ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

ঈমান এবং ঈমানের মাপকাঠি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈমান (الإيمان) কি?

ঈমান (الإيمان) ইসলামি পরিভাষায় একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি একজন মুসলমানের জীবন ও আমলের ভিত্তি। ঈমান’ শব্দটি আরবি “أمن” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ নিরাপত্তা, বিশ্বাস, শান্তি। পরিভাষায় ঈমান অর্থ- মৌখিক স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং তদনুযায়ী কাজের নামই হচ্ছে ঈমান। মনেপ্রাণে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া। ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা এবং শিরক ও মুশরিকদের সাথে সম্পর্কে ছিন্ন করা।

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের ﷺ আনীত সকল বিষয়ের প্রতি অন্তর দিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, তা মুখে বলবে এবং তার আচরণ ও কাজেও সে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাবে—এটাই ঈমান।

কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী ঈমানের সংজ্ঞা:

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَـٰبِ ٱلَّذِى نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلَّذِىٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُ‌ۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدًا (١٣٦)

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাজিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরি করলো সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো। সুরা নিসা : ১৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ‌ۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّن رُّسُلِهِۦ‌ۚ

রাসূল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনগণও! এরা প্রত্যেকে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবে, তাঁর রাসুলদের বিশ্বাস স্থাপন করে। সুরা বাকারা : ২৮৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও ইরশাদ করেন-

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

অর্থঃ বরং প্রকৃতপক্ষে সৎকাজ হলো- ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফিরিশতাদের উপর, এবং সমস্ত নবি রাসুলগণের উপর। সুরা বাকারা : ১৭৭

ঈমান সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস  :

ইবন উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-

“‏ بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‏”‏‏

ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। (১) আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। (২) সালাত কায়িম করা। (৩) জাকাত আদায় করা। (৪)  হাজ্জ সম্পাদন করা এবং (৫) রমজানের সিয়াম পালন করা।

সহিহ বুখারি : ৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম ১৬, সুনানে তিরমিজি ২৬০৯, সুনানে নাসায়ি ৫০০১, আহমাদ ৬০১৫, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ্ ১৮৮০;

ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাসরার অধিবাসী মা’বাদ জুহাইনাহ প্রথম ব্যক্তি যে তাকদীর অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনে ’আবদুর রহমান উভয়ে হজ অথবা উমরাহ’র উদ্দেশে রওয়ানা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যে কোন সাহাবার সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ঐ সব লোক তাকদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাখী তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সঙ্গে আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। (কারণ আমি ছিলাম বাক পটু)। আমি বললাম, “হে আবু আবদুর রহমান। আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াহইয়া তাদের কিছু গুণাবলীর কথাও উল্লেখ করলেন। তাদের ধারণা (বক্তব্য) হচ্ছে, তাকদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়।”

ইবনে উমর (রা.) বললেন, “যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের উপর ঈমান না আনবে। অতঃপর তিনি বললেন, আমার পিতা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোন চিহ্নও তার মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউই তাকে চিনেও না।

অবশেষে সে নবি ﷺ এর সামনে বসলো। সে তার হাটুদ্বয় নবি ﷺ এর হাটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তার (অথবা নিজের) উরুর উপর রাখলো এবং বলল, হে মুহাম্মাদ ﷺ! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইসলাম হচ্ছে এই– তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়িম করবে, জাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ করবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন। বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, আমরা তার কথা শুনে আশ্চার্যান্বিত হলাম। কেননা সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে।

এরপর সে বললো, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাকুল, তার কিতাবসমূহ, তার প্রেরিত নবিগণ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখবে এবং তুমি তাকদীর ও এর ভালো ও মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন।

এবার সে বললো, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ইহসান এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাকে দেখছো, যদি তাকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে।

এবার সে জিজ্ঞেস করলো। আমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে বলুন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। অতঃপর সে বলল, তাহলে আমাকে এর কিছু নিদর্শন বলুন। তিনি বললেন, দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে এবং নগ্ন পদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র, বকরীর রাখালদের বড় দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গৰ্ব অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে।

বর্ণনাকারী উমর (রা.) বলেন, এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরজ করলাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন। সহিহ মুসলিম : ৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩, সুনানে নাসায়ি :  ৪৯৯০, ৪৬৯৫,  সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৯৫, আহমাদ : ১৮৫, ৩৬৯, ৩৭৬।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় তাঁর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ‘ঈমান কী?’ তিনি বললেন, ‘ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, (কিয়ামতের দিন) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রাসুলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইসলাম কী?’ তিনি বললেন, ‘ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ জাকাত আদায় করবেন এবং রমাযান-এর সিয়াম ব্রত পালন করবেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইহসান কী?’ তিনি বললেন, ‘আপনি এমনভাবে আল্লাহর ‘ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।’ ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিয়ামত কবে?’ তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে আমি আপনাকে কিয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছি, বাঁদি যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। (কিয়ামতের জ্ঞান) সেই পাঁচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ জানে না।’ অতঃপর আল্লাহর রাসূল ﷺ এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন-

اِنَّ اللّٰہَ عِنۡدَہٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ  وَیُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ  وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَکۡسِبُ غَدًا ؕ  وَمَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ٪

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহর নিকট কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। আর তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং জরায়ূতে যা আছে, তা তিনি জানেন। আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। সুরা লোকমান : ৩৪

এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেন, ‘তোমরা তাকে ফিরিয়ে আন।’ তারা কিছুই দেখতে পাইল না। তখন তিনি বললেন, ‘ইনি জিবরীল (আ)। লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন। সহিহ বুখারি : ৫০, সহিহ মুসলিম : ১০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৪, ৪০৪৪; সহিহ ইবনে খুযায়মাহ : ২২৪৪, আহমাদ ৯৫০১, হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ (أركان الإيمان) ছয়টি :

কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাইলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-

(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান, 

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, 

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান,

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং

(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।

(১) আল্লাহর ওপর ঈমান  (١ الإيمانُ باللهِ),

কী বিশ্বাস করতে হব- আল্লাহ একমাত্র উপাস্য (ইলাহ)। তিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিজিকদাতা ও শাসক। তাঁর কোনো শরীক নেই—না সত্তায়, না গুণে, না ইবাদতে। তিনি দৃষ্টিগোচর নন, কিন্তু সবকিছুই দেখেন ও জানেন। তিনি রাগ করেন, ভালোবাসেন, রহমত করেন এবং শাস্তি দেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেহই নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالمَلَائِكَةِ),

বিশ্বাস করতে হবে, ফেরেশতারা আল্লাহর তৈরি করা আলো সদৃশ জীব। তারা খাওয়া-দাওয়া করে না, ঘুমায় না, অবাধ্য হয় না। তারা সার্বক্ষণিক আল্লাহর আদেশ পালন করে থাকে। কিছু কিছু ফিরিশতার কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। জিবরা্ই (আ.) যুগে যুগে নবি রাসুলদের নিকট অহি আনয়নকারী।  মিকাঈল (আ.) আল্লাহ আদেশে রিজিক ও বৃষ্টি বণ্টন করে থাকেন। ইসরাফীল (আ.) আল্লাহর আদেশে কিয়ামতের পূর্বে শিঙ্গা ফুঁকবেন। আজরাইল (আ.) বা মালাকুল মউত আল্লাহ আদেশে তার সৃষ্টি জীবের জান কবজ করে থাকেন। ইহা ছাড়া মানুষের ডানে বামে আমল লেখক ফিরিশতা থাকেন। সামনে পিছে মানুষ হিফাজতের জন্য ফিরিশতা থাকেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَکَمۡ مِّنۡ مَّلَکٍ فِی السَّمٰوٰتِ لَا تُغۡنِیۡ شَفَاعَتُہُمۡ شَیۡئًا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اَنۡ یَّاۡذَنَ اللّٰہُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَیَرۡضٰی

অর্থ : আর আসমানসমূহে অনেক ফেরেশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনোই কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট, তার ব্যাপারে অনুমতি দেয়ার পর। সুরা কামার : ২৬

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান  ( الإيمانُ بالكُتُبِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ যুগে যুগে মানব জাতির হিদায়াতের জন্য কিতাব দিয়েছেন। ইহার মাঝে প্রধান কিতাব চারটি। যথা-

তাওরাত যা মূসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

জাবুর যা দাউদ (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

ইনজীল যা ঈসা (আ.) এর উপর নাজিল হয়েছে।

সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব কুরআন যা  মুহাম্মদ ﷺ এর উপর নাজিল হয়েছে। কুরআন পূর্ববর্তী সব কিতাবকে বাতিল করে দিয়েছে এবং এটিই চিরকাল প্রযোজ্য।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

بِالۡبَیِّنٰتِ وَالزُّبُرِ ؕ وَاَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الذِّکۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَیۡہِمۡ وَلَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ

অর্থ : তাদের প্রেরণ করেছিলাম স্পষ্ট নিদর্শন ও গ্রন্থসহ এবং তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে। সুরা নাহল : ৪৪

(৪) রাসুলগণের প্রতি ঈমান (٤ الإيمانُ بالرُّسُلِ),

বিশ্বাস করতে হবে, আল্লাহ প্রতি জাতির জন্য একজন করে রাসুল পাঠিয়েছেন। তারা মানুষ নন, ফেরেশতা নন। সকল রাসুল তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সদস্য হলেন মুহাম্মদ ﷺ।  তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ  وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا 

অর্থ : মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবি। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। সুরা আহযাব : ৪০

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং ( الإيمانُ باليَوْمِ الآخِرِ)

বিশ্বাস করতে হবে, মৃত্যুর পর সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে। হাশর-মহাশর, হিসেব-নিকাশ, মীযান (আমলের পাল্লা), সিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম এসব বাস্তব বিষয়। জান্নাত হবে মুমিনদের চিরস্থায়ী পুরস্কার। জাহান্নাম হবে কুফর ও গুনাহগারদের শাস্তির স্থান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَّاَنَّ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ اَعۡتَدۡنَا لَہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا 

অর্থ : আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আজাব। সুরা ইসরা : ১০

(৬) তাকদীর বা পূর্ব নিয়তির প্রতি ঈমান (٦ الإيمانُ بالقَدَرِ) ।

বিশ্বাস করতে হবে, সবকিছু আল্লাহর জ্ঞানে ও ইচ্ছায় ঘটে। যা হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে সবকিছু আল্লাহ জানেন। মানুষের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ—সব আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে, তবে আল্লাহর চূড়ান্ত ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ.

অর্থ : আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি। সুরা কামার : ৪৯

এই ছয়টি বিষয়ের প্রতি ঈমানই একটি মুসলিমের ঈমানের মূল ভিত্তি। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস থাকা মানে হলো সে ইসলামের মূল ভিত্তিতে বিশ্বাসী।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

ঈমানের মাপকাঠি ও বৈশিষ্ট্য

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি : 

আমাদের ঈমানের মাপকাঠি হবে সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত। সেই সময়কার মুশরিক ও মুনাফিকদের আল্লাহ সাহাবাদের (রা.) ঈমানের মত ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সাহাবাদের (রা.) ঈমান কে-ই ঈমানের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন। যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَإِنۡ ءَامَنُواْ بِمِثۡلِ مَآ ءَامَنتُم بِهِۦ فَقَدِ ٱهۡتَدَواْ‌ۖ وَّإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا هُمۡ فِى شِقَاقٍ۬‌ۖ فَسَيَكۡفِيڪَهُمُ ٱللَّهُ‌ۚ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ

অর্থ : তোমরা যেমনি ঈমান এনেছো তারাও যদি ঠিক তেমনিভাবে ঈমান আনে, তাহলে তারা হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলতে হবে ৷ আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে সোজা কথায় বলা যায়। (সুরা বাকারা : ১৩৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُ‌ۗ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَـٰكِن لَّا يَعۡلَمُونَ

অর্থ : আর যখন তাদের বলা হয়েছে, অন্য লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো  তখন তারা এ জবাবই দিয়েছে- আমরা কি ঈমান আনবো নির্বোধদের মতো? সাবধান !আসলে এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা জানে না ৷ সুরা বাকারা : ১৩

ঈমানদারের কিছু লক্ষন বা বৈশিষ্ট্য :

১. কুরআন তিলওয়াত ঈমানদারদের ঈমান বৃদ্ধিপায় করে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَاِذَا تُلِیَتۡ عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتُہٗ زَادَتۡہُمۡ اِیۡمَانًا وَّعَلٰی رَبِّہِمۡ یَتَوَکَّلُوۡنَ ۚۖ

মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে। সুরা আনফাল : ০২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِذَا مَا أُنْزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ 

অর্থ : আর যখন কোন সুরা অবতীর্ণ করা হয় তখন কেহ কেহ বলে, তোমাদের মধ্যে এই সুরা কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অবশ্যই যে সব লোক ঈমান এনেছে, এই সুরা তাদের ঈমানকে বর্ধিত করেছে এবং তারাই আনন্দ লাভ করছে। সুরা তাওবা : ১২৪

২. ঈমানদার নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার ভাইদের জন্যও তা পছন্দ করবে।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ـ قَالَ ‏ “‏ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ – أَوْ قَالَ لِجَارِهِ – مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ‏

অর্থ : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৬, সুনানে তিরমিজি ২৫১৫, সুনানে নাসায়ি ৫০১৬, ৫০১৭, ৫০৩৯; আহমাদ ১২৩৯০, ১২৭৩৪, সুনানে দারিমী ২৭৪০।

৩.  মুমিনের নিকট নিজ পিতা ও সন্তান থেকেও রাসুলুল্লাহ ﷺ বেশী প্রিয় : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন-

 لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

অর্থ : তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৭, সুনানে নাসায়ি : ৫০১৩-১৪, আহমাদ : ১২৭৩৯, ১৩৪৯৯, সুনানে দারিমী : ২৭৪১।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ، وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي

অর্থ : যে লোকের মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ ঘটে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে। (১) তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা দুনিয়ার সকল কিছু হতে অধিক প্রিয়। (২) যে লোক একজন মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই ভালোবাসে। (৩) যে লোক কুফরি হতে নাজাতপ্রাপ্ত হয়ে ঈমান ও ইসলামের আলো গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এত অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।  সহিহ বুখারি : ২১, সহিহ মুসলিম : ৪৩, নাসায়ি ৪৯৮৮, তিরমিজি ২৬২৪, ইবনে মাজাহ ৪০৩৩, আহমাদ ১২৭৬৫।

৪. ঈমানদার পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ ‏”‏ ‏.

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৮, সুনানে তিরমিজি : ২৬৮৮, আহমাদ ৮৮৪১, ৯৪১৬।

আবু উমামাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتكْمل الْإِيمَان

যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসে, আর আল্লাহর ওয়াস্তে কারও সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত করে, আবার আল্লাহর ওয়াস্তেই দান-খয়রাত থেকে বিরত থাকে। সে ঈমান পূর্ণ করেছে। সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮১, মিশকাত : ২৯, সহিহুল জামি ;৫৯৬৫।

৫. কোন ঈমানদার অপর ঈমানদারকে গালি দিতে পারে না :

عَنْ زُبَيْدٍ قَالَ سَأَلْتُ أَبَا وَائِلٍ عَنِ الْمُرْجِئَةِ فَقَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ اللهِ أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

অর্থ : জুবাইদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু ওয়াইল (রহ.) কে মুরজিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ আমার নিকট বলেছেন, নবি ﷺ বলেছেন-

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.

মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরি। সহিহ বুখারি : ৪৮, সহিহ মুসলিম : ৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৮৩, ২৬৩৪-৩৫, সুনানে নাসায়ি : ৪১০৫-১৩।

৬. ঈমানদার লজ্জাশীল হবে :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 “‏ الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ ‏”

অর্থ :, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা। সহিহ বুখারি : ৯, সহিহ মুসলিম ৩৫, মিশকাত : ৫, সুনানে দারিমী : ৪৬৭৬, সুনানে নাসায়ি ৫০০৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৭, আহমাদ : ৯৩৬১, ইবনে হিব্বান : ১৬৬।

৭. ঈমানদার প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান প্রদর্শন করবে :

আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন-

‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ ‏

অর্থ যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথির অভ্যর্থনা ও আদর-যত্ন করে। আর যে লোক আল্লাহ তায়ালা ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২৫০০, ইরওয়া : ২৫২৫, আবু দাঊদ : ৩৭৪৮, ৫১৫৪,  সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫০৬, দারিমী : ২০৩৬, আস সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ১৭১০৬।

আবু শুরাইহ আদাবী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার দু’কান শুনেছে এবং দুই চক্ষু দেখেছে, যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা বলছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

‏”‏ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا وَمَا جَائِزَتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ يَوْمُهُ وَلَيْلَتُهُ وَالضِّيَافَةُ ثَلاَثَةُ أَيَّامٍ فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ – وَقَالَ – مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালোভাবে নিজ মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তখন সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ভালোভাবে মানে কী? তখন তিনি বললেন, তাকে একদিন ও এক রাত্রি আপ্যায়ন করবে। আর (সাধারণভাবে) মেহমানদারির সময়কাল তিন দিন। এর চাইতে বেশি দিন মেহমানদারি করা তার জন্য সাদাকা স্বরূপ। তিনি আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। সহিহ মুসলিম : ৪৮, ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৫, সুনানে তিরমিজি : ১৯৬৭

৮. প্রথম ঈমান শিখবে অতঃপর কুরআন শিখবে :

عَنْ جُنْدُبِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ    ـ وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ فَتَعَلَّمْنَا الإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا ‏”‏ ‏

অর্থ : জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবি ﷺ এর সাথে ছিলাম। আমরা ছিলাম শক্তিশালী এবং সক্ষম যুবক। আমরা কুরআন শেখার পূর্বে ঈমান শিখেছি, অতঃপর কুরআন শিখেছি এবং তার দ্বারা আমাদের ঈমান বেড়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬১

৯. ঈমান আনতে হবে শুধু ইসলাম ধর্মের উপর :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يسمع بِي أحدق مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ إِلَّا كَانَ من أَصْحَاب النَّار»

অর্থ : যে প্রতিপালকের হাতে মুহাম্মাদের জীবন তাঁর কসম! এ উম্মাতের যে কেউই চাই ইহুদি হোক বা খ্রিষ্টান, আমার রিসালাত ও নুবূওয়্যাত মেনে না নিবে ও আমার প্রেরিত শারীয়াতের উপর ঈমান না এনেই মৃত্যুবরণ করবে, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামি। সহিহ : মুসলিম ১৫৩, মিশকাত : ৯, আহমাদ ৮৬০৯, সহীহাহ ১৫৭, সহিহাহ আল জামি : ৭০৬৩।

১০. ঈমানদার মুসলিমের হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে :

আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ»

যে ব্যক্তি মুসলিম যার হাত ও মুখ হতে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে। আর (প্রকৃত ও পরিপূর্ণ) মুমিন সে ব্যক্তি যার থেকে মানুষ নিজের জীবন ও সম্পদকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করে। মিশকাত : ৩২,  সুনানে নাসায়ি : ৪৯৯৫, সহিহ জামি : ৬৭১০।

১১. ঈমানদার আমানতকারী ও ওয়াদা পুরনকাররী

وَعَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَلَّمَا خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَّا قَالَ: «لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الْإِيمَانِ

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরূপ খুতবা খুব কমই দিয়েছেন যাতে এ কথা বলেননি যে, যার আমানাতদারী নেই তার ঈমানও নেই এবং যার অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বীনও নেই। মিশকাত : ৩৪, সহীহুত্ তারগিব : ৩০০৪, শু‘আবুল ঈমান ৪০৪৫।

১২. মুমিনকে পাপাচার পীড়া দেয় :

আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক লোক রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! ঈমান কী? তিনি ﷺ বললেন-

«مَا الْإِيمَانُ قَالَ إِذَا سَرَّتْكَ حَسَنَتُكَ وَسَاءَتْكَ سَيِّئَتُكَ فَأَنْتَ مُؤْمِنٌ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا الْإِثْمُ قَالَ إِذَا حَاكَ فِي نَفْسِكَ شَيْءٌ فَدَعْهُ»

যখন তোমাকে নেক (সৎ) কাজ আনন্দ দিবে ও খারাপ (অসৎ) কাজ পীড়া দিবে, তখন তুমি মুমিন। আবার সে লোকটি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! খারাপ (অসৎ) কাজ কি? উত্তরে তিনি ﷺ বললেন, যখন কোন কাজ করতে তোমার মনে দ্বিধা ও সন্দেহের উদ্রেক করে (তখন মনে করবে এটা গুনাহের কাজ), তখন তা ছেড়ে দিবে। মিশকাত : ৪৪, আহমাদ ২১৬৬২, সহীহুত্ তারগিব ১৭৩৯।

১৩। পাপ কাজ করার সময় মানুষের ঈমান চলে যায় :

ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহﷺ বলেছেন-

لاَ يَزْنِي الْعَبْدُ حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَقْتُلُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ

মুমিন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। মুমিন থাকা অবস্থায় কোন চোর চুরি করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ মদ্য পান করে না। মুমিন থাকা অবস্থায় কেউ হত্যা করে না।

ইক্বরিমাহ (রহ.) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, তার থেকে ইমান কিভাবে ছিনিয়ে নেয়া হয়? তিনি বললেন, এভাবে। আর অঙ্গুলিগুলো পরস্পর জড়ালেন, এরপর অঙ্গুলিগুলো বের করলেন। যদি সে তওবা করে তবে আগের অবস্থায় এভাবে ফিরে আসে। এ বলে অঙ্গুলিগুলো আবার পরস্পর জড়ালেন। সহিহ বুখারি : ৬৮০৯, মিশকাত : ৫৪

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মুমিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম ৫৭, সুনানে আবু দাঊদ : ৪৬৮৯, সুনানে নাসায়ি : ৪৮৭০, সুনানে তিরমিজি : ২৬২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৬, মিশকাত : ৫৩, সহিহাহ : ৩০০০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *