মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কুরআনের বর্ণনা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ‘অদৃশ্য বিশ্ব’ বা ‘মাল্টিভার্স’ তত্ত্বের মধ্যে এক বিস্ময়কর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। কুরআন যেখানে চৌদ্দশ বছর আগে ‘আলম-আল-গায়েব’ বা অদৃশ্য জগতের কথা বলেছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ গাণিতিক সূত্র ও মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেই একই সত্যের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
১. সাত আসমান ও একাধিক মহাবিশ্ব (Multiverse)
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার ‘সাবআ সামাওয়াত’ বা সাত আসমানের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ لَکُمۡ مَّا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ٭ ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ فَسَوّٰىہُنَّ سَبۡعَ سَمٰوٰتٍ ؕ وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ
তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য যমীনের সব কিছু সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলোকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করলেন।” সূরা বাকারাহ: ২৯
আধুনিক বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “অদৃশ্য বিশ্ব” বা “একাধিক মহাবিশ্ব” (Multiverse) একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ধারণা। আমরা আমাদের চারপাশের যে বিশ্বকে দেখি, তা অসীম মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আধুনিক কসমোলজিতে Multiverse ধারণাটি খুবই জনপ্রিয়। আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বাবল ইউনিভার্স’ বা ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’ তত্ত্ব বলছে যে, আমাদের এই মহাবিশ্বের বাইরেও আরও অনেক জগত থাকা সম্ভব। কুরআনের ‘সাত আসমান’ এই একাধিক স্তরের মহাবিশ্বের ধারণাকেই সমর্থন করে, যেখানে প্রতিটি স্তরের নিজস্ব নিয়ম ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের এই মহাবিশ্বের বাইরেও অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতে পারে। এগুলোর মধ্যে প্রধান কয়েকটি ধরন হলো:
বুদবুদ মহাবিশ্ব (Bubble Universes): ‘ইনফ্লেশন’ বা মহাজাগতিক স্ফীতি তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকাশের প্রসারণের সময় বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন বুদ্বুদের মতো মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে। এক একটি বুদ্বুদ এক একটি আলাদা মহাবিশ্ব, যাদের ভৌত নিয়ম (যেমন মাধ্যাকর্ষণ বা আলোর গতি) আমাদের চেয়ে আলাদা হতে পারে।
সমান্তরাল মহাবিশ্ব (Parallel Universes): কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, প্রতিটি ঘটনার একাধিক ফলাফল থাকতে পারে। ‘মেনি-ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন’ বলে যে, প্রতিটি সম্ভাব্য ফলাফলই কোনো না কোনো আলাদা বিশ্বে বাস্তবে ঘটছে। অর্থাৎ, আপনার অন্য একটি সংস্করণ অন্য কোনো বিশ্বে অন্যভাবে জীবন অতিবাহিত করছে।

২. অদৃশ্য জগত বা আলম-আল-গায়েব
বিজ্ঞান বলছে মহাবিশ্বের ৯৫% হলো ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি, যা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। কুরআন এই অদৃশ্য জগতকে ‘গায়েব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاِلَیۡہِ یُرۡجَعُ الۡاَمۡرُ کُلُّہٗ فَاعۡبُدۡہُ وَتَوَکَّلۡ عَلَیۡہِ ؕ وَمَا رَبُّکَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ
আসমানসমূহ ও যমীনের গায়েব আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল কর। আর তোমরা যা কিছু কর সে ব্যাপারে তোমার রব গাফেল নন। সূরা হুদ: ১২৩
বিজ্ঞান যেমন স্বীকার করে নিয়েছে যে আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে এক বিশাল অদৃশ্য অস্তিত্ব রয়েছে যা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কুরআন ঠিক একইভাবে ফেরেশতা, আরশ এবং সিদরাতুল মুনতাহার মতো এমন এক জগতের বর্ণনা দেয় যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়।
৩. ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি
আমাদের মহাবিশ্বের মাত্র ৫% সাধারণ পদার্থ (যা দিয়ে আমরা, গ্রহ ও নক্ষত্র গঠিত)। বাকি ৯৫ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।
এগুলো পুরোপুরি অদৃশ্য এবং সাধারণ আলোর সাথে কোনো বিক্রিয়া করে না।
এগুলো আমাদের চারপাশেই আছে, কিন্তু আমরা এদের দেখতে বা স্পর্শ করতে পারি না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি আমাদের জগতের সমান্তরালে থাকা এক বিশাল ‘অদৃশ্য জগত’ যা পুরো মহাবিশ্বের কাঠামো ধরে রেখেছে।

৪. উচ্চতর মাত্রা ও মিরাজ
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অসাধারণ সেতুবন্ধন হলো উচ্চতর মাত্রা বা ডাইমেনশন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজ। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই ত্রিমাত্রিক জগতে বাস করি এবং চতুর্থ মাত্রা হিসেবে সময়কে অনুভব করি। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের স্ট্রিং থিওরি (String Theory) মহাবিশ্বের এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরেও অন্তত ১০ বা ১১টি মাত্রা বিদ্যমান থাকতে পারে। এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো আমাদের ইন্দ্রিয়ের কাছে অদৃশ্য এবং অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংকুচিত হয়ে আছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই অদৃশ্য মাত্রাগুলোতে ভিন্ন কোনো জগত বা শক্তির অস্তিত্ব থাকা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে মিরাজ বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বগমনকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত আমাদের এই পরিচিত ত্রিমাত্রিক জগত থেকে বের হয়ে উচ্চতর মাত্রায় বা এক মহাবিশ্ব থেকে অন্য মহাবিশ্বে ভ্রমণের এক অলৌকিক দৃষ্টান্ত। যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য স্থান ও কালের সীমাবদ্ধতা দুভেদ্য, সেখানে মহান আল্লাহর কুদরতে রাসূল (সা.) সেই উচ্চতর মাত্রার জগতসমূহ অতিক্রম করেছিলেন।
সুরা নূরের সেই বিখ্যাত বর্ণনা—”নূরুন আলা নূর” বা নূরের ওপর নূর—এই সত্যেরই ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল ভৌত আলো নয়, বরং বিভিন্ন মাত্রার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐশ্বরিক শক্তির বিচ্ছুরণ। প্রতিটি মাত্রার জন্য আলাদা আলাদা নূর বা স্তরের উপস্থিতি এখানে প্রতীয়মান। যখন আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন, তখন তা কেবল আমাদের এই দৃশ্যমান জগতকে নয়, বরং স্ট্রিং থিওরি বর্ণিত সেই অদৃশ্য উচ্চতর মাত্রাগুলোকেও আলোকিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। মিরাজের মাধ্যমে রাসূল (সা.) সেই উচ্চতর মাত্রার জগতগুলোর নূর বা মহিমা স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে সৃষ্টিজগত আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিশাল এবং রহস্যময়।
৫. পূর্ব ও পশ্চিমের অতীত অস্তিত্ব
আপনি আগে উল্লেখ করেছিলেন মহাকাশে কোনো পূর্ব-পশ্চিম নেই। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
رَبُّ الۡمَشۡرِقَیۡنِ وَرَبُّ الۡمَغۡرِبَیۡنِ ۚ
তিনি দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের পালনকর্তা। সূরা -রহমান: ১৭
বিজ্ঞান বলে, যদি একাধিক মহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্স থাকে, তবে প্রতিটি বিশ্বের নিজস্ব আলোর উৎস বা সূর্য থাকতে পারে। ‘দুই উদয়াচল’ বা ‘দুই অস্তাচল’ এবং অন্য আয়াতে বর্ণিত ‘মাশারিক’ (বহুবচন উদয়াচল) ইঙ্গিত দেয় যে, আল্লাহর সৃষ্টিজগত কেবল আমাদের এই একটি সূর্য বা একটি পৃথিবীর নিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমান্তরাল অনেক জগতের উপস্থিতির প্রতি এক বিশাল ইঙ্গিত।
সমন্বিত সিদ্ধান্ত :
আধুনিক বিজ্ঞানের মাল্টিভার্স, স্ট্রিং থিওরি এবং অদৃশ্য মাত্রা মূলত কুরআনের সেই সত্যকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে যা আল্লাহ সংক্ষেপে বলে দিয়েছেন।
- বিজ্ঞান একে বলছে ‘গাণিতিক সম্ভাবনা’।
- কুরআন একে বলছে ‘আল্লাহর মহিমা ও সৃষ্টিশৈলী’।
সুরা নূরের সেই উপমা অনুযায়ী, আল্লাহর নূর যেমন কোনো নির্দিষ্ট দিক (পূর্ব বা পশ্চিম) থেকে আসে না, তেমনি তাঁর সৃষ্টিজগতও আমাদের এই দৃশ্যমান ছোট মহাবিশ্বে সীমাবদ্ধ নয়। আসমান ও জমিন জুড়ে এক অসীম ও অদৃশ্য শৃঙ্খলা বিদ্যমান, যা কেবল তাঁর নূরেই উদ্ভাসিত।