা একটি নির্দিষ্ট সময় সেখানে অবস্থান করে হজ্জের জন্য অপেক্ষা করেন। এই অবসর সময় বেশী বেশী নফল তাওয়াফ করে আল্লাহকে খুসি করা চেষ্টা করা। এই নফল তাওয়াফে কোন প্রকার রমল বা ইযতিবা নাই। নফল তাওয়াফ আদায় কারর সময় কোন প্রকার ইহরামের কাপড় পড়তে হয় না। সাধারণ পোশাকেই কাবাঘরের চতুর্পাশে সাত চক্কর দিলে তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে। অনেকের মনে করে থাকেন হজ্জের ন্যায় শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের পক্ষ থেকে ও তাওয়াফ করা যায়। যেমনঃ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি আপন  জনের পক্ষ থেকে। কিন্তু কারও পক্ষ থেকে নফল তাওয়াফ করা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়। 

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী ‘উমরাহ আদায়ের পর যত দিন হালাল অবস্থায় থাকবে ততদিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এরপর যখন ‘আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজ্জলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা ‘আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি ‘আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর ‘আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে ‘আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত ‘ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌঁছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহ্কে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’ তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। (সহিহ বুখারি ৪৫২১)

৭। তাওয়াফে বিদাঃ

হজ্জ শেষে বহিরাগত হাজ্জি সাহেবগন যখন বায়তুল্লাহ থেকে প্রত্যাবর্তনের করবেন তখন আরেক বার বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করতে হয়। এই শেষবার বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করাকে তাওয়াফে বিদা বলে। এই তাওয়াফটি বহিরাগত হাজ্জিদের জন্য মুজতহীদ আলেমগণ ওয়াজিব বলে গন্য করেছেন। কাজেই কোন হাজ্জি মিনায় থেকে সরাসরি নিজ নিজ দেশে চলে যেতে পারবেন না। কেননা, কাবাঘরের শেষ ওয়াজিব তাওয়াফটি এখনও বাকি আছে। তাই বহিরাগত হাজ্জিগন মক্কা হয়ে বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করে নিজ নিজ বাস স্থানে ফিরবেন। এই তাওআফের মাঝেই বহিরাগত হাজ্জিগন তাদের হজ্জ শেষ করে মক্কা থেকে প্রস্থানের অনুমতি পায়। এই বিদায়ী তাওয়াফ আদায় করা হানাফি মাজহাবে ওয়াজিব হিসাবে গন্য করা হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্ন পথ দিয়ে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেন শেষবারের মতো বায়তুল্লাহ ত্বওয়াফ না করা পর্যন্ত প্রত্যাবর্তন না করে।” (সহিহ মুসলিম ৩১১১, সুনানে আবু দাউদ ২০০২)

এক নজরে পুর্নাঙ্গ তাওয়াফ করার পদ্ধতি

ক) কারা ও মসজিদের হারামের যথাযত সম্মান ভক্তি প্রদর্শণ করে কারার চত্তরে প্রবেশ করে তাওয়াফ শুরু করতে হবে। তাওয়াফ শুরু করার পূর্বেই তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিতে হবে। যে কোন স্থান থেকেই তাওয়াফ শুরু করা যাবে না। রুকনে হাজরে আসওয়াদ বা কাবার যে কোনায় হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করা আছে সেই কোন থেকে তাওয়াফ শুরু করেত হবে। হাজরে আসওয়াদ কাবাঘরের দক্ষিন-পূর্ব কোনে স্থাপন করা আছে। কাবাঘরের ‘‘হাজরে আসওয়াদ’’ কোণ থেকে মসজিদে হারামের দেয়াল ঘেষে সবুজ বাতি জ্বালান থাকে। ঐ বাতি দেখেই তাওয়াফ শুরুর স্থান চিনে নিতে হবে।

খ) প্রথমে মনে মনে তাওয়াফের নিয়ত করা। নিয়ত না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না, কেননা কোন আমলের জন্য নিয়ত করা ফরজ।

গ) নিয়ত করার পর, প্রথমে ‘হাজারে আসওয়াদ (কাল পাথরের) কাছে গিয়ে, ‘‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’’  বলতে হবে এবং এই পাথরকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ কার্য শুরু করতে হবে। কাবাঘরকে বামপাশে রেখে তাওয়াফ করতে হয়। তাওয়াফের করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নীচের দোয়াটি পড়তেন। তাই তাওয়াফের সময় নিম্মের দোয়াটি পড়লে ভাল। কারন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এমনটি করতেন। দোয়াটি হলঃ

**اَللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيْقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مَحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم**-

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রতি ঈমান এনে, তোমার কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য তোমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে এ তাওয়াফ কার্যটি করছি।

ঘ) রমজান ও হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড় থাকে। এই ভীড়ের মধ্য শতকরা দুই চার জন ছাড়া কেউই চুমু দিতে পারে না। বয়স্ক, বৃদ্ধ ও মহিলাদের জন্য পাথর চুম্বন দেয়াতো প্রশ্ন উঠে না। তারপরও যদি কেউ চুমু প্রদান করতে যায়, তবে কোন প্রকার ধাক্কা ধাক্কি করা যাবে না। এই কাজটি হলো সুন্নাহ আর ধাক্কা ধাক্কি করে কাউকে কষ্ট দেয়া হারাম। সুন্নাহ আমল করতে গিয়ে হামার কাজ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত কাজ হবে। কিন্তু ভীড়ের মাঝে কষ্ট না দিয়ে তাওয়াফ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই বেশী ভীড় দেখলে ধাক্কাধাক্কি করে চুমু দেওয়ার চেষ্টা না করাই উত্তম তবে ভীড় কম হলে এবং যে কোন কারনে চুমু দেওয়ার সুযোগ হবে অবশ্যই চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করা। চুমু দেয়া সম্ভব না হলে, ইশারায় চুমু দিয়ে তাওয়াফ শুরু করে দিতে হবে। ইশারায় চুমু দিয়ে শুরু করা ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত আমল।

ঙ) তাওয়াফ শুরু করার আগে আরও একটি কাজ করতে হবে তা হলো, ইযতিবা করা। ইযতিবা হলো, পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেবেন যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে ফেলবেন। এ নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা শুধুমাত্র প্রথম তাওয়াফে করতে হয়। পরবর্তী তাওয়াফগুলোতে এ নিয়ম নেই। এটা করা সুন্নাত। যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।

ছ) তাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর রমল করা। রমল হলো, তাওয়াফের সময় মুজাহিদের মতো বীরদর্পে দুই কাঁধ দুলিয়ে দ্রুতপায়ে চলা। বিদায় হজ্জের সময়, মক্কার মুশরিকরা যখন বলাবলি করতে থাকে যে, ইয়াসরিবের (মদিনার) আবহাওয়া মুসলমানদেরকে দুর্বল ও রুগ্ন করে ফেলেছে। মুশরিকদের এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমল করে তাওয়াফ করার নির্দেশ দেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং পরেও এ বিধান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

মক্কায় প্রবেশ করে প্রথম যে তাওয়াফটি করতে হয় শুধু এটাতেই প্রথম তিন চক্রের রমলের এ বিধান। এরপর যতবার তাওয়াফ করবেন সেগুলোতে আর “রম্‌ল” করতে হবে না। এমনকি নফল তাওয়াফ অর্থাৎ হজ্জ ও উমরার নিয়্যাতে নয়, বাইতুল্লায় নামাজের সময় বা আগে পরে তাওয়াফ করার সময় রমল বা ইযতিবা প্রয়োজন নেই। মহিলাদের রমল করতে হয় না।

জ) তাওয়াফ শুরু সাথে সাথে নজরে আসবে মাকামে ইবরাহীম। মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান হলো, কাবার পূর্ব পাশে। কাজেই এই স্থানে এসে কুরআন এই আয়াতটি তিলওয়াত করা মু্স্তাহাব। আয়াতটি হলো,

(*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান বানাও। (সুরা বাকারাহ ২:১২৫)

ঝ) মাকামে ইবরাহীম অতিক্রমের পরই হাতের বামপাশে নজরে আসবে হিজর বা হাতীম। এটি কাবার উত্তরদিকে অবস্থিত অর্ধেক বৃত্তাকার অংশ যার পরিমান প্রায় পাঁচ হাতের মত। মক্কার কুরাইশগন কাবা নির্মাণের সময় অর্থাভাবের কারনে সম্পূর্ণ কাবা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়, ফলে তারা এই অংশটুকু ছেড়ে যায়। এই ছাদহীন অর্ধ-বৃত্তাকার দেয়ালঘেরা হাতিম মুলত কাবাঘরেই অংশ। তাই তাওয়াফ করার সময় যদি কেউ হাতিমে প্রবেশ করে এবং হাতীমের ভীতর দিয়ে তাওয়াফ করে তবে তার তাওয়াফ হবেনা। কেননা, তাওয়াফ করতে হবে কাবার চতুর পাশ দিয়ে। কাবার ভীতর দিয়ে তাওয়ফ করা যাবে না।

ঞ) হাতীম অতিক্রম করা পর আপনি চলে আসবেন কাবার পশ্চিম পাশে। এই পাশে তাওয়াফের সাথে সাথে চেষ্টা করেতে হবে যাতে কাবার নিকটি দিয়ে যাওয়া যায়। কারন এই পশ্চিম ও দক্ষিন কোনাকে বলা হয় রুকনে ইয়ামানী, যা ষ্পর্শ করাও একটি মুস্তাহাব কাজ। কাজেই প্রতিটি তাওয়াফের সাথে এই রুকনে ইয়ামনী ষ্পর্শ করা চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু প্রচন্ড ভীড় থাকলে, এই আমল না করলে কোন অসুবিধা নাই। ভীড়ের মধ্যে কাউকে কষ্ট দিল ষ্পর্শ না করাই ভাল। তবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, সাথে নারী, শিশু বা বয়স্ক কেউ না থাকলে ভীড়ের মধ্যেও কাউকে কষ্ট না দিয়ে রুকনে ইয়ামানী ষ্পর্শ করা সম্বব। তাই রুকনে ইয়ামানীর পাশে এসে পৌঁছলে ভীড় না হলে এ কোণকে ডান হাত দিয়ে ষ্পর্শ করার চেষ্টা করা। কিন্তু সাবধান, এ রুকনে ইয়ামেনীকে চুমু দেবেন না, এর পাশে এসে হাত উঠিয়ে ইশারাও করবেন না এবং সেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ও বলবেন না। ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন হাজরে আসওয়াদে পৌঁছে। রুকনে ইয়ামেনী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নের এ দোয়াটি পড়া মুস্তাহাবঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯০ ইফাঃ)

কাজেই এই দোয়াটি পড়তেই থাকবেন। পড়তে পড়তে আপনি হাজরে আসওয়াদ বরাবরা পৌছে যাবেন। অর্থাৎ আপনার এক চক্কর সমাপ্তের পথে।

ট) দোয়াটি পড়তে পড়তেই আপনি রুকনে ইয়ামেনী থেকে হাজরে আসওয়াদে চলে এসেছেন। আপন এবার নতুন তাওয়াফ শুরু করছেন। মনে রাখবেন, তাওয়াফের প্রত্যেক চক্রেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা ষ্পর্শ করা উত্তম। কিন্তু হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড়ের কারণে এটি খুবই দূরূহ কাজ। সেক্ষেত্রে প্রতি চক্রেই হাজরে আসওয়াদের পাশে এসে এর দিকে মুখ করে ডান হাত উঠিয়ে ইশারা করবেন। ইশারাকৃত এ হাত চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় একবার বলবেন (بسم الله الله أكبر )‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’।

ঠ) হাজরে আসওয়াদের যে কোনা থেকে সবুজ বাতি দেখে তাওয়াফ শুরু করেছিলেন, আবার সেখানে আসলে তাওয়াফের এক চক্র শেষ হবে। এভাবে সাত চক্কর পূর্ণ করতে হবে। ভীড়ের পরিমাণ যদি আরো বেশী দেখতে পান এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ করা কঠিন মনে করেন তাহলে দু’তলা বা ছাদের উপর দিয়েও তাওয়াফ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সময় একটু বেশী লাগলেও ভীড়ের চাপ থেকে রেহাই পাবেন। ছাদের উপর তাওয়াফ করলে দিনের প্রখর রৌদ্রতাপ ও প্রচন্ড গরমে না গিয়ে রাতের বেলায় করবেন। বেশী ভীড়ের মধ্যে ঢুকে মানুষকে কষ্ট দেবেন না। দিলে ইবাদত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এই ক্ষেতে মনে রাখতে হবে মসজিদে হারামের সীমার বাইলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না।

ড) তাওয়াফরত অবস্থায় খুব বেশী বেশী জিকির, দোয়া ও তাওবা করতে থাকবেন। কুরআন তিলাওয়াতও করা যায়। কিছু কিছু বইতে আছে প্রথম চক্রের দোয়া, ২য় চক্রের দোয়া ইত্যাদি। কুরআন হাদীসে এ ধরনের চক্রভিত্তিক দোয়ার কোন ভিত্তি নেই। যত পারেন একের পর এক দোয়া আপনি করতে থাকবেন। আপনার নিজ ভাষায় আপনার মনের কথাগুলো আল্লাহ্‌র কাছে বলতে থাকবেন, মিনতি সহকারে চাইতে থাকবেন। দলবেঁধে সমস্বরে জোরে জোরে দোয়া করে অন্যদের দোয়ার মনোযোগ নষ্ট করবেন না। আরবীতে দোয়া করলে এগুলোর অর্থ জেনে নেয়ার চেষ্টা করবেন যাতে আল্লাহর সাথে আপনি কি বলছেন তা যেন হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন

ঢ) তাওয়াফ করার সময় যদি জামা’আতের ইকামত দিয়ে দেয় তখন সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াফ বন্ধ করে দিয়ে নামাযের জামা’আতে শরীক হবেন এবং ডান কাঁধ ও বাহু চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলবেন। নামায রত অবস্থায় কাঁধ ও বাহু খোলা রাখা জায়েয না। সালাত শেষে তাওয়াফের বাকী অংশ পূর্ণ করবেন। অর্থাৎ আপনি যদি সালাতে আগে তিন চক্ক দিয়ে থাকেন তবে সালাতে পর বাকি চার চক্কর দিয়ে তাওয়াফ শেষ করবেন।

ণ) তাওয়াফ শেষ করার পর মাকামে ইবরাহীমের পিছনে গিয়ে কাবার দিকে মুখ করে দু্‌ই রাকাত সালাত আদায় করতে হবে।

ত) সালাত আদায়ের পর জমজমের পানি পান করা মুস্তাহাব।

মন্তব্যঃ প্রচন্ড ভীড়ের কারণে কোন পর মহিলার গা স্পর্শ হলে এতে তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না, অযুও ছুটবে না। তবে সতর্ক থাকতে হবে। তাওয়াফরত অবস্থায় শরীরের কোন স্থান ক্ষত হয়ে গেলে বা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়লে এতে তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না।বিশেষ করে মসজিদে হারামে মুসল্লীর সামনে দিয়ে কেউ হাঁটলে তার গোনাহ হবে না। (আবূ দাঊদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ), তবে মুহাদ্দিস আলবানী (রহ.)-এর মতে হাঁটা জায়েয নয়। সেজন্য সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। তাওয়াফ শেষে দু’রাক‘আত সালাত দিন ও রাতের যে কোন সময় এমনকি নিষিদ্ধ ও মাকরূহ ওয়াক্তেও আদায় করা যাবে। তবে নিষিদ্ধ তিনটি সময়ে নামায না পড়া উত্তম।

তাওয়াফের ওয়াজিব আমলসমূহ

তাওয়াফের ওয়াজিব আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের ওয়াজিব সমূহ আলোচনা করা হলোঃ তাওয়াফের ওয়াজিব আমল হলোঃ

১। তাওয়াফের নিয়ত করা

২। বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া

৩। ছতর ঢাকা রাখা

৪। হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করা

৫। কাবাঘরকে হাতের বামপাশে রেখে তাওয়াফ করা

৬। হাতিম বা হিজরের ভিতরে তাওয়াফ না করা

৭। মসজিদে হারামের ভেতর দিয়ে তাওয়াফ করা

৮। বিরতিহীন ভাবে ‘সাতবার চক্কর’ দিয়ে তাওয়াফ পূর্ণ করা

৯। সাত চক্করে শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করা

তাওয়াফের ওয়াজিব সমূহ বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলোঃ

১। তাওয়াফের নিয়ত করাঃ

যে কোন আসলের জন্য নিয়ত করা ফরজ। বিষয় সম্পর্কে বহু বার আলোচনা করা হয়েছে। এই জন্য এই ব্যপারে শুধু এতটুকু বলব যে তাওয়াফের জন্য গদবাধা কোন নিয়ত নেই। শুধু মনে মনে সংকল্পকরে মহান আল্লাহর হুকুম আদায়ের জন্য তাওয়াফ করা। যতি কেউ উমরার তাওয়াফ করে তা মনে মনে সংকল্পর করবে আমি উমরার তাওয়াফ করছি। কেউ হজ্জের তাওয়াফ করলে মনে মনে সংকল্পর করবে আমি হজ্জের তাওয়াফ করছি। হজ্জ ও উমরা ব্যতিত কোন নফল তাওয়াফ করলে সেই সংকল্প করেই তাওয়াফ কবরে। তাওয়াফের নিয়ত না করে সারাদিন হাজার হাজার বার বাইতুল্লাহর চার পাশে চক্কর দিলেই তাওয়াফ হবে না। কাজেই নিয়ত হলো তাওয়াফের প্রথম ফরজ কাজ। এটি বাদ পড়লে তাওয়াব হবে না, তবে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়। 

বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়াঃ

তাওয়াফ করা অন্যতাম ওয়াজিব হলো, বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া। যদি কারো বড় নাপাকি যেমন- হায়েজ, নিফাজ, গোসল ফরজ ইত্যাদি থাকে তবে তার জন্য বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা জায়েয নয়। এই বড় নাপাকি থেকে শরীর পবিত্র হওয়া পরই কেমন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা যাবে।

দলিল সহিহ বুখারির হাদিসঃ

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে প্রবেশ করলেন। অথচ মক্কা প্রবেশের পূর্বেই ‘সারিফ’ নামক জায়গায় তার মাসিক শুরু হয়। তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার কী হয়েছে? মাসিক শুরু হয়েছে না কি? তিনি বললেনঃ হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা তো এমন এক ব্যাপার যা আল্লাহ আদাম আঃ)-এর কন্যাদের উপর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কাজেই হাজীগণ যা করে থাকে, তুমিও তেমনি করে যাও, তবে তুমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। এরপর আমরা যখন মিনায় ছিলাম, তখন আমার কাছে গরুর গোশ্ত নিয়ে আসা হল। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কী? লোকজন উত্তর করলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানী করেছেন। (সহিহ বুখারি ৫৫৪৮)

ছতর ঢাকা রাখাঃ

উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা যাবে না। কেউ উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করে তাহলে তার তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। জাহেলী যুগে লোকেরা উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করত। উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার প্রমানঃ  

১৬৬৫. ‘উরওয়াহ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, জাহিলী যুগে হুমস ব্যতীত অন্য লোকেরা উলঙ্গ অবস্থায় (বাইতুল্লাহর) তাওয়াফ করত। আর হুমস্ হলো কুরায়শ এবং তাদের ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি। হুমসরা লোকেদের সেবা করে সওয়াবের আশায় পুরুষ পুরুষকে কাপড় দিত এবং সে তা পরে তাওয়াফ করত। আর স্ত্রীলোক স্ত্রীলোককে কাপড় দিত এবং এ কাপড়ে সে তাওয়াফ করত। হুমসরা যাকে কাপড় না দিত সে উলঙ্গ অবস্থায় বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করত। সব লোক ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করত আর হুমসরা প্রত্যাবর্তন করত মুযদালিফা হতে। রাবী হিশাম (রহ.) বলেন, আমার পিতা আমার নিকট ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াতটি হুমস সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ

 (ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ) (এরপর যেখান হতে অন্য লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে, তোমরাও সেখান হতে প্রত্যাবর্তন করবে) রাবী বলেন, তারা মুযদালিফা হতে প্রত্যাবর্তন করত, এতে তাদের ‘আরাফাহ পর্যন্ত যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হল। (সহিহ বুখারি ১৬৬৫)

নবম হিজরীর হজ্জের মৌসুমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে আজ থেকে কোন মুশরিক হজ্জে আসবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কবরে না।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের পূর্বে যে হাজ্জে (হজ্জ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর (রাঃ) কে আমীর নিযুক্ত করেন, সে হাজ্জে (হজ্জ) কুরবানীর দিন [আবূ বকর (রাঃ)] আমাকে একদল লোকের সঙ্গে পাঠালেন, যারা লোকদের কাছে ঘোষণা করবে যে, এ বছরের পর থেকে কোন মুশরিক হাজ্জ (হজ্জ) করবে না এবং বিবস্ত্র হয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে না। (সহিহ বুখারি ১৫২৪ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ সৌদি আরবের বিশিষ্ট মুজতাহীদ আলেম শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, যদি কোন উলঙ্গ ব্যক্তি তাওয়াফ করে তাহলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। কেননা তা করা নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হচ্ছে, “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যাতে আমাদের অনুমোদন নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত। (আল-শারহুল মুমতি’ ৭/২৫৭)

৪। হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করাঃ

হাজারে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু ও শেষ করতে হবে। হাজরে আসওয়াদের সামনে থেকে শুরু করলে তার সাতটি চক্কর পূর্ণ হবে না। ঠিক তেমনিভাবে হাজরে আসওয়াদে পৌছার আগে শেষ করলে তার সম্পম চক্কর পূর্ণ হবে না। তাই  হাজরে আসওয়াদ থেকেই তাওয়াফ শুরু ও শেষ করতে হবে।

দলিলঃ

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করতেন তখন প্রথম তিন চক্করে (তাওয়াফে) রামল করতেন (বাহু দুলিয়ে বীরদর্পে প্রদক্ষিণ করতেন) এবং চার চক্করে সাধারণ হেঁটে তাওয়াফ করতেন, হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত। ইবনে উমার (রাঃ)-ও তাই করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫০)

মন্তব্যঃ কেউ যদি কাবার ফটক থেকে তাওয়াফ শুরু করে তাহলে তার তাওয়াফ অপূর্ণ ও অশুদ্ধ হবে। যদি কোন ব্যক্তি কাবার ফটক থেকে তাওয়াফ শুরু করবে এবং এর উপর ভিত্তি করে তাওয়াফ শেষ করবে তার তাওয়াফ পরিপূর্ণ হবে না। এমনকি যদি কেউ হাজারে আসওয়াদের সমান্তরালের সামান্য কিছু পর থেকে তাওয়াফ শুরু করে সেক্ষেত্রে তার এ চক্করটি বাতিল। আর যদি যে জানতে পারে যে সে হাজরে আসওয়াদের কিছু পর থেকে তাওয়াফ শুরু করে ছিল, তবে জানার সাথে সাথে তার তাওয়াফটি বাতিল হয়ে যাবে। তাকে আবার নতুন করে সম্পূর্ণ তাওয়াফ আদায় করতে হবে। কেননা তার সাতটি চক্কর পূর্ণ হয় নাই। ঠিক তেমনিভাবে যদি কেউ সপ্তম চক্করে হাজর আসওয়াদে পৌছার আগেই চক্কর বাদ দিয়ে চলে যায় তারও তাওয়াফটি বাতিল হবে। কেননা, সে  সাতটি চক্কর সমাপ্ত করে নাই। তাই ফরজ বা ওয়াজিব তাওয়াফ হলে তাকে অবশ্যই আবার তাওয়াফটি নতুন করে আদায় করতে হবে।

৫। কাবাঘরকে হাতের বামপাশে রেখে তাওয়াফ করাঃ

বায়তুল্লাহ্‌কে বাম দিকে রেখে তাওয়াফ করা। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ্‌কে বামে রেখে তাওয়াফ করেছেন। শত শত বছর থেকে বায়তুল্লাহ্‌কে বাম দিকে রেখে লক্ষ লক্ষ মুসলিম সর্বক্ষন চারপাশে তাওয়াফ করে আসছে এর কোন ব্যাতিক্রম পাওয়া যায় না।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কংকর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলছিলেন, তোমরা হাজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। তিনি আরো বলেনঃ আমি অবহিত নই আমার এই হাজ্জের পর আবার হাজ্জ করার সুযোগ পাবো কি না। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৭০)

৬। হাতিম বা হিজরের ভিতরে তাওয়াফ করাঃ

১। আবদুল হামিদ ইবন জুবায়র (রহঃ) তার ফুফু সফিয়া বিনত শায়বা সূত্রে বলেছেন, আমাদের কাছ আয়েশা (রাঃ) বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি কা’বায় প্রবেশ করবো না? তিনি ইরশাদ করলেন, তুমি হিজারে প্রবেশ কর। কেননা, তা কাবারই অংশ। (সুনানে নাসঈ ২৯১৪)

২। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার ইচ্ছা হতো কাবায় প্রবেশ করে তাতে সালাত আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে প্রবেশ করিয়ে বললেনঃ যখন তুমি কাবায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেছ, তখন এখানে সালাত আদায় কর, কেননা এটি কাবারই এক অংশ। কিন্তু তোমার গোত্র যখন একে নির্মাণ করে, তখন তাকে সংক্ষিপ্ত করেন।(সুনানে (সুনানে নাসঈ ২৯১৪৫, সুনানে তিরমিজি ৮৭৬)

৩। অন্য এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! কাবা ঘরে প্রবেশ করব না কি?’ তিনি বললেন, “তুমি হিজরে প্রবেশ কর। তা কাবা ঘরেরই অংশ।” (নাসাঈ ২৯১৪)

মন্তব্যঃ সহিহ হাদিসের আলোকে জানতে পারছি যে, হাতিম বা হিজর কাবারই অংশ। আমাদের জানা আছে, তাওয়াফ করতে হয় কাবার চার পাশে। কাবার ভিতর দিয়ে তাওয়াফ হবে না। কাজেই কাবা ঘরের তাওয়াফকারী অবশ্যই হিজরের বাইরে দিয়ে তওয়াফ করবে।

৭। মসজিদে হারামের ভেতর দিয়ে তাওয়াফ করাঃ

তাওয়াফের ক্ষেত্রে ফরয হচ্ছে বায়তুল্লাহ্‌কে তাওয়াফ করা। যদি কেউ মসজিদে হারামের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করে তাহলে সে মসজিদকে তাওয়াফ করল, বায়তুল্লাহ্‌কে নয়।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, আলেমগণ বলেন: তাওয়াফ সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে মসজিদে হারামের ভেতরে হওয়া। মসজিদের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করে তাহলে আদায় হবে না। এজন্য কেউ যদি মসজিদে হারামের বাহিরে দিয়ে তাওয়াফ করতে চায় তাহলে সেটা জায়েয হবে না। কেননা সেক্ষেত্রে সে মসজিদকে তাওয়াফকারী হবে, কাবাকে নয়। আর যারা মসজিদের ভেতরে উপরে কিংবা নীচে দিয়ে তাওয়াফ করেন তাদের তাওয়াফ জায়েয হবে। তবে, সাফা-মারওয়া দিয়ে কিংবা সাফা-মারওয়ার উপর দিয়ে তাওয়াফ করা থেকে সাবধান। কেননা সাফা-মারওয়া মসজিদের অংশ নয়। (তাফসিরু সুরাতিল বাক্বারা ২/৪৯)

বিরতিহীন ভাবে সাতবার চক্কর দিয়ে তাওয়াফ পূর্ণ করাঃ

১. ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মক্কায় পৌছে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার জন্য বায়তুল্লাহর যে তাওয়াফ করতেন, তাতে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে সম্পন্ন করতেন। তাপর দু’রাকাআত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৯)

২. আম্‌র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-কে জিজ্জেস করলাম, ‘উমরাহকারীর জন্য সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করার পূর্বে স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে কি? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ সমাপ্ত করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেন, অতঃপর সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করেন। এরপর ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) তিলাওয়াত করেন, “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে”। (আল-আহযাবঃ ২৩)। (সহহি বুখরি ১৬২৩)

মন্তব্যঃ পরিপূর্ণ সাত চক্কর তাওয়াফ করা। সাত চক্করের চেয়ে এক কদমও কম হলে তাওয়াফ পরিপূর্ণ হবে না। ইমাম নববী বলেন: তাওয়াফের শর্ত হচ্ছে, সাত চক্কর হওয়া। প্রত্যেকবার হাজারে আসওয়াদ থেকে শুরু করে হাজারে আসওয়াদ শেষ করবে। যদি সাত চক্করের চেয়ে এক কদমও কম হয় তাহলে তার তাওয়াফ ধর্তব্য হবে না। চাই সে ব্যক্তি মক্কাতে অবস্থান করুক কিংবা মক্কা থেকে বের হয়ে তার নিজ দেশে ফিরে আসুক। দম বা পশু জবাই করে কিংবা অন্য কোন আমলের মাধ্যমে তাওয়াফের ঘাটতিকে পূরণ করা সম্ভবপর নয়। (আল-মাজউ (৮/২১)

তাওয়াফ করার সময় যদি জামা‘আতের ইকামত দিয়ে দেয় তখন সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াফ বন্ধ করে দিয়ে নামাযের জামা‘আতে শরীক হবেন এবং ডান কাঁধ ও বাহু চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলবেন। নামায রত অবস্থায় কাঁধ ও বাহু খোলা রাখা জায়েয না। সালাত শেষে তাওয়াফের বাকী অংশ পূর্ণ করবেন।

সাত চক্করে শেষ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করাঃ

তাওয়াফের সাত চক্কর শেষ হলে দু’কাঁধ এবং বাহু ইহরামের কাপড় দিয়ে আবার ঢেকে ফেলবেন এবং ‘‘মাকামে ইব্রাহীমের’’ কাছে গিয়ে পড়বেনঃ

* وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلّىً*

অর্থঃ ইব্রাহীম (পয়গাম্বর)-এর দন্ডায়মানস্থলকে সালাত আদায়ের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো।

অতঃপর তাওয়াফ শেষে এ মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে এসে দু’রাকআত সালাত আদায় করবেন। ভীড়ের কারণে এখানে জায়গা না পেলে মসজিদে হারামের যে কোন অংশে এ সালাত আদায় করা জায়েয আছে। মানুষকে কষ্ট দেবেন না, যে পথে মুসল্লীরা চলাফেরা করে সেখানে সালাতে দাঁড়াবেন না। সুন্নত হলো এ সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার পর প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ইখলাস পড়া।

এই কথার দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘উমরাহ করতে গিয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করলেন ও মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করলেন এবং তাঁর সাথে এ সকল সাহাবী ছিলেন যারা তাঁকে লোকদের হতে আড়াল করে ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন কিনা? এক ব্যক্তি আবূ আওফা (রাঃ)-এর নিকট তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারি ১৬০০ তাওহীদ)

২. ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বাইতুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”। (আল-আহযাবঃ ২৩)। (সহিহ বুখারি ১৬২৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ লোকেদের করলো এবং দু’ রাক‘আত নামায পড়লো, তা একটি ক্রীতদাসকে দাসত্বমুক্ত করার সমতুল্য। (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৯৫৬)

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের সুন্নাহসমূহ আলোচনা করা হলোঃ তাওয়াফের সুন্নাহ সম্মত আমল হলোঃ

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী হলোঃ

১। অজুসহকারে তাওয়াফ করাঃ

২। তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করা

৩। কাবায় ঢুকেই হাজারে আসওয়াদের নিকট আসা

৪। সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

৫। চুম্বন সম্বব না হলে ইশারায় চুম্বর করাঃ

৬। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করাঃ

৭। তাওয়াফের সময় দোয়া করাঃ

৮। ইযতিবা করাঃ

৯। প্রথম তিন চক্করে রমল করাঃ

১০। বাকী চার চক্কর সাধারণ গতিতে আদায় করা

১১। প্রতি চক্করেই রোকনে ইয়ামীনি স্পর্ম করাঃ

১২। প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা ইশারা দ্বারা চুম্বন করাঃ

১৩। প্রতি চক্করে তাকদির দেয়া

১৪। পায়ে হেঁটে বা বাহনে চড়ে তাওয়াফ করাঃ

১৫। তাওয়াফের মাঝে দোয়া ও জিকির করাঃ

১৬। তাওয়াফের মাঝে জরুরী কথা বলা ও কাজ করা যায়ঃ

১৭। তাওয়াফ শেষ করে জমজমের পানি পান করা

তাওয়াফের সুন্নত কার্যাবলী হলোঃ

১। অজুসহকারে তাওয়াফ করাঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম অযূ করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। (রাবী) ‘উরওয়াহ (রহঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই তাওয়াফটি ‘উমরাহ’র তাওয়াফ ছিল না। (তিনি আরো বলেন) অতঃপর আবূ বকর ও ‘উমর (রাঃ) অনুরূপভাবে হজ্জ করেছেন। এরপর আমার পিতা যুবাইর (রাঃ)-এর সাথে আমি হজ্জ করেছি তাতেও দেখেছি যে, সর্বপ্রথম তিনি তাওয়াফ করেছেন। এরপর মুহাজির, আনসার সকল সাহাবা (রাঃ)-কে এরূপ করতে দেখেছি। আমার মা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি, তাঁর বোন এবং যুবাইর ও অমুক অমুক ব্যক্তি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধেছেন, যখন তাঁরা তাওয়াফ সমাধা করেছেন, হালাল হয়ে গেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৪)


সুন্নহ হলো অজু করা

অনেক মুজতাহীদ আলেম মনে করেন, তাওয়াফে নামাযের মত শুদ্ধতার জন্য পবিত্রতা শর্ত। অজু না করা পর্যন্ত অপবিত্র ব্যক্তির নামায যেমন শুদ্ধ হয় না তেমনি তাওয়াফও। তাই তওয়াফের আগে সুন্দর করে অজু করে নিতে হবে। এর বীপরিতে অনেক মুজতাহীদ আলেম মনে করেন, তাওয়াফের জন্য অজু শর্ত নয়। তাওয়াফের পূর্বে অজু করে নেয়া উত্তম তবে অপরিহার্য় বা ফরজ নয়। বড় অপবিত্রতা (মাসিক) থাকলে তাকে পবিত্র হয়েই তাওয়াফ করেত হবে।

যে সকল মুজতাহীদ আলেম বলেন তাওয়াফের জন্য অজু অপরিহার্য় বা ফরজ তাদের দলিল।

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাত আদায় করার মতই। তবে সালাতে তোমরা কথা বলতে পার না কিন্তু এতে কথা বলতে পার। সুতরাং এ সময় ভাল কথা ছাড়া কিছূ বলবে না। (সুনানে তিরমিযি ৯৬০, আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন)

২. সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ করতে চাইতেন তখন তিনি ওযু করে নিতেন।” আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন: “তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজ্জের কার্যাবলি শিখে নাও। (সহিহ মুসলিম ১২৯৭)

শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লার মতে, অজু ছাড়া তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। তাঁকে আরও জিজাসা করা হয় যে, “এক ব্যক্তি তাওয়াফ শুরু করার পর তার বায়ু বেরিয়েছে। তার উপর তাওয়াফ কর্তন করা কী আবশ্যক? নাকি সে তাওয়াফ চালিয়ে যাবে?”

জবাবে তিনি বলেনঃ যদি কেউ তাওয়াফের মধ্যে বায়ু, পেশাব, বীর্য, লজ্জাস্থান স্পর্শ করা কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন কারণে অপবিত্র হয় তাহলে সে নামাযের ন্যায় তার তাওয়াফ স্থগিত করে পবিত্রতা অর্জন করতে যাবে; এরপর নতুনভাবে তাওয়াফ শুরু করবে। এটাই সঠিক অভিমত; যদিও এ মাসয়ালাতে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু, তাওয়াফ ও নামাযের ক্ষেত্রে এটাই সঠিক অভিমত। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যদি তোমাদের কেউ নামাযের মধ্যে নিঃশব্দে বায়ু ত্যাগ করে তাহলে সে যেন বেরিয়ে গিয়ে ওযু করে আসে এবং পুনরায় নামায আদায় করে।” (সুনানে আবু দাউদ)। তাই সামগ্রিক দৃষ্টিতে তাওয়াফ নামায শ্রেণীয়।  [(মাজমুউ ফাতাওয়াস শাইখ বিন বায (১৭/২১৬-২১৭)]

কোন কোন আলেমের মতে, তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। এটি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর অভিমত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ অভিমতটিকে পছন্দ করেছেন। তারা প্রথম অভিমতের দলিলঃগুলোর নিম্নোক্ত জবাব দেনঃ

** যে হাদিসে বলা হয়েছে যে, “বায়তুল্লাহকে তাওয়াফ নামাযতুল্য” এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী হিসেবে ‘সহিহ’ নয়; তবে এটি ইবনে আব্বাসের উক্তি। ইমাম নববী তার ‘আল-মাজমু’ কিতাবে বলেন: বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে- এটি ইবনে আব্বাসের উক্তি (মাওকুফ হাদিস)। বাইহাকী ও অন্যান্য হাফেযে-হাদিস মুহাদ্দিস এমনটি বলেছেন।

** তারা আরও বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র অবস্থায় তাওয়াফ করা: এর দ্বারা এটা প্রমাণ হয় না যে, পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা ওয়াজিব; বরং এর দ্বারা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ আমল করেছেন। কিন্তু, সাহাবীদেরকে নির্দেশ দেননি।

*** আর আয়েশা (রাঃ) কে যে তিনি বলেছেন, “একজন হাজী যা যা করে তুমিও তা তা কর; কিন্তু তুমি পবিত্র হওয়া অবধি তাওয়াফ করবে না” : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রাঃ) তাওয়াফ করতে বাধা দেয়ার কারণ হল, আয়েশা (রাঃ) হায়েযগ্রস্ত থাকা। কেননা হায়েযগ্রস্ত নারী মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন:

যারা তাওয়াফের জন্য পবিত্রতা শর্ত বলেন: মূলতঃ দলিলঃ তাদের পক্ষে নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাওয়াফের জন্য ওযু করার নির্দেশ বর্ণিত হয়নি; না সহিহ সনদে; আর না যয়ীফ (দুর্বল) সনদে। অথচ তাঁর সাথে বিশাল সংখ্যক মানুষ হজ্জ আদায় করেছেন। এবং তিনি কয়েকটি উমরাও করেছেন। তার সাথে অনেক মানুষ উমরা করেছে। তাই তাওয়াফের জন্য ওযু থাকা যদি ফরয হত তাহলে তিনি সাধারণভাবে সেটা বর্ণনা করতেন। আর তিনি যদি বর্ণনা করতেন তাহলে মুসলমানেরা তার থেকে সেটা বর্ণনা করতেন; অবহেলা করতেন না। কিন্তু, সহিহ হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি যখন তাওয়াফ করেছেন তখন তিনি ওযু করেছেন। শুধু এ দলিলঃ ওয়াজিব হওয়ার নির্দেশনা দেয় না। কারণ তিনি প্রত্যেক নামাযের জন্য তাওয়াফ করতেন। তিনি আরও বলেছেন: “আমি পবিত্র না হয়ে আল্লাহ্‌র যিকির করা অপছন্দ করেছি…”[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/২৭৩)]

এই অভিমতটি অর্থাৎ ‘তাওয়াফের জন্য পবিত্রতার শর্ত না করা’ মজবুত হওয়া সত্ত্বেও এবং দলিলঃ-প্রমাণে সে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কোন মানুষের পবিত্রতা ছাড়া তাওয়াফ করা উচিত নয়। কেননা পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা উত্তম, অধিক সতর্কতাপূর্ণ ও দায়মুক্তির অধিক উপযুক্ত এতে কোন সন্দেহ নেই। এর উপর আমল করার মাধ্যমে ব্যক্তি জমহুর আলেমের অভিমতের বিপরীত আমল করা থেকে নিরাপদে থাকবে।

তবে, ওযু রক্ষা করতে গিয়ে তীব্র কষ্ট-ক্লেশের মুখোমুখি হলে মানুষ এ অভিমতের উপর আমল করতে পারে; যে পরিস্থিতি মওসুমগুলোতে তৈরী হয়ে থাকে। কিংবা ব্যক্তি যদি অসুস্থ হয় নতুবা বয়োবৃদ্ধ হয় যাতে করে প্রচণ্ড ভীড়, তীব্র ঢেলাঠেলি ইত্যাদি কারণে ওযু রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়।

শাইখ বিন উছাইমীন (রহঃ) জমহুর আলেমের দলিলঃগুলোর জবাব দেয়ার পর বলেন, পূর্ব আলোচনার ভিত্তিতে বলতে পারি, যে অভিমতের প্রতি হৃদয় প্রশান্ত হচ্ছে সে অভিমতটি হচ্ছে: তাওয়াফের জন্য লঘু অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়া শর্ত নয়। তবে, কোন সন্দেহ নাই যে, পবিত্র হয়ে তাওয়াফ করা উত্তম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের দিক থেকে অধিক পরিপূর্ণ। এক্ষেত্রে জমহুর আলেমের বিরুদ্ধে গিয়ে এটি লঙ্ঘন করা উচিত নয়। কিন্তু, কখনও কখনও ব্যক্তি শাইখুল ইসলামের মনোনীত অভিমতটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। যেমন- তীব্র ভীড়ের মধ্যে কেউ যদি অপবিত্র হয়, সেক্ষেত্রে যদি বলা হয় যে, বের হয়ে ওযু করে আসা তার উপর আবশ্যক এবং বিশেষতঃ তার যদি কয়েকটি চক্কর বাকী থাকে- এতে তীব্র কষ্ট রয়েছে। আর যাতে তীব্র কষ্ট রয়েছে এবং দলিলঃ যদি সুস্পষ্ট না হয় সেক্ষেত্রে মানুষকে এমন অভিমতের উপর আমলে বাধ্য করা উচিত নয়। বরং আমরা সহজ্জটির উপর আমল করব। কেননা দলিলঃ ছাড়া কষ্টকর অভিমতের উপর মানুষকে আমল করতে বাধ্য করা আল্লাহ্‌র বাণী “আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ্জ করতে চান; কঠিন করতে চান না” এর খিলাফ।[সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১৮৫; আল-শারহুল মুমতি (৭/৩০০)]

২। তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করাঃ

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হারামের নিকটবর্তী স্থানে পৌছলে তালবিয়া পাঠ বন্ধকরে দিতেন। অত:পর যী-তুয়া নামক স্থানে রাত যাপন করতেন। এরপর সেখানে ফজরের সালাত আদায় করতেন ও গোসল করতেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করতেন। (সহিহ বুখারি ১৫৭৩) 

তাওয়াফের বিস্তারিত বিবরণে দেখেসি, ‘হাজারে আসওয়াদ (কাল পাথরের) কাছে গিয়ে, বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার বলে পাথরকে চুমু দিয়ে তাওয়াফ কার্য শুরু করতে হবে। কাবাঘরকে বামপাশে রেখে তাওয়াফ করতে হয়।

মন্তব্যঃ সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, হারামের নিকটবর্তী স্থানে পৌছলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তালবিয়া পাঠ বন্ধকরে দিতেন। তাওয়াফের সময় তিনি দোয়া ও জিকিরে ব্যস্ত থাকতেন।  তাই সুন্নাহের দাবি হলে, তাওয়াফের শুরু তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দিতে হবে।

কাবায় ঢুকেই হাজারে আসওয়াদের নিকট আসাঃ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনাহ্ হতে (হজ্জ্জ ও ‘উমরা পালনের জন্য) মাক্কায় প্রবেশ করে হাজারে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হলেন, একে চুমু খেলেন। তারপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলেন, এরপর সাফা পাহাড়ের দিকে এলেন এবং এর উপর উঠলেন যাতে বায়তুল্লাহ দেখতে পান। তারপর দু’ হাত উঠালেন এবং উদারমনে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ করতে লাগলেন। (আবু দাউদ ১৮৭২, মিসকাত ২৫৭৫)

সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করাঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মক্কায় উপনীত হয়ে তাওয়াফের শুরুতে হাজ্‌রে আসওয়াদ ইসতিলাম (চুম্বন, স্পর্শ) করতে এবং সাত চক্করের মধ্যে প্রথম তিন চক্করে রামল করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৬০৩)

২. আসলাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উমর ইব্‌নু খাত্তাব (রাঃ) কে হাজ্‌রে আসওয়াদ চুম্বন করতে দেখেছি। আর তিনি বললেন, যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তাহলে আমিও তোমায় চুম্বন করতাম না। (সহিহ বুখারি ১৬১০)

৩. সালিম (রহঃ) থেকে। তার পিতা তাকে বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছেন যে, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হাজারে আসওয়াদে চুম্বন করে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি নিশ্চিত জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র। আমি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখতাম তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। অনুরূপ একটি হাদীস যায়দ ইবনু আসলাম থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ মুসলিম ২৯৩৭ ইফাঃ)

৪. আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মাদীনাহ থেকে) আগমন করে মক্কায় প্রবেশ করলেন, এরপর ‘হাজরে আসওয়াদের’ নিকটবর্তী হয়ে তাতে চুমু খেলেন এবং বায়তুল্লাহ তওয়াফ করলেন। অতঃপর সাফা পাহাড়ের চুড়ায় উঠলেন এবং সেখান থেকে বায়তুল্লাহ দৃষ্টিগোচর হলেই তিনি দুই হাত উত্তলোন করে যতক্ষন ইচ্ছে মহান আল্লাহর যিকির করলেন এবং দু’আ করলেন। আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, এ সময় সিঁড়ির পাথর তার নীচে ছিলো। হাশিম (রহঃ) বলেন, সেখানে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ইচ্ছেমত দু’আ করেন। (আবু দাউদ ১৮৭২)

চুম্বন সম্বব না হলে ইশারায় চুম্বর করাঃ

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইঙ্গিত করতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১২)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩২)

বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করাঃ

হাজারে আসওয়াদের দিকে অগ্রসর হয়ে ডান হাত দিয়ে আপনি তা স্পর্শ করে এতে চুম্বন করবেন। যদি হাত দিয়ে পাথরটিকে স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেদিকে ফিরে ডান হাত দিয়ে ইশারা করবেন। তবে হাতে চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় বলবেন ‘‘আল্লাহু আকবার। (সহিহ বুখারি)

বায়হাকীর এক বর্ণায় সহিহ সনদে ইবনে উমার থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তাওয়াফের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বলা উত্তম। (বায়হাকী ৫/৭৯ এবং আত-তালখীসুল হাবীর ২/২৪৭ হাফেজ ইবনে হাজার, সনদ সহিহ)

তাওয়াফের সময় দোয়া করাঃ

১. আবদুল্লাহ্ ইবনুস সায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’ রুকনের মাঝখানে বলতে শুনেছিঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯০ ইফাঃ)

ইযতিবা করাঃ

ইফরাদ হজ্জকারী বাইতুল্লাহ এসে প্রথম একটি তাওয়াফ করে এবং কেরান হজ্জকারী ও তামাত্তু হজ্জকারী উমরার উদ্দেশ্যে যে তাওয়াফ করে থাকেন তাকে তাওয়াফে কুদুম বা আগমনি তাওয়াফ বলে। এই তাওয়াফের সময় রমল করা হয়। এই রমল করা সময়  পুরুষেরা ইহরামের গায়ের কাপড়টির একমাথা ডান বগলের নীচ দিয়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে দেয়, যাতে ডান কাঁধ, বাহু ও হাত খোলা থাকে। কাপড়ের বাকী অংশ ও উভয় মাথা দিয়ে বাম কাঁধ ও বাহু ঢেকে তাওয়াফ করবে। এই নিয়মটাকে আরবীতেও ইযতিবা বলা হয়। এটা করা সুন্নাত।

সুনানে তিরমিজিতে হাসান সদনে একটি হাদিসে এসেছেঃ

১. ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একটি চাদরের মধ্যভাগ ডান বগলের নীচে দিয়ে এবং তার দুই প্রান্ত বাম কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো (ইযতিবা) অবস্থায় (বাহু খোলা রেখে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্ তাওয়াফ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৫৯, আবু দাউদ ১৮৮৩ ইফাঃ)

২. ইয়ালা ইবনে উমাইয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ডান কাঁধ খোলা রেখে এবং বাম কাঁধের উপর চাদরের উভয় কোণ একত্রে লটকিয়ে তাওয়াফ করেন। কাবীসা (রাঃ) তার বর্ণনায় বলেন, তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর। (সুনানে ইবনে মাজা ২৯৫৪)

প্রথম তিন চক্করে রমল করাঃ

রামল শুরু হয় সপ্তম হিজরীতে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ষষ্ঠ ‘হিজরীতে হুদায়বিয়া থেকে ফিরে যান উমরা আদায় না করেই। হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী বছর তিনি ফিরে আসেন উমরা পালনের উদ্দেশ্যে। সময়টি ছিল যিলকদ মাস। সাহাবাদের কেউ কেউ জ্বরাক্রান্ত হয়েছিলেন। তাই মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদেরকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল, ‘এমন এক সম্প্রদায় তোমাদের কাছে আসছে ইয়াছরিবের (মদিনার) জ্বর যাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবাদেরকে (রাঃ) রামল অর্থাৎ আমাদের যুগের সামরিক বাহিনীর কায়দায় ছোট ছোট কদমে গা হেলিয়ে বুক টান করে দৌড়াতে বললেন। উদ্দেশ্য, মুমিন কখনো দুর্বল হয় না এ কথা মুশরিকদেরকে বুঝিয়ে দেয়া। একই উদ্দেশ্যে রামলের সাথে সাথে ইযতিবা অর্থাৎ চাদর ডান বগলের নীচে রেখে ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখারও নির্দেশ করলেন তিনি। সেই থেকে রমল ও ইযতিবার বিধান চালু হয়েছে।

এই কথার দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কা্ আগমন করলে মুশরিকরা মন্তব্য করল, এমন একদল লোক আসছে যাদেরকে ইয়াসরিব-এর (মাদ্বীনার) জ্বর দুর্বল করে দিয়েছে (এ কথা শুনে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রামল’ করতে (উভয় কাঁধ হেলে দুলে জোর কদমে চলতে) এবং উভয় রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটুকু স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবীদের প্রতি দয়াবশত সব ক’টি চক্করে রামল করতে আদেশ করেননি। (সহিহ বুখারি ১৬০২)

বনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ শরীফ প্রথমবারের তাওয়াফে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে তাওয়াফ করতেন। তিনি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈর সময় (বাতনুল মাসীল) মধ্যবর্তী স্থানে দৌড়াতেন। ইবনু উমর (রাঃ)-ও তাই করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৮)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় তিন চক্করে রামল করেতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা’ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৭

সেই সপ্তম হিজরী থেকে রমল করা শুরু হয়ে আজও এইকাজ সুন্নাহ হিসাবে পরিগনিত হয়ে আসছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় সাহাবী রাদুয়াল্লাহু আনহুগন ও এই আমল ছাড়েন নাই।

দলিলঃ আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ ‘উমর ইব্‌নু খাত্তাব (রাঃ) হাজ্‌রে আসওয়াদকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে! আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিতরূপে জানি তুমি একটি পাথর, তুমি কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ করতে পার না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তোমায় চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না। এরপর তিনি চুম্বন করলেন। পরে বললেন, আমাদের রামল করার উদ্দেশ্য কী ছিল? আমরা তো রামল করে মুশরিকদেরকে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করেছিলাম। আল্লাহ এখন তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। এরপর বললেন, যেহেতু এই (রামল) কাজটি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছেন, তাই তা পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না। (সহিহ বুখারি ১৬০৫)

১০বাকী চার চক্কর সাধারণ গতিতে আদায় করা

১. ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মক্কায় পৌছে হাজ্জ (হজ্জ) ও উমরার জন্য বায়তুল্লাহর যে তাওয়াফ করতেন, তাতে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে সম্পন্ন করতেন। তাপর দু’রাকাআত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৯)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাজরে আসওয়াদ হতে শুরু করে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন বার দ্রুত পদক্ষেপে তাওয়াফ করেন এবং ধীর পদক্ষেপে চারবার তাওয়াফ করেন। (তিরমিজি ৮৫৭)

১১প্রতি চক্করেই রোকনে ইয়ামীনি স্পর্ম করাঃ

রুকনে ইয়ামানী এটি কাবাঘরের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এটি ইয়ামান দেশের দিকে হওয়াতে একে রুকনে ইয়ামানী বলা হয়েছে থাকে। কাবা ঘরের এই অংশে কখনো  চুম্বন  করবেন না, তবে স্পর্শ করা মুস্তাহাব। মনে রাখতে হবে শুধু হাজরে আসওয়াদ পাথটি চুম্বন করব আর রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করব।  যা সহহি হাদিস দ্বারা প্রমানিত। ইহা ছাড়া অন্য কোন স্থান ষ্পর্শ বা চুম্বন কোন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয়। যা হয় শুধুই আবেগের ফল। বিষয়টি বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দেই।

১. একবার হযরত মু‘আবিয়া ও ইবনু আববাস (রাঃ) একত্রে ত্বাওয়াফরত অবস্থায় মু‘আবিয়া (রাঃ) কাবাগৃহের সবগুলি রুকন (চারটি কোণ) স্পর্শ করলে ইবনু আববাস (রাঃ) তার প্রতিবাদ করে বলেন, কেন আপনি এ দু’টি রুকন স্পর্শ করছেন? অথচ রাসূল (ছাঃ) এ দু’টি স্পর্শ করেননি। জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বলেন, কা‘বাগৃহের কোন অংশই পরিত্যাগ করার নয়। তখন ইবনু আববাস আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে’ (আহযাব ২১) জবাবে মু‘আবিয়া (রাঃ) বললেন, আপনি সত্য বলেছেন’। (ত্বাবারাণী আওসাত্ব ২৩২৩, আহমাদ ৩৫৩২ হাদিসে সনদ সহহি)

২. আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়দ ইবন উমায়ার (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললো: হে আবু আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এই দু স্তম্ভ (দু’রুকনে ইয়ামানী) ব্যতীত অন্য কোন স্তম্ভ চুম্বন করতে দেখি না। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ এদের স্পর্শ করা গুনাহ দূর করে দেয় এবং তাঁকে এও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সাতবার তাওয়াফ করে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সাওয়াব পাবে। (সুনানে নাসাঈ ২৯২২ হাদিসের মান সহিহ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সুন্নত হচ্ছে, এটিকে চুমু না দিয়ে শুধু স্পর্শ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে এ রুকনটিতে স্পর্শ করতেন।

১. আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল ইয়ামানী রুকন দু’টিই স্পর্শ করতে দেখেছি। (সহিহ মুসলিম ২৯১৩)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দুই ইয়ামানী রুকন ব্যতীত বায়তুল্লাহর অন্য কিছু স্পর্শ করতে দেখিনি।  (সহিহ মুসলিম ২৯৫১)

৩. উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমর (রাঃ)-কে বললেন, হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখি, যা আপনার অন্য কোন সঙ্গীকে করতে দেখিনা। তিনি বললেন, ‘ইবনু জুরায়জ, সেগুলো কি?’ তিনি বললেন, আমি দেখি, (১) আপনি তাওয়াফ করার সময় রুকনে ইয়ামানী দু’টি ব্যতীত অন্য রুকন স্পর্শ করেন না। (২) আপনি ‘সিবতী’ (পশমবিহীন) চপ্পল পরিধান করেন; (৩) আপনি (কাপড়ে) হলুদ রং ব্যবহার করেন এবং (৪) আপনি যখন মক্কায় থাকেন লোকে চাঁদ দেখে ইহরাম বাঁধে; কিন্তু আপনি তারবিয়ার দিন (৮ ই যিলহাজ্জ) না এলে ইহরাম বাঁধেন না।

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেনঃ রুকনের কথা যা বলেছ, তা এজন্য করি যে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইয়ামানী রুকনদ্বয় ছাড়া আর কোনটি স্পর্শ করতে দেখিনি। আর ‘সিবতী’ চপ্পল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পশমবিহীন চপ্পল পরতে এবং তা পরিহিত অবস্থায় অজু করতে দেখেছি, তাই আমি তা করতে ভালবাসি। আর হলুদ রং, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা দিয়ে কাপড় রঙিন করতে দেখেছি, তাই আমিও তা দিয়ে রঙিন করতে ভালবাসি। আর ইহরাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে তাঁর সওয়ারি রওনা না হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ইহরাম বাঁধতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি ১৬৭ ইফাঃ)

১২প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা ইশারা দ্বারা চুম্বন করাঃ

১. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার ইঙ্গিত করতেন এবং তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি  ১৬১৩)

২. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটের পিঠে (আরোহণ করে) বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজ্‌রে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছু দিয়ে তার প্রতি ইঙ্গিত করতেন। (সহিহ বুখারি  ১৬১২)

মন্তব্যঃ বর্তমান ভীড়ের কারনে প্রতি চক্করতো দুরের কথা, পুরা সফরেই একবার চুম্বন করা সম্বব নয়। আর মহিলাদেরতো হজ্জের মৌসুমে চুম্বন করার প্রশ্নই আসে না। যা হোক সরাসরি চুম্বন করা আর ইশারায় চুম্বর করার মাঝে তেমন পার্থক্য নাই কেননা, আমলটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি প্রমানিত যে, তিনি প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ ইশারা দ্বারা চুম্বন করেছেন।

১৩। প্রতি চক্করে তাকদির দেয়াঃ

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬৩২)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের উপর সওয়ার অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন। হাজারে আসওয়াদের কাছে পৌঁছেই নিজের হাতের কোন জিনিস (লাঠি) দিয়ে ইশারা করতেন এবং (আল্লা-হু আকবার) তাকবীর দিয়েছেন। (মিসকাত ২৫৭০)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম উটের পিঠে সওয়ার হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনই তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখন তাঁর হাতের বস্তু (লাঠি) দিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করতেন ও তাকবীর বলতেন। (সহিহ বুখাই ১৬০৭)

১৪পায়ে হেঁটে বা বাহনে চড়ে তাওয়াফ করাঃ

১. সাফিয়্যাহ বিনতু শাইবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপদ হওয়ার পর তাঁর উটে সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন এবং তাঁর হাতের লাঠির সাহায্যে (ইশারায়) হাজরে আসওয়াদে চুমু দিলেন। সাফিয়্যাহ বলেন, আমি এ দৃশ্য তাকিয়ে দেখেছিলাম। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৭৮)

২. আবুত তুফাইল (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর সাওয়ারীতে চড়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে দেখেছি। তিনি তাঁর লাঠির সাহায্যে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার পর তাতে চুমু দিয়েছেন। মুহাম্মাদ ইবনু রাফি‘র বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তিনি সাফা ও মারওয়ায় যান এবং স্বীয় বাহনে আরোহিত অবস্থায়ই সাত বার তাওয়াফ (সাঈ) করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৭৯)

মন্তব্যঃ এখন ভীরের কারনে বাহনে চড়ে তাওয়াফ করার আর প্রশ্ন উঠে না। তবে যারা অসুস্থ, বৃদ্ধ, মাজুর, মহিলা, শিশু ইত্যাদি লোক জন তাদের উপরের কারনে হুইল চেয়ারে করে কাবা তাওয়াফ করতে পারেন।

১৫তাওয়াফের মাঝে দোয়া ও জিকির করাঃ

তাওয়াফরত অবস্থায় খুব বেশী বেশী জিকির, দোয়া ও তাওবা করতে থাকবেন। কুরআন তিলাওয়াতও করা যায়। কিছু কিছু বইতে আছে প্রথম চক্রের দোয়া, ২য় চক্রের দোয়া ইত্যাদি। কুরআন হাদীসে এ ধরনের চক্রভিত্তিক দোয়ার কোন ভিত্তি নাই।

১. তাওয়াফের করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নীচের দোয়াটি পড়তেন। দোয়াটি হলঃ

**اَللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيْقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مَحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم**-

অর্থঃ হে আল্লাহ! তোমার প্রতি ঈমান এনে, তোমার কিতাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য তোমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে এ তাওয়াফ কার্যটি করছি।

২. এর পর মাকামে ইব্রাহীমের নিকট পড়েছেন,

*وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى*

অর্থঃ আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। ( সুরা বাকারা ২:১২৫)

৩. ইয়ামানীর পাশে এসে পৌঁছলে ভীড় না হলে এ কোণকে ডান হাত দিয়ে ষ্পর্শ করার চেষ্টা করা। কিন্তু সাবধান, এ রুকনে ইয়ামেনীকে চুমু দেবেন না, এর পাশে এসে হাত উঠিয়ে ইশারাও করবেন না এবং সেখানে ‘আল্লাহু আকবার’ও বলবেন না। ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন হাজরে আসওয়াদে পৌঁছে। রুকনে ইয়ামেনী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নিম্নের এ দোয়াটি পড়া মুস্তাহাবঃ

**رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ**

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে তুমি দুনিয়ায় সুখ দাও, আখেরাতেও আমাদেরকে সুখী কর এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। (সুরা বাকারা ২:২০১)

৪. উপরের দোয়াটি পড়তে পড়তেই আপনি রুকনে ইয়ামেনী থেকে হাজরে আসওয়াদে চলে এসেছেন। আপন এবার নতুন তাওয়াফ চক্কর শুরু করছেন। তাওয়াফের প্রত্যেক চক্রেই হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা ষ্পর্শ করা উত্তম। কিন্তু হজ্জের মৌসুমে প্রচন্ড ভীড়ের কারণে এটি খুবই দূরূহ কাজ। সেক্ষেত্রে প্রতি চক্রেই হাজরে আসওয়াদের পাশে এসে এর দিকে মুখ করে ডান হাত উঠিয়ে ইশারা করবেন। ইশারাকৃত এ হাত চুম্বন করবেন না। ইশারা করার সময় একবার বলবেন (بسم الله الله أكبر ) ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’।

১৬তাওয়াফের মাঝে জরুরী কথা বলা ও কাজ করা যায়ঃ

তাওয়াফ মহান আল্লাহর জন্য খাসভাবে নিবেদীত একটি ইবাদাত। ইবাদতের সময় আজে বাদে কথা ও কাজ থেকে দুরে থাকা ইমানের দাবি। কাজেই তাওয়াফ করার সময় কোন প্রকার ফাহেসা করা ও কাজ না করা ভাল। তবে প্রয়োজন সাথীদের সাথে কথা বলেলে তাওয়াফ ভঙ্গ হয় না। আবার এমন জরুরী কাজ যা না করলে তাওয়াফ ব্যাহত হয়। সে সকল কাজ তাওয়াফের মাঝে করা যায়। এমনকি সালাতের ইকামত হলে তাওয়াফ স্থগিত রেখে জামাতে অংশগ্রহন করতে হয়। সালাত শেষে বাকি তাওয়াফ করতে হয়।

দলিলঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করা সালাত আদায় করার মতই। তবে সালাতে তোমরা কথা বলতে পার না কিন্তু এতে কথা বলতে পার। সুতরাং এ সময় ভাল কথা ছাড়া কিছূ বলবে না। (সুনানে তিরমিজি ৯৬৩ ইফাঃ)

২. তাওয়াফ করার সময় কথাবার্তা বলাঃ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সময় এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, সে চামড়ার ফিতা বা সূতা অথবা অন্য কিছু দ্বারা আপন হাত অপর এক ব্যক্তির সাথে বেঁধে দিয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাঁর বাঁধন ছিন্ন করে দিয়ে বললেন, হাত ধরে টেনে নাও। (সহিহ বুখারি ১৬২০)

৩. ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বায়তুল্লাহর তাওয়াফও সালাতই, তবে তাওয়াফের মধ্যে কথা বলা আল্লাহ হালাল করেছেন (যা সালাতে হারাম)। ফলে যে ব্যক্তি এতে (তাওয়াফের মধ্যে) কথা বলবে, সে যেন কল্যাণকর কথা ব্যতীত অন্য কোনো কথা না বলে। (সুনানে আদ দামেরী ১৮৮৪)

১৭তাওয়াফ শেষ করে জমজমের পানি পান করা

 যমযমের পানি পান করতে যাওয়া মুস্তাহাব। পান শেষে যমযমের কিছু পানি মাথার উপর ঢেলে দেয়া সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন।

১. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৪)

২. ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে যমযমের পানি পান করিয়েছি। তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় তা পান করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৪)

তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

তাওয়াফের ভুল আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমারা আগেই জেনেছি হজ্জের তিনটি ফরজ আছে তার মধ্যে তাওয়াফ অন্যতম। তাওয়াফকে সহিহ শুদ্ধভাবে আদায় করতে হলে এই বিষয়টি সম্পর্কে ভাল করে জ্ঞান অর্জণ করতে হবে। তাওয়াফে এমন কাজ আছে যা আদায় না করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। যার ফলে হজ্জের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কাজগুলোই তাওয়াফের জন্য ওয়াজিব। আবার এমন অনেক কাজ আছে যা আদায় না করলেও তাওয়াফ আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সহিহ সুন্নাহ তোমাবেক আদায় হবে না। এমন কাজগুলো হলো, তাওয়াফের সুন্নত বা মুস্তাহাব। আবার অনেকে তাওয়াফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকের কারনে অনেক ভুল করে থাকেন। যার ফলে কখনো ওয়াজিব ভঙ্গ হয় আবার কখনও সুন্নাহ ভঙ্গ হয়, এই কার্যাবলীতে তাওয়কফের ভুলত্রুটি বলে উল্লেখ করে আলোচনা করা হলো। এ পর্যায়ে তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহ আলোচনা করা হলোঃ

তাওয়াফের ভুলত্রুটিসমূহঃ

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মনে করা

২। ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

৩। প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়া

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করা

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়া

৭। সাত চক্করেই তাওয়াফে রমল করা

৮। অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা

৯। মহিলাদের রমল

১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করা

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করা

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করা

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়

১৪। তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করা

১৫। মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

১৬। বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

১৭। বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করা

১৮। নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১। তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করাঃ

পূর্বে উল্লেখিত বহু হাদিস দ্বারা এ কথা প্রমানিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বা ইশারার সাহায্য চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করছেন। তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মুলত একটি সুন্নাহ আমল। এই আমলটিকে জ্ঞানের সল্পতার কারনে বা না জানার কারনে অনেক ওয়াজিব মনে করে থাকে। যারা ওয়াজিব মনে করে তারা মনে করে,হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা না করলে মনে হয় তাওয়াফে শুদ্ধ হবে না।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা একটি সুন্নাহ। তাই কোন ব্যক্তি যদি হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন না করে বা ভিড়ের কারনে করতে না  পারে তবে তার তাওয়াফের কোন ক্ষতি হবে না। তাই তাওয়াফে শুদ্ধ হওয়া জন্য হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা জরুরী মনে করা এতটি ভুল ধারনা মাত্র।

ভুল পদ্ধতিতে ইযতিবা করাঃ

ইযতিবা অর্থ চাদরের দু’প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর রেখে দিয়ে ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখা। ইযতিবা করতে হয় তাওয়াফ করার সময়। সুনানে তিরমিজিতে হাসান সদনে একটি হাদিসে এসেছেঃ

ইয়ালা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একটি চাদরের মধ্যভাগ ডান বগলের নীচে দিয়ে এবং তার দুই প্রান্ত বাম কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো (ইযতিবা) অবস্থায় (বাহু খোলা রেখে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহ্ তাওয়াফ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৫৯, আবু দাউদ ১৮৮৩ ইফাঃ)

কেউ কেউ ইহরাম বাধার নিয়ত করার পর থেকে ইযতিবা করে থাকেন। অনেক হজ্জযাত্রী ইহরামের শুরু থেকে হালাল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি করে থাকেন। আবার কেউ কেউ তাওয়াফ শেষে ইযতিবা অবস্থাতেই দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা। অনেক আবার সাফা মারওয়ায় সাঈ করার সময় করে থাকে। এভাবে ইযতিবা করা একটি ভুল পদ্ধতি। ইযতিবা শুধুমাত্র তাওয়াফে কুদুমের মধ্যে করতে হয়, যেমনটি হাদিসে এসেছে। সাঈয়ের মধ্যেও বা তাওয়াফের আগে করা যাবে না।

মন্তব্যঃ তামাত্তু ও কেরান হজ্জের ফরজ তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা নাই। ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীদের ফরজ হজ্জের সময় তাওয়াফে রামল বা ইযতিবা করতে হয়। তাওয়াফের সময় পুরুষের জন্য রামল ইযতিবা করেত হলেও নারীদের রামল ইযতিবা করতে হয় না।

    প্রত্যেক তাওয়াফ নির্দিষ্ট দোয়াঃ

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ (٢٩)

অর্থঃ তারপর নিজেদের ময়লা দূর করে, নিজেদের মানত পূর্ণ করে এবং প্রাচীন গৃহের তাওয়াফ করে(সুরা হজ্জ ২২:২৯)

কাবা ঘরের তাওয়াফ একটি ফরজ ইবাদাত। এই ইবাদতে আদায়ের যথাযত পদ্দতি কুরআন সুন্নাহ দ্বারা ষ্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজে আমল করে রেখে গেছেন। তাওয়াফের কোথায় কি দোয়া আমল করতে হবে তাও সহিহ হাদিসে বিবৃত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন বইতে দেখা যায় প্রতি তাওয়াফে আলাদা আলাদ দোয়ার কথা লেখা আছে।

অনেক খুব কষ্ট করে এই আবরী দোয়া মুখস্ত করে হজ্জে গমন করেন। দোয়া কষ্ট করে মুখস্ত করলেও তার অর্থ কিন্তু অজানা থেকে যায়। এই দোয়াগুলো অর্থের দিক থেকে ভাল। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও এই ধরনের আমল করেন নাই।

মূলত নতুনভাবে আবিষ্কৃত, বেদাত। তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। তবে তাওয়াফের এই পুরো সময়টুকু দোয়া কবুলের সময়। তাই যেকোনো ধরনের দোয়া এই সময় আপনি করতে পারেন। সবচেয়ে উত্তম দোয়া হচ্ছে, যেটি আপনার অন্তরের মধ্যে এসেছে, আপনি আপনার ভাষায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পেশ করলেন। এটা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম দোয়া।

দোয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে দুটি। প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে চাইতে হবে। অর্থাৎ চাওয়াটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে হতে হবে। দ্বিতীয় হচ্ছে, কী চাইছেন, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। আপনি দোয়া করলেন, কিন্তু আপনি সেটা বুঝলেন না। তাহলে তো আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে চাইতে পারেননি। এ জন্য আরবিতে কতগুলো দোয়া লিখে নিয়ে গেলেন, আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে বললেন। অথচ আপনি জানলেনই না আপনি কী বললেন। এটা আসলে ভুল কাজ। তবে রাসূল (সা.) যে দোয়াগুলো শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো যদি কেউ জানেন, সেটাও উত্তম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জিনিসটা বুঝতে হবে যে আপনি আল্লাহতায়ালার কাছে কী চাইলেন।

তাই যাঁদের কাছে আরবি ভাষার জ্ঞান নেই অথবা যাঁরা মূলত আরবি বুঝতে পারেন না, উত্তম হচ্ছে, তাঁরা বাংলায় অথবা তাঁদের মাতৃভাষায় দোয়া করবেন। কারণ, তিনি সেটা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। আপনি যখন জিনিসটা বুঝবেন, তখন আবেগ তৈরি হবে, সেখানে একটু আবেগ আসবে। এই জন্য সেই আবেগের সঙ্গে অত্যন্ত মিনতির সঙ্গে যদি আল্লাহতায়ালার কাছে সেটা তুলে ধরেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আল্লাহর বান্দার সেই দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।  

৪। জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করাঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি। ইন্দুনেশীয়ার অনেক মুসলীম ভাই বোনেরা জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করেন। তাদের সকলের মাথায় এক রকমের রুমাল বা স্ক্রাপ পড়া। আমার ধারনা  তারা হয়ত একে অপর থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে এ কাজটি করে থাকেন। আসলে তাদের উদ্দেশ্য হল জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করা। তাদের জামাতের কেউ দল ছুট হয়ে গেলে, মাথার রুমালের কালার দেখে তাড়াতাড়ি মাতাফে তাদের অবস্থান বুঝতে পাবরে এবং আবার জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করতে পারবে। দলের সাথে একত্র হওয়ার জন্য দল ছুট ব্যাক্তি মাতাফে এলোমোলো চলাচল করে ফলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।  অপর পক্ষে জামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার ফলে মাতাফে ভিড় সৃষ্টি হয়। অন্যদের ওপর অস্বাভাবিক চলাচলে চাপ পড়ে। এতে অন্যদের ভীষণ কষ্ট হয়। অপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা খারাপ। সার কথা হলোঃ  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম এমনটি করেননি। উলামায়ে কিরাম এটিকে বিদআত বলেছেন। বিশুদ্ধ হলো একাকী নিজে নিজে তালবিয়াহ পাঠ করা। ।

৫। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করাঃ

জমামাতবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করার সময় দেখা যায় এরা জামাতবদ্ধ হয়ে মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করে থাকে। জামাতের মধ্যে একজন মুখস্থ বা দেখে দেখে উঁচু আওয়াজে দোয়া পড়ে আর তার সঙ্গে পুরো জামাত সমস্বরে দোয়া পড়তে থাকে। এই কাজটি পরিষ্কার বিদআত। এই ধরনের আমল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার সাহাবি রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। আমাদের পূর্বসুরি কোন মুজতাহীদ আলেম থেকেও প্রমানিত নয়। দোয়ার করার যে সহজ্জ সরল পদ্দতি আছে তার সাথে এর কোন মিল নাই। মাতাফে সম্মিলিত ও উচ্চস্বরে দোয়া করলে নিজে শুধু গদবাধা কথা মুখে উচ্চারণ করে। এতে নিজের চাহিদা মত দোয়া করা সম্ভব হয়ণা এবং উচ্চস্বরের জন্য অন্যদের একাগ্রতা বিঘ্নিত হয়। যার ফলে নিজের দোয়ার সাথে সাথে মাতাফে অবস্থানরত সকল হাজিদের দোয়া নষ্ট করছি। এই বিদআত ত্যাগ করা খুবই জররী। আশার কথা হল, আরবেদের মত আমাদের উপমহাদেশে হাজিগন এই বিদআত থেকে অনেকটিই মুক্ত।

৬। বই দেখে দেখে দোয়া পড়াঃ

হজ্জের সফরে দেখেছি অনকেভাই তাওয়াফ করার সময় এক থাকে বই রেখে দিয়ে বইয়ের দিক তাকিয়ে পড়ছেণ আর হাঁটছেন। দোয়ার দিকে, দোয়ার অর্থের দিকে, তাওয়াফের দিকে এমন কি পাশের লোকের দিকেও কোন খেয়ার নেই। এক দিকে শুধুই খেয়ার কিভাবে দোয়ার রিডিং পড়ে শেষ করবে। এতে কোন তাওয়াফের সময় তার কি ভাব হলে তা বলা কষ্টকর হলে ও এ কথা বলা যায় যে, তার মনযোগ পড়ার প্রতি থাকায় মাতাফে অন্যদের কষ্ট হয়। যদি সকলেই নিজে নিজে চলত এবং দেখে দেখে দোয়া না পড়ত, যা মুখস্থ আছে তা-ই পড়ত তাহলে মাতাফে হঠাৎ যে চাপ সৃষ্টি হয় তা হত না। সকলেই একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে নিমগ্ন থেকে দোয়া ও তাওয়াফ করতে পারত।

৭। পুরো তাওয়াফে রমল করাঃ

তাওয়াফের সময় মুজাহিদের মতো বীরদর্পে দুই কাঁধ দুলিয়ে দ্রুতপায়ে চলা। হজ্জের সফরে মক্কার মুশরিকরা সাহবিদের লক্ষ করে বলছিল, ইয়াসরিবের (মদিনার) আবহাওয়া মুসলমানদেরকে দুর্বল ও রুগ্ন করে ফেলেছে। মুশরিকদের এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নির্দেশ দেন। যেমন হাদিসে এসেছেঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে নিয়ে মক্কায় আগমন করলে মুশরিকরা মন্তব্য করল, এমন একদল লোক আসছে যাদেরকে ইয়াসরিব এর (মদিনার) জ্বর দুর্বল করে দিয়েছে (এ কথা শুনে) নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগনকে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করতে এবং উভয় রুকনের মধ্যবর্তী স্থানটুকু স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবাদের প্রতি দয়াবশত সব কয়টি চক্করে রমল করতে আদেশ করেন নি। (সহিহ বুখারী ১৫০৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ অতপর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং পরেও এ বিধান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। কিন্তু নফল তাওয়াফ অর্থাৎ হজ্জ ও ওমরার নিয়্যাতে নয়, বাইতুল্লায় নামাজের সময় বা আগে পরে তাওয়াফ করার সময় রমল বা ইযতিবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, অনেককে দেখা যায়, তাওয়াফের ৭ চক্করেই রমল করে থাকে। আবার কেউ কেউ নফল তাওয়াফেও রমল করে। মনে করে, রমল সকল তাওয়াফে এবং তাওয়াফের সব চক্করেই করতে হয়। অথচ এটি ভুল। রমল শুধু ওই তাওয়াফেই করতে হয়, যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে। আর এই তাওয়াফেরও সব চক্করে নয়, শুধু প্রথম তিন চক্করে।

অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করাঃ

রমল করা সুন্নত। মাতাফে কোনো কোনো সময় অস্বাভাবিক ভিড় হয়। বিশেষ করে হজের আগে দু-এক দিন এবং যিলহজের ১০-১১ তারিখে। তখন মাতাফে চলাই মুশকিল হয়। সামান্য নড়াচড়ার প্রভাব পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু আশ্চর্য হলো, ওই কঠিন ভিড়েও কাউকে কাউকে রমল করতে দেখা যায়। এতে নিজেরও প্রচুর কষ্ট হয়। বিশাল জনসমুদ্রকেও কষ্ট দেয়া হয়। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, রমলটা তাওয়াফের ফরজ অংশ। এজন্যই বুযুর্গগণ বলেন, ‘যথাযথ হজ্জ করতে হলে সামান্য ইলম যথেষ্ট নয়; বরং প্রচুর ইলম এবং তার সঙ্গে অনেক বেশি আকলের প্রয়োজন।’ রমল ছাড়াও তাওয়াফ আদায় হয়ে যায়। তাই প্রচন্ড ভিড়ে অন্যকে কষ্ট দিয়ে রমল করা যাবে না; বরং তখন স্বাভাবিকভাবে চলবে। চলতে চলতে কখনো সামান্য ফাঁকা পেলে এবং অন্যের কষ্ট না হলে স্বাভাবিক গতিতে রমলের চেষ্টা করবে। (সহিহ মুসলিম ৪১০)।

৯। মহিলাদের রমলঃ

রমল শুধু পুরুষের জন্য। এ বিধানটি মহিলাদের জন্য নয়। কিন্তু কখনো কখনো মহিলাদেরকেও তা করতে দেখা যায়। এটি ভুল। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদিস ১৩১১০)।

.১০। কাবার বিভিন্ন স্থানে চুম্বন বা ষ্পর্শ করাঃ

উবায়দ ইবনু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কে বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখছি- যা আপনার সঙ্গী-সাথীদের কাউকে করতে দেখিনি। তিনি বললেন, হে ইবনু জুরায়জ! সেগুলো কি কি? তিনি বললেন, আমি দেখেছি আপনি রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত আর কোন রুকন স্পর্শ করেন না। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি পশমবিহীন চামড়ার স্যাণ্ডেল পরিধান করেন। আমি আরও দেখেছি যে, আপনি হলুদ বর্ণ ব্যবহার করেন। আমি আরও লক্ষ্য করেছি যে, আপনি মক্কায় অবস্থানকালে (যিলহাজ্জ মাসের) আট তারিখে ইহরাম বাধেন। অথচ লোকেরা নতূন চাঁদ দেখার সাথে সাথে ইহরাম বাধে।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, রুকন সমূহের ব্যাপারে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে রুকনে হাজারে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী ছাড়া অন্য কোন রুকন স্পর্শ করতে দিতে দেখিনি। আর পশমবিহীন স্যাণ্ডেলের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পশমবিহীন চামড়ার স্যান্ডেল পরিধান করতে দেখেছি। তিনি তা পায়ে দিয়ে উযুও করতেন। আমিও তাই এ ধরনের স্যাণ্ডেল পছন্দ করি। হলুদ রঙ এর সম্পর্কে কথা হচ্ছে এই যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এই রং ব্যবহার করতে দেখেছি। অতএব আমিও এই রং পছন্দ করি। ইহরাম সম্পর্কে বলতে হয় যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তখনি তালবিয়া পাঠ করতে শুনেছি যখন তাঁর উট যাত্রা শুরু করেছে। (সহিহ মুসলিম ২৬৮৯ ইফঃ)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের পিঠে আরোহণ করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন, যখনি তিনি হজ্জরে আসওয়াদের কাছে আসতেন তখনই কোন কিছুর দ্বারা তার দিকে ইশারা করতেন এবং তাকবীর বলতেন। (সহহি বুখারী ১৫১৭ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আগেই জেনেছি, সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন বা স্পর্শ করা সুন্নত। পক্ষান্তরে সম্ভব না হলে কেবল ইশারা করাই সুন্নত। ঠিক তেমনিভাবে সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা সুন্নাহ। কিন্তু অনেকে এই সুন্নাহ বাদ দিয়ে হাজরে আসওয়াদ মতই রুকনে ইয়ামেনিকে চুম্বন করে থাকে। এটা ঠিক নয়, বরং সম্ভব হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে ডান হাত দিয়ে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করা ও এবং স্পর্শের পর হাতে চুম্বন না করা। স্পর্শ করা সম্ভব না তাকে আর হাজরে আসওয়াদের মত হাতের ইশারায় চুম্বন করার কোন বিধান নেই। তাওয়াফের সময় কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সারকথাঃ সম্ভব হলে তাওয়াফ শুরুতে আসওয়াদ চুম্বন অথবা ইশারা করব। অপর পক্ষে প্রতি চক্করে রুকনে ইয়ামেনিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করব কিন্তু সম্বব না হলে,  চুম্বন বা ইশারা কোনটাই করব না। তাওয়াফের সময় অনেকেই মাকামে ইবরাহীমকে হাত অথবা রুমাল-টুপি দিয়ে স্পর্শ করে থাকে। আবার কেউ কেউ কাবার দেয়াল স্পর্শ করেন দাড়িয়ে থাকে। এগুলি আবেগী মনের ভাবনা মাত্র। এই সব কোন সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। এক জনের দেখা দেখি অন্য জন করছে। জরুরী মনে কের এই কাজগুলি বিদআত হবে এতে কোন প্রকার সন্দেহ নাই। কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাহাবী (রাঃ) কেউ হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামেনি ছাড়া আর কিছু স্পর্শ করেননি। তাই তা থেকে বিরত থাকতে হবে।

১১। কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করাঃ

অনেক আবেগী হাজিকে দেখা যায় কাবার দেয়াল ধরে কান্নাকাটি করছে। মহান আল্লাহ ভয়ে কান্নাকাটি করা নিঃসন্দেহ একটি উত্তম আমল। কিন্তু এই ভয়ের কান্না হবে গোপনে ও নিরবে। আর যে কোন কারনে এ কান্না প্রকাশ্যে হলেও দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের রাসুল ও তার সাহাবীগন এইভাবে কাবার দেয়ার ধরে কান্নাকাটি করেনি যেমন আমরা করছি। যদি কেউ ইহাকে ইবাদাত বা আল্লাহকে খুসি করার জন্য করে তবে বিদআত হবে। কাজেই এই ধরনের আবেগ থেকে দুরা থাকি। 

১২। তাওয়াফের সময় হাতিমে প্রবেশ করাঃ

তাওয়াফের সময় কেউ কেউ হাতীমের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। এরূপ করলে তাওয়াফ হবে না। কেননা হাতীম পবিত্র কাবার অংশ হিসেবে বিবেচিত। হাতিমের পুর্ব পাশ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে পশ্চিম পাশ দিয়ে বাহির হলে তো আর কাবা ঘর সম্পূর্ণ তাওয়াফ হবে না। এর হলে তার তাওয়াফ ছুটে যাবে। ফলে তাকে আবার তওয়াফ করতে হবে।

আবূস্‌ সাফর (রহঃ) বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে এ কথা বলতে শুনেছি, হে লোক সকল! আমি যা বলছি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর এবং তোমরা যা বলতে চাও আমাকে শোনাও এবং এমন যেন না হয় যে তোমরা এখান থেকে চলে গিয়ে বলবে ইবনু ‘আব্বাস এরূপ বলেছেন। (অতঃপর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন) যে ব্যাক্তি বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতে ইচ্ছা করে সে যেন হিজর এর বাহির থেকে তাওয়াফ করে এবং এ স্থানকে হাতীম বলবেনা কারণ, জাহেলীয়াতের যুগে কোন ব্যাক্তি ঐ জায়গাটিতে তার চাবুক, জুতা তীর ধনু ইত্যাদি নিক্ষেপ করে হলফ করত। (সহিহ বুখারী ৩৫৬৯ ইফাঃ)

১৩। তাওয়াফ শেষে কাবার যে কোন স্থানে দুরাকাত সালাত আদয়ঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى

অর্থঃ যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় উপনীত হয়ে সাত চক্করে (বায়তুল্লাহর) তাওয়াফ সম্পন্ন করে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর সাফার দিকে বেরিয়ে গেলেন। [ইবনু ‘উমর (রাঃ) বলেন] মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সহহি বুখারি ১৫২৮ ইফাঃ )

এ থেকে অনেকের ধারণা মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে। এই নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া মাসজিদের অন্য কোথাও তাওয়াফের দু’রাকা’আত সালাত আদায় করা যাবে না। এ ধারণাও সঠিক নয়। বরং মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায় করবে সম্ভব না হলে হারামের যে কোন স্থানে পড়ে নিবে। আর কারন বসত হারামের বাহিরেও আদায় করা যায়ঃ প্রমান নিম্মের হাদিসঃ

উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অসুস্থতার কথা জানালাম, অন্য সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনু হারব (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে প্রস্থান করার ইচ্ছা করলে উম্মু সালামা (রাঃ)-ও মক্কা ত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, অথচ তিনি (অসুস্থতার কারনে) তখনও বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে পারেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁকে বললেনঃ যখন ফজরের সালাতের ইকামত দেওয়া হবে আর লোকেরা সালাত আদায় করতে থাকবে, তখন তোমর উটে আরোহণ করে তুমি তাওয়াফ আদায় করে নিবে। তিনি তাই করলেন। এরপর (তাওয়াফের) সালাত আদায় করার পূর্বেই মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। (সহহি বুখারি ১৫২৭ ইফাঃ )

১৪ তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করাঃ

অনেকে ধারনা প্রতি চক্করে মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করতে হবে। সহিহ হাদিস সমুহে প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদকে ষ্পর্শ করার কথা প্রমানি হলেও কোন জাল বা যঈফ হাদিসেও তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করার কথা বলা হয় নাই। কাজেই যদি ইবাদত বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে তাওয়াফের সময় মাকামে ইবরাহীম ষ্পর্শ করে তবে তাজ কাজটি ইবাদাত না হয়ে বিদআত হবে। কোন কারন ছাড়া মাকামে ইবরাহীম নিকট গেলে বা ষ্পর্শ করলে কোন সমস্যা নাই। কিন্তু আমলের নিয়তে বা তাওয়াফের অংশ হিসাবে করা বা ভাবা যাবে না।

১৫ মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই সালাত আদায় করাঃ

তাওয়াফ শেষ করা পর দুই রাকাত সালাত আদায়কে অনেক ওয়াজিব বলেছেন। মুলত এই সালাত আদায় করা সু্ন্নাহ। মহান আল্লাহ বলেন,

* وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى *

অর্থঃ আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও। (সুরা বাকার  ২:১২৫)

এই আয়াতে আলোকে অনেকে ভাবেন তাওয়াফের এই দুই রাকাত সালাত মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। মাকামে ইবরাহীর পিছেন এই সালাত পড়লে কোন সমস্যা নাই। এই সালাত কাবা ঘরের যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। তবে যদি কেউ মনে করে যে, এই সালাত শুধু মাকমে ইব্রাহীমের পিছনেই আদায় করতে হবে। অন্য স্থানে পড়া যাবে না বা অন্য স্থানে পড়লে আদায় হবে না। তাদের এই ধারনা ভুল। এই সালাত যে কোন স্থানেই আদায় করা যায়। হজ্জের মৌসুমে প্রচুর ভীড় থাকে এই সময় মাকামে ইবরাহীমের পিছেন তাওয়াফ করাই কষ্টকর, সালাত আদায়তো অনেক দুরের কথা। তবে হ্যা, দিন রাতের কোন এক সময় ভাগ্যক্রমে ফাঁকা পাওয়া যেতে পারে। ফাঁকা পেলে এখানে সালাত আদায়ে সমস্যা নাই। কিন্তু দেখা যায়, প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে একজন দাড়িয়ে সালাত আদায় করছে। আর হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সালাতের যেহেতু কোন অতিরিক্ত ফজিলত নাই তাই ভীড় হলে এখানে সালাত আদায় না করাই উত্তম। 

১৬বিদায়ী তাওযাফের ভুলঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বিভিন্নভাবে প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “কেউই যেনপ্রত্যাবর্তন না করে যাবত না তার সর্বশেষ কাজ হবে শেষবারের মত বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। (সহহি মুসলীম ৩০৮৯ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, লোকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (প্রত্যাবর্তনকালে) তাদের সর্বশেষ কাজ যেন হয় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। কিন্তু ঋতুমতী মহিলাদেরকে তা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। (সহহি মুসলীম ৩০৯০ ইফাঃ )

মন্তব্যঃ বিদায়ী তাওয়াফই হল হজ্জ ও উমরার শেষ ওয়াজিব আমল। তাই বিদয়ী তাওয়াফের পর কোন শরীয়ত সম্মত কারণ বা যাত্রার ব্যস্ততা ব্যতীত বিনা প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করা। অনেক কঙ্কর নিক্ষেপের কাজ শেষ করার পূর্বেই বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করে। যা একটি ভুল কাজ।

১৭বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করাঃ

অনেক অজ্ঞ লোক কাবাকে বেশী সম্মান দিতে গিয়ে, বিদায়ী তাওয়াফের সময় উল্টোপায়ে হেটে কাবা চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই ধরনের কাজ ইসলমি শরীয়তের বিদআত হিসাবে অবিহীত করে। কেননা, এই সকল আমলের কোন দলিল নেই। মতগড়া ও ভিত্তিহীন আবেগের স্থান ইসলামে নেই। আমাদের দেশে মুলত বিদআতি কিছু মাজার পালগ ভক্ত এমন কাজ করে থাকে সুফীদের মাজারকে কেন্দ্র করে। তারা মাজার থেকে বাহির হওয়ার সময়  উল্টোপায়ে হেটে মাজার চত্ত্বর ত্যাগ করে। এই সকল বিদআতি মুসলিম সম্ববত এই বিদআতটি মাজার থেকে কাবায় নিয়ে গেছে। ইহার পাশাপাশি আবার অনেক কে দেখা যায়, বিদায়ী তাওয়াফের পর কাবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। তাদের এই আমলটিও একটি বিদাআতি আমল।

১৮নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরীঃ

কাবার একটি সাধারণ দৃশ্য হলো, নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করা। যুগ যুগ ধরে এমন আমল চলে আসছে। পুরুষের সঙ্গে নারীদের তাওয়াফ করা মুলত একটি বৈধ কাজ হিসাবে আলেমগন মত দিয়ছেন। কেননা, কাবার তাওয়াফকারীদের সংখ্যা এত বেশী যে, নারী পুরুষ আলাদা সময় বের করে তাওয়াফ করা সম্বব নয়। এই কারনে অনেক অজ্ঞ মুসলিম ধরনা করে থাকে, কাবায় নারী পূরুষ একত্রে তাওয়াফ করলেও পর্দা রক্ষা করা জরুরী নয়। তাদের এই ধারনা ভিত্তিহীন। নারী পুরুষের পর্দা করা সব সময়ের জন্য ফরজ। তাওয়াফের সময় পর্দা সিথীল নয়। তবে পরিস্থিতীর কারনে নারী পুরুষ একত্র তাওয়াফ করে। এই পরিস্থিতির কারনে একত্র তাওয়াফ করলেও তাকে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। এই জন্য নারীগন নিচের পরামর্শ গ্রহন করতে পারেন।

১. নারীকে হজ্জে গমনের সময় যেমন তার সফর সঙ্গী মাহরাম পুরুষ থাকতে হয়, তাওয়াফের সময়ও ঠিক তেমনি মাহরাম পুরুষ থাকতে হবে।

২. তাকে সব সময় ভীর এড়িয়ে কাবার একটু দুর দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। যাতে সরাসরি পুরুষের সাথে সংঘর্স না হয়।

৩. যখন ভীর কম থাকার সম্বাবনা তখন তাকে তাওয়াফের সময় বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে সকাল ১০ টা থেকে ১২ টার সময়। আরার রাত ১২ থেকে ফজরের আগ পর্যান্ত। এই সময় কাবার চত্বরে ভীর একটু কম থাকে।

৪. তাওয়াফের সময় পর পুরুষ পাশ কাটিয়ে চলতে হবে।

৫. মাহরম পুরুষ সাথীকে নারীর সামনে রেখে তাওয়াফ করা। প্রয়োজন বোধে নারী তার সাথীর কাঁধে হাত রেখে তাওয়াফ করবে।

দলিলঃ  

আত্বা (রহঃ) বলেছেন, ইব্‌নু হিশাম (রহঃ) যখন মহিলাদের পুরুষের সঙ্গে তাওয়াফ করতে নিষেধ করেন, তখন ‘আত্বা (রহঃ) তাঁকে বললেন, আপনি তাদের কী করে নিষেধ করেছেন, অথচ নবী সহধর্মিণীগন পুরুষদের সঙ্গে তাওয়াফ করেছেন? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, তা কি পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পরে, না পূর্বে? তিনি [আত্বা (রহঃ)] বললেন, হ্যাঁ আমার জীবনের কসম, আমি পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরের কথাই বলছি। আমি জানতে চাইলাম পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে কিভাবে তাওয়াফ করতেন? তিনি বললেন, পুরুষগন মহিলাদের সাথে মিলে তাওয়াফ করতেন না। ‘আয়েশা (রাঃ) বরং পুরুষদের পাশ কাটিয়ে তাওয়াফ করতেন, তাদের মাঝে মিশে যেতেন না। এক মহিলা ‘আয়েশা (রাঃ) কে বললেন চলুন, হে উম্মুল ‘মু’মিনীন! আমরা তাওয়াফ করে আসি। তিনি বললেন, “তোমার মনে চাইলে তুমি যাও” আর তিনি যেতে অস্বীকার করলেন। তাঁরা রাতের বেলা পর্দা করে বের হয়ে (সম্পূর্ণ না মিশে) পুরুষদের পাশাপাশি থেকে তাওয়াফ করতেন। উম্মুল মু’মিনীনগন বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে চাইলে সকল পুরুষ বের করে না দেয়া পর্যন্ত তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। ‘আত্বা (রহঃ) বলেনহ, ‘ঊবাইদ ইব্‌নু ‘উমাইর এবং আমি ‘আয়েশা (রাঃ) এর কাছে গেলাম, তিনি তখন “সবীর” পর্বতে অবস্থান করছিলেন।? [ইব্‌নু জুরাইজ (রহঃ) বলেন] আমি বললাম, তখন তিনি কি দিয়ে পর্দা করছিলেন? আত্বা (রহঃ) বললেন, তখন তিনি পর্দা ঝুলানো তুর্কী তাঁবুতে ছিলেন, এছাড়া তাঁর ও আমাদের মাঝে অন্য কোন কিছু ছিলনা। (অকস্মাৎ দৃষ্টি পড়ায়) আমি তাঁর গায়ে গোলাপি রং-এর চাদর দেখতে পেলাম।  (সহিহ বুখারি ১৬১৮)

১৯। বিদায়ী তাওযাফের সময় রমল করা

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে যিয়ারাতের সাত চক্করের একটিতেও রমল করেননি। (সুনানে আবু দাউদ ২০০১)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাযার (তাওয়াফে যিয়ারতের) সাত চক্কর রমল করেননি (জোর পায়ে চলেননি)। (মিসকাত ২৬৭৩)

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানোর বিধান

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানোর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সাঈ বা সাফা মারওয়া মাঝে দৌড়ানো

সাঈ অর্থ দৌড়ানো। কাবার অতি নিকটেই দু’টো ছোট্ট পাহাড় আছে যার একটি ‘সাফা’ ও অপরটির নাম ‘মারওয়া’। এ দু’ পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে মা হাজেরা শিশুপুত্র ইসমাঈলের পানির জন্য ছোটাছুটি করেছিলেন। ঠিক এ জায়গাতেই হজ্জ ও উমরা পালনকারীদেরকে দৌড়াতে হয়। শাব্দিক অর্থে দৌড়ানো হলেও পারিভাষিক অর্থে স্বাভাবিক গতিতে চলা। শুধুমাত্র দুই সবুজ পিলার দ্বারা চিহ্নিত মধ্যবর্তী স্থানে সামান্য একটু দৌড়ের গতিতে চলতে হয়। তবে মেয়েরা দৌড়াবে না।

উরওয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্জেস করলাম যে, মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

*إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ *

নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। (সুরা বাকারা ২:১৫৮)

(আমার ধারণা যে,) সাফা-মারওয়ার মাঝে কেউ সা‘ঈ না করলে তার কোন দোষ নেই। তখন তিনি [‘আয়িশাহ (রাযি.)] বললেন, ওহে বোনপো! তুমি যা বললে, তা ঠিক নয়। কেননা, যা তুমি তাফসীর করলে, যদি আয়াতের মর্ম তাই হতো, তাহলে আয়াতের শব্দ বিন্যাস এভাবে হতো।

 (لاَ جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا ) 

‘‘দু’টোর মাঝে সা‘ঈ না করায় কোন দোষ নেই।’’

কিন্তু আয়াতটি আনসারদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুশাল্লাল নামক স্থানে স্থাপিত মানাত নামের মূর্তির পূজা করত, তার নামেই তারা ইহরাম বাঁধত। সে মূর্তির নামে যারা ইহরাম বাঁধত তারা সাফা-মারওয়া সা‘ঈ করাকে দোষাবহ মনে করত। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! পূর্বে আমরা সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করাকে দোষা মনে করতাম। (এখন কী করবো?) এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা‘আলা

 (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ ) 

অবতীর্ণ করেন। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, (সাফা ও মারওয়ার মাঝে) উভয় পাহাড়ের মাঝে সা‘ঈ করা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধান দিয়েছেন। কাজেই কারো পক্ষে এ দুয়ের সাঈ পরিত্যাগ করা ঠিক নয়। (রাবী বলেন) এ বছর আবূ বাকার ইবনু ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) কে ঘটনাটি জানালাম। তখন তিনি বললেন, আমি তো এ কথা শুনিনি, তবে ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ব্যতীত বহু ‘আলিমকে উল্লেখ করতে শুনেছি যে, মানাতের নামে যারা ইহরাম বাঁধত তারা সকলেই সাফা ও মারওয়া সায়ী করত, যখন আল্লাহ কুরআনে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা উল্লেখ করলেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার আলোচনা তাতে হলো না, তখন সাহাবাগণ বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করতাম, এখন দেখি আল্লাহ কেবল বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা অবতীর্ণ করেছেন, সাফার উল্লেখ করেননি। কাজেই সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করলে আমাদের দোষ হবে কি? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা অবতীর্ণ করেন,

 ( إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ ) 

আবূ বাকার (রাঃ) আরো বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি, আয়াতটি দু’ প্রকার লোকদের উভয়ের প্রতি লক্ষ্য করেই অবতীর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ যারা জাহিলী যুগে সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করা হতে বিরত থাকতেন, আর যারা তৎকালে সা‘য়ী করত বটে, কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সা‘য়ী করার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের দ্বিধার কারণ ছিল আল্লাহ বাইতুল্লাহ তাওয়াফের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার কথা উল্লেখ করেননি? অবশেষে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের কথা আলোচনা করার পর আল্লাহ সাফা ও মারওয়া সা‘ঈ করার কথা উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারী ১৬৪৩)

আমর ইব্‌নু দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-এর নিকট জিজ্জেস করলাম, কোন ব্যক্তি ‘উমরাহ করতে গিয়ে শুধু বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে, আর সাফা ও মারওয়া সা’ঈ না করে, তার পক্ষে কি স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে? তখন তিনি বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মক্কায়) উপনীত হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ সাত চক্করে সমাধা করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন, এরপর সাত চক্করে সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করলেন। [এতটুকু বলে ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] “তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”(আল-আহযাবঃ ২১)। (সহিহ বুখারি ১৬৪৫)

জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমরা জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে উক্ত বিষয়ে জিজ্জেস করলাম। তখন তিনি বললেন, সাফা ও মারয়ার সা’ঈ করার পূর্বে কারো পক্ষে স্ত্রী সহবাস মোটেই বৈধ হবে না। (সহিহ বুখারি ১৬৪৬)

আসিম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) কে বললাম, আপনারা কি সাফা ও মারওয়া সা’ঈ করতে অপছন্দ করতেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। কেননা তা ছিল জাহিলী যুগের নিদর্শন। অবশেষে মহান আল্লাহ অবতীর্ণ করেনঃ “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন। কাজেই হজ্জ বা ‘উমরাকারীদের জন্য এ দুইয়ের মধ্যে সা’ঈ করায় কোন দোষ নেই”। (সু্রা বাকারা-১৫৮)। (সহিহ বুখারি ১৬৪৮)

সাঈ না করলে হজ্জ ও উমরা আদায় হবে নাঃ

হিশাম ইবনু উরওয়াহ্ (রহঃ) থেকে তার পিতা সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ্ (রাযিঃ) কে বললাম, আমি মনে করি কোন ব্যক্তি সাফা-মারওয়াহ পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ না করলে তার কোন ক্ষতি হবে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন কেন? আমি বললাম, কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ ‘সাফা-মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম ……… “— (সূরা আল বাকারাহ ২ঃ ১৫৮)। তখন আয়িশাহ (রাযিঃ) বললেন, কোন ব্যক্তি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ না করলে আল্লাহ তার হাজ্জ ও উমরাহ পূর্ণ করেন না। তুমি যা বলেছ যদি তাই হতো তবে আয়াতটি এভাবে হতো, “ঐ দুই পাহাড়ের মাঝে না দৌড়ালে কোন অসুবিধা নেই।” তুমি কি জান ব্যাপারটি কী ছিল? ব্যাপার তো ছিল এই যে, আনসারগণ জাহিলী যুগে দু’টি প্রতিমার নামে সমুদ্রের তীরে ইহরাম বাঁধত। একটির নাম ইনসাফ, অপরটির নাম নায়িলাহ। তারা এসে সাফা-মারওয়াহ সাঈ করত। অতঃপর মাথা কামাতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর তারা জাহিলী যুগে যা করত, সে কারণে সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করা খারাপ মনে করল। তাই আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেনঃ “সাফা-মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম ………।” অতঃপর লোকেরা সাঈ করে।(সহিহ মুসলিম ২৯৬৯ হাদিস ফাউন্ডেশন)

সাঈ এর ধারাবাহিক কাজগুলো নিম্ম রুপঃ

ক) তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত সালাত আদায় করে কিছু জমজমের পানি পান করেই ‘সাফা’ পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দেবেন।

খ) সা‘ঈ করতে যাচ্ছেন এ মর্মে মনে মনে নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ করুন। সা‘ঈ করতে যাবার পূর্বে হাজরে আসওয়াদ পাথর ‘ইস্তিলাম’ (চুম্বন-স্পর্শ) করা উত্তম। তবে ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে কোনো সমস্যা নেই, সরাসরি সাফা পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়ে পড়ুন। তবে এ সময় হাজরে আসওয়াদ পাথরের দিকে হাত তুলে ইশারা করা বা তাকবীর বলার কোনো বিধান নেই। সাফা পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব উঠে বা কাছাকাছি পৌছে এ দো‘আটি শুধুমাত্র এখন একবারই পড়ুন। দোয়াটি হলোঃ

«إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ»

(উচ্চারণঃ‘‘ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা‘আয়িরিল্লাহ, আবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহি’’।)

অর্থঃ ‘‘অবশ্যই ‘সাফা’ এবং ‘মারওয়া’ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহের অন্যতম।’’ আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন আমিও সেভাবে শুরু করছি।

এ দোয়াটি এখানে ছাড়া আর কোথাও পড়বেন না। সাঈর প্রথম চক্রের শুরুতেই শুধুমাত্র পড়বেন। প্রতি চক্রে বারবার এটা পুনরাবৃত্তি করবেন না।

গ) অতঃপর,যতটুকু সম্ভব সাফা পাহাড়ে উঠুন। একেবারে চূড়ায় আরোহণ করা জরুরী নয়। তারপর কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত তুলে নীচের দোয়াটি পড়ুনঃ

اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَه لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَه لاَ شَرِيكَ لَـه، أَنْجَزَ وَعْدَه، وَنَصَرَ عَبْدَه، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَه.

(উচ্চারণঃ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহ, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদ্, ইয়ুহয়ী ওয়া ইয়ুমিতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওআহদাহু লা শারিকালাহু, আনজাযা ওয়া‘দাহু ওয়ানাসারা আবদাহু ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু’’।)

অর্থঃ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আসমান যমীনের সার্বভৌম আধিপত্য একমাত্র তাঁরই। সকল প্রশংসা শুধু তাঁরই প্রাপ্য। তিনিই প্রাণ দেন এবং তিনিই আবার মৃত্যুবরণ করান। সবকিছুর উপরই তিনি অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি এক ও একক। তাঁর কোন শরীক নেই। যত ওয়াদা তাঁর আছে তা সবই তিনি পূরণ করেছেন। স্বীয় বান্দাকে তিনি সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রুদলকে পরাস্ত করেছেন। (আবূ দাউদঃ ১৯০৫)

এ দোয়াটি তিনবার পড়ার পর দু’হাত উঠিয়ে যত পারেন দোয়া করুন, আরবীতে বা নিজের ভাষায় দুনিয়া ও আখেরাতের অসংখ্যকল্যাণ চাইতে থাকুন ।

অথবা উক্ত দো‘আটি প্রথমে একবার পাঠ করে তারপর আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। ফের উক্ত দো‘আটি পড়ে আবার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য দো‘আ পড়বেন। শেষ আর একবার এমনভাবে দো‘আ পড়বেন। অর্থাৎ তিন বার এভাবে করবেন। (সহিহ মুসলিম ২১৩৭)

ঘ) দোয়া শেষ করে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলতে শুরু করুন। এখানে কাবাকে উদ্দেশ্য করে হাতের উঠানো বা তাকবীর বলা কিংবা তালুতে চুম্বন করার কোনো নিয়ম নেই। তাওয়াফের মত এখানেও আপনি ইচ্ছে করলে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, জিকির, ইস্তিগফার করতে পারেন। মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করতে থাকুন নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য এবং মুসলিম মিল্লাতের সবার জন্য। তবে আওয়াজ করে, জোরে শব্দ করে বা দলবদ্ধ হয়ে কোনো জিকির বা দোয়া করা সুন্নাহ সম্মত নয়। অথচ লক্ষ্য করে দেখবেন এখানে অনেকেই এ ভুল কাজটি করছেন।

ঙ) স্বাভবিকভাবে হেঁটে সাফা থেকে মারওয়া পাহাড় এসে পৌছলে ১ চক্কর সম্পন্ন হল। মারওয়া পাহাড়ে উঠে বা যতটুকু সম্ভব মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আবার কা‘বার দিকে মুখ করে দুই হাত উঠিয়ে উপরোক্ত বড় দো‘আটি আবার ৩বার পড়ুন। ঠিক একই পদ্ধতিতে যেমন সাফা পাহাড়ে করেছিলেন।

চ) চলতে চলতে সাফা পাহাড় থেকে কিছু দূর এগুলেই উপরে ও ডানে-বামে সবুজ আলোর বাতি আপনার নজরে আসবে।  এ সবুজ আলোর জায়গাটুকুতে শুধু পুরুষরা আস্তে আস্তে জগিং করার মতো দৌঁড়াবেন (রমল এর মতো)। সবুজ আলো অতিক্রম করার পর আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন। সা‘ঈ করার সময় যতবারই এ সবুজ আলোর জায়গার মধ্য দিয়ে যাবেন ততবারই জগিং করার মতো দৌড়াবেন। কিন্তু মহিলারা এখানে দৌড়াবেন না, স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন। এবং নিম্মের দোয়াটি পাঠ করতে থাকবে। দোয়াটি হলোঃ

«رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ»

(উচ্চারণঃ রাবিবগফির ওয়ারহাম ইন্নাকা আনতাল আ‘আযযুল আকরাম)

অর্থঃ ‘হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন রহম করুন। নিশ্চয় আপনি সমধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত।’

ছ) যখনই সবুজ চিহ্নিত স্থান অতিক্রম করে ফেলবেন তখনি আবার সাধারণ গতিতে হাঁটতে থাকবেন। ‘সাফা’ পাহাড়ে পৌঁছে প্রথমবার যা যা পড়েছিলেন ও করেছিলেন এবারও তা এখানে পড়বেন ও করবেন। আবার মারওয়ায় গিয়েও তাই করবেন। এভাবে প্রত্যেক চক্রেই এ নিয়ম পালন করে যাবেন। মারওয়া থেকে হেঁটে সাফা পাহাড়ে পৌঁছলে ২ চক্কর সম্পন্ন হল।

জ) যাদের সাঈ সম্পর্কে জ্ঞান কম তারা মনে করে থাকেন সাফা থেকে মারওয়া গিয়ে আবার সাফায় আসলে এক চক্কর হবে। আসলে ব্যাপারটি তা নয়। সাফা থেকে মারওয়ায় গেলেই এক চক্কর আবার মারওয়া থেকে সাফায় আসলেই এক চক্কর। এমনিভাবে মোট সাতবার যাওয়া আসা করলেই সাত চক্কর সম্পন্ন হয়ে যাবে।

ঝ) মারওয়া’য় গিয়ে যখন সাত চক্কর সম্পূর্ণ হবে তখন চুল কেটে আপনি হালাল হয়ে যেতে পারেন যদি আপনার হাদি কুরবানী হয়ে থাকে। আর যদি হাদি কুরবাণী না হয়ে থাকে তবে অপেক্ষ করুন। এই জন্য অনেক হাদী কুরবানীর পরই তাওয়াফ ও সাঈ করে থাকে। যারা কুরবানীর পর সাঈ করেছেন তারা (পুরুষেরা) মাথা মুন্ডন করবে অথবা সমগ্র মাথা থেকে চুল কেটে ছোট করে নেবে। আর মহিলারা আঙ্গুলের উপরের গিরার সমপরিমাণ চুল কেটে হালাল হয়ে যাবেন। অর্থাৎ ইহরামের কাপড় খুলে অন্য কাপড় পরবেন। ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ আপনার জন্য নিষিদ্ধ ছিল এগুলো এখন বৈধ হয়ে গেল।

ঞ) সাঈ করার সময় কোনো সালাতের ইকামত হলে সঙ্গে সঙ্গে সালাত আদায় করে নিবেন এবং যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে ফের শুরু করবেন।

ট) সা‘ঈ করার সময় এদিক ওদিক তাকানো ও ঘুরাঘুরি না করে একাগ্রচিত্তে বিনয়ের সাথে সা‘ঈ করাই উত্তম। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া সাঈ করার সময় কথা না বলাই ভালো। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত দোয়াগুলো মুখস্ত করে অর্থ জেনে সাঈ করার সময় পড়তে পারেন।

ঠ) সাঈ করার সময় দলবদ্ধ হয়ে সাঈ করা সহজ্জ। কারণ বেজমেন্ট/প্রথম তলা/দ্বিতীয় তলা/ছাদের উপরও প্রয়োজনে সা‘ঈ করা যায়, তাই সা‘ঈ করার সময় লোকের ভিড় ও চাপ তাওয়াফের তুলনায় কিছুটা কম হয়।

মন্তব্যঃ ঋতুবতী নারীগন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ছাড়া হজ্জের অন্য সকল কার্য সম্পাদন করতে পারে বিধায় তারাও এই অবস্থায় সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’ঈ করবে। দলিল হিসাবে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি।

১. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি মক্কা-য় আসার পর ঋতুবতী হওয়ার কারণে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা সা’ঈ করতে পারিনি। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এ অসুবিধার কথা জানালে তিনি বললেনঃ পবিত্র হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত অন্য সকল কাজ অপর হাজীদের ন্যায় সম্পন্ন করে নাও। (সহিহ বুখার ১৬৫০)

২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সঙ্গে হজ্জ আদায় করে কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করলাম। এ সময় সাফিয়্যাহ (রাঃ)-এর ঋতু দেখা দিল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সঙ্গে তা ইচ্ছা করছিলেন যা একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে ইচ্ছা করে থাকে। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো ঋতুবতী। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তবে তো সে আমাদের আটকিয়ে ফেলবে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সাফিয়্যাহ (রাঃ) তো কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করে নিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তবে রওয়ানা হও। কাসিম, ‘উরওয়া ও আসাদ (রহঃ) সূত্রে ‘আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাফিয়্যা কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৩৩)

৩. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, লোকদের আদেশ দেয়া হয় যে, তাদের শেষ কাজ যেন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ। তবে এ হুকুম ঋতুবর্তী মহিলাদের জন্য শিতিল করা হয়েছে। (সহিহ বুখার ১৭৫৫)

সাঈয়ের ওয়াজিব, সুন্নহ ও ভূলত্রুটিসমূহ

সাঈয়ের ওয়াজিব, সুন্নহ ও ভূলত্রুটিসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উমরা ও হজ্জের ক্ষেত্রে সাফা এবং মারওয়াতে পাহাড়ের মাঝে সাঈ আদায় করা একটি ওয়াজিব আমল। তবে অনেকে ইহাকে ফরজও বলেছেন। মূলত সাঈ একটি ওয়াজিব আমল। সাঈ আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক আমল আছে যেগুলো বাদ দিলে সাঈ আদায় হবে না। অর্থাৎ সাঈটি বাদ হয়ে যাবে। এমন কাজই সাঈয়ের ওয়াজিব। আমরা এমন অনেক সুন্নাহ আমল আছে যা বাদ দিলে সাঈ আদায় হবে কিন্তু সুন্নাহ সম্মত সাঈ হবে না। আবার অনেক আমল আছে যা সাঈকে প্রশ্নবিদ্ধ করে করে। অর্থাৎ সাঈ আদায় করে অনেক ভুল করে থাকে যা কাম্য নয়। ভুল যদি ওয়াজিব পর্যায় হয় তবে সাঈ বাতিল হয়ে যায় আর সুন্নাহ পর্যায় থাকলে নেকী কম হয়ে যাবে।

সাঈয়ের ওয়াজিবসমূহ হলোঃ

১। তাওয়াফ আদায়ের পরে সাঈ করা

২। সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করা

৩। প্রতিবারই সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে

৪। সাফা এবং মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবে

৫। সাত চক্র পূর্ণ করা

সাঈয়ের সুন্নাতসমূহঃ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

৩। তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

৪। সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

৫। সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

৬। প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

৭। সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

৮। সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

৯। উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

সাইয়ের ভুলত্রুটি হলোঃ

১। নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

২। দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

৩। ইযতিবা বা রমল করাঃ

৪। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

সাঈয়ের ওয়াজিব

১। তাওয়াফ আদায়ের পরে সাঈ করাঃ

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ বিদায় হাজ্জে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বাহনে চড়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করেন, যাতে লোকেরা তাঁকে দেখে, তাঁর কাজের প্রতি দৃষ্টি দেয় এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে জিজ্ঞেস করে নেয়। কারন লোকেরা চতুর্দিক থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছিলো। (আবু দাউদ ১৮৮০)

আমর (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ইবন উমর (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি। আমরা তাঁকে এমন এক ব্যক্তি সম্বন্ধে প্রশ্ন করছিলাম, যে উমরা করতে এসে কা’বার তাওয়াফ করে, কিন্তু সাফা ও মারওয়ার সাঈ করেনি। সে কি তার পরিবারের কাছে গমন (সহবাস) করবে? তিনি বললেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় আগমন করেন, তখন তিনি সাতবার তাওয়াফ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দুই রাক’আত সালাত আদায় করেন এবং সাফা ও মারওয়া সাঈ করেন। “আর তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে”। (সুনানে নাসাঈ ২৯৩০)

মন্তব্যঃ প্রতিটি হাদিসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের পর সাফা মারওয়া সাঈ করার কথা উল্লেখ আছে। আমলের ক্ষেত্রেও যুগ যুগ ধরে এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। ইসলাম আগমনের পর থেকেই প্রতি দিন উমরা ও হজ্জ আদায়কারী তাওয়াফের পর সাঈয়ের আমল করে থাকে। এই আমলের ব্যতক্রম আমল পাওয়া যায় না। তাই কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নাই যে, তাওয়াফের পর দুই রাকাত সালাত আদায় করে একটু জমজমের পানি পান করেই সাত চক্কর সাই করতে হবে।

সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করাঃ

সাঈ সাফা থেকে শুরু, নাকি মারওয়া থেকে শুরু করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোন প্রকার মতভেদ নেই। সবল যুগের সকল মুসলিম একমত সাঈ সাফা থেকে শুরু করতে হবে। কেননা, এমন আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রমানি। যুগ যুগ ধরে সালাফদের মাঝে প্রচলিত।

দলিলঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতবার বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন, এতে তিনবার রমল করেন এবং চারবার সাধারণভাবেই হেঁটে তাওয়াফ করেন। তারপর মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়িয়ে দু’রাকাত সালাত আদায় করেন এবং পড়েনঃ

* وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى *

এ সময় তিনি লোকদেরকে শোনাবার জন্য উচ্চকণ্ঠে পড়েন। এরপর সেখান থেকে এসে তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করেন। তারপর সাফার দিকে গমন করেন এবং বলেন, আমরা তা হতে আরম্ভ করবো, আল্লাহ যা হতে আরম্ভ করেছেন। এরপর তিনি সাফা হতে আরম্ভ করে তার উপর আরোহণ করেন। সেখান থেকে তিনি বায়তুল্লাহ দেখতে পান এবং তিনি তিনবার বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি আল্লাহু আকবর বলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন এরপর তার জন্য যা নির্ধারিত ছিল তিনি তা দিয়ে দু’আ করেন। পরে তিনি পায়ে হেঁটে নেমে এসে বাতনে মাসীলে (উপত্যকায়) এসে পৌঁছেছেন। তারপর তিনি দ্রুত হেঁটে চলেন, যাতে তাঁর পদদ্বয় উঠে যায়। পরে তিনি মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করেন। এখানেও বায়তুল্লাহ তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। এখানেও তিনি তিনবার বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন, সুবহানাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ বলেন, এখানে তিনি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী দু’আ করলেন। দুআ করেন এবং এভাবে তিনি তাওয়াফ শেষ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭৭ ইফাঃ)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি শুনেছি যে, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফায় গমনের ইচ্ছায় মসজিদ (অর্থাৎ তাওয়াফের স্থান) থেকে বের হলেন, তখন তিনি বললেন, আমরা সেখান থেকে আরম্ভ করব যেখান থেকে আল্লাহ্‌ তা’আলা আরম্ভ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৬৯)

৩. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফার দিকে বের হয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা যে স্থান থেকে আরম্ভ করেছেন, আমরাও সে স্থান থেকে আরম্ভ করবো। তারপর তিনি পাঠ করেন,

* إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللّهِ*

অর্থঃ সাফা ও মারওয়া আল্লাহ্‌ তাআলার ‘শি’আর’ (বিশেষ) প্রতীক সমুহের অন্তর্ভুক্ত (সুরা বাকারা ২:১৫৮)। সুতরাং যারা বায়তুল্লাহ্‌র হজ্জ করবে তাদের জন্য এ দুটিতে সা’ঈ করলে কোন অপরাধ হবে না। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭০)

মন্তব্যঃ  সাঈ সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করলে মারওয়া পাহাড়ে গেলেই এক চক্কর গনণা করা হবে। আমার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে আসালে আরেক চক্কর হয়ে যাবে। অনেকে মনে করে থাকে সাফা থেকে মারওয়া গিয়ে আবার সাফা ফিরে আসলে এক চক্কর হবে। তাদের ধারানা ভুল। তাই সাফা থেকে শুরু করার পর সাত চক্কর পর মারওয়াতে গিয়ে সাঈ শেষ হবে।

।  সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম করতে হবেঃ

সাঈ সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড়ে গেলেই এক চক্কর গনণা করা হবে। আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড়ে আসালে আরেক চক্কর হয়ে যাবে। এখন যদি কেউ সাফা বা মারওয়া পাহাড়ের উপর না উঠে, পাহাড়ের কাছে থেকে ফিরে আসে তবে তার চক্কর সম্পূর্ণ হবে না। অর্থাৎ সাফা ও মারওয়া এর মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ দূরত্ব অতিক্রম না করলে ঐ চক্কর কাউন্ট হবে না। তাওয়াফের অন্যতাম শর্ত হলে সাত চক্কর সাঈ করা কিন্তু কোন চক্করে যদি আংশিক সম্পন্ন হবে তবে সাত চক্ক না হয়ে কম হবে। সে ক্ষেত্র সাঈয়ের ওয়াজির সাত চক্কর সম্পন্ন হবে না বিধায় তার সাঈ বাতিল হয়ে যাবে।

সাফা মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবেঃ

সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা সাঈ করা জন্য নির্দষ্ট স্থান আছে। এই স্থান দিয়েই সাঈ করতে হবে। বর্তমানে সাঈয়ের স্থানকে একটি বিল্ডিং দ্বারা আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এই বিল্ডিং টি তিল তলা বিশষ্ট করা হয়েছে যাতে করে প্রচন্ড ভীরের সময় যে যথেষ্ঠ স্থান থাকে। কাজেই সাঈ করতে হলে এই তিন তলা বিশিষ্ট বিল্ডিং এর সীমানার ভীতর থেকেই করতে হবে। এই বিল্ডিং এর যে কোন তলা দিয়েই সাঈ করলে সাঈ হয়ে যাবে। কেননা, বিল্ডিং এর বেজমেন্ট, প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলা এবং ছাদ সম্পূর্ণটাই সাঈয়ের স্থান। বিল্ডিং এই স্থান বাদ দিয়ে এর সমান্তাল বাহিরে কোন স্থান দিয় সাঈ করলে সাঈ আদায় হবে না। যেমনঃ বিল্ডিং টির পূর্বপাশে যথেষ্ট পরিমান ফাকা জায়গা আছে যদি কেউ ভীরের কারনে বেজমেন্ট, প্রথম তলা, দ্বিতীয় তলা এবং ছাদ বাদ দিয়ে ঐ ফাকা জায়গার সাঈ করে তবে তার সাই শুদ্ধ হবে না। সাঈ কে শুদ্ধ করার অন্যতম ওয়াজিব কাজ হলো, সাফা ও মারওয়াতে পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানেই সাঈ করতে হবে।

সাত চক্র পূর্ণ করাঃ

সাঈয়ের অন্যতাম ওয়াজিব হলে সাত চক্করে সাঈ করতে হবে। সাত চক্করের কম করলে সাঈ আদায় হবে না। কেউ যদি সাতের কম পাচ বা ছয় চক্কর আদায় করে তবে তবে তার সাঈয়ের ওয়াজিব আদায় হবে না। তাকে কাফ্ফার আদায় করে দায় মুক্ত হতে হবে।

আমর ইব্‌নু দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-এর নিকট জিজ্জেস করলাম, কোন ব্যক্তি ‘উমরাহ করতে গিয়ে শুধু বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে, আর সাফা ও মারওয়া সা’ঈ না করে, তার পক্ষে কি স্ত্রী সহবাস বৈধ হবে? তখন তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কায়) উপনীত হয়ে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ সাত চক্করে সমাধা করে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করলেন, এরপর সাত চক্করে সাফা ও মারওয়া সা’য়ী করলেন। [এতটুকু বলে ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন] “তোমাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”-(আল-আহযাবঃ ২১)।(৩৯৫)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হজ্জের সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ ও ‘উমরাহ একসাথে পালন করেছেন। তিনি হাদী পাঠান অর্থাৎ যুল-হুলাইফা হতে কুরবানীর জানোয়ার সাথে নিয়ে নেন। অত:পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধেন, এরপর হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধেন। সাহাবীগণ তাঁর সঙ্গে ‘উমরাহ’র ও হজ্জের নিয়্যাতে তামাত্তু‘ করলেন। সাহাবীগণের কতেক হাদী সাথে নিয়ে চললেন, আর কেউ কেউ হাদী সাথে নেননি। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা পৌছে সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যারা হাদী সাথে নিয়ে এসেছ, তাদের জন্য হজ্জ সমাপ্ত করা পর্যন্ত কোন নিষিদ্ধ জিনিস হালাল হবে না। আর তোমাদের মধ্যে যারা হাদী সাথে নিয়ে আসনি, তারা বাইতুল্লাহ এবং সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ করে চুল কেটে হালাল হয়ে যাবে। এরপর হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধবে। তবে যারা কুরবানী করতে পারবে না তারা হজ্জের সময় তিনদিন এবং বাড়িতে ফিরে গিয়ে সাতদিন সওম পালন করবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা পৌঁছেই তাওয়াফ করলেন। প্রথমে হাজরে আসওয়অদ চুম্বন করলেন এবং তিন চক্কর রামল করে আর চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হেঁটে তাওয়াফ করলেন। বাইতুল্লাহর তাওয়াফ সম্পন্ন করে তিনি মাকামে ইব্রাহীমের নিকট দু’রাক‘আত সালাত আদায় করলেন, সালাম ফিরিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় আসলেন এবং সাফামারওয়ার মাঝে সাত চক্কর সাঈ করলেন। হজ্জ সমাধান করা পর্যন্ত তিনি যা কিছু হারাম ছিল তা হতে হালাল হননি। তিনি কুরবানীর দিনে হাদী কুরবানী করলেন, সেখান হতে এসে তিনি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করলেন। অত:পর তাঁর উপর যা হারাম ছিল সে সব কিছু হতে তিনি হালাল হয়ে গেলেন। সাহাবীগণের মধ্যে যাঁরা হাদী সাথে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা সেরূপ করলেন, যেরূপ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৯১)

সাঈয়ের সুন্নাহ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

৩। তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

৪। সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

৫। সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

৬। প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

৭। সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

৮। সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

৯। উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

সাঈয়ে সুন্নাতসমূহের বিস্তারিত বিবরণঃ

১। অযু অবস্থায় সাঈ করা ও সতর ঢাকাঃ

যে কোন ইবাদতের জন্য পরিস্কার পরিচ্চন্না থাকা উত্তম। তাওয়াফে জন্য কিছু মুসতাহীদ আলেম অজুকে শর্ত আরপ করলেও সাঈয়ের জন্য অজু শর্ত করেন নাই। বড় অপবিত্রতা থেকে মুক্ত না হয়ে তাওয়াফ করা যাবে না, কিন্তু এই অবস্থায় সাঈ আদায় করা যাবে। তাওয়াফ শেষ করে সালাত আদায় করেই সাঈ আদায় করতে হয়। তাই দেখা যায় সাঈ আদায়ের সময় অধিকাংশের অজু থাকে। এই অজুসহকারে সাঈয়ের আমল করা সুন্নাহ। যদি অজু না থাকে এবং অজুকরা কষ্টকর তবে অজু ছাড়াই সাঈ আদায় করা যায়। আর সতল ঢাকা একটি ফরজ কাজ। কোন অস্থায় সতল খোলা যাবে না। জাহেলী জামানায় অনেক অজ্ঞ লোক সতল না ঢেকে তাওয়াফ ও সাঈ আদায়  করত। কাজেই এখন শুধু সতর খোলা নয় পর্দার প্রতিও খেয়াল রেখে পোশাক পড় সাঈ আদায় করতে হবে।

..২। সাফা থেকে কাবা দেখে তাকবির বলাঃ

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় আরোহণ করে যখন তিনি বায়তুল্লাহ্‌ দেখতে পান তখন তাকবীর বলেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭১ হাদিসের মান সহিহ)

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফায় (পাহাড়ে) আরোহণ করে তিনবার তাকবীর (আল্লাহু আকবর) বলেন। এরপর তিনি বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

(আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।) তিনি এইরূপ তিনবার বলেন, পরে দু’আ করেন। মারওয়া পাহাড়েও তিনি এইরূপ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭২ হাদিসের মান সহিহ)

তাওয়াফ শেষে সময় ক্ষেপণ না করে সাঈ করাঃ

সহিহ হাদিসমূহের বর্ণনা থেকে জানা যায় রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ করে, দুই রাকাত সালাত আদায় করে, জমজমের কিছু পানি পান করেই সাঈ করেন। আমাদের সালাফদের আমলও তাই তারা উমরা বা হজ্জের সময় তাওয়াফ শেষ করেই সাঈ করে থাকেন। এই দুটি আমল পাশাপাশি আদায় আদায় করার সাথে সাথে এর প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে যেন তাওয়াফ ও সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় ক্ষেপন না হয়। 

সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে না থাকাঃ

সাঈ কোন কষ্টসাধ্য আমল নয়। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব ৩০০ মি (৯৮০ ফুট)। সাতবার আসা যাওয়া করার পর মোটামুটি ২.১ কিমি (১.৩ মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। বেশী বয়স্ক ও মাজুর না হলে ২.১ কিমি সাধারণ গতিতে হাটা একেবারেই সহজ্জ আমল। কাজেই সাঈয়ের মাঝে বেশী সময় থেমে থাকা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আমাদের সালাফদের আমল এক নাগালে সাত চক্কর দিয়ে সাঈ শেষ করা।

সবুজ বাতির মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের একটু দৌড়ানোঃ

আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারি ১৬১৭)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ মুসলিম পর্ব ১৫/৩৯ হাঃ ১২৬১)

প্রতি চক্রেই সাফা ও মারওয়া আরহন করে দোয়া করাঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফার দিকে গেলেন এবং তাতে আরোহণ করলেন। এরপর বায়তুল্লাহ তার দৃষ্টিগোচর হলো। এরপর তিনি মহান আল্লাহর তাওহীদ বর্ণনা করে তাকবীর পাঠ করলেন। তিনি বলেনঃ

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

এরপর তিনি চলতে লাগলেন যখন তাঁর পদদ্বয় উপত্যকাতে নামলো তখন সাঈ করলেন। যখন উভয় পদ ‘উপতাকা থেকে উপরে উঠে এলো, তখন তিনি হেঁটে মারওয়ায় আগমন করেন। এখানেও তাই করলেন, যা তিনি সাফা পাহাড়ে করেছিলেন। এভাবে তিনি তার তাওয়াফ শেষ করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯88 ইফাঃ)

২. জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারওয়ায় এসে তার উপর আরোহণ করেন। তারপর বায়তুল্লাহ্‌ তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। তখন তিনি তিনবার বলেন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

(আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুতে ক্ষমতাবান।) এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে স্মরণ (যিকির) করেন, সুবহানাল্লাহ ও আল-হামদুলিল্লাহ বলেন। তারপর তিনি আল্লাহ্‌র ইচ্ছা অনুযায়ী দু’আ করেন এবং এভাবে তিনি তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮৭ ইফাঃ)

সাঈয়ে সময় জিকির ও দোয়া করাঃ

সাঈ আদায়কালে নির্দষ্ট কোন দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয় নাই। শুধু সবুজ বাতিল স্থানে একটি দোয়া কথা হাদিসে উল্লেখ আছে। ইহা ছাড়া সাফ ও মারওয়া পাহাড়ে আরহনের পর দোয়া করা বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সাঈ যেহেতু মহান আল্লাহ অন্যতাম নিদর্শণ তাই সাঈ করার সময় মহান আল্লাহ জিকির করা ইমানের দাবি। কাজেই এই সময় মহান আল্লাহ প্রসংশামূকল জিকির করেত থাকি। জিকিরের মাঝে বীতিতভাবে মনের আশা পূরনের জন্য শ্রেষ্ঠ দাতা মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করে চাই। সাঈয়ের সময় সাফা মারওয়া চলাচলের পথে আজেবাযে চিন্তা না করে মহান আল্লাহ জিকির ও তার নিকটি দোয়া করে কাটানই উত্তম আমল হবে।

সক্ষম ব্যক্তির পায়ে হেঁটে সাঈ করা

জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফা থেকে অবতরন করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভুমিতে অবতরিত হলে তিনি সা’ঈ করে তা পার হতেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮৪ ইফাঃ)

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যদি সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করে দৌঁড়াই তবে তা এজন্য যে, আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাঈ করতে দেখেছি। আমি যদি তা হেঁটে অতিক্রম করি তবে তা এজন্য যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা হেঁটে অতিক্রম করতে দেখেছি। আমি তো একজন অতি বৃদ্ধ। (ইবনে মাজাহ ২৯৮৮)

কাসীর ইব্‌ন জুমহান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি ইব্‌ন উমর (রাঃ) -কে দেখেছি তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যস্থলে হাঁটছেন। তিনি বলেন : যদি আমি হেঁটে চলি, তা এজন্য যে, আমি রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে হাঁটতে দেখেছি। আর যদি আমি দ্রুত ছুটে চলি (সা’ঈ করি), তা এজন্য যে, আমি রাসুলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে দ্রুত ছুটে চলতে দেখেছি। (সুনানে নাসাঈ ২৯৭৯ ইফাঃ)

উমরা ও হজ্জে সাঈ একবারই আদায় করতে হবেঃ

তাওয়াফের ক্ষেত্র আমরা দেখেছি নফল তা্‌ওয়াফ আছে। অর্থাৎ আপনি ইচ্ছা করলে মক্কা থাকাকালীন সময় যে কোন সময় নফল তাওয়াফ করতে পারবেন। উমরা ও হজ্জের তাওয়াফ ফরজ হলেও অন্য সময় তাওয়াফ একটি নফল আমল। কিন্ত সাঈয়ের ক্ষেত্র উমরা বা হজ্জের সময় ওয়জিব হলেও নফল কোন সাঈ নাই। তাই উমরা ও হজ্জ ব্যতিত অন্য সময় সাঈ করা সুন্নাহ সম্মত আমল নয়। বরং অন্য সময় সাঈ করা একটি বিদআত আমল। ঠিক তেমনিভাবে উমরা ও হজ্জের তাওয়াফের পর মাত্র একবারই সাঈ করা হয়। বার বার বা একাধীকবার সাঈ করার কোন প্রমান পাওয়া যায় না। বরং একবারের বেশী সাঈ করতে নিষেধ করেছেন।

দলিলঃ

আবূ যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জাবির (রাঃ) কে বলতে শুনেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা ও মারওয়ার মধ্যে একবারের বেশি সাঈ করেন নি। (সুনানে তিরমিজি ২৯৮৯ ইফাঃ)

আবূ যুবায়র (রহঃ) জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণ সাফা-মারওয়ার মাঝে একবারের অধিক সাঈ করেননি। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৫)

জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ সাফা-মারওয়ার মাঝে একবারই তাওয়াফ করেছেন। এটাই ছিলো তাঁর প্রথমবারের তাওয়াফ। (সুনানে আবু দাউদ ১৮৯৫)

সাঈয়ের আদায়ের ত্রুটি

সাইয়ের ভুলত্রুটি হলো :

১। নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

২। দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

৩। ইযতিবা বা রমল করাঃ

৪। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

নিয়ত ও সাঈ শুরুর ভুলঃ

অনেক সাঈ করার পূর্বে গদবাধা নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়ে থাকে। অন্যান্য নিয়তের মত শুধু মনে মনে নিয়ত করতে হবে। সাফা পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করতে হবে। অনেক না জেনে মারওয়া পাহাড় থেকে সাঈ শুরু করে, এটা তাদের একটি ভুল আমল।

দোয়ার সময় যে ভুল হয়ঃ

অনেক মনে করে সাফা মারওয়ায় কোন প্রকার দোয়া নাই, শুধু সাঈ করতে হবে। হ্যা, সাঈতো করবই সাথে সাথে এখনে এসে দু’হাত তুলে শুধু দোয়া করতে হয়। অনেক মনে করেন হাত তুলে দোয়া নাই। হাত তুলে দোয়া করা সময় সময়ের জন্য বিদআত নয়, এই সেই স্থানগুলির একটি যেখানে হাত তুলে দোয়া করা সুন্নাহ। কোন কোন মুসলিম মনে করে, সাঈ করার সময় প্রতি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করতে হয়। বরং প্রতি চক্কর শেষেই চাহিদামত দোয়া করা যায়, প্রতি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া নাই।

ইযতিবা বা রমল করাঃ

অনেক মুসলিম ভাই অজ্ঞতার কারনে সাঈ করার সময় তাওয়াফের মত রমল করে থাকেন। আগের আলোচনায় দেখেছি সাফা মারওয়া সাঈয়ের সময় সবুজ বাতি এখাকায় প্রতি চক্করেই উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটি (সবুজ আলো দ্বারা আলোকিত) দ্রুত চলতে হবে।  যেহেতু, সাঈ করার সময় রমল করতে হয় না, তাই এখানে কোন প্রকার ইযতিবা (ইহরামের কাপড় কাদের নিচে নামিয়ে দেয়) নেই। কেউ কেউ সাঈ করার সময়ও ইযতিবা করে থাকে। এটা ভুল। ইযতিবা কেবল তাওয়াফে কুদুমের (আগমণী তাওয়াফে) সময় করতে হয়।

দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করাঃ

সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা পর্যন্ত সাঈ করার পুরো সময়টাতে আস্তে আস্তে চলাচল করা সুন্নাহ। দ্রুত চলে সাঈ সম্মন্ন করা একটি ভুল আমল।

জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাফা থেকে অবতরন করতেন তখন (স্বাভাবিক) হাঁটতেন, এমনকি তাঁর পদদ্বয় উপত্যকার নিম্নভুমিতে অবতরিত হলে তিনি সাঈ করে তা পার হতেন। (সুনানে নাসাঈ ২৯৮১)

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ পৌঁছে প্রথম তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্করে রামল করতেন এবং পরবর্তী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে চলতেন। সাফা ও মারওয়ায় সা‘ঈ করার সময় উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটুকু দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ বুখারী ১৬১৭ আধুঃ)

উভয় টিলার মধ্যবর্তী নিচু স্থানটি এখন সবুজ আলো দ্বারা আলোকিত করা হয়েছে। তাই সাঈ করার সময় কেবল সবুজ দুই চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে দ্রুত চলতে হবে। পুরুষদের জন্য সবুজ চিহ্নের মাঝে সাঈ তথা দৌড়ে না চলা একটি ভুল আমল। তবে মহিলাদের দৌড়াতে হবে না।

আরাফার ময়দানের আমল ও ভুল-ত্রুটি

আরাফার ময়দানের আমল ও ভুল-ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। মিনা হয়ে আরাফা গমন : মিনায় প্রথম দফা

মিনায় হাজ্জিগণ জিলহজ্জের মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২/১৩ তারিখ পর্যান্ত অবস্থান করে। মাঝের ৯ জিলহজ্জ তারিখ আরাফার ময়দানে ও ১০ জিলহজ্জ তারিখ রাতে মুজদালিফায় ময়দানে অবস্থান করে। কাজেই, ৮ জিলহজ্জ ইহরাম বাঁধার পর হাজিগণ সরাসরি আরাফার ময়দানে না গিয়ে মিনায় যাওয়াই সুন্নহ। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর নামাজসহ এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে প্রত্যেক নামাজ সুন্নাত মোতাবেক পড়ার নিয়ম হলো, প্রত্যেক ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) নামাজ উহার নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া। মাগরিব ও ফজর নামাজ ব্যতিত, কেননা এ দুই নামাজে কসর নেইল।

দলিলঃ

১. আবদুল ‘আযীয ইব্‌নু রুফাই‘ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্‌সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারি ১৬৫৩),

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় যুহর ও ফজরের নামায (অর্থাৎ যুহর হতে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের নামায) আদায় করলেন। তারপর ভোরেই আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৮০, হাদিসের মান সহিহ)

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর (রাঃ)-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে [অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় থেকে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে] হায়! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতেই আমর ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারী ১৫৫৪ ইফাঃ)

আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন এবং আবূ বকর, ‘উমর (রাঃ) -ও। আর ‘উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের প্রথম ভাগেও দু’রাক’আত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫৫)

৪. হারিসা ইব্‌নু ওয়াহব খুযা’য় (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে মিনাতে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। এ সময় আমরা আগের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিলাম এবং অতি নিরাপদে ছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৬৫৬)

৬. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে (অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ) -এর সময় হতে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে) আহা! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতই আমার ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারি ১৬৫৭)

*** উসমান (রাঃ) এই চার রাকআত পুরো আদায় করার বিরোধীতা করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)। সহিহ বুখারীতে এসেছেঃ

ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে মিনায় চার রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। তারপর এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) কে বলা হল, তিনি প্রথমে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়লেন। এবপর বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিনায় দু’ রাকা’আত পড়েছি, আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি এবং উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি। কতই না ভাল হতো যদি চার রাকা’আতের পরিবর্তে দু’রাকা’আত মাকবূল সালাত হতো। (সহীহ বুখারী ১০২৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মন্তব্যঃ উপরের সহিহ হাদিসসমূহের আলোকে বলা যায়, ৮ ই জিলহজ্জ ইহরাম বেঁধে মিনায় রওয়ানা হওয়া এবং সেখানেই রাত্রি যাপন করা। চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযগুলো দু’রাকআত করে পড়তে হবে। এটাকে কসর করা বলা হয়। সে নামাযগুলো হলো যুহর, আসর ও এশা। হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুয্দালিফায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের সকল লোককে নিয়ে এ সালাতগুলো কসর করে পড়েছিলেন, এটা সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে তিনি মুকীম বা মুসাফিরের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। অর্থাৎ মক্কার লোকদেরকেও চার রাকআত করে পড়তে বলেননি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ও ফাতাওয়া ইবনে বায)

তবে মনে রাখতে হবে যে, ফজর ও মাগরিবের ফরয নামায অর্থাৎ দুই এবং তিন রাকআত বিশিষ্ট নামায কখনো কসর হয় না। মিনাতে প্রত্যেক সালাত ওয়াক্তমত আদায় করবেন, জমা করবেন না। অর্থাৎ যুহর-আসর একত্রে এবং মাগরিব-এশা একত্রে পড়বেন না। এমনকি মুসাফির হলেও না। বিস্তারিত সফরের বিধান নামক অধ্যায় আলোচনা করা হয়েছ।

কাজেই সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত মিনায় সালাত চার নয় দুই বাকআতই আদায় করা উত্তম। কিন্তু কেউ পূর্ণ সালাত আদায় করলে তাদের গবেষণার উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সামনে সহিহ হাদিসগুলি তুলে ধরে বুঝাতে হবে। এ নিয়ে ফতোয়াবাজী করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করা যাবেনা। কারন আমাদের অনুকরনী তৃতীয় খলীফা (রাঃ) শেষের দিকে পূর্ণ সালাত আদায় করেছেন বলে প্রমানিত যদিও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার বিরোধীতা করেছেন।

২। মিনার গমনের পূর্বে কিছু আমলঃ

ক। আট জিলহজ্জ সকালে ফজরের সালাত কাবায় আদায় করে বাস্থানে চলে আসতে হবে। কেননা হজ্জের নিজ নিজ ঘর বা বাসস্থান থেকেই ইহরাম বাঁধতে হবে। মক্কায় অবস্থানকারীরাও নিজ নিজ ঘর থেকে ইহরাম বাঁধবেন।  তামাত্তু হাজি যারা ইহরাম ত্যাগ করে হালাল হয়ে মক্কা অবস্থান করে ছিল তারা, মক্কার বাসস্থান থেকেই ইহরাম বাধবেন। ইফরাদ ও কেরান হাজীগণ যারা আগে থেকেই ইহরাম পরা অবস্থায় আছেন, তাঁরা ইহরাম অবস্থায়ই থাকবেন। ইহরামের পোষাক পরার পর হজ্জের নিয়ত করে ফেলবেন। হজ্জের ইহরাম বাধার জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া, গোসল করা ও গায়ে সুগন্ধি মাখা সুন্নাহ। তবে কুরবানী দিবেন তারা ১লা যিলহজ্জ থেকে কুরবানীর পূর্ব পর্যন্ত চুল-নখ কাটবেনা।

খ।  হাজিদের কেউ যিলহজ্জের আট তারিখে ইহরাম বেঁধে তাওয়াফ ও সাঈ করে মিনায় রওয়ানা দেয় এবং দশ তারিখে তাওয়াফ করে আর সাঈ করে না। এটা ভুল। শুদ্ধ হলো ইহরাম বাঁধার পর তাওয়াফ ছাড়া মিনায় রওয়ানা দেবেন।

গ। সূর্যোদয়ের পর থেকে যুহরের নামাযের আগেই রওয়ানা দেয়া মুস্তাহাব। অর্থাৎ যুহরের নামাযের আগেই মিনায় চলে যাওয়া উত্তম। মক্কা থেকে মিনায় পায়ে হেটে যাওয়া মুস্তাহার। তবে গাড়িতে গেলে কোন প্রকার অসুবিধা নাই।

আবদুল ‘আযীয ইবনু রুফাইয়‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারী ১৬৫৩)

ঘ। যারা মাজুর ও মহিলা তারা জিলহজ্জের সাত তাখির রাতের মধ্যেই মিনায় চলে যায়। মুহাক্কিক আলেমদের মনে কোন অসুবিধা নাই। কারন বর্তমানে ভিড়ের কারনে সকালে মহিলা ও মাজুরদের মিনায় হেটে যাওয়া খুবই কষ্টকর। আর সকালে গাড়ির বিশাল যানজট থাকে।

ঙ। মিনায় আজকের রাত্রি যাপন মুস্তাহাব বা সুন্নাত। যেহেতু আগামীকাল আরাফার দিন, সেহেতু আজকের রাতকে বলা হয় ‘‘আরাফার রাত’’। এ রাতে সূর্য উদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত মিনাতেই অবস্থান করা সুন্নাত।

চ। কেউ কেউ সূর্যোদয়ের আগে মিনায় রওয়ানা দেয়। এটাও ভুল।

ছ। তালবীয় পাঠ করতে করতে আরাফায় যাওয়াঃ

১. মুহাম্মদ ইব্‌নু আবূ বাক্‌র সাক্বাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা সকাল বেলা মিনা হতে যখন ‘আরাফাতের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ)-এর নিকট তালবিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে কিরূপ করতেন? তিনি বললেন, তালবিয়া পাঠকারী তালবিয়া পড়ত, তাকে নিষেধ করা হতো না। তাকবীর পাঠকারী তাকবীর পাঠ করত, তাকেও নিষেধ করা হতো না। (সহিহ বুখারি ৯৭০)

২. মুহাম্মদ ইবন আবু বকর আস-সাকাফী (রহঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ)-এর সঙ্গে সকাল বেলা মিনার দিকে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা এই দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে তালবিয়ায় কি করতেন? তিনি বললেনঃ যে তালবিয়া পড়তো, সে তালবিয়া পড়তো। তাকে কেউ বাধা দিত না। আর যে তাকবীর বলতো, সে তাকবীর বলতো, তাকেও কেউ বাধা দিত না। (নাসাঈ ৩০০৩)

৩। যিলহাজের আট তারিখের একটি ভুল আমলঃ

আবদুল ‘আযীয ইবনু রুফাইয়‘ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আপনি যা উত্তমরূপে স্মরণ রেখেছেন তার কিছুটা বলুন। বলুন, যিলহাজ্জ মাসের আট তারিখে যুহর ও ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করতেন? তিনি বললেন, মিনায়। আমি বললাম, মিনা হতে ফিরার দিন ‘আসরের সালাত তিনি কোথায় আদায় করেছেন? তিনি বললেন, মুহাস্সাবে। এরপর আনাস (রাঃ) বললেন, তোমাদের আমীরগণ যেরূপ করবে, তোমরাও অনুরূপ কর। (সহিহ বুখারী ১৬৫৩ আধুনিক)

মন্তব্যঃ এই হাদিসে দেখা যায় যিলহজ্জের আট তারিখ মিনায় গিয়েছিলেন এবং নয় তারিখ সকালে আরাফায় গিয়েছেন। কিন্তু অনেকে একটা ভুল করে থাকে যে, তারা আট তারিখে মিনাতে না এসে সরাসরি আরাফায় চলে যাওয়া। আবার অনেক মিনায় যায় ঠিকই কিন্তু মিনায় পর্যাপ্ত স্থান থাকা সত্ত্বেও মিনার বাইরে অবস্থান করে। সুন্নাহ হল সকালে মসজিদে হারামে ফজরের সালাত আদায় করে, বাসায় এসে গোসল করে, পরিস্কার পরিছন্ন হয়ে, ইহবার বেঁধে, তারবিয়া পাঠ করতে করতে মিয়ার চলে যাওয়া। আর কেরান ও ইফরাদ হাজ্জি, যাদের ইহরাম বাধা আছে তারা ফজরের সালাত আদায় করে, বাসায় এসে গোসল করে সকালের নাস্তা খেয়ে মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে।

৪। মিনায় সালাত জমা একটি ভুল আমলঃ

সালাত জমা করার অর্থ হল দুই ওয়াক্তের সালাত কে একত্রে আদায় করা। অর্থাৎ যুহর ও আসরের এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা। সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিতে হাজিরা আরাফাতের ময়দানের জোহর ও আসরের একত্রে আদায় করে। আবার মুজদালীফায় মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করে। কিন্তু মিনায় জোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রিত করে আদায় করতেন না। আর যদি তিনি এমনটি করতেন তাহলে বিষয়টি হাদিসের গ্রস্থে উল্লেখ থাকত। কাজেই আমরা নির্দধায় বলতে পারি মিনায় সালাত জমা একটি ভুল আমল।

মিনা থেকে আরাফাতের দিকে যাত্রাঃ

জিলহজ্জের নয় তারিখ হল “ইয়ামুল আরাফ” বা আরাফার দিন। আরাফার দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করা সর্বসম্মতি ক্রমে ফরজ। যতি কেউ জিলহজ্জের নয় তারিখ আরাফায় অবস্থান না করে হজ্জের সকল কাজ সমাধা করে তবেও তার হজ্জ হবে না। কোন প্রকার দম দিয়াও এর ক্ষতি পূরণ হবে না। কাজেই এই দিন সম্পর্কে শতর্ক থাকি।

জিলহজ্জের নয় তারিখ মিনা থেকে আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সকালে মিনায় ফরজের সালাত আদায় করে। সূর্য় উদয়ের পর আস্তে আস্তে আরাফার দিকে রওয়ানা দিতে তবে। এই সময় হেঁটে আরাফায় যাওয়া সুন্নাহ তবে বাহন ব্যবহার করায় কোন ক্ষতি নাই। অনেক সময় দেখা যায় মহিলা ও মাজুর হাজিগণ আট তারিখ দিবাগত রাত্রিতে গাড়িতে করে আরাফার ময়দানে যায়। উজর বসত যাওয়া সঠিক হলেও অনেকেই তাদের সাথে রাত্রিতে আরাফাতের ময়দানে যায় যা সু্ন্নাহ সম্মত নয়।

৬। সর্বনিম্ম কখন আরাফার ময়দানে পৌছাতে হবে?

মিনা থেকে ফজরের সালাত আদায় করে হালকা খাবার খেয়ে আরাফাতের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিতে হবে। হেঁটে আরাফায় যাইতে ৩/৪ ঘন্টা লাগতে পারে। কোন সমস্যা নাই কেননা, দুপুরে সূর্য পশ্চিমে ঢলার পর থেকে আরাফার প্রকৃত সময় শুরু হয়। তবে ইমাম হাম্বলের মতে সেদিনের সকালের ফজর উদয় হওয়া থেকেই এ সময় শুরু হয়। আর এর শেষ সময় হল আরাফার দিবাগত রাত্রির ফজর উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।

দলিলঃ ১. আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ হজ্জ হলো আরাফায় (অবস্থান)। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৯)

২. বুকাইর ইবনে আতা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। আমি আবদুর রহমান ইবনে ইয়ামুর আদ-দায়লী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরাফাতে উপস্থিতকালে তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলাম। নাজদ এলাকার কতক লোক তাঁর নিকট হাযির হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! হজ্জ কিভাবে সম্পন্ন হয়? তিনি বলেনঃ ‘‘আরাফাতে অবস্থান হচ্ছে হজ্জ’’। অতএব যে ব্যক্তি মুজদালিফার রাতে ফজর নামাযের পূর্বেই আরাফাতে এসে পৌঁছলো তার হজ্জ পূর্ণ হলো। মিনায় তিন দিন (১১, ১২ ও ১৩ যুলহিজ্জা) অবস্থান করতে হয়। কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি দু’ দিন অবস্থানের পর চলে আসে, তবে তাতে কোন গুনাহ নেই। অতঃপর তিনি কোন ব্যক্তিকে নিজ বাহনের পেছনে উঠিয়ে নিলেন এবং সে উচ্চস্বরে একথা ঘোষণা করতে থাকলো। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০১৫)

বুকায়র ইবন আতা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি আবদুর রহমান ইবন ইয়া’মার দীলী (রাঃ) -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ আমি আরাফায় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে দেখেছি, তাঁর কাছে নাজদ হতে কতিপয় লোক এসে তাদের একজনকে তারা প্রতিনিধি নিযুক্ত করে, সে তাঁকে হজ্জ সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে, তিনি বলেনঃ হজ্জ হলো আরাফায় অবস্থান। যে ব্যক্তি মুযদালিফায় রাতে ভোরের সালাতের পূর্বে সেখানে আগমন করলো, সে তার হজ্জ পেল। মিনার দিন হচ্ছে (তিন দিন) যে ব্যক্তি দুই দিনের পর তাড়াতাড়ি চলে যায়, তার কেন পাপ নেই। আর যে ব্যক্তি দেরি করে তারও কোন পাপ নেই। তারপর তিনি একজন লোককে তাঁর পশ্চাতে আরোহণ করান, যিনি এ কথাগুলো লোকের মধ্যে প্রচার করছিলেন। (সুনানে নাসাঈ ৩০৪৪)

মন্তব্যঃ অনিবার্য কারণবশতঃ দিনের বেলায় আরাফায় যেতে পারল না। পৌঁছল ঐ দিন রাতের বেলায়। ফলে শুধু রাতের অংশেই সেখানে অবস্থান করল। এ ক্ষেত্রে আরাফাতে কিছুক্ষণ অবস্থান করলে তার হজ্জ হয়ে যাবে। মুযদালিফায় গিয়ে রাতের বাকী অংশ যাপন করবে।

আরাফার দিনে মর্যাদা ও ফযীলতঃ

১. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, এমন কোন দিন নেই, যে দিন আরাফার দিন হতে অধিক বান্দা অথবা বান্দীকে মহান মহিয়ান আল্লাহ্‌ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি সেদিন (বান্দার) নিকটবর্তী হন এবং তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে তাদের (মর্যাদার) ব্যাপারে গর্ব করে বলেন, এরা কী কামনা করে? আবূ আবদুর রহমান (রহঃ) বলেন : এই হাদীসের রাবী (ইউনুস) সম্ভবত, ইউনুস ইব্‌ন ইউসুফ, যার কাছ থেকে ইমাম মালিক (রহঃ) হাদীস বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন। (সুনানে নাসাঈ ৩০০৩)

২. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরাফাতের দিন জাহান্নাম থেকে যতো অধিক সংখ্যক বান্দাকে নাজাত দেন, অন্য কোন দিন এতো অধিক বান্দাকে নাজাত দেন না। মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ এ দিন (বান্দার) নিকটবর্তী হন, অত:পর তাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের নিকট গৌরব করে বলেন, তারা কী চায়? (ইবনে মাজাহ ৩০১৪, সহিহ মুসলিম ১৩৪৮)

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যিলহজ্জ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললেনঃ “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নি। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (সহিহ হাদিসে কুদসি ১০১ এবং ইবনে হিব্বান)

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা‘আলা আরাফার লোকদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন, তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ তারা এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় আমার কাছে এসেছে”। [(সহিহ হাদিসে কুদসি ১০২ এবং ইবনে হিব্বান)

৩. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল ইয়াউমুল মাওউদ”— (সূরা বুরুজ ২) অর্থ- কিয়ামতের দিন; “আল-ইয়াউমুল মাশহুদ”— (সূরা হুদ ১০৩) অর্থঃ আরাফাতে (উপস্থিতির) দিন এবং “আশ-শাহিদ” (সূরা বুরুজ ৩) অর্থঃ জুমুআর দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ যে সমস্ত দিনে সূর্য উদিত হয় ও অস্ত যায় তার মাঝে জুমুআর দিনের তুলনায় বেশি ভাল কোন দিন নেই। এ দিনের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, ঠিক সে সময় কোন মুমিন বান্দা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করলে তার প্রার্থনা তিনি কবুল করেন এবং যে বস্তু (অনিষ্ট) হতে সে আশ্রয় প্রার্থনা করে তা হতে তিনি তাকে আশ্রয় দান করেন।(তিরমিজি ৩৩৩৯)

৪. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ‘আরাফাতের মাঠে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে অবস্থান করছিলেন, আকস্মাৎ তিনি তাঁর সওয়ারী হতে পড়ে গেলে তাঁর ঘাড় ভেঙ্গে যায় অথবা সওয়ারীটি তার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। (ফলে তিনি মারা যান)। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে কুলগাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ পানি দ্বারা গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে কাফন দাও। তবে তার শরীরে সুগন্ধি মাখাবে না আর তার মাথা ঢাকবে না এবং হানূতও লাগাবে না। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা তাকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন। (সহিহ বুখারি ১৮৫০, সহহি মুসলিম ২৭৮২)

উপরের সহিহ হাদিসের আলোকে আরাফাতের ফজিলত নিম্মরূপঃ

১) মহান আল্লাহ এই দিনে জাহান্নাম থেকে অধিক সংখ্যা বান্দাকে মুক্তি দেন।

২) এই দিনে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার নিকটবর্তী হন।

৩) ফেরেশতাদের কাছে বান্দার (মর্যাদার) ব্যাপারে গর্ব করে এবং প্রশ্ন করেন, তারা কি চায়?

৪) মহান আল্লাহ এই দিনে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হন।

৫) আল্লাহর কাছে ঐ দিনের চেয়ে উত্তম আর কোন দিন নেই।

৬) আরাফার দিনে মৃত ব্যক্তিকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন

৭) এই দিনকে পরিত্র কুরআনে “আল-ইয়াউমুল মাশহুদ” (সূরা হুদ ১০৩) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরাফায় অবস্থান নিম্মের কাজগুলো করা ভালঃ

(১) গোসল করে নেয়া,

(২) পরিপূর্ণ পবিত্র থাকা

আরাফার ময়দানে হাজীদের করণীয়

১। মসজিদে নামিরার নিকটে অবস্থান করাঃ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনা থেকে যখন রওয়ানা হলেন, তখন কুরাইশরা সন্দেহাতীতভাবে মনে করছিল যে, তিনি মাশ‘আরে হারাম (অর্থাৎ) ‘মুযদালিফাতেই।] অবস্থান করবেন এবং সেখানেই তাঁর অবস্থানস্থল হবে। কেননা, কুরাইশরা জাহেলী যুগে এরকম করত। কিন্তু রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশ‘আরে হারাম অতিক্রম করে আরাফার নিকট উপনীত হলেন এবং নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।  এই কারনে আরাফায় পৌঁছে মসজিদে ‘নামিরা’র কাছে অবস্থান করা মুস্তাহাব অর্থাৎ উত্তম। সেখানে জায়গা না পেলে আরাফার সীমানার ভিতরে যে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারেন। এতে কোন অসুবিধা নেই।

দলিলঃ

১. ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার দিন ভোরে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেই (মিনা হতে) রওয়ানা করে আরাফাহ্তে এসে পৌঁছে ‘নামিরাহ’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। এটা আরাফার সেই স্থান যেখানে ইমাম (আরাফার দিন) অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর যুহর সলাতের ওয়াক্ত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাড়াতাড়ি সলাতের জন্য রওয়ানা হলেন এবং যুহর ও ‘আসরের সলাত একত্রে আদায় করে লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, তারপর সেখান থেকে প্রস্থান করে আরাফাহ্‌র ময়দানের অবস্থান স্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন। (সুনানে আবু দাইদ ১৯১৩)

২. জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফর করে যখন আরাফাতে আসলেন এবং ‘নামিরা’ নামক স্থানে তাঁর জন্য একটি নির্দিষ্ট তাবু খাটানো হয়েছে দেখতে পেলেন, তখন তিনি সেখানে অবতরণ করলেন। যখন সূর্য ঢলে পড়লো তখন তখন তাঁর নির্দেশে ‘কাসওয়া’ নামক উষ্ট্রীর পিঠে হাওদা লাগানো হলো। তারপর যখন ‘বাতনুল ওয়াদী’ তে পৌঁছালেন, সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তারপর বিলাল (রাঃ) আযান ও ইকামত বললেন। তিনি যোহরের সালাত আদায় করলেন, পুনরায় ইকামত বলার পর আসর আদায় করলেন এবং এই দুই সালাতের মধ্যে আর কোন সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬০৪)

৩. উবাইদুল্লাহ ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু আকরাম আল-খুযাঈ (রাঃ) হতে তাঁর পিতার সূত্রে থেকে বর্ণিত, তিনি (আবদুল্লাহ) বলেন, আমি আমার পিতার সাথে নামিরার সমতল ভূমিতে অবস্থান করছিলাম। ইতিমধ্যে একদল সাওয়ারী (আমাদের) পার হয়ে গেল। হঠাৎ দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন। রাবী বলেন, যখন তিনি সাজদাহ্‌য় যেতেন তখন আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখে নিতাম। (সুনানে তিরমিজি ২৭৪, ইবনু মাজাহ৮৮১ হাদিসের মান সহিহ)।

২।  আরাফার ময়দানের বাহিরে অবস্থান না করাঃ

তবে পাশেই ‘উরানা’ নামের একটি উপত্যকা আছে। সেটি আরাফার চৌহদ্দির বাইরে। কাজেই সেখানে যাবেন না। ঐখানে অবস্থান করবেন না।

দলিলঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (হজ্জে) কুরায়শরা মুযদালিফায় অবস্থান করতো (আরাফায় যেত না) এবং তাদেরকে বলা হতো ‘হুমছ’। আর আরবের অন্যান্য লোকেরা আরাফায় অবস্থান করতো। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া ত’আলা তাঁর নবীকে আরাফায় অবস্থান করতে এরপর সেখান হতে রওনা হতে আদেশ করলেন। এ প্রসঙ্গে মহান মহিয়ান আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করলেনঃ (আরবি) (অর্থ: তোমরা সেখান (আরাফা) থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, যেখান থেকে লোকেরা ফিরে যায়। (সুনানে নাসাই ৩০১২)

ইয়াযীদ ইবনু শাইবান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু মিরবা আনসারী (রাঃ) আমাদের নিকটে আসলেন। আরাফাতের এমন এক জায়গায় আমরা অবস্থান করছিলাম যাকে আমর (রাঃ) (ইমামের স্থান হতে) বহু দূর বলে মনে করছিলেন। ইবনু মিরবা আনসারী (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিনিধি হিসাবে আমি তোমাদের নিকটে এসেছি। তিনি বলেছেনঃ হজ্জের নির্ধারিত স্থানসমূহে তোমরা অবস্থান কর। কারণ, তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর ওয়ারিসী প্রাপ্ত হয়েছ। (তিরমিজি ৮৮৩ ও ইবনু মাজাহ ৩০১১)।

৩। সালাত জমা করাঃ

যুহরের সময় হলে ইমাম সাহেব খুৎবা দেবেন। খুৎবার পর যুহরের ওয়াক্তেই যুহর ও আসরের সালাত একত্রে জমা করে পড়বেন। দু’ নামাযেরই আযান দেবেন একবার, কিন্তু ইকামাত দেবেন দু’বার। কসর করে পড়বেন। অর্থাৎ যুহর দু’রাকআত এবং আসরও দু’রাকআত পড়বেন। যুহরের ওয়াক্তেই আসর পড়ে ফেলবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসী ও বহিরাগত সব হাজীকে নিয়ে একত্রে এভাবে নামায পড়িয়েছিলেন। এটা সফরের কসর নয়, বরং হজ্জের কসর। কোন নফল-সুন্নাত নামায আরাফায় পড়বেন না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েননি।

দলিলঃ

ইব্‌নু উমর (রাঃ) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম (রহঃ) বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে ‘আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও ‘আসর এক সাথেই আদায় করতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? (সহিহ বুখারি ১৬৬২)

আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন।(সহিহ বুখারি ১৬৭৪)

৪। মসজিদে নামিরায় যাওয়া সম্বব না হলে নিজ তাবুতে সালাত আদায়ঃ

মসজিদে নামিরায় যেতে না পারলে নিজ নিজ তাবুতেই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে জামা‘আতের সাথে যুহর-আসর একত্রে যুহরের আউয়াল ওয়াক্তে দুই দুই রাক‘আত করে কসর ও জমা করে পড়বেন।

দলিলঃ

ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাতের ময়দানে ‘নামিরা’ উপত্যকায় অবতরণ করেছিলেন। রাবী বলেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, যুবায়ের (রাঃ) কে হত্যা করার পর বিন উমার (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করে পাঠায় যে, আজকের এ দিনের কোন সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (খোতবা দিতে মাঠের কেন্দ্রস্থলে) রওয়ানা হতেন? তিনি বলেন, সেই সময় উপস্থিত হলে স্বয়ং আমরাই রওয়ানা হবো। অতএব তিনি কখন রওয়ানা হন তা লক্ষ্য করার জন্য হাজ্জাজ একজন লোক পাঠায়। বিন উমার (রাঃ) যখন রওয়ানা হওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? লোকেরা বললো এখনও ঢলেনি। তিনি বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? তারা বললো, এখনও ঢলেনি। কিছুক্ষণ পর তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, সূর্য কি ঢলে পড়েছে? তারা বললো, হাঁ। তারা যখন বললো, সূর্য ঢলেছে তখন তিনি রওয়ানা হলেন। (ইবনে মাজাহ ৩০০৯ সনদ হাসান)

আরাফার ময়দানে বেশী বেশী দোয়া এবং জিকির করাঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান কালে হাজ্জিদের প্রধান কাজই হলো দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ তালাস করা। এই দিনে মহান আল্লাহর ক্ষমা প্রদানে ঘোষনা আছে। তাই, ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য এই দিনে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহ প্রশংসাসহ জিকির এবং কুনআন তিলওয়াত মাধ্যমে অতিবাহিত করা উত্তম। এই জন্য আরাফাতে ময়দানে যাওয়া আগেই দোয়া করার প্রতস্তি নিতে হবে এবং যে দোয়াগুলো করবে তার অর্থ জেনে নিবে। অর্থ না জানলে মনে ভীতরে কোন আবেগের সৃষ্ট হবে না। হাদীসে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাক্যে দোয়া করা উত্তম কারন, এই দোয়াগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং অধিক উপকারী। তবে বান্দা ইচ্ছা মনের আবেগ দিয়ে তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় দোয়া করতে পারে। এতে করে তার চাহিদামত দোয়া করা সম্বব হবে। দোয়া করার সময় নিম্মের বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে আশা করি দোয়া কবুলের সহায়ক হবে। বিষয়গুলে হলোঃ

০১. আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে দোয়া করা

০২. দোয়ার আগে আল্লাহর প্রতি ‘হামদ’ (প্রশংসা)। (যেমনঃ আয়তুল কুরাসী, সুরা হাসরের শেষ তিন আয়াত তিলওয়াত করা)

০৩. রাসুলের প্রতি ‘সালাত’ (দরুদ) পাঠ করা

০৪. কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা

০৫. হাদিসে বর্ণিত বাক্যে দোয়া করা

০৬ আরাফার ময়দানে দু’হাত উঠিয়ে দোয়া করা

০৭. মনকে বিনম্র ও খুশু-খুযু রেখে মুনাজাত করা

০৮. এখলাস বা নিষ্ঠার সঙ্গে দোয়া করা

০৯. আল্লাহর প্রশংসাসূচক গুণবাচক নামের সঙ্গে দোয়া করা।

১০. কেবলামুখী হয়ে হাত উঠিয়ে দোয়া করা

১১. দোয়া কবুলের প্রচণ্ড আশা নিয়ে দোয়া করা

১২. অশ্রুসিক্ত হয়ে দোয়া করা

১৩. দোয়ার সময় কণ্ঠস্বর নীচু রাখা, উচ্চঃস্বরে দোয়া না করা

১৪. একান্তে দোয়া করা এবং

১৫. দৃঢ়তার সঙ্গে দোয়া করা

১৬. দোয়া কবুলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করা

আরাফাতের ময়দানে প্রধাণ আমলই হলো, দোয়া ও জিকির। সহিহ হাদিসে বর্ণিত এমনই কিছু দোয়া জিকির উল্লেখ করব। আপনি চাইলে এর মাধ্যমে আরাফাতের ময়দানে দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে সময় কাটাতে পারেন।

ক। হাদিসে বর্ণিত কিছু দোয়া নিম্মে উল্লেখ করা হলোঃ

আরাফাতের ময়দানে বেশী বেশি ইস্তিগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। বান্দা অন্যায় করে আর মহান আল্লাহ ক্ষমা করেন। ক্ষমা লাভের প্রধান হাতিয়ার হল ইস্তিগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর  ক্ষমা  লাভের  জন্য  তাঁর  কাছে  ক্ষমা  প্রার্থনা  করতে  হবে।  আল্লাহ  বলেন,

* وَاسْتَغْفِرُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ*

অর্থঃ ‘আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়। (সুরা বাকারা ২:১৯৯)

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللّهَ يَجِدِ اللّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا

অর্থঃ যে গোনাহ, করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়। (সুরা নিসা ৪:১০০)

১. আবূ বুরদাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী আগার্‌র (রাঃ) থেকে শুনেছি যে, ইবনু উমর (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর। কেননা আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক একশ’ বার তাওবা করে থাকি। (সহিহ মুসলিম হাদিস ৬৬১৩ ইফাঃ)

২। আবূ মালিক আশজায়ী (রহঃ) তাঁর পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই দুআ শিক্ষা দিতেনঃ

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي

“হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি রহম করুন, আমাকে হিদায়াত করুন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন।” (সহিহ মুসলিম ৬৬০৪ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

 ৩. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বলে দু‘আ করতেন,

(اللَّهُمّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ)

‘হে আমাদের প্রভু! এ দুনিয়াতেও আমাদের কল্যাণ দান কর এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান কর এবং দোজখের ‘আযাব থেকে আমাদের রক্ষা কর’’ (সূরাহ আল-বাকারাহ ২:২০১)। (সহিহ বুখারি ৪৫২২)

৪. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা (বল)

 *(اللَّهُمّ إنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ، وَمِنْ دَرَكِ الشِّقَاءِ، وَمِنْ سُوْءِ الْقَضَاءِ، وَمِنْ شَمَاتَةِ الْأعْدَاءِ)*

(আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন জাহদিল বালা-ই ওয়া মিন দারাকিশ শিকা-ই, ওয়া মিন সুইল কাযা-ই। ওয়া মিন শামাতাতিল আ‘দা-ই)

অর্থঃ হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করছি বিপদ-আপদের কষ্ট হতে, দুর্ভাগ্য হওয়া থেকে, মন্দ ফায়সালা হতে এবং শত্রুদের খুশী হওয়া থেকে। (সহিহ বুখারি ৬৬১৬)

৫। আবূ মালিক (রহঃ) এর পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছেন যে, তাঁর কাছে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যখন আমার রবের কাছে প্রার্থনা করব তখন কিভাবে তা ব্যক্ত করব? তিনি বললেন, তুমি বল,

(,اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَعَافِنِي وَارْزُقْنِي))

অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমার প্রতি রহম করুন, আমাকে মাফ করে দিন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন। আর (দু’আ করার সময়) বৃদ্ধাঙ্গুলী ব্যতীত সব আংশুল একত্র করবে। (তিনি বললেন) এই শব্দগুলো তোমার দুনিয়া ও আখিরাতকে একত্র করে দেবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬০৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ সাধারণত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা দোয়া তিনবার করে করতেন। কিন্তু আরাফার মাঠে পুনরাবৃত্তি করতেন আরো বেশী পরিমাণে। তাই আপনি ইচ্ছা করলে একই দোয়া বার বার করতে পারেন। এই সময় কান্নাকাটি করে মাতা-পিতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য বেশী বেশী দোয়া করতে হবে। এমনটি হজ্জে গমন করার জন্য যারা দোয়া চেয়েছে তাদের নাম ধরে ধরে দোয়া করা। সবার নাম নেয়া সম্ভব না হলে বললে, হে আল্লাহ যারা যারা আমার নিকটি তোমার কাজে দোয়া করতে বলেছে, তাদের সকলের মনে নেক আশা তুমি কবুল কর।  

খ। জিকির সম্পর্কিত হাদিসগুলো হলোঃ

১. আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) কর্তৃক পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সনদে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরাফাতের দিনের দু’আই উত্তম দুআ। আমি ও আমার আগের নাবীগণ যা বলেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্তম কথা। (তা হলো)

*لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ*

(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু, লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হাম্দু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর)

অর্থঃ আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, সার্বভৌমত্ব তারই এবং সমস্ত কিছুর উপর তিনি সর্বশক্তিমান”। (তিরমিযী ৩৫৮৫, আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)

২. আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন যে কিতাবুল্লাহর একটি অক্ষর পড়ল তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি অবধারিত। এবং তাকে একটি নেকির দশ গুণ ছাওয়াব প্রদান করা হবে। আমি বলছি না আলিফ লাম মীম একটি অক্ষর বরং আলিফ একটি অক্ষর, এবং লাম একটি অক্ষর, এবং মীম একটি অক্ষর। (তিরমিজি-২৭৩৫)।

৩. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই আমার এ (বাক্যে) বলা, সুবহান আল্লাহ, আলহামদুল্লিল্লাহ, অ-লাইলাহ ইল্লাহল্লাহ, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর এবং আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই, আল্লাহ মহান) পাঠ করা আমার অধিক পছন্দনীয় সে সব জিনিসের চাইতে, যার উপর সূর্য উদিত হয়। (সহিহ মুসলীম ৬৬০২ ইফাঃ)।

৪। মুসআব ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন যে, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসা ছিলাম। তখন তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ কি প্রতিদিন এক হাজার নেকী অর্জন করতে সক্ষম? তখন সেখানে উপবিষ্টদের মধ্য থেকে এক প্রশ্নকারী বলল, আমাদের কেউ কিভাবে এক হাজার নেকী অর্জন করতে পারবে? তিনি বললেনঃ যে একশ’বার তাসবীহ (سبحان الله ) পাঠ করলে তার জন্য এক হাজার নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে (অথবা) এবং তার থেকে এক হাজার গুনাহ মিটিয়ে দেওযা হবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬০৭ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৫। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার ফাতিমা (রাঃ) একজন খাদিমের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন এবং কাজের অভিযোগ করলেন। তিনি বললেনঃ আমার কাছে তো কোন খাদিম নেই। তিনি বললেনঃ তবে আমি কি তোমাকে এমন কিছুর কথা বলবনা, যা তোমার খাদিম থেকে উত্তম? তা হল রাতে শয্যা গ্রহণের সময় তুমি ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। (সহিহ মুসলিম ৬৬৭০ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৬। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

* لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهْوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ  *

(এই বাক্যটি) যে ব্যাক্তি দিনের মধ্যে একশ বার পড়বে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই, রাজত্ব একমাত্র তারই, হামদ তারই, সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান” সে একশ গোলাম আযাদ করার সাওয়াব অর্জন করবে এবং তার জন্য একশটি নেকী লেখা হবে, আর তার একশটি গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হবে। আর সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটা তার জন্য রক্ষা কবচে পরিণত হবে এবং তার চাইতে বেশী ফযীলত ওয়ালা আমল আর কারো হবে না। তবে যে ব্যাক্তি এ আমল তার চাইতেও বেশী করবে। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬১ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৭। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যাক্তি প্রত্যহ একশত বার (سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ -আল্লাহ পবিত্র ও সমস্ত প্রশংসা তাঁরই) সুবাহানআল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলবে তার গুনাহগুলি মাফ করে দেওয়া হবে তা সমুদ্রের ফেনা পরিমান হলেও। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন, সহিহ মুসলিম ৬৫৯৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

৮। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুটি বাক্য এমন যে, মুখে তার উচ্চারন অতি সহজ্জ কিন্তু পাল্লায় অনেক ভারী, আর আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। তা হলঃ সুবাহানআল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবাহানআল্লাহিল আযীম। (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর ৫৯৬৪ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

৯। আবু হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক সকালে ও বিকালে একশত বার বলেঃ সুবাহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী”, কিয়ামতের দিন তার চাইতে উত্তম (আমালকারী) আর কেউ হবে না। তবে যে লোক তার ন্যায় কিংবা তার চাইতে অধিক পরিমান তা বলে (সে উত্তম ‘আমালকারী বলে গণ্য হবে)। (তিরমিজী ৩৪৭৯ হাদিসেরমান সহিহ)।

১০। জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমি বলতে শুনেছি : “লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” অতি উত্তম যিক্‌র এবং “আলাহামদু লিল্লাহ্‌” অধিক উত্তম দু‘আ। (সুনানে তিরমিজি ৩৩৮৩, ইবনে মাজাহ ৩৮০০)

১১। ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মি’রাজের রাতে আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ” আপনার উম্মাতকে আমার সালাম পৌছিয়ে দিন এবং তাদেরকে জানান যে, জান্নাতের যামীন অতীব সুগন্ধি সমৃদ্ধ এবং সেখানকার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু। তা একটি সমতল ভূমি এবং তার গাছপালা হল “সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামৃদু লিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার”। (তিরমিজি ৩৪৫২ হাদিসের মান হাসান সহিহ)।

১২। আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্‌ তা’আলার নিরানব্বইটি নাম আছে অর্থাৎ এক কম এক শত। যে লোক এই নামসমুহ মুখস্ত করবে বা পড়বে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি ৩৫০৬, মিশকাত ২২৮৮, সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।

মন্তব্যঃ কাজেই আরাফাতের ময়দানে কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে কোন বাক্য মহান আল্লাহ তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর ইত্যাদি পড়া যায়।

আরাফা দিবসের ভুল-ত্রুটিঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের অন্যতম ফরজ কাজ। আরাফাতে ঠিক মত আস্থান না হলে তার হজ্জ হবে না। কাজেই এই স্থানে ভূলত্রুটিগুলির প্রতি একটু বেশী খেয়াল রাখতে হবে।

১। আরাফাতের বাইরে অবস্থার করাঃ

আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেনঃ হজ্জ হলো আরাফায়। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৯)

মন্তব্যঃ এই কারনে যদি কেউ আরাফার সীমানায় প্রবেশ না করে তার হজ্জ হবে না। ঠিক তেমনিভাবে কেউ যদি যথাযথ ইহরান বেধে মিনায় না গিয়েও সরাসরি সূর্যাস্তের আগে আরাফায় ময়দানে ঢুকতে পারে এবং বাকি কাজে ঠিক মত আদায় করে তবে তার হজ্জ আদায় হবে বলে ধরা হয়। আলাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হবে। কিন্তু কেউ যদি সূর্যাস্তের আগে আরাফায় ময়দান ত্যাগ করে তবে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। কোন প্রকার দম দিলেও হজ্জ আদায় হবে না। কারন ফরজ ছুটে গেলে দম দ্বারা পূর্ণ হয় না। আরাফার অবস্থান করা ছিল ফরজ। হজ্জের ফরজ কখনও দম দ্বারা আদায় হয় না। এখান আর একটি কথা মনে রাখতে হবে মাসজিদে নামিরার সম্মুখভাগের অংশটি আরাফার সীমানার বাইরে। কাজেই এখান অবস্থান করলে ফরজ আদায় কবে না। তাই আগে ভাগে আরাফার ম্যাপ দেখে নিজের অবস্থান ঠিক করে নিবেন। না বুঝলে অন্যের দ্বারা হলেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

২। হাজ্জিগণ আরাফার দিনের সিয়াম রাখবে নাঃ

আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃরাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (সুনানে তিরমিজি ৭৪৯ ও ইবনু মাজাহ ১৭৩০)

আবূ ক্বাতাদাহহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আরাফার দিনের রোযা রাখলে আল্লাহ্‌র নিকট আশা রাখি যে তিনি বিগত এক বছরের ও আগামী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

আরাফার দিনের সিয়াম পালন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। বিশেষ করে মাঠে অবস্থানকারী হাজীদের জন্য ঐ দিন রোযা না রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ রোযা না রাখাই বিধান। কারণ খানাপিনা না খেলে এ কঠিন ইবাদতের জন্য শরীরে শক্তি পাবে না। হজ্জের এ পরিশ্রান্ত ইবাদত যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য শক্তির প্রয়োজন। তাই খাবার গ্রহণ করা জরুরী। নিম্মের হাদিসটি একটু লক্ষ করুন।

মায়মূনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওম পালন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৯৮৯)

উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আরাফার দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। (সহিহ বুখারী ১৬৫৮ তাওহিদ এবং ১৫৫৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আরাফার দিনে হাজিদের সিয়াম পালণ একটি ভুল আমল।

৩। আরাফার ময়দানে নফল সালাতঃ

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যিলহজ্জ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললেনঃ “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেনঃ আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নি। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (হাদিসে কুদসি ১০১ ও ইব্‌ন হিব্বান)

উসামা ইবন যায়দ (রাঃ) বলেন, আমি আরাফায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে একই বাহনে সাওয়ার ছিলাম। তিনি দু‘আয় উভয় হাত উত্তোলন করলেন এমন সময় তার উট তাঁকে নিয়ে একদিকে হেলে গেল, ফলে তার নাকের রশি পড়ে যেতে লাগলো, তিনি তাঁর এক হাতে তা ধরে ফেললেন, এ সময় তাঁর অন্য হাত উঠানোই ছিল। (সুনানে নাসাঈ ৩০১৪)

আরাফার ময়দানেরাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত তুলে দোয়া করেছেন। এই স্থান অনেক কে দেখা যায় দোয়া না করে নফল সালাত আদায় করে যা মুলত একটি ভুল আমন। এখানে জোহর ও আসর সালাত কে জমা করে আদায় করার বিধান দেয়া হয়েছে। তাই নফল সালাত আদায় করা ঠিন নয়। আরাফা হল দোয়া কবুলের স্থান তাই এখানে হাত তুলে একাকী দোয়া করতে হবে। এখানে তাবলীগের বিশ্ব ইজতিমার মত সম্মিলিত দোয়া কোন ব্যবস্থা করা হয় না কারন এখান একাকী দোয়া করাই সুন্নাহ সম্মত আমল। কিন্তু দোয়ার সময় একটি বিষয় খুব লক্ষ করবেন। যেন কোন অবস্থায়ই কিবলাকে পিছনে রেখে জাবালে আরাফার দিকে মুখ করে দুআ করা যাবে না।

৪। জাবালে রহমত থেকে পাথর সংগ্রহঃ

আরাফাতের ময়দানে অনেক পাহাড় আছে। একটি পাহাড়ের পাদদেশে বিদায় হজের খুতবা দিয়েছিলেন। সেই পাহাড়টি যাতে সহজে চিনতে পারেন এজন্য এই চিহ্ন সেখানে স্থাপন করা হয়েছে। এই পাহাড়ের নাম জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। জাবালে রহমত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর বিশেষ কোন ফজিলত বর্ণিত হয়নি। তারপরও অনেক হাজি জাবালে রহমত কে তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় মনে করে সেখান থেকে বরকতের আশায় পাথর সংগ্রহ করা। যা একটি ভূল ধারন ও কাজ।

৫। জাবালে রহমত সামনে রেখে কাবাকে পিছনে রেখে দোয়া করাঃ

আরাফাতের ময়দানে অনেক পাহাড় আছে। একটি পাহাড়ের পাদদেশে বিদায় হজের খুতবা দিয়েছিলেন।

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আরাফা থেকে মুজদালিফার আসা ও মুজদালিফার আমলসমূহ হলো :

১। আরাফা থেকে মুজদালিফার প্রত্যাবর্তনঃ

২। আরাফা হতে প্রত্যাবর্তনে চলার গতিঃ

৩।  পথী মধ্যে অজু করছেন কিন্তু সালাত আদায় করেন নাইঃ

৪। সালাত জমা করে আদায় করাঃ

৫। মুযদালিফায় রাত্রিযাপনঃ

৬। দুই সালাতের মাঝে কোন নফল সালাত নাইঃ

৭। আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করাঃ

৮। ফরজের সালাত আদায় করে কিছু সময় দোয়াকরাঃ

৯। মিনায় আসার পথে পাথড় কুড়ানঃ

১। আরাফা থেকে মুজদালিফার প্রত্যাবর্তনঃ

যখন সূর্য ডুবে যাবে এবং সূর্য অস্ত গিয়েছে এরূপ নিশ্চিত হবেন তখন প্রশান্ত মনে ধীরে সুস্থে মুযদালিফায় রওয়ানা দেবেন। এ সময় বেশী বেশী তালবিয়াহ পড়তে থাকবেন। সাবধান, কোন অবস্থাতেই সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা যাবে না। তবে সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরাফাতে মাগরিবের নামায না পড়ে মুযদালিফায় রওয়ানা দেবেন। পৌঁছতে দেরী হলেও মাগরিব-এশা মুযদালিফায়ই পড়তে হবে। এ দেরীকে কাযা মনে করবেন না। সেদিনের জন্য এটাই নিয়ম। তবে যদি ঈশার সালাত কাজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে পথিমধ্যেই মাগরিক ও ঈশার সালাত আদায় করা।

সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরাফাত থেকে যখন মুযদালিফায় রওয়ানা সময়টি খুবই কঠিন। আরাফাতের ময়দানে সারাদিন অবস্থানের পর সবাই মুজদালিফায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয় থাকে। অনেক আসরের সালাতের পরই গাড়িতে বসে অপেক্ষা করে থাকে। কারন হাজিদের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম। কাজেই মহিলা ও মাজুল ছাড়া সকলের উচিত হেটে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যাওয়া। সূর্যাস্তের সাথে সাথে প্রায় ত্রিশ/চল্লিশ লক্ষ লোক এক সময়ে একযোগে আরাফা থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা দেয়। অভিজ্ঞতা বলে গাড়ি থেকে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় হেটে যাওয়া অনেক সহজ্জ। কারন গাড়ির তুলনায় হাজিদের সংখ্যা বিশ ত্রিশ গুন বেশী। যেখান ভিড়ের কারনে হেটে যাওয়াই কষ্টকর সেখান গাড়িতো চলারই কথা নয়। বিষয়টি বাস্থবেও তাই ট্রাফিকজ্যাম কতটা কঠিন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। মাঝে মধ্যে গাড়ীগুলো এমনভাবে থেমে থাকে মনে হয় যেন আর চলবে না। যদি সকল গাড়ি ড্রাইভার মক্কা বা সৌদিবাসি হত তবে যাতায়তে একটু সুবিধা হত। কিন্তু বেশির ভাগ ড্রাইভার বিদেশী ও নতুন তারা ঠিক মত মক্কার রাস্তাঘাট চিনে না। তাই তারা অনেক সময় ভুল রাস্তা অনুসরণ করে। অনেক সময় হাজিদের পথি মধ্যে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘‘সব রাস্তা বন্ধ, গাড়ী আর চলবে না। অনেক গাড়িতে বসে থাকে কেউ রাত দুইটায়, কেউ রাত ৩টায় কেউ আবার রাত চারটায় মুজদালিফায় পৌছায়।  এমন কি যারা গাড়িতে আসেন তাদের কোন কোন গাড়ি ফজরের আগে মুযদালিফায় পৌঁছতেই পারে না। অথচ আরাফা থেকে মুযদালিফার দূরত্ব মাত্র ৬ থেকে৭ কিলোমিটার।

হাজি ও গাড়ির ড্রাইভার দুই জনই নতুন থাকায় অনেকে মুজদালিফার সীমান চিনতে পারেনা। ট্রাফিকজামে বসে থাকতে থাকতে মনে হয়, মুজদালিফায় পৌছে গেছি। তাই তারা ভুলে মুজদালিফায় পৌছার পূর্বেই মুজদালিফা এসে গেছে ধারণা করে মাঝপথে মাগরিব এশা পড়ে ও রাত্রি যাপন করে। তাদের দেখাদেখি অনেক বিদশী হাজিও এই একই ভুল করে। অবশেষে ফজর বাদ মুযদালিফার সীমানায় এসে সাইনবোর্ড দেখে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আক্ষেপ করেঅ। এভাবে হজ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় অনেক হাজীর। কিন্তু  যারা হেটে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যাবে তাদের এই ভুল হওয়া সম্ভাবনা নাই। কেননা, শুধু হাঁটার জন্য আলাদা পথ রয়েছে, যা সমতল ও পীচ ঢালা। এ পথে কোন যানবাহন ঢুকেনা। তাই হাঁটতে বেশ আরাম। রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি থাকে। মেঘবৃষ্টি সাধারণতঃ হয় না। আবহাওয়া থাকে ভাল। সকলেই একযোগে একমুখী চলা। সবার মুখে একই তালবিয়া ‘‘লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক…’’ প্রয়োজনে রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে পারেন। দলবদ্ধ হয়ে পথ চললে ভাল হয়। যাদের সাথে নারী ও শিশু থাকবে তারা হেটে আসার সময় একটু সতর্ক থাকবেন। কেননা, অনেক সময় ভিড়ের কারণে হারিয়েও যায়। হারিয়ে গেলে চিন্তায় খুবই কষ্ট পাবেন। এই জন্যই সাথে শিশু ও নারী থাকলে বিশেষ সাবধান অবলম্ভন করতে হবে। নতুবা নারী-শিশুদেরকে বাসেই আনবেন। এই হিসাবে একান্ত মাজুর, অতি বৃদ্ধ, মহিলা, শিশু, দুর্বল ও রোগী হলে গাড়িতে যাওয়া ভাল। তা না হলে সবার জন্যই আরাফাত থেকে মুযদালিফায় হেটে যাওয়া খুবই উত্তম হবে। সে জন্য আগে থেকেই নিয়তের পাশাপাশি প্রস্ততি সরূপ আরাফাতের ময়দানে হালকা বিছানা পত্র ছাড়া ভারী কোন লাগেজ না নেয়াই ভাল।

আরাফা হতে প্রত্যাবর্তনে চলার গতিঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে তার ভাই ফায্‌ল ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাহনে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আরাফাতে সন্ধ্যাবেলা এবং মুযদালিফায় ভোরবেলা লোকদের উদ্দেশে বললেন, যখন তারা অগ্রসর হচ্ছিল- “তোমরা ধীরে-সুস্থে অগ্রসর হও।” তিনিও নিজে উষ্ট্রীর গতি ধীর করে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং এভাবে মুহাস্‌সির পৌঁছলেন- যা মিনার অন্তর্গত। তিনি (এখানে) বললেন, তোমরা নুড়ি পাথর তুলে নাও যা জামরায় নিক্ষেপ করা হয়।

রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরায় পাথর নিক্ষেপ পর্যন্ত অনবরত তালবিয়াহ্‌ পাঠ করতে থাকলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮০)

 ‘উরওয়াহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, উসামাহ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন আমি সেখানে উপবিষ্ট ছিলাম, বিদায় হজ্জের সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ‘আরাফা হতে ফিরতেন তখন তাঁর চলার গতি কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্রুতগতিতে চলতেন এবং যখন পথ মুক্ত পেতেন তখন তার চাইতেও দ্রুতগতিতে চলতেন।

(সহিহ বুখরি ১৬৬৬)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি ‘আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে ফিরে আসছিলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিছনের দিকে খুব হ্যাঁকডাক ও উট পিটানোর শব্দ শুনতে পেয়ে তাদের চাবুক দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেনঃ হে লোক সকল! তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন কর। কেননা, উট দ্রুত হাকানোর মধ্যে কোন কল্যাণ নেই। (সহিহ বুখরি ১৬৭১)

৩।  পথী মধ্যে অজু করছেন কিন্তু সালাত আদায় করেন নাইঃ

১. উসামাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার ময়দান হতে রওনা হলেন এবং উপত্যকায় পৌঁছে নেমে তিনি পেশাব করলেন। অতঃপর উযূ করলেন কিন্তু উত্তমরূপে উযূ করলেন না। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র রসূল! সালাত আদায় করবেন কি?’ তিনি বললেনঃ ‘সালাতের স্থান তোমার সামনে’। অতঃপর তিনি আবার সওয়ার হলেন। অতঃপর মুযদালিফায় এসে সাওয়ারী থেকে নেমে উযূ করলেন। এবার পূর্ণরূপে উযূ করলেন। তখন সালাতের জন্য ইক্বামাত দেওয়া হলো। তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সকলে তাদের অবতরণস্থলে নিজ নিজ উট বসিয়ে দিলো। পুনরায় ‘ইশার ইক্বামাত দেয়া হলো। অতঃপর তিনি ‘ইশার সালাত আদায় করলেন এবং উভয় সালাতের মধ্যে অন্য কোন সালাত আদায় করলেন না। (সহিহ বুখারি ১৩৯)

২. উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করছিলেন তখন তিনি একটি গিরিপথের দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মিটিয়ে উযূ করলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সালাত আদায় করবেন? তিনি বললেনঃ সালাত তোমার আরো সামনে।(সহিহ বুখারি ১৬৬৭)

৩. উসামাহ ইব্‌নু যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আরাফা হতে ফেরার সময় গিরিপথে অবতরণ করে পেশাব করলেন এবং অযূ করলেন। তবে পূর্ণাঙ্গ অযূ করলেন না। আমি তাঁকে বললাম, সালাত? তিনি বললেন, সালাত তো তোমার সামনে। অত:পর তিনি মুযদালিফায় এসে অযূ করলেন এবং পূর্ণাঙ্গ অযূ করলেন। অত:পর সালাতের ইক্বামাত হলে তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। এরপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে উট দাঁড় করিয়ে রাখার পর সালাতের ইক্বামাত দেয়া হলো। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। ‘ইশা ও মাগরিবের মধ্যে তিনি আর কোন সালাত আদায় করেননি। (সহহি বুখারি ১৬৭২)

৪. নাফি‘ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত এক সাথে আদায় করতেন। এছাড়া তিনি সেই গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করতেন যে দিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম গিয়েছিলেন। আর সেখানে প্রবেশ করে তিনি ইসতিনজা করতেন এবং অযূ করতেন কিন্তু সালাত আদায় করতেন না। অবশেষে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছে সালাত আদায় করতেন। (সহহি বুখারি ১৬৬৮)

৫. নাফি‘ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সালাত এক সাথে আদায় করতেন। এছাড়া তিনি সেই গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করতেন যে দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিয়েছিলেন। আর সেখানে প্রবেশ করে তিনি ইসতিনজা করতেন এবং উযূ করতেন কিন্তু সালাত আদায় করতেন না। অবশেষে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছে সালাত আদায় করতেন।(সহিহ বুখারি ১৬৬৮)

সালাত জমা করে আদায় করাঃ

মুযদালিফায় রাত্রিযাপন হজ্জের একটি ওয়াজিব আমল। এই আমল কোনভাবেই ত্যাগ করা যাবে না। আরাফা থেকে মুজদালিফায় এসে প্রথম কাজ মাগরিব ও এশা জমা করে কসর আদায় করা। বিলম্ব হলেও মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব-এশা পড়তে হবে, এর আগে নয়। এই দুই সালাতকে বিলম্ব করতে করতে অর্ধ রাত্রির পরে নিয়ে যাওয়া জায়েয হবে না। তবে উজর থাকলে জায়েয।

দলিলঃ

১. আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন। (সহহি বুখারি ১৬৭৪)

২. সালামা ইব্‌ন কুহায়ল (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রাঃ) -কে দেখেছি যে, তিনি (মুযদালিফায়) মাগরিবের তিন রাক‘আত এবং ইশার দুই রাক‘আত সালাত আদায় করেন এবং বলেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) তাঁদেরসহ এই স্থানে এরূপ করেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই স্থানে এরূপই করেছিলেন। (সুনানে নাসাঈ ৪৮১)

৩. উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আরাফাহ্ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর সওয়ারীতে পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। উপত্যকায় পৌঁছে তিনি তাঁর উটনী বসালেন, এরপর প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য গেলেন। তিনি ফিরে এলেন। আমি পাত্র থেকে পানি ঢেলে দিলাম এবং তিনি ওযূ করলেন, এরপর সওয়ার হলেন এবং মুযদালিফায় পৌঁছে তিনি মাগরিব ও ‘ইশার সালাত একত্রে আদায় করলেন।  (সহিহ মুসলিম ২৯৯৫)

৪. সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র(রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ইব্‌ন উমর (রাঃ) যখন আরাফাত হতে মুযদালিফার দিকে রওয়ানা করেন, তখন আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। মুযদালিফায় এসে তিনি মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করলেন। সালাত সমাপ্ত করে বললেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই স্থানে এইরূপ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ৬০৬)

৫. জাবির ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলতে চলতে মুযদালিফায় পৌঁছলেন। সেখানে এক আযান ও দুই একামতের সাথে মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করলেন। এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সময় কোন সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬৫৬)

৬. জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাহর ময়দানে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে যুহর ও ‘আসরের সলাত আদায় করেছেন। কিন্তু এ দুই সলাতের মধ্যখানে কোনো তাসবীহ পড়েননি। অনুরূপভাবে তিনি মুযদালিফায় এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং দুই সলাতের মাঝখানে কোন তাসবীহ পড়েননি। (আবু দাউদ ১৯০৬)

৭. হাকাম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (রাঃ) আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মুযদালিফায় মাগরিবের তিন রাক‘আত এবং ইশার দুই রাক‘আত সালাত আদায় করেন। এরপর বলেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) এরূপ করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –ও এরূপ করেছেন। (সুনানে নাসাঈ ৪৮৩)

৮. আশ্‘আস ইবনু সুলাইম (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাযি.)-এর সাথে আরাফা থেকে মুযদালিফা পর্যন্ত আসি। মুযদালিফায় আসা পর্যন্ত তিনি তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করেছেন। এরপর তিনি আযান ও ইকামাত দেন অথবা এক ব্যক্তিকে নির্দেশ করলে সে আযান ও ইকামাত দিলে তিনি আমাদেরকে নিয়ে মাগরিবের তিন রাক‘আত সালাত আদায় করলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, সালাত। অতঃপর নিয়ে তিনি দুই রাক‘আত ‘ইশার সালাত আদায় করলেন। এরপর রাতের খাবার আনতে বললেন। বর্ণনাকারী আশ‘আস বলেন, ‘ইলাজ ইবনু ‘আমর, ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে আমার পিতা বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে ইবনু ‘উমার (রাযি.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এভাবেই সালাত আদায় করেছি। (আবু দাউদ ১৯৩৩)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (মুযদালিফায়) মাগরিব ও ‘ইশার সলাত একত্রে (একই সময়ে কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন নিয়্যাতে) আদায় করেছেন। তিনি এক ইক্বামাতেই মাগরিবের সলাত তিন রাক‘আত এবং ‘ইশার সলাত দু’রাক‘আত আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ৩০০৫)

মুযদালিফায় রাত্রিযাপনঃ

সালাত আদায় শেষ হওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়বেন যাতে পরবর্তী দিনের কার্যাবলী সক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা যায়। ঘুমানো জন্য স্থান পাওয়া খুবই কষ্ট কর তারপর ক্লান্ত শরীরে ঘুম এসে যাবে। ধনী-গরিব আজ এক কাতারে মাটিতে গড়াগড়ি দেয়ার সময়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই।

দলিলঃ

‘আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কুরায়শগণ এবং তাদের ধর্মের অনুসারীরা (জাহিলী যুগে) মুযদালিফায় অবস্থান করত। তারা নিজেদের নামকরণ করেছিল ‘আল-হুম্‌স’। আর সমস্ত আরববাসীরা ‘আরাফাতে অবস্থান করত। যখন ইসলামের আবির্ভাব হ’ল, আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘আরাফায় অবস্থান করার ও সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। আল্লাহর বাণীর তাৎপর্যও তাই :‘‘অতঃপর অন্যান্য লোক যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে, তোমরাও সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করবে”- (সূরাহ্‌ আল বাক্বারাহ্‌ ২ : ১৯৯)। (সহিহ মুসলিম ২৮৪৪)

১. জাফর ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, আমরা জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) এর কাছে আগমন করলাম, তিনি আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুযদালিফার সমস্ত স্থানই মওকিফ বা অবস্থানের জায়গা।(সুনানে নাসাঈ ৩০৪৮)

২. জাবির (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি আরাফার এ স্থানে অবস্থান করেছি। কিন্তু পুরো আরাফাই অবস্থানের স্থান। আর আমি মুযদালিফার এ স্থানে অবস্থান করেছি। তবে মুযদালিফার পুরো এলাকাটিই অবস্থান স্থল। আমি মিনার এ স্থানে কুরবানী করেছি। মিনার পুরো এলাকাই কুরবানীর স্থান। কাজেই তোমরা তোমাদের নিজ নিজ অবস্থানে কুরবানী করো।(আবু দাউদ ১৯৩৬)

৩. জুবাইর ইবনু মুত‘য়িম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার একটি উট হারিয়ে ‘আরাফার দিনে তা তালাশ করতে লাগলাম। তখন আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ‘আরাফায় উকূফ করতে দেখলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো কুরায়শ বংশীয়। (সহিহ বুখারি ১৬৬৪)

৪. জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফাহর ময়দানে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে যুহর ও ‘আসরের সলাত আদায় করেছেন। কিন্তু এ দুই সলাতের মধ্যখানে কোনো তাসবীহ পড়েননি। অনুরূপভাবে তিনি মুযদালিফায় এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং দুই সলাতের মাঝখানে কোন তাসবীহ পড়েননি। আবু দাউদ ১৯০৬)]

৬। দুই সালাতের মাঝে কোন নফল সালাত নাইঃ

মাগরিবের তিন রাকাত ফরজ, এশার দুই রাকাত ফরজ এবং বিতর পড়তে হবে। এই দুই ওয়াক্ত সালাতের জন্য মাত্র একবার আযান এবং দুই বার ইকামাত দিতে হবে। কোন নফল সুন্নাত নামায নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় পড়েননি। কাজেই ঘুম বাদ দিয়ে নফল-সুন্নাত  সালাত আদায় করা সুন্নাহ সম্মত নয়।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশা এক সাথে আদায় করেন। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা ইকামত দেয়া  হয়। তবে  উভয়ের  মধ্যে বা পরে তিনি কোন নফল সালাত আদায় করেননি। (সহিহ বুখারি ১৬৭৩)

২. আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুযদালিফায় দু’ সালাত একত্রে আদায় করেছেন এবং দু’ সালাতই তিনি এক ইকামতসহ আদায় করেন এবং দু’ সালাতের কোন সালাতেরই পূর্বে বা পরে কোন নফল সালাত আদায় করেন নি। (সুনানে নাসাঈ ৬৬০)

৩. ইবন শিহাব (রহঃ) বলেনঃ উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবদুল্লাহ তাঁকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তার পিতা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন, এবং উভয় সালাতের মধ্যে কোন নফল আদায় করেন নি। মাগরিব আদায় করেন তিন রাকআত, ইশার সালাত আদায় করেন দুই রাকআত। আবদুল্লাহ্ ইবল উমর (রাঃ)-ও এরূপ একত্রে আদায় করতেন, মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত। (সুনানে নাসাঈ ৩০৩২)

৪. ইবনু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশা একসাথে আদায় করেন। প্রত্যেকটির জন্য আলাদা ইকামত দেওয়া হয়। তবে উভয়ের মধ্যে বা পরে তিনি কোন নফল সালাত আদায় করেননি। (সহিহ বুখারী ১৫৬৮ ইফাঃ)

৭। আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করাঃ

১. ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ইশা ও মাগরিবের সলাতকে মুযদালিফায় একত্রে আদায় করা এবং পরের দিন ফাজ্‌রের সলাত ওয়াক্তের পূর্বে (আউয়াল ওয়াক্তে) আদায় করে নেয়া, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এই দুই সলাত ছাড়া কোন সলাত ওয়াক্তের পূর্বে আদায় করতে দেখিনি। (আবু দাউদ ১৯৩৪)

২. আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কোন সালাত তার নির্ধারিত ওয়াক্ত ছাড়া আদায় করতে দেখেনি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশার সালাত ব্যতিক্রম এবং পরবর্তী ভোরে ফজরের সালাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৬ ইফাঃ)

৩. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দু’টি সালাত ব্যতীত আর কোন সালাত তার নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত আদায় করতে দেখিনি। তিনি মাগরিব ও ‘ইশা একত্রে আদায় করেছেন এবং ফজরের সালাত তার ওয়াক্তের আগে (আউয়াল ওয়াক্তে) আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮২)

৪. আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্ধারিত ওয়াক্তেই সলাত আদায় করতে দেখেছি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ‘ইশার সলাত আদায় করেছেন এবং রাতের ভোরে ফজরের সলাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছে। (সহিহ মুসলিম ৩০০৭)

৫. আসমা (রাঃ)-এর আযাদকৃত গোলাম ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ, তিনি বলেন, আমাকে আসমা (রাঃ) মুযদালিফাহ্ অবস্থানকালে জিজ্ঞেস করলেন, চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, না। অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ সলাত আদায় করলেন। পরে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে বৎস! চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সাথে রওনা হও। আমরা রওনা হলাম এবং জামরাহ্ (পৌঁছে) তিনি কাঁকর নিক্ষেপ করলেন, এরপর নিজের তাঁবুতে সলাত আদায় করলেন। আমি তাকে বললাম, হে সম্মানিত মহিলা! আমরা খুব ভোরে রওনা হয়েছিলাম। তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই হে বৎস! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহিলাদের খুব ভোরে রওনা হবার অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ৩০১৩)

৮। ফরজের সালাত আদায় করে কিছু সময় দোয়াকরাঃ

মুজদালিফায় ফজরের সালাত অন্ধকার থাকতেই আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে হবে। দুই রাকাত ফরজের সাথে দুই রাকাত সুন্নতও পড়বেন। এরপর ‘‘মাশআরুল হারাম’’-এর নিকটবর্তী কিবলামুখী দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে দোয়া-মুনাজাত করা। কাজেই মুজদালিফায় অবস্থান কালে ‘মাশআরুল হারাম’’ নিকটে থাকা উত্তম, তবে দুরে মুজদালিফার যে কোন স্থানে থাকাই সুন্নাহ। ‘মাশআরুল হারাম’’ একটি পাহাড়ের নাম। এটি মুযদালিফায় অবস্থিত। এখানে একটি মসজিদও আছে। এখানে হাজীদের জন্য বিশেষ কিছু আমল আছে তবে আমলগুল জরুরী নয়। আমলগুলো হলঃ

ক। মাশআরুল হারামের নিকট কিবলামুখী হয়ে দাড়িয়ে তাকবীর বলা

খ। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহাম্দু লিল্লাহ’ এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইত্যাদি জিকির করা

গ। খুশু-খুযু ও বিনম্র হয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করা

ঘ। দোয়ার সময় এখানে হাত তুলে মুনাজাত করা মুস্তাহাব

ঙ। এভাবে ফজরের নামাযের পর থেকে মিনায় রওয়ানা হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত দোয়া করা মুস্তাহাব।

দলিলঃ

১. সালিম (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ, তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের আগেই পাঠিয়ে দিয়ে রাতে মুযদালিফাতে মাশআরে হারামের নিকট উকূফ করতেন এবং সাধ্যমত আল্লাহর যিকর করতেন। অতঃপর ইমাম (মুযদালিফায়) উকূফ করার ও রওয়ানা হওয়ার আগেই তাঁরা (মিনায়) ফিরে যেতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ মিনাতে আগমন করতেন ফজরের সালাতের সময় আর কেউ এরপরে আসতেন, মিনাতে এসে তাঁরা কঙ্কর মারতেন। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলতেন, তাদের জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কড়াকড়ি শিথিল করে সহজ্জ করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৬)

২. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী ‘উমরাহ আদায়ের পর যদ্দিন হালাল অবস্থায় থাকবে তদ্দিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধবে। এরপর যখন ‘আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজ্জলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা ‘আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি ‘আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর ‘আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে ‘আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত ‘ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর ‘আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌঁছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহ্কে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’ তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। সহিহ বুখারি ৪৫২১)

৩. বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুযদালিফার দিন ভোরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ হে বিলাল! লোকেদের চুপ করতে বলো। অতঃপর তিনি বলেনঃ এই মুযদালিফায় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করেছেন, তোমাদের উত্তম লোকেদের উসীলায় তোমাদের গুনাহগারদের ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীল ব্যক্তি যা প্রার্থনা করেছে তিনি তাকে তা দিয়েছেন। অতএব তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যাবর্তন করো। (ইবনে মাজাহ ৩০২৪)

৪. সালিম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের আগেই পাঠিয়ে দিয়ে রাতে মুযদালিফাতে মাশ‘আরে হারামের নিকট উকূফ করতেন এবং সাধ্যমত আল্লাহর যিকর করতেন। অতঃপর ইমাম (মুযদালিফায়) উকূফ করার ও রওয়ানা হওয়ার আগেই তাঁরা (মিনায়) ফিরে যেতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ মিনাতে আগমন করতেন ফজরের সালাতের সময় আর কেউ এরপরে আসতেন, মিনাতে এসে তাঁরা কঙ্কর মারতেন। ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলতেন, তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কড়াকড়ি শিথিল করে সহজ্জ করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৬)

মন্তব্যঃ হাজ্জিদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারনে এখান ‘‘মাশআরুল হারাম’’ এর কাছে প্রচন্ড ভীল থাকে। কাজেই ভীড়ের কারণে ‘‘মাশআরুল হারাম’’এর কাছে যেতে না পারলে মুযদালিফার যে কোন স্থানে দাঁড়িয়ে এভাবে দোয়া করা উত্তম। তবে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিক ও ইশার সালাত আদায়ের পর ঘুমাতে হবে। অতপর, আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সুন্নাহসহ ফরজ আদায় করেত হবে। ফজরের ফরজ সালাত আদায়ের পরই কেমল এই জিকির ও দোয়া করতে হবে। যখন আকাশ ফর্সা হবে কিন্তু সূর্য উঠে নাই, এমন সময় মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে।

৯। মিনায় আসার পথে পাথড় কুড়ানঃ

সুন্নাত হলো প্রথম দিনের সাতটি কংকর মাশআরুল হারাম থেকে রওয়ানা দেয়ার পর মুযদালিফা থেকেই কুড়াবেন। এখান থেকে এর বেশী নয়। আর বাকী ৩ দিনের প্রত্যেক দিনের ২১টি করে কংকর মিনা থেকেই কুড়ানো যায়। এটাই সর্বোত্তম পদ্ধতি। তবে হারামের মধ্যবর্তী যে কোন স্থান থেকেই কংকর কুড়ানো জায়েয আছে।

দলিলঃ

১. ফযল ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটের পেছনে বসাছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘আরাফার সন্ধ্যায় ও মুযদালিফায় ভোরে লোকেদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা (অবশ্যই) প্রশান্তির সাথে ধীরে সুস্থে চলবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও নিজের উষ্ট্রীকে মিনার অন্তর্গত মুহাস্‌সির নামক স্থানে না পৌঁছা পর্যন্ত সংযত রেখেছিলেন। এখানে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তোমরা আঙ্গুল দিয়ে ধরা যায় এমন ছোট পাথর জামারাতে মারার জন্য লও’। ফযল বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারায় পাথর মারা পর্যন্ত সব সময় তালবিয়াহ্ পড়ছিলেন। (মিসকাতুল মাসাবিহ ২৬১০ ও সহিহ মুসলিম)

২. ইবন আব্বাস (রাঃ) সূত্রে ফযল ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যিনি (হজ্জের সময়) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে একই বাহনে সওয়ার ছিলেন, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফায় সন্ধ্যায় এবং মুযদালিফায় সকালে লোকদেরকে বললেনঃ যখন তারা (আরাফা ও মুযদালিফা হতে) প্রস্থান করে শান্তভাবে চলো। তিনি তাঁর উটনীর লাগাম টেনে রাখছিলেন। যখন তিনি মুহাস্সিরে -যা মিনার একটি অংশ প্রবেশ করলেন, তখন বললেনঃ তোমরা আংগুলে ছুঁড়ে মারার মত কংকর (পাথরের ছোট ছোট টুকরা) সংগ্রহ কর। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তালবিয়া পড়তে থাকলেন, জামরাতুল আকাবায় কংকর মারা করা পর্যন্ত। (সুনানে নাসাঈ ৩০২০)