পবিত্র কুরআন ও প্রত্যাবর্তনশীল আকাশ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শনের শপথ করে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান জানিয়েছেন। সূরা ত্বরিক-এর ১১ নম্বর আয়াতে আকাশের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:

وَالسَّمَآءِ ذَاتِ الرَّجۡعِ ۙ

“শপথ আকাশমণ্ডলীর, যা প্রত্যাবর্তনশীল (ফিরিয়ে দেয়)। সুরা তারিখ : ১১

এই আয়াতে ‘প্রত্যাবর্তনশীল’ বা ‘চক্রশীল’ বোঝাতে আরবি ‘রাজআ’ (Raj’a) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দটির মূল অর্থ হলো ‘ফিরিয়ে দেওয়া’ বা ‘পুনরাবৃত্তি করা’। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের আগে মানুষ মনে করত আকাশ কেবল এক দিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতা। কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডলের প্রতিটি স্তর আসলে একটি ‘প্রত্যাবর্তনকারী’ যন্ত্রের মতো কাজ করে। এটি নিচ থেকে উপরে যাওয়া দরকারী জিনিসকে নিচে ফিরিয়ে দেয় এবং উপর থেকে আসা ক্ষতিকর জিনিসকে মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়।

বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের প্রত্যাবর্তনমূলক ভূমিকা

পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। প্রতিটি স্তর নির্দিষ্ট কিছু পদার্থ বা তরঙ্গকে তার উৎসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। নিচে এর প্রধান কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. ট্রপোস্ফিয়ার: বৃষ্টি ও পানির চক্র

ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরটিকে বলা হয় ট্রপোস্ফিয়ার। পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের জন্য পানি অপরিহার্য। এই স্তরটি পৃথিবীর জলাশয় থেকে বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠে যাওয়া জলীয় বাষ্পকে মহাকাশে হারিয়ে যেতে দেয় না। বরং এটি বাষ্পকে ঘনীভূত করে মেঘে পরিণত করে এবং পুনরায় জীবনদায়ী ‘বৃষ্টি’ হিসেবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়। এটিই কুরআনে বর্ণিত সেই ‘প্রত্যাবর্তনশীল’ বৈশিষ্ট্য যা পৃথিবীকে মরুভূমি হওয়া থেকে রক্ষা করে।

২. ওজোন স্তর: ক্ষতিকারক বিকিরণ প্রতিফলিত করা

স্ট্রাটোস্ফিয়ারের ২৫ কিলোমিটার উচ্চতায় ওজোন স্তর অবস্থিত। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঢালের মতো কাজ করে। মহাকাশ থেকে আসা সূর্যের তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক বিকিরণ যখন এই স্তরে বাধা পায়, তখন ওজোন স্তর সেগুলোকে প্রতিফলিত করে পুনরায় মহাকাশে পাঠিয়ে দেয়। এটি যদি এই বিকিরণকে মহাকাশে ফিরিয়ে না দিত, তবে পৃথিবীতে প্রাণীকুল চর্মক্যান্সার ও ধ্বংসের সম্মুখীন হতো।

চিত্র : ওজোন স্তর ক্ষতিকারক রশ্মি বিকিরণের মাধ্যমে বাধা প্রদান করে।

৩. আয়নোস্ফিয়ার: যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড

আয়নোস্ফিয়ার স্তরটি মানব সভ্যতার আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় জাদুর মতো কাজ করে। পৃথিবী থেকে সম্প্রচারিত রেডিও তরঙ্গ যখন উপরে উঠে যায়, তখন আয়নোস্ফিয়ার স্তরটি সেই তরঙ্গকে মহাকাশে হারিয়ে যেতে না দিয়ে পুনরায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ফিরিয়ে দেয়। এটি অনেকটা একটি বিশালাকার প্রাকৃতিক আয়না বা উপগ্রহের মতো কাজ করে। এই প্রত্যাবর্তনের কারণেই আমরা রেডিও শুনতে পাই এবং বেতার যোগাযোগ সম্ভব হয়।

চিত্র : যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড আয়নোস্ফিয়ার।

৪. ম্যাগনেটোস্ফিয়ার: প্রাণঘাতী কণার ঢাল

পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের প্রতিরক্ষা বলয় হলো ম্যাগনেটোস্ফিয়ার। সূর্য এবং অন্যান্য নক্ষত্র থেকে ক্রমাগত তেজস্ক্রিয় কণা (Solar Winds) পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। ম্যাগনেটোস্ফিয়ার স্তরটি এই কণাগুলোকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে মহাকাশে বিকর্ষণ করে বা ফিরিয়ে দেয়। এই স্তরটি না থাকলে সূর্যের জ্বলন্ত কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিত।

বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ও কুরআনের অলৌকিকতা

আকাশের এই ‘ফিরিয়ে দেওয়া’ বা ‘প্রত্যাবর্তনশীল’ গুণের কারণেই পৃথিবী আজ বসবাসের যোগ্য। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় নিচের উপাত্ত থেকে:

চিত্র : ম্যাগনেটোস্ফিয়ার কিভাবে ঢালের মত কাজ করে তা দেখান হয়েছে।

স্তরযা ফিরিয়ে দেয় (Return)ফলাফল
ট্রপোস্ফিয়ারজলীয় বাষ্প/বৃষ্টিকৃষি ও জীবনের জন্য পানির সরবরাহ।
ওজোন স্তরঅতিবেগুনি রশ্মিপ্রাণিকুলের চর্ম ও কোষীয় সুরক্ষা।
আয়নোস্ফিয়াররেডিও তরঙ্গবিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান।
ম্যাগনেটোস্ফিয়ারকসমিক রশ্মি/সৌর কণাপৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও প্রাণের স্থায়ী সুরক্ষা।

উপসংহার : চৌদ্দশ বছর আগে যখন মানুষ জানত না বায়ুমণ্ডল কী, তখন মরুভূমির বুকে নাজিল হওয়া কিতাবে আকাশকে ‘প্রত্যাবর্তনশীল’ বলা কোনো সাধারণ কাকতালীয় বিষয় হতে পারে না। বৃষ্টির মাধ্যমে পানির প্রত্যাবর্তন, ওজোন স্তরের মাধ্যমে ক্ষতিকর রশ্মির প্রত্যাবর্তন এবং আয়নোস্ফিয়ারের মাধ্যমে বেতার তরঙ্গের প্রত্যাবর্তন—এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে কুরআন সেই মহান সত্তার বাণী, যিনি এই স্তরের কাজগুলো নির্ধারণ করেছেন। এই আয়াতে লুকিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক সত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি নিখুঁত নকশা একজন মহাজ্ঞানী স্রষ্টার পরিকল্পনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *