ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। লোক দেখান সালাত আদায় করা

আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সালাত আদায় করে না। বৃদ্ধ অবস্থায় সালাত শুরু করে, তখন আর কুরআন সহিহ করে পড়ার সময় থাকে না। আবার অনেকের যখন বয়স বাড়ে, ছেলে মেয়েদের বিবাহ দেওয়ার সময় হয়, তখন চক্ষু লজ্জার ভয়ে দাড়ি রাখে পাশাপাশি সালাত শুরু করে। অনেকটা সমাজের ভয়ে কে কি বলে, এর জন্য সালাত শুরু। এভাবে সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে সালাত আদায় করা মুনাফিকের লক্ষন, পাশাপাশি ছোট শিরকেও বটে। মুনাফিকরা শৈথিল্য সহকারে সালাতে আসত কারন তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিদের (রাদি.) সালাতে হাজির দেখান। ঠিক যেভাবে মুমিনদের মুনাফিকেরা ধোকা দিত। আজকের সমাজের সমাজ রক্ষার সালাত ও ঠিক তেমনি ভাবে আল্লাহকে ধোকা দিচ্ছে আর তারা নিজেরা নিজেদের ধোকা দিচ্ছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَہُوَ خَادِعُہُمۡ ۚ  وَاِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا کُسَالٰی ۙ  یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَلَا یَذۡکُرُوۡنَ اللّٰہَ اِلَّا قَلِیۡلًا ۫ۙ

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। আন নিসা : ১৪২

আলা ইবনু আবদুর রহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি একদিন আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) এর বসরাস্থ বাড়ীতে গেলেন। আর বাড়ীটি মসজিদের পাশেই অবস্থিত ছিল। তিনি (আলা ইবনু আবদুর রহমান) তখন সবেমাত্র যুহরের সালাত আদায় করছেন। আলা ইবনু ’আবদুর রহমান বলেনঃ আমরা তার (আনাস ইবনু মালিকের) কাছে গেলে তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি আসরের সালাত আদায় করছ? আমরা জবাবে তাকে বললাম, আমরা এই মাত্র যুহরের সালাত আদায় করে আসলাম। এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ যাও আসরের সালাত আদায় করে আসো। এরপর আমরা গিয়ে আসরের সালাত আদায় করে তার কাছে ফিরে আসলে তিনি বললেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ ঐ সালাত হলো মুনাফিকের সালাত যে বসে বসে সূর্যের প্রতি তাকাতে থাকে আর যখন তা অস্তপ্রায় হয়ে যায় তখন উঠে গিয়ে চারবার ঠোকর মেরে আসে। এভাবে সে আল্লাহকে কমই স্মরণ করতে পারে। সহিহ মুসলিম : ৬২২, সুনানে তিরমিযী: ১৬০, নাসায়ী : ৫১১

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নামায পড়তে শুরু করল। এমতাবস্থায় নামাযের মধ্যেই সে দেখল, তাকে অন্য কেউ লক্ষ করছে তাই সে তার সালাতে রুকনগুলি ধীরস্থিরভাবে আদায় করল। সিজদা রুকুতে সময় বেশী লাগাল। যদিও এতে আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় সালাত হলো ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সালাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন মু’মিন ব্যক্তি এরূপ সালাত করতে পারে না।

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমাদের প্রতিপালক যখন তাঁর পায়ের গোড়ালির জ্যোতি বিকীর্ণ করবেন, তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষ সবাই তাঁকে সিজদা করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য সিজদা করত, তারা কেবল অবশিষ্ট থাকবে। তারা সিজদা করতে চাইলে তাদের পিঠ একখণ্ড কাঠফলকের মত শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯

মনে রাখতে হবে, সালাতের মধ্যে অন্য চিন্তা এসে যাওয়া এক কথা আর অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় ভিন্ন কথা। প্রথম অবস্থাটি মানবিক দুর্বলতার স্বাভাবিক দাবি আর অপরটি ইচ্ছাকৃত রিয়া।সালা্তে মনোনিবেশই ইহার ক্ষতিপূরণ। কিন্তু সালাত শুরু থেকে সালাম ফেরা পর্যন্ত একবারের জন্যও মনোনিবেশ না এলে কিন্তু সালাত সঠিকভাবে আদায় হয়েছে বলা যাবে না। তবে অন্যকে দেখিয়ে সালাত আদা্য় করলে সালাত সম্পুর্ন বাতিল হয়ে যাবে কারন এটা ছোট শিরকে । 

এভাবে নামাজের রুকু সিজদাহ মত কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সামনে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো ছোট শিরক। সওয়াবের আশায় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলো ব্যয় করা শিরক। কাজেই সালাত হেফাজতের জন্য কেবল আল্লাহর সামনে অনুগত বান্দারমত দাড়াতে হবে।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 حَـٰفِظُواْ عَلَى ٱلصَّلَوَٲتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلۡوُسۡطَىٰ وَقُومُواْ لِلَّهِ قَـٰنِتِينَ

তোমাদের নামাযগুলো সংরক্ষণ করো, বিশেষ করে এমন নামায যাতে নামাযের সমস্ত গুণের সমন্বয় ঘটেছে।  আল্লাহর সামনে এমনভাবে দাঁড়াও যেমন অনুগত সেবকরা দাঁড়ায়। সুরা বাকারা : ২৩৮

২। লোক দেখান বা লোক চক্ষুল লজ্জায় সিয়াম পালন করা

আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা ইসলাম সচেতন নয়। ইসলামি কোন ইবাদাতের সাথে সম্পৃক্ত থাকে না। এমন কি নিয়মিত সালাতও আদায় করে না। কিন্তু রমজান মাসের পরিবেশ পরিস্থিতির করানে সিয়াম রাখতে বাধ্য হয়। তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর হুকুম থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষেই বেশী ভয় পায়। এই ভাবে লোক দেখানো বা লজ্জার কারনে নিয়াম রাখা কবিরা গুনাহ। আমাদের সকল ইবদতের এক মাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়ামের মাধ্যমে আমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ

 يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡڪُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِڪُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 

হে ইমানদারগন, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। সূরা বাকারা : ১৮৩

সিয়ামের উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া। এখান আমারা যদি আল্লাহ ভয় না করে সমাজ ও সমাজের মানুষেই ভয়ে সিয়াম পালন করি, তবে রিয়া ছাড়া কি হবে?

৩।  হজ্জ্বের ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

হজ্জ্বের এমন একটি ইবাদাত যেখানে ছোট শিরকে পতিত হোওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সালাতের মত আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে হজ্জ্ব পালন করে। আল্লাহর রহমতে বান্দা যখন হজ্জ্ব করার যোগ্যতা অর্জন করে। অর্থাৎ যখন টাকা পয়সার মালিক হয়, তখন সে কার্পন্য করতে থাকে। মনে হয় এটাই সমাজের রীতি। কিন্তু সমাজ ও লোক চক্ষু ভয়ে, সে অনেকটা বাধ্য হয়েই হজ্জ্বে গমন করে। বলুন এটা কি ছোট শিরকে নয়? তার প্রমান, হজ্জ্ব পালন করার পরও তাহার মুখে দাড়ি উঠেনি, সালাতে গর হাজির, অন্যান্য ইবাদাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

আর এক শ্রেণীর লোকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল নামের পিছনে আলহাজ্ব লাগাবে। যদি আলহাজ্ব লাগানোর ইচ্ছায় হজ্জ্ব হয় তবে ছোট শিরকে হবে, এতে কোন সন্ধেহে নাই।

আবার অনেকের হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্য হল ব্যবসা করা। হজ্জ্ব করবে সাথে সাথে স্বর্ন নিয়ে দেশে ফিরবে। এতে হজ্জ্ব ও হল আবার লাভও হল। বেশ তো একই সাথে দু্‌ই কাজ। কাজ দুটিই হল কিন্তু ছোট শিরক হল নেকি পাবেন না। এসব আলম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি লোকর নিকট ন্যায় পরায়ন সাজার জন্য বা স্বনামধন্য হবার জন্য হজ্জ্ব পারন করল সে শিরক করল। (মুসনাদে আহম্মদ)।

দেখবেন অনেক বিধর্মী পৃথিবীতে আনাচে কানাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা তারা জানা বা দেখার নেষা থেকেই করছে। কেউ তাদের বাধ্য করছেনা। ঠিক কোন মুসলিম যদি  জানা বা দেখার নেষা থেকে হজ্জ্বে গমন করে তা হলে এটাও ছোট শিরক হবে।

লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা করা

শুধু লোক দেখাবার জন্য সে যেসব জাকাত বা দান ছদগা করা হয়। সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে স্রষ্টা মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের দানের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না। প্রবল বর্ষণে যেমন পাথরের উপরের মাটি ধুয়ে পরিস্কার করে দেয়, লোক দেখান আল্লাহর ছাড়া অন্যের সন্তষ্টির জন্য জাকাত বা দান ছদগা ও নেকিহীন পরিছন্ন দান হিসাবে পরিগনিত হয়। তার এই দান অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া নেয়ামতকে তাঁর পথে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করার পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ব্যয় করে অথবা আল্লাহর পথে কিছু অর্থ ব্যয় করলে ব্যয় করার সাথে কষ্টও দিয়ে থাকে, সে আসলে অকৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর অনুগ্রহ বিস্মৃত বান্দা। আর সে নিজেই যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় না তখন তাকে অযথা নিজের সন্তুষ্টির পথ দেখাবার আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন,

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

এবং যারা লোকদের দেখানোর জন্য স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনা, আর যাদের সহচর শাইতান। সে নিকৃষ্ট সঙ্গীই বটে। সুরা নিসা : ৩৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা রাকারা : ২৬৪

কাউকে খুশী করা, কারো প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য অনেকেই জাকাত দেন/দান করে থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে ছাওয়াবের নিয়তে যে কোনো ভাল কাজ করা ইবাদতেরই অংশ। আর ইবাদত পাওয়ার একমাত্র যোগ্য সত্তাই হচ্ছেন, মহান  রাব্বুল আলামীন। যে জন্য যে সকল ভাল কাজের সামান্য হলেও লোক দেখান বা প্রশংসা কুড়ানোর আশা বিদ্যমান থাকে, তা মূলত বাতিল। লোক দেখানো  অর্থ ব্যয় না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই অর্থ ব্যয় করলে আল্লাহ তাকে পুরাপুরি প্রতিদান দিবেন।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

۞ لَّيۡسَ عَلَيۡكَ هُدَٮٰهُمۡ وَلَـٰڪِنَّ ٱللَّهَ يَهۡدِى مَن يَشَآءُ‌ۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ فَلِأَنفُسِڪُمۡ‌ۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ وَجۡهِ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنۡ خَيۡرٍ۬ يُوَفَّ إِلَيۡڪُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ (٢٧٢)

অর্থ: মানুষকে হিদায়াত দান করার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হয়নি ৷ আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দান করেন ৷ তোমরা যে ধন-সম্পদ দান –খয়রাত করো, তা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো ৷ তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার জন্যই তো অর্থ ব্যয় করে থাকো ৷ কাজেই দান-খয়রাত করে তোমরা যা কিছু অর্থ ব্যয় করবে , তার পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোন ক্রমেই তোমাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হবে না। সুরা বাকারা : ২৭২

লোক দেখান অনিচ্ছাকৃত দান মুনাফিকের লক্ষন। মুনাফিকেরা আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য দান করত না। মনে গহিনে দানের প্রতিরোধ স্পস্ট তারপরও দান কারন লোক দেখান (রিয়া)। আল্লাহ কাছে তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত হবে না। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন,

 وَمَا مَنَعَهُمۡ أَن تُقۡبَلَ مِنۡہُمۡ نَفَقَـٰتُهُمۡ إِلَّآ أَنَّهُمۡ ڪَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَبِرَسُولِهِۦ وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ ڪُسَالَىٰ وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمۡ كَـٰرِهُونَ (٥٤)

অর্থ: তাদের দেয়া সম্পদ গৃহীত না হবার এ ছাড়া আর কোন কারন নেই যে, তারা আল্লাহ ও তার রসূলের সাথে কুফরী করেছে, নামাযের জন্য যখন আসে আড়মোড় ভাংতে ভাংতে আসে এবং আল্লাহর পথে খরচ করলে তা করে অনিচ্ছাকৃতভাবে।( সুরা তাওবা- ৯:৫৪)।

মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 وَٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٲلَهُمۡ رِئَآءَ ٱلنَّاسِ وَلَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۗ وَمَن يَكُنِ ٱلشَّيۡطَـٰنُ لَهُ ۥ قَرِينً۬ا فَسَآءَ قَرِينً۬ا (٣٨)

অর্থ: আর আল্লাহ তাদেরকেও অপছন্দ করেন, যারা নিজেদের ধন-সম্পদ কেবল মাত্র লোকদেরকে দেখাবার জন্য ব্যয় করে এবং আসলে না আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে আর না আখেরাতের দিনের প্রতি৷ সত্য বলতে কি, শয়তান যার সাথী হয়েছে তার ভাগ্যে বড় খারাপ সাথীই জুটেছে৷ (সুরা নিসা ৪:৩৮)।

৫। কোরবানি ক্ষেত্রে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা: 

শুধুই প্রশংসা বা বাহ বাহ কুড়ানোর জন্য হাটের সবচেয়ে বড় গরুটা আমার চাই দাম যা লাগে সমস্যা নাই। দাম বেশী হলেও সমস্যা নাই, মানুষতো প্রশংসা করল বা বাহ বাহ দিন তাতেই বা কম কিসে। অথবা শুধুই মাংশ খাওয়ার ইচ্ছা। এটা একটা প্রমাণিত কথা যে, পশু উৎসর্গ করে জবেহ করা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা শিরক।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন-

قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَا وَمَمَاتِيْ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ

বল, নিশ্চয় আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু, জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্য নিবেদিত। তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি এর প্রতি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলমান। সুরা আন আম ১৬২-১৬৩

আল্লাহ্‌ তাআলা আরো বলেন-

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাকে (হাউজে) কাওসার দান করেছি, সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর। সুরা আল কাওছার : ১ ও ২।

৬।  আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশে জ্ঞান অর্জন করা

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

বল, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? সুরা যুমার : ৯

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ*

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। সুরা ফাতির : ২৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡعِلۡمَ دَرَجَـٰتٍ۬‌ۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِيرٌ۬

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহ যাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন তাদেরকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। সুরা মুজাদালাহ : ১১

মুয়াবিয়া (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকেই দ্বীনী জ্ঞান দান করেন। সহিহ বুখারি : ৭১, ৩১১৬, ৩৬৪১, ৭৩১২, ৭৪৬০, সহিহ মুসলিম : ১০৩৭

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিলত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার উদ্দেশ্যে ইলম করা ছোট শির্ক বা কবিরা গুনাহ। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي رِيحَهَا

যে ইল্মের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা যায়, কোন লোক যদি দুনিয়াবী স্বার্থ লাভের জন্য তা শিক্ষা করে, তবে সে ক্বিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধি পাবে না। সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫২

জাবির বিন আবদ (রা.) থেকে নবী ﷺ বলেন, তোমরা আলিমদের উপর বহাদুরি প্রকাশের জন্য, নির্বোধদের সৎ ঝগড়া করার জন্য এবং জনসভার বড়ত্ব প্রকাশ করার জন্য ধর্ম জ্ঞান শিক্ষার জন্য। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, তার জন্য রয়েছে আগুন আর আগুন। সুনানে ইবনে মাজাজ : ২৫৪, সহিহ তারগীব : ১০২, আলবানী সহিহ বলেছেন

কাব ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, যে লোক আলিমদের সাথে তর্ক বাহাস করা অথবা জাহিল-মূর্খদের সাথে বাকবিতণ্ডা করার জন্য এবং মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশে ইলম অধ্যয়ন করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৬৫৪, মিশকাত : ২২৫

অতএব দ্বীনি ইলম অর্জন করা সবার জন্য খুবই জরুরি ও উপকারি। ইহার ফজিরত ও উপকার বলার অপেক্ষা রাখে না। কখন কখন দ্বীনি ইলম অর্জন করা ফরজে আইন হয়ে যায়। যেমন, আমলকারি যে আমল করবে, সে সম্পর্কে ইলম অর্জন ফরজে আইন। ইলম অর্জন ইবাদাত তাই গাইরুল্লার  উদ্দেশ্যে ইলম করা শিরক। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইলম অর্জন করতে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তা অর্জন করা যাবে না। অনেক টাকা পয়সা আয় করার জন্য ইলম অর্জন করে থাকে। আবার কেউ দুনিয়ার সুনাম সুখ্যাতি পাওয়ার আসায় ইলম অর্জন করে। সে ভাবে লোকে তাকে জ্ঞানি মনে করে সম্মান করবে। আলেম বলে সম্ভোধন করবে। কেই যদি এমনি ভাবে নিয়ত করে যে, আমি ইলম অর্জন করলে লোকে তাকে আলেম বলবে, ক্বারি বলবে, হাফিজ বলবে তবে তা শিরক হবে। পার্থিব সুনাম-সুখ্যাতির উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। হাদীস শরীফে এসেছে যে, জাহান্নামে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত তিন ব্যক্তির একজন হবে ঐ আলিম, যে লোকের কাছে আলিম হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার জন্য ইলম চর্চা করেছে।

লোক দেখান বিদআতী পদ্ধতিতে জিকির করাঃ 

জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সান্বিধ্য লাভ হয়। জিকির একটি ইবাদাত। আর এই নফল ইবাদাতটি করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মুসলিম ব্যক্তিকে সকাল বিকাল জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرً۬ا كَثِيرً۬ا  وَسَبِّحُوهُ بُكۡرَةً۬ وَأَصِيلاً

মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। সূরা আহযাব : ৪১-৪২

 নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর এই আদেশ পালন করছেন। সাহাবাদের (বা.) নিজ হাতে শিক্ষাদান করেছেন এবং তারা ও জিকির করেছেন। কাজেই তাদের ইবাদতের পদ্ধতির বাহিরে নতুন কোন পদ্ধতি আবিস্কার করলে বিদআত হবে। আল্লাহ তাকে স্মরন করার পদ্ধতি বর্নণা করে বলেন-

 وَٱذۡكُر رَّبَّكَ فِى نَفۡسِكَ تَضَرُّعً۬ا وَخِيفَةً۬ وَدُونَ ٱلۡجَهۡرِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأَصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ ٱلۡغَـٰفِلِينَ

হে নবী! তোমার রবকে স্মারণ করো সকাল সাঁঝে মনে মনে কান্নাজড়িত স্বরে ও ভীতি বিহ্বল চিত্তে এবং অনুচ্চ কণ্ঠে৷ তুমি তাদের অন্তরভুক্ত হয়ো না যারা গাফলতির মধ্যে ডুবে আছে৷ সুরা আরাফ : ২০৫

আবূ মূসা আল আশআরী (রা.) থেকে বর্নিত। তিনি বলেনঃ একবার নাবী ﷺ একটি গিরিপথ দিয়ে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, একটি চুড়া হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক ব্যাক্তি এর উগরে উঠে জোরে বলল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার। আবূ মূসা বলেন, তখন রাসুল ﷺ তার খচ্চরে আরোহী ছিলেন। তখন নাবী ﷺ বললেন, তোমরা তো কোন বধির কিংবা কোন অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। অতঃপর তিনি বললেন, হে আবূ মূসা অথবা বললেন, হে আবদুল্লাহ আমি কি তোমাকে জান্নাতের ধনাগারের একটি বাক্য বাতলে দেব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, বাতলে দিন। তিনি বললেন, তা হল ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ’। সহিহ বুখারী : ৬৪০৯, সহিহ মুসলিম : ৬৬১৮ ইফাঃ

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে জিকির করা যে রিয়া বা ছোট শিরক তাতে কেউ সন্দেহ করে না। এমনকি সশব্দে জিকির করার পক্ষে যারা মত দিয়েছেন তারাও ইহাকে রিয়া বা ছোট শিরক বলে বিশ্বাস করে। তাছাড়া মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে আল্লাহর জিকির করাতো মহান আল্লাহর নির্দেশ।

আল্লাহর স্মরনের পরিবর্তে গায়রুল্লাহকে স্মরন করলে শিরক হবে। শয়তান অনেক সময় মানুষকে গায়রুল্লার জিকির করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তখন তারা পীর, অলী, গাউস. কুতুর, জ্বীন,ভুত ইত্যাদির জিকির করে থাকে যা মুলত শিরকে আকবর। যারা হক পন্থিপীর দাবি করে, তারাও মুরিদদের পীরের ধ্যান করার আদেশ  দেন। আর শতভাগ ভন্ডরা বলে, জিকিরের সময় মনে করতে হবে আমার পীরের ক্বলব হতে যিকিরের তাছির, ফায়েজ, তাওয়াজ্জুহ সরাসরি আমার ক্বলবে প্রবেশ করছে। জিকির করব আল্লাহর আর ধ্যান করব পীরের আর ফায়েজও আসবে পীর থেকে এ কেমন অবিচার।

অনেক শিরক পন্থিপীর জিকিরের সুন্নাহ বিরোধী পদ্দিতি দিয়ে বলে থাকেন। এই পদ্দতিতে জিকির করতে পারলে অল্প দিনের মধ্যেই জিকিরের হালত পয়দা হবে। ক্বলবের মাকাম ও রং স্পষ্ট দেখা যাবে। শরীরকে হালকা মনে হবে। যিকিরের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিকভাবে মক্কা-মদিনা, আরশ, কুরসী, লৌহ মাহফুজ, জান্নাত প্রভৃতি বিষয়াবলী দেখতে পারবেন। আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পেলে অদৃশ্য জগতে ভ্রমণও করতে পারবেন। অর্থাৎ এলমে গাইবের অধিকারী হবেন।

কিন্তু দুঃথের বিষয় হল এমন হালত আমাদের অনুসরনীয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হয়নি। কোন সাহাবি এমনটি দাবি করছেন বলে কেউ প্রমান করতে পারবে না। তাহলে নিশ্চয় ইহা আলাদা তরিকা বা পথ। শিরকি পথ। ইহা ইসলামের কোন পথ নয়।

মানিক গজ্ঞের এক পীর তার অনেকগুলি লিখিত বই আছে। তার প্রতিটি বইয়ের শেষে তৃতীয় সবকের সাছিরে লিখেছেন, এই সবকের তাসিরে ছত্রিশ কোটি পশমের গোড়া গিয়ে আল্লাহর জিকির বাহির হবে। এবং কোন কোন সময় হালত এরকম হবে, দেখবেন, নাভী হতে দেহের উপরের অংশ কোটি কোটি মাইল উর্ধ্বে উঠে গিয়েছে। নাভির নিচের অংশ টুকু জমিনে পড়ে আছে। এ আবার কেমন হালত যা কোন নবী, রাসুল, সাহাবি কারোই হয়নি। যা কুরআনে নেই, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলে নাই, সাহাবিগন ও জানেন না, তা কি করে ইসলাম হয়?  আর যদি কেউ,  জিকিরের মাধ্যমে নামাযে বা অন্য কোনো ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়, কোনো ব্যক্তির বিশ্রামে সমস্যা করে, আওয়াজ বড় করে অর্থাৎ  চিৎকার করে বা মাইক ব্যবহার করে জিকির তবে তা সুন্নাহ বিরোধী হবে। এমন কি যে সকল জিকিরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করন নাই, সে সকল জিকিরে সময় ও সংখ্যা নির্ধারন করা সুন্নাহ বিরোধী।

 সুকণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত ক্ষেতে যে সব ছোট শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা:

কুরআন তেলাওয়াত করা নফল ইবাদাত হলেও আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। প্রত্যেক মুসলিমকে কুরআন পড়া জানতে হবে। সহিহ শুদ্ধ ভাবে কুরআন তেলাওয়াত না জানলে গুরিত্বপূর্ণ আমল সালাত পরিপূর্ন হবে না। তাই যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবী করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা করা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্ব প্রথম কুরআনের যে আয়াতটি নাজিল করেন তাতে কুরআন পড়ার নির্দেষ দান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ

পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সূরা আলাক : ০১

কুরআন শিক্ষায় কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। উম্মাতকে কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর। মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ৮৫৭২

কুরআন তেলাওয়াত করাকে আল্লাহ ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। মানুষ ব্যবসার জন্য নিজের অর্থ, শ্রম, ও মেধা নিয়োগ করে কিছু মুনাফা অর্জন করার জন্য। কিন্তু তার ব্যবসায় লাভ এবং ক্ষতি দুটিরই সম্ভাবনা থাকে। কুরআন তেলাওয়াত এমন ব্যবসা যেখানে লাভ ছাড়া কোন প্রকার ক্ষতির আশংকা নেই। কুরআন তিলাওয়াত আল্লাহর সাথে একটি লাভজনক ব্যবসা। । এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ (٢٩) لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ (٣٠) 

যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা ফাতির ৩৫:২৯-৩০]

যে কুরআন শিখা থেকে  থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কতইনা দুর্ভাগা! আলকুরআনে এসেছে,

 وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِڪۡرِى فَإِنَّ لَهُ ۥ مَعِيشَةً۬ ضَنكً۬ا وَنَحۡشُرُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ أَعۡمَىٰ (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِىٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرً۬ا (١٢٥) قَالَ كَذَٲلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَـٰتُنَا فَنَسِيتَہَا‌ۖ وَكَذَٲلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ (١٢٦

অর্থ: আর যে আমার যিকর (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে,  নিশচয় তার জীবন যাপন হবে  সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থয় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন?  অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ?  তিনি বলবেন, অনুরুপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অত:পর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। (সূরা ত্বহা ২০:১২৪-১২৬)।

 যে ব্যবসায় লাভ বেশী সেই ব্যবসায় লোকশান হলে ক্ষতির পরিমান ও বেশী হয়। কুরআন তেলাওয়াত যদি আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য না হয়ে অন্য কারনে হয়ে থাকে তবেতো ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াবাসিকে শুনানোর জন্য কুরআন তেলাওয়াত করল, সে ছোট শিরক করল। কুরআন তেলাওয়াত  ইবাদাত আর গাইরুল্লার জন্য ইবাদাত শিরক। অনেকের আবার কুরআন তেলাওয়াত খুবই সুমধুর। সবাই তাদের কুরআন তেলাওয়াত শুনেন আর প্রশংসা করে। প্রশংসা শুনে শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত করে। শ্রতাদের খুসি করার জন্য তেলাওয়াত নিশ্চই শিরক হবে। ইদনিং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কুরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কেউ যদি নিজের সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের জন্য তেলাওয়াত করে তবে তাও শিরক হবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা জুবুল হুযন’ হতে আল্লাহ তা’আলার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তারা প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জুব্বুল হুযন কি? তিনি বললেনঃ তা জাহান্নামের মধ্যকার একটি উপত্যকা, যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামও দৈনিক শতবার আশ্রয় প্রার্থনা করে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! তাতে কে প্রবেশ করবে? তিনি বললেনঃ যেসব কুরআন পাঠক লোক দেখানো আমল করে। তিরমিজি : ২৩৮৩  ইবনু মাজাহ : ২৫৬

১০। দুনিয়া লাভের আশায় কুরআন শিক্ষা করা বা শিক্ষা প্রদান করা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَاٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَلَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَلَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّاِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ

আর তোমাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারীস্বরূপ আমি যা নাযিল করেছি তার প্রতি তোমরা ঈমান আন এবং তোমরা তা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। সুরা বাকারা : ৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمْ تَسْـَٔلُهُمْ أَجْرًا فَهُم مِّن مَّغْرَمٍ مُّثْقَلُونَ

তুমি কি তাদের কাছে পারিশ্রমিক চাচ্ছ? ফলে তারা ঋণের কারণে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। (সুরা কালাম ৬৮:৪৬)

উবাই বিন কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যাক্তিকে কুরআন শিক্ষা দিলে সে আমাকে একটি ধনুক উপহার দেয়। আমি তা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তুমি এটি গ্রহণ করলে (জানবে যে), তুমি জাহান্নামের একটি ধনুক গ্রহণ করেছ। অতএব আমি তা ফেরত দিলাম। ইবনে মাজাহ : ২১৫৮

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা তিনি জনৈক কুরআন তিলাওয়াতকারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তখন কুরআন পাঠ করতে করতে (মানুষের নিকট) ভিক্ষা করছিল। তিনি “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজি ঊন’ পাঠ করে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কুরআন তিলাওয়াতকারী ব্যক্তি যেন এর দ্বারা শুধু আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করে। কেননা অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষের নিকট ভিক্ষা করবে। সুনানে ইবনে : ২৯১৭

যারা মাদ্রাসা নিজেদে পেশা হিসাবে শিক্ষাকতা করান তাদের ইহা ছাড়া অন্য কোন পেশা নাই তারা হাদিয়া বা বেতন হিসাবে টাকা নিতে পারবে। কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয কিনা এ ব্যাপারে ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা জবাব দেন যে, হ্যাঁ, আলেমগণের দুইটি মতের মধ্যে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে- কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেয়া জায়েয। দলিল হচ্ছে- নবী ﷺ এর বাণীর ব্যাপকতা “তোমরা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ কর এর মধ্যে আল্লাহর কিতাব সবচেয়ে উপযুক্ত। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] এছাড়া যেহেতু এর প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহই উত্তম তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ এর প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আল্লাহই ভাল জানেন। http://islamqa.info/bn/20100)

১১লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে জিহাদ

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হল, এক লোক বীরত্ব দেখানোর উদ্দেশ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, এক লোক গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে এবং এক লোক মানুষকে দেখানোর জন্য যুদ্ধ করে এদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার পথে তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা’আলার বাণীকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে শুধুমাত্র সেই আল্লাহর পথে (জিহাদ)। সুনানে তিরমিজি : ১৬৪৬ সুনানে মাজাহ : ২৭৮৩

হযরত আবু মুসা আশ’আরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ এক ব্যক্তি শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের জন্য, এক ব্যক্তি আত্মগৌরব ও বংশীয় মর্যাদার জন্য এবং অপর এক ব্যক্তি লোক দেখানের জন্য লড়াই করে। এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করে? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার জন্য লড়াই করে সে-ই আল্লাহর পথে রয়েছে। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

হযরত আবু বাকরাহ নুফাই’ ইবনে হারিস সাকাফী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন দু’জন মুসলমান তরবারী কোষমুক্ত করে পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়। আমি নিবেদন করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর জাহান্নামের হকদার হওয়াটাতো বুঝলাম; কিন্তু নিহত ব্যক্তির জাহান্নামী হওয়ার কারণটা কী? রাসূলে আকরাম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কারণটা হলো এই যে, সেও তো  তার প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছিল। (বুখারী, মুসলিম ও রিয়াযুস স্ব-লিহীন)।

এক ব্যক্তি  কাছে এসে বললেন, ঐ ব্যক্তি সম্মন্ধে কি বলেন, যে ব্যক্তি সোওয়াব ও সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তিন বার পূণরাবৃত্তি করল। তিন বার একই উত্তর দিলেন। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য কৃত আমল ব্যতিত, যা দ্বারা আল্লাহ সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। (সুনানে নাসাঈ : ৩১৪২)

১২ নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা আল ইমরান : ১৮৮

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রসূলুল্লাহ ﷺ বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রসূলুল্লাহ ফিরে আসলে তাঁর কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো-

 لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّہُم بِمَفَازَةٍ۬ مِّنَ ٱلۡعَذَابِ‌ۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬ *

যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, আল ইমরান-১৮৮। সহিহ বুখারি : ৪৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ২৭৭৭)

নিজেদের প্রশংসা শুনতে সবার ভাল লাগে, তাও যদি আবার অন্যায় কাজ করে। ভালো কাজ করে প্রশংশা শুনতে চাওয়া রিয়ার মত গুনাহ হয়। নিজের বদ আমল নিয়ে আনন্দিত হওয়া বা প্রশংসা শুনতে চাওয়া জঘন্য কবিরা গুনাহ।

রিয়া থেকে মুক্তির উপায়

১।  সম্মান, সুনাম, সুখ্যাতি লাভের ইচ্ছা্ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, ইহা অন্তর থেকে বের করতে হবে।

২। কোন আমল শুরু করার আগেই বার বার অন্তরের নিয়ত পরিশোধিত করা। রিয়ার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা।

৩।  আমল করার সময় রিয়া আসাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। খুব কম লোকই আছে যাদের রিয়া আসেনা।  কাজেই রিয়া আসার সাথে সাথে নিয়ত সহিহ করতে হবে। যত বারই অন্তরে রিয়া আসবে ততবারই নিয়ত সহিহ করতে হবে। আমর না ছেড়ে  সহীহ নিয়ত অন্তরে উপস্থিত করে আমল করে যেতে হবে।

৪। যে ইবাদত প্রকাশ্যে করার বিধান (নামাজ, সালাত, সাওম, হজ্জ্ব, জাকাত, দ্বীন প্রচার, জিহাদ ইত্যাদি) তাতো প্রকাশ্যে করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য ইবাদত যেমন: নফল সালাত, দান সদকা, তাহাজ্জুদ, নফল সাওম, মানুষের উপকার ইত্যাদি গোপনে করার চেষ্টা করতে হবে।

৫।     শিরক থেকে  বাচার জন্য রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন।

দুয়াটি হচ্ছে:

اللَّهُمَّ  إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَلِمَا لاَ أَعْلَمُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।

অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

(আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩; হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬)।

উপরের আমলগুলি অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে আশা করা যায় মহান আল্লাহ ধীরে ধীরে আমাদের ইবাদত রিয়া মুক্ত করে দিবেন। ইনশাআল্লাহ। আমিন। সুম্মা আমিন।

ফারওয়াহ ইবনু নাওফাল (রা.) হতে তার পিতার সূত্র থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাওফাল (রা.)-কে বলেনঃ তুমি “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” সূরাটি পড়ে ঘুমাবে। কেননা তা শিরক হতে মুক্তকারী। সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *