কুরআন সুন্নাহর পার্থক্য
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কুরআন এবং সুন্নাহ উভয়টির মূল উত্স হল ওহী। মহান আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মাধ্যমে অথবা ইলহাম এর মাধ্যমে দ্বীর্ঘ ২৩ বছর ধরে নাজিল করেছেন। তার মধ্য তিনি নিজের কোন কথা সংযোজন বা বিয়োজন করেন নাই। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ (٤٤)-لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ (٤٥) ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ (٤٦) فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَـٰجِزِينَ (٤٧)
অর্থ : যদি এ নবী নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো। তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷ তোমাদের কেউ-ই (আমাকে) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ সুন হাকক : ৪৪-৪৭
এ আয়াত প্রমান করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের তরফ থেকে কিছুই বলতে পারেন না, যা কিছু বলেন মহান আল্লাহর তরফ থেকেই বলেন। অপর আয়াতে দেখা যায় আল্লাহ যেমন কুরআন নাযিল করেছেন তেমনি হিকমত তথা সুন্নাহ (হাদিস) ও নাজিল করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-
وَٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ وَمَآ أَنزَلَ عَلَيۡكُم مِّنَ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡحِكۡمَةِ يَعِظُكُم بِهِۦۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ۬
অর্থ : আর তোমরা স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং তোমাদের উপর কিতাব ও হিকমত যা নাযিল করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন। আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয় সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ২৩১
আল্লাহ তা’আলা তা’আলা কুরআনে সূন্নাহকে হিকমাহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-
وَأَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمۡ تَكُن تَعۡلَمُۚ
আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। সূরা নিসা : ১১৩
আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,
وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا
আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত (হাদিস) পঠিত হয় তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সুরা আহযাব :৩৪
এখানে হিকমত অর্থ সুন্নাত বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ (হাদিস) যা আল্লাহ পরোক্ষভাবে কোন ফেরেশতার মাধ্যম ব্যতীত তাঁর নবীর কাছে নাজিল করেছেন। আল-মিকদাম ইবনু মাদীকারিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ، وَمِثْلَهُ مَعَهُ أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبْعَانُ عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ عَلَيْكُمْ بِهَذَا الْقُرْآنِ فَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ، وَمَا وَجَدْتُمْ فِيهِ مِنْ حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ،
জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখো! এমন এক সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই গ্রহণ করো, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল এবং যা হারাম পাবে তা হারাম মেনে নিবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৪, আহমদ : ১৭১৭৪ আংশিক
এই হাদিসে অনুরূপ কিছু দেয়ার কার বলা হয়েছে তা আর কিছু নয়, তা হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, আল্লাহ্ এই আয়াতে “কিতার” উল্লেখ করেছেন তার অর্থ হচ্ছে কুরআন। আর উল্লেখ করেছেন হিকমাত যার অর্থ, আমি কুরআনের পণ্ডিতদের নিকট শুনেছি তাঁরা বলেছেন যে, এখানে হিকমত হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সুন্নাত। তিনি বলেন, এখানে হিকমত অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কিছু করা জায়েজ হবে না। কেননা উহা কিতাবের কথা উল্লেখ করার সাথে সাথেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ্ তাঁর নিজের আনুগত্যের সাথে সাথে তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ করা মানুষের উপর ফরয করে দিয়েছেন।
সাধারণত ওহী দুই প্রকার :
ইসলামের শরীয়তের মুল উত্স হচ্ছে ওহি। এবং দ্বীনে ইলাহীর ভিত্তি শুধুমাত্র আল্লাহর নাজিলকৃত ওহীর উপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি পন্ডিতেরা মনে করে শরীয়তের উত্স হিসাবে ওহী দুই প্রকার :
১। ওহীয়ে মাতলু (আল-কুরআন)
২। ওহীয়ে গাইরে মাতলু (সুন্নাহ ও হাদীস)।
একটি আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন ও অপরটি রসূলের সুন্নাত।। আর উভয়টি ‘ওহী’ একটি হল ওহী মাতলু অর্থাৎ যা তিলাওয়াত করা হয়; অপরটি গাইরি মাতলু অর্থাৎ যা তিলাওয়াত করা হয় না। কিন্তু উভয়টি ‘ওহী’। কোন প্রকার ওহী পরিবর্তণ পরিবর্ধনের ক্ষমাতা আল্লাহ আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেন নাই। মহান আল্লাহ বলেন-
ۚ قُلۡ مَا يَكُونُ لِىٓ أَنۡ أُبَدِّلَهُ ۥ مِن تِلۡقَآىِٕ نَفۡسِىٓۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّۖ إِنِّىٓ أَخَافُ إِنۡ عَصَيۡتُ رَبِّى عَذَابَ يَوۡمٍ عَظِيمٍ۬ (١٥)
হে মুহাম্মাদ! ওদেরকে বলে দাও, “নিজের পক্ষ থেকে এর মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন করা আমার কাজ নয়৷ আমি তো শুধুমাত্র আমার কাছে যে অহী পাঠানো হয়, তার অনুসারী৷ যদি আমি আমার রবের নাফরমানী করি তাহলে আমার একটি ভয়াবহ দিনের আযাবের আশংকা হয়”৷ সূরা ইউনুস : ১৫
মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ (٣) إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡىٌ۬ يُوحَىٰ (٤)
সে (মুহাম্মাদ সাঃ) নিজের খেয়াল খুশীমত কথা বলে না৷ যা তার কাছে নাযিল করা হয়, তা অহী ছাড়া আর কিছুই নয়৷ সূরা আন-নাজম : ৩-৪
উপরের আলোচনার সার কথা যদি এক কথায় বলেত চাই তবে বলেত পারি, হাদিস বা সুন্নাহও এক প্রকারে ওহি যা মহান আল্লাহ তার প্রিয় রাসূর ﷺ এর মাধ্যমে নাজিল করেছেন।
কুরআন এবং সুন্নার মধ্যে সম্পর্ক :
১. কুরআন হল মুল পাঠ আর সুন্নাহ (হাদিস) হল দার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ :
কুরআন এবং হাদিস দুটিই ইসলামি শরীয়তের মুল উত্স। কুরআনুল কারীমের পর ইসলামের দ্বিতীয় উৎস হাদিস। কুরআন হল মুল পাঠ আর হাদিস হল দার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।
মহান আল্লাহ বলেন-
بِٱلۡبَيِّنَـٰتِ وَٱلزُّبُرِۗ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّڪۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡہِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ
অর্থ : তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে। সুরা নাহল : ৪৪
২. কুরআন এবং হাদিস উভয়ই শরীয়তের প্রধান দুটি উত্স :
আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ۬ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ ۥۤ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاً۬ مُّبِينً۬ا
অর্থ : যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সুরা আহজাব : ৩৬
অথচ এর নিজের থেকে হারাম হালাল করার কোন অধিকার আল্লাহ দেন নাই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَاۤ اَحَلَّ اللّٰہُ لَکَ ۚ تَبۡتَغِیۡ مَرۡضَاتَ اَزۡوَاجِکَ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাহরিন : ০১
সকল হারাম হালাল বিধিবিধান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের থেকে কোন বিধান প্রদান করেন না। কাজের হাদিসে প্রদত্ত সকর বিধিবিধান আল্লাহ প্রদত্ত ওহি।
কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে পার্থক্য
নিচে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে ১০টি মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা হলো-
| বিষয় | কুরআন | সুন্নাহ | রেফারেন্স |
| উৎস | সরাসরি আল্লাহর বাণী | রাসূল ﷺ-এর বক্তব্য, কাজ ও সমর্থন | কুরআন: ৪:৮০; বুখারি ৬৩০৭ |
| সংরক্ষণ | আল্লাহ নিজে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন | উম্মতের মাধ্যমে সংরক্ষিত | কুরআন: ১৫:৯ |
| শব্দ ও অর্থ | উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে | অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, কিন্তু শব্দ রাসূল ﷺ-এর | মুসলিম: ২৭৮৮ |
| গুরুত্ব | প্রথম ও প্রধান উৎস | কুরআনের পর দ্বিতীয় উৎস | কুরআন: ৫৯:৭ |
| পাঠে সওয়াব | প্রতিটি অক্ষরে সওয়াব | পাঠে সওয়াব আছে, কিন্তু অক্ষরপ্রতি নির্দিষ্ট নয় | তিরমিজি: ২৯১০ |
| ইবাদতে ব্যবহার | সালাতে কেবল কুরআন পাঠ জায়েয | সালাতে হাদিস পড়া জায়েয নয় | সহিহ বুখারি: ৭৫৬ |
| লিখিত রূপ | ওহির সময় থেকেই লিখিতভাবে সংরক্ষিত | অধিকাংশ মৌখিক, পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ | বুখারি: ৪৯৯৯ |
| ভাষা | সবটাই আরবি | আরবিতে মূল, তবে অনুবাদ বৈধ | কুরআন: ৪৩:৩ |
| অপ্রতিদ্বন্দ্বীতা | অনন্য ও চ্যালেঞ্জযোগ্য নয় | চ্যালেঞ্জ নয়, বরং ব্যাখ্যামূলক | কুরআন: ২:২৩ |
| কিতাব রূপে সংকলন | রাসূল ﷺ এর জীবদ্দশাতেই সম্পূর্ণ | রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর সংকলিত | বুখারি: ৪৯৮৬ |