মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইদ্দত’ (عدة) হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়, যা কোনো নারী তার স্বামী থেকে তালাক বা মৃত্যু পর পালন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো নারীর গর্ভাশয়ের পবিত্রতা নিশ্চিত করা, যাতে তার বংশপরিচয় নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।
ইদ্দত হলো এমন একটি সময়সীমা, যা তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পালন করতে হয়। ইদ্দতের মাধ্যমে ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে, পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এবং বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ইদ্দতেত প্রধান প্রধান উপকারি দিক হলো—
১. ইদ্দত নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে
মানসিক প্রশান্তি : তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীদের জন্য ইদ্দত একটি মানসিক প্রশান্তির সুযোগ দেয়। এই সময়টুকুতে তারা শোক কাটাতে পারে এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে। জোর করে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়ানো থেকে এটি নারীকে রক্ষা করে।
ভরণপোষণ : তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার স্বামীর ঘরেই থাকবে এবং তার ভরণপোষণ স্বামীকেই বহন করতে হবে। এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কারণ এই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং জীবিকা অর্জনের জন্য প্রস্তুত নয়।
শোভনতা ও সম্মান : বিধবা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা তার স্বামীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায়। এটি সমাজে তাকে একটি সম্মানজনক অবস্থান দেয় এবং তার দুঃখের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে।
২. পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে
সমঝোতার সুযোগ : তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতকাল সাধারণত তিন মাসিক। এই সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার সুযোগ পায়। যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে আবার সম্পর্ক ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা সহজেই করতে পারে। এটি অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সংসারকে নতুন করে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে।
নতুন সম্পর্কের প্রস্তুতি : ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এটি সমাজে এক ধরনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। নতুন সম্পর্কের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা নারী ও তার সম্ভাব্য নতুন পরিবারের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
৩. বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে
গর্ভধারণ নিশ্চিত করা: ইদ্দতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নিশ্চিত করে যে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী গর্ভবতী কি না। যদি কোনো নারীর গর্ভে তার প্রাক্তন স্বামীর সন্তান থাকে, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে সে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারে না।
ইদ্দতের কারণে বংশের পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। যদি নারীটি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিবাহ করে এবং গর্ভবতী হয়, তাহলে কার সন্তান তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইদ্দত এই ধরনের জটিলতা দূর করে এবং সন্তানের পিতৃত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এটি সন্তানের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে।
সুতরাং, ইদ্দতকে শুধু একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে, এটি নারী, পরিবার এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।
ইদ্দত পালনের বিধান
ইদ্দত পালন করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব, যদি তার মাসিক হয়। যাদের মাসিক হয় না, তাদের জন্য এই সময়কাল তিন মাস। গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো নারীর জন্য ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। তবে, যদি তিনি গর্ভবতী হন, তবে তার ইদ্দতকালও সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতের এই সময়কালে নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না। ইদ্দতের সময়কাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। নিচে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো–
১. তালাকের ইদ্দত
তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল নির্ভর করে নারীর শারীরিক অবস্থার উপর।
ক. মাসিক হয় এমন নারীর জন্য :
তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব। এই সময়ের মধ্যে যদি তার তিনবার মাসিক হয়, তাহলে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ
এবং তালাক প্রাপ্তাগণ তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সুরা বাকারা : ২২৮
খ. মাসিক হয় না এমন নারীর জন্য :
যে সকল নারীর মাসিক হয় না (বয়সের কারণে বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে), তাদের জন্য ইদ্দত হলো তিন মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ ؕ
তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। সুরা তালাক : ৪
গ. গর্ভবতী নারীর জন্য :
গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পর পরই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, এমনকি যদি তা তালাকের এক মুহূর্ত পরেই হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا
আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪
২. স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত
যদি কোনো নারীর স্বামী মারা যায়, তবে তার ইদ্দতকাল হলো:
ক. সাধারণ নারীর জন্য :
স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। এই সময়কালে তাকে শোক পালন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّعَشۡرًا ۚ فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ
আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন তারা নিজদের ব্যাপারে বিধি মোতাবেক যা করবে, সে ব্যাপারে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবগত। সূরা বাকারা : ২৩৪
যায়নাব বিনতু আবূ সালামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী হাবীবাহ (রাযিঃ) এর কাছে তার পিতা আবূ সুফইয়ানের ইনতিকালের খবর পৌঁছল তখন তৃতীয় দিনে তিনি হলুদ বর্ণের সুগন্ধি চেয়ে পাঠালেন এবং তার দু’হাতে গায়ে ভাল করে তা মেখে নিলেন। আর বললেন, আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, যে মহিলা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার পক্ষে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা হালাল নয়। তবে স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। কেননা সে তার স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশদিন শোক পালন করবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৬, সুনানে আবু দাউদ : ২৩১৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৭, আহমাদ : ২৬৭৫৪, সহীহ আত্ তারগীব : ৩৫৩৭।
খ. গর্ভবতী নারীর জন্য:
যদি কোনো নারী তার স্বামীর মৃত্যুর সময় গর্ভবতী থাকে, তাহলে তার ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত, ঠিক তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর মতোই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا
আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪
মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সুবায়’আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে।সহিহ বুখারি : ৫৩২০, মিশকাত : ৩৩২৮, সুনানে নাসায়ী : ৩৫০৬
আবূ সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এলেন এবং বললেন, এক মহিলা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেছে। সে এখন কীভাবে ইদ্দত পালন করবে, এ বিষয়ে আমাকে ফতোয়া দিন। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম্ দু’টির যেটি দীর্ঘ, তাকে সেটি পালন করতে হবে। আবূ সালামাহ (রহ.) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর হুকুম তো হলঃ গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অর্থাৎ আবূ সালামাহর সঙ্গে আছি। তখন ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) তাঁর ক্রীতদাস কুরায়বকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন, সুবায়’আ আসলামিয়া (রাঃ)-এর স্বামীকে হত্যা করা হল, তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপরই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। যারা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবুস্ সানাবিল তাদের মধ্যে একজন। সহিহ বুখারি : ৪৯০৯, ৫৩১৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪
নোট : ইদ্দত পালন করা আল্লাহর স্পষ্ট হুকুম, তাই এটি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। এক কথায় বলেতে গেলে -তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দত ৩ হায়েজ/৩ মাস। স্বামী মারা গেলে ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন কিন্তু গর্ভবতী হলে ইদ্দত সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত।
ইদ্দত পালনের সময় করণীয়
ইদ্দত পালনকারী নারীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়:
১. বাড়িতে অবস্থান:
ইদ্দতকালীন সময়ে নারীকে তার স্বামীর বাড়ি বা যেখানে বিচ্ছেদ হয়েছে, সেখানেই অবস্থান করতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
২০৩১। ফুরাইআ বিনতে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী তার (পলাতক) গোলামের খোঁজে রওয়ানা হয়ে কাদূম নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলেন। তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে। যখন আমার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমি আমার পরিবার-পরিজন থেকে অনেক দূরে আনসারদের বসতিতে অবস্থান করছিলাম। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যখন আমার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন আমি আমার পরিজন ও ভাইদের বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করছিলাম। তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য কোন মাল রেখে যাননি এবং তার এমন কোন মালও নেই, আমি যার ওয়ারিস হতে পারি, এমনকি তার মালিকানাভুক্ত কোন ঘরও নাই। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পরিবার ও ভাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি। আর এটা আমার জন্য অধিক প্রিয় এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে সুবিধাজনকও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি চাইলে তা করতে পারো। মহিলাটি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে আমার জন্য আল্লাহর এই ফায়সালা শুনে খুশি মনে ফিরে যেতে লাগলাম।আমি মসজিদে অথবা তাঁর কোন এক হুজরার নিকটে পৌঁছতেই, তিনি আমাকে ডেকে বলেন, তুমি জানি কী বলেছিলে? মহিলাটি বললো, আমি পুনরায় তাকে আমার বিবরণ শুনালাম। তিনি বলেনঃ তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান করো, যেখানে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছো, যতক্ষণ না তোমার ইদ্দাত পূর্ণ হয়। ফুরাইআ (রাঃ) বলেন, এরপর আমি সেখানেই চার মাস দশ দিন ইদ্দাত পালন করলাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৩১, সুনানে তিরমিযী : ১২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৮, ৩৫২৯, ৩৫৩০, ৩৫৩২, সুনানে আবূ দাউদ : ২৩০০, আহমাদ : ২৬৫৪৭, ২৬৮১৭, মুয়াত্তা মালেক : ১২৫৪, দারেমী : ২২৮৭, ইরওয়াহ : ২১৩১।
তবে জরুরি প্রয়োজনে ইদ্দাত পালনকালে দিনের বেলায় ঘরের বাইরে যাওয়া জায়িয। যেমন সহিহ হাদিস এসেছে-
উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মারওয়ানের নিকট প্রবেশ করে তাকে বললাম, আপনার পরিবারের এক মহিলাকে তালাক দেয়া হয়েছে। আমি তার ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম যে, সে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। সে বললো, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) আমাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইদ্দত পালনকালে) স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন। মারওয়ান বলেন, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) তাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তা আপত্তিকর বলেছেন। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ফাতেমাহ হিংস্র পশুর উৎপাতের এলাকায় বাস করতেন বলে তার জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। আর এ কারণেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বেলায় এরূপ অনুমতি দিয়েছিলেন। সুনানে [MIH1] ২০৩২
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খালা ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি তার (খেজুর বাগানের) খেজুর পাড়ার ইচ্ছা করলেন। এক ব্যক্তি তাকে বাইরে যেতে বাধা দিলেন। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ তুমি তোমার বাগানের খেজুর পাড়ার জন্য বাইরে যেতে পার। কারণ সম্ভবত তা থেকে অন্যদের সাদাকা করবে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৪, দারিমী : ২৩৩৪, ইরওয়া : ২১৩৪।
২. সাজসজ্জা ত্যাগ করা :
স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দতের সময় নারীকে কোনো ধরনের সাজসজ্জা, সুগন্ধি, রঙিন পোশাক এবং অলঙ্কার পরিধান থেকে বিরত থাকতে হয়। এটি শোক প্রকাশের অংশ।
যাইনাব (রাঃ) বলেনঃ আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি: এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। তার চোখে অসুখ। তার চোখে কি সুরমা লাগাতে পারবে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ অথবা তিন বার বললেন, না। তিনি আরও বললেনঃ এতো মাত্র চার মাস দশ দিনের ব্যাপার। অথচ জাহিলী যুগে এক মহিলা এক বছরের মাথায় বিষ্ঠা নিক্ষেপ করত। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৬, ৫৩৩৮, ৫৭০৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৩
উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণীর স্বামী মারা গেছে, সে (’ইদ্দতকালে লাল বা) হলুদ রংয়ের কাপড় এবং গেরুয়া রঙের কাপড় পরবে না, অলঙ্কার পরবে না, চুলে বা হাতে মেহেদী লাগাবে না এবং চোখে সুরমা লাগাবে না। মিশকাত : ৩৩৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৩০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৫, আহমাদ : ২৬৫৮১, সহীহ আল জামি : ৬৬৭৭।
উম্মু আতিয়্যাহ ( হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মহিলার জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা হালাল হবে না।। সুরমা ও রঙিন কাপড়ও ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সূতাগুলো একত্রে বেঁধে হালকা রং লাগিয়ে তা দিয়ে কাপড় বুনলে তা ব্যবহার করা যাবে। সহিহ বুখারি : ১৩১৩, ৫৩৪২, সহিহ মুসলিম ৯৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৩০২, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৮৭, ইরওয়া : ২০১৪, সহীহ আল জামি : ৭৬৪৯
৩. অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ:
ইদ্দত চলাকালীন সময়ে কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না।
ইদ্দতের এই বিধানগুলো পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও বংশের পবিত্রতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। ইসলামে তালাকের পর নারীর ভরণ-পোষণ এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই বিধানগুলো নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১. ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ:
ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়, যা একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করার আগে অবশ্যই পালন করতে হয়। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে স্বাভাবিক ভরণ-পোষণ প্রদান করা।
১. তালাকে রজঈ (প্রত্যাবর্তনীয় তালাক)
যদি কোনো নারীকে তালাকে রজঈ (অর্থাৎ এক বা দুই তালাক) দেওয়া হয় এবং সে ইদ্দত পালন করে, তবে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্বামী তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না, বরং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই, এই সময়ে নারীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা খরচ স্বামীর ওপরই থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ
তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সুরা তালাক : ০৬
আয়াতে গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।
২. তালাকে বায়িন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক)
যদি তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার স্বামী তার ভরণ-পোষণের খরচ বহন করতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ
আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা তালাক : ০৬
আর যদি যদি নারী গর্ভবতী না হয় তবে বায়িন তালাক এর ক্ষেত্রে এই বিধানটি কিছুটা জটিল। বেশিরভাগ ফিকাহবিদ ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের সাধারণ বিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিছু ফিকহবিদদের মতে, তালাকে বায়িনের পর নারীকে কেবল বাসস্থান দেওয়া হবে, তবে তার খাদ্য, বস্ত্র বা অন্যান্য খরচ স্বামীর ওপর বর্তায় না। কারণ এই তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের পক্ষের দলিল হলো-
আবূ বকর বিন আবী জাহম বিন সুখাইর আদাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ্ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষের নির্দেশ দেননি। সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৫, ২০৩৬, সহিহ মুসলিম ১৪৮০, আবী দাউদ : ১৯৭৬-১৯৮০
ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল এমন যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। তিন তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার কারণে তিনি তার স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করবেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে তার স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার অধিকার দেননি।
বিষয়টি ব্যতিক্রমের কারণ- তালাকে বাইন। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দেন, তাহলে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই, ইসলামী আইন অনুযায়ী, এই ধরনের তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আর স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করার বা খোরপোষ পাওয়ার অধিকার থাকে না।
ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল তিন তালাকের। যেহেতু এটি একটি তালাকে বাইন ছিল, তাই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার নির্দেশ দেননি। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার স্বামীর থেকে কোনো খোরপোষ বা বাসস্থান পাবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত : এই হাদীসটি নিয়ে কিছু সাহাবা এবং ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। যেমন, উমর (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) এর মতো কিছু সাহাবা মনে করতেন যে, স্ত্রী রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা হোক বা বাইন তালাকপ্রাপ্তা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তার খোরপোষের অধিকার রয়েছে। তবে, অনেক সাহাবা এবং ফকীহ এই হাদীসটিকে সমর্থন করেছেন এবং তালাকে বাইনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থানের অধিকার না থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।
২. ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ
ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এই ভরণ-পোষণকে ‘মুতা’আ’ বলা হয়। মুতা’আ হলো এমন একটি উপহার বা আর্থিক সহায়তা, যা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দেবে, যা তার আর্থিক সামর্থ্য এবং স্ত্রীর সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি তালাকের কারণে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের একটি রূপ। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَلِلۡمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ
আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য থাকবে বিধি মোতাবেক ভরণ-পোষণ। মুত্তাকীদের উপর আবশ্যক। সূরা বাকারা : ২৪১
/২০৩৭। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। জাওন-কন্যা ’আমরাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পেশ করা হলে সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে (আল্লাহর) আশরয় প্রার্থনা করে। তিনি বলেনঃ তুমি এক মহান সত্তার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করেছো। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিলেন এবং উসামাহ অথবা আনাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলে তদনুযায়ী তিনি তাকে (উপঢৌকনস্বরূপ) তিনখানা সাদা লম্বা কাপড় দেন।
সহীহুল বুখারী ৫২৫৪, নাসায়ী ৩৪১৭, বায়হাকী ৭/৩১৮, ইরওয়াহ ৭/১৪৬।
মুতা’আর মূল উদ্দেশ্য হলো তালাকের পর নারীর প্রতি সহানুভূতি ও মানবিকতা প্রদর্শন করা। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে একটি সদয় কাজ, যা তালাকের তিক্ততা কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ
বাংলাদেশের আইনও এই ইসলামী বিধানকে সমর্থন করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, তালাকের পর একজন নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী। এই আইন অনুসারে, ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।
২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেয়, যেখানে বলা হয় যে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ইদ্দতকালের পরেও ভরণ-পোষণ দাবি করতে পারে, যদি সে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম হয়। এই রায়টি ইসলামী বিধানের ‘মুতা’আ’র নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং নারীর অধিকার রক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ।
ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ প্রদান করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ যা ‘মুতা’আ’ নামে পরিচিত। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এটি স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী একটি আর্থিক সহায়তা বা উপহার হিসেবে গণ্য হবে।