আল কুরআনের গুরুত্ব ফজিলত
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং বুঝে, শিখে, এবং তা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য নাজিল হয়েছে। কুরআনের প্রথম এবং মূল হক হলো এর প্রতি ঈমান আনা। অর্থাৎ, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত একমাত্র সত্য কিতাব, যা মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও দিকনির্দেশনা। ঈমান আনার অর্থ হলো -কুরআনের প্রতিটি আয়াতই সত্য এবং নির্ভুল। ঈমান আনার সাথে সাথে কুরআন শিক্ষা গ্রহন করে নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَرَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ
আর কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো। সূরা মুজাম্মিল : ৪
উসমান (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। সহিহ বুখারি : ৫০২৭
নিয়মিত তিলওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের অর্থ বুঝে পড়তে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে আয়াতের গভীরতা বুঝার জন্য কেবল অর্থ পড়া যথেষ্ট নয়, বরং বিশুদ্ধ তাফসির অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কারণ, কুরআনের কিছু আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট হলেও কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়। কুরআনের তাফসির বুঝতে হলে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ থেকে কুরআন অধ্যয়ন করা। যেমন- তাফসির ইবনে কাসির, তাফসির আত-তাবারি, তাফসির সাঈদি ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন-
کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ
আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা সাদ : ২৯
কুরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা। কেবল তিলাওয়াত বা মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়; বরং কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনা করাই আসল উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন-
وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ
আমি মানুষ ও জিনকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়াত : ৫৬
সততা, ধৈর্য, বিনয়, দয়া ও ইনসাফ কুরআনের শিক্ষা। হারাম ও অন্যায় কাজ পরিহার করা: সুদ, মিথ্যা, জুলুম, পরনিন্দা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কুরআনের বিধান মেনে চলা: বিবাহ, ব্যবসা, উত্তরাধিকারসহ সব বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন “চলমান কুরআন”, অর্থাৎ তিনি তাঁর জীবনে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। তাই আমাদেরও কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে।
কুরআনের প্রতি আমাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন মাধ্যমে আমারা আমাদের জীবনকে কুরআনের আলোতে আলোকিত করতে পারি। যারফলে আমরা পরকালে সফলতা লাভ করতে পারব।
কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফজিলত :
কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। এটি আল্লাহর নাজিলকৃত সর্বশেষ আসমানী কিতাব এবং হিদায়াতের চূড়ান্ত উৎস। কুরআন আল্লাহর নির্দেশ এবং মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। এতে জীবন পরিচালনার জন্য সব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি না মানলে একজন মানুষ পথভ্রষ্ট হতে পারে এবং আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ
এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। সূরা বাকারা : ২
কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা আল্লাহর প্রতি কুফরি করার সমান। এটি ঈমানের মূল ভিত্তি এবং একজন মুমিনের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। যারা কুরআন মেনে চলে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনা দুনিয়ায় শান্তি, আখিরাতে সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। সুতরাং, কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ এবং তা না মানলে চরম ক্ষতির কারণ হবে। নিম্মে কুরআনের উপর ঈমান আনার কিছু ফজিলত তুলে ধরছি।
২। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পুরস্কার :
কুরআনের প্রতি ঈমানের মাধ্যমেই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হয়। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে এবং আখিরাতে সফলতার পথ সুগম করে। কুরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আনা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ
অর্থ : রসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। সুরা বাকারা : ২৮৫
কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি এরশাদ করেন-
فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنزَلْنَا وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
অর্থঃ অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং অবতীর্ন নূরের (কুরআনের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। সুরা তাগাবুন : ৮
কুরআনের প্রতি ঈমান আনার আল্লাহ নির্দেশ হওয়ার কারণে অসংখ্য পুরস্কার বা লাভ রয়েছে। দুনিয়া ও আখিরাতে এই ঈমান মানুষের জন্য হিদায়াত, শান্তি, সফলতা এবং চিরস্থায়ী কল্যাণের পথ উন্মোচন করে। নিচে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার প্রধান পুরস্কারগুলো কুরআনের আয়াতের আলোকে উল্লেখ করা হলো :
(১) জান্নাতের অধিকারী হবে
মহান আল্লাহ বলেন-
وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ
এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সূরা বাকারা : ২৫
মহান আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সূরা কাহফ : ১০৭
(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে
মহান আল্লাহ বলেন-
فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ
অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫
(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে
মহান আল্লাহ বলেন-
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সূরা রা’দ: ২৮
মহান আল্লাহ বলেন-
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ ٪
যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। সূরা আনআম: ৮২
(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার
মহান আল্লাহ বলেন-
وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ
যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সূরা মায়েদাহ : ৯
মহান আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ
আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। সুরা আনফাল : ৭৪
(৫) দুনিয়ায় মর্যাদা ও সাফল্য লাভ
মহান আল্লাহ বলেন-
الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সূরা মুজাদালাহ : ১
মহান আল্লাহ বলেন-
وَاَنَّ ہٰذَا صِرَاطِیۡ مُسۡتَقِیۡمًا فَاتَّبِعُوۡہُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمۡ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ
আর এটি তো আমার (কুরআনের) সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। সূরা আনআম : ১৫৩
(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ
নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খৃষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২
মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ
আর আমি রাসূলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮
(৭) হিদায়াত ও আল্লাহর রহমত লাভ
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮
মহান আল্লাহ বলেন-
ؕ وَنَزَّلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً وَّبُشۡرٰی لِلۡمُسۡلِمِیۡنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।
(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা
মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ
আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা : ৭৫
মহান আল্লাহ বলেন-
اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
এরাই তাদের রবের পক্ষ হতে প্রাপ্ত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং এরাই পূর্ণ সফলকাম। সুরা বাকারা : ৫
(৯) আল্লাহর শিফা এবং রহমত লাভ
মহান আল্লাহ বলেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ مَا ہُوَ شِفَآءٌ وَّرَحۡمَۃٌ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۙ وَلَا یَزِیۡدُ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا خَسَارًا
আর আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়। সূরা আল-ইসরা: ৮২
(১০) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে
মহান আল্লাহ বলেন
الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তন নেই। এটিই মহাসফলতা। সূরা ইউনুস : ৬৩-৬৪
(১১) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন
মহান আল্লাহ বলেন-
اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭
(১২) সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে দিবেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-
وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَـٰلِحً۬ا نُّؤۡتِهَآ أَجۡرَهَا مَرَّتَيۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقً۬ا ڪَرِيمً۬ا
অর্থঃ আর তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকাজ করবে তাকে আমি দুবার প্রতিদান দেবো এবং আমি তার জন্য সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছি৷ (সুরা আহজাব ৩৩:৩১)।
কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে দুনিয়ায় এবং আখিরাতে অজস্র পুরস্কার পাওয়া যাবে। এটি মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে, দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও সফলতা নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর চিরস্থায়ী নৈকট্য লাভের পথ উন্মোচন করে। তাই কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
৩। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার শাস্তি
কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
(১) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া
وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ
আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সূরা বাকারা: ৮৯
(২) অস্বীকারীগণ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ
নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬
(৩) অন্তর অন্ধ হয়ে যাওয়া
মহান আল্লাহ বলেন-
قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا () قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ ()
সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’? তিনি বলবেন, ‘এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী (কিতাব) এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল’। সুরা ত্বহা : ১২৫-১২৬
(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে
মহান আল্লাহ বলেন-
اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ
যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮
(৫) আখিরাতে শাস্তির দিন অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব
মহান আল্লাহ বলেন-
تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥
“আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫
মহান আল্লাহ বলেন-
ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ
আর যারা কুফরী করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আযাব। এ কারণে যে তারা কুফরী করত। সুরা ইউনুস : ৪
মহান আল্লাহ বলেন-
اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরী করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫
(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চুড়ান্ত পথভ্রষ্ট
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, এরপর কুফরীকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭
(৭) দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-
মহান আল্লাহ বলেন-
فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ
অতঃপর যারা কুফরী করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আযাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬
(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :
মহান আল্লাহ বলেন-
فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا
অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫
(৯) জাহান্নামে স্থায়ী হবেন
– মহান আল্লাহ বলেন-
وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯
(১০) পরকালে আজাব দেওয়া হবে
মহান আল্লাহ বলেন-
وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ
আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে যমীন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১
কুরআন মানব জাতির জন্য আল্লাহর পাঠানো সর্বশেষ পথপ্রদর্শক। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এর নির্দেশনা অনুসারে জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।