কুরআনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও ছয় দিনের রহস্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগত সম্পর্কে এমন ভাষায় আলোচনা করেছে, যা একদিকে ঈমানকে দৃঢ় করে, অন্যদিকে চিন্তা ও গবেষণার দরজা খুলে দেয়। সৃষ্টিজগত ছয় দিনে সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি কুরআনের একাধিক আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ۣالَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ وَمَا بَیۡنَہُمَا فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ۚۛ اَلرَّحۡمٰنُ فَسۡـَٔلۡ بِہٖ خَبِیۡرًا

যিনি আসমান, যমীন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। পরম করুণাময়। সুতরাং তাঁর সম্পর্কে যিনি সম্যক অবহিত, তুমি তাকেই জিজ্ঞাসা কর। সুরা ফুরকান : ৫৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ وَمَا بَیۡنَہُمَا فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ٭ۖ وَّمَا مَسَّنَا مِنۡ لُّغُوۡبٍ

আর অবশ্যই আমি আসমানসমূহ ও যমীন এবং এতদোভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি। আর আমাকে কোনরূপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। সুরা ক্বফ : ৩৮

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ وَّکَانَ عَرۡشُہٗ عَلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَلَئِنۡ قُلۡتَ اِنَّکُمۡ مَّبۡعُوۡثُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡمَوۡتِ لَیَقُوۡلَنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ

আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর, যাতে তিনি পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলে সর্বোত্তম। আর তুমি যদি বল, ‘মৃত্যুর পর নিশ্চয় তোমাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে’, তবে কাফিররা অবশ্যই বলবে, ‘এতো শুধুই স্পষ্ট যাদু’। সুরা রাদ : ৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ؕ یَعۡلَمُ مَا یَلِجُ فِی الۡاَرۡضِ وَمَا یَخۡرُجُ مِنۡہَا وَمَا یَنۡزِلُ مِنَ السَّمَآءِ وَمَا یَعۡرُجُ فِیۡہَا ؕ وَہُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। সুরা হাদিদ : ৪

এ সব আয়াতে “দিন” (আরবি: يوم / ইয়াওম) শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য কী—এ প্রশ্নটি যুগে যুগে মুফাসসির ও চিন্তাবিদদের ভাবিয়েছে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং এর বিবর্তন মানব সভ্যতার চিরন্তন কৌতূহলের বিষয়। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবর্তী সবকিছু ‘ছয় দিনে’ সৃষ্টি করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান যখন মহাবিশ্বের বয়স বিলিয়ন বিলিয়ন বছর বলে নির্ধারণ করে, তখন সাধারণ মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—এই ‘ছয় দিন’ আসলে কী?

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে এই সময়ের ব্যাপ্তি এবং সৃষ্টির পর্যায়ক্রমিক ধারা এক অনন্য বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে।

১. দিনবা ইয়াওমশব্দের অর্থ ও আপেক্ষিকতা

কুরআনে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইয়াওম’ (یوم) মানে কেবল আমাদের পরিচিত ২৪ ঘণ্টার দিন নয়। এর একাধিক অর্থ হতে পারে: একটি সময়কাল, একটি পর্যায় বা একটি দীর্ঘ যুগ (A period of time/epoch)।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময়ের ধারণা আপেক্ষিক। আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ অনুযায়ী, মহাকর্ষ বল এবং গতির পার্থক্যের কারণে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সময়ের গতি ভিন্ন হয়। যেমনটি আমরা জানি,

আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, দিন ও সময় আপেক্ষিক। পৃথিবীতেই গ্রীষ্ম ও শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য সমান নয়। বাংলাদেশের দিন ও ইংল্যান্ডের দিন এক নয়। উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের পার্থক্য আরও স্পষ্ট।গ্রহসমূহের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর—

  • বুধ (Mercury) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা
  • শুক্র (Venus) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর ১২১ দিন
  • মঙ্গল (Mars) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট

এ থেকে বোঝা যায়, মহাবিশ্বে ‘দিন’ কোনো নির্দিষ্ট একক নয়। কাজী জাহান মিয়া যথার্থই বলেছেন—

“কুরআনে ‘ইয়াওম’ বলতে অতি সূক্ষ্ম সময়, মধ্যম সময় ও বিশাল সময়—সবই অন্তর্ভুক্ত।”

এমনকি কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর নিকট একদিন তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالۡعَذَابِ وَلَنۡ یُّخۡلِفَ اللّٰہُ وَعۡدَہٗ ؕ وَاِنَّ یَوۡمًا عِنۡدَ رَبِّکَ کَاَلۡفِ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

আর তারা তোমাকে আযাব তরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান। সুরা হজ্জ : ৪৭

একইভাবে কুরআনের অন্য স্থানে আল্লাহ তায়াল বলেন-

یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সাজদাহ : ৫

অতএব, মহাবিশ্ব সৃষ্টির ‘ছয় দিন’ বলতে আল্লাহ তাআলা ছয়টি বিশেষ ‘দীর্ঘ সময়কাল’ বা পর্যায়কে বুঝিয়েছেন, যা আমাদের সৌরদিন (Solar Day) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২. ছয় দিনের বিভাজন : সূরা ফুসসিলাতের গাণিতিক সমন্বয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ  اَئِنَّکُمْ  لَتَکْفُرُوْنَ بِالَّذِیْ خَلَقَ الْاَرْضَ فِیْ یَوْمَیْنِ وَ تَجْعَلُوْنَ لَہٗۤ  اَنْدَادًا ؕ  ذٰلِكَ رَبُّ  الْعٰلَمِیْنَ ۚ﴿۹﴾ وَ جَعَلَ  فِیْهَا رَوَاسِیَ مِنْ فَوْقِهَا وَ بٰرَكَ فِیْهَا وَ قَدَّرَ فِیْهَاۤ  اَقْوَاتَهَا فِیْۤ  اَرْبَعَۃِ  اَیَّامٍ ؕ سَوَآءً   لِّلسَّآئِلِیْنَ ﴿۱۰﴾ ثُمَّ  اسْتَوٰۤی  اِلَی السَّمَآءِ وَ هِیَ دُخَانٌ فَقَالَ  لَهَا وَ لِلْاَرْضِ ائْتِیَا طَوْعًا  اَوْ كَرْہًا ؕ قَالَتَاۤ   اَتَیْنَا  طَآئِعِیْنَ ﴿۱۱﴾ فَقَضٰهُنَّ سَبْعَ سَمٰوَاتٍ فِیْ یَوْمَیْنِ وَ اَوْحٰی فِیْ کُلِّ سَمَآءٍ  اَمْرَهَا ؕ وَ زَیَّنَّا السَّمَآءَ  الدُّنْیَا بِمَصَابِیْحَ ٭ۖ وَ حِفْظًا ؕ ذٰلِكَ تَقْدِیْرُ  الْعَزِیْزِ  الْعَلِیْمِ ﴿۱۲﴾

বল, ‘তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবে যিনি দু’দিনে যমীন সৃষ্টি করেছেন? আর তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ বানাতে চাচ্ছ? তিনিই সৃষ্টিকুলের রব’। আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন। তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন। তা ছিল ধোঁয়া। তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আস’। তারা উভয়ে বলল, ‘আমরা অনুগত হয়ে আসলাম’। তারপর তিনি দু’দিনে আসমানসমূহকে সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর প্রত্যেক আসমানে তার কার্যাবলী ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালার দ্বারা সুসজ্জিত করেছি আর সুরক্ষিত করেছি। এ হল মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ। সুরা ফুসসিলাত : ৯-১২

সূরা ফুসসিলাতের এ আয়াতে সৃষ্টির দিনগুলোর একটি বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় :

  • পৃথিবী সৃষ্টি: ২ দিন।
  • পৃথিবীর উপরিভাগ, পর্বতমালা ও খাদ্যের সংস্থান: ৪ দিন।
  • আকাশমণ্ডলী বা সাত আসমান গঠন: ২ দিন।

এখানে অনেকের মনে হতে পারে ২+৪+২=৮ দিন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাফসিরবিদ এবং আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি গাণিতিক যোগফল নয়, বরং পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা। যেমন: একজন নির্মাণ শ্রমিক যদি বলেন, “আমি দালানের ভিত্তি গড়তে ২ দিন নিয়েছি এবং পূর্ণ দালানটি গড়তে ৪ দিন নিয়েছি,” তার অর্থ এই নয় যে মোট ৬ দিন লেগেছে। বরং ৪ দিনের মধ্যেই প্রথম ২ দিন অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, পৃথিবী ও তার রসদ তৈরি করতে মোট সময় লেগেছে ৪ দিন, আর মহাবিশ্বের সামগ্রিক কাঠামো বা আসমানসমূহ পূর্ণ করতে লেগেছে ২ দিন—এই মিলে সর্বমোট ৬ দিন বা ছয়টি যুগ।

৩. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পর্যায়ক্রমিক মিল

পবিত্র কুরআনের সূরা ফুসসিলাতে বর্ণিত মহাবিশ্ব এবং পৃথিবী সৃষ্টির পর্যায়গুলো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের (Geology) সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনটি বিষয়ের সম্পর্কে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:

ক. প্রাথমিক পর্যায় ও মহাজাগতিক ধোঁয়া (Primordial Smoke)

সূরা ফুসসিলাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: “তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন, যখন তা ছিল ধোঁয়া (Dukhan)…”।

আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ‘ধোঁয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা ছিল এক পরম বিস্ময়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Modern Astronomy) নিশ্চিত করেছে যে, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টির আগে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি বিশাল উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড এবং ধূলিকণার মেঘ দ্বারা আবৃত ছিল। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘Nebula’ বা ‘Primordial Gas’ বলা হয়।

বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী সময়ে মহাবিশ্ব যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল, তখন হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস একটি ঘন মেঘের মতো ছড়িয়ে ছিল। এই মেঘলা অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য ‘ধোঁয়া’ (Smoke) শব্দটি বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত সঠিক, কারণ এটি গ্যাসীয় এবং কঠিন কণার (Particulate matter) একটি মিশ্রণকে নির্দেশ করে। এই মহাজাগতিক ধোঁয়া থেকেই পরবর্তী কোটি কোটি বছরে নক্ষত্র, গ্রহ এবং ছায়াপথসমূহ ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। কুরআনের এই ‘ধোঁয়া’ শব্দটি মূলত সৃষ্টির আদিম বা আদি অবস্থা তথা ‘Gaseous stage’-এর একটি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক রূপক।

খ. পৃথিবীর শীতলীকরণ ও ভূ-ত্বকের স্থিতিশীলতা

পৃথিবী যখন প্রথম সৃষ্টি হয়, তখন এটি ছিল সূর্যের মতো একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। কোটি কোটি বছর ধরে তাপ বিকিরণ করার পর পৃথিবীর উপরের স্তরটি শীতল হতে শুরু করে। এই শীতলীকরণের ফলে তরল ম্যাগমা কঠিন শিলা বা ভূ-ত্বকে (Crust) পরিণত হয়।

কুরআনে এই পর্যায়কে ‘দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক ভূ-তত্ত্ব বা Plate Tectonics তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর উপরিভাগ বা লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere) কতগুলো বড় বড় পাতে বিভক্ত। এই পাতগুলোর নড়াচড়া পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারত। কিন্তু পাহাড়গুলোর মূল (Root) মাটির গভীরে ‘পেরেক’-এর মতো প্রোথিত থাকে, যা টেকটোনিক প্লেটগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। কুরআন এই প্রক্রিয়াকে ‘পৃথিবীর উপরিভাগে দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন’ বলে উল্লেখ করেছে, যা উত্তপ্ত পিণ্ড থেকে একটি বসবাসযোগ্য শক্ত আবরণে পরিণত হওয়ার পর্যায়টিকে নির্দেশ করে। এই শক্ত আবরণ ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হতো না।

গ. জীবন ও খাদ্যের অনুকূল পরিবেশ (The Provisioning)

সূরা ফুসসিলাতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ চার দিনে (অর্থাৎ চারটি দীর্ঘ পর্যায়ে) পৃথিবীতে খাদ্য নিরূপণ বা নির্ধারণ করেছেন। এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বা Geological Time Scale-এর সাথে চমৎকারভাবে মিলে যায়।

পৃথিবীর ভূ-ত্বক সৃষ্টির পর বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) এবং জলমণ্ডল (Hydrosphere) গঠিত হয়। এই সময়ে আগ্নেয়গিরির উদগিরণ এবং মহাজাগতিক প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও পানি জমা হয়। এরপর শুরু হয় সালোকসংশ্লেষণকারী ক্ষুদ্র জীবের উদ্ভব, যা বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এই পর্যায়টি ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, যেখানে উদ্ভিদ জগত থেকে শুরু করে প্রাণীর খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ ও পরিবেশগত ভারসাম্য তৈরি করা হয়।

বিজ্ঞানের ভাষায়, একে ‘Biogeochemical cycles’ বলা যায়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন শুরু হওয়ার আগে কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র এবং জলচক্রের মতো জটিল ব্যবস্থাগুলো আল্লাহ তায়ালা সুনিপুণভাবে সেট করেছিলেন। কুরআনের ‘খাদ্য নিরূপণ’ করার বিষয়টি মূলত পৃথিবীর এই দীর্ঘ প্রস্তুতিকালকেই নির্দেশ করে, যা আধুনিক জীবাশ্ম বিজ্ঞান (Paleontology) এবং জীববিজ্ঞানের আলোকে প্রমাণের দাবি রাখে।

কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মহাবিশ্ব ও পৃথিবী গঠনের এক ধারাবাহিক ইতিহাস। ধোঁয়া থেকে শুরু করে পৃথিবীর পিঠ শীতল হওয়া এবং পরিশেষে খাদ্যের সংস্থান—এই পর্যায়ক্রমিক ধারাটি প্রমাণ করে যে কুরআন সেই সত্তার বাণী যিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের নকশা করেছেন।

মহাপ্রজ্ঞাবানের নির্ধারণ : কুরআনে বর্ণিত ছয় দিন বা ছয়টি সময়কাল আসলে মহাবিশ্ব বিবর্তনের ছয়টি মহাযুগ। আধুনিক কসমোলজি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকে বিগ ব্যাং থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান কয়েকটি যুগে (যেমন: Radiation Era, Matter Era ইত্যাদি) ভাগ করে, যা কুরআনের ‘ছয়টি ইয়াওম’-এর ধারণাকে সমর্থন করে। কাজী জাহান মিয়া যেমনটি বলেছেন-

 কুরআন ‘ইয়াওম’ বলতে অতি সূক্ষ্ম সময় থেকে বিশাল সময়—সবই অন্তর্ভুক্ত করে। মহাবিশ্বের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। বরং এটি যে একজন “মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ,” তা আজ বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়ের নিকট দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই মহাবিশ্ব আমাদের জন্য এক খোলা কিতাব, যা পাঠ করলে স্রষ্টার মাহাত্ম্য আর তাঁর অসীম জ্ঞানের কাছে মাথা নত হয়ে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *