মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
ইসলাম ধর্মে মধ্যপন্থা (وَسَطِيَّةُ) পালনে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত জীবন, ইবাদত, সামাজিক আচরণ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পৃথিবীর একমাত্র হক বা সত্য দ্বীন ইসলাম মানুষকে চরমপন্থা পরিহার করে মধ্যপন্থা করার ব্যাপারে জোড় তাগিদ দিয়েছে। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্যতম ভাল বৈশিষ্ট হল ইসলামের সকল ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই ইসলাম যে মধ্যপন্থা অবলম্বনের জন্য শিক্ষা দেয় এবং এর আলোকে তাদের জীবন সাজায়। ইসলাম কোন ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি যেমন পছন্দ করে না, ঠিক তেমনি ইসলামের বিধি-বিধান পালনে ছাড়াছাড়িও সমর্থন করে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অপচয়কে নিরুত্সাহ প্রদান করে আবার কৃপনের শাস্তি প্রদানের কথা বলে। একজন সাধারন মুসলিমকেও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। এমনকি বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানুষ কোনো ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন না করে সর্বক্ষেত্রে ভারসম্য রক্ষা করে চলবে। আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছেন। কুরআন এবং হাদিসের আলোকে মধ্যপন্থার গুরুত্ব ও প্রয়োগ নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. কুরআনে মধ্যপন্থার নির্দেশনা-
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-
وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ؕ
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারাহ : ১৪৩
মহান আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَلَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَکَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا
আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করেনা এবং কার্পন্যও করেনা; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। সুরা ফুরকান : ৬৭
২. হাদিসে মধ্যপন্থার নির্দেশনা
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَىْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ
নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (’ইবাদাত সহযোগে) সাহায্য চাও। সহিহ বুখারি : ৩৯, ৭২৩৫
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমাদের কোন ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেনঃ আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তাঁর করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা গ্রহণ কর এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কেননা, সে ভাল লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক ’আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। সহিহ বুখারি : ৫৬৭৩
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নূহ আলাইহিস সালাম কে (আল্লাহর সমীপে) হাযির করে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি কি (দ্বীনের দাওয়াত) পৌছে দিয়েছ? তখন তিনি বলবেন, হ্যাঁ। হে আমার পরওয়ারদিগার। এরপর তাঁর উম্মতকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমাদের কাছে নূহ (দাওয়াত) পৌছিয়েছে কি? তারা সবাই বলে উঠবে, আমাদের কাছে কোন ভীতি প্রদর্শকই (নাবী ও রাসুল) আসেনি। তখন নূহ আলাইহিস সালাম কে বলা হবে, তোমার (দাবির পক্ষে) কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতগণই আমার সাক্ষী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদেরকে তখন নিসে আসা হবে এবং তোমরা নূহ আলাইহিস সালাম এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের নিম্নোক্ত বাণী পাঠ করলেন-
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُواْ شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মাতে নির্ধারণ করেছেন, (বাকারা-১৪৩)। তাহলে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষী হতে পারবে আর রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৪৯
৩. মধ্যপন্থার বিভিন্ন ক্ষেত্র-
মধ্যপন্থা (وَسَطِيَّةُ) ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের মাধ্যমে চরমপন্থা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়েছে। এটি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ভারসাম্য ও ন্যায় বজায় রাখতে সহায়ক। কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মধ্যপন্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে মধ্যপন্থার বিভিন্ন ক্ষেত্র তুলে ধরা হলো:
(১) ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা-
ইসলাম ইবাদতে ভারসাম্য রাখতে নির্দেশ দেয়। ইবাদত করতে গিয়ে পার্থিব দায়িত্ব বা নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা নিষেধ। ভারসাম্য রেখে সালাত সিয়াম আদায় করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
ক। সালাত সিয়াম ও বিবাহে মধ্যপন্থা-
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।
অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১
খ। সফরের সময় সিয়ামে মধ্যপন্থা-
মহান আল্লাহ প্রতিটি ইবাদতে মধ্যপন্থা জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এমনি ভাবে অসুস্থ ও সফরে থাকা কালীন সময় সিয়াম ছেড়ে দিতে নির্দেশ প্রদান করেছেন। সুস্থ হলে বা সফর শেষ হলে সুবিধা মহ আদয়া করে নিতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেনঃ যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,
أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। সুরা বাকারা :১৮৪
মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ, অসুস্থ ব্যক্তি, সফরে থাকা ব্যক্তি বা মুসাফির, হায়েজ-নেফাস আক্রান্ত নারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, এবং দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে উদ্ধারকাজে নিয়োজিক ব্যক্তি উপর সিয়াম পালন করা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। এখনে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য তার হুকুম সিথিল করে মধ্যপন্থায় সমাধান দিয়েছেন।
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হন। তিনি রোযা রাখেন এবং লোকেরাও তার সাথে রোযা রাখে। কুরাউল গামীমে পৌছানোর পর তাকে বলা হল, রোযা রাখা লোকদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আপনি কি করেন তারা সেই অপেক্ষায় আছে। আসরের নামায আদায়ের পর তিনি এক পেয়ালা পানি চেয়ে আনালেন এবং তা পান করলেন। তখন লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ফলে তাদের মধ্যেকার কিছু লোক রোযা ভাঙ্গলো এবং কিছু লোক রোযা থাকল। তখনও কিছু লোক রোযা অবস্থায় আছে এ কথা তার নিকটে পৌছলে তিনি বললেনঃ এরী হচ্ছে অবাধ্য নাফরমান। সুনানে তিরমিজি : ৭১০
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেন- হে আবদুল্লাহ! আমি শুনেছি যে, তুমি দিনভর রোযা রাখ এবং সারা রাত সালাত আদায় কর। আমি বললাম, ঠিক তাই, ইয়া রাসূলুল্লাহ। তিনি বললেন, তা করো না। রোযা রাখ এবং ভাঙ, রাতের সালাত পড় এবং ঘুমাও। কারণ তোমার শরীরের তোমার ওপর হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে এবং তোমার অতিথির হক রয়েছে। তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখো। এটি পুরো বছরের জন্য রোযার সমান।”
আমি বললাম, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আরও বেশি করতে পারি।”
তিনি বললেন, “তবে দাউদ (আঃ)-এর রোযা পালন কর, যা হলো এক দিন রোযা রাখা এবং এক দিন না রাখা। এর চেয়ে উত্তম কিছু নেই।”
(আবদুল্লাহ বলেন) বৃদ্ধ বয়সে তিনি বলতেন, “হায়! আমি যদি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রদত্ত সহজতর বিধান গ্রহণ করতাম। সহীহ বুখারি : ১৯৭৫, ৩৯৬২, সহীহ মুসলিম : ১১৫৯
এই হাদিস থেকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
গ। জিকির ক্ষেত্রও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবেঃ
আজ কাল জিকির দেখলে মনে হয় সার্কাজ চলছে। এমন সার্কাজ সাহাবি, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগে ছিন না। তাদের মধ্য এমন হাল হতনা। আমরা বিষয় হল ইবাদতের মধ্যপন্থা। জিকির মহান আল্লাহ একটি ইবাদাত কাজেই এর ও মধ্যপন্থা আছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعاً وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالآصَالِ وَلاَ تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ
অর্থঃ আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না। সুরা আরাফ : ২০৫
কিন্তু আমরা আজ নাচার তালে তালে, উচ্চ স্বরে জিকির করছি। কেউতো রিতিমত গান গেয়ে ঢোল পিটিয়ে জিকির করতে। এগুলো চরম বাড়াবাড়ি বিদআত।
ঘ। সালাত আদায়ে মধ্যপন্থা-
জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক খন্ড পাথরের উপর নামাযরত এক ব্যক্তিকে অতিক্রম করে চলে গেলেন। তিনি মক্কার এক প্রান্তে পৌঁছে সেখানে কিছুক্ষণ কাটালেন। অতঃপর তিনি ফেরার পথে ঐ লোকটিকে পূর্বাবস্থায় নামাযরত দেখতে পেলেন। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁর দু’ হাত একত্র করে বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো। কথাটা তিনি তিনবার বলেন। কেননা তোমরা অবসাদগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ প্রতিদান দিতে ক্ষান্ত হন না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪১, সহিহহা : ১৭৬০
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-
اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ، وَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ»
তোমরা সিজদায় মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। তোমাদের কেউ যেন, তার বাহুদ্বয় কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে না রাখে। সুনানে : ১১১০
ইব্ন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উচ্চস্বরে কুরআন পাঠ করতেন। আর মুশরিকরা যখন তাঁর আওয়াজ শ্রবণ করত তখন কুরআনকে এবং যিনি তা আনয়ন করেছেন তাঁকে গালি দিত। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিম্নস্বরে কুরআন পড়তে আরম্ভ করলেন যা সাহাবায়ে কিরাম শুনতে পেতেন না। তখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন-
وَلَا تَجۡہَرۡ بِصَلَاتِکَ وَلَا تُخَافِتۡ بِہَا وَابۡتَغِ بَیۡنَ ذٰلِکَ سَبِیۡلًا
‘আপনি আপনার সালাত উচ্চৈঃস্বরে পড়বেন না, আবার একেবারে নীরবেও পড়বেন না, বরং এতদুভয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন’, সুরা ইসরা-১১০। সুনানে নাসায়ি : ১০১২
(২) ব্যয় ও অর্থনীতিতে মধ্যপন্থা:
ইসলামের শিক্ষা হলো জীবনে ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। অতিরিক্ত অপচয় ও কৃপণতা উভয়ই পরিত্যাজ্য। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
মহান আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَلَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَکَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا
আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করেনা এবং কার্পন্যও করেনা; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। সুরা ফুরকান : ৬৭
মহান আল্লাহ বলেন-
وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا
“তোমার হাতকে গলায় আটকে রেখো না (কৃপণতায় লিপ্ত হয়ো না), এবং সেটিকে পুরোপুরি খুলেও দিও না (অর্থাৎ অপচয়ে লিপ্ত হয়ো না), ফলে তুমি নিন্দিত ও হতাশ হয়ে পড়তে পারো। সুরা ইসরা : ২৯
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে, যা কৃপণতা ও অপচয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়।
মধ্যপন্থার দুটি সীমারেখা। একটি হল অপচয় অপরটি হল কৃপনা। অপচয় এবং কৃপনা মাঝেই আয় ব্যয়ের মধ্যপন্থা নিহীত আছে। তাই আসুন দেখি এই অপচয় এবং কৃপনা সম্পর্কে ইসলাম কি বল?
ক। সম্পদের অপচয় করা-
অপচয় সম্পর্কে কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
وَءَاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُ ۥ وَٱلۡمِسۡكِينَ وَٱبۡنَ ٱلسَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِيرًا (٢٦) إِنَّ ٱلۡمُبَذِّرِينَ كَانُوٓاْ إِخۡوَٲنَ ٱلشَّيَـٰطِينِۖ وَكَانَ ٱلشَّيۡطَـٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورً۬ا (٢٧)
অর্থঃ আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। সুরা বনী-ইসরাঈল : ২৬-২৭
মহান আল্লাহ বলেন,
كُلُواْ مِن ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُواْ حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
অর্থঃ এগুলোর ফল খাও, যখন ফলন্ত হয় এবং হক দান কর কর্তনের সময়ে এবং অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আনয়াম :১৪১
মহান আল্লাহ বলেন,
*يَا بَنِي آدَمَ خُذُواْ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وكُلُواْ وَاشْرَبُواْ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ*
অর্থঃ হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১
উপরে কুরআন কিছু আয়াত তুলে ধরলাম এ সম্পর্ক বহু সহিহ হাদিস আছে। কলরব বৃদ্ধির করানে সেগুলো উল্লেখ করলাম না। শুধু কুরআন থেকেই আমরা সহজেই অপচয়ের খারাপ দিকটা বিঝতে পারলাম। এবার আসুন এর সম্পূর্ণ বিপরীত কৃপনতার দিকটাও জেনে নেই।
খ। সম্পদ ব্যয়ে কৃপনতা করা-
কৃপণতার ভয়াবহতা উল্লেখ করে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَلاَ يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُمْ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلِلّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاللّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
অর্থঃ আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পন্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পন্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও যমীনের পরম সত্ত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর; আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন। ( সুরা ইমরান : ১৮০
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا
অর্থঃ আর আল্লাহ এমন লোকদেরকেও পছন্দ করেন না, যারা কৃপণতা করে, অন্যদেরকেও কৃপণতা করার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন সেগুলো গোপন করে৷ এই ধরনের অনুগ্রহ অস্বীকারকারী লোকদের জন্য আমি লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তির ব্যবস্তা করে রেখেছি৷ সুরা নিসা : ৩৭
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
هَاأَنتُمْ هَؤُلَاء تُدْعَوْنَ لِتُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَمِنكُم مَّن يَبْخَلُ وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنتُمُ الْفُقَرَاء وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ
অর্থঃ শুন, তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার আহবান জানানো হচ্ছে, অতঃপর তোমাদের কেউ কেউ কৃপণতা করছে। যারা কৃপণতা করছে, তারা নিজেদের প্রতিই কৃপণতা করছে। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্থ। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না। সুরা মুহাম্মাদ : ৩৮
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
لَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
অর্থঃ যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার প্রতি উৎসাহ দেয়, যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জানা উচিত যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। সুরা হাদীদ :২৪
অপচয়ের পর কৃপনতার সম্পর্কেও কুরআনের কিছু আয়াত তুলে ধরলাম যাতে সহজেই কৃপনাতার কুফল সম্পর্কে একটা ধারনা পাওয়া যায়। এ বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে, এই দুটি বিষয়ই ইসলামে হারাম করা হয়েছে। এ জন্য মহান আল্লাহ নিকট জবাবদিহী করতে হবে কিন্তু যদি কেউ এই দুটির মাঝামাঝিতে অবস্থান করে অর্থাৎ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তাহলে সে মহান আল্লাহ নিকট পুরস্কৃত হবে। তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মধ্যপন্থা অবলম্বন ছাড়া বিকল্প নেই।
(৩) দাওয়াহ ও ধর্ম প্রচারে মধ্যপন্থা:
ইসলাম দাওয়াহ কার্যক্রমে সহনশীলতা এবং উত্তম আচরণের নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَالۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَجَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ رَبَّکَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ وَہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ
তুমি তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন। সূরা নাহল : ১২৫
এখানে দাওয়াহ ও বিতর্কেও সুন্দরভাবে এবং মধ্যপন্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি সহিহ হাদিসে এসেছে-
عَنْ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ يَتَخَوَّلُنَا بِالْمَوْعِظَةِ فِي الْأَيَّامِ كَرَاهَةَ السَّآمَةِ عَلَيْنَا.
ইবনু মাস’ঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে নির্দিষ্ট দিনে নাসীহাত করতেন, আমরা যাতে বিরক্ত বোধ না করি। সহিহ বুখারি : ৬৮, ৬৪১১, সহিহ মুসলিম : ২৮২১
আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“ يَسِّرُوا وَلاَ تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلاَ تُنَفِّرُوا
তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না, মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিরক্তি সৃষ্টি করো না। সহিহ বুখারি : ৬৯, ৬১২৫. সহিহ মুসলিম : ১৭৩৪
আবূ ওয়াইল (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- ইবনু মাস‘ঊদ (রাযি.) প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের নাসীহাত করতেন। তাঁকে একজন বলল, ‘হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমার ইচ্ছা জাগে, যেন আপনি প্রতিদিন আমাদের নাসীহাত করেন। তিনি বললেনঃ এ কাজ থেকে আমাকে যা বাধা দেয় তা হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে ক্লান্ত করতে পছন্দ করি না। আর আমি নাসীহাত করার ব্যাপারে তোমাদের (অবস্থার) প্রতি খেয়াল রাখি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্লান্তির আশংকায় আমাদের প্রতি যেমন লক্ষ্য রাখতেন। সহিহ বুখারি :৭০
দাওয়াতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় মধ্যপন্থা অনুসরণ করছেন। তিনি কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করেনি আবার কেউ মুসরিক আবস্থায় মারা যাক তাও তিনি চাননি। মহান আল্লাহ বলেন,
نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ وَمَا أَنتَ عَلَيْهِم بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيدِ
অর্থঃ তারা যা বলে, তা আমি সম্যক অবগত আছি। আপনি তাদের উপর জোর জবরকারী নন। অতএব, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কোরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন। সুরা কাহফ : ৪৫
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের কে খুব আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহনে আহবান জানাতেন। নবী রাসূল প্রেরণ করে ভাবসাম্য রক্ষা করে মধ্যপন্থায় দাওয়াত দিতে বলেছেন। কুরআনের মাধ্যমে পরকালে ভয় প্রদর্শন করে উপদেশ দিতে হবে। আহবানে সাড়া না দিলে খুব কষ্ট পেতেন তখন আল্লাহ বলতেন,
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلَاغُ
অর্থঃ এখন যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, আমি তো আপনাকে তাদের জন্য রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি৷ কথা পৌছিয়ে দেয়াই কেবল তোমার দায়িত্ব৷ সুরা শূরা : ৪৮
মহান আল্লাহ এখানে মানুষকে তার কথা না শুনার জন্য কঠোরতা প্রদর্শণ করেনি। আবার সতর্ক করতেও কার্পন্য করেনি। একটি ভারসাম্য পূর্ণ কাজই হলো মধ্যপন্থা। কাজেই যারা হকপন্থী তারা ব্যক্তিগত, সমাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্র মনোভাব, চরমপন্থা ও বাড়াবাড়ির মতো নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে চলার চেষ্টা করবে। তাই এক কথায় বলা যায় যারা সকল ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা তারাই প্রকৃত হকপন্থী।
(৪) সামাজিক জীবনে মধ্যপন্থা:
সামাজিক আচার ব্যবহার কথা বার্তা লেন দেন সর্বক্ষেত্র মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। এটাই ইসলামি রীতি। এটাই সুন্নাহ।
আবূ জাবীরা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমর ইবন আস একজন দীর্ঘ বক্তৃতা দানকারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেনঃ যদি সে মধ্যম ধরনের বক্তৃতা দিত, তবে খুবই ভাল করতো। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
لَقَدْ رَأَيْتُ أَوْ أُمِرْتُ أَنْ أَتَجَوَّزَ فِي الْقَوْلِ فَإِنَّ الْجَوَازَ هُوَ خَيْرٌ
আমি এটা ভাল মনে করি এবং আমাকে এরূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন বক্তৃতা দেয়ার সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করি। কেননা, মধ্যম-পন্থাই হলো উত্তমপন্থা।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, (মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন বলেন) আমার অনুমান যে, তিনি এটা মারফুভাবে বর্ণনা করেছেন (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী স্বরূপ বর্ণনা করেছেন)। তিনি বলেছেনঃ নিজের বন্ধুর সাথে ভালবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সাথেও শত্রুতার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ১৯৯৭
(৫) আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়ে মধ্যপন্থা-
ইসলামে আশা ও ভয় উভয়ই মুমিনের ঈমানের জন্য অপরিহার্য। আশা আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস এনে মুমিনকে ইবাদতে উৎসাহিত করে। ভয় আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচতে আমাদের গুনাহ থেকে বিরত রাখে। একজন মুমিনের উচিত উভয়টির ভারসাম্য রক্ষা করা। যেমন, জীবনকালীন ইবাদতে ভয় বেশি রাখতে হবে, আর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে আল্লাহর রহমতের প্রতি বেশি আশা রাখতে হবে। ।
মহান আল্লাহ বলেন-
نَبِّیٴۡ عِبَادِیۡۤ اَنِّیۡۤ اَنَا الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ. وَاَنَّ عَذَابِیۡ ہُوَ الۡعَذَابُ الۡاَلِیۡمُ
আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও যে, আমি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার আযাবই যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা হিজর : ৪৯-৫০
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَنْ يُنَجِّيَ أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلُهُ قَالُوا وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ وَلاَ أَنَا إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ بِرَحْمَةٍ سَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَاغْدُوا وَرُوحُوا وَشَيْءٌ مِنْ الدُّلْجَةِ وَالْقَصْدَ الْقَصْدُ تَبْلُغُوا.
কস্মিনকালেও তোমাদের কাউকে তার নিজের ’আমল কক্ষনো নাজাত দিবে না। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেনঃ আমাকেও না। তবে আল্লাহ্ আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত রেখেছেন। তোমরা যথারীতি ’আমল করে নৈকট্য লাভ কর। তোমরা সকালে, বিকালে এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদাত কর। মধ্য পন্থা অবলম্বন কর। মধ্য পন্থা তোমাদেরকে লক্ষ্যে পৌঁছাবে। সহিহ বুখারি : ৬৪৬৩, সহিহ মুসলিম : ২৮১৬
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। আল্লাহ্ যেদিন রহমত সৃষ্টি করেন সেদিন একশটি রহমত সৃষ্টি করেছেন। নিরানব্বইটি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন এবং একটি রহমত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদি কাফির আল্লাহর কাছে সুরক্ষিত রহমত সম্পর্কে জানে তাহলে সে জান্নাত লাভে নিরাশ হবে না। আর মু’মিন যদি আল্লাহর কাছে যে শাস্তি আছে সে সম্পর্কে জানে তা হলে সে জাহান্নাম থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে না। সহিহ বুখারি : ৬৪৬৯, ৬০০০
(৬) দুনিয়া ও আখিরাতের প্রচেষ্টায় মধ্যপন্থা অবলম্বন-
মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানে হয়েছে পরীক্ষার জন্য। তাকে দুনিয়া থেকেই আখিরাতের সম্বল অর্জণ করতে হবে। শুধু দুনিয়া অর্জণ যেমন আখিরাত নষ্ট করে দিতে পারে ঠিক তেমনি দুনিয়া ছেড়ে শুধু আখেরাত মুখি হওয়াও অসম্বব। এই ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে নির্দেষ প্রদান করে। শুধু দুনিয়ার পিছনে লেগে থাকলে আখিরাত যে নষ্ট হবে তা সকলেই বুঝে। কিন্তু আখিরাত পাওয়ার জন্য দুনিয়া সম্পূর্ণ ত্যাগ করে বনে জঙ্গলে কাটালেও আখিরাত কিভাবে নষ্ট হবে, তা বুঝে আসে না। ধরুন আখিরাতের লোভে আপনি সংসার ছেড়ে, পরিবার ছেড়ে, সমাজ ছেড়ে বনে জঙ্গলে কালাতি পাত করছেন। তাহলে আপনার উপর আপনার সংসার, পরিবার ও সমাজ যে দায়িত্ব মহান আল্লাহ দিয়েছেন তা আদায় করবে কে? এই মহান আল্লাহ কোন নবী বা রাসূল সংসার বিরাগি জীবন যাপন করেনি। তারা ইবাদাতে পাশাপাশি দুনিয়ার সকলের সাথে মিলেমিসে মানুষদের আখিরাতের প্রতি আহবান করছেন। এই হল দুনিয়া ও আখিরাতের একটি ভারসাম্য নীতি বা মধ্যপন্থা। মহান আল্লাহ দুনিয়া আখিরাতের উভয়ের কল্যানের জন্য দুয়া করতে বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থঃ আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে-হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। সুরা বাকারা : ২০১
মহান আল্লাহ আয় করার হুকুম করছেন তাই হালাল উপার্জণ ফরজ। কিন্তু সেই সাথে তিনি আখিরাতকে না ভোলার নির্দেষ প্রদান করা হয়েছে। ইসলাম অর্থোপার্জন ও খরচের ব্যাপারেও মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছে। অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে একদিকে আদেশ করা হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন,
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থঃ অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সুরা জুমুআ : ১০
দুনিয়ার কোন হালাল কাজের জন্য শরীআতের কোনো হুকুম পালনে উদাসীন হলে ঐ কাজটি আবার হারাম হয়ে যাবে। অর্থাৎ আয় উপার্জণেও ভারসাম্য রাখতে হবে। মহান আল্লাহ একদিকে উপার্জনের নির্দেশ অন্যদিকে সাবধান করেছেন যেন আখিরাতকে ভুলে না যাই। মহান আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
অর্থঃ মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ত তি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা মুনাফিক্বুন ৬৩:৯)।
উপার্জনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার এমন অবহেলা ও শিথিলতা করা যাবে না, যার ফলে নিজের ও যাদের উপর ভরোন পোশন ফরজ তারা বঞ্চিত হয়। আবার এমন বাড়াবাড়ি ও লোভ-লালসার করা যাবেনা যার ফলে হালাল-হারামের সীমারেখা লংঘিত হয় অথরা ফরজ ইবাদাতে (সালাত, সিয়াম, হজ্জ) অবহেলা প্রদর্শন করা হয়। বরং আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম পালনের পর বৈধতার সীমারেখার মধ্যে থেকে যতটুকু চেষ্টা সম্ভব ততটুকুতেই ক্ষান্ত থাকবে এবং তাতে যে উপার্জন হয় তাতে পরিতুষ্ট থাকবে। এটিই উপার্জন চেষ্টার মধ্যপন্থা
হাদীসে এরই শিক্ষাদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তোমরা দুনিয়া সন্ধানে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর। মনে রেখ প্রত্যেকের জন্য তা থেকে যা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সে কেবল তাই পাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম -২১৩৩; মুসনাদে বাযযার – ১৬০২)।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য থাকলেই মানুষ ধনী হয় না। মনের ঐশ্বর্যই প্রকৃত ঐশ্বর্য। সহিহ মুসলিম ২৩১০, ইফাঃ ২২৮৮, সহিহ বুখারী, তিরমিযী, আবু দাউদ, আদাবুল মুফরাদ-২৭৬)।
৪. মধ্যপন্থার উপকারিতা-
মধ্যপন্থা বজায় রাখা ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং ধর্মীয় জীবনে বহু উপকার বয়ে আনে। এটি একজন মানুষকে পরিমিতিবোধ, স্থিতিশীলতা এবং সফলতার পথে পরিচালিত করে। নিচে মধ্যপন্থার গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা তুলে ধরা হলো। এই পন্থা জীবনকে সহজ ও ভারসাম্যময় করে তুলে।
সহিহ হাদিসে এসেছে-
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ سُئِلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ وَقَالَ اكْلَفُوا مِنْ الأَعْمَالِ مَا تُطِيقُونَ.
আয়িশাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ’আমল কী? তিনি বললেনঃ যে ’আমল সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয়। যদিও তা অল্প হয়। তিনি আরও বললেন, তোমরা সাধ্যের অতীত কাজ নিজের উপর চাপিয়ে নিও না। সহিহ বুখারি : ৬৪৬৫
আলক্বামাহ (রহ.) বর্ণনা করেন। আমি উম্মুল মু’মিনীন ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ’আমল কেমন ছিল? তিনি কি কোন ইবাদাতের জন্য কোন দিন নির্দিষ্ট করতেন? তিনি বললেন, না। তাঁর ’আমল ছিল সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতে পারতেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তা করতে পারবে? সহিহ বুখারি : ৬৪৬৬
৫। যুগে যুগে দ্বীনে মধ্যপন্থা অবলম্বন না করার ক্ষতি-
দ্বীনে মধ্যপন্থা বিপরীত হলো বাড়াবাড়ি করা অথবা দ্বীন ছেড়ে কুফরি অবলম্বন করা। দ্বীন পুরোপুরি ছেড়ে দিলে যে ক্ষতি হবে তা আর ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না। কিন্তু দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে যে ক্ষতি হয় সে সম্পর্কে একটু আলোচনা দরকার। কেননা এর মাধ্যমেই মধ্যমপন্থা অতিক্রম করা হয়। দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এটি ইবাদতে স্থায়িত্ব নষ্ট করে, মানসিক ও শারীরিক অস্বস্তি সৃষ্টি করে এবং ইসলামের সৌন্দর্যকে ম্লান করে। ইসলামের শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো সহজতা, ভারসাম্য, মধ্যপন্থা এবং মানবকল্যাণ। তাই মুসলিমদের উচিত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকা। দ্বীনে এই বাড়াবাড়ি যুগ যুগ ধরে মানুষ জাতীর মধ্যে চলে আসছে এবং আজও আমাদের শরীয়তে নামে চলছে।
আব্দুল্লাহ বিন আববাস্ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ! إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِيْ الدِّيْنِ ، فَإِنَّهُ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ فِيْ الدِّيْنِ
হে মানুষ সকল! তোমরা ধর্মীয় ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ, তোমাদের পূর্বেকার সকল উম্মাত শুধু এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে’। সহিহ মুসলিম : ২৬৭০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৮
(১) নূহ (আ.) এর কওমের বাড়াবাড়ি-
প্রতিটি যুগে মানুষ নবী, রসূল ও নেককার মানুষদের নিয়ে বাড়াবাড়ির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। নূহ আলাইহিসের কওমের বাড়াবাড়ি দ্বারাই প্রথম মুর্তি পুজার শির্ক শুরু হয়। তাদের সময়ের প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের স্মরণার্থে তাদেরই প্রতিকৃতি বা মূর্তি স্থাপন করে। প্রথমত: এগুলোকে তারা এমনিতেই তৈরী করেছিল। তারা এগুলোকে সম্মানও দেখাত না, পূজাও করত না। কিছুদিন পর শুরু হয় এগুলোর প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন, যার অনিবার্য পরিণতিতে কিছুদিনের মধ্যে এগুলো পূজার বস্তুতে পরিণত হয়। এ প্রসংগে মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا ﴾
অর্থঃ তারা বলেছে, তোমরা নিজেদের দেব-দেবীদের কোন অবস্থায় পরিত্যাগ করো না৷ আর ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসরকেও পরিত্যাগ করো না। সুরা নুহ : ২৩
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতির মাঝে প্রচলিত ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ ‘দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে অবস্থিত কালব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া’আ হল হুযাইল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুস ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটে ‘জাওফ’ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা গোত্রের হিমযায় শাখারদের মূর্তি। নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতির কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শয়তান তাদের জাতির লোকদের হৃদয়ে এই কথা ঢুকিয়ে দিল যে, তারা যেখানে বসে মজলিস করত, সেখানে তোমরা কিছু মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সকল নেক লোকের নামানুসারেই এগুলোর নামকরণ কর। সুতরাং তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐসব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলো সম্পর্কে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা করতে শুরু করে দেয়। সহিহ বুখারি হাদিস : ৪৫৫৫
(২) দ্বীনে ক্ষেত্রে ইহুদি ও খৃষ্টানদের বাড়াবাড়ি-
আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে করতে নিষেধ করেছেন। তারা সীমার বাহিরে বাড়াবড়ি কারনে অনেক সময় শাস্তি ভোগ করেছে। ইহুদি ও খ্রীষ্টানদের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের বহু স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।
وَقَالَتِ الۡیَہُوۡدُ عُزَیۡرُۨ ابۡنُ اللّٰہِ وَقَالَتِ النَّصٰرَی الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ قَوۡلُہُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ ۚ یُضَاہِـُٔوۡنَ قَوۡلَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ قٰتَلَہُمُ اللّٰہُ ۚ۫ اَنّٰی یُؤۡفَکُوۡنَ
আর ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা, তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতঃপূর্বে কুফরী করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোথায় ফেরানো হচ্ছে এদেরকে? সুরা তাওবা : ৩০
ইহুদি ও খৃষ্টানগণ বাড়াবাড়ির সকল সীমা অতিক্রম করেছে। তারা তাদের নবীাকে আল্লাহর পুত্র হিসাবে নির্ধারণ করেছে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
*يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ *
অর্থঃ হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না। সুরা নিসা : ১৭
মহান আল্লাহ বলেন-
*يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لاَ تَغْلُواْ فِي دِينِكُمْ وَلاَ تَقُولُواْ عَلَى اللّهِ إِلاَّ الْحَقِّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ فَآمِنُواْ بِاللّهِ وَرُسُلِهِ وَلاَ تَقُولُواْ ثَلاَثَةٌ انتَهُواْ خَيْرًا لَّكُمْ إِنَّمَا اللّهُ إِلَـهٌ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَن يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَات وَمَا فِي الأَرْضِ وَكَفَى بِاللّهِ وَكِيلاً*
অর্থঃ হে আহলে-কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর শানে নিতান্ত সঙ্গত বিষয় ছাড়া কোন কথা বলো না। নিঃসন্দেহে মরিয়ম পুত্র মসীহ ঈসা আল্লাহর রসূল এবং তাঁর বাণী যা তিনি প্রেরণ করেছেন মরিয়মের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহকে এবং তার রসূলগণকে মান্য কর। আর একথা বলো না যে, আল্লাহ তিনের এক, একথা পরিহার কর, তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ একক উপাস্য। সন্তান-সন্ততি হওয়াটা তাঁর যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমান সমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তার। আর কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১
(৩) উম্মতে মুহাম্মদীকে ও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন-
আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুহাম্মাদীকেও সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার সীমা অতিক্রম করে বাড়াবাড়ি আমাদের জন্য শাস্তির কারন হয় দাড়াবে। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে বলেন,
فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلاَ تَطْغَوْاْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
অর্থঃ অতএব, তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও, যেমন তোমায় হুকুম দেয়া হয়েছে। আর তোমরা সীমালংঘন করো না। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের সকল কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেন। সুরা হুদ : ১১২
আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন-
هَلَكَ الـْمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْنَ ، هَلَكَ الْـمُتَنَطِّعُوْن
‘সীমা লঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক! রাসূল (সা.) এ বাক্যটি তিন বার উচ্চারণ করেন’’। সুনানে ইবনু মাজাহ্ : ৩০৮৫, সুনানে ইবনু হিববান : ১০১১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল ’আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেন-
غَدَاةَ الْعَقَبَةِ وَهُوَ عَلَى نَاقَتِهِ ” الْقُطْ لِي حَصًى ” . فَلَقَطْتُ لَهُ سَبْعَ حَصَيَاتٍ هُنَّ حَصَى الْخَذْفِ فَجَعَلَ يَنْفُضُهُنَّ فِي كَفِّهِ وَيَقُولُ ” أَمْثَالَ هَؤُلاَءِ فَارْمُوا ” . ثُمَّ قَالَ ” يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِي الدِّينِ فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِي الدِّينِ
আমার জন্য কংকর সংগ্রহ করে লও। আমি তাঁর জন্য সাতটি কংকর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন, এই আকারের ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। তিনি পুনরায় বলেন, দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকেদেরকে দীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩০২৯, সুনানে নাসায়ি : ৩০৫৯, আহমাদ : ১৮৫৪, সহীহাহ : ১২৮৩,
(৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিয়ে বাড়াবাড়ি-
কাউকে সম্মান করার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করতে নিষেধ করেছেন। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কেও মুসলিম সমাজে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায়। অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ি করে স্রষ্টা ও সৃস্টি মধ্যে পার্থক্য না করাই বড় শির্ক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে শ্রদ্ধা করার অর্থ হল, তার আদেশ, নিষেধ মেনে চলা। তার আনিত দ্বীনের পরিপূর্ণ অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংশা করতে হবে সেইভাবে, যেভাবে আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংশা করেছেন। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সর্বশ্রেষ্ট সৃস্টি। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তাকে অনেক অনেক সম্মান দান করে বলেন-
لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ۬ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأَخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا
অর্থঃ আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে। সুরা আহজাব : ২১
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
* وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤ *
অর্থঃ “আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন। সুরা কলম : ৪
মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّكَ لَمِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ (٣) عَلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬
অর্থঃ তুমি নিসন্দেহে রসূলদের অন্তরভুক্ত, সরল-সোজা, পথ অবলম্বনকারী। সুরা ইয়াসিন : ২-৩
এ ছাড়াও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমস্ত বিশ্বজাহানের রহমত স্বরূপ তাকে প্রেরণ করা হইয়াছে। তিনি মাক্বামে মাহমূদের অধিকারী করেছেন। তিনি সমস্ত আদম জাতীর সর্দার বানিয়েছেন। তাকে আল্লাহর খলীল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহন করেছেন। তিনি আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী। তিনি সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী হিসাবে আল্লাহ মর্জাদা পেয়েছেন। তিনি সর্বাধিক মুত্তাক্বী ও পরহেজগারদের হিসাবে পরিগনিত। তিনি নবীকুল শিরোমণী।
এত সম্মান ও মর্জাদা থাকা সত্বেও কিছু অতি পন্ডিত জ্ঞান পাপি তার সম্পর্কে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জিত করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অতিরঞ্জন বা বাড়াবাড়ির অর্থ হচ্ছে তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের উর্ধ্বে স্থান দেয়া। পৃথিবীতে রিসালাতের উর্ধ্বে কোন মানুষের মর্জাদা আছে বলে কেউ স্বীকার করবে না। কারণ এটাই পৃথিবীর সর্বচ্চো ডিগ্রি, সর্বচ্চেো সম্মান। কিন্তু সুফিরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কে মহান আল্লাহ কাছাকাছি তুলনা করতে দিধা করেনি। যেমন- তিনি অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন, সর্বদা হাজির নাজির, আল্লাহর স্বত্বাগত নূর থেকে সৃষ্টি, মানুষের ভাল মন্দের ক্ষমতা রাখেন, তিনি করবে দুনিয়ার জীবনের মত জীবন জাপন করছেন ইত্যাদি। অথচ এই ধরণের বাড়াবাড়ি শিরকি ও কুফরি পর্যায়ের। ইসলাম ধর্মে এই ধরনের বাড়াবাড়ি হারাম।
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি উমার (রাঃ)-কে মিম্বারের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন যে-
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ لَا تُطْرُونِيْ كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُوْلُوْا عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ‘ঈসা মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তাঁর বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সহিহ বুখারি ৩৪৪৫, মিশকাত : ৪৮৯৭
’আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতিরিক্ত চাটুকারীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। তিনি এ কথাটি তিনবার বলেছেন। সহিহ বুখারি : ২৬৭০
এই সকল বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। সৃষ্টি ও স্রষ্টা মাঝে পার্থক্য করে যার যার যথাযথ মর্জাদা তাকেই দিতে হবে। ধর্মের মানে বাড়াবাড়ি যুগে যুগে মানুষকে শির্ক কাজ করতে বাধ্য করছে। উম্মাতে মুহাম্মাদীর মাঝে বিরাট একটা অংশ এই বাড়াবাড়ি লিপ্ত। তাদের উচিৎ হবে এই ধরনের বাড়াবাড়ি পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।
মহান আল্লাহ প্রদত্ত এত সুন্দর মধ্যপন্থী ধর্মের যারা কঠোরতা খুজে পায় তাদের ব্যাপারে শুধু একটা কথাই বলব। তাহলো তাদের জ্ঞানের সল্পতা। ইসলামকে জানি এর সৌন্দর্জ উপভোগ করি আর মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট করি। তারপর ও যদি ভূলে যাই বা ভুল করি তাও মহান আল্লাহ মাপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর আমদের সাধ্যের অতিরিক্তের জন্য কোন জবাব দিহীতা তার নিকট করতে হবে না। কারন তিনি ইরশাদ করেনঃ
لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لاَ تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
অর্থঃ আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। সুরা বাকারা : ২৮৬
কুরআন সুন্নাহর আলোকে যাদের মাঝে এই মধ্যন্থার গুনটি পাবেন তাদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তুর্ভূ্ক্ত মনে করতে পারেন। অন্যগুনগুলোর মাঝে তাদের এইগুনটিকে লক্ষ করবেন।