উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা ষ্পষ্ট ধারনা হয়েছে। নিজে নিজেই আশুরার বা মুহাররম মাসের দশ তারিখের সুন্নাহ সম্মত আমল পালন করতে পাবর। এখান আশুরার কয়েকটি জঘন্য বিদআত আলোচনা করব।
(১) আশুরার দিনে মাতম করাঃ
উপরের আলোচনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.)র নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই। এমন কি আহলে বাইতের নামে প্রচলিত মাজহাবেও তার কোনো দলীল নেই এবং সর্বোপরি ইসলামী আকীদার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই নিকৃষ্ট বিদআত আস্তে আস্তে তাদের মধ্য প্রসার ঘটে। শীয়াগণ সঠিকভাবে কখন এর দলীল দিতে পারবেনা। হুসাইন (রা.)র বহু সাহাবী শহীদ হয়েছেন। এমন কি মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ট খলিফা উসমান (রা.) উমর (রা.) ও আলী (রা.) শহীদ হয়েছেন। তারা আলী (রা.) বাদে সকল সাহাবীদের শাহাদত বরণে শোক তো দূরের কথা, বরং আনন্দ দিবসে পরিণত হয়। আববাসীয় খলীফা মুত্বী বিন মুক্বতাদিরের সময়ে (৩৩৪-৩৬৩হিঃ/৯৪৬-৯৭৪ খৃঃ) তাঁর কট্টর শীয়া আমীর আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামী ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫১ হিজরীর ১৮ই যিলহজ্জ তারিখে বাগদাদে উছমান (রা.) এর শাহাদত বরণের তারিখকে তাদের হিসাবে খুশীর দিন মনে করে ‘ঈদের দিন’ হিসাবে ঘোষণা করেন। শীয়াদের নিকটে এই দিনটি পরবর্তীতে ঈদুল আযহার চাইতেও গুরুত্ব পায়। অতঃপর ৩৫২ হিজরীর শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শীয়ারা খুশী মনে এই নির্দেশ পালন করে। কিন্তু সুন্নীরা নিষ্ক্রিয় থাকেন। পরে সুন্নীদের উপরে এই ফরমান জারি করা হলে ৩৫৩ হিজরীতে উভয় দলে ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে বাগদাদে তীব্র নাগরিক অসন্তোষ ও সামাজিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। ইবনুল আছীর, তারীখ ৮/১৮৪ পৃঃ; মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৬-৭
এমনিভাবে তারা রাসূল ﷺ কর্তৃক নিষিদ্ধ জাহেলী জামানার একটি অভ্যাসকে তারা ইবাদাত মনে করে চালিয়ে যাচ্ছে। মনে করছে তারা আহলে বাইতের সঠিক সম্মান দিচ্ছে। আসলে তারা এর মাধ্যমে ইসলামের মুল শিক্ষাকে অপমান করে আহলে বাইতের মর্জাদাকে ছোট করছে। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে তাদের আলেমগণ আশুরার দিনে মাতম ও হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে চিৎকার করাকে আল্লাহর নিদর্শন বলে উল্লেখ করে নিম্নের আয়াতটিকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
এ হচ্ছে আসল ব্যাপার (এটি বুঝে নাও), আর যে ব্যক্তি আল্লাহ নির্ধারিত রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখায়, তার সে কাজ তার অন্তরের আল্লাহভীতির পরিচায়ক। সুরা হাজ্জ্ব : ৩২
আল্লাহর নির্ধারিত রীতিনীতির প্রতি সম্মান দেখায় হল তার আনুগত্যের করা। যেমন, নামায, রোযা, হজ্জ ইত্যাদি যথাযতভাবে পালন করা। এই আমলগুলি হল বান্দার হৃদয়ের অভ্যন্তরের তাকওয়ার ফল এবং মানুষের মনে যে কিছু না কিছু আল্লাহর ভয় আছে তা এরি চিহ্ন। তাইতো সে তাঁর নিদর্শনসমূহের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করছে।
কিন্ত শীয়াগণ বিলাপ করা, গাল ও বুক থাপড়ানো, আল্লাহর বান্দা ও রাসূলের সাহাবীদেরকে গালাগালি করাকে আল্লাহর সম্মানিত নিদর্শন মনে করেই করে থাকেন। এর চেয়ে অধিক মূর্খতা আর কি হতে পারে? আবার দেখুন, মাতম করার পর তারা তারা মানুষের মাঝে গোশত, খাদ্য-পানীয় এবং অন্যান্য বস্তু বিতরণ করে। কারবালা সম্পর্কিত বিভিন্ন শির্কী কবিতা আবৃতি করে রাত পার করে। অপর পক্ষে কিছু লোক এই দিনে সিয়াম রাখল, জিকির আজকার করল, কুরআন তেলাওয়াত করল এবং অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে এই দিন অতিবাহিত কর। এই দুই জনে কে শোক পালনের কাজ করল। যদিও শোকা পালন করা শরীয়ত সম্মত নয়। বিষয়টি বুঝার জন্য বললাম। শীয়াগণ ভাল ভাল খাবার খায় আর শোক পালন করে নিজেদের আমলেই বৈপরত্য।
(২) শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করাঃ
আলোচনার প্রথমে আশুরার সম্পর্কে হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। আশুরার চেতনা হল, অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ৯ ও ১০ই মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ই মুহাররম সিয়াম পালন করা। বর্তমান সুন্নী মুসলিম সমাজে উক্ত দু’টি ছিয়াম পালনের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু শীয়া ও তাদের পাশাপাশি সামান্য কিছু সুফি তরিকার লোক শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে ছিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা এই সিয়ামের সূচনা হয়েছে মূসা (আ.) এর সময় থেকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশাতেই মুহাররমের ছিয়াম পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ আশূরার ছিয়াম পালন করেছিলেন অত্যাচারী শাসক ফেরাঊনের কবল থেকে মূসা (আ.)-এর নাজাতের আনন্দে আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ। পক্ষান্তরে আমরা আজ তা পালন করছি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের শোক স্বরূপ। অথচ ওমর (রা.), ওছমান (রা.) সহ আরো অনেক ছাহাবী শাহাদত বরণ করেছেন। আমরা তাঁদের স্মরণে কিছুই করি না। যদি হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের কারণে শোক দিবস পালন করা হয়, তাহ’লে ওমর ও ওছমান (রা.)-এর শোক দিবস পালনের অধিক হক রাখে।
(৩) ১০ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করাঃ
শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে। এ দিনে রাফেযীদের শোক দিবস যেমন বিদ‘আত; তেমনি তাদের বিরোধিতার লক্ষ্যে এ দিনে আনন্দ উৎসব করাও বিদ‘আত। এটা যেন বিদ‘আত দিয়ে বিদ‘আত এবং মিথ্যা দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করার চেষ্টা। অথচ উচিত ছিল সুন্নাত দিয়ে বিদ‘আত প্রতিহত করা। সত্য দিয়ে মিথ্যা প্রতিহত করা। রাসূল ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনটিকে শোক দিবস হিসাবেও পালন করেননি। আবার আনন্দ উৎসবেও পরিণত করেননি। তাঁরা শুধুমাত্র ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ ছিয়াম পালন করেছেন।
(৪)তাযিয়া মিছিল বাহির করাঃ
পূর্বের আলোচানায় উল্লেখ করেছি, কট্টর শীয়া আমীর আহমাদ বিন বূইয়া দায়লামী ওরফে মুইযযুদ্দৌলা ৩৫২ হিজরীর শুরুতে ১০ই মুহাররমকে তিনি হুসাইন (রা.) এর শাহাদত বরণের ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন এবং মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন। শীয়ারা খুশী মনে এই নির্দেশ পালন করে। তার চালু করা বিদআত আজও শীয়ারা পালন করে আসছে। অথচ এই সকল কাজ শরীয়ত সম্মত নয়।
আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী ﷺ ইরশাদ করেছেন-
যারা শোকে গালে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার দেয়, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়। (সহিহ বুখারী হাঃ ১২৯৬)
আবূ মূসা (রা.) কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মাথা তাঁর পরিবারের এক মহিলার কোলে ছিল। সে মহিলা চিৎকার করে উঠলো। তিনি তাকে তা থেকে বাধা দিতে পারেননি। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরলো তখন বললেন, আমি তার থেকে সম্পর্কহীন, যার থেকে রসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন। যে ব্যক্তি (মৃতের শোকে) উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটি করে, মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলে, রসূলুল্লাহ ﷺ তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। সহিহ মুসলিম : ১০৪
মিডিয়ার কারনে ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটে এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাযিয়া মিসিল। তাযিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ।
যায়নাব বিন্তু আবূ সালামা (রা.) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ এর সহধর্মিণী উম্মু হাবীবা (রা.) এর নিকটে গেলাম। তখন তিনি বললেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لاَ يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُحِدُّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلاَثٍ إِلاَّ عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
আল্লাহর রসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ্ এবং ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়। তবে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন (বৈধ)। সহিহ বুখারী : ১২৮১
অথচ শীয়ারা এর শোক যুগের পর যুগ চালিয়ৈ যাচ্ছে। শীয়াদের উদ্ভাবিত এই বিদআতী প্রথার অনুসরণেই বাংলাদেশের বিদ‘আতীরা ১০ই মুহাররমে মিছিল বের করে থাকে। প্রত্যেক আল্লাহভীরু মুসলমানের এই সব বিদ‘আত হ’তে দূরে থাকা আবশ্যক।
(৫)১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ
অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম আশূরার দিনে চোখে সুরমা লাগাননি এবং এর কোন ফযীলত বর্ণনা করেননি। ‘আশূরার দিনে চোখে ইছমিদ সুরমা লাগালে কখনোই চোখে রোগ হবে না’ মর্মে প্রচলিত হাদীছটি মাওযূ বা জাল।
শীয়াগণ ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফজিলতের আশায় বিশেষ পদ্ধতিতে ছালাত আদায় করা হয়ে থাকে। যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ছাহাবায়ে কেরাম এ দিনে বিশেষ কোন ছালাত আদায় করেছেন মর্মে কোন ছহীহ দলীল পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কে যা পাওয়া যায় তার সবগুলিই জাল বা বানোয়াট। যেমন-
ক। আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, ‘আশূরার দিনে যে ব্যক্তি চার রাক‘আত ছালাত আদায় করবে এবং প্রত্যেক রাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা ও পঞ্চাশবার সূরা ইখলাছ তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার অতীতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ এবং ভবিষ্যতের পঞ্চাশ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন’। উল্লিখিত হাদীছটি জাল বা বানোয়াট। (ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতিয় খন্ড. পৃ-১২২
খ। রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আশূরার দিনে যোহর ও আছরের ছালাতের মাঝখানে চল্লিশ রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। প্রত্যেক রাক‘আতে একবার সূরা ফাতিহা, দশবার আয়াতুল কুরসী, দশবার সূরা ইখলাছ, পাঁচবার সূরা ফালাক্ব এবং পাঁচবার সূরা নাস তেলাওয়াত করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করবেন’। অত্র হাদীছটিও জাল বা বানোয়াট। ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, দ্বিতিয় খন্ড. পৃ-১২২-১২৩; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদুল মাজমূ‘আহ, পৃ-৪৮
শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, সিয়াম ব্যতীত আশূরা সম্পর্কিত কোন সহিহ হাদীছ নেই। এই দিনে নির্দিষ্ট ছালাতের ফযীলত সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছগণের ঐক্যমতে তার সবগুলিই মিথ্যা ও বানোয়াট। মুহাক্কিক আলেমদের কেউই তাদের কিতাব সমূহে এ সমস্ত হাদীছ সংকলন করেননি। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ ৪/১১৬
অতএব এ উপলক্ষে আশূরার দু’টি সিয়াম ব্যতীত অন্য কোন ইবাদত রাসূলুল্লাহ ﷺ, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম, ইমাম চতুষ্টয়ের কেউ কখনোই করেননি। আর তাঁরা সিয়াম দু’টি পালন করেছেন কেবল ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আ.) এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ। শাহাদতে হুসাইনের শোক স্বরূপ নয়। সুতরাং বর্তমানে আশূরা উপলক্ষে যা হচ্ছে তার সবগুলিই পরবর্তী যূগের বিদ‘আতীদের আবিষ্কার, যা অবশ্যই বর্জনীয়।
(৭)তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়াঃ
ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। বরং সকল মুসলমানের ন্যায় তার মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা উচিত। কেননা মানুষ হিসাবে তার কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন। এজন্য মূলতঃ দায়ী বিশ্বাসঘাতক কূফাবাসী ও নিষ্ঠুর গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। কেননা ইয়াযীদ কেবল হুসাইন (রা.)-এর আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাঁর খুন চাননি। হুসাইন (রা.) সে আনুগত্য দিতেও প্রস্ত্তত ছিলেন। ইয়াযীদ স্বীয় পিতার অছিয়ত অনুযায়ী হুসাইনকে সর্বদা সম্মান করেছেন এবং তখনও করতেন। হুসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক ইয়াযীদের সামনে রাখা হলে তিনি কেঁদে বলে ওঠেন, ‘ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের উপর আল্লাহ লা‘নত করুন। আল্লাহর কসম! যদি হুসাইনের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক থাকত, তাহলে সে কিছুতেই তাঁকে হত্যা করত না। তিনি আরো বলেন, হুসাইনের খুন ছাড়াও আমি ইরাকীদেরকে আমার আনুগত্যে রাযী করাতে পারতাম। (ইবনু তায়মিয়া, মুখতাছার মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৩৫০; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৭৩; আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৭-১০।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন-
সকল মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকের ঐকমত্যে ইয়াযীদ ইবন মু‘আওয়িয়া হুসাইনকে হত্যার আদেশ দেন নি। বরং তিনি উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে চিঠির মাধ্যমে আদেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন ইরাকের জমিনে হুসাইনকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বাঁধা দেন। এতটুকুই ছিল তার ভূমিকা। বিশুদ্ধ মতে তার কাছে যখন হুসাইন নিহত হওয়ার খবর পৌঁছল তখন তিনি আফসোস করেছেন। ইয়াযীদের বাড়িতে কান্নার ছাপ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি হুসাইন পরিবারের কোনো মহিলাকে বন্দী বা দাসীতে পরিণত করেন নি, বরং পরিবারের সকল সদস্যকে সম্মান করেছেন। সসম্মানে হুসাইন পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে মদিনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। যে সমস্ত বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ইয়াযীদ আহলে বাইতের মহিলাদেরকে অপদস্থ করেছেন এবং তাদেরকে বন্দী করে দামেস্কে নিয়ে বেইজ্জতি করেছেন, তার কোনো ভিত্তি নেই।
ইমাম ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন–
এটি প্রায় নিশ্চিত যে ইয়াযীদ যদি হুসাইনকে জীবিত পেতেন, তাহলে তাঁকে হত্যা করতেন না। তাঁর পিতা মুয়াওয়িয়া (রা.) তাকে এ মর্মে অসীয়তও করেছিলেন। ইয়াযীদ এই কথাটি সুস্পষ্টভাবেই ঘোষণা করেছিলেন।
ইবনে আবী নু‘ম হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন একজন লোক তাঁকে ইহরাম অবস্থায় মশা হত্যা করার হুকুম জানতে চাইল। তিনি তখন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোনো দেশের লোক? সে বলল, ইরাকের। ইবনে উমর (রা.) তখন উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা এই লোকটির প্রতি লক্ষ্য কর। সে আমাকে মশা হত্যা করার হুকুম জিজ্ঞেস করছে। অথচ তারা নবী ﷺ এর নাতিকে হত্যা করেছে। আর আমি নবী ﷺকে বলতে শুনেছি, এরা দুজন (হাসান ও হুসাইন) আমার দুনিয়ার দুটি ফুল। সহিহ বুখারী : ৫৯৯৪
১০। ইয়াযীদ সম্পর্কে আমাদের ধারণা কেমন হওয়া উচিতঃ
এই বিষয়টি খুবই স্পর্ষ কাতর একদিকে আমাদের নয়ন মনি নবী এর ﷺ দহিত্র। অপর পক্ষে একজন তাবেয়ী ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা যে সরাসরি এই কাজে অংশগ্রহণ করেনি। এই ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হয়নি। শীয়াগণ হত্যার জন্য তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেয়। তারা তাকে কাফির ও ফাসিক বলেই মনে করে। আবার অনেকে আছে যারা তাকে প্রসংশা করতে করতে এই হত্যা কান্ড থেকে মুক্ত ঘোষনা করে। কিন্তু বিষয় যেহেতু আমাদের নিকট অষ্পষ্ট তাই কাউকে গালি বা অভিশাপ না দিয়ে বিচারের ভার মহান আল্লাহ উপর ছেড়ে দেই। যারা সরাসরি এই কিলিং মিশনে ছিল দুনিয়াতেই তাদের কিছু শাস্তি হয়েছে। যেমনঃ পরবর্তীতে আল-আশতার নাখ‘য়ীর হাতে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ নির্মমভাবে নিহত হন। যখন নিহত হলেন তখন তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মসজিদে রাখা হল। তখন দেখা গেল একটি সাপ এসে মাথার চারপাশে ঘুরছে। পরিশেষে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হল। ফের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে নাকের ছিদ্র দিয়ে তিনবার বের হতে দেখা গেল। (দেখুন: তিরমিযী, ইয়াকুব ইবন সুফীয়ান)
আলহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইতিহাস ও জীবনীর কিতাবগুলোতে দেখা যায় সালাফে সালেহীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং অনুকরণীয় কোনো ইমামের কিতাবে ইয়াযীদের উপর লানত করা বৈধ হওয়ার কথা আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি। কেউ তার নামের শেষে (রহ.) বা লা‘আনা হুল্লাহ- এ দু’টি বাক্যের কোনোটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং তিনি যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছেন, তাই তার ব্যাপারে আমাদের জবান দরাজ করা ঠিক নয়। তাকে গালাগালি করাতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু অর্জিত হবে না। তার আমল নিয়ে তিনি চলে গেছেন। আমাদের আমলের হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব তিনিই দিবেন।
ইমাম যাহাবী ইয়াযীদের ব্যাপারে বলেন-
আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালও বাসবো না।” মদ পান করা, বানর নিয়ে খেলা করা, ফাহেশা কাজ করা এবং আরও যে সমস্ত পাপ কাজের অপবাদ ইয়াযীদের প্রতি দেওয়া হয়, তা সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। তবে তাঁর চেয়ে হুসাইন যে বহু গুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমাদের বিশ্বাস হবে ইয়াযীদ মুসলিম ছিলেন। আমরা তাকে গালি দিবো না এবং ভালও বাসবো না। তার নামের শেষে (রহ.) বলে দোয়া করবনা। আবার লাআনা হুল্লাহ বলে অভিসাপ দিব না। তার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমরা যেহেতু উপস্থিত ছিলাম না, তাই তার ব্যাপারটি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই অধিক নিরাপদ।
আমাদের সমাজের বিশার একটা জনগোষ্ঠী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ হিসবে পালন করে। যার নাম রেখেছে ঈদে মীলাদুন্নবী। বিদআতীদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো এই দিন। তারা মহা ধুমধামে বিশাল শোভা যাত্রা এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যমে আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এই দিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। আজকাল তারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জ্ম্ম উৎসব পালন কে ফরজ বলেও উল্লেখ করছে। এই বিদআত সম্পর্কে আলোচনা করলে আর সংশয় থাকবেনা। ইনশাআল্লাহ
১। ঈদে মীলাদুন্নবী কি?
ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ): হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।
২। ঈদে মিলাদুন্নবী পালন সংশয়পূর্ণঃ
ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা বিদআতীদের নিকটও সংশয়পূর্ণ। তার কারন হলঃ
(১) ঈদে মিলাদুন্নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মকে কেন্দ্রকরে পালন করা হয় অথচ অধিকাংশ মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। অর্থাৎ কেউ তার সঠিক জম্ম তারিখ নির্ণয় করতে পারেনি।
২। ঈদে মীলাদুন্নবী ইবাদাত মনে করে পালন করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম মনে করে এই আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে ছিল না। আল্লাহর কিতাব, রাসূল ﷺ এর সুন্নাত, সাহাবাদের আমল এবং সম্মানিত তিন যুগের কোন যুগে এর কোন অস্তিত্ব ছিলনা। তাই আমরা এটাকে বিদআত বলি। কারণ যে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কমনা করা হবে, কুরআন বা সুন্নায় অবশ্যই তার পক্ষে একটি দলীল থাকতে হবে। আর মীলাদ মাহফিলের পক্ষে এরকম কোন দলীল নেই বলেই এটি একটি বিদআতী ইবাদত, যা হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর তৈরি করা হয়েছে।
তা হলে প্রশ্ন হল–
১। এই বিদআত কে, কখন এবং কোথায় প্রচলন করে? অর্থাৎ ইহার ঐতিহাসিক পটভুমি কি?
২। মুসলিমদের ঈদ কতটি? এ ব্যপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশনা কি?
প্রথমে জম্ম তারিখ বিষয়ে আলোচনা করব। অতপর আমলটি বিদআত কি না তা পর্যালোচনা করব। প্রশ্নের উত্তর খুজে আলোচনা শেষ করব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ কোনটি? এ বিষয়ে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের বছর ও বার নিয়ে তেমন কোন মতভেদ না থাকলেওে, জম্মের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে।
ক. কারো জানা ছিল না যে, এ (রাসূলুল্লাহ ﷺ) নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিবারের কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে রাখা হয়নি।
খ. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মের পূর্বেই তাহার পিতা মারা জান। মাতা ও ছয় বছর পর মারা যান। কাজেই জম্ম তারিখ মনে রাখার মত আপন আর কেই ছিল না।
গ. একশত বছর আগের কথা ভাবুন! কত জন মানুষ সঠিকভাবে জম্ম তারিখ জানে? এবার একটু ১৪০০ বছর আগে কথা কল্পনায় নিয়ে আসুন, দেখবেন জম্ম তারিখ মনে রাখা বা লিখে রাখা কতটা অসম্ভব ছিল।
ঘ. সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভর যোগ্য উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। অথচ সেখানে জম্মের দিন সোমবার দিন ছাড়া আর কিছু সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয় নি।
৩। রাসূলুল্লাহﷺ এর জন্মসম্পর্কিতযেতথ্য জানা যায়ঃ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এরজন্ম সম্পর্কিত যে তথ্যগুলোর সম্পর্কে জানা যায় এবং যে বিষয়গুলোতে সকলে একমত সেটা হচ্ছে, জন্মের সাল বা বছর ও জম্মদিন
রাসূলুল্লাহ ﷺ এরজন্মের সাল-
তার জন্মের বছর ছিল “আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর। ইমাম ইবনুল কাইয়ূম ((রহ.)) বলেন, “এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কার অভ্যন্তরে হস্তি বাহিনীর বছর জন্ম গ্রহণ করেন।” যাদুল মা‘আদ, প্রথম খন্ড,পৃ-৭৬
ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইবনে মুনযির বলেছেন, এ (জম্ম সাল) ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। খলিফা ইবনে খাইয়াত, ইবনুল জাযযার, ইবনে দিহইয়াহ, ইবনুল জাওযি ও ইবনুল কাইউম প্রমুখ আরেকটু বাড়িয়ে এ মতের উপর সকল সিরাত প্রণেতার ইজমা (মতৈক্য) উল্লেখ করেছেন। সুবুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ-৩৩৪-৩৩৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ এরজন্মদিন-
আবু কাতাদা আনসারি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّرَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ “ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ
রাসূলুল্লাহ ﷺকে সোমবারে রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন: এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছে অথবা এ দিনে আমার উপর (অহি) নাযিল হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১১৬২
আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গোনাহ (পাপ) মোচন হয়। ’আশুরাহর দিনের সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি। আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে। সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবূ দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪
৪।রাসূলুল্লাহﷺ এর জন্মসম্পর্কিতযেতথ্যগুলো পাওয়া যায় নাঃ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম সম্পর্কিত যে তথ্যগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হলো জম্মের মাস ও তারিখ। সঠিক কোন তথ্য না থাকার করানে অনেক ঐতিহাসিক বিদ্বানদের মাজে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের মাস ও তারিখ নিয়ে বিরাট মতভেদ হয়েছে। এ বিষয়ে মুজতাহীদ আলেমদের বহু অভিমত জানতে পাওয়া যায়। এমনই কয়েকটি অভিমত তুলে ধরলাম।
(১) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণের তারিখ জানা যায় না।
অনেকে মনে করেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের তারিখ অজ্ঞাত, তা জানা যায় নি, এবং তা জানা সম্ভব নয়। তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এটুকুই শুধু জানা যায়, জন্ম মাস বা তারিখ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোন আলোচনা তারা অবান্তর মনে করেন।
(২) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের দুই তারিখ।
ইবনে কাছির (রহ.) বলেন, “কেউ কেউ বলেছেন ২ রা রবিউল আউয়াল। ইবনে আব্দুল বারর “ইস্তেআব” গ্রন্থে এ অভিমত উল্লেখ করেন এবং ওয়াকেদি এ বর্ণনাটি আবু মাশার নাজিহ ইবনে আব্দুর রহমান আল-মাদানি থেকেও উদ্ধৃত করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ” (১/১৯৯)। দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক ও মাগাযী প্রণেতা মুহাদ্দিস আবু মা‘শার নাজীহ ইবন আব্দুর রহমান আস-সিনদী (১৭০হি:) এই মতটি গ্রহণ করেছেন।
(৩) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের আট তারিখঃ
ইবনে কাছির ((রহ.)) বলেন: “কেউ বলেছেন: ৮ ই রবিউল আউয়াল। হুমাইদি এ বর্ণনাটি ইবনে হাজম থেকে বর্ণনা করেন। আর মালেক, উকাইল ও ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখ এটি বর্ণনা করেন জুহরি থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম থেকে। ইবনে আব্দুল বারর বলেন, ঐতিহাসিকরা এ মতটিকে সঠিক বলেছেন। হাফেজ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারজেমি এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। হাফেজ আবুল খেতাব ইবনে দিহইয়াহ ‘আত-তানবির ফি মাওলিদিল বাশিরিন নাজির’ গ্রন্থে এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯))।
আল্লামা কাসতাল্লানী ও যারকানীর বর্ণনায় এই মতটিই অধিকাংশ মুহাদ্দিস গ্রহণ করেছেন। এই মতটি দুইজন সাহাবী ইবনে আববাস ও জুবাইর ইবন মুতয়িম (রা.) থেকে বর্ণিত। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাতুন্নবী বিশেষজ্ঞ এই মতটি গ্রহণ করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (১২৫হি:) তাঁর উস্তাদ প্রথম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নসববিদ ঐতিহাসিক তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম (১০০হি:) থেকে এই মতটি বর্ণনা করেছেন।
কাসতালানী বলেন: ‘‘মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর আরবদের বংশ পরিচিতি ও আরবদের ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ সম্পর্কিত এই মতটি তিনি তাঁর পিতা সাহাবী জুবাইর ইবন মুতয়িম থেকে গ্রহণ করেছেন।
(৪) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের নয় তারিখঃ
উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারী ((রহ.)) বলেন: “মিসরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মরহুম মাহমুদ পাশা (মৃত্যু : ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) -যিনি একাধারে জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিতবিদ্যা, বই লেখা ও গবেষণায় পারদর্শী ছিলেন- বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম ছিল সোমবার সকাল বেলা, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ মোতাবেক এপ্রিল/নিসান-এর ২০ তারিখ, ৫৭১খ্রিষ্টাব্দ। এ বছরটি হস্তি বাহিনীর ঘটনার প্রথম বছর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বনু হাশেম পল্লীতে আবু তালেবের ঘরে”। (নূরুল ইয়াকিন ফি সিরাতে সাইয়্যেদিল মুরসালিন, পৃষ্ঠা-৯; আরও দেখুন: আর-রাহিকুল মাখতুম (পৃষ্ঠা নং: ৪১)।
(৫) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের দশ তারিখঃ
অন্য মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ ১০ই রবিউল আউয়াল। এই মতটি ইমাম হুসাইনের পৌত্র মুহাম্মাদ ইবন আলী আল বাকের (১১৪হি:) থেকে বর্ণিত। দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমির ইবন শারাহিল আশ শা‘বী (১০৪হি:) থেকেও এই মতটি বর্ণিত। ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবন উমর আল-ওয়াকেদী (২০৭হি:) এই মত গ্রহণ করেছেন। ইবনে সা‘দ তার বিখ্যাত ‘‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’’-য় শুধু দুইটি মত উল্লেখ করেছেন, ২ তারিখ ও ১০ তারিখ। (ইবনে সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা (বৈরুত, দারু এহইয়ায়েত তুরাসিল আরাবী) ১/৪৭)।
ইবনে কাছির ((রহ.)) বলেন: “কেউ বলেন: ১০ রবিউল আউয়াল। এ মতটি ইবনে দিহইয়াহ তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে আসাকের এ মতটি আবু জাফর আল-বাকের থেকে এবং মুজালিদ নামক রাবী শা‘বি থেকে বর্ণনা করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)।
(৬) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখঃ
ইবনে কাছির ((রহ.)) বলেন: “কেউ বলেন, ১২ রবিউল আউয়াল। ইবনে ইসহাক এ মতটি উল্লেখ করেন। ইবনে আবু শায়বাহ তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি আফ্ফান থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে মিনা থেকে, তিনি জাবের ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তারা উভয়ে বলেছেন: ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ হস্তি বাহিনীর বছর, ১২ ই রবিউল আউয়াল, সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান’। জমহুর আলেমদের নিকট এ মতটিই বেশী প্রসিদ্ধ”।(আস-সিরাতুন নববিয়াহ (১/১৯৯)।
এই মতটি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (১৫১হি:) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন: ‘‘রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতীর বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন”।(ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়্যাহ (মিশর, কায়রো, দারুর রাইয়ান, ১ম সংস্করণ, ১৯৭৮)১/১৮৩)।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইবনে ইসহাক সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারণত: সনদ সহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এই তথ্যটির জন্য কোন সনদ উল্লেখ করেন নি। কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহণ করেছেন তাও জানান নি বা সনদসহ প্রথম শতাব্দীর কোন সাহাবী বা তাবেয়ী থেকে মতটি বর্ণনা করেন নি। এ জন্য অনেক গবেষক এই মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। (মাহদী রেজকুল্লাহ আহমদ, আস-সীরাতুন নাবাবীয়াহ, ১০৯ পৃ)।
(৭) রাসূলুল্লাহ ﷺজন্ম গ্রহণ করেন রমজান মাসে
জন্মগ্রহণ করেছেন। ৩য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বাক্কার (২৫৬ হি:) থেকে এই মতটি বর্ণিত। তাঁর মতের পক্ষে যুক্তি হলো যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বসম্মতভাবে রমযান মাসে নবুয়ত পেয়েছেন। তিনি ৪০ বৎসর পূর্তিতে নবুয়ত পেয়েছেন। তাহলে তাঁর জন্ম অবশ্যই রমযানে হবে। (ইবনে সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১০০-১০১, ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (বৈরুত, দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৬) ২/২১৫, আল-কাসতালানী, আহমদ বিন মুহাম্মাদ, আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা (বৈরুত, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬) ১/৭৪-৭৫, আল-যারকানী, শরহুল মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যা (বৈরুত, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, ১ম সংস্করণ ১৯৯৬) ১/২৪৫-২৪৮, ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মায়ারেফ, প্রাগুক্ত ১/১৫০, সূত্র:ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর) ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ জন্ম আর পাঁচটি মতামতঃ
(৮) কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ ১৭ই রবিউল আউয়াল।
(৯) কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ ২২ শে রবিউল আউয়াল।
(১০) কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম রবিউস সানী মাসে।
(১১) কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম রজব মাসে।
(১২) কারো কারো মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ সফর মাসে।
৫। শফিউররহমানমোবারকপুরি রহ. এর বক্তব্যঃ
সমকালীন সিরাত প্রণেত শফিউর রহমান মোবারকপুরি ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারন কিছু কিছু মুসলিম গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা করে বের করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সোমবার ছিল। তাহলে এটা আরেকটি মত হল। এ মতটিও শক্তিশালী, এ তারিখটি ৫৭১ খৃষ্টাব্দের নিসান (এপ্রিল) মাসের বিশ তারিখ পড়ে।
৬। বারো-ই রবিউল আউয়াল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওয়াত দিবস ঈদে মীলাদুন্নবী হিসেবে পালন করা কতটুকু যৌক্তিক?
উপরের আলোচনা হতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের মাস ও তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কঠিন মতভেদ আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকের মতে তার জন্ম দিন হল ১২ ই রবিউল আউয়াল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সকলের নিকট সমাদৃত, সহীহ হাদীস নির্ভর বিশুদ্ধতম সীরাতগ্রন্থ হল ‘আর-রাহীক আল-মাখতূম’। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এর জন্ম দিবস সম্পর্কে এ গ্রন্থে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ ﷺ ৫৭১ খৃস্টাব্দে ৯ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২০ এপ্রিল সোমবার প্রত্যুষে জন্ম গ্রহণ করেন। এটা গবেষণার মাধ্যমে প্রমান করেছেন যুগের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মাদ সুলাইমান আল-মানসূর ও মিশরের প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ।
তারা গেবষণা করে দেখিয়েছেন, জম্মে বছর (“আমুল ফিল” তথা হস্তি বাহিনীর বছর) ১২ রবিউল আউয়াল তারিখের দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। এবং ৯ই রবিউল আউয়াল তারিখের দিনটা ছিল সোমবার। অপর পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ সহীহ হাদীসে নিজেই বলেছেন তার জন্ম সোমবার দিন হয়েছে। মাহমূদ পাশার গবেষণার এ ফল প্রকাশিত হওয়ার পর সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তা গ্রহণ করেছেন এবং কেউ তার প্রমাণ খণ্ডন করতে পারেননি। অতএব নবী কারীম সা. এর জন্ম দিবস হল ৯ই রবিউল আউয়াল। ১২ই রবিউল আউয়াল নয়।
অপর পক্ষে অধিকাংশ আলেমের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এগারো হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার দিন মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে কাছিরের “আস-সিরাহ আন-নববিয়াহ” (৪/৫০৯), ইবনে হাজারের “ফাতহুল বারি” ৮/১৩০
আর সর্বসম্মতভাবে তার ইন্তেকাল দিবস হল ১২ই রবিউল আউয়াল। যে দিনটিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মোৎসব পালন করা হয় সে দিনটি মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইটি ওয়াসাল্লামের মিলাদ (জন্ম) দিবস বরং তা ছিল তাঁর ওয়াত (মৃত্যু) দিবস। তাই দিনটি ঈদ হিসেবে পালন করার আদৌ কোন যৌক্তিকতা নেই। তা সত্ত্বেও যদি ঈদ পালন করতেই হয় তবে তা ১২ ই রবিউল আউয়াল তারিখে না করে ৯ ই রবিউল আউয়ালে করা যেতে পারে। তাহলে অন্তত সাইয়েদুল মুরসালীন সা. এর ইন্তেকাল দিবসে ঈদ পালন করার মত ধৃষ্ঠতা ও বেয়াদবির পরিচয় দেয়া হবে না। অবশ্য এটাও কিন্তু বেদআত বলে গণ্য হবে। বিদআত পর্যালোচনা করার পূবে একটু লক্ষ করে দেখি মীলাদুন্নবীতে কি কি আমল করা হয়?
৭। এই দিনের বিদআতিগণ দ্বীনের নামে নিম্মের কাজগুলি করে থাকে।
(১) এ দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড, পোষ্টার, ফেস্টুন দিয়ে শোভাযাত্রায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। যা মুলত অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এটা অনেকটা শিয়াদের তাজিয়া মিশিলের অনুকরনে করা হয়ে থাকে।
(২) এ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলেন আয়োজন করে থাকে যার কোন শরিয়তের ভিত্তি নেই। এবং উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কিছু কবিতা আবৃতি করা হয়, যাতে রাসূল ﷺ এর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু’আ করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিয়ে যায়।
(৩) তৃতিয় ঈদ মনে করে খাওয়া দওয়ার আয়োজন করে থাকে, যা মুসলেমদের অন্য দুই ঈদের সম পর্যায় নিয়ে যায়। এবং আয়োজোকদের কাছ থেকে এও শুনতে পাোওয়া যায়, ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ।
(৪) কোন কোন সূফীদের দেখা যায় দলবদ্ধভাবে গান-বাজনা করে, ঢোল বাজায় এবং তাদের বানানো বিদআতী নিয়মে বিভিন্ন জিকির-আজকার করে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এসমস্ত কাজে অংশ নিয়ে থাকে। যার কারণে অনেক সময় অশালীন কাজকর্ম সংঘটিত হওয়ার সংবাদও শুনা যায়।
(৫) ইদানিং দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রায় শেষে এ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে থাকে।
(৬) অনেকে আবার জলসার আয়োজন করে থাকে, যেখানে তাদের করা পদ্ধতিতে অনুষ্ঠাণ সাজান হয়ে থাকে।
৮। ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত হওয়ার কারন হলঃ
(১) ঈদে মীলাদুন্নবী এমন একটি নতুন ইবাদত যার কোর ভিত্তি ইসলামী শরীয়তের মাঝে নেই। অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে এর কোন প্রচলন ছিল না এবং এর কোন নমুনাও ছিল না। মীলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষের ও বিপক্ষের সকল আলেম ও গবেষক একমত যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দিগুলিতে ‘‘ঈদে মীলাদুন্নবী’’ বা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মদিন পালন করা বা উদযাপন করার কোন প্রচলন ছিল না।
(২) শরীয়ত সম্মত ইবাদতের হল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের প্রতি দুরূদ ও সালাম পেশ করা। কিন্তু এর জন্য নতুন নতুন পদ্ধতিতে আদায় করা বিদআতের অন্তরভুক্ত।
(৩) ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ঈদে মীলাদুন্নবী সামনে রেখে এমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেমন গুরুত্ব ইসলামের অন্যান্য ইবাদতে (হজ্জ, কুরবানী ও ঈদুল ফিতর) দেওয়া হয়। মনে হয় এটি দ্বীনের অংশ। যা সত্যিই দ্বীনের মধ্যে নতুণ সংযোজন।
(৪) ঈদে মীলাদুন্নবী হল খৃষ্টানদের বড় দিন, হিন্দুদের জন্মাষ্ঠমী ও বৌদ্ধদের বৌদ্ধ-পূর্ণিমার অনুকরণ। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করা ঈমানের দাবী। অথচ ঈদে-মীলাদ পালনের মাধ্যমে তাদের বিরোধিতা না করে অনুসরণ করা হয়।
(৫) জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করা অনারব সংস্কৃতির অংশ, যা পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজেও প্রচলিত হয়ে যায়। কোন কোন বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে, ৭ম হিজরী শতাব্দীর শেষে এবং ৮ম হিজরী শতকের প্রথমাংশেও মীলাদুন্নবী পালন অনেক দেশের মুসলিমদের কাছে অজানা ছিল। (এহইয়াউস সুনান, আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর)
(৬) শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ.) বলেন, রাসূল ﷺ বা অন্য কারও জন্মোৎসব পালন করা জায়েজ নয়, বরং তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ এটি দ্বীনের মাঝে একটি নতুন প্রবর্তিত বিদআত। রাসূল ﷺ কখনও একাজ করেন নি। তাঁর নিজের বা তাঁর পূর্ববর্তী কোন নবী বা তাঁর কোন আত্মীয়, কন্যা, স্ত্রী অথবা কোন সাহাবীর জন্মদিন পালনের নির্দেশ দেন নি। খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম অথবা তাবেয়ীদের কেউ একাজ করেন নি। এমন কি পূর্ব যুগের কোন আলেমও এমন কাজ করেন নি। তাঁরা সুন্নাহ সম্পর্কে আমাদের চেয়ে অধিকতর জ্ঞান রাখতেন এবং রাসূল ﷺ এবং তার শরীয়ত পালনকে সর্বাধিক ভালবাসতেন। যদি এ কাজটি ছওয়াবের হত, তাহলে আমাদের আগেই তাঁরা এটি পালন করতেন। (ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ কেন বিদ’আত? লেখক:আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানী )
(৭) নবম হিজরী শতকের অন্যতম আলেম ও ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে হাজর আল-আসকালানী (৮৫২ হি.) লিখেছেন: ‘‘মাওলিদ পালন মূলত বিদ‘আত। ইসলামের সম্মানিত প্রথম তিন শতাব্দীর সালফে সালেহীনদের কোন একজনও এ কাজ করেন নি।’
(৮) আধুনিক বাংলার অন্যতম আলেমে দ্বীন ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থে লিখেন, আলেমদের এই ঐক্য হল ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত, তাদের ঐক্যমতের কারণ হলো, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে সংকলিত অর্ধশতাধিক সনদভিত্তিক হাদীসের গ্রন্থ, যাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কর্ম, আচার-আচরণ, কথা, অনুমোদন, আকৃতি, প্রকৃতি ইত্যাদি সংকলিত রয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের মতামত ও কর্ম সংকলিত হয়েছে সে সকল গ্রন্থের একটিও সহীহ বা দুর্বল হাদীসে দেখা যায় না যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবদ্দশায় বা তাঁর মৃত্যুর পরে কোন সাহাবী সামাজিকভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জন্ম উদযাপন, জন্ম আলোচনা বা জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট কোন দিনে বা অনির্দিষ্টভাবে বৎসরের কোন সময়ে কোন অনুষ্ঠান করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ই ছিলেন তাঁদের সকল আলোচনা, সকল চিন্তা চেতনার প্রাণ, সকল কর্মকান্ডের মূল। তাঁরা রাহমাতুল্লিল আলামীনের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করে তাঁর ভালবাসায় চোখের পানিতে বুক ভিজিয়েছেন। তাঁর আকৃতি, প্রকৃতি, পোষাক আশাকের কথা আলোচনা করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু তাঁরা কখনো তাঁর জন্মদিন পালন করেন নি। এমনকি তাঁর জন্মমুহুর্তের ঘটনাবলী আলোচনার জন্যও তাঁরা কখনো বসেন নি বা কোন দান-সাদকা, তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমেও কখনো তাঁর জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করেন নি। তাঁদের পরে তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীদের অবস্থাও তাই ছিল।
৯। কখন থেকে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন হচ্ছে?
মিশরের ইসমাঈলীয় শাসকগণ দ্বারা প্রবর্তিত হলেও ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপনকে সমস্ত মুসলিম বিশ্বে অন্যতম উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ইবরিলের শাসক আবু সাঈদ কূকুবূরীর। তাঁকেই আমরা মীলাদ অনুষ্ঠানের প্রকৃত প্রবর্তক বলে মনে করতে পারি। এর অন্যতম প্রমাণ হলো ৪র্থ হিজরী শতকে মিশরে এই উদযাপন শুরু হলে তার কোন প্রভাব বাইরের মুসলিম সমাজগুলোতে পড়ে নি। এমনকি পরবতী ২০০ বৎসরের মধ্যেও আমরা মুসলিম বিশ্বের অন্য কোথাও এই উৎসব পালন করতে দেখতে পাই না। অথচ ৭ম হিজরী শতকের শুরুতে কুকবূরী ইরবিলে ঈদে মীলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করলে তা তৎকালীন মুসলিম সমাজগুলিতে সাড়া জাগায়। পরবর্তী ২০০ বৎসরের মধ্যে এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম সমাজে অনেক মানুষ ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতে শুরু করে। (‘এহইয়াউস সুনান’)
ইসলামে ঈদ হল দুটি যথা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তৃতীয় কোন ঈদ নেই।
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী ﷺ মাদীনায় আগমন করার পর তাদের দু’টি দিন ছিল। এ দিন দু’টিতে তারা খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। তিনি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দু’টিতে আমরা খেলাধুলা করতাম। রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ দু’দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। সুনানে আবূ দাঊদ ১১৩৪, মিশকাত : ১৪৩৯, আহমাদ : ১৩৬২২, মুসতাদরাক লিল হাকিম : ১০৯১
ইসলামে ঈদ শুধু দু’ টি এ বিষয়টি শুধু সহিহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়, তা রবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। যদি কেউ ইসলামে তৃতীয় আরেকটি ঈদের প্রচলন করে তবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা দ্বীনের মধ্যে একটা বেদআত ও বিকৃতি বলেই গণ্য হবে। ১২ই রবিউল আউয়ালে ঈদে-মীলাদ উদযাপন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ ধরণের কাজ হতে যেমন নিজেদের বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আমাদের উপমহাদেশে (ভাতর, পাকিস্থান, বাংলাদেশ) ইসলামী দিবস হিসাবে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে দিবসটি পালিত না হলেও বাংলাদেশে এই দিনটি সরকারী ছুটির দিন। এই দিনটি উপলক্ষে দেশে সকল দৈনিক পত্রিকাগুলো ফলাউ করে মহত্ব সম্পর্কে প্রচার করে। অধিকাংশেরই এই দিন সম্পর্কে সঠিক কোন ধারনা নাই। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ কিছু ব্যক্তি গতানুগতিকভাবে এই দিবসকে ইসলামী দিবস হিসাবে পালন করে। তারা এই দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আমলও করেন।
এই দিবসটি ইসলাম ধর্মে কিভাবে চালু হল, তার অনুসন্ধার করতে গিয়ে দেখা গেল। বাংলা ভাষায় বহুল প্রচারিত দুটি অনির্ভরযোগ্য বই যার নাম ‘মুকসুদুল মুমিনীন’ এবং “বার চান্দের ফযীলত” সেখানে এই বিষয় লেখা হয়েছে। এই বই দুটি বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে থাকলেও নির্ভরযোগ্যতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে নাই। এই সকল বাজারী বইয়ের অধিকাংশ আমলই মন গড়া। কাজেই “মকছুদোল মুমিনীন ও ‘বার চান্দের ফযীলত’ বিষয়ক যেসব অনির্ভরযোগ্য পুস্তক-পুস্তিকা এক শ্রেণির মানুষের মাঝে প্রচলিত এর কোনো আমলই যাচাই বাচাই ছাড়া গ্রহন করা যাবে না। পরিতাপের বিষয় হলো, এসব অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থ এবং অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের প্রচলনকে ভিত্তি করে আমাদের দেশের এ দিবসকে খুব ঘটা কর পালন করা হয়। অথচ শরিয়াতের মানদন্ডে এ দিবসের যেমন কোনো ভিত্তি নেই, তেমন এ দিবসের আমলেরও কোনো ভিত্তি নেই।
২।আখেরি চাহার শোম্বা কী?
আখেরী চাহার শোম্বা একটি আরবী ও ফার্সি শব্দ যুগল। প্রথম অংশ আখেরী একটি আরবী শব্দ যার অর্থ “শেষ” এবং দ্বিতীয় অংশ চাহার শোম্বা ফার্সি যার অর্থ “চতুর্থ বুধবার”। অনির্ভরযোগ্য বিভিন্ন কিতাবের বর্ণনা ও দিবস পালনকারীদের প্রচলিত আকিদামতে এ দিবস পালনের প্রেক্ষাপট হলো-
এ আকিদা ও বিশ্বাস ধারণ করে আমাদের সমাজের কিছু ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত হিজরি সফর মাসের শেষ বুধবারকে ইসলামী দিবস হিসেবে পালন করেন।
দ্বিতীয় দাবিকৃত পেক্ষাপট : ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসেবে পালন
রাসুলুল্লাহ ﷺ জীবনে শেষবারের মতো রোগমুক্তি লাভ করেন বলে দিনটিকে মুসলমানেরা প্রতিবছর ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসেবে পালন করেন। তাঁরা নফল ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে দিবসটি অতিবাহিত করেন। তাই উম্মতে মুহাম্মদীর আধ্যাত্মিক জীবনে আখেরি চাহার শোম্বার গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। হিজরি সালের সফর মাসের শেষ বুধবার মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্মারক দিবস হিসেবে পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা বিভিন্ন নফল ইবাদাতের মাধ্যমে পালন করে।
“মকছুদোল মুমিনীন” এর ভাষ্য-
এই দিন সম্পর্কে “মকছুদোল মুমিনীন বলা হয়েছে, “তাযকিরাতুল আওরাদ নামক গ্রন্থে সফর মাসের শেষ বুধবার প্রভাতে গোসল করে সূর্য উঠার পর দুই রাকআত নফল নামায আদায় করার কথা উল্লেখ আছে। নামাযের নিয়ম নিম্মরূপ-
দুই রাকআতের নিয়ত করে এ নামায আদায় করতে হয়। উভয় রাকআতে সূরা ফাতিহার পর এগার বার সূরা ইখলাস পাঠ করতে হয়। নামায শেষে সত্তর বার নিম্মের দরূদ শরীফ ও দুআটি পাঠ করে মুনাজাত করতে হয়।
মকসুদুল মোমেনিনে আরও বলা হয়েছে-
’…………………..এই গোছলই হুজুরের জীবনের শেষ গোছল ছিল।………অতএব এইদিনে মুসলমানদের বিশেষভাবে গোছলাদি করত, নফল নামায এবং সিয়াম ইত্যাদি আদায় করত, নবী করিম (দা.) এর রুহের উপর ছওয়াব বখশেষ করা উচিত।’
তৃতীয় দাবিকৃত পেক্ষাপটঃ বার চান্দের ফজিলত বইয়ে লেখা আছে-
‘‘হযরত নবী করীম (ﷺ) দুনিয়া হইতে বিদায় নিবার পূর্ববর্তী সফর মাসের শেষ সপ্তাহে ভীষণভাবে রোগে আক্রান্ত হইয়া ছিলেন। অতঃপর তিনি এই মাসের শেষ বুধবার দিন সুস্থ হইয়া গোসল করতঃ কিছু খানা খাইয়া মসজিদে নববীতে হাযির হইয়া নামাযের ইমামতী করিয়াছিলেন। ইহাতে উপস্থিত সাহাবীগণ অত্যধিক আনন্দিত হইয়াছিলেন। আর খুশীর কারণে অনেকে অনেক দান খয়রাত করিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর (রা) খুশীতে ৭ সহস্র দীনার এবং হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) ৫ সহস্র দীনার, হযরত ওসমান (রা) ১০ সহস্র দীনার, হযরত আলী (রা) ৩ সহস্র দীনার এবং হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা) ১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া আল্লাহর ওয়াস্তে দান করিয়াছিলেন। তৎপর হইতে মুসলমানগণ সাহাবীগণের নীতি অনুকরণ ও অনুসরণ করিয়া আসিতেছে। হযরত নবী করীম (ﷺ) এর এই দিনের গোসলই জীবনের শেষ গোসল ছিল। ইহার পর আর তিনি জীবিতকালে গোসল করেন নাই। তাই সকল মুসলমানের জন্য এই দিবসে ওজু-গোসল করতঃ ইবাদৎ বান্দেগী করা উচিৎ এবং হযরত নবী করীম ﷺ এর প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করতঃ সাওয়াব রেছানী করা কর্তব্য…। (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ.-১৫
হাদিসের নামে জালিয়াতি কিতাবে ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) লিখেনঃ- উপরের এ কাহিনীটিই কমবেশি সমাজে প্রচলিত ও বিভিন্ন গ্রন্থে লেখা রয়েছে। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেও কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে এ ঘটনার কোনো প্রকারের উল্লেখ পাই নি। হাদীস তো দূরের কথা কোনো ইতিহাস বা জীবনী গ্রন্থেও আমি এ ঘটনার কোনো উল্লেখ পাই নি। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া অন্য কোনো মুসলিম সমাজে ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’ পালনের রেওয়াজ বা এ কাহিনী প্রচলিত আছে বলে আমার জানা নেই। হাদিসের নামে জালিয়াত
(১) ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিনে আগে (৭ ই রবিউল আউয়াল)
একাদশ হিজরীর ২৯ শে সফর সোমবার দিবস রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি জানাযার উদ্দেশ্যে বাকীতে গমন করেন। সেখান থেকে ফেরার পথেই তাঁর মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় এবং উত্তাপ এতই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় যে, মাথায় বাঁধা পট্টির উপরেও তাপ অনুভূত হতে থাকে। এ অসুস্থতাই ছিল তাঁর ওফাতকালীন রোগ ভোগের সূচনা। এ অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি এগার দিন পর্যন্ত সালাতে ইমামত করেন। এ অসুস্থ অবস্থায় তিনি ১৩ কিংবা ১৪ দিন অতিবাহিত করেন। ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিন পূর্বে (সাতই রবিউল আউয়াল) বুধবার দিবস দেহের উত্তাপ আরও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রোগযন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি বললেন, ‘আমার শরীরে বিভিন্ন কূপের সাত মশক পানি ঢাল, যাতে আমি লোকজনদের নিকট গিয়ে উপদেশ দিকে পারি। এ প্রেক্ষিতে নাবী কারীম ﷺ কে একটি বড় পাত্রের মধ্যে বসিয়ে তাঁর উপর এত বেশী পরিমাণ পানি ঢালা হল যে, তিনি নিজেই ‘ক্ষান্ত হও’, ক্ষান্ত হও’ বলতে থাকলেন।
সে সময় নাবী কারীম ﷺ এর রোগ যন্ত্রণা কিছুটা প্রশমিত হয় এবং তিনি মসজিদে গমন করেন। তখনো তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। তিনি মিম্বরের উপর উঠে বসেন এবং ভাষণ প্রদান করেন। সাহাবীগণ (রা.) আশপাশে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বললেন, “ইয়াহুদ ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক এ কারণে যে, তারা তাদের নাবীগণের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। অন্য এক রেওয়াতে রয়েছে ‘ইহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি যে তারা তাদের নাবীদের কবরকে মসজিদে বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি আরও বললেন, ‘তোমরা আমার কবরকে মূর্তি বানিওনা এ কারণে যে তার পূজা করা হবে।
(২) ওফাত প্রাপ্তির চার দিনে আগে (৮ ই রবিউল আউয়াল)
ওফাত প্রাপ্তির চার দিনে পূর্বে বৃহস্পতিবার যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠিন রোগযন্ত্রণার সম্মুখীন হলেন তখন বললেন, ‘তোমরা আমার নিকট কাগজ কলম নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য একটি নোট লিখে দেই যাতে তোমরা আমার পরে কোন দিনই পথভ্রষ্ট হবে না’।
ঐ সময় ঘরে কয়েক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন উমার (রা.), তিনি বললেন, ‘আপনার উপর রোগ যন্ত্রণার প্রাধান্য রয়েছে এবং আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব কুরআন রয়েছে। আল্লাহর কিতাব কুরআন আমাদের জন্য যথেষ্ট’- এ নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে লাগলেন। কেউ কেউ বললেন, ‘কাগজ কলম আনা হোক এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ যা বলবেন তা লিখে নেয়া হোক।’ অন্যেরা উমার (রা.) এর মত সমর্থন করলেন। লোকজনদের মধ্যে যখন এভাবে কথা কাটাকাটি চলতে থাকল তখন নাবী কারীম ﷺ বললেন, (قُوْمُوْا عَنِّيْ) ‘আমার নিকট থেকে তোমরা উঠে যাও’।
অতঃপর নাবী কারীম ﷺ সে দিনটিতে উপদেশ প্রদান করলেন। এর প্রথমটি হচ্ছে, ‘ইহুদী, নাসারা এবং মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ হতে বহিস্কার করবে। দ্বিতীয়টি হল, ‘প্রতিনিধিদলের সে ভাবেই আপ্যায়ণ করবে যেমনটি (আমার আমলে) করা হতো।’ তৃতীয় উপদেশটি বর্ণনাকারী ভুলে গিয়েছিলেন। তবে সম্ভবত সেটি ছিল আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকার উপদেশ, অথবা তা ছিল উসামা (রা.) এর বাহিনী কার্যক্রম বাস্তবায়নের উপদেশ, অথবা তা ছিল ‘সালাত’ এবং তোমাদের অধীনস্থ অর্থাৎ দাসদাসীদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার উপদেশ। কঠিন অসুস্থতা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ দিন (অর্থাৎ ওফাত প্রাপ্তির চার দিন পূর্বের বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত সকল সালাতেই ইমামত করেন। এ দিবস মাগরিবের সালাতেও তিনি ইমামতি করেন এবং সূরাহ ‘ওয়াল মুরসালাতে উরফা’ পাঠ করেন।
কিন্তু এশা সালাতের সময় অসুস্থতা এতই বৃদ্ধি পেল যে, মসজিদে যাওয়ার মতো শক্তি সামর্থ্য আর তাঁর রইল না। আয়িশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন যে, ‘লোকজনেরা সালাত আদায় করে নিয়েছে? আমি উত্তর দিলাম, ‘না’, হে আল্লাহর রাসূল! তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ রাসূলুল্লাহ ﷺবললেন, ‘আমার জন্য বড় পাত্রে পানি দাও। তাঁর চাহিদা মোতাবেক পানি দেয়া হলে তিনি গোসল করলেন। অতঃপর দাঁড়াতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না, অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকেরা কি সালাত আদায় করেছে? উত্তর দিলাম, ‘না’, হে আল্লাহর রাসূল! তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষামান রয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারেও তিনি একইরূপ করলেন, যেমনটি প্রথমবার করেছিলেন, অর্থাৎ গোসল করলেন এবং দাঁড়াতে চাইলেন কিন্তু পারলেন না।, অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। অবশেষে তিনি আবূ বাকর (রা.)-কে বলে পাঠালেন সালাতে ইমামত করার জন্য। এ প্রেক্ষিতে আবূ বাকর (রা.) ঐ দিনগুলোতে সালাতে ইমামত করেন। নাবী কারীম ﷺ এর পবিত্র জীবদ্দশায় আবূ বাকর ﷺ-এর ইমামতে সালাতে সংখ্যা ছিল সতের ওয়াক্ত।
(৩) ওফাত প্রাপ্তির তিন দিনে আগে (৯ ই রবিউল আউয়াল)
জাবির (রা.) বলেন, আমি নাবী ﷺ কে তাঁর ওফাতের তিন দিন পূর্বে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা না নিয়ে মৃত্যুবরণ না করে।
(৪) ওফাত প্রাপ্তির এক বা দুই দিনে আগেঃ (১০ ই রবিউল আউয়াল)
শনিবার কিংবা রবিবারে নাবী কারীম ﷺ কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। কাজেই, দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর দিয়ে যুহর সালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করেন। সেই সময় সাহাবীগণ (রা.) এর সালাতের জামাতে ইমামত করছিলেন আবূ বাকর (রা.)। তিনি নাবী কারীম ﷺ-এর আগমনের আভাস পেয়ে পিছনের সারিতে আসার চেষ্টা করলে তিনি তাঁকে ইশারায় পিছনে আসতে নিষেধ করে সামনেই থাকতে বললেন এবং নিজেকে তাঁর ডান পাশে বসিয়ে দেয়ার জন্য সাহায্যকারীদ্বয়কে নির্দেশ দিলেন। এ প্রেক্ষিতে আবূ বাকর (রা.)-এর ডান পাশে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হল। এরপর আবূ বাকর (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সালাতের অনুকরণ করছিলেন এবং সাহাবীগণ (রা.) কে তাকবীর শোনাচ্ছিলেন।
(৫) ওফাত প্রাপ্তির এক দিনে আগেঃ (১১ ই রবিউল আউয়াল)
ওফাত প্রাপ্তির পূর্বের দিবস রবিবার তিনি তাঁর দাসদের মুক্ত করে দেন। তাঁর নিকটে সাতটি স্বর্ণ মুদ্রা ছিল তা সাদকা করে দেন। নিজ অস্ত্রগুলো মুসলিমগণকে হিবা করে দেন। রাত্রিবেলা গৃহে বাতি জ্বালানোর জন্য আয়িশাহ (রা.) প্রতিবেশীর নিকট থেকে তেল ধার করে আনেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি লৌহবর্ম ত্রিশ ‘সা’ (৭৫ কেজি) যবের পরিবর্তে এক ইহুদীর নিকট বন্ধক রাখা ছিল।
এই সঠিক ইতিহাতের মাধ্যমে এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যায় ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিন পূর্বে বুধবার রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেলে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। পড়তে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি বললেন, বিভিন্ন কূপের সাত মশক পানি তার শরীরে ঢালা হয় এবং তিনি কিছুটা সুস্থ অনুভব করলে মাথায় পট্রি বেধে সাহাবাদের উপদেশ প্রদান করেন। এই রোগ মুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কিরাম খুশি হয়ে এই দিবসকে কেন্দ্র করে দান সদকা করেছেন, সিয়াম পালন করেছেন, নফল সালাত আদায় করেছেন বলে কোন সনদে কিছু বর্ণিত হয় নাই। কাজেই উম্মতের জন্যও এ দিনকে উদযাপনের নিমিত্তে দান সদকা করা, গোসল করা, সিয়াম পালন করা, নফল সালাত আদায় করা, আনন্দ প্রকাশ করা সবই নব আবিস্কৃত বিদআত ও গুনাহের কাজ।
৪।ইসলামি শরীয়তেরদৃষ্টিতে দিবসটিঃ
শরিয়াতের দৃষ্টিতে এ দিবস, দিবস পালনের প্রেক্ষাপট এবং এ দিবসে বর্ণিত কোনো আমলই নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত নয়। বরং তা একটি গর্হিত বিদাত ও অবশ্য পরিত্যজ্য বিষয়। এই দিবসের অনির্ভরযোগ্যতার কারণগুলো নিম্নরূপঃ
(১) রসুল ﷺকে তার ওফাতের অনেক পূর্বেই যাদু করা হয়েছিলঃ
রসুল ﷺ কে এক ইহুদি জাদু করেছিল, এ কথা ঠিক। সহিহ বুখারীতে আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যুরাইক গোত্রের লাবীদ ইবনু আ‘সাম নামক এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে যাদু করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মনে হতো যেন তিনি একটি কাজ করেছেন, অথচ তা তিনি করেননি। একদিন বা একরাত্রি তিনি আমার কাছে ছিলেন। তিনি বার বার দু‘আ করতে থাকেন। তারপর তিনি বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি কি বুঝতে পেরেছ যে, আমি আল্লাহর কাছে যা জানতে চেয়েছিলাম, তিনি আমাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। (স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক আসেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং অপরজন দু’পায়ের কাছে বসেন। একজন তাঁর সঙ্গীকে বলেনঃ এ লোকটির কী ব্যথা? তিনি বলেনঃ যাদু করা হয়েছে।
প্রথম জন বলেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বলেন, লাবীদ বিন আ’সাম। প্রথম জন জিজ্ঞেস করেনঃ কিসের মধ্যে? দ্বিতীয় জন উত্তর দেনঃ চিরুনী, মাথা আঁচড়ানোর সময় উঠা চুল এবং এক পুং খেজুর গাছের ‘জুব’-এর মধ্যে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ কয়েকজন সহাবী সাথে নিয়ে সেখানে যান। পরে ফিরে এসে বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! সে কূপের পানি মেহদীর পানির মত লাল) এবং তার পাড়ের খেজুর গাছের মাথাগুলো শয়তানের মাথার মত। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করেছেন, আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিলে সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। সহিহ বুখারীত : ৫৭৬৩
হোদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম মদীনায় ফিরে এলেন। এ সময় সপ্তম হিজরীর মহররম মাসে খয়বর থেকে ইহুদীদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় এলো। তারা আনসারদের বনি যুরাইক গোত্রের বিখ্যাত যাদুকর লাবীদ ইবনে আ’সমের সাথে সাক্ষাত করলো। তারা তাকে বললো , মুহাম্মাদ (সা) আমাদের সাথে যা কিছু করেছেন তা তো তুমি জানো। আমরা তাঁর ওপর অনেকবার যাদু করার চেষ্টা করেছি , কিন্তু সফল হতে পারেনি। এখন তোমার কাছে এসেছি। কারণ তুমি আমাদের চাইতে বড় যাদুকর। তোমার জন্য এ তিনটি আশরাফী ( স্বর্ণ মুদ্রা ) এনেছি। এগুলো গ্রহণ করো এবং মুহাম্মাদের ওপর একটি শক্ত যাদুর আঘাত হানো। এ সময় একটি ইহুদী ছেলে রসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে কাজ করতো। তার সাথে যোগসাজশ করে তারা রসূলুল্লাহ (সা) চিরুনীর একটি টুকরা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলো। তাতে তাঁর পবিত্র চুল আটকানো ছিল সেই চুলগুলো ও চিরুনীর দাঁতের ওপর যাদু করা হলো। কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে , লাবীদ ইবনে আ’সম নিজেই যাদু করেছিল। আবার কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে, তার বোন ছিল তার চেয়ে বড় যাদুকর । তাদের সাহায্যে সে যাদু করেছিল যাহোক এ দু’টির মধ্যে যে কোন একটিই সঠিক হবে। তাফহিমুল কুরআন, সুরা ফারাকের শানে নুজুল
নবী ﷺ এর ওপর প্রভাব পড়তে পূর্ণ এক বছর সময় লাগলো। বছরের শেষ ছয় মাসে মেজাজে কিছু পরিবর্তন অনুভূত হতে থাকলো। শেষ চল্লিশ দিন কঠিন এবং শেষ তিন দিন কঠিনতর হয়ে গেলো। তবে উপরে বর্ণিত হাদিসে দেখা যায় আল্লাহ রহমতে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান। কোন অবস্থায়ই তার এই যাদুর প্রভাব জীবনের শেষ ওফাত পর্যান্ত ছিল না। বরং অনেক আগেই যাদুর এর প্রভাব চলে গিয়েছিল। যা হোক যাদুর প্রভাব থেকে মুক্তির তারিখ কোন হিসাব অনুযায়ীই সফরের আখেরী চাহার শোম্বা হতে পারে না। ওফাতের পূর্বে যাদুর প্রভার সম্পর্কিত সব কথাই মিথ্যা।
(২) বুধবারের পর বৃহস্পতিবারও গোসল করেছিলেনঃ
বিশ্ব বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ “আর-রাহীকুল মাখতূম” এর বর্ণায় মতে ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিনে আগে বুধবার তিনি গোসল করেছেন। কিন্তু এই গোসলের পর নবীজি ﷺ আর গোসল করেননি, এ কথাও ঠিক নয়। কেননা, সহিহ বুখারির এক হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, নবীজি এরপর এশার নামাজের আগে গোসল করেছিলেন। এবং উপর বর্ণীত, “আর-রাহীকুল মাখতূম” এর বর্ণায় মতে ওফাত প্রাপ্তির চার দিনে আগে বৃহস্পতিবার এশার সালাতে গমনের জন্য তিনি গোসর করে ছিলেন। কাজেই বিদআতীরা যে প্রচার করে বুধবারই শেষ গোসল, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
যদি বুধবারের ঘটনা হয়ে থাকে তবে সফর মাসের শেষ বুধবার কিভাবে হচ্ছে। রাসূলে কারীম ﷺ ইন্তকালের দিন নিয়ে মতভেদ থাকলেও অনেকে ইন্তেকালের তারিখ বারোই রবীউল আউয়াল সোমবার বলে মনে করে থাকেন। এই হিসাবে ইন্তিকালের পাঁচ দিন আগে সফর মাস হয় কি করে। ইস্তিকালের পাঁচ দিন আগে হবে ৭ ই রবিউল আউয়াল বুধবার। অথচ আমরা রোগমুক্ত দিবস পালন করছি সফরের বুধবার। বিষয়টি খুবই হাস্যকর আমাদের জন্য লজ্জাকরও বটে।
(৩) খুসির জন্য দিবস পালনঃ
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্থতার কারণে মুমিন ব্যক্তি খুশি না হয়ে পারে না। তার সুস্থতার সংবাদ নিঃসন্দেহে উম্মতের জন্য আনন্দ ও খুশির বিষয়। তিনি যখন অসুস্থার পর কিছুটা সুস্থ হন, তখর সকল সাহাবি (বাঃ) আনন্দিত হয়েছিল, খুসি হয়ে ছিল এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তারা এই খুসি বা আনন্দ কিভাবে প্রকাশ করেছিলেন? ইসলামে যে কোন নিয়ামত লাভের পর তা প্রকাশ করার একমাত্র মাধ্যম হলো, মহান আল্লাহ শুকরিয়া। কাজেই সাহাবি (রা.) ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্থতার কারণে শুকরিয়া আদায় করেছেন। কিন্তু একথা দাবি করা যে, সাহাবায়ে কেরাম বা পরবর্তী যুগের মনীষীগণ সে খুশি প্রকাশের জন্য উপরোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, জাহালাত ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা এ দাবির সপক্ষে দুর্বলতম কোন দলিলও বিদ্যমান নেই।
খুশির দিনকে ইসলামী দিবস হিসেবে পালন করা হয়েছে, এই মর্মে সাহাবায়ে কিরামের জীবনীতে এর কোনো উল্লেখ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অনেক বিভিন্ন বালা মুসিবত এসেছে। আল্লাহ তায়ালা তাকে নাজাত দিয়েছেন। তায়েফ রক্তাক্ত হয়েছেন। অহুদে ৭০ জন সহাবি (রা.) হারিয়েছেন এবং নিজেও মারাত্বক আহত হয়েছেন এবং মহান আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করেছেন। একবার ঘোড়া থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছেন, যার কারণে মসজিদে যেতে পারেননি, আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করেছেন। যদি বলি তার জীবনের সবচেয়ে বড় খুসির দিন কোনটি? আমার মনে হয় অতীত থেকে শুরু করে বর্তমানের সকল মুসলিম, যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আছে, তারা বলবে, মক্কা বিজয়ের দিন। তার জীবনটি ত্যাগ করে গেছেন ইসলামের জন্য। সেই ইসলাম যে দিন বিজয় লাভ করে তার থেকে আর আনন্দের দিন হতে পারে না। কই কোন কালে তো মক্কা বিজয় বিদস পালিত হল না। ইসলামে কোন খুসি বা সু্স্থতা দিবস পালনের উদযাপনের কোন অবকাশ নাই। তাহলে আখেরী চাহার শোম্বা, যার কোন ভিত্তিই নেই, তা কিভাবে উদযাপনের বিষয় হতে পারে?
(৪) দিবস পালনের জন্য দলীলের প্রয়োজনঃ
ইসলামি শরীয়তে কিছু দিবস ও রাতকে মহান আল্লাহ মহিমান্বিত বলে ঘোষনা করেছেন। যেমনঃ আরাফার দিন ও লাইলাতুর কদরের রাত। এই সকল দিন রাতের আমল রাসূল ﷺ থেকে প্রমানিত। তাই সাহাবায়ে কিরাম (রা.), তাবেইন, তাবে-তাবেইনের যুগও এই সকল আমল সহহি সুন্নাহ মোতাবেগ করা হয়ে আসছে। ইসলামি শরীয়তে কোনো বিশেষ দিনকে ধর্মীয় দিবস মনে করা এবং তাতে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য শরিয়াতের সুনির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ আবশ্যক। অথচ আখেরি চাহার শোম্বা সম্পর্কে কোরআনে কারিম কিংবা হাদিসে উল্লেখ থাকাতো দূরের কথা, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেইন, তাবে-তাবেইনের যুগ তথা সর্বশ্রেষ্ঠ তিন যুগেও এ দিবস পালনের কোনো রেওয়াজ পাওয়া যায় না। সাহাবায়ে কিরাম খুশি হয়ে এ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং নফল নামাজ আদায় করেছিলেন অথচ কোন সহিহ বা যঈফ হাদিসে তা উল্লেখ নাই। এ কেমন কথা?
ইসলামি শরীয়তের যে কোন আমল করার জন্য কুরআন সুন্নাহ থেকে নির্দিষ্ট দলীল লাগবে। দলীল বিহীন ভাল আমল যা আল্লাহকে খুসির জন্য করা হয় তাই বিদআত। কাজেই কোন দিন কে বিশেষ ফযীলতের মনে করা, কিংবা বিশেষ কোন আমল তাতে বিধিবদ্ধ রয়েছে এমন কথা বলা, কিংবা তাকে ধর্মীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা এই সবগুলো হচ্ছে মুসলমানদের জন্য শরীয়তের বিধানের অন্তর্ভুক্ত। অতএব এগুলো শরয়ী দলীল ছাড়া শুধু মনগড়া যুক্তির ভিত্তিতে সাব্যস্ত করা যায় না। এজন্য উপরোক্ত তথ্য ইতিহাসের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ হলেও এ দিবসকে ঘিরে ওইসব রসম-রেওয়াজ জারী করার কোনো বৈধতা হয় না। যেহেতু সালফে সালেহীনদের আমলে পাওয়া যায় না। তাই এই দিনের বিশেষ যে, সালাত ও সিয়ামের পদ্ধতি মকছুদুল মোমেনীতে বর্ণিত হয়েছে তা সম্পুর্ণই ভিত্তীহীন ও মিথ্যা।
(৫) রাসুলুল্লাহ ﷺএর জীবনের শেষ দিনগুলোর বার ও তারিখ নিয়ে সংশয়ঃ
রাসুলুল্লাহ ﷺ সফর বা রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখ থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কত তারিখে ইন্তিকাল করেন সে বিষয়ে হাদীস শরীফে কোনরূপ উল্লেখ বা ইঙ্গিত নেই। অগনিত হাদিসে তাঁর অসুস্থতা, অসুস্থতাকালীন অবস্থা, কর্ম, উপদেশ, তাঁর ইন্তিকাল ইত্যাদির ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোন ভাবে কোন দিন, তারিখ বা সময় বলা হয়নি। কবে তাঁর অসুস্থতা শুরু হয়, কতদিন অসুস্থ ছিলেন, কত তারিখে ইন্তেকাল করেন সে বিষয়ে কোন হাদীসেই কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ২য় হিজরী শতক থেকে তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী আলিমগন রাসুলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের ঘটনাবলী ঐতিহাসিক দিন তারিখ সহকারে সাজাতে চেষ্টা করেন। তখন থেকে মুসলিম আলিমগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন মোট পেশ করেছেন। তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে অনেক মোট রয়েছে। কেউ বলেছেন সফর মাসের শেষ দিকে তাঁর অসুস্থতার শুরু। কেউ বলেছেন রবিউল আউওয়াল মাসের শুরু থেকে তাঁর অসুস্থতার শুরু।
দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক (১৫১হি/৭৬৮ খ্রি) বলেনঃ “রাসুলুল্লাহ ﷺ যে অসুস্থতায় ইন্তিকাল করেন, সেই অসুস্থতার শুরু হয়েছিল সফর মাসের শেষ কয়েক রাত থাকতে, অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকে। (ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন- নববিয়্যাহ ৪/২৮৯)”
কি বার থেকে তাঁর অসুস্থতার শুরু হয়েছিল, সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার, কেউ বলেছেন বুধবার এবং কেউ বলেছেন সোমবার তাঁর অসুস্থতার শুরু হয়। কয়দিনের অসুস্থতার পরে তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ১০ দিন, কেউ বলেছেন ১২ দিন, কেউ ১৩ দিন, কেউ বলেছেন ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পর রাসুল ﷺ ইন্তিকাল করেন। তিনি কোন তারিখে ইন্তকাল করেছেন সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছনে ১লা রবিউল আউয়াল, কেউ ২রা রবিউল আউয়াল, এবং কেউ বলেছেন ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি ইন্তেকাল করেন।
সর্বাবস্থায় কেউ কোনভাবে বলছেননা যে, অসুস্থতা শুরু হওয়ার পরে মাঝে কোনদিন তিনি সুস্থ হয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেই, ইন্তিকালের কয়েকদিন আগে তিনি গোসল করেছিলেন বলে সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
বুখারী সংকলিত আয়িশা (রা.) বলেনঃ নাবী ﷺ এর অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি আমার ঘরে শুশ্রূষার জন্য তাঁর স্ত্রীদের নিকট অনুমতি চাইলে তাঁরা অনুমতি দিলেন। নাবী ﷺ (আমার ঘরে আসার জন্য) দু’ব্যক্তির উপর ভর করে বের হলেন। আর তাঁর পা দু’খানি তখন মাটিতে চিহ্ন রেখে যাচ্ছিল। তিনি আব্বাস (রা.) ও অন্য এক ব্যক্তির মাঝখানে ছিলেন। উবাইদুল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘আমি ‘আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) কে এ কথা জানালাম। তিনি বললেন, সে অন্য ব্যক্তিটি কে তা কি তুমি জান? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তিনি হলেন আলী ইবনু আবূ তালিব (রা.)। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, নাবী ﷺ তাঁর ঘরে আসলে অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পেল। তিনি বললেনঃ ‘তোমরা আমার উপর মুখের বাঁধন খোলা হয়নি এমন সাতটি মশকের পানি ঢেলে দাও, তাহলে হয়ত আমি মানুষকে কিছু উপদেশ দিতে পারব। তাঁকে তাঁর স্ত্রী হাফসাহ (রা.) এর একটি বড় পাত্রে বসিয়ে দেয়া হল। অতঃপর আমরা তাঁর উপর সেই সাত মশক পানি ঢালতে লাগলাম। এভাবে ঢালার পর এক সময় তিনি আমাদের প্রতি ইঙ্গিত করলেন, (এখন থাম) তোমরা তোমাদের কাজ করেছ। অতঃপর তিনি বের হয়ে জনসম্মুক্ষে গেলেন। সহিহ বুখারী : ১৯৮
এখানে স্পষ্ট যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর অসুস্থতার মধ্যেই অসুস্থতা ও জ্বরের প্রকোপ কমানর জন্য এভাবে গোসল করেন, যেন কিছুটা আরাম বোধ করেন এবং মসজিদে যেয়ে সবাইকে প্রয়োজনীয় নসীহত করতে পারেন। এই গোসল করার ঘটনাটি কত তারিখে বা কি বারে ঘটেছিল তা হাদীসের কোন বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে আল্লামা ইবনু হাযার আসকালানী সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অন্যান্য হাদীসের সাথে এই হাদীসের সমন্বয় করে উল্লেখ করেছেন যে, এই গোসলের ঘটনাটি ঘটেছিল ইন্তিকালের আগের বৃহস্পতিবার। ইবনু হাযার, ফাতহুল বারী ৮/১৪২
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, সফর মাসের শেষ বুধবার বা আখেরী চাহার শোম্বা নামে দবিস কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়। তাই এই দিনে ইবাদত, বন্দেগী, সালাত, সিয়াম, জিকির, দোয়া, দান, সদকা ইত্যাদি পালন করলে অন্য দিনের চেয়ে বেশী বা বিশেষ কোন সওয়াব বা বরকত লাভ করা যাবে বলে ধারনা করা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।
(৬) সফর মাসে শেষ বুধবার অশুভ
বিভিন্ন জাল হাদীসে বলা হয়েছে, বুধবার অশুভ এবং যে কোনো মাসের শেষ বুধবার সবচেয়ে অশুভ দিন। আর সফর মাস যেহেতু অশুভ, সেহেতু সফর মাসের শেষ বুধবার বছরের সবচেয়ে বেশি অশুভ দিন এবং এ দিনে সবচেয়ে বেশি বালা মুসিবত নাযিল হয়। এ সব ভিত্তিহীন কথাবার্তা অনেক সরলপ্রাণ বুযুর্গ বিশ্বাস করেছেন। যেমন: ‘‘সফর মাসে একলাখ বিশ হাজার ‘বালা’ নাজিল হয় এবং সবদিনের চেয়ে ‘আখেরী চাহার শুম্বা’তে (সফর মাসে শেষ বুধবার) নাজিল হয় সবচেয়ে বেশী। সুতরাং ঐ দিনে যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত নিয়মে চার রাকাত নামাজ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ঐ বালা থেকে রক্ষা করবেন এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রাখবেন। খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার, রাহাতিল কুলুব- পৃষ্ঠা ১৩৯
আব্দিল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) লিখেন, এগুলো সবই ভিত্তিহীন কথা। তবে আমাদের দেশে ‘আখেরী চাহার শুম্বা’র প্রসিদ্ধি এ কারণে নয়, অন্য কারণে। হাদিসের নামে জালিয়াতী
রড় পীর খ্যাত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানী ৯১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার কিছু অনুসারি প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার ওফাতের দিন পালন করে থাকেন। তার মৃত্যু বার্ষিকী ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। ফাতিহা ও ইয়াজদাহম দুটি ফার্সি শব্দ। ফাতিহা অর্থ দোয়া, আর ইয়াজদাহম অর্থ এগারো। ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো-এর ফাতিহা বা দোয়াকে বুঝায়। এক কথায় রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াবের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলে। ফার্সি ভাষার প্রভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, বৃহৎ রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, ইরাক প্রভৃতি স্থানে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ অর্থাৎ এগারো-এর ফাতিহা নামে উদ্যাপিত হয়। এই দিনটি উৎযাপন করা যে বিদআতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারন ইসলামে কোন জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হারাম কাজ।
আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হলেন ইসলাম ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসাবে সুবিদিত। আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) কে ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। জিলানের অধিবাসি হিসাবে তিনি জিলানী নামে নামে পরিচিতি লাভ করে। তাকে সম্মান প্রদানের জন্য আবু মোহাম্মাদ মুহিউদ্দিন নামে উপাধি প্রদান করা হয়। তার পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। জীবনি লেখকদের মতে তার মাতা হাসান ইবনে আলী (রা.) এর বংশধর।
২। আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর শিক্ষা
আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর বাল্য শিক্ষার হাতে খড়ি হয়েছিল জ্ঞানবান পিতা ও গুনবতী মাতার মাধ্যমে। তিনি স্বীয় পিতা মাতার মাধ্যমেই প্রথমিক স্তরের শিক্ষনীয় বিষয়গুলি গৃহে বসেই সমাপ্ত করেছিলেন। সর্বপ্রথমেই তিনি পবিত্র কোরান পাঠ করা শিক্ষা করেন। গৃহশিক্ষার বাইরেও তিনি জিলান নগরের স্হানীয় মক্তবেও বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ৪৮৮ হিজরীতে যখন প্রথম তিনি বাগদাদ গমন করেন তখন তার বয়স হয়েছিল আঠার বৎসর। বাগদাত এসে তিনি শায়েখ আবু সাইদ ইবনে মোবারক মাখযুমী হাম্বলী, আবুল ওয়াফা আলী ইবনে আকীল (রহ:) এবং আবু মোহাম্ম ইবনে হোসাইন ইবনে মুহাম্মদ (রহ.) এর নিকট ইলমে ফিকাহ, শায়েখ আবু গালিব মুহাম্মদ ইবনে হাসান বাকিল্লানী (রহ.), শায়েখ আবু সাইদ ইবনে আব্দুল করীম ও শায়েখ আবুল গানায়েম মুহম্মদ ইবনে আলী ইবনে মুহম্মদ (রহ.) প্রমুখের নিকট এলমে হাদীস এবং শায়েখ আবু যাকারিয়া তাবরেয়ী (রহ.) নিকট সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ লাভ করেন। শায়খ জীলানীর বাহ্যিক ও আধ্যাত্নিক জ্ঞান চর্চার গূরু শায়খ আবু সাঈদ মাখযুমীর মনে তরুন এ শিষ্যের যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে এতই সুধারনা ও আস্হাশীলতার সৃষ্টি করল যে, নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা তত্তাবধান ও পরিচালনার দায়িত্ব শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর নিকট অর্পন করে তিনি নিজে অবসর গ্রহন করেন।
৩। আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর কর্মজীবন
শিক্ষা-দীক্ষায় পূর্ণতা অর্জনের পর তিনি নিজেকে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিত করেন। বিভিন্ন মাহফিলে তিনি ইসলামের সুমহান আদর্শ যুক্তিপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করতেন। তার মহফিলে শুধু মুসলমান নয়, অনেক অমুসলিমও অংশগ্রহণ করতো। তার বক্তব্য শুনে অনেক অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ের পণ্ডিত ছিলেন। তার রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে ‘ফতহুল গায়ের’, ‘গুনিয়াতুত তালেবীন’, ফতহুর রবযানী, ‘কালীদায়ে গাওসিয়া’ উল্লেখযোগ্য।
৪। আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) এর বিভিন্ন উপাদিসমূহঃ
অনেক বিদআতি সুফি তাকে বলেন, পীরানে পীর দস্তগীর, মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বালি, গাউসে ছামদানী, নুরে ইয়াজদানী, গাউসুল আযম হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)। এ উপাধিগুল কখন আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর নিজের দেয়া হতে পারে না। যারা তার অনুসরণ করেন, অতিমাত্রায় শ্রদ্ধা করেন তারা এ উপধিগুল দিয়ে থাকতে পারেন। তার লিখিত ‘গুনিয়াতুত তালেবীন’ কিতাব খানা পড়লে আপনার ভুল ভেঙ্গে যাবে এই কিতাবটি সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। অবশ্য তিনি কখনও লিখেন নাই এমন কিতাবও তার নাম দিয়া প্রকাশ করা হয়েছে। তার নামে ব্যবহৃত এই উপাদিগুল ব্যবহার করা কত টুকু যৌক্তিক একটু ভেবে দেখি।
(১) পীরানে পীরঃ
পীর একটি ফার্সি শব্দ যার অর্থ শায়খ, শিক্ষক। তাহলে পীরদের পীর এর অর্থ হল শায়েদ এর শায়েখ, বা পীরের পীর বা বড় বা শ্রেষ্ঠ পীর। সুফিরাদিরা যেহেতু পীরতন্ত্রে বিশ্বাসি কাজের তাদের নিকট তিনি বড় পীর। কাজেই তাকে বলা অন্যায় হবে না।
(২) দস্তগীরঃ
দস্তগীল এর অর্থ “হাত ধরা”। “দস্ত” মানে হচ্ছে “হাত” এবং “গীর” মানে হচ্ছে “ধরা”। এই সম্পর্কে যে কাহিনী প্রচলিত আছে যে উনি এবং আল্লাহ এক সাথে হাটছিলেন। হঠাৎ করে আল্লাহ পড়ে যাচ্ছিলেন এবং আব্দুল কাদের জিলানী আল্লাহর হাত ধরে ফেলেন এবং আল্লাহকে পতন থেকে রক্ষা করেন। (নাউজুবিল্লাহ মহান আল্লাহ এ থেকে অনেক পবিত্র) এই জন্য উনার টাইটেল বা উপাধি দস্তগীর।
এই ধরনের কথা কোন মুসরিকও বলতে পারবে না। কারন তারা জানে তাদের বানান মাবুদগুলিও এ ধারনা থেকে বড়। আর মহান আল্লাহ অনেক এ সকল শির্কি কথা থেকে পবিত্র ও অমুখাপেক্ষি।
(৩) গাউসুল আযমঃ
“গাউস” শব্দের অর্থ ত্রাণকর্তা, রক্ষাকর্তা, পরিত্রাণদানকারী, উদ্ধার কারী ইত্যাদি। এবং “আজম” শব্দের অর্থ মহান, বড় বা সর্বশ্রেষ্ঠ। গাউসুল আজম শব্দের অর্থ হল সর্ব শ্রেষ্ঠ ত্রাণকর্তা। আল্লাহ সম্পর্কে যাদের নুন্যতম ধারণা আছে তারা বুঝবেন এই উপাধি কার জন্যঃ আল্লাহ নাকি আব্দুল কাদের জিলানী।
অর্থ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? (সুরা মুমিনুন ৮৮-৮৯)।
(৪) কুতুবে রব্বানীঃ
আবরি কিতাব শব্দ থেকে কুতুব শব্দটি উত্পত্তি হয়নি। কুতুব শব্দটি পরিচালনা কাজে সহায়তাকারী হিসাবে সুফিগন ব্যবহার করে থাকে। সুফিদের কিছু পরিভাষা আছে, যা তাদের কথিত অলীদের উপাদি হিসাবে ব্যবহার করে যেমনঃ গাওছ, আবদাল, ইমামাইন, নুকাবা, আবরার ইত্যাদি। কুতুব এমনই একটি পরিভাষা। যে সকল অলী আল্লাহকে পরিচালনাগত ভাবে সাহায্য করে তাদের কুতুব বলে। (নাউজুবিল্লাহ)।
তাদের কেউ কেই কুতুবুল আকবর, কুতুবুল আলম, কুতুবুল এরশাদ, কুতুবুল আক্তারও বলে। ইমলামি আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ বই, যা আমাদের কওমী মাদ্রাস নেছাবভুক্ত এর ১৭৫ পৃষ্ঠায় লিখেন, কুতুবদের দুইজন উজিল থাকেন। তাদের আলাদা আলাদা নামও থাকে। ইহা ছাড়াও আরও অনেক কুতুব থাকেন। প্রত্যেক শহরে শহরে বা গ্রামে গ্রামে ও কুতুব থাকেন। কিতাবের শেষে লেখা আছে। এ সম্পর্কে কুরআন হাদিসে কিছুই বলা হয়নি। এ সবই সুফিদের কাশফ বা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত, বেশী ঘাটাঘাটি না করাই ভাল। ঘাটাঘাটি করি আর না করি আল্লাহ পরিচালনা কাজে সাহায্য করা এমন আকিদা রাখলে মুসলিম থাকবে তো। না কি তার ইমান ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৫। তার নামে প্রচলিত শির্ক কথাঃ
আমাদের সমাজে বিভিন্ন বিদাআতি মাহফিলে বিদআতি আলেম তাদের নামে অনেক শির্ক মিশ্রিত কথা প্রচার করে। হয়ত তারা এ সম্পর্কে কথনও চিন্তা করেনি যে আমার এ কথা শির্ক কথা অথবা ঐ আলেম নামধারি লোকটি আসলে আলেম নয়, শির্ক সম্পর্কে তার জ্ঞানের সল্পতার জন্য শির্ক কথা বুঝতেই পারছেনা।
বিদাআতি মাহফিলে বিদআতি আলেম তার নামে সনদবিহিনভাবে প্রচার করে, তিনি মানুষকে কবর থেকে জীবিত করেন, মুর্দা সাথে কথা বলেন জিব্রাইল (আ.) এর নিকট থেকে জোর করে রুহ ছিনিয়ে নেয়া। অনেক বছর আগে ডুবে যাওয়া কয়েকশ বরযাত্রীকে পুনঃ জীবিত করেন, আকাশে উড়ে বেড়ানো, বাঘ কে বশ করা, আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আল্লাহর সাথে তর্ক করা, ইসলাম কে পুনর্জীবন দান করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
সমাজের অধিকাংশ লোক ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের শির্ক সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় সহজে এসব বিশ্বাস করে। এভাবে সমাজে প্রচলিত আছে, অযু ছাড়া তার নাম মুখে নিলে আগে মানুষের মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে যেত, এখন শরীর থেকে একটা পশম পড়ে যায়। সুফিদের নিকট এমন কাহিনী ও প্রচলিত আছে অল্প বয়সে বাবার সাথে সমজিদে গিয়ে জান্নাতি এবং জাহান্নামীদের জুতা আলাদা করে সাজিয়ে রাখেন। উনার দোয়ার কারনে বাগদাদে বাপের আগে ছেলে মারা যায়না। একজন মহিলার পাঁচ পাঁচটি কন্যা সন্তান ছেলেতে রুপান্ত হয়। বাগদাদে একজন সদ্য বিবাহ লোকের বাসর রাতে জান কবচ করার কথা থাকলেও তার জন্য জান কবচ করতে পারে নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।
তার নামে কিছু শির্ক ও বিদাআত মিশ্রিত কাহিনী বর্ণিত আছে যার কোন সনদ নাই। কোন কোন কাহিনী লোক মুখে প্রচারিত আবার তার নামে যে সকল বই বাজারে আছে সেখানেও উল্লেখ আছে। এমনই একটি বই হল “সিররুল আসরার বা মারেফতের নিগূঢ় রহস্য”। এই বইয়ে এমন কিছু কাহিনী আছে যা বললে এবং শুনলে ঈমান হারা হওয়ার আশংকা শতভাগ। এই “সিররুল আসরার বা মারেফতের নিগূঢ় রহস্য” বইটি কাদের জিলানী (রাহিঃ) এর নামে রশীদ বুক হাউস, ৬ প্যারিদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা -১১০০ থেকে ২০১০ সালে প্রকাশ করে। বইটির তৃতীয় অধ্যায় আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর ২৮ টি কেরামত উল্লেখক করা হয়েছে যার প্রতিটির মাঝে শির্কের গন্ধ পাওয়া যায়। বইটিতে দাবি করা হয়েছে যে, বইটি আব্দুল কাদের জিলানী (রাহিঃ) লেখা। আসলে এই বইটি তার লেখা নয়। বইটির কাভার পেজে লেখা হয়েছে। “সিররুল আসরার বা মারেফতের নিগূঢ় রহস্য”। মূলঃ হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)। বঙ্গানুবাদঃ সুফী মুহাম্মাদ ইকবাল হোসেন কাদেরী।
বইটির মুল লেখক হিসাবে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর নাম লেখা আছে। কিন্তু কোন যুক্তির ভিত্তিতে বলা হল, এই বইটি তার লেখা নয়। বইটির ৬৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ আধ্যাতিক জগতের সম্রাট মাওলানা জালাউদ্দিন রুমি তাহার অমর কাব্য গ্রস্থ মসনবীতে বলিয়াছেন,
“কাফ পর্বতে অবস্থিত সী মোরগের নিকট পৌছাইবার শক্তি আমার মধ্যে রহিয়াছে। আমি আমার জ্ঞানের দরিয়ায় নিশ্চিত হইয়া গিয়াছি যদি জিন এবং মানব প্রকাশ্যে আমাকে দেখিতে পায়”।
বইটির ৬৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ
হযরত শামস তাবরীয রাহমাতুল্লাহি আলাই বলিয়াছেন, “তাওহীদ বৃক্ষের উচ্চ শাখার ফলে আমি পরিপূর্ণ পরিতৃপ্ত। আমার ফল দেখে পথিকগণ আমার প্রতি ঢিল নিক্ষেপ করে। তাহাদের এ ঢিল ছুড়াই আমি ভ্রুক্ষপ করিনা, লজ্জিতও হই না।
বইটির ৭৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ
হযরত ফরীদ উদ্দিন আত্তার রাহমাতুল্লাহি আলাই বলিয়াছেন, আল্লাহর নুরের মাঠে প্রেমাস্পদের সিংহাসন স্থাপিত রহিয়াছে, এবং উহার চারিপাশে সেনাবাহিনীর কোলাহল ধ্বনি অনবরত কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছে।
একটু লক্ষ করুন আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) যে তিন জন (জালাউদ্দিন রুমি, হযরত শামস তাবরীয ও ফরীদ উদ্দিন আত্তার) সুফির কথা থেকে উদৃতি দিলেন তাদের কার লেখার উদৃতি দেয়া আব্দুল কাদের জিলানীর পক্ষে সম্ভব নয় কারন তাদের সকলের জম্ম আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) পরে। এমন কি কারও জম্ম হয়েছে তার মৃত্যুর অর্ধশত বছর পরে। আব্দুল কাদের জিলানী জীবন দসায় যাদের জম্মই হয়নি তাদের কথা তিনি কিভাবে শুনবেন বা তাদের লিখবেন।
একটু লক্ষ করুনঃ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)৪৭১ হিজরিতে জম্ম গ্রহন করে ৫৬১ হিজরীতে মারা যান।
অপর পক্ষে শামস তাবরীয এর জম্ম সঠিকভারে জানা জায়নি, তবে ঐতিহাসিকগন লিখেন তিনি ৫৬০ হিজরীতে জম্ম গ্রহণ করেন এবং ৬৪৪ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। যখন আব্দুল কাদির জিলানীর ইন্তিকাল করনে তখন শামস তাবরিযের বয়স মাত্র এক বছর। অথচ “সিররুল আসরার বা মারেফতের নিগূঢ় রহস্য” নামের কিতাবটিতে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) শামস তাবরীয এর কথা উদৃত করছেন, কি সুন্দর গোজামিল অনেক বলে চুরি করলেও চোর নিজেই তার সাক্ষ্য রেখে যান।
আবার লক্ষ করুনঃ মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির ৬০৪ হিজরীতে জম্ম গ্রহণ করেন এবং ৬৭৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। আব্দুল কাদির জিলানীর ইন্তিকালের পরে প্রায় অর্ধশত বৎসর পরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার কাব্য গ্রস্থ মসনবী শরীফ নিশ্চয়ই তারা জম্মের পরে লিখিয়াছেন। তা হলে প্রশ্ন হল আব্দুল কাদির জিলানী কিভাবে রুমির মসনবী শরীফের সন্ধান পেলেন।
ফরিদ উদ্দিন আত্তারের বর্তমান ইরানের খোরাসান প্রদেশস্থ’ নিশাপুর শহরে ৫৪০ হিজরি মুতাবিক ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ এবং ৬১৮ হিজরি মুতাবিক ১২২১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আসল নাম আবু হামিদ মুহাম্মদ বিন আবি বকর ইবরাহীম। আত্তার ও ফরিদ উদ্দিন তাঁর কলমী নাম। আব্দুল কাদির জিলানীর যখন ৯১ বছরে মারা যান (৫৬১ হিজরী) তখন তারা বয়স মাত্র ২১ বছর। ২১ বছর বয়সে তিনি এত প্রসিদ্ধ লাভ করেনি যে, আব্দুল কাদির জিলানী মত মহান সাধক তার লেখা উল্লেখ করবেন।
তাই কোন সন্দেহ না করে, অকপটে স্বীকার করা যায় যে, “সিররুল আসরার বা মারেফতের নিগূঢ় রহস্য” নামের কিতাবটি আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর লেখা নয়। তারার মৃত্যুর পর কেউ হয়তো তার নাম দিয়ে লিখেনছেন।
৬। আব্দুল কাদির জিলালী রহ, নামে কিছু উপদেশ ধর্মি কাহিনিও আছে
একদিন তার মাতা তাকে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বাগদাদে পাঠানোর প্রাককালে চল্লিশটি দিরহাম তার কাপড়ে সেলাই করে দিলেন। এবং মিথ্যা কথা না বলার জন্য নছিয়ত করেন। পথিমধ্যে একদল দস্যু কর্তৃক তার কাফেলা আক্রানত হল। সবার কাছ থেকে সবকিছুই লুট পাট করে নিল। আব্দুল কাদের জিলানী একপাশে দাড়ানো ছিলেন। দস্যুরা তার কাছে কিচু আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন,তার কাছে চল্লিশ দিরহাম আছে। অতঃপর তারা আব্দুল কাদের জিলানীকে তাদের সর্দারের কাছে নিয়ে গেলেন। সর্দার পুনরায় তার কাছে জানতে চাইলো একথা সত্য কিনা? গাউছুল আযম নির্দ্বিধায় বললেন,তা সত্য। দস্যু সর্দার জানতে চাইলো,এ রকম অকপটে সত্য কথা বলার কারণ কি? গাউছুল আযম বললেন, মায়ের নির্দেশ সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলার। একথা শুনে দস্যু সর্দারের ভাবানতর সৃষ্টি হল, এবং মনে হতে লাগলো এ বালক তার মায়ের আদেশ পালন করার নিমিত্তে নিজের শেষ সম্বলটুকু হাতছাড়া হবে জেনেও অকপটে সত্য কথা বললো আর আমরা আল্লাহ ও রাসুলের (দঃ) নির্দেশ ভুলে গিয়ে আজীবন মানুষের উপর কতইনা অত্যাচার জুলুম করে চলেছি। তার সততার গুনে অনেকগুল মানুষ হিদায়াত পেল। কাহিনী সত্য মিথ্যা যা হোম মর্মার্থ খুবি ভাল।
৭। এই দিন উপলক্ষে কি কি বিদআত করা হয়ঃ
হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউসসানী আব্দুল কাদের জিলানী (র.) পরলোক গমন করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বড়পীর সাহেবের এই ওফাতের দিন সারা বিশ্বের মুসলমানরা প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন এবং তার মৃত্যুবার্ষিকী ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। এই দিনের বিদআত হলো-
১। তার মাজারে উরশ করা হয়।
২। মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
৩। খানা পিনা বা কাঙ্গালী ভোজের আয়োজন করা হয়।
৪। আব্দুল কাদের জিলানী (র.) স্মরণ করে গান গাওয়া হয়, কবিতা পাঠ করা হয়।
৫। তার জীবনী স্মরনে আলোচনা করা হয়, যা মিথ্যা ও শির্কে ভরপুর।
ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এই দিনের প্রতিটি কাজই বিদআতে পরিপূর্ণ। যদিও আমাদের দেশে দিবসটি সরকারী ছুটির দিন, তথাপিও কোন হক পন্থী মুসলিমের তাকে অংশ গ্রহন করা হারাম কাজ। তাই এধরনের কাজ থেকে আমরা দুরে থাকি।
আমাদের সমাজে ব্যাপক প্রচলিত একটি ইবাদতে নাম মিলাদ। মসজিদের ইমাম সাহেব সালাত শেষে প্রায়ই ঘোষণা করে থাকেন, দোয়া বাদ মিলাদ আছে। যেহেতু ইমাম সাহেব ঘোষনা করছেন আর আমল করা হবে মসজিদে, তাহলে ইবাদাত না বিদআত প্রশ্ন করা অন্যায়। তার পরও দেখি সমাজের এক শ্রেণীর লোক এর বিরোধীতা করে থাকেন। কিন্তু কেন? আমরা দেখি সাধারণত কেউ ভাল কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে মিলাদের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। নতুন ঘর তোলার পূর্বে, নতুন ঘরে উঠার পূর্বে, দোকান বা কোম্পানী উদ্ভোদন করার সময়, বিয়ের পূর্বে, বিয়ে পড়ানোর পরে, নতুন জাহাজ বা নৌকা পানিতে ভাষানোর পূর্বে, বাড়ির কল্যাণ কামনায়, কারো সুস্থতা কামনায়, মৃত্যু বার্ষিকীতে, চল্লিশায়, রাসূল ﷺ এর জন্ম উৎসবে (ঈদে মিলাদুন্নবীতে), বিশেষ কোন দিবস পালন বা বিশেষ কোনো উপলক্ষে মিলাদের মাহফিল বা অনুষ্ঠান করে থাকে। সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এই ইবাদাতটি কতটুকু ইসলামি শরীয়ত সম্মত? হয়তো অনেক প্রশ্ন করতে পারেন এত প্রচলিত একটি ইবাদাত সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা অন্যায়। কিন্তু না, এই কথা কয়েক দশক আগে বললে সাধারন মানুষ কেন হয়ত মৌলভীদেরও বুঝান কষ্ট হত। এখন ইসলামি জ্ঞান সহজ লভ্য, তাই পাড়ার ছোট ছাত্র ভাইটিকে আর বুঝাতে কষ্ট হয় না। তাহলে চলুন মিলাত সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক।
অনেকে মিলাদ ও ঈদে মিলাদুন্নবী এক করে দেখেন। কারণ এই দুটির মাঝে পরিভাষাগত বা আমলগত পার্কথ্য সমান্যই। ভুমিকায় দেখেছি বিভিন্ন কারনে মিলাদের অনুষ্ঠান করা হয়। মিলাদ মাহফিলের জন্য কোন নির্দিষ্ট দিনক্ষন লাগে না কিন্তু ঈদে মিলাদুন্নবী যেহেতু রাসূল ﷺ এর জম্ম দিন কে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয়ে থাকে তাই এর দিনক্ষন নির্দষ্ট। বছরে একবার, ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে পালন করা হয়।
মিলাদ একটি আবরি শব্দ যার বাংলা অর্থ থাকলেও মুসলিম সমাজে মিলাদ অর্থেই সমধিক পরিচিত। মিলাদ (ميلاد), মাওলেদ (مولد) এবং মাওলুদ (مولود) এ তিনটি শব্দের আভিধানিক অর্থ যথাক্রমে হল জন্মদিন, জন্মকাল ও জন্মস্থান প্রভৃতি। প্রসিদ্ধ আল মুনজিদ নামক আরবি অভিধানের الميلاد – وقت الولادة অর্থাৎ মিলাদ অর্থ জন্মসময়। المولد – موضع الولادة او وقتها মাওলেদ অর্থ জন্মস্থান অথবা জন্মসময়। المولود الولد الصغير মাওলুদ অর্থ ছোট শিশু। অনুরূপ মিসবাহুল লুগাতের বলা হয়েছে, ‘মিলাদ’ অর্থ জন্মসময়। ‘মাওলেদ’ অর্থ জন্মস্থান অথবা জন্মসময়। ‘মাওলুদ’ অর্থ ছোট শিশু। সারকথা আরবিতে ‘মিলাদ’ শব্দটি জন্মকাল বা জন্মদিন ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহৃত হয় না।
অপর পক্ষে ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ) হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।
মিলাদ ও ঈদে মিলাদুন্নবী মাঝে মিল ও অমিলগুলি হলঃ
(১) মিলাদ এর অর্থ জম্মদিন অপর পক্ষে ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনের আনন্দ।
(২) বছরের যে কোন সময় মিলাদ মাহফিল করা হয়, শুধু মাত্র ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা হয়।
(৩) যে কোন শুভ কাজের শুরুতে বা বীপদ থেকে মুক্তির আশায় মিলাদের আয়োজন করা হয় অপর পক্ষে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনের আনন্দ প্রকাশের জন্য আয়োজন করা হয়। এই দিনেও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
এই দুটি বিদআত কোন প্রকার দলীল ছাড়াই সমাজে প্রচলিত আছে। মিলাদ সম্পর্কে নিম্মে আলোচনা করা হলো-
২। মিলাদ মাহফিলের নিয়মঃ
বিদআতিদের নিকট মিলাদ মাহফিল যেহেতু একটা ইবাদাত কাজেই তারা এর মাঝে কিছু ধারা বাহিক নিয়ম নীতি চালু করছে। কুরআন সুন্নাহ বর্জিত এই সকল নিয়ম নীতিগুলিই মিলাদ পড়ার নিয়ম। মিলাদ মাহফিল সমাজে খুবই প্রচলিত কাজেই আমরা প্রাই সকলে এর নিয়ম সম্পর্ক অবহিত। তাই সংক্ষেপে এই মিলাদ পাঠের নিয়ম আলোচনা করা হলো।
(১) মিলাদের শুরুতে পরিত্র কুরআন তিলওয়াত
মিলাদের শুরুতে পরিত্র কুরআন থেকে তিলওয়াত করা হয়। কুনআন থেকে সাধারণত রসূলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কিত সূরা তাওবা ও আহযারের আয়াতগুলি তিলওয়াত করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন-
অর্থঃ তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তাঁরই ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি। সুরা তাওবা : ১২৮-১২৯
অর্থঃ আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ কর। সুরা আহযাব : ৫৬
(২) কুরআন আয়াত শেষ করার সাথে সাথেই দুরুদ পাঠ করা হয়-
আহযাবের ৫৬ নম্বরের এই আয়াতটি তিলওয়াত করার সাথে সাথে সবাই খুবই মহব্বতের সাথে নিম্মের দুরুতটি পাঠা করে।
এর পরই রাসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কিত কাসিদা বাংলা, ফার্সি ও উর্ধুতে সুর দিয়ে গাইতে থাকে। একটা কাসিদা পাঠ করার পর একবার উপরের দুরুদটি পাঠ করে করে। যেমন-
(৩) রাসুলাল্লাহ (সা.) কে সালাম প্রদান কালে কিয়াম করা বা দাড়িয় সালাম করা
এভাবে কয়েকবার সম্মিলিতভাবে দুরুদ ও কাসিদা পাঠ করার পর সকলেই দাড়িয়ে রাসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম প্রদান করে। ইহাকে মিলাদের কিয়াম বলা হয়। বিদআতিগন ইহাকে কিয়াম শরীফ বলে। এখানেও রাসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম প্রদানের সময় প্রতিবার একটি করে কাছিদা গাওয়া হয়। প্রতিবার সালমের প্রদানের সময় এই দুরুদ পড়ে সালাম প্রদান করা হয়। সবাই সালাম প্রদানের জন্য নিম্মের বাক্যগুলি পাঠ করে থাকে।
আস-সালামু আলাইকুম ইয়া রাসুলাল্লাহ।
আস সালামু আলাইকুম ইয়া হাবিবাল্লাহ।
আস সালামু আলাইকুম ইয়া নাবিয়াল্লাহ।
সালাওয়া তুল্লা আলাইকুম।
(৪) শেখ শাদির লেখা কবিতা পাঠ করাঃ
কিয়াম করে সালাম প্রদানের পর আবার বসে পড়েন এবং শেখ শাদির বিখ্যাত একটি কবিতা পাঠ করা হয়। কবিতাটি হলঃ
বালাগাল উলা বিকামালিহি।
কাশাফাদদুজা বিজামালিহি।
হাসুনাত জামিইউ খিছলীহি।
ছল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।
(৫) ছওয়াব রেসানী করাঃ
অতঃপর ছওয়াব রেসানী করে দোয়া মুনাজাত করা হয়। ছওয়াব রেসানী করার নিয়ম
অতঃপর সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার উসীলা দিয়ে দোয়া করা হয়। দোয়ার শুরুতে, মাঝে এবং শেষে অবশ্যই দরূদ শরীফ পাঠ করতে হবে।
৩। মিলদের ইতিহাসঃ
ঐতিহাসিকগণ মতে যারা সর্বপ্রথম এই বিদআতকে রূপদান করে তারা হল, বনী উবাইদ আল কাদ্দাহ। এরা নিজেদেরকে ফাতেমী বলে অবিহিত করত এবং নিজেদেরকে আলী রাদিয়াল্লাহুর বংশধর বলে দাবী করত। এরাই ফাতেমী দাওয়াতের প্রতিষ্ঠাতা। আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১১/২০২
ইসলামের নামে মিলাদ প্রচলনে এই ফাতিমীদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হল, দ্বীন ইসলামের মাঝে পরিবর্তন সাধন করে তার মধ্যে এমন কিছু ঢুকানো যার অস্তিত্ব দ্বীনের মধ্যে ছিল না। কারণ, ইসলামী শরীয়ত এবং রাসূল ﷺ এর সুন্নত থেকে মানুষকে দূরে সরানোর সব চেয়ে সহজ পদ্ধতি হল, তাদেরকে বিদআতের মধ্যে ব্যস্ত রাখা। ইতিহাসবিদদের মতে, এদের অবস্থান ইসলাম থেকে শুধু দূরেই নয় বরং এরা ইসলাম ও মুসলমানদের ঘোরতর দুশমনও যদিও এরা বাহ্যিক ভাবে তা স্বীকার করে না।
হিজরী ৬০৪ সনে আরবিলার সুলতান মুজাফফরউদ্দীন মওসিল শহরে (ইরাকের পার্শ্ববর্তী একটি শহর) এই মিলাদ নামক বিদ’আতের প্রথম প্রচলন করেন।যে সময় ক্রুসেডের মহাসমরে লক্ষ লক্ষ খৃষ্টান সৈন্য সিরিয়া ও জেরুজালেম শহরে আগমণ করে। যিশু খৃষ্টের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আকর্ষণীয় মেলা দেখে সুলতান মুজাফফরের হৃদয়ে রাসূলে কারীম ﷺ এর জন্মদিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের প্রেরণা জাগ্রত হয়, অনুগত একজন মৌলভীকে দিয়ে এই মিলাদের আনুষ্ঠানিকতা চালু করা হয়।
সুলতান মুজাফফরউদ্দীন সম্পর্কে আল্লামা যাহাবী (রহঃ) বলেন, বাদশাহ (মুজাফফরউদ্দীন) রাসূলﷺ এর মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাৎসরিক ৩ লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করতেন। দুলিল ইসলাম, ২/১০২; মিনহাজুল ওয়াজেহ, ২৫০)
সুলতান মুজাফফরউদ্দীন এর আদেশে ওমর ইবনে দাহিয়া আবুল খাত্তাব নামের এক মৌলভী মিলাদ সম্পর্কে একখানা বইও লেখেন। মন মাতানো ভাবভঙ্গিমায় পূর্ণ বই দেখে সুলতান তাকে এক হাজার মুদ্রা পুরষ্কারও প্রদান করেন। দুলিল ইসলাম, ১/১০৪
মুজাফফরউদ্দীন সম্মানিত ইমামগন ও সালফে সালেহীনদের শানে অত্যন্ত অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করত। নগ্ন ও অশ্লীল বাক্য বলতে দ্বিধাবোধ করত না। নির্বোধ ও দাম্ভিক প্রকৃতির লোক ছিল। ধর্মীয় আদেশ ও নিষেধাবলী তুচ্ছজ্ঞান করে বেপরোয়াভাবে শৈথিল্য প্রদর্শন করত”। (লিসানুল মিজান, ৪/২৯৬)
আল্লামা ইবনে বুখারী (রহঃ) বলেন, মওসিল শহরের সকলেই একথার ওপর একমত ছিল যে, মিলাদ প্রবর্তক ও মিলাদ সম্পর্কিত বইয়ের লেখক উভয়েই মিথ্যাবাদী ও ধর্মকর্মে অকর্মণ্য ছিল। লিসানুল মিজান, ৪/২৯৫
নব আবিষ্কৃত বিদ’আতের নির্দেশদাতা সুলতান মুজাফফরউদ্দীন ও ওমর ইবনে দাহিয়া আবুল খাত্তাব এর সাথে সে যুগের ভন্ডপীর ও মাজার-পূজারীগণ এসে সম্পৃক্ত হল, নির্দিষ্ট দিনে যখন দেশের বাদশাহ, মোল্লা-মৌলভী ও ভন্ডপীরগণ সম্মিলিতভাবে বিরাট জাঁকজমক করে বিপুল পরিমাণ টাকাপয়সা ব্যয় করে আকর্ষণীয় মেলার আয়োজন করা শুরু করল। তখন দেশের সরলপ্রাণ মুসলিম জনসাধারণ এটাকে দ্বীন মনে করে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। অবশেষে এই বিদ’আতই ইবাদতের মূল্যবান প্রলেপে আবৃত হয়ে সুদূর ইরাক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বসীমা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।
সউদী আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শাইখ মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আলুশ শাইখ (রহ.) বলেন, “হিজরি ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে এই বিদআত তথা রাসূল ﷺ এর জন্ম দিবস পালনের প্রথা সর্ব প্রথম চালু করেন আবু সাঈদ কূকুবূরী। [ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ৩/৫৯]
যদিও এ মর্মে অন্য আরও একাধিক মত রয়েছে।
উবাইদিয়াদের শাসনামলে মিলাদ চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা ব্যাপকতা লাভ করতে লাগল। মুসলমানগণ জিহাদ ছেড়ে দিল এবং তারা রূহানী ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় এই বিদআতটি সাধারণ মানুষের মনে শিকড় গেড়ে বসল। এমনকি অনেক মূর্খ মানুষের নিকট এটা আকীদা-বিশ্বাসের একটি অংশ হয়ে দাঁড়ালো।
কিছু আলেম যেমন ইমাম সুয়ূতী রহঃ এই বিদআতের পক্ষে প্রমাণাদি খুঁজতে বাধ্য হলেন যাতে মীলাদের বিদআতকে বৈধতা দেয়া যায়। (তিনি মিলাদের পক্ষে কতিপয় দলিল পেশ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণ তার যথপযুক্ত জবাব দিয়েছেন -আল হামদুলিল্লাহ।
অথচ পরিতাপের বিষয় হলো উক্ত মিলাদের উৎপত্তিস্থান মওসিল শহরের লোকজন বহুদিন আগে থেকেই মিলাদকে বিদ’আত বুঝতে পেরে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে, আর তদস্থলে কতিপয় স্বার্থান্বেষী পীর ও ভোগবিলাসী আলেম নামধারী ধর্মব্যবসায়ীদের ধোঁকায় পড়ে উপমহাদেশের সরলপ্রাণ মুসলিমগণ উক্ত বিদ’আতকে ইবাদত মনে করে পঙ্কিলতায় হাবুডুবু খাচ্ছেন।
হুজ্জাজে কেরামগণ পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরীফে সফর করেন, রাসূলﷺ এর দেড় হাজার বৎসর পরেও আরব দেশে মিলাদ নামক ‘পূণ্যানুষ্ঠান’ অপরিচিত।
৪। মিলাদের পক্ষের দলীল ও তার খন্ডনঃ
যারা মিলাদের স্বপক্ষে দলীল দিয়ে থাকেন তারা প্রথমে সাধারণত রাসুল ﷺ এর জম্ম সংক্রান্ত কোন হাদিস বা কুরআনের আয়াত তুলে ধনের। মিলাদ অর্থ হল জম্ম তাই রাসুল ﷺ এর জম্ম সংক্রান্ত কিছু পেলেই মিলাদ বলে চালিয় দেয়। আসলে রাসুল ﷺ এর মিলাদ বা জম্ম বিদআত নয়। এ সম্পর্কিত আলোচনা ও বিদআদ নয়। বিদআত হল রাসুল ﷺ এর জম্ম তারিখ বা সাল কে কেন্দ্র করে যে সকল আমল আবিস্কার করা হয়েছে। ইসলামে ইবাদতের পদ্ধতি আবিস্কার করার কোন ক্ষমতা দেয়া হয় নাই। কিন্তু বিদআতি আলেমগন এর জম্মা সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা মিলাদের মত বিদআতী আমলের প্রচলন করেছেন। তারা যে আয়াত ও হাদিসগুলির সাহায্যে এর দলীল পেশ করে তা সম্পর্কে একটু আলোক পাত করা হল।
(১) বিদআতিদের প্রথম দলিল ও তা খন্ডন-
মিলাদ কে জায়েয করা জন্য সুরা আল ইমরানের ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াত দুটি ব্যবহার করে থাকে। আয়াত দুটির অর্থ ঠিক রেখে ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলীমদের প্রতারিত করে থাকে। তালে দেখুন আয়াত দুটির ব্যাখ্যা কি আর তারা বুঝে কি?
আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছেন- আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের সাথে যা আছে তা সত্যায়নকারীরূপে একজন রাসূল তোমাদের কাছে আসবে- তখন অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করেছ এবং এর উপর আমার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছ’? তারা বলল, ‘আমরা স্বীকার করলাম। আল্লাহ বললেন, ‘তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম’। এরপর যারাই এ অংগীকার ভংগ করবে তারাই হবে ফাসেক। সূরা আলে ইমরান : ৮১-৮২
এই আয়াত দুটির মর্ম হলঃ প্রত্যেক নবীর কাছ থেকে এই মর্মে অংগীকার নেয়া হয়েছে যে, দীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে তোমাদের নিযুক্ত করা হয়েছে এবং তোমাদের সেই দায়িত্ব তোমাদর পালন করতে হবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নবীকে পাঠানো হবে তাকে সবাই দীন মানার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে হবে। এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে আহলি কিতাবদের এই মর্মে সতর্ক করা যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কৃত অংগীকার ভংগ করছো এবং মুহাম্মাদ ﷺ কে অস্বীকার ও তাঁর বিরোধিতা করে তোমাদের নবীদের থেকে যে অংগীকার নেয়া হয়েছিল তার বিরুদ্ধাচরন করছো। কাজেই এখণ তোমরা ফাসেক হয়ে গেছো। কিন্ত বিদআতিগন এই আয়াতে মিলাদের গন্ধ খুজে পায় তারা বলে-
পৃথীবিতে আগমনের আগেই সমস্ত আম্বিয়া কেরামগনকে নিয়ে আল্লাহ তায়ালা এই মিলাদের আয়োজন করেছিলেন।এই মহাসম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা। তিঁনি নিজে ছিলেন মীরে মাজলিস বা সভাপতি। সকল নবীগন ছিলেন শ্রোতা বা ঐ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া দর্শক। আর সেটাই ছিল সর্বপ্রথম ঈদে মিলাদুন্নবী বা নূর নবীজির শুভ আগমনের খুশি উদযাপন।
বিদআতিদের দাবিঃ ঐ মজলিসের উদ্দেশ্য ছিল মোহাম্মদ মোস্তফা ﷺ এর শুভ আগমন, শান-শওকত ও মান-মর্যাদা, সম্মান ও স্বীকৃতি দান ইত্যাদি অন্যান্য নবীগনের সামনে তুলে ধরা এবং তাঁদের থেকে রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন ও সাহায্য সমর্থনের প্রতিশ্রুতি আদায় করা। তাই এটাকে তারা বলে, নবীজীর সম্মানে এটাই ছিল সর্বপ্রথম মিলাদ মাহফিল এবং মিলাদ মাহফিলের উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। সুতরাং মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠান হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত বা তরিকা।
তাদের এই মনগড়া ব্যাখ্যা কোন কালে কোন তাফসির কারক করেনি, চার মাজহাবের কোন মুজতাহীদ ইমামও করেনি। এটা তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা ও আমল আবিস্কারের হাতিয়ার মাত্র।
(২) বিদআতিদের দ্বিতীয় দলিল ও তা খন্ডন-
ইবরাহীম (আ.) তার নিজ বংশে আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ এর আগমনের জন্য দোয়া করেছিলের যার উল্লেখ মহান আল্লাহ বলেন-
হে আমাদের রব! এদের মধ্যে স্বয়ং এদের জাতি পরিসর থেকে এমন একজন রসূল পাঠাও যিনি এদেরকে তোমার আয়াত পাঠ করে শুনাবেন, এদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং এদের জীবন পরিশুদ্ধ করে সুসজ্জিত করবেন। অবশ্যি তুমি বড়ই প্রতিপত্তিশালী ও জ্ঞানবান। সুরা বাকারা : ১২৯
ইবরাহীম (আ.) এর দোয়ার কবুলের প্রমান হল এই আয়াত এবং তার ফলাফল হল তার বংশে মুহাম্মাদ ﷺ এর আবির্ভাব। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিদআতীগন বলেন, ইব্রাহীম (আ.) ৪০০০ বৎসর পূর্বেই মুনাজাত আকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শুভ আবির্ভাব, রাসূলের সারা জিন্দেগীর কর্ম চাঞ্চল্য ও মানুষের আত্নার পরিশুদ্ধির ক্ষমতা বা রাসূলের ওসিলায় নাপাকি হতে মুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধি লাভ বর্ননা করে হুজুর ﷺ এর শুভ আগমনের সারাংশ পাঠ করেছেন তথা আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন। নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইব্রাহিম (আ.) এর দোয়ার ফসল।
সাহাবী হযরত ইরবাদ ইবনে সারিয়া (রা.) রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আঁমি আল্লাহর নিকট শেষ নবী হিসেবে লিখিত ছিলাম যখন আদম (আ.) কাদা মাটির মাঝে মিশ্রিত ছিল।আর অচিরেই আঁমি তোমাদেরকে আঁমার প্রথম অবস্থা সম্পর্কে খবর দিচ্ছি। আঁমি হলাম ইব্রাহিম (আ.) এঁর দোয়ার ফসল, ঈসা (আ.) এঁর সুসংবাদ এবং আঁমার মায়ের ঐ দর্শন যেটা মা দেখেছিলেন যে ,তিঁনি আঁমাকে ভূমিষ্ট (পৃথিবীতে আগমনের সময়ে) করেছেন এমতাবস্থায় তার থেকে একটি নূর বের হলো যা তার সামনে সিরিয়ার প্রাসাদ সমূহকে আলোকিতা করেছিল। (মিশকাত : ৫৭৫৯, নাসিরুদ্দীন আলবানী উক্ত হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)।
তাদের দাবি- বর্তমান মিলাদ রাসূল ﷺ শুভ আবির্ভাবের যে বর্ননা দেয়া হয় তা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর দোয়ার তুলনায় সামান্যতম অংশ মাত্র। সুতরাং আমরা যে মিলাদ শরিফ পাঠ ও কিয়াম করি ইব্রাহীম (আ.) এর-ই সুন্নাত।
কত বড় জাহেল হলে এমন কথা বলতে পারে। এই আয়াত যার উপর নাজিল হল তিনি বুঝলেন না যে এর দ্বারা মিলাদ কিয়াম করতে হবে। অথচ বাংলার নামধারী সুন্নী, জাহেল, নবী প্রেমীক দাবিকারীগণ, বুঝলেন ইহা হল, ইব্রাহীম (আ.) এর-ই সুন্নাত। ইহা আর একটি ধোকা কারণ হাদিসে এসেছে, একদা উমার (রা.) তাওরাতের কয়েকটি পাতা নিয়ে পড়ছিলেন। তা দেখে নবী ﷺ রাগান্বিত হয়ে বললেন, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! যদি মুসাও জীবিত হয়ে এসে যান, আর তোমরা আমাকে ছেড়ে তাঁর অনুসারী হয়ে যাও এবং আমাকে বর্জন কর, তাহলে অবশ্যই তোমরা ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চয় উম্মতের মধ্যে তোমরা আমার অংশ এবং নবীগণের মধ্যে আমি তোমাদের অংশ। আহমাদ : ১৫৮৬৪, ১৮৩৩৫)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, যদি মূসা তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেন, তাহলে আমার অনুসরণ ছাড়া তাঁর জন্য অন্য কিছু বৈধ হতো না। আহমাদ : ১৪৬৩১, শুআবুল ঈমান বাইহাক্বী : ১৭৯
কাজেই ইব্রাহীম (আ.) এর সুন্নাত বলে আমল করা যাবে না। ধোকাবাজী করে অজ্ঞ মুসলীমদের ভুল বুঝাতে সক্ষম হলেও কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ সামনে বিদআতকে সুন্নাহ বলে বুঝান সম্ভব হবে না। ইনশাআল্লাহ।
(স্মরণ কর) যখন মরিয়ম-তনয় ঈসা বলল, হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম আহমদ। অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বললঃ এ তো এক প্রকাশ্য যাদু। সুরা সফ : ৬
বিদআতিগন এই আয়াতের ব্যাখ্যা করে মিলাদ কিয়ামকে ঈসা (আ.) সুন্নাহ বলে প্রচার করে থাকে। তাদের দাবী, নবী করিম ﷺ এঁর পৃথিবীতে শুভ আগমনের ৫৭০ বৎসর পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) আবির্ভাব। তিঁনি তাঁর উম্মত হাওয়ারী (বনি ইসরাইল) কে নিয়ে নবী করিম ﷺ এর মিলাদ শরীফ পাঠ করেছেন। তিনি তার উম্মতের কাছে আখেরী জামানার পয়গম্বর রাসূল ﷺ এর নাম ও সানা সিফাত এবং আগমন বার্তা এভাবে বর্নণা করেছেন। বিদআতীগন এও দাবী করে থাকে যে, হযরত ঈসা (আ.) তাঁর উম্মতদেরকে লক্ষ্য করে যে ভাষন দিয়েছেন, তা দাঁড়িয়েই দিয়েছেন। এ থেকে মিলাদের কিয়ামও জায়েয। সুতরাং মিলাদ ও কিয়াম হযরত ঈসা (আ.) এর সুন্নাত।
এটি কুরআন মজীদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। কারণ এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.) স্পষ্টভাবে রসূলুল্লাহ ﷺ এর নাম উল্লেখ করে তাঁর আগমণের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই সংবাদ সকল ইহুদী ও খৃষ্টান পাদ্রীগণ জানতেন কিন্তু তারা নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে রাখার জন্য ইহুদী ও খৃষ্টান জনগনের নিকট গোপন রাখেন। মহান আল্লাহ কুরআনে এই আয়াতের মাঝে আবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, এক জন সত্য নবী আসবেন যার নাম হবে আহম্মদ। অথচ বিদআতিগণ ইহুদী ও খৃষ্টানদের মত উম্মতে মুহাম্মদীকে ভূল বুঝিয়ে এই আয়াত দ্বারাও মিলাদ কিয়ামের গদ্ধ খুজে পায়।
বিদআতীরা যে তিনটি সুরাকে (৩:৮১-৮২; ২:১২৯; ৬১:৬) মিলাদের দলীল হিসাবে পেশ করে থাকে তাতে মিলাদ নামক কোন বস্তুর অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। এটা তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা মাত্র। অথচ মীলাদের সমর্থনে বিগত ৮০০ বৎসরে অনেক প্রসিদ্ধ লেখক অনেক দলীল, যুক্তি, মত, কাশফ, স্বপ্ন ইত্যাদির কথা লিখেছেন। তবে তাঁরা সকলেই উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগে মীলাদ ছিল না। এজন্য তা বিদআতে হাসানা। (হাদিসের নামে জালিয়াতি) অথচ আমরা জানি বিদাতে হাসানা বলে ইসলামে কোন বিদআত নেই।
(৪) বিদআতিদের চতুর্থ দলিল ও তা খন্ডন-
নুবাইহ ইবনু ওয়াহাব থেকে বর্ণিত, একবার কা’ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিকট প্রবেশ করলেন। তারপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা উল্লেখ করলেন। তখন কা’ব বললেন: এমন কোন দিন নেই যেদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা অবতরণ করেন না, এমনকি তারা তাদের ডানা দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কবরকে বেষ্টন করে ডানা দ্বারা (ছোট ছোট করে) আঘাত করে এবং তাঁর উপর সালাত প্রেরণ করতে থাকে। সন্ধ্যা বেলায় সেই দল ফিরে গেলে তাদের অনুরূপ আরেকদল দুনিয়ায় নেমে এসে অনুরূপ করতে থাকে। এভাবে যখন তাঁর কবরের মাটি তাঁর উপর থেকে থেকে ফেটে যাবে এবং তিনি বের হবেন তখন সত্তর হাজার ফেরেশতা তাঁকে নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হবে। সুনানে দারেমী : ৯৫ হাদিস বিডি
এই হাদিসটি জঈফ। হাদিস দ্বারা এর সম্মান ও মর্যাদা বুঝান হয়েছে। শুধু ফিরস্তা নয় তার উম্মতগনও প্রতি নিয়ত সালাতের বৈঠকে তাকে উপর দুরুদ পাঠের মাধ্যমে সালাম প্রেরণ করা হয়। তার নাম শুনলেও দুরুদ পড়া বাধ্যমামুলক করা হয়েছে। সুতারং এই হাদিস দিয়ে মিলাদের দলিল প্রদান করা হাস্যকর।
(৫) বিদআতিদের পঞ্চম দলিল ও তা খন্ডন-
মিলাদের সমর্থনে অনেক জাল হাদিস বর্নণা করে থাকে। তাদের বর্ণিত একটি জালা হাদিস হলোঃ
আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে জান্নাতে আমার সাথী হবে। উমার (রা) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তা’যীম করবে সে ইসলামকে জীবিত করবে। উসমান (রা) বলেন: যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবী পাঠের জন্য এক দিরহাম ব্যয় করবে সে যেন বদর বা হুনাইনের যুদ্ধে যোগদান করলো। আলী (রা) বলেন: ‘‘যে ব্যক্তি মীলাদুন্নবীর তা’যীম করবে এবং মীলাদুন্নবী পাঠের কারণ হবে, সে দুনিয়া হতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাসান বসরী (রাহ) বলেন: আমার কামনা হয় যে, যদি আমার উহদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তবে আমি তা মীলাদুন্নবী পড়ার জন্য ব্যয় করতাম। … ইমাম শাফিয়ী (রাহ) বলেন: যদি কেউ মীলাদুন্নবীর জন্য বন্ধুদেরকে জমায়েত করে, খাবার প্রস্ত্তত করে, স্থান খালি করে দেয়, দান-খয়রাত করে এবং তার কারণে মীলাদুন্নবী পড়া হয় তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সিদ্দীক, শহীদ ও সালিহগণের সাথে উত্থিত করবেন এবং সে জান্নাতে থাকবে।…’’এভাবে আরো অনেক তাবিয়ী, তাবি তাবিয়ী ও পরবর্তী বুজুর্গগণের নামে মীলাদুন্নবী ‘পড়া’-র ফযীলতে অনেক বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। আন-নিমাতুল কুবরা আলাল আলাম ফী মাওলিদি সাইয়িদি ওয়ালাদি আদাম’’ (বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত আদম সন্তানদের নেতার জন্মের মধ্যে’ হাদিসের নামে জালিয়াতি
এই হাদিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল (রহ.) জালা হাদিস বলে উল্লেখ করেছেন।
(৬) বিদআতিদের ষষ্ঠ দলিল ও তা খন্ডন-
মিলাদের সমর্থনে তারা নিম্মের জাল হাদিস বর্নণা করে থাকে-
ইবন আববাস বলেন, একদিন তিনি নিজ বাড়িতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের ঘটনাবলি বর্ণনা করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ আগমন করেন এবং বলেন, তোমাদের জন্য আমার শাফাআত পাওনা হলো।
এটি হাদিস নয়, মিথ্যা কথা কারন ইবন আববাসের বয়স ৮ বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকাল হয়। তিনি কি ৫/৬ বৎসর বয়সে ছেলেমেয়েদের হাদীস শুনাচ্ছিলেন।
(৭) বিদআতিদের সপ্তম দলিল ও তা খন্ডন-
আবূ দারদা (রা) বলেন, ‘‘আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে আমির আনসারীর (রা) বাড়ির পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তাঁর সন্তান ও পরিবারের মানুষদের তাঁর জন্মের ঘটনাবলি শেখাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, আজই সেই দিন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য রহমতের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন এবং ফিরিশতাগণ তোমাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছে।
এগুলোর কোন রূপ সনদ কেউ উল্লেখ করেন নাই। এমনকি ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরে সংকলিত কোনো গ্রন্থে এগুলো সনদসহ বা সনদ ছাড়া সংকলিত হয়েছে বলেও কেউ প্রমাণ বা দাবি করেন নি। হাদীসের নামে জালিয়াতি, ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)
(২) মিলাদ একটা ইবাদত মনে করা হয় যার পক্ষে রাসুল ﷺ থেকে কোন নির্দেশনা নেই।
(৩) মিলাদ আমল হিসাবে আদায় করা হয় এবং এর পদ্ধতিও আবিস্কার করা হয়েছে। প্রত্যেক আদায়কারী এর মাধ্যমে সওয়াব আশা করে থাকে। কাজেই এটা বিদআত।
(৪) রাসুল ﷺ তাঁর জন্মের শুকরিয়া হিসেবে সোমবার ব্যক্তিগত সিয়াম পালন করতেন। এই সোমবারের সিয়াম সাহাবের নিয়ে একত্রে পালন করতেন বা কোনো সাহাবীকে এই সোমবার সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তার প্রমান নেই এবং তিনি বাত্সরিক কোনো উত্সব বা কোনো সাহাবী রাসুল ﷺ এর জন্মদিন উপলক্ষে কোনো উত্সব পালন করেছেন এর কোনই প্রমান নাই। নিজের জন্মদিন উপলক্ষে শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য জম্মদিনে স্ব স্ব ব্যক্তি সিয়াম পালন করতে পারে। কিন্তু একজনের জন্মের দিনে অন্যজন উত্সব করবে এমনটা শরীয়ত সম্মত নয়। এই মিলাদ সম্পর্কে যারা দলিল উপস্থাপন করেন তারা তাদের মত ব্যাখ্যা ব্যতীত আর কিছুই তুলে ধরতে সক্ষম হয় না। রাসুল ﷺ সোমবার সিয়াম পালন করতেন সেটা তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতা বোধ আল্লাহর প্রতি। আজকে যারা মিলাদুন নবীর কথা বলে তারা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে সোমবারের কথা কিছুই বলে না। ভন্ডামি করে এই সোমবারের উদাহরণ পেশ করে বাত্সরিক মিলাদ করে থাকে।
৬। মিলাদ কেন্দ্রিক একটি শির্কি আকিদা
মিলাদ কেন্দ্রিক একটি অন্যতম শির্কি বিশ্বাস হল মিলাদের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগমন। মিলাদ কিয়ামে বিশ্বাস কিছু লোক এমনও আছে, যাদের বিশ্বাস এই মাহফিলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগমন করে। এই উপলক্ষে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সম্মানে দাড়িয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস মিলাদে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে সালাম প্রদান করলে তিনি স্বশরীরে মিলাদ মাহফিলে হাজির হয়ে যায় তাই তার সম্মনে মাহফিলের এক পাশে চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়। মিলাদ মাহফিল চলা কালে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগমন করে এমন বিশ্বাস মুসলিমদের মাঝে কোন কালেই ছিল না। এ সম্পর্কে কোন কালে কোন বিতর্কও ছিল না। “নবী মুহাম্মদ ﷺ বা অন্য কোন অলীর হাজির নাযির নয়, বরং আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা, দর্শন, জ্ঞান ও শুনার দ্বারা সর্বত্র হাজির নাযির”। কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বর্নণাকে ভুল মিথ্যা ও মনগড়া ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা খুবই গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আগমনে জম্মের আগে পরে তিনি এমন জ্ঞানের অধিকারি ছিলেন না। বিভিন্ন নবীদের ঘটনা ও দাওয়াত দান কালে মুহাম্মদ ﷺ হাজির নাযির ছিল না।
(হে মুহাম্মদ!) তুমি সে সময় পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না৷ যখন মূসাকে এ শরীয়াত দান করেছিলাম এবং তুমি সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্তও ছিল না৷ বরং এরপর (তোমার যুগ পর্যন্ত) আমি বহু প্রজন্মের উদ্ভব ঘটিয়েছি এবং তাদের ওপর অনেক যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে৷ তুমি মাদয়ানবাসীদের মধ্যেও উপস্থিত ছিলে না, যাতে তাদেরকে আমার আয়াত শুনাতে পারতে কিন্তু আমি সে সময়কার এসব তথ্য জানাচ্ছি৷ সুরা কাসাস : ৪৪-৪৫
এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহির মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য। সুরা হুদ : ৪৯
মুহাম্মদ ﷺ কে গায়েবের বিষয় ওহির মাধ্যমে জানান হত। তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকলে ওহির জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না।
আর তোমাদের আশপাশের মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আজাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আজাবের দিকে। সুরা তাওবা : ১০১
মুহাম্মদ ﷺ এর চার পাশে অনেক মুনাফিক লোক ছিল। তিনি তাদের চিনতেন না। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন কে কে মুনাফিক ছিল। যদি তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকতেন তবে মুনাফিকের কার্যকালাপ দেখতে পেতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক তাকে আর অবহিত করার প্রয়োজন ছিন না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি দ্বারা সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির। উপরের আয়াতগুলো প্রমান করে মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ এই গুনটি দান করেন নাই। বরং তিনি তার প্রয়োজন মাফিক ওহি করে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর এই গুনের সাথে অন্য কোন নবী, রাসুল, ওলি, আওলিয়াকে যুক্ত করলে বড় শির্কে পতিত হবে যা কবিরা গুনাহ থেকেও ভয়াবহ। মিলাদ বিদআত হলেও এই শির্ক আকিদা গ্রহণকারী বিদআতীগন ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। কাজেই কুরআন সুন্নাহ বুঝে আমল করার চিন্তা করি।
আমরা দেখেছি ইসলামি শরীয়তে অনেকগুলো দিনকে গুরুত্ব দিয়ে উদযাপণ করে থাকে। ঐ দিবসগুলো উদযাপন করা ইবাদত। মহান আল্লাহ সৃষ্টির করে পরীক্ষান জন্য আমাদের দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আর তিনি একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে কেউ তার নির্ধারিত সীমার বাহিরে গিয়ে কাজ করলে তাকে পরকালে লাঞ্চনাকর শাস্তি প্রদাণ করবেন। এই জন্য তিনি মানুষকে ন্যায় বোধ, ভালো, সত ও কল্যানকর কাজের আদেম করে থাকেন। অন্যায় অসত্য ও মন্দ কাজের করতে নিষেধ করে থাকেন। একইভাবে তিনি কিছু দিবস উদযাপন করা নিয়ম কানুন নিয়েছেন। যাতে বান্দা কার দেওয়া সীমানা থেকেই কাজ করে। প্রথম অধ্যায় আলোচনা দেখেছি আল্লাহ প্রদত্ত দিবস বাদেও শর্ত সাপেক্ষে দিবস উদযাপন করা যায়। যদি দিবস উদযাপন করাকে ইবাদাত মনে না করা হয়, উদযাপন করার ক্ষেত্রে কুফরি আকিদা না থাকে, উদযাপন করার সময় ইসলাম বহির্ভূত হারাম কাজ লিপ্ত না হয়, উদযাপন করার ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় না হয়, বিধর্মীদের অনুসকরণে উদযাপন করা না হয় তবে জায়েয বলা হয়েছে। প্রথম অন্যায় এই শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখন যে দিবস সম্পর্কে আলোচন করব সে দিবসগুলো উদযাপনের জন্য ঐ সকর শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বিধান এই দিবসগুলো উদযাপন করা হারাম।
পূর্বের আলোচনায় দেখেছি আল্লাহ প্রদত্ত দিবস উদযাপন করা নেকীর কাজ। নিজে নিজে বিদস আবিস্কার করে আল্লাহকে খুসির জন্য আমল করা বিদআতি কাজ। কিন্তু এমন কতগুলি দিবস আছে যা উদযাপন করার জন্য ইসলামি শরীয়তের কোন নির্দেশনা নাই। আবার আমরা ঐ দিবস উদযাপনকে ইবাদত ও মনে করি না, হলে হলে কি হবে? এই প্রশ্ন সরল উত্তর হয় হালাল না হয় হারাম। ইসলামি শরীয়ত লংঙ্গিত হয় এমন দিবস উদযাপন হারাম কিন্তু কিন্তু ইসলামি শরীয়তের মধ্যে থেকে উদযাপন করতে পারলে জায়েয হবে। এই পর্যায়ে আমরা এমন কতগুলি দিবস সম্পর্ক আলোচনা করব।
পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ
বাংলা সনের প্রথম দিন বা পহেলা বৈশাখ যাকে আমরা “বাংলা নববর্ষ” বলি। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শুভ নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে উদজাপিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যদোয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় পায় নাই।
ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি তার আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
১। নববর্ষ উদযাপনঃ
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও এখান শহরের কেন্দ্রিক হয়েছে। আধুনিক মিডিয়ার প্রচারের কারনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই দিন উপলক্ষে বাঙ্গালীরা নতুন জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় বাহির হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হলেও নিম্মের অনুষ্ঠানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
(১) ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণঃ
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়।
(২) নববর্ষ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে একটি শোভাযাত্রা বের করে। এই শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের যুক্ত হয়। ঐ প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। শোভাযাত্রার অনতম আকর্ষণ শোভাযাত্রায় সাধারণত স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম, বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, কুমীর, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ এবং সাজসজ্জ্বা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রং বেরংয়ের পোশাক পরিহিত ছাত্র ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। ২০১৮ সালের শোভাযাত্রার ছিল বিশাল আকৃতির মহিষ। মহিষের উপর বসে আছে কয়েকটি রঙ্গিন পাখি। শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা উড়িয়ে দেয়া ভঙ্গিকে একজন নারীর প্রতিকৃতি ছিল শোভাযাত্রায়। বিশালাকায় কাঠামোয় তৈরি করা লাল-সাদা বক, বকের ঠোঁটের সামনে রাখা হয় সমান আকৃতির একটি মাছ। হলুদ-লাল হাতি ও জেলের প্রতিকৃতিও ছিল শোভাযাত্রায়। এছাড়া পোঁচা, টেপা পুতুল, সূর্য, রাজা-রানীসহ নানা আকৃতি ও রংয়ের মুখোশ ছিল শোভাযাত্রায়। এছাড়া ছিল রঙিন মা পাখি ও ছানার প্রতীকী কাঠামো। চারপাশে ফুলের মাঝে বড় একটি মুখের প্রতিকৃতিও ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রায়। বিষয়টি বুঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দিলাম। এক কথায় ১৯৮৯ সালে আবিস্কৃত শোভাযাত্রায় থাকে বাহারি পোশাকে মুখোশধারী নারী পুরুষের মিছিল। ঢাক-ঢোল, কাঁসা, তবলার তালে তালে চলতে থাকে নারী পুরুষের আবাধ সঙ্গীতও নৃত্যের মাধ্যমে উম্মাদনা। এক কথায় শেভাযাত্রা মানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নারীদেহের সৌন্দর্য প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্র, আলপনা ও উল্কি অংকন। এমনকি যৌন হয়রানির মত ঘটনা ঘটে এই শোভাযাত্রা থেকে।
(৩) নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীদের হালখাতাঃ
বছরের প্রথম দিন বা নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীগণ তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। ব্যবসায়ীগণ তাদের খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে “শুভ হালখাতা” নামের কার্ড এর মাধ্যমে নিমন্ত্রণ জানানো হয়। এই হালখাতার দিন খদ্দেরগণও চেষ্টা করে কিছু বাকি টাকা পরিশোধের। উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান। টাকা আদায়ের পর পুরান বাকির খাতা বাদ দিয়ে, বৈশাখের প্রথম দিনে থেকে নতুন করে বাকির খাতা হালনাগাদ করা হয়। হিসাবের খাতা হাল নাগাদ করা থেকে “হালখাতা”-র উদ্ভব। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছোট বড় মাঝারি যেকোনো দোকানেই এটি পালন করা হয়ে থাকে।
(৪) হিন্দুদের বা সনাতনধর্মাবলম্বীদেরপুজাঃ
পহেলা বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ধর্মের দোকানী ও ব্যবসায়ীরা পুজা দান করেন। হিন্দুদের দাবী করে থাকে যে লক্ষী হলো, বিত্তের দেবী। তাই তারা পহেলা বৈশাখের নববর্ষে লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। তারা এই দিন লক্ষীর নিকট দাবি করে যে, তাদের সারা বছর যেন ব্যবসা ভাল যায়। দেবতার পূজার্চনার পর তার পায়ে ছোঁয়ানো সিন্দুরে স্বস্তিকা চিহ্ন অঙ্কিত ও চন্দন চর্চিত খাতায় নতুন বছরের হিসেব নিকেশ আরম্ভ করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরা গনেশকে সিদ্ধিদাতা হিসাবে বিশ্বাস করে বিধায় এই দিনে তাদের অনেকে গণেশের পুজাও করে থাকে।
(৫) নববর্ষ উপলক্ষে গ্রাম অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা
গ্রাম অঞ্চলের লোকেরা খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন থাকে। নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন করে থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। এমন কোন জেলা নাই যেখানে পহেলা বেশাখ উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হয়না। বাংলাদেশের অসংখ্যা মেলার মাঝে উল্লেখযোগ্য দুটি মেলা হলোঃ
ক। বউমেলা
খ। ঘোড়ামেলা
বউমেলাঃ
ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, যার নাম ‘বউমেলা’। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা পাঁচ দিনব্যাপী চলে। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনস্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন। সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাঁঠাবলির রেওয়াজও পুরনো। বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন কপোত-কপোতি উড়িয়ে শান্তির বার্তা পেতে চায় ভক্তরা দেবীর কাছ থেকে। বউমেলায় কাঙ্ক্ষিত মানুষের খোঁজে কাঙ্ক্ষিত মানসীর প্রার্থনা কিংবা গান্ধর্ব প্রণয়ও যে ঘটে না সবার অলক্ষে, তা কে বলতে পারবে।
ঘোড়ামেলাঃ
এ ছাড়া সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলার আয়োজন করা হয়। এটির নাম ঘোড়ামেলা। লোকমুখে প্রচলিত জামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর ওই স্থানেই তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তথাপি সব ধর্মের লোকজনেরই প্রাধান্য থাকে এ মেলায়। এ মেলায় শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়।
২। নববর্ষের সাথে ইসলামের বিরোধ কোথায়?
(১) সরাসরি সনাতন ধর্মের আদলে করাঃ
আধুনিক নববর্ষের প্রধান আকর্ষন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণিল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় বাঘ, হাতি, কুমির পেঁচাসহ বহু জীবজন্তুর মূর্তি বা প্রতিকৃতি প্রদর্ষণ করা হয়। এই শোভাযাত্রার প্রচলন কারীগণ দাবি করে থাকে, এই জীবজন্তুর মূর্তি মাধ্যমে মানুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। এই জন্য তারা এর নাম দিয়েছেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুভাইদেরও দেখি নিজেদের মঙ্গল কামন করে তারা গাছ, পাথর, সাপ, সিংহ, মহিষ, ময়ুর, গাভী, নদীর পুঁজা করে থাকে।
সনাতন হিন্দু ধর্মমতেঃ দুর্গার বাহন হল সিংহ। কারন সিংহ হলো দুর্গার তেজ, ক্রোধ ও হিংস্রতার প্রতীক। একথা বলা আছে পদ্মপুরানে। গনেশকে বিশ্বাস করা হয় সিদ্ধিদাতা হিসেবে এবং গনেশের সাথে থাকে ইঁদুর। কার্তিক হলো যুবক, যোদ্ধা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। ময়ূর, কার্তিকের এই তিনটি গুণেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কেননা, কার্তিক যেমন চিরযুবা, তেমনি মৃত্যু পর্যন্ত ময়ূরের সৌন্দর্য ও তারুণ্যও কখনো নষ্ট হয় না। সাপ হলো গোপন ষড়যন্ত্রের প্রতীক এবং যে কোনো যুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র থাকবেই। ময়ূরের পায়ের নিচে সাপের অর্থ হলো, শুধু যুদ্ধ করলেই হবে না, যুদ্ধের এই গোপন ষড়যন্ত্রকেও দমন করতে হবে, যেমন ময়ূর নিমিষের মধ্যে একটি সাপের দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতে পারে। সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁসের এই ক্ষমতা আছে যে, দুধ ও জল মিশিয়ে দিলেও সে শুধু দুধকেই পান করতে পারে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী লক্ষ্মীর বাহন হচ্ছে লক্ষ্মীপেঁচা। লক্ষ্মী হলো ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী। তাই অনেক হিন্দু গৃহস্থ ঘরে লক্ষ্মীপেঁচা ঢুকলে যেন উড়ে না যায় সে চেষ্টা করেন। তাদের বিশ্বাস, ঘরে লক্ষ্মীপেঁচা থাকলে ধন-সম্পদে পূর্ণ হবে। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে পেঁচার গুরুগম্ভীর ডাককে অশুভর প্রতীক বলে মনে করা হয়। পেঁচা ডাকলে ঘরে ওঠার সিঁড়িতে জল ঢেলে দেওয়া হয়। তাদের বিশ্বাস, এতে সব ধরনের অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া তারা হাতিকে সাক্ষাৎ ভগবান মনে করে হাতির পূজার্চনা করে। হাতি মানুষের ফসল ঘরবাড়ি নষ্ট করবে না, হাতি যাতে রেগে না যায় সেজন্যই হিন্দুরা হাতির পুজা করে। পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের বর্ডার সংলগ্ন এলাকায় শত শত বছর ধরে বাস্তু দেবীর প্রতিক হিসাবে কুমিরের পূজা হয়ে আসছে। এই পূজায় মূল প্রতীকী কুমির হওয়ায় বর্তমানে কুমির পূজা নামে প্রচলিত থাকলেও আসলে এই পূজার মূল নাম বাস্তুপূজা। বিশেষ করে বাঘ, সাপ ও কুমিরের আক্রমণে নিয়মিত মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাই হিন্দুদের দৈব বিশ্বাস আর ধর্মীয় রীতি নির্ভর করে এদের পুঁজা করে থাকে।
মঙ্গল লাভের আশায় সনাতন ধর্মের হিন্দুরা এই দিনে সরাসরি লক্ষী ও গণেশের পুজা করে থাকে। বউমেলায় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুঁজা করা হয়। ঘোড়ামেলায় এ হিন্দুরা পুজারমত প্রার্থান আয়োজন করে থাকে। এ থেকে প্রমানিত হয় যে, নববর্ষ সরাসরি সনাতন ধর্মের আদলে উদজাপন করা হয়।
নববর্ষে সনাতন ধর্মের লোকেরা সিদ্ধেশ্বরী দেবী, লক্ষীদেবী ও গণেশের পুঁজা করে থাকে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত সিংহ, বাঘ, হাতি, লক্ষীপেঁচা, ময়ুর, কুমীর, সাপ ইত্যাদির প্রতিকৃতি যা সনাতন হিন্দু ধর্মের পুঁজায় ব্যবহৃত বা সরাসরি পুঁজা করে থাকে। এর একে বারে বীপরিত মেরুতে অবস্থান হল ইসলাম ধর্মে। ইসলাম ধর্মে একক ক্ষমতার একমাত্র মালিক হলো আল্লাহ তায়ালা। এই সকল জীবজন্তুর পুঁজাকে শির্ক কাজ বলা হয়। যা মহান আল্লাহ তাওয়া ছাড়া কখনও ক্ষমা করবেন না। মুসলিম হওয়ার জন্য আমরা যে কালিমা পড়ি তার শিক্ষাও এই সকল জীবজন্তুর পুঁজা সম্পর্ন বিরোধী। কালিমাটি হলোঃ
অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও প্রেরিত রাসুল।
এই মহান কালিমা মুল দাবি ইবাদতে আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে শরীক করা যাবে না। কিন্তু এই শোভা যাত্রা দ্বারা শিখান হয় জীবজন্তুর পুঁজার মাধ্যমে মঙ্গল কামনা। কাজেই এই ধরনের বড় বড় র্যালি বের করা যাকে মঙ্গল শুভ যাত্রা বলা হয়, এটা নিরেট হিন্দুদের ধর্মীয় কাজ। যা কোন মুসলমান কখনো করতে পারেনা৷ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী ﷺ বলছেনঃ আল্লাহর কাছে সবচাইতে ঘৃণিত ব্যাক্তি হচ্ছে তিন জন। যে ব্যাক্তি হারাম শরীফে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে ব্যাক্তি ইসলামী যুগে জাহিলী যুগের প্রথা তালাশ করে। যে ব্যাক্তি যথার্থ কারণ ব্যতীত কারো রক্তপাত দাবি করে। (সহিহ বুখারী ৬৪১৬ ইফাঃ)
নববর্ষের নামে এই ধরনের শির্কি কাজে অংশ গহন করা যাবে না। ইসলামি শরীয়ত মতে কেউ এই ধরনের শির্কি কাজে অংশ গ্রহন করলে বা আয়জনে সাহায্য করলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।
(২) ইসলাম বিরোধী আকিদা ধারণ করে
নববর্ষ উপলক্ষে প্রচার কর হয় যে, নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। এই ধরনের কোন তত্ত্ব কথায় সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। এই কথা বিশ্বাস করলে ইসলাম বিরোধী আকিদা হিসাবে চিহৃত হবে। নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে।
ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস আমাদের সকল প্রকার শুভ অশুভের মালিক এক মাত্র মহান আল্লাহ। কিন্তু নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের শিক্ষা দেন আল্লাহ ছাড়াও শুভ অশুভ বা কল্যান অকল্যানের বহু মালিক আছে। এই প্রতি বছর মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরুতে একটি করে কুফরী আকিদা প্রচার করে। যেনমঃ প্রচার করে থাকে এ বছর মা দূর্গা গজে বা হাতিতে চড়ে এসছেন তাই এ বছর ফসল ভাল হবে। তাছাড়া নববর্ষকে আহবান করা হয় এই বলে যে, “এসো হে বৈশাখ”। এই ধরনের কোন আপেক্ষিত বন্তুকে আহবান করা নিষেধ ৷ কারন এর দ্বারা মাখলুকের নিকট কল্যাণ কামনা করা হয়৷ অথচ কল্যানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’লা।
আপনার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে। (সুরা নিসা ৪:৭৯)
(৩)গান বাজনা মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা
নববর্ষে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহন করা হয়। প্রথম কর্মসুচি হলো, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়। অথচ ইসলামি শরীয়তে এই ধরনের গান বাজনা হারাম করা হয়েছে। গানবাজনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ষ্পষ্ট ঘোষনা এসেছে। সূরা আন-নাজম এর ৫৯-৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ
তাহলে কি এসব কথা শুনেই তোমরা বিস্ময় প্রকাশ করছো? হাসছো কিন্তু কাঁদছো না? অথচ তোমরা সঙ্গীত বা গান-বাজনা করছো?” (সূরা আন-নাজম ৫৩:৫৯-৬১)।
আবূ উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা গায়িকা নারীদের ক্রয়-বিক্রয় করো না, তাদেরকে গান-বাজনা শিক্ষা দিও না, তাদের ব্যবসায়ের মধ্যে কোন মঙ্গল নেই এবং এদের মূল্যও হারাম। এ প্রসঙ্গেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়-
আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব, সূরা লুকমান-৬। সুনানে তিরমিজি : ৩১৯৫
আবূ উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺবলেছেন, গায়িকা বিক্রয় কর না, ক্রয়ও কর না এবং তাদেরকে গানের প্রশিক্ষণও দিও না। এদের ব্যবসায়ের মধ্যে কোনরকম কল্যাণ নেই এবং এদের বিনিময় মূল্য হারাম। এই আয়াত এ ধরণের লোকদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে-
মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতা বশতঃ আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করেএবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, তাদেরই জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি, সূরা লুকমান-৬। সুনানে তিরমিজি : ১২৮২, ৩১৯৫, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৯২২)
আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশআরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি ৫৫৯০)
বাদ্যযন্ত্রসহ গান ইসলামে হারাম করা হয়েছে। ইসলামে বাদ্যযন্ত্র মাধ্যমে গান হারাম হওয়ার ব্যাপারে কিছু ভ্রান্ত সুফি ছাড়া করলে এক মত। কুনআন সহিহ হাদিসের দলীলও ষ্পষ্ট। কাজেই এই দিনের প্রধান কাজ শুরু হয় হারাম দ্বারা।
(৪)নবর্ষের মাধ্যামে বিজাতির অনুসরণ করা হয়
একটি সহহি হদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মাক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করে দেখলেন, মদীনাবাসী খেলাধূলার মধ্য দিয়ে দুটি দিবস উদযাপন করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ও দুটি দিবস কি? তারা বলল, এ দুটি দিবস জাহেলী যুগে আমরা খেলাধূলার মধ্য দিয়ে উদযাপন করতাম তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য এর থেকে উত্তম দুটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, একটি হল, ঈদুল আযহা এবং অপরটি হল, ঈদুল ফিতর।” (সুনান আবূদাঊদ, হাদীস নং ৯৫৯ সনদ সহিহ নাসির উদ্দিন আলবানী রহঃ)।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ হাদিস বিশারত লিখেছেন, মদীনাবাসী যে দুটি দিবস উদযাপন করত তা ছিল তাদের নববর্ষ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, নববর্ষের বিকল্প হিসাবে আল্লাহ আমাদের দুটি উত্তম দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অথচ আমরা আল্লাহ প্রদত্ত দিবস বাদ দিয়ে মনগড়া দিবস পালন করছি। ইদানিং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে দুই ঈদের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানো হয়। যেমন গত কয়েক বৎসর পূর্বে প্রথম আলোর হেড লাইন ছিল, “বাংগালীদের সব চেয়ে বড় উৎসব” ব্যবধান হল। শুধু মাত্র ঈদ শব্দেটি বাদ দিছে। ঈদ শব্দ লিখলে মুসলিমদের মাঝে প্রতিক্রিয়া হবে তাই লিখছে না। কিন্তু মিডিয়ার প্রচারের ফলে, ঈদের মত দিনটি উৎসবে পরিনত করছে। ঈদের মত ভাল খাবার নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করছে। সরকার বাহাদুরও ঈদের মত সরাকারী চাকুরি জীবিদের ঈদ বোনাসের মত বৈশাখী ভাতা প্রদান শুরু করছে। সরাকারী বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিনটি উদযাপনের জন্য ছুটি ঘোষনা করে থাকে। তারা বিভিন্ন সামাজিক সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এই নববর্ষের অধিকাংশ অনুষ্ঠান করা হয় অমুসলিমদের অনুকরণে। আগের আলোচায় দেখেছি হিন্দুরা এই দিনে পুজাঁ করে। তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে কিন্তু আমরা কি করছি। আমরা কি হিন্দুদের দেবতাকে খুশি করতেছি? নাকি মানুষ জাতীর শত্রু ইবলিস শয়তানকে খুসি করছি।
বিজাতিদের যে জাহেলী উৎসব প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ পালন করতে নিষেধ করছেন। আমরা যেন সেই উৎসবকেই আকড়ে ধরছি। অথচ বিজাতিদের অনুসরণ করা নিষেধ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
আর তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতঃপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারপর তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, অতঃপর তাদের অন্তরসমূহ কঠিন হয়ে গেল। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক। সুরা হাদীদ : ১৬
যে অমুসলিমদের সাথে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখলো, সে আমার উম্মত নয়। তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সাথে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখো না। কারণ, ইহুদিরা সালাম দেয় আঙ্গুলের ইশারায়। আর খ্রিস্টানরা সালাম দেয় হাতের ইশারায়। সুনানে তিরমিযী ২৬৯৫
আমর ইবনে মাইমূন রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা ’উমর (রা.) মুয্দালিফায় ফজরের নামায শেষে দাঁড়িয়ে বললেন, মুশরিকরা মুজদালিফাহ থেকে রওয়ানা করতো না যতক্ষণ না সাবীর পাহাড়ের উপর সূর্য উদিত হতো। তারা বলতো, হে সাবীর পাহাড়! তুমি সকালে উপনীত হও যাতে আমরা রওয়ানা করতে পারি। তখন রাসূল ﷺ তাদের বিরোধিতা করেই সূর্যোদয়ের পূর্বে রওয়ানা করেন। সহিহ বুখারী : ১৬৮৪, ৩৮৩৮
(৫)নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশাঃ
শয়তানের হাতিয়ার হল নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই কাজটি সে আনজান দিয়ে থাকে নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে। নববর্ষ মানে আনন্দ। এই আনন্দ হলো, সর্বস্থরের নারী পুরুষ একত্র হয়ে নগ্নতা, অশ্লিলত, বেহায়া পনার মাধ্যমে নিজকে প্রদর্শণ করান। নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশা আমাদের সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, মনে করা হয় এই বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, আমাদের দেশীয় আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অংশ। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয হলো, এসব বাদ দিয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির নামে যুবক যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ করে দিয়ে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছি। আমরা এক বারের জন্যও চিন্তা করি না যে এই নববর্ষ উপলক্ষ্যে এক বারের জন্যও যদি আমাদের কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা অশ্লীলতায় মাঝে নিপতিত হয়, তবে তাদের আর বের করা সম্ভব হবে না। তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকবে।
আমাদের ধারনা ব্যভিচার করা হয় শুধু বিশেষ অংগের দ্বারা। বাস্তবতা হলো, ব্যভিচার হতে পারে বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা। নববর্ষে নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশার ফলে অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনা সংঘটিত হয়। প্রায় প্রতি বছরই এই রকম অপ্রীতিকর ঘটনার কথা জাতীয় দৈনকে প্রকাশিত হয়। যার প্রধান কারন হল, নারীরা নববর্ষে তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য নিজেদের বিভিন্ন উপায় সাজায়। তাদের সাজানোর অন্যতম কারন পুষুরদের আকৃষ্ট করা। আর আস্তভোলা পুরুষ একটু আধটু বিয়াদবীতো করবেই। যদি নারী তার সৌন্দর্য ঢেকে রাখত তবে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটত না।
নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহ কি বলে?
আমাদের ইসলামি শরীয়তে এ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাপাচারের প্রথার উৎস হলো, নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এই জন্য বিষয়টি খুবই ইসালাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯
নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমরা আমাদের কলিজার টুকরা ছেলে মেয়েদেরকে বেপর্দা ও বেহায়পনার সুযোগ দিয়ে থাকি। আমরা দিন পালন করার চেষ্টা করছি নিয়মিত সালাত আদায় করছি। অপর পক্ষে আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দিচ্ছি। নিজে বুঝার চেষ্টা করি এবং তাদের বুঝাই ও নিয়ন্ত্রণ করি। কারন ছেলেমেয়ের পাপের জন্য আপনার আমলনামায় গোনাহ জমা হচ্ছে। যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকে ‘‘দাইউস’’ বলা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজ নকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। সুরা তাহরীম : ৬
তিন শ্রেণীর লোকের জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। সর্বদা মদ্যপায়ী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ূস। মিশকাত : ৩৬৬৫, আহমাদ : ৫৩৭২, সহিহ আল জামি : ৩০৫২, সহিহ আত তারগীব : ২৩৬৬
সালিম এর পিতা আব্দুল্লাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির প্রতি মহান মহিয়ান আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন দৃষ্টি দিবেন না, পিতা মাতার অবাধ্য, , পুরুষের বেশধারী নারী এবং দাইয়ূস। আর তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা, পিতা মাতার অবাধ্য, মাদকাসক্ত ব্যক্তি এবং দানকৃত বস্তুর খোঁটা দানকারী ব্যক্তি। সুনানে নাসায়ী : ২৫৬৩
যে সকল পুরুষ নিজের স্ত্রী, মা, বোন কিংবা মেয়ে সম্পর্কে যার কোনো গাইরাত (protective jealousy) নেই। যিনি নারী আত্মীয় বা স্ত্রীর দ্বারা অশোভন আচরণের ব্যাপারে উদাসীন তাকে দাউয়ুস বলে। কেউ কউ বলেন, যিনি নিজের স্ত্রীকে কিংবা তার দায়িত্বশীল পরিবারের মেয়েদের পরপুরুষকে দেখিয়ে আনন্দ পায় কিংবা পরপুরুষের সামনে যেতে কোনো ধরনের বাধা দেয় না তাকে দাউয়ুস বলে।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” সহিহ বুখারী : ৮৯৩, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯
নববর্ষ যে আমাদের জাহান্নামে দিকে আহবান করছে এতে কোন প্রকার সন্দেহের কারণ নাই। এখনই এ সম্পর্কে সতর্ক হয়। নিজে বাচার চেষ্টা করি পরিবার, সমাজের সকলে বাচাতে চেষ্টা করি। দ্বীন বুঝে আমল করি।
(৬)সময় ও অর্থ অপচয়কারীঃ
নববর্ষ উপলক্ষে যে কোন সময় ওঅর্থ অপচয় করা সঠিক কাজ হবে না। এই দিবস উদযাপনের জন্য প্রধানত চারটি স্থান সময় ওঅর্থ অপচয় করে থাকে।
হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১
আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন মায়ের নাফরমানী, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া, কারো প্রাপ্য না দেয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু নেয়া আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক বাক্য ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা, আর মাল বিনষ্ট করা বা অপচয় করা। সহহি বুখারি বুখারী : ২৪০৮, ৮৪৪, ১৪৭৭, ৫৯৭৫, ৬৩৩০, ৬৪৭৩, ৬৬১৫, ৭২৯২, মুসলিম ৫৯৩, নাসায়ী ১৩৪১, ১৩৪২, ১৩৪৩, আবূ দাউদ ১৫০৫, ৩০৭৯)
তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যাবত না তার সাথে অপচয় বা অহংকার যুক্ত হয়। ইবনে মাজাহ : ৩৬০৫
বর্তমানে নববর্ষে মুসলিমগন খাবারের পেছনে তেমন খরচ করেত দেখা না গেলেও হিন্দু ভাইয়েরা এই উৎসবে খাবারের পেছনে বেশ খরচ করে থাকে। কিন্তু নববর্ষে পোশাকের ক্ষেত্রে এখন হিন্দুদের মুসলিমরা পেছনে ফেলে দিয়েছেন। নববর্ষের গানের অনুষ্ঠানে ও শোভাযাত্রায় যারা অংশ গ্রহন করে তাদের পোশাক দেখলেই বিষয়টি বুঝে যাবেন। নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ছায়ানট রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সংঘ, সমিতি ইত্যাদি নানান অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দেশের সব জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে বৈশাখী র্যালি আয়োজন করা হয়। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। একটু চিন্তা করে সহজে অনুমান করতে পারবেন যে নববর্ষ উপলক্ষে যে কোন সময় ওঅর্থ অপচয় করা। শোভাযাত্রার আয়োজনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট মাসের পর মাস করা করে। তারা প্রচুর সময় ও অর্থ অপচয় করে থাকে।
মন্তব্যঃ ইসলামি শরীয়তে উৎসব অয়োজন করার সুনির্দিষ্ট বীধি বিধান আছে। অনুষ্ঠান অয়োজনের ক্ষেত্রে সেই বীধি বিধানের বাহিরে যাওয়ার সুযোগ নাই। নববর্ষে ইসলাম বিরোধী কাজ থাকার কারনে এই অনুষ্ঠানে যাওয়া ও তাদের সাথে উৎসব অংশ গ্রহন করা ইসলাম বিরোধী কাজ হবে। কাজেই কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই বলা যায় নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনে যা যা করা হয় তার পুরোটাই ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। মুসলিম হিসেবে যা অবশ্যই বর্জন করতে হবে।
(৭)মুখোস এবং উল্কি আঁকা একটি ইসলামি বিরোধী সংস্কৃতিঃ
নববর্ষ উপলক্ষে হাজার হাজার যুবগ যুবতী তাদের গালে, কপালে, হাতে উল্কি আঁকাছে। তারা এ সব খুবই মজা করে আকঁছে। কিন্তু এই কাজ যে ইসলামি বিরোধী তারা হয়তো তা জানে না। মানুষের শরীরে উল্কি আঁকা হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। নিম্মে এ সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস বর্ণনা করা হল-
আওন ইবনু আবূ জুহাইফাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি-
إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ، وَثَمَنِ الْكَلْبِ، وَآكِلِ الرِّبَا وَمُوكِلِهِ، وَالْوَاشِمَةِ وَالْمُسْتَوْشِمَةِ.
নবী ﷺ রক্তের মূল্য ও কুকুরের মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, উল্কি অঙ্কনকারী উল্কি গ্রহণকারী নারীদের উপর লানত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৫
বর্তমানে কিছু মুসলিম তরুণ-তরুণী যারা পশ্চিমা খ্রিস্টানদের কৃষ্টি-কালচার এবং তাদের অপসংস্কৃতি ধারণ করে, তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে কালেমা, আল্লাহ, রাসুল, কাবা শরিফ, মসজিদে নববি ইত্যাদি ইসলামি নির্দশনের ট্যাটু অঙ্কন করে এটিকে হালাল করার অপচেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটিও অত্যন্ত গর্হিত কাজ ও ইসলামের প্রতি ধৃষ্টতার শামিল। পবিত্র স্থান এবং চিহ্নগুলো শরীরের বিভিন্ন জায়গায় অঙ্কন করে এর মাধ্যমে ইসলাম ও কালেমার সম্মানহানি করা, ইসলামের সঙ্গে চরম অন্যায় ও অমানবিক আচরণ, যা কোনো মুসলমান দেখতে ও সহ্য করতে পারে না।
আর অবশ্যই আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, মিথ্যা আশ্বাস দেব এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান ছিদ্র করবে এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ করব, ফলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে’। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা তো স্পষ্টই ক্ষতিগ্রস্ত হল। সুরা নিসা : ১১৯
পরচুলা (কৃত্রিম চুল) সংযোগকারিণী ও ব্যবহারকারিণী এবং উল্কি অঙ্কনকারিণী ও যে তা অঙ্কন করায়, এদেরকে আল্লাহ তা’আলা অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ১৭৫৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৮৭
‘আউন ইবনু আবূ জুহায়ফাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে দেখেছি যে, তিনি একটি শিঙ্গা লাগানেওয়ালা গোলাম কিনলেন। তিনি তার শিঙ্গা লাগানোর যন্ত্র ভেঙ্গে ফেলতে নির্দেশ দিলে তা ভেঙ্গে ফেলা হল। আমি তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আল্লাহর রসূল ﷺ রক্তের মূল্য, কুকুরের মূল্য, দাসীর (ব্যভিচারের মাধ্যমে) উপার্জন করা হতে বারণ করেছেন। আর তিনি শরীরে উল্কি অঙ্কনকারী ও উল্কি গ্রহণকারী, সুদগ্রহীতা ও সুদদাতার উপর এবং (জীব জানোয়ারের) ছবি অঙ্কনকারীর উপর অভিসম্পাত করেছেন। সহিহ বুখারি : ২২৩৮
সহিহ হাদিসে আলোকে দেখা যায় উল্কি যারা তার শরীরে আঁকায় তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। উল্কি আঁকার সময় শরীরে বিভিন্ন প্রকারের ক্যামিক্যালের ক্রিম ব্যবহার করে থাকে যা ত্বকের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর৷ উল্কি আকার সময় নারীকে পর পুরুষের সমনে বেপর্দা হতে হয়। উল্কি আকাঁর ফলে মহান আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন। মুখোশ ব্যবহার করে মানুষ একটি বিকৃত রুচির পরিচয়। মোখোশ তৈরি করাই হয় মানুষকে ধোকা প্রদানের জন্য। ইসলামে এই রকম কিছু করার বিধান নাই।
আমাদের দেশে নববর্ষ হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। তেমনি ১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে উৎসবের মেজাজে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে। কিছু জাতি যেমন চীনা, ইহুদি, মুসলমান প্রভৃতির মধ্যে নিজ নিজ ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষ পালন করতে দেখা যায়। আজ কাল ০১ জানুয়ারির যে ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন করা হয় তা নতুনই বলা চলে। কারণ বেশীদিন হয়নি যখন থেকে এই তারিখ সর্বজনীনভাবে নববর্ষ হিসেবে গৃহীত হয়ে আসছে। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে বছরের শুরু হয় জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হলোঃ ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রোগোরির এক আদেশ অনুসারে এই বর্ষপঞ্জীর প্রচলন ঘটে। সেই বছর কিছু রোমান ক্যাথলিক দেশ গ্রেগোরিয় বর্ষপঞ্জী গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে ক্রমশ অন্যান্য দেশসমূহেও এটি গৃহীত হয়। আর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করে ১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন তারা তাদের ক্যালেন্ডার থেকে ১১ দিন বাদ দেয়। তাই ১৭৫২ সালের ক্যালেন্ডারে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর এই ১১ টি দিন পাওয়া যায় না।
বিশ্বের যে সকল দেশ এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে সিভিল ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা সবাই ইংরেজি নববর্ষ পালন করে থাকে। তবে অনেক দেশই ক্যালেন্ডারটি গ্রহণ করার পূর্বে নববর্ষের রীতিটি গ্রহণ করেছে। যেমনঃ ১৫৫৬ সালে স্পেন, পর্তুগাল, ১৫৫৯ সালে সুইডেন, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স, ১৬০০ সালে স্কটল্যান্ড, ১৭০০ সাল রাশিয়া, ১৭৫২ সাল ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ব্রিটিশ কলোনিগুলো, এই রীতি অনুসরণ শুরু করে। কিন্তু ইসরায়েল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে থাকলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। আবার কিছু কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করেনি। যেমনঃ সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া এবং আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। আমাদের ব্যবহৃত বর্তমান ইংরেজী ক্যালেন্ডারটি ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’।
প্রায় সারাবিশ্বে প্রচলিত ইংরেজী ক্যালেন্ডার এখন ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। ইংরেজী নববর্ষের শুরু হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২-টা ০১ মিনিটে। আর তখন থেকেই শুরু হয় আতশবাজি, বাদ্য-বাজনা, নাচ-গান, যুবক-যুবতীর ফ্রি স্টাইল ফূর্তি। উল্লাস আর বেলেল্লাপনায় কেটে যায় সারাটি রাত। রাতের গুরুত্বপূর্ণ যে সময়টিকে তারা টগবগে যৌবনের লাগামছাড়া নেশা মেটানোর সময় হিসাবে বেছে নিয়েছে সে সময়টিতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারী ১১৪৫ তাওহীদ, ১০৭৯ ইফাঃ)
মহান স্রষ্টার আহবানকে উপেক্ষা করে যারা শয়তানের আহবানে রাত জাগে, তাদের পরিণাম আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম। তিনিই সুক্ষ বিচারক।
বাংলা নববর্ষ এবং ইংরেজী নববর্ষ উদযাপনের মধ্য একটু পার্থক্য আছে। বাংলা সংস্কৃতির আবহে, বাংলা নববর্ষকে গানের মাধ্যমে দিনের শুরুতে আহবান করা হয়। আর ইংরেজী নববর্ষ শুরু হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২-টা ০১ মিনিটে। এই রাতকে থার্টি ফাষ্ট নাইট হিসাবে পালন করা হয়। রাত বারটি বাজার সাথে সাথে বিশ্বের নাম করা সব শহরে আতঁশ বাজির ঝলসানিতে চোখ ঝাঝিয়ে দেয়। তারা এর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে থাকে। পৃথিবীতে এক সাথে এত বেশী আতঁশ বাজি করা হয় না। ক্ষনিকের আনন্দ উপভোগে এত টাকা খরচ করাকে অপচয় ছাড়া কিছু নয়। বাংলা নববর্ষকে দিনের বেলায় স্বাগতম জানন হয় কিন্তু ইংরেজী নববর্ষ উদযাপনের সময়ই হল নিজ নিজ দেশের মধ্য রাত। এরপর যারা এই দিনটিকে ঘটা করে পালন কর তারা হল বিধর্মী। পর্দা কি, অশ্লীলতা কাকে বলে, যৌনতা কি? এসব তাদের ডিকসনারীতেই নাই। কাজেই ইংরেজী নববর্ষ মানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা, সাথে মদের আসর। বড় বড় হোটেলে পার্টির আয়োজন বা ড্যান্স বারের নর্তকীদের উদ্দাম নাচ। যা হোন এ সব অশ্লীশ কাজতো আর আমাদের ধর্মের কোন সমস্যা করে না। তারা যে ধর্মের অনুসরণ করে সেই ধর্ম মতে কতটুকু শুদ্ধ আর কত টুকু অশুদ্ধ তা তাদের বিষয়। আমাদের নাক গলানোর কিছু নাই। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। আজ কার ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন আর তাদের বিষয় নয়। কারন আমাদের দেশে এখন ইংরেজী নববর্ষ বেশ জোর শোরে পালিত হচ্ছে।
ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন করা হারামঃ
বলার অপেক্ষা রাখে না বাংলা নববর্ষ থেকে ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন একটু আলাদা। বাংলা দেশের অধিকাংশ মুসলিম হওয়াতে বাংলা নববর্ষ কিছুটা শালীনতা আছে। কিন্তু ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন করে থাকে অধিকাংশই বিধর্মী যাদের নিকটি অশ্লীলতা, যৌনতা ও মাদকতা কোন পাপ নয়। এই দৃষ্টি কোন থেকে বুঝা যায় ইসলামি শরীয়তের আলোকে বাংলা নববর্ষ থেকে ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপনে কতটা বেশী অশ্লীলাতা থাকবে। ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপনে অশ্লীলাতা থাকলে মুসলিমদের মাথা ব্যথার কারন নয় কারন এটাতো আর মুসলিমদের অনুষ্ঠান নয়। হ্যা, এই কথাটা সত্য হলে আমরা আর লেখার কোন প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে আমাদের দেশসহ সকল মডারেট মুসলিম দেশের মুসলিমগণ ইংরেজী নিউ ইয়ার কে খু্বই ধুমধামের সাথে উদযাপন করছে। শুধু একটি কথাই বলল যে, কম অশ্লীতায় উদযাপিত বাংলা নববর্ষ যদি উদযাপন ইসলাম সমর্থন না করে, তা হলে অশ্লীলতায় ভরা ইংরেজী নিউ ইয়ার উদযাপন করা কতটা মারাত্বক বুঝে নিন।
নওরোজ একটি ফার্সি শব্দ যার বাংলা অর্থ ‘নতুন দিন’। ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে পালিত ইরানি নববর্ষ। ইহাকে ‘পারস্য নববর্ষ’ ও বলা হয়। ইরানি শীয়া মতের অনুসরীগন এই উৎসবকে পালন করে থাকে। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়।
নওরোজের ইতিহাস
কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য শাহনামা ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের প্রাচীন কিংবদন্তীতে উল্লেখিত বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এ উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন।
আবু রায়হান আল বেরুনি তাঁর বিখ্যাত বই অসারুল বাকিয়্যাহ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বিখ্যাত পারস্য লেখক তাকি যাদেহ মাদ রাজত্বকালে (৭০৮ খ্রিষ্টপূর্ব-৫৫০-৫২৯ খ্রিষ্টপূর্ব) বাবেল বা বর্তমান ইরাক, তুরস্ক, আজারবাইজান, আফগানিস্তান ও বর্তমান ইরানসহ এতদঞ্চলে তিনটি ঈদ পালনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঈদে নওসারদ (নওরোজ উৎসব), তার ইয়াসকাই (তিরগান বা গ্রীষ্মকালীন উৎসব) ও মেহরানকাই (হেমন্তকালীন উৎসব)। তবে নওরোজ উৎসবটি অভিজাত, জাঁকজমকপূর্ণ ও চাকচিক্যময় আকার ধারণ করেহাখামানশি রাজত্বকালে (৫৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩৩০-৩২৭ খ্রিষ্টপূর্ব)।
আবার অনেক ঐতিহাসিকগনের মতে প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলো। (ইসলামি বিশ্বকোষ, ইসলামি ফাউন্ডেশন)
নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত :
নওরোজকে কেন্দ্র করে বর্তমান ইরানে বেশ কিছু বিদআতি উৎসব ও শিরকি রীতিনীত প্রচলিত আছে। নওরোজ পালনের উৎস পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের থেকেই প্রচলিত হয়েছে। সেই হতে যুগে যুগে নওরোজ উদ্যাপিত হইতেছে। এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্য তথা ইরানে নওরোজ ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উংসব। পারসিক কালচারে সমৃদ্ধ কাট্টা শিয়া রাষ্ট্র ইরানে এখনো ইহা জাতীয় দিবস এবং দেশের সকল অধিবাসীর মহা আনন্দ উৎসবের সঙ্গে উদ্যাপন করিয়া থাকে। সাধারণত বিশ বা একুশে মার্চ ফার্সি নববর্ষ শুরু হয়। এই দিন সমগ্র ইরানে ঈদ-ই নওরোজের রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। বর্তমানে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, ইরাক, জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও কম বেশী নওরোজের উৎসব পালিত হয়।
নওরোজ উপলক্ষ্যে কি কি উৎসব রীতিনীত প্রচলিত তার জানার ইচ্ছা সকলের। তাদের এই উৎসব রীতিনীত জানতে পারলে খুব সহজেই আপনি বুঝতে পারবের ইহার সাথে ইসলামি শরীয়তের সম্পর্ক কতটুকু।
১. নওরোজ হলো শিয়াদের ঈদ
পারস্যের অগ্নি উপাসক তথা মজুসিদের নওরোজ হল শিয়াদের ঈদের দিন তারা এই দিনটি ঈদের চেয়েও বেশী মর্যাদা প্রদান করে থাকে। ইরানি শিয়াগণ এই উৎসবকে সবচেয়ে বড় ঈদ বলেও মনে করে। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে ১৩ দিন পর্যন্ত তারা এই উৎসব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই উৎসবের জন্য দেশটিতে অন্য যেকোনো জাতীয় উৎসবের বেশী দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করে থাকে। প্রায় ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে প্রায় দীর্ঘ এক মাস। জাতিসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নওরোজ উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অথচ মুসলিমদের ঈদ অর্থ হলো আল্লাহ প্রদত্ত খুশি যা ইসলামি শরিয়ত মত উদ্যাপন করা হয়। যার ফলে দুনিয়া ও আখেরত কল্যাণ লাভ হয়। মুসলিম এমন ঈদ দুটি, তৃতীয় কোন ঈদ নাই।
তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবি (ﷺ) মদিনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্রের দিন এবং কুরবানির দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬
এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব পালন করার সুযোগ নেই। অথচ শিয়ারা নওরোজে তৃতীয় ঈদ হিসেবে উদযাবন করেছে।
২. হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ
ঘরে ঘরে নওরোজের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে উৎসব শুরুর ১৫ দিন আগে থেকেই এক ব্যক্তি অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে নতুন দিনের জয়গান গায়। পরনে থাকে লাল জামা ও লাল টুপি এবং মুখমণ্ডল কৃষ্ণকায়। এই ব্যক্তি কে হাজি ফিরুজ হিসাবে নাম করন করা হয়। এই ব্যক্তিই হলো, আনন্দ, উৎসব ও নতুনের আগমনি প্রতীক। হাজি ফিরুজের পাশাপাশি আমু নওরোজ বা নববর্ষ চাচাও সমান জনপ্রিয়। আমু নওরোজ ঈদের রাতগুলোতে বাচ্চাদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। আমু নওরোজের পোশাকের রং হচ্ছে সাদার ওপরে বিভিন্ন কারুকার্য করা পোশাক, সাদা দাঁড়ি ও গোঁফ, মাথায় সাদা টুপি। আমু নওরোজের উৎস সন্ধানে দেখা যায় চমৎকার এক প্রেমকাহিনি। আমু নওরোজ এখনো তার প্রেমিকার অপেক্ষায় আছে এবং সে বিশ্বাস করে তার প্রেমিকার সঙ্গেই তার বিয়ে হবে।
এই সকলই পারসিক অগ্নীপুজকদের রুসম রেওয়াজ ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নাই। হাজি ফিরুজ ও আমু নওরোজ অনেকটা খ্রিষ্টানদের ফাদারের মত।
নওরোজ উদ্যাপনের প্রস্ততি
নওরোজের আগেই ইরানিরা ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা পাড়াপড়শি ও আপনজনদের সহায়তা করেন। অনেকে আগেই পুরোনো আসবাবপত্র বা জরাজীর্ণ জিনিস ফেলে দিয়ে তারা নতুন জিনিস কেনেন। আমাদের দেশের ঈদুল ফিতরের মত নতুন জামা, কাপড়, জুতা প্রভৃতি কেনার হিড়িক পড়ে যায়। নওরোজের মেহমানদারির জন্য তারা ব্যাপক পরিমাণ ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনে থাকেন। এ সময় স্থায়ী বাজার ছাড়াও অনেক অস্থায়ী বাজার বা মেলার আসর জমজমাট হয়ে ওঠে।
ইসলামে সাথে সম্পর্ক :
যদিও শিয়াদের দাবি নওরোজ উৎসব পালনের জায়েয। আসলে ইসলামের সাথে এই উৎসবের কোন সম্পর্ক নাই। তারা এর সাথে শত শত বিদআত সৃষ্টি করে ইসলামের পোশাক দ্বারা আবৃত করছে মাত্র। ইরানি জাতির নওরোজ উৎসব পালনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও ইসলামের আবির্ভাবের পর ইরানে নওরোজ উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়। ইসলামি আচার অনুষ্ঠান যুক্ত হয় এ উৎসবের সাথে। নওরোজের প্রথম সেকেন্ডেই সবাই এ দোয়া পাঠ করেন। এ সময় তাদের সামনে টেবিলে বা দস্তরখানে থাকে পবিত্র কোরআন, তসবিহ এবং “হাফতসিন” নামে খ্যাত সাতটি বিশেষ সামগ্রীসহ আরো কিছু সামগ্রী।
হাফত সিন বা শিন
হাফত সিন বা সাতটি জিনিস হল নওরোজের প্রধান আকর্ষণ। এটি ছাড়া নওরোজ কল্পনাও করা যায় না।
হাফত সিন হল একটি সুসজ্জিত টেবিল যাতে সাত প্রকার খাদ্য থাকবে যাদের প্রতিটির প্রথম অক্ষর ফারসি অক্ষর সিন (س) দ্বারা গঠিত। নওরোজ শুরুর দিন কয়েক দিন আগে থেকে ইরানের পথেঘাটে বেরোলেই চোখে পড়বে হাফত সিনের যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রয়ের দৃশ্য। নওরোজকালীন সময়ে এটি প্রায় প্রতিটি বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষ বা অফিস-আদালতে অপরিহার্য একটি অংশ।
যেমন : একটি টেবিলে শাম, শারাব, শিরিন, শাহদ, শামশাদ, শারবাত ও শাকায়েক রাখা হল। এই টেবিলটিই হল হাফত সিন বা শিন। এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো শাম অর্থ মোমবাতি, শারাব অর্থ মদ, শিরিন অর্থ মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য, শাহদ অর্থ মধু, শামশাদ অর্থ বৃক্ষ বিশেষ, শারবাত অর্থ শরবত ও শাকায়েক অর্থ লাল রঙের টিউলিপ জাতীয় ফুল গাছ বিশেষ।
ইসলাম আগমনের আগে নওরোজের টেবিলে সজ্জিতকরণে এগুলো ছিল অপরিহার্য উপাদান। ইসলাম আগমন করার পর লোকজন চেষ্টা করলেন প্রাচীন রীতিনীতিগুলোকে সংরক্ষণ করবেন এবং নওরোজের মত উসবকে টিকিয়ে রাখবেন। যেহেতু ইসলামে শরাব বা মদ হারাম তাই শরাবের স্থলে সেরকে নির্বাচিত করলেন। আর এভাবেই ধীরে ধীরে শিন দ্বারা লিখিত ও সজ্জিত সাতটি বস্তুর বদলে সিন দ্বারা প্রচলিত সাতটি বস্তু নির্বাচন করলেন।
ইসলাম আগমনের পর বা বর্তমান হাফত সিনের মূল উপাদ্য হচ্ছে, সিব, সেরকে, সামানু, সোমাক, সির, সেঞ্জেদ, সাবযেহ, সেক্কে ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন।
এই দ্রব্যগুলিম নাম ফার্সিতে এর অর্থ হলো : সিব অর্থ আপেল, সেরকে অর্থ সিরকা, সামানু অর্থ অঙ্কুরিত গম, বালি বা অন্যান্য শস্যদানা আর আটা দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন বা হালুয়া বিশেষ, সোমাক অর্থ মধ্যমাকারের গাছ বিশেষ যার ফল দেখতে মসুরের ডালের মতো, তবে সামান্য বড় ও টক, সির অর্থ রসুন, সেঞ্জেদ অর্থ দেখতে বরইয়ের মতো ফল, সাবযেহ অর্থ সবজি। সেক্কে অর্থ ধাতব কয়েন ও সঙ্গে একটি পবিত্র কোরআন। এ ছাড়া ডিম, মাছের উপস্থিতিও হাফত সিনে দেখা যায়।
যারা নওরোজ উদ্যাপন করে তাদের বিশ্বাস এগুলোর প্রত্যেকটির অভ্যন্তরে এক একটি পারিভাষিক অর্থ বিরাজমান রয়েছে, যেমন পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী চিত্র। প্রথমত বুঝতেই পারছেন এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটি কোন ধর্মীয় বিষয় নয়। যদি কেউ এর সাথে ইসলামি শরীয়তের কোন সম্পর্ক দাড় করায় তবে এই কাজ করা বিদআত। কিন্তু এ সম্পর্কে আকিদা রাখে যে, এইগুলি পরিপূর্ণ জীবন, সুস্থতা, বরকত, আরোগ্য লাভ ইত্যাদির প্রতীকী তাহলে আর বিদআত থাকবে না। এটি কুফরি কাজ হবে। কাজেই মুসলিম হিসাবে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরানের শিয়াগন এই আমলের সাথে ধর্মকে যোগ করে শির্ক ও বিদআতেমত কাজ কাজ করছে।
চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব
ইসলাম আগমনের আগে পারশ্যবাসীর (ইরান) অধিকাংশ লোক অগ্নি পুজক ছিল। অপর পক্ষে নওরোজও তাদের বহু পুরা সংস্কৃতি। তাই অগ্নীপুজকগণ নওরোজকে স্বাগতম জানাতে চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব উদ্যাপন করে থাকে। ফারসি সাহিত্যে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন হচ্ছে ঔজ্জ্বল্য, পবিত্রতা, আনন্দ ও উৎফুল্ল এবং জীবন ও সুস্থতার প্রতীক। প্রাচীন ইরানের জনগণ চাহার শাম্বে সূরিতে হলুদাভ বিবর্ণতা, অপবিত্রতা, নোংরা, দূষিত ও যাবতীয় রোগ-শোককে অগ্নিতে বিসর্জন দেন। ফলশ্রুতিতে রক্তিমতা, প্রফুল্লতা, বর্ণিলতা, সুস্থতা ও কর্মনিষ্ঠতা অগ্নি থেকে গ্রহণ করেন। আনন্দদায়ক এই অগ্নি উৎসবে রংবেরঙের বিস্ফোরকদ্রব্য ও আতশবাজি এবং শত শত ফানুস রাতের ইরানকে আলোকিত করে।
মন্তব্য : এই ধরনের কুফরি আকিদা নিয়ে অগ্নীপুজকদের চাহার শাম্বে সূরি বা অগ্নি প্রজ্বলন উৎসব করা একজন মুসলিমের পক্ষে কীভাবে সম্ভব! ইসলাম সম্পর্কে যাদের সাধারণ ধারণা আছে তারাও বিষয়টি বুঝতে পারবে আশা করি।
সিজদাহ বেদার বা প্রকৃতির দিন
প্রাচীন ইরানে নওরোজ উৎসব পালনের পর ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হতেন। এই দিনটি কে বলা হয়ঃ সিজদাহ বেদার বা রুযে তাবিয়াত বা প্রকৃতির দিন। বর্তমান ইরানীরা এই দিনে মরুভূমি, উন্মুক্ত প্রান্তর, ঝরনার প্রান্ত, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং অত্যন্ত আনন্দ-উৎফুল্লতা এবং হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠতেন। সঙ্গে বৃষ্টির জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় নত হয়। আবার কোনো কোনো গবেষক ফারভারদিন মাসের ত্রয়োদশতম দিনকে বছরের প্রথম কৃষিকার্যের সূচনা দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নওরোজ উপলক্ষ্যে ভ্রমণ :
এই উৎসব নববর্ষের প্রথম তারিখ থেকে শুরু হয় এক টানা ১৩ দিন চলে। ১৩ তম দিনে ইরানিদের কেউই ঘরে থাকে না। তারা সেদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও মনোরম প্রাকৃতিক স্পটে সময় কাটান। বিশেষ করে উদ্যান, ঝর্ণা, পাহাড়, পার্ক- এসব স্থানে তারা চাদর বিছিয়ে বা তাঁবু খাটিয়ে খোশগল্প করে এবং মজাদার খাবার খেয়ে সময় কাটান। আগেই উল্লেখ করেছি, নওরোচ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানে ১৫ দিন সরকারি ছুটি থাকে এবং দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছুটি থাকে এক মাস। এই সুযোগে ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনো স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন। অনেকে এ উপলক্ষ্যে পবিত্র কোম শহরে তাদের ইমাম রেজার বোন মাসুমার মাজারে যান, কেউবা ইরাকে ইমাম হোসাইনর মাজারে বা আহলে বাইতের অন্য কোনো সদস্যের মাজারে নববর্ষ শুরু করেন।
উপহার বা বখশিশের প্রচলন
নওরোজের দিন অনেকেই একে-অপরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়।
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বাংলা নববর্ষ যেমন বাঙালি হিন্দুদের উৎসব, ইংরেজি নববর্ষ যেমন খ্রিষ্টানদের উৎসব ঠিক তেমনি নওরোজ হল প্রাচীর পারস্যের অগ্নীপুজকদের উৎসব। ইরানের ইসলামি নামধারী শিয়ারা যতই ইসলামের লেবাস লাগিয়ে নওরোজ উদ্যাপন করুক না কেন কোন অবস্থায়ই ইসলামি শরীয়ত সমর্থন করবে না।
কাজেই শিয়াদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদাসমুহ নিজে জানার পর অপর কে জানান, যাতে করে সকল মুসলিম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকিদা-বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। এবং শিয়াদের মিথ্যা বর্ণনাসমূহ, আকিদা, বিশ্বাস এবং তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ক হেফাজত থাকতে পারে। হে মহান আল্লাহ, এই সামান্য খেদমত টুকু কবুল করে আমাদের সকল কে নাজাত দান করুন। আমিন
শিশু মাসের যে তারিখকে জন্মগ্রহণ করেছে বছর ঘুরে সে তারিখটি আবার ফিরে আসলে সেটাই তার তথা জন্মদিন। সে দিনে আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধক নিয়ে বড় কেক টেকে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। এতে আমন্ত্রিত মেহমানদের সুস্বাধু খাবার দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে। মেহমানরা তাকে জন্মদিনের শুভকামনা জানান এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করে দোয়া করেন। সেই সাথে তার জন্য উপহার সামগ্রীও দিয়ে থাকেন।
আজকের সমাজে জন্মদিন পালন করাটা আধুনিকতা হয়ে গেছে। আর জন্মদিন পালন না করাটা হয়ে গেছে ব্যাক ডেটেড। একজন মুসলিম হিসেবে এই সম্পর্কে ভাবা উচিত । জন্মদিন পালন করা ইসলামি চেতনার পরিপন্থি। জন্মদিন পালন করা মুসলিমদের কালচার নয়। এটি এসেছে খ্রিস্টানদের কাছ থেকে যা মুসলিমদের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। এই উপলক্ষ্যে আনন্দ-ফুর্তি করা অথবা কোন আমল করার বিষয়ে কুরআন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত নয়। রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে তাবেয়ীদের যুগে জন্মদিন পালনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। যদি জন্মদিন বলতে ইসলামে কোন কিছু থাকত তাহলে হাদীস ও ইতিহাসের কিতাব গুলোতে সাহাবী ও তাবাঈন (রাঃ) এর জন্মদিন পালনের কোন না কোন ঘটনা থাকত। বর্তমানে এই কথা যাচাইয়ের জন্য আর আলেম হতে হয় না। আপনার সামনে সহিহ বুখারী, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহম্মদসহ বহু হাদিসের গ্রন্থ অনুদিত। সময় থাকলে মিলিয়ে নেন। কোন হাদিস গ্রন্থে এমন প্রমান নাই যে, সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ীদের কেউ জম্মদিন পালন করেছেন। আমাদের প্রিয়নবী ﷺ রবিউল আওয়াল মাসের কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন এটা নিশ্চিত ভাবে জানা না থাকায় সীরাত প্রণেতাদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। আমাদের মাঝে অতি প্রাসিদ্ধ বারই রবিউল আউয়া্লও সর্ব সম্মত মত নয়। সিরাতের প্রন্থে কম পক্ষে রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর ২০ টি জম্ম তারিখ পাওয়া যায়। যদি জম্মদিন পালনে বিশেষ কোন ফজিলত থাকত তাহলে সাহাবিগণ (রাঃ) যে কোন উপায় রাসুল্লাল্লাহর ﷺ এর জম্ম তারিখ বের করে পালন করেতেন। অথচ জন্মদিন পালন তো দূরের কথা তারা প্রিয় মানুষির জন্ম তারিখই সংরক্ষণ করে নাই। এর মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয় জন্মদিন বলতে বর্তমানে যা বুঝায় ইসলামে এর কোন অস্তিত্বই ছিল না।
কিছু দিবস রয়েছে, যেগুলো মানুষকে সচেতন করার জন্য বা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মেসেজ দেওয়ার জন্য পালন করা হয়ে থাকে। তবে ইবাদতের কোনো ফরম্যাট এর মধ্যে থাকতে পারবে না, তাহলে এই কাজটি বেদাত হয়ে যাবে।
ইমানদার ব্যক্তিগণ বেহুদা কাজ থেকে নিজেদের দূরে রাখবেন। এসব কাজে সময় নষ্ট করার সামান্যতম কোনো সুযোগ তাঁদের নেই। রাসুল ﷺ হাদিসের মধ্যে বলেছেন, ‘একজন মুসলিমের প্রকৃত সৌন্দর্য হচ্ছে সেখানেই, সে এমন কাজ পরিহার করে চলবে, যেটা তার জন্য অপ্রয়োজনীয়।’
জম্মদিনের খারাপ দিকঃ
(১) জন্মদিন কেক কেটে পালন করা হচ্ছে যা পশ্চিমাদের সংস্কৃতি। কোন মুসলিম বিধর্মীদের বা বিজাতী লোকের অনুসরণ করতে পারে না।
আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সুরা বাকারা : ১২০
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
যে ব্যক্তি কোন জাতির সাথে যে কোনভাবে সাদৃশ্য বজায় রাখলো সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবূ দাউদ : ৪০৩১
(২) অনেক ক্ষেত্র জম্মদিনের পার্টিতে নারী পুরুষ একত্র হয় অনুষ্ঠান উপভোদ করে যেখানে পর্দার কোন বালাই থাকে না। পর্দার ফরজ লংঘন করে এই ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান করা হারাম।
হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯
(৩) যারা জম্মদিন পালনের জন্য বড় অনুষ্ঠান করে তারা অনেক সময় নাচ গানের আসর বসায়। এই ধনের অনুষ্ঠানে যে কোন গানের অনুষ্ঠান করা হারাম। অনেক সময় মুউজিক্যাল সাউন্ডের সাথে যুবক যুবতীরা নাচতে থাকে। যা মুলত হারাম কাজ।
(৪) এই দিন উপলক্ষে অতিতীদের আপ্যায়নের জন্য খাবরের আয়োজন করে যা মুলত অপচয়।
হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১
অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১
ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস পালন করা এবং এ উপলক্ষে যে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয় তা হারাম এবং বিদআত। জন্ম দিবস পালনের কোন প্রমাণ কিংবা চর্চা রাসুল সা. কিংবা তাঁর সাহাবী (রাঃ) দের মাধ্যমে হয়েছিল বলে কোন প্রমাণ নাই। বর্তমানে জন্মদিন পালন করাটা হয়ে গেছে যেন একে অপরের প্রতি মহবত্তের পরিচায়ক। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবাগন ছিলেন সত্যিকারার্থে নবীপ্রেমিক ও সর্বোত্তম অনুসারী। নবী প্রেমের নজীর ও দৃষ্টান্ত তারাই স্থাপন করেছেন। যদি জন্মদিন পালন করাটা ভাল হত ও মহব্বতের পরিচায়ক হত তবে তারা তা অবশ্যই করতেন।
ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন‘স ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত হয়। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়ে থাকে, যদিও অধিকাংশ দেশেই দিনটি ছুটির দিন নয়।
১। ইতিহাসঃ
বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস প্রাচীন। এই দিনের সূচনা প্রায় ১৭শ’ বছর আগের পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালবাসা’র মধ্য দিয়ে। এই দিন সম্পর্কে নানান কল্পকাহিনী জড়িত আছে। কোনটা সত্য আর কোনটি মিথ্যা তার বলা কঠিত। ভ্যালেনটাইন ডে সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্য থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হল।
১. ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্মপ্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। আর তাই তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেন্টাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন।
২. রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর আমলের ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেনটাইন সম্রাটের খ্রিস্টধর্ম ত্যাগের আহবান প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।
৩. ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমকদের লেসিয়াস দেবীর পবিত্র দিন। এদিন তিনি দু’টি শিশুকে দুধ পান করিয়েছিলেন। যারা পরবর্তীতে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিল।
৪. ১৪ ফেব্রুয়ারি রোমানদের বিবাহ দেবী ‘ইউনু’-এর বিবাহের পবিত্র দিন।
৫. রোম সম্রাট ক্লডিয়াস তার বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করতে গিয়ে যখন এতে বিবাহিত পুরুষদের অনাসক্ত দেখেন, তখন তিনি পুরুষদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করেন। কিন্তু জনৈক রোমান বিশপ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন ও গোপনে বিয়ে করেন। সম্রাটের কানে এ সংবাদ গেলে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। সেদিন থেকে দিনটি ভালবাসা দিবস হিসাবে কিংবা এ ধর্মযাজকের নামানুসারে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশে বিশ্ব ভালবাসা দিবস কি ভাবে আর্বিভাব হয়?
১৯৯৩ সালের দিকে বাংলাদেশে বিশ্ব ভালবাসা দিবসের আর্বিভাব ঘঠে। যায় যায় দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান। তিনি পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের ছোঁয়া নিয়ে দেশে এসে লন্ডনী সংস্কৃতির প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি প্রথম যায় যায় দিন পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্ব ভালবাসা দিবস বাংলাদেশীদের কাছে তুলে ধরেন। তেজগাঁওয়ে তার পত্রিকা অফিসে কেউ চাকরী নিতে গেলে না কি সাথে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে যেতে হতো। প্রেমের যুগললবন্দী কপোত-কপোতীকে দেখে ওনি না কি খুব খুশী হতেন। এজন্য শফিক রেহমানকে বাংলাদেশে ভালবাসা দিবসের জনক বলা হয়।
খৃস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানেও ২০১৭ সালে ইসলামবিরোধী হওয়ায় ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে সে দেশের আদালত। বর্তমানকালে, পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ওশুভেচ্ছা কার্ড ক্রয় করে এবং আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়।(উৎসঃ উইকিপিডিয়া এবং দৈনিক ইনকিলাব)
আগেকার দিনে বিশ্ব ভালবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ পালিত হত বিচিত্র অনুষ্ঠানাদির মধ্যে দিয়ে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল। দু’জন শক্তিশালী পেশিবহুল যুবক গায়ে কুকুর ও ভেড়ার রক্ত মাখত। অতঃপর দুধ দিয়ে তা ধুয়ে ফেলার পর এ দু’জনকে সামনে নিয়ে বের করা হ’ত দীর্ঘ পদযাত্রা। এ দু’যুবকের হাতে চাবুক থাকত যা দিয়ে তারা পদযাত্রার সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে আঘাত করত। রোমক রমণীদের মাঝে কুসংস্কার ছিল যে, তারা যদি এ চাবুকের আঘাত গ্রহণ করে তবে তারা বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তি পাবে। এ উদ্দেশ্যে তারা এ মিছিলের সামনে দিয়ে যাতায়াত করত।
২। বর্তমান অবস্থাঃ
বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতেই এই দিনটি বেশী উদযাপিত হয়। এই দিনে সেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উপহার বিনিময় হয়। উপহার সামগ্রীর মধ্যে আছে পত্র বিনিময়, খাদ্যদ্রব্য, ফুল, বই, ছবি, প্রেমের কবিতা, গান, শ্লোক লেখা কার্ড প্রভৃতি। এ দিন স্কুলের ছাত্ররাও তাদের ক্লাসরুম সাজায় এবং অনুষ্ঠান করে।
পশ্চিমা যুবক যুকতীগন এই দিনে চুম্বনাবদ্ধ হয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। কোথাও কোথাও চুম্বনাবদ্ধ হয়ে ৫ মিনিট অতিবাহিত করে ঐ দিনের অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে। শুধু পশ্চিমা দেশগুলো যুবক যুকতীগন নয়, বরং সবাই এই দিন নানান অনুষ্ঠানে মাধ্যমে উপভোগ করে থাকে। ‘ভালবাসা দিবস’ কে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন হোটেল, ড্যান্স বার, মদের বার ইত্যাদি সাজান হয় বর্ণাঢ্য সাজে। নানা রঙের বেলুন আর অসংখ্য ফুলে স্বপ্নিল করা হয় বলরুমের অভ্যন্তর। জম্পেশ অনুষ্ঠানের সূচিতে থাকে লাইভ ব্যান্ড কনসার্ট, ডেলিশাস ডিনার এবং উদ্যাম নাচ। আগতদের সবাই সম্মিলিত নাচে অংশ গ্রহন করে।
পশ্চিমাদের থেকে আমাদের দেশও পিছিয় নেই। বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে স্যাটেলাইটের কল্যাণে আমাদের সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণ করছে। নিজেদের স্বকীয়তা-স্বাতন্ত্র্যকে ভুলে গিয়ে, ধর্মীয় অনুশাসনকে উপেক্ষা করে তারা আজকে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে, তাদের সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা বিশ্ব ভালবাসা দিবস উদযাপন করে থাকে। আমাদের দেশে উঠতি বয়সের যুবক যুকতীরা ভালবাসায় মাতোয়ারা থাকে। ভালবাসা দিবসে যুবগ যুবতীরা রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন করে থাকে। এই দিনে বাজধানী ঢাকার পার্ক, রেস্তোরাঁ, ভার্সিটির করিডোর, টিএসসি, ওয়াটার ফ্রন্ট, ঢাবির চারুকলার বকুলতলা, আশুলিয়া- সর্বত্র থাকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের তুমুল ভিড়। মনে হবে আর ভালবাসার ঈদের দিন। পশ্চিমাদের মতই আমাদের দেশের নামী-দামী হোটেলের বলরুমে বসে তারুণ্যের মিলন মেলা। মনে হবে কোন অভিজাত পশ্চিমা দেশের হোটেলে বসে ভালবাসা দিবস পালন করছি। ঢাবির টিএসসি এলাকায় প্রতি বছর এ দিবসে বিকেল বেলা অনুষ্ঠিত হয় ভালবাসা র্যালি। এতে বেশ কিছু খ্যাতিমান দম্পতির সাথে প্রচুরসংখ্যক তরুণ-তরুণী, প্রেমিক-প্রেমিকা যোগ দেয়। প্রেমের কবিতা আবৃত্তি, প্রথম প্রেম, দাম্পত্য এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়াদির স্মৃতি চারণে অংশ নেয় তারা।
এই ধরনের ভালাবাসায় কোন নৈতিকরা নাই। আছে শুধু সার্থের টান। ইসলামের ভালবাসা থাকে একক যার মাঝে কোন খাদ থাকে না। এই ভালবাসার একজনই দাবিদার, আর পেয়েও যায় একজন। কিন্তু বর্তমানের ভ্যালেন্টাইন এর ভালবাসা হলঃ জীবনজ্বালা আর জীবন জটিলতার নাম। মা-বাবা, ভাইবোন হারাবার নাম। নৈতিকতার বন্ধন মুক্ত হওয়ার নাম। তাদের ভালবাসার পরিণতি ‘ধর ছাড়’ আর ‘ছাড় ধর’ নতুন নতুন সঙ্গী। তাদের এ ধরা-ছাড়ার বেলেল্লাপনা চলতে থাকে জীবনব্যাপী।
৩। ভালোবাসা দিবসবাভ্যালেন্টাইন ডে হারাম কেন?
১। এই দিনে ইতিহাস বলছে ইহা একটি খাটি খৃষ্টানদের অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানর সাথে একাত্ত প্রকাশ মানে খৃষ্টানদের সাথে একাত্ত প্রকাশ।
২। বর্তমান খৃষ্টান ধর্মে পর্দার কোন বিধান নেই। যৌনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা তাকের নিকট কোন পাপ কাজ নয়। অপর পক্ষে পর্দা করা ইসলামে ফরজ এবং যৌনতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেসা হারাম। কাজেই ভালবাসা দিবসে পশ্চিমা খৃষ্টানগণ যে সকল অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা কাজ করে তাদর কাছে কোন অন্যায় নয়। কিন্তু একজন মুসলিমের নিকট এই সকল অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা হারাম কাজ। প্রতিটি কাজের জন্য সে কবিরা গুনাহে পতিত হবে। তাওবা ছাড়া আল্লাহ এই সকল গুনাহ মাপ করবেন না। এখান একবার ভাবুন তো পশ্চিমা অনুকরনে ভালবাসা দিবস উদযাপন করা কতটুকু গুনাহের কাজ?
(৩) পশ্চিমা আদতে দেশের ‘ভালবাসা দিবস’ কে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন হোটেল ও ড্যান্স বার সাজান হয় বর্ণাঢ্য সাজে। নামি-দামী হোটেলের বলরুমে বসে তারুণ্যের মিলন মেলা। এখনে চলে ইসলাম বিরোধী অশ্লীলাত মহা উৎসব। অশ্লীলাতার বাহিরে সবচেয় বড় গুনাহের কাজ হল অপচয় করা। এই দিবসের উপলক্ষে যত ব্যয় করা হবে সবই হারাম কাজ হবে।
(৪) মানুষের অন্তর অনুকরণ প্রিয়, এই অনুকরন হবে কুরআন হাদিসের। কিন্তু ইসলামি বিরোধী কাজের অনুসরণ সব সময় নিন্দিত। বিশেষ করে অনুকরণীয় বিষয় যদি হয় আক্বীদা, ইবাদত, ধর্মীয় আলামত বিরোধী, আর অনুকরণীয় ব্যক্তি যদি হয় বিধর্মী, বিজাতি। দুর্ভাগ্য যে, মুসলমানরা ক্রমশ ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসে দুর্বল হয়ে আসছে এবং বিজাতিদের অনুকরণ ক্রমান্বয়ে বেশি বেশি আরম্ভ করছে। যার অন্যতম হল ভালবাসা দিবস। মুসলমানদের জন্য এসব বিদস পালন জঘন্য অপরাধ। দেখুন হাদিসে কিভাবে বিধর্মীদের অনুসকণ করতে নিষেধ করেছন।
আবূ ওয়াকীদ লায়ছী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হুনায়ন অভিযানে বের হন তখন মুশরিকদের একটি বৃক্ষের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। একে ’‘যাত আনওয়াত’’ বলা হত। তারা এতে তাদের অস্ত্র-সস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। সাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এদের যেমন ’‘যাত আনওয়াত’’ আছে আমাদের জন্যও একটা ’যাত আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দিন। নাবী ﷺ বললেন, সুবহানাল্লাহ! এতো মূসা (আঃ)-এর কওমের কথার মত হলো যে, এদের (কাফিরদের) যেমন অনেক ইলাহ আছে আমাদের জন্যও ইলাহ বানিয়ে দাও। যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতি-নীতি অবলম্বন করবে। (তিরমিজীহাদিসনম্বরঃ২১৮০ইসলামিফাউন্ডেশন, হাদিসেরমানসহিহ)
৪। ভালবাসা দিবস পালন সম্পর্কে একটি ফতোয়াঃ
ভালবাসা দিবস পালন করা সম্পর্কে সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি প্রদত্ত একটি ফতোয়া নিম্মে উল্লেখ করা হল।
প্রশ্নঃ কিছু কিছু মানুষ প্রতি বছর ঈসায়ী সনের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবস পালন করে থাকে। এ দিনে তারা লাল গোলাপ বিনিময় করে, লাল পোশাক পরিধান করে, একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। কিছু কিছু মিষ্টির দোকান লাল রঙের মিষ্টি তৈরী করে, এর উপরে ‘লাভ চিহ্ন’ অংকন করে। কিছু কিছু দোকান এ দিনের জন্য তৈরী বিশেষ বিশেষ সামগ্রীগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচার করে থাকে। সুতরাং নিম্নোক্ত বিষয়ে আপনাদের অভিমত কি?
১. এ দিনটি পালন করার বিধান কি?
২. এ দিন উদযাপনকারী দোকান থেকে কেনাকাটা করার বিধান কি?
৩. এ দিনে যারা উপহার বিনিময় করে থাকে তাদের কাছে এসব উপকরণ বিক্রি করার বিধান কি?
উত্তরঃ
কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল ও সলফে সালেহিনের ইজমার ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইসলামে ঈদ শুধু দুইটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। এ ছাড়া যত উৎসব আছে সে উৎসব কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হোক, দলকেন্দ্রিক হোক, কোন ঘটনাকেন্দ্রিক হোক অথবা বিশেষ কোন ভাবাবেগকেন্দ্রিক হোক সেগুলো বিদআত। মুসলমানদের জন্য সেসব উৎসব পালন করা, তাতে সম্মতি দেয়া, এ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা অথবা এক্ষেত্রে সহযোগিতা করা নাজায়েয। কারণ এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের শামিল। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে সে নিজ আত্মার উপরই জুলুম করে। এর সাথে এ উৎসব যদি কাফেরদের উৎসব হয়ে থাকে তাহলে এটি এক গুনাহর সাথে আরও একটি গুনাহর সম্মিলন। কারণ এ উৎসব পালনের মধ্যে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য ও তাদের সাথে মিত্রতা গ্রহণের বাস্তবতা পাওয়া যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ ও তাদের মিত্রতা গ্রহণ থেকে নিষেধ করেছেন এবং নবী ﷺ থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কোন কওমের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের দলভুক্ত”। ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ সম্পর্কে বলা হয়- এটি পৌত্তলিক ও খ্রিস্টান ধর্মের উৎসব। সুতরাং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের জন্য এ দিবস পালন করা, এটাকে সমর্থন করা অথবা এ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা জায়েয হবে না। বরং মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এবং আল্লাহর গজব ও শাস্তির কারণসমূহ থেকে দূরে থাকার নিমিত্তে এটি বর্জন করা এবং এর থেকে দূরে থাকা। অনুরূপভাবে এ গর্হিত দিবস উদযাপনে কোন ধরনের সহযোগিতা করা থেকে বেঁচে থাকা। যেমন-পানাহার, বেচাবিক্রি, কেনাকাটা, পণ্যপ্রস্তুত, উপহার বিনিময়, পত্র বিনিময়, বিজ্ঞাপন প্রদান ইত্যাদি যে কোন প্রকারের সহযোগিতা হোক না কেন সেসব থেকে বেঁচে থাকা। কারণ এ ধরনের সহযোগিতা গুনাহর কাজ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন: “সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ২] একজন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে- সর্বাবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে থাকা; বিশেষতঃ ফিতনা-ফাসাদের সময়। মুসলমানের উচিত যাদের উপর আল্লাহ লানত পড়েছে, যারা পথভ্রষ্ট, যারা পাপাচারী- আল্লাহকে সম্মান করে না, ইসলামের সম্মান চায় না এ সকল মানুষের বিভ্রান্তির ব্যাপারে সচেতন থাকা। মুসলমানের দায়িত্ব আল্লাহর কাছে ধর্না দিয়ে তাঁর নিকট হেদায়েতের জন্য ও এর উপর অটল থাকার জন্য প্রার্থনা করা। কারণ আল্লাহ ছাড়া কোন হেদায়েতদাতা নেই, তিনি ছাড়া অটল রাখার কেউ নেই। তিনি পবিত্রময়, তিনিই তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। সমাপ্ত।