হজ্জ ও উমরার ফজিলত
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
হজ্জ ইসলামি শরীয়তে অন্যতম ফরজ ইবাদাত। ইহার মাধ্যমে একজন পাপিষ্ট মুসলিম নিস্পাপ মুসলিমে রুপান্তরিত হয়। এমন মুসলিম সদ্যভুমিষ্ট শিশুর মত নিস্পাপ হয়ে যায়। যদি হজ্জের কোন প্রকার ফজিলত না থাকত, তবু ফরজ হিসাবে প্রতিটি ঈমানের দাবিদার মুসলিম হজ্জ করতে বাধ্য থাকত। মহান আল্লাহর অপরিসীম করুনা যে তিনি তার হুকুম পালনের মাধ্যমে বান্দাকে ভালবান করবেন।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
(٩) لِّيَشْهَدُوا مَنَٰفِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا ٱسْمَ ٱللَّهِ فِىٓ أَيَّامٍ مَّعْلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَٰمِۖ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا ٱلْبَآئِسَ ٱلْفَقِيرَ
অর্থঃ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। (সূরা হজ্জ ২২:২৮)
হজ্জ একটি ফরজ ইবাদত। মহান আল্লাহর নেকট্য লাভের প্রধার উপায় হল ফরজ কাজ যথাযথভাবে আদায় করা। হজ্জের মাধ্যমে যে বান্দা মহান আল্লাহ নৈকট্য ভাল করবে তাতে কোন প্রতার সংশয় নাই। তারপরও বহু সহিহ হাদিসে আলাদা আলাদাভাবে হজ্জের ফজিলত বর্ণনা করেছে। নিম্মে এমনই কিছু সহিহ হাদিস উপস্থাপন করছি।
হজ্জ সর্বোত্তম আমলঃ
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে জিজ্ঞেস করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞেস করা হল , অতঃপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞেস করা হল, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেনঃ হজ্জ-ই-মাবরূর (মাকবূল হজ্জ)। (সহিহ বুখারী ১৫১৯ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৬ ইফাঃ) )
হজ্জের প্রতিদানে জান্নাতঃ
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জে মাবরূরের জান্নাত ব্যতীত কোন প্রতিদান নেই। আর এক উমরাহ অন্য উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ের জন্য গুনাহের কাফফারা হয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৪ ইফাঃ)
আবু হুরায়রা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৫ ইফাঃ)
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক উমরাহ অন্য উমরাহ্ পর্যন্ত কাফফারা হয় উভয়ের মধ্যবর্তী পাপের। আর হজ্জে মাবরূর এর বিনিময় জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩১ ইফাঃ)
মহিলাদের জিহাদ হলো মাবরূর হজ্জঃ
উম্মুল মু‘মিনীন ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন। হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! জিহাদকে আমরা সর্বোত্তম ‘আমল মনে করি। কাজেই আমরা কি জিহাদ করবো না? তিনি বললেনঃ না, বরং তোমাদের জন্য সর্বোত্তম জিহাদ হল, হজ্জে মাবরূর। (সহিহ বুখারী ১৫২০ তাওহীদ প্রকাশনী)
আয়েশা বিনত তালহা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি আপনার সাথে জিহাদে যোগদান করবো না? আমি কুরআনে জিহাদ আপেক্ষা উত্তম কোন আমলই দেখছি না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, বরং অতি উত্তম জিহাদ হলো বায়তুল্লাহর হজ্জ অর্থাৎ হজ্জে মাবরূর।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩০ ইফাঃ)
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বৰ্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বৃদ্ধ, অল্প বয়স্ক, দুর্বল এবং নারীদের জিহাদ হলো হজ্জ ও উমরাহ করা। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)
হজ্জের কারনে গুনাহ মাফঃ
১. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হজ্জ হতে ফিরে আসবে যে দিন তার মা জন্ম দিয়েছিল। (সহিহ বুখারী ১৫২১ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬২৮ ইফাঃ)
২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এক ‘উমরাহ’র পর আর এক ‘উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান । (সহিহ বুখারী ১৭৭৩)
হজ্জ দরিদ্রতা দুর করে দেয়ঃ
আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ ও ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা হজ্জ ও উমরা পালন কর। কেননা হজ্জ ও উমরা উভয়টি দারীদ্রতা ও পাপরাশিকে দূরীভূত করে যেমনিভাবে রেত স্বর্ণ, রৌপ্য ও লোহার মরিচা দূর করে দেয়। আর মাবরূর হজ্জের বদলা হল জান্নাত।” (সুনানে তিরমিযী ৮১০, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৩ ইফাঃ)
আমর ইবন দীনার (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ সমাপনের পর উমরা এবং উমরার পর হজ্জ করবে, কেননা তা অভাব অনটন ও পাপকে দূর করে দেয়। যেমন হাপর লোহার মরিচ দূর করে থাকে।(সুনানে নাসাঈ ২৬৩২ ইফাঃ)
হজ্জযাত্রীর দোয়া আল্লাহ কবুল করেনঃ
ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর পথের সৈনিক, হজ্জযাত্রী ও উমরা যাত্রীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা আল্লাহর নিকট দোয়া করলে, তিনি তা কবুল করেন এবং কিছু চাইলে তা তাদের দান করেন। (ইবনে মাজাহ ২৮৯৩ হাদিসের মান হাসান)
হজ্জযাত্রী আল্লাহর প্রতিনিধিঃ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি, গাযী, হাজী ও উমরাহ্ আদায়কারী। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৭ ইফাঃ)
হজ্জে জন্য খরচের নেকী সাতশ গুন বৃদ্ধি পায়ঃ
বুরাইদা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হজ্জে খরচ করা আল্লাহর পথে (জিহাদে) খরচ করার সমতূল্য সাওয়াব। হজ্জে খরচকৃত সম্পদকে সাতশত গুণ বাড়িয়ে এর প্রতিদান দেয়া হবে। (মসনদে আহমাদ ২২৪৯১)
রমাজানের উমরা হজ্জের সমানঃ
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি এক আনসারী মহিলাকে বললেন যার নাম ইবনু আব্বাস (রাঃ) উল্লেখ করেছিলেন কিন্তু আমি তার নাম ভুলে গেছি- আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিল? মহিলা বলল, আমাদের পানি বহনকারী মাত্র দুটি উট আছে। আমার ছেলের বাপ (স্বামী) ও তার ছেলে এর একটিতে চড়ে হাজ্জ (হজ্জ) করেন এবং অপরটি আমাদের জন্য রেখে যান পানি বহনের উদ্দেশ্যে। তিনি বললেন, রমযান মাস এলে তুমি উমরা কর। কারণ এ মাসের উমরা একটা হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৮ ইফাঃ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সিনান এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সাথে হাজ্জ (হজ্জ) করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? মহিলা বলল, অমুকের পিতা- অর্থাৎ তার স্বামীর দুটি পানি বহনকারী উট আছে। এর একটি নিয়ে সে ও তার ছেলে হজ্জে গিয়েছে। অপরটির সাহায্যে আমাদের গোলাম পানি বহন কর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে রমযান মাসের উমরা-হজ্জের সমান কিংবা তিনি বলেছেন, আমাদের সঙ্গে একটি হজ্জের সমান। (সহিহ মুসলিম ২৯০৯ ইফাঃ)
হজ্জে মাবরূরঃ
সহিহ হাদিসসমূহে হজ্জের ফজিলত বর্ণনায় ‘হজ্জে মাবরুর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হজ্জে মাবরূর অর্থ মকবুল হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় শব্দটির বিভিন্ন অর্থ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বটে কিন্তু সব কথার সার একটিই আর তা হলোঃ হজ্জে যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থেকে পাপমুক্ত হজ্জ সম্পাদিত হওয়াকে ‘হজ্জে মাবরুর’ বলে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত বিধানকে সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে আদায় করলে কবুল হওয়া আশা করা যায়। কাজে যে হজ্জ পরিপূর্ণভাবে আদায় করার ফলে কবুল হবে তাকে হজ্জে মাবরুর বলা হয়। তাই অনেকে কবুলযোগ্য হজ্জকেও হজ্জে মাবরূর বলেছেন। এই হজ্জের প্রতিদার একমাত্র জান্নাত।
১. আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ্জ ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। কেননা, এ হজ্জ ও উমরা দারিদ্র্য ও গুনাহ্ দূর করে দেয়, লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা যেমনভাবে হাপরের আগুনে দূর হয়। একটি ক্ববূল হজ্জের প্রতিদান জান্নাতব্যতীত আর কিছুই নয়। (তিরমিজ ৮১০, ইবনু মাজাহ ২৮৮৭)।
২. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ এক উমরা অপর উমরা পর্যন্ত সংঘটিত গুনাহসমূহের কাফফারা স্বরূপ। ক্ববূল হজ্জ্জের প্রতিদান জান্নাতছাড়া আর কিছু নেই। (তিরমিজ ৯৩৩, ইবনে মাজাহ ২৮৮৮)
৩. আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হলঃ সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ কোনটি এবং উত্তম বা কল্যাণকর কোন ধরণের কাজ? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা। আবার প্রশ্ন করা হল, এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ জিহাদ হচ্ছে সকল কাজের চূড়া বা শিখর। আবার প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরপর কোন জিনিস উত্তম? তিনি বললেনঃ (আল্লাহ্ তা’আলার নিকট) হজ্জে মাবরুর বা কবুলযোগ্য হজ্জ। (সহিহ বুখারি ২৬, তিরমিজি ১৬৫৮)
মাবরুর হজ্জের জন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ
আমাদের সকলের উচিৎ মাবরূর হজ্জ বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের চেষ্টা করা। হজ্জে সফরের সাথে আর্থিক ও শারীরিক সম্পর্ক থাকে বিধায় আমলটি কঠিন। তাই শ্রম দিয়ে অর্থ দিয়ে যদি কবুলযোগ্য হজ্জজ্ আদায় করেতে না পাবি তবে বিষয়টি খুবই পরিতাপের। তাই হজ্জে মাবরুল বা কবুলযোগ্য হজ্জ আদায়ের জন্য নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।
ক। ঈমান থাকাঃ
কাফির ও মুশরিক কোন আমল মহান আল্লাহ নিকট গ্রহনীয় নয়। যদি ইমান এসে মুসলিম হয়, তখন তার ইবাদাত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এমন কি কেউ ইমান আনার পর ইহাতে কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ করলেও তার কোন ভাল কাজ বা ইবাদাত গৃহীত হবে না।
খ। ইখলাসঃ
আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি অর্জনের জন্য ভাল কাজ বা ইবাদাত করাই হল ইখলাস। আমাদের সকর ইবাদাতের একমাত্র উপাশ্য হলেন মহান আল্লাহ। তাই আল্লাহ ছাড়া কোন গাইরুল্লাহে খুশি করার জন্য ইবাদাত করলে তা গ্রহণ যোগ্য হবে না। প্রতিটি কাজ বা আমলের এক মাত্র উদ্দেশ্য হবে মহান আল্লাহ সন্ত্ব্ষ্টি। সকল প্রকার ইবাদাত ও ভাল কাজ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে খুশী করার নিয়তে করতে হবে। এটাকেই বলা হয় ইখলাস।
গ। সুন্নাত তরীকাঃ
ইবাদাত কবুলের অন্যতম শর্ত হলো, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় আমল করা। সালাত, সিয়াম, জিকির, দান সদগা ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদাত যখন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত তরীকায় করা হবে তখন ইবাদাত। আর যখন সুন্নাহ তরীকার বাহিরে মনগড়া পদ্ধতিতে করা হবে তখন বিদআত। সকল প্রকার বিদআত পরিত্যাজ্য। তাই সুন্নাহ সম্মত কাজ বা আমলই ইবাদাত বলে গণ্য হবে। তাই সহিহ সুন্নাহ সম্মত দলিল ছাড়া বা মনগড়া কিছুই করা যাবে না।
ঘ। শির্কমুক্ত থাকাঃ
মহান আল্লাহ শির্ক যুক্ত ইবাদাত গ্রহন করে না। তার কোন অংশিদার নাই। তাই তিনি সকল প্রকার শির্কি আমল প্রত্যাখান করে থাকেন এবং তার সকল ভাল আমলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
* وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ *
অর্থঃ ‘‘আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শির্ক করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন বলে গণ্য হবেন। (সুরা যুমার ৩৯”৬৫)।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
ذَٲلِكَ هُدَى ٱللَّهِ يَہۡدِى بِهِۦ مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦۚ وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (٨٨)
অর্থঃ এটি হচ্ছে আল্লাহর হেদায়াত, নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে তিনি যাকে চান তাকে এর সাহায্যে হেদায়াত দান করেন৷ কিন্তু যদি তারা কোন শির্ক করে থাকতো তাহলে তাদের সমস্ত কৃতকর্ম ধ্বংস হয়ে যেতো৷ (আনআম–৬:৮৮)।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা বলেন: শরীকদের মধ্যে অংশীদারির অংশ (শির্ক) থেকে আমিই অধিক অমুখাপেক্ষী। যে কেউ এমন আমল করল যাতে আমার সাথে অপরকে শরিক করেছে, আমি তাকে ও তার শির্ককে প্রত্যাখ্যান করি”। (সহহি মুসলিম)।
মন্তব্যঃ কাজেই কবুল তথা হজ্জে মাবরুর আদায় করতে হলে অবশ্য এই তারটি শর্ত পূরন সাপেক্ষে হজ্জের যাবতীয় বীধি বিধন যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।
ঙ. বৈধ উপার্জন
হজের সফর দো‘আ কবুলের সফর। তারপরও যদি হারাম মাল দিয়ে তা করে তবে তা কবুল না হওয়ার বিষয়টি এসেই যায়। হাদীসে এসেছে
২৯৮৯। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে লোক সকল! আল্লাহ তা’আলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কুবুল করেন না। আল্লাহ তার রাসূলদেরকে যেসব বিষয়ের হুকুম দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেসব বিষযের হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত”- (সূরাঃ আল-মু’মিনূন ৫১)।
তিনি আরো বলেনঃ “হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে আমি যে রিযিক দিয়েছি তা হতে পবিত্র বস্তু আহার কর” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সারা শরীর ধূলি মলিন। সে আসমানের দিকে হাত দরায করে বলে, হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় তার দু’আ কিভাবে কুবুল হতে পারে। (সুনানে তিরমিজ ২৯৮৯ হাদিসের মান হাসান)
চ। হজ্জ হতে হবে শুধুই আল্লাহ জন্যঃ
যদি হজ্জ আল্লাহর জন্য না হয়ে লোক দেখানো কিংবা সুনাম কুড়ানোর জন্য হয় থাকে তবে সেই হজ্জ মহান আল্লাহ নিকটি কবুলযোগ্য হজ্জ হবে না। তাই লোক দেখান হজ্জ করার মানসিকতা বর্জন করা উচিৎ।
আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উটের পিঠে) একটি পুরাতন জিন ও পালানে উপবিষ্ট অবস্থায় হজ্জ করেন। তাঁর পরিধানে ছিল একটি চাদর যার মূল্য চার দিরহাম বা তারও কম। অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! এ এমন হজ্জ, যাতে কোন প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা নেই। (ইবন মাজাহ ২৮৯০)
ছ। আহার করানো ও ভালো কথা বলা
জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজ হজ্জকে মাবরূর করে? তিনি বললেন, ‘আহার করানো এবং ভালো ও সুন্দর কথা বলা। (মুস্তাদরাক ১/১৭৭৮)
খাল্লাদ ইবন আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবন যুবাইরকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ হাজী উত্তম? তিনি বললেন, যে আহার করায় এবং তার জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, আমাকে ছাওরী বলেছেন, আমরা শুনেছি, এটিই মাবরূর হজ্জ। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৫/৮৮১৬)
জ। সালাম বিনিময়
জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সা. কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ কাজের দ্বারা হজ্জ মাবরূর হয়? তিনি বললেন, ‘খাবার খাওয়ানো এবং বেশি বেশি সালাম বিনিময়ের দ্বারা’। (মুসনাদে আহমদ ৩/৩২৫)
ঝ। তালবিয়া পাঠ ও কুরবানী করা
১. আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল, কোন প্রকার হাজ্জ সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেনঃ চিৎকার করা (উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ) ও রক্ত প্রবাহিত করা (কুরবানী দেওয়া)। (সুনানে তিরমিজ ৮২৭, ইবনু মাজাহ ২৯২৪)
২. খাল্লাদ ইবনুল সাইব (রাঃ) হতে তাঁর পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জিবরাঈল (আ) আমার নিকট এসে বলেন যে, আমার সাহাবীদেরকে যেন আমি উচ্চস্বরে তালবিয়াপাঠের নির্দেশ প্রদান করি। (ইবনু মাজাহ ২৯২২)
মাবরুর হজ্জে সম্পাদনের লক্ষনঃ
একজন হাজ্জি উপরের বিষয়গুলি খেয়াল রেখে হজ্জ আদায় করলেন। হজ্জ সম্পাদনের পর যথাযত নিজ দেশে ফিরেও আসলেন। যদি দেখা যায় ঐ হাজ্জির মধ্য আমলগত ও আচরণগত পরিবর্ত ঘটছে তবে বুঝতে হবে তার হজ্জ কবুলযোগ্য বা মাবরুর হজ্জ হয়েছে। অর্থাৎ যদি তাকে পর্যবেক্ষন করে দেখা যায় তার সালাত, জাকাত, আচার-আচরণ, লেনদেন, আমানতদারী, অন্যের হক আদায় এবং ইবাদতের ওপর অবিচলতায় তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে তবে বুঝতে হবে, তার হজ্জ মাবরূর হয়েছে।
সমাজে বহুল প্রচারিত একটি যঈফ হাদিস হলোঃ
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি এতটুকু পাথেয় ও সফর সংক্রান্ত্রের অধিকারী হয়, যা তাকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, এরপরও যদি সে হজ্জ পালন না করে তবে সে ইয়াহুদী হয়ে মরল বা নাসারা হয়ে মরল এই বিষয়ে (আল্লাহর) কোন পরওয়া নেই। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কিতাবে ইরশাদ করেনঃ ( وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً) ‘‘মানুষের মাঝে যার সেখানে যাবার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য’’। (সুনানে তিরমিজ ৮১০ হাদিসের মান যঈফ)