হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

হজ্জের প্রকারভেদ এবং বদলী হজ্জের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হজ্জের প্রকারভেদ আলোচনা পূর্বে নিম্মের হাদিসগুলো মনযোগ দিয়ে পড়ি। হাদিসের  আলোকেই হজ্জের শ্রেণীভিবাগ করা হবে।

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

২. আবূ মূসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ইয়ামানে আমার গোত্রের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি (হজ্জ-এর সফরে) বাতহা নামক স্থানে অবস্থানকালে আমি (ফিরে এসে) তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ তুমি কোন্‌ প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? আমি বললাম, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইহরামের অনুরূপ আমি ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তিনি বললেনঃ তোমার সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে কি? আমি বললাম, নেই। তিনি আমাকে বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ করতে আদেশ করলেন। আমি বায়তুল্লাহ-এর তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ার সা’য়ী করলাম। পরে তিনি আদেশ করলে আমি হালাল হয়ে গেলাম। অতঃপর আমি আমার গোত্রীয় এক মহিলার নিকট আসলাম। সে আমার মাথা আঁচড়িয়ে দিল অথবা বলেছেন, আমার মাথা ধুয়ে দিল। এরপর ‘উমর (রাঃ) তাঁর খিলাফতকালে এক উপলক্ষে আসলেন। (আমরা তাঁকে বিষয়টি জানালে) তিনি বললেনঃ কুরআনের নির্দেশ পালন কর। কুরআন তো আমাদেরকে হজ্জ ও ‘উমরাহ পৃথক পৃথকভাবে যথাসময়ে পূর্ণরূপে আদায় করার নির্দেশ দান করে। আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা হজ্জ ও ‘উমরাহ আল্লাহ’র উদ্দেশে পূর্ণ কর” (২:১৯৬)। আর যদি আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতকে অনুসরণ করি, তিনি তো কুরবানীর পশু যবহ্‌ করার আগে হালাল হননি। (সহিহ বুখারি ১৫৫৯ তাওহীদ)

৩. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে বের হলাম এবং একে হজ্জের সফর বলেই আমরা জানতাম। আমরা যখন (মক্কায়) পৌঁছে বাইতুল্লাহ-এর তাওয়াফ করলাম তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিলেনঃ যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে আসেনি তারা যেন ইহ্‌রাম ছেড়ে দেয়। তাই যিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেননি তিনি ইহ্‌রাম ছেড়ে দেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহধর্মিণীগণ তাঁরা ইহ্‌রাম ছেড়ে দিলেন। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি ঋতুবতী হয়েছিলাম বিধায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। (ফিরতি পথে) মুহাসসাব নামক স্থানে রাত যাপনকালে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই ‘উমরাহ ও হজ্জ উভয়টি সমাধা করে ফিরছে আর আমি কেবল হজ্জ করে ফিরছি। তিনি বললেনঃ আমরা মক্কা পৌঁছলে তুমি কি সে দিনগুলোতে তওয়াফ করনি? আমি বললাম, জ্বীনা। তিনি বললেন, তোমার ভাই-এর সাথে তান্‌’ঈম চলে যাও, সেখান হতে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বাঁধবে। অতঃপর অমুক স্থানে তোমার সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ কী বললে! তুমি কি কুরবানীর দিনগুলোতে তাওয়াফ করনি! আমি বললাম, হ্যাঁ করেছি। তিনি বললেনঃ তবে কোন অসুবিধা নেই, তুমি চল। ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এমতাবস্থায় আমার সাক্ষাৎ হলো যখন তিনি মক্কা ছেড়ে উপরের দিকে উঠছিলেন, আর আমি মক্কার দিকে অবতরণ করছি। অথবা ‘আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি উঠছি ও তিনি অবতরণ করছেন। (সহিহ বুখারি ১৫৬১ তাওহীদ)


৪. মারওয়ান ইবনু হাকাম (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ‘উসমান ও ‘আলী (রাঃ)-কে (উসফান নামক স্থানে) দেখেছি, ‘উসমান (রাঃ) (তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন) হাজ্জ ও ‘উমরাহ একত্রে আদায় করতে নিষেধ করতেন। ‘আলী (রাঃ) এ অবস্থা দেখে হাজ্জ ও উমরার ইহরাম একত্রে বেঁধে তালবিয়া পাঠ করেন (لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجَّةٍ )  হে আল্লাহ! আমি ‘উমরাহ ও হাজ্জ-এর ইহরাম বেঁধে হাযির হলাম। এবং বললেন, কারো কথায় আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাত বর্জন করতে পারব না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৩ তাওহীদ)

৫. নবী সহধর্মিণী হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! লোকদের কী হল, তারা ‘উমরাহ শেষ করে হালাল হয়ে গেল, অথচ আপনি ‘উমরাহ হতে হালাল হচ্ছেন না? তিনি বললেনঃ আমি মাথায় আঠালো বস্তু লাগিয়েছি এবং কুরবানীর জানোয়ারের গলায় মালা ঝুলিয়েছি। কাজেই কুরবানী করার পূর্বে হালাল হতে পারি না। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৬. আবূ শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ আমি ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বেঁধে হজ্জে তামাত্তু’র নিয়্যতে তারবিয়্যাহ দিবস (আট তারিখ)-এর তিন দিন পূর্বে মক্কায় প্রবেশ করলাম, মক্কাবাসী কিছু লোক আমাকে বললেন, এখন তোমার হজ্জের কাজ মক্কা হতে শুরু হবে। আমি বিষয়টি জানার জন্য ‘আত্বা (রহঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে বলেছেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর উট সঙ্গে নিয়ে হজ্জে আসেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সাহাবীগন ইফরাদ হজ্জ-এর নিয়্যাতে শুধু হজ্জের ইহ্‌রাম বাধেঁন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মক্কায় পৌছে) তাদেরকে বললেনঃ বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ সমাধা করে তোমরা ইহ্‌রাম ভঙ্গ করে হালাল হয়ে যাও এবং চুল ছোট কর। এরপর হালাল অবস্থায় থাক। যখন জিলহজ্জ মাসের আট তারিখ হবে তখন তোমরা হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বেঁধে নিবে, আর যে ইহ্‌রাম বেঁধে এসেছ তা তামাত্তু‘ হজ্জের ‘উমরাহ বানিয়ে নিবে। সাহাবীগন বললেন, এ ইহ্‌রামকে আমরা কিরূপে ‘উমরাহ’র ইহ্‌রাম বানাব? আমরা হজ্জ-এর নাম নিয়ে ইহ্‌রাম বেঁধেছি। তখন তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে যা আদেশ করছি তাই কর। কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে না আসলে তোমাদেরকে যা করতে বলছি, আমিও সেরূপ করতাম। কিন্তু কুরবনী করার পূর্বে (ইহরামের কারনে) নিষিদ্ধ কাজ (আমার জন্য) হালাল নয়। সাহাবীগন সেরূপ পশু যবহ করলেন। আবূ ‘আবদুল্লাহ্‌ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, আবূ শিহাব (রহঃ) হতে মারফূ’ বর্ণনা মাত্র এই একটিই পাওয়া যায়। (সহিহ বুখারি ১৫৬৬ তাওহীদ)

৭. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়িয়ে, তেল মেখে, লুঙ্গি ও চাদর পরে ( হজ্জের উদ্দেশ্যে) মদীনা হতে রওয়ানা হন। তিনি কোন প্রকার চাদর বা লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি, তবে শরীরের চামড়া রঞ্জিত হয়ে যেতে পারে এরূপ জাফরানী রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। যুল-হুলাইফা হতে সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পাঠ করেন এবং কুরবানীর উটের গলায় মালা ঝুলিয়ে দেন, তখন যুলকা’দা মাসের পাঁচদিন অবশিষ্ট ছিল। জিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে মক্কায় উপনীত হয়ে সর্বপ্রথম কা’বাঘরের তাওয়াফ করে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করেন। তাঁর কুরবানীর উটের গলায় মালা পরিয়েছেন বলে তিনি ইহ্‌রাম খুলেননি। অতঃপর মক্কার উঁচু ভূমিতে হাজূন নামক স্থানের নিকটে অবস্থান করেন, তখন তিনি হজ্জের ইহরামের অবস্থায় ছিলেন। (প্রথমবার) তাওয়াফ করার পর ‘আরাফাহ হতে ফিরে আসার পূর্বে আর কা’বার নিকটবর্তী হননি। অবশ্য তিনি সাহাবাগণকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে হালাল হতে নির্দেশ দেন। কেননা যাদের সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই, এ বিধানটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর যার সাথে তার স্ত্রী রয়েছে তার জন্য স্ত্রী-সহবাস, সুগন্ধি ব্যবহার ও যে কোন ধরনের কাপড় পরা জায়িয। (সহিহ বুখারি ১৫৪৫ তাওহীদ)

৮. জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে আমরা হজ্জের তালবিয়া পাঠ করতে করতে (মক্কায়) উপনীত হলাম। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নির্দেশ দিলেন, আমরা হজ্জকে ‘উমরাহ’তে পরিণত করলাম।(সহিহ বুখারি ১৫৭০ তাওহীদ)

৯. জাবির ইব্‌নু ‘আব্দুল্লাহর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবীগণ হজ্জ-এর ইহ্‌রাম বাঁধেন, তাঁদের মাঝে কেবল নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল না। ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে আগমন করে, তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি [আলী (রাঃ)] বললেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছেন, আমি ও সেরূপ ইহ্‌রাম বেঁধেছি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণের মধ্যে যাদের নিকট কুরবানীর পশু ছিল না, তাদের ইহ্‌রামকে ‘উমরায় পরিণত করার নির্দেশ দিলেন, তারা যেন তাওয়াফ করে, চুল ছেঁটে অথবা মাথা মুণ্ডিয়ে হালাল হয়ে যায়। তারা বলাবলি করতে লাগলেন, (যদি হালাল হয়ে যাই তা হলে) স্ত্রীর সাথে মিলনের পরপরই আমাদের পক্ষে মিনায় যাওয়াটা কেমন হবে! তা অবগত হয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আমি পরে যা জানতে পেরেছি তা যদি আগে জানতে পারতাম, তাহলে কুরবানীর পশু সাথে আনতাম না। আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকলে অবশ্যই ইহ্‌রাম ভঙ্গ করতাম। (হজ্জ এর সফরে) ‘আয়েশা (রাঃ) ঋতুবতী হওয়ার কারণে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ব্যতীত হজ্জ-এর অন্য সকল কাজ সম্পন্ন করে নেন। পবিত্র হওয়ার পর তাওয়াফ আদায় করেন, (ফিরার পথে) ‘আয়েশা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকলেই হজ্জ ও ‘উমরাহ উভয়টি আদায় করে ফিরছে, আর আমি কেবল হজ্জ আদায় করে ফিরছি, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আবদুর রহমান ইব্‌নু আবূ বকর (রাঃ) -কে নির্দেশ দিলেন, যেন ‘আয়েশা (রাঃ) -কে নিয়ে তান’ঈমে চলে যান, সেখানে গিয়ে ‘উমরাহর ইহ্‌রাম বাঁধবেন)। ‘আয়েশা রাঃ হজ্জের পর উমরা আদায় কর নিলেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫১)

১০. নাফি’ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ইব্‌নু যুবাইরের খিলাফতকালে খারিজীদের হজ্জ আদায়ের বছর ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হজ্জ পালন করার ইচ্ছা করেন। তখন তাঁকে বলা হল, লোকেদের মাঝে পরস্পর লড়াই সংঘটিত হতে যাচ্ছে, আর তারা আপনাকে বাধা দিতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বললেন, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে উত্তম আদর্শ”- (আল-আহযাবঃ ২১)। কাজেই আমি সেরূপ করব যেরূপ করেছিলেন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, আমি আমার উপর ‘উমরাহ ওয়াজিব করে ফেলেছি। এরপর বায়দার উপকণ্ঠে পৌঁছে তিনি বললেন, হজ্জ এবং ‘উমরাহ’র ব্যাপার তো একই। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী করে বলছি, ‘উমরাহ’র সাথে আমি হজ্জকেও একত্রিত করলাম। এরপর তিনি কিলাদা পরিহিত কুরবানীর জানোয়ার নিয়ে চললেন, যেটি তিনি আসার পথে কিনেছিলেন। অতঃপর তিনি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার সা’ঈ করলেন। তাছাড়া অতিরিক্ত কিছু করেননি এবং সে সব বিষয় হতে হালাল হননি যেসব বিষয় তাঁর উপর হারাম ছিল- কুরবানীর দিন পর্যন্ত। তখন তিনি মাথা মুড়ালেন এবং কুরবানী করলেন। তাঁর মতে প্রথম তাওয়াফ দ্বারা হজ্জ ও ‘উমরাহ’র তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে। এ সব করার পর তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপই করেছেন। (১৬৩৯)

       উপরের হাদিসের আলোকে দেখা যায় হজ্জ সম্পাদন করার বেশ কয়েকটি পদ্ধতি চাল আছে। হাদিসগুলোর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, হজ্জযাত্রী ব্যক্তি মীকাত থেকে শুধু হজ্জে নিয়ত করছে। আবার অনেকে মীকাত থেকে উমরা এবং হজ্জ দুটোরই নিয়ত। যারা হাদি না নিয়ে হজ্জে গমন করেছেন তারা উমরা পর হালাল হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে আবার নতুন কর হজ্জে নিয়ত করে হজ্জ কবছেন। আর যারা হাদি সঙ্গে নিয়ে আসেন, তারা উমরার পর হালাল না হয়ে হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করে একই ইহরানে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে। হাদিসের ভাষ্য মতে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদি নিয়ে হজ্জে আসেন, তাই তিনি হালাল না হয়ে একই ইহরামে হজ্জ সম্পাদন করে কিন্তু তিনি বলেছিলেন হাদি সঙ্গে না থাকলে তিনি হালাল হয়ে যেতেন। সাহবী (রাঃ) আমল থেকে দেখা যায় কেউ উমরার পর হালাল হয়েছেন (উসমান রাদিঃ ও আবূ মূসা আশ’আরী রাদিঃ) আবার কেউ হালাল হন নাই (আলী রাদিঃ)। তাই হাদিসের আলোকে বলা যায় হজ্জ তিন প্রকার। যথাঃ

১। তামাত্তু হজ্জ

২। কিরান হজ্জ

৩। ইফরাদ হজ্জ

ক। তামাত্তু হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধে মক্কায় প্রবেশ করে কিন্তু তাদের সাথে হাদী থাকে না। তারা প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং আবার ইহরাম বেধে হজ্জ করে। অর্থাৎ একই সফরে পৃথকভাবে প্রথমে উমরা ও পরে হজ্জ আদায় করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে। তামাত্তু হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। ৯ জিলহজ্জের পূর্বে যে কোন মুহূর্তে উমরা আদায় করে হালাল হয়ে গিয়ে আবার উকুফে আরাফার পূর্বে নতুন করে হজ্জের ইহরাম বাঁধা। এরপর ধারাবাহিকভাবে হজ্জের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা। হজ্জের নিমিত্তে যারা মক্কার বাহির থেকে আসেন এবং আসার সময় হাদী সঙ্গে নিয়ে আসে না, তাদের জন্য তামাত্তু হজ্জই উত্তম।  কারও কারও মতে সর্বাবস্থায় তামাত্তু হজ্জ উত্তম।

দলিলঃ আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কী প্রকার ইহ্‌রাম বেঁধেছ? ‘আলী (রাঃ) বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুরূপ। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আমার সঙ্গে কুরবানীর পশু না থাকলে আমি হালাল হয়ে যেতাম। (সহিহ বুখারি ১৫৫৮ তাওহীদ)

তামাত্তু হজ্জ দুটি পদ্ধতিতে আদায় করা যায়ঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জ পর্যন্ত মক্কাতেই অবস্থান করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে উমরার যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং হজ্জের সময় আরম্ভ হতে যদি বেশী দেরী থাকে তবে এর ফাঁকে, হজ্জের পূর্বেই মদিনায় গিয়ে জিয়ারত করে আসা। পরে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে আবার উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাওয়া এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

যারা সরাসরি মদিনা গমন করবে, তারাও এই পদ্ধতিতে মদিনা থেকে মক্কায় আসার পথে উমরার নিয়তে ইহরাম বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করে উমরা সমাপ্ত করে হালাল হয়ে যাবে এবং ৮ জিলহজ্জ নতুনভাবে হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদন করা।

খ। কিরান হজ্জঃ

সাধারণ যারা হাদী নিয়ে হজ্জে নিয়তে মক্কায় আসেন, তারা একই ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করে থাকেন। এই ভাবে একই ইহরামে ইহরামে উমরা ও হজ্জ আদায় করা কে কিরান হজ্জ বলে। আমরা জানি তামাত্তু হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা করে হালল হয়ে যায় এবং পরে ইহরাম বেধে হজ্জ করে। কিন্তু কিরান হজ্জের ক্ষেত্রে প্রথমে উমরা কিন্তু হালাল হবে না। অর্থাৎ ইহরাম ত্যাগ করবে না। এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সমাপ্ত করবে। কিরান হজ্জের সময় হলো পহেলা শাওয়াল থেকে জিলহজ্জ মাসের ০৯ তারিখ পর্যান্ত যে কোন দিন। তবে হজ্জ শুরুর ২/৪ দিন আগে আসলে এই কিরান করা সম্ভব। শাওয়ার মাসে কিরান হজ্জের নিয়তে মক্কা এসে এক দেড় মাস ইহরামে থাকে খু্বই কষ্ট কর। তাছাড়া এখন মক্কার বাজারে হাদি পাওয়া খুবই সহজ্জ লভ্য তাই হাদি সঙ্গে না এসে হজ্জে তামাত্তু করাই ভাল।

যদিও রাসুল সাঃ কিরান হজ্জ করেছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জের জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি উমরার পর মাত্র কয়েক দিন মক্কায় ইহরাম অবস্থায় ছিলেন।

কেরন হজ্জের দুটি পদ্ধতিঃ

প্রথম পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে একত্রে হজ্জ ও উমরা উভয়টার নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। মক্কায় পৌঁছে প্রথমে উমরা আদায় করা ও ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। হজ্জের সময় হলে এই একই ইহরামে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা। পবিত্র মক্কায় পৌঁছার পর উমরার তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে হজ্জের নিয়ত উমরার সাথে যুক্ত করে নেয়া। উমরার তাওয়াফ-সাঈ শেষ করে, এহরাম অবস্থায় হজ্জের অপেক্ষায় থাকা ও ৮ জিলহজ্জ একই এহরামে মিনায় গমন ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পাদন করা।

গ। ইফরাদ হজ্জঃ

সাধারণ যারা হজ্জের সফলে উমরা করার সময় সুযোগ পান না, তারা ইফরাদ হজ্জ করেন। অর্থাৎ হজ্জের মাসগুলোয় উমরা না করে শুধু হজ্জ করাকে ইফরাদ হজ্জ বলে। এ ক্ষেত্রে মীকাত থেকে শুধু হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হয়। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম (আগমনি তাওয়াফ) করা। ইচ্ছা হলে এ তাওয়াফের পর সাঈও করা যায়। সে ক্ষেত্রে হজ্জের ফরজ তাওয়াফের পর আর সাঈ করতে হবে না। তাওয়াফে কুদুমের পর ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করা। ৮ জিলহজ্জ একই ইহরামে হজ্জের কার্যক্রম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে মিনার দিকে রওয়ানা হওয়া। ইফরাদ হজ্জকারীকে হাদী জবেহ করতে হয় না। তাই ১০ জিলহজ্জ কঙ্কর নিক্ষেপের পর মাথা মুন্ডন করে ইফরাদ হজ্জকারী প্রাথমিকভাবে হালাল হয়ে যেতে পারে।

এই তিন প্রকারের মধ্যে কোন প্রকার হজ্জ আদায় করা উত্তমঃ

প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করছি। হাদিস পড়েই আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোন প্রকারের হজ্জ উত্তম।

১. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫)

২. আবূ জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে তামাত্তু‘ হাজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে তা আদায় করতে আদেশ দিলেন। এরপর আমি তাঁকে কুরবানী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তামাত্তু‘র কুরবানী হলো একটি উট, গরু বা বকরী অথবা এক কুরবানীর পশুর মধ্যে শরীকানা এক অংশ। আবূ জামরাহ (রহ.) বলেন, লোকেরা তামাত্তু‘ হাজ্জকে যেন অপছন্দ করত। একদা আমি ঘুমালাম তখন দেখলাম, একটি লোক যেন (আমাকে লক্ষ্য করে) ঘোষণা দিচ্ছে, উত্তম হাজ্জ এবং মাকবূল তামাত্তু‘। এরপর আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এসে স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করে বললেন, এটাই তো আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। আদম, ওয়াহাব ইবনু জারীর এবং গুনদার (রহ.) শু‘বাহ্ (রহ.) হতে মাকবূল ‘উমরাহ এবং উত্তম হাজ্জ বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৮৮)

মন্তব্যঃ এইদুটি সহিহ হাদিসের আলোকে ষ্পষ্টভাবে বুঝা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরান হজ্জ আদায় করে ছিলেন কিন্তু তিনি তামাত্তু হজ্জেই উত্তম বলেছেন। যদি তিনি আল্লাহ তরফ থেকে আগেই জানতে পারতেন তবে তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করতেন।

উমরার ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

উমরার ফরজ তিনটি।উমরার ওয়াজিব তিনটি
১. ইহরাম বাঁধা। ২. তাওয়াফ করা ৩. সাঈ করা।  ১. ইহরামের কাপড় পরে উমরার নিয়ত করার কাজটি মীকাত পার হওয়ার আগেই করা। ২. ‘সাফা ও মারওয়া’ এ দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করা। কিছু আলেম একে রুকন অর্থাৎ ফরয বলেছেন। ৩. চুল কাটা (মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা)।

হজ্জের ফরজ আমল ও ওয়াজিব আমলঃ

হজ্জের ফরজ তিনটি।হজ্জের ওয়াজিব নয়টি
১. ইহরাম বাঁধা
২. আরাফাতে অবস্থান করা।
৩. তাওয়াফে ইফাদা  
১. সাঈ করা। (অনেকের মতে এটা হজ্জের ফরজ আমল)
২. মীকত থেকে ইহরাম বাঁধা
৩. আরাফাতে অবস্থান সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা।
৪. মুযদালিফায় রাত্রি যাপন।
৫. মুযদালিফার পর কমপক্ষে দুই রাত্রি মিনায় যাপন করা।
৬. কঙ্কর নিক্ষেপ করা।
৭. হাদী (পশু) জবাই করা (তামাত্তু ও কিরান হাজীদের জন্য।)
৮. চুল কাটা।
৯. বিদায়ী তাওয়াফ।

এক নজরে তিন প্রকার হজ্জের ধারাবাহিক আমলগুলোঃ

তামাত্তু হজ্জের ধারাবাহিক আমলকিরান হজ্জের ধারাবাহিক আমলইফরাত হজ্জের ধারাবাহিক আমল
১। উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা (মক্কায় পৌছার পরই)
৩। উমরার সাঈ করা ৪। উমরার জন্য মাথা মুন্ডানো (এর মাধ্যমে সে হালাল হলো) ৫। হজ্জের জন্য ইহরাম বাধা (৮ তারিখ মক্কায়) ৬। আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৭। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ যে কোন দিন) ৮। হজ্জের সায়ী
৯। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
১০। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
১১। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১২।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৩। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১৪। ১২ জিলহজ্জ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৫। বিদায়ী তাওয়াফ করা এর মাঝেঃ  
১। হজ্জ ও উমরার জন্য ইহরাম বাধা
২। উমরার জন্য তাওয়াফে কুদুম করা  (মক্কায় পৌছার পরই) ৩। উমরার সাঈ করা ৪। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৫। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা (১০, ১১ অথবা ১২ জিলহজ্জ একবার) ৬। হজ্জের সায়ী
৭। বড় জামারাতে ৭টি পাথর মারা (১০ জিলহজ্জ সকালে মারা সুন্নত)
৮। কুরবানী করা (হালাল হতে হলে কুরবানী করতে হবে)
৯। কুরবানীর পর মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ১০।  ১১ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১১। ১২ জিলহজ্জ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ১২। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১৩। বিদায়ী তাওয়াফ করা  
১। শুধু হজ্জ ইহরাম বাধা ২। ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৩। বড় জামারাতে ৭টি পাথর (মারা ১০ জিলহজ্জ সকালে) ৩। হজ্জের জন্য তাওয়াফ করা ৫। হজ্জের সায়ী
৬। মাথা মুন্ডানো করে হালাল হওয়া ৭।  ১১ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৮। ১২ তারিখ তিনটি জামারায় ২১ টি পাথর মারা ৯। ১২ তারিখ দুপুরের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ তারিখ ২১ টি পাথর মেরে মিনা ত্যাগ করা ১০। বিদায়ী তাওয়াফ করা  

এক নজরে তারিখ অনুসারে হজ্জের ধারাবাহিক কাজগুলোঃ

তারিখস্থানকরনীয় ইবাদত
৮ই জিলহজ্জ  এবং এর আগে যারা বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশ করবেন)মীকাত১) মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধবেন।
মক্কা২) কাবা ঘরে উমরার তাওয়াফ করবেন। ৩) সাঈ করবেন। ৪) চুল কেটে হালাল হয়ে যাবেন।
৮ই জিলহজ্জনিজ বাসস্থান  এবং মিনানিজ বাসস্থান থেকে ইহরাম বেঁধে হজ্জের নিয়ত করে সূর্যোদয়ের পর মিনায় রওয়ানা হবেন। সেখানে যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের সালাত আদায় করবেন।
৯ জিলহজ্জআরাফা ময়দান১) সূর্যোদয়ের পর মিনা অথবা নিজ বাসস্থান থেকে আরাফাতে রওয়ানা হবেন। ২) যুহরের প্রথম ওয়াক্তে যুহর ও আসর পড়বেন একত্রে পরপর দুই দুই রাকআত করে। ৩) আরাফায় দোয়া, দুরুদ ও জিকির করে সময় পার করতে হবে। ৪) সূর্যাস্ত পর্যান্ত অবস্থান করতে হবে। সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করলে হজ্জ শুদ্ধ হবে না।
১০ জিলহজ্জ (৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর)মুজদালীফা১) সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা করবেন। মুযদালিফার পৌছে মাগরিব এশা জমা করে একত্রে পড়বেন। ২) সেখানে রাত্রি যাপন করে প্রথম ওয়াক্তে অন্ধকার থাকতেই ফজর পড়বেন। ৩) আকাশ ফর্সা হওয়া পর্যন্ত কেবলামুখী হয়ে হাত তুলে দীর্ঘ সময় দোয়া ও মোনাজাতে মশগুল থাকবেন। ৪) বড় জামারায় নিক্ষেপের জন্য ৭টি কংকর এখান থেকে কুড়াতে পারেন।
১০ ই জিলহজ্জমিনা১) বড় জামরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) কুরবানী করবেন, সমস্যা হলে পরে করা যাবে। ৩) চুল কাটাবেন। (কুরবানি না হলে চুল কাটা যাবে না)। ৪) চুল কাটার পর ইহরামের কাপড় বদলিয়ে হালাল হতে হবে।
মক্কা১) তাওয়াফে ইফাদা করবেন। এই দিন না পারলে এটি ১১ বা ১২ তারিখেও করতে পারবেন। ২। তাওয়াফের পর সাথে সাথে সাঈও করবেন।
১১ জিলহজ্জ (আইয়ামে তাশরীকের প্রথম দিন)মিনা১) দুপুরের পর সিরিয়াল ঠিক রেখে প্রথমে ছোট, মধ্যম ও এর পরে বড় জামরায় প্রত্যেকটিতে ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করবেন। ২) মিনায় রাত্রি যাপন করবেন।
১২ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের দ্বিতীয় দিন)মিনা১) পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী ৩টি জামরায় ৭+৭+৭=২১টি কংকর নিক্ষেপ করবেন। দুপুরের আগে কংকর নিক্ষেপ করবেন না। ২) সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করবেন। তা না পারলে আজ দিবাগত রাতও মিনায় কাটাবেন।
১৩ জিলহজ্জ (আইয়ামে শরীকের তৃতীয় দিন)মিনা১) যারা গত রাত মিনায় কাটিয়েছেন তারা আজ দুপুরের পর পূর্ব দিনের নিয়মেই ৭টি করে মোট ২১ টি কংকর মারবেন। অতঃপর মিনা ত্যাগ করবেন।
১৪ জিলহজ্জ বা তার পরের যে কোন দিনমক্কাদেশে ফেরার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।

বদলী হজ্জঃ

যদি কোন ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরজ এবং উমরা ওয়াজিব হয় কিন্তু ওজরের কারনে তার পক্ষে সশরীরে তা আদায় করা সম্বব নয়। এই ক্ষেত্রে, তার পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিয়ে অন্য কোন ব্যক্তিকে দিয়ে হজ্জ বা উমরা আদায় করা কে বদলী হজ্জ বা বদলী উমরা বলে। বেশ কিছু সহিহ হাদিস দ্বারা বদলী হজ্জ ও বদলী উমরার বিধান প্রমাণিত হয়। নীচে হাদিসগুলো উল্লেখ করা হল।

১. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, ফযল ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) একই বাহনে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে আরোহণ করেছিলেন। এরপর খাশ‘আম গোত্রের জনৈক মহিলা উপস্থিত হল। তখন ফযল (রাঃ) সেই মহিলার দিকে তাকাতে থাকে এবং মহিলাটিও তার দিকে তাকাতে থাকে। আর আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফযলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে থাকে। মহিলাটি বলল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আল্লাহ্‌র বান্দার উপর ফরজকৃত হজ্জ আমার বয়োঃবৃদ্ধ পিতার উপর ফরজ হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ্জ আদায় করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ (আদায় কর)। ঘটনাটি বিদায় হজ্জের সময়ের। (সহিহ বুখারী ১৫১৩ তাওহীদ প্রকাশনী, সুনানে নাসাঈ ২৬৪৩ ইফাঃ, আবু দাউদ ১৮০৯)

মন্তব্যঃ পুরুষের পক্ষ থেকে নারী হজ্জ আদায় করতে পারে।

২. আবু রুযাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন বয়োবৃদ্ধ লোক, হজ্জ ও উমরাহ করার ক্ষমতা তার নেই এবং বাহনে আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

৩. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, বিদায় হজ্জের বছর খাস‘আম গোত্রের একজন মহিলা এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর তরফ হতে বান্দার উপর যে হাজ্জ ফরজ হয়েছে তা আমার বৃদ্ধ পিতার উপর এমন সময় ফরজ হয়েছে যখন তিনি সওয়ারীর উপর ঠিকভাবে বসে থাকতে সক্ষম নন। আমি তার পক্ষ হতে হাজ্জ আদায় করলে তার হাজ্জ আদায় হবে কি? তিনি বললেনঃ হাঁ (নিশ্চয়ই আদায় হবে)। (সহিহ বুখারি ১৮৫৪)

কার জন্য বদলী হজ্জ করান ওয়াজিবঃ

যে ব্যক্তি অতি বার্ধক্যে উপনীত অথবা যার সুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন রোগের কারণে হজ্জ-উমরা আদায়ে অক্ষম এ অবস্থায় যদি সে আর্থিকভাবে সক্ষম হয় তবে তার ওপর হজ্জ ফরয হবে না। কেননা হজ্জ ফরজ হওয়ার শর্ত তার উপর আরোপিত হয় নাই। হজ্জ ফরজের অন্যতম শর্ত হলো, সফরের আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। অপর পক্ষে কোন ব্যক্তি যদি বর্তমানে শারীরিকভাবে অক্ষম কিন্তু অক্ষম  হওয়ার আগেই তার উপর হজ্জ ফরজ হয়েছিল। অর্থাৎ সে শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম ছিল। তার কর্তব্য হল, তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়ের জন্য একজনকে প্রতিনিধি নিয়োগ করা। এমনকি যার ওপর হজ্জ ফরয সে যদি হজ্জ না করেই মারা যায় আর তার সম্পদ থাকে, তাহলে তার সে সম্পদ থেকে হজ্জের খরচ পরিমাণ অর্থ নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে তার বদলী হজ্জ আদায় করাতে হবে।

দলিলঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য।(সহিহ বুখারি ১৮৫২, ৬৬৯৯, ৭৩১৫, নাসাঈ ২৬৩৩)

বদলী হজ্জের পূর্বে নিজের হজ্জ করা জরুরীঃ

বিশুদ্ধ মতানুসারে হজ্জ ও উমরার প্রতিনিধি হওয়ার আগে তার নিজের হজ্জ করা জরুরী। তবে ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর মতে, বদলী হজ্জ করার জন্য তার পূর্বে হজ্জ করা জরুরী নয়। তবে যিনি পূর্বে হজ্জ করেছেন তাকে দিয়ে বদলী হজ্জ করানো উত্তম।

এর বিপরীতে মুজতাহীদ আলেমগন মনে করেন যে, যারা নিজের ফরজ হজ্জ করেন নাই, তাদের জন্য অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করা যাবে না। কোন মুসলিম যদি অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করতে চায় তাহলে আগে তাকে নিজের হজ্জ করতে হবে। এই কথার দলিল হলোঃ

দলিলঃ ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনেন, ‘‘লাব্বায়েক আন্ শুবরুমা’’ (আমি শুবরুমার পক্ষে হাযির)। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ শুবরুমা কে? সে ব্যক্তি বলে, আমার ভাই অথবা আমার বন্ধু। তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ আচ্ছা তুমি কি হজ্জ করেছ? সে বলে, না। তিনি বলেনঃ প্রথমে তুমি নিজের হজ্জ আদায় কর, পরে শুবরুমার হজ্জ সম্পন্ন কর। (সুনানে আবু দাউদ ১৮১১ ইফাঃ)

বদলী হজ্জ প্রকারণঃ

উপরে আলোচিত তিন প্রকার হজের মধ্যে বদলী হজ্জ কোন্ প্রকারের হবে, তা যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ করা হচ্ছে তিনি নির্ধারণ করে দেবেন। যদি ইফরাদ করতে বলেন, তাহলে ইফরাদ করতে হবে। যদি কিরান করতে বলেন, তাহলে কিরান করতে হবে। আর যদি তামাত্তু করতে বলেন, তাহলে তামাত্তু করতে হবে। এর অন্যথা করা যাবে না। মনে রাখবেন, বদলী হজ্জ ইফরাদই হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে বলেছিলেন,

তাহলে তুমি তোমার পিতার পক্ষ খেকে হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬২৩ ইফাঃ)

এই হাদীসে হজ্জ ও উমরা উভয়টার কথাই আছে। এতে প্রমাণিত হয়, বদলী হজ্জকারী তামাত্তু ও কিরান হজ্জ করতে পারবে। বদলি হজ্জকারী ইফরাদ ভিন্ন অন্য কোনো হজ্জ করলে তার হজ্জ হবে না, হাদিসে এমন কোনো বাধ্য বাধকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘হজ্জ’ শব্দ উচ্চারণ করলে শুধুই ইফরাদ বোঝাবে, এর পেছনেও কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। বদলি-হজ্জ কেবলই ইফরাদ হজ্জ হতে হবে, ফেকাহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবেও এ কথা লেখা নেই। ফেকাহশাস্ত্রের কিতাবে যা লেখা আছে, তা হল, বদলি-হজ্জ যার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে তিনি যে ধরনের নির্দেশ দেবেন সে ধরনের হজ্জই করতে হবে। সার কথা হল, যিনি হজ্জ করাবেন তিনি ইফরাদ বা তামাত্ত যে হজ্জ আদায়ের কথা বলবেন, সেই হজ্জই আদায় করা উত্তম।  (হজ্জ উমরা ও যিয়ারতের গাইড, ইসলাম হাউজ.কম)

বদলী হজ্জ সম্পর্কে কয়েকটি মাসায়েলঃ

ক। বদলী হজে প্রেরণকারীর উচিত একজন সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিকে তার পক্ষে হজ্জ করতে পাঠানো, যিনি হজ্জ-উমরার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত এবং যার অন্তরে রয়েছে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়।

খ। বদলী হজ্জকারির কর্তব্য আপন নিয়ত পরিশুদ্ধ করা। তার নিয়ত হবে, আমি মুসলিম ভাই বা আত্মীয় হিসাবে মৃত ব্যক্তিকে তার হজ্জের দায় থেকে মুক্ত করতে যাই। এর মাধ্যমে হয়ত তিনি আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে তার উপকার করতে।

গ। যতটুকু অর্থ খরচ হবে তাই গ্রহণ করবে। অবশিষ্টগুলো ফেরত দেবে।

ঘ। যে ব্যক্তি হজ্জ করতে এবং হজের নিদর্শনাবলি দেখতে ভালোবাসে অথচ সে হজের খরচ যোগাতে অক্ষম। অতএব সে তার প্রয়োজন পরিমাণ অর্থ নেবে এবং তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে হজের ফরয আদায় করবে। বদলী হজ্জকারী হজের জন্য টাকা নেবে কিন্তু টাকার জন্য হজে যাবে না। আশা করা যায়, এ ব্যক্তি বিশাল নেকির অধিকারী হবে এবং তাকে প্রেরণকারীর মতো সেও পূর্ণ হজের সওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মানতের হজ্জ আদায়ঃ

যাদের উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং হজ্ব আদায়ের সক্ষমতাও ছিল, কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করেনি। অতপর হজ্ব আদায়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, এমন ব্যক্তি পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানো যায়। কোন ব্যক্তির হজ্জ ফরজ কিন্তু তিনি হজ্জ আদায়ের পূর্বেই মৃত্যু বরণ করেছেন বা কোন ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানোর অসিয়ত করে গিয়েছেন তার পক্ষ থেকেও বদলী হজ্জ করার যাবে।

১. ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আমার আম্মা হাজ্জের মানৎ করেছিলেন তবে তিনি হাজ্জ আদায় না করেই ইন্তিকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ হতে হাজ্জ করতে পারি? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার পক্ষ হতে তুমি হাজ্জ আদায় কর। তুমি এ ব্যাপারে কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তা হলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহর হক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহ্‌র হকই সবচেয়ে বেশী আদায়যোগ্য। (সহিহ বুখারী ১৮৫২ তাওহীদ, সুনানে নাসাঈ ২৬৩৪)

২. মূসা ইবন সালামা হুযালী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সিনান ইবন সালামা জুহানী (রাঃ)-এর স্ত্রী তাকে বললেন, যেন তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেন যে, তার মাতা হজ্জ না করেই ইনতিকাল করেছেন। তার মাতার পক্ষ থেকে সে হজ্জ করলে তা যথেষ্ট হবে কি ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, যদি তার কোন দেনা থাকতো আর তার পক্ষ হতে সে আদায় করতো, তা হলে কি তার মাতার পক্ষ থেকে তা আদায় হতো না। অতএব সে যেন তার মাতার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৫)

৩. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর পিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করল যে, তিনি হজ্জ না করে ইনতিকাল করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ আদায় কর। (সুনানে নাসাঈ ২৬৩৬)

৪. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, খাছ’আম গোত্রের একজন মহিলা মুযদালফায় সকালে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলোঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার পিতার অতি বৃদ্ধাবস্থায় তার উপর হজ্জ ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি বাহনের উপর স্থির থাকতে পারেন না, এমতাবস্থায় আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সুনানে নাসাঈ ২৬৩৭)

৫. আবু রাযীন উকায়লী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা একজন অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি, হজ্জ ও উমরাহ করার মত ক্ষমতা নেই এবং আরোহণেরও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তোমার পিতার পক্ষ হতে হজ্জ এবং উমরাহ আদায় কর।সুনানে নাসাঈ ২৬৩৯)

এই সফরে বার বার উমরা করাঃ

এক সফরে একাধিক বার উমরা করা ইসলামি শরীয়ত সম্মত কোন ইবাদাত নয়। কারন এই উমরা আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) থেকে প্রমানিত নয়। সময় সুযোগ থাকার সত্বেও আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবী (রাঃ) এমন আমল করেন নাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে মোট চারবার উমরা পালন করেছেন। তারার উমরাগুলো হলোঃ

হুদাইবিয়ার উমরা, উমরাতুল কাযা, হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় এবং শেষ উমরাটি করের বিদায় হজের সাথে। সাহাবীদের (রাঃ) কেউ বিদায় হজ্জের সফরে এক বারের বেশি উমরা করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ‘উমরাহ পালন করেছেন। তিনি হাজ্জের সঙ্গে যে ‘উমরাটি পালন করেন সেটি ব্যতীত সবকটিই যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর পরের বছরের ‘উমরাটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে এবং হুনাইনের প্রাপ্ত গানীমাত যে জিঈরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখানের ‘উমরাটিও ছিল যুলকাদাহ্ মাসে, আর তিনি হাজ্জের সঙ্গে একটি ‘উমরাহ্ পালন করেন। (সহিহ বুখারি ৪১৪৮ তাওহীদ প্রকাশনি)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত বার উমরা করেছেন, তিনি মক্কার বাহির থেকে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা করেছেন। কিন্তু মক্কায় প্রবেশের পর মক্কা থেকে বের হয়ে হারাম এলাকার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে, তিনি কখনো উমরা করেন নি। এমনকি হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরো বছর মক্কায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি কখনো মক্বার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে উমরা করেন নি।

হজ্জের সময় দেখা যায় অনেক হাজিগন মক্কার বাইরে তান‘ঈম গিয়ে মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে থাকে। যারা মসজিদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা করে তাদের যুক্তি বিদায় হজ্জের সফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তান‘ঈম থেকে ইহরাম বেঁধে উমরা পালন করেছেন। তাই তারা এই স্থান থেকে ইহবাম বেধে বার বার উমরা করে থাকে।

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তালহা (রাঃ) ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর ‘আলী (রাঃ) ইয়ামান হতে এলেন এবং তাঁর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে ইহরাম বেঁধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাঁধলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইহরামকে ‘উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তাঁরা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট পৌঁছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং ‘উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আবদুর রাহমান ইবনু আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান‘ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) ‘উমরাহ আদায় করলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জামরাতুল ‘আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম (রাঃ)-এর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে ‘উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য। (সহিহ বুখারি ১৭৮৫ তাওহীদ প্রকাশনি)

মন্তব্যঃ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর উপরা পালনের সাহ্যয্য করেত তার সাথে ছিল তার ভাই আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। সময় সুযোগ সব কিছু থাকা সত্বেও তিনি তার বোন আয়েশার সাথ উমরা করেন নাই। বরং আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু যদি তার বোন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর সাথে উমরা করতে তবে তার আরও বেশী সাহায্য হত। এই থেকে বুঝ যায়, তান‘ঈম থেকে উমরা করার প্রচলনটি ছিল বিশেষ একটি প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। অন্যথায় হজের সফরে বা একই সফরে বার বার উমরা করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত নয়।

সাহাবীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা একবার উমরা আদায় করার পর তাদের মাথার চুল কালো না হওয়া পর্যন্ত পূণরায় উমরা পালন করতেন না। চুল কালো হওয়ার পর উমরা করতেন।

সুন্নাত হচ্ছে হাজীগণ হজের সময় উমরা শেষ করে, হালাল অবস্থায় মক্কা অবস্থান করবেন। আর যারা হাদি সংঙ্গে নিয়েছেন তারা হালাল হবেন না। তাই হজ্জের সফরে একাধিক বার উমরা না করে, বার বার কারা ঘর তাওয়াফ করাই হল অধিক উত্তম। তবে যখন উমরাকারীদের খুব ভীড় থাকবে তখন বেশি বেশি তাওয়াফ না করে বেশি বেশি সালাত, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকিরে ব্যস্ত থাকা। তাওয়াফ শেষে মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, মুরব্বীদের জন্য দো‘আ করুন। কারো নামে উমরা করা বা কারো জন্য উমরা করা ইত্যাদি পরিহার করুন। আপনি কত বেশি আমল করলেন, এটি আল্লাহর নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আপনি কতটুক আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *