জান্নাতের বিবরণ : চতুর্থ পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২৫. জান্নাতীদের আকৃতি-প্রকৃতি

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ  الْاَبْرَارَ لَفِیْ نَعِیْمٍ ﴿ۙ۲۲﴾ عَلَی الْاَرَآئِكِ یَنْظُرُوْنَ ﴿ۙ۲۳﴾ تَعْرِفُ فِیْ  وُجُوْهِهِمْ نَضْرَۃَ  النَّعِیْمِ ﴿ۚ۲۴﴾

পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে। মুতাফফিফীন : ২২-২৪

ক. জান্নাতিদের দেহ ষাট হাত লম্বা হবে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-

আল্লাহ তা’আলা আদাম (আঃ) –কে তাঁর যথাযোগ্য গঠনে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে বললেনঃ তুমি যাও। উপবিষ্ট ফেরেশতাদের এই দলকে সালাম করো এবং তুমি মনোযোগ সহকারে শোনবে তারা তোমার সালামের কী জবাব দেয়? কারণ এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ। তাই তিনি গিয়ে বললেনঃ ‘আস্‌সালামু ‘আলাইকুম’। তাঁরা জবাবে বললেনঃ ‘আস্‌সালামু ‘আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ’। তাঁরা বাড়িয়ে বললেনঃ ‘ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বাক্যটি। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বললেনঃ যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা আদাম (আঃ) –এর আকৃতি বিশিষ্ট হবে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত মানুষের আকৃতি ক্রমে ক্রমে কমে আসছে। সহিহ বুখারি : ৬২২৭

খ. জান্নাতীরা সকলেই ৩৩ বছরের যুবক হবে

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের সময় তাদের শরীরে লোম থাকবে না, দাড়ি-গোঁফও থাকবে না এবং চোখে সুরমা লাগানো থাকবে। তারা হবে ত্রিশ অথবা তেত্রিশ বছরের যুবক। সুনানে তিরমিজি : ২৫৪৫

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক বৃদ্ধা মহিলাকে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, কি কারণে বৃদ্ধারা জান্নাতে যাবে না? অথচ এ বৃদ্ধা মহিলা কুরআন পাঠ করেছিল। তখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন-

তুমি কি কুরআনের এ আয়াত পাঠ করনি-

اِنَّاۤ اَنۡشَاۡنٰہُنَّ اِنۡشَآءً ۙ

নিশ্চয় আমি হূরদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করব। সুরা ওয়াকিয়া : ৩৫। মিশকাত : ৪৮৮৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ২৯৮৭

গ. জান্নাতীরা অসীম রূপবান ও রূপবতী হবে

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ সেখানে আহার করবে, সেখানে পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না, মল-মূত্র ত্যাগ করবে না এবং তাদের নাক থেকে শ্লেষ্মা ঝরবে না। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এমতাবস্থায় তাদের খাদ্যের পরিণতি কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, ঢেকুর এবং মিশকের মতো সুগন্ধি ঘামের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাদের অন্তরে এমনভাবে ঢেলে দেয়া হবে যেমন শ্বাস-নিঃশ্বাস অনবরত চলছে। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৪১, মিশকাত : ৫৬২০, সহীহুল জামি : ২০২৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৫২০, মুসনাদে আহমাদ : ১৪৯৬৪, আবূ ইয়া’লা : ১৯০৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪২৪

ঘ. জান্নাতে কখনো অসুস্থ, বার্ধক্যে, হতাশ ও দুশ্চিন্তা আসবে না

আবূ সাঈদ ও আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসী জান্নাতে প্রবেশ করার পর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবেন, তোমরা সর্বদা সুস্থ থাকবে, আর কখনো রোগগ্রস্ত হবে না। তোমরা সর্বদা জীবিত থাকবে আর কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তোমরা সর্বদা যুবক থাকবে, আর কখনো বার্ধক্যে উপনীত হবে না এবং সর্বদা আরাম-আয়েশে থাকবে, আর কখনো হতাশ ও দুশ্চিন্তা তোমাদেরকে পাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৭, মিশকাত : ৫৬২২, সহীহুল জামি : ৮১৬৪, ত্ববারানী : ২১৩। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

ঙ. জান্নাতে প্রত্যেক লোককে একশত পুরুষের শক্তি দান করা হবে

আনাস (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: জান্নাতী মুমিনদেরকে এত এত সহবাসের শক্তি প্রদান করা হবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এক লোক এত শক্তি রাখবে কি? তিনি (সা.) বললেন, প্রত্যেক লোককে একশত পুরুষের শক্তি দান করা হবে। সুনানে তিরমিযী : ২৫৩৬, মিশকাত : ৫৬৩৬, সহীহুল জামি : ৮১০৬

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতীদের শরীরে কোন লোম থাকবে না, দাঁড়ি-গোফ থাকবে না এবং চোখে সুরমা লাগানো থাকবে। কখনো তাদের যৌবন শেষ হবে না, জামাও পুরাতন হবে না। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩৯, মিশকাত : ৫৬৩৮, ৫৬৩৯, সহীহুল জামি : ৮০৭২,  সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২৯৮৭

চ. জান্নাতে যৌবন কখনোও নিঃশেষ হবে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ۫ وَّنُدۡخِلُہُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়।   সুরা নিসা : ৫৭

২৬. জান্নাতি হুরদের অসাধারণ গুনাবলী

ক. হুরেরা হবে সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ حُوْرٌ عِیْنٌ ﴿ۙ۲۲﴾ كَاَمْثَالِ اللُّؤْلُؤَ  الْمَکْنُوْنِ ﴿ۚ۲۳﴾

আর (তাদের জন্য থাকবে) আয়তলোচনা হুর যেন সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। সুরা ওয়াকিয়া : ২২-২৩

খ. হুরদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করে নাই

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیْهِنَّ قٰصِرٰتُ الطَّرْفِ ۙ لَمْ  یَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ  وَ لَا  جَآنٌّ ﴿ۚ۵۶﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۵۷﴾ كَاَنَّهُنَّ الْیَاقُوْتُ  وَ الْمَرْجَانُ ﴿ۚ۵۸﴾

সে সবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তারা (সৌন্দর্যে) যেন হীরা ও প্রবাল। সুরা আর রাহমান : ৫৬-৫৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِیْهِنَّ خَیْرٰتٌ حِسَانٌ ﴿ۚ۷۰﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۷۱﴾ حُوْرٌ  مَّقْصُوْرٰتٌ فِی  الْخِیَامِ ﴿ۚ۷۲﴾  فَبِاَیِّ  اٰلَآءِ  رَبِّکُمَا تُكَذِّبٰنِ ﴿ۚ۷۳﴾ لَمْ یَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَ لَا جَآنٌّ ﴿ۚ۷۴﴾

সে সকলের মাঝে রয়েছে উত্তম চরিত্রের সুন্দরীগণ। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তারা তাঁবুতে সুরক্ষিত হুর। অতএব তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে? তাদেরকে তাদের পূর্বে কোন মানুষ অথবা জ্বিন স্পর্শ করেনি। সুরা আর রাহমান : ৭০-৭৪

গ. হুরগণ হবে কুমারী, প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَأَصْحَابُ الْيَمِينِ مَا أَصْحَابُ الْيَمِينِ (27) فِي سِدْرٍ مَّخْضُودٍ (28) وَطَلْحٍ مَّنضُودٍ (29)

তাদেরকে (হুরীগণকে) আমি সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে। তাদেরকে করেছি কুমারী। প্রেমময়ী ও সমবয়স্কা। ডান হাত-ওয়ালাদের জন্য। (যাদেরকে ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে। সেখানে আছে কঁাটাহীন। কুলগাছ। কাঁদি ভরা কলাগাছ। সুরা ওয়াকিয়াহ : ২৭-২৯

ঘ. সমবয়স্কা নব্য-যৌবনা তরুণী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا (31) حَدَائِقَ وَأَعْنَابًا (32) وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا (33)

নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্যই রয়েছে সফলতা; উদ্যানসমূহ ও নানাবিধ আঙ্গুর এবং নব্য-যৌবনা সমবয়স্কা তরুণীগণ। সুরা নাবা : ৩১-৩৩

ঙ. হুর হবে আনতনয়না, ডাগরচোখা ও সমময়সী

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعِنۡدَہُمۡ قٰصِرٰتُ الطَّرۡفِ عِیۡنٌ ۙ کَاَنَّہُنَّ بَیۡضٌ مَّکۡنُوۡنٌ

তাদের কাছে থাকবে আনতনয়না, ডাগরচোখা (হুর) যেন তারা সুরক্ষিত ডিম।”। সূরা সাফফাত : ৪৮-৪৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہٰذَا ذِکۡرٌ  وَإِنَّ لِلۡمُتَّقِينَ لَحُسۡنَ مَ‍َٔابٖ ٤٩ جَنَّٰتِ عَدۡنٖ مُّفَتَّحَةٗ لَّهُمُ ٱلۡأَبۡوَٰبُ ٥٠ مُتَّكِ‍ِٔينَ فِيهَا يَدۡعُونَ فِيهَا بِفَٰكِهَةٖ كَثِيرَةٖ وَشَرَابٖ ٥١ وَعِندَهُمۡ قَٰصِرَٰتُ ٱلطَّرۡفِ أَتۡرَابٌ ٥٢ هَٰذَا مَا تُوعَدُونَ لِيَوۡمِ ٱلۡحِسَابِ ٥٣ إِنَّ هَٰذَا لَرِزۡقُنَا مَا لَهُۥ مِن نَّفَادٍ

এটি এক স্মরণ, আর মুত্তাকীদের জন্য অবশ্যই রয়েছে উত্তম নিবাস- চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দরজাসমূহ থাকবে তাদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানে তারা হেলান দিয়ে আসীন থাকবে, সেখানে তারা বহু ফলমূল ও পানীয় চাইবে। আর তাদের নিকটে থাকবে আনতনয়না সমবয়সীরা। হিসাব দিবস সম্পর্কে তোমাদেরকে এ ওয়াদাই দেওয়া হয়েছিল। নিশ্চয় এটি আমার দেওয়া রিযিক, যা নিঃশেষ হবার নয়”। সূরা সাদ : ৪৯-৫৪

চ. জান্নতে হুরগণ হবে পবিত্র

জান্নাতীদের জন্য জান্নাতে পবিত্র সঙ্গিনী থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ لَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ۫ وَّنُدۡخِلُہُمۡ ظِلًّا ظَلِیۡلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই আমি তাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। সেখানে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব বিস্তৃত ঘন ছায়ায়। সরা নিসা : ৫৭

ছ. হুরদের অন্তর ঈর্শাহীন ও বিদ্বেষহীন হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ مِّنۡ غِلٍّ

আর তাদের অন্তরে যা কিছু ঈর্ষা ও বিদ্বেষ রয়েছে তা আমি দূর করে দিব।

জ. হুর হবে মানবীয় সমস্যা মুক্ত ও সুগন্ধি যুক্ত

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতবাসীগণ সেখানে আহার করবে, সেখানে পান করবে কিন্তু তারা থুথু ফেলবে না, মল-মূত্র ত্যাগ করবে না এবং তাদের নাক থেকে শ্লেষ্মা ঝরবে না। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, এমতাবস্থায় তাদের খাদ্যের পরিণতি কি হবে? তিনি (সা.) বললেন, ঢেকুর এবং মিশকের মতো সুগন্ধি ঘামের দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাদের অন্তরে এমনভাবে ঢেলে দেয়া হবে যেমন শ্বাস-নিঃশ্বাস অনবরত চলছে। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৪১, মিশকাত : ৫৬২০, সহীহুল জামি : ২০২৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৫২০, মুসনাদে আহমাদ : ১৪৯৬৪, আবূ ইয়া’লা : ১৯০৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪২৪

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে, পূর্ণিমা রজনির চাঁদের মতো রূপ ধারণ করেই তারা প্রবেশ করবে। আর পরবর্তী  তাদের যে দল যাবে, তারা হবে আকাশের সমুজ্বল তারকার মতো উদ্দীপ্ত, জান্নাতবাসী সকলের অন্তর এক লোকের অন্তরের মতো হবে। তাদের মধ্যে কোন ঝগড়া থাকবে না এবং কোন হিংসা-বিদ্বেষও থাকবে না। তাদের প্রত্যেকের জন্য হুরিদের থেকে দুই দুইজন স্ত্রী থাকবে। সৌন্দর্যের কারণে তাদের হাড় ও মাংসের উপর থেকে নলার ভিতরের মজ্জা দেখা যাবে। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনায় ব্যস্ত থাকবে। তারা কখনো রোগাগ্রস্ত হবে না। তাদের পেশাব হবে না, পায়খানাও করবে না,থুথু ফেলবে না, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা ঝরবে না। তাদের পাত্রসমূহ হবে সোনা-রূপার। আর তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের এবং তাদের ধুনীর জ্বালানি হবে আগরের, তাদের গায়ের ঘর্ম হবে কস্তুরীর মতো (সুগন্ধি)। তাদের স্বভাব হবে এক লোকের মতো, শারীরিক গঠন অবয়বে হবে তাদের পিতা আদাম আলায়হিস সালাম এর ন্যায়, উচ্চতায় ষাট গজ লম্বা। সহিহ বুখারী : ৩৩২৭, সহিহ মুসলিম : ২৮৩৪, সুনানে তিরমিযী : ২৫৩৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ১৭৩৬, সহীহুল জামি : ২০১৫, দারিমী : ২৮২৩

সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যদি জান্নাতের কোন জিনিসের এক চিমটি পরিমাণও (পৃথিবীতে) আসতে পারতো তাহলে আসমান-যমীন সকল স্থান আলোকিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে যেতো। কোন জান্নাতী যদি দুনিয়াতে উকি দিত এবং তার হস্তালংকার প্রকাশিত হয়ে পড়তো তাহলে তা সূর্যের আলোকে নিস্তেজ করে দিত যেভাবে সূর্যের আলো নক্ষত্রসমূহের আলোকে নিস্তেজ করে দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৫৩৮, মিশকাত : ৫৬৩৭, আহমাদ : ১৪৪৯, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৩৩৯৬, সহীহুল জামি : ৫২৫১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, বদরের যুদ্ধে হারিসা (রাঃ) অজ্ঞাত তীরের আঘাতে শাহাদাত লাভ করলে তাঁর মা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার অন্তরে হারিসার মায়া-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাতে থাকে তবে আমি তার জন্য রোনাজারি করব না। আর যদি তা না হয় তবে আপনি শীঘ্রই দেখবেন আমি কী করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি কি জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছ। জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নত মর্যাদার জান্নাত ফিরদাউসে আছে।

তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর পথে চলা দুনিয়া ও তার মাঝের সবকিছুর চেয়ে উত্তম। তোমাদের কারো ধনুক পরিমাণ বা পা রাখার জায়গা পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তার মাঝের সবকিছুর চেয়ে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি উঁকি মারে তবে তামাম দুনিয়া আলোকিত ও সুঘ্রাণে পূর্ণ হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর ওড়না দুনিয়া ও তার ভিতরের সব কিছুর চেয়ে উত্তম। সহহি বুখারি : ৬৫৬৭ ও ৬৫৬৮ দুটি হাদিস একত্রে

ঝ. হুরগণ জান্নাতে সুরেলা আওয়াযে গান গাইবে

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে আয়াতলোচনা হুরদের সমবেত হওয়ার একটি জায়গা রয়েছে। তারা সেখানে এমন সুরেলা আওয়াযে গান গাইবে, যেমন আওয়ায কোন মাখলুক ইতিপূর্বে কখনো শুনেনি। তারা এই বলে গান গাইবেঃ আমরা তো চিরঙ্গিনী, আমাদের ধ্বংস নেই। আমরা তো আনন্দ-উল্লাসের জন্যই, দুঃখ-কষ্ট নেই আমাদের। আমরা চির সন্তুষ্ট, আমরা কখনো অসন্তুষ্ট হব না। তাদের কতই না সৌভাগ্য যাদের জন্য আমরা এবং আমাদের জন্য যারা। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬৪, হাদিসের নাম জঈফ

ঞ. জান্নাতে হুরদের স্ত্রীর মর্জাদা প্রদান হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَذَٰلِكَ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

 এরূপই ঘটবে ওদের; আর আয়তলোচনা হুরদের সাথে তাদের বিবাহ দেব। সুরা দুখান  : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ۖ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

অর্থাৎ, তারা বসবে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে; আমি তাদের বিবাহ দেব আয়তলোচনা হুরদের সঙ্গে। সুরা তুর : ২০

ট. একজন শহীদের সাথে বাহাত্তরটি হুরের সাথে বিবাহ দেওয়া হবে

মিকদাম ইবনু মা’দীকারির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কাছে শহীদদের জন্য রয়েছে ছয়টি বৈশিষ্টঃ রক্ত ক্ষরণের প্রথম মূহূর্তেই তাকে মাফ করা হবে। জান্নাতে তার নির্ধারিত স্থান প্রদর্শন করা হবে। কবর আযাব থেকে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সবচেয়ে মহাভীতির দিনে তাকে নিরাপদে রাখা হবে, তাঁর মাথায় সম্মানের তাজ পরানে হবে, এর একটি ইয়াকুত পাথর দুনিয়া ও এর সব কিছু থেকে উত্তম হবে; বাহাত্তর জন আয়াত লোচন হুরের সঙ্গে তার বিবাহ হবে, তার সত্তর জন নিকট আত্মীয় সম্পর্কে তার সুপারিশ কবুল করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৬৬৩, সহীহাহ : ৩২১৩

মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ শহীদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।(১) তার দেহের রক্তের প্রথম ফোঁটাটি বের হতেই তিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং জান্নাতে তার ঠিকানা তাকে দেখানো হয়, (২) কবরের আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হয়, (৩) (কিয়ামতের) ভয়ংকর ত্রাস থেকে সে নিরাপদ থাকবে, (৪) তাকে ঈমানের চাদর পরানো হবে, (৫) আয়তলোচনা হুরের সাথে তার বিবাহ দেয়া হবে এবং (৬) তার নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তরজনের পক্ষে তাকে শাফা’আত করার অনুমতি দেয়া হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১৬৬৩, আহমাদ : ১৬৭৩০, মিশকাত : ৩৮৩৪

২৭. জান্নাতে নিজের পরিবার পরিজনদের সাথে একত্র প্রবেশ করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِم مِّن كُلِّ بَابٍ

স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যাতে তারা এবং তাদের পিতৃপুরুষগণ, তাদের স্ত্রীগণ ও তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা সৎ ছিল তারা প্রবেশ করবে। আর ফেরেশতারা প্রতিটি দরজা দিয়ে তাদের নিকট প্রবেশ করবে। সুরা রাদ : ২৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اُدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ اَنۡتُمۡ وَاَزۡوَاجُکُمۡ تُحۡبَرُوۡنَ

তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিনীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। সুরা যুখরুফ : ৭০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ

তারা এবং তাদের স্ত্রীগণ সুশীতল ছায়ায় থাকবে এবং হেলান দিয়ে বসবে সুসজ্জিত আসনে। সুরা ইয়াসীন : ৫৬

পার্থিব স্ত্রীর রূপ-গুণ বেহেশ্তী স্ত্রীদের তুলনায় অধিক হবে। বেহেশতী হুরগণ তাদের পার্থিব সপত্নীর খিদমত করবে।

২৮. জান্নাতে গর্ভবতী হবে না তবে ইচ্ছা করলে সন্তান ধারন করতে পারবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মু’মিন লোক যদি জান্নাতে সন্তানের আকাঙ্খা করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রী গর্ভধারণ করবে ও সন্তান প্রসব করবে এবং সন্তানটি হবে বয়সে যুবক। তার ইচ্ছা অনুযায়ী মুহুর্তের মধ্যেই এসব হয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৬৩

২৯. জান্নাতীদের সেবক গিলমান

জান্নাতবাসীদের অতিরিক্ত আরাম ও সেবার জন্য মহান আল্লাহ চিরকিশোর ‘গিলমান’ সৃষ্টি করে রেখেছেন। এই গিলমানরা জান্নাতে ঘুরে-ফিরে তাদের খিদমত করবে। তবে, তাদের পরিচয় নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, তারা হলো মুসলিমদের সেইসব শিশু, যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মারা গেছে। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, তারা হবে কাফেরদের সেইসব শিশু, যারা দুনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত হলো, তারা জান্নাতের একটি আলাদা সৃষ্টি।

ক. গিলমান হবে চির কিশোর

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُونَ إِذَا رَأَيْتَهُمْ حَسِبْتَهُمْ لُؤْلُؤًا مَّنثُورًا

চির কিশোরগণ (গেলমান) তাদের কাছে (সেবার জন্য) ঘুরাঘুরি করবে, তুমি তাদেরকে দেখলে তোমার মনে হবে, তারা যেন বিক্ষিপ্ত মুক্তা। সুরা দাহর : ১৯

খ. তাদের মনে হবে সুরক্ষিত মুক্তা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَطُوفُ عَلَيْهِمْ غِلْمَانٌ لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَّكْنُونٌ

তাদের (সেবায়) তাদের কিশোরেরা তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করবে; যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। সুরা তুর : ২৪

গ. গিলমানেরা প্রস্রবণ নি:সৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা পরিবেশন করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَطُوفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُونَ (17) بِأَكْوَابٍ وَأَبَارِيقَ وَكَأْسٍ مِّن مَّعِينٍ (18)

তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে। সুরা ওয়াকিয়া : ১৭-১৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ ۖ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

স্বর্ণের থালা ও পান পাত্র নিয়ে ওদের মাঝে ফিরানো হবে, সেখানে রয়েছে এমন সমস্ত কিছু, যা মন চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়। সেখানে। তোমরা চিরকাল থাকবে। সুরা যুখরুফ : ৭১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرَا

তাদের উপর ঘুরানো করা হবে রৌপ্যপাত্র এবং স্ফটিকের মত স্বচ্ছ পান-পাত্র। সুরা দাহর : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُطَافُ عَلَیۡہِمۡ بِصِحَافٍ مِّنۡ ذَہَبٍ وَّاَکۡوَابٍ ۚ  وَفِیۡہَا مَا تَشۡتَہِیۡہِ الۡاَنۡفُسُ وَتَلَذُّ الۡاَعۡیُنُ ۚ  وَاَنۡتُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ۚ

স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী। সুরা যুখরুফ : ৭১

৩০ জান্নাতীদের সাজ-সজ্জা

জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য মহান আল্লাহ অসাধারণ সাজ-সজ্জার ব্যবস্থা রেখেছেন। জান্নাতে তাদের হাতে পরানো হবে স্বর্ণ ও মুক্তার ঝলমলে কঙ্কন, যা তাদের মর্যাদা ও সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তাদের পরনে থাকবে সূক্ষ্ম ও নরম রেশমের পোশাক, যা দুনিয়ার কোনো বস্ত্রের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এসব অলংকার ও পোশাক তাদের সৎকর্মের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ।

ক. হুরেরা স্বর্ণ ও মুক্তার কঙ্কণ পরিধান করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كُلَّمَا أَرَادُوا أَن يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ أُعِيدُوا فِيهَا وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ

যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেথায়। তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা এবং সেথায় তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। সুরা হজ : ২৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أُولَٰئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِّن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ

তাদেরই জন্য আছে স্থায়ী জান্নাত; যার নিম্নদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেথায় তাদেরকে স্বর্ণ-কঙ্কণে অলঙ্কৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও স্থূল রেশমের সবুজ বস্ত্র। সুরা কাহফ : ৩১

খ. জান্নাতিদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ

অর্থাৎ, তারা প্রবেশ করবে স্থায়ী জান্নাতে, যেখানে তাদের স্বর্ণ-নির্মিত কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং যেখানে তাদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের। সুরা ফাতির : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

عَالِيَهُمْ ثِيَابُ سُندُسٍ خُضْرٌ وَإِسْتَبْرَقٌ ۖ وَحُلُّوا أَسَاوِرَ مِن فِضَّةٍ

তাদের দেহে হবে মিহি সবুজ এবং মোটা রেশমী কাপড়, তারা অলক্ত হবে রৌপ্য-নির্মিত কনে। সুরা দাহর : ২১

গ. জান্নাতে রেশমের তৈরি পুরু ফরাশ ও স্বর্ণখচিত সারি সারি আসন থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ ۚ وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ

সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায়। সুরা আর রহমান : ৫৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ

তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ বালিশে ও সুন্দর গালিচার উপরে। সুরা আর রহমান : ৭৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ۖ وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ

তারা বসবে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে। সুরা তুর : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

عَلَىٰ سُرُرٍ مَّوْضُونَةٍ (15) مُّتَّكِئِينَ عَلَيْهَا مُتَقَابِلِينَ (16)

স্বর্ণখচিত আসনে। তারা আসনে হেলান দিয়ে বসবে, পরস্পর মুখোমুখি হয়ে। সুরা ওয়াকিয়া : ১৫-১৬

ঘ. আভিজাত্য সম্পন্ন উন্নত খাট, পালঙ্ক, শয্যা ও পানপাত্র থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فِيهَا سُرُرٌ مَّرْفُوعَةٌ (13) وَأَكْوَابٌ مَّوْضُوعَةٌ (14) وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ (15) وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَةٌ (16)

সেখানে রয়েছে সমুচ্চ বহু খাট-পালঙ্ক এবং সদা প্রস্তুত পান পাত্রসমূহ ও সারি সারি বালিশসমূহ এবং বিছানো গালিচাসমূহ। সুরা গাশিয়াহ :  ১৩-১৬

৩১.  জান্নাত ও তার নির্মান উপকরণা

ক. কস্তুরী ও জাফরানের মতো সুগন্ধময় মাটি

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল আমাদের কি হলো যে, আমরা দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হয়ে যাই এবং আমাদেরকে পরকালবাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করতে থাকি। তারপর আপনার কাছ থেকে সরে গিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়ে দুনিয়াবী কাজে জড়িয়ে পড়ি এবং সন্তানাদির সুগন্ধ পেতে থাকি, তখন আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা যে অবস্থায় আমার নিকট হতে বেরিয়ে যাও, সবসময় যদি সেই অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বাড়ীতে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতো। আর তোমরা অপরাধ না করলে আল্লাহ তা’আলা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করতেন। যাতে তারা অপরাধ করে আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেন।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কি দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ পানি দিয়ে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কি দিয়ে জান্নাত তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ সোনা-রুপার ইট দিয়ে। একটি রূপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট, এভাবে গাথা হয়েছে। এর গাথুনির উপকরণ (চুন-সুরকি-সিমেন্ট) সুগন্ধি মৃগনাভি এবং কংকরসমূহ মণি-মুক্তার ও মাটি হলো জাফরান। জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দে থাকবে, কোন দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল এতে অবস্থান করবে আর মৃত্যুবরণ করবে না। না তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে আর না তার যৌবনকাল শেষ হবে।

তিনি পুনরায় বললেন, তিনজনের দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয়নাঃ ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ, রোযাদারের ইফতারের সময়কালীন দু’আ এবং মাযলুমের দু’আ আল্লাহ তা’আলা একে (মায়ালুমের দু’আ) মেঘমালার উপর তুলে নেন, তার জন্য আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ আমার ইজ্জাত ও সম্মানের শপথ! কিছু দেরিতে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করবো। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৬

খ. সাদা ধবধবে মিহি আটার মতো মাটি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাতের মাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “জান্নাতের মাটি হবে সাদা মিহি আটার মতো, তার কঙ্কর হলো মুক্তা ও ইয়াকুত এবং তার ইট হলো সোনা ও রুপার।” মুসনাদ আহমাদ : ১৪৪৫৭

গ. মিশকের ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত

আবূ সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইবনু সায়্যাদ জান্নাতের মাটি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ জান্নাতের মাটি ময়দার মত সাদা এবং খাঁটি মিশকের ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত হবে। সহিহ মুসলিম : ৭০৮৮

৩২. জান্নাতে মধু, দুধ ও মদের নদি থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَثَلُ الۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ فِیۡہَاۤ اَنۡہٰرٌ مِّنۡ مَّآءٍ غَیۡرِ اٰسِنٍ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ لَّبَنٍ لَّمۡ یَتَغَیَّرۡ طَعۡمُہٗ ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ خَمۡرٍ لَّذَّۃٍ لِّلشّٰرِبِیۡنَ ۬ۚ وَاَنۡہٰرٌ مِّنۡ عَسَلٍ مُّصَفًّی ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَا مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ وَمَغۡفِرَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ؕ کَمَنۡ ہُوَ خَالِدٌ فِی النَّارِ وَسُقُوۡا مَآءً حَمِیۡمًا فَقَطَّعَ اَمۡعَآءَہُمۡ

মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝর্নাধারা, যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝর্নাধারা। তথায় তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের ন্যায়, যারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে এবং তাদেরকে ফুটন্ত পানি পান করানো হবে ফলে তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে? সুরা মুহাম্মদ : ১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجۡرَ مَنۡ أَحۡسَنَ عَمَلًا ٣٠ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ جَنَّٰتُ عَدۡنٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهِمُ ٱلۡأَنۡهَٰرُ يُحَلَّوۡنَ فِيهَا مِنۡ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٖ وَيَلۡبَسُونَ ثِيَابًا خُضۡرٗا مِّن سُندُسٖ وَإِسۡتَبۡرَقٖ مُّتَّكِ‍ِٔينَ فِيهَا عَلَى ٱلۡأَرَآئِكِۚ نِعۡمَ ٱلثَّوَابُ وَحَسُنَتۡ مُرۡتَفَقٗا

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, নিশ্চয় আমরা এমন কারো প্রতিদান নষ্ট করব না, যে সু-কর্ম করেছে। এরাই তারা, যাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ। সেখানে তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণের চুড়ি দিয়ে এবং তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু সিল্কের সবুজ পোশাক। তারা সেখানে (থাকবে) আসনে হেলান দিয়ে। কী উত্তম প্রতিদান এবং কী সুন্দর বিশ্রামস্থল”! সূরা কাহফ : ৩০-৩১

হাকীম ইবনু মু’আবিয়াহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে রয়েছে পানির সমুদ্র, মধুর দরিয়া, দুধের সমুদ্র এবং শরাবের দরিয়া। অতঃপর তা থেকে আরো বহু নদী প্রবাহিত হবে।  সুআনে তিরমিযী : ২৫৭১, মিশকাত : ৫৬৫০, সহীহুল জামি : ৩৮৮৫

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহরগুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফুরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে। এরপর আমাকে বাইতুল মা’মুর-এ উঠানো হল। বললাম, হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে বাইতুল মামুর। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনো আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। সহিহ মুসলিম : ১৬৪ আংশিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *