কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত

অনেক মুসলিমের বিশ্বাস মানতে ফলে উপকার হয়। যাদের মানত সম্পর্কে জ্ঞান নাই তারাই এর উপর ভুল বিশ্বাসের আলোকে আমাল করে থাকে। যে আমল করা নিজের উপর ওয়াজিব ছিল না, এমন কোন আমল নিজের উপর ওয়াজিব করে নেয়াকে মানত বলে। মানত শর্তযুক্তও হতে পারে আবার শর্ত মুক্তও হতে পারে। মান্নত করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন। এই জন্য মানত করা মাকরুহ।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنْ النَّذْرِ وَقَالَ إِنَّهُ لاَ يَرُدُّ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنْ الْبَخِيلِ

নাবী ﷺ মানত করতে নিষেধ করেছেন। এই মর্মে তিনি বলেন, মানত কোন জিনিসকে দূর করতে পারে না। এ দ্বারা শুধুমাত্র কৃপণের মাল খরচ হয়। সহিহ বুখারি হাদিস : ৬৬০৮, ৬৬৯২, ৬৬৯৩, সহিহ মুসলিম : ১৬৩৯

আমরা অনেকে মনে করি মান্নত করলে বিপদ আপদ দুর হবে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে, কল্যান লাভ হবে, এটা সওয়াবের কাজ, আল্লাহ খুশী হবেন ইত্যাদি। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা তা নয়। মানত  কোন মতেই সওয়াবের কাজ নয়। আল্লাহর রাসূল ﷺ যা করতে নিষেধ করেছেন তাতে আল্লাহ খুশী হবেন না। এবং এতে কোনো সওয়াবও হয় না। তাই আমাদের উচিত হবে কোনো অবস্থায় মানত না করা। অবশ্য মানত করে ফেললে তা পালন করতেই হবে। মান্নত করলে অবশ্যই তা পূরন করতে হবে। মান্নত পূরণ করা একটি ইবাদত। মানত করতে হবে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য এবং পূরণ করতে হবে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে। মানত করা সওয়াব না হলেও তা আদায় করা অশব্যই ওয়াজিব ও সওয়াবের কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ

অতঃপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে এবং তাদের মানত পূর্ণ করে ও তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের। সূরা হজ্জ্ব : ২৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يُوفُونَ بِٱلنَّذۡرِ وَيَخَافُونَ يَوۡمً۬ا كَانَ شَرُّهُ ۥ مُسۡتَطِيرً۬ا

তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে যার অকল্যাণ হবে সুবিস্তৃত। সূরা ইনসান : ৭

অসৎ কাজের মানত আদায় করা জায়েয নেই।

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন-

مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلاَ يَعْصِهِ

যে ব্যক্তি এরূপ মানত করে যে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে। আর যে মানত করে, সে আল্লাহর নাফরমানী করবে, সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে। সহিহ বুখারি ৬৬৯৬, ৬৭০০

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে নাবী ﷺ এক বৃদ্ধ ব্যাক্তিকে তাঁর দুই ছেলের উপর ভর করে হেটে যেতে দেখে বললেন, তাঁর কি হয়েছে? তাঁরা বললেন, তিনি পায়ে হেটে হজ করার মানত করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, লোকটি নিজেকে কষ্ট দিক আল্লাহ তা’আলার এর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তিনি তাঁকে সওয়ার হয়ে চলার জন্য আদেশ করলেন। (সহিহ বুখারি হাদিস ১৮৬৫

আল্লাহ নিকট ইবাদতের নিমিত্তে মানত করা মাকরুহ পর্যায়ের জায়েয হলে তা পুরন করা ওয়াজিব। একটুকু ঠিকই আছে কিন্ত মানত যখন গাইরুল্লাহ বা কোনো পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে করা হবে তখন তা ছোট শিরক হয়ে যাবে। শুধু গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানত করা শিরকে আকবর। আর যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঐ সকল লোকদের সুপারিশের জন্য বা কোন না কোন ভাবে উপকার পাবার জন্য করে থাকে তবে তা ছোট শিরক হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন-

 وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا ڪُلَّ ذِى ظُفُرٍ۬‌ۖ وَمِنَ ٱلۡبَقَرِ وَٱلۡغَنَمِ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتۡ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلۡحَوَايَآ أَوۡ مَا ٱخۡتَلَطَ بِعَظۡمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ جَزَيۡنَـٰهُم بِبَغۡيِہِمۡ‌ۖ وَإِنَّا لَصَـٰدِقُونَ

আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট! সুরা আনাম : ১৩৬

মানতকারী যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, অলী ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন না। তার দোয়া বা নেক নজর পাওয়ার নিয়তও করে না। কিংবা শাফাআত বা অসীলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু ভাবে যে, তিনি আল্লাহর অলী, তাকে সম্মান করা সওয়াবের কাজ এ জন্য আমি মাজারে মান্নত করি। তাহলেও ছোট শিরক হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এখন মুসলমানেরা শুধু মৃত পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে মান্নত করে তৃপ্ত নয়, বরং তাদের মাজারের কচ্ছপ, কুমির, মাছের নামেও মান্নত করে থাকে। কতবড় নিকৃষ্ট শিরকের দিকে আমাদের জাতি ধাবিত হচ্ছে।

২। দুয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম ধরা

দোয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন :

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ

আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি ৷ যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে ৷ সুরা বাকারা : ১৮৬

আল্লাহ তাআলা আমাদের এতো কাছে অবস্থান করর যে, কোন প্রকার মাধ্যমে ও সুপারিশ ছাড়াই  নিজেই সরাসরি সবসময় আমাদের আবেদন নিবেদন শুনেন। কাজেই আমাদের উচিৎ মুর্খতার বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলা। আল্লাহ তাআলার আহবানে সাড়া দিয়ে তার দিকে ফিরে যেতে হবে এবং তারই বন্দেগী ও আনুগত্য করতে হবে। সরাসরি সবসময় তারই নিকট চাইব কেননা কোনো কিছু চাওয়ার নিয়ম তো আল্লাহ্‌ তাআলাই ভাল জানেন। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছ

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ

এবং তোমাদের রব বলেছেন আমার কাছে চাও, আমিই দিব। সুরা গাফির : ৪০

সুতরাং বান্দা তার রবের কাছেই চাইবে। অন্য কারো অছিলায় চাওয়া মুলত আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার কে খর্ব করে। তেমনি অন্যকেও এ কাজে জড়িয়ে ফেলা হয়, সে জন্য এটি শির্কেই নামান্তর। সরাসরি গাউরুল্লাহ নিকট দুয়ার মাধ্যামে চাওয়া শিরকে আকবর কিন্তু যদি দুয়া কবুলের আশায় মাধ্যম ধরা বা কারো সুপারিশ লাভের আশায় মাধ্যম ধরা শির্ক আসগর।

৩। গাইরুল্লাহ নামে পশু জবেহ করা

পশুকে যবেহ একটি ইবাদাত। ইবাদাতের জন্য অবশ্য আল্লাহর হুকুম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরন করতে হবে। এই জন্য আল্লাহ পশুকে যবেহ করার নীতিমালা ঘোষনা করছেন। গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করল শিরক হবে কেননা আল্লাহ নিজের নামে কুরবানী করার হুকুম দিয়েছেন। যে সকল লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তারা মুশরিক। তাই মুমিনের ফরজ দায়িত্ব হল আল্লাহর নামে জবেহ করা যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,  (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর। সুরা কাওসার : ২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান (কুরবানী), আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। সুরা আনআম : ১৬২

যা কিছু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবেহ করা হয় তা যে হারাম এ ব্যাপারে মুসলিমদের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত। তাই পশু জবেহ দেওযার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান না মেনে অন্যদের আনুগত্য করে জবেহ করলে শিরক হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু জবেহ করে সে শয়তানের আনুগত্য করল এবং মুশরিক হল। তার দলিল নিম্মের আয়াত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ

 আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশ্ খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷  কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

এখানে আল্লাহ তাআলা অন্য ধর্মের লোকদের বিধান অনুযায়ী চলা এবং তাদের আনুগত্য করিকে মুশরিক বলেছেন। কারন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর আনুগত্য কায়েম করার নামই তাওহীদ। অপর পক্ষে জবেহর সময় যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্‌ত খাও হালাল করা হয়েছে৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَـٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ

এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্ খাও৷ সুরা আনআম : ১১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيۡڪُمُ ٱلۡمَيۡتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحۡمَ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ‌ۖ

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, মৃতদেহ খেয়ো না, রক্ত ও শূকরের গোশত থেকে দূরে থাকো। আর এমন কোন জিনিস খেয়ো না যার ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৩

৪। মাজার, মুর্তি, দে্তার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা

মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদাত। আর ইবাদাতের মুল উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন। মাজার, মুর্তি, দেবতার পুজা করা শিরকে আকবর তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু তাদের পুজা না করে ভালো কর্ম মনের করে কিছু পেশ করা হয় তবে তা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর মাধ্যম গাইরুল্লাহ ইবাদতে সহযোগীতা করা হয়। কোন অবস্থায়ই মাজার, মুর্তি, দেতার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَـٰمِ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে, তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদা : ৩

তারিক বিন শিহাব হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ﷺ বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কিভাবে হলো? তিনি বললেনঃ দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু কুরবানী করো’। সে বললো, কুরবানী দেয়ার মত আমার কিছুই নেই। তারা বলল, অন্ততঃ একটি মাছি হলেও কুরবানী দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তির জন্য কুরবানী দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, মূর্তিকে তুমিও কিছু কুরবানী করো। সে বললঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কারো জন্য কুরবানী দেইনা। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৭৩৪৩, ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৩০৩৮, ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫;

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন গাছ বা অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা শিরকের অন্তরভুক্ত। যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু উৎসর্গ বা জবেহ করবে তার ব্যাপারে কঠোর শাস্তির কথা হাদিসে এসেছে,

আবু তোফায়েল থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আলী ইবনে আবি তালেব (রা.) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, নবী কারীম স. গোপনে আপনাকে কি বলেছিলেন?’ বর্ণনাকারী বলেন, আলী (রা.) এ কথা শুনে রেগে গেলেন এবং বললেন, নবী কারীম স. মানুষের কাছে গোপন রেখে আমার কাছে একান্তে কিছু বলেননি। তবে তিনি আমাকে চারটি কথা বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি বলল, ‘হে আমিরুল মোমিনীন! সে চারটি কথা কি ? তিনি বললেন-

১. যে ব্যক্তি তার পিতামাতাকে অভিশাপ দেয় আল্লাহ তাকে অভিশাপ দেন।

২. যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবেহ করে আল্লাহ তার উপর লানত করেন।

৩. ঐ ব্যক্তির উপর আল্লাহ লানত করেন যে ব্যক্তি কোন বেদআতীকে প্রশ্রয় দেয়।

৪. যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে আল্লাহ তাকে লা’নত করেন। সহিহ মুসলিম, শরহে নবভী

৫। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা

কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা কখন জায়েয আবার কখন নাজায়েয শিরক। ইসলামি শরিয়তে যে সকল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করার কথা বলা হয়েছে শুধু সে গুল থেকেই বরকত হাসিল করা যাবে। ইসলামি শরিয়তে নেই এমন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করা অনেক সময় হরাম আবার অনেক সময় শিরক। বিষয়টি সম্পর্কে পরিস্কার ধারনার জন্য উভয়টি সম্পর্কে জানা দরকার।

জায়েয তাবার্রুক বা বরকতঃ

(১) ব্যক্তি হিসেবে রসূলুল্লাহ থেকে বরকত হাসিলঃ

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالْحَلاَّقُ يَحْلِقُهُ وَأَطَافَ بِهِ أَصْحَابُهُ فَمَا يُرِيدُونَ أَنْ تَقَعَ شَعْرَةٌ إِلاَّ فِي يَدِ رَجُلٍ ‏.‏

আমি দেখেছি নাপিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল ছাটছে আর সাহাবীরা তার চতুস্পার্শ ঘিরে রেখেছেন। তারা চাইতেন যে, কোন চুল যেন মাটিতে না পড়ে তা যেন কারো না কারো হাতে পড়ে। সহিহ মুসলিম ২৩২৫

আবূ জুহাইফা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে একটি লাল বর্ণের একটি তাবূতে দেখেছি, আমি আরো দেখেছি বেলাল (রা.) কে, তিনি তাঁর ওযূর পানি নিয়ে আসলেন, অতঃপর আমি দেখলাম লোকজন তাঁর ওযূর পানি নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করছে এবং তারা তা (শরীরে) মেখে নিচ্ছেন। রাবী বলেন, “তারপর বিলাল (রা.) একটি বর্ষা নিয়ে আসেন, অতঃপর তিনি তা গেড়ে দেন, তারপর রাসূল ﷺ এক জোড়া লাল বর্ণের শেরওয়ানী পরিধান করে বের হয়ে আসেন এবং সেটাকে (বর্ষা) সামনে রেখে সালাত আদায় করেন। আর মানুষ ও চতুষ্পদপ্রাণী সেটির সামনে দিয়ে চলাচল করছিল। সহিহ বুখারি : ৩৭৬, সহিহ মুসলিম : ৫০৩, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১২৬৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ৬৮৮

সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত রসূলুল্লাহ ﷺ এর অজুর পানি, থুথু, ঘাম, চুল, পোশাক দ্বারা সাহবিগণ (রা.) বরকত হাদিসর করতেন। এখন যদি কেউ ভাবেন তাহলে তো আমাদের পীর, বুজুর্গ, আকাবিরদের থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করা যাবে কারন তারা নবীদের ওয়ারিস। তা হলে মহা ভুল করবেন কারন এটা শুধু রাসূল ﷺ জন্য খাস ছিল। তা না হলে আমাদের পীরের পীর, বুজুর্গদের বুজুর্গ, অলীদির অলী আবু বক্কর (রা.), ওমর (রা:), আলী (রা:), ওসমানসহ (রা:) কোন সাহাবির থুথু,  ঘাম, পোশাক থেকে কেউ বরকত লাভ করছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া আমরা যাকে তার বাহিজ্জিক আমল আখলাক দেখে আল্লাহর অলী মনে করছি। মহান আল্লাহর কাছে সে অলী না ও হতে পারে। 

অপর পক্ষে সকলের জন্য খাদ্য হিসাবে যাইতুনের তৈল, দুধ, মধু ও যমযমের পানি, আজও বরকতময়। মসজিদে হারাম, মসজিদে নবী, মসজিদে আকসা, এমনকি পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ আজও বরকত হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহর জিকির কারি বা নেককারদের সোহবত বরকতময় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

(২) খাদ্যা হিসাবে বরকত আছেঃ

মহান আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ کُلِیۡ مِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ فَاسۡلُکِیۡ سُبُلَ رَبِّکِ ذُلُلًا ؕ یَخۡرُجُ مِنۡۢ بُطُوۡنِہَا شَرَابٌ مُّخۡتَلِفٌ اَلۡوَانُہٗ فِیۡہِ شِفَآءٌ لِّلنَّاسِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

অতঃপর তুমি (মৌমাছি) প্রত্যেক ফল থেকে আহার কর এবং তুমি তোমার রবের সহজ পথে চল। তার (মৌমাছি) পেট থেকে এমন পানীয় (মধু) বের হয়, যার রং ভিন্ন ভিন্ন, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগ নিরাময়। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা নাহল : ৬৯

যাইদ ইবনু আসলাম (রহ.) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত আছে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা (যাইতুনের) তেল খাও এবং তা শরীরে মালিশ কর। কেননা এটা বারকাত ও প্রাচুর্যময় গাছের তেল। সুনানে তিরমিজি : ১৮৫১, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ১৩১৯

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিকট দুধ আনা হলে তিনি বলতেন, এক অথবা দু’ বরকত। ইবনে মাজাহ : ৩৩২১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছেন, কালো জিরা ’সাম’ ব্যতীত সকল রোগের ঔষধ। ইবনু শিহাব বলেছেন, আর ’সাম’ অর্থ হল মৃত্যু। সহিহ বুখারি : ৫৬৮৮

তাই খাদ্য হিসেবে যাইতুন, মধু, দুধ ও কালোজিরা যে বরকত মত তাতে কোন  সন্দেহ নাই। বর্তমানে বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে যে সকল হালাল খাদ্যে উপকার আছে তা গ্রহনেও কোন বাধা নাই।

(৩) স্থান হিসবে তিন সমজিদঃ

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (নেকির আশায়) সফর করা যায় না। এ মসজিদগুলো হল, মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ এবং মাসজিদুল আকসা। সহিহ বুখারি : ১১৮৯, সহিহ মুসলিম : ১৩৯১, সুনানে নাসায়ী ৭০০, সুনানে  আবূ দাঊদ ২০৩৩, ইবনু মাজাহ : ১৪০৯

 (৪) শিরকি তাবার্রুক

সহিহ হাদসি দ্বারা প্রমানিত আরাফাত, মিনা ও মুজদালিফায় বরকতময় ও দুয়া কবুলের স্থান। পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ অন্য সকল স্থান থেকে উত্তম বলা হয়েছে। কিন্ত যদি কেউ ররকত হাসিলের জন্য হেরাগুহা, জাবারে শুর, জাবালে রহমত, শোহাদায়ে ওহুদের কবর জিয়ারত করে করে কাজটি ছোট শিরক হবে। কেননা বরকত দানের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ বা তার রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সকল স্থানে বরকত হাসিলের কথা বলেন নাই। বরকত হাসিল করা যা কোন সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন দসায় বা ওফাতের পর এখান আসেন নাই। যদি বরকত হাসিলের জন্য ক্বাবা ঘরের গিলাফ, কোন মসজিদ বা মাজারের দেয়াল, মাটি, জানালা, দরজা ইত্যাদি চুমু খাওয়া ছোট শিরকের অন্তর্ভূকক্ত। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ এই সব বস্তু দ্বারা বরকত হাসিল কে মুর্তি পুজার সাথে তুলানা করছেন।

আবূ ওয়াক্বিদ আল লায়সী (রা.) হতে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ’যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ’যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’সুবহানাল্লহ। তোমাদের এ দাবীটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতি ছাড়া আর কিছু্‌ই নয়, যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছো যা বনী ইসরাইল মূসা (আ.) কে বলেছিল, হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা’বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা’বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছ, (আরাফ-১৩৮। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতিই অবলম্বন করছো। সুনানে তিরমিজি : ২১৮০, মিশকাত : ৫৪০৮, মুসনাদে আহমাদ : ২১৯৪৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৭০২, তবারানী :৩২১৮।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

َّقَدۡ رَضِىَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِى قُلُوبِہِمۡ فَأَنزَلَ ٱلسَّكِينَةَ عَلَيۡہِمۡ وَأَثَـٰبَهُمۡ فَتۡحً۬ا قَرِيبً۬ا  

 আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে তোমরা কাছে বাইয়াত করছিলো৷  তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন৷ তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন, পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করেছেন৷  সুরা ফাতহা : ১৮

যে গাছর নীচে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সে গাছির কোন আলাদা মর্জাদা সহাবাগন দেন নাই।  সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে, ইবনে সা’দে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েবের। তিনি বলেন, আমার পিতা বাইয়াতে রিদওয়ান শরীক ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন পরের বছর আমরা যখন উমরাতুল কাযার জন্য গিয়েছিলাম তখন গাছটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনুসন্ধান করেও তার কোন হদিস করতে পারিনি। হযরত উমর ( রা) তাঁর খিলাফত কালে যখন হুদাইবিয়া অতিক্রম করেন তখন জিজ্ঞেস করেন, যে গাছটি নিজে বাইয়াত হয়েছিলো তা কোথায়৷ কেউ বলে, অমুক গাছটি এবং কেউ বলেন অমুকটি। তখন হযরত উমর (রা:) বলেন, এ কষ্ট বাদ দাও, এর কোন প্রয়োজন নেই।

সময় হিসাবে: সাহাবিগন রাসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর কখন তার জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকি পালন করেনি। ঈদে মিলাদন্নবী নাম করন করেনি। তেমনি ভাবে মিরাজের রাত্রি, অহুদ দিবস, বদর দিবস, হিজরত দিবস পালন করে নি। অথচ তাদের কাছে সময় এবং সুযোগ ছিল। তারা আমাদের চেয়ে দ্বীণ ভাল বুঝতেন। সুতারং সাহাবিগন যা করেনি তাতে কোন বরকত হতে পারে না বরং তা বিদাত বা শিরকি আলাম হবে।

৬। সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিরক

সমজে প্রচলিত নানান সামজিক অনুষ্ঠান যা ইসলাম অনুমোধন করেনি, তা ইসলামি আদতে পালন করে উত্তম বা নেকির কাজ মনে করা হারাম। এই হারাম কাজটি যখন গইরুল্লাহর ইবাদত করা পর্যায় পৌছে যাবে, তখন আর হারাম থাকবে না, তখন কাজটি শিরক হবে। যেমন-

মৃত্যু ব্যক্তির লাসের উপর ফুল দেওয়া, বিভিন্ন বেদিবতে ফুল দেওয়া, তার সমানে নিরবতা পালন করা। কোন কিছুর সম্মান প্রদর্শের জন্য খালি পায়ে হাটা বাধ্য করে নেওয়া। নববর্ষে বিভিন্ন জীব জন্তুর প্রতিকৃতি বহন করে তাকে শুভ-অশুর প্রতিক বলে বিশ্বাস করা বা প্রচার করা। অথচ আল্লাহ সাবধান বাণী উচ্চারণ করে আমাদেরকে বলেন-

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلاَمِ دِيناً فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

 যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে দীন হিসাবে অনুসন্ধান করবে, তার নিকট থেকে তা কবুল করা হবেনা। আর আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

৭। জোতিষবিদ বা গণকের কাছে গমন করা

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, বড় সাইন বোর্ড টাঙিয়ে ও পাখি দিয়েও ভাগ্য নির্ধারণের মিথ্যা অপচেষ্টা চলে। একটু লক্ষ করলেই শহরের রাস্তাঘাটে এ বিষয়টি নজরে পড়বে। অনেক মানুষ ভবিষ্যতের ভালো মন্দ জানার জন্য বা ভাগ্য গণনা করতে জোতিষবিদ ও গণকের কাছে গমন করে। তাদের যদি এ বিশ্বাস থাকর যে, তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী তবে তারা কুফরিতে লিপ্ত হল যার অর্থ হচ্ছে তারা কাফির হয়ে গেল। নবী ﷺ এর কয়েকজন সহধর্মিনী হতে বর্ণিত আছ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً»

যে ব্যক্তি গণকের কাছে যাবে এবং তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে অতঃপর তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে সে ব্যক্তির চল্লিশ দিনের সালাত কবুল হবে না’’। সহিহ মুসলিম : ২২৩০

আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে জ্যোতিষের কাছে যাবে এবং তাদের কথা বিশ্বাস করলো সে নবী ﷺ এর উপরে নাযিলকৃত বিষয়ে কুফরি করলো’’। সুনানে আবু দাউদ : ৩৯০৪

আবূ মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ ثَمَنِ الْكَلْبِ وَمَهْرِ الْبَغِيِّ وَحُلْوَانِ الْكَاهِنِ

কুকুরের বিক্রয় মূল্য, বেশ্যার পারিশ্রমিক এবং গণকের উপঢৌকনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ২০৭১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২১৫৯)।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ أَوْ أَتَى امْرَأَتَهُ حَائِضًا أَو أَتَى امْرَأَته من دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ

যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষের কাছে যায় এবং সে যা কিছু বলে তা বিশ্বাস করে অথবা যে ব্যক্তি ঋতুমতী অবস্থায় নিজের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে কিংবা যে ব্যক্তি স্ত্রীর পিছন দ্বার দিয়ে সহবাস করে, সে ঐ জিনিস হতে সম্পর্কহীন হয়ে গেল, যা মুহাম্মাদ ﷺ এর ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৯০৪, সুনানে ইবনু মাজাহ ৬৩৯, মিশকাত : ৪৫৯৯,  আহমাদ ৯৫৩৬, সহিহাহ : ২৬৫০, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৪৪।

ইকরিমাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলা যখন আকাশে কোন ফায়সালা করেন তখন মালায়িকাহ আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অতি নম্রভাবে তাদের ডানা ঝাড়তে থাকে; যেন মসৃণ পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। যখন তাদের মনের ভয়-ভীতি দূর হয় তারা (একে অপরকে) জিজ্ঞেস করে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা বলেন, তিনি যা বলেছেন, সত্যই বলেছেন। তিনি মহান উচ্চ। যে সময়ে লুকোচুরিকারী (শায়ত্বন) তা শোনে, আর লুকোচুরিকারী এরূপ একের ওপর এক। সুফ্ইয়ান তাঁর হাত উপরে উঠিয়ে আঙ্গুলগুলো ফাঁক করে দেখান। তারপর শায়ত্বন কথাগুলো শুনে নেয় এবং প্রথমজন তার নিচের জনকে এবং সে তার নিচের জনকে জানিয়ে দেয়। এমনিভাবে এ খবর দুনিয়ার জাদুকর ও জ্যোতিষের কাছে পৌঁছে দেয়। কোন কোন সময় কথা পৌঁছানোর আগে তার উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয় আবার অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে সে কথা পৌঁছিয়ে দেয় এবং এর সাথে শত মিথ্যা মিশিয়ে বলে। এরপর লোকেরা বলাবলি করে সে কি অমুক দিন অমুক অমুক কথা আমাদের বলেনি? এবং সেই কথা যা আসমান থেকে শুনে এসেছে তার জন্য সব কথা সত্য বলে মনে করে। সহিহ বুখারি : ৪৮০০

গনক, জ্যোতিষ এবং এ ধরনের কাজের সাথে জড়িতরা কাফির। কেননা তারা গায়েবী বিষয়ে জ্ঞানের দাবী করে অথচ গায়েবী বিষয় একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলাই পরিজ্ঞাত। অন্য কেউই গায়েব জানে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُۚ 

আপনি বলুন, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও যমীনের কেউ অদৃশ্যের সংবাদ জানেন না। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّي مَلَكٌۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ

বল, আমি বলছি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে, আমি গায়েবও জানি না। আমি তোমাদের এ কথাও বলছি না যে , আমি একজন ফেরেশতা। আমি অনুসরণ করি শুধু তাই যা আমার কাছে ওহী হয়ে আসে। সূরা আনাআম : ৫০

৮। যাদুকরের নিকট গমন করা

বর্তমানে সমাজে মানুষ যাদুকে একটি শিল্প হিসাবে গণ্য করছে। ইহার চর্চাকারীদের উৎসাহিত করার জন্য তারা নানান প্রতিযোগিতার এবং পুরস্কার প্রদান ব্যবস্থা করছে। জ্ঞানের অভাবে অনেক মুমলিম ইহাদের ব্যাপারে ঢিলামি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। বরং যাদুকে অনেকেই গর্বের বিষয় মনে করে, ইহা শিক্ষা গ্রহনের জন্য সময় ও অর্থ খরচ করে থাকে। ইসলামের সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে যাদুকরদের প্রদর্শিনে হাজির হয়ে থাকে। যাদুকরগন ও হাজার হাজার দর্শকদের চিত্তবিনোদ করে জিবীকা নির্বাহ করে থাকে। যাদুতে বিশ্বাস করা যেহেতু শিরকি আকিদা তাই এই আক্বীদার ব্যাপারে গাফিলতি ও শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না।  

যাদু একটি স্পষ্ট শয়তানী কাজ। যাদু বিদ্যা আয়ত্ব করেত হলে অধিকাংশ ক্ষেতে শিরকি কাজের সাহায্য নিতে হয়। দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য হাসিল করতে হয়। আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করাই মুমিনদের এক মাত্র কাজ। যাদু শিক্ষার প্রধান কাজই হল, দুরাত্মা এবং অপবিত্র শয়তানদের নৈকট্য হাসিল করা যা শিরকি কাজ। এই শিরকি যাদুর সত্যি সত্যি অস্তিত্ব রয়েছে যার প্রমান কুরআন ও সহিহ হাসিদের সুস্পষ্ট বর্ননা (সূরা বাকারা- ১০২)। সুরা ফালাক এবং সুরা নাসের শানে নুযুলে বলা হয়েছে, সপ্তম হিজরীতে ইহুদিরা যখন মদীনায় রসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর যাদু করেছিল এবং তার প্রভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তখন এ সূরা দুটি নাযিল

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ এত এত দিন এমন অবস্থায় অতিবাহিত করছিলেন যে, তাঁর খেয়াল হতো যেন তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, অথচ তিনি মিলিত হননি। ’আয়িশাহ বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, হে ’আয়িশাহ! আমি যে ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। (আমি স্বপ্নে দেখলাম) আমার কাছে দু’জন লোক আসল। একজন বসলো আমার পায়ের কাছে এবং আরেকজন মাথার কাছে। পায়ের কাছে বসা ব্যক্তি মাথার কাছে বসা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলঃ এ ব্যক্তির অবস্থা কী? সে বললঃ তাঁকে যাদু করা হয়েছে। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ তাঁকে কে যাদু করেছে? সে বললঃ লাবীদ ইবনু আ’সাম। সে আবার জিজ্ঞেস করল, কিসের মধ্যে? সে বলল, নর খেজুর গাছের খোসার ভিতরে তাঁর চিরুনীর এক টুকরা ও আঁচড়ানো চুল ঢুকিয়ে দিয়ে ’যারওয়ান’ কূপের মধ্যে একটা পাথরের নীচে রেখেছে। এরপর নবী ﷺ গিয়ে দেখে বললেন, এ সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। সেখানের খেজুর গাছের মাথাগুলো যেন শয়তানের মাথা এবং সে কূপের পানি যেন মেহদী ভেজা পানি। এরপর নবী ﷺ এর হুকুমে তা কূপ থেকে বের করা হলো। ’আয়িশাহ বলেন, তখন আমি বললাম। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন অর্থাৎ এটি প্রকাশ করলেন না? নবী ﷺ বললেন, আল্লাহ তো আমাকে আরোগ্য করে দিয়েছেন, আর আমি মানুষের নিকট কারো দুষ্কর্ম ছড়িয়ে দেয়া পছন্দ করি না। আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ লাবীদ্ ইবনু আ’সাম ছিল ইয়াহূদীদের মিত্র বনূ যুরায়কের এক ব্যক্তি। সহিহ বুখারি : ৬০৬৩

বলা যায় যাদু আমাদের নবী ﷺ এর উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই যাদু মানুষের মনের উপর, দেহের উপর আছর করে। ফলে সে কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে এমন কি কখনো নিহতও হয়। যাদু দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়। তবে বিশ্বাস করতে হবে, যাদুর এই আছর ও আল্লাহ তাআলার পার্থিব ও তাক্বদীরে নির্ধারিত হুকুম ও অনুমতি ক্রমেই হয়ে থাকে। যেহেতু অনেকে যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে মনে করে। যাদুর নিজস্ব ক্ষমতা আছে এই কথা মনে প্রানে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। তবে আল্লাহ উপর বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও জাদুকরের নিকট গমন তার তদবির গ্রহণ করা শিরকে আসগর।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا ڪَفَرَ سُلَيۡمَـٰنُ وَلَـٰكِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ كَفَرُواْ يُعَلِّمُونَ ٱلنَّاسَ ٱلسِّحۡرَ وَمَآ أُنزِلَ عَلَى ٱلۡمَلَڪَيۡنِ بِبَابِلَ هَـٰرُوتَ وَمَـٰرُوتَ‌ۚ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٌ۬ فَلَا تَكۡفُرۡ‌ۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنۡهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَزَوۡجِهِۦ‌ۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنۡ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذۡنِ ٱللَّهِ‌ۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ‌ۚ وَلَقَدۡ عَلِمُواْ لَمَنِ ٱشۡتَرَٮٰهُ مَا لَهُ ۥ فِى ٱلۡأَخِرَةِ مِنۡ خَلَـٰقٍ۬‌ۚ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡاْ بِهِۦۤ أَنفُسَهُمۡ‌ۚ لَوۡ ڪَانُواْ يَعۡلَمُونَ  

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত। সূরা বাকারা : ১০২   

উক্ত আয়াতে বলা হইয়াছে, যাদু শয়তানদের শিখানো বস্তু যা হাসিল করা কুফরি কাজ। এতে গায়েবী এলেমের প্রতি বিশ্বাস জম্মে ও অদৃশ্য বিষয়ে নগদ ফলাফলের আশা করা হয়, যা আল্লাহর সাথে শিরক  করার সমতুল্য।

৯। তাবীজ লটকানো, রিং, তাগা পরিধান করা, হাতে লোহা বা রাবারের আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতির মালা বা অনুরূপ বস্তু ব্যবহার করা

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাবী ‘আবদুল্লাহ্‌ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সংবাদ বহনকারী পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়। সহিহ বুখারি : ৩০০৫

নোটঃ  জাহেলী যুগে কুসংস্কারের কারণে উটের গলায় মালা লটকানো হতো যাতে উট বদ নজর থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ভ্রান্ত ধারণা ও রসম উৎখাতের ব্যবস্থা করেন।

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

টিকা : এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শির্কী কালামের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহীহ হাদীছে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারন সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহীহা : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রহ.

উকবা বিন আমের আল-জোহানি রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে একদল লোক উপস্থিত হল। তিনি দলটির নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার সাথে তাবিজ রয়েছে। অতঃপর তিনি স্বহস্তে তা ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বায়আত করলেন, আর বললেন, যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল। সহিহ মুসনাদে আহমদ, হাকেম হাদিসের মান সহিহ।

নিম্ম লিখিত কারনে তাবিজ-কবজ নাই-

ক। যে কালামের ভাষা বুঝা যায়না তা দ্বারা তাবিজ-কবজ করা হয়।

খ। সংখ্যা সম্ভলিত তাবিজ-কবজ জায়েজ নাই কারন ইহা অনেকটা জ্যেতিষীদের রাশি এবং ভাগ্য গনণার মত। তাছাড়া ইহার আবিস্কারক হল গ্রীসরা যা পরে আরবদের মাঝে প্রসার লাভকরে। ইসলামের মুল উত্স কুরআন হাদিসে এর অস্তিস্থ খুজেও পাবে না।

গ। শির্ক যুক্ত কালাম বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আশ্রায় খোজা। যেমন: ইয়া ফিরাউন, ইয়া হামান, ইয়া কিতমির (জিনের সর্দার) ইত্যাদি লিখে তাবিজ দেওয়া হয়।

ঘ। নকসা সম্ভলিত তাবিজ দেয়া  হয়। যেমন- নবী সা. এর জুতার নকসা, আলি (রা.) তলোযারের নকসা, কাবার নকসা ইত্যাদি।

ঙ। যদি কেউ এ বিশ্বাস করে যে, তাবিজ-কবজ বা ঝাড়-ফুকের নিজস্ব ক্ষমতা আছে তবে শিরকে আকবর হবে।

এই সব কারনে সালাফিগণ সকল প্রকারের তাবিজ-কবজের ব্যবহার কে ছোট শিরক মনে করে। কিন্তু ইহার উপর তাওয়াক্কুল করা কে বড় শির্ক মনে করে, যা কোন ব্যক্তি কে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। 

১০ বরকত লাভের আশায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো  

সুফিগন মাজারে যে সকল বিদআত করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হল- মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানো ও চাদর চড়ান। এ ধরনের বিদাআতি কাজ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিলনা। এ সকল কাজ সমাজে মুশরিক বা অগ্নি পুজকদের মাঝে প্রচলিত। আস্তে আস্তে কাল ক্রমে মুশরিকদের নিকট থেকেই মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করে, আজ যা মুসলিদের বিশেষ একটা অংশ ইবাদাত মনে করে পালন করে থাকে। তাদের ধারনা মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালালে মাজারে শায়িত ব্যক্তি খুসি হবে এবং তারা বরকত লাভ করবে। প্রথমত গাইরুল্লাহকে খুসি করার জন্য তারা এই বিদআতি কর্মটি শিরকে পরিনত করল। দ্বিতীয়ত বরকত দানের একমাত্র আল্লাহ অথচ তার এই গুনের মধ্যে সুফিরা তাদের অলীকে সম্পৃক্ত করে শিরক করল। তৃতীয়ত মৃত্যুর পর দুনিয়ার সাথে মৃত ব্যক্তির সকল প্রকারের সম্পর্কি বিচ্ছিন্ন হয় যায়। অথচ সুফিরা মনে করেন তাদের অলীগণ মরে না। তারা তাদের কবরে জীবিত। এক কথায় বলা যায় মাজারে ধূপকাঠি, আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালানোর মাধ্যামে মাজার পুজারীগণ উপরের তিনটি শিরকে লিপ্ত হয়।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ

রাসূলুল্লাহ ﷺ কবর যিয়ারাতকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করেছেন। যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে এবং কবরে বাতি জ্বালায় তাদেরকেও অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনান নাসায়ী : ১১৮, মিশকাত : ৮৪০ মান জইফ।

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত করেছেন।  

১১।  নিজেকে মালিকুল আমলাক (রাজাধিরাজ) উপাধিতে ভুষিত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَتَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَتُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। সুরা আল ইমরান : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡاَرۡضَ لِلّٰہِ ۟ۙ یُوۡرِثُہَا مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَالۡعَاقِبَۃُ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

এই পৃথিবীর সার্বভৌম মালিক আল্লাহ, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা উহার উত্তরাধিকারী করেন, শুভ পরিণাম ও শেষ সাফল্য লাভ হয় আল্লাহভীরুদের জন্য। সুরা আরাফ : ১২৮

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَخْنَى الأَسْمَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ رَجُلٌ تَسَمَّى مَلِكَ الأَمْلاَكِ ‏

আল্লাহ তাআলার নিকট কিয়ামত দিবসে এ ব্যাক্তির নাম সব চাইতে ঘৃণিত, যে তার নাম ধারণ করেছে মালিকাল আমলাক (مَلِكَ الأَمْلاَكِ) বা রাজাধিরাজ। সহিহ বুখারি : ৬২০৫

এমনই কিছু শব্দ যা উপাধি বা নাম হিসাবে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয়। যেমন-

শাহ জাহান, শাহান শাহ, কাজিউল কুজাত, হাকিমুল হুক্কাম,  হাকিমুল হাকিম। একই অর্থবহন করে এমন বাংলা নামও আছে। যেনম- রাজাধিরাজ, মহারাজ, জগতের বাদশাহ, বিচারকদের বিচারক, শাসকদের শাসক ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষ মহান আল্লাহই হলেন, রাজাধিরাজ। কিয়ামের দিন মহান আল্লাহ নিজেকে রাজাধিরাজ ঘোষণা করবেন।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَقْبِضُ اللَّهُ الأَرْضَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَطْوِي السَّمَاءَ بِيَمِينِهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ مُلُوكُ الأَرْضِ ‏

 আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যমীন ও আসমানকে গুটিয়ে তাঁর ডান হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে বলবেন, আমিই রাজাধিরাজ, পৃথিবীর রাজা-বাদশারা (আজ) কোথায়? সহহি বুখারী : ৪৮১২, ৭৩৮২, ৭৪১৩; মুসলিম : ২৭৮৭, ইবনে মাজাহ : ১৯২

যে নামগুলো রাখলে মহান আল্লাহ খান নাম এসে যায়, সেই নামে রাখার যাবে না। যে নামগুলো সরাসির আল্লাহর গুনের সাথে সরাসরি  সম্পৃক্ত তা রাখল শিরকি কাজ হবে।

১২। ক্ষমা পাওয়ার আশায় গাইরুল্লাহ নিকট তাওবা করা

মহান আল্লাহ তাওবা করার হুকুম দান করেছে। নবী রাসুল সকলেই মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা শিরকি কাজ। হিন্দুরা মুর্তির সামনে ঠাকুরের কাছে পাপ মোচনের জন্য ধর্না দেয়। খৃষ্টারগন তাদের নির্বাচিত ফাদারের কাছে পাপের কথা বলে পাপ মোচন করে। মুসলিমগন ও তাদের দেখাদেখি আজ কাল পীরের হাতে হাত দিয়া তাওবা করছেন। অথচ তাওবা হল অনুতপ্ত হয়ে একমাত্র আল্লহর দরবারে কান্না কাটি করা। যদি হিন্দু ও খৃণ্টানদের মত আকিদা রাখি আল্লাহ মাধ্যম (ফাদার বা ঠাকুর) ছাড়া তাওবা কবুল করেন না। তবে তো মুশরিকি আকিদা পোষশ করা হল। অথচ কুরআনে আল্লাহ বারবার ঘোষনা করছেন আল্লাহর নিকট তাওবা কর, তিনিই তাওবা কবুল কারি। তিনি ছাড়া তওবা কবুল করার আর কেউ নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَـٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَہُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ

আর যারা কখনো কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা কোন গোনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করে বসলে আবার সংগে সংগে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে তাঁর কাছে নিজেদের গোনাহ খাতার জন্য মাফ চায়। কারণ আল্লাহ ছাড়া আর কে গোনাহ মাফ করতে পারেন এবং জেনে বুঝে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর জোর দেয় না। সুরা আল ইমরান : ১৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَهُوَ ٱلَّذِى يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّيِّـَٔاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ

 তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং মন্দ কাজসমূহ ক্ষমা করেন৷ অথচ তোমাদের সব কাজকর্ম সম্পর্কে তার জানা আছে৷ সুরা শুরা : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ

হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে৷ সুরা নুর ২৪:৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا لَنَا لَا نُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَمَا جَآءَنَا مِنَ ٱلۡحَقِّ وَنَطۡمَعُ أَن يُدۡخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلصَّـٰلِحِينَ

তবে কি তারা আল্লাহর কাছে তাওবা করবে না এবং মাফ চাইবে না? আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সুরা মায়েদা : ৭৪

যারা আজ ঠাকুর, ফাদার, পুরহীদদের নিকট তাওবা করে গুনা মাফের ফরিয়াদ করছে। তাদের এই শিরকি কাজের জন্য তাদের তাওবা কবুল হবে না। এবং কাল কিয়ামতের কঠিন ময়দানে তাদের তাওবা করার সুযোগই দেওয়া হবে না, তাওবা কবুল করা তো অনেক দুরের কথা। তাদের সম্পর্কে কুরআনের কিছু আয়ত দেওয়া হল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَلِكُمْ بِأَنَّكُمُ اتَّخَذْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا وَغَرَّتْكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ لَا يُخْرَجُونَ مِنْهَا وَلَا هُمْ يُسْتَعْتَبُونَ

তোমাদের এই পরিণাম এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত করেছিলে এবং দুনিয়ার জীবন তোমাদের ধোকায় ফেলে দিয়েছিলো৷ তাই আজ এদেরকে দোযখ থেকেও বের করা হবে না কিংবা একথাও বলা হবে না যে, তাওবা চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো৷  সুরা জাসিয়াহ : ৩৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَيَوۡمَ نَبۡعَثُ مِن كُلِّ أُمَّةٍ۬ شَهِيدً۬ا ثُمَّ لَا يُؤۡذَنُ لِلَّذِينَ ڪَفَرُواْ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٨٤)

যেদিন আমি উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী দাঁড় করাবো, তারপর কাফেরদের যুক্তি-প্রমাণ ও সাফাই পেশ করার সুযোগও দেয়া হবে না৷ আর তাদের কাছে তাওবা ইসতিগফারেরও দাবী জানানো হবে না৷ সুরা নাহল : ৮৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَيَوۡمَٮِٕذٍ۬ لَّا يَنفَعُ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مَعۡذِرَتُهُمۡ وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُونَ (٥٧)

কাজেই সেদিন জালেমদের কোন ওজর- আপত্তি কাজে লাগবে না এবং তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে না৷ (সুরা রুম ৩০:৫৭)।

কাজেই সময় থাকতে মহান আল্লাহর নিকট খালেছ তাওবা করে পর কালের জন্য প্রস্তত হতে হবে। কারন পরকালে কোন প্রকার তাওবার সুযোগও নাই। যিনি কবুল করবেন সেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে তাওবা করা কতটুকু যৌক্তিক কাজ হবে?

১৩  কফিনে ফুল দেয়া বা পুষ্পস্তবক অর্পণ করা

বর্তমানে আমাদের ঢাকা শহরে কোন কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষক, এমপি, মিনিষ্টার বা বিখ্যাত নামকরা কেউ মারাগেলে তার প্রতি শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে শহীদ মিনার বা তার কর্মস্থলে রাখা হয়। তার নিকট প্রিয়জন বা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিগন তার কফিনে ফুল দেন। তারা ফুল দিয়ে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসর অর্ঘ্য অর্পণ করেন থাকেন, তবে তারা সকলে মৃত ব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে বা সওয়াব পাঠানোর নিয়তে করেন কিনা তা ষ্পষ্ট নয়। কারন ইসলামি শরীয়তে মৃত্যুর জন্য কিছু করতে হল তা অবশ্যই আল্লাহর হুকুম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখান পথে করতে হবে। যদি কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা না হয় বা লোক দেখানোর জন্য হয় অথবা আল্লাহর রাসূল কর্তৃক কাজটি অনুমোদিত না হয়, তাহলে এ কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

 আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

যদি কেউ আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৬

তবে এ আমল যে মুসলামানদের নয় সে ব্যাপারটি সুষ্পষ্ট। মৃত্যুর পর ফুল দিয়ে, বাতি জ্বালীয়ে শ্রদ্ধা অর্ঘ্য অর্পণ করার রেওয়াজ অধিকাংশ পাশ্চাত্যের মানুষ করে থাকে, যারা কঠোর ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী। আর আমরা আমদের সঠিক ও সহিহ আমলকে বাদ দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তির অনুকরণে মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণের উদ্দেশে এমনটি করে থাকি যা হারাম। যদি সৃষ্টিকে খুসি করার ইচ্ছা থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য অর্পণ করা হয় তবে তা ছোট শিরক। কিন্তু যদি কর্মকে ইবাদতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে তখন আর ছোট শিরক থাকবে না বড় শিরকে পরিনত করবে। 

১৪ মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ।

আমাদের উপমহাদেশে অনেককে মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান খাদেম হিসাবে কাজ করে। তাদের এই কাজ শিরকি কাজে সহায়তা ছাড়া কিছুই নয়। যে শিরক করতে সহায়তা করে সে মুলত শিরকি কাজ করে। কাজেই মাযার বা কবর যেখানে শিরকি কাজ হয় সেখান কার খাদেম হওয়া ও শিরকি কাজ। এমনকি আল্লাহ নিজের ঘর কাবাকে ও শিরক  বিদাআত থেকে পবিত্র রাখতে বলেছেন। আর যেখানটি (মাজার) তৈরি করা হয়েছে শুধুই শিরক করার জন্য তার খেদমত কতটুকু যুক্তি যুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَیۡتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَالۡعٰکِفِیۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ

আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’। সুরা বাকারা : ১২৫

উক্ত আয়াতে আল্লাহ ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কে কাবা ঘর পাক পবিত্র রাখার নির্দেষ দিয়েছন। এর অর্থ কেবলমাত্র ময়লা-আবর্জনা থেকে পাক-পবিত্র রাখা নয়। আল্লাহর ঘরের আসল পবিত্রতা হল শিরক থেকে পবিত্র রাখা এবং সেখানে আল্লাহর ছাড়া আর কারোর নাম উচ্চারিত হবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে বসে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে মালিক, প্রভু, মাবুদ, অভাব পূরণকারী ও ফরিয়াদ শ্রবনকারী হিসেবে ডাকে, সে আসলে তাকে নাপাক ও অপবিত্র করে দিয়েছে।

১৫ কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً لَّا یَخۡلُقُوۡنَ شَیۡئًا وَّہُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ وَلَا یَمۡلِکُوۡنَ لِاَنۡفُسِہِمۡ ضَرًّا وَّلَا نَفۡعًا وَّلَا یَمۡلِکُوۡنَ مَوۡتًا وَّلَا حَیٰوۃً وَّلَا نُشُوۡرًا

আর তারা আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে; তারা নিজদের কোন কল্যাণ ও অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে না এবং মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থান করতেও সক্ষম হয় না।সুরা ফুরকান : ৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

مَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ حَسَنَۃٍ فَمِنَ اللّٰہِ ۫ وَمَاۤ اَصَابَکَ مِنۡ سَیِّئَۃٍ فَمِنۡ نَّفۡسِکَ ؕ

তোমার কাছে যে কল্যাণ পৌঁছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে অকল্যাণ তোমার কাছে পৌঁছে তা তোমার নিজের পক্ষ থেকে। সুরা নিসা : ৭৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ ؕ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡكَ بِخَیۡرٍ فَهُوَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোন দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই। আর যদি কোন কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন তবে তিনিই তো সব কিছুর উপর ক্ষম তাবার্রুক ন। সুরা আনাম : ১৭

আমাদের বিশ্বাস সকল প্রকারের কল্যাণ, বরকত, উপকার মহান আল্লাহর পক্ষে থেকে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰہُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَہٗۤ اِلَّا ہُوَ ۚ وَاِنۡ یُّرِدۡکَ بِخَیۡرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضۡلِہٖ ؕ یُصِیۡبُ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন ক্ষতি পৌঁছান, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহের কোন প্রতিরোধকারী নেই। তিনি তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তাকে তা দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু’। সুরা ইউনুস : ১০৭

উপমহাদেশে কবরের প্রতি ভক্তি অনেক পুরান। আমাদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল, মূর্তি পুজার প্রতি তাদের বড় ঝোঁক ছিল। অনেকে হিন্দু থেকে কালের আবর্তে মুসলিম হয়েছে ঠিকই কিন্তু জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে কবরকে মূর্তির মত পূজা শুরু করে। তাই তারা কল্যাণ লাভের আশায় কবরকে অতিরিক্ত ভক্তি করে এবং মাজারকে পূজনীয় মনে করে তার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা প্রদর্শন করে থাকে যা মুলাত একটি শিরকি কর্ম। আল্লাহর পরিবর্তে মাজারে থেকে বরকত লাভের আশায় এর উপর মশারি, ও শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে থাকে। যখনই কোনো মাজার ভক্ত মাজারে যায় তখন তারা হিন্দুদের মত হাত মুখে ও কপালে লাগায়। কবরকে তারা এতই বরকত মনে করে যে কবরের গায় তারা হাত লাগায় এবং পেট ও পিঠ ঠেকায় এবং অনেকেই কবরকে চুম্বন করে। বুজুর্গের মাজার বা কাবর স্থান থেকে ফিরে আসর সময় কবরের দিকে মুখ করে বেরিয়ে আসা। তাদের এই অতিরিক্ত ভক্তি করাকে হিন্দুদের মূর্তি ভক্তির চেয়ে সামান্য টুকুও কম নয়। তাদের মাজার আর হিন্দুদের মূর্তির পার্থক্য হল তাদের বুজুর্গ মাটির নিচে আর হিন্দুদের মূর্তি মাটির উপরে। কাজেই যদি কেউ মূর্তি ভক্তি দেখে থাকেন তাকে আর মাজার ভক্তি দেখার দরকার নেই। তার যার মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করে এই মঙ্গলের  মালিক স্বংয় আল্লাহ আমার প্রিয় কেও এই মঙ্গল অমঙ্গলের মালিক করা হয় নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنِّیۡ لَاۤ اَمۡلِکُ لَکُمۡ ضَرًّا وَّلَا رَشَدًا

(হে নবি) বল, আমি তোমাদের মঙ্গল-অমঙ্গলের মালিক নই। সুরা জ্বিন : ২১

১৬ আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা

ইচছা করে আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা কুফরি কাজ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمُ ٱتَّبَعُوا۟ مَآ أَسْخَطَ ٱللَّهَ وَكَرِهُوا۟ رِضْوَٰنَهُۥ فَأَحْبَطَ أَعْمَٰلَهُمْ

এটা এজন্য যে, তারা সেই কাজ করেছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে তারা অপছন্দ করেছে। তাই তিনি তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিয়েছেন। সুরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَوَلَّوْا۟ قَوْمًا غَضِبَ ٱللَّهُ عَلَيْهِمْ قَدْ يَئِسُوا۟ مِنَ ٱلْءَاخِرَةِ كَمَا يَئِسَ ٱلْكُفَّارُ مِنْ أَصْحَٰبِ ٱلْقُبُورِ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা সেই সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাদের প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তারা তো আখিরাত সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েছে, যেমনিভাবে কাফিররা কবরবাসীদের সম্পর্কে নিরাশ হয়েছে। সুরা মুমতাহীনা : ১৩

জনৈক মাদীনাবাসী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সময় উম্মুল মুমিনীন আয়শা (রা.) কে মুয়াবিয়া (রা.) লিখে পাঠান, আমাকে লিখিতভাবে কিছু উপদেশ দিন, তবে তা যেন দীর্ঘ না হয়। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আয়শা (রা.) মুয়াবিয়া (রা.) কে লিখলেন,  আপনাকে সালাম। তারপর এই যে, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আকাঙ্খা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট হতে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তায়ালাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তায়ালা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আপনাকে আবারো সালাম। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৪)

সাধারণ মহান আল্লাহর ক্ষমতা, ইবাদতের মাঝে অংশ বসালে শিরক হয়। আল্লাহর তায়ালার অসন্তুষ্টির মাধ্যমে কোন মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা শুধু আল্লাহর অংশ বা সমকক্ষ করে নাই। বরং তার চেয়ে নিজে স্থানকে দিয়েছেন আল্লাহকে। নাউজুবিল্লাহ

১৭। কদমবুছির করা

একজন মুসলমানের সাথে অন্যে মুসরমানের দেখা হলে সালাম (আস-সালামু আলাইকুম বলা)  দেওয়া একটি সার্বজনিন সুন্নত। আবার যাকে সালাস দেওয়া হবে তার পক্ষ থেকে উত্তর প্রদান করাও ইসলামী সুন্নাত। মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর মতনিত প্রিয় বান্দা, শ্রেষ্ঠতম রাসুল ও হাবীব, যাকে ভালবাসা আর আল্লাহকে ভালবাসা একই কথা এবং আল্লাহর কাছে নাজাতের অন্যতম ওসীলা। (ইমরান-৩১)। সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তী জীবনের প্রতিদিন অগণিত সাহাবী তাঁর দরবারে এসেছেন। সেই সকল সাহাবি (রা.) ছিলেন, মানব ইতিহাসের অতুলনীয় অনুসারি, যারা নিজের জীবন থেকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বেশি ভালবেসেছেন, ভক্তি করেছেন ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এই মহান দরবারের মহান ভক্তবৃন্দ কেউই কোনদিন কদমবুছি করলেন না। সবাই এসে সালাম দিয়ে দরবারে বসছেন। সালাম দিয়ে দরবার ত্যাগ করছেন। কখনো হয়ত মোসাফাহা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে নবুয়তী জিন্দেগিতে তার লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দুই একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহাস্রাধিকবার এসেছেন। এই দীর্ঘ নবুয়তী জিন্দেগিতে শুধুমাত্র তিন চার জন্য নবাগত, দরবারের সুন্নাতের সাথে অপরিচিত মানুষ পায়ে চুমু খেয়েছেন বলে কোনো কোনো হাদীসে জানা যায়। সেই বর্ণনাগুলি প্রায় সবই যয়ীফ বা দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেননি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা কয়েকজন বেদুঈন বা ইহুদি, যারা দরবারে থাকেনি বা দরবারের আদব ও সুন্নাত জানত না। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ফাতেমা, বেলাল (রা) ও তাঁদের মতো অগণিত প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে দীর্ঘ ২৩ বৎসরে হাজার হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদমবুছি করেন নি বা কদম মুবারকে চুমু খাননি। এমনকি কদম মুবারকে হাত রেখে সেই হাতের উপরও চুমু খাননি। এহইয়াউস সুনান, পঞ্চম অধ্যায়, পৃ-৩৮৬ খন্দোকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ,


কিন্তু আমাদের দেশের ভন্ডপীরে দরবারের কথা ভাবুর। পীর সাহেব বসে আছেন অগণিত ভক্ত এসে সালাম করছেন, মুসাফাহা করছেন, এরপর হাতে বা পায়ে চুমুখাচ্ছেন আর সাথে কিছু সেলামি দিচ্ছেন। যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারেন সম্পুর্ণ ভিন্ন সুন্নত বিরোধী।

আবার অনেকে বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ী, উস্তাদকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুছি করে থাকেন। এটা জায়েয হবার ভিত্তি খুবই দুর্বল। একেতো সুন্নত বিরোধী বিদআত তারপর একাজটি সম্মানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করা যা শিরকের আহ্বায়ক। সর্বসিদ্ধান্ত মাসআলা হল, সম্মানে অতিরঞ্জিত করা হল, শিরকের আহ্বায়ক। আর শিরকের আহ্বায়ক হারাম। ইহা অনেক সময় সিজদার সাথে সামঞ্জস্যমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সিজদার সাথে সামঞ্জস্য হলে যে শিরক তাতে কোন সন্ধেহ নাই। তাইতো বর্তমানে দেখা যায় অনেক মাযারে পীরের কদমবুছি না করে সরাসরি সিজদা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *