নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৬ ::  আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত না করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে (আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে) সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত মারাত্মক পাপ, যা শিরক হিসেবে চিহ্নিত। ইসলাম একেশ্বরবাদে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্বকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তারপরও মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় কল্পিত গাইরুল্লাহর ইবাদত করে। প্রকৃদ পক্ষে গাইরুল্লাহর কোর অস্তিস্থ নাই। গাইরুল্লা হলো মানুষের কল্পিত ইলাহ। মুশরিকদের ইলাহর কোন অস্তিস্থ নাই। মুসরিকদের ইলাহগণ কারো উপকার বা অপকার করতে পারে না, এমনকি আল্লাহ নিকট সুপারিশও করতে পারেন না।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَیَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡ وَیَقُوۡلُوۡنَ ہٰۤؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ قُلۡ اَتُنَبِّـُٔوۡنَ اللّٰہَ بِمَا لَا یَعۡلَمُ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করছে, যা তাদের ক্ষতি করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী’। বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনে থাকা এমন বিষয়ে সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন? তিনি পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। সুনা ইউনুস : ১৮

মহান আল্লাহই হলেন প্রকৃত ইলাহ বা উপাস্য এবং একমাত্র তিনিই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আল্লাহ পাশাপাশি দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকের মনগড়া ইলাহ বা উপাস্য সৃষ্টি করে নিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পাশাপাশি গাইরুল্লাহর ইবাদাত করা বা অন্য কাউকে ইলাহ স্বীকার করাই হলো শিরকে আকবার। যা বান্দাকে ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির করে দেয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَقَالَ اللّٰہُ لَا تَتَّخِذُوۡۤا اِلٰـہَیۡنِ اثۡنَیۡنِ ۚ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ

আর আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। তিনি তো কেবল এক ইলাহ। সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর। সুরা নাহল : ৫১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

اَمِ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اٰلِہَۃً ؕ قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ ۚ

তারা কি তাঁকে ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে? বল, ‘তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস। সুরা আম্বিয়া : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اٰلِہَۃً لَّعَلَّہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ؕ

অথচ তারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য সব ইলাহ গ্রহণ করেছে, এই প্রত্যাশায় যে, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। সুরা ইয়াসিন : ৭৪

একাধিক ইলাহ যে নেই সে সম্পর্ক মহান আল্লাহ যুক্তিই সর্বোউত্তম ও অকাঠ্য তিনি বলেন-

مَا اتَّخَذَ اللّٰہُ مِنۡ وَّلَدٍ وَّمَا کَانَ مَعَہٗ مِنۡ اِلٰہٍ اِذًا لَّذَہَبَ کُلُّ اِلٰہٍۭ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعۡضُہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ  سُبۡحٰنَ اللّٰہِ عَمَّا یَصِفُوۡنَ ۙ

আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই। (যদি থাকত) তবে প্রত্যেক ইলাহ নিজের সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত; তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আল্লাহ কত পবিত্র! সুরা মুমিনুন : ৯১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہِیۡمُ لِاَبِیۡہِ اٰزَرَ اَتَتَّخِذُ اَصۡنَامًا اٰلِہَۃً ۚ اِنِّیۡۤ اَرٰىکَ وَقَوۡمَکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ

আর (স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্তিগুলোকে ইলাহরূপে গ্রহণ করছ? নিশ্চয় আমি তোমাকে তোমার কওমকে স্পষ্ট গোমরাহীতে দেখছি’। সুরা আনাম : ৭৪

কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়ে ইহার অসারতা ও ক্ষতিকর দিক বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। নিম্মে তার কিছু উদারহণ প্রদান করা হলো-

(১) গাইরুল্লাহর ইবাদতের গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

(২)  গাইরুল্লাহর ইবাদত ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوۡ اَشۡرَکُوۡا لَحَبِطَ عَنۡہُمۡ مَّا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আবূ সাদ বিন আবূ ফাদালাহ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ إِذَا جَمَعَ اللَّهُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ لِيَوْمٍ لاَ رَيْبَ فِيهِ نَادَى مُنَادٍ مَنْ كَانَ أَشْرَكَ فِي عَمَلٍ عَمَلَهُ لِلَّهِ فَلْيَطْلُبْ ثَوَابَهُ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ ‏”

আল্লাহ তাআলা যখন কিয়ামতের দিন, যে দিনের আগমনে কোন সন্দেহ নাই, পূর্বাপর সকলকে একত্র করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করতে গিয়ে এর মধ্যে কাউকে শরীক করেছে, সে যেন গাইরুল্লাহর নিকট নিজের সওয়াব চেয়ে নেয়। কেননা আল্লাহ তাআলা শরীকদের শেরেক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৩, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৪, আহমাদ : ১৭৪৩১, মিশকাত : ৫৩১৮

(৩) মুশরিক বা গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর কোন আমলই কবুল হবে না

মুআবিয়াহ বিন হায়দাহ বিন মুআবিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯। তাহকীক আলবানীঃ হাসান।

(৪) মুশরিক বা গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

(৫) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর সমস্ত কৃতকর্ম ধূলোর মতো উড়িয়ে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰہُ ہَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

(৬) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর জন্য জান্নাত হারাম

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَمَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَمَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ

নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা মায়েদা : ৭২

(৭) শিরককারী গোমরাহীতে পথভ্রষ্ট

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। সুরা নিসা : ১১৬

(৮) শিরককারীকে আল্লাহ মু্ল্যহীন বস্তুর সাথে তুলনা করেছেন

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

حُنَفَآءَ لِلّٰہِ غَیۡرَ مُشۡرِکِیۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ

আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিম্বা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল। সুরা হজ : ৩১

(৯) গাইরুল্লাহর ইবাদতকারী সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

(১০) আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা হারাম

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁকে শরিক করার পাপ ক্ষমা করেন না এবং এর বাইরে যা কিছু রয়েছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, সে অবশ্যই এক মহাপাপ রচনা করেছে। সূরা নিসা : ৪৮

(১১) গাইরুল্লাহর ইবাদত একটি নিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ

আবূ বকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

আবূ বকরাহ (রা.) বলেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি বললেন-

أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ – ثَلاَثًا – الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ أَوْ قَوْلُ الزُّورِ ‏”‏ ‏.‏ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَمَازَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ

আমি কি তোমাদের কবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে বলব না? তিনি এ কথাটি তিনবার বললেন। (তারপর বললেন) সেগুলো হলো, আল্লাহর সাথে শারীক করা, পিতামাতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া কিংবা কথা বলা। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং (শেষোক্ত) কথাটি বারবার বলতে লাগলেন। এমন কি আমরা মনে মনে বলছিলাম, আহা তিনি যদি থামতেন। সহিহ মুসলিম : ৮৭

২। গাইরুল্লাহর জন্য করা হয় এমন কিছু ইবাদত-

আমাদের সমাজে অনেক ইবাদত প্রচলিত আছে যা একান্তভাবেই গাইরুল্লাহর বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা হয়। এই ইবাদত মূলত শিরকের অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী। আল্লাহর ইবাদতে গাইরুল্লাহকে শরিক করা মারাত্মক গুনাহ। নিচে গাইরুল্লাহর ইবাদতের সম্পর্কে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

(১) গাইরুল্লাহর নিকট সাহায্যের প্রার্থনা করা

আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন গাইরুল্লার নিকট সাহায্য প্রর্থনা করা। আল্লাহ কে বাদ অন্যের নিকট দুয়া করে সাহায্য বা আশ্রয় প্রার্থনায় করা শিরক। যা এক জন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে মুশরিক বানিয়ে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

 وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ

আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যে তোমার না কোন উপকার করতে না ক্ষতি করতে পারে৷ যদি তুমি এমনিটি করো তাহলে জালেমদের দলভুক্ত হবে। সুরা ইউনুস : ১০৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ

আর আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকো তারা খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। সুরা ফাতির : ১৪

(২)  গাইরুল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রর্থনা করা

কোন ক্ষতিকর ব্যক্তি বা বস্তু ক্ষতি হতে বাঁচার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা বা বা সরনাপন্ন হওয়া শিরকে আকবর। আল্লাহ ব্যতীত অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নিকট আশ্রয় চাওয়া শিরক। এমন ভাবাও ঠিক নয় যে, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত,  মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির নিকট আশ্রয় চাইলে অদৃশ্য ভাবে সাহায্য করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

আর মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক জিনদের কিছু লোকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতো৷ এভাবে তারা জিনদের অহংকার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷ সুরা জিন : ০৬

গাইরুল্লাহ নয়, আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাওয়া ফরজ-

যুগ যুগ ধরে চলে আশা মিথ্যা বিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলামের ঘোষনা খু্বই ষ্পষ্ট। ইসলাম এসে মানবতাকে শিখাল আল্লাহই এক মাত্র আশ্রয়দাতা। সুতারং তার নিকটই আশ্রয় চাইতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ ٱلشَّيۡطَـٰنِ نَزۡغٌ۬ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِ‌ۖ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

যদি তোমরা শয়তানের পক্ষ থেকে কোন প্ররোচনা আঁচ করতে পার তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সব কিছু শোনেন এবং জানেন৷ সুরা হা-মিম-সাজদাহ : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقُل رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنۡ هَمَزَٲتِ ٱلشَّيَـٰطِينِ  وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحۡضُرُونِ

আর দোয়া করো, ‘‘হে আমার রব! আমি শয়তানদের উস্কানি থেকে তোমার আশ্রয় চাই৷ হে! রব, সে আমার কাছে আসুক এ থেকেও তো আমি তোমার আশ্রয় চাই। সূরা মুমিনুন : ৯৭-৯৮

আবূ আহমাদ শাকাল ইবনু হুমাইদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে একটি দু’আ শিক্ষা দিন। তিনি বললেনঃ তুমি বলোঃ ’’হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কানের অশ্লীল শ্রবণ, চোখের কুদৃষ্টি, জিহ্বার কুবাক্য, অন্তরের কপটতা ও কামনার অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাই।’ সুনানে আবু দাউদ : ১৫৫১

(৩) বিপদে গাইরুল্লাহকে আহবান করা

আহবান করা মানে নিজের অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে সাহায্যের জন্য ডাকা। তবে ঈমানের দাবি হল বিপদ বা সংকটমুক্ত এবং অভাব বা প্রয়োজন পূর্ণ করার সব ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিহীত আছৈ। তাই একমাত্র তার কাছেই প্রর্থনা করা সঠিক ও যথার্থ সত্য বলে বিবেচিত। অন্যকে অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে গাইরুল্লাহকে সাহায্যের জন্য আহবান করা পরিস্কার শিরক।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

. َأَعۡتَزِلُكُمۡ وَمَا تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَأَدۡعُواْ رَبِّى عَسَىٰٓ أَلَّآ أَكُونَ بِدُعَآءِ رَبِّى شَقِيًّ۬ا

আমি আপনাদেরকে ত্যাগ করছি এবং আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে আহবান করেন তাদেরকেও। আমি তো আমার রবকেই আহবান করব৷ আশা করি আমি নিজের রবকে আহবান করে ব্যর্থ হবো না। সুরা মারিয়াম : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً

বল, ‘তাদেরকে ডাক, আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে (উপাস্য) মনে কর। তারা তো তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার ও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না’। সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৬

(৪) গাইরুল্লাহর তৈরি করে উপসনা করা-

আল্লাহর পরিবর্তে গাইরুল্লাহর মূর্তি তৈরি করে তার উপসনা করা। ইসলাম মূর্তি সংস্কৃতির সাথে কখনো আপোষ করেনি। ইসলামে যদ শিরকি কাজে আছে তার মধ্যে মূর্তির পূজাকে সবচেয়ে জঘন্য শিরক হিসেবে গন্য করা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর, এ সব গর্হিত বিষয়, শাইতানী কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাক, যেন তোমাদের কল্যাণ হয়। সুরা মায়েদা : ৯০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡثَـٰنً۬ا وَتَخۡلُقُونَ إِفۡكًا‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمۡلِكُونَ لَكُمۡ رِزۡقً۬ا فَٱبۡتَغُواْ عِندَ ٱللَّهِ ٱلرِّزۡقَ وَٱعۡبُدُوهُ وَٱشۡكُرُواْ لَهُ ۥۤ‌ۖ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ

তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে পূজা করছো তারাতো নিছক মূর্তি আর তোমরা একটি মিথ্যা তৈরি করছো৷  আসলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা পূজা করো তারা তোমাদের কোন রিযিকও দেবার ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহর কাছে রিযিক চাও, তাঁরই বন্দেগী করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তারই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷ সুরা আকাবুত : ১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَرَءَيۡتُمُ ٱللَّـٰتَ وَٱلۡعُزَّىٰ (١٩) وَمَنَوٰةَ ٱلثَّالِثَةَ ٱلۡأُخۡرَىٰٓ  

এখন একটু বলতো, তোমরা কি কখনো এ লাত, এ উযযা এবং তৃতীয় আরো একজন দেবতা মানাতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছো? সৃরা নাজম : ১৯-২০

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন কা’বা শরীফের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। নবী ﷺ নিজের হাতের লাঠি দিয়ে মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে থাকেন আর বলতে থাকেন-

  وَقُلۡ جَآءَ ٱلۡحَقُّ وَزَهَقَ ٱلۡبَـٰطِلُ‌ۚ إِنَّ ٱلۡبَـٰطِلَ كَانَ زَهُوقً۬ا    

সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, মিথ্যার তো বিলুপ্ত হবারই কথা। (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৮১)। সহিহ বুখারি : ২৪৭৮

(৫) গাইরুল্লাহর ভাষ্কর্যের সামনে সম্মান প্রদর্শন করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 قَالَ أَتَعۡبُدُونَ مَا تَنۡحِتُونَ (٩٥) وَٱللَّهُ خَلَقَكُمۡ وَمَا تَعۡمَلُونَ  

সে বললো, “তোমরা কি নিজেদেরই খোদাই করা জিনিসের পূজা করো? অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যে জিনিসগুলো তৈরি করো তাদেরকেও (সৃষ্টি করেছেন)৷ (সুরা সাফফাত :৯৫-৯৬

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-

أمرني رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ لاَ أَدَعَ قَبْرًا مُشْرِفًا إِلاَّ سَوَّيْتُهُ , وَلاَ تِمْثَالاً إِلاَّ طَمَسْتُهُ

আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যাতে সকল উঁচু কবরকে ভেঙ্গে দেই এবং সকল ভাষ্কর্যকে বিলুপ্ত করি”। সহিহ মুসলিম : ৯৬৯

(৬) আল্লাহর পরিবর্তে জ্বিনের আশ্রয় চাওয়া

জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা জ্বিনের আশ্রয় চাইত। জ্বিন মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন বিশ্বাস নিয়ে তারা জ্বিনকে ভয় করার মাধ্যমে শিরকের মত পাপাচারে লিপ্ত হত। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করা শির্কে আকবর। আর সেই কাজটি জাহেলীযুগের আরাবের লোকেরা করত। বর্তমানে অনেক মুসলিম জ্বিনের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করছে এবং তাদের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এমনকি জ্বিন বাবা নাম দিয়ে ব্যবসা করছে। আর অজ্ঞ লোকেরা হুমড়ু খেয়ে টাকা পয়াসা নিয়ে জ্বিন বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ছে। এভাবে জ্বিনের আশ্রয় বিপদ আপদ থেকে বাচার ব্যর্থ চেষ্টা করা বড় শিরক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَأَنَّهُ ۥ كَانَ رِجَالٌ۬ مِّنَ ٱلۡإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ۬ مِّنَ ٱلۡجِنِّ فَزَادُوهُمۡ رَهَقً۬ا

‘মানুষের মধ্য থেকে কতিপয় লোক জ্বিন সম্প্রদায়ের মধ্যস্থিত কিছু জ্বিনের আশ্রয় নিতো। ফলে ঐ মানুষগুলো জ্বিনদের মান মর্যাদা আত্মন্তরিতা বাড়িয়ে দিতো’’। সুররা জ্বিন : ৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

وَجَعَلُواْ لِلَّهِ شُرَكَآءَ ٱلۡجِنَّ وَخَلَقَهُمۡ‌ۖ وَخَرَقُواْ لَهُ ۥ بَنِينَ وَبَنَـٰتِۭ بِغَيۡرِ عِلۡمٍ۬‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يَصِفُونَ

এসব সত্ত্বেও লোকেরা জ্বিনদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করলো,  অথচ তিনি তাদের সৃষ্টিকর্তা৷ আর তারা না জেনে বুঝে তাঁর জন্য পুত্র ও কন্যা তৈরী করে ফেললো, অথচ এরা যেসব কথা বলে তা থেকে তিনি পবিত্র এবং তার উর্ধে৷ সুরা আনআম : ১০০

(৭) ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করা

সাধারনত খৃষ্টান ধর্মের অনুসারিগন ঈসা (আ.) কে মহান আল্লাহর সাথে তুলনা করে থাকে। তারাই এই শিরকের প্রবক্তা, অনুসারী এবং প্রচার কারি। খৃষ্টানদের অপপ্রচারে কারণে কিছু শিক্ষিত কিন্তু ইসলামি জ্ঞানে অজ্ঞ নামধারি মুসলিম লোকেরাও বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই শিরক থেকে বাচতে চাইলে প্রথমে চাই এ সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা। মহান আল্লাহই এ ব্যাপারটি পরিস্কান করে দিয়েছেন। তিনি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 لَقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ‌ۖ وَقَالَ ٱلۡمَسِيحُ يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّى وَرَبَّڪُمۡ‌ۖ إِنَّهُ ۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَٮٰهُ ٱلنَّارُ‌ۖ وَمَا لِلظَّـٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٍ۬  

নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ই আল্লাহ৷ অথচ মসীহ্‌ বলেছেন, হে নবী ইসরাঈল! আল্লাহর বন্দেগী করো, যিনি আমার রব এবং তোমাদেরও রব ! যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস জাহান্নাম ৷ আর এ ধরনের জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই৷ সুরা মায়েদা : ৭২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

لَّقَدۡ ڪَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ ثَالِثُ ثَلَـٰثَةٍ۬‌ۘ وَمَا مِنۡ إِلَـٰهٍ إِلَّآ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۚ وَإِن لَّمۡ يَنتَهُواْ عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ (٧٣)

অর্থ: নিসন্দেহে তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে, আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন৷ অথচ এক ইলাহ্‌ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই যদি তারা নিজেদের এই সব কথা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণা দায়ক শাস্তি দেয়া হবে৷  সুরা মায়েদা : ৭৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 مَّا ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ وَأُمُّهُ ۥ صِدِّيقَةٌ۬‌ۖ ڪَانَا يَأۡڪُلَانِ ٱلطَّعَامَ‌ۗ ٱنظُرۡ ڪَيۡفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ ٱلۡأَيَـٰتِ ثُمَّ ٱنظُرۡ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ (٧٥) 

অর্থ: মারয়াম পুত্র মসীহ্‌ তো একজন রসূল ছাড়া আর কিছুই ছিল না?  তার পূর্বেও আরো অনেক রসূল অতিক্রান্ত হয়েছিল৷ তার মা ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ মহিলা৷ তারা দুজনই খাবার খেতো৷ দেখো কিভাবে তাদের সামনে সত্যের নিদর্শনগুলো সুস্পষ্ট করি৷ তারপর দেখো তারা কিভাবে উল্টো দিকে ফিরে যাচ্ছে৷ সুরা মায়েদা : ৭৫

উপরের তিনটি আয়াতের দ্ব্যর্থহীনভাবে খৃষ্টীয় আকীদার সুস্পষ্ট প্রতিবাদ করা হয়েছে। যদি কেই প্রশ্ন করে হযরত ঈসা (আ.) কি ছিলেন? তিনি সম্পূর্ণ সন্দেহাতীভাবে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা ও রাসুল ছিলেন। মানুষের হেদায়েতের পৃথিবীতে অনেক নবী রাসূল এসেছিল, তিনি তাদের মধ্যে একজন। তিনি নিজে কখন বলে নাই, আমিই আল্লাহ, আমিই রব বা এমন ও দাবি করে নাই যে, আমি আল্লাহর সন্তান (নাউজুবিল্লহ)। তিনি নিজে আল্লাহ বা আল্লাহর কাজে তাঁর সাথে শরীক ও তাঁর সমকক্ষ করতেন না।  তিনি যে এক জন সত্যিকারের মানুষ তার প্রমান, তার জন্ম এক মহিলার গর্ভে, যার একটি বংশ তালিকা আছে, যিনি মানবিক দেহের অধিকারী ছিলেন, তিনি ঘুমাতেন, খেতেন, ঠাণ্ডা-গরম অনুভব করতেন।আসলে যে ঈসা (আ.) এর আবির্ভাব বাস্তবে ঘটেছিল, যিনি রাসুল ছিলেন তার আনিত ধর্ম থেকে খৃষ্টানগন আজ বহুদুরে। সত্যিকার ঈসা আলাইহিস সালামকে তারা মানে না। বরং তারা মানে নিজেদের কল্পিত  ঈসা মসিহ কে।

(৮) সৃষ্টি ও ইবাদতে মহান আল্লাহর সাথে ফিরিস্তাদের সম্পৃক্ত করা-

জাহেলীযুগের আবরের মূর্খ লোকরা ফিরিস্তাদের আল্লাহর মেয়ে কল্পনা করত এবং এর তারা আল্লাহর সৃষ্ট মাকলুক ফিরিস্তাদেরকে কাল্পনিকভাবে আল্লাহর সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। এমনকি তারা কাল্পনিকভাবে আল্লাহর বংশ তালিকাও তৈরি করে তা আল্লাহর বংশধারা চালিয়ে দিয়েছে। তারা ফিরিস্তাদেরকে বিভিন্ন দেবীদের নামে নামকরণ করে পুজা করত যা স্পষ্ট শিরকি কাজ৷  আর এসব তারা করত শুধু অনুমানের ভিত্তিতে, কোন প্রমান ছাড়াই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 إِنَّ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأَخِرَةِ لَيُسَمُّونَ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ تَسۡمِيَةَ ٱلۡأُنثَىٰ (٢٧) وَمَا لَهُم بِهِۦ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ‌ۖ وَإِنَّ ٱلظَّنَّ لَا يُغۡنِى مِنَ ٱلۡحَقِّ شَيۡـًٔ۬ا (٢٨) 

কিন্তু যারা আখেরাত মানে না তারা ফিরিস্তাদেরকে দেবীদের নামে নামকরণ করে৷  অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই নেই৷ তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে৷  আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না৷ সুরা নাজম : ২৭-২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 وَجَعَلُواْ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةَ ٱلَّذِينَ هُمۡ عِبَـٰدُ ٱلرَّحۡمَـٰنِ إِنَـٰثًا‌ۚ أَشَهِدُواْ خَلۡقَهُمۡ‌ۚ سَتُكۡتَبُ شَهَـٰدَتُہُمۡ وَيُسۡـَٔلُونَ (١٩) وَقَالُواْ لَوۡ شَآءَ ٱلرَّحۡمَـٰنُ مَا عَبَدۡنَـٰهُم‌ۗ مَّا لَهُم بِذَٲلِكَ مِنۡ عِلۡمٍ‌ۖ إِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ (٢٠)

এরা দয়াময় আল্লাহর খাস বান্দা ফিরিস্থাগনকে স্ত্রীলোক গন্য করেছে। এরা কি তাদের দৈহিক গঠন দেখেছে? এদের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করে নেয়া হবে এবং সে জন্য এদেরকে জবাবদিহি করতে হবে৷ এরা বলে, দয়াময় আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা কখনো পূজা করতাম না। এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য এরা আদৌ জানে না, কেবলই অনুমানে কথা বলে৷ সুরা জুকরুক : ১৯-২০

(৯) আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানের উপসনা করা

সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মহান আল্লাহই এক মাত্র উপসনার যোগ্য। তাকে বাদে যারই ইবাদাত করা হোক না কেন বড় শিরকের অন্তভূক্ত হবে। তাইতো মহান আল্লাহ শয়তানের ইবাদাত করতে নিষেধ করছেন। এবং শুধু তারই ইবাদাত করতে নির্দেষ প্রদান করছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

أَلَمۡ أَعۡهَدۡ إِلَيۡكُمۡ يَـٰبَنِىٓ ءَادَمَ أَن لَّا تَعۡبُدُواْ ٱلشَّيۡطَـٰنَ‌ۖ إِنَّهُ ۥ لَكُمۡ عَدُوٌّ۬ مُّبِينٌ۬ (٦٠) وَأَنِ ٱعۡبُدُونِى‌ۚ هَـٰذَا صِرَٲطٌ۬ مُّسۡتَقِيمٌ۬ (٦١) وَلَقَدۡ أَضَلَّ مِنكُمۡ جِبِلاًّ۬ كَثِيرًا‌ۖ أَفَلَمۡ تَكُونُواْ تَعۡقِلُونَ (٦٢)  

হে আদম সন্তানেরা! আমি কি তোমাদের এ মর্মে হিদায়াত করিনি যে, শয়তানের ইবাদাত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। এবং আমারই ইবাদাত করো, এটিই সরল-সঠিক পথ। কিন্তু এ সত্ত্বেও সে তোমাদের মধ্য থেকে বিপুল সংখ্যককে গোমরাহ করে দিয়েছে, তোমাদের কি বুদ্ধি-জ্ঞান নেই? সুরা ইয়াসিন : ৬০-৬২

(১০) দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহ সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করা

মহান আল্লাহ আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন। এই কাজ করতে তিনি কখন ক্লান্ত হন না। তার কোন সাহায্যকারিও দরকার হয় না। তিনি একক ক্ষমতার অধিকারী, তিনি কারো মুখাপেক্ষি নন। যদি কেউ বিশ্বাস করে মহান আল্লাহ দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করার জন্য অন্যের সাহায্য দরকার তবে সে নিসন্দেহে মুশরিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

 يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ فِى يَوۡمٍ۬ كَانَ مِقۡدَارُهُ ۥۤ أَلۡفَ سَنَةٍ۬ مِّمَّا تَعُدُّونَ (٥)

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন এবং এ পরিচালনার বৃত্তান্ত ওপরে তার কাছে যায় এমন একদিনে যার পরিমাপ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর ৷ সুরা সাজদা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীণ বলেন-

قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَـٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَىَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَىِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُ‌ۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ  

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? এই শুনার ও দেখার শক্তি কার কর্তৃত্বে আছে? কে প্রাণহীন থেকে সজীবকে এবং সজীব থেকে প্রাণহীনকে বের করে? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা”? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ৷ বলো, তবুও কি তোমরা সতর্ক হচ্ছো না? সুরা ইউনুস : ৩১

খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের বিশ্বাস, আল্লাহ যেহেতু একা, সেহেতু একাই তার পক্ষে পুরো বিশ্বজগত পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মু‘আল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজীর ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাউসুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে আবদাল ৪০ জন আল্লাহ তা‘আলার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। আর আওলিয়া দ্বারা সৃষ্ট জীবের হায়াত, রুযী, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মান ও মুছীবত বিদূরণের কার্য সম্পাদন করেন। মৃতগণ কবরে শ্রবণ, দর্শন ও উপলদ্ধি করে থাকেন। তাদের শ্রবণ ও দর্শন যদিও সব সময় থাকে, কিন্তু জুম‘আর দিনে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সাধারণ মৃত ব্যক্তিরাও কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া যিয়ারাতকারীদের সাথে কথা বলে। এই সকর কথাই কল্পনা প্রসু।

(১১) কবর কেন্দ্রিক মাজার নির্মাণ করে সিজদার স্থানে পরিণত করা

আয়িশাহ ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযি.) বলেছেন, নবী ﷺ এর মৃত্যু পীড়া শুরু হলে তিনি তাঁর একটা চাদরে নিজ মুখমণ্ডল আবৃত করতে লাগলেন। যখন শ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হলো, তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বললেন-

‏ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏”‏‏.‏ يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا‏.‏

ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। তারা যে কার্যকলাপ করত তা হতে তিনি সতর্ক করেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৫, ৪৩৬, ১৩৩০, ১৩৯০, ৩৪৫৩, ৩৪৫৪, ৪৪৪১, ৪৪৪৩, ৪৪৪৪, ৫৮১৫, ৫৮১৬, সহিহ মুসলিম : ৫৩১

আবূ হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ ‏‏

আল্লাহ ইয়াহুদীদেরকে ধ্বংস করুক, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৮ ইফাঃ

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবী ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মাসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে। সহিহ বুখঅরি : ৪২৭, ৪৩৪, ১৩৪১, ৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৫২৮

 (১২) মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের নিকট সাহায্য চাওয়া

জীবিত কারো কাছে দোয়া চাওয়া বা সাহায্য চাওয়া জায়েয কিন্তু আমাদের দেশে মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে চাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তা স্পষ্ট শিরকেরই অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ তারা দুটি শিরকি আকিদা থেকে করে থাকে। প্রথমত তাদের ধারনা অলীগণ কবরে জীবিত। দ্বিতীয়ত মৃত্যুঅলী মৃত্যুর পর এমন কিছু ক্ষমার অধিকারি হয়েছে যা জীবিতদের নাই।

অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا يَسۡتَوِى ٱلۡأَحۡيَآءُ وَلَا ٱلۡأَمۡوَٲتُۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُسۡمِعُ مَن يَشَآءُۖ وَمَآ أَنتَ بِمُسۡمِعٍ۬ مَّن فِى ٱلۡقُبُورِ

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়, নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না।  সুরা ফাতির : ২২

কাজেই কোনো মৃতব্যক্তি, ওলী, পীর, মুরুব্বি, খাজা, প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে দুয়া চাওয়া শিরক।  

(১৩) আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

একমাত্র মহান আ্ল্লাহই মানুষের অন্তরের খবর জানেন। কিছু ভন্ড পীর বা আল্লাহর ওলি বাদিদার কিছু প্রতারক দাবি করে যে সেও মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। অনেক অজ্ঞ মানুষ ভন্ডদের কথা বিশ্বাস করে। এই দুই শ্রেণীর লোকই কাফির। কেননা তারা উভয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমকক্ষ দাড় করিয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَعْلَمُ ٱللَّهُ مَا فِى قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِىٓ أَنفُسِهِمْ قَوْلًۢا بَلِيغًا

ওরা তো তারাই যাদের অন্তরের কথা আল্লাহ জানেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, আর কিছু উপদেশ দাও এবং তাদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু কথা বল। সুরা নিসা : ৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَعْلَمُ خَآئِنَةَ ٱلْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِى ٱلصُّدُورُ

চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন। (সুরা গাফির ৪০:১৯)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

أَوَلَيْسَ ٱللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِى صُدُورِ ٱلْعَٰلَمِينَ

আল্লাহ কি বিশ্ববাসীর অন্তরের কথা সম্যক অবগত নন?  সুরা আনকাবুত : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

আল্লাহ অন্তরের খবর ভাল করেই জানেন।  সুরা লোকমান : ২৩

(১৪) আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

আল্লাহ তায়ালা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে না। অনেক অজ্ঞ মুসলিমকে দেখা যায় সন্তান লাভের আশায় মাজারে মাজরে ঘুরে। এমনাকি অনেক ভন্ড প্রতারক ফকিরের খপ্পরে পড়ে নি:শ্ব হয়েছেন। অথচ তার উচিত ছিল শরিয়ত সম্মত চিকত্সার পাশাপাশি মহান আল্লাহ উপর তাওয়াক্বুল করে তার নিকটই সাহায্য চাওয়া।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لِّلَّهِ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ يَهَبُ لِمَن يَشَآءُ إِنَٰثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَآءُ ٱلذُّكُورَ

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’। সুরা ফুরকান : ৭৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبْ لِى مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়া তার প্রভুর কাছে দোয়া করে। সে বলে, “হে আমার প্রভু! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে (তোমার বিশেষ কৃপায়) ভাল সন্তান দান কর। অবশ্যই তুমি দোয়া শ্রবণকারী।  (সুরা আল ইমরান ৩:৩৮)

(১৫) গাইরুল্লাহর জন্য সরাসরি ইবাদাত নিবেদন করা-

আমাদের সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, কুরবানি, জিকির, দান, সদগা, তিলওয়াত, আচার, আচরণ ইত্যাদি সব ইবাদাত পাওয়ার একমাত্র যোগ হক ইলাহ হলো মহান আল্লাহ। কিন্তু কোন ইবাদাত যদি মহান আল্লাহর জন্য না করে গাইরুল্লাহ জন্য করা হয় তবে শির্ক

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلْ أَتَعْبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًاۚ وَٱللَّهُ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ

বল, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদাত করবে, যা তোমাদের জন্য কোন ক্ষতি ও উপকারের ক্ষমতা রাখে না? আর আল্লাহ, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’সুরা মায়েদা : ৭৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ

যখন আমি বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করবে না এবং সদাচার করবে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে। সুরা বাকারা : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَن لَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّا ٱللَّهَۖ إِنِّىٓ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ

তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদাত করনা। আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক দিনের শাস্তির আশংকা করছি। সুরা হুদ : ২৬

(১৬) একাধীক উপাস্য বা দেব-দেবীর পূজা করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالَ اللّٰہُ لَا تَتَّخِذُوۡۤا اِلٰـہَیۡنِ اثۡنَیۡنِ ۚ اِنَّمَا ہُوَ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ۚ فَاِیَّایَ فَارۡہَبُوۡنِ

আর আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না। তিনি তো কেবল এক ইলাহ। সুতরাং তোমরা আমাকেই ভয় কর। সুরা নাহল : ৫১

(১৭) লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

(১৮) কোন গাইরুল্লাহকে আল্লাহর সমান মনে করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَہُمۡ وَرُہۡبَانَہُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَالۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَمَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـہًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ سُبۡحٰنَہٗ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের* রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র। তাওবা : ৩১

(১৯) গাইরুল্লাহকে কল্যান অকল্যায় মালিক বিশ্বাস করা-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا جَآءَتۡہُمُ الۡحَسَنَۃُ قَالُوۡا لَنَا ہٰذِہٖ ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّطَّیَّرُوۡا بِمُوۡسٰی وَمَنۡ مَّعَہٗ ؕ اَلَاۤ اِنَّمَا طٰٓئِرُہُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

অতঃপর যখন তাদের কাছে কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের জন্য।’ আর যখন তাদের কাছে অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সঙ্গীদেরকে অশুভলক্ষণে মনে করত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ তো আল্লাহর কাছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ জানে না। সুরা আরাফ : ১৩১

সামূদ জাতিও তাদের নবীকে অমঙ্গল মনে করত। এই সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

) قَالُواْ ٱطَّيَّرۡنَا بِكَ وَبِمَن مَّعَكَ‌ۚ قَالَ طَـٰٓٮِٕرُكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ‌ۖ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ۬ تُفۡتَنُونَ

তারা বলল, আমরা তো তোমাদেরকে ও তোমার সাথীদেরকে অমঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে পেয়েছি৷ সালেহ জবাব দিল, “তোমাদের মঙ্গল অমঙ্গলের উৎস তো আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ, আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে৷ সুরা নমল : ৪৭

পূর্বের নবি রাসূলগন অমঙ্গল মনে করার আগেকটি প্রমান হলো। মহান আল্লাহ আরও বলেন-

قَالُوْا إِنَّا تَطَيَّرْنَا بِكُمْ، لَئِنْ لَمْ تَنْتَهُوْا لَنَرْجُمَنَّكُمْ وَلَيَمَسَّنَّكُمْ مِنَّا عَذَابٌ أَلِيْمٌ، قَالُوْا طَائِرُكُمْ مَعَكُمْ، أَئِنْ ذُكِّرْتُمْ، بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُوْنَ

তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাদেরকে অমঙ্গলের কারণ মনে করি। তোমরা যদি বিরত না হও তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে’। সুরা ইয়াসিন : ১৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ عَدْو‘ى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنْ الأَسَدِ.

রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষণ নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক। সহিহ বুখারি : ৫৭০৭,

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ غُوْلَ، فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! فَمَا بَالُ الإِبِلِ تَكُوْنُ فِيْ الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَجِيْءُ الْبَعِيْرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيْهَا، فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا، قَالَ: فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ؟

ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। কুলক্ষণ বলতেই তা একান্ত অমূলক। হুতোম পেঁচা, সফর মাস, রাশি-তারকা অথবা পথ ভুলানো ভূত কারোর কোন ক্ষতি করতে পারে না। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহ্’র রাসূল! কখনো এমন হয় যে, মরুভূমির মধ্যে শায়িত কিছু উট। দেখতে যেমন হরিণ। অতঃপর দেখা যাচ্ছে, চর্ম রোগী একটি উট এসে এগুলোর সাথে মিশে গেলো। তাতে করে সবগুলো উট চর্ম রোগী হয়ে গেলো। তখন রাসূল (সা.) বললেন: বলো তো: প্রথমটির চর্ম রোগ কোথা থেকে এসেছে? সহিহ বুখারি : ৫৭১৭, ৫৭৭০, ৫৭৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২২০

(২০) গাইরুল্লাহর প্রভাবে বৃষ্টি হয়ে থাকে বিশ্বাস করা।

যায়দ ইবনু খালিদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহর করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। সহিহ বুখারি ৮৪৬, ১০৩৮, ৪১৪৭, সহিহ মুসলিম : ৭১,

তারকারাজী মহান আল্লাহ এক বিশ্বয়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বয়কর সৃষ্টি দেখে সৃষ্টিকর্তা মনে করা অজ্ঞ আদম সন্তারের খুব পুরান অভ্যাস। কাজেই তারকারাজী ব্যাপারটিও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। তারকারাজী মানুষের ভাগ্য বা অন্য কোন ব্যাপারে বিশেষ কোন ক্ষমতা রাখে বিশ্বাস করা শিরক। আমাদের উপমহাদেশে অনেক হিন্দুদের চাঁদের প্রতি এই রূপ ধারনা করেত দেখা যায়। তারা চাঁদের তারিখ অনুযায়ী শুভ অশুভ বিশ্বাস করে নিশিপালন ও উপবাস করে থাকে। এই শুভ অশুভ উপর ভিত্তি করে তারা বিভিন্ন শুভ কাজ আরম্ভ করে থাকে। তাদের দেখা দেখি উপমহাদেশের অনেক অজ্ঞ মুসলিমও শুভ অশুভ দিন তারিখ দেখ কাজকর্ম করে থাকে যা ছোট শিরকের আওতাভূক্ত।

(২১) গাউরুল্লাহর নামে নামে শপথ করা

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللهِ أَوْ لِيَصْمُت

কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে। সহহি বুখারি : ২৬৭৯, ৩৮৩৬, ৬১০৮, ৬৬৪৬, ৬৬৪৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

ا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، وَلَا بِأُمَّهَاتِكُمْ، وَلَا بِالْأَنْدَادِ، وَلَا تَحْلِفُوا إِلَّا بِاللَّهِ، وَلَا تَحْلِفُوا بِاللَّهِ إِلَّا وَأَنْتُمْ صَادِقُونَ

তোমরা নিজেদের পিতা-মাতা কিংবা দেবদেবীর নামে শপথ করবে না। তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর নামে শপথ করবে। আর তোমরা আল্লাহর নামে কেবল সে বিষয়েই শপথ করবে যে বিষয়ে তোমরা সত্যবাদী। আবু দাউদ : ৩২৪৮, সুনানে নাসায়ী : ২৭৯৬

সা’দ ইবনু উবাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ইবনু উমার (রাঃ) একজন লোককে বলতে শুনলেন, না, কাবার শপথ! ইবনু উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺকে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে লোক শপথ করল সে যেন কুফরী করল অথবা শিরক করল। সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৫, সহিহাহ : ২০৪২

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ’উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তাঁর পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে। সহিহ বুখরি : ৬৬৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৪৬, সুনানে তিরমিজি : ১৫৩৩, ১৫৩৮, ১৫৩৫, সুনানে নাসায়ী ৩৭৬৬, ৩৭৬৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৪৯

(২২) গাইরুল্লাহ মনে করে মহাকালেকে গালি দেওয়া

মহাকাল বলতে দিবারাত্রির আবর্তন-বিবর্তনকে বুঝানো হয়েছে। রাত্রি উপনীত হলে অন্ধকার ছেয়ে যায়। আর দিন প্রকাশ পেতেই সমস্ত জিনিস উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই দিবারাত্রি অতিবাহিত হওয়ার নামই হল কাল, যুগ বা সময়। যা আল্লাহর কুদরত ও কারিগরি ক্ষমতা প্রমাণ করে। অন্ধকার যুগে আরবরা যখন কঠিন বিপদে পড়ত তখই মহকাল বা সময়কে গালি দিত। তারা ভাবত মহাকালই তাদের বিপদের কারন। মহাকালকে গালি প্রদানকারীর হুকুমের দুটি পর্যায়, হয়ত সে আল্লাহকে গালি দিচ্ছে অথবা আল্লাহর সাথে মহাকালকে শরীক করছে। যদি কেউ মনে করে মহাকাল এবং আল্লাহ যৌথভাবে বিপদ সংঘটিত করেন তাহলে শিরকে আকবর হয়ে যাবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَالُوۡا مَا ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا یُہۡلِکُنَاۤ اِلَّا الدَّہۡرُ ۚ وَمَا لَہُمۡ بِذٰلِکَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا یَظُنُّوۡنَ

আর তারা বলে, ‘দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর মহাকাল-ই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে।’ বস্তুত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু ধারণাই করে। সুরা জাসিয়া : ২৪

আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

اللهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِيْنِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ.

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদাম সন্তান আমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, তারা যুগ বা কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই জামানা অর্থাৎ যুগ বা কাল। আমার হাতেই ক্ষমতা, দিন-রাত্রির পরিবর্তন আমিই করে থাকি। সহিহ বুখারি : ৪৮২৬, ৮১৬১, সহিহ মুসলিম : ২২৪৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৭৪, আহমাদ : ৭২৪৫

আবূ হুরাইরাহ্‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আদাম সন্তান সময় ও কালকে গালি-গালাজ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত্রি ও দিবস। সহিহ মুসলিম : ৫৭৫৫

(২৩) কুফরি কথা ব্যবহার করে ঝাড়-ফুঁক করা

চোখ লাগা, জাদু, মানসিক ও শারীরিক অসুখ বিসুখ দূরীকরণে জন্য ঝাড় ফুঁক ফলপ্রসূ। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যেমন ঝাড় ফুঁক করেছেন, তেমনি তিনি ঝাড়-ফুঁক নিয়েছেন। সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, ঝাড়-ফুঁকের জন্য পবিত্র কুরআনের আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক্ব, সূরা নাস, সূরা এখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা বাক্বারা ও বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া ফলপ্রসূ। ঝাড়-ফুঁক শরীয়াত সম্মত হলেও অনেক সময় প্রয়োগকারী ও ব্যবহার কারির প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য শিরক হয়। যদি কেউ ঝাড়-ফুঁক করার সময়  শির্কী ও কুফরী শব্দ ব্যবহারের করে, এমন শব্দের মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করে যার অর্থ বোধগম্য নয় বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা ছোট শিরকের অন্তরভূক্ত হবে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক নিজস্ব কোনো প্রভাব এবং ক্ষমতা আছে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে শিরকে আকবর হবে। জ্যোতিষ, গনক ও জাদুকরগন সাধারনত কুফরি বাক্য দ্বরা ঝাড়-ফুঁক করে থাকে যা মুলত শিরক। এদের পরিত্যাগ করা জরুরী।

আওফ ইবনু মালিক আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ فَقَالَ ‏ “‏ اعْرِضُوا عَلَىَّ رُقَاكُمْ لاَ بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ ‏

আমরা জাহিলী যুগে মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। এ জন্যে আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! এক্ষেত্রে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার নিকট উপস্থাপন করো, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তাতে কোন শিরক (জাতীয় কথা) না থাকে। সহিহ মুসলীম : ২০০

(২৪) গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্য মানত করা

আল্লাহ নিকট ইবাদতের নিমিত্তে মানত করা মাকরুহ পর্যায়ের জায়েয হলে তা পুরন করা ওয়াজিব। একটুকু ঠিকই আছে কিন্ত মানত যখন গাইরুল্লাহ বা কোনো পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে করা হবে তখন তা ছোট শিরক হয়ে যাবে। শুধু গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানত করা শিরকে আকবর। আর যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ঐ সকল লোকদের সুপারিশের জন্য বা কোন না কোন ভাবে উপকার পাবার জন্য করে থাকে তবে তা ছোট শিরক হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন-

 وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا ڪُلَّ ذِى ظُفُرٍ۬‌ۖ وَمِنَ ٱلۡبَقَرِ وَٱلۡغَنَمِ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتۡ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلۡحَوَايَآ أَوۡ مَا ٱخۡتَلَطَ بِعَظۡمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ جَزَيۡنَـٰهُم بِبَغۡيِہِمۡ‌ۖ وَإِنَّا لَصَـٰدِقُونَ

আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট! সুরা আনাম : ১৩৬

মানতকারী যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, অলী ভাল মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন না। তার দোয়া বা নেক নজর পাওয়ার নিয়তও করে না। কিংবা শাফাআত বা অসীলাও আমার উদ্দেশ্য নয়। শুধু এতটুকু ভাবে যে, তিনি আল্লাহর অলী, তাকে সম্মান করা সওয়াবের কাজ এ জন্য আমি মাজারে মান্নত করি। তাহলেও ছোট শিরক হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এখন মুসলমানেরা শুধু মৃত পীর, অলী, আওলীয়া, বুযুর্গ, নবী রাসূলদের নামে মান্নত করে তৃপ্ত নয়, বরং তাদের মাজারের কচ্ছপ, কুমির, মাছের নামেও মান্নত করে থাকে। কতবড় নিকৃষ্ট শিরকের দিকে আমাদের জাতি ধাবিত হচ্ছে।

(২৫) গাইরুল্লাহ নামে পশু জবেহ করা

পশুকে যবেহ একটি ইবাদাত। এই জন্য আল্লাহ পশুকে যবেহ করার নীতিমালা ঘোষনা করছেন। গাইরুল্লাহর নামে পশু জবেহ করল শিরক হবে কেননা আল্লাহ নিজের নামে কুরবানী করার হুকুম দিয়েছেন। যে সকল লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবেহ করে তারা মুশরিক। তাই মুমিনের ফরজ দায়িত্ব হল আল্লাহর নামে জবেহ করা যার কোন শরিক নাই। এ কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,  (فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ) তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর। সুরা কাওসার : ২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ إِنَّ صَلَاتِى وَنُسُكِى وَمَحۡيَاىَ وَمَمَاتِى لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

বলো, আমার নামায, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান (কুরবানী), আমার জীবন ও মৃত্যু সবকিছু আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। সুরা আনআম : ১৬২

আল্লাহ তাআলা বলেন:

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ

 আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশ্ খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷  কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَـٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ

এখন যদি তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহ বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে যে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তার গোশ্ খাও৷ সুরা আনআম : ১১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيۡڪُمُ ٱلۡمَيۡتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحۡمَ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ‌ۖ

আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যদি কোন নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, মৃতদেহ খেয়ো না, রক্ত ও শূকরের গোশত থেকে দূরে থাকো। আর এমন কোন জিনিস খেয়ো না যার ওপর আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম নেয়া হয়েছে। সুরা বাকারা : ১৭৩

(২৬) গাইরুল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা

মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদাত। আর ইবাদাতের মুল উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন। মাজার, মুর্তি, দেবতার পুজা করা শিরকে আকবর তাতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু তাদের পুজা না করে ভালো কর্ম মনের করে কিছু পেশ করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর মাধ্যম গাইরুল্লাহ ইবাদতে সহযোগীতা করা হয়। কোন অবস্থায়ই মাজার, মুর্তি, দেতার উদ্দেশ্যে কোন কিছু পেশ করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحۡمُ ٱلۡخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسۡتَقۡسِمُواْ بِٱلۡأَزۡلَـٰمِ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে, তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদা : ৩

তারিক বিন শিহাব হতে বর্ণিত হাদীছে রাসূল ﷺ বলেন, এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির কারণে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কিভাবে হলো? তিনি বললেনঃ দু’জন লোক এমন একটি গোত্রের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, যাদের একটি মূর্তি ছিল। উক্ত মূর্তির জন্য কোন কিছু উৎসর্গ না করে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারতোনা। উক্ত কওমের লোকেরা দু’জনের একজনকে বললো, ‘মূর্তির জন্য তুমি কিছু কুরবানী করো’। সে বললো, কুরবানী দেয়ার মত আমার কিছুই নেই। তারা বলল, অন্ততঃ একটি মাছি হলেও কুরবানী দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তির জন্য কুরবানী দিল। তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বললো, মূর্তিকে তুমিও কিছু কুরবানী করো। সে বললঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নৈকট্য লাভের জন্য আমি কারো জন্য কুরবানী দেইনা। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিল। এতে সে জান্নাতে প্রবেশ করল’’। বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৭৩৪৩, ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৩০৩৮, ইমাম আহমাদ, আয-যুহুদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-১৫

(২৭) উপকাররের আশায তাবীজ, রিং, তাগা, আংটা লাগানো, সুতা, পুঁতি ব্যবহার করা

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাবী ‘আবদুল্লাহ্‌ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সংবাদ বহনকারী পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রাঃ) আব্দুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবীজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহীহা : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রহ.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *