মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ

মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুযদালিফা থেকে মিনা যাত্রা কালে সুন্নাহ হলোঃ

১। সূর্য উঠার আগেই মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হতে হবে

২। দুর্বল ব্যক্তিদের আগেভাগে মুযদালিফা ত্যাগ কার জায়েয

৩। মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে ধীর স্থিরভাবে চলতে হবে

৪। ওয়াদী মুহাসসির নামক স্থানে দ্রুত চলা

৫। বড় জামারায় পৌছার পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা

১। সূর্য উঠার আগেই মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হতে হবেঃ

ফজরের সালাত আদায় না করা পর্যন্ত মুযদালিফায় থাকতে হবে। তাই আউয়াল ওয়াক্তে ফজরের সালাত আদায় করতে হবে। ফজরের সালাত শেষে  তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল, তাকবীর ও দোয়া শেষ করে, আকাশ ফর্সা হয়ে গেলে সূর্য উঠার আগেই মিনায় রওয়ানা দেবেন। প্রচন্ড ভীড়ের কারণে ট্রাফিক জামের দরুন বাসের অপেক্ষা না করে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দেয়াই ভাল। জাহিলী যুগের লোকেরা মুজদালিফা হতে মিনার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা জন্য সূর্য উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপরীত শিক্ষা আমাদের দিলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন।

দলিলঃ

১. আমর ইব্‌নু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি, ‘উমর (রাঃ) -এর সাথে ছিলাম। তিনি মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আদায় করে (মাশ‘আরে হারামে) উকূফ করলেন এবং তিনি বললেন, মুশরিকরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত রওয়ানা হত না। তারা বলত, হে সাবীর! আলোকিত হও। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিপরীত করলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন। (সহিহ বুখরি ১৬৮৪)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, সূর্য উঠার আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মুযদালিফা হতে) যাত্রা করেন।  (সুনানে তিরমিজি ৮৯৫ হাদিসের মান সহিহ)

৩. আমর ইবনু মাইমূন (রহঃ) বলেন, আমরা মুযদালফায় অবস্থানরত ছিলাম। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তখন বললেনঃ সূর্য না উঠা পর্যন্ত মুশরিকরা এখান হতে রাওয়ানা হত না। তারা বলতঃ হে সাবির। আলোকিত হও। কিন্তু তাদের বিপরীত নীতি অনুসরণ করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অতঃপর সূর্য উঠার পূর্বেই উমর (রাঃ)-ও রাওয়ানা হন। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৬ হাদিসের মান হাসান সহিহ)

৪. আমর ইবনে মায়মুন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সাথে হজ্জ করেছি। আমরা যখন মুযদালিফা থেকে প্রত্যাবর্তন করলাম তখন তিনি বলেন, মুশরিকরা বলতো, হে সাবীর (মুযদালিফার একটি পাহাড়)! উজ্জ্বল হও, আমরা প্রত্যাবর্তন করবো। তারা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (মুযদালিফা থেকে) প্রত্যাবর্তন করতো না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিপরীত আমল করেন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে (মিনার উদ্দেশ্যে) রওয়ানা করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০২২, নাসাঈ ৩০৩৭)

৫. আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উমর (রাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তিনি মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আদায় করে (মাশা’আরে হারামে) উকুফ করলেন এবং তিনি বললেন, মুশরিকরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত রওয়ানা হত না। তাঁরা বলত, হে সাবীর! আলোকিত হও! নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বিপরীত করলেন এবং তিনি সূর্য উঠার আগেই রওয়ানা হলেন। (সহিহ বুখারী ১৫৭৯ ইফাঃ)

২। দুর্বল ব্যক্তিদের আগেভাগে মুযদালিফা ত্যাগ কার জায়েযঃ

দুর্বল নারী ও শিশু এবং অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য অর্ধ রাত্রির পর মুযদালিফা থেকে মিনায় চলে যাওয়া জায়েয হবে। দুর্বল ও অসুস্থদের সাহায্যার্থে তাদের সাথে সুস্থ অভিভাবকরাও যেতে পারবে। এরূপ ওযর ছাড়া মুযদালিফায় ফজর আদায় না করে কারো মিনায় চলে যাওয়া ঠিক হবে না। চলে গেলে দম দিতে হবে।

১. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মুযদালিফায় অবতরণ করলাম। মানুষের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হওয়ার জন্য সওদা (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অনুমতি চাইলেন। আর তিনি ছিলেন ধীরগতি মহিলা। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনুমতি দিলেন। তাই তিনি লোকের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হলেন। আর আমরা সকাল পর্যন্ত সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হলেন, আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। সওদার মত আমিও যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অনুমতি চেয়ে নিতাম তাহলে তা আমার জন্য হতে অধিক সন্তুষ্টির ব্যাপার হতো।(সহিহ বুখারি ১৬৮১, সহিহ মুসলিম ৩০০৯)

২. আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) মুযদালিফার রাতে (মিনা যাওয়ার জন্য) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অনুমতি চাইলেন, তিনি তাঁকে অনুমতি দেন। সওদাহ (রাঃ) ছিলেন ভারী ও ধীরগতিসম্পন্না নারী। (সহিহ বুখারি ১৬৮০)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে মালপত্রের সাথে মুযদালিফা হতে রাত্রিকালে প্রেরণ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৮৫৬)

৪. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারের মধ্যে দুর্বলদের (মুযদালফা হতে মিনায়) আগেই পাঠিয়ে দেন। আর তিনি বলেদেনঃ তোমরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (জামরায়) কংকর নিক্ষেপ করবে না। (সুনানে তিরমিজ ৮৯৩, আবু দাউদ ১৯৪১)

৫. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারে যেসব দুর্বল লোকেদের (মুযদালিফা থেকে মিনায়) আগেভাগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৬)

৬. ফযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ হাশিমের দুর্বলগণকে আদেশ করেন যে, তারা যেন মুযদালিফা থেকে আগে ভাগে চলে যায়।(সুনানে নাসাঈ ৩০৩৭)

মন্তব্যঃ বীনা ওজরে আগেভাগে চলে যাওয়া সঠিক কাজ নয়। যদি কেউ আগেভাগে মিনায় গিয়ে ফজরের সালাত আদায় করে তবে তাকে দম দিতে হবে।

৩। মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে ধীর স্থিরভাবে চলতে হবেঃ

১. আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, যখন তারা সন্ধ্যায় আরাফা ও সকালে মুযদালিফা ত্যাগ করেন, তোমরা ধীর-স্থিরভাবে চল। তখন তিনি তার উটনীর লাগাম টেনে রাখেন। এরপর যখন তিনি মিনায় প্রবেশ করেন তখন তিনি অবতরণ করেন। ‘মুহাসসির’ নামক স্থানে তিনি বলেন : তোমরা ‘খায়ক’ (দুই আংগুলে মারার ছোট) কংকর সাথে নাও, যা জামরায় মারতে হবে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতে ইঙ্গিত করে বলেন, যেরূপ কংকর মানুষ সাধারণত মেরে থাকে। (সুনানে নাসাঈ ৩০৫৮)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্জে ধীরেসুস্থে (মুযদালিফা থেকে) রওয়ানা করেন এবং লোকেদেরও শান্তভাবে রওয়ানা হতে বলেন। (মিনায় পৌঁছার পর) তিনি তাদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন ক্ষুদ্র কাঁকর নিক্ষেপ করে। তিনি নিজে (মুযদালিফা ও মিনার মাঝখানে অবস্থিত) ওয়াদী মুহাসসির দ্রুত অতিক্রম করেন এবং বলেনঃ আমার উম্মাত যেন হজ্জের অনুষ্ঠানাদি শিখে নেয়। কারণ এ বছরের পর হয়তো আমি তাদের সাথে মিলিত হতে পারবো না। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৩)

৪। ওয়াদী মুহাসসির নামক স্থানে দ্রুত চলাঃ

চলার সময় বেশী বেশী লাববাইকা অর্থাৎ তালবিয়াহ ও আল্লাহু আকবার পড়তে থাকবেন। ওয়াদি মুহাস্সির নামক স্থানে পৌঁছলে সামান্য দ্রুত গতিতে হাঁটা মুস্তাহাব, যদি অন্য মানুষকে কষ্ট দেয়া ছাড়া এটি করা যায়, তবেই তা করবেন। ‘‘ওয়াদী মুহাস্সির’’ নামক জায়গাটি মুযদালিফা ও মিনার মধ্যবর্তী একটি উপত্যকার নাম।

দলিলঃ

১. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়াদী মুহাসসারে তার উট দ্রুত হাঁকিয়ে যান। এই হাদীসে বিশর আরো উল্লেখ করেন যে, তিনি শান্তভাবে মুযদালিফা হতে ফিরে আসেন এবং লোকদেরকেও শান্তভাব অবলম্বনের হুকুম দেন। আবূ নুআইম আরো বর্ণনা করেনঃ তিনি নুড়ি পাথর (জামরায়) ছুঁড়ে মারার হুকুম দেন এবং বলেনঃ এই বছরের পর হয়ত আমি আর তোমাদের দেখা পাব না। (সুনানে তিরমিজ ৮৮৬)

২. জা’ফর ইবন মুহাম্মাদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আমি জাবির ইবন আবদুল্রাহ্ (রাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বললামঃ রাসূলুল্রাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হজ্জ সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করুন। তিনি বললেনঃ রাসূলুল্রাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বেই মুযদালিফা ত্যাগ করেন এবং ফযল ইবন আব্বাসকে তাঁর বাহনে তাঁর পেছনে বসিয়ে নেন, মুহাস্সিরে এসে তিনি তাঁর বাহনকে দ্রুতগতিতে পরিচালনা করেন। পরে তিনি সে পথ ধরে চলেন যা তোমাকে জামরায় কুবরায় (বড় শয়তান) পৌঁছে দেবে। এরপর তিনি বৃক্ষের নিকটের জামরায় উপনীত হন এবং সেখানে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করেন। তিনি এগুলোর প্রত্যেকটি নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলেন। তিনি (কংকর) নিক্ষেপ করেন উপত্যকার নিম্নভূমি থেকে। (সুনানে নাসাঈ ৩০৫৪)

৩. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফা হতে শান্তভাবে রওয়ানা হলেন এবং লোকদেরকে ছোট কংকর মারার নির্দেশ দিলেন। তিনি দ্রুত গতিতে মুহাসসির উপত্যকা অতিক্রম করেন। (আবু দাউদ ১৯৪৪)

৫। বড় জামারায় পৌছার পর তালবিয়া পাঠ বন্ধ করাঃ

মিনায় পৌছরা পর যখই বড় জামারায় পৌছাবেন, সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবেন।

দলিলঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ‘আরাফাহ হতে মুয্দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৩)

২. ফাযল ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তার বাহনের পিছনে বসিয়ে এনেছেন। জামরা আকাবায় কংকর মারা পর্যন্ত তিনি অনবরত তালবিয়া পাঠ করেন। (সুনানে তিরমিজি ৯১৮)

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফায় ফায্লকে বাহনে তাঁর পিছনে বসালেন। রাবী বলেন, এরপর ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) আমাকে অবহিত করলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামরাতুল ‘আক্বাবায় পাথর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত অনবরত তালবিয়াহ্ পাঠ করতে থাকেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৯)

কিছু পরামর্শঃ মুজদালিফায় জায়গা বাড়ে নাই বেড়েছে হাজিদের সংখ্যা। তাই ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না। বিছানা বিছানোর মত কোন সুবিধাজনক স্থান পেলেই সালাত আদায়ের সাথে সাথে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে বালু ও ছোট ছোট পাথরের কনা প্রচুর বিধায় ঘুমান কষ্টকর। মহান আল্লাহর ইবাদাতের কথা মনে করে, বালু কণা আর পাথরের টুকরা যাই থাকুক এরই উপর একটি মাদুর বিছিয়ে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে পড়বেন। এখানে প্রায় স্থানেই অজু ও টয়লেটের ব্যবস্থা আছে তার পরও সারা রাত প্রতিটি টয়লেটের সামনে দীর্ঘ লাইন লেগেই থাকে। এজন্য পানি কম খাওয়া ভাল। মুজদালিফা থেকে পায়ে হেঁটে মিনায় পৌঁছতে হবে। গাড়িতে মিনা যাওয়ার কল্পনা করা যায় না। কেননা মানুষের ভিড়ে বাস্তায গাড়ী চলাচলের সুযোগ তাকে না বললেই চলে।

এই দিন সরাসরি মিনায় পাথর নিক্ষেপের জন্য জামারাতে না গিয়ে তাবুতে যাওয়া ভাল। সকলে সবাই জামারাতে যাওয়া চেষ্টা করে বিধায় বিশাল ভিড় লেগে যায়। সকাল ১০/১১ টার দিকে ভিড় একটু কমে যায়। মিনায় তাঁবুতে পৌঁছে নাস্তা খেয়ে একটু বিশ্রাম করে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে কংকর নিক্ষেপ করতে যেতে পারেন। মিনায় তাবুতে পৌছাতে হবে আপনাকে সঠিক লোকেশন জানতে হবে। তাই মুয়াল্লীমকে হাত ছাড়া করা চলবে না। সাথে সাথে নিজের নোটবুকে লিখে রাখুন, কত নম্বর খুঁটির নিকটে মিনায় আপনার তাঁবু। কারণ এখান থেকে হারিয়ে গেলে জনরাশির মহাস্রোতে আপনাকে খুঁজে বের করা খুব দুরহ।

মুজদালিফারভুল-ত্রুটি

মুজদালিফার ভুল-ত্রুটি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সারা দিন আরাফাতে অবস্থানের পর মুজদালিফা যেতে প্রান আনচান করতে থাকে। আগেই বলেছি, যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আরাফাহ থেকে মুজদালিফায় যায় তবে হজ্জ হবে না। কাজেই আরাফাতের ময়দানে বসে, সূর্য অস্ত দেখে, ধীর স্থির ও শান্ত ভাব বজায় রেখে মুযদালিফার পথে রওয়ানা দিতে হবে। মুজদালিফায় পৌছে মাগরিব ও এশার সালাত একত্র আদায় করে জমিনে ঘুমিয়ে পরা। এখানে ঘুমই ইবাদাত। কিছু কিছু মানুষ মুযদালিফার রাত নামায আদায়, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরের মাধ্যমে কাটায়। এটি সুন্নাহ বিরোধী। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ রাতে এ ধরণের কোন ইবাদত করেননি। নিম্মে সুনানে আবু দাউদে সহিহ সনদে বর্ণিত একটি বিশাল হাদিসের অংশ বিশেষ উল্লেখ করছি।

জা‘ফর ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) হতে তাঁর পিতার থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা আমরা জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) এর নিকট যাই। আমরা তার নিকটবর্তী হলে তিনি (অন্ধ হওয়ার কারণে) আগন্তুকদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং এক পর্যায়ে আমার কাছাকাছি এলে আমি বললাম, আমি মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলী ইবনু হুসাইন ইবনু ‘আলী (রাঃ)। আমার কথা শুনে তিনি আমার মাথার দিকে হাত বাড়ান, আমার জামার উপরের ও নিচের বোতাম খুলে তার হাতের তালু আমার বুকের উপর রাখলেন। …………………

অতঃপর বিলাল (রাঃ) (আরাফায়) আযান অতঃপর ইক্বামাত দিলেন। তিনি যুহরের সলাত আদায় করলেন, পুনরায় ইক্বামাত দিলে ‘আসরের সলাত আদায় করলেন। কিন্তু এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অন্য (নফল) সলাত পড়েননি। অতঃপর তিনি কাসওয়া উষ্ট্রীতে আরোহণ করে আরাফাতে অবস্থানের স্থানে এলেন এবং কাসওয়া উষ্ট্রীকে ‘জাবালে রহমাতের’ পাদদেশে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে তিনি পাহাড়কে সামনে রেখে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ালেন। সূর্য ডুবে আকাশের লালিমা কিছুটা মুছে যাওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। সূর্যের লালিমা বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি ‘উসামাকে তাঁর পেছনে সওয়ারীতে বসিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখান থেকে রওয়ানা হলেন এবং উষ্ট্রীর লাগাম শক্ত করে ধরলেন, ফলে উটের মাথা হাওদার সম্মুখভাগের সাথে ছুটতে লাগলো। এ সময় তিনি ডান হাতের ইশারায় বলতে লাগলেন : ধীরস্থিরভাবে পথ চলো, হে লোকেরা, ধীরস্থিরভাবে চলো, হে লোকজন! তিনি কোন বালির টিলার নিকট এলে উষ্ট্রীর লাগাম সামান্য ঢিলা করতেন যাতে তা সহজে টিলায় উঠে সামনে অগ্রসর হতে পারে। অবশেষে তিনি ‘মুযদালিফায়’ উপস্থিত হলেন। এখানে এসে এক আযান ও দুই ইক্বামাতে মাগরিব ও ‘ইশার সলাত একত্রে আদায় করেন। এ দুই সলাতের মাঝখানে তিনি অন্য কোনো (নফল) সলাত পড়েননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম এ স্থানে ভোর পর্যন্ত বিশ্রামকরেন। ফাজ্‌রের সময় হলে তিনি ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেন। তিনি এ সলাত আদায় করেছেন এক আযান ও এক ইক্বামাতে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯০৫)

মন্তব্যঃ এই সহহি হাদিসে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার নামায আদায় করার পর ফজর হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম করেছেন। ফজর হওয়ার পর তিনি ফজরের নামায আদায় করেছেন। তিনি এই রাতে কোন তাহাজ্জুদের নামায, ইবাদত বন্দেগী, তাসবিহ, যিকির-আযকার বা কুরআন তেলাওয়াত নেই।

মুজদালিফার ৯ টি ভুল-ত্রুটি হলঃ

১। মুজদালিফায় আসার জন্য তাড়াহুড়া করা ২। মুজদালিফার বাহিরে অবস্থান করা  ৩। মুজদালিফাতে পৌঁছার আগেই পথিমধ্যে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় ৪। মুজদালিফায় পৌছাতে সালাত কাজা করা

৫। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় না করা ৬। সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করা   ৭। মুযদালিফার উপর দিয়ে যায় কিন্তু কিছু সময়ের জন্যও অবস্থান করে না ৮। মিনা মনে করে মুজদালিফায় অবস্থান করা  ৯। সকল কঙ্কর মুজদালিফায় কুড়ানো জরুরী মনে করা

১। মুজদালিফায় আসার জন্য তাড়াহুড়া করাঃ

 হিশাম (রহঃ) থেকে তার পিতার হতে বর্ণিত। তিনি (উরওয়া) বলেন, উসামা (রাঃ) কে আমার উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসা করা হল অথবা আমি উসামা ইবনু যায়দ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে তাঁর সওয়ারীর পেছনে বসিয়েছিলেন, তখন তিনি কিভাবে চলেছিলেন? তিনি বললেন, তিনি ধীর গতিতে সওয়ারী চলছিলেন, যখন খোলা জায়গা পেলেন, তখন দ্রুতগতিতে চলতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৭৬ ইফাঃ}

মন্তব্যঃ আরাফা থেকে মুযদালিফাতে আসার সময় হাজীসাহেবগণ খুই তাড়াতাড়ি করে থাকেন। সূর্য ডোবার সাথে সাথে সবাই তাড়াহুড়ো করে মুজদালিফার পানে ছুটতে থাকেন। তারা একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করা। এমনকি গাড়িগুলোও ছুটতে থাকে, যার ফলে কখনও কখনও এক্সিডেন্ট হয়। অথচ উপরের হাদিস থেকে বুঝা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফার ময়দান থেকে ধীর গতিতে চলছেন শুধু খোলা জায়গা পেলে দ্রুত গতিতে চলতেন।  অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতেন। আমাদেরও পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলা উচিত।

২। মুজদালিফার বাহিরে অবস্থান করাঃ

কেউ যদি মুজদালিফায় রাত্রিযাপন না করে সরাসরি মিনায চলে যায় তবে তার ওয়াজিব ছুটে যাবে। তাকে দম দিতে হবে। কাজেই মুযদালিফায় অবস্থান না করে মিনায় চলে যাওয়া যানে না। যারা হেঁটে হেঁটে আরাফার ময়দান থেকে মুজদালিফায় যান, তারা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে অক্ষম হয়ে পড়েন। ফলে তারা মুযদালিফাতে পৌঁছার আগেই অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই ফজরের সালাত আদায় করে মীনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। যে ব্যক্তি এমনটি করেছে তার মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন ছুটে গেছে। এর ফলে হাজি সাহেবদের রুকন ছুটে যাবে। কারণ মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন কোন কোন আলেমের মতে, হজ্জের একটি রুকন। এই জন্য হাজীসাহেবের কর্তব্য হচ্ছে, নিজে না জানলে বা না বুঝলে মুয়াল্লিমের মাধ্যমের মুযদালিফাতে রাত্রি নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে মুযদালিফা ত্যাগ ত্যাগ না করা।  কিন্তু অনেকে আছেন যারা মুজদালিফার সীমানাই জনেন না। অনেক গাড়িতে থাকে বিদেশী ড্রাইভার তারাও মুজদালিফার সীমান জানেন না। ফলে না জেনে, মুজদালিফার সীমানার বাইরে অবস্থান করে। এই জন্য হাজি সাহেব ও ড্রাইভার উভয়ের জন্য জরুরী হল মুজদালিফার সীমান জানা। কিন্তু অপারগতা কারনে ভুল হলে মহান আল্লাহ নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি কারও উপর তার সাধ্যের চেয়ে বেশী বোঝা চাপিয়ে দেন না। (২:২৮৬)। আল্লাহু আলাম।

৩। মুজদালিফাতে পৌঁছার আগেই পথিমধ্যে মাগরিব ও এশার সালাত আদায়ঃ

উসামাহ ইবনু যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আরাফা হতে সওয়ারীতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে আরোহণ করলাম। মুযদালিফার নিকটবর্তী বামপার্শ্বের গিরিপথে পৌঁছলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটটি বসালেন। এরপর পেশাব করে আসলেন। আমি তাঁকে উযূর পানি ঢেলে দিলাম। আর তিনি হালকাভাবে উযূ করে নিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সালাত? তিনি বললেনঃ সালাত তোমার আরো সামনে। এ কথা বলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করে মুযদালিফা আসলেন এবং সালাত আদায় করলেন। মুযদালিফার ভোরে ফযল [ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)] আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পিছনে আরোহণ করলেন।  (সহিহ বুখারী ১৬৬৯ তাওহীদ প্রকাশনী, সহিহ মুসলিম ২৯৬৯ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ এই সহিহ হাদিসটি থেকে বুঝা যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফাতে পৌঁছেই সালাত আদায় করেছিলেন। এশার নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশ করার পর তিনি মাগরিব ও এশার নামায জমা করে আদায় করেছেন। তাই কোন ওজর বা অসুবিধা ছাড়াই মুজদালিফাতে পৌঁছার আগে পথিমধ্যে সাধারণ অবস্থার মত মাগরিব ও এশার নামায আদায় করা একটি ভুল আমল। যা সুন্নাতে খেলাপ।

৪। মুজদালিফায় পৌছাতে সালাত কাজা করাঃ

বর্তমানে অনেকই হাঁটার পাশাপাশি গাড়ি করে আরাফা থেকে মুজদালিফায় যায়। কোন কোন গাড়ি মুজদালিফায় হাজিদের নামিয়ে দিয়ে আবার আরাফার ময়দানে হাজিদের নিতে আসে। এই সকল গাড়ি দুই তিন বার আরাফা ও মুজদালিফায় যাতায়াত করে। প্রচন্ড যানজটের কারনে বা বিদেশী অপরিচিত ড্রাইভারের ভুলের কারন আরাফা থেতে মুজদালিফায় যেতে অনেক সময় রাত ৩/৪ টা পর্যান্ত বেজে যায়। যার প্রমান আমি নিজে। আমাদের জামাতে প্রায় ৫০ জনের মত লোক ছিলাম। আমাদের মত পাকিস্থানি ও কয়েকটি জামাত ছিল। আমাদের মত তাদের সাথেও নারী ও শিশু ছিল। আমরা সবাই গাড়ির জন্য অপেক্ষা থাকলাম রাত ১১ টার পর গাড়ি পেলাম রাস্তায় প্রচন্ড যানজট। তাই মুজদালিফায় পৌছাতে আমাদের প্রায় রাত  ৩ টা থেকে ৪ টা বেজে যায়। অর্থৎ আমরা এশার নামাযের ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে মুযদালিফাতে পৌঁছেছিলাম। এখানে মনে রাখতে হবে যদি কোন কারনে এশার সালাতে সময় মুজদালিফায় পৌছাতে না পারি সে ক্ষেত্রে পথিমধ্যেই এশার ও মাগরিবের সালাত আদায় করতে হবে। মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব হলেও, এখানে এসে সালাত জমা করে আদায় করা একটি সুন্নাহ আমল। একটি সুন্নাহকে বাস্তবায়ন করেতে গিয়ে সালাত কাজা করা যাবে না। করন আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

 إِنَّ الصَّلاَةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا

অর্থঃ নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। (সুরা নিসা ৪:১০৩)

এই কারনে সালাত কাজা করে মুজদালিফায় আদায় করা জায়েয নয়। বরং হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন সহহি হাদিসের দলিলের ভিত্তিতে, সালাতকে নির্দিষ্ট সময় থেকে বিলম্বে আদায় করা হারাম। সকল মুসলিমকে সালাতের সময়সীমা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।  

অতএব, হাজীসাহেব যদি এই আশংকা করেন যে, মুযদালিফাতে পৌঁছার আগেই এশার নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে সেক্ষেত্রে তাঁর উপর আবশ্যক হচ্ছে- নামায আদায় করে নেয়া। এমনকি মুযদালিফাতে না পৌঁছলেও; তিনি যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থাতেই নামায আদায় করে নিবেন। যদি তিনি পদব্রজী হন তাহলে দাঁড়িয়ে কিয়াম ও রুক-সিজদাসহ নামায আদায় করে নিবেন। আর যদি আরোহী হন এবং নামা সম্ভবপর না হয় তাহলে গাড়ীতে থেকে হলেও নামায আদায় করে নিবেন। এর দলিলঃ হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআলার বলেন,

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পন্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (সুরা তাগাবুন ৬৪:১৬ )

যদিও গাড়ী থেকে নামতে না পারার সম্ভাবনাটি একেবারেই দূরবর্তী। কারণ প্রত্যেক মানুষই রাস্তার ডানপার্শ্বে বা বামপার্শ্বে নেমে নামায পড়তে পারেন। কারো জন্য মাগরিব ও এশার নামায আদায়ে এত বিলম্ব করা জায়েয হবে না যাতে করে এশার ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।

৫। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় না করাঃ

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কোন সালাত তার নির্ধারিত ওয়াক্ত ছাড়া আদায় করতে দেখেনি। তবে মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশার সালাত ব্যতিক্রম এবং পরবর্তী ভোরে ফজরের সালাত নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৬ ইফাঃ)

মুযদালিফাতে ফজরের সালাত আগে আগে আদায় করা বাঞ্ছনীয়। এর অর্থ এই নয় যে, ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই সালাত আদায় করা। হাজীসাহেবের উপর আবশ্যক হলো, ফজরের ওয়াক্ত হওয়া নিশ্চিত হওয়ার পর বা প্রবল ধারণা হওয়ার পর ফজরের নামায আদায় করা। হাদিসের ভাষ্য মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে আগে আদায় করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায পড়া হবে।  তিনি সাধারনত ফজর ওয়াক্ত হওয়ার একটু পরে সালাত আদায় করেতেন কিন্তু মুজদালিফায় তার সালাত আদায়ের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে অর্থাৎ ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করেছেন।  কিন্তু এ সম্পর্কে ভুল আমল হলোঃ কিছু কিছু হাজীসাহেব ফজরের নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই নামায পড়ে ফেলেন। নামায পড়েই তারা রওয়ানা হয়ে যান। ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায আদায় করলে নামায কবুল হবে না। বরং তা হারাম কাজ। কেননা সেটি আল্লাহ্‌র সীমারেখার লঙ্ঘন। যেহেতু নামাযের ওয়াক্ত নির্ধারিত। শরিয়ত ওয়াক্তের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করে দিয়েছে। অতএব, কারো জন্য ওয়াক্ত হওয়ার আগে নামায আদায় করা জায়েয নয়।

৬। সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করাঃ

আমর ইবন মায়মূন (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলেছেন যে, জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয়ের পূর্বে মুযদালিফা হতে প্রত্যাবর্তন করতো না, যতক্ষণ না সূর্য ‘সাবীর’ পর্বতের উপর দেখা যেত। অতঃপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহার বিপরীত করেন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বেই মুযদালিফা হতে প্রতাবর্তন করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৩৬ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ সূর্য উঠার আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মুযদালিফা হতে) যাত্রা করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৫)

অনেক হাজীসাহেব সূর্যোদয় পর্যন্ত মুযদালিফাতে অবস্থান করে ইশরাকের সালাত আদায় করেন। ইশরাকের সালাত আদায়ের পর মিনার দিকে রওয়ানা হন। এই আমলটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের খেলাফ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফা থেকে আকাশ ভালভাবে ফর্সা হওয়ার পর সূর্যোদয়ের আগেই রওয়ানা হয়েছেন আর জাহিলিয়াতের যুগে লোকেরা সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করত। অতএব, আমাদের আমলকে ত্রুটি মুক্ত করতে চাইলে অবশ্যই ফজরের সালত আদায় করে সূর্যোদয়ের আগেই রওয়ানা দিতে হবে।

একটি সংশয়ের নিরশনঃ  যারা শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর তারা কি ফজরের আগে রওয়ানা দিতে পারবে?

উত্তরঃ হ্যা, যারা শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর তারা ফজরের আগে রওয়ানা দিতে পারবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের মধ্যে যারা শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন তাদেরকে রাত থাকতেই মুযদালিফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছেন। দলিল নিম্মের হাদিসগুলঃ

ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের দুর্বল শ্রেণীকে (নারী ও শিশু) অন্ধকার থাকতে (মুযদালিফা) হতে পাঠিয়ে দিতেন এবং তাদেরকে এরূপ নির্দেশ দিতেন যে, তাঁরা যেন (মিনায় পৌঁছে) সূর্যোদয়ের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ না করে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৩৯ ইফাঃ)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পরিবারের মধ্যে দুর্বলদের (মুযদালিফা হতে মিনায়) আগেই পাঠিয়ে দেন। আর তিনি বলে দেনঃ তোমরা সূর্য না উঠা পর্যন্ত (জামরায়) কংকর নিক্ষেপ করবে না। (সুনানে তিরমিজি ৮৯৩, ইবনে মাজাহ ৩০২৫)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও স্থুলদেহী। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মুযদালিফা থেকে রাত থাকতেই প্রস্থান করার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, হায়! যদি সওদা (রাঃ) এর মত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমিও অনুমতি প্রার্থনা করতাম! আয়িশা (রাঃ) ইমামের সাথে মুযদালিফা হতে রওনা হতেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৮৯ ইফাঃ)

আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমিও যদি সওদা (রাঃ) এর অনুরূপ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করতাম! তিনি মিনায় পৌছে ফজরের সালাত আদায় করেন এবং লোকদের পৌঁছার পূর্বেই জামরায় পাথর নিক্ষেপ করেন। আয়িশা (রাঃ) কে বলা হল, সওদা (রাঃ) কি তাঁর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি ছিলেন স্থুলদেহী এবং ভারী, তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৯০ ইফাঃ)

এখন প্রশ্ন হল, ফজরের ওয়াক্ত এর কত আগে রওয়ানা দেয়া যাবে?

প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে হাদিসটি মনযোগ দিয়ে পড়ি।

আসমা (রাঃ) এর আযাদকৃত গোলাম আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে আসমা (রাঃ) মুযদালিফা অবস্থানকালে জিজ্ঞাসা করলেন, চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, না। অতঃপর তিনি কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। পরে পূনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! চাঁদ ডুবেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমার সাথে রওনা হও। আমরা রওনা হলাম এবং জামরা (পৌঁছে) তিনি কাঁকর নিক্ষেপ করলেন, এরপর নিজের তাঁবুতে সালাত আদায় করলেন। আমি তাকে বললাম, হে সম্মানিত মহিলা! আমরা খুব ভোরে রওনা হয়েছিলাম। তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই হে বৎস! নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের খুব ভোরে রওনা হওযার অনুমতি দিয়েছিলেন। (সহিহ মুসলিম ২৯৯২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কাজেই শারীরিকভাবে দুর্বল (নারী ও শিশু) ও মাজুর ব্যাক্তিগণ আরাফা থেকে মুজদালিফায় নাম মাত্র অবস্থান করে মধ্যরাতের আগেই মিনার দিকে রওয়ানা দেয়া যাবে না। আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থান হল জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ। ঐ রাতের চন্দ্র নিশ্চিতভাবে মধ্যরাতের পরেই অস্ত যাবে এবং তখন রাতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ কেটে যায়। আসমা (রাঃ) সময় সুযোগ থাকা সত্বেও  চন্দ্র অস্ত যাওয়ার পরই মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কাজেই মাজুর হিসাবে মিনায় আগে চলে যাওয়ার সময়টা চন্দ্র অস্ত যাওয়ার সাথে নির্দিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়। কেননা এটা একজন সাহাবীর আমল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবারের যারা দুর্বল ছিলেন তাদেরকে রাতে মুযদালিফা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু রাতের কখন তারা মুযদালিফা ত্যাগ করবে সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। এ সাহাবীর এ আমল সে অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। তাই দুর্বল ও অন্য যাদের জন্য মানুষের ভিড়ে গমন করা কষ্টকর তাদের মুযদালিফা ত্যাগ করার জন্য এ সময়টিকে তথা চন্দ্র অস্ত যাওয়াকে নির্দিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়।

 ৭। মুযদালিফার উপর দিয়ে যায় কিন্তু কিছু সময়ের জন্যও অবস্থান করে নাঃ

সুনানে আবু দাউদ এর একটি সহিহ দীর্ঘ হাদিসের শেষে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ স্থানে ভোর পর্যন্ত বিশ্রামকরেন। ফাজ্‌রের সময় হলে তিনি ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেন। তিনি এ সলাত আদায় করেছেন এক আযান ও এক ইক্বামাতে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯০৫)

অনেক হাজি সাহেব আছেন যারা আরাফা থেকে যাত্রা শুরু করে মুজদালিফার উপর দিয়ে মিনায় চলে যান। তিনি চলার মধ্যেই আছেন এবং অতিক্রম করে যাচ্ছেন; থামছেন না। তিনি বলেন: অতিক্রম করে যাওয়াই তো যথেষ্ট। এটি মহা ভুল। কারণ অতিক্রম করা যথেষ্ট নয়। বরং সুন্নাহ্‌ প্রমাণ করে যে, হাজীসাহেব মুযদালিফাতে ফজরের নামায পড়া পর্যন্ত অব্স্থান করবেন।

সারকথা হলোঃ আল মাশআরুল হারামের নিকটে অবস্থান করে ফজরের শেষ ওয়াক্তে যখন ফর্সা হবে অর্থা  সূর্যোদয়ের পূর্বে, দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই, মিনার উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করবেন।

৮। মিনা মনে করে মুজদালিফায় অবস্থান করাঃ

হাজ্জিদের সংখ্যা বাড়ার কারনে সকল হাজ্জিদের মিনায় জায়গা দেয়া সম্বন হচ্ছে না। তাই বর্তমানে মুযদালিফার কিছু অংশ মিনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ননব্যালটি অধিকাংশ বাংলাদেশী হাজীর মিনার তাঁবু মুযদালিফায় অবস্থিত। এ জায়গাটুকু মিনা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও যেহেতু মৌলিকভাবে তা মুযদালিফার অংশ তাই এ অংশে রাত্রিযাপন করলেও মুযদালিফায় রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। কাজেই যদি কোন উপায়ই মিনা থাকা সম্বব না হয়, সে ক্ষেত্র আলেমদের মত হল মিনা তাবুর সাথে মিজদালিফার তাবু মিলিয়ে স্থাপন করতে হবে। তাহলে ওজরের কারনে আদায় হয়ে যাবে। অনেক মুনাফাখোর এজেন্সিও মিনায় জায়গা ঠিক না করে অনেক সময় মিনার বাহিরে হোটেলে রাখে। যদি হোটেল মিনার সীমানার বাহির হয় তবে তাকে দম দিতে হবে কেননা আগেই উল্লেখ করেছি মিনায় অবস্থা করা একটি ওয়াজিব আমল।

৯। সকল কঙ্কর মুজদালিফায় কুড়ানো জরুরী মনে করাঃ

অনেক হাজী সাহেব মনে করেন, মুযদালিফা থেকে কঙ্কর কুড়ানো ফযীলতপূর্ণ কাজ। এটা একেবারে ভুল ধারণা। বরং যেখান থেকে সহজ হয় সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করা যাবে। তবে বর্তমানে মিনায় গিয়ে কঙ্কর খুঁজে পাওয়া রীতিমতো কষ্টের ব্যাপার। তাই মুযদালিফা থেকে তা কুড়িয়ে নিলে কোনো অসুবিধা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু প্রথম দিনের কঙ্করই মুযদালিফা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। তাই শুধু প্রথম দিনের সাতটি কঙ্কর কুড়িয়ে নিলেই হবে। পরবর্তীগুলো মিনা থেকে নিলে চলবে। আর যদি মনে করেন যে, একবারে সব দিনের পাথর নিয়ে নেবেন তবে তাও নিতে পারেন। সে হিসেবে যদি মিনায় ১৩ তারিখ থাকার ইচ্ছা থাকে তবে ৭০টি কঙ্কর নেবেন। নতুবা ৪৯টি পাথর নেবেন। তবে একেবারে সমান সমান না নিয়ে দু’একটি বেশি নেয়া ভাল। কারণ নিক্ষেপের সময় কোনটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তখন কম পড়ে যাবে। আর সেখানে কঙ্কর পাবেন না।  বুটাকৃতির কঙ্কর নেবেন, যা আঙুল দিয়ে নিক্ষেপ করা যায়। কঙ্কর পানি দিয়ে ধুতে হবে এমন কোনো বিধান নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্কর ধুয়েছেন বলে কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না।

মিনায় অবস্থানের সময় আমল

মিনায় অবস্থানের সময় আমল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মিনায় দ্বিতীয় দফা অবস্থান :

জিলহজ্জের দশ তারিখ মুজদালিফা থেকে দ্বিতীয় দফা মিনায় আসা হয়। এই স্থানে ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্জ অবস্থান করা ওয়াজিব। এই কয় দিন মিনায় অবস্থানের অন্যতম কারন জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ। কঙ্কর নিক্ষেপ হজ্জের একটি ওয়াজিব আমল। মক্কা বা মিনার বাহিরে রাত্রি যাপন করে এসে মিনায় কঙ্কর মারলেই হবে না। সহিহ হাদিসে মিনায় অবস্থান করার কথাই ষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ জিলহজ্জ মিনাতে রাত্রিযাপন করালেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। কোন কারনে ১২ জিলহজ্জ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখও অবস্থান করতে হবে। পরের দিন ১৩ই যিলহজ্জ দুপুরের পর ৩টি জামারাকে আরো ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে পরে মিনা ত্যাগ করতে হবে। তবে ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) এর মতে দুপুরের আগে কঙ্কর মারা জায়েয আছে। কিন্তু একই মাযহাবের তাঁরই দুজন সঙ্গী ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে দুপুরে সূর্য ঢলার আগে কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয হবে না। কাজেই দুপুরের আগে নিক্ষেপ না করাই উত্তম।

মিনায় থাকার হুকুমঃ

বিশুদ্ধ মতে, আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে হাজ্জি সাহেবদের জন্য মিনায় রাত্রিযাপন করা ওয়াজিব। তাই উক্ত দিনগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মিনায় অবস্থায় করতে হবে। হাজী সাহেবগণ যদি কোন রাতই মিনায় যাপন না করেন, তাহলে আলিমদের মতে, তার ওপর দম দেয়া ওয়াজিব হবে। আর যদি কিছু রাত মিনায় থাকেন এবং কিছু রাত অন্যত্র, তাহলে গুনাহগার হবেন। এক্ষেত্রে কিছু সদকা করতে হবে। পারতপক্ষে দিনের বেলায়ও মিনাতেই থাকুন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোও মিনায় কাটিয়েছেন।

দলিলঃ

১. আবদুর রাহমান ইবনু ইয়ামার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ সূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটে নাজদবাসী কিছু লোক আসলো। তিনি তখন আরাফাতে অবস্থান করছিলেন। তারা হজ্জ সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করে। এই মর্মে এক ঘোষণাকারীকে তিনি ঘোষণা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেনঃ হজ্জ হচ্ছে আরাফাতে অবস্থান। মুযদালিফার রাতে ফজর উদয় হওয়ার পূর্বেই কোন লোক এখানে পৌঁছতে পারলে সে হজ্জ পেল। তিনটি দিন হচ্ছে মিনায় অবস্থানের। দুই দিন অবস্থান করে কোন লোক তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছা করলে তাতে কোন সমস্যা নেই। আর তিন দিন পর্যন্ত অবস্থানকে কোন লোক বিলম্বিত করলে তাতেও কোন সমস্যা নেই। মুহাম্মাদ আল-বুখারী বলেন, ইয়াহইয়ার বর্ণনায় আরো আছেঃ এক লোককে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পিছনে আরোহণ করালেন। সে লোক তা ঘোষণা দিতে থাকল। (সুনানে তিরমিজ ৮৮৯, ইবনু মাজাহ (০১৫)।

২. ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘উমর রা. আকাবার ওপারে (মিনার বাইরে) রাত্রিযাপন করা থেকে নিষেধ করতেন এবং তিনি মানুষদেরকে মিনায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দিতেন’। (ইবন আবী শায়বা ১৪৩৬৮)।

উজরের কারনে মিনার রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থানঃ

ইব্‌নু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আব্বাস (রাঃ) পানি পান করানোর জন্য মিনার রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থানের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চাইলেন। তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৫)

হাজ্জীদেরকে পানি পান করানোর জন্য মক্কা অবস্থানঃ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল-‘আব্বাস (রাঃ) হাজ্জীদেরকে পানি পান করানোর জন্য মিনায় অবস্থানের রাতগুলোতে মক্কায় অবস্থান করার অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাকে অনুমতি দেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৫৯)

মিনায় অবস্থান কালে প্রধান আমলঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ বা ঈদের দিনের কাজঃ

মুজদালিফায় থেকে ফজরের পর রওয়ানা দিয়ে মিনায় খুব সকালে পৌছান যায় এবং সূর্যোদয়ের পর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু হয়। কিন্তু মাজুল, দুর্বল, শিশু, নারী ও অক্ষম ব্যক্তিরা যারা মুজদালিফা থেকে মধ্য রাতেই চলে এসেছিল, তারা মধ্যরাত্রির পর থেকে কঙ্কর মারা শুরু করতে পারে। তবে ফজরের আউয়াল ওয়াক্ত থেকে সূর্য উঠার আগেও কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয আছে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে,  এই ঈদের দিনে কঙ্কর নিক্ষেপের উত্তম সময় হল সূর্যোদয় থেকে শুরু করে দুপুরে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত। সন্ধ্যা পর্যন্ত মারাও জায়েয আছে। কারণবশতঃ সন্ধ্যার পর থেকে ঐ দিবাগত রাতের ফজর উদয় হওয়ার আগেও যদি মারে তবু চলবে। তবে এ সময়ে মাকরূহ হবে। আর অন্যান্য দিনে দুপুর পর থেকে মারা সুন্নাহ। জিলহজ্জের দশ তারিখ বা ঈদের দিন সকালে মিনায় পৌছেই বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। মুস্তাহাব হলো এর আগে অন্য কোন কাজ না করা। হারাম শরীফ থেকে মিনায় আসলে ঐ পথে যেটা কাবার নিকটতম সেটাই বড় জামরা। এখন আর এই সব হিসাব করার দরকার নাই। তিনটি জামারা পর পর আছে। কাবা দিক থেকে প্রথম জামারাই হলো বড় জামারাহ।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন জামরাতুল আকাবায় কংকর মেরে মিনায় তাঁর অবস্থান স্থলে ফিরে এসে কুরবানীর পশু আনিয়ে তা যাবাহ করলেন। পরে নাপিত ডাকিয়ে প্রথমে তাঁর মাথার ডান দিকের চুল মুড়ালেন এবং তিনি উপস্থিত লোকদেরকে এক বা দুইগাছি করে চুল বিতরণ করলেন। তারপর মাথার বাম দিকের চুল মুড়ালেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এখানে আবু ত্বালহা আছে কি না? অবশিষ্ট চুলগুলো তিনি আবু ত্বালহা (রাঃ)-কে দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮১)

কঙ্কর নিক্ষেপর আগে জামারার অবস্থান দেখে নিন।

খ। ১১ জিলহজ্জ বা ঈদের পরের দিনের কাজঃ

১০ যিলহজ দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ যিলহজের রাত মিনাতেই যাপন করতে হবে। এটি যেহেতু আইয়ামুত-তাশরীকের রাত তাই সবার উচিত এ সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করা এবং পরদিন ১১ তারিখের আমলের জন্য প্রস্তুত থাকা।

প্রাথমিকভাবে হালাল হওয়ার জন্য সে সকল কাজ করা দরকার তা না করে থাকলে আজ প্রথমেই সেই কাজগুলো করতে হবে। যদি কোন কারনে ১০ তারিখের আমলের মধ্যে হাদী যবেহ, মাথা মু্ণ্ডন বা চুল ছোট করা অথবা তাওয়াফে ইফাযা বা যিয়ারত সম্পাদন বাকি থাকে, তবে তিনি আজ তা সম্পন্ন করতে পারেন। গত কাল শুধু বড় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করেছিল। আজ তিনটি জামরাতেই কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। প্রত্যেক জামরাতে সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। সবগুলোর সমষ্টি দাঁড়াবে একুশটি কঙ্কর। তবে আরো দু’চারটি বাড়তি কঙ্কর সাথে নেবেন। যাতে কোন কঙ্কর লক্ষভ্রষ্ট হয়ে নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পড়ে গেলে তা কাজে লাগানো যায়। আজ ছোট জামরা থেকে শুরু করতে হবে এবং বড় জামরা দিয়ে শেষ করতে  হবে।  কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হলো সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে। এদিন সূর্য হেলে যাওয়ার পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করা জায়েয নয়।

দলিলঃ

১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন সূর্য পূর্ণভাবে আলোকিত হওয়ার পর জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। আর পরের দিনগুলোতে (নিক্ষেপ করেছেন) সূর্য হেলে যাওয়া পর। সহিহ মুসলিম ১২৯৯)

২.  ওয়াবারা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

কঙ্কন নিক্ষেপের যে বিস্তারিত পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে তার অনুসরণেই এই দিনে কঙ্কন নিক্ষেপ করতে হবে। তবে এই দিনে যিনি ইমাম বা ইমামের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তিনি লোকজনের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করবেন। এ খুতবায় তিনি দীনের বিষয়সমূহ তুলে ধরবেন।

দলিলঃ

১. ইবনু আবূ নাজীহ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি তাঁর পিতা থেকে বনী বাকরের দুই ব্যক্তি সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘আইয়্যামে তাশরীকে’ মধ্যের দিন (বারো তারিখ) খুৎবা দিতে দেখেছি। এই সময় আমরা তাঁর সওয়ারীর নিকটেই ছিলাম। মিনাতে এটাই ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেশকৃত খুৎবা। (আবু দাউদ ১৯৫২)

আজকের দিনটি আইয়ামে তাশরীকের অন্তর্ভুক্ত। আইয়ামে তাশরীক হলো আল্লাহর যিকর করার দিন। হাজীদের কর্তব্য স্থান, কাল ও অবস্থার মর্যাদা অনুধাবন করে তদনুযায়ী চলা ও আমল করা। সময়টাকে আল্লাহ তা‘আলার যিকর, তাকবীর বা অন্য কোন নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগানো এবং সব রকমের অন্যায়, অপরাধ, ঝগড়া, অনর্থক ও অহেতুক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা।

১২ জিলহজ্জ দিনের কাজঃ

১২ জিলহজ্জের আমল পুরোপুরি ১১ জিলহজ্জের আমলের মত। এই দিনে হাজ্জি সাহেবগণ সাধারণত ‘মুতা‘আজ্জেল’ তথা দ্রুতপ্রস্থানকারী এবং ‘মুতা’আখখের’ তথা ধীরপ্রস্থানকারী এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যান। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوۡمَيۡنِ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَآ إِثۡمَ عَلَيۡهِۖ لِمَنِ ٱتَّقَىٰۗ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّكُمۡ إِلَيۡهِ تُحۡشَرُونَ ٢٠٣ ﴾

অর্থঃ অতঃপর যে তাড়াহুড়া করে দু’দিনে চলে আসবে। তার কোনো পাপ নেই। আর যে বিলম্ব করবে, তারও কোনো অপরাধ নেই। (এ বিধান) তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় তোমাদেরকে তাঁরই কাছে সমবেত করা হবে। (সুরা বাকারা ২:২০৩)

মুতা‘আজ্জেল বা দ্রুতপ্রস্থানকারী হাজীগন এই দিন মিনা থেকে সূর্যাস্তের পূর্বেই বের যেতে হবে। সূর্য অস্ত গেলে আর বের হওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এবং তিনি মিনায় রাত্রিযাপন করবেন এবং পরের দিন কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন।

কারণ ইবন উমর রা. বলেন, ‘আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝির দিকে (১২ তারিখ) যে ব্যক্তি মিনায় থাকতে সূর্য ডুবে যায়, সে যেন পরদিন কঙ্কর নিক্ষেপ না করে (মিনা থেকে) প্রস্থান না করে। (মুয়াত্তা মালিক ১/১০৪)

যদি দ্রুতপ্রস্থানকারী হাজীগণ বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং চেষ্টা করেছেন তারপরও কোন কারণে বের হতে পারেননি বা পথিমধ্যে সূর্য অস্ত গিয়েছে। তবে তারা অধিকাংশ আলিমের মতে মুতা‘আজ্জেল থাকবেন এবং বের হয়ে যেতে পারবেন। অনুরূপভাবে মুতা‘আজ্জেল হাজীগণ যদি মিনায় তাদের কোন সামগ্রী রেখে আসেন এবং সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা থেকে বের হয়ে যান, তাহলে তারাও ফিরে গিয়ে তা নিয়ে আসতে পারবেন। এ জন্য আর পরদিন থাকতে হবে না।

মুতা‘আজ্জেল বা দ্রুতপ্রস্থানকারী এবং মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজীদের মধ্যে মুতা’আখখের বা ধীরপ্রস্থানকারী হাজ্জি সাহেবগনই উত্তম। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ১৩ তারিখ মিনায় অবস্থান করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর হুবহু অনুসরণের মধ্যেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত। তবে যদি কেউ ১২ তারিখ বিকালে আসতে চায তবে কোন অসুবিধা নাই। যদি কেউ হজ্জের কাজ থেকে বিরক্ত হয়ে শেষ দিন কঙ্কর নিক্ষেপ ত্যাগ করে বা আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনায় মিনা ত্যাগ করে, তবে তার কাজটি তাকওয়ার পরিপন্থি হবে। এই জন্যই সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত ১৩ মিনায় অবস্থান করা। 

মিনায় অবস্থান কালে ফরজ ও ওয়াজিব আদায়ঃ

মিনায় রাত্রি জাপন ওয়াজিব। মিনার এই ওয়াজিব পালনের পাশিপাশি কিছু আমলও চালিতে যেতে হবে। মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার পর চারটি আবশ্যকীয় আমল করেত হবে। কাজ চারটি হলোঃ

১. কঙ্কর নিক্ষেপ করা

২. কুরবানী করা

৩. মাথা মুন্ডন করা বা চুল ছোট করা

৪. তাওয়াফে ইফাদা বা হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা

মন্তব্যঃ এই চারটি কাজের মধ্যে তাওয়াফে ইফাদা ব্যতিত প্রতিটি কাজই ওয়াজিব। তাই কোন কাজ হালকা করে নেয়া যাবে না। মিনায় অবস্থান কাজেই এই ফরজ ও ওয়াজিবগুলো গুরুত্ব দিয় আদায় করতে হয়। তাওয়াফে ইফাদা ব্যতিত বাকি তিনটি কাজই মিনায় করা যায়। তাওয়াফে ইফাদা আদায়ের জন্য মক্কায় গেলেও আবার মিনায় ফিরে এসে রাত্রিযাপন করতে হবে।

দিনের বেলায় মিনা ত্যাগ করাতে অসিবুধা নাইঃ

 মিনায় শুধু রাত্রি জাপন ওয়াজিব। তাই দিনের বেলায় হাজ্জিগন হজ্জের অন্যতম কাজ তাওয়াফে ইফাযা ও সা‘ঈ করার জন্য মক্কায় চলে যেতে পারেন। যারা মক্কা গমন করবে, তাঁদেরকে অবশ্যই তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে মিনায় ফিরে আসতে হবে। আবার অনেকে কুরবানী করার জন্যও মিনার বাহিরে যায়। তাদেরও দিন শেষে আবার মিনায় রাত্রি জাপনের জন্য ফিরে আসতে হবে। মনে রাখা দরকার যে, মিনায় রাত্রিযাপন গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এমনকি সঠিক মতে এটি ওয়াজিব।

দলিলঃ

১. হিশাম ইবনু উরওয়াহ (র) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেছেন মিনায় অবস্থানের রাত্রিসমূহে কেউ যেন মিনা ব্যতীত অন্যত্র রাত্রি যাপন না করে। (মুয়াত্তা মালিক ৯০৫, হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) একক ভাবে বর্ণনা করেছেন)

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন মক্কায় এসে তাওয়াফে যিয়ারত সমাপ্ত করে পুনরায় মিনায় ফিরে এসে সেখানে যুহরের সলাত আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৯৮)

৩. ইবনু ‘উমার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মক্কায় এসে তাওয়াফে যিয়ারা সমাপ্ত করে পুনরায় মিানয়ই ফিরে এসে সেখানে যুহরের সালাত আদায় করেন। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৯৮)

৪. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন মাক্কায় গিয়ে তাওয়াফে ইফাযাহ্ (তাওয়াফে যিয়ারত) করলেন। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিনায় ফিরে যুহরের সালাত আদায় করলেন। (মিসকাত ২৬৫২)

৫. আয়িশাহ্ (রাঃ)] থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের সালাত আদায়ে পর দিনের শেষ বেলায় তাওয়াফে ইফাযাহ্ সম্পন্ন করেন। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার মিনায় ফিরে এলেন এবং সেখানেই আইয়্যামে তাশরীক্বের দিনগুলো অবস্থান করলেন। এ দিনগুলোতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সূর্যাস্তের পর জামারায় সাতটি করে পাথর মারতেন। প্রত্যেক পাথর মারার সাথে সাথে ‘আল্লা-হু আকবার’ বলতেন। আর প্রথম ও দ্বিতীয় জামারার নিকট দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন ও আল্লাহর কাছে (অনুনয়-বিনয় করে) প্রার্থনা করতেন। কিন্তু তৃতীয় জামারায় (পূর্বের ন্যায় পাথর মারার পর) অপেক্ষা করতেন না। (মিসকাত ২৬৭৬, আবূ দাঊদ ১৯৭৩)

মিনায় রাত্রিযাপনের সময় আমলঃ

বলাবাহুল্য, মিনায় রাত্রিযাপনের অর্থ মিনার এলাকাতে রাত কাটানো। রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু ঘুমিয়ে বা শুয়ে থাকতে হবে। সুতরাং যদি মিনায় বসে সালাত আদায় করে, দোয়া যিকর কিংবা কথাবার্তা বলে তাহলেও রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। মিনা রাত্রযাপন কালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছেন। হজ্জের বিধান বর্ণনা করছেন। এমনি কি তিনি সাহাবীদের জন্য ওয়াজ নসিয়ত করেছেন। তাই হাজ্জিদের মিনা অবস্থান কাজে ব্যক্তিগত আমলের পাশাপাশি আলেমদের বক্তব্য শুনার চেষ্টা করতে হবে। নিজ দেশের ও নিজের ভাষার বহু আলেম হজ্জে যায়। তাদের কাছে থেকে ইমল অর্জন করে আমলের চেষ্টা করি।

দলিলঃ

১. আবূ বাক্‌রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানী দিবসে মিনায় ভাষণ দানকালে বলেছেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সন্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদাসম্পন্ন । (উবনু মাজাহ ২৩৩, আহমাদ ১৯৮৭৩)

২. আবূ বাক্‌রাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি একদা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা উল্লেখ করে বলেন, (মিনায়) তিনি তাঁর উটের উপর উপবেশন করলেন। জনৈক ব্যক্তি তাঁর উটের লাগাম ধরে রেখেছিলো। তিনি বললেনঃ ‘এটা কোন্‌ দিন?’ আমরা চুপ করে রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এ দিনটির আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ “এটা কি কুরবানীর দিন নয়?” আমরা বললাম, ‘জি হ্যাঁ।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘এটা কোন্‌ মাস?’ আমরা নীরব রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এর আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ ‘এটা কি যিলহাজ্জ মাস নয়?’ আমরা বললাম, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেনঃ ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদাসম্পন্ন। এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা (আমার এ বাণী) যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এসব কথা পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্তে রাখতে পারবে। (সহিহ বুখারি ৬৭, ১০৫, ১৭৪১, ৩১৯৭, ৪৪০৬, ৪৬৬২, ৫৫৫০)

৩. আবদুর রহমান ইবনু মুয়ায আত-তাইমী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। এ সময় আমরা ছিলাম উৎকর্ণ, যাতে তার বক্তব্য (ভাল করে) শুনতে পাই। আমরা আমাদের নিজ নিজ অবস্থানেই ছিলাম। তিনি তাদের হাজ্জের যাবতীয় বিধি-বিধান শিখালেন, এমনকি কংকর মারা সম্পর্কেও। তিনি তাঁর উভয় শাহাদাত আঙ্গুল নিজের দু’ কানের মধ্যে রেখে বললেনঃ কংকরগুলো খুবই ক্ষুদ্র হওয়া চাই। তারপর মুহাজিরদেরকে নির্দেশ দিলে তারা মাসজিদের পেছনে গিয়ে অবস্থান করলেন। অত:পর অন্যান্য লোক তাদের অবস্থান গ্রহণ করে। (আব দাউদ ১৯৫৭)

মিনায় রাত্রযাপন কালে সালাতঃ

প্রথম দফায় ইহরাম বাঁধার পর হাজ্জিগণ মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে যাওয়াই হলো সুন্নাত তরিকা। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে এই পাঁচ প্রত্যেক ওয়াক্ত সালাতে তিন ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) সালাত নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া।

দ্বিতীয় দফায় ১০ জিলহজ্জ সকালের ফজর সালাত আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসা হয়। এ সময় একটাকা ৪/৫ দিন মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময়ও সালাতের কসর আদায় করেত হবে। তবে অনেকে পূর্ণ সালাতও আদায় করে থাকে। তাদেরও দলিল আছে। দুটি দলিল পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মিনার সকল সালাত কসরই হবে বলে মনে হবে। সে যা হোক আপনি অধিক যৌক্তিক ও হাদিস সম্মত কসরই আদায় করবেন তবে যদি কেউ কোন দলিলের আলোকে এখানে সালাত কসর না করে তবে তাকে ভতসনা করা যাবে না। তার সাথে বিবাদে জড়ান যাবে না। বিস্তরিত সফরের পরিচ্ছেদে দলিলসহ বর্ণানা করা হয়েছে।

মিনায় অবস্থানের সময় কাল বা আইয়ামে তাশরিক

মিনায় অবস্থানের সময় কাল বা আইয়ামে তাশরিক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১০ জিলহজ্জ মুজদালিফায় থেকে ফজরের পর রওয়ানা দিয়ে মিনায় খুব সকালে পৌছে, বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। দিনের বেলায় কুরবানী, তাওয়াফ ও মাথা মুন্ডনসহ হজ্জ সংশ্লিষ্ট কাজে করে রাতে মিনায় থাকতে হবে। যদি হজ্জ সংশ্লিষ্ট কাজ বাকি থাকে তবে ১১ জিলহজ্জ তারিখ সকালে করার চেষ্টা করতে হবে। এই দিন বিকালে তিনটি জামারার প্রতিটটিতে সাতটি করে মোট ২১ পাথার মারতে হবে এবং দিবাগত রাত মিনায় থাকতে হবে। মাজুর না হলে হজ্জের কোন আমল বাকি থাকার কথা না। তাই ১২ জিলহজ্জ তারিখ সকালে মিনায় বিশ্রাম করে বিকালে তিনটি জামারার প্রতিটটিতে সাতটি করে মোট ২১ পাথার মারতে হবে। যদি সম্বম হয় কঙ্কর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কোন কারনে যদি ১২ তারিখ সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারেন তবে এই রাতও মিনায় থাকতে হবে।  তখন যথারীতি ১৩ জিলহজ্জ কঙ্কর মেরে তারপর মিনা ত্যাগ করতে হবে।

মনে রাখত হবে, রাতের বেশির ভাগ কিংবা অর্ধরাত অবস্থানের মাধ্যমে রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। এ হুকুম তাদের জন্য যাদের পক্ষে মিনায় অবস্থান করা সহজ এবং যারা তাঁবু পেয়েছে। পক্ষান্তরে যারা মিনায় তাঁবু পাননি বরং তাদের তাঁবু মুযদালিফার সীমায় পড়ে গেছে, তাদের তাঁবু যদি মিনার তাঁবুর সাথে লাগানো থাকে, তবে তারা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করলেই মিনায় রাত্রিযাপন হয়ে যাবে।

এককথায় ১০ জিলহজ্জ থেকে ১২ জিলহজ্জ মিনায় থাকা ওয়াজিব। ১২ তারিখ সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারেলে ১৩ জিলহজ্জ মিনায় থাকতে হবে।

দলিলঃ

১. আবদুর রহমান ইবনু ইয়া‘মুর আদ্ দায়লী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি ‘আরাফাই হচ্ছে হজ্জ। যে ব্যক্তি ‘আরাফায় মুযদালিফার রাতে (৯ যিলহজ্জ শেষ রাতে) ভোর হবার আগে ‘আরাফাতে পৌঁছতে পেরেছে সে হজ্জ পেয়ে গেছে। মিনায় অবস্থানের সময় হলো তিনদিন। যে দুই দিনে তাড়াতাড়ি মিনা হতে ফিরে আসলো তার গুনাহ হলো না। আর যে (তিনদিন পূর্ণ করে) দেরী করবে তারও গুনাহ হলো না। (মিসকাত ২৭১৪, আহমাদ ১৮৭৭৪, দারিমী ১৯২৯, ইবনু হিব্বান ৩৮৯২।

আইয়ামে তাশরিকের ফজিলতঃ

এ দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ রাববুল আলামীনের যিকর ও তাঁর শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ۞وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ﴾

অর্থঃ আর আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে। (সুরা রাকারা ২:২০৩)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস রা. বলেন, ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে আইয়ামুত-তাশরীক বুঝানো হয়েছে। (সহিহ বুখারী ঈদ অধ্যায়ের ভুমিকা)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আইয়ামুত-তাশরীক হলো, খাওয়া-দাওয়া ও আল্লাহ রাববুল আলামীনের যিকরের দিন। (সহিহ মুসলিম ১১৪১)

ইমাম ইবন রজব রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আইয়ামুত-তাশরীক এমন কতগুলো দিন যাতে ঈমানদারদের দেহ-মনের নিয়ামত তথা স্বতঃস্ফূর্ততা একত্র করা হয়েছে। কারণ, খাওয়া-দাওয়া দেহের খোরাক আর আল্লাহর যিকর ও শুকরিয়া মনের খোরাক। আর এভাবেই এ দিনসমূহে নিয়ামতের পূর্ণতা লাভ করে।

. আইয়ামুত-তাশরীক তথা তাশরীকের দিনগুলো ঈদের দিন হিসেবে গণ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও মিনার দিনগুলো (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) আমাদের তথা ইসলাম অনুসারিদের ঈদের দিন। (আবূ দাউদ : ২৪১৯)

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের আমল ও ফজিলতঃ

মহান আল্লাহ তায়াল আমাদের জন্য চারটি মাস পবিত্র এ সম্মানিত করেছেন। এই মাসগুলোর মধ্যে জিলহজ্জ মাস অন্যতম। এই মাসের প্রথম দশদিনের আবার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ্জ এই মাসের প্রথম দশকেই হয়ে থাকে। কুনআন সুন্নাহে তাই এই মাসের প্রথম দশদিনের বেশ গুরত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে।  এই দশকের সম্মান ও পরিত্রতা প্রকাশান্তে এই দশকের রাতের নামে মহান আল্লাহ শপথ করে ইরশাদ করেন, 

وَٱلۡفَجۡرِ (١) وَلَيَالٍ عَشۡرٍ۬ (٢) وَٱلشَّفۡعِ وَٱلۡوَتۡرِ (٣)

অর্থঃ শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির, শপথ তার, যা জোড় ও যা বিজোড়। (সুরা ফাজর ১-৩)

সুরা ফজরের আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ লিখেন, দশ রজনী দ্বারা জিলহজ্জ মাসের প্রথশ দশ রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। এই কথা ইবনে আব্বাস রাঃ, ইবনে জুবায়ের রাঃ ও মুজাহীদ রহঃ এবং আগে পরের বহু গুরুজন বলেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (সুরা হজ্জ আয়াত ২৮)

‌এই আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলতে কোনো দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে ইমাম বুখারি রাহিমাহুল্লাহ সহিহ বুখারির ৯৬৯ নম্বর হাদিসের শিরোনামে বলেন,

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) বলেন, وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ  مَعْدُودَاتٍ   (সূরা বাকরাহ ২:২০৩) দ্বারা (যিলহাজ্জ মাসের) দশ দিন বুঝায় এবং   مَعْدُودَاتٍ  দ্বারা ‘আইয়ামুত তাশরীক’ বুঝায়। ইবনু ‘উমার ও আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) এই দশ দিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবীরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবীর বলত। মুহাম্মাদ ইবনু ‘আলী (রহ.) নফল সালাতের পরেও তাকবীর বলতেন।

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না। (সহিহ বুখারি ৯৬৯)

জিলহজ্জের প্রথম দশদিনের ফজিলতঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহর নিকট যে কোনো দিনের সৎ আমলে চেয়ে যিলহজ্জ (হজ্জ) মাসের দশ প্রথম দিনের আমলের অধিক প্রিয়। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? তিনি বললেনঃ না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে জিহাদে বের হয় এবং কোনো একটি নিয়েও ফিরে না আসে তার কথা স্বতন্ত্র। (আবূ দাউদ : ২৪৩৮)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কোন দিন নেই যে দিনসমূহের সৎকাজ আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যুলহিজ্জা মাসের এই দশ দিনের সৎকাজ অপেক্ষা বেশি প্রিয়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদ করাও কি (এত প্রিয়) নয়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ তা’আলার পথে জিহাদও তার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। তবে জান-মাল নিয়ে যদি কোন লোক আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদে বের হয় এবং এ দুটির কোনটিই নিয়ে যদি সে আর ফিরে না আসতে পারে তার কথা (অর্থাৎ সেই শহীদের মর্যাদা) আলাদা। (তিরমিজি ৭৫৭)

৩. আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়। (মুসনাদ আহমদ ২/৭৫)

উপরের হাদিসের আলোকে জানা যায় যে, বছরে যতগুলো মর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশ দিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনসমূহে নেক আমল করার জন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর এ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফযীলত প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এই দশকে নিম্মের আমলগুলো করা যেতে পারে

ক। হজ্জ ও উমরা পালন করাঃ

হজ্জ ও উমরা আদায়ের ফজিলত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই দশকের বাহিরে হজ্জ করার কোন প্রশ্নই উঠেনা কেননা এই মাসের ০৮ তারিখ ইহরাম বেধে মিনায় যায়, ০৯ তারিখ আরাফাতের অবস্থানের মাধ্যমে হজ্জ শুরু করে। ১০ তারিখ হজ্জের বাকি কাজগুলো করে সময় কাটায়। ইসলামি শরীয়তে এর কোন বিকল্প নাই। তবে এই মাসের বাহিরে যে কোন সময উমরা করা যায়। রমজান মাসের উমরার ফজিলত বেশী বর্ণিত হয়েছে।

কুরবানি করাঃ

এই সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই মাসের কত তারিখে, কখন কিভাবে কুরবানি করতে হবে। কুরবানির হুকুম কি? এর ফজিলতও বর্নণা করা হয়েছে। কাজেই সামর্থবানদের উচিত এই মাসের কুরবানি করা।

কুরবানী আদায়কারী চুল ও নখ কাটবে নাঃ

যারা কুরাবানীর নিয়ত করবে তারা এই ১০ তিন চুল ও নখ কাটবে না। এই মর্মে বহু সহিহ হাদিস আছে। যেমনঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

ঘ এই দশকের পুরাটাই সিয়াম পারন করা বিশেষ করে আরাফার দিনের সিয়ামঃ

১. আবূ কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট আরাফাতের দিনের রোযা সম্পর্কে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (সুনানে তিরমিজি ৭৪৯ ও ইবনু মাজাহ ১৭৩০)

২. আবূ ক্বাতাদাহহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আরাফার দিনের রোযা রাখলে আল্লাহ্‌র নিকট আশা রাখি যে তিনি বিগত এক বছরের ও আগামী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

আরাফার দিনের সিয়াম পালন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। বিশেষ করে মাঠে অবস্থানকারী হাজীদের জন্য ঐ দিন রোযা না রাখা মুস্তাহাব। নিম্মের হাদিসটি একটু লক্ষ করুন।

১. মায়মূনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সওম পালন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৯৮৯)

২. উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আরাফার দিনে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। (সহিহ বুখারী ১৬৫৮ তাওহিদ এবং ১৫৫৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ আরাফার দিনে হাজিদের সিয়াম পালণ একটি ভুল আমল।

খাঁটি তওবা করাঃ

তওবার অর্থ প্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। মহান আল্লাহ আদেশ অমান্য করে যে সকল কাজ করা হয়েছে তা থেকে এই তওবা করা। অতীতে যে সকল আদেশ অমান্য করেছে তার জন্য অনুতপ্ত হবে, ভবিশ্যতে আর করবেনা এবং বান্দার হক থাকরে তা মিটিয়ে ফেলাম নামই তওবা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানি থেকে ফিরে আসা, আল্লাহর হুকুমের পাবন্দি করার উপর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা এবং অতীতের কৃত কর্মের উপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তা ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আল্লাহর নাফরমানি না করা ও তার হুকুমের অবাধ্য না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা। এ দিন গুলোতে তাওবা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ يَوۡمَ لَا يُخۡزِي ٱللَّهُ ٱلنَّبِيَّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَعَهُۥۖ نُورُهُمۡ يَسۡعَىٰ بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَبِأَيۡمَٰنِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَتۡمِمۡ لَنَا نُورَنَا وَٱغۡفِرۡ لَنَآۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ٨ ﴾

অর্থঃ হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর—বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মোমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সুরা তাহরিম ৮)

চ। ফরজ সালাতের পাশাপাশি নফল সালাত আদায় করাঃ

ফরয ও নফল সালাতগুলো গুরুত্বের সাথে আদায় করা। অর্থাৎ ফরয ও ওয়াজিবসমূহ সময়-মত সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল ইবাদতসমূহ তার সুন্নত, মোস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। ফরয সালাতগুলো সময় মত সম্পাদন করা, বেশি বেশি করে নফল সালাত আদায় করা। যেহেতু এগুলোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সর্বোত্তম মাধ্যম। 

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার উপর ফরয করেছি শুধুমাত্র তা দ্বারাই কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না বরং আমার বান্দা সর্বদা নফল ‘ইবাদাত দ্বারা আমার অধিক নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোন কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি কোন কাজ করতে চাইলে তা করতে কোন দ্বিধা করি-না, যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি।(সহিহ বুখারি ৬৫০২)

বেশী বেশী দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াত করাঃ

বান্দার আমলের সময়ই আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে প্রিয়। সকল প্রকারে আমলে আগে প্রস্ততি দরকার হয় কিন্তু দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াতের জন্য কোন প্রকার পূর্ব প্রস্ততি প্রয়োজন নাই। তাই এই বরকতময় দিনগুলোতে বেশী বেশী দোয়া, জিকির ও কুরআন তিলওয়াত করা। এই দিনগুলিতে জিকিরের নির্দেশ আল্লাহই দিয়েছেন। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,

﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ ٢٨ ﴾

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। (সুরা হজ্জ আয়াত ২৮)

মন্তব্যঃ নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে বলা হয়েছে। এর অর্থ হলে এই জিলহজ্জের শেষ দশকে স্মরণ করা। আর স্মরনের সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম জিকির ও দোয়া।

১. আবদুল্লাহ ইবন উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লাইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে আদায় কর।’ (মুসনাদে আহমদ ৫৪৪৬, বায়হাকি ৩৭৫০, ত্ববারানী ১১১১৬)

উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করা

এ দিনগুলোতে আল্লাহ রাববুল আলামীনের মহত্ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। এ তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে মসজিদে, বাড়ি-ঘরে, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বত্র উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা বাঞ্ছনীয়। তবে মহিলাদের তাকবীর হবে নিম্ন স্বরে। তাকবীরের শব্দগুলো নিম্নরূপঃ

اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أكْبَرُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ وَلِله الحَمْدُ.

(আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ)

যিলহজ্জ মাসের সূচনা হতে আইয়ামে তাশরীক শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ তাকবীর পাঠ করা সকলের জন্য ব্যাপকভাবে মুস্তাহাব। তবে বিশেষভাবে আরাফা দিবসের ফজরের পর থেকে মিনার দিনগুলোর শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ যেদিন মিনায় পাথর নিক্ষেপ শেষ করবে সেদিন আসর পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের পর উক্ত তাকবীর পাঠ করার জন্য বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবু হুরাইরা রা. যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও তাকবীর পাঠ করতেন, লোকজনও তাদের অনুসরণ করে তাকবীর পাঠ করতেন। অর্থাৎ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই দুই প্রিয় সাহাবি লোকজনকে তাকবীর পাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।

কঙ্কর নিক্ষেপের শর্ত

কঙ্কর নিক্ষেপের শর্ত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কঙ্কর নিক্ষেপের শর্তসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো :

১। ঈদের দিন (১০ জিলহজ্জ) বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে

২। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে     

৩। কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা

৪। মাটি বা ইটের নিক্ষেপ করলে হবে না

৫। কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে

৬। প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবে

৭। ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা যাবে না

৮। সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করা

৯। কঙ্কর নিক্ষেপের সিরিয়াল ঠিক রাখতে হবে

১০। সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা

১। ঈদের দিন (১০ জিলহজ্জ) বড় জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি কোরবানির দিন সকাল বেলা জমরাতুল আকাবাতে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছেন; যেটি সর্বশেষ জমরাত ও মক্কার নিকটবর্তী। প্রত্যেকটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলেছেন। কঙ্করগুলো ছিল আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে নিক্ষেপ করার মত কঙ্কর অর্থাৎ ছোলার চেয়ে কিছুটা বড়।

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন।  (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২. আবদুর রাহমান ইবনু ইয়াযীদ হতে বর্ণিত, তিনি ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ)-এর সঙ্গে হাজ্জ আদায় করলেন। তখন তিনি বাইতুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে বড় জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখেছেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকরা নাযিল হয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ     

জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে হবে। অন্যদিকে টার্গেট করে মারলে খুঁটিতে লাগলেও শুদ্ধ হবে না। প্রতিটি কঙ্করই জামারার হাউজের মধ্যে ফেলতে হবে সন্দেহ হলে, সেই কটা আবার মারতে হবে। কঙ্কর হাউজের বাইরে পড়লে ঐ কঙ্কর পুনরায় মারতে হবে। নিক্ষিপ্ত কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে না পড়লে সে নিক্ষেপ করা সহিহ হবে না। তবে, যদি প্রবল ধারণা হয় যে, কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে পড়েছে তাহলে সেটা যথেষ্ট। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া শর্ত নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর নয়। যদি কোন ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে প্রবল ধারণার ভিত্তিতে আমল করা হয়। কারণ শরিয়তপ্রণেতা নামাযে সন্দেহ হলে, কয় রাকাত পড়া হয়েছে, তিন রাকাত; নাকি চার রাকাত; সেক্ষেত্রে প্রবল ধারণার উপর আমল করার কথা বলেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সে ব্যক্তি যেন কোনটা সঠিক সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে; এরপর এর ভিত্তিতে বাকী নামায শেষ করে। (নানে আবু দাউদ (১০২০)

এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, ইবাদতের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রবল ধারণা যথেষ্ট। এটি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সহজ্জতা। কেননা কখনও কখনও ইয়াকীন বা নিশ্চিত জ্ঞান অসম্ভব হতে পারে। যদি কঙ্করগুলো হাউজের ভিতরে পড়ে এতেই ব্যক্তির দায়িত্ব মুক্ত হবে। চাই সেটা হাউজের ভেতরে থেকে যাক; কিংবা গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ে যাক। তবে যদি ধারনা হয় বাহিরে পড়ছে তবে পুনরায় মারতে হবে। যদি এক বা একাধিক কঙ্কর কম নিক্ষেপ করে থাকে তবে প্রতিটি কংকরের জন্য অর্ধেক সাআ (অর্থাৎ এক কেজি বিশ গ্রাম) পরিমাণ গম, খেজুর বা ভুট্টা দান করতে হবে। আর ঘাটতি কংকরের সংখ্যা ৩ এর অধিক হলে দম দিতে হবে। জামারার খুঁটিকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ না করলে আপনার কঙ্কর নিক্ষেপের ওয়াজিব আদয় হবে না। কেননা এর ফলে প্রমানিত হবে আপনি জামায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেন নাই। আর যদি ৪  বা তার অধিক নিক্ষেপ নিশ্চিত হয়ে তবে দম দিতে হবে না।

কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাঃ

কঙ্করগুলো খুব জোরে নিক্ষেপ করার যাবে না আবার জামারার নিকটি গিয়ে ফেলে দিলে হবে না। এমন কি কঙ্করগুলো জামারার নিকটি গিয়ে ষ্পর্শ করালেও হবে না। সরাসরি মধ্যম গতিতে নিক্ষপর করতে হবে। এমন জোরেও নিক্ষেপ করা যাবে না যে, কঙ্করটি জামারায় আঘাত করে আবার ফিরে এসে কোন হাজিকে আহত করে। অনেকে জামাকে শয়তায় মনে করে এত জোরে জোরে কঙ্কর নিক্ষেপ করে যে দেখতে খুবই দৃষ্টিকটু এবং অন্য হাজ্জিদের জন্য কষ্টের কারন। তাই কঙ্কর নিক্ষেপ করাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করি।

মাটি বা ইটের নিক্ষেপ করলে হবে নাঃ

কঙ্কর বলতে আমরা পাথরের ছোট ছোট টুকরা বুঝে থাকি। যাকে অনেকে নুড়ি পাথরও বলে থাকে। যার সাইজ হবে গুলালের গুলির কাছাকাছি বা চানা বুটের দানার চেয়ে একটু বড়। তাই মাটি বা ইটের টুকরা কে কঙ্কর হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। 

দলিলঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল ‘আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেনঃ এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেনঃ দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকেদেরকে দীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৯, নাসাঈ ৩০৫৯)

কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবেঃ

সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো, কঙ্করগুলো হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে। কোন প্রকার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, ছেলে-মেয়েদের খেলনা, গুলাল, তীর বা পা দিয়ে লাথি মেরে নিক্ষেপ করলে হবে না। হাতে নিক্ষেপ করতে হবে। সুতরাং তীরের সাহায্যে নিক্ষেপ করলে কিংবা পা দিয়ে ঠেলে দিলে জায়েয হবে না। কঙ্কর সত্যিকার অর্থে নিক্ষেপ করতে হবে। জামরার জায়গায় রেখে দেওয়া নয়। কেউ যদি কঙ্কর তুলে জামরার জায়গায় রেখে দেয়, তবে এটা জায়েয হবে না। কেননা, একে নিক্ষেপ করা বলা হয় না। তিন হাত কিংবা আরও বেশি দূর থেকে কঙ্কর নিজ হাতের দ্বারা ছুঁড়ে মারতে হবে। ওজর ব্যতিত অন্যের দ্বারা নিক্ষেপ করা যাবেনা। কঙ্কর নিজে নিক্ষেপ করতে হবে। সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বিনা ওজরে অন্যের দ্বারা কঙ্কর নিক্ষেপ করানো জায়েয নয়। ওজর থাকলে জায়েয। সুতরাং কোনো রোগীর পক্ষ থেকে তার আদেশে অন্য ব্যক্তি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে জায়েয হবে। যদি কঙ্কর নিক্ষেপের পর সময়ের মধ্যেই রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তবে তাকে পুনরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। যদি রোগী কঙ্কর নিক্ষেপ না করে এবং তার পক্ষ থেকেও কেউ কঙ্কর নিক্ষেপ না করে, তবে ফিদিয়া দেওয়া ওয়াজিব হবে।

প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবেঃ

সাতটি কঙ্কর হাতের মুঠোয় ভরে একেবারে নিক্ষেপ করা যাবে না। প্রতিবারে একটি একটি করে কঙ্কর হাতে নিয়ে নিক্ষেপ করতে হবে। কঙ্কর সাতটি, সাত বারে মারা ওয়াজিব। যদি কেউ একবারই সাতটি মারে তবে একরারই নিক্ষেপ হবে। যদিও সাতটা একবারে মারা ঠিক নয়। তাই ওয়াজিব আদায়ের জন্য আপনাকে একটি একটি করে আলাদা আলাদাভাবে সাতবারে সাতটি নিক্ষপ করেত হবে। মুঠোয়ভরে হাত মুঠো নিক্ষেপ করলে সাতবার হবে কিন্তু সাতটি হবে না। আবার একটি মুঠোয় সাতটি নিক্ষেপ করলে সাতবার নিক্ষেপ হবে না, একবার নিক্ষেপ করে। তাই প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদা নিক্ষেপ করতে হবে। এর কোন প্রকার ব্যতিক্রম হলে নিক্ষেপ সঠিক হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা হজ্জ ও উমরা আল্লাহ্‌র জন্য পরিপূর্ণ কর”, (২:১৯৬)। তাই সুন্নাহ সম্মত নিক্ষেপের কোন প্রকার ব্যতিক্রম গ্রহণীয় নয়।  

ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা যাবে নাঃ

বর্তমানে ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা কোনই সুযোগ নাই। কেননা বর্তমানে জামারাহগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে কঙ্কর নিক্ষেপের পর নিচে চলে যায়। কোথায় যায় কিভাবে যায় তা সাধারণ হাজ্জিদের জানার কথা নয়। কাজেই ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করা কোন সুযোগ নাই। যদি ব্যবহৃত কঙ্কর পুনরায় ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে তবে তা জায়েয হতো না।

সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

কঙ্কর নিক্ষেপের সঠিক সময় আছে। সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ না করতে পারলে ওয়াজিব ছুটে পাবে এবং দম দিতে হবে। কাজেই এই সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবাশ্যিক। কুরবানির দিন বা ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করা নিক্ষেপ করা হলেও আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপ হয় থাকে। অর্থাৎ কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য চার দিনে দুটি পৃথম সময় হয়ে থাকে। যথঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করাঃ

ক। ১০ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর নিক্ষেপ করাঃ

সঠিক সময় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। জিলহজ্জের ১০ তারিখ কুরবানির দিন। এই মুজদালিফা থেকে এসে সূর্যোদয়ের পর থেকে নিয়ে দুপুর বারটা পর্যান্ত মারা সুন্নাহ। তবে ওজরের কারনে সূর্যোদয়ের পুর্বে বা দুপুরের পরও নিক্ষেপ করা জায়েয।

দলিলঃ

খ। আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপঃ

দলিলঃ

ওয়াবারা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

গ। ওজরের কারনে ফরজের পূর্বে কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি মুযদালিফার রাতে মুযদালিফার কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে সালাতে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অত:পর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি অস্তমিত হয়েছে? আমি বললাম, না। তিনি আরো কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অত:পর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি ডুবেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, চল। আমরা রওয়ানা হলাম এবং চললাম। পরিশেষে তিনি জামরায় কঙ্কর মারলেন এবং ফিরে এসে নিজের অবস্থানের জায়গায় ফজরের সালাত আদায় করলেন। অত:পর আমি তাঁকে বললাম, হে মহিলা! আমার মনে হয়, আমরা বেশি অন্ধকার থাকতেই আদায় করে ফেলেছি। তিনি বললেন, বৎস! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদের জন্য এর অনুমতি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৯)

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, সাওদা (রাঃ) মুযদালিফার রাতে (মিনা যাওয়ার জন্য) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট অনুমতি চাইলেন, তিনি তাঁকে অনুমতি দেন। সাওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও ধীরগতিসম্পন্না নারী। (সহিহ বুখারি ১৬৮০)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  তিনি বলেন, আমরা মুযদালিফায় অবতরণ করলাম। মানুষের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হওয়ার জন্য সাওদা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চাইলেন। আর তিনি ছিলেন ধীর গতি মহিলা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে অনুমতি দিলেন। তাই তিনি লোকের ভিড়ের আগেই রওয়ানা হলেন। আর আমরা সকাল পর্যন্ত সেখানেই রয়ে গেলাম। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রওয়ানা হলেন, আমরা তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। সওদার মত আমিও যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট অনুমতি চেয়ে নিতাম তাহলে তা আমার জন্য অধিক সন্তুষ্টির ব্যাপার হতো। (সহিহ বুখারি  ১৬৮১)

ঘ। আইয়্যামে তাশরীকের দুপুরের পরে নিক্ষেপঃ

আইয়্যামে তাশরীকের দিনগুলোর হল, ১১, ১২ ও ১৩ ই যিলহজ্জ। এই তিন দিনে তিনটি জামারায়ই কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজি। প্রতিবারে সাতটি করে তিনটি জামারায় মোট (৭×৩)= ২১ টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। এটা বাদ গেলে দম দিতে হবে। এই সময় কঙ্কর নিক্ষেপর সময় হলো, দুপুরের পর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপে শুরু হয়ে সূর্য ডুবার পূর্ব পর্যন্ত নিক্ষেপ করা সুন্নাহ। তবে রাতেও মারা যাবে অর্থাৎ ফজরের পূর্ব পর্যন্ত জায়েয আছে।

দলিলঃ

ওয়াবারা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইব্‌নু উমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, কখন কঙ্কর নিক্ষেপ করব? তিনি বললেন, তোমার ইমাম যখন কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন তুমিও নিক্ষেপ করবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আমরা সময়ের অপেক্ষা করতাম, যখন সূর্য ঢলে যেত তখনই আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করতাম। (সহিহ বুখারি ১৭৪৬)

ঙ। আইয়্যামে তাশরীকের কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাতসমূহ হলোঃ

(১) দুপুর হলে পরে কঙ্কর নিক্ষেপ আগে, এরপর যুহরের সালাত আদায় এভাবে সিরিয়াল করা মুস্তাহাব। (বুখারী) প্রচন্ড ভীড় থাকে বিধায় এ সিরিয়াল ঠিক রাখার চেষ্টা না করাই ভাল।

(২) মিনার মসজিদে ‘খায়েফ’ থেকে কাবার দিকে অগ্রসর হলে প্রথমে ছোট এরপর মধ্যম এবং শেষে বড় জামরা দেখতে পাবেন। আগে ছোট ‘জামারায়’ কঙ্কর নিক্ষেপ করে এটাকে বামে রেখে এখান থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে কিবলামুখী হয় দাঁড়িয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়বেন এবং দু’হাত উঠিয়ে দোয়া করবেন।

(৩) এরপর যাবেন মধ্যম ‘জামারায়’। এখানেও পূর্বের মত ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন এবং পরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, পড়বেন এবং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঠিয়ে আরবীতে বাংলায় যত পারেন লম্বা মুনাজাত করবেন। একাকি মুনাজাত করাই সুন্নাত।

(৪) সবশেষে বড় জামরায় এসে ৭টি কঙ্কর মেরে আর থামবেন না সেখানে। জামারা ত্যাগ করবেন। একই নিয়মে শেষ ৩ দিন প্রতিদিন ৭+৭+৭= ২১টি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন।

কঙ্কর নিক্ষেপের সিরিয়াল ঠিক রাখতে হবেঃ

প্রথমে ছোট, এরপর মধ্যম এবং সর্বশেষে বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপে তারতীব অর্থাৎ সিরিয়াল ঠিক রাখার ওয়াজিব। কাজেই সিরিয়াল ঠিক রাখি।

দলিলঃ

আবু উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জামরাতুল উলাতে এক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহর রাসুল! কোন জিহাদ অধিক উত্তম? তিনি তাকে কিছু না বলে নীরব থাকলেন। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপকালে সে পুনরায় একই প্রশ্ন করলো। তিনি এবারও নিশ্চুপ থাকলেন। তিনি জামরাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার পর বাহনে আরোহণের জন্য পাদানিতে পা রেখে জিজ্ঞাসা করলেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? সে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! এই যে আমি। তিনি বলেনঃ যালেম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা (উত্তম জিহাদ)। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪০১২)

১০সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করাঃ

১. আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) এর সাথে হজ্জ করেন। রাবী বলেন, তিনি (আবদুল্লাহ) জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন- বায়তুল্লাহকে বামদিকে এবং মিনাকে ডানদিকে রেখে এবং তিনি বলেন, এই সে স্থান যেখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সূরা আল বাকারাহ নাযিল করা হয়েছিল। (সহিহ মুসলীম ৩০০১ ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

২. আবদুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বাইতুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে বড় জামরাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকারা নাযিল হয়েছে।(সহিহ বুখারি ১৭৪৭,১৭৪৮)

এই হাদিসের আলোকে যানা যায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেত হবে।

কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাহসমূহ

কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাহসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। মিনায় প্রবেশ করেই কঙ্কর নিক্ষেপর করা

২। কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করার পূর্বে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দেয়া

৩। প্রতিটি কঙ্কর এর সঙ্গে তাকবীর পাঠ

৪। কংকরের সাইজ ঠিক রাখা

৫। বায়তুল্লাহকে হাতের বামে এবং মিনাকে ডানে রেখে কঙ্কর নিক্ষেপ

৬। দুই কংকরের মধ্যে বেশী সময় না নেয়া

৭। কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাব

৮। কঙ্কর নিক্ষেপের পর সমতলে গিয়ে হাত তুলে দোয়া করা

৯। বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে

১০। কঙ্কর নিক্ষেপের পর স্থান ত্যাগ করা

১১। প্রয়োজনে বাহনে বসে কঙ্কন নিক্ষেপ

১২। ওজরের কারনে কঙ্কর পরে নিক্ষেপ

১৩। ওজরের কারনে সময়ের কঙ্কর আগে নিক্ষেপ

১। মিনায় প্রবেশ করেই কঙ্কর নিক্ষেপর করাঃ

মিনায় প্রবেশ করে কঙ্কর নিক্ষেপের আগে অন্য কিছু না করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

২। কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করার পূর্বে তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করে দেয়াঃ

ইহরাম বাধার পর থেকে তালবিয়া বলা শুরু হয়েছিল। জামারায় পৌছার পর কঙ্কর নিক্ষেপের আগেই তালবিয়া বলা বদ্ধ কর একটি সুন্নাহ সম্মত কাজ।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৩, ১৬৮৫, ১৬৮৫, ১৬৮৭)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,‘আরাফাহ হতে মুয্‌দালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পিছনে উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুযদালিফা হতে মিনা পর্যন্ত ফযল [ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)]-কে তাঁর পিছনে আরোহণ করান। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তাঁরা উভয়ই বলেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরা আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ করছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৫৪৪)

প্রতিটি কঙ্কর এর সঙ্গে তাকবীর পাঠঃ

প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলা। ডান হাতে নিক্ষেপ করা। পুরুষের হাত উঁচু করে নিক্ষেপ করা। মেয়েরা হাত উঁচু করবে না।

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রথম জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষন দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু’আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামারায় কঙ্কর মারতেন এবং দীর্ঘক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামারায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১, ১৭৫২, ১৭৫৩)

উম্মু জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি কোরবানির দিন জামরাতুল আকাবার নিকটে উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। তিনি প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সাথে সাথে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন, অতঃপর প্রত্যাবর্তন করেন। ইবনে মাজাহ ৩০৩১)

কংকরের সাইজ ঠিক রাখাঃ

কংকরের সাইজ হবে গুলালের গুলির কাছাকাছি বা চানা বুটের দানার চেয়ে একটু বড়।

সা’ঈদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফ্‌ফাল (রাঃ)-এর একজন নিজের লোক ছোট ছোট পাথর ছুঁড়লে তিনি তাকে তা করতে বারণ করেন এবং বললেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছোট ছোট পাথর নিক্ষেপ বারণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, এটা না শিকার করতে পারে আর না শত্রুকে পরাভূত করতে পারে; বরং এটি দাঁত ভাঙ্গে আর চোখে আঘাত করে। সা’ঈদ (রহঃ) বলেন, লোকটি যখন পূণরায় এ কাজ করল তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে হাদীস শোনাচ্ছি যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে নিষেধ করেছেন, এরপরও তুমি কঙ্কর নিক্ষেপ করছো? তোমার সঙ্গে আমি কখনো কথা বলবো না। (সহিহ মুসলিম ৪৯৪৭)

উম্মু জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কোরবানির দিন জামরাতুল আকাবার নিকটে আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে খচ্চরের পিঠে আরোহিত অবস্থায় দেখেছি। তখন তিনি বলেছেনঃ হে লোকসকল! যখন তোমরা জামরায় (কংকর ) নিক্ষেপ করতে যাবে তখন সেখানে ক্ষুদ্র আকারের কংকর নিক্ষেপ করবে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৮)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামরাতুল আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেনঃ আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেনঃ এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেনঃ দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। (ইবনে মাজাহ ৩০২৯]

বায়তুল্লাহকে হাতের বামে এবং মিনাকে ডানে রেখে কঙ্কর নিক্ষেপঃ

কঙ্কর নিক্ষেপের সময় দাড়ানোর সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো, মক্কাকে বামপাশে এবং মিনাকে ডানে রেখে ‘জামারার’ দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। এরপর নিক্ষেপ করবে। প্রচন্ড ভীড় হলে যে কোন দিকে দাঁড়িয়েও মারতে পারেন।

আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জামারাতুল কুবরা বা বড় জামারার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৭)

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি জামরাতুল কুবরা বা বড় জামরার কাছে গিয়ে বায়তুল্লাহকে বামে ও মিনাকে ডানে রেখে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। আর বলেন, যাঁর প্রতি সূরা আল-বাকারাহ নাযিল হয়েছে তিনিও এরূপ কঙ্কর মেরেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭৪৮)

আবদূর রাহমান ইব্‌নু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ)-এর সঙ্গে হজ্জ আদায় করলেন। তখন তিনি বায়তুল্লাহকে নিজের বামে রেখে এবং মিনাকে ডানে রেখে জামারাকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখেছেন। এরপর তিনি বললেন, এ তাঁর দাঁড়াবার স্থান যাঁর প্রতি সূরা বাকারা নাযিল হয়েছে। (সহিহ বুখারি ১৭৪৯)

দুই কঙ্করের মধ্যে বেশী সময় না নেয়াঃ

একবার কঙ্কর মারা শুরু কলরে একাধারা মারতে থাকা। প্রতিটির মাঝে ৫/১০ সেকেন্ড দেরী হলে সমস্যা নাই। কিন্তু একটা কঙ্করের নিক্ষেপের পর সময় নিয়ে বা অন্য কোন কাজ করে আবার একটি নিক্ষেপ করা সুন্নাহতে খিলাফ। জারাতে কঙ্কর নিক্ষেপের সময় প্রচন্ড ভীড় থাকে। কাজেই পর পর সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করে অন্য মুসলিম ভাইদের নিক্ষেপ করার সুযোগ করে দেই। যদি একটি একটি করে ধীরে ধীর কঙ্কর নিক্ষপ করি। তবে সময়ের অপচয় তবে। অন্যদের কষ্ট দেয়া মুলত হারাম কাজ। কাজেই পর পর সাতটি নিক্ষেপ করে অন্যকে সুযোগ দিতে হবে। এমনকি কঙ্কর নিক্ষেপের পরও আর ওখানে থেকে সময় নষ্ট করা যাবে না। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে আসতে হবে।

সালিম ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) নিকটবর্তী জামরায় সাতটি কঙ্কর মারতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। এরপর সামনে এগিয়ে গিয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলা মুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় অনুরূপভাবে কঙ্কর মারতেন। এরপর বাঁ দিক হয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলা মুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন। অতঃপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন এবং এর কাছে তিনি দেরী করতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমি অনুরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫২)

কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাবঃ

মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ একটি ইবাদাত। আর এই ইবাদের মাধ্যম হলে ছোট নুড়ি কঙ্কর। কঙ্করগুলো পবিত্র হওয়া মুস্তাহাব। অপবত্রি কঙ্কর দেখলে তার দিয়ে আমল না করাই ভাল। তবে ওজরের কারনে অপবিত্র হলেও তা দিয়ে নিক্ষেপ করা যাবে। তবে মাকরূহ হবে। এই কঙ্কর সাধারণত খোলা ময়দান থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাই অনেকের ধারনা কঙ্করগুলো অপবিত্র। তারা কঙ্কর সংগ্রহ  করার পর সেগুলোকে ধৌত করেন। তাদের ধারনা কঙ্করগুলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া উত্তম। কিন্তু মনে রাখতেহবে খোলা জায়গা থাকলেই কঙ্কর অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই মনে সন্দেহ নিয়ে কঙ্কর ধৌত করা বিদআত। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা করেননি। তিনি খোলা জায়গা থেকেই কঙ্কর সংগ্রহ করছেন। যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেননি ইবাদতের উদ্দেশ্যে সে কাজ করা বিদআত। আর ইবাদতের উদ্দেশ্যে না হলে এমন কাজ করা বোকামি ও সময় নষ্ট।

কঙ্কর নিক্ষেপের পর সমতলে গিয়ে হাত তুলে দোয়া করাঃ

সালিম ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) নিকটবর্তী জামারায় সাতটি কঙ্কর মারতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। এরপর সামনে এগিয়ে গিয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু’আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামারায় অনুরূপভাবে কঙ্কর মারতেন। এরপর বাঁ দিক হয়ে সমতল ভূমিতে এসে ক্বিবলামুখী হয়ে দীর্ধক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত উঠিয়ে দু’আ করতেন। অতঃপর বাতন ওয়াদী হতে জামারায়ে আকাবায় কঙ্কর মারতেন এবং এর কাছে তিনি দেরী করতেন না। তিনি বলতেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমি অনুরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫২)

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১)

বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবেঃ

মহান আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণার (তাকবীর) সাথে বিনয়ী ও শান্ত হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। অনেক মূর্খরা যেমন হৈ হুল্লুড় ও গালী-গালাজ করে তাদের মত করবে না। কেননা জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অমর্ত্মভূক্ত। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

*ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ*

যে কেউ আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান করবে সে তো তার অন্তরস্থিত আল্লাহ-ভীতি থেকেই তা করবে। (সুরা হজ্জ ২২:৩২)

আর হাদীসে নাবী (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়ার সাঈ এবং জামরাগুলিতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা আল্লাহর যিকির (স্মরণ) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে বিধি-বদ্ধ করা হয়েছে। (সহিহ ইবনে খুযাইমাহ ২৮৮২)।

১০। কঙ্কর নিক্ষেপের পর স্থান ত্যাগ করা

ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পর সেখানে আর অবস্থান করেন নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে , নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও এরূপ করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩২)

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাকঙ্মরাতুল আকাবায় ককর নিক্ষেপ করে চলে যেতেন, অবস্থান করতেন না। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৩)

১১। প্রয়োজনে বাহনে বসে কঙ্কন নিক্ষেপঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সওয়ারীতে আরোহিত অবস্থায় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৪)

কুদামাহ বিন আবদুল্লাহ আল-আমিরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কোরবানির দিন লাল-সাদা মিশ্র বর্ণের একটি উষ্ট্রীতে সওয়ার অবস্থায় জামরায় কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। এতে না ছিল আঘাত, না ছিল হাঁকানো, না এদিক, না ওদিক। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৫)

১২। ওজরের কারনে পরে কঙ্কর নিক্ষেপঃ

১. আবুল বাদ্দাহ ইবনে আসেম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট চালকদের একদিন কাঁকর নিক্ষেপ করার ও একদিন বিরতি দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৬)

২. আবুল বাদ্দাহ ইবনে আসেম (রহঃ) থেকে তার পিতার সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট চারকদের মিনায় অথবা তার বাইরে রাত যাপনের অনুমতি দিয়েছেন, যেন তারা কোরবানীর দিন কংকর নিক্ষেপ করে। এরপর কোরবানীর পরে দু’ দিনের কংকর একসাথে নিক্ষেপ করবে। তারা ঐ দু’ দিনের যে কোন একদিন তা নিক্ষেপ করবে। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, আমার মনে হয় আবদুল্লাহ ইবনে আবূ বাকর বলেছেন, প্রথম দিন (কোরবানীর দিন) কংকর নিক্ষেপ করবে, অতঃপর প্রস্থানের দিন কংকর নিক্ষেপ করবে। (ইবনে মাজাহ ৩০৩৭)

১৩। ওজরের কারনে সময়ের আগে কঙ্কর  নিক্ষেপঃ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওজরের কারনে সময়ের আগে কঙ্কর নিক্ষেপ করার অনুমিত প্রদান করেছেন। ওজরের বা মহিলাদের আগের কঙ্কর নিক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট সহিহ দ্বারা প্রমানিত।

দলিলঃ

আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি মুযদালিফার রাতে মুযদালিফার কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে সালাতে দাঁড়ালেন এবং কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি অস্তমিত হয়েছে? আমি বললাম, না। তিনি আরো কিছুক্ষণ সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বললেন, হে বৎস! চাঁদ কি ডুবেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, চল। আমরা রওয়ানা হলাম এবং চললাম। পরিশেষে তিনি জামরায় কঙ্কর মারলেন এবং ফিরে এসে নিজের অবস্থানের জায়গায় ফজরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, হে মহিলা! আমার মনে হয়, আমরা বেশি অন্ধকার থাকতেই আদায় করে ফেলেছি। তিনি বললেন, বৎস! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের জন্য এর অনুমতি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৭৯)

বদলীতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার শর্তঃ

কঙ্কর নিক্ষেপ একটি কষ্টকর ইবাদাত। তীব্র ভিড়ে এটি আদায় করা আরও কঠিন কাজ। কিন্তু কেউ অক্ষম হয় এবং তার পক্ষে নিজে নিজে কঙ্কর মারা কোনভাবেই সম্ভবপর নয়। তবে তার ক্ষেত্রে অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে এই আমল করা জায়েয, বিশেষ করে যারা দুর্বল ও বৃদ্ধ। এমনকি কোন নারী যদি মানুষের ভিড়ে কঙ্কর মারা নিজের জন্য বিপদজনক মনে করেন তাহলে তিনি পরে রাতের বেলায় কঙ্কর মারতে পারেন। স্বপক্ষে দলিল নিম্মের হাদিস।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সওদা (রাঃ) ছিলেন ভারী ও স্থুলদেহী। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মুযদালিফা থেকে রাত থাকতেই প্রস্থান করার অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, হায়! যদি সওদা (রাঃ) এর মত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমিও অনুমতি প্রার্থনা করতাম! আয়িশা (রাঃ) ইমামের সাথে মুযদালিফা হতে রওনা হতেন। (সহিহ মুসলীম ২৯৮৯ ইফাঃ)

মোদ্দাকথা হচ্ছেঃ যে অক্ষমতার কারণে কেউ নিজে কঙ্কর মারতে পারে না সে অক্ষমতা ব্যতীত হাজীসাহেব কর্তৃক অন্যকে কঙ্কর মারার দায়িত্ব দেয়া বড় ধরণের ভুল। কেননা এটি ইবাদত পালনে অবহেলা এবং ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় কাজ পালনে অলসতা।

দুর্বল, রোগী, অতি বৃদ্ধ ও শিশুদের পক্ষ থেকে পক্ষে বদলী কঙ্কর নিক্ষেপ জায়েয। তবে নিম্মের শর্তগুলো খেয়াল রাখতে হবে।

(১) যিনি বদলী মারবেন তিনি একই বছরের হাজী হতে হবে।

(২) যার পরিবর্তে বদলী মারবেন তিনি অবশ্যই অক্ষম ব্যক্তি হতে হবে।

(৩) প্রথমে হাজী নিজের কঙ্কর মারবেন, এরপর অক্ষম ব্যক্তির কঙ্কর মারবেন।

কঙ্কর নিক্ষেপের ভুলত্রুটিসমূহ

কঙ্কর নিক্ষেপের ভুলত্রুটিসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুজদালিফায়ই কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবে

২। জমরাতগুলো শয়তান মনে করা।

। কঙ্কর নিক্ষেপের কয়েকটি ভুল পদ্ধতি।

৪। তাওয়াফে যিয়ারাতের পূর্বে ইহরাম ত্যাগ করা যায়।

১। মুজদালিফায়ই কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবেঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জমরাতুল আকাবাতে কঙ্কর নিক্ষেপের দিন ভোরে তাঁর সওয়ারীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় আমাকে বললেন, আমার জন্য (কঙ্কর) কুড়িয়ে আন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি তাঁর জন্য কঙ্কর কুড়িয়ে আনলাম। সেগুলো আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে ছুড়ে মারা যায় এমন। তিনি সেগুলো নিজের হাতে রেখে বললেন: আপনারা এগুলোর মত কঙ্কর নিক্ষেপ করুন…। দ্বীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে সাবধান থাকুন। কেননা আপনাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩০২৯),

অনেক ধারনা করে থাকে মুজদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করত হবে। তারা মনে করে মুজদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করা সুন্নাহ। আসলে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কোন বর্ণনা আসেনি যে, তিনি মুযদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহ করেছেন বা তার উম্মতকে সংগ্রহ করতে বলেছেন। তাই এই কাজটি সুন্নাহ নয় ওয়াজিবতো অনেক দুরের কথা। সুন্নাহ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ বা অনুমোদন। এর কোনটি মুযদালিফা থেকে কঙ্কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। কাজেই আমরা কঙ্কর যে কোন স্থান থেকে সংগ্রহ করা যাবে, মুযদালিফা থেকে, মীনা থেকে, কিংবা অন্য যে কোন স্থান থেকে। উদ্দেশ্য হচ্ছে কঙ্কর হওয়া।

২। জমরাতগুলো শয়তান মনে করাঃ

আমাদের সমাজে ‘জামারাগুলোকে’ শয়তান অর্থে ব্যবহারের একটা প্রচলন আছে। অর্থাৎ বড় শয়তান, মধ্যম শয়তান ও ছোট শয়তান বলা হয়। এরূপ নামকরণ কোন অবস্থায়ই ঠিক নয়। এ ৩টি জামারা শয়তানের প্রতিকি চিহ্নও নয়। এগুলোকে কঙ্কর নিক্ষেপ করলে শয়তানকে কঙ্কর মারা হয়, এ কথাও ঠিক নয়। এটা একটা ভুল ধারণা ও বিভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস। এই আকিদা বা ধারণা করে যে, এ জমরাতগুলো শয়তান মনে করে তারা ভাবে যে, শয়তানকেই কঙ্কর নিক্ষেপ করছে। এ কারণে আপনি দেখবেন যে, কেউ কেউ তীব্র রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়াশীল আসে। যেন শয়তান তার সামনে। এরপর এই জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করে। যার ফলে নিম্নোক্ত অনিষ্টগুলো ঘটে থাকেঃ

১। এই জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করি আল্লাহ্‌র যিকিরকে বুলন্দ করার জন্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে এবং ইবাদত হিসেবে। কেননা কোন মানুষ যদি কোন নেকীর কাজের উপকারিতা না জানা সত্ত্বেও সেটা পালন করে. সে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র ইবাদত হিসেবেই সেটা করে। এটি আল্লাহ্‌র প্রতি তার পরিপূর্ণ নতিস্বীকার ও পূর্ণ আনুগত্যের প্রমাণ।

২। কেউ কেউ তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্রোধ, রাগ, শক্তি ও আবেগ তাড়িত হয়ে কঙ্কর মারতে আসে। এরফলে সে ব্যক্তি অন্য মানুষকে কঠিন কষ্ট দেয়। সে কোন মানুষ আর মানুষ করে না, দুর্বলদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।

৩। এই কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র জন্য একটি ইবাদত পালন করছে। এ কারণে সে ব্যক্তি শরিয়ত অনুমোদিত যিকির-আযকার বাদ দিয়ে শরিয়তে অনুমোদন নেই এমন কথাবার্তা বলে। আপনি দেখবেন যে, কঙ্কর মারার সময় সে ব্যক্তি বলছে: ‘হে আল্লাহ্‌! শয়তানকে অসন্তুষ্টকরণ ও রহমানকে সন্তুষ্ট করণস্বরূপ’। অথচ কঙ্কর মারার সময় এমন কথা বলা শরিয়তসম্মত নয়। বরং শরিয়তের বিধান হচ্ছে- তাকবীর বলা, যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন।

নিম্মের হাদিস দুটি লক্ষ করিঃ

১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর ঘরে তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ এবং জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ আল্লাহ তা‘আলার যিকর প্রতিষ্ঠা করার জন্যই করা হয়েছে। (তিরমিযী)

একটা ভুল অনুভূতি নিয়ে জামারাগুলোকে কঙ্কর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে মানুষের ভাবাবেগের পরিবর্তন হয়ে যায়, বাড়াবাড়ি করে ফেলে। ফলে নানা অঘটনও ঘটে যায়। আসুন আমরা ভুল আকীদা পরিহার করি।

২. ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। অতঃপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী দাঁড়িয়ে উভয় হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। এরপর বাতন ওয়াদী হতে জামরায়ে ‘আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরূপ করতে দেখেছি। (সহিহ বুখারি ১৭৫১ তাওহীদ প্রকাশনী)

মন্তব্যঃ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন (জিকির করতেন) এবং এর পর কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতেন এবং উভয় হাত তুলে দু‘আ করতেন। কিন্তু অনেকে ধারণা করে, এই জামারাতগুলো শয়তান এবং তারা শয়তানকেই কঙ্কর নিক্ষেপ করছে। যার ফলে কেউ কেউ তীব্র রাগ, ক্ষোভ কারনে কঙ্করের পাশাপাশি ছাতা, জুতা, বড় কঙ্কর ইত্যাদি নিক্ষেপ করে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে। যেন শয়তান তার সামনে।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা হলো, জমরাতগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে  আল্লাহ্‌র যিকিরকে বুলন্দ করব। আর আমরা কঙ্কর নিক্ষেপ করছি ক্ষোপ প্রকাশের জন্য। যদি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে কঙ্কর নিক্ষপ করি তবে তা ইবাদত হবে। আর যদি শয়তায় মনে করে তীব্র প্রতিক্রিয়া বা ক্রোধের সাথে কঙ্কর নিক্ষপ করি তাহলে ইবাদাত হবে? যখন কেউ কঙ্কর নিক্ষেপের সময় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় তখনজামারার সামনে অবস্থানরত হাজিদের শুধু  কষ্টই হয়। জামারাকে শয়তার মনে করা একটি ভ্রান্ত আকিদার। যার ফলে সে একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত কে বড় বড় কঙ্কর, ছাতা, কাষ্ঠখণ্ড, জুতা ইত্যাদি নিক্ষেপ করে শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার দাবি করে থাকে। জামারাগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বাস রাখব যে, আমরা আল্লাহ্‌র মহত্ব প্রকাশ ও আল্লাহ্‌র ইবাদত পালন করছি। যেহেতু আমলটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণ হিসেবে করছি তাই মহান আল্লাহ পুরস্কারের আশা করছি।

৩। কঙ্কর নিক্ষেপের কয়েকটি ভুল পদ্ধতিঃ

১। অনেকে জামারার সামনে এতো জোরে কঙ্কর নিক্ষেপ করে যে, কঙ্কর জামারায় লেগে আবার স্বজোরে ফিরে আসে। যার ফলে অন্য হাজিদের গায় লাগে এবং তারা কষ্ট পায়। কাজেই জামারা লক্ষ করে আস্তে নিক্ষেপ করেত হবে। 

২। নিক্ষিপ্ত কঙ্করটি নির্ধারিত স্থানে ফেলার চেষ্টা করেত হবে, তা না হলে নিক্ষেপ করা সহিহ হবে না। কিন্তু অনেক হাজি আছে তারা কঙ্কর নিক্ষেপ করার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দেন না। নির্ধারিত স্থানে পড়ল, নাকি পড়ল না, তারা তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করেন না। যাহোক চেষ্টা থাকবে কঙ্করগুলো যেন জামারার হাউজের ভিতরে পড়ে এতেই ব্যক্তির দায়িত্ব মুক্ত হবে। আবার অনেকে মনে করে যে, কঙ্কর নিক্ষেপ সহিহ হওয়ার জন্য কঙ্করটি পিলারের গায়ে লাগাতে হবে। এটা ভুল ধারনা, কেননা এই পিলার নির্মাণ করা হয়েছে নিক্ষেপের জায়গাটি নির্দিষ্ট বা চিহ্নিত করার আলামত হিসেবে। কঙ্করটি যদি নিক্ষেপের জায়গায় গিয়ে পড়ে তাহলে সেটাই যথেষ্ট।

৩।  প্রতি জামারায় সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেত হবে। একটি একটি করে আলাদা আলাদা করে নিক্ষেপ করতে হবে। এক সাথে সাতটি কঙ্কর একবার মুষ্টিবদ্ধ করে নিক্ষেপ করা একটি ভুল আমল।

৪। শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বে অন্যকে দিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা যাবে না। কারণ কঙ্কর নিক্ষেপ হজ্জের অন্যতম একটি আমল। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “তোমরা হজ্জ ও উমরা আল্লাহ্‌র জন্য পরিপূর্ণ কর”। (সুরা বাকারা ২:১৯৬) এ আয়াতটির বিধান যাবতীয় কর্মসহ হজ্জ সম্পন্ন করাকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাই মানুষের উপর ওয়াজিব হচ্ছে হজ্জের কার্যাবলী নিজেই পালন করা এবং অন্য কাউকে দায়িত্ব না দেয়া।

৫।  ১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ দুপুরের আগেই কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকে। এ কাজটা ভুল। সময় শুরু হয় দুপুরের পর থেকে।

৬।  কেউ কেউ কঙ্কর ধৌত করে থাকে। এ কাজ ঠিক না।

৭। ধাক্কাধাক্কি করে অন্য হাজীদেরকে কষ্ট দিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকে। এরূপ করা অন্যায়।

৪। তাওয়াফে যিয়ারাতের পূর্বে ইহরাম ত্যাগ করা যায়ঃ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আমার এ দু’হাত দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে খুশবু লাগিয়েছি, যখন তিনি ইহ্‌রাম বাঁধার ইচ্ছা করেছেন এবং তাওয়াফে যিয়ারাহ্‌র পূর্বে যখন তিনি ইহ্‌রাম খুলে হালাল হয়েছেন। এ কথা বলে তিনি তাঁর উভয় হাত প্রসারিত করলেন। (সহিহ বুখারি ১৭৬৪)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে তাঁর ইহ্‌রামের সময় এবং তাঁর ইহ্‌রাম খোলার জন্যও, জামরাতুল আকাবায় (বড় শয়তানকে) কঙ্কর নিক্ষেপের পর এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফের পুর্বে সুগন্ধি লাগিয়েছি। (সুনানে নাসাঈ ২৬৮৭)

কুরবানির হুকুম

কুরবানির হুকুম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরবানি করা মুলত একটি ওয়াজিব ইবাদত। ইসলামি শরীয়তের অধিকাংশ মুজতাহীদ আলেম সামর্থবান মুসলিমের উপর বছরে একবার পশু কুরবানি করাকে ওয়াজিব আমল বলছেন। আমাদের চার ইমামের প্রসিদ্ধ তিন ওয়জিব বলেছেন। তারা হলেন, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম মালেক (রহঃ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)। তবে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর প্রসিদ্ধ মত হলো, কুরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ইহা ছাড়া ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস ও ইমাম তাইমিয়া ওয়াজিব বলেছেন। বর্তমানের যুগের অন্যতম সৌদী ফিকাহবীদ আলেম শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহঃ) উভয় পক্ষের দলিলঃ-প্রমাণ উল্লেখ করার পর বলেন, এ সকল দলিলঃ-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয় বরং একটা অন্যটার সম্পূরক। তার মতে,  যারা কুরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী।

যারা কুরবানি ওয়াজিব বলেন তাদের দলিল হলোঃ

আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন,

* فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ*

অর্থঃ তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং (পশু) কুরবানি কর। (সূরা কাউছার ১০৮:২)

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যে কোন নির্দেশ পালন করা ওয়াজিব। তিনি যেহেতু বলেছেন কুরবনি করে তাই করা ওয়াজিব। আমাদের প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিয়মিত কুরবানি করেছেন যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। তিনি কুরবানি করার পাশাপাশি আমাদের ও করতে  আদেশ করেছেন। তার দলিল পাওয়া যায় নিচের সহিহ হাদিসে।

মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আরাফাতের ময়দানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অবস্থানরত ছিলাম। তখন তিনি বলেনঃ হে জনগণ! প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একটি কোরবানী ও একটি আতীরা রয়েছে। তোমরা কি জানো আতীরা কী? তা হলো, যাকে তোমরা রাজাবিয়া বলো। (ইবনে মাজাহ ৩১২৫, তিরমিজি ১৫১৮, আবু দাউদ ২৭৮৮)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)

মন্তব্যঃ এই দুটি হাদিসের আলোচকে বুঝায় যায কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। যারা কুরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি উপরের হাদিস একটি সতর্ক বাণী। তাই কুরবানি ওয়াজিব।

অপর পক্ষে যারা কুরবানীকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলেছেন তাদের দলিলঃ

উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করতে চায়, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামএর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

মন্তব্যঃ এই হাদিস দুটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  ‘যে কুরবানি করার নিয়ত করে বা কুরবানি করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়। অপর পক্ষে, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কুরবানি ওয়াজিব নয়।

হজ্জের সাথে কুরবানীর হুকুমঃ

বইয়ের শুরুতে দেখতে পেয়েছি হজ্জ তিন প্রকার। তামাত্তু হজ্জ, কেরান হজ্জ এবং ইফরাদ হজ্জ।  এই তিন প্রকারের মধ্যে তামাত্তু হজ্জ এবং কেরান হজ্জে গমনকারীদের উপর কুরবানী ওয়াজিব। যারা হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধে মক্কায় প্রবেশ করে কিন্তু তাদের সাথে হাদী থাকে না। তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে এদের হজ্জকে তামাত্তু হজ্জ বলা হয়। অর্থাৎ একই সফরে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। অপর পক্ষে যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন এবং একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন, তাদের হজ্জকে কেরান হজ্জ বলা হয়। অর্থাৎ একই সফরে এক ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করা কে কেরান হজ্জ বলে। কেরান হজ্জযাত্রীতো হাদি নিয়েই আসে এবং এই হাদী কুরআনী দেয়া তাদের উপর ওয়াজিব। তামাত্তু ও কেরান হাজ্জিদের ইহরাম ত্যাগ করা আগে কুরবাণী দেয়া ওয়াজিব।

দলিল নিম্মের হাদিসঃ

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে বের হলাম এবং একে হাজ্জের সফর বলেই আমরা জানতাম। আমরা যখন (মক্কা্য়) পৌঁছে বাইতুল্লাহ-এর তাওয়াফ করলাম তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেনঃ যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসেনি তারা যেন ইহরাম ছেড়ে দেয়। তাই যিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেননি তিনি ইহরাম ছেড়ে দেন। আর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ তাঁরা ইহরাম ছেড়ে দিলেন। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, আমি ঋতুমতী হয়েছিলাম বিধায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। (সহিহ বুখারি ১৫৬১ নম্বর হাদিসের প্রথম আংশ)

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫)

হাদী কুরবানী করতে সমর্থ না হলে করনীয়ঃ

হজ্জের সময়ের মিকাত হলো, পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। এই সময়ের আগে বা পরে আসলে হজ্জের ইহরান বেধে মক্কা প্রবেশ করা যাবে না। শুধু উমরার ইহরাম বাধা যাবে। আর এই সময় মাঝে আসলে হজ্জ ও উমরা উভয়ের নিয়তে মক্কা প্রবেশ করা যাবে। কেননা, মহান আল্লাহই হজ্জের তারিখ নির্দষ্ট করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

 الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ اللّهُ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُوْلِي الأَلْبَابِ

অর্থঃ হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। ( সুরা বাকারা ২:১৯৭)

ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, হজ্জ-এর মাসগুলো হলঃ শাওয়াল, যিলক্বাদ এবং যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ সুন্নাত হল, হজ্জের মাসগুলোতেই যেন হজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা হয়।

আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলেনঃ যদি কেউ হজ্জের মাসে অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকা’দা, যিলহজ্জ মাসে হজ্জের পূর্বে উমরা আদায় করিয়া মক্কায় এতদিন অবস্থান করে, যতদিনে সে হজ্জই আদায় করিতে পারে, তাহার এই হজ্জ তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাহার উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। যদি কুরবানী করার সামর্থ্য তাহার না থাকে তবে মক্কায় অবস্থানকালে তিনদিন এবং বাড়ি ফিরিয়া আর সাতদিন তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ উক্ত হুকুম তখনই প্রযোজ্য হইবে যখন উমরা সমাপন করিয়া হজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানরত থাকিবে এবং হজ্জও করিবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ মক্কার বাসিন্দা কোন ব্যক্তি অন্য কোথাও গিয়া বসতি স্থাপন করিল। হজ্জের মাসে সে উমরা করিতে আসিয়া মক্কায় অবস্থান করিয়া হজ্জ সমাধা করিল। তাহার এই হজ্জ হজ্জে তামাত্তু বলিয়া গণ্য হইবে। এই ব্যক্তির উপর কুরবানী করা জরুরী হইবে। কুরবানী করিতে না পারিলে তাহাকে রোযা রাখিতে হইবে। মক্কার অপরাপর স্থায়ী বাসিন্দার মত তাহার হুকুম হইবে না। (মুয়াত্তা মালিক ৭৬০, হজ্জ অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ১৯, রেওয়াত ৬৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ কোন ব্যক্তি যদি শাওয়াল মাস আসার পূর্বেই উমরার ইহরাম করে এবং (বাকি সময়টা) মক্কায় অবস্থান করে সেই বছরেই হাজ্জও করে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব হবে না। কারণ, সে তামাত্তুকারী নয়। কেননা সে হাজ্জের মাস আসার পূর্বেই উমরার ইহরাম করেছে। হাজ্জে তামাত্তু ও কেরান হাজ্জির জন্য হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে যে, সে যেন মক্কা বা হারামের এলাকার অধিবাসী না হয়। সুতরাং যারা মক্কা বা হারামের এলাকার অধিবাসী তাদের উপর হাদী (কুরবানী) যবহ করা ওয়াজিব নয়। যার দলিল মহান আল্লাহর বাণী,

**(فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ )البقرة **

যে কেউ উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে উচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এ মোট দশদিন সিয়াম পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

মক্কা বা হারামের বাইরের কোন শহর যদি কেউ হজ্জ করতে আসে আর যদি তারা তামাত্তু বা কেরান হজ্জের নিয়ত করে, তবে তাদের প্রতি হাদী (কুরবানী) করা ওয়াজিব। কারণ, তারা মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। তবে যদি মক্কার অধিবাসী বিদ্যার্জনের জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশে মক্কার বাইরে সফর করে, অতঃপর হাজ্জে তামাত্তু বা কেরানের নিয়তে মক্কা ফিরে আসে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) করা ওয়াজিব হবে না। কারণ, এক্ষেত্রে তার বাসস্থানকে কেন্দ্র করতে হবে, আর তা হলো মক্কা মুকার্রামাহ।

মন্তব্যঃ তামাত্তু হজ্জ এবং কেরান হজ্জ আদায়কারী যদি হাদী (কুরবানীর পশু) না পায় বা তার খরচ-খরচা এবং বাড়ি ফিরে আসার মত পয়সার অতিরিক্ত কুরবানী ক্রয় করার পয়সা না থাকে তাহলে তার প্রতি হাদী (কুরবানী) ওয়াজিব হবে না, বরং তার সিয়াম পালন করা আবশ্যক হবে। যার দলিল মহান আল্লাহর বাণী,

**(فَمَن تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ تِلْكَ عَشَرَةٌ كَامِلَةٌ ذَلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ )البقرة **

যে কেউ উমরাহকে হাজ্জের সঙ্গে মিলিয়ে উপকার লাভ করতে উচ্ছুক, সে যেমন সম্ভব কুরবানী দিবে এবং যার পক্ষে সম্ভব না হয়, সে ব্যক্তি হাজ্জের দিনগুলোর মধ্যে তিনদিন এবং গৃহে ফেরার পর সাতদিন, এ মোট দশদিন সিয়াম পালন করবে। এটা সেই লোকের জন্য, যার পরিবারবর্গ মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। (সুরা বাকারা ২:১৯৬)

তাশরীক্বের দিনগুলিতে কি এই সিয়াম পালন করা যাবে?

হ্যা, তাশরীক্বের দিনগুলিতে এই সিয়াম আদায় করা জায়েয। তাশরীক্বের দিনগুলো হলো, আরবী যিলহাজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ। তামাত্তু ও কিরান হজ্জযাত্রীগণ এই দিনে হাদি কুরবাণীর কাফ্ফারা হিসাবে সিয়াম পালন করতে পারলেও সাধারণত কোন হাজ্জিকে এই দিনে সিয়াম পালনের অনুমতি প্রদান করা হয় নাই। এই দিনে সিয়াম জায়েয হওয়ার দলিলঃ

*** আয়িশাহ্ (রাযি.) ও ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন, যাঁর নিকট কুরবানীর পশু নেই তিনি ব্যতীত অন্য কারও জন্য আইয়্যামে তাশরীকে সওম পালন করার অনুমতি দেয়া হয়নি। (সহিহ বুখারী ১৯৯৭-১৯৯৮)

তামাত্তু এবং কিরান হজ্জযাত্রী ব্যাক্তি যদি বুঝতে পারে যে, হজ্জের সময় তিনি হাদি কুরবাণী দিতে পারবেন না। অর্থাৎ হজ্জের অন্যতম ওয়াজিব কাজ কুরবানী তিনি আদায় করতে সমর্থ হবেন না। এই ব্যাক্তি ইচ্ছা করলে উমরার ইহরাম বাঁধার পরে, হজ্জের কার্যক্রম শুরুর আগেই তিনটি সিয়াম পালন করতে পারে। এইকথার দলিলঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী,

*** ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত পর্যন্ত হাজ্জের মধ্যে উমরাও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। (সুনানে তিরমিজি ৯৩২)

*** ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এ সেই ‘উমরা যা থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি। কাজেই যার সাথে কুরবানীর পশু নেই সে সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যাবে। আর ‘উমরা কিয়ামাত পর্যন্ত হজের (হজ্জের) মধ্যে প্রবেশ করলো।(সুনানে আবু দাউদ ১৭৯০)

মন্তব্যঃ যদি উমরার অবস্থায় তিনটি সিয়াম পালন করে তাহলে সে হাজ্জের দিনেই সিয়াম পালন করল। তবে ঈদের দিনে এই সিয়াম পালন করবে না।

*** আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ (দিনের) সিয়াম ও দু’ (প্রকারের) ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করা হয়েছে, ঈদুল ফিতর ও কুরবানীর (দিনের) সিয়াম এবং মুলামাসা ও মুনাবাযা (পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয়) হতে। (সহিহ বুখারি ১৯৯৩)

উকবা ইবনু আমির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের মুসলিম জনগণের ঈদের দিন হচ্ছে আরাফার দিন, কুরবানীর দিন ও তাশরীকের দিন। এ দিনগুলো হচ্ছে পানাহারের দিন।  (তিরমিজি ৭৭৩)

আর এই সিয়ামগুলি পরস্পর রাখা এবং বিরতি দিয়েও রাখা জায়েয। তবে তাশরীক্বের দিনগুলির পরে রাখবে না। আর অবশিষ্ট সাতটি সিয়াম নিজ গৃহে ফিরার পরে মন চাইলে বিনা বিরতিতে অথবা বিরতি দিয়ে আদায় করবে। কারণ, আল্লাহ পাক এই সিয়াম ওয়াজিব করেছেন, কিন্তু এক নাগাড়ে সিয়াম পালনের শর্তারোপ করেননি।

কুরবানির শর্তসমূহ

কুরবানির শর্তসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ কুরবানিকে সঠিকভাবে করতে হলে রাসূল এর দেখান সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি আদায় করতে হবে। আমাদের মন মত যে কোন পশু ধরে জবেহ দিলেই কুরবানী আদায় হবে না। কোন পশু কোন তারিখে কি পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবে। জবেহকৃত পশুর গোশ্তের বিধানা কি এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান কুরআন সুন্নাহ থেকে জেনে আমল করতে হবে। কুরবানিকে সঠিক ও কবুল যোগ্য কারার জন্য আমাদের নিম্মের শর্তগুলি লক্ষ রাখতে হবে।

১। এক মাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবে

২। পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবে

৩। কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবে

৪। পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত হতে হবে

৫। পশুটি অবশ্যই সুসাস্থের অধিকারী হতে হবে

৬। বড় পশুকে সাতজন ও ছোট পশুকে একজনে কুরবানি দিতে হবে

৭। হাজ্জিদেরকে মিনা অথবা মক্কার অলীগলিতে পশু জবেহ করতে হবে

৮। হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরিকে দিনে জবেহ করতে হবে

৯। ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে না

১০। শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবে

১১। দাঁত ও নখ দ্বারা জবেহ করা যাবে না

১২। আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবে

১৩। গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে না

১৪। জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকে

১৫। শরীয়ত সম্মতভাবে গোশ্ত বন্টন করা

১৬। কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে না

১৭। কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে না

১। এক মাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবেঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ*

অর্থঃ এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। ( সুরা হাজ্জ্ব ২২:৩৭ )

২। পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবেঃ

কুরবাণীর পশু হলো, উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। এর দলিল মহান আল্লাহর বলেন,

(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ)

অর্থঃ আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক্ দেয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। কারণ, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। (সুরা হজ্জ ২২:৩৪)

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহ পশুর ধরণ বলেছেন, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। আমাদের সমাজে প্রচলিত গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হলোঃ- উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ।

১. আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন আমাদের খুৎবা দিলেন এবং দু’টি কালো-সাদা রঙের দুম্বার নিকট গিয়ে তা যবেহ করলেন। (নাসাঈ ৪৩৮৮)

২. আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’টি শিংওয়ালা হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা কুরবানী করলেন, যার পা সমূহ শুভ্র ছিল আর পূর্ন শরীর কালো আর তার পেট ছিল কালো, আর চোখও ছিল কালো। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯০)

৩. .জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানীর দিন ‘আয়িশা (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেন। (সহিহ মুসলিম ৩০৮২)

৪. যিয়াদ ইবনু জুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ইবনু ‘উমার (রাঃ) এক ব্যক্তির কাছে এলেন। সে তার উটকে বসিয়ে কুরবানী করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিনি বললেন, এটাকে দাঁড় করিয়ে কুরবানী কর। এটাই তোমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত। (সহিহ মুসলিম ৩০৮৪)

৫. আবূ জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) কে তামাত্তু‘ হাজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে তা আদায় করতে আদেশ দিলেন। এরপর আমি তাঁকে কুরবানী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তামাত্তু‘র কুরবানী হলো একটি উট, গরু বা বকরী অথবা এক কুরবানীর পশুর মধ্যে শরীকানা এক অংশ। আবূ জামরাহ (রহ.) বলেন, লোকেরা তামাত্তু হাজ্জকে যেন অপছন্দ করত। একদা আমি ঘুমালাম তখন দেখলাম, একটি লোক যেন (আমাকে লক্ষ্য করে) ঘোষণা দিচ্ছে, উত্তম হাজ্জ এবং মাকবূল তামাত্তু‘। এরপর আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে বললেন, এটাই তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। আদম, ওয়াহাব ইবনু জারীর এবং গুনদার (রহ.) শু‘বাহ্ (রহ.) হতে মাকবূল ‘উমরাহ এবং উত্তম হাজ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৮)

৩। কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়ত পশুর নির্ধারিত বয়স ঠিক করে দিয়ছে। আর তা হচ্ছে, উঁটের বয়স পাঁচ বছর সম্পূর্ণ হওয়া, গরুর বয়স দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়া, ছাগলের বয়স এক বছর সম্পূর্ণ হওয়া, মেষ বা দুম্বার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া। এর কম বয়সের হলে তা কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না। এর দলিলঃ

১. উকবা ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মধ্যে কুরবানীর পশু বণ্টন করলেন। আমার অংশে একটি এক বছরের বকরী পড়লো। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার অংশে একটি এক বছরের বকরী পড়েছে। তিনি বললেনঃ তুমি তা কুরবানী কর। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮১)

২. উকবা ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে একটি এক বছর বয়সী ভেড়া কুরবানী করেছি। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮৩)

৩. কুলায়ব (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার সফরে ছিলাম, তখন কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হলো। আমাদের একেক ব্যক্তি দুটি বা তিনটি এক বছরের ভেড়ার পরিবর্তে একটি দু’ বছরের বয়সের ভেড়া খরিদ করছিল। তখন মুযায়না গোত্রের এক ব্যক্তি বললোঃ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। এমন সময় দিনটি উপস্থিত হলে এক ব্যক্তি দুটি বা তিনটি এক বছরের ভেড়ার পরিবর্তে একটি দু বছরের ভেড়া তালাশ করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বকরীর ক্ষেত্রে দু বছর বয়সী দ্বারা যেভাবে কুরবানী আদায় হয়, তদ্রুপ এক বছর বয়সী দ্বারাও আদায় হয়ে যাবে। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৮৪)

৪। আসিম ইবনু কুলাইব (রহঃ) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিতঃ তিনি (কুলাইব) বলেন, আমরা বনী সুলাইম গোত্রের মুজাশি’ নামক নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এক সাহাবীর সাথে ছিলাম। একবার বকরীর মূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পেলে তিনি ঘোষককে নির্দেশ দেয়ায় সে ঘোষণা করলো রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেনঃ এক বছর বয়সের ছাগলের স্থানে ছয় মাস বয়সের ভেড়া যথেষ্ট। আবূ দাউদ (রহঃ) বলেন, তিনি মাসউদের পুত্র মুজাশি’ (রাঃ)। (আাবু দাউদ ২৭৯৯)

৫। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে একবার উটের স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি লোকেদেরকে গরু কোরবানী করার নির্দেশ দেন। (ইবনে মাজাহ ৩১৩৪)

৬। মুজাশি‘ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ (কুলায়ব) বলেন, আমরা সুলায়ম গোত্রের মুজাশি‘ (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এক সাহাবীর সাথে ছিলাম। মেষ-বকরীর স্বল্পতা দেখা দিলে তিনি একজন ঘোষককে নির্দেশ দিলেন এবং তদনুযায়ী সে ঘোষণা করলোঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেনঃ এক বছর বয়সের বকরীর দ্বারা যে কাজ হয় (কোরবানীর ক্ষেত্রে) ছয় মাস বয়সের মেষ দ্বারাও তা হতে পারে। (ইবনে মাজাহ ৩১৪০, আলবালীঃ হাদিসের মান সহিহ, নাসায়ী ৪৩৮৩, ৪৩৮৪, আবূ দাউদ ২৭৯৯)

৭। আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সালাতের পূর্বে যে যবেহ্ করবে তাকে পুনরায় যবহ্ করতে হবে। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আজকের এ দিনটিতে গোশত খাবার আকাঙ্ক্ষা করা হয়। সে তার প্রতিবেশীদের অবস্থা উল্লেখ করল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। সে বলল, আমার নিকট এখন ছয় মাসের এমন একটি মেষ শাবক আছে, যা আমার নিকট দু’টি হৃষ্টপুষ্ট বকরীর চাইতেও অধিক পছন্দনীয়। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেটা কুরবানী করার অনুমতি দিলেন। অবশ্য আমি জানি না, এ অনুমতি তাকে ছাড়া অন্যদের জন্যও কিনা? (সহিহ বুখারি ৯৮৪, ৫৫৪৬, ৫৫৪৯, ৫৫৬১)

৮. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা মুসিন্নাহ্‌ (দুধ দাঁত পড়ে গেছে এমন পশু) ছাড়া কুরবানী করবে না। তবে এটা তোমাদের জন্য কষ্টকর মনে হলে তোমরা ছ’মাসের মেষ-শাবক কুরবানী করতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৭৬)

৪। পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত হতে হবেঃ

১. উবাইদ ইবনে ফাইরূয (রাঃ) বলেন, আমি বারাআ ইবনে আযিব (রাঃ) কে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধরনের পশু কোরবানী করতে অপছন্দ অথবা নিষেধ করেছেন সেই সম্পর্কে আমাদের বলুন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতের ইশারায় বলেন, এরূপ, আর আমার হাত তাঁর হাতের চেয়ে ক্ষুদ্র। চার প্রকারের পশু কোরবানী করলে তা যথেষ্ট হবে না। অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট, রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে। উবাইদ (রাঃ) বলেন, আমি ক্রটিযুক্ত কানবিশিষ্ট পশু কোরবানী করা অপছন্দ করি। বারাআ (রাঃ) বলেন, যে ধরনের পশু তুমি নিজে অপছন্দ করো তা পরিহার করো, কিন্তু অন্যদের জন্য তা হারাম করো না। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৪)

২. বারাআ ইবনু আযিব (রাঃ) মারফু হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হিসাবে বর্ণনা করেছেনঃ খোড়া জন্তু যার খোড়ামী স্পষ্টভাবে প্রকাশিত; অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত; রুগ্ন পশু যার রোগ দৃশ্যমান এবং ক্ষীণকায় পশু যার হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে- তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। (সুনানে তিরমিযী ১৪৯৭)

৩. বনী শায়বানের আযাদকৃত দাস আবু যাহহাক উবায়দ ইবন ফায়রূয (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বারা (রাঃ)-কে বললাম, যে সকল পশু কুরবানী করতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, তা আমার নিকট বর্ণনা করুন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খুতবা দিতে) দাঁড়ালেন আর আমার হাত তাঁর হাত অপেক্ষা ছােট। তিনি বললেন, চার প্রকার পশু কুরবানী বৈধ নয়, কানা পশু যার কানা হওয়াটা সুস্পষ্ট, রুগ্ন যার রোগ সুস্পষ্ট, খোঁড়া পশু যার খোঁড়া হওয়া সুস্পষ্ট; দুর্বল, যার হাঁড়ে মজ্জা নেই। আমি বললামঃ আমি শিং ও দাঁতে ত্রুটি থাকাও পছন্দ করি না। তিনি বললেনঃ তুমি যা অপছন্দ কর, তা ত্যাগ কর; কিন্তু অন্য লোকের জন্য তা হারাম করো না।

(নাসায়ী ৪৩৭০, ৪৩৭১)

৪. হুজায়্যা ইব্‌ন আদী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আলী (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করেছেন আমরা যেন কুরবানীর পশুর চোখ ও কান উত্তমরূপে দেখে নিই। (নাসায়ী ৪৩৭৬)

উপরের হাদিসগুলো থেকে ষ্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয়ে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি দোষ হতে কুরবানীর পশুর মুক্ত হওয়া জন্য বলেছেন। কুরবানীর পশুর যে চারটি দোষমুক্ত হবে তা হলোঃ

১। অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট

২। রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট

৩। খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং

৪। কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।

৫। পশুটি অবশ্যই সুসাস্থের অধিকারী হতে হবেঃ

কুরবানীর পশুতে যে সব গুণ থাকা উত্তম তা হলো, কুরবানীর পশুর মোটা হওয়া, শক্তিশালী হওয়া, দৈহিক গঠনে বড় হওয়া এবং দেখতে সুন্দর হওয়া। সুতরাং কুরবানীর পশু যত ভাল হবে ততই মহান আল্লাহর নিকট তা প্রিয় হবে। আর সহীহ হাদীসে রয়েছে, আল্লাহ সুন্দর ও উত্তম, তাই তিনি সুন্দর ও উত্তম ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।

দলিলঃ

১. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন শিংবিশিষ্ট মোটাতাজা দুম্বা কুরবানী করেছেন যার চোখ, মুখ ও পা কালো বর্ণের ছিলো। (আবু দাউদ ২৭৯৬)

২. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানির ইচ্ছা করলে দু’টি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধুসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর এর একটি নিজ উম্মাতের যারা আল্লাহ্‌র একত্বের সাক্ষ্য দেয় এবং তাঁর নবুয়াতের সাক্ষ্য দেয় তাদের পক্ষ থেকে এবং অপরটি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন। ইবনে মাজাহ ৩১২২)

৩. আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে (কোরবানীর পশুর) চোখ ও কান উত্তমরূপে পরীক্ষা করে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৩)

বড় পশুকে সাতজন ও ছোট পশুকে একজনে কুরবানি দিতে হবেঃ

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হুদাইবিয়ার বছর (৬ষ্ঠ হিজরী) আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে প্রতি সাতজনের পক্ষ থেকে একটি উট এবং প্রতি সাতজনের পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী করেছি। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৬)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হাজ্জের ইহরাম বেঁধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে রওনা হলাম। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি উট বা গরু সাতজনে মিলে কুরবানী করার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৭)

৩. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জ ও ‘উমরাহ্ পালনকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাতজনে মিলে একটি উট কুরবানী করেছি। এক ব্যক্তি জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, জাযূর-এ যে ক’জন শারীক হতে পারে- বাদানাহ্-তেও কি অনুরূপ শারীক হওয়া যায়? তখন তিনি বললেন, উভয় তো একই। জাবির (রাঃ) হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা ঐদিন ৭০টি উট কুরবানী করেছি। প্রতিটি উটেই ৭ জন শারীক ছিলাম। (সহিহ মুসলিম ৩০৭৯)

৪. ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কোন এক সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ আসলে আমরা একটি গরুতে সাতজন এবং একটি উটে দশজন করে শরীক হই। (তিরমিজি ৯০৫, ইবনু মাজাহ ৩১৩১)

৫. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে ছিলাম, তখন কুরবানীর সময় উপস্থিত হলে আমরা একটি উটে দশজন শরীক হলাম, আর একটি গাভীতে সাতজন। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯৩)

৬. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগে তামাত্তু হাজ্জ করতাম এবং সাতজন মিলে একটি গরু কুরবানী করতাম। অনুরূপভাবে একটি উটেও সাতজন শরীক হয়ে কুরবানী করেছি। আবু দাইদ ২৮০৭)

৭. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সঙ্গে তামাত্তু হজ্জ করতাম। আমরা সাতজনের পক্ষ থেকে গরু যবেহ করতাম এবং তাতে শরীক হতাম। (সুনানে নাসাঈ ৪৩৯৪)

৮. আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যে সকল স্ত্রী উমরাহ (অর্থাৎ তামাত্তো হাজ্জ) করেন, তিনি তাদের সকলের পক্ষ থেকে একটি গাভী কোরবানী করেন।  ইবনে মাজাহ ৩১৩৩

মন্তব্যঃ এই সকল হাদীস থেকে প্রমানিত হয় যে, ভাগে কুরবানী তথা কয়েকজন মিলে একটি পশু কুরবানী করা জায়িয। অধিকাংশ মুজতাহীদ আলেমদের অভিমত হল ভাগে কুরবানী জায়িয, কুরবানী ওয়াজিব হোক আর মুস্তাহাব হোক। উপরে বর্ণিত হাদিসই তার দলিল। অন্যদিকে সামান্য কিছু আলেমদের মত হলো, নাফলের ক্ষেত্রে ভাগ দেয়া, বৈধ ওয়াজিব এর ক্ষেত্রে নয়।

ইমাম আবূ হানিফার মতে, সকলেরই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য হয় তবে ভাগে কুরবানী জায়িয, অন্যথায় জায়িয নয় (অর্থাৎ শারীকদের মধ্যে কেউ যেন কেবল গোশত খাওয়ার নিয়্যাত না করে)।

আর সকলের ঐকমত্যে ছাগল-বকরীতে ভাগে কুরবানী জায়িয নয় । বর্ণিত হাদীসসমূহ থেকে জানা যায় যে, উট এবং গরুর ক্ষেত্রে সাত সাতজন ব্যক্তি শারীক হতে পারে। যাবির (রাঃ)-এর শেষ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তামাত্তু‘ হাজ্জ পালনকারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব এবং ওয়াজিব কুরবানীতে ভাগে কুরবানী করা জায়িয । মূলকথা কুরবানী ভাগে না দিয়ে একাই দেয়াই উত্তম।

হাজ্জিদেরকে মিনা অথবা মক্কার অলীগলিতে পশু জবেহ করতে হবেঃ

হজ্জ সংশ্লিষ্ট সকল স্থানই হাদী জবেহ করার স্থান নয়। শুধু মিনা এবং মক্কা বা হারামের এলাকায় হাদী জবেহ জায়েয। এর দলিলঃ

১. আত্বা (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আরাফাহ্‌র পুরো এলাকাই অবস্থানের জায়গা। মিনার সম্পূর্ণ এলাকা কুরবানীর স্থান এবং মুযদালিফার বিস্তৃত এলাকা অবস্থানের স্থান এবং মক্কার প্রতিটি অলি-গলি চলাচলের পথ এবং কুরবানীর স্থান। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৭)

২. ‘আতা (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযি.) আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আরাফার পুরো এলাকাই অবস্থানের জায়গা। মিনার সম্পূর্ণ এলাকা কুরবানীর স্থান এবং মুযদালিফার বিস্তৃত এলাকা অবস্থানের স্থান এবং মক্কার প্রতিটি অলি-গলি চলাচলের পথ এবং কুরবানীর স্থান। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৭)

৩. জাবির (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি এ স্থানে কুরবানী করেছি। আর মিনার পুরো এলাকাই কুরবানীর স্থান। তিনি আরাফার এক স্থানে অবস্থান করেছেন এবং বলেছেনঃ আমি এ স্থানে অবস্থান করেছি, আর আরাফার সম্পূর্ণ এলাকাই অবস্থানের স্থান। তিনি মুযদালিফার এক স্থানে অবস্থান করেছেন এবং বলেছেনঃ আমি এ স্থানে অবস্থান করেছি, আর মুযদালিফার পুরো এলাকাই অবস্থানের স্থান। (আবু দাউদ ১৯০৭)

৪. জাবির (রাযিঃ) কর্তৃক বর্ণিত। তার এ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আমি এখানে কুরবানী করেছি এবং মিনার গোটা এলাকা কুরবানীর স্থান। অতএব তোমরা যার যার অবস্থানে কুরবানী কর। আর আমি এখানে অবস্থান করছি এবং গোটা ‘আরাফাহই অবস্থানস্থল (মাওকিফ), মুযদালিফার সবই অবস্থানস্থল এবং আমি এখানে অবস্থান করছি।” (সহিহ মুসলিম ২৮৪২)

৫. আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুযদালিফায় রাত যাপনের পর সকালে ‘কুযাহ’ পাহাড়ে অবস্থান করেন এবং বললেনঃ এটি ‘কুযাহ’ এবং এটাই অবস্থানস্থল। মুযদালিফার গোটা এলাকাই অবস্থানের স্থান। (তারপর মিনায় এসে বললেন) আমি এ স্থানে কুরবানী করেছি। মিনার পুরো এলাকাই কুরবানী স্থান। সুতরাং তোমরা তোমাদের নিজ নিজ অবস্থানে কুরবানী করো। (আবু দা্‌উদ ১৯৩৫)

৬. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন মিনার সমস্ত এলাকাই কোরবানীর স্থান, মক্কার প্রতিটি প্রশস্ত সড়কই রাস্তা এবং কোরবানীর স্থান, আরাফাতের গোটা এলাকাই অবস্থানস্থল এবং মুযদালিফার সমস্ত এলাকাও অবস্থানস্থল। ইবনে মাজাহ ৩০৪৮)

মন্তব্যঃ ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, হারামের সমস্ত এলাকা হচ্ছে কুরবানীস্থল, সুতরাং হাজ্জে বা উমরায় হারামের যে কোন স্থানে কুরবানী করলেই যথেষ্ট হবে। তাই যদি দেখা যায় যে, কুরবানী মক্কায় করলে দরিদ্রদের বেশী লাভ হবে তাহলে মক্কাতেই কুরবানী করবে, তা ঈদের দিন হোক কিংবা তার পরের তিন দিনে হোক। আর যদি কেউ হারামের এলাকার বাইরে, যেমন আরফায় বা অন্য কোন হালাল স্থানে হাদী জবেহ করলে প্রসিদ্ধ মতে তা যথেষ্ট হবে না।

হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরিকে দিনে জবেহ করতে হবেঃ

১০ ই জিলহাজ্জ অর্থাৎ ঈদের দিন সূর্য এক বর্ষা পরিমাণ উদয় হওয়া ও ঈদের সলাত সমাপ্ত হওয়ার পর থেকে হাদী জবেহের সময় শুরু হয়। এই কাজ একটা তাশরীকের শেষ দিন অর্থাৎ ১৩ই জিলহাজ্জ সূর্যাস্তের আগ পর্যান্ত চলতে থাকবে। তবে সুন্নাহ হলে ঈদের সালাতের পর দেরী না করে সকাল সকাল কুরআনী দেয়া, কেননা, নাবী (সা.) নিজ কুরবানীর পশু ঈদের দিন সকাল বেলা যবাহ করেছেন।

দলিল পেলে দিব

অনুরূপ তাশরীকের দিনগুলি অতিবাহিত হওয়ার পর কুরবানী করা জায়েয নয়। কারণ, ইহা কুরবানীর জন্য নির্ধারিত দিনের বাইরে। আর এই চার দিনের রাত দিন যে কোন সময় কুরবানী করা জায়েয, তবে দিনে কুরবানী করা উত্তম।

ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে নাঃ

ঈদের দিন মাঠে দু’রাক’আত নামায আদায়ের পূর্বে কেউ যদি কুরবানীর পশু যাবাহ করে ফেলে তাহলে সেটি কুরবানী হবে না বরং তা সাধারণ পশু যাবাহের মত হবে।

১. জুনদুব ইবন সুফয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, সালাত শেষে দেখলেন একটি বকরী যবেহ করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, সালাতের পূর্বে কে যবেহ করলো? সে যেন এর পরিবর্তে অন্য একটি বকরী যবেহ করে। আর যে এখনও যবেহ করেনি, সে যেন আল্লাহর নামে যবেহ করে। (নাসায়ী ৪৩৬৯)

২. বারাআ ইবনু ‘আযিব (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল আযহার দিন সালাতের পর আমাদের উদ্দেশে খুৎবাহ দান করেন। খুৎবাহ্য় তিনি বলেনঃ যে আমাদের মত সালাত আদায় করল এবং আমাদের মত কুরবানী করল, সে কুরবানীর রীতিনীতি যথাযথ পালন করল। আর যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করল তা সালাতের পূর্বে হয়ে গেল, এতে তার কুরবানী হবে না। বারাআ-এর মামা আবূ বুরদাহ্ ইবনু নিয়ার (রাযি.) তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জানা মতে আজকের দিনটি পানাহারের দিন। তাই আমি পছন্দ করলাম যে, আমার ঘরে সর্বপ্রথম যবহ্ করা হোক আমার বকরীই। তাই আমি আমার বকরীটি যবহ্ করেছি এবং সালাতে আসার পূর্বে তা দিয়ে নাশ্তাও করেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার বকরীটি গোশ্তের উদ্দেশ্যে যবেহ্ করা হয়েছে। তখন তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নিকট এমন একট ছয় মাসের মেষ শাবক আছে যা আমার নিকট দু’টি বকরীর চাইতেও পছন্দনীয়। এটি (কুরবানী করলে) কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তবে তুমি ছাড়া অন্য কারো জন্য যথেষ্ট হবে না। (সহিহ বুখারি ৯৮৫)

৩. জুন্‌দাব ইবনু সুফ্‌ইয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে ঈদুল আয্‌হায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি অন্য কোন কাজ না করে সলাত আদায় করলেন। সলাত শেষে সালাম ফিরলেন। অতঃপর তিনি কুরবানীর গোশ্‌ত দেখতে পেলেন, যা তাঁর সলাত আদায়ের আগেই যাবাহ করা হয়েছিল। তারপর তিনি বললেন, যে লোক সলাত আদায়ের আগে তার কুরবানীর পশু যাবাহ করেছে, সে যেন এর জায়গায় অন্য একটি পশু যাবাহ করে। আর যে ব্যক্তি যাবাহ করেনি সে যেন আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে (বিস্‌মিল্লা-হ) যাবাহ করে। (সহিহ মুসলিম ৪৯৫৮)

১০। শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে জবেহ করতে হবেঃ

কুরবানি দাতা নিজের কুরবানির পশু নিজেই যবেহ করবেন, যদি তিনি ভালভাবে যবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যবেহ করেছেন। আর যবেহ করা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কুরবানি নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিৎ। উট জবেহ করার ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো, পশু দাঁড় করে সামনের বাম পা বাঁধা অবস্থায় কুরবানী করা। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে পশু দাঁড়ান অবস্থায় বা বসা অবস্থায় জবেহ করবে। পক্ষান্তরে উঁট ছাড়া অন্য পশু যবহের ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো, পশুকে কাত করে শুয়ে দিয়ে জবেহ করা। দাঁড় করে জবেহ করা পশুর বুকের দিক থেকে গলার নিচভাগে হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে শুইয়ে যবহ করা পশুর মাথার দিক থেকে গলার উপরভাগে হয়ে থাকে। দাঁড় করে যবহ করা হোক কিংবা শুইয়ে যবহ করা, উভয় ক্ষেত্রে পশুর গলার ‘ওয়াদাজ’ নামক দুটো শিরা কেটে রক্ত প্রবাহিত করা আবশ্যক। আর রক্ত প্রবাহিত করার শরীয়াত সম্মত পদ্ধতি হলো, গলার দুটো শিরা কেটে দেয়া। দুই ওয়াদাজ হলো, খাদ্য নালীর দুই পাশ্বের মোটা শিরা। আর তা সম্পূর্ণভাবে কাটতে হলে খাদ্যনালী এবং কণ্ঠনালীও তার সাথে কাটতে হবে। পশুর প্রতি সহনশীল আচরণ করে জবেহ করা উচিত। যাতে প্রানীর কষ্ট কম হয় তার প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।

দলিলঃ

শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি জিনিসের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনের আবশ্যকতা গণ্য করেছেন। অতএব তোমরা (কিসাসে অথবা জিহাদে) কোন লোককে হত্যা করলে উত্তম পন্থায় হত্যা করবে এবং কোন কিছু যবেহ করার সময় উত্তম পন্থায় যবেহ করবে। তোমাদের মধ্যে যে কেউ যেন তার ছুরি ভালভাবে ধারালো করে নেয় এবং যবেহ করার পশুটিকে আরাম দেয়। (সুনানে তিরমিজি ১৪০৯, ইবনু মাজাহ ৩১৭০ হাদিসের মান সহিহ)

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি ধারালো করতে এবং তা পশুর দৃষ্টির অগোচরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যবেহ করার সময় যেন দ্রুত যবেহ করে।(ইবনে মাজাহ ৩১৭২)

১১। দাঁত ও নখ দ্বারা জবেহ করা যাবে নাঃ

রাফি’ ইবনু খাদীজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমরা আগামীকাল শত্রুর সঙ্গে মুকাবিলা করবো। অথচ আমাদের সঙ্গে কোন ছুরি নেই। তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি কিংবা ভালভাবে দেখে নিখঁতভাবে যাবাহ করবে। যা রক্ত প্রবাহিত করে, যার উপর আল্লাহ্‌র নাম নেয়া হয় তা (দিয়ে যাবাহকৃত জন্তু) খাও। তবে তা যেন দাঁত ও নখ না হয়। আমি তোমাদের কাছে এর কারণ বর্ণনা করেছি। কেননা দাঁত হলো হাড় বিশেষ, আর নখ হলো হাবশীদের ছুরি। রাবী বলেন, আমরা গনীমাতের কিছু উট ও বকরী পেলাম। সেখান থেকে একটি উট ছুটে গেলে এক লোক তীর মেরে সেটাকে আটকিয়ে ফেললো। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এসব উটের মধ্যেও বন্য প্রাণীর মতো আচরণ রয়েছে। অতএব এগুলোর মাঝে কোন একটি যদি নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে যায় তবে তার সঙ্গে এরূপ ব্যবহারই করবে। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৬)

রাফি‘ ইবনু খাদীজ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম। আগামী দিন আমরা শত্রুর সম্মুখীন হব অথচ আমাদের সঙ্গে কোন ছুরি নেই। তিনি বললেনঃ সতর্ক দৃষ্টি রাখ কিংবা তিনি বলেছেন, জলদি কর। যে জিনিস রক্ত প্রবাহিত করে এবং যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়, সেটি খাও। যতক্ষণ না সেটি দাঁত কিংবা নখ হয়। এ ব্যাপারে তোমাদের জানাচ্ছি, দাঁত হল হাড়, আর নখ হল হাবশীদের ছুরি। দলের দ্রুতগতি লোকেরা আগে বেড়ে গেল এবং গনীমতের মালামাল লাভ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন লোকজনের পেছনে। তারা ডেকচি চড়িয়ে দিল।

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে তা উল্টে দেয়ার আদেশ দিলেন, তারপর সেগুলো উল্টে দেয়া হল। এরপর তিনি তাদের মধ্যে মালে গনীমত বণ্টন করলেন এবং দশটি বক্রীকে একটি উটের সমান গণ্য করলেন। দলের অগ্রভাগের নিকট হতে একটি উট ছুটে গিয়েছিল। অথচ তাদের সঙ্গে কোন অশ্বারোহী ছিল না। এ অবস্থায় এক ব্যক্তি উটটির দিকে তীর ছুঁড়লে আল্লাহ উটটিকে থামিয়ে দিলেন। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সকল চতুষ্পদ জীবের মধ্যে বন্য পশুর স্বভাব আছে। কাজেই, এগুলোর কোনটি যদি এমন করে, তাহলে তার সঙ্গে এরকমই ব্যবহার করবে। (সহিহ বুখারি ৫৫৪৩)

১২। আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবেঃ

দাড়ান বা কাত করে শোয়ানোর পর ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলে ছুরি দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করতে হবে। জবেহ করার সময় কমপক্ষে (بسْمُ اللَّهِ) ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ফরজ কাজ। কারণ, কোন পশুর জবেহ করার পূর্বে আল্লাহর নাম না পাঠ করলে সেই পশুর গোশত খাওয়া হারাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ

অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও। (সুরা আন’য়াম ৬:১১৮)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَلاَ تَأْكُلُواْ مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ

যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। (সুরা আন’য়াম ৬:১২১)

মন্তব্যঃ এই কারনে মৃ্ত পড়ে থাকা জন্তু খাওয়া হলাল নয়। কেননা, কেউ জানেনা এই জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে শিকার বা জবেহ করা হয়েছিল কি না!

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’ শিং বিশিষ্ট সাদা-কালো ধুসর রংয়ের দু’টি দুম্বা স্বহস্তে যাবাহ করেন। তিনি ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লহু আকবার’ বলেন এবং (যাবাহ্‌কালে) তাঁর একখানা পা দুম্বা দু’টির ঘাড়ের পাশে রাখেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮১, আবু দাউদ ২৭৯৪)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’শিং যুক্ত সাদা-কালো বর্ণের দু’টি দুম্বা কুরবানী করেন। তিনি আরও বলেন, আমি-তাঁকে দুম্বা দু’টি স্বহস্তে যাবাহ করতে দেখেছি। আরও দেখেছি, তিনি ও দু’টির ঘাড়ের পাশে নিজ পা দিয়ে চেপে রাখেন এবং ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলেন।  (সহিহ মুসলিম ৪৯৮২)

আয়িশাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরবানী করার জন্য শিংওয়ালা দুম্বাটি আনতে নির্দেশ দেন- যেটি কালোর মধ্যে চলাফেরা করতো (অর্থাৎ- পায়ের গোড়া কালো ছিল), কালোর মধ্যে শুইতো (অর্থাৎ- পেটের নিচের অংশ কালো ছিল) এবং কালো মধ্য দিয়ে দেখতে (অর্থাৎ- চোখের চারদিকে কালো ছিল)। সেটি আনা হলে তিনি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, ছোরাটি নিয়ে এসো। অতঃপর বলেন, ওটা পাথরে ধার দাও। তিনি তা ধার দিলেন। পরে তিনি সেটি নিলেন এবং দুম্বাটি ধরে শোয়ালেন। তারপর সেটা যাবাহ করলেন এবং বললেন,

** بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ‏”‏ **

অর্থঃ আল্লাহ্‌র নামে। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার ও তাঁর উম্মাতের পক্ষ হতে এটা ক্ববূল করে নাও। তারপর এটা কুরবানী করেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৫, আবু দাউদ ২৮১০)

১৩। গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে নাঃ

গাইরুল্লাহ নামে জবেহ করা যাবে হারাম। হান আল্লাহ আরও বলেন,

((*وَلاَ تَأْكُلُواْ مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ*))

যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় না, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। (সুরা আন’য়াম ৬:১২১)

আবূ তুফায়ল ‘আমির ইবনু ওয়াসিলাহ্‌ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক লোক তাঁর নিকট এসে বলল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে আড়ালে কি বলেছিলেন? রাবী বলেন, তিনি রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদের কাছ থেকে গোপন রেখে আমার নিকট একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি (বিশেষ শিক্ষণীয়) কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল হে আমীরুল মু’মিনীন! সে চারটি কথা কি? তিনি বললেনঃ ১. যে লোক তার পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করে, আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করেন, ২. যে লোক আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কারো নামে যাবাহ করে আল্লাহ তার উপরও অভিসম্পাত করেন, ৩. ঐ ব্যক্তির উপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, যে কোন বিদ‘আতী লোককে আশ্রয় দেয় এবং ৪. যে ব্যক্তি জমিনের (সীমানার) চিহ্নসমূহ অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করে, তার উপরও আল্লাহ অভিসম্পাত করে। (সহিহ মুসলিম ৫০১৮)

১৪। জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকেঃ

আতা ইবনু ইয়াসার (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আবূ আইয়ূব (রাঃ)-কে আমি প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যামানায় কুরবানীর বিধান কেমন ছিল। তিনি বললেন, কোন লোক তার ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী আদায় করত এবং তা নিজেরাও খেত, অন্যান্য লোকদেরকেও খাওয়াত। অবশেষে মানুষেরা গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তা তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছ। (সুনানে তিরমিজি ১৫০৫)

আতা’ ইয়াসার বলেন থেকে বর্ণিতঃ আমি আবূ আইউব আল-আনসারী (রাঃ) এর নিকট জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে আপনাদের কোরবানী কিরূপ ছিল? তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে কোন ব্যক্তি নিজের ও স্বীয় পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বকরী কোরবানী করতো। তা থেকে তারাও আহার করতো এবং (অন্যদেরও) আহার করাতো। পরবর্তী কালে লোকেরা কোরবানীকে অহমিকা প্রকাশের বিষয়ে পরিণত করে এবং এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। (ইবনে মাজাহ ৩১৪৭)

১৫। শরীয়ত সম্মতভাবে গোশ্ত বন্টন করাঃ

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন:

لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাব গ্রস্থকে আহার করাও। (সুরা হাজ্জ্ব ২২:২৮ )

১. সালামাহ্‌ ইবনু আক্‌ওয়া’ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে যেন ঈদের তৃতীয় রাতের পর তার বাড়িতে কুরবানীর পশুর কোন কিছু সঞ্চিত না রাখে। আগামী বছর যখন আগত হলো, তখন লোকজনেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা কি গত বছরের মতো করবো? তিনি বললেন, না। সে বছর তো মানুষ খুব দুর্দশায় ছিল, তাই আমি চেয়েছিলাম যাতে সকলের কাছে কুরবানীর (গোশ্‌ত) পৌঁছে যায়। (সহিহ মুসলিম ৫০০৩)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ওয়াকিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিন দিনের উপরে কুরবানীর গোশ্‌ত খেতে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ করেছেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ বাক্‌র (রহঃ) বলেন, আমি বিষয়টি ‘আম্‌রাহ্‌ (রাঃ) এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ইবনু ওয়াকিদ সত্যই বলেছেন। আমি ‘আয়িশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যামানায় ‘ঈদুল আযহার সময় বেদুঈনদের কিছু পরিবার শহরে আগমন করে, তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমরা তিনদিনের পরিমাণ জমা রেখে বাকী গোশ্‌তগুলো সাদাকাহ্‌ করে দাও। পরবতী সময়ে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! মানুষেরা তো কুরবানীর পশুর চামড়া দিয়ে পাত্র প্রস্তুত করছে এবং তার মাঝে চর্বি গলাচ্ছে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাতে কি হয়েছে? তারা বলল, আপনিই তো তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত খাওয়া হতে বারণ করেছেন। তিনি বললেনঃ আমি তো বেদুঈনদের আগমণের কারণে এ কথা বলেছিলাম। অতঃপর এখন তোমরা খেতে পার, জমা করে রাখতে পার এবং সাদাকাহ্‌ করতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৭)

৩. জাবির (রাঃ) কর্তৃক নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিতঃতিনি তিনদিনের পরেও কুরবানীর গোশ্ত খেতে বারণ করেছেন। তারপর পরবর্তীকালে তিনি বলেছেন, এখন তোমরা খেতে পার, পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করতে পার এবং সঞ্চয় করে রাখতে পার। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৮

৪. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা মিনায় তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত খেতাম না। পরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুমতি দিয়ে বললেনঃ তোমরা খেতে পার এবং অতিরিক্ত হিসেবে জমাও রাখতে পার। (ইবনু জুরায়জ বলেন) আমি ‘আতাকে বললাম, জাবির (রাঃ) কি ‘মাদীনায় আগমন করা পর্যন্ত’ কথাটি বলেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (সহিহ মুসলিম ৪৯৯৯)

৫. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা তিনদিনের বেশি কুরবানীর গোশ্‌ত জমা করে রাখতাম না। পরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনদিনের পরেও এ থেকে খাওয়ার এবং পথেয় হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আমাদের অনুমতি দেন। (সহিহ মুসলিম ৪৯৮৫)

৬. ইবনু বুরাইদাহ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদেরকে তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছিলাম। এখন আমি শেষ বিষয়ে তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি। আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত করো। কেননা তা দর্শনে (মৃত্যুকে) স্মরণ হয়।

৭. আমি তোমাদেরকে পানপাত্র সম্পর্কে নিষেধ করেছিলাম যে, তোমরা চামড়ার পাত্রে নবীয পান করবে। এখন তোমরা যে কোনো পাত্রে পান করতে পারো। কিন্তু তোমরা কখনো মাদক দ্রব্য পান করো না। আমি তোমাদের উপর কুরবানীর গোশতের ব্যাপারে তা তিন দিনের পর না খেতে বলেছিলাম। এখন তোমরা তা (দীর্ঘদিন) খেতে পারো এবং তোমাদের সফরে তা কাজে লাগাতে পারো। সুনানে আবু দাউদ ৩৬৯৮)

মন্তব্যঃ আমাদের সমাজ প্রচলিত আছে, কুরবানীর গোশ্ত সমান তিন ভাগ করার পর এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে এবং এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়। এই কথার সুন্নাহ সম্মত কোন দলিল নাই। তবে সুন্নাত হলো, কুরবানীর গোশ্ত নিজে খাওয়া এবং তা হতে অন্যদেরও খাওয়ানো। আর প্রয়োজন হলে ভবিশ্যতের জন্য সংরক্ষন করে রাখবে।

অনেক হাজ্জিকে দেখা যায় কুরবানী করা পর গোশ্ত ফেলে রেখে আসে। কিন্তু কুরবানীর গোশ্ত নিজে না খেয়ে এবং অপরকে তা দান না করে শুধু-শুধু যবহ করে ফেলে রেখে দেয়া যথেষ্ট নয়। কারণ, ইহা ধন-সম্পদ বিনষ্ট করার শামিল। তাই যতক্ষণ এমন স্থানে না যবহ করবে যেখানে নিজের আশে-পাশ্বে দরিদ্র-অভাবীরা থাকবে, অতঃপর কুরবানীর পশু যবহ করে তাদেরকে দান করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কুরবানীকারী দায়িত্ব মুক্ত হবে না। সুতরাং হাজীর জন্য উচিত যে, সার্বিক দিক থেকে নিজ কুরবানীর প্রতি গুরুত্ব দিবে, যাতে করে তার কুরবানী মহান আল্লাহর নিকট গৃহিত হয় ও তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয় এবং আল্লাহর বান্দাদের জন্য তা যেন লাভজনক হয়।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কঙ্কর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলছিলেন : তোমরা হাজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। তিনি আরো বলেনঃ আমি অবহিত নই আমার এই হাজ্জের পর আবার হাজ্জ করার সুযোগ পাবো কি না। (আবু দাউদ ১৯৭০)

১৬। কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে নাঃ

‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, তাঁকে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজের কুরবানীর জানোয়ারের পাশে দাঁড়াতে আর এগুলোর সমুদয় গোশ্ত, চামড়া এবং পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে নির্দেশ দেন এবং তা হতে যেন কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছুই না দেয়া হয়।  (সহিহ বুখারি ১৭১৭)

কুরবানীর জন্তুর কিছুই কসাইকে দেয়া যাবে না।

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাঠালেন, আমি কুরবানীর জানোয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, অতঃপর তিনি আমাকে আদেশ করলেন। আমি ওগুলোর গোশ্‌ত বণ্টন করে দিলাম। এরপর তিনি আমাকে আদেশ করলেন। আমি এর পিঠের আবরণ এবং চামড়াগুলোও বিতরণ করে দিলাম। (সহিহ বুখারি ১৭১৬)

১৭। কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে নাঃ

১. উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম ৫০১২, আবু দাউদ ২৭৯১)

২. নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহাজ্জের নতুন চাঁদ দেখার পর ঈদের দিন থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।(সহিহ মুসলিম ৫০১৫)

কুরবানী সংক্রান্ত কয়েকটি মাসায়েল

কুরবানী না করে হালাল হওয়া যাবে নাঃ

হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! লোকদের কী হল যে, তারা ‘উমরাহ করে হালাল হয়ে গেল অথচ আপনি ‘উমরাহ হতে হালাল হননি! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো আমার মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং পশুর গলায় কিলাদা ঝুলিয়েছি। তাই কুরবানী না করে আমি হালাল হতে পারি না। (সহিহ বুখারি ১৭২৫)

ব্যতিক্রমি মাসায়েলঃ

১। হাদীর পীঠে সওয়ার হওয় যায়ঃ

*** আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে কুরবানীর উট হাঁকিয়ে নিতে দেখে বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। সে বলল, এ তো কুরবানীর উট। তিনি বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। লোকটি বলল, এ তো কুরবানীর উট। তিনি বললেন, এর উপর সওয়ার হয়ে যাও। এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। সহিহ বুখারি ১৬৯০)

মক্কায় নিজে না গিয়ে শুধু হাদী পাঠালে ইহরাম সাব্যস্ত হয় নাঃ

আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদ্বীনা হতে কুরবানীর পশু পাঠাতেন, আমি তার গলায় কিলাদার মালা পাকিয়ে দিতাম। এরপর মুহরিম যে কাজ বর্জন করে, তিনি তার কিছু বর্জন করতেন না। (সহিহ বুখারি ১৬৯৮)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তিনি সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন। পরে হাদীর পশু তার যথাস্থানে (হারামে) পৌঁছার পূ্ববর্তী সময় পর্যন্ত তিনি ঐ সমস্ত কাজই করতেন, যা একজন হালাল ব্যক্তি করে থাকে। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৬)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তারপর তিনি মদীনায় অবস্থান করতেন, ইহরাম বাঁধতেন না। (অর্থাত ‘ইহরাম বেঁধেছেন’ বলে সাব্যস্ত হত না। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৭)

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীর (কুরবানীর জন্তুর) কিলাদা পাকাতাম। তারপর তিনি তাঁর হাদীকে তা পরিয়ে (মক্কাভিমুখে) পাঠিয়ে দিতেন। পরে তিনি মদীনায় অবস্থান করতেন এবং মুহরিম যা পরিহার করে, তার কিছুই পরিহার করতেন না। (সুনানে নাসাঈ ২৭৭৮)

মন্তব্যঃ কিলাদা (قِلادة) একটি আবরী শব্দ যার অর্থ নেকলেস, মালা ।

হাদী ছাড়াও অতিরিক্ত কুরবানী করার বিধান

বিজ্ঞ আলিমগণ হজের হাদীকে হাদী ও কুরবানী উভয়টার জন্যই যথেষ্ট হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে কুরবানী করলে তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। হাজী যদি মুকীম হয়ে যায় এবং নেসাবের মালিক হয়, তার ওপর ভিন্নভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব বলে ইমাম আবূ হানীফা রহ. মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে হাজী মুকীম না মুসাফির, এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক থাকলেও বাস্তবে হাজী সাহেবগণ মুকীম নন। তারা তাদের সময়টুকু বিভিন্নস্থানে অতিবাহিত করেন। তাছাড়া দো‘আ কবুল হওয়ার সুবিধার্থে তাদের জন্য মুসাফির অবস্থায় থাকাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

৪। অজানা ভুলের জন্য দম দেয়ার বিধান

হজকর্ম সম্পাদনের পর কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করতে থাকেন যে কে জানে কোথাও কোনো ভুল হল কি-না। অনেক গ্রুপ লিডার হাজী সাহেবগণকে উৎসাহিত করেন যে ভুলত্রুটি হয়ে থাকতে পারে তাই ভুলের মাশুল স্বরূপ একটা দম দিয়ে দিন। নিঃসন্দেহে এরূপ করা শরীয়ত পরিপন্থি। কেননা আপনি ওয়াজিব ভঙ্গ করেছেন তা নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা হওয়া ছাড়া নিজের হজকে সন্দেহযুক্ত করছেন। আপনার যদি সত্যি সত্যি সন্দেহ হয় তাহলে বিজ্ঞ আলেমগণের কাছে ভাল করে জিজ্ঞেস করবেন। তারা যদি বলেন যে, আপনার ওপর দম ওয়াজিব হয়েছে তাহলে কেবল দম দিয়ে শুধরিয়ে নেবেন। অন্যথায় নয়। শুধু সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে দম দেওয়ার কোনো বিধান ইসলামে নেই। তাই যে যা বলুক না কেন এ ধরনের কথায় মোটেও কর্ণপাত করবেন না। অনেক এটাকে দমে-খাতা ভুলের মাশুল বলা হয়।

হজ্জের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাঃ

হাজ্জিগণ হজ্জের কার্যক্রমের একটি ধারাবাহি কাজ করে থাকে। মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার পর তার সামনে চারটি তিনটি ওয়াজিব ও একটি ফরজ কাজ থাকে। অর্থাৎ মিনায় এসে তিনি প্রথম বড় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন তারপর কুরবাণী করবেন। কুরবাণী আদায়ের পরই তিনি মাথা মুন্ডন করার মাধ্যমে ইহরাম ত্যাগ করে হালাল হয়ে যাবেন। হালাল হওয়ার পরও তাওয়াফ করা যায়। তবে মুজদালিফা থেকে মিনায় আসার দিনে না পারলে পরবর্তী ২ দিনের মধ্যে বা অন্য যে কোন সময় করলেও চলবে। হানাফি মাযহাবের মতে হজ্জের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ওয়াজিব। অর্থাৎ কুরবাণী করার আগে মাথা মুন্ডান বা চুল ছোট করা যাবেনা। তাদের দলিলঃ

মহান আল্লহ কালাম।মহান আল্লাহ বলেন,

*وَأَتِمُّواْ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلّهِ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ وَلاَ تَحْلِقُواْ رُؤُوسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ*

অর্থঃ আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজ্জলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। ( সুরা বাকারা ২:১৯৬ )

মন্তব্যঃ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসির আহসানুল বায়ান লিখেনঃ

যদি পথে শত্রু অথবা কঠিন অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে একটি পশু, উট অথবা গরু (গোটা অথবা এক সপ্তমাংশ) অথবা ছাগল বা ভেড়া সেখানেই যবেহ করে মাথা নেড়া করে হালাল হয়ে যাও। যেমন, নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ হুদাইবিয়্যাতে কুরবানী যবেহ করেছিলেন। আর হুদাইবিয়্যা হারাম সীমানার বাইরে। অতঃপর আগামী বছরে তার কাযা কর। যেমন, নবী করীম (সাঃ) সন ৬ হিজরীর উমরার কাযা সন ৭ হিজরীতে করেছিলেন। আর এর সম্পর্ক হল নিরাপদ পরিস্থিতির সাথে। অর্থাৎ, নিরাপদ অবস্থায় ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা নেড়া করবে না (ইহরাম খুলে হালাল হবে না), যতক্ষণ না হজ্জের সমস্ত কার্যাদি পূরণ করেছ। (তাফসিরে আহসানুল বয়ান সুরা বাকারার ১৯৬ আয়াতের ব্যাখ্যা)

তাই হানাফি মাযহাবের ফিকাহবিদগন মনে বলে থাকেন, যদি কেই কুরবানির আগে মাথা মুন্ডন করে তবে তাকে কাফ্ফারা দিতে হবে। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা রহ.-এর প্রখ্যাত দুই ছাত্র ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. ১০ যিলহজের কাজসমূহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলেও দম ওয়াজিব হবে না বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। (বাদায়েউস্সানায়ে  ২/১৫৮)

অপর পক্ষে নবীজীর বিদায় হজ্জের আমল অনুসারে ১০ যিলহজের ধারাবাহিক আমল হল, প্রথমে কঙ্কর নিক্ষেপ করা, অতপর হাদীর পশু যবেহ করা, এরপর মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করা। এরপর তাওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করা ও সা‘ঈ করা। সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে এ দিনের এই চারটি আমলের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করা তথা আগে-পিছে করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলের পরিপন্থি কাজ। তবে যদি কেউ উযর বা অপারগতার কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারে, অথবা ভুলবশত আগে-পরে করে বসে, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে হজ করার সময় সাহাবায়ে কিরামের কেউ কেউ এরূপ আগে-পিছে করেছেন। উযর কিংবা অপরাগতার কারণে সেসবের আলোকে আমল করলে ইনশাআল্লাহ হজের কোনো ক্ষতি হবে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে হাজীদের প্রচণ্ড ভিড় আর হাদী যবেহ প্রক্রিয়াও অনেক জটিল। তাই বিষয়টিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সহজভাবে দেখেছেন আমাদেরও সেভাবে দেখা উচিত।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আমর ইব্‌নু ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ  আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হাজ্জের দিবসে মিনায় লোকদের সম্মুখে (বাহনের উপর) দাঁড়ালেন। লোকেরা তাঁকে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করছিলো। জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো, আমি ভুলক্রমে কুরবানীর পূর্বেই মাথা কামিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ যবেহ করো, কোন ক্ষতি নেই। আর এক ব্যক্তি এসে বললো, আমি ভুলক্রমে কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ কঙ্কর ছুঁড়ো, কোন অসুবিধে নেই। ‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘আমার (রাঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেদিন পূর্বে বা পরে করা যে কোন কাজ সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হচ্ছিলেন, তিনি এ কথাই বলেছিলেন, করো, কোন ক্ষতি নেই। (সহিহ বুখারী ৮৩, ১২৪, ১৭৩৬, ১৭৩৭, ১৭৩৮, ৬৬৬৫)

২. ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হাজ্জের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞাসিত হলেন। কোন একজন বললো : আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই যবেহ (কুরবানী) করে ফেলেছি। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেনঃ কোন অসুবিধে নেই। আর এক ব্যক্তি বললো, আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি। তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন, কোন ক্ষতি নেই। (সহিহ বুখারি ৮৪, ১৭২১, ১৭২২, ১৭২৩, ১৭৩৪, ৬৬৬৬)

মন্তব্যঃ এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে অনেক সালাফি আলেম হজ্জের সময়ের আমলগুলোর ধারা বাহিকভাবে রক্ষা করার জন্য বাধ্যবাধকতা আরপ করেন না। তারা মনে করেন এর মাধ্যমে ইহরাম ভঙ্গ করার নিদর্শন বলে সাব্যস্ত হয় মাত্র। যা হোক মাসায়েলটি একটু মতভেদ পূর্ন। আশা করি দুটি মতই সঠিক আপনি যে কোনটি আমল করতে পারেন। কিন্তু ইহা নিয়ে বিবেভ সৃষ্টি করা হারাম। সতর্ক হই। আল্লাহু আলাম।

চুল ছোট বা সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন সম্পর্কিত বিধান

চুল ছোট বা সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন সম্পর্কিত বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

চুল ছোট করার চেয়ে সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন করা উত্তমঃ

ইয়াহইয়া ইবনু হুসায়ন (রহঃ) থেকে তার দাদীর সুত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদী) বিদায় হাজ্জকালে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার এবং চুল ছোটকারীদের জন্য একবার দু’আ করতে শুনেছেন। ওয়াকীর “বিদায় হাজ্জ” কথাটুকু উল্লেখ করেননি। (সহিহ মুসলীম ৩০২০ ইফাঃ)

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জকালে নিজের মাথার চুল মুন্ডন করেছেন। (সহিহ মুসলীম ৩০২১ ইফাঃ, সুনানে আবু দাউদ ১৯৭৭)

যেহেতু সহিহ হাদিস প্রমান করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হাজ্জকালে নিজের মাথার চুল মুন্ডন করেছেন। তাই চুল ছোট করার চেয়ে সম্পুর্ণ মাথা মুন্ডন করা উত্তম। অনেক হাজি উত্তম আমলটি না জানার করানে চুল ছোট করে থাকে, যদিও ইহা সুন্নাহ সম্মত আমল।

আরেকটি ভুল হলো কুরবানী করার আগেই মাথার চুল মুন্ডন করা। মিনায় কঙ্কর মারার পর ঐ দিন (১০ জিলহজ্জ) হাদি কুরবানী করার পরই মাথা চুল মুন্ডন যাবে যদি এই দিন হাদি কুরবানী না হয় তবে চুল মুন্ডন যাবে না। সে ক্ষেত্রে পরের দুই দিনের যে কোন দিন হাদি কুরবানী করার পরই মাথা চুল মুন্ডন যাবে। কাজেই হাদি কুরবানী না অন্যের দেখা দেখি ১০ ই জিলহজ্জ মাথা চুল মুন্ডন একটি ভুল আমল। কারন মাথা মুন্ডনের অর্থই হল ইহরাম ত্যাগ করে নিজেকে হালাল করে নেয়া। হাদি কুরবানী করার নিজেকে হালাল করে নেয়া যায় না।

মহিলাদের চুলের সীমাঃ

হজ্জ বা উমরার সময় মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল ছোট করা একটি ওয়াজিব কাজ। পুষের জন্য মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট দুটিই জায়েয তবে মাথা মুন্ডান উত্তম কারন তার মাথা মুন্ডন করেছিলেন। নারীদের জন্য মাথা মুণ্ডন করার অনুমতি নেই। তাদের জন্য অনুমোদিত হল চুল ছোট করা। তবে অগ্রগণ্য মতানুযায়ী মাথার সবগুলো চুল ছোট করা আবশ্যক। এটি মালেকি ও হাম্বলি মাযহাবের অভিমত। যদি কারো মাথার চুলগুলো বেণী করা থাকে তাহলে সবগুলো বেণীর মাথা থেকে কাটবে। যদি বেণী করা না থাকে তাহলে সবগুলো চুল একত্রিত করে সবগুলো চুল থেকে কাটবে। মুস্তাহাব হচ্ছে আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ কাটা। এর চেয়ে কমও কাটতে পারেন। যেহেতু চুল কাটার পরিমাণ নির্ধারণমূলক কোন শরয়ি দলিলঃ বর্ণিত হয়নি।

আল-বাযি (রহঃ) ‘আল-মুনতাকা’ গ্রন্থে (৩/২৯) বলেন: পক্ষান্তরে, কোন নারী যখন ইহরাম করার মনস্থ করবেন তখন তিনি তার চুল বেণী করে নিবেন যেন তিনি হালাল হওয়ার জন্য চুল কাটতে পারেন। কী পরিমাণ চুল কাটবেন? ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ। ইবনে হাবিব ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেন যে, আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ কিংবা এর চেয়ে একটু বেশি কিংবা এর থেকে একটু কম। ইমাম মালেক বলেন: আমাদের মাযহাবে এর সুনির্দিষ্ট কোন পরিমাণ নেই। যতটুকু কাটে সেটা জায়েয হবে। তবে, মাথার সবগুলো চুল কাটতে; সেটা লম্বা চুল হোক কিংবা খাটো চুল হোক।

ইবন জুরায়জ (রহঃ) বলেছেন, আমি সাফিয়্যা বিনত শায়বা ইবন উসমান হতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, আমাকে উম্মে উসমান খবর দিয়েছেন যে, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন স্ত্রীলোকদের জন্য মাথা মুন্ডনের প্রয়োজন নেই, বরং (এক আঙ্গুল পরিমাণ চুল) কর্তন করবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮০)

ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, স্ত্রীলোকদের জন্য মাথা মুন্ডনের দরকার নেই, বরং তারা (এক আঙ্গুল পরিমান চুল) কর্তন করবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৯৮১)

খাল্লাস (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। কিন্তু এই সূত্রে আলী (রাঃ) এর উল্লেখ নাই। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদিসটিকে ইয্তিরাব রয়েছে। হাম্মাদ ইবনু সালাম- কাতাদা -আয়িশা (রাঃ) এ হাদিসটি বর্ণিত আছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের মাথা মুন্ডনের অনুমতি দেন না। তবে তাদের (ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য) কিছূ চুল ছাটার অভিমত পোষণ করেছেন।  (তিরমিজী হাদিস নম্বর ৯১৭, হাদিসে মান  নির্নিত নয়)

ইমাম আহমাদ বলতেনঃ “চুলের প্রত্যেক বেণী থেকে এক কর পরিমাণ কর্তন করবে।” এটি ইবনে উমর (রাঃ), শাফেয়ি, ইসহাক, আবু সাওর প্রমুখের অভিমত। আবু দাউদ বলেন, “আমি ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। নারীরা কি সম্পূর্ণ মাথার চুল ছোট করবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। মাথার সবগুলো চুলকে সামনের দিকে এনে চুলের আগা থেকে আঙ্গুলের কর পরিমাণ কর্তন করবে। (ফতোয়াতে উসায়মিন রাহিঃ)

কাজেই নারীদের মাথার যে কোন স্থান থেকে সামান্য চুল ছোট করলেই হবে না। সম্পুর্ণ মাতা থেকে সমান করে আঙ্গুলের এক করের কিছু কম বেশী চুল ছোট করতে হবে।

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার ভুল-ত্রুটিঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! মাথা মুন্ডুনকারীদের ক্ষমা করুন। সাহাবীগন বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! মাথা মুন্ডুনকারীদেরকে ক্ষমা করুন। সাহাবীগন বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটি তিনবার বলেন, এরপর বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদেরকেও। (সহিহ বুখারী ১৬২০ ইফাঃ)

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার উমরা বা হজ্জের একটি ওয়াজিব কাজ। এই কাজ না করলে উমরা বা হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। উমরা বা হজ্জ আদায়ে পর, হালাল হওয়ার পূর্বে সম্পুর্ণ মাথার চুল মুন্ডুন করতে হবে। আর যদি কেউ চুল ছোট করতে চায় তবে তাকে সম্পূর্ণ মাথা পরিব্যাপ্ত করে ছোট করতে হবে। কিছু কিছু লোক মাথার কিয়দাংশ খুর দিয়ে ভালভাবে মুণ্ডন করে; বাকীটুকু রেখে দেয়। এই সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে তারা মনে করে থাকে যে,  যেহেতু তারা উমরা ও হজ্জ একত্র করবে তাই উমরা সময় অর্ধেক মুণ্ডন করব আর হজ্জ করার পর বাকী অর্ধেক মুন্ডন করব। এটি অজ্ঞতা ও গোমরাহি। আবার অনেক আছে যারা অজ্ঞতার কারনে সম্পূর্ণ মাথা পরিব্যাপ্ত না করেই ছোট করে থাকে। মাথার কোন একটি অংশ থেকে কিছু চুলের আগা কেটে বলে থাকে চুল ছোট করছে। তাদের এই আমল কুরআনের এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاء اللَّهُ آمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُؤُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ

অর্থঃ আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। (সুরা ফাতাহ ৪৮:২৭)

অতএব, চুল ছোট করার প্রভাবটা মাথার উপর স্পষ্টভাবে দেখা যেতে হবে। সবাই জানে যে, সামন্য কিছু চুল কাটলে সেটা কোন প্রভাব ফেলে না বিধান সামান্য চুল কাটা এই আয়াতের বাহ্যিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই যদি মুণ্ডন করতে চায় তাহলে গোটা মাথার চুল মুণ্ডন করবে। আর যদি চুল ছোট করতে চায় তাহলে সম্পূর্ণ মাথার চুল ছোট করবে।

মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট না করেই হালাল হয়ে যাওয়াঃ

উমরা বা হজ্জের সময় তাওয়ার ও সাঈ আদায়ে পর মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার ওয়াজিব কাজ। কিন্তু অনেকে এই কাজটি না করেই বাসায় গিয়ে স্বাভাবিক কাপড় চোপড় পরে। তার পর সুবিধা জনক সময় মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করে থাকে। অথচ সঠিক সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি হলো ইহরামের কাপড় গায়ে থাকা অবস্থায় মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করা। মাথা মুন্ডুন বা চুল ছোট করার পরই ইহরামের কাপড় খুলে হালাল হতে হবে। যেমনঃ

জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ হজ্জের ইহরাম বাঁধেন। কিন্তু তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত আর কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর এ সময় আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে আগমন করেন এবং তার সাথেও কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরূপ ইহরাম বেঁধেছেন আমিও সেরূপ ইহরাম বাঁধলাম।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদের নির্দেশ দেন যে, তারা যেন এটাকে উমরায় পরিণত করে এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে এবং মস্তক মুন্ডনের (বা চুল ছোট করে কর্তনের) পর হালাল হয়। অবশ্য যাদের সাথে কুরবানীর পশু আছে তারা ব্যতীত। তারা বলেন, আমরা মিনার দিকে এমন অবস্থায় যাই যে আমরা স্ত্রী সহবাস করেছি। এই কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, আমি যা পরে অবহিত হয়েছি যদি তা পূর্বে অবগত হতে পারতাম তবে আমি সাথে করে কুরবানীর পশু আনতাম না। আর আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি অবশ্যই ইহরাম খুলে ফেলতাম।

এ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, চুল ছোট করা ছাড়া হালাল হওয়া যাবে না। কিন্তু অজ্ঞতাবশতঃ মাথা মুণ্ডন করা কিংবা চুল ছোট করার আগে এই মনে করে হালাল হয়ে গেছে যে, এটি জায়েয তাহলে তার অজ্ঞতার কারণে কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু, জানার সাথে সাথে তাকে স্বাভাবিক কাপড়-চোপড় খুলে ইহরামের কাপড় পরতে হবে। কেননা, সে হালাল হয়নি এ কথা জানার পর আর গড়িমসি করা জায়েয হবে না। অতঃপর সে মাথা মুণ্ডন করা কিংবা চুল ছোট করার পর হালাল হবে। (সুনানে আবু দাউদ ১৭৮৯)

আইয়ামুততাশরীকে মিনায় রাত্রীজাপন না করাঃ

আইয়ামুত-তাশরীক বলা হয় কুরবানির পরবর্তী তিন দিনকে। অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের এগারো, বারো ও তেরো তারিখকে আইয়ামুত-তাশরীক বলা হয়। তাশরীক শব্দের অর্থ শুকানো। মানুষ এ দিনগুলোতে গোশত শুকাতে দিয়ে থাকে বলে এ দিনগুলোর নাম ‘আইয়ামুত-তাশরীক’ বা ‘গোশত শুকানোর দিন’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জিকির ও তার শুকরিয়া আদায়ের দিন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَاذْكُرُواْ اللّهَ فِي أَيَّامٍ مَّعْدُودَاتٍ فَمَن تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلاَ إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلا إِثْمَ عَلَيْهِ

অর্থঃ আর স্মরণ কর আল্লাহকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি দিনে। অতঃপর যে লোক তাড়াহুড়া করে চলে যাবে শুধু দুদিনের মধ্যে, তার জন্যে কোন পাপ নেই। আর যে লোক থেকে যাবে তাঁর উপর কোন পাপ নেই, অবশ্য যারা ভয় করে। (সুরা বাকারা ২:২০৩)

আইয়ামুততাশরীক হল ১১, ১২ ও ১৩ ই যিলহজ্জ। এই সময় মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এটা বাদ গেলে দম দিতে হবে। কিন্তু হানাফি ওলামাগন মিনায় অবস্থান কে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলে থাকেন। উপরের আয়াতের আলোকে অনেকে আলেম মনে করে থাকেন আইয়ামুত-তাশরীকে মিনা থেকে মক্কার দিকে ১২ই বা ১৩ যিলহজ্জ যেদিনেই ফিরে আসা হোক না কেন তাতে কোন ক্ষতি নেই। এই দিনগুলোতে আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতে হবে। কোন প্রকারে উৎসব অনুষ্ঠান বা মেলায় ঘুরে ফূর্তি সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।

মন্তব্যঃ আইয়ামুত-তাশরীকের প্রথাধ ভুল হল বীনা ওজরে মিনায় রাত্রীজাপন না করে মক্কায় অবস্থান করা।

কুরবানীর ভুল ত্রুটিঃ

হারাম সীমানার বাইরে হাদী জবেহ করা যাবে না। কাজেই মক্কা ও মিনার হামার সীমানা জেনে হাদি জবেহ করা উচিত। এ ক্ষেত্র হজ্জের সময় যে মুয়াল্লিম থাকবে তার সাহায্য নিতে হবে। তা হলে আর ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। হাদি কুরবানির জন্য উপযুক্ত কিনা তা যাচাই না করে জবেহ করা। কারন হাদিসে বর্ণিত চারটি খুত থাকল হাদি কুরবানি হবে না।

হজ্জের সফরের অধিকাংশ মুয়াল্লামি থাকে ব্যবসায়ী। এই সফরে একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারবেন আপনার সাথী মুয়াল্লিম ব্যক্তি কেমন। যদি মনে করে তার উপর আস্থা রাখা যায় তবে নিজে না গিয়ে তার মাধ্যমে হাদি জবেহ করাতে পারেন। আর যদি মনে করেন তিনি অথটা আস্থা ভাজন ব্যক্তি নয় তবে নিজে গিয়ে হাদির জবেহের ব্যবস্থা করবেন। কারন অনেক মুয়াল্লিম অসত হয়, তারা হাদি জবেহ না করেই, জবেহ হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়। দশ জনের টাকা নিয়ে পাঁচটি হাদি জবেহ করই বলে দেয় সবার হাদি জবেহ হয়েছে। পাঁচ শত রিয়েলের চুক্তি করে দুই/তিন শত বিয়েলের হাদি জবেহ করে। তবে হ্যা, সে যদি বলে আমি হাদি কুরবানী বাবত এক/দুই শত রিয়েল নিব আর হাদি বাবদ যা আসে আপনার তবে ঠিক আছে। কিন্তু যদি বলে সচ্ছতার অভাব থাকে তবে মুয়াল্লীম গুনাগার হবে। এই জন্যই বলেছি, মুয়াল্লিম আস্থা ভাজন ব্যক্তি হলে আর চিন্তা করার দরকার নাই। যদি মনে করেন তাও সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্র সৌদি হজ্জ কমিটির অধিনে নির্ধিষ্ট টাকা জনা দিলে, তারা আপনার হাদি যবেহের ব্যবস্থা করবেন। এ ক্ষেত্র একটা ভুল হয়ে থাকে। অনেক হাদি যবেহ হওয়ার আগেই মাথার মুন্ডন করে ফেলে। এই জন্য আপনাকে মেসেস বা অন্য কোন মাধ্যমে আপনাকে জানান হবে যে, আপনার হাদি জবেহ করা হয়েছে। এরপরই আপনি মাথার মুন্ডন করতে পারবেন।

বর্তমানে যারা প্রবাসী হিসাবে হজ্জ করে থাকেন তাদের গোশত পাক করে খাওয়া বা সংরক্ষন করে রাখার কোন ব্যবস্থা নাই তাই তারা হাদির গোসত নিয়ে বিপাকে পরে যায়। মক্কায় বর্তমানে ফকির মিসকিন পাওয়াও খুব কষ্টের ব্যপার। তাই এই অনেক হাদির গোশত ফেলে দেন যা একটি ভুল আমল। তাই যদি কেউ নিজে না খেতে পারে বা ফকির মিসকিনকে দিতে না পারে, সে কেত্রে কয়েক রিয়েল খরচ করে সরকারি কসাই খানায় জবেহ করে, সম্পূর্ণ গোশত তাদের হাওলায় ছেড়ে দিতে পারেন। আশা করি তারা একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা করবেন।

অনেক হাজি সাহেব মুজদালিফায় রাত্রি জাপন করে, মিনায় গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ না করে, নিজেদের তাবুতে যায়। তারা ভাবেন এই সময় ভিড় থাকবে, তাই একটু পরে আসানের সাথে গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। এটা কোন ভুল আমল নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হাদি জবের আগেকটি ভুল আমল হলো, তারা কঙ্কর নিক্ষেপ করার আগেই সুযোগ বুঝে হাদি জবেন করেন। সহিহ সুন্নাহ হলো কঙ্কর নিক্ষেপের পরই হাদি জবেহ করতে হবে।

স্ত্রীদের পক্ষ হতে তাদের আদেশ ছাড়াই স্বামী কর্তৃক গরু কুরবানী করা।

‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, যিল-কা’দাহ মাসের পাঁচ দিন বাকী থাকতে আমরা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। হজ্জ আদায় করা ব্যতীত আমাদের অন্য কোন ইচ্ছা ছিল না। যখন আমরা মক্কার কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদেশ করলেনঃ যার সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই সে যেন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করে হালাল হয়ে যায়। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, কুরবানীর দিন আমাদের কাছে গরুর গোশ্‌ত আনা হলে আমি বললাম, এ কী? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে কুরবানী করেছেন। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, উক্ত হাদীসখানা কাসিমের নিকট আলোচনা করলে তিনি বললেন, সঠিকভাবেই তিনি হাদীসটি তোমার কাছে বর্ণনা করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৭০৯)

কুরবানীর গোশ্‌ত সঞ্চয় করে রাখা যাবেঃ

জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানীর গোশ্‌ত মিনা’র তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেনঃ খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি ‘আত্বা (রহঃ)-কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদীনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। (সহিহ বুখারি ১৭১৯

মাথা মুণ্ডানোর পূর্বে কুরবানী করা।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সে ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল, যে মাথা কামানোর আগে কুরবানী অথবা অনুরূপ কোন কাজ করেছে। তিনি বললেনঃ এতে কোন দোষ নেই, এতে কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৭২১)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হল, সন্ধ্যার পর আমি কঙ্কর মেরেছি। তিনি বললেনঃ কোন দোষ নেই। সে আবার বলল, কুরবানী করার আগেই আমি মাথা কামিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ এতো কোন দোষ নেই। (সহিহ বুখারি ১৭২৩)

নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলতেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ্জের সময় তাঁর মাথা কামিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি ১৭২৬)

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহম করুন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যারা মাথার চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহম করুন। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। এবার আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। লায়স (রহঃ) বলেন, আমাকে নাফি’ (রফ.) বলেছেন, আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, এ কথাটি তিনি একবার অথবা দু’বার বলেছেন। রাবী বলেন, ‘উবায়দুল্লাহ (রহঃ) নাফি’ (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন, চতুর্থবার বলেছেনঃ চুল যারা ছোট করেছে তাদের প্রতিও। (সহিহ বুখারি ১৭২৭)

আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের ক্ষমা করুন। সাহাবীগণ বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদেরকে ক্ষমা প্রদর্শন করুন। সাহাবীগণ বললেন, যারা চুল ছোট করেছে তাদের প্রতিও। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথাটি তিনবার বলেন, এরপর বললেনঃ যারা চুল ছোট করেছে তাদের উপরও। (সহিহ বুখারি  ১৭২৮)

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) ও মু’আবিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একটি কাঁচি দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুল ছোট ছোট করে দিয়েছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৭৩০)

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আ করলেন : হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমাত বর্ষণ করুন। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের? তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! মাথা মুণ্ডনকারীদের প্রতি রহমাত বর্ষণ করুন। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! চুল খাটোকারীদের? এবার তিনি বললেনঃ এবং চুল খাটোকারীদের প্রতিও। আবু দাউদ ১৯৭৯