যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০৩ :: শবে বরাত রাতে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু বিদআত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পুর্বের আলোচনা দ্বারা বুঝতে  পেরেছি। এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে সকলে একমত। এই রাতের আলস সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহে কোন দিক নির্দেশনা নাই। তারপরও কিছু আলেমদের মাঝে এই রাতে আমল করা না করা নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়।  এই রাতের আমলের বাহিরে সমজে এমন কতগুলী কাজ চালু চয়েছে যাকে সকলেই একবাক্যে বিদআত বলে অবিহিত করছেন। এমনই কিছু বিদআত সম্পর্কে নিচে ধারনা দেওয়া হলো-

(১) শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের দিনে সিয়াম পালন

আমদের উপমহাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায় ও দিনে সিয়াম পালন করাকে ইসলামি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এখনও এই আমলটি গুরুত্বসহকারে করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দী অনুসরাণী ও সুন্নী নাম ধারি বিদআতিগণ এই আলম চালু রেখেছেন। অবশ্য দুই একজন ব্যতিক্রমও আছে। তারা একটি জাল হাদিসের উপর আমল করে। হাদিসটি হলো-

আলী ইবনু আবূ তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-

“‏ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ

যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে সালাত পড়ো এবং এর দিনে সওম রাখো। কেননা এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ কে আছো আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো রিযিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দান করবো। কে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছো এই প্রার্থনাকারী। ফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮, মিশকাত : ১৩০৮ যঈফ আত তারগীব : ৬৩২। হাদিসের মান জাল শায়খ নাসিরউদ্দিন আলবানী জাল বলেছেন, যাঈফা : ২১৩২

হাদিসটি জাল বলেছেনঃ

১. শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) হাদীসটি জাল বলেছেন। সিলসিলাহ যায়ীফাহ, হাদীস নম্বর : ২১৩২

২.. উক্ত হাদিসের রাবী আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবু সাবরাহ সম্পর্কে ইমামগণ বলেন, তিনি দুর্বল।

৩. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ সম্পর্কে ইবনু হিব্বান সিকাহ বললেও অন্যত্রে তিনি বলেন যে সে হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। ইমাম যাহাবী তাকে সত্যবাদী বলেছেন।

সঠিক কথা হলো- এই হাদিসটি জাল বিধান এর কোন প্রকার হুকুম মানা যাবে না। উম্মতের মাঝে ঐক্যমত আছে কোন প্রকারের জাল হাদিসের উপর আমল করা যাবে না। এই হাদিসে বলা  হয়েছে, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত আত্ম ভোলা নয় যে তিনি সালাত ও সিয়ামের কথা বলবেন বলতে ভুলে গেলের। এই হাদিসটি জাল তাই ও দ্বারাও কোন আমল সৃষ্ট করা যাবে না এবং লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাতে কেন্দ্র করে সিয়াম পালন করা যাবে না। কিন্তু শাবান মান খুবই বরকতময় মাসে এই মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ অন্য মাসের চেয়ে অনেক বেশী  সিয়াম পালন করতেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يَصُومُ‏.‏ فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلاَّ رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ‏.‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ একাধারে সিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর সিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। সিয়াম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর (নফল) সিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে রমজান ব্যতীত কোন পুরা মাসের সিয়াম পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে কোন মাসে বেশী (নফল) সিয়াম পালন করতে দেখিনি। সহিহ বুখারী : ১৯৬৯

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী ﷺ শা‘বান মাসের চেয়ে বেশী (নাফল) সিয়াম কোন মাসে পালন করতেন না। তিনি (প্রায়) পুরা শাবান মাসই সিয়াম পালন করতেন এবং বলতেন, তোমাদের সাধ্যে যতটুকু কুলোয় ততটুকু আমল কর, কারণ তোমরা ক্লান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা (সওয়াব দান) বন্ধ করেন না। নাবী ﷺ এর কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় সালাতই ছিল তাই যা যথাযথ নিয়মে সর্বদা আদায় করা হত। যদিও তা পরিমানে কম হত এবং তিনি যখন কোন (নফল) সালাত আদায় করতেন পরবর্তীতে তা অব্যাহত রাখতেন। সহিহ বুখারী : ১৯৭০

শাবান মাসে বেশী থেকে বেশী সিয়াম পালন করা সুন্নাহ। তা হলে প্রশ্ন হল বেশী বেশী সিয়াম পালনের সময় এর মাঝে যদি লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাত হয়, তবে কি সিয়াম আদায় করলে বিদআত হবে না? প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে মোট ৩ দিনের সিয়াম পালনে করা সুন্নাত যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই তিন দিনকে শরীয়াতের পরিভাষায় “আইয়ামুল বীদ” বলা হয়। এই সিয়াম পালন সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

আবূ যার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ ‏”‏

হে আবূ যার! তুমি যখন কোন মাসে তিনদিন সওম পালন করতে চাও, তাহলে তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখে করবে। সুনানে তিরমিজি ৭৬১, নাসায়ী ২৪২৪, সহীহ আল জামি‘ ৬৭৩, আহমাদ ২১৪৩৭)।

ইবনু মিলহান আল-কায়সী (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نَصُومَ الْبِيضَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ، قَالَ: وَقَالَ هُنَّ كَهَيْئَةِ الدَّهْرِ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আইয়ামে বীয অর্থাৎ চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সওম পালনে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ এগুলো সারা বছর সওম রাখার সমতুল্য। সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৯, সুনানে নাসায়ি : ২৪৩২

যদি কারপ্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করে থাকে। তবে সেও শাবান মাসের এই তিন দিন সিয়াম পালন করতে বিদআত হবে না। এমন কি যারা সাপ্তাহিক সোমবার ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করে তারা ঐ দিন সাপ্তাহিক সিয়াম রাখলে বিদআতা হবে না। যদি কেউ সাধারণত নফল সিয়াম রাখে কিন্তু এই দিনকে ভীষন গুরুত্ব দিয়ে সিয়াম পালন করে তবে  তা  বিদআত হবে।  

(২) এই রাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায় করাঃ

বিদআতিগণ রাতে ইবাদত উপলক্ষে  বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়ের পদ্ধতি আবিস্কার করেছে। তাদের এই আবিস্কারের পিছনে কাজ করছে কয়েকটি জাল হাদিস। জাল হাদিসগুলো হলো-

 ইবনু উমার (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে বলেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে এক শত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তা‘য়ালা তার কাছে ১০০ জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নমের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫০-৫১।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।

৩. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, পঞ্চম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭১।

৪. মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব, আখবারু মাক্কাহ, ফাকিহানী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৮৬-৮৭।

৫. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাতপরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৯

২. বিশিষ্ট তাবিয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকির (১১৫ হি) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরাতে বর্ণনা করেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকআত সালাতে ১০০০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তার কাছে ১০০ ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ৩০ জন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ৩০ জন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ৩০ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ১০ জন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।’

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫১।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।

৩. আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১১৩-১১৪।

৪. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাতপরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৩৯)

৩. দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত সালাত পড়িবে। সূরা ফাতেহার পর প্রত্যেক রাকাতেই সূরা এখলাছ দশবার করিয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়মেই সালাত শেষ করিবে।

১. হাদীসে শরীফে আছেঃ  যাহারা এই সালাত পড়িবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাহাদের চারিটি হাজত পুরা করিয়া দিবেন ও তাহাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন।

২. হাদীস শরীফে আছেঃ মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হইয়া ভুমিষ্ট হয়, উল্লিখিত ৪ রাকাত সালাত পড়িলেও সেইরূপ নিষ্পাপ হইয়া যাইবে। (মেশকাত)

৩. হাদীস শরীফে আছেঃ  যাহারা এই সালাত পাঠ করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদের পঞ্চাশ বৎসরের গুনাহ মার্জনা করিয়ো দিবেন। (তিরমিজী)

৪. আরও হাদীসে আছেঃ যাহারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মরতবা দরূদ শরীফ হযরত (ﷺ) এর উপর পাঠ করিবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাহাদের উপর দোজখ হারাম করিবেন। হযরত (দঃ) ও সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন। (সহিহ বোখারী)

বর্ণনাগুলি পাবেনঃ মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-২৩৬-২৪১।

যারা জাল বলেছেনঃ

১. এই আমলটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর কোন সনদ নাই। সহিহ, যয়ীফ বা জাল কোন সনদেই কথাগুলী বর্ণিত হয় নাই।

২. উপরের কথাগুলো সবই বানোয়াট। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা যে, গ্রন্থকার এখানে মিশকাত, তিরমিযী ও বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন ভিত্তিহীন কিছু কথার জন্য, যে কথাগুলো এ গ্রন্থগুলো তো দূরের কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই নেই। এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সরলপ্রাণ বাঙালি পাঠক।  হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৫০

এই সালাত বিদআত কেননা, ইসলামে এ ধরণের নামায পড়ার নিয়ম সম্পূর্ণ নতুন আবিস্কৃত বিদআত। এ ব্যাপারে সর্ব যুগের সমস্ত আলেমগণ একমত। কারণ, তা রাসূল ﷺ এবং খোলাফায়ে রাশেদীন কখনো তা পড়েন নি। তাছাড়া ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, আহমদ বিন হাম্বল, সুফিয়ান সাওরী, আওযাঈ, লাইস প্রমূখ যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামগণ কেউ এ ধরণের বিশেষ নামায পড়ার কথা বলেন নি। এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি হাদীস বিশেষজ্ঞদের মতে বানোয়াট এবং জাল। যেমন, ইব্‌নুল জাওযী উক্ত হাদীসটি মাওযু’আত (জাল হাদীস সংগ্রহ) কিতাবে তিনটি সনদে উল্লেখ করে বলেছেন, এটি যে বানোয়াট তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনটি সনদেই এমন সব বর্ণনাকারী রয়েছে যাদের অধিাকংশরই পরিচয় অজ্ঞাত। আরো কতিপয় বর্ণনাকারী খুব দূর্বল। সুতরাং হাদীসটি নিশ্চিতভাবে জাল। আল মাউযূআত ২য় খন্ড, পৃ- ১২৭-১৩০

এই বিদআতি সালাতের ইতিহাস-

ইমাম ত্বরতূশী (রাহ:) বলেন, শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে একশত রাকআত নামায পড়ার পদ্ধতি সর্ব প্রথম যে ব্যক্তি চালু করে তার নাম হল ইব্‌ন আবুল হামরা। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের অধিবাসী। তিনি ৪৪৮ হিজরী সনে বাইতুল মাকদিসে আসেন। তার তেলাওয়াত ছিল খুব সুন্দর। তিনি শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে মসজিদুল আকসায় এসে নামায শুরু করে। আর এক লোক তার পেছনে এক্তেদা করে। অতঃপর আর একজন আসে। কিছুক্ষণপর আরে আরও একজন। এভাবে নামায শেষে দেখা গেল বিরাট জামাআতে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তী বছর শবে বরাতে সে ব্যক্তির সাথে প্রচুর পরিমাণ মানুষ নামাযে শরীক হয়। এভাবে এ নামাযটি মসজিদে আক্বসা সহ বিভিন্ন মসজিদে পড়া আরম্ভ হয়ে গেল। কিছু মানুষ নিজেদের বাড়িতে এ নামায পড়া শুরু করে দিল। পরিশেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যেন এটি একটি সুন্নাত। (আত্‌ ত্বারতুশী রচিত আত্‌তাহযীর মিনাল বিদা। পৃষ্টা: ১২১ ও ১২২)।

রাতে নফল ইবাদাত করলে বিদআত হবে কেন?

 যে কোন রাতে বা দিনে যে কেউ ইচ্ছামত জিকির-আসগান, কুরআন তেলাওয়াত, নফল সালাত, দুয়া -মুনাজাত, ইস্তিগফার, কান্নাকাটি, কবর যিয়ারাত, দান-সাদকাহ, ওয়াজ-নাসীহাত প্রভৃতি নেক আমল আদায় করতে পার। এই সকল আমাদের সাথে সময় বা সংখ্যা নির্দিষ্ট করা যাবে না যা বিদআতের আলোচনা থেকে শিখেছি। কারন সংখ্যা ও সময় নির্দষ্ট করার একমাত্র ক্ষমতা হলো মহান আল্লাহর  আর তিনি তার রাসূল সাঃ মাধ্যমে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি সামান্য কিছুই গোপন করেন নাই।  নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলার সন্ত্বষ্টি অর্জনের জন্য  দুয়া-মুনাজাত, সালাত, সিয়াম, দান-ছাদাকাহ, কুরআন তিলাওয়াত, রাত্রি জাগরণ খুবই ভাল কাজ। এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করবে না এবং বিদআত ও বলবেনা। কিন্তু যখন কেউ কুনআন সুন্নাহর দলীল ব্যতিত একটি মাত্র রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদাত করবে তখন তা বিদআত হয়ে যাবে। দলীলহীনভাবে একটি রাতের নাম শবে বরাত বা সৌভাগ্য রজনী অথবা মুক্তি রজনী রেখে তার উপর ভ্রান্ত বিশ্বাস রেখে আমল করলে ঐ সকল সুন্নাহ সম্মত ইবাদাতও বিদআতে পরিনত হবে। যদি কেউ নিয়মিত প্রতি রাতেই এই সকল নফল ইবাদাত করে থাকে তবে ঐ রাতেও সে নফল ইবাদাত করতে পারে বিদআত হবে না। যার সিয়াম পালনের অভ্যাস তিনি এ দিন সিয়াম পালন করতে পারেন। যেমন হাদিসে এসেছেঃ আবু কাতাদাহ ইবনে মিলহান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে শুক্লপক্ষের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম রাখার জন্য আদেশ করতেন।’ (হাদিসটি নেয়া হয়েছে রিয়াযুস স্বা-লিহীন-১২৭১; আবূ দাউদ ২৪৪৯; নাসায়ী ২৪৩২)।

তাই যদি কারও প্রত্যেক চদ্র মাসে শুক্ল পক্ষের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের সিয়াম পালন করার অভ্যাস থাকে আর সে এই দিন সিয়াম পালন করে তবে বিদআত হবে না। কিন্তু কোন ব্যাক্তি যদি বছরের কখনও সিয়ম পালন করেনা শুধু মিথ্যা বিশ্বাসের উপর শাবান মাসের ১৫ তারিখের সিয়াম পালন করে তবে তা নিঃসন্দেহে বিদআত হবে।

ঠিক তেমনিভাবে বছরের কোন সময় দুয়া-মুনাজাত, সালাত, দান-ছাদাকাহ, কুরআন তিলাওয়াত, রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে কাটালাম না শুধু মিথ্যা বিশ্বাসের উপর শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে কাটালাম তবে বিদআদ হবে। আমাদের একমাত্র আদর্শ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নবুওয়াতের তেইশ বছরের জীবনে কখনো তার সাহাবীগণকে সাথে নিয়ে মক্কায় মাসজিদুল হারামে অথবা মদীনায় মাসজিদে নবুবীতে কিংবা অন্য কোন মাসজিদে একত্র হয়ে উল্লিখিত ইবাদাত-বন্দেগীসমূহ করেছেন এমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর সাহাবায়ে কিরাম (রা.) তথা খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে কেহ জানতো না শবে বরাত কি এবং এতে কি করতে হয়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘আমল প্রত্যক্ষ করেছেন। আমাদের চেয়ে উত্তম রূপে কুরআন অধ্যয়ন করেছেন। তারা তাতে শবে বরাত সম্পর্কে কোন দিক-নির্দেশনা পেলেন না। তারা তাদের জীবন কাটালেন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে, অথচ জীবনের একটি বারও তাঁর কাছ থেকে শবে বরাত বা মুক্তির রজনীর ছবক পেলেন না? যা পালন করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে যাননি, যা কুরআনে নেই, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের তা’লীমে নেই, সাহাবীগণের ‘আমলে নেই, তাদের সোনালী যুগের বহু বছর পরে প্রচলন করা শবে বরাতকে নিঃসন্দেহে বিদআদ। হয়তো মনে প্রশ্ন হতে পারে এতদিন ধরে চলছে। মাদ্রাসার বড় হুজুরও আদায় করছে তা হলে বিদআত হয় কি করে? তারা কি কুনআন হাদিস কম বুঝে?

মনে রাখবেন ইসলাম ধর্মে যতগুলো বিদ‘আত চালু হয়েছে তার শতভাগই এক শ্রেনী আলেম দ্বারা। তারা মানুষের বেশী ভাল করতে গিয়ে, ইবাদাত পালনের প্রতি ঝোক সৃষ্ট করতে গিয়ে এই সকল বিদআতের প্রচলণ করেছেন। কোন কালেই কোন সাধারণ মানুষ বা কাফির মুশরিকদের মাধ্যমে বিদআত চালু হয়নি বা প্রসারও ঘটেনি। বিদআত সম্পর্কে ষ্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। কোন আলেমের অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণ করা যাবে না। সন্দেহ হলে ভাল মুহাক্কিক আলেমের পরামর্শ গ্রহন করতে হবে। কারন কোন কারনে যদি আমি বিআদতি আমল করি বা আমার কারনে বিদআতের প্রসার ঘটে এ জন্য তাদেরকে আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে। যে দিন বলা হবেঃ

*وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ*

অর্থঃ আর সে দিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রাসূলদের আহ্বানে কিভাবে সাড়া দিয়েছিলে? (সূরা কাসাস ৬৫)

সে দিন তো এ প্রশ্ন করা হবে না যে, তোমরা অমুক বড় হুজুরের মত অনুযায়ী বা অমুক ইমামের মত অনুযায়ী ‘আমল করেছিলে কিনা। যারা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ মত ‘আমল করবে তারাই সে দিন সফল কাম হবে। কাজেই বিআদত সম্পর্কে শতর্ক হই। আমার আমলকে কেউ বিদআত বললে, সম্ভব হলে নিজের আমলের পক্ষের দলীল জেনে নেই। দলীল জানা থাকলে আমলেন প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হয় এবং কিয়ামতের দিন (উপরের আয়াতে বর্ণিত) প্রশ্নের উত্তরে বলা যাবে। হ্যা, তোমার রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়ে সুন্নাহ সম্মত আমল করেছি।


(৩) হালুয়া-রুটি খাওয়াঃ

শবে বরাত উপলক্ষ্যে আমাদের সমাজে হালুয়া রুটি তৈরি বেশ প্রচলন আছে। এই বিদআতি কর্মকান্ডের জন্য দায়ী জাল হাদিস।  এই কথাগুলিকে জাল হাদিস বলতেও ঘৃনা হয়। অথচ যুগ যুগ ধরে অন্ধ ও অজ্ঞ মুসলীমদের মাঝে হাদিস হিসাবে প্রচলিত। এমনই একটি জাল হাদিস হলো-

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে।

হাদীসট জাল কারনঃ

১. রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হাদীসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। মাসিক আল কাউসার, প্রকাশ কাল, আগস্ট ২০১৪

২. এ রত্রিতে হালুয়া-রুটি তৈরি করা, খাওয়া, বিতরণ করা, মিষ্টান্ন বিতরণ করা ইত্যাদি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কর্ম। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯

সমাজে প্রচলিত এমনই আরেকটি জাল হাদিস হলো-

কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবরক শহীদ হয়েছিল, তখন কিছুদিন কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না সেই ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই দিনে ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়

সকল মুসলিম জানেন যে, ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসের সাত তারিখে। এই রক্তক্ষয়ী ও অসম যুদ্ধে কাফেরদের আঘাতে নবী ﷺ দাঁত ভেঙ্গে দিয়ে ছিল যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এরই সুযোগ নিয়ে অনেক বিদআতি জাহেল প্রচার করে কিছুদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। তিনি এই সময়টা নরম বা হালুয়া রুটি খেতেন। তার সাথে সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য ঐ দিন হালূয়া রুটি খেতে হবে। দেখুন অপরাধী কিভাবে তার অপরাধের সাক্ষী রেখে যায়। ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে ও এরা হালূয়া রুটি খায় শাবান মাসে। তিনি নরম খাবার কি শুধু একদিন খেয়ে ছিলেন? কুরআন সুন্নাহ সম্মত আমলেতো নয়ই বরং তাদের কথাগুলী সম্পূর্ণ অযৌক্তিও বটে। বিদআতীদের অবস্থা হল, আল্লাহর নবীর রেখে যাওয়া সাধারণ সুন্নতগুলোও পালন করে না সুবিধামত আমলের নামে বিদআতী কাজ করা। বিদআতী আমলের ভীরে তারা ফরজ সালাত, সিয়াম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদির কথা ভূলে যায়। তারপর সমাজের অনেক অজ্ঞ বিদআতি আলেম দাবি করে থাকে যে, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি অথবা অন্য কোনো বিশেষ খাবার তৈরি করা শরীয়তে নাজায়িয তো নয়ই বরং জায়িয এবং খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। যারা এটাকে বিদয়াত বা নাজায়িয বলে থাকে তাদের কথা মোটেও শরীয়তসম্মত ও গ্রহণযোগ্য তো নয়ই বরং তা সম্পূর্ণরূপে কুফরী ও গুমরাহীতে পরিপূর্ণ। এই হলো একজন বিদআতি আলেমের কথা।

মুহাক্কিক আলেমদের মনে ঐ নির্দষ্ট দিনে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে, মিথ্যা নেকীর উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি বানান সম্পূর্ণ বিদআতি কাজ।

(৪) এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা 

উপমহাদেশে যারা বিদআতে ধারক বাহক তাদের অনুষ্ঠান হবে অথচ মিলাদ হবে না ভাবা যায় না। শবে বরাতের রাত আর মসজিদে এশার সালাত পর মিলাদ একটি রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। আর ৩০/৩৫ বছর ঢাকা আছি অনেক মসজিদে সালাত আদায় করা সৌভাগ্য হয়েছে। মাজার পুজারী বিদআতী ইমাম নয়, ঢাকার অনেক নামিদামি মসজিদের ইমামকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শবে বরাতের মিলাদে জিলাপি কেনার জন্য চাঁদা আদায় করতে দেখেছি। এই রাতকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে মিলাদের জিলপি কেনার টাকা তোলা হয়। বলূত তো এটা কার সুন্নাহ? রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগন কি এইভাবে মিলাদের আয়োজন করেছেন। আমাদের চার মাযহাবের কোন ইমান কি এমন আমল করতে বলেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ ছাড়াও বিদআতিদের খানকাহ ও দরগায়সমূহে বিশাল আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মিলাদ শেষে চলে মিষ্টি খওয়ার ধুম। চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম জিকিরের মজলিশ। এ সব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়।

(৫) মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করাঃ

চাকুরির সুবাধে চট্রগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখান সৌভাগ্য হয়েছে। এ সব মসজিদে, এ রাতে বিদআতীগণ মিলাদ উপলক্ষে রান্না করা খাবার (পায়েশ, ভাত-গোশতের তরকারী, হালূয়া-রুটি) জমা করে। এশার সালাতের পর সম্মিলিতভাবে মিলাদের আয়োজন করে এবং মীলাদ শেষে সকলে মিলে ঐ জমা করা খাদ্য খায়। মনে হবে, কোন একটি অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া চলছে। এই কাজকে তারা ইসলামি কাজ মনে করে নেকীর জন্য করছে অথচ এর কোন দলীল প্রমান কুরআন সুন্নাহতে নেই। এই ভাবে খেতে অসুবিধা নেই কিন্তু নির্দষ্ট দিনে নেকী আশায় আমল করলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমানিত হতে হবে নতুবা বিদআত হবে।

(৬) এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করাঃ

ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করার জন্য কোন সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। আমাদের মাঝে অনেকেই এই রাতে কিয়ামে ব্যস্ত থেকেছেন কিন্তু সহিহ বুঝ আসার পর এই আমল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু কিছু মুসলীম ভাইকে দেখা যায় এই রাতের মায়া ছাড়তে পারে না। তারা এই রাতের নির্দিষ্ট সালাত ছেড়ে দিলেও এশা সালাতের পর ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকিরের মাহফিল কায়েম করে থাকেন। প্রশ্ন হল এই আলোচনা ও জিকিরের এই রাতে কেন? যদি তারা বছরের বিভিন্ন সময় এই ধরনের মাহফিল করে থাকে তবে কোন সমস্যা নেই কিন্তু যদি তারা সমগ্র বছরের শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে এমন আমল করারে জরুরী মনে করে তবে তা আমল নয় বিদআতে পরিনত হবে। কারন যখন কোন আমল সময়ে সাথে করা কে জরুরী মনে করা হবে তবে তার দলীল প্রয়োজন হবে। আমলটি রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীদের থেকে প্রমানিত হতে হবে।

অনেক মসজিদে আলোচনা করার পর আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক (১২/২০ রাকাত) সালাত আদায় করার সময় প্রদান করেন। এরপর লম্বা একটি সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। কোন কোন মসজিদে আরার আলোচনা শেষ করে ব্যক্তিগত আমল জিকির, সালাত, তিলওয়াত করার সময় প্রদান করে। ফজর সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। ইসলামি আলোচনা, সালাত, তিলওয়াত, জিকির এবং সম্মিলিত মুনাজান কোনটিই বিদআত নয়। কিন্তু শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে সময়ে সাথে নির্দষ্ট করার জন্য বিদআত পরিনত হবে।

(৭) এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা

সুনানে তিরমিজে এই জঈফ হাদিসের কারনে অনেক এই দিন কবর জিয়ারতকে জরুরী মনে করে থাকে। বিখ্যাত সেই জঈফ হাদিসটি হলো-

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।

পূর্বের আলোচনায় থেকে জানতে পেরেছি হাদিসটির মান জঈফ। তারপরও যদি হাদীসটিকে সহিহ বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলেও কি কোন প্রকার আমল প্রমাণিত। না এ হাদিস দ্বারা কোন আমল প্রমানিত হয় না। যদি কেউ হাদিসটির উপর আমল করতে চায় তবে সে একাকি করব জিয়ারত করতে পারে ঠিক যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। মনে রাখতে হবে সম্মিলিত কবর জিয়ারত এই বিদআতি আমল। আল্লাহু আলাম

(৮) এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা :

আমাদের সমাজে সাধারণ বিহাহের আয়োজনে, আনন্দ উত্সবে বা কোন খুসির কারনে আলোক সজ্জা করা হয়। আতশবাজী ফুটান হয়। এই দুটি কাজই সময় ও অর্থের অপব্যয় করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটি কাজই হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সুরা ইসরা : ২৭

ইবাদাত মনে করে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করা বিদআত। সুতারং এই কাজটি হারাম হওয়া পাশাপাশি বিদআতও বটে। তাই এ রাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা যাবে না। এ কাজ শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে গ্রীক ধর্মের একটি প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালীপূজা নামে মশহুর হয়। আলোক সজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশ করে। যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয় না বরং এগুলো অগ্নি পুজকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *