মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
সময়ের ধারণা নিয়ে মানুষের আদিম কৌতূহল চিরন্তন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছিল যে সময় একটি ধ্রুব বা স্থির বিষয়, যা মহাবিশ্বের সব জায়গায় একইভাবে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমাণ করেন যে, সময় স্থির নয় বরং আপেক্ষিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক বিজ্ঞানের এই জটিল তত্ত্বটি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১. আধুনিক বিজ্ঞানে সময়ের আপেক্ষিকতা
১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তার ‘স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ (Special Theory of Relativity) এবং পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে ‘জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’র মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সময় একটি চতুর্থ মাত্রা। তাঁর মতে, সময় নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের গতি বা বেগ এবং মহাকর্ষীয় বলের ওপর।
সহজ কথায়, কোনো বস্তু যদি আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করে, তবে তার জন্য সময় ধীর হয়ে যায় (Time Dilation)। একইভাবে, প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও সময় ধীরগতিতে চলে।
উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর সমতলে যে গতিতে সময় চলে, কোনো কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) কাছে বা মহাকাশের উচ্চতায় সেই গতি এক থাকে না। আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং জিপিএস সিস্টেম থেকে শুরু করে আধুনিক মহাকাশ গবেষণায় এর প্রয়োগ অপরিহার্য।

আল-কোরআনে সময়ের আপেক্ষিকতার প্রতিফলন
যে সময় আইনস্টাইন এই তত্ত্ব দেন, তখন উন্নত গবেষণাগার বা টেলিস্কোপ ছিল। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মরুভূমিতে নাজিল হওয়া কোরআনে যখন সময়ের এই পার্থক্যের কথা বলা হয়, তখন সেটি ছিল মানব চিন্তার অতীত। কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে সময় যে স্থান ও প্রেক্ষাপট ভেদে আলাদা হতে পারে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
১. এক দিন সমান ১০০০ বছর
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالۡعَذَابِ وَلَنۡ یُّخۡلِفَ اللّٰہُ وَعۡدَہٗ ؕ وَاِنَّ یَوۡمًا عِنۡدَ رَبِّکَ کَاَلۡفِ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ
আর তারা তোমাকে আযাব তরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান। সুরা হজ্জ : ৪৭
একইভাবে কুরআনের অন্য স্থানে আল্লাহ তায়াল বলেন-
یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ
তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সাজদাহ : ৫
২. এক দিন সমান ৫০,০০০ বছর
সময়ের এই প্রসারণ বা পার্থক্য আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে সুরা আল-মা’আরিজে। সেখানে ফেরেশতা এবং রূহের ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে-
تَعۡرُجُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَالرُّوۡحُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗ خَمۡسِیۡنَ اَلۡفَ سَنَۃٍ ۚ
ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন এক দিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হয়, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। সুরা মায়ারিজ : ৪
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, ফেরেশতারা যদি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে (আলোর গতির কাছাকাছি) ভ্রমণ করেন, তবে তাদের একদিন পৃথিবীর ৫০,০০০ বছরের সমান হওয়া তত্ত্বীয়ভাবে সম্ভব। এটি সময়ের আপেক্ষিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
মানুষের উপলব্ধিতে সময়ের আপেক্ষিকতা
কোরআন কেবল মহাজাগতিক হিসেবেই নয়, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধিতেও সময়ের আপেক্ষিকতার কথা বলেছে। পরকালে বিচারের দিন মানুষকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে তারা পৃথিবীতে কতদিন ছিল, তখন তাদের উত্তর হবে বিস্ময়কর। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قٰلَ كَمْ لَبِثْتُمْ فِی الْاَرْضِ عَدَدَ سِنِیْنَ ﴿۱۱۲﴾ قَالُوْا لَبِثْنَا یَوْمًا اَوْ بَعْضَ یَوْمٍ فَسْـَٔلِ الْعَآدِّیْنَ ﴿۱۱۳﴾
আল্লাহ বলবেন, ‘বছরের হিসাবে তোমরা যমীনে কত সময় অবস্থান করেছিলে?’ তারা বলবে, ‘আমরা একদিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি; সুতরাং আপনি গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞাসা করুন।’ সুরা মুমিনুন : ১১২-১১৩
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছালে মানুষের কাছে পৃথিবীর দীর্ঘ জীবনকেও অতি সামান্য মনে হবে। বর্তমানের ‘সাইকোলজিক্যাল টাইম’ গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, আনন্দ বা কষ্টের তীব্রতায় মানুষের সময়ের উপলব্ধি বদলে যায়।
বিজ্ঞান ও ঐশী বাণীর মিলনসূত্র
আইনস্টাইনের সূত্র মতে কোন বস্তুর গতি বাড়লে সময় সংকুচিত হয়। অথচ কোরআনে কোনো গাণিতিক সমীকরণ ছাড়াই এই সত্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর আগে কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে, পৃথিবীর একদিন অন্য কোনো মাত্রায় হাজার বছর বা পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হতে পারে।
উপসংহার : সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং কোরআনের বর্ণনার মধ্যে যে অভূতপূর্ব মিল পাওয়া যায়, তা কোনো কাকতালীয় বিষয় হতে পারে না। এটি প্রমাণ করে যে, কোরআন কোনো সাধারণ মানুষের লেখা গ্রন্থ নয়, বরং এটি সেই সত্তার বাণী যিনি সময় এবং স্থানের ঊর্ধ্বে। আজ বিজ্ঞান যা প্রমাণ করছে, কোরআন তা ১৪০০ বছর আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়ে তার ঐশী সত্যতার স্বাক্ষর রেখেছে।