যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০২ ::  ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈদ আরবি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে এমন সাধারণ সম্মেলন যা বারবার ফিরে আসে। চাই তা সপ্তাহ ঘুরে ফিরে আসুক, মাস ঘুরে আসুক কিংবা বৎসর ঘুরে আসুক। অর্থাৎ যে দিনটি বার বার ফিরে আসে তাকে ঈদের দিন বলে। আমরা ঈদ বলতে বুঝি খুসি আর আনন্দেভরা দিন। প্রতি বছর রমযান মাসে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালনের পর আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন লাভের আনন্দ লাভ করা সত্যিকার অর্থেই ঈদ (যে আনন্দ বার বার ফিরে আসে)। ঈদুল ফিতরের দিনটি আল্লাহ তাআলা অনেক বড় অনুগ্রহ কারন মাস ব্যাপি সিয়াম পালনের পর পানাহারের অনুমতি প্রদান। এমনি ভাবে ত্যাগের মহিমা নিয়ে বার বার ফিরে আসে ঈদুল আজহা বা কুরবানীর ঈদ। আল্লাহ তা’আলা প্রতি বছর তার বান্দাকে নিয়ামাত, ইহসান ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করে থাকেন। এতে মানুষের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হয়। এসব কারণে এ দিবসের নামকরণ হয়েছে ঈদ। মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিযাত : ৫৬

কাজেই মুসলিমদের ঈদও ইবাদাত। অর্থাৎ আল্লাহর মর্জিমত আনন্দ করলেও ইবাদত হবে। এই জন্যই মুসলিমদের ঈদের আনন্দ অত্যন্ত নির্মল, পবিত্র এবং মধুময়। এই আনন্দ প্রকাশের সীমা ও ইসলাম নির্ধারণ করেছে। ঈদের আনন্দ শুরু হয় ঈদের সালাতের সমাবেশের মাধ্যমে যেখানে দেখা হয় নতুন পুরাতন হাজার বন্ধু বান্ধবদের সাথে, শুভেচ্ছা বিনিময় চলতে থাকে পাড়া প্রতিবেশীসহ সকল স্তরের মানুষের সাথে। মহান মিলন মেলার কথা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। এ উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব একে অপরকে দাওয়াত দেয়। সমাজের সবার জন্য সবার দার উম্মুক্ত থাকে। তবে থাকে না ধনি গরিবের ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্রোধ। 

১। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সুচনা

আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত,

كَانَ لَكُمْ يَوْمَانِ تَلْعَبُونَ فِيهِمَا وَقَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْفِطْرِ، وَيَوْمَ الْأَضْحَى

তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবী (ﷺ) মদীনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নিদির্ষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্‌রের দিন এবং কুরবানীর দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬

এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামী শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব উদ্‌যাপন করার সুযোগ নেই। অথচ আমাদের মুসলিম সমাজে বর্তমানে ঈদে মিলাদুন নবী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম উৎসব নামে তৃতীয় একটি ঈদের প্রচল হয়েছে, যাকে সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ বলে জোরেশোরে প্রচার চালান হচ্ছে। যা এক দিকে যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধী অপর পক্ষে সলফে সালেহিদের যামানায় ইহার অস্থিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। আমাদের সমাজে ঘটা করে ঈদের মত সমান গুরুত্ব দিয়ে উদ্‌যাপন করা হয় তথাকথিত পহেলা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষ, বিশ্ব ভালবাসা দিবস, এপ্রিল ফুল, বড় দিনসহ অগণিত উৎসব। হিন্দু ও খৃষ্টানদের মত বিধর্মীদের থেকে আমদানিকৃত সংষ্কৃতিতে ইসলাম ও মুসলমানের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না।

 ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। আবু দাউদ : ৪০৩১

ইসলাম স্বীকৃত দুটি ঈদ ছাড়া অন্য কোন ঈদ বা উৎসব উদ্‌যাপন করা, তাতে অংশগ্রহণ করা বা সে উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়। অপর পক্ষে আমরা যারা এই দুটি কে ঈদ হিসাবে স্বীকার করি ও উদ্‌যাপন করি তারাও এই উৎসব উদ্‌যাপন করতে গিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের সীমা লংঘন করছি। এমন অনেক আছেন সাওম বা সালাতের ধারেও নেই কিন্তু ইফতারিতে হরেক রকম সুস্বাদু খাবার খান আর ঈদে দামি দামি পোশাক পরেন। ঈদের দিন ব্যয় করে নাটক, সিনেমা, বিদেশী সিরিয়াল দেখে। আবার অনেকে ঈদের দিন প্রতিবেশীদের সাথে সৌহদ্যপূর্ণ ব্যবহারের পরিবর্তে পরিবারসহ পার্কে বা বিনোদন কেন্দ্রে সমায় কাটানোর নতুন ফ্যাসন বাহির করছেন। এভাবে ইসলামের সৌন্দর্যময় ঈদের উদ্দেশ্য থেকে তারা যোজর বিয়োজন দুরে থাকছেন।

২। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কিছু বিধান

(১) ঈদের দিন গোসল করা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ভাল পোশাক পরিধান করা

মহান আল্লাহ বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الأَضْحَى

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন গোসল করতেন। ইবনে মাজাহ : ১৩১৫ মান যঈফ।

(২) ঈদের দিনে বৈধ আনন্দ করা যায়।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আবূ বকর (রাঃ) ঈদুল তিফত্র অথবা ঈদুল আযহার দিনে তাঁকে দেখতে এলেন। তখন নবী ﷺ ‘ ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় দু’জন অল্প বয়স্কা বালিকা এ কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করছিল যা আনসারগণ বু‘আস যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিল। তখন আবূ বকর (রাঃ) দু‘বার বললেন, এ হল শয়তানের ঢাল। নবী ﷺ বললেন-

دَعْهُمَا يَا أَبَا بَكْرٍ إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيْدًا وَإِنَّ عِيْدَنَا هَذَا الْيَوْمُ

হে আবূ বকর, ওদেরকে ছাড়। প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই ঈদ আছে আর আজ হল আমাদের ঈদের দিন। সহিহ বুখারি : ৩৯৩১, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, মিসকাত : ১৪৩২, সুনানে নাসায়ী : ১৫৯৩

(৩) দুই ঈদের দিন সিয়াম রাখা নিষেধ

বনূ আযহারের আযাদকৃত গোলাম আবূ ’উবায়দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার ঈদে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম, তখন তিনি বললেন-

هَذَانِ يَوْمَانِ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ صِيَامِهِمَا يَوْمُ فِطْرِكُمْ مِنْ صِيَامِكُمْ، وَالْيَوْمُ الآخَرُ تَأْكُلُونَ فِيهِ مِنْ نُسُكِكُمْ‏.‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করতে নিষেধ করেছেন। (ঈদুল ফিতরের দিন) যে দিন তোমরা তোমাদের সিয়াম ছেড়ে দাও। আরেক দিন, যেদিন তোমরা তোমাদের কুরবানীর মাংস খাও। সহিহ বুখারি : ১৯৯০

যিয়াদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি এসে ইবনু উমর (রাঃ) কে বলল যে, এক ব্যাক্তি কোন এক দিনের সিয়াম উদ্‌যাপন করার মানত করেছে, আমার মনে হয় সে সোমবারের কথা বলেছিল। ঘটনাক্রমে ঐ দিন ঈদের দিন পড়ে যায়। ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তাআলা মানত পুরা করার নির্দেশ দিয়েছেন আর নবী ﷺ এই (ঈদের) দিনে সাওম উদ্‌যাপন করতে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ১৯৯৪

(৪) ঈদের সময় তাকবির বলার বিধান।

দু’ ঈদের রাত আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত উচ্চ স্বরে তাকবির বলা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে পৌঁছে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর বলতেন। যখন নামাজ আদায় করতেন, তার পর আর তাকবীর বলতেন না। (আবী শাইরাহ, আলবানী একে সহিহ বলেছেন)।

ঈদের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তাকবীর পড়তে পড়তে যেতেন সেটি তাকবীরটি হলঃ

**اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ*** اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ**

উচ্চারণঃ আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

অর্থঃ আল্লাহ মহান, আল্লাহ অতিমহান, তিনি ছাড়া সত্যিকার আর কোন মা’বুদ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান আর সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁরই জন্য।

মাসায়েলঃ  তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত।  ঈদগাহের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে তাকবীর পাঠ শুরু করবে এবং ইমাম সাহেব সালাত শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতে থাকবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ঈদুল ফিত্‌রের তাকবীর শুরু করবে ঈদের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকেই। ঈদের সলাত শেষ হওয়া পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর পাঠ করতেন।

(৫) ঈদের দিন ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া

সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَنَّ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ كَانَ يَخْرُجُ إِلَى الْعِيدِ مَاشِيًا وَيَرْجِعُ مَاشِيًا ‏.‏

নবী ﷺ পদব্রজে ঈদগাহে যেতেন এবং পদব্রজেই ঈদগাহ থেকে ফিরে আসতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১২৯৪

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ঈদের মাঠে পায়ে হেটে যাওয়া এবং যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। সুনানে তিরমিজি : ৫৩০

(৬) ঈদের দিন ঈদগাহে গমনের আগে কিছু খেয়ে নেওয়া।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

لاَ يَغْدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتَّى يَأْكُلَ تَمَرَاتٍ‏.‏ حَدَّثَنِي أَنَسٌ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَيَأْكُلُهُنَّ وِتْرًا‏.‏

রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক রিওয়াতে আনাস (রাঃ) নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বেজোড় সংখ্যক খেতেন। সহিহ বুখারি : ৯৫৩

৩। ঈদের দিন ঈদের সালাত আদায় করা

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ (٢)

অর্থঃ আপনি আপনার প্রভুর জন্য নামাজ পড়েন এবং কুরবানি করুন। (সূরা কাউসার)

বারাআ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ ﷺকে খুতবা ‍দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন-

إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ مِنْ يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا ‏‏

আমাদের আজকের এ দিনে আমরা যে কাজ প্রথম শুরু করব, তা হল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা। এরপর ফিরে আসব এবং কুরবানী করব। তাই যে এরূপ করে সে আমাদের রীতিনীতি সঠিকভাবে উদ্‌যাপন করল। সহিহ বুখারি : ৯৫১

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেছেন ঈদের সলাত প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ একই মত পোষণ করেন।

(১) ঈদের সালাত দু রাকআত।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَلَّى يَوْمَ الْفِطْرِ رَكْعَتَيْنِ، لَمْ يُصَلِّ قَبْلَهَا وَلاَ بَعْدَهَا، ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ وَمَعَهُ بِلاَلٌ، فَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ، فَجَعَلْنَ يُلْقِينَ، تُلْقِي الْمَرْأَةُ خُرْصَهَا وَسِخَابَهَا‏.‏

নবী ﷺ ঈদুল ফিতরে দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করেন। এর আগে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। তারপর বিলাল (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে মহিলাগনের কাছে এলেন এবং সাদাকা প্রদানের জন্য তাদের নির্দেশ দিলেন। তখন তারা দিতে লাগলেন। কেউ দিলেন আংটি, আবার কেউ দিলেন গলার হার। সহিহ বুখারী : ৯৬৪, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৫৯

(২) ঈদের সালাত আদায় করার পরে খুতবা দিতেন

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي فِي الْأَضْحَى وَالْفِطْرِ ثُمَّ يَخْطُبُ بَعْدَ الصَّلاَةِ.

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন সালাত আদায় করতেন। আর সালাত শেষে খুতবা দিতেন। সহিহ বুখারি  : ৯৫৭

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ ـ رضى الله عنهم ـ فَكُلُّهُمْ كَانُوا يُصَلُّونَ قَبْلَ الْخُطْبَةِ‏.‏

আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ, আবূ বকর, উমর, এবং উসমান (রাঃ) এর সঙ্গে সালাতে হাযির ছিলাম। তারা সবাই খুতবার আগে সালাত আদায় করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৬২

(৩) ঈদের সালাত আযান ও ইকামত নেই।

জাবির ইবনু সামুরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-

صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْعِيدَيْنِ غَيْرَ مَرَّةٍ وَلاَ مَرَّتَيْنِ بِغَيْرِ أَذَانٍ وَلاَ إِقَامَةٍ

আমি রসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে একবার দু’বার নয়, অনেক বার দু’ঈদের সালাত আযান ও ইকামাত ব্যতীত আদায় করেছি। সহিহ মুসলিম : ৮৮৭, আবূ দাঊদ : ১১৪৮, সুনানে তিরমিজি ৫৩২, মিশকাত : ১৪২৭

(৪) দুই ঈদের সালাতের মাঝের তাকবীরসমূহের বিধান।

ঈদের সলাতে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে অতিরিক্ত কিছু তাকবীর দেয়া হয়, সে তাকবীরের সংখ্যা সম্পর্কে বেশ কিছু মতভেদ আছে। তাদের মধ্যে দুটি মত প্রসিদ্ধ-

প্রতম মত হল-

হানাফী মাযহাবের ইমাম আবূ হানিফার (রহ.) মত হল ঈদের সলাতে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে ১ম রাকআতে অতিরিক্ত ০৩ তাকবীর ও ২য় রাক’আতে অতিরিক্ত ০৩ তাকবীর, মোট অতিরিক্ত ০৬ তাকবীর দিতে হবে।

তাদের দলীল-

ইমাম আবদুর রায্যাক রাহ. (সুফিয়ান) ছাওরী থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি আলকামা ও আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে, তাঁরা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (ইবনে মাসউদ রা.) দুই ঈদের নামাযে ৯টি করে তাকবীর দিতেন। কুরআন পাঠের আগে ৪টি। তারপর তাকবীর দিয়ে রুকু করতেন। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়তেন। কুরআন পড়া শেষ হলে ৪ তাকবীর দিতেন। তারপর রুকু করতেন। মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক : ৫৬৮৬

ইমাম আবদুর রায্যাক রাহ. মা‘মার থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি আলকামা ও আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা বলেছেন, একবার ইবনে মাসউদ রা. বসে ছিলেন। তাঁর কাছে হুযায়ফা রা. ও আবু মূসা আশআরী রা. ও ছিলেন। সায়ীদ ইবনুল আস উভয়কে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযের তাকবীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা তাকে (ইবনে মাসুদ) জিজ্ঞাসা করতে বলেন। শেষে হুযায়ফা রা. ইবনে মাসউদ রা. এর দিকে ইশারা করে বললেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা কর। জিজ্ঞাসা করলে ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ৪ তাকবীর দিয়ে কুরআন পড়বে। তারপর তাকবীর দিয়ে রুকু করবে। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়বে। তারপর ৪ তাকবীর দিবে। মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক : ৫৬৮৭

ইবনে মাসউদ (রা.) এই রেওয়ায়েতে ৪ তাকবীরে ঈদের সালাত বলা সম্পর্কে একদল ফকীহ বলেন, ৪ তাকবীরকে প্রথম রাকাতে তাকবীরে উলার সাথে ৩ তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবীর সহ ৩ তাকবীর। অর্থাত অতিরিক্ত ৬ টি তাকবীর দিতে হবে।  উল্লেখ্য, মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) এটাকে দুর্বল হাদীস বলেছেন।

দ্বিতীয় মত হল-

তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে প্রথম রাক’আতে অতিরিক্ত ০৭ তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক’আতে অতিরিক্ত ০৫ তাকবীর, মোট অতিরিক্ত ১২ তাকবীর দিতে হবে।

তাদের দলীল-

 আমর ইবনু আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ كَبَّرَ فِي الْعِيدَيْنِ سَبْعًا فِي الأُولَى وَخَمْسًا فِي الآخِرَةِ

রাসূলুল্লাহ ﷺ দু ঈদের সালাতে প্রথম রাকআতে সাত তাকবীর এবং শেষের রাকআতে পাঁচ তাকবীর দিতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১২৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৬, মিশকাত : ১০৪১, তালীক ইবনু খুযাইমাহ : ১৪৩৮, ১৪৩৯ হাদিসের মান সহিহ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُكَبِّرُ فِي الْفِطْرِ وَالأَضْحَى فِي الأُولَى سَبْعَ تَكْبِيرَاتٍ وَفِي الثَّانِيَةِ خَمْسًا

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার নামাযের প্রথম রাকাতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচবার তাকবীর বলতেন। আবূ দাউদ : ১১৪৯, ইবনে মাজাহ : ১২৮০

ইসলামি জিজ্ঞাসা ও জবাব ওয়েব সাইডে এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়- এটি একটি ইজতাহিদী মাসয়ালা। এ নিয়ে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও পরবর্তী ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য আছে এবং এ মাসয়ালায় ১০টিরও অধিক মতামত রয়েছে।

মালেকী ও হাম্বলি মাযহাবের আলেমগণ বলেন: ঈদের নামাযের প্রথম রাকাতে তাকবীর সংখ্যা ৬টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫টি। এটি মদিনার সাত ফকীহ, উমর ইবনে আব্দুল আযিয, যুহরী ও মুযানি থেকে বর্ণিত আছে। আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা’ ১৩/২০৯

বুঝা যাচ্ছে- প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমাকে তারা সপ্তম তাকবীর হিসেবে গণ্য করেন এবং দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর তাকবীরকে তারা বর্ণিত পাঁচটি তাকবীরের অতিরিক্ত তাকবীর হিসেবে গণ্য করেন। আর হানাফী মাযহাবের অভিমত ও এক বর্ণনা মতে ইমাম আহমাদের মত হচ্ছে: দুই ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ৬ তাকবীর দিতে হবে। প্রথম রাকাতে ৩ তাকবীর, দ্বিতীয় রাকাতে ৩ তাকবীর। এটি ইবনে মাসউদ (রাঃ), আবু মুসা আশআরী (রাঃ), হুযাইফাতুল ইয়ামান (রাঃ), উকবা বিন আমের (রাঃ), ইবনে যুবায়ের (রাঃ), আবু মাসউদ আল-বদরী (রাঃ), হাসান বসরী (রহঃ), মুহাম্মদ বিন সিরিন (রহঃ), ছাওরী (রহঃ), কুফার আলেমগণ ও এক বর্ণনা মতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর অভিমত।

শাফেয়ি মাযহাবের আলেমগণ বলেন, প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত তাকবীর ৭টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫টি।

আইনী (রহঃ) অতিরিক্ত তাকবীরের সংখ্যার ব্যাপারে ১৯ টি উক্তি উল্লেখ করেছেন। ইসলামি জিজ্ঞাসা ও জবাব, প্রশ্ন নম্বর : ২২৪০৩২, শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ।

মাসায়েলঃ হানাফী ও মালেকী মাযহাবে বাড়তি তাকবীর বলা ওয়াজিব। এটা ছুটে গেলে সাহু সিজদা দিতে হবে। পক্ষান্তরে অন্যান্য মাযহাবে বাড়তি তাকবীর বলা সুন্নাত। এবং এই বাড়তি তাকবীর বলার সময় প্রত্যেক তাকবীরেই কি হাত উঠাতে হবে।

৪। ঈদের সলাত আদায়ের পদ্ধতি-

প্রথম পদ্ধতিঃ

প্রথমে নিয়ত করে আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত বাঁধবে। এরপর ছানা পড়তে হবে। সুরা ফাতিহা পড়ার পূর্বেই একের পর এক মোট ৭ বার তাকবীর দিতে হবে। প্রতি দুই তাকবীরের মাঝখানে একটুখানি চুপ থাকতে হবে। অতপর সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা মিলিয়ে পড়ে সাভাবি রুকুও সিজদা করতেন। এভাবে প্রথম রাক’আত শেষ করার পর সাজদাহ থেকে উঠে সূরা ফাতিহা শুরুর পূর্বেই দ্বিতীয় রাকাতে পর পর ৫টি তাকবীর দিতেন। তারপর সূরা ফাতিহা পড়ে আরেকটি সূরা পড়তেন। এরপর তিনি রুকু ও সাজদাহ করে দু’ রাক’আত ঈদের সলাত শেষ করতেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি একটি তীরের উপর ভর দিয়ে যমীনে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতেন। তখন ঈদগাহে কোন মিম্বর নেয়া হত না। তারপর দু’আ করে শেষ করে দিতেন।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ

দ্বিতীয় নিয়মটি প্রথমটির মতই। শুধু পার্থক্য হল প্রথম রাক’আতে তাকবীরে তাহরীমার পর অতিরিক্ত ৩ তাকবীর বলবে এবং প্রথম দুই তাকবীরে হাত ছেড়ে দেবে এবং শেষ তাকবীরে হাত বেঁধে ফেলবে। দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা শেষে রুকুর পূর্বে অতিরিক্ত ৩ তাকবীর দেবে এবং প্রত্যেক তাকবীরেই হাত ছেড়ে দেয়। চতুর্থ তাকবীরে রুকুতে যাবে। অপতর সাধারন নিয়মে সালাত শেষ করবে।

মাসায়েলঃ  ঈদের নামাযের কোন কাজা নেই। এটাই হানাফী মাযহাবের মত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে উসাইমিন (রহঃ)। এ মতটি গ্রহন করছেন। তবে মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের হুবহু দুই রাকাত উল্লেখিত তাকবীরসমূহসহ কাজা করা যাবে।

৫। ঈদের পূর্বে বা পরে কোন সালাত নেই।

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَلَّى يَوْمَ الْفِطْرِ رَكْعَتَيْنِ لَمْ يُصَلِّ قَبْلَهَا وَلاَ بَعْدَهَا ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ وَمَعَهُ بِلاَلٌ فَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ فَجَعَلْنَ يُلْقِينَ تُلْقِي الْمَرْأَةُ خُرْصَهَا وَسِخَابَهَا

নবী ﷺ ‘ঈদুল ফিত্রে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। অতঃপর বিলাল (রাযি.)-কে সঙ্গে নিয়ে নারীদের নিকট এলেন এবং সাদাকা প্রদানের জন্য তাদের নির্দেশ দিলেন। তখন তাঁরা দিতে লাগলেন। নারীদের কেউ দিলেন আংটি, আবার কেউ দিলেন গলার হার। সহিহ বুখারি : ৯৬৪, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৫৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১২৯১, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৭, মিশকাত : ১৪৩০

৬। ঈদের সলাতের স্থানঃ

ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَغْدُو إِلَى الْمُصَلَّى، وَالْعَنَزَةُ بَيْنَ يَدَيْهِ، تُحْمَلُ وَتُنْصَبُ بِالْمُصَلَّى بَيْنَ يَدَيْهِ فَيُصَلِّي إِلَيْهَا‏.‏

নবী ﷺ যখন সকাল বেলায় ঈদগাহে যেতেন, তথন তার সামনে বর্শা বহন করা হতো এবং তার সামনে ঈদগাহে তা স্থাপন করা হতো এবং একে সামনে রেখে তিনি সালাত আদায় করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৭৩

আবূ সাঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন (ঘর থেকে) বের হয়ে ঈদগাহের ময়দানে গমন করতেন। প্রথমে তিনি (ﷺ) সেখানে গিয়ে সালাত আদায় করাতেন। এরপর তিনি (ﷺ) মানুষের দিকে মুখ ফিরে দাঁড়াতেন। মানুষরা সে সময় নিজ নিজ সারিতে বসে থাকতেন। তিনি (ﷺ) তাঁদেরকে ভাষণ শুনাতেন, উপদেশ দিতেন। আর যদি কোন দিকে কোন সেনাবাহিনী পাঠাবার ইচ্ছা করতেন, তাদেরকে নির্বাচন করতেন। অথবা কাউকে কোন নির্দেশ দেয়ার থাকলে তা দিতেন। তারপর তিনি (ﷺ) [ঈদগাহ] হতে ফিরে প্রত্যাবর্তন করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৫৬, সহিহ মুসলিম : ৮৮৯, মিশকাত : ১৪২৬

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত-

أَنَّهُ أَصَابَهُمْ مَطَرٌ فِي يَوْمِ عِيدٍ فَصَلَّى بِهِمُ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم صَلَاةَ الْعِيدِ فِي الْمَسْجِدِ ‏.‏

একদা ঈদের দিন বৃষ্টি হলে নবী ﷺ সাহাবীদেরকে নিয়ে ঈদের সালাত মসজিদে আদায় করেন। সুনানে আবু দাঊদ : ১১৬০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩১৩,  মিশকাত : ১৪৪৮ হাদিসের মান দুর্বল।

৭। ঈদের সালাতে মহিলাদের অংশ গ্রহন সম্পর্কেঃ

উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كُنَّا نُؤْمَرُ أَنْ نَخْرُجَ يَوْمَ الْعِيدِ، حَتَّى نُخْرِجَ الْبِكْرَ مِنْ خِدْرِهَا، حَتَّى نُخْرِجَ الْحُيَّضَ فَيَكُنَّ خَلْفَ النَّاسِ، فَيُكَبِّرْنَ بِتَكْبِيرِهِمْ، وَيَدْعُونَ بِدُعَائِهِمْ يَرْجُونَ بَرَكَةَ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَطُهْرَتَهُ‏.‏

ঈদের দিন আমাদের বের হওয়ার আদেশ দেওয়া হত। এমন কি আমরা কুমারী মেয়েদেরকেও অন্দর মহল থেকে বের করতাম এবং ঋতুমতী মেয়েদেরকেও। তারা পুরুষদের পিছনে থাকতো এবং তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর বলতো এবং তাদের দু’আর সাথে দু’আ করত-তারা আশা করত সে দিনের বরকত এবং পবিত্রতা। সহিহ বুখারি : ৯৭১

উম্মু ’আতিয়্যাহ (রাযি.) হতে রিওয়ায়াত হয়েছে , তিনি বলেনঃ নবী ﷺ ঈদের দিবসে ঋতুমতী এবং পর্দানশীন নারীদের বের করে আনার আদেশ দিলেন, যাতে তারা মুসলিমদের জামা’আত ও দু’আয় অংশ গ্রহণ করতে পারে। অবশ্য ঋতুমতী নারীগণ সালাতের জায়গা হতে দূরে অবস্থান করবে। এক মহিলা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো কারো ওড়না নেই। তিনি বললেনঃ তার সাথীর উচিত তাকে নিজের ওড়না পরিয়ে দেয়া। সহিহ বুখারি ; ৩৫১, ৯৭১, ৯৭৪, ৯৮০-৮১, ১৬৫২, সহহি মুসলিম : ৮৯০, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৯০, ১৫৫৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৩৬, ১১৩৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩০৭, ১৩০৮।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি নবী ﷺ এর সঙ্গে কখনো ঈদে উপস্থিত হয়েছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ। যদি তার কাছে আমার মর্যাদা না থাকত তা হলে কম বয়সী হওয়ার কারণে আমি ঈদে উপস্থিত হতে পারতাম না। তিনি বের হয়ে কাসীর ইবনু সালাতের গৃহের কাছে স্থাপিত নিশানার কাছে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন। এরপর খুতবা দিলেন। তারপর তিনি মহিলাগনের নিকট উপস্থিত হলেন। তখন তার সঙ্গে বিলাল (রাঃ) ছিলেন। তিনি তখন মহিলাগনের উপদেশ দিলেন, নসীহত করলেন এবং দান সাদাকা করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি তখন মহিলাগণের নিজ নিজ হাত বাড়িয়ে বিলাল (রাঃ) এর কাপড়ে দান সামগ্রী ফেলতে দেখলাম। এরপর তিনি এবং বিলাল (রাঃ) নিজ বাড়ীর দিকে চলে গেলেন। সহিহ বুখারি : ৯৭৭

৮। ঈদুর আজহার দিন সালাতের পর কুরবানি করা

আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

 فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ

তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর। সূরা কাউছার : ২

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا ‏

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১২৩

বারা ইবনু আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী ﷺ এক কুরবানীর ঈদের দিন আমাদের সামনে এক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, এ ঈদের দিন প্রথমে আমাদেরকে সলাত আদায় করতে হবে। এরপর আমরা বাড়ী গিয়ে কুরবানী করব। যে ব্যক্তি এভাবে কাজ করল সে আমাদের পথে চলল। আর যে ব্যক্তি আমাদের সলাত আদায় করার পূর্বে কুরবানী করল সে তার পরিবারের জন্য তাড়াতাড়ি যাবাহ করে নিশ্চয়ই তা গোশত ভক্ষণের ব্যবস্থা করল তা কুরবানীর কিছুই নয়। সহিহ বুখারি : ৯৬৮, সহিহ মুসলিম ১৯৬১, সহিহ আল জামি : ২০১৯, মিসকাত : ১৪৩৫

৯। সালাতের পর ঈদুল আজহার মূল আমল কুরবানির কিছু জরুরি বিধানঃ

(১) একমাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবেঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ*

অর্থঃ এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সুরা হাজ্জ্ব : ৩৭

(২) পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবেঃ

কুরবাণীর পশু হলো, উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। এর দলিল মহান আল্লাহর বলেন,

(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ)

অর্থঃ আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক্ দেয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। কারণ, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। সুরা হজ্জ : ৩৪

মহান আল্লাহ পশুর ধরণ বলেছেন, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। আমাদের সমাজে প্রচলিত গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হলোঃ- উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। সহিহ মুসলিম : ৩০৮২, সুনানে নাসায়ি : ৪৩৮৮, ৪৩৯০

(৩) কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়ত পশুর নির্ধারিত বয়স ঠিক করে দিয়ছে। আর তা হচ্ছে, উঁটের বয়স পাঁচ বছর সম্পূর্ণ হওয়া, গরুর বয়স দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়া, ছাগলের বয়স এক বছর সম্পূর্ণ হওয়া, মেষ বা দুম্বার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া। এর কম বয়সের হলে তা কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না। সহিহ মুসলিম : ৪৯৭৬, সুনানে নাসাঈ : ৪৩৮১, ৪৩৮৩, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১৩৪,

(৪) পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত ও সুস্বাস্থের অধিকারী হতে হবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ চারটি দোষ হতে কুরবানীর পশুর মুক্ত হওয়া জন্য বলেছেন। কুরবানীর পশুর যে চারটি দোষমুক্ত হবে তা হলো-

  • অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট।
  • রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট।
  • খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট। এবং
  • কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।

সহিহ মুসলিম : ৩০৭৬, সুনানে তিরমিজি : ১৪৯৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১৪৪, ৩১২২, সুনানে নাসায়ী : ৪৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯৬

(৫) ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে নাঃ

জুনদুব ইবন সুফয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, সালাত শেষে দেখলেন একটি বকরী যবেহ করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, সালাতের পূর্বে কে যবেহ করলো? সে যেন এর পরিবর্তে অন্য একটি বকরী যবেহ করে। আর যে এখনও যবেহ করেনি, সে যেন আল্লাহর নামে যবেহ করে। সুনানে নাসায়ী : ৪৩৬৯

(৬) আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবেঃ

দাড়ান বা কাত করে শোয়ানোর পর ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলে ছুরি দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করতে হবে। জবেহ করার সময় কমপক্ষে (بسْمُ اللَّهِ)  ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ফরজ কাজ। কারণ, কোন পশুর জবেহ করার পূর্বে আল্লাহর নাম না পাঠ করলে সেই পশুর গোশত খাওয়া হারাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

*فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ*

অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও। সুরা আন’য়াম : ১১৮

মন্তব্যঃ এই কারনে মৃ্ত পড়ে থাকা জন্তু খাওয়া হলাল নয়। কেননা, কেউ জানেনা এই জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে শিকার বা জবেহ করা হয়েছিল কি না!

(৭) জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকেঃ

আতা ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহু থেকে বর্ণিত, আবূ আইয়ূব (রা.) কে আমি প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যামানায় কুরবানীর বিধান কেমন ছিল। তিনি বললেন, কোন লোক তার ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী আদায় করত এবং তা নিজেরাও খেত, অন্যান্য লোকদেরকেও খাওয়াত। অবশেষে মানুষেরা গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তা তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছ। সুনানে তিরমিজি : ১৫০৫, ইবনু মাজাহ : ৩১৪৭

(৮) কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে নাঃ

আলী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তাঁকে নাবী ﷺতাঁর নিজের কুরবানীর জানোয়ারের পাশে দাঁড়াতে আর এগুলোর সমুদয় গোশ্ত, চামড়া এবং পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে নির্দেশ দেন এবং তা হতে যেন কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছুই না দেয়া হয়।  সহিহ বুখারি : ১৭১৭

(৯) কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে নাঃ

উম্মু সালামা (রা্ং) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। সহিহ মুসলিম : ৫০১২, সহিহ মুসলিম : ৫০১৫, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯১)

১০। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ

জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, নরি (স.)-এর সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন-

تقبل الله منا ومنكم

উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।

অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে (আমল) কবুল করুন। ফাতহুল কাদির, খণ্ড-২, পৃ-৫১৭

ওয়াসিলা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (স.) এর সঙ্গে ঈদের দিন সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’। মহানবী (স.) বললেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা। বায়হাকি খন্ড-৩, পৃ-৪৪৬

১১। ঈদের সালাতের পর মুআনাকা বা কোলাকুলি করার বিধান

আমাদের সমাজে ঈদ মানে, ঈদের সালাতে পর কোলাকুলি। ঈদুল ফিতর মানে ছবিতে বা ক্যাপসনে কোলাকুলির দৃশ্য। কিন্তু আমরা কেউ একবারর জন্যও ভেবে দেখেনি কাজটি কি ইসলাম সম্মত। এখানে দুটি প্রশ্ন একটি হলো কোলাকুলি আর একটি হল ঈদের সালাতের পর কোলাকুলি। কোলাকুলি মুলত একটি শরীযত সম্মত সুন্নাহ কাজ। যেমন

আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যাইদ ইবনু হারিসা (রাঃ) যখন (সফর হতে) মদীনায় ফিরে এলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার ঘরে ছিলেন। তিনি এসে দরজা খটখট করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালি গায়ে কাপড় টানতে টানতে তার নিকটে গেলেন। আল্লাহর শপথ! আমি তাকে আগে বা পরে কখনো খালি গায়ে দেখিনি। তারপর তিনি যাইদের সাথে কোলাকুলি করলেন এবং তাকে চুমু খেলেন। সুনানে তিরমিজী : ২৭৩২, মিশকাত : ৪৬৮২, শরহুস সুন্নাহ : ৩৩২৭ মান জইফ।

এখন আসুন ঈদের সালাতের পর বিশেষ কুলাকুলি। মূলত কুলাকুলির হুকুম হল, দীর্ঘদিন পর কোন কাছের মানুষের সাথে দেখা হলে কুলাকুলি করবে। এখন ঈদের জামাতের পর যদি কোন কাছের মানুষের সাথে দেখা হয়, তাহলে সালাম বিনিময়ের পর কুলাকুলি করতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এটিকে ঈদের সালাতের পরের সুন্নত মনে করা বিদআত। কিংবা আমভাবে সবার সাথেই ঈদের নামায শেষ হতেই কুলাকুলি শুরু করে দেয়া একটি রুসুম। সুন্নাত, মুস্তাহাব কিছুই নয়। এটিকে সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি মনে করা বিদআত হবে। এই কুলাকুলি আরেকটি সুন্নাহ বিরোধী কাজ হল তিন বার কুলাকুলি করা। হাদিসে মূলত একবার করার কথা পাওয়া যায়। তিনবারের কোন বিধান নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের প্রচলন হিসেবে এমনটি করা হয়ে থাকে। এটি সুন্নত নয়।

কোলাকুলি সম্পর্কে অধিক জানার জন্য আধুনিক যুগ শ্রেষ্ঠ তিন জন ‘আলিমের ফাতওয়া পেশ করা হলোঃ

১। সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ (মৃত-১৯৯৯) বলেছেন,

“লোকদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা ছাড়া কোলাকুলির কোনো ভিত্তি আছে বলে আমরা জানি না। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, (ইবাদত) কবুল হওয়ার দু‘আ করা। যখন সে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তার জন্য (ইবাদত) কবুলের দু‘আ করবে। এটা সালাফদের কর্ম। পক্ষান্তরে এ উপলক্ষে কোলাকুলি করার ভিত্তি আমি জানি না। এটি লোকদের আচার বা প্রথা মাত্র। সবচেয়ে উত্তম হলো, সাক্ষাতে শুধু করমর্দন করা এবং এটাতেই ক্ষান্ত হওয়া। সে তার ভাইয়ের সাথে করমর্দন করবে এবং তাকে বলবে, ‘হান্নাআকাল্লাহু বি হাযাল ঈদ (আল্লাহ তোমাকে এই ঈদের মাধ্যমে খুশি করুন)’, ‘বারাকাল্লাহু লাকা ফী হাযাল ঈদ (আল্লাহ তোমাকে এই ঈদে বরকত দিন)’ অথবা ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা (আল্লাহ তোমার ও আমার পক্ষ থেকে এই ঈদ কবুল করুন)’; কিংবা অনুরূপ কিছু বলবে। এতে কোনো অসুবিধা নাই। (binbaz.org.sa/fatwas/1533/حكم-المعانقة-في-الاعياد.]

·
২। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সাবেক সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল ‘উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ (মৃত-২০০১) প্রদত্ত ফাতওয়া-

প্রশ্ন: “ঈদের নামাজের পর করমর্দন, কোলাকুলি এবং মুবারকবাদ জানানোর বিধান কী?”

উত্তর: “এগুলো করায় কোনো সমস্যা নেই। কেননা লোকেরা এগুলো ইবাদত বা আল্লাহ’র নৈকট্য অর্জনের জন্য করে না। বরং তারা এগুলো দেশাচারমূলক প্রথা হিসেবে করে এবং একে অপরকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের জন্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো আচার বা প্রথার ব্যাপারে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মৌলিক মান হলো বৈধতা। যেমন বলা হয়—‘সকল (প্রথাগত) বিষয়ের মৌলিক মান হলো বৈধতা, আর শরিয়তপ্রণেতার অনুমতি ছাড়া সকল ইবাদতের মৌলিক মান হলো নিষিদ্ধতা’।” (ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৬ পৃষ্ঠা)

৩। মাদীনাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আচার্য, বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বাদর হাফিযাহুল্লাহ প্রদত্ত ফাতওয়া-

প্রশ্ন: “বর্তমানে আমাদের এখানে বিভিন্ন উপলক্ষে এবং ঈদের দিনগুলোতে লোকেরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে।”

উত্তর: “আল্লাহ’র কসম, আমার কাছে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, এটা সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার সাথে লোকেরা কোলাকুলি করে থাকে। আর তারা তা খুশি ও আনন্দের উপস্থিতির কারণে করে। সুতরাং এ কাজে কোনো ক্ষতি নেই। উদাহরণস্বরূপ কোনো ব্যক্তির যদি বিবাহ উপস্থিত হয়, আর সে তার বিয়েতে আনন্দিত হয়, ফলে সে অপরকে শুভেচ্ছা জানায় এবং কোলাকুলি করে। এগুলোর (উল্লিখিত প্রকারগুলোর) প্রত্যেকটিতেই খুশি ও আনন্দ রয়েছে। যেমন: সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তিকে নিয়ে খুশি হওয়া, বিয়েতে খুশি হওয়া এবং ঈদে খুশি হওয়া।”

কোলাকুলি করা একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। অনেক দিন পর দেখা হলে করা যায় এমনকি ঈদের দিনও করা যায়। আবার কেউ ঈদের ইবাদাত মনে না করে আদায় করলেও বিদআত হবে না। কিন্তু যদি কেউ মনে করে এই সুন্নাহটি ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এটি একটি ইবাদাত তবে তা বিদআতে পরিনত হবে।   

·

১২। ঈদের রাতে সালাত  আদায় করাঃ

আমাদের দেশে অনেক ঈদের রাত মসজিদে কাঠান। কারন তারা একটা জাল হাদিসের উপর আমর করে থাকে। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা পর, শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে ইতিকাফ শেষ করে বাড়িতে যেতে হয়। কিন্তু কিছু ভাই এই যঈফ/জাল হাদিসের কারনে ঈদের রাত মসজিদে থেকে ঈদের দিন সকালে বাড়িতে যান। তাদের এই কাজটি ইবাদতে বাড়াবাড়ি। তারা যে হাদিসের আলোকে এই রাতে ইবাদাত করেন সেই বিখ্যাত জাল হাদিসটি হলো-

ঈদের রাতে কিয়ামুল লাইল পালনের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটি হলোঃ

১. আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদাত করবে তার অন্তর ঐ দিন মরবে না, যে দিন অন্তরসমূহ মরে যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৮২

হাদিসটি জাল বলেছেনঃ

১. এটির সনদে রাবী উমার ইবনু হারুণ রয়েছেন। তার সম্পর্কে ইবনু মাঈন এবং সালেহ জাযারাহ বলেছেন, তিনি মিথ্যুক। ইবনুল জাওয়ী, আল-মাওযু’আত, দ্বিতীয় খন্ডে (পৃষ্ঠা-১৪২) অনুরূপ কথাই বলেছেন। অতঃপর তার একটি হাদীছ উল্লেখ করে তাকে জাল করার দোষে দোষী করেছেন।

২. আর ইবনু হিব্বান দ্বিতীয় খন্ডে (পৃষ্ঠা-৯১) বলেছেন, তিনি নির্ভরযোগ্যদের উদ্ধৃতিতে মুযাল হাদীছ বর্ণনা করতেন এবং সে যাদেরকে নিজের শাইখ হিসাবে দাবী করতেন অথচ তিনি তাদেরকে দেখেননি। এ ব্যক্তি মিথ্যার দোষে দোষী।

৩. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ঈদের রাতের (ইবাদত) সম্পর্কে যত হাদিস উল্লেখ করা হয় সবগুলো নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যাচার।

৪. শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি জাল বলেছেন। (যঈফ ও জাল হাদিস, হাদিস-৫২০)

৫. সমাগ্রীকভাবে হাদিসটি খুবই দুর্বল। ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব। শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ উত্তরগুলো তত্ত্বাবধান করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *