কুরআনে ঐতিহাসিক শহর পেত্রা
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
পেত্রা, জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন শহর, বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। লালচে বালুকাময় পাহাড়ে খোদাই করা অসাধারণ স্থাপত্য, যেমন আল-খাজনেহ (The Treasury) এবং আদ-দেয়র (The Monastery), এটিকে ‘রোজ সিটি’ (Rose City) নামে খ্যাত করেছে। পেত্রার ইতিহাস প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে শুরু হয়, যখন এখানে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে, কিন্তু এর প্রধান উন্নয়ন ঘটে নাবাতীয় সভ্যতার হাতে দ্বিতীয় শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই শহরটি মশলা বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, যা দক্ষিণ আরব থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যাওয়ার পথে অবস্থিত। কিন্তু পেত্রার সাথে পবিত্র কুরআনের যোগসূত্র কী? কুরআনে সরাসরি ‘পেত্রা’ নাম উল্লেখ না থাকলেও, অনেক গবেষক এবং ঐতিহাসিক মনে করেন যে এটি সামুদ জাতির বাসস্থান ‘আল-হিজর’ (যা সৌদি আরবের মাদাইন সালেহ নামে পরিচিত) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ لَقَدْ كَذَّبَ اَصْحٰبُ الْحِجْرِ الْمُرْسَلِیْنَ ﴿ۙ۸۰﴾ وَ اٰتَیْنٰهُمْ اٰیٰتِنَا فَكَانُوْا عَنْهَا مُعْرِضِیْنَ ﴿ۙ۸۱﴾ وَ كَانُوْا یَنْحِتُوْنَ مِنَ الْجِبَالِ بُیُوْتًا اٰمِنِیْنَ ﴿۸۲﴾ فَاَخَذَتْهُمُ الصَّیْحَۃُ مُصْبِحِیْنَ ﴿ۙ۸۳﴾ فَمَاۤ اَغْنٰی عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا یَکْسِبُوْنَ ﴿ؕ۸۴﴾
আর অবশ্যই ‘হিজর’-এর অধিবাসীরা (সামুদ জাতি) রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল। আমি তাদের কাছে আমার নিদর্শনসমূহ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারা পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ করত অত্যন্ত নিরাপদ মনে করে। অতঃপর এক প্রভাতে এক প্রচণ্ড মহানাদ তাদের পাকড়াও করল। সুতরাং তাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ ও কৌশল তাদের কোনো কাজে আসলো না। সূরা আল-হিজর : ৮০-৮৪


চিত্র : পেত্রা, জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন এই শহরটি বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। লালচে বালুকাময় পাহাড়ে খোদাই করা অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী, যেমন আল-খাজনেহ (The Treasury) এবং আদ-দেয়র (The Monastery), এটিকে ‘রোজ সিটি‘ (Rose City) নামে খ্যাতি দিয়েছে।
পেত্রার ঐতিহাসিক পটভূমি
পেত্রার ইতিহাস একটি দীর্ঘ যাত্রা। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অনুসারে, এখানে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে নিওলিথিক যুগে, প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন কৃষি-ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠে। পরবর্তীকালে, ব্রোঞ্জ যুগে (৩০০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এটি ইজিপ্শিয়ান নথিতে ‘পেল’, ‘সেলা’ বা ‘সেয়ার’ নামে উল্লেখিত হয়। আয়রন যুগে (১২০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এখানে এডোমাইটরা বাস করত, যারা পাহাড়ী জলাধার ব্যবহার করে ওয়াইন, জলপাই তেল এবং কাঠের বাণিজ্য করত। কিন্তু পেত্রার সত্যিকারের উজ্জ্বলতা আসে নাবাতীয়দের হাতে। নাবাতীয়রা, আরব মরুভূমির যাযাবর জাতি, চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে বসতি স্থাপন করে এবং দ্বিতীয় শতাব্দীতে এটিকে তাদের রাজধানী বানায়। নাবাতীয় ভাষায় এর নাম ছিল ‘রাকমু’ বা ‘রাকেমো’।
পেত্রার নব্যতীয় (Nabataean) সভ্যতা :
নাবাতীয়রা ছিলেন অসাধারণ প্রকৌশলী। তারা পাহাড়ে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, চ্যানেল এবং ড্যাম তৈরি করে মরুভূমিতে কৃষি চালিয়ে যায়। পেত্রা ধীরে ধীরে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে দক্ষিণ আরবের ধূপ, মশলা এবং অন্যান্য পণ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হত।
প্রথম শতাব্দী খ্রিস্টাব্দে এর জনসংখ্যা ২০,০০০-এ পৌঁছে। আল-খাজনেহ, যা সম্ভবত রাজা আরেটাস চতুর্থের সমাধি, ৩৭ মিটার উঁচু এবং হেলেনিস্টিক স্থাপত্যের প্রভাব দেখায়, কলাম, পেডিমেন্ট এবং দেবতাদের মূর্তি যেমন ক্যাস্টর, পোলাক্স, আইসিস-টাইকি। আদ-দেয়র, ৪৫ মিটার উঁচু, নাবাতীয় উপাদান যুক্ত।
অন্যান্য স্থাপনায় রয়েছে থিয়েটার (৮,৫০০ আসন), কলোনেডেড স্ট্রিট, নিম্ফিয়াম এবং রয়্যাল টম্বস। ১০৬ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা এটি দখল করে ‘আরাবিয়া পেট্রিয়া’ নাম দেয়, কিন্তু ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্প এবং সমুদ্রপথের উত্থানে এর পতন ঘটে। বাইজানটাইন যুগে খ্রিস্টান গির্জা তৈরি হয়, কিন্তু ইসলামী যুগের শুরুতে এটি পরিত্যক্ত হয়। ১৮১২ সালে সুইস অভিযাত্রী জোহান লুডভিগ বুর্কহার্ড এটি পুনরাবিষ্কার করেন।

চিত্র : মাদা’য়েন সালেহ (Mada’in Saleh বা Hegra) সৌদি আরবের আল-উলা অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রাচীন নাবাতীয় ধ্বংসাবশেষ।
পেত্রার বিস্ময়কর পানি ব্যবস্থাপনা (Ancient Engineering)
আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী, পেত্রা ছিল নব্যতীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। এরা ছিল অত্যন্ত দক্ষ ব্যবসায়ী এবং প্রকৌশলী। বিশেষ করে মরুভূমিতে পানি সংগ্রহের জন্য তারা যে জটিল বাঁধ ও নালা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা আজও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। কুরআনে বর্ণিত সামুদ জাতির পরবর্তী বংশধর বা একই সংস্কৃতির উত্তরসূরী হিসেবে নব্যতীয়দের বিবেচনা করা হয়। মরুভূমির চরম বৈরী পরিবেশে পেত্রাকে একটি সমৃদ্ধ শহরে পরিণত করার পেছনে কাজ করেছিল নব্যতীয়দের (Nabateans) অবিশ্বাস্য প্রকৌশল জ্ঞান। এটি আজ থেকে ২০০০ বছর আগে নির্মিত আধুনিক হাইড্রোলিক সিস্টেমের এক অনন্য উদাহরণ।
বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ: পেত্রাতে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ছিল নগণ্য। নব্যতীয়রা আশেপাশের পাহাড়ের ওপর পানি সংগ্রহের এলাকা (Catchment areas) তৈরি করেছিল। প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য তারা পাহাড়ের গায়ে নালা (Channels) খোদাই করে পানিকে শহরের ভেতরের চৌবাচ্চায় (Cisterns) নিয়ে আসত। পেত্রাতে প্রায় শতাধিক মাটির নিচের চৌবাচ্চা আবিষ্কৃত হয়েছে যা কয়েক লাখ ঘনমিটার পানি ধরে রাখতে পারত।
বাঁধ ও টানেল নির্মাণ: হঠাৎ আসা বন্যার পানি থেকে শহরকে রক্ষা করার জন্য তারা বিশাল বাঁধ (Dams) নির্মাণ করেছিল। একটি বিশেষ টানেলের মাধ্যমে বন্যার পানিকে শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হতো।
উন্নত পাইপলাইন সিস্টেম: তারা পোড়ামাটির (Clay) পাইপ ব্যবহার করে প্রায় ৫-৭ কিমি দূরবর্তী প্রাকৃতিক ঝরনা (যেমন: আইন মূসা) থেকে পানি শহরে নিয়ে আসত। এই পাইপগুলো এমনভাবে ঢালু করে বসানো হয়েছিল যাতে পানির চাপ (Water Pressure) সঠিক থাকে এবং কোনো পলি না জমে। তাদের এই পাইপলাইনের নকশা বর্তমান যুগের প্রকৌশলীদেরও বিস্মিত করে।
পলি অপসারণ ও বিশুদ্ধকরণ: পানির সাথে আসা বালি বা কাদা দূর করার জন্য তারা ক্রমান্বয়ে নিচু চৌবাচ্চা বা ‘সেটলিং বেসিন’ ব্যবহার করত, যা পানিকে প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ করত।

চিত্র : পেত্রার বিস্ময়কর পানি ব্যবস্থাপনা (প্রাচীন প্রকৌশল)
কুরআনে সামুদ জাতি এবং আল-হিজর
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হিজর বা সামুদ জাতির স্থাপত্যশৈলী এবং তাদের সেই অলৌকিক ইতিহাস সত্যিই বিস্ময়কর। পেত্রার উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ জাতির উষ্ট্রীর কাহিনী বিস্তারিত পাওয়া যায়। সামুদ জাতির কথা একাধিক সূরায় উল্লেখ করেছে, যা প্রাচীন আরবের একটি জাতি যারা পাহাড়ে ঘর খোদাই করে বাস করত এবং অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
৭৩. আর সামূদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালক হতে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। এটা আল্লাহর উষ্ট্রী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। এটাকে ‘আল্লাহর জমিতে চরে খেতে দাও এবং এর সাথে কোন দুর্ব্যবহার করনা, নচেৎ মর্মান্তিক শাস্তি তোমাদের উপর পতিত হবে।
‘স্মরণ কর, ‘আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করেছ। সুতরাং তোমরা ‘আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াও না। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সে সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল, ‘তোমরা কি জান যে, সালেহ ‘আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল, ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী। তখন অহংকারীরা বললো তোমারা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অবিশ্বাস করি। অতঃপরতারা সেই উষ্ট্রিটিকে মেরে ফেললো এবং (গর্ব ও দাম্ভিকতার সাথে) তাদের প্রতিপালকের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে চলতে লাগলো এবং বললো হে সালেহ! তুমি সত্য রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে শাস্তিÍর ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর। সুতরাং তাদেরকে একটি প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প এসে গ্রাস করে নিলো, ফলে তার নিজেদের গৃহের মধ্যেই (মৃত্যু অবস্থায় ) উপুড় (অধোমুখী) হয়ে পড়ে গেল। অতঃপর তিনি (সালেহ আ:) একথা বলে তাদের জনপদ হতে বের হয়ে গেলেন হে আমার সম্প্রদায়! আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি, আর আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি, কিন্তু তোমরা তো উপদেশ দাতাদেরকে পছন্দ কর না। সূরা আল-আরাফ : ৭৩-৭৯
এ সম্পর্কে আরও দেখুন : আল-হুদ : ৬১-৬৯, আল-হিজর : ৮০-৮৪, আশ-শুয়ারা : ১৪১-১৫৮, আন-নামল : ৪৫-৫৩, আল-কামার : ২৩-৩১, আল-ফাজর : ৬-১৩ এবং আশ-শামস : ১১-১৫।
সামুদ ছিলেন আদ জাতির বংশধর, যাদের নবী সালিহ (আ.) পাঠানো হয়। কুরআন বলে-
وَاِلٰی ثَمُوۡدَ اَخَاہُمۡ صٰلِحًا ۘ قَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ ہُوَ اَنۡشَاَکُمۡ مِّنَ الۡاَرۡضِ وَاسۡتَعۡمَرَکُمۡ فِیۡہَا فَاسۡتَغۡفِرُوۡہُ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡہِ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ قَرِیۡبٌ مُّجِیۡبٌ
আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম)তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল,‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের* ব্যবস্থা করেছেন । সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী’। সুরা হুদ : ৬১
তারা অহংকারী ছিল, পাহাড়ে নিরাপদ ঘর বানিয়ে মনে করত কেউ তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। আল্লাহ একটি উটনীকে চিহ্ন হিসেবে পাঠান, কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে। ফলে ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতে তারা ধ্বংস হয়। আল-হিজর’ সূরায় বলা হয়েছে-
আর আল-হিজরের অধিবাসীরা রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছিল। আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়েছিলাম কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আর তারা পাহাড়সমূহে নিরাপদে ঘরসমূহ খোদাই করত। সুরা হিজর : : ৮০-৮২
এই ‘আসহাবুল হিজর’ হলো সামুদ, যারা পাহাড় খোদাই করে ঘর বানাত। কুরআন এটিকে একটি সতর্কবাণী হিসেবে উপস্থাপন করে, যাতে মানুষ অহংকার থেকে বিরত থাকে। সামুদের সময়কাল নোয়া (আ.) এবং হুদ (আ.) এর পর, ইবরাহিম (আ.) এবং মুসা (আ.) এর আগে বলে কুরআন নির্দেশ করে।

চিত্র : ম্যাপে পেত্রা নগরী।

চিত্র : পেত্রার স্যাটেলাইট ভিউ।
সামুদ জাতির উষ্ট্রীর অলৌকিক কাহিনী
পবিত্র কুরআনে সামুদ জাতির কাছে প্রেরিত হযরত সালেহ (আ.)-এর সেই উষ্ট্রীর ঘটনাটি এক মহান নিদর্শন ও পরীক্ষা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
অলৌকিক আবির্ভাব: সামুদ জাতি ছিল অত্যন্ত অহঙ্কারী। তারা সালেহ (আ.)-এর কাছে দাবি করল, যদি তিনি একটি নির্দিষ্ট বিশাল পাথর থেকে একটি গর্ভবতী ও জীবন্ত উষ্ট্রী বের করে দেখাতে পারেন, তবেই তারা ঈমান আনবে। সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং মানুষের চোখের সামনে সেই আস্ত পাথর ফেটে একটি অতিকায় উষ্ট্রী বের হয়ে এল।
পানির বণ্টন ও অলৌকিকতা: এই উষ্ট্রীটি ছিল সাধারণ উটের চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহ পরীক্ষা হিসেবে নির্দেশ দিলেন যে, শহরের কূয়োর পানি একদিন উষ্ট্রী পান করবে এবং পরের দিন মানুষ ও তাদের গবাদি পশুরা পান করবে। উষ্ট্রীটি যেদিন পানি পান করত, সেদিন সে এতো পরিমাণ দুধ দিত যে পুরো শহরের মানুষের চাহিদা পূরণ হয়ে যেত।
অবাধ্যতা ও ষড়যন্ত্র: সামুদ জাতির নেতারা উষ্ট্রীর এই জনপ্রিয়তা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, উষ্ট্রীটি বেঁচে থাকলে মানুষ সালেহ (আ.)-এর প্রতি আরও বেশি ঝুঁকে পড়বে। তাই তারা কুদার ইবনে সালিফ নামক এক পাপিষ্ঠ লোকের মাধ্যমে উষ্ট্রীটিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা (হামস্ট্রিং) করল।
চূড়ান্ত শাস্তি: উষ্ট্রীটিকে হত্যার পর সালেহ (আ.) তাদের সতর্ক করলেন যে আর মাত্র তিন দিন তারা সময় পাবে। তিন দিন পর এক প্রচণ্ড বিকট শব্দ (মহানাদ) এবং ভূমিকম্পে পুরো সামুদ জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। শুধু সালেহ (আ.) এবং তাঁর অল্প কয়েকজন অনুসারী রক্ষা পান।
প্রত্নতাত্ত্বিক এবং গবেষণামূলক যোগসূত্র
প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে, পেত্রা নাবাতীয় সভ্যতার (৪র্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১ম খ্রিস্টাব্দ) সাথে যুক্ত, যা সামুদের থেকে অনেক পরবর্তী। সামুদকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাখা হয়। কিন্তু সৌদি আরবের আল-হিজর (মাদাইন সালেহ বা হেগরা) কুরআনের আল-হিজরের সাথে সরাসরি যুক্ত। এখানে ১১০টিরও বেশি নাবাতীয় সমাধি আছে, যা পেত্রার মতোই পাহাড়ে খোদাই করা। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, এটি নাবাতীয় রাজধানী পেত্রার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ছিল। কুরআনের সামুদ এখানকার বাসিন্দা বলে মুসলিম ঐতিহ্য মনে করে, যদিও নাবাতীয়রা পরবর্তী। পেত্রা সামুদের অংশ, যা নাবাতীয় নামে পরিচিত। তারা আদের বংশধর এবং উত্তর আরবে চলে আসে। কুরআনের বর্ণনা, পাহাড়ে ঘর, ভূমিকম্পে ধ্বংস – পেত্রার ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পের সাথে মিলে যায়।
হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.) আল-হিজর দিয়ে যাওয়ার সময় সতর্ক করেন। ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন আল-হিজর (সামুদ জাতির জনপদ) অতিক্রম করলেন, তখন তিনি বললেন, তোমরা এই শাস্তিপ্রাপ্ত জাতির (ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের) কাছে প্রবেশ করবে না, যদি না তোমরা কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করো। আর যদি কাঁদতে না পারো, তবে সেখানে প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের ওপরও এমন শাস্তি নেমে আসে, যেমনটি তাদের ওপর নেমে এসেছিল। সহিহ বুখারি : ৩৩৮০, ৩৩৮১, ৪৪১৯, ৪৪২০, ৪৭০২; সহিহ মুসলিম : ২৯৮।
বর্তমান অবস্থা
১৮১২ সালে জোহান লুডভিগ বুর্খাট নামক একজন সুইস পর্যটক পেত্রাকে আধুনিক বিশ্বের কাছে পরিচিত করান। ১৯৮৫ সালে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়। ২০০৭ সালে একে বিশ্বের ‘সপ্তাশ্চর্যের’ একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পেত্রা একটি প্রাচীন বিস্ময়, যা ঐতিহাসিকভাবে নাবাতীয় সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে এবং কুরআনিকভাবে সামুদের স্মৃতি জাগায়। যদিও সরাসরি যোগসূত্র নেই, এর স্থাপত্য কুরআনের বর্ণনাকে জীবন্ত করে।
হাইরোগ্লিফ বা চিত্রলিপি ও মিসরের ফারাও রাজা
পবিত্র কুরআনের ফেরাউন ও তার বাহিনীর ধ্বংসের পরের অবস্থা বর্ণনা করে। প্রাচীন মিসরের হায়ারোগ্লিফ বা চিত্রলিপির যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন, তা আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। হায়ারোগ্লিফ এবং ফেরাউন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে আলোচিত হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَمَا بَکَتۡ عَلَیۡہِمُ السَّمَآءُ وَالۡاَرۡضُ وَمَا کَانُوۡا مُنۡظَرِیۡنَ
আকাশ এবং পৃথিবীর কেহই তাদের জন্য অশ্রুপাত করেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হয়নি। সুরা দুখান : ২৯।
এই আয়াতে বলা হয়েছে, ফেরাউন ও তার অনুসারীদের মৃত্যুর পর “আকাশ ও পৃথিবী তাদের জন্য কাঁদেনি”। তারা এতটাই জালিম ও অবাধ্য ছিল যে তাদের ধ্বংসে সৃষ্টিজগতের কেউ শোক প্রকাশ করেনি, বরং তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সময় বা সুযোগও বাড়ানো হয়নি।
ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, “মুমিন বান্দা মারা গেলে তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় বলে আসমান কাঁদে, আর তার সিজদার স্থান বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জমিন কাঁদে। কিন্তু কাফিরদের জন্য আকাশ-জমিন কাঁদে না।” তাফসির ইবন কাসির
প্রাচীন মিসরীয় বিশ্বাস: হায়ারোগ্লিফ লিপি থেকে জানা যায়, মিসরীয়রা বিশ্বাস করত যে ফারাওরা ছিল দেবতার অংশ (যেমন সূর্যের দেবতা ‘রা’ এর সন্তান)। তারা মনে করত, কোনো ফারাও মারা গেলে মহাবিশ্বের প্রকৃতি, আকাশ এবং পৃথিবী শোক পালন করে।
কুরআনের চ্যালেঞ্জ: আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাদের সেই মিথ্যা দম্ভ ও বিশ্বাসকে নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তারা নিজেদের এত প্রভাবশালী মনে করলেও আসলে সৃষ্টিজগতের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই।


চিত্র : প্রাচীন মিসরীয়রা এই লিপি ব্যবহার করে ফারাওদের গৌরবগাথা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করতেন।
২. হাইরোগ্লিফ বা চিত্রলিপি
হায়ারোগ্লিফ (Hieroglyphs) বা চিত্রলিপি হলো প্রাচীন মিসরীয়দের ব্যবহৃত একটি বিশেষ লিখন পদ্ধতি, যেখানে বর্ণমালার পরিবর্তে বিভিন্ন ছবি বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো।
সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি “ছবি দিয়ে লেখা” ভাষা। হায়ারোগ্লিফ শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘পবিত্র খোদাইকৃত লিপি’। এই পদ্ধতিতে মানুষ, পশু-পাখি, গাছপালা এবং বিভিন্ন বস্তুর ছবি ব্যবহার করা হতো। প্রতিটি ছবির আলাদা আলাদা অর্থ ছিল। একটি চোখের ছবি দিয়ে দেখা বোঝানো হতো। একটি পাখির ছবি দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ধ্বনি বা উড়ন্ত কিছু বোঝানো হতো।
প্রাচীন মিসরীয়রা মনে করত এই লিপিটি দেবতাদের পক্ষ থেকে উপহার। তাই তারা এটি মূলত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যবহার করত। পিরামিড ও মন্দিরের দেয়ালে ফারাওদের গৌরবগাথা বা ধর্মীয় মন্ত্র লিখত। জকীয় সমাধিতে মৃত ব্যক্তির পরকাল বিষয়ক নির্দেশনা খোদাই করত।
ফেরাউনের যুগের সমাপ্তির পর হায়ারোগ্লিফ লিপি পড়ার জ্ঞান পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। হাজার বছর মানুষ জানত না পিরামিডের গায়ে কী লেখা আছে। ১৭৯৯ সালে রসেটা স্টোন (Rosetta Stone) আবিষ্কারের পর ১৮২২ সালে জঁ-ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিওঁ প্রথম এই লিপি পড়ার পদ্ধতি বের করেন। বিভিন্ন পিরামিড ও মন্দিরের দেয়ালে হায়ারোগ্লিফ লিপিতে ফারাওদের দেবতুল্য করার বর্ণনা লেখা থাকত। কুরআনের এই আয়াতটি ঠিক সেই প্রাচীন লিপিতে থাকা অহংকারকে লক্ষ্য করেই নাযিল হয়েছে।



চিত্র : ফারাওরা নিজেদের দেবতুল্য হিসেবে উপস্থাপন করতেন, যা হাইরোগ্লিফ লিপিতে বর্ণিত।
৩. ফারাওদের দম্ভ ও পরিণতি
প্রাচীন হায়ারোগ্লিফ লিপি বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকরা দেখেছেন যে, ফারাওরা নিজেদের “আকাশ ও পৃথিবীর অধিপতি” হিসেবে দাবি করত। তারা পাথরের গায়ে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করত যেন তারা অমর। কুরআন এই লিপিগুলো উন্মোচনের হাজার বছর আগেই ঘোষণা করেছে যে, তাদের এই আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের শেষে কোনো সহানুভূতি ছিল না।
প্রাচীন মিসরের শিলালিপি বা হায়ারোগ্লিফ আমাদের সামনে ফারাওদের যে জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাসের চিত্র তুলে ধরে, কুরআন এই একটি আয়াতের মাধ্যমে সেই পুরো আভিজাত্যকে অর্থহীন প্রমাণ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের ক্ষমতা যতই আকাশচুম্বী হোক না কেন, আল্লাহর অবাধ্য হলে তা ধুলোয় মিশে যায়।