যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০৪ ::  আরাফার ও অন্যান্য কিছু দিবস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জিলহজ মাসের নয় তারিখকে আরাফার দিন বলা হয়। এই দিনে আরাফারের ময়দানে হাজিদের অবস্থান করা সর্বসম্মতিতে ফরজ। যতি কেউ জিলহজ মাসের নয় তারিখ আরাফায় অবস্থান না করে হজের সকল কাজ সমাধা করে তবেও তার হজ্জ হবে না। কোন প্রকার দম দিয়াও এর ক্ষতি পূরণ হবে না। আর যারা হজ করার জন্য আরাফাতের ময়দানে হাদির হবে না তাদের এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাহ। যারা হজের নিয়তে মিনায় সমবেত হয়েছে তারা এই দিন সকালে মিনায় ফরজের সালাত আদায় করে। সূর্য় উদয়ের পর আস্তে আস্তে আরাফার দিকে রওয়ানা দিবে। এই সময় হেঁটেই আরাফায় যাওয়া সুন্নাহ তবে বাহন ব্যবহার করায় কোন ক্ষতি নাই। অনেক সময় দেখা যায় মহিলা ও মাজুর হাজিগণ আট তারিখ দিবাগত রাত্রিতে গাড়িতে করে আরাফার ময়দানে যায়। উজর বসত যাওয়া সঠিক হলেও অনেকেই সময় সুযোগ থাকা সত্বেও মাজুরদের সাথে রাত্রিতে আরাফাতের ময়দানে যায়, যা সু্ন্নাহ সম্মত নয়। অথচ আরাফাত দিনের আগে রাতে রসুলুল্লাহ (সা.) ছিল মিনায় রাত্রি জাপন করেছেন। এই আমলটি করা মুস্তহাব।

১। আরাফার দিনে মর্যাদা ও ফযীলত

(১) মহান আল্লাহ এই দিনে জাহান্নাম থেকে অধিক সংখ্যা বান্দাকে মুক্তি দেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللَّهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِي بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ ‏আরাফাহ দিবসের তুলনায় এমন কোন দিন নেই। যে দিন আল্লাহ তা’আলা সর্বাধিক সংখ্যক লোককে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহ তা’আলা নিকটবতী হন, অতঃপর বান্দাদের সম্পর্কে মালায়িকার সামনে গৌরব প্রকাশ করেন এবং বলেন, তারা কী উদ্দেশে সমবেত হয়েছে? সহিহ মুসলিম ১৩৪৮, ইবনু মাজাহ : ৩০১৪, সুনানে নাসায়ী ৩০০৩

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “জ্বিলহজ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললে,  “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেন, আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নাই। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (সহিহ হাদিসে কুদসি ১০১)

(২) ফেরেশতাদের কাছে বান্দার ব্যাপারে গর্ব করে এবং প্রশ্ন করেন, তারা কি চায়?

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ يُبَاهِي بِأَهْل عَرَفَاتْ مَلَائِكَة السْمَاءِ فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عِبَادِي جَاَءُونِي شُعْثًا غُبْرًا

আল্লাহর তাআলা আরাফার লোকদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন, তিনি বলেন, আমার বান্দাদের দেখ তারা এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় আমার কাছে এসেছে”। সহিহ হাদিসে কুদসি : ১০২, সহিহ ইবনে হিব্বান

(৩) আরাফার দিনে মৃত ব্যক্তিকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠান হবে

ইব্‌নু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আরাফাতের মাঠে নবী (সা.) এর সাথে অবস্থান করছিলেন, আকস্মাৎ তিনি তাঁর সওয়ারী হতে পড়ে গেলে তাঁর ঘাড় ভেঙ্গে যায় অথবা সওয়ারীটি তার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। (ফলে তিনি মারা যান)। এরপর নবী ﷺ বললেন, তোমরা তাকে কুলগাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ পানি দ্বারা গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে কাফন দাও। তবে তার শরীরে সুগন্ধি মাখাবে না আর তার মাথা ঢাকবে না এবং হানূতও লাগাবে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন। সহিহ বুখারি : ১৮৫০, সহহি মুসলিম : ২৭৮২)

২। আরাফার ময়দানে হাজীদের করণীয়ঃ

এক নজরে এই দিনে হাজীদের করণীয় আমল।

(১) মসজিদে নামিরার নিকটে অবস্থান করাঃ

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার দিন ভোরে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেই রওয়ানা করে আরাফাতে এসে পৌঁছে ‘নামিরাহ’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। এটা আরাফার সেই স্থান যেখানে ইমাম অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর যুহর সলাতের ওয়াক্ত হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাড়াতাড়ি সলাতের জন্য রওয়ানা হলেন এবং যুহর ও ‘আসরের সলাত একত্রে আদায় করে লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, তারপর সেখান থেকে প্রস্থান করে আরাফার ময়দানের অবস্থান স্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৯১৩

রাসুলূল্লাহ ﷺ আরাফার ময়দানের নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন। এই কারনে আরাফায় পৌঁছে মসজিদে ‘নামিরা’র কাছে অবস্থান করা মুস্তাহাব বা উত্তম। সেখানে জায়গা না পেলে আরাফার সীমানার ভিতরে যে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারেন। এতে কোন অসুবিধা নেই।

(২) আরাফার ময়দানের বাহিরে অবস্থান না করাঃ

আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন-

الْحَجُّ عَرَفَةُ، فَمَنْ أَدْرَكَ لَيْلَةَ عَرَفَةَ قَبْلَ طُلُوعِ الْفَجْرِ مِنْ لَيْلَةِ جَمْعٍ، فَقَدْ تَمَّ حَجُّهُ»

হজ্জ হলো আরাফায় অবস্থান। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। সুনানে নাসাঈ : ৩০১৯

আরাফাতের একটি সীমা দেয়া আছে, এর বাহিরে কোন হাজি অবস্থান করলে তার হজ্জ শুদ্ধ হবে না।

(৩) আরাফাতে সালাত জমা করাঃ

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم جَمَعَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِالْمُزْدَلِفَةِ

আল্লাহর রাসূল ﷺ বিদায় হাজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ইশা একত্রে আদায় করেছেন। সহিহ বুখারি : ১৬৭৪

ইবনু উমর (রা.) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি আবদুল্লাহ (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও আসর এক সাথেই আদায় করতেন। আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল ﷺ ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল ﷺ এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? সহিহ বুখারি : ১৬৬২

(৪)। আরাফার ময়দানে বেশী বেশী দোয়া এবং জিকির করাঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান কালে হাজ্জিদের প্রধান কাজই হলো দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ তালাস করা। এই দিনে মহান আল্লাহর ক্ষমা প্রদানে ঘোষনা আছে। তাই, ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য এই দিনে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহ প্রশংসাসহ জিকির এবং কুনআন তিলওয়াত মাধ্যমে অতিবাহিত করা উত্তম।

উসামা ইবন যায়দ (রা.) বলেন-

كُنْتُ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَفَاتٍ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ يَدْعُو، فَمَالَتْ بِهِ نَاقَتُهُ، فَسَقَطَ خِطَامُهَا فَتَنَاوَلَ الْخِطَامَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ، وَهُوَ رَافِعٌ يَدَهُ الْأُخْرَى

আমি আরাফায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর সঙ্গে একই বাহনে সাওয়ার ছিলাম। তিনি দুয়ায় উভয় হাত উত্তোলন করলেন। এমন সময় তার উট তাঁকে নিয়ে একদিকে হেলে গেল, ফলে তার নাকের রশি পড়ে যেতে লাগলো, তিনি তাঁর এক হাতে তা ধরে ফেললেন, এ সময় তাঁর অন্য হাত উঠানোই ছিল। সুনানে নাসাঈ ৩০১১

হাদীসে বর্ণিত রাসূল ﷺ এর বাক্যে দোয়া করা উত্তম কারন, এই দোয়াগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং অধিক উপকারী। তবে বান্দা ইচ্ছা মনের আবেগ দিয়ে তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় দোয়া করতে পারে। এতে করে তার চাহিদামত দোয়া করা সম্বব হবে। আরাফাতের ময়দানে প্রধাণ আমলই হলো, দোয়া ও জিকির।  আরাফার ময়দানে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হাত তুলে দোয়া করেছেন। এই স্থান অনেক কে দেখা যায় দোয়া না করে নফল সালাত আদায় করে থাকে। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বা  সাহাবিদের থেকে এই আমলের প্রমান পাওয়া যায়। বরং এই স্থানে জোহর ও আসর সালাত কে জমা করে আদায় করার বিধান দেয়া হয়েছে। তাই নফল সালাত আদায় করা ঠিন নয়। আরাফা হল দোয়া কবুলের স্থান। তাই এখানে হাত তুলে একাকী দোয়া করতে হবে। এখানে তাবলীগের বিশ্ব ইজতিমার মত সম্মিলিত দোয়া কোন ব্যবস্থা করা হয় না কারন এখান একাকী দোয়া করাই সুন্নাহ সম্মত আমল। কিন্তু দোয়ার সময় একটি বিষয় খুব লক্ষ করবেন। যেন কোন অবস্থায়ই কিবলাকে পিছনে রেখে জাবালে আরাফার দিকে মুখ করে দুআ করা যাবে না।

৩। যারা আরাফাতে অবস্থান করবেন তাদের আমলঃ

আরাফার দিনের সিয়াম উদ্‌যাপন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। কেননা এই দিনে প্রকাশ্যে সিয়াম ভঙ্গ করে উম্মতে দেখিয়েন। আর যারা হজে গমন করেন নাই, তারা নিজ নিজ স্থান থেকে এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করবে।

আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالَّتِي بَعْدَهُ

আমি আল্লাহর নিকট আরাফাত দিবসের রোযার এই সওয়াব আশা করি যে, তিনি তাঁর বিনিময়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৩০, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৯, সুনানে আবু দাউদ : ২০৯৬, আহমাদ : ২২০২৪

উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

شَكَّ النَّاسُ يَوْمَ عَرَفَةَ فِي صَوْمِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَبَعَثْتُ إِلَى النَّبِيِّ بِشَرَابٍ فَشَرِبَهُ

আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। সহিহ বুখারি : ১৬৫৮

মায়মূনাহ (রা.) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّاسَ شَكُّوا فِي صِيَامِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَرَفَةَ فَأَرْسَلَتْ إِلَيْهِ بِحِلاَبٍ وَهُوَ وَاقِفٌ فِي الْمَوْقِفِ فَشَرِبَ مِنْهُ وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ

কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল ﷺ এর সিয়াম উদ্‌যাপন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল ﷺ এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। সহিহ বুখারি ১৯৮৯, সহিহ মুসলিম : ১১২৪

নোট- আমাদের উপমহাদেশে আরাফাতের সিয়ামের তারিখ নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। আমাদের দেশে সাধারণ চন্দ্র মাসের তারিক সৌদি আরব থেকে একদিন পিছিয়ে থাকে। এই কারনে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সৌদি আরবের একদিন পর উদযাপিত হয়ে থাকে। এই কারনে আমাদের দেশের অনেক আলেম মতামত দিয়েছেন। সৌদি আরবে যে দিন আরাফার ময়দানে হাজিগণ অবস্থান করবে তার একদিন পর অর্থাৎ সৌদির দশ আর আমাদের দেশে নয় জিলহজ তারিখে আরাফার সিয়াম উদ্‌যাপন করতে হবে। আরেক দল আলেম বলছেন যে যেহেতু আমরা জানতে পারছি যে সৌদির নয় জিলহজ ও আমাদের দেশে আট জিলহজ হাজিরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছি তাই এই দিনেই আরাফার সিয়াম উদ্‌যাপন করতে হবে।

প্রথম পক্ষের একটি দাবি- যেহতু আমরা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সৌদি আরবের একদিন পর উদ্‌যাপন করি তাই আরাফার সিয়ামও একদিন পর আদায় কবর।

দ্বিতীয় পক্ষের মতে- আমাদের দেশে আরাফার ময়দান নাই, আর সিয়াম যেহেতু আরাফার দিনের কথা বলেছেন। আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে শতভাগ সঠিকভাবেই জানতে পারছি যে হাজিরা কখন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন। এখানে তারিখ কোন বিষয় নয়, বিষয় হলো হাজিদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন। তাই আমরা যদি শতভাগ নিশ্চিত হয় যে হাজিগণ অমুক দিন আরাফাতে অবস্থান করবে, তখন সেই দিনই সিয়াম উদ্‌যাপন করব এবং এটাই সুন্নাহ। পরের দিন নয়।

যেহেতু বিষয়টি মতভেদপূর্ণ তাই অনেক আলেম বলেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাহ সম্মত ইবাদত। কাজেই আমরা এই দশদিন সিয়াম উদ্‌যাপন করলে, আমি আর বিতর্কের মাঝে থাকলাম না। আর যাদের দশ দিন সিয়াম উদ্‌যাপন করা সম্ভব নয় তারা অন্তত জিলহজের নয় ও দশ তারিখ দুটি সিয়াম রাখলে এই বিতর্কের উর্ধে চলে যাবেন। আর যারা একটি সিয়াম উদ্‌যাপন করবে তারা সুধারণার ভিত্তিতে যে কোন দিন উদ্‌যাপন করেত পারে কিন্তু যারা তার মতের বাহিরে আমল করবে তাদের আমল  হবে বলে মত প্রকাশ করা যাবে। আল্লাহু আলাম।

সাপ্তাহিক সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়ামঃ

প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার- এ দু’দিন সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাত। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’দিন রোযা রাখতে পছন্দ করতেন।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا

প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। এরপর এমন সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, যারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে না। তবে সে ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই ও তার মধ্যে শত্রুতা বিদ্যমান। এরপর বলা হবে, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য অবকাশ দাও, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য সুযোগ দাও, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য সুযোগ দাও। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৫, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৭, ২০২৩, আবূ দাউদ :ধ ৪৯২৬, ইবনু মাজাহ : ১৭৪০

রবীআ ইবনুল গায (রহ.) থেকে বর্ণিত-

أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ عَنْ صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ كَانَ يَتَحَرَّى صِيَامَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ

তিনি আয়িশা (রাঃ) এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযার প্রতি খুবই খেয়াল রাখতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ :১৭৩৯, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৫, সুনানে নাসায়ী : ২১৮৬, ২৩৬০, ২৩৬১, মিশকাত : ২০৫৫

আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-

أَنَّرَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ ‏”‏ ‏.‏

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সোমবার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “এই দিনটি এমন যে দিন আমার জন্ম হয়েছে, যেদিন আমি প্রেরিত হয়েছি অথবা ঐ দিনে আমার প্রতি অহী’ অবতীর্ণ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১১৬২, আবূ দাঊদ : ২৪২৬, মিশকাত : ২০৪৫,, আহমাদ : ২২৫৫০

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবার সওম রাখতেন। তাঁর কাছে আরয করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আপনি অধিকাংশ সময়ই সোম ও বৃহস্পতিবার সওম রাখেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সোম ও বৃহস্পতিবার হলো ঐ দিন, যেদিন আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মুসলিমকে মাফ করে দেন। কিন্তু ওদেরকে মাফ করে দেন না যারা সম্পর্কচ্ছেদ করে রাখে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)-কে (ফেরেশতাগণকে) বলেন, ওদেরকে ছেড়ে দাও যে পর্যন্ত তারা পরস্পর সম্পর্ক ঠিক করে নেয় (এরপর তাদেরকে মাফ করে দেয়া হবে)। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৪০, মিশকাত : ২০৬৮,  সহিহ আল জামি : ২২৭৮, সহিহ আত তারগীব : ১০৪২

,

প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ বা আইয়ামে বিদের সিয়াম

প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে মোট ৩ দিনের সিয়াম পালনে করা সুন্নাত যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এ ৩ দিনকে শরীয়াতের পরিভাষায় “আইয়ামুল বীদ” বলা হয়। বীদ অর্থ সাদা বা আলোকিত। কারণ এ ৩ দিনের রজনীগুলো ফুটফুটে চাঁদের আলোতে উদ্ভাসিত থাকে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَوْصَانِي خَلِيلِي بِثَلاَثٍ لاَ أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ صَوْمِ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَصَلاَةِ الضُّحَى وَنَوْمٍ عَلَى وِتْرٍ.

আমার খলীল ও বন্ধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি কাজের ওসিয়্যাত করেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আমি পরিত্যাগ করব না। প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম, সালাতুয্-যুহা এবং বিতর আদায় করে শয়ন করা। সহিহ বুখারি ১১৭৮, ১৯৮১, সহিহ মুসলিম : ৭২১, তিরমিজি ৭৬০, নাসায়ী ১৬৭৭, ১৬৭৮, ২৪০৬, আবূ দাউদ ১৪৩২,

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ ‏”‏

হে আবূ যার! তুমি যখন কোন মাসে তিনদিন সওম উদ্‌যাপন করতে চাও, তাহলে তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখে করবে। সুনানে তিরমিজি ৭৬১, নাসায়ী ২৪২৪, সহীহ আল জামি‘ ৬৭৩, আহমাদ ২১৪৩৭)।

ইবনু মিলহান আল-কায়সী (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نَصُومَ الْبِيضَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ، قَالَ: وَقَالَ هُنَّ كَهَيْئَةِ الدَّهْرِ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে বীয অর্থাৎ চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সওম পালনে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এগুলো সারা বছর সওম রাখার সমতুল্য। সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৯, সুনানে নাসায়ি : ২৪৩২

আবূ দরদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এমন তিনটি কাজের অসিয়ত করেছেন, যা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, কখনোই ত্যাগ করব না। প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা উদ্‌যাপন করা, চাশতের নামায পড়া এবং বিতির না পড়ে নিদ্রা না যাওয়া। সহিহ মুসলিম : ৭২২, সুনানে আবূ দাউদ : ১৪৩৩, আহমাদ : ২৬৯৩৫, ২৭০০৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখা, সারা বছর ধরে রোযা রাখার সমান।  সহিহ বুখারী : ১১৫৯, ১৯৭৫)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *