কুরআনে সৃষ্টির রহস্য : সব সৃষ্টি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে মানুষ যখনই গবেষণা করেছে, এক অদ্ভুত এবং সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্যের দেখা পেয়েছে। এই সামঞ্জস্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘জোড়া’ বা ‘জুটি’র উপস্থিতি। সাধারণত মানুষ জোড়া বলতে নারী ও পুরুষ বা প্রাণিজগতের পুরুষ ও স্ত্রীলিঙ্গকে বুঝে থাকে। কিন্তু পবিত্র কুরআন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ঘোষণা করেছে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই জোড়ায় জোড়ায় তৈরি—এমনকি সেইসব জিনিসও যা মানুষ তখন জানত না।

অজানার মাঝেও জোড়া

সূরা ইয়াসিন আল্লাহ তাআলা এক বৈপ্লবিক সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

سُبۡحٰنَ الَّذِیۡ خَلَقَ الۡاَزۡوَاجَ کُلَّہَا مِمَّا تُنۡۢبِتُ الۡاَرۡضُ وَمِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ وَمِمَّا لَا یَعۡلَمُوۡنَ

পবিত্র মহান তিনি, যিনি উদ্ভিদ, মানুষ এবং তারা যাদেরকে জানেনা তাদের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। সুরা ইয়াসিন : ৩৬

এই আয়াতে তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে:

১. উদ্ভিদের জোড়া (লিঙ্গভেদ)।

২. মানুষের নিজস্ব জোড়া (নারী-পুরুষ)।

৩. এমন কিছুর জোড়া যা মানুষ সেই সময় জানত না।

আয়াতের শেষ অংশটি—”যা তারা জানে না”—বিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে জোড়ার ধারণা কেবল জীববিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা বা পরমাণুর গভীরেও বিদ্যমান।

১. উদ্ভিদ ও জীববিজ্ঞানে জোড়া

উদ্ভিদবিজ্ঞানে (Botany) একসময় ধারণা করা হতো যে সব উদ্ভিদের লিঙ্গভেদ নেই। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, প্রতিটি উদ্ভিদেরই স্ত্রী ও পুরুষ অংশ থাকে। এমনকি যে ফুলগুলো উভয়লিঙ্গ (Hermaphrodite), সেগুলোর মধ্যেও পুংকেশর ও গর্ভকেশর নামক দুটি ভিন্ন লিঙ্গীয় অংশ থাকে। কুরআনের এই ঘোষণা উদ্ভিদবিজ্ঞানের আধুনিক তত্ত্বের সাথে হুবহু মিলে যায়।

২. পদার্থবিজ্ঞানে জোড়া: অ্যান্টি-ম্যাটার বা প্রতি-পদার্থ

কুরআনের সেই “অজানা জিনিসের জোড়া” সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা এসেছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে। ১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পল ডিরাক (Paul Dirac) পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণারই একটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘প্রতি-কণা’ বা ‘অ্যান্টি-পার্টিকেল’ (Anti-particle) রয়েছে। একে পদার্থবিজ্ঞানে ‘প্যারিটি’ (Parity) বলা হয়।

মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

•      পদার্থ ও প্রতি-পদার্থ (Matter and Anti-matter): প্রতিটি মৌলিক কণার একটি বিপরীত জোড়া থাকে। যেমন, ইলেকট্রনের বিপরীত হলো পজিট্রন।

•      বিপরীত আধান: সাধারণ ইলেকট্রনের আধান থাকে ঋণাত্মক (Negative), কিন্তু এর প্রতি-কণা পজিট্রনের আধান থাকে ধনাত্মক (Positive)। একইভাবে প্রোটনের বিপরীতে থাকে অ্যান্টি-প্রোটন।

•      জোড়া সৃষ্টি (Pair Production): কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুযায়ী, শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়ামে সব সময় কণা এবং প্রতি-কণা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি হয় এবং আবার একে অপরের সাথে মিলে বিলীন হয়ে যায়।

[Image showing Matter and Anti-matter pairs like Electron and Positron]

৩. জড় জগতের গভীর রহস্য

বিজ্ঞান আজ আমাদের বলছে যে কেবল প্রাণহীন পদার্থ নয়, বরং মহাবিশ্বের মৌলিক বলগুলোর মধ্যেও জোড়া বিদ্যমান। যেমন:

•      চৌম্বক ক্ষেত্রের উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু।

•      বিদ্যুতের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান।

•      আলোর কণা ও তরঙ্গের দ্বৈত প্রকৃতি।

বিজ্ঞানী পল ডিরাকের এই আবিষ্কারের কয়েক শতাব্দী আগেই কুরআন বলে দিয়েছে যে, এমন অনেক কিছু জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে যা তৎকালীন মানুষ জানত না। বর্তমানে আমরা জানি যে, এই ‘জোড়া’র নিয়মটি সাব-অ্যাটোমিক লেভেল বা পরমাণুর ভেতরেও কার্যকর।

৪. তথ্য ও উপাত্তের বিশ্লেষণ

ক্ষেত্রজোড়ার ধরণ (Pairs)কুরআনিক প্রতিফলন
প্রাণিজগতনারী ও পুরুষ“তাদের নিজেদের মধ্য থেকে”
উদ্ভিদজগতপরাগ ও ডিম্বক“যা ভূমি উৎপন্ন করে”
পদার্থবিজ্ঞানকণা ও প্রতি-কণা (Matter/Anti-matter)“যা তারা জানে না”
বিদ্যুৎধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান“যা তারা জানে না”

 

৫. কুরআনের অলৌকিকত্ব ও উপসংহার

সপ্তম শতাব্দীর মানুষের কাছে ‘প্রতি-পদার্থ’ বা পদার্থের পারমাণবিক জোড়ার কোনো ধারণা থাকা অসম্ভব ছিল। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন এক সার্বজনীন সত্যের কথা বলা, যা কেবল ১৩০০ বছর পর বিজ্ঞানের গবেষণাগারে প্রমাণিত হবে, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে কুরআন কোনো মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়।

যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি প্রতিটি স্তরে—ক্ষুদ্র কণা থেকে শুরু করে বিশাল ছায়াপথ পর্যন্ত—একটি চমৎকার ভারসাম্য ও জোড়া তৈরি করেছেন। কুরআনের এই আয়াতটি আধুনিক বিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা এবং বিশ্বাসী মানুষের জন্য আল্লাহর অসীম জ্ঞানের এক চূড়ান্ত প্রমাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *