কুরআন ও নবজাতকের সুরক্ষায় মায়ের দুধ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

প্রকৃতির এক অনন্য এবং অতুলনীয় দান হলো মায়ের দুধ। এটি কেবল একটি খাদ্য নয়, বরং নবজাতকের জন্য এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ তাআলা মানবশিশুর জন্মের পর তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য মায়ের স্তনে যে সুধা গচ্ছিত রেখেছেন, তার কোনো বিকল্প আধুনিক বিজ্ঞান আজও তৈরি করতে পারেনি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ১৪০০ বছর আগেই শিশুর স্তন্যপান করানোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় এক চরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কুরআনের নির্দেশনা ও বৈজ্ঞানিক সামঞ্জস্য

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَوَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡہِ ۚ حَمَلَتۡہُ اُمُّہٗ وَہۡنًا عَلٰی وَہۡنٍ وَّفِصٰلُہٗ فِیۡ عَامَیۡنِ اَنِ اشۡکُرۡ لِیۡ وَلِوَالِدَیۡکَ ؕ اِلَیَّ الۡمَصِیۡرُ

আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। সূরা লুকমান : ১৪

এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবেই দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যপান করানোর কথা উল্লেখ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত মানুষ এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF) জোর দিয়ে বলছে যে, একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য জন্মের পর থেকে পূর্ণ দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যপান করানো অত্যন্ত জরুরি।

কেন মায়ের দুধ অতুলনীয়?

আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা ‘ইনফ্যান্ট ফর্মুলা’ বা কৃত্রিম দুধ কখনোই মায়ের দুধের সমকক্ষ হতে পারে না। এর কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

উপযোগী পুষ্টি উপাদান:

মায়ের দুধে শিশুর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট এবং ভিটামিন এমনভাবে থাকে যা শিশুর কাঁচা হজমশক্তির জন্য একদম মানানসই। শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার চাহিদ অনুযায়ী মায়ের দুধের উপাদানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়।

প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি:

জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন মায়ের স্তন থেকে যে শালদুধ (Colostrum) নির্গত হয়, তাকে শিশুর ‘প্রথম টিকা’ বলা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ইমিউনোগ্লোবিউলিন থাকে, যা শিশুকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি থেকে রক্ষা করে।

মস্তিষ্কের বিকাশ:

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে, তাদের আইকিউ (IQ) এবং কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট অন্য শিশুদের তুলনায় ভালো হয়। এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কোষ গঠনে সহায়তা করে।

মায়ের দুধ কেবল একটি পানীয় নয়, এটি একটি “জীবন্ত টিস্যু” যা প্রতিনিয়ত শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের উপাদান পরিবর্তন করে। নিচে মায়ের দুধের প্রধান পুষ্টিগুণ ও এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো বৈজ্ঞানিক চার্ট ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।

মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ: একটি বৈজ্ঞানিক চার্ট

মায়ের দুধের উপাদানগুলো শিশুর পরিপাকতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে সহজপাচ্য। গড়ে প্রতি ১০০ মিলিলিটার মায়ের দুধে যা থাকে:

পুষ্টি উপাদানপরিমাণ (প্রতি ১০০ মি.লি.)ভূমিকা
পানি৮৭ – ৮৮ গ্রামশিশুকে হাইড্রেটেড রাখে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
ল্যাকটোজ (শর্করা)৭.০ গ্রামমস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায় এবং ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।
ফ্যাট (চর্বি)৩.৮ – ৪.৫ গ্রামপ্রধান শক্তির উৎস এবং রেটিনা ও স্নায়ু গঠনে অপরিহার্য।
প্রোটিন১.০ – ১.৫ গ্রামপেশি গঠন ও এনজাইম তৈরিতে কাজ করে (হজম করা সহজ)।
ভিটামিন ও খনিজসামান্য কিন্তু পর্যাপ্তভিটামিন A, C, E এবং আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস।

স্তন্যদানের দুই বছরের তাৎপর্য :

কেন আল্লাহ দুই বছরের কথা নির্দিষ্ট করলেন? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম পূর্ণতা পেতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। এই দুই বছর শিশু তার মায়ের দুধ থেকে যে সুরক্ষা পায়, তা তাকে ভবিষ্যতে স্থূলতা, অ্যালার্জি এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এছাড়া, স্তন্যপান করানোর মাধ্যমে মা ও শিশুর মধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন তৈরি হয়, যা শিশুর মানসিক নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে।

উপসংহার : মায়ের দুধের এই অলৌকিক গুণাবলি এবং দুই বছর পর্যন্ত এর উপযোগিতা সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো মানুষের কথা নয় বরং বিশ্বজাহানের স্রষ্টার বাণী। মা যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন এবং দুধ পান করান, তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আল্লাহ এই আয়াতে পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আজ যখন বিজ্ঞান মায়ের দুধের উপকারিতা নিয়ে নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছে, তখন মুমিনদের ঈমান আরও মজবুত হচ্ছে এই ভেবে যে, কুরআন সবসময়ই বিজ্ঞানের চেয়ে অগ্রগামী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *