পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: প্রথম কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ

বর্তমান বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বিনোদনের দ্রুত বিকাশ। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সমাজ এই বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- আধুনিকতা ও প্রগতির নামে পাশ্চাত্যে যে বিনোদন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা অনেকাংশে নৈতিক অবক্ষয়, লজ্জাহীনতা ও অশ্লীলতার উর্বর ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ফ্যাশন, ক্রীড়া, সোশ্যাল মিডিয়া— প্রতিটি অঙ্গনেই আজ অশালীনতার প্রকাশ এতটাই সাধারণ যে, তা তাদের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতিকে বলা যেতে পারে “পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন”  যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি ও আনন্দের নামে মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নৈতিক বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে।

এই অশ্লীল বিনোদন কেবল একটি সামাজিক প্রবণতা নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস— যা মানবমনের চিন্তাভাবনা, পরিবারব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করছে। গবেষণায় দেখা যায়, পাশ্চাত্যের এই বিনোদন-সংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত যৌনাসক্ততা, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক বিকার, অপরাধ প্রবণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নগ্নতা, পরকীয়া, সমকামিতা, লিঙ্গবিভ্রান্তি ইত্যাদিকে আজ “স্বাধীনতা” ও “শিল্প” নামে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। ফলে, পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব কেবল নৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়েও গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারা আরো ভয়াবহ। ইসলাম মানবজাতিকে বিনোদনের বিরোধিতা করেনি; বরং শালীন, সীমার মধ্যে থাকা বিনোদনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যখন বিনোদন মানুষকে পাপ, অশ্লীলতা, আল্লাহর অবাধ্যতা ও সমাজের নৈতিক কাঠামো ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়, তখন তা স্পষ্ট হারাম ও ধ্বংসাত্মক হয়ে যায়। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে “ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব” বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মানুষের অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে, লজ্জা ও হায়ার মূল্যবোধ ধ্বংস করে এবং ফিতনার দরজা খুলে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার চক্ষু সংযত রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়ে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন।” কিন্তু পাশ্চাত্যের বিনোদন মানুষের চোখ, কান ও মনকে এমন বিষে ভরিয়ে দিচ্ছে, যা ঈমান ও তাকওয়ার সর্বনাশ ডেকে আনছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই অশ্লীল সংস্কৃতি আজ মুসলিম সমাজে দ্রুত অনুপ্রবেশ করছে। স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট, চলচ্চিত্র, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম— সবখানেই পাশ্চাত্যের বিনোদনের আধিপত্য। মুসলিম তরুণ-তরুণীরা অজান্তেই সেই সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে পড়ছে। পোশাক-আশাক, কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা, এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কেও তাদের মাঝে পাশ্চাত্যের প্রভাব স্পষ্ট। এভাবে “মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ” কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এটি একটি ধর্মীয় সংকটেও রূপ নিচ্ছে। এই প্রভাব মুসলিম উম্মাহর চেতনা, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের শিকড় উপড়ে ফেলছে— ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নৈতিক শূন্যতা, যেখানে পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য পর্যন্ত মুছে যাচ্ছে।

এই অধ্যায়ে আমরা চারটি শিরোনামের আলোকে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন সংস্কৃতির উৎস, বিকাশ, নেতিবাচক প্রভাব, ইসলামি বিশ্লেষণ এবং মুসলিম সমাজে এর অনুপ্রবেশের বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করা হবে। লক্ষ্য হলো— এই বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক পুনর্জাগরণের দিকনির্দেশনা প্রদান করা।

১. পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন

২. পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

৩. ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

৪. মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

পঞ্চম অধ্যায়

পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন

আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বিনোদনের যে ধারাটি প্রভাবশালী, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লাগামহীন অশ্লীলতা, কুরুচি ও নোংরামি। এই ধরনের বিনোদন কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ নয়, বরং এটি মানবজাতির আধ্যাত্মিক এবং মানসিক শান্তির পরিপন্থী। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের প্রবণতা জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতির ফল এবং এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শিক ও সামাজিক কারণ, যা কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

কুরআন মাজীদ মুমিনদেরকে জীবনধারণের ক্ষেত্রে সংযম, শালীনতা এবং তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, দুনিয়ার জীবন কেবল ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের স্থান এবং পরকালীন সফলতা অর্জনের ক্ষেত্র। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে যখন ভোগবাদী দর্শন, বস্তুবাদিতা এবং প্রবৃত্তির অবাধ অনুসরণ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন বিনোদনের ধরনও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের এই আধিক্যের মূলে রয়েছে একটি সুসংগঠিত আদর্শিক পটভূমি। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরকালের ধারণাকে অস্বীকার করা, দুনিয়ার জীবনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধকে দুর্বল করে দেওয়া। এই বিষয়গুলো সম্মিলিতভাবে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচার এবং অশ্লীলতাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তিকে কেবল বাণিজ্যিক লাভের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিবার ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছে এই ক্ষণস্থায়ী, অর্থহীন বিনোদনের মধ্যে। পরবর্তী অংশে কুরআন ও হাদীসের আলোর এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে কিভাবে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলেই সমাজে অশ্লীলতার এই ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কারণ :

১. ভোগবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

২. নফসের (প্রবৃত্তির) অনুসরণ

৩. পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দেয়া

৪. পুনরুত্থানকে অস্বীকারের করা

৫. কুফরির কারনে দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে

৬. ভোগ-বিলাস পরীক্ষার উপকরণ করা হয়েছে

৭. উন্নত জীবনধারা, আর্থিক অগ্রগতি কারণে

৮ পার্থিক জিন ক্ষনস্থায়ী যা ভাবনাতেই নাই

৯. পার্থিক জীবন উভোগ্য সামগ্রী মাত্র যা ভাবনাতেই নাই

১০. ধর্মীয় ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা:

১১. ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিকীকরণ :

১২. গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ:

১৩. পরিবারের ভূমিকা দুর্বল হওয়া

১৪. যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারা আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি অবিশ্বাস:

১৫. সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন

পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কারণ :

পাশ্চাত্য সমাজে আজ নোংরা, অসংযত ও অনৈতিক বিনোদনের যে ভয়াবহ প্রসার দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ তাদের বিশ্বাস ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। এই সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পরকাল, জবাবদিহিতা, জান্নাত-জাহান্নাম বা সওয়াব-গুনাহের ধারণাকে কার্যত গুরুত্বহীন মনে করে। তাদের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধুমাত্র দুনিয়ার ভোগবিলাস, ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি। এই চরম বস্তুবাদী (Materialistic) মনোভাবই সমাজকে এমন এক পথে চালিত করেছে, যেখানে নৈতিকতার মানদণ্ড প্রায় বিলুপ্ত, এবং লজ্জা-শরম, হায়া, ও আত্মসংযমের মতো গুণাবলিকে উল্টো ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার বাধা’ বলে মনে করা হয়। যখন কোনো সমাজ চিরস্থায়ী পরকালের চেয়ে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে বেশি মূল্যবান মনে করে এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন তারা নৈতিক সীমালঙ্ঘনের দিকে ধাবিত হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় নোংরা বিনোদনের মতো নিম্নগামী ও অশ্লীল পথ অবলম্বন করে। এই ভোগবাদী মানসিকতা এবং পরকালবিমুখতাই পাশ্চাত্য সমাজে অনৈতিকতার প্রসারের প্রধান ভিত্তি তৈরি করেছে। নিচে পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো :

১. ভোগবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

পাশ্চাত্য সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর যে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর স্থাপিত, তা গভীরভাবে পরকালের বিশ্বাসের পরিপন্থী। এই সমাজব্যবস্থা মূলত ভোগবাদ এবং বস্তুবাদকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, জীবনের প্রধান লক্ষ্য দাঁড়ায় তাৎক্ষণিক সুখ অর্জন এবং সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগ করা। এই সংস্কৃতি মানুষকে শেখায় যে, ‘তুমি যা দেখতে পাও এবং স্পর্শ করতে পারো, তাই তোমার একমাত্র বাস্তবতা’, আর এর বাইরের কোনো অদৃশ্য নৈতিক বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নেই। এই প্রেক্ষাপটে, নোংরা বিনোদন বা অশ্লীলতা পরিণত হয় ভোগবাদী সমাজের এক সহজলভ্য, দ্রুত ফলদায়ক এবং অত্যন্ত উচ্চ-মুনাফাকারী উপাদানে। যেহেতু এই বিনোদন তাৎক্ষণিক শারীরিক ও মানসিক কামনাকে সন্তুষ্ট করে, তাই এটি অর্থনীতির জন্য বিশাল বাজার তৈরি করে। পরকালে কোনো জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে নৈতিকতার কোনো বাঁধন বা সীমা মানা হয় না। ফলস্বরূপ, এই অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি সমাজে অনৈতিকতার স্রোতকে আরও বেগবান করে, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে অর্থ ও ভোগই প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি বস্তুত পরকালীন জীবনের দাবির সরাসরি উল্টো চিত্র।

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানো হত তাহলে তিনি কোন কাফিরকে এখানকার পানির এক ঢোকও পান করাতেন না। সুনানে তিরমিজি : ২৩২০, সহীহাহ : ৯৪০

২. নফসের বা প্রবৃত্তির অনুসরণ

যখন কোনো সমাজে পরকালের প্রতিদান ও জবাবদিহিতার ভয় সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়, তখন মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো তার নফসের (প্রবৃত্তির) বা অনিয়ন্ত্রিত কামনা-বাসনার দাসত্ব করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّہَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَالۡبَنِیۡنَ وَالۡقَنَاطِیۡرِ الۡمُقَنۡطَرَۃِ مِنَ الذَّہَبِ وَالۡفِضَّۃِ وَالۡخَیۡلِ الۡمُسَوَّمَۃِ وَالۡاَنۡعَامِ وَالۡحَرۡثِ ؕ ذٰلِکَ مَتَاعُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَاللّٰہُ عِنۡدَہٗ حُسۡنُ الۡمَاٰبِ

মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চি‎‎হ্নত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল। সুরা আল ইমরান : ১৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰدَاوٗدُ اِنَّا جَعَلۡنٰکَ خَلِیۡفَۃً فِی الۡاَرۡضِ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ بِالۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الۡہَوٰی فَیُضِلَّکَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ یَضِلُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌۢ بِمَا نَسُوۡا یَوۡمَ الۡحِسَابِ 

হে দাউদ! নিশ্চয় আমি তোমাকে যমীনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার কর আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের জন্য কঠিন আযাব রয়েছে। কারণ তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছিল। সুরা সাদ : ৩৮

ইসলামি পরিভাষায় নফস হলো মানুষের ভেতরের সেই শক্তি, যা তাকে মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করে এবং নৈতিক সংযম থেকে দূরে রাখে। পাশ্চাত্য সমাজের মতো যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক সীমারেখা দুর্বল, সেখানে মানুষ সহজেই তার প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত হয়। নোংরা বিনোদন হলো এই নফসের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার এক অত্যন্ত সহজ, তাৎক্ষণিক ও সহজলভ্য মাধ্যম। সমাজের পক্ষ থেকে কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক তোয়াক্কা না থাকায়, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে আত্মসংযমকে নেতিবাচকভাবে সংজ্ঞায়িত করায়, এই প্রবৃত্তি অনুসরণ করাই যেন স্বাভাবিকতা লাভ করে। মানুষ তখন কেবল তাদের শারীরিক ও জৈবিক চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা মূলত মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়। এই অবাধ্য নফসের নিরঙ্কুশ অনুসরণ সমাজে অশ্লীলতা ও অনৈতিক বিনোদনের মাত্রাকে ক্রমশ চরম শিখরে নিয়ে যেতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এটি স্পষ্ট করে যে, পরকালের ভয় না থাকলে মানুষ নৈতিকতার লাগাম ছেড়ে দিয়ে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

৩. পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দেয়া

পাশ্চাত্য ঈমানহীন সমাজে পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যার পরকালের কথা বলে তাদের মাঝে ইসলাম ফবিয়া বা ইসলাম ভীতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছ। তার মনের করে পরকালের ভীতি তাদের ভাড়া ভাতে পানি দিবে। তারা তাদের প্রতিটি কাজে কর্মে দুনিয়াকে প্রধান্য দেয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ মনোভাবের কারণ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ بِاَنَّہُمُ اسۡتَحَبُّوا الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا عَلَی الۡاٰخِرَۃِ ۙ وَاَنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং এ জন্য যে, আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেননা। সূরা নাহল : ১০৭

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের নৈতিক অধঃপতনের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা এবং আখিরাতের প্রতি উদাসীনতা। যখন কোনো জাতি পরকালের জবাবদিহিতা ভুলে যায়, তখন তারা সবকিছুতেই শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দ খোঁজে। নৈতিকতা, সংযম, বা পাপ-পুণ্যের ধারণা তখন তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

অথচ দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন—

بَلْ  تُؤْثِرُوْنَ الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا ﴿۫ۖ۱۶﴾ وَ الْاٰخِرَۃُ  خَیْرٌ  وَّ اَبْقٰی ﴿ؕ۱۷﴾

“তোমরা এ দুনিয়ার জীবন চাও, অথচ পরকাল উত্তম ও স্থায়ী। সূরা আলা : ১৬-১৭

অর্থাৎ দুনিয়ার সুখ-ভোগ অল্প কিছুদিনের জন্য, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী এবং প্রকৃত সুখের স্থান।

দুনিয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, যেমন শিশুর খেলা; কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরন্তন বাস্তবতা।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। সূরা আল ইমরান : ১৮৫

মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়, কিন্তু তা ধোঁকা। ফলস্বরূপ, পাশ্চাত্যে আজ “বিনোদন” মানেই যৌন উন্মুক্ততা, নগ্নতা, অশ্লীলতা, মাদক, জুয়া, বা বিকৃত সংস্কৃতির প্রকাশ। তারা এটাকে “শিল্প” বা “স্বাধীনতা” বলে আখ্যা দেয়। অথচ এর আড়ালে আছে পরকাল-অস্বীকার, আত্মসংযমহীনতা, ও হৃদয়ের অন্ধতা।

অতএব, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, পাশ্চাত্যের অধিকমাত্রায় নোংরা বিনোদনের দিকে ধাবিত হওয়ার মূল কারণ হলো—আখিরাতের বিশ্বাস হারানো ও দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া। যার পরিণাম হলো নৈতিক শূন্যতা, আত্মিক সংকট, ও মানবিক মূল্যবোধের ধ্বংস।

৪. পুনরুত্থানকে অস্বীকারের করা

পাশ্চাত্য সমাজের একটি বিশাল অংশের মধ্যে পুনরুত্থান (আখিরাত) অস্বীকারের মানসিকতা থাকায় অশ্লীল বিনোদনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরকাল বা চূড়ান্ত জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, তাদের কাছে নৈতিকতার বাঁধন আলগা হয়ে যায়। ফলে, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে সর্বোচ্চ ভোগ ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্জন করা। অশ্লীল বিনোদন হলো এই তাৎক্ষণিক ভোগবাদ চরিতার্থ করার সহজ মাধ্যম।

পাশ্চাত্য সমাজের এ মৌলিক বিশ্বাস কুরআনের ঘোষনার সাথে মিলে যায় আল্লাহ বলেন-

اِنۡ ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا نَحۡنُ بِمَبۡعُوۡثِیۡنَ ۪ۙ

একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি বাঁচি এখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হবনা। সুনা মুমিনুন : ৩৭

পুনরুত্থান অস্বীকারের ফলে, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগ ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্জন করা। অশ্লীল বিনোদন এই তাৎক্ষণিক ভোগবাদকে সহজে চরিতার্থ করার মাধ্যম হিসেবে সমাজের কেন্দ্রে চলে আসে। তাদের বিশাল অংশের মনোভাবে এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। তাদের কাছে দৃশ্যমান দুনিয়াই একমাত্র সত্য, আর শ্রুতিনির্ভর পরকালকে তারা অসম্ভব মনে করে। এই মানুষগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের মতো বিষয়কে গৌণ মনে করে এবং দুনিয়ার জীবনেই যথাসম্ভব পরিপূর্ণ প্রাপ্তির লালসা করে। পরকালের কোনো জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, তারা নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করে না। তারা নিকটবর্তী চন্দ্রের মোহ দেখে দূরবর্তী বিশাল নক্ষত্রকে ভুলে বসেছে—অর্থাৎ তাৎক্ষণিক ভোগবিলাস তাদের কাছে চিরস্থায়ী কল্যাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরকালবিমুখতার পরিণতি হিসেবে, তাদের সামনে আল্লাহ পার্থিব জীবনকে আরও বেশি মোহনীয় করে উপস্থাপন করেছেন।

৫. কুফরির কারনে দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে

যারা পরকালে অবিশ্বাস করে বা কুফরিকে তাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের জন্য পার্থিব জীবনকে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বা ‘সুশোভিত’  করে তোলেন। অর্থাত তাদের মধ্যে দুনিয়াকে ভোগ করা তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়। প্রযুক্তি, সম্পদ, বিলাসিতা এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ লাভের সুযোগগুলো তাদের কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এই মোহের কারণেই তারা নোংরা ও অনৈতিক বিনোদনের মতো নিম্নগামী ভোগে ডুবে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

زُیِّنَ لِلَّذِیۡنَ کَفَرُوا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا وَیَسۡخَرُوۡنَ مِنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۘ

যারা কুফরী করেছে, দুনিয়ার জীবনকে তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে। সূরা বাকারা : ২১২

যখন দুনিয়ার জীবন তাদের কাছে এতোটাই মোহনীয় ও একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা মুমিনদের জীবনযাত্রাকে (সংযম, ধৈর্য, এবং ত্যাগে) উপহাস করে। তাদের দৃষ্টিতে, মুমিনরা যেন এক ‘অবাস্তব’ পরকালের জন্য ‘বাস্তব’ জীবনের ভোগ-সুখ ত্যাগ করছে। এই উপহাসের মানসিকতা প্রমাণ করে যে, তাদের অন্তরে পরকালের প্রতি বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র স্থান নেই, যা তাদের অসংযত ও অনৈতিক জীবনধারাকে ন্যায্যতা দেয়।

৬. ভোগ-বিলাস পরীক্ষার উপকরণ করা হয়েছে

পাশ্চাত্য সমাজের ভোগ-বিলাসের জীবন হলো একটি ক্ষণস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মোহে অন্ধ হয়ে তারা নোংরা বিনোদন ও অনৈতিকতার দিকে ঝুঁকেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی

আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সূরা ত্বহা : ১৩১

পাশ্চাত্য সমাজে যে বিপুল সম্পদ, প্রযুক্তি, এবং “পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের উপকরণ (যেমন- বিলাসবহুল জীবনধারা, দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন, এবং নোংরা বিনোদনের সহজলভ্যতা) দেখা যায়, তা মূলত তাদের স্থায়ী সফলতা বা পুরস্কার নয়। বরং এটি তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি কঠিন পরীক্ষা। এই উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে এটা দেখার জন্য যে, তারা এই ক্ষণস্থায়ী জৌলুসে মত্ত হয়ে সঠিক পথ (ঈমান ও নৈতিকতা) থেকে বিচ্যুত হয় কি না।

পাশ্চাত্য সমাজ পুনরুত্থান ও পরকালকে অস্বীকার করে এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা এই “পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করে অশ্লীলতা ও অনৈতিক ভোগে ডুবে গেছে।

আল্লাহ তাআলা এই ভোগ-বিলাসের প্রতি দৃষ্টি না দিতে বলে মুমিনদের সতর্ক করেছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, কাফিরদের এই জীবনধারা ঈর্ষার যোগ্য নয়, বরং এটি একটি ফাঁদ (পরীক্ষা)। এর বিপরীতে, মুমিনদের জন্য “আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী রিজিক হলো পরকালীন সুখ, জান্নাত, এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি।

৭. উন্নত জীবনধারা ও আর্থিক অগ্রগতি কারণে

পাশ্চাত্য সমাজের মানুষ তাদের উন্নত জীবনধারা, আর্থিক অগ্রগতি, ও জাগতিক প্রতিপত্তি (ধন-সম্পদ, প্রযুক্তি, ক্ষমতা) দেখে প্রায়শই মনে করে যে, তারা সঠিক পথেই আছে এবং এটি তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। তারা ধরে নেয়, এই প্রাচুর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কৃতিত্বের পুরস্কার।

আল্লাহ তাআলা তাদের সুখ-সম্ভোগ, রিজিক, সম্পদ ও সন্তান দান করেছেন, এগুলো তাদের পরিশুদ্ধতা ও আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাদের ভালোবাসার কারণে? না, বাস্তবতা এমন নয়। বরং তারা পৃথিবীতে যে ভালো কাজগুলো করে, দুনিয়াতেই এগুলো তার নগদ প্রতিদান। আর কিয়ামতের দিন তারা এমনভাবে পুনরুত্থিত হবে, তাদের আমলনামায় কোনো নেকআমল অবশিষ্ট থাকবে না, থাকবে শুধু বদআমলের ফিরিস্তি আর নোংরা কালিনা। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

اَیَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِہٖ مِنْ مَّالٍ وَّ بَنِیْنَ ﴿ۙ۵۵﴾ نُسَارِعُ  لَهُمْ فِی الْخَیْرٰتِ ؕ بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ ﴿۵۶﴾

তারা কি মনে করে যে, তাদের জাগতিক প্রতিপত্তির কারণে আমি তাঁদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে তাদের দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না। সুরা মুমিনুন : ৫৫-৫৬

দুনিয়ার জীবন আল্লাহর পরীক্ষা ক্ষেত্র, স্থায়ী আবাস নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

مَنْ كَانَ یُرِیْدُ الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا نُوَفِّ اِلَیْهِمْ اَعْمَالَهُمْ فِیْهَا وَ هُمْ  فِیْهَا  لَا  یُبْخَسُوْنَ ﴿۱۵﴾ اُولٰٓئِكَ الَّذِیْنَ لَیْسَ لَهُمْ فِی الْاٰخِرَۃِ  اِلَّا النَّارُ ۫ۖ وَ  حَبِطَ مَا صَنَعُوْا  فِیْهَا وَ  بٰطِلٌ  مَّا  كَانُوْا  یَعْمَلُوْنَ ﴿۱۶﴾

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার জৌলুস কামনা করে, আমি সেখানে তাদেরকে তাদের আমলের ফল পুরোপুরি দিয়ে দেই এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই; আর তারা যা কিছু করছে তাও বিফল হবে। সূরা হুদ : ১৫-১৬

কাফের বা অবিশ্বাসীরা মনে করে যে, তাদের ধন-সম্পদ (মাল) ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য তাদের সৌভাগ্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ। তারা ভুলবশত মনে করে যে, আল্লাহ তাদের দ্রুত কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশ্চাত্য সমাজের ভোগবাদী সফলতা এই বিভ্রান্তিকে আরও দৃঢ় করে।

আল্লাহ তাআলা তাদের এই জাগতিক প্রতিপত্তি দিচ্ছেন পরীক্ষা হিসেবে এবং এটি তাদের অজ্ঞতা প্রমাণ করে। এই প্রাচুর্য তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ধীরে ধীরে এই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় দায়িত্ব থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেয়। তারা এই মিথ্যা মায়ায় ডুবে গিয়ে মনে করে যে, পরকালের কোনো প্রয়োজন নেই।  জাগতিক মোহে তারা এতোটাই অন্ধ হয়ে যায় যে, তারা বুঝতে পারে না যে, এই জীবন কেবল পরীক্ষা মাত্র এবং এই প্রতিপত্তি তাদের অনৈতিকতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্য চূড়ান্ত শাস্তি অনিবার্য করে তুলছে।

৮. পার্থিক জীবন উভোগ্য সামগ্রীর কারনে

পার্থিব জীবন ভোগ্য সামগ্রী মাত্র”—এ বক্তব্যটি কুরআনের ভাষায় গভীর অর্থ বহন করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন, দুনিয়ার জীবনের সব সাজসজ্জা, আনন্দ ও ভোগবিলাস মূল লক্ষ্য নয়; বরং এটি এক পরীক্ষা, এক অস্থায়ী ভোগ্য সামগ্রী, যার পরেই আসবে চিরস্থায়ী জীবন আখিরাত।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا ہٰذِہِ الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا لَہۡوٌ وَّلَعِبٌ ؕ وَاِنَّ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ لَہِیَ الۡحَیَوَانُ ۘ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ

আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখিরাতের নিবাসই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। সূরা আনকাবূত : ৬৪

অর্থাৎ দুনিয়া হলো এক প্রকার অস্থায়ী বিনোদন, যা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। প্রকৃত জীবন হলো আখিরাতের, যেখানে সুখ-দুঃখ, পুরস্কার বা শাস্তি স্থায়ী।

 আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন—

اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا لَعِبٌ وَّلَہۡوٌ وَّزِیۡنَۃٌ وَّتَفَاخُرٌۢ بَیۡنَکُمۡ وَتَکَاثُرٌ فِی الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَوۡلَادِ ؕ

তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। সূরা হাদীদ : ২০

এ আয়াতগুলো দুনিয়ার জীবনকে উদ্ভিদের মতো উপমা দেওয়া হয়েছে—অল্প সময়ের জন্য সবুজ, তারপর ধীরে ধীরে মলিন ও শেষ।

০৯. ধর্মীয় ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা :

ঐতিহাসিকভাবে চার্চের ক্ষমতা হ্রাস এবং আধুনিক সেক্যুলারিজমের উত্থানের ফলে সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমে গেছে। ফলে, নৈতিকতা ও সংযমের শিক্ষা দেওয়ার এবং অশ্লীলতা প্রতিরোধের কোনো শক্তিশালী সামাজিক বা আধ্যাত্মিক বাঁধন অবশিষ্ট নেই। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে চরম পর্যায়ে নেওয়ার ফলে ধর্মীয় অনুশাসনকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা গণমাধ্যম ও বিনোদনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَنۡ اَعۡرَضَ عَنۡ ذِکۡرِیۡ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیۡشَۃً ضَنۡکًا وَّنَحۡشُرُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اَعۡمٰی

যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামাত দিবসে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সূরা ত্বাহা : ১২৪

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে গেলে মানুষের অন্তর সংকীর্ণ হয়, নৈতিকতা লুপ্ত হয়, আর সংযমের জায়গায় প্রবৃত্তি প্রাধান্য পায়।

৪৩৩৮। কাইস (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু বাকর (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন, হে জনসমাজ! তোমরা তো এ আয়াত পাঠ করে থাকো, কিন্তু একে যথাস্থানে প্রয়োগ করো না। আল্লাহর বাণী-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا عَلَیۡکُمۡ اَنۡفُسَکُمۡ ۚ لَا یَضُرُّکُمۡ مَّنۡ ضَلَّ اِذَا اہۡتَدَیۡتُمۡ 

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাক তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। সূরা মায়িদা : ১০৫

তিনি খালিদ থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোনো যালেমকে যুলম করতে দেখে তার দু’ হাত চেপে ধরে না অবিলম্বে আল্লাহ তাদের সবাইকে শাস্তি দিবেন। আমর (রহঃ) হুসাইন থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতির মধ্যে পাপকাজ হতে থাকে, এগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধ করছে না, অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে চরম শাস্তি দিবেন। সুনানে আবু দাউদ ; ৪৩৩৮

১০. ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিকীকরণ :

 বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া ‘যৌন বিপ্লব’ এবং ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’র চরম ব্যাখ্যার কারণে যেকোনো ধরনের অসংযত ও অনৈতিক যৌনাচারকে স্বাভাবিক, এমনকি প্রগতিশীল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই দর্শন লজ্জা, শরম ও আত্মসংযমকে পশ্চাৎপদতা বা ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার বাধা’ হিসেবে চিত্রিত করে, যা নোংরা বিনোদনের প্রসারকে বৈধতা দেয়।  অথচ আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে যৌনাচারকে বৈধ করা কুরআনের এই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বিরোধী। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতা শারঈ সীমারেখার মধ্যে।

আবূ মাস‘ঊদ ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আম্বিয়া-এ-কিরামের উক্তিসমূহ যা মানব জাতি লাভ করেছে, তার মধ্যে একটি হল, ‘‘যদি তোমার লজ্জা না থাকে তাহলে তুমি যা ইচ্ছে তাই কর।’’ সহিহ বুখারি : ৩৪৮৩, ৩৪৮৪, ৬১২০

অর্থাৎ লজ্জাহীনতা ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার’ অপব্যবহার মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

১১. গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ:

পশ্চিমা অর্থনীতিতে, নোংরা ও অশ্লীল বিনোদন ইত্যাদি হলো এক বিশাল লাভজনক শিল্প। ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এই শিল্প মুনাফা লাভের জন্য ক্রমাগত আরও বেশি উত্তেজক, কুরুচিপূর্ণ এবং সহজলভ্য সামগ্রী তৈরি করে। এখানে লাভই একমাত্র চালিকাশক্তি, নৈতিকতা নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُرِیۡدُوۡنَ لِیُطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰہِ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَاللّٰہُ مُتِمُّ نُوۡرِہٖ وَلَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। সূরা সফ : ৮

অর্থাৎ, পুঁজিবাদী গণমাধ্যম আল্লাহর নূর (নৈতিকতা, হায়া, ঈমান) নিভিয়ে দিতে চায় লাভের জন্য। কিন্তু আল্লাহর দ্বীন কখনো নিভবে না।

১২. পরিবারের ভূমিকা দুর্বল হওয়া

 ঐতিহ্যবাহী পরিবার কাঠামোর ভাঙন এবং বিবাহ ও সন্তানের প্রতি অনাগ্রহ বাড়ার কারণে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে। পরিবার যেখানে শিশুদের সংযম, লজ্জা ও সম্পর্কের পবিত্রতার শিক্ষা দিত, সেই ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় শিশুরা খুব কম বয়স থেকেই অশ্লীল বিনোদনের শিকার হচ্ছে এবং একেই স্বাভাবিক মনে করছে। অথচ আল্লাহ বলেন-

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارٗا

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো। সূরা তাহরীম : ৬

পরিবারের দায়িত্ব হলো সন্তানদের ঈমান, লজ্জা, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া। যখন পরিবার ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ নৈতিক ভিত্তি হারায়।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম (শাসক) একজন দায়িত্বশীল। কাজেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে, আর খাদিম তার মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। [‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)] বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এদের সম্পর্কে (নিশ্চিতভাবেই) শুনেছি। তবে আমার ধারণা; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আর সন্তান তার পিতার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। মোটকথা তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৮, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯

১৩. যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারা আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি অবিশ্বাস:

পাশ্চাত্য দর্শন বহুলাংশে চরম যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদকে গ্রহণ করেছে। এর ফলস্বরূপ, আবেগ, আধ্যাত্মিকতা, এবং নৈতিক জ্ঞানকে (যা ধর্ম থেকে আসে) অযুক্তিসঙ্গত বা অন্ধ বিশ্বাস হিসেবে বাতিল করে দেওয়া হয়। যার ফলে তারা মনে করে ধর্ম বা পরকার বলতে কিছুই নাঈ। ধর্মীয় বিশ্বাস বাদ দিয়ে যখন মানবজীবনের নৈতিকতা শুধু যুক্তি বা সামাজিক চুক্তির ওপর নির্ভর করে, তখন প্রবৃত্তি অনুসরণ করাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়, যা অশ্লীল বিনোদনের জন্ম দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَفَلَمۡ یَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَتَکُوۡنَ لَہُمۡ قُلُوۡبٌ یَّعۡقِلُوۡنَ بِہَاۤ اَوۡ اٰذَانٌ یَّسۡمَعُوۡنَ بِہَا ۚ فَاِنَّہَا لَا تَعۡمَی الۡاَبۡصَارُ وَلٰکِنۡ تَعۡمَی الۡقُلُوۡبُ الَّتِیۡ فِی الصُّدُوۡرِ

তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তাদের হত এমন হৃদয় যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কান যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। চোখ অন্ধ হয় না, বরং বুকের ভেতর যে হৃদয় আছে, সেটিই অন্ধ হয়। সূরা হাজ্জ : ৪৬

যারা শুধু যুক্তি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে বিচার করে, তাদের অন্তর অন্ধ হয়ে যায়—তারা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।

১৪. সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পরকালবিমুখ এবং বস্তুবাদী সমাজে এক ধরনের ‘অস্তিত্বের শূন্যতা’ ও মানসিক অস্থিরতা বিরাজ করে। এই শূন্যতা এবং জীবনের অর্থহীনতার ভয় থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাৎক্ষণিক, তীব্র আনন্দদায়ক কিন্তু অর্থহীন বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার মধ্যে অশ্লীলতা অন্যতম। সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন জন্য অর্থহীন বিনোদনের দিকে না ঝুঁকে আল্লাহর স্মররই মুক্তি দিতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮

যখন সমাজ আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন হৃদয়ে শূন্যতা, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা ভর করে; মানুষ তা পূরণ করতে অশ্লীলতা, মদ্যপান ও বিনোদনে ডুবে যায়।

১৫. পার্থিক আইনে অশ্লীলতা বৈধনা প্রদান

পাশ্চাত্য সমাজে আইন ও নৈতিকতার মধ্যে তীব্র বিভাজন বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় আইনে ‘পাপ’ বা ‘নৈতিক অপরাধ’ বলে কিছু নেই। ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন তা অন্যের ক্ষতি করে। ফলে, অধিকাংশ অশ্লীল বিনোদন (পর্নোগ্রাফির উৎপাদন ও বিতরণ, যা স্বেচ্ছায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ঘটে) আইনের সুরক্ষা পায়, কারণ এটিকে ‘অভিব্যক্তির স্বাধীনতা’ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা হয়।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰکُمۡ عَبَثًا وَّاَنَّکُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ

তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না’? সূরা মুমিনুন : ১১৫

আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ গৰ্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক। সহিহ মুসলিম : ৪৯

আইন যদি অশ্লীলতাকে বৈধতা দেয়, মুসলিমকে অন্তত হৃদয়ে ঘৃণা করতে হবে এবং সমাজে বিকল্প নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *