মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১. সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ছড়া বা গান না গেয়ে বরং দুআ ও কুরআন পাঠ করানো উচিত।
সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় অনেক মা-বাবা বিভিন্ন ধরনের ছড়া বা গান ব্যবহার করেন, যেমন: ‘আয় আয় চাঁদ মামা’, ‘আয় আয় টিয়ে’, ‘হাট্টিমাটিম টিম’ ইত্যাদি। এই ছড়াগুলোর হয়তো কোনো গভীর অর্থ নেই, কিন্তু শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য এগুলো যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইসলামে শিশুদের ভালো গুণ ও আদর্শ দিয়ে লালন-পালন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে, শিশুকে ঘুম পাড়ানোর সময় যদি কোনো অর্থহীন ছড়া না গেয়ে বরং ইসলামিক দুআ, কোরআনের ছোট ছোট সূরা, বা আল্লাহর প্রশংসা করে কোনো গান শোনানো হয়, তাহলে সেটি শিশুর জন্য খুবই উপকারী হতে পারে।
ক. শিশুর কানে ভালো কথা প্রবেশ করানো: ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু কোরআনের আয়াত বা আল্লাহর প্রশংসামূলক কথা শোনে, তাহলে তার মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব কথা তার অবচেতন মনে গেঁথে যাবে, যা ভবিষ্যতে তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
খ. স্মৃতিশক্তি ও মানসিক বিকাশে সহায়তা: নিয়মিত দুআ ও সূরা শুনতে শুনতে একসময় তার সেগুলো মুখস্থ হয়ে যাবে। এটি তার স্মরণশক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে।
গ. আল্লাহর রহমত লাভ: বিশ্বাস করা হয় যে, ঘুম পাড়ানোর সময় এই ধরনের ইসলামিক পাঠ করলে শিশুর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। এতে শিশু শান্ত ও নিরাপদে ঘুমায়।
সুতরাং, মা-বাবারা চাইলে প্রথাগত ছড়া বা গানের পরিবর্তে নতুন এই পদ্ধতিটি অবলম্বন করতে পারেন। এতে শিশু ঘুমের সময় প্রশান্তি পাবে এবং তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশও ঘটবে।
২. রূপকথার বদলে কুরআন ও হাদিসের গল্প
শিশুদের গল্প শোনানো তাদের মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তারা কল্পনা করতে শেখে এবং নৈতিক শিক্ষা লাভ করে। আমাদের সমাজে প্রচলিত দাদি-নানিদের বলা রূপকথার গল্পগুলো, যেমন – রাজা-রানি, রাজপুত্র-রাজকন্যা বা রাক্ষসের গল্প, শিশুদের মনকে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। তবে এই গল্পগুলোর বেশিরভাগই কাল্পনিক এবং বাস্তব জীবনের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
রূপকথার বদলে যদি শিশুদের কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসুল, সাহাবি, বা অন্যান্য সত্য ঘটনার গল্প শোনানো হয়, তাহলে তারা একই সাথে বিনোদন ও শিক্ষা লাভ করবে। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
বাস্তবতার শিক্ষা: কোরআন ও হাদিসের গল্পগুলো বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এসব গল্পের মাধ্যমে শিশুরা শিখতে পারে যে জীবনে সফলতা, ব্যর্থতা, এবং চ্যালেঞ্জ থাকে। তারা বুঝতে পারে যে ভালো কাজ করলে কী ফল হয় এবং খারাপ কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে।
আদর্শ চরিত্রের সাথে পরিচয়: এসব গল্পে আল্লাহ্র নবী, রাসুল, এবং সাহাবিদের মতো মহান চরিত্রদের সাথে শিশুদের পরিচয় ঘটে। তাদের সততা, সাহসিকতা, ধৈর্য, এবং ত্যাগের গল্প শুনে শিশুরা অনুপ্রাণিত হয় এবং তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করে।
ধর্মীয় জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি: ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা কোরআন ও হাদিসের গল্প শোনে, তাহলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়। এটি তাদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং ভবিষ্যতে তাদের ধর্মীয় শিক্ষায় সাহায্য করে।
নৈতিকতার বিকাশ: এসব গল্পে সত্য, মিথ্যা, ন্যায়, অন্যায়, ভালো, মন্দ – এগুলোর স্পষ্ট ধারণা থাকে। এটি শিশুদের সঠিক-ভুল চিনতে সাহায্য করে এবং তাদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।
সুতরাং, শিশুদের গল্প শোনানোর সময় রূপকথার পরিবর্তে কোরআন ও হাদিসের সত্য গল্প শোনানোর অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে করে শিশুরা বিনোদন পাওয়ার পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা লাভ করবে।
৩. শিশুদের জন্য সঠিক বই নির্বাচন
শিশুদের মন ও মস্তিষ্কের বিকাশে বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোন ধরনের বই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেদিকে অভিভাবকদের বিশেষভাবে নজর রাখা উচিত। ভূত-প্রেত বা কাল্পনিক অশরীরী শক্তির গল্প নিয়ে লেখা বইগুলো শিশুদের মনে ভীতির সৃষ্টি করতে পারে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
প্রাসঙ্গিক। শিশুদের জন্য এমন বই কেনা উচিত, যা তাদের জ্ঞান ও নৈতিকতার ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করবে। বাজারে এখন অনেক ভালো মানের বই পাওয়া যায়, যেমন-
ইসলামিক শিক্ষামূলক বই: শিশুদের উপযোগী করে লেখা নবী-রাসুল এবং সাহাবিদের জীবনী, কোরআন ও হাদিসভিত্তিক গল্পের বই। এসব বই থেকে তারা মহৎ চরিত্রগুলোর আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারবে এবং নৈতিক শিক্ষা লাভ করবে।
সাধারণ জ্ঞানের বই: বিজ্ঞান, ইতিহাস, পরিবেশ, বা অন্যান্য বিষয়ের ওপর লেখা সহজবোধ্য বই শিশুদের কৌতূহল বাড়াতে সাহায্য করবে।
এছাড়াও, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান বই পড়ুক, তাহলে আপনাকেও তাদের সামনে বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। এতে তারা বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে এবং এটিকে একটি ভালো অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করবে।
৩. শিশুদের খেলাধুলা ও সুস্থ বিকাশ
শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার উচিত তাদের সাথে খেলা করা এবং বয়স অনুযায়ী খেলনা কিনে দেওয়া। খেলার সামগ্রী কেনার সময় প্যাকেটে উল্লেখিত বয়সসীমা দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শিশুর আগ্রহ বজায় থাকে এবং খেলনাটি তার বিকাশে সঠিক ভূমিকা পালন করে।
এছাড়াও, শিশুদের শুধু কোলে-পিঠে না রেখে তাদের মাটি, বালি বা কাদার মতো প্রাকৃতিক জিনিসের সাথে খেলতে দেওয়া উচিত। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে নতুন কিছু শিখতে পারে। খেলার মাধ্যমে তারা শুধু আনন্দই পায় না, বরং তাদের সৃজনশীলতা ও জানার আগ্রহও বৃদ্ধি পায়।
৪. শিশুর সুস্থ বিকাশে মোবাইল ও টিভি থেকে দূরে রাখুন
অনেক মা-বাবা নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য বা শিশুর কান্না থামাতে তার হাতে মোবাইল বা টিভির রিমোট তুলে দেন। তারা হয়তো সাময়িক স্বস্তি পান, কিন্তু অজান্তেই শিশুর বড় ক্ষতি করে ফেলেন।
শিশুরা যখন মোবাইল বা টিভিতে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই ডিভাইসগুলো তাদের বাস্তব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, শিশু একা একা থাকতে শেখে এবং আশেপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশতে পারে না। তাই, শিশুকে সাময়িকভাবে ব্যস্ত রাখার জন্য মোবাইল বা টিভির ওপর নির্ভর না করে তার সাথে খেলার চেষ্টা করুন। তাকে বাইরে নিয়ে যান, নতুন কিছু দেখান বা বই পড়ে শোনান। এতে শিশু আপনার সাথে সুন্দর সময় কাটাবে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে।
৫. শিশুকে খাওয়ানোর সময় মোবাইল ও টিভি বন্ধ রাখুন
অনেক মা-বাবা শিশুকে খাওয়ানোর জন্য মোবাইল বা টিভি ছেড়ে দেন, যাতে শিশু সেদিকে তাকিয়ে থাকে আর সহজে খাবার খায়। যদিও এই পদ্ধতিটি সাময়িক কাজে দেয়, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই ক্ষতিকর।
খাওয়ার সময় মোবাইল বা টিভিতে মনোযোগ দিলে শিশুরা খাবারের স্বাদ, গন্ধ বা গঠন বুঝতে পারে না। ফলে খাবারের পুষ্টিগুণ তাদের শরীরে সঠিকভাবে কাজ করে না। এই অভ্যাস শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করে। তাই, শিশুকে খাওয়ানোর সময় সব ধরনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। খাবারের সময়টাকে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করুন, যেখানে আপনি আপনার সন্তানের সাথে কথা বলতে পারেন এবং তাকে খাওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে পারেন।
৬. শিশুর প্রশ্নের জবাব দেওয়া: ধৈর্য ও আন্তরিকতা
শিশুরা যখন কথা বলতে শেখে, তখন তাদের মনে হাজারো প্রশ্ন উঁকি দেয়। তাদের কৌতূহল মেটাতে তারা একই প্রশ্ন বারবার করতে পারে, বা এমন প্রশ্ন করতে পারে যা আপনার কাছে সহজ বা কঠিন মনে হতে পারে। এই সময়ে বিরক্ত না হয়ে তাদের প্রতিটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শিশুদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া বা দায়সারা জবাব দেওয়া উচিত নয়। এতে তারা নিজেদের অবহেলিত মনে করতে পারে। যদি কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর আপনার জানা না থাকে, তবে সততার সঙ্গে বলুন, “আমি জেনে তোমাকে পরে জানাব।” এবং অবশ্যই সেই কথা রাখুন। এভাবে আপনি শিশুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ দেখালে তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ আরও বাড়বে, এবং তারা আপনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শিখবে। তাদের কৌতূহলকে সম্মান করলে তারা শেখার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে।
৭. শিশুকে আল্লাহর সাথে পরিচয়:
শিশুদের বয়স যখন একটু বাড়ে এবং তারা বুঝতে শুরু করে, তখন তাদের মহান আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত। সহজ ভাষায় তাদের বোঝানো যেতে পারে যে আল্লাহ আমাদেরকে এবং এই পুরো পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন।
তাদেরকে বোঝান যে আল্লাহ আমাদের ভালো কাজ দেখলে খুশি হন। যখন আমরা ভালো ব্যবহার করি, সত্য কথা বলি, বা অন্যকে সাহায্য করি, তখন আল্লাহ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং আমাদের প্রার্থনা শোনেন। একই সাথে, তাদের এই বিষয়টিও বোঝানো প্রয়োজন যে খারাপ কাজ করলে বা মিথ্যা বললে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। এমনকি লুকিয়ে কোনো খারাপ কাজ করলেও আল্লাহ তা দেখেন। এভাবে শিশুদের মনে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা তৈরি হবে। এটি তাদের মধ্যে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
৮. শিশুদের কুরআনের সাথে পরিচয়:
অনেক মুসলিম পরিবারে কুরআনকে শ্রদ্ধার নামে দূরে সরিয়ে রাখা হয়—একে স্পর্শ করা যাবে না, শুধু কাপড়ে মুড়িয়ে উঁচু তাকে রাখতে হবে, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। এই ধরনের ভুল ধারণা শিশুদের মনে কুরআন সম্পর্কে এক ধরনের ভয় তৈরি করে।
শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকেই কায়দা বা আমপারা পড়ার পাশাপাশি সরাসরি কুরআনের মূল আরবি কপিটি হাতে ধরতে এবং দেখতে দেওয়া উচিত। এর ফলে তাদের মনে কুরআনের প্রতি কোনো অযৌক্তিক ভয় বা দূরত্ব তৈরি হবে না। বরং, তারা একে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। এটি তাদের পবিত্র কিতাবের সাথে একটি সরাসরি এবং ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
৯. শিশুদের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা
শিশুরা ছোট হলেও তাদের সামনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এমনটা ভাবা ঠিক নয় যে তারা কিছুই বুঝবে না। বরং, তাদের কৌতূহল মেটাতে এবং নতুন কিছু শেখানোর জন্য এটি একটি চমৎকার সুযোগ।
শিশুদের উপযোগী বিজ্ঞানের অনেক বই বাজারে পাওয়া যায়, যা তাদের জন্য সহজবোধ্য। এই বিষয়গুলো যখন আল্লাহর সৃষ্টির সাথে মিলিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন তা আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। যেমন: আকাশের বিশালতা, বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্র, বা প্রকৃতির নিয়মাবলি নিয়ে কথা বলার সময় কুরআন ও হাদীসের উদাহরণ তুলে ধরা যায়। এভাবে শিশুরা শুধু বিজ্ঞানই শিখবে না, বরং আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে তাদের মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হবে।
১০. শিশুদের গ্রামের সাথে পরিচয় করানো
শহুরে জীবনে বেড়ে ওঠা শিশুদের অনেকেই গ্রামের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। মা-বাবার উচিত তাদের মাঝেমধ্যে গ্রামে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানকার জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
শিশুদের কৃষক, রাখাল, গবাদি পশু, ফসলের ক্ষেত ও খামার ইত্যাদি দেখানো উচিত। এতে তারা প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারে এবং জীবনের মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারে। একইভাবে, যখন গ্রামের কোনো আত্মীয় বা মানুষজন বেড়াতে আসে, তখন তাদের প্রতি ভালো আচরণ করা জরুরি। এর মাধ্যমে শিশুরা সম্মান এবং শিষ্টাচার শিখবে এবং মানুষের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হবে। এটি তাদের মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করবে।
১১. শিশুদের ভাগ করে নিতে শেখানো
শিশুদের মধ্যে কোনো কিছু ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু, বিশেষ করে যারা একা থাকে, তারা অন্যদের সাথে জিনিসপত্র ভাগ করতে চায় না। এটি মূলত মা-বাবার প্রশিক্ষণের অভাব থেকে হয়।
মা-বাবা যদি শুরু থেকেই সচেতন থাকেন এবং শিশুকে ভাগাভাগি করার গুরুত্ব শেখান, তাহলে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব। যখন কোনো শিশু অন্য শিশুর সাথে খেলনা বা খাবার ভাগ করে নেয়, তখন তাকে উৎসাহিত করা উচিত। এর মাধ্যমে শিশু অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখে এবং তার সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে।
১২. ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো
যেসব পরিবারের একাধিক সন্তান আছে, সেখানে বড়দের ছোটদের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো খুবই জরুরি। শিশুরা নিজের থেকে সব কিছু শেখে না, তাই বাবা-মায়ের উচিত তাদের এই বিষয়ে সাহায্য করা।
বড় ভাই বা বোন কীভাবে ছোটদের দেখাশোনা করবে, তাদের খেয়াল রাখবে এবং বিভিন্ন কাজে সাহায্য করবে, তা শেখানো উচিত। এটি শুধু তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধই তৈরি করে না, বরং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও নির্ভরশীলতাও বাড়ায়। পাহাড়ি এলাকার উপজাতিদের মধ্যে এই অভ্যাসটি খুব সাধারণ—যেখানে বড়রা ছোটদের পিঠে নিয়ে সংসারের কাজ করে। এমন দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি এবং শিশুদের মধ্যে এই মানবিক গুণটি গড়ে তুলতে পারি।
১৩. ছোট শিশুদের একা বাসায় রাখা নিরাপদ নয়
ছোট শিশুদের একা বাসায় রেখে বাইরে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও অনেক মা-বাবার কাজের প্রয়োজনে এমনটা করতে হয়, কিন্তু শিশুর সুরক্ষার কথা ভেবে এটি থেকে বিরত থাকা উচিত।
আমেরিকা এবং কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতে আইন রয়েছে যে, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের একা বাসায় রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর প্রধান কারণ হলো, শিশুরা অবুঝ এবং খেলার ছলে যেকোনো ধরনের বিপজ্জনক কাজ করে ফেলতে পারে। যেমন: ধারালো জিনিস দিয়ে খেলা, বারান্দার রেলিংয়ে ওঠা, বা ম্যাচ নিয়ে খেলা করা। সাধারণত বড়দের উপস্থিতিতে তারা এই ধরনের কাজ করে না, কিন্তু একা থাকলে নিজেদের স্বাধীন মনে করে এবং কৌতূহলবশত দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।
তাই, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে, তাদের একা বাসায় রাখা থেকে বিরত থাকা জরুরি। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তাদের সাথে রেখে যাওয়া উচিত।
১৪. শিশুদের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়
শিশুদের গায়ে হাত তোলা বা শারীরিক শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের সমাজে একসময় শিশুদের মারধর করাকে সংশোধনের একটি উপায় হিসেবে মনে করা হতো, কিন্তু আধুনিক শিশু মনোবিজ্ঞান এবং ইসলাম—কোনোটাই এই ধরনের অমানবিক আচরণকে সমর্থন করে না।
শিশুকে আঘাত করা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। ইসলামেও কারও মুখে আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই, শারীরিক শাস্তি না দিয়ে ভালোবাসা, ধৈর্য এবং যুক্তির মাধ্যমে শিশুকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। এতে শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
১৫. দশ বছর বয়স থেকে শিশুদের জন্য আলাদা বিছানা
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, শিশুরা ১০ বছর বয়স হলে তাদের বিছানা বাবা-মায়ের থেকে আলাদা করে দেওয়া উচিত। আমাদের সমাজে সাধারণত শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমায়, তবে এটি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সহিহ হাদিসে এসেছে-
আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-
“ مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে তখন (সালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে।[ সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৫, আহমাদ : ৬৬৮৯
এই বয়সে তাদের মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এবং গোপনীয়তার বোধ তৈরি হতে শুরু করে। আলাদা বিছানা তাদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে এবং একই সাথে পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শালীনতা রক্ষা করতে সহায়তা করে। এই নিয়মটি মেনে চলা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৬. সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করা ঠিক নয়
মা-বাবাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তানদের মধ্যে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না করা। যে পরিবারের একাধিক সন্তান আছে, সেখানে অনেক সময় দেখা যায় যে, মা-বাবা কোনো একটি সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেন বা বেশি ভালোবাসেন। এর ফলে অন্য সন্তানরা মনে কষ্ট পায় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব তাদের মানসিক বিকাশে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ করা বাধ্যতামূলক।
আমির (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নুমান ইবনু বাশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। নুমান (রাঃ) বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন।
সহিহ বুখারি : ২৫৮৭
সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব তাদের পড়ালেখায় মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এবং মা-বাবার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কমিয়ে দেয়। তাই সব সন্তানের সাথে সমান ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত, যেন তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত ও মূল্যবান মনে করে।
১৭. শিশুদের পুতুল খেলা: একটি সহজ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুদের পুতুল খেলার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। তবে এটি পরিষ্কার যে, শিশুরা একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত পুতুল দিয়ে খেলতে পারে।
৬১৩০. ’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত। সহিহ বুখারি : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০, আহমাদ : ২৬০২০
বাজারে যে প্লাস্টিক, কাপড় বা মাটির পুতুল পাওয়া যায়, সেগুলো সাধারণত পূজা করার জন্য তৈরি করা হয় না। তাই শিশুদের জন্য এগুলো দিয়ে খেলাধুলা করা বৈধ। তবে তাদের ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে বোঝানো উচিত যে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খেলা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
শিশুদের মধ্যে দান করার অভ্যাস তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। এটি একটি কার্যকরী পদ্ধতি হতে পারে যে, প্রতি বছর তাদের খেলনাগুলো দিয়ে দরিদ্র শিশু বা হাসপাতালের শিশুদেরকে উপহার দেওয়া। এর মাধ্যমে শিশুরা কেবল পুতুল খেলার প্রতি তাদের আসক্তি কমাতে শেখে না, বরং তাদের মধ্যে অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতাও তৈরি হয়। এই অভ্যাস তাদের মধ্যে সহানুভূতি, উদারতা এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্ম দেয়। এভাবে খেলার মাধ্যমে এবং একই সাথে নৈতিক শিক্ষাও দেওয়া সম্ভব।
শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ২৫টি টিপস :
১. ঘুমানোর অভ্যাস: শিশুরা যখন ঘুমায়, বাবা-মায়ের উচিত তাদের সাথে কিছুটা সময় ঘুমানো। এতে তাদের ঘুমের সময়কাল বাড়ে এবং তারা শান্তিতে ঘুমায়।
২. খাবারের নিয়ম: শিশুদের কখনোই শুয়ে শুয়ে খেতে দেবেন না। এর ফলে খাবার শ্বাসনালীতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. শান্ত পরিবেশ: শিশুদের সামনে উঁচু গলায় কথা বলা, ঝগড়া বা তর্ক করা থেকে বিরত থাকুন। এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে।
৪. স্ক্রিন টাইম: দুই বছর বয়সের আগে শিশুদের টিভি বা যেকোনো স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। দুই বছর পর থেকে দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা তাদের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখতে দিতে পারেন।
৫. সৃজনশীলতা: শিশুদের সামনে এমন গান বা কার্টুন চালাতে পারেন যেখানে ভালো কিছু শেখার আছে। তিন বছর বয়স থেকে এ ধরনের শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখতে দিলে তাদের সৃজনশীলতা বাড়বে।
৬. শারীরিক সুরক্ষা: শিশুদের কখনোই ঝাঁকাবেন না বা ছুঁড়ে মারবেন না। এর ফলে তাদের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগতে পারে।
৭. ইতিবাচক ব্যবহার: শিশুদের কড়া বা অপমানজনক কোনো নামে ডাকবেন না। সব সময় ইতিবাচক এবং উৎসাহমূলক কথা বলুন।
৮. খেলার গুরুত্ব: শিশুদের খেলাধুলা করতে দিন। এতে তারা নিজেদের থেকে কিছু করতে শেখে এবং বিভিন্ন কাজে তাদের আগ্রহ বাড়ে।
৯. দায়িত্ববোধ: শিশুদের তাদের খেলা শেষে খেলনা গুছিয়ে রাখতে শেখান। এতে ছোট থেকেই তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।
১০. মারামারি ও সহিংসতা: শিশুদের এমন কোনো কার্টুন বা খেলা দেখতে দেবেন না যেখানে মারামারি বা সহিংসতা আছে। এর ফলে তাদের মধ্যে হিংসা বা আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হতে পারে।
১১. শারীরিক কার্যকলাপ: প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট শিশুদের সাথে কিছু হালকা ব্যায়াম করুন। এতে তাদের শরীর ও মন দুটোই সতেজ থাকে।
১২. একা থাকার অভ্যাস: শিশুদের কিছু সময় একা থাকতে দিন। এতে তাদের নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তবে খেয়াল রাখুন, একা থাকা মানে বাবা-মায়ের দৃষ্টির আড়ালে নয়।
১৩. সম্পর্ক তৈরি: শিশুদের অন্যদের সাথে মিশতে বা খেলতে উৎসাহিত করুন। এতে তারা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে এবং মিলেমিশে থাকতে শিখবে।
১৪. স্বাধীনতা: শিশুদের নিজেদের জিনিসপত্র বা পোশাক পছন্দ করতে দিন। তাদের পছন্দকে সম্মান করুন।
১৫. পরিবারের সাথে খাবার: পরিবারের সবাই একসঙ্গে এক টেবিলে খেতে বসুন। এটি শিশুদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করে তোলে।
১৬. শিক্ষার গুরুত্ব: শিশুদের প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ মিনিট কিছু একটা পড়তে দিন। এতে তাদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হবে।
১৭. সুস্থ খাবার: শিশুদের সার ও কেমিক্যালমুক্ত শাকসবজি এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। এতে তাদের শরীর সুস্থ থাকে।
১৮. পুরস্কার ও সম্মান: শিশুরা বাবা এবং মা দুজনের কাছ থেকেই যেন উপহার পায়। এতে তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।
১৯. মাটির কাছাকাছি: শিশুদের কাদা, মাটি বা ধুলো নিয়ে খেলতে দিন। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে শেখে।
২০. খেলার মাধ্যমে শেখা: শিশুদের এমন খেলায় হারতে দিন যাতে তারা শিখতে পারে যে কীভাবে পরাজয়কে সামলে নিতে হয় এবং কীভাবে ভালো খেলতে হয়।
২১. শাস্তির বিকল্প: শিশুদের মারধর বা শারীরিক শাস্তি দেবেন না। এর পরিবর্তে তাদেরকে বুঝিয়ে বলুন যে খারাপ কাজের পরিণতি কী হতে পারে।
২২. স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া: শিশুরা যখন কাঁদে, তখন তাদের জোর করে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। তাদের নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে দিন।
২৩. সৃজনশীল খেলা: ছেলে বা মেয়ে নির্বিশেষে শিশুদের বাবার জুতো-শার্ট বা মায়ের শাড়ি-বড় পোশাক পরতে বাধা দেবেন না। এতে তাদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বাড়ে।
২৪. নতুন কাজের সুযোগ: শিশুদের নতুন নতুন কাজ করতে দিন এবং এতে তাদের উৎসাহ দিন, বাধা দেবেন না।
২৫. পটি ট্রেনিং: ছেলে শিশুদের তিন বছর বয়সে এবং মেয়ে শিশুদের দুই বছর বয়সে পটি ট্রেনিং দেওয়া ভালো। এটি তাদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে।
সন্তান প্রতিপালনে কিছু অসংগতি
১. শিশুর লালন-পালনে মুরুব্বীদের অবদান ও সীমাবদ্ধতা
আমাদের সমাজে শিশুদের লালন-পালনে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভূমিকা অপরিসীম। অনেক ক্ষেত্রে তারাই প্রথম হাতে ধরে শিশুকে বড় করে তোলেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অবদান অনস্বীকার্য। তবে বর্তমান যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে শিশু পরিচর্যা এবং শিক্ষায় অনেক নতুন তথ্য ও পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। তাই দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভালোবাসার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও দেখা যেতে পারে। এই বিষয়গুলো সুন্দর ও শ্রদ্ধার সাথে মোকাবিলা করা মা-বাবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও প্রচলিত কুসংস্কার
শিশুদের পরিচর্যার ক্ষেত্রে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু অনেক সময় তাদের এই অভিজ্ঞতা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় অনুমতির সাথে সংগতিপূর্ণ হয় না। এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। যেমন-
ক. চিকিৎসা বিষয়ক ভুল ধারণা:
শিশুদের রোগ-শোকে অনেক সময় বয়স্করা এমন কিছু ঘরোয়া বা অপ্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিশুদের জন্য যে টিকাগুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের অনেকেরই সঠিক ধারণা নেই। তারা মনে করেন, এটি অপ্রয়োজনীয় বা এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায় না, ফলে তারা হাম, পোলিও, ধনুষ্টংকারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
খ. মায়ের দুধে বাতাস লাগা
গ্রামাঞ্চলে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, যদি কোনো নবজাতকের পাতলা পায়খানা হয়, তাহলে এর কারণ হলো মায়ের দুধে ‘বাতাস লেগেছে’। এই বিশ্বাস থেকে মুরুব্বীরা নবজাতককে মায়ের দুধ পান করানো থেকে বিরত রাখেন। এটি খুবই বিপজ্জনক একটি প্রথা, যার কারণে নবজাতকের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
নবজাতকের পাতলা পায়খানা হলে তার শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। এমন অবস্থায় মায়ের দুধই হলো তার জন্য সবচেয়ে ভালো তরল খাবার যা তাকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু এই কুসংস্কারের ফলে যখন তাকে দুধ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন তার শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
নবজাতকের জন্য মায়ের দুধই একমাত্র আদর্শ খাবার, যা তার সঠিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। দুধ বন্ধ করে দিলে শিশুটি মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে। নবজাতককে দুধ পান করানো বন্ধ করলে মায়ের স্তনে দুধ জমে থাকে, যা ব্যথা ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় জোর করে এই দুধ ফেলে দেওয়া হয়, যা অপ্রয়োজনীয় এবং কষ্টকর।
নবজাতকের পাতলা পায়খানার পেছনে মূলত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো জীবাণু সংক্রমণ দায়ী। এটি মায়ের দুধের কারণে হয় না। মায়ের দুধ নবজাতককে এই ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তাই পাতলা পায়খানা হলে দুধ বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যদি কোনো নবজাতকের পাতলা পায়খানা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
গ. ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে ভুল সংশোধন
দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভুল পরিচর্যা বা ভুল ইসলামী শিক্ষা দিলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, তারা ভালোবাসা থেকেই এসব করেন। তাই তাদের মনে কষ্ট না দিয়ে বুঝিয়ে বলার কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
যখন কোনো ভুল দেখা যাবে, তখন সরাসরি তাদের ভুল না বলে বিনয়ের সাথে বলতে হবে, “মা/বাবা, এখন বিজ্ঞানীরা এটা করতে নিষেধ করে” অথবা “হুজুররা বলেছেন যে এটা ইসলামে অনুমোদিত নয়।”
যদি সম্ভব হয়, তাহলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য বা ইসলামী জ্ঞানের উৎস থেকে প্রমাণ দেখাতে পারেন। যেমন- কোনো নির্ভরযোগ্য ডাক্তারের ভিডিও, ইসলামিক স্কলারের লেকচার বা বইয়ের অংশবিশেষ।
সঠিক ইসলামী শিক্ষা : শিশুদের প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা যেমন- কালেমা, ছোট সূরা ইত্যাদি শেখানোর ক্ষেত্রেও মুরুব্বীদের ভুল হতে পারে। এক্ষেত্রে মা-বাবা হিসেবে আপনাদের নিজেদেরই সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। কারণ, আপনার যদি সঠিক জ্ঞান না থাকে, তাহলে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা বোঝা সম্ভব হবে না।
ঘ. দাদা-দাদী ও নানা-নানীর জন্য সঠিক জ্ঞানের ব্যবস্থা করা
শিশুর লালন-পালন ও প্রাথমিক শিক্ষায় দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভূমিকা অপরিসীম। তাই মা-বাবার পাশাপাশি তাদেরও আধুনিক ও সঠিক ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।
তাদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ডকুমেন্টারি বা ভিডিও লেকচার দেখতে ও শুনতে দিতে পারেন। যদি তারা বই পড়তে ভালোবাসেন, তবে এ সংক্রান্ত ভালো বই কিনে দিতে পারেন। তাদের সঙ্গে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে পারেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানিয়ে নতুন জ্ঞান সম্পর্কে তাদের উৎসাহিত করতে পারেন।
২. নবজাতের রোগমুক্তির জন্য তাবিজ প্রদান
শিশুদের রোগমুক্তি বা সুস্থতার জন্য তাবিজ ব্যবহার করা একটি প্রচলিত কুসংস্কার, যা আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলাম উভয় দিক থেকেই ভুল। এটি মূলত শিশুদের রোগবালাই বা ‘অশুভ দৃষ্টি’ থেকে রক্ষা করার একটি ভ্রান্ত ধারণা।
ক. চিকিৎসা বিজ্ঞান :
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রতিটি রোগের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। এই কারণ হতে পারে জীবাণু (যেমন- ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া), পুষ্টির অভাব, জেনেটিক সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন সঠিক ঔষধ, চিকিৎসা পদ্ধতি, অথবা কোনো বিশেষ থেরাপি। তাবিজের মধ্যে এমন কোনো উপাদান নেই যা এই জীবাণু বা শারীরিক সমস্যাকে দূর করতে পারে। যখন কোনো শিশুর অসুস্থতার জন্য তাবিজের ওপর নির্ভর করা হয়, তখন তাকে সঠিক এবং কার্যকর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এর ফলে শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং কখনো কখনো তা জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, যদি কোনো শিশুর নিউমোনিয়া হয় এবং তার বাবা-মা তাকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে তাবিজ পরিয়ে দেন, তাহলে জীবাণু ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়বে এবং শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে। তাবিজ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা তৈরি হয়। তারা মনে করে তাবিজই সব সমস্যার সমাধান, যার ফলে তারা আধুনিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা হারায়। মোট কথা, তাবিজ ব্যবহার করলে শিশুদের প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়, যার ফলে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।
খ. তাবির ব্যবহার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছোট শির্ক :
ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ
যে লোক কোনোকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ
আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলেন। (রাবী) ‘আবদুল্লাহ্ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সংবাদ বহনকারীকে পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়। সহিহ বুখারি : ৩০০৫, সহিহ মুসলিম : ২১১৫, আহমাদ : ২১৯৪৬
নোট : জাহেলি যুগে কুসংস্কারের কারণে উটের গলায় মালা লটকানো হতো যাতে উট বদ নজর থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ভ্রান্ত ধারণা ও রসম উৎখাতের ব্যবস্থা করেন।
আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রা.) আব্দুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-
إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ
যাদু, তাবিজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক
টিকা : এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শিরকি কালামের মাধ্যমে ঝাড় ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহিহ হাদিসে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারণ সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।
উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহিহ : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব রহ.
যদি কেউ এ ধারনা রাখেন যে ভালো মন্দ করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর তারপরও তাবিজ ব্যবহার করে তবে সে ছোট শির্কে লিপ্ত হলো। সে কারণে সে মুললিম থাকবে, কিন্তু যদি কেউ বিশ্বাস করে তাবিজের নিজেস্ব ক্ষমতা আছ, তবে সে শিরকে আকবারে লিপ্ত হলো। এ কারনে সে ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যাবে। শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা বা আল্লাহর ক্ষমতার সাথে অন্য কিছুর ক্ষমতাকে যুক্ত করা। ইসলাম বিশ্বাস করে, রোগ-শোক নিরাময় এবং সুরক্ষা একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন। কোনো তাবিজ বা অলৌকিক বস্তু এই ক্ষমতা রাখে না। তাই তাবিজ ব্যবহার ছোট শিরক।
শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য সঠিক উপায় হলো:
কোনো শিশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। ইসলামে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো পাঠ করার কথা বলা হয়েছে।
৩. নবজাতকের জন্য ‘আতুর ঘর’ ও ইসলামের নির্দেশনা
“আতুর ঘর” বলতে সাধারণত সেই কক্ষকে বোঝানো হয়, যেখানে একজন নবজাতকের জন্ম হয় এবং তার প্রাথমিক পরিচর্যা করা হয়। গ্রামাঞ্চলে এই ঘরকে প্রায়শই একটি বিশেষ পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয় এবং প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে সেখানে সহজে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। কিছু মানুষ মনে করে যে বাইরের লোক ঘরে প্রবেশ করলে শিশুর ক্ষতি হবে।
ইসলামে এই ধরনের কোনো কুসংস্কার বা ধারণার স্থান নেই। বরং ইসলাম নবজাতক ও তার মায়ের জন্য আরামদায়ক, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।
ক. আতুর ঘরের ইসলামী বিধান :
ইসলামে ‘আতুর ঘর’ বলে কোনো বিশেষ প্রথা নেই। সন্তান যে ঘরেই জন্ম নিক না কেন, সেই ঘরটি যেন পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ হয়, এটাই ইসলামের মূল নির্দেশনা। সন্তানের জন্মগ্রহণের পর মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই উত্তম ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। নবজাতকের জন্য এমন একটি পরিবেশ দরকার, যা ধুলো-ময়লা ও জীবাণুমুক্ত। প্রথাগত ‘আতুর ঘর’-এর ধারণা অনেক সময় অপরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করে, যা নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটি সমর্থন করে যে, নবজাতকের জন্য একটি জীবাণুমুক্ত এবং খোলামেলা পরিবেশ প্রয়োজন।
খ. কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলাম:
ইসলাম কুসংস্কার ও শিরক-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। বাইরের লোক ঘরে প্রবেশ করলে শিশুর ক্ষতি হবে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী। শিশুর ভালো-মন্দ আল্লাহর হাতে। এ ধরনের বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা থেকে বিচ্যুত করে এবং শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইসলামে যেকোনো বিপদ বা ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে, কোনো কুসংস্কার বা অযৌক্তিক রীতিনীতি নয়।
৪. কপালে কালো টিপ দিয়ে থাখে
কপালে কালো টিপ দেওয়া, যা অনেক সময় শিশুদেরকে কুনজর থেকে রক্ষা করার জন্য করা হয়, তা একটি প্রচলিত কুসংস্কার। ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই এবং এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ইসলামে শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ওপর ভরসা করা বা সেটিকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার মনে করা।
হিফাজতের মালিক আল্লাহ :
ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে, সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহরই রয়েছে। কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পেতে বা কোনো কল্যাণ লাভের জন্য একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে হবে।
কালো টিপকে যদি কুনজর থেকে রক্ষার মাধ্যম মনে করা হয়, তবে এটি আল্লাহর ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস না করে একটি বস্তুর ওপর ভরসা করার শামিল। এই ধরনের বিশ্বাস ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি শিরকের কাছাকাছি চলে যায়।
নবজাতককে যেকোনো অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য নবীজির (সা.) শেখানো দোয়া পাঠ করা উচিত, যেমন: “আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ”। এই দোয়াটি পাঠ করে শিশুদের ওপর ফুঁ দিলে আল্লাহই তাদের হেফাজত করবেন।
এই পরিস্থিতিতে মা-বাবার দায়িত্ব হলো সুন্দর ও সাবলীলভাবে মুরুব্বীদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তাদের ভালোবাসা ও অবদানকে সম্মান জানিয়ে বোঝাতে হবে যে, সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেছে এবং বর্তমানে আরও ভালো ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে।
৫. শিশুরা ফিরিশতা মনে করা :
শিশুদের নিষ্পাপ হওয়ার কারণে অনেক সময় আমরা বলে থাকি ‘শিশুরা ফিরিশতার মতো’। এই ধরনের কথা আবেগের বশবর্তী হয়ে বলা হলেও, এর পেছনে কিছু ভুল ধারণা থাকতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে, শিশু হলো মানুষ, ফিরিশতা নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষ এবং ফিরিশতাকে আলাদা আলাদা সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে। মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় ধরনের প্রবণতাই থাকে। ফিরিশতারা সৃষ্টি হয়েছেন নূর (আলো) থেকে। তাদের মধ্যে কোনো পাপ করার বা আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কোনো প্রবণতা নেই। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালন করে। যদিও শিশুরা নিষ্পাপ, কারণ তারা এখনো এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়নি যা তাদের পাপী করে তোলে, তবুও তারা মানুষেরই অংশ, ফিরিশতা নয়। তাই ফিরিশতাদের সাথে মানুষের তুলনা করা বা শিশুকে ফিরিশতা বলা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়।