মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স‘ বিস্ময়কর নিদর্শন
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex) বা মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের কার্যাবলী সম্পর্কে কুরআন এবং আধুনিক নিউরোসায়েন্সের মধ্যে চমৎকার মিল রয়েছে। এটি কেবল কাকতালীয় নয়, বরং এক বিস্ময়কর নিদর্শন। নিচে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
كَلَّا لَئِنْ لَّمْ یَنْتَهِ ۬ۙ لَنَسْفَعًۢا بِالنَّاصِیَۃِ ﴿ۙ۱۵﴾ نَاصِیَۃٍ كَاذِبَۃٍ خَاطِئَۃٍ ﴿ۚ۱۶﴾
“কখনও নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে নাসিয়াহ (নাসিয়াহ-এর সম্মুখভাগ) ধরে হেঁচড়াব। এমন নাসিয়াহ যা মিথ্যাবাদী ও পাপিষ্ঠ।” সুরা আলাক : ১৫-১৬
যখন আবু জাহল রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাবা প্রাঙ্গণে সালাত আদায়ে বাধা দিচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তখন কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করে এই আয়াতগুলো তখন নাজিল হয়েছিল। এখানে আরবি ‘নাসিয়াহ’ (نَاصِيَة) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আভিধানিক অর্থ হলো কপালের উপরিভাগ বা মাথার সম্মুখভাগ। আয়াতটিতে শুধু কপালের কথা বলা হয়নি, বরং সেই কপাল বা সম্মুখভাগকে ‘মিথ্যাবাদী’ এবং ‘পাপিষ্ঠ’ বলে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
২. আধুনিক নিউরোসায়েন্স কী বলে?
দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে মানুষের সব চিন্তাভাবনা বা অনুভূতি হৃদপিণ্ড থেকে আসে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যক্তিত্ব প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণের কেন্দ্রবিন্দু হলো মস্তিষ্কের একদম সামনের অংশ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বলা হয়।

চিত্র : মাথার সামনের কমরা কালারের অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে;।
মিথ্যা বলার কেন্দ্র: ২০০১ সালে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিন ল্যাঙ্গেলবেন (Sean Langleben) এফএমআরআই (FMRI) স্ক্যানের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, যখন মানুষ সত্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, তখন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে রক্ত প্রবাহ এবং স্নায়বিক উদ্দীপনা বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের এই অংশটিই মিথ্যা ‘তৈরি’ বা ‘পরিচালনা’ করে।
পাপ বা ভুল সিদ্ধান্ত: মানুষের নৈতিকতা এবং ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতাও এই অংশে থাকে। কোনো অপরাধ করার আগে যে পরিকল্পনা বা তাড়না কাজ করে, তা এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই কুরআন যখন একে ‘পাপিষ্ঠ’ বলে সম্বোধন করে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায়।
৩. প্যাথলজিক্যাল মিথ্যুক ও হোয়াইট ম্যাটার
২০০৫ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অভ্যাসগতভাবে মিথ্যা বলে (Pathological Liars), তাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ‘হোয়াইট ম্যাটার’ (White Matter) বা সাদা পদার্থের পরিমাণ স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় প্রায় ২২% থেকে ২৬% বেশি থাকে। হোয়াইট ম্যাটার মূলত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বেশি হোয়াইট ম্যাটার থাকার অর্থ হলো, সেই ব্যক্তি খুব দ্রুত তথ্য জাল করতে পারে এবং জটিল মিথ্যা সাজাতে পারে।
৪. দৃষ্টিশক্তি ও প্রচলিত ভুল ধারণা
মানুষ আগে মনে করত চোখ যেহেতু সামনে, তাই হয়তো দেখার কাজ মাথার সামনেই হয়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের শিখিয়েছে যে, চোখের সংকেতগুলো মস্তিষ্কের একেবারে পেছনের অংশ ‘অক্সিপিটাল লোব’ (Occipital Lobe)-এ প্রক্রিয়াজাত হয়। যদি কুরআন কেবল মানবিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে রচিত হতো, তবে হয়তো এখানে দৃষ্টিশক্তির কথা থাকত। কিন্তু কুরআন সুনির্দিষ্টভাবে মিথ্যা এবং পাপকে কপালের সাথে যুক্ত করেছে।

চিত্র : মাথার পিছনে হলুদ অংশ ‘অক্সিপিটাল লোব‘।
চিন্তার খোরাক : ১৪৫০ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে বসে একজন মানুষ (রাসুলুল্লাহ সা.), যাঁর কাছে কোনো ল্যাবরেটরি বা এমআরআই মেশিন ছিল না, তাঁর পক্ষে মানুষের মাথার খুলির ভেতরে থাকা ঘিলুর কোন অংশ কী কাজ করে তা জানা অসম্ভব ছিল। সেই সময়ে মানুষের ধারণা ছিল কপাল কেবল চুলের আধার বা সৌন্দর্যের অংশ।
কিন্তু কুরআন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এই ‘নাসিয়াহ’ বা সম্মুখভাগকে অপরাধের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং এটি সেই মহান সত্তার বাণী যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি সুক্ষ্ম গঠন সম্পর্কে অবগত।